ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

31 October, 2026

বায়ু তত্ত্ব

31 October 0

বায়ু তত্ত্ব
বায়ু তত্ত্ব হল আকাশ তত্ত্বের পৃষ্ঠরূপ [অয়ম্ বায়ুরন্তরিক্ষস্য পৃষ্ঠম্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.২৫২)], এখানে এর দুটো অর্থ আছে। এরমধ্যে প্রথম হল পূর্বে অনেকত্র বর্ণিত অহংকার রূপ বায়ু হল আকাশ তত্ত্বের আধার। এই দিব্য বায়ুই আকাশ তত্ত্বের মূল উপাদান কারণ হওয়ার পাশাপাশি তার আধারও হয়। এখানে দ্বিতীয় অর্থ হল বায়ু তত্ত্ব আকাশ তত্ত্বের পশ্চাৎ উৎপন্ন হয়। এই সৃষ্টির প্রত্যেক কর্ম বা বলের পিছনে বায়ু রশ্মিগুলোই প্রধান কারণ হয়। এই কারণেই একে বিশ্বকর্মা (অয়ম্ বৈ বায়ুর্বিশ্বকর্মা; শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.১.১.৭) অর্থাৎ সবার কর্ত্তা বলা হয়। এই সৃষ্টির মধ্যে প্রত্যেকটা উৎপন্ন পদার্থ বায়ু তত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত থাকে, আবার এর থেকে উৎপন্নও হয়  (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.২.৭)। বায়ু তত্ত্ব বিভিন্ন পদার্থের বীজকে বিভিন্ন প্রকারে উৎপন্ন ও ধারণ করে। এটা পদার্থকে বিকৃত বা রূপান্তরিত করে অন্য অনেক পদার্থের নির্মাণ করে। এইভাবে এটা বিভিন্ন ক্রিয়া বা বলকে উৎপন্ন করে (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.৩.৮.১)। বায়ু তত্ত্ব বিভিন্ন পদার্থকে জুড়ে রাখার কাজ করে। এর অভাবে কোনো পদার্থই পরস্পর সন্ধি করতে পারবে না (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৩.১-২; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৩.১-২)। এই তত্ত্ব অন্য সব পদার্থের সঙ্গে মিলিত থেকে সেগুলোকে পরস্পর মিলিয়েও রাখে তথা বিভিন্ন পদার্থের বিয়োজন কর্মেও এই বায়ু তত্ত্বই তার ভূমিকা পালন করে (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৫৬)। এই বায়ু তত্ত্ব আকাশ তত্ত্বের মধ্যে আশ্রিত থেকে বিভিন্ন দ্যুলোককে প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ আধার প্রদান করে। একে ছাড়া দ্যুলোকের উৎপত্তি ও স্থিতি হওয়া সম্ভব নয়। আবার আকাশের অভাবে বায়ু তত্ত্ব হওয়াও সম্ভব নয় (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১১.১.৯)। বিভিন্ন দেব পদার্থের মধ্যে বায়ু তত্ত্ব সবথেকে অধিক সংকুচিত বা প্রক্ষেপক, আকর্ষক বা প্রতিকর্ষক বলযুক্ত হয়। বস্তুতঃ এই সৃষ্টির মধ্যে যেসব বল বিদ্যমান আছে, সেটা বায়ুর বলই হয় [বায়ুর্বৈ দেবানামোজিষ্ঠঃ ক্ষেপিষ্ঠঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.৫.১)]। [তূর্ণি = ক্ষিপ্রনাম (নিঘন্টু ২.১৫), তূর্ণিঃ কর্ম (নিরুক্ত ৭.২৭)] এটা অতিশীঘ্র বিভিন্ন প্রকারের কর্মকে অব্যক্ত রূপে সম্পাদিত করে। এর আবশ্যকতাকে দেখিয়ে মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য বলেছেন - "অনিরুক্তো হি বায়ুঃ" (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৭.৩.১২)। অনিরুক্তের অর্থ সম্বন্ধে বলেছেন - "অপরিমিতম্ বাऽ অনিরুক্তম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৫.৪.৪.১৩)। এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে বায়ু তত্ত্ব মানবের দৃষ্টিতে অপরিমিত ক্ষেত্রে ব্যাপ্ত হয়ে সমস্ত কণা বা কোয়ান্টা আদি পদার্থকে প্রত্যেক ক্রিয়াতে তাদের সক্ষম করে তোলে (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৩৪)।


বায়ু কি আর তার স্বরূপ কি? 

পূর্বোক্ত বিভিন্ন প্রকারের প্রাণ রশ্মিগুলোই বায়ু রূপ হয়। এই প্রাণ রশ্মি তথা পূর্বোক্ত বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির সমূহের মিশ্রণই বায়ু তত্ত্বের নামে পরিচিত। সূক্ষ্ম প্রাণ ও ছন্দ রশ্মিগুলো আকাশ তত্ত্বের নির্মাণ করে, কিন্তু আকাশ তত্ত্বের নির্মাণের পশ্চাৎ উৎপন্ন বৃহৎ ছন্দ রশ্মির সঙ্গে প্রাণ রশ্মির মিশ্রণ বায়ু তত্ত্বের নামে জানা যায় [প্রাণো হি বায়ুঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৪.৬.৮), প্রাণা উ বৈ বায়ুঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৪.১.৮)] 

শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৭.৩.১২ "ত্রৈষ্টুভো হি বায়ুঃ" এই বচন থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে ঋষিরা এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির মিশ্রণকে বায়ু সংজ্ঞা করেন নি। যখন ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়ে যায়, সেই সময় বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির মিশ্রণ বায়ু নামে পরিচিত হয়। এরপরই সেই প্রাণ ও ছন্দ রশ্মিগুলো অধিক তীব্র তেজ এবং বলযুক্ত হতে থাকে।

বায়ুর্বাতের্বেতের্বা স্যাত্ গতিকর্মণঃ (নিরুক্ত ১০.১) এই বচনানুসারে বায়ু শব্দ "বা গতিগন্ধনয়োঃ" ধাতু দ্বারা নিষ্পন্ন হয়। গতি অর্থযুক্ত হওয়াতে স্পষ্ট হয় যে এই তত্ত্ব সর্বদা গতিশীল থাকে, অথচ গন্ধন অর্থ একটা গম্ভীর বিজ্ঞানকে দর্শায়। আপ্টে সংস্কৃত-হিন্দি কোষের মধ্যে "গন্ধনম্" পদের অনেক অর্থ দেওয়া আছে, যেমন - অবিরাম প্রচেষ্টা, আঘাত করা, প্রকাশন, বিজ্ঞপ্তি এবং সংকেত আদি। এই অর্থের দ্বারা বায়ু এমন তত্ত্ব সিদ্ধ হয় যেটা অবিরাম গতি ও চেষ্টা করতে থাকে। এটা বিভিন্ন পদার্থের সঙ্গে তথা নিজের সঙ্গে (বায়ু রশ্মিগুলো পরস্পর) আকর্ষণ-প্রতিকর্ষণ-ধারণ আদি ভাব রাখে। এর কারণেই সৃষ্টির পদার্থের বিভিন্ন গুণ প্রকাশিত হয় তথা বিভিন্ন সংবাদ-সূচনার মাধ্যম বা বাহক এই তত্ত্বই হয়। সব প্রকারের বল এবং ফিল্ডের কারণ এই বায়ুই হয়। সৃষ্টির সমস্ত সংকেত বায়ু রশ্মির রূপেই আসে। যেসব সংকেত বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে আসে, সেগুলোরও মূল কারণ বায়ু তত্ত্বই হয়। মহর্ষি য়াস্কের উপরোক্ত বচনে "বায়ুঃ" পদ "বী গতিব্যাপ্তিপ্রজনকান্ত্যসনখাদনেষু" ধাতু দ্বারা নিষ্পন্ন হয়। এরদ্বারা স্পষ্ট হয় যে বায়ু রশ্মিগুলো ক্রমাগত গমনশীল থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন পদার্থকে ব্যাপ্ত করে, সেগুলোকে পরিধি রূপে ঘিরে ধরে, সেগুলোকে প্রেরিত বা প্রক্ষিপ্ত করে আর সেগুলোকে বিভিন্ন পদার্থের উৎপত্তিতে সক্ষম করে তোলে। সব পদার্থের সকল ক্রিয়া এই বায়ু তত্ত্বের রশ্মির মাধ্যমেই হয়।

বৈশেষিক দর্শন ২.১.৪ তে বলা হয়েছে "স্পর্শবান্ বায়ুঃ" অর্থাৎ পূর্বে আকাশের গুণ "শব্দ" বলা হয়েছে, এখানে বায়ু তত্ত্বের গুণ স্পর্শ বলা হয়েছে। ঋষি দয়ানন্দ "স্পর্শ সংস্পর্শনে" ধাতুর অর্থ "আলিঙ্গন করা", "বাঁধা", "অনুগত হওয়া" তথা "গ্রহণ করা" করেছেন। তিনি তাঁর বেদভাষ্যে বিভিন্ন স্থলে নিম্নানুসারে অর্থ গ্রহণ করেছেন:- 

স্পৃশ = অনুগতো ভব (যজুর্বেদ ভাষ্য ১৩.১০)
স্পৃশ = গৃহাণ (ঋগ্বেদ ভাষ্য ৪.৩.১৫)
স্পৃশন্তি = আলিঙ্গয়ন্তি (ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৬২.১১)
স্পৃশন্তি। = সম্বধ্নন্তি (ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৩৬.৩)

এরদ্বারাও এটাই স্পষ্ট হয় যে "স্পর্শবান্ বায়ুঃ" -র তাৎপর্য কেবল স্পর্শকারী নয়, বরং প্রত্যেক পদার্থের ভিতরে অনুকূলতাপূর্বক ব্যাপ্ত, তাকে গ্রহণ করে অধিকারে করে, তার সাথে সংযুক্ত থেকে এবং তাকে বাঁধতে-মিশ্রণকারীও হয়। এইদিকে আমাদের শরীরে স্পর্শ করার ক্রিয়াও বায়ু রশ্মির কারণেই সম্ভব হয়।

এই তত্ত্বকে আচার্য সুশ্রুত "রজোবহুলো বায়ুঃ" (সুশ্রুত সংহিতা, শারীরস্থানম্ ১.২৭) বলে রজোগুণ প্রধান বলেছেন। এই কারণে এটা সর্বদা ক্রিয়াশীল থাকে। এরমধ্যে দ্রব্যমান নগণ্য এবং দীপ্তি অতি মন্দ হয়। মহর্ষি ব্রহ্মা এবং মহর্ষি ভৃগুর বচন (অনুগীতা, মোক্ষধর্মপর্ব) থেকে এই সংকেত পাওয়া যায় যে আকাশের পশ্চাৎ বায়ু তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। এই সময়েই প্রাণীদের করণরূপ স্পর্শ ইন্দ্রিয় রূপী সূক্ষ্ম রশ্মির উৎপত্তি হয়। বায়ু তত্ত্বের সাথে-সাথে সূক্ষ্ম কার্যরূপ বিদ্যুতেরও উৎপত্তি হয়, একে ফিল্ডস রূপও বলা যেতে পারে। আকাশ তত্ত্বের সংকোচন থেকে বায়ু তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। এই বায়ু তত্ত্ব আকাশ তত্ত্বের ভিতরে উর্ধগামীর মতো উৎপন্ন হয়। একে উপমার দ্বারা বোঝাতে বলা হয়েছে যে ছিদ্ররহিত কোনো পাত্র পূর্ণরূপে নিঃশব্দ মনে হয় আর যখন তাতে ছিদ্র করে জল ভরা হয়, সেই সময় ধ্বনি উৎপন্ন হয়। ঠিক এইভাবে নিঃশব্দ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে যখন পূর্বোক্ত বলবান্ বায়ু তত্ত্ব উৎপন্ন হয়, তখন আকাশ তত্ত্বের মধ্যে ধ্বনি উৎপন্ন হতে থাকে। এখানে এই সংকেতও পাওয়া যায় যে যেভাবে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি সর্বত্র একসঙ্গে হয় না, সেইভাবে বায়ু তত্ত্বও এক স্থান বিশেষে সর্বপ্রথম প্রকট হয়। তারপর সম্পূর্ণ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বায়ু রশ্মিগুলো বেগের সাথে প্রকট হয়ে বিচরণ করে বিভিন্ন ঘোষ উৎপন্ন করতে থাকে।

এখানে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির তীব্রতা যত বাড়তে থাকে, ততই সর্বত্র বিভিন্ন প্রকারের ধ্বনি তরঙ্গ উৎপন্ন হয়ে তীব্র হতে থাকে। পাঠক নিশ্চয়ই এই বিষয়টা বুঝে গেছেন যে এই বায়ু তত্ত্ব লোকপ্রচলিত হাওয়া (এয়ার) নয়। প্রায় সব দার্শনিকগণ এই বিষয়ে এটাই ভারী ভুল করেছেন যে তারা হাওয়াকেই বায়ু মহাভূত মনে করেছেন। পশ্চিমী জগতের বৈজ্ঞানিকরাও দার্শনিকদের আলোচনাতে বায়ু মহাভূতের মানে এয়ার গ্রহণ করার ভুল করেছেন।
প্রাণ রশ্মিগুলো মরুত্ বা ছন্দ রশ্মির সাথে মিথুন করেই সৃষ্টির নির্মাণ করে। একইসঙ্গে বিভিন্ন প্রাণ রশ্মিগুলো পরস্পর তথা বিভিন্ন ছন্দ রশ্মিও পরস্পর মিথুন তৈরি করে। ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ প্রকাশের অষ্টম সমুল্লাসে লিখেছেন - "সবথেকে সূক্ষ্ম টুকরো অর্থাৎ যাকে খণ্ড করা যায় না, তার নাম পরমাণু, ষাট (৬০) টা পরমাণুর মিশ্রণের নাম অণু, দুটো অণুর একটা দ্বয়ণুক, এটা হল স্থূল বায়ু, তিনটা দ্বয়ণুকের নাম অগ্নি, চারটা দ্বয়ণুকের নাম জল, পাঁচটা দ্বয়ণুকের পৃথিবী অর্থাৎ (আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক জীর মতে এখানে "অথবা" শব্দ হওয়া উচিত) তিনটা দ্বয়ণুকের ত্রসরেণু আর তার দ্বিগুণ হলে পৃথিবী আদি দৃশ্য পদার্থ হয়। ঋষি দয়ানন্দ যাকে পরমাণু বলেছেন, সেটা আসলে একটা প্রাণ/মরুত্/ছন্দ রশ্মির নাম। এমন ষাট (৬০) প্রকারের রশ্মি মিলিত হয়ে একটা অণু তৈরি করে আর দুটো অণু অর্থাৎ একশো বিশ (১২০) প্রকারের রশ্মি মিলিত হয়ে স্থূল বায়ুর অণুকে উৎপন্ন করে। প্রাণ রশ্মিগুলো মরুত্ বা ছন্দ রশ্মির সাথে মিথুন করেই সৃষ্টির নির্মাণ করে। একইসঙ্গে বিভিন্ন প্রাণ রশ্মিগুলো পরস্পর তথা বিভিন্ন ছন্দ রশ্মিও পরস্পর মিথুন তৈরি করে। এইভাবে ৬০ প্রকারের প্রাণ রশ্মির যুগ্ম একটা অণু তথা ৬০ প্রকারের ছন্দ বা মরুত্ রশ্মির যুগ্ম অন্য অণুর নির্মাণ করে। এখানে দ্বিতীয় বিকল্প এটাও সম্ভব যে একটা অণুর মধ্যে ৩০ প্রকারের প্রাণ ও ৩০ প্রকারের মরুত্ বা ছন্দ রশ্মির যুগ্ম হবে তথা এগুলোর থেকে ভিন্ন ৩০ প্রকারের প্রাণ ও ৩০ প্রকারের মরুত্ বা ছন্দ রশ্মির যুগ্ম দ্বিতীয় অণু হবে। যখন এই দুই অণুর মিথুন হয়, তখন বায়ু তত্ত্বের একটা অণু নির্মিত হয়। যেখানে  বায়ুকে স্থূল বায়ু বলে, যেখানে ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিও বিদ্যমান হয়ে থাকে। এর পূর্বে সব রশ্মি আকাশ বা সূক্ষ্ম বায়ুর রূপেই হয়। এইভাবে বায়ুর একটা অণুর মধ্যে সর্বমোট ১২০ প্রকারের পরমাণু অর্থাৎ ছন্দ, মরুত্ ও প্রাণ রশ্মি বিদ্যমান থাকে। এইসবের গুচ্ছ স্বতন্ত্র বিচরণ করে একটা স্বতন্ত্র এককের সমান ব্যবহার করে। বায়ু তত্ত্ব যদিও বর্তমান বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেকোনো কোয়ান্টা তথা মূলকণার থেকেও সূক্ষ্ম হয়, তবুও একে অণু নাম দেওয়াতে এটাই সংকেত পাওয়া যায় যে বায়ু তত্ত্ব একরস হয় না, বর্তমান যেকোনো টেকনিক দিয়ে তাকে যদিও অনুভূত করা যায় না আর তাই সাধারণত তাকে একরসবৎ বলতে বাধ্য হয়েছে।

বায়ু তত্ত্ব

অর্থাৎ দুটি সম্ভাবনার ক্ষেত্রেই মোট ১২০টি সূক্ষ্ম রশ্মি নিয়ে বায়ুর একটি অণু তৈরি হচ্ছে বলে লেখাটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।


তথ্যসূত্রঃ

মহাভারত, আশ্ব.প., অনুগীতা পর্ব অধ্যায় - ৪২
মহাভারত শা.প., মোক্ষধর্মপর্ব, অধ্যায় - ১৮৩
জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.২৫২
মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.৫.১
তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১৮.৮.৭
শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৫.২.৫
শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৭.৩.১২)
সত্যার্থ প্রকাশ অষ্টম সমুল্লাস
বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞানম্
Read More

আকাশ তত্ত্ব

31 October 0

 

আকাশ তত্ত্ব

পঞ্চমহাভূত:-(আকাশ তত্ত্ব)

আমাদের বৈদিক বিজ্ঞান এই বিষয়কে দেখায় যে এই সৃষ্টির উৎপত্তি বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির বিভিন্ন প্রকারের মিশ্রণ থেকেই হয়েছে। সমগ্র পঞ্চমহাভূত পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু এবং আকাশ এগুলো থেকেই হয়েছে তথা প্রাণ ও ছন্দ উভয় প্রকারের রশ্মি বস্তুতঃ একই হয়। এইসব মূলতঃ ছন্দ রশ্মিরই রূপ হয়। পৃথিবী, জল, অগ্নি এবং বায়ু এই চারটা মহাভূতের তো গন্ধ, রস আদি গুণ আছে, কিন্তু এগুলোর মধ্যে আকাশের কোনো গুণ না থাকার কারণে শব্দকে আকাশের গুণ মানা হয়েছে আর একে আকাশের মধ্যে বিদ্যমান থাকে মানা হয়েছে। শব্দ যদিও অন্য মহাভূতেরও গুণ হয় তথা এটা সেই মহাভূতগুলোর মধ্যেও বিদ্যমান থাকে, কিন্তু সেখানে এর বিদ্যমানতা আকাশ তত্ত্বের বিদ্যমানতার কারণেই হয়, আকাশের অভাবে হয় না।

রিক্তস্থান রূপী আকাশ, মহাভূত আকাশ থেকে পৃথক হয়। মহাভূত আকাশ অন্য মহাভূতের প্রবেশ ও নিষ্ক্রমণের স্থান ও আধার হয়। বর্তমান ভৌতিকী পঞ্চ মহাভূতের থেকে সূক্ষ্ম কোনো পদার্থের বিষয়ে বিচার করতে পারে না। এই কারণে তাদের দৃষ্টিতে আকাশ (স্পেস) মহাভূতের থেকে সূক্ষ্ম এবং নিরবয়ব কোনো পদার্থ এই সৃষ্টির মধ্যে নেই। 

আকাশ (স্পেস) আট প্রকার ছন্দ রশ্মিগুলোর (দৈবী, যাজুষী, প্রাজাপত্যা, সাম্নী, আসুরী, আর্চী, আর্ষী, ব্রাহ্মী) উৎপত্তি চলাকালীনই আকাশের উৎপত্তি হয়। "আকাশ" পদ দুইটা রূপে ব্যবহৃত হয়। প্রথম রূপ হল একরস মূল প্রকৃতি পদার্থের মধ্যে প্রারম্ভিক সংকোচন বা সংঘননের ক্রিয়া আরম্ভ হলে অবকাশ রূপ (এম্পটিনেস) স্থানকেই আকাশ বলে। অবকাশ রূপ আকাশ হল অভাব বা শূন্যরূপ, এর উৎপত্তি ও এর বিনাশ ব্যবহারেই ব্যবহৃত হয়। ঋষি দয়ানন্দ দুই প্রকারের আকাশের সংকেত করেছেন। প্রথম আকাশ তো অবকাশ রূপ তথা আরেকটা ব্যোম নামক দ্বিতীয় আকাশের সংকেত আছে। অহংকার থেকেই পাঁচ মহাভূত উৎপন্ন হয়েছে, যারমধ্যে আকাশ মহাভূতের উৎপত্তি সর্বপ্রথম হয়েছে। এই সময় শ্রোত্র-ইন্দ্রিয়েরও উৎপত্তি হয়েছে।

মহাভারত শান্তিপর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩ থেকে আমরা জানতে পারি সম্পূর্ণ অহংকার (মনস্তত্ত্ব) পদার্থ স্থির, অনন্ত, অবকাশরূপ তমোময় আকাশের সমান তথা তারমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। সেই সময় চন্দ্র, সূর্য, বায়ু আদি সব পদার্থ নষ্ট অর্থাৎ নিজ কারণ রূপ সেই অচল, অনন্ত পদার্থের ভিতরে ঘুমিয়ে ছিল অর্থাৎ তারমধ্যেই লীন ছিল। সেই অহংকার বা মনস্তত্ত্ব থেকে সলিল (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.১.৬.১) অর্থাৎ সবকিছুকে নিজের ভিতরে ব্যাপ্ত বা লীন করে এমন আকাশ নামক মহাভূত উৎপন্ন হয়। সেই আকাশ এমন মনে হচ্ছিল যেন একটা অন্ধকারের মধ্যে তার থেকেই আরেকটা অন্ধকার উৎপন্ন হয়েছে। সেই আকাশ তত্ত্বের উৎপীড়ন অর্থাৎ সংকোচন থেকে বায়ু মহাভূতের উৎপত্তি হয়। 

অর্থাৎ অহংকার বা মনস্তত্ত্ব থেকে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি। বৈদিক বাঙ্ময়ে আকাশ ও অন্তরিক্ষকে সমানার্থক মানা হয়েছে। এই কারণে নিঘন্টু ১.৩ -মধ্যে "আকাশ" শব্দকে অন্তরিক্ষ নামে পড়ানো হয়েছে।

ঋষির মতে আকাশ হল সেই পদার্থ যারমধ্যে সম্পূর্ণ সৃষ্টির বীজ বপন করা হয় অর্থাৎ সব প্রকারের কণা ও তরঙ্গাণু আকাশ তত্ত্বের মধ্যেই উৎপন্ন হয় ও তারমধ্যেই নিবাস করে (ঐতরেয় আরণ্যক ২.৩.১)। আকাশ প্রাণ রশ্মির রূপেই বিদ্যমান থাকে, যার মন্থন দ্বারা অগ্রিম সৃষ্টি উৎপন্ন হয় (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.১৮)। আকাশ স্বয়ং রশ্মি রূপ হয়, এই রশ্মিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়  (ঐতরেয় আরণ্যক ২.৪.১)। এর উৎপত্তি "ভুবঃ" নামক মূল ছন্দ রশ্মি থেকে হয় কিংবা এই ছন্দ রশ্মি তার বীজরূপ হয় (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৫.১; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৫.১)। এরমধ্যে বাক্ অর্থাৎ "ওম্" ছন্দ রশ্মি প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে (জৈমিনীয়োপনিষদ ব্রাহ্মণ ৪.১১.১.১১)। মহর্ষি গৌতম তাঁর ন্যায়দর্শনে আকাশের ধর্ম সম্বন্ধে লিখেছেন -

অব্যূহাবিষ্টম্ভবিভুত্বানি (ন্যায়দর্শন ২.৪.২২) অর্থাৎ এটা বিভিন্ন পদার্থকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে না, বিশেষ অবরোধ না করে সবাইকে মার্গ প্রদান করে তথা সবার মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে।

অন্যদিকে মহর্ষি কণাদ আকাশের মুখ্য লক্ষণ সম্বন্ধে এইভাবে বলেছেন - নিষ্ক্রমণম্ প্রবেশনমিত্যাকাশস্য লিঙ্গম্ (বৈশেষিক দর্শন ২.১.২০) অর্থাৎ যারমধ্যে দিয়ে বিভিন্ন পদার্থ প্রবেশ করে বা বেরিয়ে যায়, তাকে আকাশ বলে।

আর্ষী ভুরিগুষ্ণিক্ ছন্দ রশ্মির মধ্যে বিদ্যমান প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মি থেকে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবে বিভিন্ন রশ্মি আদি পদার্থের মাঝে আকাশ তত্ত্ব বিস্তৃত হতে থাকে, সেই কারণে বিভিন্ন রশ্মির গতি আর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই রশ্মিগুলোও সেই আকাশ তত্ত্বের মধ্যে ব্যাপ্ত হতে থাকে (ঋগ্বেদ ৩.১৩.১)। প্রাণ, অপান এবং উদান রশ্মির এক হাজার বার আবৃত্তি তথা বিভিন্ন প্রাণের সঙ্গম থেকে অন্য ছন্দ রশ্মিগুলো আকাশ তত্ত্বের রূপে প্রকট হয়। আকাশ তত্ত্ব হল সূক্ষ্ম প্রাণ আর মরুদ্ রশ্মির মিশ্র রূপ। এরমধ্যেও ত্রিষ্টুপ্ আর বৃহতী ছন্দ রশ্মি প্রচুর মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। ঋষিদের কতন বিচার করলে আকাশ তত্ত্বের স্বরূপ নিম্মানুসারে প্রকাশিত হয় - সৃষ্টি প্রক্রিয়ার অন্তর্গত যখন "ওম্", "ভূঃ", "ভুবঃ", "স্বঃ" -এর অতিরিক্ত অন্য দৈবী ছন্দ রশ্মি এবং সূত্রাত্মা বায়ু সহিত প্রাণাপানাদি প্রাণ রশ্মি উৎপন্ন হয়ে যায়, সেই সময় সেগুলোর মধ্যে কিছু রশ্মির সংঘাতে একটা সূক্ষ্ম ও প্রায় একরসবৎ পদার্থের উৎপত্তি হয়। এই পদার্থের উৎপত্তির পূর্বে প্রাণ, অপান এবং উদানের এক সহস্র বার আবৃত্তি হয়ে গিয়ে থাকে। তখন দৈবী অনুষ্টুপ্, বৃহতী, পঙক্তি ও ত্রিষ্টুপ্ এগুলোও উৎপন্ন হয়ে গিয়ে থাকে। এই চারটা ছন্দ রশ্মি পরস্পর এমন মিশ্রিত হয় যে দৈবী অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির সমান প্রভাব দেখায়। বিভিন্ন প্রাণ, অপান আদি রশ্মিগুলো বিভিন্ন দৈবী ছন্দ রশ্মির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এমন দৈবী অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিকে প্রকট করে যা প্রায় নিষ্কম্প হয়। এই রশ্মিগুলো নিজ স্থানের উপরই স্পন্দিত হতে থাকে, এমন নয় যে মনস্তত্ত্বের মধ্যে সর্বত্র গমন করে। আকাশ তত্ত্বের অবয়বভূত প্রাণ ও মরুদ্ রশ্মিগুলো শিথিলাবস্থায় পারস্পরিক সংঘাত রূপে বিদ্যমান থাকে। এই সংঘাতে বিদ্যমান সেই রশ্মিগুলো চক্রাকার ঘূর্ণনও করতে থাকে অর্থাৎ সেগুলোর মধ্যে রেখীয় গতি হয় না, কিন্তু ঘূর্ণন গতি মন্দ বেগে হয়। এগুলোর মধ্যে অব্যক্ত দীপ্তিও বিদ্যমান থাকে।


এই রশ্মিগুলো আকাশ রশ্মি রূপে পরিচিত হয়। এই রশ্মিগুলো এই অবস্থায় এমন শিথিল হয় যে বিভিন্ন বৃহদ্ ছন্দ রশ্মি, কণা বা তরঙ্গাণু সহজে এগুলোর মধ্য দিয়ে স্বচ্ছন্দ গতি করতে পারে। গতি করা কালীন কণা, তরঙ্গাণু বা রশ্মি যখন আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের মধ্যদিয়ে যায়, তখন সেগুলো চক্রণ করতে-করতে পূর্বোক্ত শিথিল আকাশ রশ্মির (প্রাণ ও মরুত্) মাঝে সহজভাবে স্খলিত হয়ে গতি করে। এতকিছুর পরেও এই শিথিল রশ্মিগুলো সর্বদা সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকে। এই কারণে যখন আকাশ তত্ত্ব কোনো বলের দ্বারা সংকুচিত বা ডিস্টার্ড হয়, তখন সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির দ্বারা আকাশ রশ্মির ঘূর্ণন গতি প্রভাবিত হওয়ার কারণেই হয়। বিভিন্ন মরুদ্ ও প্রাণ রশ্মিও সূত্রাত্মা বা ধনঞ্জয় বায়ু রশ্মির সানিধ্যে আকাশ তত্ত্বকে ডিস্টার্ট বা কার্ভ করতে সক্ষম হয়। উপরিনির্দিষ্ট আর্ষী ভুরিগুষ্ণিক্ অথবা ২৪ স্তোম রশ্মি উৎপন্ন হলে আকাশের নির্মাণ দ্রুত হয়।

তত্ত্ববেত্তা ঋষিগণ একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন -

অন্তরিক্ষম্ বা অন্তর্য়ামঃ (গ্রহঃ) (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৫.৬; ৪.৭.১; কাঠক সংহিতা ২৭.২; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪২.২) এখানে অন্তরিক্ষ অর্থাৎ আকাশ তত্ত্বকে অন্তর্য়াম নামক বল বলা হয়েছে। "বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ" গ্রন্থের মধ্যে অন্তর্য়াম বলকে এইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে -

"উদান বা অপানের সংযুক্ত বলকে অন্তর্য়াম বলে। এগুলোর মধ্যে উদান প্রাণ উপরে আর অপান প্রাণ নিচে সংযুক্ত হয়ে কোনো পদার্থের মাঝে সঞ্চারিত হতে থাকে। বিভিন্ন সূক্ষ্ম মরুদ্ রশ্মিও এই ক্ষেত্রেই সঞ্চারিত হয়। এই সবের সংযুক্ত বলকে অন্তর্য়াম বলে।"

এরদ্বারা স্পষ্ট হয় যে যেকোনো কণা বা কোয়ান্টার ভিতরেও স্পেসের অংশ বিদ্যমান থেকে সেগুলোকে ধারণ করে রাখে। আচার্য সুশ্রুত আকাশকে সতোগুণ প্রধান বলার পাশাপাশি বলেছেন - সত্ত্ববহুলমাকাশম্ (সুশ্রুতসংহিতা শারীরস্থানম্ ১.২৭) এই কারণে এই তত্ত্ব সূক্ষ্ম ও অব্যক্ত প্রকাশযুক্ত, সবথেকে হালকা অর্থাৎ নগণ্য দ্রব্যমানের হয়। ধ্যাতব্য হল, এই তত্ত্বের উৎপত্তির সঙ্গে-সঙ্গে প্রাণীদের মধ্যে বিদ্যমান শ্রোত্র ইন্দ্রিয়েরও সূক্ষ্ম রশ্মি রূপে উৎপত্তি হয়।


তথ্যসূত্রঃ 

  1.  মহাভারত আশ্বমেধিক পর্ব, অনুগীতা পর্ব, অধ্যায় - ৪২
  2.  মহাভারত শান্তিপর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩
  3.  আপঃ = অন্তরিক্ষনাম (নিঘন্টু ১.৩)
  4.  বেদ বিজ্ঞান আলোক
  5.  বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞানম্
  6.  ঐতরেয় আরণ্যক ২.৩.১
  7.  জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.১৮
  8.  শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.৩.১.৩
  9.  ঐতরেয় আরণ্যক ২.৪.১
  10.  শতপথ ব্রাহ্মণ ১.২.১.১৬
  11. তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৯
  12. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৪.৬.৪
  13. কাঠক সংহিতা ১৬.২
  14. তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৩.১০.২; ২১.৭.৩
  15. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.২.১.১ 
  16. শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৩.৪.১১
  17. কাঠক সংহিতা ৬.৮; ৭.৭ 
  18. কপিষ্ঠল সংহিতা ৩১.১৩
  19. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৬.৮.৫ 
  20. জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩০৭
  21. তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৫.১
  22. তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৫.১
  23. জৈমিনীয়োপনিষদ ব্রাহ্মণ ৪.১১.১.১১
  24. গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ২.২৪


Read More

24 October, 2026

অষ্টাঙ্গহৃদয়ম্

24 October 0


অষ্টাঙ্গহৃদয়ম্

আয়ুর্বেদীয় বাঙ্ময়ের ইতিহাস ব্রহ্মা, ইন্দ্র আদি দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে অত্যন্ত প্রাচীন, গৌরবময় ও বিস্তৃত। ভগবান ধন্বন্তরি এই আয়ুর্বেদকে 'তদিদং শাশ্বতং পুণ্যং স্বর্গ্যং যশস্যমায়ুষ্যং বৃত্তিকরং চেতি' (সু.সূ. ১।১৯) বলেছেন। লোকোপকারের দৃষ্টিতে এই বিস্তৃত আয়ুর্বেদকে পরে আটটি অঙ্গে বিভক্ত করে দেওয়া হয়। তখন থেকে একে 'অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ' বলা হয়। এই অঙ্গগুলির বিভাজন সেই সময়ের আয়ুর্বেদজ্ঞ মহর্ষিরা করেছিলেন। কালান্তরে কালচক্রের অব্যাহত আঘাতে এবং অন্যান্য বহু কারণে এই অঙ্গগুলি খণ্ডিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় লুপ্তও হয়ে যায়। শতাব্দীর পর ঋষিকল্প আয়ুর্বেদবিদ পণ্ডিতেরা আয়ুর্বেদের সেই খণ্ডিত অঙ্গগুলির পুনরায় রচনা করেন। খণ্ডিত অংশগুলির পূর্তি-যুক্ত সেই সংহিতাগ্রন্থগুলিকে প্রতিসংস্কৃত বলা হতে থাকে, যেমন আচার্য দৃঢ়বল কর্তৃক প্রতিসংস্কৃত চরকসংহিতা। এ ছাড়াও প্রাচীন খণ্ডিত সংহিতাগুলির মধ্যে ভেড় (ল) সংহিতা এবং কাশ্যপসংহিতার নামও উল্লেখযোগ্য। তৎপরবর্তী কালে সংগ্রহের প্রবৃত্তি থেকে রচিত সংহিতাগুলির মধ্যে অষ্টাঙ্গসংগ্রহ এবং অষ্টাঙ্গহৃদয় সংহিতা প্রধান ও সুপ্রসিদ্ধ। পরবর্তী পণ্ডিতেরা শ্রেণিবিভাগের দৃষ্টিতে আয়ুর্বেদীয় সংহিতাগুলির বিভাজন বৃহত্ত্রয়ী এবং লঘুত্রয়ীর রূপে করেন। বৃহত্ত্রয়ীতে-চরকসংহিতা, সুশ্রুতসংহিতা এবং অষ্টাঙ্গহৃদয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কারণ 'গুণা গুণজ্ঞেষু গুণাঃ ভবন্তি'। এটিও তথ্য যে বাগ্ভটের রচনাগুলির মধ্যে যতটা প্রচার-প্রসার 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর রয়েছে, ততটা 'অষ্টাঙ্গসংগ্রহ'-এর নেই। এটিকেই ভিত্তি করে বৃহত্ত্রয়ী রত্নমালায় 'হৃদয়' রূপ রত্নটিকে নিয়ে পারখিরা গেঁথেছিলেন কি?

চরক-সুশ্রুত সংহিতাগুলির মান্যতা নিজ নিজ স্থানে প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি অক্ষুণ্ণভাবে চলে আসছে। অতএব এগুলির পঠন-পাঠন তথা কর্মাভ্যাসও হয়ে আসছে। এটিও সত্য যে পুনর্বসু আত্রেয় এবং ভগবান ধন্বন্তরির উপদেশের সংগ্রহরূপ উক্ত সংহিতাগুলিতে যা লেখা আছে, তা নিজ নিজ ক্ষেত্রের মধ্যে আপ্ত তথা আর্ষ বচনের চৌহদ্দি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে রয়ে গেছে এবং উক্ত মহর্ষিরা পরাধিকারে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিজ্ঞা করে রেখেছিলেন। এটি উক্ত সংহিতাকারদের নিজ নিজ উজ্জ্বল চরিত্র ছিল। মহর্ষি অগ্নিবেশ প্রণীত কায়চিকিৎসার নাম চরকসংহিতা এবং ভগবান ধন্বন্তরি কর্তৃক উপদিষ্ট শল্যতন্ত্রের নাম সুশ্রুতসংহিতা। এই উভয়ই আয়ুর্বেদশাস্ত্রের উত্তরাধিকার এবং অক্ষয়নিধি। সেই সেই আচার্যদের দ্বারা এগুলিতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি বিশেষভাবে আয়ুর্বেদশাস্ত্রের জীবাতু, অতএব এই সংহিতাগুলি সমাজের পরম উপকারক।

চরকসংহিতায় স্বাস্থ্যরক্ষার সিদ্ধান্তসমূহ, রোগমুক্তির উপায়সমূহ তথা আয়ুর্বেদীয় সদ্বৃত্ত আদি বিষয়গুলির যে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, তা সমস্ত দৃষ্টিতেই গুরুত্বপূর্ণ। আর অধিক কী বলা যায়, চরকোক্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত ত্রিকালাবাধিত। এই ধরনের বিষয়গুলির প্রচুর উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আচার্য দৃঢ়বল 'যদিহাস্তি তদন্যত্র যন্নেহাস্তি ন তৎক্বচিৎ' (চ.সি. ১২।৫৪) এই যে ডিণ্ডিমঘোষ করেছেন, তা চিকিৎসা-সিদ্ধান্তগুলির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে সঠিক প্রমাণিত হয়। সুশ্রুতসংহিতায় আয়ুর্বেদের আটটি অঙ্গের বিভাজন শল্যকর্মকে প্রধান বলে মনে করে করা হয়েছে; তবুও আধুনিক শল্য-শালাক্য চিকিৎসার দৃষ্টিতে এই প্রাচীন সিদ্ধান্তগুলিতে পদে পদে প্রতিসংস্কারের প্রয়োজনীয়তা প্রতীয়মান হয়।

সিংহগুপ্তের পুত্র বাগ্ভট এই প্রতিসংস্কারের উৎকট ভাবনা দ্বারা প্রেরিত হয়ে প্রথমে অষ্টাঙ্গসংগ্রহের রচনা করেন, যাকে তিনি 'যুগানুরূপসন্দর্ভ' সংজ্ঞা দিয়েছিলেন (অ.সং.সূ. ১।১৮)। তারপর সেই অষ্টাঙ্গসংগ্রহ থেকেই 'হৃদয়'-এর মতো সারভাগ স্বতন্ত্রভাবে পৃথক সংগ্রহ করে 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর রচনা করে ফেললেন এবং তার বিশ্বে সাদরে প্রচার-প্রসার হয়েছিল। বাগ্ভট কেবল আত্রেয় আদি মহর্ষিদের বচনের অনুকরণমাত্র করেননি, বরং প্রসঙ্গোচিত অভিনব বিষয়গুলিরও এতে স্থানে স্থানে সমাবেশ করেছেন, যেগুলি চিকিৎসার দৃষ্টিতে উপাদেয়। তিনি উত্তরস্থানে সেই রোগগুলির নিদান তথা চিকিৎসার বর্ণনা করেছেন, যেগুলির বর্ণনা আরম্ভের নিদান তথা চিকিৎসাস্থানগুলিতে হতে পারেনি, অতএব আয়ুর্বেদের বৃহত্ত্রয়ীতে পরবর্তী বিদ্বানেরা 'অষ্টাঙ্গসংগ্রহ' ছেড়ে 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর সমাবেশ করে ফেলেছেন, যা এই গ্রন্থের সর্বাঙ্গীণ গুণমানের জ্বলন্ত প্রমাণ।

বস্তুত কালিদাসের অনুসারে 'পুরাণমিত্যেব ন সাধু সর্বং, নবীনমিত্যেব ন চাপ্যবদ্যম্। সন্তঃ পরীক্ষ্যান্যতরদ্ ভজন্তে মূঢ়ঃ পরপ্রত্যয়নেয়বুদ্ধিঃ' ।। (মালবি০ ১।২) এর তাৎপর্য এই যে, পুরোনো অথবা নতুন সমস্ত বস্তুই নিজেদের গুণমানের কারণে গ্রহণযোগ্য এবং তার বিপরীত হওয়ার কারণে ত্যাজ্য হয়। এমন কোনো মাপকাঠি নেই যে পুরোনো সমস্ত বস্তু ভালো হবে এবং নতুন সমস্ত বস্তু অনুপাদেয় হবে। তাৎপর্য এই যে, ভালো বস্তু নিজের গুণের প্রভাবে সকলের মন আকর্ষণ করেই নেয়। নারায়ণভট্ট তাঁর 'প্রক্রিয়াসর্বস্ব' গ্রন্থে এই কথার প্রামাণিক আলোচনা করেছেন যে, যে বিষয়টি পাণিনি বলেছেন, তার ঘাটতি তাঁর পরবর্তী বার্তিককার পূরণ করেছেন; তাতে যে ঘাটতি থেকে গিয়েছিল, তা ভাষ্যকার পতঞ্জলি এবং তাতেও যে ত্রুটি থেকে গিয়েছিল, তা ভোজ আদি বিদ্বানেরা সংশোধন ও পরিমার্জন করেছেন। অতএব ব্যাকরণ সম্প্রদায়ে এই সিদ্ধান্তটি সুপ্রসিদ্ধ— 'যথোত্তরং মুনীনাং প্রামাণ্যম্' । আয়ুর্বেদের ক্ষেত্রে এই প্রকারের প্রামাণ্য মহর্ষি বাগ্ভটের রচনারও রয়েছে।

ভারতীয় বাঙ্ময়ে 'বাগ্ভট'-এর উল্লেখ অনেক পাওয়া যায়। যথা—বৃদ্ধ, মধ্য, লঘু তথা রসবাগ্ভট নামের দ্বারা প্রায় চারজন বাগ্ভট প্রসিদ্ধ। এঁদের অতিরিক্তও অন্যান্য সাহিত্যিক ক্ষেত্রে অনেক বাগ্ভট গ্রন্থকার রূপে পাওয়া যায়। হরীতসংহিতায় আয়ুর্বেদের এই আচার্যেরা বহুচর্চিত—'চরকঃ সুশ্রুতশ্চৈব বাগ্ভটশ্চ তথা পরঃ। মুখ্যাশ্চ সংহিতা বাচ্যাস্তিস্র এব যুগে যুগে।। অত্রিঃ কৃতযুগে বৈদ্যো দ্বাপরে সুশ্রুতো মতঃ। কলৌ বাগ্ভটনামা চ গরিমাত্র প্রদৃশ্যতে'।। মহর্ষি বাগ্ভটের বচনের উল্লেখ নিশ্চলকর চক্রদত্ত গ্রন্থের রত্নপ্রভা ব্যাখ্যায় করেছেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর রসরত্নসমুচ্চয়ের রচয়িতা বাগ্ভটকেই এখানে 'রসবাগ্ভট' নামে স্মরণ করা হয়েছে, কারণ তাঁর পিতার নামও সিংহগুপ্ত ছিল। পিতা-পুত্রের নামের সাদৃশ্যকে ভিত্তি করে কিছু ঐতিহাসিক বিদ্বান অষ্টাঙ্গহৃদয় তথা রসরত্নসমুচ্চয়ের রচয়িতাদের একই ব্যক্তি বলে মানার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এত কিছু হওয়া সত্ত্বেও সময়ের ব্যবধান উভয়কে এক বলে স্বীকার করার ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ প্রমাণিত হয়।

বৃদ্ধ বা প্রথম বাগ্ভট ঐতিহাসিকদের মান্যতা অনুসারে, তিনি পূর্ববর্তী আর্শসংহিতাগুলিকে নিজের গ্রন্থের ভিত্তিশিলা করে 'অষ্টাঙ্গসংগ্রহ সংহিতা'-র রচনা করেছেন। তার উত্তরস্থান অধ্যায় ৫০/১৩২-৩৩-এ নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও দিয়েছেন। আমাদের মতে, তিনি নিজের জীবনের আরম্ভে বৈদিক ধর্মানুযায়ী ছিলেন এবং 'অবলোকিত' নামক বৌদ্ধ গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করার পরে তাঁর চিন্তাধারায় পরিবর্তন এসেছিল, যার পূর্ণ প্রভাব তাঁর উক্ত রচনায় পরিলক্ষিত হয়। যেখানে বৌদ্ধধর্মের অতিরিক্ত বচনগুলির সমাবেশ হয়েছে, তাকে আত্রেয় আদি মহর্ষিদের বচন এবং তাঁর পূর্বাশ্রমের প্রভাব বলে বুঝে নেওয়া উচিত। চিকিৎসাক্ষেত্রের বিষয় 'বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়' হয়। এতে ধর্মীয় প্রভাব বাধাস্বরূপ হয় না। উক্ত বাগ্ভট বৈদিকধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের সমুচিত সমন্বয় নিজের রচনাগুলিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এমনটা অন্যত্রও দেখা যায়। অবলোকিতেশ্বরের মূর্তিগুলি গুপ্তকালে অধিকাধিক পরিমাণে পাওয়া গেছে। কালক্রমে অবলোকিতেশ্বরের মূর্তির বাহুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেখুন- কলিকাতা সংস্কৃত সিরিজ XII-8.37-38, এরই অনুসারে বাগ্ভট অবলোকিতেশ্বরের ১২টি বাহুর উল্লেখ করেছেন। বাগ্ভটের এই সংগ্রহ তথা হৃদয়ে মন্ত্রযানের রূপ তো দৃষ্টিগোচর হয়, কিন্তু বজ্রযানের নয়। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে আট প্রকারের সিদ্ধির যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেগুলির উল্লেখ বাগ্ভট রসায়ন প্রকরণে অঞ্জন, পাদলেপ, রস, রসায়নের রূপে করেছেন। কোষকার অমরসিংহ বৌদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজের কোষে প্রথমে সাংকেতিক রূপে বুদ্ধকে প্রণাম করে শাস্ত্রীয় মর্যাদা পালন করে মঙ্গলাচরণ করেছেন। তৎপর স্বর্গ, গণদেবতা, দেবযোনি তথা দৈত্যদের নামের উল্লেখ করে পরে বুদ্ধের নামগুলির পরিগণনা করতে গিয়ে এঁদের মধ্যেই যাঁদের সমাবেশ করেছেন, তাঁদের এখন ভিন্ন রূপে দেখা যায়।

চীনা পর্যটক ইৎসিং (৬৭১-৬৯৫ খ্রিস্টাব্দ) সমগ্র ভারতে প্রসিদ্ধ 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর প্রচারের উল্লেখ করেছেন। ইৎসিং-এর পূর্ববর্তী বরাহমিহির (৫০৫-৫৮৭ খ্রিস্টাব্দ)-এর জ্যোতিষ-সম্বন্ধীয় সিদ্ধান্তগুলি দ্বারা হৃদয়কার প্রভাবিত ছিলেন। যেমন তিনি আত্রেয় আদি-কে নিজের সংহিতার জীবাতু বলে মনে করেছেন, কিন্তু তিনি দৃঢ়বলের উল্লেখ কোথাও করেননি, এতে মনে হয় যে তাঁর সামনে চরকসংহিতার আদিম স্বরূপই সহজলভ্য ছিল, দৃঢ়বলের দ্বারা প্রতিসংস্কৃত স্বরূপ নয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে দৃঢ়বল তথা প্রথম বাগ্ভট প্রায় সমকালীনই ছিলেন অথবা দৃঢ়বল কিছু পূর্ববর্তী ছিলেন। বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও 'হৃদয়'-এর তুলনায় 'সংগ্রহ'-এর কলেবর বিশাল। অতএব পরিনিরীক্ষণ করার পরে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে বাগ্ভট প্রথমের কাল ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ মেনে নেওয়া উচিত। যেমন ইতিহাসকারেরা স্বীকার করেছেন, তদনুসারে এখানে পর্যন্ত প্রথম অথবা বৃদ্ধবাগ্ভটের আলোচনা করা হয়েছে। এখন এর পরবর্তী অংশে 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর রচয়িতা বাগ্ভটের আলোচনা উপস্থাপিত।

সাম্প্রদায়িক স্বরূপ - শাস্ত্র-রচনা অথবা শাস্ত্র-চিন্তার ক্ষেত্রে সমস্ত শ্রেণির বিদ্বানদের চিন্তাভাবনা সাম্প্রদায়িক ভাবগুলি পরিত্যাগ করে তত্ত্বচিন্তার দিকে অগ্রসর হতে দেখা যায়। কয়েকটি উদাহরণ- নামলিঙ্গানুশাসনের রচয়িতা অমরসিংহের মতো বাগ্ভটও নিজের ক্ষেত্রে সর্বমান্য ও সুপ্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। বৌদ্ধ জিনেন্দ্রবুদ্ধি অষ্টাধ্যায়ীর কাশিকাবৃত্তির উপর 'কাশিকাবিবরণ পঞ্জিকান্যাস' নামক ব্যাখ্যা লিখেছেন। ব্যাকরণশাস্ত্রের ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। এমনিতেও লোকে তিনি বুদ্ধের সমান সম্মান লাভ করেছেন। বৌদ্ধ পুরুষোত্তমদেব-রচিত ত্রিকাণ্ডশেষ, ভাষাবৃত্তি (অষ্টাধ্যায়ী ব্যাখ্যা) গ্রন্থগুলির সর্বত্র সমভাবের সঙ্গে আদর রয়েছে। এই শাস্ত্রকারদের কোথাও ধর্মের প্রতি দুরাগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। কারণ শাস্ত্রচিন্তায় পরম্পরা কোথাও বাধাস্বরূপ হয় না। দেখুন- হর্ষবর্ধন শৈব ছিলেন এবং রাজ্যবর্ধন সৌগত ছিলেন, অথচ এই দুজন সহোদর ভাই ছিলেন। বাস্তুপাল জৈন ছিলেন। তিনি সোমনাথের যাত্রা করেছিলেন তথা অনেক শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—এমন বর্ণনা অরিসিংহ-রচিত 'সুকৃতসংকীর্তনকাব্য'-এ পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণভক্ত জয়দেব গীতগোবিন্দে 'কেশবধৃতবুদ্ধশরীর' বলে তাঁর স্তব করেছেন। রত্নাবলীতে শ্রীহর্ষ 'শিব-পার্বতী'-র এবং নাগানন্দ নাটকে 'বুদ্ধো জিনঃ পাতু বঃ' বলে বুদ্ধের বন্দনা করেছেন। এই সমস্ত উদ্ধৃতি দেখে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে সেই কালে আজকের মতো কলহ তথা মনোমালিন্যপূর্ণ দুরাগ্রহ ছিল না। এই কারণেই বাগ্ভট আয়ুর্বেদের নির্বচনে মধ্যমার্গ অনুসরণ করেছিলেন, যার ফলে বাগ্ভট তথা তাঁর কৃতির বিশ্বে সর্বত্র সমাদর রয়েছে।

অষ্টাঙ্গহৃদয়কার বাগ্ভট- সংগ্রহ তথা হৃদয়ের রচয়িতা বাগ্ভট 'ইতি হ স্মাহুরাত্রেয়াদয়ো মহর্ষয়ঃ' এই অংশে উভয়েই সমান। মঙ্গলাচরণের পদ্যের আরম্ভ 'রাগাদিরোগ' পদ দিয়েও উভয়েই সমান এবং উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি অনুসারে উভয়ের দ্বারা গ্রথিত গ্রন্থগুলিতে চরক-সুশ্রুতের অনুগামিতাও সমান। আর কী বলব, 'সংগ্রহ'-এর অনেক অবিকল পদ্য 'হৃদয়'-এ সহজলভ্য। এই দৃষ্টিগুলি থেকে সংগ্রহ ও হৃদয়ের রচয়িতাদের এক বলে মেনে নেওয়া উচিত। এর সমর্থনে আমরা নাগপুর-নিবাসী বৈদ্য শ্রীগোবর্ধনশর্মা ছাঙ্গাণী-রচিত অষ্টাঙ্গসংগ্রহ সূত্রস্থানের ভূমিকা থেকে কিছু অংশ সাদরে উদ্ধৃত করছি-

'স্বর্গীয় জ্যোতিষচন্দ্র সরস্বতীও অষ্টাঙ্গহৃদয় উত্তরস্থান (শিবদাস সেন টীকা)-এর সম্পাদকীয় উপোদ্ঘাতে অষ্টাঙ্গসংগ্রহ ও হৃদয়ের রচয়িতাদের ভিন্ন ভিন্ন বলে মেনেছেন। এতে ভিত্তি কেবল সংগ্রহ থেকে হৃদয়ের কিছু স্থানে মতভেদ দেখানো হয়েছে। এই মতভেদে সংগ্রহের মত তো দেওয়াই হয়েছে, কিন্তু তাতে সুश्रুত আদি অনুসারে আরও কিছুটা যোগ করা হয়েছে, যা সংগ্রহের রচনাকালে বাদ পড়ে গিয়েছিল। কেবল এই কারণকে নিয়ে অষ্টাঙ্গসংগ্রহ ও অষ্টাঙ্গহৃদয়ের রচয়িতারা ভিন্ন হতে পারেন না। অষ্টাঙ্গসংগ্রহের রচনা আগে হয়েছে। তার পরে লিখিত অষ্টাঙ্গহৃদয়ে সেই একই গ্রন্থকার বাদ পড়ে যাওয়া বিষয় গ্রহণ করতে পারেন।'

মহামহোপাধ্যায় স্বর্গীয় গণনাথসেন সরস্বতী এবং শ্রদ্ধেয় যাদবজি আচার্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, উপস্থাপিত এই দুই গ্রন্থের সর্বত্র ভাষার সাদৃশ্য তথা পিতা-পিতামহের একই নাম আদি হওয়ার কারণে সংগ্রহ ও হৃদয়ের ভিন্ন ভিন্ন রচয়িতা বলে মনে করা বড় ভুলের কথা। সারাংশ এই যে, অষ্টাঙ্গসংগ্রহ এবং অষ্টাঙ্গহৃদয়ের রচয়িতা বাস্তবে একই বাগ্ভট।

এই তথ্যগুলি থেকে আশ্বস্ত অষ্টাঙ্গসংগ্রহের ব্যাখ্যাকার তথা বাগ্ভটের শিষ্য শ্রী ইন্দু তাঁর দ্বারা করা মঙ্গলাচরণ 'দুর্ব্যাখ্যাবিষসুপ্তস্য বাগ্ভটস্যাস্মদুক্তয়ঃ'-এ তথা ব্যাখ্যায় 'সোঽয়ং বাগ্ভটনামা শাস্ত্রকারঃ'-এ কোথাও বৃদ্ধ, প্রথম, মধ্য অথবা লঘু বিশেষণগুলির প্রয়োগ তাঁর নামের পূর্বে করেননি। তিনি কেবল সিংহগুপ্তসূনু বাগ্ভট বলেছেন। তাঁর দৃষ্টিতেও উভয় (সংগ্রহ তথা হৃদয়)-এর রচয়িতা বাগ্ভট একই ছিলেন। উক্ত মতের সমর্থনে অষ্টাঙ্গহৃদয়ের রচয়িতার নিম্নলিখিত সূক্তিগুলির অবলোকন তথা মনন করুন এবং এগুলির ব্যাখ্যা যথাস্থানে দেখুন-

তেভ্যোঽতি বিপ্রকীর্ণেভ্যঃ প্রায়ঃ সারতরোচ্চয়ঃ।

ক্রিয়তেঽষ্টাঙ্গহৃদয়ংনাতিসংক্ষেপবিস্তরম্।। (অ.হৃ.সূ. ১।১৪)

অষ্টাঙ্গবৈদ্যকমহোদধিমন্থনেন যোঽষ্টাঙ্গসংগ্রহমহামৃতরাশিরাপ্তঃ।

তস্মাদনল্পফলমল্পসমুদ্যমানাং প্রীত্যর্থমেতদুদিতং পৃথগেব তন্ত্রম্।। (অ.হৃ.উ. ৪০/৮০)

গ্রন্থকারদের ব্যাস ও সমাস পদ্ধতি- প্রাচীনকালে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়, যেখানে একই গ্রন্থকার একই বিষয়ের ব্যাস ও সমাস পদ্ধতিতে রচনা করেছেন; যথা- ভট্টোজিদীক্ষিতের পৌত্র তথা নাগেশভট্টের বিদ্যাগুরু শ্রী হরিদীক্ষিত বৃহচ্ছব্দরত্ন তথা লঘুশব্দরত্নের রচনা করেছিলেন। এরই প্রভাব ছিল যে তাঁর শিষ্য আচার্য নাগেশভট্ট ব্যাকরণ বিষয়ের অনেক গ্রন্থ লিখেছিলেন; যথা-বৃহচ্ছন্দেন্দুশেখর তথা লঘুশব্দেন্দুশেখর, মঞ্জূষা, লঘুমঞ্জূষা, পরমলঘুমঞ্জূষা। জয়পুরের রাজা সওয়াই জয়সিংহ (১৬৮৮-১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ)-এর কাল তথা শ্রীনাগেশভট্টের কাল একই ছিল।

নামনির্ধারণ পরম্পরা প্রায়শই প্রাচীনকালে পিতামহের নামই পৌত্রেরও রাখা হতো। দেখুন-নীলকণ্ঠ দীক্ষিত-রচিত 'গঙ্গাবতরণম্'-এর ভূমিকা, কাব্যমালা গুচ্ছক ৭৬ পৃষ্ঠা ১২, সিদ্ধান্ত-সাগর প্রেস থেকে ১৯১৬ সালে প্রকাশিত 'বিদিতমেব হি সর্বেষামস্মাকমস্মদ্দেশীয়াঃ প্রায়শো বিভ্রতি পিতামহানাং নাম; যথা-আচার্য দীক্ষিতঃ, আচার্য দীক্ষিত পৌত্রঃ'। এই প্রকারের এই নামনির্ধারণ পরম্পরা কোথায় কোথায় ছিল এবং কবে থেকে চলে এসেছে, এটিও একটি গবেষণার বিষয়, যার প্রভাব 'বাগ্ভট' নামের উপরও পরিলক্ষিত হয়। দেখুন- 'ভিষগ্বরো বাগ্ভট ইত্যভূন্মে পিতামহঃ'। (অ.সং.উ. ৫০/২০৩)

অষ্টাঙ্গহৃদয়ের কলেবর - 'কায়বালগ্রহোর্ধ্বাঙ্গশল্যদংষ্ট্রাজরাবৃষান্। অষ্টাবঙ্গানি'। (অ.হৃ.সূ. ১।১৫) অনুসারে আয়ুর্বেদের আটটি অঙ্গ এইগুলি- ১. কায়চিকিৎসাতন্ত্র, ২. বাল (কৌমারভৃত্য) তন্ত্র, ৩. গ্রহচিকিৎসা (ভূতবিদ্যা) তন্ত্র, ৪. ঊর্ধ্বাঙ্গচিকিৎসা (শালাক্য) তন্ত্র, ৫. শল্যচিকিৎসা (শল্যতন্ত্র), ৬. দংশ্ট্রা বিষচিকিৎসা (অগদতন্ত্র), ৭. জরাচিকিৎসা (রসায়নতন্ত্র) তথা ৮. বৃষচিকিৎসা (বাজীকরণতন্ত্র)। যদিও উক্ত সমস্ত অঙ্গের মধ্যে কায়চিকিৎসা এমন একটি অঙ্গ, যা সমগ্র কায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, অতএব এর দ্বারা সমস্ত অঙ্গ প্রভাবিত হয়ে যায়, তবুও অন্যান্য অঙ্গের সত্তা নিজ নিজ স্থানে বিশেষ গুরুত্ব রাখেই, তথাপি কায়চিকিৎসা অঙ্গকে সকলের মধ্যে প্রধান বলে মনে করা হয়। তিনিও সুশ্রুতের মতো নিজের গ্রন্থকে (অষ্টাঙ্গহৃদয়) ৬টি স্থানে বিভক্ত করেছেন।

Read More

14 October, 2026

বেদে কি পুনরুক্তি দোষ রয়েছে?

14 October 0

বেদে কি পুনরুক্তি দোষ রয়েছে?

বেদে পুনরুক্তি-দোষ বক্তার প্রমাদকে প্রমাণিত করে। বেদে অনেক স্থানে এই দোষ পাওয়া যায়। এই দোষ থাকার ফলে না বুদ্ধিপূর্বক বাক্যরচনাকে বেদে স্বীকার করা যেতে পারে এবং না তার রচয়িতাকে ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা ইত্যাদি দোষ থেকে মুক্ত বলে মনে করা যেতে পারে। এমন অবস্থায় বেদের প্রামাণ্যতার উপর প্রশ্নচিহ্ন লাগা স্বাভাবিক।

কোনো কথাকে বারবার বলা পুনরুক্তি বলা হয়। শব্দ ও অর্থের ভেদে তা দুই প্রকারের হয়। যখন কোনো শব্দকে বারবার বলা হয়, তখন তা শব্দপুনরুক্ত বলে। যেমন- নিত্যঃ নিত্যঃ অথবা শীঘ্রং গচ্ছ শীঘ্রং গচ্ছ। যখন ভিন্ন ভিন্ন শব্দের দ্বারা একই অর্থকে বারবার বলা হয়, তখন অর্থপুনরুক্ত বলা হয়। যেমন- নিত্যং শাশ্বতম্ অথবা অগ্নিমীলে, পাবকং স্তৌমি। এখানে শব্দের আবৃত্তি না হলেও ব্যবহৃত শব্দগুলির অর্থ একই।

পদ, পাদ, অর্ধর্চ, মন্ত্র এবং সূক্তের ভেদে পুনরুক্তি পাঁচ প্রকারের হয়-

পদ পুনরুক্তি যেখানে একই মন্ত্রে এক বা একাধিক পদ বারবার ব্যবহৃত হয়। যেমন-

1. উপ ত্বাগ্নে দিবেদিবে। ঋ০ ১-১-৭

2. মন্ম রেজতি রক্ষোহা মন্ম রেজতি। ঋ০ ১-১২৬-৬

3. কস্ত্বা যুনক্তি স ত্বা যুনক্তি কস্মৈ ত্বা যুনক্তি। যজু০ ১-৬

4. মধুমন্তং মধুশ্চুতম্। ঋ০ ৪-৫৭-২

উপরিউক্ত মন্ত্রাংশগুলিতে দিবে, মন্ম রেজতি, যুনক্তি এবং মধু পদগুলির একাধিকবার প্রয়োগ হয়েছে। পাদ পুনরুক্তি (ক) যেখানে সম্পূর্ণ পাদ (চরণ) পুনরায় পুনরায় বহু স্থানে ব্যবহৃত হয়। যেমন-

1. তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু। যজু০ ৩৪-১ থেকে ৬

2. কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম। যজু০ ২৫-১০ থেকে ১৩; ৩২-৬, ৭; ১২-১০২

3. ইন্দ্রায়েন্দো পরিস্রব। ঋ০ ৬ সূক্ত ১১২, ১১৩, ১১৪-এর প্রত্যেক মন্ত্রে

4. মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শোষ্ণে। যজু০ ৩৭-৩ থেকে ১০

5. তস্মৈ জ্যেষ্ঠায় ব্রহ্মণে নমঃ। অ০ ১০-৭-৩২ থেকে ৩৪ तथा ১০-৮-১

6. স জনাস ইন্দ্রঃ। ঋ০ ২-১২-১ থেকে ১৪

7. অর্চন্ননু স্বরাজ্যম্। ঋ০ ১-৮০-১ থেকে ১৬

8. অপ নঃ শোশুচদঘম্। ঋ০ ১-৬৭-১ থেকে ৮

(খ) যেখানে সম্পূর্ণ পাদ (চরণ) একই মন্ত্রে পুনরুক্ত হয়। যেমন-

1. ত্র্যম্বকং যজামহে পুষ্টিবর্ধনম্।- যজু০ ৩-৬০

2. প্রত্যুষ্টং রক্ষ আরাতয়ঃ। যজু০ ১-২৬

3. উৎপুনামি সূর্যস্য রশ্মিভিঃ। যজু০ ১-৩১

4. মখস্য ত্বা মখায় ত্বা শীষ্ণে। যজু০ ৩৭-৬, ৭, ১০-এ তিন-তিনবার तथा ৮ ও ৬-এ ছয়-ছয়বার

5. মণ্ডূকা ইবোদকান্মণ্ডূকা উদকাদিব। ঋ০ ১০-১৬৬-৫

অর্ধর্চপুনরুক্তি (ক) যেখানে অর্ধেক ঋচা (মন্ত্র) পুনরুক্ত হয়। যেমন-

1. তত্ত আ বর্তয়ামসীহ ক্ষয়ায় জীবসে এই অর্ধেক ঋচা দশম মণ্ডলের (ঋগ্বেদ) সূক্ত ৫৮-এর সমস্ত ১২টি মন্ত্রে পুনরায় পুনরায় পাওয়া যায়।

2. আ তু ইন্দ্র শংসয় গোষ্বশ্বেষু শুত্রিষু সহস্রেষু তুবীমঘ। এই অর্ধর্চ ঋগ্বেদের মণ্ডল ১, সূক্ত ২৬-এর সাতটি মন্ত্রেই সমানভাবে পাওয়া যায়।

3. অথর্ববেদ কাণ্ড ১৬, সূক্ত ৮-এ মন্ত্র ৫ থেকে ২৬ পর্যন্ত সমস্ত ২৫টি মন্ত্র একই রকমের- কেবল এক-একটি শব্দের পার্থক্য রয়েছে।

(খ) কিছু স্থান এমনও আছে যেখানে হিন্দিতে প্রচলিত গিরিধরের কুণ্ডলীর মতো একটি মন্ত্রের অন্তিম চরণের পরবর্তী মন্ত্রের প্রারম্ভে প্রয়োগ পাওয়া যায়। যেমন-

1. বিশ্বস্য দূতমমৃতম্। যজু০ ১৫-৩২

বিশ্বস্য দূতমমৃতম্। যজু০ ১৫-৩৩

2. স দুদ্রবৎস্বাহুতঃ। যজু০ ১৫-৩৩

স বুদ্রবৎস্বাহুতঃ। যজু০ ১৫-৩৪

3. ভদ্রা উত প্রশস্তয়ঃ । যজুঃ ১৫-৩৮ ভদ্রা উত প্রশস্তয়ঃ। যজুঃ ১৫-৩৬

মন্ত্রপুনরুক্তি যেখানে সম্পূর্ণ মন্ত্রই বহু স্থানে পাওয়া যায়। যেমন-

1. তৎসবিতুর্বরেণ্যং আদি মন্ত্র, যা গায়ত্রী মন্ত্র নামে প্রসিদ্ধ, তা যজুর্বেদে ৩ বার (৩-৩৫, ২২-৬, ৩০-২), ঋগ্বেদে একবার ৩-৬১-১০ এবং সামবেদে একবার (উত্তরার্চিক ৬-৩-১০-১) এসেছে। প্রথমে ভূর্ভুবঃ স্বঃ ব্যাহৃতিগুলির সঙ্গে পঠিত এই মন্ত্র যজুর্বেদে (৩৬-৩) আরও একবার এসেছে।

2. ইল়ামগ্নে পুরুদংসম্... এই সম্পূর্ণ মন্ত্র ঋগ্বেদ মণ্ডল ৩-এর সূক্ত ১, ৫, ৬, ৭ ও ১৫-এর শেষে পাওয়া যায়।

3. আপো হি ষ্ঠা ময়োভুবঃ এই মন্ত্র এই-এই স্থানে এসেছে ঋঃ ১০-৬-১, যজুঃ ১১-৫০ ও ৩৬-১৪, সামঃ উত্তরার্চিক ৬-২-১০-১, অথর্বঃ ১-৫-১

সূক্ত পুনরুক্তি যেখানে সম্পূর্ণ সূক্ত পুনরুক্ত হয়। যেমন-

1. ঋগ্বেদ ১০-১০ যম-যমী সূক্ত অথর্ববেদ ১৮-১-এ পুনরুক্ত হয়েছে। ঋঃ ১০-১৫৪ পাঁচটি মন্ত্রের ভাববৃত্ত সূক্ত সামান্য পরিবর্তনের সঙ্গে অথর্ববেদ ১৮-২-এ পাওয়া যায়। ঋগ্বেদ ১০-৮৫ বিবাহ সূক্ত নামে প্রসিদ্ধ; সামান্য ক্রমাদি-ভেদের সঙ্গে এই সম্পূর্ণ সূক্ত অথর্ববেদ ১৪-১-এ এসেছে। ঋগ্বেদ ১০-৬০ পুরুষ সূক্ত কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে যজুর্বেদ ১০-৩১ তথা অথর্ববেদ ১৬-৬-এও রয়েছে। এই সূক্তের কয়েকটি মন্ত্র সামবেদের পূর্বার্চিকের অরণ্যপর্বেও পাওয়া যায়।

2. কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ সূক্ত নয়, কিন্তু তার দুই-তিন বা অধিক মন্ত্র একই ক্রমে একই বেদে অথবা অন্য বেদগুলিতে পুনরুক্ত হয়েছে। যেমন— কয়া নশ্চিত্র আদি ঋগ্বেদ ৪-৩১-এর প্রথম তিনটি মন্ত্র ঠিক এই ক্রমে যজুর্বেদ অধ্যায় ২৭ মন্ত্র ৩৬-৪১ তথা অধ্যায় ৩৬ মন্ত্র ৪-৬—এই দুই স্থানে, সামবেদে উত্তরার্চিক ১-১২-১-৩-এ এবং অথর্ববেদে কাণ্ড ২০ সূক্ত ১২৪ মন্ত্র ১-৩-এ পুনরাবৃত্ত হয়েছে।

এগুলি ছাড়াও বহু স্থানে এমনও দেখা যায়, যেখানে একই ভাব বহুবার পুনরুক্ত হয়েছে, যদিও ভাষা ভিন্ন। যেমন ইন্দ্র বৃত্রদের সংহারক, ঐশ্বর্যশালী, দাতা এবং সোমরসের পানকারী। উষা দ্যুলোকের কন্যা, জ্যোতির্মতী তথা অন্ধকারকে উচ্ছিন্নকারিণী। অগ্নি দেবতাদের দূত, হব্যের ভক্ষণকারী এবং জ্যোতির্মান। এই প্রকারের ভাব বেদগুলিতে বহু স্থানে পাওয়া যায়।

বস্তুত ঈশ্বরোক্ত হওয়ার কারণে বেদগুলিতে পুনরুক্তিকে দোষ বলে মনে করা যায় না।

বেদকে মানব-রচনা মনে করলে তাতে দোষের সম্ভাবনা থাকতে পারে, কিন্তু তাকে সর্বজ্ঞ পরমেশ্বরের নিঃশ্বাসজাত জ্ঞান মনে করলে তাতে দোষ-দর্শনের দ্বারা নিজেরই অল্পজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। ন হি প্রয়োজনমনভিসন্ধায় প্রেক্ষাবন্তঃ প্রবর্তন্তে—কোনো বুদ্ধিমান পুরুষ প্রয়োজন ছাড়া কোনো কাজে প্রবৃত্ত হন না। আবার পরমেশ্বর তো মনীষী। ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা ইত্যাদি দোষ তাঁর মধ্যে কল্পনা করা যায় না। অতএব তাঁর কোনো ক্রিয়াই নিষ্প্রয়োজন অথবা স্মৃতিভ্রংশতা কিংবা অজ্ঞানবশত হতে পারে না। বুদ্ধিপূর্বা বাক্যকৃতির্বেদে (বৈঃ ৮০৬-১-১) পরমেশ্বরের নৈসর্গিক নিত্যজ্ঞানের বোধক বেদে, তাঁর অমর কাব্যে যে বাক্যরচনা রয়েছে, পদ ও পদসমূহের যে আনুপূর্বী রয়েছে, তা সবই বুদ্ধিপূর্বক; অতএব যেখানে শব্দ অথবা অর্থের পুনরুক্তি প্রতীয়মান হয়, সেখানে তার বিশেষ অভিপ্রায় জানার জন্য গভীরভাবে চেষ্টা করা উচিত। যদি কোনো কোনো ব্যাখ্যাকার এই প্রকারের প্রসঙ্গে বিশেষার্থ প্রকাশ না করে থাকেন, তবে তা ব্যাখ্যাকারদের দোষ, বেদগুলির নয়। মহাভাষ্যকার পাণিনীয় শাস্ত্রের জন্য লিখেছেন-:

ব্যাখ্যানতো বিশেষপ্রতিপত্তির্ন হি সদ্বেহাবলক্ষণম্। অর্থাৎ কোনো সূত্রে সন্দেহমাত্রের কারণে তাকে অলক্ষণ, শাস্ত্রের নিয়মবিরুদ্ধ বলে মনে করা উচিত নয়, বরং ব্যাখ্যার দ্বারা বিশেষ অর্থের জ্ঞান লাভের চেষ্টা করা উচিত। যে প্রকারে আর্ষ বা অনার্ষ গ্রন্থগুলির পুনরুক্তি-দোষের নিবৃত্তির জন্য সূক্ষ্ম বিবেচনা করা হয়, সেই প্রকারে বেদগুলির পুনরুক্ততা-দোষের নিবারণের জন্যও প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত। এটি অনুসন্ধানের বিষয়, শ্রমসাধ্য, প্রতিভাসাধ্য। মহাভাষ্যকার যথার্থই বলেছেন- একঃ শব্দঃ সম্যগ্ জ্ঞাতঃ সম্যক্প্রযুক্তঃ স্বর্গে লোকে চ কামধুগ্ভবতি । যে বেদের নিজের অঙ্গ- মুখভূত ব্যাকরণ শব্দের এই গরিমার উদ্‌ঘোষ করছে, সেই বেদ নিজেই শব্দের নিরর্থক প্রয়োগ করে পুনরুক্তি-দোষের ভাগী হবে, এটি কীভাবে সম্ভব?

প্রয়োজনশূন্যত্বে পদবাক্যয়োঃ পুনঃ পুনঃ কথনং পুনরুক্তিদোষঃ শব্দ বা বাক্যকে বারবার নিষ্প্রয়োজনে বলা পুনরুক্তি-দোষ বলে পরিচিত হয়, কিন্তু যেখানে শব্দ বা শব্দসমষ্টির বারবার প্রয়োগ কোনো প্রয়োজনের সিদ্ধির জন্য করা হয়, সেখানে তা পুনরুক্ত না হয়ে অনুবাদ বলে পরিচিত হয়। ভিন্ন ভিন্ন শব্দের দ্বারা একই অর্থের কথনও সপ্রয়োজন হয়। এই প্রকারে কোনো বিশেষ অর্থের প্রয়োজন থাকার কারণে অনুবাদ দোষাবহ হয় না। গচ্ছ গচ্ছ অথবা যাও, যাও-তে গচ্ছ অথবা যাও-এর দুবার প্রয়োগ নিরর্থক নয়, বরং তাড়াতাড়ি চলে যাও—এই বিশেষ অর্থের দ্যোতক। ‘অনুবাদোপপত্তেশ্চ’ ন্যায়-দর্শনের এই সূত্র (২-১-৬১)-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাৎস্যায়নমুনি পুনরুক্ত ও অনুবাদের ভেদ এই শব্দগুলিতে স্পষ্ট করেছেন-

অনর্থকোঽভ্যাসঃ পুনরুক্তম্, অর্থবানভ্যাসোঽনুবাদঃ শীঘ্রতরগমনোপদেশবৎ ।

অর্থাৎ যেখানে পুনরুক্তি নিরর্থক হয়, সেখানে তা দোষযুক্ত হয়। যেখানে অনুবাদ সার্থক হয়, সেখানে তা নির্দোষ হয়। যেমন- শীঘ্রং শীঘ্রং গম্যতাম্-এ শীঘ্রম্-এর দুবার প্রয়োগ অত্যন্ত দ্রুততার সূচক। বেদে পুনরুক্তি সার্থক অথবা সনিমিত্ত হওয়ার কারণে দোষাবহ নয়।

বেদে কোনো শব্দই নিরর্থক নয়। পদ-পুনরুক্তির দুটি ভেদ রয়েছে- সুবন্তের পুনরুক্তি এবং তিঙন্তের পুনরুক্তি। বৈয়াকরণদের মতানুসারে সুবন্তের পুনরুক্তি থেকে বীপ্সা = ব্যাপ্তি অর্থ গম্য হয়। যেমন-গ্রামো গ্রামো রমণীয়ঃ প্রত্যেক গ্রাম রমণীয়। এখানে রমণীয়তার ব্যাপ্তি গ্রাম-গ্রামে রয়েছে—এই অর্থ প্রতীয়মান হয়। তিঙন্তের পুনরুক্তি থেকে ক্রিয়ার পুনরায় হওয়া জানা যায়। যেমন- দেবদত্তঃ পচতি পচতি দেবদত্ত পাকাতেই থাকে। এগুলির জন্য পাণিনীয় সূত্র হল- নিত্যবীপ্সয়োঃ (অ০ ৮।১।৪) ।

এই নিয়ম অনুসারে দিবেদিবে-এর অর্থ হবে প্রতিদিনম্ (সায়ণ)। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ধাত্বর্থকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থ করেছেন- বিজ্ঞানস্য প্রকাশায় প্রকাশায় অর্থাৎ বিজ্ঞানের প্রত্যেক প্রকাশের জন্য। এই প্রকারে বেদে যেখানে তিঙন্তের পুনরাবৃত্তি রয়েছে, সেখানে তার দ্বারা ক্রিয়ার পুনঃ পুনঃ হওয়া অভিপ্রেত।

সন্ধ্যায় ওঁ বাক্ বাক্, ওঁ প্রাণঃ প্রাণঃ ইত্যাদি বলা হয়। এখানে বাক্ বাক্-এ প্রথম বাক্ উদ্দেশ্যভূত, দ্বিতীয়টি বিধেয়ভূত। বাণীতে ‘বাক্‌ত্ব’ অর্থাৎ যথার্থ কথনরূপ গুণ অভিপ্রেত, কাম্য। এই ভাবই প্রাণ, চক্ষু, শ্রোত্র ইত্যাদির পুনরুক্ত হওয়ার মধ্যে নিহিত। বিবাহ-প্রকরণে ‘পাদ্যং পাদ্যং পাদ্যম্’ এই তিনবার অভ্যাস এবং পুনরুক্ত বলে প্রতীয়মান হলেও সার্থক। বস্তুত মন-বচন-কর্ম তিনটিরই নির্দেশ থাকার কারণে তিনবার কথন স্বতঃই যুক্তিযুক্ত।

তত্ত আ বর্তয়ামসীহ ক্ষয়ায় জীবসে (ঋঃ ১০-৫৮) এই অর্ধঋচাটি এই সূক্তের সমস্ত ১২টি মন্ত্রে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এই সূক্তের প্রত্যেক মন্ত্রে মনো জগাম দূরকম্ এই দ্বিতীয় চরণটিও বারবার প্রয়োগ করা হয়েছে। এই সূক্তে মূর্ছিত ব্যক্তির নষ্ট হয়ে যাওয়া চেতনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের দৃঢ়সংকল্প এবং ভৈষজ্য-কৌশল প্রকাশ করতে তথা রোগীর আত্মীয়দের বিশ্বাস ও সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বারবার বলে-যদি তোমার চেতনা মৃত্যুর কাছেও পৌঁছে গিয়ে থাকে, তবুও তত্ত আ বর্তয়ামসি তাকে ফিরিয়ে এনে দিচ্ছি।

অথর্ববেদ কাণ্ড ২-এর ৩৩তম সূক্তে যক্ষ্মা দূর করার বিধান রয়েছে। যক্ষ্মাপীড়িত ব্যক্তির মনোবল বাড়ানোর জন্য, তার বিভিন্ন শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নির্দেশ করে তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বারবার বি বৃহার্মি তে পদটি বলে বলা হয়, ‘তোর কোনো অঙ্গে যক্ষ্মা প্রবেশ করে থাকলেও, আমি তাকে বের করে দেব-তোর মৃত্যু হতে দেব না।’

কোনো বেদমন্ত্রের একইরূপ শব্দরূপ অন্য কোনো স্থানে এসে গেলেই তাকে পুনরুক্তি-দোষ মনে করা উচিত নয়। মণ্ডূকা ইবোদকান্মণ্ডূকা উদকাদিব (ঋঃ ১০/১৬৬।৫)-এ আপাতদৃষ্টিতে পুনরুক্তি প্রতীয়মান হয়, কিন্তু বস্তুত উভয় উপমান বাক্যের নিজস্ব বিশেষত্ব রয়েছে। প্রথম বাক্যে মণ্ডূকাঃ-এর উপর জোর রয়েছে, কারণ উপমাবাচক পদ তার সঙ্গেই রয়েছে। অভিপ্রায় এই যে, আমার অধীনে থাকাকালীন তোমরা প্রসন্নচিত্তে তেমনই কথা বলতে পার, যেমন জলে ব্যাঙেরা কথা বলে। দ্বিতীয় বাক্যে উদকাত্-এর উপর জোর রয়েছে।। অর্থাৎ যেমন ব্যাঙেরা কেবল জলেই কথা বলে, তেমনই তোমাদের কথা বলার অধিকার ততক্ষণই রয়েছে, যতক্ষণ তোমরা আমার অনুশাসনে রয়েছ। বিদ্রোহী হয়ে উঠলেই এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।

বেদগুলিতে বারবার আনীত বহু মন্ত্রের অর্থ সর্বত্র একই রকম নয়, প্রসঙ্গ বা দেবতাভেদের কারণে ভিন্ন ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা প্রসিদ্ধ মন্ত্র দেব সবিতঃ প্রসুব যজ্ঞম্ গ্রহণ করি। এই মন্ত্র যখন যজুর্বেদে (৬-১) এসেছে, তখন সেখানে রাজসূয়-প্রকরণ হওয়ার কারণে দেব সবিতঃ আদি পদগুলিকে সম্রাট্‌পরক মনে করে মন্ত্রের রাজনীতিসম্পর্কিত অর্থ করা হয়েছে। এই মন্ত্রই যজুর্বেদে (১১-৭) যখন যোগের প্রসঙ্গে এসেছে, তখন সেখানে এর পরমেশ্বরপরক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সনাদগ্নে মৃণসি....মুক্ষত বৈব্যায়াঃ- এই মন্ত্র বেদগুলিতে চারবার এসেছে। একবার ঋগ্বেদে (১০।৮৭।১৬), একবার সামবেদে (পূর্ব০ ১-২-৩-৮) এবং দুবার অথর্ববেদে (৫-২৬-১১ ও ৮-৩-১৮)। ঋগ্বেদে এটি রাষ্ট্রের সেনানীকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে-শত্রুদের বিনাশ করার জন্য। সামবেদে ভক্তির প্রসঙ্গে পরমেশ্বরকে সম্বোধন করে চিত্তে ব্যাপ্ত রাক্ষসী ভাবগুলির সংহার করার প্রার্থনা করা হয়েছে। অথর্ববেদে প্রথম স্থানে অগ্নির প্রসঙ্গ (রোগকৃমিদের বিনাশ) অনুসারে যজ্ঞাগ্নি গ্রহণ করে মন্ত্রের অর্থ করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে অগ্নির দ্বারা রোগের সংহারকারী বৈদ্যকে গ্রহণ করা হয়েছে।

চত্বারি শৃঙ্গা ত্রয়োঽস্য পাদাঃ (ঋঃ ৪-৫৮-৩ ও যজুঃ ১৬-৬১) এই মন্ত্রকে ঈশ্বর-পরক মনে করে ‘চত্বারি শৃঙ্গা’-এর অর্থ চার বেদ, ‘ত্রয়োঽস্য পাদাঃ’-এর অর্থ উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয় ইত্যাদি করা হয়েছে। যাস্ক যজ্ঞ-পরক মনে করে ‘চত্বারি শৃঙ্গা’-এর অর্থ বেদ করেছেন, কিন্তু অবশিষ্ট পদগুলির অর্থ যজ্ঞ-বিষয়ক করেছেন। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি মন্ত্রের অর্থ শব্দ-পরক করে নাম, আখ্যাত, উপসর্গ এবং নিপাতকে চারটি শিং বলেছেন।

ঈশ্বরের বিশিষ্ট গুণগুলির কারণে তাঁকে হিরণ্যগর্ভঃ, আত্মদা বলদা, প্রাণতো নিমিষিতঃ রাজা তথা যেন দ্যৌরুগ্রা পৃথিবী চ দৃঢ়া যেন স্বঃ স্তভিতং যেন নাকঃ রূপে স্মরণ করা হয়েছে। এই গুণগুলির অনুরূপই মহর্ষি দয়ানন্দ ‘কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম’-এর চারটি ভিন্ন অর্থ করেছেন।

যখন একই মন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন বেদে আসে, তখন পৃথক পৃথক বিদ্যা, বিজ্ঞান, কর্ম এবং উপাসনার দ্বারা শরীর, মন ও প্রাণের সাধনার দ্যোতক হয়। চার বেদের মুখ্য উদ্দেশ্য ঈশ্বরপ্রাপ্তি হলেও জ্ঞান, কর্ম, উপাসনা তথা বিজ্ঞান-ভেদে সেই মন্ত্র অথবা সূক্তের তৎ-তৎ বেদ অনুসারে অর্থ হয়ে যাবে। ঋগ্বেদে জ্ঞানপ্রধান, যজুর্বেদে কর্মপ্রধান, সামবেদে উপাসনাপ্রধান এবং অথর্ববেদে বিজ্ঞান-পরক অর্থ হবে। যেমন আপঃ সূক্তের মন্ত্রগুলির জল-পরক, পরমেশ্বর-পরক, নারী-পরক এবং ব্রহ্মচর্য-পরক অর্থ হয়। অশ্বত্থে বো নিষদনম্—যজুর্বেদে (৩৫-৪) এই মন্ত্রের আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে, কিন্তু ঋগ্বেদে (১০-৬৭-৫) ঔষধি-সূক্তের অন্তর্গত হওয়ার কারণে এই মন্ত্রেরই ঔষধি-পরক অর্থ রয়েছে। শুনং হুবেম মঘবান-মিন্দ্র। এই মন্ত্র ঋগ্বেদ ও সামবেদ উভয়েই এসেছে। ঋগ্বেদে রাজধর্ম-প্রকরণ হওয়ার কারণে এর অর্থ রাজা-পরক, কিন্তু সামবেদে উপাসনা-বিষয়ে এর অর্থ ঈশ্বর-পরক। এই প্রকারে বেদ-ভেদে অর্থভেদ হওয়ার কারণে পুনরুক্তি-দোষ থাকে না।

ঋষি, দেবতা, স্বর ও ছন্দ-ভেদের কারণে অর্থভেদ হওয়ার ফলেও পুনরুক্তি-দোষ থাকে না। যো হ বা অবিদিতার্ষেয়চ্ছন্দোঽধীতে যাজয়তি বা জীর্যতে বা প্রমীয়তে বা প্রমায়ুকো বা যজমানঃ স্যাত্।

অর্থাৎ ঋষি, ছন্দ ও দেবতার জ্ঞান ছাড়া যদি কেউ মন্ত্রোচ্চারণ করে অথবা যজ্ঞ করায়, তবে সে নষ্ট হয়ে যায়। সে নিজে এবং তার যজমানও মৃত্যুর গ্রাসে পতিত হন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে মন্ত্রার্থ বোঝার জন্য ঋষি, ছন্দ ইত্যাদির জ্ঞান আবশ্যক। ঋষি, দেবতা ইত্যাদির ভেদ হয়ে যাওয়ার কারণে মন্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয় এবং চিন্তন-শৈলীতে মৌলিক ভেদ হয়ে যায়। পূর্বোক্ত মন্ত্র অশ্বত্থে বো নিষদনম্-এর ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদে ছন্দ এক হওয়া সত্ত্বেও উভয়ের ঋষি ও দেবতার মধ্যে ভেদ রয়েছে। ঋগ্বেদে এর ঋষি ভিষগাথর্বণঃ এবং দেবতা ঔষধি, কিন্তু যজুর্বেদে ঋষি আদিত্যাঃ দেবাঃ এবং দেবতা বায়ুঃ সবিতা। সেই অনুসারেই অর্থভেদ হওয়ার কারণে পুনরুক্তি-দোষের নিরাকরণ হয়ে যায়। দেবতাভেদে তো একটি একটি মন্ত্রের একাধিক অর্থ হয়ে যায়। তখন তাদের মধ্যে পুনরুক্তি-দোষ থাকে না।

বেদ সমস্ত বিদ্যার ভাণ্ডার। এই বিদ্যাগুলি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। গণিত, জ্যোতিষ, পদার্থবিদ্যা তথা বাস্তুকলা পরস্পর স্বতন্ত্র বিদ্যা, কিন্তু তবুও একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। গণিত ছাড়া কারও গতি নেই। কোনো বিষয়েরই বিবেচনা করতে গেলে গণিতের উল্লেখ না করে থাকা যাবে না। বাস্তুকলার আলোচনায় রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার আলোচনা অবশ্যই হবে। দর্শন বিজ্ঞানের উপর এবং বিজ্ঞান দর্শনের উপর নির্ভরশীল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রসায়নশাস্ত্র পাশাপাশি চলবে। সংসারের প্রত্যেক পদার্থ ও জ্ঞান একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে একটির কাজ অন্যটি ছাড়া চলতে পারে না। আমরা কোনো বিষয়ের যত বিশদ বিবেচনা করব, বিবেচ্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলির ততই অধিক দিগ্‌দর্শন করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারেই একটি বিষয়ের মন্ত্র বিভিন্ন বিষয়ের বিবেচনায় সহায়ক হওয়ার জন্য বহু স্থানে উদ্ধৃত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সেগুলি পুনরুক্ত বলে মনে হয়, কিন্তু বস্তুত সেখানে সপ্রয়োজন হওয়ার কারণে সেগুলিকে পুনরুক্তি-দোষে দোষারোপ করা যায় না।

ধাতুর অনেক অর্থ হয়। এই কারণে সেই ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দেরও অনেক অর্থ হয়ে যায়। যেমন লভ্ ধাতুর ১৬টি অর্থ হয়—অব রক্ষণ গতিকান্তিপ্রীতিতৃপ্ত্যবগমপ্রবেশশ্রবণস্বা-ম্যর্থযাচনক্রিয়েচ্ছাদীপ্ত্যবাপ্ত্যালিঙ্গনহিংসাদানভাগবৃদ্ধিষু ॥ তথা যেখানে গত্যর্থক ধাতু থাকবে, তার জ্ঞান, গমন ও প্রাপ্তি অর্থ হবে। ঋগ্বেদে (১-৩-৭) ওমাসঃ পদের ১৬টি অর্থ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকারে একটি শব্দও অনেক ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়। ইন্দ্র পদ ভিন্ন ভিন্ন ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়ে প্রসঙ্গ অনুসারে অনেক অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে, অতএব একটি সূক্ত অথবা একটি মন্ত্রে বারবার আসা সত্ত্বেও বিভিন্ন অর্থের বাচক হওয়ার কারণে তাকে পুনরুক্ত বলা যায় না। ঋগ্বেদের (২-১৬-৬) একটি মন্ত্র হল—

বৃষা তে বজ্র উত তে বৃষা রথো বৃষণা হরী বৃষভাণ্যায়ুধা। বৃষ্ণো মদস্য বৃষভ ত্বমীশিষ ইন্দ্র সোমস্য বৃষভস্য তূষ্ণুহি ॥

এই মন্ত্রে বৃষন্ পদটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাতবার প্রয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু এর দ্বারা বৃষন্ পদের...অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থের উপর আলোকপাত হয়। যেমন বৃষভ অত্যুত্তম, বৃষা অন্যের শক্তিকে প্রতি- । বন্ধিতকারী, বৃষা বেগবান্, বৃষণা বলিষ্ঠ, বৃষভাণি শত্রুদের বলকে রোধকারী, বৃষ্ণঃ = বলকারী এবং বৃষভস্য পুষ্টিকারী। এই প্রকারে ধাতুজ মূল ভাবের সমস্ত অর্থের সঙ্গে অন্বিত হয়েও মন্ত্রগত ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের গুণগুলির প্রকাশ হয়।

যজুর্বেদের ১৬তম অধ্যায় নমঃ অধ্যায় নামে প্রসিদ্ধ। শাস্ত্রে নমঃ পদের সৎকার, অন্ন এবং দণ্ড অর্থ রয়েছে। এখানে সৎকার করার যোগ্য পদার্থগুলির সঙ্গে নমঃ-এর অর্থ সৎকার হবে, পালন করার যোগ্য বস্তুগুলির সঙ্গে অন্ন, এবং বিনাশবাচক পদগুলির সঙ্গে দণ্ড।

বিনিয়োগ অনুসারে একই মন্ত্রের বিভিন্ন যজ্ঞে তথা অবসরে প্রয়োগ হওয়ার কারণে পুনরুক্তি সদোষ থাকে না। যেমন- সন্ধ্যায় দুটি অবসরে আচমনের বিধান থাকার কারণে শন্নো দেবী ইত্যাদি মন্ত্রের পুনরুক্ত হওয়া দোষ বলে মনে করা যায় না। এই মন্ত্রেরই যখন উপাসনা-বিষয়ে বিনিয়োগ হয়, তখন দেবী আপঃ দিব্যগুণযুক্ত পরমেশ্বরের বাচক। বিজ্ঞানকাণ্ডে বিনিয়োগ করা হলে অথর্ববেদে সেই একই মন্ত্র সূক্ষ্ম জল এবং ঔষধিরূপ জলের অর্থের দ্যোতক হয়ে যায়।

উপনয়ন-সংস্কারে পঠিত আপো হি ষ্ঠা ময়োভুবঃ ইত্যাদি যজুর্বেদের (৩৬।১৪-১৬) তিনটি মন্ত্র বিবাহ-সংস্কারেও বিনিযুক্ত হয়েছে। মম ব্রতে তে হৃদয়ং বধামি ইত্যাদি গৃহ্যসূত্রের এই মন্ত্র সামান্য পার্থক্যসহ উপনয়ন, বেদারম্ভ তথা বিবাহ-সংস্কারগুলিতে প্রয়োগ করা হয়েছে। বিনিয়োগ অনুসারে অর্থভেদ হওয়ার কারণে এই প্রকার পুনরুক্তিকে দোষ বলে মনে করা যায় না।

প্রয়োজনের সিদ্ধি হওয়া পর্যন্ত অভ্যাসের নিরন্তরতা প্রত্যাশিত। যতক্ষণ সাক্ষাৎকার না হয়। ততক্ষণ প্রত্যাশিত সাধনগুলির আবৃত্তি আবশ্যক। যতক্ষণ চাল বের না হয়, ততক্ষণ ধান ভানা চলতে থাকে। এই প্রকারে ব্রহ্মের সাক্ষাৎকারের জন্য যোগাঙ্গগুলির বারবার অনুষ্ঠান করতে হয়। একবার উপদেশ থেকে যে জ্ঞান হয়, তা কেবল শব্দজ্ঞান। শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন। ছাড়া অভীষ্টের সিদ্ধি সম্ভব নয়।

উপদেশকে আবশ্যক জেনে তাকে বারবার বলা হয়। তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু-এর বারবার কথন মনের পবিত্রতার উপর জোর দেওয়ার জন্য করা হয়। রাষ্ট্রদা রাষ্ট্রং মে দেহি তথা অর্চন্তনু স্বরাজ্যম্-এর মতো বচনগুলির আবৃত্তি জাতীয়তা তথা দেশভক্তির ভাবনাকে পুষ্ট করার জন্য করা হয়েছে। তেভ্যো নমো...... জম্ভে দধ্মঃ - বিভিন্ন দিকের পৃথক পৃথক অধিপতি, রক্ষক তথা ইষবঃ-এর সঙ্গে যুক্ত করে এই পদগুলির বারবার আবৃত্তির উদ্দেশ্য হল- উপাসকের হৃদয়ে ঈশ্বরের ব্যাপকতা, তাঁর গুণ, কর্ম তথা সামর্থ্য জেনে তাঁর ন্যায়ের প্রতি বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণের ভাবনাকে দৃঢ় করা। উপদেষ্টার মতো বেদগুলির উপদেষ্টা পরমেশ্বরের বারবার উপদেশ দেওয়া নিষ্প্রয়োজন না হয়ে অভ্যাসার্থ হওয়ার কারণে পুনরুক্ত হলেও নির্দোষ।

অধ্যাপক যখন কোনো বিষয় অধ্যয়নকারীর মনে বদ্ধমূল করতে চান, তখন তিনি তাকে কখনও সেই একই শব্দে এবং কখনও সেই অর্থের দ্যোতক ভিন্ন শব্দে বারবার বলেন। মহাভাষ্যের প্রসঙ্গ-পুনরুক্তির বিষয়ে বৈয়াকরণদের মত হল যে আচার্য পতঞ্জলি যে বিষয়টি অধ্যেতাদের হৃদয়ে সম্যক্ প্রকারে অঙ্কিত করতে চান, সেই বিষয়ের সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ প্রসঙ্গানুসারে বহুবার পুনরাবৃত্তি করেন। শবরস্বামীও মীমাংসা-ভাষ্যে ছাত্রদের লাভের জন্য করা প্রসঙ্গ-পুনরুক্তিকে সার্থক মনে করেছেন। মহর্ষি পতঞ্জলি অস্য সূত্রস্য শাটকং বয়েতি এই দৃষ্টান্তটি বহু স্থানে দেন। তিনি কি অন্য কোনো দৃষ্টান্ত পেতে পারতেন না? কিন্তু একই দৃষ্টান্ত বারবার দেওয়ার ফলে অধ্যাপনার কাজ সহজ হয়ে যায়, কারণ নতুন দৃষ্টান্ত বুঝতে প্রতিবার অকারণেই অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। লোকেও অধ্যাপক কোনো বোধগম্য অর্থকে কোনো নির্দিষ্ট শব্দের দ্বারা একবার বলে অধ্যাপনার কাজ সম্পন্ন করতে পারেন না। তাঁকে কখনও একই শব্দ বহুবার বলে এবং কখনও বিভিন্ন শব্দ ও পদ্ধতির দ্বারা নিজের কথা বোঝাতে হয়। ছাত্রকেও নিজের অধীত পাঠ- শব্দ ও অর্থ উভয় রূপে বারবার বলে মনে রাখতে হয়। এই একই শৈলী পূর্বেষামপি গুরু-পরমেশ্বরের উপদেশেও এখানে-সেখানে দৃষ্টিগোচর হয়। এই প্রকারের বারবার কথনকে শাস্ত্রে অভ্যাস বলা হয়েছে। অভ্যাসকে পুনরুক্তি-দোষ মনে করা হয় না, তা অধ্যাপক-গুরু বা উপদেষ্টার দ্বারা হোক অথবা অধ্যেতা বা উপদেশ্য দ্বারা। কখনও কখনও শব্দ ও অর্থ উভয়ের মধ্যে সমানতা প্রতীয়মান হয়, কিন্তু গভীরভাবে বিবেচনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। শব্দের বিশ্লেষণ করলেই রহস্য উন্মোচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ-

ঋগ্বেদের (৪-৫৭-২) পর্জন্যকে বলা হয়েছে যে তিনি আমাদের এমন জলধারা প্রদান করুন, যা মধুমান্-ও হবে এবং মধুশ্চুত-ও হবে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে এখানে একই ঋচায় সমার্থক দুটি পদ এসে যাওয়ার কারণে পুনরুক্তি-দোষ দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবে এই দুটি পদের অর্থে পার্থক্য রয়েছে। এমন আবশ্যক নয় যে যা মধুমান্, তা মধুস্রাবীও অবশ্যই হবে। এমন ব্যক্তির অভাব নেই, যারা ধনবান্ তো হন, কিন্তু ধনের বর্ষণ-দান করেন না। এই বেদমন্ত্রে পর্জন্যের কাছে এমন জলধারা কামনা করা হয়েছে, যা নিজেও মধুর ও শুদ্ধ এবং বনস্পতি ইত্যাদিকে মধুর রসে আপ্লুতকারী হবে।

এই প্রকারে হিরণ্যরূপঃ স হিরণ্যসন্দৃক্ (ঋঃ ২-৩৫-১০) ইত্যাদি মন্ত্রে অগ্নিকে হিরণ্যরূপ এবং হিরণ্যসন্দৃক্ বলা হয়েছে। সমার্থক বলে প্রতীয়মান হলেও নিরুক্তকার এখানে পুনরুক্তি-দোষ মনে করেন না। তাঁর মতে এই দুটি শব্দের অভিপ্রায়ের মধ্যেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এমন আবশ্যক নয় যে যার রূপ সোনার মতো, তাকে সোনার মতো দেখাতেও হবে। শত্রু যতই সুন্দর অথবা গুণবান্ হোক না কেন, তবুও সে কুৎসিত ও গুণহীনই প্রতীয়মান হবে।

এই প্রসঙ্গে এই দুটি মন্ত্র দ্রষ্টব্য-

প্রিয়ং মা কৃণু দেবেষু প্রিয়ং রাজসু মা কৃণু । প্রিয়ং সর্বস্য পশ্যত উত শূদ্র উতায়ে ।। অথর্বঃ ১৬।৬২।১

রুচং নো ধেহি ব্রাহ্মণেষু রুচং রাজসু নস্কৃধি । রুচং বিশ্যেষু শূদ্রেষু ময়ি ধেহি রুচা রুচম্ ॥ - যজুঃ ১৮/৪৮

উপর থেকে দেখলে এই দুটি মন্ত্রের একই অর্থ প্রতীয়মান হওয়ার কারণে এখানে পুনরুক্তি-দোষ বলা যেতে পারে। প্রথম মন্ত্রে সকলের প্রিয় হওয়ার প্রার্থনা রয়েছে, তো দ্বিতীয়টিতে সকলের প্রতি রুচি ও প্রেম রাখার প্রার্থনা রয়েছে। কিন্তু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলে উভয় মন্ত্র পৃথক পৃথক ভাবের দ্যোতক বলে মনে হয়। প্রথম মন্ত্রে যেখানে অন্যদের কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার কামনা রয়েছে, সেখানে দ্বিতীয় মন্ত্রে নিজে অন্যদের ভালোবাসার ইচ্ছা রয়েছে। উভয় দিক থেকে ভালোবাসা হলেই প্রেমের পরিপাক হয়। এই প্রকারে ভাব ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতার কারণে অর্থভেদ হয়ে যায়, যার ফলে সেখানে পুনরুক্তি-দোষ থাকে না।

পুনরুক্তির একটি উদ্দেশ্য কোনো অভীষ্ট অর্থের প্রতি আধিক্য প্রদর্শন করা; তার মধ্যে শ্রদ্ধার আধিক্য উৎপন্ন করাও হয়। ঋগ্বেদ মণ্ডল ১০ সূক্ত ১১৬-এর প্রত্যেক মন্ত্রের শেষে কুবিৎসোমস্যাপামিতি শব্দগুলির আবৃত্তি করা হয়েছে। এই সূক্তের প্রত্যেক মন্ত্রের শুরুতে ভগবানের ভক্তির দ্বারা আবির্ভূত ভক্ত নিজের ভাব-বিহ্বলতার উল্লেখ করতে করতে শেষে বলেন যে আমার এই উচ্ছ্বাসের কারণ হল, আমি কুবিৎসোমস্যাপামিতি—ভরপেট সোমরস পান করেছি। প্রভুভক্তিরূপী সোমরস পান করে প্রাপ্ত অসীম ও অদ্ভুত সামর্থ্যের প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্যই বারবার এমন বলা হয়েছে। তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু, কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ইত্যাদি বাক্যের পুনরাবৃত্তিরও এই একই প্রয়োজন।

কখনও কখনও হৃদয়ের ভাবাবেগের অভিব্যক্তির জন্যও পুনরুক্তির প্রয়োজন হয়। ঋগ্বেদের (৪-৩২-২০) মন্ত্র হল-

ভূরিদা ভূরি দেহি নো মা দাং ভূর্যা ভর। ভূরি ঘেদিন্দ্র দিত্সসি ॥

হে প্রভু ! আপনি অনেক দাতা। আমাদের অনেক দিন। কম নয়, অনেক দিন। সত্যিই আপনি অনেক বড় দাতা। যুক্তি দিয়ে দেখলে যখন ভূরিদা বলে দেওয়া হয়েছে, তখন ভূরি দিত্সসি বলা বৃথা। এই প্রকারে যখন ভূরি দেহি বলে দেওয়া হয়েছে, তখন মা বনং ভূর্যা ভর বলা বৃথা। কিন্তু দাতা ও যাচক অথবা ভগবান ও ভক্তের মধ্যে যুক্তি চলে না, কারণ সেখানে ভাবনা প্রধান হয়। এই প্রকারের বচনগুলির দ্বারা ভগবানের প্রতি ভক্তের আস্থা, ব্যাকুলতা তথা প্রার্থনা পূর্ণ হওয়ার বিশ্বাস প্রকাশিত হয়। এই প্রকারের ভাবনা অথর্ববেদের (৬-১৬-১) এই মন্ত্রে পাওয়া যায়-

পুনন্তু মা দেবজনাঃ পুনন্তু মনবো ধিয়া। পুনন্তু বিশ্বা ভূতানি পবমানঃ পুনন্তু মা ॥

ভয়, শঙ্কা, শোক, অসূয়া, হর্ষ, বিস্ময়, ত্বরা, উৎসাহ ইত্যাদির প্রদর্শনের জন্যও পুনরুক্তিকে দোষ বলে মনে করা হয় না। এটি কাব্যশাস্ত্রের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত, যেমন আচার্য ভামহ ও দণ্ডীর এই বচনগুলি থেকে প্রমাণিত হয়-

হর্ষবিস্ময়য়োরপি । ভয়শোকাভ্যসূয়াসু যথাহ গচ্ছ গচ্ছেতি পুনরুক্তং ন তদ্বিদুঃ ॥ কাব্যালঙ্কার ৪-১৪

অনুকম্পাদ্যতিশয়ো যদি কশ্চিদ্ বিবক্ষ্যতে । ন দোষঃ পুনরুক্তোঽপি প্রত্যুতেয়মলঙ্ক্রিয়া ॥ - কাব্যাদর্শ ৩-১৩৭

বেদের অনেক পুনরুক্তি এই অর্থগুলিতে আসার কারণে নির্দোষ।

বৈদিক মত অনুসারে বেদের রচয়িতা ঈশ্বর এবং পাশ্চাত্য মত অনুসারে মানুষ, কিন্তু উভয় অবস্থাতেই রচয়িতা কবি। কবিরাও ছন্দ মেলানো ব্যক্তি নন। ঈশ্বর কবিরূপে মনীষী, তো মানুষ সূক্ষ্মদ্রষ্টা ঋষি। কবির রচনা কাব্য বলে পরিচিত হয়। যদি কালিদাস আদি কবিদের কাব্যে পদ, চরণ, শ্লোকার্ধ অথবা সম্পূর্ণ শ্লোক একইভাবে বহুবার প্রয়োগ হওয়া সত্ত্বেও পুনরুক্ত বলে মনে করা না হয়, বরং অলঙ্কার-যোজনা অথবা অন্য অর্থের বোধের জন্য আবশ্যক মনে করা হয়, তবে বেদরূপী কাব্যে সেগুলিকে দোষাবহ বলে কীভাবে মনে করা যেতে পারে? ভেঙ্কট মাধবের অনুসারে-

আবর্তয়ন্তি সূক্তীশ্চ যথাঽর্চন্ননু স্বরাজ্যম্ ।

অনেক স্থানে (গীতিকাব্যের সিদ্ধান্ত অনুসারে) সূক্তিগুলির আবৃত্তি হয়। যেমন-অর্চন্ননু স্বরাজ্যম্।

ভেঙ্কট মাধব ‘শব্দাবৃত্ত্যানুক্রমণী’-তে লিখেছেন-

এবং চ পূরণঃ পাদো নি স্থিরাণি চিদোজসা । অভ্যাসাম্ননু চাত্রাপি ভূয়ানর্থঃ প্রতীয়তে ॥ ৪-১-১১

অর্থাৎ ঋগ্বেদের (১-১২৭-৪) যে পদ-পুনরুক্তি রয়েছে, তা অভ্যাসের দ্বারা ভূয়ান্ বিশেষ অর্থের প্রতীতির উদাহরণ।

ঋগ্বেদের (১-১২৬-৬) থেকে মন্ম রেজতি তথা অব স্রবেত্ পুনরুক্ত হয়েছে। এর সমাধান করতে গিয়ে নিরুক্তকার বলেন-অভ্যাসে ভূয়াংসমর্থং মন্যন্তে যথাহো দর্শনীয়াঽহো দর্শনীয়—অর্থাৎ যেখানে পুনরুক্তির দ্বারা অর্থে চমৎকার এসে যায়, সেখানে তা বাঞ্ছনীয়। যেমন অহো দর্শনীয় দুবার বলার ফলে দৃশ্য পদার্থে বিশেষ চমৎকারের অনুভূতি হয়। চমৎকার কাব্যের প্রাণ, যা অলঙ্কার-যোজনার দ্বারা উৎপন্ন হয়। শ্লেষালঙ্কারে একটি শব্দের একই সময়ে দুটি অর্থ প্রত্যাশিত হয়। যমকে একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে একাধিকবার প্রয়োগ করা হয়। এই প্রকারে অনুপ্রাসের বিভিন্ন ভেদ দ্বারা কাব্যে অভিনব সৌন্দর্যের প্রাপ্তি হয়। কবয়ামি বয়ামি যামি - (কবিতা করি, বুনি, যাই) এখানে তিনটি পদের অলঙ্কারপূর্ণ যোজনার দ্বারা যে চমৎকার উৎপন্ন হয়েছে, তা পুনরুক্তির কারণেই হয়েছে, যা কেবল নির্দোষই নয়, বরং সৌন্দর্যের উৎপাদক।

বেদে পুনরুক্তিকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন হেতু উপস্থাপন করার পর আমরা ব্যাকরণশাস্ত্র থেকে একটি প্রমাণ উপস্থাপন করি। ভারতীয় বৈয়াকরণরা তো অর্ধমাত্রালাঘবেন পুত্রোৎসবং মন্যন্তে বৈয়াকরণঃ এই উক্তির দ্বারা পাণিনিমুনির রচিত অষ্টাধ্যায়ীর স্বল্পাক্ষর রচনা-পদ্ধতির প্রশংসা করেনই, পাশ্চাত্য বিদ্বানরাও তার সূক্ষ্মৈক্ষিকাপূর্ণ বিশিষ্ট রচনায় মুগ্ধ। সেই অষ্টাধ্যায়ীতেও পুনরুক্ত সূত্রের অভাব নেই, অতএব বেদের পুনরুক্তি নির্দোষ হওয়ার পক্ষে অষ্টাধ্যায়ীর উপর ভিত্তি করে একটি হেতু দেওয়া হয়-

পাণিনীয় অষ্টাধ্যায়ীতে এমন অনেক সূত্র রয়েছে, যেগুলি একই শব্দানুপূর্বীতে একাধিকবার পাঠ করা হয়েছে। বৈদিক ব্যাকরণের লৌকিক ব্যাকরণ থেকে ভিন্নতা ও বিশেষত্ব বোঝানোর জন্য ‘বহুলং ছন্দসি’ সূত্রটি এই একই আনুপূর্বীতে ১৪ বার পাঠ করা হয়েছে। একবার তো সেটি ২-৪-৭৩-এর পরে ২-৪-৭৬-এ, অর্থাৎ মাত্র দুটি সূত্রের পরেই আবার পাঠ করা হয়েছে। কিন্তু প্রসঙ্গভেদের কারণে প্রত্যেক প্রসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হয়। এই শব্দাত্মক পুনরুক্তিকে অনর্থক বলা যায় না। সূত্র-পুনরুক্তির মতো পদ-পুনরুক্তির (যেমন তদধীতে তদ্ বেদ-৪-২-৫৬) তথা অর্থ-পুনরুক্তির (যেমন বিশেষণং বিশেষ্যেণ বহুলম্ -২-১-৫৭)-ও অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। আবার বেদমন্ত্র তো ব্যাকরণের সূত্র নয়, কাব্য। সেখানে কাব্যোচিত পুনরুক্তি সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ হবে।

Read More

08 October, 2026

ঋগ্বেদ ১০/৬১/৫

08 October 0

ঋগ্বেদ ১০/৬১/৫, ঋগ্বেদ ১০/৬১/৬, ঋগ্বেদ ১০/৬১/৭, বেদে পিতা-কন্যার সঙ্গমের অনুমতি আছে?

আক্ষেপ: “বেদে পিতা-কন্যার স*ঙ্গমের অনুমতি আছে”—দাবিটি কি সত্য?
সম্প্রতি একটি লেখায় ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫–৭ এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১.৪.৩-এর কিছু অনুবাদ দেখিয়ে দাবি করা হয়েছে যে, বেদ ও উপনিষদে পিতা-কন্যার যৌ*ন সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে এবং তাই হিন্দুসম্প্রদায়ে Incest বা নিকট আত্মীয়ের মধ্যে যৌ*ন সম্পর্ক অনুমোদিত।
এই দাবির ক্ষেত্রে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—কোনো অনুবাদে “father”, “daughter”, “union”, “seed” ইত্যাদি শব্দ এসেছে বলেই সেই অনুবাদই মূল বৈদিক অর্থের একমাত্র অর্থ হয়ে যায় না। বৈদিক মন্ত্রের অর্থ নির্ধারণে মূল সংস্কৃত, পদার্থ, অন্বয়, নিরুক্ত ও ভাষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫–৭-এর ক্ষেত্রে দুটি বৈদিক ভাষ্য দেখি। 👇
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫):
প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ।
পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ ৫॥
পদার্থ— (য়স্য) যে রুদ্র নামী প্রজাপতি অগ্নির (ইষ্ণদ্) ঈক্ষণযুক্ত (বীরকর্মম্) উৎপাদন কর্ম (প্রথিষ্ঠ) প্রথিত হয় সেই (অনুস্থিতম্) স্থাপিত এবং স্থিত হওয়া উৎপাদন কর্মকে (অনর্বা) দৃঢ় (নর্য়ঃ) মনুষ্য আর দেবগণের হিতকারক পার্থিব অগ্নি (নু) নিশ্চয়ই (অপ, ঔহৎ) লুকিয়ে রাখে (তৎ) সেটা (পুনঃ) আবার (আবৃহতি) চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এটাই হল সেই তত্ত্ব (য়ৎ) যা (কনায়াঃ) উজ্জ্বল (দুহিতুঃ) দ্যুলোক থেকে (অনুভৃতম্) গ্রহণ করা হয়েছে (আঃ) হয়।
ভাবার্থ— প্রজাপতি রুদ্র=অগ্নির উৎপাদন শক্তি বিস্তার লাভ করে। তার দ্বারা স্থাপিত উৎপাদন শক্তি রূপ তেজকে দৃঢ় আর নর তথা দেবগণের হিতকারী পার্থিব অগ্নি নিজের ভেতরে ঢেকে রাখে আর সেই তেজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বস্তুতঃ এটা সেই তেজ, যা দ্যুলোক থেকে গ্রহণ করা হয়।
📖 ১. ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫— “পিতা কন্যার সঙ্গে স*ঙ্গম করলেন”—এটাই কি একমাত্র অর্থ?
আক্ষেপে H.H. Wilson-এর ইংরেজি অনুবাদ এবং পণ্ডিত রাম গোবিন্দ ত্রিবেদীর হিন্দি ব্যাখ্যা দেখিয়ে পিতা-কন্যার যৌন সম্পর্কের অর্থ করা হয়েছে।
কিন্তু আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ পাওয়া যায়।
তিনি এখানে—
“দুহিতুঃ” — দ্যুলোক/ঊর্ধ্বলোকের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থে,
“কনায়া” — উজ্জ্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থে,
এবং সমগ্র মন্ত্রকে প্রজাপতি রুদ্র/অগ্নির উৎপাদনশক্তি ও তেজের বিস্তার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর ভাবার্থের সারকথা:
প্রজাপতি রুদ্ররূপ অগ্নির উৎপাদনশক্তি বিস্তার লাভ করে। সেই তেজ পার্থিব অগ্নির মধ্যে ধারণ হয় এবং পরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এটি দ্যুলোক থেকে গৃহীত তেজ।
অর্থাৎ এখানে পিতা-কন্যার কোনো মানবীয় যৌন সম্পর্কের বর্ণনা নেই।
☀️ ২. ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬— যৌ*ন স*ঙ্গম নয়, সূর্য ও ঊষার প্রতীকী সম্পর্ক
আক্ষেপে বলা হয়েছে—পিতা ও যুবতী কন্যা মিলিত হয়ে শুক্রপাত করলেন।
কিন্তু আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ব্যাখ্যায়—
পিতা = সূর্য
যুবতী = ঊষা/দ্যুলোক
রেতঃ = অরুণ কিরণরূপ তেজ
এবং তাঁর ভাবার্থ অনুযায়ী:
আদিত্য ও ঊষা/দ্যুলোকের পারস্পরিক অভিগমনে অরুণ কিরণরূপ তেজের প্রকাশ ঘটে এবং দিনের উৎপত্তি হয়।
অর্থাৎ এখানে “রেতঃ” শব্দটিকে মানুষের যৌন বীর্য ধরে নেওয়াই মূল সমস্যা।
বৈদিক ভাষ্যে একই শব্দ প্রসঙ্গভেদে তেজ, শক্তি, সৃষ্টিশক্তি, বীজ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬):
মধ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃণ্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্ ।
মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ।।৬॥
পদার্থ - (কামম্) ইচ্ছামতো (পিতরি) সূর্য (য়ুবত্যাম্) দ্যুলোক বা ঊষার (কৃণ্বানে) করার পর (য়ৎ) যে (কর্ত্বম্) কর্ম (মধ্যা) অন্তরিক্ষের মধ্যে (অভীকে) তাদের নিকট (অভবৎ) হয়েছিল বা হয় তাতে (মনানক্) সামান্য (রেতঃ) অরুণ কিরণ নামক তেজকে (বিয়ন্তা) পরস্পর অভিগমনকারী দুইজনে (জহতুঃ) ছেড়েছিল বা ছাড়ে। এটা হল সেই তেজ যাকে প্রজাপতি সূর্য দ্বারা (সুকৃতস্য) উত্তম কর্মের (সানৌ) উঁচু (য়োনৌ) স্থান দ্যুলোকে (নিষিক্তম্) নিষিক্ত থাকে।
ভাবার্থ- আদিত্য আর ঊষা বা দ্যুলোকের পারস্পরিক অভিগমনে যে কর্ম হয়, তাতে আদিত্য অরুণ কিরণ নামক তেজকে ঊষা বা দ্যুলোকের মধ্যে ছেড়ে দেয় আর দিনের উৎপত্তি হয়। সূর্যের এই তেজ দ্যুলোকের মধ্যে ভরা থাকে।
🌞 ৩. ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭— “পিতা নিজের কন্যার সঙ্গে”—আবারও প্রতীকী ব্যাখ্যা
আক্ষেপে বলা হয়েছে:
“When the father u*nited with the daughter…”
কিন্তু স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজকের ভাষ্যে—
পিতা = আদিত্য/সূর্য
দুহিতা = ঊষা/দ্যুলোক
ক্ষ্মা = পৃথিবী
রেতঃ = অরুণ কিরণরূপ তেজ
তাঁর ব্যাখ্যার মূল বক্তব্য:
আদিত্য যখন ঊষা বা দ্যুলোককে অভিব্যাপ্ত করে এবং পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে তার তেজ আকাশে সঞ্চার করে, তখন সেই তেজ থেকে দিনের প্রকাশ ও অগ্নি প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।
এখানে আবারও মানব পিতা নিজের জৈবিক কন্যার সঙ্গে যৌ*ন সম্পর্ক করছে- এমন অর্থ অপরিহার্য নয়।
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭):
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ক্ষ্ময়া রেতঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ।
স্বাধ্যোऽজনয়ন্ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ॥৭॥
পদার্থ— (পিতা) প্রজাপতি আদিত্য (য়ৎ) যখন (স্বাম্) নিজের (দুহিতরম্) ঊষা অথবা দ্যুলোককে (অধিষ্কন্) প্রাপ্ত করেন তখন (ক্ষ্ময়া) পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে (রেতঃ) নিজের অরুণ কিরণ নামক তেজকে (নিসিঞ্চৎ) আকাশে সেচন করেন তখন (স্বাধ্যঃ) ভালোভাবে প্রকট (দেবাঃ) দিব্য শক্তিগুলো - সূর্যকিরণগুলো (ব্রহ্ম) অগ্নিকে (অজনয়ন্) উৎপন্ন করে আর তাকে (ব্রতপাম্) ব্রতের পালক (বাস্তোঃ, পতিম্) বাস্তোষ্পতি রুদ্র নামক অগ্নিকে (নিঃ, অতক্ষন্) নির্মিত করে।
ভাবার্থ— আদিত্য যখন দ্যুলোক অথবা ঊষাকে অভিব্যাপ্ত করে, তখন পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে আকাশে তেজ সেচন করে, সেটা থেকে দিনের প্রকাশ অগ্নি ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। এই অগ্নিকে বাস্তোষ্পতি রুদ্র-অগ্নি বলা হয়।
📜 ৪. বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১.৪.৩-এর বিষয়টিও একইভাবে দেখতে হবে
আক্ষেপে স্বামী মাধবানন্দের অনুবাদ এবং শঙ্করাচার্যের ভাষ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে—
Manu/Viraj তাঁর কন্যা Śatarūpā-র সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং সেখান থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়।
এখানে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে শঙ্করাচার্যের ভাষ্যে “daughter called Satarupa” এবং তাঁর সঙ্গে union-এর একটি আক্ষরিক বর্ণনা পাওয়া যায়—এটি গোপন করার কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু এখান থেকেও সরাসরি এই সিদ্ধান্ত: “হিন্দুধর্ম (সম্প্রদায়ে) পিতা-কন্যার যৌ*ন সম্পর্ককে নৈতিকভাবে অনুমোদন করেছে”—এটি একটি অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত। কারণ সৃষ্টিতত্ত্বের পৌরাণিক/দার্শনিক রূপক এবং সাধারণ মানুষের জন্য নৈতিক বিধান এক জিনিস নয়।
🧠 সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগত ভুল
আক্ষেপকারী বলছেন— “বেদে Incest নিষিদ্ধ করার একটি মন্ত্র দেখান।”
কিন্তু কোনো গ্রন্থে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের নাম করে নিষেধ না থাকলেই কি সেই কাজ অনুমোদিত হয়ে যায়?
❌ না।
উদাহরণস্বরূপ—
“বেদে অমুক নির্দিষ্ট অপরাধের নাম নেই”
“বেদ অমুক অপরাধকে অনুমোদন করেছে।”
অনুমোদনের দাবি করতে হলে অনুমোদনকারী বিধান দেখাতে হবে।
ঠিক একইভাবে কোনো মন্ত্রের একটি বিতর্কিত অনুবাদ পাওয়া গেলেই বেদ Incest অনুমোদন করেছে— এটি প্রমাণিত হয় না।
🕉️ বৈদিক আদর্শ কী?
বৈদিক সাহিত্যে ব্রহ্মচর্য, ইন্দ্রিয়সংযম ও সংযত জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন অথর্ববেদ ১১.৫ সূক্তে বারবার ব্রহ্মচর্য-এর মাহাত্ম্য এসেছে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.১৭ ব্রহ্মচর্যেণ তপসা রাজা রাষ্ট্রং বি রক্ষতি।
ব্রহ্মচর্য ও তপস্যার মাধ্যমে রাজা রাষ্ট্রকে রক্ষা করেন—এই আদর্শ এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.১৮ ব্রহ্মচর্যেণ কন্যা যুবানং বিন্দতে পতিম্।
ব্রহ্মচর্যের মাধ্যমে কন্যা উপযুক্ত যুবককে স্বামী হিসেবে লাভ করে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.১৯ ব্রহ্মচর্যেণ তপসা দেবা মৃত্যুমপাঘ্নত।
ব্রহ্মচর্য ও তপস্যার মাধ্যমে দেবগণ মৃত্যুকে অতিক্রম করেছেন—এমন ভাব প্রকাশ করা হয়েছে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.২১ অপক্ষাঃ পক্ষিণশ্চ যে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ।
এখানেও ব্রহ্মচর্যের ধারণা উপস্থিত।
অতএব বৈদিক আদর্শকে “যৌন অবাধতা” হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।
🔥 “বেদে অশ্লীল শব্দ কেন?”—এ প্রশ্নেরও উত্তর আছে
আরেকটি আপত্তি: “বেদে এমন শব্দ কেন থাকবে?”

এখানে বৈদিক যৌগিক শব্দের বহুমাত্রিক অর্থ বুঝতে হবে।
যেমন “অগ্নি” শব্দটি কেবল রান্নার আগুন বোঝায় না; বৈদিক ব্যাখ্যায় প্রসঙ্গ অনুযায়ী তাপ, আলো, বিদ্যুৎ, শক্তি, বিদ্বান, রাজা ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে।
একইভাবে “যো*নি” শব্দের অর্থ সব ক্ষেত্রে কেবল নারীর যৌ*নাঙ্গ নয়। ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩২-এর ব্যাখ্যায় মহর্ষি যাস্ক— “যো*নিরন্তরিক্ষম্” বলেছেন—অর্থাৎ অন্তরীক্ষকেও “যো*নি” বলা হয়েছে।
কারণ “যো*নি” শব্দের মূল ধারণার মধ্যে উৎপত্তিস্থান, আশ্রয়, উৎস ইত্যাদি অর্থ রয়েছে।
সুতরাং— একটি শব্দ আধুনিক প্রচলিত যৌ*ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে বলেই বেদের প্রতিটি স্থানে সেই যৌ*ন অর্থ বসিয়ে দেওয়া যায় না। এটাই ভাষাবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম।

উক্ত মন্ত্রে স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক ভাষ্য—

প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ। পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ট) য়স্য গৃহস্থস্য পুত্রকর্ম পুত্রার্থকর্ম বীর্য়সেচনম্ 'পুত্রো বৈ বীরঃ' [শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৩.১.১২] প্রথিতম্ প্রথতে বা (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপেণ প্রাপ্তম্ 'ইষ্ণন্ প্রাপ্নুবন্' [ঋগ্বেদ ৪.১৭.৩ দয়ানন্দঃ] সেবিতম্ সেবায়াম্ সফলীভূতম্ য়ুবানম্ (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) পুনস্তম্ স সমন্তাদুদ্যচ্ছতি পুত্রোৎপাদনেন (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরেভ্যো হিতো হিতকরঃ সন্ সর্বকার্য়ভারম্ ত্যজেৎ (য়ৎ) য়তঃ (কনয়াঃ-দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) কান্তায়াঃ সন্তানদোহনয়োগ্যায়াঃ পত্ন্যাঃ-আনুকূল্যেন ধারিতমাসীৎ (অনর্বা) স্বস্মিন্ সমর্থাऽনন্যাশ্রমী জাতঃ ।

ভাষান্বয়ার্থ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ঠ) যে গৃহস্থের পুত্রকর্ম-পুত্র উৎপাদনের জন্য কর্ম বীর্য সেচন দ্বারা প্রথিত-পুষ্ট হয় (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপে প্রাপ্ত সফলীকৃতকে (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) তারপর তাকে সে ভালোভাবে উৎসাহিত করে পুত্র উৎপাদনের দ্বারা (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরদের অবশ্যই হিতকর হয়ে সব কার্যভার ত্যাগ করে (য়ৎ) যার দ্বারা (কনায়াঃ দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) সন্তান দোহন যোগ্য-উৎপাদন যোগ্য কান্তার অনুকূলতায় ধারণ করা হয় (অনর্বা) নিজের মধ্যে সমর্থ স্বাশ্রয়ী হয়ে যায়।
.
ভাবার্থ — গৃহস্থের লক্ষ্য হল সন্তান উৎপাদন করা, তদর্থ বীর্য সেচন করার পর কমনীয় সন্তানকে দোহনকারী পত্নীতের মধ্যে সেটা পুষ্ট হয়ে সন্তানের রূপে উৎপন্ন হয় আর সে যুবক হয়ে যায়। তখন পিতা তাকে পুত্র পরম্পরা চালানোর জন্য উৎসাহিত করে। যখন সেই পুত্র পুত্রবান হয়ে যায়, তখন আবার তার পিতা গৃহস্থ জীবন ত্যাগ করে, অন্য মানুষদের হিত কর্ম করার জন্য।
.
মথ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃন্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্। মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) য়দা য়ুবত্যাম্ ভাৰ্য়ায়াম্ পুত্ৰোৎপাদনকৰ্ত্তব্যম্ পূৰ্ণম্ ভবতি (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবতি পিতরি তদাশ্রমে পুত্ৰস্য পুত্ৰোৎপাদনম্ কামম্ কুৰ্বতি সতি তৎসম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ- জহতুঃ) বিশিষ্টতয়া প্ৰাপ্নুবন্তৌ পতিপত্ম্যৌ-অল্পাঃ প্ৰজাস্তু ত্যজতাম্ 'রেতঃ প্ৰজাঃ' [ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৩] (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মণঃ পিতৄণ্যস্য প্ৰতীকারায় গৃহে গৃহাশ্রমে বিভক্তে জগতে নিষক্তম্ নিষেচনীয়ম্ কৰ্ত্তব্যম্ ভৱতি 'সানৌ বিভক্তে জগতি' [ঋগ্বেদ ১.১৪৬.২ দয়ানন্দঃ]।
.
ভাষান্বয়াৰ্থ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) যখন যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদন থেকে কৰ্তব্য পূৰ্ণ হয়ে যায় (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবিত পিতার মধ্যে - তার আশ্ৰয়ে পুত্ৰের পুত্ৰ উৎপাদনের কামনা হয়ে গেলে তার সম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ জহতুঃ) বিশিষ্টতা থেকে প্ৰাপ্ত হতে থাকা পতি পত্নী অল্প সন্তানদের তো ত্যাগ করবেন - উৎপন্ন করবেন (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মের অৰ্থাৎ পিতৃ ঋণের প্ৰতীকার হয়ে যাওয়ার পর গৃহাশ্ৰমে বিশেষ সেবন করার যোগ্য জগতে নিষেক করা কৰ্তব্য হয়।
.
ভাবাৰ্থ - যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদনের জন্য বীৰ্য নিষেক করা কৰ্তব্য হয়। পিতা জীবিত থাকাকালীন অন্ততঃ প্ৰজা তো অবশ্যই উৎপন্ন করবে। এর জন্য গৃহস্থ আশ্ৰম হল পুণ্যের স্থান। বিশেষ সেবনীয় জগতে সন্তান পরম্পরার জন্য নিষেক করা আবশ্যক হয়। এটা হল গৃহস্থাশ্ৰমের পরম্পরা।
.
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ ক্ষ্ময়া তঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ। স্বাধ্যোऽজনয়ন্ ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ।। (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭)

সংস্কৃতান্বয়ার্থঃ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানস্য ভূমিরূপয়া ভার্য়য়া সঙ্গচ্ছমানঃ (রেতঃ-নিষিঞ্চন্) বীর্য়ম্ গর্ভাধানরূপেণ নিষিঞ্চন্ সন্ (পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন্) পিতা স্বাম্ কন্যাম্ প্রাপ্নোতি-উত্পাদয়তি 'স্কন্ নিস্সারয়তু' [য়জুর্বেদ ১.২৬ দয়ানন্দঃ] 'স্কন্দন্তি-প্রাপ্ত হয়' [ঋগ্বেদ ৫.৫১.৩ দয়ানন্দঃ ] ন তু পুত্রম্ (স্বাধ্যঃ দেবাঃ- ব্রহ্ম জনয়ন্) সু-আধ্যাতারঃ-দূরদর্শিনো বিদ্বাংসো জ্ঞানম্ প্রাদুর্ভাবয়ন্তি মন্যন্তে ঘোষয়ন্তি (বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন্) য়ৎ তাম্ কন্যাম্ গৃহস্য পতিম্ স্বামিনীম্ কর্মপালিকাম্ পিতৃকর্মরক্ষিকাম্ নির্ধারয়ন্তি ।

ভাষান্বয়াৰ্থ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানের ভূমিরূপ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে তথা ( রেতঃ-নিষিঞ্চন ) গর্ভাধান রীতিতে বীর্য সেচন করে ( পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন ) পিতা তার কন্যাকে প্রাপ্ত করেন - উৎপন্ন করেন - পুত্র প্রাপ্ত করেন না, তখন ( স্বাধ্যঃ-দেবাঃ-ব্রহ্ম জনয়ন ) দূরদর্শী বিদ্বান জ্ঞানকে - গৃহস্থ জ্ঞানকে নিয়মকে প্রকট করেন, ঘোষিত করেন ( বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন ) সেই কন্যাকে গৃহপতি - ঘরের স্বামী রূপে পিতৃকর্মের রক্ষিকা নির্ধারিত করেন।

ভাবার্থ — যদি পুরুষের স্ত্রী সহবাস অর্থাৎ বীর্যসেচন করার পর পুত্রকে না প্রাপ্ত করে কেবল কন্যাকে প্রাপ্ত করে, তখন সেই কন্যা পিতৃকর্মের রক্ষিকা তথা পিতার ঘরের সম্পত্তির স্বামী হয়। বেদের পরম্পরা এবং বৈদিক বিদ্বানদের মান্যতা হল এটা।

বেদের স্বাভাবিক (অর্থ) কেবল আধিদৈবিকই হয়, বাকি দুই প্রকারের ভাষ্য ভাষ্যকারীর রুচি ও যোগ্যতার উপর নির্ভর করে আর সেগুলো থেকে সমাজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ লাভ করে। এই দুই বিদ্বানই আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক ভাষ্য করেছেন। আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর আধিদৈবিক ভাষ্য সাধারণ স্তরের, তবুও আক্ষেপকারীর আক্ষেপকে নির্মূল করতে সক্ষম আছে। এই বিদ্বানদের ভাষ্য পড়ে কোনো সাধারণ বুদ্ধির মানুষও এই মন্ত্রগুলোর উপর কোনো আক্ষেপ করতে পারবে না। এই মন্ত্রগুলোর বাস্তবিক বিজ্ঞানের বোধ কেবল আমার বেদভাষ্য থেকেই হওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে বেদের মধ্যে এমন ভাষায় উপদেশ কেন দেওয়া হয়েছে, যা থেকে নানা প্রকারের অবাঞ্ছিত যৌন সম্পর্কের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় অর্থাৎ কিছু মন্ত্রের এমনও অর্থ হতে পারে, যা অশ্লীল হবে? এর উত্তর জানার জন্য বেদ তথা ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে হবে। বেদ সেই ভাষায় আছে, যে ভাষা বেদের উৎপত্তি অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে চার ঋষির দ্বারা আকাশ থেকে বৈদিক ঋচার রশ্মিকে গ্রহণ করার পূর্বে এই পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল না।

বেদের তুলনা পৃথিবীর অন্য কোনো গ্রন্থের সাথে করা যায় না। পৃথিবীর অন্য সব গ্রন্থ সেই ভাষায় লেখা হয়েছে, যে ভাষা সেই গ্রন্থগুলো লেখার পূর্বে পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, কোরআন লেখার পূর্বে আরবি ভাষা আরবে প্রচলিত ছিল। আরবি ভাষা আরবদের কথ্য-ভাষা ছিল। একইভাবে অন্যান্য সব গ্রন্থের ক্ষেত্রেও এটাই বুঝুন, কেবল বেদই হল এর ব্যতিক্রম।

সারমর্ম হল অন্যান্য গ্রন্থের ভাষাগুলো সংসার থেকে সেই গ্রন্থগুলোতে গেছে। কিন্তু বেদ থেকে সংসারে ভাষা ও জ্ঞান উভয়েরই উদ্ভব হয়েছে। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে যে শব্দগুলো বিদ্যমান আছে, সেগুলো সেই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, যে অর্থে সেগুলো সেই অঞ্চলে বলা হয়, অথচ বেদের মধ্যে এমনটা আবশ্যক নয়। এই কারণে সংসারে প্রচলিত অর্থ দেখে বৈদিক পদের অর্থ করা আনাড়ি কাজ হবে, যেটা বেশিরভাগ ভাষ্যকার করেছেন। বৈদিক শব্দগুলোর অর্থের বোধ শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নিরুক্ত ও নিঘন্টুর আধারেই হওয়া সম্ভব। এরমধ্যেও এই বিষয়টা ধ্যানে রাখতে হয় যে বেদের পদগুলো শুধুমাত্র য়ৌগিকই হয়, রূঢ় নয়।

আমি এখানে শব্দের তিনটা প্রকার স্পষ্ট করবো -

১. রূঢ় - এমন শব্দ, যা কোনো প্রকৃতি-প্রত্যয়ের নিশ্চয়তা ছাড়াই সমাজে প্রচলিত হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, 'খাট' শব্দটা চারপাই (খাট) বোঝাতে সমাজে ব্যবহৃত হয়। এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই।

২. য়োগরূঢ় - এমন শব্দ, যা নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয়, কিন্তু সেগুলো কোনো বিশেষ বস্তুর জন্যই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, নীরজ, বারিজ আদি। এগুলোর অর্থ হল- জলে উৎপন্ন বস্তু, কিন্তু জলে উৎপন্ন প্রত্যেকটা পদার্থ, উদ্ভিদ বা প্রাণীকে নীরজ অথবা বারিজ বলা যায় না, শুধুমাত্র কমলের জন্যই এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।

৩. য়ৌগিক - যেসব শব্দ নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয় অথবা যেগুলোর অর্থের ভিত্তিতে তাদের ব্যাখ্যা করা যায়। এই শব্দগুলো কোনো বিশেষ পদার্থের জন্য কখনও ব্যবহৃত হয় না, বরং প্রসঙ্গ অনুযায়ী অনেক পদার্থের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, 'অগ্নি' পদ প্রকৃতি-প্রত্যয় থেকেও উৎপন্ন হয়। এছাড়া মহর্ষি য়াস্ক নিরুক্তের মধ্যে এর বিস্তারিত নির্বচন করেছেন। প্রসঙ্গ অনুসারে এর অনেক অর্থ হওয়া সম্ভব, যেমন- প্রাণ, তাপ, বিদ্যুৎ ও আলো আদিতে যুক্ত পদার্থ, রাজা, সেনাপতি, বিদ্বান, আত্মা ও পরমাত্মা। বেদের মধ্যে সমস্ত পদ এই প্রকারের হয়, এই কারণে বৈদিক পদের কেবল এক প্রকারেই অর্থ করা অজ্ঞানতা হবে। বেদের মধ্যে 'অগ্নি' পদ দেখে মানুষ সমাজে আগুনে 'অগ্নি' নাম দিয়েছে, কারণ আগুনের মধ্যে তাপ ও আলো আদির গুণ বিদ্যমান থাকে।

একইভাবে বেদের (ঋগ্বেদ ৩.২৭.৪) মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' শব্দটি আছে। এর বিষয়ে শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৪.৩.৯ মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য লিখেছেন-

'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্ শিশ্নম্ হীদম্ শিশ্নিনম্ ভূয়িষ্ঠম্ শোচয়তি ।'

এখানে 'কেশ' শব্দের বিষয়েও জানা আবশ্যক। নিরুক্ত ১২.৩৬ মহর্ষি য়াস্ক লিখছেন-

'কেশা রশ্ময়ঃ'
তৈত্তিরীয় সংহিতার (৭.৫.২৫.১) মধ্যে বলা হয়েছে-

'রশ্ময়ঃ কেশাঃ'
এইভাবে শিশ্ন সেই বস্তুকে বলা হয়, যার রশ্মি তেজস্বী হয়। এইভাবে যে কোনও নক্ষত্র, যার মধ্যে আমাদের সূর্যও সম্মিলিত আছে, শোচিষ্কেশ নামে পরিচিত হবে। এর কারণ হল তাদের রশ্মিগুলো তেজস্বী হয়।

'শোচিষ্কেশ' -এর মধ্যে 'শুচ্' ধাতু শোক করার অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং 'শোচতি জ্বলতিকর্মা' (নিঘন্টু ১.১৬) থেকে জ্বালাতে ও তেজস্বী হওয়ার অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই থেকেই 'শোচিষ্কেশ'-এর অর্থ নক্ষত্র প্রমাণিত হয়। এইভাবে 'শিশ্ন' -এর অর্থও নক্ষত্র হয়। এখানে 'শোচিষ্কেশঃ'-এর মধ্যে বহুব্রীহি সমাস মানলে এই অর্থ হয়। যদি এখানে কর্মধারয় সমাস মানা হয়, তাহলে তেজস্বিনী কিরণই 'শোচিষ্কেশ' এবং শিশ্ন বলা হবে তথা নক্ষত্রকে শিশ্নিন যুক্ত বলা হবে। 'শিশ্ন'-এর অন্য নির্বচন মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে করেছেন - যেটা শিশ্নযুক্তকে প্রভূত মাত্রায় প্রকাশিত করে। এর অর্থ হল শিশ্নী নক্ষত্র বলা হবে, কারণ নক্ষত্রকে তার শিশ্নরূপী কিরণই প্রকাশিত করে অর্থাৎ দর্শায়।

এখানে 'শিশ্ন' শব্দ, যেটা বেদের মধ্যে সূর্য বা সূর্যের কিরণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটা দেখে মানব সমাজ পুরুষেন্দ্রিয়েরও 'শিশ্ন' নাম সেই সময় রাখে, যখন তার কোনো নাম ছিল না অর্থাৎ সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে। পুরুষের উপস্থও মানুষকে সন্তান উৎপন্ন করার চিন্তায় যুক্ত করে আর কামুক পুরুষদের এই ইন্দ্রিয়ই অন্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় সর্বাধিক দুঃখী ও অস্থির করে তোলে। এখানে 'শুচ্' ধাতু শোক করা অর্থেও ব্যবহৃত হয় আর জ্বালানো অর্থে গ্রহণ করলে কামাগ্নির প্রচণ্ডতা সর্বজনবিদিত।

এখন এখানে সুলেমান রিজভীর মতো বেদবিরোধী বলবেন যে বেদের মধ্যে সূর্যকিরণ বা সূর্যের জন্য 'শিশ্ন' বা 'শিশ্নী'-র প্রয়োগ কেন হয়েছে? এই মূর্খতাপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত রিজভী মহাশয় বুঝে গেছেন। এখানে শতপথ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতির পূর্বভাগ 'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্' লোকপ্রচলিত শিশ্নের জন্য না হয়ে কেবল নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই কথা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, বেদের পাশাপাশি শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' এবং 'শিশ্ন' পদ পুরুষের উপস্থের জন্য নয়, বরং নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ধৃতির কিছু অংশের সাদৃশ্য থেকে সমাজে পুরুষেন্দ্রিয়ের নাম শিশ্ন রেখে দেওয়া হয়।

একইভাবে "য়োনিঃ শব্দ বেদের মধ্যে অন্তরীক্ষের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটা উদাহরণ মন্ত্র আছে -

য় ঈম্ চকার ন সো অস্য বেদ য় ঈম্ দদর্শ হিরুগিন্নু তস্মাৎ । স মাতুর্য়োনা পরিবীতো অন্তর্বহুপ্ৰজা নির্ঋতিমা বিবেশ ॥ (ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩২)

এর ব্যাখ্যায় নিরুক্তকার মহর্ষি য়াস্কের উক্তি হল—

"য়োনিরন্তরিক্ষম্ মহানবয়বঃ পরিবীতো বায়ুনা।'
অর্থাৎ অন্তরীক্ষকে (আকাশ) য়োনি বলা হয়, যার খুব বড় অংশ বায়ু দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে। এই পদ 'য়ু মিশ্রণেऽমিশ্রণে চ' ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই পদ বেদের মধ্যে য়ৌগিক শব্দ হয়, যা অন্য আরও কিছু পদার্থের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকেই লোকসমাজে স্ত্রীর জননেন্দ্রিয়ের জন্যও এই শব্দ প্রচলিত হতে শুরু করে। তার পূর্বে এই অঙ্গের কোনো নামই ছিল না, কারণ সংসারে ভাষার উৎপত্তি বেদ থেকেই হয়েছে। এই অঙ্গও মাংসপেশী, রক্তনালী, স্নায়ু আদি দ্বারা আচ্ছাদিত থাকার কারণে য়োনি নামে পরিচিত হয়। মূলত এই শব্দ আকাশ আদির জন্য হয়, বিশেষ করে বেদ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের মধ্যে।

এখন যদি কোনো কামুক ব্যক্তি বেদাদি শাস্ত্রের মধ্যে শিশ্ন ও য়োনি শব্দ দেখা মাত্র তাতে অশ্লীলতার অভিযোগ করে, তাহলে সেই অশ্লীলতা তার মস্তিষ্কে ভরা আছে, শাস্ত্রের মধ্যে নয়। কোনো গ্রন্থের মধ্যে শরীর ক্রিয়াবিজ্ঞানের প্রসঙ্গে যদি লোকপ্রচলিত শিশ্ন ও য়োনি বাচক শব্দও থাকে, তাহলেও সেটা বিজ্ঞানের বিষয় হবে, অশ্লীল কথা নয়। অনেক অশ্লীলতা তো ভাষ্যকারদের মনে ভরা ছিল আর বাকিটা সুলেমান রিজবীদের মতো মানুষদের মন পূরণ করে দিয়েছে। যদি এনার মধ্যে একটুও বুদ্ধি থাকে, তাহলে এনার অশ্লীলতা দেখার অশ্লীল বৃত্তি এই সমাধানের মাধ্যমে দূর হয়ে যাবে।

এখন আমি বেদের মধ্যে ব্রহ্মচর্যের বিধানকারী কিছু মন্ত্র এখানে উদ্ধৃত করবো -
১. অপক্ষাঃ পক্ষিণশ্চ য়ে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ। (অথর্ববেদ. ১১.৫.২১)
পশু আর পাখিও ব্রহ্মচর্য পালন করে অর্থাৎ তারা ঋতুগামী হয়।

২. ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্য়েণ দেবেভ্যঃ স্বরাভরৎ। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ঐশ্বর্যবান রাজা ব্রহ্মচর্যের সাধনাতেই সমস্ত দেবতাদের তেজস্বী বানান। এর অর্থ হল যে রাষ্ট্রের রাজা জিতেন্দ্রিয় হন, সেই রাষ্ট্রে সমস্ত বিদ্বান বিদুষী, মাতা-পিতা, কৃষক, চিকিৎসক, সৈনিক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক, বণিক আদি সমস্ত প্রজা জ্ঞান আর আনন্দে যুক্ত হয়।

৩. তৎ কেবলম্ কৃণুতে ব্রহ্ম বিদ্বান্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১০)
জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বামী কেবল ব্রহ্মচর্যপূর্বকই হওয়া সম্ভব।

৪. তস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে সমোতাঃ। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচারী অর্থাৎ জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির মধ্যেই সকল দিব্য গুণ বাস করে।

৫. তানা তিষ্ঠতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ ১১.৫.১১)
ব্রহ্মচর্যপূর্বক অনুসন্ধানকারীই কেবল রশ্মির মতো সূক্ষ্ম পদার্থের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

৬. তান্ সর্বান্ ব্রহ্ম রক্ষতি ব্রহ্মচারিণ্যাভৃতম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.২২)
ব্রহ্মচারীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিজ্ঞানই সকল প্রাণীর রক্ষা করতে পারে, যখন বিষয়ী (ভোগী) মানুষের বিজ্ঞান সকলের বিনাশকারী হয়।

৭. তে রক্ষতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ১১.৫.৮)
ব্রহ্মচারী বিদ্বানই কেবল নিজের তপ আর সাধনার দ্বারা পৃথিবী আর সূর্যের রক্ষা করতে পারে। এর অর্থ হল, এমন বিদ্বান ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোনো প্রকারের অশুভ রশ্মি নির্গত না করে সর্বদা সাত্ত্বিক রশ্মির দ্বারা সকল পদার্থকে সুষম করতে নিজের ভূমিকা পালন করে।
 
৮. ব্রহ্মচর্য়েন কন্যা য়ুবানম্ বিন্দতে পতিম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৮)
ব্রহ্মচর্য পালন করেই কেবল কন্যা যুবক ব্রহ্মচারীকে স্বামী হিসেবে বরণ করে।
 
৯. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা দেবা মৃত্যুমপান্ত। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কেবল বিদ্বান লোকেরা মৃত্যু অর্থাৎ দুঃখকে জয় করতে পারে।
 
১০. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা রাজা রাষ্ট্র বি রক্ষতি। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৭)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কোনো রাজা নিজের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে, অন্যথায় রাজা রাষ্ট্রের সেই প্রকার বিনাশ করে দেয়, যেমন আজ সংসারের বিনাশ হচ্ছে।

১১. ব্রহ্মচারী ব্রহ্ম ভ্রাজদ বিভর্তি। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচর্য পালন করে বিদ্বান ব্যক্তিরা বেদাদি শাস্ত্রের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক বিদ্যা অর্জন করতে পারেন।

বেদের এই আদেশ ও উপদেশগুলো মাথায় রেখেই ভগবান মনু মনুস্মৃতির মধ্যে স্পষ্টভাবে লিখেছেন-

অর্থকামেষ্বসক্তানাম্ ধর্মজ্ঞানম্ বিধীয়তে। ধর্মজিজ্ঞাসমানানাম্ প্রমাণম্ পরমম্ শ্রুতিঃ॥ (মনুস্মৃতি ২.১৩)

অর্থাৎ অর্থ ও কামে আসক্ত ব্যক্তি কখনও ধর্মের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারবে না, অর্থাৎ সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবে, বরং সে পদার্থ বিজ্ঞানকেও সূক্ষ্ম স্তরে গিয়ে জানতে পারবে না। এই উভয় প্রকারের বিদ্যার জন্য বেদই হল পরম প্রমাণ, যাকে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমেই ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

বায়ু তত্ত্ব

বায়ু তত্ত্ব হল আকাশ তত্ত্বের পৃষ্ঠরূপ [ অয়ম্ বায়ুরন্তরিক্ষস্য পৃষ্ঠম্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.২৫২)] , এখানে এর দুটো অর্থ আছে। এরমধ্যে প্রথম ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ