ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

13 May, 2026

ইসলামের পাঁচস্তম্ভ

13 May 0

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ

পাঁচটি মূল নীতি ও ধর্মাচরণের উপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে। এদেরকে বলা হয় ইসলামের ভিত্তি বা পাঁচ স্তম্ভ। এগুলো হলো (১) কলেমা, (২) নামাজ, (৩) রোজা, (৪) জাকাত ও (৫) হজ।

প্রথম স্তম্ভ কলেমা:

কলেমা হল ইসলামের ছয়টি মূল মন্ত্র, যথা (১) কলেমা তৈয়ব, (২) কলেমা শাহাদাৎ, (৩) কলেমা তৌহীদ, (৪) কলেমা তামজীদ, (৫) কলেমা রদ্দে কুফর এবং (৬) কলেমা তাহমীদ। এই ছয়টি কলেমায় বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান। ঈমান শব্দের অর্থ হল বিশ্বাস। কাজেই কলেমায় দৃঢ় ও আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন না করলে কেউ ঈমানদার বা বিশ্বাসী মুসলমান হতে পারে না। উপরিউক্ত ছয়টি কলেমার মধ্যে প্রথম কলেমা বা কলেমা তৈয়ব সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং বলা যায় ইসলামের প্রাণ।

The Five Pillars of Islam

কলেমা তৈয়ব

এই কলেমার মন্ত্র হল, "লা ইলাহা ইল্লাল্লা, মহম্মদুর রসুলুল্লা”, অর্থাৎ আল্লা ব্যতীত উপাস্য নেই, মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল। কাজেই এই কলেমায় বিশ্বাস স্থাপন করার অর্থ হল, একেশ্বর আল্লায় বিশ্বাস এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে মহম্মদের নবীত্বে বিশ্বাস করা। এই কারণেই এই কলেমার গুরুত্ব এত অপরিসীম। এই কলেমাতে অবিশ্বাসী হলে কোন মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, তৎক্ষণাৎ কাফের হয়ে যাবে। এই কারণেই আল্লা কোরানে বলেছেন, "আল্লা ও তাঁর রসুলের অনুগত হও” أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ (৩/৩২) এবং "যারা আল্লা ও তাঁর রসুলকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে" (৭২/২৩)। কাজেই সেই ব্যক্তিই ঈমানদার, যে আল্লাকে তার প্রভু, ইসলামকে তার ধর্ম ও মহম্মদকে রসুলরূপে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেছে। এই কলেমায় এটাও পরিষ্কার হচ্ছে যে, শুধু আল্লায় বিশ্বাস করলেই কেউ মুসলমান হতে পারে না। মহম্মদ যে আল্লার রসুল, সেটা বিশ্বাস করাও জরুরি। “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” সরাসরি এসেছে সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৯ আয়াতে।

কলেমা শাহাদাৎঃ

এই কলেমার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লা ছাড়া কোন উপাস্য নেই; তিনি এক এবং তাঁর কোন অংশী নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে নিশ্চয়ই মহম্মদ তাঁর বান্দা ও রসুল।"

কলেমা তৌহীদ:

এর বাংলা অর্থ হল, "(হে আল্লা) আপনি ভিন্ন কোন উপাস্য নেই, আপনি অদ্বিতীয় এবং আপনার কোন অংশী নেই। রসুল মহম্মদ ধর্মভীরুগণের নেতা এবং বিশ্বপালক কর্তৃক প্রেরিত।"

কলেমা তামজীদ:

এই কলেমার বাংলা অর্থ হল, “(হে আল্লা) আপনি ভিন্ন কোন উপাস্য নেই। আপনি জ্যোতির্ময় আল্লা এবং আপনি আপনার জ্যোতি দ্বারা যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। হজরত মহম্মদ প্রেরিত পুরুষগণের মধ্যে অগ্রগণ্য ও শেষ নবী।" প্রথম কলেমার পরেই এই চতুর্থ কলেমার গুরুত্ব। কারণ এই কলেমায় ইসলামের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে আর তা হল, মহম্মদ নবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী। মুসলমানদের মধ্যে কেউ নিজেকে নবী বলে ঘোষণা করলে এই কলেমার বলেই তাকে কাফের বলে চিহ্নিত করা হয় এবং হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে একজন দরবেশ মীর্জা আহম্মদ নিজেকে নবী বলে প্রচার করায় তাকে হত্যা করা হয় এবং সমগ্র আহম্মদী সম্প্রদায়কে কাফের বলে চিহ্নিত করা হয়। আজও এই সম্প্রদায়ের লোকেরা পাকিস্তানে কাফের ও অ-মুসলমান বলে গণ্য ও পরিত্যক্ত। অথচ মীর্জা আহম্মদ নবী মহম্মদকে কখনই অস্বীকার করেননি, বরং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নবী বলে মেনে নিয়েছিলেন। এই কলেমার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এই যে, এর ফলেই কোরান এবং হাদিসের কোন সংশোধন সম্ভব নয়। আর নবী না জন্মালে কে সংশোধন করবে?

কলেমা রদ্দে কুফর

এর বাংলা অর্থ হল, "(হে আল্লা) আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি যেন কাউকে আপনার শরীক না করি। আমার জ্ঞানের গোচর ও জ্ঞানের অগোচর সমস্ত পাপের জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং অনুতাপ (তওবা) করছি। আমি আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করছি এবং বলছি যে, আল্লা ভিন্ন উপাস্য নেই এবং মহম্মদ আল্লার প্রেরিত রসুল।" এই কলেমা সম্পর্কে দু একটি কথা বলার আছে। এতে বান্দা আল্লার কাছে প্রতিজ্ঞা করছে যে, সে আল্লার অংশী বা শরীক সৃষ্টি করবে না। এই কারণেই মুসলমানরা বলে যে, এক আল্লা ছাড়া আর কারও কাছে

তারা মাথা নত করে না বা সিজদা করে না। এই কলেমার জন্যই তারা দেশ-মাতৃকাকে প্রণাম করে না এবং "বন্দে মাতরম্" গাইতে অস্বীকার করে।

“কলেমা রদ্দে কুফর” ইসলামী সমাজে প্রচলিত একটি দোয়া/কলেমা হিসেবে পরিচিত। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— এটি কোরআনের সরাসরি আয়াত নয় এবং সহীহ হাদিসে “ইসলামের বাধ্যতামূলক ছয় কলেমা” হিসেবে একত্রে উল্লেখও পাওয়া যায় না। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মশিক্ষার অংশ হিসেবে এগুলো বেশি প্রচলিত।

ইসলামের পাঁচস্তম্ভ
প্রচলিত “কলেমা রদ্দে কুফর” হলোঃ

“আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইওঁ ওয়া আনা আ’লামু বিহি, ওয়া আসতাগফিরুকা লিমা লা আ’লামু বিহি, তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল কুফরি ওয়াশ্ শিরকি ওয়াল কিযবি ওয়াল গীবাতি ওয়াল বিদআতি ওয়ান্ নামীমাতি ওয়াল ফাওয়াহিশি ওয়াল বুহতানি ওয়াল মা’আসী কুল্লিহা, ওয়া আসলামতু ওয়া আকুলু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”

বাংলা অর্থঃ
“হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে আপনার সঙ্গে কাউকে শরীক করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আর না জেনে যে গুনাহ করেছি তার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আমি কুফর, শিরক, মিথ্যা, গীবত, বিদআত, চোগলখোরি, অশ্লীলতা, অপবাদ ও সব পাপ থেকে তওবা করছি। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং বলছি— আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।”

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কোরআনের আয়াতঃ

📖 শিরক সম্পর্কে
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না…”
— সূরা আন-নিসা ৪:৪৮

📖 তওবা সম্পর্কে
“তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”
— সূরা আন-নূর ২৪:৩১

📖 একত্ববাদ সম্পর্কে
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক।”
— সূরা ইখলাস ১১২:১

অর্থাৎ “কলেমা রদ্দে কুফর”-এর মূল বিষয়গুলো— শিরক থেকে বাঁচা, তওবা করা, এবং তাওহীদের ঘোষণা— কোরআন ও ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পুরো কলেমাটি নিজে কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত নয়।

কলেমা তাহমীদ:

এর বাংলা অর্থ হল, "পবিত্র ও সর্বশক্তিমান আল্লাতায়লাকে সকল প্রশংসার সাথে স্মরণ করছি। তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছি এবং আমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।"

এর পর রয়েছে দুটো বিশ্বাসের শপথ যার মাধ্যমে বান্দা আল্লা, তাঁর রসুল, ধর্মশাস্ত্র, কেয়ামত ইত্যাদি সব কিছুর উপর বিশ্বাসের শপথ গ্রহণ করে। দুটো শপথ বাক্যের নাম (১) ঈমান মুজমাল ও (২) ঈমান মুফাচ্ছল। ঈমান মুজমালের বাংলা করলে দাঁড়ায়, "আমি সর্ববিধ নাম ও গুণবিশিষ্ট আল্লার উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং তাঁর আদেশ ও বিধানসমূহ মেনে নিলাম।” ঈমান মুফাচ্ছল এর বাংলা অর্থ, "আমি আল্লা, তাঁর ফেরেস্তাগণ, তাঁর কেতাবসকল, তাঁর প্রেরিত রসুলগণ, কেয়ামত, তকদীর (ভাগ্য) এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবন লাভ ইত্যাদি সকল বিষয়ের উপর ঈমান আনলাম, বিশ্বাস স্থাপন করলাম।"

উপরিউক্ত কলেমাগুলি থেকে এটা পরিষ্কার হচ্ছে যে, শুধু আল্লায় বিশ্বাস করলেই মুসলমান হওয়া যায় না, সেই সঙ্গে সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, মহম্মদ আল্লার রসুল। অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে, সে কোন আল্লায় বিশ্বাস করলে হবে না, মহম্মদ যে আল্লার রসুল সেই আল্লাতেই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। অনেক সময় আল্লায় বিশ্বাস করার চাইতে মহম্মদের নবীত্বে বিশ্বাস স্থাপন করাটাই বেশী জরুরী বলে মনে হয়। কারণ মহম্মদের মতে সে ব্যক্তি এখনও প্রকৃত বিশ্বাসী হয়ে ওঠেনি যে নাকি নিজের সন্তান-সন্ততি, বাবা-মা, তথা সমগ্র মানবসমাজের থেকেও মহম্মদকে বেশী ভাল না বাসে (মুসলীম-৭১)।

হিন্দু ধর্ম মানুষের নৈতিক চরিত্রের উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। হিন্দু ধর্মমত অনুসারে আধ্যাত্মিক প্রাপ্তির মূল সোপানই হল নৈতিক চরিত্র। কিন্তু ইসলাম সে কথা বলে না। ইসলামী মতে যে কলেমা গ্রহণ করে ঈমান এনেছে বা মুসলমান হয়েছে, নৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত অধঃপতিত হলেও তার অক্ষয় স্বর্গবাস সুনিশ্চিত। এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে কলেমার গুরুত্ব অপরিসীম এবং শুধুমাত্র "লা ইলাহা ইল্লাল্লা........" কলেমা গ্রহণ করার জন্যই কেয়ামতের দিন মহম্মদ তাঁর ৭০ হাজার উম্মত সহ সকলের আগে স্বর্গে প্রবেশ করবেন (মুসলীম-৬৬৬৮)। মহম্মদ বলতেন যে, একদিন ফেরেস্তা জিব্রাইল এসে তাঁকে বললেন, "আপনার উন্মত (শিষ্য)-দের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লার কোন খোঁজ-খবর রাখে না সেও স্বর্গে প্রবেশ করবে।" একদিন তাঁর এক উন্মত আবুজার তাঁকে প্রশ্ন' করল, " সে ব্যক্তি যদি চোর কিংবা ব্যভিচারী হয় তাহলেও কি সে স্বর্গে প্রবেশ করবে?" মহম্মদ বললেন, হ্যাঁ, তাহলেও সে স্বর্গে প্রবেশ করবে" (মুসলীম-১৭১)। এখানে স্মরণ করা প্রয়োজন যে, চুরি করা ও ব্যভিচার করা ইসলামে ঘোরতর পাপ এবং তার শাস্তি হল, চোরের ডান হাত কেটে ফেলা এবং ব্যভিচারীকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা।

এ সব ব্যাপারে ইসলামী সিদ্ধান্ত হল, "আল্লার দৃষ্টিতে সব থেকে গুরুতর পাপ হল আল্লার অংশী সৃষ্টি করা, তারপর গুরুতর পাপ হল আপন শিশু সন্তানকে হত্যা করা এবং তার পরের গুরুতর পাপ হল (মুসলমান) প্রতিবেশীর পত্নীর সঙ্গে ব্যভিচার করা" (ঐ ১৫৬)। কাজেই একজন অংশীবাদী কাফের যত ভাল কাজই করুক না কেন, আল্লার অংশী সৃষ্টি করার পাপের জন্য তার সমস্ত পুণ্যের কাজই নিষ্ফল হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে একজন মুসলমান যত পাপই করুক না কেন, অংশীবাদের পাপে লিপ্ত না হবার দরুন তার কোন পাপই পাপ বলে গ্রাহ্য হবে না। এই কারণেই মুসলমানরা বলে থাকে যে, গান্ধীর চাইতে একজন অধঃপতিত মুসলমানও শ্রেষ্ঠ।

ইসলামী মতে পথটাই আসল, ভুল পথে চলে পুণ্য করা অসম্ভব। কলেমায় বিশ্বাস করে ঈমান আনাই সঠিক পথ এবং সেই সঠিক পথের পথিক না হলে শত পুণ্যের কাজ কোন কাজে আসবে না। একদিন মহম্মদের এক পত্নী বিবি আয়েশা তাঁকে বললেন যে, তার এক পৌত্তলিক আত্মীয় আছে যে গরীব-দুঃখীদের খাওয়ায় এবং আরও অনেক ভাল ভাল কাজ করে। এইসব ভাল কাজ কেয়ামতের দিন তার কি কোন কাজে আসবে? মহম্মদ জবাব দিলেন, "না, কোন কাজে আসবে না” (ঐ-৪১৬)। আল্লার অংশী সৃষ্টি করার পাপের জন্য মহম্মদ তাঁর বাবা, মা ও নিকট আত্মীয়দের প্রতিও ছিলেন সমান কঠোর এবং বলতেন যে, "তারা সবাই নরকের আগুনে রয়েছে” (ঐ-৩৯৮,৪১৭)। কোন পৌত্তলিক যদি তার অংশীবাদী ধর্ম ত্যাগ করে কলেমার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করে তবে তার পুরাণো পাপ ধুয়ে যায় কিন্তু পুণ্যটা থেকে যায় (ঐ-২২০,২২৩)। অর্থাৎ অংশীবাদী থাকার ফলে যে পুণ্যের কাজ আল্লা এতদিন কবুল করতে পারছিলেন না, কলেমা গ্রহণ করার সাথে সাথে তিনি তা কবুল করবেন। কারণ সে ব্যক্তি এখন সঠিক পথের পথিক হয়েছেন। ঠিক সেই রকম এমন অনেক কাজ আছে যা পৌত্তলিক অবস্থায় করলে পাপ হয়, কিন্তু কলেমা গ্রহণ করে মুসলমান হবার পর করলে পাপ হয় না। যেমন লুঠপাঠ করে অপরের জিনিস অংশীবাদী অবস্থায় গ্রহণ করলে তাতে পাপ হয়, কিন্তু কলেমা গ্রহণকারী মুসলমানের ক্ষেত্রে আল্লা তা পবিত্র ও বৈধ বলে ঘোষণা করেছেন (৮/৬৯)।

দ্বিতীয় স্তম্ভ নামাজ

ইসলামের ধর্মীয় রীতিনীতিগুলোকে একত্রে শরীয়ৎ বলা হয় এবং এই বিধিবিধানগুলোকে গুরুত্ব অনুসারে দশ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন (১) ফরজ, (২) ওয়াজেব, (৩) সুন্নত, (৪) নফল, (৫) মোস্তাহাব, (৬) মোবাহ, (৭) হারাম, (৮) হালাল, (৯) মরুহ ও (১০) মোফসেদ।

ফরজ হল অবশ্য-পালনীয় বিধি-বিধান। আল্লাতায়লা কোরান শরীফের আয়াৎ অবতীর্ণ করে যে সমস্ত বিধি-বিধান নির্দেশ করেছেন সেগুলোই ফরজ। কিন্তু কোরান শরীফে আল্লাতায়লা এমন কিছু কিছু নির্দেশ দিয়েছেন যা সবার পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। যেমন জিহাদ করা বা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসলামের রাজত্ব কায়েম করা। শিশু, বালক, বৃদ্ধ ও মহিলাদের পক্ষে জিহাদে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। এই ধরনের ফরজের নাম ফরজে কৈফায়া। এ ছাড়া অন্যান্য ফরজ, যেমন নামাজ, রোজা, অজু, গোসল (স্নান), যা সবাই করতে পারে, তাকে বলে ফরজে আয়েন। ফরজে আয়েন পালন না করলে বা তাতে অবিশ্বাস করলে সে আর মুসলমান থাকবে না, কাফের হয়ে যাবে।

[“নামাজ” কোরআনের শব্দ নয়, কিন্তু মুসলিম সমাজে “সালাত” (الصلاة) -এর স্থানীয় ভাষাগত রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।]

ওয়াজেব হল সেই সমস্ত বিধি-নিষেধ, যা কোরান শরীফে আছে এবং করা উচিত বা করতে পারলে ভাল। কিন্তু না করতে পারলে কাফের হতে হয় না। যেমন-ঈদের নামাজে যোগ দেওয়া, ঈদের দিন ফিত্রা বা ভিক্ষা দেওয়া বা ইদুজ্জোহার দিন পশু কোরবানী দেওয়া, ইত্যাদি। সুন্নত বলতে বোঝায় সেই সমস্ত বিধি-বিধান যা নবী নিজে পালন করতেন এবং অন্য বান্দাদেরও করতে পরামর্শ দিতেন। সুন্নতগুলো পালন করলে পুণ্য হবে, পালন না করলে পাপ হবে এবং তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। এর মধ্যে সে সমস্ত সুন্নত মহানবী নিয়মিত করতেন সেগুলোকে বলে সুন্নত মোয়াক্কাদা। আর যেগুলো মহানবী মাঝে মাঝে করতেন তাকে বলে সুন্নত গায়ের মোয়াক্কাদা।

মুসলমানদের ছয়টি বিশেষ সুন্নত হল (১) খৎনা দেওয়া, (২) গোঁফ কামানো, (৩) বগলের চুল কামানো, (৪) মাথার চুল মুড়িয়ে ফেলা বা ঘাড়ের উপর পর্যন্ত রেখে দেওয়া, (৫) হাত ও পায়ের নখ কাটা এবং (৬) নাভির নীচের কেশ কামানো বা পাকি করা। লিঙ্গাগ্রের চামড়া ছেদন করার নাম খৎনা দেওয়া। মহম্মদের অনেক আগে নবী হজরৎ ইব্রাহীম (বাইবেলের আব্রাহাম) আশি বছর বয়সে, নিজ হাতে কুঠার দিয়ে এই প্রথার প্রবর্তন করেন। কালে এই প্রথা শুধু ইহুদীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মদিনা বাসকালে মহম্মদ মুসলমানদের মধ্যে এই প্রথার প্রবর্তন করেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই যে, নবী মহম্মদ নিজের খৎনা করেছিলেন কি না তা রহস্যময়। মৃত্যুর পর মহম্মদের মৃতদেহকে যখন স্নান করানো হয় তখন আকাশ থেকে দৈববাণী হয় যে, মহম্মদের নগ্ন দেহ যে দেখবে সে মারা যাবে বা তার চোখ অন্ধ হবে। (5)

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, খৎনা প্রথা শুধুমাত্র পুরুষ মুসলমানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু কায়রো'র আল আঝর বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ গদ আল-হক্ আলি গদ আল-হক এর ফতোয়ার জোরে মিশরে মেয়েদেরও খৎনা করা হয় এবং তাদের যৌনাঙ্গের ক্লিটোরিস অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়। এই অস্ত্রোপচার করার সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে প্রতি বছর বেশ কিছু বালিকা সেখানে প্রাণ হারায়। গত ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার সি এন এন (CNN)-এর টেলিভিশানে এই রকম একটি অস্ত্রোপচার সারা পৃথিবীময় প্রচার করার ফলে মিশরের পার্লামেন্টে এই নিয়ে প্রবল বাদ-বিতণ্ডার সূচনা হয়। মিশরের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু বা মুফতি ঐ প্রথা বন্ধ করার পক্ষে মত দেন। কিন্তু উপরিউক্ত শেখ আলি গদ আল-হক-এর ফতোয়াকেই পার্লামেন্ট বজায় রাখে। তাই আজও এই প্রথা মিশরের মেয়েদের মধ্যে চালু রয়েছে।(6)

এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। প্রাক্ ইসলামী যুগে আরবদের মধ্যে একটা প্রথা চালু ছিল-দেবতার নামে উৎসর্গ করে কিছু কিছু পশু ছেড়ে দেওয়া হত এবং বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য ঐ সব পশুর কান ফুটো করে দেওয়া হত। পরে আল্লা এই প্রথার নিন্দা করেন এবং তাঁর সৃষ্টিকে বিকৃত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে কোরানের বাণী অবতীর্ণ করেন (৪/১১৯)। কাজেই খৎনার মাধ্যমে তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রিয় সৃষ্টি মানুষের এই অঙ্গ বিকৃতির প্রতি আল্লার উদাসীনতা সত্যিই বিস্ময়কর। তবে কেয়ামতের দিন আল্লা সবাইকে খৎনাবিহীন অবস্থায় পুনরুত্থিত করবেন।

তৎকালীন আরবের লোকেরা অন্য সকলের মতই দাড়ি কামিয়ে গোঁফ রাখত। কিন্তু মদিনাবাসকালে মহানবী তার উম্মতদের গোঁফ কামিয়ে দাড়ি রাখতে পারামর্শ দিলেন। এর ফলে সুবিধা হল এই যে, মুসলমানদের চেনা সহজ হল এবং ভুলক্রমে মুসলমানের দ্বারা মুসলমান নির্যাতিত হওয়া বন্ধ হল। নবী অবশ্য বললেন যে, এর সাহায্যে মুসলমানদের মধ্যে হৃদ্যতার প্রসার ঘটবে (মুসলীম-৫০০)। ঠিক একই কারণে মুসলমান রমণীদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য পর্দার প্রচলন করা হল (৩৩/৫৯)। কাজেই বিশ্বব্যাপী মুসলমান সমাজের পুরুষরা যে গোঁফ কামিয়ে দাড়ি রাখেন তার পিছনে কোন আধ্যাত্মিক কারণ নেই। সহজে সনাক্ত করার জন্যই এই প্রথা।                   ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(5) Life of Mahomet, Sir W. Muir, Ch. 34, P-501

(6) The Statesman-26-8-96.

মোস্তাহাব হল সেই সমস্ত বিধি-নিয়ম যা করলে পুণ্য আছে কিন্তু না করলে পাপ নেই। যেমন দোয়া, মোনাজাত ইত্যাদি পবিত্র আরবী ভাষায় করা। মোবাহ হল সেই সমস্ত বিধি-নিয়ম যা করলে পুণ্য নেই এবং না করলে পাপ নেই। যেমন-সঙ্গতি অনুসারে ভাল পোশাক-আসাক করা, ভাল খাওয়া-দাওয়া করা ইত্যাদি। যে সব কাজ হারাম বলে চিহ্নিত তা ইসলামে ভীষণভাবে নিষিদ্ধ, যেমন সুদ খাওয়া, ঘুষ খাওয়া, চুরি করা, ব্যভিচার করা, অন্য কোন মুসলমানকে হত্যা করা ইত্যাদি। আর হালাল হল সেই সমস্ত কাজ যা ইসলামে বৈধ। যেমন গনিমত বা লুঠের মাল একজন অ-মুসলমানের জন্য হারাম, কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য হালাল। সজ্ঞানে কেউ হারাম কাজ করলে সে কাফের হয়ে যাবে। তবে আজকাল অনেক মুসলমানই অনেক হারাম কাজ করছেন এবং সেই কারণে কাফের হচ্ছেন না। যেমন মদ্যপান, গান-বাজনা করা, ছবি আঁকা ইত্যাদি।

যে সব কাজ সম্পূর্ণ নিধিদ্ধ বা হারাম নয়, কিন্তু দোষাবহ, না করলেই ভাল, তাকে মকরুহ বলে। যেমন খালি গায়ে নামাজ পড়া, অজুর সময় কথা বলা, কাঁকড়া-চিংড়ি খাওয়া ইত্যাদি। শরীয়তের বিধান-বিরোধী কাজকে মোফসেদ বলে, যেমন নামাজের সময় কথা বলা, শব্দ করে হাসা বা কাঁদা ইত্যাদি। রোজার সময়, দিনের বেলায় সজ্ঞানে পানাহার করলে বা স্ত্রী সহবাস করলেও মোফসেদ হয়। তবে এ সব ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যেও যথেষ্ট মতভেদ বিদ্যমান।

যে সমস্ত কাজ করলে পুণ্য আছে কিন্তু না করলে পাপ নেই তাকে নফল বলে। যেমন, জীবনে একবার মক্কায় গিয়ে হজ করা ফরজ। কিন্তু কেউ যদি একাধিক বার হজ করে তবে তা নফল হজ হবে। তেমনি দিনে পাঁচ বার নামাজ আদায় করা ফরজ-এর অতিরিক্ত নামাজ নফল নামাজ হবে।

নামাজ একটি ফার্সী শব্দ এবং আরবীতে এর নাম “সালাত” (الصلاة / সালাহ্)। নামাজ শব্দের তিনটি অর্থ হয়, যথা-বিনয়, সিজদা ও উপাসনা। কাজেই ধর্মীয় রীতি হিসাবে নামাজকে বলা চলে সিজদা সহকারে বিনয়পূর্বক উপাসনা। পানিতে গোসল করলে যেমন শরীরের বাইরেটা পরিষ্কার হয়, তেমনি নামাজের ফলে পাপ ধুয়ে গিয়ে অন্তর সাফ হয়। নামাজের ফলে মানুষের পাপ শীতকালের গাছের পাতার মতই নিঃশব্দে ঝরে যায়। নবুয়ত বা নবীত্ব লাভের পর স্বয়ং ফেরেস্তা জিব্রাইল মহানবীকে নামাজ শিক্ষা দিয়েছিলেন।

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এই নামাজ পালন করার কতকগুলি পূর্ব শর্ত আছে। নামাজের আগে শরীরকে পাক বা পবিত্র করার জন্য অজু অথবা গোসল অথবা তায়াম্মুম্ করা ফরজ। এ ছাড়াও আছে আজান এবং এক্কামত। অল্প পানি দিয়ে হাতের কবজি পর্যন্ত এবং মুখ, ঘাড় ও পায়ের পাত, ধুয়ে ফেলার নাম অজু করা। নবী মহম্মদ যেভাবে অজু করতেন আজও মুসলমানরা ঠিক একইভাবে অজু করে থাকেন। প্রথমে দু হাত তিনবার ধুয়ে ফেলা। তারপর তিনবার মুখ ধোয়া, ডান হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার এবং বাঁ হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুয়ে ফেলা। এর পর ভিজে হাতটা মাথায় বুলিয়ে নেওয়া এবং গোড়ালি পর্যন্ত প্রথমে ডান পা ও পরে বাঁ পা ধুয়ে ফেলা (মুসলীম-৪৩৬)। ইসলামের জন্মস্থান আরবে পানীর বড়ই অভাব। আজও সেখানে পেট্রলের চাইতে পানীর দাম বেশী। তাই সেখানে অল্প পানি দিয়ে অজু করার এই রীতি চালু হয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই যে, আমাদের দেশের মুসলমানরাও অল্প জল দিয়ে অজু করাকে ধর্মীয় রীতি হিসাবে অনুকরণ করে চলেছেন।

যেখানে অজু করার মত সামান্য জলও পাওয়া সম্ভব নয়, সেখানে মাটি দিয়ে নিজেকে শুদ্ধ করে নেওয়াকে তায়াম্মুম বলে। আরবে গোসল বা স্নান করা বিলাসিতা। তাই সপ্তাহে মাত্র একদিন, জুমআ বা শুক্রবার দুপুরের নামাজের আগে গোসল করে পাক সাফ হওয়া ফরজ। গোসল, অজু অথবা তায়াম্মুম, যা করেই হোক না, শরীরকে শুদ্ধ করে না নিলে আল্লা নামাজ কবুল করেন না। কিছু কিছু অপবিত্রতা বা জুনুব-এর পরেও গোসল করে পাক সাফ হওয়া ফরজ যেমন স্ত্রী সহবাস বা জিমা, স্বপ্নস্খলন বা ইতিলাম, মেয়েদের ঋতুকাল বা হায়েজ এবং প্রসব বা নিফাস। ঘুম থেকে উঠে তিনবার নাক ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলাও ফরজ কারণ ঘুমালে শয়তান নাকের ভিতর আশ্রয় নেয়।

আজান কথার অর্থ হল নামাজের জন্য আহ্বান। নামাজের আগে মসজিদ থেকে এই আজান দেওয়া হয় এবং যিনি আজান দেন তাঁকে মুয়াজ্জীন বলে। আজকাল মাইকের দৌলতে এই আজান শুনতে আমরা অভ্যস্থ হয়েছি কিন্তু আরবী ভাষায় কি বলে বুঝতে পারি না। তাই আজানের কথা ও তার বাংলা অর্থ তুলে দেওয়া হল।

(১) "আল্লাহু আকবর" (৪বার), অর্থ আল্লাই সর্বশ্রেষ্ঠ।

(২) "আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লা" (২ বার), অর্থ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লা ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।

(৩) "আশহাদু আল্লা মহম্মদুর রসুলুল্লা" (২ বার), অর্থ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মহম্মদ আল্লার রসুল।

(৪) "হাইয়া আ' লাস্সালাহ্" (২ বার), অর্থ নামাজের জন্য এসো।

(৫) "হাইয়া আ' লালফালা" (২ বার), অর্থ মঙ্গলের জন্য এসো।

(৬) "আল্লাহু আকবর" (২ বার)।

(৭) "লা ইলাহা ইল্লাল্লা" (১বার), অর্থ আল্লাই একমাত্র উপাস্য।

৬২২ খ্রীস্টাব্দে ﷺ মহম্মদ যখন মদিনায় এলেন তখন সেখানে মুসলমানের সংখ্যা হাতে গোনা যেত। তাই নামাজের জন্য তাদের আহ্বান করার প্রয়োজন হত না। কিন্তু মুসলমানের সংখ্যা যখন বাড়তে থাকল তখন নামাজের সময় ঘোষণা করা জরুরী হয়ে পড়ল। কেউ খ্রীস্টানদের মত ঘণ্টা বাজাবার কথা বলল, কেউ ইহুদীদের মত শিঙা বাজাবার কথা বলল, আবার কেউ বা পারস্যের অগ্নি উপাসকদের মত আগুন জ্বালাবার পরামর্শ দিল। কিন্তু নবী মহম্মদ কাউকে নকল করা পছন্দ করলেন না এবং মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ নূতন, আজান দেওয়ার প্রথা চালু করলেন। বিলাল নামে মহম্মদের একজন কাফরী অনুচর ছিল যে খুব জোরে চিৎকার করতে পারত। প্রথম জীবনে বিলাল উমাইয়া বিন খালাল নামে এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিল। মুসলমান হবার জন্য কোরেশরা যখন তার উপর অত্যাচার শুরু করল তখন মহম্মদের ধনী বন্ধু আবু বকর তাকে কিনে মুক্ত করেন ও মদিনায় নিয়ে আসেন। মহম্মদ এই বিলালকে আজান দেবার কাজে নিযুক্ত করলেন এবং সেই হিসাবে বিলাল হলেন মুসলীম জগতের প্রথম মুয়াজ্জীন।

আজান শুনলে প্রত্যেক মুসলমানকে তার জবাব দিতে হয়। মনে মনে বলতে হয় যে, আল্লা যেন মহম্মদ ও তাঁর পরিবারবর্গকে স্বর্গের ওয়াসিলা নামক শ্রেষ্ঠ স্থানে জায়গা করে দেন (মুসলীম- ৭৪৭,৮০৭,৮০৮)। যে বান্দা আজান শুনে আল্লাকে তার উপাস্য, মহম্মদকে তার রসুল ও ইসলামকে তার দ্বীন (ধর্ম) ভেবে খুশী হয়, আল্লা তার সব গোনাহ মাফ করে দেন। আজানের শব্দ কানে গেলে মসজিদের নামাজে যোগ দেওয়া সব মুসলমানের ফরজ। নামাজের জন্য লোক ডাকা ছাড়াও আজানের আরও কিছু কিছু উপকারিতা আছে। আজান শুনলে শয়তান সেখান থেকে অনেক দূরে পালিয়ে যায়। মহম্মদ বলতেন যে, মদিনায় আজান দিলে শয়তান সেখান থেকে ৩৬ মাইল দূরে রহুয়ায় পালিয়ে যায়। মহম্মদের জীবিত কালে আজানের আরও একটা উপকারিতা ছিল। তিনি যখন কোন কাফের জনগোষ্ঠীকে আক্রমণ করতেন তখন তা খুব ভোর বেলায় করতেন। সেই সময় দূর থেকে যদি ফজরের আজান ভেসে আসত তাহলে নবী বুঝতে পারতেন যে, সেখানকার সবাই কাফের নয় এবং তাই আর আক্রমণ করতেন না (ঐ-৭৪৫)।

সবাই মসজিদে এসে গেলে এক্কামত পাঠ হয়। এক্কামত আর কিছুই নয়, আজানে যা বলা হয় এতেও তাই বলা হয়, শুধু "হাইয়া আ' লাসসালাহ্" র বদলে "কাদকা মাতিছ সালাহ্", বা নিশ্চয়ই নামাজ আরম্ভ হল, বলতে হয়। তবে আজানের মত অত উচ্চ স্বরে না বলে এক্কামত অনেক আস্তে বলা হয়।

কথিত আছে যে, ৬২১ খ্রীস্টাব্দের রজব মাসের ২৭ তারিখে আল্লাতায়লা ফেরেস্তা জিব্রাইলকে মহম্মদের কাছে পাঠান এবং তিনি নবীকে বোরাক নামক এক দ্রুতগতি বাহনে করে সপ্ত স্বর্গ ভ্রমণ করিয়ে আল্লার কাছে নিয়ে যান। বোরাক হল গাধার থেকে বড় কিন্তু খচ্চরের থেকে ছোট এক স্বর্গীয় জন্তু বিশেষ। মুসলমানদের মতে সমস্ত নবীগণের মধ্যে একমাত্র মহম্মদই ফেরেস্তা জিব্রাইলকে স্বচক্ষে এবং স্বরূপে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন এবং তাও একবার নয়, দুবার। প্রথম তিনি জিব্রাইলকে দেখেন যেদিন কোরান প্রথম নাযেল (অবতীর্ণ) হয় সেদিন। দ্বিতীয়বার তিনি জিব্রাইলকে দেখেন এই মেরাজ বা স্বর্গ ভ্রমণের দিন। ঐ দিন ﷺ মহম্মদ, একখানি ধনুক যতখানি দীর্ঘ, আল্লার ততখানি কাছে যান (অর্থাৎ আল্লার সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা স্থাপিত হয়)। মুসলমানদের মতে সেদিন তিনি আল্লার দর্শন লাভ করেন। এই দিনই আল্লা বিশ্বাসীদের জন্য দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন।

কথিত আছে যে, আল্লা প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন এবং স্বর্গ থেকে ফেরার পথে মহম্মদ যখন চতুর্থ স্বর্গে পূর্ববর্তী নবী হজরৎ মুসার (Moses) সঙ্গে দেখা করেন তখন মুসা বলেন যে, বিশ্বাসীদের পক্ষে দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা খুবই কঠিন কাজ হবে। তাই তিনি মহম্মদকে আল্লার কাছে ফিরে যেতে এবং নামাজের ওয়াক্ত কমাবার আর্জি পেশ করতে পরামর্শ দেন। আল্লার কাছে ফিরে গিয়ে মহম্মদ তাঁর অভিপ্রায় জানালে আল্লা প্রথমে কিছুতেই রাজী হতে চাইলেন না বরং বললেন যে, তাঁকে উপাসনা করাই তো মানুষের একমাত্র কাজ আর এই কাজের জন্যই তো তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত তিনি নামাজের ওয়াক্ত কিছু কম করলেন। কিন্তু হজরৎ মুসা তাতেও সন্দেহ প্রকাশ করলেন এবং মহম্মদকে আবার আল্লার কাছে পাঠালেন। এইভাবে তিনবার যাতায়াতের পর আল্লাতায়লা বিরক্ত হয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন এবং বললেন যে, এই পাঁচেই পঞ্চাশের কাজ হবে।

এই থেকে অনেকের মনে ধারণা হতে পারে যে, আল্লা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেন না বা মানুষের অনুরোধে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের হেরফের করেন। ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম নয়। মহম্মদের অনুরোধে তাল্লা শুধু এটুকুই করলেন যে, বিশ্বাসীদের এক নামাজকে দশ নামাজের সমান করে দিলেন। অর্থাৎ বিশ্বাসীদের পাঁচ নামাজ আল্লার কাছে পঞ্চাশ নামাজই থাকল। মহম্মদের নবীত্বে বিশ্বাস করার মত তাঁর এই মেরাজ বা স্বর্গভ্রমণের ঘটনাও বিশ্বাসীদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে, অন্যথায় সে কাফের হয়ে যাবে। যাইহোক, আল্লাতায়লা শেষ পর্যন্ত যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন তা হল- (১) ফজর, (২) যোহর, (৩) আসর, (৪) মাগ্রিব ও (৫) এশা।

ভোরবেলা চারিদিক ফর্সা হয়ে গেছে, অন্ধকার দূর হয়ে গেছে, কিন্তু পুবের আকাশে তখনও লাল সূর্যের উদয় হয়নি, এই সময়টা ফজরের নামাজের সময়। সূর্য উঠে গেলে আর ফজরের নামাজ পড়া যাবে না। মধ্যাহ্নের সূর্য সবে পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে, তখন যোহরের সময়। বিকালের পড়ন্ত বেলায়, যখন আর কিছুক্ষণ পরেই সূর্য ডুবতে শুরু করবে, তখন আসরের সময়। সূর্য ডুবে গেছে কিন্তু তখনও আলো আছে, সেই সময়টা মাগ্রিবের সময় এবং সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত যে কোন সময় এশার ওয়াক্ত। উপরিউক্ত নামাজের সময়কালে কেউ যদি ঘুমে, বা ভুল বশত বা দরকারী কাজে আটকে যাবার দরুন সঠিক সময়ের মধ্যে নামাজ আদায় করতে না পারে তাহলে নামাজ কাজা হয়ে যায়। এই কাজা নামাজ যত শীঘ্র সম্ভব আদায় করে নেওয়া কর্তব্য। যে পর্যন্ত মানুষের ছায়া তার দৈর্ঘ্যের সমান থাকে ততক্ষণ যোহরের সময় হয় না। বিকালে মানুষের ছায়া তার দৈর্ঘ্যের থেকে বড় হওয়া থেকে শুরু করে সূর্য হলুদ হওয়া পর্যন্ত আসরের সময় থাকে। সূর্যের লাল রঙ লুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মাগ্রিবের সময় হয় না এবং মধ্যরাত্র পার হয়ে গেলে এশার সময় শেষ হয়ে যায়।

উপরিউক্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সব মুসলমানেরই ফরজ। এছাড়াও নামাজ পড়া যায় এবং তাকে নফল কিংবা সুন্নত নামাজ বলে। প্রকৃতপক্ষে ফরজ বহির্ভূত সমস্ত নামাজই নফল এবং স্বয়ং রসুলুল্লা যে যে সময় নফল নামাজ আদায় করতেন সেগুলোই হল সুন্নতনামাজ। সুন্নত নামাজগুলোর মধ্যে পড়ে গভীর রাতের নামাজ ও শেষরাতে তাহাজ্জুদ-এর নামাজ। মহানবী তাঁর উম্মতদের তাহাজ্জুদ-এর নামাজ পড়তে বিশেষ করে উপদেশ দিতেন। ফজরের নামাজের ঠিক আগেই তাহাজ্জুদের সময়।

নামাজ একা একা বাড়ীতে অথবা মহল্লার মসজিদে কিংবা বড় বড় জামে মসজিদের জামাতের নামাজে অংশগ্রহণ করেও আদায় করা যায়। তবে আজানের শব্দ কানে গেলে সব বান্দারই মসজিদের নামাজে যোগ দেওয়া ফরজ। যে ব্যক্তি আজান শুনেও একা একা ঘরে নামাজ পড়ে আল্লা তার নামাজ কবুল করেন না। শারীরিক দিক থেকে অক্ষম না হওয়া সত্বেও যে ব্যক্তি আজান শুনে জামাতের নামাজে যোগ দেয় না, রসূলুল্লা তার ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেবার কথা বলতেন। একা একা বাড়ীতে নামাজ পড়লে যে সওয়াব বা পুণ্য হয়, মহল্লার মসজিদে পড়লে তার ২৫ গুণ সওয়াব হয়, বড় জামে মসজিদে পড়লে তার ৫০০ গুণ, জেরুজালেমের মসজিদে আকসা বা বায়তুল মোকাদ্দেসে পড়লে তার হাজার গুণ, মদিনার মসজিদ নবীতে পড়লে তার পঞ্চাশ হাজার গুণ এবং মক্কার কাবা শরীফ বা মসজিদুল হারামে পড়লে তার লক্ষ গুণ সওয়াশয়।

গরীব মুসলমানের কাছে জামাতের নামাজ হজ স্বরূপ। জামাতের নামাজে সুন্দরভাবে সারিবেঁধে দাঁড়ানোটাও একটা সুন্নত এবং রসুলুল্লা এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। জামাতের নামাজের পর ইমাম বা নামাজ পরিচালক যে খুৎবা বা ধর্মীয় ভাষণ দেন তা শেষ না হলে নামাজের স্থান ত্যাগ করা উচিত নয়। একদিন মদিনার মসজিদ নবীতে রসুলুল্লা যখন খুৎবা দিচ্ছিলেন তখন সেখানে এক ফেরিওয়ালা এসে হাজির হয় এবং উম্মতরা খুৎবা ছেড়ে ফেরিওয়ালার কাছে ভীড় করে। এইজন্য আল্লা কোরানের বাণী অবতীর্ণ করে তাদের তিরস্কার করেন (৬২/১১)। রসুলুল্লা যখন খুৎবা দেবার জন্য মিম্বারে (খুৎবা দেবার বিশেষ আসনে) উঠতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ হয়ে উঠতো, গলা চড়ে যেত এবং ক্রোধ বেড়ে যেত- যেন শত্রুর বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক করছেন (মুসলীম-১৮৮৫)।

একদিন খুৎবা দিতে উঠে রসূলুল্লা হঠাৎ চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, "তুই চলে যা, তোকে অভিশাপ দিচ্ছি। তোর কাছ থেকে আমি আল্লার আশ্রয় নিচ্ছি।" পরে সবাই যখন তাঁর এই অস্বাভাবিক ব্যবহারের কারণ জিজ্ঞাসা করল, তিনি বললেন যে, শয়তান ইবলিস আগুন নিয়ে সেখানে হাজির হয়েছিল। তিনি তাকে একরকম ধরেই ফেলেছিলেন, কিন্তু পূর্ববর্তী নবী সুলেমান (Solomon) এসে বাধা দেওয়ায় তিনি নিজেকে সংযত করেছেন। তা না হলে তিনি অবশ্যই সেদিন শয়তানকে বন্দী করতেন এবং মদিনার বাচ্চাদের খেলার বস্তুতে পরিণত করতেন (ঐ-১১০৬)।

নামাজের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল জুমআ বা শুক্রবারের জামাতের নামাজ। ইসলামে শুক্রবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই জুমআর দিনই আল্লা হজরৎ আদমকে সৃষ্টি করেন এবং তাকে স্বর্গে প্রবেশ করান। এই জুমআর দিনই তিনি স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন এবং এই দিনই ইন্তেকাল (মৃত্যুবরণ) করেন। এই দিনই মহানবী হিজরৎ করে মদিনাতুন্নবী বা নবীর নগরী মদিনায় উপস্থিত হন। এই দিন এমন একটা মুহূর্তআছে যে সময় যে কোন বান্দা আল্লার কাছে (হারাম বস্তু ছাড়া) যা চাইবে তাই পাবে। সর্বোপরি এই জুমআর দিনই স্বর্গীয় শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং কেয়ামত সংঘটিত হবে। আল্লা বনি ইস্রায়েলদের শনিবার এবং ঈশায়ীদের রবিবার দিয়েছেন। কিন্তু মুসলমানদের তিনি সবথেকে বেশী ভালবাসেন তাই তাঁর প্রিয় শুক্রবার তিনি তাদের দিয়েছেন। এইজন্য কেয়ামতের দিন মুসলমানরা সকলের আগে থাকবে এবং আল্লার কাছ থেকে বেশী করে রহমৎ বা দয়া পাবে। ঐ একই কারণে মুসলমানরা সকলের আগে জান্নাতে (স্বর্গে) প্রবেশ করবে।

জুমআর দিন যোহরের আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ করে নামাজের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। গোসল করে পাক সাফ হয়ে পরিষ্কার জামা-কাপড় পরে, গায়ে সুগন্ধি লাগিয়ে জামাতের মসজিদে হাজির হতে হবে। মেয়েরা জামাতের নামাজে যোগ দিতেপারে তবে তারা সুগন্ধি লাগাতে পারবে না। ছেলেদের পিছনে তাদের দাঁড়াতে হবে এবং সিজদার পর ছেলেদের আগে মাথা তুলতে হবে, যাতে ছেলেদের মাথা তোলার আগে বেশবাস ঠিক করে নেবার সুযোগ পায়। কুমারী ও পর্দানসীন মেয়েদের জামাতের নামাজে যোগ দেওয়া নিষেধ এবং ঋতুকালে কোন মসজিদেই তারা ঢুকতে পারবে না। মেয়েদের পক্ষে ঘরে বসে নামাজ আদায় করে নেওয়াই ভাল।

যে বান্দা জুমআর দিন পাক সাফ হয়ে সবার আগে মসজিদে হাজির হয়, সে একটা উট কোরবানীর সোয়াব পায়। তারপর যে বান্দা হাজির হয় সে একটা বকরা বা বাছুর কোরবানীর সোয়াব পায়। তারপর যে বান্দা আসে সে একটা দুম্বা ও তারপর যে আসে সে একটা মোরগ কোরবানীর সোয়াব পায়। জুমআর দিন ইমাম যখন তাঁর খুৎবা পাঠ করেন তখন আল্লার জিকির শোনার জন্য ফেরেস্তারা সেখানে হাজির হন।

জুতো পরে নামাজে যোগ দেওয়া চলতে পারে। নামাজ আদায় করার সময় আকাশের দিকে তাকালে চোখ খুবলে নেওয়া হবে। বিনা কারণে খালি মাথায় নামাজ পড়া এবং নামাজের সময় আঙুল মটকানো, ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখা, কুকুরের মত বসা বা মোরগের মত ঠকাঠক করে তাড়াতাড়ি করে সিজদা করা নিষেধ। না-পাক অবস্থায় বা না-পাক জায়গায় নামাজ পড়লে নামাজ মরুহ হয়ে যায়। কাপড়ে শুক্র লেগে থাকলে ﷺ রসুলুল্লা শুধু সেটুক ধুয়েই নামাজে যোগ দিতে যেতেন, কাপড়ে তখন দাগ বোঝা যেত (মুসলীম-৫৭০)। খালি পেটে অথবা প্রস্রাব ও পায়খানার বেগ চেপে নামাজ করলেও নামাজ দোষযুক্ত হয়। নামাজের সময় কোরান শরীফ হাতে নিয়ে পাঠ করাও নিষেধ। নামাজে দাঁড়িয়ে সামনে থুথু ফেলা নিষেধ, কারণ সামনে আল্লা আছেন। ডানদিকেও নিষেধ কারণ ডানদিকে সব পুণ্য জমা হয়। বাঁ দিকে কিংবা বাঁ পায়ের নীচে থুথু ফেলা চলতে পারে কারণ বাঁ দিকে সব পাপ জমা হয়। কেউ নামাজ পড়ছে সেই সময় তার সামনে দিয়ে কেউ যাওয়া-আসা করলে তার খুব গোনাহ হয়। তবে নামাজী যদি কোন একটা জিনিস, অন্ততপক্ষে তার লাঠিটা সামনে রেখেও নামাজ করে তবে তার গোনাহ্ হবে না।

বয়স সাত বছর হলেই ছেলেকে নামাজ শিক্ষা দিতে হবে এবং সতের বছর বয়স হওয়া সত্ত্বেও যদি সে ঠিকমত নামাজ আদায় না করে তবে তাকে লাঠি দিয়ে পিটতে হবে এবং একলা ঘরে শুতে দিতে হবে। নেশা করে অথব্য কাঁচা পেঁয়াজ রসূন খেয়ে নামাজে যোগ দেওয়া নিষেধ, কারণ ফেরেস্তারা কাঁচা পেঁয়াজ রসূনএর গন্ধ ভালবাসেন না। মেয়েদের জন্য জুমআর নামাজ ফরজ নয় এবং তাদের পক্ষে জামাতের নামাজে যোগ দেওয়া মরুহ। তসবির বা ছবিঅলা জামা গায়ে দিয়ে নামাজে যোগ দেওয়া ভীষণভাবে নিষিদ্ধ।

মুসলমানদের পক্ষে জীবজন্তু, গাছপালা বা মানুষের ছবি এঁকে আল্লার সৃষ্টির নকল করতে যাওয়া ভীষণ অন্যায়। যারা এইসব করবে কেয়ামতের দিন আল্লা ঐ সব ছবি তাদের সামনে উপস্থিত করে আদেশ দেবেন, "রুহ ফুঁকে এদের জীবিত কর"। তারা নিশ্চিতভাবেই তা পারবে না। তখন আল্লা বলবেন, "আমার সৃষ্টির নকল করে আল্লা হবার দুঃসাহস করেছিলে? যাও এবার নরকের আগুনে পুড়ে সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর।" আঁকা তো দূরের কথা, আল্লার সৃষ্টির নকল করা কোন ছবি ঘরে রাখা বা তা দেখা কতখানি দোষের দু একটা উদাহরণ দিলে তা ভাল বোঝা যাবে। একবার বিবি আয়েশা পাখীর ছবিঅলা বালিশের ওয়াড় তৈরি করেন। রসুলুল্লা দরজার চৌকাঠ থেকে তা দেখতে পেয়ে ঘরে ঢুকতেই অস্বীকার করলেন। আগে আয়েশা ঐসব সরিয়ে ফেললেন তবে তিনি ঘরে ঢুকলেন (মুসলীম-৫২৫৫)।

ইয়মন প্রদেশের নাজরান নামক জায়গায় খ্রীস্টানদের বাস ছিল। মহম্মদ তাদের চিঠি দিলেন যে, হয় ইসলাম গ্রহণ কর নতুবা জিজিয়া দাও। তখন তারা ভয় পেয়ে তিনজন পাদ্রীকে মদিনায় পাঠালো। মহম্মদকে খুশি করার জন্য তারা যে সব উপঢৌকন এনেছিল তার মধ্যে একটা কার্পেট ছিল। কিন্তু কার্পেটে ছবি থাকার জন্য মহম্মদ তা গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দিলেন (৭)। মহম্মদের কতিপয় অনুচর ঐ কার্পেটের প্রতি লোভ করেছিল বলে আল্লা তাদের জন্য নদী, সুরা ও পবিত্র সঙ্গিনী সমন্বিত স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোরানের বাণী অবতীর্ণ করেন (৩/১৫)। নাজরানবাসীরা বছরে দু হাজার হুল্লা (বস্ত্র বিশেষ) এবং দু হাজার রৌপ্যমুদ্রা জিজিয়া দেবে বলে রফা হয়। চুক্তিপত্রে এও লেখা ছিল যে, এখন থেকে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সমুদায় সম্পত্তির মালিক আল্লা ও তাঁর রসূল।

যাই হোক, ছবিতেই যখন এই অবস্থা তখন মূর্তির ক্ষেত্রে কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়, কারণ সকলেই স্বীকার করবেন যে ছবির থেকে মূর্তিতে আল্লার সৃষ্টিকে অনেক বেশি নকল করা হয়। তাই ইসলামে মূর্তি শুধু ভাঙবার জন্য, গড়বার জন্য নয়। এই কারণেই মক্কা দখল করার পর কাবার অভ্যন্তরস্থ ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে ফেলা হয় এবং সমস্ত আরব জুড়ে মূর্তি ভাঙার তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। সাফা ও মারোয়া পর্বতের উপর স্থাপিত আসাফ ও নয়লার মূর্তি ভাঙা হয় এবং মহম্মদ তাঁর কিছু অনুচরকে শাবল, কোদাল ও গাঁইতি সহ তায়েফে পাঠালেন সেখানকার বিশাল রাব্বা'র মূর্তি ভেঙে ফেলার জন্য। এই পদাঙ্ক অনুসরণ করেই দিল্লীর মুসলমান শাসকরা ভারতের হাজার হাজার মন্দির ও মূর্তিধ্বংস করে এবং এই ঐতিহ্য কাশ্মীরে আজও বজায় আছে। গত ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বরের ঘটনার পর বাংলাদেশে ৩৫০০ মন্দির ও তার মূর্তি ধ্বংস করা হয়। (৮) ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(৭) খাবার পথে (২য় খণ্ড), আব্দুল আজিজ আল আমান (হরফ), পৃঃ ১৬৯।

(৮) লজ্জা, শ্রীমতী তসলিমা নাসরিণ (পার্ল পাবলিকেশন), পূঃ ৫৬।

এতেকরে আল্লার সম্মান ও মর্যাদা হয়তো রক্ষা হল, কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্য উঠে গেল। তাদের জন্য থাকল শুধু অলঙ্করণ করে আরবী ভাষায় কোরানের বাণী লেখার শিল্প, যাকে ক্যালিগ্রাফী বলে। আর থাকল মসজিদ তৈরি করার স্থাপত্য। এই সব মসজিদ অলঙ্করণ করতেও যে সব চিত্রকলার ব্যবহার হয় তাতে আল্লার সৃষ্টির অনুকরণ সযত্নে এড়িয়ে চলা হয়। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ইসলামে গান-বাজনা করাও নিষিদ্ধ।

মহম্মদের পূর্ববর্তী নবী হজরৎ লুৎ তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের অভিযুক্ত করে এক জায়গায় বলেন যে, তারা সমকামিতা ছাড়াও অন্য অনেক অবৈধ কাজে লিপ্ত রয়েছে (২৯/২৯)। মুসলমান ভাষ্যকারদের মতে ঐ সব অবৈধ কাজের মধ্যে গালি দেওয়া, শিস দেওয়া, ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি করা, মদ্যপান, মানী ব্যক্তিদের উপহাস করার সাথে গান-বাজনা করাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। (৯) ইসলামী মতে গান-বাজনা করা শয়তানের কাজ এবং শুধু মাত্র একটা হাদিসে নবীকে এ ব্যাপারে একটু নরম মনোভাবাপন্ন দেখা যায়। হাদিসটি বলছে, কোন এক ঈদের দিন দুটি শিশু বিবি আয়েশার ঘরে গান করছিল। এমন সময় আবু বকর ও মহম্মদ ঘরে প্রবেশ করলে আবু বকর তাদের গান থামাতে বলেন এবং শয়তানের কাজ করছে বলে ধমক দেন। তখন মহম্মদ বলেন, "ওদের যা করছে করতে দাও"। পরক্ষণেই বিবি আয়েশা চোখের ঈশারায় তাদের চলে যেতে বলেন এবং তারা চলে যায় (মুসলীম- ১৯৩৮, ১৯৪২)। কাজেই মুসলমান সমাজের মধ্যে যারা আজ সঙ্গীত চর্চা করেন, তারা শরীয়ৎ উল্লঙ্খন করেই তা করে থাকেন। এই সমস্ত ধর্মীয় বিধি-নিষেধ মানুষকে সভ্যতার পথে অগ্রসব হতে সাহায্য করে, না প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে তা সুধী জনের বিচার্য। এই সব বিধিকে অনুসরণ করেই আফগানিস্তানের তালিবান সরকার সমস্ত রকম চারুকলার চর্চা সেখানে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বর্তমান প্রসঙ্গে এটাও স্মরণ করা প্রয়োজন যে, সম্রাট হবার পর আওরঙ্গজের ভারতে গান-বাজনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন (১০)

যাই হোক, পৃথিবীর সমস্ত মুসলমান যে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন তাকে কিবলা বলে। মক্কার কাবা গৃহ মুসলমানদের কিবলা। মক্কা ভারতের পশ্চিমে অবস্থিত, তাই আমাদের দেশের মুসলমানরা পশ্চিমমুখী হয়ে নামাজ আদায় করেন। মুসলীম ধর্মীয় জীবনে এই কিবলার ভূমিকাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিবলার দিকে মুখ করে মলমূত্র ত্যাগ করা নিষিদ্ধ তো বটেই, এমন কি, কিবলার দিকে পিছন ফিরে মলত্যাগ করাও মুসলমানদের বারণ। কেউ মারা গেলে দাফন করার সময় ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(৯) কোরান শরীফ, শ্রী গিরিশচন্দ্র সেন (হরফ), পৃঃ ৫৬।

(১০) Sri R.C. Mojumdar, Advanced History of India (Macmillan) 1980, P. 594

লাশ উত্তর দিকে মাথা, দক্ষিণ দিকে পা রেখে কিবলামুখী করে শোয়াতে হবে। এইভাবে শোয়াবার পরই দোয়া, দরুদ ও জানাজার নামাজ আদায় করতে হবে। কোরবাণীর ঈদের সময় যে পশু কোরবাণী করবে তাকেও কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং কোরবাণী করতে হবে। তবে কবরে জিয়ারত করার সময় কিবলাকে পিছনে এবং কবরকে সামনে রেখে দোয়া পাঠ করার নিয়ম। চলন্ত ট্রেনে, জাহাজে কিংবা স্টীমারে নামাজ পড়ার সময় নামাজীর কিবলা ভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে নিয়ম হল, নামাজ শেষ হবার মুখে কিবলামুখী হয়ে তা শেষ করতে হবে।

ইসলামের শৈশবে জেরুজালেমের মসজিদ আকসা বা বায়তুল মোকাদ্দেশ মুসলমানদের কিবলা ছিল। পরে মদিনা বাসকালে মহম্মদ মক্কার কাবাকে কিবলা করার জন্য আদিষ্ট হন (2 * j' > 88) * I কথিত আছে যে, মক্কায় থাকাকালীন মহম্মদ নামাজের সময় এমন ভাবে দাঁড়াতেন যাতে কাবা ও বায়তুল মোকাদ্দেশ একই দিকে থাকে। কিন্তু মদিনায় আসার পর তা আর সম্ভব হল না, কারণ মদিনার উত্তরে বায়তুল মোকাদ্দেশ ও দক্ষিণে কাবা। হিজরীর দ্বিতীয় বছরে রজব (মতান্তরে শাবান) মাসের ১৫ তারিখে, মদিনা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কোবা নামক স্থানে সালামা গোত্রের লোকজনের সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সারতে মহম্মদ সেখানে যান। ইতিমধ্যে যোহরের ওয়াক্ত হয়ে যায় এবং মহম্মদ স্থানীয় একটি মহল্লার মসজিদে নামাজের ইমামতি শুরু করেন। নামাজ অর্ধেক হয়েছে, এমন সময় ফেরেস্তা জিব্রাইল কিবলা পরিবর্তনের প্রত্যাদেশ নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন (২/১৪৪)। সঙ্গে সঙ্গে মহম্মদ তাঁর মুখ মক্কার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন এবং তাঁর দেখাদেখি নামাজীরাও মক্কার দিকে মুখ ঘোরালো। মহম্মদের এক নিকট অনুচর ওমর অনেকদিন আগেই মহম্মদকে কিবলা পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিল, যার মধ্যে মক্কার কোরেশদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার রাজনীতি জড়িত ছিল। এই রকম আরও দুটো ব্যাপারে আল্লা ওমরের সিদ্ধান্তকে আয়াত অবতীর্ণ করে সমর্থন করেন। ওমর বদর যুদ্ধের বন্দীদের কৎল করতে এবং মদিনার মুসলমান রমণীদের পর্দাবৃত করতে সুপারিশ করেছিলেন। তাঁর এই দুটো সুপারিশই আল্লা কোরানের আয়াৎ অবতীর্ণ করে সমর্থন করেন।

নামাজের সময় জায়নামাজ বা নামাজের জায়গায় দু হাত দুপাশে ঝুলিয়ে, দুপায়ের মধ্যে দু ইঞ্চির মত ফাঁক রেখে শুদ্ধ মনে দাঁড়াতে হবে এবং মনে মনে চিন্তা করতে হবে যে আল্লা তাকে দেখছেন। দাঁড়ানোটা অবশ্যই কিবলামুখী হবে। এরপর ঐভাবে দাঁড়িয়ে নিম্নলিখিত দোয়া পাঠ করতে হবে" নিশ্চয়ই আমি আসমান-জমিন সৃষ্টিকারীর দিকে মুখ করলাম এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।" তারপর সেই ওয়াক্তের নামাজের জন্য নির্ধারিত নিয়ত বা সংকল্পবাক্য পাঠ করতে হবে। যেমন ফজরের নামাজের নিয়ত হল, আমি আল্লার উদ্দেশে কাবামুখী হয়ে ফজরের দু রাকাত নামাজের সংকল্প করছি। আল্লাহু আকবর।" তারপর আল্লাহু আকবর বলে ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও কনিষ্ঠা দিয়ে বাঁ হাতের কবজির উপর খুব কষে ধরতে হবে। একে তাহরিমা বাঁধা বলে। এইভাবে নিম্নলিখিত দোয়া বা প্রার্থনা পাঠ করতে হবে" হে আল্লা, আমরা আপনারই গুণগান করছি, আপনার নামই কল্যাণপ্রদ, আপনার গৌরবই সর্বাধিক এবং আপনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্টকারিতা থেকে রক্ষা করতে হে আল্লা আমরা আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি।"

এর পর "বিসমিল্লা রহমানির রহিম" বা পরম করুণাময় আল্লার নামে আরম্ভকরছি, এই বলে কোরান শরীফের প্রথম সুরা বা সুরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে। পবিত্র কোরান শরীফ বা কালামপাকে মোট ১১৪ টি সুরা বা অধ্যায় আছে এবং প্রতিটি সুরা কতকগুলি বাক্য বা আয়াতে বিভক্ত। সুরা ফাতিহা খুবই ছোট সুরা এবং এতে মাত্র সাতটি আয়াৎ আছে যার বাংলা অর্থ "সমস্ত প্রশংসা নিখিল জগতের প্রতিপালক আল্লাতায়লারই জন্য। যিনি অনন্ত করুণাময় ও পরম দয়ালু: বিচারের দিনের প্রভু। (হে আল্লা) আমরা কেবল আপনারই উপাসনা করি এবং আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আপনি আমাদের সরল ও সঠিক পথে পরিচালনা করুন, তাদের পথে যারা সৎপথ ও করুণাপ্রাপ্ত; তাদের পথে নয়, যারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট।" এর পর অন্য আরেকটি সূরা বা পবিত্র কোরান শরীফের কমপক্ষে তিনটি আয়াত পাঠ করতে হবে।

তারপর মাথা নত করে, দুই হাতে দুই হাঁটু কষে ধরে, আল্লাহু আকবর বলে রুকু করতে হবে। দাঁড়ানো অবস্থায় মাথা নীচু করে প্রণাম করাকে রুকু বলে। ঐ রুকু অবস্থায় বলতে হবে, "আমার মহান প্রতিপালক অতি পবিত্র এবং আল্লার প্রশংসা করলে তিনি তা শুনতে পান।" এই বলতে বলতে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং তারপর আল্লাহু আকবর বলে সিজদা করতে হবে। সিজদা করতে করতে বলতে হবে "আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” এইভাবে আল্লাহু আকবর বলে দ্বিতীয়বার সিজদা করতে হবে এবং সিজদা শেষে আল্লাহু আকবর বলে উঠে দাঁড়াতে হবে। এইভাবে এক রাকাত নামাজ পূর্ণ হবে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্তে এই রকম সতের রাকাত নামাজ ফরজ। ফজরে ২ রাকাত, যোহরে ৪ রাকাত, আসরে ৪ রাকাত, মাগ্রিবে ৩ রাকাত এবং এশায় ৪ রাকাত। জুমআর দিনে যোহরের ৪ রাকাতের বদলে জুমআর ২ রাকাত ফরজ এবং এই কারণে ঐ দিন ১৭ রাকাতের বদলে ১৫ রাকাত ফরজ। এর পর নামাজীরা আল্লার কাছে নিজ নিজ দোয়া ও মোনাজাত পেশ করেন। এই সব দোয়া ও মোনাজাত বান্দারা 'মাতৃভাষাতেও করতে পারে তবে যে পবিত্র ভাষায় কোরান শরীফ নাযেল (অবতীর্ণ) হয়েছে, যে পবিত্র ভাবায় স্বয়ং রসুলুল্লা দোয়া মোনাজাত করতেন, সেই পবিত্র আরবী ভাষায় করাটাই মোস্তাহাব বা ভাল।

এরপর মুয়াজ্জীন খুৎবার আজান দেবেন এবং ইমাম তাঁর খুৎবা দেবেন। অনেকের ধারণা থাকতে পারে যে, যেহেতু এই খুৎবা এক ধর্মস্থান থেকে দেওয়া হচ্ছে এবং তা একজন ধার্মিক ব্যক্তি বা ইমাম দিচ্ছেন, তাই তা নিশ্চয়ই প্রেম. মৈত্রী ও আধ্যাত্মিক ভাবে পরিপূর্ণ। সেই কারণে সর্বাপেক্ষা খুশির ও প্রেম মৈত্রীর উৎসব বলে পরিচিত "ঈদুল ফিত্র"-এর পবিত্র ছানি খুৎবার অংশ বিশেষ নীচে দেওয়া গেল। ".........হে আল্লা, ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের চিরকাল জয়যুক্ত করুন, আর অবাধ্য কাফের, বেদআতী ও মোশরেকদের সর্বদা পদানত ও পরাস্ত করুন। হে আল্লা, যে বান্দা আপনার আজ্ঞাবহ হবে তাব রাজ্য চির অক্ষয় রাখুন। তিনি রাজার পুত্র হউন কিংবা খাকান পুত্র খাকান হউন, স্থল বা নদীভাগের অধিকর্তা হোন, কিংবা দুই সাগরের মালিক হোন তিনি পবিত্র মক্কা ও মদিনার সেবক হোন, কিংবা আল্লার পথে জেহাদ ও সংগ্রামকারী হোন, তিনি যদি মুসলীম রাজা হ'ন আল্লা তাঁর রাজ্য ও অধিকৃত সাম্রাজ্যকে চির অক্ষয় রাখুন। তাঁরই তরবারি দ্বারা বিদ্রোহী, মহাপাতকী ও অবাধ্যদের (কাফেরদের) মস্তকচ্ছেদন করে নিশ্চিহ্ন করে দিন। হে আল্লা আপনি ধ্বংস করুন কাফেরদের, বেদাআতী মোশরেকদের। হে আল্লা, তাদের দল ও সংঘকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিন। হে আল্লা, তাদের ঐক্যের মধ্যে মতানৈক্য আনয়ন করুন। হে আল্লা, তাদের দেশসমূহকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিন।....." (১১)। কাজেই যে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্ম সমন্বয়কারী হিন্দুরা ঈদের দিন মুসলমানদের সঙ্গে কোলাকুলি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, আশা করা যায় যে, এই খুৎবা পড়ার পর তারা আর ততখানি উৎসাহ বোধ করবেন না। খুৎবা শেষ হলে মুয়াজ্জীন আল্লাহু আকবর বলে নামাজের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে জামাতের নামাজ শেষ হবে।

কোন মহিলা কোন দিন কোন জামাতের নামাজে ইমামতি করতে পারবেন না। কোন বজ্জাৎ (জারজ) ব্যক্তি ইমামতি করার অযোগ্য। ইসলাম ধর্ম ও তার হকিকৎ, শরীয়ৎ ইত্যাদি ব্যাপারে আলিম (জ্ঞানী) ব্যক্তিই ইমামতি করার যোগ্য। নামাজের সময় সর্বদা ইমামকে অনুসরণ করতে হবে; সে সিজদা করলে সিজদা করতে হবে, সে রুকু করলে রুকু করতে হবে। যে ব্যক্তি ইমামের আগেই সিজদা থেকে মাথা তোলে আল্লা তার মাথা গাধার মাথা করে দেন। আল্লাহু আকবর ধ্বনি দেবার সময়ও ইমামের গলার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে হবে, তার চেয়ে জোরে চীৎকার করা যাবে না। প্রয়োজনবোধে ইমাম তাঁর পছন্দমত ব্যক্তিকে ইমামতি                                                                        ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১১) মুসলীম পঞ্জিকা (১৪০০ বঙ্গান্ধী, হরফ, পৃঃ ১৬৯।

করতে বলতে পারেন। জীবনের শেষ কয়েকদিন রসুলুল্লা অসুস্থ হলে আবু বকর তার বদলে মদিনার মসজিদ নব্বীর নামাজে ইমামতি করেছিলেন। তিনজন ব্যক্তি নামাজের জন্য একত্র হলেই তাদের মধ্য থেকে একজনকে ইমামতি করতে হবে। এ ছাড়াও নামাজের আরও অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আছে যা বাহুল্যবোধে বর্জিত হল।

তৃতীয় স্তম্ভ রোজা

আরবী বারমাসের নাম যথাক্রমে, মহরম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ। নবম মাস রমজানে রোজা পালন করা হয়। রমজান মাস পবিত্র কারণ এ মাসে মানুষের দিশারী, সৎপথের নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী বা ফোরকান রূপে আসমানী কেতাব কোরান শরীফ নাযেল হয়েছে। আল্লাতায়লার ইচ্ছা ছিল যে, যে রাতে কোরান নাযেল হয়েছে সেই পবিত্র সবে কদর-এর রাত মানুষের কাছে গোপন থাকুক। তাই রমজান মাসের ঠিক কত তারিখে কোরান নাযেল হয়েছিল তা আল্লার রসুল ভুলে যান। তিনি শুধু এটুকু মনে করতে সক্ষম হন যে, রমজান মাসের শেষ দশদিনের কোন বেজোড় তারিখে সবে কদর হয়েছিল।

[“রোজা” ফারসি শব্দ, আর আরবিতে “সাওম” (صوم)]

এই কারণে মুসলমানদের মধ্যে রমজান মাসের শেষ দশদিন শুদ্ধ অবস্থায় মসজিদে কাটানোর রীতি আছে। একে এতেক্কাফ বলে। আল্লার রসুল জীবনের শেষ বছর বিশদিন এতেকাফে কাটান। এতেকাফকারীর সুন্নত হল, সে জানাজা নামাজে বা মৃতের জন্য কল্যাণ কামনার নামাজে অংশ গ্রহণ করবে না, প্রাকৃতিক প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদের বাইরে যাবে না এবং কোন স্ত্রীলোককে স্পর্শ করবে না। রসুলুল্লা যে মজ্জিদে এতেকাফ করতেন সেখান থেকে বিবি আয়েশার ঘর দেখা যেত এবং তিনি ঐ কদিন বিবি আয়েশাকে জানালা খুলে রাখতে বলতেন (মুসলীম-৫৮৪)। রোজাদার ছাড়া কেউ এতেক্কাফ করতে পারে না এবং জামে মসজিদ ছাড়া এতেক্কাফ হয় না।

রমজান মাসের পুরো একমাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত, রোগী ও মুসাফির (পর্যটক) ব্যতীত সকল মুসলমানের রোজা রাখা বা পানাহার পরিত্যাগ করা ফরজ। রমজানের আক্ষরিক অর্থ হল পুড়িয়ে ফেলা। একমাস ব্যাপী উপবাসের দ্বারা মুসলমানরা তাদের পাপ ও অকল্যাণ পুড়িয়ে ফেলে। রোজা সংযম শিক্ষা দেয়, এই কারণে এর আর এক নাম সিয়াম বা সংযম। তবে এক নাগাড়ে উপবাস বা সিয়াম এ ওয়াসিলা ইসলামে নিষিদ্ধ। মহম্মদ দয়া করে তাঁর উম্মতদের জন্য কষ্টকর সিয়াম এ ওয়াসিলা নিষিদ্ধ করে গেছেন। কেউ অসুস্থ হবার ফলে বা প্রবাসে যাবার ফলে রোজা বিঘ্নিত হলে অন্য সময় রোজা রেখে তা পূরণ করে নেওয়া চলতে পারে। যার পক্ষে রোজা রাখা দুঃসাধ্য তাকে প্রতিদিন একজন দরিদ্র (মুসলমান)-কে অন্ন দান করতে হবে। স্বামীর যত্নের জন্য আল্লা স্ত্রীর রোজা মাফ করেছেন। পাছে রসুলুল্লার অযত্ন হয় এই কারণে তাঁর নয়জন পত্নী ও চারজন দাসী রক্ষিতার কেউ রোজা রাখতেন না। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোন রমণীর পক্ষে রোজা রাখা বা কোন মাহারাম ব্যক্তিকেও ঘরে প্রবেশ করানো উচিত নয়। খুবই নিকট আত্মীয়, যাদের সঙ্গে বিবাহ কোরান দ্বারা অবৈধ এবং যাদের সামনে পর্দার প্রয়োজন নেই, সেই সব পুরুষকে মাহারাম বলে।

ইসলামের আগে, জাহেলিয়াৎ বা অন্ধকারময় অজ্ঞতার যুগেও আরবের লোকেরা রমজান মাসে রোজা পালন করতো এবং ঐ মাসে কোন যুদ্ধবিগ্রহ বা রক্তপাত করতো না। নবী মহম্মদের পিতামহ আব্দুল মোত্তালেব পুরো রমজান মাস হেরা পর্বতের এক গুহায় জপতপের মধ্যে কাটাতেন। তখনকার দিনে আরবের লোকেরা ঐ একমাস স্ত্রী-সংসর্গও বর্জন করতো। ইসলামের আমলে আল্লা কোরান শরীফের আয়াৎ অবতীর্ণ করে স্ত্রী-সংসর্গ বৈধ ঘোষণা করেন (২/১৮৭)। তবে দিনের বেলায় উপবাসের সময় তা অবৈধই থাকল। এই সময় দিনের বেলায় স্ত্রী-সংসর্গ করলে তার প্রায়শ্চিত্য হল, হয় একজন ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেওয়া, নতুবা দু মাসের রোজা রাখা, নতুবা ষাটজন গরীব (মুসলমান)-কে খাওয়ানো।

আরবে চান্দ্র মাস ও চান্দ্র বছর গণনা করা হয়। তাই অমাবস্যার পরদিন, অর্থাৎ শুক্লা প্রতিপদে নতুন মাস শুরু হয়। এই কারণে রোজার নিয়ম হল, রমজান মাসে প্রথম চাঁদ দেখার আগে রোজা রাখতে নেই এবং শওয়াল মাসের প্রথম চাঁদ দেখার আগে তা বন্ধ করতে নেই। যদি শওয়াল মাসের প্রথম দিনের চাঁদ দেখা না যায় তবে আরও একদিন বেশী রোজা রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে, চান্দ্র মাস ও চান্দ্র বছর গণনার ফলে আরবের মাস কখনও ২৯ দিনের কম এবং ৩০ দিনের বেশী হয় না। এবং ৩৬৫ দিনে বছর না হয়ে ১০ দিন কম বা ৩৫৫ দিনে বছর হয়। এই কারণে সমস্ত ইসলামী উৎসবই প্রতি বছর ১০ দিন করে এগিয়ে আসে এবং ৩ বছরে ১ মাস এগিয়ে আসে। ফলে কোন বছর যদি গরম কালে ঈদ হয় তবে ১০ বছর পরে তা প্রায় ৩ মাস এগিয়ে আসবে এবং শীতকালে ঈদ হবে।

লুঠপাট করে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের ধনসম্পত্তি অবৈধভাবে অধিকার করাকে জিহাদ বলে এবং এই জিহাদের সময় আল্লা রোজা মাফ করে দিয়েছেন। রমজান মাসে মুসলমানদের সঙ্গে পৌত্তলিক কোরেশদের বদর যুদ্ধ হয়। রোজা রাখা দুর্বল লোকজন দ্বারা যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাই মহম্মদ প্রথমে রোজা ভাঙেন এবং উম্মতদেরও তাই করতে বলেন। তবে জিহাদের সময় যে বান্দা একদিন রোজা রাখবে আল্লা একদিনের জন্য তার কাছ থেকে নরকের আগুনকে ৭০ বছর দূরে রাখবেন। অর্থাৎ ৭০ বছর ক্রমাগত হেঁটে যে দূরত্ব অতিক্রম করা যায়, ঠিক ততটা দূরে রাখবেন।

হিজরীর ২য় বছরের ১৮ই রমজান, মদিনা থেকে ৩০ মাইল ও মক্কা থেকে ১২০ মাইল দূরে বদর নামক প্রান্তরে যে যুদ্ধ হয় তাই বদর যুদ্ধ নামে খ্যাত। ঐতিহাসিকদের মতে পলাশীর যুদ্ধ বা ওয়াটারলুর যুদ্ধের মতই এই যুদ্ধ ঐতিহাসিক

দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এর কয়েকদিন আগে মহম্মদ ৩১৩ জন মুসলমান, ৭০ টি উট ও ২টি ঘোড়ার এক বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হন। উদ্দেশ্য ছিল আবু সুফিয়ান নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বে সীরিয়া থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তণকারী এক বাণিজ্য কাফেলাকে মাঝপথে লুঠপাট করা। কিন্তু মহম্মদের উদ্দেশ্য টের পেয়ে বাণিজ্য কাফেলা অন্যপথে মক্কায় চলে যায় এবং মক্কা থেকে ১০০০ সৈন্য, ৭০ (মতান্তরে ২০০) ঘোড়া ও অসংখ্য উট সহ এক বিশাল কোরেশ বাহিনী এসে মহম্মদের গতি রোধ করে। কিন্তু মুসলমানবাহিনী আশ্চর্যজনকভাবে এই অসম যুদ্ধে জয়লাভ করে। কোরেশবাহিনী জয় নিশ্চিত মনে করে তেমন গুরুত্ব সহকারে যুদ্ধ না করার ফলেই তাদের পরাজয় হয়। যদি কোরেশবাহিনী বদর যুদ্ধে জয়লাভকরতো তবে সেই দিনই দুনিয়া থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। অপর দিকে বদর যুদ্ধে জয়লাভ মুসলমানদের কাছে একটা চিরন্তন প্রেরণা হয়ে আছে। এই বদর যুদ্ধের আস্বাভাবিক সাফল্যকে স্মরণ করেই আমাদের দেশের মুসলমান মাঝি মাল্লারা বদর বদর বলে নৌকা ছাড়ে। ওমর এই বদর যুদ্ধের বন্দীদেরই কোৎল করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা পরে আল্লা সমর্থন করেন।

ঊষার কিছু পূর্বে খেয়ে নেওয়া এবং দিনের শেষে কিছু খেয়ে নিয়ে এফতার বা উপবাস ভঙ্গ করা আল্লা পছন্দ করেন। ইহুদী ও খ্রীস্টানরা উপবাসের সময় অনেকরাত থাকতে খায় এবং আকাশে তারা দেখা না গেলে এফতার করে না। কিন্তু মুসলমানদের সে রকম করা নিষেধ। অনেক সময় নবীর এমন হত যে, স্ত্রী-সহবাস জনিত অপবিত্র অবস্থাতেই ভোর হয়ে যেত। তখন তিনি আর খাবার সময় পেতেন না। গোসল করেই রোজা রাখতেন। রোজার মাসে দিনের বেলায় স্ত্রী-গমন অবৈধ হলেও চুম্বন, আলিঙ্গন ইত্যাদি বৈধ। নবী রোজা অবস্থায় স্বীয় পত্নীদের চুম্বন করতেন। রোজার সময় থুথু গিলে ফেলাও নিষেধ, তবে ভুলক্রমে কিছু খেয়ে ফেললে রোজা নষ্ট হয় না।

রমজান মাসে আল্লার আদেশে জান্নাতের সকল রজা খুলে দেওয়া হয় এবং দোজখ বা নরকের সব দরজা বন্ধ রাখা হয়। এই মাসে শয়তান শৃঙ্খলিত থাকে, অর্থাৎ শয়তানের দ্বারা কুপথে চালিত হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। জান্নাতে আটটি দরজার মধ্যে একটির নাম রাইয়ান। কেয়ামতের দিন ঐ দরজা শুধু রোজাদারদের জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং ফেরেস্তারা ডাক দেবেন, "প্রিয় রোজাদারেরা কোথায়?" তখন রোজাদারেরা উঠে দাঁড়াবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। ঐ দরজা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না এবং রোজাদারেরা ঢুকে গেলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা বা অন্যান্য কুকর্ম ত্যাগ না করে পানাহার ত্যাগ করে রোজা রাখে, আল্লা তার কোন খোঁজ-খবর নেওয়া প্রয়োজন মনে করেন না। যে ব্যক্তি রোগ, ব্যাধি বা অন্য কোন ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া একদিনও রোজা বন্ধ করে, সারা জীবন রোজা রাখলেও তার সে ক্ষতি পূরণ হয় না। আল্লা গর্ভবতী নারী ও স্তন্যদাত্রী জননীর জন্য রোজা মাফ করেছেন এবং মুসাফির (প্রবাসী)-দের জন্য নামাজের অর্ধেক ও রোজা পুরো মাফ করেছেন। বাসস্থান থেকে কমপক্ষে ৩০ মাইল দূরে না গেলে কোন ব্যক্তি মুসাফির বলে গণ্য হবে না। আল্লা বলেন, "রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার পুরস্কার প্রদান করব, কারণ বান্দা আমার জন্যই তার প্রবৃত্তিকে দমন করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।" রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লার কাছে মৃগনাভির থেকেও উৎকৃষ্ট। মিশর থেকে চলে আসার পর এবং দশ প্রত্যাদেশ (Ten commandments) অবতীর্ণ হবার প্রাক্কালে আল্লা পূর্ববর্তী নবী হজরৎ মুসাকে ২০ দিন রোজা রাখতে বলেন এবং ২০ দিন রোজা রাখার পর মুসা মুখ ধুয়ে ফেলেন। এতে ফেরেস্তারা হায় হায় করে ওঠে এবং বলে "এ আপনি কি করলেন? অপনার মুখে মৃগনাভির গন্ধ হয়েছিল তা নষ্ট করে ফেললেন!" এই কারণে মুসাকে আরও ১০ দিন অতিরিক্ত রোজা রাখতে হয়।

রমজানের রোজা ছাড়াও ১০ই মহরম ইহুদীদের উৎসব আসু'র দিনেও মুসলমানদের উপবাস করার রীতি আছে। ইসলামের আগে আরও কিছু কিছু দিনে উপবাস করার রেওয়াজ আরবের লোকদের মধ্যে ছিল। তবে ইসলামী মতে এই সব উপবাস করলেও চলে, না করলেও চলে। একবার আসুরের দিনে মহম্মদ বিবি আয়েশার কাছ থেকে খাবার চেয়ে খান এবং বলেন যে, এই সব উপবাস হল সঙ্কা (ভিক্ষা)'র জন্য কিছু টাকা আলাদা করে রাখার মত। পরে সেটা ভিক্ষা দেওয়াতেও খরচ করা চলে আবার নিজের জন্য খরচ করাও চলে (মুসলীম-২৫৭৩)। ঈদের দিন কোন মুসলমানের পক্ষেই রোজা রাখা উচিত নয়।

চতুর্থ স্তম্ভ জাকাত

আরবী জাকাত শব্দের অর্থ শুদ্ধিকরণ। আয়ের ৪০ ভাগের ১ ভাগ দরিদ্রদের জন্য জাকাত হিসাবে দান করে প্রত্যেক সঙ্গতিসম্পন্ন মুসলমানের শুদ্ধ হওয়া ফরজ (৯২/১৮-২১)। জাকাত  আয়ের ২.৫% কিন্তু এটি মোট “আয়ের” উপর নয়; নির্দিষ্ট পরিমাণ সঞ্চিত সম্পদ (নিসাব) এক চান্দ্র বছর পূর্ণ হলে তার উপর প্রযোজ্য। কাজেই এটা অনেকটা আজকের আয়করের সমতুল্য বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। এইজন্য রসুলুল্লা দরিদ্র মুসলমানগণকে ধনীদের পাপ মোচন কারী রুমাল রূপে বর্ণনা করেছেন। যে ব্যক্তি আল্লার দেওয়া ধন থেকে জাকাত দেয় না, পরলোকে ঐ ধন বিষধর সাপের আকার ধারণ করে দু গাছা মালার মতন তার গলা বেষ্টন করবে। অথবা কেয়ামতের দিন ঐ অভিশপ্ত ধনসম্পদ কেশহীন সাপের আকার ধারণ করে তার মালিককে অনুসরণ করবে এবং দংশন করবে। সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপার মালিকহয়েও যে ব্যক্তি ন্যায্য জাকাত দেয় না, কেয়ামতের দিন তার জন্য অগ্নি শলাকা থাকবে। ঐ শলাকা দোজখের আগুনে পুড়িয়ে তার কপালে ও পিঠেদাগ দেওয়া হবে। বিচার যতদিন শেষ না হবে ততদিন এই শাস্তি চলতে থাকবে এবং তখনকার একদিন হবে আজকের পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। যে ন্যায্য জাকাত দেয় না তার ধন বৃদ্ধি না পেয়ে হ্রাস পায়।

[ “দান আত্মশুদ্ধির মাধ্যম” — এই ধারণার কারণ “يتزكى / তাযাক্কা” শব্দের অর্থই পবিত্রতা বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করা কু০ ৯২।১৮ ٱلَّذِى يُؤْتِى مَالَهُۥ يَتَزَكَّىٰ ١٨]

শাক-সবজি ও তরিতরকারী, পাঁচ ওসক (২৮ মণ বা ১০৩৬ কেজি)-এর কম শস্য, ভারবাহী পশু, ঘোড়া, গাধা ও ক্রীতদাসের জন্য কোন জাকাত নেই। যে সব জমি বৃষ্টি, ঝরণা বা নদী-নালার জল দ্বারা স্বাভাবিক ভাবে সিঞ্চিত হয়, তার উৎপন্ন শস্যের (অবশ্যই ৫ ওসকের বেশী হলে) এক-দশমাংশ জাকাত দিতে হবে। যার আয় পাঁচ উকিয়া (সাড়ে ৫২ তোলা) রূপা, পাঁচটি উট বা পাঁচ ওসক শস্যের কম, তার কোন জাকাত নেই। এক বছর পার না হলে কারও সঞ্চিত ধনের উপর জাকাত ধার্য হবে না। জাকাত ব্যতীত আল্লা ঈমান ও নামাজ কবুল করেন না। জাকাত দেওয়ার মধ্যেই ইসলামের পরিপূর্ণতা ও পাপের পরিত্রাণ। কোন বান্দা রোজা পালন করলে বেহেস্তের পথের এক-তৃতীয়াংশ পার হয়, নামাজের দ্বারা সে বাকী এক-তৃতীয়াংশ পার হয় এবং জাকাত তাকে বাকী এক-তৃতীয়াংশ পার করে জান্নাতে পৌঁছে দেয়।

জাকাত সম্পর্কে এতক্ষণ যা বলা হল তাতে এটা মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে এটা অত্যন্ত মানবিক ব্যবস্থা যার লক্ষ্য হল ধনী ও দরিদ্রের মধ্যেকার ব্যবধান কমিয়ে আনা। এই কারণে জাকাতের উৎপত্তির ইতিবৃত্ত কিছুটা জানা আবশ্যক। প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে, এই জা'কাত শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং দরিদ্রকে জাকাত দেওয়া বলতে শুধু দরিদ্র মুসলমানকেই দেওয়া বোঝায়। কাজেই এর মধ্যে বৃহত্তর বা উদার মানসিকতার কোন ব্যাপার নেই। এর সঙ্গে পাঠক কমিউনিস্টদের মানোভাবের মিল খুঁজে পাবেন। কারণ তাদের মতেও সব গরীবই গরীব নয়। যেই গরীব তাদের সমর্থক তারাই প্রকৃত গরীব। এই মনোভাবের দ্বারা চালিত হয়েই পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট সরকার দণ্ডকারণ্য থেকে আগত শত শত গৃহহীন উদ্বাস্তুকে মরিচঝাঁপিতে গুলি করে মেরে ফেলতে পেরেছিল।

মহম্মদ হিজরৎ করে মদিনায় আসার পর তাঁর যে সমস্ত উম্মত মক্কা থেকে মদিনায় চলে আসে তাদের বলা হত মুহাজির বা উদ্বাস্তু। এদের প্রায় সকলেই ছিল অত্যন্ত গরীব। মদিনার মুসলমানদের অনুগ্রহ ও দানের দ্বারাই তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ হত। মদিনার এইসব মুসলমানদের বলা হত অম্লার বা সাহায্যকারী। প্রথম দিকে এই সাহায্যের ব্যাপারটা ছিল নিতান্তই ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এবং এর জন্য কোন রকম বাধ্যবাধকতার ব্যাপার ছিল না। তখন এই সাহায্যের নাম ছিল সক্কা বা দান। আজও মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ এই সদ্‌স্কার রীতি চালু আছে। সক্কা হিসাবে সংগৃহীত অর্থ কিভাবে ব্যয় করা হবে সে ব্যাপারে আল্লা বলছেন, "সক্কা (দান) কেবলমাত্র নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য; যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য এবং দাসমুক্তি ও ঋণ-গ্রস্তের এবং আল্লার পথ ও পথিকের জন্য" (৯/৬০)।

অর্থাৎ সক্কা হিসাবে সংগৃহীত অর্থের একটা অংশ' ব্যয় হবে দরিদ্র মুসলমানদের জন্য এবং যারা ঘুরে ঘুরে সক্কা আদায় করে তাদের ভরণপোষণের জন্য। দ্বিতীয় অংশ ব্যয়িত হবে যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা দরকার তাদের জন্য। এই দলে দু রকমের লোক পড়ে। প্রথমতঃ, যারা এখনও মুসলমান হয়নি সেইসব গরীব লোকদের টাকার লোভ দেখিয়ে মুসলমান বানানোর জন্য। দ্বিতীয়তঃ, যারা সদ্য মুসলমান হয়েছে তাদের মধ্যে যাদের ইসলাম ত্যাগ করার সম্ভাবনা আছে, তাদের টাকা দিয়ে ইসলামের প্রতি অনুরক্ত রাখার জন্য। অনুগত মুসলমানদের না দিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত মুসলমানদের টাকা দেওয়ার উপর আল্লার রসুল ﷺ বেশী জোর দিতেন এবং বলতেন যে, এদের একটু বেশী দেওয়া দরকার যাতে এরা আবার আগুনে (অর্থাৎ পুরাণো পৌত্তলিক ধর্মে) ফিরে না যায় (মুসলীম-২৩০০)।

উপরিউক্ত (৯/৬০) আয়াতের পরবর্তী অংশে মদিনায় মুসলমানের সংখ্যা বাড়াবার পন্থা-পদ্ধতিগুলো সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। প্রথমতঃ, কোন ক্রীতদাসকে তার মুক্তি পণ দিয়ে প্রভুর কাছ থেকে মুক্ত করে মুসলমান করা। দ্বিতীয়তঃ, কোন ঋণগ্রস্ত গরীব মানুষকে ঋণের দায় থেকে মুক্ত করে মুসলমান করা। আল্লার পথে ও আল্লার পথের পথিকের জন্য সদকা ব্যয় করার অর্থ হল জিহাদ ও জিহাদে অংশগ্রহণকারী মুহাজিরদের জন্য ব্যয় করা। আগেই বলা হয়েছে যে, জিহাদ বলতে বোঝায় লুঠতরাজ, দাঙ্গা, অতর্কিতে আক্রমণ ইত্যাদির মাধ্যমে বিধর্মীদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করা এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের রাজত্ব কায়েম করা। আমাদের দেশের অনেক পণ্ডিত (?) জিহাদের অর্থ ধর্মযুদ্ধ করেন এবং এ ধারণা ভুল।

ইসলামের প্রসার ও সমৃদ্ধির পিছনে এই জিহাদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই ঘোড়া সহ অন্যান্য উপকরণ বা অস্ত্রশস্ত্র, যা জিহাদের কাজে লাগে, তার পিছনে ব্যয়কেই আল্লার পথে ব্যয় বলা হয়েছে। কালে মদিনায় মহম্মদ ﷺ ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের জোর বাড়লে এই ঐচ্ছিক সক্কাই বাধ্যতামূলক জাকাতে রূপান্তরিত হয়।

সঙ্কা সম্বন্ধে মহম্মদ ﷺ বলতেন যে, যে ব্যক্তি গোপনে সক্কা দেয়, এমনভাবে দেয় যে ডান হাত জানে না যে বাঁ হাত কি করছে, আল্লা সেই ব্যক্তিকে রক্ষা করেন। সদ্‌ক্কা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দিয়ে দেওয়া উচিত, কারণ কেয়ামতের আগে এমন একদিন আসবে যখন সক্কা দেবার বা দান খয়রাৎ করার লোক পাওয়া যাবে না। আল্লার মহত্ত্ব কীর্তন করলেও তা সদকা বলে গণ্য করা চলে। এমন কি স্ত্রী-সহবাসকালে বীর্যপাতও এক ধরনের সক্কা। মহম্মদ নিজে কখনও সক্কা দিতেন না এবং বলতেন, "সক্কা আমাদের জন্য নয়" (মুসলীম-২৩৪০)। একদিন বারিরা নামে এক মহিলাকে মহম্মদের এক স্ত্রী কিছুটা মাংস সক্কা দেন। পরে বারিরা সেই মাংস মহম্মদকে উপহার দিতে চাইলে মহম্মদ জেনে বুঝেও তা গ্রহণ করলেন এবং বললেন, "সঙ্কা ওদের জন্য আর উপহার আমাদের জন্য" (মুসলীম-২৩৫১)।

সক্কা যখন বাধ্যতামূলক জাকাতে পরিণত হল তখন তা বেশীরভাগ আরববাসীর অসন্তোষের কারণ হল। বিশেষ করে মরুবাসী বেদুইনদের মধ্যে এই অসন্তোষ চরমে উঠল। কারণ তারা জাকাত দিত কিন্তু তার ফল ভোগ করার সুযোগ পেত না (৯/৯৮, ৯৯/১০১)। অর্থাৎ জাকাতের টাকায় যে জিহাদ হত তাতে তাদের যোগ দেবার সুযোগ না থাকায় তারা জিহাদের লুঠের মাল বা গনিমতের ভাগ পেত না। মহম্মদ মক্কাজয়ের পর জাকাত আদায়ের জন্য চতুর্দিকে লোক পাঠালেন। তখন বনি তামিম গোষ্ঠীর কিছু লোক জাকাত দিতে অস্বীকার করল। মহম্মদ তখন ৫০ জন অশ্বারোহী-বিশিষ্ট একটা দলকে সেখানে পাঠালেন তাদের শায়েস্তা করার জন্য এবং তারা বনি তামিমের লোকজনদের বন্দী করে নিয়ে এল। মহম্মদ মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দিলেন বটে তবে এই ঘটনার ফলে জাকাত আদায় নির্বিঘ্ন হল। মহম্মদের মৃত্যুর পর জাকাতের প্রতি আরববাসীদের এই অসন্তোষ প্রবল আকারে আত্মপ্রকাশ করল এবং তা বিদ্রোহের রূপ নিল। বহু লোক ইসলাম ত্যাগ করল। তখন খলিফা আবু বক্র ইয়েমেন থেকে মুসলমান নিয়ে এসে সেই বিদ্রোহ দমন করেন।

সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যে জাকাত দেবার জন্য মহম্মদ সবাইকে উপদেশ দিতেন, না দিলে নরকের ভয় দেখাতেন এবং বল প্রয়োগ করে তা আদায় করতেন, সেই মহম্মদ নিজে জাকাত দিতেন না এবং বলতেন যে তিনি ও তাঁর পরিবারের উপর জাকাত নেই (মুসলীম-২৩৪০)। তাঁর এই পরিবার বলতে বোঝাত চাচা আব্বাস ও হারিস এবং চাচাত ভাই আলি, আকিল ও জাফরের পরিবার ও তাদের বংশধরগণ। উপরিউক্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে মহম্মদের চাচাতভাই আলির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইনি মহম্মদের চাচা আবু তালেব-এর পুত্র। এর সাথে মহম্মদ তাঁর কন্যা ফতেমার বিবাহ দেন। আট বছর বয়সে আলি মুসলমান হন। আক্রমণ, লুণ্ঠন ও হত্যা ইত্যাদি ব্যাপারে ইনি নবীর দক্ষিণ হস্ত ছিলেন।

মহম্মদের মৃত্যুর পর আবু বকর, ওমর ও ওসমানের পরে আলি ৬৫৫ খ্রীস্টাব্দে মুসলীম জগতের চতুর্থ খলিফা হন।

একবার মহম্মদ তাঁর অনুচর ওমরকে জাকাত সংগ্রহের কাজে লাগান। কিন্তু খালেদ বিন ওয়ালেদ নামে এক ব্যক্তি এবং মহম্মদের চাচা আব্বাস জাকাত দিতে অস্বীকার করলে ওমর মহম্মদকে তা জানালেন। যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যাপারে উপরিউক্ত খালেদ বিন ওয়ালেদও মহম্মদের প্রধান অনুচরদের একজন ছিলেন। পরবর্তী কালে খয়বর অভিযানের সময় ইনি দ্বিতীয় প্রধান সেনাপতি নির্বাচিত হন এবং মক্কা বিজয়ের পর খালেদ নাখল নামক স্থানের বিখ্যাত আল উজ্জার মূর্তি ধ্বংস করেন। যাই হোক ওমরের অভিযোগ শোনার পর মহম্মদ বললেন, "খালেদের কাছে জাকাত চেয়ে তুমি অন্যায় করেছ কারণ সে আল্লার জন্য অস্ত্রশস্ত্র মজুদ রাখে। আর আব্বাসের ব্যাপারটা আমি দেখছি। তবে স্মরণ রেখো যে, কোন ব্যক্তির কাছে তার চাচা পিতৃতুল্য (মুসলীম-২১৪৮)।

মহম্মদের মৃত্যুর অল্প কিছুকালের মধ্যেই জাকাত তার প্রাধান্য হারিয়ে ফেলল এবং গনিমত বা লুঠের মাল সে স্থান দখল করে নিল। এই লুঠের মাল কিভাবে বন্টন করা হবে আগে তার কোন নিয়ম-কানুন ছিল না। বদর যুদ্ধে মুসলমানরা কোরেশদের যে বিপুল সম্পদ দখল করল তা কিভাবে ভাগাভাগি হবে তা নিয়ে উম্মতদের মধ্যে বেশ অনিশ্চয়তা ছিল। অনেকে ভেবেছিল এবং মনে মনে আশা করেছিল যে এই লুঠের মালের যারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে তারাই পাবে। এমন সময় আল্লা কোরানের বাণী (৮/১) অবতীর্ণ করে জানিয়ে দিলেন যে সমুদায় লুঠের মাল মালিক হলেন আল্লা ও তাঁর রসুল। এই বাণীর দ্বারা আল্লা এটাই সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন যে, লুঠের মালের আসল মালিক হলেন আল্লার রসুল মহম্মদ। কাজেই তিনি যে ভাবে ইচ্ছা লুঠের মাল বণ্টন করতে পারেন। এর পর আল্লা বাণী অবতীর্ণ করলেন যে, লুঠের মালের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আল্লার রসূলের প্রাপ্য (৮/৪১) এবং সেই অনুসারে মহম্মদ এক-পঞ্চমাংশ নিজে রেখে বাকীটা উম্মতদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। এই এক-পঞ্চমাংশকে বলে পবিত্র খুম। এর পর থেকে এই নিয়মই চলতে থাকল এবং লুটের মালের এক পঞ্চমাংশ পবিত্র খুম হিসাবে নবী পেতে থাকলেন। এই পবিত্র খুম কিভাবে ব্যয় করবেন তা পুরোপুরি আল্লার রসুলের ইচ্ছাধীন। প্রথমতঃ তা থেকে তিনি তাঁর নিজের ও তাঁর পরিবারের খরচ খরচা চালাবেন এবং বাদবাকীটা নিম্নলিখিত চার ভাগে খরচ করবেন। (১) গরীব মুসলমানদের জাকাত দিতে, (২) অনুচরদের উপহার দিতে, (৩) বিধর্মী দরিদ্রদের টাকা দিয়ে মুসলমান করতে এবং বাকীটা আল্লার পথে। আল্লার পথে খরচ করা বলতে অস্ত্রশস্ত্র ও জিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণ কেনার খরচ বোঝায়। উপহার তিনি সেই সব অনুচরদের দিতেন যারা সদ্য মুসলমান হয়েছে এবং এ ব্যাপারে তিনি বলতেন "যারা কিছুদিন আগেও অবিশ্বাসী ছিল আমি মাঝে মাঝে তাদের উপহার দিই যাতে তারা সত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় (মুসলীম-২৩০৩)। অনেক সময় নবীর এই উপহার দেওয়া নিয়ে উম্মতদের মধ্যে অশান্তির সৃষ্টি হত। হুনাইন যুদ্ধের পর নবী সমস্ত ভাল ভাল ও দামী গনিমতের মাল নতুন মুসলমান হয়েছে এরকম কোরেশ নেতা ও বেদুইন দলপতিদের দিয়ে দিলেন। এদের মধ্যে ছিল ইসলাম ও মহম্মদের চির শত্রু আবু সুফিয়ান। পরে মক্কা বিজয়ের পর আবু সুফিয়ান মহম্মদের প্রিয় পাত্র হন এবং তাঁর মেয়ে উম্মে হাবিবাকে নবী বিবাহ করেন। যখন এদের সকলকে ১০০ টা করে উট দেওয়া হল তখন আর এক অনুচর আবদুল্লা বিন যায়েদ তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করল এবং মহম্মদ তখন তাকেও ১০০টা উট দিলেন (মুসলীম- ২৩০৩, ২৩০৪)। এই শেষোক্ত আবদুল্লা বিন যায়েদ ছিলেন মহম্মদের পালিত পুত্র যায়েদের ছেলে এবং যায়েদের স্ত্রী জয়নবকে নবী বিবাহ করেন।

একবার গনিমতের মাল হিসাবে আলি ইয়েমেন থেকে কিছু সোনা পাঠান এবং তার বণ্টনের বেলায়ও আল্লার রসুল পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। নবী তখন রেগে গিয়ে বললেন, "আমি আল্লার রসুল, সকাল বিকাল আমার কাছে আল্লার বাণী আসে, তবুও তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে না!" তখন খোয়ারু [যুল খুওয়াইসিরা” (ذو الخويصرة) ] নামে এক ব্যক্তি বলল, "আল্লার রসুল, আল্লাকে ভয় করুন ও ন্যায় বিচার করুন।" নবীর অনুচর ওমর সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, "আল্লার রসুল, অনুমতি করুন এই কপটের মুণ্ডটা এখনই ধড় থেকে নামিয়ে দিই।" যাই হোক, মহম্মদ তাকে প্রাণে মারলেন না বটে, তবে সেই থেকে খোয়ারু ও তার বংশধরেরা-ঘৃণিত কপট বলে চিহ্নিত হল (মুসলীম-২৩১৬, ২৩২৭)। উপরিউক্ত ওমর পরে মুসলীম জগতের দ্বিতীয় খলিফা হন এবং এঁর আমলে মুসলমান সাম্রাজ্য খুবই বিস্তৃতি লাভ করে। ঐ সময় বিজিত দেশগুলি থেকে এত গনিমতের মাল আসতে শুরু করে যে আরবের একটি সদ্যোজাত শিশুও তার ভাগ পেতে থাকে। ওমরের বিধবা কন্যা হাফসাকে মহম্মদ বিবাহ করেন।

এ প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা দরকার। জিহাদ না করে, শুধু ভয় দেখিয়ে বিধর্মীদের ধনসম্পদ হস্তগত করাকে ফেই বলে। যেহেতু জিহাদকারীদের মধ্যে তা বিতরণের কোন প্রশ্ন নেই তাই এর পুরোটাই আল্লার রসুলের প্রাপ্য। মদিনার উপকন্ঠে বনি নাজির, বনি কানুইকা ও বনি কুরাইজা নামে ইহুদী গোষ্ঠীর লোকেরা বসবাস করত। নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তি ও কর্মকুশলতায় আরবের বেদুইনদের থেকে উন্নত হবার ফলে এরা বেশ সচ্ছল ও ধনসম্পত্তির মালিক ছিল। এইসব ধন সম্পত্তিকে লক্ষ্য করে আল্লা বাণী অবতীর্ণ করলেন, "আরও বহু সম্পদ আল্লা তোমাদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন, যা এখনও তোমাদের অধিকারে আসে নাই, তবে আল্লার নিকট গচ্ছিত আছে" (৪৮/২১)। মহম্মদ শুধু ভয় দেখিয়ে বনি নাজির গোষ্ঠীকে মদিনা থেকে বিতাড়িত করলেন। তারা পরিবার পিছু এক উটের পিঠে যতটা মাল ধরে তাই নিয়ে মদিনা ত্যাগ করতে বাধ্য হল এবং মদিনার উত্তরে খয়বর নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করল। কাজেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বাংলাদেশ বা পূর্বপাকিস্তান থেকে যে হিন্দু বিতাড়ন হয়েছে বা হচ্ছে, নবী তাঁর জীবিত কালেই তার সূচনা করে গেছেন। এখানে আরও একটা লক্ষ্য করার বিষয় হল এই যে, বিশ্বাসীরা যাতে শিক্ষায় দীক্ষায় নিজেদের উন্নত করে সচ্ছল ও সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে পারে এরকম কোন প্রেরণা ইসলামে অনুপস্থিত। পক্ষান্তরে বলপূর্বক ও অন্যায়ভাবে পরের দ্রব্য আত্মসাৎ করাতেই ইসলাম প্রেরণা যুগিয়ে আসছে। যাই হোক, যেহেতু জিহাদ না করেই বনি নাজির গোষ্ঠীর জমিজায়গা, ধন সম্পত্তি হস্তগত করা সম্ভব হল তাই এই সমুদায় সম্পত্তি পবিত্র ফেই হিসাবে নবীর মালিকানায় চলে এল।

ইসলামের আগে বেদুইনদের মধ্যে এই রীতি ছিল যে, দস্যুতা করে যে সম্পদ পাওয়া যেত তার চার আনা দলপতি পেত এবং বাকী বার আনা শাকরেদদের মধ্যে ভাগ হত। যে চার আনা দলপতি গ্রহণ করতো তাকে সফি বলা হত। বনি নাজির গোষ্ঠীর যে বিশাল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হাতে এল মুসলমানরা ভাবল তাও এইভাবে ভাগ বাঁটোয়ারা হবে। কিন্তু আল্লা কোরানের বাণী (৫৯/৭) “ما أفاء الله على رسوله ... فلله وللرسول ... অর্থাৎ: “আল্লাহ যে সম্পদ তাঁর রাসূলকে দিয়েছেন ... তা আল্লাহ ও রাসূলের জন্য...” অবতীর্ণ করে সমুদায় সম্পত্তি ফেই হিসাবে আল্লার রসুলের প্রাপ্য বলে ঘোষণা করলেন। এতে করে আল্লার রসুল এক বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক হলেন। এরই একটা অংশে একটা বাগানবাড়ী তৈরি করিয়ে নবী তাঁর মিশরীয় ও খ্রীস্টান রক্ষিতা মেরী বা মারিয়াকে রাখেন। মেরী ক্রীতদাসী ছিল। অষ্টম হিজরীতে এর গর্ভে মহম্মদের পুত্র ইব্রাহীম জন্মগ্রহণ করে কিন্তু ১৮ মাস বয়সে মারা যায়। মৃত্যুকালে মহম্মদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে একমাত্র কন্যা ফতেমা জীবিত ছিলেন এবং তিনিও মহম্মদের মৃত্যুর ৬ মাস পরে, ১১ হিজরীতে মারা যান। মহম্মদের মৃত্যুর পর মেরীর ইতিবৃত্ত রহস্যাবৃত। অনেকের মতে সে আবার মিশরে ফিরে গিয়েছিল।

বর্তমান প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। বদর যুদ্ধে মুসলমানরা সর্বপ্রথম গনিমতের মাল দখল করে। কিন্তু তা ভোগ করতে তাদের মধ্যে কিছুটা সঙ্কোচ দেখা দেয়। কিন্তু আল্লা অপরাধী মনোভাব দূর করে মহানন্দে তা ভোগ করতে আদেশ দেন এবং বলেন, " যে গনিমতের মাল তোমরা পেয়েছ তা বৈধ ও উত্তম জেনে ভোগ কর" (৮/৬৯)। মুসলমানদের নৈতিক উন্নতির বদলে তার অধঃপতন ঘটাতে আল্লা কতখানি উৎসাহী তা উপরিউক্ত আয়াৎটিতে পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধবন্দী মানুষও ইসলামে লুঠের মাল বলে গণ্য এবং নারী যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে যৌনক্রিয়া বৈধ। হুনাইন যুদ্ধের সময় যে সমস্ত নারী যুদ্ধবন্দীকে গনিমতের মাল হিসাবে নিয়ে আসা হয়, প্রথম দিকে মুসলমানরা কাফের হলেও সেই সব সধবা রমণীদের ভোগ করতে সঙ্কোচ করে। তখন আল্লা বাণী অবতীর্ণ করলেন, "তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের অধিকার করেছে (অর্থাৎ যুদ্ধবন্দী ও দাসী) তারা ব্যতীত অন্য কোন সধবা রমণী তোমাদের জন্য বৈধ নয়" (৪/২৪)। এইভাবে আল্লা তাদের সঙ্কোচ দূর করলেন এবং বিশ্বাসীরা বৈধ কর্মে লিপ্ত হল (মুসলীম-৩৪৩২)। শ্রীমতী তসলিমা নাসরিন এর লজ্জা উপন্যাসের মায়াকে গনিমতের মাল হিসাবেই অপহরণ করা হয়েছিল এবং আল্লার উপরিউক্ত বাণীগুলোর জন্যই অপহরণকারীদের মনে কোন পাপ বোধ জাগ্রত হয় নি।

গনিমতের মালের প্রলোভনই মুসলমান জিহাদকারীদের সর্বপ্রধান প্রেরণা এবং আজও এই প্রেরণাই বাংলাদেশ থেকে হিন্দু বিতাড়নের মূল কারণ। লুটের মালের ভাগ পাবার লোভে অনেক সময় অনেক অ-মুসলমান কাফেরও মহম্মদের কাছে জিহাদকারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রার্থনা জানাত। একবার একজন লোক মহম্মদের কাছে এসে বলল যে, সে জিহাদে যোগ দিয়ে লুটের মালের ভাগ পেতে ইচ্ছুক। মহম্মদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি আল্লা ও তাঁর রসুলে বিশ্বাস কর?" লোকটি জবাব দিল "না"। তখন মহম্মদ তাকে বললেন "আগে ভুল রাস্তা ঠিক কর (অর্থাৎ মুসলমান হও)" (মুসলীম-৪৪৭২)। তবে প্রয়োজন বোধ করলে আল্লার রসুল কাফেরদের সাহায্য নিতে কুণ্ঠিত হতেন না। কুজমান ও সাফোয়ান বিন উমায়া নামে দুই জন পৌত্তলিক কাফের ওহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে মুসলমানদের হয়ে যুদ্ধ করেছিল।

যাইহোক, মহম্মদের মৃত্যুর কুড়ি বছরের মধ্যে ইসলামের সাম্রাজ্য এত বিস্তার লাভ করল এবং সেই সব বিজিত দেশগুলো থেকে লুঠের মাল ও রাজস্ব হিসাবে এত টাকা আরবে আসতে শুরু করল যে জাকাত প্রায় উঠেই গেল। অর্থাৎ আরবের লোকদের কাছ থেকে জাকাত আদায় করে রাজকোষ পূর্ণ করার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। বরং বিদেশ থেকে আগত টাকা পয়সা জাকাত (ভিক্ষা) হিসাবে দরিদ্র আরবদের মধ্যে বিলি হতে থাকল। মহম্মদের মৃত্যুর পর আবু বকর ইসলাম জগতের প্রথম খলিফা হন, এবং তাঁর আমলের প্রথম বছরে মক্কা ও মদিনার মুসলমানরা মথাপিছু ৯ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) করে জাকাত পেল। এর পর দ্বিতীয় বছরে তা বেড়ে ২০ দিরহামে দাঁড়ায়। ৬৩৪ সালে আবু বকর স্বেচ্ছায় খলিফার পদ ত্যাগ করলে ওমর দ্বিতীয় খলিফা হন ও মিশর ও ইরান জয় করেন। এইসকল কারণে মহম্মদের মৃত্যুর প্রায় দুই দশকের মধ্যেই এই জাকাত বা বাৎসরিক ভাতা অবিশ্বাস্য রকম বৃদ্ধি পায়। মহম্মদের প্রত্যেক বিধবা পত্নী সর্বোচ্চ বাৎসরিক ১২০০০ দিরহাম, যারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সেই সম্মানীয় বদরীরা বাৎসরিক ৫০০০ দিরহাম, বদর যুদ্ধের আগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তারা বাৎসরিক ৪০০০ দিরহাম এবং তাদের বংশধরেরা বাৎসরিক ২০০০ দিরহাম হিসাবে জাকাত পেতে থাকল। এইভাবে রাজস্ব হিসাবে যে জাকাতের উদ্ভব হয়েছিল, আরবভূমি থেকে তা লুপ্ত হয়ে গেল। আজ মুসলীম সমাজে জাকাত বলতে বোঝায় ভিখারীকে ভিক্ষা দেওয়া।

উপরিউক্ত ভাতা বণ্টনের চিত্র থেকে দেখা যায় যে মহম্মদের বিধবা পত্নীর' সর্বাপেক্ষা সন্মানীয়া ছিলেন এবং তার পরেই ছিল বদরীদের স্থান। এই বদরীদের এত সম্মান ছিল যে, মহম্মদের সর্বকনিষ্ঠা পত্নী বিবি আয়েশার কুৎসাকারী হয়েও আবু বকরের মাসতুতো ভাই হজরৎ মিসতা শুধু বদরী হবার জন্য রেহাই পেয়েছিলেন। মহম্মদের বিধবা পত্নীদের বাৎসরিক ভাতার পরিমাণ থেকে এটা সহজেই অনুমান করা চলে যে তাঁরা সকলেই বেশ সচ্ছল জীবন যাপন করতেন। অবশ্য মহম্মদের জীবিত কালেই তাঁরা একরকম বিলাসবহুল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং এর সপক্ষে একটা উদাহরণ দেওয়া চলতে পারে। আগেই বলা হয়েছে যে, মহম্মদ শুধু ভয় দেখিয়ে বনি নাজির গোষ্ঠীর ইহুদীদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করেন। তারা তখন মদিনার উত্তরে খয়বর নামক স্থানে চলে যায়। কিন্তু এতেও তারা রেহাই পেল না। মহম্মদ তাদের উৎপন্ন শস্যের পঞ্চাশ শতাংশ কর ধার্য করলেন। এই কর থেকে যা পাওয়া যেত তার এক পঞ্চমাংশ নবী পেতেন। নবী তাঁর এই প্রাপ্য অংশ থেকে প্রত্যেক স্ত্রীকে বাৎসরিক ৮০ ওয়াসক খেজুড় ও ২০ ওয়াসক বার্লি দিতেন (মুসলীম-৩৭৫৯)। এক ওয়াসকের পরিমাণ প্রায় ২০৭ কেজি। কাজেই সেই হিসাবে প্রত্যেক পত্নী বছরে ১৬৬ কুইন্টাল খেজুড় ও ৪১ কুইন্টাল বার্লি পেতেন।

পঞ্চম স্তম্ভ হজ

আরবী হজ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল বহির্গমন করা বা যাত্রা করা, যার সঠিক ইংরাজী প্রতিশব্দ হল to set out। বিশেষ অর্থে হজ বলতে বোঝায় তীর্থভ্রমণৈ যাত্রা। সঙ্গতিসম্পন্ন মুসলমানদের জন্য সর্বপ্রধান উপাসনালয় মক্কার কাবা শরীফ এবং নবীর পুণ্য 'স্মৃতি বিজড়িত মদিনা নগরী ও সেখানকার মসজিদ নবী তীর্থ দর্শন করা ফরজ। তবে হজ শুধু তীর্থভ্রমণই নয়। মক্কা মদিনা সহ ইসলামের অন্যান্য পবিত্র স্থান দর্শন করা এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ কিছু ধর্মীয় রীতি নীতি পালন করাকেই একত্রে হজ বলে। সারা জীবনে একবার মাত্র হজ করা ফরজ এবং একাধিক বার করলে তা নফন? হজ বলে গণ্য হবে। আর্থিক দিক দিয়ে সম্ম হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি হজ করে না আল্লা তার খোঁজ-খবর রাখা প্রয়োজন মনে করেন না এবং সে ব্যক্তি ইহুদী হয়ে মারা গেল না খ্রীস্টান হয়ে মারা গেল তাতেও আল্লার কোন মাথাব্যথা থাকে না। বিত্তবানদের জন্য হজ ফরজ এবং তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে রাখাই ভাল, কারণ কে যে কখন ইন্তেকাল করবে কেউ বলতে পারে না।

আরবী বছরের শেষ তিন মাস, শওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ, হজের জন্য নিয়রিত. তবে আজকাল শুধু শেষ মাস জিলহজেই এই হজক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে। এই জিলহজ মাসের ১০ তারিখেই পূর্ববর্তী নবী হজরৎ ইব্রাহীম (বাইবেলের Abraham) তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে আল্লার কাছে কোরবানী করতে নিয়ে যান এবং সেই ঘটনার পুণ্য স্মৃতি হিসাবেই ঐ দিন বিশ্বের সমস্ত মুসলমান কোরবানীর ঈদ ঈদুজ্জোহা বা ইদ উল্ আজহা পালন করেন। যারা হজ করতে যান সেই সব হাজীরাও ঐ দিন থেকে তাদের হজের কোরবানী শুরু করেন এবং পরবর্তী তিন দিন ধরে তা চলতে থাকে। ইসলামের ওমরাও বলে আরও একটা বিশেষ পালনীয় ব্রত আছে। নিয়ম-নীতির দিক দিয়ে হজ ও ওমরাওর মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। শুধু হজের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে করলে হজ এবং বছরে? অন্য সময় করলে তা ওমরাও।

হজে যাবার আগে সমস্ত ঋণ মিটিয়ে দেওয়া উচিত, সমস্ত গচ্ছিত ধন ফেরত দেওয়া উচিত এবং হজ শেষ করে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে আসা উচিত। তিন ব্যক্তি আল্লার মেহমান বা নিমন্ত্রিত-এরা হল গাজী বা জিহাদে নিহত ব্যক্তি, হাজী বা হজ পালন করেছেন এমন ব্যক্তি এবং তৃতীয় জন হলেন ওমরাও পালনকারী। এঁরা যা প্রার্থনা করেন আল্লা তা কবুল করেন এবং আহ্বান করলে আল্লা তার জবাব দেন। এঁরা যা ব্যয় করেন তার বদলে আল্লা তাদের দশ হাজার দিরহাম পুরস্কার দেন। ইসলামে সর্ব প্রধান পুণ্যের কাজ হল আল্লা ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান রাখা। পরবর্তী পুণ্যের কাজ হল আল্লার পথে জিহাদ করা এবং তার পরের পুণ্যের কাজ হল হজ পালন করা। বৃদ্ধ, স্ত্রীলোক ও দুর্বল ব্যক্তি, যাদের পক্ষে জিহাদ করা সম্ভব নয়, তাদের কাছে হজই জিহাদ। হজের সময় স্ত্রী সংসর্গ নিষিদ্ধ এবং হজ একবার শুরু করলে তা অবশ্যই শেষ করা কর্তব্য। ইসলামের আগেও আরবদের মধ্যে হজ করার প্রথা ছিল। সে সময়কার পৌত্তলিকরা অনেক সময় হজ শুরু করে তা শেষ না করেই বাড়ী ফিরে আসত এবং পিছনের দরজা দিয়ে বাড়ীতে ঢুকত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এভাবে বাড়ীতে ঢুকলে হজ শেষ না করার পাপ মাফ হয়ে যায়। পরে আল্লা কোরানের বাণী অবতীর্ণ করে এ প্রথার নিন্দা করেন (২/১৮৯)।

হজযাত্রীদের যে সমস্ত ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে হয় তার মধ্যে সর্বপ্রথম হল ইহরাম বন্ধন করা বা সেলাইবিহীন কাপড় পরা। দু টুকরো সাদা কাপড় থাকে, তার মধ্যে এক টুকরো পরতে হয় এবং অন্যটা গায়ে জড়াতে হয়। আমাদের দেশ বা পূর্ব দিক থেকে যারা হজ করতে যান, লোহিত সাগরের তীরে এল্মলম্ পর্বতে পৌছাবার আগেই তাদের ইহরাম বন্ধন করে নেবার নিয়ম। যে সব হাজীরা জাহাজে যান তারা এল্যুলম্ পর্বতে পৌঁছুবার আগেই ইহরাম পরে নেন। আর যাঁরা বিমানে যান তাঁর। বিমানে ওঠার আগেই ইহরাম পরে নেন। এই রকম উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে আগত যাত্রীদের ক্ষেত্রেও বিশিষ্ট কতকগুলি স্থান আছে যেখানে তারা ইহরাম বন্ধন করেন। ইহরাম পরিহিত হাজীকে মুহরীম বলে। বিগত দশম হিজরীতে নবী মহম্মদ তাঁর জীবনের সর্বশেষ হজ সম্পন্ন করেন যা বিদায় হজ বা হজ্জাতুল বিদা নামে খ্যাত। আজকের হজের ব্যাপারে কর্তবা, অকর্তব্য, নিয়মরীতি, সব কিছুর আদর্শ এই বিদায় হজ। ঐ সময় মহানবী মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করে জুলহুলাইয়া নামক স্থানে ইহরাম বন্ধন করেছিলেন এবং সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আজও যারা মদিনা বা উত্তর দিক থেকে হজ করতে আসেন তারা এই জুলহুলাইয়াতেই ইহরাম বন্ধন করেন। ইহরাম বন্ধন করে নেবার পর হাজীরা হজের জন্য বিশেষ নামাজ আদায় করেন এবং তালবিয়া পাঠ করেন। এই তালবিয়া হল, "লব্বাইক আল্লাহুম্মা লব্বাইক, লব্বাইক লা শরীফ লব্বাইক; ইন্নাল হামদা অন্নিয়মাতা লাকা অল মুলক, লা শরীকা লাক"- অর্থাৎ, আমি হাজির, প্রভু আপনার আহ্বানে আমি হাজির, আপনার কোন অংশী নেই, সকল প্রশংসা আপনার এবং আপনি সকল কিছুর প্রভু, আপনার কোন শরীক নেই।

ইহরাম বন্ধন অবস্থায় গায়ে সুগন্ধি লাগানো নিষেধ এবং শিকার করা নিষেধ (৫/৯৪)। তবে অন্য কেউ শিকার করে দিলে তার মাংস গ্রহণ করতে বা খেতে কোন নিষেধ নেই। একবার এক ব্যক্তি একটা বন্য গাধা শিকার করে তার কিছু মাংস মহম্মদকে দেন এবং তিনি মুহরীম অবস্থায় তা গ্রহণ করেন এবং রান্না করা হলে খান। মুহরীম অবস্থায় শিকার করা নিষেধ বলে মনে করার কোন কারণ নেই যে হাজীরা তখন পুরোপুরি অহিংস থাকবেন। প্রয়োজন পড়লে মুহরীম কিছু কিছু জঘন্য প্রাণী মারতে পারেন, যেন কাক, চিল, ইঁদুর ও কুকুর। একবার এক উম্মত মহম্মদকে জিজ্ঞাসা করল যে, একজন মুহরীম সাপ মারতে পারে কিনা। আল্লার রসুল বললেন, "তা মারতে পারে" (মুসলীম-২৭১৭)।

কিছু হাদিস মতে মুহরীম অবস্থায় বিয়ে করা কিংবা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নিষেধ (মুসলীম-৩২৮১)। কিন্তু হিজরীর সপ্তম বছরে মহম্মদ মুহরীম অবস্থায় বিবি মায়মুনাকে বিবাহ করেছিলেন। ঐ বছর মক্কার কোরেশরা নবীকে তিনদিন মক্কায় থেকে হজ করার অনুমতি দেয় এবং সেই সময় তিনি মুহরীম অবস্থায় হারিস নামক এক ব্যক্তির বিধবা মেয়ে মাইমুনাকে নিকা করেন। মুসলমান ভাষ্যকারদের মতে মক্কার কোরেশদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই নবী এই নিকা করেছিলেন। কিন্তু যতদূর মনে হয় নবীর এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল হয়নি। কারণ মহম্মদ যখন মক্কায় আর একদিন বেশী থাকার আবেদন জানালেন এবং বদলে মক্কাবাসীদের বিয়ের ভোজ খাওয়াবার লোভ দেখালেন, কোরেশরা তাতে আমল তো দিলই না এবং তৎক্ষণাৎ তাঁকে মক্কা ত্যাগ করতে বাধ্য করল। (১২)

এর পর হাজীরা মক্কার কাবা শরীফে নামাজ পড়েন এবং কাবা শরীফকে ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১২) Mahammad Encyclopacdia, Seerah Fomdation, London. Vol-2, P-201  

তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন। সাতবার প্রদক্ষিণ করলে একবার তাওয়াফ সম্পূর্ণ হয়। আগে শুধু পায়ে হেঁটেই তাওয়াফ করার রীতি ছিল, কিন্তু একবার হজরতের এক পত্নী বিবি উম্মে সালামা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তাকে পাল্কী করে তাওয়াফ করতে বলেন এবং সেই থেকে রুগ্ন, বৃদ্ধ ও শাবীরিক দিক থেকে অক্ষম বা পঙ্গু ব্যক্তিদের পাল্কী করে তাওয়াফ করার রীতি চালু হয়। বিদায় হজের সময় এত লোকের ভীড় হয়েছিল যে, হেঁটে তাওয়াফ করা নবীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তিনি তাঁর প্রিয় উট আল কাসোয়ায় চড়ে তাওয়াফ করেন। মেয়েদের পক্ষে ঋতুকালে তাওয়াফ করা নিষেধ। তবে ঋতুকাল উত্তীর্ণ হলে প্রয়োজনীয় তাওয়াফ সেরে নেওয়া যায় এবং তাতেও সমান পুণ্য হয়। বিদায় হজের সময় বিবি আয়েশা ঋতুমতী হলে নবী তাকে হজের আর সমস্ত ক্রিয়াকলাপ যথারীতি করতে বলেন, শুধু তাওয়াফ করতে নিষেধ করেন। ইসলামের আগে, জাহেলিয়াতের যুগে একমাত্র কোরেশ ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার রীতি প্রচলিত ছিল। বিদায় হজের ঠিক আগের বছর আল্লা কোরানের আয়াৎ অবতীর্ণ করে এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটান (৭/৩১)।

মক্কা বিজয়ের সময় আল্লার রসুল তাঁর উম্মতদের বীরের মত বুক ফুলিয়ে হেলে দুলে, অনেকটা don't care ভাবে তাওয়াফ করতে নির্দেশ দেন। একে তাওয়াফে রমল বলে। মক্কাবাসীদের ভয় দেখানোই এর উদ্দেশ্য ছিল। পরে সবাই মুসলমান হয়ে গেলে এ প্রথা আপনা-আপনিই বন্ধ হয়ে যায়। তবে রসূলুল্লা করেছিলেন সেই সুন্নত হিসাবে এখনও কেউ কেউ তাওয়াফে রমল করেন। প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, কাবা শরীফে তাওয়াফ কখনও বন্ধ হয় না। যখনই সেখানে যাওয়া যাবে তখনই দেখা যাবে যে কেউ না কেউ তাওয়াফ করছে। মুসলমানদের বিশ্বাস যে এমন কোন পার্থিব শক্তি নেই যা কাবা শরীফে তাওযাফ বন্ধ করতে সক্ষম। তবে কেয়ামতের কিছু পূর্বে এক স্থূলকায় কলো হাবসী কাবা ধ্বংস করবে এবং সেই দিনই তাওয়াফ বন্ধ হবে। (১৩)

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে হজের ব্যপারে তো বটেই, তা ছাড়া কিবলার মধ্যে দিয়ে ইসলামে কাবার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃত পক্ষে মক্কার কাবাই ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলমানদের মতে মক্কার কাবা পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত এবং এর ঠিক উপরেই আছে স্বর্গের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত স্বর্গীয় উপাসনাগার বায়তুল মামুর। অর্থাৎ সেই বায়তুল মামুর থেকে যদি একটা দড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া যায় তবে তা মক্কার কাবাকে স্পর্শ করবে। এমন কি, সেই দড়ি বেয়ে যদি কেউ উপরে উঠতে শুরু করে তবে সে স্বর্গের বায়তুল মামুরে পৌঁছে                                     ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১৩) কোরান শরীফ, শ্রী গিরিশচন্দ্র সেন, হরফ, পৃঃ ৪৬৭

যাবে, তবে সময় লাগবে ৫০০ বছর। তবে এই দূরত্ব আসা-যাওয়া করতে ফেরেস্তা জিব্রাইলের মাত্র একদিন সময় লাগে।

হজরৎ আদম যতদিন স্বর্গে ছিলেন ততদিন তিনি বায়তুল মামুরেই আল্লার উপসনাদি করতেন। কিন্তু স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে পৃথিবীতে আসার পর থেকে উপাসনাগারের অভাবে তাঁর খুব অসুবিধা হতে থাকল এবং এই মর্মে আল্লার কাছে আর্জি পেশ করতে থাকলেন। আল্লা তখন ফেরেস্তা জিব্রাইলকে মক্কায় পাঠালেন এবং সে তখন তার নূরের ডানা দিয়ে মাটিতে ঝাপটা মারতে লাগল। এতে করে বিশাল এক খাদের সৃষ্টি হল যার গভীরতা পৃথিবীর সপ্তম তলে গিয়ে পৌঁছালো। তারপর অন্যান্য ফেরেস্তাগণ বেশ, জুদী, তুর ও লেবাননের পর্বত থেকে পাথর এনে সেই খাদে ফেলতে থাকল। অচিরেই সেই খাদ ভর্তি হয়ে গেল এবং এই ভাবেই বর্তমান কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপিত হল। (১৪) কাজেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কাবার ভিত খুবই মজবুত।

ভিত অত মজবুত হল বটে, কিন্তু কাবার কাঠামো অত মজবুত হল না, কারণ হজরৎ আদম ও তাঁর তৃতীয় পুত্র শীশ শুধু কাদা দিয়ে পাথর গেঁথে প্রথম কাবাগৃহ নির্মাণ করলেন। এই কারণেই নূহের প্লাবনের সময় তা ভেসে গেল এবং কালক্রমে তা একটা বালির ঢিবিতে পরিণত হল। হজরৎ হুদের সময় আরবের লোকেরা এই বালির ঢিবিকেই কাবা বলে মানত এবং সেখানেই তারা আল্লার উপাসনা করতো। কিন্তু কালক্রমে কাবার সেই চিহ্নও লুপ্ত হয়ে যায়। এখানে বলে রাখা দরকার যে, আরবী কাবা শব্দের অর্থ ঘনক বা ইংরাজীতে কিউব (cube)। কাজেই এমন হতে পারে যে, পরবর্তীকালে এই আরবী কাবা থেকেই ইংরাজী cube শব্দ এসেছে। তবে পৃথিবী সৃষ্টি করার দু হাজার বছর আগে আল্লা কাবার একটা অনুকৃতি বা মডেল তৈরি করে স্বর্গে রেখেছিলেন এবং তার অনুকরণেই হজরৎ আদম কাবাগৃহ তৈরি করেছিলেন। প্রথম সেই কাবাগৃহের শুধু চারদিকে দেয়াল ছিল, ছাদ ছিল না।

এরপর প্রায় খ্রীঃ পূর্ব ২০০০ সালে নবী ইব্রাহীম কাবা পুনর্নিমাণের জন্য আল্লা কর্তৃক আদিষ্ট হন (২/১২৬,১২৭)। ইসলামী মতে হজরৎ ইব্রাহীম হজরৎ আদমের ২০তম বংশধর এবং আনুমানিক সম্রাট হামুরাবির রাজত্বকালে ব্যাবিলনে জন্মগ্রহণ করেন (১০)। ইব্রাহীম যখন আল্লা কর্তৃক আদিষ্ট হলেন তখন তিনি শামদেশ বা বর্তমান সীরিয়ায় ছিলেন এবং ফেরেস্তা জিব্রাইল তাঁকে বোরাক বাহনে করে মক্কায় নিয়ে আসেন। মতান্তরে শাকীনা নামে এক প্রবল বাতাস তাঁকে শামদেশ থেকে উড়িয়ে মক্কায় নিয়ে আসে। ঐ সময় আকাশে একখণ্ড মেঘ উড়ে আসে এবং তার ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১৪) কাবার পথে, ১ম খণ্ড, ১১তম অধ্যায়।

(১৫) H. G. Wells. A Shorts History of The World (Pelican), P-84.

ছায়া শুধু কাবার ভিতের উপর পতিত হয়। ফলে ইব্রাহীম কাবার ভিতকে সনাক্ত করতে সক্ষম হন। অন্য মতে ফেরেস্তা জিব্রাইল কাবার ভিতের চারিদিকে দাগ কেটে দেয় এবং তার ফলেই ইব্রাহীম তা চিনতে পারেন (১৬)

অনতিবিলম্বে ইব্রাহীম পুত্র ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে কাবাগৃহ নির্মাণে হাত দিলেন এবং তিনিও কাদা দিয়ে পাথর গেঁথে কাবার দেয়াল তুললেন। তখনও কাবার ছাদ তৈরি করা সম্ভব হল না। যখন কাবা তৈরি শেষ হল তখন ইব্রাহীমের বয়স দাঁড়াল ১০০ বছর। তারপর আল্লা সবাইকে কাবায় হজ করতে ডাকার জন্য ইব্রাহীমকে আদেশ করলেন (২২/২৬,২৭)। কিন্তু ইব্রাহীম বললেন যে, তার ডাক তো বেশীদূর পর্যন্ত পৌঁছাবে না। তখন আল্লা বললেন, "আমি তোমাকে ডাকতে বলছি, তাই তোমার কাজ হল ডাকা। বাকীটা আমি দেখছি।" ইব্রাহীম তখন আবু করিশ পাহাড়ের উপর উঠে সবাইকে হজ করার জন্য ডাকতে লাগলেন। অন্যমতে ইব্রাহীম যখন সবাইকে ডাকার জন্য একটা পাথরের উপর উঠলেন তখন এক অলৌকিক শক্তিতে তা আকাশে উঠে গেল এবং তাঁর আহ্বানে দূর-দূরান্ত থেকে কাতারে কাতারে লোক আল্লাহুম্মা লব্বাইক আল্লাহুম্মা লব্বাইক বলতে বলতে হজ করতে আসতে শুরু করল এবং এই ভাবে বর্তমান হজ ক্রিয়ার সূচনা হল।

এরপর মহম্মদের যৌবনকালে মক্কার কোরেশরা ইব্রাহীম নির্মিত কাবাগৃহ ভেঙে নতুন করে কাবা তৈরি করে যা ইব্রাহীম নির্মিত কাবার চাইতে কিছুটা ছোট আকারে করা হয়। মহম্মদের মৃত্যুর পর হিজরীর ৬৪ সনে আবদুল্লা বিন যুবায়ের ঐ কাবাকে ভেঙে ফেলে ইব্রাহীম-নির্মিত কাবার মাপে আবার কাবা নির্মাণ করেন এবং এর মাত্র দশ বছর বাদে, ৭৪ হিজরীতে হাজ্জাশ বিন ইউসুফ সেই কাবাকে ভেঙে মহম্মদ যেই কাবা দেখে গেছেন ঠিক সেই আকারে কাবা নির্মাণ করেন। এই ইউসুফ-নির্মিত কাবাই বর্তমানে রয়েছে যার মাপ হল- দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট, প্রস্থ ৩৫ ফুট ও উচ্চতা ৫০ ফুট। ইব্রাহীম-নির্মিত কাবার চাইতে বর্তমান কাবা প্রস্থে কম হবার জন্য পুরাণো কাবার কিছুটা অংশ বাইরে চলে যাওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় ব্যাপারে তা কাবার অভ্যন্তর বলে গণ্য হয়ে থাকে। একে হাতীম বলে এবং কেউ হাতীমে নামাজ পড়লে সে কাবার ভিতরে নামাজ পড়ার ফল পায়। কাবার ছাদ থেকে বৃষ্টির জল পড়ার জন্য একটা নল আছে যার নাম মীজাবে রহমৎ। বৃষ্টির জল মীজাবে রহমৎ দিয়ে হাতীমে পতিত হয়। এই জল মুসলমানদের কাছে খুবই পবিত্র।

কাবার চারটি কোণের বিশেষ নাম আছে। সীরিয়ার দিকের কোণের নাম রুে শামী, ইয়েমেনের বা দক্ষিণ দিকের কোণের নাম রুকনে ইয়ামানী, ইরাকের দিকের কোণের নাম রুকনে ইরাকী এবং কাবার যেই কোণে পবিত্র কৃষ্ণ প্রস্তর হাজরে                                    ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১৬) কোরান শরীফ, গিরিশচন্দ্র সেন (হরফ), পৃঃ ৫১৩।

আসোয়াদ রয়েছে সেই কোণের নাম রুকনে আসোয়াদ। কাবাগৃহ তৈরির মধ্যে কোন উন্নত স্থাপত্যের নিদর্শন বা শৈল্পিক উৎকর্ষ নেই এবং খুবই মোটা দাগের কাজ। এবড়ো খেবড়ো অমসৃণ পাথরের চাঁই ইয়েমেনী সুরকী দিয়ে গেঁথে তৈরি। একটা কালো কাপড়ের ঢাকনা বা গিলাফ দিয়ে কাবাগৃহ ঢাকা থাকে এবং গিলাফে কোরানের বাণী উৎকীর্ণ করা থাকে। হজের সময় বছরে একবার গিলাফ পাল্টানো হয়। কাবা শরীফে একটা মাত্র দরজা আছে। বছরের অন্য সময় এই দরজা তালাবন্ধ থাকে, শুধু হজের মরশুমে খুলে দেওয়া হয়। হজের সময় হাজীরা কাবার ভিতরে যেয়ে হাজরে আসোয়াদকে চুম্বন করেন। এই সময় ভীড়ের চাপে খুব কম হাজীই ভিতরে যেয়ে হাজরে আসোয়াদকে চুম্বন করতে সুযোগে পান এবং যারা তা পারেন না তাঁরা বাইরে থেকে সাঙ্কেতিক চুম্বন করেন। হজ্জাতুল বিদার সময় আল্লার রসুল লাঠির সাহায্যে হাজরে আসোয়াদকে প্রতীকি চুম্বন করেন।

কাবার দক্ষিণ পূর্ব কোণে, ভূমি থেকে প্রায় ৪ বা ৫ ফুট উপরে এই হাজরে আসোয়াদ রক্ষিত আছে। প্রায় ৭ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট প্রায় গোলাকৃতি (oval) এই হাজরে আসোয়াদ ডজনখানেক ছোট ছোট কালো পাথরের টুকরো রক্তাভ সিমেন্ট দিয়ে জুড়ে তৈরি। কথিত আছে যে, হজরৎ আদম কাবাগৃহ তৈরি করলে পর ফেরেস্তা জিব্রাইল স্বর্গ থেকে হাজরে আসোয়াদকে নিয়ে আসেন এবং সেখানে স্থাপন করেন। তখন এর রঙ দুধের মত সাদা ছিল এবং কালক্রমে মানুষের পাপ শোষণ করতে করতে এর রঙ কালো হয়ে যায়। নূহের প্লাবনের সময় কাবাগৃহ ভেঙে পড়লে ফেরেস্তাগণ হাজরে আসোয়াদকে নিকটবর্তী আবু কুবায়েশ পর্বতের কোন এক স্থানে সুরক্ষিত করে রাখেন। এর পর হজরৎ ইসমাইল যখন কাবাগৃহ নির্মাণ করছিলেন তখন একদিন বিশেষ একটি পাথরের সন্ধানে ইসমাইল আবু কুবায়েশ পর্বতে যান এবং তখন জিব্রাইল হাজরে আসোয়াদকে ইসমাইলের হাতে ফেরত দেন। ইসলাম ঘোরতর ভাবে পৌত্তলিকতা-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কাবা ও তার অভ্যন্তরস্থ হাজরে আসোয়াদকে ঘিরে মুসলমানরা যে ঘোরতর পৌত্তলিক মনোভাবের পরিচয় দিয়ে থাকেন তা বিস্ময়কর।

যাই হোক, এর পর হাজীরা কাবার নিকটবর্তী সাফা ও মারোয়া পর্বতে যান এবং দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে সায়ী বা দৌড়াদৌড়ি করেন। সাতবার সায়ী কাবার নিয়ম, চারবার যাওয়া, তিনবার আসা। কথিত আছে যে, পূর্ববর্তী রসুল ইব্রাহীমের দুই পত্নী ছিল, বিবি সারা ও বিবি হাজেরা। ইব্রাহীমের মিশর ভ্রমণকালে সেখানকার ফেরাউন বিবি সারার সেবা যত্ন করার জন্য হাজেরাকে ক্রীতদাসী হিসাবে দান করেন। বিবি সারার কোন সন্তান না হওয়ায় তিনি নিজেকে বন্ধ্যা মনে করে হাজেরার সঙ্গে ইব্রাহীমের বিবাহ দেন। কিন্তু হাজেরা গর্ভবতী হলে সারার মনে সপত্নীসুলভ বিদ্বেষভাব দেখা দেয় এবং পুত্র ইসমাইল ভূমিষ্ঠ হলে সেই বিদ্বেষ প্রবল আকার ধারণ করে। বিবি সারা তখন পুত্র ইসমাইল সহ হাজেরাকে পরিত্যাগ করার জন্য ইব্রাহীমকে প্ররোচিত করতে থাকেন। কিছুদিন পর আল্লা বিবি সারার পরামর্শকে অনুমোদন করলে ইব্রাহীম শিশুপুত্র ইসমাইল ও বিবি হাজেরাকে নির্বাসিত করলেন।(১৭) আজ যেখানে মক্কা নগরী সেই সময় তা ছিল এক জনমানবহীন মরু প্রান্তর। ইব্রাহীম ইসমাইল ও হাজেরাকে সেখানে রেখে এলেন। সঙ্গে রেখে এলেন এক মশক জল ও কিছু খেজুর।

অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সেই পানি ও খেজুর ফুরিয়ে গেল। পানির অভাবে হাজেরার বুকের দুধও শুকিয়ে গেল। তৃষ্ণায় মৃতপ্রায় শিশু ইসমাইলকে বাঁচাবার জন্য হাজেরা তখন উন্মত্তের মত আশেপাশে জন বসতির খোঁজ করতে লাগলেন। একবার তিনি সাফা পর্বতে ওঠেন, জনবসতির খোঁজ করেন। আবার পরক্ষণেই মারোয়া পর্বতে ওঠেন। দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা নিয়ে এইভাবে সাতবার তিনি সাফা ও মারোয়া পর্বতের মধ্যে ছোটাছুটি করেন এবং এই ঘটনার স্মরণেই হাজীরা সাফা মারোয়ায় সায়ী করেন। এই সায়ী করার সময় হাজীরা বলেন, "আল্লা ব্যতীত উপাস্য নেই। তিনি তাঁর কথা রেখেছেন, সেবক মহম্মদকে শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি একাই অসংখ্য অংশীবাদীকে তাড়িয়ে দিয়েছেন।

যাই হোক, সাতবার ছোটাছুটি করে মা হাজেরা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তখন ফেরেস্তা জিব্রাইল সেখানে উপস্থিত হলেন এবং পায়ের ক্ষুর দিয়ে বালি সরিয়ে এক কূপের সৃষ্টি করেন। এই কূপের নামই হল বিখ্যাত জমজম কূপ, যার পানি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র শরাবান তহুরা বা স্বর্গীয় সুধা। হাজীরা হজ শেষ করে ফেরার সময় পাত্রে করে এই পবিত্র পানি নিয়ে আসেন। হাজীরা সায়ী করে ক্লান্ত হবার পর এই পানি পান করেন। জাহেলিয়াতের যুগে মহম্মদের পিতামহ আব্দুল মোত্তালেব ও তাঁর পরিবারের উপর দায়িত্ব ছিল হাজীদের জমজমের পানি পান করাবার। মক্কা বিজয়ের পর মহম্মদ তাঁর আর এক চাচা আব্বাস ও তাঁর পরিবারের উপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং আজও সেই বংশের লোকেরাই এই মহান দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। জাহেলিয়াতের যুগে পৌত্তলিক কোরেশরা সাফা পর্বতের উপর দেবী আসাফ ও মারোয়া পর্বতের উপর দেবী নয়লার মূর্তিস্থাপন করেছিল যা মুসলমানরা মক্কা দখল করার পর ভেঙে ফেলে। প্রকৃতপক্ষে সাফা মারোয়া পর্বতও আজ পায় কেটে সাফ করে ফেলা হয়েছে। শুধু প্রতীক হিসাবে কিছুটা অংশ রেখে দেওয়া হয়েছে।

আরবে জলের খুবই অভাব এবং যেখানে জল পাওয়া যায় সেই জলের ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১৭) কোরান শরীফ, শ্রীগিরিশচন্দ্র সেন (হরফ), পৃঃ ২৭৫

উৎসকে কেন্দ্র করেই জনবসতি গড়ে ওঠে। সেই একই ভাবে জমজম কূপকে ঘিরে জনবসতির সূত্রপাত হল এবং এইভাবে মক্কা নগরীর সৃষ্টি হল। পরবর্তীকালে এই জমজম কূপ হারিয়ে যায়। একবার মক্কায় অত্যধিক জলকষ্ট হলে আব্দুল মোত্তালেব প্রতিজ্ঞা করলেন যে, জমজম কূপ আবিষ্কার করতে পারলে তিনি তাঁর দশ (মতান্তরে বার) পুত্রের মধ্যে একজনকে আল্লার কাছে কোরবানী দেবেন। ভাগ্যক্রমে তিনি জমজম কূপ আবিষ্কার করতে সক্ষম হলেন এবং কোন ছেলেকে কোরবানী দেবেন তা স্থির করার জন্য লটারী করলে ছেলে আবদুল্লার নাম উঠল। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে নিরস্ত করল। এবং আবদুল্লার বদলে ১০০টা উট কোরবাণী করা হল। এই আবদুল্লা ছিলেন মহম্মদের পিতা। আবদুল কথার অর্থ দাস। আবদুল ও আল্লা, এই দুই শব্দ মিলে আবদুল্লা হয়। কাজেই আবদুল্লা বলতে বোঝায় আল্লার দাস। কাজেই যদি ইব্রাহীম দ্বারা ইসমাইলের কোরবানী সফল হতো তবে মহম্মদের বংশের উৎপত্তি হত না। আবার আবদুল মোত্তালেব দ্বারা আবদুল্লার কোরবানী সফল হলে মহম্মদের জন্ম হত না। কারণে মহম্মদকে অনেক সময় দুই কোরবানীর পুত্র বলা হয়।

জমজম কূপের জল স্বাভাবিক ভাবেই পবিত্র, উপরন্তু মক্কা বিজয়ের পর আল্লার রসুল ঐ জলকে তাঁর থুথুর দ্বারা চিরকালের জন্য পবিত্র করে রেখে যান। নবীর থু থু খুবই পবিত্র এবং বহুবার বহু পরিস্থিতিতে নবী তাঁর এই পবিত্র থুথুর প্রয়োগ করেন। আসমা বিনতে আবু বকরের বড় মেয়ে আসমার ছেলে হলে সে তাকে নবীর কাছে নিয়ে আসে এবং নবী সেই সদ্যোজাত শিশুকে তাঁর থুথু খাইয়ে পবিত্র করেন, ইসলামী পরিভাষায় এটিকে “তাহনিক” (تحنيك) বলা হয় ওহুদ যুদ্ধের সময় তাঁর এক অনুচর চোখে আঘাত পায় এবং নবী তার চোখে থুথু দিলে তা ভালো হয়ে যায়। খয়বর অভিযানের সময় নবীর চাচাত ভাই তথা জামাতা আলির চোখে প্রদাহ হয় এবং নবীর থুথুতে তা আরোগ্য হয়। আবদুল্লা বিন উবাইয়া নামে এক অনুচর মারা গেলে নবী মৃত আবদুল্লার মুখে থুথু দিয়ে তার পরলোকের পথ প্রশস্ত করেন (মুসলীম ৬৬৭৯,৬৬৮০)।

যাইহোক, সায়ী করার ফলে ক্লান্ত হাজীরা জমজমের পানি পান করে সুস্থ হয়ে মক্কার নিকটবর্তী মিনা নামক স্থানে যান এবং সেখানে রাত্রি যাপন করেন। আজকাল হাজীদের রাত্রিবাস করার জন্য সৌদি সরকার অসংখ্য তাঁবুর ব্যবস্থা করে থাকে এবং গত ১৯৯৭ সালে এই তাঁবুতে আগুন ধরে যায় এবং অনেক হাজী মারা যান। হজের অঙ্গ হিসাবে এই রাত্রিবাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই রাতকে আরাফত-এর রাত বলে এবং মুসলমানদের কাছে এই রাত সহস্র লায়লাতুল কদর অপেক্ষাও পবিত্র। এই লায়লাতুল কদরের অন্য নাম শবে কদর। এই রাত খুবই পবিত্র কারণ এই রাতেই সৎপথের দিশারী হিসাবে আসমানী কেতাব কোরণ শরীফ নাযেল হয়েছিল।

যারা এই পবিত্র আরাফতের রাত্রে বিশেষ নামাজ, দোয়া, মোনাজাত ইত্যাদি করে আল্লা তাদের কেয়ামতের দিন পর্যন্ত জীবিত রাখেন, তাদের সব গোনাহ মাফ করেন এবং তাদের জন্যে দোজখ (নরক) এর আগুনকে হারাম করেন (অর্থাৎ নরকের আগুন তাদের পোড়াতে পারে না)। এই রাতে যে বান্দা চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করে আল্লা তার সব প্রার্থনা কবুল করেন। এই কারণে ধর্মপ্রাণ ও নিষ্ঠাবান মুসলমানরা এই আরাফতের রাতটা বিশেষ নামাজ, দোয়া ইত্যাদি করেই কাটান এবং পরদিন সকালে তারা আরাফত নামক স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

আরাফতের প্রান্তর আদি পিতা হজরৎ আদম ও মা হাওয়ার পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত। মক্কা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে দয়ার পাহাড় জবলে রহমৎ এবং তার পাশেই আরাফা পর্বত। আরাফা পর্বতের গা ঘেঁষেই এই আরাফৎ প্রান্তর অবস্থিত। আরাফৎ শব্দের অর্থ মিলন। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হবার পর হজরৎ আদম ও মা হাওয়া অনেক দিন বিচ্ছিন্ন ভাবে কাটান এবং তারপর আল্লার ইচ্ছায় এই আরাফৎ প্রান্তরেই তাদের মিলন সংঘটিত হয়। তাই এই প্রান্তর আরাফৎ বা মিলনের প্রান্তর। মিলিত হবার পর এই প্রান্তরে তাঁরা মিলিতভাবে যে প্রার্থনা করেছিলেন তাতে সন্তুষ্ট হয়েই আল্লাতায়লা তাদের গন্দমবৃক্ষের ফল খাবার পাপ মাফ করে দেন। এই কারণে এই প্রান্তরে যে নামাজ পড়ে সে অনেক বেশী করে আল্লার রহমৎ পায়। আরাফতের দিন সমস্ত হাজীরা যখন এই প্রান্তরে সমবেত হয়, আল্লা তখন ফেরেস্তাগণকে সঙ্গে করে আকাশের সব থেকে নীচের আকাশে নেমে আসেন এবং বান্দাদের প্রার্থনা কবুল করেন। তিনি তখন তাঁর ফেরেস্তাগণকে বলেন, দেখ, আমার জন্যে আমার বান্দারা এখানে মিলিত হয়ে প্রার্থনা করছে। তোমরা সাক্ষী থাক, আমি এদের সব গোনাহ মাফ করে দিলাম।" এইদিন আল্লা তাঁর জাহান্নমের সব দরজা খুলে দেন এবং সর্বাধিক সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নমের আগুন থেকে মুক্তি দেন। এখানে বলে নেওয়া দরকার যে, ইসলামী মতে সাত রকমের নরক আছে যার মধ্যে জাহান্নম নামক নরক শুধু মুসলমানদের জন্যই সংরক্ষিত। এই নরকের আগুনের দাহিকা শক্তিও অন্য নরকের থেকে অনেক কম। আল্লা জাহান্নমের দরজা খুলে দেবেন বলতে বোঝায় যে, ঐ দিন শুধু মুসলমান নরকবাসীরাই নরক থেকে স্বর্গে যাবে।

রসুলুল্লার জীবনের শেষ বছর আরাফতের মাটি তাঁর কদম মুবারক চুম্বন করোছিল। ঐ দিন তিনি বিদায় হজ সমাপন করে লক্ষাধিক মুসলমানের এক বিশাল সমাবেশে তাঁর বিদায় ভাষণ দেন এবং এর মধ্য দিয়ে ইসলামের মূল নীতিগুলো ব্যাখ্যা করেন। এই ভাবেই তিনি "কুল্লে মুসলেমীন ইথুয়াতুন" বা বিশ্বব্যাপী মুসলীম ভ্রাতৃত্বের নীতিও ব্যাখ্যা করেন। এই সমস্ত কারণে আরাফতের এই পবিত্র কুদুম ইলাকায় প্রবেশ করলে বা কিছুক্ষণ অবস্থান করলে মানুষ আপানিই হাজী হয়ে যায়।

নবম হিজরীতে, মক্কা বিজয়ের ঠিক পরে পরেই আল্লা পবিত্র কোরানের সুর' নসর (১১০নং সুরা), অবতীর্ণ করে বললেন, "যখন আল্লার সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লার দ্বীনে (ধর্মে) প্রবেশ করতে দেখবে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসার দ্বারা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর"। প্রকৃতপক্ষে মক্কা বিজয়ের পর মহম্মদ হলেন সমগ্র জাজীরা তুল আরবের একচ্ছত্র অধিপতি। দলে দলে লোক তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার মাধ্যমে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করল এবং মুসলমানের সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত হারে বাড়তে লাগল। ঠিক এই সময় আল্লাতায়লার উপরিউক্ত বাণী অবতীর্ণ হওয়াতে আল্লার রসুল স্থির করলেন যে আরবের সমস্ত মুসলমানদের একত্র করে এক বিশাল জমায়েত করবেন। সঙ্গে সঙ্গে এটাও স্থির করলেন যে, এরকম একটা বিশাল জমায়েৎ করার জন্য হজই হল সর্বোৎকৃষ্ট পথ।

কিন্তু অসুবিধা রইল একটাই, অ-মুসলমানদের জন্য তখনও কাবায় হজ করতে যাওয়া নিষিদ্ধ হয়নি। নবীর অভিপ্রায় অনুধাবন করতে আল্লার বিলম্ব হল না এবং তিনি অংশীবাদী কাফেরদের জন্য কাবার পবিত্র এলাকায় প্রবেশ ও হজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন (৯/৩)। কাজেই এটা নিশ্চিত হল যে, হজের জন্য জমায়েত শুধু আল্লার দ্বীনে প্রবেশকারীদেরই জমায়েত হবে। আল্লা ইতিমধ্যে নগ্ন হয়ে তাওয়াফ করাকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন (৭/৩১)। আল্লার এই দুই নিষেধাজ্ঞা কাবায় সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সেই বছর নিজে না গিয়ে আবুবকর ও আলির নেতৃত্বে ৩০০ মুসলমানের একটি দলকে মক্কায় হজ করতে পাঠালেন এবং পরের বছর নিজে যাবেন স্থির করলেন।

ইসলামের পাঁচস্তম্ভ
পরের বছর আরবের সমস্ত গোষ্ঠী পতিদের কাছে হজে যোগ দেবার অনুরোধ জানিয়ে খবর পাঠানো হল। গোষ্ঠীপতিরাও বুঝতে পারলেন যে, এ শুধু অনুরোধ নয়, তার চেয়ে কিছু বেশী এবং দলবল নিয়ে হজে যোগ না দিলে ভবিষ্যতে তার জন্য অবশ্যই খেসারত দিতে হবে। দশম হিজরীর ২৬শে জিলকদ, শনিবার প্রিয় আল কাসোয়া উষ্ট্রীতে চেপে আল্লার রসুল মদিনা ত্যাগ করলেন। মদিনা থেকে যাত্রা করার সময় তাঁর সঙ্গী হল প্রায় ৭০ হাজার মুসলমান। পথের দুপাশ থেকে আরও কাতারে কাতারে লোক এসে যোগ দিতে লাগল এবং মক্কায় পৌঁছে এই লোকসংখ্যা দাঁড়াল প্রায় সোয়া লক্ষ। এর সঙ্গে মক্কার মুসলমানদের যোগ করে মোট লোকসংখ্যা প্রায় দু লক্ষে পৌঁছালো। ক্রীতদাসী ও রক্ষিতা বাদে এই সময় নবীর নয়জন বিবি ছিল এবং তাঁরা হলেন, সৌদা, আয়েশা, হাফসা, উম্মে সালমা, জয়নব, জয়েরিয়া, উম্মে হাবিবা, সফিয়া ও মায়মুনা। (১৮) এই পত্নীরাও নবীর সঙ্গে মক্কায় গিয়েছিলেন এবং নবী সঙ্গে নিয়েছিলেন কোরবানী করার জন্য ১০০ উট।

আরবে উট খুবই মূল্যবান এবং সেই কারণে কোরবানীর উটের সংখ্যা থেকে নবীর তৎকালীন আর্থিক সচ্ছলতার একটা চিত্র পাওয়া যায়। এর চার বছর আগে, হুদাইবিয়ার চুক্তির বছর, তিনি কোরবানীর জন্য সঙ্গে নিয়েছিলেন ৭০টি উট। এই সমৃদ্ধির উৎস হল জিহাদ-লব্ধ গণিমতের মালের পবিত্র খুম এবং ফেই। এর আগে নাজির গোষ্ঠীর সমুদায় সম্পত্তি যে ফেই হিসাবে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল তা আগেই বলা হয়েছে। খয়বর থেকে কর হিসাবে যা আসত তার ১/৫ অংশ যে নবী পেতেন তাও আগে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বনি কুরাইজা, বনি কানুইকা, বনি হারিস ইত্যাদি গোষ্ঠীর ইহুদীদের কাছ থেকে যে বিপুল গণিমতের মাল পাওয়া যায় তার এক-পঞ্চমাংশও নবী খুম হিসাবে পেয়েছেন। এছাড়া ছোটখাট জিহাদের দ্বারা লব্ধ গণিমতের মাল তো ছিলই।

মহম্মদ মোট দশ বছর মদিনায় বাস করেন এবং এই সময়ের মধ্যে মুসলমানরা মোট ৮২টি আক্রমণ ও লুণ্ঠন চালায় যার মধ্যে ২৬টি ছিল গাজোয়াৎ এবং বাকীগুলো ছিল সরিয়া। যে সমস্ত আক্রমণ ও লুষ্ঠনে স্বয়ং নবী অংশগ্রহণ করতেন সেগুলোকে গাজোয়াৎ বলে। কাজেই এই সমস্ত অভিযান থেকে খুম হিসাবে নবী কত ধন সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন তা সহজেই অনুমান করা চলে। এই সব গণিমতের মালের মধ্যে যে সব যুদ্ধবন্দী থাকত বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যেকার সক্ষম পুরুষদের হত্যা করা হত। যে সব নারী ও শিশুদের রেহাই দেওয়া হত তাদের মধ্যে সুন্দরী নারীরা নবী কিংবা তাঁর প্রিয় অনুচরদের হারেমে স্থান পেত এবং বাদবাকীদের ক্রীতদাসী হিসাবে বিক্রী করা হত। এই ক্রীতদাসী বিক্রী থেকেও ভালই আয় হত। মহানবী বনি মুস্তালেকদের বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে গণিমতের মাল হিসাবে জয়েরিয়াকে লাভ করেন এবং খয়বর অভিযানকালে ইহুদী দলপতির কন্যা সফিয়াকে লাভ করেন। সফিয়ার প্রকৃত নাম ছিল জয়নব। সাধারণত গণিমতের মালের শ্রেষ্ঠ বস্তুকে সফিয়া বলে। খয়বর থেকে লব্ধ গণিমতের মালের মধ্যে জয়নব শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয় যার ফলে তার নাম হয়ে যায় সফিয়া। এ প্রসঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন যে, গণিমতের মাল ভাগাভাগির সময় সফিয়া অংশটা আল্লার রসুলেরই প্রাপ্য হত।

যাই হোক, বিদায় হজের সময় নবী আল কাসোয়ায় চড়ে তাওয়াফ করেন এবং লাঠির সাহায্যে হাজরে আসোয়াদকে প্রতীকি চুম্বন করেন। এই সময় হজক্রিয়ার      ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১৮) Mahammad Encychopacdia, Seera Foundation (London). Vol-2. p-206

আরও কিছু কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন সাফা ও মারোয়া পর্বতে আসাফ ও নয়লার মূর্তি ছিল বলে প্রথম প্রথম উম্মতরা সায়ী করতে কুণ্ঠিত হচ্ছিল। তখন আল্লা কোরানের আয়াৎ অবতীর্ণ করে সায়ী করাকে হজের অন্তর্ভুক্ত করেন (২/১৫৮)। আগে হজের কালে স্ত্রী-সংসর্গ পাপ বলে বিবেচিত হত এবং এই সময় নবী তা বৈধ বলে ঘোষণা করেন (বুখারী-১৪৪৩)। আগে কাবার ভিতরে ৩৬০ রকমের মূর্তি থাকায় নবী কাবার ভিতরে নামাজ আদায় করতেন না। এই বিদায় হজের সময়ই তিনি জীবনে প্রথম কাবার অভ্যন্তরে নামাজ পড়েন। আগে কোরেশ বংশীয়রা তাদের বংশ মর্যাদার কারণে আরাফতে গিয়ে সকলের সঙ্গে রাত্রি যাপন করতো না। মুজদালিফা পর্যন্ত যেয়ে ফিরে আসতো। বিদায় হজের সময় নবী তাদেরও আরাফতে যেয়ে রাত্রি যাপন করতে আদেশ দেন (২/১৯৮, ১৯৯)।

এর পর রসুলুল্লা ৯ই জিলহজ আরাফৎ প্রান্তরে তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় ভাষণ দেন। এই ভাষণের সারবস্তু তিনটি (১) "কুল্লে মুসলেমীন ইখুয়াতুন" বা সব মুসলমান ভাই ভাই এবং এই বাণী থেকেই বর্তমান মুসলীম বিশ্বভ্র। তৃত্ব বা ইসলামী উম্মা জন্ম লাভ করে। (২) তিনি মারা যাবার পর আর কোন নবী জন্মাবে না এবং (৩) মুসলমানরা দৃঢ়ভাবে কোরানকে অবলম্বন করে থাকলে কেউ তাদের ধ্বংস করতে পারবে না। এ ছাড়া তিনি তাদের নিয়মিত নামাজ, রোজা ইত্যাদি করে যেতে বলেন। সবশেষে তিনি উপস্থিত জনতাকে প্রশ্ন করলেন, "আমি কি তোমাদের মধ্যে আল্লার বাণী পৌঁছে দিতে পেরেছি?" সমবেত জনতা তখন সমস্বরে বলে উঠল, "নিশ্চয়ই আল্লার রসুল, নিশ্চয়ই আপনি পেরেছেন।" এবং ভাষণ শেষ হল। এই একই ভাষণ তিনি পরের দিন মিনা'য় দেন এবং ১১ই কিংবা ১২ই জিলহজ আইয়াম্'এ দেন। বিদায় ভাষণের দিন যোহরের নামাজের অনেক দেরী হয়ে যায় এবং আসরের ওয়াক্ত প্রায় সমাগত হয়ে পড়ে। এই কারণে আল্লার রসুল ঐ দিন সবাইকে যোহর ও আসরের নামাজ একই সঙ্গে সেরে ফেলতে বলেন। এই সুন্নত হিসাবে হাজীরা আজও আরাফতের দিন যোহর ও আসরের নামাজ এক সঙ্গে আদায় করেন। (১৯)

এর পর হাজীরা আবার মিনাতে ফিরে আসেন এবং শয়তানের উদ্দেশে রমি করার জন্য নিকটবর্তী জুমরা নামক স্থানে যান। জুমরা শব্দের অর্থ কাঁকর বা পাথরের টুকরো এবং রমি করার অর্থ নিক্ষেপ করা। রমি করার জন্য হাজীরা আগে থেকেই মিনার মুহাস্সীর অঞ্চল থেকে কাঁকর-পাথর সংগ্রহ করে রাখেন।

প্রথমে তাঁরা জুমরাতুল আকাবা বা বড় শয়তানকে পাথর ছোঁড়ার জায়গায় যান এবং পাথর ছোঁড়েন। তারপর জুমরাতুল উস্তায় গিয়ে মেজো শয়তানকে পাথর           ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(১৯) কাবার পথে, আব্দুল আজিজ আল আমান (হরফ), ১ম খণ্ড,পৃঃ ২৯৪

ছোঁড়েন। এই তিনটি জায়গাই খুব কাছাকাছি এবং প্রত্যেক জায়গাতেই একটা স্তম্ভবানিয়ে রাখা আছে এবং হাজীরা ঐ স্তম্ভগুলিকে উদ্দেশ করে রমি করেন।

কথিত আছে যে, আল্লা একদিন নবী ইব্রাহীমকে স্বপ্নাদেশ করেন তাঁর সব থেকে প্রিয় বস্তুটি আল্লার উদ্দেশে কোরবানী করতে। পরদিন ইব্রাহীম ১০০ উট কোরবানী করলেন কিন্তু তা সত্ত্বেও ঐ একই স্বপ্ন দেখলেন। এইভাবে তৃতীয় দিন ১০০ উট কোরবানী করা স্বত্ত্বেও যখন তিনি ঐ একই স্বপ্ন দেখলেন, তখন বুঝতে পারলেন যে আল্লার বিশেষ কোন অভিপ্রায় আছে। ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে বুঝতে পারলেন যে তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু হলেন পুত্র ইসমাইল এবং আল্লা তাকেই কোরবানী করার কথা বলছেন। এই কথা ইসমাইলকে জানালে যোগ্য পিতার যোগ্যপুত্র হজরৎ ইসমাইল সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলেন এবং বললেন, "আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন।" ইব্রাহীম তখন ইসমাইলকে নিয়ে মিনাতে রওনা হলেন। এই শুভ কাজ থেকে বিরত করবার জন্য শয়তান তাকে তিনবার তিন জায়গায় বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এবং প্রতিবারই তিনি পাথর ছুঁড়ে তাকে নিরস্ত করেন। অথবা বড় শয়তান ইব্রাহীমকে, মেজো শয়তান ইসমাইলকে এবং ছোট শয়তান মা হাজেরাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এবং সব জায়গাতেই বিফল হয়ে সে অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়ে। যাই হোক, শয়তানের এই ঘৃণ্য আচরণকে স্মরণ করেই হাজীরা ঘৃণাভরে তার প্রতি রমি করেন।

মিনাতে পৌঁছে ইব্রাহীম নিজের চোখ বাঁধলেন এবং ইসমাইলকেও চোখ বেঁধে শুইয়ে দিলেন। তারপর ইব্রাহীম বিসমিল্লা বলে ইসমাইলের গলায় ছুরি চালালেন, কিন্তু সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও জবেহ করতে পারলেন না। এমন সময় দৈববাণী হল, "হে ইব্রাহীম, তুমি তোমার স্বপ্নকে সাকার করেছ।" চোখ খুলে ইব্রাহীম দেখেন যে একটি বেহেস্তী (স্বর্গীয়) দুম্বা জবেহ্ হয়ে পড়ে আছে আর পুত্র ইসমাইল হাসিমুখে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন ছিল জিলহজ মাসের দশ তারিখ। এই ঘটনাটিকে স্মরণ করেই সমগ্র মুসলীম জগৎ জিলহজ মাসের দশ তারিখে কোরবানীর ঈদ ঈদুজ্জোহা বা ঈদুল আজহা পালন করেন।

রমি করা হয়ে গেলে হাজীরা আবার মিনাতে ফিরে আসেন এবং কোরবানীর জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পশু কোরবানী করতে যান। মিনা শব্দের অর্থ প্রবাহিত। সম্ভবত কোরবানীর দিন এখানে লক্ষ লক্ষ পশুর কোরবানীর রক্ত প্রবাহিত হয় বলেই হয়তো এর নাম মিনা। কোরবানী সম্পর্কে শরীয়তের বিধান হল, জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ইদুজ্জোহার নামাজের পর থেকে ১২ তারিখের সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানী করা যাবে। যে সমস্ত বিত্তবানদের উপর জাকাত, ফিৎরা (ভিক্ষা) ইত্যাদি বাধ্যতামূলক কর্তব্য বলে ধরা হয়েছে, তাদের অবশ্যই কোরবানী করতে হবে। উট, গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি হালাল পশুই কোরবানী করা যাবে এবং তা সবল ও সুস্থ হওয়া চাই। কান-কাটা বা শিঙ-ভাঙা এরকম খুঁতযুক্ত পশু কোরবানীর অযোগ্য। ছাগল, ভেড়ার এক বছর, গরুর দু বছর এবং উটের পাঁচ বছর বয়স হওয়া চাই। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা একজনের জন্য এবং গরু, মোষ বা উট সাতজনের জন্য বোরবানী করা চলে।

উটকে দাঁড় করিয়ে জবেহ করার নিয়ম। এ ব্যাপারে আল্লা বলছেন, "আমি উস্ট্রকে আল্লার নিদর্শন স্বরূপ তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের জন্য ওতে কল্যাণ আছে, সুতরাং সারিবদ্ধ ভাবে দণ্ডায়মান অবস্থায় ওদের জবেহকালে তোমরা আল্লার নাম লও, যখন ওরা কাৎ হয়ে পড়ে যায় তখন তোমরা উহা হতে আহার কর এবং আহার করাও" (২২/৩৬)। অবশ্য জবেহ করার সময় উটের পা বেঁধে নেওয়া নিয়ম। অন্য পশুদের শুইয়ে জবেহ করতে হবে এবং জবেহকারীর ডানদিকে মাথা রেখে কিবলামুখী করে শোয়াতে হবে। তারপর জবেহকারী কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবেন এবং ডান পা দিয়ে পশুর গর্দান চেপে ধরে "বিসমিল্লাহ্ আল্লাহু আকবর" বলে ছুরি চালাবেন। ছুরি চালাবার সময় বলতে হবে, "আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লা, আল্লাহু আকবর, আল্লাহুম্মা মেন্কা অ অলয়কা"-অর্থাৎ "আল্লাই সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লা ব্যতীত উপাস্য নাই, হে আল্লা, তোমা হতে আগমন ও তোমার দিকে প্রতিগমন।" রাতের বেলায় কোরবানী নিষেধ এবং যার নামে কোরবানী তিনি নিজে হাতে জবেহ করলেই উত্তম। আগেকার দিনে হাজীরা কোরবানী রক্তে কাবার দেয়ালে মাখানো হজ ক্রিয়ার অঙ্গ বলে মনে করতো। পরে আল্লা কোরানের বাণী অবতীর্ন করে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন (২২/৩৭)। ছুরি দিয়ে পশুর শ্বাসনালী ছিন্ন করাকে জবেহ করা বলে।

বর্তমানে মিনাতে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে একটা নির্দিষ্ট স্থান কোরবানীর জন্য সংরক্ষিত করে রাখা আছে। পশু ব্যবসায়ীরা সেখানে লক্ষ লক্ষ উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি মজুদ করে রাখে এবং হাজীরা দামদস্তুর করে তাদের কাছ থেকে পশু কেনেন। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোরবানী করার লোকও প্রস্তুত হয়ে আছে। কোরবানী কথার অর্থ বলিদান এবং আল্লা ইব্রাহীমকে প্রিয়বস্তু কোরবানী করার মধ্য দিয়ে সম্ভবত ত্যাগের মহান আদর্শের কথাই বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই আদর্শের খুব সামান্যই আজ অবশিষ্ট আছে এবং প্রকৃতপক্ষে এটা বর্তমানে একটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও বীভৎস যান্ত্রিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জনাব আব্দুল আজীজ আল আমান সাহেব তাঁর "কাবার পথে" গ্রন্থে কোরবানীর বীভৎসতার যে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়েছেন, তার কিছুটা উদ্ধৃতি দেওয়া চলতে পারে। তিনি লিখছেন, " কোরবানীর জায়গায় এসে অবাক হয়ে গেলাম। এতখানি দুর্লভ বিস্ময় যে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে তা জানা ছিল না। নির্দিষ্ট ইলাকায় প্রবেশ করেই দেখতে পেলাম কয়েক হাজার পশু জবেহ্ হয়ে পড়ে আছে, অধিকাংশই আবার একটির উপর আর একটি। এই সব দুম্বা, বকরী তল করে, দলিত মথিত করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে অনেকটা দূরে। যেতে যেতে দেখলাম মিনা আজ রক্তস্রোতে সত্যই "মিনা" (প্রবাহিত) হয়ে উঠেছে। যাঁরা কোরবানী করেছেন, কেউ কেউ দু-একটা রান ছাড়িয়ে কেটে নিয়ে গেছেন, কেউ বা সিনহা থেকে নিয়েছেন কিছুটা গোস্ত, বাদবাকী সবটাই পড়ে আছে।(১০)

"মরা পশুর উপর দিয়ে পদচারণা, সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। চামড়ার উপরে পা দিয়ে বহুবার পিছলে পড়তে পড়তে টাল সামলে এবং বার কয়েক আছাড় খেয়ে হাতে পায়ে রক্তে মাখামাখি হয়ে অবশেষে কোরবানীর ইলাকা পার হয়ে মুক্ত মাটিতে পা রাখলাম। সম্মুখে ভীষণ জটলা, হাজার হাজার গরু, ভেড়া, দুম্বা, বকরী কেনা-বেচা হচ্ছে।... দাম-দস্তুর মিটে গেলেই কোরবানী করার লোক প্রস্তুত হয়ে এগিয়ে আসবেন। এরা কসাই, কোরবানীর দিন কোরবানীও করেন।... দাম-দস্তুর মিটে গেলেই কোরবানীর পশুটি এইসব লোকগুলোর হাওলায় চলে যাচ্ছে। তারা কান ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে এনে কখনও বা ফাঁকা জমিনে, অধিকাংশ সময় কোরবানী দেওয়া পশুর উপরই ফেলে দেয় এবং মুহূর্তমাত্র দেরী না করে গলায় ছুরি চালাতে শুরু করে। জবাই শেষ হল কি না হল, কোরবানীর পশু ছেড়ে দিয়ে তারা পারিশ্রমিকের জন্য হাত বাড়ায়। মর্মান্তিক ভাবে লক্ষ্য করলাম একটি বকরী সম্পূর্ণ জবেহ্ হয়নি, সেই অবস্থায় তাকে ফেলে দিয়ে ২ জন কসাই পারিশ্রমিকের জন্য ছুটে এসে মালিককে পাকড়াও করছে। এদিকে আধজবাই হওয়া বকরীটি তার রক্তাক্ত ঘাড় তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। এ রকম পাশবিকতা, এ দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। (২১)

কিন্তু এই পাশবিকতা দেখার পর কি আল আমান সাহেব তাঁর কোরবানীর সঙ্কল্প ত্যাগ করে চলে এলেন? না, কারণ কোরবানী না করে চলে আসলে যে হজ করতে এত কষ্ট স্বীকার করে তিনি মক্কায় গেছেন তা সম্পূর্ণ হবে না। তাই তিনি মধ্যম আকারের দুটো বকরী কিনলেন, একটি নিজের জন্য অন্যটি তাঁর স্ত্রীর জন্য। আল আমান সাহেবের সন্দেহ হচ্ছিল যে, পয়সার বিনিময়ে যে কসাইরা কোরবানী করছিল তারা, কোরবানী নিয়ত তো দূরের কথা, বিসমিল্লা, আল্লাহু আকবর টুকুও বলছিল না। তাই তিনি নিজের হাতেই কোরবানী করবেন মনস্থ করলেন। বকরী                                    ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(২০) কাবার পথে, আব্দুল আজিজ আল আমান, ১ম খণ্ড (হরফ), পৃঃ ৩৬২

(২১) ঐ, পৃঃ ৩৬৩

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ইসলামের পাঁচস্তম্ভ

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ পাঁচটি মূল নীতি ও ধর্মাচরণের উপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে। এদেরকে বলা হয় ইসলামের ভিত্তি বা পাঁচ স্তম্ভ। এগুলো হলো (১) কলেমা, (২...

Post Top Ad

ধন্যবাদ