মহারাজ ভোজ কৃত "সমরাঙ্গণ-সূত্রধার" ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে ৮৩ টি অধ্যায় রয়েছে, যার মধ্যে শহর-পরিকল্পনা, ভবনের কারুকাজ, মন্দিরের কারুকাজ, ভাস্কর্য এবং মুদ্রা। মুদ্রাসহ বিভিন্ন যন্ত্র ও যন্ত্রের বর্ণনা রয়েছে। গ্রন্থের ৩১'তম অধ্যায়ের নাম "যন্ত্রবিধান" যেখানে যন্ত্রবিজ্ঞান বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে অনেক যন্ত্রের বর্ণনা করা হয়েছে বিমান, যান্ত্রিক দারোয়ান এবং সৈন্য, যা বর্তমান রোবটের আভাস দেয়।
এছাড়া ময় দানব রচিত অসুরদের ভাস্কর গ্রন্থের তালিকা রয়েছে যা নিম্নরূপ- মায়াদীপিকা, মায়ামত, মায়ামত প্রতিষ্টাতন্ত্র, মায়াশীলপম, মায়াসম্গ্রহ, মায়াশীলপাষ্টকম ইত্যাদি।
সম্পাদক ও ব্যাখ্যাকার
ড. সুধাকর মালবীয়
এম.এ., পিএইচ.ডি., সাহিত্যাচার্য
সংস্কৃত বিভাগ, কলা অনুষদ
কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, বারাণসী
পরিচালক, মহামনা সংস্কৃত আকাদেমি
এবং চিত্তরঞ্জন মালবীয়
প্রভাষক, মহামনা সংস্কৃত আকাদেমি
চৌখম্ভা সংস্কৃত ভবন
বারাণসী – ২২১০০১ (ভারত)
সম্পাদকীয়
আমি গিরিজানন্দন একদন্ত দেবতাকে প্রণাম করি যাঁর দেহ সিঁদুরে রঞ্জিত, যাঁর শুঁড় অতি বিশাল,
যাঁর দেহ নাগরাজ দ্বারা অলংকৃত, যাঁর সঙ্গে সিদ্ধি ও বুদ্ধি যুক্ত, এবং যাঁকে দেবতা, নাগ ও মানুষ সকলেই সর্বার্থসিদ্ধির জন্য আরাধনা করেন।
এখন বিদ্বজ্জনসমক্ষে শ্রদ্ধা ও আনন্দসহকারে উপস্থাপিত হচ্ছে—হিন্দি ব্যাখ্যাসহ সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থের প্রথম ভাগ, যা প্রথম থেকে অষ্টচত্বারিংশ (৪৮) অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থটি রচিত হয়েছে শ্রীমান মহারাজাধিরাজ ধারাধিপতি ভোজদেব কর্তৃক। এই গ্রন্থে অষ্টচত্বারিংশ অধ্যায় পর্যন্ত গৃহনির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে। আর পরবর্তীতে ঊনপঞ্চাশতম (৪৯) অধ্যায় থেকে ত্রয়াশী (৮৩) অধ্যায় পর্যন্ত প্রাসাদ নির্মাণসংক্রান্ত বিষয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে—অমরকোষকারের মতে “প্রাসাদো দেবভূভুজাম্”—অর্থাৎ প্রাসাদ শব্দের সাধারণ অর্থ দেবতার মন্দির অথবা রাজাদের ভবন। কিন্তু সমরাঙ্গণসূত্রধার অনুসারে ‘প্রাসাদ’ শব্দ দ্বারা কেবল দেবতার আয়তন বা মন্দিরকেই বোঝানো হয়েছে।
এই বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থে প্রধানত গৃহবিদ্যা (বাস্তু = গৃহ), শিল্পবিদ্যা, তক্ষক-কৌশল এবং প্রতিমাবিদ্যা আলোচিত হয়েছে। শয়ন, আসন প্রভৃতির লক্ষণ এবং যন্ত্রবিধান তক্ষক-কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। আর প্রতিমাবিদ্যা শিল্পবিদ্যার অন্তর্গত।
বাস্তুশাস্ত্র বা স্থাপত্যবিদ্যার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই। কারণ মৎস্যপুরাণ-এ যাঁদের অষ্টাদশ শিল্পশাস্ত্রের উপদেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—ভৃগু, অত্রি, বশিষ্ঠ প্রভৃতি—তাঁরাই এই বিদ্যার প্রবর্তক বলে স্বীকৃত।
ভৃগু, অত্রি, বশিষ্ঠ, বিশ্বকর্মা ও ময়,
নারদ, নগ্নজিৎ, বিশালাক্ষ ও পুরন্দর,
ব্রহ্মাকুমার, নন্দীশ, শৌনক ও গর্গ,
বাসুদেব, অনিরুদ্ধ এবং শুক্র ও বৃহস্পতি—
এই অষ্টাদশজনই প্রসিদ্ধ শিল্পশাস্ত্রের উপদেশদাতা।
— মৎস্যপুরাণ
মানসার, ময়মত, শিল্পরত্ন প্রভৃতি দ্রাবিড় গ্রন্থসমূহে এবং বিশ্বকর্মা বাস্তুশাস্ত্র, অপরাজিতপৃচ্ছা ইত্যাদি নাগর ধারার বাস্তুশাস্ত্র গ্রন্থসমূহেও এই একই বাস্তুশাস্ত্র-উপদেশক পরম্পরা সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
বুদ্ধিমানদের কাছে এটি অজানা নয় যে এই পৃথিবীতে গার্হস্থ্য প্রভৃতি চতুর্বিধ আশ্রমের মধ্যে গার্হস্থ্য জীবনই প্রধান ও মৌলিক। সেইজন্যই নিজস্ব বাসস্থানরূপ গৃহ নির্মাণ অপরিহার্য।
এই অভিপ্রায়কে লক্ষ্য করেই পণ্ডিত শ্রী রামযত্ন ওঝা মহাশয় বলেছেন—
সমরাঙ্গণসূত্রধার
স্ত্রী, পুত্র প্রভৃতি ভোগসুখের উৎপাদক, ধর্ম–অর্থ–কাম প্রদানকারী,
প্রাণীদের আবাসস্থান, সুখের আশ্রয়, শীত ও আর্দ্রতার দোষনাশক—
কূপ, দেবালয় প্রভৃতি সকল পুণ্যই গৃহ থেকেই উৎপন্ন হয়।
এই কারণেই বিদ্বজ্জনগণ, শ্রী বিশ্বকর্মা প্রভৃতি, সর্বপ্রথম গৃহকেই শ্রেষ্ঠ বলে মান্য করেছেন।
— বাস্তুরাজবল্লভ ১.৫
এখানে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল প্রকার চিন্তা ও বিচারসমষ্টিই জ্যোতিষশাস্ত্রের অঙ্গরূপে ‘বাস্তুশাস্ত্র’ নামে প্রসিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে, গৃহনির্মাণের সূচনাকালীন মুহূর্তে আয়–ব্যয় প্রভৃতি গুণ–দোষ অনুসারে সেই নির্মাতার জীবনে আমরণ সুখ–দুঃখাদি অবশ্যম্ভাবী—এ কথা বাস্তুশাস্ত্রে সর্বত্র সুদৃঢ়ভাবে প্রতিপাদিত হয়েছে এবং সর্বজনের অভিজ্ঞতায় সর্বদা প্রমাণিত।
এই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু সমকালীন ও পরম্পরাগত গ্রন্থ প্রসিদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্ত বাস্তুশাস্ত্রসমূহের মধ্যে সমরাঙ্গণসূত্রধার-ই একমাত্র এমন গ্রন্থ, যেখানে সম্পূর্ণ বাস্তুশাস্ত্রের বিধি ও নিয়মের বিস্তারিত প্রতিপাদন পাওয়া যায়।
মানসার গ্রন্থে ভবনসমূহের (অর্থাৎ বিমানসমূহের) প্রতিমান ও বিবরণ দেওয়া হয়েছে—ময়মত গ্রন্থেও একই বিষয় আলোচিত। শিল্পরত্ন গ্রন্থে ভবনসমূহের প্রতিমান, চিত্রাদি এবং সমস্ত বাস্তুশাস্ত্রবিষয়ক বিষয়ের নিরূপণ রয়েছে। কিন্তু সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থে নগর, দুর্গ, ভবন, প্রাসাদ, প্রতিমা, চিত্র, যন্ত্র, শয়ন, আসন প্রভৃতি—স্থাপত্যবিদ্যার অষ্টাঙ্গের সকল বিষয়েরই বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়।
এই কারণে ঐ সকল গ্রন্থের মধ্যে সমরাঙ্গণসূত্রধার-কে শিরোমণিরূপে গণ্য করা হয়। এর প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ হলো—
১. মহাসমাগমন
২. বিশ্বকর্মার পুত্রসংলাপ
৩. বাস্তুবিষয়ক প্রশ্ন
৪. মহদাদি সৃষ্টিতত্ত্ব
৫. ভুবনকোষ
৬. সহদেবাধিকার
৭. বর্ণাশ্রম বিভাগের নিরূপণ
৮. ভূমি পরীক্ষা
৯. হস্তলক্ষণ
১০. পুরনিবেশ
১১. বাস্তুত্রয় বিভাগের নিরূপণ
১২. নাড়ী, শিরা প্রভৃতির বিকল্প
১৩. মর্মবেধ
১৪. পুরুষাঙ্গ–দেবতা–নিঘণ্টু প্রভৃতির সিদ্ধান্ত
১৫. রাজনিবেশ
১৬. বনপ্রবেশ
১৭. ইন্দ্রধ্বজ উৎসবের নিরূপণ
১৮. নগর প্রভৃতির সংজ্ঞা
১৯. চতুঃশাল বিধান
২০. নিম্ন–উচ্চ আদি ফলনির্ণয়
২১. দ্বাসপ্ততি–ত্রিশাল ভবনের লক্ষণ
২২. দ্বিশাল গৃহের লক্ষণ
২৩. একশাল গৃহের লক্ষণ
২৪. দ্বার, পীঠ, প্রাচীর প্রভৃতির মাননির্ণয়
২৫. সকল গৃহের সংখ্যাকথন
২৬. আয়াদি নির্ণয়
২৭. সভাষ্টক
২৮. গৃহদ্রব্যের পরিমাপ
২৯. শয়ন–আসনের লক্ষণ
৩০. রাজগৃহের লক্ষণ
৩১. যন্ত্রবিধান
৩২. গজশালার লক্ষণ
৩৩. অশ্বশালার লক্ষণ
৩৪. অপ্রয়োজনীয় ও প্রয়োজনীয় বিষয়ের বিবেচনা
| ৩৫ | শিলান্যাস বিধি |
| ৩৬ | বাস্তুদেবতার বলিদান বিধির নিরূপণ |
| ৩৭ | গৃহনির্মাণের জন্য কীলক ও সূত্রপাত |
| ৩৮ | বাস্তুর সংস্থান-মাতৃকা |
| ৩৯ | দ্বারের গুণ ও দোষ |
| ৪০ | পীঠের পরিমাপ |
| ৪১ | চয়নবিধি |
| ৪২ | শান্তিকর্ম বিধি |
| ৪৩ | দ্বারভঙ্গের ফল |
| ৪৪ | স্থপতির লক্ষণ |
| ৪৫ | অষ্টান্ন লক্ষণ |
| ৪৬ | তোরণভঙ্গ প্রভৃতি শান্তিকর্ম |
| ৪৭ | বেদীর লক্ষণ |
| ৪৮ | গৃহদোষ নিরূপণ |
| ৪৯ | রুচক প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের লক্ষণ |
| ৫০ | প্রাসাদের শুভাশুভ লক্ষণ |
| ৫১ | আয়তন বিন্যাস |
| ৫২ | প্রাসাদের জাতি |
| ৫৩ | জঘন্য বাস্তুর দ্বার |
| ৫৪ | প্রাসাদের দ্বার, স্তম্ভ, বিন্যাস, বিতান, লুমা, বৃত্তচ্ছাদ, লুমা, সিংহকর্ণ—ইত্যাদির পরিমাপ নিরূপণ |
| ৫৫ | মেরু প্রভৃতি ষোড়শ প্রাসাদের লক্ষণ, জগৎলক্ষণ, দ্বারাদি কলার নিরূপণ |
| ৫৬ | রুচক প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের বিবরণ |
| ৫৭ | মেরু প্রভৃতি বিশ প্রকারের নিরূপণ |
| ৫৮ | প্রাসাদ স্তবন |
| ৫৯ | বিমান প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের নিরূপণ |
| ৬০ | শ্রীকূট প্রভৃতি ছত্রিশ প্রাসাদের লক্ষণ |
| ৬১ | পীঠপঞ্চকের লক্ষণ |
| ৬২ | দ্রাবিড় প্রাসাদ অধ্যায় |
| ৬৩ | মেরু প্রভৃতি বিশ প্রকার নাগর প্রাসাদের ভূমিজ উৎপত্তি |
| ৬৪ | বাভাট প্রাসাদের নিরূপণ |
| ৬৫ | ভূমিজ প্রাসাদ অধ্যায় |
| ৬৬ | মণ্ডপ অধ্যায় |
| ৬৭ | সপ্তবিংশতি মণ্ডপ অধ্যায় |
| ৬৮ | জগত্যঙ্গসমূহের সমষ্টি বিষয়ক অধিকার |
| ৬৯ | জগৎলক্ষণ অধ্যায় |
| ৭০ | লিঙ্গ, পীঠ ও প্রতিমার লক্ষণ নিরূপণ |
| ৭১ | চিত্র নির্দেশনার নিরূপণ |
| ৭২ | ভূমিবন্ধ বিধান |
| ৭৩ | লেপ্যকর্ম, লিখন, কূর্চক অধ্যায় |
| ৭৪ | অণ্ডক প্রমাণের বিবরণ |
| ৭৫ | মানের উৎপত্তি |
| ৭৬ | প্রতিমার লক্ষণ |
| ৭৭ | দেবতা প্রভৃতির রূপ, প্রহার ও সংযোগজাত অধ্যায় |
| ৭৮ | দোষ ও গুণ অধ্যায় |
| ৭৯ | ঋজু, বক্র প্রভৃতি অবস্থানের লক্ষণ |
| ৮০ | বৈষ্ণব প্রভৃতি স্থানকলার লক্ষণ অধ্যায় |
| ৮১ | পঞ্চপুরুষ ও স্ত্রীলক্ষণ |
| ৮২ | রসদৃষ্টি লক্ষণ অধ্যায় |
| ৮৩ | চৌষট্টি হস্তের লক্ষণ অধ্যায় |
বাস্তুশাস্ত্রের গাম্ভীর্য, সূক্ষ্মতা এবং দুর্বোধ্যতা কোনো সংস্কৃতজ্ঞ ব্যক্তির কাছেও অগোচর নয়। অতএব হিন্দি ভাষাকে মাধ্যম করে বাস্তুশাস্ত্রানুগ ব্যাখ্যা প্রদান একপ্রকার দুঃসাহসই বটে। তথাপি কোমলবুদ্ধিসম্পন্ন বাস্তুবিদ্যা-অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কষ্ট বিবেচনা করে, শাস্ত্ররক্ষাকেই নিজের কর্তব্য মনে করে, হিন্দি ভাষার মাধ্যমে যথাসাধ্য ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটি বর্তমান সংস্করণে ‘সরলা’ নামে সংযোজিত হয়েছে।
বর্তমানে সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থের দুইটি সংস্করণ উপলব্ধ—
১. মহামহোপাধ্যায় টি. গণপতি শাস্ত্রী সম্পাদিত, গায়কোয়াড় সংস্কৃত গ্রন্থমালায় প্রকাশিত।
২৫ ও ৩২ ক্রমাঙ্কে (প্রথম ভাগে ১–৫৪, দ্বিতীয় ভাগে ৫৫–৮৩) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বরোদা থেকে ১৯২৪ ও ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত সংস্করণটি উপলব্ধ।
২. ড. সুদর্শন কুমার শর্মা সম্পাদিত (দ্বিভাগাত্মক—১–৫০, ৫১–৮৩),
ইংরেজি অনুবাদসহ—পরিমল পাবলিকেশন্স, দিল্লি থেকে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত একটি উৎকৃষ্ট সংস্করণও পাওয়া যায়।
অতিরিক্তভাবে, পণ্ডিত দ্বিজেন্দ্রনাথ শুক্ল সম্পাদিত—ঊনচত্বারিংশ অধ্যায়াত্মক, খণ্ডিতরূপে নিবন্ধ আকারে উপস্থাপিত এই গ্রন্থটি হিন্দিসহ দ্বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। এই সংস্করণটি মেহরচন্দ লক্ষ্মণদাস পাবলিকেশন্স, নয়াদিল্লি থেকে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত।
এদের মধ্যে আমি পণ্ডিত টি. গণপতি শাস্ত্রী সম্পাদিত সংস্করণ অবলম্বন করে পাঠ গ্রহণ করেছি। এই কারণে তাঁর সংস্করণের সম্পাদকবৃন্দের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
এই বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থের অধ্যেতাদের নিকট সুপরিচিত যে, এই শাস্ত্রে নিবদ্ধ বাক্যসমূহ অত্যন্ত গভীর ও জটিল। তথাপি শ্রীমদ্গুরুচরণে সম্পূর্ণ বিদ্যায় পারঙ্গত, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতবিদ্যা ও ধর্মবিজ্ঞান সংকলয়ের বেদ বিভাগাধ্যক্ষ, বিশিষ্ট পণ্ডিত, স্বর্গীয় শ্রীযুক্ত প্রফেসর বিদ্যাধর পাণ্ডেয় মহাশয়ের নিকট থেকে যা প্রাপ্ত হয়েছে, তাই-ই এই সংস্করণের মূল আশ্রয়রূপে গৃহীত হয়েছে।
“গুরুবৎ গুরুপুত্রেষু …” —এই শাস্ত্রবিধান অনুসারে আশীর্বাদকামনায় আমি বাস্তুবিদ্ পণ্ডিত রামেন্দ্র পাণ্ডেয় মহাশয় (দিল্লি) এবং অধ্যাপক কৌশলেন্দ্র পাণ্ডেয় মহাশয়কে (সাহিত্য বিভাগের অধ্যক্ষ, সংস্কৃতবিদ্যা ও ধর্মবিজ্ঞান সংকলয়, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়) স্মরণ করছি।
অন্তে, কাশীস্থিত চৌখম্ভা সংস্কৃত ভবন-এর স্বত্বাধিকারীগণের প্রতি—যাঁরা দুর্লভ ও প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থরত্ন প্রকাশে নিয়োজিত—শ্রী ব্রজেন্দ্রকুমার মহাশয়ের নিকট আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি; যাঁদের প্রচেষ্টায় এই উৎকৃষ্ট ও সুসম্পাদিত সংস্করণটি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে।
ধন ও ধানে সমৃদ্ধ,
পত্নী ও সন্তানসহ সুসংযুক্ত,
গো, গজ ও অশ্বসমূহে পরিপূর্ণ যে গৃহ—
তা স্বর্গের থেকেও শ্রেষ্ঠ।
— ভবিষ্য পুরাণ, উত্তরখণ্ড ১৬৮.৪
মকরসংক্রান্তি, ২০১০
বিদ্বদ্বশংবদঃ
এ. ৪/৩১, শিশমহল কলোনি,
কমচ্ছা, বারাণসী
সুধাকর মালবীয়
চিত্তরঞ্জন মালবীয়
দুটি কথা
যিনি বিদ্যা (অধ্যাত্মবিদ্যা) এবং অবিদ্যা (ভৌতিক শাস্ত্র) — উভয়কেই একসঙ্গে জানেন, তিনি অবিদ্যার দ্বারা মৃত্যুরূপ সংসার অতিক্রম করে বিদ্যার দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করেন।
মহারাজ ভোজ রচিত বাস্তু (= গৃহনির্মাণ) বিদ্যার উপর ‘সমরাঙ্গণসূত্রধার’ নামক গ্রন্থের অষ্টচত্বারিংশ (৪৮) অধ্যায়বিশিষ্ট প্রথম ভাগটি এইবার প্রথমবারের মতো রচিত ‘সরলা’ হিন্দি ব্যাখ্যাসহ বিদ্বজ্জনসমক্ষে উপস্থাপিত হচ্ছে।
ভোজরাজ ছিলেন উজ্জয়িনীর প্রসিদ্ধ পরমার বংশীয় রাজা। ধারা ছিল তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী। তিনি বিদ্যা, কলা ও কবিদের গুণগ্রাহী ও পারদর্শী সম্রাট ছিলেন। ব্যাকরণ, দর্শন, কাব্যকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর রচিত বহু প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রয়েছে। যোগসূত্রের উপর তাঁর রচিত ‘যোগমার্তণ্ড’ নামক টীকা (বৃত্তি) একটি অত্যন্ত সম্মানিত রচনা। এতে সহজ ও সরল ভাষায় যোগশাস্ত্রের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বাস্তুবিদ্যা ভৌতিকতার বিজ্ঞান, যা প্রত্যক্ষভাবে জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাস্তুশাস্ত্রের এই গ্রন্থে গৃহনির্মাণের নিয়মাবলি ক্রমানুসারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই কারণেই এর অপর নাম ‘বাস্তুশাস্ত্র’।
এই গ্রন্থে মোট তিরাশি (৮৩)টি অধ্যায় রয়েছে। এর মধ্যে গৃহনির্মাণ সংক্রান্ত অষ্টচত্বারিংশ (৪৮)টি অধ্যায় এবং ঊনপঞ্চাশ (৪৯) থেকে তিরাশি (৮৩) অধ্যায় পর্যন্ত দেবমন্দির ও দেবপ্রতিমা প্রভৃতি সংক্রান্ত বাস্তুবিচার আলোচিত হয়েছে।
সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—বাস্তু বিন্যাসের জন্য ভূমি পরীক্ষা অত্যন্ত আবশ্যক। ভূমি তিন প্রকারের—
১. জাঙ্গল দেশ — যেখানে আবাসস্থল থেকে জল দূরে থাকে।
২. অনূপ দেশ — যেখানে আবাসস্থলের নিকটে জল থাকে।
৩. সাধারণ দেশ — যে অঞ্চল না অতিশয় শীতল, না অতিশয় উষ্ণ।
এই ভূমিসমূহের মৃত্তিকা পরীক্ষা করে তবেই বাস্তু নির্মাণ করা উচিত।
১. ভূমি পরীক্ষার প্রথম পদ্ধতি —
ভূমির মধ্যভাগে এক হাত পরিমাণ একটি গর্ত খনন করতে হবে। এরপর গর্ত থেকে উত্তোলিত মাটি সেই গর্তেই পুনরায় ভরাট করতে হবে। যদি গর্ত পূর্ণ করার পরও মাটি অতিরিক্ত থেকে যায়, তবে সেই ভূমিকে উত্তম বলে গণ্য করতে হবে। যদি মাটি সমান হয়, তবে তা মধ্যম ফলদায়ী ভূমি বলে বিবেচিত হবে। আর যদি মাটি কম পড়ে, তবে সেই ভূমিকে অধম ভূমি বলা হয়।
২. ভূমি পরীক্ষার দ্বিতীয় পদ্ধতি—
উপর্যুক্ত প্রকারে গর্ত খুঁড়ে তাতে জল ঢালবে এবং উত্তর দিকে একশো কদম যাবে, তারপর ফিরে এসে দেখবে। যদি গর্তে জল ঠিক ততটাই থাকে, তবে সেই ভূমি উত্তম। যদি জল কমে (অর্ধেক) থাকে, তবে তা মধ্যম ভূমি; আর যদি খুবই কম থেকে যায়, তবে তা অধম ভূমি। অধম ভূমিতে বাস করলে স্বাস্থ্য ও সুখের ক্ষতি হয়। উসর (লবণাক্ত), ইঁদুরের গর্তওয়ালা, বাঁবি (ঢিবি)ওয়ালা, ফাটা, উঁচুনিচু গর্তওয়ালা এবং টিলাওয়ালা ভূমি ত্যাগ করা উচিত। যে ভূমিতে গর্ত খুঁড়লে কয়লা, ভস্ম, হাড়, ভূষা ইত্যাদি বের হয়, সেই ভূমিতে বাড়ি বানিয়ে বাস করলে রোগ হয় এবং আয়ু হ্রাস পায়।
৩. ভূমির পৃষ্ঠ—
পূর্ব, উত্তর ও ঈশান দিকে নিচু ভূমি সব দৃষ্টিতে লাভজনক। আগ্নেয়, দক্ষিণ, নৈঋত্য ও পশ্চিম দিকে ঢালু ভূমি অপ্রশস্ত (অশুভ) হয়।
৪. বাস্তু পুরুষের মর্ম—
বাস্তু পুরুষের যে মর্মস্থানে পেরেক, খুঁটি ইত্যাদি পোঁতা হবে, গৃহস্বামীর সেই অঙ্গেই ব্যথা বা রোগ উৎপন্ন হবে। অতএব মর্মস্থান দেখে তবেই নির্মাণ করা উচিত। বাস্তুশাস্ত্রের হৃদয় (মধ্যের ব্রহ্মস্থান) অত্যন্ত মর্মস্থান। এই স্থানে কোনো দেয়াল, খুঁটি ইত্যাদির নির্মাণ করা উচিত নয়। এখানে জোঁটা বাসন বা অপবিত্র বস্তু রাখাও উচিত নয়। এমন করলে নানা প্রকার রোগ উৎপন্ন হয়।
৫. গৃহের আকার—
চৌকো ও আয়তাকার বাড়ি উত্তম। আয়তাকার বাড়িতে প্রস্থের দ্বিগুণের বেশি দৈর্ঘ্য হওয়া উচিত নয়। কচ্ছপের আকারের ঘর কুষ্ঠরোগদায়ক। তিন ও ছয় কোণবিশিষ্ট ঘর আয়ুক্ষয়কারী। পাঁচ কোণবিশিষ্ট ঘর সন্তানের কষ্টদায়ক। আট কোণবিশিষ্ট ঘর নানাবিধ রোগ সৃষ্টি করে। ঘর কোনো একদিকে বাড়ানো উচিত নয়। বাড়াতেই হলে সব দিকেই সমানভাবে বাড়ানো উচিত। যদি ঘর বায়ব্য দিকে বাড়ানো হয়, তবে বাতব্যাধি হয়। উত্তর দিকে বাড়ালে রোগ বৃদ্ধি পায়; দক্ষিণ দিকে বাড়ালে মৃত্যুভয়ের সম্ভাবনা দেখা দেয়।
৬. গৃহনির্মাণের উপকরণ—
ইট, লোহা, পাথর, মাটি ও কাঠ এগুলি বাড়িতে নতুনই ব্যবহার করা উচিত। পুরোনো ব্যবহার করলে দোষ সৃষ্টি হয়। এক বাড়িতে ব্যবহৃত কাঠ অন্য বাড়িতে লাগালে গৃহস্বামীর বিনাশ হয়। মন্দির, রাজপ্রাসাদ ও মঠে পাথর ব্যবহার করা শুভ; কিন্তু গৃহে পাথর ব্যবহার শুভ নয় অর্থাৎ মেঝে ইত্যাদিতে পাথর পাতা অশুভ। পিপল, কদম্ব, নিম, বহেড়া, আম, পাকার, গুলার, বট, তেঁতুল, বাবুল ও শিমুল গাছের কাঠ গৃহনির্মাণে ব্যবহার করা উচিত নয়।
৭. গৃহের নিকটবর্তী বৃক্ষ—
আগ্নেয় কোণে বট, পিপল, পাকড় ও গুলার গাছ থাকলে কষ্ট ও মৃত্যু ঘটে। দক্ষিণ দিকে পাকড় গাছ রোগ উৎপন্ন করে। উত্তরে গুলার গাছ থাকলে চক্ষুরোগ হয়। যে বাড়িতে বরই, কলা, ডালিম, পিপল ও লেবু থাকে, সেই বাড়ির কখনো উন্নতি হয় না। বাস্তবিকই বাড়ির কাছে কাঁটাযুক্ত, দুধওয়ালা (ক্ষীরবৃক্ষ) ও ফলদ বৃক্ষ ক্ষতিকর। পাকড়, গুলার, আম, নিম, বহেড়া, পিপল, কপিত্থ, বরই, নির্গুণ্ডী, তেঁতুল, কদম্ব, বেল ও খেজুর এই সব বৃক্ষ বাড়ির নিকটে অশুভ। অতএব গৃহস্থের উচিত বাড়ির আঙিনায় ও বাইরে কেবল তুলসীই রোপণ করা।
৮. গৃহের নিকটবর্তী অশুভ বস্তু—
দেবমন্দির, ধূর্তের বাড়ি, সচিবের বাড়ি অথবা চৌরাস্তারের নিকটে বাড়ি নির্মাণ করলে দুঃখ, শোক ও ভয় লেগেই থাকে।
৯. প্রধান দ্বার—
যে দিকে দ্বার করতে হবে, সেই দিকে বাড়ির দৈর্ঘ্য সমানকে নয় ভাগে ভাগ করে ডানদিকে পাঁচ ভাগ ও বামদিকে তিন ভাগ রেখে অবশিষ্ট (বাম দিক থেকে চতুর্থ) ভাগে দ্বার করা উচিত। ডান ও বাম দিক ধরা হবে, যখন ঘর থেকে বাইরে বেরোনো হয়। পূর্ব বা উত্তরদিকে অবস্থিত দ্বার সুখ ও সমৃদ্ধিদায়ক। দক্ষিণে অবস্থিত দ্বার বিশেষত নারীদের জন্য দুঃখদায়ক। দ্বার নিজে নিজে খোলা বা বন্ধ হওয়া অশুভ। নিজে নিজে খুললে উন্মাদ রোগ হয় এবং নিজে নিজে বন্ধ হলে দুঃখ হয়।
১০. দ্বারবেধ—
প্রধান দ্বারের সামনে পথ বা বৃক্ষ থাকলে গৃহস্বামীর নানা রোগ হয়। কুয়ো থাকলে মৃগী ও অতিসার রোগ হয়। খুঁটি বা চবুতরা থাকলে মৃত্যু ঘটে। বাবড়ী থাকলে অতিসার ও সন্নিপাত রোগ হয়। কুমোরের চাকা থাকলে হৃদরোগ হয়। শিলা থাকলে পাথরি রোগ হয়। ভস্ম থাকলে অর্শ রোগ হয়। যদি বাড়ির উচ্চতার দ্বিগুণ জমি ফাঁকা রেখে উপরোক্ত নির্দিষ্ট বেধবস্তু থাকে, তবে তার দোষ ওই বাড়িতে লাগে না।
১১. গৃহে জলস্থান—
কুয়ো বা ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্ক পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর বা ঈশান দিকে হওয়া উচিত। জলাশয় বা ঊর্ধ্ব ট্যাঙ্ক উত্তর বা ঈশান দিকে হওয়া উচিত। যদি বাড়ির দক্ষিণ দিকে কুয়ো থাকে তবে অশুভ রোগ হয়। নৈঋত্য দিকে কুয়ো থাকলে আয়ুক্ষয় হয়।
১২. বাড়িতে কক্ষগুলির অবস্থান—
যদি একটি কক্ষ পশ্চিমে ও একটি কক্ষ উত্তরে হয়, তবে তা গৃহস্বামীর জন্য মৃত্যুদায়ক। তেমনি পূর্ব ও উত্তর দিকে কক্ষ থাকলে আয়ু হ্রাস পায়। পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিকে কক্ষ থাকলেও দক্ষিণে কক্ষ না থাকলে সর্বপ্রকার রোগ উৎপন্ন হয়।
১৩. গৃহের অভ্যন্তরীণ কক্ষের অবস্থান—
স্নানঘর পূর্বে, রসোইঘর আগ্নেয় দিকে, শয়নকক্ষ দক্ষিণে, অস্ত্রাগার, সূতিকাগৃহ ও গৃহসামগ্রী এবং বড় ভাইয়া ও পিতার কক্ষ নৈঋত্যে, শৌচালয় নৈঋত্য, বায়ব্য বা দক্ষিণে, ভোজনস্থান পশ্চিমে, অন্নভাণ্ডার ও পশুগৃহ বায়ব্যে, পূজাঘর উত্তর বা ঈশানে, জল রাখার স্থান উত্তর বা ঈশানে, ধনসঞ্চয় উত্তর দিকে এবং নৃত্যশালা পূর্ব, পশ্চিম, বায়ব্য বা আগ্নেয় দিকে হওয়া উচিত। বাড়ির ভারী সামগ্রী নৈঋত্য দিকে রাখা উচিত।
১৪. গৃহস্বামীর জানার যোগ্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ—
ঈশান দিকে স্বামী-স্ত্রী শয়ন করলে রোগ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। সর্বদা পূর্ব বা দক্ষিণ দিকে মাথা করে শোয়া উচিত। উত্তর বা পশ্চিম দিকে মাথা করে শুলে দেহে রোগ হয় ও আয়ু ক্ষীণ হয়। রাত্রিতে দক্ষিণ দিকে এবং দিনে উত্তর দিকে মুখ করে মল-মূত্র ত্যাগ করা উচিত; কারণ দিনে সমুখে সূর্য থাকায় পূর্ব দিকে ও রাত্রিতে পশ্চিম দিকে মুখ করে মল-মূত্র ত্যাগ করলে রোগ উৎপন্ন হয়। দিনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রহরে যদি কোনো বৃক্ষ বা মন্দিরের ছায়া বাড়ির উপর পড়ে, তবে সেই বাড়ির বাস্তু রোগ উৎপন্ন করে।
১৫. গৃহবাস্তুর অবস্থান—
এক দেয়াল সংলগ্ন দুটি বাড়ি যমরাজের ন্যায় গৃহস্বামীর বিনাশকারী হয়। দুটি কক্ষের বিভাগও এক দেয়াল দ্বারা বিধিত নয়। কোনো পথ বা গলির শেষের বাড়ি কষ্টদায়ক হয়। বাড়ির সিঁড়ি (পগ), খুঁটি, জানালা, দরজা ইত্যাদির গণনা ইন্দ্র-যম-কুবের-রাজা এই ক্রমে করা উচিত; এবং শেষে যদি যম আসে, তবে সেই সিঁড়িকে অশুভ মনে করা উচিত।
সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর সংস্করণ—
পং. গণপতি শাস্ত্রী সম্পাদিত বড়োদা সংস্করণ ‘সমরাঙ্গণ সূত্রধার’-এর মানক সংস্করণ। বর্তমান সংস্করণটি বড়োদা সংস্করণের উপরই ভিত্তি করে, যা Central Library, Baroda থেকে ১৯২৪–১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। বড়োদা সংস্করণের উপর ভিত্তি করেই ড. সুদর্শন কুমার শর্মা, অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল, M.R. Government College, ফাজিলকা (পাঞ্জাব) কর্তৃক আঙলানুবাদের সঙ্গে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি থেকে প্রকাশিত সংস্করণটিই বর্তমানে উপলব্ধ। এ ছাড়া পং. দ্বিজেন্দ্রনাথ শুক্ল সম্পাদিত মেহরচাঁদ দিল্লির নিবন্ধাত্মক সংস্করণ রয়েছে। পং. শুক্লজি অপ্রয়োজনীয়ভাবে পং. গণপতি শাস্ত্রীর সংস্করণের অধ্যায়ক্রম এদিক-ওদিক করে দিয়েছেন এই বলে যে এটি লেখকের দোষ—
মন্যে ত্রুটিপূর্ণোऽয়ং সংগ্রহঃ অধ্যায়ানাম্।
লেখকস্য দোষো, ন গ্রন্থকর্তুর্দোষ ইতি প্রতীয়তে।।
— প্রাক্কথন পৃ. ৪
এভাবে তাঁর বলা সম্পূর্ণ ভুল। বর্তমান সংস্করণের তেইশতম অধ্যায়ে সমরাঙ্গণ সূত্রধারের রচয়িতা মহারাজ ভোজদেব এইভাবে বলেন—
ব্রূমো বিভাগমধুনা গৃহদেবতানাং
সম্যক্ শুভাশুভফলপ্রবিভাগ যুক্তম্। (২৩.১৪৮)
অর্থাৎ দেবতাদের নগরে পদ-সংনিবেশ ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে এবং এখন বাস্তুপদে প্রতিষ্ঠিত দেবতাদের শুভাশুভ ফল, যা বিভাগসম্মত ও শাস্ত্রপ্রতিপাদিত—তা যথাযথভাবে বলছি।
এইভাবে মূল শ্লোকে ‘ব্রূমো …’ প্রভৃতি দ্বারা যে কথা বলা হয়েছে, তা পং. গণপতি শাস্ত্রীর সংস্করণে পাওয়া যাবে; কিন্তু পং. দ্বিজেন্দ্রনাথ শুক্লের সংস্করণে ২৪তম অধ্যায়ে নয়, বরং ১৪তম অধ্যায়ে পাওয়া যাবে। এইভাবে পং. শুক্লজি কেন প্রাচীন সংস্করণের সঙ্গে ছেদচ্ছেদ করেছেন কিছুই বোঝা যায় না। যদি কোনো পাণ্ডুলিপির উদাহরণ পেশ করে অধ্যায়গুলির সঙ্গে এই রকম ছেদচ্ছেদ করতেন, তবে তা ঠিক ও ক্ষমাযোগ্য হতো এবং গবেষণামূলক বলেই প্রতীয়মান হতো। কিন্তু কোনো ভিত্তি ছাড়াই মূলচ্ছেদ করা একজন বিদ্বানের পক্ষে উপযুক্ত নয়। বর্তমানে উপস্থাপিত সংস্করণে ২২.১৯২ শ্লোকের ন্যায়ই ৪৪ শ্লোকে ‘রোগ’ পাঠ না রেখে ‘অম্বুদধ্বংসী’ পাঠ সম্পাদক কর্তৃক করা হয়েছে। আমি এই গ্রন্থের প্রকাশক কাশীস্থিত চৌখম্ভা সংস্কৃত ভবনের সংরক্ষক স্ব. শ্রীব্রজরত্নদাসজির দ্বিতীয় আত্মজ শ্রী ব্রজেন্দ্র কুমারকে ধন্যবাদ জানাই এবং আমার কামনা—তিনি এইভাবেই দুর্লভ গ্রন্থগুলি প্রকাশ করতে থাকুন।
মকরসংক্রান্তি ২০৬৭
বিদ্বদ্বশংবদ
এ. ৪/৩১, শীশমহল কলোনি,
সুধাকরমালবীয়
কমচ্ছা, বারাণসী
চিত্তরঞ্জনমালবীয়
প্রারম্ভিক কথা
স্থাপত্যবিদ্যার উপর ভোজদেব রচিত প্রশংসনীয় গ্রন্থ ‘সমরাঙ্গণ সূত্রধার’ বিদ্বৎসমাজের সামনে উপস্থাপন করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।
উল্লেখযোগ্য যে ভোজ ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা—তিনি একাধারে কবি, পণ্ডিত, বিজ্ঞানী ও জনপ্রিয় শাসক। তিনি সংস্কৃত জ্ঞানের নানা শাখায় প্রায় চুরাশি (৮৪)টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
এই সকল গ্রন্থের মধ্যে দুটি গ্রন্থ সরাসরি স্থাপত্যবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রথমটি—সমরাঙ্গণ সূত্রধার,
দ্বিতীয়টি—যুক্তিকল্পতরু।
সমরাঙ্গণ সূত্রধার গ্রন্থটি মোট তিরাশি (৮৩)টি অধ্যায়ে রচিত। এতে নগর পরিকল্পনা, গৃহস্থাপত্য, মন্দির স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যসংক্রান্ত বিষয়—যেমন প্রতিমালক্ষণ, আইকনোগ্রাফি, আইকনোমেট্রি, আইকনোপ্লাস্টিক শিল্প, মুদ্রা (হস্তমুদ্রা), হাতের বিভিন্ন ভঙ্গি, দেহভঙ্গি এবং পায়ের অবস্থান বা ভঙ্গি—ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। সহজ পাঠের সুবিধার্থে নীচে অধ্যায়ভিত্তিক বিষয়বস্তুর বিবরণ প্রদান করা হয়েছে।
The Existence of Prthv1.
-
The Conversation Between Viswakarma and his Sons.
-
‘Prabhavaka Charit' of Prabhachandra Siri, pg. 185 Quoted by Dr. Pratipala Bhatia, Cff 5 p. 316
ভোজব্যাকরণং হ্যেতচ্ছন্দশাস্ত্রং প্রবর্ততে।
অসৌ স মালবাধীশো বিদ্বচ্চক্রশিরোমণিঃ॥
শব্দালঙ্কারদৈবজ্ঞতর্কশাস্ত্রাণি নির্মমে।
চিকিৎসারজসিদ্ধান্তরসভাস্তূদয়ানি চ॥
অঙ্কশকুনবাচ্চাত্মস্বপ্নসামুদ্রিকান্যপি।
গ্রন্থান্ নিমিত্তব্যাখ্যানপ্রশ্নচূড়ামণীনিহ॥
বিবৃতিং চায়সদ্ধাবেऽর্ধকাণ্ডে (অর্থশাস্ত্র) মেঘমাল॥
৩. বাস্তুসংক্রান্ত প্রশ্নাবলি।
৪. সৃষ্টির বিবরণ।
৫. ভৌগোলিক তথ্য ও পৃথিবীর বর্ণনা।
৬. দেবতাদের সমতুল্যতা (দেবসমীকরণ)।
৭. সমাজের চার বর্ণ ও জীবনের চার আশ্রমের বিভাজন।
৮. শুভ ও অশুভ ভূমির বিবরণ।
৯. হস্ত বা কুবিত (হাত মাপ)-এর সংজ্ঞা।
১০. নগর পরিকল্পনা।
১১. ভূমি পরিকল্পনার তিন প্রকার।
১২. বাস্তুর মধ্যবর্তী শিরা ও ধমনীর বিবরণ।
১৩. মার্মস্থান (সংবেদনশীল বিন্দু) সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতার আলোচনা।
১৪. দেবতাদের পরিভাষা ও গৃহদেবতার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রকারভেদ।
১৫. রাজপ্রাসাদের পরিকল্পনা।
১৬. গৃহনির্মাণের জন্য কাঠের প্রয়োজনীয়তা।
১৭. অসুরদের উপর ইন্দ্রের বিজয় উপলক্ষে ইন্দ্রধ্বজের বিবরণ।
১৮. নগর নামকরণের বিধান।
১৯. বর্গাকার, বৃত্তাকার ও চতুষ্কক্ষবিশিষ্ট গৃহের চিত্রণ।
২০. গৃহ ও ভূমির উচ্চ ও নিম্ন অংশের গুণ ও দোষ।
২১. বাহাত্তর প্রকার ত্রিকক্ষবিশিষ্ট গৃহের সংজ্ঞা।
২২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট গৃহের সংজ্ঞা।
২৩. এককক্ষবিশিষ্ট গৃহের সংজ্ঞা।
২৪. দ্বার, পীঠ ও প্রাচীরের সংজ্ঞা ও পরিমাপ।
২৫. সর্বপ্রকার গৃহের সংখ্যার বিবরণ।
২৬. নির্মাণের শুভ ও অশুভ বিধান।
২৭. সভাগৃহ বা আদালতকক্ষের অষ্টপ্রকার ভেদ।
২৮. গৃহস্থালির উপকরণের বিবরণ।
২৯. শয্যা ও আসনের সংজ্ঞা।
৩০. রাজপ্রাসাদের বিবরণ।
৩১. যান্ত্রিক উপকরণ সংক্রান্ত অধ্যায়।
৩২. হস্তিবাহনের পরিচর্যাকার (মহুত) সংক্রান্ত বিবরণ।
৩৩. অশ্বশালার সংজ্ঞা।
৩৪. পাঠযোগ্য ও অপাঠযোগ্য নির্মাণসামগ্রী এবং প্রাচীরচিত্র।
৩৫. শিলান্যাস সংক্রান্ত বিধান।
৩৬. দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি প্রদান।
৩৭. কীলক স্থাপন ও সূত্রপাত।
৩৮. গৃহের ভূমি-নকশা।
৩৯. দ্বারের গুণ ও দোষ।
৪০. ভিত্তিপীঠের পরিমাপ।
৪১. নির্মাণবিধি (চয়নবিধি)।
৪২. শান্তিকর্ম সংক্রান্ত আচারবিধি।
৪৩. ক্ষতিগ্রস্ত দ্বারের শুভ ও অশুভ ফল।
৪৪. স্থপতির সংজ্ঞা।
৪৫. স্থাপত্যের অষ্টাঙ্গের সংজ্ঞা।
৪৬. তোরণ বা খিলান ভেঙে পড়লে প্রায়শ্চিত্তমূলক শান্তিকর্ম।
৪৭. বেদীর সংজ্ঞা।
৪৮. গৃহের নির্ধারিত দোষসমূহ।
৪৯. রুচক প্রভৃতি প্রাসাদের সংজ্ঞা।
৫০. প্রাসাদের শুভ ও অশুভ লক্ষণ।
৫১. দেবালয়ের ভিত্তি নির্মাণ।
৫২. প্রাসাদসমূহের নির্দিষ্ট নামকরণ।
৫৩. ভবনের অন্তর্গত দ্বারসমূহ।
৫৪. প্রাসাদের দ্বারের পরিমাপ।
৫৫. মেরু প্রভৃতি ষোড়শ প্রকার ভবনের সংজ্ঞা।
৫৬. রুচক প্রভৃতি চৌষট্টি প্রাসাদের চিত্রণ।
৫৭. মেরু প্রভৃতির বিশক (বিশ সংখ্যক) বিভাগ।
৫৮. প্রাসাদস্তবন (প্রাসাদের প্রশস্তি)।
৫৯. চৌষট্টি প্রকার বিমান-এর সংজ্ঞা।
৬০. শ্রীকূট প্রভৃতি ছত্রিশ প্রকার প্রাসাদের সংজ্ঞা।
৬১. পীঠপঞ্চকের লক্ষণ।
৬২. দ্রাবিড় প্রাসাদের সংজ্ঞা।
৬৩. মেরু প্রভৃতি বিশক নাগর প্রাসাদ (মেরু মান অনুযায়ী বিশ প্রকার নগর ভবন)।
৬৪. দিগ্ভদ্র প্রভৃতি প্রাসাদের পূর্বশর্তসমূহ।
৬৫. ভূমিজ প্রাসাদের চিত্রণ।
৬৬. মণ্ডপের সংজ্ঞা।
৬৭. সাতাশ প্রকার মণ্ডপের সংজ্ঞা।
৬৮. ভূমির বিভিন্ন অঙ্গের নির্দিষ্ট বিন্যাস।
৬৯. ঊনচল্লিশ প্রকার জগতি’র লক্ষণ।
৭০. শিবলিঙ্গের পীঠে প্রতিমা চিত্রণের বিবরণ।
৭১. ‘চিত্ত্রোদ্দেশ’—চিত্রকলার বিধান।
৭২. ভূমিবন্ধ (চিত্রাঙ্কনের পূর্বে প্রাচীর প্রস্তুতকরণ)।
৭৩. লেপ্যকর্ম প্রভৃতি—ঢালাই, মডেল নির্মাণ ও প্রলেপকার্য।
৭৪. অণ্ডক পরিমাপ ও মানবমুখ অঙ্কনের নির্দিষ্ট মাপ।
৭৫. মানোৎপত্তি—পরিমাপের উৎপত্তি।
৭৬. প্রতিমার বিবরণ।
৭৭. দেবতাদের রূপ, অস্ত্র ও চিহ্নের সংজ্ঞা।
৭৮. গুণ ও দোষের লক্ষণনিরূপণ।
৭৯. প্রতিষ্ঠার জন্য সরল ও উপযুক্ত স্থানের লক্ষণ।
৮০. বৈষ্ণব প্রভৃতি দেবস্থান স্থাপনের লক্ষণ।
৮১. পঞ্চপুরুষ ও নারীর প্রতিমার চিত্রণ।
৮২. রস (ভাব)-এর পূর্বশর্ত সংক্রান্ত আলোচনা।
৮৩. পতাকা প্রভৃতি চৌষট্টি হস্তমাপের সংজ্ঞা।
ভোজদেব প্রাচীন ভারতের সর্বোত্তম নগর পরিকল্পনার প্রথম সুসংহত বিবরণ প্রদান করেন।
— সমরাঙ্গণসূত্রধার (১০.৭.২৫)
যোগাযোগের ধমনির (arteries of communication) ছয়টি শ্রেণি স্বীকৃত হয়েছে, যথা—
মহারথ্যা (বৃহৎ রথচলাচলের পথ),
যানমার্গ (যানবাহন চলাচলের পথ),
উপরথ্যা (শাখা রথপথ),
রথ্যা (সাধারণ রথপথ),
ঘণ্টামার্গ (গ্রাম্য প্রধান সড়কের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত মুখ্য পথ) এবং
রাজমার্গ (নগরের সড়ক ও মহাসড়ক)।
পরবর্তীতে আমরা সমরাঙ্গণসূত্রধার (VIII.7.25)-এ দেখতে পাই যে, এই গ্রন্থটি রাজনৈতিক ভূগোল বিষয়ে গভীর জ্ঞানের সাক্ষ্য দেয় এবং ষোড়শ প্রকার ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের উল্লেখ করে—
১. বালিশস্বামিনী (সমৃদ্ধ ও জনবহুল অঞ্চল),
২. ভোগ্যা (সমৃদ্ধ দেশ),
৩. সীতাগোচররক্ষিণী (নদী ও পর্বতে পরিপূর্ণ অঞ্চল),
৪. অপাশ্রয়বতী (অনুকূলতাবিহীন অঞ্চল),
৫. কান্তা (প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপূর্ণ স্থান ও পর্যটনকেন্দ্র),
৬. খানিনি (খনি অঞ্চল),
৭. আত্মধারিণী (স্বল্প জনসংখ্যাবিশিষ্ট কিন্তু স্বাধীনতাপ্রিয় জনগোষ্ঠীর অঞ্চল),
৮. বণিক্প্রসাধিতা (বাণিজ্যকেন্দ্র),
৯. দ্রব্যবতী (উৎপাদনশীল অরণ্যাঞ্চল),
১০. অমিত্রঘাতিনী (বন্ধুপ্রতিবেশীসমৃদ্ধ বা শত্রুর পক্ষে অননুকূল অঞ্চল),
১১. আশ্রেণীপুরুষা (শান্তিপ্রিয় জনগণের অঞ্চল),
১২. শাক্যসামন্তা (নিরপেক্ষ অঞ্চল),
১৩. দেবমাতৃকা (অতিবৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল),
১৪. ধান্যশালিনী (অত্যন্ত উৎপাদনশীল অঞ্চল),
১৫. হস্তিবনোপেতা (বন্যপ্রাণসম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল) এবং
১৬. সুরক্ষা (কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল)।
এছাড়াও ভোজ সমরাঙ্গণসূত্রধার-এ (চতুর্থ অধ্যায়) ভূগোল সম্পর্কিত একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় প্রদান করেছেন, কারণ তিনি নিজেও একজন ভূগোলবিদ ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ‘ভোজপ্রতিদেশব্যবস্থা’ নামে একটি সুবৃহৎ ভূগোলবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যা যথার্থ অর্থেই একটি পরিপূর্ণ ভূগোলগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার যোগ্য। ভারতবর্ষে এ ধরনের প্রাচীন গ্রন্থ অত্যন্ত দুর্লভ। সুতরাং রাজনৈতিক ভূগোল এবং বাস্তুশাস্ত্র—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর সুস্পষ্ট ও গভীর দখল ছিল। এই কারণেই দশম শতাব্দীতে তিনি ভূগোল ও বাস্তুশাস্ত্র—উভয় শাস্ত্রের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কৌটিল্যরূপে প্রতিভাত হন। প্রকৃতপক্ষে উপরোক্ত ষোড়শ প্রকার ভূ-রাজনৈতিক বিভাগের আলোচনাই প্রমাণ করে যে, নগর পরিকল্পনার কালানুক্রমিক বিকাশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সীমিত পরিসরের মধ্যেই অধিক সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্টভাবে বিষয় উপস্থাপনের প্রয়াস করেছিলেন।
আমরা আমাদের সহকর্মী অধ্যাপিকা শৈলজা পান্ডে, এলাহাবাদ (উত্তর প্রদেশ) এবং শ্রীকৃষ্ণ ‘যুগানু’-এর নিকট গভীরভাবে কৃতজ্ঞ …রাজস্থানের উদয়পুর নিবাসী যাঁরা প্রাচীন সংস্কৃত বাস্তুশাস্ত্রগ্রন্থসমূহ সম্পাদনা ও হিন্দিতে অনুবাদের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. সুদর্শন কুমার শর্মা, এম. আর. সরকারি কলেজ, ফাজিলকা (পাঞ্জাব)-এর নিকট আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ, কারণ সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর তাঁর ইংরেজি অনুবাদ নিঃসন্দেহে এক মাইলফলকস্বরূপ কাজ। নিঃসন্দেহে উপর্যুক্ত সকল পণ্ডিতের নিকট আমরা ঋণী, যাঁরা বাস্তুশাস্ত্রের পাঠকদের জন্য প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যবিদ্যার উৎকৃষ্টতম উপাদান পরিবেশন করে চলেছেন।
সুধাকর মালব্য
চিত্তরঞ্জন মালব্য
প্রথম সংস্করণের ভূমিকা
সমরাঙ্গণ সূত্রধার স্থাপত্যবিদ্যার একটি গ্রন্থ। শব্দার্থ অনুযায়ী এর অর্থ—মানব আবাসস্থলের স্থপতি। এই গ্রন্থে নগর ও গ্রাম পরিকল্পনা, গৃহ, সভাগৃহ ও প্রাসাদ নির্মাণের বিধান, তদুপরি নানাবিধ যন্ত্রের বিবরণ আলোচিত হয়েছে।
এই সংস্করণটি নিম্নলিখিত তিনটি পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে—
১. # চিহ্নিত পাণ্ডুলিপি—বড়োদার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অধিভুক্ত। এটি দ্বিতীয় অধ্যায়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত, তবে এতে ১৯টি ফোলিও অনুপস্থিত। কোলফনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী এটি সংবৎ ১৫৯৪ সালে লিপিবদ্ধ।
২. " চিহ্নিত পাণ্ডুলিপি—উক্ত গ্রন্থাগারেরই অন্তর্গত, যা ৫৫তম অধ্যায়ের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।
৩. " চিহ্নিত পাণ্ডুলিপি—পাটনার ভাণ্ডারকর গ্রন্থাগার থেকে ধার নেওয়া, যা ৪৯তম অধ্যায়ের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত; তবে এতে ১০টি ফোলিও অনুপস্থিত এবং বয়সের দিক থেকে এটি প্রথম পাণ্ডুলিপিটির সমসাময়িক বলে প্রতীয়মান।
এই পাণ্ডুলিপিগুলি ত্রুটিতে পরিপূর্ণ এবং পাঠোদ্ধারে খুব একটা সুস্পষ্ট নয়। সেগুলিকে মুদ্রণের উপযোগী করে পরীক্ষা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। প্রথম ৫৪টি অধ্যায় বর্তমানে প্রথম খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে; অবশিষ্ট অধ্যায়সমূহ মুদ্রণাধীন এবং শীঘ্রই দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত হবে।
এই খণ্ডের শুরুতে একটি বিস্তৃত বিষয়সূচি সংযোজিত হয়েছে, যার পর্যালোচনায় গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত সকল বিষয়ের একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যাবে।
টীকা—এই ভূমিকা ১৯৬৬ সালের সমরাঙ্গণ সূত্রধার সংস্করণ থেকে গৃহীত; কারণ বর্তমান সম্পাদক প্রথম সংস্করণ প্রত্যক্ষ করতে পারেননি।
এই গ্রন্থে নগর, প্রাসাদ ও বৃহৎ ভবন নির্মাণের বিষয় অন্যান্য প্রাপ্ত শিল্পশাস্ত্রগ্রন্থের তুলনায় অধিক স্পষ্ট ভাষায় ও বিশদ বিবরণসহ আলোচিত হয়েছে। একত্রিশতম অধ্যায়ে নানাবিধ যন্ত্রের বর্ণনা রয়েছে, যা অন্যান্য শিল্পগ্রন্থে পাওয়া যায় না—যেমন হাতির যন্ত্র (গজযন্ত্র), আকাশে চলমান কাঠের পাখির যন্ত্র (ব্যোমচারিবিহগযন্ত্র), আকাশে উড়ন্ত কাঠের বিমানযন্ত্র (আকাশগামিদারুময়বিমানযন্ত্র), দ্বাররক্ষক যন্ত্র (দ্বারপালযন্ত্র), যোদ্ধাযন্ত্র (যোধযন্ত্র) প্রভৃতি।
“যন্ত্রাণি কল্পিতো হস্তীভ তদ্ গচ্ছৎ প্রतीयতে ।
শুকাদ্যাঃ পক্ষিণঃ ক্লপ্তাস্তালস্যানুগমান্মুহুঃ ॥ ৭৩ ॥
জনস্য বিস্ময়কৃতো নৃত্যন্তি চ পঠন্তি চ ।
পুত্রিকা বা গজেন্দ্রো বা তুরগো মর্কটোऽপি বা ॥ ৭৪ ॥
বলনৈর্বর্তনৈর্নৃত্যংস্তালেন হরতে মনঃ ॥”
“লঘুদারুময়ং মহাবিহঙ্গং দৃঢ়সুশ্লিষ্টতনুং বিধায় তস্য ।
উদরে রসযন্ত্রমাদধীত জ্বলনাধারমধোऽস্য চাগ্নিপূর্ণম্ ॥ ৯৪ ॥
তত্রারূঢ়ঃ পুরুষস্তস্য পক্ষদ্বন্দ্বোচ্চালপ্রোজ্ঝিতেনানিলেন ।
সুপ্তস্যান্তঃ পারদস্যাস্য শক্ত্যা চিত্রং কুর্বন্নম্বরে যাতি দূরম্ ॥ ৯৫ ॥
ইত্থমেব সুরমন্দিরতুল্যং সঞ্চলত্যলঘু দারুবিমানম্ ।
আদধীত বিধিনা চতুরোऽন্তস্তস্য পারদভৃতান্ দৃঢ়কুম্ভান্ ॥ ১৭ ॥”
সাধারণত বিদ্যমান শিল্পশাস্ত্রগ্রন্থগুলির ভাষা ব্যাকরণগত ত্রুটিপূর্ণ; কিন্তু বর্তমান গ্রন্থটি ব্যাকরণগত অসঙ্গতি থেকে মুক্ত এবং অধিকাংশ স্থানে মধুর ও সুন্দর শৈলীতে রচিত।
এই গ্রন্থটি ভারতীয় স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন অত্যন্ত উপকারী হবে, তেমনি যারা বাস্তবে এই বিদ্যাকে প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক, তাঁদের জন্যও সমানভাবে কল্যাণকর প্রমাণিত হবে।
গ্রন্থে উল্লিখিত লেখক হলেন মহারাজাধিরাজ শ্রীভোজদেব, যিনি সম্ভবত ধারানগরের সেই ভোজরাজ, যিনি খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের প্রথম ভাগে মালবদেশ শাসন করেছিলেন। তাঁর রচিত বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে শৃঙ্গারপ্রকাশ (অলঙ্কারশাস্ত্র) ও সরস্বতীকণ্ঠাভরণ (ব্যাকরণ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ
টি. গণপতি শাস্ত্রী
এই দ্বিতীয় খণ্ডটি সমরাঙ্গণ গ্রন্থের কার্য সম্পূর্ণ করে, যা তিরাশি অধ্যায়ের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে প্রাসাদসমূহের বর্ণনা, চিত্র ও প্রতিমায় অঙ্কনযোগ্য বিষয়াবলি, পতাকা প্রভৃতি দিয়ে সূচিত চৌষট্টি প্রকার হস্তলক্ষণ এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; যাদের বিশদ বিবরণ সংযুক্ত বিষয়সূচিতে পাওয়া যাবে।
এই সংস্করণ প্রকাশ করতে গিয়ে বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কারণ প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় উল্লিখিত পাণ্ডুলিপি ব্যতীত আর কোনো পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। উক্ত পাণ্ডুলিপিটি বহু ত্রুটিপূর্ণ এবং বহু স্থানে পাঠোদ্ধারে অস্পষ্ট। ত্রুটিগুলির যথাযথ বিকল্প পাঠ প্রশ্নচিহ্নের মাধ্যমে প্রস্তাব করা হয়েছে এবং অশুদ্ধ শব্দ ও বাক্যের জন্য নতুন পাঠ যতদূর সম্ভব পাদটীকার মাধ্যমে নির্দেশ করা হয়েছে।
বিষয়বস্তু যেহেতু শিল্পশাস্ত্রসংক্রান্ত, সেহেতু গ্রন্থটির সাহিত্যিক গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক নয়। তথাপি এটি তার মধুর ও সরল কাব্যশৈলীর জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কারণেই প্রথম খণ্ডে আমি উল্লেখ করেছি যে গ্রন্থকার সেই ধারানগরের রাজা ভোজই, যিনি শৃঙ্গারপ্রকাশ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন এবং যাঁকে সাহিত্যক্ষেত্রে উচ্চ আসন প্রদান করা হয়েছে।
এ কথা বলা যেতে পারে যে, গ্রন্থে উল্লিখিত হাতির যন্ত্র, দ্বাররক্ষক যন্ত্র, উড়ন্ত যন্ত্র প্রভৃতি নানাবিধ যন্ত্র যেহেতু আগে কখনো দেখা বা শোনা যায়নি, সেহেতু সেগুলি কেবল কল্পনাপ্রসূত, বাস্তবে নির্মিত ও ব্যবহৃত যন্ত্র নয়। কিন্তু তা সঠিক নয়; কারণ একসময়ে বিদ্যমান বস্তুসমূহও দীর্ঘকাল ব্যবহারের অভাবে কালে কালে অবাস্তব বলে বিবেচিত হতে পারে, এবং সেইসব বস্তু…অত্যধিক শ্রম, সময় ও অর্থসাপেক্ষ বিষয়সমূহও খুব সহজেই ব্যবহারের বাইরে চলে যেতে পারে।
এরপর প্রশ্ন উঠতে পারে—কবি কেন যন্ত্র নির্মাণের পদ্ধতি বর্ণনা করেননি। এ বিষয়ে কবি নিজেই উত্তর দিয়েছেন (৩১.৭৯–৮০)—
যন্ত্রাণাং ঘটনা নোক্তা গুপ্ত্যর্থ নাজ্ঞতাবশাত্ ।
তত্র হেতুরয়ং জ্ঞেয়ো ব্যক্তা নৈতে ফলপ্রদাঃ ॥
(প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৫)
“ব্যক্তা নৈতে ফলপ্রদাঃ”—এই পঙ্ক্তির অর্থ এই যে, যদি গ্রন্থে যন্ত্র নির্মাণের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়, তবে যাঁরা গুরুর নিকট থেকে শিল্পে দীক্ষা লাভ করেননি, তাঁরাও যন্ত্র নির্মাণের চেষ্টা করবেন। কিন্তু এই ধরনের লোকের দ্বারা করা প্রচেষ্টা সফল তো হবেই না, বরং নানা প্রকার বিপদ ও অসুবিধার কারণ হয়ে উঠবে।
পরবর্তী শ্লোকে যন্ত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে (৩১.৮৭)—
পারম্পর্যকৌশলং সোপদেশশাস্ত্রাভ্যাসো বাস্তুকর্মোদ্যমো ধীঃ ।
সামগ্রীয়ং নির্মলা যস্য সোऽস্মিঞ্চিত্রাণ্যেবং বেত্তি যন্ত্রাণি কর্তুम् ॥
(প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৬)
অত্যন্ত উপযোগী যন্ত্রসমূহের ক্ষেত্রে তাদের নির্মাণ-পদ্ধতি গোপন রাখা—এটিও কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়।
ভূমিকা
(১৯৬৬)
ভোজদেব রচিত সমরাঙ্গণসূত্রধার প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ ও ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে, জি. ও. সিরিজের ২৫ ও ৩২ নম্বর হিসেবে, দুই খণ্ডে—যার সম্পাদক ছিলেন মহামহোপাধ্যায় টি. গণপতি শাস্ত্রী। বহু বছর ধরে এই গ্রন্থটি মুদ্রণশেষে অপ্রাপ্য হয়ে ছিল।
ড. ভি. এস. আগরওয়ালা সমগ্র পাঠ পুনঃসম্পাদনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বিষয়বস্তুর আলোচনা-সহ দীর্ঘ ভূমিকা, টীকা ও প্রযুক্তিগত পরিভাষার সূচিপত্র সম্বলিত আরেকটি খণ্ড সংযোজনের পরিকল্পনা করেন। তিনি সেই অতিরিক্ত খণ্ড প্রস্তুতের কাজেও নিয়োজিত ছিলেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে জুলাই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন, কাজটি সম্পূর্ণ করার পূর্বেই। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী পূর্বে দুই খণ্ডে প্রকাশিত পাঠ এখন পুনঃসম্পাদিত হয়ে এক খণ্ডে প্রকাশিত হল—যাতে ভূমিকা, টীকা ও সূচি সংযোজিত হয়েছে—ড. আগরওয়ালার নোট প্রভৃতির ভিত্তিতে। ড. আগরওয়ালা এই পাঠ-খণ্ডের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা প্রদান করেছেন।
এই খণ্ডসমূহ প্রকাশের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় অনুদান কমিশন এবং গুজরাট রাজ্য সরকারের নিকট কৃতজ্ঞ।
এছাড়াও এই খণ্ড মুদ্রণের ক্ষেত্রে আন্তরিক সহযোগিতার জন্য বরোদা এম. এস. বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের ব্যবস্থাপক শ্রী আর. জে. প্যাটেলের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ।
ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট
বি. জে. সন্দেসারে
বরোদা
পরিচালক
তারিখ: ৯ই নভেম্বর, ১৯৬৬
চতুঃ প্রকারং স্থাপত্যমষ্টধা চ চিকিৎসিতম্ ।
ধনুর্বেদশ্চ সপ্তাঙ্গোঁ জ্যোতিষং কমলালয়াত্ ।।
ভারতদেশের বাস্তু মূলত তিন প্রকার—
১. দেবভবন (মন্দির, সমাধিস্থল, গুরুদ্বারা, জৈনমন্দির, বৌদ্ধমন্দির ইত্যাদি),
২. রাজভবন (ভারতের বহু রাজাদের দুর্গ), এবং
৩. সাধারণ ভবন (একতলা থেকে সাততলা পর্যন্ত ভবন, এক কক্ষের গৃহ থেকে দশ কক্ষ (শালা) বিশিষ্ট ভবন ইত্যাদি)।
এইভাবে এই তিন বিভাগে বিশ্বের সমগ্র বাস্তুসমূহকে সমরাঙ্গণ সূত্রধার বাস্তুশাস্ত্র গ্রন্থ যে বিভক্ত করেছে—এটাই এই গ্রন্থের বিশেষ দান। মানসার, ময়মত প্রভৃতি শিল্পশাস্ত্রীয় গ্রন্থে ধরা (পৃথিবী), হ্ম্য (প্রাসাদ), যান এবং পর্যঙ্ক—এই রূপে চতুর্বিধ বাস্তু-লক্ষণ প্রতিপাদিত হয়েছে। সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এ যে ষড়্বিধ বাস্তু-লক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ১. দেশ-নিবেশ, ২. পুর (নগর) নিবেশ এবং ৩. ভবন-নিবেশ বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী।
ভারতদেশে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। অতএব ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় প্রভৃতি চার বর্ণকে এবং ব্রহ্মচর্য, গৃহস্থাশ্রম প্রভৃতি চার আশ্রমকে লক্ষ্য করে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে। পৃথু গোরূপ পৃথিবীর দোহন করেছিলেন—এই কাহিনি ভাগবত পুরাণ প্রভৃতি বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত। সৃষ্টির রচয়িতা (কর্তা) ‘ব্রহ্মা’ নামে অভিহিত এবং ভগবান বিশ্বকর্মা সৃষ্টির আচার্য (অভিযন্তা) ও মন্দির প্রভৃতি ভবনের নির্মাতা প্রথম গুরু (স্থপতি)। তিনি অষ্ট বসুর মধ্যে প্রভাস নামক বসুর পুত্র। সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এর পরম্পরা অনুযায়ী প্রভাস বসুর পত্নী বৃহস্পতির ভগিনী। অতএব বিশ্বকর্মা বৃহস্পতির ভাগ্নে। বিশ্বকর্মা ইন্দ্রের নগরী অমরাবতীর নির্মাণ করেছিলেন এবং এই জগতের প্রথম শাসক মহারাজ পৃথু ছিলেন, যাঁর কার্য্যে বিশ্বকর্মা সহায়তা করেছিলেন। সুতরাং তাঁরা সমকালীন ছিলেন। কিন্তু অপরাজিতপৃচ্ছা-এর পরম্পরা অনুযায়ী প্রভাস বসুর বিবাহ ভৃগুর ভগিনীর সঙ্গে হয়েছিল। ‘ভৃগু’ শব্দটি প্রাচীন কারিগরদের জন্য ব্যবহৃত হত। মহাভারত প্রভৃতি ইতিহাসগ্রন্থে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বায়ব্যাস্ত্র ও বারুণাস্ত্রের কারিগর সম্ভবত তাঁরাই ছিলেন। রাজগৃহে যান্ত্রিক বিধান তাঁদের দ্বারাই সম্পন্ন হত। সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এর যন্ত্রাধ্যায় (৩১)-এ বিমান যন্ত্র, পারদ, অগ্নি এবং অয়ঃকপাল প্রভৃতি যান্ত্রিক কলার উল্লেখ আছে, কিন্তু সেগুলি কীভাবে নির্মিত হবে—তা বলা হয়নি। সাধারণ গৃহনিবেশ ও রাজগৃহ প্রভৃতির বর্ণনা সমরাঙ্গণ সূত্রধার-এর আটচল্লিশ অধ্যায়ে রয়েছে। অবশিষ্ট ৪৯–৮৩ অধ্যায় পর্যন্ত দেবমন্দিরসমূহের বর্ণনা পাওয়া যায়।
‘সমরাঙ্গণ সূত্রধার’-এ ‘সূত্রধার’-এর অর্থ হল সূত্র ধরে মাপজোককারী (কারিগর) এবং ‘সমরাঙ্গণ’-এর অর্থ হল আঙিনাযুক্ত গৃহ, যা মানবজীবনে পঞ্চমহাভূতের প্রकोপ থেকে রক্ষা করে এমন যুদ্ধক্ষেত্র। অর্থাৎ জীবনযাপনরূপী যুদ্ধের ময়দানস্বরূপ গৃহ (আঙিন) স্থান। এই গৃহরূপ যুদ্ধস্থল নির্মাণের বিধানবিষয়ক শাস্ত্রই সমরাঙ্গণ সূত্রধার। এই প্রসঙ্গে প্রোঃ বাসুদেব শরণ আগরওয়ালেরও অনুরূপ মত আছে—
The name সমराङ्गण सूत्रधार is worthy of attention. The word सूत्रधार literally means 'Thread bearer', i.e. an architect who takes his measurements by means of the plumblime. Here is a pun on the word 'H' which means both a battlefield and a mortal human being (sa+mara) (destined to die). Thus the title as applicable to Bhoja would signify firstly that he was the architect of the fortunes on the battlefield, i.c. who planned the course of battle leading to victory, and secondly, who was the architect of human dwellings, i.e. evil architecture on an extensive scale, The epithet in its second denotation is a fact of King Bhoja's building activities who planned cities, palaces, temples, educational institutions and hospitals, wharfs, lakes, ponds, stepped wells, pavilions, resting places, roads, groves, etc. in a liberal spirit.
ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র (স্থাপত্য)-এর প্রধান ও প্রথম অঙ্গের ভিত্তিপ্রস্তর হল ‘বাস্তুপদ’ বিন্যাস। ভগবত্পাদ শঙ্করাচার্যের প্রপঞ্চসার অনুসারে প্রাচীনকালে ‘বাস্তু’ নামে এক পুরুষ ছিলেন, যিনি সমগ্র সংসারকে উপদ্রুত ও অশান্ত করেছিলেন। তাঁর আকৃতি ছিল চতুষ্কোণ বস্তুর ন্যায়। সেই দিতিপুত্র রাক্ষসকে দেবতারা বধ করেন (প্রপঞ্চসার ৫.৫)। তাঁর দেহে অবস্থানকারী দেবগণের সংখ্যা ছিল তিপ্পান্ন। অতএব সেই দেবতাদের উদ্দেশ্যে বাস্তুতে মণ্ডল নির্মাণ করে তাতে স্থাপন ও পূজন করা উচিত।
বাস্তুপূজায় সর্বপ্রথম পৃথিবীকে চতুষ্কোণ রূপে সমতল করতে হয়। চতুরস্ত্র অর্থাৎ চতুষ্কোণকে পৃথিবীর প্রতীক ধরা হয়, যার উপর ঐ ৫৩ দেবতার বাস। সেই সমতল ভূমি (চতুরস্র)-এর উপর আট অষ্টক—অর্থাৎ ৬৪টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষ্ঠকে (বাস্তুপুরুষ বধকারী) ৫৩ দেবতার পূজা করে তাঁদের বলি প্রদান করা উচিত। এর জন্য ঐ ৬৪ চতুষ্কোণের মধ্যস্থ চারটি চতুষ্কোণকে এক গণ্য করে তার মধ্যভাগে ব্রহ্মার পূজা করতে হবে।
তারপর তার পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তর দিকের কোষ্ঠকগুলিতে আর্যক, বিবস্বান্, মিত্র এবং মহীধরের অভ্যর্থনা করতে হবে।
চতুষ্কোণগুলিতে অবস্থিত অর্ধেক-অর্ধেক করে দুই-দুইটি কোষ্ঠকে সাবিত্রী, সবিতা, ইন্দ্র, ইন্দ্রজয়, রুদ্র, রুদ্রজয়, আপ্, বৎসক এবং অগ্নির; বায়ব্য কোণে শর্ব, গুহ, আর্য্যমা ও জম্ভক এবং ঈশান কোণে পিলিপিচ্ছ, চরকী, বিদারী ও পূতনার অভ্যর্থনা করা উচিত।
এরপর সেই ব্রাহ্ম প্রকোষ্ঠের চারদিকে অবস্থিত চারটি কোষ্ঠক (চতুষ্কোষ্ঠক অর্থাৎ মোট ১২টি কোষ্ঠক)-এ ক্রমানুসারে আর্যক, বিবস্বান, মিত্র এবং মহীধরের; তারপরে চার উপদিশার ১৬টি কোষ্ঠকের মধ্যে আগ্নেয় কোণে সাবিত্রী, সবিতা, শক্র ও ইন্দ্রজয়ের; নৈঋত্য কোণে রুদ্র, রুদ্রজয়, আপ্ ও বৎসকের; বায়ব্য কোণে শর্ব, গুহ, আর্য্যমা ও জম্ভকের এবং ঈশান কোণে পিলিপিচ্ছ, চরকী, বিদারী ও পূতনার পূজা করা উচিত।
বাসব (পূর্ব), যম (দক্ষিণ), জলেশ (পশ্চিম) এবং শশি (উত্তর) দিশাবর্তী ৩২টি কোষ্ঠকের মধ্যে—পূর্বের কোষ্ঠকগুলিতে ঈশাল, সর্পজন্য, জয়ন্ত, শক্র, ভাস্কর, সত্য, বৃষ এবং অন্তরীক্ষ—এই পূর্বে উল্লিখিত দেবতাদের পূজা করতে হবে।
দক্ষিণের কোষ্ঠকগুলিতে অগ্নি, পুষা, বিতথ, যম, গৃহরক্ষক, গন্ধর্ব, ভৃঙ্গরাজ এবং মৃগের; পশ্চিমের কোষ্ঠকগুলিতে নিরৃতি, দৌবারিক, সুগ্রীব, বরুণ, পুষ্পদন্ত, অসুর, শেষ এবং উরগের; এবং উত্তর দিশার কোষ্ঠকগুলিতে বায়ু, নাগ, মুখ্য, সোম, ভল্লাট, অর্গলা, দিতি ও অদিতির অর্চনা করা উচিত।
এই ভূতলে সর্বপ্রথম নাদ ব্রহ্মের জন্ম হয় নটরাজ শিবের ডমরু নিনাদ থেকে, যা লয়, তাল এবং নৃত্যকেও জন্ম দিয়েছে। দেবতাকে প্রসন্ন করার জন্য মন্দিরসমূহে এর প্রয়োগ হয়েছে। অতএব সমরাঙ্গণ-এর উত্তরার্ধের অধ্যায়সমূহে হস্তমুদ্রারও বিবেচনা পাওয়া যায়।
সমরাঙ্গণসূত্রধার-এর রচয়িতা ভোজদেব—
ভোজ (ভোজরাজ) ছিলেন পরমারবংশীয় ধারার (মালবা) নরেশ। তিনি সংস্কৃত ভাষার পুনরুদ্ধারক ছিলেন এবং বহু শাস্ত্র রচনা করেছেন। জ্যোতিষ বিষয়ক ‘রাজমৃগাঙ্ক’ নামক গ্রন্থটি তিনি ১০৪২–৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন। তাঁর পিতৃব্য (চাচা) ছিলেন মহারাজ মুঞ্জ, যাঁর মৃত্যু ৯৯৪ থেকে ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে হয়। তৎপরবর্তী কালে তাঁর পিতা সিন্ধুরাজ সিংহাসনারূঢ় হন এবং কিছুদিন রাজগদ্দিতে আসীন থাকেন। মহারাজ ভোজের উত্তরাধিকারী জয়সিংহ ১০৫৫–৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। মান্ধাতা নামক স্থানে ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দের একটি শিলালিপি পাওয়া যায়। অতএব মহারাজ ভোজদেবের সময়কাল একাদশ শতকের পূর্বার্ধ (১০১৮–১০৬৩) বলে মানা হয়। ভোজের বিদ্বত্তা, গুণগ্রাহকতা ও দানশীলতা ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। রাজতরঙ্গিণী (৭.২৫৯)-এ কাশ্মীর নরেশ অনন্তরাজ ও মালবাধিপতি ভোজদেবকে সমানভাবে বিদ্বৎ-প্রিয় বলা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সমান অধিকারসহ লেখনী পরিচালনা করেছেন এবং প্রায় ৮৪টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
১. তিনি ‘শৃঙ্গারমঞ্জরী’ নামক শৃঙ্গারিক রচনা এবং
২. ‘মন্দারমরন্দচম্পূ’ নামক কথাকাব্য রচনা করেছেন।
৩. বাস্তুশাস্ত্র বিষয়ে তাঁর ‘সমরাঙ্গণ-সূত্রধার’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আছে; এতে সাত হাজার শ্লোকে বাস্তুশাস্ত্রের গূঢ় রহস্য উদ্ভাসিত হয়েছে।
৪. ‘সরস্বতীকণ্ঠভরণ’ (বৃহদ্শব্দানুশাসন) নামক তাঁর ব্যাকরণ বিষয়ক গ্রন্থ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ; এটি আট প্রকাশে বিভক্ত।
৫. তিনি ‘যুক্তিপ্রকাশ’ এবং
৬. ‘তত্ত্বপ্রকাশ’ নামক ধর্মশাস্ত্রীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন।
৭. ‘রাজমার্তণ্ড’ নামক গ্রন্থ ঔষধি বিষয়ক; এতে মোট ৪১৮টি শ্লোক আছে।
৮. যোগসূত্রের উপর ভোজদেবের ‘রাজমার্তণ্ড’ নামক অত্যন্ত প্রসিদ্ধ টীকা আছে।
৯. ‘আয়ুর্বেদ সর্বস্ব’,
১০. ‘শালিহোত্র’ এবং
১১. ‘বিশ্রান্ত বিদ্যাবিনোদ’ নামক গ্রন্থ আয়ুর্বেদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১২. ‘সংগীতপ্রকাশ’ নামক গ্রন্থ সংগীতশাস্ত্র বিষয়ক।
১৩. ‘রাজমার্তণ্ড’ নামক গ্রন্থ বেদান্ত দর্শনের।
১৪. ‘সিদ্ধান্ত সংগ্রহ’,
১৫. ‘সিদ্ধান্ত সার-পদ্ধতি’,
১৬. ‘শিব তত্ত্ব রত্নকলিকা’,
১৭. ‘তত্ত্বপ্রকাশ’ (শিবতত্ত্বপ্রকাশিকা)—এই গ্রন্থগুলি দর্শন (আগম) শাস্ত্রের অন্তর্গত।
১৮. ‘কূর্মাষ্টক’ (দুই ভাগে) প্রাকৃত কবিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
১৯. ‘চম্পূরামায়ণ’, ‘মহাকালীবিজয়’ ও ‘বিদ্যাবিনোদ’—চম্পূ কাব্য ও গদ্যসাহিত্যের রচনা।
২০. ‘নামমালিকা’ নামক গ্রন্থ কোষ বিষয়ক।
২১. ‘সুভাষিত-প্রবন্ধ’ নামক গ্রন্থ সুভাষিত কাব্য।
২২. ‘আদিত্য প্রতাপ সিদ্ধান্ত’,
২৩. ‘রাজমার্তণ্ড’,
২৪. ‘রাজমৃগাঙ্ক’ এবং
‘বিদ্বজ্জ্ঞানবল্লভ’ (প্রশ্নবিজ্ঞান)—এই গ্রন্থগুলি জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২৫. ‘ভুজবুল প্রবন্ধ’,
২৬. ‘ভূপাল পদ্ধতি’,
২৭. ‘ভূপাল সমুচ্চয়’ বা ‘কৃত্যসার সমুচ্চয়’,
২৮. ‘চাণক্যনীতি’ (দণ্ডনীতি),
২৯. ‘চৌঞ্চর্যা’,
৩০. ‘ব্যবহার সমুচ্চয়’,
৩১. ‘যুক্তিকল্পতরু’,
৩২. ‘পূর্তমার্তণ্ড’,
৩৩. ‘রাজমার্তণ্ড’ এবং
৩৪. ‘রাজনীতিঃ’—এই গ্রন্থগুলি ধর্মশাস্ত্র, রাজধর্ম ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩৫. কাব্যশাস্ত্র বিষয়ে ভোজদেব ‘শৃঙ্গারপ্রকাশ’ এবং
৩৬. ‘সরস্বতীকণ্ঠা-ভরণালঙ্কার’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই দুই রচনায় সংশ্লিষ্ট সকল বিধার বিস্তৃত বিবেচনার সঙ্গে বহু নতুন তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছে।
শৃঙ্গারকে মূল রস রূপে গ্রহণ করে ভোজরাজ অলঙ্কারশাস্ত্রের ইতিহাসে নতুন …উদ্ভাবনা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাস্তবতঃ ভোজদেব পূর্ববর্তী সকল কাব্যশাস্ত্রীয় সিদ্ধান্তের বিবেচনা উপস্থাপন করে সমন্বয়বাদী পরম্পরার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই কাব্যশাস্ত্রে তাঁর গুরুত্ব অধিক।
ভোজরাজের বহুমুখী প্রতিভায় প্রভাবিত হয়ে ষোড়শ শতাব্দীর বল্লালসেন ‘ভোজপ্রবন্ধ’ নামে এক অনন্য কাব্যের প্রণয়ন করেন। এই প্রবন্ধে বিভিন্ন কবির দ্বারা ভোজরাজের যে প্রশস্তি করা হয়েছে, তার কাহিনিভিত্তিক বিবরণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি কাহিনি অনুযায়ী—
ধারার সিন্ধুরাজের বৃদ্ধাবস্থায় ভোজ নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। বৃদ্ধাবস্থার কারণে সিন্ধুরাজ রাজ্যের ভার অন্যের হাতে অর্পণ করার কথা ভাবলেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুঞ্জরাজ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। তখন ভোজরাজ মাত্র পাঁচ বছরের বালক। সিন্ধুরাজ অমাত্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজ্যভার মুঞ্জের হাতে তুলে দেন এবং ভোজকে তাঁর কোলে দেন।
কিছু সময় পরে একদিন মুঞ্জের সভায় এক সর্ববিদ্যাপারঙ্গত জ্যোতিষী উপস্থিত হলেন। মুঞ্জ তাঁর কাছে ভোজের ফলিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তখন সেই মহাপণ্ডিত ফলিত গণনা করে বললেন যে ভোজ গৌড়সহ সমগ্র দক্ষিণাপথেও রাজত্ব করবেন। এই কথা শুনে মুঞ্জরাজ চমকে উঠে কোনোভাবে ভোজকে নিজের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বঙ্গদেশের বৎসরাজকে ডেকে আদেশ দিলেন যে ভুবনেশ্বরী বনে ভোজকে হত্যা করে তাঁর কর্তিত মস্তক রাজাকে এনে দেখাতে হবে।
বৎসরাজ বহু বোঝানোর পরও মুঞ্জ নিজের আদেশ পরিবর্তন করলেন না এবং বৎসরাজকে আদেশ পালনে বাধ্য করলেন। অসহায় বৎসরাজ ভোজকে সঙ্গে নিয়ে ভুবনেশ্বরী বনে এসে পৌঁছালেন। ভোজকে হত্যা করার জন্য ভুবনেশ্বরী বনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এই সংবাদে ধারাবাসী জনগণ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।
এদিকে বৎসরাজ ভোজকে ভুবনেশ্বরী বনে মহামায়া মন্দিরের কাছে নিয়ে গেলেন এবং পিতৃতুল্য চাচার আদেশ তাঁকে জানালেন। ভোজ এক বটবৃক্ষের পাতায় নিজের রক্ত দিয়ে একটি বার্তা লিখে মহারাজ মুঞ্জকে দেওয়ার জন্য বৎসরাজের হাতে তুলে দিলেন। তারপর তিনি বৎসরাজকে শীঘ্রই মুঞ্জের আদেশ পালন করতে বললেন। সেই সময় ভোজের দীপ্তিময় মুখ দেখে বৎসরাজ করুণায় আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি ভোজকে নিজের গৃহে নিরাপদে রাখলেন এবং একটি কৃত্রিম মস্তক প্রস্তুত করে রাজা মুঞ্জকে দেখালেন। সঙ্গে সঙ্গে ভোজের সেই বার্তাটিও তিনি মুঞ্জকে দিলেন। মুঞ্জ সেই বার্তাটি পড়লেন—
মান্ধাতা স महीपतিঃ কৃতযুগালঙ্কারভূতো গতঃ
সেতুর্যেন মহোদধৌ বিরচিতঃ ক্বাঽসৌ দশাস্যান্তকঃ ।
অন্যে চাপি যুধিষ্ঠিরপ্রভৃতয়ো যাতা দিবং ভূৃপতে
নৈকেনাপি সমং গতা বসুমতী মুঞ্জ ত্বয়া যাস্যতি॥
‘সত্যযুগের অলংকারস্বরূপ মহীপতি মহারাজ মান্ধাতা চলে গেছেন। যিনি সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণ করেছিলেন এবং রাবণবধকারী ত্রেতাযুগের অলংকারস্বরূপ মহারাজ শ্রীरामচন্দ্র—তিনি কোথায়? দ্বাপরযুগের অলংকারস্বরূপ যুধিষ্ঠির প্রভৃতি রাজাগণও স্বর্গে গমন করেছেন। কারও সঙ্গেই এই বসুমতী (পৃথিবী) যায়নি; কিন্তু হে মুঞ্জ! এই পৃথিবী আপনার সঙ্গেই যাবে।’
এই বার্তা পড়ে মুঞ্জরাজ অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি নিজেকে মহাপাপী বলে নিন্দা করতে লাগলেন এবং পুত্রহত্যার প্রায়শ্চিত্তে উদ্যত হলেন। তখন বৎসরাজ বুদ্ধিসাগর প্রভৃতি অমাত্যদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করে মুঞ্জকে প্রকৃত ঘটনা জানালেন এবং ভোজকে মুঞ্জের সম্মুখে উপস্থিত করলেন। নিজের কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে মুঞ্জ ভোজের সামনে খুব কাঁদলেন। ভোজও তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন।
এরপর মুঞ্জরাজ নিজেই ভোজের রাজ্যাভিষেক করলেন এবং নিজের পুত্র জয়ন্তকে ভোজের হাতে অর্পণ করে নিজে তপোবনে চলে গেলেন।
সমরাঙ্গণসূত্রধার ও অন্যান্য বাস্তুশাস্ত্রীয় গ্রন্থসমূহের উপর বিহঙ্গম দৃষ্টি—
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতো মুখো
বিশ্বতো বাহুরুতবিশ্বতস্মাত্ ।
স বাহুভ্যাং ভ্রমতি স পতত্রৈ-
র্দ্যাবাভূমী জনয়ন্ দেব একঃ ।।
সেই এক দেবই এই সমগ্র সৃষ্টির রচনা করেছেন। তাঁর চক্ষু, মুখ, পা ও বাহু সর্বত্র ব্যাপ্ত। তিনি দ্যুলোক ও ভূমিকে প্রকাশ করেছেন। সেই দেব সমগ্র বিশ্বকে ব্যাপ্ত করে বিরাজমান।
বাস্তু শব্দের নিরুক্তি—
দেবতা ও মানুষ যেখানে-যেখানে সুখপূর্বক বাস করে, সেই স্থানকে ‘বস্তি’ বলা হয়। ‘বস্তি’-সম্পর্কিত বিষয়কে ‘বাস্তু’ সংজ্ঞায় অভিহিত করা হয়। যেমন ময়মতম্ (২.১)-এ বলা হয়েছে—
অমর্ত্যশ্চৈব মর্ত্যশ্চ যত্র যত্র বসন্তি হি।
তদ্ বস্ত্বিতি মন্ত্রজ্ঞৈঃ তত্তদ্ধেদং বদাম্যহম্॥ —ময়মতম্ ২/১
এইভাবে সমগ্র পৃথিবীই বাস্তু-র ভিত্তি। অতএব ভূমি ও বাস্তু-র অধ্যয়নই বাস্তুশাস্ত্রের বিষয়। ব্রহ্মা যখন সমগ্র বিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন, তখনই তিনি বাস্তু-র ভিত্তিও কল্পনা করেন। বিশ্বকর্মা—যিনি বাস্তুশাস্ত্রের প্রথম আচার্য বলে মানা হয়—বাস্তু-র বহু দিব্য উদাহরণ উপস্থাপন করে তাঁর পুত্র জয়কে বলেছিলেন যে সৃষ্টির আদিকালে ব্রহ্মা সর্বপ্রথম বাস্তুপুরুষের সৃষ্টি করেন—
তানুবাচ মুনির্বৎসা বিদিতং বো যথা পুরা।
বাস্তুব্রহ্মা সসরজাদৌ বিশ্বমপ্যখিলং তথা।
—সমরাঙ্গণসূত্রধার ২/৪
ভূমির লক্ষণ—
ভবন, প্রাসাদ, দুর্গ বা অন্যান্য নির্মাণের আগে ভূমির পরীক্ষা করা এবং তার লক্ষণ জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যদিও স্থাপত্য এবং শিল্পের ভিত্তি ভূমি, তাই নির্মাণ কাজ করার আগে ভূমি পরীক্ষা করতে হয়। যদি ভূমি সঠিকভাবে নির্বাচিত না হয়, তবে সেই স্থানে নির্মিত ভবন ক্ষতিকর হয়। ময়মতম্ গ্রন্থ অনুযায়ী নিম্নলিখিত ধরনের ভূমি শুভ মনে করা হয়েছে—
১. চতুরস্র ভূমি ভবন ও দেবালয়ের জন্য শুভ। পশ্চিম–উত্তর দিকে উঁচু ভূমি বিশেষ শুভ।
২. বিল্ব, নিম্ব, নির্বুণ্ডি, পিণ্ডিত, ছিতবন এবং আমের গাছযুক্ত ভূমি শুভ। যদি এটি সমতল হয় তবে আরও শুভ।
৩. উজ্জ্বল, হলুদ, লাল, কালো, কবুতরের চোখের মতো রঙের ভূমি শুভ।
৪. হাড়বিহীন, বাঁবী (=বল্মীক)বিহীন, কীট-মাকড়বিহীন, ভস্মবিহীন, গাছের শিকড়বিহীন, কাদাবিহীন, কুয়া-বিহীন এবং ভূসিবিহীন ভূমি শুভ।
৫. মৃতদেহের গন্ধযুক্ত, মাছ ও পাখির গন্ধযুক্ত ভূমি শুভ নয়।
৬. দেবালয়, রাজপ্রাসাদ ও কাঁটাযুক্ত গাছের নিকটবর্তী ভূমি শুভ নয়।
৭. ত্রিকোণ, বৃত্তাকার, বিষম, এক–দুই–তিন–চার পথে বিচ্ছিন্ন ভূমি, বড় গাছের দ্বারা চার কোণ আক্রমিত ভূমি, সর্পনিবাস ভূমি এড়িয়ে যেতে হবে।
৮. শ্মশান, আশ্রম, বানর–শূকরের বাসস্থান নিকটবর্তী ভূমি, বহু প্রবেশ পথযুক্ত ভূমি, রাস্তা দ্বারা বিচ্ছিন্ন ভূমি এড়ানো উচিত।
৯. উত্তর–পশ্চিমে উঁচু ভূমি, পূর্ব বা উত্তরে নদী সংযুক্ত ভূমি, সুগন্ধযুক্ত ভূমি বাসস্থানের জন্য অত্যন্ত শুভ।
বিশ্বকর্মা অনুযায়ী ভূমির লক্ষণ—
দেবতাদের শিল্পী বিশ্বকর্মা। তিনি স্থাপত্যবেদের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবর্তক ঋষি মণ্ডলে অন্তর্ভুক্ত। তাঁর মতে, ভূমি চার ধরনের এবং প্রধানত চার রঙের হয়।
ব্রাহ্মণী ভূমি সুগন্ধযুক্ত।
ক্ষত্রিয়া ভূমি লাল রঙের, যা রক্তের মতো গন্ধ বের করে।
বৈশ্য ভূমি মধুর গন্ধযুক্ত।
শূদ্র ভূমি মদ বা তীক্ষ্ণ গন্ধযুক্ত।
ব্রাহ্মণী ভূমির স্বাদ মিষ্টি, ক্ষত্রিয়া ভূমি কষাইলা, বৈশ্য ভূমি টক, শূদ্র ভূমি তিতা—
মথুরা ব্রাহ্মণী ভূমি: কষায়া ক্ষত্রিয়া মতা।
অম্লা বৈশ্যা ভবেদ্ ভূমিস্তিক্তা শূদ্রা প্রकीর্তিতা।
—বিশ্বকর্মা ১/২৬
আবাসনের জন্য দুর্লভ ভূমি—
কিছু ভূমি দুর্লভ। এই ধরনের ভূমিতে ভবন নির্মাণ করলে মানুষ প্রজন্মে প্রজন্মে সুখী থাকে। এই ভূমি হলো—চতুর্ভুজ, হাতির মতো, সিংহ, বেল, ঘোড়া, হাতি, বৃত্ত, ভদ্রপীঠ, ত্রিশূল, শিবলিঙ্গের মতো আকৃতির। বিশ্বকর্মা মত—
চতুরস্ত্রাং দ্বিপাকারাং সিংহোক্ষাশ্বেবরূপিণীঃ।
বৃত্তঞ্চ ভদ্রপীঠঞ্চ ত্রিশূলং লিঙ্গসন্নিভম্॥
মহলের ধ্বজার মতো উঁচু এবং পাত্রের মতো ভূমি দেবতরাও কামনা করেন—
প্রাসাদধ্বজকুম্ভাদিদেবানামপি দুর্লভাম্॥
দৃঢ় ভূমি—
দুর্লভ ভূমির পর শ্রেষ্ঠ ভূমি হলো দৃঢ় ভূমি। এতে চতুরস্র সহজেই চেনা যায়। এরপর গুরুতর, উঁচু ও সম ভূমি শুভ মনে করা হয়। এ ধরনের ভূমিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা বসতি গঠন করতে পারেন। বিশ্বকর্মার মতে, সকল জাতি–বর্ণের জন্য সম ভূমি শুভ—
দ্বিতীয় দৃঢ়ভূমি চ নিম্না চোত্তরপূর্বকে।
গম্ভীরা ব্রাহ্মণী ভূমির নৃপাণ শৃঙ্গমাশ্রিতা। —বিশ্ব ১/৩২
বৈশ্যানাং সমভূমি চ শূদ্রাণাং বিকটা স্মৃত।
সর্বেষাং চৈব বর্ণানাং সমভূমি: শুভাভবা॥ —বিশ্ব ১/৩৩
রঙের ভিত্তিতে ভূমি—
উজ্জ্বল রঙের ভূমি সকল বর্গের জন্য শুভ। কুশ–কাষ এই ধরনের ভূমি ব্রাহ্মণদের জন্য বিশেষ শুভ, এতে বাস করলে তপস্যা ও বিদ্যায় বৃদ্ধি হয়। দূর্বা উদ্ভূত ভূমি ক্ষত্রিয়দের জন্য ফলপ্রদ। শূদ্রদের জন্য ঘাস–ফুঁসযুক্ত ভূমি ফলপ্রদ।
শুক্লবর্ণা চ সর্বেষাং শুভাভূমি রুদাহৃতা।
কুশকাষযুক্তা ব্রাহ্মীদূর্বানৃপাতিভর্গগা।
ফলপুষ্পলতা বৈশ্যা শূদ্রাণাং তৃণসংযুক্তা॥ —বিশ্ব ১/৩৪
শুভ ভূমির ফল—
চতুরস্ত্র মহাধনদায়ী
হাতির মতো ভূমি—ধনদায়ী
সিংহের মতো ভূমি (ব্যাঘ্রমুখ নয়)—গুণী পুত্র
বেল মতো ভূমি—পশুপালক
বৃত্তাকার ভূমি—শুভধনদায়ী
ভদ্রপীঠ ভূমি—শুধনদায়ী
ত্রিশূল মতো ভূমি—বীরসন্তান, ধন–সুখদায়ী
শিবলিঙ্গ সদৃশ ভূমি—সাধুদের সুখদায়ী
প্রাসাদ ধ্বজ মতো ভূমি—পদোন্নতিদায়ী
কুম্ভ সদৃশ ভূমি—ধনবৃদ্ধিদায়ী
সুগন্ধের ভিত্তিতে ভূমি—
যে ভূমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুগন্ধ বের করে, তা অত্যন্ত শুভ। স্থান নির্বাচনের সময় হাতে মাটি নিয়ে গন্ধ গ্রহণ করতে হয়। স্বাদ জানার জন্য চেখেও দেখা উচিত।
রোলি, আগর, করপুর, চন্দনের মিশ্র সুগন্ধের মতো যদি ভূমি সুগন্ধযুক্ত হয়, তবে তা শুভ।
কনাইল (কনার), গোলাপ, কমল, মালতি, চম্পা ও অন্যান্য সুগন্ধী ফুলের মতো ভূমি প্রশস্ত।
যে ভূমি গো-মূত্র, গোবর, দুধ, দই, ঘি–এর মতো সুগন্ধ বের করে, তা ফলপ্রদ। ময়মতম্ অনুযায়ী দই, ঘি, মধু, সুগন্ধযুক্ত ভূমি অশুভ।
মদ, মহুয়া, গন্ধ, হাতির মদজাত সুগন্ধ, আসম্ভ সুগন্ধ, ধান, পিসান–জাত সুগন্ধ—এই ধরনের ভূমি সকল জাতি ও বর্গের জন্য শুভ।
কুংকুমাগরুকর্পূরস্পৃক্কৈলাচন্দনাদিভিঃ
সুগন্ধা মিশ্রিতৈরেবিঃ পৃথকস্থৈর্বা বসুন্ধরা॥
কলহারপাতল্যাভোজমালতী চম্পকোত্পলঐঃ
স্থলাম্বুপ্রভাবৈশ্চান্যৈঃ সুগন্যা কুসুমৈস্তথা॥
গোমূত্র–গোময়–ক্ষীরদ্ধি–মধ্বাজ্যগন্ধভাক্…
সমান সুগন্ধ—
সামানগন্ধা মদিরামাধ্বীকে ভমদাসবৈঃ।
শালিপিষ্ঠকগন্ধৈশ্চ ধান্যগন্ধৈশ্চ বা তাথা।
প্রশস্তাখিলবর্ণনামি দ্রিগ্ গন্ধা বসুন্ধরা॥
মৌসুমের ভিত্তিতে ভূমির লক্ষণ— গরমের দিনে যেই ভূমির স্পর্শ শীতলতা দেয় এবং শীতের দিনে উষ্ণতা অনুভূত হয়, এছাড়াও বর্ষার দিনে যেই ভূমির স্পর্শে শীতলতা ও উষ্ণতার মিশ্র অনুভূতি আসে, সেই ভূমি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং শুভ।
ঘর্মাগমে হিমস্পর্শা বা স্যাদুষ্ণা হিমাগমে। প্রাবৃষ্যুষ্ণহিমস্পর্শা সা প্রশস্তা বসুন্ধরা॥
শুভ ভূমি থেকে উদ্ভূত ধ্বনি—
যে ভূমি শুভ, যদি রাতে তাতে শয়ন করা হয়, তবে মৃদঙ্গ, বীণা, বাঁশি এবং দণ্ডুভী বাদ্যের মতো শব্দ শোনা যায়। কখনও হাতির ডাক, ঘোড়ার হিনহিন বা সাগরের ঢেউয়ের মতো শব্দও ভূমি থেকে শোনা যায়। এমন ভূমি শুভ ধরা হয়—
মৃদঙ্গবল্লকীবীণুদুন্দুভীনাং সমা ধ্বনৌ।
দ্বিপাশ্চাব্ধিসমস্বানা চেতি স্যুর্ভূময়ঃ শুভাঃ॥
অশুভ ভূমি—
সমরাঙ্গণসূত্রধার গ্রন্থে যেসব ভূমির বিস্তারিত লক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা অন্যত্র এত সুন্দরভাবে পাওয়া যায় না। এই ধরনের দুষ্ট ভূমি, যেখানে ভবন বা অন্য কোনো নির্মাণ করাও অশুভ। এমন ভূমি সচেতনভাবে এড়ানো উচিত।
১. (চিতা) ভস্ম, অঙ্গার (জলানো কাঠ বা উপলা), কপাল (হাড়যুক্ত মাথা), অস্থি, ভূসি, চুল এবং বিষাক্ত পাথরের মতো ভূমি অশুভ।
২. (ইঁদুর) ইঁদুরের বাসস্থানযুক্ত ভূমি, বাঁবীযুক্ত ভূমি, চিনি মিশ্রিত ভূমি, শুষ্ক ভূমি, ঢালু ভূমি, দ্রুত ভেঙে যায় এমন ভূমি, বড় বড় ছিদ্রযুক্ত ভূমি, গর্তে জল ভর্তি হলে জল বাম দিকে ঘুরে যায় এমন ভূমি, কসর ভূমি, নিম্ন–উচ্চ ভূমি, কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদ, ফলহীন বৃক্ষযুক্ত ভূমি, দুষ্ট পাখি এবং কীট–মাকড়ে ভর্তি ভূমি, অতিরিক্ত রান্নার পরও খাদ্য কমে যাওয়া বা স্বাদ খারাপ হওয়া—এই ধরনের ভূমি অশুভ।
৩. পূর্বে নদী বয়ে গেছে এমন ভূমি, মাংস–চর্বি–মেদ বা দুর্গন্ধযুক্ত ভূমি, পচা মালার গন্ধযুক্ত ভূমি, পশু–পাখির মল–মূত্রের মতো গন্ধযুক্ত ভূমি, তেল বা মৃতদেহের মতো দুর্গন্ধ, ধূসর বা ফিকে রঙের ভূমি, তিতা–কষায়–নমকযুক্ত বা ঘাম সৃষ্ট ভূমি—এগুলো অশুভ।
৪. শুষ্ক, কঠিন, গরম বা ঠান্ডা ভূমি, যা দেখলে অনিষ্টের সম্ভাবনা থাকে, তা এড়াতে হবে।
৫. শিয়াল, উট, ঘোড়া, গাধার আওয়াজের মতো শব্দ দিয়ে ভূমি শোনালে তা ত্যাগ করতে হবে।
৬. ঝরনার মতো শব্দযুক্ত ভূমি অশুভ।
৭. রাতে শয়নের সময় পাত্রের ঝনঝন শব্দ বা ধাক্কাধাক্কি শোনানো ভূমি ত্যাগ করা উচিত।
ভূমি খোঁড়ার সময় লক্ষণ—
যে ভূমিতে ভবন নির্মাণ হবে, তা হাল বা কুদাল দিয়ে খুঁড়ে পরীক্ষা করা হয়।
কাঠ বের হলে অগ্নি সৃষ্টিকারী ভূমি
পাথর বের হলে কল্যাণদায়ী ভূমি
ইট বের হলে ধনলাভকারী ভূমি
অস্থি বের হলে কুলনাশকারী ভূমি
সাপ বের হলে চুরি–ডাকাতির ক্ষতি করা ভূমি
নির্মাণের জন্য অযোগ্য স্থান—
সভাগার, বাগান, মঠ–মন্দির, রাজপ্রাসাদ, কাঁটাযুক্ত গাছের নিকট, নিচু আয়ের মানুষের ঘরের পাশে, বড় বৃক্ষের কাছে এবং শ্মশান, গুহ্যবিদ্যা আশ্রম, বানর–ভালু–শূকরের বাসস্থানের নিকট ভবন তৈরি করা উচিত নয়।
ভূমি পরীক্ষা পদ্ধতি—
১. ভূমি খনন পদ্ধতি—
ভূমির মধ্যে একটি হ্যান্ডলম্বা, চওড়া ও গভীর গর্ত খোঁড়া উচিত। গর্ত থেকে বের হওয়া মাটি আবার ভরে দিন।
যদি গর্ত পুরোপুরি পূর্ণ হয় এবং মাটি বাকি থাকে—উৎকৃষ্ট ভূমি
কেবল গর্ত পূর্ণ হয়—সাধারণ ভূমি
মাটি কম পড়ে—নিষিদ্ধ ভূমি
২. জলপূর্ণ পদ্ধতি—
গর্তে জল ভরে দিন।
জল দ্রুত শুকিয়ে গেলে—নাশ,
একই পরিমাণে থাকলে—উত্তম ফল, স্থির জল
দক্ষিণমুখী পরিক্রমায় ঘুরলে—সুখ
বামমুখী ঘুরলে—মৃত্যু
৩. রাত্রি জলপূর্ণ পদ্ধতি—
রাতে গর্ত খুঁড়ে জল ভরে রাখুন। সকালে—
জল দেখলে—বৃদ্ধি
কাদার দেখা দিলে—সমতা
ফাটল থাকলে—নাশ
৪. দীপ পদ্ধতি—
উজ্জ্বল, লাল, হলুদ, কালো প্রদীপ মাটিতে স্থাপন করুন। তেলের আলোকপ্রদীপে যেই রঙ দীর্ঘ সময় জ্বলে, সেই বর্ণের ব্যক্তির জন্য ভূমি শুভ।
৫. পুষ্প পদ্ধতি—
সন্ধ্যায় ভূমিতে সাদা, লাল, হলুদ, কালো ফুল রাখুন। সকালে ফুলের অবস্থান দেখুন। যে বর্ণের ফুল সবচেয়ে তাজা, সেই বর্ণের ব্যক্তির জন্য ভূমি শুভ।
৬. অন্তঃকরণ পদ্ধতি—
যে প্লট বা খণ্ডে মন আনে, অন্তঃকরণ প্রফুল্ল হয়, সেই খণ্ড ব্যক্তির জন্য শুভ।
তত্তস্য ভবতি শুভদম্ যস্য চ যস্মিন মনোরমতে॥
৬ ফুট গভীরে পড়ে থাকা হাড় অশুভ ফল দেয় না। তাই ৬ ফুট গভীর ভূমি ঘুরিয়ে দিলে ত্রুটি দূর হয় এবং এই ধরনের ভূমিতে বাধা সৃষ্টি হয় না।
দিক নির্ধারণ—
ভবন নির্মাণে সঠিক দিক জ্ঞান অত্যন্ত জরুরি। ভারতীয় স্থাপত্যশাস্ত্রে দিগ্বিজ্ঞানের (দিকের জ্ঞান) একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রচিত হয়েছে, তবে আজকাল দিগ্বিজ্ঞানের জন্য চুম্বক যন্ত্র (কম্পাস) সেরা সরঞ্জাম।
দিক নির্ণয়:
পূর্ব: অগ্নিকোণ (পূর্ব দক্ষিণ)
পশ্চিম: নৈরিত্যকোণ (দক্ষিণ পশ্চিম)
উত্তর: বায়ব্যকোণ (পশ্চিম উত্তর)
দক্ষিণ: ঈশানকোণ (পূর্ব উত্তর)
ভূখণ্ডের (প্লটের) বিভাজন:
উত্তর-দক্ষিণ দিকের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভূখণ্ড সাধারণত চার বা আট অংশে ভাগ করা হয়।
যদি ভূখণ্ডে যোগচিহ্ন (প্লাস) চিহ্নিত করা হয়, তবে এটি চার অংশের হবে, যেমন:
উত্তর
উ.পূ.
পশ্চিম পূর্ব
নৈঃরিত্য অগ্নি
দক্ষিণ
দ.পূ.
যদি ভূখণ্ড দুটি রেখা দিয়ে বিভক্ত করা হয়, তবে এটি আট অংশের প্লট হয়ে যায় এবং মাঝখানে একটি আঙ্গনও তৈরি হয়। এটি হলো সাধারণ ভাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী ভাগ।
উত্তর
উ.পূ.
বায়ব্য ঈশান
পশ্চিম পূর্ব
নৈঃরিত্য অগ্নি
দক্ষিণ
দ.পূ.
অনেক প্লট যা চতুর্ভুজ (সমান্তরাল) বা আয়তাকার নয়, সেখানে নির্মাণকালে দিক নির্ণয় কঠিন হয়। ফলে উত্তর–দক্ষিণ দিককে সরাসরি রেখায় স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী উত্তর–দক্ষিণ দিকের সরল বা সমান্তরাল থাকা অপরিহার্য। সর্বোত্তম হলো এমন যে, উত্তর–দক্ষিণ দিকে অসমান বা বিকৃত প্লট গৃহ নির্মাণের জন্য গ্রহণ না করা। যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে নির্মাণকালে তা ঠিক করে নেওয়া উচিত।
উচ্চ–নিম্ন ভূমি ও ঢালযুক্ত ভূখণ্ডের প্রভাব (সম০ সূত্র০ ৪৮.১-৫):
প্রায়ই সমান ভূমি পাওয়া যায় না, বা যেসব এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে হয় সেখানে ভূমি কোনো বিশেষ দিকের দিকে ঢালু থাকে। শাস্ত্রে নির্মাণের জন্য ভূমির ঢাল বা ঝোঁক সম্পর্কে বিস্তারিত বিবেচনা করা হয়েছে, যেমন:
পূর্ব দিকে ঢালযুক্ত ভূমি: ধনসম্পদ বৃদ্ধি
অগ্নিকোণ দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত): ক্ষয়, মৃত্যু, শোক
দক্ষিণ দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত): মৃত্যু, গৃহনাশ
নৈরিত্যকোণের দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত) – ধননাশ
পশ্চিম দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত) – পুত্র ক্ষতি ও রোগ
বায়ব্যকোণের দিকে ঢালযুক্ত ভূমি (নিন্দিত) – মানসিক উৎকণ্ঠা ও যাত্রা
উত্তর দিকে ঢালযুক্ত ভূমি – ধনলাভ
ঈশানকোণের দিকে ঢালযুক্ত ভূমি – বিদ্যা অর্জন ও সুখ-সমৃদ্ধি
ভাস্তুশাস্ত্রে ঢালযুক্ত ভূমির নাম:
১. যমবীথি: উত্তরে উঁচু, দক্ষিণে ঢালযুক্ত – ক্ষয়কারী ভূখণ্ড
২. গজবীথি: উত্তরে ঢাল, দক্ষিণে উঁচু – সাধারণ শুভ ভূখণ্ড
৩. ভূতবীথি: ঈশানকোণে উঁচু, নৈরিত্যকোণে নীচ – শুভ ভূখণ্ড
৪. নাগবীথি: অগ্নিকোণে উঁচু, বায়ব্যকোণে নীচ – শুভ ভূখণ্ড
৫. বৈশ্বানরি ভূমি: বায়ব্যকোণে উঁচু, অগ্নিকোণে নীচ – শুভ ভূখণ্ড
৬. ধনবীথি: ঈশানকোণে উঁচু, নৈরিত্যকোণে নীচ – ধনলাভের ভূখণ্ড
৭. পিতামহ ভূষ্টি: অগ্নিকোণের মধ্যে উঁচু, পশ্চিম-বায়ব্যের মধ্যে নীচ – অত্যন্ত শুভ, কিন্তু বিরল
৮. সুপথ ভূষ্টি: অগ্নিকোণ-পশ্চিমের মধ্যে উঁচু, বায়ব্য-উত্তরের মধ্যে নীচ – শুভ
৯. দীর্ঘায়ু ভূষ্টি: উত্তর-ঈশান মধ্যে নীচ, নৈরিত্য-দক্ষিণ মধ্যে উঁচু – বংশ বৃদ্ধি করে
১০. পুণ্যক ভূষ্টি: ঈশান-পূর্ব মধ্যে নীচ, নৈরিত্য-পশ্চিম মধ্যে উঁচু – শুভ
১১. অপথ ভূষ্টি: পূর্ব-অগ্নিকোণ মধ্যে নীচ, বায়ব্য-পশ্চিম মধ্যে উঁচু – কলহকারী
১২. রোগকৃত ভূষ্টি: অগ্নিকোণ-দক্ষিণ মধ্যে নীচ, বায়ব্য-উত্তর মধ্যে উঁচু – রোগসংক্রান্ত
১৩. আরগল ভূষ্টি: নৈরিত্য-দক্ষিণ মধ্যে নীচ, ঈশান-উত্তর মধ্যে উঁচু – পাপনাশিনী
১৪. শ্মশান ভূষ্টি: ঈশান-পূর্ব মধ্যে উঁচু, পশ্চিম-নৈরিত্য মধ্যে নীচ – কুলনাশকারী
১৫. প্রধান ভূষ্টি: ঈশানকোণ, অগ্নিকোণ, পশ্চিমে উঁচু, নৈরিত্য মধ্যে নীচ – দরিদ্রতা বৃদ্ধি
১৬. স্থাবর ভূষ্টি: অগ্নিকোণে উঁচু, নৈরিত্য, ঈশান, বায়ব্যে নীচ – সর্বশুভ
১৭. স্থণ্ডিল ভূষ্টি: নৈরিত্যকোণে উঁচু, অগ্নি, বায়ব্য, ঈশানে নীচ – স্থিতিশীলতা প্রদানকারী
১৮. শাণ্ডুল ভূষ্টি: ঈশানে উঁচু, অগ্নি, বায়ব্য, নৈরিত্যতে নীচ – অযোগ্য ও অশুভ
১৯. সুস্থান ভূষ্টি: অগ্নি, নৈরিত্য, ঈশানে উঁচু, বায়ব্যতে নীচ – ব্রাহ্মণের জন্য শুভ
২০. সুতল ভূষ্টি: পূর্বে নীচ, নৈরিত্য, বায়ব্য, পশ্চিমে উঁচু – ক্ষত্রিয়দের জন্য শুভ
২১. চরভূষ্টি: দক্ষিণে নীচ, উত্তর, ঈশান, বায়ব্যে উঁচু – বৈশ্যদের জন্য শুভ
২২. স্বমুখ ভূষ্টি: পশ্চিমে নীচ, ঈশান, পূর্ব-অগ্নিকোণে উঁচু – শূদ্রদের জন্য শুভ
২৩. ব্রহ্মঘ্ন ভূষ্টি: নৈরিত্য, অগ্নি, ঈশানে উঁচু, পূর্ব ও বায়ব্যতে নীচ – অযোগ্য ও অশুভ
শাস্ত্রকাররা ভূখণ্ডের দিক ও কোণ অনুযায়ী উঁচু–নীচের কারণে শুভ ও অশুভ ভূমির বিবেচনা করেছেন। বর্তমান সময়ে অনেকেই সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যে কোনো স্থানে উঁচু বা নীচু নির্মাণ করে থাকেন, যা শাস্ত্র অনুযায়ী ভুল। সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
আবাসনের জন্য শুভ ভূমি:
ভাস্তুশাস্ত্রে গজপৃষ্ঠ, কূর্মপৃষ্ঠ, দैत্যপৃষ্ঠ এবং নাগপৃষ্ঠ ভূমির বর্ণনা আছে। বাসনের জন্য গজপৃষ্ঠ ও কূর্মপৃষ্ঠ শুভ, আর দैत্যপৃষ্ঠ ও নাগপৃষ্ঠ অশুভ।
গজপৃষ্ঠ: দক্ষিণ-পশ্চিমে উঁচু, নৈরিত্য ও বায়ব্যকোণে উঁচু, বাকি দিকগুলোতে নীচ – আয়ু, ধন ও সৌভাগ্য বৃদ্ধি করে
কূর্মপৃষ্ঠ: মধ্যভূমি উঁচু, চারপাশ নীচ – উৎসাহ ও ধন-ধান্য বৃদ্ধি করে
দৈত্যপৃষ্ঠ: পূর্ব, ঈশান ও অগ্নিকোণে উঁচু, পশ্চিমে নীচ – কখনও ধনী হতে দেয় না, ধন, পুত্র ও পশুর ক্ষতি করে
নাগপৃষ্ঠ: পশ্চিম দিকে লম্বা অর্থাৎ পশ্চিম প্রান্ত দীর্ঘ এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমে উঁচু ভূমি থাকলে সেই প্লটকে নাগপৃষ্ঠ বলা হয়। নাগপৃষ্ঠে নির্মিত ভবন উচ্চাটন সৃষ্টি করে, স্ত্রী-গুণ নষ্ট হয় এবং গৃহপতির মৃত্যুও সম্ভব। এমন প্লট এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
সমরাঙ্গণ সূত্রধারের মাধ্যমে ভূমি পরীক্ষা ও ভূমির লক্ষণ বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে যাতে ভবন নির্মাণের আগে সাধারণ ত্রুটি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যদি ভূমিই অশুভ হয় বা ভবনের মানদণ্ড (নকশা, মাপ-তোল ইত্যাদি) বিভ্রান্তিকর হয়, তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। তাই ভবন নির্মাণের আগে ভূমি ক্রয় বা নির্বাচন করার সময় সতর্ক থাকা উচিত।
ভবনের জন্য ভূখণ্ড নির্বাচনে পথের অবস্থান:
চতুষ্পথ ভূখণ্ড:
যে প্লট চারদিকে রাস্তা দ্বারা ঘেরা থাকে, সেটি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। তবে পথগুলো সমান্তরাল হতে হবে; টেঁড়ে-বেড়ে রাস্তা বা ভূখণ্ড ভবনের জন্য শুভ নয়। চতুষ্পথ ভূখণ্ডে নির্মিত ভবন স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত শুভ। এই ধরনের ভবনের নাম ‘ব্রহ্মস্তব’। এমন প্লটে কোনো পথ সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না, ফলে এটি অত্যন্ত শুভ, সমৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যদায়ক।
ত্রিপথ ভূখণ্ড:
যে প্লটের তিন দিক রাস্তা বা পথ দ্বারা খোলা থাকে এবং এক দিক বন্ধ থাকে, তা সাবধানে নেওয়া উচিত।
পূর্ব দিক বন্ধ, তিন দিক খোলা – সাধারণ, স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত নয়, তবে সমৃদ্ধি থাকে।
অগ্নিকোণ দিকে ঢাল থাকলে – শুভ (পূর্বের ঢালভূমির মতো)।
এক দিক বন্ধ, তিন দিক খোলা – সাধারণ ধরণের ভবন।
দ্বিপথ ভূখণ্ড:
যে প্লটের পূর্ব ও উত্তরে রাস্তা থাকে – অত্যন্ত শুভ।
উত্তর-পশ্চিমে পথ থাকলে – সাধারণ ধরণের, চোরের আশঙ্কা ও ধনলাভে ব্যাঘাত হতে পারে।
পূর্ব-পশ্চিম বা উত্তর-দক্ষিণ পথও সাধারণ। এমন ভবনের প্রবেশদ্বার দুই রাস্তায় হওয়া উচিত নয়, না হলে ধন দ্রুত চলে যায়।
পূর্ব–দক্ষিণ বা দক্ষিণ–পশ্চিম পথে ঘেরা ভূখণ্ড অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
একটি রাস্তার সংলগ্ন জমি–ভূমি ক্ষেত্রে, দক্ষিণ দিকে রাস্তার সংস্পর্শে ঘর তৈরি করলে তার প্রধান দরজা দক্ষিণমুখী হওয়ার কারণে এটি অপ্রশস্ত বিবেচিত হয়। বাকি তিনটি দিকের মধ্যে যেকোনো এক দিকে রাস্তা থাকা বাস্তু শাস্ত্রজ্ঞদের দ্বারা প্রশস্ত বা শুভ হিসেবে গণ্য হয়। পূর্ব বা উত্তর দিকে রাস্তা থাকা অত্যন্ত শ্রেয়স্কর বিবেচিত হয়।
রাস্তার সংস্পর্শযুক্ত জমি—যেখানে রাস্তা কোনো এক পাশে সরাসরি প্রবেশ করছে, সেখানে জমিতে “রাস্তাবেধ” ধরা হয়। শুধুমাত্র ঈশান কোণে অবস্থানরত রাস্তা সংস্পর্শ ক্ষতিকর নয়। বাকি সব দিক থেকে সংস্পর্শকারী রাস্তা কষ্টকর এবং অর্থনাশজনক বলে বলা হয়েছে।
বন্ধ রাস্তা সংলগ্ন জমি—যেখানে রাস্তা শেষ হয়ে যায় সেই জমি অত্যন্ত দোষপূর্ণ মনে করা হয়। এমন ঘরে বসবাস করলে বংশবৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। যদি রাস্তা সংকীর্ণ হয়, স্বাস্থ্য নিয়মিতভাবে খারাপ থাকে। প্রকৃতপক্ষে, রাস্তার উভয় পার্শ্বের বাড়িগুলো দোষপূর্ণ নয়।
ভবনের সংস্পর্শে বিভিন্ন বেধ (সমরাঙ্গণ সূত্রধার ৪৮.২৩-৩৪)-
১. রাস্তার বেধ (ভবনে রাস্তা বা পথ সরাসরি প্রবেশ),
২. গাছের বেধ (সামনের দাঁড়ানো গাছের ছায়া যদি ভবনে পড়ে),
৩. কূপ বেধ (দরজার সামনে কূপ থাকলে),
৪. স্তম্ভ বেধ (ভবনের সামনের অংশে কোনো প্রকার খুঁটি স্থাপন থাকলে),
৫. যন্ত্রবেধ (কলহু, চারামশিন, জেটমশিন, যেখানে ঘূর্ণনশীল যন্ত্রাংশ থাকে),
৬. কাদা বেধ (ভবনের সামনে কাদা, গর্ত বা নোংরা জলাশয় থাকলে),
৭. মন্দির বা মঠ বেধ (যদি মন্দিরের ছায়া ভবনে পড়ে), এইসব কারণে ভবন ক্ষতিকর হয়। তাই ভবন নির্মাণের পূর্বে এই সমস্ত দোষ বিবেচনা করা আবশ্যক।
ভবনের বেধের ফল—
যদি ভবনের সামনে উপরোক্ত বস্তু থাকে, তাহলে তা বেধ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন বেধের ক্ষতিকর প্রভাব ভিন্ন হয়-
১. রাস্তার বেধ – গৃহপতির জন্য ধ্বংসক (সম. সূত্র ৪৮.২৪)
২. গাছের বেধ – সন্তানদের জন্য ক্ষতিকর (সম. সূত্র ৪৮.৬৫)
৩. কূপ বেধ – মৃগী রোগের কারণ (সম. সূত্র ৪৮.৮৪)
৪. স্তম্ভ বেধ – নারীদের জন্য দোষমূলক (সম. সূত্র ৪৮.৮৫)
৫. কাদা বেধ – শোকজনক (সম. সূত্র ৪৮.৮৪)
৬. মন্দির বেধ – ধ্বংসক
বেধের অর্থ এবং দূরত্বের বিবেচনা—
বেধ প্রধান দরজার সামনে (বা ফ্রন্ট ফেসে) ঘটে; পার্শ্বে নয়।
“পৃষ্ঠতঃ পার্শ্বেও বেধ চিন্তা করা উচিত নয়।
প্রাসাদ বা গৃহে বেধ সম্মুখে নির্দেশিত হয়।”
ভবনের পিছনে বা পাশের দিকে উপরের সব উপাদান থাকলেও দোষ হয় না। ভবন যত উঁচু, তত দ্বিগুণ দূরত্বে থাকলে বেধকর বস্তু থাকলেও কোনো ক্ষতি হয় না। ভবন এবং বেধকর বস্তুয়ের মধ্যে যদি রাস্তা থাকে, তবে দোষ হয় না। যদি বেধ কোণে থাকে, তাও ক্ষতি করে না।
“উচ্চায়াদ দ্বিগুণম বিভায় পৃথিবী বেধো ন ভিত্যন্তরে।
প্রকারান্তররাজমার্গপার্তা বেধো ন কোণদ্বয়ে।”
ভবনের বিশেষ কক্ষের অবস্থান—
ভবনের সুপরিকল্পিত মানচিত্রে (নকশা, ম্যাপ) কোন কক্ষ কোথায় এবং কোন দিকে হওয়া উচিত? দেবতাগৃহ, রান্নাঘর, শয়নকক্ষ, স্নানাগার, ভাণ্ডারকক্ষ, শস্যাগার, পশুধনকক্ষ, অতিথিকক্ষ ইত্যাদি কোন দিকে থাকা উচিত? এই কক্ষের বিন্যাসে পরিবর্তন হলে কি ক্ষতি হতে পারে বা কতটা পরিবর্তন সম্ভব? এটি ভবন নির্মাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাস্তুশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে কক্ষ স্থাপন খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সুচিন্তিতভাবে করতে হবে।
ভাস্তুশাস্ত্র গ্রন্থ এই প্রসঙ্গে এইভাবে বলে—
১. বিশ্বকর্মার মত—
“ঈশান্যায় দেবতাগৃহ, পূর্বে স্নানাগার।
আগ্নেয়্যে পাকসদন, ভাণ্ডারগৃহ উত্তরে।
আগ্নেয়-পূর্বমধ্য দধিমন্থনগৃহ,
অগ্নিপ্রদেশমধ্য আজ্যগৃহ প্রশস্ত।
যাম্য-নৈর্ঋত্যমধ্য পুড়ীষত্যাগমন্দির,
নৈর্ঋত্য-অম্বুষ্যমধ্য বিদ্যাভ্যাসমন্দির।
পশ্চিমানিলয়মধ্য রোদনার্থগৃহ স্মৃত,
বায়ব্য-উত্তরমধ্য রতিগৃহ প্রশস্ত।
উত্তর-ঈশানমধ্য ঔষধার্থকার্য,
নৈর্ঋত্যে সূতিকাগৃহ নৃপাণের ভৃতিমিচ্ছতাম।”
বিশ্বকর্মার গ্রন্থ বিশ্বকর্মাপ্রকাশ অনুযায়ী—
ঈশান কোণে দেবতাগৃহ,
পূর্বে স্নানাগার,
অগ্নিকোণে রসায়ন বা রান্নাঘর,
উত্তরে ভাণ্ডারগৃহ,
অগ্নিকোণ এবং পূর্বের মধ্যে দুধ ও দই মথনের ঘর,
অগ্নিকোণ এবং দক্ষিণের মধ্যে ঘি সংরক্ষণের ঘর,
দক্ষিণ ও নৈর্ঋত্যের মধ্যে মলমূত্রাশয়,
নৈর্ঋত্য ও পশ্চিমের মধ্যে বিদ্যাভ্যাস কক্ষ,
পশ্চিম ও বায়ব্য কোণের মধ্যে রোদনগৃহ (নবজাতক সন্তানদের যত্ন বা শোককষ্টের সময় সমবেত হওয়ার ঘর),
বায়ব্য কোণ ও উত্তরের মধ্যে রতিগৃহ (শয়নকক্ষ),
উত্তর ও ঈশান কোণের মধ্যে ঔষধগৃহ বা রোগীর জন্য কক্ষ,
নৈর্ঋত্য কোণে প্রসূতি গৃহ।
বিশ্বকর্মার মতানুসারে (ষোড়শপদ)—
| কোণ/দিক | কক্ষ |
|---|---|
| ঈশান | দেবতাগৃহ |
| পূর্ব | স্নানাগার, দধিমন্থনগৃহ |
| আগ্নেয় | রসায়ন/রান্নাঘর, ঘৃতগৃহ |
| উত্তর | ভাণ্ডারগৃহ, আঙন |
| দক্ষিণ | রতিগৃহ, শৌচালয়, রোদনগৃহ |
| বায়ব্য | রতিগৃহ |
| পশ্চিম | বিদ্যাভ্যাসকক্ষ |
| নৈর্ঋত্য | প্রসূতিগৃহ |
বিশ্বকর্মা ঘি এবং দুধ–দই-এর ঘর আলাদা করেছেন। প্রাচীন ভারতের সমাজে গবাদি পশু এবং দুধজাত দ্রব্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গণ্য হতো। এজন্য ঘি ও দুধ–দই সংরক্ষণের ঘর পৃথক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুধ–দই এবং ঘি সংরক্ষণের জন্য আলাদা ঘর তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বকর্মার মতে, এমন ধরণের ভবনে পূর্ব, পশ্চিম এবং উত্তরের দিকে দরজা রাখা যায়। তার মতে, দরজা ছাড়াও ঘর হতে পারে, কারণ সব কক্ষ স্বতন্ত্রভাবে রয়েছে। এই রকম স্থাপত্যকে ধ্রুব ভাস্তু বলা হয়। এই ঘরগুলো অর্থ–সম্পদ এবং খাদ্য–দ্রব্য দানকারী হয়। এই ধরনের কক্ষে দোকানও ভালো চলে।
২. বাস্তুকার বশিষ্ঠের মত—
“ঐন্দ্র্য দিশি স্নানগৃহমাগ্নেয়াঁ পচনালয়ঃ,
যাম্যাঁ শয়নং বেষ্ম, নৈত্রৈত্যাঁ শস্ত্রমন্দিরম্।
বারুণ্যাঁ ভোজনগৃহং, বায়ব্যাঁ ধান্যমন্দিরম্।
ভাণ্ডারসদনং সৌম্যে, ত্বৈশান্যাঁ দেবতালয়ম্।
ইদ্রাগ্ন্যোর্মথনং মধ্যে, যাম্যাগ্ন্যোর্ঘৃতমন্দিরম্।
যমরাক্ষসোর্মধ্যে, পুড়ীষত্যাগমন্দিরম্।
রাক্ষসজল্যোর্মধ্যে, বিদ্যাভ্যাসস্য মন্দিরম্।
তোয়েশানিলয়োর্মধ্যে, রোদনস্য চ মন্দিরম্।
কামোপভোগশমনং বায়ব্যউত্তরযোর্গৃহম্।
কৌবেরেশান্যোর্মধ্যে, চিকিৎসামন্দিরং সদা।
গৃহং শরীরযোর্মধ্যে, সর্ববস্তুṣu সংগ্রহম্।
সদনং কারয়েদেংক্রমাদুক্তানি ষোডশ।”
দিশার সমতুল্য—
ইন্দ্র = পূর্ব,
যম = দক্ষিণ,
রাক্ষস = নৈত্রৈত্য কোণ,
তোয়েশ বা বারুণ = পশ্চিম,
অনিল (বায়ু) = বায়ব্য কোণ,
সৌম্য বা কুবের = উত্তর।
দিশার অধিপতি অনুযায়ী দিশার নামও প্রচলিত।
পূর্বে স্নানাগার, অগ্নিকোণে রান্নাঘর, দক্ষিণে শয়নকক্ষ, নৈত্রৈত্য কোণে শস্ত্রাগার, পশ্চিমে ভোজনকক্ষ (ডাইনিং হল), বায়ব্য কোণে ধান্যসংগ্রহকক্ষ, উত্তরে ভাণ্ডারগৃহ, ঈশান কোণে দেবতাগৃহ হওয়া উচিত।
বশিষ্ঠ প্রথমবার বিশ্বকর্মার নকশায় নতুন উদ্ভাবন এনেছেন। দক্ষিণ, পশ্চিম ও বায়ব্যে যেখানে বিশ্বকর্মা কোনো নির্দেশ দেননি, সেখানে বশিষ্ঠ শয়নকক্ষ, ভোজনগৃহ ও ধান্যমন্দির (গৃহ) বলে বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়াও প্রসূতির ঘরের স্থানে শস্ত্রাগার নির্দিষ্ট করেছেন। বশিষ্ঠ ঋষি প্রথমবার ষোড়শ কক্ষের ভিত্তি স্থাপন করেছেন— “সদনং কারয়েদেংক্রমাদুক্তানি ষোডশ।”
এই ধরণের ভবনের বিন্যাস এবং সুসংগঠনের কৃতিত্ব বশিষ্ঠ ঋষিকেই দেওয়া হয়।
যদি বিশ্বকর্মা এবং বশিষ্ঠ দু’জন স্থপতির মত একত্রে দেখা হয়, তাহলে ঘরের নিম্নলিখিত রূপ তৈরি হয়—
বশিষ্ঠ ঋষি অনুযায়ী স্থাপত্যচিত্র:
৩. নারদ ঋষির মত –
ভবনে কোন দিকের কোন কক্ষ থাকা উচিত তা নিয়ে বাস্তু শাস্ত্রে অনেক আলোচনা হয়েছে। নারদ ঋষি এতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করেছেন। বায়ব্যকোণে যেখানে ধান্যগৃহ ছিল, সেখানে তিনি পশুগৃহ স্থাপন করেছেন। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উপকারী প্রভাব কৃষকদের হয়েছে। যাদের কাছে পশুধন আছে, তারা শহরেও বায়ব্য কোণে পশুধন রাখলে শুভফল লাভ হয় –
‘ভাণ্ডারং তূত্তরস্যাং বায়ব্যাং পশুমন্দিরং’ (বৃহৎসংহিতা, নারদ)
নারদ ঋষির মতে বাস্তু চিত্র:
নাৰদ ঋষি তাঁর वास्तুচিত্রে দ্বিতীয় সংশোধন হিসেবে চিকিৎসা কক্ষের স্থলকে
শৃঙ্গারগৃহ (ড্রেসিং রুম) হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। বর্তমান সময়ে এটিরও শতভাগ সমর্থন রয়েছে। নাৰদ সংহিতায় এটি উল্লেখিত হয়েছে—
স্নানাগারং দিশিপ্রাচ্যামাগ্নেয়াং পচনালয়ম্।
য়াম্যায়াং শয়নাগারং নৈর্ঋত্যাং শস্ত্রমন্দিরম্।।
এवं কুর্যাদিদং স্থানং ক্ষীরপানাজ্যশালিকাঃ।
শ্যামূত্রাস্ত্রতদ্বিদ্যা ভোজনামঙ্গলাশ্রয়াঃ।।
ধান্যস্ত্রীভোগবিজয়জ্ঞ শৃঙ্গারায়তনানি চ।
ঈশান্যাদি ক্রমস্তেষাং গৃহনির্মাণকং শুভম্॥
ঈশান কোণে দেবতাগৃহ, অগ্নিকোণে রসইঘর, নৈর্ঋত্য এবং দক্ষিণের মধ্যে শৌচালয়ের স্থান কখনোই এলোমেলোভাবে পরিবর্তন করা উচিত নয়; নয়তো এই স্থানের পরিবর্তন ঘরে বিপত্তি ডেকে আনে। নৈর্ঋত্য কোণে শাস্ত্রাগারের স্থলে যন্ত্র, সেলাই বা গাড়ি রাখার স্থানও তৈরি করা যেতে পারে।
ভোজন তৈরির ব্যবস্থা অগ্নিকোণে স্থাপন করা সর্বজনগ্রাহ্য। এই কক্ষে রান্না হওয়া খাবার পশ্চিমে ডাইনিং রুমে নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে একত্রে ভোজনের সুব্যবস্থা থাকে।
পূর্বদিকে স্নানগৃহ স্থাপন করা সর্বজনগ্রাহ্য। বিশ্বকর্মার মত অনুযায়ী উত্তর দিকের ভাণ্ডারগৃহ থেকে ওষধগৃহের মধ্যে যেকোনো স্থানে স্নানাগার তৈরি করা যেতে পারে—
‘উত্তরস্যান জলস্থানং পূর্বস্যান শ্রীগৃহং তাথা।’
৪. কাশ্যপ ঋষির মত—
কাশ্যপ ঋষি ভুমি তলে (গ্রাউন্ড ফ্লোর) নয়টি কক্ষ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি শাস্ত্রাগার, ঘৃতগৃহ এবং সব-ধরনের কক্ষ (যা দুই-দুই কক্ষ ছিল) কমিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট বাসস্থান তৈরি করা যায়, তবে ভোজনকক্ষ, পূজাঘর এবং শৌচালয়ের দিক অবশ্যই वास्तুশাস্ত্র অনুযায়ী রাখতে হবে।
ভবনের প্রথম তলায় তৈরি কক্ষগুলির মধ্যে ধান্যশালা, গোশালা, দেবগৃহ এবং ভোজনকক্ষের ওপরের কক্ষগুলো শয়নকক্ষ হিসেবে তৈরি করা উচিত নয়। উত্তর দিকে মাথা রেখে ঘুমানো যাবে না, এবং নগ্ন বা ভেজা পায়ের ওপর কোনও বস্ত্র ছাড়া শুতে চলবে না।
ধান্যগোগুরুহুতাশসুরাণাং ন স্বপেদুপরি নাজ্যনুবংশম্।
নোত্তরাপারশিরা ন চ নগ্নো নৈব চার্চরণঃ শ্রিয়মিচ্ছন্॥
ভারতীয় আচার্যরা নৈর্ঋত্য কোণ এবং দক্ষিণ (শয়নকক্ষ) এর মধ্যে শৌচালয় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনমতো রোদনকক্ষের স্থলে শৌচালয় তৈরি করা যেতে পারে। কিছু वास्तুবিদ উত্তরদিকে শৌচালয়ের স্থান দেখান। উত্তর দিক সৌম্য এবং দেবতালয় নির্দেশিত। তাই উত্তর দিকের শৌচালয় পরিত্যাগ করাই শ্রেয়।
ভবনে বিদ্যুতের ব্যবস্থা—
যে কোনও কক্ষে বিদ্যুতের ব্যবস্থা অগ্নিকোণে করা উচিত। কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে যদি সুইচ থাকে, তবে মাত্র একটি ল্যাম্প রাখা উচিত। বিদ্যুৎ, ইনভার্টার ও ব্যাটারি ইত্যাদি দক্ষিণ অংশের পূর্ব প্রান্তে স্থাপন করা উচিত।
সমরাঙ্গণ সূত্রধার অনুযায়ী আঙ্গিনার ধারণা—
প্রাচীনকালে যে সব ভবন তৈরি হত, তাদের মধ্যে আঙ্গিনা থাকা অপরিহার্য ছিল। বারাণসীর পাকা মহলে প্রায় পাঁচ শতাব্দী পুরনো পাথরের ভবন এখনও দেখা যায়। वास्तুচার্যদের মত অনুযায়ী জমির মধ্যবিন্দু (ব্রহ্মস্থান) আঙ্গিনার মধ্যেই হওয়া উচিত। প্লটের কেন্দ্রবিন্দু আঙ্গিনার মধ্যেই রাখা শুভ। প্রাচীনকালে আঙ্গিনার মধ্যে একটি বেদীও তৈরি করা হত। আঙ্গিনার মধ্যভাগে কুড়াকুড়িয়ে জিনিস রাখা উচিত নয়। অনেক ভবনের মধ্যে তুলসীর মূল স্তম্ভও থাকে, যা ব্রহ্মশিরা নামে পরিচিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়।
আজকাল প্রায় এমন ভবন তৈরি হচ্ছে না। ঘরে আঙ্গিনা না থাকলে বাতাস ও আলো সঠিকভাবে পৌঁছায় না। অন্ধকারপূর্ণ বা স্যাঁতস্যাঁতে কক্ষ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অন্ধকারপূর্ণ কক্ষে রাহু দোষও প্রভাবিত করে।
আঙ্গিনা তৈরির নির্দেশ—
আঙ্গিনা তৈরি করার একটি নির্দিষ্ট নীতি আছে। আঙ্গিনা বর্গাকার বা আয়তাকার হতে পারে। দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থের হাতের মাপ যোগ করুন। যদি ফুটে মাপ হয়, তবে ১.৫ ফুট = এক হাত ধরে গড় মাপ নিতে পারেন। অথবা গৃহকর্তার হাতকে ফুটে মাপুন। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের যোগকে ৯ দিয়ে ভাগ করুন। অবশিষ্ট ১, ২, ৫, ৭ বা ০ থাকলে আঙ্গিনা শুভ। অবশিষ্ট থাকলে ক্ষতিকর।
দ্বিতীয় পদ্ধতি—দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের যোগকে ৮ দিয়ে গুণ করে ৯ দিয়ে ভাগ করুন। অবশিষ্ট ২,৩,৪,৫,৭,০ থাকলে আঙ্গিনা শুভ।
ভাস্তুরাজবল্লভ অনুযায়ী আঙ্গিনা মাঝখানে উঁচু হওয়া উচিত। নিচু বা ধংসিত আঙ্গিনা সন্তাননাশক—
‘মধ্যে নিম্নং ত্বঙ্গণাগ্রং ততোচ্চৈঃ।
শশ্বচ্চৈवं পুত্রনাশায় গেহম্।’
আঙ্গিনায় জমে থাকা জল বের করতে জলমার্গ কখনও কোণে থাকা উচিত নয়। বায়ব্য ও পশ্চিম বা নৈর্ঋত্য ও দক্ষিণের মধ্যে জলনিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করতে হবে যে পুরো ভবনের জলনিষ্কাশন পূর্ব বা উত্তরের দিকে হওয়া উচিত, নয়তো অর্থ ও জনসম্পদের ক্ষতি হয়। দক্ষিণে ড্রেন বা জল বহন করলে বড় ক্ষতি হয়। পশ্চিম ও বায়ব্য দিকে শৌচালয়ের জল নিষ্কাশন করা যেতে পারে।
সমরাঙ্গণ দ্বার চিন্তা—
বাস্তুকে ঠিক রাখতে দ্বার মানক কাজ করে। দ্বার নির্মাণ মাপ অনুযায়ী করা হয়। দ্বার নির্মাণের দুটি প্রক্রিয়া প্রচলিত—
১) বাস্তুকে আট ভাগে বিভক্ত করে দ্বার স্থাপন, এবং
২) বাস্তুকে নয় ভাগে বিভক্ত করে দ্বার স্থাপন।
(৯) অষ্ট ভাগ বিভাজন (চতুঃষষ্টিপদচক্রম্)—
চারটি দিকের দেয়াল, যেখানে দ্বার স্থাপন করতে হবে, তা আট বা সমান ভাগে বিভক্ত করা উচিত। এরপর চিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশে দ্বার তৈরি করতে হবে। এই অংশে দ্বার তৈরি করার ফলাফল নিম্নরূপ
সদ্বার (মঙ্গল ফল):
(অ) জয়ন্ত – অর্থলাভ
(আ) ইন্দ্র – রাজপ্রিয়তা
(ই) বৃহৎক্ষত্র – অর্থ, ধান্য ও সন্তানবৃদ্ধি
(উ) বরুণ – ভোগলাভ
(ঋ) মূল/প্রধান – পশুধনলাভ
(এ) ভল্লাট – বিপুল অর্থলাভ
(ঐ) সোম – ধর্মশীলের উন্নতি
সাধারণ বা নিম্নমানের দ্বার (যা অতিশয় প্রয়োজন ছাড়া স্থাপন করা উচিত নয়):
চিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশে তৈরি করা যেতে পারে। এই দরজাগুলো সাধারণ কাজের জন্য হতে পারে—
(অ) পর্দন্য অংশে দ্বার তৈরি করলে কেবল কন্যা সন্তানের বৃদ্ধি হয়।
(আ) সূর্য অংশে দ্বার তৈরি করলে রোষ বৃদ্ধি পায়।
(ই) সত্য অংশে দ্বার তৈরি করলে মিথ্যা বলার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
(উ) দোভারিক অংশে দ্বার তৈরি করলে কেবল ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
(ঋ) সাপ অংশে দ্বার তৈরি করলে কেবল সন্তানদের মধ্যে কলহ বৃদ্ধি পায়।
(২) নয় ভাগ বিভাজন (একাশীতিপদচক্রম্)—
দ্বারের মুখ—ব্রাহ্মণবর্ণের জন্য দ্বার উত্তরমুখী হওয়া উচিত। ক্ষত্রিয়ের জন্য পূর্বমুখী, বৈশ্যের জন্য দক্ষিণমুখী, এবং শূদ্রের জন্য পশ্চিমমুখী দ্বার শুভ ফল দেয়।
‘ব্যাসগৃহাণি চ বিদ্যাদ্ বিপ্রাদীনামুদগ্দিশাদ্যানি।’
প্রধান দ্বারের বৈশিষ্ট্য—
প্রধান দ্বার ঘরের অন্যান্য দরজার তুলনায় বড় হতে হবে। প্রধান দ্বারের অলঙ্করণ অন্যান্য দরজার তুলনায় বেশি হওয়া উচিত। শাস্ত্রে স্পষ্ট লেখা আছে যে ঘরের অন্য কোনো দরজাকে প্রধান দরজার সমান বা তার চেয়ে বেশি ভবর্যপূর্ণ করা উচিত নয়—মার্বেল, টাইলস বা ভित्तি চিত্র দিয়ে। প্রধান দরজার যত ভবর্যপূর্ণতা, তার মতো শুভ ফলও বেশি হয়।
‘মূলদ্বারং নান্যরভিসন্দধীত রূপধর্যা।
ঘটফলপত্রপ্রমথাদিবিশ্চ তন্মঙ্গলৈশ্চিনুয়াত।।’
বিশ্বকর্মার মতে, অষ্টভাগ বিভাজন অনুযায়ী দরজা তৈরি করা উচিত—
‘চতুঃ ষষ্টিপদং কৃত্বা মধ্যে দ্বারং প্রকল্পয়েত’।
১. এক দরজার উপরে (উচ্চ তলায়) আরেকটি দরজা তৈরি করা উচিত নয়।
২. যদি উপরের তলায় দরজা থাকে, তবে তা ছোট হওয়া উচিত।
৩. প্রধান দরারের তুলনায় অন্যান্য দরজা ছোট হওয়া উচিত। নীচের কক্ষ থেকে দ্বিগুণ উচ্চ হওয়া যাবে না।
৪. वास्तুশাস্ত্র অনুযায়ী, ভবনের দৈর্ঘ্য (এক হাত = ১.৫ ফুট) অনুযায়ী ৭০ আঙ্গুল যোগ করে দরজা তৈরি করা উচিত। বর্তমানে ছয় থেকে সাত ফুট উচ্চতার দরজা প্রচলিত।
৫. দরজার উপরের লেবেল বা সাটার সমান হওয়া উচিত।
৬. দরজা নিজে খুলে বা বন্ধ হওয়া বাড়ির জন্য অশুভ।
৭. সমান উচ্চতার কাঠের খুঁটি না থাকলে দরজা দুষ্প্রভাব দেয়।
৮. কাঠের খুঁটির উপরের অংশ উপরের দিকে, মূল অংশ নিচের দিকে হওয়া উচিত; অন্যথায় পরিবারের মৃত্যু হয়।
৯. মৎস্য পুরাণ অনুযায়ী দরজা ১১০ আঙ্গুলের কম হওয়া উচিত নয়; ১৫০ আঙ্গুলের দরজা সর্বোত্তম। ১৪০, ১৩০, ১২০, ১৮০, ১৯০, ১১৬, ১০৯, ৮০ আঙ্গুলের দরজা ও শুভ। আঙ্গুলের মাপ গৃহকর্তার আঙুল অনুযায়ী নেওয়া উচিত; সুবিধা অনুযায়ী ফুটেও রূপান্তর করা যায়।
১০. দক্ষিণ দিকে মধ্যভাগে দরজা করা যেতে পারে। নৈর্ঋত্য বা দক্ষিণের অন্য অংশে দরজা নিষিদ্ধ।
১১. দ্বারের সামনে দ্বার থাকা উচিত নয়; এটি অশুভ।
‘দ্বারং দ্বারেণ বা বিদ্ধমঅশুভায়োপপদ্যতে’ — সমরাঙ্গণসূত্রধার।
বর্তমানে বায়ু চলাচলের জন্য অনেক ঘরে দরজার সামনে দরজা করা হচ্ছে, কিন্তু এমন বাড়িতে লক্ষ্মীর বসবাস হয় না।
১২. পুরো প্লটে একমাত্র দরজা থাকলে পূর্বদিকে তৈরি করা উচিত। দুইটি দরজা থাকলে পূর্ব ও পশ্চিমে। তিনটি দরজা থাকলে যে কোনো তিন দিকেই তৈরি করা যায়, তবে প্রধান দরজা দক্ষিণে নয়। ব্রহ্মা, শিব, জৈন মন্দিরে চার দিকেই দরজা থাকা উচিত—
‘একং দ্বারং প্রাংমুখং শোভনং স্যাচ্চাতুর্বক্ত্রং ধাতৃভূতেশজৈনম্।
যুগ্মং প্রাচ্য-পশ্চিমে’য়ং ত্রিকেয়ু মূলদ্বারং দক্ষিণে বর্জনীয়ম্।’
১৩. কোণে দরজা কখনও তৈরি করা উচিত নয়; এমন দরজা দুঃখ ও শোক জন্মায়।
১৪. মধ্যভাগে দরজা তৈরি করা উচিত নয়; সামান্য মধ্য থেকে সরিয়ে দরজা করা যায়। মধ্যভাগের দরজা ধন, ধান্য ক্ষতি এবং নারীর ব্যভিচারের কারণ হয়।
১৫. ঘরের ভেতরে খোলা দরজা ব্যবহার করা উচিত; নিজের দিকে টেনে খোলার দরজা অশুভ। সামনে ঠেলে খোলার দরজা শুভ।
১৬. প্রধান দরজা সর্বদা দুটি প্যানেলের হওয়া উচিত। এক প্যানেলের দরজা ভেতরের দিকে থাকা উচিত।
ভবনের উচ্চতা ও নিম্নতা—
ভাস্তুকারদের মতে, পূর্ব ও উত্তর দিক অন্যান্য দিকের তুলনায় সামান্য নীচু হওয়া উচিত। দক্ষিণ ও পশ্চিমের অংশ পূর্বোত্তরের তুলনায় উঁচু হওয়া উচিত।
নীচু ছাদ → পূর্ব → উন্নতিকারক
উঁচু ছাদ → দক্ষিণ → ধনদায়ক
নীচু ছাদ → পশ্চিম → ধননাশক
উঁচু ছাদ → উত্তর → বিনাশকারক
‘স্যাদুন্নতিঃ পূর্বনতে নারাণাং বাস্তৌ ধনং দক্ষিণ ভাগতুঙ্গে।
ক্ষয় ধনানাং বিনতে প্রতীচ্যামুচ্চৈর্বিনাশো ধ্রুভমুত্তরেণ।।’ — রাজমার্তণ্ড ২২
যদি ভবনের ওপরের তলে (ছাদে) পূর্ব ও উত্তর দিকের কক্ষ থাকে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম নীচু হয়, তবে বিপত্তির ধারা চলতে থাকে।
বাস্তু পিণ্ডে বৃদ্ধি করার নিয়ম—
যদি ভবন চতুর্দিক স্থাপিত হয় এবং বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে চারদিকে সমানভাবে বৃদ্ধি করা উচিত।
‘ইচ্ছেদ্যদি গৃহবৃদ্ধিঃ তৎসমন্তাদ্বিবর্ধয়েত তুল্যং।’ —বৃ০স০
অত্যন্ত প্রয়োজন হলে পূর্ব দিকে বা উত্তর দিকে বাড়ানো যায়।
শুধুমাত্র পূর্ব দিকে বাড়ালে বন্ধুদের সঙ্গে বিরোধ বৃদ্ধি পায়।
দক্ষিণে বাড়ালে মৃত্যুভয়।
পশ্চিমে বাড়ালে অর্থ ক্ষয়।
উত্তরে বাড়ালে মানসিক অশান্তি হয়।
নতুন ভবনে ব্যবহারযোগ্য নতুন উপকরণ—
নতুন ঘর তৈরি হলে, খিড়কি, দরজা, বিছানা, আসনবসন এবং গৃহস্থীর সকল সামগ্রী নতুন হওয়া উচিত। পুরনো কাঠ বা লৌহ অশুভ ফল দেয়। আগের ব্যবহৃত সামগ্রী, বিশেষ করে যেগুলো স্থায়ীভাবে স্থাপন হয় যেমন: চৌখট, জানালা, দরজা, ছাদ উপকরণ (গাটার বা পাতি) ব্যবহার করা উচিত নয়। নতুন ঘরে নতুন কাঠ ব্যবহার করা শুভ, পুরনো ঘরে পুরনো কাঠ ব্যবহার করা যায়।
যেমনটি জ্যোতির্নিবন্ধ এবং সমরাঙ্গণে বলা হয়েছে—
‘নূতনে নূতনং কাষ্ঠং জীর্ণে জীর্ণ প্রাশস্যতে।
জীর্ণে চ নূতনং কাষ্ঠং ন জীর্ণ নূতনে গৃহে।’
ইষ্টিকালোহ, পাষাণ, মৃত্তিকা, জীর্ণ ময়লা, ঘাস, পাতা, এবং পুরনো কাঠ নতুন ঘরে ব্যবহার নিষিদ্ধ।
ভবনে সিঁড়ির অবস্থান—
সিঁড়ি পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকে হওয়া উচিত এবং দক্ষিণাভিমুখী (দক্ষিণের দিকে ঘূর্ণায়মান) হওয়া উচিত। উপরের তলে সিঁড়ি পূর্ব বা দক্ষিণমুখী হওয়া উচিত। বাম ও দক্ষিণ অংশের নির্দেশিকা হোক, যেমন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বাম পাশে যা থাকে তা বাম, ডান পাশে যা থাকে তা ডান।
খোলা সিঁড়ি নিষিদ্ধ। অর্থাৎ সিঁড়ি শুরু ও শেষ হওয়া স্থানে দরজা থাকতে হবে।
নিচের দরজা বড় হওয়া উচিত।
উপরের দরজা নিচের দরজার তুলনায় ১২ অংশ কম হওয়া উচিত।
‘ভূম্যরোহণমূর্ধ্বতস্তদুপরি প্রাগৃদক্ষিণং শস্যতে দ্বারং তুর্ধ্বভবং চ ভূমিরাপরা হাস্বার্ক ভাগাইঃ ক্রমাৎ।’ —বাস্তুরাজ ৫/৩৬
কক্ষে আলো ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী—
কক্ষে দীপক, টিউব, বা অন্যান্য আলো দক্ষিণ বা দক্ষিণাংশে স্থাপন করা উচিত। অন্যান্য আলোকসামগ্রী যেমন গ্যাস, মোমবাতি, ল্যাম্প, বাল্বও ডানদিকে রাখুন। দক্ষিণ কোণ অত্যন্ত শুভ। কক্ষের বাম বা মধ্যভাগে আলো অশুভ। দেবালয়ে দীপ দান বাম পাশে স্থাপন করা উচিত। আলমারী বাম বা দেওয়ালের মধ্যভাগে স্থাপন করুন।
‘দীপালয়ো দক্ষিণদিগূ বিভাগে সদা বিধেয়ো’
‘বামে চ মধ্যেচ শুভায় ঘরে সুরালয়ে বামদিশীষ্টসিদ্ধ্যাই।’ —বাস্তুরাজ ৫/২১
দরজা না থাকা ঘরে প্রবেশ নিষেধ—
কিছু লোক দ্রুত প্রবেশ করে, এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি বাড়ি উপরে ঢাকা না হয়, তাতেও প্রবেশ করা উচিত নয়। প্রবেশ বাড়ি পূজা ও বালিকর্মের পর করা উচিত।
‘অকপাটমনাছ্ছন্নমদত্তবলিভোজনম্। গৃহং ন প্রবিশেদ্ধীমান্ বিপদামাকারং তু তৎ।’ —বাস্তুরাজ ২/৩৯
দরজার জন্য ওয়েধ (বাধা) পরিহার—
প্রধান দরজায় রাস্তা বা গলি দেখা যাবে না; এটি রথ্যাওয়েধ বা মার্গওয়েধ নামে পরিচিত। এটি ক্ষতি ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
প্রধান দরজার ঠিক সামনে বিশাল গাছ থাকা উচিত নয়; গাছওয়েধ হয়। গাছের ছায়া দরজায় প্রবেশ করলে শিশুদের মৃত্যু হতে পারে।
গাছের ছায়া যদি দরজা বা বাড়িতে পড়ে, পরিবারের মানুষে মৃগী রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
দরজার ঠিক নিচ থেকে যদি নালা, পানির নালা বা খাল চলে, তবে দরজা অশুভ।
‘জলস্রাবস্তথা দ্বারে মূলে অনার্থচয় ভবেত’
মন্দিরের দরজা যদি বাড়ির প্রধান দরজার সামনে থাকে, তবে ধ্বংস হয়।
শিব মন্দিরের দরজা (ব্রহ্মস্থান) কেটে ফেললে ধ্বংস হয়।
উত্তর দিকের পঞ্চম দরজা (অষ্টখণ্ডে ভল্লাট এবং নয় খণ্ডে সোম) ব্রহ্মস্থান থেকে কাটা হলে শুভ নয়। তাই মধ্যভাগে দরজা নিষিদ্ধ। দক্ষিণের মধ্যভাগে দরজা ছাড়া অন্য উপায় নেই; তাই দক্ষিণ কখনো প্রধান দরজা হতে পারেনি।
‘উত্তরে পঞ্চমং দরজং ব্রহ্মণো বিদ্ধমুচ্যতে। তস্মাত সার্বশিরা হ্যেষ মধ্যে চ বিশেষতঃ।’শ্মশানের সামনে দরজা তৈরি করা উচিত নয়; এটি রাক্ষস ভয় সৃষ্টি করে।
বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটি, সেতুর খুঁটি বা অন্য খুঁটির সামনে দরজা রাখা উচিত নয়; এতে স্ত্রী সম্পদ ক্ষয় হয়।
বড় পাথরের সামনে দরজা তৈরি করা উচিত নয়; এতে স্ত্রীর সম্পদ নষ্ট হয়।
‘স্ত্রীনাশং স্তম্ভবেধে স্যাৎ পাষাণে চ তথৈব চ।’
খুঁটি (চৌখট) সংক্রান্ত নিয়ম—
যদি কিভাডে ছিদ্র থাকে, অর্থ ক্ষয় হয় এবং লক্ষ্মী স্থায়ী হয় না।
দরজা বন্ধ করার সময় যদি খুঁটির শব্দ কাঁদার মতো হয়, তবে বংশ ক্ষতি হয়।
প্রধান দরজা ত্রিভুজ, যান, সূর্যাকার, পাখা, ধনুষ বা বৃত্তাকার হওয়া উচিত নয়।
সাধারণ বাড়িতে পাথরের চৌখট ব্যবহার করা উচিত নয়। পাথরের চৌখট শুধুমাত্র দেবগৃহ বা রাজপ্রাসাদে শুভ।
ব্রহ্মস্থান—
বাস্তুর মধ্যভাগকে ব্রহ্মস্থান বলা হয়। এটির উপর কোনো নির্মাণ, মিথ্যা পাত্র, হাড় বা ভস্ম রাখা উচিত নয়। এমন করলে বিভিন্ন রোগ ও শোকের সৃষ্টি হয়। এখানে পেরেক বা খুঁটি বসানোও নিষিদ্ধ।
জল সম্পদ সম্পর্কিত নির্দেশ—
ভবন নির্মাণের পূর্বে বা পরবর্তীতে পানির ব্যবস্থা থাকা উচিত। এই ব্যবস্থা হতে পারে চাপাকল, জেট মেশিন, পানির ট্যাংকি বা কুয়া (কূপ) দ্বারা। বাড়ির পানির দিক ও স্থান নির্দিষ্ট করা উচিত। শাস্ত্রে কূপের উল্লেখ আছে। এটি নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে যেকোনো জল সম্পদ স্থাপন করা যায়।
বৃহৎসংহিতা অনুযায়ী—
বরাহমিহির বলেন, আগ্নিকোণের কাছে কূপ বা জল সম্পদ ভয় ও আগুনের কারণ হয়।
নৈরৃত্য কোণ শিশু মৃত্যুর কারণ এবং বায়ব্য কোণ মহিলাদের কষ্টের কারণ হয়। এই তিনটি কোণ বাদ দিয়ে বাড়ির যেকোনো অংশে জল সম্পদ রাখা যায়।
‘আগ্নেয়ে যদি কোণে গ্রামস্য পুরস্য বা ভবেত কূপঃ
নিত্যং সকরোতি ভয়ং দাহং চ সমানুষং প্রায়ঃ।
নৈরৃত্য কোণে বালক্ষয়ং চ বনিতাং চ বায়ব্যে
দিকত্রয়মেতত্ত্যক্ত্বা শেষাসু শুভাভহা কৃপাঃ।’
বিশ্বকর্মা মতে, দক্ষিণ দিকে জল সম্পদ রাখা ভুল; এতে সন্তান ক্ষয়, জমির নাশ এবং অদ্ভুত রোগ হয়—
‘গৃহস্য দক্ষিণে ভাগে কূপে দোষপ্রদঃ মতঃ।
আপত্যহানির্ভূনাশত্বথবা রোগমদ্ভুতम्।’**
মুহূর্তচিন্তামণি অনুযায়ী জল সম্পদের ফলাফল—
| স্থান | ফলাফল |
|---|---|
| পূর্ব | ঐশ্বর্য |
| আগ্নিকোণ | সন্তান নাশ |
| দক্ষিণ | স্বীয় নাশ |
| নৈরৃত্য | মৃত্যু |
| পশ্চিম | সম্পদ |
| বায়ব্য | শত্রুভয় |
| উত্তর | সুখপ্রাপ্তি |
| ঈশান কোণ | পুষ্টি বৃদ্ধি |
| ভাস্তু মধ্য (ব্রহ্মস্থান) | ধন নাশ |
‘কৃপে ভাস্তুর্মধ্যদেশে অর্থনাশ, ত্বৈশার্যাদৌ পুষ্টির ঐশ্বর্য বৃদ্ধি। সুনোর্নাশ, স্ত্রীবিনাশ, মৃত্যু চ সম্পদ, শত্রুতঃ স্যাচ্ছ সৌখ্যং।’
কিছু স্থাপত্যবিদ বলেন ওভারহেড ট্যাঙ্ক নৈরৃত্য কোণে রাখা যায়, কিন্তু এটি সঠিক নয়। নৈরৃত্য কোণ শিশু মৃত্যুর কারণ। পানির ট্যাঙ্ক ছাদে ঈশান কোণ, পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর দিকে থাকা উচিত। ট্যাঙ্ক ছাদ থেকে কমপক্ষে দুই ফুট উঁচু হওয়া উচিত। বেশি উঁচু হলে শুভ। পানির रिसाव অশুভ; অলসতা ও কাজের ক্ষতি হয় এবং রাহু গ্রহ সক্রিয় হয়ে সমস্যা দেয়। নৈরৃত্য এবং আগ্নিকোণে ভুলেও ট্যাংক, চাপাকল বা জেট স্থাপন করা যাবে না।
ভাস্তু মধ্যভাগে (ব্রহ্মস্থান) ছাদ থাকলে জল ট্যাংক স্থাপন করা যাবে না, অন্যথায় পরিবার মস্তিষ্কজনিত রোগে আক্রান্ত হয়।
পর্দন্য অংশে কুয়া, চাপাকল বা জেট মেশিন শুভ। পূর্ব অংশে আগ্নিকোণ থেকে (পর্দন্য, জয়ন্ত, ইন্দ্র) জল সম্পদ রাখা উচিত। বায়ব্য কোণ স্বাস্থ্য জন্য উপযুক্ত নয়। পশ্চিম মধ্যেও জল সম্পদ অত্যন্ত শুভ। ব্রহ্মস্থানে চাপাকল বা কূপ সর্বনাশক।
ভবন নির্মাণের পর—
গৃহপ্রবেশের পূর্বে বৈদ্যুতিক পূজা, অম্বরিকা, গণেশ ও অন্যান্য দিকনির্দেশিত দেবতাদের পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যত সন্তান, উন্নতি ও বংশবৃদ্ধির কামনা করা হয়। শুভ মুহূর্তে ব্রাহ্মণ ও সৌভাগ্যবান মহিলাদের সঙ্গে হোম বা হवन করা হয়। উদ্দেশ্য শান্তি, সুস্থিতি ও তুষ্টি অর্জন।
মকর সংক্রান্তি ২০১১, বিদ্বদ্বশম,
এ.৪/৩১, শীশমহল কলোনি,
সুধাকর মালভীয়,
কমচ্ছা, বারাণসী, চিত্তরঞ্জন মালভীয়।
বিষয়ানুক্রমণিকা
সূচিপত্র অধ্যায় পৃষ্ঠা বিষয়বস্তু | ||
|---|---|---|
নিচে আপনার দেওয়া পাঠ্যটিকে চৌখম্বা প্রকাশনার গ্রন্থসূচীপত্রের আদলে, একটানা, পরিশীলিত ও পুস্তক-মুদ্রণযোগ্য রূপে সাজিয়ে দেওয়া হল—কোনো ব্যাখ্যা যোগ করা হয়নি, কেবল বিন্যাস ও শুদ্ধতা রক্ষা করা হয়েছে। সমরাঙ্গণ-সূত্রধারবিষয়সূচীপ্রথমোऽ অধ্যায়ঃবাস্তু-সম্পর্কিত জয়ের প্রশ্ন ........................................ ১২ দ্বিতীয়োऽ অধ্যায়ঃবিশ্বকর্মা–পুত্র সংলাপ ................................................. ৯ তৃতীয়োऽ অধ্যায়ঃবাস্তু-বিষয়ক প্রশ্ন .................................................... ১২ চতুর্থোऽ অধ্যায়ঃশুভ উপাদান ও অশুভ উপাদানের নিরূপণ ........................ ২২ পঞ্চমোऽ অধ্যায়ঃভুবনকোষ ................................................................. ৩০ ৫। হিমবান্ এবং ৬। শৃঙ্গবান্ ........................................ ৩২ হিমবান্ পর্বত ............................................................ ৩৩ জম্বুদ্বীপের বর্ষসমূহের (দেশসমূহের) ভূগোল ............ ৩৪ নয় বর্ষের পরিমাপ .................................................. ৩৬ ভুবনের অন্যান্য দ্বীপসমূহের বর্ণনা ......................... ৩১ লোকালোক পর্বতের বর্ণনা ....................................... ৪৩ ষষ্ঠোऽ অধ্যায়ঃসহদেবাধিকার .......................................................... ৪৮ সপ্তমোऽ অধ্যায়ঃবর্ণাশ্রম বিভাগ ....................................................... ৫৫ অষ্টমোऽ অধ্যায়ঃভূমি পরীক্ষা ............................................................ ৬৩ | ||
২। অনূপ দেশ ............................................................ ৬৪ ৩। সাধারণ দেশ ......................................................... ৬৪ ভূমির রসানুসারে প্রশস্ততার বিবরণ ................. ৭২ ত্রিবিধ ভূমির বালিশ–স্বামিনী প্রভৃতি ১। বালিশ–স্বামিনী ভূমি ....................................... ৬৫ পুরসংযোজনের জন্য বর্জ্য ভূমির লক্ষণ ........... ৭২ মৃত্তিকা পরীক্ষা ..................................................... ৭৫ নবমোऽ অধ্যায়ঃহস্তলক্ষণ ............................................................... ৮৮ ‘প্রাশয়’ প্রভৃতি ত্রিবিধ হস্তমাত্রার লক্ষণ ........ ৯৩ ১। প্রাশয় হস্তপরিমাপ ....................................... ৯৩ মাত্রা ও কলা প্রভৃতি সাধারণ মানলক্ষণ ........ ৯৫ দশমোऽ অধ্যায়ঃপুরনিবেশ ............................................................... ১০৩ নগরাভ্যুদয়িক শান্তিকর্ম বিধান ..................... ১১৫ জাতি ও বর্ণ অনুযায়ী আবাস নিরূপণ ............. ১১৮ নগরে প্রতিষ্ঠিত দেবমন্দিরের ফল ................ ১২৩ একাদশোऽ অধ্যায়ঃবাস্তু-ত্রয় বিভাগ নিরূপণ .............................. ১২৯ দ্বাদশোऽ অধ্যায়ঃষোড়শপদ বাস্তু .................................................. ১৩৯ বাস্তুপুরুষ .......................................................... ১৪৪ | ||
ত্রয়োদশ অধ্যায়
চতুর্দশ অধ্যায়
পঞ্চদশ অধ্যায়
ষোড়শ অধ্যায়
সপ্তদশ অধ্যায়
অষ্টাদশ অধ্যায়
অধিরোহণ ও নিঃশ্রেণী
একোনবিংশো অধ্যায়
বিভিন্ন স্থাপত্যরূপ ও বিস্তারিত
অষ্টভদ্র ও চতুর্শাল ভবন
বিংশোধ্যায়
একবিংশোধ্যায়
দ্বাবিংশোধ্যায়
পঞ্চবিংশোধ্যায়
ষষ্ঠবিংশোধ্যায়
ত্রিঅংশ ও একত্রিঅংশ অধ্যায়
চতুস্ত্রিঅংশ অধ্যায়
অষ্টাত্রিঅংশোধ্যায়
তুলা ইত্যাদি স্থাপত্য এবং প্রধান স্থপতির অধ্যায়
নিচে দেওয়া হলো এই অংশের সূচিপত্রটি বাংলায় টেবিল অফ কনটেন্ট স্টাইলে একটানা: অষ্টাঙ্গশেষ দুর্গকর্ম ও গৃহ, দ্বার ও স্থাপত্য সংশ্লিষ্ট অধ্যায়
নিচে দেওয়া হলো এই অংশের সূচিপত্র বাংলায় টেবিল অফ কনটেন্ট স্টাইলে একটানা: নাগদন্ত ও গৃহ সংক্রান্ত বিশেষ অধ্যায়
|
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ