ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

04 May, 2026

বালী বধ- ছল দ্বারা বা বল দ্বারা?

04 May 0

 বালী বধ :- ছল দ্বারা বা বল দ্বারা?

বালী বধ- ছল দ্বারা বা বল দ্বারা?

অনেকে বলেন যে শ্রীরাম কাপুরুষদের ন্যায় লুকিয়ে বালীর বধ করেছেন, যদি বীর হতেন তবে লুকিয়ে বধ কেন করতেন? বাস্তবে এইরূপ আক্ষেপকারী রামায়ণকে না তো গম্ভীরভাবে পড়েন এবং না পড়ে সেই শ্লোকগুলির উপর তর্ক দ্বারা বিচার করেন। বালী বধের সত্য জানার জন্য আমরা এই প্রসঙ্গে বিচার করি। সুগ্রীব শ্রীরামের সম্মুখে বালীর পরাক্রমের বর্ণনা করে বলেন-
এতদস্যাসমং বীর্যে ময়া রাম প্রকাশিতম্ ।
কথং তং বালিনং হন্তুং সমরে শক্ষ্যসে নৃপ ॥
(বা. রা. গী. প্রে. কিষ্কি. ১১/৬৮; Cri. ed. কিষ্কি. ১১/৪৮)
অর্থাৎ শ্রীরাম ! আমি বালির অনুপম পরাক্রমকে প্রকাশ করেছি। নরেশ্বর! আপনি সেই বালিকে সংগ্রামে কিভাবে মারতে পারবেন?
এই শ্লোক অন্য সংস্করণসমূহে এইরূপ প্রাপ্ত হয়-
এতৎ তস্যোত্তমং বীর্যং ময়া রাম প্রকাশিতম্।
কথং ত্বং সমরে হন্তুং শক্ষ্যসি তং হি বালিনম্ ॥
(বা. রা. পশ্চিমো. সং. কিষ্কি. ৮/৪৪)
এতৎ তস্য মহদ্বীর্যং তব সংকীর্তিতং ময়া।
কথমুৎসহসে হন্তুং সমরে তং দুরাসদম্ ॥
(বা. রা. বং. সং. কিষ্কি. ৯/৯০)
এখানে সুগ্রীব এই প্রশ্ন করেছেন যে আপনি যুদ্ধে তাকে কিভাবে মারবেন? যদি লুকিয়ে মারা-ই অভিষ্ট হত তবে সুগ্রীব যুদ্ধে মারার কথা কেন বলতেন? একই প্রকারে আগে সুগ্রীব শ্রীরামকে বলেন-
কিং তু তস্য বলাজ্ঞোऽহং দুর্ভাতুঃ বলশালিনঃ ।
অপ্রত্যক্ষং তু মে বীর্যং সমরে তব রাঘব ॥
(বা. রা. গী. প্রে. কিষ্কি. ১১/৭৯)
অর্থাৎ কিন্তু রাঘব! আমি সেই বলশালী দুষ্ট ভ্রাতার বলকে জানি এবং সমর ভূমিতে আপনার বল আমি প্রত্যক্ষ দেখিনি।
এখানে সুগ্রীব এই শঙ্কা করেন যে আমার ভাই খুব পরাক্রামী, বলিষ্ঠ কিন্তু আমি তো যুদ্ধে আপনার বল পরাক্রম দেখিইনি। এখন চিন্তা করুন যদি লুকিয়ে মারাই হত তবে শ্রীরামের বলের প্রত্যক্ষ করার কি প্রয়োজন ছিল? সুগ্রীবের এইরূপ বলায় শ্রীরাম তাকে উত্তর দেন।
যদি ন প্রত্যয়োऽস্মাসু বিক্রমে তব বানর।
প্রত্যয়ং সমরে শ্লাধ্যমহমুত্পাদয়ামি তে ॥
(বা. রা. গী. প্রে. কিষ্কি. ১১/৮৩)
অর্থাৎ বানর! যদি তোমার এই সময় পরাক্রমের বিষয়ে আমাদের উপর বিশ্বাস না হয় তবে যুদ্ধের সময় আমরা তোমাকে তার উত্তম বিশ্বাস করিয়ে দেব।
বঙ্গাল সংস্করণে এই শ্লোক এই প্রকার এসেছে-
যদি ন প্রত্যয়োऽস্মাসু বিদ্যতে তব বানর।
প্রত্যয়ং সমরশ্লাঘ্যমহমুত্পাদয়ামি তে ॥
(বং. সং. কিষ্কি. 11/2)
এখানে শ্রীরামও যুদ্ধে নিজের বলের পরিচয় দেওয়ার কথা বলেন। যদি লুকিয়ে মারাই হত তবে এমন কেন বলতেন? এর পশ্চাতে শ্রীরাম সুগ্রীবের সংশয়ের নাশ করার জন্য নিজের বল দেখান। যদি পিছন থেকে লুকিয়ে মারাই হত তবে না তো সুগ্রীবের মনে সংশয় হত এবং না তার নিবারণের জন্য শ্রীরামকে নিজের বলের প্রত্যক্ষ করানোর কোনো প্রয়োজন পড়ত।
পুনরায় আগে যখন শ্রীরাম নিজের বল দ্বারা সুগ্রীবের সংশয়কে নষ্ট করে দেন তখন সুগ্রীব বলেন-
সেন্দ্রানপি সুরান্ সর্বাংস্ত্বং বাণৈঃ পুরুষর্ষভ ।
সমর্থঃ সমরে হন্তুং কিং পুনর্বালিনং প্রভো ॥৮॥
যেন সপ্ত মহাসালা গিরির্ভূমিশ্চ দারিতাঃ।
বাণেনৈকেন কাকুত্স্থ স্থাতা তে কো রণাগ্রতঃ ॥৯॥
(বা. রা. গী. প্রে. কিষ্কি. 12/8,9; Cri. ed. কিষ্কি. 12/8,9)
অর্থাৎ পুরুষপ্রবর। আপনি তো আপনার বাণ দ্বারা সমরাঙ্গণে ইন্দ্রসহ সম্পূর্ণ দেবতাদেরও বধ করতে সক্ষম। তবে বালিকে মারা আপনার জন্য কোন বড় কথা? কাকুত্স্থ! যিনি সাতটি বড় বড় শালবৃক্ষ, পর্বত এবং পৃথিবীকেও এক বাণে বিদীর্ণ করেছেন, তাঁর সামনে যুদ্ধের প্রান্তে কে স্থির থাকতে পারে?
এখন অন্য সংস্করণ থেকে দেখুন-
যেন সপ্ত মহাতালাঃ ক্ষিতিঃ শৈলাশ্চ দারিতাঃ ।
বাণেনৈকেন কাকুত্স্থ কঃ স্থাতা তেऽগ্রতো রণে ॥
(বা. রা. পশ্চিমো. সং. কিষ্কি. 8/63)
সেন্দ্রানপি সুরান্ সর্বাংস্ত্বং বাণৈঃ পুরুষর্ষভ ।
সমর্থঃ সমরে হন্তুং কিং পুনর্বালিনং রণে ॥৩॥
অপি বালিসহস্রাণাং সহস্রং পার্থিবাত্মজ ।
সমর্থোऽসি রণে জেতুং কিমুতৈকমরিন্দম ॥৪॥
যেন সপ্ত মহাতালাঃ শৈলোऽয়ং দানবাস্থিতঃ ।
শরেণৈকেন নির্ভিন্নাঃ সমর্থস্তস্য কঃ পুমান্ ॥৫॥
অধ্য মে বিগতঃ শোকঃ প্রীতিরধ্য পরা মম।
অধ্য মন্যে বিনিহতং বালিনং যুদ্ধদুর্মদং ॥৬॥ (বা. রা. বং. সং. কিষ্কি. 12/3-6)
এখানেও সুগ্রীবের কথায় স্পষ্ট যে শ্রীরাম বালির সাথে যুদ্ধ করবেন এবং যুদ্ধে তার বধ করবেন। রামায়ণের বালি বধ প্রসঙ্গে চিন্তা করলে এই জানা যায় যে বালি এবং সুগ্রীবের যে প্রথম যুদ্ধ তা মিশ্রণ, কারণ দ্বিতীয় বার যখন সুগ্রীব বালিকে ললকার করেন তখন তারা তাকে রোধ করেন। কিন্তু প্রথম যুদ্ধের সময় তেমন কিছু বর্ণনা প্রাপ্ত হয় না। সেই প্রসঙ্গে তারা যে বালির দ্বারা সুগ্রীবের পূর্ব পরাজয়ের বর্ণনা করেছেন তা কোনো পূর্বকালের যুদ্ধের বিষয়, সেই দিনের বিষয় নয়। মহাভারত এবং নরসিংহ পুরাণেও একটি মাত্র যুদ্ধের আলোচনা আছে।

মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম সুগ্রীবকে বলেন-

অদ্য বালিসমুত্থং তে ভয়ং বৈরং চ বানর ॥ একেনাহং প্রমোক্ষ্যামি বাণমোক্ষণেন সংযুগে ॥ প্রত্যক্ষং সপ্ত তে সালা ময়া বাণেন দারিতাঃ ॥
তেনাবেহি বলেনাদ্য বালিনং নিহতং রণে । (বা. রা. গী. প্রে. কিষ্কি. 102 14/10,11,13,14)

অর্থাৎ বানররাজ! আজ আমি বালি থেকে উৎপন্ন তোমার ভয় এবং বৈর উভয়কেই যুদ্ধস্থলে একবার বাণ নিক্ষেপ করে দূর করব। তোমার চোখের সামনে আমি আমার একটিমাত্র বাণ দ্বারা সাতটি শাল বৃক্ষ বিদীর্ণ করেছিলাম, আমার সেই বল দ্বারা আজ যুদ্ধে তুমি বালিকে নিহত বলে জেনে নাও।

এখন পশ্চিমোত্তর সংস্করণে দেখুন-

অদ্য বালিসমুত্থং তে ভয়ং শোকং চ বানর। একেনাহং প্রমার্জিষ্যে বাণমোক্ষণেন সংযুগে ॥ (বা. রা. পশ্চিমো. সং. কিষ্কি. 9/34)

এখানেও শ্রীরাম স্পষ্টরূপে এই বলেন যে আমি বালির বধ যুদ্ধে করব। "বলেনাদ্য বালিনং নিহতং ময়া" থেকে স্পষ্ট যে শ্রীরাম বালির বধ বল দ্বারা করার জন্য বলেন না যে ছল দ্বারা। সব জায়গায় শ্রীরাম বল দ্বারা যুদ্ধে বালির বধ করার কথা বলে কি ছল দ্বারা বালি বধ করবেন? "রামো দ্বির্নাভিভাষতে” (বা. রা. অযোধ্যা. ১৮/৩০) যাঁর জন্য প্রয়ুক্ত ছিল, যাঁর জন্য দেবর্ষি নারদ বলেন "সত্যে ধর্ম ইবাপরঃ" (বা. রা. গী. প্রে. বাল. 1/19, Cri. ed. বাল. 1/18) কি সেই শ্রীরাম নিজের বাক্য থেকে এই প্রকার বিমুখ হতে পারেন? কদাপি নয়। মহর্ষি বাল্মীকি দ্বারা অনেক গুণে যুক্ত পুরুষের বিষয় জিজ্ঞাসা করলে দেবর্ষি নারদজি তাঁকে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামের বিষয় বলেন। এই প্রসঙ্গে মহর্ষি বাল্মীকের এই শ্লোক দ্রষ্টব্য - "কস্য বিভ্যতি দেবাশ্চ জাতরোষস্য সংযুগে।" (বা. রা. গী. প্রে., Cri. ed. 1/4,) যদি শ্রীরাম ছল দ্বারা বালির বধ করতেন তবে
______________________________________
102 এই শ্লোকগুলি Cri. ed. কিষ্কি. 14/9,12 এ প্রাপ্ত হয়, সেখানে কেবল 'তেনাবেহি' এর স্থানে 'ততো বেত্সি' পাঠ পাওয়া যায়। মহর্ষি বাল্মীকি এরূপ জিজ্ঞাসা করলে নারদজি শ্রীরামের নাম নেন না। সুগ্রীবের ললকারে তারা বালিকে সুগ্রীবের সঙ্গে যুদ্ধে না যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং শ্রীরামের বিষয়ে বলেন-

তৎ ক্ষমো ন বিরোধস্তে সহ তেন মহাত্মনা ॥২১॥ দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন রামেণ রণকর্মসু ॥ ২২ ॥ প্রসীদ পথম্ শৃণু জল্পিতং হি মে ন রোষমেবানুবিধাতুমর্হসি । ক্ষমো হি তে কোশলরাজসুনুনা ন বিগ্রহঃ শক্রসমানতেজসা ।॥ ৩০ ॥ (বা. রা. গী. প্রে. কিষ্কি. ১৫/২১,২২,৩০)

অর্থাৎ সেই মহাত্মা রামের সঙ্গে আপনার বিরোধ করা মোটেই উপযুক্ত নয়। তাঁদের জয় করা অত্যন্ত কঠিন। আমি আপনার মঙ্গলের কথা বলছি। আপনি তা মন দিয়ে শুনুন। কেবল রোষের অনুসরণ করবেন না। কোশলরাজপুত্র শ্রীরাম ইন্দ্রের সমান তেজস্বী। তাঁর সঙ্গে বৈর বাঁধা আপনার জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়।

এখন অন্যান্য সংস্করণের পাঠ দেখুন-

ততঃ ক্ষমো ন বিরোধঃ সহ তেন মহাত্মনা। দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন রামেণ রণকর্কশ ॥১৮॥ যৌবরাজ্যেন সুগ্রীব তূর্ণং তমভিষেচয় । বিগ্রহং মা কৃথা মৌর্য্যাদ্ভাত্রা রামেণ বা স্বয়ম্ ॥২০॥ প্রসীদ পথম্ শৃণু জল্পিতং হি মে ন রোষমেতং তু বিধাতুমর্হসি । ক্ষমো হি তে কোশলরাজসুনুনা ন বিগ্রহঃ শক্রসমো হি রাঘবঃ ॥২৪॥

(বা. রা. পশ্চিমো. সং. কিষ্কি. ১০/১৮,২০,২৪)

তৎ ক্ষমং ন বিরোদ্ধং তে সহ তেন মহাত্মনা। দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন বীরেণ রণকর্মণি ॥ সুগ্রীবং প্লবগশ্রেষ্ঠং যৌবরাজ্যেऽভিষেচয় । বিগ্রহং মা কৃথা বীর রামেণামিততেজসা ॥ (বা. রা. বং. সং. কিষ্কি. ১৪/১৯,২১) তৎক্ষমং ন বিরোধস্তে সহ তেন মহাত্মনা। দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন রামেণ রণকর্মসু ॥ (বা. রা. Cri. ed. কিষ্কি. ১৫/১৮)

এখানে সর্বথা স্পষ্ট যে শ্রীরাম বালির সাথে যুদ্ধ করতে আসছেন, তারা এই তত্ত্ব জানত। এই সবের অনুসীলন করলে এই বিদিত হয় যে বালি এবং সুগ্রীবের একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতে সময় শ্রীরাম দ্বারা লুকিয়ে বালির বধ করার প্রসঙ্গ মিশ্রণ। রামায়ণ থেকে শ্রীরাম ও বালির মধ্যে হওয়া যুদ্ধের সমস্ত শ্লোক বের করে দেওয়া হয়েছে। যা মিশ্রণ তা দূর করা যেতে পারে কিন্তু যেসব মূল কথা গ্রন্থ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে সেগুলি পুনরায় প্রাপ্ত করা সহজ নয়। যদিও বাল্মীকি রামায়ণ থেকে শ্রীরাম এবং বালির সংগ্রাম বিষয়ক শ্লোকগুলি বের করে দেওয়া হয়েছে তথাপি রামায়ণে এই যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রাপ্ত হয়। বালি বধের তারা সংবাদ প্রাপ্ত হলে সে নিজের পুত্র অঙ্গদকে নিয়ে পর্বতের গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। অঙ্গদকে চারিদিক থেকে বলশালী বীরেরা ঘিরে ছিল এবং শ্রীরামকে দেখে তারা লোকেরা পালিয়ে যায়। তারা তাদের পালাতে দেখে বলে তোমরা কেন পালাচ্ছ, তখন তারা (বানর) উত্তর দেয়-

জীবপুত্রে নিবর্তস্ব পুত্রং রক্ষস্ব চাঙ্গদম্। অন্তকো রামরূপেণ হত্বা নয়তি বালিনম্ ॥১১॥ ক্ষিপ্তান্ বৃক্ষান্ সমাবিধ্য বিপুলাশ্চ তথা 103 শিলাঃ। বালী বজ্রসমৈর্বাণৈর্বজ্রেণেব নিপাতিতঃ ॥১২॥ (বা. রা. গী. প্রে. কি. কা. সর্গ 19/11,12; Cri. ed. 19/11.12)

অর্থাৎ হে দেবী! এখনও তোমার পুত্র জীবিত আছে। তুমি ফিরে যাও এবং তোমার পুত্র অঙ্গদের রক্ষা কর। শ্রীরামরূপী কাল বালিকে মেরে নিয়ে যাচ্ছে। বালির নিক্ষিপ্ত বৃক্ষ এবং বড় বড় শিলাগুলিকে নিজের বজ্রতুল্য বাণ দ্বারা বিদীর্ণ করে শ্রীরাম বালিকে আঘাতে ফেলে দিয়েছেন।

বঙ্গাল সংস্করণে এই প্রকার প্রাপ্ত হয়-

জীবপুত্রি নিবর্তস্ব রক্ষ পুত্রং অন্তকো রামরূপেণ হত্বা হরতি ত্বমঙ্গদং ।

____________________

103 শিলাস্তথা Cri. ed.

বালিনং ক্ষিপন্ বৃক্ষান্ মহাকায়ান্ বিসৃজংশ্চ মহাশিলাঃ । বজ্রিবজ্রোপমৈর্বাণৈ রামেণ বিনিপাতিতঃ ॥ (বা. রা. বং. সং. কিষ্কি. 18/10.11)

এই শ্লোকগুলিতে শ্রীরাম এবং বালির যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রাপ্ত হয়।

দেবর্ষি নারদ মহর্ষি বাল্মীকিকে বলেন—

ততঃ সুগ্রীববচনাদ্ধত্বা বালিনমাহবে। সুগ্রীবমেব তদ্রাজ্যে রাঘবঃ প্রত্যপাদয়ত্ ॥ 104 (বা. রা. গী. প্রে. বাল. 1/69.70: Cri. ed. বাল. 1/55)

অর্থাৎ সুগ্রীবের কথানুসারে সংগ্রামে বালিকে হত্যা করে তার রাজ্যে রাম সুগ্রীবকেই প্রতিষ্ঠিত করেন।

অন্যান্য সংস্করণে এই প্রকার বলা হয়েছে—

ততঃ সুগ্রীববচসা হত্বা সুগ্রীবায়ৈব তদ্রাজ্যং রাঘবঃ বালিনমাহবে। প্রত্যপাদয়ত্ ॥

(বা. রা. পশ্চিমো. সং. বাল. 1/69)

ততঃ সুগ্রীববচনাদ্ধত্বা বালিনমাহবে। সুগ্রীবমেব তদ্রাজ্যং রাঘবঃ প্রত্যপাদয়ত্ ॥ 105

(বা. রা. বং. সং. বাল. 1/72)

হনুমান্ জি দেবী সীতা জির সাথে মিলিত হলে তখন তিনিও এই বলেন যে শ্রীরাম মহাবলী বালিকে যুদ্ধে বধ করেছিলেন—

ততো নিহত্য তরসা রামো বালিনমাহবে। সর্বর্ক্ষহরিসঙ্ঘানাং সুগ্রীবমকরোত্ পতিম্ ॥

(বা. রা. গী. প্রে. সুন্দর. 35/52; Cri. ed. সুন্দর. 33/48)


104 এই পাঠ Professor Peter Peterson দ্বারা প্রকাশিত রামায়ণ (বাল. ১/৬৬) तथा Augustus Guilelmus A Schlegel দ্বারা সম্পাদিত রামায়ণ (বাল. ১/৬৮) এ প্রাপ্ত হয়।

105 William Carey And Joshua Marshman দ্বারা 1806 খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রামায়ণ (বাল. ১/৮১,৮২) এও অতি অল্প ভেদ সহ এই পাঠ প্রাপ্ত হয়, কেবল সুগ্রীবমেব এর স্থানে সুগ্রীবায়েব পাঠ প্রাপ্ত হয়।

এখন অন্যান্য সংস্করণেও দেখুন—

ততো নিহত্য তরসা রামো বালিনমাহবে। সর্বক্ষহরিসৈন্যানাং সুগ্রীবম্ অকরোত্ পতিম্ ॥

(বা. রা. পশ্চিমো. সং. সুন্দর. 29/50)

তং রামো বাহুবীর্যেণ স্বরাজ্যে প্রত্যপাদয়ত্। কপিরাজং রণে হত্বা বালিনং সুমহাবলং ।॥

(বা. রা. বং. সং. সুন্দর. 32/20)

হনুমান্ জি রাবণের সম্মুখে শ্রীরামের গুণের বর্ণনা করতে করতে বলেন যে শ্রীরাম যুদ্ধে বালির বধ করেছিলেন—

ততস্তেন মৃধে হত্বা রাজপুত্রেণ বালিনম্ । সুগ্রীবঃ স্থাপিতো রাজ্যে হরিবৃক্ষাণাং গণেশ্বরঃ ॥

(বা. রা. গী. প্রে. সুন্দর. ৫১/১০, Cri. ed. ৪৯/১০)

বঙ্গাল সংস্করণে এই প্রকার বলা হয়েছে—

ততস্তেন রণে হত্বা বয়স্যং তব বালিনং । সুগ্রীবঃ স্থাপিতো রাজ্যে হর্যক্ষাণাং গণেশ্বরঃ ॥

(বা. রা. বং. সং. সুন্দর. ৪৭/১০)

যখন শ্রীরাম মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রমে অবস্থান করেন তখন তিনি অযোধ্যার সংবাদ জানার জন্য এবং নিজের আগমনের সংবাদ ভরত জি ও নিজের বন্ধু গুহকে দেওয়ার জন্য হনুমান্ জিকে প্রেরণ করেন। ভরত জিকে বনবাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি বলার জন্য বলেন। সেখানে ভগবান শ্রীরাম বলেন যে বালির বধ যুদ্ধে হয়েছিল—

হরণং চাপি বৈদেহ্যা রাবণেন বলীয়সা। সুগ্রীবেণ চ সংবাদং 106 বালিনশ্চ বধং রণে 107 |

(বা. রা. গী. প্রে. যুদ্ধ. 125/8; দা. সং. ১২৮/৭ পশ্চিমো. ১০৬/১০ Cri. ed. 113/8)


106 সুগ্রীব সমবায়ং চ পশ্চিমো. সং. সংসর্গং দা. সং.

107 রণে বধম্ - পশ্চিমো. সং.

হনুমান্ জি ভরত জিকে বালি বধের বিষয়ে বলেন—

রামঃ স্ববাহুবীর্যেণ স্বরাজ্যং প্রত্যপাদয়ত্। বালিনং সমরে হত্বা মহাকায়ং মহাবলম্ ॥

(বা. রা. গী. প্রে. যুদ্ধ. 126/38; Cri. ed. যুদ্ধ. 114/30)

অর্থাৎ শ্রীরাম নিজের বাহুর বীর্য দ্বারা যুদ্ধে মহাকায় মহাবল বালিকে বধ করে সুগ্রীবকে তার রাজ্য প্রদান করেন।

পশ্চিমোত্তর এবং বঙ্গাল পাঠে এই প্রকার বলা হয়েছে—

তং রামো বাহুবীর্যেণ স্বং রাজ্যং প্রত্যপাদয়ত্। বালিনং সমরে হত্বা মহাকায়ং মহাবলম্ ।।

(বা. রা. পশ্চিমো. সং. যুদ্ধ. 107/86; বং. সং. 110/42,43)

হরিবংশ পুরাণ থেকেও জানা যায় যে শ্রীরাম বালির বধ যুদ্ধে করেছিলেন—

সুগ্রীবস্য কৃতে যেন বানরেন্দ্রো মহাবলঃ । বালী বিনিহতো যুদ্ধে সুগ্রীবশ্চাভিষেচিতঃ ॥

(হরি. পু. হরি. প. 41/133)

ভগবান শ্রীরাম এবং বালির যুদ্ধ হয়েছিল, যাতে ভগবান শ্রীরাম বালির বধ করেছিলেন, এর সমর্থনে আমরা পর্যাপ্ত প্রমাণ দিয়েছি। বিদ্বান জন নিজেরা চিন্তা করুন আমাদের গ্রন্থগুলির সঙ্গে কিরূপ প্রকারের ছেদ-ছাড় হয়েছে।

লুকিয়ে বালী বধ রামায়ণের একটি প্রক্ষিপ্ত অংশ!
সমগ্র পৃথিবীর রাজা ইক্ষ্বাকুবংশীয় ভরত ও রাম তার প্রতিনিধি হিসেবে যেকোনো অধর্ম কারীকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখেন। রাম সহ নানান রাজারা অধর্মকারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য সারা পৃথিবী পর্যটন করছেন। যেহেতু বালী অধর্মকারী তাই তাকে শাস্তি দেওয়া রামের কর্তব্য!
Read More

30 April, 2026

বীর হনুমান্ আর্য রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন

30 April 0

 বীর হনুমান্ আর্য রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন

বীর হনুমান্ আর্য রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন
বিগত কিছু সহস্রাব্দে ভারতীয় সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অসম্ভব পৌরাণিক শৈলী, অন্ধবিশ্বাসী জন এবং ভারতীয়তা-বিরোধী লেখকেরা এতটাই বিকৃত এবং পরিবর্তিত করে দিয়েছে যে তাকে তার বাস্তব রূপে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে গেছে। বিরোধী লেখকেরা অধিকাংশকে পৌরাণিক এবং কল্পিত ঘোষণা করে তার অস্তিত্বকেই মুছে ফেলার প্রচেষ্টা করেছে। অন্ধবিশ্বাস এবং আস্থার নামে অযৌক্তিক, অসত্য এবং অসম্ভব সব কিছুই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে এবং যদি তার সত্য রূপ উপস্থাপিত করা হয় তবে সেই লোকদের আস্থা ছুঁই মুইয়ের মতো আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যায়। আমাদের আইনের এই আচরণও চিন্তনীয় যে অভিব্যক্তির সমান স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও তাদের ক্ষেত্রে আস্থা ভঙ্গের প্রकरण দ্রুত গ্রহণ করে নেওয়া হয়, অথচ অন্যদিকে মানবীয় প্রগতি এবং সত্যের যে বৌদ্ধিক আস্থা ভঙ্গ হচ্ছে, সেই পক্ষকে উপেক্ষা করা হয়। উপর থেকে রাজনীতি সেই বিকৃতিকে আরও বেশি শক্তি প্রদান করেছে।


একে ভারতীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির বাধ্যতা বলব নাকি বিদ্রূপ, তার চক্রব্যূহে ফেঁসে সব সত্য এবং বাস্তবতা অভিমন্যুর মতো বলিদান হয়ে যায়। সুযোগবাদী রাজনীতিতে সত্যকে গ্রহণ করার না তো ইচ্ছাশক্তি আছে এবং না সাহস আছে। গত কিছু সময় থেকে একটি প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মহাপুরুষদের বিরাট ব্যক্তিত্বকে সীমিত করার। আর্যদের অনার্য প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, ঋষি-বংশে উৎপন্ন আদিকবি বাল্মীকির মতো ব্রহ্মর্ষির সঙ্গে ডাকাত হওয়ার ঘটনাকে যুক্ত করে তাদের জীবনের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। গত দিনে, একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। একজন রাজনীতিবিদ রাজবংশে উৎপন্ন আর্য ক্ষত্রিয় মহাপুরুষ বীর হনুমান্‌কে দলিত ঘোষণা করে দিয়েছেন। অন্ধ আস্থাবাদী লোকেরা তাদের ঐতিহাসিক মহাপুরুষদের আরও বেশি অপমান করেছে। বংশনাম এবং প্রতীকার্থ না বুঝে তাদের শ্রদ্ধেয় মহাপুরুষদের মধ্যে কাউকে বানর, কাউকে হাতি, কাউকে বরাহ, কাউকে মাছ, কাউকে অশ্ব পশু বানিয়ে দিয়েছে। ব্যসনী এবং স্বার্থপর, কথিত অনুসারীরা তাদের ব্যসনের পূরণের জন্য তাদের শ্রদ্ধেয় মহাপুরুষদেরই মাংস, মদিরা, ভাঙ, আফিম, গাঁজা ইত্যাদির সেবনকারী এবং অনাচারের প্রবর্তক বানিয়ে দিয়েছে। এভাবে যেখানে আমরা আমাদের মহাপুরুষদের কলঙ্কিত করছি, সেখানে আমাদের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকেও দূষিত করছি। এমন ধারণা থেকে বিশ্বের বৌদ্ধিক জগতে আমরা নিজেদের উপহাসের পাত্র করে তুলছি। একটি বালকও জানে যে কোনো পশু মানুষের সঙ্গে না তো ভাষাগত সংলাপ করতে পারে এবং না বৌদ্ধিক আচরণ। তবুও আমরা আমাদের অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে সত্যকে গ্রহণ করি না।
মহর্ষি দयानন্দ সরস্বতী উক্ত অন্ধবিশ্বাস এবং বিকৃতির বিরুদ্ধে সত্যকে প্রকাশ করার এবং অসত্যের পরিত্যাগ করানোর সাহস করেছিলেন, তখন তাকে বলিদান হতে হয়েছিল এবং তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত 'আর্যসমাজ' তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলে উল্টো তাকে রূঢ়িবাদী সমাজ এবং রাজনীতির সঙ্গে সংগ্রাম সহ্য করতে হচ্ছে। ভুল ধারণা ভারতীয় সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইতিহাস, সমাজ এবং দেশের স্বার্থে নয়। বিদেশীদের দ্বারা কল্পিত আর্য-অনার্য, আর্য-দ্রাবিড়, উত্তর-দক্ষিণ ইত্যাদি ধারণাগুলি ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা এবং সমরসতাকে নষ্ট করে ভারতীয় সমাজ এবং দেশের ক্ষতি করেছে। কমপক্ষে, এখন তো আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হওয়া উচিত।


এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য বীর শিরোমণি, শ্রীরাম-ভক্ত হনুমান্ এবং তাদের বানর-সমাজের বাস্তবতাকে উপস্থাপন করা। তার তথ্যের জন্য আমাদের কাছে রামায়ণ-কালের সর্বাধিক নিকট, প্রামাণিক এবং প্রাচীন গ্রন্থ ঋষি বাল্মীকি রচিত 'রামায়ণ' আছে। যদিও তাতেও সময়ে সময়ে প্রক্ষিপ্ত সংযোজন হয়েছে, যার জ্ঞান আমাদের তাতে প্রাপ্ত পরস্পর বিরোধী এবং অসম্ভব বক্তব্য থেকে হয়ে যায়, পুনরপি প্রাপ্ত মূল বক্তব্য বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দেয়। আসুন, তাদের ভিত্তিতে এবং কিছু অন্যান্য পরবর্তী ঐতিহাসিক বিবরণসমূহ কে সন্দর্ভে প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর চিন্তন করুন।

হনুমান অর্থ কি?

হনুমানের বংশ এবং পরিচয়-

হনুমান্ এবং তার বানর-সমাজ বানর ছিল না। তারা মানব দেহধারী ছিল এবং তাদের আকৃতি, রূপ-রং, শরীর মানুষের সদৃশ ছিল। 'বানর' তাদের বংশের নাম ছিল। ভারতীয়দের বংশাবলীতে আজও ডজনেরও বেশি এমন বংশ নাম, গোত্র-নাম এবং প্রতীক-নাম পাওয়া যায় যা পশু-পাখির নামও বটে, কিন্তু তারা মানুষ। বানর-সমাজ আর্যদের সমাজের অন্তর্গত ছিল। তার অধিকাংশ সংস্কৃতি সভ্যতা, শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবস্থা, পরম্পরা, বংশাবলি ইত্যাদি আর্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বানর-সমাজে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।


সংস্কৃতের ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে যে 'বানর' বংশের মূল উৎপত্তি ঋষি পুলহ এবং তার স্ত্রী হরিভদ্রা থেকে হয়েছিল। মাতার নামের ভিত্তিতে বানর বংশকে 'হরি বংশ' এবং 'হরি গণ'ও বলা হয়। পরে বানর বংশের বহু উপবংশীয় শাখা হয়ে যায় যা সমগ্র ভারতে বিস্তৃত ছিল। একমাত্র কিষ্কিন্ধা রাজ্যে এদের এগারোটি শাখার বানর জন বাস করত। তারা ছিল বানর, ঋক্ষ, সিংহ, ব্যাঘ্র, শরভ, দ্বীপী, নীল, শল্যক, মার্জার, লোহাস, মায়াব। বন অঞ্চলে বসবাস করা এবং বনজাত পদার্থ দিয়ে নিজের জীবিকা নির্বাহ করার কারণে এদের 'বানর' বলা হয়। বানরের পর্যায় নাম 'বনৌকস্'ও রামায়ণে ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ হলো-'বনে বসবাসকারী জন', যেমন আর্যদের মধ্যে তৃতীয় আশ্রম গ্রহণ করে বনে বসবাসকারীকে 'বানপ্রস্থ' এবং 'বনস্থ' বলা হয়। কিছু অন্যান্য নামের দ্বারা এই প্রসঙ্গ বোঝা যেতে পারে, যেমন-পাহাড়ের অঞ্চলে বসবাসকারীদের 'পাহাড়ি', সরস্বতী নদীর অঞ্চলে বসবাসকারীদের 'সারস্বত', পাঁচ নদীর প্রদেশ পাঞ্জাবের অধিবাসীদের 'পাঞ্জাবি' বলা হয়। সিন্ধ, সিন্ধী (হিন্দ, হিন্দি) নামও সিন্ধু নদীর অঞ্চলে বসবাসের ভিত্তিতে প্রচলিত হয়েছে।

হনুমানের পিতার নাম কেশরী ছিল। তিনি সুমেরু পর্বতের কোনো অংশের রাজা ছিলেন। তিনি সুগ্রীবের নিমন্ত্রণে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শ্রীরামের সাহায্যের জন্য এক হাজার যোদ্ধা নিয়ে এসেছিলেন এবং যুদ্ধ করেছিলেন। হনুমানের মাতার নাম অঞ্জনা ছিল। তিনি বানর-বংশের রাজা কুঞ্জরের কন্যা ছিলেন। হনুমানের পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের উল্লেখ রামায়ণে পাওয়া যায় না, কিন্তু একটি স্থানে হনুমান্‌কে রাজা কেশরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র বলা হয়েছে (জ্যেষ্ঠঃ কেশরিণঃ পুত্রঃ... হনূমানিতি, ৬.৩৮.১০)। এর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হনুমানের অন্যান্য ভাইও ছিল। পুরাণোক্ত বংশাবলীতে প্রাপ্ত বিবরণ থেকে জানা যায় যে হনুমানের এই চার ভাই ছিল- শ্রুতিমান্, কেতুমান্, মতিমান্ এবং ধৃতিমান্। হনুমানের নিজের কোনো পরিবার ছিল না কারণ তিনি আজীবন ব্রহ্মচারী ছিলেন। সংস্কৃত সাহিত্যে তাকে 'ব্রহ্মচারী', 'ঊর্ধ্বরেতা', 'জিতেন্দ্রিয়' বলে প্রশংসা করা হয়েছে। হনুমান্‌ বহু গুণে সমৃদ্ধ ছিলেন। বুদ্ধিমত্তা, নীতিমত্তা, শক্তি-সম্পন্নতা, বীরতা, নির্ভীকতা ইত্যাদি গুণের একত্র হওয়া কঠিন। বন্ধুত্বের কারণে তিনি সুগ্রীবের সচিব হয়েছিলেন এবং শ্রদ্ধার কারণে শ্রীরামের সেবক এবং রাজদূত হয়েছিলেন। সুগ্রীব এবং শ্রীরামের সত্যনিষ্ঠ সহযোগী এবং সংকটমোচক হয়েও হনুমান্‌ বিনয়ের প্রতিমূর্তি ছিলেন। ঋষি বাল্মীকি লিখেছেন-

শৌর্য দক্ষ্যং বলং ধৈর্যং প্রাজ্ঞতা নযসাধনম্। 

বিক্রমশ্চ প্রভাবশ্চ হনূমতি কৃতালয়াঃ।। (উত্তরকাণ্ড ৩৫.৩)


'শৌর্য, চাতুর্য, শক্তি, ধৈর্য, পাণ্ডিত্য, নীতিজ্ঞান, পরাক্রম এবং প্রভাবশীলতা, হনুমান্ এই মহান গুণগুলির ভাণ্ডার ছিলেন।' হনুমানের হাব-ভাব, আচরণ, ভাষা দেখে লক্ষ্মণ শ্রীরামের সামনে বিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন- নানৃতং বক্ষ্যতে বীরো হনূমান্ মারুতাত্মজঃ। (কিষ্কিন্ধা ৪.৩২) 'শ্রী রাম! আমি বিশ্বাসের সঙ্গে বলছি যে পবনপুত্র বীর হনুমান্ কখনও মিথ্যা বলতে পারে না।' হনুমান্ 'শুভমতি' ছিলেন (কিষ্কিন্ধা, ৪.৩৫), 'মহানুভাব' ছিলেন (কিষ্কিন্ধা ২.২৯), অপরাজেয় যোদ্ধা ক্ষত্রিয় ছিলেন। সুগ্রীব হনুমান্‌কে 'মনুষ্য' বলেছেন (মনুষ্যেণ বিজ্ঞেয়াঃ, কিষ্কিন্ধা ২.২২), আমাদের মতে এত মানবীয় গুণে সমৃদ্ধ ব্যক্তি মহামানব হয়।

রাষ্ট্র এবং রাজধানী

বানর সম্প্রদায়ের প্রধান রাষ্ট্র কিষ্কিন্ধার আশেপাশের অঞ্চল ছিল। কিষ্কিন্ধাই তার রাজধানীর নাম ছিল। বর্তমান কর্ণাটক প্রদেশে, জেলা 'বেল্লারি'র স্থান 'হাম্পি'র নিকটে, তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত 'অনাগোন্দি' গ্রামকে প্রাচীন কিষ্কিন্ধা মনে করা হয়। এটি একটি সমৃদ্ধ, উন্নত, ভব্য নগরী ছিল যা পাহাড়গুলির মধ্যে অবস্থিত ছিল। এর শোভা দেখলেই মনে হয়। এর মধ্যভাগে উদ্যান ছিল, ধনীদের সুন্দর ভবন ছিল, রাজ-পরিবারের লোকদের ভব্য প্রাসাদ ছিল। সুগ্রীবের প্রাসাদ সাত ড্যোঢ়ি পার ছিল, যার দ্বারে অস্ত্রধারী বানর জন প্রহরী ছিল। নগরী চারিদিক থেকে যন্ত্র দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। পাঠক চিন্তা করুন যে কি এমন নগরী বানরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং শাসিত হতে পারে?


এখানে পৈতৃক পরম্পরায় প্রতিষ্ঠিত বানরবংশীয়দের রাজ্য ছিল। প্রথমে এখানকার রাজা ঋক্ষরাজ ছিল। তার দেহান্তের পরে তার বড় পুত্র বালী রাজা হয়। শ্রীরামের দ্বারা বালীর বধ করা হওয়ার পরে সুগ্রীব রাজা হয়। এর অতিরিক্ত সমগ্র ভারতে মধ্য-মধ্য সময়ে বানর সম্প্রদায়ের মানুষের ছোট-ছোট বহু রাজ্য ছিল। সুগ্রীব দ্বারা ডাকার উপর রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, শ্রীরামের পক্ষে দুই ডজনের বেশি বানর রাজা উপস্থিত হয়েছিল। রামায়ণে তাদের বিবরণ পাওয়া যায়।


বেদ-বেদাঙ্গ শাস্ত্রের অধ্যয়ন-অধ্যাপন

বাল্মীকীয় রামায়ণে বহু এমন প্রমাণ পাওয়া যায় যেগুলি থেকে এই তথ্য পাওয়া যায় যে বানর সম্প্রদায়ে, আশ্রম পদ্ধতিতে, বেদ বেদাঙ্গ শাস্ত্রের অধ্যয়ন করানো হতো। পুরুষদের মতো নারীরাও শাস্ত্রের অধ্যয়ন করত। এই কারণেই রামায়ণের সব নারী এবং পুরুষ চরিত্র উচ্চ শিক্ষিত। হনুমান্‌কে তো বানর সম্প্রদায়ের সর্বশাস্ত্রজ্ঞদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিদ্বান বলা হয়েছে (বীর বানরলোকস্য সর্বশাস্ত্রবিদাং বর, কিষ্কিন্ধা. ৬৬.২)। তার জন্য কবির দ্বারা ব্যবহৃত বিশেষণ তাকে উচ্চকোটির গম্ভীর বিদ্বান প্রমাণ করে 'বাক্যকোভিদ, বুদ্ধিবিজ্ঞানসম্পন্ন, বাক্যকুশল, বাক্যবিশারদ, সুমহাপ্রাজ্ঞ, নযপণ্ডিত ইত্যাদি।' সীতার অনুসন্ধান করতে করতে, ঋষ্যমূক পর্বতের দিকে আসতে থাকা শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণকে দেখে ভীত সুগ্রীব হনুমান্‌কে তাদের পরিচয় জানার জন্য তাদের কাছে পাঠায়। হনুমান্ বানরের বেশ ত্যাগ করে ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে তাদের কাছে যায়। সেখানে হনুমান যে শুদ্ধ সংস্কৃত ভাষা এবং পরিশীলিত শৈলীতে শ্রীরামের সঙ্গে কথোপকথন করে, তা শুনে লক্ষ্মণ এই শব্দে হনুমানের বিদ্বত্তার প্রশংসা করে-
নানৃগ্বেদবিনীতস্য নাযজুর্বেদধারিণঃ । 

নাসামবেদবিদুষঃ শক্যমেবং বিভাষিতুম্।। 

নূনং ব্যাকরণং কৃত্স্নমনেন বহুধাশ্রুতম্। 

বহু ব্যাহরতানেন ন কিঞ্চিদপশব্দিতম্।। (কিষ্কিন্ধা. ৩.২৮.২৯)
অর্থাৎ 'যে বিধি অনুসারে ঋগ্বেদের অধ্যয়ন করেনি, যে যজুর্বেদের অধ্যয়ন-মনন করেনি, যে সামবেদের বিদ্বান নয়, সে এই প্রকার শুদ্ধ ভাষা এবং উত্তম শৈলীতে কথোপকথন করতে পারে না। নিশ্চয়ই এরা সংস্কৃতের ব্যাকরণ বহুবার অধ্যয়ন করেছে, কারণ অনেক কথোপকথন করার পরও এরা একটি শব্দও অশুদ্ধ বলেনি।।' এমনই প্রশংসামূলক বর্ণনা অন্যত্র বহু স্থানে এসেছে। সেখানে হনুমান্‌কে ব্যাকরণ এবং ছন্দ-শাস্ত্রের বিদ্বান বর্ণনা করা হয়েছে।


হনুমান্ সাহিত্যিক এবং কথ্য সংস্কৃত, উভয়েরই জ্ঞানী ছিলেন। সীতার সন্ধান পাওয়ার পরে তিনি চিন্তা করেন যে সীতার সঙ্গে আমাকে সেই ভাষায় কথা বলা উচিত, যাতে আমার উপর বিশ্বাস করা যায়-
বাচং চোদাহরিষ্যামি মানুষীমিহ সংস্কৃতাম্।। যদি বাচং প্রদাস্যামি দ্বিজাতিরিব সংস্কৃতাম্। রাবণং মন্যমানা মাং সীতা ভীতা ভবিষ্যতি।। (সুন্দর. ৩০.১৭,১৮) অর্থাৎ- 'আমি সীতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে বলা হয় এমন সংস্কৃত ভাষায় কথা বলব, কারণ যদি আমি দ্বিজ শ্রেণীর দ্বারা বলা হয় এমন সাহিত্যিক সংস্কৃতে কথা বলি তবে সীতা আমাকে রাবণ মনে করে ভয় পাবে।'


এই প্রসঙ্গ থেকে বহু তথ্য স্পষ্ট হয়- (১) হনুমান বহু ভাষা জানতেন। (২) রাবণ সাহিত্যিক সংস্কৃত ব্যবহার করত। (৩) রামায়ণ কালে কথ্য ভাষা সংস্কৃত ছিল। (৪) বানর সম্প্রদায়ের জনদের মধ্যে সংস্কৃত পড়া এবং বলা হতো। সংস্কৃত আর্য সম্প্রদায়ের ভাষা ছিল।

এইভাবে হনুমান্ শস্ত্র এবং শাস্ত্র উভয়েই প্রবীণ বীর বিদ্বান ছিল।

কিষ্কিন্ধার রাজা বালীও 'মহাবলী' এবং 'মহাপ্রাজ্ঞ' ছিল। সেও বেদ শাস্ত্রের অধ্যয়ন করেছিল। একদিন নির্জনে ঘুরতে থাকা বালীকে দেখে রাবণ ছলপূর্বক তার উপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল। বালীও তার ছল বুঝে ফেলেছিল। সেও বিভ্রান্ত করার জন্য মন্ত্র-জপের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বেদমন্ত্রের উচ্চারণ করতে লাগল। কাছে আসতেই বালী রাবণকে ঝাঁপিয়ে কাঁখে চেপে ধরল। বাল্মীকি লিখেছেন-
"জপन् বৈ নৈগমান্ মন্ত্রান্ তস্থৌ पर्वতরাট্ ইব" (উত্তর. ২৪.১৮)
অর্থাৎ- "বালী বেদের মন্ত্র জপ করতে করতে শান্ত এবং পর্বতের ন্যায় নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিল।"

সুগ্রীবও নিশ্চিতভাবে শাস্ত্রের অধ্যয়ন করেছিল। তার ভূগোলশাস্ত্রের ব্যাপক এবং সূক্ষ্ম জ্ঞান ছিল। সীতার অনুসন্ধানের জন্য প্রেরিত বানরদের সে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছিল। বাল্মীকি সুগ্রীবের বর্ণনা 'মহাবীর্য', 'ধৃতিমান্', 'মতিমান্', 'মহাবল পরাক্রমী' ইত্যাদি গুণ দিয়ে করেছেন (অরণ্য. ৭২.১৩,১৪)। রানি তারা-এর পিতা সুশেণ সিদ্ধহস্ত বৈদ্য ছিল। যিনি যুদ্ধে আহত শ্রীরাম, লক্ষ্মণ এবং অন্যান্য বানর বীরদের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। নল এবং নীলের অভিয়ান্ত্রিকী (ইঞ্জিনিয়ারিং) বিদ্যার বিশেষজ্ঞতার বিষয়ে আমরা দীর্ঘকাল ধরে পড়ে-শুনে আসছি, যারা শ্রীরামের বিশাল সেনার জন্য পথ এবং সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণের আশ্চর্য কাজ করেছিল। এইভাবে জাম্ববান্, শরভ, ম্যেন্দ, দ্বিবিদ প্রভৃতি ইউথপতিদের শাস্ত্রজ্ঞতা এবং বক্তৃতা-কৌশলের বর্ণনাও পাওয়া যায়। এরা সকলেই ইউথপতি রাজা ছিল এবং সু-শিক্ষিত ছিল।

বালীর স্ত্রী তারা এবং সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাও বেদবিদুষী এবং শাস্ত্রজ্ঞা ছিল। তারা বেদমন্ত্রবিদ্ ছিল। সুগ্রীবের ললকারে যুদ্ধে যাওয়ার আগে সে স্বামী বালীর জন্য 'স্বস্তিবাচন' বেদমন্ত্র দ্বারা মঙ্গলকামনা করেছিল। যদি বালী দূরদর্শিনী তারা-এর পরামর্শ মানত তবে তার মৃত্যু হতো না (তतः স্বস্ত্যয়নং কৃত্বা মন্ত্রবিদ্ বিজয়ৈষিণী, কিষ্কিন্ধা. ১৬.১২)। সে বালী-বধের পর শ্রীরামের সঙ্গে সংলাপের সময় বেদের নীতির উল্লেখ করে। বাল্মীকি তাকে 'পণ্ডিতা', 'সর্বজ্ঞা', 'রাজনীতির সূক্ষ্ম বিষয়ের বিশ্লেষিকা', 'ভবিষ্যতের আভাস জানা' ইত্যাদি লিখে তার বিদ্বত্তার প্রশংসা করেছেন। রুমা জ্যোতিষের বিদুষী ছিল।

অন্যান্য বিদ্যা এবং কলার প্রশিক্ষণও কিষ্কিন্ধায় দেওয়া হতো। সঙ্গীত-বিদ্যা, ভবন নির্মাণ-বিদ্যা, বস্ত্র-নির্মাণ, অলংকার নির্মাণ, অস্ত্র-শস্ত্র-নির্মাণ, চিত্রকলা, কশিদাকারি ইত্যাদির বর্ণনা রামায়ণে পাওয়া যায়।

আর্য-সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং পরম্পরা


বানরজনদের মধ্যে যখন ঋষিদের দ্বারা রচিত বৈদিক শাস্ত্রের অধ্যয়ন-অধ্যাপন হতো, তখন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা-পদ্ধতি এবং পরম্পরাও বৈদিক ছিল। এই বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায় যে বানররা যজ্ঞোপবীত ধারণ করত। শিক্ষা আরম্ভের আগে উপনয়ন সংস্কারের আয়োজনের মাধ্যমে যজ্ঞোপবীত প্রদান করা হয়। বর্ণনা পাওয়া যায় যে বালীর অন্ত্যেষ্টি সংস্কারের সময়, চিতায় অগ্নি দেওয়ার পরে পুত্র অঙ্গদ যজ্ঞোপবীত ডান কাঁধের দিকে ধারণ করে চিতার প্রদক্ষিণ করেছিল (ততোऽগ্নিং বিধিবদ্ দত্ত্বা সো অপসব্যং চকার হ, কিষ্কিন্ধা. ২৬.৫০) 'অপসব্য' যজ্ঞোপবীত ধারণ করার সেই পদ্ধতি যাতে যজ্ঞোপবীত ডান কাঁধে রেখে তাকে বাম হাতের নিচের অংশে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পৌরাণিক ব্যাখ্যাকাররা এই তথ্যের ব্যাখ্যায় অব্যাখ্যাত রেখে দিয়েছে। এটি তাদের পক্ষপাতী দুরাগ্রহ।

বৈদিক শিক্ষা পদ্ধতি ছিল, তাই তা বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার অন্তর্গত ছিল। হনুমানের স্পষ্ট উদাহরণ যে সে ব্রহ্মচারী থেকে বেদ শাস্ত্রের অধ্যয়ন করেছিল। সে আজীবন ব্রহ্মচারীই ছিল। এই প্রমাণও পাওয়া যায় যে বানররা অন্যান্য আশ্রমও ধারণ করত। সীতার অনুসন্ধানে নিরাশ হওয়া হনুমান প্রতিজ্ঞা করে যে যদি সীতাকে না খুঁজে পায় তবে আমি কিষ্কিন্ধায় ফিরব না, বনপ্রস্থ আশ্রম ধারণ করব (বানপ্রস্থো ভবিষ্যামি হি-অদৃষ্ট্বা জনকাত্মজাম্, সুন্দর. ১৩.৪০)। কিষ্কিন্ধায় বিদ্বান ব্রাহ্মণও ছিল, যারা শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী বালীর অন্ত্যেষ্টি সংস্কার এবং সুগ্রীবের রাজতিলক সংস্কার সম্পন্ন করেছিল।

বানর জন সন্ধ্যা-উপাসনা, যজ্ঞের অনুষ্ঠানও করত। বেদমন্ত্রের দ্বারা সন্ধ্যা করার বালীর একটি দীর্ঘ প্রসঙ্গ রামায়ণে বর্ণিত আছে (বালিনং সন্ধ্যোপাসনতৎপরম্, উত্তর. ৩৪.১২,২৭,২৯)। তারা শ্রীরামের সামনে তার যজ্ঞাধিকারের বিষয়ে সংলাপ করে (কিষ্কিন্ধা. ২৪.৩৮)। বানরদের মধ্যে বিবাহ বিধির মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী হওয়ার পরম্পরা ছিল। অসত্য ভাষণকে পাপ মনে করা হতো এবং সত্যকে পুণ্য, অতএব তারা প্রতিজ্ঞা করার সময় সত্যের শপথ নিত (সত্যেন শপাম্যহম্, কিষ্কিন্ধা. ৮.২৭)। তারা বৈদিক বিধি অনুসারে নামোচ্চারণপূর্বক বড়দের চরণস্পর্শ করে প্রণাম করত (কিষ্কিন্ধা. ২৩.২৪)।

বানর বিশুদ্ধ শাকাহারী ছিল, মাংসাহার করত না। কন্দ-মূল, ফল-ফুল, অন্ন ইত্যাদি পদার্থের আহার করত (ফলমূলাশনং নিত্যং বানরং বনগোচরম্, কিষ্কিন্ধা ১৭.২৫)

সংস্কার এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান বৈদিক শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হতো। তাদের অনুষ্ঠানের জন্য বানর সম্প্রদায়ে প্রশিক্ষিত বিদ্বান ব্রাহ্মণ ছিল। সুগ্রীবের রাজ্যাভিষেক মহর্ষিদের দ্বারা নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী বেদমন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছিল। এই উপলক্ষে যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছিল-
"মন্ত্রপূতেন হবিষা হুত্বা মন্ত্রবিদো জনাঃ।।" "শাস্ত্রদৃষ্টেন বিধিনা মহর্ষি বিধিতেন চ।" "অভ্যষিঞ্চত সুগ্রীবম্।" (কিষ্কিন্ধা. ২৬.৩০,৩৪,৩৬)

এইভাবে বালীর অন্ত্যেষ্টি সংস্কারও শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী রাজাদের মর্যাদার অনুরূপ সম্পন্ন করা হয়েছিল (কিষ্কিন্ধা. ২৫ সর্গ)। এই প্রসঙ্গে বালীকে স্পষ্টভাবে 'আর্য রাজা' বলা হয়েছে ("আর্যস্য ক্রিয়তাম্", "রাজ্ঞাম্... তাদৃশৈঃ কুর্বন্তু", কিষ্কিন্ধা. ২৫.৩০,৩২)।

বানর-সমাজে 'আর্য' সম্বোধন


আর্য সংস্কৃতির শিষ্টাচার অনুসারে, যেভাবে সীতা প্রভৃতি নারীরা তাদের স্বামী শ্রীরাম প্রভৃতিকে 'আর্যপুত্র' বলে সম্বোধন করত, সেইভাবেই বানর-বর্গের রানি তারা তার স্বামী বালীকে 'আর্যপুত্র' বলে সম্বোধন করত (কিষ্কিন্ধা. ১৯.২৭, ২০.১৩)। সুগ্রীবও বালীকে 'আর্য' প্রয়োগে বর্ণনা করে (আর্যস্য, কিষ্কিন্ধা. ২৪.২৯)। বানরদের জন্য 'অনার্য' প্রয়োগ অপশব্দ ছিল। সীতাকে অনুসন্ধানে বিলম্ব করার কারণে লক্ষ্মণ, সুগ্রীবকে 'অনার্য' এবং 'কৃতঘ্ন' বলে তিরস্কার করে (অনার্যস্ত্বং কৃতঘ্নশ্চ, কিষ্কিন্ধা. ৩৪.১৩)। তবে হনুমান প্রভৃতিকে অনার্য কীভাবে বলা যেতে পারে?

উপরোক্ত ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে হনুমান এবং তার বানর-সমাজ আর্য সংস্কৃতির অঙ্গ ছিল। যেসব লেখক তাদের অনার্য বলেছেন তারা বানর-সমাজের সঙ্গে অন্যায় করেছেন এবং ভারতীয় ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন। যারা শ্রদ্ধা-ভক্তির নামে তাদের বানর মনে করে, তারা তাদের শ্রদ্ধেয় মহাপুরুষের গুরুতর অপমান করে। মহামানবকে পশুরূপ দেওয়া তাকে কলঙ্কিত করা। সত্য তথ্যকে গ্রহণ করে তাদের এই কাজ করা ত্যাগ করা উচিত।

ডঃ সুরেন্দ্র কুমার


Read More

28 April, 2026

দর্শন ও বৈদিক বিজ্ঞান

28 April 0

দর্শন ও বৈদিক বিজ্ঞান

যখন নিউটন আপেলের ফলকে গাছ থেকে নিচে পড়তে দেখেছিলেন, তখন তাঁর মনে এই উহা ও তর্কের উদ্ভব হয়েছিল যে আপেল নিচেই কেন পড়ল? তাঁর এই চিন্তা থেকেই মাধ্যাকর্ষণের আবিষ্কার এবং এ-সম্পর্কিত পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয়। আপেল পড়তে অনেকেই দেখে থাকে, তখনও দেখত, কিন্তু এই চিন্তা নিউটনের মস্তিষ্কেই এসেছিল, কারণ তিনি তর্ক ও উহা-সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। দর্শনকে ইংরেজি ভাষায় Philosophy বলা হয়, যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Chambers Dictionary-তে লেখা হয়েছে—
"In pursuit of wisdom and knowledge, investigation contemplation of the nature of being knowledge of the causes and laws of all things, the principles underlying any sphere of knowledge, reasoning."

Oxford Advanced Learners dictionary-তে এটিকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে—
"Search for knowledge and understanding of the nature and meaning of the universe and human life."

অর্থাৎ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান বিভিন্ন বস্তু, তাদের কারণ এবং কার্যকরী নিয়ম ইত্যাদি বিষয়কে তর্ক ও উহা-র ভিত্তিতে জানার প্রচেষ্টাকেই দর্শন বলা হয়।

এতে স্পষ্ট হয় যে বিজ্ঞান ও দর্শন উভয়েরই উদ্দেশ্য ব্রহ্মাণ্ডকে জানার চেষ্টা করা। উভয় প্রক্রিয়ায় কিছু পার্থক্য অবশ্যই আছে, কিন্তু উভয়ের উদ্দেশ্য এক। বিজ্ঞানের ক্ষেত্র মানব প্রযুক্তির সামর্থ্য পর্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং দর্শনের ক্ষেত্র চিন্তা, মনন ও উহা-র সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। কোথাও বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ প্রমাণাদি ক্রিয়ার উপস্থিতিতেও মূল কারণ বা নিয়মাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে অসীম পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, আবার কোথাও দর্শনও দার্শনিকদের (বিশেষত পরম সিদ্ধ যোগীদের ব্যতীত) কল্পনার বেগে ভেসে গিয়ে ভ্রান্ত হতে পারে। আমাদের উভয় বিদ্যারই বিবেকসম্মত ব্যবহার করার চেষ্টা করা উচিত।

এখন আমরা পাঠকদের সামনে বিজ্ঞান ও দর্শনের সীমা ও সমন্বয় প্রদর্শন করে সৃষ্টির একটি নিয়ম নিয়ে চিন্তা করি—

যখন আমরা এই বিষয়ে চিন্তা করি যে একটি ধনাত্মক আধানযুক্ত বস্তু অন্য একটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত বস্তুকে কেন আকর্ষণ করে, তখন এই জ্ঞানের প্রক্রিয়ায় প্রথমেই আমরা অনুভব করি যে বিপরীত আধানযুক্ত বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। এখানে আকর্ষণ বল আছে, তাহলে তার কারণও থাকবে— এই চিন্তা করা দর্শনের বিষয়। দুটি বস্তু পরস্পরের নিকটে আসছে, তাহলে তাদের মধ্যে কোনো আকর্ষণ বল কাজ করছে— এটিও জানা দর্শনের বিষয়। এখন ঐ আকর্ষিত বস্তুগুলির উপর বিপরীত বৈদ্যুতিক আধান রয়েছে— এটি বলা বিজ্ঞানের কাজ। এই আধান কিভাবে কাজ করে— এটিও বিজ্ঞানের কাজ। বর্তমান বিজ্ঞান জেনেছে যে যখন দুই বিপরীত আধানযুক্ত কণ কাছাকাছি আসে, তখন তাদের মধ্যে Virtual Photons উৎপন্ন ও সঞ্চারিত হতে শুরু করে। এই Particles (Photons)-ই আকর্ষণ বলের কারণ হয়। বর্তমান বিজ্ঞানের মতে, এই Particles ঐ দুই কণের মধ্যবর্তী space-কে সংকুচিত করে তাদেরকে পরস্পরের নিকট আনতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়াকে জানা বিজ্ঞানের কাজ। সম্ভবত বর্তমান বিজ্ঞানের সীমা এখানেই শেষ হয়; এর পর দর্শন বা বৈদিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্র শুরু হয়।

যখন আমি প্রশ্ন করি যে ধন ও ঋণ বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত কণগুলির নিকট আসামাত্র Virtual Particles কোথা থেকে এবং কেন প্রকাশ পায়, তখন বিজ্ঞানীরা বলেন— আমরা এর উত্তর জানি না। যেখানে বর্তমান বিজ্ঞান উত্তর দিতে পারে না, সেখানে বৈদিক বিজ্ঞান বা দর্শন উত্তর দেয়। এই উত্তর বৈদিক ঋষি বা বেদের মহান জ্ঞান থেকে পাওয়া যাবে, যা আমরা অন্য কোনো গ্রন্থে বিশদে ব্যাখ্যা করব। এখানে আমাদের বক্তব্য এই যে, বর্তমান বিজ্ঞান কোনো বলের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে, কিন্তু বৈদিক বিজ্ঞান বা দর্শন তারও পরবর্তী স্তরে গিয়ে বলে যে সেই বল কেন ঘটছে এবং তার মূল প্রেরক শক্তি কী। সেখানে আমরা প্রমাণ করব যে সমস্ত জড় বলের মূল প্রেরক শক্তি চেতন পরমাত্মা তত্ত্বের শক্তি। এখানে বর্তমান বিজ্ঞান না আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়, না ঈশ্বরতত্ত্বের মূল প্রেরক শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে। এই একগুঁয়েমি বিজ্ঞানীর পক্ষে যুক্তিযুক্ত নয়। তাকে হয় সমস্যার সমাধান করতে হবে, অথবা বৈদিক বিজ্ঞানীদের কাছে সমাধান জানতে হবে।

এখানে আমরা আলোচনা করছিলাম যে ব্রহ্মাণ্ডে আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা মান্য মূলকণ অনাদি হতে পারে না, এবং তখন তাদের মধ্যে সংঘটিত কোনো ক্রিয়া বা গতি-ও অনাদি হতে পারে না। যদি কেউ বলে যে মূলকণ প্রাণাদি সূক্ষ্ম পদার্থ বা প্রকৃতি রূপ সূক্ষ্মতম পদার্থ থেকে গঠিত, তবুও সেই সূক্ষ্ম কারণ পদার্থে গতি অনাদি কেন হতে পারে না— এবং কেন এর জন্য চেতন ঈশ্বর তত্ত্বের প্রয়োজন?

এই বিষয়ে আমরা এভাবে চিন্তা করি—

এই সৃষ্টিতে যে কোনো গতি ও বল বিদ্যমান, তা পদার্থের সূক্ষ্মতম স্তর পর্যন্ত কার্যকর। পদার্থের অণুতে সংঘটিত কোনো ক্রিয়া বা বলের প্রভাব আয়ন পর্যন্ত পৌঁছায়। আয়নের মধ্যে সংঘটিত প্রতিটি গতি ও বলের প্রভাব বা সম্পর্ক ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন বা কোয়ার্ক ও গ্লুয়ন পর্যন্ত পৌঁছায়। আমাদের বিশ্বাস, বর্তমান বিজ্ঞানও এটিকে অস্বীকার করবে না। এই সূক্ষ্ম কণগুলির গঠন ও প্রকৃতি সম্পর্কে বর্তমান বিজ্ঞান অজ্ঞ, তাই এদের মধ্যে সংঘটিত গতি-ক্রিয়া-বল ইত্যাদির প্রভাবের বিস্তৃতি সম্পর্কেও সে অজ্ঞ। এই প্রভাব প্রাণ, মন ও বাক্ তত্ত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত, যা মূল প্রকৃতি ও ঈশ্বরে গিয়ে শেষ হয়। বাস্তবে ঈশ্বরতত্ত্বে কোনো ক্রিয়া হয় না এবং প্রকৃতিতে ক্রিয়া ঈশ্বরীয় প্রেরণায় ঘটে, কিন্তু তাতে প্রকৃতির মূল স্বরূপ পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই সমস্ত জ্ঞান বর্তমান বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়।

গতি ও বলের এই ব্যাপ্তির পরে আমরা আরও ভাবতে পারি যে এই ব্রহ্মাণ্ডে যে প্রতিটি ক্রিয়া ঘটছে, তা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ঘটছে। সমগ্র সৃষ্টি আকস্মিক কোনো ঘটনার ফল নয়, বরং প্রতিটি বল বা ক্রিয়া সুসংগঠিত এবং বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ। মূলকণ, কোয়ান্টা প্রভৃতি সূক্ষ্ম পদার্থ কিংবা বৃহৎ বিশ্বসমূহ জড় হওয়ার কারণে তারা নিজে থেকে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ক্রিয়া করতে পারে না এবং নিজেদের কার্যকারণের উদ্দেশ্যও বুঝতে পারে না।

Stephen Hawking, যিনি তাঁর গ্রন্থ 'The Grand Design'-এ ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অবৈজ্ঞানিক কুতর্কের মাধ্যমে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে শরীরে জীবাত্মার অস্তিত্বকেও অস্বীকার করতে চেয়েছেন। তিনি রোবট ও ভিনগ্রহী জীবের মধ্যে পার্থক্য করেন, কিন্তু ভিনগ্রহী জীবের মধ্যেও স্বাধীন ইচ্ছা ও বুদ্ধিযুক্ত আত্মাকে মানেন না। এই ধরনের একগুঁয়েমিই বর্তমান বিজ্ঞানকে ধ্বংসাত্মক ভোগবাদী পথে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি লিখেছেন—

"How can one tell if a being has free will? If one encounters an alien, how can one tell if it is just a robot or it has a mind of its own? The behaviour of a robot would be completely determined, unlike that of a being with free will. Thus one could in principle detect a robot as a being whose actions can be predicted. As we said in Chapter 2, this may be impossibly difficult if the being is large and complex. We cannot even solve exactly the equations for three or more particles interacting with each other. Since an alien the size of a human would contain about a thousand trillion trillion particles even if the alien were a robot, it would be impossible to solve the equations and predict what it would do. We would therefore have to say that any complex being has free will-not as a fundamental feature, but as an effective theory, an admission of our inability to do the calculations that would enable us to predict its actions." (The Grand Design- P. 178)

এখানে পাঠক চিন্তা করুন— যদি thousand trillion trillion কণই বুদ্ধি ও ইচ্ছার উৎপত্তির কারণ হতে পারে, তাহলে কি রোবটে এত কণ নেই? সেটিও তো একই মূলকণ দিয়ে গঠিত, যেগুলো দিয়ে আমাদের শরীর গঠিত। অণুস্তরে কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রায় পরমাণু স্তরে কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই, আর মূলকণ স্তরে তো সম্পূর্ণ সমতা রয়েছে। তাহলে কেবল কণসংখ্যার ভিত্তিতে এই পার্থক্য মানা এবং জীবের আচরণকে অজ্ঞেয় বলে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? আজ একজন মানুষ বহু স্বয়ংক্রিয় রোবট তৈরি করতে পারে, কিন্তু বহু রোবট একত্রে মিলেও কি মানুষের প্রেরণা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া একটি মানুষ তো দূরের কথা, নিজেরাই একটি রোবট তৈরি করতে পারে? এই অবৈজ্ঞানিক ও অহংকারপূর্ণ গ্রন্থে জন্ম, মৃত্যু, ইচ্ছা ইত্যাদি যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে হকিং মহাশয়কে একজন বিজ্ঞানীর পরিবর্তে একগুঁয়ে নাস্তিক দার্শনিক হিসেবে উপস্থাপন করে। এটি পড়ে তাঁর প্রতি আমার যে সম্মান ছিল, তা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তাঁর প্রতিটি যুক্তির উত্তর সহজেই দেওয়া যায়, কিন্তু এই গ্রন্থে জীবাত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করা আবশ্যক নয়, তবুও এখানে আমরা সংক্ষেপে কিছু চিন্তা উপস্থাপন করছি।

রোবটে ইচ্ছা, জ্ঞান, প্রচেষ্টা, দ্বেষ, সুখ ও দুঃখ— এই কোনো গুণ থাকে না। এটি কোনো মানুষের দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত হয়। অন্যদিকে কোনো জীবিত প্রাণী অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হয় না, বরং প্রত্যেক কর্ম সম্পাদনে স্বাধীন। আজ হকিং সাহেবের মতো যে সকল বিজ্ঞানী ইচ্ছা, জ্ঞান ইত্যাদি গুণযুক্ত আচরণের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করে জীবাত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করেন, তা বাস্তবে এইরূপ, যেমন কোনো ব্যক্তি কোনো মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারকের তৈরি করা খাদ্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আগুন, জল, ময়দা, চিনি, দুধ, ঘি, কড়াই, চামচ প্রভৃতির কাজ বর্ণনা করছে, খাদ্যদ্রব্যে বিভিন্ন পরিবর্তনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছে, কিন্তু প্রস্তুতকারকের কথাই বলছে না, বরং তার অস্তিত্বই অস্বীকার করছে। এই ধরনের কথিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আসলে অবৈজ্ঞানিক ও একগুঁয়েমিপূর্ণ।

এই বিজ্ঞানীরা একইভাবে এই সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এর স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী অসীম বুদ্ধি ও শক্তিসম্পন্ন চেতন পরমাত্মতত্ত্বকে উপেক্ষা করেনই না, বরং তার অস্তিত্ব অস্বীকার করতেও সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। আমরা নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানীদের এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার প্রশংসা করি। নিশ্চয়ই তারা মূল পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে গভীর গবেষণা করছেন এবং করা উচিত, কিন্তু এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় চেতন নিয়ন্ত্রক তত্ত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দেন। এই কারণেই বিজ্ঞান আজও মৌলিক পদার্থবিদ্যার বহু সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। এই কারণেই বিজ্ঞানের History of the time-এ গুরুতর ত্রুটি রয়েছে, শক্তি-দ্রব্য সংরক্ষণ ভঙ্গের সমস্যা রয়েছে, ‘কেন’ ও ‘কি’ ধরনের প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার সমস্যা রয়েছে— প্রকৃতপক্ষে সর্বত্র সমস্যাই সমস্যা।

এই সমস্ত আলোচনার উদ্দেশ্য এই যে, সমগ্র জড় জগতে যে সকল বল ও গতি বিদ্যমান, তার পেছনে চেতন ঈশ্বরতত্ত্বেরই মৌলিক ভূমিকা রয়েছে; অপরদিকে জীবের দেহে আত্মার ভূমিকা থাকে। প্রতিটি গতির পেছনে কোনো না কোনো বলের ভূমিকা থাকে। কেবল বলের দ্বারা গতি আকস্মিক, উদ্দেশ্যহীন ও বিশৃঙ্খল হতো, কিন্তু সৃষ্টি সুসংগঠিত, বুদ্ধিগম্য ও উদ্দেশ্যমূলক— এই কারণে এতে বলের সাথে সচেতন প্রজ্ঞার ভূমিকাও অবশ্যই রয়েছে। বল ও বুদ্ধি অথবা ইচ্ছা, জ্ঞান ইত্যাদি কেবল চেতনের মধ্যেই সম্ভব। এই চেতন তত্ত্বই ঈশ্বর নামে পরিচিত। এই তত্ত্বের উপর চিন্তা করা বর্তমান বিজ্ঞানের সাধ্যের বিষয় নয়; এই কারণে বর্তমান বিজ্ঞানীদের উচিত পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শনশাস্ত্রেও গভীর চিন্তা করা, যেখানে ঈশ্বর, জীবরূপ সূক্ষ্মতম চেতন এবং প্রকৃতি, মন, প্রাণ প্রভৃতি সূক্ষ্ম জড় পদার্থের আলোচনা করা হয়— এতে বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের বহু সমস্যার সমাধানে সহায়তা মিলবে।

মহর্ষি গৌতম কোনো তত্ত্বের (Theory) প্রতিষ্ঠার জন্য পাঁচটি অবয়ব নির্ধারণ করেছেন— "প্রতিজ্ঞাহেতূদাহরণোপনয়নিগমনান্যবয়বাঃ" (ন্যা.দ. ১.১.৩২)

অর্থাৎ এই পাঁচটি অবয়ব হলো—

(১) প্রতিজ্ঞা— গতি অনিত্য।
(২) হেতু— কারণ আমরা একে উৎপন্ন ও বিনষ্ট হতে দেখি।
(৩) উদাহরণ— যেমন জগতে জড় বস্তু বা চেতন প্রাণীদের দ্বারা বিভিন্ন গতির উৎপত্তি দেখা যায় এবং সেই গতির বিরামও চেতন দ্বারা ঘটে।
(৪) উপনয়— সেইরূপ অন্যান্য গতিও অনিত্য।
(৫) নিগমন— সমস্ত দৃশ্য ও অদৃশ্য গতি অনিত্য।

গতির অনিত্যতার প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে একইভাবে গতির পেছনে চেতন কর্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়—

(১) প্রতিজ্ঞা— গতি মূলত চেতনের শক্তি দ্বারা উৎপন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হয়।
(২) হেতু— আমরা জগতে বিভিন্ন গতিকে বিভিন্ন চেতন প্রাণীর দ্বারা উৎপন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হতে দেখি।
(৩) উদাহরণ— যেমন আমরা নিজেরাই নানা গতি সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করি।
(৪) উপনয়— সেইরূপ অন্যান্য গতি, যাদের কোনো প্রত্যক্ষ প্রেরক দেখা যায় না, সেগুলিও কোনো অদৃশ্য চেতন তত্ত্ব (ঈশ্বর ইত্যাদি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
(৫) নিগমন— সকল প্রকার গতিকে উৎপন্ন, প্রেরিত ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্য কোনো না কোনো চেতন তত্ত্ব (ঈশ্বর বা জীব) অবশ্যই থাকে; অর্থাৎ চেতন ব্যতীত গতি উৎপন্ন ও পরিচালিত হতে পারে না।

একইভাবে বলের বিষয়েও বিবেচনা করা হয়—
প্রতিজ্ঞা— প্রত্যেক বলের পেছনে চেতন তত্ত্বের ভূমিকা আছে।
হেতু— কারণ আমরা চেতন প্রাণীদের মধ্যে বলের অস্তিত্ব দেখি।
উদাহরণ— যেমন আমরা দৈনন্দিন জীবনে নানা কাজে নিজের শক্তি ব্যবহার করি।
উপনয়— সেইরূপ সৃষ্টিতে যে বিভিন্ন বল দেখা যায়, সেগুলির পেছনেও কোনো অদৃশ্য চেতনের ভূমিকা রয়েছে।
নিগমন— প্রত্যেক বলের পেছনে কোনো না কোনো চেতন (ঈশ্বর বা জীব) থাকে অথবা সেই বল সেই চেতনেরই প্রকাশ। জড় পদার্থের নিজস্ব কোনো বল নেই।

এখন বুদ্ধিগম্য কার্যগুলিতে চেতন তত্ত্বের ভূমিকা—

(১) প্রতিজ্ঞা— প্রত্যেক বুদ্ধিগম্য, সুসংগঠিত রচনার পেছনে চেতন তত্ত্ব থাকে।
(২) হেতু— কারণ আমরা চেতন প্রাণীদের দ্বারা বুদ্ধিসম্পন্ন কাজ হতে দেখি।
(৩) উদাহরণ— যেমন আমরা নিজেদের বুদ্ধি দ্বারা বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করি।
(৪) উপনয়— সেইরূপ সৃষ্টির বিভিন্ন বুদ্ধিগম্য বিন্যাসের পেছনে ঈশ্বররূপ অদৃশ্য চেতনের ভূমিকা রয়েছে।
(৫) নিগমন— সমস্ত বুদ্ধিগম্য রচনা বা সমগ্র সৃষ্টির প্রতিটি ক্রিয়ার পেছনে চেতন তত্ত্বের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে।

এইভাবে গতি ও সংযোগজনিত পদার্থের অনাদি ও অনন্ত না হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন গতি, বল ও বুদ্ধিসম্পন্ন রচনার পেছনে চেতন তত্ত্বের অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে জীবরূপ চেতনের ভূমিকা থাকে। এই কারণেই মহর্ষি বেদব্যাস বলেছেন— "সা চ প্রশাসনাত্" (ব্র. সূ. ১.৩.১১) অর্থাৎ এই সমগ্র সৃষ্টির বিভিন্ন ক্রিয়া সেই ব্রহ্মের নিয়ন্ত্রণেই সম্পন্ন হয়।

এইভাবে পাঠক বুঝতে পারবেন যে যে কোনো পদার্থ, যা সূক্ষ্ম কারণ পদার্থের সংযোগে তৈরি এবং যা অন্যের দ্বারা প্রেরিত গতি, বল, ক্রিয়া প্রভৃতি গুণে যুক্ত, তা অনাদি হতে পারে না; কিন্তু যে পদার্থ এমন সূক্ষ্ম অবস্থায় বিদ্যমান যার আর কোনো কারণ নেই, তা অনাদি হতে পারে। এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে মূল প্রকৃতিরূপ পদার্থ, যেখানে কোনো গতি ইত্যাদি গুণ নেই, সেটিই অনাদি। সেই অনাদি পদার্থ থেকেই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক, সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপী ও সর্বজ্ঞ ঈশ্বরতত্ত্ব সময়ে সময়ে এই সৃষ্টির রচনা করেন। কখনো সৃষ্টি, কখনো প্রলয় ঘটে। এই সৃষ্টি-প্রলয়ের চক্রের না কোনো শুরু আছে, না কোনো শেষ। কোনো সৃষ্টি অনাদি ও অনন্ত নয়, প্রলয়ও নয়— কিন্তু এদের চক্র অনাদি ও অনন্ত।

এইভাবে আমরা Big Bang Theory ও Eternal Universe— এই দুই মতের আলোচনার মাধ্যমে সৃষ্টির রচয়িতা চেতন ঈশ্বরতত্ত্বের অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠা করেছি। String Theory ও M-Theory উভয়ই Big Bang-কে মানে, তাই এদের ভিত্তিতে পৃথকভাবে ঈশ্বরতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ পাঠকদের উচিত নিজেদের জেদ, একগুঁয়েমি ও অহংকার ত্যাগ করে প্রকৃত বৈজ্ঞানিকতার পরিচয় দেওয়া।

Read More

Eternally Evolving Infinite Universe Theory

28 April 0

অনাদি বিকশিত অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড সিদ্ধান্ত (Eternally Evolving Infinite Universe Theory)

Eternally Evolving Infinite Universe Theory
ব্রহ্মাণ্ডের এই মডেল সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডকে অনাদি ও অনন্ত মনে করে। এই পক্ষের বিজ্ঞানীদের মত হল যে এই ব্রহ্মাণ্ড অনাদি এবং অনন্তকাল পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে। যদিও বিভিন্ন গ্যালেক্সি এবং তাদের ভিতরে তারাদের সৃষ্টি ও বিনাশ নিরন্তর চলতে থাকবে, তথাপি এই ব্রহ্মাণ্ডের একসাথে সম্পূর্ণ বিনাশ কখনো হবে না। এর সাথে মিলযুক্ত ধারণাকে ১৬৪৮ সালে ইংল্যান্ডের তিনজন বিজ্ঞানী— হায়ল, বন্ডি এবং গোল্ড Quasi Steady State Theory নাম দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন, এমনটি ভারতীয় খগোলজ্ঞ ড. জয়ন্ত বিষ্ণু নারলীকর ‘বিজ্ঞান, মানব এবং ব্রহ্মাণ্ড’ নামক গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫০-এ লিখেছেন। বাস্তবে বিগ ব্যাং সিদ্ধান্তে বহু অনসুলঝে প্রশ্ন উঠার কারণে তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ এই মতের উৎপত্তি হয়েছে, এমনটি আমাদের মনে হয়। প্রো. আভাস মিত্র এই মতের প্রবল প্রস্তোতা। তিনি এই বিষয়ের উপর জগদ্বিখ্যাত কাজ করেছেন। এই বিষয়ক তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ আমার কাছে বিদ্যমান, যা সময়ে সময়ে তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন। কথিত ব্ল্যাক হোলের স্থানে MECO নামক বিশাল লোকের কল্পনা এবং Big Bang থেকে শুরু হওয়া ব্রহ্মাণ্ডের স্থানে Eternal Universe-এর কল্পনা— তাঁর এই দুই কাজ বিশ্বচর্চিত ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রো. মিত্র MECO অর্থাৎ Magnetic Eternal Collapsing Objects-এ কোয়ার্ক, গ্লুয়ন এবং ইলেকট্রন-পজিট্রন প্লাজমা ও ব্যারিয়নসমূহের মিশ্রণ মানেন। তাঁর মতে MECO থেকে নিরন্তর এই সূক্ষ্ম পদার্থগুলির অন্তরিক্ষে প্রক্ষেপণ হতে থাকে, যার ফলে নানা লোক, গ্যালেক্সি ইত্যাদির নির্মাণ হতে থাকে। তিনি আমাকে পাঠানো একটি প্রবন্ধ A New Case for an Eternally Old Infinite Universe-এ এই বিষয়ে লিখেছেন—

"At the same time ECOs also accrete preexisting gas from the ISM (infinite static model). Thus a stellar mass ECO acts as the fundamental churning pot of cosmic matter."

এর দ্বারা স্পষ্ট যে তিনি MECO’s-কে এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণের জন্য মূল পদার্থের ভাণ্ডার মনে করেন। এই প্রবন্ধে তিনি এর বিস্তৃত প্রক্রিয়াকে পর্যায়ক্রমে প্রদর্শন করেছেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনাদি কাল থেকে চলে আসছে এবং অনন্তকাল পর্যন্ত চলতে থাকবে।

সমীক্ষা— এই সৃষ্টি শূন্য থেকে আকস্মাৎ উৎপন্ন হয়নি, বরং সদাই বিদ্যমান সূক্ষ্ম পদার্থ থেকেই এর নির্মাণ হয়েছে এবং এর বিনাশ হয়ে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড সেই সূক্ষ্ম পদার্থেই রূপান্তরিত হয়ে যায়— এই সিদ্ধান্ত সত্য ও যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু এতে কিছু প্রশ্ন এইরূপ উপস্থিত হয়—

(১) কি গ্লুয়ন-কোয়ার্কস, ইলেকট্রন্স পজিট্রন্স প্লাজমা এবং বিভিন্ন ব্যারিয়ন্স তথা এদের দ্বারা নির্মিত MECOs অনাদি হতে পারে?
(২) কি এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া কোনো চেতন কর্তার বিনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হতে পারে এবং হতে থাকবে?

এই প্রশ্নগুলির উপর আমরা ক্রমান্বয়ে চিন্তা করি—

(১) আমাদের মতে কোনো সংযোগজনিত পদার্থ অনাদি হতে পারে না। মহর্ষি দयानন্দ সরস্বতী ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থের অষ্টম সমুল্লাসে যথার্থই লিখেছেন—

সংযোগজন্য পদার্থ অনাদি নয়


"বিনা কর্তা কোনো ক্রিয়া বা ক্রিয়াজনিত পদার্থ তৈরি হতে পারে না..... যা সংযোগে তৈরি হয়, তা সংযোগের পূর্বে থাকে না এবং বিয়োগের শেষে থাকে না....." (সত্যার্থ প্রকাশ পৃ.২১৮)। MECOs অথবা কোনো লোক বিভিন্ন কণ বা কোয়ান্টাজূ-এর সংঘাত থেকে তৈরি হওয়ার কারণে অনাদি হতে পারে না। যেগুলিকে বর্তমান বিজ্ঞান মূল কণ বলে মানে, সেই কোয়ার্ক, গ্লুয়ন, লেপ্টন, ব্যারিয়ন, ফোটন ইত্যাদির মধ্যে কোনো কণই গঠনহীন নয়। বর্তমান বিজ্ঞান এই কণ বা কোয়ান্টাজূ-এর গঠন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে এগুলিকেই মূল পদার্থ মানতে বাধ্য। আমরা এই বিষয়ে পরে পঞ্চমহাভূত প্রकरणে আলোকপাত করব। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, এই পদার্থগুলি নিজেরাই সূক্ষ্ম প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির বিভিন্ন সংযোগে তৈরি হয়েছে, এই কারণে এদের মধ্যে কোনো কণ বা কোয়ান্টা অনাদি ও অবিনাশী হতে পারে না। প্রশ্ন হল, সংযোগজন্য পদার্থ অনাদি কেন হতে পারে না? এর কারণ এই যে, বিভিন্ন সূক্ষ্ম কারণভূত পদার্থ থেকে মিলিত হয়ে যখন কোনো কণ তৈরি হয়, তখন সেই কারণরূপ সূক্ষ্ম রশ্মি ইত্যাদি পদার্থের মধ্যে বিশেষ পরিস্থিতিজনিত উৎপন্ন বলের বন্ধন কাজ করে। যখন কোনো কারণে সেই পরিস্থিতি শেষ হয়ে যায়, তখন সেই বন্ধক বলও শেষ হয়ে যায়, ফলে কণ বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই সূক্ষ্ম কারণরূপ সূক্ষ্ম রশ্মি ইত্যাদি পদার্থে পরিণত হয়ে যায়, যেগুলি থেকে তার নির্মাণ হয়েছিল। তার পরে আবার যখন কখনো সেই পরিস্থিতি কারও দ্বারা উৎপন্ন করা হয়, তখন পুনরায় সেই সূক্ষ্ম কারণরূপ রশ্মি ইত্যাদি পদার্থ বন্ধক বলযুক্ত হয়ে বিভিন্ন কণ বা কোয়ান্টাজ্ উৎপন্ন করে।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে সংযোগজন্য বস্তুকে অনাদি কেন মানা যায় না? এর উত্তরে আমাদের মত হল যে সংযোগজন্য বস্তুর কারণরূপ সূক্ষ্ম পদার্থগুলি পরস্পর উপরিউক্ত বন্ধক বল দ্বারা আবদ্ধ থাকে। যদি এই বন্ধক বল না থাকে, তবে সংযোগই সম্ভব হবে না। এখন আমরা ভাবি যে দুই বা দুইয়ের অধিক পদার্থের মধ্যে বন্ধক আকর্ষণ বল কিভাবে উৎপন্ন হয়? যদিও আমরা এই বিষয়ে অন্য কোনো গ্রন্থে আলোচনা করব, তথাপি এখানে এতটুকু বলব যে দুই আকর্ষিত কণ ও তরঙ্গের মধ্যে অতি সূক্ষ্ম রশ্মি ইত্যাদি পদার্থের বিনিময় বা সঞ্চালন হয়। তার ফলে আকাশ তত্ত্ব প্রভাবিত হয়ে উভয় কণ বা তরঙ্গ পরস্পর আকৃষ্ট হয়ে আবদ্ধ হয়। বর্তমান বিজ্ঞানের বলের ধারণা অপূর্ণ ও অস্পষ্ট, তথাপি সে এটুকু মানে যে আকর্ষিত হওয়া দুই কণের মধ্যে সূক্ষ্ম ফিল্ড রশ্মি নিরন্তর নির্গত হয়, যার ফলে আকর্ষণজনিত বন্ধক বল উৎপন্ন হয়। যে ফিল্ড রশ্মিগুলি নির্গত হয়, সেগুলি সেই সূক্ষ্ম কণগুলির ভিতরে সর্বদা ভরা থাকে, নতুবা সেগুলি নির্গতই হতে পারত না। এখন ভাবা যাক, যখন প্রতিটি কণের ভিতরে এই রশ্মিগুলি ভরা থাকে, তখন সেগুলি কোনো না কোনো সময় ফাঁকাও হয়ে যেতে পারে, অর্থাৎ তাতে অনন্ত রশ্মির ভাণ্ডার থাকতে পারে না। যখন সেই ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাবে, তখন সেই কণও বিনাশ প্রাপ্ত হয়ে সেই কারণভূত রশ্মিতে পরিণত হবে। এই কারণেই কোনো সূক্ষ্মতম কণ অনাদি/অজন্মা ও অনন্ত/অবিনাশী হতে পারে না— এই আমাদের দৃঢ় মত। যদি কেউ বলে যে আকর্ষিত কণগুলির মধ্যে ফিল্ড রশ্মির বিনিময় হয়, ফলে সেই রশ্মিগুলি একটি চক্রের মতো উভয় কণের মধ্যে ঘুরতে থাকে এবং তাই তা কখনো শেষ হয় না। এই বিষয়ে আমাদের মত হল যে চক্রাকারে ঘুরতে থাকা রশ্মিগুলি উভয় কণে সমান নয়, বরং পৃথক-পৃথক হয়; এর সাথে সেই রশ্মিগুলির অতি সূক্ষ্ম অংশ আকাশ তত্ত্বে নিঃসৃত হতে থাকে, এই কারণে প্রতিটি সংযোগজন্য পদার্থ অর্থাৎ কণ, কোয়ান্টা ইত্যাদির আয়ু অনন্ত নয়। বর্তমান বিজ্ঞান ইলেকট্রন ও ফোটন ইত্যাদির আয়ু অনন্ত বলে মানে, তা সঠিক নয়। এই ভ্রান্তি এই কারণে উৎপন্ন হয়েছে যে বিজ্ঞান ফোটনের গঠন ও উৎপত্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সামান্যতমও জ্ঞান রাখে না। যদিও বর্তমানে কিছু বিজ্ঞানী ইলেকট্রনকে Cloud of tiny particles বলে মানেন, কিন্তু এই বিষয়েও এখনো অপূর্ণ ও অস্পষ্ট জ্ঞানই রয়েছে। যেদিন বর্তমান বিজ্ঞান কণ, কোয়ান্টাজ্ এবং তাদের মধ্যে কার্যরত বলগুলির প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারবে, তখন তারা আমাদের এই মতের সাথে একমত হতে পারবে যে কোনো কণ বা কোয়ান্টা না অনাদি অজন্মা হতে পারে, না অবিনাশী/অনন্ত। হ্যাঁ, যে পদার্থের কোনো অভ্যন্তরীণ গঠন নেই, সেই পদার্থ অনাদি ও অনন্ত হতে পারে। সেই পদার্থ থেকেই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড একটি নির্দিষ্ট সময়ে সৃষ্টি হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিনষ্ট হয়ে মূল কারণ পদার্থে পরিণত তাও হয়ে যায়। মূল পদার্থ অনাদি ও অনন্ত, কিন্তু এই ব্রহ্মাণ্ড না অনাদি, না অনন্ত; তবে নির্মাণ ও বিনাশের প্রবাহচক্র অনাদি ও অনন্ত। মূল কণ ও কোয়ান্টাজ্জূ-কে অনাদি ও অনন্ত মানা ছাড়া প্রো. মিত্রা সাহেবের অন্যান্য রচনাক্রমের উপর আমাদের বিশেষ আপত্তি নেই। তবে এটুকু অবশ্যই যে তাঁর এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে অপূর্ণ। বর্তমানে কিছু আধুনিক ভৌত বিজ্ঞানীরাও মূলকণ বলে মানা কণগুলিকে মূলকণ হিসেবে মানতে সন্দেহ করতে শুরু করেছেন। জার্মানির বিজ্ঞানী Walter Greiner এবং Andereas Schofer-এর বক্তব্য—

"The nonexistence of the decays n pte and ny+y also indicates the presence of a new quantum number. The proton and neutron are given a baryonic charge B = 1 and the electron B = 0 Similarly the electron is assigned leptonic charge L = 1 the nucleons L = 0 From the principle of simplicity it appears very unsatisfactory to regard all observed particles as elementary. (Quantum-chromodynamics-P. 1)"

এর দ্বারা স্পষ্ট যে বর্তমান বিজ্ঞানীরা শুধু প্রোটন ও নিউট্রন নয়, বরং ইলেকট্রন, মিউঅন, নিউট্রিনো প্রভৃতি কণকেও মূল পদার্থ হিসেবে মানতে সন্দেহ করতে শুরু করেছেন। এই মতই আমরা উপরে ব্যক্ত করেছি। এ বিষয়ে বিশেষ আলোচনা বৈদিক সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া প্রকরণে করব।

(২) এই রচনাক্রম ও প্রক্রিয়ায় চেতন কর্তার অপরিহার্যতার আলোচনা আমরা 'ঈশ্বর অস্তিত্ব ও স্বরূপের বৈজ্ঞানিকতা' নামক অধ্যায়ে করব।

String Theory
এই বিষয়ে John Gribbin লিখেছেন—
"Any of a class of theories in physics that describe the fundamental particles and their interactions in terms of tiny one dimensional entities- strings. These strings from loops which are much smaller then particles such as protons, but the important point is that they are not mathematical points- even the electrons previously regarded as a point like entity, can be described in terms of string." (Q is for Quantum- particle physics from A to Z, P. 379)

তিনি পুনরায় একই গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৩৮৩-এ লিখেছেন—
"The central idea of all subsequent string theories is that the conventional picture of fundamental particles (leptons and quarks) as points with no extension in any direction is replaced by the idea of particles as objects which have extension in one dimension like a line drawn on a piece of paper or the thinnest of strings. The extension is very small about 10-35m. It would take 1020 such strings, laid end to end, to stretch across the diameter of a proton."

এই দুই বক্তব্য থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে এই সৃষ্টির যে কণগুলি মূল কণ হিসেবে মানা হয়, সেগুলি প্রকৃতপক্ষে সূক্ষ্ম strings-এর ঘনীভূত রূপ। এদের প্রত্যেকটি string শূন্য পুরুত্বের এবং 10-35 m. দৈর্ঘ্যের হয়।

বাস্তবে এই থিওরি সৃষ্টির উৎপত্তির কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদর্শন করে না, বরং এটি বিভিন্ন কণ, কোয়ান্টাজূ এবং তাদের মধ্যে কার্যরত বিভিন্ন প্রকারের বলের উৎকৃষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে, এমনটাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এই থিওরিটিও Big Bang মডেলকেই নিজের উপায়ে ব্যাখ্যা করে। এই বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বলেন—

"In the theory of inflation, the rapid initial expansion of the universe is caused by a hypothetical particle called the inflaton. the exact properties of this particle are not fixed by the theory but should ultimately be derived from a more fundamental theory such as string theory. Indeed there have been a number of attempts to identify an inflation within the spectrum of particles described by string theory and to study inflation using string theory. While these approaches might eventually find support in observational data such as measurement of the cosmic microwave background, the application of string theory to cosmology is still in its early stages." (String theory- Cosmology- from Wikipedia-Becker, Becker and Schwarz 2007, P.533, 539-43)

এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে বিজ্ঞানীরা string theory দ্বারা Big Bang Theory-ই ব্যাখ্যা করেন। এতে ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারণ, cosmic background radiation ইত্যাদি সব কিছুর ব্যাখ্যা করা হয়। এই কারণে এই থিওরি সৃষ্টির উৎপত্তি বিষয়ে কোনো নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করে না, বরং বিগ ব্যাং-এরই সমর্থন করে। এই কারণে এর সৃষ্টির উৎপত্তি ও সৃষ্টির মূল উপাদান কারণ বিষয়ে সমীক্ষা তখন অনাবশ্যক, যখন আমরা বিগ ব্যাং, ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারণ ইত্যাদির সমীক্ষা ইতিমধ্যেই করে ফেলেছি। যেখানে পর্যন্ত বিভিন্ন কথিত মূলকণকে একটি string-এর ন্যায় মানার প্রশ্ন, এটি আমাদের কাছে প্রচলিত point particle-এর তুলনায় কিছুটা বেশি উপযুক্ত বলে মনে হয়। এই strings কিভাবে এবং কোথায় উৎপন্ন হয়, তা সবই অন্ধকারে। যদিও এটিও একটি সত্য যে string theory-কে বর্তমানে বহু বিজ্ঞানী গ্রহণ করতে পারছেন না। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী Lee Smolin তিনজন বিজ্ঞানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছেন—

(1) "Gerard't Huf a noble prize winner for his work in elementary physics has characterized the state of string theory this way! 'Actually, I would not even be prepared to call string theory a 'theory' rather a 'model' or not even that: just a hunch" (The trouble with physics: Introduction P. XV)

(2) David Gross, a noble laureate for his work on the standard model, has since become one of the most aggressive and formidable champions of string theory-says- "we don't know what we are taking about?" (id. P-XV)

(3) Brian Greene (String theorist) নিজের latest book 'The Fabric of the Cosmos'-এ লিখেছেন—
"Even today, more than three decades after its initial articulation, more string practitioners believe we still don't have a comprehensive answer to the rudimentary question, what is string theory? (id. P. XV)

এই তিন বিজ্ঞানীর বক্তব্য থেকে এই সিদ্ধান্তই বেরিয়ে আসে যে বর্তমান বিজ্ঞানীরা string theory সম্পর্কে হতাশা ও সন্দেহের অবস্থায় আছেন। গ্রন্থের লেখক Lee Smolin-ও তাঁর উক্ত গ্রন্থের Introduction-এ লিখেছেন যে গত ত্রিশ বছরে বিজ্ঞান string theory ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করতে পারেনি।

আমার string theory নিয়ে আলোচনা গত কয়েক বছর ধরে বহু ভারতীয় বিজ্ঞানীর সাথে হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে তাদের প্রায় অজ্ঞতা, অনাগ্রহ বা সন্দেহই দেখা গেছে; তবে আমি বহু বছর ধরে এটিকে গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখে আসছি। ২০১২ সালে ভারতীয় বিজ্ঞানী প্রো. অশোক সেন string theory ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরের Fundamental Physics পুরস্কার পান, যা আমার string theory সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তি দিয়েছে। যদিও আমি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হওয়া নানা গবেষণা ও তাতে প্রাপ্ত নোবেল ইত্যাদি পুরস্কার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত না হয়েই আমার কাজ করে যাই। নোবেল পুরস্কার তো বিগ ব্যাং থিওরির ক্ষেত্রেও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক কখনো বিগ ব্যাং থিওরিকে গ্রহণ করেনি। এর বিপরীতে string theory-র কিছু বিষয় আমি কখনো সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করিনি। যতক্ষণ না এই থিওরি স্পষ্ট ও বিস্তৃত রূপে প্রকাশিত হয়, ততক্ষণ এ বিষয়ে বিশেষ সমীক্ষা করা উপযুক্ত নয়। যদি এই থিওরি আধুনিক বিজ্ঞানের বহু রহস্য সমাধানের দাবি করে, তবে তাকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে এটুকু অবশ্যই যে এই থিওরির যৌক্তিক সমালোচনা করা উচিত। বর্তমানে এতটুকু ভাবা উচিত যে যে strings থেকে elementary particles-এর নির্মাণ ধরা হয়, সেই strings-এর সৃষ্টি কখন ও কিভাবে হয়? এদের দৈর্ঘ্য প্লাঙ্ক দূরত্বের সমান ধরা হয়, তাহলে কি এদের কম্পন এই দৈর্ঘ্যের কম দূরত্বে ঘটে? কি string-এর শক্তি h-এর থেকেও কম হয়? আমাদের মতে তাই হওয়া উচিত। এদের শক্তি কোথা থেকে এবং কে প্রদান করে, যার ফলে এরা বিভিন্ন মূলকণ, ফোটন ও space-এর নির্মাণে সক্ষম হয়।

বাস্তবে string ও point—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা অধিক বৈজ্ঞানিক। এই বিষয়ে আমরা মূলকণগুলির উৎপত্তি ও গঠন সম্পর্কে একটি পৃথক গ্রন্থে আলোচনা করব। তবে বিজ্ঞ পাঠক এই গ্রন্থেও তা জানতে পারবেন।

এইভাবে সৃষ্টির উৎপত্তি সম্পর্কে বর্তমান বিজ্ঞান মূলত দুইটি তত্ত্বই মানে, যার বিস্তারিত সমীক্ষা আমরা ইতিমধ্যেই করেছি। M-Theory-ও Big Bang-এরই একটি অংশ। এই theory, theory of everything অর্থাৎ unified theory হওয়ার দাবি করলেও এটি নিজেই কেবল কল্পনা মাত্র। Unified theory অর্থাৎ Theory of Everything কেবল বৈদিক বিজ্ঞানের কাছেই আছে, যার আলোচনা পরে করা হবে। সুশিক্ষিত পাঠক এর দ্বারা বুঝতে পারবেন যে সৃষ্টির উৎপত্তির প্রাথমিক অবস্থার বিষয়ে বর্তমান বিজ্ঞান এখনো অন্ধকারে রয়েছে। তবে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে বর্তমান বিজ্ঞান বিশদভাবে ভালো আলোকপাত করে, যার আলোচনা এখানে করা আমরা অপ্রাসঙ্গিক মনে করি। তথাপি আমরা এটুকু অবশ্যই বলতে চাই যে সম্পূর্ণ বর্তমান বিজ্ঞানে এখনও বহু গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে, যার সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি। সেইসব প্রশ্ন নিয়ে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব এবং তাদের সমাধান বৈদিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে করার চেষ্টা করব। ইতি।

Read More

20 April, 2026

রামায়ণ সন্দর্শিকা

20 April 0

রামায়ণ সন্দর্শিকা
সমগ্র বিশ্বে নিম্নলিখিত ৩টি গ্রন্থ সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ— (১) বেদ (২) রামায়ণ (৩) মহাভারত। এই তিনটি গ্রন্থের প্রভাব কেবল ভারতবর্ষেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সাহিত্যে সর্বাধিকভাবে লক্ষ্য করা যায়। বেদের শব্দ (পদ) বিশ্বের সকল ভাষায় তৎসম বা তদ্ভব রূপে পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারতে যেসব স্থান (ভৌগোলিক অঞ্চল)-এর নাম ও উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি আজও আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্রগুলির নাম আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে রাখা হয়েছিল এবং সেই নামগুলি- রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, হনুমান, দশরথ, সীতা, কৌশল্যা, সুমিত্রা, অনুসূয়া, তারা প্রভৃতি আজও সহস্রাব্দ ধরে রাখা হয়ে আসছে। একইভাবে, রামায়ণে যাদের নিন্দিত চরিত্র ছিল, সেই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, কৈকেয়ী, মন্ত্রা এবং শূর্পণখার নাম আজও ভারতীয় সমাজে রাখা হয় না। ওয়াশিংটনস্থিত ‘মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক শ্রী তুফাইল আহমদ ভারতীয়দের আত্মপরিচয় ও সত্তাকে রামায়ণের আদর্শ ও বার্তায় প্রত্যক্ষ করেন। রামায়ণের কাহিনি শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সকলেই কেবল শিক্ষা লাভ করেন না, বরং শিক্ষার পাশাপাশি আনন্দও পান। বিশ্বকবির ভাষায় ‘যদি কবি বাল্মীকি মানুষের চরিত্রের বর্ণনা না করে দেব-চরিত্রের বর্ণনা করতেন, তবে অবশ্যই রামায়ণের গৌরব কমে যেত.....। রামের মানুষ হওয়ার কারণেই রামচরিতের এত মহিমা। রামায়ণে দেবতা পদচ্যুত হয়ে নিজেকে মানুষ করেননি, মানুষই নিজের গুণের কারণে দেবতা হয়ে উঠেছে।’

সংস্কৃত ভাষায় রচিত অধিকাংশ প্রাচীন সাহিত্যে ⚠️প্রক্ষেপ (অন্তর্বর্তী সংযোজন) হয়েছে। বৈদিক সংহিতাগুলি ব্যতীত রামায়ণ, মহাভারত এবং মনুস্মৃতি-র মতো প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলি (যেগুলি সহস্রাব্দ ধরে বিদ্বজ্জন থেকে সাধারণ মানুষের কণ্ঠহার হয়ে আছে) তাও এ থেকে রক্ষা পায়নি। বেদ-মন্ত্রগুলির অষ্ট বিকৃতপাঠের কারণে, বিশেষত ক্রমপাঠ এবং ঘনপাঠের জটিলতা বৈদিক সংহিতার পাঠকে বিকৃত হওয়া এবং প্রক্ষেপের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তুলেছে। এর অতিরিক্ত বৈদিক বাঙ্ময়ে অনুক্রমণীকাররা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্যভাবে ঋষি, দেবতা, ছন্দ, বর্ণ, মাত্রা এবং স্বর পর্যন্ত গণনা করে রেখেছেন, যার ফলে মন্ত্রসংহিতায় প্রক্ষেপ করার সাহস কেউ করতে পারেনি। কিছু ব্রাহ্মণগ্রন্থ স্বরাঙ্কিত হওয়া সত্ত্বেও পশুমাংসলোলুপ কর্মকাণ্ডীরা পরবর্তী ব্রাহ্মণগ্রন্থ এবং কল্পসূত্র সাহিত্যেও প্রক্ষেপ করতে কোনও কসুর রাখেনি। পুনরায় পূর্বাপর ক্রমের প্রতি দৃষ্টি রাখলে এই প্রক্ষেপস্থলগুলি স্পষ্ট হয়ে যায়।
‘রামায়ণ’ থেকে শুরু করে ভক্তিকালীন ‘রামচরিতমানস’ প্রভৃতি গ্রন্থে প্রক্ষেপের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। রামচরিতমানস-এর সম্পূর্ণ ‘লবকুশকাণ্ড’ প্রক্ষিপ্ত। একইভাবে বাল্মীকীয় 📚রামায়ণের সম্পূর্ণ উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত। কারণ, যে কোনও গ্রন্থ ‘ফলশ্রুতি’ পর্যন্তই সমাপ্ত বলে গণ্য হয়। ‘রামায়ণ’-এ এই ফলশ্রুতি যুদ্ধকাণ্ডের ১২৮তম সর্গের ১০৭তম শ্লোক থেকে শুরু হয়ে ১২৫তম শ্লোক পর্যন্ত বিস্তৃত। এর অতিরিক্ত উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও শক্তিশালী কারণ রয়েছে। উত্তরকাণ্ডের দ্বিতীয় সর্গ থেকে ৩৪তম সর্গ পর্যন্ত রাবণ এবং রাক্ষসদেরই বর্ণনা আছে, যার রামকথার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। উত্তরকাণ্ডের রচনাশৈলী কাব্যশৈলী না হয়ে পুরাণশৈলী। বাল্মীকি স্থান-স্থানান্তরে প্রকৃতি, পর্বত, বন, ঋতু এবং পশুপাখির বর্ণনাও করেছেন, যা উত্তরকাণ্ডে সামান্যও নেই। বাল্মীকি-র উপমাগুলি আনন্দদায়ক ও প্রাসঙ্গিক, যার উত্তরকাণ্ডে সম্পূর্ণ অভাব। রামায়ণে আগত চরিত্রগুলির জন্মাদি সংক্রান্ত অন্তর্কথার বিস্তার বিভিন্ন পুরাণে পাওয়া যায়, যা রামায়ণের কথকরা পুরাণ থেকে নিয়ে এখানে সংযোজন করেছেন। এই অন্তর্কথাগুলির পূর্ণ বিশ্লেষণ রামকথার উৎপত্তি ও বিকাশের সম্পূর্ণ যাত্রাপথের গবেষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত Father Kamil Bulke করেছেন। সচেতন পাঠকবর্গ এই বিষয়ের বিস্তৃত তথ্য বুলকের প্রসিদ্ধ গবেষণাগ্রন্থ ‘রামকথা : উৎপত্তি এবং বিকাশ’ (প্রকাশক— হিন্দি পরিষদ, হিন্দি বিভাগ, প্রয়াগ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ, ষষ্ঠ সংশোধিত সংস্করণ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে পেতে পারেন।
বাল্মীকীয় রামায়ণের গবেষকদের🧠 সিদ্ধান্ত হলো যে বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড নিঃসন্দেহে প্রক্ষিপ্ত। এর পাশাপাশি মধ্যবর্তী কাণ্ডগুলিতেও বহু স্থানে পরবর্তী কথকরা প্রক্ষিপ্ত অংশ সংযোজন করেছেন। কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি প্রকৃত অবস্থা জানলেও পৌরাণিক বিশ্বাসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে এ বিষয়ে লেখা বা বলা থেকে বিরত থাকেন। শম্বূক প্রসঙ্গ, যযাতি–শুক্রাচার্য, লবণাসুর এবং ব্রাহ্মণ বালকের মৃত্যুকে শূদ্রের তপস্যার সঙ্গে যুক্ত করার মতো অধিকাংশ বিষয়ের রামায়ণের সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। সীতার নির্বাসনও পরবর্তীকালে সংযোজিত অংশ। প্রক্ষিপ্ত অংশগুলি চিহ্নিত করার জন্য গবেষণামূলক🔎 দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। এর বহু মানদণ্ড আছে— মূল কাহিনির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা, অলৌকিকতার প্রদর্শন, অযৌক্তিক বক্তব্য এবং অমানবিক প্রবৃত্তির আধিক্য ইত্যাদি। প্রক্ষেপের ধারার প্রধান ভিত্তি হলো রামকে ঈশ্বরীয় পরব্রহ্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, অবতারবাদ, উপকাহিনি, ভিন্ন প্রসঙ্গ, অতিশয়োক্তি এবং পুনরুক্তি; অথচ রামায়ণের মূল স্বর মানবত্ব, দেবত্ব নয়। বাল্মীকি বহু মানবগুণে সমৃদ্ধ এক পুরুষ সম্পর্কে জানতে চান—

জ্ঞাতুমেবংবিধং নরম্।

নারদ তাঁকে সেইরূপ পুরুষের কথাই বলেন—

তৈর্যুক্তঃ শ্রূয়তাং নরঃ (বালকাণ্ড ১/৭)।

এভাবেই সীতা নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—

নারীণামুত্তমা বধূঃ (১/২৭)।

রাবণের মৃত্যু ও সীতার মুক্তির পর রামও এই মানবীয় দিকটিকেই গুরুত্ব দেন—

দৈবসম্পাদিতো দোষো মানুষেণ ময়া জিতঃ (যুদ্ধকাণ্ড ১১৫/৫)।

অর্থাৎ রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিল, সেই দোষ দৈববশত সংঘটিত ছিল; আমি মানুষ হয়ে তা দূর করেছি।রামায়ণের মূল স্বর বা মূল পাঠের দিকে বিদ্বান চিন্তাবিদদের দৃষ্টি পূর্বেও আকৃষ্ট হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে বহু পণ্ডিত তাঁদের গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। মহামহোপাধ্যায় Swami Bhagavadacharya বাল্মীকী রামায়ণের উপর তাঁর গবেষণাপূর্ণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সীতার অগ্নিপরীক্ষার সময় রামের মুখ দিয়ে যে কঠোর বাক্য বলানো হয়েছে, তা বাল্মীকির চরিত্র-আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনও নারী-নিন্দক ব্যক্তি রাম ও সীতার চরিত্রকে কলুষিত করার উদ্দেশ্যে রামায়ণের মূল পাঠে এই নিকৃষ্ট প্রসঙ্গ সংযোজন করেছে। অগ্নিপরীক্ষার রাম-সীতা-সংলাপ বাল্মীকির “চারিত্র্যেণ চ কো যুক্তঃ” তত্ত্বদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে বাল্মীকি যেন তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত বলে মনে হয়। তিনি যে রামকে খুঁজছিলেন—

জিতক্রোধো দ্যুতিমান্ কোऽনসূয়কঃ

অর্থাৎ ‘যিনি ক্রোধজয়ী, উজ্জ্বলচিত্ত এবং অনিন্দক’— সেই রাম কি করে তাঁর সতী-সাধ্বী পত্নীকে এভাবে অপমান করতে পারেন! ভগবদাচার্যজি একে বাল্মীকির বাক্য বলে মানেন না। তাই তিনি তাঁর সংশোধিত বাল্মীকীয় রামায়ণ থেকে অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গ সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন। Tulsidas-ও তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এ মায়াময় সীতারই অগ্নিপরীক্ষা করিয়েছেন; প্রকৃত সীতা পূর্বেই অগ্নিতে গোপনবাসে চলে গিয়েছিলেন। ‘মানস’-এর ‘অরণ্যকাণ্ড’-এ তুলসীর রাম সীতাকে বলেন—

সুনহু প্রিয়া ব্রত রুচির সুসীলা, ম্যাঁ কছু করবি ললিত নর লীলা।
তুম্হ পাৱক মহুঁ করহু নিবাসা, জৌঁ লাগি করৌঁ নিশাচর নাসা।

অধ্যাত্ম রামায়ণে-ও সীতার ছায়ামূর্তিই অগ্নিতে প্রবেশ করেছিল। তামিলের মহাকবি কম্বনও তাঁর রামায়ণ মহাকাব্যে সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গকে বাল্মীকির দোষপরিহারের রূপেই প্রকাশ করেছেন। সীতার সতীত্বের উপর লাঞ্ছনায় তিনি বিচলিত হয়ে ওঠেন। সীতার ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র বর্ণনা যুদ্ধকাণ্ডের সর্গ ১১৪ থেকে ১২০ পর্যন্ত রয়েছে। এর প্রক্ষিপ্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—এই প্রসঙ্গে সীতার প্রতি রামের প্রেমে যে আকস্মিক পরিবর্তন দেখানো হয়েছে, তা কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, সম্পূর্ণ অস্বাভাবিকও। (Bulke, Ramkatha-অনুচ্ছেদ ৫৬৫)। সীতাহরণের পর রামের বিরহের বর্ণনা বহু সর্গে পাওয়া যায়। যুদ্ধকাণ্ডের শুরুতেই রাম নিজেই বলেন যে আমার বিরহজনিত শোক দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে (সর্গ-৫ শ্লোক-৪২)। লঙ্কা অবরোধের পরেও সীতার জন্য রামের আকাঙ্ক্ষা—

জগাম মনসা সীতা দুযমানেন চেতসা (৪২/৭)

—এইরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। ইন্দ্রজিতের দ্বারা মায়া সীতার বধের সংবাদ শুনে রাম মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান—

তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা রাঘবঃ শোকমূর্ছিতঃ।
নিপপাত তদা ভূমৌ ছিন্নমূল ইব দ্রুমঃ ॥ (৮৩/১০)

এতে স্পষ্ট যে সীতার প্রতি রামের প্রেম অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু এত কিছু থাকা সত্ত্বেও রাবণবধের পর আগত সীতাকে দেখে রামের মুখে এই কথা বলা—আমি শত্রুর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি, এখন তোমার প্রতি আমার কোনও আকর্ষণ নেই; লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব অথবা বিভীষণের মধ্যে কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারো; তোমার চরিত্র নিয়ে আমার সন্দেহ আছে—এই তথাকথিত বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে রাম সীতার সত্যবচনে, যা তার পতিব্রতা স্বভাব এবং রামের প্রতি একান্ত প্রেমের পরিচায়ক, বিশ্বাস করেননি। পূর্বে রাবণের বক্তব্যও স্পষ্ট, যেখানে সে সীতাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণের জন্য এক বছরের সময় দিয়েছিল, নচেৎ সে রাবণের পাকশালার উপাদান হয়ে যাবে (অরণ্যকাণ্ড, সর্গ-৫৫)। দশ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন সীতা রাবণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তখন রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলে—নির্ধারিত সময় পূর্ণ হতে আরও দুই মাস বাকি আছে; এর পরও যদি তুমি স্বেচ্ছায় আমার পত্নী না হও, তবে আমার রাঁধুনিরা তোমাকে টুকরো টুকরো করে আমার প্রাতরাশের অংশ করে দেবে—

দ্বাভ্যামূর্ধ্বং তু মাসাভ্যাং ভর্ত্তারং মামনিচ্ছন্তীম্।
মম ত্বাং প্রাতরাশার্থে সূদাশ্ছেত্স্যন্তি খণ্ডশঃ ॥
(সুন্দর০, সর্গ-২২ শ্লোক-৯)

এতে স্পষ্ট যে রাবণ সীতার উপর জোরপূর্বক অত্যাচার করতে পারেনি। এই অবস্থায় সীতার চরিত্র নিয়ে রামের সন্দেহের কোনও সুযোগই নেই, এবং এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষারও কোনও প্রয়োজন নেই।

এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষার পর রামের এই উক্তি—আমার মনে তোমার প্রতি কোনও সন্দেহ ছিল না, কিন্তু জনসমাজের দৃষ্টিতে তোমার এই শুদ্ধিকরণ প্রয়োজন ছিল—বুলকের ভাষায়, এই ধরনের প্রদর্শন সমগ্র মূল বাল্মীকী রামায়ণের ভাবধারার বিরোধী। (বুলকে, অনুচ্ছেদ ৫৬৫)।

এই প্রকরণ (অগ্নিপরীক্ষা)-র প্রক্ষেপ অবতারবাদ স্বীকৃত হওয়ার পরেই সম্ভব হয়েছে। কারণ পরবর্তীতে বলা হয়েছে যে রামের প্রকৃত কোনও দুঃখ নেই, তিনি তো নরলীলা করছেন। রাম ও সীতা যথাক্রমে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর অবতার। ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতারা রামকে বিষ্ণু এবং সীতাকে লক্ষ্মীর অবতার জেনে তাঁদের স্তব করছেন। বাল্মীকী রামায়ণের এটিই একমাত্র স্থান যেখানে সীতা ও লক্ষ্মীর অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (যুদ্ধকাণ্ড– ১১৭/২৭)।

এই প্রসঙ্গের প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও কিছু কারণ আছে—

১. যুদ্ধকাণ্ডের ১২৪তম সর্গে ভরদ্বাজ তপোবলে রামকথা জেনে যে বর্ণনা করেন, তাতে এই প্রসঙ্গ নেই। একইভাবে ১২৬তম সর্গে হনুমান ভরতকে যে কাহিনি বলেন, তাতেও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ নেই।

২. বালকাণ্ডের সর্গ–১ এবং সর্গ–৩-এ রামকথার সংক্ষিপ্ত অনুক্রমণিকা দেওয়া হয়েছে। সর্গ–১-এর তালিকায় অগ্নিপরীক্ষা আছে, কিন্তু সর্গ–৩-এর তালিকায় নেই। Father Kamil Bulke-এর মতে, এই দুই অনুক্রমণিকার প্রামাণিক সংস্করণই অগ্নিপরীক্ষার বিষয়ে নীরব (বুলকে, Ramkatha, পৃ–৪২৫, সংস্করণ–২০০৪)।

৩. উত্তরকাণ্ডও অগ্নিপরীক্ষা সম্পর্কে কিছুই বলে না। ২ (দুই) স্থানে রাম সীতার নির্দোষতার প্রমাণের উল্লেখ করেন। প্রথমবার সীতা-ত্যাগের সময় তিনি কেবল দেবতাদের সাক্ষ্যের কথা বলেন। দ্বিতীয়বার তিনি বাল্মীকিকে বলেন যে লঙ্কা-নিবাসের পর আমি তখনই সীতাকে গ্রহণ করেছি, যখন তিনি তাঁর সতীত্বের শপথ নিয়েছিলেন—

প্রত্যয়শ্চ পুরা বৃত্তো বৈদেহ্যাঃ শপথশ্চ কৃতস্তত্র তেন বেষ্ম সুসন্নিধৌ। প্রবেশিতা ॥
(সর্গ-৯৭, শ্লোক-৩)

যদি এই সর্গের রচনাকালে অগ্নিপরীক্ষার ঘটনা প্রচলিত থাকত, তবে এখানে রামের দ্বারা সীতার সতীত্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের উল্লেখ অবশ্যই হত। অতএব মানতে হবে যে উত্তরকাণ্ডের প্রামাণিক কাহিনি লিপিবদ্ধ হওয়ার পরেই অগ্নিপরীক্ষা-সংক্রান্ত প্রক্ষেপ যুদ্ধকাণ্ডের অংশে পরিণত হয়েছে।

৪. মহাভারতের রামোপাখ্যান থেকেও এই সিদ্ধান্ত (অর্থাৎ সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রক্ষিপ্ততা) সমর্থিত হয়। রামায়ণের এই প্রাচীনতম সংক্ষিপ্ত রূপে কোথাও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

3. অগ্নিপরীক্ষার পরবর্তী দুই সর্গ (১১৯–১২০)ও অপ্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত। এতে শিব রামের স্তব করেন, স্বর্গ থেকে রাজা দশরথ উপস্থিত হন এবং ইন্দ্র রামের অনুরোধে মৃত বানর-সৈন্যদের পুনরুজ্জীবিত করেন।

রামকথার উৎস হিসেবে বাল্মীকীয় রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, কম্বন রামায়ণ এবং তুলসীদাসকৃত ‘রামচরিতমানস’ সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এর মধ্যে বাল্মীকী রামায়ণই সর্বপ্রাচীন। কিন্তু এতে কবি, কথক এবং বিভিন্ন মত-পন্থার সমর্থক-বিরোধীদের এত হস্তক্ষেপ ঘটেছে যে আজ তার কাহিনিতে আসল-নকলের পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

জার্মান ভারতেরবিদ্যা-বিশারদ Hermann Jacobi বাল্মীকী রামায়ণের উত্তরকাণ্ড ও বালকাণ্ডকে সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেন। তবে সমগ্র বালকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হতে পারে না, কারণ অযোধ্যার বর্ণনা, রাজা, মন্ত্রী, পুরোহিত ও নাগরিকদের বিবরণ, পুত্রেষ্টি যজ্ঞ, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নের জন্ম, বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রাম-লক্ষ্মণের যজ্ঞরক্ষার্থে গমন, বল ও অতিবল শক্তির প্রাপ্তি, তাড়কা বধ, বিশ্বামিত্রের যজ্ঞরক্ষা, রামের বিবাহ এবং অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন—এই সমস্তই বালকাণ্ডে বর্ণিত। বালকাণ্ডে রামকথার মূল অংশ সর্গ ১–৮, ১৩, ১৪, ১৮–৩১, ৬৬–৭৩ এবং ৭৭—মোট ৩৩টি সর্গে সীমাবদ্ধ, অথচ এই কাণ্ডে মোট ৭০টি সর্গ আছে। অতএব বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ (যা রামকথার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়) এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়া প্রমাণিত হয়।

বাল্মীকী রামায়ণের বালকাণ্ডের প্রথম সর্গে প্রদত্ত বিষয়সূচীতেও উত্তরকাণ্ডের ঘটনাবলির উল্লেখ নেই। যুদ্ধকাণ্ডেই রামকথা সমাপ্ত করা হয়েছে। সীতা নির্বাসন উত্তরকাণ্ডের মূল কাহিনি। অধ্যাত্ম রামায়ণ, Tulsidas-রচিত ‘রামচরিতমানস’ এবং কম্বন-প্রণীত তামিল রামায়ণেও বাল্মীকীর অনুকরণে অযোধ্যায় রামের রাজ্যাভিষেক ও রামরাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই কাহিনির সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।

সিয় নিন্দক অঘ ওঘ নসায়ে। লোক বিসোক বনাই বসায়ে ॥
(রামচরিত মানস, বালকাণ্ড)

তুলসীদাসকৃত এই চৌপাই থেকে সীতার বনবাসের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, লেখকের মতে এটি গোস্বামীজির রচনা নয়, বরং পরবর্তীকালের প্রক্ষেপ।

সীতার নির্বাসনকে প্রসিদ্ধ আধুনিক তামিল রামায়ণের রচয়িতা C. Rajagopalachari-ও বাল্মীকীর রামচরিত্রের আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গত বলে মনে করেন। তাঁর ‘রামকথা দশরথ-নন্দন শ্রীরাম’-এ তিনি এই অংশ অন্তর্ভুক্ত করেননি এবং এটিকে প্রক্ষিপ্ত বলে স্বীকার করেছেন।

রামকথায় অতিশয়োক্তিপূর্ণ অমানবিক বর্ণনা কীভাবে বিস্তৃত হয়ে লোকমুখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা রাবণের ‘দশশীর্ষ’ (দশানন) এবং বিশটি বাহুর বর্ণনায় স্পষ্ট দেখা যায়। যদিও বাল্মীকী রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের দশম সর্গের ৮টি শ্লোকে (১০/১৫–২২) রাবণের দুইটি বাহুরই বর্ণনা রয়েছে। পরবর্তীতে রাবণ ও সুগ্রীবের যুদ্ধে রাবণ দুই হাতে সুগ্রীবকে ধরে মাটিতে আছাড় মারেন—

বাহুভ্যামাক্ষিপত্তলে (যুদ্ধকাণ্ড, ৪০/১৩)

অতএব অনুমান করা যায়, মূল কাহিনিতে রাবণের দুই হাতই ছিল। ‘দশগ্রীব’ শব্দের প্রকৃত অর্থ না বুঝে পরবর্তী সংযোজকরা তাকে বিশ বাহুযুক্ত করে তুলেছেন। দশমস্তকের প্রসঙ্গে বুলকে লিখেছেন— “রাবণের দশটি মস্তক ছিল... এমন বর্ণনা যেমন পাওয়া যায়, তেমনই অনেক স্থানে তার একটিমাত্র মস্তকের উল্লেখও রয়েছে। ‘দশগ্রীব’ শব্দটি প্রথমে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল (অর্থাৎ যার গ্রীবা দশজন সাধারণ মানুষের সমান শক্তিশালী), পরে তা আক্ষরিক অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে।” (Ramkatha: Utpatti aur Vikas, পৃ. ৯৩, অনুচ্ছেদ ১১২, সংস্করণ ২০০৪)

এরপর Vasudev Sharan Agrawal-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বুলকে অথর্ববেদের একটি মন্ত্র উল্লেখ করেছেন—

ব্রাহ্মণো জজ্ঞে প্রথমো দশশীর্ষো দশাস্যঃ।

স সোমং প্রথমঃ পপৌ স চকারারসং বিষম্ ॥ (৪/৬/১)

এবং লিখেছেন— অথর্ববেদে এক ‘দশাস্য’ (দশমুখ) ও ‘দশশীর্ষ’ ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে, যা রাবণের রূপকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে—এটি অসম্ভব বলা যায় না।

বুলকের এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে Ram Vilas Sharma তাঁর ‘রামকথা এবং ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়’ প্রবন্ধে লিখেছেন— অথর্ববেদের এই মন্ত্রেও রূপক অর্থই নিহিত, যেমন সাতভালেকরের টীকায় বলা হয়েছে— “শীর্ষ শব্দ বুদ্ধির এবং আস্য শব্দ বক্তৃতার প্রতীক; দশগুণ বুদ্ধিমান ও দশগুণ বিদ্বান—এই তার অর্থ।” এই ধরনের রূপকের সূচনা ঋগ্বেদের—

সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ (ঋগ্বেদ ১০/৯০/১)

—ইত্যাদি মন্ত্র থেকেই। কিছু পৌরাণিক ব্যাখ্যাতা এই রূপককে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে রাবণের এক মাথাকে দশটি এবং দুই হাতকে বিশটি করে তুলেছেন।

প্রক্ষেপসমূহের আলোচনা কেবল আধুনিক কালেই হয়েছে, এমন নয়। বেদান্ত দর্শনের দ্বৈতবাদ প্রবর্তক Madhvacharya (জন্ম—১১৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)-এর অপর নাম ‘আনন্দতীর্থ’। তিনি বেদান্তের উপর ‘পূর্ণপ্রজ্ঞ’ নামে ভাষ্য রচনা করেন। তাঁর আরেকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘মহাভারত-তাত্পর্য-নির্ণয়’। এতে তিনি লিখেছেন—

ক্বচিদ্গ্রন্থান্ প্রক্ষিপন্তি ক্বচিদন্তরিতানপি।
কুর্যুঃ ক্বচিচ্চব্যত্যাসং প্রমাদাৎ ক্বচিদন্যথা ॥৩॥
অনুৎসন্না অপি গ্রন্থা ব্যাকুলা ইতি সর্বশঃ।
উৎসন্নাঃ প্রায়শঃ সর্বে কোট্যংশোপি ন বর্ততে ॥৪॥ (২/৩–৪)

এর অর্থ এই যে— “প্রক্ষেপকারীরা কেবল নতুন শ্লোক রচনা করে মূল গ্রন্থে সংযোজনই করেন না, বরং বহু মূল শ্লোক (পাঠ) অপসারণও করেন। কোথাও কোথাও মূল শ্লোকের কিছু অংশ পরিবর্তন করে তার স্থলে নিজেদের রচিত পাঠ সংযোজন করেন। এর ফলে প্রাচীন গ্রন্থকারদের রচনায় ব্যাপক বিকৃতি (উলটপালট বা বিপর্যয়) ঘটেছে।” এই কারণেই রামায়ণ ও মহাভারতের মূল কাহিনিতে অনৈতিহাসিক, প্রত্যক্ষ প্রমাণবিরোধী এবং সৃষ্টিক্রমবিরোধী অসম্ভব ঘটনার আধিক্য দেখা যায়, যার ফলে বহু বিদ্বান এই কাহিনিগুলিকে কবিকল্পিত বলে মনে করেন।

রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণ

১. পশ্চিমী সংস্করণ—নির্ণয় সাগর প্রেস (১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) এবং Gujarati Printing Press (১৯১২–১৯২০) থেকে প্রকাশিত। এটি দাক্ষিণাত্য পাঠের প্রতিনিধিত্ব করে এবং অধিক প্রচলিত।

২. দাক্ষিণাত্য সংস্করণ—সম্পূর্ণ দাক্ষিণাত্য পাঠ, কুম্ভকোণম ও মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত।

৩. পূর্বোত্তরীয় (বঙ্গীয়) সংস্করণ—Gasper Gorresio (প্যারিস) সম্পাদিত; ‘গৌড়ীয় সংস্করণ’ নামেও পরিচিত; Calcutta Series থেকে প্রকাশিত।

৪. পশ্চিমোত্তরীয় সংস্করণ—D.A.V. College, Lahore থেকে পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত, পণ্ডিত রামলভায়া এবং পণ্ডিত বিশ্ববন্ধু শাস্ত্রী সম্পাদিত।

৫. আলোচনামূলক সংস্করণ (Critical Edition)—Baroda-এর Maharaja Sayajirao University-এর Oriental Institute-এর পণ্ডিতগণ প্রায় দুই সহস্র পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে ১৯৬০–১৯৭৫ সালের মধ্যে সাত কাণ্ডে প্রকাশ করেন।

প্রচলিত সংস্করণে ৭ কাণ্ড, ৬৪৫ সর্গ এবং ২৪,০৪৯ শ্লোক পাওয়া যায়; কিন্তু Baroda Critical Edition-এ ৭ কাণ্ড, ৬০৬ সর্গ এবং ১৮,৭৬৬ শ্লোক প্রকাশিত হয়েছে।

ঈসা-পরবর্তী তৃতীয় শতকের গ্রন্থ Abhidharma Mahāvibhāṣā-তে রামায়ণের উল্লেখ আছে, যেখানে বলা হয়েছে—‘Ramayana’ নামক গ্রন্থে ১২,০০০ শ্লোক রয়েছে। এর অর্থ এই যে সেই সময়ে রামায়ণের আকার বর্তমানের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ছিল; অতএব ‘আদি রামায়ণ’-এ শ্লোকসংখ্যা আরও কম ছিল। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে Śrīmad-Valmīkiya-Rāmāyaṇam (শোধিত) গ্রন্থের সম্পাদক Śrī Niranjanlal Mangal মূল শ্লোকসংখ্যা ৩৬০৭ নির্ধারণ করেছেন এবং সেই অনুযায়ী প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে যুদ্ধকাণ্ডই উত্তরকাণ্ড, পৃথক উত্তরকাণ্ড নেই। এই অনুযায়ী ৬ কাণ্ড, প্রতি কাণ্ডে ২৪ সর্গ এবং প্রতি সর্গে ২৪ শ্লোক।

রামায়ণের গবেষণামূলক উপস্থাপনার বহু প্রচেষ্টা পূর্বে হয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশক ‘সংক্ষিপ্ত Ramayanam’ প্রকাশ করেছেন। Arya Samaj-এর ক্ষেত্রে Brahmachari Akhilanand প্রক্ষিপ্ত শ্লোকগুলি পৃথকভাবে চিহ্নিত করে প্রকাশ করেন। মহামহোপাধ্যায় আর্যমুনি-র ‘রামায়ণার্য ভাষ্য’, শ্রিপাদ দামোদর সাতভালেকর-এর টীকা, পণ্ডিত প্রেমচন্দ্র শাস্ত্রী সম্পাদিত সংস্করণ, স্বামী জগদীশ্বরানন্দ সরস্বতীর প্রচেষ্টা, ঈশ্বরীপ্রসাদ প্রেম-এর ‘শুদ্ধ রামায়ণ’—এসব উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্বামী ব্রহ্মমুনি-র ‘রামায়ণ দর্পণ’ এবং স্বামী জগদীশ্বরানন্দ-এর ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম’ গ্রন্থ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে উপস্থাপিত ‘Ramayan Sandarshika’ গ্রন্থটি তরুণ পণ্ডিত যশপাল-এর গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার ফল। লেখক রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ধারণার খণ্ডন করে যুক্তি ও প্রমাণসহ সঠিক সমাধান উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন সংস্করণ ও পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি যে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই নতুন গ্রন্থ নিঃসন্দেহে রামায়ণ বিষয়ক সাহিত্যে সমৃদ্ধি আনবে এবং রামায়ণপ্রেমী পাঠকদের আনন্দ প্রদান করবে।

বাল্মীকী রামায়ণে প্রক্ষেপ, বিকৃতি, ভ্রান্তি ও নানা সমস্যা বিদ্যমান। গ্রন্থকার শ্রী যশপাল কিছু গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিজনক প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ভ্রান্তিগুলিকে দূর করার একটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা করেছেন। প্রক্ষেপ চিহ্নিত করার জন্য তিনি রামায়ণের পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন সংস্করণ, Critical Edition, পুরাণ এবং প্রাচীন টীকাকারদের পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে ‘পারস্পরিক বিরোধ’-কে ভ্রান্তি-নিরসনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোথাও কোথাও বেদমন্ত্র, মনুস্মৃতি এবং Dayananda Saraswati ও পাশ্চাত্য লেখকদের মতামতের দ্বারা নিজের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন।

✍️ সূত্র: 📕রামায়ণ সন্দর্শিকা
ডঃ জ্বলন্তকুমার শাস্ত্রী, বৈদিক বিদ্বান,
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সংস্কৃত বিভাগ,
রণবীর রণঞ্জয় স্নাতকোত্তর মহাবিদ্যালয়,
আমেঠি–২২৭৪০৫ (উত্তর প্রদেশ)
প্রাক্তন সম্পাদকঃ ‘বৈদিক পথ’ (মাসিক)।
Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

বালী বধ- ছল দ্বারা বা বল দ্বারা?

  বালী বধ :- ছল দ্বারা বা বল দ্বারা? অনেকে বলেন যে শ্রীরাম কাপুরুষদের ন্যায় লুকিয়ে বালীর বধ করেছেন, যদি বীর হতেন তবে লুকিয়ে বধ কেন করতেন? বা...

Post Top Ad

ধন্যবাদ