সায়েন্স ও বেদ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

01 September, 2025

সায়েন্স ও বেদ

 সাধারণ বিবরণ

যখন আমাদের কোনো একটি বিষয় দুই ভিন্ন ভাষায় অধ্যয়ন করতে হয়, তখন এ প্রয়োজন হয়ে পড়ে যে ঐ দুই ভাষায় ব্যবহৃত বিষয়-সংক্রান্ত পারিভাষিক শব্দগুলোর তুলনামূলক জ্ঞান অর্জন করা হোক। এই গ্রন্থে আমরা বিজ্ঞান বিষয়কে একদিকে বেদের ভাষায় এবং অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞান (সায়েন্স)-এর ভাষায় আলোচনা করছি। অতএব, প্রথমেই এই দুই ভাষায় বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত পারিভাষিক শব্দগুলোর পরিচয় জানা উচিত।

সবার আগে বৈদিক ভাষার শব্দ “পদার্থ” সম্পর্কে বোঝা প্রয়োজন। যেসব বস্তুর নাম ভাষায় প্রকাশ করা যায়, তাদেরই পদার্থ বলা হয়। জগতের সমস্ত সত্তা বা বস্তু, যাদের নাম ভাষায় বলা সম্ভব—তাদেরই পদার্থ বলা হয়েছে।

বর্তমান বৈজ্ঞানিক ভাষায় “পদার্থ” শব্দের কোনো সঠিক প্রতিশব্দ নেই। ইংরেজি ভাষার “thing” বা “substance” এর সমার্থক নয়। কারণ, thing এবং substance শব্দদ্বয় পদার্থের অর্থ পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। এমনকি, এগুলো সব ক্ষেত্রে প্রয়োগও করা যায় না। যেমন—“God”“Soul” শব্দকে thing বা substance বলা যায় না। অথচ বৈদিক ভাষায় “পদার্থ” শব্দ এগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ, যেসব কিছু আমরা শব্দ দ্বারা বর্ণনা করতে পারি, সেগুলোই পদার্থ নামে পরিচিত। এ রকম কোনো শব্দ বর্তমান বৈজ্ঞানিক ভাষায় নেই।

এ কথা বলা ভুল হবে যে পরমাত্মা, জীবাত্মা, প্রকৃতি এবং অনুরূপ আরও অনেক কিছু ইন্দ্রিয় দ্বারা (অথবা শক্তিশালী যন্ত্রের সাহায্যেও) উপলব্ধ করা না গেলে, তাই তারা নেই। না বোঝা বা না ধরা পড়া মানেই অস্তিত্বহীনতা নয়। সাধারণ ইংরেজি ভাষায় তাদের জন্য God, Soul এবং Primordial Matter ইত্যাদি শব্দ আছে। কিন্তু বৈদিক ভাষায় এগুলোকেও পদার্থ বলা হয়েছে।

তাদের বৈজ্ঞানিক অবস্থা কী, সেটাই এই গ্রন্থের আলোচনার বিষয়। যতদূর পর্যন্ত তাদের নাম আছে, ততদূর পর্যন্ত তারাও পদার্থ নামে পরিচিত। এইভাবে আরও অনেক পদার্থ রয়েছে, যাদের বিবরণ পরবর্তী আলোচনায় করা হবে।

বৈদিক ভাষায় সমগ্র জগতের পদার্থকে বিভিন্ন গণ বা শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। গণ বলতে এখানে শ্রেণী (class) বোঝানো হয়েছে। জগতের পদার্থ মোট সাতটি শ্রেণীতে বিভক্ত, যাদের গণ বলা হয়।

এই শ্রেণীগুলোর বিবরণ দেওয়ার আগে আমাদের “জগত্‌” শব্দের অর্থ বোঝা দরকার।
জগত্‌ বলতে বোঝায় সেই প্রপঞ্চকে, যা আমরা চারপাশে চলমান অবস্থায় দেখতে পাই। পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, তারাগণ কিংবা আমাদের চারপাশের যা কিছু গতিশীল—সবকিছুকেই এক নামে “জগত্‌” বলা হয়।

জগত্‌ শব্দের আক্ষরিক অর্থ—“যা গতিশীল।” অর্থাৎ যা সৃষ্টি হয়েছে এবং যা নশ্বর, তাকেই জগত্‌ বলা হয়। আধুনিক বিজ্ঞানে একে প্রায়শই “Universe” (বিশ্ব) বলা হয়। তবে আমরা মনে করি “Universe” শব্দটি জগত্‌ শব্দের সমার্থক নয়। কারণ, Universe একটিই, কিন্তু জগত্‌ অনেকগুলো হতে পারে, যারা একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র। তাদের আরেকটি নাম হলো “সंसার”। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় Universe বলতে মূলত সেই গ্যালাক্সিকে বোঝানো হয়, যার ক্ষুদ্র অংশ আমাদের সৌরজগত। একে আকাশগঙ্গা বলা হয়। কিন্তু আকাশগঙ্গা ছাড়াও আরও অনেক তারামণ্ডল রয়েছে।

এই জ্যোতির্বিদ্যাগত (astronomical) পরিভাষা এখানে আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। এই গ্রন্থে মূলত আমরা পৃথিবীর পদার্থের শ্রেণীগুলোর কথা আলোচনা করব।

সাংখ্য দর্শন এভাবে সেই শ্রেণীগুলোর উল্লেখ করে—

"সত্ত্বরজস্তমসাঁ সাম্যাবস্থা প্রকৃতিঃ । প্রকৃতের্ মহাআন্ । মহতোऽহংকারোऽহংকারাত্ পঞ্চতন্মাত্রাণ্য্ উভযমিন্দ্রিয়ং । তন্মাত্রেভ্যঃ স্থূলভূতানি পুরুষ ইতি পঞ্চবিংশতিঃ গণঃ ॥"
(সাংখ্য দর্শন, অধ্যায় ১, শ্লোক ৬১)

সাংখ্য মতে জগত্‌কে ২৫টি গণে বিভক্ত করা হয়েছে। শ্লোক উদ্ধৃতিতে তাদের গোনা হয়েছে।

এর অর্থ হলো—
১. সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ-এর সাম্যাবস্থা-এর নাম প্রকৃতি। এটি একটিই, কোনো গণ নয়।
২. প্রকৃতি থেকে মহৎ উৎপন্ন হয়। এটি একটিই।
৩. মহৎ থেকে অহংকার সৃষ্টি হয়। অহংকার তিন প্রকার।
৪. অহংকার থেকে দুই প্রকারের ইন্দ্রিয় জন্ম নেয়। এগুলো দশটি।

(এভাবে বাকিগুলোও গণনা করা হয়েছে, যা পরবর্তী বর্ণনায় আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হবে।)

৫. অহংকার থেকে পাঁচ তন্মাত্রা উৎপন্ন হয়।

৬. তন্মাত্রা থেকে পঞ্চ মহাভূত গঠিত হয়।

৭. পুরুষ—যার জন্য এই উল্লিখিত পদার্থগুলোর গণ তৈরি হয়েছে।

এইভাবে মোট পঁচিশটি গণ আছে।

এই গণগুলোর সমার্থক যদি বর্তমান বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয়, তবে তা হবে এভাবে—

পুরুষ দুই প্রকার—একটি পরমাত্মা (God) এবং অপরটি জীবাত্মা (Soul)

প্রকৃতি—এটি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই তিন শক্তির সাম্যাবস্থাকে বলা হয় (Primordial Matter)।

এই তিনটির বর্তমান বিজ্ঞানে কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। সাধারণ কথাবার্তায় এগুলোকে God, SoulMatter বলা হয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এগুলোকে স্বীকার করে না। অথচ বৈদিক বিজ্ঞান শুধু স্বীকারই করে না, বরং এ তিনটিকে সমগ্র জগতের ভিত্তি হিসেবে মান্য করে।

মহৎ—এরও বিজ্ঞানে কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। কেউ কেউ একে Cosmic Dust বলে, কিন্তু সেটিকে মহতের সঠিক পরিচয় হিসেবে ধরা যায় না।

অহংকার—এটি সাংখ্য দর্শনের শব্দ। বৈদিক ভাষায় একে আপঃ বলা হয়। এগুলো তিন প্রকার। এগুলো আধুনিক বিজ্ঞানেও পরিচিত। এদের সম্মিলিত নাম Atomic Particle। আর Atomic Particle-ও তিন প্রকারের। বিজ্ঞানে এ তিনটির পৃথক নাম ও শ্রেণীবিভাগ আছে। বৈদিক ভাষাতেও এদের পৃথক নাম ও গুণ আছে।

এই তিন নাম হলো—

১. মিত্র = ইলেকট্রন
২. বরুণ = প্রোটন
৩. অর্যমান = নিউট্রন

এই আপঃ থেকে গঠিত হয় পরিমণ্ডল (Atoms)। আর এই পরিমণ্ডল বা পরমাণুই সমগ্র সৃষ্টির সমস্ত পদার্থকে তৈরি করে।

সাংখ্য দর্শনে বলা হয়েছে যে অহংকার থেকে পাঁচ তন্মাত্রা এবং ইন্দ্রিয় সৃষ্টি হয়। তন্মাত্রার সংখ্যা পাঁচ এবং ইন্দ্রিয় দশ। যেসব পদার্থ অহংকার ও তন্মাত্রার সাহায্যে গঠিত হয়, তাদের পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এই শ্রেণীগুলোর নাম হলো—পৃথিবী, জল, বায়ু, অগ্নি ও আকাশ

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন। আমরা পুরুষকে দুই রকম বলেছি। কিন্তু সাংখ্যে একটির কথাই বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো—এক ধরনের পুরুষ জীবজগতে অবস্থিত। এগুলোর সংখ্যা অসংখ্য। আরেক ধরনের পুরুষ সর্বত্র ব্যাপ্ত একটিমাত্র।

এই সব গণের বর্ণনাই বৈদিক বিজ্ঞান।

আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে এর কোথায় মিল, কোথায় অমিল—তা আমরা যথাস্থানে বিশ্লেষণ করে বর্ণনা করব।

অক্ষর পদার্থ

সंसার (সন্সার)-এর সব পদার্থ প্রধানত দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। এক, যারা চিরকাল টিকে থাকে, নাশ হয় না। তারা তিনটি—পরমাত্মা (পরমাত্মা), জীবাত্মা (জীবাত্মা) এবং প্রকৃতি (প্রকৃতি) সাম্যাবস্থায়। এদের তিনটিকে অব্যক্ত (অব্যক্ত) বলা হয়। অব্যক্ত অর্থ হলো, যাদের কোনো রূপ, রঙ ইত্যাদি নেই। তারা মানুষের ইন্দ্রিয়ের নাগালের বাইরে।

ইন্দ্রিয়ের পৌঁছনো যন্ত্রের সাহায্যে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। দূরবীন ‘টেলিস্কোপ’ (টেলিস্কোপ) দৃষ্টিকে বহু দূরে পৌঁছে দেয়। এর সাহায্যে কোটি কোটি, পদ্ম (পদ্ম) মাইল দূরের বস্তু দেখা সম্ভব।

এভাবেই ক্ষুদ্রবীন (মাইক্রোস্কোপ/মাইক্রোস্ক্রোেপ) অতিসূক্ষ্ম জিনিস দেখাতে সাহায্য করে। উন্নত মানের মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কোনো বস্তুকে লক্ষ গুণ বড় করে দেখা যায়।

কিন্তু বলা হয় যে, এই তিন পদার্থ—পরমাত্মা, জীবাত্মা এবং প্রকৃতি—এই যন্ত্রগুলির নাগালেরও বাইরে। তাই তারা ইন্দ্রিয়ের নাগালের বহু বাইরে।

প্রশ্ন আসে, যখন তারা একেবারেই নাগালের বাইরে, তখন তাদের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া হবে কীভাবে? এই কারণেই বর্তমান বিজ্ঞান তাদের মানে না।

কিন্তু বুদ্ধি এটাকে মানতে পারে না যে শুন্য (শূন্য) থেকে এই দৃশ্যমান জগৎ তৈরি হলো। ‘কিছু নেই’ থেকে কিছু তৈরি হতে পারে না। মূলত কিছু একটা আছে, যাকে মানতেই হয়, নইলে জগতের নানান পদার্থ কিভাবে সৃষ্টি হলো—তা বুদ্ধির কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।

অতএব কিছু একটা আছে, যেখান থেকে এই জগতের পদার্থ তৈরি হয়েছে। ভারতীয় বিজ্ঞানে এমন পদার্থকে জানার একটি উপায় বলা হয়েছে। সেটিকে বলা হয় অনুমান প্রমাণ (অনুমান-প্রমাণ)।

সাংখ্য (সাংখ্য)-এর সিদ্ধান্ত হলো—অবস্তু (শূন্য) থেকে কিছু হয় না। এটি বিশুদ্ধ বুদ্ধি দিয়ে বিবেচিত সত্য। কোনো পীর-প্যাগম্বর বা ইলহামী (ঈশ্বর-প্রেরিত) গ্রন্থের বর্ণনার কারণে এটিকে মানতে বলা হয়নি।

এর সাথে সাংখ্যের আরও একটি মত হলো— “মলে মালাভাবাদমূলং মূলম্‌” (সাংখ্য দর্শন ১-৬৭)। অর্থাৎ—মূলের মধ্যে যদি মূল না থাকে, তবে সেই মূল মূলহীন। এর মানে, একেবারে চূড়ান্ত মূল পদার্থকে মানতেই হবে। যদি একটার মূল, তারও মূল, তারপর আবার তারও মূল খুঁজতে থাকি—তাহলে এক জায়গায় এসে সব কিছুর একটিই মূল মানতে হবে।

এই কথাটি যুক্তি (যুক্তি) দিয়েই বলা হয়েছে। এমন যুক্তিকেই বলা হয় তর্ক (তর্ক)। তবে তর্কেরও একটি শর্ত আছে—তর্ক ভিত্তিহীন হতে পারে না। যখন তর্ক কোনো ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে হয়, তখন তাকে অনুমান-প্রমাণ বলা হয়।

ন্যায় (ন্যায়) দর্শনের মতে চার ধরনের প্রমাণ আছে। ন্যায় মতে, এই কার্য-জগতে কোনো কিছুই প্রমাণ বা তর্কহীন নয়। জগতে কোনো বস্তুর অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব প্রমাণিত হয় এই চার প্রমাণে।

ন্যায় দর্শনে বলা হয়েছে—
“প্রত্যক্ষণুমানোপমানশব্দাঃ প্রমাণানি॥” (ন্যায় দর্শন ১-১-৩)

অর্থাৎ—পদার্থের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব চার প্রকার প্রমাণে জানা যায়—
১. প্রত্যক্ষ (প্রত্যক্ষ)
২. অনুমান (অনুমান)
৩. উপমান (উপমান)
৪. শব্দ-প্রমাণ (শব্দ-প্রমাণ)

প্রত্যক্ষের মানে হলো—যখন পদার্থ ইন্দ্রিয় দ্বারা জানা যায়, তখন তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় আছে—চক্ষু, ঘ্রাণ, শ্রবণ, রসনা ও স্পর্শ। এদের দ্বারা, কিংবা এদের সাহায্যকারী কোনো যন্ত্র দ্বারা কোনো পদার্থ আছে কি নেই তা প্রমাণ করা যায়।

যা প্রত্যক্ষভাবে ইন্দ্রিয় দ্বারা জানা যায়, সেটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীরাও ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রমাণিত বিষয় অস্বীকার করেন না।

কিন্তু এই জগতের মূল অক্ষর (অক্ষর) অতিসূক্ষ্ম এবং অব্যক্ত, রূপ-রঙহীন বলে ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায় না। তাই মূল অক্ষরের প্রমাণ প্রত্যক্ষ প্রমাণে হয় না।

দ্বিতীয় প্রমাণ হলো অনুমান ।
আমরা আগেই বলেছি যে অনুমানই আসলে তর্ক । আর তর্ক সম্পর্কে ব্রহ্মসূত্র -এ বলা হয়েছে :

“तर्कप्रितिष्ठानादप्यन्यथाउनुमेयमिति चेदेवमप्यविमोक्षप्रसङ्गः॥” (बू० सू० २-१-११)
[উচ্চারণ: তর্ক-প্রতিষ্ঠানাদপ্যন্যথা অনুমেয়মিতি চেদেবমপ্য বিমোক্ষ-প্রসঙ্গঃ]

অর্থাৎ—তর্ক প্রতিষ্ঠিত (প্রমাণিত) হওয়া উচিত। নাহলে যে অনুমান (অনুমান) করা হলো, তা সিদ্ধ হতে পারবে না।
“প্রতিষ্ঠিত” বলতে বোঝানো হলো—কোনো প্রত্যক্ষ দ্বারা প্রমাণিত জ্ঞানকে ভিত্তি করে করা অনুমান। যুক্তি এমন কিছুর উপর দাঁড়ানো উচিত, যা ইন্দ্রিয় দ্বারা সত্য প্রমাণিত। তখনই তাকে “প্রতিষ্ঠিত” ধরা যায়।

এই প্রতিষ্ঠিত তর্ককে সাংখ্য দর্শনে এভাবে ব্যাখ্যা করে :
“प्रतिबन्धदृश: प्रतिबद्धज्ञानमनुमानम्‌॥” (सां० द० १-१००)
[উচ্চারণ: প্রতিবন্ধ-দৃশঃ প্রতিবদ্ধ-জ্ঞানম্ অনুমানম্]

অর্থাৎ—যদি দুই বা ততোধিক বস্তু সর্বদা একসাথে দেখা যায়, তবে একটির উপস্থিতি থেকে অন্যটির উপস্থিতিকেও অনুমান দ্বারা সত্য ধরা যায়।

অনুমান তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন আগে ওই বস্তুগুলির সংযোগ কোথাও দেখা হয়ে থাকে।

একটি উদাহরণ সাংখ্য দর্শনেই দেওয়া আছে :
“अचाक्षुषाणामनुमानेन बोधो धूमादिभिरिव वहे:॥” (सां० द० १-६०)
[উচ্চারণ: অচাক্ষুষাণাম অনুমানে বোধো ধূমাদিভিরিব বনে:]

অর্থাৎ—যা চোখে দেখা যায় না বা ইন্দ্রিয় দিয়ে ধরা যায় না, তা অনুমান প্রমাণ (अनुमान प्रमाण [অনুমান প্রমাণ]) দিয়ে জানা যায়। যেমন—ধোঁয়া (धूम [ধূম]) দেখলে আগুন (अग्नि [অগ্নি]) থাকার প্রমাণ মেলে। ধোঁয়া কখনো আগুন ছাড়া দেখা যায় না। তাই আগুন অদৃশ্য হলেও, ধোঁয়া থাকলে নিশ্চয়ই আগুনও আছে—এমন সিদ্ধান্ত করা যায়।

যদিও আরও দুটি প্রমাণ আছে, কিন্তু অক্ষর ও অব্যক্ত পদার্থ প্রমাণের জন্য অনুমান প্রমাণই সর্বোত্তম।

এখন এই অনুমান প্রমাণ দিয়েই ঈশ্বরের প্রমাণ এভাবে দেওয়া যায়—

আমরা আমাদের ঘরে একটি চেয়ারে বসে আছি। যখন আমাদের ইচ্ছা হয়, আমরা চেয়ার থেকে উঠে বাইরে যেতে পারি। কিন্তু চেয়ার নিজে থেকে কখনো ঘরের বাইরে যায় না। কেউ সেটিকে উঠিয়ে নিয়ে গেলে বা ঠেললে যেখানে ঠেলা হয়, সেখানেই যায়।

অর্থাৎ—প্রকৃতির  তৈরি পদার্থ না নড়ানো পর্যন্ত নিজেদের জায়গা থেকে সরতে পারে না।

মানুষের শরীরও জড় । মানুষ যতক্ষণ বেঁচে থাকে, শরীর আত্মার শক্তিতে নড়ে চলে। কিন্তু মানুষ মারা গেলে, আত্মতত্ত্ব বেরিয়ে যায়, তখন শরীরের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়।

অতএব, শরীর জড়—আত্মা ছাড়া সে জড়বৎ, যেখানে পড়ে থাকে সেখানেই থাকে।

ঠিক তেমনই সূর্য , চন্দ্র , তারাগণ —সবই চলছে, যদিও এগুলিও জড় পদার্থ। যেমন জীবিত শরীরকে জীবাত্মা চালায়, তেমনি সূর্য ইত্যাদিকেও কোনো আত্ম-তত্ত্ব নিরন্তর গতিশীল রাখে।

আকাশে আমরা দেখি তারারা ভেঙে পড়ে, আর কখনো তাদের টুকরো পৃথিবীতে এসে পড়ে। সেই টুকরোগুলো আর নড়ে না। এখান থেকে প্রমাণ হয়, তারাগণকে সচল রাখার জন্যও একটি শক্তি আছে। সেই শক্তিই পরমাত্মা।

এভাবে বলা হয়—প্রকৃতিকে গতি দেওয়ার জন্যও একটি আত্ম-তত্ত্ব আছে। সেটিই ব্রহ্মসূত্র -এও বলা হয়েছে :

“व्यतिरिकानवस्थितेश्चानपेक्षत्वात्‌॥” (बर० सू० २-२-४)
[উচ্চারণ: ব্যতিরিকানবস্থিতেশ্চানপেক্ষত্বাত্]

অর্থাৎ—প্রকৃতির মধ্যে নিজে থেকে গতি আসে না, যতক্ষণ না কোনো বাইরের শক্তি এসে তাকে নাড়ায়।

ঠিক এই কথাই নিউটন (Newton) তার গতি-সিদ্ধান্তে বলেছেন।

এর অর্থ হলো—প্রকৃতির (प्रकृति [প্রকৃতি]) প্রতিটি কণা যেখানে থাকে সেখানেই স্থির থাকে, অথবা যদি চলে তবে সোজা রেখায় একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে যতক্ষণ না কোনো বাইরের শক্তি (शक्ति [শক্তি]) এসে তার উপর বল প্রয়োগ করে।

যে সূর্য (सूर्य [সূর্য]), চন্দ্র (चन्द्र [চন্দ্র]), পৃথিবী (पृथिवी [পৃথিবী]) এবং নক্ষত্র (नक्षत्र [নক্ষত্র]) প্রভৃতিকে গতিশীল রাখছে—সেই শক্তিই হলো পরমাত্মা (परमात्मा [পরমাত্মা])

প্রত্যক্ষ (प्रत्यक्ष [প্রত্যক্ষ]) পর্যবেক্ষণ থেকে অনুমান (अनुमान [অনুমান]) করা যায় যে, কোনো বিরাট শক্তি (शक्ति [শক্তি]) আছে, যা কোটি কোটি বছর ধরে এদের গতিশীল রাখছে। এখানে তারাগণ (तारागण [তারাগণ]) ইত্যাদি সরল রেখায় চলছে না। এই কারণে বোঝা যায়, কোনো চেতন শক্তি (चेतन शक्ति [চেতন শক্তি]) সর্বদা এদের উপর প্রভাব বিস্তার করছে।

বেদ (वेद [বেদ]) এই শক্তিকে পরমাত্মা (परमात्मा [পরমাত্মা]) বলে। এইভাবে অনুমান প্রমাণ (अनुमान प्रमाण [অনুমান প্রমাণ]) থেকে পরমাত্মার অস্তিত্ব সিদ্ধ হয়।

মানুষ এই শক্তি তথা পরমাত্মার (परमात्मा [পরমাত্মা]) গুণ (गुण [গুণ]) ও কর্ম (कर्म [কর্ম])-এর বিভিন্ন রকম কল্পনা করে থাকে। কিন্তু এতে পরমাত্মার অস্তিত্বের প্রশ্ন আসে না। নিশ্চিত কথা এই যে, এই গতিশীল জগতকে চালনা করছে কোনো মহান শক্তি (महान् शक्ति [মহান শক্তি])।

এর নাম ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন হতে পারে—এটিও আলোচনার বিষয় নয়। এখানে আমরা কেবল এর অস্তিত্ব প্রমাণ করছি।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে বেদ (वेद [বেদ]), যাকে পরমাত্মার লিঙ্গ (लिंग [লিঙ্গ]) বা প্রতীক ধরা হয়, সেখানে পরমাত্মা সম্পর্কে এইভাবে বলা হয়েছে :

“स पर्यगाच्छुक्रमकायमव्रणमस्नाविरशुद्धमपापविद्धम्‌ ।
कविर्मनीषी परिभू: स्वयम्भूर्याथातथ्यतोऽर्थान्व्यदधाच्छाश्वतीभ्य: समाभ्य:॥”
(यजुर्वेद ४०-८)
[উচ্চারণ: সঃ পর্যগাৎ শুক্রম্ আকায়ম্ অব্রণম্ অস্নাবির্ শুদ্ধম্ আপাপবিদ্ধম্। কবির্ মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভূঃ যথাতথ্যতোऽর্থান্ ব্যদধাৎ শাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ॥]

অর্থাৎ—ঈশ্বর (ईश्वर [ঈশ্বর]) তথা পরমাত্মার (परमात्मा [পরমাত্মা]) প্রধান গুণ এইভাবে বলা হয়েছে—

  • তিনি সর্বব্যাপী (सर्वव्यापक [সর্বব্যাপক])

  • অত্যন্ত বলশালী (बलशाली [বলশালী])

  • শরীরহীন (अकाय [অকায়])

  • ছিদ্রহীন, বিকারহীন

  • সর্বতোভাবে শুদ্ধ (शुद्ध [শুদ্ধ]) ও পাপমুক্ত (पापविद्ध [পাপবিদ্ধ])

  • মহান (महान् [মহান])

  • জ্ঞানবান (ज्ञानवान् [জ্ঞানবান])

  • চিন্তাশীল (मनीषी [মনীষী])

  • সর্বত্র বর্তমান (परिभू: [পরিভূঃ])

  • স্বয়ংপ্রকাশমান (स्वयम्भू [স্বয়ম্ভূ])

  • সত্য জ্ঞানের দাতা (यथातथ्यतोऽर्थान्व्यदधात् [যথাতথ্যতো অর্থান্ ব্যদধাত্])

  • শাশ্বত জ্ঞানের দ্বারা জগতের পদার্থগুলিকে রচনা করেন

  • সর্বস্থানে সমভাবে বিরাজ করেন।

এখানেও দেখা যায়—পরমাত্মার এই গুণাবলি অনুমান প্রমাণ (अनुमान प्रमाण [অনুমান প্রমাণ]) দ্বারাই সিদ্ধ করা যায়।

জীবাত্মা

‘জীবাত্মা’ সেই সত্তা, যা জড় পদার্থ আর জীবিত প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য করে দেয়। এই জগতে দুই ধরনের সত্তা দেখা যায়— একটিকে বলা হয় জীব আর অন্যটিকে বলা হয় জড়। বৈদিক ভাষায় এদেরকে বলা হয়েছে শরীরী আর অশরীরী। এর অর্থ হলো— যারা দেহ ধারণ করেছে তারা শরীরী, আর যারা দেহধারী নয় তারা অশরীরী। ইংরেজিতে এদের বলা হয় animate এবং inanimate

আধুনিক বিজ্ঞান এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পায় না। অথচ এদের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে Encyclopedia Britannica-র একটি স্থানে এভাবে বলা হয়েছে—

“একটি জীবিত সত্তাকে শনাক্ত করার জন্য কিছু মূল বৈশিষ্ট্য আছে, যার ভিত্তিতে তাকে জীববিদ্যার গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। জীব একটি স্বতন্ত্র, সীমানাবদ্ধ একক, যা ক্রমাগত তার চারপাশের পরিবেশের সাথে পদার্থ ও শক্তির আদান-প্রদান করে। এই আদান-প্রদানের পরও জীব স্বল্পকালের জন্য তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে। এই বিষয়টি সরাসরি পর্যবেক্ষণ বা একই ধরনের অন্য জীবের সঙ্গে তুলনা করে বোঝা যায়। প্রত্যেক জীবের জন্ম ঘটে বিভাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে— অথবা একই শ্রেণির আগে থেকেই বিদ্যমান এক বা একাধিক জীব থেকে। জীবের ভেতরে যে অবিরাম পদার্থ-শক্তি বিনিময় হয়, তাকেই বলা হয় উপাপচয় বা মেটাবলিজম। সংক্ষেপে বলতে গেলে— জীবিত বস্তু কেবল সেই ধরনের সত্তা থেকে জন্মায়, যা আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল।” (Encyclopedia Britannica, 1967, Vol. 3, p. 653)

জীবাত্মা সম্পর্কে ব্যাখ্যা

উক্ত কথনে যদি কোনো গ্রহণযোগ্য দিক থাকে, তবে তা কেবল ‘চিন্তাশীল’ (বুদ্ধিসম্পন্ন) হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাকিটুকু— যেমন প্রকৃতির সঙ্গে আদান-প্রদানের প্রসঙ্গ— তা তো জড় পদার্থেও দেখা যায়। সুতরাং সেটিকে জীবনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে টেনে আনা মানে মূল বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা প্রকাশ করে।

যেমন একটি প্রদীপ যখন জ্বলে, তখনও তার মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু কেউ প্রদীপের শিখাকে জীবিত বস্তু বলে না।

অন্যদিকে জীবিত প্রাণীর বৈদিক লক্ষণ যথার্থ বলে মনে হয়। জীবের যে লক্ষণ ন্যায় দর্শনে উল্লেখ আছে তা হলো—

“ইচ্ছা-দ্বেষ-প্রয়ত্ন-সুখ-দুঃখ-জ্ঞানান্য্ আত্মনো লিঙ্গমিতি” (ন্যায়সূত্র ১-১-১০৭)

অর্থাৎ— আত্মার লক্ষণ হলো: ইচ্ছা করা, দ্বেষ করা, চেষ্টা বা প্রয়াস করা, সুখ-দুঃখ অনুভব করা এবং চেতনা থাকা। এগুলো আত্মার স্বাভাবিক ও অপরিহার্য গুণ।

এখানে দর্শনাচার্য ‘লক্ষণ’ শব্দের পরিবর্তে ‘লিঙ্গ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। লিঙ্গ বলতে সেই বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যা সর্বদা ঐ বস্তুতে থাকে এবং অন্য কোথাও থাকে না। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে— ইচ্ছা, দ্বেষ ইত্যাদি লক্ষণ কেবল জীবধারী সত্তাতেই পাওয়া যায়, অন্য কোথাও নয়। এখানেই বর্তমান বিজ্ঞানের ভুল দৃষ্টি ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীরা যদি এনসাইক্লোপিডিয়ার বর্ণনাকে মানতেও না চান, তবে অন্তত এটুকু স্বীকার করতে হবে যে তাদের কাছে জীবধারীকে শনাক্ত করার যথাযথ বৈশিষ্ট্য নেই। আর যতদিন তা না পাওয়া যায়, ততদিন জীবনের প্রকৃত অনুসন্ধান সম্ভব নয়।

আজকাল জিন (gene) কে জীবনের ভিত্তি বলা হয়। এর বিষয়ে আমাদের এবং বেদের ভাবনা আলাদা অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। এখানে শুধু বোঝানো হলো— জীবধারীর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হলো সেইসব গুণ, যেগুলো ন্যায় দর্শন উল্লেখ করেছে— ইচ্ছা, দ্বেষ ইত্যাদি।

কিন্তু বেদ জীবকে কেবল জীবনীশক্তি বা জীবনতত্ত্ব হিসেবে সীমাবদ্ধ করেনি। জীবধারী আসলে তিনটি তত্ত্বের সমষ্টি। তত্ত্ব মানে হলো আসল বা সারবস্তু। অর্থাৎ জীবধারী হলো তিনটি অবিনশ্বর (অক্ষর) পদার্থের মিলন। তা যুক্তি দিয়ে এভাবে বোঝানো যায়—

ব্রহ্মসূত্রে উল্লিখিত যুক্তিশৃঙ্খলা

১. যা সর্বত্র প্রতিপন্ন, তার অধ্যয়ন থেকেই ব্রহ্মজ্ঞান হয়। ‘বহ্য’ শব্দের অর্থ পরে বোঝানো হবে। ‘সর্বত্র প্রতিপন্ন’ বলতে বোঝানো হচ্ছে এই কার্যজগৎ, যা আমরা চারপাশে দেখি।

২. এ জগতের দিকে তাকালে দেখা যায়— পদার্থ দুই রকমের: (ক) যেগুলো গতিশীল (চলমান), (খ) যেগুলো স্থির (অচল)। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, আলো, শব্দ— এরা গতিশীল। আর ঘরে রাখা চেয়ার, টেবিল, আলমারি ইত্যাদি অচল। এদের বলা হয় জঙ্গম আর স্থাবর। আর যে শক্তি এই চলমান পদার্থগুলোকে চালায় তাকেই বলা হয় আত্মা

একটা চেয়ার আছে, তার ওপর একজন মানুষ বসেছে। মানুষ নিজের ইচ্ছায় ওঠে-বসে, চলে-ফিরে বেড়ায়। কিন্তু চেয়ারকে না কেউ সরালে তা নড়বে না। সুতরাং বোঝা গেল— মানুষের মধ্যে আত্মতত্ত্ব আছে, কিন্তু চেয়ারে নেই।

৩. এই চলমান পদার্থও আবার দুই প্রকার। সহজ ভাষায়— শরীরী আর অশরীরী। যেমন— পৃথিবী নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরছে। সে নিরন্তর একই গতি ও একই দিকে ঘুরছে। কিন্তু মানুষ চাইলে তার চলার দিক ও গতি পরিবর্তন করতে পারে। পৃথিবী তা পারে না।

অর্থাৎ বোঝা গেল, এক ধরণের আত্মতত্ত্ব শুধু নির্দিষ্ট গতি বজায় রাখতে পারে, আরেক ধরণের আত্মতত্ত্ব ইচ্ছামতো গতি পরিবর্তন করতেও পারে।

৪. সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র— যুগযুগ ধরে একই গতি আর একই দিক ধরে চলছে। কিন্তু মানুষ বা অন্য জীব— তাদের চলাফেরা, দিক ও গতি সম্পূর্ণ তাদের নিজের ইচ্ছাধীন। তাই স্পষ্ট হয়— আত্মতত্ত্ব আসলে দুই প্রকারের।

৫. মানুষের শরীরেও এই দুই রকম আত্মতত্ত্ব বোঝা যায়। যেমন— মানুষ ইচ্ছায় ওঠে-বসে, বাজারে যায়, ভ্রমণে যায়। এটা তার নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু তার হৃদয়ের স্পন্দন? তা তার ইচ্ছাধীন নয়, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিরন্তর চলতেই থাকে।

অতএব বোঝা গেল— মানুষের মধ্যেও দুই ধরণের আত্মতত্ত্ব আছে।

  • যে আত্মতত্ত্ব ইচ্ছানুযায়ী ওঠা-বসা, চলাফেরা করায় তাকে বলে জীবাত্মা

  • আর যে আত্মতত্ত্ব হৃদয়কে চালিত করে, তাকে অন্যভাবে বর্ণনা করা হয়েছে—

“"গুহাঁ প্রবিষ্ঠাওআত্মানৌ হি তদর্শনাত্‌॥"(ব্রহ্মসূত্র ১-২-১১)”

অর্থাৎ— দেহরূপ গুহার মধ্যে দুটি আত্মতত্ত্ব অবস্থান করছে, এভাবে তা প্রমাণিত।

এভাবেই অনুমান প্রমাণে জীবাত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করা হয়েছে। আত্মতত্ত্ব অবিনশ্বর— চিরন্তন।

এটাও বোঝা যায়— অনেক সময় কোনো মানুষ জন্মগতভাবে অন্ধ বা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়। আবার কেউ রাজপরিবারে জন্মায়, কেউ প্রাণীজগতে। এগুলো বর্তমান জীবনের কাজের ফল নয়। এর মানে দাঁড়ায়— পূর্বজন্মের কর্মফলই বর্তমান জন্মে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাই জন্মান্তরবাদ বা পুনর্জন্ম স্বীকার করতে হয়।

নাস্তিকেরা যারা আত্মতত্ত্ব ও কর্মফল মানে না, তারা এভাবে জীবাত্মার গতি ও জন্মান্তর স্বীকারই করে না। কিন্তু আস্থিক দর্শন বলে— এমন ঘটনা ‘অকারণ’ মানা যায় না। বুদ্ধি মেনে নেয়— আত্মতত্ত্ব অনাদি থেকে আছে এবং কর্মফল ভোগ করছে।

আত্মতত্ত্ব ও পরমাত্মতত্ত্বের আদি-অন্ত কোথায়— এ আলোচনা এখানে করা হচ্ছে না, কারণ সেটি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অন্তর্গত।

এ পর্যন্ত আমরা অনুমান প্রমাণের দ্বারা পরমাত্মাজীবাত্মা— এই দুই অবিনশ্বর (অক্ষর) তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করলাম।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ভিরদান্না— সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন সাইট

🏺 ভিররানা (Bhirrana) খননে কি পাওয়া গেছে? ভিররানা (বা ভিরদান্না) প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি হরিয়ানার (ফতেহাবাদ জেলায়) ঘগ্গর (পৌরাণিক সরস্বতী) ন...

Post Top Ad

ধন্যবাদ