পরবর্তীকালে Indian Antiquary তে কীলহর্ণ সাহেবের সম্পাদিত একটি তাম্রশাসনের অনুলিপি দেখি। ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে কীলহর্ণ ঐ তাম্রশাসনটি সম্পাদনা করেন। তাতে লেখা আছে
'ও স্বস্তি শ্রীপ্রয়াগসমীপ-গঙ্গাতটবাসে-পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ-পরমেশ্বর-শ্রীবিজয় পালদেব-পদানুধ্যাত-পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ-পরমেশ্বর-শ্রীরাজ্যপালদেব-পাদানুধ্যাত-পর মভট্টারক-মহারাজাধিরাজ-পরমেশ্বর-শ্রীমন্ত্রিলোচনপালদেবঃ অসুরাভক বিষয়ে লেডুন্ডাকগ্রামে সুমপগতান রাজপুরুষান ব্রাহ্মণোত্তরাংশ।"
তাম্রশাসনটির তারিখ ১০৮৪ বিক্রমাব্দ। এর অর্থ হল পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ পরমেশ্বর রাজ্যপালদেবের পাদানুধ্যাত ত্রিলোচন-পাল প্রয়াগ সন্নিকটে গঙ্গাতীরে বাসকালে (অসুরাডক) বিষয়ান্তর্গত লেডুন্ডাক গ্রামে যে সমস্ত রাজপুরুষ এবং ব্রাহ্মণোত্তরগণ উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁদেরকে সংবাদ দেন। এখানে অসুরাডক শব্দটি লক্ষ্য করুন, এর অর্থ অসুররাজদের অধিকারভুক্ত। অর্থাৎ বিজয়পালদেব, রাজ্যপালদেব এবং ত্রিলোচনপালদেব প্রভৃতি অসুরবংশের রাজা ছিলেন। তাঁদের নিরীহ নামগুলি থেকে কি তাঁদেরকে পাতাল বা সমুদ্রগর্ভবাসী কোন অন্ধকার রাজ্যের বীভৎস কোন জীব বলে মনে হচ্ছে।
আসল কথা- অসুররা আমাদেরই মত মানুষ। ভারতেরই একটি সুপ্রাচীন জাতি। এই অসুরদেরই একটি শাখা ইরাণে গিয়ে বসবাস করেছিল। ইরাণীদের ধর্মগ্রন্থ আবেস্তাতে 'অহুর' শব্দটি অসুর শব্দেরই অপভ্রংশ। 'শব্দটি খুবই মর্যাদাসূচক। আহুর মাজদা তাঁদের পরমেশ্বরের নাম। বেদে ১০৫ বার অসুর শব্দের উল্লেখ আছে। তার মধ্যে ৯০ বারই ভাল অর্থে ব্যবহৃত। যেমন অসুরঃ অসু ক্ষেপণে শত্রুণ ইত্যসুরঃ। যারা শত্রুদের উপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে পটু তারা অসুর। কিংবা অসুন্ প্রাণান রাতি দদাতি ইত্যসুরঃ। যারা প্রাণদান করে, যাদের মধ্যে দুর্দম প্রাণশক্তির প্রকাশ দেখা যায়, সেই সমস্ত বলিষ্ঠ বীররাই অসুরপদবাচ্য। যাস্ক তার নির্ঘন্ট ও নিরুক্ত (৩।৮) গ্রন্থে বলেছেন যে অস্ ধাতু হতে অসুর শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। তাঁর মতে অস্ শব্দ যার অর্থ শ্বাসবায়ু-হতেও অসুর শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে। তাঁর মতে অসু শব্দ যার অর্থ শ্বাসবায়ু তা হতেও অসুর শব্দ নিষ্পন্ন হতে পারে।
বৈদিক যুগের গোড়ার দিকে যারাই শৌর্যে বীর্যে বড় হতেন, তাঁরাই অসুর উপাধিতে ভূষিত হতেন। রুদ্র, মরুৎ, দৌৗ, বরুণ, ত্বষ্টা, অগ্নি, বায়ু, পুষা, সবিতা, পর্জন্য এঁদের অলৌকক শক্তি ছিল বলে এঁদেরকে বৈদিক ঋষিরা অসুর বলতেন। যথা-
মরুৎ (ঋগ্বেদ)
তে জঙিরে দিব ঋদাস উক্ষণো রুদ্রস্য মর্যাসুরাঃ অরেপসা।
রুদ্র (ঋগ্বেদ ৫/৪২/২১) যক্ষবামহে সৌমনসায় রুদ্রম্ নমোভির্দেবং অসুরুৎ দেবস্য।
দৌৗ (ঋগ্বেদ ) ইন্দ্রায় হি দৌরসুরো ইত্যাদি
ইন্দ্র (ঋগ্বেদ ) বৃহচ্ছবা অসুরো বহুনা কৃতঃ পুরো হরিভ্যাং বৃষভো রথো হি যা।
বরুণ (ঋগ্বেদ) ত্বং বিশ্বেষাং বরুনাসি রাজা যে চাদেবা অসুর যে চ মত্তঃ।
অগ্নি (ঋগ্বেদ ৫/১২/১) প্রাহ্ময়ে বৃহতে যজ্ঞিয়ায় ঋতস্য অসুরায় মন্ম।
সেযুগে ধর্মীয় আচার আচরণকে কেন্দ্র করে ভারতীয়রা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছলেন। একদল বেদ মানতেন। সেই বেদপন্থীদের মধ্যে ভূক্ত অগ্নিপূজার প্রচলন করেন। তাঁরা যজ্ঞ নিয়ে মেতে রইলেন। এঁদেরই নাম হল- দেব। শতপথ ব্রাহ্মণে তাই দেবের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে যজ্ঞেন বৈ দেবাঃ (১/৫/৫/২৬) , আর যাঁরা যজ্ঞ করতেন না, তাঁদের নাম হয়ে গেল অসুর। প্রথম প্রথম দেব ও অসুরের মধ্যে খুব সৌভ্রাতৃত্ব ছিল। কিন্তু পরে খুব শত্রুতা দেখা দেয়, অনেক বড় বড় যুদ্ধ হয়। দেবতাদের নেতা ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে বধ করেন। শত্রুতা সুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে 'অসুর' শব্দটি খারাপ অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকলো যেমন অসুরাঃ রাক্ষসাঃ দেবনিন্দকাঃ ইত্যাদি। ১০৫ বারের মধ্যে ৯০ বার বাদ দিলে বাকী ১৫ বার ঐ রকম খারাপ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই থেকেই কল্পনা-সম্রাট পুরাণকার থেকে আরম্ভ করে ঠাকুরমার ঝুলির রচয়িতার হাতে পড়ে অসুররা এক ভীতিপ্রদ অমানুষের পর্যায়ে নেমে গেল।
বৈদিক যুগের শেষভাগে যজ্ঞবাদী আর্যদের সঙ্গে অসুরদের বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। অসুরজাতির অধিকাংশ ভারত ত্যাগ করে পারস্য ও তুর্কীস্থানে গিয়ে বাস করতে থাকেন। বাকী যাঁরা রইলেন, তাঁরা প্রয়াগ, ছোটনাগপুর, তিব্বত বা কামরূপের দিকে চলে যান। পূর্বে যে তাম্রশাসনের উল্লেখ করেছি, সেই তাম্রশাসন বর্ণিত প্রয়াগের ত্রিলোচনপালদেব প্রভৃতিরা এই অসুর জাতিরই শাখা। ছোটনাগপুরে এখনও একটি জাতির সন্ধান পাওয়া যায়
- সংখ্যায় অল্প হলেও এরা অসুর জাতি নামে পরিচিত। এরাও তান্ডপ্রিয়, ছোটনাগপুরের তাম্রখনিতে কাজ করে। প্রত্নতত্ত্ববিদ্রা এদেরকে সেই প্রাচীনকালের বিধ্বস্ত ও বিতাড়িত অসুরদেরই বংশধর বলে মনে করেন।
ওদিকে, অসুরদের যে বড় দলটি ভারতের বাইরে গেলেন, এখন হতেও হাজার বছর পূর্বে তারাই ব্যাবিলনের শতক্রোশ উত্তর পশ্চিমে এক সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। এই সাম্রাজ্যের নাম হয় 'অসুর' বা 'আসীরিয়া'। টাইগ্রীস নদীর উপকূলে এঁদের যে রাজধানী স্থাপিত হয় তার নাম হয়- অসুর। আসীরিয়দের এক গ্রাম্য দেবতার নামও হয় অসুর। আসিরীয়দের সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রাম্য দেবতা জাতীয় দেবতায়। পরিণত হয়। আসিরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার একটি। ব্যাবিলনের কন্দর এরিডুতে যে দেবতার পূজা হত, তাঁরও নাম ছিল অসরি (Asari)। এই নাম যে অসুর শব্দের অপভ্রংশ তা ধারণা করা চলে। ব্যাবলনীয়দের রাজন্যবর্গের নামমালার মধ্যে অসরু (Asuru), অসুর-নসির-পাল (Asumasipal), অসুর-বনিপাল (Asurbanipal) নামগুলি পাওয়া যায়। মোট কথা, যাদের বাসস্থানের নাম আসিরীয় বা অসুর, রাজাদের নাম অসুর উপাধিযুক্ত এবং উপাস্য দেবতার নাম অসরি বা অসুর তারাই অসুর নামে অভিহিত।
ভারতীয় অসুরগণ দুর্গ নির্মাণে পটু ছিলেন। বেদে তার বহু প্রমাণ পাই। শম্বর অসুরের ছিল ১০টি দুর্গ (ঋগ্বেদ ১/১৩০/৭)। বর্তী অসুরের লক্ষ লক্ষ যোদ্ধা ছিল, তিনি নিজেও ছিলেন দুর্দান্ত, বীর (৬১০/১৫১/৩)। পিক্ অসুরেরও বড় বেল্লা ছিল। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে দেখি ইন্দ্র পিপরুর কেল্লা নষ্ট করে দিয়েছিলেন (১০/১৩৮/৩)।
এদিকে আসিরীয় অসুরদের যে পরিচয় পাই, তাতে তারাও যে যুদ্ধবিদ্যায়-পটু ছিলেন তারও ইতিহাস সম্মত প্রমাণ আছে। তাঁদেরও দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল। কালক্রমে বাহুবলে এশিয়া মাইনর হতে ককেশাস পর্বত পর্যন্ত নিজেদের অধিকার, বিস্তার করেছিলেন।
ভারতের অসুরজাতি এবং আসিরীয় অসুরজাতি যে একই জাতি তা বলবার আরও তিনটি কারণ আছে-
(ক) আসিরীয়রা দুরকম শ্মশান তৈরী করতেন। একটি ছিল তাঁদের তাঁবুর আকৃতি আর একটি ডিম্বাকৃতি। শতপথ ব্রাহ্মণে দেখি দেবতাদের শশ্মশান ছিল চতুরস্রকার আর অসুরদের শ্মশান ছিল গোলাকৃতি। যা আসূর্য প্রাচ্যাস্তদ্ যে ত্বৎ পরিমণ্ডলানি শশ্মশানানি কুর্বতে। (১৩/৪/১/২)
(খ) দ্বিতীয়তঃ আসীরীয় অসুররা মাড়ুকের প্রতীক পূজা করতেন। এই প্রতীক বাগাকৃতি। Strom God এর পূজাও এদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এদিকে ভারতীয় অসুররাও ছিলেন রুদ্রোপাসক। বেদে রুদ্রও Storm God রূপে চিত্রিত। বাণাসুরের পতাকায় যে 'বাণ' প্রতীক থাকতো, তার বর্ণনা আমরা মহাভারতে পাই।
(গ) তৃতীয়তঃ, ভারতীয় অসুররা মায়া বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। যার জন্য তাঁদেরকে 'মায়াবী বলা হয়। আসিরীয় অসুরগণও যে অলৌকিক মায়া বিদ্যার অনুশীলন করতেন তা ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে G. Smith Assyrian Discoveries নামক গ্রন্থে বহু গবেষণামূলক তথ্যের দ্বারা প্রমাণ করেছেন। তিনি আসিরীয়দের কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেবদেবীর মূর্তিও উদ্ধার করেছেন। এগুলি British Museum এর Bab. Room (No. 996-1009) রক্ষিত আছে।
ঐ সমস্ত বৈদিক, ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের বলে আমরা কি এখন তাহলে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে অসুররা ভারতেরই একটি প্রাচীন জাতি, ভারতের আর্য জাতির বংশধর, তাঁরা আমাদেরই মত মনুষ্যদেহধারী এবং আসিরীয়রাই সেই অসুরজাতির বংশধর।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ