ধর্ম্মতত্ত্ব: ইতিহাস

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

30 April, 2026

বীর হনুমান্ আর্য রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন

30 April 0

 বীর হনুমান্ আর্য রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন

বীর হনুমান্ আর্য রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন
বিগত কিছু সহস্রাব্দে ভারতীয় সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অসম্ভব পৌরাণিক শৈলী, অন্ধবিশ্বাসী জন এবং ভারতীয়তা-বিরোধী লেখকেরা এতটাই বিকৃত এবং পরিবর্তিত করে দিয়েছে যে তাকে তার বাস্তব রূপে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে গেছে। বিরোধী লেখকেরা অধিকাংশকে পৌরাণিক এবং কল্পিত ঘোষণা করে তার অস্তিত্বকেই মুছে ফেলার প্রচেষ্টা করেছে। অন্ধবিশ্বাস এবং আস্থার নামে অযৌক্তিক, অসত্য এবং অসম্ভব সব কিছুই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে এবং যদি তার সত্য রূপ উপস্থাপিত করা হয় তবে সেই লোকদের আস্থা ছুঁই মুইয়ের মতো আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যায়। আমাদের আইনের এই আচরণও চিন্তনীয় যে অভিব্যক্তির সমান স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও তাদের ক্ষেত্রে আস্থা ভঙ্গের প্রकरण দ্রুত গ্রহণ করে নেওয়া হয়, অথচ অন্যদিকে মানবীয় প্রগতি এবং সত্যের যে বৌদ্ধিক আস্থা ভঙ্গ হচ্ছে, সেই পক্ষকে উপেক্ষা করা হয়। উপর থেকে রাজনীতি সেই বিকৃতিকে আরও বেশি শক্তি প্রদান করেছে।


একে ভারতীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির বাধ্যতা বলব নাকি বিদ্রূপ, তার চক্রব্যূহে ফেঁসে সব সত্য এবং বাস্তবতা অভিমন্যুর মতো বলিদান হয়ে যায়। সুযোগবাদী রাজনীতিতে সত্যকে গ্রহণ করার না তো ইচ্ছাশক্তি আছে এবং না সাহস আছে। গত কিছু সময় থেকে একটি প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মহাপুরুষদের বিরাট ব্যক্তিত্বকে সীমিত করার। আর্যদের অনার্য প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, ঋষি-বংশে উৎপন্ন আদিকবি বাল্মীকির মতো ব্রহ্মর্ষির সঙ্গে ডাকাত হওয়ার ঘটনাকে যুক্ত করে তাদের জীবনের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। গত দিনে, একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। একজন রাজনীতিবিদ রাজবংশে উৎপন্ন আর্য ক্ষত্রিয় মহাপুরুষ বীর হনুমান্‌কে দলিত ঘোষণা করে দিয়েছেন। অন্ধ আস্থাবাদী লোকেরা তাদের ঐতিহাসিক মহাপুরুষদের আরও বেশি অপমান করেছে। বংশনাম এবং প্রতীকার্থ না বুঝে তাদের শ্রদ্ধেয় মহাপুরুষদের মধ্যে কাউকে বানর, কাউকে হাতি, কাউকে বরাহ, কাউকে মাছ, কাউকে অশ্ব পশু বানিয়ে দিয়েছে। ব্যসনী এবং স্বার্থপর, কথিত অনুসারীরা তাদের ব্যসনের পূরণের জন্য তাদের শ্রদ্ধেয় মহাপুরুষদেরই মাংস, মদিরা, ভাঙ, আফিম, গাঁজা ইত্যাদির সেবনকারী এবং অনাচারের প্রবর্তক বানিয়ে দিয়েছে। এভাবে যেখানে আমরা আমাদের মহাপুরুষদের কলঙ্কিত করছি, সেখানে আমাদের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকেও দূষিত করছি। এমন ধারণা থেকে বিশ্বের বৌদ্ধিক জগতে আমরা নিজেদের উপহাসের পাত্র করে তুলছি। একটি বালকও জানে যে কোনো পশু মানুষের সঙ্গে না তো ভাষাগত সংলাপ করতে পারে এবং না বৌদ্ধিক আচরণ। তবুও আমরা আমাদের অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে সত্যকে গ্রহণ করি না।
মহর্ষি দयानন্দ সরস্বতী উক্ত অন্ধবিশ্বাস এবং বিকৃতির বিরুদ্ধে সত্যকে প্রকাশ করার এবং অসত্যের পরিত্যাগ করানোর সাহস করেছিলেন, তখন তাকে বলিদান হতে হয়েছিল এবং তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত 'আর্যসমাজ' তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলে উল্টো তাকে রূঢ়িবাদী সমাজ এবং রাজনীতির সঙ্গে সংগ্রাম সহ্য করতে হচ্ছে। ভুল ধারণা ভারতীয় সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইতিহাস, সমাজ এবং দেশের স্বার্থে নয়। বিদেশীদের দ্বারা কল্পিত আর্য-অনার্য, আর্য-দ্রাবিড়, উত্তর-দক্ষিণ ইত্যাদি ধারণাগুলি ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা এবং সমরসতাকে নষ্ট করে ভারতীয় সমাজ এবং দেশের ক্ষতি করেছে। কমপক্ষে, এখন তো আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হওয়া উচিত।


এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য বীর শিরোমণি, শ্রীরাম-ভক্ত হনুমান্ এবং তাদের বানর-সমাজের বাস্তবতাকে উপস্থাপন করা। তার তথ্যের জন্য আমাদের কাছে রামায়ণ-কালের সর্বাধিক নিকট, প্রামাণিক এবং প্রাচীন গ্রন্থ ঋষি বাল্মীকি রচিত 'রামায়ণ' আছে। যদিও তাতেও সময়ে সময়ে প্রক্ষিপ্ত সংযোজন হয়েছে, যার জ্ঞান আমাদের তাতে প্রাপ্ত পরস্পর বিরোধী এবং অসম্ভব বক্তব্য থেকে হয়ে যায়, পুনরপি প্রাপ্ত মূল বক্তব্য বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দেয়। আসুন, তাদের ভিত্তিতে এবং কিছু অন্যান্য পরবর্তী ঐতিহাসিক বিবরণসমূহ কে সন্দর্ভে প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর চিন্তন করুন।

হনুমান অর্থ কি?

হনুমানের বংশ এবং পরিচয়-

হনুমান্ এবং তার বানর-সমাজ বানর ছিল না। তারা মানব দেহধারী ছিল এবং তাদের আকৃতি, রূপ-রং, শরীর মানুষের সদৃশ ছিল। 'বানর' তাদের বংশের নাম ছিল। ভারতীয়দের বংশাবলীতে আজও ডজনেরও বেশি এমন বংশ নাম, গোত্র-নাম এবং প্রতীক-নাম পাওয়া যায় যা পশু-পাখির নামও বটে, কিন্তু তারা মানুষ। বানর-সমাজ আর্যদের সমাজের অন্তর্গত ছিল। তার অধিকাংশ সংস্কৃতি সভ্যতা, শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবস্থা, পরম্পরা, বংশাবলি ইত্যাদি আর্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বানর-সমাজে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।


সংস্কৃতের ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে যে 'বানর' বংশের মূল উৎপত্তি ঋষি পুলহ এবং তার স্ত্রী হরিভদ্রা থেকে হয়েছিল। মাতার নামের ভিত্তিতে বানর বংশকে 'হরি বংশ' এবং 'হরি গণ'ও বলা হয়। পরে বানর বংশের বহু উপবংশীয় শাখা হয়ে যায় যা সমগ্র ভারতে বিস্তৃত ছিল। একমাত্র কিষ্কিন্ধা রাজ্যে এদের এগারোটি শাখার বানর জন বাস করত। তারা ছিল বানর, ঋক্ষ, সিংহ, ব্যাঘ্র, শরভ, দ্বীপী, নীল, শল্যক, মার্জার, লোহাস, মায়াব। বন অঞ্চলে বসবাস করা এবং বনজাত পদার্থ দিয়ে নিজের জীবিকা নির্বাহ করার কারণে এদের 'বানর' বলা হয়। বানরের পর্যায় নাম 'বনৌকস্'ও রামায়ণে ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ হলো-'বনে বসবাসকারী জন', যেমন আর্যদের মধ্যে তৃতীয় আশ্রম গ্রহণ করে বনে বসবাসকারীকে 'বানপ্রস্থ' এবং 'বনস্থ' বলা হয়। কিছু অন্যান্য নামের দ্বারা এই প্রসঙ্গ বোঝা যেতে পারে, যেমন-পাহাড়ের অঞ্চলে বসবাসকারীদের 'পাহাড়ি', সরস্বতী নদীর অঞ্চলে বসবাসকারীদের 'সারস্বত', পাঁচ নদীর প্রদেশ পাঞ্জাবের অধিবাসীদের 'পাঞ্জাবি' বলা হয়। সিন্ধ, সিন্ধী (হিন্দ, হিন্দি) নামও সিন্ধু নদীর অঞ্চলে বসবাসের ভিত্তিতে প্রচলিত হয়েছে।

হনুমানের পিতার নাম কেশরী ছিল। তিনি সুমেরু পর্বতের কোনো অংশের রাজা ছিলেন। তিনি সুগ্রীবের নিমন্ত্রণে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শ্রীরামের সাহায্যের জন্য এক হাজার যোদ্ধা নিয়ে এসেছিলেন এবং যুদ্ধ করেছিলেন। হনুমানের মাতার নাম অঞ্জনা ছিল। তিনি বানর-বংশের রাজা কুঞ্জরের কন্যা ছিলেন। হনুমানের পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের উল্লেখ রামায়ণে পাওয়া যায় না, কিন্তু একটি স্থানে হনুমান্‌কে রাজা কেশরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র বলা হয়েছে (জ্যেষ্ঠঃ কেশরিণঃ পুত্রঃ... হনূমানিতি, ৬.৩৮.১০)। এর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হনুমানের অন্যান্য ভাইও ছিল। পুরাণোক্ত বংশাবলীতে প্রাপ্ত বিবরণ থেকে জানা যায় যে হনুমানের এই চার ভাই ছিল- শ্রুতিমান্, কেতুমান্, মতিমান্ এবং ধৃতিমান্। হনুমানের নিজের কোনো পরিবার ছিল না কারণ তিনি আজীবন ব্রহ্মচারী ছিলেন। সংস্কৃত সাহিত্যে তাকে 'ব্রহ্মচারী', 'ঊর্ধ্বরেতা', 'জিতেন্দ্রিয়' বলে প্রশংসা করা হয়েছে। হনুমান্‌ বহু গুণে সমৃদ্ধ ছিলেন। বুদ্ধিমত্তা, নীতিমত্তা, শক্তি-সম্পন্নতা, বীরতা, নির্ভীকতা ইত্যাদি গুণের একত্র হওয়া কঠিন। বন্ধুত্বের কারণে তিনি সুগ্রীবের সচিব হয়েছিলেন এবং শ্রদ্ধার কারণে শ্রীরামের সেবক এবং রাজদূত হয়েছিলেন। সুগ্রীব এবং শ্রীরামের সত্যনিষ্ঠ সহযোগী এবং সংকটমোচক হয়েও হনুমান্‌ বিনয়ের প্রতিমূর্তি ছিলেন। ঋষি বাল্মীকি লিখেছেন-

শৌর্য দক্ষ্যং বলং ধৈর্যং প্রাজ্ঞতা নযসাধনম্। 

বিক্রমশ্চ প্রভাবশ্চ হনূমতি কৃতালয়াঃ।। (উত্তরকাণ্ড ৩৫.৩)


'শৌর্য, চাতুর্য, শক্তি, ধৈর্য, পাণ্ডিত্য, নীতিজ্ঞান, পরাক্রম এবং প্রভাবশীলতা, হনুমান্ এই মহান গুণগুলির ভাণ্ডার ছিলেন।' হনুমানের হাব-ভাব, আচরণ, ভাষা দেখে লক্ষ্মণ শ্রীরামের সামনে বিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন- নানৃতং বক্ষ্যতে বীরো হনূমান্ মারুতাত্মজঃ। (কিষ্কিন্ধা ৪.৩২) 'শ্রী রাম! আমি বিশ্বাসের সঙ্গে বলছি যে পবনপুত্র বীর হনুমান্ কখনও মিথ্যা বলতে পারে না।' হনুমান্ 'শুভমতি' ছিলেন (কিষ্কিন্ধা, ৪.৩৫), 'মহানুভাব' ছিলেন (কিষ্কিন্ধা ২.২৯), অপরাজেয় যোদ্ধা ক্ষত্রিয় ছিলেন। সুগ্রীব হনুমান্‌কে 'মনুষ্য' বলেছেন (মনুষ্যেণ বিজ্ঞেয়াঃ, কিষ্কিন্ধা ২.২২), আমাদের মতে এত মানবীয় গুণে সমৃদ্ধ ব্যক্তি মহামানব হয়।

রাষ্ট্র এবং রাজধানী

বানর সম্প্রদায়ের প্রধান রাষ্ট্র কিষ্কিন্ধার আশেপাশের অঞ্চল ছিল। কিষ্কিন্ধাই তার রাজধানীর নাম ছিল। বর্তমান কর্ণাটক প্রদেশে, জেলা 'বেল্লারি'র স্থান 'হাম্পি'র নিকটে, তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত 'অনাগোন্দি' গ্রামকে প্রাচীন কিষ্কিন্ধা মনে করা হয়। এটি একটি সমৃদ্ধ, উন্নত, ভব্য নগরী ছিল যা পাহাড়গুলির মধ্যে অবস্থিত ছিল। এর শোভা দেখলেই মনে হয়। এর মধ্যভাগে উদ্যান ছিল, ধনীদের সুন্দর ভবন ছিল, রাজ-পরিবারের লোকদের ভব্য প্রাসাদ ছিল। সুগ্রীবের প্রাসাদ সাত ড্যোঢ়ি পার ছিল, যার দ্বারে অস্ত্রধারী বানর জন প্রহরী ছিল। নগরী চারিদিক থেকে যন্ত্র দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। পাঠক চিন্তা করুন যে কি এমন নগরী বানরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং শাসিত হতে পারে?


এখানে পৈতৃক পরম্পরায় প্রতিষ্ঠিত বানরবংশীয়দের রাজ্য ছিল। প্রথমে এখানকার রাজা ঋক্ষরাজ ছিল। তার দেহান্তের পরে তার বড় পুত্র বালী রাজা হয়। শ্রীরামের দ্বারা বালীর বধ করা হওয়ার পরে সুগ্রীব রাজা হয়। এর অতিরিক্ত সমগ্র ভারতে মধ্য-মধ্য সময়ে বানর সম্প্রদায়ের মানুষের ছোট-ছোট বহু রাজ্য ছিল। সুগ্রীব দ্বারা ডাকার উপর রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, শ্রীরামের পক্ষে দুই ডজনের বেশি বানর রাজা উপস্থিত হয়েছিল। রামায়ণে তাদের বিবরণ পাওয়া যায়।


বেদ-বেদাঙ্গ শাস্ত্রের অধ্যয়ন-অধ্যাপন

বাল্মীকীয় রামায়ণে বহু এমন প্রমাণ পাওয়া যায় যেগুলি থেকে এই তথ্য পাওয়া যায় যে বানর সম্প্রদায়ে, আশ্রম পদ্ধতিতে, বেদ বেদাঙ্গ শাস্ত্রের অধ্যয়ন করানো হতো। পুরুষদের মতো নারীরাও শাস্ত্রের অধ্যয়ন করত। এই কারণেই রামায়ণের সব নারী এবং পুরুষ চরিত্র উচ্চ শিক্ষিত। হনুমান্‌কে তো বানর সম্প্রদায়ের সর্বশাস্ত্রজ্ঞদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিদ্বান বলা হয়েছে (বীর বানরলোকস্য সর্বশাস্ত্রবিদাং বর, কিষ্কিন্ধা. ৬৬.২)। তার জন্য কবির দ্বারা ব্যবহৃত বিশেষণ তাকে উচ্চকোটির গম্ভীর বিদ্বান প্রমাণ করে 'বাক্যকোভিদ, বুদ্ধিবিজ্ঞানসম্পন্ন, বাক্যকুশল, বাক্যবিশারদ, সুমহাপ্রাজ্ঞ, নযপণ্ডিত ইত্যাদি।' সীতার অনুসন্ধান করতে করতে, ঋষ্যমূক পর্বতের দিকে আসতে থাকা শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণকে দেখে ভীত সুগ্রীব হনুমান্‌কে তাদের পরিচয় জানার জন্য তাদের কাছে পাঠায়। হনুমান্ বানরের বেশ ত্যাগ করে ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে তাদের কাছে যায়। সেখানে হনুমান যে শুদ্ধ সংস্কৃত ভাষা এবং পরিশীলিত শৈলীতে শ্রীরামের সঙ্গে কথোপকথন করে, তা শুনে লক্ষ্মণ এই শব্দে হনুমানের বিদ্বত্তার প্রশংসা করে-
নানৃগ্বেদবিনীতস্য নাযজুর্বেদধারিণঃ । 

নাসামবেদবিদুষঃ শক্যমেবং বিভাষিতুম্।। 

নূনং ব্যাকরণং কৃত্স্নমনেন বহুধাশ্রুতম্। 

বহু ব্যাহরতানেন ন কিঞ্চিদপশব্দিতম্।। (কিষ্কিন্ধা. ৩.২৮.২৯)
অর্থাৎ 'যে বিধি অনুসারে ঋগ্বেদের অধ্যয়ন করেনি, যে যজুর্বেদের অধ্যয়ন-মনন করেনি, যে সামবেদের বিদ্বান নয়, সে এই প্রকার শুদ্ধ ভাষা এবং উত্তম শৈলীতে কথোপকথন করতে পারে না। নিশ্চয়ই এরা সংস্কৃতের ব্যাকরণ বহুবার অধ্যয়ন করেছে, কারণ অনেক কথোপকথন করার পরও এরা একটি শব্দও অশুদ্ধ বলেনি।।' এমনই প্রশংসামূলক বর্ণনা অন্যত্র বহু স্থানে এসেছে। সেখানে হনুমান্‌কে ব্যাকরণ এবং ছন্দ-শাস্ত্রের বিদ্বান বর্ণনা করা হয়েছে।


হনুমান্ সাহিত্যিক এবং কথ্য সংস্কৃত, উভয়েরই জ্ঞানী ছিলেন। সীতার সন্ধান পাওয়ার পরে তিনি চিন্তা করেন যে সীতার সঙ্গে আমাকে সেই ভাষায় কথা বলা উচিত, যাতে আমার উপর বিশ্বাস করা যায়-
বাচং চোদাহরিষ্যামি মানুষীমিহ সংস্কৃতাম্।। যদি বাচং প্রদাস্যামি দ্বিজাতিরিব সংস্কৃতাম্। রাবণং মন্যমানা মাং সীতা ভীতা ভবিষ্যতি।। (সুন্দর. ৩০.১৭,১৮) অর্থাৎ- 'আমি সীতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে বলা হয় এমন সংস্কৃত ভাষায় কথা বলব, কারণ যদি আমি দ্বিজ শ্রেণীর দ্বারা বলা হয় এমন সাহিত্যিক সংস্কৃতে কথা বলি তবে সীতা আমাকে রাবণ মনে করে ভয় পাবে।'


এই প্রসঙ্গ থেকে বহু তথ্য স্পষ্ট হয়- (১) হনুমান বহু ভাষা জানতেন। (২) রাবণ সাহিত্যিক সংস্কৃত ব্যবহার করত। (৩) রামায়ণ কালে কথ্য ভাষা সংস্কৃত ছিল। (৪) বানর সম্প্রদায়ের জনদের মধ্যে সংস্কৃত পড়া এবং বলা হতো। সংস্কৃত আর্য সম্প্রদায়ের ভাষা ছিল।

এইভাবে হনুমান্ শস্ত্র এবং শাস্ত্র উভয়েই প্রবীণ বীর বিদ্বান ছিল।

কিষ্কিন্ধার রাজা বালীও 'মহাবলী' এবং 'মহাপ্রাজ্ঞ' ছিল। সেও বেদ শাস্ত্রের অধ্যয়ন করেছিল। একদিন নির্জনে ঘুরতে থাকা বালীকে দেখে রাবণ ছলপূর্বক তার উপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল। বালীও তার ছল বুঝে ফেলেছিল। সেও বিভ্রান্ত করার জন্য মন্ত্র-জপের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বেদমন্ত্রের উচ্চারণ করতে লাগল। কাছে আসতেই বালী রাবণকে ঝাঁপিয়ে কাঁখে চেপে ধরল। বাল্মীকি লিখেছেন-
"জপन् বৈ নৈগমান্ মন্ত্রান্ তস্থৌ पर्वতরাট্ ইব" (উত্তর. ২৪.১৮)
অর্থাৎ- "বালী বেদের মন্ত্র জপ করতে করতে শান্ত এবং পর্বতের ন্যায় নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিল।"

সুগ্রীবও নিশ্চিতভাবে শাস্ত্রের অধ্যয়ন করেছিল। তার ভূগোলশাস্ত্রের ব্যাপক এবং সূক্ষ্ম জ্ঞান ছিল। সীতার অনুসন্ধানের জন্য প্রেরিত বানরদের সে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছিল। বাল্মীকি সুগ্রীবের বর্ণনা 'মহাবীর্য', 'ধৃতিমান্', 'মতিমান্', 'মহাবল পরাক্রমী' ইত্যাদি গুণ দিয়ে করেছেন (অরণ্য. ৭২.১৩,১৪)। রানি তারা-এর পিতা সুশেণ সিদ্ধহস্ত বৈদ্য ছিল। যিনি যুদ্ধে আহত শ্রীরাম, লক্ষ্মণ এবং অন্যান্য বানর বীরদের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। নল এবং নীলের অভিয়ান্ত্রিকী (ইঞ্জিনিয়ারিং) বিদ্যার বিশেষজ্ঞতার বিষয়ে আমরা দীর্ঘকাল ধরে পড়ে-শুনে আসছি, যারা শ্রীরামের বিশাল সেনার জন্য পথ এবং সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণের আশ্চর্য কাজ করেছিল। এইভাবে জাম্ববান্, শরভ, ম্যেন্দ, দ্বিবিদ প্রভৃতি ইউথপতিদের শাস্ত্রজ্ঞতা এবং বক্তৃতা-কৌশলের বর্ণনাও পাওয়া যায়। এরা সকলেই ইউথপতি রাজা ছিল এবং সু-শিক্ষিত ছিল।

বালীর স্ত্রী তারা এবং সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাও বেদবিদুষী এবং শাস্ত্রজ্ঞা ছিল। তারা বেদমন্ত্রবিদ্ ছিল। সুগ্রীবের ললকারে যুদ্ধে যাওয়ার আগে সে স্বামী বালীর জন্য 'স্বস্তিবাচন' বেদমন্ত্র দ্বারা মঙ্গলকামনা করেছিল। যদি বালী দূরদর্শিনী তারা-এর পরামর্শ মানত তবে তার মৃত্যু হতো না (তतः স্বস্ত্যয়নং কৃত্বা মন্ত্রবিদ্ বিজয়ৈষিণী, কিষ্কিন্ধা. ১৬.১২)। সে বালী-বধের পর শ্রীরামের সঙ্গে সংলাপের সময় বেদের নীতির উল্লেখ করে। বাল্মীকি তাকে 'পণ্ডিতা', 'সর্বজ্ঞা', 'রাজনীতির সূক্ষ্ম বিষয়ের বিশ্লেষিকা', 'ভবিষ্যতের আভাস জানা' ইত্যাদি লিখে তার বিদ্বত্তার প্রশংসা করেছেন। রুমা জ্যোতিষের বিদুষী ছিল।

অন্যান্য বিদ্যা এবং কলার প্রশিক্ষণও কিষ্কিন্ধায় দেওয়া হতো। সঙ্গীত-বিদ্যা, ভবন নির্মাণ-বিদ্যা, বস্ত্র-নির্মাণ, অলংকার নির্মাণ, অস্ত্র-শস্ত্র-নির্মাণ, চিত্রকলা, কশিদাকারি ইত্যাদির বর্ণনা রামায়ণে পাওয়া যায়।

আর্য-সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং পরম্পরা


বানরজনদের মধ্যে যখন ঋষিদের দ্বারা রচিত বৈদিক শাস্ত্রের অধ্যয়ন-অধ্যাপন হতো, তখন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা-পদ্ধতি এবং পরম্পরাও বৈদিক ছিল। এই বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায় যে বানররা যজ্ঞোপবীত ধারণ করত। শিক্ষা আরম্ভের আগে উপনয়ন সংস্কারের আয়োজনের মাধ্যমে যজ্ঞোপবীত প্রদান করা হয়। বর্ণনা পাওয়া যায় যে বালীর অন্ত্যেষ্টি সংস্কারের সময়, চিতায় অগ্নি দেওয়ার পরে পুত্র অঙ্গদ যজ্ঞোপবীত ডান কাঁধের দিকে ধারণ করে চিতার প্রদক্ষিণ করেছিল (ততোऽগ্নিং বিধিবদ্ দত্ত্বা সো অপসব্যং চকার হ, কিষ্কিন্ধা. ২৬.৫০) 'অপসব্য' যজ্ঞোপবীত ধারণ করার সেই পদ্ধতি যাতে যজ্ঞোপবীত ডান কাঁধে রেখে তাকে বাম হাতের নিচের অংশে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পৌরাণিক ব্যাখ্যাকাররা এই তথ্যের ব্যাখ্যায় অব্যাখ্যাত রেখে দিয়েছে। এটি তাদের পক্ষপাতী দুরাগ্রহ।

বৈদিক শিক্ষা পদ্ধতি ছিল, তাই তা বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার অন্তর্গত ছিল। হনুমানের স্পষ্ট উদাহরণ যে সে ব্রহ্মচারী থেকে বেদ শাস্ত্রের অধ্যয়ন করেছিল। সে আজীবন ব্রহ্মচারীই ছিল। এই প্রমাণও পাওয়া যায় যে বানররা অন্যান্য আশ্রমও ধারণ করত। সীতার অনুসন্ধানে নিরাশ হওয়া হনুমান প্রতিজ্ঞা করে যে যদি সীতাকে না খুঁজে পায় তবে আমি কিষ্কিন্ধায় ফিরব না, বনপ্রস্থ আশ্রম ধারণ করব (বানপ্রস্থো ভবিষ্যামি হি-অদৃষ্ট্বা জনকাত্মজাম্, সুন্দর. ১৩.৪০)। কিষ্কিন্ধায় বিদ্বান ব্রাহ্মণও ছিল, যারা শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী বালীর অন্ত্যেষ্টি সংস্কার এবং সুগ্রীবের রাজতিলক সংস্কার সম্পন্ন করেছিল।

বানর জন সন্ধ্যা-উপাসনা, যজ্ঞের অনুষ্ঠানও করত। বেদমন্ত্রের দ্বারা সন্ধ্যা করার বালীর একটি দীর্ঘ প্রসঙ্গ রামায়ণে বর্ণিত আছে (বালিনং সন্ধ্যোপাসনতৎপরম্, উত্তর. ৩৪.১২,২৭,২৯)। তারা শ্রীরামের সামনে তার যজ্ঞাধিকারের বিষয়ে সংলাপ করে (কিষ্কিন্ধা. ২৪.৩৮)। বানরদের মধ্যে বিবাহ বিধির মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী হওয়ার পরম্পরা ছিল। অসত্য ভাষণকে পাপ মনে করা হতো এবং সত্যকে পুণ্য, অতএব তারা প্রতিজ্ঞা করার সময় সত্যের শপথ নিত (সত্যেন শপাম্যহম্, কিষ্কিন্ধা. ৮.২৭)। তারা বৈদিক বিধি অনুসারে নামোচ্চারণপূর্বক বড়দের চরণস্পর্শ করে প্রণাম করত (কিষ্কিন্ধা. ২৩.২৪)।

বানর বিশুদ্ধ শাকাহারী ছিল, মাংসাহার করত না। কন্দ-মূল, ফল-ফুল, অন্ন ইত্যাদি পদার্থের আহার করত (ফলমূলাশনং নিত্যং বানরং বনগোচরম্, কিষ্কিন্ধা ১৭.২৫)

সংস্কার এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান বৈদিক শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হতো। তাদের অনুষ্ঠানের জন্য বানর সম্প্রদায়ে প্রশিক্ষিত বিদ্বান ব্রাহ্মণ ছিল। সুগ্রীবের রাজ্যাভিষেক মহর্ষিদের দ্বারা নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী বেদমন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছিল। এই উপলক্ষে যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছিল-
"মন্ত্রপূতেন হবিষা হুত্বা মন্ত্রবিদো জনাঃ।।" "শাস্ত্রদৃষ্টেন বিধিনা মহর্ষি বিধিতেন চ।" "অভ্যষিঞ্চত সুগ্রীবম্।" (কিষ্কিন্ধা. ২৬.৩০,৩৪,৩৬)

এইভাবে বালীর অন্ত্যেষ্টি সংস্কারও শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী রাজাদের মর্যাদার অনুরূপ সম্পন্ন করা হয়েছিল (কিষ্কিন্ধা. ২৫ সর্গ)। এই প্রসঙ্গে বালীকে স্পষ্টভাবে 'আর্য রাজা' বলা হয়েছে ("আর্যস্য ক্রিয়তাম্", "রাজ্ঞাম্... তাদৃশৈঃ কুর্বন্তু", কিষ্কিন্ধা. ২৫.৩০,৩২)।

বানর-সমাজে 'আর্য' সম্বোধন


আর্য সংস্কৃতির শিষ্টাচার অনুসারে, যেভাবে সীতা প্রভৃতি নারীরা তাদের স্বামী শ্রীরাম প্রভৃতিকে 'আর্যপুত্র' বলে সম্বোধন করত, সেইভাবেই বানর-বর্গের রানি তারা তার স্বামী বালীকে 'আর্যপুত্র' বলে সম্বোধন করত (কিষ্কিন্ধা. ১৯.২৭, ২০.১৩)। সুগ্রীবও বালীকে 'আর্য' প্রয়োগে বর্ণনা করে (আর্যস্য, কিষ্কিন্ধা. ২৪.২৯)। বানরদের জন্য 'অনার্য' প্রয়োগ অপশব্দ ছিল। সীতাকে অনুসন্ধানে বিলম্ব করার কারণে লক্ষ্মণ, সুগ্রীবকে 'অনার্য' এবং 'কৃতঘ্ন' বলে তিরস্কার করে (অনার্যস্ত্বং কৃতঘ্নশ্চ, কিষ্কিন্ধা. ৩৪.১৩)। তবে হনুমান প্রভৃতিকে অনার্য কীভাবে বলা যেতে পারে?

উপরোক্ত ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে হনুমান এবং তার বানর-সমাজ আর্য সংস্কৃতির অঙ্গ ছিল। যেসব লেখক তাদের অনার্য বলেছেন তারা বানর-সমাজের সঙ্গে অন্যায় করেছেন এবং ভারতীয় ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন। যারা শ্রদ্ধা-ভক্তির নামে তাদের বানর মনে করে, তারা তাদের শ্রদ্ধেয় মহাপুরুষের গুরুতর অপমান করে। মহামানবকে পশুরূপ দেওয়া তাকে কলঙ্কিত করা। সত্য তথ্যকে গ্রহণ করে তাদের এই কাজ করা ত্যাগ করা উচিত।

ডঃ সুরেন্দ্র কুমার


Read More

20 April, 2026

রামায়ণ সন্দর্শিকা

20 April 0

রামায়ণ সন্দর্শিকা
সমগ্র বিশ্বে নিম্নলিখিত ৩টি গ্রন্থ সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ— (১) বেদ (২) রামায়ণ (৩) মহাভারত। এই তিনটি গ্রন্থের প্রভাব কেবল ভারতবর্ষেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সাহিত্যে সর্বাধিকভাবে লক্ষ্য করা যায়। বেদের শব্দ (পদ) বিশ্বের সকল ভাষায় তৎসম বা তদ্ভব রূপে পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারতে যেসব স্থান (ভৌগোলিক অঞ্চল)-এর নাম ও উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি আজও আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্রগুলির নাম আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে রাখা হয়েছিল এবং সেই নামগুলি- রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, হনুমান, দশরথ, সীতা, কৌশল্যা, সুমিত্রা, অনুসূয়া, তারা প্রভৃতি আজও সহস্রাব্দ ধরে রাখা হয়ে আসছে। একইভাবে, রামায়ণে যাদের নিন্দিত চরিত্র ছিল, সেই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, কৈকেয়ী, মন্ত্রা এবং শূর্পণখার নাম আজও ভারতীয় সমাজে রাখা হয় না। ওয়াশিংটনস্থিত ‘মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক শ্রী তুফাইল আহমদ ভারতীয়দের আত্মপরিচয় ও সত্তাকে রামায়ণের আদর্শ ও বার্তায় প্রত্যক্ষ করেন। রামায়ণের কাহিনি শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সকলেই কেবল শিক্ষা লাভ করেন না, বরং শিক্ষার পাশাপাশি আনন্দও পান। বিশ্বকবির ভাষায় ‘যদি কবি বাল্মীকি মানুষের চরিত্রের বর্ণনা না করে দেব-চরিত্রের বর্ণনা করতেন, তবে অবশ্যই রামায়ণের গৌরব কমে যেত.....। রামের মানুষ হওয়ার কারণেই রামচরিতের এত মহিমা। রামায়ণে দেবতা পদচ্যুত হয়ে নিজেকে মানুষ করেননি, মানুষই নিজের গুণের কারণে দেবতা হয়ে উঠেছে।’

সংস্কৃত ভাষায় রচিত অধিকাংশ প্রাচীন সাহিত্যে ⚠️প্রক্ষেপ (অন্তর্বর্তী সংযোজন) হয়েছে। বৈদিক সংহিতাগুলি ব্যতীত রামায়ণ, মহাভারত এবং মনুস্মৃতি-র মতো প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলি (যেগুলি সহস্রাব্দ ধরে বিদ্বজ্জন থেকে সাধারণ মানুষের কণ্ঠহার হয়ে আছে) তাও এ থেকে রক্ষা পায়নি। বেদ-মন্ত্রগুলির অষ্ট বিকৃতপাঠের কারণে, বিশেষত ক্রমপাঠ এবং ঘনপাঠের জটিলতা বৈদিক সংহিতার পাঠকে বিকৃত হওয়া এবং প্রক্ষেপের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তুলেছে। এর অতিরিক্ত বৈদিক বাঙ্ময়ে অনুক্রমণীকাররা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্যভাবে ঋষি, দেবতা, ছন্দ, বর্ণ, মাত্রা এবং স্বর পর্যন্ত গণনা করে রেখেছেন, যার ফলে মন্ত্রসংহিতায় প্রক্ষেপ করার সাহস কেউ করতে পারেনি। কিছু ব্রাহ্মণগ্রন্থ স্বরাঙ্কিত হওয়া সত্ত্বেও পশুমাংসলোলুপ কর্মকাণ্ডীরা পরবর্তী ব্রাহ্মণগ্রন্থ এবং কল্পসূত্র সাহিত্যেও প্রক্ষেপ করতে কোনও কসুর রাখেনি। পুনরায় পূর্বাপর ক্রমের প্রতি দৃষ্টি রাখলে এই প্রক্ষেপস্থলগুলি স্পষ্ট হয়ে যায়।
‘রামায়ণ’ থেকে শুরু করে ভক্তিকালীন ‘রামচরিতমানস’ প্রভৃতি গ্রন্থে প্রক্ষেপের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। রামচরিতমানস-এর সম্পূর্ণ ‘লবকুশকাণ্ড’ প্রক্ষিপ্ত। একইভাবে বাল্মীকীয় 📚রামায়ণের সম্পূর্ণ উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত। কারণ, যে কোনও গ্রন্থ ‘ফলশ্রুতি’ পর্যন্তই সমাপ্ত বলে গণ্য হয়। ‘রামায়ণ’-এ এই ফলশ্রুতি যুদ্ধকাণ্ডের ১২৮তম সর্গের ১০৭তম শ্লোক থেকে শুরু হয়ে ১২৫তম শ্লোক পর্যন্ত বিস্তৃত। এর অতিরিক্ত উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও শক্তিশালী কারণ রয়েছে। উত্তরকাণ্ডের দ্বিতীয় সর্গ থেকে ৩৪তম সর্গ পর্যন্ত রাবণ এবং রাক্ষসদেরই বর্ণনা আছে, যার রামকথার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। উত্তরকাণ্ডের রচনাশৈলী কাব্যশৈলী না হয়ে পুরাণশৈলী। বাল্মীকি স্থান-স্থানান্তরে প্রকৃতি, পর্বত, বন, ঋতু এবং পশুপাখির বর্ণনাও করেছেন, যা উত্তরকাণ্ডে সামান্যও নেই। বাল্মীকি-র উপমাগুলি আনন্দদায়ক ও প্রাসঙ্গিক, যার উত্তরকাণ্ডে সম্পূর্ণ অভাব। রামায়ণে আগত চরিত্রগুলির জন্মাদি সংক্রান্ত অন্তর্কথার বিস্তার বিভিন্ন পুরাণে পাওয়া যায়, যা রামায়ণের কথকরা পুরাণ থেকে নিয়ে এখানে সংযোজন করেছেন। এই অন্তর্কথাগুলির পূর্ণ বিশ্লেষণ রামকথার উৎপত্তি ও বিকাশের সম্পূর্ণ যাত্রাপথের গবেষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত Father Kamil Bulke করেছেন। সচেতন পাঠকবর্গ এই বিষয়ের বিস্তৃত তথ্য বুলকের প্রসিদ্ধ গবেষণাগ্রন্থ ‘রামকথা : উৎপত্তি এবং বিকাশ’ (প্রকাশক— হিন্দি পরিষদ, হিন্দি বিভাগ, প্রয়াগ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ, ষষ্ঠ সংশোধিত সংস্করণ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে পেতে পারেন।
বাল্মীকীয় রামায়ণের গবেষকদের🧠 সিদ্ধান্ত হলো যে বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড নিঃসন্দেহে প্রক্ষিপ্ত। এর পাশাপাশি মধ্যবর্তী কাণ্ডগুলিতেও বহু স্থানে পরবর্তী কথকরা প্রক্ষিপ্ত অংশ সংযোজন করেছেন। কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি প্রকৃত অবস্থা জানলেও পৌরাণিক বিশ্বাসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে এ বিষয়ে লেখা বা বলা থেকে বিরত থাকেন। শম্বূক প্রসঙ্গ, যযাতি–শুক্রাচার্য, লবণাসুর এবং ব্রাহ্মণ বালকের মৃত্যুকে শূদ্রের তপস্যার সঙ্গে যুক্ত করার মতো অধিকাংশ বিষয়ের রামায়ণের সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। সীতার নির্বাসনও পরবর্তীকালে সংযোজিত অংশ। প্রক্ষিপ্ত অংশগুলি চিহ্নিত করার জন্য গবেষণামূলক🔎 দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। এর বহু মানদণ্ড আছে— মূল কাহিনির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা, অলৌকিকতার প্রদর্শন, অযৌক্তিক বক্তব্য এবং অমানবিক প্রবৃত্তির আধিক্য ইত্যাদি। প্রক্ষেপের ধারার প্রধান ভিত্তি হলো রামকে ঈশ্বরীয় পরব্রহ্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, অবতারবাদ, উপকাহিনি, ভিন্ন প্রসঙ্গ, অতিশয়োক্তি এবং পুনরুক্তি; অথচ রামায়ণের মূল স্বর মানবত্ব, দেবত্ব নয়। বাল্মীকি বহু মানবগুণে সমৃদ্ধ এক পুরুষ সম্পর্কে জানতে চান—

জ্ঞাতুমেবংবিধং নরম্।

নারদ তাঁকে সেইরূপ পুরুষের কথাই বলেন—

তৈর্যুক্তঃ শ্রূয়তাং নরঃ (বালকাণ্ড ১/৭)।

এভাবেই সীতা নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—

নারীণামুত্তমা বধূঃ (১/২৭)।

রাবণের মৃত্যু ও সীতার মুক্তির পর রামও এই মানবীয় দিকটিকেই গুরুত্ব দেন—

দৈবসম্পাদিতো দোষো মানুষেণ ময়া জিতঃ (যুদ্ধকাণ্ড ১১৫/৫)।

অর্থাৎ রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিল, সেই দোষ দৈববশত সংঘটিত ছিল; আমি মানুষ হয়ে তা দূর করেছি।রামায়ণের মূল স্বর বা মূল পাঠের দিকে বিদ্বান চিন্তাবিদদের দৃষ্টি পূর্বেও আকৃষ্ট হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে বহু পণ্ডিত তাঁদের গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। মহামহোপাধ্যায় Swami Bhagavadacharya বাল্মীকী রামায়ণের উপর তাঁর গবেষণাপূর্ণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সীতার অগ্নিপরীক্ষার সময় রামের মুখ দিয়ে যে কঠোর বাক্য বলানো হয়েছে, তা বাল্মীকির চরিত্র-আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনও নারী-নিন্দক ব্যক্তি রাম ও সীতার চরিত্রকে কলুষিত করার উদ্দেশ্যে রামায়ণের মূল পাঠে এই নিকৃষ্ট প্রসঙ্গ সংযোজন করেছে। অগ্নিপরীক্ষার রাম-সীতা-সংলাপ বাল্মীকির “চারিত্র্যেণ চ কো যুক্তঃ” তত্ত্বদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে বাল্মীকি যেন তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত বলে মনে হয়। তিনি যে রামকে খুঁজছিলেন—

জিতক্রোধো দ্যুতিমান্ কোऽনসূয়কঃ

অর্থাৎ ‘যিনি ক্রোধজয়ী, উজ্জ্বলচিত্ত এবং অনিন্দক’— সেই রাম কি করে তাঁর সতী-সাধ্বী পত্নীকে এভাবে অপমান করতে পারেন! ভগবদাচার্যজি একে বাল্মীকির বাক্য বলে মানেন না। তাই তিনি তাঁর সংশোধিত বাল্মীকীয় রামায়ণ থেকে অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গ সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন। Tulsidas-ও তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এ মায়াময় সীতারই অগ্নিপরীক্ষা করিয়েছেন; প্রকৃত সীতা পূর্বেই অগ্নিতে গোপনবাসে চলে গিয়েছিলেন। ‘মানস’-এর ‘অরণ্যকাণ্ড’-এ তুলসীর রাম সীতাকে বলেন—

সুনহু প্রিয়া ব্রত রুচির সুসীলা, ম্যাঁ কছু করবি ললিত নর লীলা।
তুম্হ পাৱক মহুঁ করহু নিবাসা, জৌঁ লাগি করৌঁ নিশাচর নাসা।

অধ্যাত্ম রামায়ণে-ও সীতার ছায়ামূর্তিই অগ্নিতে প্রবেশ করেছিল। তামিলের মহাকবি কম্বনও তাঁর রামায়ণ মহাকাব্যে সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গকে বাল্মীকির দোষপরিহারের রূপেই প্রকাশ করেছেন। সীতার সতীত্বের উপর লাঞ্ছনায় তিনি বিচলিত হয়ে ওঠেন। সীতার ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র বর্ণনা যুদ্ধকাণ্ডের সর্গ ১১৪ থেকে ১২০ পর্যন্ত রয়েছে। এর প্রক্ষিপ্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—এই প্রসঙ্গে সীতার প্রতি রামের প্রেমে যে আকস্মিক পরিবর্তন দেখানো হয়েছে, তা কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, সম্পূর্ণ অস্বাভাবিকও। (Bulke, Ramkatha-অনুচ্ছেদ ৫৬৫)। সীতাহরণের পর রামের বিরহের বর্ণনা বহু সর্গে পাওয়া যায়। যুদ্ধকাণ্ডের শুরুতেই রাম নিজেই বলেন যে আমার বিরহজনিত শোক দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে (সর্গ-৫ শ্লোক-৪২)। লঙ্কা অবরোধের পরেও সীতার জন্য রামের আকাঙ্ক্ষা—

জগাম মনসা সীতা দুযমানেন চেতসা (৪২/৭)

—এইরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। ইন্দ্রজিতের দ্বারা মায়া সীতার বধের সংবাদ শুনে রাম মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান—

তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা রাঘবঃ শোকমূর্ছিতঃ।
নিপপাত তদা ভূমৌ ছিন্নমূল ইব দ্রুমঃ ॥ (৮৩/১০)

এতে স্পষ্ট যে সীতার প্রতি রামের প্রেম অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু এত কিছু থাকা সত্ত্বেও রাবণবধের পর আগত সীতাকে দেখে রামের মুখে এই কথা বলা—আমি শত্রুর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি, এখন তোমার প্রতি আমার কোনও আকর্ষণ নেই; লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব অথবা বিভীষণের মধ্যে কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারো; তোমার চরিত্র নিয়ে আমার সন্দেহ আছে—এই তথাকথিত বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে রাম সীতার সত্যবচনে, যা তার পতিব্রতা স্বভাব এবং রামের প্রতি একান্ত প্রেমের পরিচায়ক, বিশ্বাস করেননি। পূর্বে রাবণের বক্তব্যও স্পষ্ট, যেখানে সে সীতাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণের জন্য এক বছরের সময় দিয়েছিল, নচেৎ সে রাবণের পাকশালার উপাদান হয়ে যাবে (অরণ্যকাণ্ড, সর্গ-৫৫)। দশ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন সীতা রাবণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তখন রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলে—নির্ধারিত সময় পূর্ণ হতে আরও দুই মাস বাকি আছে; এর পরও যদি তুমি স্বেচ্ছায় আমার পত্নী না হও, তবে আমার রাঁধুনিরা তোমাকে টুকরো টুকরো করে আমার প্রাতরাশের অংশ করে দেবে—

দ্বাভ্যামূর্ধ্বং তু মাসাভ্যাং ভর্ত্তারং মামনিচ্ছন্তীম্।
মম ত্বাং প্রাতরাশার্থে সূদাশ্ছেত্স্যন্তি খণ্ডশঃ ॥
(সুন্দর০, সর্গ-২২ শ্লোক-৯)

এতে স্পষ্ট যে রাবণ সীতার উপর জোরপূর্বক অত্যাচার করতে পারেনি। এই অবস্থায় সীতার চরিত্র নিয়ে রামের সন্দেহের কোনও সুযোগই নেই, এবং এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষারও কোনও প্রয়োজন নেই।

এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষার পর রামের এই উক্তি—আমার মনে তোমার প্রতি কোনও সন্দেহ ছিল না, কিন্তু জনসমাজের দৃষ্টিতে তোমার এই শুদ্ধিকরণ প্রয়োজন ছিল—বুলকের ভাষায়, এই ধরনের প্রদর্শন সমগ্র মূল বাল্মীকী রামায়ণের ভাবধারার বিরোধী। (বুলকে, অনুচ্ছেদ ৫৬৫)।

এই প্রকরণ (অগ্নিপরীক্ষা)-র প্রক্ষেপ অবতারবাদ স্বীকৃত হওয়ার পরেই সম্ভব হয়েছে। কারণ পরবর্তীতে বলা হয়েছে যে রামের প্রকৃত কোনও দুঃখ নেই, তিনি তো নরলীলা করছেন। রাম ও সীতা যথাক্রমে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর অবতার। ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতারা রামকে বিষ্ণু এবং সীতাকে লক্ষ্মীর অবতার জেনে তাঁদের স্তব করছেন। বাল্মীকী রামায়ণের এটিই একমাত্র স্থান যেখানে সীতা ও লক্ষ্মীর অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (যুদ্ধকাণ্ড– ১১৭/২৭)।

এই প্রসঙ্গের প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও কিছু কারণ আছে—

১. যুদ্ধকাণ্ডের ১২৪তম সর্গে ভরদ্বাজ তপোবলে রামকথা জেনে যে বর্ণনা করেন, তাতে এই প্রসঙ্গ নেই। একইভাবে ১২৬তম সর্গে হনুমান ভরতকে যে কাহিনি বলেন, তাতেও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ নেই।

২. বালকাণ্ডের সর্গ–১ এবং সর্গ–৩-এ রামকথার সংক্ষিপ্ত অনুক্রমণিকা দেওয়া হয়েছে। সর্গ–১-এর তালিকায় অগ্নিপরীক্ষা আছে, কিন্তু সর্গ–৩-এর তালিকায় নেই। Father Kamil Bulke-এর মতে, এই দুই অনুক্রমণিকার প্রামাণিক সংস্করণই অগ্নিপরীক্ষার বিষয়ে নীরব (বুলকে, Ramkatha, পৃ–৪২৫, সংস্করণ–২০০৪)।

৩. উত্তরকাণ্ডও অগ্নিপরীক্ষা সম্পর্কে কিছুই বলে না। ২ (দুই) স্থানে রাম সীতার নির্দোষতার প্রমাণের উল্লেখ করেন। প্রথমবার সীতা-ত্যাগের সময় তিনি কেবল দেবতাদের সাক্ষ্যের কথা বলেন। দ্বিতীয়বার তিনি বাল্মীকিকে বলেন যে লঙ্কা-নিবাসের পর আমি তখনই সীতাকে গ্রহণ করেছি, যখন তিনি তাঁর সতীত্বের শপথ নিয়েছিলেন—

প্রত্যয়শ্চ পুরা বৃত্তো বৈদেহ্যাঃ শপথশ্চ কৃতস্তত্র তেন বেষ্ম সুসন্নিধৌ। প্রবেশিতা ॥
(সর্গ-৯৭, শ্লোক-৩)

যদি এই সর্গের রচনাকালে অগ্নিপরীক্ষার ঘটনা প্রচলিত থাকত, তবে এখানে রামের দ্বারা সীতার সতীত্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের উল্লেখ অবশ্যই হত। অতএব মানতে হবে যে উত্তরকাণ্ডের প্রামাণিক কাহিনি লিপিবদ্ধ হওয়ার পরেই অগ্নিপরীক্ষা-সংক্রান্ত প্রক্ষেপ যুদ্ধকাণ্ডের অংশে পরিণত হয়েছে।

৪. মহাভারতের রামোপাখ্যান থেকেও এই সিদ্ধান্ত (অর্থাৎ সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রক্ষিপ্ততা) সমর্থিত হয়। রামায়ণের এই প্রাচীনতম সংক্ষিপ্ত রূপে কোথাও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

3. অগ্নিপরীক্ষার পরবর্তী দুই সর্গ (১১৯–১২০)ও অপ্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত। এতে শিব রামের স্তব করেন, স্বর্গ থেকে রাজা দশরথ উপস্থিত হন এবং ইন্দ্র রামের অনুরোধে মৃত বানর-সৈন্যদের পুনরুজ্জীবিত করেন।

রামকথার উৎস হিসেবে বাল্মীকীয় রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, কম্বন রামায়ণ এবং তুলসীদাসকৃত ‘রামচরিতমানস’ সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এর মধ্যে বাল্মীকী রামায়ণই সর্বপ্রাচীন। কিন্তু এতে কবি, কথক এবং বিভিন্ন মত-পন্থার সমর্থক-বিরোধীদের এত হস্তক্ষেপ ঘটেছে যে আজ তার কাহিনিতে আসল-নকলের পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

জার্মান ভারতেরবিদ্যা-বিশারদ Hermann Jacobi বাল্মীকী রামায়ণের উত্তরকাণ্ড ও বালকাণ্ডকে সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেন। তবে সমগ্র বালকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হতে পারে না, কারণ অযোধ্যার বর্ণনা, রাজা, মন্ত্রী, পুরোহিত ও নাগরিকদের বিবরণ, পুত্রেষ্টি যজ্ঞ, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নের জন্ম, বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রাম-লক্ষ্মণের যজ্ঞরক্ষার্থে গমন, বল ও অতিবল শক্তির প্রাপ্তি, তাড়কা বধ, বিশ্বামিত্রের যজ্ঞরক্ষা, রামের বিবাহ এবং অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন—এই সমস্তই বালকাণ্ডে বর্ণিত। বালকাণ্ডে রামকথার মূল অংশ সর্গ ১–৮, ১৩, ১৪, ১৮–৩১, ৬৬–৭৩ এবং ৭৭—মোট ৩৩টি সর্গে সীমাবদ্ধ, অথচ এই কাণ্ডে মোট ৭০টি সর্গ আছে। অতএব বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ (যা রামকথার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়) এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়া প্রমাণিত হয়।

বাল্মীকী রামায়ণের বালকাণ্ডের প্রথম সর্গে প্রদত্ত বিষয়সূচীতেও উত্তরকাণ্ডের ঘটনাবলির উল্লেখ নেই। যুদ্ধকাণ্ডেই রামকথা সমাপ্ত করা হয়েছে। সীতা নির্বাসন উত্তরকাণ্ডের মূল কাহিনি। অধ্যাত্ম রামায়ণ, Tulsidas-রচিত ‘রামচরিতমানস’ এবং কম্বন-প্রণীত তামিল রামায়ণেও বাল্মীকীর অনুকরণে অযোধ্যায় রামের রাজ্যাভিষেক ও রামরাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই কাহিনির সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।

সিয় নিন্দক অঘ ওঘ নসায়ে। লোক বিসোক বনাই বসায়ে ॥
(রামচরিত মানস, বালকাণ্ড)

তুলসীদাসকৃত এই চৌপাই থেকে সীতার বনবাসের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, লেখকের মতে এটি গোস্বামীজির রচনা নয়, বরং পরবর্তীকালের প্রক্ষেপ।

সীতার নির্বাসনকে প্রসিদ্ধ আধুনিক তামিল রামায়ণের রচয়িতা C. Rajagopalachari-ও বাল্মীকীর রামচরিত্রের আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গত বলে মনে করেন। তাঁর ‘রামকথা দশরথ-নন্দন শ্রীরাম’-এ তিনি এই অংশ অন্তর্ভুক্ত করেননি এবং এটিকে প্রক্ষিপ্ত বলে স্বীকার করেছেন।

রামকথায় অতিশয়োক্তিপূর্ণ অমানবিক বর্ণনা কীভাবে বিস্তৃত হয়ে লোকমুখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা রাবণের ‘দশশীর্ষ’ (দশানন) এবং বিশটি বাহুর বর্ণনায় স্পষ্ট দেখা যায়। যদিও বাল্মীকী রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের দশম সর্গের ৮টি শ্লোকে (১০/১৫–২২) রাবণের দুইটি বাহুরই বর্ণনা রয়েছে। পরবর্তীতে রাবণ ও সুগ্রীবের যুদ্ধে রাবণ দুই হাতে সুগ্রীবকে ধরে মাটিতে আছাড় মারেন—

বাহুভ্যামাক্ষিপত্তলে (যুদ্ধকাণ্ড, ৪০/১৩)

অতএব অনুমান করা যায়, মূল কাহিনিতে রাবণের দুই হাতই ছিল। ‘দশগ্রীব’ শব্দের প্রকৃত অর্থ না বুঝে পরবর্তী সংযোজকরা তাকে বিশ বাহুযুক্ত করে তুলেছেন। দশমস্তকের প্রসঙ্গে বুলকে লিখেছেন— “রাবণের দশটি মস্তক ছিল... এমন বর্ণনা যেমন পাওয়া যায়, তেমনই অনেক স্থানে তার একটিমাত্র মস্তকের উল্লেখও রয়েছে। ‘দশগ্রীব’ শব্দটি প্রথমে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল (অর্থাৎ যার গ্রীবা দশজন সাধারণ মানুষের সমান শক্তিশালী), পরে তা আক্ষরিক অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে।” (Ramkatha: Utpatti aur Vikas, পৃ. ৯৩, অনুচ্ছেদ ১১২, সংস্করণ ২০০৪)

এরপর Vasudev Sharan Agrawal-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বুলকে অথর্ববেদের একটি মন্ত্র উল্লেখ করেছেন—

ব্রাহ্মণো জজ্ঞে প্রথমো দশশীর্ষো দশাস্যঃ।

স সোমং প্রথমঃ পপৌ স চকারারসং বিষম্ ॥ (৪/৬/১)

এবং লিখেছেন— অথর্ববেদে এক ‘দশাস্য’ (দশমুখ) ও ‘দশশীর্ষ’ ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে, যা রাবণের রূপকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে—এটি অসম্ভব বলা যায় না।

বুলকের এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে Ram Vilas Sharma তাঁর ‘রামকথা এবং ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়’ প্রবন্ধে লিখেছেন— অথর্ববেদের এই মন্ত্রেও রূপক অর্থই নিহিত, যেমন সাতভালেকরের টীকায় বলা হয়েছে— “শীর্ষ শব্দ বুদ্ধির এবং আস্য শব্দ বক্তৃতার প্রতীক; দশগুণ বুদ্ধিমান ও দশগুণ বিদ্বান—এই তার অর্থ।” এই ধরনের রূপকের সূচনা ঋগ্বেদের—

সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ (ঋগ্বেদ ১০/৯০/১)

—ইত্যাদি মন্ত্র থেকেই। কিছু পৌরাণিক ব্যাখ্যাতা এই রূপককে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে রাবণের এক মাথাকে দশটি এবং দুই হাতকে বিশটি করে তুলেছেন।

প্রক্ষেপসমূহের আলোচনা কেবল আধুনিক কালেই হয়েছে, এমন নয়। বেদান্ত দর্শনের দ্বৈতবাদ প্রবর্তক Madhvacharya (জন্ম—১১৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)-এর অপর নাম ‘আনন্দতীর্থ’। তিনি বেদান্তের উপর ‘পূর্ণপ্রজ্ঞ’ নামে ভাষ্য রচনা করেন। তাঁর আরেকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘মহাভারত-তাত্পর্য-নির্ণয়’। এতে তিনি লিখেছেন—

ক্বচিদ্গ্রন্থান্ প্রক্ষিপন্তি ক্বচিদন্তরিতানপি।
কুর্যুঃ ক্বচিচ্চব্যত্যাসং প্রমাদাৎ ক্বচিদন্যথা ॥৩॥
অনুৎসন্না অপি গ্রন্থা ব্যাকুলা ইতি সর্বশঃ।
উৎসন্নাঃ প্রায়শঃ সর্বে কোট্যংশোপি ন বর্ততে ॥৪॥ (২/৩–৪)

এর অর্থ এই যে— “প্রক্ষেপকারীরা কেবল নতুন শ্লোক রচনা করে মূল গ্রন্থে সংযোজনই করেন না, বরং বহু মূল শ্লোক (পাঠ) অপসারণও করেন। কোথাও কোথাও মূল শ্লোকের কিছু অংশ পরিবর্তন করে তার স্থলে নিজেদের রচিত পাঠ সংযোজন করেন। এর ফলে প্রাচীন গ্রন্থকারদের রচনায় ব্যাপক বিকৃতি (উলটপালট বা বিপর্যয়) ঘটেছে।” এই কারণেই রামায়ণ ও মহাভারতের মূল কাহিনিতে অনৈতিহাসিক, প্রত্যক্ষ প্রমাণবিরোধী এবং সৃষ্টিক্রমবিরোধী অসম্ভব ঘটনার আধিক্য দেখা যায়, যার ফলে বহু বিদ্বান এই কাহিনিগুলিকে কবিকল্পিত বলে মনে করেন।

রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণ

১. পশ্চিমী সংস্করণ—নির্ণয় সাগর প্রেস (১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) এবং Gujarati Printing Press (১৯১২–১৯২০) থেকে প্রকাশিত। এটি দাক্ষিণাত্য পাঠের প্রতিনিধিত্ব করে এবং অধিক প্রচলিত।

২. দাক্ষিণাত্য সংস্করণ—সম্পূর্ণ দাক্ষিণাত্য পাঠ, কুম্ভকোণম ও মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত।

৩. পূর্বোত্তরীয় (বঙ্গীয়) সংস্করণ—Gasper Gorresio (প্যারিস) সম্পাদিত; ‘গৌড়ীয় সংস্করণ’ নামেও পরিচিত; Calcutta Series থেকে প্রকাশিত।

৪. পশ্চিমোত্তরীয় সংস্করণ—D.A.V. College, Lahore থেকে পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত, পণ্ডিত রামলভায়া এবং পণ্ডিত বিশ্ববন্ধু শাস্ত্রী সম্পাদিত।

৫. আলোচনামূলক সংস্করণ (Critical Edition)—Baroda-এর Maharaja Sayajirao University-এর Oriental Institute-এর পণ্ডিতগণ প্রায় দুই সহস্র পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে ১৯৬০–১৯৭৫ সালের মধ্যে সাত কাণ্ডে প্রকাশ করেন।

প্রচলিত সংস্করণে ৭ কাণ্ড, ৬৪৫ সর্গ এবং ২৪,০৪৯ শ্লোক পাওয়া যায়; কিন্তু Baroda Critical Edition-এ ৭ কাণ্ড, ৬০৬ সর্গ এবং ১৮,৭৬৬ শ্লোক প্রকাশিত হয়েছে।

ঈসা-পরবর্তী তৃতীয় শতকের গ্রন্থ Abhidharma Mahāvibhāṣā-তে রামায়ণের উল্লেখ আছে, যেখানে বলা হয়েছে—‘Ramayana’ নামক গ্রন্থে ১২,০০০ শ্লোক রয়েছে। এর অর্থ এই যে সেই সময়ে রামায়ণের আকার বর্তমানের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ছিল; অতএব ‘আদি রামায়ণ’-এ শ্লোকসংখ্যা আরও কম ছিল। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে Śrīmad-Valmīkiya-Rāmāyaṇam (শোধিত) গ্রন্থের সম্পাদক Śrī Niranjanlal Mangal মূল শ্লোকসংখ্যা ৩৬০৭ নির্ধারণ করেছেন এবং সেই অনুযায়ী প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে যুদ্ধকাণ্ডই উত্তরকাণ্ড, পৃথক উত্তরকাণ্ড নেই। এই অনুযায়ী ৬ কাণ্ড, প্রতি কাণ্ডে ২৪ সর্গ এবং প্রতি সর্গে ২৪ শ্লোক।

রামায়ণের গবেষণামূলক উপস্থাপনার বহু প্রচেষ্টা পূর্বে হয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশক ‘সংক্ষিপ্ত Ramayanam’ প্রকাশ করেছেন। Arya Samaj-এর ক্ষেত্রে Brahmachari Akhilanand প্রক্ষিপ্ত শ্লোকগুলি পৃথকভাবে চিহ্নিত করে প্রকাশ করেন। মহামহোপাধ্যায় আর্যমুনি-র ‘রামায়ণার্য ভাষ্য’, শ্রিপাদ দামোদর সাতভালেকর-এর টীকা, পণ্ডিত প্রেমচন্দ্র শাস্ত্রী সম্পাদিত সংস্করণ, স্বামী জগদীশ্বরানন্দ সরস্বতীর প্রচেষ্টা, ঈশ্বরীপ্রসাদ প্রেম-এর ‘শুদ্ধ রামায়ণ’—এসব উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্বামী ব্রহ্মমুনি-র ‘রামায়ণ দর্পণ’ এবং স্বামী জগদীশ্বরানন্দ-এর ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম’ গ্রন্থ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে উপস্থাপিত ‘Ramayan Sandarshika’ গ্রন্থটি তরুণ পণ্ডিত যশপাল-এর গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার ফল। লেখক রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ধারণার খণ্ডন করে যুক্তি ও প্রমাণসহ সঠিক সমাধান উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন সংস্করণ ও পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি যে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই নতুন গ্রন্থ নিঃসন্দেহে রামায়ণ বিষয়ক সাহিত্যে সমৃদ্ধি আনবে এবং রামায়ণপ্রেমী পাঠকদের আনন্দ প্রদান করবে।

বাল্মীকী রামায়ণে প্রক্ষেপ, বিকৃতি, ভ্রান্তি ও নানা সমস্যা বিদ্যমান। গ্রন্থকার শ্রী যশপাল কিছু গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিজনক প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ভ্রান্তিগুলিকে দূর করার একটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা করেছেন। প্রক্ষেপ চিহ্নিত করার জন্য তিনি রামায়ণের পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন সংস্করণ, Critical Edition, পুরাণ এবং প্রাচীন টীকাকারদের পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে ‘পারস্পরিক বিরোধ’-কে ভ্রান্তি-নিরসনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোথাও কোথাও বেদমন্ত্র, মনুস্মৃতি এবং Dayananda Saraswati ও পাশ্চাত্য লেখকদের মতামতের দ্বারা নিজের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন।

✍️ সূত্র: 📕রামায়ণ সন্দর্শিকা
ডঃ জ্বলন্তকুমার শাস্ত্রী, বৈদিক বিদ্বান,
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সংস্কৃত বিভাগ,
রণবীর রণঞ্জয় স্নাতকোত্তর মহাবিদ্যালয়,
আমেঠি–২২৭৪০৫ (উত্তর প্রদেশ)
প্রাক্তন সম্পাদকঃ ‘বৈদিক পথ’ (মাসিক)।
Read More

20 March, 2026

মহাভারত যুদ্ধকে ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে তারিখ নির্ধারণ:

20 March 0

মহাভারত যুদ্ধকে ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে তারিখ নির্ধারণ:

ভারতের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উল্লেখ

মহাভারতের গ্রহণসমূহ একটি অত্যন্ত বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার কথা বলে, যেখানে দুটি গ্রহণের মধ্যে মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধান ছিল— যা ভারতের প্রাচীন মহাভারত মহাকাব্যে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মহাভারতে জ্যোতির্বিদ পুরোহিতদের দ্বারা প্রাচীনকালে নথিভুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে আজ আমরা কুরু ও পাণ্ডবদের মধ্যে সংঘটিত ঐতিহাসিক সংঘর্ষের তারিখ পুনর্গঠন করতে পারি।

ড. এস. বালকৃষ্ণ অনুমান করেছেন যে গ্রহণগুলোর মধ্যে ১৩ দিনের এই বিরল ব্যবধান আসলে একটি বাস্তব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার নির্দেশ করে, যা প্রথমে ১১ আগস্ট, ৩১২৯ খ্রিস্টপূর্বে ভারতের কুরুক্ষেত্র (৩০° উত্তর, ৭৭° পূর্ব) থেকে পর্যবেক্ষিত হয়েছিল।

প্রাচীন ভারতের মহাভারত যুদ্ধের ঐতিহাসিক তারিখ নির্ধারণের জন্য ড. বালকৃষ্ণ যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন তা অত্যন্ত কৌশলী এবং এটি দেখায় যে মানব ইতিহাস পুনর্গঠনে প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মহাভারতের প্রাচীন শাস্ত্রগুলোতে একটি বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে— যেখানে মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে পরপর দুটি গ্রহণ দেখা গিয়েছিল। সাধারণত, আরেকটি গ্রহণ ঘটার আগে চাঁদকে পৃথিবীর চারদিকে অন্তত অর্ধেক পথ অতিক্রম করতে হয়, ফলে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের পুনরায় গ্রহণ সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত বিন্যাস তৈরি হতে সাধারণত ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু মহাভারতের পাঠ্যে মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানের এই বিরল ঘটনাটির কথা বলা হয়েছে। এই ঘটনাটি পাঠ্যে বিরল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এটি স্পষ্টতই কোনো ভুল বা অসাবধানতাজনিত উল্লেখ নয়।

ড. এস. বালকৃষ্ণ যা করেছেন তা হলো, চাঁদের কক্ষপথের পরিবর্তন ও বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে এই ধরনের ঘটনা কখন ঘটতে পারে তার কয়েকটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা। তাঁর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ইতিহাসে এই ঘটনার জন্য একাধিক সম্ভাব্য সময় রয়েছে, তবে মনে রাখতে হবে যে পর্যবেক্ষণটি ভারতে, নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান থেকে করা হয়েছিল— যা সম্ভাব্য সময়গুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। যেহেতু ১৩ দিনের ব্যবধানের অনেক সম্ভাব্য ঘটনা কুরুক্ষেত্র থেকে দেখা যেত না, তাই ড. বালকৃষ্ণ ১১ আগস্ট, ৩১২৯ খ্রিস্টপূর্বের সূর্যগ্রহণ এবং তার পরবর্তী ২৫ আগস্টের চন্দ্রগ্রহণকে চিহ্নিত করেছেন, যা ১৪তম সূর্যোদয়ের আগেই ঘটে।

এখন, ড. বালকৃষ্ণের কাজ মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি যে মহাভারতের গ্রহণসমূহের জন্য ৩১২৯ খ্রিস্টপূর্ব তারিখ নির্ধারণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, ২৫ আগস্ট, ৩১২৯ খ্রিস্টপূর্বের চন্দ্রগ্রহণটি…

___________________________________

1 http://www.vedicastronomy.net/mahabharatha.htm

2 The idea of 13 days means 13 sunrises, so the Lunar eclipse occurs before the 14 th sunrise. 

যা কুরুক্ষেত্র থেকে দৃশ্যমান নয়, কারণ এটি দিগন্তের নিচে সংঘটিত হয়, এবং দ্বিতীয়ত, মহাভারতের পাঠ্যে আরও বহু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে যা ড. বালকৃষ্ণ প্রস্তাবিত তারিখের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

উদাহরণস্বরূপ, মহাভারতের পাঠ্যে প্রদত্ত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উল্লেখগুলো স্পষ্টভাবে জানায় যে বৃহস্পতি ও শনি একই নক্ষত্রমণ্ডলে যুগপৎ অবস্থানে রয়েছে, এবং এটিই ছিল বালকৃষ্ণের নির্ধারণে প্রথম সমস্যার ইঙ্গিত। ৩১২৯ খ্রিস্টপূর্বে— যেখানে ড. বালকৃষ্ণ ১৩ দিনের গ্রহণ-অস্বাভাবিকতাটি স্থাপন করেন— সেখানে কোনো বৃহস্পতি-শনি যুগপৎ অবস্থান ছিল না। একইভাবে, মহাভারতের পাঠ্যে উল্লিখিত রেগুলাস নক্ষত্রের নিকটে মঙ্গলের অবস্থানও এই নির্ধারণে অনুপস্থিত। প্রকৃতপক্ষে, প্রায় সব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উল্লেখই উপেক্ষিত হয়েছে এবং ৩১২৯ খ্রিস্টপূর্ব নির্ধারণের সঙ্গে পাঠ্যের উল্লেখগুলোর অসামঞ্জস্য রয়েছে।

পাঠ্যে গ্রহগুলোর অবস্থান সম্পর্কিত বহু বিবরণ রয়েছে, এবং এগুলোর কোনোটিই ড. বালকৃষ্ণ প্রদত্ত তারিখের সঙ্গে মেলে না। তাই আমরা ড. বালকৃষ্ণের কাজকে ভিত্তি করে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং বৃহস্পতি ও শনির যুগপৎ অবস্থানের বিবরণের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি, কারণ গুপ্ত যুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্ট মহাভারত যুদ্ধের আনুমানিক তারিখ ৩১০২ খ্রিস্টপূর্ব নির্ধারণে এই তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি যে পাঠ্য অনুযায়ী মকর রাশিতে বৃহস্পতি-শনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুগপৎ অবস্থানটি ৭ ডিসেম্বর, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে সংঘটিত হয়। বৃহস্পতি ও শনির অবস্থান সংক্রান্ত এই তথ্য দীর্ঘ সময়পর্ব— যেমন ভারতের যুগসমূহ— নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের সেই নির্দিষ্ট বছরটি নির্ধারণে সহায়তা করে যখন এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা পর্যবেক্ষিত হয়েছিল।

এরপর আমরা মহাভারতের পাঠ্যে প্রদত্ত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলোর একটি সংক্ষিপ্তসার দিচ্ছি, যা পশ্চিমা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে:

১. ঊর্ধ্বগামী চন্দ্র নোড সূর্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
২. নিম্নগামী চন্দ্র নোড স্পিকা (α Virgo)-এর পরবর্তী অবস্থানে।
৩. কর্কট রাশিতে একটি ভয়ংকর ধূমকেতুর উদয়।
৪. রেগুলাস (α Leo)-এর নিকটে মঙ্গল।
৫. মকর রাশিতে বৃহস্পতি।
৬. মকর রাশিতে শনি।
৭. অ্যান্ড্রোমিডা (α Andromeda)-এর নিকটে শুক্র।
৮. পেগাসাস (রাশিচক্রে মীন)-এ শুক্র ও মঙ্গলের যুগপৎ অবস্থান।
৯. নিম্নগামী চন্দ্র নোড বৃশ্চিক রাশিতে।
১০. ধ্রুবতারা প্রখরভাবে দীপ্ত (তৎকালীন α Draconis)।
১১. বৃষ (α Taurus)-এর নিকটে চন্দ্র ও সূর্য।
১২. কর্কটে মঙ্গল এবং মকরে বৃহস্পতির বিপরীত অবস্থানে।
১৩. তুলা রাশিতে স্থির অবস্থায় বৃহস্পতি ও শনি।
১৪. গ্রহণের মধ্যে ১৩ দিনের ব্যবধান।

যেমনটি দেখা যাচ্ছে, ১৩ দিনের গ্রহণের ঘটনা কেবলমাত্র বহু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উল্লেখের একটি, যা আমাদের জানায় যে প্রায় ৫০০০ বছর আগে মহাভারত যুদ্ধ কখন সংঘটিত হয়েছিল। পাঠ্যের বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে দেখায় যে এখানে একটি মাত্র ঘটনা নয়, বরং একাধিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে— এবং এখানেই প্রাচীন পাঠ্যের বর্ণনার প্রকৃত মেধা নিহিত।

যদি পাঠ্যে কেবল একটি গ্রহীয় বিন্যাস নির্ধারণ করা হতো, তবে সেই ঘটনাটি খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব হতো। কিন্তু যেহেতু মহাভারতের পাঠ্যে একই গ্রহগুলোর একাধিক বিন্যাসের উল্লেখ রয়েছে, তাই আমরা সময়ের একটি আরও নির্দিষ্ট পরিসরে পৌঁছাতে সক্ষম হই, যেখানে এই ঘটনাগুলোর সন্ধান করা সম্ভব।

__________________________________

৩. এই ১৮টি তথ্য এই গবেষণার শেষে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে আগ্রহী পাঠক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্যগুলো যাচাই করতে পারেন।

৪. এই তথ্যগুলো পরবর্তীতে আরও বিশদভাবে এবং ১৮টি পৃথক উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তারিখ নির্ধারণের জন্য ১৩ দিনের গ্রহণ-অস্বাভাবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্রহীয় বিন্যাস খুঁজে বের করতে হয়।

উদাহরণস্বরূপ, কর্কট রাশিতে এক ভয়ংকর ধূমকেতুর উল্লেখটি সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ধূমকেতু— যেটিকে আমরা আজ হ্যালির ধূমকেতু নামে চিনি— তারই প্রতি ইঙ্গিত করে। এই ধূমকেতুটি সূর্যের চারদিকে তার দীর্ঘ পরাবৃত্তাকার কক্ষপথ সম্পন্ন করে ফিরে এলে পুনরায় কর্কট রাশিতে দৃশ্যমান হয়। এর আবর্তনকাল প্রায় ৭৫ থেকে ৭৬ বছর, ফলে হ্যালির ধূমকেতুর দর্শন জীবনে একবারই ঘটে। এই গবেষণার শেষে প্রদত্ত বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ৫০০০ বছরেরও বেশি আগে এই ধূমকেতুর দর্শন আনুমানিক ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল বলে গণনা করা যায়, যদিও এতে কিছু ত্রুটির সম্ভাবনা রয়েছে যা একে নির্দিষ্ট তারিখ হিসেবে গ্রহণের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে যেহেতু নির্দিষ্ট গ্রহীয় অবস্থানগুলোর সঙ্গে মিল থাকতে হবে, তাই এই অনিশ্চয়তা ক্রমশ কমে আসে যতক্ষণ না বর্ণিত ঘটনাগুলোর অধিকাংশ বা সবকটির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।

উদাহরণস্বরূপ, পাঠ্যে মঙ্গলের তিনটি ভিন্ন অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে: একটি সিংহ (৪), একটি কর্কট (১২), এবং আরেকটি শুক্রের সঙ্গে যুগপৎ অবস্থানে (৮)। শেষোক্ত অবস্থানটি রাশিচক্রে মীন রাশিতে ঘটেছে বলে বলা হয়েছে, এবং বাস্তবেই এটি ৪ এপ্রিল, ৩১০৬ খ্রিস্টপূর্বে ঘটেছিল। পরবর্তীতে, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে মঙ্গল রাশিচক্রে পরিভ্রমণ করে কর্কট অতিক্রম করে সিংহে পৌঁছায়, যেমনটি (৪) নম্বর পয়েন্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতি ও শনির জন্য দুটি অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে, এবং আগেই বলা হয়েছে যে এটি সময় নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। (৫) ও (৬) নম্বর পয়েন্টে এই দুটি গ্রহের মকর রাশিতে অবস্থান বর্ণিত হয়েছে, আর (১৩)-তে তুলা রাশিতে। বৃহস্পতি ও শনির যুগপৎ অবস্থানের ত্রিভুজাকার বিন্যাস সম্পর্কে জানা থাকলে সহজেই বোঝা যায় যে মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী এই ‘মহাযুগপৎ অবস্থান’ মকর, তুলা ও বৃষ রাশিতে সংঘটিত হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো যথাক্রমে ৩১৪৪ খ্রিস্টপূর্বে (তুলা), ৩১২৪ খ্রিস্টপূর্বে (বৃষ) এবং ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে (মকর) ঘটেছিল।

এই তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী যুগ পরিবর্তনের বছর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়, তবে ১৩ দিনের গ্রহণের ঘটনাটি আমাদের সেই নির্দিষ্ট মাস ও দিন নির্ধারণে সাহায্য করে। পূর্বে সংক্ষেপে যেমন দেখা গেছে, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে রেগুলাস (α Leo)-এর নিকটে মঙ্গলের অবস্থান এবং একই বছরে মকর রাশিতে বৃহস্পতি-শনির মহাযুগপৎ অবস্থান নির্দেশ করে যে ঘটনাটি সম্ভবত ওই বছরেই সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো— ওই বছরে কি ১৩ দিনের গ্রহণ-অস্বাভাবিকতা ঘটেছিল? উত্তর হলো— হ্যাঁ, এবং এমন অনুকূল অবস্থায় ঘটেছিল যে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ উভয়ই ভারতের কুরুক্ষেত্র (৩০° উত্তর, ৭৭° পূর্ব) থেকে দেখা সম্ভব ছিল।

পাঠ্যে (১১) বলা হয়েছে যে সূর্য ও চন্দ্র বৃষ রাশিতে অবস্থান করবে, বা আরও নির্দিষ্টভাবে অ্যালডেবারান (α Taurus)-এর নিকটে— যা রাশিচক্রের ষাঁড়ের চোখ হিসেবে পরিচিত। এই সূর্য-চন্দ্র অবস্থান আমাদের জানায় যে সূর্যগ্রহণটি রাশিচক্রের কোন স্থানে ঘটেছিল, এবং একইসঙ্গে এটি নির্দেশ করে যে ঘটনাটি বসন্ত বিষুবের পর প্রথম পূর্ণিমার সময় সংঘটিত হয়েছিল।

পাঠ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে যে ১৩ দিনের গ্রহণটি ‘প্রথম লুনেশন’ থেকে শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ বসন্ত বিষুবের পর প্রথম অমাবস্যায়। এই সমস্ত তথ্য হাতে থাকায় মহাভারতের পাঠ্যে উল্লিখিত নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা খুব কঠিন হয়ে ওঠেনি।

_________________________________________

৫. প্রায় ৫০০০ বছর আগে বসন্ত বিষুব বৃষ রাশিতে অবস্থান করত, যা নিশ্চিত করে যে আলোচ্য তারিখটি আমাদের সময় থেকে না বেশি সাম্প্রতিক, না আরও প্রাচীন— বরং প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বের।

আমরা ভারতের কুরুক্ষেত্রের ভৌগোলিক অবস্থানে ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের ২০ এপ্রিল দাঁড়িয়ে আছি। এটি বসন্ত বিষুবের পর প্রথম অমাবস্যা, যেখানে নির্দেশিত সূর্যগ্রহণটি ভোরের মুহূর্তেই সংঘটিত হতে দেখা যায়, যেমন আধুনিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সফটওয়্যার স্টেলারিয়াম প্রদর্শন করে। ওই দিনে সূর্য উদয় হয় আংশিকভাবে চাঁদের দ্বারা আবৃত অবস্থায়, এবং প্রত্যাশিতভাবেই— এবং মহাভারতের বর্ণনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে— এই সূর্যগ্রহণ ও পরবর্তী ৪ মে-এর চন্দ্রগ্রহণের মধ্যে ঠিক ১৩ দিনের ব্যবধান রয়েছে, যা ১৪তম সূর্যোদয়ের আগেই ঘটে।

৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের ৪ মে (তৃতীয় চিত্র)-এ পৃথিবীর ছায়া আংশিকভাবে চাঁদকে আচ্ছাদিত করে যখন তা দিগন্তের নিচে নামতে থাকে, ফলে সেই সময়ের যে কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানীর জন্য ১৩ দিনের (সূর্যোদয় গণনায়) ব্যবধানে দুটি গ্রহণ প্রত্যক্ষ করার এক অনন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের ২০ এপ্রিল (জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বর্ষপঞ্জিতে −৩১০৪) ভারতের কুরুক্ষেত্রে সূর্যোদয়ের সিমুলেশন। সকালে সূর্য গ্রহণাবস্থায় উদিত হয় এবং সর্বাধিক গ্রহণের মুহূর্তটি কয়েক ঘণ্টা পর সকালেই ঘটে।



সূর্যগ্রহণটি বৃষ রাশিতে সংঘটিত হয়। আকাশীয় ষাঁড়ের চোখ, অ্যালডেবারান নক্ষত্র, বিষুববিন্দুর অবস্থান নির্দেশ করে এবং এটি হিন্দু নক্ষত্রমণ্ডল বা নক্ষত্র ‘রোহিণী’-এর চিহ্ন। গ্রহণটি রোহিণীতে ঘটে, যেমনটি মূল পাঠ্যে বলা হয়েছে, এবং একইসঙ্গে এটি বছরের প্রথম অমাবস্যাতেও সংঘটিত হয়, যেমন মহাভারতের পাঠ্যেও উল্লেখ আছে। সূর্য সদ্য বিষুববিন্দু অতিক্রম করেছে, যা বিষুবীয় সমতল (নীল) এবং ক্রান্তিবৃত্তীয় সমতল (লাল)-এর ছেদবিন্দু; ফলে এই গ্রহণটি বছরের প্রথম অমাবস্যায় সংঘটিত হচ্ছে।


১৪তম সূর্যোদয়ের ঠিক আগে, চাঁদ দিগন্তের নিচে নামার পূর্বমুহূর্তে পৃথিবীর ছায়ায় আচ্ছাদিত হতে শুরু করে, এবং এর ফলে মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী ১৩ দিনের (সূর্যোদয় গণনায়) মধ্যে চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হয়।


প্রাচীন পাঠ্যের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো বৃহস্পতি ও শনির অবস্থান। এখানে, সূর্যগ্রহণের মুহূর্তে উভয়ই মকর রাশিতে অবস্থান করছে, যেমনটি পাঠ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, এবং একই বছরের পরবর্তী সময়ে, ৭ ডিসেম্বর, তারা যুগপৎ অবস্থানে (সংযোজনে) আসবে।

মহাভারতের পাঠ্যে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উল্লেখগুলোর একটি বিশদ পর্যালোচনা

২০ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব (JD 587432) তারিখে মহাভারতের গ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য মহাভারতের ৫ম ও ৬ষ্ঠ গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেগুলো উদয়োগ পর্ব ও ভীষ্ম পর্ব নামে পরিচিত।

এই প্রাচীন পাঠ্যগুলোর প্রদত্ত তথ্যের নিম্নোক্ত উপস্থাপনায় আমরা প্রথমে ১৮৮৩ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত কিসারী মোহন গাঙ্গুলির ইংরেজি অনুবাদ থেকে মূল বিষয়বস্তু উদ্ধৃত করব। এরপর আমরা বাক্যগুলোর মধ্যে থাকা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উল্লেখগুলো আলাদা করে সেগুলোর বর্ণিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট তারিখ দেখাব।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে পাঠ্যটি হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞানের কারিগরি পরিভাষা ব্যবহার করেছে, তাই রাশিচক্রের অবস্থান সম্পর্কে খুব স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়ার আশা করা যায় না, কারণ হিন্দু জ্যোতির্বিদরা পশ্চিমে মেসোপটেমিয়া ও মিশরীয়দের মাধ্যমে প্রাপ্ত ১২টি রাশিচক্রের পরিবর্তে ২৮টি নক্ষত্রমণ্ডল বা নক্ষত্রের একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করতেন।

প্রাচীন হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞানের ২৮টি নক্ষত্র চাঁদের কক্ষপথের সমতলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ক্রান্তিবৃত্তীয় সমতলের সঙ্গে নয়। ফলে কখনো কখনো পশ্চিমা জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনায় এমন নক্ষত্রমণ্ডল অন্তর্ভুক্ত হয় যা রাশিচক্রের অংশ নয়, যদিও সেগুলো রাশিচক্রের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, পেগাসাস, ওরিয়ন এবং অ্যাকুইলা নক্ষত্রমণ্ডল নক্ষত্র ব্যবস্থার অংশ হলেও এগুলো রাশিচক্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই নক্ষত্রের স্থানাঙ্ককে অনুবাদ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সেই নির্দিষ্ট নক্ষত্রগুলো চিহ্নিত করা যা সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডল গঠন করে। পরবর্তী পৃষ্ঠায় আমরা হিন্দু নক্ষত্র ও রাশিচক্র ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্কগুলো দেখতে পাব।


নক্ষত্র ও রাশিচক্র

১. উত্তর ফাল্গুনি — ডেনেবোলা
২. পূর্ব ফাল্গুনি — δ ও η Leo
৩. মঘা — রেগুলাস
৪. আশ্লেষা — δ, ε, η, ρ এবং σ Hydra
৫. পুষ্য — γ, δ ও θ Cancer
৬. পুনর্বসু — কাস্টর ও পোলাক্স
৭. আর্দ্রা — বেতেলজিউস
৮. মৃগশিরা — λ, φ Orion
৯. রোহিণী — অ্যালডেবারান
১০. কৃত্তিকা — প্লেইয়াডিস
১১. ভরণী — 35, 39 এবং 41 Aries
১২. অশ্বিনী — β এবং γ Aries
১৩. রেবতী — ζ Piscium
১৪. উত্তর ভাদ্রপদ — γ Pegasus এবং α Andromeda
১৫. পূর্ব ভাদ্রপদ — α এবং β Pegasus
১৬. শতভিষা — γ Aquarii
১৭. ধনিষ্ঠা — α থেকে δ Delphini
১৮. শ্রবণা — α, β এবং γ Aquila
১৯. অভিজিৎ — α, ε এবং ζ Lyra – Vega
২০. উত্তরাষাঢ়া — ζ এবং σ Sagittarius
২১. পূর্বাষাঢ়া — δ এবং λ Sagittarius
২২. মূলা — ε, ζ, η, θ, ι, κ, λ এবং ν Scorpio
২৩. জ্যেষ্ঠা — অ্যান্টারেস
২৪. অনুরাধা — β, δ এবং π Scorpio
২৫. বিশাখা — α, β, γ এবং λ Libra
২৬. স্বাতী — আর্কটুরাস
২৭. চিত্রা — স্পিকা
২৮. হস্তা — α, β, γ, δ এবং ε Corvi

পাঠক লক্ষ্য করবেন যে ঘড়ির কাঁটার দিকের সংখ্যা সূর্য ও চন্দ্রের বার্ষিক গতির বিপরীত দিকে চলে। তাই এখানে নক্ষত্রগুলো উল্টো ক্রমে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু তবুও তারা তাদের সংশ্লিষ্ট রাশিচক্র অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উৎস:
গ্রন্থ ৫, উদ্যোগ পর্ব, অধ্যায় CXLII (১৪৩)-এ বলা হয়েছে:

“অত্যন্ত দীপ্তিমান ভয়ংকর গ্রহ শনৈশ্চর (শনি) রোহিণী [α Taurus] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে, পৃথিবীর জীবজগতকে ব্যাপকভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্য। অঙ্গারক (মঙ্গল) গ্রহ, হে মধুসূদন, জ্যেষ্ঠা [α Scorpio]-এর দিকে গমন করতে করতে অনুরাধা [তুলার দিকে বিপরীতগতি] নক্ষত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা বন্ধুদের ব্যাপক হত্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিঃসন্দেহে, হে কৃষ্ণ, কুরুদের উপর এক ভয়ংকর বিপর্যয় আসন্ন, বিশেষত যখন, হে বৃশ্নিবংশীয়, মহাপাত গ্রহ চিত্রা [α Virgo] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে। চন্দ্রপৃষ্ঠের চিহ্ন তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে; এবং রাহুও সূর্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।”

পাঠ্যের বিশ্লেষণ:

১) “অত্যন্ত দীপ্তিমান ভয়ংকর গ্রহ শনৈশ্চর (শনি) রোহিণী [α Taurus] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে…”
এখানে বলা হয়েছে যে শনি α Taurus নক্ষত্রের নিকটে অবস্থান করছে, যা পশ্চিমা জ্যোতির্বিজ্ঞানে অ্যালডেবারান নামে পরিচিত। এটি ৩১২৫ খ্রিস্টপূর্বে ঘটেছিল, এবং যেহেতু শনি রাশিচক্র অতিক্রম করতে প্রায় ৩০ বছর সময় নেয়, তাই এটি সেই সময়ের আগে বা পরে পুনরাবৃত্ত হতে পারে।

২) “অঙ্গারক (মঙ্গল) গ্রহ… জ্যেষ্ঠা [α Scorpio] নক্ষত্রের দিকে গমন করতে করতে অনুরাধা [তুলার দিকে বিপরীতগতি] নক্ষত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে…”
এখানে বলা হয়েছে যে মঙ্গল বিপরীতগতিতে রয়েছে, কারণ এটি জ্যেষ্ঠা থেকে অনুরাধার দিকে যাচ্ছে, অর্থাৎ α Scorpio (অ্যান্টারেস) থেকে β Scorpio-এর দিকে, যা ক্রান্তিবৃত্ত বরাবর বিপরীত গতিপথ। ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্বে ৫ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত এই অবস্থানে মঙ্গল বিপরীতগতিতে ছিল।

৩) “…মহাপাত গ্রহ চিত্রা [α Virgo] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে।”
এখানে শনি ‘মহাপাত’ নামে উল্লেখিত হয়েছে, এবং ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্বে যখন মঙ্গল বিপরীতগতিতে ছিল, তখন শনি চিত্রা নক্ষত্রে (α Virgo বা স্পিকা) অবস্থান করছিল। ফলে এই তৃতীয় বিবরণটি মঙ্গলের অবস্থানের দ্বিতীয় বিবরণের সঙ্গে সমসাময়িক।

৪) “চন্দ্রপৃষ্ঠের চিহ্ন তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে; এবং রাহুও সূর্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।”
এই সময়ে ঊর্ধ্বগামী চন্দ্র নোড রাহু মিথুন ও বৃষ রাশির মধ্যে অবস্থান করছিল। ৩০ এপ্রিল, ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্বে একটি সূর্যগ্রহণ ঘটেছিল, যার পরে ১৩ মে একটি চন্দ্রগ্রহণ হয়। রাহু ‘সূর্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে’— এই ধারণাটি এসেছে এই কারণে যে নোডগুলো ক্রান্তিবৃত্ত বরাবর ঘূর্ণায়মান থাকে, যখন সূর্য বছরে তার গতিপথে অগ্রসর হয়। তবে এই বক্তব্যটি বিশেষ অর্থবহ নয়, কারণ এটি সব সময়ই ঘটে। এর প্রকৃত অর্থ সম্ভবত এই যে ঊর্ধ্বগামী চন্দ্র নোড (রাহু) বসন্ত বিষুববিন্দুর (সূর্যের ঊর্ধ্বগামী নোড) সঙ্গে মিলিত হতে চলেছিল। এবং বাস্তবে এটি ২০ জুলাই, ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্বে সংঘটিত হয়।

গ্রন্থ ৬, ভীষ্ম পর্ব, অধ্যায় III (৩)-এ বলা হয়েছে:

“…পৃথিবী বারবার কাঁপছে, এবং রাহু সূর্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শ্বেত গ্রহ (কেতু) চিত্রা [α Virgo] নক্ষত্র অতিক্রম করে অবস্থান করছে। এই সমস্তই বিশেষভাবে কুরুদের ধ্বংসের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এক ভয়ংকর ধূমকেতু উদিত হয়েছে, যা পুষ্য [Cancer] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে। এই মহাগ্রহ উভয় সেনাবাহিনীর জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। মঙ্গল মঘা [α Leo]-এর দিকে গমন করছে এবং বৃহস্পতি (বৃহস্পতি) শ্রবণা [Aquila/Capricorn]-এর দিকে। সূর্যের সন্তান (শনি) ভাগ নক্ষত্রের দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে পীড়িত করছে। শুক্র গ্রহ পূর্বভাদ্রপদ [α Pegasus/Pisces]-এর দিকে অগ্রসর হয়ে উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করছে এবং উত্তরভাদ্রপদ [α Andromeda/Pisces]-এর দিকে গমন করে, একটি ক্ষুদ্র গ্রহের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। শ্বেত গ্রহ (কেতু), ধোঁয়ামিশ্রিত আগুনের মতো জ্বলতে জ্বলতে, ইন্দ্রের পবিত্র জ্যেষ্ঠা [α Scorpio] নক্ষত্রকে আক্রমণ করে অবস্থান করছে। ধ্রুব নক্ষত্র (ধ্রুবতারা), প্রখরভাবে জ্বলতে জ্বলতে, ডানদিকে ঘুরছে। চন্দ্র ও সূর্য উভয়েই রোহিণী [α Taurus] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে। ভয়ংকর গ্রহ (রাহু) চিত্রা [α Virgo] ও স্বাতী [α Bootes]-এর মধ্যে অবস্থান নিয়েছে। অগ্নিসদৃশ দীপ্তিময় লালবর্ণের (মঙ্গল) গ্রহ, বক্রপথে গমন করে, বৃহস্পতির দ্বারা আবৃত অবস্থায় শ্রবণা [α Aquila/Capricorn]-এর সঙ্গে সরলরেখায় অবস্থান করছে।

(…)

এই দুই দীপ্তিমান গ্রহ, অর্থাৎ বৃহস্পতি ও শনি, বিশাখা [α Libra] নক্ষত্রে এসে একত্রিত হয়ে পূর্ণ এক বছর স্থির অবস্থায় রয়েছে। এক পক্ষের মধ্যে তিনটি লুনেশন দুইবার সংঘটিত হওয়ায় পক্ষের দৈর্ঘ্য দুই দিন কমে গেছে। ফলে প্রথম লুনেশন থেকে ত্রয়োদশ দিনে, তা পূর্ণিমা হোক বা অমাবস্যা, চন্দ্র ও সূর্য রাহুর দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই ধরনের অদ্ভুত গ্রহণ— চন্দ্র ও সূর্য উভয়ই— ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের পূর্বাভাস দেয়।

(…)

ভয়ংকর কর্মসম্পন্ন রাহু, হে রাজন, কৃত্তিকা [Pleiades] নক্ষত্রকেও পীড়িত করছে। ভয়ঙ্কর বিপদের পূর্বাভাসবাহী প্রবল বাতাস নিরন্তর প্রবাহিত হচ্ছে। এই সবই বহু দুঃখজনক ঘটনার সমন্বয়ে এক যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নক্ষত্রগুলো তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রতিটি শ্রেণির কোনো না কোনো নক্ষত্রের উপর অশুভ গ্রহ প্রভাব বিস্তার করেছে, যা ভয়াবহ বিপদের পূর্বাভাস দেয়। পূর্বে একটি পক্ষের দৈর্ঘ্য ছিল চৌদ্দ, পনেরো বা ষোলো দিন। কিন্তু আমি কখনো শুনিনি যে অমাবস্যা প্রথম লুনেশন থেকে ত্রয়োদশ দিনে ঘটতে পারে, অথবা পূর্ণিমাও একইভাবে ত্রয়োদশ দিনে ঘটতে পারে। অথচ একই মাসে চন্দ্র ও সূর্য উভয়ই প্রথম লুনেশন থেকে ত্রয়োদশ দিনে গ্রহণগ্রস্ত হয়েছে। অতএব সূর্য ও চন্দ্র অস্বাভাবিক দিনে গ্রহণগ্রস্ত হয়ে পৃথিবীর জীবজগতের ব্যাপক ধ্বংস ঘটাবে।”

পাঠ্যের বিশ্লেষণ:

৫) “রাহু সূর্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শ্বেত গ্রহ (কেতু) চিত্রা [α Virgo] নক্ষত্র অতিক্রম করে অবস্থান করছে।”
স্বাভাবিকভাবেই এর অর্থ হলো নিম্নগামী চন্দ্র নোড (কেতু) স্পিকা অতিক্রম করেছে। আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্বে এটি ইতিমধ্যেই ঘটেছিল।

৬) “এক ভয়ংকর ধূমকেতু উদিত হয়েছে, যা পুষ্য [Cancer] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে…”
এই ধূমকেতুটিকে শনাক্ত করা কঠিন। এটি হ্যালির ধূমকেতু (1P/Halley) হতে পারে, যার আবর্তনকাল ৭৫–৭৬ বছর। হ্যালির ধূমকেতু সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে দৃশ্যমান হয়েছিল, তবে এটি ১৫৩১ সালে পেট্রুস অ্যাপিয়ানুস, ১৬০৭ সালে জোহানেস কেপলার এবং ১৬৮২ সালে এডমন্ড হ্যালি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ১৫৩১ সাল থেকে ৭৬ বছর করে পিছিয়ে গেলে ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্বের নিকটবর্তী তারিখ হয় ৩১০৬ খ্রিস্টপূর্ব। ১৬৮২ সাল থেকে পিছিয়ে গেলে ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব পাওয়া যায়… আবার ৭৫ বছরের ব্যবধানে হিসাব করলে ৩১২০ খ্রিস্টপূর্ব পাওয়া যায়।

চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ২৪০ খ্রিস্টপূর্বে হ্যালির ধূমকেতুর উল্লেখ করেছেন বলে মনে করা হয়, এবং সেখান থেকে ৭৬ বছরের ব্যবধানে পিছিয়ে গেলে −৩১২৬ খ্রিস্টপূর্ব পাওয়া যায়, আর ৭৫ বছরের ব্যবধানে ৩১২৮ খ্রিস্টপূর্ব।

যদিও এই অনুমানগুলো দুর্বল, তবুও এটি সত্য যে হ্যালির ধূমকেতু কর্কট ও সিংহ রাশিতে দৃশ্যমান হয়।

৭) “মঙ্গল মঘা [α Leo]-এর দিকে গমন করছে এবং বৃহস্পতি শ্রবণা [Aquila/Capricorn]-এর দিকে।”
মঙ্গল ও বৃহস্পতির এই অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে এটি ৩১১৩ খ্রিস্টপূর্বে মঙ্গলের পরবর্তী রেগুলাস (α Leo)-এ আগমন নয়, কারণ সেই বছরে বৃহস্পতি বৃষ (রোহিণী)-তে ছিল। পাঠ্য অনুযায়ী বৃহস্পতি শ্রবণা (মকর)-তে থাকা উচিত— যা নির্দেশ করে যে তারিখটি ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের সঙ্গে মিলে যায়। সেই সময় মঙ্গলও সত্যিই মঘা (α Leo/Regulus)-তে ছিল।

৮) “সূর্যের সন্তান (শনি) ভাগ নক্ষত্রের দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে পীড়িত করছে।”
এখানে ‘শনি’কে সূর্যের ‘পুত্র’ বলা হয়েছে, যা হিন্দু জ্যোতিষীয় পুরাণে প্রচলিত। ভাগ নক্ষত্রটি ঐ গ্রহের নিয়ন্ত্রক আবাস নির্দেশ করে, যা ঐতিহ্যগতভাবে মকর রাশি। আমরা লক্ষ্য করি যে বৃহস্পতির অবস্থানও একই রাশিতে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রহগুলোর এই সান্নিধ্য বৃহস্পতি ও শনির মহাযুগপৎ অবস্থানের সম্ভাব্য সময়কে নির্দেশ করে।

এটি ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব বছর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ, কারণ ওই বছর ৬–৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতি ও শনির মহাযুগপৎ অবস্থান মকর রাশিতে সংঘটিত হয়েছিল। দীর্ঘ সময়পর্বে তারিখ নির্ধারণে বৃহস্পতি-শনির যুগপৎ অবস্থান অত্যন্ত কার্যকর— কারণ একই রাশিতে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটতে প্রায় ৬০ বছর সময় লাগে।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে পাঠ্যে সরাসরি যুগপৎ অবস্থানের কথা বলা হয়নি, বরং বৃহস্পতি ও শনির নিকটবর্তী অবস্থানের কথা বলা হয়েছে, যা ১৩ দিনের গ্রহণের প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষিত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৯) “শুক্র গ্রহ পূর্বভাদ্রপদ [α Pegasus/Pisces]-এর দিকে অগ্রসর হয়ে উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করছে…”
এটি শুক্রের মীন রাশির দিকে অগ্রসর হওয়ার বর্ণনা, যা ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের একেবারে শুরুতেই শুরু হয় এবং ২৮ জানুয়ারি ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে বুধের নিকটবর্তী অবস্থানে পৌঁছে চূড়ান্ত হয়।

অন্যদিকে, এটি পূর্ববর্তী এক সংযোগের বর্ণনাও হতে পারে, যেখানে শুক্র ও মঙ্গল পূর্বভাদ্রপদ ও উত্তরভাদ্রপদ (মীন রাশি)-তে মিলিত হয়েছিল, যা ৩ এপ্রিল, ৩১০৬ খ্রিস্টপূর্বে ঘটেছিল— অর্থাৎ পূর্বোক্ত সম্ভাবনার প্রায় ৯ মাস আগে।

১০) “শ্বেত গ্রহ (কেতু), ধোঁয়ামিশ্রিত আগুনের মতো জ্বলতে জ্বলতে, ইন্দ্রের পবিত্র জ্যেষ্ঠা [α Scorpio] নক্ষত্রকে আক্রমণ করে অবস্থান করছে।”
এখানে বর্ণনায় একটি অসঙ্গতি রয়েছে, কারণ বলা হয়েছে কেতু (নিম্নগামী চন্দ্র নোড) বৃশ্চিক রাশিতে থাকা উচিত, অথচ প্রকৃতপক্ষে রাহুই বৃশ্চিকে থাকে। বাস্তবে ২০ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের সূর্যগ্রহণ ঘটে নিম্নগামী চন্দ্র নোডে, যা ঐতিহ্যগতভাবে কেতু— রাহু নয়।

তবে এটি নিম্নগামী সৌর নোড বা শরৎ বিষুব বিন্দুর প্রতি ইঙ্গিতও হতে পারে, যা তখন জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে ছিল। কিন্তু চন্দ্র নোড নিয়ে বিভ্রান্তি পরবর্তী বিবরণেও দেখা যাবে।

১১) “ধ্রুব নক্ষত্র (ধ্রুবতারা), প্রখরভাবে জ্বলতে জ্বলতে, ডানদিকে ঘুরছে।”
ধ্রুব নক্ষত্র বলতে উত্তর আকাশীয় মেরুকে বোঝায়, যা তখন বৃষে বিষুব অবস্থানের সময় ড্রাকো নক্ষত্রমণ্ডলে ছিল। ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে ধ্রুবতারা ছিল থুবান বা α Draconis। “ডানদিকে ঘোরা” কথাটি বিশেষ কিছু নির্দেশ করে না, কারণ পৃথিবীর আবর্তনের কারণে এটি প্রতি রাতেই ঘটে…

তবে এই পর্যবেক্ষণটি বিষুবের প্রাক-অগ্রগতির (precession) ইঙ্গিত হতে পারে, যা উত্তর আকাশীয় মেরুর স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমেও বোঝা যায়।

১২) “চন্দ্র ও সূর্য উভয়েই রোহিণী [α Taurus] নক্ষত্রকে পীড়িত করছে।”
এখানে বলা হয়েছে সূর্য ও চন্দ্র বৃষ রাশিতে, বিশেষভাবে α Taurus বা আলডেবারান তারার কাছে অবস্থান করছে। ঠিক এখানেই ২০ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে সূর্যগ্রহণ ঘটেছিল।

১৩) “ভয়ংকর গ্রহ (রাহু) চিত্রা [α Virgo] ও স্বাতী [α Bootes]-এর মধ্যে অবস্থান নিয়েছে।”
এখানেও রাহুর উল্লেখ বিভ্রান্তিকর। এটি ঊর্ধ্বগামী চন্দ্র নোডকে কন্যা (আংশিকভাবে তুলা)-তে স্থাপন করছে। কিন্তু ২০ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের গ্রহণের সময় এই নোড বৃশ্চিকে ছিল। ফলে এই তথ্যটি গ্রহণের পরবর্তী বা পূর্ববর্তী কোনো সময় নির্দেশ করতে পারে।

যদি এটি ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের পরবর্তী সময় হয়, তবে তা ৩১০০ খ্রিস্টপূর্ব হতে পারে; আর যদি পূর্ববর্তী সময় হয়, তবে তা ৩১২০ খ্রিস্টপূর্ব, যখন ঊর্ধ্বগামী নোড এই অবস্থানে ছিল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, চন্দ্র নোড সম্পর্কিত তথ্যগুলোতে অসঙ্গতি রয়েছে।

সম্ভবত “ভয়ংকর গ্রহ” আদৌ কোনো চন্দ্র নোড নয়। অনুবাদক বন্ধনীর মধ্যে এটিকে রাহু বলেছেন… কিন্তু এই স্থানে দৃশ্যমান একমাত্র বস্তু হলো প্যালাস— ১৮০২ সালে আবিষ্কৃত একটি বৃহৎ গ্রহাণু। এটি ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের ডিসেম্বর মাসে α Virgo-র কাছে অবস্থান করেছিল, তবে খালি চোখে এটি দেখা সম্ভব ছিল— এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

১৪) “অগ্নিসদৃশ দীপ্তিময় লালবর্ণের (মঙ্গল) গ্রহ, বক্রপথে গমন করে, বৃহস্পতির দ্বারা আবৃত অবস্থায় শ্রবণা [α Aquila/Capricorn]-এর সঙ্গে সরলরেখায় অবস্থান করছে।”
এখানে কর্কট রাশিতে মঙ্গল এবং মকর রাশিতে বৃহস্পতির বিরোধ অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে। মঙ্গল ১৭ মার্চ, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে কর্কটে প্রবেশ করে এবং ৫ এপ্রিলের দিকে আশ্লেষা নক্ষত্রের নিকটে পৌঁছায়— যা শ্রবণার বিপরীত। এটি ২০ এপ্রিলের সূর্যগ্রহণের কয়েকদিন আগে।

১৫) “এই দুই দীপ্তিমান গ্রহ, অর্থাৎ বৃহস্পতি ও শনি, বিশাখা [α Libra] নক্ষত্রে এসে একত্রিত হয়ে পূর্ণ এক বছর স্থির অবস্থায় রয়েছে।”
এখানে বৃহস্পতি ও শনির মহাযুগপৎ অবস্থান তুলা রাশিতে বোঝানো হয়েছে, যা ৩১৪৪ খ্রিস্টপূর্ব বা ৩০৮৪ খ্রিস্টপূর্বে ঘটেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই গ্রহদ্বয় এক বছর তুলায় অবস্থান করেছিল।

এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে পর্যবেক্ষক জ্যোতির্বিদরা বৃহস্পতি-শনির যুগপৎ অবস্থানের ত্রিভুজাকার চক্র সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

১৬) “এক পক্ষের মধ্যে তিনটি লুনেশন দুইবার সংঘটিত হওয়ায় পক্ষের দৈর্ঘ্য দুই দিন কমে গেছে… ত্রয়োদশ দিনে সূর্য ও চন্দ্র রাহুর দ্বারা আক্রান্ত হয়…”
এখানেই প্রথমবার ১৩ দিনের অস্বাভাবিক গ্রহণ ব্যবধানের উল্লেখ এসেছে। আবারও রাহুর উল্লেখ কিছুটা অদ্ভুত, যদিও এটি ২০ এপ্রিল ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের সূর্যগ্রহণের পর ৪ মে সংঘটিত চন্দ্রগ্রহণে অবশ্যই ভূমিকা রাখে। তবুও মনে হয় এখানে নোডগুলোর বিনিময় ঘটেছে, যা পরবর্তী অংশে আরও স্পষ্ট হবে।

১৭) “ভয়ংকর কর্মসম্পন্ন রাহু কৃত্তিকা [Pleiades] নক্ষত্রকেও পীড়িত করছে…”
এখানেও ঊর্ধ্বগামী নোড রাহুকে কৃত্তিকায় স্থাপন করা হয়েছে— আবারও নোডের অবস্থান অদলবদল হয়েছে।

চন্দ্র নোড ১৮.৬ বছরে ৩৬০° পূর্ণ করে, তাই ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বের তুলনায় ৯.৩ বছরের ব্যবধানে অন্য সম্ভাব্য অবস্থান খোঁজা যেতে পারে। কিন্তু ব্যাপক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের কোনো বিকল্প ক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্র থেকে গ্রহণ দৃশ্যমান নয় এবং অন্য গ্রহগত অবস্থানগুলিও মেলে না।

অতএব সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে রাহুকে এখানে নির্দিষ্টভাবে ঊর্ধ্বগামী বা নিম্নগামী নোড হিসেবে নয়, বরং সাধারণভাবে চন্দ্র নোড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

১৮) “একটি পক্ষ পূর্বে চৌদ্দ, পনেরো বা ষোলো দিনের হত… কিন্তু কখনো শুনিনি যে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা ত্রয়োদশ দিনে ঘটতে পারে… অথচ একই মাসে সূর্য ও চন্দ্র উভয়ই ত্রয়োদশ দিনে গ্রহণগ্রস্ত হয়েছে…”
অতএব, সূর্য ও চন্দ্র অস্বাভাবিক দিনে গ্রহণগ্রস্ত হয়ে পৃথিবীর জীবজগতের ব্যাপক ধ্বংসের কারণ হবে।

এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, গ্রহণগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক ১৩ দিনের ব্যবধানের উল্লেখের পাশাপাশি “প্রথম লুনেশন”-এর কথাও বলা হয়েছে, যা বছরের প্রথম পর্যায়কে নির্দেশ করে। বছরটি শুরু হয়েছিল বসন্ত বিষুব (Vernal Equinox) দিয়ে: ১৬ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে। মাত্র চার দিন পরে, ২০ এপ্রিল, বছরের প্রথম অমাবস্যায় একটি সূর্যগ্রহণ ঘটে, এবং ১৩ দিন পরে পূর্ণিমা একটি চন্দ্রগ্রহণে পরিণত হয়।

এখন, মহাভারতের মধ্যে প্রদত্ত এই ১৮টি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করার পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে ১৩ দিনের এই অস্বাভাবিক ঘটনাটি ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব বছরেই খুঁজতে হবে। তবে আমরা উল্লেখ করতে চাই যে চন্দ্র নোড সম্পর্কিত সমস্যাটি কেবল তখনই দেখা দেয়, যখন আমরা ধরে নিই যে পাঠ্যে রাহুকে ঊর্ধ্বগামী চন্দ্র নোড হিসেবে বোঝানো হয়েছে— যেমনটি পরবর্তী ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রন্থে সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু যদি আমরা সতর্কভাবে ১৬ নম্বর অংশটি পড়ি, তবে দেখা যায় সেখানে বলা হয়েছে সূর্য ও চন্দ্র উভয়ই রাহুর দ্বারা প্রভাবিত। এছাড়া নিম্নগামী চন্দ্র নোড, অর্থাৎ কেতু, কেবল অনুবাদকের ব্যাখ্যা হিসেবে বন্ধনীর মধ্যে এসেছে, যখন পাঠ্যে “শ্বেত গ্রহ”-এর উল্লেখ রয়েছে। যাই হোক, চন্দ্র নোডগুলোর অবস্থান বৃশ্চিক ও বৃষের মধ্যে ছিল— যেমনটি ১০ ও ১৭ নম্বর অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপসংহার

এখন, সারসংক্ষেপে তথ্যগুলো নিম্নরূপ। ১–৫ নম্বর পয়েন্ট পূর্ববর্তী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলোর নির্দেশ দেয়। ১ নম্বর পয়েন্ট ৩১২৫ খ্রিস্টপূর্বের একটি উল্লেখ দেয়, আর ২ থেকে ৪ নম্বর পয়েন্ট (মহাভারতের পঞ্চম গ্রন্থ উদ্যোগ পর্ব থেকে) ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্বে সংঘটিত ঘটনাগুলোর তারিখ প্রদান করে। ভীষ্ম পর্ব (ষষ্ঠ গ্রন্থ)-এর প্রথম উল্লেখটি ৩১১৩ খ্রিস্টপূর্বের একটি অস্পষ্ট ইঙ্গিত।

এরপর ৬ নম্বর পয়েন্টে ধূমকেতুর উল্লেখ আসে, যা পূর্বে দেখানো হয়েছে যে ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব বছরের ইঙ্গিত দিতে পারে। ৭ নম্বর পয়েন্ট, যেখানে মঙ্গল ও বৃহস্পতির নির্দিষ্ট অবস্থান বর্ণনা করা হয়েছে, তা ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব সালকে নিশ্চিত করে— যখন মঙ্গল রেগুলাস নক্ষত্রের কাছে এবং বৃহস্পতি মকর রাশিতে ছিল। ৮ নম্বর পয়েন্টও এই ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব সালকে নিশ্চিত করে, কারণ এতে বলা হয়েছে শনি-ও মকর রাশিতে ছিল।

৯ নম্বর পয়েন্ট শুক্রের অবস্থান দেয়, যা ৩১০৫ বা ৩১০৬ খ্রিস্টপূর্ব হতে পারে। ১০ নম্বর পয়েন্ট বৃশ্চিকে একটি চন্দ্র নোডের উল্লেখ করে, যা ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব সালের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, এবং ১১ নম্বর পয়েন্ট ধ্রুবতারা সম্পর্কে মন্তব্য করে।

১২ নম্বর পয়েন্টে সূর্য ও চন্দ্রের বৃষ রাশিতে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে— ঠিক যেখানে ২০ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে সূর্যগ্রহণ ঘটে। ১৩ নম্বর পয়েন্টে কন্যা রাশিতে একটি “ভয়ংকর গ্রহ”-এর বিভ্রান্তিকর উল্লেখ রয়েছে, যাকে অনুবাদক চন্দ্র নোড হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন… ১৪ নম্বর পয়েন্ট আবারও ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব সালকে নিশ্চিত করে, কারণ এতে মঙ্গল ও বৃহস্পতির যথাক্রমে কর্কট ও মকর রাশিতে বিপরীত অবস্থান বর্ণনা করা হয়েছে।

১৫ নম্বর পয়েন্টে তুলা রাশিতে বৃহস্পতি ও শনির মহাসংযোগের কথা বলা হয়েছে, যা ৩১৪৪ খ্রিস্টপূর্ব বা ৩০৮৪ খ্রিস্টপূর্বে ঘটেছিল। এবং শেষে ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর পয়েন্টে গ্রহণগুলোর মধ্যে বিরল ১৩ দিনের ব্যবধানের উল্লেখ রয়েছে।

অবশেষে, মূল বিষয়টি হলো গ্রহণগুলো নিজেরাই— এবং এই সত্য যে এগুলো একে অপরের মধ্যে ১৩ দিনের ব্যবধানে ঘটতে হবে। তবে এটিই একমাত্র শর্ত নয়। এই গ্রহণগুলো কুরুক্ষেত্রের ভৌগোলিক অবস্থান (৩০°০০′ উত্তর, ৭৬°৫০′ পূর্ব) থেকে দৃশ্যমান হওয়াও আবশ্যক।

আমাদের প্রদর্শিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মহাভারতের পাঠ্যে এমন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রাচুর্য রয়েছে যা ২০ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্বে সংঘটিত একটি সূর্যগ্রহণের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই তথ্য আর্যভট্টের (৩১০২ খ্রিস্টপূর্ব) এবং ড. এস. বালকৃষ্ণের (৩১২৯ খ্রিস্টপূর্ব) তুলনামূলকভাবে কম নির্ভুল তারিখ নির্ধারণকে সমর্থন করে, তবে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো ২০ এপ্রিল, ৩১০৫ খ্রিস্টপূর্ব— এই আরও নির্দিষ্ট তারিখের দিকে নির্দেশ করে।



Read More

31 January, 2026

সমরাঙ্গণ সূত্রধার

31 January 0

মহারাজ ভোজ কৃত "সমরাঙ্গণ-সূত্রধার" ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে ৮৩ টি অধ্যায় রয়েছে, যার মধ্যে শহর-পরিকল্পনা, ভবনের কারুকাজ, মন্দিরের কারুকাজ, ভাস্কর্য এবং মুদ্রা। মুদ্রাসহ বিভিন্ন যন্ত্র ও যন্ত্রের বর্ণনা রয়েছে। গ্রন্থের ৩১'তম অধ্যায়ের নাম "যন্ত্রবিধান" যেখানে যন্ত্রবিজ্ঞান বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে অনেক যন্ত্রের বর্ণনা করা হয়েছে বিমান, যান্ত্রিক দারোয়ান এবং সৈন্য, যা বর্তমান রোবটের আভাস দেয়।

সমরাঙ্গণ সূত্রধার
এছাড়াও গুপ্ত বা গুপ্ত-পরবর্তী যুগে যখন কিছু কিছু পুরাণগুলি সংকলিত হতে শুরু করেছিল, তখন সমাজে বিশেষত ভাস্কর ও কারিগরদের মধ্যে প্রচলিত ঐতিহ্যগুলিকে সংগ্রহ করতে থাকে পুরাণকাররা। যেহেতু বিশ্বকর্মাকে পুরাণে প্রথম শিল্পী বা শিল্পাচার্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তাই বেশিরভাগ গ্রন্থ তাঁর নামে রচিত হয়েছে বা তাঁর দ্বারা রচিত বলে লেখা রয়েছে। যেমন- বিশ্বকর্মপদ্ধতি, বিশ্বকর্মপুরাণ, বিশ্বকর্মাপ্রকাশ, বিশ্বকর্মমত, বিশ্বকর্মশাস্ত্র, বিশ্বকর্মশিল্প, বিশ্বকর্মসংহিতা ইত্যাদি।

শিল্পকলা ঋষি ঐতিহ্যের সাথে এর সম্পর্কও যুক্ত হওয়ার কারণেই এই নানা ঋষিদের নামেও অনেক গ্রন্থ পাওয়া যায়, যেমন অগস্ত্য সকালধিকার, অগস্ত্য প্রোক্ত সর্বাধিকার, কাশ্যপশিল্প, নারদসংহিতা, নারদশিল্প, নাগনাজিৎ রচিত চিত্রলক্ষণ, পিশুনের রচিত বাস্তুবিধি, পরাস্ত্রশাস্ত্র প্রণীত এবং পরাস্তষ্টার প্রণীত, সিদ্ধার্থ সংহিতা।

এছাড়া ময় দানব রচিত অসুরদের ভাস্কর গ্রন্থের তালিকা রয়েছে যা নিম্নরূপ- মায়াদীপিকা, মায়ামত, মায়ামত প্রতিষ্টাতন্ত্র, মায়াশীলপম, মায়াসম্গ্রহ, মায়াশীলপাষ্টকম ইত্যাদি।


সম্পাদক ও ব্যাখ্যাকার
ড. সুধাকর মালবীয়
এম.এ., পিএইচ.ডি., সাহিত্যাচার্য
সংস্কৃত বিভাগ, কলা অনুষদ
কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, বারাণসী
পরিচালক, মহামনা সংস্কৃত আকাদেমি
এবং চিত্তরঞ্জন মালবীয়
প্রভাষক, মহামনা সংস্কৃত আকাদেমি

চৌখম্ভা সংস্কৃত ভবন

বারাণসী – ২২১০০১ (ভারত)

সম্পাদকীয়

আমি গিরিজানন্দন একদন্ত দেবতাকে প্রণাম করি যাঁর দেহ সিঁদুরে রঞ্জিত, যাঁর শুঁড় অতি বিশাল,
যাঁর দেহ নাগরাজ দ্বারা অলংকৃত, যাঁর সঙ্গে সিদ্ধি ও বুদ্ধি যুক্ত, এবং যাঁকে দেবতা, নাগ ও মানুষ সকলেই সর্বার্থসিদ্ধির জন্য আরাধনা করেন।

এখন বিদ্বজ্জনসমক্ষে শ্রদ্ধা ও আনন্দসহকারে উপস্থাপিত হচ্ছে—হিন্দি ব্যাখ্যাসহ সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থের প্রথম ভাগ, যা প্রথম থেকে অষ্টচত্বারিংশ (৪৮) অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থটি রচিত হয়েছে শ্রীমান মহারাজাধিরাজ ধারাধিপতি ভোজদেব কর্তৃক। এই গ্রন্থে অষ্টচত্বারিংশ অধ্যায় পর্যন্ত গৃহনির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে। আর পরবর্তীতে ঊনপঞ্চাশতম (৪৯) অধ্যায় থেকে ত্রয়াশী (৮৩) অধ্যায় পর্যন্ত প্রাসাদ নির্মাণসংক্রান্ত বিষয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এখানে লক্ষ্যণীয় যে—অমরকোষকারের মতে “প্রাসাদো দেবভূভুজাম্”—অর্থাৎ প্রাসাদ শব্দের সাধারণ অর্থ দেবতার মন্দির অথবা রাজাদের ভবন। কিন্তু সমরাঙ্গণসূত্রধার অনুসারে ‘প্রাসাদ’ শব্দ দ্বারা কেবল দেবতার আয়তন বা মন্দিরকেই বোঝানো হয়েছে।

এই বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থে প্রধানত গৃহবিদ্যা (বাস্তু = গৃহ), শিল্পবিদ্যা, তক্ষক-কৌশল এবং প্রতিমাবিদ্যা আলোচিত হয়েছে। শয়ন, আসন প্রভৃতির লক্ষণ এবং যন্ত্রবিধান তক্ষক-কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। আর প্রতিমাবিদ্যা শিল্পবিদ্যার অন্তর্গত।

বাস্তুশাস্ত্র বা স্থাপত্যবিদ্যার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই। কারণ মৎস্যপুরাণ-এ যাঁদের অষ্টাদশ শিল্পশাস্ত্রের উপদেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—ভৃগু, অত্রি, বশিষ্ঠ প্রভৃতি—তাঁরাই এই বিদ্যার প্রবর্তক বলে স্বীকৃত।

ভৃগু, অত্রি, বশিষ্ঠ, বিশ্বকর্মা ও ময়,
নারদ, নগ্নজিৎ, বিশালাক্ষ ও পুরন্দর,
ব্রহ্মাকুমার, নন্দীশ, শৌনক ও গর্গ,
বাসুদেব, অনিরুদ্ধ এবং শুক্র ও বৃহস্পতি—
এই অষ্টাদশজনই প্রসিদ্ধ শিল্পশাস্ত্রের উপদেশদাতা।
মৎস্যপুরাণ

মানসার, ময়মত, শিল্পরত্ন প্রভৃতি দ্রাবিড় গ্রন্থসমূহে এবং বিশ্বকর্মা বাস্তুশাস্ত্র, অপরাজিতপৃচ্ছা ইত্যাদি নাগর ধারার বাস্তুশাস্ত্র গ্রন্থসমূহেও এই একই বাস্তুশাস্ত্র-উপদেশক পরম্পরা সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।

বুদ্ধিমানদের কাছে এটি অজানা নয় যে এই পৃথিবীতে গার্হস্থ্য প্রভৃতি চতুর্বিধ আশ্রমের মধ্যে গার্হস্থ্য জীবনই প্রধান ও মৌলিক। সেইজন্যই নিজস্ব বাসস্থানরূপ গৃহ নির্মাণ অপরিহার্য।

এই অভিপ্রায়কে লক্ষ্য করেই পণ্ডিত শ্রী রামযত্ন ওঝা মহাশয় বলেছেন—

সমরাঙ্গণসূত্রধার

স্ত্রী, পুত্র প্রভৃতি ভোগসুখের উৎপাদক, ধর্ম–অর্থ–কাম প্রদানকারী,
প্রাণীদের আবাসস্থান, সুখের আশ্রয়, শীত ও আর্দ্রতার দোষনাশক—
কূপ, দেবালয় প্রভৃতি সকল পুণ্যই গৃহ থেকেই উৎপন্ন হয়।
এই কারণেই বিদ্বজ্জনগণ, শ্রী বিশ্বকর্মা প্রভৃতি, সর্বপ্রথম গৃহকেই শ্রেষ্ঠ বলে মান্য করেছেন।
বাস্তুরাজবল্লভ ১.৫

এখানে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল প্রকার চিন্তা ও বিচারসমষ্টিই জ্যোতিষশাস্ত্রের অঙ্গরূপে ‘বাস্তুশাস্ত্র’ নামে প্রসিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে, গৃহনির্মাণের সূচনাকালীন মুহূর্তে আয়–ব্যয় প্রভৃতি গুণ–দোষ অনুসারে সেই নির্মাতার জীবনে আমরণ সুখ–দুঃখাদি অবশ্যম্ভাবী—এ কথা বাস্তুশাস্ত্রে সর্বত্র সুদৃঢ়ভাবে প্রতিপাদিত হয়েছে এবং সর্বজনের অভিজ্ঞতায় সর্বদা প্রমাণিত।

এই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু সমকালীন ও পরম্পরাগত গ্রন্থ প্রসিদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্ত বাস্তুশাস্ত্রসমূহের মধ্যে সমরাঙ্গণসূত্রধার-ই একমাত্র এমন গ্রন্থ, যেখানে সম্পূর্ণ বাস্তুশাস্ত্রের বিধি ও নিয়মের বিস্তারিত প্রতিপাদন পাওয়া যায়।

মানসার গ্রন্থে ভবনসমূহের (অর্থাৎ বিমানসমূহের) প্রতিমান ও বিবরণ দেওয়া হয়েছে—ময়মত গ্রন্থেও একই বিষয় আলোচিত। শিল্পরত্ন গ্রন্থে ভবনসমূহের প্রতিমান, চিত্রাদি এবং সমস্ত বাস্তুশাস্ত্রবিষয়ক বিষয়ের নিরূপণ রয়েছে। কিন্তু সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থে নগর, দুর্গ, ভবন, প্রাসাদ, প্রতিমা, চিত্র, যন্ত্র, শয়ন, আসন প্রভৃতি—স্থাপত্যবিদ্যার অষ্টাঙ্গের সকল বিষয়েরই বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়।

এই কারণে ঐ সকল গ্রন্থের মধ্যে সমরাঙ্গণসূত্রধার-কে শিরোমণিরূপে গণ্য করা হয়। এর প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ হলো—

১. মহাসমাগমন
২. বিশ্বকর্মার পুত্রসংলাপ
৩. বাস্তুবিষয়ক প্রশ্ন
৪. মহদাদি সৃষ্টিতত্ত্ব
৫. ভুবনকোষ
৬. সহদেবাধিকার
৭. বর্ণাশ্রম বিভাগের নিরূপণ
৮. ভূমি পরীক্ষা
৯. হস্তলক্ষণ
১০. পুরনিবেশ
১১. বাস্তুত্রয় বিভাগের নিরূপণ
১২. নাড়ী, শিরা প্রভৃতির বিকল্প
১৩. মর্মবেধ
১৪. পুরুষাঙ্গ–দেবতা–নিঘণ্টু প্রভৃতির সিদ্ধান্ত
১৫. রাজনিবেশ
১৬. বনপ্রবেশ
১৭. ইন্দ্রধ্বজ উৎসবের নিরূপণ

১৮. নগর প্রভৃতির সংজ্ঞা
১৯. চতুঃশাল বিধান
২০. নিম্ন–উচ্চ আদি ফলনির্ণয়
২১. দ্বাসপ্ততি–ত্রিশাল ভবনের লক্ষণ
২২. দ্বিশাল গৃহের লক্ষণ
২৩. একশাল গৃহের লক্ষণ
২৪. দ্বার, পীঠ, প্রাচীর প্রভৃতির মাননির্ণয়
২৫. সকল গৃহের সংখ্যাকথন
২৬. আয়াদি নির্ণয়
২৭. সভাষ্টক
২৮. গৃহদ্রব্যের পরিমাপ
২৯. শয়ন–আসনের লক্ষণ
৩০. রাজগৃহের লক্ষণ
৩১. যন্ত্রবিধান
৩২. গজশালার লক্ষণ
৩৩. অশ্বশালার লক্ষণ
৩৪. অপ্রয়োজনীয় ও প্রয়োজনীয় বিষয়ের বিবেচনা

৩৫শিলান্যাস বিধি
৩৬বাস্তুদেবতার বলিদান বিধির নিরূপণ
৩৭গৃহনির্মাণের জন্য কীলক ও সূত্রপাত
৩৮বাস্তুর সংস্থান-মাতৃকা
৩৯দ্বারের গুণ ও দোষ
৪০পীঠের পরিমাপ
৪১চয়নবিধি
৪২শান্তিকর্ম বিধি
৪৩দ্বারভঙ্গের ফল
৪৪স্থপতির লক্ষণ
৪৫অষ্টান্ন লক্ষণ
৪৬তোরণভঙ্গ প্রভৃতি শান্তিকর্ম
৪৭বেদীর লক্ষণ
৪৮গৃহদোষ নিরূপণ
৪৯রুচক প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের লক্ষণ
৫০প্রাসাদের শুভাশুভ লক্ষণ
৫১আয়তন বিন্যাস
৫২প্রাসাদের জাতি
৫৩জঘন্য বাস্তুর দ্বার
৫৪প্রাসাদের দ্বার, স্তম্ভ, বিন্যাস, বিতান, লুমা, বৃত্তচ্ছাদ, লুমা, সিংহকর্ণ—ইত্যাদির পরিমাপ নিরূপণ
৫৫মেরু প্রভৃতি ষোড়শ প্রাসাদের লক্ষণ, জগৎলক্ষণ, দ্বারাদি কলার নিরূপণ
৫৬রুচক প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের বিবরণ
৫৭মেরু প্রভৃতি বিশ প্রকারের নিরূপণ
৫৮প্রাসাদ স্তবন
৫৯বিমান প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের নিরূপণ
৬০শ্রীকূট প্রভৃতি ছত্রিশ প্রাসাদের লক্ষণ
৬১পীঠপঞ্চকের লক্ষণ
৬২দ্রাবিড় প্রাসাদ অধ্যায়
৬৩মেরু প্রভৃতি বিশ প্রকার নাগর প্রাসাদের ভূমিজ উৎপত্তি
৬৪বাভাট প্রাসাদের নিরূপণ
৬৫ভূমিজ প্রাসাদ অধ্যায়
৬৬মণ্ডপ অধ্যায়
৬৭সপ্তবিংশতি মণ্ডপ অধ্যায়
৬৮জগত্যঙ্গসমূহের সমষ্টি বিষয়ক অধিকার
৬৯জগৎলক্ষণ অধ্যায়
৭০লিঙ্গ, পীঠ ও প্রতিমার লক্ষণ নিরূপণ
৭১চিত্র নির্দেশনার নিরূপণ
৭২ভূমিবন্ধ বিধান
৭৩লেপ্যকর্ম, লিখন, কূর্চক অধ্যায়
৭৪অণ্ডক প্রমাণের বিবরণ
৭৫মানের উৎপত্তি
৭৬প্রতিমার লক্ষণ
৭৭দেবতা প্রভৃতির রূপ, প্রহার ও সংযোগজাত অধ্যায়
৭৮দোষ ও গুণ অধ্যায়
৭৯ঋজু, বক্র প্রভৃতি অবস্থানের লক্ষণ
৮০বৈষ্ণব প্রভৃতি স্থানকলার লক্ষণ অধ্যায়
৮১পঞ্চপুরুষ ও স্ত্রীলক্ষণ
৮২রসদৃষ্টি লক্ষণ অধ্যায়
৮৩চৌষট্টি হস্তের লক্ষণ অধ্যায়

বাস্তুশাস্ত্রের গাম্ভীর্য, সূক্ষ্মতা এবং দুর্বোধ্যতা কোনো সংস্কৃতজ্ঞ ব্যক্তির কাছেও অগোচর নয়। অতএব হিন্দি ভাষাকে মাধ্যম করে বাস্তুশাস্ত্রানুগ ব্যাখ্যা প্রদান একপ্রকার দুঃসাহসই বটে। তথাপি কোমলবুদ্ধিসম্পন্ন বাস্তুবিদ্যা-অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কষ্ট বিবেচনা করে, শাস্ত্ররক্ষাকেই নিজের কর্তব্য মনে করে, হিন্দি ভাষার মাধ্যমে যথাসাধ্য ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটি বর্তমান সংস্করণে ‘সরলা’ নামে সংযোজিত হয়েছে।

বর্তমানে সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থের দুইটি সংস্করণ উপলব্ধ—

১. মহামহোপাধ্যায় টি. গণপতি শাস্ত্রী সম্পাদিত, গায়কোয়াড় সংস্কৃত গ্রন্থমালায় প্রকাশিত।

২৫ ও ৩২ ক্রমাঙ্কে (প্রথম ভাগে ১–৫৪, দ্বিতীয় ভাগে ৫৫–৮৩) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বরোদা থেকে ১৯২৪ ও ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত সংস্করণটি উপলব্ধ।

২. ড. সুদর্শন কুমার শর্মা সম্পাদিত (দ্বিভাগাত্মক—১–৫০, ৫১–৮৩),
ইংরেজি অনুবাদসহ—পরিমল পাবলিকেশন্স, দিল্লি থেকে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত একটি উৎকৃষ্ট সংস্করণও পাওয়া যায়।

অতিরিক্তভাবে, পণ্ডিত দ্বিজেন্দ্রনাথ শুক্ল সম্পাদিত—ঊনচত্বারিংশ অধ্যায়াত্মক, খণ্ডিতরূপে নিবন্ধ আকারে উপস্থাপিত এই গ্রন্থটি হিন্দিসহ দ্বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। এই সংস্করণটি মেহরচন্দ লক্ষ্মণদাস পাবলিকেশন্স, নয়াদিল্লি থেকে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত।

এদের মধ্যে আমি পণ্ডিত টি. গণপতি শাস্ত্রী সম্পাদিত সংস্করণ অবলম্বন করে পাঠ গ্রহণ করেছি। এই কারণে তাঁর সংস্করণের সম্পাদকবৃন্দের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

এই বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থের অধ্যেতাদের নিকট সুপরিচিত যে, এই শাস্ত্রে নিবদ্ধ বাক্যসমূহ অত্যন্ত গভীর ও জটিল। তথাপি শ্রীমদ্গুরুচরণে সম্পূর্ণ বিদ্যায় পারঙ্গত, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতবিদ্যা ও ধর্মবিজ্ঞান সংকলয়ের বেদ বিভাগাধ্যক্ষ, বিশিষ্ট পণ্ডিত, স্বর্গীয় শ্রীযুক্ত প্রফেসর বিদ্যাধর পাণ্ডেয় মহাশয়ের নিকট থেকে যা প্রাপ্ত হয়েছে, তাই-ই এই সংস্করণের মূল আশ্রয়রূপে গৃহীত হয়েছে।

“গুরুবৎ গুরুপুত্রেষু …” —এই শাস্ত্রবিধান অনুসারে আশীর্বাদকামনায় আমি বাস্তুবিদ্ পণ্ডিত রামেন্দ্র পাণ্ডেয় মহাশয় (দিল্লি) এবং অধ্যাপক কৌশলেন্দ্র পাণ্ডেয় মহাশয়কে (সাহিত্য বিভাগের অধ্যক্ষ, সংস্কৃতবিদ্যা ও ধর্মবিজ্ঞান সংকলয়, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়) স্মরণ করছি।

অন্তে, কাশীস্থিত চৌখম্ভা সংস্কৃত ভবন-এর স্বত্বাধিকারীগণের প্রতি—যাঁরা দুর্লভ ও প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থরত্ন প্রকাশে নিয়োজিত—শ্রী ব্রজেন্দ্রকুমার মহাশয়ের নিকট আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি; যাঁদের প্রচেষ্টায় এই উৎকৃষ্ট ও সুসম্পাদিত সংস্করণটি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে।

ধন ও ধানে সমৃদ্ধ,
পত্নী ও সন্তানসহ সুসংযুক্ত,
গো, গজ ও অশ্বসমূহে পরিপূর্ণ যে গৃহ—
তা স্বর্গের থেকেও শ্রেষ্ঠ।
ভবিষ্য পুরাণ, উত্তরখণ্ড ১৬৮.৪

মকরসংক্রান্তি, ২০১০

বিদ্বদ্বশংবদঃ
এ. ৪/৩১, শিশমহল কলোনি,
কমচ্ছা, বারাণসী

সুধাকর মালবীয়

চিত্তরঞ্জন মালবীয়

দুটি কথা

বিদ্যাং চ অবিদ্যাং চ যস্তদ্বেদ উভয়ং সহ।
অবিদ্যয়া মৃত্যুম্ তীর্ত্বা বিদ্যয়াঽমৃতমশ্নুতে ॥

যিনি বিদ্যা (অধ্যাত্মবিদ্যা) এবং অবিদ্যা (ভৌতিক শাস্ত্র) — উভয়কেই একসঙ্গে জানেন, তিনি অবিদ্যার দ্বারা মৃত্যুরূপ সংসার অতিক্রম করে বিদ্যার দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করেন।

মহারাজ ভোজ রচিত বাস্তু (= গৃহনির্মাণ) বিদ্যার উপর ‘সমরাঙ্গণসূত্রধার’ নামক গ্রন্থের অষ্টচত্বারিংশ (৪৮) অধ্যায়বিশিষ্ট প্রথম ভাগটি এইবার প্রথমবারের মতো রচিত ‘সরলা’ হিন্দি ব্যাখ্যাসহ বিদ্বজ্জনসমক্ষে উপস্থাপিত হচ্ছে।

ভোজরাজ ছিলেন উজ্জয়িনীর প্রসিদ্ধ পরমার বংশীয় রাজা। ধারা ছিল তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী। তিনি বিদ্যা, কলা ও কবিদের গুণগ্রাহী ও পারদর্শী সম্রাট ছিলেন। ব্যাকরণ, দর্শন, কাব্যকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর রচিত বহু প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রয়েছে। যোগসূত্রের উপর তাঁর রচিত ‘যোগমার্তণ্ড’ নামক টীকা (বৃত্তি) একটি অত্যন্ত সম্মানিত রচনা। এতে সহজ ও সরল ভাষায় যোগশাস্ত্রের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

বাস্তুবিদ্যা ভৌতিকতার বিজ্ঞান, যা প্রত্যক্ষভাবে জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাস্তুশাস্ত্রের এই গ্রন্থে গৃহনির্মাণের নিয়মাবলি ক্রমানুসারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই কারণেই এর অপর নাম ‘বাস্তুশাস্ত্র’

এই গ্রন্থে মোট তিরাশি (৮৩)টি অধ্যায় রয়েছে। এর মধ্যে গৃহনির্মাণ সংক্রান্ত অষ্টচত্বারিংশ (৪৮)টি অধ্যায় এবং ঊনপঞ্চাশ (৪৯) থেকে তিরাশি (৮৩) অধ্যায় পর্যন্ত দেবমন্দির ও দেবপ্রতিমা প্রভৃতি সংক্রান্ত বাস্তুবিচার আলোচিত হয়েছে।

সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—বাস্তু বিন্যাসের জন্য ভূমি পরীক্ষা অত্যন্ত আবশ্যক। ভূমি তিন প্রকারের—

১. জাঙ্গল দেশ — যেখানে আবাসস্থল থেকে জল দূরে থাকে।
২. অনূপ দেশ — যেখানে আবাসস্থলের নিকটে জল থাকে।
৩. সাধারণ দেশ — যে অঞ্চল না অতিশয় শীতল, না অতিশয় উষ্ণ।

এই ভূমিসমূহের মৃত্তিকা পরীক্ষা করে তবেই বাস্তু নির্মাণ করা উচিত।

১. ভূমি পরীক্ষার প্রথম পদ্ধতি
ভূমির মধ্যভাগে এক হাত পরিমাণ একটি গর্ত খনন করতে হবে। এরপর গর্ত থেকে উত্তোলিত মাটি সেই গর্তেই পুনরায় ভরাট করতে হবে। যদি গর্ত পূর্ণ করার পরও মাটি অতিরিক্ত থেকে যায়, তবে সেই ভূমিকে উত্তম বলে গণ্য করতে হবে। যদি মাটি সমান হয়, তবে তা মধ্যম ফলদায়ী ভূমি বলে বিবেচিত হবে। আর যদি মাটি কম পড়ে, তবে সেই ভূমিকে অধম ভূমি বলা হয়।

২. ভূমি পরীক্ষার দ্বিতীয় পদ্ধতি
উপর্যুক্ত প্রকারে গর্ত খুঁড়ে তাতে জল ঢালবে এবং উত্তর দিকে একশো কদম যাবে, তারপর ফিরে এসে দেখবে। যদি গর্তে জল ঠিক ততটাই থাকে, তবে সেই ভূমি উত্তম। যদি জল কমে (অর্ধেক) থাকে, তবে তা মধ্যম ভূমি; আর যদি খুবই কম থেকে যায়, তবে তা অধম ভূমি। অধম ভূমিতে বাস করলে স্বাস্থ্য ও সুখের ক্ষতি হয়। উসর (লবণাক্ত), ইঁদুরের গর্তওয়ালা, বাঁবি (ঢিবি)ওয়ালা, ফাটা, উঁচুনিচু গর্তওয়ালা এবং টিলাওয়ালা ভূমি ত্যাগ করা উচিত। যে ভূমিতে গর্ত খুঁড়লে কয়লা, ভস্ম, হাড়, ভূষা ইত্যাদি বের হয়, সেই ভূমিতে বাড়ি বানিয়ে বাস করলে রোগ হয় এবং আয়ু হ্রাস পায়।

৩. ভূমির পৃষ্ঠ
পূর্ব, উত্তর ও ঈশান দিকে নিচু ভূমি সব দৃষ্টিতে লাভজনক। আগ্নেয়, দক্ষিণ, নৈঋত্য ও পশ্চিম দিকে ঢালু ভূমি অপ্রশস্ত (অশুভ) হয়।

৪. বাস্তু পুরুষের মর্ম
বাস্তু পুরুষের যে মর্মস্থানে পেরেক, খুঁটি ইত্যাদি পোঁতা হবে, গৃহস্বামীর সেই অঙ্গেই ব্যথা বা রোগ উৎপন্ন হবে। অতএব মর্মস্থান দেখে তবেই নির্মাণ করা উচিত। বাস্তুশাস্ত্রের হৃদয় (মধ্যের ব্রহ্মস্থান) অত্যন্ত মর্মস্থান। এই স্থানে কোনো দেয়াল, খুঁটি ইত্যাদির নির্মাণ করা উচিত নয়। এখানে জোঁটা বাসন বা অপবিত্র বস্তু রাখাও উচিত নয়। এমন করলে নানা প্রকার রোগ উৎপন্ন হয়।

৫. গৃহের আকার
চৌকো ও আয়তাকার বাড়ি উত্তম। আয়তাকার বাড়িতে প্রস্থের দ্বিগুণের বেশি দৈর্ঘ্য হওয়া উচিত নয়। কচ্ছপের আকারের ঘর কুষ্ঠরোগদায়ক। তিন ও ছয় কোণবিশিষ্ট ঘর আয়ুক্ষয়কারী। পাঁচ কোণবিশিষ্ট ঘর সন্তানের কষ্টদায়ক। আট কোণবিশিষ্ট ঘর নানাবিধ রোগ সৃষ্টি করে। ঘর কোনো একদিকে বাড়ানো উচিত নয়। বাড়াতেই হলে সব দিকেই সমানভাবে বাড়ানো উচিত। যদি ঘর বায়ব্য দিকে বাড়ানো হয়, তবে বাতব্যাধি হয়। উত্তর দিকে বাড়ালে রোগ বৃদ্ধি পায়; দক্ষিণ দিকে বাড়ালে মৃত্যুভয়ের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

৬. গৃহনির্মাণের উপকরণ
ইট, লোহা, পাথর, মাটি ও কাঠ এগুলি বাড়িতে নতুনই ব্যবহার করা উচিত। পুরোনো ব্যবহার করলে দোষ সৃষ্টি হয়। এক বাড়িতে ব্যবহৃত কাঠ অন্য বাড়িতে লাগালে গৃহস্বামীর বিনাশ হয়। মন্দির, রাজপ্রাসাদ ও মঠে পাথর ব্যবহার করা শুভ; কিন্তু গৃহে পাথর ব্যবহার শুভ নয় অর্থাৎ মেঝে ইত্যাদিতে পাথর পাতা অশুভ। পিপল, কদম্ব, নিম, বহেড়া, আম, পাকার, গুলার, বট, তেঁতুল, বাবুল ও শিমুল গাছের কাঠ গৃহনির্মাণে ব্যবহার করা উচিত নয়।

৭. গৃহের নিকটবর্তী বৃক্ষ
আগ্নেয় কোণে বট, পিপল, পাকড় ও গুলার গাছ থাকলে কষ্ট ও মৃত্যু ঘটে। দক্ষিণ দিকে পাকড় গাছ রোগ উৎপন্ন করে। উত্তরে গুলার গাছ থাকলে চক্ষুরোগ হয়। যে বাড়িতে বরই, কলা, ডালিম, পিপল ও লেবু থাকে, সেই বাড়ির কখনো উন্নতি হয় না। বাস্তবিকই বাড়ির কাছে কাঁটাযুক্ত, দুধওয়ালা (ক্ষীরবৃক্ষ) ও ফলদ বৃক্ষ ক্ষতিকর। পাকড়, গুলার, আম, নিম, বহেড়া, পিপল, কপিত্থ, বরই, নির্গুণ্ডী, তেঁতুল, কদম্ব, বেল ও খেজুর এই সব বৃক্ষ বাড়ির নিকটে অশুভ। অতএব গৃহস্থের উচিত বাড়ির আঙিনায় ও বাইরে কেবল তুলসীই রোপণ করা।

৮. গৃহের নিকটবর্তী অশুভ বস্তু
দেবমন্দির, ধূর্তের বাড়ি, সচিবের বাড়ি অথবা চৌরাস্তারের নিকটে বাড়ি নির্মাণ করলে দুঃখ, শোক ও ভয় লেগেই থাকে।

৯. প্রধান দ্বার
যে দিকে দ্বার করতে হবে, সেই দিকে বাড়ির দৈর্ঘ্য সমানকে নয় ভাগে ভাগ করে ডানদিকে পাঁচ ভাগ ও বামদিকে তিন ভাগ রেখে অবশিষ্ট (বাম দিক থেকে চতুর্থ) ভাগে দ্বার করা উচিত। ডান ও বাম দিক ধরা হবে, যখন ঘর থেকে বাইরে বেরোনো হয়। পূর্ব বা উত্তরদিকে অবস্থিত দ্বার সুখ ও সমৃদ্ধিদায়ক। দক্ষিণে অবস্থিত দ্বার বিশেষত নারীদের জন্য দুঃখদায়ক। দ্বার নিজে নিজে খোলা বা বন্ধ হওয়া অশুভ। নিজে নিজে খুললে উন্মাদ রোগ হয় এবং নিজে নিজে বন্ধ হলে দুঃখ হয়।

১০. দ্বারবেধ
প্রধান দ্বারের সামনে পথ বা বৃক্ষ থাকলে গৃহস্বামীর নানা রোগ হয়। কুয়ো থাকলে মৃগী ও অতিসার রোগ হয়। খুঁটি বা চবুতরা থাকলে মৃত্যু ঘটে। বাবড়ী থাকলে অতিসার ও সন্নিপাত রোগ হয়। কুমোরের চাকা থাকলে হৃদরোগ হয়। শিলা থাকলে পাথরি রোগ হয়। ভস্ম থাকলে অর্শ রোগ হয়। যদি বাড়ির উচ্চতার দ্বিগুণ জমি ফাঁকা রেখে উপরোক্ত নির্দিষ্ট বেধবস্তু থাকে, তবে তার দোষ ওই বাড়িতে লাগে না।

১১. গৃহে জলস্থান
কুয়ো বা ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্ক পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর বা ঈশান দিকে হওয়া উচিত। জলাশয় বা ঊর্ধ্ব ট্যাঙ্ক উত্তর বা ঈশান দিকে হওয়া উচিত। যদি বাড়ির দক্ষিণ দিকে কুয়ো থাকে তবে অশুভ রোগ হয়। নৈঋত্য দিকে কুয়ো থাকলে আয়ুক্ষয় হয়।

১২. বাড়িতে কক্ষগুলির অবস্থান
যদি একটি কক্ষ পশ্চিমে ও একটি কক্ষ উত্তরে হয়, তবে তা গৃহস্বামীর জন্য মৃত্যুদায়ক। তেমনি পূর্ব ও উত্তর দিকে কক্ষ থাকলে আয়ু হ্রাস পায়। পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিকে কক্ষ থাকলেও দক্ষিণে কক্ষ না থাকলে সর্বপ্রকার রোগ উৎপন্ন হয়।

১৩. গৃহের অভ্যন্তরীণ কক্ষের অবস্থান
স্নানঘর পূর্বে, রসোইঘর আগ্নেয় দিকে, শয়নকক্ষ দক্ষিণে, অস্ত্রাগার, সূতিকাগৃহ ও গৃহসামগ্রী এবং বড় ভাইয়া ও পিতার কক্ষ নৈঋত্যে, শৌচালয় নৈঋত্য, বায়ব্য বা দক্ষিণে, ভোজনস্থান পশ্চিমে, অন্নভাণ্ডার ও পশুগৃহ বায়ব্যে, পূজাঘর উত্তর বা ঈশানে, জল রাখার স্থান উত্তর বা ঈশানে, ধনসঞ্চয় উত্তর দিকে এবং নৃত্যশালা পূর্ব, পশ্চিম, বায়ব্য বা আগ্নেয় দিকে হওয়া উচিত। বাড়ির ভারী সামগ্রী নৈঋত্য দিকে রাখা উচিত।

১৪. গৃহস্বামীর জানার যোগ্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ
ঈশান দিকে স্বামী-স্ত্রী শয়ন করলে রোগ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। সর্বদা পূর্ব বা দক্ষিণ দিকে মাথা করে শোয়া উচিত। উত্তর বা পশ্চিম দিকে মাথা করে শুলে দেহে রোগ হয় ও আয়ু ক্ষীণ হয়। রাত্রিতে দক্ষিণ দিকে এবং দিনে উত্তর দিকে মুখ করে মল-মূত্র ত্যাগ করা উচিত; কারণ দিনে সমুখে সূর্য থাকায় পূর্ব দিকে ও রাত্রিতে পশ্চিম দিকে মুখ করে মল-মূত্র ত্যাগ করলে রোগ উৎপন্ন হয়। দিনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রহরে যদি কোনো বৃক্ষ বা মন্দিরের ছায়া বাড়ির উপর পড়ে, তবে সেই বাড়ির বাস্তু রোগ উৎপন্ন করে।

১৫. গৃহবাস্তুর অবস্থান
এক দেয়াল সংলগ্ন দুটি বাড়ি যমরাজের ন্যায় গৃহস্বামীর বিনাশকারী হয়। দুটি কক্ষের বিভাগও এক দেয়াল দ্বারা বিধিত নয়। কোনো পথ বা গলির শেষের বাড়ি কষ্টদায়ক হয়। বাড়ির সিঁড়ি (পগ), খুঁটি, জানালা, দরজা ইত্যাদির গণনা ইন্দ্র-যম-কুবের-রাজা এই ক্রমে করা উচিত; এবং শেষে যদি যম আসে, তবে সেই সিঁড়িকে অশুভ মনে করা উচিত।

সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর সংস্করণ
পং. গণপতি শাস্ত্রী সম্পাদিত বড়োদা সংস্করণ ‘সমরাঙ্গণ সূত্রধার’-এর মানক সংস্করণ। বর্তমান সংস্করণটি বড়োদা সংস্করণের উপরই ভিত্তি করে, যা Central Library, Baroda থেকে ১৯২৪–১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। বড়োদা সংস্করণের উপর ভিত্তি করেই ড. সুদর্শন কুমার শর্মা, অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল, M.R. Government College, ফাজিলকা (পাঞ্জাব) কর্তৃক আঙলানুবাদের সঙ্গে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি থেকে প্রকাশিত সংস্করণটিই বর্তমানে উপলব্ধ। এ ছাড়া পং. দ্বিজেন্দ্রনাথ শুক্ল সম্পাদিত মেহরচাঁদ দিল্লির নিবন্ধাত্মক সংস্করণ রয়েছে। পং. শুক্লজি অপ্রয়োজনীয়ভাবে পং. গণপতি শাস্ত্রীর সংস্করণের অধ্যায়ক্রম এদিক-ওদিক করে দিয়েছেন এই বলে যে এটি লেখকের দোষ—
মন্যে ত্রুটিপূর্ণোऽয়ং সংগ্রহঃ অধ্যায়ানাম্।
লেখকস্য দোষো, ন গ্রন্থকর্তুর্দোষ ইতি প্রতীয়তে।।

— প্রাক্কথন পৃ. ৪

এভাবে তাঁর বলা সম্পূর্ণ ভুল। বর্তমান সংস্করণের তেইশতম অধ্যায়ে সমরাঙ্গণ সূত্রধারের রচয়িতা মহারাজ ভোজদেব এইভাবে বলেন—
ব্রূমো বিভাগমধুনা গৃহদেবতানাং
সম্যক্ শুভাশুভফলপ্রবিভাগ যুক্তম্। (২৩.১৪৮)

অর্থাৎ দেবতাদের নগরে পদ-সংনিবেশ ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে এবং এখন বাস্তুপদে প্রতিষ্ঠিত দেবতাদের শুভাশুভ ফল, যা বিভাগসম্মত ও শাস্ত্রপ্রতিপাদিত—তা যথাযথভাবে বলছি।
এইভাবে মূল শ্লোকে ‘ব্রূমো …’ প্রভৃতি দ্বারা যে কথা বলা হয়েছে, তা পং. গণপতি শাস্ত্রীর সংস্করণে পাওয়া যাবে; কিন্তু পং. দ্বিজেন্দ্রনাথ শুক্লের সংস্করণে ২৪তম অধ্যায়ে নয়, বরং ১৪তম অধ্যায়ে পাওয়া যাবে। এইভাবে পং. শুক্লজি কেন প্রাচীন সংস্করণের সঙ্গে ছেদচ্ছেদ করেছেন কিছুই বোঝা যায় না। যদি কোনো পাণ্ডুলিপির উদাহরণ পেশ করে অধ্যায়গুলির সঙ্গে এই রকম ছেদচ্ছেদ করতেন, তবে তা ঠিক ও ক্ষমাযোগ্য হতো এবং গবেষণামূলক বলেই প্রতীয়মান হতো। কিন্তু কোনো ভিত্তি ছাড়াই মূলচ্ছেদ করা একজন বিদ্বানের পক্ষে উপযুক্ত নয়। বর্তমানে উপস্থাপিত সংস্করণে ২২.১৯২ শ্লোকের ন্যায়ই ৪৪ শ্লোকে ‘রোগ’ পাঠ না রেখে ‘অম্বুদধ্বংসী’ পাঠ সম্পাদক কর্তৃক করা হয়েছে। আমি এই গ্রন্থের প্রকাশক কাশীস্থিত চৌখম্ভা সংস্কৃত ভবনের সংরক্ষক স্ব. শ্রীব্রজরত্নদাসজির দ্বিতীয় আত্মজ শ্রী ব্রজেন্দ্র কুমারকে ধন্যবাদ জানাই এবং আমার কামনা—তিনি এইভাবেই দুর্লভ গ্রন্থগুলি প্রকাশ করতে থাকুন।

মকরসংক্রান্তি ২০৬৭
বিদ্বদ্বশংবদ
এ. ৪/৩১, শীশমহল কলোনি,
সুধাকরমালবীয়
কমচ্ছা, বারাণসী
চিত্তরঞ্জনমালবীয়

প্রারম্ভিক কথা

স্থাপত্যবিদ্যার উপর ভোজদেব রচিত প্রশংসনীয় গ্রন্থ ‘সমরাঙ্গণ সূত্রধার’ বিদ্বৎসমাজের সামনে উপস্থাপন করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।

উল্লেখযোগ্য যে ভোজ ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা—তিনি একাধারে কবি, পণ্ডিত, বিজ্ঞানী ও জনপ্রিয় শাসক। তিনি সংস্কৃত জ্ঞানের নানা শাখায় প্রায় চুরাশি (৮৪)টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

এই সকল গ্রন্থের মধ্যে দুটি গ্রন্থ সরাসরি স্থাপত্যবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত
প্রথমটি—সমরাঙ্গণ সূত্রধার,
দ্বিতীয়টি—যুক্তিকল্পতরু

সমরাঙ্গণ সূত্রধার গ্রন্থটি মোট তিরাশি (৮৩)টি অধ্যায়ে রচিত। এতে নগর পরিকল্পনা, গৃহস্থাপত্য, মন্দির স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যসংক্রান্ত বিষয়—যেমন প্রতিমালক্ষণ, আইকনোগ্রাফি, আইকনোমেট্রি, আইকনোপ্লাস্টিক শিল্প, মুদ্রা (হস্তমুদ্রা), হাতের বিভিন্ন ভঙ্গি, দেহভঙ্গি এবং পায়ের অবস্থান বা ভঙ্গি—ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। সহজ পাঠের সুবিধার্থে নীচে অধ্যায়ভিত্তিক বিষয়বস্তুর বিবরণ প্রদান করা হয়েছে।

  1. The Existence of Prthv1.

  2. The Conversation Between Viswakarma and his Sons.

  3. ‘Prabhavaka Charit' of Prabhachandra Siri, pg. 185 Quoted by Dr. Pratipala Bhatia, Cff 5 p. 316

ভোজব্যাকরণং হ্যেতচ্ছন্দশাস্ত্রং প্রবর্ততে।
অসৌ স মালবাধীশো বিদ্বচ্চক্রশিরোমণিঃ॥
শব্দালঙ্কারদৈবজ্ঞতর্কশাস্ত্রাণি নির্মমে।
চিকিৎসারজসিদ্ধান্তরসভাস্তূদয়ানি চ॥
অঙ্কশকুনবাচ্চাত্মস্বপ্নসামুদ্রিকান্যপি।
গ্রন্থান্ নিমিত্তব্যাখ্যানপ্রশ্নচূড়ামণীনিহ॥
বিবৃতিং চায়সদ্ধাবেऽর্ধকাণ্ডে (অর্থশাস্ত্র) মেঘমাল॥

৩. বাস্তুসংক্রান্ত প্রশ্নাবলি।

৪. সৃষ্টির বিবরণ।

৫. ভৌগোলিক তথ্য ও পৃথিবীর বর্ণনা।
৬. দেবতাদের সমতুল্যতা (দেবসমীকরণ)।
৭. সমাজের চার বর্ণ ও জীবনের চার আশ্রমের বিভাজন।
৮. শুভ ও অশুভ ভূমির বিবরণ।
৯. হস্ত বা কুবিত (হাত মাপ)-এর সংজ্ঞা।
১০. নগর পরিকল্পনা।
১১. ভূমি পরিকল্পনার তিন প্রকার।
১২. বাস্তুর মধ্যবর্তী শিরা ও ধমনীর বিবরণ।
১৩. মার্মস্থান (সংবেদনশীল বিন্দু) সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতার আলোচনা।
১৪. দেবতাদের পরিভাষা ও গৃহদেবতার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রকারভেদ।
১৫. রাজপ্রাসাদের পরিকল্পনা।
১৬. গৃহনির্মাণের জন্য কাঠের প্রয়োজনীয়তা।
১৭. অসুরদের উপর ইন্দ্রের বিজয় উপলক্ষে ইন্দ্রধ্বজের বিবরণ।
১৮. নগর নামকরণের বিধান।
১৯. বর্গাকার, বৃত্তাকার ও চতুষ্কক্ষবিশিষ্ট গৃহের চিত্রণ।
২০. গৃহ ও ভূমির উচ্চ ও নিম্ন অংশের গুণ ও দোষ।
২১. বাহাত্তর প্রকার ত্রিকক্ষবিশিষ্ট গৃহের সংজ্ঞা।
২২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট গৃহের সংজ্ঞা।
২৩. এককক্ষবিশিষ্ট গৃহের সংজ্ঞা।
২৪. দ্বার, পীঠ ও প্রাচীরের সংজ্ঞা ও পরিমাপ।
২৫. সর্বপ্রকার গৃহের সংখ্যার বিবরণ।
২৬. নির্মাণের শুভ ও অশুভ বিধান।
২৭. সভাগৃহ বা আদালতকক্ষের অষ্টপ্রকার ভেদ।
২৮. গৃহস্থালির উপকরণের বিবরণ।

২৯. শয্যা ও আসনের সংজ্ঞা।
৩০. রাজপ্রাসাদের বিবরণ।
৩১. যান্ত্রিক উপকরণ সংক্রান্ত অধ্যায়।
৩২. হস্তিবাহনের পরিচর্যাকার (মহুত) সংক্রান্ত বিবরণ।
৩৩. অশ্বশালার সংজ্ঞা।
৩৪. পাঠযোগ্য ও অপাঠযোগ্য নির্মাণসামগ্রী এবং প্রাচীরচিত্র।
৩৫. শিলান্যাস সংক্রান্ত বিধান।
৩৬. দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি প্রদান।
৩৭. কীলক স্থাপন ও সূত্রপাত।
৩৮. গৃহের ভূমি-নকশা।
৩৯. দ্বারের গুণ ও দোষ।
৪০. ভিত্তিপীঠের পরিমাপ।
৪১. নির্মাণবিধি (চয়নবিধি)।
৪২. শান্তিকর্ম সংক্রান্ত আচারবিধি।
৪৩. ক্ষতিগ্রস্ত দ্বারের শুভ ও অশুভ ফল।
৪৪. স্থপতির সংজ্ঞা।
৪৫. স্থাপত্যের অষ্টাঙ্গের সংজ্ঞা।
৪৬. তোরণ বা খিলান ভেঙে পড়লে প্রায়শ্চিত্তমূলক শান্তিকর্ম।
৪৭. বেদীর সংজ্ঞা।
৪৮. গৃহের নির্ধারিত দোষসমূহ।
৪৯. রুচক প্রভৃতি প্রাসাদের সংজ্ঞা।
৫০. প্রাসাদের শুভ ও অশুভ লক্ষণ।
৫১. দেবালয়ের ভিত্তি নির্মাণ।
৫২. প্রাসাদসমূহের নির্দিষ্ট নামকরণ।
৫৩. ভবনের অন্তর্গত দ্বারসমূহ।
৫৪. প্রাসাদের দ্বারের পরিমাপ।
৫৫. মেরু প্রভৃতি ষোড়শ প্রকার ভবনের সংজ্ঞা।
৫৬. রুচক প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের চিত্রণ।
৫৭. মেরু প্রভৃতির বিশক (বিশ সংখ্যক) বিভাগ।
৫৮. প্রাসাদস্তবন (প্রাসাদের প্রশস্তি)।
৫৯. চৌষট্টি প্রকার বিমান-এর সংজ্ঞা।
৬০. শ্রীকূট প্রভৃতি ছত্রিশ প্রকার প্রাসাদের সংজ্ঞা।
৬১. পীঠপঞ্চকের লক্ষণ।
৬২. দ্রাবিড় প্রাসাদের সংজ্ঞা।
৬৩. মেরু প্রভৃতি বিশক নাগর প্রাসাদ (মেরু মান অনুযায়ী বিশ প্রকার নগর ভবন)।
৬৪. দিগ্ভদ্র প্রভৃতি প্রাসাদের পূর্বশর্তসমূহ।
৬৫. ভূমিজ প্রাসাদের চিত্রণ।
৬৬. মণ্ডপের সংজ্ঞা।
৬৭. সাতাশ প্রকার মণ্ডপের সংজ্ঞা।
৬৮. ভূমির বিভিন্ন অঙ্গের নির্দিষ্ট বিন্যাস।
৬৯. ঊনচল্লিশ প্রকার জগতি’র লক্ষণ।
৭০. শিবলিঙ্গের পীঠে প্রতিমা চিত্রণের বিবরণ।
৭১. ‘চিত্ত্রোদ্দেশ’—চিত্রকলার বিধান।
৭২. ভূমিবন্ধ (চিত্রাঙ্কনের পূর্বে প্রাচীর প্রস্তুতকরণ)।
৭৩. লেপ্যকর্ম প্রভৃতি—ঢালাই, মডেল নির্মাণ ও প্রলেপকার্য।
৭৪. অণ্ডক পরিমাপ ও মানবমুখ অঙ্কনের নির্দিষ্ট মাপ।
৭৫. মানোৎপত্তি—পরিমাপের উৎপত্তি।
৭৬. প্রতিমার বিবরণ।
৭৭. দেবতাদের রূপ, অস্ত্র ও চিহ্নের সংজ্ঞা।
৭৮. গুণ ও দোষের লক্ষণনিরূপণ।
৭৯. প্রতিষ্ঠার জন্য সরল ও উপযুক্ত স্থানের লক্ষণ।
৮০. বৈষ্ণব প্রভৃতি দেবস্থান স্থাপনের লক্ষণ।
৮১. পঞ্চপুরুষ ও নারীর প্রতিমার চিত্রণ।
৮২. রস (ভাব)-এর পূর্বশর্ত সংক্রান্ত আলোচনা।
৮৩. পতাকা প্রভৃতি চৌষট্টি হস্তমাপের সংজ্ঞা।

ভোজদেব প্রাচীন ভারতের সর্বোত্তম নগর পরিকল্পনার প্রথম সুসংহত বিবরণ প্রদান করেন।
সমরাঙ্গণসূত্রধার (১০.৭.২৫)

যোগাযোগের ধমনির (arteries of communication) ছয়টি শ্রেণি স্বীকৃত হয়েছে, যথা—

মহারথ্যা (বৃহৎ রথচলাচলের পথ),
যানমার্গ (যানবাহন চলাচলের পথ),
উপরথ্যা (শাখা রথপথ),
রথ্যা (সাধারণ রথপথ),
ঘণ্টামার্গ (গ্রাম্য প্রধান সড়কের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত মুখ্য পথ) এবং
রাজমার্গ (নগরের সড়ক ও মহাসড়ক)।

পরবর্তীতে আমরা সমরাঙ্গণসূত্রধার (VIII.7.25)-এ দেখতে পাই যে, এই গ্রন্থটি রাজনৈতিক ভূগোল বিষয়ে গভীর জ্ঞানের সাক্ষ্য দেয় এবং ষোড়শ প্রকার ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের উল্লেখ করে—
১. বালিশস্বামিনী (সমৃদ্ধ ও জনবহুল অঞ্চল),
২. ভোগ্যা (সমৃদ্ধ দেশ),
৩. সীতাগোচররক্ষিণী (নদী ও পর্বতে পরিপূর্ণ অঞ্চল),
৪. অপাশ্রয়বতী (অনুকূলতাবিহীন অঞ্চল),
৫. কান্তা (প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপূর্ণ স্থান ও পর্যটনকেন্দ্র),
৬. খানিনি (খনি অঞ্চল),
৭. আত্মধারিণী (স্বল্প জনসংখ্যাবিশিষ্ট কিন্তু স্বাধীনতাপ্রিয় জনগোষ্ঠীর অঞ্চল),
৮. বণিক্‌প্রসাধিতা (বাণিজ্যকেন্দ্র),
৯. দ্রব্যবতী (উৎপাদনশীল অরণ্যাঞ্চল),
১০. অমিত্রঘাতিনী (বন্ধুপ্রতিবেশীসমৃদ্ধ বা শত্রুর পক্ষে অননুকূল অঞ্চল),
১১. আশ্রেণীপুরুষা (শান্তিপ্রিয় জনগণের অঞ্চল),
১২. শাক্যসামন্তা (নিরপেক্ষ অঞ্চল),
১৩. দেবমাতৃকা (অতিবৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল),
১৪. ধান্যশালিনী (অত্যন্ত উৎপাদনশীল অঞ্চল),
১৫. হস্তিবনোপেতা (বন্যপ্রাণসম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল) এবং
১৬. সুরক্ষা (কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল)।

এছাড়াও ভোজ সমরাঙ্গণসূত্রধার-এ (চতুর্থ অধ্যায়) ভূগোল সম্পর্কিত একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় প্রদান করেছেন, কারণ তিনি নিজেও একজন ভূগোলবিদ ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ‘ভোজপ্রতিদেশব্যবস্থা’ নামে একটি সুবৃহৎ ভূগোলবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যা যথার্থ অর্থেই একটি পরিপূর্ণ ভূগোলগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার যোগ্য। ভারতবর্ষে এ ধরনের প্রাচীন গ্রন্থ অত্যন্ত দুর্লভ। সুতরাং রাজনৈতিক ভূগোল এবং বাস্তুশাস্ত্র—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর সুস্পষ্ট ও গভীর দখল ছিল। এই কারণেই দশম শতাব্দীতে তিনি ভূগোল ও বাস্তুশাস্ত্র—উভয় শাস্ত্রের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কৌটিল্যরূপে প্রতিভাত হন। প্রকৃতপক্ষে উপরোক্ত ষোড়শ প্রকার ভূ-রাজনৈতিক বিভাগের আলোচনাই প্রমাণ করে যে, নগর পরিকল্পনার কালানুক্রমিক বিকাশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সীমিত পরিসরের মধ্যেই অধিক সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্টভাবে বিষয় উপস্থাপনের প্রয়াস করেছিলেন।

আমরা আমাদের সহকর্মী অধ্যাপিকা শৈলজা পান্ডে, এলাহাবাদ (উত্তর প্রদেশ) এবং শ্রীকৃষ্ণ ‘যুগানু’-এর নিকট গভীরভাবে কৃতজ্ঞ …রাজস্থানের উদয়পুর নিবাসী যাঁরা প্রাচীন সংস্কৃত বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থসমূহ সম্পাদনা ও হিন্দিতে অনুবাদের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. সুদর্শন কুমার শর্মা, এম. আর. সরকারি কলেজ, ফাজিলকা (পাঞ্জাব)-এর নিকট আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ, কারণ সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর তাঁর ইংরেজি অনুবাদ নিঃসন্দেহে এক মাইলফলকস্বরূপ কাজ। নিঃসন্দেহে উপর্যুক্ত সকল পণ্ডিতের নিকট আমরা ঋণী, যাঁরা বাস্তুশাস্ত্রের পাঠকদের জন্য প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যবিদ্যার উৎকৃষ্টতম উপাদান পরিবেশন করে চলেছেন।

সুধাকর মালব্য
চিত্তরঞ্জন মালব্য

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

সমরাঙ্গণ সূত্রধার স্থাপত্যবিদ্যার একটি গ্রন্থ। শব্দার্থ অনুযায়ী এর অর্থ—মানব আবাসস্থলের স্থপতি। এই গ্রন্থে নগর ও গ্রাম পরিকল্পনা, গৃহ, সভাগৃহ ও প্রাসাদ নির্মাণের বিধান, তদুপরি নানাবিধ যন্ত্রের বিবরণ আলোচিত হয়েছে।

এই সংস্করণটি নিম্নলিখিত তিনটি পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে—

১. # চিহ্নিত পাণ্ডুলিপি—বড়োদার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অধিভুক্ত। এটি দ্বিতীয় অধ্যায়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত, তবে এতে ১৯টি ফোলিও অনুপস্থিত। কোলফনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী এটি সংবৎ ১৫৯৪ সালে লিপিবদ্ধ।

২. " চিহ্নিত পাণ্ডুলিপি—উক্ত গ্রন্থাগারেরই অন্তর্গত, যা ৫৫তম অধ্যায়ের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

৩. " চিহ্নিত পাণ্ডুলিপি—পাটনার ভাণ্ডারকর গ্রন্থাগার থেকে ধার নেওয়া, যা ৪৯তম অধ্যায়ের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত; তবে এতে ১০টি ফোলিও অনুপস্থিত এবং বয়সের দিক থেকে এটি প্রথম পাণ্ডুলিপিটির সমসাময়িক বলে প্রতীয়মান।

এই পাণ্ডুলিপিগুলি ত্রুটিতে পরিপূর্ণ এবং পাঠোদ্ধারে খুব একটা সুস্পষ্ট নয়। সেগুলিকে মুদ্রণের উপযোগী করে পরীক্ষা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। প্রথম ৫৪টি অধ্যায় বর্তমানে প্রথম খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে; অবশিষ্ট অধ্যায়সমূহ মুদ্রণাধীন এবং শীঘ্রই দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত হবে।

এই খণ্ডের শুরুতে একটি বিস্তৃত বিষয়সূচি সংযোজিত হয়েছে, যার পর্যালোচনায় গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত সকল বিষয়ের একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যাবে।

টীকা—এই ভূমিকা ১৯৬৬ সালের সমরাঙ্গণ সূত্রধার সংস্করণ থেকে গৃহীত; কারণ বর্তমান সম্পাদক প্রথম সংস্করণ প্রত্যক্ষ করতে পারেননি।

এই গ্রন্থে নগর, প্রাসাদ ও বৃহৎ ভবন নির্মাণের বিষয় অন্যান্য প্রাপ্ত শিল্পশাস্ত্রগ্রন্থের তুলনায় অধিক স্পষ্ট ভাষায় ও বিশদ বিবরণসহ আলোচিত হয়েছে। একত্রিশতম অধ্যায়ে নানাবিধ যন্ত্রের বর্ণনা রয়েছে, যা অন্যান্য শিল্পগ্রন্থে পাওয়া যায় না—যেমন হাতির যন্ত্র (গজযন্ত্র), আকাশে চলমান কাঠের পাখির যন্ত্র (ব্যোমচারিবিহগযন্ত্র), আকাশে উড়ন্ত কাঠের বিমানযন্ত্র (আকাশগামিদারুময়বিমানযন্ত্র), দ্বাররক্ষক যন্ত্র (দ্বারপালযন্ত্র), যোদ্ধাযন্ত্র (যোধযন্ত্র) প্রভৃতি।

“যন্ত্রাণি কল্পিতো হস্তীভ তদ্‌ গচ্ছৎ প্রतीयতে ।
শুকাদ্যাঃ পক্ষিণঃ ক্লপ্তাস্তালস্যানুগমান্মুহুঃ ॥ ৭৩ ॥
জনস্য বিস্ময়কৃতো নৃত্যন্তি চ পঠন্তি চ ।
পুত্রিকা বা গজেন্দ্রো বা তুরগো মর্কটোऽপি বা ॥ ৭৪ ॥
বলনৈর্বর্তনৈর্নৃত্যংস্তালেন হরতে মনঃ ॥”

“লঘুদারুময়ং মহাবিহঙ্গং দৃঢ়সুশ্লিষ্টতনুং বিধায় তস্য ।
উদরে রসযন্ত্রমাদধীত জ্বলনাধারমধোऽস্য চাগ্নিপূর্ণম্ ॥ ৯৪ ॥
তত্রারূঢ়ঃ পুরুষস্তস্য পক্ষদ্বন্দ্বোচ্চালপ্রোজ্ঝিতেনানিলেন ।
সুপ্তস্যান্তঃ পারদস্যাস্য শক্ত্যা চিত্রং কুর্বন্নম্বরে যাতি দূরম্ ॥ ৯৫ ॥
ইত্থমেব সুরমন্দিরতুল্যং সঞ্চলত্যলঘু দারুবিমানম্ ।
আদধীত বিধিনা চতুরোऽন্তস্তস্য পারদভৃতান্ দৃঢ়কুম্ভান্ ॥ ১৭ ॥”

সাধারণত বিদ্যমান শিল্পশাস্ত্রগ্রন্থগুলির ভাষা ব্যাকরণগত ত্রুটিপূর্ণ; কিন্তু বর্তমান গ্রন্থটি ব্যাকরণগত অসঙ্গতি থেকে মুক্ত এবং অধিকাংশ স্থানে মধুর ও সুন্দর শৈলীতে রচিত।

এই গ্রন্থটি ভারতীয় স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন অত্যন্ত উপকারী হবে, তেমনি যারা বাস্তবে এই বিদ্যাকে প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক, তাঁদের জন্যও সমানভাবে কল্যাণকর প্রমাণিত হবে।

গ্রন্থে উল্লিখিত লেখক হলেন মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেব, যিনি সম্ভবত ধারানগরের সেই ভোজরাজ, যিনি খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের প্রথম ভাগে মালবদেশ শাসন করেছিলেন। তাঁর রচিত বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে শৃঙ্গারপ্রকাশ (অলঙ্কারশাস্ত্র) ও সরস্বতীকণ্ঠাভরণ (ব্যাকরণ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ
টি. গণপতি শাস্ত্রী

ভূমিকা
(১৯২৫)

এই দ্বিতীয় খণ্ডটি সমরাঙ্গণ গ্রন্থের কার্য সম্পূর্ণ করে, যা তিরাশি অধ্যায়ের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে প্রাসাদসমূহের বর্ণনা, চিত্র ও প্রতিমায় অঙ্কনযোগ্য বিষয়াবলি, পতাকা প্রভৃতি দিয়ে সূচিত চৌষট্টি প্রকার হস্তলক্ষণ এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; যাদের বিশদ বিবরণ সংযুক্ত বিষয়সূচিতে পাওয়া যাবে।

এই সংস্করণ প্রকাশ করতে গিয়ে বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কারণ প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় উল্লিখিত পাণ্ডুলিপি ব্যতীত আর কোনো পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। উক্ত পাণ্ডুলিপিটি বহু ত্রুটিপূর্ণ এবং বহু স্থানে পাঠোদ্ধারে অস্পষ্ট। ত্রুটিগুলির যথাযথ বিকল্প পাঠ প্রশ্নচিহ্নের মাধ্যমে প্রস্তাব করা হয়েছে এবং অশুদ্ধ শব্দ ও বাক্যের জন্য নতুন পাঠ যতদূর সম্ভব পাদটীকার মাধ্যমে নির্দেশ করা হয়েছে।

বিষয়বস্তু যেহেতু শিল্পশাস্ত্রসংক্রান্ত, সেহেতু গ্রন্থটির সাহিত্যিক গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক নয়। তথাপি এটি তার মধুর ও সরল কাব্যশৈলীর জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কারণেই প্রথম খণ্ডে আমি উল্লেখ করেছি যে গ্রন্থকার সেই ধারানগরের রাজা ভোজই, যিনি শৃঙ্গারপ্রকাশ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন এবং যাঁকে সাহিত্যক্ষেত্রে উচ্চ আসন প্রদান করা হয়েছে।

এ কথা বলা যেতে পারে যে, গ্রন্থে উল্লিখিত হাতির যন্ত্র, দ্বাররক্ষক যন্ত্র, উড়ন্ত যন্ত্র প্রভৃতি নানাবিধ যন্ত্র যেহেতু আগে কখনো দেখা বা শোনা যায়নি, সেহেতু সেগুলি কেবল কল্পনাপ্রসূত, বাস্তবে নির্মিত ও ব্যবহৃত যন্ত্র নয়। কিন্তু তা সঠিক নয়; কারণ একসময়ে বিদ্যমান বস্তুসমূহও দীর্ঘকাল ব্যবহারের অভাবে কালে কালে অবাস্তব বলে বিবেচিত হতে পারে, এবং সেইসব বস্তু…অত্যধিক শ্রম, সময় ও অর্থসাপেক্ষ বিষয়সমূহও খুব সহজেই ব্যবহারের বাইরে চলে যেতে পারে।

এরপর প্রশ্ন উঠতে পারে—কবি কেন যন্ত্র নির্মাণের পদ্ধতি বর্ণনা করেননি। এ বিষয়ে কবি নিজেই উত্তর দিয়েছেন (৩১.৭৯–৮০)—

যন্ত্রাণাং ঘটনা নোক্তা গুপ্ত্যর্থ নাজ্ঞতাবশাত্ ।
তত্র হেতুরয়ং জ্ঞেয়ো ব্যক্তা নৈতে ফলপ্রদাঃ ॥

(প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৫)

“ব্যক্তা নৈতে ফলপ্রদাঃ”—এই পঙ্‌ক্তির অর্থ এই যে, যদি গ্রন্থে যন্ত্র নির্মাণের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়, তবে যাঁরা গুরুর নিকট থেকে শিল্পে দীক্ষা লাভ করেননি, তাঁরাও যন্ত্র নির্মাণের চেষ্টা করবেন। কিন্তু এই ধরনের লোকের দ্বারা করা প্রচেষ্টা সফল তো হবেই না, বরং নানা প্রকার বিপদ ও অসুবিধার কারণ হয়ে উঠবে।

পরবর্তী শ্লোকে যন্ত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে (৩১.৮৭)—

পারম্পর্যকৌশলং সোপদেশশাস্ত্রাভ্যাসো বাস্তুকর্মোদ্যমো ধীঃ ।
সামগ্রীয়ং নির্মলা যস্য সোऽস্মিঞ্চিত্রাণ্যেবং বেত্তি যন্ত্রাণি কর্তুम् ॥

(প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৬)

অত্যন্ত উপযোগী যন্ত্রসমূহের ক্ষেত্রে তাদের নির্মাণ-পদ্ধতি গোপন রাখা—এটিও কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়।

টি. গণপতি শাস্ত্রী
১৯২৫

ভূমিকা
(১৯৬৬)

ভোজদেব রচিত সমরাঙ্গণসূত্রধার প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ ও ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে, জি. ও. সিরিজের ২৫ ও ৩২ নম্বর হিসেবে, দুই খণ্ডে—যার সম্পাদক ছিলেন মহামহোপাধ্যায় টি. গণপতি শাস্ত্রী। বহু বছর ধরে এই গ্রন্থটি মুদ্রণশেষে অপ্রাপ্য হয়ে ছিল।

ড. ভি. এস. আগরওয়ালা সমগ্র পাঠ পুনঃসম্পাদনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বিষয়বস্তুর আলোচনা-সহ দীর্ঘ ভূমিকা, টীকা ও প্রযুক্তিগত পরিভাষার সূচিপত্র সম্বলিত আরেকটি খণ্ড সংযোজনের পরিকল্পনা করেন। তিনি সেই অতিরিক্ত খণ্ড প্রস্তুতের কাজেও নিয়োজিত ছিলেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে জুলাই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন, কাজটি সম্পূর্ণ করার পূর্বেই। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী পূর্বে দুই খণ্ডে প্রকাশিত পাঠ এখন পুনঃসম্পাদিত হয়ে এক খণ্ডে প্রকাশিত হল—যাতে ভূমিকা, টীকা ও সূচি সংযোজিত হয়েছে—ড. আগরওয়ালার নোট প্রভৃতির ভিত্তিতে। ড. আগরওয়ালা এই পাঠ-খণ্ডের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা প্রদান করেছেন।

এই খণ্ডসমূহ প্রকাশের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় অনুদান কমিশন এবং গুজরাট রাজ্য সরকারের নিকট কৃতজ্ঞ।

এছাড়াও এই খণ্ড মুদ্রণের ক্ষেত্রে আন্তরিক সহযোগিতার জন্য বরোদা এম. এস. বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের ব্যবস্থাপক শ্রী আর. জে. প্যাটেলের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ।

ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট
বি. জে. সন্দেসারে
বরোদা
পরিচালক

তারিখ: ৯ই নভেম্বর, ১৯৬৬

ভূমিকা
‘বাস্তু ব্রহ্মা সসরজাদৌ বিশ্বমপ্যখিলং তথা’
চতুঃ প্রকারং স্থাপত্যমষ্টধা চ চিকিৎসিতম্ ।
ধনুর্বেদশ্চ সপ্তাঙ্গোঁ জ্যোতিষং কমলালয়াত্ ।।

ভারতদেশের বাস্তু মূলত তিন প্রকার—
১. দেবভবন (মন্দির, সমাধিস্থল, গুরুদ্বারা, জৈনমন্দির, বৌদ্ধমন্দির ইত্যাদি),
২. রাজভবন (ভারতের বহু রাজাদের দুর্গ), এবং
৩. সাধারণ ভবন (একতলা থেকে সাততলা পর্যন্ত ভবন, এক কক্ষের গৃহ থেকে দশ কক্ষ (শালা) বিশিষ্ট ভবন ইত্যাদি)।
এইভাবে এই তিন বিভাগে বিশ্বের সমগ্র বাস্তুসমূহকে সমরাঙ্গণ সূত্রধার বাস্তুশাস্ত্র গ্রন্থ যে বিভক্ত করেছে—এটাই এই গ্রন্থের বিশেষ দান। মানসার, ময়মত প্রভৃতি শিল্পশাস্ত্রীয় গ্রন্থে ধরা (পৃথিবী), হ্ম্য (প্রাসাদ), যান এবং পর্যঙ্ক—এই রূপে চতুর্বিধ বাস্তু-লক্ষণ প্রতিপাদিত হয়েছে। সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এ যে ষড়্বিধ বাস্তু-লক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ১. দেশ-নিবেশ, ২. পুর (নগর) নিবেশ এবং ৩. ভবন-নিবেশ বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী।

ভারতদেশে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। অতএব ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় প্রভৃতি চার বর্ণকে এবং ব্রহ্মচর্য, গৃহস্থাশ্রম প্রভৃতি চার আশ্রমকে লক্ষ্য করে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে। পৃথু গোরূপ পৃথিবীর দোহন করেছিলেন—এই কাহিনি ভাগবত পুরাণ প্রভৃতি বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত। সৃষ্টির রচয়িতা (কর্তা) ‘ব্রহ্মা’ নামে অভিহিত এবং ভগবান বিশ্বকর্মা সৃষ্টির আচার্য (অভিযন্তা) ও মন্দির প্রভৃতি ভবনের নির্মাতা প্রথম গুরু (স্থপতি)। তিনি অষ্ট বসুর মধ্যে প্রভাস নামক বসুর পুত্র। সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এর পরম্পরা অনুযায়ী প্রভাস বসুর পত্নী বৃহস্পতির ভগিনী। অতএব বিশ্বকর্মা বৃহস্পতির ভাগ্নে। বিশ্বকর্মা ইন্দ্রের নগরী অমরাবতীর নির্মাণ করেছিলেন এবং এই জগতের প্রথম শাসক মহারাজ পৃথু ছিলেন, যাঁর কার্য্যে বিশ্বকর্মা সহায়তা করেছিলেন। সুতরাং তাঁরা সমকালীন ছিলেন। কিন্তু অপরাজিতপৃচ্ছা-এর পরম্পরা অনুযায়ী প্রভাস বসুর বিবাহ ভৃগুর ভগিনীর সঙ্গে হয়েছিল। ‘ভৃগু’ শব্দটি প্রাচীন কারিগরদের জন্য ব্যবহৃত হত। মহাভারত প্রভৃতি ইতিহাসগ্রন্থে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বায়ব্যাস্ত্র ও বারুণাস্ত্রের কারিগর সম্ভবত তাঁরাই ছিলেন। রাজগৃহে যান্ত্রিক বিধান তাঁদের দ্বারাই সম্পন্ন হত। সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এর যন্ত্রাধ্যায় (৩১)-এ বিমান যন্ত্র, পারদ, অগ্নি এবং অয়ঃকপাল প্রভৃতি যান্ত্রিক কলার উল্লেখ আছে, কিন্তু সেগুলি কীভাবে নির্মিত হবে—তা বলা হয়নি। সাধারণ গৃহনিবেশ ও রাজগৃহ প্রভৃতির বর্ণনা সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এর আটচল্লিশ অধ্যায়ে রয়েছে। অবশিষ্ট ৪৯–৮৩ অধ্যায় পর্যন্ত দেবমন্দিরসমূহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

‘সমরাঙ্গণ সূত্রধার’-এ ‘সূত্রধার’-এর অর্থ হল সূত্র ধরে মাপজোককারী (কারিগর) এবং ‘সমরাঙ্গণ’-এর অর্থ হল আঙিনাযুক্ত গৃহ, যা মানবজীবনে পঞ্চমহাভূতের প্রकोপ থেকে রক্ষা করে এমন যুদ্ধক্ষেত্র। অর্থাৎ জীবনযাপনরূপী যুদ্ধের ময়দানস্বরূপ গৃহ (আঙিন) স্থান। এই গৃহরূপ যুদ্ধস্থল নির্মাণের বিধানবিষয়ক শাস্ত্রই সমরাঙ্গণ সূত্রধার। এই প্রসঙ্গে প্রোঃ বাসুদেব শরণ আগরওয়ালেরও অনুরূপ মত আছে—

The name সমराङ्गण सूत्रधार is worthy of attention. The word सूत्रधार literally means 'Thread bearer', i.e. an architect who takes his measurements by means of the plumblime. Here is a pun on the word 'H' which means both a battlefield and a mortal human being (sa+mara) (destined to die). Thus the title as applicable to Bhoja would signify firstly that he was the architect of the fortunes on the battlefield, i.c. who planned the course of battle leading to victory, and secondly, who was the architect of human dwellings, i.e. evil architecture on an extensive scale, The epithet in its second denotation is a fact of King Bhoja's building activities who planned cities, palaces, temples, educational institutions and hospitals, wharfs, lakes, ponds, stepped wells, pavilions, resting places, roads, groves, etc. in a liberal spirit.

ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র (স্থাপত্য)-এর প্রধান ও প্রথম অঙ্গের ভিত্তিপ্রস্তর হল ‘বাস্তুপদ’ বিন্যাস। ভগবত্পাদ শঙ্করাচার্যের প্রপঞ্চসার অনুসারে প্রাচীনকালে ‘বাস্তু’ নামে এক পুরুষ ছিলেন, যিনি সমগ্র সংসারকে উপদ্রুত ও অশান্ত করেছিলেন। তাঁর আকৃতি ছিল চতুষ্কোণ বস্তুর ন্যায়। সেই দিতিপুত্র রাক্ষসকে দেবতারা বধ করেন (প্রপঞ্চসার ৫.৫)। তাঁর দেহে অবস্থানকারী দেবগণের সংখ্যা ছিল তিপ্পান্ন। অতএব সেই দেবতাদের উদ্দেশ্যে বাস্তুতে মণ্ডল নির্মাণ করে তাতে স্থাপন ও পূজন করা উচিত।

বাস্তুপূজায় সর্বপ্রথম পৃথিবীকে চতুষ্কোণ রূপে সমতল করতে হয়। চতুরস্ত্র অর্থাৎ চতুষ্কোণকে পৃথিবীর প্রতীক ধরা হয়, যার উপর ঐ ৫৩ দেবতার বাস। সেই সমতল ভূমি (চতুরস্র)-এর উপর আট অষ্টক—অর্থাৎ ৬৪টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষ্ঠকে (বাস্তুপুরুষ বধকারী) ৫৩ দেবতার পূজা করে তাঁদের বলি প্রদান করা উচিত। এর জন্য ঐ ৬৪ চতুষ্কোণের মধ্যস্থ চারটি চতুষ্কোণকে এক গণ্য করে তার মধ্যভাগে ব্রহ্মার পূজা করতে হবে।

তারপর তার পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তর দিকের কোষ্ঠকগুলিতে আর্যক, বিবস্বান্, মিত্র এবং মহীধরের অভ্যর্থনা করতে হবে।
চতুষ্কোণগুলিতে অবস্থিত অর্ধেক-অর্ধেক করে দুই-দুইটি কোষ্ঠকে সাবিত্রী, সবিতা, ইন্দ্র, ইন্দ্রজয়, রুদ্র, রুদ্রজয়, আপ্, বৎসক এবং অগ্নির; বায়ব্য কোণে শর্ব, গুহ, আর্য্যমা ও জম্ভক এবং ঈশান কোণে পিলিপিচ্ছ, চরকী, বিদারী ও পূতনার অভ্যর্থনা করা উচিত।

এরপর সেই ব্রাহ্ম প্রকোষ্ঠের চারদিকে অবস্থিত চারটি কোষ্ঠক (চতুষ্কোষ্ঠক অর্থাৎ মোট ১২টি কোষ্ঠক)-এ ক্রমানুসারে আর্যক, বিবস্বান, মিত্র এবং মহীধরের; তারপরে চার উপদিশার ১৬টি কোষ্ঠকের মধ্যে আগ্নেয় কোণে সাবিত্রী, সবিতা, শক্র ও ইন্দ্রজয়ের; নৈঋত্য কোণে রুদ্র, রুদ্রজয়, আপ্ ও বৎসকের; বায়ব্য কোণে শর্ব, গুহ, আর্য্যমা ও জম্ভকের এবং ঈশান কোণে পিলিপিচ্ছ, চরকী, বিদারী ও পূতনার পূজা করা উচিত।

বাসব (পূর্ব), যম (দক্ষিণ), জলেশ (পশ্চিম) এবং শশি (উত্তর) দিশাবর্তী ৩২টি কোষ্ঠকের মধ্যে—পূর্বের কোষ্ঠকগুলিতে ঈশাল, সর্পজন্য, জয়ন্ত, শক্র, ভাস্কর, সত্য, বৃষ এবং অন্তরীক্ষ—এই পূর্বে উল্লিখিত দেবতাদের পূজা করতে হবে।
দক্ষিণের কোষ্ঠকগুলিতে অগ্নি, পুষা, বিতথ, যম, গৃহরক্ষক, গন্ধর্ব, ভৃঙ্গরাজ এবং মৃগের; পশ্চিমের কোষ্ঠকগুলিতে নিরৃতি, দৌবারিক, সুগ্রীব, বরুণ, পুষ্পদন্ত, অসুর, শেষ এবং উরগের; এবং উত্তর দিশার কোষ্ঠকগুলিতে বায়ু, নাগ, মুখ্য, সোম, ভল্লাট, অর্গলা, দিতি ও অদিতির অর্চনা করা উচিত।

এই ভূতলে সর্বপ্রথম নাদ ব্রহ্মের জন্ম হয় নটরাজ শিবের ডমরু নিনাদ থেকে, যা লয়, তাল এবং নৃত্যকেও জন্ম দিয়েছে। দেবতাকে প্রসন্ন করার জন্য মন্দিরসমূহে এর প্রয়োগ হয়েছে। অতএব সমরাঙ্গণ-এর উত্তরার্ধের অধ্যায়সমূহে হস্তমুদ্রারও বিবেচনা পাওয়া যায়।

সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর রচয়িতা ভোজদেব—
ভোজ (ভোজরাজ) ছিলেন পরমারবংশীয় ধারার (মালবা) নরেশ। তিনি সংস্কৃত ভাষার পুনরুদ্ধারক ছিলেন এবং বহু শাস্ত্র রচনা করেছেন। জ্যোতিষ বিষয়ক ‘রাজমৃগাঙ্ক’ নামক গ্রন্থটি তিনি ১০৪২–৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন। তাঁর পিতৃব্য (চাচা) ছিলেন মহারাজ মুঞ্জ, যাঁর মৃত্যু ৯৯৪ থেকে ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে হয়। তৎপরবর্তী কালে তাঁর পিতা সিন্ধুরাজ সিংহাসনারূঢ় হন এবং কিছুদিন রাজগদ্দিতে আসীন থাকেন। মহারাজ ভোজের উত্তরাধিকারী জয়সিংহ ১০৫৫–৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। মান্ধাতা নামক স্থানে ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দের একটি শিলালিপি পাওয়া যায়। অতএব মহারাজ ভোজদেবের সময়কাল একাদশ শতকের পূর্বার্ধ (১০১৮–১০৬৩) বলে মানা হয়। ভোজের বিদ্বত্তা, গুণগ্রাহকতা ও দানশীলতা ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। রাজতরঙ্গিণী (৭.২৫৯)-এ কাশ্মীর নরেশ অনন্তরাজ ও মালবাধিপতি ভোজদেবকে সমানভাবে বিদ্বৎ-প্রিয় বলা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সমান অধিকারসহ লেখনী পরিচালনা করেছেন এবং প্রায় ৮৪টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

১. তিনি ‘শৃঙ্গারমঞ্জরী’ নামক শৃঙ্গারিক রচনা এবং
২. ‘মন্দারমরন্দচম্পূ’ নামক কথাকাব্য রচনা করেছেন।
৩. বাস্তুশাস্ত্র বিষয়ে তাঁর ‘সমরাঙ্গণ-সূত্রধার’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আছে; এতে সাত হাজার শ্লোকে বাস্তুশাস্ত্রের গূঢ় রহস্য উদ্ভাসিত হয়েছে।
৪. ‘সরস্বতীকণ্ঠভরণ’ (বৃহদ্‌শব্দানুশাসন) নামক তাঁর ব্যাকরণ বিষয়ক গ্রন্থ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ; এটি আট প্রকাশে বিভক্ত।
৫. তিনি ‘যুক্তিপ্রকাশ’ এবং
৬. ‘তত্ত্বপ্রকাশ’ নামক ধর্মশাস্ত্রীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন।
৭. ‘রাজমার্তণ্ড’ নামক গ্রন্থ ঔষধি বিষয়ক; এতে মোট ৪১৮টি শ্লোক আছে।
৮. যোগসূত্রের উপর ভোজদেবের ‘রাজমার্তণ্ড’ নামক অত্যন্ত প্রসিদ্ধ টীকা আছে।
৯. ‘আয়ুর্বেদ সর্বস্ব’,
১০. ‘শালিহোত্র’ এবং
১১. ‘বিশ্রান্ত বিদ্যাবিনোদ’ নামক গ্রন্থ আয়ুর্বেদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১২. ‘সংগীতপ্রকাশ’ নামক গ্রন্থ সংগীতশাস্ত্র বিষয়ক।
১৩. ‘রাজমার্তণ্ড’ নামক গ্রন্থ বেদান্ত দর্শনের।
১৪. ‘সিদ্ধান্ত সংগ্রহ’,
১৫. ‘সিদ্ধান্ত সার-পদ্ধতি’,
১৬. ‘শিব তত্ত্ব রত্নকলিকা’,
১৭. ‘তত্ত্বপ্রকাশ’ (শিবতত্ত্বপ্রকাশিকা)—এই গ্রন্থগুলি দর্শন (আগম) শাস্ত্রের অন্তর্গত।
১৮. ‘কূর্মাষ্টক’ (দুই ভাগে) প্রাকৃত কবিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
১৯. ‘চম্পূরামায়ণ’, ‘মহাকালীবিজয়’ ও ‘বিদ্যাবিনোদ’—চম্পূ কাব্য ও গদ্যসাহিত্যের রচনা।
২০. ‘নামমালিকা’ নামক গ্রন্থ কোষ বিষয়ক।
২১. ‘সুভাষিত-প্রবন্ধ’ নামক গ্রন্থ সুভাষিত কাব্য।
২২. ‘আদিত্য প্রতাপ সিদ্ধান্ত’,
২৩. ‘রাজমার্তণ্ড’,
২৪. ‘রাজমৃগাঙ্ক’ এবং
‘বিদ্বজ্জ্ঞানবল্লভ’ (প্রশ্নবিজ্ঞান)—এই গ্রন্থগুলি জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২৫. ‘ভুজবুল প্রবন্ধ’,
২৬. ‘ভূপাল পদ্ধতি’,
২৭. ‘ভূপাল সমুচ্চয়’ বা ‘কৃত্যসার সমুচ্চয়’,
২৮. ‘চাণক্যনীতি’ (দণ্ডনীতি),
২৯. ‘চৌঞ্চর্যা’,
৩০. ‘ব্যবহার সমুচ্চয়’,
৩১. ‘যুক্তিকল্পতরু’,
৩২. ‘পূর্তমার্তণ্ড’,
৩৩. ‘রাজমার্তণ্ড’ এবং
৩৪. ‘রাজনীতিঃ’—এই গ্রন্থগুলি ধর্মশাস্ত্র, রাজধর্ম ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩৫. কাব্যশাস্ত্র বিষয়ে ভোজদেব ‘শৃঙ্গারপ্রকাশ’ এবং
৩৬. ‘সরস্বতীকণ্ঠা-ভরণালঙ্কার’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই দুই রচনায় সংশ্লিষ্ট সকল বিধার বিস্তৃত বিবেচনার সঙ্গে বহু নতুন তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছে।
শৃঙ্গারকে মূল রস রূপে গ্রহণ করে ভোজরাজ অলঙ্কারশাস্ত্রের ইতিহাসে নতুন …উদ্ভাবনা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাস্তবতঃ ভোজদেব পূর্ববর্তী সকল কাব্যশাস্ত্রীয় সিদ্ধান্তের বিবেচনা উপস্থাপন করে সমন্বয়বাদী পরম্পরার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই কাব্যশাস্ত্রে তাঁর গুরুত্ব অধিক।

ভোজরাজের বহুমুখী প্রতিভায় প্রভাবিত হয়ে ষোড়শ শতাব্দীর বল্লালসেন ‘ভোজপ্রবন্ধ’ নামে এক অনন্য কাব্যের প্রণয়ন করেন। এই প্রবন্ধে বিভিন্ন কবির দ্বারা ভোজরাজের যে প্রশস্তি করা হয়েছে, তার কাহিনিভিত্তিক বিবরণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি কাহিনি অনুযায়ী—

ধারার সিন্ধুরাজের বৃদ্ধাবস্থায় ভোজ নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। বৃদ্ধাবস্থার কারণে সিন্ধুরাজ রাজ্যের ভার অন্যের হাতে অর্পণ করার কথা ভাবলেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুঞ্জরাজ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। তখন ভোজরাজ মাত্র পাঁচ বছরের বালক। সিন্ধুরাজ অমাত্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজ্যভার মুঞ্জের হাতে তুলে দেন এবং ভোজকে তাঁর কোলে দেন।

কিছু সময় পরে একদিন মুঞ্জের সভায় এক সর্ববিদ্যাপারঙ্গত জ্যোতিষী উপস্থিত হলেন। মুঞ্জ তাঁর কাছে ভোজের ফলিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তখন সেই মহাপণ্ডিত ফলিত গণনা করে বললেন যে ভোজ গৌড়সহ সমগ্র দক্ষিণাপথেও রাজত্ব করবেন। এই কথা শুনে মুঞ্জরাজ চমকে উঠে কোনোভাবে ভোজকে নিজের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বঙ্গদেশের বৎসরাজকে ডেকে আদেশ দিলেন যে ভুবনেশ্বরী বনে ভোজকে হত্যা করে তাঁর কর্তিত মস্তক রাজাকে এনে দেখাতে হবে।

বৎসরাজ বহু বোঝানোর পরও মুঞ্জ নিজের আদেশ পরিবর্তন করলেন না এবং বৎসরাজকে আদেশ পালনে বাধ্য করলেন। অসহায় বৎসরাজ ভোজকে সঙ্গে নিয়ে ভুবনেশ্বরী বনে এসে পৌঁছালেন। ভোজকে হত্যা করার জন্য ভুবনেশ্বরী বনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এই সংবাদে ধারাবাসী জনগণ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।

এদিকে বৎসরাজ ভোজকে ভুবনেশ্বরী বনে মহামায়া মন্দিরের কাছে নিয়ে গেলেন এবং পিতৃতুল্য চাচার আদেশ তাঁকে জানালেন। ভোজ এক বটবৃক্ষের পাতায় নিজের রক্ত দিয়ে একটি বার্তা লিখে মহারাজ মুঞ্জকে দেওয়ার জন্য বৎসরাজের হাতে তুলে দিলেন। তারপর তিনি বৎসরাজকে শীঘ্রই মুঞ্জের আদেশ পালন করতে বললেন। সেই সময় ভোজের দীপ্তিময় মুখ দেখে বৎসরাজ করুণায় আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি ভোজকে নিজের গৃহে নিরাপদে রাখলেন এবং একটি কৃত্রিম মস্তক প্রস্তুত করে রাজা মুঞ্জকে দেখালেন। সঙ্গে সঙ্গে ভোজের সেই বার্তাটিও তিনি মুঞ্জকে দিলেন। মুঞ্জ সেই বার্তাটি পড়লেন—

মান্ধাতা স महीपतিঃ কৃতযুগালঙ্কারভূতো গতঃ
সেতুর্যেন মহোদধৌ বিরচিতঃ ক্বাঽসৌ দশাস্যান্তকঃ ।
অন্যে চাপি যুধিষ্ঠিরপ্রভৃতয়ো যাতা দিবং ভূৃপতে
নৈকেনাপি সমং গতা বসুমতী মুঞ্জ ত্বয়া যাস্যতি॥

‘সত্যযুগের অলংকারস্বরূপ মহীপতি মহারাজ মান্ধাতা চলে গেছেন। যিনি সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণ করেছিলেন এবং রাবণবধকারী ত্রেতাযুগের অলংকারস্বরূপ মহারাজ শ্রীरामচন্দ্র—তিনি কোথায়? দ্বাপরযুগের অলংকারস্বরূপ যুধিষ্ঠির প্রভৃতি রাজাগণও স্বর্গে গমন করেছেন। কারও সঙ্গেই এই বসুমতী (পৃথিবী) যায়নি; কিন্তু হে মুঞ্জ! এই পৃথিবী আপনার সঙ্গেই যাবে।’

এই বার্তা পড়ে মুঞ্জরাজ অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি নিজেকে মহাপাপী বলে নিন্দা করতে লাগলেন এবং পুত্রহত্যার প্রায়শ্চিত্তে উদ্যত হলেন। তখন বৎসরাজ বুদ্ধিসাগর প্রভৃতি অমাত্যদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করে মুঞ্জকে প্রকৃত ঘটনা জানালেন এবং ভোজকে মুঞ্জের সম্মুখে উপস্থিত করলেন। নিজের কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে মুঞ্জ ভোজের সামনে খুব কাঁদলেন। ভোজও তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন।

এরপর মুঞ্জরাজ নিজেই ভোজের রাজ্যাভিষেক করলেন এবং নিজের পুত্র জয়ন্তকে ভোজের হাতে অর্পণ করে নিজে তপোবনে চলে গেলেন।

সমরাঙ্গণসূত্রধার ও অন্যান্য বাস্তুশাস্ত্রীয় গ্রন্থসমূহের উপর বিহঙ্গম দৃষ্টি—
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতো মুখো
বিশ্বতো বাহুরুতবিশ্বতস্মাত্ ।
স বাহুভ্যাং ভ্রমতি স পতত্রৈ-
র্দ্যাবাভূমী জনয়ন্ দেব একঃ ।।

সেই এক দেবই এই সমগ্র সৃষ্টির রচনা করেছেন। তাঁর চক্ষু, মুখ, পা ও বাহু সর্বত্র ব্যাপ্ত। তিনি দ্যুলোক ও ভূমিকে প্রকাশ করেছেন। সেই দেব সমগ্র বিশ্বকে ব্যাপ্ত করে বিরাজমান।

বাস্তু শব্দের নিরুক্তি—
দেবতা ও মানুষ যেখানে-যেখানে সুখপূর্বক বাস করে, সেই স্থানকে ‘বস্তি’ বলা হয়। ‘বস্তি’-সম্পর্কিত বিষয়কে ‘বাস্তু’ সংজ্ঞায় অভিহিত করা হয়। যেমন ময়মতম্ (২.১)-এ বলা হয়েছে—

অমর্ত্যশ্চৈব মর্ত্যশ্চ যত্র যত্র বসন্তি হি।
তদ্ বস্ত্বিতি মন্ত্রজ্ঞৈঃ তত্তদ্ধেদং বদাম্যহম্॥ —ময়মতম্ ২/১

এইভাবে সমগ্র পৃথিবীই বাস্তু-র ভিত্তি। অতএব ভূমি ও বাস্তু-র অধ্যয়নই বাস্তুশাস্ত্রের বিষয়। ব্রহ্মা যখন সমগ্র বিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন, তখনই তিনি বাস্তু-র ভিত্তিও কল্পনা করেন। বিশ্বকর্মা—যিনি বাস্তুশাস্ত্রের প্রথম আচার্য বলে মানা হয়—বাস্তু-র বহু দিব্য উদাহরণ উপস্থাপন করে তাঁর পুত্র জয়কে বলেছিলেন যে সৃষ্টির আদিকালে ব্রহ্মা সর্বপ্রথম বাস্তুপুরুষের সৃষ্টি করেন—

তানুবাচ মুনির্বৎসা বিদিতং বো যথা পুরা।
বাস্তুব্রহ্মা সসরজাদৌ বিশ্বমপ্যখিলং তথা।
—সমরাঙ্গণসূত্রধার ২/৪

ভূমির লক্ষণ—
ভবন, প্রাসাদ, দুর্গ বা অন্যান্য নির্মাণের আগে ভূমির পরীক্ষা করা এবং তার লক্ষণ জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যদিও স্থাপত্য এবং শিল্পের ভিত্তি ভূমি, তাই নির্মাণ কাজ করার আগে ভূমি পরীক্ষা করতে হয়। যদি ভূমি সঠিকভাবে নির্বাচিত না হয়, তবে সেই স্থানে নির্মিত ভবন ক্ষতিকর হয়। ময়মতম্ গ্রন্থ অনুযায়ী নিম্নলিখিত ধরনের ভূমি শুভ মনে করা হয়েছে—

১. চতুরস্র ভূমি ভবন ও দেবালয়ের জন্য শুভ। পশ্চিম–উত্তর দিকে উঁচু ভূমি বিশেষ শুভ।
২. বিল্ব, নিম্ব, নির্বুণ্ডি, পিণ্ডিত, ছিতবন এবং আমের গাছযুক্ত ভূমি শুভ। যদি এটি সমতল হয় তবে আরও শুভ।
৩. উজ্জ্বল, হলুদ, লাল, কালো, কবুতরের চোখের মতো রঙের ভূমি শুভ।
৪. হাড়বিহীন, বাঁবী (=বল্মীক)বিহীন, কীট-মাকড়বিহীন, ভস্মবিহীন, গাছের শিকড়বিহীন, কাদাবিহীন, কুয়া-বিহীন এবং ভূসিবিহীন ভূমি শুভ।
৫. মৃতদেহের গন্ধযুক্ত, মাছ ও পাখির গন্ধযুক্ত ভূমি শুভ নয়।
৬. দেবালয়, রাজপ্রাসাদ ও কাঁটাযুক্ত গাছের নিকটবর্তী ভূমি শুভ নয়।
৭. ত্রিকোণ, বৃত্তাকার, বিষম, এক–দুই–তিন–চার পথে বিচ্ছিন্ন ভূমি, বড় গাছের দ্বারা চার কোণ আক্রমিত ভূমি, সর্পনিবাস ভূমি এড়িয়ে যেতে হবে।
৮. শ্মশান, আশ্রম, বানর–শূকরের বাসস্থান নিকটবর্তী ভূমি, বহু প্রবেশ পথযুক্ত ভূমি, রাস্তা দ্বারা বিচ্ছিন্ন ভূমি এড়ানো উচিত।
৯. উত্তর–পশ্চিমে উঁচু ভূমি, পূর্ব বা উত্তরে নদী সংযুক্ত ভূমি, সুগন্ধযুক্ত ভূমি বাসস্থানের জন্য অত্যন্ত শুভ।

বিশ্বকর্মা অনুযায়ী ভূমির লক্ষণ—
দেবতাদের শিল্পী বিশ্বকর্মা। তিনি স্থাপত্যবেদের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবর্তক ঋষি মণ্ডলে অন্তর্ভুক্ত। তাঁর মতে, ভূমি চার ধরনের এবং প্রধানত চার রঙের হয়।

  • ব্রাহ্মণী ভূমি সুগন্ধযুক্ত।

  • ক্ষত্রিয়া ভূমি লাল রঙের, যা রক্তের মতো গন্ধ বের করে।

  • বৈশ্য ভূমি মধুর গন্ধযুক্ত।

  • শূদ্র ভূমি মদ বা তীক্ষ্ণ গন্ধযুক্ত।

ব্রাহ্মণী ভূমির স্বাদ মিষ্টি, ক্ষত্রিয়া ভূমি কষাইলা, বৈশ্য ভূমি টক, শূদ্র ভূমি তিতা—
মথুরা ব্রাহ্মণী ভূমি: কষায়া ক্ষত্রিয়া মতা।
অম্লা বৈশ্যা ভবেদ্ ভূমিস্তিক্তা শূদ্রা প্রकीর্তিতা।

—বিশ্বকর্মা ১/২৬

আবাসনের জন্য দুর্লভ ভূমি—
কিছু ভূমি দুর্লভ। এই ধরনের ভূমিতে ভবন নির্মাণ করলে মানুষ প্রজন্মে প্রজন্মে সুখী থাকে। এই ভূমি হলো—চতুর্ভুজ, হাতির মতো, সিংহ, বেল, ঘোড়া, হাতি, বৃত্ত, ভদ্রপীঠ, ত্রিশূল, শিবলিঙ্গের মতো আকৃতির। বিশ্বকর্মা মত—
চতুরস্ত্রাং দ্বিপাকারাং সিংহোক্ষাশ্বেবরূপিণীঃ।
বৃত্তঞ্চ ভদ্রপীঠঞ্চ ত্রিশূলং লিঙ্গসন্নিভম্॥

মহলের ধ্বজার মতো উঁচু এবং পাত্রের মতো ভূমি দেবতরাও কামনা করেন—
প্রাসাদধ্বজকুম্ভাদিদেবানামপি দুর্লভাম্॥

দৃঢ় ভূমি—
দুর্লভ ভূমির পর শ্রেষ্ঠ ভূমি হলো দৃঢ় ভূমি। এতে চতুরস্র সহজেই চেনা যায়। এরপর গুরুতর, উঁচু ও সম ভূমি শুভ মনে করা হয়। এ ধরনের ভূমিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা বসতি গঠন করতে পারেন। বিশ্বকর্মার মতে, সকল জাতি–বর্ণের জন্য সম ভূমি শুভ—
দ্বিতীয় দৃঢ়ভূমি চ নিম্না চোত্তরপূর্বকে।
গম্ভীরা ব্রাহ্মণী ভূমির নৃপাণ শৃঙ্গমাশ্রিতা।
—বিশ্ব ১/৩২
বৈশ্যানাং সমভূমি চ শূদ্রাণাং বিকটা স্মৃত।
সর্বেষাং চৈব বর্ণানাং সমভূমি: শুভাভবা॥
—বিশ্ব ১/৩৩

রঙের ভিত্তিতে ভূমি—
উজ্জ্বল রঙের ভূমি সকল বর্গের জন্য শুভ। কুশ–কাষ এই ধরনের ভূমি ব্রাহ্মণদের জন্য বিশেষ শুভ, এতে বাস করলে তপস্যা ও বিদ্যায় বৃদ্ধি হয়। দূর্বা উদ্ভূত ভূমি ক্ষত্রিয়দের জন্য ফলপ্রদ। শূদ্রদের জন্য ঘাস–ফুঁসযুক্ত ভূমি ফলপ্রদ।
শুক্লবর্ণা চ সর্বেষাং শুভাভূমি রুদাহৃতা।
কুশকাষযুক্তা ব্রাহ্মীদূর্বানৃপাতিভর্গগা।
ফলপুষ্পলতা বৈশ্যা শূদ্রাণাং তৃণসংযুক্তা॥
—বিশ্ব ১/৩৪

শুভ ভূমির ফল—

  • চতুরস্ত্র মহাধনদায়ী

  • হাতির মতো ভূমি—ধনদায়ী

  • সিংহের মতো ভূমি (ব্যাঘ্রমুখ নয়)—গুণী পুত্র

  • বেল মতো ভূমি—পশুপালক

  • বৃত্তাকার ভূমি—শুভধনদায়ী

  • ভদ্রপীঠ ভূমি—শুধনদায়ী

  • ত্রিশূল মতো ভূমি—বীরসন্তান, ধন–সুখদায়ী

  • শিবলিঙ্গ সদৃশ ভূমি—সাধুদের সুখদায়ী

  • প্রাসাদ ধ্বজ মতো ভূমি—পদোন্নতিদায়ী

  • কুম্ভ সদৃশ ভূমি—ধনবৃদ্ধিদায়ী

সুগন্ধের ভিত্তিতে ভূমি—
যে ভূমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুগন্ধ বের করে, তা অত্যন্ত শুভ। স্থান নির্বাচনের সময় হাতে মাটি নিয়ে গন্ধ গ্রহণ করতে হয়। স্বাদ জানার জন্য চেখেও দেখা উচিত।
রোলি, আগর, করপুর, চন্দনের মিশ্র সুগন্ধের মতো যদি ভূমি সুগন্ধযুক্ত হয়, তবে তা শুভ।
কনাইল (কনার), গোলাপ, কমল, মালতি, চম্পা ও অন্যান্য সুগন্ধী ফুলের মতো ভূমি প্রশস্ত।
যে ভূমি গো-মূত্র, গোবর, দুধ, দই, ঘি–এর মতো সুগন্ধ বের করে, তা ফলপ্রদ। ময়মতম্ অনুযায়ী দই, ঘি, মধু, সুগন্ধযুক্ত ভূমি অশুভ।
মদ, মহুয়া, গন্ধ, হাতির মদজাত সুগন্ধ, আসম্ভ সুগন্ধ, ধান, পিসান–জাত সুগন্ধ—এই ধরনের ভূমি সকল জাতি ও বর্গের জন্য শুভ।
কুংকুমাগরুকর্পূরস্পৃক্কৈলাচন্দনাদিভিঃ
সুগন্ধা মিশ্রিতৈরেবিঃ পৃথকস্থৈর্বা বসুন্ধরা॥
কলহারপাতল্যাভোজমালতী চম্পকোত্পলঐঃ
স্থলাম্বুপ্রভাবৈশ্চান্যৈঃ সুগন্যা কুসুমৈস্তথা॥
গোমূত্র–গোময়–ক্ষীরদ্ধি–মধ্বাজ্যগন্ধভাক্…

সমান সুগন্ধ—
সামানগন্ধা মদিরামাধ্বীকে ভমদাসবৈঃ।
শালিপিষ্ঠকগন্ধৈশ্চ ধান্যগন্ধৈশ্চ বা তাথা।
প্রশস্তাখিলবর্ণনামি দ্রিগ্‌ গন্ধা বসুন্ধরা॥

মৌসুমের ভিত্তিতে ভূমির লক্ষণ— গরমের দিনে যেই ভূমির স্পর্শ শীতলতা দেয় এবং শীতের দিনে উষ্ণতা অনুভূত হয়, এছাড়াও বর্ষার দিনে যেই ভূমির স্পর্শে শীতলতা ও উষ্ণতার মিশ্র অনুভূতি আসে, সেই ভূমি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং শুভ।
ঘর্মাগমে হিমস্পর্শা বা স্যাদুষ্ণা হিমাগমে। প্রাবৃষ্যুষ্ণহিমস্পর্শা সা প্রশস্তা বসুন্ধরা॥

শুভ ভূমি থেকে উদ্ভূত ধ্বনি—
যে ভূমি শুভ, যদি রাতে তাতে শয়ন করা হয়, তবে মৃদঙ্গ, বীণা, বাঁশি এবং দণ্ডুভী বাদ্যের মতো শব্দ শোনা যায়। কখনও হাতির ডাক, ঘোড়ার হিনহিন বা সাগরের ঢেউয়ের মতো শব্দও ভূমি থেকে শোনা যায়। এমন ভূমি শুভ ধরা হয়—
মৃদঙ্গবল্লকীবীণুদুন্দুভীনাং সমা ধ্বনৌ।
দ্বিপাশ্চাব্ধিসমস্বানা চেতি স্যুর্ভূময়ঃ শুভাঃ॥

অশুভ ভূমি—
সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থে যেসব ভূমির বিস্তারিত লক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা অন্যত্র এত সুন্দরভাবে পাওয়া যায় না। এই ধরনের দুষ্ট ভূমি, যেখানে ভবন বা অন্য কোনো নির্মাণ করাও অশুভ। এমন ভূমি সচেতনভাবে এড়ানো উচিত।

১. (চিতা) ভস্ম, অঙ্গার (জলানো কাঠ বা উপলা), কপাল (হাড়যুক্ত মাথা), অস্থি, ভূসি, চুল এবং বিষাক্ত পাথরের মতো ভূমি অশুভ।
২. (ইঁদুর) ইঁদুরের বাসস্থানযুক্ত ভূমি, বাঁবীযুক্ত ভূমি, চিনি মিশ্রিত ভূমি, শুষ্ক ভূমি, ঢালু ভূমি, দ্রুত ভেঙে যায় এমন ভূমি, বড় বড় ছিদ্রযুক্ত ভূমি, গর্তে জল ভর্তি হলে জল বাম দিকে ঘুরে যায় এমন ভূমি, কসর ভূমি, নিম্ন–উচ্চ ভূমি, কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদ, ফলহীন বৃক্ষযুক্ত ভূমি, দুষ্ট পাখি এবং কীট–মাকড়ে ভর্তি ভূমি, অতিরিক্ত রান্নার পরও খাদ্য কমে যাওয়া বা স্বাদ খারাপ হওয়া—এই ধরনের ভূমি অশুভ।
৩. পূর্বে নদী বয়ে গেছে এমন ভূমি, মাংস–চর্বি–মেদ বা দুর্গন্ধযুক্ত ভূমি, পচা মালার গন্ধযুক্ত ভূমি, পশু–পাখির মল–মূত্রের মতো গন্ধযুক্ত ভূমি, তেল বা মৃতদেহের মতো দুর্গন্ধ, ধূসর বা ফিকে রঙের ভূমি, তিতা–কষায়–নমকযুক্ত বা ঘাম সৃষ্ট ভূমি—এগুলো অশুভ।
৪. শুষ্ক, কঠিন, গরম বা ঠান্ডা ভূমি, যা দেখলে অনিষ্টের সম্ভাবনা থাকে, তা এড়াতে হবে।
৫. শিয়াল, উট, ঘোড়া, গাধার আওয়াজের মতো শব্দ দিয়ে ভূমি শোনালে তা ত্যাগ করতে হবে।
৬. ঝরনার মতো শব্দযুক্ত ভূমি অশুভ।
৭. রাতে শয়নের সময় পাত্রের ঝনঝন শব্দ বা ধাক্কাধাক্কি শোনানো ভূমি ত্যাগ করা উচিত।

ভূমি খোঁড়ার সময় লক্ষণ—
যে ভূমিতে ভবন নির্মাণ হবে, তা হাল বা কুদাল দিয়ে খুঁড়ে পরীক্ষা করা হয়।

  • কাঠ বের হলে অগ্নি সৃষ্টিকারী ভূমি

  • পাথর বের হলে কল্যাণদায়ী ভূমি

  • ইট বের হলে ধনলাভকারী ভূমি

  • অস্থি বের হলে কুলনাশকারী ভূমি

  • সাপ বের হলে চুরি–ডাকাতির ক্ষতি করা ভূমি

নির্মাণের জন্য অযোগ্য স্থান—
সভাগার, বাগান, মঠ–মন্দির, রাজপ্রাসাদ, কাঁটাযুক্ত গাছের নিকট, নিচু আয়ের মানুষের ঘরের পাশে, বড় বৃক্ষের কাছে এবং শ্মশান, গুহ্যবিদ্যা আশ্রম, বানর–ভালু–শূকরের বাসস্থানের নিকট ভবন তৈরি করা উচিত নয়।

ভূমি পরীক্ষা পদ্ধতি—

১. ভূমি খনন পদ্ধতি—
ভূমির মধ্যে একটি হ্যান্ডলম্বা, চওড়া ও গভীর গর্ত খোঁড়া উচিত। গর্ত থেকে বের হওয়া মাটি আবার ভরে দিন।

  • যদি গর্ত পুরোপুরি পূর্ণ হয় এবং মাটি বাকি থাকে—উৎকৃষ্ট ভূমি

  • কেবল গর্ত পূর্ণ হয়—সাধারণ ভূমি

  • মাটি কম পড়ে—নিষিদ্ধ ভূমি

২. জলপূর্ণ পদ্ধতি—
গর্তে জল ভরে দিন।

  • জল দ্রুত শুকিয়ে গেলে—নাশ,

  • একই পরিমাণে থাকলে—উত্তম ফল, স্থির জল

  • দক্ষিণমুখী পরিক্রমায় ঘুরলে—সুখ

  • বামমুখী ঘুরলে—মৃত্যু

৩. রাত্রি জলপূর্ণ পদ্ধতি—
রাতে গর্ত খুঁড়ে জল ভরে রাখুন। সকালে—

  • জল দেখলে—বৃদ্ধি

  • কাদার দেখা দিলে—সমতা

  • ফাটল থাকলে—নাশ

৪. দীপ পদ্ধতি—
উজ্জ্বল, লাল, হলুদ, কালো প্রদীপ মাটিতে স্থাপন করুন। তেলের আলোকপ্রদীপে যেই রঙ দীর্ঘ সময় জ্বলে, সেই বর্ণের ব্যক্তির জন্য ভূমি শুভ।

৫. পুষ্প পদ্ধতি—
সন্ধ্যায় ভূমিতে সাদা, লাল, হলুদ, কালো ফুল রাখুন। সকালে ফুলের অবস্থান দেখুন। যে বর্ণের ফুল সবচেয়ে তাজা, সেই বর্ণের ব্যক্তির জন্য ভূমি শুভ।

৬. অন্তঃকরণ পদ্ধতি—
যে প্লট বা খণ্ডে মন আনে, অন্তঃকরণ প্রফুল্ল হয়, সেই খণ্ড ব্যক্তির জন্য শুভ।
তত্তস্য ভবতি শুভদম্ যস্য চ যস্মিন মনোরমতে॥

৬ ফুট গভীরে পড়ে থাকা হাড় অশুভ ফল দেয় না। তাই ৬ ফুট গভীর ভূমি ঘুরিয়ে দিলে ত্রুটি দূর হয় এবং এই ধরনের ভূমিতে বাধা সৃষ্টি হয় না।

দিক নির্ধারণ—

ভবন নির্মাণে সঠিক দিক জ্ঞান অত্যন্ত জরুরি। ভারতীয় স্থাপত্যশাস্ত্রে দিগ্বিজ্ঞানের (দিকের জ্ঞান) একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রচিত হয়েছে, তবে আজকাল দিগ্বিজ্ঞানের জন্য চুম্বক যন্ত্র (কম্পাস) সেরা সরঞ্জাম।

দিক নির্ণয়:

  • পূর্ব: অগ্নিকোণ (পূর্ব দক্ষিণ)

  • পশ্চিম: নৈরিত্যকোণ (দক্ষিণ পশ্চিম)

  • উত্তর: বায়ব্যকোণ (পশ্চিম উত্তর)

  • দক্ষিণ: ঈশানকোণ (পূর্ব উত্তর)

ভূখণ্ডের (প্লটের) বিভাজন:

  • উত্তর-দক্ষিণ দিকের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভূখণ্ড সাধারণত চার বা আট অংশে ভাগ করা হয়।

  • যদি ভূখণ্ডে যোগচিহ্ন (প্লাস) চিহ্নিত করা হয়, তবে এটি চার অংশের হবে, যেমন:

          উত্তর
          উ.পূ.
পশ্চিম              পূর্ব
নৈঃরিত্য             অগ্নি
          দক্ষিণ
          দ.পূ.
  • যদি ভূখণ্ড দুটি রেখা দিয়ে বিভক্ত করা হয়, তবে এটি আট অংশের প্লট হয়ে যায় এবং মাঝখানে একটি আঙ্গনও তৈরি হয়। এটি হলো সাধারণ ভাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী ভাগ।

           উত্তর
           উ.পূ.
বায়ব্য                  ঈশান
পশ্চিম                     পূর্ব
নৈঃরিত্য                  অগ্নি
           দক্ষিণ
           দ.পূ.

অনেক প্লট যা চতুর্ভুজ (সমান্তরাল) বা আয়তাকার নয়, সেখানে নির্মাণকালে দিক নির্ণয় কঠিন হয়। ফলে উত্তর–দক্ষিণ দিককে সরাসরি রেখায় স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী উত্তর–দক্ষিণ দিকের সরল বা সমান্তরাল থাকা অপরিহার্য। সর্বোত্তম হলো এমন যে, উত্তর–দক্ষিণ দিকে অসমান বা বিকৃত প্লট গৃহ নির্মাণের জন্য গ্রহণ না করা। যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে নির্মাণকালে তা ঠিক করে নেওয়া উচিত।

উচ্চ–নিম্ন ভূমি ও ঢালযুক্ত ভূখণ্ডের প্রভাব (সম০ সূত্র০ ৪৮.১-৫):
প্রায়ই সমান ভূমি পাওয়া যায় না, বা যেসব এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে হয় সেখানে ভূমি কোনো বিশেষ দিকের দিকে ঢালু থাকে। শাস্ত্রে নির্মাণের জন্য ভূমির ঢাল বা ঝোঁক সম্পর্কে বিস্তারিত বিবেচনা করা হয়েছে, যেমন:

  • পূর্ব দিকে ঢালযুক্ত ভূমি: ধনসম্পদ বৃদ্ধি

  • অগ্নিকোণ দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত): ক্ষয়, মৃত্যু, শোক

  • দক্ষিণ দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত): মৃত্যু, গৃহনাশ

নৈরিত্যকোণের দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত) – ধননাশ
পশ্চিম দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত) – পুত্র ক্ষতি ও রোগ
বায়ব্যকোণের দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত) – মানসিক উৎকণ্ঠা ও যাত্রা
উত্তর দিকে ঢালযুক্ত ভূমি – ধনলাভ
ঈশানকোণের দিকে ঢালযুক্ত ভূমি – বিদ্যা অর্জন ও সুখ-সমৃদ্ধি

ভাস্তুশাস্ত্রে ঢালযুক্ত ভূমির নাম:
১. যমবীথি: উত্তরে উঁচু, দক্ষিণে ঢালযুক্ত – ক্ষয়কারী ভূখণ্ড
২. গজবীথি: উত্তরে ঢাল, দক্ষিণে উঁচু – সাধারণ শুভ ভূখণ্ড
৩. ভূতবীথি: ঈশানকোণে উঁচু, নৈরিত্যকোণে নীচ – শুভ ভূখণ্ড
৪. নাগবীথি: অগ্নিকোণে উঁচু, বায়ব্যকোণে নীচ – শুভ ভূখণ্ড
৫. বৈশ্বানরি ভূমি: বায়ব্যকোণে উঁচু, অগ্নিকোণে নীচ – শুভ ভূখণ্ড
৬. ধনবীথি: ঈশানকোণে উঁচু, নৈরিত্যকোণে নীচ – ধনলাভের ভূখণ্ড
৭. পিতামহ ভূষ্টি: অগ্নিকোণের মধ্যে উঁচু, পশ্চিম-বায়ব্যের মধ্যে নীচ – অত্যন্ত শুভ, কিন্তু বিরল
৮. সুপথ ভূষ্টি: অগ্নিকোণ-পশ্চিমের মধ্যে উঁচু, বায়ব্য-উত্তরের মধ্যে নীচ – শুভ
৯. দীর্ঘায়ু ভূষ্টি: উত্তর-ঈশান মধ্যে নীচ, নৈরিত্য-দক্ষিণ মধ্যে উঁচু – বংশ বৃদ্ধি করে
১০. পুণ্যক ভূষ্টি: ঈশান-পূর্ব মধ্যে নীচ, নৈরিত্য-পশ্চিম মধ্যে উঁচু – শুভ
১১. অপথ ভূষ্টি: পূর্ব-অগ্নিকোণ মধ্যে নীচ, বায়ব্য-পশ্চিম মধ্যে উঁচু – কলহকারী
১২. রোগকৃত ভূষ্টি: অগ্নিকোণ-দক্ষিণ মধ্যে নীচ, বায়ব্য-উত্তর মধ্যে উঁচু – রোগসংক্রান্ত
১৩. আরগল ভূষ্টি: নৈরিত্য-দক্ষিণ মধ্যে নীচ, ঈশান-উত্তর মধ্যে উঁচু – পাপনাশিনী
১৪. শ্মশান ভূষ্টি: ঈশান-পূর্ব মধ্যে উঁচু, পশ্চিম-নৈরিত্য মধ্যে নীচ – কুলনাশকারী
১৫. প্রধান ভূষ্টি: ঈশানকোণ, অগ্নিকোণ, পশ্চিমে উঁচু, নৈরিত্য মধ্যে নীচ – দরিদ্রতা বৃদ্ধি
১৬. স্থাবর ভূষ্টি: অগ্নিকোণে উঁচু, নৈরিত্য, ঈশান, বায়ব্যে নীচ – সর্বশুভ
১৭. স্থণ্ডিল ভূষ্টি: নৈরিত্যকোণে উঁচু, অগ্নি, বায়ব্য, ঈশানে নীচ – স্থিতিশীলতা প্রদানকারী
১৮. শাণ্ডুল ভূষ্টি: ঈশানে উঁচু, অগ্নি, বায়ব্য, নৈরিত্যতে নীচ – অযোগ্য ও অশুভ
১৯. সুস্থান ভূষ্টি: অগ্নি, নৈরিত্য, ঈশানে উঁচু, বায়ব্যতে নীচ – ব্রাহ্মণের জন্য শুভ
২০. সুতল ভূষ্টি: পূর্বে নীচ, নৈরিত্য, বায়ব্য, পশ্চিমে উঁচু – ক্ষত্রিয়দের জন্য শুভ
২১. চরভূষ্টি: দক্ষিণে নীচ, উত্তর, ঈশান, বায়ব্যে উঁচু – বৈশ্যদের জন্য শুভ
২২. স্বমুখ ভূষ্টি: পশ্চিমে নীচ, ঈশান, পূর্ব-অগ্নিকোণে উঁচু – শূদ্রদের জন্য শুভ
২৩. ব্রহ্মঘ্ন ভূষ্টি: নৈরিত্য, অগ্নি, ঈশানে উঁচু, পূর্ব ও বায়ব্যতে নীচ – অযোগ্য ও অশুভ

শাস্ত্রকাররা ভূখণ্ডের দিক ও কোণ অনুযায়ী উঁচু–নীচের কারণে শুভ ও অশুভ ভূমির বিবেচনা করেছেন। বর্তমান সময়ে অনেকেই সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যে কোনো স্থানে উঁচু বা নীচু নির্মাণ করে থাকেন, যা শাস্ত্র অনুযায়ী ভুল। সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

আবাসনের জন্য শুভ ভূমি:
ভাস্তুশাস্ত্রে গজপৃষ্ঠ, কূর্মপৃষ্ঠ, দैत্যপৃষ্ঠ এবং নাগপৃষ্ঠ ভূমির বর্ণনা আছে। বাসনের জন্য গজপৃষ্ঠ ও কূর্মপৃষ্ঠ শুভ, আর দैत্যপৃষ্ঠ ও নাগপৃষ্ঠ অশুভ।

  • গজপৃষ্ঠ: দক্ষিণ-পশ্চিমে উঁচু, নৈরিত্য ও বায়ব্যকোণে উঁচু, বাকি দিকগুলোতে নীচ – আয়ু, ধন ও সৌভাগ্য বৃদ্ধি করে

  • কূর্মপৃষ্ঠ: মধ্যভূমি উঁচু, চারপাশ নীচ – উৎসাহ ও ধন-ধান্য বৃদ্ধি করে

  • দৈত্যপৃষ্ঠ: পূর্ব, ঈশান ও অগ্নিকোণে উঁচু, পশ্চিমে নীচ – কখনও ধনী হতে দেয় না, ধন, পুত্র ও পশুর ক্ষতি করে

নাগপৃষ্ঠ: পশ্চিম দিকে লম্বা অর্থাৎ পশ্চিম প্রান্ত দীর্ঘ এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমে উঁচু ভূমি থাকলে সেই প্লটকে নাগপৃষ্ঠ বলা হয়। নাগপৃষ্ঠে নির্মিত ভবন উচ্চাটন সৃষ্টি করে, স্ত্রী-গুণ নষ্ট হয় এবং গৃহপতির মৃত্যুও সম্ভব। এমন প্লট এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

সমরাঙ্গণ সূত্রধারের মাধ্যমে ভূমি পরীক্ষা ও ভূমির লক্ষণ বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে যাতে ভবন নির্মাণের আগে সাধারণ ত্রুটি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যদি ভূমিই অশুভ হয় বা ভবনের মানদণ্ড (নকশা, মাপ-তোল ইত্যাদি) বিভ্রান্তিকর হয়, তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। তাই ভবন নির্মাণের আগে ভূমি ক্রয় বা নির্বাচন করার সময় সতর্ক থাকা উচিত।

ভবনের জন্য ভূখণ্ড নির্বাচনে পথের অবস্থান:

চতুষ্পথ ভূখণ্ড:
যে প্লট চারদিকে রাস্তা দ্বারা ঘেরা থাকে, সেটি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। তবে পথগুলো সমান্তরাল হতে হবে; টেঁড়ে-বেড়ে রাস্তা বা ভূখণ্ড ভবনের জন্য শুভ নয়। চতুষ্পথ ভূখণ্ডে নির্মিত ভবন স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত শুভ। এই ধরনের ভবনের নাম ‘ব্রহ্মস্তব’। এমন প্লটে কোনো পথ সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না, ফলে এটি অত্যন্ত শুভ, সমৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যদায়ক।

ত্রিপথ ভূখণ্ড:
যে প্লটের তিন দিক রাস্তা বা পথ দ্বারা খোলা থাকে এবং এক দিক বন্ধ থাকে, তা সাবধানে নেওয়া উচিত।

  1. পূর্ব দিক বন্ধ, তিন দিক খোলা – সাধারণ, স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত নয়, তবে সমৃদ্ধি থাকে।

  2. অগ্নিকোণ দিকে ঢাল থাকলে – শুভ (পূর্বের ঢালভূমির মতো)।

  3. এক দিক বন্ধ, তিন দিক খোলা – সাধারণ ধরণের ভবন।

দ্বিপথ ভূখণ্ড:

যে প্লটের পূর্ব ও উত্তরে রাস্তা থাকে – অত্যন্ত শুভ।
উত্তর-পশ্চিমে পথ থাকলে – সাধারণ ধরণের, চোরের আশঙ্কা ও ধনলাভে ব্যাঘাত হতে পারে।
পূর্ব-পশ্চিম বা উত্তর-দক্ষিণ পথও সাধারণ। এমন ভবনের প্রবেশদ্বার দুই রাস্তায় হওয়া উচিত নয়, না হলে ধন দ্রুত চলে যায়।
পূর্ব–দক্ষিণ বা দক্ষিণ–পশ্চিম পথে ঘেরা ভূখণ্ড অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

একটি রাস্তার সংলগ্ন জমি–ভূমি ক্ষেত্রে, দক্ষিণ দিকে রাস্তার সংস্পর্শে ঘর তৈরি করলে তার প্রধান দরজা দক্ষিণমুখী হওয়ার কারণে এটি অপ্রশস্ত বিবেচিত হয়। বাকি তিনটি দিকের মধ্যে যেকোনো এক দিকে রাস্তা থাকা বাস্তু শাস্ত্রজ্ঞদের দ্বারা প্রশস্ত বা শুভ হিসেবে গণ্য হয়। পূর্ব বা উত্তর দিকে রাস্তা থাকা অত্যন্ত শ্রেয়স্কর বিবেচিত হয়।

রাস্তার সংস্পর্শযুক্ত জমি—যেখানে রাস্তা কোনো এক পাশে সরাসরি প্রবেশ করছে, সেখানে জমিতে “রাস্তাবেধ” ধরা হয়। শুধুমাত্র ঈশান কোণে অবস্থানরত রাস্তা সংস্পর্শ ক্ষতিকর নয়। বাকি সব দিক থেকে সংস্পর্শকারী রাস্তা কষ্টকর এবং অর্থনাশজনক বলে বলা হয়েছে।

বন্ধ রাস্তা সংলগ্ন জমি—যেখানে রাস্তা শেষ হয়ে যায় সেই জমি অত্যন্ত দোষপূর্ণ মনে করা হয়। এমন ঘরে বসবাস করলে বংশবৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। যদি রাস্তা সংকীর্ণ হয়, স্বাস্থ্য নিয়মিতভাবে খারাপ থাকে। প্রকৃতপক্ষে, রাস্তার উভয় পার্শ্বের বাড়িগুলো দোষপূর্ণ নয়।

ভবনের সংস্পর্শে বিভিন্ন বেধ (সমরাঙ্গণ সূত্রধার ৪৮.২৩-৩৪)-
১. রাস্তার বেধ (ভবনে রাস্তা বা পথ সরাসরি প্রবেশ),
২. গাছের বেধ (সামনের দাঁড়ানো গাছের ছায়া যদি ভবনে পড়ে),
৩. কূপ বেধ (দরজার সামনে কূপ থাকলে),
৪. স্তম্ভ বেধ (ভবনের সামনের অংশে কোনো প্রকার খুঁটি স্থাপন থাকলে),
৫. যন্ত্রবেধ (কলহু, চারামশিন, জেটমশিন, যেখানে ঘূর্ণনশীল যন্ত্রাংশ থাকে),
৬. কাদা বেধ (ভবনের সামনে কাদা, গর্ত বা নোংরা জলাশয় থাকলে),
৭. মন্দির বা মঠ বেধ (যদি মন্দিরের ছায়া ভবনে পড়ে), এইসব কারণে ভবন ক্ষতিকর হয়। তাই ভবন নির্মাণের পূর্বে এই সমস্ত দোষ বিবেচনা করা আবশ্যক।

ভবনের বেধের ফল—
যদি ভবনের সামনে উপরোক্ত বস্তু থাকে, তাহলে তা বেধ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন বেধের ক্ষতিকর প্রভাব ভিন্ন হয়-
১. রাস্তার বেধ – গৃহপতির জন্য ধ্বংসক (সম. সূত্র ৪৮.২৪)
২. গাছের বেধ – সন্তানদের জন্য ক্ষতিকর (সম. সূত্র ৪৮.৬৫)
৩. কূপ বেধ – মৃগী রোগের কারণ (সম. সূত্র ৪৮.৮৪)
৪. স্তম্ভ বেধ – নারীদের জন্য দোষমূলক (সম. সূত্র ৪৮.৮৫)
৫. কাদা বেধ – শোকজনক (সম. সূত্র ৪৮.৮৪)
৬. মন্দির বেধ – ধ্বংসক

বেধের অর্থ এবং দূরত্বের বিবেচনা—
বেধ প্রধান দরজার সামনে (বা ফ্রন্ট ফেসে) ঘটে; পার্শ্বে নয়।
“পৃষ্ঠতঃ পার্শ্বেও বেধ চিন্তা করা উচিত নয়।
প্রাসাদ বা গৃহে বেধ সম্মুখে নির্দেশিত হয়।”

ভবনের পিছনে বা পাশের দিকে উপরের সব উপাদান থাকলেও দোষ হয় না। ভবন যত উঁচু, তত দ্বিগুণ দূরত্বে থাকলে বেধকর বস্তু থাকলেও কোনো ক্ষতি হয় না। ভবন এবং বেধকর বস্তুয়ের মধ্যে যদি রাস্তা থাকে, তবে দোষ হয় না। যদি বেধ কোণে থাকে, তাও ক্ষতি করে না।

“উচ্চায়াদ দ্বিগুণম বিভায় পৃথিবী বেধো ন ভিত্যন্তরে।
প্রকারান্তররাজমার্গপার্তা বেধো ন কোণদ্বয়ে।”

ভবনের বিশেষ কক্ষের অবস্থান—
ভবনের সুপরিকল্পিত মানচিত্রে (নকশা, ম্যাপ) কোন কক্ষ কোথায় এবং কোন দিকে হওয়া উচিত? দেবতাগৃহ, রান্নাঘর, শয়নকক্ষ, স্নানাগার, ভাণ্ডারকক্ষ, শস্যাগার, পশুধনকক্ষ, অতিথিকক্ষ ইত্যাদি কোন দিকে থাকা উচিত? এই কক্ষের বিন্যাসে পরিবর্তন হলে কি ক্ষতি হতে পারে বা কতটা পরিবর্তন সম্ভব? এটি ভবন নির্মাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাস্তুশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে কক্ষ স্থাপন খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সুচিন্তিতভাবে করতে হবে।
ভাস্তুশাস্ত্র গ্রন্থ এই প্রসঙ্গে এইভাবে বলে—

১. বিশ্বকর্মার মত—
“ঈশান্যায় দেবতাগৃহ, পূর্বে স্নানাগার।
আগ্নেয়্যে পাকসদন, ভাণ্ডারগৃহ উত্তরে।
আগ্নেয়-পূর্বমধ্য দধিমন্থনগৃহ,
অগ্নিপ্রদেশমধ্য আজ্যগৃহ প্রশস্ত।
যাম্য-নৈর্ঋত্যমধ্য পুড়ীষত্যাগমন্দির,
নৈর্ঋত্য-অম্বুষ্যমধ্য বিদ্যাভ্যাসমন্দির।
পশ্চিমানিলয়মধ্য রোদনার্থগৃহ স্মৃত,
বায়ব্য-উত্তরমধ্য রতিগৃহ প্রশস্ত।
উত্তর-ঈশানমধ্য ঔষধার্থকার্য,
নৈর্ঋত্যে সূতিকাগৃহ নৃপাণের ভৃতিমিচ্ছতাম।”

বিশ্বকর্মার গ্রন্থ বিশ্বকর্মাপ্রকাশ অনুযায়ী—

  • ঈশান কোণে দেবতাগৃহ,

  • পূর্বে স্নানাগার,

  • অগ্নিকোণে রসায়ন বা রান্নাঘর,

  • উত্তরে ভাণ্ডারগৃহ,

  • অগ্নিকোণ এবং পূর্বের মধ্যে দুধ ও দই মথনের ঘর,

  • অগ্নিকোণ এবং দক্ষিণের মধ্যে ঘি সংরক্ষণের ঘর,

  • দক্ষিণ ও নৈর্ঋত্যের মধ্যে মলমূত্রাশয়,

  • নৈর্ঋত্য ও পশ্চিমের মধ্যে বিদ্যাভ্যাস কক্ষ,

  • পশ্চিম ও বায়ব্য কোণের মধ্যে রোদনগৃহ (নবজাতক সন্তানদের যত্ন বা শোককষ্টের সময় সমবেত হওয়ার ঘর),

  • বায়ব্য কোণ ও উত্তরের মধ্যে রতিগৃহ (শয়নকক্ষ),

  • উত্তর ও ঈশান কোণের মধ্যে ঔষধগৃহ বা রোগীর জন্য কক্ষ,

  • নৈর্ঋত্য কোণে প্রসূতি গৃহ।

বিশ্বকর্মার মতানুসারে (ষোড়শপদ)—

সমরাঙ্গণ সূত্রধার

কোণ/দিককক্ষ
ঈশানদেবতাগৃহ
পূর্বস্নানাগার, দধিমন্থনগৃহ
আগ্নেয়রসায়ন/রান্নাঘর, ঘৃতগৃহ
উত্তরভাণ্ডারগৃহ, আঙন
দক্ষিণরতিগৃহ, শৌচালয়, রোদনগৃহ
বায়ব্যরতিগৃহ
পশ্চিমবিদ্যাভ্যাসকক্ষ
নৈর্ঋত্যপ্রসূতিগৃহ

বিশ্বকর্মা ঘি এবং দুধ–দই-এর ঘর আলাদা করেছেন। প্রাচীন ভারতের সমাজে গবাদি পশু এবং দুধজাত দ্রব্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গণ্য হতো। এজন্য ঘি ও দুধ–দই সংরক্ষণের ঘর পৃথক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


দুধ–দই এবং ঘি সংরক্ষণের জন্য আলাদা ঘর তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বকর্মার মতে, এমন ধরণের ভবনে পূর্ব, পশ্চিম এবং উত্তরের দিকে দরজা রাখা যায়। তার মতে, দরজা ছাড়াও ঘর হতে পারে, কারণ সব কক্ষ স্বতন্ত্রভাবে রয়েছে। এই রকম স্থাপত্যকে ধ্রুব ভাস্তু বলা হয়। এই ঘরগুলো অর্থ–সম্পদ এবং খাদ্য–দ্রব্য দানকারী হয়। এই ধরনের কক্ষে দোকানও ভালো চলে।

২. বাস্তুকার বশিষ্ঠের মত—

“ঐন্দ্র্য দিশি স্নানগৃহমাগ্নেয়াঁ পচনালয়ঃ,
যাম্যাঁ শয়নং বেষ্ম, নৈত্রৈত্যাঁ শস্ত্রমন্দিরম্।
বারুণ্যাঁ ভোজনগৃহং, বায়ব্যাঁ ধান্যমন্দিরম্।
ভাণ্ডারসদনং সৌম্যে, ত্বৈশান্যাঁ দেবতালয়ম্।
ইদ্রাগ্ন্যোর্মথনং মধ্যে, যাম্যাগ্ন্যোর্ঘৃতমন্দিরম্।
যমরাক্ষসোর্মধ্যে, পুড়ীষত্যাগমন্দিরম্।
রাক্ষসজল্যোর্মধ্যে, বিদ্যাভ্যাসস্য মন্দিরম্।
তোয়েশানিলয়োর্মধ্যে, রোদনস্য চ মন্দিরম্।
কামোপভোগশমনং বায়ব্যউত্তরযোর্গৃহম্।
কৌবেরেশান্যোর্মধ্যে, চিকিৎসামন্দিরং সদা।
গৃহং শরীরযোর্মধ্যে, সর্ববস্তুṣu সংগ্রহম্।
সদনং কারয়েদেংক্রমাদুক্তানি ষোডশ।”

দিশার সমতুল্য—

  • ইন্দ্র = পূর্ব,

  • যম = দক্ষিণ,

  • রাক্ষস = নৈত্রৈত্য কোণ,

  • তোয়েশ বা বারুণ = পশ্চিম,

  • অনিল (বায়ু) = বায়ব্য কোণ,

  • সৌম্য বা কুবের = উত্তর।

দিশার অধিপতি অনুযায়ী দিশার নামও প্রচলিত।

পূর্বে স্নানাগার, অগ্নিকোণে রান্নাঘর, দক্ষিণে শয়নকক্ষ, নৈত্রৈত্য কোণে শস্ত্রাগার, পশ্চিমে ভোজনকক্ষ (ডাইনিং হল), বায়ব্য কোণে ধান্যসংগ্রহকক্ষ, উত্তরে ভাণ্ডারগৃহ, ঈশান কোণে দেবতাগৃহ হওয়া উচিত।

বশিষ্ঠ প্রথমবার বিশ্বকর্মার নকশায় নতুন উদ্ভাবন এনেছেন। দক্ষিণ, পশ্চিম ও বায়ব্যে যেখানে বিশ্বকর্মা কোনো নির্দেশ দেননি, সেখানে বশিষ্ঠ শয়নকক্ষ, ভোজনগৃহ ও ধান্যমন্দির (গৃহ) বলে বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়াও প্রসূতির ঘরের স্থানে শস্ত্রাগার নির্দিষ্ট করেছেন। বশিষ্ঠ ঋষি প্রথমবার ষোড়শ কক্ষের ভিত্তি স্থাপন করেছেন— “সদনং কারয়েদেংক্রমাদুক্তানি ষোডশ।”

এই ধরণের ভবনের বিন্যাস এবং সুসংগঠনের কৃতিত্ব বশিষ্ঠ ঋষিকেই দেওয়া হয়।

যদি বিশ্বকর্মা এবং বশিষ্ঠ দু’জন স্থপতির মত একত্রে দেখা হয়, তাহলে ঘরের নিম্নলিখিত রূপ তৈরি হয়—

বশিষ্ঠ ঋষি অনুযায়ী স্থাপত্যচিত্র:

৩. নারদ ঋষির মত –
ভবনে কোন দিকের কোন কক্ষ থাকা উচিত তা নিয়ে বাস্তু শাস্ত্রে অনেক আলোচনা হয়েছে। নারদ ঋষি এতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করেছেন। বায়ব্যকোণে যেখানে ধান্যগৃহ ছিল, সেখানে তিনি পশুগৃহ স্থাপন করেছেন। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উপকারী প্রভাব কৃষকদের হয়েছে। যাদের কাছে পশুধন আছে, তারা শহরেও বায়ব্য কোণে পশুধন রাখলে শুভফল লাভ হয় –
‘ভাণ্ডারং তূত্তরস্যাং বায়ব্যাং পশুমন্দিরং’ (বৃহৎসংহিতা, নারদ)

নারদ ঋষির মতে বাস্তু চিত্র:


নাৰদ ঋষি তাঁর वास्तুচিত্রে দ্বিতীয় সংশোধন হিসেবে চিকিৎসা কক্ষের স্থলকে
শৃঙ্গারগৃহ (ড্রেসিং রুম) হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। বর্তমান সময়ে এটিরও শতভাগ সমর্থন রয়েছে। নাৰদ সংহিতায় এটি উল্লেখিত হয়েছে—

স্নানাগারং দিশিপ্রাচ্যামাগ্নেয়াং পচনালয়ম্।
য়াম্যায়াং শয়নাগারং নৈর্ঋত্যাং শস্ত্রমন্দিরম্।।
এवं কুর্যাদিদং স্থানং ক্ষীরপানাজ্যশালিকাঃ।
শ্যামূত্রাস্ত্রতদ্বিদ্যা ভোজনামঙ্গলাশ্রয়াঃ।।
ধান্যস্ত্রীভোগবিজয়জ্ঞ শৃঙ্গারায়তনানি চ।
ঈশান্যাদি ক্রমস্তেষাং গৃহনির্মাণকং শুভম্॥

ঈশান কোণে দেবতাগৃহ, অগ্নিকোণে রসইঘর, নৈর্ঋত্য এবং দক্ষিণের মধ্যে শৌচালয়ের স্থান কখনোই এলোমেলোভাবে পরিবর্তন করা উচিত নয়; নয়তো এই স্থানের পরিবর্তন ঘরে বিপত্তি ডেকে আনে। নৈর্ঋত্য কোণে শাস্ত্রাগারের স্থলে যন্ত্র, সেলাই বা গাড়ি রাখার স্থানও তৈরি করা যেতে পারে।

ভোজন তৈরির ব্যবস্থা অগ্নিকোণে স্থাপন করা সর্বজনগ্রাহ্য। এই কক্ষে রান্না হওয়া খাবার পশ্চিমে ডাইনিং রুমে নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে একত্রে ভোজনের সুব্যবস্থা থাকে।

পূর্বদিকে স্নানগৃহ স্থাপন করা সর্বজনগ্রাহ্য। বিশ্বকর্মার মত অনুযায়ী উত্তর দিকের ভাণ্ডারগৃহ থেকে ওষধগৃহের মধ্যে যেকোনো স্থানে স্নানাগার তৈরি করা যেতে পারে—
‘উত্তরস্যান জলস্থানং পূর্বস্যান শ্রীগৃহং তাথা।’

৪. কাশ্যপ ঋষির মত—
কাশ্যপ ঋষি ভুমি তলে (গ্রাউন্ড ফ্লোর) নয়টি কক্ষ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি শাস্ত্রাগার, ঘৃতগৃহ এবং সব-ধরনের কক্ষ (যা দুই-দুই কক্ষ ছিল) কমিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট বাসস্থান তৈরি করা যায়, তবে ভোজনকক্ষ, পূজাঘর এবং শৌচালয়ের দিক অবশ্যই वास्तুশাস্ত্র অনুযায়ী রাখতে হবে।

ভবনের প্রথম তলায় তৈরি কক্ষগুলির মধ্যে ধান্যশালা, গোশালা, দেবগৃহ এবং ভোজনকক্ষের ওপরের কক্ষগুলো শয়নকক্ষ হিসেবে তৈরি করা উচিত নয়। উত্তর দিকে মাথা রেখে ঘুমানো যাবে না, এবং নগ্ন বা ভেজা পায়ের ওপর কোনও বস্ত্র ছাড়া শুতে চলবে না।

ধান্যগোগুরুহুতাশসুরাণাং ন স্বপেদুপরি নাজ্যনুবংশম্।
নোত্তরাপারশিরা ন চ নগ্নো নৈব চার্চরণঃ শ্রিয়মিচ্ছন্॥

ভারতীয় আচার্যরা নৈর্ঋত্য কোণ এবং দক্ষিণ (শয়নকক্ষ) এর মধ্যে শৌচালয় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনমতো রোদনকক্ষের স্থলে শৌচালয় তৈরি করা যেতে পারে। কিছু वास्तুবিদ উত্তরদিকে শৌচালয়ের স্থান দেখান। উত্তর দিক সৌম্য এবং দেবতালয় নির্দেশিত। তাই উত্তর দিকের শৌচালয় পরিত্যাগ করাই শ্রেয়।

ভবনে বিদ্যুতের ব্যবস্থা—
যে কোনও কক্ষে বিদ্যুতের ব্যবস্থা অগ্নিকোণে করা উচিত। কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে যদি সুইচ থাকে, তবে মাত্র একটি ল্যাম্প রাখা উচিত। বিদ্যুৎ, ইনভার্টার ও ব্যাটারি ইত্যাদি দক্ষিণ অংশের পূর্ব প্রান্তে স্থাপন করা উচিত।

সমরাঙ্গণ সূত্রধার অনুযায়ী আঙ্গিনার ধারণা—
প্রাচীনকালে যে সব ভবন তৈরি হত, তাদের মধ্যে আঙ্গিনা থাকা অপরিহার্য ছিল। বারাণসীর পাকা মহলে প্রায় পাঁচ শতাব্দী পুরনো পাথরের ভবন এখনও দেখা যায়। वास्तুচার্যদের মত অনুযায়ী জমির মধ্যবিন্দু (ব্রহ্মস্থান) আঙ্গিনার মধ্যেই হওয়া উচিত। প্লটের কেন্দ্রবিন্দু আঙ্গিনার মধ্যেই রাখা শুভ। প্রাচীনকালে আঙ্গিনার মধ্যে একটি বেদীও তৈরি করা হত। আঙ্গিনার মধ্যভাগে কুড়াকুড়িয়ে জিনিস রাখা উচিত নয়। অনেক ভবনের মধ্যে তুলসীর মূল স্তম্ভও থাকে, যা ব্রহ্মশিরা নামে পরিচিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়।

আজকাল প্রায় এমন ভবন তৈরি হচ্ছে না। ঘরে আঙ্গিনা না থাকলে বাতাস ও আলো সঠিকভাবে পৌঁছায় না। অন্ধকারপূর্ণ বা স্যাঁতস্যাঁতে কক্ষ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অন্ধকারপূর্ণ কক্ষে রাহু দোষও প্রভাবিত করে।

আঙ্গিনা তৈরির নির্দেশ—
আঙ্গিনা তৈরি করার একটি নির্দিষ্ট নীতি আছে। আঙ্গিনা বর্গাকার বা আয়তাকার হতে পারে। দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থের হাতের মাপ যোগ করুন। যদি ফুটে মাপ হয়, তবে ১.৫ ফুট = এক হাত ধরে গড় মাপ নিতে পারেন। অথবা গৃহকর্তার হাতকে ফুটে মাপুন। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের যোগকে ৯ দিয়ে ভাগ করুন। অবশিষ্ট ১, ২, ৫, ৭ বা ০ থাকলে আঙ্গিনা শুভ। অবশিষ্ট থাকলে ক্ষতিকর।

দ্বিতীয় পদ্ধতি—দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের যোগকে ৮ দিয়ে গুণ করে ৯ দিয়ে ভাগ করুন। অবশিষ্ট ২,৩,৪,৫,৭,০ থাকলে আঙ্গিনা শুভ।

ভাস্তুরাজবল্লভ অনুযায়ী আঙ্গিনা মাঝখানে উঁচু হওয়া উচিত। নিচু বা ধংসিত আঙ্গিনা সন্তাননাশক—
‘মধ্যে নিম্নং ত্বঙ্গণাগ্রং ততোচ্চৈঃ।
শশ্বচ্চৈवं পুত্রনাশায় গেহম্।’

আঙ্গিনায় জমে থাকা জল বের করতে জলমার্গ কখনও কোণে থাকা উচিত নয়। বায়ব্য ও পশ্চিম বা নৈর্ঋত্য ও দক্ষিণের মধ্যে জলনিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করতে হবে যে পুরো ভবনের জলনিষ্কাশন পূর্ব বা উত্তরের দিকে হওয়া উচিত, নয়তো অর্থ ও জনসম্পদের ক্ষতি হয়। দক্ষিণে ড্রেন বা জল বহন করলে বড় ক্ষতি হয়। পশ্চিম ও বায়ব্য দিকে শৌচালয়ের জল নিষ্কাশন করা যেতে পারে।

সমরাঙ্গণ দ্বার চিন্তা—
বাস্তুকে ঠিক রাখতে দ্বার মানক কাজ করে। দ্বার নির্মাণ মাপ অনুযায়ী করা হয়। দ্বার নির্মাণের দুটি প্রক্রিয়া প্রচলিত—
১) বাস্তুকে আট ভাগে বিভক্ত করে দ্বার স্থাপন, এবং
২) বাস্তুকে নয় ভাগে বিভক্ত করে দ্বার স্থাপন।

(৯) অষ্ট ভাগ বিভাজন (চতুঃষষ্টিপদচক্রম্‌)—


চারটি দিকের দেয়াল, যেখানে দ্বার স্থাপন করতে হবে, তা আট বা সমান ভাগে বিভক্ত করা উচিত। এরপর চিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশে দ্বার তৈরি করতে হবে। এই অংশে দ্বার তৈরি করার ফলাফল নিম্নরূপ

সদ্বার (মঙ্গল ফল):
(অ) জয়ন্ত – অর্থলাভ
(আ) ইন্দ্র – রাজপ্রিয়তা
(ই) বৃহৎক্ষত্র – অর্থ, ধান্য ও সন্তানবৃদ্ধি
(উ) বরুণ – ভোগলাভ
(ঋ) মূল/প্রধান – পশুধনলাভ
(এ) ভল্লাট – বিপুল অর্থলাভ
(ঐ) সোম – ধর্মশীলের উন্নতি

সাধারণ বা নিম্নমানের দ্বার (যা অতিশয় প্রয়োজন ছাড়া স্থাপন করা উচিত নয়):
চিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশে তৈরি করা যেতে পারে। এই দরজাগুলো সাধারণ কাজের জন্য হতে পারে—
(অ) পর্দন্য অংশে দ্বার তৈরি করলে কেবল কন্যা সন্তানের বৃদ্ধি হয়।
(আ) সূর্য অংশে দ্বার তৈরি করলে রোষ বৃদ্ধি পায়।
(ই) সত্য অংশে দ্বার তৈরি করলে মিথ্যা বলার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
(উ) দোভারিক অংশে দ্বার তৈরি করলে কেবল ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
(ঋ) সাপ অংশে দ্বার তৈরি করলে কেবল সন্তানদের মধ্যে কলহ বৃদ্ধি পায়।

(২) নয় ভাগ বিভাজন (একাশীতিপদচক্রম্‌)


দ্বারের মুখ—ব্রাহ্মণবর্ণের জন্য দ্বার উত্তরমুখী হওয়া উচিত। ক্ষত্রিয়ের জন্য পূর্বমুখী, বৈশ্যের জন্য দক্ষিণমুখী, এবং শূদ্রের জন্য পশ্চিমমুখী দ্বার শুভ ফল দেয়।

‘ব্যাসগৃহাণি চ বিদ্যাদ্‌ বিপ্রাদীনামুদগ্দিশাদ্যানি।’

প্রধান দ্বারের বৈশিষ্ট্য—
প্রধান দ্বার ঘরের অন্যান্য দরজার তুলনায় বড় হতে হবে। প্রধান দ্বারের অলঙ্করণ অন্যান্য দরজার তুলনায় বেশি হওয়া উচিত। শাস্ত্রে স্পষ্ট লেখা আছে যে ঘরের অন্য কোনো দরজাকে প্রধান দরজার সমান বা তার চেয়ে বেশি ভবর্যপূর্ণ করা উচিত নয়—মার্বেল, টাইলস বা ভित्तি চিত্র দিয়ে। প্রধান দরজার যত ভবর্যপূর্ণতা, তার মতো শুভ ফলও বেশি হয়।

‘মূলদ্বারং নান্যরভিসন্দধীত রূপধর্যা।
ঘটফলপত্রপ্রমথাদিবিশ্চ তন্মঙ্গলৈশ্চিনুয়াত।।’

বিশ্বকর্মার মতে, অষ্টভাগ বিভাজন অনুযায়ী দরজা তৈরি করা উচিত—
‘চতুঃ ষষ্টিপদং কৃত্বা মধ্যে দ্বারং প্রকল্পয়েত’।

১. এক দরজার উপরে (উচ্চ তলায়) আরেকটি দরজা তৈরি করা উচিত নয়।
২. যদি উপরের তলায় দরজা থাকে, তবে তা ছোট হওয়া উচিত।
৩. প্রধান দরারের তুলনায় অন্যান্য দরজা ছোট হওয়া উচিত। নীচের কক্ষ থেকে দ্বিগুণ উচ্চ হওয়া যাবে না।
৪. वास्तুশাস্ত্র অনুযায়ী, ভবনের দৈর্ঘ্য (এক হাত = ১.৫ ফুট) অনুযায়ী ৭০ আঙ্গুল যোগ করে দরজা তৈরি করা উচিত। বর্তমানে ছয় থেকে সাত ফুট উচ্চতার দরজা প্রচলিত।
৫. দরজার উপরের লেবেল বা সাটার সমান হওয়া উচিত।
৬. দরজা নিজে খুলে বা বন্ধ হওয়া বাড়ির জন্য অশুভ।
৭. সমান উচ্চতার কাঠের খুঁটি না থাকলে দরজা দুষ্প্রভাব দেয়।
৮. কাঠের খুঁটির উপরের অংশ উপরের দিকে, মূল অংশ নিচের দিকে হওয়া উচিত; অন্যথায় পরিবারের মৃত্যু হয়।
৯. মৎস্য পুরাণ অনুযায়ী দরজা ১১০ আঙ্গুলের কম হওয়া উচিত নয়; ১৫০ আঙ্গুলের দরজা সর্বোত্তম। ১৪০, ১৩০, ১২০, ১৮০, ১৯০, ১১৬, ১০৯, ৮০ আঙ্গুলের দরজা ও শুভ। আঙ্গুলের মাপ গৃহকর্তার আঙুল অনুযায়ী নেওয়া উচিত; সুবিধা অনুযায়ী ফুটেও রূপান্তর করা যায়।
১০. দক্ষিণ দিকে মধ্যভাগে দরজা করা যেতে পারে। নৈর্ঋত্য বা দক্ষিণের অন্য অংশে দরজা নিষিদ্ধ।
১১. দ্বারের সামনে দ্বার থাকা উচিত নয়; এটি অশুভ।
‘দ্বারং দ্বারেণ বা বিদ্ধমঅশুভায়োপপদ্যতে’ — সমরাঙ্গণসূত্রধার।
বর্তমানে বায়ু চলাচলের জন্য অনেক ঘরে দরজার সামনে দরজা করা হচ্ছে, কিন্তু এমন বাড়িতে লক্ষ্মীর বসবাস হয় না।
১২. পুরো প্লটে একমাত্র দরজা থাকলে পূর্বদিকে তৈরি করা উচিত। দুইটি দরজা থাকলে পূর্ব ও পশ্চিমে। তিনটি দরজা থাকলে যে কোনো তিন দিকেই তৈরি করা যায়, তবে প্রধান দরজা দক্ষিণে নয়। ব্রহ্মা, শিব, জৈন মন্দিরে চার দিকেই দরজা থাকা উচিত—
‘একং দ্বারং প্রাংমুখং শোভনং স্যাচ্চাতুর্বক্ত্রং ধাতৃভূতেশজৈনম্।
যুগ্মং প্রাচ্য-পশ্চিমে’য়ং ত্রিকেয়ু মূলদ্বারং দক্ষিণে বর্জনীয়ম্।’

১৩. কোণে দরজা কখনও তৈরি করা উচিত নয়; এমন দরজা দুঃখ ও শোক জন্মায়।
১৪. মধ্যভাগে দরজা তৈরি করা উচিত নয়; সামান্য মধ্য থেকে সরিয়ে দরজা করা যায়। মধ্যভাগের দরজা ধন, ধান্য ক্ষতি এবং নারীর ব্যভিচারের কারণ হয়।
১৫. ঘরের ভেতরে খোলা দরজা ব্যবহার করা উচিত; নিজের দিকে টেনে খোলার দরজা অশুভ। সামনে ঠেলে খোলার দরজা শুভ।
১৬. প্রধান দরজা সর্বদা দুটি প্যানেলের হওয়া উচিত। এক প্যানেলের দরজা ভেতরের দিকে থাকা উচিত।

ভবনের উচ্চতা ও নিম্নতা—
ভাস্তুকারদের মতে, পূর্ব ও উত্তর দিক অন্যান্য দিকের তুলনায় সামান্য নীচু হওয়া উচিত। দক্ষিণ ও পশ্চিমের অংশ পূর্বোত্তরের তুলনায় উঁচু হওয়া উচিত।

  • নীচু ছাদ → পূর্ব → উন্নতিকারক

  • উঁচু ছাদ → দক্ষিণ → ধনদায়ক

  • নীচু ছাদ → পশ্চিম → ধননাশক

  • উঁচু ছাদ → উত্তর → বিনাশকারক

‘স্যাদুন্নতিঃ পূর্বনতে নারাণাং বাস্তৌ ধনং দক্ষিণ ভাগতুঙ্গে।
ক্ষয় ধনানাং বিনতে প্রতীচ্যামুচ্চৈর্বিনাশো ধ্রুভমুত্তরেণ।।’
— রাজমার্তণ্ড ২২

যদি ভবনের ওপরের তলে (ছাদে) পূর্ব ও উত্তর দিকের কক্ষ থাকে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম নীচু হয়, তবে বিপত্তির ধারা চলতে থাকে।

বাস্তু পিণ্ডে বৃদ্ধি করার নিয়ম—

যদি ভবন চতুর্দিক স্থাপিত হয় এবং বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে চারদিকে সমানভাবে বৃদ্ধি করা উচিত।
‘ইচ্ছেদ্যদি গৃহবৃদ্ধিঃ তৎসমন্তাদ্বিবর্ধয়েত তুল্যং।’ —বৃ০স০

অত্যন্ত প্রয়োজন হলে পূর্ব দিকে বা উত্তর দিকে বাড়ানো যায়।

  • শুধুমাত্র পূর্ব দিকে বাড়ালে বন্ধুদের সঙ্গে বিরোধ বৃদ্ধি পায়।

  • দক্ষিণে বাড়ালে মৃত্যুভয়।

  • পশ্চিমে বাড়ালে অর্থ ক্ষয়।

  • উত্তরে বাড়ালে মানসিক অশান্তি হয়।

নতুন ভবনে ব্যবহারযোগ্য নতুন উপকরণ—
নতুন ঘর তৈরি হলে, খিড়কি, দরজা, বিছানা, আসনবসন এবং গৃহস্থীর সকল সামগ্রী নতুন হওয়া উচিত। পুরনো কাঠ বা লৌহ অশুভ ফল দেয়। আগের ব্যবহৃত সামগ্রী, বিশেষ করে যেগুলো স্থায়ীভাবে স্থাপন হয় যেমন: চৌখট, জানালা, দরজা, ছাদ উপকরণ (গাটার বা পাতি) ব্যবহার করা উচিত নয়। নতুন ঘরে নতুন কাঠ ব্যবহার করা শুভ, পুরনো ঘরে পুরনো কাঠ ব্যবহার করা যায়।

যেমনটি জ্যোতির্নিবন্ধ এবং সমরাঙ্গণে বলা হয়েছে—
‘নূতনে নূতনং কাষ্ঠং জীর্ণে জীর্ণ প্রাশস্যতে।
জীর্ণে চ নূতনং কাষ্ঠং ন জীর্ণ নূতনে গৃহে।’

ইষ্টিকালোহ, পাষাণ, মৃত্তিকা, জীর্ণ ময়লা, ঘাস, পাতা, এবং পুরনো কাঠ নতুন ঘরে ব্যবহার নিষিদ্ধ।

ভবনে সিঁড়ির অবস্থান—
সিঁড়ি পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকে হওয়া উচিত এবং দক্ষিণাভিমুখী (দক্ষিণের দিকে ঘূর্ণায়মান) হওয়া উচিত। উপরের তলে সিঁড়ি পূর্ব বা দক্ষিণমুখী হওয়া উচিত। বাম ও দক্ষিণ অংশের নির্দেশিকা হোক, যেমন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বাম পাশে যা থাকে তা বাম, ডান পাশে যা থাকে তা ডান।

খোলা সিঁড়ি নিষিদ্ধ। অর্থাৎ সিঁড়ি শুরু ও শেষ হওয়া স্থানে দরজা থাকতে হবে।

  • নিচের দরজা বড় হওয়া উচিত।

  • উপরের দরজা নিচের দরজার তুলনায় ১২ অংশ কম হওয়া উচিত।
    ‘ভূম্যরোহণমূর্ধ্বতস্তদুপরি প্রাগৃদক্ষিণং শস্যতে দ্বারং তুর্ধ্বভবং চ ভূমিরাপরা হাস্বার্ক ভাগাইঃ ক্রমাৎ।’ —বাস্তুরাজ ৫/৩৬

কক্ষে আলো ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী—
কক্ষে দীপক, টিউব, বা অন্যান্য আলো দক্ষিণ বা দক্ষিণাংশে স্থাপন করা উচিত। অন্যান্য আলোকসামগ্রী যেমন গ্যাস, মোমবাতি, ল্যাম্প, বাল্বও ডানদিকে রাখুন। দক্ষিণ কোণ অত্যন্ত শুভ। কক্ষের বাম বা মধ্যভাগে আলো অশুভ। দেবালয়ে দীপ দান বাম পাশে স্থাপন করা উচিত। আলমারী বাম বা দেওয়ালের মধ্যভাগে স্থাপন করুন।
‘দীপালয়ো দক্ষিণদিগূ বিভাগে সদা বিধেয়ো’
‘বামে চ মধ্যেচ শুভায় ঘরে সুরালয়ে বামদিশীষ্টসিদ্ধ্যাই।’ —বাস্তুরাজ ৫/২১

দরজা না থাকা ঘরে প্রবেশ নিষেধ—
কিছু লোক দ্রুত প্রবেশ করে, এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি বাড়ি উপরে ঢাকা না হয়, তাতেও প্রবেশ করা উচিত নয়। প্রবেশ বাড়ি পূজা ও বালিকর্মের পর করা উচিত।
‘অকপাটমনাছ্ছন্নমদত্তবলিভোজনম্। গৃহং ন প্রবিশেদ্ধীমান্ বিপদামাকারং তু তৎ।’ —বাস্তুরাজ ২/৩৯

দরজার জন্য ওয়েধ (বাধা) পরিহার—

  1. প্রধান দরজায় রাস্তা বা গলি দেখা যাবে না; এটি রথ্যাওয়েধ বা মার্গওয়েধ নামে পরিচিত। এটি ক্ষতি ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

  2. প্রধান দরজার ঠিক সামনে বিশাল গাছ থাকা উচিত নয়; গাছওয়েধ হয়। গাছের ছায়া দরজায় প্রবেশ করলে শিশুদের মৃত্যু হতে পারে।

  3. গাছের ছায়া যদি দরজা বা বাড়িতে পড়ে, পরিবারের মানুষে মৃগী রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

  4. দরজার ঠিক নিচ থেকে যদি নালা, পানির নালা বা খাল চলে, তবে দরজা অশুভ।

‘জলস্রাবস্তথা দ্বারে মূলে অনার্থচয় ভবেত’

  1. মন্দিরের দরজা যদি বাড়ির প্রধান দরজার সামনে থাকে, তবে ধ্বংস হয়।

  2. শিব মন্দিরের দরজা (ব্রহ্মস্থান) কেটে ফেললে ধ্বংস হয়।

  3. উত্তর দিকের পঞ্চম দরজা (অষ্টখণ্ডে ভল্লাট এবং নয় খণ্ডে সোম) ব্রহ্মস্থান থেকে কাটা হলে শুভ নয়। তাই মধ্যভাগে দরজা নিষিদ্ধ। দক্ষিণের মধ্যভাগে দরজা ছাড়া অন্য উপায় নেই; তাই দক্ষিণ কখনো প্রধান দরজা হতে পারেনি।
    ‘উত্তরে পঞ্চমং দরজং ব্রহ্মণো বিদ্ধমুচ্যতে। তস্মাত সার্বশিরা হ্যেষ মধ্যে চ বিশেষতঃ।’

  4. শ্মশানের সামনে দরজা তৈরি করা উচিত নয়; এটি রাক্ষস ভয় সৃষ্টি করে।

  5. বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটি, সেতুর খুঁটি বা অন্য খুঁটির সামনে দরজা রাখা উচিত নয়; এতে স্ত্রী সম্পদ ক্ষয় হয়।

  6. বড় পাথরের সামনে দরজা তৈরি করা উচিত নয়; এতে স্ত্রীর সম্পদ নষ্ট হয়।
    ‘স্ত্রীনাশং স্তম্ভবেধে স্যাৎ পাষাণে চ তথৈব চ।’

খুঁটি (চৌখট) সংক্রান্ত নিয়ম—

  1. যদি কিভাডে ছিদ্র থাকে, অর্থ ক্ষয় হয় এবং লক্ষ্মী স্থায়ী হয় না।

  2. দরজা বন্ধ করার সময় যদি খুঁটির শব্দ কাঁদার মতো হয়, তবে বংশ ক্ষতি হয়।

  3. প্রধান দরজা ত্রিভুজ, যান, সূর্যাকার, পাখা, ধনুষ বা বৃত্তাকার হওয়া উচিত নয়।

  4. সাধারণ বাড়িতে পাথরের চৌখট ব্যবহার করা উচিত নয়। পাথরের চৌখট শুধুমাত্র দেবগৃহ বা রাজপ্রাসাদে শুভ।

ব্রহ্মস্থান—
বাস্তুর মধ্যভাগকে ব্রহ্মস্থান বলা হয়। এটির উপর কোনো নির্মাণ, মিথ্যা পাত্র, হাড় বা ভস্ম রাখা উচিত নয়। এমন করলে বিভিন্ন রোগ ও শোকের সৃষ্টি হয়। এখানে পেরেক বা খুঁটি বসানোও নিষিদ্ধ।

জল সম্পদ সম্পর্কিত নির্দেশ—

ভবন নির্মাণের পূর্বে বা পরবর্তীতে পানির ব্যবস্থা থাকা উচিত। এই ব্যবস্থা হতে পারে চাপাকল, জেট মেশিন, পানির ট্যাংকি বা কুয়া (কূপ) দ্বারা। বাড়ির পানির দিক ও স্থান নির্দিষ্ট করা উচিত। শাস্ত্রে কূপের উল্লেখ আছে। এটি নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে যেকোনো জল সম্পদ স্থাপন করা যায়।

বৃহৎসংহিতা অনুযায়ী—
বরাহমিহির বলেন, আগ্নিকোণের কাছে কূপ বা জল সম্পদ ভয় ও আগুনের কারণ হয়।
নৈরৃত্য কোণ শিশু মৃত্যুর কারণ এবং বায়ব্য কোণ মহিলাদের কষ্টের কারণ হয়। এই তিনটি কোণ বাদ দিয়ে বাড়ির যেকোনো অংশে জল সম্পদ রাখা যায়।

‘আগ্নেয়ে যদি কোণে গ্রামস্য পুরস্য বা ভবেত কূপঃ
নিত্যং সকরোতি ভয়ং দাহং চ সমানুষং প্রায়ঃ।
নৈরৃত্য কোণে বালক্ষয়ং চ বনিতাং চ বায়ব্যে
দিকত্রয়মেতত্ত্যক্ত্বা শেষাসু শুভাভহা কৃপাঃ।’

বিশ্বকর্মা মতে, দক্ষিণ দিকে জল সম্পদ রাখা ভুল; এতে সন্তান ক্ষয়, জমির নাশ এবং অদ্ভুত রোগ হয়—
‘গৃহস্য দক্ষিণে ভাগে কূপে দোষপ্রদঃ মতঃ।
আপত্যহানির্ভূনাশত্বথবা রোগমদ্ভুতम्।’
**

মুহূর্তচিন্তামণি অনুযায়ী জল সম্পদের ফলাফল—

স্থানফলাফল
পূর্বঐশ্বর্য
আগ্নিকোণসন্তান নাশ
দক্ষিণস্বীয় নাশ
নৈরৃত্যমৃত্যু
পশ্চিমসম্পদ
বায়ব্যশত্রুভয়
উত্তরসুখপ্রাপ্তি
ঈশান কোণপুষ্টি বৃদ্ধি
ভাস্তু মধ্য (ব্রহ্মস্থান)ধন নাশ

‘কৃপে ভাস্তুর্মধ্যদেশে অর্থনাশ, ত্বৈশার্যাদৌ পুষ্টির ঐশ্বর্য বৃদ্ধি। সুনোর্নাশ, স্ত্রীবিনাশ, মৃত্যু চ সম্পদ, শত্রুতঃ স্যাচ্ছ সৌখ্যং।’

কিছু স্থাপত্যবিদ বলেন ওভারহেড ট্যাঙ্ক নৈরৃত্য কোণে রাখা যায়, কিন্তু এটি সঠিক নয়। নৈরৃত্য কোণ শিশু মৃত্যুর কারণ। পানির ট্যাঙ্ক ছাদে ঈশান কোণ, পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর দিকে থাকা উচিত। ট্যাঙ্ক ছাদ থেকে কমপক্ষে দুই ফুট উঁচু হওয়া উচিত। বেশি উঁচু হলে শুভ। পানির रिसाव অশুভ; অলসতা ও কাজের ক্ষতি হয় এবং রাহু গ্রহ সক্রিয় হয়ে সমস্যা দেয়। নৈরৃত্য এবং আগ্নিকোণে ভুলেও ট্যাংক, চাপাকল বা জেট স্থাপন করা যাবে না।

ভাস্তু মধ্যভাগে (ব্রহ্মস্থান) ছাদ থাকলে জল ট্যাংক স্থাপন করা যাবে না, অন্যথায় পরিবার মস্তিষ্কজনিত রোগে আক্রান্ত হয়।
পর্দন্য অংশে কুয়া, চাপাকল বা জেট মেশিন শুভ। পূর্ব অংশে আগ্নিকোণ থেকে (পর্দন্য, জয়ন্ত, ইন্দ্র) জল সম্পদ রাখা উচিত। বায়ব্য কোণ স্বাস্থ্য জন্য উপযুক্ত নয়। পশ্চিম মধ্যেও জল সম্পদ অত্যন্ত শুভ। ব্রহ্মস্থানে চাপাকল বা কূপ সর্বনাশক।

ভবন নির্মাণের পর—
গৃহপ্রবেশের পূর্বে বৈদ্যুতিক পূজা, অম্বরিকা, গণেশ ও অন্যান্য দিকনির্দেশিত দেবতাদের পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যত সন্তান, উন্নতি ও বংশবৃদ্ধির কামনা করা হয়। শুভ মুহূর্তে ব্রাহ্মণ ও সৌভাগ্যবান মহিলাদের সঙ্গে হোম বা হवन করা হয়। উদ্দেশ্য শান্তি, সুস্থিতি ও তুষ্টি অর্জন।


মকর সংক্রান্তি ২০১১, বিদ্বদ্বশম, 

এ.৪/৩১, শীশমহল কলোনি, 

সুধাকর মালভীয়, 

কমচ্ছা, বারাণসী, চিত্তরঞ্জন মালভীয়।

বিষয়ানুক্রমণিকা

সূচিপত্র

অধ্যায় পৃষ্ঠা বিষয়বস্তু



নিচে আপনার দেওয়া পাঠ্যটিকে চৌখম্বা প্রকাশনার গ্রন্থসূচীপত্রের আদলে, একটানা, পরিশীলিত ও পুস্তক-মুদ্রণযোগ্য রূপে সাজিয়ে দেওয়া হল—কোনো ব্যাখ্যা যোগ করা হয়নি, কেবল বিন্যাস ও শুদ্ধতা রক্ষা করা হয়েছে।


সমরাঙ্গণ-সূত্রধার

বিষয়সূচী


প্রথমোऽ অধ্যায়ঃ

বাস্তু-সম্পর্কিত জয়ের প্রশ্ন ........................................ ১২
মহাসমাগমন .............................................................. ১২


দ্বিতীয়োऽ অধ্যায়ঃ

বিশ্বকর্মা–পুত্র সংলাপ ................................................. ৯
ভগবান বিশ্বকর্মার সম্মুখে মানসপুত্রদের আগমন .............. ৯
নিজ সহায়তা বিষয়ক বিশ্বকর্মার বচন ............................ ১০
রাজা পৃথুর জন্য বাস্তু-রচনার আদেশ ............................ ১১


তৃতীয়োऽ অধ্যায়ঃ

বাস্তু-বিষয়ক প্রশ্ন .................................................... ১২
মানসপুত্রদের জিজ্ঞাসা .............................................. ১২


চতুর্থোऽ অধ্যায়ঃ

শুভ উপাদান ও অশুভ উপাদানের নিরূপণ ........................ ২২
মহৎ-আদি সৃষ্টির বর্ণন ................................................. ২২
অনুপাদানের প্রয়োজন ................................................ ২
জয়ের দ্বারা জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহের উত্তর ..................... ৩
দেশ, নগর প্রভৃতির শ্রেয়স্করত্ব নিরূপণ ........................ ৩
প্রথম মহাপ্রলয়াবস্থার বর্ণনা ..................................... ২২
গ্রন্থোপক্রম ............................................................ ৩
সৃষ্টির উপক্রম .......................................................... ২৩
পৃথু দ্বারা ধর্ষিতা পৃথিবীর ব্রহ্মার নিকট প্রার্থনা .......... ৪
মহৎ, অহংকার প্রভৃতির সৃষ্টি ........................................ ২৩
মহৎ হইতে স্ব-স্ব গুণযুক্ত পঞ্চ মহাভূতের আবির্ভাব ...... ২৪
ভৌতিক সর্গে ব্রহ্মার অংশ হইতে সুরাসুর সৃষ্টি ............ ২৪
ভূমির উপর দ্বীপসমূহের উৎপত্তি .................................. ২৫
পৃথিবীর প্রাকট্য .......................................................... ৪
ভূমির নীচে রৌরব প্রভৃতি নরকসমূহের সৃষ্টি ............... ২৭
পৃথুর বচন শ্রবণে ব্রহ্মার কথন .................................... ৪
জরায়ুজ প্রভৃতি চতুর্বিধ ভুতের সৃষ্টি .......................... ২৭
জরায়ুজ প্রজাতির বিভাগ .............................................. ২৭
ব্রহ্মার আজ্ঞায় পৃথিবী ও রাজা পৃথুর প্রস্থান ............. ৬
গ্রাম ও অরণ্য ভেদের নিরূপণ .................................... ২৭


পঞ্চমোऽ অধ্যায়ঃ

ভুবনকোষ ................................................................. ৩০
ভূগোল-বর্ণন ............................................................ ৩০
পৃথিবীর প্রমাণ-কথন ................................................. ৩০
দ্বীপ ও সমুদ্রসমূহের বর্ণনা ....................................... ৩১
জম্বুদ্বীপ ................................................................. ৩১
১। হিমালয় .............................................................. ৩১
২। মেরু পর্বত .......................................................... ৩২
৩। মাল্যবান ও ৪। গন্ধমাদন ....................................... ৩২

৫। হিমবান্ এবং ৬। শৃঙ্গবান্ ........................................ ৩২
৭। শ্বেত এবং ৮। হেমকূট ........................................... ৩২

হিমবান্ পর্বত ............................................................ ৩৩
হেমকূট পর্বত .......................................................... ৩৩
নিষধাচল ................................................................. ৩৩
মেরু পর্বত ............................................................... ৩৪
নীল মহীধর ............................................................. ৩৪
শ্বেত পর্বত ............................................................. ৩৪
শৃঙ্গবান্ পর্বত ......................................................... ৩৪

জম্বুদ্বীপের বর্ষসমূহের (দেশসমূহের) ভূগোল ............ ৩৪
২। কিম্পুরুষ বর্ষ ...................................................... ৩৪
৩। হরিবর্ষ ............................................................... ৩৫
৪। ইলাবৃত বর্ষ .......................................................... ৩৫
৫। রম্যক বর্ষ .......................................................... ৩৫
৬। হিরণ্যক বর্ষ ...................................................... ৩৫
৭। কুরু বর্ষ ............................................................. ৩৫
৮। ভদ্রাশ্ব বর্ষ ........................................................ ৩৫
৯। কেতুমাল ............................................................. ৩৫

নয় বর্ষের পরিমাপ .................................................. ৩৬
লবণসমুদ্রের পর্বতসমূহ ........................................... ৩৮
ক্ষারসমুদ্রের মধ্যস্থিত দ্বাদশ পর্বত .......................... ৩৮
পর্বতসমূহের পরিমাণ .............................................. ৩১

ভুবনের অন্যান্য দ্বীপসমূহের বর্ণনা ......................... ৩১
১। শাকদ্বীপ ............................................................. ৪০
২। কুশদ্বীপ ............................................................. ৪০
৩। ক্রৌঞ্চদ্বীপ ........................................................ ৪১
৪। শাল্মলীদ্বীপ ...................................................... ৪১
৫। গোমেদদ্বীপ ....................................................... ৪২
৬। পুষ্করদ্বীপ ......................................................... ৪২

লোকালোক পর্বতের বর্ণনা ....................................... ৪৩
সূর্যাদি গ্রহের অবস্থান ও গতি .................................. ৪৫
সূর্যের গতি ............................................................... ৪৫
অহোরাত্রে সূর্যের গতি .............................................. ৪৬
সপ্তবায়ুর অবস্থান বর্ণনা ......................................... ৪৫


ষষ্ঠোऽ অধ্যায়ঃ

সহদেবাধিকার .......................................................... ৪৮
দেবগণের সঙ্গে মানবপ্রজার সহ-অধিষ্ঠান ................. ৪৮
কৃতযুগে মনুষ্যের উৎকৃষ্ট অবস্থা ............................ ৪৮
এক ঋতু ও এক জাতির প্রাধান্য ............................... ৫০
কালান্তরে মানুষের অপকर्षের কারণ ...................... ৫০
দিব্যভাবের তিরোধান .............................................. ৫১
চ্যুতপ্রভাবযুক্ত মানুষের প্রবৃত্তি .......................... ৫১
ক্রমশঃ মৈথুনভাবের উৎপত্তি ............................... ৫২
তৎকালীন দুর্ভাগ্যপূর্ণ লোকস্থিতি ....................... ৫৩
গৃহনির্মাণের জন্য আবাস নির্ধারণ ....................... ৫৪


সপ্তমোऽ অধ্যায়ঃ

বর্ণাশ্রম বিভাগ ....................................................... ৫৫
বর্ণভেদ ও তাদের ধর্ম ............................................ ৫৬
ব্রহ্মচারীর ধর্ম ....................................................... ৫৬
গৃহস্থের ধর্ম .......................................................... ৫৮
বানপ্রস্থের ধর্ম ...................................................... ৫৮
সন্ন্যাসীর ধর্ম ....................................................... ৫৯
শিষ্যের ধর্ম ........................................................... ৫৯
স্ত্রীদের ধর্ম .......................................................... ৬০
সকলের জীবিকার্থ খেট ও আমর্দিক বিধান ............. ৬০


অষ্টমোऽ অধ্যায়ঃ

ভূমি পরীক্ষা ............................................................ ৬৩
প্রদেশভেদ ............................................................... ৬৩
জাঙ্গলাদি ভেদে ভূমির সাধারণ তিন প্রকার ........... ৬৩
তাদের লক্ষণ ............................................................ ৬৩
১। জাঙ্গল দেশ .......................................................... ৬৩



২। অনূপ দেশ ............................................................ ৬৪

৩। সাধারণ দেশ ......................................................... ৬৪

ভূমির রসানুসারে প্রশস্ততার বিবরণ ................. ৭২
ভূমির স্পর্শানুসারে প্রশস্ততার বিবরণ ............. ৭২
ভূমির শব্দানুসারে প্রশস্ততার বিবরণ ............... ৭২

ত্রিবিধ ভূমির বালিশ–স্বামিনী প্রভৃতি
ষোড়শ বিভাগ ও তাদের লক্ষণ .......................... ৬৪

১। বালিশ–স্বামিনী ভূমি ....................................... ৬৫
২। ভোগ্যাভূমি ....................................................... ৬৫
৩। সীতাগোচররক্ষিণী ভূমি ................................. ৬৫
৪। অপাশ্রয়বতী ভূমি ........................................... ৬৫
৫। কান্তা ভূমি ....................................................... ৬৫
৬। খনিমতী ভূমি ................................................... ৬৫
৭। আত্মধারিণী ভূমি ........................................... ৬৬
৮। বণিক্-প্রসাধিতা ভূমি ................................. ৬৬
৯। দ্রব্যবতী ভূমি ................................................... ৬৬
১০। অমিত্রঘাতিনী ভূমি ........................................ ৬৬
১১। আশ্রেণীপুরুষা ভূমি ..................................... ৬৬
১২। শক্ত্যসামন্তা ভূমি .......................................... ৬৭
১৩। দেবমাতৃকা ভূমি ............................................ ৬৭
১৪। ধান্যশালিনী ভূমি ........................................ ৬৭
১৫। হস্তিবনোপেতা ভূমি ...................................... ৬৭
১৬। সুরক্ষা ভূমি .................................................... ৬৭

পুরসংযোজনের জন্য বর্জ্য ভূমির লক্ষণ ........... ৭২
চাষকৃত ভূমিতে কাষ্ঠাদি দর্শনের ফল ............. ৭৪

মৃত্তিকা পরীক্ষা ..................................................... ৭৫
ভূমি পরীক্ষার অন্যান্য প্রকার ......................... ৭৬
মৃত্তিকা পরীক্ষার তৃতীয় পদ্ধতি .................... ৭৬
মৃত্তিকা পরীক্ষার চতুর্থ বিধি ....................... ৭৬
মৃত্তিকা পরীক্ষার পঞ্চম প্রক্রিয়া ............... ৭৬


নবমোऽ অধ্যায়ঃ

হস্তলক্ষণ ............................................................... ৮৮
হস্তদণ্ড (গজ) নির্মাণবিধি ............................... ৮৯
হস্তদেবতার স্থানভেদ ও ফল ............................ ৯০
নবপর্ব দেবতা বিধান ........................................ ৯০
বাস্তুদ্রব্য বিভাগ নিরূপণ ............................... ৯০
স্থানবিশেষে করধারণের ফল ............................ ৯১

‘প্রাশয়’ প্রভৃতি ত্রিবিধ হস্তমাত্রার লক্ষণ ........ ৯৩
পুর ও নগর পরিমাপে তাদের প্রয়োগ ............... ৯৩

১। প্রাশয় হস্তপরিমাপ ....................................... ৯৩
২। সাধারণ হস্তপরিমাপ ...................................... ৯৪
৩। মাত্রাশয় হস্তপরিমাপ .................................. ৯৪

মাত্রা ও কলা প্রভৃতি সাধারণ মানলক্ষণ ........ ৯৫
একাদি সংখ্যার স্থাননির্দেশ ........................... ৯৫
নিমেষাদি কালমান ........................................... ৯৬
উপসংহার ............................................................. ৯৭


দশমোऽ অধ্যায়ঃ

পুরনিবেশ ............................................................... ১০৩
নগর পরিকল্পনা .................................................. ১০৩
নগর পরিকল্পনায় মার্গবিভাগ ....................... ১০৫
বপ্র–প্রাকার প্রভৃতির বিন্যাস ........................ ১০৬
নগর অলঙ্করণ প্রকার ........................................ ১০৮
নগরদ্বার ............................................................... ১০৯
প্রতোলী ................................................................. ১১০
পক্ষদ্বার নির্মাণ ............................................... ১১২
ছিন্নকর্ণ প্রভৃতি দোষযুক্ত নগরের বিবরণ ..... ১১২
জলভ্রম (ফোয়ারা) নির্মাণ ............................. ১১২

নগরাভ্যুদয়িক শান্তিকর্ম বিধান ..................... ১১৫
স্থাপত্যবিদ্যার বিধান ...................................... ১১৬
খেট প্রভৃতি সংজ্ঞা নিরূপণ ............................ ১১৬
উত্তম রাষ্ট্রে গ্রামসংখ্যা ................................. ১১৭

জাতি ও বর্ণ অনুযায়ী আবাস নিরূপণ ............. ১১৮
নগরে স্বর্ণকারদের নিবাস ............................... ১১৮
প্রপাস্থল ............................................................... ১১৯
লক্ষ্মী ও কুবের প্রতিমার স্থান ..................... ১২০
নগরের রক্ষক দেবতালয় ও বহির্মন্দির .......... ১২১

নগরে প্রতিষ্ঠিত দেবমন্দিরের ফল ................ ১২৩
পরাঙ্মুখ দেবপ্রতিষ্ঠার শাস্ত্রীয় বিধি .......... ১২৪
নগরের আভ্যন্তরীণ মন্দির .............................. ১২৪


একাদশোऽ অধ্যায়ঃ

বাস্তু-ত্রয় বিভাগ নিরূপণ .............................. ১২৯
একাশীতিপদ বাস্তু বিভাগ ............................... ১২৯
বহিঃস্থিত দেবতাদের পদভোগ ....................... ১৩১
শতপদ বাস্তু বিভাগ .......................................... ১৩২
শতপদবাস্তুতে দেবতাদের বিন্যাস ............... ১৩২
শতপদ দেবতাবিভাগ ........................................ ১৩৩
চতুঃষষ্টিপদ বাস্তু বিভাগ ............................... ১৩৩
চৌষট্টিপদ বাস্তু ................................................ ১৩৪
সিরানয়ন প্রকার ............................................... ১৩৫


দ্বাদশোऽ অধ্যায়ঃ

ষোড়শপদ বাস্তু .................................................. ১৩৯
সহস্রপদ বাস্তু .................................................. ১৪১
সহস্রপদবাস্তু প্রয়োগ ..................................... ১৪১
বৃত্তবাস্তু ............................................................ ১৪২
চৌষট্টিপদ বৃত্তবাস্তু ........................................ ১৪২
শতপদ বৃত্তবাস্তু ................................................ ১৪৩
ত্র্যস্রাদি (ত্রিভুজ) বাস্তুপদ ......................... ১৪৩

বাস্তুপুরুষ .......................................................... ১৪৪
বাস্তুপুরুষের মুখাদি অঙ্গসমূহ .................. ১৪৪
বাস্তুপুরুষের নাড়ী ও বংশ ......................... ১৪৫
নাড়ীর স্বরূপ ..................................................... ১৪৫
মহাবংশ ............................................................. ১৪৬
অনুবংশ ও মর্ম ................................................. ১৪৬
উপমর্ম ও সন্ধি ................................................ ১৪৬
অনুসন্ধান ও তার প্রমাণ ............................... ১৪৬
মহাবংশাদি পীড়নের ফল ও মর্মফলশ্রুতি ... ১৪৭


ত্রয়োদশ অধ্যায়

  • রাজপ্রাসাদ নির্মাণস্থান ১৪৯

  • মার্ম-ওয়েধ ১৬৭

  • অস্ত্রাগার ১৬৮

  • স্থাপত্য পুরুষের পদ ও মার্মস্থান ১৪৯

  • রাজভবনে রান্নাঘর ১৬১

  • এক্যাশি পদযুক্ত স্থাপত্য-প্রয়োগ ১৪৯

  • বাদ্যশালা ও কারিগরদের গৃহ ১৬৯

  • ষোল পদযুক্ত স্থাপত্য-প্রয়োগ ১৫০

  • কোষ্ঠাগার ১৭০

  • চৌষট্ট পদযুক্ত স্থাপত্য-পদ ১৫০

  • প্রেক্ষাগৃহ ১৭০

  • প্রয়োগ ১৫০

  • ভাপী নির্মাণ ১৭০

  • ষষ্ঠমহান্তি মার্ম-ওয়েধ স্থান ১৫০

  • অন্তঃপুর স্থান ১৭০

  • এক্যাশি পদস্থ স্থাপত্যচক্রে রাজকন্যাদের জন্য ভবন ১৭১

  • স্থাপত্যপুরুষের অঙ্গ ১৫০

  • অশোক বটিকা ও স্নানঘর ১৫০

  • ধারাগৃহ ১৭১

  • দ্বার ও প্রাচীরের মার্ম-ওয়েধ ফল ১৫১

  • কাঠপুতলি ইত্যাদি যন্ত্রের গৃহ ১৭২

  • আয়ুধগৃহ ১৭২

  • ভাণ্ডারগৃহ ও উলুকল শিলা ১৭২

  • যন্ত্রগৃহ ১৭২

  • হাসপাতালের জন্য ভবন ১৭৩

  • চিত্রকারদের জন্য গৃহ ১৭৩

  • দুগ্ধশালা ও গোষ্ঠ ১৭৩

  • অধ্যয়নকক্ষ ১৭৩

  • মন্ত্ৰনাগৃহ ১৭৪

  • অশ্বশালার জন্য স্থান ১৭৪

  • রাজকুমারদের জন্য স্থান ১৭৪

  • রাজমাতার গৃহ ১৭৪

  • হস্তিশালা স্থান ১৭৪

চতুর্দশ অধ্যায়

  • পুরুষঅঙ্গ-দেবতা-নিঘণ্ট্বাদি-নির্ণয় ১৫৬

  • স্থাপত্য-পুরুষঅঙ্গ-দেবতা ১৫৬

  • স্থাপত্য-পুরুষের শিরের দিক ১৫৮

  • স্থাপত্যগত দেবতাদের রূপ ১৫৮, ১৬১

  • স্থাপত্যের অংশ-সংক্রান্ত ষোল বর্ণ ১৬২, ১৬৩

  • পঞ্চদশ অধ্যায় ১৬৪

পঞ্চদশ অধ্যায়

  • পশু, পাখি ও জলাশয়াদি ১৭৫

  • রাজা ও সামন্তদের গৃহ ১৭৫

  • রাজগৃহের দ্বার ও বিধান ১৬৪-১৬৫

  • সেনাপতিগৃহ, আয়ুধনির্মাণশালা ১৭৫

  • ব্রহ্মপদের ব্যবহার ১৭৬

ষোড়শ অধ্যায়

  • রাজগৃহের প্রাকার ও সভাকক্ষ ১৬৫

  • বন-প্রবেশ ১৭৭

  • গৃহকর্মের জন্য কাঠ আনা ও ব্যবহার ১৭৭-১৮৬

সপ্তদশ অধ্যায়

  • পরীক্ষা ১৭৮

  • ইন্দ্রধ্বজ উৎসব ও প্রাচীন বৃক্ষের কাঠ ব্যবহার ১৭৮-১৮৭

  • বৃক্ষের অবস্থা, ব্যবহারযোগ্যতা ও উপযুক্ততা ১৭৯-১৯২

  • বৃক্ষছেদন ও স্বস্তি প্রথা ১৮২-১৯৪

  • বিভিন্ন বৃক্ষের মণ্ডল, দেবতা ও প্রতিমার বিন্যাস ১৮৩-১৯৬

  • বৃক্ষমণ্ডল কর্ম, ইন্দ্রপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা, ধ্বজোত্থান ফল ১৯৭-২০২

  • বিভিন্ন চিত্র, জলজ ও পাখির মণ্ডর, শুভাশুভ ফল ২০৩-২০৬

  • ধ্বজ প্রতিস্থাপনা ও স্বস্তি, উৎসবের ফল ২০৭-২২০

অষ্টাদশ অধ্যায়

  • নগরাদি-সংজ্ঞা, রাজগৃহ, শাখানগর, পল্লি, জনপদ ও রাষ্ট্রের রূপ ২৩০-২৩২

  • ধ্বজ ও শহরে বসবাসকারী পাখি, মধুমক্ষিক, বাজ, মৃগালি, লকট ইত্যাদির কার্য ও ফল ২১৪-২১৫

  • হ্র্ম্য ও সোপানের রূপ ২৩২

অধিরোহণ ও নিঃশ্রেণী

  • কাঠভিটংক ও সৌধের রূপ ২৩২

  • অভিগুপ্তির রূপ ২৩২

  • স্বরূপ ২৩২

  • অট্ট ও অট্টালক, চতুঃশাল-ত্রিশাল-দ্বিশাল-একশাল ২৩৮

  • অট্টালিকার রূপ ২৩৯

  • কাষ্ঠপ্রণালীর রূপ ২৩৯

  • ধারাগৃহের রূপ ২৩৯

  • দর্পণগৃহের রূপ ২৩৯

  • প্রাসাদ ও বলভীর রূপ ২৩৪

  • নির্দেশ ২৩৪

  • উপকার্যা ও ক্ষৌমের রূপ ২৪০

  • আপবরক ও শুদ্ধান্ত (অন্তঃপুর) ২৩৪

  • প্রতোলি ও কক্ষার রূপ ২৪০

  • উদ্যান, জলোদ্যান ও জলবেশ্মের রূপ ২৪০

  • ক্রীড়াগার ও বিহারভূমির রূপ ২৪১

  • মহানস ও দ্বারকোষ্টকের রূপ ২৪১

  • দেবস্থান ও চৈত্যরূপ ২৪১

  • সভা ও গোষ্ঠের রূপ ২৪১

একোনবিংশো অধ্যায়

  • প্রবেশদ্বার ও উদকশ্রমের রূপ নির্দেশ ২৩৫

  • চতুঃশাল বিধান, ভবনাজির, বনাজির ও আশ্রমাজির ২৪৩

  • চতুঃশাল গৃহ বিধান ২৪৩

  • একশাল থেকে ষষ্ঠশাল পর্যন্ত, দেহলী বা কাপাটাশ্রয় ২৪৩

  • একশাল থেকে দশশাল পর্যন্ত, কাপাট বা দ্বারপক্ষ ২৪৪

  • অর্গলা ও অর্গলাসূচীর রূপ ২৪৪

  • গৃহদ্বিতয়ের যোগফল অনুযায়ী ভবনের সংখ্যা ২৪৪

বিভিন্ন স্থাপত্যরূপ ও বিস্তারিত

  • অধিরোহণ ও নিঃশ্রেণীর বিভিন্ন অংশের রূপ ২৩২-২৪১

  • মারালপালি ও প্রণালী দ্বারের রূপ ২৩৮

  • বিতার্ডিকা ও ঈহামৃগের আস্থলকর্ম ২৩৮

  • অমেধ্যভূমি, আবস্কর ও পরিসরের রূপ ২৩৩

  • গৃহের রূপ নির্দেশ ২৩৩-২৩৫

  • প্রাসাদ, বলভী, আলিন্দ ও বলভার রূপ ২৪০

  • কোষ্ঠক ও ভিত্তির রূপ ২৪১

  • চতুঃশাল থেকে ষষ্ঠশাল পর্যন্ত গৃহভেদের সংখ্যা ২৪৩-২৪৪

অষ্টভদ্র ও চতুর্শাল ভবন

  • উত্তম বর্ণের জন্য বিধিত আট কৃত চতুভদ্র গৃহের সত্তর প্রকার ২৪৫

  • শ্রেণী অনুযায়ী চতুঃশাল গৃহের প্রমাণ ২৪৫

  • মানের বিকল্প ২৪৬

  • কিন্নরাদি ষষ্ঠভদ্রের ২৮ প্রকার, অবকোসিমা ও মূষার রূপ ২৪৭

  • ভেদগুলোর মধ্যে মৃষার অবস্থান ২৭৮

  • ভদ্রার সংজ্ঞা ভেদ ২৪৮

  • ভাণ্ডীরাদি সপ্তভদ্রের সাত ভেদে মূষার সংখ্যা অনুযায়ী অবস্থান ২৮১

  • প্রস্তার ২৪৯

  • আট ভদ্রার সার্বতোভদ্রে চতুঃশাল ভবনের মূষাভেদ সংখ্যা ২৪৯

বিংশোধ্যায়

  • একভদ্র চতুঃশাল ভবনের আট ভেদ ২৫০

  • দ্বিভদ্র চতুঃশাল ভবনের অট्ठাশ ভেদ ২৫০

  • ত্রিভদ্র চতুঃশাল ভবনের ৫৬ ভেদ ২৫১

  • চতুভদ্র চতুঃশাল ভবনের সত্তর ভেদ ২৫২

  • পাঁচভদ্র চতুঃশাল ভবনের ৫৬ ভেদ ২৫৩

  • ষষ্ঠভদ্র চতুঃশাল ভবনের অট্ঠাশ ভেদ ২৫৩

  • সপ্তভদ্র চতুঃশাল ভবনের আট ভেদ ২৫৪

  • অষ্টভদ্র চতুঃশাল ভবনের গৃহ ২৫৪

  • চতুঃশাল ভবনের শুভাশুভ ফল ২৫৪

  • একভদ্রাদি চতুঃশাল ভবনের একীকৃত সংখ্যা ২৫৪

  • দ্বিভদ্র ভেদের মূষা ২৫৬

  • ত্রিভদ্র ভেদের মূষা ২৫৭

  • গৃহ সংঘট স্থাপত্যের রূপ ২৯১

  • অধ্যায়ের উপসংহার ২৯২

একবিংশোধ্যায়

  • যমসুর্য ভেদ সংহারাদি ২৯৩

  • বহতর ত্রিশাল ভবনের লক্ষণ ২৯৩

  • চার প্রধান ত্রিশাল ভবনের প্রচণ্ডাদি, চুল্লি, কাচের ভেদের লক্ষণ ২৯৩-৩১৮

  • ত্রয়বিংশোধ্যায় ৩২২

  • একশালগৃহের লক্ষণ ৩২২

  • একশালগৃহে আলিন্দ প্রস্তার ৩২২

  • ধ্রুবাদি একশাল ভবনের ১৮ ভেদ ৩২৩

  • আলিন্দ বিন্যাস অনুযায়ী নানান ভেদ, নন্দ, শ্রীধর ও মুদিত নামক ভেদ ৩২৫

  • ষড়দারু (ধরণ বা পাটন) পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্যান্য ভেদ ৩২৬

  • ষড়দারু প্রয়োগে প্রাপ্ত ভেদ ৩০০

  • শালা পুরোভাগে তির্যক ষড়দারু দ্বারা পাঁচ ভদ্রকের রূপ ৩০৪

দ্বাবিংশোধ্যায়

  • শালা মধ্যভাগে বিন্যস্ত ষড়দারু অনুযায়ী দ্বিশালগৃহের লক্ষণ ৩০৮

  • অন্যান্য ভেদ ৩২৮

  • শালান্ত ভাগে বিন্যস্ত ষড়দারু অনুযায়ী:
    ১. সিদ্ধার্থ গৃহের ভেদ ৩১০
    ২. যমসুর্য ভবনের ভেদ ৩১০
    ৩. দণ্ড গৃহের ভেদ ৩১১
    ৪. বাত গৃহের ভেদ ৩১১
    ৫. চুল্লি গৃহের ভেদ ৩১১
    ৬. কাচ গৃহের ভেদ ৩১১

  • একশাল ভবনের ভেদ-প্রভেদ অনুযায়ী মোট সংখ্যা ৩২৯

পঞ্চবিংশোধ্যায়

  • সিদ্ধার্থ অবস্থায় হস্তিনী-মহিষী নামক একশাল গৃহ ও পাঁচশাল ভবনের নাম ৩৪৯

  • দণ্ডগৃহে গাভী-ছাগলীর মেলন থেকে দশ ভেদের সংখ্যা ৩৫০

  • একশাল গৃহের মেলন থেকে চার বিশেষ গৃহের ভেদ, নাম ও ফল ৩৫০

  • ষষ্ঠশাল ভবনের উৎপত্তি ও তাদের লক্ষণ ৩৫১

  • দ্বারপীঠ, প্রাচীর, হলক ইত্যাদি পনেরো গৃহের নাম, লক্ষণ ও ফল ৩৫২

  • সমস্ত শ্রেণীর জন্য শুভ ষষ্ঠশাল ভবন ও তাদের ভেদ ৩৫২

  • সাধারণভাবে প্রাচীর, বারান্দা, ভিত্তি ও দ্বারের উচ্চতা ৩৫৩

  • দ্বাদশ ভদ্রাদের বিবেচনা অনুযায়ী ষষ্ঠশাল ভবনের সংখ্যা ৩৫৪

  • সপ্তশাল ভবনের উৎপত্তি ও ভেদ ৩৫৫

  • দরজার উচ্চতা ও রাজযোগ্য সপ্তশাল ভবন ৩৫৬

  • সপ্তশাল গৃহের নাম, তন্ত্রক বিবেচনা ও ভাগবিন্যাস ৩৫৬

  • চতুর্দশভদ্রান্ত বিভদ্রাদি সপ্তশাল, ভদ্র-নন্দপীঠ-সৌরভ ও পুষ্কর গৃহের সংখ্যা ও লক্ষণ ৩৬২

  • অষ্টশাল ভবন ও তাদের প্রকার:
    ১. ভদ্রগৃহের লক্ষণ ৩৪৪
    ২. নন্দপীঠগৃহের লক্ষণ ৩৪৪
    ৩. সৌরভগৃহের লক্ষণ ৩৪৪
    ৪. পুষ্করগৃহের লক্ষণ ৩৪৫

  • অষ্টশাল ভবনের সংখ্যা ৩৬৪

  • সমস্ত গৃহের একীকৃত সংখ্যা ৩৬৫

  • নবশাল ভবনের লক্ষণ ৩৪৭

  • পঞ্চশাল ভবনের লক্ষণ ও মোট সংখ্যা ৩৬৭

  • পঞ্চশাল ভবনের উৎপত্তি, প্রকার ও আট পঞ্চশাল গৃহের নাম ও লক্ষণ ৩৪৭-৩৪৮

ষষ্ঠবিংশোধ্যায়

  • গৃহের উচ্চতা, বিস্তার ও আয়াদির সিদ্ধান্ত ৩৭১

  • দ্বিতীয় পদ্ধতি: সূত্রপাত (শিলান্যাস) ৩৭১

  • গৃহারম্ভের শুভাশুভ মাস ও তিথি ৩৭২

  • স্থান নির্গম ও কুম্ভিকা পিণ্ডের নিয়ম ৩৭৩-৩৭৪

  • আয়, ব্যয়, প্রমাণ ও অন্যান্য গৃহাঙ্গের বিবরণ ৩৭৫-৩৭৭

  • ইন্দ্রাদি তিন অংশক ও ধ্বজাদি প্রাধান্য ৩৭৭

  • নক্ষত্রের তিন গণ ৩৭৮

  • গৃহমেলাপক, শয়্যা ও আসনের লক্ষণ ৩৭৯-৪০৯

  • গৃহনিবাসে জীবন ও মৃত্যুর ফল, শুদ্ধ স্থাপত্যের ফল ৩৮০

  • শয়্যাশনের জন্য শুভ বৃক্ষ, নিন্দিত কাঠের পরিবর্তন ৪১০

  • মূষিকা প্রাপ্তির পদ্ধতি ৩৮৪

  • জ্যেষ্ঠা, মধ্যম ও কনীয়শয়্যা ৪১১

  • সভাগৃহের আট প্রকার শয়্যাবিধান ৪১৩

  • শ্রেষ্ঠ শয়্যার লক্ষণ ৪১৫

  • নিন্দ শয়্যা ও গৃহদ্রব্যের পরিমাণ ৩৯২

  • কাঠের ছিদ্রের নাম ও ফল ৪১৭

  • গৃহদ্বারের প্রমাণ, পুষ্করাসন ৩৯২-৪১৮

ত্রিঅংশ ও একত্রিঅংশ অধ্যায়

  • কুর্সী বা কোচের বিবেচনা ৪১৯

  • জল ও আগুনের প্রদর্শন ইত্যাদি ৪২০

  • কুর্সীর অলঙ্করণ ও অত্যন্ত আশ্চর্য্য যন্ত্র ৪২২

  • রাজার প্রাসাদের লক্ষণ, রথদোলা বিধান ৪৭৪

  • পৃথ্বীজয় নামক রাজপ্রাসাদ, মুক্তকোণ রাজগৃহ, শ্রীবৎস সংজ্ঞক ও সার্বতোভদ্র রাজগৃহের লক্ষণ ৪২৩-৪৩০

  • শত্রুমর্দন রাজগৃহের লক্ষণ ৪৩২

  • রাজাদের ক্রীড়ার জন্য অশ্বশালা, গন্ধর্ব পদ ৪৯৪

  • অশ্বশালার লক্ষণ, প্রমাণ ও উপযুক্ত স্থান ৪৯৪

  • অশ্বশালার জন্য শুভ বৃক্ষ ও হোমাদি শান্তিকর্মের স্থান ৪৯৫-৫০০

  • পৃথ্বীতিলক, শ্রীনিবাস, প্রতাপবর্ধন ও লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদের বিধান ৪৩৭-৪৪০

  • পৃথ্বীজয়াদি প্রাসাদের দ্বার মান, লুমার প্রকার ও লুমা নিরূপণ ৪৪১-৪৪২

  • পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম দিঙ্মুখ অনুযায়ী ঘোড়ার স্থান ও বিবেচনা ৫০২-৫০৫

  • হাসপাতালের জন্য ঘোড়া, স্বাস্থ্য লাভের ঘুড়সাল-ভবন ৫০৭-৫০৮

চতুস্ত্রিঅংশ অধ্যায়

  • গৃহে প্রযোজ্য ও অপ্রযোজ্য উপকরণ, পূজা দ্রব্য ৫২১

  • অপ্রযোজ্য শিলা ও চিত্রকর্ম, রাজকর্মে নিষিদ্ধ জন, গ্রন্থ ও গৃহচিত্র ৫১২-৫১৪

  • স্থাপত্যের জন্য প্রযোজ্য বস্তু ও উপকরণ ৫১৪

  • দ্বারচিত্র ও অষ্টমঙ্গল গৌরীর চিত্র ৫১৫

  • মহালক্ষ্মীর চিত্র, স্থাপত্য দেবতার বলিদান বিধি, মণ্ডলকরণ ও কলশস্থাপন ৫২৯

  • পঞ্চত্রিঅংশ অধ্যায়:

    • গৃহে রেখার (কীলক) স্থাপন, সূত্রপাত ও প্রসারণ ৫৩৬

    • ফুল, পানক ও ফলাদির চিত্র ৫১৭

    • ব্রাহ্মণাদির জন্য কীলক ও প্রেক্ষাগৃহে নৃত্য চিত্র ৫১৭-৫১৮

  • শিলান্যাস-নির্মাণ, বেদী ও কলশস্থাপন, কীলকের সংস্কার ও স্থাপন ৫৩৯-৫৪০

অষ্টাত্রিঅংশোধ্যায়

  • পরশু ইত্যাদি উপকরণের পূজা ৫৪১

  • রাজা, রাজকুমার, পুরোহিত ও জ্যোতিষী দ্বারা লগ্ন পরিশোধন ৫৪১

  • পুরোহিতের (ব্রহ্মা) পূজা ৫৪১

  • স্থপতি (বিশ্বকর্মা) পূজা ৫৪২

  • পুত্রাভিলাষী, মহাপাত্র, বহেলিয়া, একাক্ষজন, গণাচার্য, ও অন্যান্য পরিকরের পূজা ৫৪২

  • ব্রাহ্মণ পূজা, কীলের স্থাপনা বিধি, মন্ত্র ৫৪৩-৫৪৪

  • বিভিন্ন জনের প্রতিষ্ঠান ও কীলে প্রহারের ধ্বনি, শুভাশুভ ফল ৫৪৪-৫৪৫

  • কীলের ফাটন বা হাতে পড়লে ফল ৫৪৬

  • দুয়ার ও তার গুণ-দোষ, চার বর্ণের গৃহদ্বারের ফল ৫৫৬-৫৫৭

  • উৎসঙ্গাদি চার বিন্যস্ত স্থাপত্য, আয়তন ও ফল ৫৫৮

  • তিন ধরণের বাহুর লক্ষণ ও ফল ৫৫৮

  • নির্বাচন ও চুনাইয়ের ধরণ ও ফল ৫৭৫-৫৭৬

  • বর্ণানুসারে বাড়ির উচ্চতা, কর্ণিকা স্থাপন ৫৭৯-৫৮০

  • কর্ণিকায় পাখি ও কৌয়া বসার ফল, বর্ণানুসারে ভবনের তলা ও দারুগুলির শান্তি বিধি ৫৮২-৫৮৩

  • দ্বার ও স্থাপত্যের দুর্বলতা, বিভিন্ন ধরণের ভাঙন ও তাদের ফল ৫৮৫-৫৮৮

  • চারদিকে কর্ণের বহির্মুখী নির্বাচন ও কীভাবে ভাঙন প্রতিরোধ হয় ৫৭৪

  • প্রধান স্থূণার তেঁড়ে হওয়ার ফল ৫৯০

তুলা ইত্যাদি স্থাপত্য এবং প্রধান স্থপতির অধ্যায়

  • স্থপতির অঙ্গ ও ত্রুটির ফল ৫৯০

  • স্থপতির লক্ষণ ৬০৪

  • ত্রিচত্বারিশোধ্যায়: গণ্ডিকা ছেদ ও বৃত্তচ্ছেদ, দ্বার ভাঙনের ফল, নতুন কাজে গুণযুক্ত দ্রব্য ব্যবহারের ফল ৫৯২-৫৯৪

  • স্থপতির শীল ও স্থপতির আকার-লক্ষণ ৬০৫-৬০৬

  • নগরের সৌন্দর্য ও পুরের মনোহরতা ৫৯৪

  • পঞ্চত্বারিশোধ্যায়:

    • ঊর্ধ্ববংশ, অর্গলা, পীলিকা, কুঞ্চী ভাঙনের ফল ৫৯৬

    • অষ্টাঙ্গ স্থাপত্যের লক্ষণ, স্থপতির গুণ ৬১২-৬১৩

    • নতুন নির্মাণে ত্রুটি ও শুভাশুভ ফল ৫৯৬

    • যজ্ঞশালার পরিকল্পনা, মাপ ও স্থান ৬১৪

    • স্থাপত্যের বিভিন্ন অঙ্গের ভাঙন ও ফল ৫৯৭-৬০০

  • চতুশ্চত্বারিশোধ্যায়:

    • রাজশিবিরের আকার, স্থপতির লক্ষণ, রাজশিবিরে রাজা ও মন্ত্রিপরিষদের স্থাপনা ৬১৭-৬১৮

    • হাতি ও ঘোড়ার স্থান, পরিখা প্রমাণ, স্থপতির কর্মের কৌশল ও দোষ ৬১৮-৬১৯

নিচে দেওয়া হলো এই অংশের সূচিপত্রটি বাংলায় টেবিল অফ কনটেন্ট স্টাইলে একটানা:


অষ্টাঙ্গশেষ দুর্গকর্ম ও গৃহ, দ্বার ও স্থাপত্য সংশ্লিষ্ট অধ্যায়

  • গৃহের জন্য ত্যাজ্য ভূমি এবং ছয় ধরনের দুর্গ ৬১৯

  • চৈত্র ইত্যাদি নিষিদ্ধ মাসে গৃহনির্মাণের ফল, দুর্গস্থান ও স্থাপত্যপদ বিন্যাস ৬১৯-৬২০

  • কীলক ও অন্যান্য স্থানের প্রমাণ ৬২০

  • রথ্য ও উপরথ্যা দ্বার এবং পূর্বাভিমুখ বসবাসস্থান ৬২০-৬২০

  • চতুর্বিধ অশুভ বলিতের লক্ষণ, তোরণ ভঙ্গ ও শাস্তি, মূষক জাতীয় জন্তুর প্রভাব ৬২২-৬২৩

  • গৃহের জন্য ব্যবহৃত আলিন্দ ও ভূষা, ভবনের অশুভ মুখায়াম ৬২৪-৬৩৮

  • চতুর্বিধ কপোত ও তাদের ফল, বাসস্থান ও প্রায়শ্চিত বিধান ৬২৫-৬৩৯

  • সপ্তচত্বারিশোধ্যায়: উৎসঙ্গাদি, প্রবেশদ্বার ও চতুষ্টয় ৬২৯-৬৪০

  • বেদীরূপ ও প্রকার, প্রমাণ ও নির্মাণ, প্রোয়গ ও ফল ৬৩০-৬৪১

  • সীমাশালা, অন্য প্রাসাদ ও গৃহদোষের বিশ্লেষণ, গর্ভে চন্দ্রাবলোকিত নিষেধ ৬৩৫-৬৪২

  • গৃহ-শ্রোত্র, कृत्त-গवাক্ষ ও अवलोकন, দ্বারবাধা ও स्वयंবন্ধ দ্বারের নিষেধ ৬৪৩-৬৪৯

  • দেওয়ালের নির্ধারণ, মঞ্জিল ও দেওয়ালের উপরের অংশ, নিয়ম অনুযায়ী নির্মাণ ৬৫০

  • মল্লিকা কৃত ভবন, আয়-ব্যয় ও সংক্ষিপ্ত গৃহের লক্ষণ ও ফল ৬৪৫-৬৫০

  • দ্বার ও কর্ণের অঙ্গের ত্রুটি, দ্বারবেধ ও অনিষ্ট দ্রব্যের ব্যবহার, পুরাতন ও নতুন দ্বারের সংযোগ ৬৫১-৬৫৩

  • মিশ্র জাতি দ্রব্য ও দ্বার সংশ্লিষ্ট লক্ষণ, অন্তর্দ্বার ও বহিঃদ্বারের নিয়ম ৬৫২-৬৫৩

  • তুলনা ও উপতুলা, দৈবদগ্ধ দ্রব্য ও ধ্বজছায়া, নিষিদ্ধ গৃহতারার নিয়ম ও ফল ৬৫৩-৬৫৫

  • ইতিহাস-পুরাণের চিত্র, भारপট্টের সन्धি ও ইন্দ্রজাল চিত্রের নিষেধ ৬৫৫

নিচে দেওয়া হলো এই অংশের সূচিপত্র বাংলায় টেবিল অফ কনটেন্ট স্টাইলে একটানা:

নাগদন্ত ও গৃহ সংক্রান্ত বিশেষ অধ্যায়

  • তিরছে নাগদন্তে শয়ন এবং ফল ৬৫৫-৬৫৮

  • ষড্দারু দ্বারা বিদ্ধ দ্বারের শুভ-অশুভ ফল ৬৫৫-৬৫৯

  • ঘণ্ঠা, ঘড়িয়াল ইত্যাদির গৃহে নিষেধ ও ফল ৬৫৫-৬৫৯

  • নাগদন্তাদি দ্বারা শয়্যাবেদ এবং তার ফল ৬৫৬-৬৫৯

  • গৃহ নমন এবং মধ্য দ্বারের ফল ৬৫৬-৬৫৯

  • বিরূপ গৃহের ফল ৬৫৬-৬৫৯

  • দ্রব্য দ্বারা মহামর্মপীড়া এবং জীর্ণ/ধুনী কাঠের ব্যবহার নিষেধ ৬৫৬-৬৫৯

  • শূন্যতাপাদক গৃহের দোষ এবং গৃহকর্মের জন্য নিষিদ্ধ বৃক্ষ ৬৫৭-৬৫৯

  • দ্রব্যের প্রমাণাধিক্য এবং তার ফল ৬৬০

  • দেয়াল ও দ্বার ইত্যাদির মাধ্যমে মর্মপীড়ার ফল ৬৬১

  • ভবনস্বামীর জন্য অনিষ্ট ফল দেওয়া গৃহের সাধারণ দোষ ও মর্মস্থান-ধ্বনির বিশ্লেষণ ৬৫৮-৬৬১

।। শ্রী: ।।
শ্রীমন্মহারাজাধিরাজশ্রীভোজদেববিরচিত
সমরাংগণসূত্রধার

অথ প্রথমোধ্যায়ঃ
মহাসমাগমনম্
(The Existence of Prthvī)

মঙ্গলাচরণম্
দেবঃ স পাতু ভুবনত্রয়সূত্রধার-
স্ত্বাং বালচন্দ্রকলিকাঙ্গ্গিতজুটকোটিঃ ।
এতৎ সমগ্রমপি কারণমন্তরেণ
কাত্স্যাদসূত্রিতমসুত্যত যেং বিশ্বম্ ।। ১ ।।

সরলা
সদ্যোজাতায় দেবায় বামদেবায় তে নমঃ ।
নমো জ্যেষ্ঠায় রুদ্রায় ভবোদ্ভব নমো’স্তু তে ॥ ১ ॥
মহাদেব নমস্তে’স্তু নমস্ততপুরুষায় তে।
জ্ঞানরূপ নমস্তুভ্যং নমো বৈরাগ্যবারিধে ॥ ২ ॥
ঐশ্বর্যগুণপূর্ণায় নমস্তে তপসাং নিধে।
নিত্যসত্য নমস্তে’স্তু ক্ষমাসার নমো’স্তু তে ॥ ৩ ॥
ধৃতিসার নমস্তুভ্যং স্ত্রষ্টে তে জগতাং নমঃ।
আত্মসম্বোধপূর্ণায় ত্রীন লোকানধিতিষ্ঠতে ॥ ৪ ॥

মালবীয়কুলোত্পন্নঃ কুবেরবিদুষঃ সুধীঃ।
সুধাকরঃ তস্য পুত্রঃ গ্রন্থানাং গ্রন্থিভেদকঃ ॥ ৫ ॥
সমরাংগণসূত্রস্য পদার্থানাং প্রকাশিকাম্।
কৃপয়া তস্য গূঢ়ার্থ ‘সরলা’খ্যা করোম্যহম্ ॥ ৬ ॥

পৃথ্বীর প্রকাশ্য
যাহারা সমবায়ি, অসমবায়ি তথা নিমিত্তকারণবিহীনভাবে এ সমগ্র বিশ্ব
সৃষ্টি করেছেন, তাহারা বালচন্দ্রের কাঁলি রূপে অঙ্গিত কোটি কোটি জটাজুট বিশিষ্ট
তৃতীয়লোকের সূত্রধার ভগবান শংকর আপনাদের রক্ষা করুন।
বিমর্শ-গ্রন্থকার ধারাধিপ রাজা ভোজদেব মহান শিল্পী ও সৃষ্টিকর্তা
মহেশ্বরের প্রতি মঙ্গলকামনা করেছেন। বাস্তবে লোকের কোনো কাজের সিদ্ধির জন্য তিনটি কারণ থাকে—১. সমবায়ি অর্থাৎ কাজের সমবায়ি কারণ মৃ্ত্তিকা, ২. চক্র অসমবায়ি কারণ এবং ৩. কুলাল নিমিত্ত কারণ। কিন্তু বৈশেষিক দর্শনের মতের বিপরীতে এই জগৎ রূপ কাজের ঈশ্বরই উপাদান কারণ এবং নিমিত্ত কারণ উভয়। অতএব এই মঙ্গলাচরণে গ্রন্থকার প্রার্থনা করেছেন, তিন-কারণবিহীনভাবে যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি ভগবান শংকর আমাদের রক্ষা করুন ॥ ১ ॥

শুভ ও অশুভ উপাদান এবং তার প্রয়োজনীয়তা
সুখ, ধন, সমৃদ্ধি এবং সন্তান সব মানুষেরই প্রিয়।
তাহাদের সিদ্ধির জন্য শুভ লক্ষণের সমন্বয় থাকা উচিত ॥ ২ ॥

যেখানে নিন্দিত লক্ষ্মী বা অশুভ লক্ষণ আছে, সেগুলি সুখ ও সমৃদ্ধির বিনাশ করে।
অতএব গৃহে সকল ভাস্তুজন্য ও উপাদেয় শুভ লক্ষণের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক ॥ ৩ ॥

দেশ, পুরাদি ও তাদের শ্রেয়সাধকতা
দেশ, পুর, নিবাসস্থান, সভা ও ভেস্মাসনাদি যা শুভ লক্ষণ দ্বারা সম্পন্ন ও মানুষের জন্য উপকারী, সেগুলোই বিদ্বানদের মতে শ্রেয়সাধক ॥ ৪ ॥

বাস্তুশাস্ত্র ছাড়া দেশের, নগরের বা গৃহের লক্ষণ নির্ধারণ সম্ভব নয়।
অতএব লোককল্যাণের জন্য এই বাস্তুশাস্ত্রের প্রকাশনা করা হয়।
বিমর্শ-বাস্তু অর্থাৎ গৃহ এবং তার পরিকল্পিত নির্মাণশিল্পের বর্ণনা প্রদানকারী শাস্ত্রকে ‘বাস্তুশাস্ত্র’ বলা হয় ॥ ৫ ॥

গ্রন্থোপক্রমঃ
অথৈকদা
জগজ্জন্মহেতুমম্বুরুহাসনম্ ।
পৃথ্বী পৃথুভয়ক্ৰান্তা চকিতাক্ষী সমায়য়ৌ ॥ ৬ ॥

প্রাচীনকালে একবার জগতের জন্মের উদ্দেশ্যে কমলাসনে অধিষ্ঠিত ব্রহ্মার কাছে
পৃথ্বী মহারাজ পৃথুর ভয়ে অধিষ্ঠিত হয়ে সন্ত্রস্ত ও চকিত চক্ষু সমন্বিত অবস্থায় প্রকাশ পেয়েছিল ॥ ৬ ॥

প্রণম্য প্রণতিপ্রহ্বনিখিলাত্রিদশেশ্বরম্।
সগদ্গদমুভাচেতি ভূতধাত্রী পিতামহম্ ॥ ৭ ॥

পঞ্চমহা ভূতের পালনকারী ও ধারণকারী পৃথ্বী সমস্ত দেবদেবতার পিতামহকে বিনয় সহকারে প্রণাম করে বলল: পৃথ্বী, জল, তেজ, বায়ু ও আকাশ—এই পঞ্চমহাভূত, এদের ভিত্তি পৃথ্বীই ॥ ৭ ॥

পৃথুর দ্বারা ধর্ষিত পৃথ্বীর ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা
ব্রহ্মসন্নিধৌ পৃথুপদ্রুতায় ভূমের অভয়প্রার্থনম্ ভগবন্নহমেতেন পৃথুনা পৃথুতেজসা।
উপদ্রুতা ত্বাং শরণং প্রাপ্তা ত্রায়স্ব মা ততঃ ॥ ৮ ॥

পৃথ্বী বলল—হে ভগবन्! আমি মহাতেজস্বী ও পরাক্রমশালী মহারাজ পৃথুর দ্বারা
ধর্ষিত হয়ে আপনার শরণে আগমন করেছি। অতএব করুণাময় হইয়া দয়া করে এদের থেকে আমাকে রক্ষা করুন ॥ ৮ ॥

পৃথ্বীর জন্য পৃথুর আগমন
ভূমি যখন প্রস্থান করছিল, তখন পৃথু সেই স্থানে উপস্থিত হন।
“বদন্ত্যামিতি মেদিন্যামাভিরাসীদতো পৃথুহ্।”
সংরম্ভমুক্তহৃদয়ো ব্রহ্মাণং প্রণনাম চ ॥ ৯ ॥

মহারাজ পৃথুর ব্রহ্মার কাছে আগমন—এভাবে ভূমি নিজের দুঃখ কমলোদ্ভব ব্রহ্মার কাছে বলছিল এবং তখন মহারাজ পৃথুও উপস্থিত হয়ে (গো রূপ ধারণ করে পৃথ্বীর পালায়নের কারণ দূর করতে) নিজের ক্ষিনতা ত্যাগ করে পিতামহকে প্রণাম করলেন ॥ ৯ ॥

মহারাজ পৃথুর হংসবাহন ব্রহ্মদেবের প্রতি আবেদন
“জগাদৈনমথ স্নিগ্ধধ্বনি-গম্ভীরয়া গিরা।
কুর্বস্তদ্যানহংসানাং পয়োদধ্বনিশঙ্কিতম্ ॥ ১০ ॥”

নিজের মোহময় ও মেঘের গর্জনকেও বিস্মিত করতে পারে এমন গভীর কণ্ঠস্বর দিয়ে মহারাজ পৃথু হংসবাহন ব্রহ্মদেবকে এভাবে প্রার্থনা করলেন ॥ ১০ ॥

পৃথুর উদ্যোগ ব্রহ্মার প্রতি প্রকাশ
“ত্বয়াস্মি জগতাং নাথ! জগতো’ধিপতিঃ কৃতঃ।
স্থাপিতানি চ ভূতানি সর্বাণ্যপি বশে মম ॥ ১১ ॥
তেষ্বিয়ং মম বিশ্বেশ! কদাচিদ্ বশবর্তিনী।
সমীকরোমি পাষাণজালান্যস্যাঃ কিলাধুনা ॥ ১২ ॥”

সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মার কাছে প্রজা পালনের জন্য মহারাজ পৃথুর উদ্যোগের প্রকাশ—
“হে জগতের স্বামী! আমি আপনার আজ্ঞায় এই জগতের অধিপতি রাজা হয়েছি।
হে জগন্নাথ! পৃথ্বীসহ পঞ্চমহাভূত ও স্থবর ও জঙ্গম প্রাণীগুলি আপনি আমার সংরক্ষণে দিয়েছেন।
এই পঞ্চমহাভূতের মধ্যে যখন এই পৃথ্বী, হে বিশ্বেশ! অত্যন্ত কঠিনভাবে আমার শাসন (= আজ্ঞা) অধীনে এল, তখন আমি এই দেবীর উবড়-খাবড় ও ঘন অঞ্চল এবং পাহাড়গুলো আমার ধনু দিয়ে সমতল করার জন্য উদ্যত হলাম ॥ ১১-১২ ॥”

পৃথ্বীর প্রকাশ্য
“ব্যস্তানি ধনুষা তাবদ্ গৌর্ভূত্বেইয়ং পালায়িতা।
দোগ্ধুকামো’হমপ্যেনাং চিরমন্যগমং মাহীম্ ॥ ১৩ ॥
যত্র ক্বাপি প্রায়ান্ত্যেষা তত্র মামেভ পশ্যতি।
অপশ্যন্ত্যন্যতস্ত্রাণমদুগ্ধা ত্বামুপস্থিতা ॥ ১৪ ॥”

হে দেব! কয়লা এবং অন্যান্য খনিজের অনুসন্ধানের ‘বাস্ছা’-এর জন্য আমি বহুদিন এই দেবীর অনুসরণ করেছি।
যেখানে সেখানে এই দেবী যায়, সেখানে আমাকে (পদার্থ অনুসন্ধানে নিযুক্ত) দেখেন।
যে সন্ত্রাস আমি সৃষ্টি করেছি প্রাণীর সংরক্ষণের জন্য, তার থেকে রক্ষার কোনো আশ্রয় না পেয়ে, এই দেবী বিনা অনুসন্ধানে আপনার কাছে উপস্থিত হয়েছে ॥ ১৩-১৪ ॥

বর্ণাশ্রম ও স্থানবিভাগের নিয়ম
“অস্যা বর্ণাশ্রমস্থানবিভাগশ্চ বিধাস্যতে।
ইয়ং চ দূর্গমানেকক্ষোণীধরকুলাকুলা ॥ ১৫ ॥”

পৃথুর প্রশ্ন—“এই পৃথিবীতে বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী স্থানবিভাগ ও গৃহনির্মাণ কিভাবে সম্ভব হবে, যেহেতু এটি দুর্গম এবং বহু পাহাড় ও শৃঙ্গসমূহে আবৃত?”
মনে জাগল গভীর কৌতূহল ॥ ১৫-১৬ ॥

ব্রহ্মার উত্তর
“পৃথুনে ত্যথ বিজ্ঞপ্তিগবানব্জসম্ভবঃ ॥ ১৬ ॥
উবাচ বোধয়ন্নেনং কৃত্বা ভূমিং চ নির্ভয়াম্।
ইয়ং মাহী মাহীপাল! বিধিবৎ পালিতা সতী ॥ ১৭ ॥
সস্যৈরুপায়নিষ্পন্নৈস্তব ভোগ্যা ভবিষ্যতি।
যচ্চ তে স্যাদভিপ্রেতং স্থানাদিবিনিবেশনম্ ॥ ১৮ ॥
তদেষ ত্রিদশাচার্যঃ সর্বসিদ্ধিপ্রবর্তকঃ।
সুতঃ প্রভাসস্য বিভোঃ স্বস্ত্রীয়শ্চ বৃহস্পতেঃ ॥ ১৯ ॥
বিশ্বাতিশায়িধীঃ’ সর্বং বিশ্বকর্মা করিষ্যতি।”

পৃথুর কথায় ব্রহ্মা—মহারাজ পৃথুকে এভাবে বিজ্ঞাপন করে কমলোদ্ভব ব্রহ্মা ভূমিকে অভয়দান দিলেন এবং সমঝাতলেন—
“হে রাজা! এই পৃথিবী আপনার নিয়মমাফিক সংরক্ষণে এবং আপনার উদ্যোগে ধান্যাদি উৎপন্ন হবে।
আপনার ইচ্ছামাফিক স্থানাদির বিনিবেশন (শিবির, গ্রাম, শহর ইত্যাদি) পৃথিবীতে বিশ্বের আচার্য, সমস্ত সিদ্ধিপ্রবর্তক, প্রভাসের পুত্র ও বৃহস্পতির চাষা বিশ্বকর্মা সম্পাদন করবেন ॥ ১৬-২০ ॥”

১. ‘বিশ্বাভিসাবিধীঃ’—এটি বরোদা সংস্করণে পাঠ।

মহারাজ পৃথুর দ্বারা নগর ও গ্রাম বিন্যাস

“রাজন্নসৌ মহেন্দ্রস্য বিদধাবমরাবতীং ॥ ২০ ॥
অন্যা অপ্যুমনা রম্যাঃ পুর্যো লোকভৃতাং কৃতাঃ।
ত্বয়া ক্ষেত্রীকৃতাং মূর্তি দর্শ্য সাদ্রিদ্রুমামসৌঃ ॥ ২১ ॥”

হে রাজা! বাস্তবে বিশ্বকর্মাই দেবরাজ ইন্দ্রের নগরী অমরাবতীর নির্মাতা ছিলেন এবং বর্তমানেও রাজাদের অন্যান্য মনোরম নগরীগুলি তিনি রচনা করেছেন। আপনার দ্বারা পাহাড় ও বৃক্ষ দ্বারা আচ্ছাদিত এই সাক্ষাৎ মূর্তিকে (পৃথ্বী) ক্ষেত্রীকৃত (সমতল) দেখে বিশ্বকর্মা নিশ্চয়ই পুর (City), গ্রাম এবং নগরের সুন্দর বিন্যাস সম্পাদন করবেন ॥ ২০-২২ ॥

পৃথ্বী ও পৃথুর প্রস্থান
“সমাহিতয়োঃ পৃথুভূম্যোঃ বিসর্জনম্
তদ্ গচ্ছ বৎস! লোকানামিতস্ত্বং হিতকাম্যয়া ॥ ২২ ॥”

ব্রহ্মার আজ্ঞা অনুযায়ী, হে পুত্র! (পৃথু!) লোককল্যাণের জন্য আপনি এখান থেকে প্রস্থান করুন এবং পৃথ্বীর শাসন তথা আপনার ইচ্ছামাফিক কাজ সম্পন্ন করুন ॥ ২২ ॥

বিশ্বকর্মার প্রতি পৃথুর নির্দেশনা
“ভয়োজ্জিতা ত্বমপ্যুর্ভি! পৃথোঃ প্রিয়করি ভব।
কালে স্মৃতঃ স্মৃতঃ পুণ্যো রাজ্ঞঃ প্রিয়চিকীর্ষয়া।
ত্বমপ্যঅখিলমেভैतৎ বিশ্বকর্মণ! করिष्यসি ॥ ২৩ ॥”

হে পৃথ্বী! আপনিও ভয় ত্যাগ করে মহারাজ পৃথুর প্রিয়করি (ইষ্ট সাধনকারী) হন এবং হে বিশ্বকর্মা! যখন-তখন মহারাজ আপনাকে স্মরণ করবেন, আপনার কর্তব্য হলো সমস্ত বিন্যাসের (গ্রাম, নগর, শহর) আয়োজন করা ॥ ২৩ ॥

বিশ্বকর্মার প্রস্থান ও ক্রীড়া স্থান
“ইত্যুক্ত্বা গমনমুপেয়ুষি প্রজেশেষ্বং
স্থানং ক্ষিতিভুজি চ আশ্রিতে মুদোর্ভ্যম্।
প্রালেয়াবনিভৃতমাজগাম খেলত্সিদ্ধস্ত্রীপরিগতমাশু বিশ্বকর্মা ॥ ২৪ ॥”

এভাবে ব্রহ্মা নিজ স্থান ফিরে যান এবং মহারাজ পৃথু ও পৃথ্বী উভয়ই নিজের-নিজ স্থান ফিরে এসে যথেষ্ট হর্ষ অনুভব করেন। বিশ্বকর্মাও নিজ আবাসে, হিমগিরিতে ফিরে যান, যেখানে সিদ্ধ গণরা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ক্রীড়া ও বিনোদন করে থাকেন।

বিমর্শ
‘প্রালেয় মিহিকা চাথ হিমানি হিম সংহতিঃ’—এখানে ‘হিম সংহতি’কে প্রালেয় বলা হয়। ভারতের উত্তরে পৃথিবীতে সর্বাধিক বরফ জমে থাকে। এখানে সিদ্ধ, গান্ধর্ব ও চারণ গণরা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে বিনোদন করেন।
অণিমা, মহিমা, লঘিমা সহ আটটি সিদ্ধি প্রাপ্ত মহাত্মাদের সিদ্ধ বলা হয়।
‘পিশাচো গুহ্যকঃ সিদ্ধো ভূতো’—এখানে ‘সিদ্ধ’ দেবযোনীকে বোঝায় ॥ ২৪ ॥

উপসংহার
এইভাবে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রী ভোজদেববিরচিত সমরাংগণসূত্রধার, অপরনাম ‘বাস্তুশাস্ত্র’-এর ‘মহাসমাগমন’ নামক প্রথম অধ্যায়ের মহাকবি পণ্ডিত রামকুবের মালভীয়ের দ্বিতীয় সন্তান ডঃ সুধাকর মালভীয় কৃত ‘সরলা’ হিন্দি ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হলো ॥ ১ ॥


সমীক্ষাত্মক মন্তব্য:

বাস্তুর প্রকার (শ্লোক ৪-৫)
বাস্তুর অধীনে যে বিষয়গুলির অধ্যয়ন লক্ষ করা হয়, সেগুলি অন্যান্য वास्तু গ্রন্থেও পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য প্রসঙ্গসমূহ:

১. মানসার অনুযায়ী: পৃথ্বী, ভবন (= হর্ম্য), যান ও পার্যংগ (আসন) ‘বাস্তু’ বা ‘বস্তূ’ শব্দ দ্বারা নির্দেশিত হয়—
“তৈতিলাক্ষ নরাশ্চৈব যসমিন্যসমিন পরিস্থিতাঃ।
তদ্বস্তু সূরিভিঃ প্রোক্ত তথা বৈ বক্ষ্যতে’ধুনা ॥
ধরাহম্যাদি যানং চ পার্যংকাদি চতুর্বিধম্।
ধরা প্রধানবস্তু স্যাৎ তত্জ্জাতিষু সর্বশঃ ॥ (৩.১-২)”

২. ময়মৎ অনুযায়ী: ‘বস্তূ’র প্রকার—
“অমর্ত্যাশ্চৈব মর্ত্যাশ্চ যত্র যত্র বসন্তি হি।
তদ্বস্তুতি মতং তজ্জ্ঞৈস্তদ্ধেদং চ বদাম্যহম্।
ভূমিপ্রাসাদযানানি শয়নং চ চতুর্বিধম্।
ভূরে প্রধানবস্তু স্যাৎ তত্র জাতানি যানি হি।
প্রাসাদাদিনি বাস্তূনি বস্তুভ্যাদ্ বস্তুসংশ্রয়াত্।
বাস্তুন্যেভি হি তান্যেভি প্রোক্তান্যসমিন পুরাতনীঃ ॥ (২.১-৩)”

অমর (= দেব) ও মরণধর্মা (মানুষ) যেখানে থাকেন, সেখানে বিদ্বানরা ‘বস্তূ’ শব্দ দ্বারা নির্দেশ করেন। প্রধান বস্তু হলো ভূমি, কারণ অন্য প্রাসাদ, যান ও শয়ন তৎপরে উৎপন্ন হয়।

৩. বিশ্বকর্মা অনুযায়ী: দেব, মানুষ ও হাতি ইত্যাদি পশুর আবাস ও ভবন নির্মাণে ইষ্টিকা (ইট, পাথর) ও শিলা ইত্যাদি ‘বাস্তু পদ’ দ্বারা বোঝানো হয়—
“দেবতানাং নরাণাং চ গজগোভাজিনামপি।
নিবাস ভূমিশশিল্পজ্ঞৈর্বাস্তুসঞ্জ্ঞামিতীর্যতে ॥ ১ ॥
ইষ্টিকা চ শিলা দারুরয়ঃ কীলাদয়ো’প্যামী।
বাস্তুকর্মণি চান্যত্র বাস্তুসঞ্জ্ঞামুদীরিতম্ ॥ ৬১ ॥ (বিশ্বকর্মা বাস্তুশাস্ত্র ৭)”

অতিরিক্তভাবে গ্রাম, পুরি, ক্ষেত, কর্বট, দুর্গ, প্রাসাদ, হর্ম্য, ন্যায়শালা, সভা, কোষাগার, অন্তঃপুর, শস্ত্রাগার, ক্রীড়াগৃহ, তোরণ, মঞ্জিক, অধিষ্ঠান, উপপীঠ, গোপুর, সংকীর্ণ ভবন, পতাকা, পারিভদ্রক, চার বর্ণের গৃহ, বেদিকা, পোটিকা, স্তম্ভ, মণ্ডপ, বিমান ও প্রাকার ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় অধ্যায়: বিশ্বকর্মার পুত্রসংবাদ
(The Conversation Between Viśwakarmā and his Sons)

বাস্তুকলা প্রবর্তন

“অথ পৃষ্ঠে হিমগিরেঃ শশাংকশুচিরোচিষিঃ ॥ ১ ॥”

ব্রহ্মার নিযুক্তি সম্পন্ন করার জন্য হিমালয়ের শিখরে বিশাল আসনে সম্যক জ্ঞানী বিশ্বকর্মা বসেছেন। তার মানসিক স্মরণে তার চার পুত্র উপস্থিত হলেন—জয়, বিজয়, সিদ্ধার্থ ও অপ্রাজিত—যাদের উপস্থিতি দ্বারা প্রজাপতি এবং দেবদূতেরা মণিময়, মনোরম গুহা-গৃহে বাস করে এবং চন্দ্রিমার শুভ্র জ্যোৎস্না দ্বারা শোভিত হিমশিখর পরিপূর্ণ হয়েছে ॥ ১-২ ॥

পুত্রদের প্রণাম
চার মানস-পুত্র বিশ্বকর্মার কাছে এসে তাদের পিতাকে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করলেন। জয়, বিজয়, সিদ্ধার্থ এবং অপ্রাজিত তাঁদের প্রণামের মাধ্যমে সন্মান প্রকাশ করলেন ॥ ৩ ॥

ব্রহ্মার নিযুক্তির বর্ণনা বিশ্বকর্মার পুত্রদের উদ্দেশ্যে
“তানুভাচ মুনিঃ ‘বৎসা! বিদিতং ভো যথা পুরা।
বাস্তু ব্রহ্মা সসর্জাদৌ বিশ্বমধ্যখিলং তথা। ॥ ৪ ॥
ধর্ম্যং কর্ম তদা স্বেষ্ঠপ্রাপ্ত্যৈ লোকাবনানি চ।
ব্যবস্থাপ্য চকারৈষ লোকপালস্য कल्पনাম্ ॥ ৫ ॥
অহমপ্যমুনা বিশ্বনাথেনাম্বুজজন্মনা।
লোকানাং সন্নিবাসার্থমাদিষ্টো’স্মি স্বয়ম্ভुवा ॥ ৬ ॥”

হে পুত্রগণ! আপনি জানেন যে প্রাচীনকালে ব্রহ্মা জী বিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে वास्तুর (দেবতার) সৃষ্টির ব্যবস্থা করেছিলেন। সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম, কর্ম ও উৎকর্ষ অর্জন এবং লোকরক্ষার জন্য। সেই জন্য লোকপালদের কল্পনা ও ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি, বিশ্বকর্মা, বিশ্বনাথ কমলভূ ব্রহ্মার আদেশে লোকের বসবাস নিশ্চিত করার জন্য নিযুক্ত হয়েছি ॥ ৪-৬ ॥

নগর ও উদ্যান নির্মাণের পরিকল্পনা
“রম্যাণি নগরোদ্যানসভাস্থানান্যথো ময়া।
সুরাসুরোরগাদীনাং নির্মিতান্যাৎমবুদ্ধিতঃ ॥ ৭ ॥
গত্বর্বী বৈন্যনৃপতের্ত্বৎসা প্রিয়চিকীর্ষা।
নগরগ্রামখেটাদীন্ করিষ্যামি পৃথক পৃথক ॥ ৮ ॥”

এখন আমি এই ধরণায় (মৃত্যুলোক) মহারাজ পৃথুর প্রিয়াকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য শহর, গ্রাম ও ক্ষেত পৃথকভাবে গঠন করব।

পুত্রদের নির্দেশ
“স্বসাহায়ার্থে তত্তৎস্থানাদিবিনিবেশনায় তেষাঁ বিশ্বকর্মণা নিয়োজনং চ কার্যে ত্বমস্মিন্।
সম্যকসাহায়কাইর্ভাব্যং ভবদ্ধিরি তি নঃ স্থিতম্ ॥ ১ ॥
যতস্ত্রিভুবনালোকপ্রদ্যোতস্যাব্জিনীপতেঃ
সহায়তাং তমশ্ছেদে কলয়ন্তি মরীচযঃ ॥ ১০ ॥”

আমার সহায়তা—ভ্রাতৃপুত্রগণ! আমি আপনাদের এখানে স্মরণ করেছি যেন আপনি সকলেই আমার এই নিযুক্ত কর্মে সহায়তা করুন। যেমনভাবে ভুবন ভাস্কর সূর্যকে সাহায্য করেন, তেমনি আপনরাও আমার সাহায্য করুন ॥ ৯-১০ ॥

রাজা পৃথুর জন্য নগর বিন্যাসের আদেশ
“স্বয়ং করিষ্যেহমথো নিবাসায় পৃথোঃ পুরি।
বিচিত্রনগরগ্রামখেটামতিমনোহরাম্ ॥ ১১ ॥
ভবন্তঃ পুনরাগত্য চত্বরঃপি চতুর্দিশম্।
তান্স্তান্ নিবেশন্ করন্তু পৃথকজনকৃতাশ্রয়ান্ ॥ ১২ ॥
অন্তরেষ্বধ্বপাথোধিশৈলানাং সরিতাং তথা।
বিধাতব্যাণি দূর্গাণি নৃপাণাং ভয়শান্তয়ে ॥ ১৩ ॥
বর্ণপ্রকৃতিবেশ্মানী সংস্থানানি চ লক্ষ্মভিঃ।
বিধেয়ানি প্রতিগ্রামং প্রতিপত্তনম্ ॥ ১৪ ॥”

রাজা পৃথুর জন্য—শহর, গ্রাম, ক্ষেত, দুর্গ, বর্ণানুকূল প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা, সমস্ত বিন্যাস আলাদা আলাদা দিক থেকে পরিচালনা করতে হবে।

পুত্রদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ
“তানিত্যমাৎমনতন্যানভিধায় সম্যক্
সারার্থভূতমপরিস্ফুটতোজ্জিতং চ।
স্থানার্পিতোরু ভরণির্ভৃতচিত্তবৃত্তি-
স্তুষ্ণীম্ প্রভাসতনয় নযবিজ্জগাম ॥ ১৫ ॥”

এইভাবে বিশ্বকর্মা তার পুত্রদের কাছে সরাসরি নিজের মত প্রকাশ করলেন এবং তাদের উপর সৃষ্টির ভার অর্পণ করে সন্তুষ্ট হয়ে চলে গেলেন ॥ ১৫ ॥

উপসংহার
শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রী ভোজদেববিরচিত সমরাংগণসূত্রধার, অপরনাম ‘বাস্তুশাস্ত্র’-এর ‘বিশ্বকর্মার পুত্রসংবাদ’ নামক দ্বিতীয় অধ্যায়ের মহাকবি পণ্ডিত রামকুবের মালভীয়ের দ্বিতীয় সন্তান ডঃ সুধাকর মালভীয় কৃত ‘সরলা’ হিন্দি অনুবাদ সম্পূর্ণ হলো ॥ ২ ॥

অতঃ তৃতীয় অধ্যায়
বাস্তু সংক্রান্ত প্রশ্নসমূহ:
(Questions Related to Vāstu)

অতঃ তেষু জয়ো নামক বাক্যটি তৎ বিশ্বকর্মণের।
শ্রুত্বা কৃতাঞ্জলি প্রাহ স্নিগ্ধগম্ভীরয়া গিরা ॥ ১ ॥
জ্ঞানেকনিধিরপ্যস্মান যৎ সহায়তয়া কিল।
বৃণোষি তেন ন ওয়যমাত্মানং বহু মনমহে ॥ ২ ॥

মানসপুত্রদের জিজ্ঞাসা—এরপর চারজন মানসপুত্রের মধ্যে জয় নামক পুত্র তার পিতা ভগবান বিশ্বকর্মার সেই বাক্য (অর্থাৎ স্থানাদি-নিবেশনের পরিকল্পনা) শুনে হাতজোড় করে স্নিগ্ধ ও গম্ভীর ভাষায় বলল—
হে প্রভু! আপনি যেমন জ্ঞানের সাগর, যদি আমাদের মতো অজ্ঞ মানুষদের সাহায্যের জন্য বরণ করছেন, তবে এটি আমাদের জন্য সত্যিই সৌভাগ্যের এবং অত্যন্ত সম্মানের বিষয় ॥ ১-২ ॥

তদিদানীং হিতার্থে নঃ প্রজানামপি চ প্রভো।
অপ্রমেয়প্রভাবস্ত্বং সর্বমাখ্যাতুমর্ঘসি ॥ ৩ ॥

সুতরাং এই সময় আমাদের এবং প্রজাদের হিতার্থে, হে প্রভু! আপনি এমন অপ্রমেয় ও প্রভাবশালী সবকিছু প্রকাশ করতে পারেন (অর্থাৎ আমাদের করা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন, অথবা এই বিষয়ে আমাদের জিজ্ঞাসার তৃপ্তি করতে পারেন) ॥ ৩ ॥

অতঃ শাস্ত্রপ্রমেয়ভূতান বাস্তবাশ্রয়ান্যাংশ্চ বিবিধানর্থানধিকৃত্য জয়স্য প্রশ্ন—
পূর্বমেকার্ণবে জাতে জগতি প্রলয়ং গতে।
মহাভূতামরপুরিজ্যোতির্সং কথমুদ্ভবঃ ॥ ৪ ॥

বাস্তু সংক্রান্ত জয়ের প্রশ্ন—প্রাচীন কালে যখন সমগ্র জগৎ একার্ণব সমুদ্র অর্থাৎ সর্বত্র জলই জলপ্রাপ্ত ছিল এবং পূর্ণ প্রলয় উপস্থিত ছিল, তখন পৃথিবীসহ পঞ্চ মহাভূত, দেবপুরী এবং নক্ষত্রের উদ্ভব কীভাবে হলো ॥ ৪ ॥

কিমাকারা কিমাধারা কিম্ প্রমাণা চ মেদিনী।
বিস্তৃতিঃ পরিধিচ্ছাস্যা বাহুল্যাম্পি কীদৃশম্ ॥ ৫ ॥
উচ্চ্রায়ব্যাসদীর্ঘত্বৈঃ ক্যাইঃ কেস্যাং কুলভূভৃতঃ।
কতিখ্যাতানি বর্ষাণি দ্বীপা নদ্যোঃ অভধ্যস্তথা ॥ ৬ ॥

এই পৃথিবীর আকৃতি কী? এবং ভিত্তি কী? এবং প্রমাণ কী বলা হয়েছে? এই পৃথিবীর বিস্তার কত? এর পরিধি কত এবং ক্ষেত্রফল কত? এই পৃথিবীতে কত উচ্চতা, প্রস্থ ও দৈর্ঘ্যের পার্বত্য (Hereditary mountain) আছে? কত দেশ পরিচিত? কত দ্বীপ, নদী ও সাগর আছে? ॥ ৫-৬ ॥

বিমর্শ-মহেন্দ্রঃ, মালয়ঃ, সহ্যঃ, শুক্তিমান্, ঋক্ষপর্বতঃ, বিন্ধ্যঞ্চ পারিয়াত্রশ্চ—সপ্তৈতে কুলপর্বতাঃ ॥ (দেবীপূরাণম্)
১. মহেন্দ্র, ২. মালয়, ৩. সহ্য, ৪. শুক্তিমান, ৫. ঋক্ষপর্বত, ৬. বিন্ধ্য এবং ৭. পারিয়াত্র—এই সাত কুলপর্বত বলা হয়েছে ॥ ৫-৬ ॥

কঃ সূর্যেন্দুগ্রহর্ক্ষাদিগতম্ যশ্চ পৃথক পৃথক।
ভূমের উপরে কিঞ্চৈষাম্ অন্যন্ প্রকৃতমন্তরम् ॥ ৭ ॥

পৃথিবীর উপরে (অর্থাৎ আকাশে) সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদির আলাদা আলাদা চলাচলের গতিগুলি কেমন? এবং তাদের পারস্পরিক অন্তর কত? ॥ ৭ ॥

কিমাধারং দিবি জ্যোতিঃচক্রং ভ্রময়তে চ কঃ।
লোকেঃ কথম্ মহাভূতান্যূর্ধ্বাধোবিভ্রতি স্থিতিম্ ॥ ৮ ॥

আকাশে এই জ্যোতিঃচক্রের ভিত্তি কী? এবং কে এই জ্যোতিঃচক্রকে ঘূর্ণন করায়? এই বিশ্বে পঞ্চমহাভূত কীভাবে উর্ধ্ব ও অধঃ অবস্থানে অবস্থান করছে? ॥ ৮ ॥

যুগধর্মব্যবস্থাভিঃ কাশ্চাদৌ লোকবৃত্তয়ঃ।
কাশ্চাদিমস্ততো রাজ্ঞাং গ্রহাণাং বর্ণিনাং কথম্ ॥ ৯ ॥

যুগধর্মের ব্যবস্থার দ্বারা আদিকালে কোন কোন লোকবৃত্তি বা লোকাচার ছিল, এরপর পৃথিবীতে প্রথম রাজা কে হয়েছিল? এবং প্রথম গ্রহ কোনটি ছিল এবং প্রথম বর্ণী (চারটি জাতির ব্যক্তি) কে ছিল? ॥ ৯ ॥

কতিদেশাঃ কতিভূঃ পৃথক্ত্বেন নিরূপিতাঃ।
কার্যঃ ক্ব চ কথম্ সন্নিবেশো জনপদাশ্রয়ঃ ॥ ১০ ॥

পৃথিবীতে কত দেশ আছে? পৃথকভাবে কত ধরনের ভূমি নিরূপিত হয়েছে? কীভাবে এবং কোথায় জনপদাশ্রয় (জনপদসংক্রান্ত) স্থাপন করা হয়েছে? ॥ ১০ ॥

ব্যক্তচিহ্নৈঃ স্বনস্পর্শগন্ধবর্ণরসাদিাভিঃ।
কঃ শস্তা নিন্দিতাঃ কাশ্চ পুরাণামপি ভূময়ঃ ॥ ১১ ॥

কোন কোন পুরোচিত ভূমি (শহরের সৌভাগ্যপূর্ণ ভূমি) শব্দ, স্পর্শ, গন্ধ, রঙ ও রস ইত্যাদির প্রকাশের চিহ্ন অনুসারে ভূমি প্রশস্ত বা অপ্রশস্ত বলা হয়েছে? ॥ ১১ ॥

কার্য কেঞ্জেন বিধানে ভূভৃত্যপুরনিবেশনম্।
কিং ফলং সুনিবিষ্টে'সমিন্ দুরনিবিষ্টে চ কিম্ পুনঃ ॥ ১২ ॥

রাজধানী বা নগরের বিন্যাস (town planning) কোন নিয়মে করা উচিত? এবং নগরের সুন্দর বিন্যাসের ফল কী? এবং তার দুশ্চিন্তাজনক বিন্যাসের (অসংগঠিত নির্মাণ) কুপরিণাম কী? ॥ ১২ ॥

কতিপ্রকারং দুর্গ চ দুর্গকর্মক্রমশ্চ কঃ।
কিমগ্রপুরসংস্থানমনিন্দ্যং কিম্ চ নিন্দিতম্ ॥ ১৩ ॥

কশ্চাত্রানুক্রমবিধিঃ প্রমাণৈরুপপাদিতঃ।
প্রাকারগোপুরাট্টালপরিখাপ্রকর্ম চ ॥ ১৪ ॥

দূর্গ কত প্রকারের? এবং দুর্গ রচনার ক্রম বিধি কী? রাজধানীর কোন অংশ নিন্দিত এবং কোন অংশ নিন্দিত নয়? রাজধানীর বিন্যাসে প্রমাণসহ কোন অনুক্রমবিধি প্রদত্ত? এবং প্রাকার কেমন হওয়া উচিত? নগরের গোপূর, অট্টালিকা, পরিখা এবং প্রহরাগার ইত্যাদির কেমন কাজ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে? ॥ ১৩-১৪ ॥

তমঙ্গনির্গমদ্বারপ্রতোল্যট্টালকাদি ভিঃ
কিদৃশঃ প্রবিভাগশ্চ রথ্যাচত্বরবর্ত্মভিঃ ॥ ১৫ ॥
ভূমিপ্রমাণসংস্থানং সীমা চ ক্ষেত্রদিকপথৈঃ।
নগরগ্রামক্ষেত্রাণাং নিবেশাঃ স্যুঃ পৃথক পৃথক ॥ ১৬ ॥

সেখানে প্রধান নগরদ্বার কী প্রকারের বিধিসম্মত হয়। প্রতোলী এবং অট্টালিকা প্রভৃতির দ্বারা এবং রথ্যা, চত্বর ও মার্গের দ্বারা নগরের বিভাগ কেমন হওয়া উচিত? ভূমির কোন পরিমাণ এবং তার সংস্থান ও আঞ্চলিক পথসমূহ (দিক্‌পথ)-এর কোন সীমা-বিভাগ দ্বারা নগর, গ্রাম এবং খেট (= ছোট গ্রাম)-এর নিবেশ পৃথক পৃথক বলে গণ্য করা হয়েছে? ॥ ১৫–১৬ ॥

পুরস্যাভ্যন্তরে পূর্ব কৈর্দ্রব্যাবয়বক্রমৈঃ
কস্মিন্‌ স্থানে কথং কার্য শক্রধ্বজনিবেশনম্‌ ॥ ১৭ ॥

প্রতিসংবৎসরং তস্য নিযুক্তস্য কথং পুনঃ ।
হিতায় নৃপলোকানাং বিধাতব্যো মহোৎসবঃ ॥ ১৮ ॥

নগরের অভ্যন্তরে প্রথমে কোন কোন দ্রব্য দ্বারা এবং পরে তার বিভিন্ন কোন কোন অবয়বক্রম অনুসারে এবং কোন স্থানে কেমনভাবে “ইন্দ্র-ধ্বজ”-এর নিবেশ করা উচিত, এবং সেই প্রতিষ্ঠিত ইন্দ্র-ধ্বজের প্রতি বছর কীভাবে রাজা ও প্রজাদের কল্যাণের জন্য মহোৎসব করা উচিত? ॥ ১৭–১৮ ॥

গৃহেষু কেষু কেষ্বত্র কাসু কাসু ককুপ্সু চ।
ভাগৈর্বাহ্যান্তরৈ কৈঃ কৈঃ কার্যাঃ কাঃ কাশ্চ দেবতাঃ ॥ ১৯ ॥

(নগর-নিবেশে) কোন কোন গৃহে এবং কোন কোন দিকসমূহে, এবং অভ্যন্তর ও বহির্ভাগের বিভিন্ন অংশে কোন কোন দেব ও দেবীর প্রতিষ্ঠা করা উচিত? ॥ ১৯ ॥

কৈঃ কৈর্যনপরিবারবর্ণরূপবিভূষণৈঃ |
কার্যাঃ কৈঃ কৈঃ সুরা বস্ত্রবয়োবেশায়ুধধ্বজৈঃ ॥ ২০ ॥

ওই দেবতাদের যান (বাহন), পরিবার, বর্ণ, রূপ, অলংকার, বস্ত্র, বয় (= উপ্র), বেশ, আয়ুধ এবং ধ্বজ প্রভৃতির কী বিধান রয়েছে, এবং তারা কোন কোন উপলক্ষণ (= ফল) দ্বারা যুক্ত হওয়া উচিত। দেব-প্রতিমার শিল্পশাস্ত্রে কী প্রকার বিধান আছে? ॥ ২০ ॥

প্রমাণমিতিসংস্থানসংখ্যানোচ্ছ্যলক্ষ্মভিঃ ।
প্রাসাদাঃ কস্য কে বা স্যুঃ সুররাজদ্বিজাতিষু ॥ ২১ ॥

প্রাকারপরিখাগুপ্তং পুরে স্যাদ্‌ গোপুরং ক্ব চ।
যুগ্মমধ্যাম্বুবেশ্মানি ক্ব চ স্যুঃ ক্ব মহানসম্‌ ॥ ২২ ॥

দেবতা, রাজা এবং দ্বিজাতিদের গৃহ কেমন হওয়া উচিত? তাদের প্রমাণ, মিতি (মান) ও সংস্থান কেমন হবে? সংখ্যা, উচ্চ্য (উচ্চতা) প্রভৃতি কোন কোন উপলক্ষণ দ্বারা যুক্ত হবে—অর্থাৎ তাদের নিজ নিজ প্রাসাদ কেমন হওয়া উচিত? নগরের মধ্যে প্রাকার ও পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত গোপুর কোথায় হওয়া উচিত? এবং কোথায় ক্রীড়া-গৃহ ও জল-সংস্থান থাকবে, আর কোথায় মহানস (রান্নাঘর) হওয়া উচিত? ॥ ২১–২২ ॥

কোষ্ঠাগারাবুধস্থান ভাণ্ডাগারনিবেশনৈঃ
ব্যায়ামনৃত্তসংগীতস্নানধারাগৃহাদিভিঃ ॥ ২৩ ॥

শয্যাবাসগৃহপ্রেক্ষাবেশ্মাদর্শগৃহৈঃ
পৃথক্ ক্রীডাদোলালয়ারিষ্টগৃহান্তঃপুরবেশ্মভিঃ ॥ ২৪ ॥

বিটঙ্ক ভ্রম নির্যূহ কক্ষাসংযমনাদিভিঃ
অশোকবনিকাভিশ্চ লতামণ্ডপবেশ্মভিঃ ॥ ২৫ ॥

বাপীভির্দারুগিরিভিশ্চিত্রাভিঃ পুষ্পবীথিভিঃ ।
এতৈর্বিশেষৈরন্যৈশ্চ বিচিত্রৈর্বিপিনাশ্চয়ৈঃ ॥ ২৬ ॥

মানোন্মানক্রিয়ায়ামদ্রব্যাকৃতিবিনির্মিতঃ
নিকেতননিবেশঃ স্যাদ্ রাজ্ঞাং ভাগাশ্রিতঃ কথম্ ॥ ২৭ ॥

রাজগৃহের গঠনে মান, উন্মান, ক্রিয়া, আয়াম, দ্রব্য ও আকৃতির বিন্যাসে কোন কোন অংশে এবং কোথায় কোথায় কোষ্ঠাগার, আয়ুধস্থান, ভাণ্ডাগার, ব্যায়ামগৃহ, নৃত্যগৃহ, সংগীতগৃহ, স্নানগৃহ, ধারাগৃহ, শয্যাগৃহ, আবাসগৃহ, প্রেক্ষাবেশ্ম, দর্পণগৃহ, ক্রীডাগৃহ, দোলাগৃহ, অরিষ্টগৃহ, অন্তঃপুর প্রভৃতি হওয়া উচিত। অশোকবনিকা, লতামণ্ডপবেশ্ম, বিটদ্ধ (= কপোতপালী), ভ্রম, নির্যূহ, কক্ষা (প্রকোষ্ঠ), সংযমন (চতুঃশালা) প্রভৃতি, বাপী, দারুগিরি, চিত্র-বিচিত্র পুষ্পবীথি, নানাবিধ উদ্যান ইত্যাদির স্থান কোথায় কোথায় বিনিবেশ করা উচিত? ॥ ২৩–২৭ ॥

পুরোধঃ সৈন্য ভূশ্রেষ্ঠ দৈবচিন্তকমন্ত্রিণাম্
কং কং চ ভাগং প্রাপ্য স্যুরনিবেশা নৃপবেশ্মনঃ ॥ ২৮ ॥

বিশাল রাজহর্ম্যের কোন কোন অংশে পুরোহিত, সেনাপতি, ব্রাহ্মণ, দৈবজ্ঞ এবং মন্ত্রিদের ভবন হওয়া উচিত? ॥ ২৮ ॥

পুরে স্যুর্দিক্ষু ভাগেষু পদভাগেষু কেষু চ । সমম্ ॥ ২৯ ॥

তথা কৃষিতুলাশিল্পকলাপণ্যোপজীবিনঃ ।
হিংসাশ্রিতাশ্চ পুরুষা নিবেশ্যাঃ স্যুঃ কথং ক্ব চ ॥ ৩০ ॥

নিবেশাঃ কীদৃশাশ্চৈষাং কিয়ন্তো বা ভবন্তি তে।
শস্যন্তে কেন বা তেষাং কৈঃ প্রবেশজলভ্রমৈঃ ॥ ৩১ ॥

ধিষ্ণ্যমাদ্যং কতিবিধং দ্রব্যাণ্যাদ্যানি কানি বা ।
হেতুরেষাং চ সর্বেষাং স্যাচ্চ কীদৃগনুক্রমঃ ॥ ৩২ ॥

ভজন্তে যোগমন্যান্যং কানি দ্রব্যাণি কৈঃ সহ ।
কানি যোগং ন গচ্ছন্তি কৈর্বা কঃ ক্ব বসেত্ পুমান্ ॥ ৩৩ ॥

নগরের কোন কোন দিকসমূহে এবং তার কোন কোন অংশে, এবং (বাস্তুচক্রের) পদভাগসমূহে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং তাদের থেকে উৎপন্ন অনুলোম বা প্রতিলোম সন্তানদের জন্য; কৃষিজীবী, তুলাজীবী, শিল্পজীবী, কলাজীবী, পণ্যোপজীবী এবং ব্যাধ প্রভৃতি তথা হিংসাশ্রিত হয়ে জীবিকা নির্বাহকারী পুরুষদের জন্য গৃহ নির্মাণ করা উচিত? কত প্রকারের, কী কী রূপের গৃহ হওয়া উচিত? এবং তাদের মধ্যে প্রবেশপথ ও জলভ্রমের দ্বারা কোন কোন গৃহ প্রশস্ত বলে গণ্য হয়েছে? প্রথম স্থান কত প্রকারের হয়? এবং কোন কোন প্রথম দ্রব্য আছে? এ সকলের কারণ কী এবং তাদের অনুক্রম কেমন? অন্যান্য দ্রব্যের সঙ্গে কোন কোন দ্রব্য পরস্পর যোগ রাখে? এবং কোন কোন দ্রব্য পরস্পর যোগ রাখে না? কোন কোন যোগে কোন মানুষ কোথায় বাস করবে? ॥ ২৯–৩৩ ॥

ইষ্টকাকর্ম কিং চেষ্টং কীর্তিতা কতিধা চ ভূঃ ।
পরিকর্মক্রমস্তাসাং বহ্যম্বুপবনৈশ্চ কঃ ॥ ৩৪ ॥

ইষ্টকা কর্ম (ইট নির্মাণের কারিগরি) কেমন হওয়া উচিত? এবং কত প্রকারের ভূমি বর্ণিত হয়েছে (যেগুলো থেকে ইষ্টকা নির্মিত হয়)? এবং তাদের অগ্নি, জল ও বায়ুর দ্বারা কী প্রকার শোধন ও পরীক্ষা প্রভৃতি (পরিকর্ম-ক্রম) হওয়া উচিত? ॥ ৩৪ ॥

গুরুবর্ণিধ্বজোর্বীশতদ্ভৃত্যপ্রতিমাঃ পুরাম্ ।
বৃক্ষাঃ কে কে প্রশস্তাঃ স্যুর্গৃহার্থ কে চ গর্হিতাঃ ॥ ৩৫ ॥

নগরের জন্য গুরু, বর্ণ, ধ্বজ, অধীশ্বর ও তাদের ভৃত্যদের প্রতিমা কেমন হবে? গৃহনির্মাণের জন্য কোন কোন বৃক্ষ প্রশস্ত বলে বিবেচিত এবং কোন কোন বৃক্ষ নিন্দিত বলে গণ্য? ॥ ৩৫ ॥

তচ্ছেদস্রাবসম্ভূতং শব্দদিক্যাতগর্ভজম্ ।
বিজ্ঞায়তে কথং কর্তৃকারকাদিশুভাশুভম্ ॥ ৩৬ ॥

সেই (কাষ্ঠের) ছেদন ও স্রাব থেকে উৎপন্ন শব্দ, দিক্‌জ্ঞাত ও গর্ভজাত লক্ষণ দ্বারা কীভাবে কর্তা, কারক প্রভৃতির শুভ ও অশুভ নির্ণয় করা যায়? ॥ ৩৬ ॥

প্রমাণং তক্ষণচ্ছেদৈঃ শোধিতানাং কথং ভবেত্ ।
আহৃত্য স্থাপনং পূর্ব দারূণাং স্থানকে ক্ব চ ॥ ৩৭ ॥

(ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র)—এই চার বর্ণের ভবন-নির্মাণ, ইন্দ্রধ্বজের নির্মাণ, এবং রাজাদের প্রাসাদ, দেবমন্দির ও দেবপ্রতিমা নির্মাণে কোন কোন বৃক্ষ প্রশস্ত (শুভ) এবং কোন কোন বৃক্ষ গর্হিত (অশুভ) বলে বলা হয়েছে? ঐ বৃক্ষগুলিকে কাটার ফলে উৎপন্ন স্রাব, তাদের শব্দ, দিকপাত (অর্থাৎ কোন দিকে পড়েছে), এবং তাদের গর্ভ (মণ্ডল)-এর মধ্যে বসবাসকারী জীব-জন্তু প্রভৃতি থেকে প্রাপ্ত শকুন অথবা নিমিত্তের দ্বারা কর্তা (স্থপতি) ও কারক (ভবনপতি)-র শুভ ও অশুভ ফল কীভাবে নির্ধারিত হয়? বৃক্ষ কাটার মাধ্যমে সেই পরীক্ষিত বৃক্ষগুলির প্রমাণ কীভাবে গৃহীত হয়? সেই বৃক্ষগুলিকে জঙ্গল থেকে এনে প্রথমে কীভাবে তাদের স্থাপন করা হয়? এবং কোন স্থানে ও কোথায় রাখা উচিত ॥ ৩৫–৩৭ ॥

সাধারণভাবে সকলের জন্য এবং বিশেষত জাতিভেদে,
প্রশস্ত লক্ষণযুক্ত কোন কোন ভূমি বলা হয়েছে ॥ ৩৮ ॥

সব শ্রেণি ও জাতির অনুরূপ সাধারণভাবে কোন কোন লক্ষণবিশিষ্ট ভূমি হয় এবং তাদের কোন কোন জাতি বলা হয়েছে? ॥ ৩৮ ॥

শল্যোদ্ধারবিধি কিরূপ, ভূমিকার্ম কেমন,
দিগ্গ্রহ (দিক-জ্ঞান), সূত্রণ ও অধিবাসন কীভাবে সম্পন্ন হয় ॥ ৩৯ ॥

মূলপাদের প্রমাণ কী এবং শিলান্যাসের বিধি কী,
শালা ও অলিন্দ (বারান্দা) প্রভৃতি বিভাজনের দ্বারা গৃহ কীভাবে বিভাগ করা হয় ॥ ৪০ ॥

ভিত্তিগুলির মান কী, পীঠগুলির উচ্চতা কী,
এবং মেখলা প্রভৃতির দ্বারা বর্ণানুসারে সেগুলি কীভাবে বিকল্প করা হয় ॥ ৪১ ॥

সমস্ত স্তম্ভের—দ্বারস্তম্ভ ও আসনসহ,
নাগবীথি ও উপধানসমূহের,
এবং সমভাবে কণ্ঠনির্গমসহ ॥ ৪২ ॥

জয়ন্তী-সংগ্রহ, তুলাকার্য এবং বাস্তুকর্মেরও,
ফলকগুলির প্রমাণ কিরূপ বলা হয়েছে ॥ ৪৩ ॥

নিজ নিজ মান অনুসারে সকল বর্ণের তল-উচ্চতা কিরূপ,
গবাক্ষ, কপোতালি, বেদিকা ও জালক প্রভৃতির ক্রিয়াগুলি কী ॥ ৪৪ ॥

শল্যোদ্ধার-বিধি (= ভূমি-শোধন) কিরূপ হয়? ভূমিকার্ম কেমন হয়? দিগ্গ্রহ (দিক-জ্ঞান), সূত্রণ ও অধিবাসন কীভাবে সম্পন্ন হয়? মূল-পাদ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় স্তম্ভের প্রমাণ কী? শিলান্যাসের বিধি কী? শালা ও অলিন্দ (বারান্দা) প্রভৃতি বিভাজনের দ্বারা ভবনের বিভাগ কীভাবে পৃথক করা হয়? ভিত্তিগুলির মান কী? পীঠগুলির উচ্চতা কী? এবং (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র প্রভৃতি পৃথক পৃথক) বর্ণানুসারে ভবনের বিকল্প—অর্থাৎ হ্রাস ও বৃদ্ধি কীভাবে করা হয়? দ্বারের স্তম্ভ ও পট্টিকাসহ গৃহের সমস্ত স্তম্ভে সকলের …

কোন কোন প্রমাণ বর্ণিত হয়েছে? একইভাবে কণ্ঠ-নির্গমনগুলির সঙ্গে নাগবীথি এবং উপধানগুলির প্রমাণ কীভাবে বর্ণিত হয়েছে? জয়ন্তী, সংগ্রহ ও তুলার কার্যাবলি এবং বাস্তু ও ফলকসমূহের প্রমাণগুলি কীভাবে কীভাবে পরিকীর্তিত হয়েছে? আর গবাক্ষ, কপোতালী (= কবুতরের বসার চাক), বেদিকা এবং জালকের ক্রিয়াগুলি কতগুলি এবং কোন কোনটি? ॥ ৩৯–৪৪ ॥

স্থূণা নিসৃষ্টিকোৎসূকা মৃগালি উপতুলাস্তথা ।
সান্তঃ প্রাণিশিরোবংশাঃ কিংপ্রমাণাঃ প্রकीর্তিতাঃ ॥ ৪৫ ॥

স্থূণা (খুঁটি), নিসৃষ্টিকা, উৎসূকা, মৃগালি এবং উপতুলা—এবং প্রাণিসহিত শিরোবংশগুলির কোন কোন প্রমাণ কীর্তিত হয়েছে? ॥ ৪৫ ॥

ছাদ্যোদয়াঃ কিয়ন্তঃ স্যুর্বৃত্তচ্ছাদ্যক্রমশ্চ কঃ ।
ত্র্যস্ত্রাণাং খণ্ডবৃত্তানং লুপানাং চ ক্রিয়াঃ কথম্ ॥ ৪৬ ॥

সীমালিন্দশির স্তাসাং কীদৃশী চাবলম্বনা ।
কতিপ্রকারাঃ প্রাসাদশিরসাং চ বিকল্পনাঃ ॥ ৪৭ ॥

যচ্চান্যদেবমাদি স্যাত্ প্রাসাদভবনাদিষু ।
দ্রব্যকাশ্ঠকলাসঙ্গি প্রমাণং তস্য কীদৃশম্ ॥ ৪৮ ॥

ছাদ্যোদয় (ছাদ বসানোর পদ্ধতি) কত প্রকার? এবং বৃত্তাকার ছাদ বসানোর ক্রম কী? ত্রিকোণী খণ্ডবৃত্ত লুপা (মেহরাব)-গুলির ক্রিয়াবিধি কেমন? আর এই মেহরাবগুলির সীমা, অলিন্দ (= বারান্দা) ও শিখরের আধার কী? একইভাবে প্রাসাদের শিখরগুলির কত প্রকার বিকল্প আছে? তদ্রূপ প্রাসাদ, ভবন প্রভৃতিতে অন্য যে সব বিশেষ বিষয় জ্ঞাতব্য, সেগুলির দ্রব্য, কাঠ ও কলাসংক্রান্ত প্রমাণ কী রূপে বিধৃত হয়েছে? ॥ ৪৬–৪৮ ॥

শালালিন্দপ্রমাণানি চতুঃশালেষু ধামসু ।
জ্যায়োমধ্যযবীয়স্সু মূষাভিঃ কাষ্ঠকল্পনা ॥ ৪৯ ॥

উত্তম, মধ্যম ও অধম চতুঃশাল ভবনগুলিতে শালা (= ভবনের কক্ষ) ও অলিন্দের কী প্রমাণ আছে? এবং মূষা (মূষাকার ঝরোখা)-গুলির দ্বারা কাঠের কল্পনা কীভাবে বিধৃত হয়? ॥ ৪৯ ॥

একদ্বিত্রিচতুঃ শালান্যেষাং সংযোগতো’পি চ ।
কথং কতি চ বేశ্মানি কল্প্যন্তে প্রবিভাগশঃ ॥ ৫০ ॥

এভাবেই একশালা, দ্বিশালা, ত্রিশালা ও চতুঃশালা এবং এদের সংযোগে পঞ্চশালা প্রভৃতি দশশালা পর্যন্ত কীভাবে এবং কত প্রকার ভবন-ভেদ কল্পিত হয়? ॥ ৫০ ॥

কথং চ ষোড়শচতুঃষষ্ট্যেকাশীতয়ঃ শতম্ ।
সংবিভাগাঃ পদানাং স্যুঃ কথমত্রামরস্থিতিঃ ॥ ৫১ ॥

পদগুলির ষোড়শ (১৬-পদ বাস্তু), চতুঃষষ্টি (৬৪-পদ বাস্তু), একাশীতি (৮১-পদ বাস্তু) এবং শত (১০০-পদ বাস্তু)—এগুলির বিভাজন কীভাবে হয়? এবং এই পদগুলিতে বাস্তুদেবতাদের অবস্থান কীভাবে নির্ধারিত? ॥ ৫১ ॥

আদ্যো নবপদো বাস্তুৰন্ত্যঃ সাহস্রিকঃ কথম্ ।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গভাগেষু কেষু কেষু ক্ব তস্থুষঃ ॥ ৫২ ॥

কথমেতে সুরাঃ সর্বে বাস্তুৰস্য ব্যবস্থিতাঃ ।
এতদ্বংশশিরশ্চক্ষুঃ
কুক্ষিহন্মূর্ধমর্মসু ॥ ৫৩ ॥

জায়েত পীড়া দ্রব্যেষু সন্নিবিষ্টেষু কস্য কা।

প্রথম নয়-পদ বাস্তু এবং অন্তিম সহস্র-পদ বাস্তু কীভাবে বর্ণিত? এবং কোন কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অংশে কোথায় কোথায় বাস্তুদেবতারা এই পদগুলিতে স্থিত থাকেন? আবার বাস্তুপুরুষের বংশ, শির, চক্ষু, কুক্ষি, হৃদয়, মূর্ধা ও মর্মস্থলে কোন কোন দ্রব্য স্থাপন করলে কার কী রকম পীড়া জন্মায়? ॥ ৫২–৫৪ ॥

বাস্ত্বারম্ভপ্রবেশেষু যাত্রায়াং স্থাপনেষু চ ॥ ৫৪ ॥
দূতস্বপ্ননিমিত্তাদ্যৈঃ কথং জ্ঞেয়ং শুভাশুভম্ ।

বাস্তু আরম্ভ, গৃহপ্রবেশ, যাত্রা এবং গৃহস্থাপনের সময় দূত, স্বপ্ন প্রভৃতি নিমিত্তের দ্বারা কীভাবে শুভ ও অশুভ লক্ষণ জানা যায়? ॥ ৫৪–৫৫ ॥

দারুক্রিয়াসু চিত্রেষু তথা লেপ্যক্রিয়াসু চ ॥ ৫৫ ॥
যোজ্যং কিং কিমযোজ্যং চ কিং ভূূপভবনাদিষু ।

রাজ-হর্ম্য প্রভৃতিতে কাঠের কাজ (দারুক্রিয়া), চিত্র এবং লেপ্য-ক্রিয়ার ক্ষেত্রে কী কী যোজ্য এবং কী কী অযোজ্য—এই ব্যবস্থা কীভাবে বিধৃত? অর্থাৎ ভবনে কোন কোন চিত্র ব্যবহারযোগ্য এবং কোনগুলি ব্যবহারযোগ্য নয়? ॥ ৫৫–৫৬ ॥

হস্তস্য লক্ষণং মানসংজ্ঞা বৈ জ্ঞায়তে কথম্ ॥ ৫৬ ॥
কিং হব্যেষ্টগ্নিলক্ষ্ম স্যাৎ কিং চ নির্যুক্তলক্ষণম্ ।
অনুক্রমেণ বর্ণানাং বলিকর্ম চ কীদৃশম্ ॥ ৫৭ ॥

বিধেয়ং বিধিনা কেন ভবনে চ প্রবেশনম্ ।
পতিতে স্ফুটিতে জীর্ণে প্লুষ্টে বজ্রাশনিক্সতে ॥ ৫৮ ॥
নিমগ্নভগ্ননির্ভিন্নপ্রশীর্ণেষু চ বাস্তুসু ।
মধুবাল্মীকসম্ভূতৌ প্রবিরূঢ়ে চ দারুণি ।
জায়তে কিং ফলং কুত্র প্রায়শ্চিত্তেন কো বিধিঃ ॥ ৫৯ ॥

হস্তের লক্ষণ কী এবং মানের সংজ্ঞা কীভাবে জানা যায়? হব্যে অগ্নির লক্ষণ কী এবং নির্যুক্ত লক্ষণ কী? আবার বর্ণানুক্রমে বলিকর্ম কীভাবে বিধৃত? এবং কোন বিধিতে ভবনে প্রবেশ করা উচিত? তদ্রূপ পতিত, স্ফুটিত, জীর্ণ, প্লুষ্ট (দগ্ধ), বজ্র ও অশনি (= বিদ্যুৎ)-আঘাতে ক্ষত, নিমগ্ন, ভগ্ন, নির্ভিন্ন ও প্রশীর্ণ ভবনাদি বাস্তুতে কী কী ফল হয়? এবং তার প্রায়শ্চিত্তের কী বিধান আছে? একইভাবে কাঠে মধু (পোকা) লাগলে এবং বাল্মীকে ফাঁপা হয়ে গেলে কী ফল হয় এবং তার প্রায়শ্চিত্তের বিধান কী? ॥ ৫৬–৫৯ ॥

ইত্যেবমাদিকমनेकবিধং বিধানং ।
বেশ্মোপগং চ পৃথগাশ্রয়সম্ভৃতং চ ।
অস্মাস্বনল্পকরুণার্দ্রিতচিত্তবৃত্তির্ব্যাখ্যাতুমর্হসি সমস্তমনুক্রমেণ ॥ ৬০ ॥

হে প্রভু! এইভাবে নানাবিধ ভবন-সম্পর্কিত বিধান এবং ভবনের বাইরের সামগ্রী—আমাদের প্রতি আপনার অপরিসীম করুণায় আর্দ্রচিত্ত হয়ে—আপনি অনুক্রমে সমগ্র প্রমেয় (= বাস্তু) ব্যাখ্যা করুন। এটাই আমাদের প্রার্থনা। ॥ ৬০ ॥

॥ ইতি শ্রীমন্মহারাজাধিরাজশ্রীভোজদেববিরচিত সমরাঙ্গণসূত্রধার অপরনাম্নি বাস্তুশাস্ত্রে ‘প্রশ্ন’ নামক তৃতীয় অধ্যায়ঃ ॥ ৩ ॥

॥ এইভাবে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেব বিরচিত সমরাঙ্গণসূত্রধার—অপরনাম বাস্তুশাস্ত্রের ‘প্রশ্ন’ নামক তৃতীয় অধ্যায়ের মহাকবি পণ্ডিত রামকুবের মালবীয়ের দ্বিতীয় পুত্র ড. সুধাকর মালবীয় রচিত ‘সরলা’ হিন্দি ভাষ্য সম্পূর্ণ হল ॥ ৩ ॥

অথ চতুর্থোऽধ্যায়ঃ
মহদাদিসর্গঃ
(The Description of Creation)

জয়স্যেতি সমাকর্ণ্য বিশ্বকর্মা চ তদ্ বচঃ।
জগাদ গর্জদম্ভোদধ্বনিগম্ভীরয়া গিরা ॥ ১ ॥

সাধু বৎস! ত্বয়া সম্যক্ প্রজ্ঞয়াতিবিশুদ্ধয়া।
প্রশ্নোऽয়মীরিতো वास्तুবিদ্যাব্জবনভাস্করঃ ॥ ২ ॥

স ত্বং নিধায় প্রশ্নানাং সমুদায়মমুং হৃদী।
বদতো মেऽবধানেন শ্রুণু যদ্ ব্রহ্মণোদিতম্ ॥ ৩ ॥

মহদ্ আদি সৃষ্টি বর্ণন—এইরূপে নিজের পুত্র জয়ের এই কথাগুলি শুনে ভগবান বিশ্বকর্মা মেঘের গর্জনের ন্যায় গুরুগম্ভীর বাণীতে বললেন—
হে বৎস! তুমি তোমার অতিশয় বিশুদ্ধ প্রজ্ঞা দ্বারা যে এইরূপ প্রশ্ন করেছ, সেগুলি প্রকৃতপক্ষে ‘বাস্তু’ বিদ্যারূপী পদ্মবনকে প্রস্ফুটিত করার জন্য সূর্যের ন্যায়। সূর্যোদয়ে যেমন পদ্মবন প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি তোমার প্রশ্নগুলির দ্বারা বাস্তুশাস্ত্রের বিষয়বস্তু স্বতঃপ্রকাশিত হয়ে উঠেছে। অতএব এই সকল প্রশ্ন হৃদয়ে ধারণ করে মনোযোগ সহকারে আমার নিকট থেকে সেই উত্তর শ্রবণ কর, যা পিতামহ ব্রহ্মা আমাকে উপদেশ করেছিলেন ॥ ১–৩ ॥

জয়ের দ্বারা জিজ্ঞাসিত বিষয়সমূহের ক্রমানুসারে বিশ্বকর্মার উপদেশ; তন্মধ্যে প্রথমে মহাপ্রলয়াবস্থার বর্ণনা

ইদমাসীদ্ যুগান্তাগ্নিপ্লুষ্টং সংবর্তকাদিভিঃ।
সমুৎসৃজদ্ধিরম্ভাংসি বিশ্বমেকার্ণবীকৃতম্ ॥ ৪ ॥

জয়ের জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহের উত্তরে প্রথমে মহাপ্রলয় অবস্থার বর্ণনা করা হচ্ছে—সমগ্র বিশ্ব যুগান্তের অগ্নিতে দগ্ধ ছিল, অর্থাৎ পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রবল উষ্ণতা বিরাজ করছিল। পরে সংবর্তক নামক মেঘসমূহের দ্বারা মুষলধারে বর্ষণ হলে এই পৃথিবী একার্ণব অবস্থায়, অর্থাৎ সম্পূর্ণ জলময় সৃষ্টিতে পরিণত হয়। অর্থাৎ ক্রমে ক্রমে পৃথিবী নিভে গিয়ে শীতল হয়ে পড়ে (Earth cooled down) ॥ ৪ ॥

বিমর্শ—আধুনিক ভূগর্ভশাস্ত্রীরাও বলেন— “Earth was a burning ball”

তমোভূতে ততস্তস্মিন্ ভোগিপর্যঙ্কমাশ্রিতঃ।
হরিঃ সুষ্বাপ সলিলে কৃত্বোদরগতং জগত্ ॥ ৫ ॥

পুনরায় যখন সমগ্র বিশ্ব তমসায় আচ্ছন্ন ছিল, তখন শेषশয্যায় আশ্রিত হয়ে ভগবান বিষ্ণু সমস্ত জগতকে নিজের উদরে ধারণ করে জলরাশির মধ্যে শয়ন করলেন (ক্ষীরাব্ধিশয়ন—এটি সৃষ্টির তৃতীয় উপক্রম, যাকে গর্ভাবস্থা বলা যেতে পারে) ॥ ৫ ॥

প্রলয়াবসানে ব্রহ্মার আবির্ভাব ও সৃষ্টির উপক্রম

অথাস্য নাভ্যাম্ভোজমভূৎ তস্মিন্নজায়ত।
সর্বজ্ঞানাশ্রয়ঃ শ্রীমাংশ্চতুর্বক্ত্রঃ সুরেশ্বরঃ ॥ ৬ ॥

সৃষ্টির উপক্রম—এবার বিষ্ণুর নাভি থেকে পদ্ম উৎপন্ন হল এবং সেই পদ্ম থেকেই সর্বজ্ঞানাশ্রয় শ্রীমান চতুরানন সুরেশ্বর ব্রহ্মার জন্ম হল (এটি সৃষ্টির চতুর্থ উপক্রম, যখন প্রাণীদের সৃষ্টি আরম্ভ হল) ॥ ৬ ॥

মহদ্-অহংকার প্রভৃতির সৃষ্টি

স কদাচিদ্ দধচ্চেতঃ প্রজাসৃষ্টিং প্রতি প্রভুঃ।
মহান্তমসৃজৎ তত্র পূর্বং বিশ্বস্য হেতবে ॥ ৭ ॥

মহদ্ তথা অহংকার প্রভৃতির সৃষ্টির বর্ণনা—সেই ভগবান ব্রহ্মা একসময় প্রজাসৃষ্টির উদ্দেশ্যে চিত্তে চিন্তা করলে, সর্বপ্রথম এই বিশ্বসৃষ্টির কারণরূপ ‘মহান্’-এর সৃষ্টি করলেন ॥ ৭ ॥

ত্রিধাহংকৃতমেতস্মান্ মনোऽভূৎ সাত্ত্বিকাদতঃ।
রাজসাদপি চাক্ষাণি তন্মাত্রাণি চ তামসাৎ ॥ ৮ ॥

এরপর সেই মহদ্ থেকে তিন প্রকার অহংকারের সৃষ্টি হল। সেই মহদের সাত্ত্বিক বিকার থেকে মন, রাজস বিকার থেকে ইন্দ্রিয়সমূহ এবং তামস বিকার থেকে তন্মাত্রাগুলির উৎপত্তি হল ॥ ৮ ॥

মহদাদি থেকে পঞ্চমহাভূতের স্বগুণসহ আবির্ভাব

তেভ্যঃ পঞ্চ মহাভূতান্যাবিরাসন্ননুক্রমাৎ।
ব্যোমাদীনি ধরান্তানি স্বৈঃ স্বৈর্যুক্তানি তৈর্গুণৈঃ ॥ ৯ ॥

ন তপ্তং যেষু যেষ্বম্ভঃ প্রদেশেষ্বর্করশ্মিভিঃ ॥ ২১ ॥
নীতং ন বাণিলৈঃ শোষং তত্র তত্রাব্ধয়োऽভবন্।

সৃষ্টিতে যেসব অঞ্চলে সূর্যের কিরণে জল উত্তপ্ত হয়নি এবং বায়ু দ্বারাও শুকিয়ে যায়নি, সেই সব স্থানে সেই জল সমুদ্ররূপে সৃষ্টি (নিষ্পন্ন) হল ॥ ২১–২২ ॥

মহাম্ভোবীচিসংঘাতা বিক্ষিপ্তাশ্চণ্ডমারুতৈঃ ॥ ২২ ॥
যত্র যত্রাপুরৈক্যং তে তত্র তত্রাদ্রয়োऽভবন্।

প্রচণ্ড বায়ুর দ্বারা আলোড়িত প্রলয়কালীন মহাসমুদ্রের (মহাম্ভোবীচিসংঘাত) বৃহৎ বৃহৎ তরঙ্গসমূহ যেখানে যেখানে একত্রিত হল, সেখানে সেখানে তা পাহাড় ও পর্বতে রূপান্তরিত হল ॥ ২২–২৩ ॥

নিশ্চলত্বার্থমবনিশ্চর্মবদ্ বিততাথ তৈঃ ॥ ২৩ ॥
শৈলাইঃ কীলৈরিব স্থানেṣ্বাচিতা তেষু তেষ্বিয়ম্।

এই পর্বতসমূহের দ্বারা পৃথিবী স্থিতিশীলতার জন্য চর্মের ন্যায় প্রসারিত হয়ে গেল। যেখানে যেখানে পর্বত ছিল, সেখানে সেখানে পৃথিবী যেন কীলের মতো পর্বত দ্বারা আটকানো হয়ে গেল ॥ ২৩–২৪ ॥

বৃদ্ধিং গতাদ্রিনিঃস্যন্দৈর্ভূভৃতাং
প্রবিভাগজা ॥ ২৪ ॥
নিম্নগাভূৎ ততোऽম্ভোধেঃ কান্তা নিম্নানুসারিণী।
মেদিন্যন্তেষু জলধিপর্যন্তেষু বিনির্যয়ুঃ ॥ ২৫ ॥

পর্বত থেকে নির্গত ঝরনাসমূহের দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত বিভিন্ন অঞ্চলকে পৃথক পৃথক ভাগে বিভক্তকারী নদীগুলির উৎপত্তি হল। পরে সাগরের কান্তার ন্যায় নিম্নভূমি অনুসরণ করে এই নদীগুলি পৃথিবীর অন্ত, অর্থাৎ সাগর পর্যন্ত সর্বত্র প্রবাহিত হতে লাগল ॥ ২৪–২৫ ॥

অম্ভাংসি যত্র যত্রাসংস্ তে দ্বীপাশ্চিত্ররূপিণঃ।
সনিম্নগাম্বুধিদ্বীপা
বিভক্তাখিল ভূধরা ॥ ২৬ ॥
ব্যক্তা বভূব কৃত্স্নৈবং ভূমির্ভূতানি বিভরতি।

যেখানে যেখানে পৃথিবীর চারদিকে জল ছিল, সেখানে সেখানে বিচিত্ররূপ দ্বীপের সৃষ্টি হল। এইভাবে নদী, সমুদ্র ও নানাবিধ দ্বীপসহ পৃথিবী অসংখ্য পর্বত দ্বারা বিভক্ত হয়ে সমস্ত জীব (ভূত) ধারণ করতে করতে স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হল ॥ ২৬–২৭ ॥

ভূমির অধঃস্থ রৌরবাদি নরকের সৃষ্টি

স চক্রে রৌরবাদীনাং নিরয়াণামধঃ ক্ষিতেঃ ॥ ২৭ ॥
স্বকর্মফলভুক্ত্যর্থং স্থানং দুষ্কৃতকর্মণাম্।

এরপর সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা পাপকর্মে লিপ্ত জীবদের নিজ নিজ কর্মফল ভোগের জন্য পৃথিবীর নীচে রৌরব প্রভৃতি নরকের সৃষ্টি করলেন ॥ ২৭–২৮ ॥

জরায়ুজাদি চার প্রকার ভূতের সৃষ্টি

জরায়ুজাণ্ডজোদ্ভিজ্জস্বেদজৈঃ সহ স প্রভুঃ ॥ ২৮ ॥
চতুর্ধেত্যসৃজল্লোকে
ভূতগ্রামচরাচরম্।

এরপর সেই সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এই চরাচর জগতকে চার ভাগে বিভক্ত করে সৃষ্টি করলেন—
১. জরায়ুজ, ২. অণ্ডজ, ৩. উদ্ভিজ্জ, ৪. স্বেদজ ॥ ২৮–২৯ ॥

তত্র জরায়ুজানাং বিভাগঃ

দ্বেধা জরায়ুজাস্তত্র মনুষ্যাঃ পশবস্তথা ॥ ২৯ ॥

এই জরায়ুজ জীব দুই প্রকার—
১. মানুষ এবং ২. পশু ॥ ২৯ ॥

গ্রাম ও অরণ্য ভেদে পুনরায় দ্বিবিভাগ ও তার বিবরণ

গ্রাম্যাঃ সপ্তাভবংস্তেষু সপ্তারণ্যকৃতাশ্রয়াঃ।
পুমান্ গৌস্তুরগচ্ছাগৌ মেষো বেগসরঃ খরঃ ॥ ৩০ ॥

গ্রামবাসৈকনিরতাঃ সপ্তৈতে পরিকীর্তিতাঃ।
সিংহদ্বিপোষ্ট্রমহিষাঃ শরভো গবয়ঃ কপিঃ ॥ ৩১ ॥

অরণ্যগোচরা জীবাঃ সপ্তৈতে বৎস! নির্মিতাঃ।

গ্রাম ও অরণ্য ভেদের নিরূপণ—এই দুই শ্রেণির মধ্যে আবার সাতটি করে গ্রাম্য ও সাতটি করে আরণ্য ভেদ বলা হয়েছে।
গ্রামবাসী জীব সাত প্রকার—
১. মানুষ, ২. গাভী, ৩. অশ্ব, ৪. ছাগল, ৫. মেষ, ৬. খচ্চর (বেগসর) ও ৭. গাধা (খর)।
আর অরণ্যে বিচরণকারী জীব সাত প্রকার—
১. সিংহ, ২. হাতি, ৩. উট, ৪. মহিষ, ৫. শরভ, ৬. নীলগাই (গবয়) ও ৭. কপি (বানর) ॥ ৩০–৩২ ॥

ধর্মাধর্মবিবেকিত্বাচ্ছ্রেয়ান্ গ্রাম্যেষু পুরুষঃ ॥ ৩২ ॥
অরণ্যচারিষু শ্রেষ্ঠঃ সিংহঃ শৌর্যবলাদিভিঃ।

এই গ্রাম্য জরায়ুজদের মধ্যে ধর্ম (piety) ও অধর্ম (impiety)–রূপ বিবেকবোধসম্পন্ন গুণের কারণে ‘মনুষ্য’ সকল জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়েছে এবং অরণ্যচারী মৃগাদি পশুদের মধ্যে নিজের পরাক্রম ও বল প্রভৃতি গুণের কারণে ‘সিংহ’ সকল পশুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়েছে ॥ ৩২–৩৩ ॥

অণ্ডজস্বেদজোদ্ধিজ্জানাং বিভাগাদিকম্
সুপর্ণা ভুজগাঃ কীটাঃ যেऽপি চ স্যুঃ পিপীলিকাঃ ॥ ৩৩ ॥

চতুর্ধেত্যণ্ডজন্মানো
জন্মিনস্তে
প্রকীর্তিতাঃ ।

অণ্ডজ, স্বেদজ এবং উদ্ধিজদের বিভাগ—
১. অণ্ডজ চার প্রকার—
১. সুপর্ণ (পক্ষী), ২. ভুজঙ্গ (সর্প প্রভৃতি), ৩. কীট (কীটপতঙ্গ) এবং ৪. পিঁপড়া (= পিপীলিকা) ॥ ৩৩–৩৪ ॥

ক্লেদকেশসমুদ্ধূতাঃ
কৃমিযূকাদিজন্তবঃ ॥ ৩৪ ॥
সর্বেऽপি স্বেদজন্মানস্তে প্রজাপতিনা কৃতাঃ ।

২. স্বেদজ—পসিনা (ক্লেদ) ও কেশ থেকে উৎপন্ন কৃমি, উকুন, ছারপোকা (যূকাদি) প্রভৃতি জীবকে প্রজাপতি সৃষ্টি করেছেন ॥ ৩৪–৩৫ ॥

উদ্ধিজাঃ পঞ্চধা ভূ(ত্বা?) ত্থা নির্দিষ্টাঃ স্থাবরাশ্চ তে ॥ ৩৫ ॥
দ্রুমা বল্ল্যশ্চ গুল্মাশ্চ বংশাঃ সতৃণজাতয়ঃ ।
ছন্নান্তঃকরণত্বং চ স্বস্থানত্যাগিতাপি চ ॥ ৩৬ ॥
ছিন্নপ্ররোহিতা
চৈষাং
বৈশেষিকগুণত্রয়ম্ ।

৩. উদ্ধিজ্জ পাঁচ প্রকার—যারা স্থাবর, অর্থাৎ বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, বাঁশ (বংশ) এবং তৃণজাতি—এরা সকলেই উদ্ধিজ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এই উদ্ধিজদের তিনটি বিশেষ গুণ আছে—
১. এদের অন্তঃকরণ সংবেদনাশক্তি দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে (ছন্নান্তঃকরণত্ব),
২. যেখানে উৎপন্ন হয় সেখানেই স্থির থাকে (স্বস্থানত্যাগিতা), এবং
৩. কেটে ফেললেও পুনরায় অঙ্কুরিত হয় (ছিন্ন-প্ররোহিতা)—এই তিনটি এদের বৈশেষিক গুণ ॥ ৩৫–৩৭ ॥

গায়ত্রী
ভূতসঞ্জ্ঞৈ(ষাং? ষা) চতুর্বিংশতিপর্বিকা ।
জ্ঞাত্বৈনাং পুরুষঃ পুণ্যাং ভবতি স্বর্গভাজনম্ ॥ ৩৭ ॥

এইভাবে চতুর্বিংশতি পর্ববিশিষ্ট (Twenty four joints) এই ‘ভূত’ নামক গায়ত্রী। এই পুণ্যময় ভূতগায়ত্রী যে জানে, সে মৃত্যুর পরে স্বর্গলাভ করে ॥ ৩৭ ॥

ভুবন ভূজলবহ্নিমরুদ্বিয়ৎ-
প্রমুখ এষ ভবস্তব কীর্তিতঃ ।
বসুমতীপরিমাণবিনিশ্চয়ং
কথয়তঃ শৃণু সম্প্রতি বৎস! মে ॥ ৩৮ ॥

॥ ইতি শ্রীমন্মহারাজাধিরাজশ্রীভোজদেববিরচিতসমরাঙ্গণসূত্রধারাপরনাম্নি
বাস্তুশাস্ত্রে মহদাদিসর্গশ্চতুর্থোऽধ্যায়ঃ ॥ ৪ ॥

যেখানে তিন ভুবন—ভূ, জল, অগ্নি ও আকাশ প্রধান—এমন এই বিশ্বর ব্যাখ্যা এখানে করা হয়েছে। হে পুত্র! এখন পৃথিবীর পরিমাণ প্রভৃতি বিষয়ে যে নিরূপণ আমি করছি, তা তুমি শোনো ॥ ৩৮ ॥

॥ এইভাবে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেববিরচিত সমরাঙ্গণ-সূত্রধার অপরনাম বাস্তুশাস্ত্র-এর ‘মহদাদিসর্গ’ নামক চতুর্থ অধ্যায়ের মহাকবি পং রামকুবের মালবীয়ের দ্বিতীয় আত্মজ ডঃ সুধাকর মালবীয় কৃত ‘সরলা’ হিন্দি সম্পূর্ণ হলো ॥ ৪ ॥

পেজ ১৩২
অথ পঞ্চমোऽধ্যায়ঃ
ভুবনকোশঃ
(The Geographical Data and the
Description of the Earth)

অথো যথাক্রমং ভূমেঃ কৃত্স্নায়াঃ কথয়ামি তে ।
বিষ্কম্ভপরিধী বৎস! বাহুল্যমপি চ স্পুটম্ ॥ ১ ॥

ভূগোল বর্ণন—এখন মহদাদি সর্গের বর্ণনা করার পরে, হে পুত্র! এই সমগ্র পৃথিবীর বিস্তার, গোলার্ধ ও ক্ষেত্রফল (বিষ্কম্ভ, পরিধি) স্পষ্টভাবে ক্রমানুসারে বর্ণনা করছি ॥ ১ ॥

ক্ষিত্যাদীনাং প্রমাণকথনম্
বিষ্কম্ভোऽস্যাঃ সমুদ্দিষ্টো দশযোজনকোটয়ঃ ।
লক্ষাণ্যপি চ মেদিন্যাস্তদ্বদেকোনবিংশতিঃ ॥ ২ ॥

বিষ্কম্ভত্রিগুণো যাবদ্ বিষ্কম্ভাংশশ্চ পঞ্চমঃ ।
মেদিন্যাঃ পরিধিস্তাবদ্যোজনৈঃ পরিকীর্তিতঃ ॥ ৩ ॥

দ্বাত্রিংশত্কোটয়ঃ ষষ্টির্লক্ষাণি পরিধিঃ ক্ষিতেঃ ।
অশীতিশ্চ সহস্রাণি যোজনানাং প্রকীর্তিতঃ ॥ ৪ ॥

যোজনানাং সহস্রাণি বিংশতির্লক্ষয়োর্ দ্বয়ম্ ।
ইতি বাহুল্যমেতস্যাঃ ক্ষিতের্বৎস! তবোদিতম্ ॥ ৫ ॥

পৃথিবীর প্রমাণকথন—এই ভূমির বিষ্কম্ভ অর্থাৎ বিস্তার দশ কোটি উনিশ লক্ষ যোজন বলা হয়েছে এবং এর পরিধি সেই বিস্তারের ত্রিগুণ। এই পরিধি বিষ্কম্ভের পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ বত্রিশ কোটি ষাট লক্ষ আশি হাজার যোজন বলা হয়েছে। এর বাহুল্য (ক্ষেত্রফল) দুই লক্ষ কুড়ি হাজার যোজন ধরা হয়েছে। হে পুত্র! এইভাবে পৃথিবীর ক্ষেত্রফলের প্রমাণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে ॥ ২–৫ ॥

চতুর্ণাং সলিলাদীনাং ভূতাদের্মহতোऽপি চ ।
উত্তরোত্তরমুর্বীতো মানং শতগুণং বিদুঃ ॥ ৬ ॥

তোয়াদিষু স্থিতেয়ং ভূশ্চক্রবদ্ বৃত্তশালিনী ।

জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ এবং মহৎ তত্ত্বের প্রমাণ পৃথিবীর তুলনায় উত্তরোত্তর শতগুণ বেশি—অর্থাৎ পৃথিবীর তুলনায় জল শতগুণ, জলের তুলনায় অগ্নি শতগুণ, অগ্নির তুলনায় বায়ু শতগুণ এবং বায়ুর তুলনায় আকাশের ক্ষেত্রফল শতগুণ বেশি বলা হয়েছে। এইভাবে জলাদি তত্ত্বের মধ্যে স্থিত এই পৃথিবী চক্রের ন্যায় বৃত্তাকার, অর্থাৎ গোলাকার ॥ ৬–৭ ॥

পাত্রস্থাপরপাত্রশ্রীহারিণ্যন্যান্যপি
ক্রমাৎ ॥ ৭ ॥

প্রমাণমিদমেতেষাং ক্ষিত্যাদীনাং তবোদিতম্ ।

যেমন একটি পাত্রের উপর আরেকটি পাত্র শোভিত হয়, তেমনই অন্যান্য লোকসমূহও এই ক্রমে ব্রহ্মাণ্ডে স্থিত। এইভাবে, হে পুত্র! পৃথিবীর প্রমাণ ও তার পরিধি প্রভৃতি এখানে নিরূপণ করা হলো ॥ ৭–৮ ॥

দ্বীপাদীনাং পাথোধিনিবেশকথনম্
দ্বীপাদীনাং তু পাথোধিনিবেশঃ পুনরুচ্যতে ॥ ৮ ॥

দ্বীপাদি ও সমুদ্রের বর্ণন—এখন এরপর দ্বীপাদি ও সমুদ্রসমূহ, অর্থাৎ কোন দ্বীপে কোন কোন সমুদ্র ও পর্বত অবস্থিত, তার বর্ণনা করা হচ্ছে ॥ ৮ ॥

সপ্তসু দ্বীপেষু জম্বুদ্বীপবর্ণনম্
দ্বীপানামম্বুধীনাং চ সপ্তানামপি মধ্যগঃ ।
জম্বুদ্বীপো ভবেদ্ বৃত্তঃ সহস্রশতবিস্তৃতঃ ॥ ৯ ॥

হিমাদ্রির্হেমকূটাখ্যো নিষধো নীলসংজ্ঞিতঃ ।
শ্বেতঃ শৃঙ্গী চ ষডমী ভবন্ত্যস্মিন কুলাচলাঃ ॥ ১০ ॥

জম্বুদ্বীপ—এই পৃথিবীর সাতটি দ্বীপ ও সাতটি সমুদ্রের মধ্যভাগে, এক লক্ষ যোজন বিস্তৃত গোলাকার আকৃতির জম্বুদ্বীপ অবস্থিত। এই জম্বুদ্বীপে—
১. হিমাদ্রি, ২. হেমকূট, ৩. নিষধ, ৪. নীল, ৫. শ্বেত এবং ৬. শৃঙ্গী—নামক ছয়টি (মহাপর্বত) কুলাচল পর্বতশ্রেণি রয়েছে ॥ ৯–১০ ॥

এতস্মাদুত্তরেণাদ্রেস্তুষারাঙ্ঘিতমেখলাত্ ।
পূর্বাপরায়তাঃ সর্বেऽপ্যদ্রয়ো যাবদম্বুধি ॥ ১১ ॥

১. হিমালয়—তুষারাবৃত মেখলাবিশিষ্ট হিমালয়ের উত্তর দিক থেকে পূর্ব ও পশ্চিম পর্যন্ত, সমুদ্র পর্যন্ত এই ছয়টি পর্বতের বিস্তার রয়েছে ॥ ১১ ॥

অন্তরা নীলনিষধৌ জম্বুদ্বীপস্য নাভিগঃ ।
বৃত্তঃ পুণ্যজনাকীর্ণঃ শ্রীমান্ মেরুর্মহাচলঃ ॥ ১২ ॥

২. মেরু পর্বত—নীল ও নিষধ নামক দুই পর্বতের মধ্যভাগে জম্বুদ্বীপের নাভিরূপে অবস্থানকারী, পুণ্যজনাকীর্ণ (পুণ্যজন অর্থাৎ যক্ষদের দ্বারা সেবিত), গোলাকার, শ্রীসম্পন্ন ‘মেরু’ নামক মহাপর্বত অবস্থিত ॥ ১২ ॥

বিমর্শ—রঘুবংশে কালিদাস ‘পুণ্যজন’ শব্দটি যক্ষদের অর্থে ব্যবহার করেছেন—
‘পয়োধরৈঃ পুণ্যজনাঙ্গনানাম্ ।’ (রঘু ১৩.৬০)

উদগ্যাম্যায়তে মেরোঃ প্রাগ্ভাগে মাল্যবান্ গিরিঃ ।
সেবিতঃ সিদ্ধনারীভিরানীলনিষধায়তঃ ॥ ১৩ ॥

সুমেরোঃ পশ্চিমেনাদ্রির্গন্ধর্বকুলসঙ্কুলঃ ।
মাল্যবত্সদৃশায়ামো মহীভৃৎ গন্ধমাদনঃ ॥ ১৪ ॥

৩. মাল্যবান এবং ৪. গন্ধমাদন—মেরুর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত প্রাগ্ভাগে ‘মাল্যবান’ নামক পর্বত অবস্থিত। নীল ও নিষধ পর্যন্ত বিস্তৃত সুমেরুর পশ্চিমভাগে গন্ধর্বকুলে পরিপূর্ণ, মাল্যবানের সদৃশ বিস্তৃত ‘গন্ধমাদন’ নামক পর্বত রয়েছে ॥ ১৩–১৪ ॥

পর্বতাবুভয়ান্তস্থৌ হিমবান্ শৃঙ্গবান্ তথা ।
যোজনানাং সহস্ত্রে দ্বে সাৰ্ধে স্যাদুচ্ছ্রয়স্তয়োঃ ॥ ১৫ ॥

৫. হিমবান ও ৬. শৃঙ্গবান—এই দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে ‘হিমবান’ ও ‘শৃঙ্গবান’ নামক দুই পর্বত অবস্থিত এবং উভয়ের উচ্চতা আড়াই হাজার যোজন করে ॥ ১৫ ॥

শ্বেতশ্চ হেমকূটশ্চেত্যন্তয়োঃ পৃথিবীধরৌ ।
যোজনানাং সহস্রার্ধমেকৈকস্যোচ্ছ্রয়স্তয়োঃ ॥ ১৬ ॥

৭. শ্বেত ও ৮. হেমকূট—এই দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে বিস্তৃত শ্বেত ও হেমকূট পর্বত অবস্থিত, যাদের প্রত্যেকের উচ্চতা পাঁচশো যোজন ॥ ১৬ ॥

নিষধাচলনীলাদ্রীমাল্যবদ্গন্ধমাদনাঃ
সহস্রযোজনোচ্ছ্রায়াশ্চত্বারোऽমী পৃথক্ পৃথক্ ॥ ১৭ ॥

নিষধাচল, নীলাদ্রী, মাল্যবান এবং গন্ধমাদন—এই চারটি পর্বতের প্রত্যেকটির উচ্চতা এক হাজার যোজন ॥ ১৭ ॥

এতেऽষ্টাবপি শৈলেন্দ্রাঃ সহস্ত্রদ্বয়বিস্তৃতাঃ ।
উচ্ছ্রয়ার্ধমধশ্চাপি বিলগ্নাঃ সহ মেরুণা ॥ ১৮ ॥

এইভাবে এই আটটি পর্বতরাজ দুই হাজার যোজন বিস্তৃত এবং নীচের দিকে তাদের উচ্চতার অর্ধেক পরিমাণ প্রসারিত; এরা সকলেই মেরু পর্বতের সঙ্গে সংযুক্ত ॥ ১৮ ॥

মেরোঃ সমুচ্ছ্রয়োऽশীতিঃ সহস্রাণি চতুর্যুতাঃ ।
ষোডশাধঃ সহস্রাণি দ্বাত্রিংশন্মূর্ধ্নি বিস্তৃতিঃ ॥ ১৯ ॥

এই পর্বতরাজ মেরুর উচ্চতা চুরাশি হাজার যোজন, নীচের বিস্তার ষোল হাজার যোজন এবং উপরের বিস্তার বত্রিশ হাজার যোজন ॥ ১৯ ॥

জম্বূতরুর্মহান্ মধ্যে সুমেরোর্নিষধস্য চ ।
দ্বীপস্যামুষ্য যদ্যোগাজ্জম্বূদ্বীপ ইতি শ্রুতিঃ ॥ ২০ ॥

সুমেরু ও নিষধ পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে একটি মহান্ জম্বু বৃক্ষ অবস্থিত; তার সংযোগের কারণেই এই দ্বীপের ‘জম্বুদ্বীপ’ নাম প্রসিদ্ধ হয়েছে—এমন জনশ্রুতি আছে ॥ ২০ ॥

শৃঙ্গৈর্হিমশিলানদ্ধৈঃ সর্বতো হিমবানয়ম্ ।
মহান্তো নিবসন্ত্যত্র পিশাচা যক্ষরাক্ষসাঃ ॥ ২১ ॥

১. হিমবান পর্বত—এই পর্বত সর্বত্র বরফের শিলায় আবৃত, উঁচু শৃঙ্গ দ্বারা শোভিত; এখানে মহান্ পিশাচ, যক্ষ ও রাক্ষসরা বসবাস করে ॥ ২১ ॥

কূটৈর্হেমময়ৈর্হেমকূট
ইত্যবনীধরঃ ।
যং সর্বতো নিষেবন্তে সদা চারণগুহ্যকাঃ ॥ ২২ ॥

২. হেমকূট পর্বত—স্বর্ণময় শিখরের জন্য এই পর্বত লোকখ্যাত। এখানে সর্বদা চারণ ও গুহ্যক (দেবযোনিবিশেষ) সর্বত্র বিচরণ করে ॥ ২২ ॥

তরুণার্কপ্রভাজালপ্রতিভা নিষধাচলঃ ।
নিবসন্তি সুখং তত্র শেষবাসুকিতক্ষকাঃ ॥ ২৩ ॥

৩. নিষধাচল—এই নিষধ পর্বত প্রভাতকালের নবসূর্যের প্রভামণ্ডলের ন্যায় আরুণ বর্ণের। এখানে শেষ, বাসুকি ও তক্ষক গণ সুখে বসবাস করে ॥ ২৩ ॥

হেমাব্জকর্ণিকাকারঃ
সুমেরুর্মণিকন্দরঃ ।
অত্রামরাঃ সাপ্সরসস্ত্রয়স্ত্রিংশদ্ বসন্তি তে ॥ ২৪ ॥

৪. মেরু পর্বত—এই পর্বতটি স্বর্ণকমলের কর্ণিকার আকৃতির এবং এর কন্দরাগুলি নানা প্রকার মণিতে পূর্ণ। এই পর্বতে তেত্রিশ কোটি দেবতা তাঁদের অপ্সরাদের সঙ্গে বসবাস করেন ॥ ২৪ ॥

বৈডূর্যনদ্ধৈঃ শিখরৈর্নীলো
নীলমহীধরঃ ।
কলয়ন্তি তপোনিত্যাঃ যত্র ব্রহ্মর্ষয়ঃ স্থিতিম্ ॥ ২৫ ॥

৫. নীল মহীধর—এই পর্বতটি তার বৈডূর্যময় শিখরের জন্য জগতে প্রসিদ্ধ। এখানে তপোনিষ্ঠ ব্রহ্মর্ষিগণ অবস্থান করেন ॥ ২৫ ॥

শ্বেতঃ স কাঞ্চনৈঃ শৃঙ্গৈর্গগনোল্লেখিভির্বৃতঃ ।
দোর্দর্শালিনাং যত্র নিবাসস্ত্রিদশদ্বিষাম্ ॥ ২৬ ॥

৬. শ্বেত পর্বত—এই শ্বেত পর্বত স্বর্ণনির্মিত আকাশস্পর্শী উচ্চ শিখরে পরিবেষ্টিত। এখানে নিজেদের বাহুবলের দম্ভে উন্মত্ত দেবদ্রোহীদের নিবাস ॥ ২৬ ॥

মহানীলময়ো বর্হিপিচ্ছচ্ছায়ো বহির্মহান্ ।
পিতৃণামালয়ঃ শৃঙ্গৈরুচ্ছ্রিতৈঃ শৃঙ্গবান্ গিরিঃ ॥ ২৭ ॥

৭. শৃঙ্গবান পর্বত—এই পর্বতে মহা নীলবর্ণ ময়ূরের পুচ্ছের ন্যায় ছায়া বিস্তৃত, অর্থাৎ এখানে ময়ূরের আধিক্য রয়েছে। এর শিখরসমূহ অত্যন্ত উচ্চ এবং এটি পিতৃগণের নিবাসস্থান ॥ ২৭ ॥

জম্বুদ্বীপে নববর্ষস্য ভূগোলকথনম্

হিমাচলস্য যাম্যেন ক্ষারাব্ধিবৃতমন্যতঃ ।
বর্ষং স্যাদ্ ভারতং নাম প্রথমং কার্মুকাকৃতি ॥ ২৮ ॥

জম্বুদ্বীপের বর্ষ (দেশ)সমূহের ভূগোল—
১. ভারতবর্ষ—জম্বুদ্বীপে হিমালয়ের দক্ষিণভাগে, অপর দিকে ক্ষার (লবণাক্ত জলবিশিষ্ট) সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত, ধনুকাকৃতির প্রথম বর্ষ ‘ভারতবর্ষ’ নামে প্রসিদ্ধ ॥ ২৮ ॥

তুষারনিলয়স্যাদ্রের্হেমকূটাচলস্য চ ।
মধ্যে কিম্পুরুষং নাম দ্বিতীয়ং বর্ষমীরিতম্ ॥ ২৯ ॥

২. কিম্পুরুষ বর্ষ—হিমালয় ও হেমকূট পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত দ্বিতীয় বর্ষটির নাম ‘কিম্পুরুষ বর্ষ’ ॥ ২৯ ॥

অন্তরে হেমকূটস্য নিষধস্য চ ভূভৃতঃ ।
হরিবর্ষমিতি প্রোক্তং তৃতীয়ং বর্ষমুত্তমম্ ॥ ৩০ ॥

৩. হরিবর্ষ—হেমকূট পর্বত ও নিষধাচলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে তৃতীয় উত্তম বর্ষ ‘হরিবর্ষ’ নামে পরিচিত ॥ ৩০ ॥

নিষধাচলনীলাদ্রীমাল্যবদ্গন্ধভূভৃতাম্ ।
চতুর্ণাং মধ্যগং বর্ষং তুর্যমস্মিন্নিলাবৃতম্ ॥ ৩১ ॥

৪. ইলাবৃতবর্ষ—নিষধাচল, নীলাদ্রি, মাল্যবান ও গন্ধমাদন—এই চার পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত চতুর্থ বর্ষটির নাম ‘ইলাবৃতবর্ষ’ ॥ ৩১ ॥

উত্তরে নীলশৈলস্য যাম্যে চ শ্বেতভূভৃতঃ ।
পঞ্চমং বর্ষমত্যর্থরম্যং রম্যকসংজ্ঞিতম্ ॥ ৩২ ॥

৫. রম্যকবর্ষ—নীলাচলের উত্তরদিকে এবং শ্বেতাচলের দক্ষিণদিকে অবস্থিত অত্যন্ত মনোরম পঞ্চম বর্ষটি ‘রম্যক’ নামে পরিচিত ॥ ৩২ ॥

শ্বেতশৃঙ্গবতোঃ
শৈলরাজয়োরনয়োরিহ ।
মধ্যে ষষ্ঠং হিরণ্যাংশুরম্যং হৈরণ্যকাহ্যম্ ॥ ৩৩ ॥

৬. হৈরণ্যক বর্ষ—শ্বেতাচল ও শৃঙ্গাচল—এই দুই পর্বতরাজের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত, স্বর্ণকিরণের ন্যায় মনোরম ষষ্ঠ বর্ষটির নাম ‘হৈরণ্যক’ ॥ ৩৩ ॥

অস্যোত্তরে শৃঙ্গবতো যাম্যে চ ক্ষারবারিধেঃ ।
কুরুবর্ষাভিধং
বর্ষমুত্তরেণ
প্রচক্ষতে ॥ ৩৪ ॥

৭. কুরুবর্ষ—শৃঙ্গাচলের উত্তরদিকে এবং ক্ষারসমুদ্রের দক্ষিণদিকে অবস্থিত সপ্তম বর্ষটি ‘কুরুবর্ষ’ নামে পরিচিত ॥ ৩৪ ॥

অন্তরা নীলনিষধৌ প্রাগ্ভাগে মাল্যবদ্গিরেঃ ।
ভদ্রাশ্বমষ্টমং বর্ষং প্রাক্সমুদ্রান্তমীরিতম্ ॥ ৩৫ ॥

৮. ভদ্রাশ্ব বর্ষ—নীলাচল ও নিষধাচলের মধ্যবর্তী স্থানে এবং মাল্যবান পর্বতের প্রাগ্ভাগে, পূর্বসমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত অষ্টম বর্ষটি ‘ভদ্রাশ্ব বর্ষ’ নামে প্রসিদ্ধ ॥ ৩৫ ॥

গন্ধমাদনশৈলস্য প্রত্যক্ প্রাক্ চাপরাম্বুধেঃ ।
নবমং বর্ষমাচার্যাঃ
কেতুমালং প্রচক্ষতে ॥ ৩৬ ॥

৯. কেতুমাল—গন্ধমাদন পর্বতের পশ্চিমভাগে এবং পশ্চিমসমুদ্রের পূর্বদিকে অবস্থিত নবম বর্ষটির নাম ‘কেতুমাল’ ॥ ৩৬ ॥

ইতি প্রোক্তানি বর্ষাণি নবামূনি ময়া তব ।
সাম্প্রতং পুনরেতেষাং
প্রমাণমবধারয় ॥ ৩৭ ॥

হে বৎস! এইভাবে তোমার জ্ঞানের জন্য এই নয়টি বর্ষের বিবরণ দেওয়া হলো। এখন এদের পরিমাপ সম্বন্ধে অবগত হও ॥ ৩৭ ॥

নববর্ষস্য প্রমাণকথনম্

প্রমাণেন সহস্রাণি চতুস্ত্রিংশচ্চতুর্দিশম্ ।
যোজনানামিহেচ্ছন্তি চতুরস্রমিলাবৃতম্ ॥ ৩৮ ॥

নয় বর্ষের পরিমাপ—চার দিক মিলিয়ে চৌত্রিশ হাজার যোজন পরিমাপে চতুষ্কোণ আকৃতির ইলাবৃতবর্ষের পরিমাপ নির্ধারিত হয় ॥ ৩৮ ॥

প্রাক্প্রত্যগ্ভাগগে বর্ষে তস্যোদগ্যাম্যতঃ সমে ।
একত্রিংশৎসহস্রাণি কিঞ্চিত্ প্রাক্প্রত্যগায়তে ॥ ৩৯ ॥

যান্যুক্তানি ষডন্যান্যি বর্ষাণ্যেভ্যোऽবরাণি তে ।
তেষাং নবসহস্রাণি প্রত্যেকং বিস্তৃতির্মতা ॥ ৪০ ॥

ইলাবৃতবর্ষের পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে অবস্থিত দুই বর্ষের পরিমাপ সমান—একত্রিশ হাজার যোজন। অবশিষ্ট যে ছয়টি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বর্ষ, যেগুলি কিছুটা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে বিস্তৃত, তাদের প্রত্যেকটির বিস্তার নয় হাজার যোজন বলা হয়েছে ॥ ৩৯–৪০ ॥

নববর্ষস্য ভোজনাদিব্যবস্থাকথনম্

বর্ষে কিম্পুরুষে নার্যো নরাশ্চ প্লক্ষভোজনাঃ ।
জীবন্ত্যযুতমব্দানাং জাত্যজাম্বূনদত্বিষঃ ॥ ৪১ ॥

২. কিম্পুরুষ বর্ষে নারী ও পুরুষগণ প্লক্ষ বৃক্ষের ফল ভোজন করে। তারা দশ হাজার বছর পর্যন্ত জীবিত থাকে এবং তাদের বর্ণ বিশুদ্ধ স্বর্ণের ন্যায় দীপ্তিমান ॥ ৪১ ॥

হরিবর্ষে নরা নার্যো বসন্তীক্ষুরসাশিনঃ ।
সাযুতং চ সহস্রং তে জীবন্তি রজতত্বিষঃ ॥ ৪২ ॥

৩. হরিবর্ষে নারী ও পুরুষগণ ইক্ষুরস পান করে জীবনধারণ করে। তাদের বর্ণ রৌপ্যের ন্যায় শুভ্র এবং তাদের আয়ু অযুতসহ এক সহস্র, অর্থাৎ এগারো হাজার বছর ॥ ৪২ ॥

ইলাবৃতে নরাঃ পদ্মরাগভাসোদ্গতাস্তথা ।
জম্বূফলরসাহারাঃ সপাদাযুতজীবিনঃ ॥ ৪৩ ॥

৪. ইলাবৃতবর্ষ (ইলাবৃত্ত)-এ পদ্মরাগ মণির ন্যায় কান্তিযুক্ত নারী-পুরুষগণ জম্বু ফলের রস আহার করে এবং তারা সাড়ে বারো হাজার বছর পর্যন্ত জীবিত থাকে ॥ ৪৩ ॥

নাস্মিন্ মেরুটটচ্ছন্নে তারকার্কেন্দুরশ্ময়ঃ ।
স্বাঙ্গপ্রভাভিঃ কিন্তুত্র কৃতোদ্যোতা বসন্ত্যমী ॥ ৪৪ ॥

মেরু পর্বতের দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার কারণে এই বর্ষে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের রশ্মি পৌঁছায় না। অতএব এখানকার নর-নারীরা নিজেদের অঙ্গের কান্তি দ্বারাই আলোকিত হয়ে বসবাস করে ॥ ৪৪ ॥

কৈরবোদরসচ্ছায়া ভদ্রাশ্বে সাঙ্গনা নরাঃ ।
নীলাম্রকফলাহারা ভবন্ত্যত্রাযুতায়ুষঃ ॥ ৪৫ ॥

৫. ভদ্রাশ্ব নামক বর্ষে স্ত্রী-পুরুষগণ কৈরব পক্ষী (কাকাবলি)-র শ্বেত উদরের ন্যায় উজ্জ্বল কান্তিসম্পন্ন হয়। তারা নীলবর্ণ আম্রফল ভক্ষণ করে এবং তাদের আয়ু দশ হাজার বছর ॥ ৪৫ ॥

দলৎকুবলয়শ্যামাঃ কেতুমালে শরীরিণঃ ।
শরদামযুতং তেষামায়ুঃ পনসভোজিনাম্ ॥ ৪৬ ॥

৬. কেতুমাল নামক বর্ষে নর-নারীরা প্রস্ফুটিত নীল কমলের ন্যায় শ্যামবর্ণ। তারা পনস (কাঁঠাল/খেজুরার্থে ব্যবহৃত) ভক্ষণ করে এবং তাদের আয়ুও দশ হাজার বছর ॥ ৪৬ ॥

বিমর্শ—পনসঃ কণ্টকিফলো …… ইত্যমরঃ । (২.৪.৬১)

শ্বেতাভো রম্যকে রম্যে ন্যগ্রোধফলভুগ্ জনঃ ।
হরিবর্ষ ইব প্রোক্তমেতস্মিন্ মানমায়ুষঃ ॥ ৪৭ ॥

৭. রম্যক নামক বর্ষে মানুষ শ্বেতবর্ণের হয় এবং ন্যগ্রোধ (বট) বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে। এই বর্ষে প্রাণীদের আয়ু হরিবর্ষের ন্যায় এগারো হাজার বছর বলা হয়েছে ॥ ৪৭ ॥

শ্যামত্বিষঃ স্ত্রীয়ো বর্ষে পুমাংশশ্চ হিরণ্যকে ।
জীবন্ত্যযুতমব্দানাং সর্বেऽপি লকুচাশিনঃ ॥ ৪৮ ॥

৮. হিরণ্যক নামক বর্ষে স্ত্রী ও পুরুষ শ্যামবর্ণের। তারা লকুচাশী (লুকাট ভক্ষণকারী) এবং সকলেই দশ হাজার বছর জীবিত থাকে ॥ ৪৮ ॥

কুরুস্বভীষ্টদৈর্বৃক্ষৈর্জীবন্তি স্ত্রীযুতা নরাঃ ।
সপাদমযুতং দেবগর্ভভা গৌরকান্তয়ঃ ॥ ৪৯ ॥

৯. কুরু নামক বর্ষে নর-নারী ইচ্ছাপূরণকারী বৃক্ষের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের বর্ণ দেবতুল্য গৌর এবং আয়ু সাড়ে বারো হাজার বছর ॥ ৪৯ ॥

পুণ্যকর্মা বসত্যেষু বর্ষেষু নিখিলো জনঃ ।
শোকব্যাধিজরাতঙ্কশঙ্কোন্মুক্তঃ সদা সুখী ॥ ৫০ ॥

এই সকল বর্ষে কেবল পুণ্যকর্মী জনসাধারণই বাস করে। শোক, ব্যাধি, জরা ও রোগের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়ে তারা সদা সুখে জীবন যাপন করে ॥ ৫০ ॥

বনৈঃ কীর্ণানি সর্বাণি কুসুমস্তবকানতৈঃ ।
উদ্ধিজ্জাদ্ভির্নদীভিশ্চ তৈস্তৈস্তুঙ্গৈশ্চ পাদপৈঃ ॥ ৫১ ॥

উদঞ্চদ্বীচিমালেন লাবণেনাব্ধিনা বহিঃ ।
পরিক্ষিপ্তোऽয়মুক্তস্তে জম্বুদ্বীপো ময়াখিলঃ ॥ ৫২ ॥

এই সকল বর্ষ কুসুমস্তবকভারে নত বনরাজিতে আচ্ছাদিত। উদ্ধিজ্জ সৃষ্টির (বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, তৃণাদি), নদী ও উচ্চ উচ্চ বৃক্ষ দ্বারা এরা শোভিত। ঊর্ধ্বমুখী তরঙ্গমালায় শোভিত লবণ সমুদ্র দ্বারা এই জম্বুদ্বীপ বহির্ভাগে পরিবেষ্টিত। হে বৎস! এইভাবে সমগ্র জম্বুদ্বীপের বর্ণনা করা হলো ॥ ৫১–৫২ ॥

দ্বাদশাম্বুনিধাবত্র পৃথক্ ভূমিভৃতঃ স্থিতাঃ ।
ত্রয়স্ত্রয়ো দিশি দিশি স্ফারোর্মিস্থগিতোপলাঃ ॥ ৫৩ ॥

লবণসমুদ্রের পর্বতসমূহ—এই লবণসমুদ্রের মধ্যে পৃথক পৃথকভাবে বারোটি পর্বত অবস্থিত। চার দিকের প্রতিটি দিকে তিনটি করে পর্বত রয়েছে। লবণসমুদ্রের উচ্ছ্বল তরঙ্গে তাদের বৃহৎ শিলাসমূহ আচ্ছাদিত থাকে ॥ ৫৩ ॥

ক্ষারসমুদ্রমধ্যে দ্বাদশং পর্বতানাং স্থিতিকথনম্

মৈনাকশ্চ বলাহশ্চ চক্রনামা চ দক্ষিণে ।
নারদাখ্যো বরাহাখ্যঃ সোমকাখ্যশ্চ পশ্চিমে ॥ ৫৪ ॥

উদগ্ভাগেऽপি চ দ্রোণকঙ্কচন্দ্রা ইতি ত্রয়ঃ ।
ধূম্রকো দুন্দুভিশ্চৈব সার্দ্রকশ্চেতি পূর্বতঃ ॥ ৫৫ ॥

ক্ষারসমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত বারো পর্বতের দিক্‌নির্দেশ—
পূর্বদিকে: ১. ধূম্রক, ২. দুন্দুভি, ৩. আর্দ্রক।
দক্ষিণে: ৪. মৈনাক, ৫. বলাহক, ৬. চক্র।
পশ্চিমে: ৭. নারদ, ৮. বরাহ, ৯. সোমক।
উত্তরে: ১০. দ্রোণ, ১১. কঙ্ক, ১২. চন্দ্র ॥ ৫৪–৫৫ ॥

সহস্রং যোজনানাং তে দীর্ঘাস্তস্যার্ধমুচ্ছ্রিতাঃ ।
মগ্নাস্তদর্ধমম্ভোধৌ বিস্তৃতাশ্চ ধরাধরাঃ ॥ ৫৬ ॥

পর্বতগুলির মান—এই সকল পর্বত দৈর্ঘ্যে এক হাজার যোজন এবং উচ্চতায় তার অর্ধেক অর্থাৎ পাঁচশো যোজন। এর অর্ধাংশ সমুদ্রে নিমজ্জিত থাকে। এইভাবে এই ধরাধর পর্বতসমূহ বিস্তৃত ॥ ৫৬ ॥

জুষ্টাঃ সর্বে সুরৈঃ শৃঙ্গপ্রৌঢ়িলীঢবিহায়সঃ ।
জ্বলিতৌষধয়ঃ কান্তবিচিত্রদ্রুমবীরুধঃ ॥ ৫৭ ॥

ভ্রমরগুঞ্জরিত শিখরবিশিষ্ট এই সকল পর্বতে দেবগণ বিচরণ করেন। এগুলি দীপ্তিমান ঔষধি, সুন্দর ও বিচিত্র বৃক্ষ ও লতায় সমৃদ্ধ ॥ ৫৭ ॥

ভুবনস্য দ্বীপান্তরনিরূপণম্

দ্বীপাঃ শাককুশক্রৌঞ্চশাল্মল্য ইতি চ ক্রমাত্ ।
গোমেদঃ পুষ্করাখ্যশ্চ ষডমী বাহ্যতঃ স্থিতাঃ ॥ ৫৮ ॥

ভুবনের অন্যান্য দ্বীপের নিরূপণ—
১. শাকদ্বীপ, ২. কুশদ্বীপ, ৩. ক্রৌঞ্চদ্বীপ, ৪. শাল্মলী দ্বীপ, ৫. গোমেদ দ্বীপ এবং ৬. পুষ্কর দ্বীপ—এই ছয়টি দ্বীপ ক্রমান্বয়ে (ক্ষারসমুদ্রের) বাইরে অবস্থিত ॥ ৫৮ ॥

ক্ষীরাজ্যদধিমদ্যেক্ষুরসস্বাদ্বম্ভসোর্ণবাঃ
দ্বীপান্ শাকাদিকানেতে পরিবর্য স্থিতাঃ ক্রমাত্ ॥ ৫৯ ॥

এই শাকাদি দ্বীপসমূহকে ক্রমান্বয়ে দুধসমুদ্র, ঘৃতসমুদ্র, দধিসমুদ্র, মদ্যসমুদ্র, ইক্ষুরসসমুদ্র ও মিষ্টিজলসমুদ্র পরিবেষ্টিত করে আছে ॥ ৫৯ ॥

স্বদ্বীপতুল্যাঃ সর্বে তে প্রমাণেন যথাক্রমম্ ।
অমী শাকাদয়ো দ্বীপা জম্বুদ্বীপপ্রমাণতঃ ॥ ৬০ ॥

যথাক্রমং স্যুর্দ্বিগুণাস্তথাম্ভোনিধয়োऽপি চ ।

নিজ নিজ দ্বীপের ন্যায়ই এই সমুদ্রগুলির পরিমাপ। এই ছয়টি দ্বীপ ক্রমান্বয়ে জম্বুদ্বীপের পরিমাপের দ্বিগুণ এবং তাদের সমুদ্রগুলিও অনুরূপভাবে দ্বিগুণ পরিমাপের ॥ ৬০–৬১ ॥

১. শাকদ্বীপস্য বর্ণনম্

শাকে সপ্তাদ্রয়স্তেষূদয়ো জলধরস্তথা ॥ ৬১ ॥
নারকো রৈবতঃ শ্যামো রাজতোऽথাম্বিকেয়কঃ ।
চতুঃসাহস্রিকস্তেষাং বিষ্কম্ভোऽর্ধসমুচ্ছ্রয়ঃ ॥ ৬২ ॥
তদর্ধ ভূপ্রদেশশ্চ
সেবিতানাং সুরর্ষিভিঃ ।
বৃত্তানাং দ্বীপবৎ তেষাং বাহ্যতোऽমূন্যনুক্রমাৎ ॥ ৬৩ ॥
বর্ষাণি সন্নিবিষ্টানি সপ্ত তানি ব্রবীমি তে ।
শাকদ্বীপস্য বর্ষাণি
জলদাখ্যং কুমারং চ সুকুমারং মণীচিকম্ ॥ ৬৪ ॥
কুসুমোত্তরমোদাকীমহাদ্রুমবনানি চ ॥

১. শাকদ্বীপের বর্ণনা—শাকদ্বীপে সাতটি পর্বত রয়েছে—
১. উদয়, ২. জলধর, ৩. নারক, ৪. রৈবত, ৫. শ্যাম, ৬. রাজত এবং ৭. আম্বিকেয়ক।
এদের প্রত্যেকের বিষ্কম্ভ (বিস্তার) চার হাজার যোজন; তার অর্ধেক অর্থাৎ দুই হাজার যোজন উচ্চতা এবং তার অর্ধেক এক হাজার যোজন ভূপ্রদেশ। এই পর্বতসমূহ দেবর্ষিগণের দ্বারা সেবিত। দ্বীপের ন্যায় গোলাকার এই পর্বতগুলির বাইরে ক্রমান্বয়ে সাতটি বর্ষ অবস্থিত—যথা:
১. জলদ, ২. কুমার, ৩. সুকুমার, ৪. মণীচক, ৫. কুসুমোত্তর, ৬. মোদাকী এবং ৭. মহাদ্রুমবন ॥ ৬১–৬৫ ॥

২. কুশদ্বীপস্য বর্ণনম্

কুশে বিদ্রুমহেমাখ্যৌ দ্যুতিমানথ পুষ্পবান্ ॥ ৬৫ ॥
কুশেশয়ো হরিক్ష্মাভৃন্মন্দরশ্চ কুলাচলাঃ ।
বিষ্কম্ভোऽষ্টসহস্রাণি তেষাং প্রত্যেকমীরিতঃ ॥ ৬৬ ॥
তদর্ধমুচ্ছ্রয়স্তদ্বদুচ্ছ্রয়ার্ধমধোগমঃ
কুশদ্বীপস্য বর্ষাণি
উদ্ধিতং বেণুবৎসংজ্ঞং সরালমথ লম্বনম্ ॥ ৬৭ ॥
বর্ষং শ্রীমৎ প্রভাকৃৎচ কপিলং পন্নগাভিধম্ ॥

২. কুশদ্বীপের বর্ণনা—কুশদ্বীপে সাতটি কুলাচল (পর্বত) আছে—
১. বিদ্রুম, ২. হেম, ৩. দ্যুতিমান, ৪. পুষ্পবান, ৫. কুশেশয়, ৬. হরিক্ষ্মাভৃত এবং ৭. মন্দর।
এদের প্রত্যেকের বিষ্কম্ভ আট হাজার যোজন; তার অর্ধেক অর্থাৎ চার হাজার যোজন উচ্চতা এবং তার অর্ধেক অর্থাৎ দুই হাজার যোজন অধোগতি (ভূমিতে নিমজ্জন)। এই দ্বীপের বর্ষগুলির নাম—
১. উদ্ধিত, ২. বেণুবৎ, ৩. সরাল, ৪. লম্বন, ৫. শ্রীমৎ, ৬. প্রভাকৃত, ৭. কপিল এবং ৮. পন্নগ ॥ ৬৫–৬৮ ॥

৩. ক্রৌঞ্চদ্বীপস্য বর্ণনম্

ক্রৌঞ্চে ক্রৌঞ্চোऽন্ধকারশ্চ দেবো গোবিন্দবামনৌ ॥ ৬৮ ॥
দ্বিবিদঃ পুণ্ডরীকশ্চেত্যস্মিন্ সপ্ত কুলাদ্রয়ঃ ।
বিষ্কম্ভোऽযুতমেতেষাং বিষ্কম্ভার্ধ সমুচ্ছ্রয়ঃ ॥ ৬৯ ॥
অধোগতিস্তদর্ধং চ বর্ষাণ্যেষাং তু বাহ্যতঃ ।
ক্রৌঞ্চদ্বীপস্য বর্ষাণি
কুসলাখ্যাষ্টবর্ষাখ্যে
পরাপতমনোনুগে ॥ ৭০ ॥
মুনিবর্ষান্ধকারাখ্যে সপ্তমং দুন্দুভীতি চ ॥

৩. ক্রৌঞ্চদ্বীপের বর্ণনা—ক্রৌঞ্চদ্বীপে সাতটি কুলাচল (মহাপর্বত) রয়েছে—
১. ক্রৌঞ্চ, ২. অন্ধকার, ৩. দেব, ৪. গোবিন্দ, ৫. বামন, ৬. দ্বিবিদ এবং ৭. পুণ্ডরীক।
এদের বিষ্কম্ভ দশ হাজার যোজন; তার অর্ধেক অর্থাৎ পাঁচ হাজার যোজন উচ্চতা এবং তার অর্ধেক অর্থাৎ আড়াই হাজার যোজন অধোগতি। এই কুলাচলগুলির বাইরে এই দ্বীপের সাতটি বর্ষ—
১. কুসলবর্ষ, ২. অষ্টবর্ষ, ৩. পরাপতবর্ষ, ৪. মনোনুগবর্ষ, ৫. মুনিবর্ষ, ৬. অন্ধকারবর্ষ এবং ৭. দুন্দুভিবর্ষ ॥ ৬৮–৭১ ॥

৪. শাল্মলীদ্বীপস্য বর্ণনম্

গিরয়ঃ শাল্মলীদ্বীপে রক্তঃ পীতঃ সিতস্তথা ॥ ৭১ ॥
বৈপুল্যমেষাং
দ্বাত্রিংশত্সহস্রাণি
প্রচক্ষতে ।
বৈপুল্যার্থং
সমুচ্ছ্রয়স্তদর্ধমবনৌ গতিঃ ॥ ৭২ ॥
শাল্মলীদ্বীপস্য বর্ষাণি
বর্ষে শান্তভয়ং বীতভয়ং চেত্যত্র সংস্থিতे ।

৪. শাল্মলীদ্বীপের বর্ণনা—শাল্মলীদ্বীপে তিনটি পর্বত রয়েছে—
১. রক্ত, ২. পীত এবং ৩. সিত।
এদের বিস্তার বত্রিশ হাজার যোজন; তার অর্ধেক অর্থাৎ ষোলো হাজার যোজন উচ্চতা এবং তার অর্ধেক সর্বত্র অধোগতি। এই দ্বীপে মাত্র দুটি বর্ষ—
১. শান্তভয় এবং ২. বীতভয় ॥ ৭১–৭৩ ॥

৫. গোমেদদ্বীপস্য বর্ণনম্

গোমেদে তু সুরশ্চেতি কুমুদশ্চেতি ভূধরৌ ॥ ৭৩ ॥
যোজনানাং চতুঃষষ্টিস্তৌ সহস্রাণি বিস্তৃতৌ ।
উচ্ছ্রয়ো বিস্তরস্যার্ধং তদর্ধং চাপ্যধোগতিঃ ॥ ৭৪ ॥
গোমেদদ্বীপস্য বর্ষাণি
ধাতকীখণ্ডনামাস্য মধ্যে বর্ষমুদীরিতম্ ।

৫. গোমেদদ্বীপের বর্ণনা—গোমেদদ্বীপে দুটি পর্বত—
১. সুর এবং ২. কুমুদ।
এই দুই পর্বতের বিস্তার চৌষট্টি হাজার যোজন; তার অর্ধেক অর্থাৎ বত্রিশ হাজার যোজন উচ্চতা এবং তার অর্ধেক অর্থাৎ ষোলো হাজার যোজন অধোগতি। এর মধ্যভাগে একটি মাত্র বর্ষ, যার নাম ‘ধাতকীখণ্ড’ ॥ ৭৩–৭৪ ॥

৬. পুষ্করদ্বীপস্য বর্ণনম্

অস্যাদ্রিঃ পুষ্করদ্বীপে মানসোত্তরসংজ্ঞিতঃ ॥ ৭৫ ॥

পুষ্করদ্বীপস্য বর্ষকথনম্

বাহ্যতো বর্ষমেতস্য মহাবীতমিতি স্মৃতম্ ।
বিস্তৃতোऽষ্টৌ সহস্রাণি শৈলোऽয়ং দ্বে তথাযুতে ॥ ৭৬ ॥
সহস্রশতমন্যান্যচ্চ
সুরসিদ্ধর্ষিসেবিতঃ ।
ব্যাসার্ধেনোচ্ছ্রয়স্তস্য
তদর্ধেনাপ্যধোগমঃ ॥ ৭৭ ॥

৬. পুষ্করদ্বীপের বর্ণনা—পুষ্করদ্বীপে মানসোত্তর নামে একটি মাত্র পর্বত রয়েছে। এর বাইরে একটি বর্ষ, যার নাম ‘মহাবীত’। এই পর্বতরাজ এক লক্ষ আটাশ হাজার যোজন বিস্তৃত এবং দেব, সিদ্ধ ও ঋষিদের দ্বারা সেবিত। বিস্তারের অর্ধেক তার উচ্চতা—চৌষট্টি হাজার যোজন, এবং তার অর্ধেক অর্থাৎ বত্রিশ হাজার যোজন অধোগতি ॥ ৭৫–৭৭ ॥

সুরেশানাং নগর্যোऽস্মিন্ ময়া বত্স! নিবেশিতাঃ ।
ঐন্দ্রী বস্বোকসারা প্রাগ্ যাম্যা সংযমনী ততঃ ॥ ৭৮ ॥
প্রাচেতসী সুখা পশ্চাৎ তথা সৌম্যোত্তরে বিভা ।
ধর্মরক্ষার্থমেতাসু
চত্বারশ্চতসৃষ্বপি ॥ ৭৯ ॥
তথা লোকব্যবস্থার্থং পৃথগ্ লোকভৃতঃ স্থিতাঃ ।

আমি (বিশ্বকর্মা) এই পর্বতেই ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতাদের নগরসমূহ প্রতিষ্ঠা করেছি।

পঞ্চম অধ্যায়

হে বৎস! ঐ চারটি নগরের নাম এইরূপ—
১. পূর্ব দিকে ইন্দ্রের ‘বস্বোকসারা’ নগরী।
২. দক্ষিণ দিকে যমের ‘সংযমনী’ নামক নগরী।
৩. পশ্চিম দিকে বরুণের ‘সুখা’ নামক নগরী।
৪. উত্তর দিকে কুবেরের ‘বিভা’ নামক নগরী।

ধর্মের রক্ষা ও লোকব্যবস্থার জন্য এই চার দেবনগরীতে চারজন পৃথক পৃথক লোকপাল (অর্থাৎ ইন্দ্র, যম, বরুণ ও কুবের) সদা অবস্থান করেন ॥ ৭৮–৮০ ॥

লোকালোক পর্বতের বর্ণন

লোকালোকাচল মিষ্ট জলসমুদ্রের বাইরে অবস্থিত এবং সেই সমুদ্রের বিস্তারের দ্বিগুণ পরিমাণে বিস্তৃত ॥ ৮০ ॥

মিষ্ট জলসমুদ্রের পরিমাপ অনুযায়ী তার বিস্তারও দ্বিগুণ বলে গণ্য হয়। লোকালোক পর্বতের এইরূপ বিস্তার বলা হয়েছে ॥ ৮০–৮১ ॥

এই পর্বতের উচ্চতা এক লক্ষ নিয়ুত (১০০০০০) যোজন এবং তার অর্ধেক, অর্থাৎ পঞ্চাশ হাজার যোজন নীচে নিমজ্জিত। প্রত্যেক দিকেই এই পর্বতের বিস্তার পাঁচ ক্রোশ ও নয় লক্ষ যোজন। তদ্রূপ মেরুর মধ্যভাগ থেকে তার দূরত্ব অর্ধ নিয়ুত, অর্থাৎ পঞ্চাশ হাজার যোজন ॥ ৮১–৮২ ॥

সূর্যের কিরণে এই পর্বতের অর্ধাংশ দীপ্ত থাকে এবং অর্ধাংশ ভূমির দ্বারা আবৃত থাকে। আবার এর বহির্ভাগে ভূমির আবরণরূপ যে উপাদানগুলি আছে, সেগুলি নীচেও অবস্থিত এবং বাহির দিক থেকেও ভূমির উপরে অবস্থান করে ॥ ৮৩–৮৪ ॥

হে বৎস! এইরূপেই আমি তোমার কাছে পৃথিবীর সমগ্র বিন্যাস বর্ণনা করলাম ॥ ৮৩–৮৫ ॥

সূর্যাদি গ্রহের অবস্থান ও গতি

এবার আমি সূর্য প্রভৃতি গ্রহের অবস্থান ও তাদের গতি বর্ণনা করছি ॥ ৮৫ ॥

বিমর্শ—সূর্যমণ্ডল দ্বারা এই গৃহ (জগৎ) প্রভাবিত হয়, অতএব গ্রহগুলির অবস্থান ও গতি এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সূর্য ও চন্দ্র, ধিষ্ণ্য (সমস্ত নক্ষত্র), জ্ঞ (বুধ), সিত (শুক্র), ভৌম (মঙ্গল), শনৈশ্চর, বৃহস্পতি, সপ্তর্ষি ও ধ্রুব—এরা ক্রমান্বয়ে ভূমির ঊর্ধ্বে অবস্থান করে ॥ ৮৬ ॥

প্রথম চারটি (সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রসমূহ ও বুধ), তারপর দুইটি (শুক্র ও মঙ্গল)—এই ছয়টি গ্রহ ভূমির উপরে সূর্যনন্দন শনৈশ্চর পর্যন্ত একে একে এক লক্ষ যোজন করে ব্যবধানে অবস্থিত ॥ ৮৭ ॥

অন্য যে গ্রহান্তরগুলি অবশিষ্ট থাকে, সেগুলিও ক্রমানুসারে চারটি (শনি, বৃহস্পতি, সপ্তর্ষি ও ধ্রুব) প্রত্যেকটি দুই লক্ষ যোজন পরিমাপের ব্যবধানে বলা হয়েছে ॥ ৮৮ ॥

পৃথিবী ও ধ্রুবের মধ্যবর্তী স্থানে ত্রৈলোক্যের উচ্চতা চৌদ্দ লক্ষ যোজন বলা হয়েছে ॥ ৮৯ ॥

ধ্রুবের ঊর্ধ্বে ক্রমান্বয়ে মহর্লোক এক কোটি, জনলোক দুই কোটি, তপোলোক চার কোটি এবং সত্যলোক আট কোটি যোজন ব্যবধানে অবস্থিত ॥ ১০ ॥

যে অঞ্চল অণ্ডকপর্দের নীচে এবং সত্যলোকের উপরে অবস্থিত, তার ব্যবধান এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ যোজন বলে জানতে হবে ॥ ৯৯ ॥

সপ্ত বায়ুর অবস্থান বর্ণন

এবার এই জগতের যে আবরণযোগ ব্রহ্মার দ্বারা বিধৃত হয়েছে, তা আমি তোমাকে বলছি। যেমন নীচে ও তির্যক দিকে, তেমনি ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্ব দিকেও সেই ব্যবস্থা রয়েছে ॥ ৯২ ॥

বহ বায়ুতে মেঘ, প্রবহ বায়ুতে সূর্য, উদ্বহ বায়ুতে চন্দ্র, সংবহ বায়ুতে নক্ষত্র, আবহ বায়ুতে গ্রহ, পরিবহ বায়ুতে সপ্তর্ষি এবং পরাবহ বায়ুতে ধ্রুব অবস্থান করে ॥ ৯৩ ॥

এই সাতটি বায়ু প্রদক্ষিণক্রমে এই সমস্ত গ্রহাদি ও নক্ষত্রকে ঘোরাতে থাকে ॥ ৯৪ ॥

কিন্তু এদের মধ্যস্থানে সুমেরু পর্বতে মেঘীভূত অবস্থায় ধ্রুব স্থির থাকে, অর্থাৎ ধ্রুব ঘোরে না। এইভাবে এই ধ্রুবলোকের সঙ্গে আবদ্ধ সমগ্র জ্যোতিষ্চক্র (গ্রহ, নক্ষত্র, তারা প্রভৃতি) আবর্তিত হয় ॥ ৯৫ ॥

সূর্যের গতি

সপ্ত অশ্বযুক্ত একচক্র রথে আরূঢ় রথীদের শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষ্পতি সূর্য সদা পরিভ্রমণ করেন ॥ ৯৬ ॥

সূর্য কেতুমাল বর্ষে উদিত হন এবং কুরু বর্ষে অস্ত যান ॥ ৯৬–৯৭ ॥

বিমর্শ—সূর্যের নামগুলির মধ্যে ‘জ্যোতিষাং পতিঃ’ নামটিও এসেছে।
‘সূর্যসূর্যমাদিত্য … জ্যোতিষাং পতিরপ্পতিঃ’—ইত্যমরঃ।

মধ্যন্দিনং চ ভদ্রাশ্বে (ষ্টদ্র?স্তং গ)চ্ছন্ ভারতে রবিঃ ॥ ১৭ ॥

রসাব্ধিপক্ষসংখ্যানি যোজনানি নিমেষতঃ।
সপ্তবিংশতিকাং চাষ্টৌ ভাগান্ সর্পত্যহর্পতিঃ ॥ ৯৮ ॥

যোজনান্য(দ্বিনন্দর্‌নু? ব্ধিনন্দর্তু) গুণসংখ্যানি কাষ্ঠয়া।
নবাংশকচতুষ্কং চ ক্রামত্যহিমদীধিতিঃ ॥ ৯৯ ॥

বহ্ন্যগ্নিবসুখেন্দ্রক্ষ্মাসংখ্যাতান্যব্জিনীপতিঃ।
যোজনস্য ত্রিভাগং চ প্রয়াতি কলয়ৈকয়া ॥ ১০০ ॥

বিয়ত্তব্যম ভোম ভূতাশ্বিগুণপাবকসংখ্যয়া
যোজনান্যুষ্ণকিরণো
মুহূর্তেন
প্রসর্পতি ॥ ১০১ ॥

দিনের মধ্যভাগে ভদ্রাশ্ব বর্ষে অস্তগমন করতে করতে সূর্য ভারতবর্ষে এক নিমেষে ২৪৬–৮/২৭ যোজন, এক কাষ্ঠায় ৩৬৯৪–৪/৯ যোজন, এক কলায় ১১০৮৩৩–১/৩ যোজন এবং এক মুহূর্তে ৩৩২৫০০০ যোজন বেগে গমন করেন ॥ ৯৭–১০১ ॥

রাত্র্যহরেণ সহস্রাণি পঞ্চাশন্নবকোটয়ঃ।
লক্ষাণি সপ্তনবতির্গতিঃ স্যাত্ তিগ্মরোভিষঃ ॥ ১০২ ॥

অহোরাত্রে সূর্যের গতি—এইরূপে রাত্রি ও দিবস মিলিয়ে সূর্যের গতি নয় কোটি সাতানব্বই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার যোজন হয় ॥ ১০২ ॥

মধ্যেন পুষ্করদ্বীপস্যার্কো গত্যানয়া ব্রজৎ।
নভস্তলেন
পুনরপ্যুদয়াদুদয়ং শ্রয়েত্ ॥ ১০৩ ॥

ইত্যং গতিরিয়ং সম্যক্ তিগ্মভানোর্নিরূপিতা।

পুষ্করদ্বীপের মধ্য দিয়ে এই গতি অনুসারে চলতে চলতে সূর্যদেব আকাশপথে পুনরায় উদয়াচল থেকে অস্তাচলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এইভাবে সূর্যের এই গতি যথাযথভাবে নিরূপিত হয়েছে ॥ ১০৩–১০৪ ॥

গতিং চন্দ্রগ্রহার্ক্ষাণাং ভোগং চার্কাদ্ বিভাবয়েত্ ॥ ১০৪ ॥

এখন চন্দ্র, গ্রহসমূহ ও নক্ষত্রদের গতি এবং তাদের ভোগ সূর্যের গতি ও ভোগের সঙ্গে তুলনা করে বুঝে নেওয়া উচিত ॥ ১০৪ ॥

প্রোক্তং তবেত্যহোরাত্রপ্রমাণমধুনা নঘ।
পক্ষমাসর্তুবর্ষাদীন্ ব্যবহারায় কল্পয়েত্ ॥ ১০৫ ॥

হে নিষ্পাপ! তোমার জন্য এখানে অহোরাত্র (দিন ও রাত্রি)-এর পরিমাপ বলা হয়েছে। শুক্ল ও কৃষ্ণ পক্ষ, মাস, ঋতু এবং সম্পূর্ণ বর্ষ—এই সকলের পরিমাপ ব্যবহারিক দৃষ্টিতে এখান থেকেই কল্পিত ও সংযোজিত হয় ॥ ১০৫ ॥

ইতি নিগদিত এষ দ্বীপশৈলাম্বুধীনা-
মবনিবলয়বর্তী কাত্স্ন্যতঃ সন্নিবেশঃ।
গতিরপি দিনভর্তুঃ কীর্তিতা বিশ্বমানং
পুনরিহ যুগধর্মং কীর্ত্যমানং নিবোধ ॥ ১০৬ ॥

শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেববিরচিত সমরাঙ্গণসূত্রধার অপরনাম্নি
বাস্তুশাস্ত্রে ভুবনকোশঃ পঞ্চমোऽধ্যায়ঃ ॥ ৫ ॥

এইভাবে দ্বীপ, পর্বত ও সমুদ্রসমূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত এই ভুবনকোশের সম্পূর্ণ বিন্যাস এখানে বর্ণিত হয়েছে এবং দিবসের ধারক সূর্যের গতি ও বিশ্বমানও কীর্তিত হয়েছে। এখন এই বাস্তুশাস্ত্রে যুগধর্মও জানা প্রয়োজন, অতএব সেটিও এখানে বলা হল ॥ ১০৬ ॥

।। এইরূপে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেববিরচিত সমরাঙ্গণ-সূত্রধার অপরনাম বাস্তুশাস্ত্রের ‘ভুবনকোশ’ নামক পঞ্চম অধ্যায়ের মহাকবি পং রামকুবের মালবীয়ের দ্বিতীয় আত্মজ ড. সুধাকর মালবীয় কৃত ‘সরলা’ হিন্দি সম্পূর্ণ হল ॥ ৫ ॥

অথ ষষ্ঠোऽধ্যায়ঃ
সহদেবাধিকারঃ :
(Gods Equivalency)

অথ প্রাক্কথিতাদস্মাদ্ ভূতসর্গাদনন্তরম্ ।
প্রজাসীদমরৈঃ সার্ধমিয়ং পূর্ণজনাকুলা ॥ ১ ॥

পূর্বে বর্ণিত এই পঞ্চমহাভূতের সৃষ্টি সমাপ্ত হওয়ার পর, দেবতাদের সঙ্গে এই মানবপ্রজা সকল জনসমূহে পরিপূর্ণ হয়ে একত্রে বসবাস করত ॥ ১ ॥

কৃতযুগে মনুষ্যাণামত্যুকৃষ্টা স্থিতিঃ
শোকব্যাধিজরাতঙ্কবিমুক্তাস্ত্রিদশা ইব।
পুরাভবন্ কৃতযুগে পুমাংসঃ স্থিরযৌবনাঃ ॥ ২ ॥

কৃতযুগে মানুষের অবস্থা ছিল অত্যন্ত উৎকৃষ্ট। সেই কৃতযুগে মানুষ দেবতাদের ন্যায় শোক, ব্যাধি, জরা ও আতঙ্ক থেকে মুক্ত ছিল এবং তারা স্থির যৌবনসম্পন্ন—অর্থাৎ সদা যুবক—থাকত ॥ ২ ॥

তে নিকুঞ্জেষু শৈলানাং নদীষু চ সরস্সু চ ।
বনেষু চ বিচিত্রেষু চিক্রীদুর্দৈবতৈঃ সহ ॥ ৩ ॥

তারা পর্বতের কুঞ্জে, নদীতে, সরোবরসমূহে এবং বিচিত্র বনাঞ্চলে দেবতাদের সঙ্গে ক্রীড়া করত ॥ ৩ ॥

হেলয়া তে সমুত্পত্য কদাচিদমরৈঃ সহ ।
নিরর্গলাঃ সমাসাদ্য স্বর্গ্বিচেরুঃ সুরা ইব ॥ ৪ ॥

একবার তারা হাস্যরসের মধ্যেই দেবতাদের সঙ্গে উড়ে স্বর্গে পৌঁছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতায় দেবতাদের ন্যায় বিচরণ করতে লাগল ॥ ৪ ॥

চিত্রাম্বরাবৃতাঃ সর্বে নানাভরণশালিনঃ ।
বিমানাকৃতয়স্তেষামাসন্ কল্পদ্রুমাঃ দ্রুমাঃ ॥ ৫ ॥

সকলেই বিচিত্র বস্ত্র পরিধানকারী ও নানা অলংকারে ভূষিত ছিলেন। তাদের নিবাস ছিল বিমানের আকৃতির এবং প্রয়োজন পূরণের জন্য কল্পদ্রুম বৃক্ষ বিদ্যমান ছিল ॥ ৫ ॥

মনোজ্ঞাভিঃ সহ স্ত্রীভির্বিচিত্রাভরণশ্রিয়ঃ ।
কল্পদ্রুমেষ্বকার্ষুস্তে বাসং ক্রীডাং চ তেষ্বথ ॥ ৬ ॥

সুন্দরী স্ত্রীদের সঙ্গে, বিচিত্র অলংকারে শোভিত হয়ে তারা কল্পদ্রুমের নিকট বাস করত ও ক্রীড়া করত ॥ ৬ ॥

ক্ষুত্তৃঙ্দুঃখোজ্ঝিতাঃ সর্বে বভূবুরযুতায়ুষঃ ।
রত্নাবদাতদেহাস্তে কদাচিত্ ভুরসাশিনঃ ॥ ৭ ॥

ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে তারা দশ হাজার বছর আয়ু লাভ করেছিল। তাদের দেহ রত্নের ন্যায় দীপ্তিময় ছিল এবং তারা কখনো কখনো ভুরস (ইক্ষুরস) পান করত ॥ ৭ ॥

রতিপ্রায়াস্তদাসংস্তে স্বেচ্ছাহারবিহারিণঃ ।
স্বীকারবিগ্রহচ্ছেদবিশদীকৃতচেতসঃ ॥ ৮ ॥

ইক্ষুরস পান করে তারা অত্যন্ত কামপ্রবণ হয়ে উঠেছিল এবং স্বেচ্ছায় আহার-বিহার করত। কখনো তারা সৌম্য, কখনো ক্রোধপূর্ণ রূপ ধারণ করত এবং অন্যদের থেকে পৃথক হয়ে উচ্ছৃঙ্খল স্বাধীনতা অনুভব করত ॥ ৮ ॥

নাস্মিনর্কস্তপত্যুগ্রং ন বাতি প্রভলোऽনিলঃ ।
নীহারচ্ছেদসুন্দর্যো নিশাঃ পূর্ণেন্দুভূষণাঃ ॥ ৯ ॥
ভিন্নস্নিগ্ধাঞ্জনশ্যামাঃ সতডিন্মন্দ্রনিস্বনাঃ ।
অচণ্ডাশনয়শ্চাসন্ কবরীকান্তয়ো ঘনাঃ ॥ ১০ ॥

সেখানে সূর্যের উগ্র তাপ ছিল না, প্রবল বায়ুও বইত না। রাত্রিগুলি পূর্ণচন্দ্রে ভূষিত হয়ে সদা সুন্দর ও কুয়াশামুক্ত থাকত। মেঘগুলি ছিল মসৃণ অঞ্জনের ন্যায় শ্যাম, বিদ্যুৎসহ ও মৃদু গম্ভীর গর্জনকারী, এবং তাদের কান্তি ছিল কবরী গাভীর ন্যায় মনোহর ॥ ৯–১০ ॥

মাদ্যত্পিকবধূদৃষ্টমাকন্দমুকুরাঙ্গুরাঃ ।
আসন্ সদাপুষ্পফলাভোগা যেষাং বনালয়াঃ ॥ ১১ ॥

উন্মত্ত কোকিলবধূর দৃষ্টিতে স্পর্শিত আম্রবৃক্ষের মুকুল ও অঙ্কুর সদা পুষ্প ও ফল প্রদান করত; যাদের বনালয় ছিল সর্বদা পুষ্প-ফলসমৃদ্ধ ॥ ১১ ॥

একোऽগ্রজন্মা বর্ণোऽস্মিন্ বেদোऽভূদেক এব চ।
ঋতুর্বসন্ত এবৈকঃ কুসুমায়ুধবান্ধবঃ ॥ ১২ ॥

এখানে একমাত্র ব্রাহ্মণ বর্ণই ছিল। বেদও একটিই—ঋগ্বেদ। ঋতুদের মধ্যে কেবল বসন্তই বিদ্যমান ছিল, যা কুসুমায়ুধ কামদেবের বন্ধু ॥ ১২ ॥

রূপশ্রুতসুখৈশ্বর্যভাজস্তে নিখিলা অপি ।
সমত্বান্নাভবৎ তেষামুত্তমাধমমধ্যমাঃ ॥ ১৩ ॥

সেখানে সকলেই রূপ, শাস্ত্রজ্ঞান, সুখ ও ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ ছিল। সমতার কারণে কারো মধ্যে উত্তম, মধ্যম বা অধম ভেদ ছিল না ॥ ১৩ ॥

ন খেটনগরগ্রামপুরক্ষেত্রখলাদিকম্ ।
ন দংশমশকক্রব্যাদ্ভয়ং বা ন গ্রহাদি চ ॥ ১৪ ॥
কল্পদ্রুমাপ্তভোগানাং ন তেষাং প্রভুরপ্যভূৎ ।

সেখানে খেট, নগর, গ্রাম, পুর, ক্ষেত্র বা খল ইত্যাদির কোনো ধারণাই ছিল না। দংশনকারী প্রাণী, মশা, রাক্ষস বা গ্রহ-নক্ষত্রজনিত কোনো ভয়ও ছিল না। কল্পদ্রুম থেকে প্রাপ্ত ভোগে সমৃদ্ধ হলেও তাদের কোনো প্রভু ছিল না—অর্থাৎ রাজা ও প্রজার কোনো ব্যবস্থা ছিল না ॥ ১৪–১৫ ॥

পুরাস্মিন্ ভারতেবর্ষে তেষাং নিবসতামিতি ॥ ১৫ ॥
জগাম সুবহুঃ কালঃ সুরৈঃ সার্ধং সুরশ্রিয়াম্ ।

এইভাবে প্রাচীন কালে এই ভারতবর্ষে দেবতাদের সঙ্গে ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ হয়ে তারা দীর্ঘকাল বসবাস করেছিল ॥ ১৫–১৬ ॥

কালান্তরে ক্রমশস্তস্যা অপকর্ষে হেতুঃ
অজ্ঞাততৎপ্রভাবানাং সহসংবাদসম্ভবা ॥ ১৬ ॥
অথৈষামভবদ্ দৈবাদবজ্ঞা ত্রিদশান্ প্রতি ।
অপূজ্যমানাস্তে পূজ্যাঃ সর্বেঽপ্যখিলবেদিনঃ ॥ ১৭ ॥

কালের প্রবাহে মানবদের অবক্ষয়ের কারণ ঘটল। দেবতাদের প্রভাব না জেনেও তাদের সঙ্গে সহবাসের ফলে বিধিবশত দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা হ্রাস পেতে লাগল। সকল জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও পূজ্য দেবতারা আর তাদের দ্বারা সম্মানিত রইলেন না ॥ ১৬–১৭ ॥

আদায় তৎকল্পতরুং নিপেতুর্দ্যা দিবৌকসঃ ।
দিবং গমনশক্তিশ্চ দিব্যো ভাবশ্চ তদ্গতঃ ॥ ১৮ ॥

অতঃপর দেবতারা সেই কল্পতরু স্বর্গে নিয়ে স্থাপন করলেন। এর ফলে মর্ত্যদের স্বর্গগমনের শক্তি ও তাদের দিব্যভাব লুপ্ত হয়ে গেল ॥ ১৮ ॥

সরসঃ পরমো ভূমৌ ভুরসশ্চ ন্যবর্তত ।
স্মৃত্বা কল্পদ্রুমাংস্তাংস্তান্ ক্রীডাস্তাশ্চ সুরৈঃ সহ ॥ ১৯ ॥
ব্যলপন্ বহুধাত্যর্থমনর্থকৃতচেতসঃ ॥ ২০ ॥

সেই শ্রেষ্ঠ ও সরস ভুরস ভূমিতে ফিরে এল। কল্পদ্রুম ও দেবতাদের সঙ্গে করা ক্রীড়ার স্মরণে মানুষ অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বিলাপ করতে লাগল এবং নিজেদের অবজ্ঞাজনিত অনর্থ স্মরণ করল ॥ ১৯–২০ ॥

চ্যুতপ্রভাবানাং তেষাং তাদাত্মিকী বৃত্তিঃ
ততো বিলপতাং ভুরি স্বৈরমাহারহেতবে ॥ ২০ ॥
প্রাণত্রাণার্থমেতেষামভূৎ পর্পটকো ভূবি।
ভুরসেনৈব তেনৈতে কুর্বাণাঃ প্রাণরক্ষণম্ ॥ ২১ ॥
বিনা কল্পদ্রুমৈর্বাসমন্যান্যবৃক্ষেষু চক্রিরে ।

দিব্যপ্রভাবচ্যুত মানুষদের জীবিকা তখন এইরূপ হল—তাদের বিলাপের পর জীবরক্ষার জন্য আহারের উদ্দেশ্যে ভূমিতে পর্পটক বৃক্ষের উৎপত্তি হল। সেই ভুরস দ্বারাই তারা প্রাণরক্ষা করত এবং কল্পদ্রুমের অভাবে অন্যান্য বৃক্ষে বাস করতে লাগল ॥ ২০–২২ ॥

অথৈষাং পশ্যতামেব কদাচিদ্ভাগ্যসংক্ষয়াত্ ॥ ২২ ॥
বিপর্যয়াচ্চ কালস্য ভূমেঃ পর্পটকোऽপ্যগাত্ ।

পরবর্তীকালে দুর্ভাগ্য ও কালের বিপর্যয়ে তাদের চোখের সামনেই পর্পটক বৃক্ষও ভূমি থেকে লুপ্ত হয়ে গেল ॥ ২২–২৩ ॥

ততঃ পর্পটকে নষ্ট তুষশূককণোজ্ঝিতাঃ ॥ ২৩ ॥

অকৃষ্টপচ্যা মেদিন্যামভবঞ্ শালিতণ্ডুলাঃ ।

পರ್ಪটক (পাকড়) বৃক্ষের বিলুপ্তির পর, বিনা চাষে—অর্থাৎ জমি না জুতেই ও বীজ না বুনেই—পৃথিবীতে আপনাআপনি শালিধান্য তণ্ডুল, অর্থাৎ সাঁওয়া ধানের চাল উৎপন্ন হতে লাগল ॥ ২৩–২৪ ॥

শাল্যোদনেন তেনাথ সুস্বাদু ব্যঞ্জনেন তে ॥ ২৪ ॥
পরমাং তৃপ্তিমাসেদুঃ পরিতোষাত্তচেতসঃ ।

এই সাঁওয়া ভাত ও সুস্বাদু ব্যঞ্জন আহার করে তারা গভীর সন্তোষসহ পরম তৃপ্তি অনুভব করল ॥ ২৪–২৫ ॥

তন্নাশশঙ্কয়া
শালিতণ্ডুলানাং দ্রুমেষ্বধঃ ॥ ২৫ ॥
তে ব্যধুর্মহতো রাশীংস্তৎক্ষেত্রাণি চ চক্রিরে ।

এই সাঁওয়া চালটিও কোথাও নষ্ট হয়ে যাবে—এই আশঙ্কায় তারা বৃক্ষের নীচে সাঁওয়া চালের বড় বড় স্তূপ করল এবং চাষের জন্য ক্ষেতও তৈরি করল ॥ ২৫–২৬ ॥

ক্রমেণ রাগলোভাদীনামুৎপত্ত্যা তেষাং মিথুনীভাবেনাবস্থানম্
অজায়ত ততো লোভো মাত্সর্যেয়র্ষ্যাপুরস্সরঃ ॥ ২৬ ॥
তত্র তত্র শনৈশ্চক্রে পদন্যাসং চ মন্মথঃ ।
দ্বন্দ্বপ্রাপ্ত্যা ততস্তেষাং বিভ্রতামুত্তমাং গতিম্ ॥ ২৭ ॥
ধৈর্যধ্বংসাদভূৎ স্ত্রীষু ভৃশং রাগতুরঙ্গমঃ ।

ক্রমে রাগ ও লোভের উৎপত্তিতে তাদের মধ্যে মিথুনীভাব (স্ত্রী-পুরুষ যুগলতা) জন্ম নিল। মাত্সর্য ও ঈর্ষাসহ লোভ বৃদ্ধি পেল; ধীরে ধীরে কামদেব সর্বত্র পদচারণা করল। দ্বন্দ্বপ্রাপ্তির ফলে যারা পূর্বে উত্তম গতিতে অবস্থান করত, তাদের ধৈর্য নষ্ট হল এবং স্ত্রীর প্রতি প্রবল রতি (আসক্তি) জন্ম নিল ॥ ২৬–২৮ ॥

দারক্ষেত্রনিমিত্তানি
ভূয়াংস্যেষামনন্তরম্ ॥ ২৮ ॥
পরিক্লেশৌকমূলানি দ্বন্দ্বান্যাসন্ পৃথক্পৃথক্ ।

এরপর স্ত্রী-আসক্তি ও নানা ক্লেশের মূলস্বরূপ দ্বন্দ্বের কারণে তাদের পৃথক পৃথক মিথুন গঠিত হল ॥ ২৮–২৯ ॥

তৎকালিকী লোকস্থিতিঃ :
ততঃ
স্বক্লৃপ্তমর্যাদোচ্ছেদিষ্বেষ্বজিতাত্মসু ॥ ২৯ ॥
অবিনীতেষ্বভাগ্যেষু স শালিস্তুষতামগাত্।

তৎকালীন দুর্ভাগ্যপূর্ণ লোকস্থিতি—নিজেদের স্থির করা মর্যাদা লঙ্ঘনকারী, আত্মসংযমহীন ও অবিনীত দুর্ভাগ্যগ্রস্তদের ক্ষেত্রে সেই সাঁওয়া ধানও শুকিয়ে গেল; অর্থাৎ তাতে ভূসি জন্ম নিল ॥ ২৯–৩০ ॥

প্রবৃদ্ধরজসাং তেষাং সা পুণ্যশ্লোকতা গতা ॥ ৩০ ॥
মলপ্রবৃত্তিরভবৎ
তুষধান্যোপসেবয়া ।

রজোগুণ বৃদ্ধির ফলে তাদের পুণ্যশ্লোকতা লুপ্ত হল। ভূসি-যুক্ত ধান্য ভক্ষণে মলপ্রবৃত্তি—অর্থাৎ পায়খানার প্রবণতা—উদ্ভূত হল ॥ ৩০–৩১ ॥

তুষধান্যে ততো নষ্টে পরিবুক্তে চ সঞ্চয়ে ॥ ৩১ ॥
চীরবল্কলবস্ত্রাণাং কন্দমূলফলাশিনাম্ ।
ঋতবঃ কালপর্যাসাৎ ষড্ বসন্তাদয়োऽভবন্ ॥ ৩২ ॥

পরে ভূসি-ধান্যও নষ্ট হয়ে গেল এবং সঞ্চিত ধান্য ভোগে শেষ হয়ে গেলে তাদের দুরবস্থা হল। চীর ও বল্কল বস্ত্রধারী, কন্দ-মূল-ফলভোজী মানুষের জন্য কালপরিবর্তনে একমাত্র বসন্তের স্থানে ছয় ঋতুর উদ্ভব হল ॥ ৩১–৩২ ॥

ততস্তেষামভূদ্ দোষরোগশোকাকুলং বপুঃ ।
মনশ্চ কামক্রোধের্ষ্যাদিন্যাসূয়াদিদূষিতম্ ॥ ৩৩ ॥

এরপর তাদের দেহ নানা দোষ, রোগ ও শোকে আচ্ছন্ন হল; মনও কাম, ক্রোধ, ঈর্ষা, দীনতা ও ঘৃণা প্রভৃতিতে কলুষিত হল ॥ ৩৩ ॥

আধিদৈবিকমুষ্ণাম্বুশীতাদিজনিতং
মহৎ
আধিভৌতিকমপ্যাসীদ্ দুঃখং ব্যালমৃগাদিজম্ ॥ ৩৪ ॥

গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত প্রভৃতি থেকে সৃষ্ট মহৎ আধিদৈবিক দুঃখ এবং সাপ, পশু প্রভৃতি থেকে আগত আধিভৌতিক দুঃখও উপস্থিত হল ॥ ৩৪ ॥

হিমানিলাদিবারণাদ্যর্থে তেষাং গৃহাপেক্ষা
ইত্যং দুঃখত্রয়ার্তাস্তে ব্যবায়াদ্যভিগুপ্তয়ে ।
হিমনীহারশীতাম্বুবাতাদ্যপচ্ছিদেঽপি চ ॥ ৩৫ ॥
অজাতপ্রীতয়ো বৃক্ষৈঃ কুট্টীমানি গৃহাণি চ ।
ব্যধুশ্ছিত্বাশ্মভির্বৃক্ষানন্যান্ দুঃখার্তচেতসঃ ॥ ৩৬ ॥

শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা থেকে রক্ষার জন্য গৃহের প্রয়োজন দেখা দিল। এই তিন প্রকার দুঃখে পীড়িত গৃহস্থেরা নিজেদের গোপন আচরণ আড়াল করতে এবং শীতল বায়ু, কুয়াশা, ঠান্ডা জল, বৃষ্টি ও ঝড় থেকে বাঁচতে বৃক্ষে বাসে বিরক্ত হয়ে পাথর ও বৃক্ষ কেটে কুট্টীম গৃহ (ঝুপড়ি) নির্মাণ করতে লাগল ॥ ৩৫–৩৬ ॥

গৃহনির্মাণায় তৈরুপাতঃ প্রথমোপায়শ্চ
স্মৃত্বা কল্পদ্রুমাকারান্স্তদ্রূপাণি গৃহাণি তে ।
একদ্বিত্রিচতুঃ সপ্তদশশালানি
চক্রিরে ॥ ৩৭ ॥
তৃণাদিভিঃ ।
হৃষ্টাস্তেষ্বনয়ন্
কালমাপ্তেষু গৃহমেধিনঃ ॥ ৩৮ ॥

গৃহনির্মাণে তারা প্রথম উপায় হিসেবে স্বর্গস্থ কল্পদ্রুমের আকার স্মরণ করে সেই রূপে একশাল, দ্বিশাল, ত্রিশাল, চতুঃশাল ও সপ্তশাল—এমনকি দশশাল গৃহ নির্মাণ করল। তৃণাদি দ্বারা প্রাকার ও পরিখা আচ্ছাদিত করে গৃহমেধীরা আনন্দসহ সেখানে কালযাপন করতে লাগল ॥ ৩৭–৩৮ ॥

ইত্যমীষু গৃহিণো গৃহেষু তে শীতবাতজলতাপনাশিষু ।
হর্ষসংবলিতমানসাশ্চিরং সন্নিরস্তবিপদোऽবসন্ সুখম্ ॥ ৩৯ ॥

এইভাবে শীত, বাতাস, জল ও গ্রীষ্মের তাপ নিবারণকারী গৃহে বসবাস করে তারা হর্ষপূর্ণ মনে দীর্ঘকাল বিপদমুক্ত হয়ে সুখে জীবনযাপন করল ॥ ৩৯ ॥

শ্রীমন্মহারাজাধিরাজশ্রীভোজদেববিরচিতসমরাঙ্গণসূত্রধারাপরনাম্নিবাস্তুশাস্ত্রে
সহদেবাধিকারঃ ষষ্ঠোऽধ্যায়ঃ ॥ ৬ ॥

এইরূপে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেব বিরচিত সমরাঙ্গণসূত্রধার অপরনাম বাস্তুশাস্ত্র-এর ‘সহদেবাধিকার’ নামক ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত হল ॥ ৬ ॥

এইভাবে শীত, বায়ু, বর্ষা ও গ্রীষ্মের তাপ থেকে রক্ষাকারী সেই গৃহসমূহে প্রজারা বাস করতে লাগল এবং হর্ষ ও প্রসন্নচিত্তে দুঃখমুক্ত হয়ে দীর্ঘকাল সুখে জীবন অতিবাহিত করল ॥ ৩৯ ॥

।। এইরূপে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেববিরচিত সমরাঙ্গণ-সূত্রধার-অপরনাম-বাস্তুশাস্ত্রের ‘সহদেবাধিকার’ নামক ষষ্ঠ অধ্যায় মহাকবি পং০ রামকুবের মালবীয়ের দ্বিতীয় আত্মজ ড০ সুধাকর মালবীয় কৃত ‘সরলা’ হিন্দি সম্পূর্ণ হল ॥ ৬ ॥

অথ সপ্তমোऽধ্যায়ঃ
বর্ণাশ্রমপ্রবিভাগঃ
(The Division of the Four Orders of Society and Four Stages of Life)

অথামরগণৈঃ সার্ধমাজগাম পিতামহঃ ।
দুঃখচ্ছেদায় মর্ত্যানামাদায় নৃপতি पृथুম্ ॥ ১ ॥

এরপর দেবতাদের সঙ্গে পিতামহ ব্রহ্মা, মর্ত্যদের দুঃখচ্ছেদের উদ্দেশ্যে নৃপতি পৃথিবাজকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন ॥ ১ ॥

অথৈবং দুঃখাভিভূতানাং লোকানামনুগ্রহায়াদিরাজস্য পৃথিবোরভিষেকঃ
স তানূচে প্রভুর্বোऽসৌ মরুতামিব বাসবঃ ।
দণ্ডধারী চ দুষ্টানাং প্রভাবে লোকপালবৎ ॥ ২ ॥

দুঃখে পীড়িত লোকসমূহের অনুগ্রহের জন্য আদিরাজ পৃথিবাজের অভিষেক উপলক্ষে ব্রহ্মা তাদের বললেন—এই পৃথিবাজ আপনাদের প্রভু হবেন, যেমন দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্র। দুষ্টদের জন্য তিনি দণ্ডধারী হবেন এবং প্রভাবে লোকপালদের ন্যায় হবেন ॥ ২ ॥

প্রতাপতাপিতারাতিসিংহঃ সিংহপরাক্রমঃ ।
যুষ্মাকমাধিপত্যেऽসাবভিষিক্তো ময়া পৃথিবুঃ ॥ ৩ ॥

নিজ প্রতাপে শত্রুদের দগ্ধকারী, সিংহের ন্যায় পরাক্রমশালী এই পৃথিবাজকে আপনাদের আধিপত্যের জন্য আমি অভিষিক্ত করেছি ॥ ৩ ॥

রক্ষাকৃত্ সর্বশিষ্টানামুচ্ছেত্তা দুষ্টচেতসাম্ ।
বৃত্তিতো ভীতিহর্তা চ ভবিষ্যত্যেষ বো নৃপঃ ॥ ৪ ॥

তিনি সকল সজ্জনের রক্ষক হবেন এবং দুষ্টচিত্তদের বিনাশ করবেন। জীবিকার ভয় দূর করবেন—এইরূপে তিনি আপনাদের রাজা হবেন ॥ ৪ ॥

ভবদ্ধিরেতদায়ত্তৈর্ভবিতব্যং মমাজ্ঞয়া ।
করিষ্যত্যেষ বো নীত্যা চাতুর্বর্ণ্যাশ্রমস্থিতীঃ ॥ ৫ ॥

আমার আজ্ঞায় আপনারা তাঁর অধীনে থাকবেন এবং এই মহারাজ নীতির দ্বারা চার বর্ণ ও চার আশ্রমের যথাযথ ব্যবস্থা করবেন ॥ ৫ ॥

পৃথু প্রতি নরাণাং দুঃখাপनोদনার্থং প্রার্থনা
উক্ত্বেতি ব্রহ্মণি গতে নাথমাসাদ্য তেঽথ তম্ ।
অবোচন্ দুঃখিতা দুঃখাদস্মাত্ ত্রায়স্ব নঃ প্রভো! ॥ ৬ ॥

এই কথা বলে ব্রহ্মা চলে গেলে, প্রজারা আশ্রয়দাতা হিসেবে পৃথিবাজকে পেয়ে বলল—হে প্রভু! আমরা সংসারদুঃখে অত্যন্ত কাতর; এই দুঃখ থেকে আমাদের রক্ষা করুন ॥ ৬ ॥

কল্পদ্রুমামরত্যক্তান্ দ্বন্দ্বার্তিক্লান্তচেতসঃ ।
ব্যসনার্ণবনির্মগ্নান্ পাহি নঃ পৃথিবীপতে ॥ ৭ ॥

হে পৃথিবীপতি! (আমাদের অবহেলার ফলে) দেবতারা কল্পদ্রুম প্রত্যাহার করেছেন। অন্তর্দ্বন্দ্বের ক্লেশে আমাদের চিত্ত ক্লান্ত; ইন্দ্রিয়ব্যসনের মহাসাগরে আমরা নিমজ্জিত—আমাদের রক্ষা করুন ॥ ৭ ॥

অথো পৃথিবুরুবাচৈতান্ মা ভৈষ্ট সুখমাস্যতাম্ ।
দুঃখান্যপহরিষ্যামি করিষ্যে চ সুখানি বঃ ॥ ৮ ॥

তাদের প্রার্থনা শুনে মহারাজ পৃথিবাজ বললেন—ভয় করো না, সুখে থাকো। আমি তোমাদের দুঃখ অপসারণ করব এবং সুখের উপায় সৃষ্টি করব ॥ ৮ ॥

পৃথুণা কৃতো বর্ণবিভাগস্তদ্ধর্মাশ্চ

ততঃ স চতুরো বর্ণানাশ্রমাংশ্চ ব্যভাজয়ত্ ।
তেষু যে বেদনিরতাঃ স্বাচারাঃ সংযতেন্দ্রিয়াঃ ॥ ৯ ॥
সূর্যশ্চাবদাতাশ্চ ব্রাহ্মণাস্তেऽভবংস্তদা ।

এরপর শাসন ও শৃঙ্খলার জন্য পৃথিবাজ প্রজাদের মধ্যে চার বর্ণ ও চার আশ্রমের বিভাগ করলেন। যাঁরা বেদাধ্যয়নে নিবিষ্ট, সুশীল আচরণসম্পন্ন ও ইন্দ্রিয়সংযমী—সেই পবিত্র ও উজ্জ্বল চরিত্রের বিদ্বানদের তিনি ব্রাহ্মণ করলেন ॥ ৯–১০ ॥

যজনাধ্যয়নে দানং যাজনাধ্যাপনার্থিতাঃ ॥ ১০ ॥
ধর্মাস্তেষাং বিমুচ্যান্ত্যাংস্ত্রীংস্তুল্যাঃ ক্ষত্রবৈশ্যয়োঃ ।

তাদের জন্য নির্ধারিত হল—যজ্ঞ করা ও করানো, অধ্যয়ন ও অধ্যাপন, এবং দান গ্রহণ—এই ছয় ধর্ম। এর মধ্যে প্রথম তিনটি—যজন, অধ্যয়ন ও দান—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য—এই তিন বর্ণের জন্যই সমান সাত্ত্বিক কর্ম ॥ ১০–১১ ॥

য়ে তু শূরা মহোৎসাহাঃ শরণ্যাঃ রক্ষণক্ষমাঃ ॥ ১১ ॥
দৃঢ়ব্যায়তদেহাশ্চ ক্ষত্রিয়াস্ত ইহাভবন্ ।

যাঁরা বীর, অত্যন্ত উৎসাহী, শরণাগতকে আশ্রয় দিতে সক্ষম, রক্ষা-ব্যবস্থায় দক্ষ এবং দৃঢ় ও বলিষ্ঠ দেহধারী—তাঁরাই ক্ষত্রিয় হলেন ॥ ১১–১২ ॥

বিক্রমো লোকসংরক্ষাবিভাগো ব্যবসায়িতা ॥ ১২ ॥
এতেষাময়মপ্যুক্তো ধর্মঃ শুভফলোদয়ঃ ।

পূর্বোক্ত তিন ধর্মের সঙ্গে পরাক্রম, লোকসংরক্ষণ, শাসনবিভাগ ও অধ্যবসায়—এই রাজস ধর্মসমূহ ক্ষত্রিয়দের জন্য নির্দিষ্ট হল, যা শুভফল প্রদানকারী ॥ ১২–১৩ ॥

নিসর্গন্নৈপুণং যেষাং রতির্বিত্তার্জনং প্রতি ॥ ১৩ ॥
শ্রদ্ধাদাক্ষ্যদয়াবত্তা বৈশ্যাংস্তানকরোদসৌ ।

যাঁদের স্বভাবে স্বাভাবিক দক্ষতা আছে, ধনার্জনে যাঁদের সহজ অনুরাগ, এবং যাঁরা শ্রদ্ধাশীল, কুশলী, উদার ও দয়ালু—তাঁদের তিনি বৈশ্য বলে অভিহিত করলেন ॥ ১৩–১৪ ॥

চিকিৎসা কৃষিবাণিজ্যে স্থাপত্যং পশুপোষণম্ ॥ ১৪ ॥
বৈশ্যস্য কথিতো ধর্মস্তদ্বৎ কর্ম চ তাইজসম্ ।

চিকিৎসা, কৃষি, বাণিজ্য, স্থাপত্য ও পশুপালন—এই পাঁচটি বৈশ্যের ধর্ম নির্ধারিত হল; এবং তাদের কর্ম তেজোগুণপ্রধান হল ॥ ১৪–১৫ ॥

নাতিমানভৃতো নাতিশুচয়ঃ পিশুনাশ্চ যে ॥ ১৫ ॥

তে শূদ্রজাতয়ো জাতা নাতিধর্মরতাশ্চ যে।
এবং
যেসব মানুষ না খুব সম্মানিত ছিল, না খুব পবিত্র আচরণ করত, এবং না ধর্মপরায়ণ ছিল—এই রকম নিষ্ঠুর স্বভাবের প্রজারাই শূদ্র নামে পরিচিত হয় ॥ ১৫–১৬ ॥

কলারম্ভোপজীবিত্বং শিল্পিতা পশুপোষণম্ ॥ ১৬ ॥
বর্ণত্রিতয়শুশ্রূষা
ধর্মস্তেষামুদাহৃতঃ ।

শূদ্রবর্ণের জীবিকা মূলত কারিগরি প্রভৃতি কাজের উপর নির্ভরশীল ছিল। এই কারণেই—
১. কারিগরি কাজ,
২. পশুপালন, এবং
৩. তিন বর্ণের সেবা করা, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য বর্ণের কর্মে সহায়তা করা—
এই সকলকেই শূদ্রবর্ণের ধর্ম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ॥ ১৬–১৭ ॥

আশ্রমবিভাগস্তদ্ধর্মাশ্চ
ব্রহ্মচারী গৃহস্থো বা বানপ্রস্থস্তথা যতিḥ ॥ ১৭ ॥
ইত্যাশ্রমাঃ পৃথক্ তেন চত্বারঃ প্রবিভাজিতাঃ ।

আশ্রমবিভাগ ও তাদের ধর্ম—
১. ব্রহ্মচর্য আশ্রম,
২. গার্হস্থ্য আশ্রম,
৩. বানপ্রস্থ আশ্রম এবং
৪. সন্ন্যাস আশ্রম—
এই চারটি আশ্রম মহারাজ পৃথু পৃথকভাবে বিভাগ করেছিলেন ॥ ১৭–১৮ ॥

ব্রহ্মচর্যাশ্রমধর্মকথনম্
গুরুশুশ্রূষণং ভৈক্ষং ব্রতচর্যাগ্নিকর্ম চ ॥ ১৮ ॥
স্বাধ্যায়শ্চাভিষেকশ্চ ধর্মো’য়ং ব্রহ্মচারিণঃ ।

ব্রহ্মচারীর ধর্ম—
১. গুরুর সেবা করা,
২. ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবনযাপন করা,
৩. ব্রত পালন করা,
৪. হোম-হবনাদি কর্ম করা,
৫. স্বাধ্যায় করা এবং
৬. অভিষেক—
এইগুলো ব্রহ্মচারীর ধর্ম হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে ॥ ১৮–১৯ ॥

গৃহস্থাশ্রমধর্মকথনম্
পূজাগ্ন্যতিথিদেবানাং স্ববৃত্ত্যা জীবনং দমঃ ॥ ১৯ ॥
অসমানর্ষিগোত্রেষু বিবাহ ঋতুগামিতা ।
পরস্য স্ত্রীষু বৈমুখ্যং পরানুগ্রহশীলতা ॥ ২০ ॥
বিনিবৃত্তিরকার্যেভ্যো ধর্মো’য়ং গৃহিণাং ভুবি ।

গৃহস্থদের ধর্ম—
১. অগ্নিপূজা,
২. অতিথি ও দেবতাদের পূজা,
৩. নিজের বৃত্তি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ,
৪. সংযম,
৫. অসমান গোত্রে বিবাহ,
৬. ঋতুগামিতা,
৭. অন্যের স্ত্রীদের প্রতি বিমুখতা,
৮. অন্য প্রাণীদের প্রতি দয়াশীলতা এবং
৯. নিন্দিত কর্ম থেকে সর্বদা বিরত থাকা—
এগুলোই গৃহস্থদের ধর্ম (way of life) হিসেবে বলা হয়েছে ॥ ১৯–২১ ॥

বানপ্রস্থাশ্রমধর্মকথনম্
দেবতাতিথিসৎকারো ব্রহ্মচর্যং বনে স্থিতিঃ ॥ ২১ ॥
বল্কাজিনজটাচীরধারণং শয়নং ভুবি ।
উপোষণৈর্ব্রতৈর্দেহকর্শনং
নিয়মৈস্তথা ॥ ২২ ॥
আহারো’কৃষ্টপচ্যৈশ্চ ধর্মো’য়ং বনবাসিষু ।

বানপ্রস্থদের ধর্ম—
১. দেবতা ও অতিথির পূজা এবং তাদের সৎকার,
২. ব্রহ্মচর্য পালন,
৩. বনে নিবাস,
৪. বল্কল, মৃগচর্ম, জটা ও চীর ধারণ করা,
৫. ভূমিতে শয়ন করা,
৬. উপবাস, ব্রত ও নিয়মের দ্বারা দেহকে কৃশ করা,
৭. অকৃষ্ট-পচ্য (অর্থাৎ না চাষ করা, না বপন করা) কন্দ-মূল প্রভৃতির আহার গ্রহণ—
এইগুলোকেই বনবাসী বানপ্রস্থদের ধর্ম বলা হয়েছে ॥ ২১–২৩ ॥

সন্ন্যাসাশ্রমধর্মকথনম্ বৈরাগ্যমিন্দ্রিয়জয়শ্চিন্তাত্যাগঃ প্রশান্ততা ॥ ২৩ ॥
আকিঞ্চন্যমনারম্ভো যতিধর্মঃ সদা স্মৃতঃ ।

সন্ন্যাসীদের ধর্ম—বৈরাগ্য, ইন্দ্রিয়জয়, চিন্তাত্যাগ, প্রশান্তচিত্ততা, দারিদ্র্য এবং অনারম্ভ (কোনো নতুন কর্মের আরম্ভ না করা), অর্থাৎ অর্থহীন কাজে সময় নষ্ট না করা—এইগুলোকেই সন্ন্যাসীদের ধর্ম বলা হয়েছে ॥ ২৩–২৪ ॥

শিষ্যধর্মকথনম্
ক্ষমত্বং গুর্বধীনত্বং শৌচং স্বাধ্যায়নিত্যতা ॥ ২৪ ॥
বিশুদ্ধির্ব্যবহারেষু শিষ্যধর্মো’য়মীরিতঃ ।

শিষ্যের ধর্ম—ক্ষমাশীলতা, গুরুর প্রতি অধীনতা, মানসিক ও শারীরিক পবিত্রতা, স্বাধ্যায়ে নিয়মিততা এবং ব্যবহারে নিষ্কপটতা—এইগুলোকেই শিষ্যধর্ম হিসেবে প্রতিপাদন করা হয়েছে ॥ ২৪–২৫ ॥

স্ত্রীধর্মকথনম্
শুচিত্বং বাণ্ডমনঃ কায়ৈঃ পতিশুশ্রূষণং ক্ষমা ॥ ২৫ ॥
পূজনং পতিপূজ্যানাং স্ত্রীধর্মঃ শৌচমেব চ ।

স্ত্রীদের ধর্ম—বাণী, মন ও শরীর দ্বারা (অর্থাৎ মনসা, বাচা, কর্মণা) শুদ্ধ থাকা, স্বামীর সেবা করা, কথায় কথায় ক্রুদ্ধ না হয়ে ক্ষমাশীল থাকা, স্বামীর দ্বারা পূজিত মাতা-পিতা প্রভৃতি গুরুজনদের সম্মান করা এবং সর্বদা নিষ্কপট ও অন্তরে শুদ্ধ থাকা—এভাবেই বিদ্বানগণ স্ত্রীদের ধর্ম বর্ণনা করেছেন ॥ ২৫–২৬ ॥

এবং বর্ণাশ্রমান্ সম্যক্ কৃত্বা বর্ণাস্তদুদ্ভবান্ ॥ ২৬ ॥
বিভজ্য তেষাং বৈন্যেন তে তে ধর্মাঃ প্রকীর্তিতাঃ ।

এইভাবে মহারাজ পৃথু যথাযথভাবে বর্ণ ও আশ্রমের বিভাগ করেন। পরে বর্ণসমূহ এবং বর্ণ থেকে উৎপন্ন অন্যান্য শ্রেণিরও বিভাগ করে রাজা পৃথু বিভিন্ন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন ॥ ২৬–২৭ ॥

বৃত্তিং কর্মাণি চৈতেষাং পৃথগুদ্দেশ্য সো’ভ্যধাত্ ॥ ২৭ ॥
স্বধর্মাবস্থিতানাং বো ভাবি লোকদ্বয়ে সুখম্।

এই সকলের কর্ম ও জীবিকার বৃত্তি পৃথকভাবে নির্ধারণ করে তিনি বললেন—তোমরা যারা নিজ নিজ ধর্মে (অর্থাৎ পিতৃধর্মে) স্থির থাকবে, তারা উভয় লোকেই সুখ লাভ করবে ॥ ২৭–২৮ ॥

য এতাং স্থিতিমুল্লঙ্ঘ্য মোহাদন্যদ্ বিধাস্যতি ॥ ২৮ ॥
তস্যাহং যমবৎ ক্রুদ্ধঃ করিষ্যাম্যনুশাসনম্ ।

এর বিপরীতে যারা মোহবশত এই (ভগবদ্‌নির্মিত) মর্যাদা লঙ্ঘন করে বিপরীত আচরণ করবে, তাদের আমি যমরাজের ন্যায় ক্রুদ্ধ হয়ে ভয়ংকর দণ্ড দিয়ে শাসন করব ॥ ২৮–২৯ ॥

সর্বেষাং বৃত্ত্যর্থং খেটগ্রামাদিকল্পনম্
যুক্তানাং কর্মসু স্বেষু বৃত্ত্যর্থং ভবতামহম্ ॥ ২৯ ॥
খেটকগ্রামবেশ্মানি বিধাস্যামি পুরাণি চ ।

ইত্যুক্ত্বা তানথো কোট্যা কার্মুকস্য পৃথুর্নৃপঃ ॥ ৩০ ॥
বিষমাং সাধয়ামাস পৃথিবীং পৃথুবিক্রমঃ ।
তৎসঙ্ক্লেশেন গৌরভূত্বা নশ্যন্তী তেন মেদিনী ॥ ৩১ ॥

এই কথা বলে পরে রাজা পৃথু, যিনি ধনুকের কোটি-প্রয়োগে দক্ষ, তাঁর পরাক্রমে অসমতল পৃথিবীকে সমতল করতে আরম্ভ করলেন। সেই ক্লেশের ফলে পৃথিবী গৌরবর্ণ ধারণ করল এবং ধ্বংসপ্রায় হয়ে উঠল ॥ ৩০–৩১ ॥

সকলের জীবিকার জন্য খেট ও গ্রাম প্রভৃতির বিধান—
এছাড়া বর্ণাশ্রমধারী আপনারা যেন নিজ নিজ জীবিকা অর্জন করতে পারেন এবং জীবনযাপন নির্বাহের জন্য নিজের নিজের কর্মে নিয়োজিত থাকতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে আমি আপনাদের জন্য খেটক, গ্রাম, পুর এবং বেশ্ম (গৃহ) নির্মাণ করব। এইভাবে তাদের উদ্দেশ্যে কথা বলে, পরবর্তীতে নিজের ধনুকের কোটি দ্বারা মহাপরাক্রমী মহারাজ পৃথু অসমতল ভূমিযুক্ত পৃথিবীকে সমতল করলেন। সেই ক্লেশে দুঃখিত হয়ে পৃথিবী পুনরায় গোরূপে প্রকাশিত হল ॥ ৩০–৩১ ॥

বিধের্নিয়োগাদ্ দুদুহে সাধু সস্যানি ভূতয়ে ।
কল্পিতাস্তেন শৈলানাং সরিতামন্তরেষু চ ॥ ৩২ ॥
সমেষু চাবকাশেষু পুরাদীনাং বিভক্তয়ঃ ।

এরপর রাজা পৃথু সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার আদেশ অনুসারে বিশ্বকল্যাণের জন্য গোরূপী পৃথিবী থেকে যথাযথভাবে ধান প্রভৃতি শস্যের দোহন করলেন। পর্বত ও নদীর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানসমূহে এবং সমতল ভূমিতে পুর, নগর প্রভৃতির নির্মাণের জন্য তিনি পৃথিবীর যথোচিত বিভাগ করলেন ॥ ৩২–৩৩ ॥

তেন সীরাগ্রকৃষ্টেয়ং ধান্যৈরূপ্তৈর্যথাবিধি ।
সমস্যা ক্রিয়তে ক্ষোণী ভগবত্যম্বুদাগমে ॥ ৩৩ ॥

এইভাবে মহারাজ পৃথুর দ্বারা লাঙলের অগ্রভাগে চাষকৃত এই পৃথিবী বর্ষার আগমনে যথাবিধি ধান্যাদি বপনের ফলে শস্যসমৃদ্ধ হয়ে উঠল ॥ ৩৩ ॥

ইত্যুদ্ধবো নিগদিতঃ প্রথমো নৃপস্য
ধর্মেণ সার্ধমপি চাশ্রমবর্ণভেদাঃ ।
প্রোক্তাঃ কৃষিব্যতিকরো’পি চ দর্শিতস্তে
কাত্স্যেন বৎস! শৃণু দেশবিভাগভূমিম্ ॥ ৩৪ ॥

এইভাবে হে বৎস! রাজা পৃথুর ধর্মের সঙ্গে আশ্রম ও বর্ণের পার্থক্যসমূহ এবং কৃষিকর্মের বিস্তার তোমাকে সংক্ষেপে বলা হল। এখন দেশবিভাগ ও ভূমিবিন্যাস বিষয়ে শ্রবণ করো ॥ ৩৪ ॥

॥ ইতি শ্রীমন্মহারাজাধিরাজশ্রীভোজদেববিরচিতসমরাঙ্গণসূত্রধারাপরনাম্নি-
বাস্তুশাস্ত্রে বর্ণাশ্রমপ্রবিভাগো নাম সপ্তমো’ধ্যায়ঃ ॥ ৭ ॥

হে বৎস! এইভাবে আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রথম রাজাদের আবির্ভাবের প্রসঙ্গ শুনিয়েছি। পাশাপাশি আশ্রমভেদ অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস এই চার আশ্রমের পার্থক্য, এবং ব্রাহ্মণাদি চাতুর্বর্ণ্যের ভেদও নিরূপণ করেছি। সেই সঙ্গে ঐ সকল বর্ণাশ্রমধারীদের পৃথক পৃথক ধর্ম (অর্থাৎ কর্তব্য ও কর্ম)-এরও ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গেই কৃষি-ব্যতিকর, অর্থাৎ কৃষিকর্ম সম্পর্কেও অবহিত করা হয়েছে। এখন বিস্তারিতভাবে দেশ-বিভাগ ও ভূমি-বিভাগ শ্রবণ করো ॥ ৩৪ ॥

।। এইভাবে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেব বিরচিত সমরাঙ্গণসূত্রধার অপরনাম বাস্তুশাস্ত্র-এর ‘বর্ণাশ্রমপ্রবিভাগ’ নামক সপ্তম অধ্যায়ের, মহাকবি পণ্ডিত রামকুবের মালবীয়ের দ্বিতীয় আত্মজ ড. সুধাকর মালবীয় কৃত ‘সরলা’ হিন্দি ভাষ্য সম্পূর্ণ হল ॥ ৭ ॥

অথ অষ্টমো’ধ্যায়ঃ

  • ভূমিপরীক্ষা১ *
    (The Description of Auspicious and Inauspicious Lands)

দেশাশ্চ দেশভূম্যশ্চ সমাসাত্ তব সম্প্রতি ।
তৎসংখ্যা তদ্বিভাগশ্চ প্রোচ্যন্তে’বহিতঃ শৃণু ॥ ১ ॥

প্রদেশভেদ—এখন দেশ ও বিভিন্ন প্রদেশের ভূমি, তাদের সংখ্যা এবং তাদের বিভাগ সংক্ষেপে নিরূপণ করা হচ্ছে। অতএব সতর্কচিত্ত হয়ে আপনি (পৃথিবীর বিভাগ ও তার ভূগোল) শ্রবণ করুন ॥ ১ ॥

ভূমেঃ সাধারণতো জাঙ্গলাদিভেদেন ত্রৈবিধ্যং, তল্লক্ষণং চ
দেশঃ স্যাজ্জাঙ্গলানূপসাধারণতয়া ত্রিধা ।
ত্রিবিধস্যাপ্যথৈতস্য যথাবল্লক্ষণং কথ্যতে ॥ ২ ॥

জাঙ্গলাদি ভেদের দ্বারা ভূমির সাধারণত তিন প্রকার ভেদ ও তাদের লক্ষণ—
১. জাঙ্গল দেশ,
২. অনূপ দেশ এবং
৩. সাধারণ দেশ—এই তিন প্রকার ভেদে পৃথিবীর প্রদেশ নির্ধারিত হয়েছে। এখন এই ত্রিবিধ দেশের যথাযথ লক্ষণ বর্ণনা করছি ॥ ২ ॥

দূরাম্বুরিরিণপ্রায়ো হ্রস্বকণ্টকিপাদপঃ ।
রূক্ষোষ্ণচণ্ডপবনঃ কৃষ্ণমৃত্ তেষু জাঙ্গলঃ ॥ ৩ ॥

১. জাঙ্গল দেশ—যে দেশে জল বসতি থেকে দূরে থাকে অথবা যেখানে বালির আধিক্য দেখা যায়, যেখানে ছোট ছোট কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ ও উদ্ভিদ থাকে, যেখানে বায়ু শুষ্ক, উষ্ণ ও প্রবল বেগে প্রবাহিত হয় এবং যেখানে মাটি কালো—তাকে ‘জাঙ্গল দেশ’ বলা হয় ॥ ৩ ॥

১. পণ্ডিত দ্বিজেন্দ্রনাথশুক্লের সংস্করণে এটি দশম অধ্যায়।

নিম্নো ভূরিজলঃ স্নিগ্ধো বহুমৎস্যামিষো হিমঃ ।
স্যাদনূপঃ সরিত্প্রায়ঃ স্নিগ্ধোচ্ছ্রিতবহুদ্রুমঃ ॥ ৪ ॥

২. অনূপ দেশ—যে দেশে জল বসতির নিকটে থাকে, যে দেশ স্নিগ্ধ ও নিম্নভূমিসম্পন্ন, যেখানে শীতলতা বিদ্যমান এবং যেখানে মাছ, মাংস, নদী ও উঁচু উঁচু স্নিগ্ধ বৃক্ষের প্রাচুর্য থাকে—তাকে ‘অনূপ দেশ’ বলা হয় ॥ ৪ ॥

যঃ পুনর্নাতিশীতোষ্ণঃ স্যাদ্ দেশদ্বয়লক্ষণঃ ।
স সাধারণ ইত্যুক্তো দেশো দেশবিশারদৈঃ ॥ ৫ ॥

৩. সাধারণ দেশ—যে দেশে জাঙ্গল ও অনূপ—এই দুই প্রকার দেশের লক্ষণই পাওয়া যায় এবং যা না অতিরিক্ত শীতল, না অতিরিক্ত উষ্ণ—তাকে দেশবিশারদগণ ‘সাধারণ দেশ’ বলে অভিহিত করেছেন ॥ ৫ ॥

ত্রিবিধায়া অপি ভূমেঃ পুনর্বালিশস্বামিন্যাদিভেদেন
ষোডশধা বিভাগস্তল্লক্ষণং চ
জাঙ্গলাদিষু দেশেষু ত্রি(পুণ্যে? স্বপ্যে)ষু স্বলক্ষণৈঃ।
যুক্তাঃ ষোডশ বিজ্ঞেয়াঃ ভূময়ঃ প্রবিভাগতঃ ॥ ৬ ॥

বালিশস্বামিনী ভোগ্যা সীতাগোচররক্ষিণী ।
আপাশ্রয়বতী কান্তা খনিমত্যাত্মধারিণী ॥ ৭ ॥
বণিক্প্রসাধিতা
দ্রব্যসম্পন্নামিত্রঘাতিনী ।
আশ্রেণীপুরুষা শক্ত্যসামন্তা দেবমাতৃকা ॥ ৮ ॥
ধান্যা হস্তিবনোপেতা সুরক্ষা চেতি ষোডশ ।
ভুবঃ সংজ্ঞাভিরুদ্দিষ্টা লক্ষণাসামথ কথ্যতে ॥ ৯ ॥

ত্রিবিধ ভূমির—বালিশস্বামিনী প্রভৃতি ভেদে—ষোল প্রকার বিভাগ ও তাদের লক্ষণ। জাঙ্গলাদি তিন প্রকার দেশের ভূমিতে নিজ নিজ লক্ষণসহ ষোল প্রকার ভূমির কথা বলা হয়েছে। যথা—
১. বালিশ-স্বামিনী,
২. ভোগ্যা,
৩. সীতা-গোচররক্ষিণী,
৪. আপাশ্রয়বতী,
৫. কান্তা,
৬. খনিমতী,
৭. আত্মধারিণী,
৮. বণিক্‌প্রসাধিতা,
৯. দ্রব্যসম্পন্না,
১০. অমিত্র-ঘাতিনী,
১১. আশ্রেণী-পুরুষা,
১২. শক্ত্য-সামন্তা,
১৩. দেব-মাতৃকা,
১৪. ধান্যশালিনী,
১৫. হস্তি-বনোপেতা এবং
১৬. সুরক্ষা।
এইভাবে জাঙ্গলাদি ত্রিবিধ ভেদের অন্তর্গত ষোল প্রকার ভূমির নাম বলা হয়েছে। এখন এগুলোর পৃথক পৃথক লক্ষণ বর্ণনা করা হচ্ছে ॥ ৬–৯ ॥

ভূভুজা বালিশেনাপি শক্ত্যতে যা প্রশাসিতুম্ ।
য়া চ ভদ্রজনা সা স্যাদ্ বালিশস্বামিনী ক্ষিতিঃ ॥ ১০ ॥

১. বালিশ-স্বামিনী ভূমি—যে ভূমি বালিশ (অর্থাৎ কিশোর বা যুবক) রাজা দ্বারাও শাসন করা সম্ভব এবং যেখানে ভদ্রলোকেরা বসবাস করেন—তাকে বালিশ-স্বামিনী ভূমি বলা হয় ॥ ১০ ॥

বিতরন্ত্যধিকং যস্যাং ভাগভোগাদিকান্ করান্ ।
নরা ভূরিশ্রিয়ঃ সাত্র ভোগ্যেতি ক্ষিতিরুচ্যতে ॥ ১১ ॥

২. ভোগ্যা ভূমি—যে ভূমিতে সুন্দর ও ঐশ্বর্যসম্পন্ন মানুষ নিজের অংশ, অর্থাৎ উৎপাদনের অংশ থেকে ভোগাদি কর অধিক পরিমাণে প্রদান করে—তাকে ‘ভোগ্যা’ ভূমি বলা হয় ॥ ১১ ॥

যস্যাং নদাশ্চ নদ্যশ্চ গিরির্মধ্যে’থবা বহিঃ ।
বিভক্তক্ষেত্রসীমা সা সীতাগোচররক্ষিণী ॥ ১২ ॥

৩. সীতা-গোচররক্ষিণী ভূমি—যে ভূমিতে পর্বতের মধ্যে অথবা বাইরে নদ ও নদী প্রবাহিত হয় এবং যার ক্ষেত্র ও সীমানা স্পষ্টভাবে বিভক্ত—তাকে সীতা-গোচররক্ষিণী ভূমি বলা হয় ॥ ১২ ॥

সরিদদ্রিবনাদ্যেষু ত্রাসাদ্ যস্যাং বিশেজ্জনঃ ।
জনাপাশ্রয়যোগ্যত্বাদপাশ্রয়বতীতি
সা ॥ ১৩ ॥

৪. আপাশ্রয়বতী ভূমি—যে অঞ্চলের নদী, পর্বত ও অরণ্যে প্রবেশ করলে মানুষ অত্যন্ত ভীত হয় এবং যা মানুষের বসবাসের উপযোগী নয়—তাকে আপাশ্রয়বতী ভূমি বলা হয় ॥ ১৩ ॥

বনোপবনবত্যদ্রিসরিত্কুঞ্জমনোহরা
দেহিনো রময়ত্যুর্বী যা সা কান্তেতি কীর্তিতা ॥ ১৪ ॥

৫. কান্তা ভূমি—যে অঞ্চলের পর্বত, নদী, লতা ও উদ্যানের কুঞ্জসমূহ ভূমিকে মনোরম করে তোলে এবং যে ভূমিতে মানুষ বাসস্থান নির্মাণ করতে আগ্রহী হয়—তাকে বিদ্বানগণ কান্তা ভূমি বলে অভিহিত করেছেন ॥ ১৪ ॥

যস্যাং সদৈব যায়ন্তে কলধৌতাদিধাতবঃ ।
লবণানি চ ভূয়াংশি প্রাহুঃ খনিমতীতি তাম্ ॥ ১৫ ॥

৬. খনিমতী ভূমি—যে ভূমিতে সর্বদা স্বর্ণাদি ধাতু এবং প্রচুর পরিমাণে লবণ উৎপন্ন হয়—তাকে খনিমতী ভূমি বলা হয়। ধাতুদের খনি আছে এবং যেখানে লবণ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, সেই ভূমিকে ‘খনিমতী’ ভূমি বলা হয়েছে ॥ ১৫ ॥

যাত্যন্তং নানুগৃহ্যেত্ দণ্ডকোশাসনাদিভিঃ ।
স্ফীতলোকাশ্রয়া যা চ সা স্যাদ্ ভূরাত্মধারিণী ॥ ১৬ ॥

৭. আত্মধারিণী— যে ভূমি দণ্ড, কোষ তথা আসন অর্থাৎ রাজসিংহাসন প্রভৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না; অর্থাৎ যেখানে জনগণ দণ্ডের ভয়েও নয়, ধন বা চাকরির লোভেও নয়—কোনোভাবেই বশীভূত করা যায় না এবং যেখানে পুরুষদের বসবাস অত্যন্ত অল্প পরিমাণে দেখা যায়, সেই ভূমিকে আত্মধারিণী বলা হয় ॥ ১৬ ॥

প্রসিধ্যন্ত্যসকৃদ্ যত্র পণ্যোপক্রয়বিক্রয়াঃ ।
বণিকপ্রসাধিতেত্যুক্তা সা ভূর্বণিগলঙ্কৃতা ॥ ১৭ ॥

৮. বণিক্‌-প্রসাধিতা ভূমি— যেখানে বাজারে বিক্রয় ও ক্রয়ের উপযোগী দ্রব্য সর্বদা পাওয়া যায় এবং যে ভূমি বণিক শ্রেণিতে পরিপূর্ণ ও অলঙ্কৃত, সেই ভূমিকে বাণিক্‌-প্রসাধিতা ভূমি বলা হয় ॥ ১৭ ॥

শাকাশ্বকর্ণখদিরশ্রীপর্ণীস্যন্দনাসনৈঃ
বেণুবেত্রশরাদ্যৈশ্চ যুক্তা দ্রব্যবতীতি ভূঃ ॥ ১৮ ॥

৯. দ্রব্যবতী ভূমি— যে ভূমি শাক, অশ্বকর্ণ (বিশেষ বৃক্ষ), খদির (খৈর), শ্রীপর্ণী (বিশেষ বৃক্ষ), স্যন্দন (বিশেষ বৃক্ষ), আসন, বাঁশ, বেত, শর প্রভৃতি বৃক্ষে আচ্ছাদিত, সেই ভূমিকে দ্রব্যবতী ভূমি বলা হয় ॥ ১৮ ॥

যস্যাং জনপদাঃ সাধু বিভক্তাস্ত্যক্তবিক্রমাঃ ।
যোগং যান্তি চ মিত্রাণি স্যাদ্ ভূঃ সামিত্রঘাতিনী ॥ ১৯ ॥

১০. অমিত্রঘাতিনী ভূমি— যেখানে জনপদসমূহ যথাযথভাবে বিভক্ত এবং সেখানকার লোকেরা পরাক্রম ত্যাগ করেছে, অর্থাৎ পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ করে না, এবং যেখানে বন্ধুরা পরস্পর সৌহার্দ্য রক্ষা করে, সেই ভূমিকে অমিত্রঘাতিনী পৃথিবী বলা হয় ॥ ১৯ ॥

ন ক্ষুদ্রা বন্দিনো যস্যাং দুর্গপ্রত্যন্তসংশ্রয়াঃ ।
ভূঃ সাশ্রেণীমনুষ্যেতি বিনীতৈরাশ্রিতা জনৈঃ ॥ ২০ ॥

১১. আশ্রেণীপুরুষা ভূমি— যে ভূমিতে দুর্গের মধ্যে ক্ষুদ্র বন্দী নেই এবং যে দুর্গ বিনীত পুরুষদের দ্বারা পরিপূর্ণ, সেই পৃথিবীকে আশ্রেণী-পুরুষা ভূমি বলা হয় ॥ ২০ ॥

মন্ত্রোৎসাহাদিবৈমুখ্যং যস্যাং সামন্তভূভুজঃ ।
ভজন্তে সা স্মৃতা শক্যসামন্তা ভূঃ সমন্ততঃ ॥ ২১ ॥

১২. শক্যসামন্তা ভূমি— যেখানে সামন্ত অর্থাৎ মাণ্ডলিক রাজারা মন্ত্র, তন্ত্র ও উৎসাহ প্রভৃতি থেকে বিমুখ থাকে, সেই অঞ্চলের চারপাশের ভূমিকে শক্যসামন্তা ভূমি বলা হয় ॥ ২১ ॥

জীবন্তি ক্ষেত্রিণো যস্যাং নদনদ্যাদিবারিভিঃ ।
তাং দেবমাতৃকেত্যাহুরনপেক্ষিতবারিদাম্ ॥ ২২ ॥

১৩. দেবমাতৃকা ভূমি— যেখানে মেঘের বর্ষণ ছাড়াই নদী প্রভৃতির জলে সেচ করে কৃষকেরা চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে, সেই ভূমিকে দেবমাতৃকা ভূমি বলা হয় ॥ ২২ ॥

নিষ্পদ্যন্তে’ধিক যস্যাং বীজান্যুপতান্যযত্নতঃ ।
কৃষ্টানুপহৃতক্ষেত্রা ধান্যা সা ধান্যশালিনী ॥ ২৩ ॥

১৪. ধান্যশালিনী ভূমি— যে ভূমিতে বপন করা বীজ কোনো সার প্রয়োগ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে অধিক ফলন দেয় এবং যে অঞ্চলের চাষকৃত ক্ষেত ও খলিহান কখনো বন্যা প্রভৃতিতে নষ্ট হয় না, সেই কৃষিযোগ্য ভূমিকে ‘ধান্যশালিনী’ ভূমি বলা হয় ॥ ২৩ ॥

পর্যন্তেষ্ঠদ্রয়ো যস্যাং যা চ হস্তিবনাশ্রিতা ।
সা হস্তিবনবত্যুর্বী ভূভৃতঃ সৈন্যবর্ধিনী ॥ ২৪ ॥

১৫. হস্তিবনোপেতা ভূমি— যে ভূমির প্রান্তবর্তী পর্বতে হাতিতে পরিপূর্ণ বন রয়েছে এবং যেখানকার হাতি রাজাদের সৈন্যবৃদ্ধিতে সক্ষম, সেই ভূমিকে হস্তিবনোপেতা পৃথিবী বলা হয় ॥ ২৪ ॥

দুষ্প্রধৃষ্যৈব যা নিত্যং বিষমত্বাদরাতিভিঃ ।
বিষমাদ্রিসরিদ্গুপ্তা সা সুরক্ষেতি ভূঃ স্মৃতা ॥ ২৫ ॥

১৬. সুরক্ষা ভূমি— স্বভাবতই উঁচু-নিচু হওয়ার কারণে যে দুর্গম ভূমি শত্রুদের দ্বারা সহজে আক্রান্ত করা যায় না এবং যা দুর্গম পর্বত ও নদী দ্বারা সর্বদিক থেকে সুরক্ষিত, সেই ভূমিকে ‘সুরক্ষা ভূমি’ বলা হয় ॥ ২৫ ॥

জনপদাদিনিবেশনোচিতা ভূময়ঃ
ষোডশেত্যুদিতা ভূম্যঃ প্রবিভাগাদ্ যথাতথম্ ।
অন্যা জনপদাদীনাং ব্রূমঃ সম্মিশ্রলক্ষণাঃ ॥ ২৬ ॥

জনপদাদি নিবেশনের জন্য উপযুক্ত ভূমি—এইভাবে এখানে ভূমির যথাক্রমে ষোলো প্রকার নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখন জনপদাদি নিবেশনের উপযোগী যে ভূমিগুলি আছে, সেগুলির মধ্যে যেগুলির লক্ষণ সম্মিশ্রিত—সেই অন্যান্য ভূমিসমূহের বিষয় এখানে বিবেচনা করা হচ্ছে ॥ ২৬

धातुस्यान्दोल्लसत्कुञ्जगुल्मद्रुमलतावृतैः
उत्सङ्गिताः पृथुशिलैः समन्तादवनीधरैः ॥ २७ ॥
तीर्थावतारकान्ताभिः स्वादुतोयाभिरावृताः ।
नदीभिः पुलिनप्रान्तैर्विचित्रद्रुमशालिभिः ॥ २८ ॥

জনপদ বা নগরের উপযুক্ত ভূমি—এখন জনপদ, খেট (ছোট গ্রাম), গ্রাম এবং নগর বসানোর জন্য যে ভূমিগুলি বাস্তুশাস্ত্রে প্রশস্ত বলা হয়েছে, সেগুলির বর্ণনা করা হচ্ছে। যে ভূমিগুলি গৈরিক প্রভৃতি ধাতুর স্পন্দনে শোভিত কুঞ্জ, গুল্ম, বৃক্ষ ও লতায় আবৃত উদ্যানযুক্ত এবং চারদিক থেকে বৃহৎ শিলাযুক্ত পর্বত দ্বারা পরিবেষ্টিত—সেগুলি নগর স্থাপনের জন্য উপযুক্ত। যে অঞ্চলে তীর্থে স্নানের উপযোগী সুন্দর ও মিষ্ট জলবিশিষ্ট নদী পাওয়া যায় এবং যেসব নদীর তটভূমি বিচিত্র বৃক্ষে শোভিত—সেই ভূমি নগরের জন্য উপযুক্ত হয় ॥ ২৭–২৮

कोकिलालापसुभगैर्मधुमत्तालिशालिभिः
विचित्रफलपुष्पाढ्यैः काननैरुपशोभिताः ॥ २९ ॥
दलत्कुवलयश्रेणीक्वणन्मधुपहारिभिः
सरसीदेवखाताद्यैर्भूषिताः प्राज्यवारिभिः ॥ ३० ॥

যে ভূমির অরণ্যে কোকিলের মধুর কলরব শোনা যায়, যেখানে মধু-লোভী ভ্রমরে অঞ্চল গুঞ্জরিত হয় এবং যা বিচিত্র ফল ও পুষ্পে সমৃদ্ধ—এমন বনভূমিতে শোভিত অঞ্চল; যে দেশে জলাশয় ও কূপ প্রচুর, পুকুরগুলি পরিপূর্ণ জলে ভরা এবং দেবখাত প্রভৃতি জলাধার বিদ্যমান—সেই ভূমি নগর স্থাপনের যোগ্য হয় ॥ ২৯–৩০

समैः सुगन्धिभिः स्वादुशीतैः कान्तैरभङ्गुरैः ।
क्षेत्रैरक्षतसीमान्तैः सस्यनिष्पादिभिर्वृताः ॥ ३१ ॥
निष्कण्टकाश्मवल्मीकैः प्रभूतयवसेन्धनैः ।
विभक्त क्षेत्रसीमान्तैर्गोचरैरूपशोभिताः ॥ ३२ ॥
स्थले तृणसमुद्राणामन्तरेषु वसुन्धराः ।
प्रशस्यन्ते समासन्नस्वादुशीतलवारयः ॥ ३३ ॥

যেখানে কমলপত্রে ভ্রমরের সারি গুঞ্জরিত হয়ে শোভা দেয়; যে ভূমি সমতল, সুগন্ধিযুক্ত, সুস্বাদু ও শীতল, সুন্দর ও অখণ্ড; যার ক্ষেত্রসীমা অক্ষত এবং যা শস্যোৎপাদনে সক্ষম—এমন ক্ষেত্র দ্বারা আবৃত; যেখানে ক্ষেত্রসীমা পৃথকভাবে নির্ধারিত গোচর (চরাগাহ) শোভা পায়; যেখানে গবাদিপশুর জন্য প্রচুর ঘাস এবং জ্বালানির উপকরণ পাওয়া যায়; যেখানে কাঁটাবিহীন বৃক্ষ, মসৃণ পাথর ও বাল্মীক বিদ্যমান; এবং তৃণসমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, নিকটবর্তী সুস্বাদু ও শীতল জলের প্রাচুর্যযুক্ত ভূমি—এমন ভূপৃষ্ঠকে প্রশস্ত বলা হয়েছে। সেই ভূমি নগর স্থাপনের উপযুক্ত হয় ॥ ৩১–৩৩

दुरात्मनामधृष्या यास्तथानेकाश्रयान्विताः ।
संरम्भत्रासनिर्मुक्तं मनश्च रमयन्ति याः ॥ ३४ ॥
तास्वेवं गुणयुक्तासु महीषु विनिवेशयेत् ।
यथास्थानं जनपदान् खेटग्रामपुरादि च ॥ ३५ ॥

যে ভূমিগুলি দুষ্টদের দ্বারা দমনীয় নয় এবং যেখানে বহু আবাস স্থাপিত; যেখানে ভয় ও উদ্বেগের লেশমাত্র নেই এবং যা মনকে আনন্দিত করে—এমন গুণসম্পন্ন ভূমিতে যথাস্থানে জনপদ, খেটক, গ্রাম ও পুর প্রভৃতি স্থাপনের পরিকল্পনা করা উচিত ॥ ৩৪–৩৫

दुर्गनिवेशनोचिता भूमयः
युता महीध्रमूलाम्बुप्राकारैस्तु पृथक्पृथक् ।
चतस्त्रः कीर्तिता धन्या भूमयो दुर्गहेतवः ॥ ३६ ॥
दुरारोहतया दुर्गे टङ्कच्छिन्न इवान्ततः ।
समपृष्ठेऽम्बुयुक्ताऽद्रौ गिरिदुर्गावनिर्भवेत् ॥ ३७ ॥

দুর্গ নির্মাণের উপযুক্ত ভূমি—এখন দুর্গ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত ভূমির বর্ণনা করা হচ্ছে। দুর্গ নির্মাণের জন্য চার প্রকার পৃথক পৃথক ভূমিকে প্রশস্ত বলা হয়েছে— (১) পর্বত (মহীধর), (২) বন (মূল), (৩) জল (অম্বু) এবং (৪) প্রাকার।
১. পর্বত দুর্গের উপযুক্ত ভূমি—এর মধ্যে পাহাড়ে দুর্গের জন্য উপযুক্ত ভূমি হলো এমন স্থান যা আরোহণে দুরূহ, জলসম্পন্ন ও দুর্গম; এবং যার অন্তর্ভাগ ছেনি দ্বারা কেটে-ছাঁটে সমতল করা যায় ॥ ৩৬–৩৭

कण्टकिद्रुमनीरन्ध्रनद्धे साम्भसि कानने ।
गूढप्रवेशमार्गे भूर्मूलदुर्गेति कीर्तिता ॥ ३८ ॥

২. বন দুর্গের জন্য উপযুক্ত ভূমি—দুর্গ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত ভূমি সেই জঙ্গলের মধ্যেই হওয়া উচিত, যেখানে প্রবেশপথ অত্যন্ত গূঢ় (দুরূহ) এবং যেখানে কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ রোপিত রয়েছে ও জলাশয়ও বিদ্যমান আছে ॥ ৩৮ ॥

দ্বীপেষু স্বাদুতোয়েষু বহ্বগাধজলা বহিঃ ।
রম্যাবকাশদেশা স্যাজ্জলদুর্গা চ মেদিনী ॥ ৩৯ ॥

৩. জল দুর্গের জন্য উপযুক্ত ভূমি—এখন জলদুর্গের জন্য উপযুক্ত ভূমি সম্পর্কে বলা হচ্ছে—যে সব দ্বীপে স্বাদু (মিষ্টি) জল রয়েছে, যেখানে গভীর জল পরিপূর্ণ থাকে এবং জলের বাইরে চারদিকে অত্যন্ত মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়—এমন ভূমিই জলদুর্গের জন্য প্রশস্ত বলে গণ্য ॥ ৩৯ ॥

৪. প্রাকারযুক্ত ভূমি—চতুর্থ প্রকারের দুর্গ এমন হওয়া উচিত যা খাই (পরিখা) ও প্রাকার দ্বারা পরিবেষ্টিত ॥ ৩৯ ॥

পুরনিবেশনে প্রশস্তা ভূময়ঃ
স্নিগ্ধাঃ সারভৃতঃ শুদ্ধাঃ প্রদক্ষিণজলাশয়াঃ ।
বহূদকাস্তরুচ্ছন্না নিবিডাঃ প্রাদুদক্প্লবাঃ ॥ ৪০ ॥

পুর সংযোজনের জন্য প্রশস্ত ভূমি—এখন নগর সংযোজনের উপযোগী ভূমির বর্ণনা করা হচ্ছে। যে ভূমি স্নিগ্ধ, সারসমৃদ্ধ, শুদ্ধ, চারদিকে জলাশয় দ্বারা পরিবেষ্টিত; যেখানে প্রচুর জল রয়েছে, ঘন বৃক্ষে আচ্ছাদিত এবং পূর্বদিকে যার ঢাল (প্লব) রয়েছে—এমন ভূমিই নগর স্থাপনের জন্য প্রশস্ত বলে বিবেচিত ॥ ৪০ ॥

দূর্বাসস্যৌষধীমুঞ্জকুরুন্দকুশবল্কলৈঃ
পরিতঃ পরিণদ্ধাশ্চ স্বাদুস্বচ্ছস্থিরোদকাঃ ॥ ৪১ ॥

যে ভূমিতে দূর্বা, নানা ঔষধি, মুঞ্জ, কুরুন্দ, কুশ ও বল্কল প্রভৃতি উদ্ভিদের প্রাচুর্য রয়েছে; যেখানে মিষ্টি (স্বাদু) জল এবং স্বচ্ছ ও স্থির জলের জলাশয় ও কূপ বিদ্যমান—এমন ভূমিতে নগর সংযোজন করা উচিত ॥ ৪১ ॥

বাস্তুয়জ্ঞামরস্থানাদ্যারামোদ্যানসম্ভৃতাঃ
তটাকবাপীস্থানৈশ্চ যাঃ সমন্তাদলঙ্কৃতাঃ ॥ ৪২ ॥
যা যানানাং সুখদা মিথুনানাং রতিপ্রদাঃ ।
পুরার্থং তাঃ প্রশস্যন্তে ভূময়ো জনিতশ্রিয়ঃ ॥ ৪৩ ॥

যে ভূমিতে বাস্তু, যজ্ঞ, দেবমন্দির, বাগান ইত্যাদির উপকরণ পাওয়া যায়—অর্থাৎ শিল্পকলা, যজ্ঞ ও দেবমন্দির এবং আরাম ও উদ্যান প্রভৃতির জন্য যা উপযুক্ত; যা পুকুর ও কূপের মনোরম স্থানে শোভিত; যেখানে যানবাহন সহজে চলাচল করতে পারে এবং যুগলদের জন্য রতিপ্রদ স্থান উপলব্ধ—এমন ভূমিতেই নগর বা পুরের সংযোজন করা উচিত ॥ ৪২–৪৩ ॥

সর্ববর্ণোচিত ভূমিঃ, তত্তদ্বর্ণোচিত ভূময়ঃ
কুঙ্গুমাগুরুকর্পূরস্পৃক্কৈলাচন্দনাদিভিঃ
সুগন্ধা মিশ্রিতৈরেবিঃ পৃথক্স্থৈর্বা বসুন্ধরা ॥ ৪৪ ॥
কল্হারপাটলাম্ভোজমালতীচম্পকোৎপলাইঃ
স্থলাম্বুপ্রভবৈশ্চান্যৈঃ সুগন্ধা কুসুমৈস্তথা ॥ ৪৫ ॥

সকল বর্ণের নিবাসের জন্য উপযুক্ত ভূমি—এখন ব্রাহ্মণ প্রভৃতি চার বর্ণের জন্য যে ভূমি প্রশস্ত বলে বলা হয়েছে তার বর্ণনা করা হচ্ছে। যে ভূমি কুঙ্কুম, আগুরু, কর্পূর, এলাচ ও চন্দন প্রভৃতি বৃক্ষের সঙ্গে মিশ্রিত, অথবা পৃথকভাবে সুগন্ধযুক্ত বৃক্ষসমৃদ্ধ; যে ভূমি কল্হার (শাপলা), পাটল (রক্তকমল), আম্বোজ (পদ্ম), মালতী, চম্পক, নীলকমল প্রভৃতি স্থলজ ফুলে সমৃদ্ধ অথবা জলে জন্মানো অন্যান্য সুগন্ধি পুষ্পে পরিপূর্ণ—সে ভূমি সকল বর্ণের জন্যই উপযুক্ত ॥ ৪৪–৪৫ ॥

গোমূত্রগোময়ক্ষীরদধিমধ্বাজ্যগন্ধভাক্ ।
সমানগন্ধা মদিরামাধ্বীকে ভমদাসবৈঃ ॥ ৪৬ ॥
শালিপিষ্টকগন্ধৈশ্চ ধান্যগন্ধৈশ্চ যা তথা ।
প্রশস্তাখিলবর্ণানামীদৃগ্গন্ধা বসুন্ধরা ॥ ৪৭ ॥

যে ভূমি গোমূত্র, গোবর, দুধ, দই, মধু ও ঘৃত প্রভৃতি যজ্ঞীয় পদার্থের সুগন্ধে সুগন্ধিত; যে ভূমি মদিরা, মাধ্বীক (এক প্রকার আঙুরের সুরা), গজমদ ও অন্যান্য আসবের ন্যায় গন্ধযুক্ত; এবং শালি ধান কুটে ও পেষণ করলে যে গন্ধ নির্গত হয় তার মতো সুগন্ধি অথবা ধান্যের গন্ধে সুগন্ধিত—এমন ভূমি ব্রাহ্মণাদি সকল বর্ণ ও জাতির বাসস্থানের জন্য প্রশস্ত ॥ ৪৬–৪৭ ॥

অপরা সর্বসাধারণী ভূমিঃ
সিতা রক্তা চ পীতা চ কৃষ্ণা চৈব ক্রমান্মহী।
বিপ্রাদীনাং হি বর্ণানাং সর্বেষামথবা হিতা ॥ ৪৮ ॥

ব্রাহ্মণাদি বর্ণানুসারে ভূমির প্রশস্ততা—সাদা ভূমি ব্রাহ্মণের জন্য, ক্ষত্রিয়ের জন্য লাল ভূমি, বৈশ্যের জন্য হলুদ ভূমি এবং শূদ্রের জন্য কালো ভূমি—এই ভূমিগুলি যথাক্রমে সকল বর্ণের জন্য বা সর্বসাধারণের কল্যাণের জন্য উপযোগী ॥ ৪৮ ॥

স্বাদুঃ কষায়া তিক্তাঃ চ কটুকাচেত্যনুক্রমাৎ ।
বর্ণানাং স্বাদতঃ শস্তা সর্বেষাং মধুরাথবা ॥ ৪৯ ॥

ভূমির স্বাদানুসারে প্রশস্ততার বর্ণনা—মিষ্টি স্বাদের, কষা, তিক্ত এবং কড়া—এই ক্রমানুসারে ভূমি যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র প্রভৃতি জাতির জন্য প্রশস্ত বলা হয়েছে। এইভাবে মধুর (মিষ্টি) স্বাদের ভূমি ব্রাহ্মণদের জন্য, স্বাদে কষা ভূমি ক্ষত্রিয়দের জন্য, তিক্ত স্বাদের ভূমি বৈশ্যদের জন্য এবং স্বাদে কড়া ভূমি শূদ্রদের জন্য উপযোগী। অথবা স্বাদে মিষ্টি ভূমিই সকল বর্ণের জন্য প্রশস্ত বলে মানা হয় ॥ ৪৯ ॥

ঘর্মাগমে হিমস্পর্শা যা স্যাদুষ্ণা হিমাগমে ।
প্রাবৃষ্যুষ্ণহিমস্পর্শা সা প্রশস্তা বসুন্ধরা ॥ ৫০ ॥

ভূমির স্পর্শানুসারে প্রশস্ততার বর্ণনা—গ্রীষ্ম ঋতু এলে যে পৃথিবী ঠান্ডা অনুভূত হয়, শীতকালে উষ্ণ অনুভূত হয় এবং বর্ষাকালে উষ্ণ ও শীতল—উভয়ই অনুভূত হয়—আচার্যগণের মতে সেই ভূমিই প্রশস্ত (শুভ) বলে গণ্য ॥ ৫০ ॥

মৃদঙ্গবল্লকীবেণুদুন্দুভীনাং সমা ধ্বনৌ ।
দ্বিপাশ্বাব্ধিসমস্বানা চেতি স্যুর্ভূময়ঃ শুভাঃ ॥ ৫১ ॥

ভূমির শব্দানুসারে প্রশস্ততার বর্ণনা—মৃদঙ্গ, বল্লকী (বীণা, সেতার), বেণু (বাঁশি) ও দুন্দুভির ধ্বনির ন্যায় যে পৃথিবীর কম্পন (শব্দ) শোনা যায়, এবং হাতি, ঘোড়া ও সমুদ্রের ধ্বনির মতো যে ভূমির গর্জন (ধ্বনি) হয়—সেই ভূমিগুলি শুভ বলে বিবেচিত ॥ ৫১ ॥

পুরাদিনিবেশনেṣu বর্জ্যানাং ভূবাং লক্ষণম্ ।
ইদানীমপ্রশস্তানাং ভূবাং লক্ষ্মাভিদধ্মহে ।
পুরাদিসন্নিবেশার্থং পরিত্যাজ্যা ভবন্তি যাঃ ॥ ৫২ ॥

পুরসংযোজনের জন্য বর্জনীয় ভূমির লক্ষণ—এখন সেই অধম ভূমিগুলির লক্ষণ বলা হচ্ছে, যেগুলি পুর প্রভৃতির সন্নিবেশের জন্য পরিত্যাজ্য ॥ ৫২ ॥

ভস্মাঙ্গারকপালাস্থিতুষকেশবিষাশ্মভিঃ ।
মূষকোৎকরবল্মীকশর্করাভিশ্চ নির্বরা ॥ ৫৩ ॥

যে ভূমি ভস্ম, অঙ্গার, কপাল ও অস্থি, তুষ (ভূষি), কেশ (চুল), বিষ, পাথর, ইঁদুরের গর্ত, ঢিবি ও নুড়ি-পাথরে পরিপূর্ণ—সেই ভূমি পরিত্যাজ্য ॥ ৫৩ ॥

রূক্ষা প্ররোহিণী নিম্না ভঙ্গরা সুṣিরোষরা ।
বামাবর্তজলাস্রাবিণ্যসারা বিষমোন্নতা ॥ ৫৪ ॥
কটুকণ্টকিনিḥসারশুষ্কনিষ্ফলপাদপাঃ ।
ক্রব্যাৎপক্ষিসমাকীর্ণা কৃমিকীটবতী চ যা ॥ ৫৫ ॥

যে ভূমি রূক্ষ অর্থাৎ শুষ্ক, অতিরিক্ত অঙ্কুরোদ্গমশীল, নিচু, ফাটা-ফাটা, উষর; যেখানে বামাবর্তে জল প্রবাহিত হয়, জলস্বল্প, অসমতল ও উঁচু-নিচু; কড়া কাঁটাযুক্ত, নিḥসার, শুষ্ক ও ফলহীন বৃক্ষে পরিপূর্ণ; বাজ প্রভৃতি হিংস্র পাখিতে আচ্ছন্ন এবং কৃমি-কীটে ভরা—এমন ভূমি নিন্দিত বলে বলা হয়েছে ॥ ৫৪–৫৫ ॥

সুকৃতান্যপি ভোজ্যান্নভক্ষ্যপানানি তৎক্ষণাৎ ।
যস্যাং বিনাশমায়ান্তি সহ তূর্যাদিনিস্বনৈঃ ॥ ৫৬ ॥

এমন ভূমিতে সুকৃত (পুণ্য) তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে যায় এবং ভোজ্য অন্ন, ভক্ষ্য ও পানীয় প্রভৃতি তূর্যধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে নাশপ্রাপ্ত হয়। এই প্রকার ভূমিকে অধম ভূমি বলা হয় ॥ ৫৬ ॥

সরিত্ পূর্ববহা যস্যাং পুরার্থং তামপি ত্যজেত্ ।
বহুনা’পি যতোস্তত্র কালেনায়াতি সা পুনঃ ॥ ৫৭ ॥

যে ভূমিতে নদীগুলি পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়, সেই ভূমিও পুর প্রভৃতির জন্য পরিত্যাগ করা উচিত; কারণ সেখানে প্রায়ই সময়ের সাথে সেই নদীগুলি আবার ফিরে আসে ॥ ৫৭ ॥

বসাসৃঙ্মজ্জবিণ্মূত্রমলকোশপতত্রিণাম্ ।
সমগন্ধাং ত্যজেদুর্বীং তৈলস্য চ শবস্য চ ॥ ৫৮ ॥

বিদ্বান ব্যক্তি যে ভূমিতে পাখিদের চর্বি, রক্ত, মজ্জা, বিষ্ঠা, মূত্র, মল ও কোষের মতো গন্ধ রয়েছে, এবং তেল ও শবের ন্যায় দুর্গন্ধযুক্ত—সে ভূমি পরিত্যাগ করবেন ॥ ৫৮ ॥

সदैব ধূম্রবর্ণা যা মিশ্রবর্ণাথবা মহী ।
বিবর্ণা রূক্ষবর্ণা বা সা ন স্বাদিষ্টদায়িনী ॥ ৫৯ ॥

এছাড়া যে ভূমি সদা ধূম্র (ধোঁয়ার মতো) বর্ণের, অথবা মিশ্রবর্ণ, কিংবা বিবর্ণ বা রূক্ষবর্ণের—সে ভূমিও বাসযোগ্য নয় এবং তা কল্যাণকরও হয় না ॥ ৫৯ ॥

তিক্তাম্ললবণা চাপি ভূমির্যা স্বেদলা ভবেত্ ।
তাং লোকবিদ্বেষকরীং ত্যজেত্ পুরনিবেশনে ॥ ৬০ ॥

যে ভূমি তিক্ত, অম্ল, লবণাক্ত অথবা স্বেদজ (ঘামযুক্ত/সেঁতসেঁতে) প্রকৃতির হয়, সেই ভূমিকে লোককল্যাণ নাশকারী বলে জেনে নগর প্রভৃতির নিবেশের জন্য পরিত্যাগ করা উচিত ॥ ৬০ ॥

য়া রূক্ষখরসংস্পর্শা সদৈবোṣ্ণা হিমাথবা ।
অনিষ্টসুখসংস্পর্শা বা স্যাৎ তামপি সন্ত্যজেত্ ॥ ৬১ ॥

যে পৃথিবী সদা রূক্ষ ও তীক্ষ্ণ স্পর্শযুক্ত, এবং যে ভূমি সর্বদা উষ্ণ অথবা সর্বদা শীতল থাকে—এইরূপ অনিষ্টকর ও সুখস্পর্শবিহীন ভূমিও পরিত্যাগ করা উচিত ॥ ৬১ ॥

ক্রোষ্টূষ্ট্রশ্বখরস্বানাং যা চ নির্ঝরনিস্বনা ।
ভিন্নভাণ্ডসমক্রূরধ্বনিতাপি চ নেষ্যতে ॥ ৬২ ॥

যে ভূমি শিয়াল, উট, কুকুর ও গাধার শব্দের সদৃশ ধ্বনি উৎপন্ন করে, অথবা ঝর্ণার ন্যায় শব্দ করে, কিংবা ভাঙা পাত্রের মতো কর্কশ ধ্বনি দেয়—সে ভূমিও কল্যাণকারিণী নয় ॥ ৬২ ॥

ইতি গন্ধাদিভির্ভূমিঃ কথিতেয়ং শুভাশুভা ।

এইভাবে এখানে স্বাদ, গন্ধ প্রভৃতি লক্ষণের দ্বারা ভূমি শুভ না অশুভ—তার বর্ণনা করা হয়েছে ॥ ৬৩ ॥

কৃষ্যমাণায়াং ভুবি কাঠাদিদর্শনে ফলম্ ।
হলেন কৃষ্যমাণায়াং ভূমৌ কাঠে সমুদ্ধৃতে ॥ ৬৩ ॥
বিদ্যাত্ ভয়ং বহ্নিভবমিষ্টকায়াং ধনাগমম্ ।

জোতা ভূমিতে কাঠাদি দর্শনের ফল—এখন হাল দ্বারা ভূমি চাষ করার সময় মাটি থেকে যে বস্তু বের হয়, তার দ্বারা শুভাশুভ নির্ণয়ের কথা বলা হচ্ছে। হাল দিয়ে জোতা হলে যদি কাঠ বের হয়, তবে অগ্নিজনিত ভয়ের ইঙ্গিত বুঝতে হবে। যদি ইট বের হয়, তবে ধনাগমের লক্ষণ বুঝতে হবে ॥ ৬৩–৬৪ ॥

পাষাণেষু তু কল্যাণং কুলপ্রধ্বংসমস্থিষু ॥ ৬৪ ॥
সরীসৃপেষু সর্বেষু স্তেনেভ্যো ভয়মাদিশেত্ ।

যদি কঙ্কর বা পাথর বের হয়, তবে কল্যাণ সূচিত হয়। যদি অস্থি বের হয়, তবে বংশনাশের লক্ষণ বুঝতে হবে। যদি সাপ বের হয়, তবে চোরের ভয় নির্দেশ করে ॥ ৬৪–৬৫ ॥

অনূষরা বহুতৃণা শস্তা স্নিগ্ধোত্তরপ্লবা ॥ ৬৫ ॥
প্রাগীশানপ্লবা সর্বপ্লবা বা দর্পণোদরা ।

এইভাবে যে ভূমি অনূষর অর্থাৎ উর্বর, বহুতৃণযুক্ত, স্নিগ্ধ এবং যার ঢাল উত্তর বা ঈশান (উত্তর-পূর্ব) দিকে অথবা চারদিকেই থাকে, এবং যার উদর দর্পণের ন্যায় সমতল—সে ভূমি প্রশস্ত বলে বিবেচিত ॥ ৬৫–৬৬ ॥

বিমর্শ—এখানে অগ্নিপুরাণ ৯২.৮–৯ দ্রষ্টব্য।

মৃদাপরীক্ষাকথনম্
শুভে’হ্ন্যুপোষিতঃ স্নাতঃ শুচিঃ শুক্লস্ত্রগম্বরঃ ॥ ৬৬ ॥
স্বস্তি বিপ্রান্ বাচয়িত্বা বাস্তুদেবান্ সমর্চ্য চ ।
করপ্রমাণং কুর্বীত খাতং তদ্ভূমিমধ্যগম্ ॥ ৬৭ ॥

মৃত্তিকা পরীক্ষা—এখন ভূমির নানাবিধ লক্ষণ বলার পর ভূমি পরীক্ষার বিধান করা হচ্ছে। শুভ দিনে উপবাস করে, স্নান করে শুচি হয়ে, সাদা মালা ও বস্ত্র পরিধান করে, ব্রাহ্মণদের দ্বারা স্বস্তিবাচন করিয়ে এবং বাস্তুপদের বিভিন্ন দেবতার পূজা করে—সেই ভূমির মধ্যভাগে এক হাত পরিমাণ গর্ত খনন করা উচিত ॥ ৬৬–৬৭ ॥

ততস্তন্মৃদমাকৃষ্য
তৎ তয়ৈবানুপূরয়েত্ ।
খাতাধিকমৃদুক্তা ভূঃ শ্রেষ্ঠা মধ্যা চ তৎসমা ॥ ৬৮ ॥
প্রহীণখাতমৃত্ ক্ষোণী হীনা শস্তা ন সা নৃণাম্ ।

এরপর খনন করা মাটি তুলে নিয়ে সেই মাটিই দিয়ে পুনরায় গর্তটি ভরতে হবে। যদি মাটি গর্ত ভরার পরেও অতিরিক্ত থেকে যায়, তবে সেই ভূমি উত্তম; যদি ঠিক সমান হয়, তবে মধ্যম ফলদায়ী; আর যদি কম পড়ে যায়, তবে সেই ভূমি অধম—এবং সেই অধম ভূমি মানুষের জন্য প্রশস্ত নয় ॥ ৬৮–৬৯ ॥

অন্যান্য ভূপরীক্ষণানি
(মৃত্তিকাপরীক্ষা-প্রকারাঃ)

খন্যমানে যদা খাতে তন্মৃদো’ন্তর্বিলোক্যতে ॥ ৬৯ ॥
মণিশঙ্খপ্রবালাদি তদাতিশ্রেয়সী ক্ষিতিঃ ।

ভূমি পরীক্ষার অন্যান্য প্রকার—এখন মৃত্তিকা পরীক্ষার দ্বিতীয় পদ্ধতি বলা হচ্ছে। গর্ত খনন করার সময় যদি সেই মাটির ভেতরে মণি, শঙ্খ বা প্রবাল প্রভৃতি দেখা যায়, তবে সেই ভূমিকে অত্যন্ত প্রশস্ত বলে জানা উচিত ॥ ৬৯–৭০ ॥

সাপি প্রশস্যতে ভূমির্যস্যাং স্যুঃ খাতপাংশবঃ ॥ ৭০ ॥
তুষকেশোপলাঙ্গার ভস্মাস্থিলববর্জিতাঃ

যে ভূমিতে খননের সময় মাটি ছাড়া অণুমাত্রও ভূসি, চুল, কঙ্কর, অঙ্গার, ভস্ম বা অস্থি দেখা যায় না—সে ভূমিও প্রশস্ত বলে গণ্য ॥ ৬৯–৭১ ॥

ভৃত্যোদ্ভিঃ খাতমাপূর্ণে তস্মিন্ পদশতং ব্রজেত্ ॥ ৭১ ॥
তাবচ্চেদাগমে’ম্ভঃ স্যাৎ তদা ভূঃ সর্বকামিকী ।
মধ্যমাত্র প্রহীণে স্যাৎ ততো হীনতরে’ধমা ॥ ৭২ ॥

মৃত্তিকা পরীক্ষার তৃতীয় পদ্ধতি—খনন করা গর্তটি জল দিয়ে পূর্ণ করে একশো পা হেঁটে ফিরে আসতে হবে। ফিরে এসে যদি গর্তে পূর্বের মতোই জল থাকে, তবে সেই ভূমিকে সর্বকামিকী অর্থাৎ সকল কামনা পূরণকারী বলা হয়। যদি জল কিছু কমে যায়, তবে মধ্যম শ্রেণির; আর যদি আরও কমে যায়, তবে সে ভূমি অধম শ্রেণির হয় ॥ ৭১–৭২ ॥

খাতে সিতাদিমাল্যানি যস্যাং নিশ্যুষিতানি চ ।
যদ্বর্ণানি ন শুষ্যন্তি সা তদ্বর্ণেষ্টদা মহী ॥ ৭৩ ॥

মৃত্তিকা পরীক্ষার চতুর্থ পদ্ধতি—ব্রাহ্মণাদি বর্ণানুসারে যথাক্রমে সাদা, লাল, হলুদ ও কালো মালা খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়। যেসব বর্ণের মালা না শুকিয়ে সতেজ থাকে, সেই বর্ণের জন্য সেই মাটি প্রশস্ত বলে মানা হয় ॥ ৭৩ ॥

খাতস্যোদক্প্রভৃতিষু দিক্ষু প্রজ্বালয়ীত বা ।
দীপান্ যস্যাং চিরং তিষ্ঠেত্ তদ্বর্ণেষ্টপ্রদা হি সা ॥ ৭৪ ॥

মৃত্তিকা পরীক্ষার পঞ্চম পদ্ধতি—মাটি পরীক্ষার জন্য খনন করা গর্তের চারদিকে পূর্ব প্রভৃতি দিকগুলোতে দীপ জ্বালিয়ে রাখতে হবে। যে দিকের দীপ শেষ পর্যন্ত জ্বলে থাকে, সেই দিকের বর্ণের জন্য সেই ভূমি সুখপ্রদ হয় ॥ ৭৪ ॥

ইত্যেবং কীর্তিতাঃ কাত্স্ন্যাল্লক্ষ্মভিঃ পুরভূময়ঃ ।
খর্বটগ্রামখেটানামেতা এব স্মৃতা হিতাঃ ॥ ৭৫ ॥

এইভাবে সমস্ত লক্ষণের দ্বারা পুরভূমির বর্ণনা করা হলো। গ্রাম, খেট (ছোট বসতি) ও খর্বট প্রভৃতির জন্যও এই নিয়মগুলিই হিতকর বলে স্মৃত হয়েছে ॥ ৭৫ ॥

এইভাবে সকল লক্ষণে সমন্বিত পুর (নগর)-এর জন্য উপযুক্ত ভূমির এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। একইভাবে খর্বট, গ্রাম এবং খেট (ছোট গ্রাম)-এর ভূমিও এই নিয়মে বোঝা উচিত ॥ ৭৫ ॥

বর্ণিনাং বর্ণধাম্নাং চ শিবিরাণাং চ সর্বদা ।
প্রাসাদযজ্ঞবাটানামেতা এবেষ্টদা ভুবঃ ॥ ৭৬ ॥

ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়াদি বর্ণসমূহের নিবাসের জন্য উপযুক্ত ভবনসমূহে, রাজাদের দুর্গ নির্মাণে, দেবতাদের প্রাসাদে এবং যজ্ঞবাট (যজ্ঞস্থল)-এর ক্ষেত্রেও এই ভূমিগুলিই শুভফলদায়ক অথবা অশুভফলদায়ক বলে বিবেচিত হয় ॥ ৭৬ ॥

ইত্যেবমাদিভিরিমাঃ শুভলক্ষ্মযুক্তাঃ
ভূম্যঃ শুভা নিগদিতা নগরাদিহেতোঃ ।
আভ্যঃ পরেণ বহুধা পরিকল্প্যমানং
ব্রূমস্ত্রিধা স্থিতবতো’পি করস্য মানম্ ॥ ৭৭ ॥

এইভাবে নগরাদি নির্মাণের উদ্দেশ্যে শুভলক্ষণযুক্ত এই শুভ ভূমিগুলির বিবরণ দেওয়া হলো। এর পরবর্তী অংশে নানাভাবে পরিকল্পিত ‘হস্ত’ (= গজ)-এর বিভিন্ন (জ্যেষ্ঠ, মধ্যম ও কনিষ্ঠ) মানের প্রতিপাদন করা হচ্ছে ॥ ৭৭ ॥

॥ ইতি শ্রীমন্মহারাজাধিরাজশ্রীভোজদেববিরচিতে সমরাঙ্গণসূত্রধারাপরনাম্নি
বাস্তুশাস্ত্রে ভূমিপরীক্ষা নামা’ষ্টমো’ধ্যায়ঃ ॥ ৮ ॥

… Ig ….

এইভাবে নগরাদি নির্মাণের জন্য শুভপ্রদ লক্ষণসমূহে সমন্বিত এই শুভ ভূমিগুলির এখানে নিরূপণ করা হলো। এখন এর পরে বিভিন্ন প্রকারে কল্পিত ‘হস্ত’ (= গজ)-এর বিভিন্ন (জ্যেষ্ঠ, মধ্যম ও কনিষ্ঠ) মানের বিবরণ প্রদান করা হচ্ছে ॥ ৭৭ ॥

এইভাবে শ্রীমন্মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেববিরচিত সমরাঙ্গণ-সূত্রধার অপরনাম বাস্তুশাস্ত্র-এর ‘ভূমিপরীক্ষা’ নামক অষ্টম অধ্যায়টি মহাকবি পং রামকুবের মালবীয়ের দ্বিতীয় আত্মজ ড. সুধাকর মালবীয় কৃত ‘সরলা’ হিন্দি ব্যাখ্যাসহ সমাপ্ত হলো ॥ ৮ ॥

সমীক্ষাত্মক মন্তব্য

ভূমির প্রকার (৮.২–৯)

(১) বাস্তুশাস্ত্রীয় গ্রন্থ শিল্পরত্ন-এর পূর্বভাগ, তৃতীয় অধ্যায়ে ‘ভূমিপরিগ্রহ’-এর প্রসঙ্গে চার প্রকার ভূমির কথা বলা হয়েছে—পূর্ণা, সুপা (সুপদ্মা), ভদ্রা ও ধূম্রা—

পূর্ণা সুপদ্মা চ তথৈব ভদ্রা ধূম্রা চ ভূমির্বিহিতা চতুর্ধা ।
বক্ষ্যে চ তাসামপি লক্ষণানি সংক্ষেপতো ভূমিপরিগ্রহার্থম্ ॥ (৩.৪)

পূর্ণা ভূমি—
প্লক্ষন্যগ্রোধনিম্বার্জুনবকুলকুলস্থাপনসাশোকনিষ্পা-
বাঙোলৈর্মালতীচম্পকতিলখদিরৈঃ
কোদ্রবৈর্মুদ্রিতা বা ।
ভূমির্যা ভূধরাধীশ্বরশিখরগতা
পার্শ্বসংস্থাথবাদ্রেḥ
পূর্ণা সা পুষ্টিদাত্রী সুরনিলয়সমা কল্পনে স্বল্পতোয়া ॥ (৩.৫)

সুপদ্মা ভূমি—
কर्पূরাগরুনালিকেরতিলকৈর্দর্ভৈḥ
কদম্বার্জুনৈ-
র্মালিয়ৈḥ ক্রমুকেক্ষুকেতককুশৈḥ কুন্দারবিন্দোৎপলাইḥ ।
পূর্বোদকপ্লবশালিনী বহুজলা বা যা দরীদৃশ্যতে
সেয়ং শান্তিকরী সুরেশযজনে সূক্তা সুপদ্মা মহী ॥ (৩.৬)

ভদ্রা ভূমি—
তীরং বারিনিধেḥ শ্রিতাথ সরিতস্তীর্থস্য বা দক্ষিণে
ব্রীহিক্ষেত্রবিচিত্রাপ্যদিশি
যজ্ঞার্হাঙ্ঘ্রিপৈরঙ্কিতাঃ ।
কীর্ণা পুষ্পফলপ্রবালতরুভির্যোধ্যানহৃদ্যাপি বা
ভদ্রা সা পরিগীয়তে বসুমতী প্রীতিপ্রদা যজ্বনাম্ ॥ (৩.৭)

ধূম্রা ভূমি—
অকৈর্বেণুবিভীতকৈḥ স্নুহিযুতৈḥ শ্লেষ্মাতকৈḥ পীলুভিḥ
সংকীর্ণা বহুশর্করা চ কঠিনা গর্ভান্বিতা সোধরা ।
গৃধ্রশ্যেনবরাহবায়সশবাশাখামৃগৈḥ
সন্ততং
জুষ্টা যষ্টুরনিষ্টদা নিগদিতা ধূম্রা মহী সূরিভিḥ ॥ (৩.৮)

এগুলির অতিরিক্ত আরও চার প্রকার ভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়—
১. বারুণী, ২. ঐন্দ্রী, ৩. আগ্নেয়ী এবং ৪. বায়বী—

বারুণ্যৈন্দ্রী তথাগ্নেয়ী বায়বী ভূশ্চতুর্বিধা ॥ (৩.৯)

বারুণী ভূমি—
য়া কোমলতরুব্রাতা স্বতঃ পুষ্পিতকাননা ।
জলাশয়ৈশ্চ সর্বত্র যুক্তা ভূর্বারুণী স্মৃতা ॥ (৩.১০)

মাহৈন্দ্রী ভূমি—
য়া ক্ষীরবৃক্ষবহুলা সৌম্যে যস্যা জলং মহত্ ।
ব্রীহিক্ষেত্রং চ যাম্যায়াং সা মাহৈন্দ্রী ক্ষিতিঃ স্মৃতা ॥ (৩.১১)

আগ্নেয়ী ভূমি—
গৃধ্রকঙ্কবরাহর্ষশ্যেনগোমায়ুবায়সৈḥ
সংযুক্তা দূরপানীয়া
ভূরাগ্নেয়ী বিনিন্দিতা ॥ (৩.১২)

বায়বী ভূমি—
অক্ষস্নুহিকলিঙ্গার্কপীলুশ্লেষ্মাতকণ্টকৈḥ
যুক্তা যা নির্জলা ভূমিরশুভা বায়বী স্মৃতা ॥ (৩.১৩)

বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদের অনুসারে ভূমির প্রকার—
বিপ্রাদিক্রমতঃ
কুশেষুবনদূর্বাকাশযুক্তা ভুব-
স্তুল্যাতানবিতানসিন্ধুরসাব্ধ্যংশাধিদীর্ঘা
অপি।
শ্বেতাপাটলপীতমেচকরুচশ্চাজ্যাসৃগন্নাসবা-
মোদাঃ স্বাদুকষায়তিক্তকটুকাস্বাদান্বিতাশ্চ স্মৃতাঃ ॥ (৩.১৪)

(২) বিষ্ণুসংহিতা (দ্বাদশ পটল)-তেও সুপদ্মা, ভদ্রিকা, পূর্ণা ও ধূম্রা নাম পাওয়া যায় এবং গুণানুসারে তাদের তিন ভেদ—উত্তমা, মধ্যমা ও অধমা—উল্লেখিত—

ত্রিধোত্তমাধমা মধ্যা চতুর্থা জাতিভেদতঃ ।
সুপদ্মা ভদ্রিকা পূর্ণা ধূম্রেত্যপি তথৈব ভূঃ ॥ ২ ॥

বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদ প্রভৃতির অনুসারে ভূমি পরীক্ষা—
বিপ্রাদীনাং স্মৃতা ভূমিঃ সর্বেষা বত্তমস্য বা ।
সিতা রক্তা চ পীতা চ কৃষ্ণা বিপ্রাদিভূস্তথা ॥ ৭ ॥
মধুরা চ কষায়া চ তিক্তাচ কটুকা ক্রমাৎ ।
ঘৃতাসৃক্চরুবিংগন্ধা বহুবর্ণা তু বর্জিতা ॥ ৮ ॥

গ্রন্থকার (শ্লোক ১০–১৪)-এ নিন্দিত ভূমির দোষগুলিরও বর্ণনা করেছেন, যা সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর বর্ণনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

(৩) বিশ্বকর্মবাস্তুশাস্ত্র (৫.৬)-এ পৃথিবীর গুণভেদের অনুসারে উত্তমা, মধ্যমা ও অধমা—এই তিন প্রকার ভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। রস, বর্ণ, স্পর্শ এবং …গন্ধ প্রভৃতি অন্যান্য লক্ষণের অনুসারে ভূমির ভেদ এইরূপে পাওয়া যায়—

ব্রাহ্মণী ভূমি—

মাধুর্যমৃৎতিকাযুক্তা
ভূমির্দেববিপ্রহিতপ্রদা ।
তথোদুম্বরবৃক্ষাঢ্যা শ্বেতবর্ণা চ ভূরপি ॥ ৮ ॥
(উদীচ্যাং চ জলোপেতা ভूरিয়ং চোত্তমা মতা ।)

মধুর মাটিযুক্ত যে ভূমি দেবতা ও ব্রাহ্মণদের কল্যাণ প্রদানকারী, উদুম্বর বৃক্ষে সমৃদ্ধ এবং শ্বেতবর্ণ—উত্তর দিকে জলযুক্ত সেই ভূমিকে উত্তম বলা হয়েছে।

ক্ষত্রিয়া ভূমি—

কষায়মৃৎতিকা ভূমী রক্তবর্ণা চ ভূরপি ॥ ৯ ॥
পূর্বভাগজলোপেতা
তথাশ্বত্থদ্রুমান্বিতা ।
বিপুলা লোহযুগ্ভূমিঃ ক্ষত্রিয়াণাং হিতপ্রদা ॥ ১০ ॥

কষায় মাটিযুক্ত, রক্তবর্ণ ভূমি, পূর্বদিকে জলসম্পন্ন, অশ্বত্থ বৃক্ষে সমন্বিত, বিস্তৃত এবং লৌহসমৃদ্ধ—এমন ভূমি ক্ষত্রিয়দের জন্য হিতকর।

বৈশ্যবর্ণ ভূমি—

নাতিকৃষ্ণা ন রক্তা চ প্লক্ষদ্রুমসমন্বিতা ।
দক্ষিণায়াং জলোপেতা নাতিনিম্নোন্নতস্থলা ॥ ১১ ॥
ভূরিয়ং বৈশ্যজাতীনাং বলসম্পৎকরা মতা ।

অতিশয় কালো বা লাল নয়, প্লক্ষ বৃক্ষে সমন্বিত, দক্ষিণ দিকে জলযুক্ত এবং অতিনিম্ন বা অতিউচ্চ নয়—এমন ভূমি বৈশ্য জাতির জন্য বল ও সম্পদ প্রদানকারী।

শূদ্রা ভূমি—

কটুমৃৎস্না কৃষ্ণবর্ণা বটবৃক্ষসমন্বিতা ॥ ১২ ॥
বারুণ্যামুদকোপেতা শূদ্রাণাং ক্ষেমকারিণী ।

কটু মাটিযুক্ত, কৃষ্ণবর্ণ, বটবৃক্ষে সমৃদ্ধ এবং বারুণী দিক থেকে জলসম্পন্ন ভূমি শূদ্রদের জন্য কল্যাণকর।

এগুলির অতিরিক্ত ভূমির উত্তম গুণাবলির বর্ণনা বিশ্বকর্মা বাস্তুশাস্ত্র-এর ১৪–২১ অধ্যায়ে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ভূমির দোষসমূহ (২৩–২৭)ও বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে ভূমিকম্পে প্রভাবিত ভূমি এবং অগ্নিদগ্ধ ভূমি বিশেষভাবে পরিত্যাগযোগ্য—

কम्पেন ভেদিতা ভূমিরগ্নিদগ্ধা চ সর্বতঃ ॥ (৫–২৭)

অপ্রশস্ত ভূমির বর্ণনা সমরাঙ্গণসূত্রধার (৮.৫২–৬২)-এ বিস্তৃতভাবে পাওয়া যায়। অন্যান্য বাস্তুগ্রন্থেও এই বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।

(৪) ময়মতং (৩.১–২০) অনুসারে ভূমি-পরীক্ষা—

দেবানাং তু দ্বিজাতীনাং চতুরস্রায়তাঃ শ্রুতাঃ ।
বস্তুয়াকৃতিরনিন্দ্যা সা বাক্প্রত্যগ্দিক্সমুন্নতা ॥ ১ ॥

পূর্বোদগ্বারিসারা বরসুরভিসমা শূলহীনাস্থিবর্জ্যা
সা ভূমিঃ সর্বযোগ্যাকণদররহিতা সম্মতাধ্যৈর্মুনীন্দ্রৈঃ ॥ ২০ ॥

দেবালয় ও ব্রাহ্মণদের জন্য আয়তাকার ভূমি প্রশস্ত। ভূমির আকৃতি নিন্দনীয় হওয়া উচিত নয় এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে ভূমি উঁচু হওয়া উচিত। অশ্ব, গজ, বেণু, বীণা, সমুদ্র (জল) ও দুন্দুভি প্রভৃতি বাদ্যের ন্যায় ধ্বনি (ধমক) যুক্ত ভূমি হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুন্নাগ (নাগকেশর), জাতিপুষ্প (চামেলি), কমল, ধান্য ও পাটল (গোলাপ)-এর গন্ধে ভূমি সুবাসিত হওয়া উচিত।

১. শ্রেষ্ঠ ভূমি—

যে ভূমি পশুর গন্ধের সদৃশ এবং যাতে সকল প্রকার বীজ বপন করা যায়—সে ভূমি শ্রেষ্ঠ। ভূমি একবর্ণ, সঘন, কোমল, স্পর্শে স্নিগ্ধ ও সুখপ্রদ হওয়া উচিত। যে সমতল ভূমিতে বেল, নিম, নির্গুণ্ডী, পিণ্ডিত, সপ্তপর্ণক (সপ্তচ্ছদ) ও সহকার (আম)—এই ছয় বৃক্ষ থাকে, সে ভূমি শ্রেষ্ঠ।

রঙে শ্বেত, লাল, হলুদ ও কবুতরের ন্যায় কালো; স্বাদে তিক্ত, কটু, কষায়, লবণাক্ত, খট্টা ও মধুর—এই ছয় স্বাদযুক্ত ভূমি সকল প্রকার সম্পদ প্রদান করে। রঙ, গন্ধ ও স্বাদযুক্ত যে ভূমিতে জলধারার প্রবাহ ডানদিকে হয়, সে ভূমি বাসযোগ্য ও শুভ।

(উৎখনন করলে) পুরুষাঞ্জলি প্রমাণে জল দৃশ্যমান হলে, মনোহর, কপাল ও অস্থিবিহীন, কঙ্কর ও পাথরহীন, কীট ও দীমকের বাঁবি-বিহীন, ছিদ্ররহিত, সূক্ষ্ম বালিযুক্ত, জ্বলা কয়লা, বৃক্ষমূল ও কাঁটা-বিহীন, কাদা, ধুলো, কূপ, কাঠ, মাটির ঢেলা, বালি, ছাই (= ভস্ম) ও ভূষিমুক্ত ভূমি সকল জাতির মানুষের জন্য শুভ ও সমৃদ্ধিদায়ক। যে ভূমি দধি, ঘৃত, মধু (মধ্য), তেল ও রক্তের গন্ধযুক্ত—তাও প্রশস্ত বলে মানা হয়।

২. বর্জ্য ভূমি—

শব, মাছ ও পাখির গন্ধযুক্ত ভূমি বাসযোগ্য নয়। একইভাবে সভাগৃহ, চৈত্য (গ্রামের প্রধান বৃক্ষ) ও রাজভবনের নিকটবর্তী ভূমি গৃহনির্মাণের দৃষ্টিতে পরিত্যাজ্য। দেবালয়ের নিকট, কাঁটাযুক্ত বৃক্ষে সমৃদ্ধ, বৃত্তাকার, ত্রিভুজাকার, বিষম (অসামঞ্জস্য আকৃতি), বজ্রের সদৃশ (বহু কোণযুক্ত) এবং কচ্ছপাকৃতি (মধ্যভাগ উঁচু) ভূমি গৃহনির্মাণের জন্য প্রশস্ত নয়।

চাণ্ডালদের গৃহের ছায়া পড়ে এমন স্থান, চর্মজীবীদের গৃহের নিকট, এক, দুই, তিন ও চারমুখী পথ—অর্থাৎ রাজপথ, ত্রিরাস্ত্র ও চৌরাস্তায় অবস্থিত ভূমি এবং যেখানে সুস্পষ্ট পথ নেই—এমন স্থানে গৃহনির্মাণ অনুপযুক্ত।

মধ্যভাগে দেবে যাওয়া, পণব (ঢোলজাত বাদ্য), পাখি, মুরজ (পখাওয়াজ) ও মাছের ন্যায় আকৃতিযুক্ত ভূমি এবং কোণায় অশ্বত্থ, বট প্রভৃতি মহাবৃক্ষযুক্ত ভূমি গৃহনির্মাণের জন্য অনুচিত।

গ্রামের প্রধান বৃক্ষের নিকট, চার কোণায় শাল বৃক্ষযুক্ত স্থান, সাপের আবাসের নিকট এবং মিশ্র জাতির বৃক্ষের উদ্যানসংলগ্ন ভূমি গৃহনির্মাণের জন্য প্রশস্ত নয়।

শ্মশানক্ষেত্র, আশ্রমস্থান, বানর ও শূকরের ন্যায় আকৃতি, বনসাপের মতো বাঁকানো, কুঠারের আকৃতি এবং শূর্প ও উলুখলের ন্যায় আকৃতিযুক্ত ভূমি গৃহের জন্য বর্জ্য। শঙ্খ, শঙ্ক, বিড়াল, গিরগিটি ও টিকটিকির আকৃতিযুক্ত ভূমি, উষর ও কীটাক্রান্ত ভূমিও পরিত্যাজ্য।

এভাবেই অন্যান্য বক্রাকৃতি, বহু প্রবেশপথযুক্ত ও বহুপথে বিদ্ধ ভূমি বিদ্বানদের দ্বারা নিন্দিত। অজ্ঞতাবশত এমন ভূমিতে গৃহ নির্মাণ হলে গুরুতর দোষ উৎপন্ন হয়; অতএব সকল প্রকারে এমন ভূমি পরিত্যাগ করা উচিত।

শ্বেত, রক্ত, পীত ও কৃষ্ণবর্ণ ভূমি, অশ্ব ও গজের নিনাদযুক্ত, মধুর প্রভৃতি ছয় স্বাদসম্পন্ন, একবর্ণ, গো-ধান্য ও কমলের গন্ধযুক্ত, পাথর ও ভূষিমুক্ত, দক্ষিণ ও পশ্চিমে উঁচু এবং পূর্ব ও উত্তরে ঢালযুক্ত, উৎকৃষ্ট সুরভির সদৃশ, কাঁটা ও অস্থিবিহীন, কণদ (ধুলো, বালি) রহিত ভূমি সকল বর্ণের জন্য অনুকূল—এমনটাই সকল শ্রেষ্ঠ মুনির মত।

দুর্গের জন্য উপযুক্ত স্থান (শ্লোক ৮.৩৬–৩৯)

দুর্গ নির্মাণ
(১) কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র (২.৪.১–৫)-এ দুর্গসংশ্লিষ্ট রাজভবনসমূহ ও নগরের প্রধান স্থানসমূহ (= প্রতিষ্ঠান) নির্মাণের বর্ণনা এইরূপ—

ত্রয়ঃ প্রাচীনা …………………
দিগ্দেবতাঃ ।

দুর্গসংশ্লিষ্ট রাজভবন ও নগরের প্রধান স্থানসমূহের নির্মাণ—
বাস্তুবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের নির্দেশানুসারে যে ভূমি নগর নির্মাণের জন্য নির্বাচিত …184

কিছু অধ্যায় বাদ দেওয়া হলঃ

অথ চতুস্ত্রিংশো’ধ্যায়ঃ
* অপ্রয়োজ্যপ্রয়োজ্যম্ *
(Legible and Illegible Building Material and Wall-Paintings)

রাজ্ঞাং সেনাপতীনাং চ বর্ণিনামপি বেশ্মসু ।
যদি বা বাস্তুক্ষাসু সভাদেবকুলেষু চ ॥ ১ ॥

ভবন নির্মাণে প্রয়োগযোগ্য ও অপ্রয়োগযোগ্য বস্তুসমূহের বর্ণনা—রাজা ও সেনাপতিদের, এবং ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়াদি চার বর্ণের গৃহে, বাস্তু-কক্ষায়, সভাগৃহে ও দেবমন্দিরে যে বস্তুগুলি ব্যবহারযোগ্য এবং যে বস্তুগুলি ব্যবহারযোগ্য নয়—সেগুলির বর্ণনা করা হচ্ছে ॥ ১ ॥

শয়নাসনযানেষু
ভোজনাভরণেষু চ ।
ছত্রধ্বজপতাকাসু সর্বোপকরণেষু চ ॥ ২ ॥

অপ্রয়োজ্যানি যানি স্যুঃ প্রয়োক্তব্যানি যানি চ ।
বিস্তারাৎ তানি কথ্যন্তে হিতার্থমথ দেহিনাম্ ॥ ৩ ॥

শয়নগৃহ, আসন, যান, ভোজন ও অলংকার, ছত্র, ধ্বজা ও পতাকা প্রভৃতি সকল উপকরণে যে বস্তুগুলি অপ্রয়োজ্য এবং যে বস্তুগুলি প্রযোজ্য—সেগুলি প্রাণীদের কল্যাণার্থে এখানে বিস্তারে বলা হচ্ছে ॥ ২–৩ ॥

রাজাদীনাং বেশ্মেষ্বপ্রয়োজ্যানাং পরিগণনম্

পূর্বোক্তানাং নৃপাদীনাং যানি বেশ্মসু কেবলম্ ।
অপ্রয়োজ্যানি তান্যেব পূর্বমত্রাভিদধ্মহে ॥ ৪ ॥

ভবনের সৌন্দর্যে অপ্রয়োজ্য বস্তু বা উপকরণ—পূর্বে উল্লিখিত রাজা প্রভৃতি ব্যক্তিদের গৃহে যে যে বস্তু অপ্রয়োজ্য বলা হয়েছে, সেগুলিই প্রথমে এখানে বলা হচ্ছে ॥ ৪ ॥

তেষু প্রযোজ্যানাং প্রদর্শনোপক্রমঃ

তেষু নৈব প্রয়োক্তব্যাঃ সমস্তা অপি দেবতাঃ ।
দৈত্যা গ্রহাস্তথা তারা যক্ষগন্ধর্বরাক্ষসাঃ ॥ ৫ ॥
পিশাচাঃ পিতরঃ প্রেতাঃ সিদ্ধবিদ্যাধরোরগাঃ ।
চারণা ভূতসঙ্ঘাশ্চ তেষাং যোষাঃ সুতাস্তথা ॥ ৬ ॥
প্রতীহারাঃ
প্রতিহার্যস্তেষামধিকৃতাশ্চ যে ।
আয়ুধানি তদীয়ানি সর্বে চাপ্সরসাং গণাঃ ॥ ৭ ॥

অপ্রয়োজ্য চিত্রকর্ম—এগুলির মধ্যে সমগ্র দেবতাদের (চিত্র) প্রযোজ্য নয়। দানব, গ্রহ, তারা, যক্ষ, গন্ধর্ব, রাক্ষস, পিশাচ, পিতৃ, প্রেত, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, নাগ, চারণ, ভূতসঙ্ঘ—এবং তাদের স্ত্রী ও পুত্র; পুরুষ প্রতিহার (প্রহরী) ও নারী প্রতিহারিণী এবং তাদের কর্মকর্তাবর্গ; তাদের অস্ত্র-শস্ত্র এবং সকল অপ্সরাগণ—এই সকলের চিত্র প্রয়োগযোগ্য নয় ॥ ৫–৭ ॥

দীক্ষিতব্রতিপাষণ্ডিনাস্তিকাঃ
ক্ষুৎপ্রপীড়িতাঃ ।
ব্যাধিবন্ধনশস্ত্রাগ্নিতৈলাসৃক্পঙ্কপাংশুভিঃ ॥ ৮ ॥
শূলজ্বরাদিভিশ্চার্তা যে’ন্যে’প্যেবংবিধা নরাঃ ।
মত্তোন্মত্তজড়ক্লীবনগ্নান্ধবধিরাদয়ঃ

রাজকর্মে বর্জিত ব্যক্তি—দীক্ষিত, ব্রতী, পাষণ্ডী, নাস্তিক, ক্ষুধায় কাতর; রোগ, বন্ধন, শস্ত্র, অগ্নি, তেল, রক্ত, কাদা ও ধুলায় আচ্ছন্ন; শূল (ব্যথা), জ্বর প্রভৃতিতে পীড়িত; মত্ত, উন্মত্ত, জড়, নপুংসক, নগ্ন, অন্ধ ও বধির প্রভৃতি ব্যক্তিদের রাজকর্মে নিযুক্ত করা উচিত নয় ॥ ৮–৯ ॥

দোলাক্রীড়াশ্চ নেষ্যন্তে গ্রহনাণি চ দন্তিনাম্ ।
দেবাসুরাদ্যাঃ সংগ্রামা বিগ্রহাশ্চ মহীক্ষিতাম্ ॥ ১০ ॥

গৃহচিত্রের নিষেধ—দোলা (দোলনা)-ক্রীড়া, হাতি ধরা, দেব-অসুরদের যুদ্ধ এবং রাজাদের সংঘর্ষের চিত্রে অলংকৃত ভবনও প্রশস্ত নয় ॥ ১০ ॥

প্রাণিযুদ্ধবিমর্দাশ্চ মৃগয়া চ ন শস্যতে ।
রৌদ্রদীনাদ্ভুতত্রাসবীভৎসকরুণা রসাঃ ॥ ১১ ॥
ন প্রাণিষু প্রয়োক্তব্যা হাস্যশৃঙ্গারবর্জিতাঃ ।

প্রাণীদের যুদ্ধ ও তাদের নিধন, এবং মৃগয়া (শিকার)-এর চিত্রও প্রশস্ত নয়। রৌদ্র, দীন, অদ্ভুত, ত্রাস, বীভৎস ও করুণ—এই রসগুলিও প্রযোজ্য নয়; অর্থাৎ হাস্য ও শৃঙ্গার ব্যতীত অন্য রসপ্রকাশক চিত্র ব্যবহার করা উচিত নয় ॥ ১১–১২ ॥

হস্ত্যশ্বরথযানানি বিমানায়তনানি চ ॥ ১২ ॥
চণ্ডানলপ্রদীপ্তানি ভবনানি বনানি চ ।

হস্তিযান, অশ্বযান, রথযান, বিমান ও আয়তন, এবং প্রচণ্ড অগ্নিতে দগ্ধ ভবন ও বনভূমির চিত্রও গৃহে রাখা উচিত নয় ॥ ১২–১৩ ॥

বৃক্ষাঃ পুষ্পফলৈরহীনা বিহঙ্গাবাসদূষিতাঃ ॥ ১৩ ॥
একদ্বিশাখা রূক্ষাশ্চ ভগ্নাঃ শুষ্কাঃ সকোটরাঃ ।
কদম্বশাল্মলীশেলুতারক্ষারলুকাদয়ঃ ॥ ১৪ ॥
ভূতালয়ত্বান্নেষ্যন্তে কটুকণ্টকিনশ্চ যে।

বর্জিত বৃক্ষের চিত্র—পুষ্প ও ফলহীন বৃক্ষ, পাখির বাসে দূষিত বৃক্ষ; এক বা দুই শাখাবিশিষ্ট, রূক্ষ, ভগ্ন, শুষ্ক ও কোঠরযুক্ত বৃক্ষ—এবং কদম্ব, শাল্মলী, শেলু, তার, ছার, লুক প্রভৃতি বৃক্ষ—ভূতদের আবাস বলে গৃহে রাখা উচিত নয়। তিক্ত ও কাঁটাযুক্ত বৃক্ষও গৃহে প্রশস্ত নয় ॥ ১৩–১৫ ॥

গৃধ্রোলূকা বিহঙ্গেষু কপোতশ্যেনবায়সাঃ ॥ ১৫ ॥
কঙ্কশ্চেতি ন শস্যন্তে খগা রাত্রিচরাশ্চ যে ।

বর্জিত পাখির চিত্র—পাখিদের মধ্যে গৃধ্র (শকুন), উল্লুক (পেঁচা), কবুতর, বাজ, কাক ও কঙ্ক প্রভৃতি গৃহে রাখা প্রশস্ত নয়। রাত্রিচর পাখির চিত্রও বিদ্বানদের মতে অগ্রহণীয় ॥ ১৫–১৬ ॥

গজাশ্বমহিষাশ্চোষ্ট্রা
মার্জারখরবানরাঃ ॥ ১৬ ॥
সিংহো ব্যাঘ্রস্তরক্ষুশ্চ বরাহমৃগজম্বুকাঃ ।
তথা বনচরা যে চ ক্রব্যাদা মৃগপক্ষিণঃ ॥ ১৭ ॥
গৃহেষ্বেতে ন কর্তব্যাঃ শৈলাটব্যাশ্রিতাশ্চ যে ।
অমীষাং করণাদর্থৈরাচার্যো বিপ্রমুচ্যতে ॥ ১৮ ॥
ব্যাধিং ঘোরমবাপ্নোতি ব্যসনং বন্ধমেব চ ।

হাতি, ঘোড়া, মহিষ, উট, বিড়াল, গাধা, বানর; সিংহ, বাঘ, ভালুক, বরাহ, হরিণ, শিয়াল; এবং বনচর, মাংসাশী পশু-পাখি—এদের চিত্র গৃহে করা উচিত নয়, বিশেষত যারা পর্বত ও অরণ্যে বাস করে। এসবের চিত্র ব্যবহারে আচার্য আর্থিক দোষে মুক্ত থাকেন না; বরং ভয়ংকর রোগ, দুর্বিপাক ও বন্ধনের সম্মুখীন হতে হয়।

গৃহে নিষিদ্ধ পশু ও বনচরদের মধ্যে হাতি, ঘোড়া, মহিষ, উট, বিড়াল, গাধা, বানর, সিংহ, ব্যাঘ্র, তরক্ষু, শূকর, হরিণ এবং শৃগাল প্রশস্ত বলা হয়নি। আর যে কুকুরাদি (= ক্রব্যাদ) মাংসভোজী পশু-পাখি আছে, এদের সকলকেই ঘরে রাখা উচিত নয়। তদ্রূপ যে সব পশু-পাখি পর্বত ও অরণ্যে বাস করে, তাদেরও রাখা উচিত নয়; কারণ এদের রাখলে আচার্যের অর্থহানি উপস্থিত হয় এবং একই সঙ্গে তার জন্য ভয়ংকর ব্যাধি ও বন্ধনকারী কষ্টও উপস্থিত হয় ॥ ১৬-১৯ ॥

যত্র তত্র গৃহস্বামী ধনহানিং পরাজয়ম্ ॥ ১৯ ॥
প্রবাসং বন্ধনং নাশং মৃত্যং বা ক্ষিপ্রাপ্নুয়াত্ ।
ইত্যুক্তান্যপ্রশস্তানি গৃহেষু গৃহমেধিনাম্ ॥ ২০ ॥

ঘরে অপ্রশস্ত বৃক্ষ বা পশুদের থাকার ফল—যেখানে এমন অপ্রশস্ত বৃক্ষ বা পশু-পাখির ব্যবহার হয়, সেই ঘরের গৃহস্বামীও ধনহানি, পরাজয়, প্রবাস, বন্ধন, নাশ তথা মৃত্যু শীঘ্রই লাভ করে। এইভাবে গৃহস্থদের ঘরে এই অপ্রশস্ত (= অপ্রযোজ্য) বস্তুগুলির বর্ণনা করা হয়েছে ॥ ১৯-২০ ॥

তত্র প্রয়োজ্যা দেবতা
তত্র যানি প্রয়োজ্যানি কথ্যন্তে তান্যতঃ পরম্ ।
যশ্চ যত্র ভবেদ্ ভক্তির্যা চাস্য কুলদেবতা ॥ ২১ ॥
হস্তক্লৃপ্তপ্রমাণেন তান্ কুর্বন্ স্যান্ন দোষভাক্।

ভবনের সৌন্দর্যে প্রযোজ্য বস্তু বা উপকরণ—এখন সেখানে যে প্রযোজ্য বস্তু বা বৃক্ষ আছে, তাদের বর্ণনা করা হচ্ছে। যার যেখানে ভক্তি থাকে এবং যার যে কুলদেবতা, সেই দেবতার প্রতিমা এক হাতের প্রমাণে নির্মাণ করে পূজা করলে গৃহী দোষের অধিকারী হয় না ॥ ২১-২২ ॥

দ্বারেষু প্রয়োজ্যাঃ প্রতীহার্যাদিপ্রতিকৃতয়ঃ তত্রৈব
নিধীনাং লক্ষ্ম্যাশ্চ নিবেশনপ্রকারঃ
তদ্দ্বারপার্শ্বয়োঃ কার্যৌ প্রতীহারৌ স্বলঙ্কৃতৌ ॥ ২২ ॥
বেত্রদণ্ডব্যগ্রকরৌ
খঙ্গকোষপরিচ্ছদৌ ।
রূপযৌবনসম্পন্নৌ
বিচিত্রাম্বরভূষণৌ ॥ ২৩ ॥

দ্বারে প্রতিহারীর চিত্র—ভবনের দরজার উভয় পাশে অলংকৃত দুই প্রতিহারীর চিত্র স্থাপন করা উচিত। তারা দু’জনই বেতের দণ্ড হাতে ধরা থাকবে; তরবারি ও তার খাপ ধারণ করবে; রূপ ও যৌবনে সম্পন্ন এবং বিচিত্র বস্ত্র ও অলংকারে সজ্জিত হবে। এইভাবে দুই প্রতিহারীকে দ্বারের উভয় পাশে যুক্ত করা উচিত ॥ ২২-২৩ ॥

ধাত্রী বামনিকা কুব্জা সখীভিঃ পরিবারিতা ।
বিদূষকৈঃ
কঞ্ছুকিভিস্তুষ্টৈরনুগতাস্তথা ॥ ২৪ ॥
দ্বারস্যোভয়তঃ কার্যাঃ প্রতীহার্যো মনোরমাঃ ।

সখীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত, হাস্যরসিক বিদূষক ও কঞ্চুকীদের দ্বারা অনুগত সুন্দরী নারী-প্রতিহারীদের দরজার উভয় পাশে স্থাপন করা উচিত ॥ ২৪-২৫ ॥

নিধয়শ্চানুরূপাশ্চ শঙ্খাব্জোজ্জ্বললক্ষণাঃ ॥ ২৫ ॥
রত্নদিনাররাশীংশ্চ বহন্তো বদনোদ্গতান্ ।

নিজ নিজ কাজে উপযোগী (অনুরূপ), শঙ্খ ও পদ্মের উজ্জ্বল লক্ষণে চিত্রিত, মুখ থেকে নির্গত রত্ন ও অশরফির স্তূপ বহনকারী নিধি (খজানা) গৃহে প্রযোজ্য বলা হয়েছে ॥ ২৫-২৬ ॥

পদ্মস্থা পূর্ণকুম্ভা বা রত্নবস্ত্রবিভূষিতা ॥ ২৬ ॥
বক্রৈরূর্ধ্বস্থিতৈঃ পুষ্পফলপল্লবসম্ভৃতৈঃ ।
পূর্ণকুম্ভাঙ্কুশচ্ছত্রশ্রীবৃক্ষাদর্শচামরৈঃ ॥ ২৭ ॥
কার্যাষ্টমঙ্গলাঃ দ্বারে দামভিঃ শঙ্খমৎস্যয়োঃ ।

অষ্টমঙ্গলা গৌরীর চিত্র—এইরূপে পদ্মাসীনা গৌরী, পূর্ণকুম্ভধারিণী, রত্ন ও বস্ত্রে বিভূষিতা, বাঁকা ও ঊর্ধ্বমুখী পুষ্প-ফল-পল্লবে পূর্ণ পূর্ণকুম্ভ, অঙ্কুশ, ছত্র, শ্রীবৃক্ষ (বেল), আদর্শ (আয়না) ও চামর দ্বারা চিহ্নিত, শঙ্খ ও মৎস্যের মালায় বিভূষিত অষ্টমঙ্গলা গৌরীর ভित्तিচিত্র গৃহের দ্বারে অঙ্কন করা উচিত ॥ ২৬-২৮ ॥

দ্বারমণ্ডলমধ্যস্থা স্নাপ্যমানা গজোত্তমৈঃ ॥ ২৮ ॥
পদ্মাসনা পদ্মহস্তা শ্রীশ্চ কার্য়া স্বলঙ্কৃতা ।

মহালক্ষ্মীর চিত্র—দ্বারমণ্ডলের মধ্যভাগে অবস্থিতা, উত্তম গজদের দ্বারা স্নান করানো হচ্ছে এমন, পদ্মাসনে উপবিষ্টা ও পদ্মধারিণী, সুসজ্জিত মহালক্ষ্মীর চিত্রও গৃহে স্থাপন করা উচিত ॥ ২৮-২৯ ॥

গৃহবাহ্যাভ্যন্তরভিত্তিষ্বালেখ্যানাং নিয়মাঃ
বৃষঃ সवत্সা ধেনুর্বা সচ্ছত্রস্ত্রগ্বিভূষণা ॥ ২৯ ॥
ফলভক্তৈর্বহুবিধৌরাহারার্থ
নিবেদিতৈঃ ।
নানাপুষ্পফলৈর্নগ্নৈঃ শালৈস্তির্যগবস্থিতৈঃ ॥ ৩০ ॥
চিত্রা পত্রলতা লেখ্যা বাহ্যাভ্যন্তরভিত্তিষু ।

গৃহের বাহির ও ভিতরের ভিত্তিতে চিত্রাঙ্কনের নিয়ম—বাছুরসহ বৃষ বা ছত্র ও মালায় বিভূষিত ধেনুকে গৃহে চিত্রিত করার বিধান আছে। বাহ্য ও অন্তর্ভিত্তিতে বিচিত্র পত্র-লতার চিত্র অঙ্কন করা উচিত, যেখানে আহারার্থ নিবেদিত ভক্ষণযোগ্য ফলযুক্ত, নানাবিধ পুষ্প ও ফলে নত ও তির্যকভাবে অবস্থানকারী বৃক্ষ দৃশ্যমান হবে ॥ ২৯-৩১ ॥

হংসকারণ্ডচক্রাহ্বৈর্বিসিনীপত্রবর্তিভিঃ ॥ ৩১ ॥
কুমারকৈশ্চ ক্রীডদ্ধির্যুক্তা ললিতবাহুভিঃ ।
বাসধাম্নি নিবেশ্যন্তে বিচিত্রাভরণাম্বরাঃ ॥ ৩২ ॥
রতিক্রীডাপরা নার্য়ো নায়কস্তু যদৃচ্ছয়া ।

পাখিদের বিধেয় চিত্র—ঐ পত্র-লতার সঙ্গে আরও চিত্রণ থাকবে, যেমন কমলিনীর পাতায় অবস্থানকারী হংস, কারণ্ডব ও চক্রবাক প্রভৃতি। সুন্দর বাহু দ্বারা ক্রীড়ারত কুমারদেরও চিত্রিত করা হবে। বিচিত্র অলংকার ও বস্ত্র ধারণকারী এবং রতিক্রীড়ায় নিমগ্ন নারীরা চিত্রিত হবে; নায়ককে ইচ্ছানুসারে চিত্রিত করা হবে ॥ ৩১-৩৩ ॥

আপাণ্ডুদেহচ্ছবয়ঃ
স্বল্পচারুবিভূষণাঃ ॥ ৩৩ ॥
কিঞ্চিত্রতনুভির্গাত্রৈঃ কার্য়াঃ সুরতলালসাঃ ।

শৃঙ্গারিক চিত্র—নারীদের চিত্রণে তাদের পীতাভ দেহচ্ছবি-যুক্ত, অল্প কিন্তু সুন্দর অলংকারে সজ্জিত, সামান্য লজ্জানত অঙ্গভঙ্গি-সহ সুরতলালস রূপে চিত্রিত করা উচিত ॥ ৩৩-৩৪ ॥

প্রবৃদ্ধশাখাবিটপৈঃ
প্রচলারুণপল্লবৈঃ ॥ ৩৪ ॥
চম্পকাশোকপুন্নাগ-নানাপ্রতিলকাদিভিঃ ।
ছায়াপুষ্পফলোপেতৈঃ বৃক্ষৈরন্যৈশ্চ ভূষিতাঃ ॥ ৩৫ ॥
উদ্যানভূময়ঃ কার্য়াঃ কূজৎপিকমধুব্রতাঃ ।

বৃক্ষের চিত্র—উন্নত ও বিস্তৃত শাখাযুক্ত, চলমান লাল পল্লববিশিষ্ট চম্পক, অশোক, পুন্নাগ এবং নানাবিধ আম ও তিলক প্রভৃতি বৃক্ষ, তদুপরি ছায়াদার অন্যান্য বৃক্ষ, পুষ্প ও ফলে সমন্বিত উদ্যানভূমি চিত্রিত করা উচিত। তেমনই অন্যান্য বৃক্ষ দ্বারা উদ্যানভূমি নির্মাণ করা উচিত, যেখানে কোকিল ও ভ্রমর কূজন ও গুঞ্জন করছে ॥ ৩৪-৩৬ ॥ p 619




Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

নিয়োগ মীমাংসা

 আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক জীর লেখার বঙ্গানুবাদঃ सर्वाधिक विवादित विषय (नियोग) की विवेचना https://youtube.com/shorts/AG6wZZz8DTU ॥ ও৩ম্ ॥ আষ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ