বেদে পুনরুক্তি-দোষ বক্তার প্রমাদকে প্রমাণিত করে। বেদে অনেক স্থানে এই দোষ পাওয়া যায়। এই দোষ থাকার ফলে না বুদ্ধিপূর্বক বাক্যরচনাকে বেদে স্বীকার করা যেতে পারে এবং না তার রচয়িতাকে ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা ইত্যাদি দোষ থেকে মুক্ত বলে মনে করা যেতে পারে। এমন অবস্থায় বেদের প্রামাণ্যতার উপর প্রশ্নচিহ্ন লাগা স্বাভাবিক।
কোনো কথাকে বারবার বলা পুনরুক্তি বলা হয়। শব্দ ও অর্থের ভেদে তা দুই প্রকারের হয়। যখন কোনো শব্দকে বারবার বলা হয়, তখন তা শব্দপুনরুক্ত বলে। যেমন- নিত্যঃ নিত্যঃ অথবা শীঘ্রং গচ্ছ শীঘ্রং গচ্ছ। যখন ভিন্ন ভিন্ন শব্দের দ্বারা একই অর্থকে বারবার বলা হয়, তখন অর্থপুনরুক্ত বলা হয়। যেমন- নিত্যং শাশ্বতম্ অথবা অগ্নিমীলে, পাবকং স্তৌমি। এখানে শব্দের আবৃত্তি না হলেও ব্যবহৃত শব্দগুলির অর্থ একই।
পদ, পাদ, অর্ধর্চ, মন্ত্র এবং সূক্তের ভেদে পুনরুক্তি পাঁচ প্রকারের হয়-
পদ পুনরুক্তি যেখানে একই মন্ত্রে এক বা একাধিক পদ বারবার ব্যবহৃত হয়। যেমন-
1. উপ ত্বাগ্নে দিবেদিবে। ঋ০ ১-১-৭
2. মন্ম রেজতি রক্ষোহা মন্ম রেজতি। ঋ০ ১-১২৬-৬
3. কস্ত্বা যুনক্তি স ত্বা যুনক্তি কস্মৈ ত্বা যুনক্তি। যজু০ ১-৬
4. মধুমন্তং মধুশ্চুতম্। ঋ০ ৪-৫৭-২
উপরিউক্ত মন্ত্রাংশগুলিতে দিবে, মন্ম রেজতি, যুনক্তি এবং মধু পদগুলির একাধিকবার প্রয়োগ হয়েছে। পাদ পুনরুক্তি (ক) যেখানে সম্পূর্ণ পাদ (চরণ) পুনরায় পুনরায় বহু স্থানে ব্যবহৃত হয়। যেমন-
1. তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু। যজু০ ৩৪-১ থেকে ৬
2. কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম। যজু০ ২৫-১০ থেকে ১৩; ৩২-৬, ৭; ১২-১০২
3. ইন্দ্রায়েন্দো পরিস্রব। ঋ০ ৬ সূক্ত ১১২, ১১৩, ১১৪-এর প্রত্যেক মন্ত্রে
4. মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শোষ্ণে। যজু০ ৩৭-৩ থেকে ১০
5. তস্মৈ জ্যেষ্ঠায় ব্রহ্মণে নমঃ। অ০ ১০-৭-৩২ থেকে ৩৪ तथा ১০-৮-১
6. স জনাস ইন্দ্রঃ। ঋ০ ২-১২-১ থেকে ১৪
7. অর্চন্ননু স্বরাজ্যম্। ঋ০ ১-৮০-১ থেকে ১৬
8. অপ নঃ শোশুচদঘম্। ঋ০ ১-৬৭-১ থেকে ৮
(খ) যেখানে সম্পূর্ণ পাদ (চরণ) একই মন্ত্রে পুনরুক্ত হয়। যেমন-
1. ত্র্যম্বকং যজামহে পুষ্টিবর্ধনম্।- যজু০ ৩-৬০
2. প্রত্যুষ্টং রক্ষ আরাতয়ঃ। যজু০ ১-২৬
3. উৎপুনামি সূর্যস্য রশ্মিভিঃ। যজু০ ১-৩১
4. মখস্য ত্বা মখায় ত্বা শীষ্ণে। যজু০ ৩৭-৬, ৭, ১০-এ তিন-তিনবার तथा ৮ ও ৬-এ ছয়-ছয়বার
5. মণ্ডূকা ইবোদকান্মণ্ডূকা উদকাদিব। ঋ০ ১০-১৬৬-৫
অর্ধর্চপুনরুক্তি (ক) যেখানে অর্ধেক ঋচা (মন্ত্র) পুনরুক্ত হয়। যেমন-
1. তত্ত আ বর্তয়ামসীহ ক্ষয়ায় জীবসে এই অর্ধেক ঋচা দশম মণ্ডলের (ঋগ্বেদ) সূক্ত ৫৮-এর সমস্ত ১২টি মন্ত্রে পুনরায় পুনরায় পাওয়া যায়।
2. আ তু ইন্দ্র শংসয় গোষ্বশ্বেষু শুত্রিষু সহস্রেষু তুবীমঘ। এই অর্ধর্চ ঋগ্বেদের মণ্ডল ১, সূক্ত ২৬-এর সাতটি মন্ত্রেই সমানভাবে পাওয়া যায়।
3. অথর্ববেদ কাণ্ড ১৬, সূক্ত ৮-এ মন্ত্র ৫ থেকে ২৬ পর্যন্ত সমস্ত ২৫টি মন্ত্র একই রকমের- কেবল এক-একটি শব্দের পার্থক্য রয়েছে।
(খ) কিছু স্থান এমনও আছে যেখানে হিন্দিতে প্রচলিত গিরিধরের কুণ্ডলীর মতো একটি মন্ত্রের অন্তিম চরণের পরবর্তী মন্ত্রের প্রারম্ভে প্রয়োগ পাওয়া যায়। যেমন-
1. বিশ্বস্য দূতমমৃতম্। যজু০ ১৫-৩২
বিশ্বস্য দূতমমৃতম্। যজু০ ১৫-৩৩
2. স দুদ্রবৎস্বাহুতঃ। যজু০ ১৫-৩৩
স বুদ্রবৎস্বাহুতঃ। যজু০ ১৫-৩৪
3. ভদ্রা উত প্রশস্তয়ঃ । যজুঃ ১৫-৩৮ ভদ্রা উত প্রশস্তয়ঃ। যজুঃ ১৫-৩৬
মন্ত্রপুনরুক্তি যেখানে সম্পূর্ণ মন্ত্রই বহু স্থানে পাওয়া যায়। যেমন-
1. তৎসবিতুর্বরেণ্যং আদি মন্ত্র, যা গায়ত্রী মন্ত্র নামে প্রসিদ্ধ, তা যজুর্বেদে ৩ বার (৩-৩৫, ২২-৬, ৩০-২), ঋগ্বেদে একবার ৩-৬১-১০ এবং সামবেদে একবার (উত্তরার্চিক ৬-৩-১০-১) এসেছে। প্রথমে ভূর্ভুবঃ স্বঃ ব্যাহৃতিগুলির সঙ্গে পঠিত এই মন্ত্র যজুর্বেদে (৩৬-৩) আরও একবার এসেছে।
2. ইল়ামগ্নে পুরুদংসম্... এই সম্পূর্ণ মন্ত্র ঋগ্বেদ মণ্ডল ৩-এর সূক্ত ১, ৫, ৬, ৭ ও ১৫-এর শেষে পাওয়া যায়।
3. আপো হি ষ্ঠা ময়োভুবঃ এই মন্ত্র এই-এই স্থানে এসেছে ঋঃ ১০-৬-১, যজুঃ ১১-৫০ ও ৩৬-১৪, সামঃ উত্তরার্চিক ৬-২-১০-১, অথর্বঃ ১-৫-১
সূক্ত পুনরুক্তি যেখানে সম্পূর্ণ সূক্ত পুনরুক্ত হয়। যেমন-
1. ঋগ্বেদ ১০-১০ যম-যমী সূক্ত অথর্ববেদ ১৮-১-এ পুনরুক্ত হয়েছে। ঋঃ ১০-১৫৪ পাঁচটি মন্ত্রের ভাববৃত্ত সূক্ত সামান্য পরিবর্তনের সঙ্গে অথর্ববেদ ১৮-২-এ পাওয়া যায়। ঋগ্বেদ ১০-৮৫ বিবাহ সূক্ত নামে প্রসিদ্ধ; সামান্য ক্রমাদি-ভেদের সঙ্গে এই সম্পূর্ণ সূক্ত অথর্ববেদ ১৪-১-এ এসেছে। ঋগ্বেদ ১০-৬০ পুরুষ সূক্ত কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে যজুর্বেদ ১০-৩১ তথা অথর্ববেদ ১৬-৬-এও রয়েছে। এই সূক্তের কয়েকটি মন্ত্র সামবেদের পূর্বার্চিকের অরণ্যপর্বেও পাওয়া যায়।
2. কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ সূক্ত নয়, কিন্তু তার দুই-তিন বা অধিক মন্ত্র একই ক্রমে একই বেদে অথবা অন্য বেদগুলিতে পুনরুক্ত হয়েছে। যেমন— কয়া নশ্চিত্র আদি ঋগ্বেদ ৪-৩১-এর প্রথম তিনটি মন্ত্র ঠিক এই ক্রমে যজুর্বেদ অধ্যায় ২৭ মন্ত্র ৩৬-৪১ তথা অধ্যায় ৩৬ মন্ত্র ৪-৬—এই দুই স্থানে, সামবেদে উত্তরার্চিক ১-১২-১-৩-এ এবং অথর্ববেদে কাণ্ড ২০ সূক্ত ১২৪ মন্ত্র ১-৩-এ পুনরাবৃত্ত হয়েছে।
এগুলি ছাড়াও বহু স্থানে এমনও দেখা যায়, যেখানে একই ভাব বহুবার পুনরুক্ত হয়েছে, যদিও ভাষা ভিন্ন। যেমন ইন্দ্র বৃত্রদের সংহারক, ঐশ্বর্যশালী, দাতা এবং সোমরসের পানকারী। উষা দ্যুলোকের কন্যা, জ্যোতির্মতী তথা অন্ধকারকে উচ্ছিন্নকারিণী। অগ্নি দেবতাদের দূত, হব্যের ভক্ষণকারী এবং জ্যোতির্মান। এই প্রকারের ভাব বেদগুলিতে বহু স্থানে পাওয়া যায়।
বস্তুত ঈশ্বরোক্ত হওয়ার কারণে বেদগুলিতে পুনরুক্তিকে দোষ বলে মনে করা যায় না।
বেদকে মানব-রচনা মনে করলে তাতে দোষের সম্ভাবনা থাকতে পারে, কিন্তু তাকে সর্বজ্ঞ পরমেশ্বরের নিঃশ্বাসজাত জ্ঞান মনে করলে তাতে দোষ-দর্শনের দ্বারা নিজেরই অল্পজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। ন হি প্রয়োজনমনভিসন্ধায় প্রেক্ষাবন্তঃ প্রবর্তন্তে—কোনো বুদ্ধিমান পুরুষ প্রয়োজন ছাড়া কোনো কাজে প্রবৃত্ত হন না। আবার পরমেশ্বর তো মনীষী। ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা ইত্যাদি দোষ তাঁর মধ্যে কল্পনা করা যায় না। অতএব তাঁর কোনো ক্রিয়াই নিষ্প্রয়োজন অথবা স্মৃতিভ্রংশতা কিংবা অজ্ঞানবশত হতে পারে না। বুদ্ধিপূর্বা বাক্যকৃতির্বেদে (বৈঃ ৮০৬-১-১) পরমেশ্বরের নৈসর্গিক নিত্যজ্ঞানের বোধক বেদে, তাঁর অমর কাব্যে যে বাক্যরচনা রয়েছে, পদ ও পদসমূহের যে আনুপূর্বী রয়েছে, তা সবই বুদ্ধিপূর্বক; অতএব যেখানে শব্দ অথবা অর্থের পুনরুক্তি প্রতীয়মান হয়, সেখানে তার বিশেষ অভিপ্রায় জানার জন্য গভীরভাবে চেষ্টা করা উচিত। যদি কোনো কোনো ব্যাখ্যাকার এই প্রকারের প্রসঙ্গে বিশেষার্থ প্রকাশ না করে থাকেন, তবে তা ব্যাখ্যাকারদের দোষ, বেদগুলির নয়। মহাভাষ্যকার পাণিনীয় শাস্ত্রের জন্য লিখেছেন-:
ব্যাখ্যানতো বিশেষপ্রতিপত্তির্ন হি সদ্বেহাবলক্ষণম্। অর্থাৎ কোনো সূত্রে সন্দেহমাত্রের কারণে তাকে অলক্ষণ, শাস্ত্রের নিয়মবিরুদ্ধ বলে মনে করা উচিত নয়, বরং ব্যাখ্যার দ্বারা বিশেষ অর্থের জ্ঞান লাভের চেষ্টা করা উচিত। যে প্রকারে আর্ষ বা অনার্ষ গ্রন্থগুলির পুনরুক্তি-দোষের নিবৃত্তির জন্য সূক্ষ্ম বিবেচনা করা হয়, সেই প্রকারে বেদগুলির পুনরুক্ততা-দোষের নিবারণের জন্যও প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত। এটি অনুসন্ধানের বিষয়, শ্রমসাধ্য, প্রতিভাসাধ্য। মহাভাষ্যকার যথার্থই বলেছেন- একঃ শব্দঃ সম্যগ্ জ্ঞাতঃ সম্যক্প্রযুক্তঃ স্বর্গে লোকে চ কামধুগ্ভবতি । যে বেদের নিজের অঙ্গ- মুখভূত ব্যাকরণ শব্দের এই গরিমার উদ্ঘোষ করছে, সেই বেদ নিজেই শব্দের নিরর্থক প্রয়োগ করে পুনরুক্তি-দোষের ভাগী হবে, এটি কীভাবে সম্ভব?
প্রয়োজনশূন্যত্বে পদবাক্যয়োঃ পুনঃ পুনঃ কথনং পুনরুক্তিদোষঃ শব্দ বা বাক্যকে বারবার নিষ্প্রয়োজনে বলা পুনরুক্তি-দোষ বলে পরিচিত হয়, কিন্তু যেখানে শব্দ বা শব্দসমষ্টির বারবার প্রয়োগ কোনো প্রয়োজনের সিদ্ধির জন্য করা হয়, সেখানে তা পুনরুক্ত না হয়ে অনুবাদ বলে পরিচিত হয়। ভিন্ন ভিন্ন শব্দের দ্বারা একই অর্থের কথনও সপ্রয়োজন হয়। এই প্রকারে কোনো বিশেষ অর্থের প্রয়োজন থাকার কারণে অনুবাদ দোষাবহ হয় না। গচ্ছ গচ্ছ অথবা যাও, যাও-তে গচ্ছ অথবা যাও-এর দুবার প্রয়োগ নিরর্থক নয়, বরং তাড়াতাড়ি চলে যাও—এই বিশেষ অর্থের দ্যোতক। ‘অনুবাদোপপত্তেশ্চ’ ন্যায়-দর্শনের এই সূত্র (২-১-৬১)-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাৎস্যায়নমুনি পুনরুক্ত ও অনুবাদের ভেদ এই শব্দগুলিতে স্পষ্ট করেছেন-
অনর্থকোঽভ্যাসঃ পুনরুক্তম্, অর্থবানভ্যাসোঽনুবাদঃ শীঘ্রতরগমনোপদেশবৎ ।
অর্থাৎ যেখানে পুনরুক্তি নিরর্থক হয়, সেখানে তা দোষযুক্ত হয়। যেখানে অনুবাদ সার্থক হয়, সেখানে তা নির্দোষ হয়। যেমন- শীঘ্রং শীঘ্রং গম্যতাম্-এ শীঘ্রম্-এর দুবার প্রয়োগ অত্যন্ত দ্রুততার সূচক। বেদে পুনরুক্তি সার্থক অথবা সনিমিত্ত হওয়ার কারণে দোষাবহ নয়।
বেদে কোনো শব্দই নিরর্থক নয়। পদ-পুনরুক্তির দুটি ভেদ রয়েছে- সুবন্তের পুনরুক্তি এবং তিঙন্তের পুনরুক্তি। বৈয়াকরণদের মতানুসারে সুবন্তের পুনরুক্তি থেকে বীপ্সা = ব্যাপ্তি অর্থ গম্য হয়। যেমন-গ্রামো গ্রামো রমণীয়ঃ প্রত্যেক গ্রাম রমণীয়। এখানে রমণীয়তার ব্যাপ্তি গ্রাম-গ্রামে রয়েছে—এই অর্থ প্রতীয়মান হয়। তিঙন্তের পুনরুক্তি থেকে ক্রিয়ার পুনরায় হওয়া জানা যায়। যেমন- দেবদত্তঃ পচতি পচতি দেবদত্ত পাকাতেই থাকে। এগুলির জন্য পাণিনীয় সূত্র হল- নিত্যবীপ্সয়োঃ (অ০ ৮।১।৪) ।
এই নিয়ম অনুসারে দিবেদিবে-এর অর্থ হবে প্রতিদিনম্ (সায়ণ)। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ধাত্বর্থকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থ করেছেন- বিজ্ঞানস্য প্রকাশায় প্রকাশায় অর্থাৎ বিজ্ঞানের প্রত্যেক প্রকাশের জন্য। এই প্রকারে বেদে যেখানে তিঙন্তের পুনরাবৃত্তি রয়েছে, সেখানে তার দ্বারা ক্রিয়ার পুনঃ পুনঃ হওয়া অভিপ্রেত।
সন্ধ্যায় ওঁ বাক্ বাক্, ওঁ প্রাণঃ প্রাণঃ ইত্যাদি বলা হয়। এখানে বাক্ বাক্-এ প্রথম বাক্ উদ্দেশ্যভূত, দ্বিতীয়টি বিধেয়ভূত। বাণীতে ‘বাক্ত্ব’ অর্থাৎ যথার্থ কথনরূপ গুণ অভিপ্রেত, কাম্য। এই ভাবই প্রাণ, চক্ষু, শ্রোত্র ইত্যাদির পুনরুক্ত হওয়ার মধ্যে নিহিত। বিবাহ-প্রকরণে ‘পাদ্যং পাদ্যং পাদ্যম্’ এই তিনবার অভ্যাস এবং পুনরুক্ত বলে প্রতীয়মান হলেও সার্থক। বস্তুত মন-বচন-কর্ম তিনটিরই নির্দেশ থাকার কারণে তিনবার কথন স্বতঃই যুক্তিযুক্ত।
তত্ত আ বর্তয়ামসীহ ক্ষয়ায় জীবসে (ঋঃ ১০-৫৮) এই অর্ধঋচাটি এই সূক্তের সমস্ত ১২টি মন্ত্রে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এই সূক্তের প্রত্যেক মন্ত্রে মনো জগাম দূরকম্ এই দ্বিতীয় চরণটিও বারবার প্রয়োগ করা হয়েছে। এই সূক্তে মূর্ছিত ব্যক্তির নষ্ট হয়ে যাওয়া চেতনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের দৃঢ়সংকল্প এবং ভৈষজ্য-কৌশল প্রকাশ করতে তথা রোগীর আত্মীয়দের বিশ্বাস ও সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বারবার বলে-যদি তোমার চেতনা মৃত্যুর কাছেও পৌঁছে গিয়ে থাকে, তবুও তত্ত আ বর্তয়ামসি তাকে ফিরিয়ে এনে দিচ্ছি।
অথর্ববেদ কাণ্ড ২-এর ৩৩তম সূক্তে যক্ষ্মা দূর করার বিধান রয়েছে। যক্ষ্মাপীড়িত ব্যক্তির মনোবল বাড়ানোর জন্য, তার বিভিন্ন শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নির্দেশ করে তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বারবার বি বৃহার্মি তে পদটি বলে বলা হয়, ‘তোর কোনো অঙ্গে যক্ষ্মা প্রবেশ করে থাকলেও, আমি তাকে বের করে দেব-তোর মৃত্যু হতে দেব না।’
কোনো বেদমন্ত্রের একইরূপ শব্দরূপ অন্য কোনো স্থানে এসে গেলেই তাকে পুনরুক্তি-দোষ মনে করা উচিত নয়। মণ্ডূকা ইবোদকান্মণ্ডূকা উদকাদিব (ঋঃ ১০/১৬৬।৫)-এ আপাতদৃষ্টিতে পুনরুক্তি প্রতীয়মান হয়, কিন্তু বস্তুত উভয় উপমান বাক্যের নিজস্ব বিশেষত্ব রয়েছে। প্রথম বাক্যে মণ্ডূকাঃ-এর উপর জোর রয়েছে, কারণ উপমাবাচক পদ তার সঙ্গেই রয়েছে। অভিপ্রায় এই যে, আমার অধীনে থাকাকালীন তোমরা প্রসন্নচিত্তে তেমনই কথা বলতে পার, যেমন জলে ব্যাঙেরা কথা বলে। দ্বিতীয় বাক্যে উদকাত্-এর উপর জোর রয়েছে।। অর্থাৎ যেমন ব্যাঙেরা কেবল জলেই কথা বলে, তেমনই তোমাদের কথা বলার অধিকার ততক্ষণই রয়েছে, যতক্ষণ তোমরা আমার অনুশাসনে রয়েছ। বিদ্রোহী হয়ে উঠলেই এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।
বেদগুলিতে বারবার আনীত বহু মন্ত্রের অর্থ সর্বত্র একই রকম নয়, প্রসঙ্গ বা দেবতাভেদের কারণে ভিন্ন ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা প্রসিদ্ধ মন্ত্র দেব সবিতঃ প্রসুব যজ্ঞম্ গ্রহণ করি। এই মন্ত্র যখন যজুর্বেদে (৬-১) এসেছে, তখন সেখানে রাজসূয়-প্রকরণ হওয়ার কারণে দেব সবিতঃ আদি পদগুলিকে সম্রাট্পরক মনে করে মন্ত্রের রাজনীতিসম্পর্কিত অর্থ করা হয়েছে। এই মন্ত্রই যজুর্বেদে (১১-৭) যখন যোগের প্রসঙ্গে এসেছে, তখন সেখানে এর পরমেশ্বরপরক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সনাদগ্নে মৃণসি....মুক্ষত বৈব্যায়াঃ- এই মন্ত্র বেদগুলিতে চারবার এসেছে। একবার ঋগ্বেদে (১০।৮৭।১৬), একবার সামবেদে (পূর্ব০ ১-২-৩-৮) এবং দুবার অথর্ববেদে (৫-২৬-১১ ও ৮-৩-১৮)। ঋগ্বেদে এটি রাষ্ট্রের সেনানীকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে-শত্রুদের বিনাশ করার জন্য। সামবেদে ভক্তির প্রসঙ্গে পরমেশ্বরকে সম্বোধন করে চিত্তে ব্যাপ্ত রাক্ষসী ভাবগুলির সংহার করার প্রার্থনা করা হয়েছে। অথর্ববেদে প্রথম স্থানে অগ্নির প্রসঙ্গ (রোগকৃমিদের বিনাশ) অনুসারে যজ্ঞাগ্নি গ্রহণ করে মন্ত্রের অর্থ করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে অগ্নির দ্বারা রোগের সংহারকারী বৈদ্যকে গ্রহণ করা হয়েছে।
চত্বারি শৃঙ্গা ত্রয়োঽস্য পাদাঃ (ঋঃ ৪-৫৮-৩ ও যজুঃ ১৬-৬১) এই মন্ত্রকে ঈশ্বর-পরক মনে করে ‘চত্বারি শৃঙ্গা’-এর অর্থ চার বেদ, ‘ত্রয়োঽস্য পাদাঃ’-এর অর্থ উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয় ইত্যাদি করা হয়েছে। যাস্ক যজ্ঞ-পরক মনে করে ‘চত্বারি শৃঙ্গা’-এর অর্থ বেদ করেছেন, কিন্তু অবশিষ্ট পদগুলির অর্থ যজ্ঞ-বিষয়ক করেছেন। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি মন্ত্রের অর্থ শব্দ-পরক করে নাম, আখ্যাত, উপসর্গ এবং নিপাতকে চারটি শিং বলেছেন।
ঈশ্বরের বিশিষ্ট গুণগুলির কারণে তাঁকে হিরণ্যগর্ভঃ, আত্মদা বলদা, প্রাণতো নিমিষিতঃ রাজা তথা যেন দ্যৌরুগ্রা পৃথিবী চ দৃঢ়া যেন স্বঃ স্তভিতং যেন নাকঃ রূপে স্মরণ করা হয়েছে। এই গুণগুলির অনুরূপই মহর্ষি দয়ানন্দ ‘কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম’-এর চারটি ভিন্ন অর্থ করেছেন।
যখন একই মন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন বেদে আসে, তখন পৃথক পৃথক বিদ্যা, বিজ্ঞান, কর্ম এবং উপাসনার দ্বারা শরীর, মন ও প্রাণের সাধনার দ্যোতক হয়। চার বেদের মুখ্য উদ্দেশ্য ঈশ্বরপ্রাপ্তি হলেও জ্ঞান, কর্ম, উপাসনা তথা বিজ্ঞান-ভেদে সেই মন্ত্র অথবা সূক্তের তৎ-তৎ বেদ অনুসারে অর্থ হয়ে যাবে। ঋগ্বেদে জ্ঞানপ্রধান, যজুর্বেদে কর্মপ্রধান, সামবেদে উপাসনাপ্রধান এবং অথর্ববেদে বিজ্ঞান-পরক অর্থ হবে। যেমন আপঃ সূক্তের মন্ত্রগুলির জল-পরক, পরমেশ্বর-পরক, নারী-পরক এবং ব্রহ্মচর্য-পরক অর্থ হয়। অশ্বত্থে বো নিষদনম্—যজুর্বেদে (৩৫-৪) এই মন্ত্রের আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে, কিন্তু ঋগ্বেদে (১০-৬৭-৫) ঔষধি-সূক্তের অন্তর্গত হওয়ার কারণে এই মন্ত্রেরই ঔষধি-পরক অর্থ রয়েছে। শুনং হুবেম মঘবান-মিন্দ্র। এই মন্ত্র ঋগ্বেদ ও সামবেদ উভয়েই এসেছে। ঋগ্বেদে রাজধর্ম-প্রকরণ হওয়ার কারণে এর অর্থ রাজা-পরক, কিন্তু সামবেদে উপাসনা-বিষয়ে এর অর্থ ঈশ্বর-পরক। এই প্রকারে বেদ-ভেদে অর্থভেদ হওয়ার কারণে পুনরুক্তি-দোষ থাকে না।
ঋষি, দেবতা, স্বর ও ছন্দ-ভেদের কারণে অর্থভেদ হওয়ার ফলেও পুনরুক্তি-দোষ থাকে না। যো হ বা অবিদিতার্ষেয়চ্ছন্দোঽধীতে যাজয়তি বা জীর্যতে বা প্রমীয়তে বা প্রমায়ুকো বা যজমানঃ স্যাত্।
অর্থাৎ ঋষি, ছন্দ ও দেবতার জ্ঞান ছাড়া যদি কেউ মন্ত্রোচ্চারণ করে অথবা যজ্ঞ করায়, তবে সে নষ্ট হয়ে যায়। সে নিজে এবং তার যজমানও মৃত্যুর গ্রাসে পতিত হন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে মন্ত্রার্থ বোঝার জন্য ঋষি, ছন্দ ইত্যাদির জ্ঞান আবশ্যক। ঋষি, দেবতা ইত্যাদির ভেদ হয়ে যাওয়ার কারণে মন্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয় এবং চিন্তন-শৈলীতে মৌলিক ভেদ হয়ে যায়। পূর্বোক্ত মন্ত্র অশ্বত্থে বো নিষদনম্-এর ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদে ছন্দ এক হওয়া সত্ত্বেও উভয়ের ঋষি ও দেবতার মধ্যে ভেদ রয়েছে। ঋগ্বেদে এর ঋষি ভিষগাথর্বণঃ এবং দেবতা ঔষধি, কিন্তু যজুর্বেদে ঋষি আদিত্যাঃ দেবাঃ এবং দেবতা বায়ুঃ সবিতা। সেই অনুসারেই অর্থভেদ হওয়ার কারণে পুনরুক্তি-দোষের নিরাকরণ হয়ে যায়। দেবতাভেদে তো একটি একটি মন্ত্রের একাধিক অর্থ হয়ে যায়। তখন তাদের মধ্যে পুনরুক্তি-দোষ থাকে না।
বেদ সমস্ত বিদ্যার ভাণ্ডার। এই বিদ্যাগুলি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। গণিত, জ্যোতিষ, পদার্থবিদ্যা তথা বাস্তুকলা পরস্পর স্বতন্ত্র বিদ্যা, কিন্তু তবুও একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। গণিত ছাড়া কারও গতি নেই। কোনো বিষয়েরই বিবেচনা করতে গেলে গণিতের উল্লেখ না করে থাকা যাবে না। বাস্তুকলার আলোচনায় রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার আলোচনা অবশ্যই হবে। দর্শন বিজ্ঞানের উপর এবং বিজ্ঞান দর্শনের উপর নির্ভরশীল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রসায়নশাস্ত্র পাশাপাশি চলবে। সংসারের প্রত্যেক পদার্থ ও জ্ঞান একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে একটির কাজ অন্যটি ছাড়া চলতে পারে না। আমরা কোনো বিষয়ের যত বিশদ বিবেচনা করব, বিবেচ্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলির ততই অধিক দিগ্দর্শন করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারেই একটি বিষয়ের মন্ত্র বিভিন্ন বিষয়ের বিবেচনায় সহায়ক হওয়ার জন্য বহু স্থানে উদ্ধৃত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সেগুলি পুনরুক্ত বলে মনে হয়, কিন্তু বস্তুত সেখানে সপ্রয়োজন হওয়ার কারণে সেগুলিকে পুনরুক্তি-দোষে দোষারোপ করা যায় না।
ধাতুর অনেক অর্থ হয়। এই কারণে সেই ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দেরও অনেক অর্থ হয়ে যায়। যেমন লভ্ ধাতুর ১৬টি অর্থ হয়—অব রক্ষণ গতিকান্তিপ্রীতিতৃপ্ত্যবগমপ্রবেশশ্রবণস্বা-ম্যর্থযাচনক্রিয়েচ্ছাদীপ্ত্যবাপ্ত্যালিঙ্গনহিংসাদানভাগবৃদ্ধিষু ॥ তথা যেখানে গত্যর্থক ধাতু থাকবে, তার জ্ঞান, গমন ও প্রাপ্তি অর্থ হবে। ঋগ্বেদে (১-৩-৭) ওমাসঃ পদের ১৬টি অর্থ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকারে একটি শব্দও অনেক ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়। ইন্দ্র পদ ভিন্ন ভিন্ন ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়ে প্রসঙ্গ অনুসারে অনেক অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে, অতএব একটি সূক্ত অথবা একটি মন্ত্রে বারবার আসা সত্ত্বেও বিভিন্ন অর্থের বাচক হওয়ার কারণে তাকে পুনরুক্ত বলা যায় না। ঋগ্বেদের (২-১৬-৬) একটি মন্ত্র হল—
বৃষা তে বজ্র উত তে বৃষা রথো বৃষণা হরী বৃষভাণ্যায়ুধা। বৃষ্ণো মদস্য বৃষভ ত্বমীশিষ ইন্দ্র সোমস্য বৃষভস্য তূষ্ণুহি ॥
এই মন্ত্রে বৃষন্ পদটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাতবার প্রয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু এর দ্বারা বৃষন্ পদের...অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থের উপর আলোকপাত হয়। যেমন বৃষভ অত্যুত্তম, বৃষা অন্যের শক্তিকে প্রতি- । বন্ধিতকারী, বৃষা বেগবান্, বৃষণা বলিষ্ঠ, বৃষভাণি শত্রুদের বলকে রোধকারী, বৃষ্ণঃ = বলকারী এবং বৃষভস্য পুষ্টিকারী। এই প্রকারে ধাতুজ মূল ভাবের সমস্ত অর্থের সঙ্গে অন্বিত হয়েও মন্ত্রগত ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের গুণগুলির প্রকাশ হয়।
যজুর্বেদের ১৬তম অধ্যায় নমঃ অধ্যায় নামে প্রসিদ্ধ। শাস্ত্রে নমঃ পদের সৎকার, অন্ন এবং দণ্ড অর্থ রয়েছে। এখানে সৎকার করার যোগ্য পদার্থগুলির সঙ্গে নমঃ-এর অর্থ সৎকার হবে, পালন করার যোগ্য বস্তুগুলির সঙ্গে অন্ন, এবং বিনাশবাচক পদগুলির সঙ্গে দণ্ড।
বিনিয়োগ অনুসারে একই মন্ত্রের বিভিন্ন যজ্ঞে তথা অবসরে প্রয়োগ হওয়ার কারণে পুনরুক্তি সদোষ থাকে না। যেমন- সন্ধ্যায় দুটি অবসরে আচমনের বিধান থাকার কারণে শন্নো দেবী ইত্যাদি মন্ত্রের পুনরুক্ত হওয়া দোষ বলে মনে করা যায় না। এই মন্ত্রেরই যখন উপাসনা-বিষয়ে বিনিয়োগ হয়, তখন দেবী আপঃ দিব্যগুণযুক্ত পরমেশ্বরের বাচক। বিজ্ঞানকাণ্ডে বিনিয়োগ করা হলে অথর্ববেদে সেই একই মন্ত্র সূক্ষ্ম জল এবং ঔষধিরূপ জলের অর্থের দ্যোতক হয়ে যায়।
উপনয়ন-সংস্কারে পঠিত আপো হি ষ্ঠা ময়োভুবঃ ইত্যাদি যজুর্বেদের (৩৬।১৪-১৬) তিনটি মন্ত্র বিবাহ-সংস্কারেও বিনিযুক্ত হয়েছে। মম ব্রতে তে হৃদয়ং বধামি ইত্যাদি গৃহ্যসূত্রের এই মন্ত্র সামান্য পার্থক্যসহ উপনয়ন, বেদারম্ভ তথা বিবাহ-সংস্কারগুলিতে প্রয়োগ করা হয়েছে। বিনিয়োগ অনুসারে অর্থভেদ হওয়ার কারণে এই প্রকার পুনরুক্তিকে দোষ বলে মনে করা যায় না।
প্রয়োজনের সিদ্ধি হওয়া পর্যন্ত অভ্যাসের নিরন্তরতা প্রত্যাশিত। যতক্ষণ সাক্ষাৎকার না হয়। ততক্ষণ প্রত্যাশিত সাধনগুলির আবৃত্তি আবশ্যক। যতক্ষণ চাল বের না হয়, ততক্ষণ ধান ভানা চলতে থাকে। এই প্রকারে ব্রহ্মের সাক্ষাৎকারের জন্য যোগাঙ্গগুলির বারবার অনুষ্ঠান করতে হয়। একবার উপদেশ থেকে যে জ্ঞান হয়, তা কেবল শব্দজ্ঞান। শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন। ছাড়া অভীষ্টের সিদ্ধি সম্ভব নয়।
উপদেশকে আবশ্যক জেনে তাকে বারবার বলা হয়। তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু-এর বারবার কথন মনের পবিত্রতার উপর জোর দেওয়ার জন্য করা হয়। রাষ্ট্রদা রাষ্ট্রং মে দেহি তথা অর্চন্তনু স্বরাজ্যম্-এর মতো বচনগুলির আবৃত্তি জাতীয়তা তথা দেশভক্তির ভাবনাকে পুষ্ট করার জন্য করা হয়েছে। তেভ্যো নমো...... জম্ভে দধ্মঃ - বিভিন্ন দিকের পৃথক পৃথক অধিপতি, রক্ষক তথা ইষবঃ-এর সঙ্গে যুক্ত করে এই পদগুলির বারবার আবৃত্তির উদ্দেশ্য হল- উপাসকের হৃদয়ে ঈশ্বরের ব্যাপকতা, তাঁর গুণ, কর্ম তথা সামর্থ্য জেনে তাঁর ন্যায়ের প্রতি বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণের ভাবনাকে দৃঢ় করা। উপদেষ্টার মতো বেদগুলির উপদেষ্টা পরমেশ্বরের বারবার উপদেশ দেওয়া নিষ্প্রয়োজন না হয়ে অভ্যাসার্থ হওয়ার কারণে পুনরুক্ত হলেও নির্দোষ।
অধ্যাপক যখন কোনো বিষয় অধ্যয়নকারীর মনে বদ্ধমূল করতে চান, তখন তিনি তাকে কখনও সেই একই শব্দে এবং কখনও সেই অর্থের দ্যোতক ভিন্ন শব্দে বারবার বলেন। মহাভাষ্যের প্রসঙ্গ-পুনরুক্তির বিষয়ে বৈয়াকরণদের মত হল যে আচার্য পতঞ্জলি যে বিষয়টি অধ্যেতাদের হৃদয়ে সম্যক্ প্রকারে অঙ্কিত করতে চান, সেই বিষয়ের সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ প্রসঙ্গানুসারে বহুবার পুনরাবৃত্তি করেন। শবরস্বামীও মীমাংসা-ভাষ্যে ছাত্রদের লাভের জন্য করা প্রসঙ্গ-পুনরুক্তিকে সার্থক মনে করেছেন। মহর্ষি পতঞ্জলি অস্য সূত্রস্য শাটকং বয়েতি এই দৃষ্টান্তটি বহু স্থানে দেন। তিনি কি অন্য কোনো দৃষ্টান্ত পেতে পারতেন না? কিন্তু একই দৃষ্টান্ত বারবার দেওয়ার ফলে অধ্যাপনার কাজ সহজ হয়ে যায়, কারণ নতুন দৃষ্টান্ত বুঝতে প্রতিবার অকারণেই অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। লোকেও অধ্যাপক কোনো বোধগম্য অর্থকে কোনো নির্দিষ্ট শব্দের দ্বারা একবার বলে অধ্যাপনার কাজ সম্পন্ন করতে পারেন না। তাঁকে কখনও একই শব্দ বহুবার বলে এবং কখনও বিভিন্ন শব্দ ও পদ্ধতির দ্বারা নিজের কথা বোঝাতে হয়। ছাত্রকেও নিজের অধীত পাঠ- শব্দ ও অর্থ উভয় রূপে বারবার বলে মনে রাখতে হয়। এই একই শৈলী পূর্বেষামপি গুরু-পরমেশ্বরের উপদেশেও এখানে-সেখানে দৃষ্টিগোচর হয়। এই প্রকারের বারবার কথনকে শাস্ত্রে অভ্যাস বলা হয়েছে। অভ্যাসকে পুনরুক্তি-দোষ মনে করা হয় না, তা অধ্যাপক-গুরু বা উপদেষ্টার দ্বারা হোক অথবা অধ্যেতা বা উপদেশ্য দ্বারা। কখনও কখনও শব্দ ও অর্থ উভয়ের মধ্যে সমানতা প্রতীয়মান হয়, কিন্তু গভীরভাবে বিবেচনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। শব্দের বিশ্লেষণ করলেই রহস্য উন্মোচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ-
ঋগ্বেদের (৪-৫৭-২) পর্জন্যকে বলা হয়েছে যে তিনি আমাদের এমন জলধারা প্রদান করুন, যা মধুমান্-ও হবে এবং মধুশ্চুত-ও হবে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে এখানে একই ঋচায় সমার্থক দুটি পদ এসে যাওয়ার কারণে পুনরুক্তি-দোষ দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবে এই দুটি পদের অর্থে পার্থক্য রয়েছে। এমন আবশ্যক নয় যে যা মধুমান্, তা মধুস্রাবীও অবশ্যই হবে। এমন ব্যক্তির অভাব নেই, যারা ধনবান্ তো হন, কিন্তু ধনের বর্ষণ-দান করেন না। এই বেদমন্ত্রে পর্জন্যের কাছে এমন জলধারা কামনা করা হয়েছে, যা নিজেও মধুর ও শুদ্ধ এবং বনস্পতি ইত্যাদিকে মধুর রসে আপ্লুতকারী হবে।
এই প্রকারে হিরণ্যরূপঃ স হিরণ্যসন্দৃক্ (ঋঃ ২-৩৫-১০) ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নিকে হিরণ্যরূপ এবং হিরণ্যসন্দৃক্ বলা হয়েছে। সমার্থক বলে প্রতীয়মান হলেও নিরুক্তকার এখানে পুনরুক্তি-দোষ মনে করেন না। তাঁর মতে এই দুটি শব্দের অভিপ্রায়ের মধ্যেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এমন আবশ্যক নয় যে যার রূপ সোনার মতো, তাকে সোনার মতো দেখাতেও হবে। শত্রু যতই সুন্দর অথবা গুণবান্ হোক না কেন, তবুও সে কুৎসিত ও গুণহীনই প্রতীয়মান হবে।
এই প্রসঙ্গে এই দুটি মন্ত্র দ্রষ্টব্য-
প্রিয়ং মা কৃণু দেবেষু প্রিয়ং রাজসু মা কৃণু । প্রিয়ং সর্বস্য পশ্যত উত শূদ্র উতায়ে ।। অথর্বঃ ১৬।৬২।১
রুচং নো ধেহি ব্রাহ্মণেষু রুচং রাজসু নস্কৃধি । রুচং বিশ্যেষু শূদ্রেষু ময়ি ধেহি রুচা রুচম্ ॥ - যজুঃ ১৮/৪৮
উপর থেকে দেখলে এই দুটি মন্ত্রের একই অর্থ প্রতীয়মান হওয়ার কারণে এখানে পুনরুক্তি-দোষ বলা যেতে পারে। প্রথম মন্ত্রে সকলের প্রিয় হওয়ার প্রার্থনা রয়েছে, তো দ্বিতীয়টিতে সকলের প্রতি রুচি ও প্রেম রাখার প্রার্থনা রয়েছে। কিন্তু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলে উভয় মন্ত্র পৃথক পৃথক ভাবের দ্যোতক বলে মনে হয়। প্রথম মন্ত্রে যেখানে অন্যদের কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার কামনা রয়েছে, সেখানে দ্বিতীয় মন্ত্রে নিজে অন্যদের ভালোবাসার ইচ্ছা রয়েছে। উভয় দিক থেকে ভালোবাসা হলেই প্রেমের পরিপাক হয়। এই প্রকারে ভাব ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতার কারণে অর্থভেদ হয়ে যায়, যার ফলে সেখানে পুনরুক্তি-দোষ থাকে না।
পুনরুক্তির একটি উদ্দেশ্য কোনো অভীষ্ট অর্থের প্রতি আধিক্য প্রদর্শন করা; তার মধ্যে শ্রদ্ধার আধিক্য উৎপন্ন করাও হয়। ঋগ্বেদ মণ্ডল ১০ সূক্ত ১১৬-এর প্রত্যেক মন্ত্রের শেষে কুবিৎসোমস্যাপামিতি শব্দগুলির আবৃত্তি করা হয়েছে। এই সূক্তের প্রত্যেক মন্ত্রের শুরুতে ভগবানের ভক্তির দ্বারা আবির্ভূত ভক্ত নিজের ভাব-বিহ্বলতার উল্লেখ করতে করতে শেষে বলেন যে আমার এই উচ্ছ্বাসের কারণ হল, আমি কুবিৎসোমস্যাপামিতি—ভরপেট সোমরস পান করেছি। প্রভুভক্তিরূপী সোমরস পান করে প্রাপ্ত অসীম ও অদ্ভুত সামর্থ্যের প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্যই বারবার এমন বলা হয়েছে। তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু, কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ইত্যাদি বাক্যের পুনরাবৃত্তিরও এই একই প্রয়োজন।
কখনও কখনও হৃদয়ের ভাবাবেগের অভিব্যক্তির জন্যও পুনরুক্তির প্রয়োজন হয়। ঋগ্বেদের (৪-৩২-২০) মন্ত্র হল-
ভূরিদা ভূরি দেহি নো মা দাং ভূর্যা ভর। ভূরি ঘেদিন্দ্র দিত্সসি ॥
হে প্রভু ! আপনি অনেক দাতা। আমাদের অনেক দিন। কম নয়, অনেক দিন। সত্যিই আপনি অনেক বড় দাতা। যুক্তি দিয়ে দেখলে যখন ভূরিদা বলে দেওয়া হয়েছে, তখন ভূরি দিত্সসি বলা বৃথা। এই প্রকারে যখন ভূরি দেহি বলে দেওয়া হয়েছে, তখন মা বনং ভূর্যা ভর বলা বৃথা। কিন্তু দাতা ও যাচক অথবা ভগবান ও ভক্তের মধ্যে যুক্তি চলে না, কারণ সেখানে ভাবনা প্রধান হয়। এই প্রকারের বচনগুলির দ্বারা ভগবানের প্রতি ভক্তের আস্থা, ব্যাকুলতা তথা প্রার্থনা পূর্ণ হওয়ার বিশ্বাস প্রকাশিত হয়। এই প্রকারের ভাবনা অথর্ববেদের (৬-১৬-১) এই মন্ত্রে পাওয়া যায়-
পুনন্তু মা দেবজনাঃ পুনন্তু মনবো ধিয়া। পুনন্তু বিশ্বা ভূতানি পবমানঃ পুনন্তু মা ॥
ভয়, শঙ্কা, শোক, অসূয়া, হর্ষ, বিস্ময়, ত্বরা, উৎসাহ ইত্যাদির প্রদর্শনের জন্যও পুনরুক্তিকে দোষ বলে মনে করা হয় না। এটি কাব্যশাস্ত্রের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত, যেমন আচার্য ভামহ ও দণ্ডীর এই বচনগুলি থেকে প্রমাণিত হয়-
হর্ষবিস্ময়য়োরপি । ভয়শোকাভ্যসূয়াসু যথাহ গচ্ছ গচ্ছেতি পুনরুক্তং ন তদ্বিদুঃ ॥ কাব্যালঙ্কার ৪-১৪
অনুকম্পাদ্যতিশয়ো যদি কশ্চিদ্ বিবক্ষ্যতে । ন দোষঃ পুনরুক্তোঽপি প্রত্যুতেয়মলঙ্ক্রিয়া ॥ - কাব্যাদর্শ ৩-১৩৭
বেদের অনেক পুনরুক্তি এই অর্থগুলিতে আসার কারণে নির্দোষ।
বৈদিক মত অনুসারে বেদের রচয়িতা ঈশ্বর এবং পাশ্চাত্য মত অনুসারে মানুষ, কিন্তু উভয় অবস্থাতেই রচয়িতা কবি। কবিরাও ছন্দ মেলানো ব্যক্তি নন। ঈশ্বর কবিরূপে মনীষী, তো মানুষ সূক্ষ্মদ্রষ্টা ঋষি। কবির রচনা কাব্য বলে পরিচিত হয়। যদি কালিদাস আদি কবিদের কাব্যে পদ, চরণ, শ্লোকার্ধ অথবা সম্পূর্ণ শ্লোক একইভাবে বহুবার প্রয়োগ হওয়া সত্ত্বেও পুনরুক্ত বলে মনে করা না হয়, বরং অলঙ্কার-যোজনা অথবা অন্য অর্থের বোধের জন্য আবশ্যক মনে করা হয়, তবে বেদরূপী কাব্যে সেগুলিকে দোষাবহ বলে কীভাবে মনে করা যেতে পারে? ভেঙ্কট মাধবের অনুসারে-
আবর্তয়ন্তি সূক্তীশ্চ যথাঽর্চন্ননু স্বরাজ্যম্ ।
অনেক স্থানে (গীতিকাব্যের সিদ্ধান্ত অনুসারে) সূক্তিগুলির আবৃত্তি হয়। যেমন-অর্চন্ননু স্বরাজ্যম্।
ভেঙ্কট মাধব ‘শব্দাবৃত্ত্যানুক্রমণী’-তে লিখেছেন-
এবং চ পূরণঃ পাদো নি স্থিরাণি চিদোজসা । অভ্যাসাম্ননু চাত্রাপি ভূয়ানর্থঃ প্রতীয়তে ॥ ৪-১-১১
অর্থাৎ ঋগ্বেদের (১-১২৭-৪) যে পদ-পুনরুক্তি রয়েছে, তা অভ্যাসের দ্বারা ভূয়ান্ বিশেষ অর্থের প্রতীতির উদাহরণ।
ঋগ্বেদের (১-১২৬-৬) থেকে মন্ম রেজতি তথা অব স্রবেত্ পুনরুক্ত হয়েছে। এর সমাধান করতে গিয়ে নিরুক্তকার বলেন-অভ্যাসে ভূয়াংসমর্থং মন্যন্তে যথাহো দর্শনীয়াঽহো দর্শনীয়—অর্থাৎ যেখানে পুনরুক্তির দ্বারা অর্থে চমৎকার এসে যায়, সেখানে তা বাঞ্ছনীয়। যেমন অহো দর্শনীয় দুবার বলার ফলে দৃশ্য পদার্থে বিশেষ চমৎকারের অনুভূতি হয়। চমৎকার কাব্যের প্রাণ, যা অলঙ্কার-যোজনার দ্বারা উৎপন্ন হয়। শ্লেষালঙ্কারে একটি শব্দের একই সময়ে দুটি অর্থ প্রত্যাশিত হয়। যমকে একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে একাধিকবার প্রয়োগ করা হয়। এই প্রকারে অনুপ্রাসের বিভিন্ন ভেদ দ্বারা কাব্যে অভিনব সৌন্দর্যের প্রাপ্তি হয়। কবয়ামি বয়ামি যামি - (কবিতা করি, বুনি, যাই) এখানে তিনটি পদের অলঙ্কারপূর্ণ যোজনার দ্বারা যে চমৎকার উৎপন্ন হয়েছে, তা পুনরুক্তির কারণেই হয়েছে, যা কেবল নির্দোষই নয়, বরং সৌন্দর্যের উৎপাদক।
বেদে পুনরুক্তিকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন হেতু উপস্থাপন করার পর আমরা ব্যাকরণশাস্ত্র থেকে একটি প্রমাণ উপস্থাপন করি। ভারতীয় বৈয়াকরণরা তো অর্ধমাত্রালাঘবেন পুত্রোৎসবং মন্যন্তে বৈয়াকরণঃ এই উক্তির দ্বারা পাণিনিমুনির রচিত অষ্টাধ্যায়ীর স্বল্পাক্ষর রচনা-পদ্ধতির প্রশংসা করেনই, পাশ্চাত্য বিদ্বানরাও তার সূক্ষ্মৈক্ষিকাপূর্ণ বিশিষ্ট রচনায় মুগ্ধ। সেই অষ্টাধ্যায়ীতেও পুনরুক্ত সূত্রের অভাব নেই, অতএব বেদের পুনরুক্তি নির্দোষ হওয়ার পক্ষে অষ্টাধ্যায়ীর উপর ভিত্তি করে একটি হেতু দেওয়া হয়-
পাণিনীয় অষ্টাধ্যায়ীতে এমন অনেক সূত্র রয়েছে, যেগুলি একই শব্দানুপূর্বীতে একাধিকবার পাঠ করা হয়েছে। বৈদিক ব্যাকরণের লৌকিক ব্যাকরণ থেকে ভিন্নতা ও বিশেষত্ব বোঝানোর জন্য ‘বহুলং ছন্দসি’ সূত্রটি এই একই আনুপূর্বীতে ১৪ বার পাঠ করা হয়েছে। একবার তো সেটি ২-৪-৭৩-এর পরে ২-৪-৭৬-এ, অর্থাৎ মাত্র দুটি সূত্রের পরেই আবার পাঠ করা হয়েছে। কিন্তু প্রসঙ্গভেদের কারণে প্রত্যেক প্রসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হয়। এই শব্দাত্মক পুনরুক্তিকে অনর্থক বলা যায় না। সূত্র-পুনরুক্তির মতো পদ-পুনরুক্তির (যেমন তদধীতে তদ্ বেদ-৪-২-৫৬) তথা অর্থ-পুনরুক্তির (যেমন বিশেষণং বিশেষ্যেণ বহুলম্ -২-১-৫৭)-ও অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। আবার বেদমন্ত্র তো ব্যাকরণের সূত্র নয়, কাব্য। সেখানে কাব্যোচিত পুনরুক্তি সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ হবে।

