গোপথ ব্রাহ্মণ ১/৮ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

31 January, 2026

গোপথ ব্রাহ্মণ ১/৮

 গোপথ-বিজ্ঞান (ভাগ–১) 

প্রপাঠক–১

= কন্ডিকা ৮ =

তমঙ্গিরসমঋষিমভ্যশ্রাম্যদভ্যতপত্তসমতপত্তস্মাচ্ছ্রান্তাত্তপ্তাত্সন্তপ্তাদ্বিঙ্গ্‌শিনোঽঙ্গিরস ঋষীন্‌নিরমিমীত। তান্‌ বিঙ্গ্‌শিনোঽঙ্গিরস ঋষীনভ্যশ্রাম্যদ্ অভ্যতপৎসমতপৎ। তেভ্যঃ শ্রান্তেব্যস্তপ্তেব্যঃ সংতপ্তেভ্যো দশতয়ানাঙ্গিরসানার্ষেয়ান্‌নিরমিমত। ষোডশিনোঽষ্টাদশিনা দ্বাদশিন একঋচাস্তৃত্রিচাংশ্চতুরৃচান্‌ পঞ্চঋচান্‌ ষডৃচান্‌ দ্বৃচান্‌ সপ্তঋচান্‌ ইতি। তানঙ্গিরস ঋষীনাঙ্গিরসাংশ্চার্ষেয়ানভ্যশ্রাম্যদভ্যতপত্তসমতপত্তেব্যঃ শ্রান্তেব্যস্তপ্তেব্যঃ সন্তপ্তেব্যোযান্ মন্ত্রান্ অপশ্যত্‌ স আঙ্গিরসো বেদোঽভবত্। তমাঙ্গিরসম্‌ বেদমভ্যশ্রাম্যদভ্যতপত্তসম্ তপত্তস্মাচ্ছ্রান্তাত্তপ্তাত্তপ্তাজ্জনদিতি দ্বৈতমক্ষরং ব্যভবত্। স য ইচ্ছেত্‌ সর্বৈরেতৈরঙ্গিরোভিশ্চাঙ্গিরসৈশ্চ কুর্বীয়েত্‌ এতয়ৈব তং মহাব্যাহৃত্য কুর্বীত। সর্বৈর্হ বা আস্যৈতৈরঙ্গিরোভিশ্চাঙ্গিরসৈশ্চ কৃতং ভবতি য এবং বেদ যশ্চৈবং বিদ্বান্‌ এভমেতয়া মহাব্যাহৃত্য কুরুতে ॥৮॥

ভাষ্য:- (‘তম্’, ‘অঙ্গিরসম্’, ‘ঋষিম্’, ‘অভি’, ‘অশ্রাম্যত্’, ‘অভি’, ‘অতপত্’, ‘সম্’, ‘অতপত্’) এর অর্থ এই যে, পূর্ববর্তী কন্ডিকায় বর্ণিত অঙ্গিরস নামক ঋষির অর্থাৎ আকাশে নিঃসৃত সূক্ষ্ম ছন্দ ও প্রাণাদি রশ্মিগুলিকে ভূর্লোকাদির রশ্মির দ্বারা চারদিক থেকে এবং সমভাবে সংপীড়িত ও দগ্ধ করা হয়। আমাদের মতে এ কাজ ব্যাহৃতি-রশ্মিদের দ্বারাই সংঘটিত হয়। এর ফলে এই রশ্মিদের শক্তির বৃদ্ধি আরম্ভ হয়।

(‘তস্মাত্’, ‘শ্রান্তাত্’, ‘তপ্তাত্’, ‘সন্তপ্তাত্’, ‘বিংশিনঃ’, ‘অঙ্গিরসঃ’, ‘ঋষীন্’, ‘নির্’, ‘অমিমত’) — ঐ সংপীড়িত, তপ্ত ও সম্পূর্ণ দগ্ধ ঋষি-রশ্মি থেকে এমন অঙ্গিরস ঋষি-রশ্মি উৎপন্ন হয়, যা বিশ-অক্ষরবিশিষ্ট ছন্দরশ্মির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর অভিপ্রায় এই যে, এই অঙ্গিরস প্রাণরশ্মিগুলি পরস্পর মিলিত হয়ে প্রাজাপত্যী বৃতী এবং সাম্নী পঙ্ক্তি-রশ্মির সৃষ্টি করতে পারে। এর সঙ্গে এও যুক্ত থাকে যে, এই প্রকারের ঋষি-রশ্মিগুলি বিশ-অক্ষরবিশিষ্ট ছন্দরশ্মি থেকে নিঃসৃত রশ্মির অনুরূপ হয়। আমাদের মতে কোনো কোনো ছন্দরশ্মি থেকে প্রায় সেই ঋষি রশ্মিগুলি স্রবিত হয়; যেসব ঋষি রশ্মি থেকে তারা নির্মিত হয়, তবে এর ব্যতিক্রমও সম্ভব। সেই ব্যতিক্রমকেই এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।

(তান্, বিম্‌শিনঃ, অঙ্গিরসঃ, ঋষীন্, অভি, অশ্রাম্যৎ, অভি, অথপৎ, সম্, অথপৎ) তার পরবর্তী পর্যায়ে ঐ অঙ্গিরস রশ্মিগুলিকে ভূরাদি রশ্মির দ্বারা সর্বদিক থেকে সংপীড়িত, উত্তপ্ত ও সন্তপ্ত করা হল; অর্থাৎ তাদের শক্তিতে আরও বৃদ্ধি ঘটানো হল।

(তেভ্যঃ, শ্রান্তেভ্যঃ, তপ্তেভ্যঃ, সন্তপ্তেভ্যঃ, দশতয়ান্, আঙ্গিরসান্, আর্ষেয়ান্, নির্, আমিমত) ঐ সংপীড়িত, উত্তপ্ত ও সন্তপ্ত ঋষি রশ্মি থেকে দশ প্রকার আঙ্গিরস আর্ষেয় উৎপন্ন হল। এর অর্থ এই যে, সেখান থেকে এমন ছন্দ-রশ্মি উৎপন্ন হল যেগুলিকে আঙ্গিরস আর্ষেয় বলা হয়; অর্থাৎ এমন ছন্দ-রশ্মি, যা পদার্থ থেকে স্রবিত সূক্ষ্ম রশ্মিগুলির পারস্পরিক সঙ্গতির ফলেই নির্মিত হয়। এই ছন্দ-রশ্মিগুলিরও এখানে দশ প্রকারের কথা বলা হয়েছে। তাদের বর্ণনা এইরূপ—

(ষোড়শিনঃ, অষ্টাদশিনঃ, দ্বাদশিনঃ) ষোলো অক্ষরবিশিষ্ট প্রাজাপত্য এবং সাম্নীয় অনুষ্ঠুপ্, অষ্টাদশাক্ষরা সাম্নীয় বृहতী, আর্চী গায়ত্রী এবং দ্বাদশাক্ষরা সাম্নীয় গায়ত্রী, প্রাজাপত্য উষ্ণিক্, যাজুষী জগতি প্রভৃতি ছন্দ-রশ্মি উৎপন্ন হয়। এখানে ‘ইত্যাদি’ শব্দের অর্থ এই যে, বিরাট ও স্বরাজ বিভেদের কারণে একই অক্ষরসংখ্যাবিশিষ্ট আরও নানা ছন্দ-রশ্মি এখানে উৎপন্ন হতে পারে, যাদের বিষয়ে আমরা কোথাও আলোচনা করিনি। এখানে ভাববার বিষয় এই যে, রশ্মির নির্মাণ-ক্রমে সর্বপ্রথম ষোড়শাক্ষরা রশ্মিই কেন উৎপন্ন হয়? আমরা ষোড়শাক্ষরা থেকে প্রাজাপত্য অনুষ্ঠুপ্ এবং সাম্নীয় অনুষ্ঠুপ্-র উৎপত্তির আলোচনা করেছি। অনুষ্ঠুপ্ সম্পর্কে ঋষিদের বক্তব্য— “অনুষ্ঠুব্ভি ছন্দসাম্ যোনিঃ” (তাঁ ব্রা. ১১.৫.১৭), “আনুষ্ঠুভো বৈ প্রজাপতিঃ” (তাঁ ব্রা. ৪.৫.৭), “বাগ্ অনুষ্ঠুপ্ সর্বাণি ছন্দাঁসি” (তৈ. ব্রা. ১.৭.৫.৫)। এই উক্তিগুলির অভিপ্রায় এই যে, অনুষ্ঠুপ্ ছন্দ-রশ্মি প্রজাপতি-রূপ হওয়ায় এবং সকল ছন্দ-রশ্মির কারণরূপ হওয়ায় নানাবিধ পদার্থ সৃষ্টিতে বিশেষভাবে মূলভিত্তিক ভূমিকা পালন করে। তাই উৎপত্তির ক্রমে সর্বপ্রথম এগুলিরই উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাম্নীয় অনুষ্ঠুপ্ ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তির কথাও বলা হয়েছে। সাম্ সম্পর্কে ঋষিদের উক্তি— “তদ্ যৎ সংযন্তি তস্মাৎ সাম” (জৈ.উ. ১.৩৩.৭), “সাম দেবানামন্নম্” (তাঁ.ব্রা. ৬.৪.১৩)। এই উক্তিগুলির অর্থ এই যে, সাম্নীয় রশ্মি বিভিন্ন দেব-পদার্থের অন্নরূপ হওয়ায় এবং সেগুলিকে সুপরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণকারী হওয়ায় সৃজনমূলক কর্মের জন্য তাদের অধিকতর উপযোগী করে তোলে। এই কারণে এই দুই প্রকার ষোড়শাক্ষরা ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তি প্রথমে মেনে নেওয়া হয়েছে।

এরপর অষ্টাদশ অক্ষরবিশিষ্ট আর্চী গায়ত্রী এবং সাম্নীয় বৃহতী রশ্মির উৎপত্তির কথা বলা হয়েছে। নিশ্চয়ই এদের উৎপত্তি যে কোনো অনুষ্ঠুপ্ ছন্দ-রশ্মির পরে হওয়াই উচিত। আর্চী রশ্মি আলোর বিশেষ উৎপাদক এবং যেকোনো প্রকার বৃহতী রশ্মি পদার্থকে সংহত করতে তাদের ভূমিকা পালন করে। এইভাবে এই দুই প্রকার রশ্মির উৎপত্তি ষোড়শাক্ষরা রশ্মির পরেই হওয়া যুক্তিসঙ্গত।

এবার দ্বাদশাক্ষরা রশ্মিগুলির কথা বিবেচনা করি— সাম্নীয় গায়ত্রীও অন্নরূপ আচরণ করে এবং যাজুষী জগতি এজন্য পরে উৎপন্ন হয়, কারণ জগতি ছন্দ-রশ্মিগুলি অন্যান্য ছন্দ-রশ্মির তুলনায় পরে উৎপন্ন হয়েছে বলে মানা হয়। এখানে এগুলিকে জগতি যাজুষী বলা হয়েছে। যাজুষী ছন্দ-রশ্মিগুলি সংযোজক গুণবিশিষ্ট হওয়ায় অন্যান্য রশ্মির উৎপত্তির পরেই উৎপন্ন হয়। এর সঙ্গে এদের জগতি-রূপ হওয়াও সহায়ক কারণ।

(এক-ঋচান্, তৃচান্, চতুর্-ঋচান্, পঞ্চ-ঋচান্, ষট্-ঋচান্, দ্বি-ঋচান্, সপ্ত-ঋচান্, ইতি) ঋচাগুলির উৎপত্তির উপরোক্ত ক্রমে সর্বপ্রথম এক পাদ বিশিষ্ট ঋচাগুলি, তারপর তিন পাদের ঋচাগুলি, তারপরে ক্রমানুযায়ী চার পাদ, পাঁচ পাদ, ছয় পাদ, দুই পাদ এবং সাত পাদ বিশিষ্ট ঋচাগুলি উৎপন্ন হয়। এখন আমরা পাদগুলির এই ক্রম নিয়ে ভাবি— এই সৃষ্টিতে কোনো ঋচার এক পাদের প্রভাব প্রায়ই সেই ঋচার পূর্ণ প্রভাবের মতোই হয় এবং ব্যাপক স্তরে কোনো একটি ঋচার প্রভাব একাক্ষরা ঋচার মতোও হতে পারে। এভাবে এই ক্রম থেকে দুটি অর্থ প্রকাশিত হয়, যার প্রথমটি এই যে, ঋচার উৎপত্তির ক্রমে সর্বপ্রথম এক একটি পৃথক ঋচা উৎপন্ন হয়, তারপরে ক্রমান্বয়ে তিন, চার, পাঁচ এবং ছয় ঋচার সমষ্টি উৎপন্ন হয়, যা ক্রমানুসারে দৈবী গায়ত্রী, দৈবী অনুষ্ঠুপ্, দৈবী বৃহতী, দৈবী পঙ্ক্তি এবং দৈবী ত্রিষ্টুপের প্রভাব প্রকাশ করে। এরপর দৈবী উষ্ণিকের প্রভাব প্রকাশকারী দুই দুই ঋচার যুগল উৎপন্ন হতে থাকে। শেষপর্যন্ত দৈবী জগতির প্রভাব প্রকাশকারী সাত সাত ঋচার সমষ্টি উৎপন্ন হতে থাকে। এভাবে এখানে ক্ষুদ্রতম ঋচা থেকে ক্রমে বৃহত্তর ঋচা এবং তাদের সমষ্টির উৎপত্তির ক্রমিক বিজ্ঞান প্রদর্শিত হয়েছে।

(তান্, অঙ্গিরসঃ, ঋষীন্, চ, আঙ্গিরসান্, আর্ষেয়ান্, অভি, অশ্রাম্যৎ, অভি, অথপৎ, সম্, অথপৎ) পরবর্তীতে পূর্বোক্ত অঙ্গিরস নামে পরিচিত স্রাবিত রশ্মি এবং আঙ্গিরস অর্থাৎ অঙ্গিরস রশ্মি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ছন্দ-রশ্মিকে সর্বদিক থেকে সংপীড়িত, উত্তপ্ত ও সন্তপ্ত করা হয়। এখানে বারবার সংপীড়িত, উত্তপ্ত ও সন্তপ্ত শব্দগুলির ব্যবহার হয়েছে। এ বিষয়ে এখানে জানা প্রয়োজন যে প্রথমে পদার্থকে সংপীড়িত করা হয়, অর্থাৎ চাপ দেওয়া হয়। এই সংপীড়নের ফলে পদার্থের শক্তিতে কিছু বৃদ্ধি আরম্ভ হয়, কিন্তু সেই বৃদ্ধিতে কিছু স্থানে ভিন্নতাও থাকতে পারে। তৃতীয় প্রক্রিয়ায় সেই ভিন্নতা মিটে সমরূপতা আসে। এই প্রক্রিয়া সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে একসঙ্গে ঘটে। লক্ষণীয় যে সংপীড়নের এই প্রক্রিয়া ভূরাদি রশ্মির দ্বারা সংঘটিত হয় এবং এতে চূড়ান্ত প্রেরক ব্রহ্মই হয়।

(তেভ্যঃ, শ্রান্তেভ্যঃ, তপ্তেভ্যঃ, সন্তপ্তেভ্যঃ, ইয়ান্, মন্ত্রান্, অপশ্যত্, সঃ, আঙ্গিরসঃ, বেদঃ, অভবৎ) ঐ সংপীড়িত, তপ্ত ও সন্তপ্ত ঋচাগুলি থেকে যে মন্ত্রসমূহ উৎপন্ন হয় এবং যেগুলিকে ভূরাদি রশ্মিগুলি সংগ্রহ বা আকর্ষণ করে, সেই সমগ্র সংগ্রহকে আঙ্গিরস বেদ বলা হয়। এখানে ‘অপশ্যত্’ ক্রিয়াপদে যে ‘দৃশির্ প্রেক্ষণে’ ধাতুর প্রয়োগ হয়েছে, তার গ্রহণ আমরা ‘সংগ্রহ করা’ বা ‘আকর্ষণ করা’ অর্থে করেছি। এখানে আঙ্গিরস বেদ বলতে কোনো নতুন বেদের কথা নয়, বরং পূর্বোক্ত প্রকরণে স্রাবিত বলা পদসমূহ থেকে যে মন্ত্রগুচ্ছ উৎপন্ন হয়, তারই এখানে আঙ্গিরস বেদ সংজ্ঞা। আমাদের মতে এই মন্ত্রসমূহই অথর্ববেদ নামে পরিচিত। বেদ ও উপনিষদে অথর্ববেদকে আঙ্গিরস বেদও বলা হয়েছে। আমরা এখানে এর দুটি প্রমাণ উদ্ধৃত করি—

যস্মাদৃচো অপাতিক্ষন্ যজুযসমাদপাকষন্।

সামানি যস্য লোমান্যথর্ভাঙ্গিরসো মুখম্। (অথর্ব. ১০.৭.২০)

এবং বা অরে’স্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বাসিতমেতদ্

যদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোऽথর্ভাঙ্গিরসঃ। (শ. ব্রা. ১৪.৫.৪.১০; বৃহদ. উপ. ৩.৪.১০)

এই দুই প্রমাণ থেকেই আমাদের কথার সমর্থন হয়।

(তম্, আঙ্গিরসম্, বেদম্, অভি, অশ্রাম্যত্, অভি, অতপত্, সম্, অতপত্) পরবর্তীতে এই আঙ্গিরস মন্ত্রগুলিকেও সংপীড়িত, তপ্ত ও সন্তপ্ত করা হয়।

(তস্মাত্, শ্রান্তাত্, তপ্তাত্, সন্তপ্তাত্, জনৎ, ইতি, দ্বৈতম্, অক্ষরম্, অবভবৎ) সেই সংপীড়িত, তপ্ত ও সন্তপ্ত অঙ্গিরস ও আঙ্গিরস নামক উক্ত পদার্থসমূহ থেকে অক্ষরের দ্বৈত ‘জনত্’ প্রকাশিত হয়। এর অর্থ এই যে ‘জনত্’ পদ ঐ সংপীড়িত পদার্থসমূহ থেকে বাইরে স্রাবিত হতে থাকে। পণ্ডিত যুধিষ্ঠির মীমাংসক বিপূর্বক ‘ভূ’ ধাতুর তিনটি অর্থ দিয়েছেন, তার মধ্যে দুটি অর্থ হল— আশ্রয় দেওয়া এবং দেখা। এর অর্থ এই যে এই পদরূপ রশ্মি, যাকে পরে মহাব্যাহৃতি বলা হয়েছে, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে অনুকূল রশ্মিগুলিকে খুঁজে খুঁজে তাদের আশ্রয় দিয়ে নতুন নতুন রশ্মি প্রভৃতি পদার্থ উৎপন্ন করতে থাকে। অন্যান্য রশ্মিকে সংগত করা এর বিশেষ স্বভাব।

(সঃ, যঃ, ইচ্ছেত্, এতৈঃ, সর্বৈঃ, অঙ্গিরোবিঃ, চ, আঙ্গিরসৈশ্চ, কুর্বীয়, ইতি, তম্, এতয়া, এব, মহাব্যাহৃত্যা, কুর্বীত) যে ভূরাদি রশ্মিসমূহের গোষ্ঠী এই সমস্ত অঙ্গিরস ও আঙ্গিরস রশ্মি প্রভৃতি পদার্থের দ্বারা পরবর্তী ধাপের রচনাসমূহ করতে ইচ্ছা করে, সে এই ‘জনত্’ মহাব্যাহৃতির দ্বারাই তা করে। এর অর্থ এই যে এখন ভূরাদি রশ্মিগুলি যা কিছু সৃষ্টি করে, তাতে ‘জনত্’ মহাব্যাহৃতির অপরিহার্য সহায়তা থাকে। এখানে ‘জনি প্রাদুর্ভাবে’ ধাতু হওয়ায় উৎপত্তি-ক্রিয়াগুলি এই মহাব্যাহৃতির কারণে আরও সমৃদ্ধ হয়।

(অস্য, এতৈঃ, সর্বৈঃ, অংগিরভিঃ, চ, আংগিরসৈঃ, চ, হ, বৈ, কৃতম্, ভবতি) এই রাশ্মি সমষ্টির মাধ্যমে সমস্ত অংগিরস ও আংগিরস নামক পদার্থের দ্বারা সেই সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয় যা সে করতে চায় অর্থাৎ ভবিষ্যতের পর্যায়ে এই ভূরাদি রাশ্মির মাধ্যমে সেই-সেই পদার্থের সৃষ্টিই নিশ্চিত হয়; অর্থাৎ এতে কোনো প্রকার পদার্থ বাধা সৃষ্টি করে না।

(যঃ, এভং, বেদ, চ, যঃ, এভং, বিদ্বান্, এভং, এতায়া, মহাব্যাহৃত্যা, কুরুতে) যখন এই প্রকার অবস্থা সৃষ্টি হয় অর্থাৎ যখন ‘জনৎ’ মহাব্যাহৃতিগুলো সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যে কোনো ভূরাদি রাশ্মি সমষ্টি বিদ্যমান থাকে, তা এই সৃষ্টির নিয়ম অনুযায়ী ‘জনৎ’ মহাব্যাহৃতি দ্বারা করণীয় কর্ম সম্পন্ন করতে শুরু করে।

ভাবার্থ– আকাশে নিঃসৃত সূক্ষ্ম রাশ্মিগুলো একত্র হয়ে বিভিন্ন প্রকার ছন্দ রাশ্মির সৃষ্টি করে। এই ছন্দ রাশ্মিগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠুপ্ ছন্দ রাশ্মি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এদের উৎপত্তি অন্যান্য বহু রাশ্মির সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে। এছাড়াও অনুষ্ঠুপ্ ছন্দ রাশ্মিগুলো বিভিন্ন ছন্দ রাশ্মির নানাবিধ ক্রিয়াকে অনুকূলভাবে ত্বরান্বিত করে।

এই কণ্ডিকায় বিভিন্ন ছন্দ রাশ্মির উৎপত্তির ক্রম প্রদর্শিত হয়েছে, যার বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান শুধু ভাষ্য পাঠের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব। এই ক্রমে প্রথমে এক-পাদযুক্ত ঋচা, তারপরে তিন-পাদ, চার-পাদ, পাঁচ-পাদ, ছয়-পাদ, দুই-পাদ এবং সাত-পাদযুক্ত ঋচা উৎপন্ন হয়। সৃষ্টিতে কোনো ঋচার এক-পাদ প্রভাব সাধারণত সমগ্র ঋচার প্রভাবের সমান হয়। ব্যাপকভাবে কোনো এক ঋচা একাক্ষর ঋচার মতো প্রভাবও প্রদর্শন করতে পারে।

সৃষ্টির প্রাথমিক সময়ে প্রথমে উৎপন্ন ঋচাগুলো পৃথকভাবে উদ্ভূত হয়। এরপর সমষ্টির মধ্যে উৎপন্ন হয়ে বড় ঋচাগুলো ক্রমান্বিতভাবে উদ্ভূত হয়। ঋচাগুলোর সংক্ষেপণের এই প্রক্রিয়ার ফলে ব্রহ্মাণ্ডের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। নিঃসৃত সূক্ষ্ম ঋচা থেকে উৎপন্ন বড় ঋচাগুলো যখন ভূরাদি রাশ্মি দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে সঞ্চিত হয়, তখন সেই ঋচা সংরক্ষণকে অঙ্গিরস বেদ বলা হয় এবং এটিকেই অথর্ববেদও বলা হয়।

এই রাশ্মিগুলোর উৎপত্তির পর পদার্থের সৃষ্টির প্রক্রিয়া আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে। এর কারণ হলো, আংগিরস নামক মন্ত্র সমষ্টি যখন ভূরাদি রাশ্মি দ্বারা সংক্ষেপিত হতে শুরু করে, তখন সেই সংক্ষেপণ থেকে ‘জনৎ’ পদরূপ নতুন ব্যাহৃতিরূপ রাশ্মি উদ্ভূত হতে শুরু করে, যার প্রভাবে নতুন পদার্থের সৃষ্টির প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হয়।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

গোপথ ব্রাহ্মণ ১/১৬

 = কণ্ডিকা ১৬ = [ব্রহ্ম দ্বারা সৃষ্টির উৎপত্তির ক্রমিক বিজ্ঞান] ব্রহ্ম হ বৈ ব্রহ্মাণং পুষ্করে সসৃজে, স খলু ব্রহ্মা সৃষ্টশ্চিন্তামাপেদে কেনাহ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ