হিন্দু অর্থ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

24 September, 2026

হিন্দু অর্থ

হিন্দু অর্থ,  হিন্দু শব্দের অর্থ, হিন্দু শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ, হিন্দু ধর্মের নাম কি, হিন্দু কারা, হিন্দু দেশের তালিকা, হিন্দু ধর্ম কি, হিন্দু ধর্মের আদি নাম কি, হিন্দু meaning in english, হিন্দু শব্দের আরবি অর্থ কি

আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতই শুধু প্রাণধারণের ও দিন যাপনের গ্লানিতে কাটলেও তবে বংশগত ঐতিহ্য এবং জন্মগত সংস্কারের বশে হিন্দুধর্ম এবং সংস্কৃতির উপর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা পোষণ করি। হিন্দু ভারতবর্ষে হিন্দু হয়ে জন্মেছি বলে যথেষ্ট গৌরববোধ করি। ছাত্রজীবন থেকেই একটি প্রশ্ন আমার মনে বার বার পীড়া দেয়, সেটি ঐ হিন্দু শব্দটি নিয়ে। ইতিহাসে পড়েছি আমাদের পূর্বপুরুষরা সিন্ধু নদীর তীরে বাস করতেন বলে আমাদেরকে হিন্দু বলা হয় এবং মুসলমানরা নাকি হিন্দু অর্থে কাফের এবং কালো আর ইংরাজরা নাকি Heathen এবং Black Native অর্থে অবজ্ঞা ভরেই আমাদের 'হিন্দু' অভিধা দিয়েছে। এখন আমার প্রশ্ন বিদেশীদের প্রদত্ত ঐ কদর্থব্যঞ্জক শব্দটি আমরা আবহমানকাল ধরে কেন বহন করে আসছি? সিন্ধু নদ থেকেই যদি হিন্দু বা হিন্দু ধর্মের নামকরণ হয়ে থাকে, বিদেশীদের নামকরণ পূর্বে সিন্ধুতীরবাসীরা নিজেদেরকে কি নামে এবং কোন্ ধর্মাবলম্বী বলে পরিচয় দিত? নিশ্চয় আত্মধর্ম এবং আত্মজাতির পরিচয় দানের জন্য তারা আদিতে একটা নাম ব্যবহার করতেন, সেটি কি? কেনই বা এবং কখন তাঁরা সেই আদিনাম পরিত্যাগ করে পরদত্ত নাম দ্বারা নিজেদের পরিচয় দিতে আরম্ভ করলেন? হিন্দুধর্মের প্রচারক কে? প্রতিষ্ঠাতাই বা কে? সংস্কৃতে কি হিন্দু শব্দ আছে? আমরা জানি ভৌগোলিক স্থান বা বস্তু যথা দেশ নদী সাগর পর্বত প্রভৃতি নাম হতে ধর্মের নামকরণ হয়ে থাকে যেমন শিব হতে শৈব, সূর্য হতে সৌর, গণপতি হতে গাণপত্য, বিষ্ণু হতে বৈষ্ণব, বুদ্ধ হতে বৌদ্ধ খ্রীষ্ট হতে খ্রীষ্টান ইত্যাদি।

এমতাবস্থায় হিন্দুধর্মের বেলাতেই কেবল উপাস্য দেবতা বা ধর্মপ্রবর্তককে বাদ দিয়ে একটা নদী বা পরজাতিদত্ত কদর্থব্যঞ্জক একটা শব্দকে বেছে নেওয়া হল এটি কেমন করে সম্ভব? আমি ইতিপূর্বে এই প্রশ্ন অনেক জ্ঞানী গুণীকেই করেছি, কিন্তু কোন সদুত্তর পাই নি। তাই হিন্দু শব্দের ব্যুৎপত্তি জানার আগ্রহ আমার বহুদিনের।

প্রথমেই জেনে নিশ্চিত হোন যে পরপ্রদত্ত কদর্থব্যঞ্জক শব্দই আমরা বহন করছি না। হিন্দু শব্দ সংস্কৃতে আছে এবং বৈদিক যুগ থেকে আমরা নিজেদের হিন্দু নাম গূঢ় এবং গভীর অর্থেই ব্যবহার করে আসছি। আমাদের হিন্দু নামের কারণ

আসিন্ধুসিন্ধুপর্যন্ত্য যস্য ভারতভূমিকা

পিতৃভূঃ পুণ্যভূশ্চৈব স বৈ হিন্দুরিতিস্মৃতঃ।

অর্থাৎ সিন্ধুদেশ থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণে সিন্ধু অর্থাৎ সমুদ্র পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ পুণ্য সংস্কার, পুণ্য  আচার, পুণ্য অনুষ্ঠান, পুণ্য জ্ঞানের বিমল ধারা যেখানে পিতৃভূঃ অর্থাৎ জন্মগ্রহণ করেছে সেই পাবন ক্ষেত্রে আমরা বাস করি বলে আমদের পিতৃপুরুষরা নিজেদেরকে হিন্দু নামে অভিহিত করতেন। হিন্দু এবং আর্য শব্দ সমার্থক। বৈদিক যুগে এই পুণ্য ভূখণ্ডের অধিবাসীরা নিজেদেরকে আর্য বলে পরিচয় দিলেও এবং আর্য শব্দটি তাঁদের কাছে অধিকতর প্রিয় হলেও মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষে বৈদিক যুগ এবং বেদ প্রকট হওয়ার পূর্বেও মনুষ্যজাতির বাস ছিল। তাঁরাই আমাদের পূর্বপুরুষ। তাঁরাই হিন্দু। বৈদিক যুগে আর্যদের যে শাখাটি সম্প্রদায়গত বিরোধের জন্য ইরাণে চলে যান, তাঁরা তাঁদের এখানকার জাতিদেরকে হিন্দুই বলতেন। আবার এখানকার অধিবাসীরা বিদেশবাসী জ্ঞাতি ভাইদের বাসস্থানকে আর্যস্থান বলতেন- ইরাণ < ঐড়ান < এরিয়ান < আর্যস্থান। এখন যাঁদেরকে আমরা পারসিক বলি তাঁরা ঐ ঐড়ান বা আর্যস্থানের অধিবাসী।

প্রাচীন পারস্য ভাষায় হপ্তহিন্দু কথাটি রয়েছে। এই হপ্তহিন্দু বেদোক্ত 'সপ্ত সিন্ধু'। প্রাচীন পারসিকরা 'স' উচ্চারণ করতে পারতেন না, তাঁদের ভাষায় 'স' এর উচ্চারণ 'হ'। এজন্য তাঁরা সোমকে হোম, সিন্ধুকে হিন্দু, সপ্তকে হপ্ত, স্বর (স্বর্গ) কে হর্ বলতেন। যে কারণে সেই সুপ্রাচীন যুগে আমাদের আদি পূর্বপুরুষরা ইরাণকে বলতেন আর্যস্থান, ঠিক সেই একই কারণে তাঁরাও পূর্বস্মৃতির স্মারক হিসাবে সিন্ধুনদ হতে সমুদ্র পর্যন্ত মূল ভূখণ্ডের অধিবাসী অর্থাৎ আমাদেরকে হিন্দু বলতেন।

ঐ একইভাবে পারসিকদের হাতে হেন্দ> ইন্দাস ইংরাজদের মুখে ইন্ডিয়া এই নামকরণ হয়েছে। কাজেই হিন্দু বা ইন্ডিয়ান বললে তার মধ্যে আমরা অগৌরবের কিছু দেখি না। পারসিক ভাষাতেও হিন্দু শব্দের কোন দোষাবহ অর্থ নাই।

সত্য বটে, F. Streingah Ph D প্রণীত A comprehensive Persian English Dictionary (ইংরাজী পারসিক অভিধান) দেখলে সেখানে হিন্দু শব্দে কৃষ্ণবর্ণ, ভূতা, ক্রীতদাস, পৌত্তলিক, ঈশ্বর বিশ্বাসহীন ইত্যাদি অর্থ পাওয়া যাবে। কিন্তু একটু বিচার বালেই বুঝা যায়, পারস্য ভাষায় কোন ধাতুর্থানুসারে, ব্যুৎপত্তি অর্থে হিন্দু শব্দ নিষ্পন্ন নয়, সাহেব বর্ণিত ঐরকম কোন অর্থও হয় না। পারসিক শব্দে 'হিন্দব' বলে একটি শব্দ আছে কিন্তু তা গৌরব ও সম্মান জ্ঞাপক। 'হন্দ' বলে একটি শব্দ হিব্রুতেও আছে। হন্ন্দ শব্দের অর্থ তেজ ও বিক্রম প্রকাশক। হিরু ভাষার হনন্দ শব্দই পুশতু ভাষায় হন্দ রূপ ধারণ করে। অতএব হন্দ হন্দু হিন্দু। হন্দু হতেই হিন্দু শব্দের উদ্ভব হয়েছে।

কেউ কেউ বলেন আর্যগণ হিমালয় হতে বিন্দু সরোবরের মধ্যবর্তী প্রদেশে বাস করতেন। সেজন্য হিমালয়ের আদ্য অক্ষর 'হি' এবং বিন্দুর শেষ অক্ষর 'ন্দু' উভয়কে মিলিয়ে তাঁরা নিজেদেরকে হিন্দু বলে পরিচয় দিতেন। আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যে ভাবে গূঢ় ব্যঞ্জনাময় সংস্কৃত শ্লোকাদি রচনার শৈলী প্রচলিত ছিল, তাতে আমরা ঐ যুক্তিকে অগ্রাহ্য করতে পারি না।

প্রত্যেকেই জানেন, উচ্চারণের বিকৃতিতে সাধারণ জনতার মুখে অনেক মূল ভাষায় একটি লোকায়ত রূপ নেয়, যেমন ধরুন সংস্কৃত হতে তৎকালীন জনতার ভাষা পালি ভাষার জন্ম হয়েছে। তেমনি পূর্বে গান্ধার দেশে (বর্তমান যার নাম আফগানিস্থান) সেখানে লোকে মুখে মুখে উচ্চারণের দোষে সংস্কৃত হতে একটি নূতন ভাষা রূপ নেয়। এর নাম বাতারি। এই ভাষার দুটি আঞ্চলিক রূপ ছিল, একটি বিশ্ববিখ্যাত সংস্কৃত আর একটি অবেস্তান। সংস্কৃতের 'স' অবেস্তান ভাষাতে উচ্চারিত হত 'হ'। অবেস্তান ভাষায় সিন্ধু মানে স্বচ্ছ জলের দেশ। পুশতু ভাষাতেও সিন্দ মানে বহু নদী। ভারতবর্ষ নদীমাতৃক এখানে বহু নদী হিন্দু নামের এটাও একটা কারণ। বিখ্যাত আফগান ভাষাবিদ, বাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শ্রী ফল রাবচি পালবাক গবেষণা করে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তবে কেউ যদি বিদ্বেষ বশে কোন জাতিকে তাদের ভাষায় কদর্থে অভিহিত করে তাতে মূল নামে কোন কদর্থ প্রকাশ পায় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ম্যাকলে (Macanlay) সাহেব তো বাঙালী জাতির অনেক নিন্দা করেছেন, এজন্য কি বাঙালী জাতি দূষিত হয়েছে। মুসলমান রাজত্বের সময় মুসলমানদের গ্রন্থে বা ইংরেজদের রাজত্বের সময় ইংরেজদের গ্রন্থে তারা যদি অন্ধ বিদ্বেষ এবং হিংসা বশে হিন্দু অর্থে Heathen বা কাফের বলে গালি দিয়ে থাকে সেটা তাদেরই নীচতার পরিচয়। সেজন্য হিন্দু শব্দটিতে কোনভাবেই গ্লানি স্পর্শ করে না।

ম্যাকলে সাহেবের সগোত্রদেরকে Tory এবং মুসলমানদের 'ফেরেস্তা' এই শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করলেই মুখের মত জবাব দেওয়া যায়। Torry মূল Irish শব্দ Toraidhe শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ robber বা ডাকাত। কিন্তু ইংরেজরা কি বিজয়ী Irish জাতিপ্রদত্ত ঐ অর্থের জন্য Torry শব্দটিতে দূষিত মনে করেন। ইংলণ্ডের Torry বা Conservative Party ইংলণ্ডের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদেরকে নিয়েই গঠিত। ঠিক এমনি ভাবে সংস্কৃত প্রেত শব্দটি আরবীতে ফেরেস্তা শব্দে পরিবর্তিত হয়েছে। আমরা খারাপ অর্থে প্রেত শব্দ ব্যবহার করলেও মুসলমান ভাষায় ফেরেস্তা শব্দ মর্যাদাসূচক। আন্তর্জাতিক ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়মানুসারে একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কিরূপ রূপ এবং অর্থ পরিবর্তন করে তার কিছু প্রমাণ দিচ্ছি। প্রেত শব্দ আগেই বলেছি আমাদের কাছে নিন্দাবাচক হলেও মুসলমানদের কাছে মর্যাদাসূচক 'ফেরেস্তা', বৌদ্ধদের কাছে 'পেরেক' ইউরোপীয়দের কাছে 'Priest'। 'Priest' শব্দটি আবার 'Preost এই ফরাসী শব্দ থেকে এসেছে। পুরোহিত শব্দটি আমাদের কাছে কতই না মর্যাদাসূচক। কিন্তু এই শব্দটি অন্য ভাষায় ধধ্বনি পরিবর্তন করে কি দশা লাভ করেছে দেখুন Purohita <Fulohida <Folohia<Follosi<Follis< ইংরাজীতে Foolish! দুর্ভাগ্য যে, সম্প্রদায়গত এবং জাতিগত বিদ্বেষের ফলে এক জাতি অন্য জাতির নানা শব্দ নানা অর্থে এইভাবে কুৎসা করে থাকে। আমাদের দেশে এমন কি বৈদিক যুগেও দেব এবং অসুর জাতি একই আর্যজাতির শাখা হলেও উভয়ের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব এবং দ্বেষ তুঙ্গে উঠেছিল তখন অসুর শব্দে কদর্থ আরোপ করেছিলেন। এইভাবেই এক ভাষায় উল্লাস অন্য ভাষায় alas, এক ভাষায় হল-হলা অন্য ভাষায় হলাহল, এক ভাষায় হর হর অন্য ভাষায় horror, এক ভাষায় হরিবোল অন্য ভাষায় horrible এ পরিণত হয়েছে। কাজেই হিন্দু শব্দে বিদেশীরা যে অর্থই আরোপ করুক না কেন আমাদের কাছে হিন্দু শব্দ পরম আদরণীয় শব্দ।

হিন্দু কোন ধর্ম নয়। এজন্য এর কোন প্রতিষ্ঠাতা নাই। হিন্দু কোন জাতি নয়, হিন্দু বলতে কোন সম্প্রদায়কেও বোঝায় না। হিন্দু শব্দের অর্থ উদার বিশ্বজনীনতা, হিন্দু শব্দ সংস্কৃতি বাচক। বেদের মতই এটিকে অপৌরুষেয় শব্দ বলা চলে। প্রাচীন ব্রহ্মাবর্তবর্ষ ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্থান নামক বিরাট ভূখণ্ডে আর্য বৌদ্ধ শৈব গাণপত্য সৌর খ্রীষ্টান, এমন কি মুসলমান প্রভৃতি সকল অধিবাসীরাই হিন্দু নামের যোগ্য

হীনতা বর্জনকারী মানব নিচয়।

হিন্দু বলে আপনার দেয় পরিচয়।

যিনিই হীনতা ত্যাগ করতে পারবেন তিনিই হিন্দু। প্রাচীন মেরুতন্ত্রানুসারে এর ধাতুগত অর্থই হল

হীনঞ্চ দূষয়ত্যেব হিন্দুরিত্যুচত্যে প্রিয়ে।

ব্যাকরণের নিয়মানুসারে হীন দুষ-ডু-যে নিপাতনে। নিপাতনে সিদ্ধ এই পদ পৃযোদরদিত্বাৎ সাধুঃ। রামকোষ নামক প্রাচীন অভিধানেও হিন্দু শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,

হিন্দুদুষ্টনূহঃ প্রোক্তোহনার্যনীতি বিদূষকঃ।

সদ্ধর্ম-পালকো বিদ্বান্ শ্রৌতধর্মপরায়ণঃ।।

অর্থাৎ দুষ্টের দণ্ডদাতা, অনার্য নীতির বিরোধী সদ্ধর্মের পালক ব্যক্তিই হিন্দু।

তথ্যসূত্রঃ তপভুমি নর্মদা 

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

অসুর কারা?

অসুর বলতে দৈত্যদানা মানুষখেকো কোন জীব নয়। অসুররা ভারতেরই একটি সভ্য জাতি। হায়দ্রাবাদে একটি স্থান রয়েছে, তার নাম অসুরগড়, সেখানেও তামার খনি আছে...

Post Top Ad

ধন্যবাদ