ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ
পাঁচটি মূল নীতি ও ধর্মাচরণের উপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে। এদেরকে বলা হয় ইসলামের ভিত্তি বা পাঁচ স্তম্ভ। এগুলো হলো (১) কলেমা, (২) নামাজ, (৩) রোজা, (৪) জাকাত ও (৫) হজ।
প্রথম স্তম্ভ কলেমা:
কলেমা হল ইসলামের ছয়টি মূল মন্ত্র, যথা (১) কলেমা তৈয়ব, (২) কলেমা শাহাদাৎ, (৩) কলেমা তৌহীদ, (৪) কলেমা তামজীদ, (৫) কলেমা রদ্দে কুফর এবং (৬) কলেমা তাহমীদ। এই ছয়টি কলেমায় বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান। ঈমান শব্দের অর্থ হল বিশ্বাস। কাজেই কলেমায় দৃঢ় ও আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন না করলে কেউ ঈমানদার বা বিশ্বাসী মুসলমান হতে পারে না। উপরিউক্ত ছয়টি কলেমার মধ্যে প্রথম কলেমা বা কলেমা তৈয়ব সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং বলা যায় ইসলামের প্রাণ।
কলেমা তৈয়ব
এই কলেমার মন্ত্র হল, "লা ইলাহা ইল্লাল্লা, মহম্মদুর রসুলুল্লা”, অর্থাৎ আল্লা ব্যতীত উপাস্য নেই, মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল। কাজেই এই কলেমায় বিশ্বাস স্থাপন করার অর্থ হল, একেশ্বর আল্লায় বিশ্বাস এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে মহম্মদের নবীত্বে বিশ্বাস করা। এই কারণেই এই কলেমার গুরুত্ব এত অপরিসীম। এই কলেমাতে অবিশ্বাসী হলে কোন মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, তৎক্ষণাৎ কাফের হয়ে যাবে। এই কারণেই আল্লা কোরানে বলেছেন, "আল্লা ও তাঁর রসুলের অনুগত হও” أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ (৩/৩২) এবং "যারা আল্লা ও তাঁর রসুলকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে" (৭২/২৩)। কাজেই সেই ব্যক্তিই ঈমানদার, যে আল্লাকে তার প্রভু, ইসলামকে তার ধর্ম ও মহম্মদকে রসুলরূপে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেছে। এই কলেমায় এটাও পরিষ্কার হচ্ছে যে, শুধু আল্লায় বিশ্বাস করলেই কেউ মুসলমান হতে পারে না। মহম্মদ যে আল্লার রসুল, সেটা বিশ্বাস করাও জরুরি। “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” সরাসরি এসেছে সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৯ আয়াতে।
কলেমা শাহাদাৎঃ
এই কলেমার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লা ছাড়া কোন উপাস্য নেই; তিনি এক এবং তাঁর কোন অংশী নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে নিশ্চয়ই মহম্মদ তাঁর বান্দা ও রসুল।"
কলেমা তৌহীদ:
এর বাংলা অর্থ হল, "(হে আল্লা) আপনি ভিন্ন কোন উপাস্য নেই, আপনি অদ্বিতীয় এবং আপনার কোন অংশী নেই। রসুল মহম্মদ ধর্মভীরুগণের নেতা এবং বিশ্বপালক কর্তৃক প্রেরিত।"
কলেমা তামজীদ:
এই কলেমার বাংলা অর্থ হল, “(হে আল্লা) আপনি ভিন্ন কোন উপাস্য নেই। আপনি জ্যোতির্ময় আল্লা এবং আপনি আপনার জ্যোতি দ্বারা যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। হজরত মহম্মদ প্রেরিত পুরুষগণের মধ্যে অগ্রগণ্য ও শেষ নবী।" প্রথম কলেমার পরেই এই চতুর্থ কলেমার গুরুত্ব। কারণ এই কলেমায় ইসলামের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে আর তা হল, মহম্মদ নবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী। মুসলমানদের মধ্যে কেউ নিজেকে নবী বলে ঘোষণা করলে এই কলেমার বলেই তাকে কাফের বলে চিহ্নিত করা হয় এবং হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে একজন দরবেশ মীর্জা আহম্মদ নিজেকে নবী বলে প্রচার করায় তাকে হত্যা করা হয় এবং সমগ্র আহম্মদী সম্প্রদায়কে কাফের বলে চিহ্নিত করা হয়। আজও এই সম্প্রদায়ের লোকেরা পাকিস্তানে কাফের ও অ-মুসলমান বলে গণ্য ও পরিত্যক্ত। অথচ মীর্জা আহম্মদ নবী মহম্মদকে কখনই অস্বীকার করেননি, বরং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নবী বলে মেনে নিয়েছিলেন। এই কলেমার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এই যে, এর ফলেই কোরান এবং হাদিসের কোন সংশোধন সম্ভব নয়। আর নবী না জন্মালে কে সংশোধন করবে?
কলেমা রদ্দে কুফর
এর বাংলা অর্থ হল, "(হে আল্লা) আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি যেন কাউকে আপনার শরীক না করি। আমার জ্ঞানের গোচর ও জ্ঞানের অগোচর সমস্ত পাপের জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং অনুতাপ (তওবা) করছি। আমি আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করছি এবং বলছি যে, আল্লা ভিন্ন উপাস্য নেই এবং মহম্মদ আল্লার প্রেরিত রসুল।" এই কলেমা সম্পর্কে দু একটি কথা বলার আছে। এতে বান্দা আল্লার কাছে প্রতিজ্ঞা করছে যে, সে আল্লার অংশী বা শরীক সৃষ্টি করবে না। এই কারণেই মুসলমানরা বলে যে, এক আল্লা ছাড়া আর কারও কাছে
তারা মাথা নত করে না বা সিজদা করে না। এই কলেমার জন্যই তারা দেশ-মাতৃকাকে প্রণাম করে না এবং "বন্দে মাতরম্" গাইতে অস্বীকার করে।
“কলেমা রদ্দে কুফর” ইসলামী সমাজে প্রচলিত একটি দোয়া/কলেমা হিসেবে পরিচিত। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— এটি কোরআনের সরাসরি আয়াত নয় এবং সহীহ হাদিসে “ইসলামের বাধ্যতামূলক ছয় কলেমা” হিসেবে একত্রে উল্লেখও পাওয়া যায় না। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মশিক্ষার অংশ হিসেবে এগুলো বেশি প্রচলিত।
প্রচলিত “কলেমা রদ্দে কুফর” হলোঃ“আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইওঁ ওয়া আনা আ’লামু বিহি, ওয়া আসতাগফিরুকা লিমা লা আ’লামু বিহি, তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল কুফরি ওয়াশ্ শিরকি ওয়াল কিযবি ওয়াল গীবাতি ওয়াল বিদআতি ওয়ান্ নামীমাতি ওয়াল ফাওয়াহিশি ওয়াল বুহতানি ওয়াল মা’আসী কুল্লিহা, ওয়া আসলামতু ওয়া আকুলু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”
বাংলা অর্থঃ
“হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে আপনার সঙ্গে কাউকে শরীক করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আর না জেনে যে গুনাহ করেছি তার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আমি কুফর, শিরক, মিথ্যা, গীবত, বিদআত, চোগলখোরি, অশ্লীলতা, অপবাদ ও সব পাপ থেকে তওবা করছি। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং বলছি— আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।”
এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কোরআনের আয়াতঃ
📖 শিরক সম্পর্কে
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না…”
— সূরা আন-নিসা ৪:৪৮
📖 তওবা সম্পর্কে
“তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”
— সূরা আন-নূর ২৪:৩১
📖 একত্ববাদ সম্পর্কে
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক।”
— সূরা ইখলাস ১১২:১
অর্থাৎ “কলেমা রদ্দে কুফর”-এর মূল বিষয়গুলো— শিরক থেকে বাঁচা, তওবা করা, এবং তাওহীদের ঘোষণা— কোরআন ও ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পুরো কলেমাটি নিজে কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত নয়।
কলেমা তাহমীদ:
এর বাংলা অর্থ হল, "পবিত্র ও সর্বশক্তিমান আল্লাতায়লাকে সকল প্রশংসার সাথে স্মরণ করছি। তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছি এবং আমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।"
এর পর রয়েছে দুটো বিশ্বাসের শপথ যার মাধ্যমে বান্দা আল্লা, তাঁর রসুল, ধর্মশাস্ত্র, কেয়ামত ইত্যাদি সব কিছুর উপর বিশ্বাসের শপথ গ্রহণ করে। দুটো শপথ বাক্যের নাম (১) ঈমান মুজমাল ও (২) ঈমান মুফাচ্ছল। ঈমান মুজমালের বাংলা করলে দাঁড়ায়, "আমি সর্ববিধ নাম ও গুণবিশিষ্ট আল্লার উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং তাঁর আদেশ ও বিধানসমূহ মেনে নিলাম।” ঈমান মুফাচ্ছল এর বাংলা অর্থ, "আমি আল্লা, তাঁর ফেরেস্তাগণ, তাঁর কেতাবসকল, তাঁর প্রেরিত রসুলগণ, কেয়ামত, তকদীর (ভাগ্য) এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবন লাভ ইত্যাদি সকল বিষয়ের উপর ঈমান আনলাম, বিশ্বাস স্থাপন করলাম।"
উপরিউক্ত কলেমাগুলি থেকে এটা পরিষ্কার হচ্ছে যে, শুধু আল্লায় বিশ্বাস করলেই মুসলমান হওয়া যায় না, সেই সঙ্গে সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, মহম্মদ আল্লার রসুল। অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে, সে কোন আল্লায় বিশ্বাস করলে হবে না, মহম্মদ যে আল্লার রসুল সেই আল্লাতেই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। অনেক সময় আল্লায় বিশ্বাস করার চাইতে মহম্মদের নবীত্বে বিশ্বাস স্থাপন করাটাই বেশী জরুরী বলে মনে হয়। কারণ মহম্মদের মতে সে ব্যক্তি এখনও প্রকৃত বিশ্বাসী হয়ে ওঠেনি যে নাকি নিজের সন্তান-সন্ততি, বাবা-মা, তথা সমগ্র মানবসমাজের থেকেও মহম্মদকে বেশী ভাল না বাসে (মুসলীম-৭১)।
হিন্দু ধর্ম মানুষের নৈতিক চরিত্রের উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। হিন্দু ধর্মমত অনুসারে আধ্যাত্মিক প্রাপ্তির মূল সোপানই হল নৈতিক চরিত্র। কিন্তু ইসলাম সে কথা বলে না। ইসলামী মতে যে কলেমা গ্রহণ করে ঈমান এনেছে বা মুসলমান হয়েছে, নৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত অধঃপতিত হলেও তার অক্ষয় স্বর্গবাস সুনিশ্চিত। এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে কলেমার গুরুত্ব অপরিসীম এবং শুধুমাত্র "লা ইলাহা ইল্লাল্লা........" কলেমা গ্রহণ করার জন্যই কেয়ামতের দিন মহম্মদ তাঁর ৭০ হাজার উম্মত সহ সকলের আগে স্বর্গে প্রবেশ করবেন (মুসলীম-৬৬৬৮)। মহম্মদ বলতেন যে, একদিন ফেরেস্তা জিব্রাইল এসে তাঁকে বললেন, "আপনার উন্মত (শিষ্য)-দের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লার কোন খোঁজ-খবর রাখে না সেও স্বর্গে প্রবেশ করবে।" একদিন তাঁর এক উন্মত আবুজার তাঁকে প্রশ্ন' করল, " সে ব্যক্তি যদি চোর কিংবা ব্যভিচারী হয় তাহলেও কি সে স্বর্গে প্রবেশ করবে?" মহম্মদ বললেন, হ্যাঁ, তাহলেও সে স্বর্গে প্রবেশ করবে" (মুসলীম-১৭১)। এখানে স্মরণ করা প্রয়োজন যে, চুরি করা ও ব্যভিচার করা ইসলামে ঘোরতর পাপ এবং তার শাস্তি হল, চোরের ডান হাত কেটে ফেলা এবং ব্যভিচারীকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা।
এ সব ব্যাপারে ইসলামী সিদ্ধান্ত হল, "আল্লার দৃষ্টিতে সব থেকে গুরুতর পাপ হল আল্লার অংশী সৃষ্টি করা, তারপর গুরুতর পাপ হল আপন শিশু সন্তানকে হত্যা করা এবং তার পরের গুরুতর পাপ হল (মুসলমান) প্রতিবেশীর পত্নীর সঙ্গে ব্যভিচার করা" (ঐ ১৫৬)। কাজেই একজন অংশীবাদী কাফের যত ভাল কাজই করুক না কেন, আল্লার অংশী সৃষ্টি করার পাপের জন্য তার সমস্ত পুণ্যের কাজই নিষ্ফল হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে একজন মুসলমান যত পাপই করুক না কেন, অংশীবাদের পাপে লিপ্ত না হবার দরুন তার কোন পাপই পাপ বলে গ্রাহ্য হবে না। এই কারণেই মুসলমানরা বলে থাকে যে, গান্ধীর চাইতে একজন অধঃপতিত মুসলমানও শ্রেষ্ঠ।
ইসলামী মতে পথটাই আসল, ভুল পথে চলে পুণ্য করা অসম্ভব। কলেমায় বিশ্বাস করে ঈমান আনাই সঠিক পথ এবং সেই সঠিক পথের পথিক না হলে শত পুণ্যের কাজ কোন কাজে আসবে না। একদিন মহম্মদের এক পত্নী বিবি আয়েশা তাঁকে বললেন যে, তার এক পৌত্তলিক আত্মীয় আছে যে গরীব-দুঃখীদের খাওয়ায় এবং আরও অনেক ভাল ভাল কাজ করে। এইসব ভাল কাজ কেয়ামতের দিন তার কি কোন কাজে আসবে? মহম্মদ জবাব দিলেন, "না, কোন কাজে আসবে না” (ঐ-৪১৬)। আল্লার অংশী সৃষ্টি করার পাপের জন্য মহম্মদ তাঁর বাবা, মা ও নিকট আত্মীয়দের প্রতিও ছিলেন সমান কঠোর এবং বলতেন যে, "তারা সবাই নরকের আগুনে রয়েছে” (ঐ-৩৯৮,৪১৭)। কোন পৌত্তলিক যদি তার অংশীবাদী ধর্ম ত্যাগ করে কলেমার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করে তবে তার পুরাণো পাপ ধুয়ে যায় কিন্তু পুণ্যটা থেকে যায় (ঐ-২২০,২২৩)। অর্থাৎ অংশীবাদী থাকার ফলে যে পুণ্যের কাজ আল্লা এতদিন কবুল করতে পারছিলেন না, কলেমা গ্রহণ করার সাথে সাথে তিনি তা কবুল করবেন। কারণ সে ব্যক্তি এখন সঠিক পথের পথিক হয়েছেন। ঠিক সেই রকম এমন অনেক কাজ আছে যা পৌত্তলিক অবস্থায় করলে পাপ হয়, কিন্তু কলেমা গ্রহণ করে মুসলমান হবার পর করলে পাপ হয় না। যেমন লুঠপাঠ করে অপরের জিনিস অংশীবাদী অবস্থায় গ্রহণ করলে তাতে পাপ হয়, কিন্তু কলেমা গ্রহণকারী মুসলমানের ক্ষেত্রে আল্লা তা পবিত্র ও বৈধ বলে ঘোষণা করেছেন (৮/৬৯)।
দ্বিতীয় স্তম্ভ নামাজ
ইসলামের ধর্মীয় রীতিনীতিগুলোকে একত্রে শরীয়ৎ বলা হয় এবং এই বিধিবিধানগুলোকে গুরুত্ব অনুসারে দশ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন (১) ফরজ, (২) ওয়াজেব, (৩) সুন্নত, (৪) নফল, (৫) মোস্তাহাব, (৬) মোবাহ, (৭) হারাম, (৮) হালাল, (৯) মরুহ ও (১০) মোফসেদ।
ফরজ হল অবশ্য-পালনীয় বিধি-বিধান। আল্লাতায়লা কোরান শরীফের আয়াৎ অবতীর্ণ করে যে সমস্ত বিধি-বিধান নির্দেশ করেছেন সেগুলোই ফরজ। কিন্তু কোরান শরীফে আল্লাতায়লা এমন কিছু কিছু নির্দেশ দিয়েছেন যা সবার পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। যেমন জিহাদ করা বা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসলামের রাজত্ব কায়েম করা। শিশু, বালক, বৃদ্ধ ও মহিলাদের পক্ষে জিহাদে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। এই ধরনের ফরজের নাম ফরজে কৈফায়া। এ ছাড়া অন্যান্য ফরজ, যেমন নামাজ, রোজা, অজু, গোসল (স্নান), যা সবাই করতে পারে, তাকে বলে ফরজে আয়েন। ফরজে আয়েন পালন না করলে বা তাতে অবিশ্বাস করলে সে আর মুসলমান থাকবে না, কাফের হয়ে যাবে।
ওয়াজেব হল সেই সমস্ত বিধি-নিষেধ, যা কোরান শরীফে আছে এবং করা উচিত বা করতে পারলে ভাল। কিন্তু না করতে পারলে কাফের হতে হয় না। যেমন-ঈদের নামাজে যোগ দেওয়া, ঈদের দিন ফিত্রা বা ভিক্ষা দেওয়া বা ইদুজ্জোহার দিন পশু কোরবানী দেওয়া, ইত্যাদি। সুন্নত বলতে বোঝায় সেই সমস্ত বিধি-বিধান যা নবী নিজে পালন করতেন এবং অন্য বান্দাদেরও করতে পরামর্শ দিতেন। সুন্নতগুলো পালন করলে পুণ্য হবে, পালন না করলে পাপ হবে এবং তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। এর মধ্যে সে সমস্ত সুন্নত মহানবী নিয়মিত করতেন সেগুলোকে বলে সুন্নত মোয়াক্কাদা। আর যেগুলো মহানবী মাঝে মাঝে করতেন তাকে বলে সুন্নত গায়ের মোয়াক্কাদা।
মুসলমানদের ছয়টি বিশেষ সুন্নত হল (১) খৎনা দেওয়া, (২) গোঁফ কামানো, (৩) বগলের চুল কামানো, (৪) মাথার চুল মুড়িয়ে ফেলা বা ঘাড়ের উপর পর্যন্ত রেখে দেওয়া, (৫) হাত ও পায়ের নখ কাটা এবং (৬) নাভির নীচের কেশ কামানো বা পাকি করা। লিঙ্গাগ্রের চামড়া ছেদন করার নাম খৎনা দেওয়া। মহম্মদের অনেক আগে নবী হজরৎ ইব্রাহীম (বাইবেলের আব্রাহাম) আশি বছর বয়সে, নিজ হাতে কুঠার দিয়ে এই প্রথার প্রবর্তন করেন। কালে এই প্রথা শুধু ইহুদীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মদিনা বাসকালে মহম্মদ মুসলমানদের মধ্যে এই প্রথার প্রবর্তন করেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই যে, নবী মহম্মদ নিজের খৎনা করেছিলেন কি না তা রহস্যময়। মৃত্যুর পর মহম্মদের মৃতদেহকে যখন স্নান করানো হয় তখন আকাশ থেকে দৈববাণী হয় যে, মহম্মদের নগ্ন দেহ যে দেখবে সে মারা যাবে বা তার চোখ অন্ধ হবে। (5)
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, খৎনা প্রথা শুধুমাত্র পুরুষ মুসলমানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু কায়রো'র আল আঝর বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ গদ আল-হক্ আলি গদ আল-হক এর ফতোয়ার জোরে মিশরে মেয়েদেরও খৎনা করা হয় এবং তাদের যৌনাঙ্গের ক্লিটোরিস অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়। এই অস্ত্রোপচার করার সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে প্রতি বছর বেশ কিছু বালিকা সেখানে প্রাণ হারায়। গত ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার সি এন এন (CNN)-এর টেলিভিশানে এই রকম একটি অস্ত্রোপচার সারা পৃথিবীময় প্রচার করার ফলে মিশরের পার্লামেন্টে এই নিয়ে প্রবল বাদ-বিতণ্ডার সূচনা হয়। মিশরের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু বা মুফতি ঐ প্রথা বন্ধ করার পক্ষে মত দেন। কিন্তু উপরিউক্ত শেখ আলি গদ আল-হক-এর ফতোয়াকেই পার্লামেন্ট বজায় রাখে। তাই আজও এই প্রথা মিশরের মেয়েদের মধ্যে চালু রয়েছে।(6)
এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। প্রাক্ ইসলামী যুগে আরবদের মধ্যে একটা প্রথা চালু ছিল-দেবতার নামে উৎসর্গ করে কিছু কিছু পশু ছেড়ে দেওয়া হত এবং বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য ঐ সব পশুর কান ফুটো করে দেওয়া হত। পরে আল্লা এই প্রথার নিন্দা করেন এবং তাঁর সৃষ্টিকে বিকৃত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে কোরানের বাণী অবতীর্ণ করেন (৪/১১৯)। কাজেই খৎনার মাধ্যমে তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রিয় সৃষ্টি মানুষের এই অঙ্গ বিকৃতির প্রতি আল্লার উদাসীনতা সত্যিই বিস্ময়কর। তবে কেয়ামতের দিন আল্লা সবাইকে খৎনাবিহীন অবস্থায় পুনরুত্থিত করবেন।
তৎকালীন আরবের লোকেরা অন্য সকলের মতই দাড়ি কামিয়ে গোঁফ রাখত। কিন্তু মদিনাবাসকালে মহানবী তার উম্মতদের গোঁফ কামিয়ে দাড়ি রাখতে পারামর্শ দিলেন। এর ফলে সুবিধা হল এই যে, মুসলমানদের চেনা সহজ হল এবং ভুলক্রমে মুসলমানের দ্বারা মুসলমান নির্যাতিত হওয়া বন্ধ হল। নবী অবশ্য বললেন যে, এর সাহায্যে মুসলমানদের মধ্যে হৃদ্যতার প্রসার ঘটবে (মুসলীম-৫০০)। ঠিক একই কারণে মুসলমান রমণীদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য পর্দার প্রচলন করা হল (৩৩/৫৯)। কাজেই বিশ্বব্যাপী মুসলমান সমাজের পুরুষরা যে গোঁফ কামিয়ে দাড়ি রাখেন তার পিছনে কোন আধ্যাত্মিক কারণ নেই। সহজে সনাক্ত করার জন্যই এই প্রথা। ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
(5) Life of Mahomet, Sir W. Muir, Ch. 34, P-501
(6) The Statesman-26-8-96.
