বীজগণিতের ইতিহাস - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

24 September, 2026

বীজগণিতের ইতিহাস

বীজগণিতের ইতিহাস, the history of algibra
এরূপ প্রবাদ আছে যে ভাস্করাচার্য তাঁর বিধবা কন্যা লীলাবতীকে পাটীগণিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত শিরোমণির পাটীগণিত অংশ লিখেছিলেন বলে তার নাম লীলাবতী। এ প্রবাদ সত্য নয়। লীলাবতীতে যেমন 'অয়ি বালে লীলাবতী'- হে বালিকে লীলাবতী বলে সম্বোদন রয়েছে তেমন 'ব্রুহি সখে' ও ব্রুহি কান্তে' সখা ও কান্তা বলেও সম্বোধন রয়েছে। নিজের মেয়েকে কেউ সখা ও কান্তা বলে সম্বোধন করতে পারে না। আমার মনে হয় লীলাবতী বলতে এখানে কোন মহিলাকেই বোঝায় না, লীলাবতী শব্দের অর্থ গুণসম্পন্না। এই অর্থে সিদ্ধান্ত শিরোমণির গোড়ায় লীলাবতী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, 'লালিত্য লীলাবতী' মাধুর্য গুণসম্পন্না। নিজের পুস্তককে নিজেই গুণসম্পন্ন বলা যুক্তিবিরুদ্ধ- এই আপত্তি টিকতে পারে না, কারণ ভাস্করাচার্য সিদ্ধান্ত শিরোমণির গোলাধ্যায়ের শেষেও লিখেছেন 'কবি ভাস্কর পণ্ডিতগণের সন্তোষপ্রদ, সুব্যক্ত, সুযৌক্তিক বাক্যবহুল, সহজবোধ্য, কুবুদ্ধি বিনাশক এই সিদ্ধান্ত গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।'

বীজগণিতেও হিন্দুদের কৃতিত্ব যথেষ্ট। 'যদিও শেষোক্ত বিজ্ঞান (বীজগণিত) একটি আরবী নামে অভিহিত, তথাপি এ দান আমরা হিন্দুদের কাছ থেকেই পেয়েছি' (Macdonel) 'যে সময় আরবরা বীজগণিতের কিছুই জানত না সেই সময়ে (অর্থাৎ আরবদের বহুপূর্বে) হিন্দুরা বীজগণিত আবিষ্কার করে' (কোলব্রুক)। বীজগণিতের ইংরেজী নাম অ্যালজেবরা (Algebra)। আরবদের মধ্যে বীজগণিতের প্রথম লেখক মহম্মদ মুশাআল্ খোয়ারেজমী (৮২৫ খৃঃ) কৃত 'আলজেব-ওয়াল-মোকাবেল' নামক বীজগণিতের গ্রন্থের নাম থেকে ঐ শব্দ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপ আরবদের কাছ থেকে বীজগণিত শিক্ষা করে, কিন্তু আলখোয়ারেজমী তাঁর বীজগণিতের জ্ঞান হিন্দুদের কাছ থেকেই লাভ করেছিলেন।
আরবরা হিন্দুদের কাছ থেকে কেবল যে বীজগণিতের মূল পেয়েছিল তা নয় তারা গণনাপ্তক ও দশ ধরে গণনা পদ্ধতিও হিন্দুদের কাছ থেকেই পায়' (মনিয়ার উইলিয়ামস্)। যদিও গ্রীক ও চীনারাও প্রাচীনকালে বীজগণিতের চর্চা করেছিল, তথাপি এই বিজ্ঞানে হিন্দুরাই অধিকতর ব্যুৎপত্তি লাভ করে।
ডাঃ বিভূতিভূষণ দত্তের মতে আধুনিক বীজগণিতের আকার ও ভাব মূলতঃ হিন্দুদের। হিন্দুরা বীজগণিত ও অব্যক্তগণিত এই দুই নামেই এই শাস্ত্রকে অভিহিত করত। অব্যক্ত গণিত অর্থ অজ্ঞাত রাশির গণনা বিজ্ঞান, আর বীজ শব্দের অর্থ মূল বা কারণ। ঋণাত্বক সংখ্যা (negative number) প্রয়োগের জন্য জগৎ হিন্দুদের কাছে ঋণী। প্রথম ধন (Positive) ও খনন সংখ্যাকে যথাক্রমে ঋক্ ও অনূক বলা হত; পরবর্তীযুগে ব্রহ্মগুপ্ত প্রভৃতি গণিত পণ্ডিতরা এদের ধন ও ঋণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বীজগণিতে সমীকরণ (equation) শব্দও প্রথম। হিন্দু গণিতজ্ঞ ব্রহ্মহ্মগুপ্ত (৬২৮ খৃঃ) তা আবিষ্কার করেন। হিন্দু গণিতে চার রকমের সমীকরণের উল্লেখ পাওয়া যায়: ১) একবর্গ সমীকরণ ২) অনেকবর্গ সমীকরণ ৩) মধ্যমাহরণ ও ৪) ভাবিত (Simple, Simultaneous quadratic equation and equation involving products to two unknown quantities)। বর্গসমীকরণের (Quadratic equation) নাম মধ্যমাহরণ হওয়ার কারণ মধ্যম সংখ্যা অপনয়নের দ্বারা ঐ সমীকরণের সমাধান। এই প্রণালী প্রথম শ্রীধরাচার্য অবিষ্কার করেন।
বর্গ সমীকরণে অজ্ঞাত সংখ্যার ধন ও ঋণ এই দুইটি মূল্যই বের হতে পারে তা হিন্দু গণিতজ্ঞ পদ্মনাভের আবিষ্কার। শ্রীধরাচার্য ও পদ্মনাভ কৃত গণিতের পুস্তক এখনও পাওয়া যায় নি। ভাস্করাচার্যের গ্রন্থে তাঁদের নাম ও উপরোক্ত অবিষ্কারের উল্লেখ পাওযা যায়। বর্গসমীকরণে ভাস্করাচার্যের প্রণালী শ্রীধরাচার্যের প্রণালী থেকে তফাৎ এবং তা বর্তমান প্রচলিত প্রণালীরই অনেকটা অনুরূপ। হিন্দুরা বর্গসমীকরণের পূর্বে সমাধান করতে পারত। অনিশ্চিত একবর্গ সমীকরণ (Indeterminate equation of the first degree) বা কুটকের সমাধান আর্যভট্টের গ্রন্থেই পাওয়া যায়। তারপর অন্যান্য হিন্দু বীজগণিতজ্ঞদের চেষ্টায় ইউরোপের বহুপূর্বে সাধারণ সমাধান আবিষ্কৃত হয়।
আধুনিক কালে ১৬২৪ সালে Bajel De Maziriak ঐ নিয়ম পুনরায় আবিষ্কার করেন এবং Oylar ও Lagraze তার উন্নতি সাধন করেন। উপরোক্ত ইউরোপীয় গণিতজ্ঞদের প্রণালী ও আর্যভট্ট আবিষ্কৃত নিয়ম ফলতঃ একই। ভাস্করাচার্য অনিশ্চিত বর্গ সমীকরণেরও (Indeterminate equation of the 2nd degree) সাধারণ সমাধান আবিষ্কার করেছিলেন। এ বিষয়ে অংক শাস্ত্রের ইতিহাস প্রণেতা Kazori লিখেছেন 'অনিশ্চিত সমীকরণ বিদ্যায় হিন্দুরা বেশ একটা সহজ নিজস্ব ভাব দেখিয়েছেন। আমরা আগেই বলেছি যে এ বিষয়টি গ্রীক বীজগণিতজ্ঞ Diophantus এর প্রিয় ছিল এবং তিনি কয়েকটি নির্দিষ্ট উদাহরণের সমাধান করতে অফুরন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু অংকশাস্ত্রের এই সূক্ষ্ম বিভাগে সাধারণ আবিষ্কারের গৌরব হিন্দুদেরই।'
-----------
* মহাবীর - দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের অধিবাসী। গুনোত্তর প্রগতি, দ্বিঘাত সমীকরণের তিন প্রকার সমাধান, উপবৃত্ত, ভগ্নাংশ প্রভৃতির আলোচনার জন্য ভারতীয় গণিতের ইতিহাসে তাঁর আসন চিরকালের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত থাকলেও দ্বিঘাত সমীকরণের ক্ষেত্রে কাল্পনিক মূল অবশ্য তিনি বাদ দিয়ে গেছেন। তাঁর গণিত আলোচনা ব্রহ্মহ্মগুপ্ত অপেক্ষা বিশদ ও ব্যাপক হলেও মৌলিকতার দিক হতে তিনি ব্রহ্মগুপ্তের থেকে নিকৃষ্ট ছিলেন।
* আর্যভট্ট- আর্যভট্ট প্রণীত মহাসিদ্ধান্তেরই অপর নাম আর্যসিদ্ধান্ত। ইনি খ্রীষ্টীয় দশম শতাব্দীতে বিদ্যমান ছিলেন। বৃদ্ধ আর্যভট্ট এবং আর্যভট্টীয় প্রণেতা আর্যভট্ট হতে ইনি পৃথক ব্যক্তি। কোন কোন বিষয়ে ভাস্কারাচার্য আর্যসিদ্ধান্তকার আর্যভট্টের কাছে ঋণী ছিলেন। আর্যভট্ট বলেছেন 'ভপঞ্জরঃ স্থিরো ভুরেব বৃত্যাবৃত্য' ইত্যাদি। অর্থাৎ নক্ষত্রখচিত নভোমণ্ডল স্থির হলেও স্বীয় মেরুদণ্ড অবলম্বন পূর্বক ভ্রমণ করে। সেই জন্যেই গ্রহনক্ষত্রগণের উদয়াস্ত প্রতীয়মান হয়। তাঁর অপর সিদ্ধান্ত 'বৃত্তভপঞ্জরমধ্যে কক্ষয়া পরিবেষ্টিতঃ' ইত্যাদি। এইরূপ চিন্তাধারা থেকেই ভাস্করাচার্য রলেছেন 'নান্যাধার স্বশক্তৈব বিয়তি নিয়তং তিষ্ঠতীহাস্য পৃষ্ঠে ইত্যাদি। অর্থাৎ পৃথিবীর কোন আধার নাই নিয়ত অন্তরীক্ষে অবস্থান করে এবং আমরা তার পৃষ্ঠদেশে বাস করছি। তাঁদের এসব গবেষণাই প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানচর্চার প্রমাণ। পৃথিবীর আবর্তনের জন্য দিবারাত্রি ভেদ হয়, এই তত্ত্ব আর্যভট্ট প্রথম আবিষ্কার করেন। তাঁর মত খণ্ডনের জন্য লল্ল, *বরাহমিহির ও ব্রহ্মগুপ্ত যে সমস্ত যুক্তি দিয়েছিলেন, ইউরোপে কোপার্নিকাস কর্তৃক ভূভ্রমণবাদ আবিষ্কারের পর সেই মত খণ্ডনের জন্য তায়কোভ্রূহি নামক জ্যোতির্বিদ হিন্দু জ্যোতিষীদের প্রায় একহাজার বৎসর পরে ঠিক ঠিক তাঁদের যুক্তিগুলিও প্রয়োগ করেছিলেন।
* ব্রহ্মগুপ্ত - ব্রহ্মগুপ্ত আর্যভট্টের পর গণিত ও জ্যোতিষে বিশেষ স্বকীয়তার পরিচয় দেন। অধ্যাপক সার্টন লিখেছেন, 'One of the greatest scientists of his race and the greatest of his time', হিন্দু ভারতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থক্ষেত্র উজ্জয়িনী ছিল তাঁর বিজ্ঞান সাধনার ক্ষেত্র। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে তিনি 'ব্রহ্ম-স্ফুট সিদ্ধান্ত' রচনা করেন। বৃদ্ধ বয়সে খন্ড-খাদাক (যার আরবী অনুদিত নাম অর্কন্দ) ও উত্তর খন্ড খাদ্যক নামে আরও দুখানি জ্যোতিষীয় গ্রন্থ রচনা করেন। যার খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আরবী ভাষায় অনুদিত হয়ে এর নাম হয় 'সিন্হিন্দ'। দিনের যে কোন সময়ে গ্রহদের সঠিক গতি ও অবস্থান কিভাবে নির্ণয় করা ছাড়াও লম্বন, সূর্যের উন্নতি, বলন ইত্যাদি জ্যোতিষীয় বিষয়ের নির্ভুল গণনা-পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় মাত্রার নির্ণেয় ও অনির্ণেয় সমীকরণ ও বৃত্তস্থ চতুর্ভুজের নানা ধর্ম আবিষ্কার করে তিনি গণিতের ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।
* শ্রীধর - প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ শ্রীধর আবির্ভূত হন দশম শতাব্দীর শেষভাগে। আনুমাণিক ১০২০ খৃঃ তিনি রচনা করেন 'গণিতসার' বা 'ত্রিশতিকা'। শূণ্যের (০) তাৎপর্য বর্ণনায় শ্রীধর ত্রিশতিকার এক শ্লোকে যা লিখেছেন তার সাংকেতিক অর্থ হল a±= 0; 0 x a=o; a x 0= o অধ্যাপক সার্টনের মতে সংস্কৃত ভাষায় শূন্যের গুণ ও তাৎপর্য সম্বন্ধে এটাই সর্বাপেক্ষা পরিস্কার ও প্রাঞ্জল, আলোচনা। দ্বিঘাত সমীকরনের সমাধানের সূত্র তাঁরই প্রথম আবিষ্কার।
* ভাস্ককাচার্য - প্রাচীন ভারতে আর আর একজন ভাস্করাচার্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন বেদান্ত ভাষ্যকার- সিদ্ধান্তশিরোমণি প্রণেতা ভাস্করাচার্যের উর্ধ্বতন ষষ্ঠপুরুষ। তিনি ৯ম খ্রীষ্টাব্দের লোক। রাজা মিহিরভোজ তাঁকে 'কবি চক্রবর্ত্তী' উপাধি প্রদান করেন। তাঁর বেদান্ত-ভাষ্য বিশিষ্টাদ্বৈতাবাদের অন্তর্ভুক্ত। ভামতীকার বাচস্পতি মিশ্র কর্তৃক তাঁর মতবাদ খণ্ডিত হয়।
* বরাহমিহির - বরাহমিহির ছিলেন ভারতবর্ষের প্লিনি। তাঁর জ্ঞান ছিল বিশ্বকোষের মত ব্যাপক। গণিত, জ্যোতিষ, ফলিত জোতিষ, ভূগোল, মণিকবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা প্রভৃতি নানা বিদ্যায় তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন এবং গ্রন্থ রচনা করো কিন্তু তাঁর বিদায় ভার যত ছিল ধার তত ছিল না। প্রাচীন হিন্দু বিজ্ঞান, বিশেষতঃ জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বরাহের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতিষীয় গ্রন্থ 'পঞ্চসিদ্ধান্তিকা'। এতে তিনি তিনি পৌলিশ, রোমক, বাশিষ্ট, সূর্য ও পৈতামহ সিদ্ধান্তের আলোচনা করেছেন। বরাহের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ 'বৃহৎ-সংহিতা'। এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় ফলিত জ্যোতিষ। মানুষের উপর গ্রহাদির প্রভাব কাটাবার জন্য তিনি দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান নানাবিধ প্রস্তর, মনি, মুক্তা, প্রবাল এর বাহ্যিক গুণাগুণ সম্বন্ধে বহু তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনিই প্রথম নানারূপ রঞ্জক দ্রব্য বকুল, উৎপল, চম্পকের গন্ধ অনুকরণ করে কৃত্রিম উপায়ে সুগন্ধি দ্রব্য, ধাতু নিষ্কাশন বিদ্যা, বজ্রলেপ নামক সিমেন্ট জাতীয় পদার্থের কথা ভারতবাসীকে জানিয়ে গেছেন। বরাহমিহির ক্ষুদ্র-বৃহৎ কয়েকটি জাতক রচনা করেছিলেন, যা আলবিরুনী আরবী ভাষায় অনুবাদ করেন।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

অসুর কারা?

অসুর বলতে দৈত্যদানা মানুষখেকো কোন জীব নয়। অসুররা ভারতেরই একটি সভ্য জাতি। হায়দ্রাবাদে একটি স্থান রয়েছে, তার নাম অসুরগড়, সেখানেও তামার খনি আছে...

Post Top Ad

ধন্যবাদ