ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

29 March, 2024

শ্রীরাম

29 March 0

শ্রীরাম


মহাপ্লাবনের পর তিব্বতের দেবলোকে পরিশ্রমী দেবতারা বসবাস করতে থাকেন এবং অন্যান্য অঞ্চল যে সকল স্থান জলমগ্ন ছিলো না সেখানে কিছু মনুষ্য বসবাস শুরু করেন। দেবাভূমিতে যারা উন্নতি করছিলেন ও পরিশ্রমী ছিলেন তাঁরা বাদে যে সমস্ত ভায়েরা পরিশ্রমী ছিলেন না বা উন্নতি করতে পারছিলেন না তাঁরা বৃদ্ধ ব্রহ্মাজীর সাথে পরামর্শের পর তাঁর নির্দেশ মতো দক্ষিনের ছোট বড় দ্বীপ গুলিতে বসবাস করার জন্য দেবলোক ত্যাগ করে, চলে আসেন।

দ্বীপ গুলির রক্ষক এই সকল দেবতাদের বংশধরেরা ছিলেন ! রক্ষক শব্দ পরে বিকৃত হয়ে রাক্ষস অর্থাৎ মানুষরূপী মাংসভুক প্রাণী হয়ে যায়। সেই সময় "রাক্ষস" খারাপ শব্দ মনে করা হতো না কিন্তু হাজার বছর পর বন্য মানুষ দেখে তারাও খারাপ কাজ করতে শুরু করেন এমনকি মাংস খেতে শুরু করে পরে পরে এরা মানুষের মাংসও খাওয়া শুরু করে ফলতঃ তাদের শরীরে পরিবর্তন আসতে থাকে। ধীরে ধরে তারা সেই দ্বীপগুলিতে কয়েক হাজার বছর বসবাস করে। ততক্ষণে দেবলোকের অন্তর্গত পৃথিবীও শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষ সেখানেও বসবাস শুরু করে এবং কঠোর পরিশ্রমীরা উন্নতি করতে থাকেন। আর্যবর্ত্ত দেশ ছিল সেইসব মানুষের আদি নিবাস, এই আর্যবর্ত্তের এক বিশাল অংশ যা আজ ভারতবর্ষ নামে পরিচিত। এই ভারতবর্ষের দক্ষিণে অসুরদের বাস ছিল।

এই অসুর বংশের এক রাজা ছিলেন বিদ্যুৎকেশ ও তাঁর রাণী ছিলেন ভোগ-বিলাসে নিমগ্না সালকটদক্টা। রাণী সালকটদক্টা কাউকে পরোয়া করতেন না, তিনি ভোগ-বলাসের জন্য সেবকদের তাঁর সদ্যোজাত পুত্র কে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন, তাঁরা সেই শিশুকে পর্বতের এক অংশে ফেলে আসেন। সেই সময় কৈলাশপতি শঙ্কর ও দেবী পার্বতী নিজেদের বিমানে করে ভ্রমণ করতে করতে বিদ্যুৎকেশের পুত্র কে দেখতে পায়। পার্বতী জী শিশুটিকে তাঁদের নিবাস-স্থান কৈলাসে নিয়ে গিয়ে লালন-পালন করতে থাকেন ও শিশুর নাম "সুকেশ" রাখেন। বিদ্যুৎকেশের পুনঃ পুত্র না হওয়ায় দুঃখী হতে থাকেন, সুকেশ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে একসময় শঙ্কর জী সুকেশকে তাঁর আসল পরিচয় অবগত করিয়ে এক বিমান উপহার দিয়ে তাঁর পিতার কাছে পাঠিয়ে দেন। সুকেশ বলশালী ও বুদ্ধমান এবং শঙ্কর-পার্বতী জী দ্বারা পালিত ও তাঁর নিকট বিমান থাকার কারনে ক্রমশ অহঙ্কার বাড়তে থাকে। সুকেশের তিন পুত্র উৎপন্ন হয় যথা মাল্যবান, মালী ও সুমালী। 

তিন ভাই অত্যন্ত বলশালী তাঁরা ঘোর তপস্যা ও শাস্ত্র অভ্যাস করার কারনে নিজেদের অতিশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মানতে থাকে এবং এক সময় আসে যখন দেবতা, গন্ধর্ব ও মানব আদি সব এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হতে থাকে। এদের পিতা সুকেশ, শঙ্করজীর খুব প্রিয় থাকার কারনে অন্যরা তিন ভায়ের কেউ বিরোধ করতেন না। বেশ কিছু জন মিলে শঙ্করজীর কাছে সুকেশের সন্তানদের বিষয়ে অবগত করানোর জন্য কৈলাশে গেলেও শঙ্করজী তাদের সাহায্য করতে পারবেন না জানিয়ে দেন কারন সুশেক পার্বতীজীর খুব প্রিয়। শঙ্করজী বলেন তারা যেন নিজেরা পার্বতীজীর নিকট গিয়ে সব কথা জানান।

এদিকে পার্বতী জী যখন জানতে পারেন সুকেশের বিরূদ্ধে সকলে অভিযোগ নিয়ে এসেছেন তখন তিনি তাদের সাথে দেখা করতে অস্বীকার কারেন। পুনঃ শঙ্করজী সকলকে দেব লোকের রাজা ইন্দ্রের ছোট ভাই শ্রী বিষ্ণুর নিকট যেতে বলেন, দুখীজন সাগরপতি শ্রীবিষ্ণুর নিকট প্রস্থান করেন। 

বিষ্ণু তাঁর পত্নী লক্ষী দেবীর সাথে মহাসাগরের কোন দ্বীপে বসবাস করতেন। সমস্ত বৃত্তান্ত শোনার পর বিষ্ণু রাক্ষসদের ওপর আক্রমণ করার ঘোষণা করেন। ষোষণা শোনার পর কোন প্রতীক্ষা না করেই রাক্ষসরা প্রথমেই বিষ্ণুলোক আক্রমণ করেন। বিষ্ণুজী রাক্ষসদের ওপর দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করতে থাকেন এবং বিশাল যুদ্ধ শুরু হয়। দিব্যাস্ত্রের প্রয়োগে বিশাল রাক্ষস সেনা গাজর-মুলার মতো কাটা পড়ে মারা যেতে থাকে। সমস্ত রাক্ষসদের সমূলে বিনাশের জন্য বিষ্ণুজী এবার লঙ্কাপুরী যা অজেয় মানা হতো সেখানে আক্রমণ করেন এবং সেখানে সুদর্শন চক্রের আঘাতে মাল্যবান ও মালী মারা যায়।

তাঁদের মৃত্যু দেখে যে কিছু রাক্ষস বেঁচে ছিলো তাঁরা লঙ্কাপুরী ছেড়ে চলে যায় এবং লঙ্কাপুরী জন শুন্য হয়ে যায়। জন শুন্য লঙ্কাপুরীতে দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি পুলস্ত্যের পৌত্র বৈশ্রবণকে ওখানের লোকপাল নিযুক্ত করেন। বৈশ্রবণ অতি বলবান, তেজময় তথা জ্ঞানবান ছিলেন তিনি লঙ্কাপুরীতে বসবাস করতে থাকেন ও রাজ্য চালনা করতে থাকেন। এই বৈশ্রবণ পরে পরে কুবের নামে বিখ্যাত হয়ে ছিলেন। 

পাতাল লোকে জঙ্গল এবং হিংস্র প্রাণীতে ভর্তি ছিলো বনবাসী সর্বথা নবীন ছিলেন। রাক্ষসরা জানতে না কি খাওয়া সঠিক হবে আর কি খাওয়া অনুচিত হবে ? সুমালী তাঁর পিতার বিমান কে বাচিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়ে ছিলেন। সেই বিমানে করে ঘুরে খোঁজ করে নিয়ে ছিলেন কোথায় ফল-মূল যুক্ত বৃক্ষ বেশী রয়েছে, এবং পান যোগ্য জল আর কোথায় কৃষি উপযুক্ত ভূমি রয়েছে সেখানে সজাতিদের বসতি স্থাপনে সফল হয়ে ছিলেন। সব কিছু থাকা সত্ত্বেও লঙ্কাপুরীর মতো সমৃদ্ধি সেখানে ছিলো না। সুদর্শন চক্রের আগুনে তার পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। কিছু রাক্ষস তাদের স্ত্রী এবং পরিবারকে বাঁচাতে ও তাদের নিয়ে যেতে সক্ষম হয়ে ছিলেন।

সুমালী পুনঃ বিবাহ করে এক কন্যা সন্তান প্রাপ্ত হয়। ধীরে ধীরে কিছু রাক্ষস নিজ অবস্থায় দুঃখী হওয়ায় তারা লঙ্কায় গিয়ে বসবাস করতে থাকে। দেবতা ও মনুষ্যষের পক্ষে লঙ্কা বসবাস যোগ্য ছিলো না তাই কুবের তাদের পুনরায় লঙ্কাতে বসবাসের কোন বাধা দিলো না এবং লঙ্কার জন সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এইসময় রাক্ষসদের পুনরায় লঙ্কাতে যেতে দেখে সুমালীর মনে লঙ্কাতে গিয়ে থাকার ইচ্ছা হতে থাকে কিন্তু যে খানে সে একসময় রাজা ছিলো সেখানে সে সাধারন প্রজা হিসেবে থাকতে অনিচ্ছুক ছিলো। কিন্তু মনে এক বিচার আসে যে তার কন্যার বিবাহ যদি লঙ্কা অধিপতি কুবেরের সাথে দিতে পারে তবে সে নিশ্চয় সেই রাজ্যের এক অধিকারী হতে পারে। অতঃ বিমানে তাঁর কন্যাকে নিয়ে লঙ্কা পৌঁছান।

কিন্তু রাজপ্রাসাদে গিয়ে সুমালী জানতে পারেন কুবের বিবাহিত ও তার পত্নী অধিক সুন্দরী। সুমালী তার নিবাস-স্থানে ফিরে চিন্তা করেন যদি কুবেরের পিতার সাথে তার কন্যার বিবাহ দিতে পারেন তবে তার দ্বারা লঙ্কায় অধিকার জমাতে পারবেন। এই বিচার মনে আসায় তিনি বিমানে করে দেবলোকে ঋষি বিশ্রবার (বিশ্বশ্রবা) আশ্রমের সামনে পৌঁছান। অধিক তেজ্বস্বী ঋষিকে এক বৃক্ষের নীচে আসনে স্বাধ্যায় করতে দেখে সুমালী বিমানে ফিরে আসেন এবং তার কন্যা কৈকসীকে তার মনে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কৈকসী (অন্য নাম নিকষা) ঋষিকে দেখার পর তাঁর নিকট গিয়ে উপস্থিত হন এবং ঋষিপুত্র কুবেরের ন্যায় এক সন্তান পেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ঋষি কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষন চিন্তা করে তাকে পত্নীরূপে স্বীকার করে নেন।

মুনি বিশ্রবার প্রথম পত্নী রৌহিণী যিনি কুবেরের মাতা, রৌহিণী বিশ্রবার আশ্রম থেকে কিছু দূরে বাস করতেন এবং বিশ্রবা পুনঃ বিবাহের পর ব্রহ্ম ঋষি বিশ্রবার ঔরসে কৈকসীর গর্ভে চার সন্তান উৎপন্ন হয়। প্রথম সন্তান এক বলশালী বুদ্ধিমান পুত্র, যার উচিত সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার পর নাম রাখা হয় "দশগ্রীব"। যিনি পরে রাবণ নামে বিখ্যাত হয়ে ছিলেন। দ্বিতীয় পুত্রের শরীর বিশালাকার হওয়ার কারনে কুম্ভকর্ণ নাম রাখা হয়। তৃতীয় সন্তান এক সুন্দরী কন্যা যার নাম রাখা হয় শূর্পণখা। কৈকসীর চতুর্থ সন্তান বিভীষণ যিনি অধিক সুন্দর ও মধুর স্বভাব যুক্ত এবং ঈশ্বরভক্ত ছিলেন।

বিভীষণ পিতার নিকট সহজেই শাস্ত্রের জ্ঞান প্রাপ্ত হন এবং হয়গ্রীব ও কুম্ভকর্ণ শাস্ত্র অধ্যয়নের চেয়ে খেলাধুলা বেশী পছন্দ করতেন। হয়গ্রীব যখন আঠারো বছরে উপনীত হয় তখন সুমালী তাঁর কন্যার সাথে তাঁদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ কারার জন্য হয়গ্রীব এবং কুম্ভকর্ণকে ব্রহ্মলোকে শিক্ষা দেওয়ার বিচার করতে থাকেন। হয়গ্রীব (রাবণ) এবং কুম্ভকর্ণকে ব্রহ্মলোকে শিক্ষার জন্য মনের দিক থেকে তৈরী করতে থাকেন। রাক্ষসদের সন্তান হওয়ার জন্য বাস্তবে রাবণ যে লঙ্কার রাজা এটা সুমালী দ্বারা বুঝতে পারেন এবং রাজ পদের জন্য অর্থাৎ কুবেরকে পরাস্ত করার জন্য নিজেও ব্রহ্মলোকে শিক্ষার জন্য প্রস্তুত হন কিন্তু দেবতা ছাড়া অন্য কেউ ব্রহ্মলোকে শিক্ষা লাভ করতে পারতো না, সেই কারনে পিতা বিশ্রবা মুনি দ্বারা ব্রহ্মাজীকে দেওয়া পত্র নিয়ে দুই ভাই ব্রহ্মলোকে শিক্ষা লাভের জন্য পৌঁছেছিলেন। যদিও প্রথমে ব্রহ্মলোকে খুব ঠান্ডা হওয়ার কারনে কুম্ভকর্ণ আসতে আগ্রহ ছিলেন না।

পাঁচ বছর কঠোর শিক্ষা গ্রহণ করায় দুই ভাই যুদ্ধবিদ্যায় নিপুন হয়ে ওঠেন। এই সময়ে দশগ্রীব বেদাদি শাস্ত্রওে জ্ঞান অর্জন করায় ব্রহ্মাজী খুব প্রসন্ন হন, শিক্ষা লাভের পর প্রসংসা পত্র নিয়ে দুই ভাই প্রথমে পিতা মাতার দর্শন করেন পরে নানা সুমালীর কাছে চলে আসেন, সেখানে নানার নিকট লঙ্কার পূর্ণ ইতিহাস জানতে পারেন। সুমালীর পথ নির্দেশ মতো দশগ্রীব (রাবণ) পিতার নিকট গিয়ে বলেন তিনি শিক্ষা প্রাপ্তের পর এখন কোন রাজ্যের রাজা হওয়ার যোগ্য হয়েছেন এবং বড় ভাই কুবেরকে বলতে বলেন যেন রাবণকে লঙ্কাপুরীর ভার দিয়ে দেন। বিশ্রবা শুনে রাবণকে পরামর্শ দেন যেন রাবণ কুবেরের কাছে থেকে রাজকার্যে সহায়তা করেন এবং পরে নিজ যোগ্যতায় কুবেরের চেয়ে অধিক মান-প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা করেন।  


     

    

continue>

তথ্যসূত্রঃ পুস্তক "শ্রীরাম", লেখক-গুরদত্ত, বাল্মীকি রামায়ণ 

Read More

19 March, 2024

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬/৯

19 March 0

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬/৯
ন তস্য কশ্চিৎ পতিরস্তি লোকে ন চেশিতা নৈব চ তস্য লিঙ্গম্।

স কারণং করণাধিপাধিপো ন চাস্য কশ্চিজ্জনিতা ন চাধিপঃ ॥৯৷

পদার্থঃ (লোকে) এই জগতে (তস্য) সেই পরমাত্মার (কশ্চিৎ) কোনো (পতিঃ) স্বামী, রক্ষক (ন অস্তি) নেই (চ) এবং (ঈশিতা) নিয়ন্তা, শাসক (ন) নেই (চ) এবং (তস্য) তাঁর (লিঙ্গম) কোনো লিঙ্গ বা পরিচায়ক চিহ্নও (ন এব) নেই (সঃ) তিনি (কারণম্) জগতের কারণ এবং (করণাধিপাধিপঃ) সকল ইন্দ্রিয়ের স্বামী জীবেরও স্বামী (চ) এবং (অস্য) এঁর (কশ্চিৎ) কোনো শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্
(জনিতা) জনক, উৎপাদক (ন) নেই (চ) এবং (ন) নেই (অধিপঃ) অধিষ্ঠাতা, স্বামী ॥৯ ॥
সরলার্থঃ জগতে ওই পরমাত্মার কোনো স্বামী নেই এবং তাঁর কোনো নিয়ন্তা বা শাসক নেই। তাঁর কোনো লিঙ্গ বা পরিচায়ক চিহ্নও নেই, যা দ্বারা তাঁকে অনুমান করা যায়। তিনিই জগতের কারণ এবং সকল ইন্দ্রিয়ের স্বামী জীবেরও স্বামী; তাঁর কোনো জনক বা উৎপাদক নেই এবং কোনো অধিপতিও নেই ॥৯॥
ব্যাখ্যাঃ এই সংসারে পরমাত্মার কোনো প্রভু নেই, নিয়ন্তাও কেউ নেই। বরং পরমাত্মাই এই ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র স্বামী এবং সকলের শাসক। তিনিই তাঁর সুনির্দিষ্ট নিয়ম দ্বারা সবাইকে চালনা করেন এবং সবার ওপর প্রভুত্ব করছেন। তাঁর কোনো লিঙ্গ বা পরিচায়ক চিহ্ন নেই অর্থাৎ তিনি কীরূপ, তা কোনো চিহ্ন বা প্রতীক দ্বারা বোঝা সম্ভব নয়। তিনি এই সৃষ্ট জগতের মূল কারণ অর্থাৎ সৃষ্টির কারণভূত প্রকৃতিরও স্বামী ও নিয়ন্তা। সেই পরমাত্মার কোনো 'জনক' অর্থাৎ জন্মদাতা পিতা বা উৎপাদক নেই, এ কারণেই তিনি 'স্বয়ম্ভু'। যিনি কারো অধীন নন, সর্বকালে স্বতন্ত্র, নিত্য, অনাদি, অনন্ত, নিরাকার, নিরাধার, নির্বিকার, সর্বাধিপতি, সর্বনিয়ন্তা, সর্বোৎপাদক এবং সর্বশক্তিমান- তিনিই পরমাত্মা। তাঁর এই শাশ্বত স্বরূপই মুক্তিকামী জীবের জ্ঞাতব্য ॥৯॥
Read More

প্রাণায়াম

19 March 0

 << পূর্ববর্ত্তী পঞ্চমভাগ

ব্রহ্মচর্য

প্রাণায়াম (ষষ্ঠ ভাগ)
ভূমিকা
"প্রাণায়াম হচ্ছে ব্রহ্মচারীর প্রাণ" এটা সোলো আনা সত্য। প্রাণায়ামের সাধনা শ্রদ্ধাপূর্বক নিরন্তর দীর্ঘকাল অভ্যাস না করা পর্যন্ত পূর্ণরূপে সিদ্ধ হয় না আর বিনা ব্রহ্মচর্য পালন করে এর সিদ্ধির সফলতা প্রাপ্ত হয় না। যদি কেউ প্রাণায়ামের সাধনা না করে ব্রহ্মচর্য পালনে সফলতা প্রাপ্ত করতে চায় তাহলে সেটা এমন দুঃসাহস হবে যে যেমন কেউ বিন্দুকে ধরে আকাশে চড়তে চায়। অতঃ "প্রাণায়ামঃ পরমম্ তপঃ" অর্থাৎ প্রাণায়াম হল সর্বশ্রেষ্ঠ তপ, এমন রহস্যপূর্ণ বাক্য লিখে মনু জী আমাদের চক্ষু খুলে দিয়েছেন, কারণ তপ হচ্ছে ব্রহ্মচারীর ভূষণ। এইজন্য মহর্ষি দেব দয়ানন্দ জী দয়া করে আমাদের এই ভাবে সাবধান করে দিয়েছেন যে "কেউ রাজকুমার অথবা রাজকুমারী হোক অথবা কোনো দরিদ্রের সন্তান হোক, সবাইকে তপস্বী হওয়া উচিত।"
এইজন্য প্রত্যেক বালককে নিজের কল্যাণার্থ অনিবার্য রূপে ব্রহ্মচর্যের সাধনার জন্য তপ করতেই হবে। এটা ছাড়া অখণ্ড ব্রহ্মচর্যের পালন করা একদমই অসম্ভব, আর শরীর শুকনো করা বা খিদাতে মরার নাম তপ নয় কিন্তু ধর্মের কাজ করতে গিয়ে যেসব কষ্ট আসবে তাকে সহ্য করে নিরন্তর ধর্মাচরণ করাই হল তপ। এই তপ তো সাধারণত প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য আচরণে নিয়ে আসার তপ হয় কিন্তু যে ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হতে চাইবে তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ তপ প্রাণায়ামের সাধনা করতেই হবে। এইজন্য সকল আশ্রমবাসীকে প্রাণায়ামের অভ্যাস করার জন্য ঋষিরা আদেশ দিয়েছেন কিন্তু সর্ব আশ্রমের আধার ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মধ্যে সফলতা প্রাপ্ত করার জন্য প্রাণায়াম রূপী তপের আগুনে না তাপা পর্যন্ত কল্যাণ অথবা সফলতা নেই।

প্রাণ আর ব্রহ্মচারীর পরস্পর একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্বন্ধ আছে, এর উপর ছান্দোগ্য উপনিষদের আধারে মহর্ষি দয়ানন্দ জী সত্যার্থ-প্রকাশ গ্রন্থের মধ্যে প্রকাশ ফেলেছেন, তিনি লিখেছেন - ব্রহ্মচর্য তিন প্রকারের হয়, কনিষ্ঠ, মধ্যম আর উত্তম। কনিষ্ঠ ব্রহ্মচারীর জন্য এটা সত্কর্ত্তব্য যে ২৪ বছর পর্যন্ত জিতেন্দ্রিয় অর্থাৎ ব্রহ্মচারী থেকে বেদাদি বিদ্যা আর সুশিক্ষা গ্রহণ করবে আর বিবাহ করার পরও লম্পট হবে না, তাহলে তার শরীরে প্রাণ বলবান হয়ে সব শুভ গুণের বাস হবে আর ব্রহ্মচারীর শরীর তথা আত্মা আরোগ্য আর বলবান হবে।"

এর ফল এমন লেখা আছে যে - "বসু ব্রহ্মচারীর আয়ু ৭০ বা ৮০ বছর পর্যন্ত হবে। মধ্যম ব্রহ্মচর্য হল যারা ৪৪ বছর পর্যন্ত ব্রহ্মচারী থেকে বেদাভ্যাস করে, তাদের প্রাণ ইন্দ্রিয়, অন্তঃকরণ আর আত্মা বলবান হয়ে দুষ্টদের রোদন করায় আর শ্রেষ্ঠদের পালনকারী হয়। যেসব ব্রহ্মচারী প্রথম বয়ের মধ্যে তপশ্চর্যা করে তার এই রুদ্র রূপ প্রাণযুক্ত হয়ে এটা মধ্যম ব্রহ্মচর্য সিদ্ধ হবে। উত্তম ব্রহ্মচর্য ৪৮ বছর পর্যন্ত হয়। উত্তম ব্রহ্মচারীর প্রাণ অনুকূল হয়ে সর্বপ্রকার বিদ্যা গ্রহণ করে। যে আচার্য আর মাতা-পিতা নিজের সন্তানকে প্রথমে বিদ্যা ও গুণ গ্রহণের জন্য তপস্বী বানিয়ে সেই বিষয়েরই উপদেশ করেন, সেইসব সন্তান নিজেরাই তৃতীয় উত্তম অখণ্ডিত ব্রহ্মচর্যকে পূর্ণ করে, তাদের আয়ু পূর্ণ অর্থাৎ ৪০০ বছর পর্যন্ত প্রাপ্ত হয় আর যারা এই ব্রহ্মচর্যকে প্রাপ্ত করে সেটা নষ্ট করে না তারা সব ধরণের রোগ হতে রহিত হয়ে ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষকে প্রাপ্ত করে।"
উপরোক্ত লেখাতে আদর্শ ব্রহ্মচারী মহর্ষি দয়ানন্দ জী ব্রহ্মচারীকে তপস্যা করার জন্য আদেশ করেছেন আর তিন প্রকারের ব্রহ্মচারীদের ব্রহ্মচর্য দ্বারা যেসব ফল প্রাপ্তি হয় তারও উল্লেখ করেছেন। এরমধ্যে একটা কথা ধ্যান দেওয়া উচিত যে "প্রথম বসু ব্রহ্মচারীর শরীরে প্রাণ বলবান হয়ে সব শুভ গুণ বাস করে আর তার শরীর ও আত্মা নিরোগ তথা বলবান হয় অর্থাৎ সত্যিকারের বৈশ্য হয়। দ্বিতীয় রুদ্র ব্রহ্মচারীর প্রাণ, ইন্দ্রিয়, অন্তঃকরণ আর আত্মা বলবান হয় আর সেই রুদ্ররূপ প্রাণ দ্বারা যুক্ত হয়ে দুষ্টদের রোদন করাতে আর শ্রেষ্ঠদের পালন করার শক্তি প্রাপ্ত করে অর্থাৎ সত্যিকারের ক্ষত্রিয় হয়। তৃতীয় উত্তম ব্রহ্মচারী ৪৮ বছর পর্যন্ত অখণ্ডিত ব্রহ্মচর্যের পালন করে। তার প্রাণ তার অনুকূল হয় আর সে সর্বপ্রকার বিদ্যার ভাণ্ডার হয়ে যায়।

তার আয়ু পূর্ণ অর্থাৎ ৪০০ বছর পর্যন্ত প্রাপ্ত হয়। এই রকম অখণ্ড ব্রহ্মচারী যদি ব্রহ্মচর্যের ক্ষয় না করে তাহলে সে নিজের জীবনের অন্তিম লক্ষ্যকে অর্থাৎ পুরুষার্থ চতুষ্টয় ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ, জীবনের এই চারটা ফলকে সে প্রাপ্ত করে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ অখণ্ডিত ব্রহ্মচর্যের পালন করে পূর্ণ বিদ্বান হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তার প্রাণ অনুকূল হবে না, আর প্রাণ অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ আয়ু যার অবধি ৪০০ বছর বলা হয়েছে, প্রাপ্ত হবে না আর এই রকম দেব পুরুষই মৃত্যুকে জিতে মোক্ষ প্রাপ্ত করে। "ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা দেবা মৃত্যুমপাঘ্নত। ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্য়েণ দেবেভ্যঃ স্বরাভরত্", দেবতারা ব্রহ্মচর্য আর তপ না করে মৃত্যুকে জিততে পারবে না আর এই ইন্দ্র অর্থাৎ আত্মা নিজের ইন্দ্রিয়কে নিশ্চিত ভাবে ইহলৌকিক সুখ আর পরলৌকিক মোক্ষ আনন্দ তখনই প্রদান করতে পারবে যখন সে নিশ্চিত ভাবে সর্বোত্তম ব্রহ্মচর্যের পালন করবে। "দেবা অমৃতমানশানাঃ" দেবতারা অমৃতের ভোগ অর্থাৎ অমরপদের প্রাপ্তি করে। বেদের এই শিক্ষা এটাই সিদ্ধ করে যে দেবলোকে যাওয়ার জন্য দেব না হওয়া পর্যন্ত নির্বাহ হবে না। সেখানে দেবতারাই প্রবেশ করতে পারে আর দেবতা হওয়ার পূর্বে তো সর্বোত্তম ব্রহ্মচর্যের পালন করে ঋষি পদের প্রাপ্তি করতে হবে। "চতুর্বেদাদৃষিঃ, অত ঊর্ধ্বম্ দেবঃ" ব্রহ্মচর্য পালন করার সাথে চারটা বেদ সাঙ্গোপাঙ্গ পড়ার পর ঋষি পদের প্রাপ্তি হবে। দেবতাদের স্থান ঋষিদেরও উপরে আর এক-একটা বেদ পড়ার জন্য ১২-১২ বছর পর্যন্ত ব্রহ্মচর্য পালন করা অত্যন্ত আবশ্যক, তারপর ঋষিপদ পাওয়া যায় আর দেবপদ তো তার থেকেও উঁচুতে, অর্থাৎ সারা জীবন যে অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালন করার জন্য প্রচণ্ড তপশ্চর্যা করবে, সে-ই দেব হয়ে মৃত্যুকে জিতে মোক্ষকে প্রাপ্ত করবে। এই রকম আপ্ত পুরুষ দেব দয়ানন্দ ছিলেন। এইজন্য প্রাণের বসুরূপ, রুদ্ররূপ আর আদিত্যরূপকে প্রাপ্ত করার জন্য তিন প্রকারের ব্রহ্মচর্যের উপদেশ করা হয়েছে।
ঋষি দয়ানন্দ পুরুষের বিবাহের সর্বোত্তম সময় ৪৮ বছর বলেছেন, কারণ এই আয়ুতে সব সাঙ্গোপাঙ্গ বেদ তথা শরীরস্থ সব ধাতু পুষ্ট হয়ে পূর্ণত্বকে প্রাপ্ত করে। "পুরুষের যেমন সর্বোত্তম বিবাহের সময় ৪৮ বছর, তেমনই স্ত্রীদের ২৪ বছর। এমনও লেখা আছে যে এই সময়ের পশ্চাৎ যে ধাতুবৃদ্ধি হয় সেটা শরীরে থাকে না কিন্তু স্বপ্ন, ঘর্মাদি দ্বারা বাইরে বেরিয়ে যায়। অতঃ ৪৮ বছরের পর পুরুষ আর ২৪ বছরের পর স্ত্রীকে ব্রহ্মচর্য থাকা উচিত নয়", এই স্থানটা পড়ে অনেকবার ব্রহ্মচারী-প্রেমীদের সন্দেহ হয় যে - ২৪ বছর পর স্ত্রী আর ৪৮ বছর পর পুরুষের শরীরে যে বীর্যাদি ধাতু বাড়ে সেটা যখন শরীরের মধ্যে থাকবেই না আর স্বপ্ন, প্রস্বেদাদি দ্বারা বাইরে বেরিয়ে যাবে তাহলে ব্রহ্মচারী হয়ে কি লাভ? এই বিষয়ে অনেকবার ব্রহ্মচারী-প্রেমীরা সাক্ষাৎ করে তথা পত্র দ্বারা শঙ্কা করেছে, তারা মহর্ষি দয়ানন্দের যথার্থ তাৎপর্যকে না বুঝতে পেরে ভ্রমে পড়ে যায়। আসলে, উপরোক্ত কথাটা সামান্য ব্যক্তিদের বিষয়ে লেখা হয়েছে কিন্তু যারা সারা জীবন ব্রহ্মচারী থাকতে চায়, এই নিয়মটা তাদের জন্য নয়। এই নিয়ম তো বিবাহ করবে এমন পুরুষ আর স্ত্রীদের জন্য, "কিন্তু যারা বিবাহ করতেই নিচ্ছুক নয়, তারা আমরণ ব্রহ্মচারী থাকতে পারলে থাকুক - ভালো কথা।

কিন্তু এই কাজ পূর্ণ বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয় আর নির্দোষ য়োগী স্ত্রী-পুরুষের জন্য। কারণ কামবেগকে দমন করে ইন্দ্রিয় সমূহকে আত্মবশে রাখা খুবই কঠিন কাজ।" মহর্ষি দয়ানন্দ জীর অনেক ইচ্ছে ছিল যে তার সমান এইরকম সারাজীবন ব্রহ্মচারী হয়ে থাকা স্ত্রী আর পুরুষ সহস্র হোক। তিনি পুনাতে একটা বক্তৃতা দেওয়ার সময় সেই ইচ্ছাকে এইভাবে প্রকট করেছিলেন - "আর্য ধর্মের উন্নতির জন্য আমার মতো অনেক উপদেষক আপনার দেশে হওয়া উচিত। এইরকম কাজ একা কেউ ঠিকভাবে করতে পারবে না তবুও এটা দৃঢ় নিশ্চয় করে নিয়েছি যে নিজের বুদ্ধি আর শক্তির অনুসারে যা কিছু দীক্ষা নিয়েছি তা চালিয়ে যাবো।"
দেব দয়ানন্দের কত দৃঢ় ধারণা ছিল, তিনি তাঁর এই ইচ্ছাকে পুনরায় সত্যার্থ প্রকাশের মধ্যে এই বাক্যে প্রকট করেন - "যে পুরুষ বা স্ত্রী বিদ্যা, ধর্ম বৃদ্ধি আর সারা সংসারের উপকার করতেই ইচ্ছুক, তারা বিবাহ করবে না, যেমন পঞ্চশিখাদি পুরুষ আর গার্গী আদি স্ত্রী হয়েছিলেন।" উপরোক্ত প্রমাণ দ্বারা এটা সিদ্ধ হয় যে দেব দয়ানন্দ নিজের সমান দেশোপকারের জন্য সহস্র নৈষ্ঠিক অর্থাৎ আজীবন ব্রহ্মচারী আর ব্রহ্মচারিণি বানাতে চেয়েছিলেন, এইরকম অবস্থায় যদি ৪৮ বছরের পশ্চাৎ শরীরে বীর্যাদি ধাতুকে সুরক্ষিত না রাখা যেতে পারে তাহলে তিনি স্বয়ং কেন ব্রহ্মচারী হতেন আর নিজের সমান "ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা রাজা রাষ্ট্র বিরক্ষতি। আচার্য়ো ব্রহ্মচর্য়েণ ব্রহ্মচারিণমিচ্ছতে" এই বেদ মন্ত্রের অনুসারে ব্রহ্মচারীদের কামনা কেন করতেন। আসল কথা হল এই কাজটা সর্বশ্রেষ্ঠ কিন্তু খুবই কঠিন, তাই ঋষিবর লিখেছেন যে এই কাজ পূর্ণ বিদ্বান আর পূর্ণ য়োগীদের।
য়োগের আটটা অঙ্গ আছে আর সেই আটটার মধ্যে একটা অঙ্গ হল প্রাণায়াম, যাকে পরম তপ বলা হয়েছে আর প্রাণায়ামাদির সাধনা ছাড়া পূর্ণ য়োগী কেন সাধারণ ব্রহ্মচারীও হতে পারবে না। এইজন্য প্রাণায়াম হচ্ছে ব্রহ্মচারীর প্রাণ। সত্যার্থ প্রকাশের মধ্যে একটা শঙ্কা আছে যে "যারা ব্রহ্মচর্য থেকে সন্ন্যাস নিবে তাদের নির্বাহ কষ্টকর হবে, কামকে থামিয়ে রাখাও অতি কঠিন হবে, এইজন্য গৃহাশ্রম, বানপ্রস্থ হয়ে যখন বৃদ্ধ হয়ে যাবে তখনই সন্ন্যাস নেওয়া উচিত।" ঋষিবর এর উত্তর দিয়েছেন - "যারা নির্বাহ করতে পারবে না, ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না তারা ব্রহ্মচর্য থেকে সন্ন্যাস নিবে না কিন্তু যারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তারা কেন নিবে না? যে পুরুষ বিষয়ের ফলে দোষ আর বীর্য সংরক্ষণের গুণ জেনে গেছে, সে কখনো বিষয়াসক্ত হবে না, তার বীর্য বিচারাগ্নির ঈন্ধনবত্ হবে অর্থাৎ তার মধ্যেই ব্যয় হয়ে যাবে।"

এই বাক্যটা পূর্বোক্ত শঙ্কার পূর্ণ সমাধান করে দিয়েছে। যে ব্যক্তি প্রাণায়ামাদির সাধনা করে তার বীর্য স্বপ্ন আর প্রস্বেদাদির দ্বারা বাইরে বেরিয়ে আসে না, সে ঊর্ধ্বরেতা হয় অর্থাৎ তার বীর্য প্রাণায়ামের দ্বারা তার মস্তিষ্কের মধ্যে পৌঁছে যায় আর সেখানে বিচারাগ্নির জ্বালানি হয়ে তারমধ্যে ব্যয় হয় আর ব্রহ্মচারীর মস্তিষ্কের মধ্যে জ্ঞানের জ্যোতি প্রকাশিত হয়। বীর্যের একটা অণুও তার শরীর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে না। যেমন প্রদীপের তেল বাতির দ্বারা উপরে চড়তে থাকে আর সবকিছু প্রকাশিত করে, তেমনই আদিত্য ব্রহ্মচারী প্রাণায়ামের দ্বারা এই বীর্যকে মস্তিষ্কের মধ্যে পৌঁছে দিয়ে, সব বিদ্যার মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়ে সূর্যের সমান সংসারকে দেদীপ্যমান করে তোলে। যেভাবে এই পবিত্র আর্যাবর্তের মধ্যে "অষ্টাশীতি সহস্রাণি ঋষীণামূর্ধ্বরেতসাম্ বভূবুঃ" ৮৮ হাজার ঊর্দ্ধরেতা অখণ্ড ব্রহ্মচারী ঋষি হয়েছিল যারা এই এই ব্রহ্মচর্যের প্রতাপ দ্বারাই সারা বিশ্বের মধ্যে বেদের পবিত্র জ্ঞানের প্রকাশ করেছে আর প্রাণায়ামাদি অষ্টাঙ্গ য়োগ দ্বারা পূর্ণ য়োগী হয়ে ঊর্দ্ধরেতা পদবীকে প্রাপ্ত করেছে।
এইজন্য ব্রহ্মচারীর প্রাণ প্রাণায়ামকে গ্রহণ করে আমাদের দেশের বালক-বালিকারা সত্যিকারের ব্রহ্মচারী হতে সফল হোক, এই ভাবনার সঙ্গে ব্রহ্মচারীর প্রাণ "প্রাণায়াম" এই ছোট্ট পুস্তকটা পাঠকদের ভেট করছি।

- ওমানন্দ সরস্বতী
গুরুকুল ঝজ্জর
শিবরাত্রি ২০৩২ (বিক্রম সম্বত্)

প্রাণায়াম (ষষ্ঠ ভাগ)
প্রাণায়ামের গুরূত্ব
আজ মানুষের জীবন নিতান্ত নীরস আর ক্লেশপূর্ণ হয়ে গেছে। চতুর্দিকে ভয় আর আশঙ্কার মেঘে আকাশ মেঘলা হয়ে উঠেছে। মানুষের জীবনে সুখ শান্তির কোনো লক্ষণই দৃষ্টিগোচর হয় না। সারা বিশ্ব একটা ভয়ংকর অশান্তির আগুনে ধুধু করে জ্বলছে। জীবাত্মাকে সব লৌকিক সুখ প্রাপ্তি করার সাধন আর মোক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার সুন্দর বাহন রূপী এই শরীর বিভিন্ন ব্যাধির দ্বারা জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে। "শরীরম্ ব্যাধিমন্দিরম্" এই উক্তি স্পষ্ট রূপে চরিতার্থ হচ্ছে। আর্য সন্তান রাজযক্ষ্মা, (তপেদিক) শ্বাস-দমা, প্রমেহ, অর্শ, হৃদয়-রোগ, যকৃৎ-রোগ, উদর-রোগ তথা ভয়ংকর বাতের রোগে পীড়িত হয়ে গোঙাচ্ছে। রোগীদের চিৎকারে বায়ুমণ্ডল পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। বৈদ্য আর ডাক্তার ছায়ার মতো মানুষদের পিছু পিছু ছুটছে, কিন্তু এতসব চেষ্টার পরেও দেশের স্বাস্থ্য উন্নতির স্থানে দিন প্রতিদিন অবনতিই হচ্ছে। শরীরের সমান মনেরও অবস্থা হয়েগেছে, সবাই মানসিক রোগে পীড়িত আর কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ঈর্ষা, মদ, মৎসর আদি ভয়ংকর শত্রু আজ খুব বেড়ে গেছে।
কামের অগ্নি মানুষকে ভস্মসাত করছে, তবুও মানুষ অন্ধ হয়ে পতঙ্গের সমান এই বিষয়ের অগ্নিতে ঝাঁপ দিচ্ছে। শৃঙ্গারপূর্ণ জীবন, দূষিত শিক্ষা তথা অশ্লীল চলচ্চিত্র এই অগ্নিতে বায়ুর সমান কাজ করছে। ক্রোধও তার প্রচণ্ড অবস্থাতে আছে, আর ক্রোধ রূপী বিষে সিক্ত বচন অন্য মানুষের হৃদয়ে নিজের সমানই প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন করে বাতাবরণকে বিক্ষুব্ধ করছে, আর তাই দ্বেষ, ঈর্ষা, বিবাদ তথা কলহের বাজার ভয়ংকর গরম হয়ে আছে। ধনের তাপ তো মানুষের জীবনের ধারাকেই পরিবর্তন করে দিয়েছে, যে মানুষের জন্ম আত্ম-জ্ঞানের জন্য হয়েছিল, আজ তারাই এই ভৌতিক পার্থিব নুড়ি-পাথর সংগ্রহতে ব্যর্থ নষ্ট করে দিচ্ছে, জীবনের মাপদণ্ড কেবলমাত্র টাকা রোজগার করাই হয়ে গেছে। চরিত্র, সংযম, ব্রহ্মচর্য, য়োগাভ্যাসের তো কোথাও নামও শোনা যায় না। এইভাবে আজ মানসিক রোগকে অমৃত মনে করে স্নেহের সঙ্গে তাকে বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
হে মানব জাতি! তুমি কি জানো আমাদের এই দয়নীয় দশা কেন হয়েছে? জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সুখ আমাদের জন্য মৃগ মরীচিকা মাত্র হয়ে গেছে? জীবনে এত বিষমতা-অশান্তি আর নিরাশা কোথা থেকে এসেছে? সব প্রকারের দিব্য শক্তি থেকে আমাদের সম্বন্ধ কেন বিচ্ছেদ হয়ে গেছে? আজ আমরা কেন পশুদের থেকেও নিকৃষ্ট, দীন-হীন, দুঃখী আর নিরাশ্রয় হয়ে গেছি? এইসব প্রশ্নের যদি আপনি একটাই উত্তর জানতে চান তাহলে আমি বলবো যে আমরা বেদের মধ্যে পরমেশ্বরের দ্বারা উপদিষ্ট প্রাণ বিদ্যাকে ভুলে গেছি। এই জীবনদায়িনী প্রাণবিদ্যাকে আদি সৃষ্টিতে বেদ দ্বারা ঋষি-মুনিরা প্রাপ্ত করে সকল মানুষের নিকট এর ক্রিয়াত্মক প্রচার করেছিলেন। এই প্রাণবিদ্যারই স্বরূপ হচ্ছে প্রাণায়াম, যার দ্বারা "ন হ অস্য প্রজা হীয়তে"র অনুসারে আমাদের দেশে আয়ু মধ্যম শত বর্ষ ছিল আর মানুষ চারশো বছর পর্যন্তও নিরোগ জীবন ধারণ করতো আর মৃত্যুঞ্জয় পদবী দ্বারা বিভূষিত হতো। পিতার সামনে পুত্রের মৃত্যু হতো না, বিশাল ললাট, বলবান আর প্রসারিত হওয়া বক্ষঃস্থল, প্রচণ্ড ভুজদণ্ড তথা কান্তিযুক্ত ৬ ফিট লম্বা সুদৃঢ় সুন্দর শরীরকে দেখে রোগ দূরেই থাকতো। প্রাণায়ামের প্রভাবে শরীর আর মন পবিত্র হওয়ার কারণে কোনো প্রকারের নির্বলতা, নিরাশা, নিষ্কর্মণ্যতার কোনো স্থান ছিল না। এই প্রাণ বিদ্যা ভারতবর্ষের প্রত্যেক নর-নারী নিকট পর্যন্ত পৌঁছে ছিল, এর প্রভাবেই সকলে চরিত্রের ধনী হতো আর এই কারণেই মনু মহারাজ বিশ্বের সম্মুখে ঘোষণা করেছিলেন -
এতদ্দেশপ্রসূতস্য সকাশাদগ্রজন্মনঃ।
স্বম্ স্বম্ চরিত্রম্ শিক্ষেরন্পৃথিব্যাম্ সর্বমানবাঃ।।
(মনুঃ ১/৭৪)
অর্থাৎ সারা বিশ্বের মানব ভারতবর্ষের ব্যক্তিদের থেকে চরিত্রের শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের জীবনকে বিশুদ্ধ করবে। এই প্রাণায়াম বিদ্যার কারণেই দেশের মধ্যে সবদিক থেকে সুখ শান্তি ছিল।

🍁 প্রাণায়ামের আদিস্রোত হল বেদ 🍁

মহর্ষি দয়ানন্দ জী দ্বারা প্রণীত আর্যসমাজের তৃতীয় নিয়মানুসারে "বেদ হল সব সত্য বিদ্যার পুস্তক।" সব বিদ্যার সমান এই প্রাণ বিদ্যারও আদিমূল হল বেদ। বেদের মধ্যে প্রাণায়ামের মৌলিক সিদ্ধান্তের বর্ণনা স্পষ্ট ভাবে আছে। সুবিজ্ঞ পাঠকদের জ্ঞানের জন্য এখানে কিছু মন্ত্র উদ্ধৃত করে দিচ্ছি -

দ্বাবিমৌ বাতৌ বাত আ সিন্ধোরা পরাবতঃ।
দক্ষম্ তে অন্য আ বাতু পরান্যো বাতু য়দ্রুপঃ।।
(ঋঃ ১০/১৩৭/২)

এই মন্ত্রের ভাষ্য আর্য বিদ্বান এইভাবে করেছেন -
(ইমৌ দ্বৌ) এই দুই প্রকারের (বাতৌ) বায়ু (বাতঃ) বাহিত হয়, একটা বায়ু (আসিন্ধোঃ) হৃদয় পর্যন্ত যায় আর আরেকটা (আপরাবতঃ) বাইরের বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত যায়। (অন্যঃ) তারমধ্যে একটা (তে) তোমার জন্য(দক্ষম্) বল (আবাতু) ভিতরে নিয়ে আসবে আর (অন্যঃ) আরেকটা (য়দ্রপঃ) যে দোষ মন্দ আছে তাকে (পরাবাতু) বাইরে নিয়ে যাবে।

অর্থাৎ - হে মনুষ্য! তোমার মধ্যে দুটো বায়ু চলছে। তোমার মধ্যে শ্বাস আর প্রশ্বাস রূপে প্রাণের দুই রকমের গতি হয়। শ্বাস দ্বারা বাইরের শুদ্ধ বায়ু তোমার ভিতরের সিন্ধু স্যন্দনশীল হৃদয় পর্যন্ত আসে আর প্রশ্বাস দ্বারা ভিতরের দূষিত বায়ু বাইরে "পরাবত" পর্যন্ত যায়।

আমাদের ভিতরে হৃদয় হল সেই "সিন্ধু" স্থান যেখানে সহস্র রুধিরবাহিনী নাড়ীরূপ নদী এসে একত্রিত হয় আর বাইরের "পরাবত" হল সেই বায়ুমণ্ডল নামক স্থান যা হচ্ছে বায়ুর অপার অটুট ভাণ্ডার। আর এই যে পরাবত থেকে সিন্ধু পর্যন্ত আর সিন্ধু থেকে পরাবত পর্যন্ত দুটো বায়ু আমাদের মধ্যে নিরন্তর চলছে, এটাই হল আমাদের জীবনের আধার। কারণ এরমধ্যে প্রথম বায়ু শ্বাস, আমাদের সিন্ধুতে বাইরে থেকে প্রাণ আর নবজীবনকে নিয়ে আসে আর আমাদের রক্তের এক-একটা কণাকে নব-বল সংযুক্ত করে আর আরেকটা বায়ু, আমাদের রক্ত থেকে তথা সারা শরীর থেকে সমস্ত মল-দোষ-বিকারকে বয়ে নিয়ে যায় আর বাইরে পরাবতের মধ্যে ফেলে দেয় আর আমাদের জীবনকে বাড়িয়ে দেয়, এইভাবে আমাদের জীবনের বৃদ্ধি হয়। আমরা নিত্য অধিক-অধিক বলবান আর নিরোগ হই। তবে হে মনুষ্য! এই দ্বিবিধ প্রাণক্রিয়া কেবল তোমার ভৌতিক জীবনের সিদ্ধান্ত নয় বরং তোমার মানসিক আর আত্মিক জীবনের রহস্যও এরমধ্যে আছে। তুমি জানো না যে, সব মহাপুরুষ নিজের শ্বাস দ্বারা কেবল শারীরিক শক্তিকে নয় বরং উৎসাহ, ধৈর্য, বল, সত্য, প্রেম আদি সব মানসিক আর আত্মিক সৎ ভাবনাকে ভিতরে নিয়েছে, তথা প্রশ্বাস দ্বারা সব প্রতিবন্ধকতা, কাপুরুষতা, অশক্তি, মিথ্যা, ঘৃণা আদি সব অসৎ ভাবনাকে বাইরে বের করে দিয়েছে, এইজন্য তারা মহান হয়েছে। প্রাণের সঙ্গে মন এমন ভাবে জুড়ে আছে যে তুমি শ্বাস দ্বারা যেটা ভাববে সেটাই তোমার মধ্যে এসে বাস করবে আর যাকে প্রশ্বাস দ্বারা ধ্যান করবে সেটা বাইরে বেরিয়ে যাবে। নিজের প্রার্থনাতে তুমি এই সিদ্ধান্তকে একটু ব্যবহার করে দেখো। যাকে বাস করাতে চাইবে তাকে শ্বাস দ্বারা চিত্রিত করে দেখো আর যেসব অশুভ বিচার যেতেই চায় না, সেগুলো আসলে বার-বার প্রশ্বাসের দ্বারা বাইরে বের করে দেখো তাহলে তুমি নিঃসন্দেহে অদ্ভুত সফলতা প্রাপ্ত করবে। আর নিজের ব্যায়াম প্রাণায়াম আর প্রার্থনার মধ্যে তুমি সদা এই জগৎ ব্যাপক জীবন সিদ্ধান্তের ব্যবহার করো। তুমি দেখবে যে নিজের এই দ্বিবিধ প্রাণক্রিয়া দ্বারা অনন্ত শক্তির ভাণ্ডার দিয়ে জুড়ে আছো আর এই ভাণ্ডার থেকে নিজের প্রত্যেক শ্বাস দ্বারা প্রয়োজন অনুযায়ী বল প্রাপ্ত করতে পারবে আর নিজের শ্বাস দ্বারা সেই পবিত্রকারক মহাপারাবারের মধ্যে নিজের তুচ্ছ মলিনতাকে ফেলে দিয়ে সদা পবিত্র থাকতে পারবে। অতঃ হে মনুষ্য! তুমি ওঠো আর এখন নিজের প্রত্যেক শ্বাস আর প্রশ্বাস দ্বারা নিত্য উন্নত আর নবজীবন সম্পন্ন হও। 

এইভাবে বেদের আজ্ঞা আছে। এইরকমই আরেকটা মন্ত্র প্রাণায়ামের স্বরূপকে স্পষ্ট চিত্রণ করে -

আ বাত বাহি ভেষজম্ বি বাত বাহি য়দ্রপঃ।
ত্বম্ হি বিশ্বভেষজো দেবানাম্ দূত ঈয়সে।।
(ঋঃ ১০/১৩৭/৩)

অর্থাৎ - (বাত) হে প্রাণ! (ভেষজম্ আবাহি) স্বাস্থ্যপ্রদ ঔষধীগুণ আমার মধ্যে নিয়ে আসো আর (বাত) হে প্রাণ! (য়দ্রপঃ) আমার মধ্যে যে দুঃখ রোগ আছে তাকে (বি বাহি) আমার থেকে বাইরে নিয়ে যাও। (ত্বম্) তুমি (হি) নিশ্চিত রূপে (বিশ্বভেষজঃ) সর্ব ঔষধীরূপ, (দেবানাম্ দূত ঈয়সে) তুমি দিব্যগুণের দূতের মতো গতি করো। 

মন্ত্রের মধ্যে প্রাণের একটা দিব্য দেব রূপ সুন্দর আলঙ্কারিক বর্ণনা করা হয়েছে, যথা - হে বায়ু! হে প্রাণ! তুমি সর্ব ঔষধীরূপ, তোমার মধ্যে সমস্ত ঔষধ বিদ্যমান আছে, আমরা তো না জেনে বাইরের এই বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ খাওয়ার চক্করে পড়ে আছি। যদি আমরা সঠিক ভাবে তোমার সেবন করি, তোমার শক্তি ব্যবহার করি তাহলে আমাদের কখনও কোনো ওষুধের আবশ্যকতা হবে না। সংসারের ৯০ শতাংশ রোগী এইজন্য রোগগ্রস্থ কারণ তারা সঠিক ভাবে শ্বাস নেওয়া জানে না তথা সর্বৌষধময় তোমার থেকে লাভ নিতে জানে না। যদি আমরা ঠিক ভাবে শ্বাস নিই তাহলে ভিতরে আসতে থাকা শ্বাসই আমাদের দিব্য ঔষধপান হবে আর বাইরে যেতে থাকা প্রশ্বাস আমাদের সব রোগ-মল বের করে দিবে। এমনটা যে বলা হয় দেবতাদের বৈদ্য হল অশ্বিনীকুমার, সেটা আর কিছু না, সেটা নাসত্যৌ (নাক থেকে জন্মা) অশ্বিনৌ অর্থাৎ এই শ্বাস-প্রশ্বাস বা প্রাণাপানই হল সেটা, যাকে ইড়া, পিঙ্কলা, চন্দ্রপ্রাণ, সূর্যপ্রাণ আদি অন্য রূপেও দেখা যায়। এই প্রাণাপানের নিয়ম দ্বারাই সংসারের সব রোগের দিব্য আর অমোঘ চিকিৎসা হয়ে যায়। অবিদ্যার কারণে আমরা বাইরের বৈদ্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, অথচ সব ঔষধ আমাদের ভিতরেই বিদ্যমান আছে।

আর হে প্রাণ! তুমি তো দেবদূত, আমাদের ভিতরে দেবদূত হয়ে গমন করছো, আমাদের ভিতরে সব দেবতাদের বার্তা নিয়ে এসে শুনিয়ে দিয়ে যাও। যারা প্রাণোপাসনা হতে রহিত, তোমার এই সূক্ষ্ম দেব-বার্তাকে শোনে না, তারা তোমার এই দিব্য চিকিৎসা হতে বঞ্চিত থাকে, কিন্তু যারা তোমার উপাসক হয় তারা তো নিজের প্রাণের মধ্যে সূক্ষ্ম রূপে চলতে থাকা সব পৃথ্বী, অপ, তেজ আদি দেবগুলোর বার্তাকে শুনে নেয়। শরীরের সব কার্যকলাপ আর চেষ্টার প্রেরক তথা নিয়ামক হে বাত! হে প্রাণ! শরীরের মধ্যে দোষ উৎপন্ন হতেই তুমি আমাদের মধ্যে দিব্য প্রেরণা করো, শরীরকে বিশেষ ভাবে  নাড়া-চারা বা চেষ্টা করার প্রেরণা তথা বিশেষ প্রকারের ভোজন, পান, আচ্ছাদনের প্রেরণা উৎপন্ন করো। আমরা যদি সেগুলো শুনি আর তদনুসারে আচরণ করি তাহলে আমাদের সব রোগের চিকিৎসা হয়ে যাবে অথবা বেশির ভাগ অবস্থায় তো আমরা রোগ উৎপন্ন হওয়ার থেকেই বেঁচে যাবো। কিন্তু আমরা সেগুলো শুনি না, অন্যদিকে যারা শোনে তারা নিজের নাসিকার মধ্যে চলতে থাকা তোমার "স্বর"কেও শুনে নেয়, তাকে আধিদৈবিক সংসারের স্বরের সঙ্গে মিলিয়ে রাখে, এরফলে তাদের জীবন এমন সংগীতময় হয়ে যায় যে তারা সর্বদা সুস্থ আর নিরোগ থাকে। হে প্রাণ!  আমরা তোমার দিব্যদূত বার্তা শুনি অথবা না শুনি তবে এটা সত্য যে আমাদের নিকট আসা দিব্য চিকিৎসক হচ্ছ তুমি আর তুমি সর্বৌষধ রূপ। হে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ দেবের দূত হয়ে আমাদের মধ্যে চলমান প্রাণ! তুমি সত্যিই সর্বৌষধ রূপ।

এইভাবে বেদের মধ্যে প্রাণায়ামের গুরুত্বের বিশদ বর্ণনা আছে। শারীরিক মানসিক সব বিকারকে দূর করে তারমধ্যে শক্তির সঞ্চার করা হল প্রাণায়ামের মুখ্য কাজ। জীবন পূর্ণতঃ শ্বাসক্রিয়ার উপরই অবলম্বিত। প্রাণায়াম দ্বারা দেহের মধ্যে সঞ্জীবন শক্তির সঞ্চার হয়, মনের প্রসুপ্ত শক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে, শরীর শুদ্ধ, পবিত্র, বলবান, তেজস্বী তথা কান্তিমান হয়, শরীরের সব মাংসপেশী সম্পুষ্ট হয়, শরীরের মধ্যে পরিভ্রমণ করতে থাকা রক্ত শুদ্ধ আর বিকাররহিত হয়। এইভাবে প্রাণায়াম সব ধাতুর মলকে দূর করে বীর্যকে শুদ্ধ পবিত্র করে ওজ-রূপে পরিণত করে জীবনকে সুখময় করে তোলে। এইজন্য বেদের মধ্যে প্রাণকে পিতা, ভ্রাতা, মিত্র আদি রূপে বর্ণিত করা হয়েছে। সামবেদের উত্তরার্চিকে এই বিষয়ের মন্ত্র আছে -

উত বাত পিতাসি ন উত ভ্রাতোত নঃ সখা।
স নো জীবাতবে কৃধি।। (সামবেদ ১৮৪১)

মন্ত্রের ভাবনা স্পষ্ট যে প্রাণই হচ্ছে আমাদের পিতা, ভ্রাতা আর মিত্র। অতঃ প্রাণ আমাদের দীর্ঘজীবনের জন্য সক্ষম। সামবেদের মধ্যে এর পূর্বের মন্ত্রটা সব রোগ দূর কারক প্রাণায়ামকে কল্যাণকারী বলা হয়েছে -
বাত আ বাতু ভেষজম্ শম্ভু ময়োভু নো হৃদে।
প্র ন আয়ূম্ষি তারিষত্।। (সামবেদ ১৮৪০)
অর্থাৎ - (বাত) হে বায়ু (নঃ) আমাদের (হৃদয়ে) (শম্ভু) কল্যাণ আর শান্তিকারক (ময়োভু) সুখকারক (ভেষজম্) আধি ব্যাধিকে শান্তিদায়ক ঔষধীকে (আবাতু) প্রাপ্ত করাও আর (নঃ) আমাদের (আয়ূম্ষি) আয়ুর বর্ষকে (প্রতারিষত্) বাড়াও।

প্রাণ হল শরীরের প্রধান শক্তি, প্রাণের উপর বশিত্ব প্রাপ্ত করলে মন সহিত জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয়ও মানুষের বশে এসে যায়। অথর্ববেদের মধ্যে প্রাণবিদ্যার বিশদ বর্ণনা আছে। অথর্ববেদের প্রাণসূক্তের একটা মন্ত্র প্রাণের প্রাধান্যকে স্পষ্ট রূপে বর্ণনা করে -

প্রাণায় নমো য়স্য সর্বমিদম্ বশে।
য়ো ভূতঃ সর্বস্যেশ্বরো য়স্মিন্ত্সর্বম্ প্রতিষ্ঠিতম্।।
(অথর্বঃ ১১/৪/১)

এই মন্ত্রটার ভাষ্য মহর্ষি দয়ানন্দ জী সত্যার্থ প্রকাশের প্রথম সমুল্লাসে এইভাবে করেছেন -
"যেমন সারা শরীর আর ইন্দ্রিয় প্রাণের অধীন হয়, তেমনই সারা জগৎ হল পরমেশ্বরের অধীন।" এই মন্ত্রের মধ্যে পরমেশ্বরের স্বামিত্ব বলার জন্য প্রাণের উপমা দেওয়া হয়েছে, যারদ্বারা প্রাণের গুরুত্ব স্পষ্ট সিদ্ধ হয়।
.
যেভাবে অথর্ববেদের মধ্যে প্রাণের গুরুত্বের বর্ণনা আছে সেইভাবে য়জুর্বেদের মধ্যেও প্রাণের বিশদ বর্ণনা আছে।  প্রাণকে পুষ্ট আর দীর্ঘ করার জন্য লেখা আছে -
প্রাণস্ত আপ্যায়তাম্।। (য়জুঃ ৬/১৫) অর্থাৎ তোমার প্রাণ সম্বন্ধিত হোক। প্রাণের পুষ্টি দ্বারাই সারা শরীরের অঙ্গের পুষ্টি হয়, এই বর্ণনা নিম্ন মন্ত্রের মধ্যে করা হয়েছে -

ঐন্দ্রঃ প্রাণোऽঅঙ্গেऽঅঙ্গে নিদীধ্যদৈন্দ্রऽউদানোऽঅঙ্গেऽঅঙ্গে নিধীতঃ। (য়জুঃ ৬/২০) 

অর্থাৎ - আত্মার শক্তি দ্বারা প্রেরিত হয়ে প্রাণ প্রত্যেক অঙ্গের মধ্যে গিয়ে পৌঁছায়। আত্মার শক্তি দ্বারা প্রেরিত হয়ে উদান প্রত্যেক অঙ্গের মধ্যে পৌঁছায়। সুতরাং সবাইকে প্রাণের রক্ষা করা উচিত, এই সংকেত বেদের মধ্যে স্পষ্ট রূপে করা হয়েছে।

প্রাণম্মে পাহ্যপানম্মে পাহি ব্যানম্মে পাহি চক্ষুর্মऽউর্ব্যা বিভাহি শ্রোত্রম্মে শ্লোকয়। (য়জুঃ ১৪/৮)

অর্থাৎ - আমার প্রাণ-অপান-ব্যানের সংরক্ষণ করো। প্রাণের রক্ষণ হলে প্রাণ সারা শরীরের রক্ষা করে। এইভাবে "প্রাণম্ তে শুন্ধামি" (য়জুঃ ৬/১৪), "প্রাণম্ মে তর্পয়ত" (য়জুঃ ৬/৩১) আদি বেদের বচনও উপরোক্ত ভাবকে ব্যক্ত করে। য়জুর্বেদের মধ্যে প্রাণকে শরীরের রাজা বলা হয়েছে যথা "রাজা মে প্রাণঃ" (য়জুঃ ২০/৫) অর্থাৎ প্রাণ হল আমাদের রাজা। যেরূপ সংসারের মধ্যে রাজা শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণে সব ব্যবস্থা সঠিকভাবে চলে, সেইরূপ প্রাণ সবল হলে মনেন্দ্রিয় আদি শরীরের অবয়ব সঠিকভাবে কাজ করে। উপরোক্ত উদাহরণ দ্বারা স্পষ্ট সিদ্ধ হয়ে গেল যে প্রাণ-বিদ্যার আদি স্রোত হল বেদ।

🍁 উপনিষদের মধ্যে প্রাণের গুরুত্ব 🍁

উপনিষদ হল আধ্যাত্মিক গ্রন্থ তথা প্রাণও অধ্যাত্ম ক্ষেত্রের তত্ত্ব, এই কারণে উপনিষদের মধ্যে প্রাণের গুরুত্ব বিশেষরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। উপনিষদের মধ্যে প্রাণকে কোথাও ব্রহ্মা, কোথাও দেব, কোথাও বসু, রুদ্র, আদিত্য, পিতা, মাতা, স্বসা, আচার্য আদি বিশেষণ দ্বারা বিভূষিত করা হয়েছে, যারদ্বারা প্রাণের সর্বশ্রেষ্ঠতা সিদ্ধ হয়। এই বিষয়ে নিম্ন স্থল  বিশেষ দ্রষ্টব্য -
প্রাণো ব্রহ্মেতি ব্যজানাত্। প্রাণাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। প্রাণেন জাতানি জীবন্তি। প্রাণম্ প্রয়ন্ত্যভিসম্বিশন্তীতি। 
(তৈত্তিরীয়োপনিষদ, ভৃগুবল্লী, তৃতীয়োऽনুবাক) 

এই প্রকরণের অভিপ্রায় স্পষ্ট যে - প্রাণই হল ব্রহ্ম, কারণ প্রাণ থেকে সব ভূত উৎপন্ন হয়, প্রাণ দ্বারা জীবিত থাকে আর অন্তিমে প্রাণের মধ্যেই গিয়ে লীন হয়। 

এইভাবে উপনিষদের স্থানে-স্থানে প্রাণকে জ্যেষ্ঠ আর শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, সেগুলো দেখুন -

১. কতম একো দেব ইতি প্রাণ ইতি... (বৃহ.উ. ৩/৯/৯)
২. প্রাণো বৈ জ্যেষ্ঠশ্চ শ্রেষ্ঠশ্চ... বৃহ. ৬/১/১)
৩. প্রাণো বৈ বলম্ তৎপ্রাণে প্রতিষ্ঠিতম্..(বৃহ.উ. ৫/১৪/৪)
৪. প্রাণো বা অমৃতম্... (বৃহ. ১/৬/৩)
৫. প্রাণা বৈ সত্যম্... (বৃহ. ২/১/২০)
৬. প্রাণা বৈ য়শো বীর্য়্যম্... (বৃহ. ১/২/৬)

প্রাণের সর্বশ্রেষ্ঠতা বলার জন্য প্রশ্নোপনিষদের মধ্যে একটা অতিরোচক উপাখ্যান আছে। একবার শরীরের মধ্যে ইন্দ্রিয়ের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া বাধে, মন-শ্রোত্র-চক্ষু-ত্বচা-রসনা আদি ইন্দ্রিয়গুলো স্বয়ংকে বড় আর অন্যদের ছোটো বলতে থাকে। এই রকম অবস্থা দেখে প্রাণ সবাইকে বলে -

তান্ বরিষ্ঠঃ প্রাণ উবাচ মামোহ মাপদ্যথাऽহমেব তৎপঞ্চধাऽऽত্মানম্ প্রবিভজ্যৈতদ্বাণমবষ্টভ্য বিধারয়ামীতি।।১৯
তেऽশ্রদ্দধানা বভূবুঃ সোऽভিমানাদূর্ধ্বমুৎক্রমত ইব তস্মিন্নুৎক্রামত্যথেতরে সর্ব এবোৎক্রামন্তে তস্মিম্শ্চ প্রতিষ্ঠমানে সর্ব এব প্রতিষ্ঠন্তে তদ্যথা মক্ষিকা মধুকররাজানমুৎক্রামন্তম্ সর্বা এবোৎক্রামন্তে তস্মিম্শ্চ প্রতিষ্ঠমানে সর্বা এব প্রতিষ্ঠন্তে এবম্ বাঙ্মনশ্চক্ষুঃশ্রোত্রঞ্চ  তে প্রীতাঃ প্রাণম্ স্তুন্বন্তি।।২০

সেই বিবাদকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণ বললো যে তোমরা মোহ অজ্ঞানীর মতো করো না। আমিই স্বয়ং নিজেকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে এই শরীরকে ধারণ করে আছি। কিন্তু এই বচন তারা বিশ্বাস করলো না। এতে অভিমান করে প্রাণ শরীরের বাইরে চলে যেতে থাকে, যখন সে বাইরে যেতে থাকে তখন মন আদি ইন্দ্রিয়গুলোও তার সঙ্গে বের হতে থাকে আর তার স্থির হওয়াতে তারাও স্থির হয়। তখন তারা সন্তুষ্ট হয়ে প্রাণকে শ্রেষ্ঠ মেনে নেয় আর তার স্তুতি করতে থাকে। এই সব উপাখ্যানের তাৎপর্যই ছিল প্রাণের সর্বশ্রেষ্ঠতা সিদ্ধ করা।

বৃহদারণ্যকোপনিষদের মধ্যে প্রাণকে শরীরের অঙ্গের রস রূপে স্বীকার করা হয়েছে, এতে তার প্রাধান্য নিশ্চিত হয়। যথা -

সোऽয়াস্য আঙ্গিরসোऽঅঙ্গানাম্ হি রসঃ প্রাণো বা অঙ্গানাম্ রসঃ প্রাণো হি বা অঙ্গানাম্ রসস্তস্মাদ্যস্মাত্ কস্মাচ্চাঙ্গাৎপ্রাণ উৎক্রামতি তদেব তচ্ছুষ্যত্যেষ হি বা অঙ্গানাম্ রসঃ।। (বৃহ. ১/৩/১৯)

অর্থাৎ প্রাণই হচ্ছে অঙ্গের রস, যে অঙ্গ থেকে প্রাণ চলে যায় সেই অঙ্গ শুকিয়ে যায়।

বসু রুদ্র আদিত্য রূপে প্রাণের বর্ণনা -
প্রাণা বাব বসব এতে হীদঁ সর্বম্-বাসয়ন্তি।। ১
প্রাণা বাব রুদ্রা এতে হীদঁ সর্বঁ রোদয়ন্তি।। ৩
প্রাণা বাবাऽऽদিত্যা এতে হীদঁ সর্ব মাদদতে।। ৫ 
(ছান্দোগ্যোপনিষদ ৩/১৬)

প্রাণ হল বসু কারণ এটা সবাইকে বাস করায়, জীবন প্রদান করায়। প্রাণ হল রুদ্র কারণ এটা বেরিয়ে গেলে মৃত্যু হয়, সবাই কান্না করে। প্রাণ হল আদিত্য কারণ এটা সব বিদ্যাকে গ্রহণ করে।

আমি এটা পূর্বেই লিখেছি যে বেদের মধ্যে প্রাণকে মাতা-পিতা-ভ্রাতা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। উপনিষদের মধ্যেও প্রাণের সেইরকম স্তুতি আছে -

প্রাণো হ পিতা প্রাণো মাতা প্রাণো ভ্রাতা প্রাণঃ স্বসা প্রাণ আচার্য্যঃ প্রাণো ব্রাহ্মণঃ।। (ছান্দোগ্যোপনিষদ ৭/১৫/১)

অর্থাৎ প্রাণ হল মাতা (মান্য হিতকারী), প্রাণ হল পিতা (পালক-সংরক্ষক), প্রাণ হল ভ্রাতা (ভরণ পোষণ করার যোগ্য), প্রাণ হল স্বসা (উত্তম রূপে রক্ষক), প্রাণ হল আচার্য (আত্মিক গুরু), প্রাণ হল ব্রাহ্মণ (ব্রহ্মের নিকট নিয়ে যায়)। এইভাবে অন্য উপনিষদের মধ্যেও অনেক স্থানে প্রাণের স্তুতি আছে।
🍁আয়ুর্বেদের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ চরকের মধ্যে প্রাণের গুরত্ব🍁 

তিস্র এষণাঃ পর্য়েষ্টব্যা ভবন্তি, তদ্যথা প্রাণৌষণা, ধনৈষণা পরলোকৈষণেতি। আসাম্ তু খল্বেষণানাম্ প্রাণৌষণাম্ তাবতৎপূর্বতরমাপদ্যেত। কস্মাতৎ প্রাণপরিত্যাগে হী সর্বত্যাগঃ।

অর্থাৎ মানুষের তিনটা ইচ্ছা করা উচিত, প্রথম হল - প্রাণের কামনা, দ্বিতীয় হল - ধনের কামনা আর তৃতীয় হল - মোক্ষের কামনা। এই তিনটা কামনার মধ্যে প্রাণের সুরক্ষণাদির কামনা হল মুখ্য, কারণ প্রাণ নাশের ফলে সর্বনাশ হয়, অর্থাৎ ধনৈষণা আর পরলোকৈষণা দুটো জীবিত অবস্থাতেই হতে পারে, মারা গেলে নয়। সুতরাং প্রাণৌষণা হচ্ছে মুখ্য, তাই প্রাণরক্ষার জন্য মানুষকে প্রাণায়ামের অভ্যাস করা উচিত। আর নিয়মিত প্রাণায়ামের অভ্যাস করার ফলে মানুষ দীর্ঘায়ু হয়।

🍁 প্রাণায়ামের ফলে বুদ্ধির বিকাশ 🍁

প্রাণায়াম যেমন শরীরের শক্তি বাড়ায় তেমনই মলের নাশও করে। মানুষের বুদ্ধি ত্রিগুণাত্মক হয়, তমোগুণের প্রভাবে বুদ্ধির মধ্যে মলিনতা-প্রমাদ-আলস্য-তন্দ্রার বাহুল্য থাকে, আর সর্বদা নিষ্কর্মণ্যতার সাম্রাজ্য মনের মধ্যে রাজত্ব করে। এইভাবে যখন বুদ্ধির মধ্যে রজোগুণের প্রভাব হয় তখন মনের মধ্যে চঞ্চলতা-রাগ-দ্বেষ-ঈর্ষা আদির প্রাধান্য হয়, আর সাংসারিক ঐশ্বর্য ইন্দ্রিয়ের বিষয়ে আসক্তি তথা আডম্বর প্রধান জীবন হয়। প্রাণায়াম করার ফলে বুদ্ধিতে তমোগুণ আদি মল দূর হয়ে সত্ত্বগুণের প্রাধান্য হয়। য়োগদর্শনের মধ্যে মহর্ষি পতঞ্জলি জী লিখেছেন -

"ততঃ ক্ষীয়তে প্রকাশাবরণম্" (য়োগদর্শন ২/৫২)

অর্থাৎ - প্রাণায়াম করার ফলে আমাদের মনে প্রকাশের আবরণ স্বরূপ যে মল আছে সেটা ক্ষীণ হয়ে যায়। যার ফলে আমাদের অবিদ্যা-অজ্ঞান-দুর্বলতা আদি সব মানসিক অক্ষমতা দূর হয়ে মন, আত্মা সব শক্তির ভাণ্ডার হয়। এই কারণে একজন অনুভবী বিদ্বান লিখেছেন -

প্রাণায়ামাত্ পুষ্টির্গাত্রস্য বুদ্ধিস্তেজো য়শো বলম্।
প্রবর্ধন্তে মনুষ্যস্য তস্মাৎপ্রাণায়ামমাচরেৎ।।

অর্থাৎ - প্রাণায়াম করার ফলে মানুষের শরীর হৃষ্ট-পুষ্ট হয়, বুদ্ধি সূক্ষ্মগ্রাহিণী এবং কুশাগ্র হয়, শরীরের মধ্যে তেজ, যশ আর বলের নিরন্তর বৃদ্ধি হয়। সুতরাং প্রতিদিন অবশ্যই প্রাণায়াম করা উচিত।

এই যুগের সর্বমূর্ধন্য য়োগিরাজ মহর্ষি দয়ানন্দ জী এই বিষয়ে য়োগদর্শনের একটা সূত্রের ভাষ্যতে লিখেছেন -

য়োগাঙ্গানুষ্ঠানাদশুদ্ধিক্ষয়ে জ্ঞানদীপ্তিরাবিবেকখ্যাতেঃ।
(য়োগদর্শন ২/২৮)

অর্থাৎ যখন মানুষ প্রাণায়াম করে তখন প্রতিক্ষণ উত্তরোত্তর কালে অশুদ্ধির নাশ আর জ্ঞানের প্রকাশ হতে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত মুক্তি হয় না ততক্ষণ পর্যন্ত তার আত্মার জ্ঞান নিরন্তর বাড়তে থাকে। (সত্যার্থপ্রকাশ তৃতীয় সমুল্লাস)

মহর্ষি দয়ানন্দ জী আরও লিখেছেন যে -
এইভাবে প্রাণায়াম করলে দুই প্রাণায়ামের গতি রুদ্ধ হওয়াতে প্রাণ নিজ বশে আসলে মন তথা ইন্দ্রিয় স্বাধীন হয়। বল পুরুষার্থ বৃদ্ধি হয়ে বুদ্ধি তীব্র আর সূক্ষ্ম হয়, যার ফলে অত্যন্ত কঠিন আর সূক্ষ্ম বিষয়কে অতি শীঘ্র গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এতে মানুষের শরীরে বীর্যবৃদ্ধির ফলে স্থৈর্য, বল, পরাক্রম, জিতেন্দ্রিয়তা আর অল্পকালের মধ্যেই সকল শাস্ত্র বুঝে আয়ত্ত করার সামর্থ জন্মায়। (সত্যার্থপ্রকাশ তৃতীয় সমুল্লাস)

এইভাবে মনুস্মৃতির প্রমাণও উদ্ধৃত করে মহর্ষি জী প্রাণায়ামের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন -

প্রাণায়ামা ব্রাহ্মণস্য ত্রয়োऽপি বিধিবৎকৃতাঃ।
ব্যাহৃতিপ্রণবৈর্য়ুক্তা বিজ্ঞেয়ম্ পরমম্ তপঃ।।
দহ্যন্তে ধ্মায়মানানাম্ ধাতূনাম্ হি য়থা মলাঃ।
তথেন্দ্রিয়াণাম্ দহ্যন্তে দোষাঃ প্রাণস্য নিগ্রহাত্।।
প্রাণায়ামৈর্দহেদ্দোষান্ ধারণাভিশ্চ কিল্বিষম্।
প্রত্যাহারেণ সম্সর্গান্ ধ্যানেনানীশ্বরান্গুণান্।।
(মনুঃ ৬/৭০-৭২)

এইভাবে ব্রাহ্মণ অর্থাৎ ব্রহ্মবিৎ সন্ন্যাসীর কর্তব্য হল, ওঙ্কার সহিত সপ্তব্যাহৃতি দ্বারা বিধিপূর্বক যথাশক্তি প্রাণায়াম করবে। কিন্তু কখনও তিনটার কম প্রাণায়াম করা উচিত নয়, এটাই সন্ন্যাসীর পরম তপস্যা। কারণ যেভাবে অগ্নিতে ধাতু উত্তপ্ত অথবা দ্রবীভূত করলে তার মল নষ্ট হয়ে যায়, সেইরূপ প্রাণের নিগ্রহ দ্বারা মন প্রভৃতি ইন্দ্রিয় সমূহের দোষ ভস্মীভূত হয়। এইজন্য সন্ন্যাসীগণ নিত্য প্রতি প্রাণায়াম দ্বারা আত্মা, অন্তঃকরণ আর ইন্দ্রিয় সমূহের দোষ, ধারণার দ্বারা পাপ, প্রত্যাহার দ্বারা সঙ্গদোষ আর ধ্যান দ্বারা অনীশ্বার গুণ অর্থাৎ হর্ষ, শোক এবং অবিদ্যাদি জীবের দোষ ভস্মীভূত করবে। (সত্যার্থপ্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাস)

🍁 প্রাণায়াম দ্বারা মনের একাগ্রতা 🍁

আমাদের মনের মধ্যে অনেক দিব্য শক্তি বিদ্যমান আছে, কিন্তু মনের চঞ্চলতার কারণে আমরা সেগুলোর ব্যবহার করতে সক্ষম হই না। সংসারে সবথেকে কঠিন কাজ হল মনকে বশ করা। গুরু দ্রোণাচার্যের পরীক্ষাতে পাখির চোখে তীর মেরে উত্তীর্ণ হওয়া, মাছের চোখকে তীর দিয়ে বিন্ধ করে দ্রৌপদী স্বয়ম্বরের বিজয়ী তথা নিদ্রাকে বশ করে গুডাকেশের পদবী দ্বারা বিভূষিত বিশ্বপ্রসিদ্ধ যোদ্ধা অর্জুনও এই মনের চঞ্চলতাকে অনুভব করে য়োগীরাজ শ্রীকৃষ্ণ জীকে সম্বোধিত করে বলেছিলেন -

চঞ্চলম্ হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্ দৃঢম্।
তস্যাহম্ নিগ্রহম্ মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্।(গীতা ৬/৩৪)

অর্থাৎ - হে কৃষ্ণ! এই মন অতি বলবান, দৃঢ়, প্রমাথি তথা অতি চঞ্চল। একে একাগ্র করা আমি বায়ুকে নিরোধের সমান অতি দুষ্কর মনে করি।

যদি আমাদের অধিকার মনের উপর হয় তাহলে নিশ্চিতরূপে আমরা আমাদের অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো। এর চঞ্চলতাকে নষ্ট করে একাগ্র করার জন্য মুখ্য সাধন হল প্রাণায়াম। মন আর প্রাণের মধ্যে অতি নিকট সম্বন্ধ আছে, মনের নিরোধ হলে প্রাণের নিরোধ তথা প্রাণের নিরোধ হলে মনের নিরোধ হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী। এইজন্য কোনো এক সাধক বিদ্বান লিখেছেন -

চলে বাতে চলম্ চিত্তম্ নিশ্চলে নিশ্চলম্ ভবেত্।
য়োগী স্থাণুত্বমাপ্নোতি ততো বায়ুম্ নিরোধয়েত্।। 

অর্থাৎ - প্রাণ চঞ্চল হলে মন চঞ্চল তথা প্রাণ নিরোধ হলে মনও নিরোধ হয়। প্রাণায়াম দ্বারা য়োগী স্থিরভাব প্রাপ্ত করে, সুতরাং প্রাণের অবরোধ করা উচিত।
.
এইভাবে য়োগদর্শনের মধ্যে মহর্ষি পতঞ্জলি জী মন নিরোধের সাধনের বর্ণনা সম্বন্ধে লিখেছেন -

প্রচ্ছর্দনবিধারণাভ্যাম্ বা প্রাণস্য। (য়োগদর্শন ১/৩৪)

প্রাণকে নাসিকা দিয়ে বাইরে নিক্ষেপ করে আর তাকে বিশেষরূপে নিরুদ্ধ করলে মন স্থির হয়। অর্থাৎ রেচক আর পূরক প্রাণায়াম দ্বারা মন চঞ্চলতা ছেড়ে একাগ্র হয়।

প্রাণের ফল নির্দেশ করে য়োগদর্শনকার পুনঃ লিখেছেন -
ধারণাসু চ য়োগ্যতা মনসঃ। (য়োগদর্শন ২/৫৩) 

অর্থাৎ - প্রাণায়াম দ্বারা মন একাগ্র হয়ে ধারণার জন্য সক্ষম হয়।

সাংখ্যদর্শনের নির্মাতা মহর্ষি কপিল জীও প্রাণায়াম দ্বারা মনের একাগ্রতাকে স্বীকার করে নিজের দর্শনের মধ্যে লিখেছেন -

নিরোধশ্ছর্দিবিধারণাভ্যাম্। (সাংখ্যদর্শন ৩/৩৩)

অর্থাৎ - রেচক পূরক প্রাণায়াম দ্বারা মনের বৃত্তির নিরোধ হয়।

এইভাবে সব ঋষি-মহর্ষি এই বিষয়ে এক মত, অতএব সাধক মহানুভব স্বয়ং অনুভব করে লাভ নিবেন।

🍁 প্রাণ-অপানের স্বরূপ 🍁

আজ শিক্ষিত সমাজের মধ্যে প্রাণ-অপানের বিষয়ে নিতান্ত ভ্রম ছড়িয়ে আছে। মানুষ মনে করে, যে বায়ুকে আমরা বাইরে থেকে ভিতরে শরীরের মধ্যে গ্রহণ করি সেটা প্রাণ তথা যে বায়ু ভিতর থেকে বাইরে যায় সেটা অপান। এই ভ্রম প্রাণ অপানকে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমার্থক শব্দ মনে করেই হয়েছে। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের মধ্যে প্রাণ অপানের স্বরূপ এর একদম ভিন্ন আছে। মহর্ষি দয়ানন্দ জীও তাঁর গ্রন্থের মধ্যে প্রাচীন মান্যতাকে প্রামাণিক মেনে যে শ্বাস বাইরে বের হয় তার সংজ্ঞা "প্রাণ" তথা যে বায়ু বাইরে থেকে ভিতরে নেওয়া হয় তার নাম "অপান" বলেছেন।

অনেক পুস্তক প্রকাশক মহানুভব মহর্ষি জীর মন্তব্যকে না বুঝতে পেরে বর্তমান কালের মিথ্যা ধারণার অনুসারে সত্যার্থপ্রকাশ আদি ঋষি গ্রন্থের মধ্যে পরিবর্তন করার অক্ষম্য অপরাধ করে বসেছেন। প্রাণ অপানের বিষয়ে মহর্ষির মন্তব্য জানার জন্য ওনার গ্রন্থের উদাহরণ এখানে দেওয়া উপযুক্ত হবে।

সত্যার্থপ্রকাশের মধ্যে মহর্ষি জী বৈশেষিকদর্শনের (২/৪) সূত্রের ভাষ্য করে লিখেছেন - "(প্রাণ) ভিতর থেকে বায়ুকে বাইরে নিক্ষেপ করা, (অপান) বাইরে থেকে বায়ুকে ভিতরে আনা।" (সত্যার্থপ্রকাশ, তৃতীয় সমুল্লাস) 

এইভাবে "প্রাণময় কোষ" এর বিবেচনা করে মহর্ষি জী অন্য স্থানে লিখেছেন - "প্রাণময়" যারমধ্যে "প্রাণ" অর্থাৎ যে বায়ু ভিতর থেকে বাইরে যায়, "অপান" যে বায়ু বাইরে থেকে ভিতরে আসে...। (সত্যার্থপ্রকাশ, নবম সমুল্লাস)

প্রাণ অপানের স্বরূপ সম্বন্ধে মহর্ষি জী য়জুর্বেদের নিম্ন মন্ত্রের ভাষ্য করে লিখেছেন -

প্রাণায় স্বাহাऽপানায় স্বাহা ব্যানায় স্বাহা চক্ষুষে স্বাহা শ্রোত্রায় স্বাহা বাচে স্বাহা মনসে স্বাহা। (য়জুঃ ২২/২৩)

পদার্থ - (প্রাণায়) য় আভ্যান্তরাদ্ বহির্নিঃসরতি (অপানায়) য়ো বহির্দেশাদাভ্যন্তরম্ গচ্ছতি...।

আর্যভাষা - (প্রাণায়) যে পবন ভিতর থেকে বাইরে যায়...(অপানায়) যেটা বাইরে থেকে ভিতরে আসে...।

এইভাবে ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকার মধ্যে অথর্ববেদের মন্ত্র উদ্ধৃত করে লিখেছেন -

আয়ুশ্চ রূপম্ চ নাম চ কীর্তিশ্চ।
প্রাণশ্চাপানশ্চ চক্ষুশ্চ শ্রোত্রম্ চ।।

(প্রাণশ্চাপানশ্চ) যে বায়ু ভিতর থেকে বাইরে যায় তাকে "প্রাণ" আর যে বায়ু বাইরে থেকে ভিতরে আসে তাকে "অপান" বলে। (ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা, বেদোক্তধর্মবিষয়)

প্রাণায়ামের বিষয়ে অন্য ঋষি-মহর্ষিদেরও মন্তব্য এটাই, তথা মহর্ষি পাণিনি জী তাঁর বর্ণোচ্চারণ শিক্ষা গ্রন্থের মধ্যে লিখেছেন - "নাভিপ্রদেশাত্ প্রয়ত্নপ্রেরিতঃ প্রাণো নাম বায়ুরূর্ধ্বমাক্রামন্নুর আদীনাম্ স্থানানামন্যতমস্মিন্ স্থানে প্রয়ৎনেন বিচার্য়তে।" 

মহর্ষি দয়ানন্দ জী এই প্রসঙ্গের অর্থ আর্যভাষাতে এইভাবে করেছেন - যে শ্বাস উপরে বের হয় তাকে প্রাণ বলে, সেটা আত্মার উচ্চারণের ইচ্ছা দ্বারা বিচারপূর্বক নাভিদেশ থেকে প্রেরণা পেয়ে প্রাণবাযু উপরে উঠে কন্ঠ আদি স্থানের মধ্যে কোনো এক স্থানে উত্তম প্রচেষ্টা দ্বারা বিচার করা হয়।

প্রাণাপানের বর্ণনা বাচস্পত্য কোষের মধ্যেও এইভাবে লেখা আছে - য়দ্বৈ পুরুষঃ প্রাণিতি মুখনাসিকাভ্যাম্ বাযুম্ বহির্নিস্সারয়তি স প্রাণাখ্যো বায়ুর্বায়ুবৃত্তিবিশেষঃ। য়দপানিত্যপশ্যমিতি তাভ্যামেব মুখনাসিকাভ্যাম্ অন্তরাকর্ষতি সোऽপানাখ্যো বৃত্তিরিতি।

এইভাবে অন্যত্র অনেক স্থানেও প্রাণাপানের স্বরূপের বর্ণনা এইরকম আছে। 

🍁 প্রাণায়ামের স্বরূপ 🍁
এই উপস্থিত অধ্যায়ের মধ্যে প্রাণায়ামের স্বরূপ আর শরীরের উন্নতিতে প্রাণায়াম কিরকম সহায়ক হয় তার বিবেচনা করা হবে। প্রাণায়াম হচ্ছে য়োগাঙ্গের চতুর্থ অঙ্গ। য়োগদর্শনের মধ্যে একে সমাধির সিদ্ধিতে বহিরাঙ্গ সাধন মানা হয়েছে। প্রাণায়ামের স্বরূপ প্রকট করতে গিয়ে মহর্ষি পতঞ্জলি য়োগদর্শনের মধ্যে লিখেছেন -
তস্মিন্ সতি শ্বাসপ্রশ্বাসয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ। (য়োগ ২/৪৯)
(তস্মিন্ সতি) আসনের সিদ্ধি হয়ে গেলে (শ্বাস-প্রশ্বাসয়োঃ) শ্বাস আর প্রশ্বাসের (গতি-বিচ্ছেদঃ) গতিকে যথাশক্তি থামিয়ে দেওয়া (প্রাণায়ামঃ) "প্রাণায়াম" বলে।
যে বায়ু আমরা বাইরে থেকে ভিতরে গ্রহণ করি তাকে শ্বাস তথা যাকে ভিতর থেকে বাইরে ছেড়ে দিই তাকে প্রশ্বাস বলে। আসনকে সম্যক্ ভাবে অভ্যাস করার পশ্চাৎ এই শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে রীতি বিশেষ অনুসারে থামিয়ে রাখাকে প্রাণায়াম বলে।
এখানে শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বিচ্ছেদের তাৎপর্য হল শ্বাসকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে ভিতরেই যথাশক্তি থামিয়ে রাখা তথা প্রশ্বাসকে বাইরেই যথাশক্তি থামানোর চেষ্টা করা। প্রাণায়াম শব্দ (প্রাণানামায়ামঃ) প্রাণ+আয়াম এই দুটো শব্দের সংযোগ দ্বারা হয়েছে, প্রাণের অর্থ শ্বাস-প্রশ্বাসের তথা আয়ামের অর্থ হল ছড়িয়ে দেওয়া বা বিস্তার করা। অর্থাৎ শনৈঃ শনৈঃ অভ্যাস দ্বারা শ্বাস প্রশ্বাসকে নিগ্রহ করে তার নিরোধের অবধি বাড়িয়ে দেওয়াই হল প্রাণায়াম।
🍁 শারীরিকোন্নতির সাধন প্রাণায়াম 🍁
"প্রাণো বৈ বলম্" এর অনুসারে শরীরের বল বাড়াতে প্রাণ হচ্ছে মুখ্য সাধন। প্রাণায়ামের অভ্যাস দ্বারা একজন দুর্বল আর নির্বীর্য মানুষও সশক্ত তথা তেজস্বী হতে পারে। ইতিহাসের মধ্যে এর অনেক প্রমাণ আছে, রাবণের সভাতে অঙ্গদ দ্বারা ভূমিতে পা জমিয়ে সব রাক্ষসদের লজ্জিত করতে এই প্রাণায়ামই কারণ ছিল। মহর্ষি দয়ানন্দ জীও প্রাণায়ামের অভ্যাস দ্বারাই অতুল শারীরিক বল সংগ্রহ করেছিলেন। ওনার জীবনে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল, যেমন কয়েক মনের বোঝাই করা গাড়ি কাদায় আটকে যাওয়া দুটো ষাঁড় দিয়েও বের করা যাচ্ছিল না এমন গাড়িকে সহজেই কাদা থেকে বাইরে বের করা প্রাণায়াম দ্বারাই সম্ভব ছিল, তারপর পরস্পর সংঘর্ষ করতে থাকা ভয়ংকর দুটো ষাঁড়ের শিং ধরে সরিয়ে দেওয়া, ছুটতে থাকা ঘোড়া বগ্গীকে পিছন থেকে ধরে থামিয়ে দেওয়া আর কয়েকশ বরিষ্ঠ কুস্তিগীরের সভাতে হাত উঁচু করে শক্তি পরীক্ষার জন্য সতর্ক করা, কর্ণ সিংহকে হাত ধরে মূর্চ্ছিত করে দেওয়া, নিজের ভেজা কৌপিন থেকে চিপে জল বের করে কুস্তিগীরদের পরীক্ষা করা আর এইরকম অন্য অনেক পরিস্থিতিতে নিজের শারীরিক বল দ্বারা মানুষকে আশ্চর্যচকিত করে দেওয়া আদি সব প্রাণায়ামেরই প্রতাপ ছিল। তিনি নিত্য প্রতি খুব প্রাতঃকালে উঠে ৩-৪ ঘন্টা পর্যন্ত প্রাণায়াম করতেন। প্রাণায়ামের কারণে ওনার শরীর বজ্রসদৃশ হয়ে যায়। বড়-বড় কুস্তিগীর ওনার পা দাবানোর সময় পায়ের স্পর্শ করে আর এইরকম ওনার শরীরের অদ্ভুত কঠোরতা দেখে খুব অবাক হয়ে যেত।
.
প্রফেসর রামমূর্তির লোকপ্রসিদ্ধ বলের রহস্য এই প্রাণায়ামই ছিল। এই বিষয়ে তিনি স্বয়ং লিখেছেন যে "বাল্যাবস্থায় শরীরে তপেদিকের লক্ষণ দেখা দেয় কিন্তু ব্রহ্মচর্য, ব্যায়াম আর প্রাণায়ামের বিশেষ অভ্যাসের কারণে আমি শারীরিক বলে বিশ্ববিজেতা হতে পেরেছি।" এই প্রাণায়াম দ্বারা প্রফেসর রামমূর্তির একটা ঘুষিতেই বিদেশি কুস্তিগীরের মৃত্যু হয়েছিল। মোটা-মোটা শিকলকে সুতোর মতো তিনি অনায়াসে ছিঁড়ে ফেলতেন, কয়েকশ মনের পাথরকে বুকে রেখে ভেঙে দেওয়া তথা হাতিকে নিজের বুকের উপরে চড়িয়ে দেওয়া, দু-দুটো মোটরকে একসাথে থামিয়ে তিনি প্রাণায়ামের আধিপত্য দেশ-বিদেশের সব স্থানে ছড়িয়ে ছিলেন। আজ দেশের স্বাস্থ্য পতনোন্মুখ হয়ে আছে যদি আমরা চাই যে আমাদের দেশে পুনরায় বলিষ্ঠ স্ত্রী-পুরুষ হোক তাহলে আমাদের নিজের দিনচর্যাতে প্রাণায়ামকে স্থান দিতে হবে। প্রাণায়াম বিনা আমরা আরোগ্য আর বল প্রাপ্তির দিশাতে এক পাও আগে যেতে পারবো না। প্রাণায়াম দ্বারা কিভাবে শারীরিক উন্নতি হয় সেটা জানার জন্য এক দৃষ্টি শরীরের ভিতরে হতে চলা অনিচ্ছিত কাজের মধ্যে হৃদয় আর ফুসফুসের কাজের উপর ফেলা উচিত।
🍁 হৃদয় 🍁
রক্তপরিচালক যন্ত্রের নাম হল হৃদয়। এই অঙ্গ অনৈচ্ছিক মাংস দ্বারা নির্মিত আর দুই ফুসফুসের মাঝে বক্ষের ভিতরে থাকে। যুবক মানুষের হৃদয় প্রায় ৪ ইঞ্চি লম্বা ৬ ইঞ্চি চওড়া আর ২ ইঞ্চি মোটা আর তার ভার প্রায় ৩০০ গ্রাম হয়। কোনো মানুষের হৃদয়, আকার, পরিমাণাদিতে তার বন্ধ মুঠি থেকে অনেক কিছু পাওয়া যায়। হৃদয়ের অধিকাংশ মধ্যরেখার বাদিকে অবস্থিত আর তার ডানদিকে ডান তথা বাদিকে বাম ফুসফুস থাকে। হৃদয় হচ্ছে মাংস দ্বারা নির্মিত একটা কোষ্ঠ যার ভিতরে রক্ত ভরা থাকে। এর ভিতরে চারটা ভিন্ন-ভিন্ন ঘর আছে, যথা (১) ডান গ্রাহক কোষ্ঠ, (২) ডান ক্ষেপক কোষ্ঠ, (৩) বাম গ্রাহক কোষ্ঠ আর (৪) বাম ক্ষেপক কোষ্ঠ।
.
হৃদয় কখনও একইরকম থাকে না, সেটা কখনও সংকুচিত হয় আবার কখনও প্রসারিত হয়। হৃদয়ের সঙ্গে দুই প্রকারের স্নায়ুর সম্বন্ধ থাকে, যেসব স্নায়ুতন্ত্র শরীর থেকে দূষিত রক্তকে হৃদয়ের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে আসে তাদের শিরা বলে তথা যেগুলোর মধ্যে শুদ্ধ রক্ত শরীরের পোষণের জন্য হৃদয়ের মধ্যে আসে, তাদের ধমনি বলে। শরীর থেকে শিরা দ্বারা আসা অশুদ্ধ রক্তকে শুদ্ধ হওয়ার জন্য ফুসফুসের মধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া তথা ফুসফুস থেকে আসা শুদ্ধ রক্তকে শরীরের মধ্যে পাঠিয়ে দেওয়াই হল হৃদয়ের কাজ। হৃদয় নিরন্তর নিজের কাজের মধ্যে লেগে থাকে। মানুষের শরীরের সব রক্তের ভার শরীরের ভারের প্রায় বিশ শতাংশ হয়। যে ব্যক্তির ভার ১ মন ২০ সের, তার শরীরে প্রায় ৩ সের রক্ত আছে। হৃদয় সংকুচিত হওয়াকে আঙ্কুচন বা সঙ্কোচ বলে আর ছড়িয়ে পূর্বদশাকে প্রাপ্ত হওয়াকে প্রসার বলে। হৃদয় এই সঙ্কোচ আর প্রসার দ্বারা রক্তকে গ্রহণ করে আর সামনের দিকে ধাক্কা দেয়। হৃদয় এই সঙ্কোচ আর প্রসারের ক্রিয়া এক মিনিটে ৭২ বার করে। এইভাবে ২৪ ঘন্টায় ২৫২ মন রক্ত হৃদয় থেকে শুদ্ধ হওয়ার জন্য ফুসফুসের মধ্যে যায় আর ততটাই ফুসফুস থেকে শুদ্ধ হয়ে হৃদয়ে পুনরায় ফিরে আসে। যখন হৃদয় সঙ্কোচ করে তখন সেটা রক্তকে খুব বেগে ধমনির মধ্যে ধাক্কা দেয়া আর প্রসার দিয়ে শিরা দ্বারা রক্তকে গ্রহণ করে। এই সঙ্কোচ-প্রসারের কারণে এক ধরণের শব্দ উৎপন্ন হয় যা শুনতে লুব-ডপ লুব-ডপ লুব-ডপ এইরকম হয়।
🍁 ফুসফুস বা শ্বাসযন্ত্র 🍁
ফুসফুস দুটো আছে, বক্ষের মধ্যে হৃদয়ের ডান আর বামদিকে থাকে। ডানদিকের ফুসফুস বামদিকের ফুসফুসের তুলনায় অধিক চওড়া আর ভারী হয়। মানুষের ফুসফুসের ভার প্রায় এক সের হয়, তবে স্ত্রীদের এর থেকে একটু কম হয়। ফুসফুসের মধ্যে শ্বাস নাসিকার দ্বারা শ্বাসপ্রণালীর মধ্যে হয়ে পৌঁছায়। ফুসফুসের মধ্যে অনেক ছোট-ছোট অংশ আছে যা পরস্পর সৌত্রিক তন্তুর দ্বারা বাঁধা থাকে, যাকে বায়ু মন্দির বলে। ফুসফুসের কাজ হল শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার সম্পাদন করা, এটা শ্বাস নিলে প্রসারিত হয় আর প্রশ্বাস অর্থাৎ বায়ু বাইরে বেরিয়ে গেলে নিজের পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে। প্রশ্বাসের পশ্চাৎও ফুসফুসের মধ্যে বায়ু ভরা থাকে। সাধারণতঃ সুস্থ মানুষ এক মিনিটে ১৬ থেকে ২০ পর্যন্ত শ্বাস নেয়, বাল্যকালে এই সংখ্যা অধিক হয়। রোগ হলে শ্বাসের সংখ্যা হ্রাস পায়। ফুসফুস নিরন্তর শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার দ্বারা রক্তের শুদ্ধি করে। এটা আমি পূর্বেই লিখেছি যে ফুসফুস হচ্ছে স্পঞ্জের মতো অসংখ্য ছোট-ছোট বায়ু মন্দিরের সমুদায়। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ছড়িয়ে দিলে শ্বাসযন্ত্র ১৪০০০ বর্গ ফিট স্থান নেয়। এই বায়ু মন্দির বক্ষোদর, মধ্যস্থ পেশীর চালে খোলা আর বন্ধ হতে থাকে। যখন এই বায়ু মন্দির ধাক্কা দেয় তখন একদিকে তো হৃদয় থেকে অশুদ্ধ রক্ত আর অন্যদিক থেকে শ্বাস দ্বারা নেওয়া বায়ু তাকে ভরে দেয়। রক্ত আর বায়ুর মাঝে এক অতি পাতলা ঝিল্লি থাকে। প্রকৃতির একটা বিলক্ষণ নিয়ম তাতে কাজ করে, সেই নিয়মের বশীভূত হওয়ায় যারমধ্যে যে বায়ু হয় না সেটা অন্যের থেকে টেনে নেয়। শুদ্ধ বায়ু থেকে জীবনীয় তত্ত্ব (অক্সিজেন) রক্তের মধ্যে মিলে যায় আর রক্তের মধ্যে সঞ্চিত দূষিত তত্ত্ব বায়ুর মধ্যে মিলে যায়, এইভাবে শুদ্ধ হওয়া রক্ত ধমনির দ্বারা সারা শরীরের মধ্যে পৌঁছে যায় আর অশুদ্ধ হওয়া বায়ু প্রশ্বাস দ্বারা শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়। এই কাজ প্রতিক্ষণ হতে থাকে।
🍁শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে শুদ্ধ বায়ু না পৌঁছানোর পরিণাম 🍁
এখন চিন্তার বিষয় হল যদি হৃদয় থেকে রক্ত শুদ্ধ হওয়ার জন্য শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে যাবে কিন্তু শ্বাস দ্বারা পর্যাপ্ত বায়ু শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে না পৌঁছায় অথবা সব বায়ু মন্দিরের মধ্যে যেখানে রক্ত পৌঁছে গেছে কিন্তু শুদ্ধ বায়ু না পৌঁছায় তাহলে তার পরিণাম কি হবে?
শ্বাসযন্ত্রের প্রধানত তিনটা ভাগ আছে, (১) উর্দ্ধ ভাগ যা প্রায় গলা পর্যন্ত, (২) মধ্যভাগ যা দুইদিকে হৃদয়ের এদিক-সেদিক এবং (৩) নিম্ন ভাগ যা বক্ষোদয় মধ্যস্থ পেশীর উপরে দুইদিকে। সাধারণ ভাবে যে শ্বাস নেওয়া হয় সেটা পূর্ণ শ্বাস হয় না এইজন্য শ্বাসযন্ত্রের সব ভাগে অথবা সব ভাগের সমস্ত বায়ু মন্দিরের মধ্যে পৌঁছায় না, ফলে শ্বাসযন্ত্রের উর্দ্ধ ভাগ রোগী হওয়া শুরু করে।
.
ঠিক এইভাবে শ্বাসযন্ত্রের মধ্য আর নিম্ন ভাগ রোগী হয়ে গেলে কাশি-শ্বাস-নিমোনিয়া আর জীর্ণ জ্বরাদি অনেক রোগ যা শ্বাসযন্ত্রের সঙ্গে সম্বন্ধিত, সেগুলো হতে থাকে। এইভাবে পর্যাপ্ত বায়ু শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে না পৌঁছানোর কারণে যেমন একদিকে শ্বাসযন্ত্র বা ফুসফুস সম্বন্ধিত রোগ উৎপন্ন হয়, তেমনই অন্যদিকে রক্ত শুদ্ধ হতে পারে না আর এই বিনা শুদ্ধ হওয়া অশুদ্ধ রক্তই হৃদয়ের মধ্যে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে সারা শরীরের মধ্যে ধমনির দ্বারা ছড়িয়ে যায়। বারংবার এইভাবে দূষিত রক্ত শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ চুলকানি থেকে ভয়ংকর কুষ্ঠ রোগ পর্যন্ত হয়। শরীরের মধ্যে উৎসাহ-কান্তি-স্ফূর্তির নিতান্ত অভাব হয়, শরীর-মন-মস্তিষ্কের সমস্ত শক্তি নিস্তেজ হয়ে যায় আর মানুষ ভয়ংকর রোগে পীড়িত হয়ে সাক্ষাৎ নরকের অনুভব করে।

🍁 প্রাণায়ামের গুরুত্ব 🍁
এতক্ষণ আমরা হৃদয় ফুসফুস আদি শরীরের অঙ্গের বর্ণনা এইজন্য করলাম যাতে আমরা শ্বাস সংস্থানের কাজ আর তার গুরুত্বকে বুঝতে পারি। আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়া, কর্মেন্দ্রিয়া, মন, বুদ্ধি আদি সব অধ্যাত্ম জগতের তত্ত্বের নির্মাণ রক্তের দ্বারাই হয়। রক্তের দ্বারাই মাংস, চর্বি, অস্থি, মজ্জা, শুক্র যাবৎ ধাতু তৈরি হয়। রক্ত যত শুদ্ধ পবিত্র হবে শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নির্মাণ ততই ঠিক ভাবে হবে। রক্তকে শুদ্ধ তথা জীবনীয় তত্ত্ব দ্বারা পরিপূর্ণ করার কাজ ফুসফুসের যাকে সে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্বারা সম্পাদিত করে। এইরকম অবস্থায় প্রাণায়ামের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে যায়। আমরা পূরক প্রাণায়াম দ্বারা বিশুদ্ধ বায়ু অধিক পরিমাণে ফুসফুসের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারি আর সেটা তার চাপ দ্বারা ফুসফুসের মধ্যে উপস্থিত সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বায়ু মন্দিরের মধ্যে পৌঁছে রক্তকে শুদ্ধ করতে পারে, তথা অভ্যন্তর কুম্ভক দ্বারা শ্বাসযন্ত্রের ধারণশক্তিকে অধিকাধিক বাড়িয়ে তাকে সবল বানাতে পারে আর বেগপূর্বক রেচক প্রাণায়াম করে ফুসফুসের মধ্যে উপস্থিত সম্পূর্ণ দূষিত বায়ুকে বাইরে ফেলে দিতে পারে। এইভাবে রেচক আর পূরক ক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা পূর্ণ স্বাস্থ্য লাভ করে সুখী হতে পারি।
.
আমি এটা প্রাণায়ামের স্থূল কাজের বর্ণনা করেছি যাকে আধুনিক শরীরশাস্ত্রজ্ঞও স্বীকার করে। এছাড়াও প্রাণায়ামের আরও অনেক অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। যে বায়ু আমরা নাসিকা দ্বারা ভিতরে নিই বা বাইরে বের করি, কেবল তারই নাম প্রাণ নয়। প্রাণবাহক স্নায়ুতন্ত্র শরীরের প্রত্যেক অঙ্গের মধ্যে এমনকি ত্বকেরও প্রত্যেক অণুর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এইসব স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে প্রতিক্ষণ প্রাণদেব পরিক্রমা করতে থাকে। প্রাণবাহক স্নায়ুতন্ত্র রক্তবাহক স্নায়ুতন্ত্রের সমান সচ্ছিদ্র নয় বরং দৃঢ় হয়। এর অভ্যন্তর তথা বাইরের অবয়ব থেকে হয়ে প্রাণ এমন ভাবে গতি করে যেমন "শোষক কাগজে" জল। একেই প্রাণসূত্র বলে। গতি আর জ্ঞান এই দুই প্রকার কাজের সম্পাদন প্রাণ আর দৈব মন এই সূত্রের দ্বারা করে। প্রাণায়াম করার ফলে এইসব প্রাণসূত্র বিশেষ বল প্রাপ্ত করে, যার ফলে সম্পূর্ণ শরীরের মধ্যে স্ফূর্তি আর উৎসাহের সঞ্চার হয়।
প্রাণায়াম করার সময় "মূলধারের সঙ্কোচ" নামক ক্রিয়া বিশেষ ধ্যান দিয়ে করতে হয়, যার বর্ণনা আমরা পরবর্তী অধ্যায়ের মধ্যে করবো। মূলধারের সঙ্কোচ দ্বারা প্রাণ উর্দ্ধগতি হয়ে মস্তিষ্কের মধ্যে স্থির হয়ে যায়, যার ফলে মন অনায়াসে একাগ্র হয়ে সাধককে আনন্দিত করে তোলে। এইভাবে প্রাণায়াম করলে অনেক অপূর্ব লাভ হয়।
🍁 দীর্ঘায়ুর সাধন প্রাণায়াম 🍁
প্রাণীদের আয়ুকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে বিভক্ত তো মানা যায় না তবে যারা ব্রহ্মচর্যের পালন করে নিয়মপূর্বক প্রাণায়াম করে তারা তেমন শরীর মন আদি হতে নিরোগ থাকে তেমনই তারা আয়ুতেও বৃদ্ধি প্রাপ্ত করে। প্রাণায়ামের অভ্যাস দ্বারা মানুষের ফুসফুস বলবান হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি গম্ভীর হওয়াতে আয়ু ক্ষীণ হয় না আর তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সংখ্যা অনেক কমে যায়। এই কারণে ঋষি, মহর্ষি তথা সংযমী মানুষ দীর্ঘায়ু হয় আর তাদের অপেক্ষায় চরিত্রহীন সংযম-রহিত জীবনযাপনকারী ব্যক্তি অতি অল্পায়ু হয়। যেসময় আমাদের দেশে এই প্রাণায়াম বিদ্যার প্রচার ছিল তখন মানুষের সাধারণ আয়ু শত বর্ষ ছিল, রোগ প্রায় হতোই না, মৃত্যুও বিনা ইচ্ছায় আসতো না। মহাভারতে ভীষ্ম পিতামহ কয়েক মাস যাবৎ মৃত্যুর সঙ্গে সংঘর্ষ করতে থাকেন আর তারপর নিজের ইচ্ছানুসারে প্রাণ বিসর্জন করেন। শ্বাসের সঙ্গে আয়ুর ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে, সেটা নিম্ন বিবরণ তালিকার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় -
🌱 শ্বাসের উপর প্রাণীদের আয়ু -
(প্রাণী) --(প্রতি মিনিট শ্বাস) -- (আয়ু)
খরগোশ -------- ৩৮ ------------ ৮ বছর
পায়রা ----------- ৩৬ ------------ ৮ বছর
বাঁদর ------------- ৩২ ---------- ২১ বছর
কুকুর ------------ ২৯ ----------- ১৪ বছর
ছাগল ----------- ২৪ ----------- ১৩ বছর
নেউল ----------- ২৫ ----------- ১৩ বছর
ঘোড়া ------------ ১৯ ----------- ৫০ বছর
মানুষ ------------ ১৫ --------- ১০০ বছর
হাতি -------------- ১২ --------- ১০০ বছর
সাপ ---------------- ৮ ---------- ১২০ বছর
কচ্ছপ ------------- ৫ ---------- ১৫০ বছর
দ্রষ্টব্য - এই শ্বাস সংখ্যা সুস্থ প্রাণীদের দেওয়া হয়েছে, রোগী আর দূর্ব্যসনিদের নয়।
🍁 শ্বাস সর্বদা নাক দিয়েই নিবেন 🍁
পরমপিতা পরমাত্মার কৃপায় মানুষ এমন সুবিধা প্রাপ্ত করেছে যে সে নাক আর মুখ দুটো দিয়েই শ্বাস নিতে পারে কিন্তু একটু গম্ভীর ভাবে দেখলে এই পরিণাম আসে যে - শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রকৃতি নাসিকারই নির্মাণ করেছে। আজ অনেক ব্যক্তি আর বিশেষ করে কথিত সভ্য বলা হয় এমন মানুষের মধ্যে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার দূর্ব্যসন দেখা যায়, যার পরিণাম খুবই হানিকারক। তার কারণ হল মুখের মধ্যে এমন কোনো সাধন নেই যেটা বায়ুকে সংশোধন করে ফুসফুসের যোগ্য করতে পারে, এই কারণে দূষিত পরমাণু সহিত বায়ু শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে পৌঁছে অনেক সংক্রামক রোগকে উৎপন্ন করে। মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার মার্গ ছোট হওয়ার কারণেও বায়ু অতি শীত অথবা অতি উষ্ণ রূপেই শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে পৌঁছে যায়, যার ফলে সর্দি, জ্বর, কাশি আদি অনেক রোগ উৎপন্ন হয়। এর বিপরীত নাসিকা দিয়ে শ্বাস নেওয়া অতি উপযোগী হয়। পরমাত্মা নাসিকার মধ্যে এমন ভাবে সাধন সংযুক্ত করেছেন যা ফুসফুসকে হানি করে এমন জীবাণুকে মাঝখানেই থামিয়ে দেয়, আর শ্বাসযন্ত্র পর্যন্ত বায়ু এসে পৌঁছাতে-পৌঁছাতে বায়ু উপযুক্ত শীতোষ্ণ হয়ে যায়। যেসব ব্যক্তি প্রাণায়াম মার্গে আগে যেতে চায় তাদের সর্বপ্রথম নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার স্বভাব করা উচিত। এটা শুনতে খুবই সামান্য কথা বলে মনে হয় কিন্তু স্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে এর বিশেষ গুরুত্ব আছে।
🍁 প্রাণায়ামের প্রস্তুতি 🍁
প্রাণায়াম করার পূর্বে তার প্রস্তুতি নেওয়াটা পরমাবশ্যক, অর্থাৎ নিজেকে প্রাণায়ামের যোগ্য করে তোলা।
যেসব সাধক নিজেকে প্রাণায়ামের অধিকারী করে না তারা অনুভবী গুরুর সানিধ্যে থাকা সত্ত্বেও যথেষ্ট উন্নতি হতে বঞ্চিতই থাকে। সুতরাং প্রাণায়ামের পথিককে নিম্ন বিষয়গুলোর উপর গভীর ভাবে ধ্যান দেওয়া উচিত -
🌿 প্রাণায়ামের প্রতি আস্থা 🌿
যারা প্রাণায়ামে সফল হতে চায় তাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য হল তারা তাদের মনকে প্রাণায়ামের গুণের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিবে, যাতে প্রাণায়ামের বিচার আসতেই তার মধুর পরিণামের বিচার করে মন লাফিয়ে ওঠে। প্রাণায়াম করার পূর্বে আমাদের মনের মধ্যে এই বিচার দৃঢ় হওয়া উচিত যে এখন আমরা জীবনদায়িনী ক্রিয়াকে করতে চলেছি, যার দ্বারা অনেক দিব্য শক্তি প্রাপ্ত হবে। শরীরের সব ধাতুর মল ভস্মীভূত হয়ে যাবে। নিরাশা-দুর্বলতা-নিষ্কর্মণ্যতা নামেরও শেষ থাকবে না, সব প্রকারের রোগের ইতিশ্রী হয়ে যাবে। জীবনে উৎসাহ-পৌরুষ-সাহস-শৌর্য- পুরুষার্থ আদি শুভ গুণের উদয় হবে। ইন্দ্রিয়ের মলিনতা এবং চঞ্চলতা নষ্ট হয়ে পরমপুরুষার্থের সহযোগিনী হয়ে উঠবে। বুদ্ধি কুশাগ্র হওয়াতে জ্ঞানের অথাহ সাগরের মধ্যে ইচ্ছানুসারে বিচরণ করতে পারবে। সব ধরণের ঋদ্ধিসিদ্ধি চরণ চুম্বন করবে, বীর্যের ঊর্ধ্বগতি হওয়ার কারণে আত্মা বাস্তবিক রূপে শরীরের রাজা হয়ে যাবে। সংকীর্ণতা দূর হয়ে "বসুধৈব কুটুম্বকম্" এর দিব্য সংবাদ মনের মধ্যে স্ফুরিত হয়ে উঠবে। অন্তঃকরণের মল বিক্ষেপ আবরণ আদি সব দোষ দূর হয়ে জীবন পবিত্র আর সফল হয়ে যাবে। এই ভাবে অনেক শুভ গুণের ধ্যান করে অতি উৎসাহ-নিষ্ঠা আর শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রাণায়াম করতে বসবেন। মনের ভিতরে সংশয় অথবা বিকল্পের একটুও অবকাশ দিবেন না, এইভাবে করলে খুব শীঘ্রই যথেষ্ট উন্নতি হওয়া সম্ভব।
🌿 প্রাণায়ামে আসনের উপযোগিতা 🌿
প্রাণায়াম তথা আসনের পরস্পর ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে। আসনের সিদ্ধির পশ্চাৎই সাধক প্রাণায়ামে পূর্ণ সফলতা প্রাপ্ত করতে পারে এইজন্য য়োগদর্শনের মধ্যে মহর্ষি পতঞ্জলি জী প্রাণায়ামের সম্বন্ধে করে লিখেছেন -
তস্মিন্সতি শ্বাসপ্রশ্বাসয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ। (য়োগ ২/৪৯)
অর্থাৎ - আসন সিদ্ধ হলে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে রোধ করা হল প্রাণায়াম। সূত্রের মধ্যে "তস্মিন্ সতি" পদ বিশেষ ধ্যান দেওয়ার যোগ্য, আচার্য এই পদের দ্বারা প্রাণায়ামের জন্য আসনের বিশেষ উপযোগিতা সিদ্ধ করতে চাইছেন, এই কারণে প্রাণায়ামের পূর্বে এই আসনের বিধান করেছেন। আসনের স্থিরতার সবথেকে বড় লাভ হল - সাধককে উপাসনার বিঘ্ন শীত-উষ্ণ- খিদে-তৃষ্ণা আদি দ্বন্দ্ব দুঃখ দেয় না। এইজন্য য়োগসূত্রকার লিখেছেন -
ততো দ্বন্দ্বানভিঘাতঃ।। (য়োগ ২/৪৭)
অর্থাৎ - যখন আসন স্থির হয়ে যায় তখন উপাসককে কোনো পরিশ্রম করতে হয় না আর শীত-উষ্ণ অধিক পীড়া দেয় না।
গীতার মধ্যে আসনের বিষয়ে লেখা আছে -
য়োগী য়ুঞ্জীত সততমাত্মানম্ রহসি স্থিতঃ।
একাকী য়তচিত্তাত্মা নিরাশীরপরিগ্রহঃ।। ১০
শুচৌ দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য স্থিরমাসনমাত্মনঃ।
নাত্যুচ্ছ্রিতম্ নাতিনীচম্ চৈলাজিনকুশোত্তরম্।। ১১
তত্রৈকাগ্রম্ মনঃ কৃত্বা য়তচিত্তেন্দ্রিয়ক্রিয়ঃ।
উপবিশ্যাসনে য়ুঞ্জ্যাদ্যোগমাত্মবিশুদ্ধয়ে।। ১২
সমম্ কায়শিরোগ্রীবম্ ধারয়ন্নচলম্ স্থিরঃ।
সম্প্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রম্ স্বম্ দিশশ্চানবলোকয়ন্।। ১৩
(গীতা ৬/১০-১৩)
য়োগী একান্ত দেশে বসে মন একাগ্র করবে। পরমেশ্বরের চিন্তনের অতিরিক্ত অন্য বিষয়বাসনার চিন্তন করবে না। নিরন্তর একরস মমতারহিত হয়ে মনকে পরমেশ্বরের মধ্যে লাগাবে।। ১০
এমন স্থানে করবে সেখানকার ভূমি, জল, বায়ু শুদ্ধ হবে আর সেটা না তো অধিক উঁচু আর না অধিক নিচু হবে, সেখানে নিচে কুচের আসন তার উপর মৃগছালা বিছিয়ে তার উপর একাগ্র মনে চিত্ত আর ইন্দ্রিয়ের বৃত্তিকে নিরোধ করে নিশ্চল দৃঢ় আসনপূর্বক স্বয়ং বসে নিজের আত্মার শুদ্ধির জন্য ধ্যান য়োগের মাধ্যমে পরমাত্মার চিন্তনে তৎপর হবে।। ১১-১২
কাধ, মেরুদন্ড, মাথা আর গলাকে অচল আর সোজা ধারণ করে নিজের নাসিকার অগ্রভাগে ধ্যান রেখে স্থির হয়ে বসবে আর এদিক-সেদিক কোনো দিশাতে দৃষ্টি ফেলবে না।। ১৩
প্রাণায়াম করার জন্য উপযুক্ত আসনের জিজ্ঞাসাতে আমি বলবো, যে আসনে সুখপূর্বক অধিক সময় পর্যন্ত বসা যেতে পারে সেই আসনটাই উচিত হবে। য়োগদর্শনের মধ্যেও সেটা বলা হয়েছে -
"স্থিরসুখমাসনম্" (য়োগ ২/৪৬)।
প্রাণায়ামের অভ্যাস করার জন্য সিদ্ধাসন হল সর্ব শ্রেষ্ঠাসন। সিদ্ধাসনের অভ্যাস দ্বারা অন্য অনেক ধাতু সম্বন্ধীয় বিকার নষ্ট হয়ে যায়। বিধিটা এইরকম -
.
সমতল ভূমিতে বসে বাঁ পায়ের গোড়ালি অণ্ডকোষ আর গুদা ইন্দ্রিয়ের মাঝখানে যে স্থান আছে, সেখানে লাগাবে। এটা হচ্ছে সেই স্থান যেখান থেকে বীর্যবাহক স্নায়ুতন্ত্র গমন করে। ডান পায়ের গোড়ালি মূত্র ইন্দ্রিয়ের উপরে যেখানে কেশ গজায়, সেখানে লাগাবে। দুই পায়ের গোড়ালি মিলে থাকবে। দুই হাঁটু ভূমিতে স্পর্শ করবে। মাথা-গলা-মেরুদণ্ড সমরেখাতে (সোজা) রাখতে হবে। দুই হাত সোজা করে দুই হাঁটুর উপরে রাখবে। শরীর টানটান হওয়া উচিত। বুক প্রসারিত আর সামনের দিকে উদিত হয়ে থাকবে। দৃষ্টি নাসিকার অগ্রভাগ অথবা ভ্রুকুটিতে স্থির করবে। প্রাণায়ামের অভ্যাস করার পূর্বে এক বা দুই ঘন্টা পর্যন্ত এই আসনে বসার অভ্যাস করা উচিত।
.
এই আসন করলে পাচনশক্তি বাড়ে, ডায়রিয়া, শ্বাস, কাশী, বহুমূত্র আদি রোগ দূর হয়, হৃদয় বলবান হয়, স্বপ্নদোষ, প্রমেহ আদি ধাতু সম্বন্ধীয় সব দোষ নষ্ট হয়ে যায়, মন একাগ্র এবং শান্ত হয়ে নিয়ন্ত্রণে আসে, বিষয় লালসা কম হয়, বীর্যের ঊর্দ্ধগতি হয়। ব্রহ্মচারীকে ব্রহ্মচর্যের সিদ্ধির জন্য এর বিশেষ অভ্যাস করা উচিত। এর অতিরিক্ত শির্ষাসন, পদ্মাসন, সর্বাঙ্গাসন, হলাসন, ময়ুরাসন, পশ্চিমোত্তানাসনও প্রাণায়ামের অভ্যাসের জন্য বিশেষ লাভদায়ক হয়। এইসব আসন করলে স্নায়ুতন্ত্রের শুদ্ধি হয়ে প্রাণায়ামে সফলতা প্রাপ্ত হয় আর অভ্যাসকারীর স্বাস্থ্য ঠিক থাকে।
🍁 প্রাণায়াম আর বন্ধ জ্ঞান 🍁

প্রাণায়াম অভ্যাসীদের জন্য বন্ধের জ্ঞান হওয়াটা অতি আবশ্যক। বন্ধ হল তিনটা, যথা (১) মূলবন্ধ, (২) উড্ডিয়ানবন্ধ আর (৩) জালন্ধরবন্ধ (কণ্ঠবন্ধ)। এই তিনটা একসঙ্গে বন্ধত্রয় বলে। তিনটা বন্ধই প্রাণায়াম মার্গে অতি লাভপ্রদ আর পরমোপয়োগী হয়। তিনটার বিধি এখানে পৃথক-পৃথক ভাবে দেওয়া হল -

🌿 মূলবন্ধ 🌿

পদ্মাসন বা সিদ্ধাসনে বসে নাভি থেকে নিচে উদরের ভাগকে পিছন দিকে সঙ্কুচিত করে তথা গুদা ইন্দ্রিয় এবং মূত্র ইন্দ্রিয়কে উপরের দিকে সঙ্কোচ করবেন। আপনি এটা অন্য ভাবেও ঠিক বুঝতে পারবেন, যখন লঘুশঙ্কা (প্রস্রাব) করতে যাবেন আর মূত্রত্যাগ করার সময় মাঝখানেই নাভির নিচের ভাগকে উপরের দিকে টান দিবেন তো এর উপরে সঙ্কোচের কারণে গুদা ইন্দ্রিয় আর মূত্রেন্দ্রিয়ও একসঙ্গে টানবে তথা মূত্র বের হওয়া একদম বন্ধ হয়ে যাবে আর যতক্ষণ এই মূলাধারকে ঢিলা করবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত এক ফোঁটা মূত্র আসবে না, এই ক্রিয়াকেই মূলবন্ধ বলে। সব প্রকারের প্রাণায়ামে এই বন্ধ জারি থাকা অত্যাবশ্যক। এই মূলাধার সঙ্কোচকে তো ব্রহ্মচারীর প্রাণই বলা উচিত, কারণ এর নিরন্তর অভ্যাস দ্বারা সব প্রকারের বীর্য সম্বন্ধীয় বিকার দূর হয়ে যায় তথা বীর্যের ঊর্ধ্বগতি হয়। যেসব ব্যক্তির কুসঙ্গ আদির কারণে স্বপ্নদোষ আদি রোগ হয়েছে, তাদের জন্য এটা খুবই উত্তম প্রয়োগ। আপনি যখন কয়েক মাস প্রাণায়াম করার অভ্যাস করবেন তথা মূলবন্ধকে লাগানোর ঠিক অভ্যাস হয়ে যাবে তখন আপনি দেখবেন যে স্বপ্নদোষ আর স্বপ্নদোষের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকবে। ধীরে-ধীরে আপনি স্বপ্নদোষ থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন আর আপনার বিজয় হবে।

এর অতিরিক্ত মূলাধার সঙ্কোচের কারণে কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়ে যায় তথা সুষুম্নার মুখ খুলে যায়, যার ফলে কুণ্ডলিনী এরমধ্যে প্রবেশ করে, এই ক্রিয়ার ফলে সাধকের প্রাণের ঊর্দ্ধগতি হয়ে সুষুম্নার দ্বারা মস্তিষ্কের মধ্যে চলে যায় আর সেখানে স্থির হওয়ার কারণে সাধক পরমাত্মার দিব্য আনন্দের প্রাপ্তি করে। এই বিষয়ে স্বামী আত্মানন্দ জী মহারাজ তাঁর "সন্ধ্যা অষ্টাঙ্গ য়োগ" পুস্তকের মধ্যে লিখেছেন -

কুণ্ডলিনী পেটের কোন অঙ্গ আর এটা জাগলে সুষুম্নার মুখ খুলে যাওয়ার সঙ্গে এর কি তাৎপর্য, এতে মতভেদ আছে। তবে হ্যাঁ, একথা অবশ্যই আছে যে "কুণ্ডলিনী জাগরণ" নামক ক্রিয়ার পরে সুষুম্না মার্গে প্রাণ বিনা কোনো বাধায় তীব্রতার সঙ্গে মস্তিষ্কের দিকে চলে যায় আর এর পূর্বে এমনটা হতো না, খুব সম্ভবত সুষুম্নার নিচের ভাগ শ্লেষ্মা আদি মলের দ্বারা আক্রান্ত থাকে আর সেটাই প্রাণের উর্দ্ধগতির প্রতিবন্ধক থাকে। (মূলবন্ধাদি) বিশেষ ক্রিয়া দ্বারা সংশোধন হয়ে যাওয়ার পর প্রাণের বন্ধ সরে যায়...। কুণ্ডলিনীর স্বরূপ যাইহোক না কেন তবে এটা নিশ্চিত যে মূলাধার সঙ্কোচের ফলে প্রাণের ঊর্দ্ধগতি হয়ে আধ্যাত্ম আনন্দের প্রাপ্তি হয়।

🌿 উড্ডিয়ানবন্ধ 🌿

পদ্মাসন বা সিদ্ধাসন লাগিয়ে বসবেন তথা সম্পূর্ণ শ্বাসকে একসঙ্গে বের করে দিবেন, পেটকে পিছনের দিকে টানবেন, এমনটা করলে অন্ত্র শরীরের পিছনের ভাগে লেগে যাবে তখন পেটের সব অবয়বের মধ্যে সঙ্কোচ উৎপন্ন হবে, একেই উড্ডিয়ানবন্ধ বলে। উড্ডিয়ানের অর্থ উড়ন-ও হয়, কারণ যখন এর অভ্যাস করা হয় তখন প্রাণ সুষুম্নানাড়ি থেকে উপরে উড়ে যায়, এইজন্য এই বন্ধের নাম হল উড্ডিয়ান।

এর অভ্যাস বাহ্যকুম্ভকের সময় করা হয়। প্রাণায়ামের সময় এই বন্ধকে বসে তথা ব্যায়ামের সময় দাঁড়িয়ে করা যেতে পারে। এই বন্ধকে ৬ থেকে ৮ মিনিট পর্যন্ত করা উচিত। নৌলি ক্রিয়ার প্রারম্ভিক ক্রিয়া উড্ডিয়ান বন্ধই হয়। নৌলি ক্রিয়া বিশেষ ভাবে দাঁড়িয়ে করা হয়। ব্রহ্মচর্য রক্ষাতে এর দ্বারা খুব সহায়তা পাওয়া যায়। নিয়মিত এর অভ্যাস করলে স্বাস্থ্য, শক্তি, তেজ আর স্ফূর্তি প্রাপ্ত হয়। এর অভ্যাস নৌলি ক্রিয়ার সঙ্গে করা হয়। এই অভ্যাস আমাশয়-অন্ত্র আদির দোষের জন্য রামবাণ আর পেটের সব রোগ থেকে বাঁচার জন্য উড্ডিয়ান বন্ধ হল অমূলক ঔষধ। এই ক্রিয়ার মাধ্যমে উদরের সব অবয়বের যথাযত ব্যায়াম হয়ে যায়, এর জন্য এর থেকে ভালো আর কোনো ক্রিয়া নেই। সব প্রকারের ব্যায়ামের মধ্যে এই ক্রিয়া অনুপম তথা সবথেকে অধিক লাভকারী। পেট আর অন্ত্রের কঠিন রোগে যেখানে ঔষধ ব্যর্থ হয়ে যায় সেখানে এই ক্রিয়া অতি শীঘ্র সফলতা প্রাপ্ত করে। উদরের চর্বিকে কম করতে আর বায়ুর নিবৃত্তি করতে এই ক্রিয়া অদ্বিতীয়।

🌿 জালন্ধরবন্ধ 🌿

পদ্মাসন অথবা সিদ্ধাসন লাগিয়ে বসে অভ্যন্তর প্রাণায়াম করবেন অর্থাৎ নাক দিয়ে বায়ুকে ভিতরে শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে ভরে নিবেন আর সেখানেই নিরোধ করবেন, তারপর গলাকে সঙ্কুচিত করে থুতনিকে বুকের মধ্যে লাগাবেন, একেই জালন্ধরবন্ধ বলে। যখন কুম্ভকের অবধি পুরো হয়ে যাবে তখন মাথা উপরে ওঠাবেন আর তারপর মাথা, গলা আর সারা শরীর সোজা করে শ্বাস বাইরে বের করে দিবেন। অভ্যন্তর কুম্ভক করার সময় বায়ু উপরে মস্তিষ্কের মধ্যে চলে যায়, যার ফলে মাথায় উষ্ণতা, মাথা ব্যথা, ভারীতা আদি অনেক বিকার হয় কিন্তু জালন্ধর বন্ধ সঠিক ভাবে করলে প্রাণ উপরে যায় না আর কোনো ধরণের বিকারের সম্ভাবনা থাকে না। 

উপরে মূলবন্ধ, জালন্ধরবন্ধ তথা উড্ডিয়ানবন্ধ নিয়ে পৃথক-পৃথক ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সিদ্ধসনে বসে প্রাণায়াম করার সময় এগুলোর অভ্যাস করা উচিত। এরই সঙ্গে প্রাণায়াম করলে বিশেষ লাভ হয় সুতরাং এর প্রয়োগ মন দিয়ে করা উচিত।

🍁 ব্রহ্মচর্য আর প্রাণায়াম 🍁

যারা প্রাণায়াম থেকে পূর্ণ লাভ প্রাপ্ত করতে চায় তাদের সর্বপ্রথম ব্রহ্মচর্য প্রলনের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়া উচিত। সংযম বিনা কোনো সাধকই এই পথে এক পাও আগে যেতে পারবে না। পুস্তক তথা ব্যাখ্যাতে প্রাণায়ামের দিব্য আকর্ষক গুণের স্মরণ করে অনেক ব্যক্তি ব্রহ্মচর্যের উপেক্ষা করে প্রাণায়ামের মধ্যেই পরিশ্রম করে। এতে তারা লাভের স্থানে অনেক ভয়ংকর রোগ নিয়ে বসে। আসলে প্রাণায়াম আর ব্রহ্মচর্যের মধ্যে অবিনাভাব সম্বন্ধ আছে। যেভাবে ব্রহ্মচর্য বিনা প্রাণায়ামে সফলতা পাওয়া যায় না, তেমনই প্রাণায়ামের অভাবে ব্রহ্মচর্য পথ প্রশস্ত হওয়া সম্ভব নয়।

প্রাণায়াম করার ফলে শরীরের মধ্যে এক ধরণের উষ্ণতা উৎপন্ন হয়, যার ফলে জঠরাগ্নি প্রদীপ্ত হয়ে উদরস্থ সব বিকার নষ্ট হয়ে তথা শরীরের রস, রক্ত, মাংস, মেদাদি বীর্য পর্যন্ত সব ধাতুর মল ক্ষীণ হয়ে শরীর শুদ্ধ পবিত্র হয়ে যায়। আর এর বিপরীত যে অসংযমী ব্যক্তি ভোগ বিলাস দ্বারা নিজেকে নির্বীর্য বানিয়ে ফেলেছে, সে যদি প্রাণায়াম করে তাহলে তার ভিতরে উষ্ণতা অধিক বেড়ে শরীরের ধাতুকে শুকিয়ে দিবে, যার ফলে তার শরীর দূর্বল, রুক্ষ আর নিস্তেজ হয়ে হবে।

প্রাণায়ামের অভ্যাসীকে ব্রহ্মচর্য পালনের কতটা আবশ্যকতা আছে তার একটা প্রমাণ মহর্ষি দয়ানন্দ জীর জীবনচরিত্র থেকে পাওয়া যায় - একদিন এক ঠাকুরপ্রসাদ সুনার দানাপুর স্বামী জীর নিকট নিবেদন করে যে আপনি আমাকে য়োগ (প্রাণায়াম) এর বিধি বলুন। স্বামী জী উত্তর দেন - "আরও একটা বিয়ে করে নাও তোমার য়োগ (প্রাণায়াম) পূর্ণ হয়ে যাবে।" কিছুদিন পূর্বে ঠাকুরপ্রসাদ প্রথম স্ত্রী থাকতে দ্বিতীয় বিবাহ করেছিল। অতঃ মহর্ষি তাকে এইভাবে উপহাসাত্মক উত্তর দেন, যার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রাণায়ামের অভ্যাসীকে ব্রহ্মচর্যের দৃঢ়ব্রতী হওয়া উচিত।

তাছাড়া প্রত্যেক কাজের শুরুতে অনভ্যাসের কারণে কষ্টকর অনুভব হয় তবে প্রাণায়ামের প্রারম্ভিক অভ্যাস কালে সাধকের উপর আলস্য-প্রমাদের তীব্র আক্রমণ হয়, সেখান থেকে পার হওয়া ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই সম্ভব। এইজন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জী গীতাতে ঠিকই বলেছেন -

অসম্য়তাত্মনা য়োগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ।
বশ্যাত্মনা তু য়ততা শক্যোऽবাপ্তুমুপায়তঃ।। 
(গীতা ৬/৩৬)

অর্থাৎ - যার মন নিজের অধীনে নেই তার সমাধিরূপ য়োগ অনেক দুঃখের সঙ্গে প্রাপ্ত হয়, এটা আমি মনে করি আর যে নিজের মনকে বশ করেছে আর স্বয়ং যত্নশীল, সে চেষ্টা করলে প্রাপ্ত করতে পারবে। অতঃ যে সজ্জন প্রাণায়ামের মার্গে যেতে চাইবে তাকে বিশেষ নিষ্ঠা পূর্বক ব্রহ্মচর্যের পালন করা উচিত।

🍁 প্রাণায়াম আর ভোজন 🍁

আমাদের জীবনের মূল আধার হল ভোজন। ভোজনের সাত্ত্বিক মীমাংসার বিনা আমরা কোনো ক্ষেত্রেই উন্নতি করতে পারবো না, কারণ আমাদের শরীর-মন-মস্তিষ্ক তথা অন্য সব সাধনভূত শরীর অবয়ব ভোজন দ্বারাই নির্মিত আর বিকশিত হয়। সাত্ত্বিক-রাজসিক আর তামসিক ভেদ দ্বারা ভোজন তিন ভাগে বিভক্ত, প্রাণায়ামের অভ্যাসীকে শুদ্ধ সাত্ত্বিক-পৌষ্টিক তথা স্নিগ্ধ আহারই সর্বদা সেবন করা উচিত আর সেটাও পরিমিত মাত্রায়, নিশ্চিত সময়, দেশ কাল আর শরীরের বলাবলের বিচার করে, তবেই লাভপ্রদ হয়।

আজ আমাদের ভোজন প্রায় দূষিত হয়ে গেছে। প্রথমত আমরা এটাই জানি না যে ভোজন স্বাদের জন্য হয় না বরং শরীর রক্ষার নিমিত্তের জন্য হয়, এই কারণে আমরা ভোজনের নির্ধারণ করার সময় লাভ-হানির উপেক্ষা করে কেবল জিহ্বার লোলুপতাকে অধিক গুরুত্ব দিই। প্রাণায়াম অভ্যাসীদের জন্য অনুভবী সাধক বিদ্বান ভোজনের চর্চা করে লিখেছেন -

পুষ্টম্ সুমধুরম্ স্নিগ্ধম্ ধাতুপ্রপোষণাম্।
মনোऽভিলষিতম্ য়োগ্যম্ য়োগী ভোজনমাচরেত্।।

অর্থাৎ - প্রাণায়ামের সাধক য়োগীকে শরীরপোষক, মধুর, স্নিগ্ধ, শরীরের সব ধাতুকে পুষ্ট করে এমন রুচিকারক, প্রকৃতির অনুকূল ভোজন করা উচিত।

ঠিক এইরকম সাত্ত্বিক ভোজনের বিধান শ্রীকৃষ্ণ জী গীতার মধ্যে বলেছেন -

আয়ুঃ সত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।
(গীতা ১৭/৮)

অর্থাৎ - আয়ু, উৎসাহ, বল, আরোগ্য, সুখ আর প্রীতি বৃদ্ধিকারী ভোজন সত্ত্বগুণী মানুষদের প্রিয় হয়। অর্থাৎ যে ভোজনের সেবন দ্বারা আয়ু, বল, বীর্য, আরোগ্য আদি শুভ গুণের বৃদ্ধি হয়, যা সরস হালকা - ঘৃতাদিযুক্ত চিরস্থায়ী আর হৃদয়ের জন্য হিতকর হয় সেইসব ভোজন সাত্ত্বিক হয়। কিছু সাত্ত্বিক পদার্থ নিচে দেওয়া হল -

🌿 সাত্ত্বিক পদার্থ -

দেশী গরুর ঘী আর দুধ, গম, যব, চাল, মুগ ডাল, তাজা ফল, শাক, ঝিঙ্গে, লাউ আদি মধুর শীতল, স্নিগ্ধ, সরস, শুদ্ধ, পবিত্র আর শীঘ্র হজমকারী তথা ওজ আর কান্তিপ্রদ পদার্থ, এগুলো সব সাত্ত্বিক।

আজকাল মানুষের ভোজনে সাত্ত্বিকের অভাব তথা রাজসিক আর তামসিক অংশের প্রাধান্য আছে। সবাই টক, নোনতা, অত্যুষ্ণ, তীক্ষ্ণ, রুক্ষ, দাহক, লবণাক্ত, ঝাল তথা মসলা যুক্ত ভোজন করে, যার ফলে রজোগুণের বৃদ্ধি হয়ে প্রতিক্ষণ তৃষ্ণা আর চিন্তার জ্বালাতে মানুষ অশান্ত হয়ে আছে। এই ধরণের মানুষ প্রাণায়ামে কখনো সফল হবে না, সুতরাং প্রাণায়ামের অভ্যাসীকে সাত্ত্বিক ভোজনের মাত্রাও ধ্যানে রাখা আবশ্যক, অধিক মাত্রায় খাওয়া সাত্ত্বিক ভোজনও দুঃখদায়ক। গরিষ্ঠ আর মলবদ্ধকারী আহার থেকে সাধককে দূরেই থাকা উচিত।

🍁 প্রাণায়াম আর নিয়মিত দিনচর্যা 🍁

প্রাণায়ামে সফলতার জন্য নিয়মিত দিনচর্যা হওয়াটা পরম আবশ্যক। সাধকের প্রত্যেক ক্ষণ নিশ্চিত কার্যক্রমানুসারে বিভক্ত হওয়া উচিত। প্রাতঃকাল জাগরণ থেকে শুরু করে রাতের শয়ন পর্যন্ত নিয়মিত রূপে দিনচর্যা অবাধ রূপে চলা উচিত। এইভাবে একটানা লম্বা সময় পর্যন্ত অভ্যাস করলে মন তথা শরীরের অন্য অবয়ব সময়ানুসারে কাজ করার অভ্যাস হয়ে যায়, ফলে মন সব বিকল্প থেকে রহিত অতিশান্ত থাকবে। সায়ংকালে নিশ্চিত সময়ে শয়ন করার ফলে প্রাতঃ ঠিক সময় নিদ্রা পূরণ হবে আর একটু সময়ের মধ্যেই শরীরের সব ক্লান্তি দূর হবে। শৌচ আদি মল বিসর্জনের সময় নিশ্চিত হওয়াতে আমাদের অনৈচ্ছিক মাংস সঠিক সময়ে মল ত্যাগ করবে। এর ফলে কব্জ বা কোষ্ঠকাঠিন্য আদি রোগ থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যাবে। ভোজনের সময় নিশ্চিত হওয়াতে খিদে ঠিকভাবে পাবে আর ভোজনের পরিপাকও উচিত রীতিতে হবে। শরীরের সব অঙ্গের ব্যবস্থা ঠিক থাকার জন্য প্রাণায়াম করে প্রতিদিন মন উৎসাহিত থাকবে, আর মন স্বতঃ প্রাণায়ামের মধ্যে লেগে যাবে। এইভাবে নিয়মিত দিনচর্যা করলে খুব শীঘ্রই উন্নতি হবে।

প্রাণায়ামের অভ্যাসীদের জন্য কিছু বিষয় উপরে লেখা হয়েছে। এর অতিরিক্ত আজকাল অনেক ব্যক্তি হঠ য়োগের আডম্বরকে প্রধান মেনে অনেক প্রকারের মুদ্রা-বস্তি-ধৌতি-ত্রাটক আদি ক্রিয়ার বিধান করে। কিন্তু এইসব ক্রিয়া প্রাণায়ামের মার্গে সাধক হওয়ার স্থানে বাধকই হয়। আমার জানা এমন অনেক মানুষ আছে যারা মুদ্রা আর বস্তি আদি ক্রিয়ার ফলে নিজেকে সারা জীবনের জন্য রোগী বানিয়েছে। যে সাধক ব্রহ্মচর্যের পালন করার সঙ্গে শুদ্ধ সাত্ত্বিক আহার করে তার এইসব অস্বাভাবিক সাধনের কোনো আবশ্যকতাই নেই কারণ প্রাণায়াম করলে সব মলের নিরাকরণ হয়ে যায়। অতঃ এইসব হট্টগোল থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়স্কর।
.
এই বিষয়ে দিব্য য়োগী মহর্ষি দয়ানন্দ জী তাঁর পুনার একাদশতম বক্তৃতাতে এইভাবে বিধান করেছেন -
"এখন হঠ য়োগের বিধান নিয়ে বর্ণনা করবো। হঠ য়োগের মধ্যে বস্তি তাকে বলে যেটা গুদার পথ দিয়ে জল চড়িয়ে পরিষ্কার করা হয়। টকটকি লাগিয়ে এমনভাবে দেখা যেখানে চোখের পলকও বন্ধ হবে না, তাকে ত্রাটক বলে। নাকের মধ্যে সুতো ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বের করাকে নেতি বলে। মখমলের চার আঙ্গুল চওড়া আর ১৬ থেকে ৮০ হাত পর্যন্ত লম্বা কাপড় মুখের রাস্তা দিয়ে পেটে নিয়ে পুনঃ বাইরে বের করাকে ধৌতি বলে। এইসব হচ্ছে যাদুকরের খেলা, এইসব থেকে কবে নিবৃত্তি পেয়ে য়োগ প্রাপ্ত করতে পারবে, এটা হঠ য়োগই জানে! এইসব করার ফলে রোগ উৎপন্ন হয়।"

মহর্ষি দয়ানন্দ জীর উপরোক্ত উদাহরণ থেকে স্পষ্ট সিদ্ধ হয় যে বস্তি আদি হঠয়োগ ক্রিয়ার সঙ্গে য়োগ আর প্রাণায়ামের কোনো সম্বন্ধ নেই, এইসব করলে সাধক য়োগী না হয়ে রোগী তো অবশ্যই হয়ে যাবে। সুতরাং এইসব থেকে দূরে থাকা উচিত।

🍁 প্রাণায়াম বিধি এবং ভেদ 🍁
প্রাচীনকালে ভারতবর্ষ ভৌতিক ঐশ্বর্যের সঙ্গে-সঙ্গে আধ্যাত্ম বিদ্যাতেও উন্নতির শিখরে বিরাজমান ছিল। প্রাণায়াম বিদ্যা এখানে প্রত্যেক মানুষ জানতো। ব্রহ্মনিষ্ঠ শ্রোত্রিয় গুরুদের পরম্পরা অবিচ্ছিন্ন রূপে চলতো। প্রাণায়ামের মর্ম জানা মনীষী বিদ্বানদের গুরুকুলাদি আশ্রম স্থানে-স্থানে বিদ্যমান ছিল, যেখানে সহস্র সংখ্যক ব্রহ্মচারী, বানপ্রস্থী প্রাণায়ামাদি য়োগাঙ্গের ক্রিয়াত্মক অভ্যাস করতো। সন্ন্যাসী মহাত্মারা গ্রামে-গ্রামে ভ্রমণ করে প্রাণায়ামের গম্ভীর রহস্যের বিবেচনা নিষ্কাম ভাবে মানুষ মাত্রের হিতার্থে করতেন। সেই সময় ভারত সারা বিশ্বের গুরু ছিল। প্রাণায়াম বিদ্যার কারণে সব ক্ষেত্রে তেজস্বিতার একছত্র সাম্রাজ্য ছিল। এই কারণে পবিত্র আর্যাবর্তে সব স্ত্রী-পুরুষ শ্রদ্ধা পূর্বক প্রাণায়াম নিত্যপ্রতি করতেন।
ধীরে-ধীরে প্রমাদ আলস্যের প্রভাবে তথা সৎকর্মের হ্রাসের কারণে বৈদিক জ্ঞানের ভানু অস্তাচলে পৌঁছে যায়। যার পরিণাম স্বরূপ তত্ত্ববেত্তাদের সন্তান আজ প্রাণবিদ্যা হতে নিতান্ত শূন্য। শুধু সামান্য জনতাই নয় বরং বড় বড় পণ্ডিতও প্রাণায়াম বিদ্যা সম্বন্ধে অন্ধ, এইজন্য সর্বত্র অন্ধপরম্পরা চলছে। মানুষ প্রাণায়ামের নামে ভয় পায় আর সেটা কেবল য়োগীদের ব্যবহারের বস্তু বলে মনে করে। এমন অনেক পাখণ্ডী আছে যারা য়োগের নামে আডম্বর করে মানুষের কাছ থেকে ধন হরণ করে মহাপাতকী হচ্ছে। চেলা-চেলিদের বাড়িয়ে সম্প্রদায়ের রূপ দিয়ে অতি নিন্দিত কর্ম করছে। এইরকম অবস্থা দেখে ঋষিদের সন্দেশকে সকল মানুষের কাছে পৌঁছানোর ভাবনা নিয়ে এখানে শাস্ত্রোক্ত প্রাণায়ামের বিধি লেখা হল।
মহর্ষি দয়ানন্দ জী এই যুগের সর্বমান্য য়োগীরাজ আর আপ্ত পুরুষ হন। মহাভারত কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই ৫ হাজার বছরে তাঁর সমান কোনো য়োগী হয়নি। আজকালকার য়োগী আর মহাত্মা বলা হয় এমন জন তো তাঁর পায়ের ধুলোও হবে না। তিনি নিজের জীবনে পূর্ণরূপে য়োগতত্ত্বের সাক্ষাৎকার করেছিলেন। তাঁর দ্বারা উপদিষ্ট বিধি সর্বথা বেদাদি শাস্ত্রোক্ত হওয়ার কারণে পাঠকদের কল্যাণার্থ এখানে উদ্ধৃত করা হল -
প্রচ্ছর্দনবিধারণাভ্যাম্ বা প্রাণস্য। (য়োগ ১/৩৪)
অত্যন্ত বেগে বমন করলে যেমন অন্নজল বাইরে বেরিয়ে যায় তেমনই প্রাণকে বলপূর্বক বহির্নিক্ষেপ করে যথাশক্তি বাইরেই নিরুদ্ধ করবে। যখন বের করতে ইচ্ছা হবে তখন মূলেন্দ্রিয়কে উর্দ্ধদিকে আকর্ষণ করে বায়ুকে বাইরে নিক্ষেপ করবে। যতক্ষণ মূলেন্দ্রিয়কে উর্দ্ধদিকে আকর্ষণ করে রাখবে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাণ বাইরে থাকবে। এইভাবে প্রাণ অধিক সময় বাইরে থাকতে সক্ষম হবে। যখন অস্থিরতা বোধ হবে তখন ধীরে-ধীরে বায়ুকে ভিতরে নিয়ে এসে পুনরায় সামর্থ্য আর ইচ্ছানুসারে সেইরূপ করতে থাকবে আর মনে-মনে "ও৩ম্" জপ করতে থাকবে। এইভাবে করলে আত্মা আর মনের পবিত্রতা আর স্থিরতা হয়। প্রথম, "বাহ্যবিষয়" অর্থাৎ প্রাণকে বহুক্ষণ বাইরে নিরোধ করা। দ্বিতীয়, "অভ্যন্তর" অর্থাৎ প্রাণকে ভিতরে যতক্ষণ নিরোধ করা যায় ততক্ষণ নিরোধ করা। তৃতীয়, "স্তম্ভবৃত্তি" অর্থাৎ একই সঙ্গে যে স্থানের প্রাণ সেই স্থানে যথাশক্তি রোধ করা। চতুর্থ, "বাহ্যাভ্যন্তর" ক্ষেপী" অর্থাৎ প্রাণ যখন ভিতর থেকে বাইরে বহির্গত হতে থাকবে তখন তার বিরুদ্ধে তাকে বাইরে বের হতে না দিয়ে বাইরে থেকে ভিতরে আনবে। যখন প্রাণ বাইরে থেকে ভিতরে আসতে আরম্ভ করবে তখন তাকে ভিতর থেকে বাইরের দিকে ধাক্কা দিয়ে রোধ করে রাখবে। এইভাবে একের বিরুদ্ধে অন্যের ক্রিয়া করলে উভয়ের গতি রুদ্ধ হওয়াতে প্রাণ নিজের বশে এলে মন তথা ইন্দ্রিয়ও স্বাধীন হয়। বল আর পুরুষত্ব বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে বুদ্ধি তীব্র আর সূক্ষ্মরূপ হয়, যার ফলে অত্যন্ত কঠিন তথা সূক্ষ্ম বিষয় শীঘ্র গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এতে মানব শরীরে বীর্য বৃদ্ধির ফলে ধৈর্য্য, বল, পরাক্রম, জিতেন্দ্রিয়তা আর অল্পকালের মধ্যেই সব শাস্ত্র বুঝে আয়ত্ত করার সামর্থ্য জন্মাবে। স্ত্রীরাও এইরূপ য়োগাভ্যাস করবে। (সত্যার্থপ্রকাশ, তৃতীয় সমুল্লাস)
মুখ্য রূপে প্রাণায়ামের চারটা ভেদ আছে। মহর্ষি দয়ানন্দ জী উপরে প্রাণায়ামের পূর্ণ বিধি লিখে দিয়েছেন। এর আধার হল য়োগদর্শনের "বাহ্যাভ্যন্তরস্তম্ভবৃত্তির্দেশকালসম্খ্যাভিঃ পরিদৃষ্টো দীর্ঘসূক্ষ্মঃ" তথা "বাহ্যাভ্যন্তরবিষয়াক্ষেপী চতুর্থঃ" (য়োগ ২/৫০-৫১) এই দুটো সূত্র। এই দুই সূত্রের ভাষ্য ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকার উপাসনাবিষয়ে সংস্কৃত তথা আর্য উভয় ভাষাতে মহর্ষি জী এইভাবে করেছেন -
"য়ত্র প্রশ্বাসপূর্বকো গত্যভাবঃ স বাহ্যঃ। য়ত্র শ্বাসপূর্বকো গত্যভাবঃ স আভ্যন্তরঃ। তৃতীয়ঃ স্তম্ভবৃত্তির্য়ত্রোভয়াভাবঃ সকৃৎপ্রয়ত্নাদ্ভবতি। য়থা তপ্তে ন্যাস্তমুপলে জলম্ সর্বতঃ সঙ্কোচমাপদ্যতে তথা দ্বয়োর্য়ুগপদ্ গত্যভাব ইতি।