আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক জীর লেখার বঙ্গানুবাদঃ
॥ ও৩ম্ ॥
আষাঢ় কৃষ্ণ অমাবস্যা বি.সং. ২০৮৩, সৃষ্টি সংবৎ ১৯৬০৮৫৩১২৭
সাবধানী
পাঠকগণ! অনুগ্রহ করে এই লেখাটি মনোযোগ সহকারে সম্পূর্ণ পড়ার কষ্ট করুন। অসম্পূর্ণ পড়লে ভ্রান্তি হতে পারে।
॥ ও৩ম্ ॥
নিয়োগ-মীমাংসা
নিয়োগ বিষয়কে নিয়ে কিছু লোক সত্যার্থ প্রকাশ, ঋষি দয়ানন্দ এবং আর্যসমাজের অশিষ্টতার সঙ্গে নিন্দা করে, তাদের দুই ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। এদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে বামপন্থী নাস্তিক तथा কিছু নিরক্ষর তথাকথিত সন্ত লোক আছে, যাদের উদ্দেশ্য সমস্ত প্রাচীন আর্শ গ্রন্থ এবং বেদাদি শাস্ত্রসমূহের নিন্দা করে জনসাধারণকে এই শাস্ত্রসমূহ থেকে দূরে করা। সর্বপ্রথম আমরা এদেরই উত্তর দেওয়া আবশ্যক মনে করি, কারণ বেদাদি শাস্ত্র-বিরোধী এই পৃথিবীতে সর্ববৃহৎ মানবতা-বিরোধী, যারা বর্তমান যুব-প্রজন্মকে নিজেদের বাক্জালে ফাঁসিয়ে চলেছে। এই পতিত লোকেরা এই বিষয়কে নিয়ে ঋষিকে নিয়োগী দয়ানন্দ ইত্যাদি-ইত্যাদি নানা অপশব্দ দ্বারা সম্বোধন করে। তো আসুন, আমরা এর উপর বিচার করি—
নিয়োগ বিষয়ের উপর বিচার করার পূর্বে আমাদের ঋষির সেই-সেই মতগুলির উপর বিশেষ ধ্যান দেওয়া উচিত, যেগুলি জিতেন্দ্রিয়তাকে অতি আবশ্যক মনে করে। সর্বপ্রথম তো মহর্ষি দয়ানন্দজীর মান্যতা এই যে, যে যুবক অথবা যুবতী জিতেন্দ্রিয় থাকতে পারে তথা রাষ্ট্র ও সমাজের বিশেষ হিত করতে চায়, তারা বিবাহই না করুক; কিন্তু এরূপ সংকল্পকারীদের সচেতও করেন যে, এই কাজ পূর্ণ বিদ্যাযুক্ত জিতেন্দ্রিয় এবং নির্দোষ যোগী স্ত্রী ও পুরুষের১। এটি অতি কঠিন কাজ যে, কামের বেগকে রোধ করে ইন্দ্রিয়সমূহকে নিজের বশে রাখা; কিন্তু ঋষির ভাবনা অবশ্যই এই যে, যারা এরূপ করতে পারে, তারা অবশ্যই করুক।
এই প্রকারের প্রস্তুতির জন্য অথবা বৈদিক চিন্তার অনুকূল গৃহস্থ হওয়ার জন্য তিনি তাদের মাতা-পিতার দ্বারা গর্ভাধান থেকেই প্রস্তুতি আবশ্যক মনে করেন। তিনি শিক্ষা বিষয়কে প্রারম্ভ করতে গিয়ে দ্বিতীয় সমুল্লাসের আরম্ভেই একটি আর্শ বচন উদ্ধৃত করেন— ‘মাতৃমান্ পিতৃমান্ আচার্যবান্ পুরুষো বেদ’ অর্থাৎ মাতা-পিতা ও আচার্যকে উত্তম শিক্ষক হওয়া উচিত, তবেই সন্তান উত্তম হবে। সেই সমুল্লাসের পূর্বে প্রথম সমুল্লাসে পরমেশ্বরের সর্বোত্তম জ্ঞানের বিশদ আলোচনা করেন। তিনি একশত নামের ব্যাখ্যার দ্বারা ঈশ্বরের স্বরূপের সেই গাগরে সাগর ভরেছেন, যা অন্যত্র কোথাও একসঙ্গে পাওয়া সম্ভবত সম্ভব হতে পারে না। এই একশত নাম দ্বারা পরব্রহ্ম পরমেশ্বরের স্বরূপের ব্যাপক জ্ঞান হতে পারে। এই স্বরূপকে বুঝে এবং তদনুসারে সেই ঈশ্বরকে জানা, মানা তথা তদনুকূল আচরণকারী নিঃসন্দেহে নির্মল জ্ঞানী হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে নির্মল চরিত্রবিশিষ্টও হয়ে যায়। এত জ্ঞানী ও পবিত্র পুরুষের জন্যও প্রথম বিবাহের যোগ্যতা নির্ধারণ করতে গিয়ে চতুর্থ সমুল্লাসে ভগবান্ মনু মহারাজকে উদ্ধৃত করেছেন—
বেদানধীত্য বেদৌ বা বেদং বাপি যথাক্রমম্। অবিলুপ্তব্রহ্মচর্যো গৃহস্থাশ্রমমাবিশেত্।।
১ সত্যার্থ প্রকাশ, তৃতীয় সমুল্লাস এবং সংস্কৃত বাক্য প্রবোধ।
অর্থাৎ যে পূর্ণ অখণ্ড ব্রহ্মচর্যের পালন করতে করতে, অর্থাৎ স্বপ্নেও বীর্যস্খলন না হয়ে থাকে, এমন পূর্ণ জিতেন্দ্রিয়তাযুক্ত পুরুষ বা স্ত্রী চারটি বেদ, তিনটি, দুটি বা কম-সে-কম একটি বেদের সাঙ্গোপাঙ্গ অধ্যয়ন না করে থাকে, তার গৃহস্থ হওয়ারই অধিকার নেই।
এখানে সাঙ্গোপাঙ্গ পড়ার অর্থ এই না বোঝা যাক যে, বর্তমান বিদ্বানদের ন্যায় সাধারণ শব্দার্থ গ্রহণ করাই বেদাধ্যয়ন; এটি সর্বথা অনুচিত। গোপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে যে, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ অশূন্য হয়ে যায়। এর অর্থ এই যে, বেদজ্ঞ সৃষ্টির সম্পূর্ণ জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থাৎ জড় ও চেতন (ঈশ্বর ও জীব) সকলের সম্পূর্ণ বিজ্ঞান প্রাপ্ত করে নেয় এবং তদনুকূলই তার জীবন হয়ে যায়। এমন সুবিজ্ঞ ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বযুক্ত ব্যক্তি, সে পুরুষ হোক বা স্ত্রী, তারই বিবাহের অধিকার আছে। যদি কেউ বলে যে, এটি তো অন্যদের অধিকারের হনন, তবে সে এই কথা ধ্যান রাখুক যে, বিবাহ মাত্র ব্যক্তিগত ইচ্ছার পূর্তির সাধন নয়, বরং বিবাহ সম্পূর্ণ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বকে প্রভাবিতকারী গুরুত্বপূর্ণ কারক। দুষ্টদের বিবাহ সংসারে দুঃখেরই বৃদ্ধি-করনেওয়ালা হবে, যখন সজ্জনদের বিবাহ সংসারের জন্য কল্যাণকারী হবে।
যখন বিবাহের এই যোগ্যতা আছে, তখন নিয়োগের ব্যবস্থাও এই যোগ্যতারই ভিত্তির উপর হবে। এর অর্থ এই যে, প্রথমত পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় ও পরোপকারী বিবাহই না করুন এবং যদি করেনও, তবে উপর্যুক্ত যোগ্যতা অনিবার্য। এই প্রকারের মাতা-পিতা গর্ভাধানের পূর্বে, মধ্যে এবং পশ্চাতে শান্তি, আরোগ্য, বল, বুদ্ধি, পরাক্রম এবং সুশীলতার দ্বারা সভ্যতাকে প্রাপ্ত করুন, তদ্রূপ ঘৃত, দুগ্ধ, মিষ্ট, অন্নপান ইত্যাদি শ্রেষ্ঠ পদার্থের সেবন করুন, যাতে রজবীর্যও দোষসমূহ থেকে রহিত হয়ে গুণযুক্ত হয়। এর পূর্বে পঠনকালে অষ্ট মৈথুন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকুন। তদুপরান্ত বলাদি-যুক্ত স্ত্রী-পুরুষ বিধিপূর্বক গর্ভাধান করুন तथा গর্ভ স্থির হওয়া থেকে এক বৎসর পর্যন্ত পরস্পর কখনও শারীরিক সম্পর্ক করবেন না।
ঋষির কথন এই যে, মানুষ পূর্ণ ঋতুগামী হোক। এই বিষয়ে পশুও আমাদের আদর্শ হতে পারে, যারা ঋতুকাল ব্যতীত মাদীর নিকট যায় পর্যন্ত না। ঋষির মন্তব্য এই যে, সন্তানোৎপাদনের হেতুতেই শারীরিক সম্পর্ক হোক। যখন সন্তানের ইচ্ছা না থাকে, তখন কখনও শারীরিক সম্পর্কই না করুক। যাঁরা মনুর এই বাক্যের উপর উপহাস করতে পারে যে, সর্বাধিক ১০ সন্তান পর্যন্ত উৎপন্ন করুন, তারা এই কথা ভুলে যায় যে, যারা ঘৃণিত সন্ততি-নিরোধকদের দ্বারা সমগ্র জীবন স্বেচ্ছাচারিতায় সমস্ত রেকর্ড ভেঙে রেখেছে এবং তারা ‘আমরা দুই, আমাদের দুই’-কে আদর্শ মেনে দেখানোর জন্য সংযমী হয়। কোনো পশুকে কি এমন করতে কেউ দেখেছে? তারা ভলা সেই মনুর (যিনি বলেন যে, জীবনে সর্বাধিক ১০ বারই শারীরিক সম্পর্ক রাখো)-এর উপর কী ব্যঙ্গ করতে পারে? আছে কি কোনো মনু-বিরোধী, যে এমন সর্বাধিক ব্যবস্থাতেও থাকতে পারে?
অর্থাৎ নিজের জীবনকালে মাত্র দশবারই শারীরিক সম্পর্ক রাখার সংযম দেখাতে পারে? সেই শারীরিক সম্পর্কও সুসন্তান প্রাপ্তির উদ্দেশ্যমাত্রের জন্য হোক, বিষয়-ভোগের জন্য নয়।
এখন আমরা নিয়োগ-ব্যবস্থার উপর আসি। এখানে পর্যন্ত লেখার ভাব এই যে, ঋষির স্তর অত্যুচ্চ কোটির ছিল। তিনি নিজের চিন্তাধারাকে নিজের স্তর থেকেই সংসারকে দেওয়ার প্রয়াস করেন। তাঁকে আচরণের মর্যাদাসমূহে কিঞ্চিৎও স্খলন স্বীকার নয়। তাঁর স্তর পর্যন্ত চিন্তা করার মস্তিষ্ক ও চিত্ত আজকের শ্রেষ্ঠতম বলে পরিচিত মানুষদের মধ্যেও নেই। যে উদ্দেশ্য বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষদের শারীরিক সংযোগের হয়, সেই উদ্দেশ্যই নিয়োগেরও হয়। কেবল অন্তর এই যে, নিয়োগ অস্থায়ী ও আপৎকালের ব্যবস্থা, যখন বিবাহের উদ্দেশ্য কেবল সন্তানোৎপত্তি নয়, বরং সমাজকে একটি সু-ব্যবস্থিত ও শ্রেষ্ঠ রূপ দেওয়াও, এবং এটি আজীবন স্থায়ী ব্যবস্থা।
এর অতিরিক্ত উভয় ব্যবস্থারই উদ্দেশ্য সমাজ, রাষ্ট্র বা বিশ্বকে একটি শ্রেষ্ঠ সন্তান দেওয়া হয়। এই কথা ধ্যাতব্য যে, সংসারে সর্ববৃহৎ সম্পত্তি ধর্মাত্মা, প্রতিভাবান এবং বলবান সন্তানই। এর বিপরীত গুণবিশিষ্ট, অর্থাৎ দুষ্গুণী সন্তান এই পৃথিবীর উপর ভারস্বরূপ। কল্পনা করুন যে, আজ এই অন্ধকারে ভরা যুগে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম ও যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ এবং দেবী সীতা ও দেবী রুক্মিণীর মতো সন্তান জন্ম নিতে শুরু করে, তবে কোনো কারণ নেই যে, এই সংসার পুনরায় স্বর্গ না হয়ে যায়। আজ ক্রূর পিশাচদের তাণ্ডবে মানবতার উপর ভয়ঙ্কর সংকট রয়েছে। যদি আজ কোনো ভগবান শ্রীরাম ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো পুরুষ এসে যায়, তবে এই পৃথিবী ও মানবতার সকল সন্তাপ দূর করতে পারে। ঋষি দয়ানন্দের এই-ই স্বপ্ন ছিল যে, দেশ ও বিশ্বে শ্রেষ্ঠ সন্তানেরই জন্ম হোক, পাপী ও অকর্মণ্য সন্তানের নয়। এই কারণেই তিনি ভগবান মনুর শ্রেষ্ঠতম মর্যাদা অনুযায়ী বিবাহের বিধান করেন। ঋষি দয়ানন্দের ভাবনার উপহাসকারীরা ঋষি ও দেবগণের মহতী পাবনী পরম্পরাকে কী জানবে? আজ এমন দিব্য সন্তানই এই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ধন, যার জন্যই স্ত্রী ও পুরুষদের শারীরিক সম্পর্কের বিধান, তারপর সে বিবাহের মাধ্যমে হোক অথবা বিশেষ আপৎকাল এবং অপরিহার্য অবস্থায় নিয়োগের তাত্ক্ষণিক অস্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমে হোক। ধ্যানে রাখুন যে, উভয় ব্যবস্থার উপরই সামাজিক অনুমতির মোহর লাগানো অনিবার্য। এটি ব্যতীত উভয় ব্যবস্থাই ব্যভিচারের শ্রেণীতে এসে যায়।
এখানে আমি এই প্রকারের নিরক্ষর ও অসভ্য নিন্দুকদের এর পুষ্টিতে বেদাদি শাস্ত্রের প্রমাণ দেব না, কারণ অবৈদিকদের তাতে কী প্রাপ্ত হবে? আমি এখানে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণও দেব না, কারণ আজ পাশ্চাত্য শিক্ষার দাস অথবা ভারত-বিরোধী লোকেরা ব্যাস, বায়ুদেব, ইন্দ্র, ধর্মদেব প্রভৃতিকে ব্যভিচারী বলতে কেন সংকোচ করবে? দ্বিতীয় কথা এইও যে, ইতিহাসে যেখানে-যেখানে আপদ্ধর্ম-নিয়োগের প্রসঙ্গ রয়েছে, সেগুলি অনেক স্থলেই প্রক্ষিপ্ত বলেও প্রতীত হয়। এই কারণে আমি কেবল সাধারণ তর্কেরই প্রয়োগ করছি। পুনর্বিবাহ কার হোক ও কার না হোক, এই বিষয়টি ভালো প্রকারে আগে সত্যার্থ প্রকাশ-এ পড়ে নেওয়া যাক। তারপর নিয়োগ কখন ও কেন করা যাক, এটিকে সেই বৈচারিক পরিপক্বতা ও উচ্চত্বের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে পড়া যাক, তখন অনেক প্রশ্নের সমাধান সেখানেই হয়ে যাবে। আমি সত্যার্থ প্রকাশ-এর সমস্ত তর্ক এখানে উদ্ধৃত করে পিষ্টপেষণ করে লেখাকে বৃথা বাড়াতে চাই না। ঋষি তো ব্যভিচার বা কুকর্ম রোধ করার উপায়ই লিখেছেন—
"এই ব্যভিচার এবং কুকর্মকে রোধ করার একটি এই-ই শ্রেষ্ঠ উপায় যে, যারা জিতেন্দ্রিয় থাকতে পারে, তারা বিবাহ বা নিয়োগও না করুক, তবে ঠিক আছে। কিন্তু যারা এমন নয়, তাদের বিবাহ এবং আপৎকালে নিয়োগ অবশ্যই হওয়া উচিত।"
বিধবা বা বিধুরকে সেই আপৎকালেই নিয়োগের প্রেরণা করেন, যখন তাদের সন্তানের ইচ্ছা থাকে অথবা যে বিধুর বা বিধবার দ্বারা ব্রহ্মচারী থাকা সম্ভব না হয় এবং অপর পক্ষের সন্তানের ইচ্ছা ও অত্যাবশ্যকতা থাকে। এখানে ঋষি সন্তানের জন্য সর্বপ্রথম তো কারও সন্তানকে দত্তক নেওয়ার ব্যবস্থা দিয়েছেন, নিয়োগ তো সর্বশেষের ব্যবস্থা। এর দ্বারা তাদের কর্মের ফল এই হবে যে, সন্তানও প্রাপ্ত হয়ে যাবে, কারণ ঋষি সন্তানের ইচ্ছা ব্যতীত বীজকে বৃথা ফেলে দেওয়াকে ব্যভিচার ও পাপ মনে করেন। তাঁর মান্যতা সেই প্রকার যথার্থ, যে প্রকার কোনো কৃষক সুন্দর বীজকে এমনি উষরে ছড়িয়ে দেওয়াকেই কৃষকের ধর্ম মনে করে। তার একটি ফলও প্রাপ্ত না হতে পারে এবং ফল পাওয়ার ইচ্ছাও না করে। এমন কৃষককে মহামূর্খই মনে করা হবে। কিন্তু যারা বীজ ফেলে দিতেই আনন্দ মানে, তাদের কী বোঝানো যাবে? সেই অবস্থাই তাদের, যারা সমগ্র জীবন ভোগ তো করতে চায়, কিন্তু সন্তান হওয়াকে এমন ভয় করে, যেমন মানুষ ভয়ঙ্কর নাগকে স্পর্শ করতে ভয় করে।
তদ্রূপ নিয়োগকে ব্যভিচার রোধ করার সাধন বলা তথা 'যাদের দ্বারা ব্রহ্মচারী থাকা সম্ভব না হয় তাদের নিয়োগ করার কথা' আমার দৃষ্টিতে সর্বথা অনুচিত, এটি ঋষির ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে না। এই বাক্য লেখকদেরই কৃতকর্ম, এই আমার দৃঢ় মত।
বস্তুত নিয়োগ অত্যন্ত জিতেন্দ্রিয় ঋষি-কোটির লোকদেরই আপদ্ধর্ম। আজ ঋষি দয়ানন্দের উপহাস তারা করে, যারা নানাবিধ ঘৃণিত দুরাচার বা দেশদ্রোহের অভিযোগে কারাগারে বন্দী আছে বা ছিল। যারা দুধে স্নান করে সেই দুধের ক্ষীর বানিয়ে নিজেদের অন্ধভক্ত নারী বা পুরুষদের খাওয়ানোর মতো ঘৃণিত কুকর্মও করে। এমন লোকেরা ঋষির বিরাট ও পাবন ব্যক্তিত্বকে কী বুঝবে? এবং সেই মলিন অভক্ষ্য ক্ষীর ভক্ষণকারী তাদের তামসিক অন্ধভক্তদের সাধ্যই বা কোথায়? যাদের আশ্রমে অশ্লীলতার পরাকাষ্ঠার নগ্ন নৃত্য হয়, তারা যদি বলে, তবে এটিকে তাদের ঘোর পাপই মনে করা যেতে পারে, যার ফল আজ না হোক কাল অবশ্যই ভোগ করতে হবে। তারা ঘোর পাপে লিপ্ত অপ্রাকৃতিক হয়েও সর্বথা প্রাকৃতিক ঈশ্বরীয় ব্যবস্থার পালনকে পাপ মনে করে। যারা স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে অথবা যারা শিষ্য ও শিষ্যাদের সঙ্গে নিজেরা সমগ্র জীবন ব্যভিচারে রত, তারা নিজেদের সংস্কারবান গৃহস্থ মনে করে এবং ঋষিদের পাপী প্রতিপন্ন করে।
যদি কেউ বলে যে, আজ কি কোনো ঋষিভক্ত বলে পরিচিত ব্যক্তি নিজের স্ত্রী, কন্যা বা ভগিনীর আপৎকালেও কারও সঙ্গে নিয়োগ করাতে চাইবে অথবা কি কোনো মায়ের লাল নিজের বড় ভাবী বা ছোট ভাবীর সঙ্গে আপৎকালে নিয়োগ করবে? এর উপর আমার বলা যে, করবে না এবং যদি এমন করে, তবে সে নিশ্চিতই মহাপাপী ও দুষ্ট বলে পরিচিত হবে। আমি স্বীকার করি যে, বর্তমান দেশ-কাল-পরিস্থিতিতে এমনই বলা উপযুক্ত হবে। তখন কেউ বলবে যে, তবে আমি ঋষিপ্রোক্ত বা বেদোক্ত নিয়োগ-ব্যবস্থার ওকালতি কেন করছি? আমিও কি কিছু আর্যদের ন্যায় চাপা জিহ্বায় একে সত্যার্থ প্রকাশ, বেদ বা ভারতীয় ইতিহাসের একটি কলঙ্ক বলে না মানি? না, আমি এমন কদাপি করতে পারি না, কিন্তু আমি বর্তমানে এই পরম্পরাকে যথোচিতও কদাপি মনে করতে পারি না। হ্যাঁ, ঋষি-কোটির মহাপুরুষদের সমাজে সিদ্ধান্ততঃ নিয়োগ শ্রেষ্ঠ আপদ্ধর্ম।
কেউ যদি প্রশ্ন করে যে, আজ এই ধর্মকে অধর্ম বলে বর্তমান সময়ে এমন কাজকে পাপ কেন বলা হচ্ছে? এর কারণ আমি বলতে চাই।
সর্বপ্রথম এই বিষয়টি জেনে নেওয়া উচিত যে, কিছু ব্যবস্থা দেশ-কাল-পরিস্থিতি অনুসারে পরিবর্তিতও হয়ে থাকে, যদিও সেগুলি যতই শ্রেষ্ঠ ও হিতকর কেন না হোক। যে কাজ হেমন্ত ঋতুতে করণীয় হতে পারে, সেই একই কাজ গ্রীষ্ম ঋতুতে অকরণীয় হবে। কোনো কাজ ধ্রুব প্রদেশে করণীয়, সেই একই কাজ ভূমধ্যরেখীয় উষ্ণ প্রদেশগুলিতে ক্ষতিকর হতে পারে। কোনো কাজ শিশুর জন্য করণীয়, সেই একই কাজ যুবক ও বৃদ্ধদের জন্য অকরণীয় হতে পারে। আমি এর উদাহরণ দেওয়া প্রয়োজন মনে করি না, কারণ প্রায় সকল প্রাজ্ঞ পাঠকই তা নিজেরাই জানতে পারেন।
প্রাচীন কালে নদীর তীরে, বনে, পর্বতে সন্ধ্যা করা, বনভ্রমণ ও নিবাসকে বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসীর ধর্ম বলা হতো, কিন্তু আজ বনই নেই এবং কোথাও থাকলেও, সেই অধিকাংশ বনে কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড়, জলহীনতা অথবা দূষিত জলেরই উপস্থিতি, মশা ইত্যাদির ভয়ংকর উপদ্রব, কন্দ-মূল-ফলের প্রায় অভাব, কোথাও যদি কিছু থাকে, তবে বন বিভাগের পাহারা। এমন অবস্থায় 'গঙ্গাতীরে হিমগিরিশিলা...'কে আচরণে প্রয়োগ করা কোনো সহজ কাজ নয় এবং এটি আবশ্যকও নয়। তখন আমাদের এমন বিকল্প খুঁজতে হবে, যেখানে সাধনায় বিঘ্নও না ঘটে এবং বনের ন্যায় শান্তি, সরলতা ও প্রাকৃতিক জীবন ঘর বা আশ্রমেই উপলব্ধ হয়ে যায়। যে সময়ে এই সব লেখা হয়েছিল, সেই সময়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক ব্যবস্থা এবং রাজধর্মও তদনুকূলই ছিল। রামরাজ্যে মশা, সাপ, প্রাকৃতিক বিপদ ইত্যাদিরও ভয় ছিল না, তখন যে-কোনো স্থানে বসে নির্বিঘ্নে সাধনা করা যেত। আজ তো বন্ধ ঘরে বসেও মশারি ও পাখা দরকার হয়, তাহলে গভীর জঙ্গলে সাধনা কীভাবে হবে? অতএব, আমাদের প্রাচীন কালের কিছু উৎকৃষ্টতম ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ হিতকর বলে মান্য করেও বর্তমান প্রতিকূল কালে তাকে উপযুক্ত বলে মনে করা উচিত নয়।
যখন ভারতে আপৎকালীন নিয়োগ প্রথা প্রচলিত ছিল, তখনকার মানুষ উপরোক্ত সংযমপূর্ণ সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় বসবাসকারী ঋষি-সম মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁরা কামশক্তিসম্পন্ন হয়েও কামুক ছিলেন না। নারী-পুরুষ পরস্পরের সঙ্গে সংযোগ কেবলমাত্র সন্তান উৎপত্তির উদ্দেশ্যেই করতেন, তা নিয়োগ হোক বা বিবাহ। যখন উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে যেত, তখন তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের কোনো আকাঙ্ক্ষাও থাকত না। তখন তারাই নিশ্চিতভাবে নিয়োগ করা বা করানোর অধিকারী ছিলেন, কিন্তু আজ যখন মানুষ কামুকতায় জগতের সকল নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্ট প্রাণীকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে, যারা বৃথাই বীর্যাদি ক্ষরণ করাতেই আনন্দ মনে করে এবং যে উদ্দেশ্যে বীজের ব্যবহার হওয়া উচিত, তা থেকেই ভয় পায়। যেখানে স্বয়ং মাতা সাপিনীর ন্যায় হয়ে নিজেরই ভ্রূণকে খেয়ে ফেলে, অর্থাৎ গর্ভপাত করে পাপিনী হয়ে যায়, আবার কেউ পরিবার পরিকল্পনার নামে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ভোগলিপ্সায় প্রতিদিন রত থাকে, তারা আবার নিয়োগের বিরুদ্ধে আঙুল তোলার অধিকার কোথায় পেল এবং তারা নিয়োগ করা বা করানোর অধিকারীও নয়।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যারা সত্যার্থ প্রকাশ-এর ভূমিকা থেকে তৃতীয় সমুল্লাস এবং চতুর্থ সমুল্লাসের অর্ধেক পর্যন্ত মহর্ষির প্রজ্জ্বলিত মান্যতাগুলিকে শতকাংশেও জীবনে ধারণ করার যোগ্যতা রাখে না, তারাই সরাসরি নিয়োগ প্রথা নিয়ে শোরগোল করে। আরে! আগে এটুকু তো পড়ে নাও যে, ঋষি জিতেন্দ্রিয়তাকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? তিনি বিবাহিতদেরও কেমন হওয়ার পরামর্শ দেন? যদি ঋষির কথাগুলি মানো, তবে গৃহস্থ হওয়াই অসম্ভব হয়ে যাবে, তখন নিয়োগ কে করবে বা করাবে? এই কথা কে অস্বীকার করতে পারে যে, ঋষির অনুমোদিত গৃহস্থের আদর্শে খুবই বিরল কেউ উত্তীর্ণ হতে পারে। নিয়োগের যোগ্যতা তো এর থেকেও উচ্চতর। তাহলে কোথায় নিয়োগ নিয়ে আলোচনা করতে চলে এসেছ? উত্তম তো এটাই যে, আগে নিজের অন্তরে দৃষ্টি দাও, তারপর কাদা ছোড়ো।
যে ব্যক্তি শরীরশাস্ত্রের ক, খ, গ-ও জানে না, তার একজন যোগ্য শল্যচিকিৎসকের দ্বারা সম্পাদিত শল্যচিকিৎসা নিয়ে শোরগোল করার কী অধিকার আছে? আরে! আগে শল্যচিকিৎসার প্রাথমিক জ্ঞান তো অর্জন করো, তারপর ভাবো যে, শল্যচিকিৎসকের দ্বারা সম্পাদিত চিরে-ফাড়া হিংসা নয়, বরং প্রকৃত অহিংসা। একইভাবে, যারা অতিশয় জিতেন্দ্রিয় যোগী পুরুষ বা নারী, তারাই নিয়োগ করা-করানোর যোগ্যতা রাখেন এবং তারাই এই বিষয় নিয়ে বিশেষ চিন্তন করতে পারেন। নীতিগতভাবে অবশ্য প্রত্যেক প্রাজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি চিন্তা করতে পারেন, যদিও তিনি সম্পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় না-ও হতে পারেন, কিন্তু অন্তত ইন্দ্রিয়াসক্তিকে পাপ বলে মনে করেন। যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়াসক্তিকেই স্বাভাবিক বলে মনে করে, তার মস্তিষ্কে এই কথা সাত জন্মেও প্রবেশ করতে পারে না যে, মহা আপৎকালে নিয়োগ উত্তম, আর একে মন্দ বলা হচ্ছে এই কারণে যে, আজ সমাজ একে মন্দ বলে। সেই ধৃষ্ট ব্যক্তি নিয়োগের সমালোচনা করে নিজেকে পবিত্র দেখাতে চায়। এই সমাজে কত রকমের পাপ প্রকাশ্যে বা গোপনে সংঘটিত হচ্ছে, সেদিকে সমাজও মনোযোগ দেয় না, আর অভিযোগকারীরাও দেয় না।
আজ শুধু নিয়োগই নয়, বরং এমন বহু বৈদিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা যে-কোনো নিরপেক্ষ সত্যপথগামী ব্যক্তির কাছে যথাযথ বলে প্রতীয়মান হবে, কিন্তু সেগুলি পালন করা সম্ভব নয়। যেমন বেদে বলা হয়েছে যে, যদি কেউ আমাদের গরু, ঘোড়া অথবা মানুষকে হত্যা করে, তবে তাকে সীসা দিয়ে হত্যা করা উচিত। যদিও এই আদেশ সম্পূর্ণরূপে যথাযথ ও হিতকর, কিন্তু আজকের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তা করতে দেবে না। হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণীর হত্যাকারীকে হত্যা করা বীর পুরুষকেও সেইরূপ কারাগারে বন্দি করা হবে, যেরূপ অন্য কোনো হত্যাকারীকেও বন্দি করা হতে পারে। তাহলে এটি কেমন অন্ধ আইন? এই অন্ধ আইনের কারণে আজ বেদের যথাযথ ও উৎকৃষ্ট আদেশ কীভাবে ব্যর্থ হয়ে গেল? তাহলে কি দোষ বেদাদেশকে দেওয়া হবে? সেই উৎকৃষ্ট ব্যবস্থাকে দোষ দেওয়া হবে, না আজকের পাপপূর্ণ তথাকথিত সমতার আচরণের দম্ভকারী আইনব্যবস্থাকে দোষ দেওয়া হবে? এটি পাঠকরাই নিজেরা চিন্তা করুন।
যদি এই ব্যবস্থা কার্যকর করতেও দেওয়া হয়, তবে পরস্পরের রক্তই প্রবাহিত হতে থাকবে। যার শক্তি থাকবে, সে সুযোগ পেয়ে দুর্বলকে হত্যা করতেই থাকবে। আজ পাপীকে গুলি করে মারার মানসিকতা রাখেন, এমন ব্যক্তিও তো বিরল। বৈদিক আর্ষ ব্যবস্থা এ-ও বলে যে, যে ধনী দান করে না এবং যে দরিদ্র তপস্যা করে না, তাদের উভয়কেই হত্যা করা উচিত। (বিদুর নীতি) আজ যদি এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তবুও ভয়ঙ্কর রক্তপাত ঘটবে, কারণ আজ তো দান চাওয়া অর্থচোরদেরও একটি জাল বিস্তৃত রয়েছে, যারা বলপূর্বক দান চাইবে এবং না দিলে বিদুরজীর প্রমাণ দেখিয়ে অদাতাকে হত্যা করবে। একইভাবে ক্ষুধার্ত-উলঙ্গ শোষিতদের রক্তশোষক ধনী ব্যক্তি তপস্যা করার উপদেশ দেবে, অন্যথায় হত্যা করতে প্রস্তুত থাকবে। এই কারণে এই ব্যবস্থাও বর্তমান সময়ে উপযুক্ত নয়, কারণ আজ না দরিদ্ররা তপস্বী রয়েছে, না ধনীরা পরোপকারী রয়েছে।
অতএব আজ বৈদিককালের উৎকৃষ্টতম, কিন্তু এই প্রকার তীক্ষ্ণ অথবা আপদ্ধর্মের ব্যবস্থাগুলিকে হঠাৎ গ্রহণ করার নয়, বরং সমগ্র পরিবেশকেই বেদানুকূল করে তোলার প্রয়োজন। তার পরেই সেই ব্যবস্থাগুলি কার্যকর করা যেতে পারে, অন্যথায় যোগ্য ব্যক্তিকেও নিয়োগের অধিকার দেওয়া উচিত নয়, কারণ যদিও তিনি যথাযথ কাজ করছেন, তথাপি অনধিকারী লোকেরা তাঁর স্তর না জেনে নিজেরা সন্তানলাভের উদ্দেশ্যে নয়, বরং ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হতে পারে, যার ফলে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। হ্যাঁ, যদি কখনো বৈদিক সাম্রাজ্য অথবা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে পুনরায় সেই সমস্ত নিয়ম সহজেই কার্যকর করা যেতে পারে। তবে এটিও স্মরণ রাখা উচিত যে, তখনও নিয়োগ সাধারণ ধর্ম না হয়ে আপদ্ধর্মই থাকবে, আর বিবাহ সাধারণ ধর্মই থাকবে।
হ্যাঁ, এই কথা উল্লেখযোগ্য যে, সত্যার্থ প্রকাশ-এ দেবরের অর্থ বড় বা ছোট ভাই লেখা হয়েছে এবং তাকে নিজের ভাবীর সঙ্গে নিয়োগের অধিকারী বলা হয়েছে, এটিকে আমি অনুচিত মনে করি। আমার দৃষ্টিতে এটি ঋষি দয়ানন্দের লেখকের নিকৃষ্ট কাজ, যা ঋষির দৃষ্টিতে আসেনি। যে বৈদিক পাবনী সংস্কৃতিতে বড় ভাবীকে মাতার সমান এবং ছোট ভাবীকে কন্যার সমান মনে করা হয়েছে, সেখানে দেবর অর্থাৎ নিযুক্ত পতি-র অর্থ পতির ভাই মনে করা অনুচিত। সেই কুল অথবা তার থেকেও উচ্চ কুলের দূরবর্তী সম্পর্কীয় ব্যক্তি নিযুক্ত পতি হতে পারেন, কিন্তু এই ব্যবস্থাও মহান যোগিজনদের জন্য; এটিও কেবল সৎসন্তানের উৎকট কামনা থাকলেই। যেখানে দশ ব্যক্তির সঙ্গে নিয়োগের কথা আছে, সেটিও দশটি সন্তানের ইচ্ছার উপর। এর কারণ এই যে, একই পুরুষ অথবা স্ত্রীর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে নিয়োগ হবে, তাহলে পরস্পর আকর্ষণ দৃঢ় হওয়ার প্রবল আশঙ্কা হতে পারে। এই কারণে পৃথক পৃথক ব্যক্তির সঙ্গে নিয়োগের বিধান হতে পারে। এই কথা মনুস্মৃতির সেই উক্তির সঙ্গে মিলে যায় যে, সর্বাধিক দশটি সন্তানই হওয়া উচিত। সেই সময় জনসংখ্যা অত্যন্ত অল্প হওয়ায় এমন বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে এটি উপযুক্ত নয়। এটি তো সর্বাধিক সীমা।
এর সঙ্গে আমি এই-ই বলব যে, বর্তমান দেশ, কাল ও পরিস্থিতিতে না কেউ নিয়োগের সমর্থন করার অধিকারী, না নিয়োগের বিরোধিতা করারই অধিকারী। যে ব্যক্তি ভগবান মনুর মতে গৃহস্থের বৈদিক যোগ্যতা অর্জন করে, কেবল তখনই এই বিষয়ে বলা উপযুক্ত। বর্তমান সময়ে তো এই-ই উপযুক্ত যে, যারা নিয়োগের পক্ষে তর্ক দেন, তাদের এই-ই বলা উচিত যে, ঋষি দয়ানন্দ নিজের স্তরের অখণ্ড ব্রহ্মচারী থেকে গৃহস্থ হওয়া মহান যোগী পুরুষ অথবা স্ত্রীকেই আপৎকালে এবং সন্তানের অত্যাবশ্যকতা অনুভূত হলে তবেই নিয়োগ করার অধিকার দিয়েছেন। এটি সাধারণ মানুষের জন্য সাধারণ ব্যবস্থা কদাপি নয়। এটাই ঋষি দয়ানন্দের কথনের অভিপ্রায়। অপরদিকে, যারা এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন, তাদের বলা উচিত যে, ঋষি দয়ানন্দ প্রাচীন বৈদিককালের মহান ব্যক্তিদের অনুকরণে যে ব্যবস্থা দিয়েছেন, তা বর্তমান সময়ে কারও জন্যই কিঞ্চিৎ পরিমাণেও উপযুক্ত নয়। অতএব, এই বিষয়ে বর্তমান সময়ে আলোচনা করাই অনাবশ্যক। আমার এ-ও প্রতীয়মান হয় যে, ঋষি দয়ানন্দের সময় বর্তমানের তুলনায় সেই সময়ের মানুষের চরিত্র উত্তম ছিল, কিন্তু ভগবান মনুর যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি সেই কালেও দুর্লভ ছিল। এমন অবস্থায় নিয়োগ বিষয়ের উপর এত বল দেওয়ার ঔচিত্যও কম প্রতীয়মান হয়।
প্রতীয়মান হয় যে, এটিও ঋষি দয়ানন্দের লেখকের কাজ, যা আর্য সমাজের সেই প্রজন্মের পুরুষেরা বুঝে নিয়েছিলেন এবং নিয়োগের ব্যবস্থার স্থলে পুনর্বিবাহের ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়েছিল। আমার মনে হয়, এটাই দেশ, কাল অনুযায়ী অনুকূল ছিল। হ্যাঁ, আজকাল অনেক পতিত লোকও Social Media-তে নিয়োগকে নিয়ে ঋষি দয়ানন্দ ও আর্য সমাজের উপর আক্রমণ করছে, তারা সেইরূপ উপহাসের পাত্র, যেমন কোনো বেশ্যা কোনো সদাচারী জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিকে ব্রহ্মচর্য সম্পর্কে প্রবচন দিয়ে উপহাসের পাত্র হয়ে থাকে।
এখন আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নিন্দুকদের মনোরোগের চিকিৎসা করি। অবশ্য উভয় প্রকার নিন্দুকেরই সমগ্র প্রবন্ধ মনোযোগ সহকারে পড়ে নিজের মনোমালিন্য দূর করার চেষ্টা করা উচিত।
দ্বিতীয় শ্রেণীর নিন্দুক তারা, যারা বেদ সম্পর্কে অজ্ঞ, কিন্তু বেদ ও ঋষিদের পতাকা তুলে ধরা বড় বড় তথাকথিত ধর্মগুরু এবং তাদের অন্ধভক্ত অথবা পোষা তোতা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে কিছু না কিছু বলে থাকে। এমন প্রতীয়মান হয় যে, এদের উভয়েরই কিছু বিদেশী শক্তির সঙ্গে আঁতাত রয়েছে। তারা বেদ ও ঋষিদের সম্মান দেয়, কিন্তু তাঁদের যথার্থ স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ এবং প্রতিমাপূজা ও অবতারবাদের উপর নির্ভরশীল নিজেদের জীবিকার উপর সংকট মনে করে ঋষি দয়ানন্দ এবং আর্য সমাজের নিন্দা করাকেই সনাতন ধর্মের বিজয় বলে মনে করে। তারা ঋষি দয়ানন্দ এবং আর্য সমাজের উপকারসমূহ ভুলে গিয়ে সর্বদা এদের নিজেদের শত্রু মনে করে এবং সুযোগ পেলেই এদের মিথ্যা নিন্দা করে। এ ধরনের নিন্দুকেরা নিজেদের শাস্ত্রও মনোযোগ দিয়ে পড়ে না। এমন মহানুভবগণ প্রথম শ্রেণীর নিন্দুকদের জন্য এ পর্যন্ত লিখিত অংশটি মনোযোগ সহকারে সম্পূর্ণ পড়ে নিন, তারপর নিজের ভ্রান্তি দূর করার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রতি মনোযোগ দিন—
বিবেচনা করুন, কোথাও কি আপনি নিজে উপহাসের পাত্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মহান পূর্বপুরুষদেরও নিন্দার পাত্র করে তুলছেন না? যে কথা আপনারও মান্য গ্রন্থ বাল্মীকী রামায়ণ এবং মহাভারত বলছে, সেই কথাই যদি ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থপ্রকাশ-এ লিখে থাকেন, তবে তার নিন্দা করা কি আপনাকে উপহাসের পাত্র করে না?
আসুন, আমরা নিয়োগের সমর্থনে কয়েকটি উদাহরণ এখানে উপস্থাপন করি—
নিম্নলিখিত মন্ত্রটি ঋষি দয়ানন্দ নিয়োগের সমর্থনে উদ্ধৃত করেছেন—
"উদীর্ধ্ব নার্যভিজীবলোকং গতাসুমেতমুপ শেষ এহি। হস্তাগ্রভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সংবভূব। (ঋ০১০.১৮.৮)
(নারি) বিধবা, তুমি (এতং গতাসুম্) এই মৃত পতির আশা ত্যাগ করে (শেষ) অবশিষ্ট পুরুষদের মধ্য থেকে (অভিজীবলোকম্) জীবিত দ্বিতীয় পতিকে (উপৈহি) গ্রহণ কর এবং (উদীর্ধ্ব) এই বিষয়ে চিন্তা ও দৃঢ়নিশ্চয় রাখ যে, (হস্তগ্রাভস্য দিধিষোঃ) তোমার বিধবা অবস্থায় পুনরায় পাণিগ্রহণকারী নিযুক্ত পতির সম্পর্কের জন্য যে নিয়োগ হবে, তখন (ইদম্) এই (জনিত্বম্) জন্মগ্রহণকারী সন্তান সেই নিযুক্ত (পত্যুঃ) পতিরই হবে; আর তুমি নিজের জন্য নিয়োগ করলে এই সন্তান (তব) তোমার হবে। এইরূপ দৃঢ়নিশ্চয়যুক্ত (অভি সং বভূব) হও এবং নিযুক্ত পুরুষও একই নিয়ম পালন করুক।"২
যারা এই অর্থের উপর ঋষির উপহাস করে, তারা আচার্য সায়ণের ভাষ্যও মনোযোগ দিয়ে পড়ুক—
"হে নারি মৃতস্য পত্নি জীবলোকং জীবানাং পুত্র পৌত্রাদীনাং লোকং স্থানং গৃহমভিলক্ষ্যোদীর্ধ্ব। অস্মাৎস্থানাদুত্তিষ্ঠ॥ ঈর্ গতৌ আদদিকঃ। গতাসুমপক্রান্তপ্রাণমেতং পতিমুপ শেষে। তস্য সমীপে স্বপিষি। তস্মাত্ত্বমেহি। আগচ্ছ যস্মাত্ত্বং হস্তগ্রাভস্য পাণিগ্রাহং কুর্বতো দিধিষোর্গর্ভস্য নিধাতুস্তবাস্য পত্যুঃ সম্পর্কাগতভিদং জনিত্বং জায়াত্বমভিলক্ষ্য সং বভূথ সম্ভূতাসি অনুমরণনিশ্চয়মকার্ষীঃ তস্মাদাগচ্ছ।"
২ সত্যার্থ প্রকাশ চতুর্থ সমুল্লাস
সায়ণাচার্য এই মন্ত্রের উপর একটি আর্শবচন উদ্ধৃত করেছেন—
"দেবরাদিকঃ প্রেতপত্নীমুদীর্ধ্ব নারীতি্যান্যয়া ভর্তৃসকাশাদুৎথাপয়েত্। সূচিতং চ। তামুত্যাপয়েদ্দেবরঃ পতিস্থানীয়োऽতেবাসী জরদ্দাসো বোধীব নার্যভি জীবলোকং।
(আ০গৃ০ ৪.২.১৮)"
কোনো ঋষি দয়ানন্দ-বিরোধী সায়ণভক্ত বলুন তো, এই দুই ভাষ্যের মধ্যে কী পার্থক্য আছে? উভয়ের অর্থ কি সমান নয়? এমন অবস্থায় ঋষি দয়ানন্দের নিন্দা করা কি মূর্খতাপূর্ণ পক্ষপাতের চরম সীমা অর্থাৎ পাপ নয়? ঋষির উপহাসকারীরা আগে নিজেদের আচার্য সায়ণকেই পড়ে নিত, কিন্তু এ কাজ তো কেবল বুদ্ধিমানই করবে, নির্বুদ্ধি কী করবে?
স্পষ্টই এখানে সায়ণ ভাষ্যও সেই কথাই বলে, যা ঋষি দয়ানন্দ বলেন। কিছু ঋষি-দ্রোহী এমন নিরক্ষর যে, তারা সায়ণ ভাষ্য বুঝতেই পারবে না; তবুও তারা কেবল কয়েকটি শব্দ দেখেই অন্তত অনুমান তো করতে পারে।
নিয়োগের পক্ষে সত্যার্থপ্রকাশ-এ একটি মন্ত্র—
কুহ॑ স্বিদ্দো॒ষা কুহ॒ বস্তো॑র॒শ্বিনা॒ কুহা॑ভিপি॒ত্বং ক॑রত॒ঃ কুহো॑ষতুঃ।
কো বাং॑ শযু॒ত্রা বি॒ধবে॑ব দে॒বরং॒ মর্যং॒ ন যোষা॑ কৃণুতে স॒ধস্থ॒ আ॥ (ঋ০ ১০.৪০.২)
স্বরসহ পদপাঠ:
কুহ॑ । স্বি॒ৎ । দো॒ষা । কুহ॑ । বস্তোঃ॑ । অ॒শ্বিনা॑ । কুহ॑ । অ॒ভি॒ऽপি॒ত্বম্ । ক॒র॒তঃ॒ । কুহ॑ । ঊ॒ষ॒তুঃ॒ । কঃ । বাম্ । শ॒যু॒ऽত্রা । বি॒ধবা॑ऽইব । দে॒বর॑ম্ । মর্য॑ম্ । ন । যোষা॑ । কৃ॒ণু॒তে॒ । স॒ধऽস্থে॑ । আ ॥
এই মন্ত্রের যে নিয়োগ-সমর্থক অর্থ ঋষি দয়ানন্দ করেছেন, ঠিক সেই অর্থই আচার্য সায়ণ তাঁর বেদভাষ্যে এবং মহর্ষি যাস্ক নিরুক্ত ভাষ্যে তথা নিরুক্তের স্কন্দস্বামী-মহেশ্বর টীকাতেও করেছেন। এমন অবস্থায়, এই গ্রন্থগুলিকে প্রমাণ বলে মানা পৌরাণিকদের দ্বারা ঋষি দয়ানন্দ এবং আর্য সমাজের নিন্দা করা কি তাদের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকৃতির পরিচয় দেয় না?
অবশ্য আমি আরও স্পষ্ট করে দিই যে, কোনো বেদমন্ত্রের স্বাভাবিক ও মূল ভাষ্য তো আধিদৈবিকই হয়; আধিভৌতিক ভাষ্য ভাষ্যকারের যোগ্যতা এবং দেশ, কাল ও পরিস্থিতি অনুসারে মানব-আচরণ শিক্ষা দেওয়ার জন্য হয়ে থাকে। এই মন্ত্রের 'বেদার্থ-বিজ্ঞানম্' ৩.১৫-এ আমার আধিদৈবিক (বৈজ্ঞানিক) এবং আধিভৌতিক ভাষ্য এইরূপ—
আধিদৈবিক ভাষ্য—
(অশ্বিনৌ) বিভিন্ন প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লোক অথবা কণ (কুহ, স্বিত্, দোষা) 'ক্ব স্বিদ্রাত্রৌ ভবথঃ' [দোষা = রাত্রিনাম (নিঘং. ১.৭)। কঃ প্রজাপতির্বে কঃ (তৈ.সং.১.৬.৮.৫; ম্য.সং.১.১০.১০; শ.ব্রা.৬.৪.৩.৪; জৈ.উ.৩.২.১০; তৈ.ব্রা.২.২.৫.৫; জৈ.ব্রা.১.২৯০, ২.২৩১; ঐ.ব্রা.২.৩৮; ৬.২১; তাং.ব্রা.৭.৮.৩; গো.উ.১.২২; কৌ.ব্রা.৫.৪, ২৪.৪;), প্রাণো বাভ কঃ (জৈ.উ.৪.২৩.৪)] মহাপ্রলয়রূপ রাত্রিতে কোথায় থাকে? অর্থাৎ তারা বিনষ্ট হয়ে তাদের কারণভূত পদার্থে পরিণত হয়ে যায়। আমাদের মতে এখানে 'কঃ'-কে 'কিম্' এবং তা থেকে উৎপন্ন 'কুহ' শব্দ ছান্দস প্রয়োগ; এই কারণে এখানে এই প্রশ্নের উত্তরও গোপন রয়েছে যে, মহাপ্রলয়কালে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লোক অথবা কণ প্রজাপতি-রূপ পরমাত্মা এবং প্রকৃতিতে লীন হয়ে যায় অথবা অবস্থান করে।
(কুহ, বস্তোঃ) 'ক্ব দিবা' ব্রহ্মদিন অর্থাৎ সৃষ্টিকালে সেই উভয় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লোক অথবা কণ কোথায় থাকে? এর উত্তরে এই শব্দগুলির দ্বারাই বলা হয়েছে যে, এই উভয় প্রকার পদার্থ প্রাণতত্ত্বে অবস্থান করে; কিন্তু প্রাণতত্ত্ব নিজে প্রকৃতি এবং ঈশ্বরেই অবস্থান করে। মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিকালেও মূল পদার্থ প্রকৃতির অস্তিত্ব বজায় থাকে; অর্থাৎ তা সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টিতে পরিণত হয় না। প্রাণতত্ত্ব নিজেও প্রকৃতি এবং ঈশ্বরেই অবস্থান করে। মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিকালেও মূল পদার্থ প্রকৃতির অস্তিত্ব বজায় থাকে; অর্থাৎ তা সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টিতে পরিণত হয় না।
(কুহ, অভিপিত্বম্, করতঃ) 'ক্বাভিপ্রাপ্তিং কুরুথঃ' অর্থাৎ সৃষ্টিকালে এই উভয় পদার্থ চারিদিক থেকে কোন কোন পদার্থকে প্রাপ্ত করে? এই প্রশ্নের সঙ্গেই উত্তর দিতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, এই উভয় পদার্থ সৃষ্টিকালে বিভিন্ন প্রাণরশ্মিকেই চারিদিক থেকে প্রাপ্ত করে।
(কুহ, ঊষতুঃ) 'ক্ব বসথঃ' এই উভয় পদার্থ সৃষ্টিকালে কোথায় বাস করে? এর সঙ্গেই লেখা হয়েছে যে, এই উভয় পদার্থ সৃষ্টিকালে পরমাত্মা ও প্রকৃতির সঙ্গে-সঙ্গে প্রাণ ও মনস্তত্ত্বেও বাস করে এবং এগুলির দ্বারাই আচ্ছাদিত থাকে। (কঃ, বাম্, শযুত্রা, বিধবেব, দেবরম্) 'কো বাং শযনে বিধবেব দেবরম্ দেবরঃ কস্মাত্ দ্বিতীয়ো বর উচ্যতে বিধবা বিধাতৃকা ভবতি বিধবনাদ্বা বিধা-বনাদ্বেতি চর্মশিরাঃ অপি বা ধব ইতি মনুষ্যনাম তদ্বিয়োগাদ্বিধবা দেবরো দীব্যতিকর্মা' তাদের উভয়ের শয়নস্থান কী? অর্থাৎ তারা উভয়ে কোথায় মিলিত হয়? এর উত্তরও এর মধ্যেই নিহিত আছে যে, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত কণ প্রাণতত্ত্বেই মিলিত হয়। [কঃ = সুখং বৈ কম্ (গো.উ.৬.৩), অন্ন বৈ কম্ (মৈ.সং.৩.৩.৬, ঐ.ব্রা.৬.২১, গো.উ.৬.৩)] এর সঙ্গে-সঙ্গেই এই উভয় পরস্পরের বলরশ্মিরূপ ইন্দ্রিয়সমূহকে পরস্পর উৎকৃষ্টরূপে ধারণ ও পুষ্ট করার অথবা পরস্পরকে অবশোষিত করার উদ্দেশ্যে মিলিত হয়।
[বরম্ = বরো বরয়িতব্যো ভবতি (নিরু. ১.৭), বর ইব বৈ স্বর্গো লোকঃ (জৈ.ব্রা.২.৯৯), স্বর্গো বৈ লোকো যজ্ঞঃ (কৌ.ব্রা.১৪.১)] এই মিলন কখন হয়, তা বলতে গিয়ে বলেন যে, বিধবা অর্থাৎ যখন কোনো কণ তার ধারক ও পোষক লোক থেকে উৎসর্জিত হয়ে অন্তরীক্ষে কম্পিত হতে হতে বিভিন্ন প্রকারে গমন করে, তখন সে দেবর অর্থাৎ অন্য কোনো কণের সঙ্গে শয়ন করে, অর্থাৎ সংযুক্ত হয়ে যায়। তার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তার গতি তুলনামূলকভাবে সহজ ও অবিক্ষুব্ধ হয়ে যায়। বিধবা পদের এই নিরুক্তি আচার্য চর্মশিরা করেছেন, যা গ্রন্থকার উদ্ধৃত করেছেন।
এইরূপ ক্রিয়া তখনও ঘটে, যখন এই গ্রন্থের খণ্ড ৩.৭-এ বর্ণিত ধবাঃ সংজ্ঞক কণসমূহ তাদের সঙ্গে সংযুক্ত অন্য কোনো কণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখানে-সেখানে কম্পিত হতে হতে বিচরণ করতে থাকে এবং সেই সময় দীপ্তিমান দেবর অর্থাৎ কিছু প্রকাশিত কণ, তরঙ্গাণু ইত্যাদি তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়।
(মর্যম্, ন, যোষা, আকৃণুতে, সধস্থে) 'মর্যো মনুষ্যো মরণধর্মা যোষা যৌতেঃ আকুরুতে সহস্থানে'— একই প্রকার সংযোগ-প্রক্রিয়া তখনও ঘটে, যখন স্বল্পায়ু মনুষ্য-নামক কণ, যাদের ব্যাখ্যা খণ্ড ৩.৭-এ করা হয়েছে, কোনো স্ত্রী-সংজ্ঞক সংযোজ্য কণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে; এবং সেই সময় স্ত্রী-সংজ্ঞক সংযোজ্য পদার্থ ঐ স্বল্পায়ু কণগুলিকে নিজের সঙ্গে ধারণ করে এবং তাদের একটি নবীন পদার্থে রূপান্তরিত করে।
ঋষি দয়ানন্দের বিরোধিতা করেন যারা, তারা আমার আধিদৈবিক অর্থ পড়ে নিজেরাই বিবেচনা করুন যে, তাদের বোধে কতটুকু এসেছে? এক তথাকথিত সন্ন্যাসী, যিনি সর্বদা বেদভাষ্যই দেখিয়ে থাকেন, তাঁর বোধে তো সম্ভবত কিছুই আসবে না।
এখন আমরা এই মন্ত্রের আধিভৌতিক অর্থের উপর বিবেচনা করি, যেখানে উপমা প্রভৃতি অলংকারের পূর্ণ গুরুত্ব রয়েছে।
(মর্যম্, ন, যোষা, আকৃণুতে, সধস্থে) 'মর্যো মনুষ্যো মরণধর্মা যোষা যৌতেঃ আকুরুতে সহস্থানে'— এইরূপ সংযোগ-প্রক্রিয়া তখনও ঘটে, যখন অল্পায়ুবিশিষ্ট মনুষ্য-নামক কণ, যাদের ব্যাখ্যা খণ্ড ৩.৭-এ করা হয়েছে, কোনো স্ত্রী-সংজ্ঞক সংযোজ্য কণের সঙ্গে সংযোগ করে এবং সেই সময় স্ত্রী-সংজ্ঞক সংযোজ্য পদার্থ সেই অল্পায়ু কণগুলিকে নিজের সঙ্গে ধারণ করে এবং তাদের একটি নবীন পদার্থে রূপান্তরিত করে। ঋষি দয়ানন্দের বিরোধিতা করেন যারা, তারা আমার আধিদৈবিক অর্থ পড়ে নিজেরাই বিবেচনা করুন যে, তাদের বোঝায় কতটুকু এসেছে? এক তথাকথিত সন্ন্যাসী, যিনি সর্বদা বেদভাষ্যই দেখিয়ে থাকেন, তাঁর বোঝায় তো সম্ভবত কিছুই আসবে না। এখন আমরা এই মন্ত্রের আধিভৌতিক অর্থের উপর বিবেচনা করি, যেখানে উপমা প্রভৃতি অলংকারের পূর্ণ গুরুত্ব রয়েছে।
আধিভৌতিক ভাষ্য—
(অশ্বিনৌ) হে রাজন্ ও রাজপুরুষগণ! আপনারা উভয়ে (কুহ, স্বিত্, দোষা) দুঃখরূপ রাত্রিতে কোথায়, (কুহ, বস্তোঃ) সুখরূপ দিনে কোথায়, (কুহ, অভিপিত্বম্, করতঃ) পরস্পরকে কোথায় প্রাপ্ত হন অর্থাৎ প্রজাকল্যাণার্থ কোথায় মিলিত হন? কোথায় এবং কীভাবে প্রজার সুখ-সম্পাদনের জন্য উপায়-উপকরণ প্রাপ্ত করেন? (কুহ, ঊষতুঃ) আপনারা উভয়ে কোথায় অবস্থান করেন, অর্থাৎ নিরাপত্তা ও সাধারণ জনগণের সমস্যার সমাধানের জন্য আপনারা উভয়ে কোথায় থাকেন? (কঃ, বাম্, শযুত্রা) আপনাদের উভয়ের শয়ন অথবা বিশ্রামস্থল কোথায়? (বিধবা, ইব, দেবরম্) আপনারা উভয়ে প্রজাহিতের কামনা এবং সেই একমাত্র লক্ষ্য নিয়ে রাজসভায় পরস্পর সেইরূপ মিলিত হন, যেমন কোনো বিধবা স্ত্রী কেবল সন্তানপ্রাপ্তির ইচ্ছাতেই তার নিযুক্ত পতির সঙ্গে মিলিত হয় এবং এর অতিরিক্ত কেবল বিষয়াসক্তির জন্য কখনো মিলিত হয় না; এবং (মর্যম্, ন, যোষা, আকৃণুতে, সধস্থে) যেমন কেবল সন্তানেরই কামনা করে কোনো স্ত্রী তার পতিকে নিজের স্থানে আহ্বান করে, এর অতিরিক্ত পতি ও পত্নীরও কোনো শারীরিক সম্পর্ক কখনো হয় না অথবা হওয়া উচিত নয়।
ভাবার্থ— রাজা ও রাজপুরুষ (মন্ত্রী প্রভৃতি) সর্বদা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবেন। সুখ ও দুঃখ—উভয় অবস্থাতেই কেবল প্রজার কল্যাণই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাদের উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক কেবল প্রজাকল্যাণের উদ্দেশ্যেই হওয়া উচিত; অন্য বিষয়ে তারা স্বাধীন থাকবেন, অর্থাৎ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে তারা স্বাধীন থাকবেন এবং প্রজাহিতে তারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ থাকবেন। এখানে উপমার দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, যেমন কোনো বিধবা তার নিযুক্ত পতির সঙ্গে অথবা কোনো স্ত্রী তার পতির সঙ্গে কেবল সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্যেই মিলিত হয়, কেবল বিষয়সুখের জন্য নয়; তেমনি রাজা এবং অমাত্যগণের ব্যক্তিগত স্বার্থে স্বাধীন থেকে এবং প্রজাহিতের জন্য সভার আয়োজন করে যথাযথ চিন্তা-বিবেচনা করতে থাকা উচিত। এখানে বারবার 'কোথায়' প্রশ্নবাচক পদের প্রয়োগের উদ্দেশ্য এই যে, রাজা ও রাজপুরুষদের নিজেদের বাসস্থান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা উচিত, যাতে তারা আপৎকালে নিজেদের ও প্রজার রক্ষা ও পালন করার জন্য যে কোনো সময় অবিলম্বে মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। এর সঙ্গে সুখ ও দুঃখ—উভয় অবস্থাতেই তাদের নীতিসমূহ সর্বদা প্রজাহিতের রক্ষাকারী হওয়া উচিত।
এখন আমরা মহাভারতের প্রসঙ্গের উপর বিবেচনা করি। এই বিষয়ে আমরা গীতা প্রেস, গোরখপুর থেকে প্রকাশিত মহাভারতের শ্লোক এবং তাদেরই করা হিন্দি অনুবাদ এখানে উদ্ধৃত করছি, যাতে কেউ আমার বিরুদ্ধে মনগড়া অর্থ করার অভিযোগ আনতে না পারে।
"সম্বভূব তয়া সার্ধং মাতুঃ প্রিয়চিকীর্ষয়া।
ভয়াৎ কাশিসুতা তং তু নাশক্নোদভিবীক্ষিতুম্ ॥ ৬ ॥
(মহাভারত, আদিপর্বণি, সম্ভবপর্ব, অধ্যায় ১০৫)
"মাতার প্রিয় করার ইচ্ছায় ব্যাসজি তার সঙ্গে সমাগম করেছিলেন, কিন্তু কাশিরাজের কন্যা ভয়ের কারণে তাঁর দিকে ভালোভাবে তাকাতে পারেনি।"
এর পরবর্তী শ্লোকগুলিতে লেখা আছে যে, অম্বিকার চক্ষু বন্ধ করার ফলে ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন; একইভাবে পাণ্ডুর পাণ্ডুবর্ণের জন্ম হওয়ারও আলোচনা আছে। শেষে দাসীর সঙ্গে নিয়োগের বিষয়ে মহাভারতে বলা হয়েছে—
"কামোপভোগেন রহস্তস্যাং তুষ্টিমগাদৃষিঃ ॥ ২৬ ॥"
"একান্তে মিলিত হয়ে তার সঙ্গে কামোপভোগের দ্বারা মহর্ষি ব্যাস অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।"
এখানে 'কাম' এবং 'রহস্' শব্দ অর্থকে স্পষ্ট করছে। অপরদিকে 'ধর্ম' নামক দেব কর্তৃক দেবী কুন্তীর গর্ভে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জন্মের প্রসঙ্গে কুন্তী ও ধর্মের নিয়োগের বর্ণনা এইরূপ—
"সংযুক্তা সা হি ধর্মেণ যোগমূর্তিধরেণ হ।
লেভে পুত্রং বরারোহা সর্বপ্রাণভৃতাং হিতম্ ॥ ৫ ॥" (মহা. আদিপর্বণি, সম্ভবপর্ব, অধ্যায় ১২২)
এখানে 'যোগমূর্তিধরেণ' শব্দটি বিবেচনাযোগ্য। গীতা প্রেস সংস্করণে এর অনুবাদ এইরূপ—
"তৎপর যোগমূর্তি ধারণকারী ধর্মের সঙ্গে সমাগম করে সুন্দরাঙ্গী কুন্তী এমন এক পুত্র লাভ করেছিলেন, যিনি সমগ্র প্রাণীদের হিতকারী ছিলেন।"
এই একই পর্বের ১০৪তম অধ্যায়ে গীতা প্রেস পাদটীকা হিসাবে মনুস্মৃতির কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত করেছে—
"বিধবায়াং নিযুক্তস্তু ঘৃতাক্তো বাগ্যতো নিশি। একমুৎপাদয়েত্ পুত্রং ন দ্বিতীয়ং কথঞ্চন।। (মনু. ৯.৬১)
"বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের জন্য (পতিপক্ষের গুরুজনদের দ্বারা) নিযুক্ত পুরুষ নিজের সমগ্র শরীরে ঘি মেখে (সৌন্দর্য নষ্ট করে), বাক্-সংযমে থেকে (নীরব থেকে), রাত্রিতে সহবাস করবে। এইভাবে সে কেবল একটি পুত্র উৎপন্ন করবে, দ্বিতীয়টি কখনো করবে না। প্রধান প্রধান অপ্সরাগণ, গন্ধর্বদের স্ত্রীগণ, যক্ষ ও নাগদের কন্যাগণ, ঋক্ষদের স্ত্রীগণ, বিদ্যাধরীগণ, কিন্নরীগণ এবং বানরীগণের গর্ভ থেকে বানররূপে নিজেরই তুল্য পরাক্রমশালী পুত্র উৎপন্ন করো। ৫-৬॥"
(গীতাপ্রেস, বা০রা০, বালকাণ্ড ১৭ সর্গ)
এখানে সকল শ্রেণীর স্ত্রীর গর্ভ থেকে বানরবর্গের লোকেরা কীভাবে উৎপন্ন হয়ে গেল? এটিও তো নিয়োগই। হনুমানজির পিতা কেশরী নামক বানরবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন। তিনি কি সন্তান উৎপাদনে অসমর্থ ছিলেন? সকল বানরবংশীয়ই কি নপুংসক হয়ে গিয়েছিল যে, দেবতাদের তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়োগ করতে হলো?
বস্তুতঃ শ্রীরামকে বিষ্ণুর অবতার প্রমাণ করার প্রয়াসে সমগ্র প্রসঙ্গটি মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু অবিবেচক এবং ধূর্ত ব্যক্তি আর্য সমাজ কর্তৃক বিভিন্ন আর্শ গ্রন্থের কিছু কথা গ্রহণ করা এবং কিছু কথাকে প্রক্ষিপ্ত মনে করে বর্জন করার জন্য উপহাস করে; তারা প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রের মর্যাদা ও কার্য বোঝে না। আজ তাদের কারণেই প্রায় সমস্ত আর্শ গ্রন্থের উপর বিধর্মী অথবা বামপন্থীরা ইচ্ছামতো দোষারোপ করছে। তারা আমাদের সন্ততিকে মুসলিম, খ্রিস্টান অথবা বামপন্থী করে তুলছে। এই পৌরাণিক ভ্রাতৃগণের এ বিষয়ে না কোনো লজ্জা আছে, না হিন্দু ও সনাতন ধর্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তা আছে। তাদের এতটুকু বুদ্ধিও নেই যে, রামায়ণের ভিত্তি দেবর্ষি নারদ এবং মহর্ষি বাল্মীকির সংলাপ। যদিও তাতেও কিছু শ্লোক প্রক্ষিপ্ত বলে প্রতীয়মান হয়, তথাপি কোথাও শ্রীরামকে পরব্রহ্ম বলা হয়নি, বরং স্পষ্টভাবেই নর বলা হয়েছে। মহর্ষি ব্রহ্মা মহর্ষি বাল্মীকিকে শ্রীরামের চরিত্র লিখতে বলেছিলেন এবং সেই সময় ব্রহ্মাজিও শ্রীরামকে অবতার বলেননি।
যদি এই মনগড়া অবতারকে দুর্জনতোষন্যায়ে সত্য বলেও মেনে নেওয়া হয়, তবুও এখানেও নিয়োগই সিদ্ধ হচ্ছে; পাশাপাশি সকল বানরবংশীয় ক্ষত্রিয় নপুংসকতা প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত বলে সিদ্ধ হচ্ছে। নিজেদের মহাপুরুষদের নপুংসকতা প্রভৃতি রোগে পীড়িত বলে প্রতিপন্ন করা কি মহাপাপ নয়? কিন্তু এই লোকদের পাপ-পুণ্যের সঙ্গে সম্পর্কই বা কবে ছিল? সমস্ত পুরাণই এরূপ বহু পাপের সাক্ষী।
যখন দেবতারা নিয়োগ করেন, মহর্ষি ব্যাস নিয়োগ করেন, তখন তো পাপ নয়; কিন্তু ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ প্রকাশ-এ নিয়োগের আলোচনা করলেই ব্যঙ্গ করতে শুরু করে। একে পাগলামি ও ধূর্ততার চরম সীমা না বললে আর কী বলা যায়?
এ বিষয়ে কেউ কেউ বলবেন যে, প্রকৃতপক্ষে নিয়োগ প্রথা প্রাচীনকালে প্রচলিত ছিল, কিন্তু তাতে শারীরিক সম্পর্ক হতো না; বরং শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াই মন্ত্রাদি তপোবলের দ্বারা গর্ভধারণ হয়ে যেত। তারা এই প্রবন্ধে মহাভারতে মহর্ষি ব্যাস কর্তৃক সম্পাদিত নিয়োগ-প্রকরণের শ্লোকগুলি বুদ্ধিপূর্বক পড়ে নিন; বৃথা অনুমান করবেন না, ঈর্ষা, পক্ষপাত ইত্যাদির পাপাগ্নি থেকে বাঁচুন।
যারা নিয়োগ-প্রকরণ নিয়ে অশালীন ভাষায় আর্য সমাজ এবং ঋষি দয়ানন্দ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, তারা নিজেদের চালচলন ও চরিত্রের দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে দেখুন; তাহলে বুঝবেন যে, বিষয়লম্পট অসভ্য লোকদের এই বিষয়ে কথা বলার কোনো অধিকার নেই। হ্যাঁ, যারা শিষ্ট ভাষায় সমালোচনা করেন, তারা অবশ্যই সংলাপের যোগ্য।
সর্বপ্রথম আমরা মহর্ষি ব্যাস কর্তৃক মহারাণী অম্বিকা এবং অন্যান্যদের সঙ্গে নিয়োগ করে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরের, এবং মহারাণী কুন্তী ও মাদ্রী কর্তৃক দেবতাদের সঙ্গে নিয়োগ করে পাণ্ডবদের জন্মদানের বিষয়টি বিবেচনা করি—পৌরাণিকদের দ্বারা আদৃত গীতা প্রেসের অনুবাদ এবং মূল শ্লোকসমূহ থেকে নিযুক্ত পতিদের (ব্যাসজি এবং বিভিন্ন দেবতা) সঙ্গে সন্তানকামিনী নারীদের প্রত্যক্ষ শারীরিক সংস্পর্শেরই প্রমাণ পাওয়া যায়। তবুও মহর্ষি ব্যাসের দ্বারা এক বছর ব্রত পালনের কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতিবশত তিনি ব্রত পালন না করেই নিয়োগ করেছিলেন। 'কাম উপভোগ' পদ স্পষ্ট করে যে, শারীরিক সম্পর্ক ব্যতীত সন্তানের জন্ম সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন ওঠে যে, নিয়োগ তো রাজপ্রাসাদের কোনো বলবান যোদ্ধার দ্বারাও করা যেত; তাহলে তৎকালীন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঋষিকে এই সাধারণ কাজের জন্য কেন নির্বাচন করা হলো? এই কাজকে সাধারণ বলে যে ব্যক্তি মনে করে, সে কেবল কোনো মন্দবুদ্ধি অথবা বিষয়লম্পটই হতে পারে; বুদ্ধিমান সদাচারী কখনো নয়। পশুর ন্যায় সন্তান জন্ম দেওয়া এক কথা, কিন্তু সুশীল সন্তান জন্ম দেওয়া খুবই বিরল বিষয়। আজ নামমাত্র এই পৃথিবীতে আটশো কোটি মানুষ রয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে বেদ ও আর্শ গ্রন্থসমূহের মর্মবাণীর দৃষ্টিতে একজনও প্রকৃত মানুষ আছে কি? অন্তত নিয়োগ বিষয় নিয়ে কদর্য মন্তব্যকারী ঋষি দয়ানন্দ-বিরোধীরা তো কোনো অবস্থাতেই মানুষ হতে পারে না।
অম্বিকা, অম্বালিকা প্রমুখের কাছ থেকে মাতা সত্যবতী কোনো সাধারণ সন্তান চাননি; তিনি ভূমণ্ডলের সর্ববৃহৎ রাজ্যের ভার গ্রহণ করতে সক্ষম শ্রেষ্ঠ, ধর্মাত্মা, বলবান ও বুদ্ধিমান সন্তান চেয়েছিলেন। এখানে বিষয় ছিল নিয়োগের এবং নিয়োগ-ধর্ম সাধারণ গার্হস্থ্যধর্ম অর্থাৎ সন্তান-জননের কাজ থেকে স্বতন্ত্র, এবং তার তুলনায় অধিক উচ্চ যোগ্যতার প্রত্যাশা করে। যেখানে কামের উপভোগও হয় এবং 'যোগমূর্তিধর' বিশেষণ, যা ইন্দ্রাদি দেবতাদের প্রসঙ্গে লিখিত হয়েছে, তাও সার্থক থেকে যায়। শরীর ও মনের উপর এমন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা চাই যে, উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক কোনো আকর্ষণ না থাকে, কামের কোনো আলোচনা না হয়, মনে কেবল ধর্ম ও কর্তব্যেরই চিন্তা থাকে, কামুকতার লেশমাত্র ভাবও না থাকে; তবুও শরীর প্রজনন-প্রক্রিয়ার জন্য অনুকূল হয়ে যায়।
এই সবকিছু একসঙ্গে সম্পন্ন করা অত্যন্ত অসাধারণ কাজ। এই বিষয়ে বর্তমান মানুষের তুলনায় পশু-পক্ষীদেরই অধিক যোগ্যতা রয়েছে। তারা কামশক্তিসম্পন্ন হয়েও কামুক হয় না। কেবল ঋতুমতী মাদার প্রতিই পুরুষ পশু-পক্ষীদের আকর্ষণ হয়। প্রজনন-ক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গর্ভধারণ হয়ে যাওয়ার পরে সেই পুরুষ ও মাদা পরস্পরের প্রতি কামের আকর্ষণ সম্পূর্ণরূপে ভুলে যায়। কুকুরদের দেখুন, তারা ঋতুকালে পাগলের ন্যায় ঘুরে বেড়ায়; ঋতুমতী কুকুরীদের দেখে অথবা দূর থেকেই তাদের গন্ধ পেয়ে তারা কামোন্মত্ত হয়। এর অতিরিক্ত তারা পরস্পরের সঙ্গে খুব খেলাধুলা করে, খায়, মারামারি-ঝগড়া করে; কিন্তু কখনোই একে অপরকে কামবাসনার দৃষ্টিতে দেখে না। মানুষের মধ্যে যদি এতটুকুও উন্নতি আসে, তবে আজ পৃথিবীতে কামলীলার এই ঘৃণ্য ও নিষ্ঠুর খেলা দেখা যেত না এবং কৃত্রিম গর্ভনিরোধক উপায়ের ব্যবহারের পাপপূর্ণ ব্যবসাও ফুলে-ফেঁপে উঠত না।
নিয়োগে একটি প্রক্রিয়া এইরূপও সম্ভব যে, গর্ভধারণের পরে স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই কোনো বিশেষ যোগিক বিভূতির দ্বারা এই ঘটনাটি, অর্থাৎ সেই সহবাস-ক্রিয়াটিকে, অন্তঃকরণ থেকেও সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত করে দেয়। তাদের কখনো আভাসও হয় না যে, তারা প্রজনন-ক্রিয়াও সম্পন্ন করেছিল। এই কাজও কেবল উচ্চকোটির সিদ্ধযোগীই করতে পারেন, কোনো সাধারণ পুরুষ বা স্ত্রী নয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে তাদের উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক কোনো আকর্ষণ থাকে না এবং উৎপন্ন সন্তানটির প্রতিও নিযুক্ত পুরুষ বা স্ত্রীর কখনো কোনো আকর্ষণ থাকে না।
নিয়োগ বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দের উপর মন্তব্য করার আগে তারা প্রথমে নিজেদের ইন্দ্রিয় ও মনের চঞ্চলতা দূর করার অভ্যাস করার চেষ্টা করুন; তারপর বলুন যে, আর্যসমাজীরা যার-তার সঙ্গে যার-তার নিয়োগ করিয়ে নেয়। তারা নিজেরাই এ ধরনের পাপ করে, নানা প্রকার কৃত্রিম গর্ভনিরোধক উপায় ব্যবহার করে, সমস্ত সম্পর্ককে ছিন্নভিন্ন করার পাপ করে; সেই কারণেই তারা এমন কদর্য মন্তব্য করে। নচেৎ এমন অশ্লীল ও কামুকতাপূর্ণ শব্দ তাদের মুখ ও লেখনী থেকে বেরোয়ই বা কীভাবে?
পশু-পক্ষীর স্তরে পৌঁছানোই আজ মানুষের পক্ষে কঠিন; সেখানে নিয়োগ তো এক পরোপকারী, ধর্মাত্মা, বলবান, প্রতিভাবান পুত্র বা কন্যার জন্মদানের জন্য হয়ে থাকে। সেই সময় প্রজননকার্যে নিযুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থা কোনো উচ্চ সমাধিস্থ যোগীর চেয়ে নিম্নতর নয়, বরং উচ্চতরই হবে। যোগী তো আত্মা ও পরমাত্মার স্বরূপেরই চিন্তা করেন; কিন্তু নিয়োগকারী যুগলকে শরীরের প্রজননাঙ্গসমূহকে নিজ নিজ কর্মে নিযুক্ত রেখেও মনকে সমাধিস্থ রাখা, পরস্পরের প্রতি কোনো কামজনিত আকর্ষণ জন্মাতে না দেওয়া, উচ্চ সন্ততির উচ্চ গুণসম্পন্ন আত্মার আহ্বান করতেও থাকা এবং এই সমস্ত ভাবের মধ্যে আত্মার দ্বারা পূর্ণ সাম্যও বজায় রাখা—এ সবই কেবল সম্পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় মহাপুরুষের পক্ষেই সম্ভব। মহর্ষি ব্যাস, ধর্মরাজ, ইন্দ্র, বায়ু প্রভৃতি দেবতা অত্যন্ত অসাধারণ মহাপুরুষ ছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে নিয়োগকারী দেবীগণও অসাধারণ যোগপ্রতিভাসম্পন্ন ছিলেন; তখনই নিয়োগ সংঘটিত হয়েছিল। এইরূপ দিব্য পুরুষদেরই নিয়োগের অধিকার ছিল, কোনো সাধারণ মানুষের নয়। এটিও তখনই বলা হচ্ছে, যখন দেবী কুন্তী ও মাদ্রীকেও নিয়োগের দ্বারা সন্তান উৎপন্নকারী মাতা বলে ধরা হয়; অথচ আমি এটিকে ঐতিহাসিক সত্য বলে মানি না।
পাণ্ডবদের বিষয়ে ঋষির প্রমাণের উপর কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, আর্য সমাজ কি শাপ ও বরদান মানে? আমার দৃষ্টিতে কিন্দম ঋষি কর্তৃক মহারাজ পাণ্ডুকে শাপ দেওয়ার কাহিনিটিই প্রক্ষিপ্ত ও মনগড়া। এই ঘটনা মহাভারতের আদিপর্বের সম্ভবপর্বের ১১৭তম অধ্যায়ে পাওয়া যায়।
"এতে কিন্দম ঋষি বলেন যে, আমি মনুষ্যরূপে আমার স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে লজ্জা অনুভব করতাম। এই কারণে আমি নিজে মৃগের রূপ ধারণ করে এবং আমার স্ত্রীকে মৃগী বানিয়ে অন্যান্য মৃগদের সঙ্গে বনে বিচরণ করতে করতে আমার স্ত্রীর সঙ্গে, যিনি মৃগীর রূপে ছিলেন, সম্পর্ক স্থাপন করতাম। সেই সময় মহারাজ পাণ্ডু সেই যুগলকে বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন।"৩
আসুন, এ বিষয়ে বিবেচনা করি—
কোনো ঋষিকোটির ব্যক্তি যে কাজ করতে লজ্জা অনুভব করেন, সেই কাজই তিনি কোনো পশুর রূপ ধারণ করে এবং স্ত্রীকেও পশু বানিয়ে করেন—এমন ব্যক্তিকে কেউ ঋষি বলেই বা কীভাবে মানতে পারে? আমি তো কোনো ঋষিকোটির ব্যক্তির কথা ছেড়েই দিলাম, সাধারণ মানুষের পক্ষেও এমন কর্মকে নিন্দনীয়ই বলব। এই কাহিনির রচয়িতা হিসেবে ভগবৎপাদ ব্যাসঋষির নাম উল্লেখ করা তার চেয়েও বড় পাপ। ধিক্! এখানে আর-একটি বিষয়ও আছে যে, ধর্মাত্মা মহারাজ পাণ্ডু বেদবিরুদ্ধ এবং মনুস্মৃতিবিরুদ্ধ শিকার কীভাবে করতে পারেন এবং কীভাবে নিরপরাধ মৃগ-মৃগীকে হত্যা করতে পারেন? এইভাবে এখানে ঋষি কিন্দম এবং মহারাজ পাণ্ডু—উভয়কেই অধার্মিক প্রমাণ করা হয়েছে; তাহলে কেন আমরা এই প্রকরণটিকে পাপীদের দ্বারা প্রক্ষিপ্ত বলে মানব না?
৩. গীতা প্রেস, গোরখপুর।
এখানে আমি বিস্তারের ভয়ে শ্লোকসহ সম্পূর্ণ হিন্দি / বাংলা অনুবাদ দিইনি।
এখন রইল মহারাজ পাণ্ডুর নপুংসক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। সে বিষয়ে আমার নিজস্ব মত এই যে, যখন মূল কাহিনিটিই অসংলগ্ন প্রলাপ হওয়ায় প্রক্ষিপ্ত, তখন তার শাখা, ফুল, পাতা কীভাবে বাস্তব হতে পারে? অতএব দেবতাদের দ্বারা মহারাণী কুন্তী ও মাদ্রীকে সন্তান প্রদান করার ঘটনাটিও প্রক্ষিপ্ত বলেই প্রতীয়মান হয়। ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ প্রকাশ-এ এই ঘটনাকে এবং তার সঙ্গে ব্যাসঋষি কর্তৃক নিয়োগকেও ঐতিহাসিক বলে মেনেছেন। এখানে আমাদের মত এই যে, মহর্ষি ব্যাসের মহারাণীদের সঙ্গে নিয়োগের কারণ স্পষ্ট; কিন্তু মহারাজ পাণ্ডুর ঘটনার মূলটিই প্রক্ষিপ্ত ও অসংলগ্ন। ব্যস্ততার কারণে ঋষি দয়ানন্দ এই বিষয়ে লক্ষ্য করেননি; তবুও মহর্ষি ব্যাসের ঘটনাটিই নিয়োগের ঐতিহাসিকতা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।
হ্যাঁ, এমন হতে পারে যে, মহারাজ পাণ্ডু অন্য কোনো দুর্ঘটনাবশত নপুংসকতা-রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তখন রাণীরা দেবতাদের সঙ্গে নিয়োগ করেছিলেন; সেক্ষেত্রে এটিকে সত্য বলে মানা যেতে পারে। এমন অবস্থায় নিয়োগ-প্রক্রিয়াকে পূর্ববৎই বুঝতে হবে। আমাদের তো এটিও বিশ্বাস হয় না যে, মহারাজ পাণ্ডুর মতো মহাবীর যোদ্ধা এমন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা সেই সময়ের মহান জ্ঞান-বিজ্ঞানও দূর করতে পারেনি। এই প্রকরণটিই মিথ্যা; তবুও মন্ত্রশক্তির বিষয়ে বিবেচনা করি।
যদি মন্ত্রের দ্বারা সন্তান জন্ম হতো, তবে দেবী কুন্তীকে সূর্যদেব মন্ত্রশক্তির দ্বারা পুত্র দিয়েছিলেন—তাহলে দেবী কুন্তীর লজ্জা কেন হয়েছিল, যার ফলে তিনি নিরপরাধ নবজাত পুত্রকে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন? এ সম্পর্কে মহাভারতে স্পষ্ট লেখা আছে—
সূর্যদেব দেবী কুন্তীকে নিয়োগের জন্য অনেক বুঝিয়েছিলেন—
"বেদাহং সর্বমেবৈতদ্ যদ্ দুর্বাসা বরং দদৌ।
সন্ত্যজ্য ভয়মেবেহ কুর্বতাং সংগমো মম ॥ ১৩ ॥"
"সূর্যদেব বললেন— শুভে! আমি এ সবই জানি যে, দুর্বাসা তোমাকে বর দিয়েছেন। তুমি ভয় ত্যাগ করে এখানে আমার সঙ্গে সমাগম কর।" (মহাভারত, আদিপর্ব, সম্ভবপর্ব, অধ্যায়-১১০, গীতা প্রেস, গোরখপুর)
সূর্যদেবের বহু অনুরোধের পর দেবী কুন্তী সমাগমের জন্য প্রস্তুত হলেন।
এখানে স্পষ্টই দেবতাদের কামপিপাসু রূপে দেখিয়ে বদনাম করা হয়েছে, যারা কুমারী কন্যাকেও নিয়োগের জন্য বাধ্য করেন। দয়ানন্দ ও আর্য সমাজের নিন্দাকারী পৌরাণিকদের নিজেদের এই পাপটি চোখে পড়ে না। ঋষি দয়ানন্দ কেবল বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষদেরই চরম আপৎকালে নিয়োগের অধিকারী বলেছেন, তাও সমাজের অনুমতিপূর্বক, বিধিপূর্বক সংস্কার সম্পন্ন করার পর। এখানে সূর্যদেব তো একাকী, অসহায় কুমারী কুন্তীকেই নিয়োগের জন্য বাধ্য করছেন। না কোনো সামাজিক অনুমোদন, না কোনো সংস্কার; কুন্তী বিবাহিতও নন এবং তাঁর সন্তানেরও কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। এই পাপের বিষয়ে এদের মুখে তালা লেগে যায় কেন? এখানে কোনো মন্ত্রবিদ্যার অলৌকিকতা নেই, বরং শারীরিক সংযোগই দেখানো হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে এই প্রকরণটিও সূর্যদেব ও দেবী কুন্তীকে বদনাম করার উদ্দেশ্যে সংযোজিত হয়েছে।
যতদূর মন্ত্রের দ্বারা সন্তান উৎপন্ন হওয়ার কথা, সে বিষয়ে আমার মত এই যে, যদি মন্ত্রের দ্বারা সন্তান জন্ম হতো, তবে দেবতা বা ঋষিদের বিবাহের প্রয়োজনই হতো না এবং মানুষের উৎপত্তি সর্বদাই অমৈথুনী হতো। আজ এই পৌরাণিক জগৎই দেবতার সঙ্গে দেবীর যুগলরূপ দেখায়; তাহলে তার প্রয়োজন কী? সকল মহাপুরুষ ও দেবীগণ একাকী থাকলেও সন্তান লাভ করতে পারতেন। মন্ত্রের দ্বারা সন্তান উৎপন্ন হলে সেখানে লজ্জা বা শঙ্কার কোনো স্থানই থাকত না।
পাণ্ডবদের বিষয়ে আমার আরও একটি মত এই যে, দেবী কুন্তী ও দেবী মাদ্রীর সন্তানদের ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারের মতো দেবতারা নিজেদের কাছে রেখে সন্তানস্বরূপ শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং কালক্রমে পাণ্ডবদের তাঁদেরই সন্তান বলে মনে করে দেবতাদের থেকে তাদের উৎপত্তির কাহিনি রচিত হয়েছে। আমার মনে হয়— সত্যার্থ প্রকাশ থেকে মহারাজ পাণ্ডুর সন্তানকে নিয়োগজাত বলে মানার বিষয়টি বাদ দেওয়া উচিত; কেবল মহর্ষি ব্যাসের উদাহরণটিই রাখা উচিত।
কিছু লোক এমন মনে করেন যে, নিয়োগে শারীরিক সম্পর্কের প্রয়োজন নেই; বরং তারা কৃত্রিম গর্ভাধানের দ্বারাও সন্তান উৎপন্ন করতে পারেন। যদিও এমনটি সম্ভব হতে পারে, কিন্তু যতদূর আমি পশুদের বিষয়ে জানি, কৃত্রিম গর্ভাধানের দ্বারা উৎপন্ন পশুদের রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হয়। এমন অবস্থায় বিশেষ আপৎকালে কোনো রাণী কখনোই চাইবেন না যে, তাঁর সন্তান দুর্বল ও রোগাক্রান্ত জন্মগ্রহণ করুক; কারণ এমন সন্তান কখনোই সেই রাজ্যের রক্ষা করতে পারবে না, যার জন্য কোনো রাণী নিয়োগ গ্রহণ করেন।
কিছু উন্মত্ত লোক বলে—
"মহারাণী অম্বিকা মহর্ষি ব্যাসকে দেখে ভয়ে চক্ষু বন্ধ করে নিয়েছিলেন; এই কারণে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নিয়োগ শারীরিক সম্পর্ক নয়, বরং তা এক বিশেষ মন্ত্র-শক্তিপাতের ক্রিয়া; অন্যথায় ভয়ের কারণে চক্ষু বন্ধ করার সঙ্গে গর্ভস্থ সন্তানের কী সম্পর্ক?"
পাণ্ডুর জন্মের বিষয়েও তারা এই একই কুতর্ক উপস্থাপন করে। এই বিষয়টি গার্হস্থ্যজীবনের বিষয়, যার উপর আমি কিছু বলতে অসমর্থ এবং এ-সব জানার প্রতিও আমার কখনো কোনো আগ্রহ ছিল না; কিন্তু ধূর্ত লোকদের দ্বারা ঋষি দয়ানন্দের মতো নিষ্কলঙ্ক মহাপুরুষের অপমান আমি সহ্য করতে পারি না। এই কারণেই চরক সংহিতা, শরীর স্থানম্ ৮.৬ এখানে উদ্ধৃত করতে বাধ্য হয়েছি। সেই প্রকরণটি এইরূপ—
"তত্রাত্যশিতা ক্ষুধিতা পিপাসিতা ভীতা বিমনাঃ শোকার্তা ক্রুদ্ধাঽন্যং চ পুমাংসমচ্ছন্তী মৈথুনে চাতিকামা বা নারী ন গর্ভ ধত্তে। বিগুণাং বা প্রজাং জনয়তি। অতিবালামতিবৃদ্ধাং দীর্ঘরোগিণীমন্যান্যেন বা বিকারেণোপসৃষ্টাং বর্যয়েত্।
পুরুষেऽপ্যেত এব দোষাঃ।
তখন যে স্ত্রী অতিভোজন করে থাকে, ক্ষুধার্ত থাকে, পিপাসার্ত থাকে, ভীত থাকে, পতির প্রতি বিরূপ বা দুঃখিতচিত্ত হয়, শোকে পীড়িত থাকে, ক্রোধে থাকে, পতির অতিরিক্ত অন্য পুরুষকে কামনা করে অথবা মৈথুন বা ভোগের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা রাখে—এমন স্ত্রী গর্ভ ধারণ করে না। যদি গর্ভ স্থাপিতও হয়, তবে বিপরীত গুণবিশিষ্ট সন্তান জন্ম দেয়। পুরুষের উচিত, অতি বালিকা, অতি বৃদ্ধা, দীর্ঘকাল রোগিণী অথবা অন্য কোনো রোগে পীড়িতা স্ত্রীর সঙ্গে মৈথুন না করা। একইভাবে স্ত্রীরও উচিত, যদি পুরুষ উল্লিখিত দোষ বা ত্রুটিযুক্ত হয়, অর্থাৎ অতি বালক হয়, অতি বৃদ্ধ হয়, দীর্ঘকাল রোগী হয় অথবা অন্য কোনো রোগে পীড়িত হয়, তবে তার সঙ্গে সহবাস না করা।"
এতদ্বারা কি এখনও কোনো উন্মত্ত ব্যক্তি এই ধারণা পোষণ করে, যে নারী ও পুরুষের মানসিক অবস্থার সন্তানের উপর কোনো প্রভাব পড়ে না, এবং নিজের ধূর্ততার পরিচয় দেবে?
এত কিছু লেখার পরও আমি এই কথাই বলব যে, এই বিষয়টি অত্যন্ত উচ্চকোটির যোগী, দেবগণ, ঋষিগণ অথবা শ্রেষ্ঠ ধর্মাত্মা রাজা-মহারাজাদের বিষয়; তাও কেবল সন্তানলাভের অপরিহার্য ইচ্ছা থাকলে, যাতে রাষ্ট্র বা বিশ্ব কোনো মহান পুরুষ বা নারীকে লাভ করতে পারে। অন্যথায় বর্তমান যুগের মানুষের এ বিষয়ে আলোচনাও করা উচিত নয়।
ঋষি দয়ানন্দের নিয়োগ-বিষয়ে অশ্লীল ভাষায় ব্যঙ্গকারীরা এটুকুই বলুন যে, আপনাদের মতে মহর্ষি ব্যাসকে মহর্ষি পরাশর কোন পদ্ধতিতে জন্ম দিয়েছিলেন? কুমারী কন্যা সত্যবতীর সঙ্গে নৌকাতেই অন্ধকার সৃষ্টি করে সেখানেই গর্ভধারণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এই ভ্রাতৃগণ বলুন, এটি কোন প্রথা ছিল? আমি তো এ ঘটনাকে সত্য বলেই মানি না; বরং আমি মনে করি, এই সমস্ত পাপকাহিনি বেদ ও ভারতবিরোধীরা আমাদের দেশের বৈদিক ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের বদনাম করার জন্য সংযোজন করেছে। কিন্তু আপনারা সেই সমস্ত পাপকেই গর্বভরে বুকে ধারণ করে আছেন। এমন কোনো মহান ঋষি বা দেবতাকে আপনারা ছাড়েননি, যাঁর উপর কাদা ছোড়েননি; তারপর চলেছেন ভগবৎপাদ পরমর্ষি ব্রহ্মা থেকে মহর্ষি জৈমিনি পর্যন্ত আর্শ-পরম্পরার ধারক ঋষি দয়ানন্দের উপর ব্যঙ্গ করতে! এই পাপই আমাদের দেশ ও বৈদিক সনাতন ধর্মকে ডুবিয়ে দেবে। কিন্তু মনে হয়, আপনারা এদের ডুবিয়েই ছাড়ার সংকল্প করেছেন। এমনও হতে পারে যে, আপনারাও কোনো বড় প্রলোভনে পড়ে এই পাপ করছেন। মহর্ষি বেদব্যাসের জন্মসংক্রান্ত এই পাপপূর্ণ মিথ্যা কাহিনি গীতা প্রেস, গোরখপুর থেকে প্রকাশিত মহাভারত, আদিপর্বের সম্ভবপর্বের ১০৪তম অধ্যায়ে পড়তে পারেন। আমরা ঋষিদের উপর আরোপিত কলঙ্ক মুছে ফেলতে চাই, কিন্তু আপনারা তো বিচিত্র প্রকৃতির মানুষ।
আর্য সমাজ তো তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এই বিষয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল। এই কারণেই তারা নিজেদের গুরু ঋষি দয়ানন্দের এই ব্যবস্থাকে বর্তমান সময়ের উপযোগী না জেনে নিয়োগের পরিবর্তে বিধবা-বিবাহের প্রথার সূচনা করেছিল।
কিন্তু নিয়োগের বিষয় নিয়ে ঋষি দয়ানন্দকে দিনরাত গালাগালি করা পৌরাণিক তথাকথিত সনাতনীরা আজও কামাখ্যা মন্দিরে রক্তের নদী বইয়ে দিচ্ছে। সোমযাগে এখনও নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে তাদের স্বর্গলাভ করাচ্ছে এবং নিজেরাও স্বর্গলাভের কামনা করছে। খাজুরাহো মন্দিরের অশ্লীল মূর্তিগুলি আজও কিছু পৌরাণিকের বিকৃত কামলীলার সাক্ষ্য বহন করছে। বিদেশি লোকেরা এই অশ্লীল মূর্তিগুলি দেখে সনাতন ধর্মের কী প্রশংসাই বা করে থাকবে? আজ এখানে যে বলিপ্রথা কিছুটা বন্ধ হয়েছে, তাও সরকারি আইনের ভয়ে এবং আর্য সমাজের প্রভাবে হয়েছে। তবুও কোথাও কোথাও কোনো ফল কেটে পশুবলির প্রথা পালন করতে দেখা যায়। এর অর্থ এই যে, তারা আজও মনে বলিদানের পাপকে ধারণ করে আছে, অথচ আর্য সমাজের নিয়োগপ্রথা নিয়ে সমালোচনা করে; যে প্রথা আর্য সমাজে না ঋষি দয়ানন্দের সময় ছিল, না পরবর্তীকালে কখনো প্রচলিত ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, কাঁচের প্রাসাদে বাস করেও তারা সুদৃঢ় ভবনে বসবাসকারীদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করছে।
আমি আর্য সমাজের শিরোমণি সভাসমূহ এবং 'সত্যার্থ প্রকাশ' গ্রন্থের প্রকাশকদের কাছে নিবেদন করছি যে, তাঁরা এই প্রবন্ধটি পড়ে সত্যার্থ প্রকাশ-এর চতুর্থ সমুল্লাসে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নিন। ঋষির বিশ্বাসঘাতক লেখকদের কপটতার কারণে ঋষিকে যেন বদনাম হতে না দেওয়া হয়। এই বিষয়ে তাঁরা যত দ্রুত পদক্ষেপ করবেন, ততই তা আর্য সমাজ ও মানবতার কল্যাণে হবে।
এখানে আমাদের ঋষি দয়ানন্দের সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাঁকে সত্যার্থ প্রকাশ-এর প্রথম সংস্করণ বাতিল করতে হয়েছিল। 'পঞ্চপঞ্চ নখা ভক্ষ্যাঃ...'-সম্পর্কিত প্রকরণটিও ঋষি দয়ানন্দের নজরে আসামাত্র তিনি তা বাদ দিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয়, ব্যাকরণ মহাভাষ্য-এ আজ পর্যন্ত সকল বিদ্বান এই পাপ বহন করে চলেছেন। ঋষি দয়ানন্দের বিশ্বস্ত পাচক অর্থের লোভে পড়ে তাঁকে তীব্র বিষ পর্যন্ত দিয়েছিল; তাহলে অর্থের লোভে অথবা অন্য কোনো প্রতিশোধস্পৃহা থেকে তাঁর লেখক পণ্ডিতেরা যদি গোপনে তাঁর গ্রন্থে মিথ্যা অথবা আপত্তিজনক বিষয় সংযোজন করে থাকে, তবে তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে?
ভীমসেন শর্মা তাঁর শিষ্য ছিলেন, কিন্তু পরে আর্য সমাজ ত্যাগ করে চলে যান। এমন অবস্থায় কি এ সম্ভাবনা নেই যে, তিনি ঋষিকৃত গ্রন্থগুলিতে কিছু কারসাজি করে থাকতে পারেন? তাঁর বেদভাষ্যের হিন্দি অনুবাদ বহু স্থানে ভুল। অতএব আর্য বিদ্বান এবং নিরপেক্ষ বিদ্বানদের পরম কর্তব্য এই যে, তাঁরা সম্মিলিতভাবে সমস্ত ঋষিকৃত গ্রন্থের উপর মন্থন করুন। ঋষি দয়ানন্দ নিজেই বলেছিলেন, যদি আমার কথার মধ্যে কিছু অসত্য বলে প্রতীয়মান হয়, তবে বিদ্বানদের উচিত তা সংশোধন করে নেওয়া। অন্যথায় 'বাবা বাক্যং প্রমাণম্' হয়ে আর্য সমাজও একটি সম্প্রদায়ে পরিণত হবে। অতএব সার্বদেশিক প্রভৃতি আর্য সভাগুলি জাগ্রত হোক; এমন যেন না হয় যে, তাদের নিদ্রাই আর্য সমাজকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলে।
একইভাবে আমি সৎ পৌরাণিক এবং কথিত সনাতনধর্মী বিদ্বানদের কাছেও নিবেদন করব যে, আজ সমগ্র বিশ্বে বেদ, আর্শ গ্রন্থসমূহ, দেবগণ, ঋষিগণ এবং অন্যান্য মহাপুরুষদের হেয় প্রতিপন্ন করার এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র চলছে। এর জন্য বিদেশ থেকে কিছু ভারতীয় বিশ্বাসঘাতককে বিপুল পরিমাণ অর্থও দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয়।
আমাদের এবং আপনাদের শাস্ত্র (তথাকথিত পুরাণসমূহ ব্যতীত), মহাপুরুষ এবং সংস্কৃতি প্রভৃতি—সবই এক। অতএব এগুলির রক্ষার জন্য শাস্ত্রসমূহে করা ভেজাল এবং মিথ্যা ভাষ্যসমূহ দূর অথবা সংশোধন করার কাজে আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কাজ করুন।
আমাদের 'বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞান' এই বিষয়ে এক মাইলফলক প্রমাণিত হবে। আপনারা নিজেদের সনাতন ধর্মকে অনাড়ি, ভণ্ড এবং স্বার্থপর লোকদের হাতের খেলনা হতে দেবেন না; অন্যথায় বেদ-বিরোধীদের ঘৃণ্য স্বপ্ন সফল হতে পারে এবং সনাতন ধর্মের পাশাপাশি সমগ্র ভারতেরও সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটতে পারে।
জয় মা বেদ ভারতী