বেদার্থ বিজ্ঞানম্ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

08 September, 2025

বেদার্থ বিজ্ঞানম্

বেদার্থ বিজ্ঞানম্

মানবকে এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মনে করা হয়। এর কারণ এই যে, কেবল এই প্রাণীটিই সর্বাধিক বুদ্ধিমান হওয়ার দরুন সত্য ও অসত্যের বিবেচনা করতে করতে ক্রমাগত নিজের জ্ঞানের বিকাশ করতে পারে। এই পৃথিবীর বাইরে এই ব্রহ্মাণ্ডে যেখানেই এই ধরনের বিবেকশীল প্রাণী থাকুক না কেন, তারাও মানুষ বলার যোগ্য, তাদের দেহ যেমনই হোক না কেন। পৃথিবীর এই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ সম্বন্ধে এই একটি সত্য অবশ্যই স্বীকার করতে হয় যে জন্মের সময় তার স্বাভাবিক জ্ঞান অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অতি সামান্য থাকে। এই কারণে তার বাহ্যিক জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। মানব সৃষ্টির আদিতে জ্ঞান ও ভাষার বিকাশ কিভাবে হয়েছিল তা জানার জন্য “বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানम्” নামক গ্রন্থ পাঠযোগ্য; আমরা এখানে সেই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করা যথোপযুক্ত মনে করি না। যেমন আমরা সেখানে লিখেছি যে, সৃষ্টির আদিতে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অড্ডিরা— এই চার উচ্চস্তরের আত্মা ব্রহ্মাণ্ড থেকে পরা বা পশ্যন্তী তরঙ্গরূপে সম্প্রজ্ঞাত সমাধিতে বেদবাণীকে গ্রহণ করেন, পরে সেই বাণীর যথার্থ বিজ্ঞান সমাধি অবস্থায় ঈশ্বরের দ্বারা প্রাপ্ত হয়। এই চার ঋষিই ক্রমান্বয়ে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদের জ্ঞান লাভ করেন। এর সম্পূর্ণ বিজ্ঞান পাঠক “বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানम्” নামক গ্রন্থ থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝে যাবেন।

এখানে আমাদের এই অবশ্যই চিন্তা করতে হবে যে সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মের মানুষের স্তর কেমন ছিল? তাদের স্তর কি ঠিক সেই রকম ছিল, যেমন আজ একেবারেই অশিক্ষিত মানুষের হয়? সৃষ্টির আদিতে মানুষ যৌবনাবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিল, এটি তো যুক্তি দ্বারা প্রমাণযোগ্য কথা। কিন্তু সেই যুবক বা যুবতী কি আজকের সেই ব্যক্তির সমান বৌদ্ধিক স্তরে ছিলেন, যাকে জন্মের পরই যদি কোন নির্জন স্থানে রাখা হয় এবং পশুপাখি ও বৃক্ষসমূহের মধ্যে থেকে যৌবনে পৌঁছে যায়? আমাদের মতে এ কথা সত্য হতে পারে না। যদি এমন হতো, তবে প্রারম্ভিক প্রজন্মের মানুষদের কাছে বেদের জ্ঞান কখনোই পৌঁছাত না। কারণ আজ কোনো নিরক্ষর ও মানবসমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে যদি বেদজ্ঞানের দীক্ষা দিতে হয়, তবে অক্ষরজ্ঞান দিয়ে শুরু করতে হবে; আর যতক্ষণ না সে বেদবিদ্যা অর্জন করে, ততক্ষণ সে কোন জ্ঞানের ভিত্তিতে জীবনযাপন করবে? সুতরাং এটি নিশ্চিত যে সেই প্রজন্মে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা যেমন সর্বোত্তম স্তরের মানুষ ছিলেন, তেমনি অন্য মানুষরাও সাধারণ ছিলেন না। এরই ইঙ্গিত মহর্ষি দয়ানন্দ যজুর্বেদ ভাষ্য ৩১.৯-এ নিম্নরূপে করেছেন—

তং য়॒জ্ঞং ব॒র্হিষি॒ প্রৌক্ষ॒ন্ পুর॑ুষং জা॒তম॑গ্র॒তঃ ।
তেন॑ দে॒বাऽঅ॑য়জন্ত সা॒ধ্যাऽঋষ॑য়শ্চ॒ য়ে ॥

পদার্থ: — (তৎ) উক্ত (যজ্ঞম্‌) পূজনীয় (বর্হিষি) মানসিক জ্ঞানযজ্ঞে (প্র) প্রকৃষ্টভাবে (অউক্ষন্‌) সিঞ্চন করেন (পুরুষম্‌) পূর্ণ (জাতম্‌) প্রকাশিত জগতের কর্তা (অগ্রত:) সৃষ্টির পূর্বে (তেন) সেই উপদেশকৃত বেদ দ্বারা (দেবা:) বিদ্বানেরা (অযজন্ত) পূজা করেন (সাধ্যাঃ) সাধনযোগাভ্যাসাদি করতে থাকা জ্ঞানীগণ (ঋষয়ঃ) মন্ত্রার্থবিদগণ (চ) (যে)।

ভাবার্থ: — বিদ্বান্‌ মানুষকে সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকে যোগাভ্যাস দ্বারা সদা হৃদয়াকাশে ধ্যান ও পূজা করা উচিত।

পদার্থ: — হে মানুষ! (যে) যারা (দেবা:) বিদ্বান্‌ (চ) এবং (সাধ্যাঃ) যোগাভ্যাস ইত্যাদি সাধন করে (ঋষয়ঃ) মন্ত্রার্থ জানেন, তারা যে (অগ্রতঃ) সৃষ্টির পূর্বে (জাতম্‌) প্রকাশিত (যজ্ঞম্‌) সম্যক পূজনীয় (পুরুষম্‌) পূর্ণ পরমাত্মাকে (বর্হিষি) মানসযজ্ঞে (প্র, অউক্ষন্‌) সিঞ্চন করেন অর্থাৎ ধারণ করেন, তারাই (তেন) তার উপদেশকৃত বেদ দ্বারা এবং (অযজন্ত) তার পূজা করেন। (তম্‌) তাকেই তোমরা জানো।

ভাবার্থ: — বিদ্বান মানুষদের উচিত সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকে যোগাভ্যাস প্রভৃতির দ্বারা সদা হৃদয়রূপ আকাশে ধ্যান ও পূজা করা।

এই মন্ত্র থেকে স্পষ্ট যে প্রারম্ভিক প্রজন্মের সকল মানুষই ঋষিকোটির অথবা অন্ততঃ অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান, অতি পবিত্র অন্তঃকরণবিশিষ্ট ছিলেন। এই কারণেই সেই চার ঋষির দ্বারা প্রাপ্ত জ্ঞান মহর্ষি ব্রহ্মার মাধ্যমে সকল মানুষ সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। মহর্ষি ব্রহ্মা তাঁদের ব্যাকরণ প্রভৃতি নানা বিষয় পড়াননি, বরং সরাসরি বেদমন্ত্রই উপদেশ করেছেন। গত কয়েক হাজার বছরে এই পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যক্তি জন্মেনি, যিনি কিছু না পড়েই সরাসরি বেদমন্ত্রের গম্ভীর বিজ্ঞান বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। এই কারণে এটি স্পষ্ট যে গত পাঁচ-দশ হাজার বছরে যত ঋষি জন্মেছেন, তাঁদের বৌদ্ধিক স্তরের তুলনায় সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের সকল মানুষের বৌদ্ধিক স্তর কোনোভাবেই কম হতে পারে না, বরং অধিকই হতে পারে। তাই বেদের সকল অধ্যেতা ও ভাষ্যকারের মনে এই ধারণা অবশ্যই স্থাপন করা উচিত যে বেদজ্ঞান, যা সেই সময় ঈশ্বরের দ্বারা প্রাপ্ত হয়েছে, তা সেই উচ্চকোটির মানুষের স্তরেরই ছিল, অত্যন্ত নীচ স্তরের নয়। যদিও বর্তমান ব্যাখ্যাকারগণ সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার জন্য অত্যন্ত সহজ ও নিম্ন স্তরের অর্থ করে দেন। তবুও ভাষ্যকারদের বেদের মর্যাদা হ্রাস করে এমন কোনো ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

ঈশ্বর কর্তৃক বেদজ্ঞান প্রদান অপরিহার্য প্রমাণ করার জন্য আমরা একটি মূল যুক্তি দিই— প্রথম প্রজন্মকে সংসারে ব্যবহার করার জ্ঞান দেওয়ার মতো ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ ছিলেনই না। সেই প্রজন্মের পরে তো জ্ঞান পিতামাতা প্রভৃতি থেকে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু প্রথম প্রজন্মকে জ্ঞান কে দেবে? এই যুক্তি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে ফলাফল এই যে, প্রথম প্রজন্ম, যা ঋষিকোটির ছিল, তাদের সৃষ্টির গম্ভীর জ্ঞান ও উচ্চস্তরের ব্যবহারিক শিক্ষা ঈশ্বরের দ্বারাই দেওয়া উচিত, সাধারণ স্তরের নয়, বরং বর্তমান প্রজন্মের তুলনায় উচ্চতর স্তরের জ্ঞান। আর সেই গম্ভীর জ্ঞানও সৃষ্টির মতোই অত্যন্ত বিস্তৃত হবে, সংক্ষিপ্ত নয় এবং তার বিস্তারেরও প্রচুর সম্ভাবনা থাকবে।

বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আজ বেদভাষ্যকার ও ব্যাখ্যাকারগণ বেদার্থ ও বেদপ্রচারের নামে এমন তাণ্ডব সৃষ্টি করেছেন যে, বেদ মূর্খ ও ধূর্তদের গল্পে পরিণত হয়েছে। এই কারণেই চার্বাক মত-এ বলা হয়েছে—

ত্রয়ো বেদস্য কর্ত্তারো ভণ্ডধূর্তনিশাচরাঃ । জর্ফরীতুর্ফরীত্যাদি পণ্ডিতানাং বচঃ স্মৃতম্‌॥

(স.প্র. ১২তম সমুল্লাস থেকে উদ্ধৃত)

যখন বিশ্বের বেদবিরোধীরা বেদ ও ঋষিগণের গ্রন্থসমূহের উপর আক্রমণ করে, তখন নিঃসন্দেহে আমরা সকল বেদভক্ত ব্যথিত হই এবং একই সঙ্গে বেদবিরোধীদের প্রতি ক্রোধও অনুভব করি। কিন্তু কখনও কি আমরা এই চিন্তা করেছি যে তাদেরকে বেদবিরোধ করার উপাদান কে সরবরাহ করেছে? বেদের মিথ্যা ভাষ্যকারগণ, আর্ষ গ্রন্থসমূহের ভ্রান্ত টীকাকারগণ এবং ঐসব গ্রন্থে স্বেচ্ছাচারী প্রক্ষিপ্ত যুক্তকারীরাই এ সকলের প্রধান দায়ী।

ভাষ্যকারদেরও দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথম শ্রেণীর ভাষ্যকার তাঁরা, যাদের বেদাদি শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু বেদার্থ বিজ্ঞানের সঠিক উপলব্ধির যোগ্যতা ছিল না। তাঁরা কেবল ভক্তিবশে অথবা লোকৈষণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভাষ্য করতে শুরু করেন এবং যেমন তাদের বুদ্ধিতে এসেছে, তেমনই (প্রায়ঃ রূঢ়) অর্থ করে বসেন। কিছু ভাষ্যকার এই শাস্ত্রগুলোকে কেবল কর্মকাণ্ডগ্রন্থ মনে করে তদনুযায়ী ভাষ্য করলেন। তাঁরা বৈদিক পদগুলোর রূঢ় অর্থ করে বেদাদি শাস্ত্রে পশুবলি, নরবলি, মাংসাহার, অশ্লীলতা, ছুঁয়াছুঁয়ি এবং বিজ্ঞানবিরোধী বিধান পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাষ্যকার ছিলেন তাঁরা, যারা প্রকৃতিগতভাবেই মানবতার শত্রু; তাঁরা সচেতনভাবে শাস্ত্রের ভ্রান্ত অর্থ করলেন এবং মনুস্মৃতি, বাল্মীকি রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি বহু গ্রন্থে স্বেচ্ছায় প্রক্ষিপ্ত সংযোজন করলেন। এই শ্রেণীর লোকেরা ঋষিদের নামে নতুন নতুন কল্পিত গ্রন্থ রচনা শুরু করে দিল। এই দুঃখজনক প্রথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে থাকে।

বাস্তবিকই, এই প্রথা কেবল বেদের বিরুদ্ধেই নয়, সমগ্র মানবজাতির প্রতিই এক ভয়ঙ্কর অপরাধ। গ্রন্থভাষ্যের প্রথা শুরু হওয়ার আগেই ব্রাহ্মণগ্রন্থ ও শ্রৌতসূত্রাদি নামের অধীনে বিভৎস যজ্ঞ এই দেশে শুরু হয়, যেখানে শুধু পশুই নয়, মানুষেরও বলি দেওয়া হতে লাগল। এটিকে দেখে পশুবলির প্রথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament)-এ যজ্ঞবেদী ও পশুবলির বর্ণনা পাওয়া যায় এবং কোরআনে কোরবানির নামে নৃশংস হিংসার তাণ্ডব সুপরিচিত। এর অর্থ এই যে, বিশ্বজুড়ে যত কল্যাণ ছড়িয়েছে তার মূল কারণ বেদাদি শাস্ত্রের যথার্থ জ্ঞান; আর যত অকল্যাণ ছড়িয়েছে, তার মূল কারণ এই শাস্ত্রসমূহের মিথ্যা ব্যাখ্যা অথবা এই শাস্ত্র থেকে দূরে থাকা। বেদাদি শাস্ত্র প্রাণীমাত্রের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্য এক অমোঘ ঔষধি। ঔষধি সম্বন্ধে সকলে জানে যে, সঠিকভাবে গ্রহণ করলে ঔষধি রোগ সারায়, কিন্তু ভুলভাবে গ্রহণ করলে প্রাণ পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে। এমনও সম্ভব যে ঔষধি ছাড়াই রোগী বেঁচে যাবে এবং সুস্থ হয়ে উঠবে, কিন্তু বিপরীতভাবে ঔষধি গ্রহণ করলে সে অবশ্যই বিপদে পড়বে। আজকের বিশ্বে বেদাদি শাস্ত্রকে ভুলভাবে বোঝা ও প্রচার করা হচ্ছে, আর এটাই জগতের সব দুঃখের কারণ— শারীরিক, মানসিক বা আত্মিক যন্ত্রণা হোক, অন্যান্য প্রাণী বা মানুষের পারস্পরিক কলহজনিত দুঃখ হোক, রাষ্ট্র ও সামাজিক ব্যবস্থাজনিত দুঃখ হোক অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক— সমস্ত দুঃখের মূল কারণ অজ্ঞতা অথবা মিথ্যা জ্ঞান।

সহায়ক গ্রন্থের প্রয়োজন

এখন আমরা আবার পূর্বের বিষয়ে আসি— প্রারম্ভে সকল মানুষ বেদ থেকেই বেদের অর্থ বুঝে নিতেন। তাদের অন্য কোনো সহায়ক গ্রন্থের প্রয়োজনই ছিল না। তাই বেদ ছাড়া অন্য কোনো গ্রন্থ ছিল না, যা বেদার্থ বুঝতে সহায়ক হতে পারে। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে সত্ত্বগুণের হ্রাস হতে থাকল এবং তখন বেদার্থ তাদের কাছে দুরূহ হয়ে উঠল। তখন যেসব ঋষি বেদ থেকেই বেদকে বুঝতে সক্ষম ছিলেন, তাঁরা বেদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ব্রাহ্মণগ্রন্থের প্রচার শুরু করলেন এবং এমন যজ্ঞের কল্পনা করলেন, যা পরিবেশ শোধনের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টিকে বোঝার মানচিত্র হিসেবেও কার্যকর ছিল। যখন মানুষের মধ্যে সত্ত্বগুণ আরও কমে গেল, তখন ব্রাহ্মণগ্রন্থও তাদের বোঝা কঠিন হয়ে উঠল এবং তাঁরা বেদ ও ব্রাহ্মণ উভয়ের অর্থেই বিভ্রান্ত হতে লাগলেন। এর ফলে রূঢ় অর্থের প্রচলন শুরু হয়। সেই সময় কিছু মহান ঋষি বৈদিক পদগুলির নির্বচন প্রক্রিয়াকে জগতের সামনে উপস্থাপন করার জন্য বিরাট উদ্যোগ নিলেন।

বর্তমানে নির্বচনপ্রক্রিয়া বোঝার জন্য আমাদের কাছে মহর্ষি ইয়াস্ককৃত নিরুক্তশাস্ত্র বিদ্যমান। পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার-এর মতে, মহর্ষি ইয়াস্কের সময় বিক্রম থেকে প্রায় ৩১০০ বছর পূর্বের এবং মহাভারতের সময় বিক্রম থেকে প্রায় ৩০৮১ বছর পূর্বের। এইভাবে মহর্ষি ইয়াস্ক মহাভারতকালীন প্রমাণিত হন। পণ্ডিত ভগবদ্দত্তজি নিরুক্ত ভাষ্যের ভূমিকায় আচার্য দুর্গকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন যে আচার্য দুর্গের পূর্বে ভারতে অন্ততঃ ১৪টি নিরুক্ত প্রচলিত ছিল। অতএব, নিরুক্তকারদের উদ্দেশ্য ছিল বেদের যোগিকতা প্রতিষ্ঠা করা এবং বেদে লুকিয়ে থাকা জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো উদ্ভাসিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে নিরুক্তশাস্ত্র রচিত হয়েছিল বৈদিক পদগুলোর রূঢ় অর্থের প্রথা থেকে রক্ষা করার জন্য, সেই গ্রন্থটিকেই তার ভাষ্যকাররা রূঢ় অর্থপ্রক্রিয়ার হাতে সমর্পণ করে দিলেন।

আমার কাছে বহু নিরুক্তের ভাষ্য বিদ্যমান। প্রায় সকল ভাষ্যকারই মূল গ্রন্থকারের অভিপ্রায় স্পর্শও করতে পারেননি। ফলে তাঁরা বেদের সঙ্গে বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। এদের মধ্যে কোনো ভাষ্যই বেদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা তো দূরের কথা, রক্ষা করতেও সক্ষম নয়। বরং এ সব ভাষ্য বেদের মহিমা লোপকারীই হয়েছে। এইসব ভাষ্য পড়ে বহু ভারতীয় ও বিদেশী বিদ্বান্ কেবল মহর্ষি ইয়াস্কের নির্বচন-শৈলীকে নির্বুদ্ধিতারূপে আখ্যায়িত করেননি, বরং বেদকেও প্রবলভাবে নিন্দা করেছেন। যে বেদ সমগ্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল এবং যার ভিত্তিতে কোটি কোটি বছর ধরে মানুষ জ্ঞান ও আনন্দের আলো পেয়ে আসছে, সেই বেদকেই আজ উপহাস ও নিন্দার পাত্রে পরিণত করা হয়েছে। এর চেয়ে মানবজাতির জন্য দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে?

বেদ কী?

এখন আমরা আবার এই জানার চেষ্টা করি যে বেদ কী? যদিও বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানम् গ্রন্থে আমরা এই বিষয়ে বিশদভাবে লিখেছি, তবুও আমরা এখানে কিছু পরিপূরক প্রচেষ্টা করি। আমরা সকলে জানি, বেদ হলো মন্ত্রসমষ্টি, এবং মন্ত্র পদসমষ্টি। এই পদ শব্দরূপ। পদগুলির উচ্চারণে যে ধ্বনিতরঙ্গ উৎপন্ন হয়, সেই তরঙ্গগুলির পরা ও পশ্যন্তীরূপ সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থের জন্মকালে থেকেই উৎপন্ন হতে শুরু করে। ধ্বনিতরঙ্গ কোনো জড়পদার্থে উৎপন্ন কম্পনের রূপ। যখন এই কম্পন পরা রূপে থাকে, তখন কম্পিত পদার্থ হলো সৃষ্টির মূল উপাদান কারণ— প্রকৃতি নামক পদার্থ। প্রতিটি প্রকারের বাণীর প্রাথমিক ধাপ মূলত প্রকৃতিপদার্থেই শুরু হয়। তাই পরাবাণীর মাধ্যম প্রকৃতি। বাণীর পরবর্তী ধাপ পশ্যন্তী রূপ, যা মনস্তত্ত্বে উৎপন্ন হয়; অর্থাৎ পশ্যন্তীবাণীর মাধ্যম মনস্তত্ত্ব। পশ্যন্তী থেকে স্থূল বাণীর তৃতীয় স্তর মধ্যমা জন্ম নেয়, যা আকাশতত্ত্বে উৎপন্ন কম্পনের রূপ। বাণীর সবচেয়ে স্থূল স্তর, যা কানে শোনা যায়, তা বৈখরী নামে পরিচিত এবং এর জন্য কঠিন, তরল বা গ্যাসীয় পদার্থ মাধ্যমের কাজ করে। এই পদার্থগুলির সূক্ষ্ম কণাগুলি বৈখরী বাণীর তরঙ্গে কম্পিত হয়।

যে মহাপুরুষেরা এই প্রশ্ন করেন যে শব্দ তো পদার্থের সংঘর্ষেই উৎপন্ন হয়, তাঁরা আসলে বৈখরী বাণী (যা আমরা কানে শুনি) প্রসঙ্গে এ প্রশ্ন করেন। কিন্তু বাণীর অন্য তিন রূপের মাধ্যম কী, তা আমরা ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছি। তাই শব্দের উৎপত্তি নিয়ে এই প্রশ্ন তোলা অনর্থক হয়ে যায়। আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি যে মূল প্রকৃতিপদার্থে কোনো না কোনো আন্দোলন না হলে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া শুরু-ই হতে পারে না, এবং যে কোনো আন্দোলন কম্পনের রূপেই শুরু হয়। প্রকৃতির সেই কম্পনই বাণীর পরারূপ। ক্রমশঃ যখন অগ্রবর্তী পদার্থগুলির সৃষ্টি হয়, তখন তখন সেই কম্পনের রূপও পরিবর্তিত হয়। এর ফলে বাণীর অগ্রবর্তী ধাপসমূহ সৃষ্টি হতে থাকে। বৈদিক পদগুলির এই বিশেষত্ব যে, তাদের অর্থের সঙ্গে নিত্য সম্পর্ক আছে। এখানে “অর্থ” বলতে পদার্থকেও বুঝতে হবে। অর্থাৎ, সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় যে পদ উৎপন্ন হচ্ছে, সেই সময়েই সেই পদ দ্বারা বোধগম্য পদার্থের উৎপত্তিপ্রক্রিয়ারও বীজরোপণ হয়ে যায়।

পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার নিরুক্ত ১.২-এর ভাষ্যে এ বিষয়ে লিখেছেন—

**“পাণিনি, ‘তত্র তস্যেব ৫.১.১১৬’ অনুসারে মনুষ্যবৎ অর্থ হলো— ‘যেমন মানুষের মধ্যে’, এর অন্য কোনো অর্থ হয় না। এখানে মানুষ ব্যতীত দেবতা দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে? বেদে মন্ত্রময় দেবতারা আছেন। এই বেদমন্ত্রগুলোতেও পদচতুষ্ট্ব অনুযায়ী বর্ণনা রয়েছে এবং সেখান থেকেই তো পদচতুষ্ট্ব লোকজগতে এসেছে।

দ্বিতীয় দেবতারা হলেন অগ্নি, বায়ু, সূর্য, চন্দ্র, বृहস্পতি প্রভৃতি ভৌত দিব্যগুণযুক্ত দেবতা। যখন সৃষ্টির উৎপত্তি হচ্ছিল, তখন এই গতিশীল দেবগণ ঈশ্বরনিয়মে প্রেরিত হয়ে নানাবিধ ধ্বনি প্রকাশ করছিলেন। “স ভূরিতি ব্যাহরত্‌, স ভূমিমসৃজত।” এবং— “দেবীম্‌ বাকম্‌ অজনয়ন্ত দেবাঃ।” অর্থাৎ দেবগণ দেবী বাককে সৃষ্টি করলেন। এই ভূঃ প্রভৃতি ধ্বনি ও মন্ত্র সেই মহান আত্মার নিশ্বাসরূপে উচ্চারিত হচ্ছিল। ঐ দেববচন বা দেবাভিধান অর্থাৎ মন্ত্রগুলিতেও পদচতুষ্ট্বের বিভাগ আছে।**

দেবতাভিধান— বর্তমান খ্রিস্টীয়-ইহুদি জগতে এবং তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজে যত কল্পনা রয়েছে বাক্‌উৎপত্তি সম্বন্ধে, সবই ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। কেবল বৈদিক মতই যথার্থ বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। তদনুসারে, ঈশ্বর-প্রেরিত ভৌত দেবগণই আকাশস্থ ব্যাপক শব্দকে স্বাভাবিকভাবে মন্ত্ররূপে প্রকাশ করেন। এই প্রক্রিয়া এতটাই স্বাভাবিক যে প্রতিটি সৃষ্টিতে পূর্বের মতোই ঘটে। তাই এই মন্ত্রগুলো সর্বদা প্রকাশিত হয়। ঐ মন্ত্রগুলোই ঈশ্বর-প্রেরিত ঋষিরা হৃদয়গুহায় অর্থাৎ বুদ্ধিতে দেখেন ও শুনেন। এই শ্রবণ করার কারণেই মন্ত্রসমষ্টিকে ‘শ্রুতি’ বলা হয়েছে।

ইয়াস্কমুনি একটি বাক্যে এই মহান সত্য প্রকাশ করেছেন।

রাজওয়াড়ে লিখেছেন— careless sanskit (p.iiv)— প্রাচীন সংস্কৃত বাক্যবিন্যাসে অদক্ষতার কারণে রাজওয়াড়ের এ কেবল প্রলাপমাত্র।

দুর্গের অর্থ— দুর্গের অর্থকে সীতারাম ও রাজারাম গ্রহণ করেছেন। যেমন সীতারামের রচনায় আছে— “যেমন মানুষের নামকরণে পদ ব্যবহৃত হয়, তেমনি দেবতাদের নামকরণেও পদ প্রযোজ্য।” অর্থাৎ বেদে দেবতাদের জন্য যে হবি প্রদান করা হয় বা যেসব প্রার্থনা করা হয়, তা এই শব্দগুলির মাধ্যমেই হয়।

তেমনি রাজারাম লিখেছেন— “যেমন শব্দ দ্বারা মানুষের কাজের বিবরণ দেওয়া হয়, তেমনি ইন্দ্রাদি দেবতাদের কাজও শব্দ দ্বারা বলা হয়।”

এই দুই অনুবাদক দুর্গের ব্যাখ্যানুযায়ী এই অর্থ করেন। কিন্তু দুর্গ স্পষ্ট করে বলেননি যে দেবতাদের অভিধান কেমন ছিল। দেবতা-অভিধান একটি ষষ্ঠীতৎপুরুষ সমাস। বাস্তবে বেদের নিত্যতার এটাই মৌলিক রহস্য। মন্ত্রগুলো সৃষ্টির আদিতে স্বাভাবিকভাবে উচ্চারিত হয়েছিল। সেটাই দেবতাদের অভিধান ছিল। বাণীউৎপত্তির এটাই মূল।**

মহাবিদ্বান ভর্তৃহরি এই সত্য উপলব্ধি করে বাক্যপদীয়তে লিখেছেন— “শব্দস্য ফলরূপ এই জগত, এটি আম্নায়বিদগণ জানেন।” (১.১২১)। অর্থাৎ দেবশব্দেরই ফলস্বরূপ এই জগৎ, এ কথা বেদজ্ঞগণ জানেন। ব্রাহ্মণগ্রন্থসমূহে এই তত্ত্ব সুপ্রতিপাদিত হয়েছে।

রাজওয়াড়ে লিখেছেন— “অভিধান হবি…” (মূল পাঠ বিকৃত)। “দেবতা” শব্দের সঙ্গে “অভিধান” পদ যোগ করা উচিত নয়, বরং “তেষাং”-এর সঙ্গে যোগ করা উচিত। মূল তত্ত্ব না বুঝে রাজওয়াড়ে এই অনর্থক রচনা করেছেন।”

নতুন পাঠকদের এই কথা অদ্ভুত ও কল্পনাপ্রসূত মনে হতে পারে, কিন্তু যারা এই গ্রন্থ পড়ার পূর্বে ‘বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানম্’ নামক গ্রন্থটি ভালোভাবে বুঝে নেবেন, তাদের কাছে এ বিষয়টি সহজে বোধগম্য হবে। সেই বিজ্ঞ পাঠকরা এটিও বুঝতে পারবেন যে, বেদের অর্থ কেবল জ্ঞান নয়, বরং যে শাস্ত্রগুলি থেকে জ্ঞান লাভ হয়, সেই শব্দ তথা ভিন্ন–ভিন্ন মাধ্যমে সংঘটিত কম্পনও বেদরূপ। বেদের সেই রূপই সৃষ্টির উপাদান কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার গ্রহণ অগ্নি প্রভৃতি চার ঋষি ব্রহ্মাণ্ড থেকে করেন এবং তাঁরা তা কেবল পরমেশ্বরের সহায় নিয়ে সমাধি–অবস্থায় করতে সক্ষম হন। যখন তাঁরা বেদ গ্রহণ করে নেন, তখন তাদের অন্তরে সমাধি অবস্থাতেই ঈশ্বর সেই শব্দসমূহের অর্থ প্রকাশ করে দেন। ঋষি দयानন্দ এই প্রক্রিয়াটিকেই তাঁর গ্রন্থসমূহে ব্যাখ্যা করেছেন, যেটি পড়েই সাধারণত মানুষ ঈশ্বর–প্রদত্ত জ্ঞানকেই বেদ মনে নেয় এবং এটি সত্যও বটে। কিন্তু তাঁরা এই বিষয়ে আর চিন্তা করেন না যে, মানুষের উৎপত্তির বহু পূর্বেই বেদ–মন্ত্র ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান ছিল। বৈদিক ভাষার বিশেষত্বই এই যে, এর পদসমূহ ব্রহ্মাণ্ডে সর্বত্র বিরাজমান। সৃষ্টির প্রতিটি পদার্থের সঙ্গে তাদের নিত্য ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। তাই বৈদিক ভাষা ব্রহ্মাণ্ডের ভাষা এবং বেদ–মন্ত্র এই ব্রহ্মাণ্ডের বৈজ্ঞানিক সংগীত। এই কারণে বেদ এক ব্রহ্মাণ্ডীয় গ্রন্থ। এজন্যই তো বেদে নিজেই বলা হয়েছে যে, ঋষিরা বেদ–মন্ত্র নিজেদের পবিত্র অন্তঃকরণে এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে সেইভাবেই ছেঁকে–ছেঁকে গ্রহণ করেছেন, যেমন আমরা সাত্তু বা আটা ছেঁকে থাকি। এই বিষয়টি পাঠক ‘বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানम्’ নামক গ্রন্থে ইতিমধ্যেই পড়েছেন।

একবার ভেবে দেখুন—যদি বেদ–মন্ত্র পূর্বে বিদ্যমান না থাকত, তবে সেগুলোকে ছেঁকে–ছেঁকে গ্রহণ করাই বা কীভাবে সম্ভব হতো? এখানে এই ইঙ্গিতও মেলে যে, সেই চার ঋষি যেসব মন্ত্র গ্রহণ করেছিলেন, সেগুলো তাঁরা বেছে নিয়েই গ্রহণ করেছিলেন। এমন অবস্থায় ব্রহ্মাণ্ডে অনেক মন্ত্র রয়ে গিয়েছিল, যেগুলি তাঁরা গ্রহণ করেননি। যেসব মন্ত্র তাঁরা গ্রহণ করেননি, সেগুলিও তো বেদরূপ। এ–রকম কিছু মন্ত্র ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ও বেদের কিছু শাখায় পাওয়া যায়, যেগুলি পরে গৃহীত হয়েছিল।

এখানে আর একটি চিন্তনীয় বিষয় এই যে, যখন ঈশ্বর সেই চার ঋষিকে জ্ঞান দিলেন এবং যদি তার পূর্বে বেদ–মন্ত্র রশ্মি–রূপে ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান না থাকত, তবে ঈশ্বর কেন নিজের জ্ঞানকে ছন্দ–রূপে প্রদান করলেন? কখনও কি এই পৃথিবীতে মানুষের কথ্য ভাষা বেদের মতো ছন্দবদ্ধ রূপে ছিল? আমাদের মতে, মানুষের ব্যবহারিক ভাষা কখনো পদ্যরূপে ছিল না। অগ্নি, বায়ু প্রভৃতি ঋষিরাও বেদ–জ্ঞান প্রাপ্তির পর যেই ভাষায় দৈনন্দিন কথাবার্তা বলতেন, তা নিশ্চয়ই গদ্যভাষাই ছিল। তবে ঈশ্বর কেন পদ্য–রূপে জ্ঞান দিলেন?

তিনি কি নিজের কাব্য–প্রতিভার প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন, নাকি কাব্য–কলা শেখাতে চেয়েছিলেন? আমার মনে হয়, এরূপ করা একেবারেই অপরিহার্য ছিল না। শেখাবার জন্য আরও বহু কলা ছিল, সেগুলি তিনি কেন বাদ দিলেন? প্রকৃতপক্ষে, সাহিত্য ও কলাপ্রেমীরা ঈশ্বরকে কেবল শিল্পী ও সাহিত্যকার হিসেবেই দেখতে চান। আমি এমন–এমন বিদ্বানদের দেখেছি, যারা বেদে সব সম্প্রদায়ের বিশ্বাসসমূহ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কেউ আবার বেদে বীর–রস, হাস্য–রস, শৃঙ্গার–রস প্রভৃতি সব রসের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে বেদের সর্বজ্ঞতাকে হাস্যকর উপহাসে পরিণত করেন। অথচ বেদে সৃষ্টি–বিদ্যার গভীর রহস্য প্রমাণ করার চেষ্টা অত্যন্ত বিরল, যদিও সেটিই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। যারা এরূপ চেষ্টা করেনও, তারা আধুনিক বিজ্ঞানের অপূর্ণ বা কল্পিত মতবাদকেই বেদে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে নিজেদের ধন্য মনে করেন। পরে যখন সেই বৈজ্ঞানিক মতবাদ মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তখন এই বৈদিক বিদ্বানরা বেদকে হাস্যাস্পদ করে নীরব হয়ে যান। আজ বেদ–বিজ্ঞানের নামে যেটা চলছে, তা আসলেই হাস্যকর প্রচেষ্টা। আমি নিজেই দেখেছি, বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে ব্যঙ্গ করেছেন, কিন্তু আমি আমার বৈদিক বিজ্ঞান দিয়ে তাদের অভিভূত এবং পরাভূতও করেছি।

যখন কেউ আমাদের জিজ্ঞাসা করে যে, ঈশ্বর কেন বেদের জ্ঞান দেন? তখন আমরা সর্বদা এরূপ উত্তর দিই যে, ঈশ্বর মানুষকে পৃথিবীতে কেমন আচরণ করতে হবে, তা শেখাবার জন্যই বেদের জ্ঞান দেন। এর অতিরিক্ত আমরা এটাও বলি যে, বেদ এই সৃষ্টির ব্যাখ্যা করে এবং বেদ ঈশ্বরের সাঙ্ঘাতিক জ্ঞান; আর সৃষ্টি তাঁর পরীক্ষাগার। কিন্তু যারা এরূপ বলেন, তাঁরা বেদ থেকে এই সৃষ্টির ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কেন করেন না? আর যারা চেষ্টা করেনও, তাঁরা কেন এটা বোঝার চেষ্টা করেন না যে, সৃষ্টিকে ঈশ্বরের চেয়ে বেশি বা তাঁর সমান কেউ জানতে পারে না? তাহলে এই বিদ্বানরা বেদকে আধুনিক বিজ্ঞানের পেছনে অযৌক্তিকভাবে চালানোর চেষ্টা করেন কেন? যদি আধুনিক বিজ্ঞানই সর্বোচ্চ প্রমাণ হয় এবং আমাদের চোখ বন্ধ করে তার অনুসরণ করতেই হয়, তবে বেদের প্রয়োজনই বা কোথায়? এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি আমরা দৈনন্দিন জীবনের কথাও বলি, তবে তার জন্যও পৃথিবীতে অসংখ্য বই রয়েছে। তাহলে বর্তমান যুগে সংসার–চর্চা শেখার জন্য বেদ–শাস্ত্রগুলির প্রয়োজনই বা কেন? হয়তো প্রথম প্রজন্মের মানুষের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এখন কেন থাকবে? প্রকৃতপক্ষে এই ধরণের অবিবেক বেদের বেদত্বকে ধ্বংস করেছে। আর আমরা বৈদিকরা কেবল নিজেদের ধর্মস্থানে নিজেদের লোকেদের মধ্যে বেদ–শাস্ত্র ও পণ্ডিতদের প্রশংসা করে চলেছি। এটি সত্য–অসত্যের জিজ্ঞাসু জনদের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয় এবং বিদ্বানদের জন্য তো একেবারেই অশোভন।

বেদকে রক্ষা করতে হলে আমাদের অবশ্যই নিজের–নিজের পূর্বধারণা ত্যাগ করে এই চিন্তা করতে হবে যে, বেদের প্রকৃত স্বরূপ কী? সৃষ্টি কেমন করে ধাপে ধাপে সংঘটিত হয়? সৃষ্টির উপাদান কারণরূপ পদার্থ থেকে পরবর্তী পদার্থগুলির সৃষ্টি একটি লয়বদ্ধ আন্দোলন দ্বারাই সম্ভব, এবং সেই আন্দোলনও সময়ে–সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হওয়া উচিত।

ঈশ্বর–তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা ও স্বরূপ

আন্দোলন ঘটার জন্য মূল পদার্থে কোনো বল–এর উপস্থিতি থাকা আবশ্যক। এই কথাটি বৈজ্ঞানিক যুক্তি দ্বারা যে–কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি জানতে পারেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা জানা বা জানা সম্ভব এমন কোনো বল সেই সময়ে বিদ্যমান থাকতে পারে না। আমাদের এই বক্তব্য বুঝতে হলে মানুষের বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি থাকা জরুরি, যে বুঝতে পারে বা বোঝার ক্ষমতা রাখে যে, বলের উৎপত্তি কীভাবে সম্ভব। যখন কোনো বল নিজে নিজে উৎপন্ন হতে পারে না, তখন পদার্থে আন্দোলন আরম্ভ হলো কীভাবে? আর সেই আন্দোলনও আবার সৃষ্টির মতো সর্বোৎকৃষ্ট কার্য সম্পাদনের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্তভাবে ঘটল। এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, সৃষ্টি–প্রক্রিয়া সংঘটনের জন্য যে বল ও উদ্দেশ্যের প্রয়োজন, তা প্রমাণ করার জন্য বুদ্ধি ও বল—দুটিরই প্রয়োজন। এ দুটো গুণ কোনো জড় পদার্থে কখনোই থাকতে পারে না। এজন্য এমন এক পরম–চৈতন্য তত্ত্বের প্রয়োজন, যার বুদ্ধি ও বল সর্বদা পূর্ণ ও অনন্ত এবং এই বিশাল সৃষ্টিকে উৎপন্ন করার জন্য যার ব্যাপকতাও মূল পদার্থের তুলনায় বেশি তথা অসীম হতে হবে। এমন পরম–চৈতন্য তত্ত্বই ঈশ্বর নামে পরিচিত, যিনি সম্পূর্ণ নিরাকার হতে বাধ্য, কারণ কোনো সাকার বস্তু সর্বব্যাপী এবং অনন্ত বল–বুদ্ধিসম্পন্ন হতে পারে না।

আজকাল কিছু লোক নিরাকার’ শব্দের অর্থ “আকারহীন” মনে করেন না, তাঁরা ব্যাকরণের অপব্যবহার করে বলেন যে, যিনি অসংখ্য আকর–আকৃতি–সম্পন্ন পদার্থ উৎপন্ন করেন, তাকেই নিরাকার বলে। আসলে এই ভ্রান্ত ব্যাখ্যা তাঁরা মূর্তি–পূজা ও অবতার–বাদকে জোর করে সিদ্ধ করার জন্যই করেন। এ ধরনের পণ্ডিতেরা মুণ্ডক–উপনিষদে উল্লিখিত ‘অমূর্ত’, যজুর্বেদের বাণী (৪০.৮) “অকায়ম্”, “অব্রণম্”, “অস্নাবিরম্” এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৩.১৯)–এর বাণী “আপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা, পশ্যত্যচক্ষুঃ, শৃণোত্যকর্ণঃ”–এর ব্যাখ্যা কীভাবে করবেন? প্রকৃতপক্ষে, এরূপ একগুঁয়ে পণ্ডিতেরাই শাস্ত্রের গৌরব ধ্বংস করেছেন।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শক্তি বা বল সর্বদা নিরাকারনিরবয়ব পদার্থেই বিদ্যমান থাকতে পারে, সাকারে কখনো নয়। যেখানে–যেখানেই সাকার পদার্থে বল ও শক্তির উপস্থিতি দেখা যায়, তা কেবল সেই সাকার পদার্থের ভেতরে বিদ্যমান নিরাকার ও নিরবয়ব চৈতন্য–তত্ত্বর কারণেই ঘটে। কখনো জীবাত্মার কারণে, আর সর্বত্র পরমাত্মার কারণেই ঘটে। মনে রাখতে হবে, সেই নিরাকার ঈশ্বর কোরআন বা বাইবেলের আল্লাহ বা গডের মতো কথিত নিরাকার নন, কারণ তারা তো সপ্তম কিংবা চতুর্থ আসমানে থাকেন, তাঁরা আসনে বসেন, সেই আসন ফেরেশতারা বহন করেন। প্রকৃতপক্ষে, ড. জাকির নায়েক–জাতীয় লোকেরা “ন তস্য প্রতিমা অস্তি” এই বেদ–বাণীর অপব্যবহার করে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার কুচক্রী পরিকল্পনা চালাচ্ছেন। যারা বড়–বড় কবর পূজা করেন, সেগুলিতে মূল্যবান চাদর চড়ান, যারা পাথরকে শয়তান মনে করে পাথর নিক্ষেপ করেন, তাঁরা কিভাবে মূর্তি–পূজার বিরোধিতা করতে পারেন? ।অস্তু!

হ্যাঁ, তো আমরা পদার্থে আন্দোলন থেকে সৃষ্টির উৎপত্তির কথা বলছিলাম। সেই আন্দোলন ধ্বনি ব্যতীত অন্য কোনো রূপে হতে পারে না। সর্বপ্রথম যে সূক্ষ্মতম অথচ সমগ্র পদার্থে সংঘটিত আন্দোলন ঘটে, তা ‘ওঁ’ ধ্বনির ‘পরা’ রূপেই ঘটে। তাই সেই চেতন তত্ত্বের প্রধান ও নিজ নাম ‘ওঁ’ই। এই রশ্মি সরাসরি পরমেশ্বর থেকে উৎপন্ন হয় এবং সর্বদা তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই এই রশ্মিই বিজ্ঞানের ন্যায় সমস্ত কর্ম সম্পন্ন করে। এই রশ্মিই উদ্দেশ্য অনুযায়ী পরবর্তী স্পন্দন সৃষ্টি করতে থাকে। অন্য স্পন্দনের সঙ্গে ঈশ্বরের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকে না, কিন্তু সকল রশ্মির সঙ্গে সর্বদা ‘ওঁ’ রশ্মির সম্পর্ক থাকে। এই কারণে এই সৃষ্টির প্রত্যেক ক্রিয়ার পিছনে ‘ওঁ’ রশ্মির মাধ্যমে ঈশ্বরের অপরিহার্য ভূমিকা থাকে।

‘ওঁ’ রশ্মির মাধ্যমে সময়ে সময়ে যে সব লয়বদ্ধ আন্দোলন ঘটে, সেগুলোই বৈদিক মন্ত্ররূপ। সেই মন্ত্রগুলোই চার ঋষি গ্রহণ করেছিলেন। এই কারণেই বেদ গদ্য আকারে নয়, ছন্দ আকারে বিদ্যমান। কিন্তু তাদের হৃদয়ে পরমেশ্বর যে ছন্দের অর্থের প্রকাশ করেন, তা গদ্য রূপে হয়, অর্থাৎ সেই ভাষায় হয়, যেটি ঋষি এবং অন্যান্য মানুষ ব্যবহার করে।

বেদ অধ্যয়নের পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া

এইভাবে বেদের উৎপত্তির প্রক্রিয়া কেবল ততটাই নয়, যতটা ঋষি দयानন্দ সত্যার্থপ্রকাশ এবং ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা-য় দেখিয়েছেন। তিনি সেই জ্ঞানরূপ বেদের কথা বলেছেন, যা চার ঋষিকে প্রাপ্ত হয়। ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা-য় তিনি বৈদিক পদকে নিত্য বলেছেন এবং সেই পদগুলির আকাশে সমরূপে ভরা থাকার কথাও বলেছেন। কিন্তু বৈদিক পদ সৃষ্টির সূচনায় কেমন করে উদ্ভূত হয় এবং কেমন করে সেই পদ মিলে মন্ত্ররূপ নেয় এবং সেই শব্দ ও মন্ত্রের সৃষ্টিতে কী ভূমিকা থাকে—সময়ের অভাবে তিনি তা কোথাও স্পষ্ট করেননি।

এটি আর্য পণ্ডিতদের কর্তব্য ছিল যে তারা ঋষির এই ভাবনার উপর আরো কাজ করতেন। কিন্তু পণ্ডিত ভাগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার ব্যতীত অন্য কোনো আর্য পণ্ডিত এ বিষয়ে স্পর্শও করেননি। আমি ঋষি দयानন্দের এই উক্তি এবং পণ্ডিত ভাগবদ্দত্তের গ্রন্থ থেকেই বৈদিক রশ্মির সংকেত পেয়েছি। সেই সংকেতের ভিত্তিতে আমি ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির উপর চিন্তা করেছি। এর ফলেই আমি সৃষ্টির উৎপত্তি, পরিচালনা ও প্রলয়ের ব্যাখ্যা আধুনিক বিজ্ঞানের থেকে অনেক দূরে গিয়ে বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞানের মাধ্যমে করতে পেরেছি। বেদের উৎপত্তি এবং সৃষ্টিবিজ্ঞানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞানের বাইরে আর কোনো বিকল্প নেই।

এখন আমরা নিরুক্ত শাস্ত্রের স্বরূপ বিষয়ে কিছু চিন্তা করব। এই গ্রন্থ কেবল শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, অপরিহার্যও বটে—যারা কেবল ব্যাকরণের ভিত্তিতে বৈদিক পদগুলির উৎপত্তি খুঁজে বেদের ব্যাখ্যা করতে বসেন। নিরুক্তকার কিছু বৈদিক পদ বেছে নিয়ে তাদের নির্বচন এই গ্রন্থে করেছেন এবং সেই নির্বচনকে বেদার্থে প্রয়োগযোগ্য প্রমাণ করতে কিছু মন্ত্রকে উদাহরণরূপে ব্যবহার করেছেন। গ্রন্থকার যে নির্বচন এবং মন্ত্রব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন, তা সেই সময়ের বিদ্বানদের কাছে সহজে বোধগম্য ছিল।

এই গ্রন্থের কাল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পূর্বেকার বলে মনে করা হয়। এত দীর্ঘ সময়ে মানুষের সত্ত্বগুণ অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে গেছে। তাই এই গ্রন্থও মধ্যযুগীয় ও বর্তমান পণ্ডিতদের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে গেছে। এই কারণে যতগুলো ভাষ্য এখন পাওয়া যায়, তার মধ্যে কোনো ভাষ্যই গ্রন্থকারের অভিপ্রায় বোঝাতে সক্ষম হয়নি—আমার হাতে থাকা আটটি ভাষ্য দেখে আমি এই অনুমান করছি।

আমি আচার্য দুর্গ এবং স্কন্দস্বামী-মহেশ্বর প্রভৃতি খ্যাতনামা মধ্যযুগীয় ব্যাখ্যাকার, টীকাকার থেকে শুরু করে অর্বাচীন ব্যাখ্যাকার—পণ্ডিত চন্দ্রমণি বিদ্যালঙ্কার, পণ্ডিত ভাগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার, পণ্ডিত मुकুন্দ ঝা শর্মা, আচার্য বিশ্বেশ্বর, স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিত্রাজক, পণ্ডিত সীতারাম শাস্ত্রী, আচার্য ভগীরথ শাস্ত্রী প্রমুখের হিন্দি ভাষ্য, যার মধ্যে পণ্ডিত ছজ্জুরাম শাস্ত্রী ও পণ্ডিত দেবশর্মা শাস্ত্রীর সংস্কৃত টীকাও অন্তর্ভুক্ত, তাদের সামগ্রিক পর্যালোচনা করেছি। এর মধ্যেও পণ্ডিত ভাগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলারের ভাষ্য মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সকল ব্যাখ্যাকার ও টীকাকার কেবল বৈদিক মন্ত্রের ব্যাখ্যাতেই নয়, নির্বচনের অভিপ্রায় বোঝাতেও বড় ভুল করেছেন।

এই অবস্থায় এই নিরুক্ত ভাষ্য পড়ে কেউ বেদকে বুঝে তার রক্ষা করতে পারবে, এমন ভাবা বড় ভুল হবে। যদিও এরা সকলেই আমার কাছে অত্যন্ত সম্মানীয় এবং আজীবন বিদ্যার সাধনা করেছেন। নিরুক্ত ভাষ্য করতে গিয়ে আমি এদের কাছ থেকে কিছু না কিছু সাহায্যও পেয়েছি এবং কোথাও কোথাও তাদের উদ্ধৃতও করেছি। তবুও আমি তাদের ভাষ্যে সন্তুষ্ট নই, বরং দুঃখিত। পাঠকগণের কাছে আমার এই উক্তি বড় অদ্ভুত মনে হবে—যাদের থেকে আমি সাহায্য নিয়েছি, তাদেরই খণ্ডন করতে বসেছি। কিন্তু ক্ষমা করবেন, আমার কাছে সত্যের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই, বেদ ও ঈশ্বরের চেয়ে বড় কোনো সম্মানীয় নেই। কেউ আমার কাছে যতই পূজ্য হোন না কেন, তার ভাষ্য, রচনা বা প্রবচন যদি বেদাদি শাস্ত্রের গরিমা মুছে দেয়, প্রাচীন মহাপুরুষদের প্রতিপত্তি ক্ষুণ্ণ করে, তবে অবশ্যই আমার পরম কর্তব্য হবে যে আমি সেই পূজ্য ব্যক্তির ভাবনার খণ্ডন করি এবং বেদ ও ঋষি-দেবতাদের প্রতিপত্তির রক্ষা করি।

আমার আন্তরিক আবেদন, আপনারা হৃদয় থেকে পক্ষপাত ও ব্যক্তিগত ঈর্ষা-দ্বেষের কাঁটা তুলে বাইরে ফেলে দিন, কারণ বেদের রক্ষা করা আমাদের সকল মানুষের সম্মিলিত কর্তব্য। বেদবিজ্ঞান বিলীন হয়ে যাওয়ার ফলেই আজ সমগ্র মানবজাতি ভয়ঙ্কর সংকটে পড়েছে। আমরা কি নিজেদের স্বার্থ ও রাগ-দ্বেষরূপী অধর্মের বলি দিয়ে তাকে রক্ষা করার সাহস দেখাব না?

পদগুলির নির্বচনের আমার শৈলী ও অন্যান্য ব্যাখ্যাকারদের শৈলীর তুলনা

এখন আমি অন্য ব্যাখ্যাকারদের সঙ্গে নিজের ব্যাখ্যার তুলনা করে কয়েকটি উদাহরণ উপস্থিত করছি—

১. নিঘণ্টু — এর নির্বচন করতে গিয়ে মহর্ষি ইয়াস্ক লিখেছেন—

“নিঘণ্টবঃ কসমাতু। নিগমা ইমে ভবন্তি। ছন্দোভ্যঃ সমাহত্য সমাহত্য সমাম্নাতাঃ। তে নিগন্তব এৱং সন্ত্রো নিগমনান্নিঘণ্টব উচ্যন্ত ইত্যৌপমন্যবঃ। অপি ৱা আহননাদেৱ স্যুঃ। সমাহতাঃ ভবন্তি। যদ ৱা সমাহতাঃ ভবন্তি।”

এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পণ্ডিত ভাগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার লিখেছেন—

“নিঘণ্টবঃ কিস কারণে? নিগমমাত্র এরা। ছন্দ অর্থাৎ মন্ত্র থেকে একত্র করে সংকলিত হয়েছে। এই মন্ত্রসমূহ অর্থজ্ঞানের করণীয় হওয়ায় নিগমন (অর্থাৎ জ্ঞান করানোর কারণেই) নিঘণ্টবঃ বলা হয়েছে। এমনই বলেন আচার্য ঔপমন্যব। আবার আহনন থেকেও (নিঘণ্টবঃ) হয়। এক জায়গায় একত্র করে (হনন) পাঠ করা হয়েছে। তাই আরোও সমাহরণের দ্বারা সমাহত—অর্থাৎ একত্র হওয়া।”


এটি বাস্তবে ব্যাখ্যা নয়, বরং নিছক অনুবাদমাত্র। কিছু বিদ্বান এই নির্বচন এর বিশদ ব্যাখ্যা করারও চেষ্টা করেছেন, বিশেষত স্কন্দস্বামী মহেশ্বর; কিন্তু তাদের ব্যাখ্যায় শব্দজালের অতিরিক্ত আর কিছু নেই। সারকথা সেই একটিই, যা পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার অনুবাদের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। আমাদের মতে মহর্ষি ভগবন্ত কোনো গ্রন্থের নামকরণ এমনভাবে করতেন যাতে সেই নামের মাধ্যমে ঐ গ্রন্থের বিজ্ঞানসংক্রান্ত কিছু পরিচয় প্রকাশ পায়। আমরা এই পদটির বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছি, যার দ্বারা বৈদিক রশ্মি-বিজ্ঞানের এক সূক্ষ্ম ও গম্ভীর রূপ স্পষ্ট হয়। এর দ্বারা এমন এক বিজ্ঞানপ্রকাশ ঘটে যা আধুনিক বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি বর্তমান বেদঅজ্ঞদেরও বিস্মিত করতে সক্ষম। পাঠকবৃন্দ এটি প্রথম অধ্যায়ের প্রথম খণ্ডের সূচনাতেই পড়তে পারবেন।

२. निर्वचनम्‌ (নির্বচন)

মহর্ষি ইয়াস্ক বৈদিক পদগুলির নির্বচন-এর যে বিজ্ঞান প্রচার করেছেন, তা সত্যিই আশ্চর্যজনক। ব্যাকরণশাস্ত্র কোনো পদ অনুযায়ী তার উৎপত্তি করে, প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের ভিত্তিতে সেই পদের ব্যাখ্যা দেয়। এইভাবে ব্যাকরণশাস্ত্র শব্দকে মুখ্য করে তোলে। অন্যদিকে নিরুক্ত শাস্ত্র শব্দমুখ্য নয়, বরং অর্থমুখ্য। এখানে কোনো শব্দের অন্তরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লুকানো অর্থের উৎঘাটনের জন্য নির্বচন করা হয়।

‘নির্বচন’ শব্দের অর্থ কী, এ বিষয়ে আমরা পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলারকে উদ্ধৃত করা উপযুক্ত মনে করি। তিনি নিজের নিরুক্ত ভাষ্য ২.১-এ আচার্য দুর্গকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন—

“অপিহিতস্য অর্থস্য পরোক্ষবৃত্তৌ অতিপরোক্ষবৃত্তৌ বা শব্দে নিষ্কৃষ্য বিগৃহ্য বচনং নির্বচনম্‌। অর্থাৎ শব্দে নিহিত অর্থ যখন পরোক্ষরূপে বা অতিপরোক্ষরূপে বর্তমান থাকে, তখন তাকে টেনে বের করে বা ভেঙে প্রকাশ যে বচন, তাই নির্বচন।”

‘নির্বচন’ শব্দের একটি সরল অর্থও আছে—সৃষ্টির প্রারম্ভকালে অর্থ-পদার্থের সেই মায়া, যেখান থেকে বাক্য/শব্দ নির্গত হয় (निर्गतो वचन यस्मात् )।

এখানে ‘অর্থ’ শব্দ দ্বারা পদার্থগ্রহণের हेतु হিসেবে প্রমাণকে বোঝানো হয়েছে। এজন্য পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত ন্যায়দর্শন-এর “ইন্দ্রিয়ার্থসন্নিকর্ষোত্পন্নম্‌...” সূত্রটি উদ্ধৃত করেছেন। এই বিষয়টি পাঠকবৃন্দ দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম খণ্ডে ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।

আসলে নির্বচন বিদ্যা বেদার্থের প্রাণস্বরূপ। এটি এক অতি গম্ভীর বিজ্ঞান। নির্বচনের যে-যে প্রক্রিয়া শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া ও পদার্থের একই রূপ এই সৃষ্টিতেও বিদ্যমান থাকে। তাই নির্বচন বিদ্যা ও নির্বচন প্রক্রিয়ার প্রতিটি পদ-বাক্যের সঙ্গে সৃষ্টির পদার্থগুলির নিত্য সম্পর্ক থেকে যায়।

এখানে কোনো পাঠক যেন এ না ভাবেন যে ব্যাকরণশাস্ত্রের নিজস্ব কোনো বিজ্ঞান নেই। মোটেই তা নয়। কোনো পদের উৎপত্তি-প্রক্রিয়ায় শাস্ত্রে যে সূত্রগুলির প্রয়োগ হয়, সেই সূত্রে বর্ণিত নিয়মাবলী ও তাদের অনুসারে উৎপত্তি-প্রক্রিয়াগুলি সৃষ্টির সময় পদার্থের গঠনেও কার্যকর থাকে। অর্থাৎ উৎপত্তি (ব্যুৎপত্তি) এবং নির্বচন—উভয় প্রক্রিয়াতেই বৈদিক রশ্মি-বিজ্ঞান কার্যকর।

ব্যাকরণশাস্ত্র যেমন কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করে, তেমনি তার কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, ব্যাকরণ বেদ ও লোকশিষ্ট পুরুষদের অনুসরণ করে; তাই প্রধান আসল ভিত্তি হলো বেদ ও লোকপ্রয়োগ। মহর্ষি পাণিনি ও তাঁর পূর্ববর্তী আচার্যরা লোক ও বেদ উভয়ের মধ্যকার পদগুলোকে ব্যাকরণের নিয়মে বেঁধে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সব পদকে নিয়মবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাই বহু লোকপদ নিয়মে আবদ্ধ না হলেও শিষ্টপ্রয়োগ হওয়ায় সাধু হিসেবে গৃহীত হয়। অপরদিকে বহু বৈদিক পদকে সাধু স্বীকৃতি দিতে গিয়ে মহর্ষি পাণিনিকে “व्यत्ययो बहुलम्‌” ও “छन्दसि बहुलम्‌” ইত্যাদি সূত্র রচনা করতে হয়েছিল।

অতএব, নির্বচন বিদ্যা উৎপত্তি-বিদ্যার তুলনায় অধিক ব্যাপক ও বেদার্থে অধিক উপযোগী। আমরা কেবল দুই বিদ্যার তুলনার জন্যই বলছি; ব্যাকরণের গুরুত্ব কমানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বলতে চাই, বেদার্থ নিরূপণের সময় একগুঁয়েভাবে কেবল ব্যাকরণশাস্ত্রের আশ্রয় নেওয়া সমীচীন নয়। এই বিষয়ে গ্রন্থকার নিজেই নিরুক্ত ২.১-এ লিখেছেন—

“ন সংস্কারমাদ্রিয়েত। বিষয়বত‍্যো হি বৃত্তয়ো ভবন্তি। যথার্থ বিভক্তিঃ সন্নময়েত্‌।”

এর ব্যাখ্যা পাঠক দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম খণ্ডে পড়তে পারবেন।

নির্বচন বিদ্যার অধিকারী কে?

গ্রন্থকার দেখিয়েছেন, কাকে নির্বচন বিদ্যা শেখানো উচিত নয় এবং কাকে শেখানো উচিত।

“নावৈয়াকরণায় নানুপসন্নায় অনিদংবিদে বা। নিত্যম্‌ হ্যবিজ্ঞাতুর্বিজ্ঞানে সূয়া। উপসন্নায় তু নির্ব্রূয়াত্‌ যো वा বিজ্ঞাতুং স্থাত্‌ মেধাবিনে তপস্বিনে বা।” (নিরু. ২.৩)

এই উক্তির ভিত্তিতে বহু বিদ্বান দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে চান যে নিরুক্ত শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য মহাভাষ্য পর্য্যন্ত ব্যাকরণশাস্ত্র পড়া অপরিহার্য। এই কারণেই আমি এই গ্রন্থের ভাষ্য করছিলাম শুনে নানাবিধ বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করা হয়েছিল। অথচ সকল বিদ্বানকে উচিত হবে এই উক্তির উপর আমার ব্যাখ্যা দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় খণ্ডে নিরপেক্ষভাবে পড়া। শাস্ত্রকারের উদ্দেশ্য না বুঝে অহংকারবশত এ ধরনের কথা বলা অজ্ঞতার লক্ষণ।

যদিও গ্রন্থকার জানতেন যে বেদবিদ্যার উপর প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে, তবু তিনি বলেছেন—কিছু লোককে বেদবিদ্যা শিক্ষা দেওয়া উচিত নয়। কারা সেই শ্রেণির মানুষ, তা দ্বিতীয় অধ্যায়ের চতুর্থ খণ্ডে পড়তে হবে। আমাদের মতে এই নিষেধকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রসঙ্গে মানা উচিত, কারণ দুষ্টপ্রবৃত্তির লোকেরা এই বিদ্যার অপব্যবহার করে সমাজের নানা অনিষ্ট ঘটাতে পারে। একই খণ্ডে গ্রন্থকার বিদ্যার উপযোগিতাও স্পষ্ট করেছেন, যা বিশেষ করে শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও নীতি-নির্ধারকদের অবশ্যই পাঠ করা উচিত।


নির্বচন বিজ্ঞানের কিছু উদাহরণ

১. বলম্ (বল)
৩.৯ খণ্ডে গ্রন্থকার এর নির্বচন করেছেন—
“বলং কস্মাত্‌? বলং ভরং ভবতি, বিভর্তে।”

এর বিশ্লেষণ পাঠক ঐ খণ্ডেই পড়তে পারবেন। এখানে ‘বল’-এর যে প্রকৃত রূপ দেখানো হয়েছে, তা কোনো আধুনিক বিজ্ঞানী আজও উপলব্ধি করতে পারেননি। আমরা বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ-এ ৯ প্রকার বলের আলোচনা করেছি, অথচ গ্রন্থকার এখানে ২৮ প্রকার বলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেই নামগুলি নিঘণ্টু-তে উল্লিখিত এবং প্রতিটি নাম আলাদা আলাদা বলের স্বরূপ নির্দেশ করে।

২. কুপঃ (কূপ/কুয়াঁ)
৩.১৯ খণ্ডে নির্বচন—
“কূপঃ কস্মাত্‌? কু পানং ভবতি, কুপ্যতের্‌ বা।” (নিরু. ৩.১৯)

প্রায় সব ভাষ্যকারই এর অর্থ করেছেন এভাবে—‘কূপ’ মানে কুয়াঁ। একে কূপ বলা হয় কারণ এখান থেকে পানি তুলতে কষ্ট হয় এবং যদি তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির কাছে পানি তোলার উপায় না থাকে, তবে সে রাগান্বিত হয়। তাই কুয়াঁকে কূপ বলা হয়।

কিন্তু এই ব্যাখ্যা থেকে সব ভাষ্যকারের বেদবিদ্যা-সংক্রান্ত অজ্ঞতাই প্রকাশ পায়। আমরা এই নির্বচন থেকেই কীভাবে এক মহান বিজ্ঞানের রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছি, তা পাঠক ৩.১৯ খণ্ডে পড়তে পারবেন। সেখানে আমরা ‘কূপ’-এর ১৪টি নাম দেখিয়েছি, যা ভিন্ন ভিন্ন বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বহন করে।

৩. অকুপারঃ এবং কচ্ছপঃ (অকূপার ও কচ্ছপ)
৪.১৮ খণ্ডে নির্বচন—

“আদিত্যোऽপ্যকূপার উচ্যতে। অকূপারো ভবতি দূরপারঃ। সমুদ্রোऽপ্যকূপার উচ্যতে। অকূপারো ভবতি মহাপারঃ। কচ্ছপোऽপ্যকূপার উচ্যতে। অকূপারো ন কূপমৃচ্ছতি ইতি। কচ্ছপঃ কচ্ছে পাতি, কচ্ছেন পাতি ইতি বা, কচ্ছেন পিবতি ইতি বা। কচ্ছঃ খচ্ছঃ খচ্ছদঃ। অয়মপি তরো নদীকচ্ছ এতস্মাদেব। কমুদকম্‌। তেন ছাদ্যতে।” (নিরু. ৪.১৮)

পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার এর অর্থ করেছেন এভাবে—

“সূর্যও ‘অকূপার’ বলা হয়, কারণ তিনি ক্ষুদ্রসীমাহীন—দূরপারে অবস্থিত। সমুদ্রকেও ‘অকূপার’ বলা হয়, কারণ সে সীমাহীন—মহাপার। কচ্ছপ (কচ্ছুয়া)-কেও ‘অকূপার’ বলা হয়, কারণ সে কূপে যায় না, নদী-তালাবেই বাস করে। কচ্ছপ মুখসম্পুট রক্ষা করে; মুখসম্পুট দ্বারা পোষণ করে বা পান করে। ‘কচ্ছ’ মানে আকাশসদৃশ শূন্যতাকে আচ্ছাদনকারী। নদীকূলে ভূমি জল দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে, তাই তার নামও কচ্ছ।”

এখানে অধিকাংশ ভাষ্যকারের মতোই ‘কচ্ছপ’ শব্দের অর্থ কচ্ছুয়া প্রাণী ধরা হয়েছে। কিন্তু যদি সত্যিই বেদে কচ্ছুয়া নামক প্রজাতির উল্লেখ থাকত এবং নিরুক্তকারকে তারও নির্বচন করতে হতো, তবে বেদ ও নিরুক্ত উভয়ই সীমাহীন আকার ধারণ করত। আমাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী (৪.১৮ খণ্ডে) ‘কচ্ছপ’-এর প্রকৃত অর্থ সূর্য, এবং এখান থেকেই এক গভীর সূর্যবিজ্ঞানের উদ্‌ঘাটন ঘটে।

৪. বেকনাটঃ — এই পদটির নির্বচন করতে গিয়ে গ্রন্থকার খণ্ড ৬.২৬-এ লিখেছেন—

“বেকনাটাঃ খলু কুসীদিনো ভবন্তি। দ্বিগুণকারিণো বা দ্বিগুণদায়িনো বা। দ্বিগুণং কাময়ন্ত ইতি বা।”

এখানে সমস্ত ভাষ্যকারই বেকনাটঃ শব্দের অর্থ করেছেন—“সুদে ঋণদানকারী”। এবং এর উদাহরণস্বরূপ যে মন্ত্রটি উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে সুদখোর বৈশ্যের বিনাশের কথা বলা হয়েছে। অথচ এভাবে বলা সমীচীন নয়। ভগবান মনু সীমিত পরিমাণে সুদগ্রহণকে বৈশ্যের এক কর্ম হিসেবে স্বীকার করেছেন। সুতরাং আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, এখানে বেকনাটঃ শব্দের অর্থ “সুদগ্রহণকারী” একেবারেই নয়। আমাদের ব্যাখ্যায় এর অর্থ হয়েছে—“মেঘরূপ পদার্থ”। এইভাবে বেকনাট হলো সেই মেঘসমূহ, যারা আকাশে কাঁপতে কাঁপতে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। এর বিস্তৃত রূপ জানার জন্য আমাদের ভাষ্য পাঠ করা উচিত।


৫. गायत्री (গায়ত্রী) — এই পদটির নির্বচন করতে গিয়ে গ্রন্থকার খণ্ড ৭.১২-এ লিখেছেন—

“গায়ত্রী গায়তে স্তুতিকর্মণঃ। ত্রিগমনাঃ বা বিপরীতা। গায়তো মুখাদুদপতত্‌।”

এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রায় সব ভাষ্যকারই কেবল এতটুকুই বলেছেন—“যা স্তোত্রার্থক, তিন পদ দ্বারা গমনকারী, ‘ত্রি+গায়’-এর বিপরীত, এবং গায়ক প্রজাপতির মুখ থেকে উৎপন্ন—সে ছন্দ গায়ত্রী।” কিন্তু এ থেকে কোনো উদ্দেশ্য বা বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য প্রকাশিত হয় না। কোনো বিজ্ঞান তো প্রকাশ পায়ই না। এর প্রকৃত বিজ্ঞান বুঝতে হলে পাঠক আমাদের ভাষ্য অধ্যয়ন করবেন। অনুরূপভাবে অন্য ছন্দসমূহের নির্বচনের বিজ্ঞানও এই গ্রন্থে পাওয়া যাবে।


৬. अग्निः (অগ্নি) — এর নির্বচন করতে গিয়ে গ্রন্থকার খণ্ড ৭.১৪-এ লিখেছেন—

“অগ্নিঃ পৃথিবীস্থানোऽস্তং প্রথমং ব্যাখ্যাস্যামঃ। অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীর্ভবতি। অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে। অদ্ভ নযতি সন্নমমানঃ। অক্রোপনো ভবতীতি স্থৌলাষ্টীভিঃ। ন ক্রোপয়তি। ন স্নেহয়তি। ত্রিভ্য আখ্যাতেভ্যো জায়ত ইতি শাকপূণিঃ। ইতাতূ। অক্তাদ্দগ্ধাদ্বা। নীতাতূ। স খল্বেতেরকারমাদত্তে। গকারমনক্তের্বা দহতের্বা। নীঃ পরঃ।”

এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধিকাংশ ভাষ্যকার লিখেছেন—“যিনি অগ্রণী, যিনি যজ্ঞকর্মে সর্বপ্রথম আনা হয়, যিনি অন্য পদার্থকে নিজের সংস্পর্শে এনে নিজের মতো করে দেন, যিনি ভিজান না, স্নিগ্ধ করেন না, যিনি গমন করেন, প্রকাশ করেন এবং দহন করেন—সেই পদার্থ অগ্নি।” এ সকল অর্থ ভৌত অগ্নি (fire)-এরই সূচক। কিন্তু এর বিস্তৃত অর্থ গ্রহণ করতে হলে পাঠক আমাদের ভাষ্য অধ্যয়ন করবেন।


৭. मण्डूकः (মণ্ডূকঃ) — এর নির্বচন করতে গিয়ে গ্রন্থকার খণ্ড ৯.৫-এ লিখেছেন—

“মণ্ডূকা মজ্যূকা মজনাতূ। মদতের্বা মোদতিকর্মণঃ। মন্দতের্বা তৃপ্তিকর্মণঃ। মণ্ডয়তেরিতি বৈয়াকরণাঃ। মণ্ড এষামোক ইতি বা। মণ্ডো মর্দেবা। মুদ্দের্বা।”

এখানে সব ভাষ্যকারই মণ্ডূক শব্দের অর্থ করেছেন—“ব্যাঙ”। কচ্ছপের ন্যায় ব্যাঙ অর্থবাহী মণ্ডূক শব্দের এমন বিশাল নির্বচন গ্রন্থকার করবেন—এটি সত্যিই হাস্যকর। ফলত, যেসব মন্ত্রে মণ্ডূক পদ রয়েছে, তাদের অর্থও হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই পদটির নির্বচনের গম্ভীর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বুঝতে হলে পাঠক খণ্ড ৯.২-এ অবস্থিত এই মন্ত্রের ভাষ্য পড়বেন—

“অশ্বো ভোট্ঠা সুখং রথং হাসনামুপমন্ত্রিণঃ। শেপো রোমণ্বন্তৌ ভেদৌ বারিণ্মণ্ডূক ইচ্ছতীন্দ্রায়েন্দো পরি স্রব॥”


৮. इन्द्रः (ইন্দ্র) — এর নির্বচন করতে গিয়ে গ্রন্থকার খণ্ড ১০.৮-এ লিখেছেন—

“ইন্দ্রঃ ইরাং দুরণাতীতি বা। ইরাং দদাতীতি বা। ইরাং দধাতীতি বা। ইরাং দারয়তে ইতি বা। ইরাং ধারয়তে ইতি বা। ইন্দবে দ্রবতীতি বা। ইন্দৌ রমতে ইতি বা। ইন্ধে ভূতানীতি বা। তদ্যদেনং প্রাণৈঃ সমৈন্ধস্তদিন্দ্রস্যেন্দ্রত্বম্‌। ইতি বিজ্ঞায়তে। ইদং করণাদিত্যাগ্রায়ণঃ। ইদং দর্শনাদিত্যৌপমন্যবঃ। ইন্দতে বৈশ্বর্যকর্মণঃ। ইন্দচ্ছত্রূণাং দারয়িতা বা। দ্রাবয়িতা বা। আদরয়িতা বা। আদরয়িতা চ যজ্বনাম্‌।”

এই নির্বচনের বিজ্ঞান না বোঝার কারণে সব ভাষ্যকারই ‘ইন্দ্র’ নামক পদার্থের প্রকৃত স্বরূপ বোঝার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য পাঠক আমাদের ভাষ্য পড়বেন।


বিভিন্ন পদের নির্বচনের এইসব উদাহরণের পর গ্রন্থকার ছয় বিকারযুক্ত ভাববিকার—অর্থাৎ ক্রিয়াপদগুলির ব্যাখ্যাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

গ্রন্থকার খণ্ড ১.২-এ লিখেছেন—

“ঘড্‌ ভাববিকারাঃ ভবন্তীতি বার্ষ্যায়ণিঃ। যায়তে, অস্তি, বিপরিণমতে, বৃদ্ধতে, অপক্ষীয়তে, বিনশ্যতি ইতি। ‘জায়তে’ ইতি পূর্বভাবস্যাদিমা আচ্ছটে। নাপরভাবমা আচ্ছটে, ন প্রতিষেধতি। ‘অস্তি’ ইত্যুৎপন্নস্য সত্ত্বস্যাৱধারণম্‌। ‘বিপরিণমতে’ ইত্যপ্রচ্যবমানস্য তত্ত্বাদ্‌ বিকারম্‌। ‘বর্ধতে’ ইতি বাচশভ্যুচ্চয়ং সাংযোগিকানাং वार্থানাম্‌। ‘বর্ধতে’ বিজয়েনেতি বা। ‘বর্ধতে’ শরীরেণেতি বা। ‘অপক্ষীয়তে’ ইত্যেনৈব ব্যাখ্যাতঃ প্রতিলোমম্‌। ‘বিনশ্যতি’ ইত্যপরভাবস্যাদিমা আচ্ছটে। ন পূর্বভাবমা আচ্ছটে, ন প্রতিষেধতি।”

এই ক্রিয়াগুলির ব্যাখ্যায় গ্রন্থকার এক আশ্চর্যজনক ও সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন, যা পাঠক আমাদের ভাষ্যে ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।

ক্রিয়াপদগুলির মতোই ব্যাকরণশাস্ত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপসর্গ-এরও নিজস্ব গম্ভীর বিজ্ঞান রয়েছে। এই বিজ্ঞান সমগ্র সৃষ্টির ক্রিয়াকলাপে কার্যকর। ব্যাকরণে আমরা কেবল শিখি—উপসর্গ কোনো ধাতুর নানা অর্থকে প্রকাশ করে। কিন্তু এই উপসর্গসমূহের সৃষ্টিতে কী ভূমিকা রয়েছে, তা কেউ ভাবেন না। এ বিষয়ে জানার জন্য খণ্ড ১.৩ পাঠযোগ্য।


আমার বেদভাষ্য-শৈলীর অন্যান্য ভাষ্যকারদের সঙ্গে তুলনা________

গ্রন্থকার বৈদিক শব্দার্থ নির্ণয়ের যোগিক পদ্ধতি দেখিয়ে বেদের অধ্যেতাদের একটি দিকনির্দেশ প্রদান করেছিলেন, যাতে বেদপাঠকরা কোনো গোঁড়ামিতে পড়ে বেদের স্থূল বা প্রচলিত অর্থ না করেন। এই উদ্দেশ্যেই তিনি নিরুক্ত বিদ্যার প্রকাশ করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই তিনি বিভিন্ন বৈদিক পদ নিরুক্ত করেছেন এবং কিছু মন্ত্রের ভাষ্যও করেছেন। তাঁর সেই ভাষ্য ছিল সমকালীন অধ্যেতাদের জন্য। নিরুক্তের রচনাকাল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে বলে ধরা হয়। সেই সময় মানুষের মধ্যে সত্ত্বগুণ এবং শারীরিক শক্তি উভয়ই বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। সেই যুগের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনও বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি পবিত্র ও উন্নত ছিল। এই কারণেই সেই সময়ের মানুষের কাছে নিরুক্তের পদনিরুক্ত এবং বেদব্যাখ্যা হস্তামলকের মতোই প্রত্যক্ষ প্রতীয়মান হতো, কিন্তু বর্তমান কালে সেই নিরুক্ত ও বেদভাষ্যগুলো বোঝা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে গেছে। এজন্যই আজকের নিরুক্তশাস্ত্রের শিক্ষক-অধ্যেতারা নিরুক্তকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

যে নিরুক্তশাস্ত্র বেদকে গোঁড়ামি থেকে সরিয়ে যোগিকতার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য রচিত হয়েছিল, সেই নিরুক্তশাস্ত্রই আজ গোঁড়ামির আঁধার গলিতে কোথাও হারিয়ে গেছে। যে সব নিরুক্ত আসলে বেদের যোগিকতা প্রমাণ করে, তারাই আজ গোঁড়ামির জালে আবদ্ধ। নিরুক্তের বহু ভাষ্যকারই কেবল শব্দের প্রচলিত অর্থে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কিছু ভাষ্যকার, বিশেষ করে স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিত্যাজক, তাঁর “নিরুক্ত-সম্মর্শ” নামক গ্রন্থে ব্যাকরণের বিপুল প্রয়োগ করেছেন, কিন্তু সেই ব্যাকরণ দিয়ে বৈদিক পদগুলোর বৈজ্ঞানিকতা প্রায়ই স্পষ্ট হয় না। ফলে “নিরুক্ত-সম্মর্শ” নামক গ্রন্থ, অশেষ পরিশ্রমে রচিত হলেও, বেদপিপাসুদের কাছে বিশেষভাবে উপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি। যখন স্কন্দস্বামী মহেশ্বর ও আচার্য দুর্গ প্রমুখ মধ্যযুগীয় ভাষ্যকারেরা নিরুক্তশাস্ত্রকে গোঁড়ামির ফাঁদে ফেলে বসেছিলেন, তখন অর্বাচীন বিদ্বানদের কথা আর কী বলব?

বেদকে কিভাবে বোঝা যায়?

প্রত্যেক বেদ-ভাষ্যকার কিংবা অধ্যেতাকে সর্বপ্রথম বেদের প্রকৃতি ও স্বরূপ সম্যকভাবে বুঝে নেওয়া উচিত। একইসাথে বেদের উৎসস্বরূপ সৃষ্টিকর্তা পরব্রহ্ম পরমাত্মার স্বরূপকেও যথাসাধ্য অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। এই উভয় বিষয় উপলব্ধির জন্য “বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানম্‌” নামক গ্রন্থ অবশ্যপাঠ্য। তাকে সম্পূর্ণভাবে না বুঝলে বেদের বেদত্ব এবং পরমাত্মার প্রকৃত স্বরূপ কখনোই ধরা পড়বে না।

বেদজ্ঞানের জন্য সৃষ্টিকে বোঝাও অপরিহার্য। যদি কোনো বেদপাঠক এই পৃথিবীর প্রকৃতি সম্পর্কেও না জানে, তবে সে বেদের এমন এক স্থূল ভাষ্য করবে, যাতে বেদ কেবল পৃথিবীতে বাস করা মানুষদের জন্য সাধারণ জ্ঞানের গ্রন্থমাত্র বলে প্রমাণিত হবে। অথচ বেদ তেমন নয়। কেউ যদি বেদভাষ্যে ভারতবর্ষ, পৃথিবীর নদী, পর্বত, দেশ বা জীবজন্তুর নাম উল্লেখ করে, তবে তা বেদের প্রতি উপহাসমাত্র হবে। অনুরূপভাবে যদি কেউ বেদে কোনো ব্যক্তির নাম প্রমাণ করতে চায়, তবে সেই ভাষ্য সর্বাংশেই মিথ্যা হবে। একবার যদি প্রমাণিত হয় যে বেদ ঈশ্বরপ্রদত্ত সৃষ্টিবিদ্যার গ্রন্থ এবং বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞান উপলব্ধ হয়, তবে এইসব ভ্রান্ত ভাষ্য আপনিই পরিত্যাজ্য হয়ে যাবে।

আমাদের চিন্তা করা উচিত যে কেবল একটি গ্যালাক্সিতেই বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র ও তাদের নিজস্ব গ্রহ-উপগ্রহ আছে এবং বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই এই মহাবিশ্বে তিন থেকে চার বিলিয়ন গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে সমগ্র মহাবিশ্বে আমাদের এই পৃথিবীর অবস্থান সমুদ্রের মধ্যে এক বিন্দু জলের মতোই। তখন কেমন করে সম্ভব যে বেদে কেবল এই পৃথিবীর নদী, সমুদ্র, পর্বত, জীবজন্তু বা উদ্ভিদের নাম থাকবে? যে কোনো ভাষ্যে এভাবে দেখা গেলে তার দৃষ্টিতে বেদ ঈশ্বরীয় গ্রন্থ প্রমাণিত হবে না। অথচ বেদকে ঈশ্বরীয় প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট তথ্য আমাদের বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞান সহজেই প্রদান করে।

যে কোনো ভাষ্যকার যদি মানবসমাজের জন্য উপযুক্ত জীবনাচরণের উপদেশ দিতে চান, তবে তিনি বেদ থেকে সেই প্রেরণা অবশ্যই দিতে পারেন। কিন্তু তাতে কোনো ব্যক্তি, দেশ ইত্যাদি পার্থিব নাম থাকতে পারে না। একইসাথে বেদের মূল বা প্রাথমিক ভাষ্য অবশ্যই আধিদেবিক হতে হবে। কারণ বেদমন্ত্ররূপ রশ্মি দিয়েই সমগ্র সৃষ্টির নির্মাণ হয়েছে। তাই বেদমন্ত্র প্রথমত সৃষ্টির ব্যাখ্যাই করবে—এটাই স্বাভাবিক এবং অনিবার্য। এই কারণেই আমরা নিরুক্তে উল্লিখিত বেদমন্ত্রগুলোর প্রায়শই আধিদেবিক ভাষ্য করেছি। যেখানে অন্য ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা খুব আপত্তিকর বা ভুল মনে হয়েছে, সেখানে আমরা আধিদেবিকের পাশাপাশি আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্যও দিয়েছি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ঋষি দয়ানন্দের আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্যও উদ্ধৃত করেছি। তাই সেই অবস্থায় আমরা আলাদা করে আধিভৌতিক বা আধ্যাত্মিক ভাষ্য দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করিনি।

এখানে উল্লেখ্য যে ঋষি দয়ানন্দ তাঁর ভাষ্য সংস্কৃত ভাষায় করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা পণ্ডিতরা তার হিন্দি অনুবাদ করেছিলেন। তাই বহু স্থানে হিন্দি অনুবাদ দয়ানন্দের সংস্কৃত ভাষ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। কোথাও কোথাও বেদকেই উপহাসযোগ্য করে তুলেছে। ঋষি দয়ানন্দ তাঁর ভাষ্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করেছিলেন। ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্র কিছুটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছিলেন, কিন্তু পরে ক্রমশ ভাষ্য সংক্ষিপ্ত হতে হতে অতি সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তিনি বলেছিলেন যে চারটি বেদের ভাষ্য করতে তাঁর চারশো বছরের সময় দরকার, অথচ তিনি মাত্র কয়েক বছরের সুযোগই পেয়েছিলেন। তখন আমরা অনুমান করতে পারি, তাঁর ভাষ্যে বেদার্থ কতখানি সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হতে পারে? আসলে দয়ানন্দের বেদভাষ্য কেবল সাংকেতিক, যাতে তিনি সমসাময়িক ভ্রান্ত ভাষ্যপরম্পরার পরিবর্তে যোগিক পদ্ধতির নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তিনি বহু পদ কেবল এই ভেবে ব্যাখ্যা করেননি যে তাঁর অনুবাদক পণ্ডিতরা তাঁর চিন্তা ও শৈলীর সঙ্গে মিলিয়ে অনুবাদ করবেনই। কিন্তু অনুবাদকরা অজান্তেই বহু ভুল করে ফেলেছেন। এর উদাহরণ শত শত পাওয়া যাবে, তবে আমরা এখানে একটি দিচ্ছি—

ঋষি দয়ানন্দ ‘पूषणं न्व…उच्यते’ (ঋ.৬.৫৫০.৪) মন্ত্রে ‘अजाश्वम्‌’ শব্দের অর্থ করেছেন— “অজা এবং অশ্ব উভয়ই যাহাতে আছে”। অথচ হিন্দি অনুবাদকরা অর্থ করেছেন— “যেখানে ছাগল আর ঘোড়া বিদ্যমান”
এভাবে ভাষ্যে বলা হয়েছে যে সূর্যের মধ্যে ছাগল, ঘোড়া ইত্যাদি প্রাণী বাস করে! এ কথা শুনে যে কেউ বেদের উপহাস করবে এবং তার অধিকারও আছে।

এছাড়া একই ধরণের সমস্যা বহু জায়গায় ঘটেছে। যেমন—পূর্ববর্তী মন্ত্রে ‘অজাশ্ব’ শব্দ এসেছে, যেখানে দয়ানন্দ সংস্কৃতে অর্থ করেছেন “অবিনাশী বিজুলিরূপ অশ্বযুক্ত”, আর হিন্দি অনুবাদে তা হয়েছে “অবিনাশী বিজুলিরূপ ঘোড়াবিশিষ্ট”। কিন্তু তার পরের মন্ত্রেই সেই একই শব্দকে ছাগল-ঘোড়া হিসেবে অনুবাদ করা হলো! তাহলে এই বিপরীত ব্যাখ্যা কোথা থেকে এলো?

আজ দয়ানন্দের নামে যে হিন্দি অনুবাদিত ভাষ্যগুলি প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোর বহু জায়গায় ভুল আছে। অথচ সাধারণ মানুষ কেবল হিন্দি সংস্করণই পড়ে। সর্বদেশিক আর্য প্রতিনিধি সভাও দয়ানন্দের নামে হিন্দি অনুবাদই ছাপাচ্ছে। এটা দয়ানন্দের প্রতি সুবিচার নয়।

আরেকটি মন্ত্র—

(যজু. ১৪.১৯)

“পৃথিভী হন্দোSন্তরিক্ষং ছন্দো চৌশ্ছন্দঃ সমাশ্ছন্দো নক্ষত্রাণি ছন্নন্দো বাক্‌ ছন্দো মনশ্ছন্দঃ কৃষিশ্ছন্দো হিরণ্যং ছন্দো গৌশ্ছন্দো Sজাচ্ছন্দো Sশ্বশ্ছন্দঃ”

অর্থ (বাংলা অনুবাদ):

  • (পৃথিবী) ভূমি: (ছন্দঃ) স্বচ্ছন্দ:(আন্তরিক্ষম) আকাশ: (ছন্দঃ) দৌঃ প্রচ্ছন্ন আলো:(ছন্দঃ) সমাঃ বৃষ্টি:(ছন্দঃ) নক্ষত্র: (ছন্দঃ) বাক্‌ (ছন্দঃ) মনঃ (ছন্দঃ) কৃষি বা ভূমি চাষ (ছন্দঃ) হিরণ্যঃ সোনার ধাতু (ছন্দঃ) গৌঃ গরু (ছন্দঃ) জাঃ ছাগল (ছন্দঃ) শ্বঃ ঘোড়া

এখানে দয়ানন্দ অনেক পদ অনর্থক ফেলে রেখেছেন। কেন? তিনি কি জানতেন না? আসলে তিনি সক্ষম হয়েও বুঝেছিলেন যে তাঁর জীবন আর দীর্ঘ নয়। তাই তিনি অতি দ্রুত ও সাংকেতিক ভাষ্যে গেছেন। ভেবেছিলেন সংস্কৃতজ্ঞরা তাঁর ইঙ্গিত থেকে বাকিটা বুঝে নেবেন এবং যারা সংস্কৃত জানে না, তারা হিন্দি অনুবাদ থেকেই বেদার্থ ধরতে পারবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয়নি।

দয়ানন্দের মৃত্যুর পরও কেউ তাঁর ধারা অনুসারে অসম্পূর্ণ মন্ত্রগুলোর ভাষ্য সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করেনি। অথচ প্রয়োজন ছিল ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রগুলির মতো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা। বেদমন্ত্র কোনো হিন্দি দোহা নয় যে দুই-তিন লাইনে শেষ হয়ে যাবে। বেদ হলো সমস্ত সত্যবিদ্যার গ্রন্থ। তাই তার ভাষ্যে সমস্ত বিজ্ঞান প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

ঋষি দয়ানন্দ আর্যসমাজের তৃতীয় নিয়ম শুধু ভক্তিভরে লেখেননি, বরং প্রাচীন ঋষিদের মত অনুসারে লিখেছেন। সেই মত কোনো অতিশয়োক্তি নয়, বরং বাস্তবতা। যে জ্ঞান ঈশ্বরীয়, তাতে সব সত্যবিদ্যা অবশ্যই থাকবে। মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থবিদ্যা, আধ্যাত্মবিজ্ঞান ও সমাজজীবনের শিক্ষা বেদেই কেন থাকবে না? আজ কি কোনো বেদভক্ত পণ্ডিত বা ধর্মগুরু দাবি করতে পারেন যে বেদভাষ্যের ওপর নির্ভর করে তিনি সমস্ত জাগতিক কার্য সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবেন? যতক্ষণ না তা প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ আমরা বলতে পারি না যে বেদ সব সত্যবিদ্যার গ্রন্থ।

হায়! যদি আর্যসমাজ এই ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পারত এবং তথাকথিত ‘পৌরাণিক সমাজ’ (যারা নিজেদের ‘সনাতনী’ বলে) আর্যবিদ্বানদের সঙ্গে মিলিত হয়ে বেদকে ঈশ্বরীয় ও সর্ববিজ্ঞানের গ্রন্থ প্রমাণে সর্বশক্তি ও সম্পদ ব্যয় করত, তবে সমগ্র আর্যাবর্ত আজ ম্যাকলের দাসত্বে পড়ত না। আমাদের তরুণ প্রজন্ম পাশ্চাত্য কুসভ্যতা ও কুসংস্কারে ভেসে যেত না। দুর্ভাগ্যক্রমে উভয় সমাজই বেদের মাহাত্ম্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

পৌরাণিক সমাজ বেদকে ছেড়ে গীতা, ভাগবত, রামচরিতমানস প্রভৃতি গ্রন্থকেই নয়, বরং বেদবিদ্যা-বিহীন তাদের গুরুজনদেরকেই সর্বোচ্চ স্থানে বসিয়েছে। ফলে সমগ্র হিন্দু সমাজ—যার মধ্যে আর্যসমাজও রয়েছে—বেদ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই কারণেই বিশাল ধর্মীয় আয়োজন, দালানকোঠার মন্দির, আড়ম্বরপূর্ণ পূজা-যজ্ঞ করেও ভিতরে ভিতরে শূন্য, যেখানে লুকানো আছে নাস্তিকতা ও ইংরেজি সংস্কৃতির প্রভাব। বেদের বেদত্ব, ঋষিদের ঋষিত্ব, দেবতাদের দেবত্ব আর আর্যদের আর্যত্ব যেন পৃথিবী ছেড়ে অন্যলোকে চলে গেছে। হয়তো এই কারণেই মহাপুরুষরাও আর জন্ম নিতে চান না।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে—বেদের বাইরে অন্য কোনো গ্রন্থ, এমনকি আর্শগ্রন্থেরও কি এই পৃথিবীতে প্রয়োজন নেই? আমাদের মতে সৃষ্টির আদিকালে কেবল বেদই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখন তামস-রজোগুণে ভরা জগতে তা সম্ভব নয়। আধুনিক বিজ্ঞান পড়াও জরুরি হয়ে গেছে, কারণ আমাদের বৈজ্ঞানিক সাহিত্য হারিয়ে গেছে। তবে আমাদের উচিত আর্শগ্রন্থ ও বেদের বৈজ্ঞানিক ভাষ্য করে ধীরে ধীরে বিজ্ঞানকে পুনর্গঠন করা। বেদকে কেবল বাকশিল্পে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।

আমরা গভীরভাবে চিন্তা করেছি—আমাদের প্রিয় আর্যাবর্ত ও পৃথিবীর এই দুরবস্থার কারণ কী? আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছে—বেদাদি শাস্ত্রের ভ্রান্ত ভাষ্যই সব দুঃখের মূল। তাই ঈশ্বরের কৃপায় আমরা ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এর ভাষ্য করেছি, যা আজ “বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ” নামে পরিচিত। সেই একই শৈলীতে আমরা ঋষি যাস্কপ্রণীত নিরুক্তশাস্ত্রের ভাষ্য “বেদার্থবিজ্ঞানম্‌” নামে প্রকাশ করেছি। এই উভয় আর্শগ্রন্থের বৈজ্ঞানিক ভাষ্য বিশ্বে সম্ভবত প্রথমবার আমরা-ই করেছি। এই গ্রন্থে শত শত মন্ত্রের ভাষ্য করা হয়েছে। পাঠক অন্য যে কোনো ভাষ্যের সঙ্গে তুলনা করলেই তা বুঝতে পারবেন।

মন্ত্র সংখ্যা ৯

অক্ষণ্বন্তঃ কর্ণবান্তঃ সখায়ঃ মনোজবেষ্বসমা ভবূঃ।
আদদপ্বাস উপকক্ষাস উ ত্বে হৃদা ইব স্ত্রাত্বা উ ত্বে দদূশ্রে॥ 
[ঋগ্বেদ ১০.৭১.৭]

নিরুক্তকারের এই মন্ত্রের ব্যখ্যা নীম্মরূপে করেছেনঃ

“অক্ষিমন্তঃ কর্ণবন্তঃ সখায়ঃ । অক্ষি চষ্টেঃ | অনক্তেঃ ইত্যাগ্রায়ণঃ । তস্মাদেতে ব্যক্ততরে ইব ভবত ইতি হ বিজ্ঞায়তে। কর্ণঃ কৃত্ততেঃ । নিকৃত্তদ্বারা ভবতি | ঋচ্ছতেরিত্যাগ্রায়ণঃ । ঋচ্ছন্তীভা খে উদ্ন্তাম্‌ ইতি হ বিজ্ঞায়তে। মনসাং প্রজবেষ্বসমা ভবূঃ। আস্যদঘ্নলা আপরে। উপকক্ষদদপ্রা আপরে। আস্যমস্যতেঃ। আস্যন্দত এনদন্নমিতি বা। দষ্লন দঘ্যতেঃ স্রবতিকর্মণঃ। দস্যতের্বা স্যাৎউঃ। বিদস্ততরং ভবতি। প্রস্নেয়াঃ। হৃদা ইব একে দদৃশিরে। প্রস্নেয়াঃ স্নানাহঃ | হৃদো হৃদতেঃ শব্দকর্মণঃ । হৃদতের্বা স্যাচ্ছীতিভাবকর্মণঃ” (নিরুক্ত ১।৯)

এই অংশের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, মন্ত্রে বর্ণিত দেব বা প্রাকৃতিক শক্তি এমনভাবে কাজ করে যা কানের মতো শুনতে পারে, মন ও বুদ্ধি সমানভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারে, এবং কিছু কার্য (যেমন দান, বৃষ্টি বা অভিজ্ঞতা) হৃদয় স্পর্শ করে সম্পন্ন হয়। শব্দ, ক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা সবই সমন্বয়ে হৃদয়ে প্রতিফলিত হয়।

নিরুক্তকারের এই ভাষ্যকে ভিত্তি করে ভিন্ন-ভিন্ন ব্যাখ্যাকাররা তাদের-তাদের ব্যাখ্যা করেছেন, যার সারাংশ প্রায় একই রকমই। এর মধ্যে আমরা উদাহরণ হিসেবে আচার্য ভগীরথ শাস্ত্রীর হিন্দি ব্যাখ্যা, যা মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত ছজ্জূরাম শাস্ত্রী এবং পণ্ডিত দেবশর্মা শাস্ত্রীর সংস্কৃত টীকা-র উপর ভিত্তি করে, এখানে উদ্ধৃত করছি—

“**“অক্ষিমন্ত: প্রশস্ত চোখের অধিকারী কর্ণবন্তঃ প্রশস্ত কানের অধিকারী সখায়ঃ সমান জ্ঞানসম্পন্ন বা এক শাস্ত্রে সমানভাবে কৃতশ্রম। ‘অক্ষি চষ্টে:’ দর্শনের জন্য ‘চক্ষিদ্’ থেকে অক্ষি তৈরি হয়, কারণ চোখের মাধ্যমে দেখা হয়। ‘অনক্তে:’ অর্থাৎ আগ্রায়ণ: আগ্রায়ণ এই ‘অক্ষি’ শব্দটিকে ‘অজ্জূ ব্যক্তিমেক্ষণকান্তিগতিষু’ থেকে গ্রহণ করেন, কারণ এই চোখগুলো অন্যান্য চোখের তুলনায় ব্যক্তিসম্পন্ন। ‘তস্মাত্ এতে ব্যক্ততরে ইব ভবত ইতি হ বিজ্ঞায়তে’, এটি ব্রাহ্মণের বক্তব্য। এর অর্থ হলো— এ কারণে এই চোখগুলো অন্যান্য চোখের তুলনায় বেশি ব্যক্তিসম্পন্ন ও আলোকময়; এভাবে বোঝা যায়। কর্ণ: ‘কৃন্ততে:’ কৃতী ছেদনের মাধ্যমে কর্ণ হয়। ‘নিকৃত্ত’ দ্বারা হয়, কারণ কানের দ্বার কাটা। ‘ঋচ্ছতে:’ অর্থাৎ আগ্রায়ণের মতে, গত্যার্থক ‘ঋচ্ছ’ ধাতু থেকে কর্ণ হয়। এতে ব্রাহ্মগবচনও প্রমাণ— ‘ঋচ্ছন্তীভ খে উদগন্তাম্‌ ইতি হ বিজ্ঞায়তে’। এর অর্থ হলো— আকাশে প্রকাশিত শব্দগুলো এই কানগুলোকে ‘ঋচ্ছন্তি’ প্রাপ্ত হয় এবং এই কানগুলো সেই শব্দগুলোকে গ্রহণ করার জন্য উপরের দিকে যায়। তাই ‘ঋচ্ছ’ ধাতু থেকে কর্ণ শব্দের উৎপত্তি।

মনসামূ প্রজবেষু: মনের গতি বা ‘মনোগম্যেষু অর্থেষু’ মনের গমনযোগ্য অর্থে অসম থাকে। আস্যদঘ্না: অন্য কোনো মুখ পর্যন্ত পানির মতো উপকক্ষদঘ্না: অন্য কোনো কাঁখ পর্যন্ত পানির মতো হৃদয়ের মতো।

মন্ত্রে ‘আদঘ্নাস:’ পদ আছে। এতে ‘আস্যদঘ্ন’ এর ‘স্য’ ‘পৃষোদেরাদিত্বাত্‌’ বা ‘ছান্দসত্বাত্‌’ লোপ হয়েছে। ‘আস्यमস্যতে:’ ‘আস্য’ শব্দ ক্ষেপণার্থক ‘অসু’ থেকে তৈরি হয়। এই মুখে খাদ্য ফেলা হয়— ডালা হয়। ‘আস্যন্দত এতদন্নম্‌ ইতি’ বা কারণ এটি মুখ শুকনো খাদ্যও লালা দিয়ে আর্দ্র করে, তাই আডূপূর্বক ‘স্যন্দূ প্রস্নবণে’ থেকে তৈরি হতে পারে। ‘দঘ্নং দঘ্যতে:’ স্রাবকর্মণ: ‘দঘ্ন’ শব্দ স্রাব্যার্থক ‘দঘ’ ধাতু থেকে তৈরি হয়, কারণ উত্তর পরিমাপের তুলনায় তা কম। ‘দস্যতের বা স্যাদ্‌ বিদস্তরং হয়’ বা উপক্ষয়ের জন্য ‘দসু’ ধাতু থেকে দঘ্ন তৈরি হয়। ‘প্রস্নেয়া হদ ইভ একে প্রস্নেয়া দদৃশিরে স্রানার্হা:’ যেখানে অনেক গভীরভাবে ডুব দিয়ে বা সাঁতার কেটে সাঁতার করা যায়, সেই হৃদয়ের মতো একক ছাত্র গভীর বিদ্যান্বিত মনে হয়। ‘হদো হাদতে:’ শব্দকর্মণ: শব্দার্থক ‘হাদ’ থেকে হৃদ তৈরি হয়। ‘হাদতের বা স্থাত্‌ শীতি ভাবকর্মণ:’ বা শীতার্থক ‘হাদ’ থেকে হৃদ তৈরি হয়।”

এই ব্যাখ্যার ওপর মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে দেখা যায় যে, বেদ অত্যন্ত সাধারণ স্তরের একটি গ্রন্থ হিসেবে ধরা হয়। ব্যাখ্যাকাররা এবং টীকারকাররা মহর্ষি ইয়াস্কের ভাষ্যের রহস্য কিছুই বুঝতে পারেননি এবং তারা বর্তমান প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী শুধুমাত্র অনুবাদ করেছেন। তারা শব্দের বাহ্যিক আকার দেখেছেন, কিন্তু তার আত্মা একটুও বুঝতে পারেননি।

পাঠকরা অন্য নিরুক্তের ব্যাখ্যা এবং বেদভাষ্যও পড়ুন, তবেই তারা এই মন্ত্র থেকে কিছুই পেতে পারবেন না। এই মন্ত্রের ওপর আমাদের আধ্যদৈবিক ব্যাখ্যা পড়তে পারেন এবং আমাদের ব্যাখ্যা থেকে পাঠকরা কণিকাশাস্ত্র (পার্টিকেল ফিজিক্স) এবং সূক্ষ্মবিজ্ঞান সম্পর্কিত কিছু রহস্যের ধারণা পেতে পারেন।

মন্ত্র সংখ্যা ২

“দেবানাং মানে প্রথমা অতিষ্ঠনকুন্তত্রাদেষামুপরা উদায়ন্‌। ত্রয়স্তপন্তি পৃথিভীমনূপা দ্বা বুবুকং বহতঃ পুরীষং॥ [ ঋ.১০.২৭.২৩ ]”

গ্রন্থকার এই মন্ত্রের ভাষ্য এইভাবে করেছেন—

(দেবানাং নির্মাণে প্রথমা অতিষ্ঠনমধ্যমিকা দেবগণাঃ। প্রথম ইতি মুখ্য নাম। প্রতমো ভবতি। কৃতত্রম অন্তরীক্ষং। বিকর্তনং মেঘানাম্। বিকর্তনেন মেঘানাম উদক জায়তে। ত্রয়স্তপন্তি পৃথিভীম নূপাঃ। পর্জন্যো, বায়ুরাদিত্যঃ। শীতোষ্ণ, বর্ষ, রোশধীঃ পাচয়ন্তি। অনূপা অনুবপন্তি লোকান্তস্বেন স্বেন কর্মণা। অয়ম পীতারো নূপ এতসমাদেভ। অনূপ্যত উদকেন। আপি ৱান্বাবিতি স্যাৎ। যথা প্রাগিতি। তস্যানূপ ইতি স্যাৎ। যথা প্রাচীনমতি। দ্বা বুবুকম্। বহতঃ পুরীষং। বায়ুভাদিত্যা উদকম্। বৃবুকম্ ইতি উদকনাম। ব্রভীতের্বা শব্দকর্মণঃ। ভ্রংশতের্বা। পুরীষং পূর্ণাতেঃ। পূরয়তে বা।”)- নিরুক্ত ২।২২

এই ভাষ্যটি ভিন্ন-ভিন্ন পণ্ডিতরা তাদের বুদ্ধি অনুযায়ী ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে আমরা আচার্য বিশ্বেশ্বরের ব্যাখ্যা এখানে উদ্ধৃত করছি:-

এই ভাষ্যের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বিদ্বানরা তাদের বুদ্ধি অনুযায়ী বিভিন্নভাবে করেছেন। এর মধ্যে আমরা আচার্য বিশ্বেশ্বরের ব্যাখ্যা এখানে উদ্ধৃত করছি—

“দেবতাদের নির্মাণে [মেঘ, বায়ু এবং আদিত্য—এই তিন] প্রধান [ধরা হয়]। এর মধ্যে [উপরা:] মেঘ [কৃতত্রাত্‌ থেকে] আন্তরিক্ষ থেকে [অন্যান্যদের মতে ‘কৃতত্রাত্‌’ এর অর্থ করা হয়েছে ‘কর্তনাতু’। কিন্তু এটি ঠিক নয়। কারণ ইয়াস্ক লিখেছেন ‘কৃতত্রম্‌ অন্তরীক্ষম্‌’ এবং কৃতত্র শব্দটিকে স্পষ্টভাবে আকাশ-বাচক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘উদায়ন্‌!’ এটি ‘ইণ গতৌ’ ধাতুর নিজন্ত-গর্ভিত রূপ যা জলকে প্রবাহিত করে। [উদায়ন্‌ উদৃময়ন্তি জলম্‌। এরা] তিনজন [অনূপা:] অনুগ্রহকারী পৃথিবীকে [অর্থাৎ পৃথিবীতে থাকা ঔষধি, খাদ্য ইত্যাদি কে উত্তপ্ত করে অর্থাৎ পাকায়। এবং [বায়ু এবং আদিত্য] এই দুইজন পূরণ বা পূর্ণকারী [বৃবুকম্‌ অর্থাৎ) জলকে [পুনরায় মেঘ বানিয়ে বর্ষণ করার জন্য] আকাশের দিকে নিয়ে যায়।

দেবতাদের নির্মাণে মাধ্যমিক দেবগণ [অর্থাৎ মেঘ, বায়ু এবং আদিত্য] প্রধান হিসেবে গণ্য। প্রথম—এটি প্রধানের সূচক। [কারণ এটি] শ্রেষ্ঠতম। ‘কৃতত্র’—আন্তরীক্ষ [এর নাম], কারণ এটি মেঘকে কেটে ফেলার স্থান। মেঘের খণ্ডিত হওয়ার মাধ্যমে বৃষ্টি হয়। ‘অনুগ্রহকারী তিনটি পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে।’ [তিনটি কে?] মেঘ, বায়ু এবং আদিত্য। [তারা পৃথিবীকে কীভাবে উত্তপ্ত করে?] শীত, উষ্ণ এবং বৃষ্টির মাধ্যমে ঔষধি ও খাদ্যকে পাকায়। ‘অনূপ’ [এই বিশেষণ দেওয়া হয়েছে কারণ এই তিনজন] তাদের-তাদের কর্ম দ্বারা লোককে অনুগৃহীত করে। [লোকের জলতীরবর্তী অঞ্চলকে ‘অনূপ’ বলা হয়।] এটি দ্বিতীয় অনূপ [জল-অঞ্চল]ও এই কারণে অনূপ বলা হয়, কারণ জল দ্বারা অনুগৃহীত বা সিক্ত করা হয়। অথবা ['অনুগতা আপা যত্র' এই অর্থে] ‘অন্বাপ্‌’—এই শব্দটি প্রাকৃতিক অর্থে তৈরি হয়েছে। সেই ‘অন্বাপ্‌’ থেকে অনূপ হয়েছে যেমন ‘প্রাক্‌’ থেকে প্রাচীন। [বায়ু এবং আদিত্য] ‘পুরীষম্‌’ অর্থাৎ পূর্ণ বা সম্পূর্ণকারী জলকে নিয়ে যায়। বায়ু এবং আদিত্য। ‘বৃবুকঃ’এটি জলটির নাম। শব্দার্থক ‘ব্রুজ’ ধাতু থেকে অথবা ‘ভৃংশ’ ধাতু থেকে [উক-প্রত্যয় যোগ করে] তৈরি।

এখানে ব্যাখ্যাকার বৃষ্টি-বিজ্ঞান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত এবং স্থূল আলোচনাই করেছেন। এ বিষয়ে আমাদের ব্যাখ্যা পাঠকরা যথাস্থানে পড়তে পারেন, যেখানে সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়ার সূক্ষ্ম বিজ্ঞান উদঘাটিত হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রের আধ্যভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও করা হয়েছে।

শাসদ্বহীর দুহিতুর্নপ্ত্যং গাদ্বিদ্বাং ঋতস্য দীধিতিং সপর্যং। 

পিতা যত্র দুহিতুঃ সেকমৃজ্জন্ত্সং শাগ্ম্যেন মনসা দধন্বে। [ঋগ্বেদ ৩.৩১.১]”

এর গ্রন্থকার এইভাবে ভাষ্য করেছেন—

প্রশাস্তি বোধা সন্তানকর্মণে দুহিতুঃ পুত্রভাবম্। দুহিতা দুরহিতা। দূরে হিতা। দোগ্ধের্বা। নপ্তারমুপাগমত্। দৌহিত্রং পৌত্রমিতি। দিদ্বান্ প্রজননযজ্ঞস্থ। রেতসো বা। অজ্লদজ্জাত্সম্ভূতস্য হৃদয়াদধিজাতস্য মাতরী প্রত্যৃতস্য। বিধানং পূজয়নূ। অবিশেষেণ মিথুনাঃ পুত্রা দায়াদা ইতি। নিরুক্ত ৩।৪

এই ভাষ্যের ব্যাখ্যা পণ্ডিত ভগবদ্ধত্ত গবেষক এইভাবে করেছেন—

“*অর্থ- (শাসৎ) নির্দেশ করে (ওহি:) বিবাহ করার যোগ্য [বরকে] যিনি দুহিতার [পুত্রভাব]ের জন্য নেন, কারণ সেই থেকে (নপ্ত্যং) দৌহিত্রকে পৌত্র হিসেবে গণ্য করে (গাত্‌) পায়। (বিদ্বান) জানেন (ঋতস্য) প্রজনন নামক যজ্ঞের (দীধিতিম্‌) কর্ম বিধি এবং (সপর্যন্‌) পূজা করে [সম্মান প্রদর্শন করে]। পিতা যেখানে কন্যার (সেকম্‌) [বীর্য সিদ্ধিতে সক্ষম] স্বামী বা জামাতা (ঋজ্জন) পান বা গ্রহণ করেন, [তখন] (সং + শগ্ম্যেন) অত্যন্ত সুখী মনে (সং + দধন্বে) [জামাতার সঙ্গে] মিলিত হন।

“নির্দেশ করে”—কথা বলে, কন্যাকে বরণকারী, সন্তানের উৎপত্তি সংক্রান্ত ক্রিয়ার জন্য, দুহিতার পুত্রভাবের। দুহিতা দুঃহিতা, যার জন্য অত্যন্ত কঠিন হলেও উপকারী। দূরে—দূরে অনুষ্ঠিত উপকারী বিবাহ। দোহন করার মাধ্যমে অথবা। নপ্তা প্রাপ্ত হয়। দৌহিত্রকে পৌত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। জানেন, প্রজনন যজ্ঞ। রেতঃ বীর্য বা স্ফূর্তি। [যে বীর্য] অজ থেকে অজ + প্রতি অজ উৎপন্ন হয়, হৃদয় থেকে জন্মগ্রহণ করে, মাতার গর্ভে পৌঁছে। [এই সব কর্ম] বিধান মেনে পূজা করা হয়। [অতএব] কোনো ভেদাভেদ ছাড়া স্ত্রী-পুরুষ উভয়ই সন্তান। এবং দায়াদও দায় ভাগে অংশগ্রহণ করে।

ভাষ্য—এই ঋকের অর্থ কঠিন। ইয়াস্কও অর্থের ক্ষেত্রে সন্তানকর্ম এবং পুত্রভাবকে উল্লেখ করেছেন। এই ঋকের উত্তরাংশের অর্থ ইয়াস্ক পরবর্তীতে খণ্ড ৫-এর শেষে ব্যাখ্যা করেছেন। ওহি:—ওহি: বোঝায় ‘বোধা’। তাই.ব্রা.১.১.৬.১০-এ ওহি: বা অনড্বান্‌ হিসাবেও ধরা হয়েছে। এটি ওহি: অনড্বান্‌এর কাজ করে। যজুর্বেদ ২২.২২ অনুযায়ী শ্রেষ্ঠ অনড্বান্‌ বোধা গুণযুক্ত। তাই প্রকারণ অনুযায়ী ওহি: অর্থ বোঝায় ‘বোধা’। দুহিতা, অত্যন্ত কঠিনতার মধ্যে উপযুক্ত বর পাওয়ার পরই উপকৃত হয়। দূর গোত্র ইত্যাদিতে বিবাহ হলে সন্তান সুস্থ ও শক্তিশালী হওয়ায় উপকারী হয়। অথবা দুহিতা পিতৃকুলের সম্পদ সবসময় দোহন করে। মন্ত্রের অর্থ নির্ধারিত হয়েছে যে পুত্র এবং দুহিতার দায়াদে কোনো সময়ে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। তাই দত্তক গ্রহণ প্রশস্ত কর্ম নয়।

পণ্ডিতজির এই ব্যাখ্যা আধ্যভৌতিক দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয়েছে। এখন পাঠকরা আমাদের ব্যাখ্যা দেখুন, যেখানে বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের সীমা পেরিয়ে সৃষ্টির বিজ্ঞানের একটি রহস্যের আলোচনা করা হয়েছে।”

মন্ত্র সংখ্যা ৪

“কুহ স্বিদ্যোষা কুহ বস্তোরশ্চিনা কুহাভিপিত্বং করতঃ কুহোষতুঃ। 

কোবার শযুত্রা বিধবেৱ দেবরম্‌ মার্য ন যোষা কৃণুতে সঘধস্থ আ॥ [ঋ০১০।৪০।২]”

এর ব্যাখ্যা গ্রন্থকার এইভাবে করেছেন—

“ক্ব স্বিদ্রাত্রী ভবথঃ। ক্ব দিবা। ক্বাভিপ্রাপ্তিং কুরুথঃ। ক্ব বাসথঃ। কো ৱাং শযনে বিধবেৱ দেবরম্‌। দেবরঃ কসমাতূ। দ্বিতীয়ো বর উচ্যতে। বিধবা বিধাতৃকা ভবতি। বিধবানাদ্ঠা। বিধাবানাদ্বেতি চর্মশিরা। অপি বা ধব ইতি মনুষ্যনাম।তদ্ঠি যোগাদ্বিধবা। দেবরঃ দীব্যতিকর্মা। মার্যঃ মনুষ্যঃ মরণধর্মা। যোষা যৌতেঃ। আকুরুতে সহস্থানে।” নিরুক্ত ৩।১৫

পণ্ডিত চন্দ্রমণি বিদ্যালঙ্কার এর ব্যাখ্যা এভাবে করা হয়েছে;-

“যদি কোনো নারী বা পুরুষ তাদের দেশে থেকে দেশের বাইরে যাই, তবে সেই দেশের শাসক বা কর্মকর্তাদের উচিত, প্রবেশের আগে তাদের নিম্নরূপ প্রশ্ন করা (অশ্বিনা) হে নারী-পুরুষ! (কুহ স্বিত্‌ দোষা) গত রাত্রে আপনি কোথায় ছিলেন? (কুহ বস্তুঃ) গতকাল দিনে কোথায় ছিলেন? (কুহ অভিপিত্বং করতঃ) কোথায় বস্তুাদি সংগ্রহ করেছিলেন? অর্থাৎ কোথায় ভোজন করেছিলেন? (কুহ ঊষতুঃ) আপনার বাসস্থান কোথায়? অর্থাৎ আপনি কোন দেশের বাসিন্দা? (বিধবা দেবরং ইভ, যোষা মর্য না শযুত্রা স্থধস্থে ওং কঃ আকৃণুতে) এবং যেমন কোনো বিধবা স্ত্রী নিযুক্ত স্বামীকে বা অকৃত-যোনি স্ত্রী পূর্ব স্বামীর ছোট ভাইকে (দেবর) বা বিবাহিতা স্ত্রী তার স্বামীকে সমমান স্থানে সন্তানের জন্ম দিতে একত্র হয়, তেমনি আপনার অত্যন্ত প্রিয় ঘনিষ্ঠ বন্ধু কে? যার সঙ্গে মিলিত হয়ে আপনি আপনার ধর্মীয়, সামাজিক বা ব্যবহারিক কর্ম সম্পন্ন করেন।

এধরনের প্রশ্নের বিধান শুক্রনীতি (১।২৬৯) তেও পাওয়া যায়। সেখানে লেখা আছে, রাজা প্রতি দুই গ্রামে একটি পন্থশালা নির্মাণ করান। এবং সেই পন্থশালার প্রধান প্রতিটি পন্থ থেকে এই প্রশ্নগুলো করুন “কোথা থেকে এসেছে? কেন এসেছে? কোথায় যাচ্ছে? তোমার জাতি ও বংশ কী? তোমার বসবাসের স্থান কোথায়?” ইত্যাদি।

এমনভাবে এই মন্ত্রে হীন উপমার মাধ্যমে সঙ্গী এবং প্রিয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে।

শব্দার্থ:

  • শযুত্রা – শযনে, শয়ন-ভাষী 'শযু' থেকে সপ্তমী অর্থে 'ত্রা'।

  • দেবর – দ্বিতীয় বর। অর্থাৎ যে বিবাহিতা স্ত্রী মারা গেছে, সেই নিযুক্ত স্বামীর ছোট ভাইকে দেবর বলা হয়।

  • বিধবা – (ক) বিধাতৃকা-বিধবা, যার স্বামী নেই। (খ) ‘वि’ + ‘অপ্‌’ প্রয়োগে এটি যে চিরকাল অনিশ্চিত ও কম্পমান থাকে তার জন্য বিধবা। (গ) চর্মশির আচার্য অনুযায়ী, ‘ধাও’ ধাতু থেকে বিধবা শব্দের উৎপত্তি, কারণ বিধবা সাধারণত মানসিকভাবে অনিশ্চিত থাকে।

  • মর্য – মানুষ, যার মরণ ধর্ম আছে। ‘মৃ’ ধাতু থেকে ‘ইত’ প্রত্যয়।

  • যোষা – ‘যু’ ধাতু থেকে ‘স’ প্রত্যয়। স্বামীর সঙ্গে যুক্ত থাকে।

এই মন্ত্র থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়, পাঠক তাদের মনে রাখবেন—

১. অশ্বিনৌ অর্থাৎ দম্পতির কাছে প্রশ্ন করে বোঝা যায় যে দেশের মধ্যে বা দেশের বাইরে নারী ও পুরুষকে একত্রে থাকা উচিত, বিচ্ছিন্ন হওয়া উচিত নয়। মানু এরও নির্দেশ দিয়েছেন (৯.১৩)।

২. বিধবা ও বিধুর সম্পর্ক – বিধবা নারীর সঙ্গে বিধুর, অথবা বিধুর সঙ্গে বিধবার সম্পর্ক হওয়া উচিত; কুমার বা কুমারীর নয়।

৩. অকৃত-যোনি নারীর পুনর্বিবাহ–অকৃত-যোনি নারী তার কুমার দেবরের সঙ্গে পুনর্বিবাহ করতে পারে। মানু (৯।৬৯) এ বিষয়ে বলেছেন “তামনেন বিধানে নিযো বিন্দেত দেবরঃ”।

শ্রেষ্ঠ উপমা সংস্কৃত সাহিত্যে অনেক বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু যেখানে ছোট থেকে বড়কে উপমা দেওয়া হয়, সেই হীন উপমা সংস্কৃত সাহিত্যে কম ব্যবহৃত হয়। তবে এটি বেদের ক্ষেত্রে প্রচলিত।

যখন মানুষ বেদের অধ্যয়ন শুরু করে, তখন লোকিক আচরণ ও সংস্কৃত সাহিত্য থেকে প্রভাবিত হয়ে এই হীন উপমা তাকে একটু অস্বস্তি দেয়। কারণ সে সবসময় উচ্চমানের উপমা শুনে বড় হয়েছে। কিন্তু উপমার উদ্দেশ্য হলো কোনো বিষয়ের গুণকে অন্য পরিচিত বিষয়ের গুণ দ্বারা স্পষ্টভাবে বোঝানো। এবং স্পষ্টতা যেখান থেকে সম্ভব, তা প্রয়োগ করা যায়, হীন বা শ্রেষ্ঠ উপমা হোক।

এ কারণে এই ভেদটি মাথায় রেখে বেদের স্বাধ্যায় করা উচিত।

পাঠক নিজেই আধিদেবিক এবং আধিভৌতিক উভয় ধরনের ভাষ্য পড়ে তুলনা করতে পারেন।

35

প্রথম খণ্ড

সমাম্নায়ঃ সমাম্নাতঃ। স ব্যাখ্যাতব্যঃ। তমিমং সমাম্নায়ং নিঘণ্টব ইত্যাচক্ষতে। নিঘণ্টবঃ কস্মাৎ। নিগমা ইমে ভবন্তি। ছন্দোখ্যং সমাম্নৃত্য সমাম্নৃত্য সমাম্নাতাঃ।
তে নিগন্তব এব সন্তো নিগমনাধিঘণ্টব উচ্যন্ত ইত্যৌপমনবঃ। অপি বাহুননাদেব স্যুঃ। সমাহিতা ভবন্তি। যথা সমাম্নৃতা ভবন্তি।

(সমাম্নায়ঃ) যেসব বৈদিক পদের আর্ষ পরম্পরায় যথাযথ নিয়ম ও মর্যাদার সঙ্গে বিচার ও সংগ্রহ করা হয়ে এসেছে, সেই পদগুলিরই এই গ্রন্থে সংগ্রহ করা হয়েছে। পণ্ডিত ভগবদত্ত রিসার্চ স্কলার এখানে ‘সমাম্নায়’ শব্দ দ্বারা প্রজাপতি কশ্যপের মূল ‘নিঘণ্টবঃ’ শাস্ত্রসংগ্রহকেই গ্রহণ করেছেন। বেদ বুঝবার জন্য ঋষিগণ সময়ে সময়ে নানা প্রকারে বৈদিক পদের সংগ্রহ করেছিলেন। মহর্ষি যাস্কের এই সমাম্নায় অর্থাৎ পদসংগ্রহ বেদ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমাম্নায় অর্থাৎ পদের সংগ্রহের ব্যাখ্যা এই গ্রন্থে (নিরুক্তে) স্বয়ং মহর্ষি যাস্কই করেছেন। এই পদগুলির ব্যাখ্যা ছাড়া কেবল সংগ্রহমাত্র দ্বারা বেদার্থের প্রসিদ্ধি হতে পারে না, এই কারণেই গ্রন্থকার এই সমাম্নায়ের ব্যাখ্যানকে আবশ্যক বলে মনে করেন। সেই সমাম্নায় অর্থাৎ পদের সমষ্টিকেই ‘নিঘণ্টবঃ’ বলা হয়েছে। এখানে ‘নিঘণ্টু’ শব্দটি বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিষয়ে পণ্ডিত ভগবদত্ত রিসার্চ স্কলারের মত এই যে অতিপ্রাচীন কালে ‘নিঘণ্টু’ পদ বহুবচনান্তরূপেই ব্যবহৃত হতো। এই বিষয়ে আমাদের মত এটিও যে, পণ্ডিতজীর বক্তব্য সত্য হলেও, এটিও সম্পূর্ণ সম্ভাব্য যে সকল নিঘণ্টুকার পূর্ববর্তী বিভিন্ন নিঘণ্টুকারদের সমাম্নায় থেকেও নানা পদ সংগ্রহ করে থাকবেন। এই কারণেই যেসব পদ যাস্কীয় নিঘণ্টুতে উপলব্ধ, সেগুলি পূর্ববর্তী সকল নিঘণ্টুতেই উপলব্ধ থাকবে এটি আবশ্যক নয়; সকলের মধ্যেই বহু প্রকার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

বৈদিক পদের সংগ্রহকে ‘নিঘণ্টু’ কেন বলা হয়? এই বিষয়ে স্পষ্ট করতে গিয়ে গ্রন্থকার লিখেছেন যে, এই পদগুলি নিগমরূপ হয়। এর অর্থ এই যে, এই পদগুলি নিশ্চিতরূপে নিজের বাচ্যরূপ পদের প্রকৃত অর্থ বোধ করাতে সক্ষম হয়। যখন এই পদগুলির দ্বারা সেই পদার্থগুলির নিশ্চিতার্থক বোধ হয়ে যায়, তখন এর দ্বারা বৈদিক মন্ত্রগুলির প্রকৃত ও ছন্দরশ্মির …বৈদিক পদের সংগ্রহকে ‘নিঘণ্টু’ কেন বলা হয়? এটিকে স্পষ্ট করতে গিয়ে গ্রন্থকার লিখেছেন যে, এই পদগুলি নিগমরূপ হয়। এর অর্থ এই যে, এই পদগুলি নিশ্চিতভাবে নিজেদের বাচ্যরূপ পদার্থের যথার্থ বোধ করাতে সক্ষম হয়। যখন এই পদগুলির দ্বারা সেই পদার্থগুলির নিশ্চিতাত্মক বোধ হয়ে যায়, তখন এর দ্বারা বৈদিক মন্ত্রগুলির যথার্থ অর্থ এবং ছন্দরশ্মির স্বরূপের বোধ হয়ে সৃষ্টিরও বোধ হতে শুরু করে। এই কারণেই বৈদিক পদসমষ্টিকে ‘নিঘণ্টু’ বলা হয়।

এই বৈদিক পদগুলি গ্রন্থকার কোথা থেকে গ্রহণ করেছেন? এর উত্তর দিতে গিয়ে গ্রন্থকার স্বয়ং বলেন যে, এই পদগুলি বিভিন্ন বেদমন্ত্র থেকে বেছে বেছে একত্র করে সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে মহর্ষি উপমনুর পুত্র ঔপমনব্যের মত প্রদর্শন করতে গিয়ে মহর্ষি যাস্ক লিখেছেন যে, এই বৈদিক পদগুলি নিগমরূপ হয়ে মন্ত্রগুলির অর্থ এবং তাদের সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার উপর পড়া প্রভাবগুলির বোধ করায়; এই কারণেই এগুলি নিগন্তুরূপ হয়। এখানে ‘নিগন্তু’ শব্দের অর্থ হল—মন্ত্রসমূহ এবং তাদের বিভিন্ন পদার্থের উপর পড়া প্রভাবগুলির নিশ্চিতাত্মক জ্ঞান করিয়ে দেয় যে। এই ‘নিগন্তু’ শব্দকেই ‘নিঘণ্টু’ বলা হয়েছে।

মুদ্রিত ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’ নামক গ্রন্থ, যা ঐতরেয় ব্রাহ্মণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, তাতে আশীর্বচন লিখতে গিয়ে আর্যজগতের এক বরিষ্ঠ বৈদিক বিদ্বান আচার্য সত্যানন্দ বেদবাগীশ মহর্ষি যাস্কের নিরুক্তবচন ও মহর্ষি পাণিনির কিছু প্রয়োগের উপর প্রশ্ন তুলেছেন; সেগুলির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণভাবে অসম্মত। তিনি ‘নিঘণ্টু’ শব্দের নিরুক্তের উপর প্রশ্ন উত্থাপন করতে গিয়ে লিখেছেন “ভাষার্থক সকর্মক ‘ঘটি’ (চুরা ২২৩) ধাতু থেকে ঔণাদিক ‘উ’ প্রত্যয় করার দ্বারা এবং ‘ঘণ শব্দে’ (কাশি. ব্রা. ধা. ত্বা. ২০৬) থেকে ঔণাদিক ‘তু’ প্রত্যয় করার দ্বারা ‘নিঘণ্টু’ শব্দ সিদ্ধ হয়। এমন অবস্থায় মহর্ষি ঔপমনব্যের দ্বারা ‘নিগন্তু’কে ‘নিঘণ্টু’ বানানোর কী প্রয়োজন পড়ল? আর এই অনাবশ্যক নিরুক্তকে মহর্ষি যাস্ক কেন প্রমাণভূত বলে মেনে নিলেন?”

এখানে এই বিদ্বান উভয় ঋষির নিরুক্ত প্রক্রিয়াকে দোষপূর্ণ বলে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। এই বিষয়ে আমাদের মত এই যে, যদিও উপর্যুক্ত ‘ঘটি’ ও ‘ঘণ’ এই দুই ধাতু থেকেই ‘নিঘণ্টু’ পদ সিদ্ধ হতে পারে এবং এই ‘নিঘণ্টু’ পদ থেকে এটিও সিদ্ধ হতে পারে যে নিঘণ্টুতে সংগৃহীত বিভিন্ন বৈদিক পদ বেদমন্ত্রের স্বরূপ, প্রভাব এবং অর্থকে স্পষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টির পদার্থগুলিকেও প্রকাশিত করে। পণ্ডিত যুধিষ্ঠির মীমাংসক ‘সংস্কৃত-ধাতু-কোষ’-এ ‘ঘটি’ ধাতুর অর্থ বলার সঙ্গে ‘চমকানো’ এবং ‘প্রকাশিত করা’ অর্থও উল্লেখ করেছেন। এই কারণে বৈদিক পদের প্রভাব থেকে সৃষ্টিতে দীপ্তিও উৎপন্ন হয়।

কি মহর্ষি যাস্ক অথবা মহর্ষি ঔপমনব্যের কাছে বৈদিক পদের এত অর্থ ও প্রভাব পর্যাপ্ত প্রতীত হয়নি যে তাঁরা এই ধাতুগুলি থেকে নিষ্পন্ন নিঘণ্টু পদে সন্তুষ্ট হননি? তাঁদের কাছে ‘নিগন্তু’ পদ কেন অধিক উপযোগী মনে হল? এর উত্তরে আমাদের মত এই যে, পূর্বোক্ত নিগম পদের সঙ্গে নিগন্তু পদের সমানতা আছে। উভয় ক্ষেত্রেই একই ধাতু এবং উপসর্গের প্রয়োগ হয়েছে। নিগন্তু পদে ‘গম্’ ধাতুর প্রয়োগ আছে, যা জ্ঞান, গমন ও প্রাপ্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা নিগন্তু পদের অর্থ হয় নিশ্চিতভাবে বেদমন্ত্রসমূহ এবং সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার উপর তাদের প্রভাবসমূহের জ্ঞান করিয়ে দেয়, সদা গতি অর্থাৎ কল্পনা করায় এবং সৃষ্টির পদার্থগুলিতে ব্যাপ্ত হয়ে থাকে।

আপ্টে কোষকার ‘গম্’ ধাতুর অর্থ ‘সহবাস করা’ বলেও লিখেছেন। এর দ্বারা এটিও সংকেত মেলে যে বৈদিক পদ পরস্পর মিথুন হওয়ার প্রবৃত্তির সঙ্গেও যুক্ত। এইভাবে নিগন্তু পদ এই কথার বোধক যে বৈদিক পদ, যা বৈদিক ছন্দ-রশ্মির অবয়বস্বরূপ, সৃষ্টির পদার্থসমূহের জ্ঞান করায়, তাদের মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে, সদা কল্পনা করতে করতে নানাবিধ সূক্ষ্ম কণিকা ও তরঙ্গের কল্পনা করে এবং সৃষ্টিতে সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়াকে উৎপন্ন ও সঞ্চালিত করে।

এই কারণেই এই দুই ঋষি নিগন্তু পদ থেকে নিঘণ্টু হওয়াকে স্বীকার করেছেন। এখানে সেই বরিষ্ঠ বিদ্বান এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যে, যখন নিগন্তু পদ এত সারগর্ভিত, তখন মহর্ষি যাস্ক অথবা ঔপমনব্য ঋষি নিগন্তু পদেই কেন স্থির থাকলেন না? তাকে নিঘণ্টু বানানোর প্রয়োজন কেন পড়ল? এর উত্তরে আমাদের মত এই যে, নিঘণ্টুতে সংগৃহীত পদ নিগন্তু পদ দ্বারা নির্দেশিত প্রভাবগুলির সঙ্গে সঙ্গে দীপ্তি উৎপন্নকারীও হয়। এই কারণে ‘ঘটি’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন নিঘণ্টু পদের প্রভাবও দৃষ্টিগোচর হয়, যা নিগন্তু দ্বারা প্রকাশিত হয় না। যদিও সেখানে জ্ঞান করানো প্রভাব সিদ্ধ হয়, কিন্তু দীপ্তির প্রভাব স্পষ্ট হয় না। এই কারণেই তাঁরা নিগন্তু পদ থেকে নিঘণ্টু পদের কল্পনা করেছেন।

এখানে কেউ দুরাগ্রহবশত এই প্রশ্নও করতে পারে যে, যেমন ‘নিগন্তু’ থেকে ‘নিঘণ্টু’-র কল্পনা করা হয়েছে, তেমনি কেন ‘নিঘণ্টু’ থেকে ‘নিগন্তু’ পদের কল্পনা করা যাবে না? এর উত্তরে আমাদের মত হলো ‘নিগন্তু’ থেকে যে প্রভাবের কথা বলা হয়, তা সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় সূক্ষ্ম ও কারণরূপ হয়ে থাকে; কিন্তু ‘নিঘণ্টু’ থেকে যে প্রভাব বলা হয়, অর্থাৎ দীপ্তির উৎপত্তি, তা কার্যরূপ হয়ে থাকে। এই কারণেই কারণরূপ প্রভাব থেকে কার্যরূপ প্রভাবের সিদ্ধি প্রদর্শনের জন্যই ‘নিগন্তু’ থেকে ‘নিঘণ্টু’-র কল্পনা করা হয়েছে। ‘নিঘণ্টু’ থেকে ‘নিগন্তু’-র কল্পনা সম্পূর্ণ অসঙ্গত। ঋষিদের দৃষ্টির এটি এক উৎকৃষ্ট বিস্ময় যে তাঁরা পদের সংগ্রহের নামের মধ্যেও অদ্ভুত বিজ্ঞান সংযোজিত করে দিয়েছেন।

এখানে গ্রন্থকার আবার ‘হন্’ ধাতু থেকেও ‘নিঘণ্টু’ শব্দের নিরুক্তের কথা বলেছেন। ‘হন্’ ধাতু হিংসা ও গতি অর্থে ব্যবহৃত হয়। পূর্বে আমরা ‘নিগন্তু’ পদ নিয়ে আলোচনা করেছি—সেখানে ‘নি’ উপসর্গযুক্ত ‘গম্’ ধাতুর যে অর্থ ও প্রভাব, সেই অর্থ ও প্রভাবই ‘সম্’ উপসর্গযুক্ত গতার্থক ‘হন্’ ধাতুর ক্ষেত্রেও মানা উচিত। ‘আ’ উপসর্গের দ্বারা এই প্রভাব মর্যাদাপূর্ণ হলেও প্রচুর মাত্রায় গ্রহণযোগ্য হয়। এইভাবে গতার্থক ‘হন্’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন ‘নিঘণ্টু’ পদ দ্বারা সমস্ত প্রভাব ও কার্য যথাযথভাবে সিদ্ধ হয়, যা ‘নিগন্তু’ থেকে নিষ্পন্ন ‘নিঘণ্টু’ পদের দ্বারাও সম্পন্ন হয়।

এখানে ‘হন্’ ধাতুর হিংসা অর্থ অতিরিক্ত প্রভাব নির্দেশকারী হয়। হিংসার্থক ‘আ’ উপসর্গযুক্ত ‘হন্’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন ‘নিঘণ্টু’ পদের এই প্রভাবও হয় যে, সেই পদগুলি বিভিন্ন মন্ত্র—অর্থাৎ ছন্দ-রশ্মির অবয়ব রূপে অবস্থান করেও—অন্য রশ্মি এবং উৎপন্ন বিভিন্ন কণিকা ও তরঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়ার উৎপত্তিতে সহায়ক হয়। এইভাবে ‘হন্’ ধাতু থেকে ‘আ’ উপসর্গসহ নিষ্পন্ন ‘নিঘণ্টু’ পদ বহুবিধ ব্যাপক প্রভাব প্রকাশে সক্ষম হয়।

এখানে ‘আ’ উপসর্গযুক্ত ‘হন্’ ধাতু থেকে ‘আহন্তু’ পদ নিষ্পন্ন হয়েছে; হকারের স্থানে ঘকার, ত-এর স্থানে ঠ এবং ন-এর স্থানে ণ হয়ে ‘নিঘণ্টু’ পদ নিষ্পন্ন হয়েছে। এখানে গ্রন্থকার ‘সমাহিতা ভবন্তি’ বলে এই নির্দেশ করেছেন যে, এই পদগুলিতে ‘সম্’ উপসর্গের প্রভাবও প্রকাশিত হয়, যার ফলে উপরিউক্ত সমস্ত প্রভাব যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়। এই কারণেই এই পদগুলিকে ‘নিঘণ্টু’ বলা হয়।

এবার শেষ বিকল্পটি দেখিয়ে গ্রন্থকার বলেন যে, ‘সম্’ এবং ‘আ’ উপসর্গযুক্ত ‘ন্’ ধাতু থেকেও ‘নিঘণ্টু’ পদ সিদ্ধ হতে পারে। এখানে প্রথমে ‘সমাহতু’ পদ নিষ্পন্ন হয়ে পরে উভয় উপসর্গকে অবিদ্যমান ধরে হকারের স্থানে ঘকার, রেফের স্থানে ‘ণ্’ এবং ‘ত্’-এর স্থানে ‘ঠ’ করে ‘নিঘণ্টু’ পদ গঠিত হয়। এখানে ‘সম্’ ও ‘আ’ উভয়ের স্থানে ‘নি’ উপসর্গ এসে গেছে। এদের অর্থ ও প্রভাব ‘সমাহ’-এর সমান এ কথা আমরা আগেই দেখিয়েছি।

এখানে ‘ন্’ ধাতু থেকে ‘নিঘণ্টু’ পদ নিষ্পন্ন হওয়ায় বৈদিক ‘ন্’ ধাতুর নানা অর্থ যেমন ধ্বংস করা, অপহরণ করা, বিনাশ করা, আকর্ষণ করা, অধীন অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত করা, গ্রহণ করা, প্রাপ্ত করা ইত্যাদির প্রভাব প্রকাশ পায়। এইভাবে নিষ্পন্ন ‘নিঘণ্টু’ পদ পূর্বোক্ত বিভিন্ন প্রকার নিরুক্তের সকল প্রভাবকে নিজের মধ্যে সমাহিত করে রাখে। এই ব্রহ্মাণ্ডে নানাবিধ ক্রিয়ার পশ্চাতে এই বিশেষ বৈদিক পদের প্রভাবই কার্যকর থাকে।

বিভিন্ন বৈদিক পদ একত্রে বৈদিক মন্ত্ররূপী ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তি ঘটায়, এবং প্রত্যেকটি পদ নিজেই এক একটি ছন্দস্বরূপ; আর এই বিভিন্ন ছন্দ-রশ্মি থেকেই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ হয়েছে। পাঠকদের বৈদিক ছন্দ-রশ্মি-বিজ্ঞানের আরও বিশদ জ্ঞানের জন্য মুদ্রিত ‘বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞান’ অথবা প্রখ্যাত বিশাল আর্য রচিত ‘পরিচয় বৈদিক ভৌতিকী’ নামক গ্রন্থ পাঠ করা উচিত। এইভাবে গ্রন্থকার ‘নিঘণ্টু’ পদের তিন প্রকার নিরুক্ত প্রদর্শন করে নিজের নিরুক্ত-শৈলীর গভীর বৈজ্ঞানিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বৈদিক পদগুলির কী কীভাবে পৃথক পৃথক নিরুক্ত সম্ভব তা এখানে সুন্দরভাবে দেখা ও বোঝা যায়। বৈদিক পদরূপী সূক্ষ্ম ছন্দ-রশ্মিগুলি এই ব্রহ্মাণ্ডে সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে কী কী প্রভাব প্রকাশ করে, এবং সেই প্রভাবের ফলে কীভাবে মূল পদার্থ প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে স্পন্দনরূপী পদ ও শক্তির উৎপত্তি হয়ে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও পরিচালনা ঘটে এর দিশা বৈজ্ঞানিক মনস্ক পাঠকদের কাছে ‘নিঘণ্টু’ পদের নিরুক্ত থেকেই সহজে স্পষ্ট হতে পারে। এর সঙ্গে সঙ্গে এই শাস্ত্রের মহত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিকতার ধারণাও স্বতঃসিদ্ধভাবে গড়ে ওঠে।

তদ্যান্যেতানি চত্বরি পদজাতানি নামাখ্যাতে চোপসর্গনিপাতা শ্র তানি মানতি ভবন্তি। তত্রৈতন্নামাখ্যাতয়োর্লক্ষণং প্রদিশন্তি। ভাবপ্রধানমাখ্যাতম্। সত্ত্বপ্রধানানি নামানি।

তারা পূর্বে উল্লিখিত নিঘণ্টু সঙ্ক পদ কোন দুই ধরনের? এটি প্রদর্শন করে মহর্ষি লিখেছেন যে, এই পদগুলো নাম, আখ্যাত, উপসর্গ এবং নিপাত এই চার ধরনের হয়।

নিঘণ্টু= নাম, আখ্যাত, উপসর্গ, নিপাত

তাদের মধ্যে ‘নাম’ এবং ‘আখ্যাত’ এই দুই ধরনের পদগুলোর বৈশিষ্ট্য এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। যেসব পদ ভাবপ্রধান হয়, সেগুলোকে ‘আখ্যাত’ বলা হয়। অর্থাৎ, যেসব পদ কোনো ঘটনা বা ক্রিয়াকে নির্দেশ করে, সেগুলো ‘আখ্যাত’ পদ হিসেবে পরিচিত। এই পদগুলো যে কোনো মন্ত্রের ছন্দ রশ্মির অংশ হয়, তারা সেই ছন্দ রশ্মিগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করার মূল উদ্দেশ্য বহন করে।

উদাহরণস্বরূপ, ‘প্রচোদয়াত্’ এই আখ্যাত সংজ্ঞক পদ বিভিন্ন কণা ও তরঙ্গকে তাদের নিজস্ব কার্য সম্পাদনে প্রেরণা প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে, প্রেরণা দেওয়ার জন্য কোনো বিশেষ পদার্থ থাকে, আর এই আখ্যাত পদ শুধুমাত্র নির্দেশ করে যে সেই পদার্থ কোন কাজটি করছে। সেই পদার্থ ছাড়া আখ্যাত পদ কিছু করতে সক্ষম নয়; অর্থাৎ কোনো ঘটনা ঘটতে পারে না। এই আখ্যাত পদ আরও নির্দেশ করে যে কোনো ঘটনা কখন ঘটেছে, ভবিষ্যতে ঘটবে, অথবা এই সময়ে ঘটছে।

একই সঙ্গে এই পদ দেখায় যে, এই ক্রিয়া সম্পাদনকারী পদার্থ একক কি বহুসংখ্যক। ক্রিয়াটি সম্পাদনকারী পদার্থগুলোকে ‘নাম’ বলা হয়। নামের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে গ্রন্থকার লিখেছেন যে, যেখানে সত্ত্বের প্রধানত্ব থাকে, সেটিকেই ‘নাম’ বলা হয়।

নাম পদ সম্পর্কিত নিৰুক্তের ভাষ্যকার স্কন্দস্বামী বলেছেন “সত্ত্বং দ্রব্যং লিঙ্গসংখ্যাযুক্তং বস্তু”। এর অর্থ, লিঙ্গ এবং সংখ্যার (একবচন/বহুবচন) ভিত্তি যে পদার্থের ওপর নির্ভর করে, সেটিকে ‘সত্ত্ব’ বা পদার্থ বলা হয়। কোনোও পদার্থ নামরূপেই থাকে বা নামের বিষয়বস্তু হয়, এবং সেই পদার্থেই ক্রিয়া নির্ভর করে।

‘সত্ত্ব’ শব্দ থেকে উদ্ভূত ‘সত্ত্বানঃ’ পদার্থের অর্থ ব্যাখ্যা করে ঋষি দয়ানন্দে যজুর্বেদ ভাষ্যে ১৬।১৮-এ ‘সত্ত্বগুণবলোপেতাঃ’ এবং ঋগ্বেদ ১।৬৪।২-এ ‘বলপরাক্রম-প্রাণিভূতগণাঃ’ উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ‘সত্ত্বা’-এর অর্থ ঋগ্বেদ ৪।১৩।২-এ ‘গন্তা’ এবং ঋগ্বেদ ৬।১৮।২-এ ‘বলবান’ হিসেবে করা হয়েছে।

এতে স্পষ্ট হয় যে, ‘নাম’ সেই পদগুলোর সংজ্ঞা, যা ক্রিয়া, বল, পরাক্রম, আলো এবং গতি ইত্যাদির আশ্রয়। ফলে এটি বোঝা যায় যে, বিভিন্ন ছন্দ রশ্মিতে উপস্থিত নাম সংজ্ঞক পদই প্রকৃতপক্ষে সেই ছন্দ রশ্মিগুলোর শক্তি, গতি, আলো ইত্যাদির মূল কারণ।

মহর্ষি ঐতরেয় মাহীদাসও ঐতরেয় আরণ্যকে লিখেছেন “নামানি দামানি” (ঐ.আ.২.১.৬)। ‘দাম’ শব্দের অর্থ ঋষি দয়ানন্দে ব্যাখ্যা করেছেন ‘দমনসাধনम्’ (ঋ.১.১৬২.৮)। এটি আরও নির্দেশ করে যে কারণেই নাম সংজ্ঞক পদই ছন্দ রশ্মিতে উপস্থিত অন্যান্য সব পদকে নিয়ন্ত্রণ করে সম্পূর্ণ রশ্মিকে প্রভাবশালী করে সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে সম্পাদন করার মূল উদ্দেশ্য বহন করে। এখানে পাঠক ‘দ্রব্য’ শব্দটিকে সম্পূর্ণভাবে বৈশেষিক দর্শনের দ্রব্য হিসেবে ভাববেন না, কারণ বৈশেষিক দর্শনে ব্যবহৃত ‘গুণবাচী’ শব্দও মূলত নাম সংজ্ঞক পদই।

যেখানে নাম এবং আখ্যাত উভয়ই উপস্থিত থাকে, সেখানে কোনটির প্রধানতা থাকে? এর উত্তর হিসেবে বলা হয়েছে যে, সেই সময়ে ভাব বা ক্রিয়ার প্রধানতা থাকে।

উদাহরণস্বরূপ “ইন্দ্রো বিশ্বস্য রাজতি...” (যজুর্বেদ ৩৬।৮) এই বাক্যে ‘ইন্দ্রঃ’ এবং ‘বিশ্বস্য’ উভয়ই নাম সংজ্ঞক পদ, এবং ‘রাজতি’ আখ্যাত সংজ্ঞক পদ। এখানে ইন্দ্র তত্ত্বের দ্বারা সকলকে প্রকাশিত হওয়ার আলোচনা করা হয়েছে। বাক্যের মূল অর্থ হলো প্রকাশ করা, যা এখানে ইন্দ্র তত্ত্ব দ্বারা সম্পন্ন হচ্ছে।

এই মন্ত্রাংশ রূপী ছন্দ রশ্মির প্রভাবের মাধ্যমে সৃষ্টি জগতে বিদ্যুতের মাধ্যমে বিভিন্ন পদার্থ প্রকাশিত হয়। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, এই ছন্দ রশ্মির ফল বা কার্য হলো ‘প্রকাশ হওয়া’। এজন্য এই বাক্যে ক্রিয়া বা প্রকাশকর্মের প্রধানতা রয়েছে, আর ইন্দ্র সেই প্রকাশের কারণ হিসেবে गौণ হয়ে যায়।

এবার আখ্যাত পদকে সংজ্ঞায়িত করে বলা হয়েছে যে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে ঘটনা ঘটছে, তা আখ্যাত দ্বারা বলা হয়। অর্থাৎ, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী ঘটছে, তা নির্দেশ করে যে পদটি আখ্যাত। উদাহরণস্বরূপ, ‘ব্রজতি’ এবং ‘পচতি’ এই দুই আখ্যাত সংজ্ঞক পদ, যথাক্রমে যাওয়া এবং রান্নার ঘটনার বা ক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পাদন নির্দেশ করছে।

‘উপক্রম’ অর্থ ব্যাখ্যা করতে আচার্য ভগীরথ শাস্ত্রী তার হিন্দি টীকা-তে লিখেছেন  “আরম্ভস্তস্মাদারভ্যাপবর্গপর্যন্ত যাওদন্ত্যা ক্রিয়েত্যর্থঃ”। এর অর্থ, ক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেসব বিভিন্ন অন্যান্য ক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হয়, সেগুলো মিলিত হয়ে সেই প্রধান ক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করে। 

যখন কোনো ক্রিয়ার সম্পাদনে সহায়ক বহু ক্ষুদ্র ক্রিয়া মিলিত হয়ে একটি প্রধান ক্রিয়ার কারণ হয়ে ওঠে, তখন সেই সমস্ত ক্ষুদ্র ক্রিয়াকে পৃথকভাবে আখ্যাত হিসেবে গ্রহণ না করে, কেবলমাত্র সেই প্রধান ক্রিয়াটিকেই আখ্যাত রূপে গ্রহণ করা হয়।

উদাহরণস্বরূপ, ‘গমন’ ক্রিয়ার ক্ষেত্রে বহু ছোট ছোট ক্রিয়া যুক্ত থাকে—যেমন জুতো পরা, ঘোড়া বা অন্য কোনো বাহন গ্রহণ করা অথবা পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পা ওঠানো-নামানো, পথে খাদ্য গ্রহণ করা, আর যদি কোনো মোটরযানের মাধ্যমে যাওয়া হয়, তবে সেই যান গ্রহণ করা, তা চালানোর জন্য নানা ধরনের ক্রিয়া করা, তাতে জ্বালানি ভরা ইত্যাদি। এই সমস্ত ক্ষুদ্র ক্রিয়াই ‘ব্রজতি’ এই প্রধান গমন ক্রিয়ার অঙ্গ, এবং সেগুলো তার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে ‘পচতি’ (রান্না করে) ক্রিয়ার ক্ষেত্রেও তার অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্রিয়াগুলোকে সেই মূল ক্রিয়ার মধ্যেই সমাহিত বলে বুঝতে হবে।

যখন কোনো ভাব বা ক্রিয়া মূর্ত রূপ ধারণ করে এবং সত্ত্ব বা দ্রব্যের মতো ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন সেটি সত্ত্ব বা দ্রব্যবাচক নামরূপে পরিগণিত হয়। যেমন— ‘ব্রজ্যা’ এবং ‘পক্তিঃ’ শব্দদ্বয়ের অর্থ যথাক্রমে গমন ও পচন। এই শব্দগুলোর সাথেও লিঙ্গ ও বচনের ব্যবহার ঠিক সেইভাবেই হয়, যেমন নামরূপ পদগুলোর সঙ্গে হয়ে থাকে। এই ধরনের পদ যখন কোনো মন্ত্ররূপ ছন্দ রশ্মির অংশ হয়, তখন সেগুলো সংশ্লিষ্ট ক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করে, অথবা এদের প্রভাব আখ্যাত পদগুলোর প্রভাবের সমানই হয়—যা পূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

“অদঃ ইতি সত্ত্বানামুপদেশঃ। গৌরশ্বঃ পুরুষো হস্তীতি। ভবতীতি ভাবস্য। আস্তে শেতে ব্রজতি তিষ্ঠতীতি। ইন্দ্রিয়নিত্যং বচনমৌদুম্বারায়ণঃ ॥ ১ ॥”

বিভিন্ন সত্ত্ব বা দ্রব্যের নির্দেশ ‘অদঃ’ এই সর্বনাম দ্বারাও করা হয়। আমাদের মতে, এখানে ‘অদঃ’ শব্দের দ্বারা সব ধরনের সর্বনামবাচক পদের গ্রহণ করা উচিত, কারণ এই সকল পদের অনুসরণেই লিঙ্গ ও বচন নির্ধারিত হয়। এই পদগুলো সব প্রকারের পদার্থের বাচক হয়, অথচ নামবাচক শব্দগুলো নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ পদার্থের বাচক।

যেমন— ‘গৌঃ’ (গরু), ‘অশ্বঃ’ (ঘোড়া), ‘পুরুষঃ’ (মানুষ) এবং ‘হস্তী’ (হাতি)—এই চারটি নামবাচক পদ যথাক্রমে নির্দিষ্ট চারটি পদার্থ এবং তাদের যোগার্থ দ্বারা গৃহীত কিছু বিশেষ পদার্থের বাচক। কিন্তু এদের মধ্যে কোনো একটি পদ বা সবগুলো মিলেও পদার্থমাত্রের বাচক হতে পারে না। অপরদিকে, যে কোনো সর্বনাম পদ দ্বারা গরু, ঘোড়া, হাতি, মানুষ, অগ্নি, বায়ু, পৃথিবী ইত্যাদি যে কোনো কিছুকেই নির্দেশ করা যেতে পারে।

একইভাবে ‘ভবতি’ পদটি ভাব বা ক্রিয়ার সাধারণ নির্দেশ করে। অর্থাৎ ‘ভবতি’ হয় বা ঘটেএর দ্বারা যে কোনো ক্রিয়ার উপদেশ হতে পারে। কিন্তু ‘আস্তে’, ‘শেতে’, ‘ব্রজতি’ ও ‘তিষ্ঠতি’ এই পদগুলো যথাক্রমে বসে, শোয়, যায় এবং দাঁড়িয়ে থাকে এই চারটি নির্দিষ্ট ক্রিয়াকেই নির্দেশ করে।

সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গে এই আলোচনার দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, সর্বনামবাচক পদসমূহের সঙ্গে সম্পর্কিত সংজ্ঞা শব্দগুলো তাদের নিজ নিজ বাচ্য পদার্থকে সমৃদ্ধ করে। অপরদিকে, কোনো নামবাচক পদ কেবলমাত্র তার নির্দিষ্ট বাচ্য পদার্থকেই সমৃদ্ধ করে। যেমন, কোনো ঋচায় ‘ইন্দ্র’ শব্দটি কেবল ইন্দ্র অর্থাৎ তীক্ষ্ণ বিদ্যুৎকেই সমৃদ্ধ করে; আর ‘অগ্নি’ শব্দটি কেবল অগ্নি অর্থাৎ তাপ, আলো ও বিদ্যুৎকেই সমৃদ্ধ করে। একইভাবে ক্রিয়াবাচক পদগুলোর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য পাঠক নিজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

এখানে গ্রন্থকার মহর্ষি উদুম্বরের পৌত্র অথবা তাঁর অনুসারী ঔদুম্বরায়ণের মত উপস্থাপন করে বলেন যে, ‘বচন’ অর্থাৎ শব্দ অর্থাৎ নাম, আখ্যাত, নিপাত ও উপসর্গ এই সব পদই ইন্দ্রিয়-নিত্য। অর্থাৎ এগুলো ইন্দ্রিয়ে স্থিত থাকে বা ইন্দ্রিয়ের মধ্যেই নিরন্তর উদ্ভূত হতে থাকে। এখানে ‘ইন্দ্রিয়-নিত্য’ পদের বিষয়ে কোনো বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এই বিষয়টি পরবর্তী খণ্ডে আলোচনা করা হবে।

পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত, যিনি একজন রিসার্চ স্কলার, তাঁর মতে “ইন্দ্রিয়নিত্যং বচনম্”—এটি মহর্ষি ঔদুম্বরায়ণের সরাসরি উক্তি নয়, বরং তাঁর কোনো বক্তব্যের ভাবার্থ। যদি এটি শব্দশঃ তাঁর উক্তি হতো, তবে পাঠ হতো “ইন্দ্রিয়নিত্যং বচনমিত্যৌদুম্বরায়ণঃ”। আমাদের দৃষ্টিতে এই মতটি যথার্থই মনে হয়। তবুও, এই মতটি মূলত ঔদুম্বরায়ণ ঋষিরই সিদ্ধান্ত বলে প্রতীয়মান হয়।

দ্বিতীয় খণ্ড : ৫

“তত্র চতুষ্ট্বং ন উপপদ্যতে। যুগপৎ উৎপন্নানাং বা শব্দানাম্ ইতরেতরোপদেশঃ শাস্ত্রকৃতো যোগশ্চ।”

এর অর্থ হলো সেখানে চতুষ্টয় (চার প্রকার) হওয়া যুক্তিসংগত হয় না। অথবা একই সময়ে উৎপন্ন শব্দগুলোর পারস্পরিক উপদেশ (ব্যাখ্যা বা নির্ধারণ) শাস্ত্রকারের দ্বারা কৃত একটি যোগ বা কৃত্রিম বিন্যাস মাত্র।

পূর্বে যে মহর্ষি ঔদুম্বরায়ণের মত প্রদর্শিত হয়েছে, তার সাধারণ অর্থ এভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে যে শব্দ (বচন) ইন্দ্রিয়ে কেবল উচ্চারণ বা শ্রবণ ক্রিয়ার সময় পর্যন্তই স্থিত থাকে। অর্থাৎ, শব্দের অস্তিত্বকে অনেকেই কেবল বাক্‌ইন্দ্রিয় বা শ্রবণেন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত ক্ষণস্থায়ী ঘটনা হিসেবেই বুঝেছেন। কিন্তু এই অংশে শাস্ত্রকার ইঙ্গিত করছেন যে, শব্দসমূহ একই সঙ্গে উৎপন্ন হলেও তাদের পারস্পরিক বিভাগ, শ্রেণিবিন্যাস বা ব্যাখ্যা শাস্ত্রের দ্বারা নির্ধারিত একটি যৌক্তিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ নাম, আখ্যাত, উপসর্গ ও নিপাত—এই চার প্রকারভেদ স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে উপস্থিত শব্দগুলোর মধ্যে ভৌতভাবে আলাদা হয়ে থাকে না, বরং শাস্ত্রকারের বৌদ্ধিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এই বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এভাবে বোঝা যায় যে, শব্দের অস্তিত্ব কেবল ইন্দ্রিয়গত উচ্চারণ বা শ্রবণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও যোগের মাধ্যমে তার স্বরূপ নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ শব্দটি কেবল উপস্থিত থাকে উচ্চারণ বা শ্রবণের মুহূর্ত পর্যন্ত; এরপর শব্দটি নষ্ট হয়ে যায়। এই কারণেই তারা পদের বিভাগ প্রক্রিয়ার ওপর প্রশ্নচিহ্ন তুলে বলেন যে, যখন শব্দ অনিত্য, তখন নাম, আখ্যাত, উপসর্গ ও নিপাত এই চার প্রকার বিভাগ সম্ভব নয়, অথবা এই বিভাগ অর্থহীন।

কীভাবে এটি অর্থহীন তা ব্যাখ্যা করতে তারা বলেন যে, শব্দগুলো একসঙ্গে উৎপন্নই হয় না; সুতরাং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে স্থাপিত হতে পারে? যখন আমরা একটি শব্দ উচ্চারণ করি, তখন অন্য শব্দের কোনো অস্তিত্বই থাকে না। আবার যখন দ্বিতীয় শব্দ উচ্চারণ করা হয়, তখন প্রথম উচ্চারিত শব্দের অস্তিত্ব লুপ্ত হয়ে যায়। এই অবস্থায় ঐ দুই শব্দের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে কল্পনা করা যায়? এই কারণেই পদের প্রধানতা বা গৌণতার আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।

একইভাবে ব্যাকরণশাস্ত্রে বিভিন্ন পদের যে ‘যোগ’ দেখানো হয়, তাও অসংগত বা অর্থহীন বলে মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, উপসর্গের সঙ্গে ধাতুর এবং ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয়ের সংযোগ অর্থহীন, কারণ যখন উপসর্গ উচ্চারিত হয়, তখন ধাতু ও প্রত্যয় উৎপন্নই হয় না। আবার যখন ধাতু উচ্চারিত হয়, তখন উপসর্গ নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রত্যয় তখনও উৎপন্ন হয় না। একইভাবে প্রত্যয় উচ্চারণের সময় ধাতু ও উপসর্গ উভয়ই ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে থাকে। এই পরিস্থিতিতে শব্দশাস্ত্রকেই অর্থহীন বলে মনে হয়।

এইভাবেই সৃষ্টি-বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিচার করা যেতে পারে। এই সমস্ত আপত্তি বিদ্যমান থাকলে অর্থাৎ শব্দ ও বর্ণ যদি অনিত্য হয় তবে ছন্দ রশ্মির কোনো রূপই গঠিত হতে পারে না। কারণ এক বর্ণের সঙ্গে অন্য বর্ণের এবং এক শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দের কোনো সম্পর্কই স্থাপিত হবে না। এমন অবস্থায় সকল পদের পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব? তখন বৈদিক ঋচা অর্থাৎ ছন্দ রশ্মিগুলোর অস্তিত্বই অসিদ্ধ বা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

“ব্যাপ্তিমত্ত্বাৎ তু শব্দস্য।”

এই সমস্ত আশঙ্কাকে সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করে মহর্ষি যাস্ক বলেন শব্দ ব্যপ্তিমান, অর্থাৎ নিত্য। সুতরাং শব্দকে অনিত্য মনে করে যে সব আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এখানে প্রশ্ন ওঠে শব্দ কোথায় ব্যাপ্ত থাকে?

এই বিষয়ে আমাদের মত হলো, “ইন্দ্রিয়নিত্যং বচনম্”—এই উক্তিতে ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দ দ্বারা কেবল বাক্‌ইন্দ্রিয় বা শ্রবণেন্দ্রিয়কেই বোঝানো হয় না; বরং এর দ্বারা অন্যান্য তত্ত্ব বা পদার্থের গ্রহণও হয়। এর সমর্থনে কিছু প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে—

  • ইন্দ্রিয়ম্ ইন্দ্রঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৭.৩)

  • ইন্দ্রিয়ঃ বা ইন্দ্রঃ (মৈ.সং. ৪.২.১০, ৪.৩.৮)

  • ইন্দ্রিয়ং বা ইন্দ্রঃ (কাঠক সংহিতা ২৯.১)

  • মন এব ইন্দ্রঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৯.১.১৩)

  • স যস্‌স আকাশ ইন্দ্র এব সঃ (জৈমিনীয় উপনিষদ ১.২৮.২)

  • ইন্দ্রিয়স্বামিন্‌ জীব (মধ্যদিন যজুর্বেদ ভাষ্য ২১.৫৭)

এই প্রমাণগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, এখানে ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দের অর্থ ইন্দ্র, আর ইন্দ্র শব্দের অর্থ আকাশ, মন ও আত্মাও বটে।

শব্দের নিত্যত্ব প্রসঙ্গে ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী ঋগ্বেদাদিভাষ্য-ভূমিকায় লিখেছেন

“শব্দ তো আকাশের মতো সর্বত্র সমভাবে ভরে আছে; কিন্তু যখন উচ্চারণের ক্রিয়া হয় না, তখন তারা প্রকাশ্যে শ্রুতিগোচর হয় না। যখন প্রাণ ও বাণীর ক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্চারণ করা হয়, তখনই শব্দ প্রকাশিত হয়।”

এর সঙ্গে সঙ্গে ঋষি দয়ানন্দ আরও বহু ঋষির মত উদ্ধৃত করে শব্দের নিত্যত্ব প্রমাণ করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ঋগ্বেদাদিভাষ্য-ভূমিকা গ্রন্থের ‘বেদনিত্যত্ব’ বিষয়টি দ্রষ্টব্য।

আসলে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড বৈদিক ছন্দ-রশ্মি দিয়েই নির্মিত। আকাশতত্ত্ব যাজুষী ছন্দ-রশ্মি ও সূত্রাত্মা বায়ু প্রভৃতি রশ্মি দ্বারা গঠিত, এবং তাতে বৃহৎ বৃহৎ ছন্দ-রশ্মি সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকে। এই কথাকেই বলা হয় আকাশে শব্দের একরসতা। এই বিজ্ঞান উপলব্ধি করার জন্য রচয়িত ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’ গ্রন্থ পাঠযোগ্য।

এই কারণেই সমস্ত বৈদিক পদের নিত্য আকাশব্যাপী অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়েছে। আকাশে এই শব্দগুলোর ব্যাপ্তি পরমপিতা পরমাত্মার দ্বারা সংঘটিত হয় এই বিষয়টিও বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ গ্রন্থের মাধ্যমে বোঝা যায়।

যখন আমরা কোনো পদ উচ্চারণ করি, তখন সেই উচ্চারণ-ক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঋষি দয়ানন্দ, পাণিনিমুনি প্রণীত বর্ণোচ্চারণ শিক্ষা-র ব্যাখ্যায় লিখেছেন—

“আত্মা বুদ্ধিদা সমেত্য অর্থান্‌ মনো যুক্তে বিবক্ষয়া।
মনঃ কায়াগ্নিমাহন্তি স প্রেরয়তি মারুতম্।
মারুতস্তূরসি চরন্‌ মন্দং জনয়তি স্বরম্॥”

এর অর্থ—জীবাত্মা বুদ্ধির সঙ্গে অর্থসমূহের সংযোগ ঘটিয়ে বলার ইচ্ছায় মনকে প্রবৃত্ত করে। মন বিদ্যুৎরূপ জঠরাগ্নিকে আন্দোলিত করে; সেই অগ্নি বায়ুকে প্রেরণা দেয় এবং সেই বায়ু বক্ষস্থলে বিচরণ করে মৃদু স্বর উৎপন্ন করে।

এখানে আত্মা বুদ্ধির সঙ্গে অর্থগুলোর সংযোগ স্থাপন করে বলার ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং তারপর সেই ইচ্ছার সঙ্গে মনকে যুক্ত করে এটি এই বিষয়ের সূচক যে, পদের পরা অবস্থা জীবাত্মার সংকল্প থেকেই স্বতঃপ্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে উচ্চারণ ক্রিয়ার কর্তা জীবাত্মাই; ইন্দ্রিয়গুলো কেবলমাত্র উপকরণ বা সাধনমাত্র।

জীবাত্মা যে পদগুলো বলার জন্য মনকে প্রবৃত্ত করে, সেই পদগুলো পরা বাণীর রূপে জীবাত্মার সংকল্পের সঙ্গেই কেবল প্রকাশমাত্র হয়। শব্দের ব্যাপ্তি পরা অবস্থায় প্রকৃতিতে, পশ্যন্তী রূপে মনস্তত্ত্বে এবং মধ্যমা রূপে আকাশে বিদ্যমান থাকে। আত্মা যে পদ গুলোকে পরা অবস্থায় প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করে, মন সেই পদগুলোকেই পশ্যন্তী অবস্থায় রূপান্তরিত করে। ইন্দ্রিয়গুলো আবার সেই পদগুলোকেই মধ্যমা রূপে পরিবর্তিত করে।

এখানে শব্দের উচ্চারণ ও শ্রবণের প্রক্রিয়া অনিত্য হলেও, শব্দ নিজে অনিত্য নয়। এই কারণেই শব্দগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের পূর্বে উল্লিখিত চার প্রকার বিভাগ আলোচনা করা অসংগত নয়, বরং সম্পূর্ণ সঙ্গত। এভাবে শব্দকে অনিত্য ধরে যে সব আশঙ্কা উত্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলো সবই ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। যদি শব্দগুলোর বিভাগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক না থাকে, তবে বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি ও তাদের স্বরূপের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না, আর এর অভাবে সৃষ্টির উৎপত্তি কখনোই সম্ভব নয়।

“অগণীয়সত্ত্বাচ্চ শব্দেন সংজ্ঞাকরণং ব্যবহারার্থ লোকে।”

শব্দ সম্পর্কে পুনরায় মহর্ষি যাস্ক বলেন শব্দ অত্যন্ত সূক্ষ্ম; এই কারণেই তা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে ব্যাপ্ত। বৈদিক ছন্দ-রশ্মির অন্তর্গত বিভিন্ন পদ সূক্ষ্ম কম্পনের রূপ, যাদের আকার বর্তমান কালে পরিচিত যেকোনো সূক্ষ্মতম পরিমাপের থেকেও ক্ষুদ্র। আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞান যে প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের কথা বলে এবং যে স্তরে গিয়ে ভৌত বিজ্ঞানের সমস্ত নিয়ম অকার্যকর বলে স্বীকার করে, আমাদের মতে শব্দ তার থেকেও সূক্ষ্ম বিশেষত বৈদিক ছন্দ-রশ্মির প্রসঙ্গে।

এই সৃষ্টিতে শব্দ দুই প্রকার কাজ করে:-

১. সংজ্ঞাকরণঅর্থাৎ বিভিন্ন পদের পারস্পরিক ব্যবহারের জন্য তাদের নাম প্রদান করা। শব্দের মাধ্যমে বিভিন্ন পদার্থকে সম্বোধন না করলে লোকব্যবহার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। শব্দের দ্বারা সংজ্ঞাকরণ নাম, আখ্যাত, উপসর্গ ও নিপাত এই চার রূপে সম্পন্ন হয়; এই কারণেই পদের এই চারটি রূপ স্বীকৃত হয়েছে। এই চার রূপ থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন শব্দ নিজেরাই তাদের স্বরূপ যথাযথভাবে প্রকাশ করে।

বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষার পদগুলোর এটি এক মহৎ বৈশিষ্ট্য যে, তারা যে পদার্থকে বোঝায়, তার স্বরূপ সম্পূর্ণভাবে নিজেই প্রকাশ করে দেয়। লোকজ জীবনেও বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে নানাবিধ আচরণ ও কার্য সম্পাদন করা সহজ হয়। বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় শব্দের ব্যবহার মূলত বৈদিক শব্দভাণ্ডার থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।

২. দৈবিক ব্যবহার— (লোকাঃ খণ্ডাংশি বৈ সর্বে লোকাঃ)। ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান বিভিন্ন ছন্দ-রশ্মির মধ্যে যে পারস্পরিক কার্য-ব্যবহার ঘটে, তা ওই ছন্দ-রশ্মিগুলোর অন্তর্গত বিভিন্ন শব্দরূপ রশ্মি-অংশের কারণেই ঘটে। এইভাবে ব্রহ্মাণ্ডের সূক্ষ্মতম স্তর থেকে স্থূলতম পদার্থ পর্যন্ত সবকিছুই তাদের সমস্ত কার্য শব্দ-রশ্মির মাধ্যমেই সম্পন্ন করে। এই শব্দগুলোর চার প্রকার রূপও নিজ নিজ কার্য সর্বত্র প্রকাশ করে থাকে।

“তেষাং মনুষ্যবদ্দেবতাভিধানম্।”

উপরিউক্ত প্রসঙ্গকে এগিয়ে নিয়ে মহর্ষি বলেনযেমনভাবে মানুষের মধ্যে শব্দের ব্যবহার হয়, তেমনভাবেই এই সৃষ্টিতে সকল জড় ও দেবতাত্মক পদার্থের মধ্যেও শব্দের ব্যবহার ঘটে। প্রকৃতপক্ষে, শব্দের উৎপত্তি ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টির আরম্ভে মূল পদার্থ প্রকৃতিতেই ‘ওম্’-এর পরা অবস্থায় ঘটে। অন্যান্য অবস্থায় ‘ওম্’ এবং অন্যান্য বৈদিক পদের উৎপত্তি মনস্তত্ত্ব থেকে শুরু হয়ে লোক থেকে লোকান্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং ক্রমাগত ঘটে চলেছে।

এ কথাটি এভাবেও বলা যায় যে এই শব্দরূপ তরঙ্গগুলোর দ্বারা বিভিন্ন ছন্দ-রশ্মির সৃষ্টি হয় এবং সেই ছন্দ-রশ্মিগুলোর দ্বারাই সমগ্র সৃষ্টির উদ্ভব ঘটে। এই সৃষ্টিতে যে যে পদার্থ যখন যখন উৎপন্ন হয়, তখন তখন সেই পদার্থের সঙ্গে তার বাচক শব্দগুলোরও উৎপত্তি ঘটে। এই সত্যটিকেই তত্ত্বজ্ঞ ঋষিগণ এভাবে প্রকাশ করেছেন

“স ভূরিতি ব্যাহরত্‌ স ভূমিমসৃজত্‌” (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২।২।৪।২)
“প্রজাপতির্যদগ্রে ব্যাহরত্‌ স ভূরিত্যেব ব্যাহরত্‌ স ইমাম্‌ অসৃজত্‌” (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১।১০২)

এর আশয় হলো যখন পৃথিবী তত্ত্বের অণুসমূহ এবং বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ ও লোকসমূহের উৎপত্তি হচ্ছিল, তখন সেই সময়ে ‘ভূঃ’ পদটি এই ব্রহ্মাণ্ডে পশ্যন্তী ও মধ্যমা অবস্থায় বিশেষভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। একই সঙ্গে, যে যে ছন্দ-রশ্মির প্রধানত্বে এই সব পদার্থের উৎপত্তি হয়, সেই ছন্দ-রশ্মিগুলিতেও ‘ভূঃ’ পদটি প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে।

অন্যত্রও বলা হয়েছে—

“স্বরিতি সামভ্যোঊক্ষরত্‌ স স্বর্গো লোকোऽভবৎ” (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ১।৫)

এর অর্থ হলো সামরূপ ছন্দ ইত্যাদি রশ্মি থেকে যে সূর্য প্রভৃতি লোকসমূহের উৎপত্তি হয়, সেখানে ‘স্বঃ’ রশ্মিগুলি প্রধানভাবে নির্গত হতে থাকে অথবা বিদ্যমান থাকে।

এইভাবেই সকল পদার্থের উৎপত্তিকে বোঝা উচিত। এমনটি কখনোই সম্ভব নয় যে সৃষ্টির উৎপত্তি-প্রক্রিয়ায় কোনো পদার্থের যে ছন্দ-রশ্মি কারণরূপে কাজ করে, তাতে সেই পদার্থের বাচক পদগুলোর উপস্থিতি থাকবে না। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো যে যে শব্দের যে যে অর্থ, সেই সেই অর্থই তার বাচ্যরূপ পদার্থের প্রভাব হিসেবে প্রকাশিত হয়।

এই কথার সমর্থন স্বয়ং বেদেও পাওয়া যায়ঃ—

“দেবীং বাচমজনয়ন্ত দেবাঃ” (ঋগ্বেদ ৮।১০০।১১)

অর্থাৎ সৃষ্টিতে দেবতাত্মক পদার্থগণ বিভিন্ন শব্দকে উৎপন্ন করেন। মনে রাখতে হবে, যেমন মানুষের কথ্য ভাষায় নাম, আখ্যাত, উপসর্গ ও নিপাত এই চার রূপের বাণী রয়েছে, তেমনই বৈদিক বাক্‌-এও এই চার রূপ বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের ভাষায় বাণীর এই রূপগুলো এসেছে বৈদিক বাক্‌ থেকেই।

“পুরুষবিদ্যানিত্যত্বাৎ কর্মসম্পত্তির্মন্ত্রো বেদে।”

এর অর্থ পুরুষবিদ্যার নিত্যত্বের কারণেই বেদে মন্ত্রের মাধ্যমে কর্মসিদ্ধি বা কর্মসম্পাদন সম্ভব হয়।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ভিরদান্না— সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন সাইট

🏺 ভিররানা (Bhirrana) খননে কি পাওয়া গেছে? ভিররানা (বা ভিরদান্না) প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি হরিয়ানার (ফতেহাবাদ জেলায়) ঘগ্গর (পৌরাণিক সরস্বতী) ন...

Post Top Ad

ধন্যবাদ