আধিদৈবিক ভাষ্য (১) -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের সমান তেজস্বী আর শুদ্ধ সোম পদার্থ (অরাব্ণঃ, অপঘ্নন্তঃ) [অরাব্ণঃ = রা দানে (অদা.) ধাতোর্বনিপ্। নঞ্ সমাসঃ] সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়াতে বাধা উৎপন্নকারী অথবা সেই প্রক্রিয়াতে ভাগ নিতে অক্ষম পদার্থকে নষ্ট করে অথবা সেগুলোকে সরিয়ে দিয়ে (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = ঋতমিত্যেষ (সূর্য়ঃ) বৈ সত্যম্ ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.২০), ঋতমেব পরমেষ্ঠী (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৫.৫.১), অগ্নির্বা ঋতম্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.১.১১.১)] সূর্যলোকের সর্বোত্তম আগ্নেয় ক্ষেত্র অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ভাগ অথবা সম্পূর্ণ সূর্যলোকের উৎপত্তি আর নিবাসস্থানে বিদ্যমান থাকে।
ভাবার্থ - সূর্যলোকের উৎপত্তি হওয়ার পূর্বে বিশাল খগোলীয় মেঘের ভিতরে সোম রশ্মিগুলো শুদ্ধ রূপে ব্যাপ্ত হয়। যখন সেই সোম রশ্মিগুলো তপ্ত হওয়া শুরু করে, তখন সেগুলো এমন পদার্থ যা স্বয়ং সূর্যলোক নির্মাণের প্রক্রিয়াতে ভাগ নেওয়ার জন্য সংযোগ-বিয়োগ আদি প্রক্রিয়াতে ভাগ নেওয়ার যোগ্য হয় না অথবা যা সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়াতে বাধার সৃষ্টি করে, সেগুলোকে নষ্ট বা দূর করে দেয়। এমন করতে-করতে সেই সোম রশ্মিগুলো সম্পূর্ণ মেঘের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে যায়। একইভাবে সোম প্রধান বিদ্যুৎ ঋণাবেশিত কণাও সম্পূর্ণ খগোলীয় মেঘ আর কালান্তরে সূর্যলোকের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে যায়।
আধিদৈবিক ভাষ্য (১) -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বিদ্যুতের সমান গত্যাদি ব্যবহারকারী অর্থাৎ বিদ্যুতের মতো শুদ্ধ মার্গের উপর গমন করে সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণ (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) মার্গের মধ্যে আসা এমন কণা, যা সংযোগ-বিয়োগ ক্রিয়াতে ভাগ নেয় না অথবা বাধা উৎপন্ন করে, তাকে দূরে সরিয়ে গমন করে। (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = অগ্নির্বা ঋতম্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.১.১১.১)] সেইসব কণা অগ্নির কারণরূপ প্রাণ তত্ত্বের মধ্যে নিরন্তর নিবাস করে অর্থাৎ সেগুলো প্রাণের মধ্যেই নিবাস আর প্রাণের মধ্যেই প্রাণের দ্বারা গমন করে।
ভাবার্থ - এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেসব কণা প্রায় প্রকাশের বেগে গমন করে, সেইসব কণা অথবা বিকিরণ মার্গের মধ্যে বাধক পদার্থকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজের মার্গকে নির্বাধ বানিয়ে গমন করে। এর অর্থ হল সেগুলো বিভিন্ন আয়ন বা ইলেকট্রনকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং সেগুলোর দ্বারা নিঃসরণ আর শোষণের ক্রিয়া করে নিরাপদ রূপে নিরন্তর গমন করতে থাকে। এই ক্রিয়ার কারণে সেগুলোর বাস্তবিক শুদ্ধ গতির মধ্যে কিছুটা ঘাটতিও দেখা দেয়। যদি শোষণ ও নিঃসরণ পদার্থ অধিক মাত্রায় বিদ্যমান হয়, তাহলে সেই অনুপাতের মধ্যে গমনকারী কণার পরিণামী গতি কম হতে থাকবে। বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা পরিভাষিত ডার্ক মেটার এই সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণের সঙ্গে কোনো পরস্পর প্রতিক্রিয়া
করে না, এইজন্য সেই পদার্থকে সেইসব কণা বা বিকিরণ দূরে সরিয়ে নির্বাধ গমন করতে থাকে। এই কণা বা বিকিরণ সূর্যাদি নক্ষত্র, অন্য আকাশীয় লোক, প্রাণীদের শরীর বা বনস্পতি অথবা খোলা অন্তরিক্ষের মধ্যে সর্বত্র এই ব্যবহারই দর্শায়।
ধ্যাতব্য - আমি এখানে দুই প্রকারের আধিদৈবিক ভাষ্য প্রস্তুত করেছি, এইভাবে "পবমান স্বর্দৃক্" পদগুলো থেকে নক্ষত্র, গ্রহাদি লোকের অর্থ গ্রহণ করে অন্য আধিদৈবিক ভাষ্যও করা যেতে পারে।
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের সমান তেজস্বী বেদবিত্ পবিত্রাত্মা ও পুরুষার্থী রাজা (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) এমন নাগরিক, যারা ধনবান্ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রহিতে ন্যায়কারী রাজার দ্বারা নেওয়া করের পরিশোধ করে না অথবা কর চুরি করে অথবা আবশ্যকতা হলে কোনো নির্ধনের অথবা পরোপকারের কাজে আর্থিক সহায়তা করে না অথবা সমাজ আর রাষ্ট্রের হিতের বিরোধী বা উদাসীন হয়, রাজা তাদের উচিত দণ্ড দিয়ে (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = ব্রহ্ম বাऽঋতম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.১.৪.১০), সত্যম্ বিজ্ঞানম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৭১.২)] সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল বেদের কারণ রূপ পরব্রহ্ম পরমাত্মার মধ্যে নিবাস করেন।
ভাবার্থ - যেকোনো রাষ্ট্রের রাজা শরীর, মন আর আত্মার দ্বারা পূর্ণ সুস্থ আর বলবান্ হওয়া উচিত। এমন রাজাই সতত পুরুষার্থকারী হতে পারবেন। শরীর, মন বা আত্মার মধ্যে যেকোনো একটা নির্বল বা রোগী হলে কোনো রাজাই রাষ্ট্রের সঞ্চালনে সক্ষম হবেন না। এর পাশাপাশি যতক্ষণ পর্যন্ত রাজা জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হবেন না, ততক্ষণ পর্যন্তও রাজা রাষ্ট্রের উচিত সঞ্চালন করতে পারবেন না, কারণ এমন রাজাকে তার চাটুকার, চালাক-স্বার্থপর মন্ত্রী, প্রশাসনিক অধিকারী, বৈজ্ঞানিক, পুঁজিপতি এবং অন্য দেশের রাজা ভ্রমিত করে নিজের প্রয়োজন সিদ্ধ করতে পারেন।
এমন রাজা দণ্ডনীয় আর সম্মানীয় পাত্রের বিবেক রাখতে পারবেন না, অথচ বিদ্বান আর য়োগী রাজা এর পরিচয় নিশ্চিত করে দণ্ডনীয়কে দণ্ড আর সম্মানীয়কে সম্মান দিয়ে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের হিত সম্পাদন করেন। যে রাষ্ট্রের মধ্যে দণ্ডনীয়কে দণ্ড আর সম্মানীয়কে সম্মান তথা সত্য ও উন্নতির মার্গে চলা ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণা দেওয়া হয় না, সেই রাষ্ট্র অরাজকতা, হিংসা, ভয়, অশান্তি, অন্যায় আর তিন প্রকারের দুঃখে গ্রস্থ হয়ে বিনাশ প্রাপ্ত হয়। অপরাধীকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে ভগবান্ মনুর কথন হল -
দণ্ডঃ শাস্তি প্রজাঃ সর্বা দণ্ড এবাভিরক্ষতি।
দণ্ডঃ সুপ্তেষু জাগর্তি দণ্ডম্ ধর্মম্ বিদুর্বুধাঃ।। (মনুস্মৃতি ৭.১৮)
অর্থাৎ উচিত দণ্ডই প্রজার উপর শাসন করে আর দণ্ডই প্রজার রক্ষা করে। দণ্ড কখনও শিথিল হয় না, এইজন্য বিদ্বান ব্যক্তিরা দণ্ডকেই ধর্ম বলেছেন। কৃপণ ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে মহাত্মা বিদুর বলেছেন -
দ্বাবম্ভসী নিবেষ্টব্যৌ, গলে বদ্ধ্বা দৃঢাম্ শিলাম্।
ধনবন্তমদাতারম্, দরিদ্রম্ চাতপস্বিনম্।। (বিদুরনীতি ১.৬৫)
অর্থাৎ ধনবান হওয়া সত্ত্বেও পরোপকারের কাজে দান না দেওয়া ব্যক্তি আর নির্ধন হওয়া সত্ত্বেও পরিশ্রম না করা তথা দুঃখ না সহ্য করতে চাওয়া ব্যক্তিকে গলার মধ্যে ভারী পাথর বেঁধে গভীর জলাশয়ে ডুবিয়ে দেওয়া উচিত। এখানে সম্পূর্ণ প্রজার জন্যও নির্দেশ আছে যে ধনী ব্যক্তি ধনকে ঈশ্বরের প্রসাদ ভেবে ত্যাগপূর্বকই উপভোগ করবেন। তারা অবশ্যই নির্ধন ও দুর্বলের সহায়তা করবেন। অন্যদিকে নির্ধন ব্যক্তি কখনও ধনীদের প্রতি ঈর্ষা করবেন না, বরং স্বয়ং ধর্মপূর্বক পুরুষার্থ করতে থাকবেন আর দুঃখকেও সহ্য করার অভ্যেস করবেন। তারা কারও ধন চুরি করে ধনী হওয়ার চেষ্টা করবেন না অথবা বিনা কর্ম আর যোগ্যতায় ধন, পদ বা ঐশ্বর্য পাওয়ার ইচ্ছা কখনও করবেন না।
আধিভৌতিক ভাষ্য (২) -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বেদবিদ্যার প্রকাশ দ্বারা প্রকাশমান, ব্রহ্মতেজ দ্বারা সম্পন্ন, পবিত্রাত্মা এবং য়োগী আচার্য বা আচার্যা নিজ বিদ্যার্থীদের বিদ্যাভাস করা কালীন (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) বিদ্যাকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক অথবা গ্রহণ না করা শিষ্য আর শিষ্যাদের আবশ্যক এবং উচিত তাড়নাও করবেন।
(ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) এমন আচার্য আর আচার্যা সম্পূর্ণ সত্য বিদ্যার মূল কারণ বেদ অথবা পরমাত্মার মধ্যে নিরন্তর বিরাজমান থাকেন।
ভাবার্থ - বেদ জ্ঞান দ্বারা সম্পন্ন নিরন্তর য়োগনিষ্ঠ বিদ্বান বা বিদুষীকেই আচার্য বা আচার্যা হবার অধিকারী হওয়া উচিত। তাদের উচিত তারা তাদের শিষ্য বা শিষ্যাদের প্রীতিপূর্বক আর নির্মল ভাবে অধ্যাপনা করবেন। যেসকল বিদ্যার্থী বিদ্যাগ্রহণে প্রমাদ করবে আর প্রীতিপূর্বক বুঝালেও বুঝবে না, তাদের সমুচিত দণ্ড অবশ্যই দিবেন। এই বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ-প্রকাশের দ্বিতীয় সমুল্লাসের মধ্যে ব্যাকরণ মহাভাষ্যের প্রমাণ দিয়ে লিখেছেন -
সামৃতৈঃ পাণিভির্ঘ্নন্তি গুরবো ন বিষোক্ষিতৈঃ।
লালনাশ্রয়িণো দোষাস্তাডনাশ্রয়িণো গুণাঃ।।
অর্থাৎ যে সকল মাতা, পিতা আর আচার্য সন্তান আর শিষ্যদের তাড়ন করেন, মনে করতে হবে যে তারা নিজের সন্তান আর শিষ্যকে নিজের হাতে অমৃত পান করাচ্ছেন আর যারা সন্তান বা শিষ্যদের লালন করেন (আদর দিয়ে মাথায় তোলেন), তারা নিজের সন্তান ও শিষ্যদের বিষ পান করিয়ে নষ্ট-ভ্রষ্ট করেন। কারণ লালনের দ্বারা সন্তান ও শিষ্য দোষযুক্ত এবং তাড়নার দ্বারা গুণবান হয়। আর সন্তান এবং শিষ্যদের সর্বদা তাড়নে প্রসন্ন এবং লালনে অপ্রসন্ন থাকা উচিত। কিন্তু মাতা, পিতা ও শিক্ষকগণ ঈর্ষা ও দ্বেষ বশতঃ তাড়না করবেন না, কিন্তু বাইরে ভয় দেখাবেন আর অন্তরে কৃপাদৃষ্টি রাখবেন।
ধ্যাতব্য - এইভাবে মাতা-পিতা আদির গ্রহণ করে অন্য প্রকারের আধিভৌতিক ভাষ্য করা যেতে পারে।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) য়ম-নিয়ম দ্বারা পবিত্র হওয়া য়োগী ব্রহ্মের সাক্ষাৎকারী (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) সব ধরণের দোষের পরিত্যাগ করতে না পারার অনিষ্ট চিত্তবৃত্তিকে দূর করে দেন অর্থাৎ সেই য়োগী পুরুষ সব প্রকারের অনিষ্ট বৃত্তিগুলোকে ধীরে-ধীরে নিরুদ্ধ করতে থাকেন। যখন তার বৃত্তিগুলো নিরুদ্ধ হয়ে যায়, তখন (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) সেই য়োগী পুরুষ সব সত্য বিদ্যার মূল পরব্রহ্ম পরমাত্মার মধ্যে বিরাজমান হয়ে যান অর্থাৎ তিনি ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার করেন।
ভাবার্থ - যখন কোনো য়োগাভ্যাসী অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য আর অপরিগ্রহের মতো য়ম এবং শৌচ, সন্তোষ, তপ, স্বাধ্যায়, ঈশ্বর-প্রণিধানের মতো নিয়ম দ্বারা নিজেকে পবিত্র বানিয়ে নেন, তখন তার চিত্তের বৃত্তি নিরুদ্ধ হতে থাকে, যারদ্বারা তিনি ব্রহ্মসাক্ষাৎকার করতে সক্ষম হন। এখানে এটা স্পষ্ট হল যে য়ম-নিয়মের পালন না করে কোনো ব্যক্তিই য়োগী হতে পারবেন না।