আর্যদের আদি দেশ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

31 January, 2026

আর্যদের আদি দেশ

 ও৩ম্ ॥

আর্যদের আদি দেশ


আমরা অতীতের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের জন্য বর্তমান কালে বেঁচে থাকি। অতএব যদি কারও ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে হয়, তবে তার অতীতকে নষ্ট করে এই কাজ সহজেই করা যেতে পারে। অতীতকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, কিন্তু তার স্বরূপকে বিকৃত রূপে উপস্থাপন করে তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা সম্ভব। ইংরেজদের ভারতের মধ্যে আগমনের উদ্দেশ্য ছিল এই দেশের উপর শাসন করা এবং এর মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও প্রসার করা। নিজেদের শাসনক্ষমতাকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য এখানকার মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেছিল। এর জন্য তারা এই ধারণার জন্ম দেয় যে এই দেশের কিছু মানুষ মূল অধিবাসী এবং কিছু মানুষ বিদেশ থেকে এসে এখানকার মূল (আদি) অধিবাসীদের পরাজিত করে এই দেশের উপর অধিকার করে নিয়েছে। বিভেদের এই বীজরোপণের ফলই হল যে আজ আমাদের দেশের ক্ষুদ্রতম পাঠশালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ানো ও শেখানো হয় যে এই দেশের মূল অধিবাসী কোল, দ্রাবিড়, ভীল, সাঁওতাল প্রভৃতি। কালের পরিক্রমায় ইরান প্রভৃতি দেশ থেকে এসে কিছু মানুষ (আর্যরা) এই দেশের উপর আক্রমণ করেছিল। এখানকার আদিবাসীদের মধ্যে কিছু মানুষকে তারা হত্যা করেছিল, কিছু মানুষকে বন্দি করে নিজেদের দাস বানিয়েছিল এবং কিছু মানুষ ভয়ে দক্ষিণের দিকে পালিয়ে গিয়ে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেছিল।

এখানে আমরা দিল্লির বিদ্যালয়গুলিতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ানো ‘প্রাচীন ভারত’ নামক গ্রন্থের সেই অংশ উদ্ধৃত করছি, যেখানে ‘বৈদিক যুগের জীবন’ শিরোনামের অধীনে লেখা আছে—
“যখন প্রথম প্রথম আর্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল, তখন তাদের ভূমির জন্য সেই সব মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল, যারা এখানে আগে থেকেই বসবাস করত। আর্যরা এই মানুষদের দস্যু বা দাস বলত। আর্যরা ছিল গৌর বর্ণের এবং দস্যুরা ছিল কালো রঙের ও চ্যাপ্টা নাকওয়ালা। দস্যুরা সেই সব দেবতার পূজা করত না, যাদের পূজা আর্যরা করত। তারা যে ভাষা বলত, তা আর্যরা বুঝতে পারত না। আর্যরা সংস্কৃত ভাষায় কথা বলত। আর্যরা দস্যুদের যুদ্ধে পরাজিত করেছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে দয়ালু আচরণ করেনি এবং বহু দস্যুকে দাস বানিয়ে নিয়েছিল। দস্যুদের আর্যদের সেবা করতে হত। তাদের কঠিন এবং নীচ কাজও করতে হত।”

বিভেদের এই বীজরোপণ একদিকে যেমন উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে সবর্ণ-অসবর্ণ, জনজাতি, অনুসূচিত জনজাতি, পরিগণিত-জাতি ইত্যাদি নামে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ, ঘৃণা ও দ্বেষকে উৎসাহিত করেছে।

আজ ভারতের একতা ও অখণ্ডতা এবং তার নানাবিধ সমস্যার সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল আর্যদের বিদেশি বলে প্রচলিত মিথ্যা ধারণা। আশ্চর্য ও দুঃখের বিষয় এই যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার চল্লিশ বছর পরেও আমরা এই মিথ্যা কল্পনার মধ্যেই বাস করছি। এর দুষ্পরিণাম আমাদের সামনে নানারূপে প্রকাশ পাচ্ছে। এখন বলা হচ্ছে যে, যদি দুইশো বছর আগে আগত ইংরেজরা বিদেশি হয়ে থাকে, তবে তিন হাজার বছর আগে আগত আর্যরা বিদেশি নয় কেন? দেশ সেই দিনই স্বাধীন বলে গণ্য হবে, যেদিন ইংরেজদের মতো আক্রমণকারী রূপে আগত আর্যরাও (প্রায় ৬০ কোটি) এই দেশ থেকে চলে যাবে এবং শাসনের বাগডোর আদিবাসী নামে পরিচিত এই দেশের মূল অধিবাসীদের হাতে ন্যস্ত হবে।

মুসলমান ও খ্রিস্টানদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, এই দেশের মানুষদের মধ্যে যারা মুসলমান ও খ্রিস্টান হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র জাতি—অনুসূচিত জাতি ও জনজাতি, গিরিজন প্রভৃতি শ্রেণি থেকে এসেছে, কারণ এই শ্রেণির মানুষরাই ভারতের মূল অধিবাসী। অতএব হিন্দু থেকে মুসলমান ও খ্রিস্টান হওয়া মানুষরাই এই দেশের প্রকৃত মালিক, অন্য সবাই বিদেশি। ইংরেজরা চলে গেছে, কিন্তু ভারতে সর্বপ্রথম আক্রমণকারী আর্যদেরই আগে চলে যাওয়া উচিত। এই প্রসঙ্গে ‘Muslim India’-এর ২৭ মার্চ, ১৬৮৫ সংখ্যায় প্রকাশিত নিম্নলিখিত বক্তব্যটি দ্রষ্টব্য—

"This land (India) belongs to those who are its original inhabitants and hence its rightful owners. It is they who built the Harappa and Mohenjodaro, the world's most ancient civilisation. Most of India's Muslims and christians are converts from these sons of the soil. They are either Dalits or tribals.
In all foreign invasions, it is these people who defended India. They (Aryans) don't belong to India and hence don't love India. They are foreigners, the enemy within. As Aryans, they are also India's first foreigners. If Muslims and Christians are foreigners and must get out of India, as India's first foreigners,
the Aryans are duty bound to get out first. Those who came first must leave first."

৪ সেপ্টেম্বর, ১৬৭৭ তারিখে সংসদে রাষ্ট্রপতির দ্বারা মনোনীত সদস্য ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্থনি দাবি করেছিলেন—
"Sanskrit should be deleted from the 8th schedule of the constitution because it is a foreign lang-
uage brought to this country by foreign invaders, the Aryans." (Indian Express, 5.9.77),
অর্থাৎ সংবিধানের অষ্টম তফসিলে পরিগণিত ভারতীয় ভাষার তালিকা থেকে সংস্কৃতকে বাদ দেওয়া উচিত, কারণ এটি বিদেশি আক্রমণকারী আর্যদের দ্বারা আনা হওয়ায় একটি বিদেশি ভাষা।

সন ১৬৭৮ সালের সূচনায় ভারত তার প্রথম উপগ্রহ অন্তরীক্ষে উৎক্ষেপণ করেছিল। তার নাম ভারতের প্রাচীন বৈজ্ঞানিক আর্যভট্টের নামানুসারেই তা রাখা হয়েছিল। এই উপলক্ষে ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৬৭৮ তারিখে দ্রমুক (দ্রাবিড় মুনেত্র কষগম)-এর প্রতিনিধি লক্ষ্মণন রাজ্যসভায় দাবি করেছিলেন যে ভারতীয় উপগ্রহের নাম ‘আর্যভট্ট’ রাখা উচিত হয়নি, কারণ এটি একটি বিদেশি নাম। কয়েক বছর আগে তামিলনাড়ুর সেলেম নামক নগরে মর্যাদা পুরুষোত্তম রামের আর্য হওয়ার কারণে তাঁর মূর্তির গলায় জুতোর মালা পরিয়ে, ঝাড়ু দিয়ে মারতে মারতে বাজারে শোভাযাত্রা বের করা হয়েছিল। ঋষি ক্রান্তদর্শী হয়ে থাকেন। সর্বপ্রথম ঋষি দयानন্দই এই ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন—

“কোনো সংস্কৃত গ্রন্থে বা ইতিহাসে লেখা নেই যে আর্যরা ইরান থেকে এসে এখানকার বনবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, জয়লাভ করে, তাদের বের করে দিয়ে এই দেশের রাজা হয়েছিল। আবার বিদেশিদের লেখা
কীভাবে মাননীয় হতে পারে?”

এই কথাই নিরপেক্ষ পাশ্চাত্য বিদ্বান মিউর বলেছেন—
"I must, however, begin with candid admission that, so far as I know, none of the Sanskrit books, not even the most ancient, contains any distinct reference or allusion to the foreign origin of the Aryans. There is no evidence or indication in the Rigveda of the words Dasa, Dasyu, Asura etc. having been
used for non-Aryans or original inhabitants of India."-Muir: Original Sanskrit Texts. Vol II.

অর্থাৎ— “এটি নিশ্চিত যে কোনো সংস্কৃত গ্রন্থে, তা যতই প্রাচীন হোক না কেন, আর্যদের বিদেশি উৎসের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঋগ্বেদে যে দাস, দস্যু ও অসুর প্রভৃতি শব্দের উল্লেখ রয়েছে, সেগুলি
অনাৰ্য অর্থাৎ ভারতের আদিম অধিবাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে— এমন কোনো প্রমাণ বা ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।”

বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসবিদ এলফিন্সটনের বক্তব্য থেকেও ঋষি দয়ানন্দের মতের সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন—
"Neither the code of Manu, nor in the Vedas, nor in any book which is older than the code of Manu, is there any allu-sion to the Aryan prior residence in any country outside India." -Elphinstion : History of India, Vol. I. অর্থাৎ—মনুস্মৃতিতে, না বেদে এবং না মনুস্মৃতির থেকেও প্রাচীন অন্য কোনো গ্রন্থে (ভারতে আসার পূর্বে) আর্যদের ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশে বসবাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে এসেছে এবং ভারতের মূল অধিবাসী কোল, দ্রাবিড়, ভীল, সন্থাল প্রভৃতিরাই এখানকার আদিবাসী ছিল—এই ধারণাটি সর্বপ্রথম ‘Cambridge History of India’-তে উপস্থাপিত হয়।

তারপর এই মতের প্রচারের জন্য বারাণসী ও লাহোরে কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। বারাণসীতে টি০ এইচ০ গ্রিফিথকে বারাণসী কলেজের প্রিন্সিপাল করা হয়। লাহোরে ওরিয়েন্টাল কলেজের প্রিন্সিপালের পদে এ০ সি০ বুলনারকে নিয়োগ করা হয়। এই কলেজগুলিতে সংস্কৃতে এম০এ০ করা ছাত্রদের (বিশেষত ব্রাহ্মণদের) সর্বোচ্চ বৃত্তি দিয়ে অক্সফোর্ডে পাঠানো হত। সেখান থেকে শিক্ষা লাভ করে স্বদেশে
ফেরত আসা ব্যক্তিদের এখানে-সেখানে প্রিন্সিপাল বা উচ্চ পর্যায়ের প্রফেসর নিযুক্ত করা হত। লাহোর ও বারাণসীতেও অক্সফোর্ডে নির্ধারিত পাঠ্যক্রমই চালু রাখা হয়েছিল।

ইংরেজরা এটাও উপলব্ধি করেছিল যে, যতদিন বৈদিক ধর্মের শিকড়কে ফাঁপা করা না যাবে, ততদিন তারা নিজেদের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণরূপে সফল হতে পারবে না। এর জন্য বৈদিক সাহিত্যকে বিকৃত রূপে
উপস্থাপন করা প্রয়োজন ছিল। এই কাজের জন্য কর্নেল বডেন নামক এক ব্যক্তি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিকে বিপুল অর্থ দান করেছিলেন। এ কথা সত্য যে বিদেশি পণ্ডিতেরা ভারতীয় না হয়েও সংস্কৃত সাহিত্যে, বিশেষত বৈদিক বাঙ্ময়ে, অনুকরণীয় পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু জাতিগত পক্ষপাত এবং শাস্ত্রবিষয়ে গভীর জ্ঞানের অভাবে তারা বৈদিক সাহিত্যকে তার প্রকৃত রূপে উপস্থাপন করতে পারেননি।
বিদেশিরা কোন লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের সাহিত্যে এত গভীর পরিশ্রম করেছেন, তার আভাস পাওয়া যায় মনিয়র উইলিয়ামস কর্তৃক তাঁর Sanskrit-English Dictionary-এর ভূমিকায় লেখা এই কথাগুলি
থেকে—

"That the special object of his munificent bequest was to promote the translation of the scriptures into English, so as to enable his countrymen to proceed in the conversion of the
natives of India to the Christian Religion."

ভাবার্থ এই যে, মিস্টার বডেনের ট্রাস্টের মাধ্যমে সংস্কৃত গ্রন্থগুলির ইংরেজিতে অনুবাদ করা হচ্ছিল, যাতে ভারতের অধিবাসীদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করার কাজে তাঁর দেশের লোকেরা সহায়তা পায়। এই
মনিয়র উইলিয়ামসই তাঁর ‘The Study of Sanskrit in relation to missionary work in India’ (1861) গ্রন্থে লিখেছেন—"When the walls of the mighty fortress of Hinduism are encircled, undermined and finally stormed by the soldiers of the cross, the victory of christianity must be signal and complete." ভাব এই যে, মনিয়র উইলিয়ামসের সমস্ত পরিশ্রমের লক্ষ্য ছিল হিন্দুত্বকে ধ্বংস করে খ্রিস্টধর্মের পতাকা উত্তোলন করা। সংস্কৃতের ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মধ্যে লর্ড ম্যাকাওলে কর্তৃক নিযুক্ত প্রফেসর ম্যাক্সমুলারকে সর্বাগ্রে গণ্য করা হয়। তাঁর বেদ-গবেষণা ও অনুবাদকার্যে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা তিনি নিজের স্ত্রীর নামে লেখা এক পত্রে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন—

"This edition of mine and the translation of the Veda will hereafter tell to a great extent on the fate of India. It is the root of their religion and to show them what the root is, I feel sure, is the only way of uprooting all that has sprung from it during the last three thousand years."
(Life and Letters of Frederick Maxmueller, Vol. I chap. XV, Page 34.)

অর্থাৎ—আমার এই সংস্করণ এবং বেদের অনুবাদ ভবিষ্যতে ভারতের ভাগ্যকে বহু দূর পর্যন্ত প্রভাবিত করবে। এটি তাদের ধর্মের মূল, এবং তাদের এই মূলটি কেমন তা দেখিয়ে দেওয়াই গত তিন হাজার
বছরে এর থেকে যা কিছু উদ্ভূত হয়েছে, সবকিছুকে মূলসহ উপড়ে ফেলার একমাত্র উপায়।

ভারত সচিব (Secretary of State for India)-এর নামে ১৬ ডিসেম্বর ১৮৬৫ তারিখে লেখা নিজের পত্রে ম্যাক্সমুলার লিখেছেন—

"The ancient religion of India is doomed. Now, if christia-nity does not step in whose fault will it be ?"
(Ibid, Vol. I, chap. XVI, p. 378)

অর্থাৎ—ভারতের প্রাচীন ধর্ম এখন ধ্বংসের মুখে। এখন যদি খ্রিস্টধর্ম তার স্থানে প্রবেশ না করে, তবে তার দোষ কার হবে? ম্যাক্সমুলারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিস্টার ই০ বি০ পুসে নিজের পত্রে তাঁকে লিখেছিলেন—

"Your work will mark a new era in the efforts for the conversion of India."

অর্থাৎ—আপনার কাজ ভারতবাসীদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরের প্রচেষ্টায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে এইভাবে ইংরেজদের এবং ইংরেজি শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় মানুষের মধ্যে নিজেদের প্রাচীন সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি অনাস্থা ও ঘৃণা সৃষ্টি করা। বেদ সম্পর্কে তারা যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছিল, তার মাধ্যমে একদিকে বেদকে গোয়ালদের গান বা জঙ্গলি মানুষের প্রলাপ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, আর অন্যদিকে মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেশের একতা ও অখণ্ডতাকে আঘাত করা হয়েছিল। তাদের এই পরিকল্পিত প্রচেষ্টার ফল এই দাঁড়াল যে ধীরে ধীরে ভারতীয় পণ্ডিতরাও তাদের রঙে রঙিন হতে শুরু করলেন এবং পাশ্চাত্য চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারে সহায়ক হয়ে উঠলেন। এই ভারতীয় পণ্ডিতরাও সেই সুরেই গান গাইতে শুরু করলেন, যা ইংরেজরা চেয়েছিল। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো মণীষী ও মহান্‌কেওএটি বহু দূর পর্যন্ত প্রভাবিত করেছিল।

অর্থাৎ—ভারতের প্রাচীন ধর্ম এখন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। এখন যদি খ্রিস্টধর্ম তার স্থান গ্রহণ না করে, তবে তার জন্য দায়ী কে হবে? ম্যাক্সমুলারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু

মিস্টার ই০ বি০ পুসে নিজের পত্রে তাঁকে লিখেছিলেন—

"Your work will mark a new era in the efforts for the conversion of India."

অর্থাৎ—আপনার কাজ ভারতবাসীদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে। এইভাবে ইংরেজদের এবং ইংরেজি শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় মানুষের মধ্যে নিজেদের প্রাচীন সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি অবিশ্বাস ও ঘৃণা সৃষ্টি করা। বেদ সম্পর্কে তারা যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছিল, তার মাধ্যমে তারা একদিকে বেদকে গোয়ালদের গান বা জঙ্গলিদের অসংলগ্ন প্রলাপ বলে প্রমাণ করতে চেয়েছিল, আর অন্যদিকে মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেশের একতা ও অখণ্ডতাকে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের এই পরিকল্পিত প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে ভারতীয় পণ্ডিতরাও তাদের প্রভাবে রঞ্জিত হতে শুরু করলেন এবং পাশ্চাত্য চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারে সহায়ক হয়ে উঠলেন। এই ভারতীয় পণ্ডিতরাও সেই একই সুরে কথা বলতে শুরু করলেন, যা ইংরেজরা চাইত। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো মনীষী ও মহান দেশভক্তও এই ভ্রান্ত ধারণার শিকার হয়ে পড়েছিলেন। তিনিও আর্যদের বিদেশি আক্রমণকারী মনে করে তাদের উত্তর ধ্রুব থেকে আগত বলে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর মতে, আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে উত্তর ধ্রুবে এক ভয়াবহ তুষারঝড় হয়েছিল। এর ফলেই আর্যরা সেখান থেকে পালিয়ে ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, ইরান ও ভারতে এসে বসতি স্থাপন করে।

এই বিষয়টি নিয়ে বাংলার প্রখ্যাত বিদ্বান উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্ন তিলক মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পুনায় গিয়েছিলেন। বিদ্যারত্নজি সেই সাক্ষাতের বিবরণ দিতে গিয়ে তাঁর গ্রন্থ ‘মানবের আদি জন্মভূমি’ (পৃষ্ঠা ১২৪)-এ লিখেছেন—“আমি গতবৎসরে তিলক মহোদয়ের আতিথ্য গ্রহণ করিয়া ছিলাম।

তাঁহার সহিত এই বিষয়ে আমার ক্রমাগত পাঁচ দিন বহু সংলাপ হইয়া ছিল। তিনি আমাকে তাঁহার দ্বিতল গৃহে বসিয়া সরলহৃদয়ে বলিয়া ছিলেন যে— ‘আমি মূল বেদ অধ্যয়ন করি নাই, আমি সাহেবদের
দিগের অনুবাদ পাঠ করিয়া ছি।’ অর্থাৎ তিলক মহোদয় স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দিয়েছিলেন যে—

“আমরা মূল বেদ পড়িনি। আমরা তো সাহেবদের (পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের) করা অনুবাদই পড়েছি।” উত্তরী ধ্রুব বিষয়ক নিজের মতের প্রসঙ্গে তিলক মহোদয় লিখিয়াছেন—

"It is clear that Soma juice was extracted and purified at night in the Arctic." —অর্থাৎ ‘উত্তরী ধ্রুবে সোমরস রাত্রিকালে নিষ্কাশন ও পরিশোধন করা হইত।’

ইহার প্রত্যাখ্যান করিয়া নারায়ণ ভবানী পাভগি তাঁহার গ্রন্থ ‘আর্যাবর্তান্তীল আর্যাঞ্চী জন্মভূমি’-তে লিখিয়াছেন— “কিন্তু উত্তরী ধ্রুবে তো সোমলতা আদৌ হয় না; ইহা তো হিমালয়ের
এক অংশ মু্ঞ্জবান পর্বতে জন্মায়।”

তিলক মহোদয় বলেন যে আর্যরা উত্তরী ধ্রুব হইতে ইরানে এবং ইরান হইতে ভারতে পৌঁছায়। কিন্তু ইরানের বিদ্যালয়গুলিতে পড়ানো হয় যে আর্যরা ভারত হইতে গিয়া ইরানে বসতি স্থাপন করিয়াছিল—

“চন্দ হাজার সাল পেশ অজ জামানা মাজিরা বুযুর্গি অজ নিযাদ আর্যা অজ কোহহায় কফ কাজ গুজিশ্‌তা বর সর জমিনে কি ইমরোজ মাসকানে মাস্ত কদম নিহাদন্দ। ও চূঁ আবে ও হাওয়ায়ে এই সর
জমিনেরা মুআফিক তব্‌এ খোদ ইয়াফতন্দ, দারিঁ জা মাসকানে গুজিদন্দ ও আঁ রা বেনাম খেশ ইরান খাঁদন্দ।”

—দেখো ‘জুগরাফিয়া পঞ্জম ইবতিদাই’ নামক তদরিস দরসাল পঞ্চম ইবতিদাই, পৃষ্ঠা ৭৮, কলাম ১, মুদ্রণালয় দরসানহি তেহরান, সন হিজরি ১৩০৬, সিন আউয়াল ও চাহারম, তরফে ভিজারতে মুআরিফ ও শারশুদঃ। ভাব এই যে—কয়েক হাজার বছর পূর্বে আর্যরা হিমালয় হইতে নামিয়া আসিয়া সেখানকার জলবায়ু অনুকূল পাইয়া ইরানে বসবাস করিতে শুরু করিয়াছিল। এই উদ্ধৃতি দ্বারা স্বামী দয়ানন্দ কর্তৃক

প্রস্তাবিত তিব্বতে সৃষ্টির উদ্ভব এবং সেখান হইতে আর্যদের ইতস্তত বিস্তারের মতের সমর্থন পাওয়া যায়।ইরানের বাদশাহগণ চিরকাল নিজেদের সঙ্গে ‘আর্যমেহর’ উপাধি ব্যবহার করিয়া আসিয়াছেন। ফারসি ভাষায় ‘মেহর’ অর্থ সূর্য।

ইরানের মানুষ নিজেদের সূর্যবংশীয় আর্য বলিয়া মনে করিয়া আসিয়াছে। ধর্মীয় মতান্ধতার ফলে এখন এই অবস্থা ক্রমশ পরিবর্তিত হইতেছে।

রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করিলেও পাশ্চাত্যদের মানসপুত্রদের চোখে পরানো তাদের দেওয়া চশমা আজও অবিকল অটল রহিয়াছে। ভারতীয় সংস্কৃতির মহান পৃষ্ঠপোষক কে০ এম০
মুন্সী তাঁহার গ্রন্থ ‘লোপামুদ্রা’-য় প্রাচীন আর্যদের সম্বন্ধে লিখিয়াছেন—

“ইহাদের ভাষায় আজও জঙ্গলি অবস্থার স্মৃতি বিদ্যমান ছিল। মাংস ভক্ষণ করা হইত, এমনকি গোমাংসও। ‘অতিথিগ্ব’ গোমাংস খাওয়ানো ব্যক্তির সম্মানসূচক উপাধি ছিল। ঋষিরা সোমরস পান
করিয়া নেশাগ্রস্ত থাকিতেন এবং লোভ ও ক্রোধের প্রকাশ করিতেন। তাহারা জুয়া ব্যাপকভাবে খেলিতেন। সাধারণ মানুষ মদ্যপান করিয়া নেশায় মত্ত থাকিত। ঋষিরা যুদ্ধক্ষেত্রে সহস্র মানুষের সংহার
করিতেন। রূপবতী নারীদের আকৃষ্ট করিবার জন্য তাঁহারা মন্ত্র রচনা করিতেন। কুমারী হইতে জন্মলাভ করা সন্তান অধম, পতিত …মান্য করা হতো না। বহু ঋষির পিতার পরিচয় জানা ছিল না। আর্যরা নেকড়ের মতো লোভী ছিল। বিভৎসতা বা অশ্লীলতার কোনো ধারণা ছিল না। আত্মার কোনো চিন্তা ছিল না। ঈশ্বরের কল্পনা ছিল না, নাম ছিল না, স্বীকৃতিও ছিল না। স্বদেশের কোনো ধারণা ছিল না। দস্যুরাই ছিল ভারতবর্ষের শিবলিঙ্গ-পূজক মূল অধিবাসী।

গ্রন্থের ভূমিকায় শ্রী মুন্সী লিখেছেন যে, তাঁর গ্রন্থে তিনি যা কিছু লিখেছেন, তা ঋগ্বেদের ভিত্তিতেই লিখেছেন। আমরা চিঠি লিখে তাঁর কাছে সেই সব বেদমন্ত্র উদ্ধৃত করার অনুরোধ জানাই, যেগুলির ভিত্তিতে তিনি তাঁর গ্রন্থে এসব কথা লিখেছেন। এর উত্তরে তিনি তাঁর ২ ফেব্রুয়ারি ১৬৫০ তারিখের পত্রে লিখে পাঠান—

"I believe the Vedas to have been composed by human beings in the very early stage of our culture and my attempt in this book has been to create an atmosphere which I find in the Vedas as translated by western scholars and as given in Dr. Keith's Vedic Index. I have accepted their views of life and conditions in those times."

অর্থাৎ—আমি মনে করি যে আমাদের সংস্কৃতির প্রারম্ভিক পর্যায়ে মানুষের দ্বারাই বেদ রচিত হয়েছে। এই গ্রন্থে আমার প্রচেষ্টা ছিল পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের করা বেদের অনুবাদে এবং ডক্টর কিথের Vedic Index-এ যে পরিবেশ পাওয়া যায়, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা। সেই সময়ের মানুষের জীবনযাপন ও পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি তাঁদের মতকেই গ্রহণ করেছি।

সায়ণ এবং তাঁর অনুসারী পাশ্চাত্য ও ভারতীয় পণ্ডিতদের নৈরুক্তিক প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে, লৌকিক সংস্কৃতির ভিত্তিতে বেদের অর্থ নির্ণয় করার এই দুষ্পরিণাম হয়েছে যে আমরা সভ্য বিশ্বের সামনে মুখ দেখানোর যোগ্যই রইলাম না। যোগিক অর্থ গ্রহণ না করে রূঢ় অর্থের ভিত্তিতে বেদকে বিনোদনমূলক গল্প-কাহিনির পসরা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এইভাবে আমাদের মস্তিষ্করূপী ভূমিতে বেদের প্রতি অবিশ্বাসের পাথুরে চট্টান গড়ে উঠেছে।

বেদে ইতিহাস

বেদ ত্রিকালাবাধিত হওয়ার কারণে বেদের অন্তঃসাক্ষী থেকে কোনো ইতিহাস-সম্পর্কিত বিষয়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অতএব বেদের প্রসঙ্গ দেখে এক-দুটি শব্দের ভিত্তিতে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। লোকমান্য তিলক বেদে নির্দেশিত কতিপয় নক্ষত্রের বিশেষ অবস্থানের ভিত্তিতে বেদের কাল নির্ধারণ করেছেন। তিনি তাঁর গ্রন্থ Orion-এ লিখেছেন যে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৮৬-তম সূক্তে বসন্ত-সম্পাতের মৃগশীর্ষ নক্ষত্রে অবস্থানের বর্ণনা আছে। মৃগশীর্ষ নক্ষত্র বর্তমান উত্তর-ভাদ্রপদা থেকে ছয়টি নক্ষত্র পূর্বে। বসন্ত-সম্পাত এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে যেতে ৯৬০ বছর সময় নেয়। এই হিসাবে মৃগশীর্ষ নক্ষত্রে বসন্ত-সম্পাত আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর (৬৬০ × ৬) পূর্বে ঘটেছিল বলে ধরে নেওয়া হয়। তিলকের মতে এটাই ওই সূক্তের কারণে বেদের রচনাকাল।

প্রথম দর্শনে এই যুক্তি সঠিক বলে মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরে প্রবেশ করলে এর শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নক্ষত্রের মোট সংখ্যা ২৭। এইভাবে প্রতি ২৫৬২০ (৯৬০ × ২৭) বছর পর বসন্ত-সম্পাত ক্রান্তিবৃত্তে ঘুরে আবার তার পূর্বস্থানে ফিরে আসে। যদি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬০০০ বছর আগে বসন্ত-সম্পাত মৃগশীর্ষ নক্ষত্রে অবস্থান করে থাকে, তবে তার প্রায় ২৬০০০ বছর আগেও, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩২০০০ বছর পূর্বেও, সেটি একই নক্ষত্রেই ছিল। তারও আগে আরও ২৬০০০ বছর পূর্বে বসন্ত-সম্পাত মৃগশীর্ষ নক্ষত্রেই ফিরে এসেছিল। সৃষ্টির প্রায় দুইশো কোটি বছরের স্থিতিকালে এই অবস্থা কতবার ঘটেছে—

  1. Scientists (Prof. Nagi and Prof. Zumberg of the University of Arizona) have found traces of ancient life and matter dating back to 2,300 million years. The discovery was made in rocks found in Transaval area of South Africa, 320 K.M. north of Johansberg. — The Tribune, 13th July 1975.

সোমবার প্রতি সাত দিন অন্তর আবার ফিরে আসে। তাহলে কেবল ‘সোমবার’ বলা হলে আজ থেকে এক সপ্তাহ আগের সোমবারকেই কেন বোঝা হবে? এক মাস, এক বছর কিংবা একশো বছর আগের সোমবারও কেন বোঝা যাবে না? বেদে বর্ণিত এই নক্ষত্রস্থিতি যে আজ থেকে ঠিক ৬০০০ বছর আগেরই, তার আগের নয়—এর পক্ষে কোনো নিশ্চিত কারণ নেই। আজ থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর পরে (২৬০০০–৬০০০) বসন্ত-সম্পাত আবার মৃগশীর্ষ নক্ষত্রে অবস্থান করবে। তখন, তার পাঁচশো বছর পরে জন্ম নেওয়া কোনো পণ্ডিত এই যুক্তির ভিত্তিতেই বেদকে নিজের থেকে মাত্র ৫০০ বছর আগের রচনা বলে প্রমাণ করবে। বাস্তবে ইতিবৃত্তমূলক রূপে বেদে কোনো ধরনের ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক ইঙ্গিত না থাকায়, এই ধরনের সব মতই কেবল কল্পনার উপর নির্ভরশীল।

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও ভৌগোলিক স্থানের নাম আলাদা আলাদাভাবে বেদে পাওয়া গেলে তা ইতিহাস থাকার ভ্রম সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু যখন সেগুলিকে প্রসঙ্গের ভেতরে পূর্বাপর সম্পর্ক জুড়ে সামঞ্জস্য স্থাপনের চেষ্টা করা হয়, তখন বাস্তবতার বিরুদ্ধে যাওয়ায় তাদের তথাকথিত ঐতিহাসিকতা সঙ্গে সঙ্গেই লুপ্ত হয়ে যায়। নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করার জন্য এখানে আমরা কয়েকটি উদাহরণ উপস্থাপন করছি—

১. অথর্ববেদ (১৩।৩।২৬)-এ বলা হয়েছে— ‘কৃষ্ণায়াঃ পুত্রো অর্জুনঃ ।’ 

কৃ॒ষ্ণায়াঃ॑ পু॒ত্রো অর্জু॑নো॒ রাত্র্যা॑ বৎসোজা॑য়ত। স হ্য দ্যা॒মধি॑ রোহতি॒ রুহো॑ রুরোহ॒ রোহি॑তঃ।

উপরিভাগে দেখলে এই মন্ত্রে কৃষ্ণা (দ্রৌপদী)-র পুত্র অর্জুনের উল্লেখ আছে বলে মনে হয়। কিন্তু যদি সত্যিই তা হতো, তবে অর্জুনকে দ্রৌপদীর স্বামী বলা কি রূপে উচিত ছিল, যেমনটি মহাভারতে লেখা আছে। এই পদগুলির যোগিক অর্থ গ্রহণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। শতপথ ব্রাহ্মণ অনুযায়ী ‘কৃষ্ণা’ রাত্রির নাম, আর রাত্রি থেকে উৎপন্ন সূর্য বা দিনের নাম ‘অর্জুন’—
‘রাত্রির্বৈ কৃষ্ণা অসাৱাদিত্যস্তস্যা বত্সোऽর্জুনঃ ।’

এইভাবে এখানে কৃষ্ণা বলতে মহাভারতের দ্রৌপদী এবং অর্জুন বলতে মহাভারতের অর্জুনকে গ্রহণ করা যায় না।

২. ‘অহশ্চ কৃষ্ণমহরর্জুনং চ’ (ঋ০ ৬।।।১)—এখানে কৃষ্ণ ও অর্জুন একই ব্যক্তির নাম, অথচ ইতিহাস (মহাভারত) অনুযায়ী এরা দুই ভিন্ন ব্যক্তি। প্রকৃতপক্ষে এখানে কৃষ্ণ ও অর্জুন—উভয়ই দিনের নাম।

৩. যজুর্বেদ (২২।১৮)-এ অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকা—এই তিনটি নাম একসঙ্গে দেখে বলা হয় যে এরা সেই তিন কন্যা, যাদের ভীষ্ম অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখানে তাদের ‘কাম্পীল-বাসিনী’ বলা হয়েছে, যেখানে মহাভারতে তাদের কাশীরাজের কন্যা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই শব্দগুলি যথাক্রমে মা, দিদিমা ও প্রপিতামহীর বাচক। অথবা যজুর্বেদ ১২৭৭৬ ও ৩১৫৭-এ আয়ুর্বেদে এগুলি ঔষধির নাম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

ভৌগোলিক ইঙ্গিত প্রদানকারী শব্দগুলির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। যজুর্বেদে একটি মন্ত্র এসেছে—
‘পঞ্চ নদ্যঃ সরস্বতীমপি যন্তি সস্ত্রোতসঃ ।
সরস্বতী তু পঞ্চধা সো দেশেঽভবৎসরিত্।।—৩৪।১১’

এই মন্ত্রে পাঁচটি নদীর উল্লেখ থাকায় একে পাঞ্জাব অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বর্ণনা বলা হয়। সবাই জানে, সরস্বতী নামে কোনো নদী পাঞ্জাবে প্রবাহিত হয় না, পাঞ্জাবের প্রসিদ্ধ পাঁচটি নদী সরস্বতীতে মিলিত হয় না, এবং সরস্বতী নিজেও পাঁচটি ধারায় প্রবাহিত হয় না। বাস্তবে এই মন্ত্রে পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা প্রাপ্ত জ্ঞান অথবা মনের পাঁচটি বৃত্তি স্মৃতিতে স্থিত হয়ে বাণীর মাধ্যমে নানাবিধ প্রকাশ পাওয়ার কথাই বলা হয়েছে।

ঋগ্বেদ (১০।৭৫।১৫)-এর যে মন্ত্রের ভিত্তিতে আর্যদের সপ্তসিন্ধু (সাত নদীর দেশ)-এ বসবাসের কল্পনা করা হয়, সেখানে সাতটির পরিবর্তে দশটি নদীর নাম দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী মন্ত্রেই লখনউয়ের কাছে প্রবাহিত গোমতী নদীর নামও এসেছে। মন্ত্রটি এইরূপ—

ইমে গঙ্গে যমুনে সরস্বতী শুতুদ্রী স্তোমং সচতা পরুষণ্যাঃ।
অসিবন্যা মরদবৃধে বিতস্তয়া অর্জীকীয়ে শৃণুহ্যা সুয়োগয়া ।।

ভাগীরথের দ্বারা গঙ্গা আনার অনেক আগেই বেদের প্রাদুর্ভাব হয়ে গিয়েছিল। গোমতীকে তো নতুন নদীগুলির মধ্যেই গণনা করা হয়। এই শব্দগুলিকে নদী-সংক্রান্ত ধরে নিলে এদের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য স্থাপন করা যায় না। ভৌগোলিক বর্ণনার সঙ্গে এই মন্ত্রগুলির কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে এখানে আধ্যাত্মিক স্রোতসমূহ এবং দেহস্থিত ইড়া, পিঙ্গলা প্রভৃতি নাড়ীর বর্ণনাই করা হয়েছে। পরবর্তীকালে এই মন্ত্রগুলির শব্দ গ্রহণ করেই নদীগুলির নামকরণ করা হয়েছে। বেদ থেকে লোকে নাম এসেছে, লোক থেকে বেদে নয়।

এই সমস্ত লেখার আমাদের উদ্দেশ্য এটুকুই যে, বেদে আগত শব্দগুলির আপাতদৃষ্টিতে ঐতিহাসিক অথবা ভৌগোলিক ইঙ্গিত মনে হওয়ার কারণে সেগুলির ভিত্তিতে আর্যদের বিদেশি বলে সিদ্ধান্ত করা যুক্তিসংগত নয়।

কয়েক বছর আগে ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীতে ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী সাত সদস্যের একটি দল সর্বসম্মতভাবে আর্যদের ইরান থেকে এসে ভারতে বসতি স্থাপনের মতবাদের প্রতিবাদ করেছিল। এই প্রসঙ্গে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর ৩১ অক্টোবর ১৯৭৭ তারিখে প্রকাশিত এই বিবরণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—

"There is no conclusive evidence of Aryan inmigration into India from outside, according to Indian historians, linguists and archaclogists who participated in the interna- tional seminar in Dashambe, the capital of Soviet Republic of Tajikistan. Dr. N. R. Banerjee, Director of national Museum and a member of the Indian delegation, said that Indian scholars made out this point at the seminar and the papers presented by them were very much appreciated. The seminar was held under the aegies of UNESCO to discuss the problem of ethnic movement during the second millenium B. C. Nienty delegates from the Soviet Union, West Germany, Iran, Pakistan and India attended. The seven member Indian delegation was led by Prof, B. B. Lal: Director of Advanced Studies. It was pointed out by Indian scholars that the archaeological material associated with Aryans in different regions and periods in India did not show any links with the archaeological survival of the Aryans in Afghanistan, Iran and Central Asia."

এর তাৎপর্য এই যে, প্রত্নতত্ত্বের ভিত্তিতে এমন একটিও প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে আর্যরা কোথাও বাইরে—ইরান, আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়া থেকে এসে জোরপূর্বক ভারতের উপর অধিকার স্থাপন করেছিল।

এর পর আমরা এই দেশের দুইজন শিক্ষামন্ত্রী—শ্রী প্রতাপচন্দ্র এবং শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র পন্ত—এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই অনুরোধ জানিয়েছি যে, যখন স্বয়ং সরকার-নিযুক্ত স্বীকৃত বিদ্বানদের পক্ষ থেকে সমবেত কণ্ঠে আর্যদের বাইরে থেকে আগমন-সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার প্রত্যাখ্যান হয়ে গেছে, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তব্য এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক, সরকারি নির্দেশাবলি, সংবিধান প্রভৃতি থেকে ‘আদিবাসী’ জাতীয় শব্দ এবং আর্য ও দ্রাবিড় প্রভৃতির মধ্যে বিভেদসূচক বিবরণগুলি অপসারণ করানো।

আমাদের কাছে এই কথার দৃঢ় প্রমাণ রয়েছে যে আর্যরা এই দেশেরই মূল অধিবাসী এবং তাদের আগে এখানে অন্য কোনো জাতি বসবাস করত না। এই দেশের প্রাচীনতম নাম আর্যাবর্ত। যেখানে মানুষ বসবাস করে, সেই ভূখণ্ড কোনো না কোনো নামে অবশ্যই পরিচিত হয়। আর্যদের আগমন (?) এর পূর্বে যদি এখানে দ্রাবিড় প্রভৃতির বসবাস থাকত, তবে তাদের ভাষা ও সাহিত্যে এই দেশের কোনো না কোনো নাম অবশ্যই পাওয়া যেত। এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত না পাওয়া থেকে স্পষ্ট হয় যে, আর্যদের এই দেশে আক্রমণের কথা সম্পূর্ণরূপে কল্পনাপ্রসূত। T. Burrow-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত …

পুরাতত্ত্ববিদ লিখেছেন—
“The Aryan invasion of India is recorded in no written document and it cannot yet be traced archaeologically.” — উদ্ধৃত: The Early Aryans, Cultural History of India-তে প্রকাশিত, সম্পাদনা: A. L. Basham, প্রকাশক: Clarendon Press, Oxford, 1975। অর্থাৎ, আর্যদের দ্বারা ভারতের উপর আক্রমণের যে ধারণা প্রচলিত আছে, তার কোনো প্রমাণ নেই এবং প্রত্নতত্ত্বের সাহায্যেও একে সিদ্ধ করা যায় না। এই প্রসঙ্গে প্রায়ই সিন্ধু উপত্যকার হরপ্পা সংস্কৃতির কথা তোলা হয়। হরপ্পা ও মোহনজোদড়োতে এই উদ্দেশ্যে যে উৎখনন (Excavations) করা হয়েছে, তাতে প্রাপ্ত উপাদানের ভিত্তিতে দাবি করা হয় যে এটিই এই দেশের প্রাচীনতম সংস্কৃতি। এর পতনের পরেই এখানে আর্যদের আগমন ঘটেছিল।

এই বিষয়ে আমরা নিজেরা কিছু না বলে, মোহনজোদড়োর খননকার্যে প্রাপ্ত একটি সিল (মুদ্রা)-এর ফোটোস্ট্যাট প্রতিলিপি দিচ্ছি, যা যেন নিজেই নিজের কাহিনি বলে দেয়—

Photostat of Plate No. CXIL Seal No. 387 from the excavations at Mohenjo-daro (From Mohenjo-daro and the Indus Civilization, edited by Sir John Marshall, Cambridge, 1931)

এখানে একটি বৃক্ষে বসে থাকা দুইটি পাখি দেখা যাচ্ছে, যাদের মধ্যে একটি ফল খাচ্ছে, আর অন্যটি কেবল দেখছে।

ঋগ্বেদের একটি মন্ত্র এইরূপ—

দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া সমানং বৃক্ষং পরি ষস্বজাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্ত্যনশ্নন্নন্যো অভিচাকশীতি॥

— ঋগ্বেদ ॥ ১.১৬৪/২০

এই মন্ত্রের ভাবার্থ এই যে—একটি (সংসাররূপী) বৃক্ষে দুইটি (প্রায় একরকম) পাখি বসে আছে। তাদের মধ্যে একটি তার ফল ভোগ করছে, আর অন্যটি তা ভোগ না করে কেবল নিরীক্ষণ করছে।

স্পষ্ট যে, মোহনজোদড়োর খননকার্যে প্রাপ্ত চিত্রে যা কিছু দেখানো হয়েছে, তার ভিত্তি ঋগ্বেদের উপরোক্ত মন্ত্র। এ কথা নির্বিবাদ যে, পৃথিবীতে ঋগ্বেদের চেয়ে প্রাচীন কোনো গ্রন্থ নেই। শিল্পীর দ্বারা নির্মিত চিত্রের পূর্বেই ঋগ্বেদের অস্তিত্ব প্রমাণিত। মোহনজোদড়োর খননে এই চিত্র পাওয়া যাওয়ায় প্রমাণিত হয় যে বেদসমূহ (অন্তত ঋগ্বেদ) তথাকথিত হরপ্পা সংস্কৃতির পূর্ববর্তী। বেদ আর্যদের গ্রন্থ, অতএব সর্বপ্রথম আর্যদের অস্তিত্বই প্রমাণিত হয়।

পুরাতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে যুক্ত আমাদের এক সহপাঠী বন্ধুর বক্তব্য হলো—হতে পারে হরপ্পা ও আর্য সংস্কৃতি সমকালীন। দুর্জনতোষন্যায় অনুসারে যদি এটিও মেনে নেওয়া হয়, তবুও আর্যদের পূর্বে অন্য কারও এখানে বসবাসের কল্পনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়ই।

এই প্রসঙ্গেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (নয়া দিল্লি, ৮-৯-৯৫)-এ প্রকাশিত এই বিবরণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—

“Mr. Vishau Shridhar Vakankar, former Head of the Archaeology Department of Ujjain (Viktam) University, claimed here on Thursday that he had successfully made a break through in solving the mystery of the writing of the seals found in the Indus Valley civilisation of Harappa and
Mohenjodaro. He claimed that the Indus Valley civilisation” —script was original to India and its roots are found in the

Aryan Civilisation.”
He challenged foreign claims that the Indus Valley Civilisa-
tion was non-Aryan by stating that recent results were based on
computers.”

ডাক্তার ওয়াকঙ্কর তাঁর দ্বিতীয় বক্তব্যে, যা Times of India
(Ahmedabad, 22.12.85)-এ প্রকাশিত হয়েছিল, বলেন—
“His survey (conducted by 30 experts drawn from different disciplines like archaeology, geology, history, folklore etc.) when completed might even drastically change the popular conception among
historians that Aryans invaded India from Central Asia, etc.”

অর্থাৎ, উজ্জয়ন (বিক্রম) বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন সভাপতি ডঃ বিষ্ণু শ্রীধর ওয়াকঙ্কর ৩০ জন বিশেষজ্ঞের সহযোগে সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদান নিয়ে ২০ বছর ধরে গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন যে হরপ্পা সভ্যতার মূল আর্য সভ্যতার মধ্যেই নিহিত ছিল; অর্থাৎ হরপ্পা সভ্যতার পূর্বেই আর্য সভ্যতা বিদ্যমান ছিল। তাঁর মতে, হরপ্পা সভ্যতা ছিল আর্য সভ্যতারই একটি অঙ্গ। এই সিদ্ধান্ত তিনি কম্পিউটারের সাহায্যে উপনীত হয়েছেন। ডঃ ওয়াকঙ্করের আরও বক্তব্য হলো—তাঁর গবেষণা কাজ সম্পূর্ণ হলে তিনি আর্যদের বিদেশি আক্রমণকারী হওয়ার ধারণাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন।

১৯৬০ সালে সর্বপ্রথম ডঃ ফতহসিংহ সফলভাবে সিন্ধু লিপি পাঠ করেন। সে সময় পর্যন্ত তিনি প্রায় আড়াই হাজার মুদ্রা পাঠ করেছিলেন, যার ভিত্তিতে রাজস্থান প্রাচ্য বিদ্যা প্রতিষ্ঠান, যোধপুর থেকে
প্রকাশিত স্বাহা পত্রিকায় তিনি একাধিক প্রবন্ধ লেখেন। ডঃ ফতহসিংহের এই গবেষণার ভিত্তিতে ডঃ পদ্মধর পাঠক হিন্দুস্তান টাইমস-এ তাঁর সমর্থনে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এর পরে একই পত্রিকায়
কেমব্রিজের ডঃ আলভিন সম্পাদকের নামে …Continue

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

সমরাঙ্গণ সূত্রধার

মহারাজ ভোজ কৃত "সমরাঙ্গণ-সূত্রধার" ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে ৮৩ টি অধ্যায় রয়েছে, যার মধ্যে...

Post Top Ad

ধন্যবাদ