ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

25 September, 2026

আদি শঙ্করের রচনাবলি

25 September 0

শঙ্করাচার্যের রচনাবলি, আদি শঙ্করের রচনাবলি

প্রাচীনকাল হতে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ভাষায় ভাষ্য, প্রকরণ গ্রন্থ এবং স্তোত্রাদি মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা গ্রন্থ শঙ্করের নামে প্রচলিত আছে।

তার মধ্যে ব্রহ্মসূত্রের উপর বিখ্যাত শারীরক ভাষ্য, ঈশ-কঠ-মুণ্ডক-ঐতরেয়-ছান্দোগ্য বৃহদারণ্যক উপনিষদের উপর রচিত উপাদেয় ভাষ্যরাজি, গৌড়পাদকৃত মাণ্ডুক্যকারিকার ভাষ্য, বিষ্ণুসহস্রনাম ভাষ্য, শ্রীমদ্ভগবদগীতা ভাষ্য, মণ্ডলব্রাহ্মণোপনিষদের উপর রাজযোগ ভাষ্য, বিবেকচূড়ামণি, সর্ববেদান্তসিদ্ধান্তসংগ্রহ, উপদেশসহস্রী, অদ্বৈতানুভূতিঃ, অনাত্মশ্রীবির্গহন প্রকরণম্, মঠাম্নায়ঃ, মোহমুদগরঃ, নির্বাণদশকম্, আত্মবোধঃ, অদ্বৈতপঞ্চক, কেবলোহম্ ওর্বষ্টকম্, দক্ষিণামূর্তিস্তোত্রম্, পরাপূজা, নির্গুণমানসপূজা, প্রবোধসুধাকর, স্বাত্মপ্রকাশিকা, প্রশ্নোত্তরমালিকা, মণিরত্নমালা, বিজ্ঞান-নৌকা (স্বরূপানুসন্ধানম্), ব্রহ্মজ্ঞানাবলীমালা, ব্রহ্মানুচিন্তনম্ এবং নির্বাণষটকম্ প্রভৃতি গ্রন্থ যে আদি শঙ্করাচার্যের রচিত এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নাই। নিশ্চিত প্রমাণের ভিত্তিতে পণ্ডিতরা সকলেই এ বিষয়ে একমত। কিন্তু আপনার উল্লেখিত ভবাণ্যষ্টক, গঙ্গাষ্টক, গণেশাষ্টক, শিবস্তুতি, দুর্গাপরাধভঞ্জনস্তোত্র প্রভৃতি প্রায় ৭৫ খানি স্তবস্তুতি গ্রন্থ সহ শঙ্করের নামাঙ্কিত আরও কয়েকটি ভাষ্য ও উপদেশগ্রন্থ সম্বন্ধে আমার মনে ঘোরতর সংশয় অছে।
'দেবী সুরেশ্বরি ভগবতি গঙ্গে' থেকে আরম্ভ করে প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুণ, ভবান্যষ্টক, দুর্গাপরাধভঞ্জন স্তোত্র, কাল্যপরাধভঞ্জন স্তোত্র, গণেশাষ্টক প্রভৃতি স্তোত্র শঙ্করের রচিত নয়। ঐগুলি প্রক্ষিপ্ত।
শঙ্করাচার্যের নামে প্রকাশিত তাবৎ গ্রন্থকে তাঁর লেখা বলে স্বীকার না করলে তাতে তাঁর মহিমা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না। গ্রন্থকারের কৃতিত্ব সংখ্যাধিক্যের উপর নির্ভর করে না, বিষয় গৌরব, বস্তু গৌরব, চিন্তার স্বকীয়তা ও গভীরতা, সর্বোপরি গ্রন্থনিহিত বোধির দীপ্তিই গ্রন্থকারকে অমরতা দান করে।
ভারতের ধর্ম, দর্শন এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আচার্য শঙ্কর ছিলেন কোহিনুর স্বরূপ- কোহিনুরই বা বলি কেন, তিনি ততোধিক। কোহিনুর বহুবার লুন্ঠিত হয়েছে, তুর্কী-মোগল-ইংরেজ অনেকের কাছেই হস্তান্তরিত হয়েছে বারবার, তাতে আমাদের স্থায়ী কিছু ক্ষতি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু যদি শঙ্করাচার্যের মূল একখানি গ্রন্থও চিরতরে অপহৃত বা নষ্ট হত তাহলে দেশের যে ক্ষতি হত তা অপূরণীয়। ১৫০/২০০ টির পরিবর্তে মাত্র ৩৫টি গ্রন্থকে তাঁর প্রকৃত রচনা বলায় আপনি ক্ষুণ্ণ হচ্ছেন, কিন্তু মাত্র ৩২ বৎসর আয়ুষ্কালের মধ্যে ৩৫ খানা কালজয়ী গ্রন্থ লেখাও কি কম কথা? আমার মতে তিনি যদি কেবল ব্রহ্মহ্মসূত্রের শারীরিক ভাষ্য লিখে যেতেন, অন্য কোন বই লেখার সুযোগ তাঁর নাও হত তাহলেও তিনি মৃত্যুজিৎ কীর্ত্তির অধিকারী হতেন।
নিম্নলিখিত প্রমাণ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শঙ্করের নামে প্রচলিত অনেক পুস্তকই প্রকৃত পক্ষে অন্য লোকের দ্বারা রচিত হয়ে তাঁর নামে আরোপিত হয়ে আসছে:-
(ক) উদাহরণস্বরূপ প্রথমেই 'জ্ঞানগঙ্গাশতক এবং 'বোধসারা' নামক দুইখানি গ্রন্থের কথাই ধরা যাক। ১২৯২ সালে জনৈক অন্নদাপ্রসাদ বসু ঐ দুখানি পুস্তক কলিকাতা হতে প্রকাশ করেন। রচনার লালিত্য, রস এবং উপাদেয়তা লক্ষ্য করে তিনি ভুলক্রমে এইগুলিকে স্বয়ং শঙ্করাচার্যের লেখা বলে প্রচার করেন। কিন্তু পরে পন্ডিতরা আবিষ্কার করেন যে বিখ্যাত সংস্কৃত কাব্যকার এবং দার্শনিক বিদ্বদ্বর্ষ নরহরি নামক জনৈক দক্ষিণী ব্রাহ্মণ ঐ বই দুখানির লেখক। প্রকৃত তথ্য হল, অন্নদাপ্রসাদ বসু নরহরি রচিত 'বোধসারঃ' হতে ২৫০টি শ্লোক সঙ্কলন করেছিলেন মাত্র। নরহরি বাংলা ১২২০ সালে 'বোধসারা' রচনা করেন এবং তাঁর প্রিয় শিষ্য দিবাকর ১২২৩ সালে (১৭৩৮ শকাব্দে) তার টাকা রচনা করেন। তাঁরা কেউ শঙ্করাচার্যের নাম উল্লেখ করেন। নি। জ্ঞানগঙ্গাশতক এবং বোধসারঃ এর গ্রন্থকার যে শঙ্করাচার্য নন তার একটি বড় প্রমাণ ঐ বই দুটিতে শঙ্কর প্রবর্তিত সন্ন্যাস ধর্মের বিধি ও চিহ্নাদি ধারণের নিন্দা আছে। তাছাড় গ্রন্থমধ্যে ষোড়শ শতাব্দীতে আবির্ভূত মধুসূদন সরস্বতীর বহু উদ্ধৃতিই প্রমাণ করে যে বইটি শঙ্করাচার্যের রচনা নয়।
(খ) কাল্যপরাধভঞ্জন স্তোত্রটিও শঙ্করের রচিত নয়। কারণ, স্তোত্রটি গুপ্তার্ণব তন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। যিনি তন্ত্রমত খণ্ডন করে তার উচ্ছেদ সাধন ঘটিয়েছিলেন এবং যার জন্য বহু স্থানে তাঁর তান্ত্রিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটেছিল, এমন কি একসময় একজন কাপালিকের হাতে তাঁর প্রাণ যাওয়ারও উপক্রম ঘটেছিল, সেই শঙ্কর কোন তান্ত্রিক ভাবধারামণ্ডিত স্তোত্র রচনা করবেন বলে মনে হয় না।
(গ) আচার্যের নামে প্রচারিত দুর্গাপরাধভঞ্জন স্তোত্রটি সম্বন্ধেও ঐ একই কথা। একথা সবাই জানেন, পণ্ডিতমহলেও একথা স্বীকৃত সত্য যে আচার্য শঙ্কর ৭৮৮ খৃঃ ৮২০ খৃষ্টাব্দ অর্থাৎ ৩২ বৎসর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এমতাবস্থায় স্তোত্রটিকে শঙ্কর রচিত বলে স্বীকার করলে তিনি ৮৫ বৎসর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলে মানতে হবে। কারণ ঐ স্তোত্রের মধ্যে রচয়িতা স্বীকারোক্তি করেছেন মা দুর্গে। অন্য দেবতা পরিত্যাগ করে পঁচাশি বৎসর বা তদধিক কাল পর্যন্ত তোমারই সেবা করে এলাম। এখন তুমি যদি আমায় কৃপা না কর, তাহলে আমি আর কার শরণ নিবা পরিত্যক্তা দেবা বিবিধবিধিসেবাকুলতয়া ময়া পঞ্চাশীতেরধিকমপনীতে তু বয়সি। অপীদানীং মাতস্তব যদি কৃপা নাপি ভবিতা নিরালম্বো লম্বোদর-জননি কং যামি শরণম।।
(ঘ) শুনলে আশ্চর্য হবেন বাংলাদেশেও একজন শঙ্করাচার্য ছিলেন। লন্ডনে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে রক্ষিত 'তারারহস্যবৃত্তিকা' নামে একখানি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। নেপাল দরবার লাইব্রেরীতেও ঐ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি রয়েছে। ঐ প্রতিলিপির তারিখ লক্ষ্মণসংবৎ ৫১১ (১৬৩০ খৃঃ)। গ্রন্থের পুষ্পিকায় লেখক আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি বাঙালী এবং কৌল। তাঁর পিতার নাম কমলাকর, পিতামহের নাম লম্বোদর (Descriptive Catalougue of Sanskrit Mss in India Office Libary 4/2603)। এই গৌড়ীয় শঙ্করাচার্য রচিত 'মৃত্যুঞ্জয় পূজা', 'প্রপঞ্চসার' এবং 'সৌন্দর্যলহরী' প্রভৃতি গ্রন্থ বৈদান্তিক চূড়ামণি জ্ঞান-গুরু শঙ্করের নামে অবলীলাক্রমে প্রচলিত হয়ে আসছে।
(ঙ) প্রকৃতপক্ষে শঙ্করের রচিত নয় অথচ তাঁর নামে প্রচলিত হয়ে আসছে এমন গ্রন্থগুলিকে তাঁর মূল রচনার সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে বিচার করলেই যে কোন নিরপেক্ষ পাঠকের চোখে উভয় শ্রেণীর গ্রন্থের মধ্যে ভাষাগত ও ভাবগত অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। যেমন শ্বেতাশ্বতর ও নৃসিংহতাপনীয় উপনিষদের তথাকথিত শঙ্করভাষা। ঐ দুটি ভাষ্যের লেখক পৌরাণিক প্রসঙ্গ ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু আদি শঙ্করাচার্যের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, তিনি তাঁর লেখার মধ্যে উপনিষৎ প্রমাণকেই প্রধান্য দিয়েছেন। এ ছাড়া ঐ দুখানি ভাষ্যে ব্যাকরণ অশুদ্ধিও রয়েছে। এতেই বুঝা যায় যে, ঐ দুটি ভাষ্যের ব্যাখ্যাতা আর যিনিই হোন, তিনি কদাপি আদি শঙ্করাচার্য নন।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ ভাষ্যের একস্থানে গৌড়পাদের একটি কারিকার (৩/৫৫) উল্লেখ এইভাবে করা হয়েছে 'তথা চ শুকশিয্যো গৌড়পাদাচার্যঃ। অর্থাৎ শুকের শিষ্য কোন এক গৌড়পাদাচার্য ইত্যাদি। শঙ্করাচার্যের মত মহাজ্ঞানী শিষ্যের আচার-বিরুদ্ধ এইরকম লঘু ভাষায় লঘু চালে নিজ পরমগুরুর নাম স্মরণ করবেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন।
(চ) কেনোপনিষদের পদভাষ্য এবং বাক্যভাষাও শঙ্করের নামে প্রচলিত। কিন্তু যে কোন অনুসন্ধানী পাঠক একটু খুঁটিয়ে বিচার করলেই দেখতে পাবেন এই উভয় ভাষ্যের কোন কোন অংশে মূলের ব্যাখ্যা পরস্পর ভিন্ন এবং বিপরীত। মূল ২/১/২ এর পাঠ পদভাষ্য মতে 'নাহম' কিন্তু বাক্যভাষ্য মতে 'নাই'। লেখক একজন হলে বিশেষতঃ শঙ্করের মত মহাপণ্ডিত এর রচয়িতা হলে এই ধরণের ভাবগত ও ভাষাগত ভুল কখনও সম্ভব নয়।
(ছ) সম্প্রতি বর্তমান ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ তত্ত্বদর্শী মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ প্রণীত 'ভারতীয় সাধনার ধারা' নামে একখানি অমূল্য গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই বই-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, মাণ্ডুক্য উপনিষদের ভাষ্যও আদি শঙ্করের নয়। এর দুটি মঙ্গল শ্লোক অত্যন্ত নিকৃষ্ট ভাষায় রচিত। দ্বিতীয় শ্লোকে ত পরিষ্কার ছন্দোভঙ্গের দোষ। শ্লোকের প্রথম তিন পক্তি মন্দাক্রান্তা এবং চতুর্থ পঙক্তি অধরা ছন্দে লিখিত। অন্তিম তিন শ্লোকে ব্যাকরণগত অশুদ্ধিও বর্তমান। এই সব মারাত্মক ত্রুটি কি শঙ্করাচার্যের লেখায় সম্ভবপর।
সম্ভব যে নয় তা বিচারশীল লোকমাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য। তবুও যে নানা অবৈদিক মতবাদে কণ্টকিত (কোন কোন ক্ষেত্রে শঙ্করের জীবন-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবধারায় পরিপূর্ণ) গ্রন্থও অবলীলাক্রমে তাঁর নামে কিভাবে চলে আসছে, তার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের দেশের দু' একটি বিশিষ্ট প্রাচীন রীতি এবং বিচিত্র মানসিকতাকেই দায়ী করতে হয়। সাম্প্রদায়িক স্বার্থ এবং অতিভক্তির জলাভূমিতেই এই রীতি ও মানসিকতার জন্ম। স্বরচিত গ্রন্থের গৌরব বৃদ্ধির জন্য অনেকেই আমাদের দেশে নিজ নাম গোপন করে প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মহাত্মা ও মনীষীর নামে গ্রন্থরচনা করে গেছেন অনেকে আবার নিজ মতবাদকে জনপ্রিয় এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রসিদ্ধ আকরগ্রন্থের মধ্যে স্বরচিত অনেক শ্লোকও সুকৌশলে প্রক্ষেপ (Interpolation) করেছেন। পরবর্তীকালে অনেক গবেষক পণ্ডিতের চোখে এ রহস্য ধরাও পড়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে অভিসন্ধিপরায়ণ লোকেরা বিশেষতঃ নানা মঠ মিশনের মোহান্ত মহারাজের দল এইরকম অপকার্য করে এসেছেন। এখানে কিছু ঘটনার উল্লেখ করছি। যেমন রামের দুর্গাপুজা প্রসঙ্গ। রাম দুর্গাপূজা করেন নি, মূল বাল্মীকি রামায়ণে দুর্গাপূজার উল্লেখ নাই। রাজসাহী জেলার অন্তর্গত তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ খুঃ পঞ্চদশ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান করেন। তাঁর সভাপণ্ডিত ও পুরোহিত। পণ্ডিত রমেশ চন্দ্র শাস্ত্রীই দুর্গাপূজার পদ্ধতি ও মন্ত্রাদি রচনা করে বাজাকে দিয়ে পূজা করান। ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের লেখা 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' নামক বই-এ এই প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে এবং রাজা কংসনারায়ণের সাক্ষাৎ বংশধর, কাশীস্থ ভারতীয় ধর্ম মহামণ্ডলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রাজা শশিশেখরেশ্বর রায়ও প্রাচীন দলিল ও কাগজপত্র দৃষ্টে এই তথ্য সমর্থন করেছেন। কিন্তু রাজার সভাকবি কৃত্তিবাস তাঁর বাংলা রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রের নামে এই মহাপূজা আরোপ করার পর থেকে সারাদেশে দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়ে গেল। এখন আবালবৃদ্ধবনিতা বিশ্বাস করেন যে রাম দুর্গাপূজা করেছিলেন এবং মহামুনি বাল্মীকিই যেন ঐ পূজাপদ্ধতির প্রবর্তক।
বুদ্ধদেবের কথা ভেবে দেখুন যে বুদ্ধদেবের প্রতিষ্ঠিত ধর্মের মূল মন্ত্রই ছিল ক্ষমা, প্রেম, মুদিতা, করুণা ও অহিংসা, যে বুদ্ধদেব ঈশ্বর সম্বন্ধে সারাজীবন নীরব থেকেছেন, মূর্তিপূজা ও বহিরাচারকে যিনি অসার ও নিরর্থক বলেছেন, তন্‌হা অর্থাৎ তৃষ্ণা দূর করে নির্বাণলাভই ছিল যাঁর ধর্মে পরম পুরুষার্থ, সেই অমিতাভবুদ্ধের মৃত্যুর পর কি দেখা গেল। দেখা গেল, তথাগতের ধর্ম কতকগুলো ভ্রষ্টাচারী ভিক্ষু ভিক্ষুণীর স্বকপোলকল্পিত তান্ত্রিক পূজাপাঠ এবং গুহ্য ক্রিয়াকৌশলে পরিণত হয়ে গেল। একদিকে যেমন তা মহাযান, হীনযান, বজ্রযান প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত হল, অন্যদিকে তেমনি তা দণ্ডেশ্বরী, বজ্রেশ্বরী, চক্রেশ্বরী প্রভৃতি বহুতর দেবদেবীর অনুষ্ঠানসর্বস্ব পূজাপদ্ধতিতে হল পর্যবসিত। যেহেতু বৌদ্ধধর্মের কোন কোন সম্প্রদায়ে ঐ সব অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে, এজন্য কি কেউ বলবেন যে বুদ্ধদেব ঐ সব মূর্তিপূজা এবং তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ। করতেন।
আমি বলতে চাই যে রাম ও বুদ্ধদেবের মত নির্বিশেষে ব্রহ্মহ্মবাদী শঙ্করাচার্যের নামে নানা দেবদেবীর আরাধনা এবং তদনুকূল স্তোত্রমন্ত্রাদি প্রচলনের মূলেও ঐ একই মনোবৃত্তি বর্তমান। প্রক্ষেপের ভূত ভারতের ধর্মজগতে অনেক অঘটন ঘটিয়েছে, অনেক অনাচারেরই জন্ম দিয়েছে। এই ভৌতিক উপদ্রব থেকে ব্যাসদেব এমন কি স্বয়ং ভূতনাথও রক্ষা পাননি। বোম্বাই এর ক্ষেমরাজ কোম্পানী দেবনাগরী অক্ষরে একখানি পুরাণ প্রকাশ করেছেন। নাম- ভবিষাপুরাণ। অন্যান্য পুরাণ-গ্রন্থের মত এটিও ব্যাসদেবের রচিত বলে অপপ্রচার করা হয়েছে। বইটিতে আছে মহাদেবেন লোকার্থে ভবিষ্যং রচিতং শুভম্' লোকহিতের জন্য মহাদেবই যেন বইখানির প্রণেতা। লক্ষ্য করুন, এখানে লেখক এক ঢিলে দুই পাখী মারার আশ্চর্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

শিব ও ব্যাসদেব দুজনকেই জড়িয়েছেন। দুইজনের পুণ্য নামকে যথেচ্ছভাবে অপব্যবহার করেছেন। ভাবখানা এই বইটি originally মহাদেবের দ্বারা লিখিত হলেও এই অধরম ধরাধামে ব্যাসদেবই তার প্রকাশক। শিবের উক্তিতে কলিকাতারও উল্লেখ করা হয়েছে 'কলিকাতা-পূরী রম্যা প্রসিদ্ধাভুৎ মহীতলে' (৪র্থ খণ্ড)। শান্তিপুরেরও নাম বাদ যায়নি 'গঙ্গামুলে শান্তিপুরং রচিতং তেন ধীমতা'। 'তেন' অর্থাৎ রাজা শাস্তিবমা গঙ্গাতীরে শান্তিপুর নগর নির্মাণ করলেন আর তাঁর পুত্র নদীবর্মা গৌড়দেশে গড়ে তুললেন 'নদীহা' অর্থাৎ নদীয়া 'চকার নগরীং রম্যাং নদীহাং গৌড়রাষ্ট্রভাক্ (শ্লোক ২৫) শিব একে ত্রিনয়ন তায় ত্রিকালদর্শী। কাজেই মতলবী গ্রন্থকার তাঁর মুখ দিয়ে রামানন্দ, শ্রীধরস্বামী ও তাঁর গীতার টীকা, জয়দেব-পদ্মাবতী এবং গীতগোবিন্দ, চৈতন্য-শঙ্কর-রামানুজ, কবীর-নানক-নিত্যানন্দ, বিশ্বমঙ্গল, তুলসীদাস সকলের কথাই বলিয়েছেন। স্থান-কাল-পাত্র, সমীচীনতা-অসমীচীনতা কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই।

ভবিষ্যপুরাণের শিব শুধু অসাধারণ ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিরই অধিকারী নন, হিন্দু অহিন্দু সকলের প্রতিই তাঁর সমান করুণা। শুধু হিন্দুর কথাই তিনি বলেন, মুসলমান বা ইংরেজদের কথা বলবেন না, এমন ত আর হয় না। তাই তিনি পৃথ্বীরাজের প্রতিমূর্তির গলায় সংযুক্তার মাল্যদান এবং জয়চন্দ্র পৃথ্বীরাজের যুদ্ধপর্ব বর্ণনার পরেই কুতুবুদ্দিন সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন 'পৈশাচঃ কুতুবুদ্দিনঃ'। ইংরাজদের বেলায় শিবকে একটু গদগদ দেখা যায়। তাঁর মতে ইংরাজরা বড় ভাল লোক। তারা ঈশ্বরের পুত্র যীশুর মতাবলম্বী, বাণিজ্যের জন্যই তারা এদেশে এসেছে 'ঈশ-পুত্র-মতে সংস্থা তেষাং হৃদয়মুত্তমম'। তাদের কে রাজা এবং সে রাজার সিংহাসন কোথায় সে সব কথাও পঞ্চানন পঞ্চমুখে ব্যক্ত করেছেন- 'বিকটে পশ্চিমে দ্বীপে তৎপত্নী বিকটাবতী' বিকট অর্থাৎ অতি দুর্গম পশ্চিম দ্বীপে রাজার পত্নী বিকটাবর্তী অর্থাৎ রাণী ভিক্টোরিয়া। তিনি বর্তমানে আটজন কৌসলী অর্থাৎ কাউন্সিলারের সাহায্যে রাজাশাসন করছেন। 'অষ্ট কৌশলমার্গেণ রাজ্যমত্র চকার হ'। একেই বলে কলি-কৌতুক।
সংস্কৃত ভাষায় লিখিত হলেই তা যেমন শাস্ত্র হয় না, তেমনি 'শিব উবাচ', 'ব্যাস-উবাচ' বলে নিজেদের সংস্কার বিশ্বাস এবং মতবাদ প্রচারের প্রয়াসও কখনও মান্য ও প্রামাণ্য বলে গ্রাহ্য হতে পারে না। শঙ্করাচার্যের গদীতে বসে কেউ ফরমান জারী করলেও না।
ভবিষ্যপুরাণের শিব ও ব্যাসের উক্তিতে যেমন কৌতুক সৃষ্টি করা হয়েছে, তেমনি কৌতুক সৃষ্টি করা হয়েছে সাক্ষাৎ বেদান্ত মূর্তি আচার্য শঙ্করকে নিয়ে। ভবিষ্যপুরাণের শুদ্ধ ও সরল সংস্কৃত ভাষার কোন ব্যাকরণ গত দোষ নাই। তাই তা যেমন শিব ও ব্যাসের রচনা বলে চালাতে কোন অসুবিধা নাই, তেমনি লালিত্যমণ্ডিত ছন্দোবদ্ধ সংস্কৃতে নানা শ্লোক ও স্তোত্রমন্ত্রাদি রচনা করে শঙ্করের নামে প্রচার করলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তাও সহজে ধরার উপায় নাই। সূক্ষ্ম মনন ও বিচারের আলো ফেলে শঙ্করের নামাঙ্কিত কোন কোন গ্রন্থে তাঁর জীবন-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব সুকৌশলে পরিবেশন করে সম্প্রদায়ীরা তাদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থবুদ্ধি চরিতার্থ করেছে, কয়জনই বা তা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে বলুন। তাই অগণিত মানুষ আজও সহজিয়া ভক্তিবশে আচার্যের নামাঙ্কিত প্রতিটি রচনাকেই তাঁরই মূল রচনা বলে মনে করেন। যিনি ছিলেন জ্ঞানগঙ্গার নব ভগীরথ, অদ্বৈতবাদের মহান্ উদ্‌গাতা, যাঁর অভেদ দৃষ্টিতে সর্বত্র সর্ব বস্তুতে অদ্বয় ব্রহ্মের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু ভাসত না, তাঁর পক্ষে 'দেবী। সুরেশ্বরী ভগবতে গঙ্গে' বলে ভৌম গঙ্গার স্তবস্তুতি এবং বাহ্যিক পূজারাধনামূলক মন্ত্রাদি রচনা সম্ভব কিনা তা একবারও কেউ বিচার করে দেখে না। যিনি স্বরচিত 'আত্মপূজা' বা 'পরাপূজা'তে ব্রহ্ম যজ্ঞের ভাব এবং 'নির্গুণমানসপূজা'তে বাহ্যিক পূজাঙ্গ ষোড়শোপচারাদির নিগূঢ় তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করে কিভাবে দিব্যভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে নির্গুণের ধ্যান করতে হয়, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিশদভাবে বুঝিয়ে গেলেন, তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মঠের মঠাচার্যরা তবু কেন যে পূর্ণাগিরি, শারদাদেবী, প্রভৃতির জড়োপসানার ঠাঁট সাড়ম্বরে বজায় রেখেছেন, তা আমার বুদ্ধির অগম্য। ঐ সমস্ত মূর্তির পূজা যে তাঁর অন্তর্ধানের পর শিষ্য প্রশিষ্যদের দ্বারাই প্রচলিত হয় নি, তার কি কোন নিশ্চিত প্রমাণ আছে?
সত্য বটে, আচার্য তাঁর 'মঠাম্নায়ঃ' নামক অনুশাসন-গ্রন্থে সিদ্ধেশ্বর, নারায়ণ, জগন্নাথ, ভদ্রকালী, বিমলা ও পূর্ণাগিরি প্রভৃতি দেবদেবীর নামোল্লোখ করেছেন। কিন্তু তা কি অর্থে? তাঁর ঐ সনদ বা অনুশাসনে পূজ করার কোন নির্দেশ নাই, প্রধান চারটি মঠের পরিচয় দিতে আচার্য ঐ সব দেব-দেবীর কথা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন মাত্র। যেমন শারদা মঠের পরিচিতিতে বসেছেন দ্বারকাখ্য হি ক্ষেত্রং স্যাৎ দেবঃ সিদ্ধেশ্বরঃ স্মৃতঃ। ভদ্রকালী তু দেবী স্যাদাচার্যো বিশ্বরূপকা। মঠটি কোথায়। না দ্বারকাক্ষেত্রে, যেখানে সিদ্ধেশ্বর ও ভদ্রকালী রয়েছেন, সেখানকার প্রথম আচার্য হবেন বিশ্বরূপ অর্থাৎ সুরেশ্বর। গোবর্দ্ধন মঠ সম্বন্ধে আচার্যের বিজ্ঞপ্তি- পুরুষোত্তমং তু ক্ষেত্রং স্যাজ জগন্নাথোহস্য দেবতা। বিমলাখ্যা হি দেবী স্যাদাচাৰ্য্যঃ পদ্মপাদকঃ। অর্থাৎ গোবর্দ্ধন মঠটি পুরুষোত্তমক্ষেত্র অর্থাৎ পুরীতে অবস্থিত যেখানে জন্মনাথ ও বিমলা দেবী আছেন, সেখানকার প্রথম আচার্য হবেন পদ্মপাদ। এখানে 'অস্য দেবতা' বলতে মঠের আরাধ্য দেবতা নন, অস্য ক্ষেত্রসা দেবতা। পুরীক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ দেবতা জগন্নাথ, জগন্নাথের নামেই পুরীর নাম পুরুষোত্তম বা জগন্নাথক্ষেত্র। গোবর্দ্ধন মঠের অভ্যন্তরে জগন্নাথের কোন মূর্তি প্রতিষ্ঠিত নাই, আচার্যও তাঁর পূজার কথা বলছেন না। জ্যোতির্মঠ সম্বন্ধে বলেছেন বদরিকাশ্রমঃ ক্ষেত্রং দেবো নারায়ণঃ স্মৃতঃ। পূর্ণাগিরি চ দেবী স্যাদাচার্যড্রোটকঃ মৃতঃ।। এই মঠটি বদরিকাশ্রমে অবস্থিত যেখানে ক্ষেত্রদেবতা নারায়ণ এবং পূর্ণাগিরির মন্দির আছে সেখানে প্রথম আচার্য হবেন তোটকাচার্য। সর্বশেষে আচার্য শৃঙ্গেরী মঠের অবস্থান নির্দেশ করেছেন এইভাবে রামেশ্বরাহয়ং ক্ষেত্রমাদিবরাহ দেবতা। কামাক্ষী তস্য দেবী স্যাৎ সর্বকামফলপ্রদা। পৃথ্বীধরাখ্য আচার্যস্তুঙ্গভদ্রেতি তীর্থকম্।। শৃঙ্গেরী মঠটি কোথায়। না রামেশ্বরক্ষেত্রে, তুঙ্গভদ্রা নদীতীরে এই তীর্থের দেবতা হলেন আদিবরাহ এবং দেবী কামাক্ষী। পৃথ্বীধর এখানকার প্রথম আচার্য হবেন।
আপনি যদি কাউকে আপনার বাসস্থান কলিকাতার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন যে, এই শহর গঙ্গাতীরে অবস্থিত, হিন্দুরা গঙ্গাকে তীর্থ বলে মনে করেন, এখানে কালীঘাটের কালী প্রধান দেবতা, এখানে নকুলেশ্বর শিবের মন্দির এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল রয়েছে, তাহলে তাতে যেমন আপনি ঐ ভদ্রলোককে কালী নকুলেশ্বর প্রভৃতিকে পূজা করতে বলছেন একথা মনে করা চলবে না, তেমনি মঠাপ্লায়ে দেবদেবীর উল্লেখ আছে বলেই আচার্য তাঁদের পূজার বিধান দিয়েছেন এ কথা ভাবাও যুক্তিসঙ্গত নয়। আচার্যের আবির্ভাবের পূর্ব হতেই তাঁর মঠগুলির সন্নিহিত স্থানে ঐ সকল দেবদেবীর মন্দির বর্তমান ছিল, তিনি সেগুলির উল্লেখ করে নিজের মঠের অবস্থান (Location) বর্ণনা করেছেন।
তবুও যদি বলেন তবে কেন মঠাচার্য 'জগদ্গুরুর' দল ঐ সব মূর্তিপূজা করেন, তার একমাত্র উত্তর তাঁদের সংস্কার বদ্ধতা এবং প্রচলিত সামাজিক বিধিবিধান পালন করে জনতার তুষ্টি বিধানের মনোবৃত্তিই এর জন্য প্রধানতঃ দায়ী। এইভাবে তাঁরা অদ্বৈতবেদান্ত এবং বহিরাচারকে জোড়াতালি দিয়ে আপোষরফা করেছেন এবং প্রতিষ্ঠা বজায় রেখেছেন। আমার যুক্তির অনুকূলে আরও কিছু প্রমাণ দিচ্ছি। 'ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ্যশঃ। যজুর্বেদের (৩২/৩) এই বিখ্যাত মন্ত্রের অর্থ আচার্য অবগত ছিলেন একথা আশা করি, সকলেই স্বীকার করবেন। 'ন প্রতীকে ন হিঃ সঃ' ব্রহ্মসূত্রের ((8/9) / 8) মন্ত্রের ভাষ্য করতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, জড়মূর্তি কোনমতেই নির্বিশেষ ব্রহ্মের প্রতীক হতে পারে না। 'মনকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করবে এটি আধ্যাত্মিক প্রতীক। আকাশ ব্রহ্ম এটি আধিদৈবিক প্রতীক ইত্যাদি' (শারীরিক ভাষ্যের অনুবাদ)। শুধু তাই নয়, গীতার ১৮অ/৫০ শ্লোকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির পদ্ধতি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ যেখানে বলেছেন- 'সিদ্ধিং প্রান্তো যথা ব্রহ্মা তথাপ্নোতি নিবোধ মে' সেখানে সেই শ্লোকের ভাষ্য করতে গিয়ে জ্ঞান-ভাস্করের বক্তব্য কত স্পষ্ট শুনুন। যাঁরা নিরাকার পরমাত্মার বুদ্ধিতে ধারণার জন্য মূর্তির দরকার বলে থাকেন, তাঁদের সেই অসার যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে আচার্য কতকটা যেন উষ্ণ কণ্ঠেই বলছেন 'কেচিত্ব পণ্ডিতম্মন্যা নিরাকারত্মাদাত্মবস্তু নোপৈতি বুদ্ধিরতো দুঃসাধ্যা সম্যগ জ্ঞাননিষ্ঠেতাহা। সত্যমেবং গুরুসম্প্রদায়রহিতানাং অশ্রুতবেদান্তানাং অত্যন্তবহিবিষয়াসক্তবুদ্ধীনাম্ সম্যক্ প্রমাণেষকৃতশ্রমানাং কোন কোন পণ্ডিতম্মন্য বলে থাকে যে পরমাত্মা নিরাকার বলে তাঁকে মনুষ্যবৃদ্ধি ধারণা করতে পারে না। কাজেই দুঃসাধ্য। সতা বটে, যারা সদগুরুর কোনদিন সেবা করেনি, বেদান্ত শ্রবণ মননের সৌভাগ্য যাদের হয়নি, ন্যায়াদি প্রমাণ বিষয়ে কিছুমাত্র পরিশ্রম করে নি, সেই সব অত্যন্ত বহির্মুখ বিষয়াসক্তরাই তো ঐ রকম বলবে।" অর্থাৎ সাকার উপাসনা সম্বন্ধে যাঁর মন্তব্য এতই কঠোর, তিনি তাঁর মঠে পূর্ণাগিরি, শারদা ইত্যাদি পূজার নির্দেশ দিয়ে যাবেন এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। যিনি প্রকৃত আচার্য তিনি নিজে যা বলেন, কার্যতঃ তাই আচরণ করেন। শঙ্কর ছিলেন আচার্যানাং আচার্য্য তাঁর practice এবং preaching এর মধ্যে বিরোধিতা (Self-contradiction) ত আমি ভাবতেই পারি না।
বজ্রগতি যখন এই প্রকার, কীর্তিমান শঙ্করপন্থীদের হাতেই যখন শঙ্করের ভাবধারা এইভাবে বিপর্যস্তঃ এবং বিকৃত, তখন কোন গ্রন্থটি প্রকৃতপক্ষে তাঁরই লেখা, তা নির্ণয় করা দুরূহ সন্দেহ নাই। তবুও আমার মতে এর একটি সহজ উপায় আছে। সবাই জানেন গ্রন্থ হল লেখকের মানস-দর্পণ। গ্রন্থের ভাবধারা দিয়েই চেনা যায় লেখককে এবং তাঁর লেখাকে। আদি শঙ্করাচার্যের ভাবধারাও তাঁর কৃত ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে বিধৃত রয়েছে; বিধৃত রয়েছে তাঁর গীতা এবং উপনিষদগুলির ভাষ্যের মধ্যে, ভাষাবৃত তত্ত্বের নিগূঢ় তাৎপর্য বিদ্যারণাকৃত পঞ্চদশী, বাচস্পতি মিশ্রের ভামতী টীকা, মধুসুদন সরস্বতীর অদ্বৈতসিদ্ধিঃ নামক গ্রন্থ এবং আরও অনেক বার্তিক ও টাকা টীপ্পনীর মধ্যে অত্যন্ত যুক্তিসিদ্ধ ভাষায় আম্লাত রয়েছে। সেইগুলি দেখলেই এই অদ্বৈতবাদী পরমযোগীর জীবন-দর্শনের সম্যক্ পরিচয় পেতে কারও অসুবিধা হয় না। এখন যদি এইসব চিন্তাধারার বিপরীত কোন তত্ত্ব কোন গ্রন্থে দেখা যায়, তাহলে অবিলম্বে আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসা উচিত যে ঐ সব তথাকথিত গ্রন্থ শঙ্করের নামে। প্রচারিত ও প্রচলিত হলেও তা নিশ্চয়ই শঙ্করের নয়। এই ব্রহ্মাজ্ঞ মহাপুরুষের মহত্তম স্থিতি এবং সর্বোত্তম গতির কথা একবারটি চিন্তা করে দেখুন। যিনি বলতে পেরেছিলেন অহং নির্বিকল্পো নিরাকাররূপো বির্ভূব্যাপী সর্বত্র সর্বেন্দ্রিয়াণাম। ন বা বন্ধনং বৈ মুক্তির্ন ভীতিশ্চিদানন্দরূপঃ শিবোহহম্ শিবোহহম্।। ৬ যিনি অনুভব করেছিলেন (নির্বাণঘাটকম) 'আমি বিকল্পশূণ্য, সর্বত্রব্যাপ্তিহেতু, আমি নিরাকার, সকল সময়ে সকল ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্বন্ধরহিত হওয়ায় আমি ইন্দ্রিয়াতীত, আমার যুক্তি বা বন্ধনের বালাই নাই, আমি সচ্চিদানন্দ শিব অর্থাৎ স্বয়ং ব্রহ্মাস্বরূপ, যদর্কেন্দুবিদ্যুৎ প্রভাজালমালা বিলাসাম্পদং যৎ স্বভেদাদিশূনাম। সমস্তং জগদ যস্য পাদাত্মকং স্যাল্ যতঃ শক্তিভানং তদেবাহম্মি।। ১০ (নির্বণিমারী) 'যিনি সূর্য, চন্দ্র, বিদ্যুৎপ্রভাসমূহের বিলাসের আশ্রয়, যিনি স্বগতাদিভেদশূণ্য, সমস্ত জগৎ যাঁর এক চতুর্থাংশস্বরূপ, যা হতে সমস্ত শক্তির উদ্ভব ও প্রকাশ ঘটে, আমি সেই ব্রহ্মস্বরূপ। 'যিনি পুনঃ পুনঃ ঘোষণা করে গেছেন- 'নির্বিকার, নির্বিশেষ, নির্গুণ, চৈতনাস্বরূপ পরমাত্মা কখনও দ্বৈতভাবে উপাস্য নন, কেবল অহং ইত্যাকার জ্ঞানেই উপলভ্য,' তাঁর পক্ষে কখনও কি ক্ষন্তব্যোমেহপরাধঃ প্রকটিতবদনে কামরূপে করালে' ইত্যাদি বলে সগুণ দেবতার পূজাপাঠ বা স্তবস্তুতি রচনা সম্ভব। যিনি নির্গুণমানসপূজাতে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন- অখণ্ডে সচ্চিদানন্দে নির্বিকল্পৈকরাপিণি। স্থিতিহদ্বিতীয়ভাবেহস্মিন্ কথং পূজা বিধয়ীতে।। তিনিই আবার স্নাহা প্রত্যুষকালে রূপনবিধিবিধৌ নাহৃতং গাঙ্গতোয়ং, পূজার্থং বা কদাচিদবহুতরগহনাৎ খণ্ডবিশ্বদলানি।। নানীতা পদ্মামালা সরসি বিকশিতা গন্ধযুপৌ ত্বদর্থং ক্ষন্তব্যোমেহপরাধঃ শিব শিব শির ভোঃ শ্রীমহাদের শন্তো।' (শিবপারবভঞ্জন ডোত্র)
ইত্যাদি বাহ্যপূজামূলক স্তোত্রাদি রচনা করেন কি করে। অত্যন্ত সহজ বুদ্ধিতেই ধরা পড়ে, প্রথমটি শঙ্কর-রচিত হলে দ্বিতীয়টি নিশ্চয়ই তিনি লেখেন নি। 'নির্গুণমানসপূজা' যে আদি শঙ্করাচার্যের লেখা, সে কথা সকল পণ্ডিতরাই স্বীকার করেন। কাজেই শিবপরাধভঞ্জন' স্তোত্রটি শঙ্কর-রচিত নয়, একথা বলাই বাহুল্য মাত্র। নিজের ইস্টের প্রাধান্য স্থাপনের জন্যই কোন শিবভক্ত শঙ্করাচার্যের নাম অপব্যবহার করেছেন।
দীর্ঘকাল ধরেই এই অপকার্য চলে আসছে। আমি পূর্বেই বলেছি সম্প্রদায়ীদের নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠার দুরভিসন্ধি ছাড়াও এর মূলে আরও একটি কারণ রয়েছে, তার নাম দিয়েছি অতিভক্তির জলাভূমি। ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির গবেষক মাত্রেই জানেন যে প্রাচীনকালে শুরুগতপ্রাণ শিষ্যরা গ্রন্থ রচনা করে স্বীয় গুরুদেবের নামে উৎসর্গ করতেন গুরুর নামেই তা প্রকাশ করতেন। এই পদ্ধতি শুরুভক্তির পরাকাষ্ঠা সন্দেহ নাই কিন্তু ব্রহ্মবিদ্‌ শুরু নিজে ভূমার ভূমিতে উঠে আপন উপলব্ধ সত্য যেমন ভাবে প্রকাশ করতে পারেন তেমনিভাবেই তাঁর কোন শিষ্যের পক্ষে তা কখনও নির্ভুলভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রশিষ্যরা প্রকাশ করলে ত আর কথাই নাই।আদিগুরুর ভাবধারার সঙ্গে তাঁদের ভাবধারার উপলব্ধিগত তারতম্য ঘটতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, নানক ও কবীরের কথা চিন্তা করে দেখুন। বিখ্যাত 'গ্রন্থসাহেবের' সকল চৌপাই বা দৌহা নানকের স্বরচিত নয়। তাঁর তিরোধানের পর গুরু অঙ্গদ হতে আরম্ভ করে শুরু অর্জুনদেব, হরকিষণজী, শুরু গোবিন্দ সিং প্রভৃতি অপর ৯ জন গুরুর বহু উপদেশও 'নানক কহে' এই বয়ানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কবীরের নামে যে অজস্র দোঁহা প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটি কবীরের রচিত নয়। তাঁর শিষ্য প্রশিষ্য রচিত দোঁহাও 'কহত কবীরা শুন ভাই সাধু'। বলে কবীরের নামে প্রচলিত হয়ে আসছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঐ সব দোঁহাতে যে স্থানে স্থানে ভাববিভ্রাট এবং তত্ত্বগত বিভ্রাট ঘটেছে তা যেকোন বিচারশীল পাঠকের চোখে ধরা পড়বে।
জ্ঞানগুরু শঙ্করের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা প্রযোজ্য। ভারতবর্ষে আদি শঙ্করাচার্য ছাড়াও আরও অনেক 'শঙ্করের' সন্ধান পাওয়া গেছে। আমি পূর্বেই এক গৌড়ীয় শঙ্করাচার্যের কথা বলেছি। আচার্য প্রতিষ্ঠিত প্রধান চারটি মঠের মোহান্ত মাত্রেই শঙ্করাচার্য নামে অভিহিত হয়ে আসছেন অর্থাৎ তাঁরা প্রত্যেকেই 'শঙ্কর'। শৃঙ্গেরী মঠের গুরু পরম্পারাতেও বিদ্যাশঙ্কর ও ভারতীশঙ্কর নামে দুজন প্রসিদ্ধ 'শঙ্কর' ছিলেন। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের 'ত্রিপুরাতন্ত্রর' নামে একখানি গ্রন্থ আছে। ঐ গ্রন্থমতে শঙ্করাচার্যে ১৪ জন শিষ্য ছিলেন, তার মধ্যে ৫ জন সন্ন্যাসী এবং ৯জন গৃহী। ঐ ৫ জন সন্ন্যাসী শিষ্যের মধ্যে একজনের মূল নামই ছিল 'শঙ্কর'। এ ছাড়া কাজী-কামকোটি পীঠের গুরুপরম্পরাতে কৃপাশঙ্কর, উজ্জ্বলশঙ্কর, মুকশঙ্কর এবং অভিনবশঙ্কর নামেও কয়েকজন বিদ্বান্ সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটেছিল। অভিনবশঙ্করের তিরোভাব কাল ৮৪০ খৃষ্টাব্দ। আর আদি শঙ্করাচার্যের তিরোভাব কাল ৮২০ খৃষ্টাব্দ। অর্থাৎ আদি শঙ্করাচার্যের সমসাময়িক কালে ত বটেই তাঁর তিরোভাবের পরও কিছুকাল ঐ অভিনবশঙ্কর বর্তমান ছিলেন। এই সমস্ত 'শঙ্করের' রচিত অনেক গ্রন্থই নামসামা হেতু আদি শঙ্করের নামে প্রচলিত হয়ে আসছে বলে আমার ধারণা। বিশেষতঃ শঙ্করের নামে প্রচলিত যাবতীয় শক্তিবিষয়ক স্তবস্তুতি যে পূর্বোক্ত কৌলসাধক গৌড়ীয় শঙ্করাচার্য এবং ত্রিপুরাতন্ত্রোক্ত শঙ্করের দ্বারা রচিত হয়েছে, সে বিষয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ নাই। কবীর নানকের শিষ্য প্রশিযারা যেমন স্ববর্তিত রচনা স্ব স্ব গুরুবর্গের নামে প্রকাশ করে স্বেচ্ছায় আত্মবিলোপ ঘটিয়েছেন, তেমনি ঐ সমস্ত 'শঙ্কর মহারাজরাও' কেউ নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আবার কেউ বা গুরুভক্তির পরাকাষ্ঠা স্বরূপ নিজেদের রচনা আদি শঙ্করাচার্যের নামে স্বেচ্ছায় প্রচলিত করে থাকতে পারেন। তার ফলে তাঁদের ভাবধারাও শঙ্করাচার্যের ভাবধারা বলে অবলীলাক্রমে ভ্রমবশতঃ পরিগৃহীত ও পরিগণিত হয়ে আসছে।
এমতাবস্থায় গুরুমুখী বা হিন্দী ভাষায় রচিত যে কোন দোঁহার অন্তে 'নানক কহে' কিংবা 'কহত কবীরা' থাকলে তাকে যেমন নিঃসংশয়ে নানক বা কবীরের রচিত বলা যায় না, তেমনি সংস্কৃত ভাষায় রচিত যে কোন গ্রন্থের অন্তে ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ-পূজ্যপাদ-গোবিন্দপাদাচার্যশিষ্য-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য-শ্রীশঙ্করভগবৎপূজ্যপাদ বিরচিতং' ইত্যাদি ছাপা থাকলেই তা স্বয়ং আদি শঙ্করাচার্যের দ্বারা লিখিত একথা বলা যুক্তিসঙ্গত নয়, এই হল আমার সিদ্ধান্ত। অলমিতি।
📚 গ্রন্থসূত্র:
তপোভূমি নর্মদা সপ্তম খণ্ড
(শ্রী শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী)

Read More

24 September, 2026

অসুর কারা?

24 September 0

অসুর কারা?, অসুর
অসুর বলতে দৈত্যদানা মানুষখেকো কোন জীব নয়। অসুররা ভারতেরই একটি সভ্য জাতি। হায়দ্রাবাদে একটি স্থান রয়েছে, তার নাম অসুরগড়, সেখানেও তামার খনি আছে। অসুররা তামা ভালবাসতেন। দ্রাবিড়রা ঐ অসুরগড়কে বলেন- 'রাক্ষসগুড়িয়ম্'।

পরবর্তীকালে Indian Antiquary তে কীলহর্ণ সাহেবের সম্পাদিত একটি তাম্রশাসনের অনুলিপি দেখি। ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে কীলহর্ণ ঐ তাম্রশাসনটি সম্পাদনা করেন। তাতে লেখা আছে

'ও স্বস্তি শ্রীপ্রয়াগসমীপ-গঙ্গাতটবাসে-পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ-পরমেশ্বর-শ্রীবিজয় পালদেব-পদানুধ্যাত-পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ-পরমেশ্বর-শ্রীরাজ্যপালদেব-পাদানুধ্যাত-পর মভট্টারক-মহারাজাধিরাজ-পরমেশ্বর-শ্রীমন্ত্রিলোচনপালদেবঃ অসুরাভক বিষয়ে লেডুন্ডাকগ্রামে সুমপগতান রাজপুরুষান ব্রাহ্মণোত্তরাংশ।"

তাম্রশাসনটির তারিখ ১০৮৪ বিক্রমাব্দ। এর অর্থ হল পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ পরমেশ্বর রাজ্যপালদেবের পাদানুধ্যাত ত্রিলোচন-পাল প্রয়াগ সন্নিকটে গঙ্গাতীরে বাসকালে (অসুরাডক) বিষয়ান্তর্গত লেডুন্ডাক গ্রামে যে সমস্ত রাজপুরুষ এবং ব্রাহ্মণোত্তরগণ উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁদেরকে সংবাদ দেন। এখানে অসুরাডক শব্দটি লক্ষ্য করুন, এর অর্থ অসুররাজদের অধিকারভুক্ত। অর্থাৎ বিজয়পালদেব, রাজ্যপালদেব এবং ত্রিলোচনপালদেব প্রভৃতি অসুরবংশের রাজা ছিলেন। তাঁদের নিরীহ নামগুলি থেকে কি তাঁদেরকে পাতাল বা সমুদ্রগর্ভবাসী কোন অন্ধকার রাজ্যের বীভৎস কোন জীব বলে মনে হচ্ছে।

আসল কথা- অসুররা আমাদেরই মত মানুষ। ভারতেরই একটি সুপ্রাচীন জাতি। এই অসুরদেরই একটি শাখা ইরাণে গিয়ে বসবাস করেছিল। ইরাণীদের ধর্মগ্রন্থ আবেস্তাতে 'অহুর' শব্দটি অসুর শব্দেরই অপভ্রংশ। 'শব্দটি খুবই মর্যাদাসূচক। আহুর মাজদা তাঁদের পরমেশ্বরের নাম। বেদে ১০৫ বার অসুর শব্দের উল্লেখ আছে। তার মধ্যে ৯০ বারই ভাল অর্থে ব্যবহৃত। যেমন অসুরঃ অসু ক্ষেপণে শত্রুণ ইত্যসুরঃ। যারা শত্রুদের উপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে পটু তারা অসুর। কিংবা অসুন্ প্রাণান রাতি দদাতি ইত্যসুরঃ। যারা প্রাণদান করে, যাদের মধ্যে দুর্দম প্রাণশক্তির প্রকাশ দেখা যায়, সেই সমস্ত বলিষ্ঠ বীররাই অসুরপদবাচ্য। যাস্ক তার নির্ঘন্ট ও নিরুক্ত (৩।৮) গ্রন্থে বলেছেন যে অস্ ধাতু হতে অসুর শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। তাঁর মতে অস্ শব্দ যার অর্থ শ্বাসবায়ু-হতেও অসুর শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে। তাঁর মতে অসু শব্দ যার অর্থ শ্বাসবায়ু তা হতেও অসুর শব্দ নিষ্পন্ন হতে পারে। 

বৈদিক যুগের গোড়ার দিকে যারাই শৌর্যে বীর্যে বড় হতেন, তাঁরাই অসুর উপাধিতে ভূষিত হতেন। রুদ্র, মরুৎ, দৌৗ, বরুণ, ত্বষ্টা, অগ্নি, বায়ু, পুষা, সবিতা, পর্জন্য এঁদের অলৌকক শক্তি ছিল বলে এঁদেরকে বৈদিক ঋষিরা অসুর বলতেন। যথা-

মরুৎ (ঋগ্বেদ)

তে জঙিরে দিব ঋদাস উক্ষণো রুদ্রস্য মর্যাসুরাঃ অরেপসা।

রুদ্র (ঋগ্বেদ ৫/৪২/২১) যক্ষবামহে সৌমনসায় রুদ্রম্ নমোভির্দেবং অসুরুৎ দেবস্য।

দৌৗ (ঋগ্বেদ ) ইন্দ্রায় হি দৌরসুরো ইত্যাদি

ইন্দ্র (ঋগ্বেদ ) বৃহচ্ছবা অসুরো বহুনা কৃতঃ পুরো হরিভ্যাং বৃষভো রথো হি যা।

বরুণ (ঋগ্বেদ) ত্বং বিশ্বেষাং বরুনাসি রাজা যে চাদেবা অসুর যে চ মত্তঃ। 

অগ্নি (ঋগ্বেদ ৫/১২/১) প্রাহ্ময়ে বৃহতে যজ্ঞিয়ায় ঋতস্য অসুরায় মন্ম।

সেযুগে ধর্মীয় আচার আচরণকে কেন্দ্র করে ভারতীয়রা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছলেন। একদল বেদ মানতেন। সেই বেদপন্থীদের মধ্যে ভূক্ত অগ্নিপূজার প্রচলন করেন। তাঁরা যজ্ঞ নিয়ে মেতে রইলেন। এঁদেরই নাম হল- দেব। শতপথ ব্রাহ্মণে তাই দেবের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে যজ্ঞেন বৈ দেবাঃ (১/৫/৫/২৬) , আর যাঁরা যজ্ঞ করতেন না, তাঁদের নাম হয়ে গেল অসুর। প্রথম প্রথম দেব ও অসুরের মধ্যে খুব সৌভ্রাতৃত্ব ছিল। কিন্তু পরে খুব শত্রুতা দেখা দেয়, অনেক বড় বড় যুদ্ধ হয়। দেবতাদের নেতা ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে বধ করেন। শত্রুতা সুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে 'অসুর' শব্দটি খারাপ অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকলো যেমন অসুরাঃ রাক্ষসাঃ দেবনিন্দকাঃ ইত্যাদি। ১০৫ বারের মধ্যে ৯০ বার বাদ দিলে বাকী ১৫ বার ঐ রকম খারাপ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই থেকেই কল্পনা-সম্রাট পুরাণকার থেকে আরম্ভ করে ঠাকুরমার ঝুলির রচয়িতার হাতে পড়ে অসুররা এক ভীতিপ্রদ অমানুষের পর্যায়ে নেমে গেল।

বৈদিক যুগের শেষভাগে যজ্ঞবাদী আর্যদের সঙ্গে অসুরদের বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। অসুরজাতির অধিকাংশ ভারত ত্যাগ করে পারস্য ও তুর্কীস্থানে গিয়ে বাস করতে থাকেন। বাকী যাঁরা রইলেন, তাঁরা প্রয়াগ, ছোটনাগপুর, তিব্বত বা কামরূপের দিকে চলে যান। পূর্বে যে তাম্রশাসনের উল্লেখ করেছি, সেই তাম্রশাসন বর্ণিত প্রয়াগের ত্রিলোচনপালদেব প্রভৃতিরা এই অসুর জাতিরই শাখা। ছোটনাগপুরে এখনও একটি জাতির সন্ধান পাওয়া যায়

- সংখ্যায় অল্প হলেও এরা অসুর জাতি নামে পরিচিত। এরাও তান্ডপ্রিয়, ছোটনাগপুরের তাম্রখনিতে কাজ করে। প্রত্নতত্ত্ববিদ্রা এদেরকে সেই প্রাচীনকালের বিধ্বস্ত ও বিতাড়িত অসুরদেরই বংশধর বলে মনে করেন।

ওদিকে, অসুরদের যে বড় দলটি ভারতের বাইরে গেলেন, এখন হতেও হাজার বছর পূর্বে তারাই ব্যাবিলনের শতক্রোশ উত্তর পশ্চিমে এক সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। এই সাম্রাজ্যের নাম হয় 'অসুর' বা 'আসীরিয়া'। টাইগ্রীস নদীর উপকূলে এঁদের যে রাজধানী স্থাপিত হয় তার নাম হয়- অসুর। আসীরিয়দের এক গ্রাম্য দেবতার নামও হয় অসুর। আসিরীয়দের সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রাম্য দেবতা জাতীয় দেবতায়। পরিণত হয়। আসিরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার একটি। ব্যাবিলনের কন্দর এরিডুতে যে দেবতার পূজা হত, তাঁরও নাম ছিল অসরি (Asari)। এই নাম যে অসুর শব্দের অপভ্রংশ তা ধারণা করা চলে। ব্যাবলনীয়দের রাজন্যবর্গের নামমালার মধ্যে অসরু (Asuru), অসুর-নসির-পাল (Asumasipal), অসুর-বনিপাল (Asurbanipal) নামগুলি পাওয়া যায়। মোট কথা, যাদের বাসস্থানের নাম আসিরীয় বা অসুর, রাজাদের নাম অসুর উপাধিযুক্ত এবং উপাস্য দেবতার নাম অসরি বা অসুর তারাই অসুর নামে অভিহিত।

ভারতীয় অসুরগণ দুর্গ নির্মাণে পটু ছিলেন। বেদে তার বহু প্রমাণ পাই। শম্বর অসুরের ছিল ১০টি দুর্গ (ঋগ্বেদ ১/১৩০/৭)। বর্তী অসুরের লক্ষ লক্ষ যোদ্ধা ছিল, তিনি নিজেও ছিলেন দুর্দান্ত, বীর (৬১০/১৫১/৩)। পিক্ অসুরেরও বড় বেল্লা ছিল। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে দেখি ইন্দ্র পিপরুর কেল্লা নষ্ট করে দিয়েছিলেন (১০/১৩৮/৩)।

এদিকে আসিরীয় অসুরদের যে পরিচয় পাই, তাতে তারাও যে যুদ্ধবিদ্যায়-পটু ছিলেন তারও ইতিহাস সম্মত প্রমাণ আছে। তাঁদেরও দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল। কালক্রমে বাহুবলে এশিয়া মাইনর হতে ককেশাস পর্বত পর্যন্ত নিজেদের অধিকার, বিস্তার করেছিলেন।

ভারতের অসুরজাতি এবং আসিরীয় অসুরজাতি যে একই জাতি তা বলবার আরও তিনটি কারণ আছে-

(ক) আসিরীয়রা দুরকম শ্মশান তৈরী করতেন। একটি ছিল তাঁদের তাঁবুর আকৃতি আর একটি ডিম্বাকৃতি। শতপথ ব্রাহ্মণে দেখি দেবতাদের শশ্মশান ছিল চতুরস্রকার আর অসুরদের শ্মশান ছিল গোলাকৃতি। যা আসূর্য প্রাচ্যাস্তদ্‌ যে ত্বৎ পরিমণ্ডলানি শশ্মশানানি কুর্বতে। (১৩/৪/১/২)

(খ) দ্বিতীয়তঃ আসীরীয় অসুররা মাড়ুকের প্রতীক পূজা করতেন। এই প্রতীক বাগাকৃতি। Strom God এর পূজাও এদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এদিকে ভারতীয় অসুররাও ছিলেন রুদ্রোপাসক। বেদে রুদ্রও Storm God রূপে চিত্রিত। বাণাসুরের পতাকায় যে 'বাণ' প্রতীক থাকতো, তার বর্ণনা আমরা মহাভারতে পাই।

(গ) তৃতীয়তঃ, ভারতীয় অসুররা মায়া বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। যার জন্য তাঁদেরকে 'মায়াবী বলা হয়। আসিরীয় অসুরগণও যে অলৌকিক মায়া বিদ্যার অনুশীলন করতেন তা ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে G. Smith Assyrian Discoveries নামক গ্রন্থে বহু গবেষণামূলক তথ্যের দ্বারা প্রমাণ করেছেন। তিনি আসিরীয়দের কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেবদেবীর মূর্তিও উদ্ধার করেছেন। এগুলি British Museum এর Bab. Room (No. 996-1009) রক্ষিত আছে।

ঐ সমস্ত বৈদিক, ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের বলে আমরা কি এখন তাহলে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে অসুররা ভারতেরই একটি প্রাচীন জাতি, ভারতের আর্য জাতির বংশধর, তাঁরা আমাদেরই মত মনুষ্যদেহধারী এবং আসিরীয়রাই সেই অসুরজাতির বংশধর।


Read More

ইরাণ নামের উৎপত্তি

24 September 0

ইরাণ নামের উৎপত্তি

 পারস্যের আর একটি প্রাচীন নাম ইরাণ। ইরাণদেশের অধিবাসীরা 'ঐরাণ' নামেও পরিচিত। ইরাণ ও ঐরাণ- এই দুটি শব্দের মূল অনুসন্ধান করলে আমরা পাই যে চন্দ্রবংশে ইড়ার গর্ভে পুরুরবার জন্ম হয়। তাঁর বংশধরগণ অর্থাৎ ইড়ার পুত্র- এই অর্থে 'ঐড়' নামে অভিহিত। এই ঐড়গণের বাসস্থান বলে ঐড়াণ বা ঐরাণ নামের উৎপত্তি। সূর্যবংশীয়দের সঙ্গে চন্দ্রবংশীয়দের বিবাদের ফলেই যে তাদেরকে এদেশ ত্যাগ করতে হয় একথাও আমাদের ধর্মশাস্ত্রে বারবার উল্লেখ আছে। তুরাণ ও ইরাণদের যুদ্ধ আসলে চন্দ্রবংশীয় ও সূর্যবংশীয়দেরই যুদ্ধ। সুর ও সুরাণ শব্দের অপভ্রংশে যে তুর ও তুরাণ শব্দের উৎপত্তি - একথা ভাষাতত্ত্ববিদমাত্রেই স্বীকার করতে বাধ্য। বেদ ও জেন্দ অভেস্তায় বর্ণিত দেবদেবীদের নাম, বীরগণের নাম ও উপাখ্যান, যজ্ঞবিধি ধর্ম কর্ম আচার ব্যবহার সবকিছু আলোচনা করলে সব বিষয়ে সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। অনেক ঘটনার এমন হবহু মিল দেখা যায় যে সবিস্ময়ে ভাবতে হয়- একটি অপরটির ভাষান্তরে অনুবাদ মাত্র কিনা। কর্ণেল টডের মত ভারতবিদ্বেষী লোকও প্রাচীন মিডিয়া রাজ্যের অভ্যুদয় বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একস্থানে লিখেছেন প্রাচীন ব্রহ্মাবর্তবর্ষের রাজা অজমেধের পাঁচটি পুত্র ছিল। তাঁদের মধ্যে দুজন ভারতবর্ষ ত্যাগ করে উত্তর পশ্চিমে চলে যান। তাঁরা সেখানে নূতন রাজ্য স্থাপন করেন এবং পিতৃস্মৃতি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তাঁদের পদবী মেধ এবং তাঁদের বাসস্থানের নাম রাখেন মেধদেশ- এই মেধদেশই চলতি ভাষায় মেধিয়া হতে ক্রমে Media নামের উৎপত্তি। এইভাবে তিনি পারসীদের সম্বন্ধে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন The country from which Persians are said to have come, can no other be than the North-West Part of Ancient India.'

প্রাচীন ভারতীয়দের একটি দল যে আফগানিস্থান বেলুচিস্থানের পথে হিমালয় অতিক্রম করে পারস্যে উপনীত হয়েছিলেন- একথা সবিস্তারে জেন্দ অভেস্থাতেই লেখা আছে। জেন্দ অভেস্থার অন্তর্গত 'ভেন্দিদাদ' নামক অংশে জরাথুষ্ট্রকে সম্বোধন করে আহুর মাজদা বলছেন- 'আমি মনুষ্যদিগের জন্য অত্যুৎকৃষ্ট উর্বর ভূখণ্ড প্রদান করিয়াছি। কেহই সেরূপ ভূখণ্ড প্রদানে সমর্থ নহেন। সেই ভূখণ্ড পূর্বভাগে অবস্থিত। সেখানে প্রতি সন্ধ্যায় তারাদল সমূদিত হন'। জেন্দ্ অভেস্থায় আরও লেখা আছে জামসেড নামক নেতার কর্তৃত্বাধীনে ঐ জাতি সেই পূর্ব স্থিত উচ্চ ভূখণ্ড হতে জীবজন্তু মনুষ্যহীন সমতলে উপনীত হন। ভূগোল সম্বন্ধে যাঁর কিঞ্চিৎমাত্র জ্ঞান আছে - তিনি নিশ্চয়ই ঐ বর্ণনা হতে বুঝতে পারছেন যে পারস্যের পূর্বভাগে ভারতবর্ষ অবস্থিত। মূলকথা যে জরাথুষ্ট্রকে পাশ্চাত্য ও প্রতীচ্যের গবেষকগণ ও পণ্ডিতগণ পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদের উদ্‌দ্গাতা বলে বর্ণনা করেন- তাঁর সেই প্রাচীনতম ধর্মমতের মূল উৎস ভারতীয় বৈদিক ধর্মের মধ্যেই নিহিত।
ভারতের আর্য হিন্দুগণ ও পারস্যের প্রাচীন অধিবাসীদের ভাব ভাষা আচার ব্যবহার এবং ধর্মগ্রন্থের বাণীবচনের সাদৃশ্য আলোচনা করলেই বোঝা যাবে যে ভারতীয় ধর্ম হতেই ইরাণীয় ধর্মের উৎপত্তি। প্রথমতঃ ধরুন - ধর্মগ্রন্থের নামে বিভাগ ও ভাষার সাদৃশ্য। হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থের নাম বেদ। বেদ শব্দের মূল বিদ ধাতু। বিদ্‌ ধাতুর অর্থ জানা। জেন্দ অভেস্থা নামের মূল জেন্দ অবেস্তা, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় এই নাম - নানারূপে এবং বিভিন্ন শব্দ সংযোগে উচ্চারিত হয়। বাংলা ভাষায় বলা হয় জেন্দ অভেস্তা, কেউ বলেন জেন্দাভেস্তা আবার কেউ বলেন জেন্দ অভস্থা। ইংরাজীতে বলা হয় Zend Avesta, ইরাণী ভাষায় জেন্দ শব্দ ইরাণী ধাতু Zan বা জান্ ধাতু হতে নিষ্পন্ন। এই জান্ ধাতু মানেও জানা অর্থাৎ সংস্কৃতে 'জ্ঞা' ধাতুর সমার্থক অবস্তা শব্দটি বিদ্‌ ধাতুরই রূপান্তর। নিরুক্ততে বিদ্‌ ধাতুর যতরকম রূপান্তর এবং প্রয়োগ হতে পারে তা বলতে গিয়ে অবস্তা শব্দটিরও উল্লেখ আছে।
আমার মতে জেন্দ শব্দটিকে সংস্কৃত 'ছন্দঃ' শব্দেরও রূপান্তর বলা যেতে পারে। অভিজ্ঞান শকুন্তলমে দেখি সংস্কৃত 'ঐয়ি শকুন্তলে' কে সখীরা 'হলে শউন্দলে' বলে সম্বোধন করেছেন। সংস্কৃতে ঐয়ি শকুন্তলে যদি প্রাকৃত ভাষায় হলে শউন্দলে হয় তাহলে লৌকিক কথ্য ভাষার মহিমায় ছন্দ শব্দটিও জেন্দ বা জেন্দ এ রূপান্তরিত হওয়া এমন কিছু আশ্চর্য নয়। বেদের ভাষাকে পাণিনি বলেছেন- ছন্দঃ। তদনুযায়ী যে অভেস্তার ভাষাকে ইরাণীরা জেন্দ বলেছেন- এ বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। ছন্দঃ এবং জেন্দ একই ভাবাত্মক। এইভাবে আভেস্তা শব্দটি সংস্কৃত অবস্থা শব্দেরও রূপান্তর হতে পারে। অবস্থা শব্দের অর্থ স্থিতি। জেন্দ ভাষায় জেন্দ অভেস্থাতে যে জ্ঞানের কথা আছে- যে নিত্যস্থিতির কথা আছে- ছন্দঃ অর্থাৎ বেদেও সেই পরিপূর্ণ স্থিতির কথা আছে।
আর একটি বিষয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায় জেন্দ অভেস্তা প্রধানতঃ তিন ভাগে বিভক্ত (১) যশ্ব (২) ভেন্দিদাদ (৩) যস্থ বা যশৎ। 'যশ্ন' শব্দটি সংস্কৃত যজন বা যজ্ঞ শব্দের রূপান্তর। বৈদিক সূত্রে যেমন ঈশ্বরের স্তব বা যজ্ঞাহতির পরিচয় পাই, জেন্দ অভেস্তায় যশ্ন অংশেও সেইরকম আহরমণ অর্থাৎ ঈশ্বরের স্তব স্তুতি বা হবনাদি ক্রিয়ার বর্ণনা আছে। এই যশ্বের অপর নাম গাথা। বেদের ঋক্ মন্ত্রগুলিতে যেখানে স্তব আছে সেগুলিকে গাথা বলে।
ভেন্দিদাদ কথাটি সংস্কৃতে বন্দিতাতঃ কথার অপভ্রংশ। বন্দিতাতঃ মানে হে তাতঃ, হে পরমপিতঃ। তোমাকে বন্দি অর্থাৎ বন্দনা করি। আশ্চর্যভাবে জেন্দ্ অভেস্তার ভেন্দিদাদ অংশটি পুরোপুরি আহুর মাজদার উপাসনা পদ্ধতিতে পরিপূর্ণ। জেন্দ অভেস্তার তৃতীয় অংশ যস্থ বা যষতে আমাদের অথর্ববেদের মত লৌকিক ব্যবহার বিষয়ে বহু উপদেশ লিপিবদ্ধ আছে। জেন্দ অভেস্তার এই যে তিনটি ভাগ এও বেদের প্রতিচ্ছায়া।
শুধু তাই নয়- আমাদের দেশে সকলের সংস্কার আছে যে সকল রকম ধর্ম কর্ম আধ্যাত্মিক বিষয় সংস্কৃতে হওয়া চাই। কারণ সংস্কৃত বাক্যগুলি ঋষিবাক্য। হিন্দু মাত্রই বিশ্বাস করেন ঋষিগণ যে ভাষায় মন্ত্রগুলি আদিতে রচনা করেছেন সেই সংস্কৃত ভাষাতেই সেগুলি যথাযথ উচ্চারিত হলে তবেই কার্য সিদ্ধ হয়। কারণ ঐ ভাষা ও শব্দের মধ্যে তাঁদের বাক্ চৈতন্য ছড়িয়ে আছে। আজ পর্যন্ত্য কোন হিন্দুকেই কখনও তাঁর মাতৃভাষায় পূজা-পদ্ধতি শ্রাদ্ধাদি দশকর্ম করতে দেখা যায় না। বেদমন্ত্রগুলি যথাযথ ভাবে উদাত্তপ্লুত অনুদাত্ত স্বর যোগে যথাবিহিত ছন্দে উচ্চারিত হলে যে কোন আধ্যাত্মিক কার্যে তবেই সিদ্ধিলাভ সম্ভব -এ বিশ্বাস প্রত্যেক হিন্দুর মজ্জাগত। ঠিক তেমনি ইরাণীগণও জেন্দ অভেস্তার ভাষাতেই তাঁদের ঈশ্বর আহুর মাজদার উপাসনা করে থাকেন। কোন ইরাণীকেই আপনি জেন্দ অভেস্তার ভাষা ছাড়া তাদের কথ্য ভাষার আহুর মাজদার উপাসনা করতে দেখবেন না। কারণ তাঁরাও আমাদের মত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন জেন্দ ভাষায় লিখিত স্তোত্রাদি মোহিনী শক্তি সম্পন্ন। সাধারণ ভাষায় সে স্তোত্র অনুবাদ করে উচ্চারণ করলে তাতে কোন ফললাভ হবে না।
এই সহজ সংস্কার, এই চেতনা এই সাদৃশ্য দেখে কি ইরাণীদের মধ্যে বৈদিক ঋষিদের Heredity complex এর প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না? এই কৃষ্টিগত বোধের সমতা ও সাদৃশ্য দেখে কি ইরাণীদেরকে সেই প্রাচীন ভারতীয়দের সেই বৈদিক অব্যাহত ধারার একটি নিরবচ্ছিন্ন সংস্কৃতির স্রোত বললে কি ভুল হবে?
এইবার কিছু ব্যাকরণগত সাদৃশ্য আলোচনা করা যাক। সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেদে যাহা অস্মৈ, কস্মৈ, যস্যাম জেন্দ ভাষায় লিখিত অবেস্তাতে তা হয়েছে অহ্মৈ কম্বো এং যেস্যাম্। সংস্কৃতে অস্মৈ মানে ইঁহাদেরকে জেন্দের অহ্মৈ মানেও ইঁহাদেরকে। বেদে আছে কস্মৈ দেবায় বিধেম - কোন দেবতাকে উৎসর্গ করবো? অবেস্তাতেও ঠিক ঐ কথাই আছে কহ্মৈ দেবায় বিধেম। এইভাবে যস্যাম এবং যেস্যাম একই অর্থ বহন করে। সংস্কৃতে কুকুরকে বলা হয় শ্বন, অবেস্তাতেও কুকুরকে বলা হয়েছে স্পন্। শব্দ রূপের বিচারে এই দুই মহাগ্রন্থের কি অপূর্ব মিল। সংস্কৃতে শ্বন্ শব্দের প্রথমার একবচনে 'শ্বা', জেন্দ ভাষায়ও 'স্পন্' শব্দের প্রথমার একবচনে 'স্পা'। শ্বন্ শব্দের দ্বিতীয়ার একবচনে সংস্কৃতে 'শ্বানম্', জেন্দ ভাষাতেও 'স্পন্' শব্দের দ্বিতীয়ার একবচনে 'স্পানম্' অর্থাৎ কুকুরকে। চতুর্থীর একবচনে উভয় শব্দ একবারে মিলে গেছে- যথা শুনে এবং সুনে। কেবলমাত্র তফাৎ বানানে। সংস্কৃতে তালব্যশতে উকার, জেন্দে দন্ত্যসতে উকার। জেন্দ্ অবেস্তার 'পথন' শব্দটিরও ব্যুৎপত্তি আলোচনা করলে আরও স্পষ্ট হবে যে বেদেরই কোন অংশ ভাষান্তরে জেন্দ অবেস্তারূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। জেন্দের এই পথন্ শব্দটি সংস্কৃতে 'পথিন' শব্দের অনুরূপ। সংস্কৃতে 'পথন' শব্দের প্রথমার একবচনে 'পন্থা', জেন্দ ভাষায় 'পথন' শব্দেরও প্রথমার একবচনে পস্তা। প্রথমার বহুবচনে 'পন্থানঃ' জেন্দ ভাষায় 'পস্তানো'। শব্দরূপ ও বিভক্তির ধারায় কোন প্রভেদ নেই, প্রভেদ শুধু 'থ' এর জায়গায় 'ত'।
পারসীদের পরম পূজনীয় গ্রন্থ জেন্দ অভেস্তা এবং হিন্দুদের পরম পূজনীয় গ্রন্থ বেদ – এই দুই এর তত্ত্বগত, গুণগত এবং সাধনতত্ত্ব আলোচনা করে আমি বলতে চাইছি যে- জেন্দ অভেস্তা অথর্ববেদেরই লুপ্ত অংশ মাত্র। এ আমার হিন্দু সংস্কার বা বেদ প্রীতিমাত্র নয়; প্রাচ্য পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতগণ যে তড়িৎ সিদ্ধান্তে এসেছেন- অথর্ববেদের অংশ বিশেষ নানা রাষ্ট্র বিপর্যয় এবং অন্য কোন কারণে নষ্ট হয়ে গেছে- সে বিষয়েই আমি প্রতিবাদ করছি এবং বলতে পারেন- আমার দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের ফল প্রকাশ করে এই আবেদন জানাতে চাইছি- পণ্ডিতমহাশয়গণ। কৃপা করে অন্য কোন বই এর অংশকে অথর্ববেদের অংশ বলে চালাতে চাইবেন না। বেদের সেই লুপ্ত ভৃগু বিদ্যা, অথর্বন ঋষি বা ভৃগু ঋষির সেই আলোকজ্জ্বল উপলব্ধির সারসত্য আমাদেরই পূর্বপুরুষদের একটি শাখা ইরাণীদের মহাগ্রন্থ জেন্দ অবেস্তা রূপে বিরাজমান। তত্ত্বগত মিল ছাড়াও সামান্য মাত্র একটি আধটি বর্ণের পরিবর্তন করে দেখলে উভয় ভাষায় উভয় গ্রন্থের ভাষা ও শব্দের অভিন্নত্ব সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।
📚 গ্রন্থসূত্র:
তপোভূমি নর্মদা সপ্তম খণ্ড, পৃ০ ১৫-১৭
(শ্রী শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী)

Read More

পাটীগণিতের ইতিহাস

24 September 0

পাটীগণিতের ইতিহাস
ভারতবর্ষ উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিক তত্ত্বালোচনায় যথেষ্ট প্রতিভা ও উৎসাহের পরিচয় দিয়েছে কিন্তু তাই বলে বাস্তবকে ভোলে নি। যে আরুণি শ্বেতকেতুকে বলেছিলেন, 'তত্ত্বমসি শ্বেতকেতো'- তিনিই তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন- অন্ন-ব্রহ্মঃ। পাটীগণিত, বীজগণিত (ব্যক্ত ও অব্যক্ত গণিত) জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, জ্যোতিষ, রসায়ণ, ফলিত রসায়ণ ও চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রভৃতি বিজ্ঞানের সব বিভাগেই ভারতীয়রা আশ্চর্যজনক উন্নতি লাভ করেছিলেন।

পাটীগণিত সম্পূর্ণরূপে হিন্দুদের বিজ্ঞান। অন্য কোনও জাতির দ্বারা কোনও রকমে প্রভাবান্বিত না হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে হিন্দুরা অন্য সব জাতির চেয়ে পাটীগণিতে সমধিক ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। পাটীগণিতে হিন্দুদের সব চেয়ে বড় কৃতিত্ব ১ থেকে ৯ পর্যন্ত সংখ্যা ও '০'এর আবিষ্কার। মানুষের আবিষ্কারের মধ্যে অক্ষর আবিষ্কারের পরেই এই আবিষ্কারের স্থান। আমেরিকার অধ্যাপক হ্যালস্ট্রেড হিন্দুদের '০' অবিষ্কারের সম্বন্ধে লিখেছেন-'অংক শাস্ত্রের অন্য কোনও আবিষ্কার মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও ক্ষমতা বিকাশের পথে এতটা প্রভাব বিস্তার করেনি। ১ থেকে ৯ এবং '০' ধরে অর্থাৎ দশ ধরে গণনা পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলেই হিন্দুরা গণিতে গ্রীকদের চেয়ে বেশী উন্নতি লাভ করেছিলেন।' ঐতিহাসিক এলফিনস্টোন তাঁর ভারত-ইতিহাসে লিখেছেন- 'হিন্দুরা পাটীগণিতে সর্ববাদী সম্মত দশ ধরে গণনা পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত এবং মনে হয় এটাই, গ্রীকদের তুলনায় পাটীগণিতে তাঁদের এত বেশী উন্নতির কারণ।' যজুর্বেদ (১৭।২) সংহিতায় আমরা বিভিন্ন বিরাট সংখ্যার নামকরণ পাইঃ এক (১), দশ (১০), শত (১০০), সহস্র (১০০০), অযুত (১০,০০০), নিযুত (১,০০,০০০), প্রযুত (১,০০০,০০০), অর্বুদ (১০,০০০,০০০), নার্বুদ (১০০,০০০,০০০) সমুদ্র (১,০০০,০০০,০০০), মধ্য (১০,০০০,০০০,০০০), অম্ভ (১০০,০০০,০০০,০০০ ) ও পরার্ধ (১,০০০,০০০,০০০,০০০)। গ্রীকদের গণিতে মিরিয়াড (১০,০০০) এর উর্দ্ধে কোন সংখ্যার নাম পাওয়া যায় না। অক্ষরের সাহায্য সংখ্যা প্রকাশ করবার দুর্বলতার জন্যই বৃহৎ সংখ্যা চিরদিনই গ্রীকদের কল্পনাতীত থেকে গেছে।
এই সংখ্যা গণনা পদ্ধতি ইউরোপ আরবদের কাছ থেকে শিক্ষা করে, তাই ইউরোপীয়রা একে আরবীয় সংখ্যা বলে ধরে। কিন্তু আরবীয়রা নিজেরাই একে হিন্দুসংখ্যা বলে স্বীকার করে। কোলব্রুক বলেছেন 'আরবরা স্পষ্টতই বিজ্ঞানে অধমর্ণ এবং তাদের নিজেদের স্বীকৃতি অনুসারেই এটা নিশ্চিত যে তাঁরা এই সংখ্যা গণনাপদ্ধতি হিন্দুদের কাছ থেকে শিক্ষা করেছিল।' Macdonell তাঁর History of Sanskrit Literature এ লিখেছেন - "বিজ্ঞানেও ভারতবর্ষের কাছে ইউরোপের ঋণ যথেষ্ট, প্রথমতঃ জগতে প্রচলিত সংখ্যা হিন্দুদের আবিষ্কার। শুধু অঙ্ক শাস্ত্রে নয়, সমস্ত সভ্যতার ক্রমবিকাশের উপর এই দশ ধরে গণনা পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রভাব অপরিসীম। ৮ম ও ৯ম শতাব্দীতে ভারতীয়রা পাটীগণিত ও বীজগণিতে আরবদের শিক্ষাদাতা হয়েছিলেন এবং তাঁদের মারফতে পাশ্চাত্ত্য জাতি সমূহের শিক্ষাদাতা। এই দশ ধরে গণনা পদ্ধতিকে ইংরেজীতে Decimal Notation বলে। হিন্দুরা Decimal Notation আবিষ্কার করেছিলেন- বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত ডঃ ব্রজেন শীল পতঞ্জলির ব্যাসভাস্য থেকে সূত্র উদ্ধৃত করে এই ধারণাকে সমর্থন করেছেন।
হিন্দুরা পূর্ণসংখ্যার যোগ, বিয়োগ, পূরণ, ভাগ, বর্গ, ঘন, ঘনমূল এই ৮ রকমের প্রণালী জানতেন। মধ্যযুগে ইউরোপ ভাগকে একটা শক্ত জিনিষ বলে মনে করত। কিন্তু হিন্দুদের কাছে তা বেশ সহজ ছিল। বর্তমান ভাগের প্রণালী হিন্দুদের আবিষ্কার। বর্গমূল ও ঘনমূল বের করার বর্তমান নিয়মও হিন্দুদের দান। হিন্দুরা গ্রীকদের অনেক আগে, যে সমস্ত সংখ্যার বর্গমূল পূর্ণসংখ্যা হয় না, তাদের নিকটতম বর্গমূল বের করার প্রণালী জানতেন। কোনও দু বা ততোধিক সংখ্যার পূরণফল ঠিক হয়েছে কিনা স্থির করার জন্য '১' বাদ দিয়ে যে নিয়ম রয়েছে তাও হিন্দুদের।
ত্রৈরাশিকও প্রথম হিন্দুদের দ্বারা আবিষ্কৃত হয়। ঠিক কোন সময় এই আবিষ্কার হয়েছে, তা নির্ণীত হয় নি। কিন্তু আর্যভট্ট প্রণীত গ্রন্থে ত্রৈরাশিকের নিয়ম পাওয়া যায়। আরবরা ত্রৈরাশিকের নিয়মও হিন্দুদের কাছ থেকে শিক্ষা করে। ভগ্নাংশ সম্বন্ধেও হিন্দুদের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। দুই বা ততোধিক ভগ্নাংশের যোগ বিয়োগ করতে হলে লঘিষ্ট সাধারণ গুণনীয়ক বের করতে হয়। ৯ম শতাব্দীর হিন্দু গণিতজ্ঞ মহাবীর* তাঁর গণিত সার-সংগ্রহে এই নিয়মের ব্যবহার করেছেন। তিনি লঘিষ্ট সাধারণ গুণনীয়ক (ল.সা.গু) কে 'নিরুদ্ধ' নাম দিয়েছিলেন।
হিন্দুরা অতি প্রাচীনকাল থেকেই ছন্দগণিত Permutation and Combination জানতেন। বিভিন্ন রকমের বৈদিক ছন্দ ঠিক করার জন্যই প্রথম এদিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। খৃঃ পূঃ ২য় শতাব্দীতে আচার্য পিঙ্গলের ছন্দশাস্ত্রে এ সম্বন্ধে নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। Arithmetical and Geometrical progression কে ঋষিরা বলতেন 'শ্রেটী'। আর্যভট্টের গ্রন্থে এ সম্বন্ধে সাধারণ নিয়মও কষে দেখানো হয়েছে। কোনও সংখ্যাকে শূণ্য দিয়ে ভাগ করলে যে অনন্ত রাশি হয়, ভাস্করাচার্যের লীলাবতীতে তা পাওয়া যায়। সমান্তর বা গুণোত্তর প্রগতির যোগফল নির্ণয়ের পদ্ধতি বৈদিক হিন্দুরা জানতেন। শতপথ ব্রাহ্মণে সমান্তর প্রগতির যোগফল নির্ণয়ের পদ্ধতি আছে। বৌধায়ন একটি বর্গ সংখ্যাকে কিরূপে একটি সমান্তর প্রগতিতে রূপান্তরিত করা যায় তা দেখিয়েছেন।
মোট কথা, হিন্দুরা পাটীগণিতে প্রাচীনকাল হতে অবিসম্বাদিত রূপে সমস্ত জাতির চেয়ে উন্নত ছিল। হিন্দুরা মূলতঃ ধর্মপ্রাণ জাতি। এই ধর্মই হিন্দুদের সমস্ত বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভের গবেষণা ও চর্চার প্রেরণা জুগিয়েছে। ঠিক সময়ে ধর্মকার্য করার জন্য হিন্দুরা জ্যোতিষশাস্ত্রের ভাল রকম চর্চা আরম্ভ করে। গণিত শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ না করলে জ্যোতিষ শাস্ত্রে পণ্ডিত হওয়া যায় না। তাই তারা গণিতের চর্চা আরম্ভ করে।
বেদ থেকে নিয়েই "সূর্য সিদ্ধান্ত" আদিতেও এই সংখ্যারই বর্ণনা করা হয়েছে -
একম্ দশ শতম্ চৈব সহস্রময়ুতম্ তথা।
লক্ষম্ চ নিয়ুতম্ চৈব কোটিরর্বুদমেব চ।।
বৃন্দম্ খর্বো নিখর্বশ্চ সঙ্গখঃ পদ্মশ্চ সাগরঃ।
অন্ত্যম্ মধ্যম্ পরার্ধশ্চ দশবৃদ্ধ্যা য়থাক্রমম্।।
এই দুই শ্লোকের শব্দে নাম দেখলে জানা যায় যে যজুর্বেদ মন্ত্রকেই কিছু সরল সংস্কৃতে লেখা হয়েছে। এইভাবে যজুর্বেদে গণিতের দুই প্রকারের সংখ্যার আবশ্যকতা বলা হয়েছে।
• প্রথম - ১,৩,৫,৭,৯,১১,১৩,১৫,১৭,১৯ থেকে ৩৩ পর্যন্ত তথা ক্রম হতে। এই মন্ত্রে গুণন, ভাগ, বর্গ, বর্গমূল, ঘন, ঘনমূল, ভাগজাতি, প্রভাগজাতি আদি যা গণিতের ভেদ রয়েছে, সেটা য়োগ আর অন্তর থেকেই উৎপন্ন হয়, এটা গণিতের গূঢ় বিদ্যা দেওয়া হয়েছে। (যজুর্বেদ ১৮|২৪)
• দ্বিতীয় - ৪,৬,৮,১২,১৬,২০,২৪,২৮,৩২,৩৬,৪০,৪৪,৪৮ তথা ক্রম হতে। এই মন্ত্রে সম সংখ্যার দ্বারা গণিতের অনেক ধরনের বিদ্যাকে শেখানো হয়েছে। (যজুর্বেদ ১৮|২৫)
এই মন্ত্র থেকেই অনিশ্চিত তথা অসংখ্যাতের মান বের করার জন্য বীজগণিতের বিদ্যা সংকেতের (অ+ক, অ-ক, অ÷ক) দ্বারা বের হয়। এইভাবে বেদ দ্বারা রেখা গণিত সম্বন্ধিত মন্ত্র তৃতীয় অধ্যায়ে আপনারা পড়েছেন। মহর্ষি দয়ানন্দ তো এই দুই মন্ত্র থেকে সব গণিতের বিদ্যা শেখার কথা বলতেন। ওনার কথা সেসময় সিদ্ধ হয় যখন বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা বৈদিক গণিত বের হয় যা অত্যন্ত সরলতার সঙ্গে গূঢ় তথ্য শেখায়। আজ অনেক শিক্ষণ সংস্থানে বৈদিক গণিতকে স্বীকার করা হয়েছে কারণ এটি সময়কে বাঁচায়। আসলে, যে বৈদিক গণিত আজ বিশ্বের কাছে আশ্চর্যের কেন্দ্র সেটা তো আমাদের প্রাচীন আচার্য্যদের গণিতের বিদ্যার একটা ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। হাজার হাজার গ্রন্থ লুপ্ত হওয়ার পরেও সূর্য সিদ্ধান্ত, লীলাবতী, আর্যভট্ট, সিদ্ধান্ত শিরোমণির মতো গ্রন্থ দ্বারা প্রাচীন গণিত, জ্যোতিষ তথা সৃষ্টি বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ পরম্পরাকে জানা যেতে পারে।
সারা বিশ্ব মানে যে, বেদই হল সংসারের প্রাচীন পুস্তক আর বেদের মধ্যে গণিতের গূঢ় জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তথা অনেক বড় বড় সংখ্যার মানও দেওয়া হয়েছে। এতকিছু হওয়ার পরেও বুদ্ধির শত্রু এটা প্রচার করেছে যে, ভারত কেবল ০ (শূন্য) এর জ্ঞান দিয়েছে তাও আবার শত বছর পূর্বে। এত বড় মিথ্যা লোকের দ্বারা বলা হয়েছে। কেন? এর কারণটি খুবই সহজ যে, যদি সংসারকে বলে দেওয়া হয় যে প্রত্যেক বিদ্যা সংসারের প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থের মধ্যে আগে থেকেই ছিল তথা ভারতীয় বিদ্বান তারাও জানতো তাহলে বর্তমান বৈজ্ঞানীকদের উপর প্রশ্ন উঠতো যে, এনারা কোন আবিষ্কারটি করেছে?
যদি এই বিষয়ে আমি আমার নিজের মত দেই তবে নিশ্চিত রূপে বলবো যে, প্রাচীন সাহিত্যে সৃষ্টির সব নিয়ম, গণিত বিদ্যা আদি বিস্তারে দেওয়া আছে এরজন্য এর শ্রেয় তাদেরই প্রতি হওয়া উচিত। শেষ প্রায় ১৫০০ বছরের ভারতীয় ইতিহাস করুণ অবস্থার মাঝে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে কেটেছে এইজন্য প্রত্যেক বিদ্যা থিওরী রূপে হওয়ার পরেও ব্যবহারিক (Practical) জ্ঞান উন্নতি করতে পারেনি। এরজন্য ধন, সাধন, রাজা, ব্যবস্থা, তথা সমাজের অনুকূলতা আদি উপলব্ধই হতে পারেনি। পরিণামস্বরূপ ইউরোপের মধ্যে ধীরে ধীরে এই থিওরী থেকে প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষণ হওয়া প্রারম্ভ হয় আর ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ হওয়া শুরু হয়। এই কাজের জন্য সেসকল ইউরোপ আদি পাশ্চাত্য দেশের বৈজ্ঞানিকদের শ্রেয় দেওয়া উচিত। আমি আগেই বলেছি যে, বিজ্ঞান আর বৈজ্ঞানিক সমস্ত সংসারের লাভের জন্য হয়ে থাকে।
প্রাচীন শাস্ত্রের গণিত জ্ঞানের উপর প্রফেসর ম্যাকডোনেল লিখেছেন যে -
"The great fact that the Indians invented the numerical figures used all over the world. (A.A. Macdonell, 'A History of Sanskrit Literature', p.424) অর্থাৎ - ভারতীয়রাই সারা বিশ্বে উপয়োগ কারক সংখ্যাত্মক পরিসংখ্যানের আবিষ্কার করেছে।
গণিত বিদ্যা প্রাপ্ত হলে পরেই ব্রহ্মাণ্ডের অনেক গূঢ় রহস্যের সমাধান করা যেতে পারে। প্রাচীন শাস্ত্রের মধ্যে উচ্চ গণিতের বিদ্যা ছিল এই কারণে গ্রহ, উপগ্রহ, সূর্য, চন্দ্র, পৃথ্বী আদির সঙ্গে সম্বন্ধিত সৃষ্টির নিয়মেরও উচ্চ জ্ঞান উপলব্ধ ছিল। জ্যোতিষ বিদ্যায় (গ্রহ-নক্ষত্রের জ্ঞানে) ভারতে অনেক উন্নতি করেছিল। ভারতে প্রাচীন জ্যোতিষের উপর অনেক গ্রন্থ উপলব্ধ রয়েছে। আর্যভট্ট তো বৈদিক জ্যোতিষ দ্বারা বিভিন্ন গ্রহের সূর্য থেকে দূরত্বও মেপেছেন যা বর্তমান সংখ্যার মাপের সঙ্গে মিলে যায়।
ভারতীয় জ্যোতিষের প্রাচীনতার উপর বিদেশী বিদ্বান লিখেছেন যে -
"Astronomy of the Hindus has formed the subject of excessive admiration. As pointed out by Mr. Weber - Astronomy was practiced in India as early as 2780 B.C." (Acharya Vaidyanath Shastri, Science in the Vedas, 1970, p.187)
ভাবুন একবার, যেখানে ইউরোপে আজ থেকে ৩৫০ বছর পূর্ব পর্যন্তও খগোল বিজ্ঞানের মতো বিষয়ের উপর শোধ করার কারণে বৈজ্ঞানিকদের কারাগারে বন্দী করে দেওয়া হত অথবা মেরে পর্যন্ত ফেলা হত (পুস্তক - गैलीलियों पर अत्याचार), সেইখানে ভারতে আজ থেকে ৪৮০০ বছর পূর্বে খগোল বিজ্ঞানের উপর শোধ হচ্ছিল। বিভিন্ন গ্রহের গতি, গ্রহণ লাগা, গ্রহের ঘূর্ণায়মান, পৃথিবীর পরিধি তথা ব্যাস, প্রকাশ নিয়ে সম্বন্ধিত জ্ঞান আদি প্রত্যেক বিষয় বেদে তথা প্রাচীন শাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে।
প্রসিদ্ধ পারসী বিদ্বান ফর্দুন লিখেছেন যে, "The Veda is a book of knowledge and wisdom, comprising the book of nature, the book of religion, the book of prayers, the book of morals and so on. The word 'Veda' means wit, wisdom, knowledge and truly the Veda is condensed wit, wisdom and knowledge." (Philosophy of Zoroastrianism and comparative study of Religion)
অর্থাৎ - বেদ হল জ্ঞানের পুস্তক যেখানে প্রকৃতি, ধর্ম, প্রার্থনা, সদাচার ইত্যাদির বিষয় সম্মিলিত রয়েছে। বেদের অর্থ হল জ্ঞান আর বেদে সকল প্রকারের জ্ঞান-বিজ্ঞান উপস্থিত রয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশতঃ আজ ভারতের অশিক্ষিত লোকেদের কিছু গুরু ঘান্টাল জ্যোতিষের নামে ভয় দেখিয়ে ঠকিয়ে থাকে। জ্যোতিষকে হাত দেখা, কুণ্ডলী দেখা, মুখ দেখে ভবিষ্দ্বাণী বলার বিদ্যা বলে দেখানো হচ্ছে। কোথায় জ্যোতিষ দ্বারা ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য জানা যেত আর এখন কোথায় জ্যোতিষের নামে ভালো মন্দ গ্রহের নাম করে লোকেদের মূর্খ বানানো হচ্ছে।
Read More

বীজগণিতের ইতিহাস

24 September 0

বীজগণিতের ইতিহাস, the history of algibra
এরূপ প্রবাদ আছে যে ভাস্করাচার্য তাঁর বিধবা কন্যা লীলাবতীকে পাটীগণিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত শিরোমণির পাটীগণিত অংশ লিখেছিলেন বলে তার নাম লীলাবতী। এ প্রবাদ সত্য নয়। লীলাবতীতে যেমন 'অয়ি বালে লীলাবতী'- হে বালিকে লীলাবতী বলে সম্বোদন রয়েছে তেমন 'ব্রুহি সখে' ও ব্রুহি কান্তে' সখা ও কান্তা বলেও সম্বোধন রয়েছে। নিজের মেয়েকে কেউ সখা ও কান্তা বলে সম্বোধন করতে পারে না। আমার মনে হয় লীলাবতী বলতে এখানে কোন মহিলাকেই বোঝায় না, লীলাবতী শব্দের অর্থ গুণসম্পন্না। এই অর্থে সিদ্ধান্ত শিরোমণির গোড়ায় লীলাবতী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, 'লালিত্য লীলাবতী' মাধুর্য গুণসম্পন্না। নিজের পুস্তককে নিজেই গুণসম্পন্ন বলা যুক্তিবিরুদ্ধ- এই আপত্তি টিকতে পারে না, কারণ ভাস্করাচার্য সিদ্ধান্ত শিরোমণির গোলাধ্যায়ের শেষেও লিখেছেন 'কবি ভাস্কর পণ্ডিতগণের সন্তোষপ্রদ, সুব্যক্ত, সুযৌক্তিক বাক্যবহুল, সহজবোধ্য, কুবুদ্ধি বিনাশক এই সিদ্ধান্ত গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।'

বীজগণিতেও হিন্দুদের কৃতিত্ব যথেষ্ট। 'যদিও শেষোক্ত বিজ্ঞান (বীজগণিত) একটি আরবী নামে অভিহিত, তথাপি এ দান আমরা হিন্দুদের কাছ থেকেই পেয়েছি' (Macdonel) 'যে সময় আরবরা বীজগণিতের কিছুই জানত না সেই সময়ে (অর্থাৎ আরবদের বহুপূর্বে) হিন্দুরা বীজগণিত আবিষ্কার করে' (কোলব্রুক)। বীজগণিতের ইংরেজী নাম অ্যালজেবরা (Algebra)। আরবদের মধ্যে বীজগণিতের প্রথম লেখক মহম্মদ মুশাআল্ খোয়ারেজমী (৮২৫ খৃঃ) কৃত 'আলজেব-ওয়াল-মোকাবেল' নামক বীজগণিতের গ্রন্থের নাম থেকে ঐ শব্দ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপ আরবদের কাছ থেকে বীজগণিত শিক্ষা করে, কিন্তু আলখোয়ারেজমী তাঁর বীজগণিতের জ্ঞান হিন্দুদের কাছ থেকেই লাভ করেছিলেন।
আরবরা হিন্দুদের কাছ থেকে কেবল যে বীজগণিতের মূল পেয়েছিল তা নয় তারা গণনাপ্তক ও দশ ধরে গণনা পদ্ধতিও হিন্দুদের কাছ থেকেই পায়' (মনিয়ার উইলিয়ামস্)। যদিও গ্রীক ও চীনারাও প্রাচীনকালে বীজগণিতের চর্চা করেছিল, তথাপি এই বিজ্ঞানে হিন্দুরাই অধিকতর ব্যুৎপত্তি লাভ করে।
ডাঃ বিভূতিভূষণ দত্তের মতে আধুনিক বীজগণিতের আকার ও ভাব মূলতঃ হিন্দুদের। হিন্দুরা বীজগণিত ও অব্যক্তগণিত এই দুই নামেই এই শাস্ত্রকে অভিহিত করত। অব্যক্ত গণিত অর্থ অজ্ঞাত রাশির গণনা বিজ্ঞান, আর বীজ শব্দের অর্থ মূল বা কারণ। ঋণাত্বক সংখ্যা (negative number) প্রয়োগের জন্য জগৎ হিন্দুদের কাছে ঋণী। প্রথম ধন (Positive) ও খনন সংখ্যাকে যথাক্রমে ঋক্ ও অনূক বলা হত; পরবর্তীযুগে ব্রহ্মগুপ্ত প্রভৃতি গণিত পণ্ডিতরা এদের ধন ও ঋণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বীজগণিতে সমীকরণ (equation) শব্দও প্রথম। হিন্দু গণিতজ্ঞ ব্রহ্মহ্মগুপ্ত (৬২৮ খৃঃ) তা আবিষ্কার করেন। হিন্দু গণিতে চার রকমের সমীকরণের উল্লেখ পাওয়া যায়: ১) একবর্গ সমীকরণ ২) অনেকবর্গ সমীকরণ ৩) মধ্যমাহরণ ও ৪) ভাবিত (Simple, Simultaneous quadratic equation and equation involving products to two unknown quantities)। বর্গসমীকরণের (Quadratic equation) নাম মধ্যমাহরণ হওয়ার কারণ মধ্যম সংখ্যা অপনয়নের দ্বারা ঐ সমীকরণের সমাধান। এই প্রণালী প্রথম শ্রীধরাচার্য অবিষ্কার করেন।
বর্গ সমীকরণে অজ্ঞাত সংখ্যার ধন ও ঋণ এই দুইটি মূল্যই বের হতে পারে তা হিন্দু গণিতজ্ঞ পদ্মনাভের আবিষ্কার। শ্রীধরাচার্য ও পদ্মনাভ কৃত গণিতের পুস্তক এখনও পাওয়া যায় নি। ভাস্করাচার্যের গ্রন্থে তাঁদের নাম ও উপরোক্ত অবিষ্কারের উল্লেখ পাওযা যায়। বর্গসমীকরণে ভাস্করাচার্যের প্রণালী শ্রীধরাচার্যের প্রণালী থেকে তফাৎ এবং তা বর্তমান প্রচলিত প্রণালীরই অনেকটা অনুরূপ। হিন্দুরা বর্গসমীকরণের পূর্বে সমাধান করতে পারত। অনিশ্চিত একবর্গ সমীকরণ (Indeterminate equation of the first degree) বা কুটকের সমাধান আর্যভট্টের গ্রন্থেই পাওয়া যায়। তারপর অন্যান্য হিন্দু বীজগণিতজ্ঞদের চেষ্টায় ইউরোপের বহুপূর্বে সাধারণ সমাধান আবিষ্কৃত হয়।
আধুনিক কালে ১৬২৪ সালে Bajel De Maziriak ঐ নিয়ম পুনরায় আবিষ্কার করেন এবং Oylar ও Lagraze তার উন্নতি সাধন করেন। উপরোক্ত ইউরোপীয় গণিতজ্ঞদের প্রণালী ও আর্যভট্ট আবিষ্কৃত নিয়ম ফলতঃ একই। ভাস্করাচার্য অনিশ্চিত বর্গ সমীকরণেরও (Indeterminate equation of the 2nd degree) সাধারণ সমাধান আবিষ্কার করেছিলেন। এ বিষয়ে অংক শাস্ত্রের ইতিহাস প্রণেতা Kazori লিখেছেন 'অনিশ্চিত সমীকরণ বিদ্যায় হিন্দুরা বেশ একটা সহজ নিজস্ব ভাব দেখিয়েছেন। আমরা আগেই বলেছি যে এ বিষয়টি গ্রীক বীজগণিতজ্ঞ Diophantus এর প্রিয় ছিল এবং তিনি কয়েকটি নির্দিষ্ট উদাহরণের সমাধান করতে অফুরন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু অংকশাস্ত্রের এই সূক্ষ্ম বিভাগে সাধারণ আবিষ্কারের গৌরব হিন্দুদেরই।'
-----------
* মহাবীর - দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের অধিবাসী। গুনোত্তর প্রগতি, দ্বিঘাত সমীকরণের তিন প্রকার সমাধান, উপবৃত্ত, ভগ্নাংশ প্রভৃতির আলোচনার জন্য ভারতীয় গণিতের ইতিহাসে তাঁর আসন চিরকালের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত থাকলেও দ্বিঘাত সমীকরণের ক্ষেত্রে কাল্পনিক মূল অবশ্য তিনি বাদ দিয়ে গেছেন। তাঁর গণিত আলোচনা ব্রহ্মহ্মগুপ্ত অপেক্ষা বিশদ ও ব্যাপক হলেও মৌলিকতার দিক হতে তিনি ব্রহ্মগুপ্তের থেকে নিকৃষ্ট ছিলেন।
* আর্যভট্ট- আর্যভট্ট প্রণীত মহাসিদ্ধান্তেরই অপর নাম আর্যসিদ্ধান্ত। ইনি খ্রীষ্টীয় দশম শতাব্দীতে বিদ্যমান ছিলেন। বৃদ্ধ আর্যভট্ট এবং আর্যভট্টীয় প্রণেতা আর্যভট্ট হতে ইনি পৃথক ব্যক্তি। কোন কোন বিষয়ে ভাস্কারাচার্য আর্যসিদ্ধান্তকার আর্যভট্টের কাছে ঋণী ছিলেন। আর্যভট্ট বলেছেন 'ভপঞ্জরঃ স্থিরো ভুরেব বৃত্যাবৃত্য' ইত্যাদি। অর্থাৎ নক্ষত্রখচিত নভোমণ্ডল স্থির হলেও স্বীয় মেরুদণ্ড অবলম্বন পূর্বক ভ্রমণ করে। সেই জন্যেই গ্রহনক্ষত্রগণের উদয়াস্ত প্রতীয়মান হয়। তাঁর অপর সিদ্ধান্ত 'বৃত্তভপঞ্জরমধ্যে কক্ষয়া পরিবেষ্টিতঃ' ইত্যাদি। এইরূপ চিন্তাধারা থেকেই ভাস্করাচার্য রলেছেন 'নান্যাধার স্বশক্তৈব বিয়তি নিয়তং তিষ্ঠতীহাস্য পৃষ্ঠে ইত্যাদি। অর্থাৎ পৃথিবীর কোন আধার নাই নিয়ত অন্তরীক্ষে অবস্থান করে এবং আমরা তার পৃষ্ঠদেশে বাস করছি। তাঁদের এসব গবেষণাই প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানচর্চার প্রমাণ। পৃথিবীর আবর্তনের জন্য দিবারাত্রি ভেদ হয়, এই তত্ত্ব আর্যভট্ট প্রথম আবিষ্কার করেন। তাঁর মত খণ্ডনের জন্য লল্ল, *বরাহমিহির ও ব্রহ্মগুপ্ত যে সমস্ত যুক্তি দিয়েছিলেন, ইউরোপে কোপার্নিকাস কর্তৃক ভূভ্রমণবাদ আবিষ্কারের পর সেই মত খণ্ডনের জন্য তায়কোভ্রূহি নামক জ্যোতির্বিদ হিন্দু জ্যোতিষীদের প্রায় একহাজার বৎসর পরে ঠিক ঠিক তাঁদের যুক্তিগুলিও প্রয়োগ করেছিলেন।
* ব্রহ্মগুপ্ত - ব্রহ্মগুপ্ত আর্যভট্টের পর গণিত ও জ্যোতিষে বিশেষ স্বকীয়তার পরিচয় দেন। অধ্যাপক সার্টন লিখেছেন, 'One of the greatest scientists of his race and the greatest of his time', হিন্দু ভারতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থক্ষেত্র উজ্জয়িনী ছিল তাঁর বিজ্ঞান সাধনার ক্ষেত্র। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে তিনি 'ব্রহ্ম-স্ফুট সিদ্ধান্ত' রচনা করেন। বৃদ্ধ বয়সে খন্ড-খাদাক (যার আরবী অনুদিত নাম অর্কন্দ) ও উত্তর খন্ড খাদ্যক নামে আরও দুখানি জ্যোতিষীয় গ্রন্থ রচনা করেন। যার খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আরবী ভাষায় অনুদিত হয়ে এর নাম হয় 'সিন্হিন্দ'। দিনের যে কোন সময়ে গ্রহদের সঠিক গতি ও অবস্থান কিভাবে নির্ণয় করা ছাড়াও লম্বন, সূর্যের উন্নতি, বলন ইত্যাদি জ্যোতিষীয় বিষয়ের নির্ভুল গণনা-পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় মাত্রার নির্ণেয় ও অনির্ণেয় সমীকরণ ও বৃত্তস্থ চতুর্ভুজের নানা ধর্ম আবিষ্কার করে তিনি গণিতের ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।
* শ্রীধর - প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ শ্রীধর আবির্ভূত হন দশম শতাব্দীর শেষভাগে। আনুমাণিক ১০২০ খৃঃ তিনি রচনা করেন 'গণিতসার' বা 'ত্রিশতিকা'। শূণ্যের (০) তাৎপর্য বর্ণনায় শ্রীধর ত্রিশতিকার এক শ্লোকে যা লিখেছেন তার সাংকেতিক অর্থ হল a±= 0; 0 x a=o; a x 0= o অধ্যাপক সার্টনের মতে সংস্কৃত ভাষায় শূন্যের গুণ ও তাৎপর্য সম্বন্ধে এটাই সর্বাপেক্ষা পরিস্কার ও প্রাঞ্জল, আলোচনা। দ্বিঘাত সমীকরনের সমাধানের সূত্র তাঁরই প্রথম আবিষ্কার।
* ভাস্ককাচার্য - প্রাচীন ভারতে আর আর একজন ভাস্করাচার্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন বেদান্ত ভাষ্যকার- সিদ্ধান্তশিরোমণি প্রণেতা ভাস্করাচার্যের উর্ধ্বতন ষষ্ঠপুরুষ। তিনি ৯ম খ্রীষ্টাব্দের লোক। রাজা মিহিরভোজ তাঁকে 'কবি চক্রবর্ত্তী' উপাধি প্রদান করেন। তাঁর বেদান্ত-ভাষ্য বিশিষ্টাদ্বৈতাবাদের অন্তর্ভুক্ত। ভামতীকার বাচস্পতি মিশ্র কর্তৃক তাঁর মতবাদ খণ্ডিত হয়।
* বরাহমিহির - বরাহমিহির ছিলেন ভারতবর্ষের প্লিনি। তাঁর জ্ঞান ছিল বিশ্বকোষের মত ব্যাপক। গণিত, জ্যোতিষ, ফলিত জোতিষ, ভূগোল, মণিকবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা প্রভৃতি নানা বিদ্যায় তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন এবং গ্রন্থ রচনা করো কিন্তু তাঁর বিদায় ভার যত ছিল ধার তত ছিল না। প্রাচীন হিন্দু বিজ্ঞান, বিশেষতঃ জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বরাহের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতিষীয় গ্রন্থ 'পঞ্চসিদ্ধান্তিকা'। এতে তিনি তিনি পৌলিশ, রোমক, বাশিষ্ট, সূর্য ও পৈতামহ সিদ্ধান্তের আলোচনা করেছেন। বরাহের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ 'বৃহৎ-সংহিতা'। এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় ফলিত জ্যোতিষ। মানুষের উপর গ্রহাদির প্রভাব কাটাবার জন্য তিনি দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান নানাবিধ প্রস্তর, মনি, মুক্তা, প্রবাল এর বাহ্যিক গুণাগুণ সম্বন্ধে বহু তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনিই প্রথম নানারূপ রঞ্জক দ্রব্য বকুল, উৎপল, চম্পকের গন্ধ অনুকরণ করে কৃত্রিম উপায়ে সুগন্ধি দ্রব্য, ধাতু নিষ্কাশন বিদ্যা, বজ্রলেপ নামক সিমেন্ট জাতীয় পদার্থের কথা ভারতবাসীকে জানিয়ে গেছেন। বরাহমিহির ক্ষুদ্র-বৃহৎ কয়েকটি জাতক রচনা করেছিলেন, যা আলবিরুনী আরবী ভাষায় অনুবাদ করেন।
Read More

হিন্দু অর্থ

24 September 0

হিন্দু অর্থ,  হিন্দু শব্দের অর্থ, হিন্দু শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ, হিন্দু ধর্মের নাম কি, হিন্দু কারা, হিন্দু দেশের তালিকা, হিন্দু ধর্ম কি, হিন্দু ধর্মের আদি নাম কি, হিন্দু meaning in english, হিন্দু শব্দের আরবি অর্থ কি

আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতই শুধু প্রাণধারণের ও দিন যাপনের গ্লানিতে কাটলেও তবে বংশগত ঐতিহ্য এবং জন্মগত সংস্কারের বশে হিন্দুধর্ম এবং সংস্কৃতির উপর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা পোষণ করি। হিন্দু ভারতবর্ষে হিন্দু হয়ে জন্মেছি বলে যথেষ্ট গৌরববোধ করি। ছাত্রজীবন থেকেই একটি প্রশ্ন আমার মনে বার বার পীড়া দেয়, সেটি ঐ হিন্দু শব্দটি নিয়ে। ইতিহাসে পড়েছি আমাদের পূর্বপুরুষরা সিন্ধু নদীর তীরে বাস করতেন বলে আমাদেরকে হিন্দু বলা হয় এবং মুসলমানরা নাকি হিন্দু অর্থে কাফের এবং কালো আর ইংরাজরা নাকি Heathen এবং Black Native অর্থে অবজ্ঞা ভরেই আমাদের 'হিন্দু' অভিধা দিয়েছে। এখন আমার প্রশ্ন বিদেশীদের প্রদত্ত ঐ কদর্থব্যঞ্জক শব্দটি আমরা আবহমানকাল ধরে কেন বহন করে আসছি? সিন্ধু নদ থেকেই যদি হিন্দু বা হিন্দু ধর্মের নামকরণ হয়ে থাকে, বিদেশীদের নামকরণ পূর্বে সিন্ধুতীরবাসীরা নিজেদেরকে কি নামে এবং কোন্ ধর্মাবলম্বী বলে পরিচয় দিত? নিশ্চয় আত্মধর্ম এবং আত্মজাতির পরিচয় দানের জন্য তারা আদিতে একটা নাম ব্যবহার করতেন, সেটি কি? কেনই বা এবং কখন তাঁরা সেই আদিনাম পরিত্যাগ করে পরদত্ত নাম দ্বারা নিজেদের পরিচয় দিতে আরম্ভ করলেন? হিন্দুধর্মের প্রচারক কে? প্রতিষ্ঠাতাই বা কে? সংস্কৃতে কি হিন্দু শব্দ আছে? আমরা জানি ভৌগোলিক স্থান বা বস্তু যথা দেশ নদী সাগর পর্বত প্রভৃতি নাম হতে ধর্মের নামকরণ হয়ে থাকে যেমন শিব হতে শৈব, সূর্য হতে সৌর, গণপতি হতে গাণপত্য, বিষ্ণু হতে বৈষ্ণব, বুদ্ধ হতে বৌদ্ধ খ্রীষ্ট হতে খ্রীষ্টান ইত্যাদি।

এমতাবস্থায় হিন্দুধর্মের বেলাতেই কেবল উপাস্য দেবতা বা ধর্মপ্রবর্তককে বাদ দিয়ে একটা নদী বা পরজাতিদত্ত কদর্থব্যঞ্জক একটা শব্দকে বেছে নেওয়া হল এটি কেমন করে সম্ভব? আমি ইতিপূর্বে এই প্রশ্ন অনেক জ্ঞানী গুণীকেই করেছি, কিন্তু কোন সদুত্তর পাই নি। তাই হিন্দু শব্দের ব্যুৎপত্তি জানার আগ্রহ আমার বহুদিনের।

প্রথমেই জেনে নিশ্চিত হোন যে পরপ্রদত্ত কদর্থব্যঞ্জক শব্দই আমরা বহন করছি না। হিন্দু শব্দ সংস্কৃতে আছে এবং বৈদিক যুগ থেকে আমরা নিজেদের হিন্দু নাম গূঢ় এবং গভীর অর্থেই ব্যবহার করে আসছি। আমাদের হিন্দু নামের কারণ

আসিন্ধুসিন্ধুপর্যন্ত্য যস্য ভারতভূমিকা

পিতৃভূঃ পুণ্যভূশ্চৈব স বৈ হিন্দুরিতিস্মৃতঃ।

অর্থাৎ সিন্ধুদেশ থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণে সিন্ধু অর্থাৎ সমুদ্র পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ পুণ্য সংস্কার, পুণ্য  আচার, পুণ্য অনুষ্ঠান, পুণ্য জ্ঞানের বিমল ধারা যেখানে পিতৃভূঃ অর্থাৎ জন্মগ্রহণ করেছে সেই পাবন ক্ষেত্রে আমরা বাস করি বলে আমদের পিতৃপুরুষরা নিজেদেরকে হিন্দু নামে অভিহিত করতেন। হিন্দু এবং আর্য শব্দ সমার্থক। বৈদিক যুগে এই পুণ্য ভূখণ্ডের অধিবাসীরা নিজেদেরকে আর্য বলে পরিচয় দিলেও এবং আর্য শব্দটি তাঁদের কাছে অধিকতর প্রিয় হলেও মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষে বৈদিক যুগ এবং বেদ প্রকট হওয়ার পূর্বেও মনুষ্যজাতির বাস ছিল। তাঁরাই আমাদের পূর্বপুরুষ। তাঁরাই হিন্দু। বৈদিক যুগে আর্যদের যে শাখাটি সম্প্রদায়গত বিরোধের জন্য ইরাণে চলে যান, তাঁরা তাঁদের এখানকার জাতিদেরকে হিন্দুই বলতেন। আবার এখানকার অধিবাসীরা বিদেশবাসী জ্ঞাতি ভাইদের বাসস্থানকে আর্যস্থান বলতেন- ইরাণ < ঐড়ান < এরিয়ান < আর্যস্থান। এখন যাঁদেরকে আমরা পারসিক বলি তাঁরা ঐ ঐড়ান বা আর্যস্থানের অধিবাসী।

প্রাচীন পারস্য ভাষায় হপ্তহিন্দু কথাটি রয়েছে। এই হপ্তহিন্দু বেদোক্ত 'সপ্ত সিন্ধু'। প্রাচীন পারসিকরা 'স' উচ্চারণ করতে পারতেন না, তাঁদের ভাষায় 'স' এর উচ্চারণ 'হ'। এজন্য তাঁরা সোমকে হোম, সিন্ধুকে হিন্দু, সপ্তকে হপ্ত, স্বর (স্বর্গ) কে হর্ বলতেন। যে কারণে সেই সুপ্রাচীন যুগে আমাদের আদি পূর্বপুরুষরা ইরাণকে বলতেন আর্যস্থান, ঠিক সেই একই কারণে তাঁরাও পূর্বস্মৃতির স্মারক হিসাবে সিন্ধুনদ হতে সমুদ্র পর্যন্ত মূল ভূখণ্ডের অধিবাসী অর্থাৎ আমাদেরকে হিন্দু বলতেন।

ঐ একইভাবে পারসিকদের হাতে হেন্দ> ইন্দাস ইংরাজদের মুখে ইন্ডিয়া এই নামকরণ হয়েছে। কাজেই হিন্দু বা ইন্ডিয়ান বললে তার মধ্যে আমরা অগৌরবের কিছু দেখি না। পারসিক ভাষাতেও হিন্দু শব্দের কোন দোষাবহ অর্থ নাই।

সত্য বটে, F. Streingah Ph D প্রণীত A comprehensive Persian English Dictionary (ইংরাজী পারসিক অভিধান) দেখলে সেখানে হিন্দু শব্দে কৃষ্ণবর্ণ, ভূতা, ক্রীতদাস, পৌত্তলিক, ঈশ্বর বিশ্বাসহীন ইত্যাদি অর্থ পাওয়া যাবে। কিন্তু একটু বিচার বালেই বুঝা যায়, পারস্য ভাষায় কোন ধাতুর্থানুসারে, ব্যুৎপত্তি অর্থে হিন্দু শব্দ নিষ্পন্ন নয়, সাহেব বর্ণিত ঐরকম কোন অর্থও হয় না। পারসিক শব্দে 'হিন্দব' বলে একটি শব্দ আছে কিন্তু তা গৌরব ও সম্মান জ্ঞাপক। 'হন্দ' বলে একটি শব্দ হিব্রুতেও আছে। হন্ন্দ শব্দের অর্থ তেজ ও বিক্রম প্রকাশক। হিরু ভাষার হনন্দ শব্দই পুশতু ভাষায় হন্দ রূপ ধারণ করে। অতএব হন্দ হন্দু হিন্দু। হন্দু হতেই হিন্দু শব্দের উদ্ভব হয়েছে।

কেউ কেউ বলেন আর্যগণ হিমালয় হতে বিন্দু সরোবরের মধ্যবর্তী প্রদেশে বাস করতেন। সেজন্য হিমালয়ের আদ্য অক্ষর 'হি' এবং বিন্দুর শেষ অক্ষর 'ন্দু' উভয়কে মিলিয়ে তাঁরা নিজেদেরকে হিন্দু বলে পরিচয় দিতেন। আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যে ভাবে গূঢ় ব্যঞ্জনাময় সংস্কৃত শ্লোকাদি রচনার শৈলী প্রচলিত ছিল, তাতে আমরা ঐ যুক্তিকে অগ্রাহ্য করতে পারি না।

প্রত্যেকেই জানেন, উচ্চারণের বিকৃতিতে সাধারণ জনতার মুখে অনেক মূল ভাষায় একটি লোকায়ত রূপ নেয়, যেমন ধরুন সংস্কৃত হতে তৎকালীন জনতার ভাষা পালি ভাষার জন্ম হয়েছে। তেমনি পূর্বে গান্ধার দেশে (বর্তমান যার নাম আফগানিস্থান) সেখানে লোকে মুখে মুখে উচ্চারণের দোষে সংস্কৃত হতে একটি নূতন ভাষা রূপ নেয়। এর নাম বাতারি। এই ভাষার দুটি আঞ্চলিক রূপ ছিল, একটি বিশ্ববিখ্যাত সংস্কৃত আর একটি অবেস্তান। সংস্কৃতের 'স' অবেস্তান ভাষাতে উচ্চারিত হত 'হ'। অবেস্তান ভাষায় সিন্ধু মানে স্বচ্ছ জলের দেশ। পুশতু ভাষাতেও সিন্দ মানে বহু নদী। ভারতবর্ষ নদীমাতৃক এখানে বহু নদী হিন্দু নামের এটাও একটা কারণ। বিখ্যাত আফগান ভাষাবিদ, বাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শ্রী ফল রাবচি পালবাক গবেষণা করে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তবে কেউ যদি বিদ্বেষ বশে কোন জাতিকে তাদের ভাষায় কদর্থে অভিহিত করে তাতে মূল নামে কোন কদর্থ প্রকাশ পায় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ম্যাকলে (Macanlay) সাহেব তো বাঙালী জাতির অনেক নিন্দা করেছেন, এজন্য কি বাঙালী জাতি দূষিত হয়েছে। মুসলমান রাজত্বের সময় মুসলমানদের গ্রন্থে বা ইংরেজদের রাজত্বের সময় ইংরেজদের গ্রন্থে তারা যদি অন্ধ বিদ্বেষ এবং হিংসা বশে হিন্দু অর্থে Heathen বা কাফের বলে গালি দিয়ে থাকে সেটা তাদেরই নীচতার পরিচয়। সেজন্য হিন্দু শব্দটিতে কোনভাবেই গ্লানি স্পর্শ করে না।

ম্যাকলে সাহেবের সগোত্রদেরকে Tory এবং মুসলমানদের 'ফেরেস্তা' এই শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করলেই মুখের মত জবাব দেওয়া যায়। Torry মূল Irish শব্দ Toraidhe শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ robber বা ডাকাত। কিন্তু ইংরেজরা কি বিজয়ী Irish জাতিপ্রদত্ত ঐ অর্থের জন্য Torry শব্দটিতে দূষিত মনে করেন। ইংলণ্ডের Torry বা Conservative Party ইংলণ্ডের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদেরকে নিয়েই গঠিত। ঠিক এমনি ভাবে সংস্কৃত প্রেত শব্দটি আরবীতে ফেরেস্তা শব্দে পরিবর্তিত হয়েছে। আমরা খারাপ অর্থে প্রেত শব্দ ব্যবহার করলেও মুসলমান ভাষায় ফেরেস্তা শব্দ মর্যাদাসূচক। আন্তর্জাতিক ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়মানুসারে একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কিরূপ রূপ এবং অর্থ পরিবর্তন করে তার কিছু প্রমাণ দিচ্ছি। প্রেত শব্দ আগেই বলেছি আমাদের কাছে নিন্দাবাচক হলেও মুসলমানদের কাছে মর্যাদাসূচক 'ফেরেস্তা', বৌদ্ধদের কাছে 'পেরেক' ইউরোপীয়দের কাছে 'Priest'। 'Priest' শব্দটি আবার 'Preost এই ফরাসী শব্দ থেকে এসেছে। পুরোহিত শব্দটি আমাদের কাছে কতই না মর্যাদাসূচক। কিন্তু এই শব্দটি অন্য ভাষায় ধধ্বনি পরিবর্তন করে কি দশা লাভ করেছে দেখুন Purohita <Fulohida <Folohia<Follosi<Follis< ইংরাজীতে Foolish! দুর্ভাগ্য যে, সম্প্রদায়গত এবং জাতিগত বিদ্বেষের ফলে এক জাতি অন্য জাতির নানা শব্দ নানা অর্থে এইভাবে কুৎসা করে থাকে। আমাদের দেশে এমন কি বৈদিক যুগেও দেব এবং অসুর জাতি একই আর্যজাতির শাখা হলেও উভয়ের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব এবং দ্বেষ তুঙ্গে উঠেছিল তখন অসুর শব্দে কদর্থ আরোপ করেছিলেন। এইভাবেই এক ভাষায় উল্লাস অন্য ভাষায় alas, এক ভাষায় হল-হলা অন্য ভাষায় হলাহল, এক ভাষায় হর হর অন্য ভাষায় horror, এক ভাষায় হরিবোল অন্য ভাষায় horrible এ পরিণত হয়েছে। কাজেই হিন্দু শব্দে বিদেশীরা যে অর্থই আরোপ করুক না কেন আমাদের কাছে হিন্দু শব্দ পরম আদরণীয় শব্দ।

হিন্দু কোন ধর্ম নয়। এজন্য এর কোন প্রতিষ্ঠাতা নাই। হিন্দু কোন জাতি নয়, হিন্দু বলতে কোন সম্প্রদায়কেও বোঝায় না। হিন্দু শব্দের অর্থ উদার বিশ্বজনীনতা, হিন্দু শব্দ সংস্কৃতি বাচক। বেদের মতই এটিকে অপৌরুষেয় শব্দ বলা চলে। প্রাচীন ব্রহ্মাবর্তবর্ষ ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্থান নামক বিরাট ভূখণ্ডে আর্য বৌদ্ধ শৈব গাণপত্য সৌর খ্রীষ্টান, এমন কি মুসলমান প্রভৃতি সকল অধিবাসীরাই হিন্দু নামের যোগ্য

হীনতা বর্জনকারী মানব নিচয়।

হিন্দু বলে আপনার দেয় পরিচয়।

যিনিই হীনতা ত্যাগ করতে পারবেন তিনিই হিন্দু। প্রাচীন মেরুতন্ত্রানুসারে এর ধাতুগত অর্থই হল

হীনঞ্চ দূষয়ত্যেব হিন্দুরিত্যুচত্যে প্রিয়ে।

ব্যাকরণের নিয়মানুসারে হীন দুষ-ডু-যে নিপাতনে। নিপাতনে সিদ্ধ এই পদ পৃযোদরদিত্বাৎ সাধুঃ। রামকোষ নামক প্রাচীন অভিধানেও হিন্দু শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,

হিন্দুদুষ্টনূহঃ প্রোক্তোহনার্যনীতি বিদূষকঃ।

সদ্ধর্ম-পালকো বিদ্বান্ শ্রৌতধর্মপরায়ণঃ।।

অর্থাৎ দুষ্টের দণ্ডদাতা, অনার্য নীতির বিরোধী সদ্ধর্মের পালক ব্যক্তিই হিন্দু।

তথ্যসূত্রঃ তপভুমি নর্মদা 

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

আদি শঙ্করের রচনাবলি

প্রাচীনকাল হতে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ভাষায় ভাষ্য, প্রকরণ গ্রন্থ এবং স্তোত্রাদি মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা গ্রন্থ শঙ্করের নামে প্রচলিত আছে। তার ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ