পৌরাণিক (তথাকথিত সনাতনী) পরম্পরা
সায়ণ ভাষ্য-
অশ্বো॒ বোळ्হা সু॒খং রথং॑ হাস॒নামু॑পম॒ন্ত্রিণঃ॑ ।
শেপো॒ রোম॑ণ্বন্তৌ ভে॒দৌ বারিন্ম॒ণ্ডূক॑ ইচ্ছ॒তীন্দ্রা॑য়েন্দো॒ পরি॑ স্রব ॥ ঋগ্বেদ ০৯.১১২.০৪
লক্ষ্যস্থানে পৌঁছে দেওয়ার বাহক অশ্ব সুখকর, কল্যাণকর রথ কামনা করে। উপমন্ত্রিণঃ অর্থাৎ উপমন্ত্রযুক্ত, পরিহাসকারী সখাগণ পরিহাসপূর্ণ বাক্য কামনা করে। তদ্রূপ শেপঃ। “শেপী বৈতস” অর্থাৎ পুরুষের প্রজননাঙ্গ— এইরূপ যাস্কের উক্তি। (নিরু. ৩.২১) যেমন শেপ লোমযুক্ত ভেদদ্বয় কামনা করে। মণ্ডূক জলই কামনা করে। ‘ইৎ’ অবধারণার্থে। কেবল জলই কামনা করে। সেইরূপ আমিও তোমার পরিস্ত্রবণ কামনা করি। অতএব “ইন্দ্রায় ইন্দো পরি স্ত্রব”।
আমার পরম্পরা / আর্ষ পরম্পরা / বৈদিক পরম্পরা
আমার ভাষ্য-
অশ্বো বো্হা সুখং রথং হসনামুপমন্ত্রিণঃ ।
শেপো রোমণ্বন্তৌ ভেদৌ বারিন্মণ্ডূক ইচ্ছতীন্দ্রায়েন্দো পরি স্ত্রব ॥
[ ঋ. ৯.১১২.৪ ]
এই মন্ত্রের ঋষি শিশু। [শিশুঃ শিশুঃ শংসনীয়ো ভবতি শিশীতের্ বা স্যাদ্ দানকর্মণঃ চিরলব্ধো গর্ভো ভবতি (নিরু. ১০.৩৯), অয়ং বাভ শিশুর্যোऽয়ং মধ্যমঃ প্রাণঃ (শ. ব্রা. ১৪.৫.২.২)। মধ্যম্— ত্রিষ্টুপ্ছন্দঃ, ইন্দ্রো দেবতা মধ্যম্ (শ. ব্রা. ১০.৩.২.৫)] এর অর্থ এই যে, এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি তীক্ষ্ণ তেজযুক্ত ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির ক্ষেত্রে হয়। এই ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিগুলিই গর্ভরূপ, যা সূর্যাদি লোককে উত্তমরূপে প্রকাশিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের উক্তি— “গর্ভঃ সমিত্” (শ. ব্রা. ৬.৬.২.১৫)। এবং এই ছন্দ রশ্মিগুলি সুদীর্ঘ কালে সূর্যাদি লোকের নির্মাণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কারণেই সূর্যকেও গর্ভ বলা হয়েছে— “এষ বৈ গর্ভো দেবানাং য এষ (সূর্যঃ) তপত্যেষ হীদং সর্বং গৃভ্ণাত্যেতেনেদং সর্বং গৃভীতম্” (শ. ব্রা. ১৪.১.৪.২)। এর দেবতা পবমান সোম এবং ছন্দ নিবৃত্ পঙ্ক্তি হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে সোম রশ্মিগুলি তীক্ষ্ণভাবে বিস্তৃত হতে থাকে।
পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার বৃহদ্দেবতার অনুসারে এর দেবতা ইন্দ্রও মেনেছেন। এই কারণে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে ইন্দ্রতত্ত্বও পরিপক্ব এবং বিস্তৃত হতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে এগুলি সংযোগ প্রভৃতি ক্রিয়াকেও বিস্তৃত এবং পরিপক্ব করতে থাকে। এর আধিদৈবিক ভাষ্য এইরূপ—
(অশ্বঃ, বো্হা, সুখম্, রথম্, হসনাম্, উপমন্ত্রিণঃ) “অশ্বো বোঢ়া সুখং বোঢ়া রথং বোঢ়া সুখমিতি কল্যাণনাম কল্যাণং পুণ্যম্ সুহিতং ভবতি সুহিতং গম্যতীতি বা হাসয়িতা বা পাতা বা পালয়িতা বা।” অশ্ব নামক তরঙ্গ অথবা রশ্মিগুলি বিভিন্ন কণা প্রভৃতি পদার্থকে বহনকারী হয়। রথের বিষয়ে ঋষিদের উক্তি— “বজ্রো বৈ রথঃ” (তৈ.সং.৫.৪.১১.২, শ.না. ৫.১.৪.৩, কাঠ. সং. ২১.১২)। এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, বাধক অসুর প্রভৃতি রশ্মিগুলিকে বিনষ্ট অথবা নিয়ন্ত্রিতকারী বজ্র রশ্মিগুলিই রথ নামে পরিচিত এবং সেই বজ্ররূপ রশ্মিগুলিকে এই অশ্বরূপ রশ্মিগুলি বহন করে। এই রশ্মিগুলি কণা অথবা বজ্র রশ্মিগুলিকে উত্তমরূপে আকর্ষণ ও ধারণ করতে করতে গমন করে। এদের দ্বারা সেই কণাগুলির ধারণ এইরূপে হয় যে, সেই কণাগুলি শুদ্ধ রূপ ধারণ করে পরস্পর সংগমনের যোগ্য হতে থাকে। এই কারণেই এখানে গ্রন্থকার ‘সুখম্’-এর অর্থ ‘পুণ্যম্’ করেছেন। এখানে প্রশ্ন এই ওঠে যে, কণাগুলির শুদ্ধ রূপ কী হয়? আমাদের দৃষ্টিতে এই সৃষ্টিতে সর্বত্র রশ্মির জাল বিস্তৃত হয়ে থাকে। এদের মধ্যে কিছু রশ্মি এমনও থাকে, যেগুলি সংগমন-প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। স্বাধীনরূপে বিচরণকারী অথবা সংযোগার্থে গমনকারী কণাগুলির চারপাশেও এই রশ্মিগুলি বিদ্যমান থাকে। অশ্ব নামক তরঙ্গ অথবা রশ্মিগুলি বজ্ররূপ রশ্মিগুলির দ্বারা সেই বাধক রশ্মিগুলিকে বিনষ্ট করে অথবা দূরে সরিয়ে দিয়ে কণাগুলিকে বাধক রশ্মি থেকে মুক্ত করে দেয়, একেই কণাগুলির শুদ্ধ হওয়া বলা হয়। এরূপ হওয়ার পরে সেই কণাগুলি সহজেই সংগমনের যোগ্য হয়ে যায়।
এখানে ‘হসৈতা’ পদটি ‘হাসয়িতা’-এর রূপ বলে প্রতীয়মান হয়। [মন্ত্রঃ ব্রহ্ম বৈ মন্ত্রঃ (শ. ব্রা.৭.১.১.৫), বাগ্বৈ মন্ত্রঃ (শ. ব্রা.৬.৪.১.৭)] উপরোক্ত এই ক্রিয়াগুলিতে বিভিন্ন বাক্ ও প্রাণ রশ্মির সঙ্গে নিকটভাবে বিদ্যমান অশ্ব নামক তরঙ্গ অথবা রশ্মিগুলি সহজেই সংগমন-কর্মের পালন ও রক্ষণ করতে সমর্থ হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে এই সকলের মিলনে নানাপ্রকার কণা যজন-প্রক্রিয়ার সময় একে অপরের নিকট নিরবাধ গতিতে অগ্রসর হতে থাকে। (শেপঃ, রোমণ্বন্তৌ, ভেদৌ) “শেপমৃচ্ছতীতি” [‘রোম’ এই পদ ‘লোম’-এর বাচক, যেখানে লত্বের স্থানে রেফ হয়েছে। “লোম ছন্দাংসি বৈ লোমানি” (শ. ব্রা.৬.৪.১.৬), “পশবো বৈ লোম” (তাং.ব্রা.১৩.১১.১১)] এই সংযোগ-প্রক্রিয়াগুলিতে এখানে শেপ-সংজ্ঞক রশ্মিগুলির ভূমিকাও রেখাঙ্কিত করা হয়েছে। আমাদের মতে শেপ-সংজ্ঞক রশ্মিগুলিই সেগুলি, যাদের ঋগ্বেদ ১.২৪ সূক্তে শুনঃশেপ ঋষিরূপে প্রদর্শিত করা হয়েছে। ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’ ৭.১৫.৩ এবং ৭.১৬.১-২-এ এদের আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে শুনঃশেপ রশ্মিগুলির বিষয়ে বলা হয়েছে—
“এই রশ্মিগুলি মধ্যম বল ও বিস্তারযুক্ত হয়। এই রশ্মিগুলি প্রজনন-উৎপাদন ক্ষমতায় বিশেষভাবে সম্পন্ন হয়। এই রশ্মিগুলি যখন অন্য কোনো রশ্মি প্রভৃতি পদার্থের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন নিজের তেজ ও বল সেই রশ্মিকে প্রদান করে নিজেরা যেন শান্ত হয়ে যায়। এই রশ্মিগুলি অন্য রশ্মির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সময় তাকে স্পর্শ করে তার মধ্যে নিজের বল সঞ্চারিত করে দেয়।”
এইরূপ শুনঃশেপ নামক রশ্মিগুলি বিভিন্ন প্রকার যজন-ক্রিয়ার সময় প্রকাশিত হতে থাকে এবং এই শুনঃশেপ রশ্মিগুলিই বহু ছন্দ রশ্মির উৎপাদক হয়। এখানে ‘রোমণ্বন্তৌ’ এবং ‘ভেদৌ’-এর দ্বিবচনান্ত প্রয়োগ হয়েছে এবং ‘শেপ’ নামক পদার্থকে ‘রোমণ্বন্তৌ ভেদৌ’-কে কামনাকারী বলা হয়েছে। এর অর্থ বোঝার জন্য পাঠকদের ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’ ৭.১৬.২-৩ পাঠ করা আবশ্যক। সেখানে শুনঃশেপ নামক ঋষি-রশ্মি থেকে ত্রিষ্টুপ্ এবং গায়ত্রী— এই দুই প্রকার ছন্দ রশ্মির উৎপন্ন হওয়ার আলোচনা করা হয়েছে। এই উভয় ছন্দ রশ্মির বিষয়েই বলা হয়েছে— “এতে বাব ছন্দসাং বীর্যবত্তমে যদ্ গায়ত্রী চ ত্রিষ্টুপ্ চ” (তাং. ব্রা.২০.১৬.৮)।
(এই অংশটি অত্যন্ত দীর্ঘ। আপনার নির্দেশ অনুযায়ী শব্দানুসারী, দেবনাগরী-বিহীন এবং মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে অনুবাদ করতে হলে এটিকে ধারাবাহিক অংশে দিতে হবে। নিচে প্রথম অংশের অনুবাদ দেওয়া হল।)
এই দুই ছন্দ রশ্মির পৃথক পৃথক দুইটি গোষ্ঠীর জন্যই ‘রোমণ্বন্তৌ ভেদৌ’ এই দ্বিবচনান্ত প্রয়োগ হয়েছে। এর অর্থ এই যে, এই সৃষ্টিতে বিভিন্ন প্রকার যজন-ক্রিয়ার সময় শুনঃশেপ নামক ঋষি-রশ্মিগুলি প্রকাশিত হয়ে এই উভয় ছন্দ-রশ্মি গোষ্ঠীকে উৎপন্ন করতে থাকে, যার ফলে নানাপ্রকার সংযোজক বল সমৃদ্ধ হতে থাকে।
(বারিন্, মণ্ডূকঃ, ইচ্ছতি, ইন্দ্রায়, ইন্দো, পরি, স্ত্রব) “বারি বারয়তি” [মণ্ডূকঃ মণ্ডূকা মজ্জূকা মজ্জনাত্ মদতের্ বা মোদতিকর্মণঃ মন্দতের্ বা তৃপ্তিকর্মণঃ মণ্ডয়তেরিতি বৈয়াকরণাঃ মণ্ড এষামোক ইতি বা মণ্ডো মদের্ বা (নিরু. ৯.৫)। মজ্জা মজ্জা যজুঃ (শ. ব্রা.৮.১.৪.৫), মজ্জানো জ্যোতিস্তদ্ধি যজুষ্মতীনাং রূপম্ (শ. ব্রা.১০.২.৬.১৮)]
এই সকল প্রক্রিয়ার মধ্যেই আরও কিছু গুরুতর ক্রিয়াও আরম্ভ হতে থাকে। এখানে যে মণ্ডূকের আলোচনা করা হয়েছে, তা ব্যাঙ নামক প্রাণী নয়; কারণ মণ্ডূকের বিষয়ে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের উক্তি— “এতদ্বৈ যত্রৈতং প্রাণা ঋষয়োऽগ্রেऽগ্নিঃ সমস্কুর্বস্তমদ্ভিরবোক্ষংস্তা আপঃ সমস্কন্দংস্তে মণ্ডূকা অভবন্” (শ. ব্রা. ৯.১.২.২১)। এর দ্বারা স্পষ্ট যে, কিছু ‘আপঃ’ অর্থাৎ প্রাণ-রশ্মিই মণ্ডূক নামক পদার্থে পরিণত হয়ে যায়।
এখন বিবেচনা করা যাক যে, এই পদার্থটি কেমন। এই পদার্থ যজুঃ-রশ্মির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে, যেগুলির দ্বারা আকাশতত্ত্বের নির্মাণ হয়, বিদ্যুৎ-প্রভাবকে আরও অধিক কার্যকর করে। এই পদার্থ বিভিন্ন বল-রশ্মি অথবা কণাকে তৃপ্ত করে এবং মণ্ড নামক পদার্থে অবস্থান করে। এর অর্থ এই যে, এই ‘মণ্ড’ সংজ্ঞক পদার্থ মণ্ডূক নামক পদার্থকে সক্রিয় অথবা অন্যান্য পদার্থের সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকার জন্য প্রেরণা দেয়। এখানে ‘মুদ্ সংসর্গে’ ধাতুর প্রয়োগ হয়েছে। এইরূপে মণ্ডূক নামক পদার্থ বিভিন্ন প্রাণ-রশ্মির সেই মিশ্রণ, যা আকাশতত্ত্ব দ্বারা বিশেষভাবে আবেষ্টিত হয়ে সংযোজ্য কণাসমূহের মধ্যে কার্যরত বিভিন্ন মধ্যস্থ কণা (মিডিয়েটর পার্টিকলস)-কে বিশেষভাবে সক্রিয় করতে সহায়তা করে। এই কারণে কণাসমূহের সংযোজনশীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এই মণ্ডূক-সংজ্ঞক রশ্মি-গোষ্ঠীগুলির অবস্থান যে ‘মণ্ড’ নামক পদার্থে বলা হয়েছে, তার অর্থ এই যে, এই মণ্ডূক-সংজ্ঞক পদার্থগুলি কেবল সংযোজী ক্রিয়াতেই প্রকাশিত হয়। এই মণ্ডূক-সংজ্ঞক পদার্থ অথবা রশ্মি-গোষ্ঠীগুলি ‘বারি’-কে কামনা করে। এর অর্থ এই যে, এই পদার্থগুলি সেই ক্ষেত্রে এমন রশ্মিগুলিকে নিরন্তর আকর্ষণ করতে থাকে, যেগুলি বাধক রশ্মিগুলির নিবারণ করে অথবা যেগুলি সমগ্র ক্ষেত্রটিকে আচ্ছাদিত করে বন্ধনসমূহকে দৃঢ় করে।
আমাদের দৃষ্টিতে এইরূপ সূক্ষ্ম রশ্মিগুলি প্রাণ ও অপানের যুগল অথবা সূত্রাত্মা বায়ু। প্রাণ-অপান রশ্মিগুলি সূক্ষ্ম স্তরে গিয়ে সূক্ষ্ম অসুরাদি রশ্মিগুলিকে বিনষ্ট অথবা নিয়ন্ত্রিত করে এবং সূত্রাত্মা বায়ু-রশ্মিগুলি সংযোজ্য কণাগুলিকে একত্রে আচ্ছাদিত করতে থাকে। সেই সময় ইন্দ্র অর্থাৎ বিদ্যুৎ-বলসমূহকে সমৃদ্ধ করার জন্য সোম-রশ্মিগুলিও সর্বদিকে সেই ক্ষেত্রে প্রবাহিত হতে থাকে।
ভাবার্থ- এই সৃষ্টিতে সর্বত্র বিভিন্ন প্রকার রশ্মির জাল বিস্তৃত হয়ে থাকে। এদের মধ্যে কিছু রশ্মি এমনও থাকে, যেগুলি আকাশে গমনকারী কণা অথবা বিকিরণের পথে কিংবা নানাপ্রকার সংগমন-ক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। অপরদিকে গমনকারী কণা অথবা বিকিরণের চারপাশেও কিছু এমন আচ্ছাদক রশ্মি থাকে অথবা উৎপন্ন হয়, যেগুলি বাধক রশ্মিগুলিকে দূর করে সেই কণাগুলি অথবা তাদের পথকে শুদ্ধ অথবা নিরবাধ করে তোলে। সূর্যাদি লোকের কেন্দ্রীয় অংশে কিছু বিশেষ প্রকার রশ্মি উৎপন্ন হয়, যেগুলি আরও বহু ছন্দ-রশ্মির উৎপাদক হয়, বিশেষত ত্রিষ্টুপ্ ও গায়ত্রী ছন্দ-রশ্মির। এদের কারণে বিভিন্ন সংযোজক বল তীব্র হয়ে যজন-প্রক্রিয়াগুলিকে নিরবাধ ও সহজ করে তোলে। বিভিন্ন কণার সংযোগের সময় কিছু এমন বিশেষ প্রকার রশ্মিও উৎপন্ন হতে থাকে, যেগুলি বল-উৎপাদক মধ্যস্থ কণাসমূহকে বিশেষভাবে সক্রিয় করতে সহায়তা করে। প্রকৃতপক্ষে এগুলি রশ্মি নয়, বরং রশ্মিগুলির মিশ্রণ, যা অন্য কোথাও উৎপন্ন হয় না।
যে মহানুভাব এই তর্ক উপস্থাপন করেন যে, এটি তো আধিদৈবিক ভাষ্য করা হলো, কিন্তু নিজের দাবিমতো আধিভৌতিক ভাষ্য করুন, তখন সেই ভাষ্যও অন্যদের ন্যায় অশ্লীলই হবে। তাঁদের সন্তুষ্টির জন্য আমি অপর দুই প্রকার ভাষ্যও আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করছি—
আধিভৌতিক ভাষ্য- (অশ্বঃ, বো্হা, সুখম্, রথম্, হসনাম্, উপমন্ত্রিণঃ) ইন্দ্র অর্থাৎ ঐশ্বর্যবান রাজা নিজের রাষ্ট্রে সকলের যাতায়াতের জন্য এমন যানবাহন কামনা করেন, অর্থাৎ নির্মাণ করান, যা সুখদ ও নিরাপদ যাত্রার উপযোগী হতে পারে। সেই যানবাহনগুলি সম্পূর্ণরূপে দূষণমুক্ত হবে। তাদের অশ্ব (বিশেষ প্রকার বিদ্যুৎ-যন্ত্র) সেই যানবাহনগুলিকে সহজেই বহন করতে সক্ষম হবে; অর্থাৎ তাতে এমন নিরাপদ বিদ্যুৎ-যন্ত্র স্থাপিত থাকবে, যা যানবাহনগুলিকে তীব্রগতি ও অধিক ভারবহন-ক্ষমতাসম্পন্ন করতে পারে। [অশ্বঃ = অসৌ বা আদিত্য এষোऽশ্বঃ (শ. ব্রা.৭.৩.২.১০)] সেই বিদ্যুৎ-যন্ত্রগুলি আদিত্য-রশ্মির দ্বারা পরিচালিত হবে। এখানে ‘অশ্ব’-এর অর্থ বিদ্যুৎ ও সূর্য— উভয়ই গ্রহণ করা উচিত। এখানে ‘রথ’-এর অর্থ বজ্র গ্রহণ করলে এমন যুদ্ধবিমানও গৃহীত হয়, যা শত্রুসেনার জন্য বজ্রস্বরূপ এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সুখদায়ক হবে। এখানে ‘বোঢ়া অশ্ব’ দ্বারা ঘোড়া অথবা বলদও গ্রহণীয়, কারণ পেশিশক্তির শক্তিই সর্বাধিক নিরাপদ। এই কারণে যজুর্বেদ ২২.২২-এ বলা হয়েছে— “বোঢ়া অনড্বান্”।
পরামর্শদাতা রাজার নিকটস্থ মন্ত্রিগণ ‘হসনা’ অর্থাৎ এমন রাজাকে কামনা করেন, যিনি প্রজাকে সন্তুষ্ট রাখতে পারেন, তাদের সর্বপ্রকার পালন ও সংরক্ষণ করতে পারেন। মহাভারতে পিতামহ ভীষ্মও ‘রাজা’ পদের নির্বচন করতে গিয়ে লিখেছেন— “রাজা রঞ্জনাত্”; অর্থাৎ রাজা তিনি, যিনি নিজের প্রজাকে আনন্দিত করতে পারেন। যে রাজার রাজ্যে প্রজা সুখী, সুস্থ ও নিরাপদ নয় এবং স্বার্থপর, বিলাসী, নিষ্ঠুর অথবা প্রমাদী রাজা— এ উভয়ই রাষ্ট্রের জন্য শত্রুর ন্যায় ক্ষতিকর। এখানে রাজার গুণ বলার সঙ্গে সঙ্গেই মন্ত্রীদের গুণও স্বতঃই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, তারা প্রজাপালক রাজাকেই কামনা করবে এবং যে রাজা প্রজার প্রতি লক্ষ্য রাখে না, তাকে পদচ্যুত করবে। রাজার সঙ্গে মন্ত্রীদেরও যোগ্য ও প্রজাবল্লভ হওয়া অপরিহার্য; অন্যথায় উত্তম রাজাও প্রজার কল্যাণ করতে পারবে না।
(শেপঃ, রোমণ্বন্তৌ, ভেদৌ) [এখানে ‘রোম’ পদটি ‘লোম’-এর রূপ, যেখানে লত্বের স্থানে রেফ নিপাতিত হয়েছে। ‘লোম’ পদের নির্বচন করতে গিয়ে গ্রন্থকারের উক্তি— “লুনাতের্ বা লীয়তের্ বা” (নিরু. ৩.৫), “শেপঃ শপতের্ স্পৃশতিকর্মণঃ” (নিরু. ৩.২১), “শপ আক্রোশে”] এখানে ‘শেপঃ’ পদের অর্থও রাজা, যিনি নিজের স্নেহ-বন্ধনের দ্বারা সমগ্র প্রজাকে নিজের সঙ্গে আবদ্ধ রাখতে এবং অরাজক তত্ত্ব অথবা শত্রুদের নিজের ক্রোধের দ্বারা বশে রাখতে সক্ষম হন। এখানে ‘লোম’ পদের দুটি অর্থ আছে, যার মধ্যে প্রথমটি হলো— দুষ্টদের ছেদন করা এবং সজ্জনদের নিজের সঙ্গে স্নেহসূত্রে আবদ্ধ রাখা, অথবা তীক্ষ্ণ ও মধুর বাক্য বলা। এরূপ রাজা নিজের দুই প্রকার আচরণ, অর্থাৎ কঠোর ও মৃদু আচরণসম্পন্ন হয়ে সকলের সঙ্গে যথোচিত ব্যবহার করতে করতে রাষ্ট্রকে সুখী করেন। কেবল মৃদু আচরণের দ্বারা, অর্থাৎ দণ্ডব্যবস্থা ব্যতিরেকে, অথবা কেবল কঠোরতার দ্বারা, অর্থাৎ শুষ্ক ও নিষ্ঠুর আচরণসম্পন্ন রাজা রাষ্ট্রের জন্য কখনোই হিতকর হতে পারেন না।
(বারিন্, মণ্ডূকঃ, ইচ্ছতি, ইন্দ্রায়, ইন্দো, পরি, স্রব) লক্ষ্য করা উচিত যে, এখানে ‘মণ্ডূক’ পদটিও রাজার জন্যই প্রয়ুক্ত হয়েছে এবং এর অর্থ আধিদৈবিক ভাষ্যে করা নির্বচনের প্রসঙ্গেই করা উচিত। এইরূপে রাজার মধ্যে নিম্নলিখিত গুণ থাকা উচিত—
১. রাজা যোগী হওয়া উচিত, যিনি নিত্য যোগের দ্বারা পরমানন্দে নিমগ্ন থাকার অভ্যাসী।
এই কারণে তিনি সমগ্র প্রজাকে প্রভুর সন্তান বলে মনে করবেন।
২. সেই রাজা প্রজার আনন্দকেই নিজের আনন্দ বলে মনে করবেন।
৩. তিনি প্রজাকে নানাপ্রকার হিতকর পদার্থের প্রাপ্যতা করিয়ে তাদের তৃপ্তিকেই নিজের তৃপ্তি বলে মনে করবেন। যে প্রকার মাতা-পিতা নিজেদের সন্তানকে সুখে তৃপ্ত করে নিজেরা প্রসন্ন ও তৃপ্ত হন, সেইরূপই রাজার আচরণ প্রজার প্রতি হওয়া উচিত।
৪. সেই রাজা দরবারে বস্ত্র-আভূষণে এবং যুদ্ধে অস্ত্র-শস্ত্র ও কবচ প্রভৃতিতে সুসজ্জিত হওয়া উচিত।
৫. সেই রাজার নিবাস ‘মণ্ড’-এ হওয়া উচিত; অর্থাৎ তিনি সর্বদা প্রসন্নবদন হবেন অথবা সেইরূপই প্রতীয়মান হবেন। কারণ যদি রাজা অথবা রাজপরিবারের কোনো সদস্যের মুখমণ্ডলে চিন্তা, বেদনা অথবা ভয়ের রেখা দেখা যায়, তবে সেই রাষ্ট্রের সমগ্র প্রজা চিন্তা, ভয় ও বিষাদে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। রাজার একটি অশ্রুবিন্দু প্রজার মধ্যে কোটি কোটি অশ্রুবিন্দু প্রবাহিত করবে। এই কারণেই রাজাকে সর্বদা প্রসন্নই প্রতীয়মান হওয়া উচিত। তিনি নিজের চিন্তার আভাসও প্রজাকে জানতে দেবেন না; বরং তা কেবল মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবেন।
এই পাঁচটি গুণে যুক্ত মণ্ডূক-সংজ্ঞক ইন্দ্র অর্থাৎ রাজা ‘বারি’-কে কামনা করেন; অর্থাৎ প্রজার প্রত্যেক দুঃখের নিবারণ করার ইচ্ছা রাখেন। যে প্রকার বারি অর্থাৎ জল গ্রীষ্ম অথবা তৃষ্ণায় পীড়িত ব্যক্তিকে শান্তি প্রদান করে, সেইরূপ রাজার সংরক্ষণ প্রজার ত্রিবিধ তাপের নিবারণ করে সুখ ও শান্তি প্রদান করে। এরূপ ইন্দ্র-রাজার জন্য সকলকে শান্তি প্রদানকারী সোম পরমাত্মা সর্বদিক থেকে জ্ঞান, আনন্দ ও শান্তির বর্ষণ করেন। এর অর্থ এই যে, প্রজাপালক ধর্মাত্মা রাজার ঈশ্বরও সর্বপ্রকার রক্ষা করেন এবং তাঁকে রাজ্যপালনের জন্য অনুকূল শক্তিও প্রদান করেন।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য- (অশ্বঃ, বো্হা, সুখম্, রথম্) [অশ্বঃ যজমানো বা অশ্বঃ (তৈ.ব্রা.৩.৯.১৭.৫), ইন্দ্রো বা অশ্বঃ (কৌ.ব্রা.১৫.৪)। রথম্ রমণীয়ো ব্যবহারঃ (ম.দ.ঋ.ভা.৬.৪৯.৫), বিদ্যাপ্রকাশম্ (ম.দ.য.ভা.৮.৩৩)] ব্রহ্মযজ্ঞের যজমান যোগনিষ্ঠ পুরুষ সর্বদা পরমাত্মার ঐশ্বর্যশালী সাম্রাজ্যে রমণ করেন; অর্থাৎ তিনি নিজেকে সর্বোচ্চ সম্রাট পরব্রহ্ম পরমাত্মার প্রজা বলে মনে করেন। এরূপ পুরুষ সংসারে আগত সমস্ত সমস্যাকে সহজভাবে বহন করার জন্য সুখদ রথ কামনা করেন এবং তা লাভ করতেও সমর্থ হন। এখানে সুখদ রথের তাৎপর্য হলো, পরমানন্দে প্রাপ্ত বিদ্যার প্রকাশ এবং সেই পবিত্র প্রকাশে সকলের সঙ্গে রমণীয় অর্থাৎ মধুর ব্যবহার। এই বিবেক, বিদ্যা অথবা মধুর ব্যবহারের দ্বারা তিনি সমাজের সমস্ত সমস্যাকে দূর করার উপদেশ দেন এবং নিজেকে সেই সমস্যাগুলি থেকে দূরে রেখে আনন্দিত থাকেন। তিনি নিজেকে কখনও দুঃখ, অপমান প্রভৃতির দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত বলে অনুভব করেন না; বরং সর্বদা ব্রহ্মানন্দে লীন থাকেন।
(হসনাম্, উপমন্ত্রিণঃ) সেই যোগীকে মন্ত্রণা প্রদানকারী তাঁর পথপ্রদর্শক গুরু প্রভৃতি তাঁকে নিজের যোগপথে সহজে, প্রসন্নচিত্তে চলতে এবং যোগমার্গে আগত সমস্ত বিঘ্ন থেকে তাঁর রক্ষা করেন। প্রাথমিক যোগাভ্যাসীর জন্য এরূপ পথপ্রদর্শক গুরুর অত্যন্ত প্রয়োজন হয়।
(শেপঃ, রোমণ্বন্তৌ, ভেদৌ) [লোম ছন্দাংসি বৈ লোমানি (শ. ব্রা.৬.৪.১.৬)] এখানে পরমাত্মার কৃপা ও জ্ঞানকে নিকট থেকে স্পর্শকারী অথবা তাতে সিক্ত যোগীকেই ‘শেপ’ বলা হয়েছে। এরূপ শেপরূপ যোগী দৈবী ও আসুরী উভয় প্রকার ঋচাকে দেখার ইচ্ছা করেন এবং দেখতেও পান। তাঁর সমস্ত ছন্দ-গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ জ্ঞান হতে থাকে এবং সৃষ্টিতে তাদের যে প্রভাব ঘটে, তাও তিনি প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হন।
(বারিন্, মণ্ডূকঃ, ইচ্ছতি) সেই যোগীকেই এখানে মণ্ডূক বলা হয়েছে, যার মধ্যে নিম্নলিখিত গুণ থাকে—
১. নিত্য পরমানন্দে নিমগ্ন থাকার অভ্যাসী।
২. সেই ব্রহ্মানন্দকেই সর্বোচ্চ আনন্দ বলে মনে করেন।
৩. সেই পরমানন্দেই তৃপ্ত এবং কোনো সাংসারিক বস্তুর প্রতি আসক্তি না রাখা। এর সঙ্গে নিজের পুরুষার্থ ও প্রারব্ধ অনুযায়ী যে সকল সাংসারিক বস্তু প্রাপ্ত হয়েছে, সেগুলিতেই তৃপ্ত থাকা।
৪. সর্বদা প্রসন্নবদন, স্থিতপ্রজ্ঞ।
৫. সত্য, করুণা, প্রেম, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য প্রভৃতি সদ্গুণে সর্বদা সমলঙ্কৃত।
এরূপ যোগী সর্বদা সমস্ত দুঃখের নিবারণকারী পরব্রহ্ম পরমাত্মার সাক্ষাৎকারেরই কামনা করেন। তাঁর কখনও সাংসারিক বস্তুর প্রতি কোনো আকর্ষণ থাকে না।
(ইন্দ্রায়, ইন্দো, পরিস্রব) এরূপ যোগী ইন্দ্র পরমেশ্বরের উপাসনার দ্বারা নিজেও ইন্দ্রের ন্যায় যশস্বী, দুঃগুণ ও দুঃখের বিনাশকারী হয়ে ওঠেন। এরূপ যোগীর জন্য শান্তিবিধায়ক পরমাত্মা সর্বদিক থেকে শান্তি ও আনন্দ প্রবাহিত করেন। যখন ব্যক্তি পবিত্র ভাব নিয়ে নিজের কর্তব্যসমূহ ঈশ্বর-প্রণিধানপূর্বক পালন করতে করতে, সকল জীবের কল্যাণ কামনা করতে করতে, অষ্টাঙ্গযোগের দ্বারা পরমেশ্বরের উপাসনা করেন, তখন পরমাত্মাও তাঁর উপর নিজের আনন্দের বর্ষণ করেন।