“যম–যমী সূক্ত”-এর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
বাস্তবতঃ সূর্য থেকে ঊষা ও দিনের উৎপত্তি হওয়ার কারণে তাঁদের সূর্যের পুত্র ও কন্যা বলা হয়। রাত্রি—
১–দ্রষ্টব্য: নিরুক্ত ১২.১.১০ এবং বৃহদ্-দেবতা।।
এভাবেই করা হয়েছে। যেখানে ‘যম’ শব্দটি দ্বারা স্ত্রীভাব নয়, বরং বোনের অর্থ বোঝাবে, সেখানে পূর্বোক্ত সূত্র অনুযায়ী ‘ডীষ্’ প্রত্যয় না হয়ে “অজাদ্যষ্টাপ্” সূত্র অনুসারে ‘টাপ্’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘যমা’ পদ গঠিত হবে, ‘যমী’ নয়। যেমন— ‘গোপ’-এর স্ত্রী হলে তিনি ‘গোপী’ নামে পরিচিত হবেন, আর যদি বোন হন তবে তিনি ‘গোপা’ হবেন। অতএব যম–যমী স্বামী–স্ত্রীই, ভাই–বোন নন। পারসীমতেও যম-এর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী যমির-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
বেদের তত্ত্বজ্ঞ, অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীও যম–যমীকে স্বামী–স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। তিনি সত্যার্থ প্রকাশ-এর চতুর্থ সমুল্লাসে উল্লেখ করেছেন যে, স্বামী সন্তান উৎপাদনে অসমর্থ হলে, এই সূক্তের দশম মন্ত্রের মাধ্যমে স্ত্রীকে আদেশ দেওয়া হয়েছে—
“হে সৌভাগ্যের কামনাকারিণী! তুমি আমার থেকে (অন্যম্) অন্য স্বামীর কামনা কর, কারণ এখন আমার দ্বারা সন্তানোৎপত্তির আশা করো না।”
এই ভিত্তিতেই নিরুক্তভাষ্যে চন্দ্রমণি পালীরত্ন এবং অন্যান্য বৈদিক বিদ্বানরা এই সূক্তের উপরোক্ত ত্রাশয়মূলক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। আমাদের কাছেও সেই প্রকার ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য; তবুও আমরা আচার্য বিশ্বেশ্বরের ভিত্তিতে এই সূক্ত—
১—ভ্রষ্টাধ্যায়ী ৪.১.৪
২—দ্রষ্টব্য: ঋগ্বেদ পর এক ঐতিহাসিক দৃষ্টি — পণ্ডিত বিশ্বেশ্বরনাথ রেক, পৃষ্ঠা ১৭৪।
৩— “অন্যমিচ্ছস্বসুভগে পতিমত্” ॥ ঋক্ ১০.১০.১০ ॥
৪—সত্যার্থ প্রকাশ, সমুল্লাস ৪, পৃষ্ঠা ১৭২, রামলাল কপুর ট্রাস্ট, সন ১৬৭২
…এর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। বেদমন্ত্রের আধিভৌতিক, আধিদৈবিক এবং আধ্যাত্মিক—এই তিন প্রকার ব্যাখ্যাই বিদ্বানদের দ্বারা স্বীকৃত; অতএব এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে সুবুদ্ধ পাঠকরাও আধ্যাত্মিক রস আস্বাদন করতে পারবেন।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী— ‘বিবাসয়তি নাশয়তি প্রলয় কালে বিশ্বং বিবস্বান্ পরমেশ্বরঃ’; অর্থাৎ প্রলয়ের সময় সমগ্র সংসারের উচ্ছেদকারী পরমেশ্বরই বিবস্বান্। সেই পরমেশ্বরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে পুরুষ (জীব) এবং প্রকৃতি—এই দুইই যম ও যমী। এদের আকর্ষণ ও বিকর্ষণের সুন্দর চিত্রই উপরোক্ত সূক্তে উপস্থাপিত হয়েছে। ঊষা সূক্তের ন্যায় এই সূক্তেও প্রকৃতির মানবীকরণ করা হয়েছে। সেখানে যেমন ঊষাকে মানবসদৃশ ক্রিয়াকলাপযুক্ত রূপে দেখানো হয়েছে, এখানেও তেমনই করা হয়েছে।
সাংখ্যকারিকায় ঈশ্বরকৃষ্ণ প্রকৃতিকে নর্তকীর রূপে উপস্থাপন করেছেন। আরেকটি কারিকায় প্রকৃতিকে কুলবধূর থেকেও অধিক সুকুমার বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
১—দ্রষ্টব্য: ঋগ্বেদ ৩.৬১ প্রভৃতি সূক্ত।।
২— “রঙ্গস্য দর্শয়িত্বা নিবর্ততে নর্তকী যথা নৃত্যাত্। পুরুষস্য তথাত্মানং প্রকাশ্য নিবর্ততে প্রকৃতিঃ।” ।। সাংখ্যকারিকা ৫৬ ।।
যেমন রঙ্গমঞ্চে নৃত্য প্রদর্শন করে নর্তকী নৃত্য থেকে নিবৃত্ত হয়ে যায়, তেমনি প্রকৃতিও পুরুষকে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করে নিবৃত্ত হয়ে যায়।
৩— “প্রকৃতেḥ সুকুমারতরং ন কিঞ্চিদস্তীতি মে মতিঃ। যা দৃষ্টাস্মীতি ন পুনর্দর্শনমুপাতি পুরুষস্য।” ।। একই, ৬১ ।।
এই যম–যমী সূক্তেও যমী রূপে প্রকৃতি পুরুষকে নিজের সঙ্গে আবদ্ধ করতে চায়। সে পুরুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এই কারণেই তাকে ‘যমী’ বলা হয়েছে। পুরুষকে নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখাতেই প্রকৃতির সার্থকতা। রূপকে দেখার মতো কেউ না থাকলে সেই সৌন্দর্যেরই বা মূল্য কী? অরণ্যে ফুটে থাকা কোনো ফুল যদি কারও চোখকে আকৃষ্ট করতে না পারে, তবে তার থাকা আর না-থাকা সমান। যেমন স্ত্রী নিজের স্বামীকে বৈরাগী হয়ে যাওয়া পছন্দ করে না, তেমনই প্রকৃতিও চায় যে পুরুষ সর্বদা আমার ইশারায় চলবে, আমার দাস হয়ে থাকবে। সে কখনোই আমার থেকে পৃথক হবে না।
অন্যদিকে, প্রকৃতির প্রকৃত স্বরূপ যিনি জানেন, সেই পুরুষ তার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চান। তিনি জানেন—প্রকৃতির সান্নিধ্যের ফল হলো জন্ম-জন্মান্তর ধরে চলা বন্ধন। আমার স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া হবে, থেকে যাবে পরাধীনতার ভারী শিকল। এই মিষ্টি স্বাদের ফল হবে তিক্ত। বিনা মূল্যে আমার ওপর সওয়ার হবে এই প্রকৃতি। একদিন এই বিশ্ব-বাটিকায় ফুলের পাপড়ির মতো আমি ম্লান হয়ে যাব। তখন আর আমার রূপের প্রশংসাকারী ভ্রমর থাকবে না, আর আমার কাছে মকরন্দলোভী মৌমাছিরাও ভিড় করবে না। শীর্ষহীন হয়ে আমি পৃথিবীর কোলে ছড়িয়ে পড়ব এবং মাটির সঙ্গে মিশে মাটিই হয়ে যাব। পুরুষ-স্বরূপ ভুলে যাব, আর নিজেকে ভাবতে শুরু করব প্রকৃতির তৈরি এক পুতুল।
আমি এমন ভুল করব না। আমি পুরুষ—প্রকৃতির শাসক, তার স্বামী। আমি নিজের সেই স্বরূপ ভুলব না, করব না প্রকৃতির সঙ্গ। এই সংসারে পদ্মপাতার ন্যায় সংসার-সাগরে অবস্থান করেও তার স্পর্শ থেকে পৃথক থাকব। আর অনেকেই আছে, যারা এর রূপের লোভী—প্রকৃতি তাদের কাছেই যাক, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখুক।
প্রকৃতি ও পুরুষের এই দ্বন্দ্বই এই সূক্তে প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞ পাঠকগণ পাঠ করুন, রস আস্বাদন করুন, শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং প্রকৃতিজয়ী পুরুষ হয়ে নিজের পৌরুষের পরিচয় দিন। এখন সূক্তের মন্ত্রসমূহ ও তাদের অর্থের অবলোকন করুন—
শ চিত্ সখায়ং সখ্যা ববৃত্যাং, তিরঃ পুরু চিদর্ণবং জগন্বান্।
পিতুর্নপাতমা দধীত বেধা, অধি ক্ষমি প্রতরং দীধ্যানঃ।।
।।ঋক্ ১০.১০.১।।
এই মন্ত্রের দেবতা যমী—অর্থাৎ পুরুষকে নিয়ন্ত্রণকারী প্রকৃতি। জীব ও প্রকৃতির সংযোগ থেকেই সংসারপ্রবাহ চলতে থাকে। প্রকৃতির বন্ধন থেকে মুক্তিই জীবের মোক্ষ। প্রকৃতি যেন পুরুষকে নিজের সঙ্গে আবদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষায় বলে—
তিরঃ—বহুবিধ দুঃখদায়ক অবস্থা, অর্থাৎ আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক—এই তাপত্রয়ে পূর্ণ
পুরু-পর্বম্—এই বিশাল সংসার-সাগরে জগন্বান্—গমনকারী, অর্থাৎ ফেঁসে থাকা এই বেধা—বিবিধ কর্মসম্পাদনকারী পুরুষ প্রতরম্—এই সংসার থেকে পার হওয়ার দীধ্যানঃ—ধ্যান বা কামনা করতে থাকা অবস্থায়, ( অধি ক্ষমি )—এই সংসারে পিতুঃ—সংসারপ্রবাহ রক্ষাকারী নপাতম্—কর্মজালের পতন, অর্থাৎ উচ্ছেদ মা দধীত—যেন না ঘটিয়ে ফেলে। অতএব আমি—প্রকৃতি—সখায়ং চিত্—আমার নিজের সখা জীবকে সখ্যা—মৈত্রীভাব দ্বারা আবৃত্যাম্—আবৃত করে, অর্থাৎ নিজের বিস্তার ছড়িয়ে এই জীবকে ফাঁসিয়ে রাখি।
এই বিস্তীর্ণ বিশ্বে নানারকম বক্রতা আছে। কোথাও অন্যান্য প্রাণীর সংস্পর্শে উৎপন্ন দুঃখ, কোথাও মন, ইন্দ্রিয় ও দেবশক্তির দ্বারা—জল, শীত, গ্রীষ্ম প্রভৃতির আধিক্য বা হ্রাসজনিত দুঃখ; আবার কোথাও অজ্ঞানজনিত আধ্যাত্মিক ক্লেশ। জীব এসবের মধ্যে ঘিরে থাকে। সে যেন কখনো এসব থেকে বিরক্ত হয়ে এর পারাপারের কথা না ভাবে এবং নিষ্কাম কর্মের দ্বারা এই সংসারপ্রবাহ চালিয়ে রাখা কর্মজাল কেটে এর বাইরে বেরিয়ে না আসে—এই কারণে আমার কর্তব্য হলো, মৈত্রীভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে তাকে এই অনুভূতি করানো যে, তার সর্বাধিক হিতৈষী বন্ধু আমি—কেবল আমি, প্রকৃতিই। আমার থেকে দূরে গেলে সে আর কোথায় এমন প্রেমময় বন্ধু পাবে—এই ভাব তার মস্তিষ্কে দৃঢ় করে তাকে আমার সঙ্গে আবদ্ধ করে রাখাই যেন প্রকৃতির অভিপ্রায়।
কিন্তু পুরুষ প্রকৃতির প্রকৃত স্বরূপ জেনে ফেলেছে। তার সামনে এমন বহু বীর পুরুষের দৃষ্টান্ত আছে, যারা নিজেদের প্রকৃতির সঙ্গ থেকে অক্ষত রেখেছে। অতএব সে এই মন্ত্রের প্রত্যাখ্যান করে বলে—
২— পাতি সংসারপ্রবাহমিতি পিতা কর্মসমূহস্তস্য।
ন তে সখা সখ্য বষ্ট্যেতৎ সলক্ষ্মা যদিষুরূপা ভবতি।
মহস্পুত্রাসো অরসুরস্য বীরাঃ দিবো ধরতার উবিয়া পরিখ্যন্ ॥
।।ঋক্ ১০.১০.২।।
তে সখা—হে প্রকৃতি, তোমার সহচর আমি— এতৎ সখ্যম্—এই মৈত্রী বা বন্ধন ন বষ্টি—চাই না, যত্—কারণ সলক্ষ্মা—সমান লক্ষণযুক্ত হয়েও তু বিষুরূপা ভবতি—তুমি শেষপর্যন্ত বিষম রূপ ধারণ কর।
অর্থাৎ প্রথমে তুমি নিজের মতোই সুখদায়িনী বলে মনে হলেও, পরিণামে তুমি দুঃখদায়িনী হয়ে ওঠ।
মহস্পুত্রাসঃ—মহান প্রভুর পুত্র, অর্থাৎ উপাসকগণ, অসুরস্য বীরাঃ—আসুরী শক্তির উপর বিজয়ী বীরেরা, দিবঃ ধরতারঃ—দিব্য জ্ঞান ধারণকারী ব্যক্তিগণ, উবিয়া—এই বিশাল
প্রকৃতি–পুরুষ সংযোগকে পরিখ্যন্—পরিত্যাগ করে দেন।
মুমুক্ষু জীবকে নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখার যে স্বপ্ন প্রকৃতির ছিল, তা পূর্ণ হয় না। কারণ জীব জানে—যে প্রকৃতি স্বভাবত নিজের মতোই মনে হয়, সেই প্রকৃতিই পরিণামে তাকে বৈষম্য ও দুঃখের মধ্যে নিক্ষেপ করে। প্রকৃতির সংসর্গেই স্বভাবত পবিত্র ও নিষ্পাপ জীবের এই দশা হয়েছে—সে নানা দুঃখে জর্জরিত হয়ে বহু যোনিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তদুপরি, তার সামনে এমন বহু বৈদিক মন্ত্র বিদ্যমান, যা তাকে প্রেয়মার্গ থেকে শ্রেয়মার্গের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়।
এই মন্ত্রে শ্রেয়মার্গে অগ্রসর হওয়ার তিনটি উপায় বর্ণিত হয়েছে।
প্রথমত—মানুষকে মহান প্রভুর পুত্র, অর্থাৎ উপাসক হয়ে উঠতে হবে (মহস্পুত্রাসঃ)। মহান প্রভুর ভক্তের লক্ষ্যও মহান হওয়া উচিত। দ্বিতীয় উপায়—আসুরী শক্তির উপর নিরন্তর বিজয় অর্জন করা (অসুরস্য বীরাঃ)। নিজের মনে আসুরী ভাবকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থান না দেওয়া। যেমন বীরেরা সীমান্ত রক্ষা করে এবং শত্রুভাবাপন্ন কাউকে নিজেদের সীমানায় প্রবেশ করতে দেয় না, তেমনই নিজের অন্তঃকরণকে আসুরী প্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করতে হবে—তাদের কাছে ঘেঁষতেও দেওয়া যাবে না।
তৃতীয় উপায়—দিব্য জ্ঞান ধারণ করা (দিবঃ ধরতারঃ)। যতক্ষণ না প্রকৃতি, পুরুষ ও পরমেশ্বরের যথার্থ জ্ঞান হয়, ততক্ষণ মানুষ প্রকৃতির আকর্ষণীয় পাশ থেকে মুক্ত হতে চায় না; আর তখন তার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কামনাও জাগে না।
এখানে এটাও বোঝানো হয়েছে যে, প্রকৃতির জাল অত্যন্ত বিস্তৃত। মুমুক্ষুকে সদা সতর্ক থাকতে হবে, নচেৎ মোহ, লোভ ইত্যাদির কোন জাল ছুড়ে দিয়ে কখন যে এই জীবকে ফাঁসিয়ে ফেলবে—তা বলা যায় না॥২॥
পুরুষের এই উত্তরে প্রকৃতি নিরাশ হয় না; বরং আবার তাকে বোঝাতে গিয়ে বলে—
উশন্তি ঘা তে অমৃতাস এতদ্ একস্য চিত্ ত্যজসং মর্ত্যস্য।
নি তে মনো ভনসি ধ্যাস্পস্মে জন্যুঃ পতিস্তন্বমা বিবিশ্যাঃ ॥
।।ঋক্ ১০.১০.৩।।
একস্য চিত্ মর্ত্যস্য—কোনো এক মানবের, অর্থাৎ গুটিকয়েক ব্যক্তির জন্য ত্যজসম্—ত্যাগযোগ্য এই প্রকৃতি–পুরুষ সংযোগকে ঘ উশন্তি—অনেকেই কামনা করে। তবু তারা অমৃতাসঃ—অমর, অর্থাৎ অমৃতভোগীই থেকে যায়, অর্থাৎ …গৃহস্থরাও মোক্ষমার্গের পথিক হতে পারেন। অস্মে—এই সত্যটি
তে মনঃ—তোমার মনকে, অর্থাৎ হে পুরুষ, মনসি নিধায়ী—মনে স্থিরভাবে ধারণ করা উচিত, ভালোভাবে বুঝে নেওয়া উচিত। অতএব তুমি জন্যুঃ—সংসারের উপাদান-কারণ এই প্রকৃতি’র
পতিঃ—স্বামী হয়ে তত্ত্বম্—আমার সঙ্গে আবিবিশ্যাঃ—নিজের স্বরূপ মিলিয়ে দাও; অর্থাৎ আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যাও, আমাকে ও নিজেকে পৃথক বলে ভাবো না।
প্রকৃতির পক্ষ থেকে মুমুক্ষুর সামনে আরেকটি যুক্তিপূর্ণ প্রলোভন এই যে—সমগ্র বিশ্বের মানুষের দিকে তাকালে দেখা যাবে, অতি অল্প কয়েকজনই প্রকৃতির প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছে; সাধারণ লোকপ্রবাহ তো তার দিকেই ধাবিত। তাছাড়া যারা তার সংস্পর্শে আছে, তারা অমৃতস্বরূপ সুখ ভোগ করছে, এবং বহু গৃহস্থও সাধনা করে মোক্ষের অধিকারী হয়েছে। অতএব তুমিও এই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশে যাও, আমার স্বামী হয়ে আমার সঙ্গে নিজের স্বরূপ এক করে দাও। সংসার ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়াতেই বা কী লাভ? এই জ্ঞানের পূর্বে তুমিও তো প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেই ছিলে; তবে এখন সেই সম্পর্ক কেন ছিন্ন করতে চাও? ॥৩॥
১. জনয়তি যা সা জন্যা প্রকৃতিঃ। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে—
“বহ্বীঃ প্রজাঃ সৃজমানাঃ সরূপাঃ।” অর্থাৎ প্রকৃতিকে নিজের সদৃশ বহু প্রজার উৎপাদক বলা হয়েছে; সেখানে তাকে ‘প্রজা’ বলা হয়েছে, আর বেদে একই অর্থে ‘জন্যা’ বলা হয়েছে। (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪.৫)
পুরুষ প্রকৃতির এই তর্ক স্বীকার করে যে—আমরা উভয়ে দীর্ঘকাল একসঙ্গে ছিলাম; কিন্তু সে তার ত্রুটিগুলোর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেগুলো উপেক্ষা করা পুরুষের পক্ষে সমীচীন নয়—
ন যৎ পুরা চক্রমা কদ্ধ, নূনমৃতা বদন্তো অনৃতং রপেম।
গন্ধর্বোऽপ্স্বপ্যা চ যোষা সা, নো নাভিঃ পরমং জামি ত্নৌ ॥
।।ঋক্ ১০.১০.৪।।
কদ্ধ নূনম্—আসলে কীভাবে আমরা, ঋতা বদন্তঃ—সত্য ভাষণ করতে করতে,
অনৃতং রপেম—এই অসত্য বলি যে, যৎ—যে আমরা পুরা ন চক্রম—পূর্বে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করিনি? এতদিন তো আমরা সংসারী পুরুষ রূপে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্তই ছিলাম আমি অপ্সু কর্মজালে, গন্ধর্বঃ—নিজের ইন্দ্রিয়সমূহ ধারণকারী ও তাদের কাজে নিয়োজিত হয়ে ছিলাম। কিন্তু আমি এটা লক্ষ্য করেছি যে—এই প্রকৃত যোষা—পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয় ও বিচ্ছিন্নও হয়, দুঃখের জালে ফাঁসায়, এবং অপ্যা—কর্মজন্য; অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত দেহ, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি তত্ত্ব কর্মানুসারে শুভ বা অশুভ রূপে লাভ হয়। এইভাবে সা—সে প্রকৃতি নঃ—আমাদের পুরুষদের নাভিঃ—বন্ধনের কারণ। তৎ—এই …
১. অপ্সু—কর্মসমূহে; ‘অপ্’ শব্দটি কর্মের বাচক (নিরুক্ত)।
২. গাম্ ইন্দ্রিয়াণি ধরতীতি গন্ধর্বঃ।
৩. যুনক্তি মিশ্রয়তি পরমিশ্রয়তি সাদয়তি চ সা যোষা।
৪. নাভিঃ—বন্ধন।
বন্ধনের কারণেই আমরা দু’জন—প্রকৃতি ও পুরুষ—
পরমং জামী—অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত।
যম অর্থাৎ মুমুক্ষু পুরুষ বলে—এ কথা বলা সত্য হবে না যে আমরা কখনো প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ রাখিনি। শ্রেয়মার্গের পথিক হওয়ার পূর্বে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্তই ছিলাম। কিন্তু তত্ত্বজ্ঞান লাভের পর আমরা বুঝেছি যে প্রকৃতি সংযোগ ও বियोग—উভয়েরই কারণ। সে বারবার মিলিত হয় এবং বিচ্ছিন্ন হয়। মিলনে মোহ সৃষ্টি করে, বিচ্ছেদে শোক। আবার প্রকৃতি থেকে আমরা যা কিছু পাই, তা সবই কর্মফলের রূপে পাই। কর্ম যদি শুভ না হয়, তবে এই প্রকৃতিই আমাদের জন্য দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তার সংসর্গই আমাদের বন্ধনের মূল কারণ। বন্ধন লোহার হোক বা সোনার—বন্ধন তো বন্ধনই। সোনার খাঁচায় আবদ্ধ পাখি কি বন্ধনের যন্ত্রণা অনুভব করে না? আমাদের দু’জনের একসঙ্গে থাকা মানেই আমার বন্ধন। অতএব এই বন্ধন আমার পছন্দ নয়; সেই কারণেই আমি প্রকৃতির সঙ্গও রাখতে চাই না।
প্রকৃতি দেখে যে তার তর্কে পুরুষ কিছুটা অভিভূত হয়েছে; তখন সে আবার আরেকটি তর্ক উপস্থিত করে। সেই তর্কটি হলো—সৃষ্টি প্রভৃতি পর্যায়ে প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগ পরমাত্মার দ্বারা জগতের প্রবাহ চালানোর উদ্দেশ্যে নির্ধারিত। প্রকৃতি প্রশ্ন করে—আপনি কি তবে পরমেশ্বরের সেই বিধানকেও সম্মান করেন না?
গর্ভে॒ নু নৌ॑ জনি॒তা দম্প॑তী কর্দে॒বস্ত্বষ্টা॑ সবি॒তা বি॒শ্বরূ॑পঃ ।
নকি॑রস্য॒ প্র মি॑নন্তি ব্র॒তানি॒ বেদ॑ নাব॒স্য পৃ॑থি॒বী উ॒ত দ্যৌঃ ॥ ঋক্ ১০.১০.৫॥
জনিতা—জগতের উৎপাদক ত্বষ্টা, অচেতন জগতের নির্মাতা; সবিতা—চেতন জগতের প্রেরক;
বিশ্বরূপঃ—সংসারকে নানারূপ দানকারী বা সর্বব্যাপী দেব, প্রকাশমান প্রভু— তিনি নু—নিশ্চয়ই
নৌ—আমাদের দু’জনকে গর্ভে—সৃষ্টির গর্ভকালে, অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে দম্পতী—সদা একসঙ্গে বসবাসকারী স্ত্রী–পুরুষের ন্যায় কঃ—এইরূপে সৃষ্টি করেছেন। অস্য—এই প্রভুর ব্রতানি—নিয়মসমূহ
ন কিঃ প্রমিনন্তি—কখনোই নিষ্ফল হয় না। নৌ—আমাদের দু’জনের অস্য—এই কর্তব্যকে পৃথিবী উৎ দ্যৌঃ—পৃথিবীর মতো সহনশীলা স্ত্রী এবং দ্যুলোকের মতো তেজস্বী পুরুষ—অর্থাৎ সকল নর–নারী
বেদ—জানেন।
মুমুক্ষুর সামনে প্রকৃতির পক্ষ থেকে যেন এই যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে যে—পরমাত্মা সৃষ্টির আদিতে আমাদের দু’জনকে সংসারপ্রবাহ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আপনি কি তবে প্রভুর সেই নিয়মও লঙ্ঘন করতে চান? মনে রাখবেন—প্রভু কখনোই কোনো নিয়ম বৃথা প্রণয়ন করেন না। তাঁর প্রতিটি নিয়মের পেছনে জগতের কোনো না কোনো মঙ্গল নিহিত থাকে। অতএব আপনাকে—
১. বিশ্বরূপঃ—এক রূপকে বহুরূপে প্রকাশকারী।
“একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং প্রতিরূপো বহিশ্চ।” — কঠোপনিষদ ৫.৬।
২. বিবাহ সংস্কারে পাণিগ্রহণের পর পুরুষ বলেন—
“দ্যৌরহং পৃথিবী ত্বং।” অর্থাৎ—হে নারী! আমি দ্যুলোক, আর তুমি পৃথিবী। (দ্রষ্টব্য: সংস্কারবিধি, বিবাহপ্রকরণ)
ওই নিয়ম ভাঙা সমীচীন নয়। বলো তো—কোন নর–নারী জানে না যে সংসার-প্রবাহ চালিয়ে রাখার জন্য যেমন স্ত্রী–পুরুষের মিলন প্রয়োজন, তেমনি প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনও অপরিহার্য?
টীকা—আমাদের এই কর্তব্যকে লোক ও পৃথিবী জানে—এই বক্তব্যটি কাব্যময় অলঙ্কারিক ভঙ্গিতে বলা হয়েছে। একে লক্ষণার্থে পুরুষ–স্ত্রী, অথবা পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে বসবাসকারী সমস্ত মানবসমাজ—এই অর্থে গ্রহণ করা যেতে পারে। ॥৫॥
যমী-প্রকৃতি পূর্ববর্তী মন্ত্রে এই কথা বলার পর যে—প্রভু আমাদের সৃষ্টির আরম্ভেই একসঙ্গে থাকার জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর কোনো নিয়মই লঙ্ঘিত হয় না—তবু আপনি কেন এমন কথা বলছেন—এই প্রশ্নের উত্তরে যম, অর্থাৎ নিবৃত্তিমার্গী পুরুষ, উত্তর দেন—
কো অত্য বেদ প্রথমস্যাহ্ম ক ঈ দদর্শ ক ইহ প্রবোচৎ ।
বৃহন্ মিত্রস্য বরুণস্যধাম কটু ত্রব গ্রহনো বীচ্যা নৃত্ ॥
।।ঋক্ ১০.১০.৬।।
প্রথমস্য—সৃষ্টি-রূপী দিনের পূর্ববর্তী, অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে এই পরমাত্মার সংকল্পকে কঃ বেদ—কে জানতে পারে? কঃ ঈ দদর্শ—কে তা প্রত্যক্ষ করেছে? জ্ঞান ও দর্শনের অভাবে ইহ—এই সংসারে
কঃ প্রবোচৎ—কে এই বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলতে পারে? মিত্রস্য বরুণস্য ধাম—সকলের মিত্র ও বরণীয় প্রভুর সৃষ্টিক্ষেত্র বৃহৎ—অত্যন্ত বৃহৎ ও বিস্তৃত। কটু ত্রব গ্রহনো বীচ্যা নৃত্—সীমিত শক্তিসম্পন্ন, দেহধারী, মরণশীল কোনো মানুষ কীভাবে এই রহস্য জানাতে পারে?
প্রথম মন্ত্রে যে কথা বলা হয়েছিল—সৃষ্টির গর্ভকালে, অর্থাৎ আদিতে, প্রকৃতি ও পুরুষ দম্পতির মতো একসঙ্গে ছিলেন এবং এই সত্য দ্যুলোক ও পৃথিবী জানে—এই বিষয়ে এই মন্ত্রে যম বলেন যে, সৃষ্টির আদিতে সংঘটিত সেই ঘটনাটি তখন কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় কেউ জানতে পারে না, কেউ তা দেখেনি এবং কেউই সেই বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারে না। কারণ দ্যুলোক প্রভৃতি তো সৃষ্টির রচনার পরেই উৎপন্ন হয়েছে। সেই প্রভুর বিশাল বিশ্বকে পরিমাপ করা যায় না; তাঁর ক্ষেত্র এতই বিস্তৃত যে সীমিত সামর্থ্যসম্পন্ন, মরণধর্মা মানুষ না নিজে তার জ্ঞান অর্জন করতে পারে, না অন্যকে তা করাতে পারে। অতএব আপনার এই বক্তব্য—যে প্রভু আদিসৃষ্টিতে আমাদের একসঙ্গে থাকার নিয়ম করে দিয়েছিলেন—কোনো দিক থেকেই সমীচীন নয়। তাই আমি আপনার সঙ্গে আবদ্ধ নই, আর আপনিও আমাকে নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখার আশা করবেন না।
নিবৃত্তিমার্গী পুরুষের এই উত্তর পেয়ে যমী—অর্থাৎ প্রবৃত্তিবৃত্তির প্রতিনিধিস্বরূপ প্রকৃতি—তার আক্রমণাত্মক ভঙ্গি পরিত্যাগ করে। এবার সে আপনত্ব প্রকাশ করে, নিজের কামনা জানিয়ে যমকে বলে—
১— অর্বাগ্ দেবাত্ স্য বিসর্জনেন ॥ ঋক্ ১০.১২৬.৬ ॥
“মা মধ্য মা বম্যং কাম ত্র্যপ্রাঙ্গন্তসমানে যোনী সহশেব্যায়।
জায়েব পত্যে তন্বংত রিরিচ্যাং বিচিত্র বহেব রথ্যেব চক্রা।”
॥ ঋগ্বেদ ১০.১০.৭ ॥
মায়ম্যম্—আমার (যমীর) মধ্যে কামঃ আগৎ—এই আকাঙ্ক্ষা উৎপন্ন হচ্ছে যে, যমস্য যমানে যোনৌ—যম অর্থাৎ পুরুষের সঙ্গে সমান স্থানে, সহশোয্যায়—একই শয্যায় শয়নের জন্য, জায়েব পত্যে—স্বামীর প্রতি স্ত্রীর মতো, তন্বং রিরিচ্যাম্—নিজেকে তোমার কাছে সম্পূর্ণরূপে অর্পণ করে দিই,
এবং বিচিত্র বহেব রথ্যেব চক্রা—যেন আমরা উভয়ে রথের দুই চাকার মতো হয়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগী হই।
নিবৃত্তি-মার্গের পথিকের মনে প্রকৃতির এই সমর্পণরূপও উপস্থিত হয়। যদি সে এই দিক থেকে সতর্ক না থাকে, তবে তার বৈরাগ্যের প্রদীপ নিভে যেতে পারে। যেন তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতি বলছে—তোমার দৃষ্টি কেবল নিজের ইচ্ছার প্রতিই নিবদ্ধ, আমার ইচ্ছার প্রতি একেবারেই নয়। তোমার আকাঙ্ক্ষা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার, কিন্তু আমার আকাঙ্ক্ষা এই যে—না তুমি আমাকে ত্যাগ করো, না আমি তোমাকে। বরং এই সংসাররূপী শয্যায় আমরা উভয়ে এমনভাবে একত্রে থাকি যেমন গৃহস্থ জীবনে স্বামী–স্ত্রী একসঙ্গে থাকে। আমি তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করি এবং তুমি সেই সমর্পণ গ্রহণ করো।
১— রিচ্ (বিযোজন সম্পর্চনয়ী)— (চুরাদিগণীয় ধাতু, সংখ্যা ১৮১৭)।
এইভাবে আমরা উভয়ে মিলিত হয়ে সংসার-প্রবাহকে সেইরূপেই পরিচালনা করি, যেমন রথের দুই চাকা একত্রে মিলেই রথকে সচল রাখে। রথ এক চাকার দ্বারা চলে না। দুটি চাকার মধ্যে একটি অকার্যকর হলে রথ চলতে পারে না। ঠিক তেমনই এই সংসাররূপী রথ প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনেই সচল হয়। এই সংসার-প্রবাহ অব্যাহত রাখার জন্য মুক্ত প্রকৃতি ও পুরুষের মিলন অপরিহার্য। অতএব, আমরা উভয়ে মিলিত হয়ে জগতের প্রবাহ চালিয়ে যাই— এর জন্য এটাই প্রয়োজন যে তুমি আমার সঙ্গ ত্যাগ না করো।
আমরা উভয়ে একসঙ্গে উদ্যোগী হলেই এই জগত্-রথ চলতে পারে।
উপরে বর্ণিত এই ভাবনা বারবার সাধকের মনে উদিত হয়ে তাকে বিচলিত করে তোলে। তার মনে এক প্রকার দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। তার বৈরাগ্যে দৃঢ় হয়ে থাকা পদচারণা টলমল করে ওঠে এবং সে প্রবৃত্তি-মার্গের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করে। কিন্তু তখনই তার অন্তরে জ্ঞানের উদয় হয়, তার টলতে থাকা পদযুগল অবলম্বন লাভ করে এবং সে চিন্তা করে—
“ন তিষ্ঠন্তি ন মিমিষন্ত্যেতে দেবানাং স্পশ ইহ যে চরন্তি।
অন্যেন মদাহনো যাহি তূয়ং তেন বিবৃহ রথ্যেব চক্রা।”
॥ ঋগ্বেদ ১০.১০.৮ ॥
ইহ—এখানে, অর্থাৎ মনের ভেতরে প্রবেশ করে তার গভীরতা অনুধাবন করতে আসা, য়ে স্পশঃ চরন্তি—যে সকল গুপ্তচরের ন্যায় সংসারিক প্রবৃত্তি কাজ করে, দেবানাম্—দিব্য প্রবৃত্তির সম্মুখে ন তিষ্ঠন্তি—স্থির থাকতে পারে না এবং ন নিমিষন্তি—চক্ষুপাতও করতে পারে না; অর্থাৎ তাদের উদয়–অস্তের ধারাবাহিকতাও লুপ্ত হয়ে যায়। অতএব অতঃ শ্রপ্রাহনঃ—হে সদ্ভাবনাশক প্রবৃত্তি, তূয়ম্—তুমি শীঘ্রই মৎ—আমার কাছ থেকে অন্যেন—অন্য কারো সঙ্গে যাহি—চলে যাও, এবং তেন—তার সঙ্গেই রথ্যা চক্রা ত্ব বিবৃহ—রথের চাকার মতো হয়ে সংসার-চক্র চালনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করো।
নিবৃত্তি-মার্গীর জন্য চিন্তনই সর্বোত্তম আশ্রয়। প্রবৃত্তিগুলি মনের ভেতরে প্রবেশ করে মুমুক্ষুর বৈরাগ্যের গভীরতা পরীক্ষা করে। এই কারণে দেবীসুলভ প্রবৃত্তির জাগরণ অপরিহার্য, নচেৎ তার বৈরাগ্যের প্রদীপ নিভে যেতে পারে। দিব্য প্রবৃত্তির সম্মুখে, তত্ত্বজ্ঞান ও সংসারিক ভোগের প্রতি বৈরাগ্যের সামনে এই সংসারিক প্রবৃত্তিগুলি স্থির থাকতে পারে না এবং নতুন কোনো প্রবৃত্তির জন্মও সম্ভব হয় না।
সাধক সচেতন। সে প্রকৃতির পাশের মধ্যে আবদ্ধ হয় না এবং প্রকৃতিকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় আমার থেকে পৃথক যে প্রবৃত্তিমার্গী, তার সঙ্গেই তুমি সম্পর্ক স্থাপন করো। তোমাকে কামনা করে এমন লোকের অভাব নেই। তাদের সঙ্গেই মিলিত হয়ে এই সংসার-প্রবাহ চালাও। আমার সঙ্গে তোমার সহাবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়— এ কথা স্পষ্টভাবে বুঝে নাও।
১— গ্রা সমন্তাৎ হন্তি বিনাশয়তি সঙ্গাবান্ বা সা ভ্রাহূনঃ।
প্রকৃতি বা প্রবৃত্তি, পুরুষের উপর নিজের প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে, যেন পরমাত্মার নিকট প্রার্থনা করছে— এই নিবৃত্তি-মার্গী পুরুষের বৈরাগ্যপ্রবণতা অপসারণ করে তাকে নিবৃত্তি-মার্গ থেকে সরিয়ে প্রবৃত্তি-মার্গের দিকে পরিচালিত করা হোক।
এই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে সে বলে—
“রাত্রিভিরস্মা গ্রহভির্দশস্থেত, সূর্যস্য চক্ষুমু হুরুন্মিমীয়াত্।
দিবা পৃথিব্যা মিথুনা সবন্ধূ, যমীর্যমস্য বিভুয়াদজামি।”
॥ ঋগ্বেদ ১০.১০.৬ ॥
রাত্রিভিঃ গ্রহভিঃ—কয়েকটি রাত ও দিন, অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই, অস্মে—এই মুমুক্ষুর এই প্রবৃত্তিকে পরমাত্মা দশস্থেত্—দংশিত অর্থাৎ বিনষ্ট করে দিন; এবং সূর্যস্য—তার পূর্বকালের জ্ঞানরূপী সূর্যের চক্ষুঃ—নয়ন উন্মিমীয়াত্—পুনরায় উন্মুক্ত হয়ে যাক, যাতে সে আবার আমার সংস্পর্শে আগ্রহী হয়। যেমন দিবা পৃথিব্যা—দ্যুলোকের সঙ্গে পৃথিবীর এবং পৃথিবীর সঙ্গে দ্যুলোকের মিথুনা সবন্ধূ—পারস্পরিক যুগল-সম্পর্ক রয়েছে; যদিও উভয়ের গুণ ও অবস্থান পরস্পরবিরোধী, তবুও তারা চিরকাল যুগলরূপেই বিরাজ করে। ঠিক তেমনি অজামি যমী—বিপরীত প্রবৃত্তিসম্পন্ন এই যমী প্রকৃতি যমস্য বিভুয়াত্—যম অর্থাৎ পুরুষকে ধারণ করুক, পুনরায় তার সঙ্গে সহাবস্থান করে তাকে রক্ষা করুক।
নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত পাঠানো অংশ একত্রিত করে, শৈলী অপরিবর্তন রেখে সম্পূর্ণ লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করা হলো।
উদ্ধৃতি ও দেবনাগরী অংশগুলি বাংলা বর্ণে উচ্চারণে দেওয়া হয়েছে।
কোনো অংশ বাদ দেওয়া হয়নি।
এই মন্ত্রে মনে হয়, প্রকৃতি পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে অসমর্থ হয়ে পরমাত্মার নিকট প্রার্থনা করছে—তিনি যেন এই মুমুক্ষুর বৈরাগ্যবৃত্তিগুলির বিনাশ করে দেন এবং তার সেই পূর্বস্মৃতি—যে স্মৃতিতে সে আমাকে প্রশংসা করত এবং সর্বদা আমার সঙ্গে থাকতে পারাকে নিজের পরম সৌভাগ্য মনে করত—পুনরায় জাগ্রত হয়ে ওঠে। তখন সে আবার ভাবতে শুরু করুক যে, যেমন গুণ ও অবস্থানের দিক থেকে পরস্পর দূরে অবস্থিত দ্যুলোক ও পৃথিবী কখনো একে অপরকে ত্যাগ করে না, বরং যুগলরূপে সর্বদা একসঙ্গে থাকে, ঠিক তেমনই আমরা দু’জন পরস্পর বিপরীত গুণের অধিকারী হয়েও একে অপরকে ধারণ করি—লালন করি।
প্রভুর কাছে প্রার্থনাই পরাজিত ব্যক্তির সর্বাধিক শক্তিশালী আশ্রয়।
নিজের সেই অস্ত্রই যেন প্রকৃতি ব্যবহার করে, পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার এই প্রার্থনাকে সফল করতে চায়।
মুমুক্ষু পুরুষ এর এক অত্যন্ত সুন্দর উত্তর দেয়। সে বলে—যখন এই তথাকথিত মঙ্গলময় মিলনের ফল সামনে আসে, তখনই বোঝা যায় যে এই মিলন আসলে কতটা দুঃখজনক পরিণতি বহন করে। অতএব সে বলে—
“আ ঘা তা উত্তরা যুগানি, যত্র জাময়ঃ কৃতবন্নজামি।
উপ ববৃহি বৃষভায় বাহুমন্য- মিচ্ছস্ব সুভগে পতিমত্।”
॥ ঋগ্বেদ ১০.১০.১০ ॥
তা—তানি—সেই সকল যুগানি—সময়, উত্তরা—উত্তরাণি—পরবর্তী পরবর্তী, আ ঘা—শীঘ্রই আরা—প্রাগমিষ্যন্তি—চলে আসবে, যত্র—যেখানে জাময়ঃ—আপন বলে মনে হওয়া প্রাকৃতিক ফাঁদসমূহ
অজামি—অসজাতীয়, অর্থাৎ পরের মতো আচরণ কৃতবন্ত্—করতে দেখা দেবে। সুভগে—হে চিরসৌভাগ্যশালিনী প্রকৃতি! বৃষভায়—কামনার বৃষ্টি ঘটানো প্রেয়োমার্গীর জন্য বাহুম্—নিজের বাহু, অর্থাৎ নিজের আকর্ষণের উপায় উপ ববৃহি—প্রসারিত করো, এবং মৎ—আমার পরিবর্তে অন্যম্—অন্য কোনো প্রবৃত্তিমার্গীকে পতিম্—স্বামী হিসেবে গ্রহণ করার ইচ্ছস্ব—কামনা করো।
পূর্ব মন্ত্রে প্রকৃতির এই কামনা—যে আমরা দ্যুলোক ও পৃথিবীর মতো মিলিত হয়ে থাকি—শুনে যম উত্তর দেয় যে, তোর সঙ্গে যে যুক্ত হবে, তার সামনে অদূর ভবিষ্যতেই এমন এক সময় আসবে, যখন সে উপলব্ধি করবে—যে প্রকৃতিকে সে আপনজন, প্রিয় ও কল্যাণকারী মনে করে তার ভোগে মত্ত ছিল, সেই প্রকৃতিই জীবের প্রতি পরের মতো, অসজাতীয়ের মতো আচরণ করেছে। রোগ, শোক ও দোষের মধ্যে ফেলে দিয়ে সেই প্রকৃতিই আমাদের অসহায়তার উপর হাসে। যেসব ভোগকে আমরা সুস্বাদু মনে করে ভোগ করছিলাম, প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজেরাই তাদের দ্বারা ভোগিত হচ্ছিলাম।
এরপর সে প্রকৃতিকে বলে—আপনি চিন্তা কেন করেন? আপনি তো চিরসুহাগিনী। যদি একজন আপনাকে ত্যাগও করে, তবে অসংখ্য মানুষ আপনাকে গ্রহণ করতে সদা প্রস্তুত। অতএব—
১— “ভোগে রোগভয়ম্।” — ভর্তৃহরি, বৈরাগ্যশতক।
২— “ভোগা ন ভুক্তা বয়মেব ভুক্তাঃ।” — একই গ্রন্থ।
আপনি আপনার অনুরাগীদের মধ্য থেকে অন্য কারও হাত ধরুন। এমন বহু মানুষ মিলবে যাদের আপনার কামনা আছে—তাদের দিকেই আপনার হাত বাড়ান, আমার পিছু (পিণ্ড) ছেড়ে দিন।
মুমুক্ষুকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে না পেরে প্রকৃতি এবার কঠোর ভর্ৎসনায় নেমে আসে। পুরুষকে নিজের দিকে টানার এটি আরেকটি উপায়—যা নারী প্রায়ই গ্রহণ করে থাকে।
এই মন্ত্রে এমন কিছু শব্দ রয়েছে, যা ভাষ্যকারদের যম-যমীকে ভাই-বোন বলে মানতে বাধ্য করেছে। সেই কারণেই তারা যম-যমীকে সগে ভাই-বোন ধরে নিয়ে বেদের গৌরব ক্ষুণ্ণকারী অর্থ করেছেন। সেই শব্দগুলি হল— ভ্রাতা, অনাথ এবং স্বসা। লৌকিক সংস্কৃতে এই শব্দগুলির অর্থ যথাক্রমে ভাই, যার নাথ/স্বামী নেই, এবং বোন। কিন্তু বেদের সমস্ত শব্দই যৌগিক এবং যোগরূঢ়ি। অতএব ভ্রাতা বা স্বসা—যে শব্দগুলি লোকভাষায় ভাই-বোন অর্থে ব্যবহৃত হয়—বেদে সেগুলি যথাক্রমে দীপ্তিমান হওয়া বা ভরণ-পোষণকারী—এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
১—যৌগিক শব্দ সেইসব শব্দ, যেগুলি ধাতুর অর্থ অনুসারেই গঠিত। যেমন ‘কর্তা’ শব্দে কৃ (ভুকৃঞ্ করণে) ধাতু এবং তচ্ প্রত্যয় রয়েছে। এই ধাতুর অর্থ ‘করা’; অতএব ‘কর্তা’-র অর্থও ‘করনকারী’ই হয়।
২—যে শব্দগুলি যৌগিক হয়েও কোনো একটি নির্দিষ্ট অর্থে রূঢ় হয়ে যায়, সেগুলিকে যোগরূঢ়ি বলা হয়। যেমন জলজ বা পঙ্কজ—এর অর্থ জল বা কাদা থেকে উৎপন্ন। যদিও জল বা কাদা থেকে বহু বস্তু উৎপন্ন হয়, তবু এই শব্দগুলি কমল অর্থে রূঢ় হয়ে গেছে; কাদা থেকে উৎপন্ন কীটকে পঙ্কজ বলা হয় না।
৩— ভ্রাজতে বিভাতি বা স ভ্রাতা — উনাদিকোষ।
ভর্তা শব্দটিও এই অর্থেই ব্যবহৃত হয়, যদিও লোকভাষায় তার অর্থ স্বামী। একইভাবে স্বসা পদটির অর্থ নিরুক্তকারেরা ব্যাখ্যা করেছেন— সু-আসা, স্বেষু সীদতি বা। নিরুক্তভাষ্যে স্বামী ব্রহ্মমুনি এর অর্থ করতে গিয়ে লিখেছেন— সু অসা অর্থাৎ যে সুসম্যকভাবে মেধার প্রক্ষেপ করে, সদ্ভাবের প্রেরণা দেয়; অথবা যে নিজের স্বজনদের মধ্যেই অবস্থান করে—যেমন কুলবধূ স্বামীর গৃহে অবস্থান করে, তুমিও তেমনই। অর্থাৎ, যে জ্ঞানযুক্ত পরামর্শ দেয়, সদ্ভাবের দিকে প্রেরণা জাগায়, অথবা স্বজনদের মধ্যেই বাস করে। স্ত্রী যেমন পুরুষকে সম্মতি দেয়, সদ্ভাবের দিকে প্রেরণা জাগায় এবং আজীবন স্বামীর গৃহে তার স্বজনদের মধ্যেই থাকে; কিন্তু বোন বিবাহের পর স্বামীর গৃহে চলে যায়। এইভাবে উপরিউক্ত নিরুক্তি এবং ‘স্বং প্রতি সরতি’—নিজের দিকেই আসে—এই ব্যুৎপত্তি অনুসারে বেদে স্বসা শব্দের অর্থ যেখানে প্রযোজ্য সেখানে স্ত্রীও হতে পারে। মন্ত্রার্থ নির্ধারণে এই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রাখা প্রয়োজন।
“কি ভ্রাতা সদ্ যদনাথং ভবাতি, কিমু স্বসা যন্নিঋতির্নিগচ্ছাত্ ।
কামসূতা বহ্য তদ্রপামি, তন্বা মে তত্ত্বং সম্পিপৃনিধি ॥ ঋ০ ১০.১০.১১ ॥”
অর্থ— কি ভ্রাতা সদ্—সে কি নিন্দিত ভর্তা (রক্ষক/পালক), যদ্ অনাথং ভবাতি—যে প্রেমবন্ধনহীন হয়ে পড়ে? কিমু স্বসা—তেমনি সে কি নিন্দিত রক্ষিকাও, যৎ নি-ঋতিঃ নিগচ্ছাত্—যার উপস্থিতিতেও রক্ষিত ব্যক্তি দুঃখ ভোগ করে? কামসূতা—সংসারচক্র চালানোর কামনায় প্রণোদিত হয়ে আমি প্রকৃতি বহ্য—বারংবার এতৎ—এই কথাই ব্রপামি—বলছি যে তন্বা মে—আমার দেহ থেকে, আমার স্বরূপ থেকে তত্ত্বং—নিজের দেহ-স্বরূপকে সম্পিপৃনিধি—সংযুক্ত করো; নিজের স্বরূপকে আমার থেকে পৃথক কোরো না।
প্রকৃতি যেন মানুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে করতে বলছে—পরমপিতা পরমাত্মা আদিসৃষ্টিতে জগত্-সঞ্চালনের জন্য আপনাকে ও আমাকে স্বামী-স্ত্রী রূপে প্রেরণ করেছিলেন। যেমন সন্তান-প্রবাহের জন্য স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে থাকা অপরিহার্য, তেমনই জগত্-প্রবাহ চালানোর জন্য আমার ও আপনার একত্র থাকা আবশ্যক। আপনি সেই নিয়ম পালনে উপেক্ষা প্রদর্শন করছেন। অতএব প্রেমবন্ধনহীন হওয়ার কারণে আপনাকে আর উত্তম স্বামী বলা যায় না। আমি নিজেকেও নিকৃষ্ট ও কুৎসিত রক্ষিকা বলে মনে করি—যার উপস্থিতিতেও আপনি নিজেকে অসুরক্ষিত ভাবতে শুরু করেছেন এবং সেই কারণেই আমাকে ত্যাগ করে পালাতে চাইছেন।
আরও একটি কথা আমি বলতে চাই—আপনার সঙ্গে বাঁধা পড়া বা আপনাকে নিজের সঙ্গে বাঁধার মধ্যে আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই; এতে কেবল সর্বহিতের ভাবনাই আছে। আমি তো কেবল সংসারচক্রের সঞ্চালনের কামনায় আপনাকে বারবার বলছি—আপনি আমার থেকে দূরে পালাবেন না; বরং আমার সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখুন, যাতে এই সংসারচক্র চলতে থাকে।
যম অর্থাৎ যতি—মুমুক্ষু, যমী—প্রকৃতি-প্রবৃত্তির এই ভর্ত্সনাপূর্ণ উপদেশেও প্রভাবিত হয় না। সে প্রকৃতির এই প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলে—
“ন বা উ তে তত্ত্বা তন্বং সং পপূচ্যাং, পাপমাহুর্যঃ স্বসারং নিগচ্ছাত্ ।
অন্যানেন মৎ প্রমুদঃ কল্পয়স্ব, ন তে ভ্রাতা সুভগে বষ্ট্যেতৎ ॥ ঋ০ ১০.১০.১২ ॥”
অর্থ— আমি যম—নিবৃত্তিমার্গী মুমুক্ষু—তে তত্ত্বা—তোমার দেহ থেকে, তোমার স্বরূপ থেকে তত্ত্বং—নিজের দেহকে, নিজের স্বরূপকে ন বা উ—কখনোই সং পপূচ্যাং—সম্পৃক্ত করব না, মিশিয়ে দেব না। অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে নিজেকে সর্বদা পৃথক বলেই ভাবব। কখনোই আত্মাকে দেহাদি বলে মানব না, আর দেহাদিকেও আত্মা বলে গ্রহণ করব না। যঃ স্বসারং নিগচ্ছাত্—যে ব্যক্তি সদা ‘সু-আসা’ অর্থাৎ দূরে থাকার যোগ্য প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংস্পর্শে থাকে, অর্থাৎ প্রকৃতিতে আত্মস্বরূপ ভুলে গিয়ে লিপ্ত হয়ে পড়ে—সেই অতিশয় আসক্তিকেই পাপম্ আহুঃ—বিজ্ঞজন পাপ বলেন। অতএব মৎ অন্যানেন—আমার থেকে ভিন্ন কোনো প্রবৃত্তিমার্গীর সঙ্গে প্রমুদঃ কল্পয়স্ব—প্রমোদ ও প্রমাদ অনুভব করো। সুভগে—হে সৌভাগ্যশালিনী! তে ভ্রাতা—এতদিন পর্যন্ত তোমার ভরণ-পোষণকারী আমি এতৎ ন বষ্টি—এই সম্পর্ক আর চাই না।
যতি প্রকৃতির পূর্ববর্তী মন্ত্রে করা ভর্ত্সনার পরও অবিচল থাকে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের স্পষ্ট নিষেধ ঘোষণা করে। প্রকৃতির স্বরূপে নিজের স্বরূপ বিলীন করে দেওয়া তার কাম্য নয়। প্রকৃতির এই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাকে—যার ফলে মানুষ নিজেকে দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি বলে ভাবতে শুরু করে—সে পাপ বলে অভিহিত করে এবং নিজের আত্মরূপ বিস্মৃত হওয়াকে গ্রহণ করে না। তার বক্তব্য—এমন আরও অনেক লোক পাওয়া যাবে যারা তোমার সঙ্গে গভীর সংযোগে আগ্রহী। তুমি তাদের সঙ্গেই মিলিত হয়ে নিজের কর্তৃত্ব সফল করো, আনন্দ করো, আমোদ-প্রমোদে মেতে ওঠো। আমি দীর্ঘকাল তোমার দেখভাল করেছি, তোমাকে আগলে রেখেছি। এখন আর তোমার সঙ্গে থাকার লেশমাত্র ইচ্ছাও আমার নেই। তুমি চিন্তাই বা করছ কেন? তুমি তো চিরকালই সৌভাগ্যশালিনী—একজন যদি তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে, শত শত তোমার প্রতি আগ্রহী রয়েছে। তাদের কাছেই যাও, তাদের সঙ্গেই আমোদ-প্রমোদ করো—আমার পিছু ছেড়ে দাও।
নিরাশ প্রকৃতি তখন পুরুষের উপর নিজের শেষ অস্ত্র নিক্ষেপ করে—তা হলো বদনাম করা। সে বলে—যমী, যমকে উত্তেজিত করতে চায়—এই আশায় যে হয়তো উত্তেজনায় পড়ে যম নিজের চিন্তা পরিবর্তন করে নেবে। অতএব সে বলে—তোমার চিন্তাধারা ও অন্তর্গত ভাব আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি প্রবৃত্তি থেকে দূরে পালাতে চাও, অথচ নিবৃত্তিকে বুকে জড়িয়ে রেখেছ; তাকে এমনভাবে নিজের পাশে আঁকড়ে রেখেছ, যেমন লতা বা অমরবেল কোনো বৃক্ষকে জড়িয়ে থাকে।
এর উত্তরে যম বলে—
“অন্যান্যসু ষু ত্বং যমন্য উ ত্বাং, পরিষ্বজাতে় লিবুজেব বৃক্ষম্ ।
তস্য বা ত্বং মন ইচ্ছ স ব তবাধা কৃশু ষ্ব সবিদ্ সুভদ্রাম্ ॥
ঋক্ ১০.১০.১৪ ॥”
অর্থ—হে যমী! ত্বং অন্যম্ ঊষু—তুমি অন্য কোনো প্রবৃত্তিমার্গীর সঙ্গে থাকো, আর ত্বাম্ উ অন্যঃ—তোমাকেও অন্য কোনো প্রবৃত্তিমার্গী বৃক্ষং লিবুজা ইব—বৃক্ষকে যেমন বেল জড়িয়ে ধরে, তেমনি পরিষ্বজাতে়—আলিঙ্গন করে জড়িয়ে রাখুক; আর তুমিও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকো। তস্য বা ত্বং মন ইচ্ছ—তার মনকে তুমি নিজের জন্য আকাঙ্ক্ষা করো, এবং স ব তব—সেও যেন তোমার মনকে কামনা করে। এরপর আমাদের এই প্রার্থনাই থাকে যে, পরমাত্মা তোমাকে সুভদ্রাম্ সবিদ্—উত্তম কল্যাণকর বুদ্ধি, সুমতি কৃশু ষ্ব—প্রদান করুন।
এইভাবে যম—যতি, কল্যাণমার্গের পথিক মুমুক্ষু—অসংখ্য আকর্ষণীয় প্রলোভন সামনে এলেও নিজের নিবৃত্তিমার্গে অটল থাকে; আর যমী—প্রকৃতি, প্রবৃত্তিমার্গের প্রতিনিধি—নিজের প্রলোভন দেওয়া থেকে বিরত হয় না। সাধকদের পথ সত্যিই আলাদা। তারা প্রকৃতির সংযোগের স্বরূপ জানে। প্রবল মোহময় প্রলোভনের ঝড়েও তারা বিবেকের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, মনের ভেতরে বসে থাকা ভোগসংস্কার বারবার জেগে উঠে সাধকের বিবেকের প্রদীপ নিভিয়ে দিতে উদ্যত থাকে। এই সত্যেরই এক মনোরম ঝাঁকি এই সূক্তে বেদের কাব্যময় ভাষায় অঙ্কিত হয়েছে। পাশাপাশি এই সূক্তে নিয়োগবিধি এবং ভাই–বোনের বিবাহনিষেধের ইঙ্গিতও ধ্বনিত হয়েছে।
সায়ণাচার্য এই সূক্তের মন্ত্রগুলির যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা বেদের গৌরবের ক্ষতি সাধন করে। পাঠকদের অবগতির জন্য তাঁর মতামতগুলি নিচে দেওয়া হলো—
১— যমী যমকে বলে—বিস্তৃত সমুদ্রের মাঝখানে এক দ্বীপের নির্জন স্থানে পৌঁছে আমি যমী, তোমার সখাকে সখ্যভাবেই—স্ত্রী–পুরুষ সংযোগজাত মিত্রভাবের দ্বারা—নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে চাই
(আভিমুখ্যেন স্থিত্বা অলজ্জাং পরিত্যজ্য ত্বংত্ সংভোগ করোমীতি অর্থঃ)।
তুমি তো গর্ভাবস্থা থেকেই আমার সখা। বিধাতা প্রজাপতি ভবিষ্যতে আমাদের যে সন্তান হবে, তার পিতারূপে তোমার জন্য আমার গর্ভে সর্বগুণসম্পন্ন সন্তানের পরিকল্পনা করেছিলেন।
২- যমের উত্তর— হে যমী! তোমার গর্ভের সঙ্গী যম তোমার সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না, কারণ তুমি সহোদরা-ভগিনী, আরঙ্গন্তব্যা। এই স্থানও নির্জন নয়, কারণ মহান প্রাণশক্তি সম্পন্ন বা জ্ঞানী প্রজাপতি যে দ্যুলোককে ধারণ করেন, সেই সন্তানস্বরূপ বীর (দেবতা)দের সমস্ত কর্ম-কাণ্ড তারা দেখছেন।
৩- হে যম! সেই প্রসিদ্ধ প্রজাপতি ইত্যাদি দেবতরাও কন্যা-বোন ইত্যাদি নারীদের কামনা করেন। সমগ্র জগতের প্রধান প্রজাপতিদেরও নিজেদের কন্যার সহবাস বা সংস্পর্শের সম্পর্ক রয়েছে। তাই, তোমার চিত্ত আমার চিত্তে অবস্থান করুক, অর্থাৎ আমি তোমাকে চাই, তুমি আমাকে চাও। যেমন পিতা প্রজাপতি কন্যার শরীরকে সহবাসের মাধ্যমে মিলিত করেছিলেন, তেমনই তুমি আমার স্বামী হয়ে আমার শরীরকে তোমার শরীরের সঙ্গে যুক্ত করো ("যোনৌপ্রজননপ্রক্ষেপোপগৃহনচুম্বনাদিনা মাম্ভ সম্ভুঙ্ক্বেত্যর্থঃ")।
৪- যম যমীকে বলেন— পূর্বকালে প্রজাপতি ক্ষমতাশালী হওয়ায় যা অগ্র্যাগমন করেছিলেন, আমরা তা করি না। আমরা সত্য বললেও মিথ্যায় জড়াই না, অর্থাৎ অগ্র্যাগমন করি না। অন্তরিক্ষে অবস্থিত জল বা রশ্মির ধারক আদিত্য এবং অন্তরিক্ষে থাকা আদিত্যের স্ত্রী আমাদের উত্পত্তি স্থান অর্থাৎ মাতাপিতা। এইভাবে আমাদের দুজনের জন্য অগ্র্যাগমন আকারে কিছু করা অনুচিত। অতএব আমি তা করি না এবং করব না।
৫- যমী— রূপের কর্ত্তা, সকলের শুভ-অশুভের প্রেরক, সর্বআত্মা, দানাদি গুণযুক্ত, উৎপাদক প্রজাপতি গর্ভাবস্থায়ই আমাদের এক উদরে সহবাসের জন্য সংযুক্ত করেছেন। এই প্রজাপতির নিয়ম কেউ ভঙ্গ করতে পারে না। এই কারণে গর্ভাবস্থায় আমাদের দুজনকে প্রজাপতি দ্বারা দম্পতি বানানোর পর তুমি আমার সঙ্গে মিলিত হও। আমাদের এই মাতার উদরে সহবাসজাত দম্পতিভাবকে ভূমি ও দ্যুলোকও জানে।
৬- প্রথম দিন থেকে সম্পর্কিত এই অন্যন্য সংমগম কে জানে? তা অনুমানশ্রিত হওয়ায় কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না। এই প্রদেশে সরাসরি এই সংমগম কে দেখে, কে তার প্রকাশ করে, সেই সম্পর্কে হে মর্যাদা-হন্তা যম, তুমি কি বলো?
৭— একসঙ্গে শয়ন করার জন্য তোমার প্রতি যম-এর যে কামনা, তা যেন যমী-র প্রতি নিবৃত্ত হয়। তারপর সম্পূর্ণ মনোরথ পূর্ণ করে, যেমন স্ত্রী স্বামীর জন্য পরম প্রীতিতে বিশ্বস্ত হয়ে রতির কামনায় নিজের দেহ প্রকাশ করে দেয়, তেমনই আমি আমার দেহ তোমার জন্য প্রকাশ করতে পারি। রথের চাকার ন্যায় আমরা দু’জনেই ধর্ম-অর্থ-কাম এই তিনের জন্য নানা প্রকার উদ্যোগ গ্রহণ করি।
৮— যম— এই লোকের মধ্যে দেবতাদের অহোরাত্রাদি গুপ্তচর রয়েছে। তারা সকলের শুভ ও অশুভ কর্ম দর্শনের জন্য সর্বদা বিচরণ করে। তারা ক্ষণমাত্রের জন্যও এই কার্য থেকে বিরত হয় না, এমনকি চোখের পলকও ফেলে না। হে অসহ্য ভাষণে আমাকে দুঃখ দানকারী যমী, তুমি আমার থেকে ভিন্ন, তোমারই সদৃশ অন্য কারো সঙ্গে শীঘ্র সংযুক্ত হও এবং রথের চাকার ন্যায় তাদের সঙ্গে ধর্ম-অর্থ-কামরূপ উদ্যোগ সম্পন্ন কর।
৬— দিন-রাত্রির মধ্যে এই যমের জন্য কল্পিত অংশ সকল যজমান দান করুক। সূর্যের তেজ বারংবার এই যমের জন্য উদিত হোক। পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত দ্যুলোক ও পৃথিবীর সঙ্গে দিন-রাত্রি এই যমের ন্যায় আত্মীয়—এ কথা জেনে যমী, যমের ভ্রাতা নয় এমন ব্যক্তিকেই গ্রহণ করুক।
১০— ভবিষ্যতে এমন যুগও আসবে, যখন ভগ্নীরা ভ্রাতার বাইরে অন্যকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবে। অতএব, হে সুভগে! তুমি এখন আমার থেকে ভিন্ন স্বামীর কামনা কর। এখন নিজের ……-এ বীর্য সিঞ্চনকারী—বীর্যসেচক পুরুষের জন্য শয়নকালে নিজের বাহুদ্বয়কে বালিশরূপে প্রস্তুত কর।
১১— সে কেমন ভাই, যার উপস্থিতিতেও ভগ্নী অনাথ হয়ে যায়? আর সে কেমন ভগ্নী, যার থাকাকালীন ভাই দুঃখ পায়? আমি কামনায় মূর্ছিত হয়ে নানা প্রকারে এই কথা বলছি। এটি জেনে তুমি আমার দেহের সঙ্গে নিজের দেহের সংযোগ কর (সম্ভোগেন শ্লেষয়। মাং সম্যগ্ সম্ভুঙ্ক্ষ্বেত্যর্থঃ) (সায়ণ)
১২— আমি তোমার দেহের সঙ্গে আমার দেহ মিলাব না। যে ভাই নিজের ভগ্নীর সঙ্গে সংযোগ করে, তাকে শিষ্ট লোকেরা পাপী বলে। হে সুভগে, এটি জেনে তুমি আমার থেকে ভিন্ন, তোমার উপযুক্ত পুরুষের সঙ্গে সংযোগজনিত আনন্দ প্রকাশ কর। তোমার ভাই যম তোমার সঙ্গে সংযোগের কামনা করে না।
১৩— যমী— হে যম! তুমি দুর্বল। তোমার মনের অন্তর্গত সংকল্প এবং হৃদয়-বুদ্ধিগত অধ্যবসায় আমি বুঝতে পারছি না। যেমন রজ্জু অশ্বকে আলিঙ্গন করে এবং যেমন লতা বৃক্ষকে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করে, তেমনই অন্যান্য নারীরা তোমাকে অনায়াসে আলিঙ্গন করে। অতএব তুমি আমার কাছ থেকে রক্ষা পেতে চাইছ।
১৪— যম— হে যমী! তুমি অন্য পুরুষকেই সেইরূপে আলিঙ্গন করো এবং অন্য পুরুষ তোমাকে আলিঙ্গন করুক, যেমন বল্লরী বৃক্ষকে আলিঙ্গন করে। তুমি সেই পুরুষের বশবর্তী হও এবং সেই পুরুষ তোমার মনকে ইচ্ছানুযায়ী গ্রহণ করুক। এরপর তুমি তার সঙ্গে মঙ্গলময় পারস্পরিক মিলন-সুখ লাভ করো।
।। ইতি ওম্ ।।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ