ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

07 July, 2026

পঞ্চমহাভুত

07 July 0

পঞ্চমহাভুত

ঋষিদের দৃষ্টিতে এই দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ড কেবল জড় পদার্থের সমষ্টি নয়—এটি মন, বাক্, প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির এক সুসংবদ্ধ সৃষ্টিলীলা।

📖 ঋষিবাণী বলছে—
মন থেকে বাক্-এর প্রকাশ।
বাক্ ও প্রাণের মিথুন থেকেই সৃষ্টির সূচনা।
ছন্দ রশ্মিই বিভিন্ন শক্তি, বল, গতি ও প্রকাশের আধার।

এই আলোচনায় বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—
🔹 ছন্দ রশ্মির প্রকৃত স্বরূপ।
🔹 "ওম্", "ভূঃ", "ভুবঃ", "স্বঃ" প্রভৃতি মূল রশ্মির ভূমিকা।
🔹 ঋক্, যজুঃ ও সাম ছন্দ রশ্মির বৈশিষ্ট্য।
🔹 গায়ত্রী, উষ্ণিক্, অনুষ্টুপ্, বৃহতী, পংক্তি, ত্রিষ্টুপ্ ও জগতী—এই সাত প্রধান ছন্দ রশ্মির কার্য ও গুরুত্ব।
🔹 সৃষ্টি, শক্তি, আলো, গতি, কণা এবং মহাবিশ্বের বিন্যাসে ছন্দ রশ্মির ভূমিকা।

🔍 আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক ধারণার সঙ্গে বৈদিক দর্শনের এই তত্ত্বের তুলনামূলক আলোচনা চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

📚 যারা বেদ, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, উপনিষদ ও বৈদিক বিজ্ঞান নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এই আলোচনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।


সৃষ্টি উৎপত্তি প্রক্রিয়াতে ছন্দ রশ্মির ভূমিকা মুখ্য আছে। বস্তুতঃ সম্পূর্ণ সৃষ্টি হল ছন্দ রশ্মিরই খেলা। আমি পূর্বে মনস্তত্ত্বের মধ্যে অনেক স্পন্দন উৎপন্ন হওয়ার চর্চা করেছি। এই স্পন্দনকে বাক্ ও প্রাণ বলে। এই বাক্ তত্ত্বকেই "ছন্দ" বলে অর্থাৎ ছন্দ রশ্মি, যেটা মনস্তত্ত্বের ভিতরে স্পন্দন রূপ হয়, তাকেই বাক্ তত্ত্ব বলে। পূর্বে আমি "ওম্", "ভূঃ", "ভুবঃ", "স্বঃ" আদি ছন্দ রশ্মি এবং প্রাথমিক প্রাণ রূপী রশ্মির চর্চা করেছি। সেগুলো সব হল মনস্তত্ত্বের মধ্যে উৎপন্ন সূক্ষ্ম স্পন্দন। তবে হ্যাঁ, এটুকু অবশ্যই হয় যে "ওম্" -এর পরারূপ মনস্তত্ত্ব উৎপন্ন হওয়ার পূর্বেই উৎপন্ন হয়ে থাকে। মন ও বাক্ তত্ত্বের বিষয়ে ঋষিদের কথন হল -
মনো বৈ পূর্বমথ বাক্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.১২৮; ৩.১২), মনসো হি বাক্ প্রজায়তে (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩২০)
.
মনসা বা অগ্রে কীর্তয়তি, তদ্ বাচা বদতি (শাংখায়ন আরণ্যক ৭.২) এরদ্বারা মনস্তত্ত্বকে বাক্ তত্ত্বের পূর্বোৎপন্ন সিদ্ধ করা হয়েছে।
.
তস্যৈ (বাগ্রূপায়া গোঃ) মন এব বৎসঃ। মনসা বৈ বাচম্ পৃক্তাম্ দুহ্রে (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.১৯)
মন এব বৎসঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.৩.১.১)
.
অর্থাৎ মনস্তত্ত্ব বাক্ তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়। আমার মতে, এখানে বাক্ তত্ত্ব কেবল "ওম্" ছন্দ রশ্মির পরাবস্থাকে গ্রহণ করা উচিত। আমি পূর্বে লিখেছি যে "ওম্" ছন্দ রশ্মি রূপী বাক্ তত্ত্বই মনস্তত্ত্বের মধ্যে বিভিন্ন বল ও ক্রিয়ার বীজবপন করে। অন্য সব বাক্ (ছন্দ) রশ্মি মনের সাপেক্ষ য়োষা (স্ত্রী) রূপ ব্যবহার করে, অথচ পরা রূপে "ওম্" রশ্মি মনের সাপেক্ষ বৃষা (পুরুষ) রূপ ব্যবহার করে। এইভাবে মূল পদার্থ রূপে মন ও বাক্ একই হয়, যেমন জলের মধ্যে ঢেউ জলের থেকে পৃথক হয় না, এই কারণে মহর্ষি জৈমিনী বলেছেন -

বাগিতি মনঃ (জৈমিনীয়োপনিষদ্ ব্রাহ্মণ ৪.১১.১.১১)

মনস্তত্ত্বের মধ্যে ছন্দ রশ্মি রূপী বাক্ তত্ত্ব উৎপন্ন করা হল ঈশ্বর তত্ত্বের কাজ, যেটা "ওম্" ছন্দ রশ্মির পরা রূপ কিংবা কালতত্ত্ব দ্বারা নিরন্তর উৎপন্ন ও নিয়ন্ত্রণও করতে থাকে। বাক্ ও মনের মিথুন দ্বারাই সমস্ত সৃষ্টির নির্মাণ ও সঞ্চালন হয়। এইজন্য বলা হয়েছে -

বাক্ চ বৈ মনশ্চ দেবানাম্ মিথুনম্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৫.২৩) বৃষা = বাক্ [বৃষা হি স্রুবঃ (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ১.৪.৪.৩), বৃষা স্রুবঃ (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ১.৩.১.৯)]
য়োষা হি বাক্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৪.৪.৪)

এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে মনস্তত্ত্ব পুরুষ রূপে তথা বাগ্ রূপ বিভিন্ন ছন্দ রশ্মি স্ত্রী রূপে ব্যবহার করে। এগুলোর পরস্পর সংযোগ ছাড়া সৃষ্টির মধ্যে কোনো কিছুই নির্মাণ হওয়া সম্ভব নয়। "ওম্" -এর পরারূপ এর ঠিক বিপরীত ব্যবহার করে।

এখন কিছু রশ্মি রূপী বাক্ তথা প্রাথমিক প্রাণ রশ্মির পারস্পরিক সম্বন্ধের বিষয়ে ঋষিদের নিম্নলিখিত বচনের উপর বিচার করবো -

বাক্ চ বৈ প্রাণশ্চ মিথুনম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৪.১.২), সর্বে প্রাণা বাচি প্রতিষ্ঠিতাঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৮.২.২৫)
.
এই প্রমাণগুলো থেকে সিদ্ধ হয় যে যেভাবে মনস্তত্ত্ব এবং বাক্ তত্ত্বের যুগ্ম হয়, সেইভাবে প্রাণ এবং বাক্ তত্ত্বেরও যুগ্ম হয়। এগুলোর সংযোগের অভাবে সৃষ্টি রচনা সম্পন্ন হওয়া তো দূরের কথা, প্রারম্ভ হওয়াও সম্ভব নয়। সব প্রাথমিক প্রাণ রশ্মি বাগ্ অর্থাৎ ছন্দ রশ্মির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই দুই প্রকারের রশ্মির সম্বন্ধকে স্পষ্ট করে ঋষিরা বলেছেন -

প্রাণো হি রেতসাম্ বিকর্ত্তা (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.৩.৮.১), প্রাণো রেতঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৩৮) বাগ্বাऽইদম্ কর্ম প্রাণো বাচস্পতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬.৩.১.১৯)

এই বচনগুলো থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে প্রাণ রশ্মিগুলো বৃষা (পুরুষ) রূপ হয়ে য়োষা (স্ত্রী) রূপ ছন্দ রশ্মির মধ্যে বীর্যবপন করতে থাকে অর্থাৎ সেগুলোকে প্রেরিত ও গতিশীল বানিয়ে রাখে। প্রাণ ছাড়া ছন্দ রশ্মির কোনো ক্রিয়াই সম্পন্ন হবে না। একইভাবে ছন্দ রশ্মির অভাবে প্রাণ রশ্মিও সৃষ্টি রচনার প্রক্রিয়াকে সঞ্চালিত করতে পারবে না।

এখন আমরা ছন্দ রশ্মি রূপী বাক্ তত্ত্বের উপর বিচার করবো। "ছন্দঃ" পদের বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দ লিখেছেন -

স্বচ্ছন্দতা (তুলনা য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৯.৭৪), প্রকাশনম্ (য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৫.৫), বলকারি (য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৪.১৮), বলম্ (য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৪.৯), পরিগ্রহণম্ (য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৪.৫), সম্স্থাপনম্ (য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৫.৫), ঊর্জনম্ (য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৫.৪)

এই প্রমাণগুলো থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে ছন্দ রশ্মি স্বচ্ছন্দ বিচরণ করে বিভিন্ন প্রাণ রশ্মিকে সবদিক থেকে গ্রহণ করে বল ও ঊর্জা এবং প্রকাশকে উৎপন্ন করে বিভিন্ন পদার্থকে ধারণ ও সক্রিয় করে। এর এই গুণের কারণেই বিভিন্ন কণা বা তরঙ্গাণুর উৎপত্তি হওয়া সম্ভব হয়। এই রশ্মির বিষয়ে অন্য ঋষিদের কথন হল -

১. ছন্দঃ স্তোতৃনাম (নিঘন্টু ৩.১৬), ছন্দতি অর্চতিকর্মা (নিঘন্টু ৩.১৪)
২. ছন্দাম্সি চ্ছাদনাৎ (নিঘন্টু ৭.১২), ছন্দাম্সি ছন্দয়ন্তীতি বা (দৈবত ব্রাহ্মণ ৩.১৯)
৩. ছন্দাম্সি বৈ বাজিনঃ (গোপথ ব্রাহ্মণ উত্তরভাগ ১.২০)
৪. প্রাণা বৈ ছন্দাম্সি (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১৭.২)
৫. ছন্দাম্সি বৈ ধুরঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.২১০)
৬. ছন্দোভির্য়জ্ঞস্তায়তে (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৪৩১)
৭. উপবর্হণম্ দদাতি। এতদ্বৈ ছন্দাম্সি রূপম্ (ক. ৪৪.৪ - ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত)
৮. ছন্দোভির্হীদꣳ সর্বম্ বয়ুনম্ নদ্ধম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.২.২.৮)
[বয়ুনম্ বেতেঃ কান্তির্বা প্রজ্ঞা বা (নিরুক্ত ৫.১৫), বীয়তে গম্যতেऽত্রেতি (উণাদি কোষ ৩.৬১)]

এই বচনগুলো থেকে নিম্ন গুণগুলো প্রকাশিত হয় -

১. ছন্দ রশ্মি প্রকাশ উৎপন্নকারী হয়।
২. ছন্দ রশ্মি কোনো পরমাণুকে (কণা বা কোয়ান্টা) সবদিক থেকে আচ্ছাদনকারী হয়।
৩. এইসব রশ্মি বলের সংযোজক এবং উৎপাদিকা হয়।
৪. এইসব রশ্মি প্রাণ রশ্মির সমানও ব্যবহার করে।
৫. এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে এইসব রশ্মির ব্যবহার বেশিরভাগ প্রাণ রশ্মির সমান হয় তথা বিভিন্ন ছন্দ রশ্মি অনেক রূপযুক্ত হয়ে সেগুলোর মধ্যে কিছু রশ্মি প্রাণের সমান বৃষা রূপ, তো বাকিগুলো তার সাপেক্ষ য়োষা রূপ ব্যবহার করে। এর তাৎপর্য হল এগুলোর পুরুষ বা স্ত্রী রূপ হওয়া সাপেক্ষ ব্যবহার হয়, সর্বথা নিরপেক্ষ হয় না।
৬. এইসব রশ্মি বিভিন্ন কণা বা তরঙ্গাণু এবং সব লোকের আধার রূপ হয়ে সেগুলোকে ধারণ করে।
৭. এগুলোই এই সৃষ্টিতে সব সংযোগ-বিয়োগাদি প্রক্রিয়াকে সম্পাদিত, সমৃদ্ধ এবং বিস্তৃত করে।
৮. এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড এগুলোর দ্বারাই বাঁধা আছে।

🪔 ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি 🪔

এগুলোর উৎপত্তির বিষয়ে বলা হয়েছে -

ছন্দাম্সি জজ্ঞিরে তস্মাত্ (য়জ্ঞাত্) (কাঠক সংকলন ১০০.১৮ - ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত)

অন্যদিকে যজ্ঞের বিষয়ে বলা হয়েছে -

বাগ্বৈ য়জ্ঞঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৫.২৪; শতপথ ব্রাহ্মণ ১.১.২.২; ৩.১.৩.২৭), আত্মা বৈ য়জ্ঞঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬.২.১.৭)

এই বচনগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে আত্মা রূপ ঈশ্বর তত্ত্ব "ওম্" ছন্দ রশ্মির দ্বারা মনস্তত্ত্বকে স্পন্দিত করে বিভিন্ন ছন্দ রশ্মিকে উৎপন্ন করে। য়জুর্বেদ পুরুষ সূক্তের ভাষ্যে ঋষি দয়ানন্দ বেদোৎপত্তি সম্বন্ধীয় এই ঋচার মধ্যে বিদ্যমান "য়জ্ঞঃ" পদের অর্থ "পরমেশ্বর" করেছেন। এর দ্বারা ছন্দোৎপত্তির মধ্যে ঈশ্বর তত্ত্বের সর্বোপরি ভূমিকা স্বতঃ সিদ্ধ হয়। এই প্রক্রিয়াতে "ভূঃ", "ভুবঃ" এবং "স্বঃ" ব্যাহৃতি রশ্মির অনিবার্য ভূমিকা থাকে। এর সংকেত নিম্ন কথন থেকে পাওয়া যায় -

স এতাম্ ত্রয়ীম্ বিদ্যামভ্যতপত্তস্যাস্তপ্যমানায়া রসান্প্রাবৃহদ্। ভূরিত্যৃগ্ভ্যো ভুবরিতি য়জুর্ভ্যঃ স্বরিতি সামভ্যঃ।। (ছান্দগ্য উপনিষদ্ ৪.১৭.৩)

এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে ছন্দ রশ্মি তিন প্রকারের হয় - "ঋক্", "য়জুঃ" এবং "সাম"। এই তিন প্রকারের ছন্দ রশ্মির নির্মাণে মনস্তত্ত্ব এবং "ওম্" রশ্মির ভূমিকার সাথে-সাথে ক্রমশঃ "ভূঃ", "ভুবঃ" এবং "স্বঃ" ব্যাহৃতি রশ্মির প্রাধান্যতার সহিত ভূমিকা থাকে। এইসব ছন্দ রশ্মি এমন স্পন্দন রূপে উৎপন্ন হয়, যেগুলো উৎপন্ন হওয়া মাত্র বিভিন্ন প্রাণ রশ্মিকে আচ্ছাদন করে মিথুন বানাতে থাকে। এখন আমরা "ঋক্", "য়জুঃ" এবং "সাম" ছন্দ রশ্মির উপর ক্রমশঃ বিচার করবো -

💫 ১. ঋক্ - এই ছন্দ রশ্মির বিষয়ে ঋষিদের কথন হল -

১. ঋক্ অর্চনী (নিরুক্ত ১.৮)
২. ঋগ্ভ্যো জাতাꣳ সর্বশো মূর্তিমাহুঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১২.৯.১)
৩. ঋগ্ বা অয়ম্ (পৃথিবী) লোকঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৩৮০)
৪. জ্যোতিস্তদ্যদ্ ঋক্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৭৬)
৫. কৃষ্ণমৃক্ (কাঠক সংহিতা ২৩.৩)
৬. বাগেবऽর্চশ্চ সামানি (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৬.৭.৫)

এই প্রমাণগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. এই রশ্মি সূক্ষ্ম দীপ্তিযুক্ত হয়, ধ্যাতব্য হল পণ্ডিত য়ুধিষ্ঠির মীমাংসক সংস্কৃত-ধাতুকোষে বেদের মধ্যে থাকা "অর্চ" ধাতুর অর্থ "উজ্জ্বলতা" বলেছেন।
২. এই সৃষ্টির মধ্যে যেসব মূর্তিমান পদার্থ আছে, সেইসবের উৎপত্তিতে এই ছন্দ রশ্মির ভূমিকা মুখ্য হয় কিংবা এটা সেই পদার্থগুলোর উপাদান কারণ হয়। এখানে আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা মানা হয় এমন মূলকণাকে মূর্তিমান মানা যেতে পারে।
৩. এই ঋচাগুলো পার্থিব লোক অর্থাৎ অপ্রকাশিত পদার্থের উপাদান কারণভূত হয়। এখানে অপ্রকাশিত পদার্থের তাৎপর্য উপরোক্ত মূলকণাকে গ্রহণ করা উচিত। এখানে পৃথিবীর তাৎপর্য অসুর তত্ত্বেরও গ্রহণ করা উচিত। এর সংকেত নিম্ন প্রমাণ থেকে পাওয়া যায় -

অসুরাণাম্ বা ইয়ম্ পৃথিব্যাসীৎ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.১.১০; কাঠক সংহিতা ৩১.৮), ঋচা বা অসুরা আয়ন্ সাম্না দেবাঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.১৫৪)

৪. এরথেকে স্পষ্ট সংকেত পাওয়া যায় যে ডার্ক মেটার ও ডার্ক এনার্জিতে ঋক্ রূপী ছন্দ রশ্মির প্রাধান্য আছে।
৫. সব মূর্তিমান পদার্থ অর্থাৎ মূলকণা বা অপ্রকাশিত পদার্থ শুরুতে জ্যোতিযুক্ত হয়ে থাকে, যা কালান্তরে অপ্রকাশিত রূপ ধারণ করে নেয়। একইভাবে অসুর তত্ত্ব অর্থাৎ ডার্ক মেটার এবং ডার্ক এনার্জিও প্রথমে প্রাণ ও ছন্দাদির সূক্ষ্ম জ্যোতির কারণ রূপেই বিদ্যমান হয়, যা কার্যরূপে পরিবর্তিত হলে অসুর তত্ত্বের রূপ ধারণ করে। এই সূক্ষ্ম জ্যোতিযুক্ত পদার্থকেই শাস্ত্রের মধ্যে "প্রজাপতি" বলা হয়েছে।
৬. এই রশ্মি থেকে উৎপন্ন পদার্থ যখন অপ্রকাশিত বা সঘন রূপ ধারণ করে, সেই সময় তার মধ্যে আকর্ষণ বলও প্রবল হয়ে যায়। অসুর তত্ত্বের (ডার্ক মেটার এবং ডার্ক এনার্জি) বিষয়ে আমার মত হল, এই পদার্থ প্রবল প্রক্ষেপক ও প্রতিকর্ষণ বল যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অতি ন্যূনতম মাত্রায় আকর্ষণের ভাবও রাখে। এখানে আকর্ষণের ভাব নিজের প্রতি অর্থাৎ আসুর পরমাণুর একে-অপরের প্রতি হয় অবশ্যই, অন্যথা এটা পদার্থ রূপে কখনও বিদ্যমান হতো না, বরং পূর্ণতঃ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সমাপ্ত হয়ে যেত।

এই ছন্দ রশ্মি তথা সাম রশ্মির মধ্যে বাক্ তত্ত্ব অর্থাৎ "ওম্" রশ্মির প্রাধান্য (মনস্তত্ত্বের সাপেক্ষ) আছে। এই কারণে এই দুই প্রকারের রশ্মি বিশেষ ভাবে বলযুক্ত হয়।

এইভাবে এই উপরোক্ত গুণ যুক্ত ছন্দ রশ্মিকে ঋক্ বলা হয়।

💫 ২ য়জুঃ - এই ছন্দ রশ্মির বিষয়ে ঋষিদের কথন হল -

১. য়জুর্ভির্য়জন্তি (কাঠক সংকলন ২৭.১, ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত), য়জুর্য়জতেঃ (নিরুক্ত ৭.১২)
২. অন্তরিক্ষম্ বৈ য়জুষামায়তনম্ (গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ২.২৪)
৩. অন্তরিক্ষলোকো য়জুর্বেদঃ (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ১.৫)
৪. সর্বা গতির্য়াজুষী হৈব শশ্বত্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১২.৯.১)
৫. মন এব য়জূম্ষি (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৬.৭.৫)

এই প্রমাণগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. এই ছন্দ রশ্মি য়জনশীল হয় অর্থাৎ বিভিন্ন পদার্থের সংযোগে এর মুখ্য ভূমিকা থাকে।
২. আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের মধ্যে এর প্রাধান্য এবং ব্যাপকতা আছে। ধ্যাতব্য হল, কোনো কণা বা রশ্মি আদির সংযোগের মধ্যে স্পেসের অনিবার্য ভূমিকা বর্তমান বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রেও সর্ববিদিত আছে।
৩. এই ছন্দ রশ্মিই মুখ্য রূপে আকাশ তত্ত্বের উপাদান কারণ হয়। অন্য ছন্দ রশ্মি গৌণ রূপে কারণ হয়।
৪. এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সব প্রকারের গতি এই ছন্দ রশ্মির ভিতরেই নিরন্তর হয়। একইসঙ্গে আকাশ তত্ত্বের উপাদানভূত এই রশ্মি ক্রমাগত গতি করতে থাকে।
৫. এই ছন্দ রশ্মির মধ্যে পূর্বোক্ত বাক্ তত্ত্বের অপেক্ষা মনস্তত্ত্বের প্রাধান্য আছে। এই কারণে এই রশ্মি অন্য রশ্মিকে আধার প্রদান করে।

💫 ৩. সাম - তৃতীয় প্রকারের ছন্দ রশ্মিকে "সাম" বলে। এর বিষয়ে ঋষিদের কথন হল -

১. অর্চিঃ (আদিত্যস্য) সামানি (শতপথ ব্রাহ্মণ ১০.৫.১.৫)
২. দেবলোকো বৈ সামঃ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.৫.১.৬), সাম বা অসৌ (দ্যু) লোকঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৪.৩.৫)
৩. সর্বম্ তেজঃ সামরূপ্যম্ হ শশ্বৎ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১২.৯.২)
৪. ক্ষত্রম্ বৈ সাম (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৮.৩.২৩)
৫. সাম বাऽঋচঃ পতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.১.৩.৫)
৬. ঋচি সাম গীয়তে (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.১.৩.৩)
৭. সাম দেবানামন্নম্ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৬.৪.১৩)

এই প্রমাণগুলো থেকে নিম্নানুসারে পরিণাম প্রাপ্ত হয় -

১. আদিত্য রশ্মির মধ্যে এই রশ্মির প্রাধান্য আছে।
২. এই সৃষ্টির মধ্যে সব প্রকারের তরঙ্গাণু (কোয়ান্টা) এবং তথাকথিত মিডিয়েটর পার্টিকলগুলোর মধ্যেও এরই প্রাধান্য আছে।
৩. ব্রহ্মাণ্ডস্থ সম্পূর্ণ প্রকাশ নিরন্তর সাম রশ্মির দ্বারাই পরিপূর্ণ হয়।
৪. এই ছন্দ রশ্মির মধ্যে ভেদন ক্ষমতা বিশেষ আছে।
৫. এই রশ্মিগুলো পূর্বোক্ত ঋক্ রশ্মির রক্ষণ ও পালন করে। বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা পরিভাষিত ঊর্জাও দ্রব্যের পালন ও রক্ষণ করে।
৬. সাম রশ্মি ঋক্ রশ্মির ভিতরে প্রকাশিত হয় অর্থাৎ সেগুলোকে প্রকাশিত করে। বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা নির্দিষ্ট ফোটনস্ বিভিন্ন কণার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেগুলোকে প্রকাশিত করে, অন্যথা সেই কণাগুলো প্রকাশিত হবে না।
৭. বিভিন্ন দেব পদার্থ অর্থাৎ তরঙ্গাণু এবং সূক্ষ্ম কণা নিরন্তর সাম রশ্মির ভক্ষণ করতে থাকে।

সব প্রকারের ছন্দ রশ্মি, যেগুলো মন্ত্র রূপে বেদ সংহিতার মধ্যে উপলব্ধ আছে এবং তারমধ্যে কিছু অনুপলব্ধও আছে, এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিদ্যমান আছে। এগুলোর দ্বারাই সম্পূর্ণ সৃষ্টি তৈরি হয়েছে। এই সব প্রকারের মন্ত্র রূপ ছন্দ রশ্মিকে উপরোক্ত তিন প্রকারে বর্গীকৃত করা হয়েছে।

এখন আমরা ছন্দ রশ্মির অন্য প্রকারে বর্গীকৃত হওয়ার উপর সবিস্তারে বিচার করবো। এই সৃষ্টির মধ্যে ছন্দ রশ্মি অনন্ত বা অসংখ্য মাত্রায় বিদ্যমান আছে, কিন্তু গুণ ও কর্মের আধারে প্রমুখ রূপে সেগুলোর সাতটা বিভাগ হয়। এই বিষয়ে ঋষিদের কথন হল -

সপ্ত ছন্দাꣳসি (তৈত্তিরীয় সংহিতা ২.৪.৬.২; জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৮৬; শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.৫.২.৮)
সপ্ত বৈ ছন্দাꣳসি (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১১.৮; কাঠক সংহিতা ১৪.৮; কপিষ্ঠল সংহিতা ৩৫.৭; কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১৪.৫)

এই সাতটা ছন্দ হল - গায়ত্রী, উষ্ণিক্, অনুষ্টুপ্, বৃহতী, পংক্তি, ত্রিষ্টুপ্ এবং জগতী। এই সাত ছন্দ রশ্মিরও আটটা ভেদ মানা হয়েছে, যথা - দৈবী, আসুরী, প্রাজাপত্যা, য়াজুষী, সাম্নী, আর্চী, আর্ষী এবং ব্রাহ্মী।

এখন আমরা এই সাতটা ছন্দ রশ্মির বিষয়ে ক্রমশঃ বিচার করবো -

💫 ১. গায়ত্রী - এই ছন্দ রশ্মি সবার প্রথমে উৎপন্ন হয়। এর বিষয়ে ঋষিদের কথন হল -

১. গায়ত্রী গায়তেঃ স্তুতিকর্মণঃ ত্রিগমনা বা বিপরীতা গায়তো মুখাদুদপতদিতি ব্রাহ্মণম্ (নিরুক্ত ৭.১২)
২. এতদ্ধি (গায়ত্রী) ছন্দ আশিষ্ঠম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.২.৩.৯)
৩. গায়ত্রীমেব প্রাতঃসবনম্ সম্পদ্যতে (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.১০১)
৪. জ্যোতির্বৈ গায়ত্রী (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১৩.৭.২)
৫. তস্য (প্রাণস্য) ত্বগ্গায়ত্রী (ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৬)
৬. মুখম্ গায়ত্রী (ছন্দসাম্) (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৭)
৭. বীর্য়ম্ গায়ত্রী (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৩.৫.৪)
৮. সা গায়ত্রী সমিদ্ধান্যানি ছন্দাꣳসি সমিন্ধে (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৩.৪.৬)
৯. বাগ্বৈ গায়ত্রী (কাঠক সংহিতা ২৩.৫; কপিষ্ঠল সংহিতা ৩৬.২)

এই প্রমাণগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. যখন মনস্তত্ত্বের মধ্যে সূক্ষ্ম প্রকাশ উৎপন্ন হবে এমন সময় অর্থাৎ "ওম্" ছন্দ রশ্মি যখন মনস্তত্ত্বকে প্রেরিত করা শুরু করে, সেই সময় সর্বপ্রথম যে রশ্মিগুলো (স্পন্দন) উৎপন্ন হয়, সেগুলোকে গায়ত্রী ছন্দ রশ্মি বলে। যদিও "ওম্" রশ্মিও এই ছন্দের সূক্ষ্ম ও ব্যাপকতম রূপ হয়, কিন্তু এই রূপ অন্য রশ্মিকে উৎপন্ন করার হেতু মনস্তত্ত্বকে প্রেরিত করে। এটা "ওম্" রশ্মির সূক্ষ্মতম অর্থাৎ পরারূপ কিংবা কালরূপ হয়। এর পশ্চাৎ "ওম্" -এর পশ্যন্তী রূপ মনস্তত্ত্বের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিভিন্ন প্রকারের ছন্দ রশ্মিতে পরিণত হতে থাকে। এর প্রথম পরিণতি গায়ত্রী ছন্দের রূপে হয়। এই রশ্মি তিন প্রকারের গতিযুক্ত হয়। পরা "ওম্" রশ্মি ঈশ্বর তত্ত্ব দ্বারা উৎপন্ন ও প্রেরিত হয়।
২. এই ছন্দ রশ্মি অন্য ছন্দ রশ্মির তুলনায় সূক্ষ্মতম, কিন্তু সর্বাধিক তেজস্বিনী হয়। এর গতিও অন্য ছন্দের তুলনায় সর্বাধিক হয়।
৩. এই ছন্দ রশ্মি প্রাতঃসবনকে সম্পাদিত করে। এর তাৎপর্য হল এর প্রাকট্য সর্বপ্রথম অকস্মাৎ অতি শীঘ্র হয়। সৃষ্টি রচনার প্রথম চরণের সময় এরই সর্বাধিক প্রাধান্য হয়।
৪. এই রশ্মি থেকে প্রকাশের উৎপত্তি হয়। এই সৃষ্টির মধ্যে যেখানেই মন্দ বা তীক্ষ্ণ প্রকাশ ব্যক্ত বা অব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান আছে, সেখানে এই ছন্দ রশ্মির ভূমিকা অবশ্যই আছে। আচার্য পিঙ্গল তাঁর ছন্দ শাস্ত্রের মধ্যে বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির প্রকাশের রঙের কথা উল্লেখ করে বলেছেন -
সিতসারঙ্গপিশঙ্গকৃষ্ণনীললোহিতগৌরা বর্ণাঃ (৩.৬৫)
এই সূত্রের মধ্যে গায়ত্রী ছন্দ রশ্মি থেকে উৎপন্ন প্রকাশকে শ্বেত (সাদা) বর্ণের বলা হয়েছে। এই শ্বেত বর্ণ চন্দ্রমার সমান জানা উচিত। এখানে "জ্যোতি" পদের উপর আর্ষ মতকে জেনে রাখাও উপযুক্ত হবে। সেই মত হল এইরকম -

বিদ্যুতো দীপ্তিঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৮.৫০), অয়মগ্নির্জ্যোতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.৪.২.২২), অয়ম্ বৈ (ভূ) লোকো জ্যোতিঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.১৫; কাঠক সংহিতা ৩৩.৩), জ্যোতির্বৈ য়জ্ঞঃ (কাঠক সংহিতা ৩১.১১), অসৌ (সূর্য়ঃ) বাব জ্যোতিঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.১০), ইদমেবান্তরিক্ষম্ জ্যোতিঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.১৬৬)

এই বচনগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে এই সৃষ্টির মধ্যে যেখানেই বিদ্যুৎ, উষ্মা, প্রকাশ এবং সংযোগ-বিয়োগের ব্যবহার হয়, সেখানে সর্বত্র এর ভূমিকা অবশ্যই আছে। অপ্রকাশিত লোক বা কণার মধ্যে এর প্রাধান্য আছে, তাছাড়া আকাশ তত্ত্ব, বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং নক্ষত্র আদির মধ্যেও এর ভূমিকা অনিবার্য রূপে আছে। এর দ্বারা সিদ্ধ হয় যে এই সৃষ্টির মধ্যে সর্বত্র এর ন্যূনাধিক ভূমিকা অবশ্যই আছে।
৫. গায়ত্রী ছন্দ রশ্মি বিভিন্ন প্রাণ রশ্মিকে ত্বকের সমান আচ্ছাদন করে। ধ্যাতব্য হল, প্রাণ ও ছন্দ অর্থাৎ বাগ্ রশ্মি পরস্পর মিথুন বানিয়েই নিজ-নিজ সামর্থ্যকে প্রাপ্ত করতে পারে, যেমন বলা হয়েছে -

বাক্ চ বৈ প্রাণশ্চ মিথুনম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৪.১.২)

সেই মিথুনকেই এখানে বোঝানো হয়েছে যে গায়ত্রী রশ্মি প্রাণ রশ্মিকে ত্বকের তুল্য আবরণ প্রদান করে। এখানে প্রাণের তাৎপর্য সব দশ প্রাথমিক প্রাণ রশ্মি, বিশেষকরে পাঁচ প্রাণ রশ্মিকে গ্রহণ করা উচিত। এখানে অন্য এক ঋষির মত "প্রাণো গায়ত্রী" (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৮) বিচার করলে এমন ও সংকেতও পাওয়া যায় যে এই ছন্দ রশ্মির সঙ্গে প্রাণ নামক প্রাথমিক প্রাণের বিশেষ সম্বন্ধ আছে, অন্য প্রাণ রশ্মির সঙ্গে ন্যূনতম সম্বন্ধ আছে। এর উপরেও এমন ভাবা মোটেও উচিত হবে না যে অন্য প্রাণ রশ্মির সঙ্গে এর সম্বন্ধ সর্বথা হবে না। এর কারণ হল প্রাণ নামক প্রাথমিক প্রাণ রশ্মির সঙ্গেও অন্য ছন্দ রশ্মির সম্বন্ধ থাকে, যাকে পরে দর্শানো হবে।
৬. এই ছন্দ রশ্মি অন্য সব ছন্দ রশ্মির মুখের সমান হয়। এর তাৎপর্য হল যেভাবে মুখ থেকে উচ্চারিত বাণী অন্য কোনো ব্যক্তিকে প্রেরিত করে, সেইভাবে গায়ত্রী রশ্মি অন্য সব ছন্দ রশ্মিকে প্রেরিত করে। তাছাড়া এই ছন্দ রশ্মি অন্য সব ছন্দ রশ্মির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়।
৭. এই রশ্মি এই সৃষ্টির বীর্য রূপ হয় অর্থাৎ এটাই সম্পূর্ণ সৃষ্টির বীজবপন করে তথা সবাইকে বল প্রদান করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
৮. যখন এই রশ্মি সমুচিত রূপে প্রকাশিত বা সক্রিয় হয়ে ওঠে, তার পশ্চাৎই এর দ্বারা অন্য সব ছন্দ রশ্মি প্রকাশিত বা সক্রিয় হয়।
৯. এখানে গায়ত্রী রশ্মিকে বাক্ রূপ বলা হয়েছে। যদিও সব ছন্দ রশ্মি বাক্ রূপই হয়, কিন্তু এগুলোকে বাক্ রূপ বলাতে এই সংকেত প্রতীত হয় যে এই ছন্দ রশ্মির মধ্যে "ওম্" রশ্মির প্রাধান্য আছে। যদিও সৃষ্টির যেকোনো সূক্ষ্ম থেকে স্থূল পদার্থ "ওম্" রশ্মি থেকে বিহীন হয় না, সেটা কণা হোক বা তরঙ্গ, তবুও এখানে এই রশ্মিকে বাক্ রূপ বলা হয়েছে, সেটা এর মধ্যে "ওম্" -এর প্রাধান্যকে পুষ্ট করে।

এইভাবে এই উপরোক্ত ৯ বিন্দুর দ্বারা গায়ত্রী ছন্দ রশ্মির স্বরূপ পর্যাপ্ত রূপে স্পষ্ট হয়। আচার্য পিঙ্গল তাঁর ছন্দ শাস্ত্রের মধ্যে বিভিন্ন ছন্দের দেবতা, স্বর তথা গোত্রের চর্চা নিম্নানুসারে করেছেন -

অগ্নিঃ সবিতা সোমো বৃহস্পতির্মিত্রাবরুণাবিন্দ্রো বিশ্বেদেবাদেবতাঃ (৩.৬৩)
স্বরাঃ ষড্জর্ষভগান্ধারমধ্যমপঞ্চমধৈবতনিষাদাঃ (৩.৬৪)
আগ্নিবেশ্যকাশ্যপগৌতমাঙ্গিরসভার্গবকৌশিকবাসিষ্ঠানি গোত্রাণি (৩.৬৬)

এইসব দেবতা, স্বর তথা গোত্র গায়ত্র্যাদি ছন্দের ক্রমানুসারেই বোঝা উচিত। এই কারণে গায়ত্রী ছন্দ রশ্মির দেবতা অগ্নি, স্বর ষড্জ তথা গোত্র আগ্নিবেশ্য সিদ্ধ হয়।

এখানে গায়ত্রী ছন্দের দেবতা প্রায়শঃ অগ্নি হওয়াতে সংকেত পাওয়া যায় যে এই ছন্দের কারণে বিদ্যুৎ রূপ অগ্নির উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হয়। এর গোত্র আগ্নিবেশ্য এটাই সংকেত দেয় যে এই রশ্মি বিদ্যুৎ অগ্নির উৎপাদক ও ধারক অবস্থাকে উৎপন্ন করে কিংবা সেই অবস্থাতেই স্বয়ং উৎপন্ন হয়। এখানে অগ্নিবেশের অর্থ প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মিকেই মানা যেতে পারে আর এরদ্বারা অথবা এর প্রাধান্যতায় গায়ত্রী ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়। এই ছন্দকে বেদপাঠী ষড্জ স্বরে গীত গায়, এটা এই বিষয়ের সংকেত করে যে [ষট্ = ষট্ পুনঃ সহতেঃ (নিরুক্ত ৪.২৭)] এই রশ্মির মধ্যে সহস্ = বল বিশেষ আছে। [সহ্ = সহ্য করা, বহন করা, সাহারা দেওয়া, জেতা, দাবানো, ধারণ করা - আপ্টে কোষ] এর অর্থ হল এই রশ্মি অন্য রশ্মিকে আশ্রয় দিতে, নিয়ন্ত্রণ করতে, ধারণ করতে, দাবাতে এবং বহন করতে সক্ষম হয়।

যেমন আমি পূর্বে লিখেছি যে প্রত্যেক ছন্দ রশ্মির আটটা রূপ আছে, সেগুলোর চর্চা আমি গায়ত্র্যাদি সব ছন্দ রশ্মির পশ্চাৎ এক সাথে করবো।

💫 ২. উষ্ণিক্ - এর বিষয়ে ঋষিদের কথন হল -

১. উষ্ণিগুত্স্নানাত্ ভবতি। স্নিহ্যতের্বা স্যাত্কান্তিকর্মণঃ (নিরুক্ত ৭.১২)
২. উষ্ণিগুত্স্নানাত্ স্নিহ্যতের্বা কান্তিকর্মণোऽপি বোষ্ণীষিণো বেত্যৌপমিকম্ (দৈবত ব্রাহ্মণ ৩.৪)
৩. আয়ুর্বা উষ্ণিক্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ১.৫), য়জমানচ্ছন্দসমেবোষ্ণিক্ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১৭.২)
৪. গ্রীবা উষ্ণিহঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৬.২.১১)
৫. তস্য (প্রাণস্য) উষ্ণিগ্লোমানি (ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৬)
৬. চক্ষুরুষ্ণিক্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১০.৩.১.১)
৭. বজ্রো বা উষ্ণিহঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.২০৯)
.
এই বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -
১. এই রশ্মি গায়ত্রী রশ্মিকে উপর থেকে আবৃত্ত করে, তাতে তথা অন্য ছন্দ রশ্মির মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ ভাব সমৃদ্ধ করে তথা সেগুলোকে আরও অধিক কান্তিযুক্ত করে।
২. পূর্ববৎ।
৩. এটা বিভিন্ন ছন্দাদি রশ্মির মধ্যে সংয়োজকতাকে বাড়িয়ে তোলে।
[আয়ুঃ = য়জ্ঞো বা আয়ুঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৬.৪.৪)]
৪. এই রশ্মি অন্য রশ্মিকে নিজের সঙ্গে জুড়তে সেইভাবে সহায়ক হয়, যেভাবে শরীরের মধ্যে গ্রীবা ধড় তথা মস্তককে জুড়ে রাখে। একইসঙ্গে এই রশ্মি অন্য রশ্মি থেকে উৎসর্জিত অতি সূক্ষ্ম রশ্মিকে ক্রমাগত গিলতে থাকে। এর দ্বারাই য়জন ক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
৫. এই রশ্মি প্রাণ রশ্মিকে আচ্ছাদিত করতে ত্বকতুল্য গায়ত্রী রশ্মির উপরে লোমের সদৃশ সংযুক্ত হয়ে থাকে।
৬. এটা অন্য রশ্মির প্রকাশশীলতাকে বাড়িয়ে তোলে।
৭. এটা অন্য রশ্মিকে তীক্ষ্ণ বানাতে সহায়ক হয়।
.
আচার্য পিঙ্গল এর দেবতা সবিতা, গোত্র কাশ্যপ তথা স্বর ঋষভ বলেছেন, আমি এটা গায়ত্রী ছন্দের প্রকরণে দেখিয়েছি। মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.১৩.১৪ -তে এর দেবতা পূষা বলা হয়েছে। এরথেকে সংকেত পাওয়া যায় যে এই রশ্মির প্রভাবে গায়ত্রী রশ্মি অধিক সক্রিয় হয়, যারফলে উষ্ণতাতে বৃদ্ধি হয়। এর দ্বারা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সারঙ অর্থাৎ রঙ-বিরঙ রূপের উৎপত্তি হতে থাকে।

🔴 প্রশ্ন - আপনি পূর্বে গায়ত্রী রশ্মিকে অন্য সব রশ্মির প্রেরক বলেছেন আর এখানে উষ্ণিককে সবার প্রেরক বলার মতো সংকেত করেছেন। বস্তুতঃ গায়ত্রী ও উষ্ণিকের মধ্যে কে প্রেরক তথা কে প্রেরিত?

🔵 উত্তর - বস্তুতঃ গায়ত্রী রশ্মিগুলোই সবার প্রেরক হয়, কিন্তু উষ্ণিক ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পশ্চাৎ এই দুটোর সংযুক্ত প্রভাব অধিক সক্রিয়তা ও য়জনশীলতাকে উৎপন্ন করে। বিশেষ করে উষ্ণতা ও য়জনশীলতার মধ্যে এর বিশেষ অবদান থাকে।
.
এখন এর কাশ্যপ গোত্রের উপর বিচার করবো। মহর্ষি য়াস্কের কথন হল - "কশঃ জলম্" (নিঘন্টু ১.১২)। অন্যদিকে "জলম্" পদ "জল ঘাতনে" ও "জল অপবারণে" ধাতু দ্বারা নিষ্পন্ন হয়। এরদ্বারা সংকেত পাওয়া যায় যে উষ্ণিক্ রশ্মি বিভিন্ন রশ্মি আদি পদার্থের ভেদন, অপবারণ ও সংযোজন আদি কর্মকে করতে সহযোগিতা প্রদান করে, একইসাথে এইসব কর্ম সম্পাদিত হওয়ার সময় এই রশ্মির প্রাধান্যতা থাকে। এর উৎপত্তি কশ্যপ অর্থাৎ কূর্ম রশ্নির দ্বারা হয় অর্থাৎ সেগুলোর প্রাধান্যে হয়।

💫 ৩. অনুষ্টুপ্ - এর বিষয়ে নিম্নলিখিত আর্ষ বচনের উপর বিচার করা উচিত -

১. অনুষ্টুবনুস্তোভনাত্ (নিরুক্ত ৭.১২; দৈবত ব্রাহ্মণ ৩.৭)
২. গায়ত্রী বৈ সা য়া অনুষ্টুপ্ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১০.৫)
৩. আনুষ্টুব্ভি ছন্দসাম্ য়োনিঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১১.৫.১৭)
৪. বাগ্বা অনুষ্টুপ্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ১.২৮)
৫. বৃষা বৈ ত্রিষ্টুব্ য়োষানুষ্টুপ্ (ঐতরেয় আরণ্যক ১.৩.৫)
৬. অনুষ্টুপ্ (প্রাণস্য) স্রাবানি (ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৬)
৭. ক্ষত্রম্ বা অনুষ্টুপ্ (ঐতরেয় আরণ্যক ১.১.৩)
৮. প্রাণা বা এতানীতরাণি ছন্দাꣳসি বাগনুষ্টুপ্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.১.৯)
৯. য়জ্ঞোऽনুষ্টুপ্ (কাঠক সংহিতা ১৯.৩)
১০. অনুষ্টুপ্ বা অগ্নেঃ প্রিয়া তনূঃ (কাঠক সংহিতা ১৯.৫)

এই বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. এই ছন্দ রশ্মি অন্য ছন্দ রশ্মিকে অনুকূলতা সহিত ধরে রাখে।
২. এই রশ্মি গায়ত্রী রশ্মির সমান ব্যবহার করে।
৩. এই রশ্মি অন্য ছন্দ রশ্মির য়োনি রূপ হয়। এর তাৎপর্য হল এই ছন্দ রশ্মির মধ্যে সব ছন্দ রশ্মি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
৪. এরমধ্যেও "ওম্" রশ্মির মাত্রা অপেক্ষাকৃত অধিক হয়।
৫. এই রশ্মি ত্রিষ্টুপ্ -এর সাপেক্ষে য়োষা রূপ হয় অর্থাৎ এর সাপেক্ষে ত্রিষ্টুপ্ বৃষার কাজ করে।
৬. এই রশ্মি প্রাণ রশ্মির স্রাবের সমান হয় অর্থাৎ সেগুলো থেকে নিরন্তর প্রবাহিত হতে থাকে।
৭. এরমধ্যে ভেদন ক্ষমতা আছে।
৮. এই রশ্মি অন্য ছন্দ রশ্মির সাপেক্ষে বাগ্ রূপ হয় অর্থাৎ অন্য রশ্মি প্রাণ বা বৃষা রূপ তথা এটা সেগুলোর জন্য বাক্ বা য়োষা রূপ ব্যবহার করে।
৯. এই রশ্মি ভেদন সামর্থ্যের সাথে-সাথে য়জনশীলও হয়।
১০. এই রশ্মির দ্বারা অগ্নি তত্ত্বকে ধারণ করা হয় কিংবা অগ্নি তত্ত্ব এর ভিতরে বিদ্যমান থাকে। এর তাৎপর্য হল অগ্নি তত্ত্বের বিস্তার এরমধ্যে বিশেষ রূপে হয়, সেই অগ্নি তত্ত্ব বিদ্যুৎ, প্রকাশ বা উষ্মা রূপ যাই হোক না কেন।
.
আমি পূর্বে গায়ত্রী ছন্দের প্রকরণে সংকেত করেছি যে এর দেবতা হল সোম, গোত্র গৌতম তথা স্বর গান্ধার। এর তাৎপর্য হল এর প্রাধান্যে সোম তত্ত্ব সক্রিয় হয়, যারফলে সেটা তীব্র রূপে প্রকাশিত হতে থাকে অর্থাৎ সেটা বিভিন্ন প্রকারের প্রকাশ রশ্মিকে ধারণ করতে সক্ষম হতে থাকে। এর থেকে পিশঙ্গ অর্থাৎ লালমিশ্রিত বাদামি রঙের উৎপত্তি হয়। এই রশ্মি গৌতম অর্থাৎ ধনঞ্জয় রশ্মি থেকে উৎপন্ন হয়।

💫 ৪. বৃহতী - সর্বপ্রথম এর বিষয়ে কিছু আর্ষ বচনকে উদ্ধৃত করবো -

১. বৃহতী পরিবর্হণাৎ (নিরুক্ত ৭.১২)
২. বৃহতী বৃম্হতের্বৃদ্ধিকর্মণঃ (দৈবত ব্রাহ্মণ ৩.১১)
৩. বৃহতী মর্য়া য়য়েমান্ লোকান্ ব্যাপামেতি তদ্ বৃহত্যা বৃহত্ত্বম্ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৪.৩)
৪. অয়ম্ মধ্যমো (লোকঃ = অন্তরিক্ষম্) বৃহতী (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৯)
৫. বৃহতী স্বর্গো লোকঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.২৯০; ২.৭; শতপথ ব্রাহ্মণ ১০.৫.৪.৬)
৬. সর্বাণি ছন্দাম্সি বৃহতীমভিসম্পন্নানি (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩১৬)
৭. অথ বৃহতী। য়োऽয়ম্ প্রাঙ্প্রাণ (উপস্থেন্দ্রিয়ম্) এষ এব সঃ। ...এতেন দ্বয়ম্ প্রাণেন করোতি রেতশ্চ সিঞ্চতি মেহতি চ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.২৫৪)

এই বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত সংকেত প্রাপ্ত হয় -

১. এই রশ্মি অন্য রশ্মিকে সবদিক থেকে ঘিরে ধরে বর্ধমান হতে থাকে।
২. উপরোক্তবৎ।
৩. এই রশ্মি বিভিন্ন কণা বা লোকের নির্মাণের সময় পদার্থকে সবদিক থেকে আবৃত্ত ও সংকুচিত
করতে-করতে নির্মাণাধীন কণা বা লোকের পরিধির নির্মাণে সহায়ক হয়। এটা সেইসব লোক বা কণাকে সর্বতঃ ব্যাপ্ত করে থাকে।
৪. আকাশ তত্ত্বের মধ্যে এই রশ্মির প্রাধান্য আছে। এই কারণে কোনো পদার্থের পরিধির নির্মাণে ও সংকোচনে আকাশ (স্পেস) তত্ত্বেরও অনিবার্য ভূমিকা থাকে।
৫. বিভিন্ন নক্ষত্র আদি প্রকাশিত লোকের কেন্দ্রীয় ভাগের মধ্যেও এর প্রাধান্য আছে। সেই ভাগগুলোতে বিভিন্ন কণার একীভূতকরণ প্রক্রিয়াতে এর ভূমিকাও অনিবার্য আছে। এটা সম্মিলিত হওয়া কণা থেকে নির্মিত নতুন কণাকেও পরিধি রূপে ব্যাপ্ত করে সেগুলোকে সংঘনিত করে।
৬. সমস্ত ছন্দ রশ্মি এই বৃহতী ছন্দ রশ্মির দ্বারাই একত্র বজায় থাকে, যার দ্বারা অনেক প্রকার পদার্থের নির্মাণ হওয়া সম্ভব হয়।
৭. প্রাণ রশ্মি এই বৃহতী রশ্মির উপস্থেন্দ্রিয়ের সমান কাজ করে। এই দুটোর সংযোগের সম্মিলিত উপস্থেন্দ্রিয় প্রাণ রশ্মিই হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন উৎপাদন কাজ সম্পাদিত হয়। এই কারণে মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বৃহতীকে প্রাণ রূপ বলেছেন -

প্রাণো বৃহতী (ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৬)

এর দেবতা হল বৃহস্পতি, গোত্র আঙ্গিরস তথা স্বর মধ্যম, একে গায়ত্রীর প্রকরণে দেখিয়েছি। এর তাৎপর্য হল এই রশ্মির উপস্থিতিতে প্রাণ, অপান এবং সূত্রাত্মা বায়ু রূপী বৃহস্পতি বিশেষ সক্রিয় হয়ে সংঘনন ও সংকোচনের ক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করে। এখানে আঙ্গিরসও সূত্রাত্মা বায়ুর বাচক হয়। এর উৎপত্তি এই প্রাণাপান ও সূত্রাত্মা বায়ুর মিশ্রণ থেকে হয়। বৃহতীর কারণেই জ্বালা যুক্ত অগ্নি উৎপন্ন হয়। যদিও এই রশ্মি সবাইকে সীমাবদ্ধ করার কাজ করে, তবে এটা সেগুলোর বহির্ভাগে নয়, বরং মাঝখানে বিদ্যমান থাকে। সেখান থেকেই বেঁধে রাখে। আচার্য পিঙ্গল একে কৃষ্ণ বর্ণের বলেছেন।

💫 ৫. পংক্তি - এর বিষয়ে আর্ষ মতের উপর দৃষ্টি ফেলবো -

১. বিস্তৃতা ক্রিয়া (তুলনা মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ২৩.৩৩), পৃথুরিব বৈ পঙ্ক্তিঃ (গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ৫.৪; শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.২.৪.৬)
২. পঞ্চপদা পঙ্ক্তিঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৫.১৮)
৩. পঙ্ক্তির্বা অন্নম্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৬.২০)
৪. য়জমানো পঙ্ক্তিঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৩.৯)
৫. পঙ্ক্তির্মজ্জা (ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৬)
৬. শ্রোত্রম্ পঙ্ক্তিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১০.৩.১.১), শ্রোত্রাদ্ বাচম্ সন্তনু (কাঠক সংহিতা ৩৯.৮)

এই বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত সংকেত প্রাপ্ত হয় -

১. এই ছন্দ রশ্মি ছড়িয়ে পড়ার সাথে-সাথে উদ্ভূত হয়ে বিভিন্ন প্রকারের ক্রিয়াকে বিস্তৃত করে।
২. এই রশ্মির মধ্যে পাঁচ প্রকারের গতি বিদ্যমান আছে।
৩. এটা বিভিন্ন রশ্মি বা কণা আদি পদার্থের দ্বারা ক্রমাগত অবশোষিত করা হতে থাকে।
৪. এই কারণে এই রশ্মি বিশেষ য়জনশীল হয়।
৫. এই রশ্মি প্রাণ রশ্মির মজ্জার সমান কাজ করে। যেভাবে শরীরের মধ্যে বিদ্যমান অস্থিগত মজ্জা সম্পূর্ণ শরীরের রক্তকে জীবন্ত বানিয়ে শরীরের প্রতিরোধী ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে, ঠিক সেইভাবে পংক্তি ছন্দ রশ্মির উপস্থিতিতে প্রাণ রশ্মির সামর্থ্য সমৃদ্ধ হয়।
৬. এই রশ্মি অন্য ছন্দ রশ্মিকেও বিস্তার প্রদান করে সংযোগ-বিয়োগাদি ক্রিয়াকে বিস্তৃত করে।
.
এর দেবতা হল মিত্রাবরুণ, গোত্র ভার্গব এবং স্বর পঞ্চম।
.
মিত্রাবরুণৌ = দ্যাবাপৃথিবী বৈ মিত্রাবরুণয়োঃ প্রিয়ম্ ধাম (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১৪.২.৪),
য়জ্ঞো বৈ মৈত্রাবরুণঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১৩.২),
প্রাণোদানৌ বৈ মিত্রাবরুণৌ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৮.৩.১২),
প্রাণাপানৌ মিত্রাবরুণৌ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৬.১০.৫),
বায়ুসবিতারৌ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৫.৬৩.৩)
.
এর তাৎপর্য হল এই রশ্মির অধিকতার কারণে প্রাণ, অপান ও উদান বিশেষ সমৃদ্ধ হয়ে বিদ্যুৎ ও উষ্মাকে শক্তিশালী রূপ প্রদান করে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত উভয় প্রকারের কণা ও লোককে জ্বালাময় করে তোলে। একইসঙ্গে এই রশ্মি জ্বালাময়ী অবস্থাতেই বিশেষ রূপে উৎপন্ন হয়। এই কারণে সেই কণা বা লোক পঞ্চম অর্থাৎ ব্যক্ত রূপকে প্রাপ্ত করতে থাকে। এই রশ্মির প্রভাবে সব প্রকারের ক্রিয়া বিস্তার ও উৎকর্ষকে প্রাপ্ত করে। এরথেকে নীল বর্ণের উৎপত্তি হয়।

💫 ৬. ত্রিষ্টুপ্ - সর্বপ্রথম আমি এই ছন্দ রশ্মির বিষয়ে আর্ষ মতকে উদ্ধৃত করবো -

১. অথ ত্রিষ্টুপ্। নাভিরেব সা (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.২৫৪)
২. অথৈতদধীতরসম্ শুক্রিয়ম্ ছন্দো য়ত্ত্রিষ্টুপ্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৬.১২)
৩. অসাবুত্তমঃ (দ্যুলোকঃ) ত্রিষ্টুপ্ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৯)
৪. ইন্দ্রস্ত্রিষ্টুপ্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬.৬.২.৭), ইন্দ্রিয়ম্ বীর্য়ম্ ত্রিষ্টুপ্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.১৩২; ৩.২০৬)
৫. এতে বাব ছন্দসাম্ বীর্য়্যবত্তমে য়দ্ গায়ত্রী চ ত্রিষ্টুপ্ চ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ২০.১৬.৮)
৬. ত্রিষ্টুপ্ছন্দা বৈ রাজন্যঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.১.৯.৬)
৭. ত্রিষ্টুপ্ স্তোভ ইত্যুত্তরপদা কা তু ত্রিতা স্যাত্তীর্ণতমম্ ছন্দো ভবতি (দৈবত ব্রাহ্মণ ৩.১৪.১৫)
৮. ত্রিষ্টুম্মাম্সম্ (প্রাণস্য) (ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৬)
৯. ব্যানস্ত্রিষ্টুপ্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৪.৪; কাঠক সংহিতা ২১.১২), অপানস্ত্রিষ্টুপ্ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৮)
১০. য়ত্ ত্রিস্তোভত্ তৎ ত্রিষ্টুভস্ত্রিষ্টুপ্ত্বমিতি বিজ্ঞায়তে (নিরুক্ত ৭.১২)
১১. বজ্রস্তেন য়ত্ত্রিষ্টুপ্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.১৬)
১২. অন্তরিক্ষম্ ত্রিষ্টুপ্ (জৈমিনীয়োপনিষদ্ ব্রাহ্মণ ১.১৭.৩.৩)
১৩. ত্রৈষ্টুভমন্তরিক্ষম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৩.৪.১১)
.
এই বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. এই ছন্দ রশ্মি সমস্ত ছন্দ সমূহের নাভিরূপ হয়ে সেগুলোকে পরস্পর বেঁধে রাখে।
২. এই ছন্দ রশ্মি অত্যধিক রূপে উৎপাদক ক্ষমতা সম্পন্ন হয়।
৩. নক্ষত্রের ভিতরে বিশেষ করে সেগুলোর কেন্দ্রীয় ভাগের মধ্যে এটা প্রচুরমাত্রায় থাকে।
৪. এর কারণে তীক্ষ্ণ বিদুৎ তরঙ্গের উৎপত্তি ও সমৃদ্ধি হয়। এটা তীব্র রূপে ভেদক শক্তি সম্পন্ন হয়।
৫. এই রশ্মি অন্য ছন্দ রশ্মিকে তীব্র তেজ ও বল প্রদান করে।
৬. সব ছন্দ রশ্মির মধ্যে গায়ত্রী তথা ত্রিষ্টুপ্ সবথেকে তীব্র তেজ ও বল যুক্ত হয়।
৭. এই ছন্দ রশ্মির কারণে বিভিন্ন কণা বা রশ্মি আদি পদার্থ তীব্র তেজ ও ভেদক শক্তিসম্পন্ন হয়ে দেদীপ্যমান হয়।
৮. এই রশ্মি দুর্বল রশ্মিকে উদ্ধার করতে অর্থাৎ সেগুলোকে বল প্রদান করতে সর্বাধিক সক্ষম হয়।
৯. এটা প্রাণ রশ্মির মাংস রূপ হয় অর্থাৎ এর দ্বারা বিভিন্ন প্রাণ রশ্মি পূর্ণ বল প্রাপ্ত করতে সক্ষম হয়। এর সংকেত আমরা মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্যের "মাম্সম্" পদের নির্বাচন থেকে পাই - মাম্সম্ বৈ পুরীষম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৬.২.১৪)। অন্যদিকে "পুরীষম্" বিষয়ে ঋষিদের কথন হল - পূর্ণম্ বলম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১২.৪৬), পুরীষম্ পৃণা তেঃ পূরয়তের্বা (নিরুক্ত ২.২২)। এই বচন দ্বারা আমার কথনের পুষ্টি হয়।
১০. এই রশ্মির দ্বারা অপান ও ব্যান প্রাণ রশ্মি বিশেষ রূপে সমৃদ্ধ ও সশক্ত হয়, যার কারণে পদার্থের ভেদন ক্ষমতার সাথে-সাথে সম্ভবতঃ বন্ধন ক্ষমতাও সমৃদ্ধ হয়।
১১. এই রশ্মি অন্য রশ্মি ও কণা আদি পদার্থকে তিন প্রকারে ধরে রাখে, এইজন্য একে ত্রিষ্টুপ্ বলা হয়।
১২. এই রশ্মি অতি তীব্র শক্তি সম্পন্ন হওয়াতে বজ্র বলা হয়। এটা অসুর পদার্থ অর্থাৎ ডার্ক এনার্জি আদির বাধক প্রভাবকে নষ্ট করতে সক্ষম হয়।
১৩. এই রশ্মি আকাশ তত্ত্বকে ধরে রাখে ও প্রভাবিত করে। একইসঙ্গে আকাশ তত্ত্বের মধ্যেও এর প্রাচুর্য আছে।
.
এর দেবতা হল ইন্দ্র, গোত্র কৌশিক তথা স্বর ধৈবত। কুশিকের বিষয়ে মহর্ষি য়াস্কের কথন হল -

ক্রশতেঃ শব্দকর্মণঃ ক্রম্শতের্বা স্যাত্
প্রকাশয়তিকর্মণঃ সাধু বিক্রোশয়িতার্থানামিতি বা (নিরুক্ত ২.২৫)
.
এর তাৎপর্য হল এর প্রভাবে ইন্দ্র অর্থাৎ তীব্র ভেদক শক্তি সম্পন্ন বিদ্যুৎ তরঙ্গের উৎপত্তি ও সমৃদ্ধি হওয়ার সাথে-সাথে তীব্র ধ্বনি ও প্রকাশের উৎপত্তি ও সমৃদ্ধি হয় এবং ইন্দ্র তত্ত্বের সক্রিয়তায় এর উৎপত্তি আরও অধিক তীব্রতার সঙ্গে হতে থাকে। স্বরের প্রভাবে বিভিন্ন প্রকারের ক্রিয়াতে তীব্রতার সহিত বৃদ্ধি হয়। এর থেকে লাল বর্ণের উৎপত্তি হয়।
.
💫 ৭. জগতী - এর বিষয়ে আর্ষ মত নিম্নানুসারে -

১. গততমম্ ছন্দঃ জলচরগতির্বা, জল্গল্যমানোऽসৃজদিতি চ ব্রাহ্মণম্ (নিরুক্ত ৭.১৩)
২. তদিদম্ সর্বম্ জগদস্যাঁ তেনেয়ম্ জগতী (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৮.২.১১)
৩. য়া সিনীবালী সা জগতী (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.৪৭), সিনীবালী সিনমন্নম্ ভবতি সিনাতি ভূতানি বালম্ পর্বম্ বৃণোতেঃ (নিরুক্ত ১১.৩১)
৪. জগতী বৈ ছন্দসাম্ পরমম্ পোষম্ পুষ্টা (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ২১.১০.৯)
৫. প্রজননম্ জগতী (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৯৩; ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ২.৩)
৬. জগত্যাদিত্যানাম্ পত্নী (গোপথ ব্রাহ্মণ উত্তরভাগ ২.৯)
৭. তদাহুঃ প্লবমিব বা এতচ্ছন্দো য়জ্জগতী (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৩৭৯)
৮. অনূকম্ জগত্যঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৬.২.৩)
৯. অস্থি (প্রাণস্য) জগতী (ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৬)
১০. দিত্যবাহো জগত্যৈ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.১৩.১৭)
.
এই বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত পরিণাম প্রাপ্ত হয় -
১. এই রশ্মি সর্বাধিক দূর পর্যন্ত গমনকারী হয়। এর গতি জলের ঢেউয়ের সমান হয় তথা এর উৎপত্তির সময় মনস্তত্ত্ব বিশেষ বিক্ষুব্ধ বা সক্রিয় হয় না। এই রশ্মি সবার অন্তিমে উৎপন্ন হয়।
২. সম্পূর্ণ জগৎ এই রশ্মির মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত, এই কারণে একে জগতী বলা হয়।
৩. এই রশ্মি বিভিন্ন সংযোগ্য কণা বা তরঙ্গাণুকে বাঁধে তথা বিভিন্ন কণাকে সংযোগাদি প্রক্রিয়া হেতু সক্ষম করে। আমার মতে বিভিন্ন কণা বা তরঙ্গাণুর অবশোষণ ও উৎসর্জনের ক্রিয়া হেতু এই রশ্মি সেগুলোকে সামর্থ্য প্রদান করে।
৪. এটা অন্য ছন্দ রশ্মিকে অত্যন্ত পুষ্ট বা সক্ষম করে তোলে। একইসঙ্গে এটা স্বয়ং বিস্তৃত ক্ষেত্রে নিজের প্রভাবকে দর্শানো হেতু সক্ষম হয়।
৫. এটা সংযোগাদি প্রক্রিয়াকে সক্ষম বানিয়ে বিভিন্ন পদার্থকে উৎপন্ন করতে নিজের ভূমিকা পালন করে। এর উপস্থিতিতে বিভিন্ন রশ্মির সংযোগাদি প্রক্রিয়াও সমৃদ্ধ হয়।
৬. এই রশ্মি আদিত্য অর্থাৎ সূর্যাদি লোকের রক্ষাতে বিশেষ উপযোগী হয়। এর কারণ হল উর্জা ও ইলেক্ট্রনের উৎসর্জন ও অবশোষণের প্রক্রিয়া এই রশ্মির কারণে সম্পন্ন হয়।
৭. এই রশ্মি জলের তরঙ্গের মতো সুদূরগামী হয়েও লাফিয়ে-ঝাপিয়ে গতি করে।
৮. এই রশ্মি সম্পূর্ণ ছন্দ রশ্মি সমূহের মেরুদণ্ডের সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৯. এটা প্রাণ রশ্মির অস্থির সমান হয়। এর তাৎপর্য হল এই রশ্মি সম্পূর্ণ প্রাণ রশ্মি সমূহকে কাঠামোগত আধার প্রদান করে, যার উপর সব ছন্দ রশ্মি আশ্রিত হয়।
১০. এই রশ্মি খণ্ডনীয় পদার্থের বহনকারী হয়। এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে সব কণা বা তরঙ্গাণুর গতিতে এরও যোগদান থাকে।
.
এর দেবতা হল বিশ্বেদেবা, গোত্র বাসিষ্ঠ তথা স্বর নিষাদ। এর তাৎপর্য হল এই রশ্মি বিভিন্ন দেব পদার্থের বসতি স্থাপন করতে শ্রেষ্ঠ হয়ে সেগুলোতে নিতরাম্ ব্যাপ্ত হয়। একইসঙ্গে এটা বসিষ্ঠ অর্থাৎ প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মি থেকে উৎপন্ন হয়, বিশেষ করে অগ্নির প্রাবল্যতে এর উৎপত্তি অধিক মাত্রায় হয়। এর থেকে গৌর বর্ণের উৎপত্তি হয়।
.
এই সাত ছন্দ রশ্মির অতিরিক্ত অষ্টি, শক্বরী আদি কিছু বড় ছন্দ রশ্মিও এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিদ্যমান আছে। এগুলোর মধ্যে অতি তীব্র তেজ ও বল বিদ্যমান আছে। আর সৃষ্টি রচনাতে এগুলোরও বড় ভূমিকা আছে।
.
এইভাবে এই সাত ছন্দ রশ্মির স্বরূপের সাধারণ বর্ণনা করার পশ্চাৎ এগুলোর বিভিন্ন বিভাগের বর্ণনা করবো।

ছন্দ রশ্মির আট বিভাগ

১. দৈবী - এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সর্বপ্রথম এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়। "ওম্", "ভূঃ", "ভুবঃ", "সুবঃ" আদি মূল ছন্দ রশ্মি যার বর্ণনা আমি পূর্বে করেছি তথা কিছু প্রাথমিক প্রাণ রশ্মি দৈবী ছন্দ রশ্মির অন্তর্গতই আসে। এর কারণে অব্যক্ত সূক্ষ্মতম জ্যোতি তথা অতি সূক্ষ্ম বলের উৎপত্তি হয়। এই সূক্ষ্মতম রশ্মির মিশ্রণ হল এই সৃষ্টির সেই সূক্ষ্মতম তত্ত্ব, যারমধ্যে অতি সূক্ষ্ম স্পন্দন বিদ্যমান আছে। এটা সর্বত্র ব্যাপ্তবৎ হয়। এই সময় স্পন্দন সর্বত্র একরসবৎ মানা জেতে পারে। এগুলোর মাঝে অবকাশ নগণ্য হয়। পূর্বোক্ত সমস্ত সাত ছন্দ রশ্মির দৈবী রূপে অক্ষর সংখ্যা নিম্নানুসারে হয় -

গায়ত্রী ১, উষ্ণিক্ ২, অনুষ্টুপ্ ৩, বৃহতী ৪, পঙক্তি ৫, ত্রিষ্টুপ্ ৬ এবং জগতীর মধ্যে ৭ অক্ষর আছে। ছন্দ রশ্মির প্রভাবের বিষয়ে নিম্নলিখিত কারক গুরুত্বপূর্ণ হল -

(ক) ছন্দের মধ্যে বিদ্যমান অক্ষর সংখ্যা - ধ্যাতব্য হল কেবল স্বর রূপ অক্ষরকেই অক্ষর সংখ্যা রূপে মানা হয়, কারণ স্বরই কোনো ব্যঞ্জন রূপ অক্ষরকে প্রকাশিত বা গতিশীল করে। পূর্বোক্ত "ওম্", "ভূঃ", "হিম্", "ঘৃম্", এই চার রশ্মি এক-একটা স্বরযুক্ত হওয়াতে একাক্ষরা হয়। এগুলো সব হল দৈবী গায়ত্রী ছন্দের উদাহরণ।

(খ) ভিন্ন-ভিন্ন অক্ষরযুক্ত রশ্মির প্রভাব ভিন্ন-ভিন্ন হয়। আমি পূর্বে একাক্ষরা "ওম্", "ভূঃ", "হিম্", ও "ঘৃম্" -এর একাক্ষরা হওয়া সত্ত্বেও পৃথক-পৃথক প্রভাব দেখিয়েছি। বিজ্ঞ পাঠক পূর্বোক্তানুসারে প্রত্যেক অক্ষরের পৃথক-পৃথক প্রভাব জেনে সব ছন্দ রশ্মির পূর্ণ প্রভাব জানতে পারবেন।

(গ) অক্ষর সংখ্যা, অক্ষরের স্বরূপ ও প্রকৃতির প্রভাবের সাথে রশ্মির ভিতরে অক্ষরের বিন্যাসের উপরেও ছন্দ রশ্মির প্রভাব নির্ভর করে। এই কারণে সমান অক্ষর সংখ্যা হলেও ছন্দ রশ্মি ভিন্ন-ভিন্ন প্রকারের হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ ৬ ও ৭ অক্ষরযুক্ত রশ্মি ক্রমশঃ দৈবী ত্রিষ্টুপ্ এবং দৈবী জগতী হওয়ার সাথে-সাথে এরথেকে ভিন্ন বিন্যাস বা ব্যবস্থা হলে পরে ক্রমশঃ য়াজুষী গায়ত্রী তথা য়াজুষী উষ্ণিকের রূপ ধারণ করতে পারে। সেইসময় এগুলোর প্রভাব ভিন্ন হয়ে যায়। এমন অন্য উদাহরণ পূর্বোক্ত সারণীর মধ্যে দেখতে পাবেন।

সব প্রকারের দৈবী ছন্দ রশ্মি নিজ-নিজ গায়ত্র্যাদি ছন্দ রশ্মির প্রভাবের সাথে-সাথে দৈবী প্রভাবও দর্শায়। এই প্রভাগুলোকে সুধী পাঠক তৎ তৎ ছন্দের অধ্যয়নে জানতে পারবেন।

✨ ২. য়াজুষী - দৈবী ছন্দ রশ্মির পশ্চাৎ এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়। এর প্রভাবে পূর্বোৎপন্ন সূক্ষ্ম রশ্মির মধ্যে সূক্ষ্ম ও নিরন্তর গতি ও য়জন ক্রিয়া উৎপন্ন হতে থাকে। এর সংকেত "য়জুঃ" সংজ্ঞক ছন্দ রশ্মির প্রকরণে পাঠক দেখতে পাবেন । এই সময় আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের উৎপত্তি হতে থাকে। সম্পূর্ণ পদার্থ নিরন্তর কম্পন করতে থাকে। যখন গায়ত্র্যাদি বিভিন্ন ছন্দ য়াজুষী রূপে উৎপন্ন হয়, সেই সময় সেগুলোর পূর্বোক্ত প্রভাবের সাথে-সাথে য়াজুষী রূপের এই প্রভাবও সেগুলোতে প্রকট হতে থাকে। দৈবী ছন্দ রশ্মির মতো এই রশ্মির মধ্যেও এক-একটা অক্ষরের বৃদ্ধি হয়ে গায়ত্র্যাদি ছন্দ রশ্মি ক্রমশঃ প্রকট হয়, সেটা পাঠক পূর্বোক্ত তালিকা থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারবেন। এক অক্ষর এক দৈবী গায়ত্রী ছন্দ রশ্মির রূপ হওয়াতে এরমধ্যে দীপ্তি ও কমনীয়তা আদি গুণের মধ্যে ক্রমিক বৃদ্ধি হয়, কিন্তু ছন্দের প্রকৃতির প্রভাবও যথাযথ প্রকট হয়। একই প্রকারের ছন্দ রশ্মি সমান অক্ষর সংখ্যাযুক্ত হলেও অক্ষরের প্রকৃতির ভিন্নতার কারণে পূর্বোক্তানুসারে ভিন্ন-ভিন্ন প্রভাব দর্শায়। এই কারণে ৮ অক্ষরযুক্ত রশ্মি বিন্যাস (ব্যবস্থা) ভিন্নতার কারণে য়াজুষী অনুষ্টুপ্ তথা প্রাজাপত্যা গায়ত্রী দুটো রূপেই প্রকট হতে পারবে। এই দুই রূপের প্রভাব ভিন্ন-ভিন্ন হবে। এইভাবে তালিকা দেখে অন্য রূপের ভেদগুলোও বুঝে নিবেন।

✨ ৩. প্রাজাপত্যা - এই রশ্মিকে জানার জন্য সর্বপ্রথম আমি "প্রজাপতি" শব্দের উপর আর্ষ মতকে উদ্ধৃত করবো -

প্রজাপতিঃ য়জ্ঞনাম (নিঘন্টু ৩.১৭), প্রজাপতির্বন্ধুঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.৭.৫.৫), প্রজাপতিঃ, প্রজানাম্ পাতা পালয়িতা বা (নিরুক্ত ১০.৪২), সোমো হি প্রজাপতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৫.১.৫.২৬), প্রজননম্ প্রজাপতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৫.১.৩.১০)

এই বচনগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হলে বিভিন্ন রশ্মির সংযোগ-বন্ধন আদির প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হয়ে নবীন রশ্মির উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াও তীব্র হয়ে যায়। এই রশ্মি বিভিন্ন রশ্মির পালক হয়। এই রশ্মি লঘু ছন্দ রূপেই হওয়ার জন্য সোম বা মরুত্ বলে, এটা মৃদু-মৃদু গতিতে গমন করে। এখন পর্যন্ত উষ্ণতার বিশেষ উৎপত্তি না হতে পারার কারণে পদার্থ প্রায় ঠাণ্ডাই থাকে, তবুও মৃদু-মৃদু দীপ্তি অবশ্য সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়। বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির মধ্যে এর অক্ষরের সংখ্যা পূর্বোক্ত তালিকার মধ্যে দেওয়া আছে। এরমধ্যে অক্ষরের সংখ্যা প্রতি ছন্দ ৪-৪ মাত্রায় বাড়তে থাকে। এই সংখ্যা এক দৈবী বৃহতী ছন্দ রশ্মির সমান হয়। এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে প্রত্যেক প্রাজাপত্যা ছন্দ রশ্মির মধ্যে একটা দৈবী বৃহতী ছন্দ রশ্মি মিলিত হলে অগ্রিম প্রাজাপত্যা ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়। এই কারণে এই ছন্দ রশ্মির মধ্যে দৈবী বৃহতী রশ্মির গুণ মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার কারণে রশ্মির বন্ধন বলের মধ্যে ক্রমশঃ বৃদ্ধি হয়, কিন্তু এখানে গায়ত্রী, উষ্ণিক্ আদি ছন্দ প্রকৃতির গুণের প্রভাবও যথাযথ বিদ্যমান থাকে। সমান অক্ষর থাকা সত্ত্বেও ছন্দ প্রকৃতির ভেদ তথা সেগুলোর ভিন্ন-ভিন্ন প্রভাবকে পাঠক পূর্ববৎ জেনে নিবেন।

✨ ৪. সাম্নী - এই রশ্মির স্বরূপ ও প্রভাবকে জানতে হলে পূর্বোক্ত সাম রশ্মির স্বরূপ ও প্রভাবকে জানা আবশ্যক। বিভিন্ন বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ, তথাকথিত মিডিয়েটর পার্টিকলস্ আদির উৎপত্তিতে এর ভূমিকা আছে। এর প্রভাবে প্রকাশ, উষ্মা এবং বিভিন্ন প্রকারের বলের সমৃদ্ধি হতে থাকে। এই কারণে ব্রহ্মাণ্ডস্থ পদার্থের মধ্যে তীব্র কম্পন হতে থাকে। এরমধ্যে প্রত্যেক ছন্দ রশ্মির মধ্যে অক্ষরের সংখ্যাতে ক্রমশঃ ২-২ অক্ষরের বৃদ্ধি হয়। এই দুটো অক্ষর এক দৈবী উষ্ণিক্ ছন্দ রশ্মির সমান হয়। এরফলে দৈবী উষ্ণিক্ ছন্দ রশ্মির প্রভাবেরও ক্রমশঃ বৃদ্ধি হওয়ার সাথে-সাথে সমস্ত ছন্দ রশ্মি নিজ প্রকৃতি ও প্রভাবকে ধারণ করে রাখে। বিভিন্ন অক্ষরের প্রভাব তথা সমান অক্ষর হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন-ভিন্ন ছন্দ রশ্মির উৎপন্ন হওয়াকে পূর্ববৎ বুঝে নিবেন। এই সময় ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ভেদন-ছেদনের প্রক্রিয়াও তীব্র হয়।

✨ ৫. আসুরী - এই রশ্মির প্রভাবে অসুর (ডার্ক পদার্থ বা ডার্ক এনার্জি) তত্ত্বের উৎপত্তি হয় কিংবা এই রশ্মি স্বয়ং ডার্ক স্বরূপে বিদ্যমান হয়। এই রশ্মির মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ অত্যল্প বা নগণ্য হয়, অথচ এরমধ্যে প্রতিকর্ষণ বা প্রক্ষেপক বলের প্রাধান্য আছে। এরমধ্যে মনস্তত্ত্ব এবং অপান প্রাণেরও প্রাধান্য আছে। এরমধ্যে বাক্ তত্ত্ব অর্থাৎ "ওম্" রশ্মির বিরলতা আছে। এরমধ্যে অক্ষরের সংখ্যা পূর্বোক্ত তালিকাতে দেখে নিবেন। এরমধ্যে ক্রমশঃ এক-এক অক্ষর অর্থাৎ এক-এক দৈবী গায়ত্রী ছন্দের হ্রাস হওয়াতে দীপ্তি ও আকর্ষণ বলে ক্রমশঃ হ্রাস পেতে থাকে। এই কারণেই এর প্রতিকর্ষণ বল বাড়তে থাকে, কিন্তু তারসঙ্গে ছন্দ প্রকৃতির প্রভাবও যথাযথ বজায় থাকে। অসুর তত্ত্বের বিষয়ে পরবর্তীতে যথাস্থানে লেখা হবে। এটা ভারী আশ্চর্যের বিষয় যে ১৪ অক্ষরযুক্ত সাম্নী উষ্ণিক্ রশ্মি ১৪ অক্ষরযুক্ত আসুরী উষ্ণিক্ রশ্মির সঙ্গে গুণ ও প্রভাবের দৃষ্টিতে নিতান্ত ভিন্ন হয়। একইভাবে ১২ অক্ষরযুক্ত সাম্নী গায়ত্রী, য়াজুষী জগতী এবং প্রাজাপত্যা উষ্ণিকের প্রভাব আসুরী বৃহতীর থেকে একদম ভিন্ন হয়। এইভাবে তালিকার মাধ্যমে অন্য ছন্দের ভেদ বুঝে নিবেন।

✨ ৬. আর্চী - এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবকে জানার পূর্বে পূর্বোক্ত "ঋক্" নামক ছন্দ রশ্মির বিষয়ে অধ্যয়ন করা অত্যাবশ্যক। এই রশ্মির প্রভাব বা এর প্রাধান্যতায় বিভিন্ন অপ্রকাশিত পদার্থ অর্থাৎ নানা মূলকণা ও লোকের নির্মাণ হতে থাকে। এই কারণে এই রশ্মি বিভিন্ন রশ্মি তথা তরঙ্গাণু আদির সংঘনন ও ভেদনের প্রক্রিয়াকে তীব্র করে তোলে। এরমধ্যে ক্রমানুসারে প্রত্যেক ছন্দে ৩ অক্ষরের বৃদ্ধি অর্থাৎ এক দৈবী অনুষ্টুপের বৃদ্ধি হয়। এরদ্বারা সমস্ত ছন্দ রশ্মি অধিক সক্রিয় ও প্রকাশিত হতে থাকে। সমান অক্ষর হওয়া সত্ত্বেও ছন্দভেদকে পূর্ববৎ বুঝে নিবেন। তালিকা থেকে এরমধ্যে অক্ষরের সংখ্যাকে জেনে নিবেন। এরমধ্যে "ওম্" ও "ভূঃ" এর সঙ্গে-সঙ্গে প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মিরও প্রাধান্য আছে।

✨ ৭. আর্ষী - এই ছন্দ রশ্মিকে জানার জন্য "ঋষি" শব্দের উপর বিচার করা অনিবার্য।

ঋষয়ঃ = প্রাণাদয়ঃ পঞ্চ দেবদত্তধনঞ্জয়ৌ চ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৭.৭৯), শব্দপ্রাপকঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৩.৫৭), রূপপ্রাপকঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৩.৫৬), প্রাণা বা ঋষয়ঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.২৭), প্রাণা ঋষয়ঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.২.৩.৫), ঋষির্হ স্ম মন্ত্রকৃত্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.২৬৬)

এই উপরোক্ত আর্ষ বচন থেকে এই সংকেত পাওয়া যায় যে প্রাণাদি রশ্মি থেকে উৎপন্ন ছন্দ রশ্মিকে আর্ষী বলে। একইসাথে অন্য অনেক প্রাণ রশ্মি, যেগুলো এই সৃষ্টির মধ্যে বিভিন্ন অতি সূক্ষ্ম রশ্মি থেকে উৎপন্ন হয়, সেগুলোকেও ঋষি বলে। এই ঋষি রশ্মি অনেক প্রকারের মন্ত্র রূপ ছন্দ রশ্মিকে উৎপন্ন ও ধারণ করে। এই রশ্মি উৎপন্ন হলে এই সৃষ্টির মধ্যে অনেক প্রকারের রূপ আর আকৃতিবান্ পদার্থসমূহ উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন প্রকারের ঘোষ (ধ্বনি) করতে থাকে। এরথেকে সংকেত পাওয়া যায় যে যখন ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোসমিক মেঘ এবং সেগুলো থেকে বিভিন্ন লোকের নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেই সময় আর্ষী ছন্দ রশ্মির প্রাচুর্য বা প্রাধান্য থাকে। এরথেকে এটাও স্পষ্ট হয় যে এই ছন্দ রশ্মির ক্ষেত্র অতি ব্যাপক হয় তথা বেদের মধ্যে এগুলোর মাত্রাই সর্বাধিক আছে। এরমধ্যেও বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির মধ্যে ক্রমশঃ ৪-৪ অক্ষর অর্থাৎ ১-১ দৈবী বৃহতী ছন্দ রশ্মির উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হতে থাকে। সমান অক্ষর সংখ্যাযুক্ত ছন্দ রশ্মির মধ্যে অক্ষর বিন্যাস থেকে ছন্দের প্রকৃতির ভেদকে পূর্ববৎ বুঝে নিবেন।

✨ ৮. ব্রাহ্মী - সর্বপ্রথমে আমরা এই রশ্মির বিষয়ে আর্ষ মতের উপর বিচার করবো -

বলম্ বৈ ব্রহ্মা (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.৮.৫.২)
ব্রহ্মা পরিবৃळহঃ শ্রুততঃ ব্রহ্ম পরিবৃळহম্ সর্বতঃ (নিরুক্ত ১.৮), ব্রহ্ম ব্রহ্মাऽভবৎ স্বয়ম্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১২.৯.৩), বৃহদ্ বলম্ (তুলনা মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ২.২৪.৩)

এই বচনগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে এই ছন্দ রশ্মির উৎপন্ন হওয়ার পর বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির বল ক্রমাগত বিস্তৃত হয়ে চলতে থাকে। এর প্রভাবে সব রশ্মিগুলো চারিদিকে বেড়ে চলে। এই ধরণের রশ্মির মধ্যে ৬-৬ অক্ষর অর্থাৎ একটা দৈবী ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির উত্তরোত্তর ক্রমশঃ বৃদ্ধি হয়। এরমধ্যে অন্য সব পূর্বোক্ত ছন্দ রশ্মির তুলনায় অক্ষরের সংখ্যা সর্বাধিক হয়। এই সময় ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে পূর্বোক্ত সব ছন্দ রশ্মির সমস্ত কাজ সমৃদ্ধ হয়ে বিভিন্ন লোকের নির্মাণের প্রক্রিয়াও সমৃদ্ধ হয়। এখানেও অক্ষরের সংখ্যা সমান হওয়াতে ছন্দভেদের হওয়া পূর্ববৎ ধরে নেওয়া যেতে পারে।

এইভাবে সর্বমোট এই আট প্রকারের বিভাগ প্রত্যেক গায়ত্র্যাদি ছন্দের হয়। এইভাবে এপর্যন্ত সর্বমোট ছাপ্পান্ন (৫৬) টা ছন্দ রশ্মির বর্ণনা হয়। ধ্যাতব্য হল, বেদের মধ্যে গায়ত্র্যাদি সাত ছন্দ রশ্মির অতিরিক্ত অষ্টি, অত্যষ্টি, শক্বরী এবং অতিশক্বরী আদি বড় ছন্দ রশ্মিও বর্ণনা আছে, যেগুলো এই সৃষ্টির মধ্যে উৎপন্ন হয়। এগুলোকে এই গ্রন্থের মধ্যেও অনেকত্র বর্ণনা করা হয়েছে। সেই ছন্দ রশ্মিরও দৈবী আদি আট প্রকারের হয়। এইভাবে ছন্দ রশ্মি ৫৬ থেকেও অনেক অধিক সংখ্যার হয়।

১. আকাশ (স্পেস)

ছন্দ রশ্মিগুলোর উৎপত্তি চলাকালীনই আকাশের উৎপত্তি হয়। "আকাশ" পদ দুইটা রূপে ব্যবহৃত হয়। প্রথম রূপ হল একরস মূল প্রকৃতি পদার্থের মধ্যে প্রারম্ভিক সংকোচন বা সংঘননের ক্রিয়া আরম্ভ হলে অবকাশ রূপ (এম্পটিনেস) স্থানকেই আকাশ বলে। এইভাবে আকাশের বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দ তাঁর সত্যার্থ প্রকাশের অষ্টম সমুল্লাসে তৈত্তিরীয় উপনিষদের একটা বচন - "তস্মাদ্বা এতস্মাদাত্মন আকাশঃ সম্ভূতঃ..." ব্যাখ্যাতে লিখেছেন -
.
"সেই পরমেশ্বর আর প্রকৃতি থেকে আকাশ অবকাশ অর্থাৎ যে কারণরূপ দ্রব্য সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছিল, তাকে একত্রিত করলে অবকাশের মতো উৎপন্ন হয়ে যায়। আসলে আকাশের উৎপত্তি হয় না, কারণ বিনা আকাশে প্রকৃতি আর পরমাণু দাঁড়াবে কোথায়?" (সত্যার্থ প্রকাশ পৃষ্ঠা ২২০)
.
অবকাশ রূপ আকাশ হল অভাব বা শূন্যরূপ, এর উৎপত্তি ও এর বিনাশ ব্যবহারেই ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় আকাশের বিষয়ে বেদের সংকেত আছে -

নাসদাসীন্নো সদাসীত্তদানীম্ নাসীদ্রজো নো ব্যোমা পরো য়ত্ (ঋগ্বেদ ১০.১২৯.১)
.
এর ভাষ্য করে ঋষি দয়ানন্দ তাঁর ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকার "সৃষ্টিবিদ্যাবিষয়" নামক অধ্যায়ে লিখেছেন -

"(নাসদাসী.) য়দা কার্য়ম্ জগন্নোৎপন্নমাসীত্ তদাऽসত্ সৃষ্টেঃ শূন্যমাকাশমপি নাসীত্। কুতঃ? তদ্ব্যবহারস্য বর্তমানাভাবাত্। (নো সদাসীত্তদানীম্) তস্মিন্ কালে সত্ প্রকৃত্যাত্মকমব্যক্তম্ সৎসম্জ্ঞকম্ য়জ্জগৎকারণম্, তদপি নো আসীন্নাবর্তত।

(নাসীদ্র.) পরমাণবোऽপি নাসন্। (নো ব্যোমাপরো য়ত্) ব্যোমাকাশম্ অপরম্ য়স্মিন্ বিরাডাখ্যে, সোऽপি নো আসীত্। কিন্তু পরব্রহ্মণঃ সামর্থ্যাখ্যমতীব সূক্ষ্মম্ সর্বস্যাস্য পরমকারণসম্জ্ঞকমেব তদানীম্ সমবর্ত্তত।"
(ঋগ্বেদ ভাষ্য - আর্য সমাজ শতাব্দী সংস্করণ, প্রথমো ভাগ: পৃষ্ঠা১৩৪-৩৫, রা.লা.ক.ট্র. বহালগড়)

এখানে ঋষি দয়ানন্দ দুই প্রকারের আকাশের সংকেত করেছেন। প্রথম আকাশ তো অবকাশ রূপ তথা আরেকটা ব্যোম নামক দ্বিতীয় আকাশের সংকেত আছে। এর উপর মন্তব্য করে পণ্ডিত য়ুধিষ্ঠির মীমাংসক লিখেছেন -

"পূর্বত্র 'অসদ্' পদ ব্যাখ্যানে 'শূন্যমাকাশমপি নাসীৎ' ইত্যুক্তমিহাপি 'ব্যোমাকাশমপরম্' ইত্যুক্তম্। উভয়ত্রাকাশাভাবস্যোক্তত্ত্বাত্ পুনরুক্তিদোষপরিহারায় পূর্বত্র শূন্যমাকাশমিত্যত্র আকাশ পদমবকাশপরম্, ইহ চাকাশম্ ভূতপরম্ ব্যাখ্যেয়ম্।"
.
এরদ্বারা পঞ্চমহাভূত আকাশ যে একটা তত্ত্ব সেটা সিদ্ধ হয়। এখন আমি এই আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি প্রক্রিয়া এবং তার স্বরূপকে দেখাবো।
.
🌿 আকাশের উৎপত্তি - এই বিষয়ে মহর্ষি ব্রহ্মার কথন হল -

অহম্কারাত্ প্রসূতানি মহাভূতানি পঞ্চ বৈ।
পৃথিবী বায়ুরাকাশমাপো জ্যোতিশ্চ পঞ্চমম্।।১।।
অতঃ পরম্ প্রবক্ষ্যামি সর্বে বিবিধমিন্দ্রিয়ম্।
আকাশম্ প্রথমম্ ভূতম্ শ্রোত্রমধ্যাত্মমুচ্যতে।।
(মহাভারত আশ্বমেধিক পর্ব, অনুগীতা পর্ব, অধ্যায় - ৪২)

অর্থাৎ অহংকার (মনস্তত্ত্বের সমকক্ষই) থেকেই পাঁচ মহাভূত উৎপন্ন হয়েছে, যারমধ্যে আকাশ মহাভূতের উৎপত্তি সর্বপ্রথম হয়েছে। এই সময় শ্রোত্র-ইন্দ্রিয়েরও উৎপত্তি হয়েছে।

অন্যদিকে এই বিষয়ে মহর্ষি ভৃগু মহর্ষি ভরদ্বাজকে বলেছেন -

পুরা স্তিমিতমাকাশমনন্তমচলোপমম্।
নষ্টচন্দ্রার্কপবনম্ প্রসুপ্তমিব সম্বভৌ।।৯।।
ততঃ সলিলমুৎপন্নম্ তমসীবাপরম্ তমঃ।
তস্মাচ্চ সলিলোৎপীডাদুদতিষ্ঠত মারুতঃ।।১০।।
(মহাভারত শান্তিপর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩)

অর্থাৎ সম্পূর্ণ অহংকার (মনস্তত্ত্ব) পদার্থ স্থির, অনন্ত, অবকাশরূপ তমোময় আকাশের সমান তথা তারমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। সেই সময় চন্দ্র, সূর্য, বায়ু আদি সব পদার্থ নষ্ট অর্থাৎ নিজ কারণ রূপ সেই অচল, অনন্ত পদার্থের ভিতরে ঘুমিয়ে ছিল অর্থাৎ তারমধ্যেই লীন ছিল।

সলিলম্ = আপো হ বাऽইদমগ্রে সলিলমেবাস (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.১.৬.১), 
অন্তরিক্ষম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৭.৪৯.১)
আপঃ = অন্তরিক্ষনাম (নিঘন্টু ১.৩)

সেই অহংকার বা মনস্তত্ত্ব থেকে সলিল অর্থাৎ সবকিছুকে নিজের ভিতরে ব্যাপ্ত বা লীন করে এমন আকাশ নামক মহাভূত উৎপন্ন হয়। সেই আকাশ এমন মনে হচ্ছিল যেন একটা অন্ধকারের মধ্যে তার থেকেই আরেকটা অন্ধকার উৎপন্ন হয়েছে। সেই আকাশ তত্ত্বের উৎপীড়ন অর্থাৎ সংকোচন থেকে বায়ু মহাভূতের উৎপত্তি হয়।

এখানে অহংকার বা মনস্তত্ত্ব থেকে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তির চর্চা আছে। বর্তমান ভৌতিক বৈজ্ঞানিক আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের বিষয়ে নিতান্ত ভ্রম বা সংশয়ের মধ্যে আছে। তারা স্পেসকে ত্রিবিমীয় (থ্রি ডায়মেনশন) মানে, কিন্তু স্পেসের স্বরূপ কি? এম্পটিনেসই কি স্পেস নাকি স্পেস কোনো পদার্থ, এটা তাদের মাথায় আসছে না। তারা গুরুত্বাকর্ষণ বল অথবা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বলের দ্বারা স্পেসের বাঁকা (কার্ভ) বা ডিস্টার্ড হওয়াকে মানে, অথচ তাকে কোনো প্রকারের পদার্থ বিশেষ বলার থেকে এড়িয়ে যায়। আকাশ যখন কোনো পদার্থই নয়, তাহলে বলের কারণে ডিস্টার্শন অথবা কার্ভেচার কিসের মধ্যে হবে? আশ্চর্যের বিষয় হল, বর্তমানে বিকশিত বলে পরিচিত ভৌতিক বিজ্ঞান গুরুত্বাকর্ষণ বলকে স্পেস কার্ভেচারের রূপেই মানে ও জানে, কিন্তু স্পেস কি, এটা জানে না। এইদিকে বৈদিক বিজ্ঞান আকাশ তত্ত্বের বিষয়ে ব্যাপক তথ্য প্রস্তুত করে। আমি সেই তথ্যগুলোর আধারে আকাশ তত্ত্বের উপর ব্যাপকভাবে বিচার করবো -

বৈদিক বাঙ্ময়ে আকাশ ও অন্তরিক্ষকে সমানার্থক মানা হয়েছে। এই কারণে নিঘন্টু ১.৩ -মধ্যে "আকাশ" শব্দকে অন্তরিক্ষ নামে পড়ানো হয়েছে। এখন আমি আকাশ বা অন্তরিক্ষের বিষয়ে বিভিন্ন ঋষিদের মত প্রস্তুত করবো -

১. আবপনমাকাশ আকাশে হীদম্ সর্বম্ সমোপ্যতে (ঐতরেয় আরণ্যক ২.৩.১)
২. স ইমান্ প্রাণানাকাশানভিনির্মন্থতি (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.১৮)
৩. অন্তরিক্ষমেব বিশ্বম্ বায়ুর্নরঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.৩.১.৩)
৪. অন্তরিক্ষম্ মরীচয়ঃ (ঐতরেয় আরণ্যক ২.৪.১)
৫. অন্তরিক্ষেণ হীমে দ্যাবাপৃথিবী বিষ্টব্ধে (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.২.১.১৬)
৬. অয়ম্ মধ্যমো (লোকঃ = অন্তরিক্ষম্) বৃহতী (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৯)
৭. অসদিব বা অন্তরিক্ষম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৪.৬.৪)
৮. আত্মা ऽঅন্তরিক্ষম্ (কাঠক সংহিতা ১৬.২)
৯. ছিদ্রমিবান্তরিক্ষম্ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৩.১০.২; ২১.৭.৩)
১০. ত্রৈষ্টুভম্ অন্তরিক্ষম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.২.১.১; শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৩.৪.১১)
১১. পশবোऽন্তরিক্ষম্ (কাঠক সংহিতা ৬.৮; ৭.৭; কপিষ্ঠল সংহিতা ৩১.১৩)
১২. প্রাণো বা অন্তরিক্ষম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৬.৮.৫; জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩০৭)
১৩. ভুব ইত্যন্তরিক্ষম্ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৫.১; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৫.১)
১৪. বাগিত্যন্তরিক্ষম্ (জৈমিনীয়োপনিষদ ব্রাহ্মণ ৪.১১.১.১১)
১৫. অন্তরিক্ষম্ বৈ য়জুষামায়তনম্ (গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ২.২৪)

এই বচনগুলো থেকে আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের স্বরূপ সার রূপে নিম্মানুসারে প্রকাশিত হয় -

১. আকাশ হল সেই পদার্থ যারমধ্যে সম্পূর্ণ সৃষ্টির বীজ বপন করা হয় অর্থাৎ সব প্রকারের কণা ও তরঙ্গাণু আকাশ তত্ত্বের মধ্যেই উৎপন্ন হয় ও তারমধ্যেই নিবাস করে।
২. আকাশ প্রাণ রশ্মির রূপেই বিদ্যমান থাকে, যার মন্থন দ্বারা অগ্রিম সৃষ্টি উৎপন্ন হয়।
৩. বায়ু অর্থাৎ বিভিন্ন ছন্দ ও প্রাণ রশ্মির মিশ্রণ আকাশ তত্ত্বের নায়ক হয় অর্থাৎ এই বায়ু রশ্মিগুলো আকাশ তত্ত্বকে কার্ভ বা ডিস্টার্ট করার ক্ষমতা রাখে।
৪. আকাশ স্বয়ং রশ্মি রূপ হয়, এই রশ্মিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়।
৫. আকাশ তত্ত্ব বিভিন্ন কণা বা তরঙ্গাণুকে ধরে রাখতে সহায়ক হয়।
৬. এরমধ্যে বৃহতী ছন্দ রশ্মি প্রচুর মাত্রায় বিদ্যমান থাকে।
৭. এটা এতই সূক্ষ্ম হয় যে এর স্বরূপ অভাব বা রিক্ততার (এম্পটিনেস) মতো মনে হয়।
৮. এরমধ্যে সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির প্রাচুর্য আছে তথা এটা সব পদার্থের মধ্যেই ব্যাপ্ত থাকে।
৯. এটা ছিদ্রের সমান অর্থাৎ শূন্যতার মতো ব্যবহার করে।
১০. এরমধ্যে ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির প্রাচুর্য আছে।
১১. এরমধ্যে বিভিন্ন মরুত্ ও ছন্দ রশ্মি বিদ্যমান আছে।
১২. এটা প্রাণ স্বরূপই হয়, যা সবাইকে গতিশীল রাখতে অবকাশ ও মার্গ প্রদান করে।
১৩. এর উৎপত্তি "ভুবঃ" নামক মূল ছন্দ রশ্মি থেকে হয় কিংবা এই ছন্দ রশ্মি তার বীজরূপ হয়।
১৪. এরমধ্যে বাক্ অর্থাৎ "ওম্" ছন্দ রশ্মি প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে।
১৫. পূর্বোক্ত "য়জুঃ" সংজ্ঞক ছন্দ রশ্মি আকাশ তত্ত্বের মধ্যে সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকে, যার কারণে বিভিন্ন পদার্থ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিরামহীন গতি করতে সক্ষম হয়।

মহর্ষি গৌতম তাঁর ন্যায়দর্শনে আকাশের ধর্ম সম্বন্ধে লিখেছেন -

অব্যূহাবিষ্টম্ভবিভুত্বানি (ন্যায়দর্শন ২.৪.২২)

অর্থাৎ এটা বিভিন্ন পদার্থকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে না, বিশেষ অবরোধ না করে সবাইকে মার্গ প্রদান করে তথা সবার মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে।

অন্যদিকে মহর্ষি কণাদ আকাশের মুখ্য লক্ষণ সম্বন্ধে এইভাবে বলেছেন -

নিষ্ক্রমণম্ প্রবেশনমিত্যাকাশস্য লিঙ্গম্ (বৈশেষিক দর্শন ২.১.২০)

অর্থাৎ যারমধ্যে দিয়ে বিভিন্ন পদার্থ প্রবেশ করে বা বেরিয়ে যায়, তাকে আকাশ বলে।

এখন আমি ঐতরেয় ব্রাহ্মণের আধারে আকাশ তত্ত্বের উপর বিচার করবো। "বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ" নামক গ্রন্থের মধ্যে আমি অনেকত্র আকাশ তত্ত্বের চর্চা করেছি। আমি এখানে সেই গ্রন্থ থেকে কিছু বিন্দুকে উদ্ধৃত করবো, যারদ্বারা আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি ও স্বরূপের গম্ভীর বিজ্ঞান প্রকট হবে -

১. "প্র বো দেবায়াগ্নয়ে..." (ঋগ্বেদ ৩.১৩.১) আর্ষী ভুরিগুষ্ণিক্ ছন্দ রশ্মির মধ্যে বিদ্যমান প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মি থেকে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবে বিভিন্ন রশ্মি আদি পদার্থের মাঝে আকাশ তত্ত্ব বিস্তৃত হতে থাকে, সেই কারণে বিভিন্ন রশ্মির গতি আর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই রশ্মিগুলোও সেই আকাশ তত্ত্বের মধ্যে ব্যাপ্ত হতে থাকে।
২. সবার ধারক আকাশ তত্ত্ব দৈবী অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি রূপই হয়। ... এর উৎপত্তি সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে অকস্মাৎ একসাথে হয় না, বরং স্থানে-স্থানে সময়ে-সময়ে হয়, তবুও এর উৎপত্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত তীব্র ও ব্যাপক হয়।
৩. প্রাণ, অপান এবং উদান রশ্মির এক হাজার বার আবৃত্তি তথা বিভিন্ন প্রাণের সঙ্গম থেকে অন্য ছন্দ রশ্মিগুলো আকাশ তত্ত্বের রূপে প্রকট হয়। ...এই আকাশ তত্ত্ব প্রাণ তত্ত্বের সঙ্গে মিশ্রিত বিভিন্ন ছন্দ রশ্মি, বিশেষ করে পঙক্তি রশ্মির রূপ হয়।
৪. আকাশ তত্ত্ব সর্বথা তেজহীন হয় না।
৫. আকাশ তত্ত্ব প্রাণ তথা বাক্ রশ্মির মিলন থেকে প্রকট হয় আর এগুলোর দ্বারা ব্যাপ্ত হয়।
৬. সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মিগুলো আকাশ তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রিত করে।
৭. সূক্ষ্ম মরুদ্ রশ্মিগুলো যখন নিষ্কম্প হয়ে সংঘাত রূপে প্রকট হয়, তখন সেগুলোই আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের রূপ ধারণ করে। ধ্যাতব্য হল, মরুদ্ রশ্মি কখনও পূর্ণ নিষ্কম্প হয় না।
৮. ২৪ স্তোম নামক বিশেষ ছন্দ রশ্মিরও আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তিতে ভূমিকা আছে।
৯. আকাশ তত্ত্ব হল সূক্ষ্ম প্রাণ আর মরুদ্ রশ্মির মিশ্র রূপ। এরমধ্যেও ত্রিষ্টুপ্ আর বৃহতী ছন্দ রশ্মি প্রচুর মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। ...আকাশের মধ্যে বিদ্যমান প্রাণ রশ্মি অত্যন্ত শিথিলাবস্থায় চক্রিয় গতিতে ভ্রমণ করতে থাকে। এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন অতি নিম্ন হয়। এই কারণে আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিভিন্ন কণা বা বিকিরণ স্বচ্ছন্দ আর নিরাপদ রূপে গতি করতে থাকে। আকাশ তত্ত্বের রশ্মিগুলো বিভিন্ন কণার সংযোগ-বিয়োগে অতি সূক্ষ্ম স্তরে সেই কণাগুলোকে স্পর্শ বা সিঞ্চিত করতে থাকে, কিন্তু সেগুলোর নিজের আকর্ষণাদি বল নগণ্যের মতো হয়।

এই উপরোক্ত নয়টা বিন্দুর উপর বিচার করলে আকাশ তত্ত্বের স্বরূপ নিম্মানুসারে প্রকাশিত হয় -

সৃষ্টি প্রক্রিয়ার অন্তর্গত যখন "ওম্", "ভূঃ", "ভুবঃ", "স্বঃ" -এর অতিরিক্ত অন্য দৈবী ছন্দ রশ্মি এবং সূত্রাত্মা বায়ু সহিত প্রাণাপানাদি প্রাণ রশ্মি উৎপন্ন হয়ে যায়, সেই সময় সেগুলোর মধ্যে কিছু রশ্মির সংঘাতে একটা সূক্ষ্ম ও প্রায় একরসবৎ পদার্থের উৎপত্তি হয়। এই পদার্থের উৎপত্তির পূর্বে প্রাণ, অপান এবং উদানের এক সহস্র বার আবৃত্তি হয়ে গিয়ে থাকে। তখন দৈবী অনুষ্টুপ্, বৃহতী, পঙক্তি ও ত্রিষ্টুপ্ এগুলোও উৎপন্ন হয়ে গিয়ে থাকে। এই চারটা ছন্দ রশ্মি পরস্পর এমন মিশ্রিত হয় যে দৈবী অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির সমান প্রভাব দেখায়। বিভিন্ন প্রাণ, অপান আদি রশ্মিগুলো বিভিন্ন দৈবী ছন্দ রশ্মির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এমন দৈবী অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিকে প্রকট করে যা প্রায় নিষ্কম্প হয়। এই রশ্মিগুলো নিজ স্থানের উপরই স্পন্দিত হতে থাকে, এমন নয় যে মনস্তত্ত্বের মধ্যে সর্বত্র গমন করে। আকাশ তত্ত্বের অবয়বভূত প্রাণ ও মরুদ্ রশ্মিগুলো শিথিলাবস্থায় পারস্পরিক সংঘাত রূপে বিদ্যমান থাকে। এই সংঘাতে বিদ্যমান সেই রশ্মিগুলো চক্রাকার ঘূর্ণনও করতে থাকে অর্থাৎ সেগুলোর মধ্যে রেখীয় গতি হয় না, কিন্তু ঘূর্ণন গতি মন্দ বেগে হয়। এগুলোর মধ্যে অব্যক্ত দীপ্তিও বিদ্যমান থাকে।

এই রশ্মিগুলো আকাশ রশ্মি রূপে পরিচিত হয়। এই রশ্মিগুলো এই অবস্থায় এমন শিথিল হয় যে বিভিন্ন বৃহদ্ ছন্দ রশ্মি, কণা বা তরঙ্গাণু সহজে এগুলোর মধ্য দিয়ে স্বচ্ছন্দ গতি করতে পারে। গতি করা কালীন কণা, তরঙ্গাণু বা রশ্মি যখন আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের মধ্যদিয়ে যায়, তখন সেগুলো চক্রণ করতে-করতে পূর্বোক্ত শিথিল আকাশ রশ্মির (প্রাণ ও মরুত্) মাঝে সহজভাবে স্খলিত হয়ে গতি করে। এতকিছুর পরেও এই শিথিল রশ্মিগুলো সর্বদা সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকে। এই কারণে যখন আকাশ তত্ত্ব কোনো বলের দ্বারা সংকুচিত বা ডিস্টার্ড হয়, তখন সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির দ্বারা আকাশ রশ্মির ঘূর্ণন গতি প্রভাবিত হওয়ার কারণেই হয়। বিভিন্ন মরুদ্ ও প্রাণ রশ্মিও সূত্রাত্মা বা ধনঞ্জয় বায়ু রশ্মির সানিধ্যে আকাশ তত্ত্বকে ডিস্টার্ট বা কার্ভ করতে সক্ষম হয়। উপরিনির্দিষ্ট আর্ষী ভুরিগুষ্ণিক্ অথবা ২৪ স্তোম রশ্মি উৎপন্ন হলে আকাশের নির্মাণ দ্রুত হয়।

কিছু তত্ত্ববেত্তা ঋষিগণ একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন -

অন্তরিক্ষম্ বা অন্তর্য়ামঃ (গ্রহঃ) (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৫.৬; ৪.৭.১; কাঠক সংহিতা ২৭.২; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪২.২)

এখানে অন্তরিক্ষ অর্থাৎ আকাশ তত্ত্বকে অন্তর্য়াম নামক বল বলা হয়েছে। "বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ" গ্রন্থের মধ্যে অন্তর্য়াম বলকে এইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে -

"উদান বা অপানের সংযুক্ত বলকে অন্তর্য়াম বলে। এগুলোর মধ্যে উদান প্রাণ উপরে আর অপান প্রাণ নিচে সংযুক্ত হয়ে কোনো পদার্থের মাঝে সঞ্চারিত হতে থাকে। বিভিন্ন সূক্ষ্ম মরুদ্ রশ্মিও এই ক্ষেত্রেই সঞ্চারিত হয়। এই সবের সংযুক্ত বলকে অন্তর্য়াম বলে।"
.
এরদ্বারা স্পষ্ট হয় যে যেকোনো কণা বা কোয়ান্টার ভিতরেও স্পেসের অংশ বিদ্যমান থেকে সেগুলোকে ধারণ করে রাখে। আচার্য সুশ্রুত আকাশকে সতোগুণ প্রধান বলার পাশাপাশি বলেছেন -

সত্ত্ববহুলমাকাশম্ (সুশ্রুতসংহিতা শারীরস্থানম্ ১.২৭)
.
এই কারণে এই তত্ত্ব সূক্ষ্ম ও অব্যক্ত প্রকাশযুক্ত, সবথেকে হালকা অর্থাৎ নগণ্য দ্রব্যমানের হয়। ধ্যাতব্য হল, এই তত্ত্বের উৎপত্তির সঙ্গে-সঙ্গে প্রাণীদের মধ্যে বিদ্যমান শ্রোত্র ইন্দ্রিয়েরও সূক্ষ্ম রশ্মি রূপে উৎপত্তি হয়।

২. বায়ু 

সর্বপ্রথম এর বিষয়ে আমি বিভিন্ন ঋষিদের মত উদ্ধৃত করবো -

১. অয়ম্ বায়ুরন্তরিক্ষস্য পৃষ্ঠম্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.২৫২)
২. অয়ম্ বৈ বায়ুর্বিশ্বকর্মা য়ো ऽয়ম্ পবত ऽ এষ হীদꣳ সর্বম্ করোতি। (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.১.১.৭)
৩. ন খলু বৈ কিম্ চন বায়ুনানভিগতমস্তি (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.২.৭)
৪. পৃথিবী পূর্বরূপম্। দ্যৌরুত্তররূপম্। আকাশঃ সন্ধিঃ। বায়ুঃ সন্ধানম্ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৩.১-২; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৩.১-২)
৫. য়দিদম্ সর্বম্ য়ুতে তস্মাদ্ বায়ুঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৫৬)
৬. বায়ুরস্যন্তরিক্ষে শ্রিতঃ। দিবঃ প্রতিষ্ঠা (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১১.১.৯)
৭. বায়ুর্বৈ দেবানামোজিষ্ঠঃ ক্ষেপিষ্ঠঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.৫.১)
৮. বায়ুর্বৈ তূর্ণির্হব্যবাড্ বায়ুর্হীদম্ সর্বম্ সদ্যস্তরতি য়দিদম্ কিম্চ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৩৪)
৯. বায়ুর্হি প্রাণঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.২৬), প্রাণো হি বায়ুঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৪.৬.৮), প্রাণা উ বৈ বায়ুঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৪.১.৮) বাগ্বৈ বায়ুঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৮.৮.১; তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১৮.৮.৭), বায়ুর্বৈ নিকায়শ্ছন্দঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৫.২.৫)
১০. বায়ুর্বৈ রেতসাম্ বিকর্ত্তা (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.৩.৮.১)
১১. ত্রৈষ্টুভো হি বায়ুঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৭.৩.১২)
.
এই উপরোক্ত আর্ষ বচনগুলো দ্বারা আমরা বায়ু তত্ত্বের বিষয়ে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত করি -

১. বায়ু তত্ত্ব হল আকাশ তত্ত্বের পৃষ্ঠরূপ, এখানে এর দুটো অর্থ আছে। এরমধ্যে প্রথম হল পূর্বে অনেকত্র বর্ণিত অহংকার রূপ বায়ু হল আকাশ তত্ত্বের আধার। এই দিব্য বায়ুই আকাশ তত্ত্বের মূল উপাদান কারণ হওয়ার পাশাপাশি তার আধারও হয়। এখানে দ্বিতীয় অর্থ হল বায়ু তত্ত্ব আকাশ তত্ত্বের পশ্চাৎ উৎপন্ন হয়।
২. এই সৃষ্টির প্রত্যেক কর্ম বা বলের পিছনে বায়ু রশ্মিগুলোই প্রধান কারণ হয়। এই কারণেই একে বিশ্বকর্মা অর্থাৎ সবার কর্ত্তা বলা হয়।
৩. এই সৃষ্টির মধ্যে প্রত্যেকটা উৎপন্ন পদার্থ বায়ু তত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত থাকে, আবার এর থেকে উৎপন্নও হয়।
৪. বায়ু তত্ত্ব বিভিন্ন পদার্থকে জুড়ে রাখার কাজ করে। এর অভাবে কোনো পদার্থই পরস্পর সন্ধি করতে পারবে না।
৫. এই তত্ত্ব অন্য সব পদার্থের সঙ্গে মিলিত থেকে সেগুলোকে পরস্পর মিলিয়েও রাখে তথা বিভিন্ন পদার্থের বিয়োজন কর্মেও এই বায়ু তত্ত্বই তার ভূমিকা পালন করে।
৬. এই বায়ু তত্ত্ব আকাশ তত্ত্বের মধ্যে আশ্রিত থেকে বিভিন্ন দ্যুলোককে প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ আধার প্রদান করে। একে ছাড়া দ্যুলোকের উৎপত্তি ও স্থিতি হওয়া সম্ভব নয়। আবার আকাশের অভাবে বায়ু তত্ত্ব হওয়াও সম্ভব নয়।
৭. বিভিন্ন দেব পদার্থের মধ্যে বায়ু তত্ত্ব সবথেকে অধিক সংকুচিত বা প্রক্ষেপক, আকর্ষক বা প্রতিকর্ষক বলযুক্ত হয়। বস্তুতঃ এই সৃষ্টির মধ্যে যেসব বল বিদ্যমান আছে, সেটা বায়ুর বলই হয়।
৮. [তূর্ণি = ক্ষিপ্রনাম (নিঘন্টু ২.১৫), তূর্ণিঃ কর্ম (নিরুক্ত ৭.২৭)] এটা অতিশীঘ্র বিভিন্ন প্রকারের কর্মকে অব্যক্ত রূপে সম্পাদিত করে। এর আবশ্যকতাকে দেখিয়ে মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য বলেছেন - "অনিরুক্তো হি বায়ুঃ" (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৭.৩.১২)। অনিরুক্তের অর্থ সম্বন্ধে বলেছেন - "অপরিমিতম্ বাऽ অনিরুক্তম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৫.৪.৪.১৩)। এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে বায়ু তত্ত্ব মানবের দৃষ্টিতে অপরিমিত ক্ষেত্রে ব্যাপ্ত হয়ে সমস্ত কণা বা কোয়ান্টা আদি পদার্থকে প্রত্যেক ক্রিয়াতে তাদের সক্ষম করে তোলে।
৯. বায়ু কি আর তার স্বরূপ কি? এখানে এটা স্পষ্ট করা হয়েছে। পূর্বোক্ত বিভিন্ন প্রকারের প্রাণ রশ্মিগুলোই বায়ু রূপ হয়। এই প্রাণ রশ্মি তথা পূর্বোক্ত বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির সমূহের মিশ্রণই বায়ু তত্ত্বের নামে পরিচিত। সূক্ষ্ম প্রাণ ও ছন্দ রশ্মিগুলো আকাশ তত্ত্বের নির্মাণ করে, কিন্তু আকাশ তত্ত্বের নির্মাণের পশ্চাৎ উৎপন্ন বৃহৎ ছন্দ রশ্মির সঙ্গে প্রাণ রশ্মির মিশ্রণ বায়ু তত্ত্বের নামে জানা যায়।
১০. বায়ু তত্ত্ব বিভিন্ন পদার্থের বীজকে বিভিন্ন প্রকারে উৎপন্ন ও ধারণ করে। এটা পদার্থকে বিকৃত বা রূপান্তরিত করে অন্য অনেক পদার্থের নির্মাণ করে। এইভাবে এটা বিভিন্ন ক্রিয়া বা বলকে উৎপন্ন করে।
১১. এই বচন থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে ঋষিরা এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির মিশ্রণকে বায়ু সংজ্ঞা করেন নি। যখন ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়ে যায়, সেই সময় বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির মিশ্রণ বায়ু নামে পরিচিত হয়। এরপরই সেই প্রাণ ও ছন্দ রশ্মিগুলো অধিক তীব্র তেজ এবং বলযুক্ত হতে থাকে।

এখন আমরা বায়ুর বিষয়ে কিছু অন্য ঋষিদের মত জানার চেষ্টা করবো। এই বিষয়ে ঋষিরা বলেছেন -

১. বায়ুর্বাতের্বেতের্বা স্যাত্ গতিকর্মণঃ (নিরুক্ত ১০.১)
২. স্পর্শবান্ বায়ুঃ (বৈশেষিক দর্শন ২.১.৪)

এই বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত বিজ্ঞান প্রকাশিত হয় -

১. বায়ু শব্দ "বা গতিগন্ধনয়োঃ" ধাতু দ্বারা নিষ্পন্ন হয়। গতি অর্থযুক্ত হওয়াতে স্পষ্ট হয় যে এই তত্ত্ব সর্বদা গতিশীল থাকে, অথচ গন্ধন অর্থ একটা গম্ভীর বিজ্ঞানকে দর্শায়। আপ্টে সংস্কৃত-হিন্দি কোষের মধ্যে "গন্ধনম্" পদের অনেক অর্থ দেওয়া আছে, যেমন - অবিরাম প্রচেষ্টা, আঘাত করা, প্রকাশন, বিজ্ঞপ্তি এবং সংকেত আদি। এই অর্থের দ্বারা বায়ু এমন তত্ত্ব সিদ্ধ হয় যেটা অবিরাম গতি ও চেষ্টা করতে থাকে। এটা বিভিন্ন পদার্থের সঙ্গে তথা নিজের সঙ্গে (বায়ু রশ্মিগুলো পরস্পর) আকর্ষণ-প্রতিকর্ষণ-ধারণ আদি ভাব রাখে। এর কারণেই সৃষ্টির পদার্থের বিভিন্ন গুণ প্রকাশিত হয় তথা বিভিন্ন সংবাদ-সূচনার মাধ্যম বা বাহক এই তত্ত্বই হয়। সব প্রকারের বল এবং ফিল্ডের কারণ এই বায়ুই হয়। সৃষ্টির সমস্ত সংকেত বায়ু রশ্মির রূপেই আসে। যেসব সংকেত বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে আসে, সেগুলোরও মূল কারণ বায়ু তত্ত্বই হয়। মহর্ষি য়াস্কের উপরোক্ত বচনে "বায়ুঃ" পদ "বী গতিব্যাপ্তিপ্রজনকান্ত্যসনখাদনেষু" ধাতু দ্বারা নিষ্পন্ন হয়। এরদ্বারা স্পষ্ট হয় যে বায়ু রশ্মিগুলো ক্রমাগত গমনশীল থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন পদার্থকে ব্যাপ্ত করে, সেগুলোকে পরিধি রূপে ঘিরে ধরে, সেগুলোকে প্রেরিত বা প্রক্ষিপ্ত করে আর সেগুলোকে বিভিন্ন পদার্থের উৎপত্তিতে সক্ষম করে তোলে। সব পদার্থের সকল ক্রিয়া এই বায়ু তত্ত্বের রশ্মির মাধ্যমেই হয়।
২. পূর্বে আকাশের গুণ "শব্দ" বলা হয়েছে, এখানে বায়ু তত্ত্বের গুণ স্পর্শ বলা হয়েছে। ঋষি দয়ানন্দ "স্পর্শ সংস্পর্শনে" ধাতুর অর্থ "আলিঙ্গন করা", "বাঁধা", "অনুগত হওয়া" তথা "গ্রহণ করা" করেছেন। তিনি তাঁর বেদভাষ্যে বিভিন্ন স্থলে নিম্নানুসারে অর্থ গ্রহণ করেছেন -

স্পৃশ = অনুগতো ভব (য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৩.১০)
স্পৃশ = গৃহাণ (ঋগ্বেদ ভাষ্য ৪.৩.১৫)
স্পৃশন্তি = আলিঙ্গয়ন্তি (ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৬২.১১)
স্পৃশন্তি। = সম্বধ্নন্তি (ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৩৬.৩)

এরদ্বারাও এটাই স্পষ্ট হয় যে "স্পর্শবান্ বায়ুঃ" -র তাৎপর্য কেবল স্পর্শকারী নয়, বরং প্রত্যেক পদার্থের ভিতরে অনুকূলতাপূর্বক ব্যাপ্ত, তাকে গ্রহণ করে অধিকারে করে, তার সাথে সংযুক্ত থেকে এবং তাকে বাঁধতে-মিশ্রণকারীও হয়। এইদিকে আমাদের শরীরে স্পর্শ করার ক্রিয়াও বায়ু রশ্মির কারণেই সম্ভব হয়।

এই তত্ত্বকে আচার্য সুশ্রুত "রজোবহুলো বায়ুঃ" (সুশ্রুত সংহিতা, শারীরস্থানম্ ১.২৭) বলে রজোগুণ প্রধান বলেছেন। এই কারণে এটা সর্বদা ক্রিয়াশীল থাকে। এরমধ্যে দ্রব্যমান নগণ্য এবং দীপ্তি অতি মন্দ হয়।

এখন আমি মহর্ষি ব্রহ্মা এবং মহর্ষি ভৃগুর বিচারের মাধ্যমে বায়ু তত্ত্বের উৎপত্তি প্রক্রিয়ার উপর অতি সংক্ষিপ্ত বিচার প্রস্তুত করবো -

মহর্ষি ব্রহ্মা উবাচ -
দ্বিতীয়ম্ মারুতো ভূতম্ ত্বগধ্যাত্মম্ চ বিশ্রুতা।
স্প্রষ্টব্যমধিভূতম্ চ বিদ্যুৎ তত্রাধিদৈবতম্।।১৯।।
(মহাভারত, আশ্ব.প., অনুগীতা পর্ব অধ্যায় - ৪২)

মহর্ষি ভৃগু উবাচ -

তস্মাচ্চ সলিলোৎপীডাদুদতিষ্ঠত মারুতঃ।।১০।।
য়থাভাজনমচ্ছিদ্রম্ নিঃশব্দমিব লক্ষ্যতে।
তচ্চাম্ভসা পূর্য়মাণম্ সশব্দম্ কুরুতেऽনিলঃ।।১১।।
তথা সলিলসম্-রুদ্ধে নভসোऽন্তে নিরন্তরে।
ভিত্ত্বার্ণবতলম্ বায়ুঃ সমুৎপততি ঘোষবান্।।১২।।
স এষ চরতে বায়ুরর্ণবোৎপীডসম্ভবঃ।
আকাশস্থানমাসাদ্য প্রশান্তিম্ নাধিগচ্ছতি।।১৩।।
(মহাভারত শা.প., মোক্ষধর্মপর্ব, অধ্যায় - ১৮৩)

এরথেকে এই সংকেত পাওয়া যায় যে আকাশের পশ্চাৎ বায়ু তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। এই সময়েই প্রাণীদের করণরূপ স্পর্শ ইন্দ্রিয় রূপী সূক্ষ্ম রশ্মির উৎপত্তি হয়। বায়ু তত্ত্বের সাথে-সাথে সূক্ষ্ম কার্যরূপ বিদ্যুতেরও উৎপত্তি হয়, একে ফিল্ডস রূপও বলা যেতে পারে। আকাশ তত্ত্বের সংকোচন থেকে বায়ু তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। এই বায়ু তত্ত্ব আকাশ তত্ত্বের ভিতরে উর্ধগামীর মতো উৎপন্ন হয়। একে উপমার দ্বারা বোঝাতে বলা হয়েছে যে ছিদ্ররহিত কোনো পাত্র পূর্ণরূপে নিঃশব্দ মনে হয় আর যখন তাতে ছিদ্র করে জল ভরা হয়, সেই সময় ধ্বনি উৎপন্ন হয়। ঠিক এইভাবে নিঃশব্দ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে যখন পূর্বোক্ত বলবান্ বায়ু তত্ত্ব উৎপন্ন হয়, তখন আকাশ তত্ত্বের মধ্যে ধ্বনি উৎপন্ন হতে থাকে। এখানে এই সংকেতও পাওয়া যায় যে যেভাবে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি সর্বত্র একসঙ্গে হয় না, সেইভাবে বায়ু তত্ত্বও এক স্থান বিশেষে সর্বপ্রথম প্রকট হয়। তারপর সম্পূর্ণ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বায়ু রশ্মিগুলো বেগের সাথে প্রকট হয়ে বিচরণ করে বিভিন্ন ঘোষ উৎপন্ন করতে থাকে।

এখানে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির তীব্রতা যত বাড়তে থাকে, ততই সর্বত্র বিভিন্ন প্রকারের ধ্বনি তরঙ্গ উৎপন্ন হয়ে তীব্র হতে থাকে। পাঠক নিশ্চয়ই এই বিষয়টা বুঝে গেছেন যে এই বায়ু তত্ত্ব লোকপ্রচলিত হাওয়া (এয়ার) নয়। প্রায় সব দার্শনিকগণ এই বিষয়ে এটাই ভারী ভুল করেছেন যে তারা হাওয়াকেই বায়ু মহাভূত মনে করেছেন। পশ্চিমী জগতের বৈজ্ঞানিকরাও দার্শনিকদের আলোচনাতে বায়ু মহাভূতের মানে এয়ার গ্রহণ করার ভুল করেছেন।

বায়ু তত্ত্বের বিষয়ে বর্তমান বিজ্ঞানের অতি স্বল্প জ্ঞানই আছে। যাকে আজ বিভিন্ন প্রকারের ফিল্ডস বলা হয়, সেগুলো সর্বাংশে বায়ু তো নয়, তবে বায়ুর দ্বারাই নির্মিত হয়। ফিল্ডের অতিরিক্ত অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে বর্তমান ভৌতিক বৈজ্ঞানিক বায়ু তত্ত্বের তুলনা করতে পারবেন না। যেদিন বায়ু তত্ত্বের বিভিন্ন ছন্দ বা প্রাণ রশ্মির বোধ বৈজ্ঞানিকদের হবে, সেই দিন তারা ফিল্ডের বিষয়ে অধিক ব্যাপক ও গম্ভীর জ্ঞান প্রাপ্ত করতে পারবেন।

৩.অগ্নিঃ

পঞ্চমহাভূতে বর্ণিত অগ্নি নামক মহাভূত বিদ্যুৎ আবেশ তথা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ এই দুটোকেই অগ্নি বলা হয়। নিরুক্ত শাস্ত্রের মধ্যে এগুলোকে পৃথক-পৃথক শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যার উপর আমরা পরবর্তীতে বিচার করবো। চলুন, সর্বপ্রথমে আমরা অগ্নি তত্ত্বের বিষয়ে ঋষিদের বিচারকে জানার চেষ্টা করি। এই ক্রমে সর্বপ্রথমে মহর্ষি ব্রহ্মার কথন হল -

তৃতীয়ম্ জ্যোতিরিত্যাহুশ্চক্ষুরধ্যাত্মমুচ্যতে।
অধিভূতম্ ততো রূপম্ সূর্য়স্তত্রাধিদৈবতম্।।২০।।
(মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব, অনুগীতা পর্ব, অধ্যায় - ৪২)

অর্থাৎ তৃতীয় মহাভূতকে জ্যোতিরূপ অগ্নি বলা হয়। এই সময়ই চক্ষু ইন্দ্রিয় রূপ সূক্ষ্ম রশ্মিগুলো উৎপন্ন হয়। সূর্য অর্থাৎ বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের ফোটনগুলো অগ্নির রূপই হয়।

এই বিষয়ে মহর্ষি ভৃগু বলেছেন -

তস্মিন্ বায়্বম্বুসম্ঘর্ষে দীপ্ততেজা মহাবলঃ।
প্রাদুরভূদূর্দ্ধশিখঃ কৃত্বা নিস্তিমিরম্ নভঃ।।১৪।।
(মহাভারত শান্তি পর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩)

অর্থাৎ পূর্বোক্ত আকাশ এবং বায়ুর সংঘর্ষ দ্বারা দীপ্ত তেজ এবং বলবান্ অগ্নি তত্ত্ব উৎপন্ন হয়, যারফলে সম্পূর্ণ আকাশ তত্ত্ব প্রকাশিত হয়ে ওঠে।অগ্নির রশ্মির দিশা আকাশের সঙ্গে সংঘর্ষ করতে-করতে বায়ু রশ্মির দিশার বিপরীত হয়, একেই ঊর্ধ্বশিখ নাম দেওয়া হয়েছে। এখানে আমি "অম্বু" শব্দের অর্থ জল গ্রহণ না করে আকাশ মহাভূত গ্রহণ করেছি। এই শব্দ এই প্রকরণের মধ্যেই "সলিল" -এর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যার দ্বারা বায়ু তত্ত্বের উৎপত্তি বলা হয়েছে। জল থেকে বায়ুর উৎপত্তি সম্ভব নয়, এই কারণে আমি পূর্বে এর অর্থ আকাশই গ্রহণ করেছি, এই কারণে সেই সলিলের স্থানে ব্যবহৃত "অম্বু" শব্দ আকাশেরই বাচক মানা উচিত, জলের বাচক নয়। ঋষি দয়ানন্দ উণাদিকোষ ১.২৭ ব্যাখ্যাতে "অম্বু" পদের ব্যুৎপত্তি করে বলেছেন -

"অমন্তি গচ্ছন্তি চেষ্টন্তে প্রাণিনো য়ে তদ্ অম্বু"

প্রাণ তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পরমাণু আদি পদার্থ অবশ্যই আকাশ তত্ত্বের দ্বারা প্রেরিত হয় অর্থাৎ সেগুলোর প্রত্যেক ক্রিয়া-গতি আদির মধ্যে আকাশের অনিবার্য ভূমিকা আছে। ঋষি দয়ানন্দ এই শব্দের অর্থ জল করেছেন, এই বিষয়টা ভিন্ন। এই ব্যুৎপত্তি থেকে আকাশের গ্রহণ করা সর্বথা সম্ভব ও প্রকরণের অনুকূল। আমার দৃষ্টিতে এই শব্দের ব্যুৎপত্তি এইভাবেও হওয়া সম্ভব - অমন্তি গচ্ছন্তি চেষ্টন্তে পরমাণবো য়স্মিন্ তদ্ অম্বু।

এখন অগ্নির বিষয়ে কিছু অন্য ঋষিদের বচনকে উদ্ধৃত করবো -

১. অগ্নয়ো বৈ ছন্দাꣳসি (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৭.৯.৩)
২. অগ্নিম্ বৈ পশবঃ প্রবিশন্ত্যগ্নিঃ পশূন্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.৮.২)
৩. অগ্নিঃ প্রজনয়িতা (কাঠক সংহিতা ৬.৭; ২৭.৮; কপিষ্ঠল সংহিতা ৬.৫)
৪. অগ্নিঃ প্রথম ইজ্যতে (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৮.১)
৫. অগ্নিনা তপোऽন্বাভবৎ (কাঠক সংহিতা ৩৫.১৫; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪৭.১৩)
৬. অগ্নিনা বা অনীকেনেন্দ্রো বৃত্রমহন্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১০.৫; কাঠক সংহিতা ৩৫.২০; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪৭.১৮)
৭. অগ্নিরসি পৃথিব্যাꣳশ্রিতঃ। অন্তরিক্ষস্য প্রতিষ্ঠা (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১১.১.৭)
৮. অগ্নিরেকাক্ষরয়োদজয়ন্মামিমাম্ পৃথিবীম্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১১.১০)
৯. অগ্নিরেকাক্ষরয়া বাচমুদজয়ত্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১১.১০; কাঠক সংহিতা ১৪.৪)
১০. অগ্নিরু দেবানাম্ প্রাণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১০.১.৪.১২)
১১. অগ্নির্গায়ত্রছন্দাঃ (কাঠক সংহিতা ৯.১৩)
১২. অগ্নিম্ বৈ বিভাজম্ নাশক্নুবꣳ স্তমশ্বেন ব্যভজন্ (কাঠক সংহিতা ৮.৫)
১৩. অগ্নির্বৈ দেবানাম্ পথিকৃৎ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.৮.৯)
১৪. অগ্নির্বৈ মিথুনস্য কর্ত্তা প্রজনয়িতা (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৪.৩.৪)
১৫. তে বাऽএতে প্রাণা এব য়দ্ অগ্নয়ঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ২.২.২.১৮)
১৬. দেবরথো বা অগ্নয়ঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ৫.১০)
১৭. ভূরিতি বা অগ্নিঃ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৫.২; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৫.২)
১৮. বিশ্বকর্মায়মগ্নিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.২.২.২)
১৯. মিথুনম্ বা অগ্নিশ্চ সোমশ্চ সোমো রেতোধা অগ্নিঃ প্রজনয়িতা (কাঠক সংহিতা ৮.১০; কপিষ্ঠল সংহিতা ৭.৬)

এই উপরোক্ত বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. এই পদার্থ পূর্বোক্ত ছন্দ রশ্মিরই রূপ হয় অর্থাৎ সেগুলো থেকেই নির্মিত হয় আর সেগুলোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত থাকে।
২. পশুঃ = প্রাণাঃ পশবঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.৫.২.৬; তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.২৮),
পশবো মারুতঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৩.১০; কাঠক সংহিতা ২১.১০),
পশবো বৈ মরুতঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৬.৮; কাঠক সংহিতা ৩৬.১; ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.১৯),
পশবো বৈ ছন্দাꣳসি (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৪.১.৩),
পশবশ্ছন্দাꣳসি (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৩.৫; কাঠক সংহিতা ১২.৮; কপিষ্ঠল সংহিতা ৩০.৮; কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১১.৫)

বিভিন্ন পশু অর্থাৎ প্রাণ, মরুত্ ও ছন্দ রশ্মি অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে প্রবেশ করে এবং অগ্নি তত্ত্ব এই রশ্মিগুলোর মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্ব এই রশ্মিগুলোর ভিতরে-বাইরে সম্পূর্ণভাবে ভরে থাকে।
৩. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন পদার্থের উৎপন্নকারী হয়। এর অভাবে কোনো স্থূল পদার্থের উৎপত্তি হওয়া সম্ভব নয়।
৪. পরমাণু (কণা বা বিকিরণ) রূপে এই পদার্থই বিদ্যমান হয়, যারমধ্যে সর্বপ্রথম সংযোগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপূর্বে উৎপন্ন বায়ু পদার্থ কণা রূপে নয়, বরং ক্রমাগত প্রবাহের রূপে বিদ্যমান রশ্মির রূপে বিদ্যমান থাকে, অথচ অগ্নি তত্ত্ব কণা বা কোয়ান্টার রূপেও বিদ্যমান থাকে আর তার সংযোগ-বিয়োগ বায়ু রশ্মির সংযোগ-বিয়োগ থেকে ভিন্ন হয়।
৫. ঊষ্মার সর্বপ্রথম উৎপত্তি অগ্নি তত্ত্বের দ্বারা অর্থাৎ এর রূপেই হয়। এর উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে সম্পূর্ণ পদার্থ প্রায় ঊষ্মারহিত অবস্থায় থাকে।
৬. তীক্ষ্ণ বিদ্যুৎ আবেশিত তরঙ্গ এই সৃষ্টির মধ্যে বিভিন্ন কস্মিক মেঘ তথা বাঁধক ডার্ক পদার্থ বা ডার্ক এনার্জিকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করে।
৭. বিদ্যুৎ আবেশ অথবা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ কোনো কণার মধ্যে আশ্রিত হয় এবং আকাশকে নিজের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত করে রাখে। এগুলো আকাশের মধ্যে কখনও স্থায়িত্বকে প্রাপ্ত করতে পারে না, বরং এগুলো আকাশের মধ্যে নিরন্তর গমন করতে থাকে।
৮. অগ্নি তত্ত্ব একাক্ষরা বাক্ রশ্মি অর্থাৎ "ওম্" এবং "ভূঃ" আদির দ্বারা সব প্রকারের পার্থিব পরমাণুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে বিদ্যুৎ আবেশিত কণার পরস্পর একে-অপরের ক্রিয়া করার সময় তথা বিভিন্ন কোয়ান্টার দ্বারা কোনো কণাকে বিভিন্ন গতি ও ক্রিয়াযুক্ত করার সময় এই "ওম্" এবং "ভূঃ" রশ্মির অনিবার্য অবদান থাকে। এখানে "মা" থেকে পৃথিবী তত্ত্বেরই গ্রহণ করা উচিত। এই বিষয়ে বলা হয়েছে -

"অয়ম্ বৈ (পৃথিবী) লোকো মা অয়ম্ লোকো মিত ইব" (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৩.৩.৫)।

৯. এই অগ্নি তত্ত্ব অথবা এর অঙ্গভূত প্রাণ রশ্মিগুলো "ওম্" একাক্ষরা বাক্ রশ্মির দ্বারাই অন্য বাক্ অর্থাৎ মরুত্ ও ছন্দ রশ্মিকে নিয়ন্ত্রিত করে বা রাখে। এই কারণে অগ্নি তত্ত্বের নির্মাণ কিংবা কাজগুলোতে এই একাক্ষরা বাক্ রশ্মির অনিবার্য ভূমিকা আছে।
১০. এই তত্ত্ব বিভিন্ন প্রকাশিত পদার্থের প্রাণ রূপ হয় অর্থাৎ সেগুলোকে প্রকাশিত ও গতিশীল করতে এর ভূমিকা আছে। এই সৃষ্টিতে অগ্নির অভাবে কোনো কণা ও স্থূল পদার্থের না তো নির্মাণ হওয়া সম্ভব আর না সেটা কোনো ক্রিয়া ও গতি করতে সক্ষম হবে।
১১. অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে গায়ত্রী ছন্দ রশ্মির প্রাধান্য আছে।
১২. অগ্নির পরমাণু, আবেশিত কণা বা কোয়ান্টা সাধারণত বিভাজিত হতে পারে না, কিন্তু এর তীব্র ঊর্জা সম্পন্ন হওয়াতে তথা তীব্র ঊর্জা-ক্ষেত্র বা তীক্ষ্ণ বল সম্পন্ন ক্ষেত্র দিয়ে অতিক্রম করলে এর বিভাজন হওয়া সম্ভব।
১৩. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন কণার মার্গ নির্মাণকারী হয় অর্থাৎ কোনো কণার মার্গ সেই কণার ঊর্জার উপর নির্ভর করে।
১৪. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন প্রকারের কণার যুগ্মকে উৎপন্ন করে সেগুলোর দ্বারা বিভিন্ন পদার্থের নির্মাণকারী হয়। অগ্নির অভাবে কোথাও সংযোগ-বিয়োগের ক্রিয়া হওয়া সম্ভব নয়।
১৫. অগ্নি তত্ত্ব প্রাণ রশ্মির দ্বারা নির্মিত হওয়াতে প্রাণস্বরূপ হয়। পূর্বেও একে ছন্দ, মরুত্ ও প্রাণ রশ্মির দ্বারা নির্মিত বলা হয়েছে।
১৬. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন প্রকাশিত কণাকে রথের সমান বহনকারী হয়।
১৭. অগ্নি তত্ত্বের (বিশেষ করে বিদ্যুৎ আবেশ যুক্ত কণা) মধ্যে "ভূঃ" ছন্দ রশ্মি বিশেষ রূপে বিদ্যমান থাকে।
১৮. সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে যে কর্মই হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে অগ্নি তত্ত্বের অনিবার্য ভূমিকা আছে। এই কর্ম বর্তমান ভৌতিক টেকনিক দ্বারা জানার যোগ্য মানা উচিত। বায়ু রশ্মির স্তরের কর্ম অগ্নির দ্বারা হয় না, এই কারণে সেগুলোকে বর্তমান ভৌতিক টেকনিক দ্বারা জানা সম্ভব নয়।
১৯. এই সৃষ্টি অগ্নি এবং সোমের মিথুন দ্বারা নির্মিত হয়। এখানে সোমের অর্থ অপ্রকাশিত ঠাণ্ডা বায়ু তত্ত্ব মানা উচিত। এই সোম তত্ত্বই অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে রেত অর্থাৎ বীর্যকে ধারণকারী হয় অর্থাৎ এই সোম রশ্মিগুলো (প্রাণ, ছন্দ ও মরুত্) অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে বল ও তেজের সঞ্চার করে, যারফলে অগ্নি তত্ত্ব আগামী পদার্থকে উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়।

এই উপরোক্ত প্রমাণগুলো থেকে সুবিজ্ঞ পাঠকদের নিশ্চয়ই বিদিত হয়ে গেছে যে অগ্নি তত্ত্ব বিদ্যুৎ আবেশ এবং বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গেরই রূপ হয়। বর্তমান ভাষায় বলা যেতে পারে বিভিন্ন বিকিরণ বা ঊর্জা অগ্নি তত্ত্বেরই রূপ হয়। আমি এপর্যন্ত অগ্নির বিষয়ে যা যা প্রস্তুত করেছি, সেগুলোর মধ্যে অনেক বিষয়ে বর্তমান বিজ্ঞান নিতান্ত অনভিজ্ঞ আছে, তো কিছু বিষয়ে তার স্বল্প জ্ঞান আছে। 

৪. জল (আপঃ)


বৈদিক বাঙ্ময়ের মধ্যে একে প্রায়শঃ "আপঃ" নামে সম্বোধন করা হয়েছে। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন তথা উপনিষদের মধ্যে "আপঃ" শব্দেরই ব্যবহার হয়েছে। য়োগদর্শনের ৩.৪৪ সূত্রের মহর্ষি ব্যাস ভাষ্যের মধ্যে "জলম্" পদের ব্যবহার হয়েছে। এখন সর্বপ্রথমে আমি "আপঃ" কিংবা জলের বিষয়ে ঋষিদের মতকে উদ্ধৃত করবো -

১. অগ্নিঃ পূর্বরূপম্। আদিত্য উত্তররূপম্। আপঃ সন্ধিঃ। বৈদ্যুতঃ (অগ্নিঃ) সন্ধানম্ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৩.২; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৩.৩)
২. অগ্নে পিত্তমপামসি (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৪.৬.১.২)
৩. অগ্নেরাপঃ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৮.২; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২.১.১)
৪. আপো বৈ সর্বা দেবতাঃ (কাঠক সংহিতা ২৫.৩, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.১৬; কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১১.৪; তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.২.৪.৩)
৫. আপো বৈ সর্বে কামাঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১০.৫.৪.১৫), আপোऽন্নম্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৬.৩০)
৬. আপো ऽসি জন্মনা বশা, সা য়জ্ঞম্ গর্ভমধত্থাঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.১৩.১৫)
৭. আপো হ বাऽইদমগ্রে সলিলমেবাস (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.১.৬.১)
৮. আপো হি ষ্ঠা ময়োভুবস্তা ন ঊর্জে দধাতন (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৪.১.৫.১)
৯. ইন্দ্রিয়ম্ বা আপঃ (কাঠক সংহিতা ৩২.২)
১০. ইমে বৈ লোকা অপ্সু প্রতিষ্ঠিতাঃ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১.২২.৮৫)
১১. ইয়ম্ (পৃথিবী) বা এতাসাম্ (অপাম্) পাত্রম্ (কাঠক সংহিতা ৩২.৭)
১২. চত্বারি বা অপাꣳরূপণি। মেঘো বিদ্যুত্ স্তনয়িত্নুর্বৃষ্টিঃ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১.২৪.৯৯)
১৩. তা (আপঃ) মিথুনমৈচ্ছন্ত। তা মিত্রাবরুণাবুপৈতাম্। তা গর্ভমদধত। ততো রেবতয়ঃ পশবোऽসৃজ্যন্ত (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.১৪০)
১৪. ত্রয়ীর্বা আপো দিব্যাঃ পার্থিবাঃ সমুদ্রিয়াঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৬.৩)
১৫. য়োষা বাऽআপো বৃষাগ্নিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.১.১.১৮; ২.১.১.৪)
১৬. বিদ্যুদ্বাऽ অপাম্ জ্যোতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.৫.২.৪৯)
১৭. অগ্নির্বা অপামায়তনম্। আপো বা অগ্নেরায়তনম্ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১.২২.৭৮,৭৯)
১৮. অপাꣳ হ্যেষ গর্ভো য়দগ্নিঃ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.১.৫.৮)

এই প্রমাণগুলোর উপর বিচার করলে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. অগ্নি অর্থাৎ বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং মূলকণা তথা আদিত্য (নক্ষত্র) লোকের নির্মাণ হওয়ার মাঝে আপঃ অবস্থা উৎপন্ন হয়। এইজন্য এই অবস্থাকে সন্ধি বলা হয়েছে। এই অবস্থাকে উৎপন্ন করতে বিদ্যুতের ভূমিকা আছে। এর উপর গম্ভীর ভাবে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে বিভিন্ন আয়ন এবং এটমের অবস্থাকেই জল (আপঃ) মহাভূত বলা হয়েছে।
২. [পিত্তম্ = তেজঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৭.৬)] "আপঃ" নামক উপরোক্ত অবস্থাযুক্ত পদার্থের মধ্যে যেসব তেজ বিদ্যমান থাকে, সেটা অগ্নি অর্থাৎ বিদ্যুৎ অথবা প্রকাশাদি বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের কারণেই হয়, নিজের স্বয়ংয়ের কারণে নয়। "আপঃ" পরমাণুগুলোর (আয়ন এবং এটম) মধ্যে বিদ্যুৎ অথবা ঊর্জা ছাড়া কোনো ক্রিয়াই হওয়া সম্ভব নয়। এইজন্য অগ্নিকে "আপঃ" পরমাণুর তেজের রূপ বলা হয়েছে। এখানে "আপঃ" অর্থ প্রাণ রশ্মিও গ্রহণ করা যেতে পারে। এমন বলাও হয়েছে -

প্রাণা বা আপঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৯.৯.৪; তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.২.৫.২; জৈমিনীয়োপনিষদ্ ব্রাহ্মণ ৩.২.৫.৯)

সেই পরিস্থিতিতে অগ্নিকে প্রাণের তেজ অর্থাৎ প্রাণ রশ্মিগুলো থেকে উৎপন্ন তেজ মানা উচিত।

৩. অগ্নি মহাভূতের পশ্চাৎ তথা সেই অগ্নি মহাভূত থেকেই আপঃ (জল) মহাভূতের উৎপত্তি হয়। এর অভিপ্রায় হল বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ তথা মূলকণার উৎপত্তির পশ্চাৎ তথা এগুলো থেকেই বিভিন্ন আয়ন এবং এটম উৎপন্ন হয়।
৪. আপঃ পরমাণুগুলোর (আয়ন/এটম) মধ্যেও সব প্রকারের প্রাণ ও ছন্দ রশ্মি বিদ্যমান থাকে। এগুলোর মধ্যে পূর্বোক্ত আকাশ, বায়ু এবং অগ্নি মহাভূতও বিদ্যমান থাকে।
৫. সব প্রকারের আপঃ পরমাণু (আয়ন এবং এটম) সূক্ষ্ম দীপ্তি তথা আকর্ষণাদি বলযুক্ত হয়। সেগুলো সর্বদা পরস্পর সংযোগের জন্য তৎপর থাকে অর্থাৎ সেগুলো স্বতন্ত্র অবস্থায় না থেকে বিভিন্ন যুগ্ম (অণু বা মলিকিউল) তৈরির চেষ্টা করতে থাকে।
৬. এই কণাগুলো উৎপন্ন হতেই নিজের দীপ্তি কামনাদি গুণযুক্ত হয়। এই কারণে এগুলো বিভিন্ন সংযোগাদি কর্মকে নিজের গর্ভে ধারণ করে থাকে। এগুলোর ভিতরেই সম্পূর্ণ সৃষ্টি-যজ্ঞের গর্ভ লুকানো থাকে। বিভিন্ন প্রকারের সঘন রূপ ধারণ করে এই আপঃ পরমাণুর দ্বারা বিভিন্ন পদার্থ প্রকট হয়।
৭. যখন অগ্নি মহাভূত থেকে এই মহাভূতের উৎপত্তি হয়, তখন এর পরমাণু রূপ আয়ন এবং এটম বিভিন্ন সলিল রূপে প্রকট হয়। এর অভিপ্রায় হল সেই সময় সম্পূর্ণ অন্তরিক্ষের মধ্যে এই আয়ন বা এটমগুলোর মহাসমুদ্রের মতো উৎপন্ন হয়ে যায়। এমন মনে হয় যেন সেই মহাসমুদ্র রূপী সলিলের মধ্যে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড লীন হয়ে যাচ্ছে, যেটা ক্রমে-ক্রমে প্রকট হবে। এই মহাসমুদ্রের মধ্যে অসংখ্য মাত্রায় কণাগুলো ক্রমাগত গতিমাণ থাকে।
৮. এইভাবে সেই মহাসমুদ্রের মধ্যে বিদ্যমান আপঃ পরমাণু শুরুতে তীব্র ঊর্জা-বল সম্পন্ন হয় না, বরং সেগুলোতে অগ্নি মহাভূত ধীরে-ধীরে ঊর্জার সঞ্চারণ করতে থাকে, যারফলে সেই আয়ন এবং এটমগুলো উত্তেজিত হতে থাকে আর অগ্রিম ধাপের পদার্থের নির্মাণ করতে সক্ষম হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে সেই উত্তেজিত আপঃ পরমাণু নিজের দ্বারা উৎপন্ন অগ্রিম ধাপের পদার্থের পরমাণুগুলোকে ঊর্জা প্রদান করতেও প্রবৃত্ত হতে থাকে।
৯. সব আয়ন এবং এটম ইন্দ্রিয় রূপ হয় অর্থাৎ অগ্রিম পদার্থকে উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়। সেগুলো এই জন্য বিদ্যুৎ চুম্বকীয় আদি বল যুক্ত হয়।
১০. এই সমগ্র লোক অর্থাৎ ভূরাদি বিভিন্ন ব্যাহৃতি তথা ছন্দ রূপ রশ্মিগুলো এই উপরোক্ত আয়ন এবং এটমের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বা ব্যাপ্ত থাকে। একইসঙ্গে এই ব্রহ্মাণ্ডে বিভিন্ন লোক, গ্যালাক্সি আদি বিশাল লোক সমূহ সব দিক থেকে এই আপঃ পরমাণুর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এর তাৎপর্য হল সমগ্র লোক-লোকান্তর আপঃ পরমাণু দিয়ে পরিতঃ/সর্বতঃ ব্যাপ্ত থাকে তথা সেগুলো দিয়েই তৈরি হয়।
১১. অগ্রিম ধাপের মহাভূত পৃথিবী এই আপঃ পরমাণুর আধার হয় অর্থাৎ আপঃ পরমাণু পার্থিব পরমাণুগুলোর মধ্যে ভরা থাকে।
১২. এই সৃষ্টির মধ্যে আপঃ পরমাণু চার রূপে প্রাপ্ত হয় -
🪴মেঘ - কিছু পরমাণু অন্তরিক্ষের মধ্যে মেঘ রূপে বিদ্যমান থাকে, যেগুলো আয়নিক ক্লাউড রূপে পরিচিত। এর থেকে কালান্তরে বিভিন্ন লোকের নির্মাণ সম্ভব হয়।
🪴বিদ্যুৎ - এগুলো আয়ন রূপে বিভিন্ন লোককে চারিদিক থেকে ব্যাপ্ত করে। এগুলো লোক তথা প্রাণী এবং উদ্ভিদের ভিতরে বিদ্যমান থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক ক্রিয়াকে সম্পাদিত করে সেগুলোকে পোষণ ও রক্ষণ করে।
🪴স্তনয়িত্নু - এগুলো মেঘরূপ পদার্থের মধ্যে তীব্র গর্জনাযুক্ত বিদ্যুৎকে উৎপন্ন করে। মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের গর্জন এগুলোর কারণেই হয়। এগুলোর ঊর্জা তীব্রতর হয়, এই কারণে এগুলো প্রবল ভেদন শক্তি সম্পন্ন হয়।
🪴বৃষ্টি - এই আপঃ পরমাণু এই অন্তরিক্ষের মধ্যে বিভিন্ন লোক থেকে নিরন্তর আতে-বর্ষণ করতে থাকে। পৃথিবীলোকের উপরে পরে এমন অনেক কসমিক পার্টিকল বা আয়ন এগুলোরই রূপ হয়।
১৩. সেই আপঃ পরমাণু নিরন্তর মিথুন/যুগ্ম তৈরির ইচ্ছাকারী হয়। প্রাণ-অপান ও ব্যান-উদান রশ্মি সেগুলোর যুগ্মকে নির্মিত করতে প্রবৃত্ত হয় এবং সেগুলোর যুগ্ম তৈরি করে। এরফলে সেগুলো বিভিন্ন তেজযুক্ত কিরণ রূপী গর্ভকে ধারণ করে বিবিধ প্রকারের পশু অর্থাৎ দ্রষ্টব্য কণাকে উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়। সেই কণা [রেবত্যঃ = রেবত্য আপঃ (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ১.২.২.২)] বিভিন্ন গর্জন যুক্ত নদীরূপ ধারার রূপ ধারণ করে এই বিশাল অন্তরিক্ষের মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে।
১৪. এখানে আপঃ পরমাণুকে নিম্নানুসারে তিন প্রকারের বলা হয়েছে -
🪴দিব্য - যে আয়ন সূর্যাদি প্রকাশিত লোকের মধ্যে বিদ্যমান হয়ে সেগুলোর পোষণ করে, তাকে দিব্য আপঃ বলা হয়। নক্ষত্রের মধ্যে ঊর্জার উৎপাদন এগুলোর একত্রীকরণের কারণে হয়।
🪴পার্থিব - যে আয়ন পৃথিবী আদি গ্রহ অথবা উপগ্রহাদি লোকের মধ্যে বিদ্যমান থেকে বিভিন্ন প্রকারের ভূগর্ভীয় এবং জৈবিক আদি ক্রিয়াকে সম্পাদিত করে, তাকে পার্থিব আপঃ বলা হয়।
🪴 সমুদ্রীয় - যে আয়ন [সমুদ্রঃ = অন্তরিক্ষনাম (নিঘন্টু ১.৩)] অন্তরিক্ষের মধ্যে নিরন্তর বিচরণ করে তথা এক লোক থেকে অন্য লোকে যার গমনাগমন হয়, তাকে সমুদ্রীয় আপঃ বলা হয়।
১৫. এই আপঃ পরমাণু য়োষা রূপ হয়ে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ রূপী বৃষার সঙ্গে নিরন্তর সংযোগ করতে থাকে। সেই বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ বিভিন্ন আয়ন এবং এটমকে উত্তেজিত করে বিভিন্ন পদার্থকে উৎপন্ন করতে সক্ষম করে তোলে।
১৬. একে দ্বিতীয় সংখ্যাতে বর্ণিত বচনের সমান বুঝে নিবেন।
১৭. অগ্নি তত্ত্ব এই আপঃ পরমাণুর আয়তন হয় অর্থাৎ ঊর্জা বা বিদ্যুদাবেশ বিভিন্ন আয়ন বা এটমের মধ্যে রমা হয়ে থাকে। একইসঙ্গে বিভিন্ন আয়ন বা এটম ঊর্জা বা বিদ্যুদাবেশের মধ্যেই রমে থাকে অর্থাৎ ঊর্জা ও আবেশ এগুলোর মধ্যে সর্বতঃ ব্যাপ্ত থাকে।
১৮. বিদ্যুদাবেশ বা ঊর্জা বিভিন্ন আপঃ পরমাণুর মধ্যে গর্ভরূপ হয়ে বিদ্যমান থাকে। এর তাৎপর্য হল এই ঊর্জা যদি এটম বা আয়নের মধ্যে বিদ্যমান না থাকে, তাহলে সেগুলো কোনো পদার্থকে উৎপন্ন করতে সক্ষম হবে না। একইসঙ্গে সেগুলো কোনোরূপ কোনো ক্রিয়াকে সম্পাদিত করতে পারবে না।
.
এই উপরোক্ত আঠারো বিন্দুর উপরে বিচার করলে এই মত পুষ্ট হয় যে আয়নিক বা এটমিক স্টেট-কে আপঃ (জল) মহাভূত বলা হয়েছে। এখন আমি জল ও আপঃ বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দের বিচারকে উদ্ধৃত করবো। তিনি সত্যার্থপ্রকাশের প্রথম সমুল্লাসে ঈশ্বরের নামের মধ্যে "জল" শব্দের ব্যুৎপত্তি করে লিখেছেন -

"জলতি ঘাতয়তি দুষ্টান্ সম্ঘাতয়তি অব্যক্তপরমাণ্বাদীন্ তদ্ ব্রহ্ম জলম্"

এই ব্যুৎপত্তি ব্রহ্ম রূপ জলের জন্য হয়েছে। এখানে আমরা যদি জল মহাভূতের বিষয়ে বিচার করি, তাহলে বিভিন্ন পরমাণুকে ভঙ্গ অথবা সংযুক্তকারী পদার্থ আপঃ সিদ্ধ হয়। এই গুণ আয়নের মধ্যে সর্ববিদিত আছে, এই কারণে আয়নকে জল বলা একদম উচিত হবে। অন্যদিকে ঋষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ২৭.২৬ মন্ত্রের ভাষ্যে "আপঃ" পদের অর্থ "ব্যাপ্তিশীলাঃ সূক্ষ্মাস্তন্মাত্রাঃ" করেছেন। এরদ্বারাও আমার মতের পুষ্টি হয় যে আয়ন বা এটমই হল আপঃ (জল) মহাভূতের পরমাণু। এই আয়ন হাইড্রোজেন থেকে শুরু করে ভারী তত্ত্বেরও হতে পারে। সত্যার্থপ্রকাশের অষ্টম সমুল্লাসের অনুসারে জলের একটা অণুর মধ্যে সর্বমোট চার দ্বয়ণুক অর্থাৎ সর্বমোট ৪৮০ প্রকারের প্রাণ ও ছন্দাদি রশ্মি আছে। এত রশ্মির সংঘাতে স্বাদ গুণ প্রকট হয়ে যায়, এটা হল আমার মত। এখানে রশ্মির সংখ্যা সবথেকে লঘু আয়ন অথবা এটমে মানা উচিত। বড় আয়ন ও এটমে এটা অধিক হতে পারে, কিন্তু ৬০০ অথবা ৭২০ থেকে কম হবে। সেটা আয়ন ও এটম রূপেই হোক না কেন যদি এর সমান হয়, তাহলে সেটা পৃথিবী মহাভূতের রূপ প্রাপ্ত করে নিবে। 

রূপরসস্পর্শবত্য আপো দ্রবাঃ স্নিগ্ধাঃ (বৈশেষিক দর্শন ২.১.২), অপ্সু শীততা (বৈশেষিক দর্শন ২.২.৫)

অর্থাৎ রূপ, রস, স্পর্শ, দ্রবত্ব ও স্নিগ্ধতাকে জলের গুণ বলেছেন তথা এর একটা লক্ষণ শীতলতাও বলেছেন। আয়ন বা এটমের মধ্যে এই চারটা গুণ, বিশেষ করে রস ও শীতলতা কিভাবে সিদ্ধ হবে?

উত্তর - সর্বপ্রথমে আমরা "রস" শব্দের উপরে বিচার করবো -

রসঃ = অন্ননাম (নিঘন্টু ২.৭)
= সর্বদ্রব্যসারঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৮.৯)

এই দুটো বিন্দুর দ্বারাও আপঃ মহাভূত যে আয়ন বা এটম রূপ হয় সেটা সিদ্ধ হয়। অন্নত্ব অর্থাৎ সংযোজকতার গুণ এগুলোর মধ্যে সর্ববিদিত আছে। সম্পূর্ণ সৃষ্টির সমগ্র লোক এগুলোর দ্বারাই নির্মিত হওয়ার জন্য এই "আপঃ" সম্পূর্ণ পদার্থের সার রূপ হওয়াতে রস গুণযুক্ত সিদ্ধ হয়। এই "রস" শব্দ "রস আস্বাদনস্নেহনয়োঃ" ধাতু দ্বারা নিষ্পন্ন হয়। এরদ্বারা আস্বাদন ও স্নেহন উভয় গুণের হওয়া সিদ্ধ হয়। "স্নেহন" সংযোজনেরই রূপ হয়, যা এটাই সিদ্ধ করে যে রস গুণযুক্ত পদার্থ পরস্পর স্নেহ অর্থাৎ আকর্ষণযুক্ত হয়। আমি এটা আয়ন বা এটমের মধ্যে সিদ্ধ করেছি। যদি স্বাদের কথা ধরি, তাহলে মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন -

মিথুনম্ বৈ স্বাদু (ঐতরেয় আরণ্যক ১.৩.৪)

অর্থাৎ যুগ্ম তৈরির গুণই স্বাদ হয়, যেটা আমার আপঃ পরমাণুর মধ্যে অনেকবিধ সিদ্ধ করা হয়ে গেছে। যদি কোনো পাঠক রসনা (জিহ্বা) দ্বারা গ্রহণ করা স্বাদমাত্রকেই জলের গুণ মনে করেন, তবুও আমার মত হল আমাদের রসনা দিয়ে যেকোনো পদার্থের ক্রিয়া করলে আয়নিক অবস্থা উৎপন্ন হয় আর সেই অবস্থাতেই স্বাদের অনুভূতি হয়। আমার মতে এই সৃষ্টির প্রত্যেক আয়ন বা এটমের মধ্যে কোনো-না-কোনো স্বাদ গুণ অবশ্যই আছে, সেটা যতই অতি সূক্ষ্ম বা অব্যক্তই হোক না কেন।

দ্বিতীয় তথ্য এটাও হয় যে প্রত্যেক প্রাণীর স্বাদ গ্রহণ করার নিজ-নিজ সীমিত ক্ষমতা আছে। আমরা যে স্বাদকে গ্রহণ করতে পারবো না, তারমধ্যে কোনো স্বাদই নেই, এটা মানা মিথ্যা হবে। স্বাদ কাকে বলে? তাকে গ্রহণ করার বিজ্ঞান কি? বর্তমান বিজ্ঞান এই বিষয়ে খুবই কম জানে। রসায়নশাস্ত্রের অন্তর্রাষ্ট্রীয় স্তরের এক ভারতীয় বৈজ্ঞানিক, মেডিক্যাল কলেজের ফিজিওলোগি বিভাগের অধ্যক্ষ ও প্রফেসরের সঙ্গেও চর্চা করার পশ্চাৎ আমার এই মত তৈরি হয়েছে। যেদিন বর্তমান বিজ্ঞান স্বাদ এবং তার বিজ্ঞানকে গম্ভীরভাবে জানবে, তখন তার আমার মতের সত্যতার বোধ হবে যে প্রত্যেক আয়নের স্বাদ গুণ আছে। কোনো আয়ুর্বেদজ্ঞও যেন স্বাদকে ছয়টা সংখ্যার মধ্যেই সীমিত না ভাবেন, কারণ স্বাদ অনেক হতে পারে।

রস গুণের চর্চার পশ্চাৎ আমরা শীত গুণের উপরেও বিচার করবো। এই বিষয়ে আমার মত হল যদি কোনো আয়ন বা এটমের মধ্যে ঊর্জা না থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই শীতল হবে, কখনও উষ্ণ হবে না। এই কারণে শীততা হল আপঃ (জল) মহাভূতের স্বাভাবিক গুণ। তার মধ্যে উষ্ণতা হওয়া কেবল অগ্নির সানিধ্যের কারণেই সম্ভব হয়। দ্বিতীয় পক্ষ এই হল যে "শীত" শব্দ "শ্যৈঙ্গতৌ" ধাতু দ্বারা নিষ্পন্ন হয়, এরদ্বারা ক্রমাগত গতিশীতলতাকেও শীততার পর্যায়বাচী মানা যেতে পারে। একে দ্রব্যত্বও বলা হয়। অন্তিম গুণ স্নিগ্ধতা অর্থাৎ স্নেহপন বলা হয়েছে।

এরও অভিপ্রায় এটাই হয় যে আপঃ মহাভূতের পরমাণু একে-অপরের প্রতি আকর্ষণের ভাব রাখে কিংবা একে-অপরের উপরে পড়তে-পড়তে গতি করে, এই কারণেও আয়ন বা এটম আপঃ অর্থাৎ জল মহাভূতের পরমাণু হয়। প্রায় সব বিদ্বানরা লোকপ্রসিদ্ধ জলকেই (ওয়াটার) জল (আপঃ) মহাভূত ভেবে নেওয়ার ভ্রান্তি করেছেন, কিছু বিদ্বান তো প্রত্যেক তরল পদার্থকে জল মহাভূত মেনে নিয়েছেন। তারা এটা ভাবেননি যে প্রত্যেক শক্ত পদার্থও গরম হয়ে তরল অবস্থাকে প্রাপ্ত করতে পারে আর প্রত্যেক তরল পদার্থও জমে গিয়ে শক্ত হতে পারে। বস্তুতঃ ব্রাহ্মণ গ্রন্থ এবং বেদের বিভিন্ন শাখার গম্ভীর অধ্যয়নের অভাবে দর্শনগুলোকে বুঝতে ভারী ভ্রান্তি হয়েছে ও হচ্ছে।

এখন এই মহাভূতের উৎপত্তির বিষয়ে মহর্ষি ব্রহ্মার বচন উদ্ধৃত করবো -

চতুর্থমাপো বিজ্ঞেয়ম্ জিহ্বা চাধ্যাত্মমুচ্যতে।
অধিভূতম্ রসশ্চাত্র সোমস্তত্রাধিদৈবতম্।।২১।।
(মহাভারত আশ্বমেধিক পর্ব, অনুগীতা পর্ব, অধ্যায় - ৪২)

অর্থাৎ চতুর্থ মহাভূতকে আপঃ বলা হয়েছে। এর উৎপত্তির সময় প্রাণীদের শরীরে ক্রিয়াশীল রসনেন্দ্রিয়ের উৎপত্তি হয়। এই সময় রস অর্থাৎ স্বাদ গুণ (যার চর্চা আমি পূর্বে করেছি) তথা সোম তত্ত্বেরও উৎপত্তি হয়। এখানে সোমের অর্থ মরুদ্ রশ্মি হয় না, বরং বৃত্রাসুর সংজ্ঞক বিশাল আসুর মেঘ হয়। অসুর তত্ত্বের বিষয়ে পরে যথাস্থানে লেখা হবে। এর বিষয়ে মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্যের কথন হল -

বৃত্রো বৈ সোম আসীত্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৪.৩.১৩)

অন্যদিকে মহর্ষি ভৃগু আপঃ মহাভূতের উৎপত্তির বিষয়ে বলেছেন -

অগ্নিঃ পবনসম্য়ুক্তঃ খম্ সমাক্ষিপতে জলম্।
সোऽগ্নিমারুতসম্য়োগাদ্ ঘনত্বমুপপদ্যতে।।১৫।।
(মহাভারত, শান্তি পর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩)

অর্থাৎ পূর্বোক্ত অগ্নি তত্ত্ব বায়ু তত্ত্বের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ঘনত্বকে প্রাপ্ত করে আকাশের মধ্যে জল মহাভূতের রূপে প্রকট হয়ে ভালো করে লাফাতে থাকে অর্থাৎ সেই সঘন হওয়া পদার্থ আকাশের মধ্যে তরল রূপে (দ্রব্য, গ্যাস বা প্লাজমা অবস্থায়) প্রবাহিত হতে থাকে। ধ্যাতব্য হল, বর্তমান ভৌতিক বিজ্ঞানের ভাষাতে হাওয়াও তরলেরই রূপ হয়, কারণ এটাও চাপে পড়ে নিজের আকার পরিবর্তন করে। তরলের এই পরিভাষা আমি দিনাঙ্ক ২০.০৭.২০১৪ ডিসকভারি সাইন্স চ্যানেলেও শুনে ছিলাম।

এখানে ধ্যাতব্য হল জল মহাভূত উৎপন্ন হওয়ার সময় বিশেষ উষ্ণ হয় না, বরং কিছু সময় পশ্চাৎ অগ্নি তত্ত্বের বিশেষ সংযোগে সেটা ধীরে-ধীরে তপ্ত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াতে "ওম্" -এর সঙ্গে-সঙ্গে অহংকার, আকাশ তত্ত্ব, বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ রশ্মি আদি সবার ভূমিকা থাকে। সর্বপ্রেরক রূপে ঈশ্বর তত্ত্বের সর্বত্র অনিবার্য ভূমিকা তো আছেই, যিনি "ওম্" রশ্মির মাধ্যমে সবার সঞ্চালন ক্রমাগত করতে থাকেন। মহর্ষি সুশ্রুত

সত্ত্বতমোবহুলা আপঃ (সুশ্রুত সংহিতা শারীরস্থানম্ ১.২৭)

বলে বিভিন্ন আয়ন বা এটম রূপী আপঃ মহাভূতকে সত্ত্ব এবং তমোগুণ প্রধান বলেছেন। এই কারণে এরমধ্যে প্রকাশ ও দ্রব্যমানের মাত্রা অধিক তথা ক্রিয়াশীলতা অগ্নি তত্ত্বের থেকে কম আছে। এরমধ্যে ধারণ ও আকর্ষণ বল তুলনামূলক ভাবে অধিক আছে।

প্রশ্ন - লোকপ্রচলিত জল (ওয়াটার) কোন মহাভূতের অন্তর্গত হবে?

উত্তর - যদিও এরমধ্যে আয়নের স্থানে মলিকিউল আছে, কিন্তু এটা প্রত্যেক বিলেয় পদার্থকে আয়নের মধ্যে বিভাজিত করার চেষ্টা করে তথা এর অন্য সব গুণ জল মহাভূতের সমান হয়, এই কারণে একেও জল মহাভূত মানা উচিত।

৫. পৃথিবী 


অবশেষে অন্তিম অর্থাৎ পঞ্চম মহাভূত পৃথিবীর উৎপত্তি হয়। একে বৈদিক বাঙ্ময়ের মধ্যে "ভূমি" নামেও জানা যায়। সর্বপ্রথমে আমি এর বিষয়ে বিভিন্ন আর্ষ বচনগুলোকে উদ্ধৃত করবো -

১. অদ্ভিঃ পৃথিবীম্ (অন্বাভবৎ) (কাঠক সংহিতা ৪৩.৪ - ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত)
২. অয়ম্ লোক ঋগ্বেদঃ (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ১.৫)
৩. অয়ম্ বৈ লোকঃ সুক্ষিতিঃ অস্মিন্হি লোকে সর্বাণি ভূতানি ক্ষিয়ন্তি (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪.১.২.২৪ - ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত)
৪. আপো বা ইদমাসন্ সলিলমেব, স প্রজাপতির্বরাহো ভূত্বোপন্যমজ্জৎ, তস্য য়াবন্মুখমাসীৎ তাবতীম্ মৃদমুদহরৎ সেয়ম্ (পৃথিবী) অভবৎ (কাঠক সংহিতা ৮.২)
৫. ইয়ম্ বা য়জ্ঞায়জ্ঞীয়ম্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.১৭৩)
৬. ইয়ম্ বৈ বেদিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.৩.১.১৫)
৭. ইয়ম্ উ বৈ য়জ্ঞো ऽস্যাꣳ হি য়জ্ঞস্তায়তে (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬.৪.১.৯)
৮. ইয়ম্ উ বাऽ এষাম্ লোকানাম্ প্রথমাসৃজ্যত (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৫.৩.১ - ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত)
৯. তদ্ য়দ্ বৈ ভূঃ ইতি তদয়ম্ লোকঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩৬৪)
১০. পৃথিবী বা অন্নানাম্ শময়িত্রী (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ৬.১৪)
১১. পৃথিব্যসি জন্মনা বশা, সা ऽগ্নিম্ গর্ভমধত্থাঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.১৩.১৫)
১২. পৃষ্ঠম্ বা অয়ম্ অগ্নিরস্য লোকস্য (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.২৫২)
১৩. অগ্নিরেকাক্ষরয়া মামুদজয়দিমাম্ পৃথিবীম্ (কাঠক সংহিতা ১৪.৪)
১৪. পৃথিবী সমিত্ তামগ্নিঃ সমিন্ধে (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৯.২৩)
১৫. অয়মেব (ভূলোকঃ) গায়ত্রী (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৯), জগতী হীয়ম্ (পৃথিবী) (শতপথ ব্রাহ্মণ ২.২.১.২০), ত্রিষ্টুভীয়ম্ (পৃথিবী) (শতপথ ব্রাহ্মণ ২.২.১.২০), গায়ত্রী বা ऽ ইয়ম্ (পৃথিবী) (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৩.৪.৯)

এই আর্ষ বচনগুলোর উপরে বিচার করলে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -

১. আপঃ মহাভূত থেকে পৃথিবী মহাভূত উৎপন্ন হয়। আমি এটা পূর্বে লিখেছি যে বিভিন্ন আয়ন বা এটম আপঃ মহাভূত হয়। এই কারণে এগুলোর সংযোগ থেকে উৎপন্ন অণু (মলিকিউল) পৃথিবী মহাভূতের রূপ অর্থাৎ পার্থিব পরমাণু বলা হয়।
২. এই মহাভূতের পরমাণুর মধ্যে পূর্বোক্ত "ঋক্" ছন্দ রশ্মির বাহুল্য আছে, অন্য ছন্দ রশ্মি কম আছে। সত্যার্থপ্রকাশের অনুসারে এর সূক্ষ্মতম রূপের মধ্যে সর্বমোট ৬০০ অথবা ৭২০ পরমাণু অর্থাৎ এত প্রকারের রশ্মি বিদ্যমান আছে। এর অধিক তো হতে পারে, কিন্তু কম নয়।
৩. এই মহাভূতের পরমাণু অন্য সব মহাভূতের নিবাস স্থান হয় অর্থাৎ বিভিন্ন মলিকিউলের মধ্যে সর্বদা বিভিন্ন আয়ন, ঊর্জা ও প্রাণাদি রশ্মির সঙ্গে আকাশও বিদ্যমান থাকে। অণুর ভিতরে এইসব পদার্থ স্বতন্ত্রাবস্থার তুলনায় অধিক উত্তম প্রকারে উপস্থিত থাকে অর্থাৎ এখানে সেগুলোর চাঞ্চল্যাদি গুণ তুলনামূলক ভাবে কম মাত্রায় থাকে।
৪. ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে এই মহাভূতের (মলিকিউল স্টেট) পূর্বে বিভিন্ন আয়ন সলিল রূপে বিদ্যমান হয় অর্থাৎ যেন সব মলিকিউল (পার্থিব পরমাণু) তারমধ্যেই লীন হয়ে যাচ্ছে। সেই সময় প্রজাপতি রূপী বাক্ ও মনস্তত্ত্ব বরাহ রূপ ধারণ করে।

বরাহঃ = অঙ্গিরসোऽপি বরাহা উচ্যন্তে (নিরুক্ত ৫.৪)
অঙ্গিরাঃ = সূত্রাত্মা প্রাণঃ (তুলনা মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ২৭.৪৫), অগ্নিঃ (তুলনা মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১১.৬১), প্রাণবলঃ (তুলনা মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১.৬২.৫)

এর তাৎপর্য হল সেই সময় বিভিন্ন আপঃ পরমাণুর উপরে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের বৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি ঈশ্বর তত্ত্ব দ্বারা প্রেরিত মনস্তত্ত্ব সূত্রাত্মাদি প্রাণ রশ্মিগুলোকে অধীনে নিয়ে সেগুলোকে আকাশের দ্বারা সংকুচিত করে অপেক্ষাকৃত সঘন রূপে প্রকট করে। এই সঘন রূপই পৃথিবী মহাভূত অর্থাৎ মলিকিউল স্টেট রূপে পরিচিত হয়। সেই সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মিগুলো ছোট-ছোট প্যাকেট রূপে পরমাণুগুলোকে বেঁধে পার্থিব পরমাণুতে পরিবর্তিত করতে থাকে।
৫. এই পরমাণু অর্থাৎ বিভিন্ন মলিকিউল সংযোগ ও বিয়োগের প্রবৃত্তিযুক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থূল পদার্থ ও লোকের নির্মাণ করে।
৬. এই পরমাণু বিভিন্ন প্রকারের সূক্ষ্ম পরমাণু বা রশ্মি আদি পদার্থের জন্য বেদী রূপ হয়, কারণ এগুলোর মধ্যে সর্বদা সূক্ষ্ম পদার্থের আহুতি দেওয়া হতে থাকে। এই আহুতির দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের বড় মলিকিউল তৈরি হতে থাকে। কালান্তরে এরথেকে বিভিন্ন লোক, বিভিন্ন প্রাণী ও বনস্পতির শরীরের নির্মাণ হয়।
৭. বিভিন্ন মলিকিউল স্বয়ং বিভিন্ন আয়ন এবং প্রাণাদি রশ্মির সংঘাত হওয়াতে যজ্ঞ রূপ হয় তথা এরপর সম্পূর্ণ সৃষ্টি যজ্ঞ বিস্তৃত হয় অর্থাৎ এই মলিকিউলগুলো বিভিন্ন রশ্মি বা কণা আদি পদার্থের সঙ্গে সঙ্গত হতে-হতে বিভিন্ন পদার্থের নির্মাণ করে। সংযোগাদি প্রক্রিয়ার অভাবেও বিভিন্ন মলিকিউলের মধ্যে থেকে বিভিন্ন সূক্ষ্ম রশ্মির যাতায়াত নিরন্তর হতে থাকে।
৮. ব্যাহৃতি রশ্মি রূপ লোকের উৎপত্তির ক্রমে পার্থিব পরমাণুর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকা "ভূঃ" ব্যাহৃতি রশ্মি ও গায়ত্রী ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি সর্বপ্রথম হয়, তৎপশ্চাৎ "ভুবঃ" আদি ব্যাহৃতি তথা ত্রিষ্টুবাদি ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়। এখানে এই সংকেতও স্পষ্ট হয় যে এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে অপ্রকাশিত গ্রহাদি লোক প্রকাশিত নক্ষত্র আদি লোকের পূর্বে উৎপন্ন হয়েছে। এই মত হল বর্তমান সৃষ্টি বিজ্ঞানের বিপরীত।
৯. বিভিন্ন মলিকিউলের মধ্যে "ভূঃ" নামক ব্যাহৃতি রশ্মির বিশেষ প্রাধান্য আছে।
১০. মলিকিউলের ভিতরে বিদ্যমান বিভিন্ন আয়ন যেগুলো স্বতন্ত্রাবস্থায় অতি সক্রিয় বা ক্ষুব্ধ হয়, তুলনামূলক ভাবে অনেক শান্ত হয়। এগুলোর সঙ্গে পুনরায় অন্য আয়ন মিলিত হয়, সেগুলোও শান্ত ও সুষমকে প্রাপ্ত করে নেয়।
১১. যেকোনো পার্থিব পরমাণু (মলিকিউল) উৎপন্ন হতেই আকর্ষণ বল ও সূক্ষ্ম দীপ্তি যুক্ত হয়। কোনো ফোটন বা ইলেকট্রন তারসঙ্গে মিলিত হয়ে তারমধ্যে গর্ভের রোপণ করে দেয়, যারফলে সেই মলিকিউল উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এরফলে সেটা অন্য কণার সঙ্গে সঙ্গত হওয়াতে বিশেষ প্রবৃত্ত হয়ে বিভিন্ন পদার্থের নির্মাণ করতে সক্ষম হয়ে ওঠে।
১২. প্রত্যেক মলিকিউল সবদিক থেকে ঊর্জার দ্বারা আবৃত্ত থাকে, সেই কারণে সেটা ক্রমাগত গতি ও কম্পন করতে থাকে অর্থাৎ কখনও পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় বা গতিহীন হয় না। একইসঙ্গে ঊর্জা ও বিদ্যুৎই এগুলোর আধার হয়।
১৩. এর ব্যাখ্যা আমি অগ্নি মহাভূতের প্রকরণে করেছি।
১৪. বিভিন্ন মলিকিউল জ্বালানি রূপ হয়, যাকে অগ্নি তত্ত্ব অর্থাৎ বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ জ্বালায় বা প্রকাশিত করে। এর অভিপ্রায় হল এই সৃষ্টির মধ্যে প্রকাশিত পদার্থ রূপে এই মলিকিউলগুলোই হয়, কিন্তু এগুলোর মধ্যে প্রকাশ ফোটনেরই হয়, এগুলোর স্বয়ংয়ের হয় না। ধ্যাতব্য হল, পূর্বোক্ত আপঃ পরমাণুও ঠিক এইভাবেই প্রকাশিত হয়।
১৫. এগুলোর মধ্যে গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ্ ও জগতী তিনটা ছন্দ রশ্মি প্রচুর মাত্রায় বিদ্যমান থাকে, তবুও এগুলোর মধ্যেও গায়ত্রী ছন্দ রশ্মি সর্বাধিক মাত্রায় থাকে। ধ্যাতব্য হল, অনুষ্টুপ্, উষ্ণিক্ আদি ছন্দ রশ্মির এখানে নিষেধ করা হয়নি। কিছু তত্ত্ববেত্তা ঋষিগণ তো অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিরও বাহুল্য দেখিয়ে বলেছেন -

ইয়ম্ (পৃথিবী) বা ऽনুষ্টুপ্ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৮.৭.২; শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৩.২.১৬)।

সারাংশতঃ এরমধ্যে সমগ্র ছন্দ ও প্রাণ রশ্মি বিদ্যমান থাকে।

উৎপত্তির বিষয়ে মহর্ষি ব্রহ্মার কথন হল -

পৃথিবী পঞ্চমম্ ভূতম্ ঘ্রাণশ্চাধ্যাত্মমুচ্যতে।
অধিভূতম্ তথা গন্ধো বায়ুস্তত্রাধিদৈবতম্।।২২।।

(মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব, অনুগীতা পর্ব, অধ্যায় - ৪২)
.
অর্থাৎ পৃথিবী হল অন্তিম এবং পঞ্চম মহাভূত। এর উৎপত্তির সময়ই প্রাণীদের শরীরের মধ্যে কার্যরত ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়েরও উৎপত্তি হয়। সেই সময় গন্ধ গুণও প্রকট হয় অর্থাৎ এই মহাভূতের উৎপত্তির পূর্বে এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোথাও গন্ধের প্রাদুর্ভাব হয় না। সেই সময় বায়ুর উৎপন্ন হওয়ার অর্থ হল পৃথিবী মহাভূতের উৎপত্তির পূর্বে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড বিভিন্ন আয়ন এবং এটমের প্লাজমা, গ্যাস বা তরলাবস্থা দিয়ে ভরা ছিল, সেই ব্রহ্মাণ্ড এখন মলিকিউল দিয়ে ভরে যায়। সর্বপ্রথমে সেই মলিকিউলগুলো গ্যাসীয় অবস্থাকেই ধারণ করে ধীরে-ধীরে সঘন রূপ ধারণ করতে থাকে। এখানে সেই গ্যাসীয় মলিকিউলার স্টেটকেই বায়ু নাম দেওয়া হয়েছে। এখানে বায়ু মহাভূতের ভ্রম কারও হওয়া উচিত নয়, এটা মনে রাখতে হবে। এই বিষয়ে মহর্ষি ভৃগুর কথন হল -

তস্যাকাশে নিপতিতঃ স্নেহস্তিষ্ঠতি য়োऽপরঃ।
স সম্ঘাতত্বমাপন্নো ভূমিত্বমনুগচ্ছতি।।১৬।।

(মহাভারত, শান্তি পর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় ১৮৩)

এর অভিপ্রায় হল পূর্বোৎপন্ন স্নেহরূপ জল মহাভূত আকাশ, বায়ু ও অগ্নির দ্বারা সংকুচিত হয়ে সংঘাতকে প্রাপ্ত করে পার্থিব পরমাণুতে পরিবর্তিত হয়। পাতঞ্জল য়োগ সূত্রের ৩.৪৪ ব্যাস ভাষ্যের মধ্যে পৃথিবীকে "মূর্তিঃ ভূমিঃ" নাম দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এরদ্বারা স্পষ্ট হয় যে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সমস্ত লোক আদি মূর্তিমান পদার্থ পার্থিব পরমাণু দিয়েই তৈরি হয়েছে। ধ্যাতব্য হল, গন্ধ গুণই পৃথিবী মহাভূতের সর্বোপরি গুণ হয়, মূর্তিমান হওয়া আদি গুণ গৌণ তথা কালান্তরে উৎপন্ন হয়। আচার্য সুশ্রুত একে "তমোবহুলা পৃথিবী" (সুশ্রুত সংহিতা, শারীরস্থানম্ ১.২৭) বলে তমোগুণ প্রধান বলেছেন। এই কারণে এর মধ্যে দ্রব্যমান সর্বাধিক তথা প্রকাশ ও ক্রিয়াশীলতা তুলনামূলক ভাবে কম হয়। এর মধ্যে ধারণ ও আকর্ষণ বলও তুলনামূলক ভাবে কম হয়। ধ্যাতব্য হল, এই গ্রন্থের মধ্যে আমি অনেকত্র "পৃথিবী" দিয়ে সমস্ত অপ্রকাশিত কণা অর্থাৎ মূলকণাও গ্রহণ করেছি। সেই সন্দর্ভে পাঠক এমনই গ্রহণ করবেন।
.
এইভাবে এই পাঁচটা মহাভূত দিয়েই সম্পূর্ণ সৃষ্টি নির্মিত হয়েছে। বর্তমান বিজ্ঞানের মধ্যে মূলকণা বলে পরিচিত কোয়ার্কস, লেপটনস বা ফোটনস আদিকে কোথাও অনাদি, আবার কোথাও নির্মিত হওয়া মানা হয়েছে। ইটারনাল ইউনিভার্স থিয়োরি এগুলোকে অনাদি মানে, অথচ বিগ-ব্যাং থিয়োরি এই কণাগুলোকে মূলকণা মানলেও অনাদি না মেনে নির্মিত হওয়া মানে, কিন্তু বর্তমান বিজ্ঞান এই বিষয় নিয়ে প্রায় অনভিজ্ঞ যে এই মূলকণাগুলো কিভাবে আর কি দিয়ে তৈরি হয়েছে? মূলকণা থেকে প্রোটনস ও নিউট্রনস আদি দ্বিতীয়ক কণার তৈরির বিষয়ে বর্তমান বিজ্ঞান বিচার করে অবশ্য। এইদিকে আমাদের বৈদিক বিজ্ঞান বর্তমান বিজ্ঞানের মূলকণার বিষয়ে অধিক গম্ভীরতা ও সূক্ষ্মতার সঙ্গে বিচার করে। চলুন, এখন আমি মূল কণা এবং কোয়ান্টার উৎপত্তি প্রক্রিয়ার উপরে বৈদিক ভৌতিকীর মত প্রস্তুত করার চেষ্টা করবো।
Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

পঞ্চমহাভুত

ঋষিদের দৃষ্টিতে এই দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ড কেবল জড় পদার্থের সমষ্টি নয়—এটি মন, বাক্, প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির এক সুসংবদ্ধ সৃষ্টিলীলা। 📖 ঋষিবাণী বল...

Post Top Ad

ধন্যবাদ