ব্রাহ্মণ গ্রন্থ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

01 September, 2025

ব্রাহ্মণ গ্রন্থ

 "সমানार्थাবেতৌ ব্রহ্মণশব্দো ব্রাহ্মণশব্দশ্চ" এই উক্তিটি পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী-র উপর পতঞ্জলির মহাভাষ্য (ব্যাকরণ মহাভাষ্য)–এর শুরুতেই (১/১) পাওয়া যায়।

এখানে পতঞ্জলি বোঝাচ্ছেন যে “ব্রহ্মণ” শব্দ ও “ব্রাহ্মণ” শব্দ সমানার্থক (অর্থে অভিন্ন) হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

‘ইষে ত্বোর্জে ত্বেতি’—শতপথ ব্রাহ্মণ, কাণ্ড ০১, অধ্যায় ০৭
অর্থাৎ, ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলো বেদ বলা যায় না—তার (একটি) কারণ হলো এই যে, (ইষে ত্বোর্জে ত্বেতি) ইত্যাদি বেদমন্ত্রগুলোর “প্রতীক” ধরে ব্রাহ্মণগ্রন্থে বেদের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু সংহিতার মন্ত্রভাগে কোথাও ব্রাহ্মণগ্রন্থের কোনো “প্রতীক” দেখা যায় না। তাই ঈশ্বর প্রদত্ত মূল মন্ত্ররূপে যে চারটি সংহিতা আছে, কেবল সেইগুলোই আসল বেদ। ব্রাহ্মণগ্রন্থ বেদ নয়।

ব্রাহ্মণগ্রন্থ বেদ নয়—এ বিষয়ে ব্যাকরণ ও মহাভাষ্যে প্রমাণ আছে। সেখানে লৌকিক আর বৈদিক বিষয়ের আলাদা আলাদা উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। যেমন—লৌকিক আর বৈদিক বাক্যের উদাহরণে ‘গৌরখঃ’ ইত্যাদি লৌকিক বাক্য হিসেবে এবং (শন্নো দেবীরভিষ্টয়) ইত্যাদি বেদবাক্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বৈদিক উদাহরণে কোথাও ব্রাহ্মণগ্রন্থের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বরং ‘গৌরশ্বঃ’ ইত্যাদি যে সব লৌকিক বাক্যের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সবই ব্রাহ্মণগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। তাই ব্রাহ্মণগ্রন্থকে বেদ বলা যায় না।

আবার কাত্যায়ন ঋষি মন্ত্র ও ব্রাহ্মণগ্রন্থ—উভয়কেই বেদ বলেছেন। সেটাকে যদি “সহচার উপাধি লক্ষণা” ধরে বলা হয়, তাহলেও তা সঠিক বা গ্রহণযোগ্য হয় না। যেমন, কেউ যদি বলে—ঐ কাঠকে ভোজন করাও। তখনই দ্বিতীয় ব্যক্তি বুঝে যায় কাঠ খাবার জিনিস নয়। তাই যাঁর হাতে কাঠ আছে, তাকেই খাওয়াতে হবে—এই অর্থে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু যদি এই ধরনের লক্ষণ ধরে নিতেও হয়, তাহলেও কাত্যায়নের উক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এ বিষয়ে অন্য কোনো ঋষির সাক্ষ্য বা প্রমাণ নেই।

এর দ্বারা বোঝা যায়—‘ব্রহ্ম’ হলো ব্রাহ্মণের নাম। তাই ব্রহ্মাদি যাঁরা বেদজ্ঞ মহর্ষি ছিলেন, তাঁদের রচিত ঐতরেয়, শতপথ ইত্যাদি ব্রাহ্মণগ্রন্থ হলো বেদের ব্যাখ্যা স্বরূপ গ্রন্থ। সেই কারণেই এই ঋষিদের রচিত গ্রন্থের নাম হয়েছে ব্রাহ্মণগ্রন্থ।

তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—বেদের সংজ্ঞা কেবল মন্ত্রভাগের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, ব্রাহ্মণগ্রন্থ কোনো অবস্থাতেই বেদ নয়।

রেফারেন্স সমূহঃ

শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩।১ ব্রহ্ম বৈ ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্ররাজন্যঃ

ব্যাকরণ মহাভাষ্য ৫/১/১ সমানার্থাবেতৌ (বৃষশব্দো বৃষনশব্দশ্চ) ব্রহ্মণ্ শব্দোব্রাহ্মণ শবদশ্চ

ব্যাকরণ মহাভাষ্য ১/১/১

ব্যাকরণ মহাভাষ্য ২/৩/৬০

ব্যাকরণ মহাভাষ্য ২/৩/৬২

ব্যাকরণ মহাভাষ্য ৪/৩/১০৫

বেদোৎপত্তির বিষয়ে আমরা যেসব তথ্য পাই সেক্ষেত্রে বেদ কে অপৌরুষেয় এবং নিত্য বলা হয়েছে।  যেমনঃ

তস্মাৎ যজ্ঞাত্ সর্বহুত ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে।
ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাৎ যজুস্তস্মাদজায়ত।।
(ঋঃ ১০।৯০।৯, যজুঃ ৩১।৭, অথর্বঃ ১৯।৬।১৩)
অর্থাৎ সেই পূজনীয় এবং সবার গ্রহনযোগ্য পরমেশ্বর হতে ঋগবেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ উৎপন্ন হয়েছে।

 এবং আর একটি মন্ত্রে স্পষ্ট বেদ কে নিত্য বলা হয়েছে " তস্মৈ নূনমভিদ্যবে বাচা বিরূপ নিত্যয়া; ঋগবেদ ৮।৭৫।৬"।  এর সমর্থন বেদান্তসূত্রে বলা হয়েছে " অতএব চ নিত্যম; ১।৩।২৯" অর্থাৎ বেদ অপৌরুষেয় হেতু নিত্য। সেহেতু কল্পান্তরে বেদ বাণীর কোনরূপ পরিবর্তন হয় না।

তো এটা স্বাভাবিক যে, অপৌরুষেয় নিত্য বাণীতে কোন মনুষ্যের জীবনকাহিনী বা ইতিহাস থাকবে না। কারণ ইতিহাস তো কোন ব্যক্তির জন্মের পর তার জীবনের কৃত কর্মের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়ে থাকে। আর কল্পান্তরে ইতিহাস কখনো এক থাকে না এজন্য ইতিহাস সর্বদা অনিত্য। যেহেতু  বেদ সর্বদা নিত্য , তাই অনিত্যাদি ইতিহাস যুক্তগ্রন্থ বেদ হতে পারে না।
অপরদিকে ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে বিভিন্ন যাজ্ঞবল্ক, মৈত্রেয়ী, জনকাদির ইতিহাস বর্নিত রয়েছে। আর কোন মনুষ্য জীবন ইতিহাস কোন দেহধারীর পক্ষেই লেখা সম্ভব। বিশেষতঃ ব্রাহ্মণগ্রন্থ দেহধারী পুরুষ কর্তৃক রচিত হবার কারনেই কখনো বেদ সঙ্গা প্রাপ্ত হতে পারে না। এই সকল গ্রন্থ ঈশ্বরোক্ত নয়।  পরন্ত এগুলো মহর্ষিগণ কর্তৃক বেদের ব্যাখ্যা স্বরূপ লিখিত হয়েছে। 
মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি মুনি ইহা স্পষ্ট করে বলেছেন যে,

চতুর্বেদবিদভির্ব্রাহ্মভির্ব্রাহ্মণৈর্মহর্ষিভিঃ
প্রোক্তানি যানিবেদব্যাখ্যানি তানি ব্রাহ্মণনীতি।
(মহাভাষ্য ৫।১।১)
অর্থাৎ চার বেদের বেত্তা এবং ঈশ্বরভক্ত ব্রাহ্মণ তথা মহর্ষি যে বেদের ব্যাখ্যা করেছেন তাকে ব্রাহ্মণ গ্রন্থ বলে।

স্পষ্ট যে, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ বেদ নয় পরন্ত তার ব্যাখ্যাস্বরূপ লিখিত হয়েছে। এরূপ অনেক বেদ মন্ত্রের ব্যাখ্যা ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে পাওয়া যায়।  
যেমন-
ঋগবেদ ১।২৪।৩ এর ব্যাখ্যা ঐতেরীয় ব্রাহ্মণ ১।১৬ মধ্য, যজুর্বেদের ১ম মন্ত্রের ব্যাখ্যা শতপথ ১।৭।১ এ, তথা সামবেদ ১ম মন্ত্রের ব্যাখ্যা তাংড্য ব্রাহ্মণ ১১।২।৩ এর মধ্যে।

এখন প্রশ্ন এই যে,  ব্রাহ্মণগ্রন্থে যেমন যাজ্ঞবল্ক, মৈত্রেয়ী, গার্গী ও জনকাদির ইতিহাস রয়েছে সেইরূপ বেদমন্ত্রেও জমদগ্নি আদি শব্দ পাওয়া যায়।  এ ক্ষেত্রে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণভাগ উভয় এক তূল্য হচ্ছে। তাহলে ব্রাহ্মণ গ্রন্থ কেন বেদ হতে পারে না?
এটা শুধুমাত্র ভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।  এর সমাধান মহর্ষি জৈমিনি নিম্ন সূত্র দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন,
আখ্যা প্রবচনান্ (পূর্বমিমাংসা ১।১।৩০)
পরস্তু শ্রূতিসামান্যমাত্রম্ (পূর্বমিমাংসা ১।১।৩১)
অর্থাৎ বেদে জমদগ্নি আদি শব্দ সামান্য (যৌগিক) শব্দ এবং পর প্রযুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বেদ মন্ত্রে জমদগ্নি বা কশ্যপ আদি যেসব শব্দ এসেছে সেগুলো কোন দেহধারী ব্যক্তির নাম নয়।  এ বিষয়ে প্রমাণ শতপথ ব্রাহ্মনেই রয়েছে -
" চক্ষুর্বৈ জমদগ্নি,  শতপথঃ কান্ড ৮ অঃ ১" এবং "কশ্যপো বৈ কূর্ম্ম। প্রাণো বৈ কূর্ম্ম, শতপথঃ কান্ড ৭ অঃ ৫"।

এই প্রকার বেদে উল্লেখিত আরো বিভিন্ন নামের অর্থ ব্রাহ্মণ গ্রন্থে এই প্রকারে রয়েছে -
বশিষ্ঠ         = প্রাণ (শতপথব্রাহ্মণ ৯।১।১।৬)
ভারদ্বাজ    = মন (শতপথব্রাহ্মণ ৮।১।১।৯)
বিশ্বামিত্র    = কান (শতপথব্রাহ্মণ ৯।১।২।৬)
বিশ্বকর্মন্   = বাক (শতপথব্রাহ্মণ ৮।১।২।৯)
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী নিরুক্ত, পূর্বমীমাংসা এবং শতপথ আদি গ্রন্থের উপর গভীর দৃষ্টি দ্বারা আলোকপাত করে বলেছেন  বেদের মধ্যে প্রযুক্ত শব্দ যৌগিক, রূঢি নয়। এই জন্যই বেদের মধ্যে ইতিহাস সম্ভব নয়। ম্যাক্সমুলার তো এক জায়গায় পশ্চিমী প্রবাহের বিরুদ্ধ, ঋষি দয়ানন্দের অনুকরণ করে বলেছেন যে, প্রত্যেক শব্দ নিজ ধাতবিক অর্থে কিছু না কিছু প্রকাশ করে - Every word reterms something of its radical meaning, everything epithet trills, ever thought it, if we once disentangle it true correct and complete.
(sangskrit Literature by Maxmuller p. 285)
বেদের মধ্যে ইতিহাসাদির উল্লেখ সায়নভাষ্যে লক্ষ্য করা যায়।  এ সমন্ধ্যে ঋষি অরবিন্দ সায়ন ভাষ্য সমন্ধ্যে বলেছেন যে,

"সায়ন ঋক মন্ত্র মন্ত্রগুলির কর্ম কান্ডীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করেছেন,  প্রয়োজনবোধে কোথাও পৌরাণিকী আখ্যায়িকাত্মক বা ঐতিহাসিক অর্থের আভাস দিয়েছেন যেন পরীক্ষাচ্ছলে। কোনও রূপ উদাত্ত বা ভাবগম্ভীর অর্থের নিরুপন সায়নের টীকাই সুদুর্লভ।  বহু আয়াসেও যে মন্ত্রগুলির যাজ্ঞিকী বা পৌরাণিকী ব্যাখ্যা সম্ভব হয় নি সেখানে বিকল্প হিসাবে উচ্চাঙ্গ অর্থের ক্ষীণ আভাস দিতে বাধ্য হয়েছেন হতাশ হয়েই যেন।  তথাপি আধ্যাত্মিক অর্থে বেদের প্রমাণ্য সায়ন নিরাকরন করেন নি,  ঋক মন্ত্রগুলিতে উচ্চতর কোন পরমার্থ সত্য নিহিত এ কথা তিনি অস্বীকার করেন নি।  সেই অন্তিমাকার্যটির সেই অস্বীকৃতির ভার এই যুগের উপর ন্যস্ত হল, পাশ্চাত্য পন্ডিতদের প্রভাবে তাহা লোকপ্রিয়ও হয়ে উঠল।"

অর্থাৎ ঋষি অরবিন্দের মতেও  এটা স্পষ্ট যে, বেদ মন্ত্র কোন ইতিহাসাদির বর্ণনা করে নি।  বরং  মন্ত্রগুলোর একটা উচ্চ আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে এটাই তিনি স্বীকার করেছেন। 
অপরদিকে ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থ যে ইতিহাসাদির গ্রন্থ তার প্রমাণস্বরূপ ন্যায়ভাষ্যে বলা হয়েছে-
"বাক্য বিভাগস্য চার্থগ্রহণাৎ "
(অঃ ২। আ ১। সূ ৬০)
"বিধ্যর্থবাদানিবাদবচনবিনিয়োগাৎ "
(অ ২। আ ১। সূ ৬১)
" স্তুতির্নন্দা পরকৃতিঃ পুরাকল্প ইত্যর্থবাদঃ"
(অঃ ২। আ ১।৬৩)
অর্থাৎ লৌকিক ব্যবহারে যেরূপ বিধি, অর্থবাদ ও অনুবাদ তিনপ্রকার বচন ব্যবহার হয়, সেরূপ ব্রাহ্মণগ্রন্থেও হয়ে থাকে।
তার মধ্যে ১ম বিধিবাক্য,  যেমন (দেবদত্তো গ্রামং গচ্ছেৎ সুখার্থম্) অর্থাৎ সুখের জন্য দেবদত্ত গ্রামে যায়।
উপরোক্ত বাক্য যেমন লৌকিক বিধিবাক্য ব্যবহৃত হয়েছে,  সেরূপ ব্রাহ্মণগ্রন্থেও লেখা রয়েছে। যেমন (অগ্নিহোত্রং জুহুয়াৎ স্বর্গকামঃ) অর্থাৎ যার সুখপ্রাপ্তির ইচ্ছা আছে,  সে অগ্নিহোত্র করে থাকে।
২য় অর্থবাদ - এই অর্থবাদ চার প্রকার।  যথাঃ
(i) স্তুতিঃ অর্থাৎ গুণের প্রকাশ করা। যা দ্বারা মানুষের উত্তম কর্ম করতে এবং গুণগ্রহন করতে শ্রদ্ধ জন্মে।
(ii) নিন্দাঃ অর্থাৎ কর্মে দোষ ধরে দেওয়া, যাতে কেউ মন্দ কর্ম না করে।
(iii) পরাকৃতিঃ যেমনঃ এই চোর মন্দ করেছে বলে শাস্তি পেলো, এবং এই সাধু ভালো কাজ করেছে বলে প্রতিষ্ঠা পেলো  ইত্যাদিকে পরাকৃতি বলে।
(iv) পুরাকল্পঃ অর্থাৎ যে ঘটনা পূর্বে ঘটেছে,  যেমনঃ (রাজর্ষি জনকের সভায় যাজ্ঞবল্ক, গার্গী, শাকল্য আদি একত্র হয়ে পরস্পর প্রশ্নোত্তর রীতিতে সংবাদ করেছিলেন, ইত্যাদি ইতিহাসকে "পুরাকল্প" বলে।

পাণিনীর অষ্টাধ্যায়ীতে আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে,
" চতুর্থ্যর্থে বহুলং ছন্দসি "
(অঃ২। পা ৩।সূ ৬২)
অর্থাৎ ব্রাহ্মণ শব্দ দ্বারা ঐতরেয় আদি ব্যাখ্যান গ্রহন হয়,  এবং ছন্দস শব্দ দ্বারা মন্ত্র মূল বেদের গ্রহন হয়ে থাকে। এই জন্য এই সূত্রে ছন্দঃ গ্রহন করা হয়েছে [ছন্দাংসি] বেদ বিষয়ে [চতুর্থ্যয়ে] চতুর্থ বিভক্তির অর্থে ষষ্ঠী বিভক্তি হয় [বহুলং] বহুল করে।
ব্রাহ্মণগ্রন্থ যে বেদ সঙ্গা প্রাপ্ত হতে পারে না,  তার অন্যতম কারন এই যে, " ইষে ত্বোজে ত্বেতি " শতপথঃ কাং ১।অঃ ৭। " ইত্যাদি বেদ মন্ত্রসকলের "প্রতীক" ধরে ব্রাহ্মণগ্রন্থে বেদের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু  মন্ত্র সংহিতাই ব্রাহ্মণগ্রন্থের একটিও প্রতীক কোন স্থানে দেখা যায় না।  অতএব ঈশ্বরোক্ত  রূপ যে, মূল মন্ত্র অর্থাৎ চারটিই সংহিতা আছে তাই বেদ, ব্রাহ্মণগ্রন্থ বেদ নয়।
এখন জিজ্ঞাসা যে, ব্রাহ্মণগ্রন্থ সকলকে বেদের সমতূল্য প্রমাণীয় গ্রন্থ বলে স্বীকার করা কর্তব্য কি না?
উত্তর এই যে, ব্রাহ্মণগ্রন্থেে প্রমাণ কদাপি বেদের সমতূল্য হতে পারে না।  কারন তাহা ঈশ্বরোক্ত নয়,  কিন্তু এগুলো [ব্রাহ্মণ সকল] বেদানুকুল বশতঃ প্রমাণ যোগ্য হয়ে থাকে।  এদের মধ্যে প্রভেদ এই যে, যদি কোন স্থানে ব্রাহ্মণগ্রন্থের রচনা বেদ প্রতিকূল দৃষ্ট হয়,  তবে তা প্রামাণ্য নয়, কিন্তু বেদে যদি ব্রাহ্মণগ্রন্থের বিরোধ দৃষ্ট হয়,  তবুও তা সর্বদা প্রামাণ্য।  অর্থাৎ বেদ স্বতঃ প্রমাণ ও ব্রাহ্মণগ্রন্থ সকল বেদানুকুল বশতঃ পরতঃ প্রমাণ স্বরূপ।


[সন্দর্ভঃ ঋগবেদভাষ্যভূমিকা [মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী], বেদ রহস্য [মহাত্মা নারায়ন স্বামী], Secret of the Vedas [ ঋষি অরবিন্দ],  অষ্টাধ্যায়ী [পাণিনী] 

এখন কেন বা কিসের ভিত্তিতে তারা এই কথা বলছে?

ঋক্, সাম,যজু বা অথর্ববেদের নয় বরং Black বা কৃষ্ণযজুর্বেদের(একে কৃষ্ণ বা Black বলা হয় এই কারনেই যে এই গ্রন্থে ১০০০ শুক্ল যজুর্বেদ মন্ত্রের সাথে কঠক ব্রাহ্মণ এর ২০০০+ শ্লোক যুক্ত আছে তাই এটিকে মিশ্র অর্থে কৃষ্ণ বলা হয়,এটিকে তৈত্তিরীয় সংহিতাও বলা হয়।বিষ্ণুপুরাণের রুপক কাহিনী থেকে বোঝা যায় যে তিত্তির পাখিসমূহ থেকে সঞ্চিত জ্ঞান বা নানা অঞ্চল থেকে মিশ্রিত শ্লোকের সমন্বয়ে তৈরী ব্রাহ্মণ গ্রন্থ সমন্বয়ে কৃষ্ণযজুর্বেদ এর সৃষ্টি) অপ্রধান একটি শ্রৌতসূত্র যা কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র নামে পরিচিত সেই কাত্যায়নেও নয় বরং কাত্যায়ন এর একটি প্রতিজ্ঞা পরিশিষ্ট নামক খিল অংশে পাওয়া যাওয়া একটি শ্লোক এর ভিত্তিতে।শ্লোকটি হল-

মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্'।অর্থাৎ মন্ত্র ব্রাহ্মণ উভয়ের নাম ই বেদ।

মজার বিষয় হল ঋগ্বেদের সাংখ্যায়ন ও অশ্বলায়ন , শুক্ল যজুর্বেদের কাত্যায়ন, তথা সামবেদের ব্রাহ্মায়ণ এবং লাটচায়ন কোন প্রধান সূত্রেই এটি পাওয়া যায় না।

এই সূত্রের ব্যাখ্যাতে বিখ্যাত টীকাকার হরদত্ত তাই বলেছেন "কৈশ্চিন্মন্ত্রাণামেব বেদত্বমাখ্যাতম্ (আশ্রিতম্)" অর্থাৎ-- 'অনেক প্রাচীন আচার্য শুধু মন্ত্রকেই বেদ মেনেছেন' অর্থাৎ প্রাচীন আচার্য্যের মতে মন্ত্রেরই কেবল মূখ্য বেদত্ব সিদ্ধ, ব্রাহ্মণের নয়, এটা সুনিশ্চিত হয়ে যায়।

মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি মুনি এটা স্পষ্ট করে বলেছেন যে,

চতুর্বেদবিদভির্ব্রাহ্মভির্ব্রাহ্মণৈর্মহর্ষিভিঃ
প্রোক্তানি যানিবেদব্যাখ্যানি তানি ব্রাহ্মণনীতি।
(মহাভাষ্য ৫।১।১)

অর্থাৎ চার বেদের বেত্তা এবং ঈশ্বরভক্ত ব্রাহ্মণ তথা মহর্ষি যে বেদের ব্যাখ্যা করেছেন তাকে ব্রাহ্মণ গ্রন্থ বলে।



ব্রাহ্মণনাম কর্মণস্তত্মন্ত্রাণাং
চ ব্যাখ্যানগ্রন্থ
(তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.৫.৭)

অর্থাৎ মন্ত্র সংহিতার ব্যাখ্যা করার জন্য যে গ্রন্থ লিখা হয়েছে তাই ব্রাহ্মণ গ্রন্থ।


তাদের এহেন উদ্ভট ধারনার কি কারন যে যেখানে ব্রাহ্মণ গ্রন্থ নিজেই বলছে তারা বেদের ব্যাখ্যা করার জন্য লিখিত গ্রন্থমাত্র সেখানে সে নিজেই কিভাবে বেদ হতে পারে? এর কারন হল এরা শাস্ত্র অধ্যয়ন ই করেনি।করলে জানত তৎকালীন সময়ে চার বেদের পর অন্যান্য প্রথিতযশা গ্রন্থসমূহকে বেদ, পঞ্চমবেদ ইত্যাদি নামে প্রায় প্রশংসাসূচক ডাকা হত।যেমন ধরুন Medical Science এর প্রথিতযশা Davidson's Principle&Practice Of Medicine কে পাশ্চাত্যে Medicine Bible বলা হয়।ঠিক তেমনি আমাদের প্রাচ্যে নাট্যবেদ,উপবেদ,ছন্দবেদ ইত্যাদি নামে প্রথিতযশা বইসমূহকে ভুষিত করা হত।যেমন মহাভারত,রামায়ণ কে পঞ্চমবেদ বলে ভূষিত করা হয়েছে।কিন্তু কোন উন্মাদও মহাভারতকে আসলেই বেদ বলে মনে করবেনা।


এসব অপপ্রচারকারীরা বেদ নিয়ে বিধর্মীদের যেকোন বিদ্রুপ,প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীসহ সকল আর্ষ বেদভাষ্যকারের দ্বারস্থ হন এবং বলেন সায়নের ভাষ্য ভুল।কিন্তু এই ক্ষেত্রে তারা আবার সায়নের আশ্রয় নিয়ে বলেন যে সায়নাচার্যও বলেছেন ব্রাহ্মণ গ্রন্থও বেদ তাই ব্রাহ্মণ কে বেদ মানতে হবে।অর্থাৎ বিপদের সময় সায়নকে ভুল মেনে দয়ানন্দজির আশ্রয় নিলেও ব্যবসার সময় তারা দয়ানন্দজিকে ভুলে গিয়ে সায়নের দোহাই দেন।কিন্তু মজার কথা হল সায়নাচার্য তাদের জন্য বিরাট দুঃখ রেখে গেছেন।

তিনি তৈত্তিরীয় সংহিতার ভাষ্য করার সময় লিখেছেন-

যদ্যপি মন্ত্রব্রাহ্মণাত্মকো বেদস্তথাপি। ব্রাহ্মণস্যমন্ত্রব্যখ্যারুপত্বান্মন্ত্রা এবাদো সমাম্নাতা।।
(তৈত্তিরীয় সংহিতা সায়নভাষ্য পৃষ্ঠা ৩)

অর্থাৎ মন্ত্র-ব্রাহ্মণকে যদিও বেদ বলা হয় তথাপি ব্রাহ্মণ হল আসলে মন্ত্রের ব্যাখ্যায় লিখিত গ্রন্থ,মন্ত্রের সমান নয়।



কাঠক সংহিতার ভাষ্যে সায়ন একই কথা লিখেছেন-

তত্র শতপথব্রাহ্মণস্য মন্ত্রয়াখ্যারুপত্বাদু ব্যাখ্যেয়মন্ত্র প্রতিপাদক সংহিতাগ্রন্থ পূর্বেভাবিত্বাত প্রথমো ভবতি

অর্থাৎ শতপথ ব্রাহ্মণসহ ব্রাহ্মণসমূহ প্রামাণিক সংহিতাগ্রন্থের ব্যাখা গ্রন্থ।





প্রাচীন বেদভাষ্যকার ভাস্কর তৈত্তিরীয় সংহিতার ভাষ্যে বলেছেন একই কথা-

ব্রাহ্মণ নাম কর্মণস্তন্মন্ত্রাণাং চ ব্যাখ্যানগ্রন্থ

অর্থাৎ বেদ তথা মন্ত্র সংহিতার ব্যাখ্যানগ্রন্থ ই হল ব্রাহ্মণ।



এজন্যে ঋষি জৈমিনী তার পূর্বমীমাংসায় বলেছেন-

মন্ত্রতস্তু বিরোধে স্ব্যাতপ্রয়োগরুপসামর্থ্যাদুৎপত্তি দেশ সঃ
(পূর্বমীমাংসা ৫.১.১৬)

অর্থাৎ যেহেতু এই মন্ত্র সংহিতার উৎপত্তি ঐশ্বরিক(এবং ব্রাহ্মণগ্রন্থের তা নয়) তাই মন্ত্রের সাথে ব্রাহ্মণের বিরোধে মন্ত্রের কথা ই শ্রেষ্ঠ মানতে হবে।



অর্থাৎ প্রাচীন সায়ন,ভাস্কর,জৈমিনি সহ সকলেই একবাক্যে মেনেছেন যে একমাত্র মন্ত্রসংহিতা ই বেদ/শ্রুতি(যা ধ্যানে শোনা হয়েছে,ঐশ্বরিক)।ব্রাহ্মণ গ্রন্থকে কেউ কেউ বেদ বলে উপমা দিলেও সবাই পরিস্কার করে দিয়েছেন যে এটা মনুষ্যরচিত গ্রন্থ মাত্র,ঐশ্বরিক কিছু নয়।

কালজয়ী গ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ীতে পাণিনি একই কথা বলেছেন-
পুরাণপ্রোক্তেষু ব্রাহ্মণকল্পেষু।।
(৪.৩.১০৪)

অর্থাৎ পুরাণতথা পুরাতন ঋষিরা ব্রাহ্মণ প্রোক্ত তথা রচনা করেছেন



শতপথ ব্রাহ্মণ এটাও স্পষ্ট করেছে যে ব্রাহ্মণ গ্রন্থ আসলে কি কি নিয়ে গঠিত-
গাথা ইতিহাসা পুরাকল্পশ্চ ব্রাহ্মণান্যেচ
(শতপথ ১৪.৭.২.১১,১২,১৩)

অর্থাৎ গাথা,ইতিহাস,পুরাণ এইসব নিয়ে ব্রাহ্মণ রচিত।

মীমাংসাসূত্র আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে-
তচ্চোদকেষু মন্ত্রাখ্যা
শেষে ব্রাহ্মণশব্দ
(
পূর্বমীমাংসা ২.১.৩৩)
অর্থাৎ ঈশ্বর যে বাণী প্রেরণ করেছেন তাই হল মন্ত্রসংহিতা আর এর শেষে যেসকল শব্দ রচিত হয়েছে ব্যখ্যা হিসেবে তা হল ব্রাহ্মণ।



ঋষি গৌতমও ন্যায়সুত্রে একই কথা বলেছেন-

তদপ্রামাণ্যমনৃণব্যাখ্যাতপুনরোক্তদোশেভ্য
(২.১.৫৬)

অর্থাৎ এই প্রামাণ্য মন্ত্রবেদের শেষে ব্যাখ্যানরুপ ব্রাহ্মণ গ্রন্থ পুনরায় লেখা হয়েছে বা উক্ত হয়েছে।



এবং আর একটি মন্ত্রে স্পষ্ট বেদ কে নিত্য বলা হয়েছে
"তস্মৈ নূনমভিদ্যবে বাচা বিরূপ নিত্যয়া"
ঋগবেদ ৮.৭৫.৬
" অত এব চ নিত্যম;তু নিত্য।"


সেহেতু কল্পান্তরে
তো এটা স্বাভাবিক যে, অপৌরুষেয় নিত্য বাণীতে কোন মনুষ্যের জীবনকাহিনী বা ইতিহাস থাকবে না। কারণ ইতিহাস তো কোন ব্যক্তির জন্মের পর তার জীবনের কৃত কর্মের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়ে থাকে। আর কল্পান্তরে ইতিহাস কখনো এক থাকে না এজন্য ইতিহাস সর্বদা অনিত্য। যেহেতু বেদ সর্বদা নিত্য , তাই অনিত্যাদি ইতিহাস যুক্তগ্রন্থ বেদ হতে পারে না।

অপরদিকে ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে বিভিন্ন যাজ্ঞবল্ক, মৈত্রেয়ী, জনকাদির ইতিহাস বর্নিত রয়েছে। আর কোন মনুষ্য জীবন ইতিহাস কোন দেহধারীর পক্ষেই লেখা সম্ভব। বিশেষতঃ ব্রাহ্মণগ্রন্থ দেহধারী পুরুষ কর্তৃক রচিত হবার কারনেই কখনো বেদ সঙ্গা প্রাপ্ত হতে পারে না। এই সকল গ্রন্থ ঈশ্বরোক্ত নয়। পরন্ত এগুলো মহর্ষিগণ কর্তৃক বেদের ব্যাখ্যা স্বরূপ লিখিত হয়েছে।

স্পষ্ট যে, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ বেদ নয় পরন্ত তার ব্যাখ্যাস্বরূপ লিখিত হয়েছে। এরূপ অনেক বেদ মন্ত্রের ব্যাখ্যা ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে পাওয়া যায়। যেমন-

ঋগবেদ ১।২৪।৩ এর ব্যাখ্যা ঐতেরীয় ব্রাহ্মণ ১।১৬ মধ্য, যজুর্বেদের ১ম মন্ত্রের ব্যাখ্যা শতপথ ১।৭।১ এ, তথা সামবেদ ১ম মন্ত্রের ব্যাখ্যা তাণ্ড্য  ব্রাহ্মণ ১১।২।৩ এর মধ্যে।

ঋষি অরবিন্দের মতেও এটা স্পষ্ট যে, বেদ মন্ত্র কোন ইতিহাসাদির বর্ণনা করে নি। বরং মন্ত্রগুলোর একটা উচ্চ আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে এটাই তিনি স্বীকার করেছেন।

মন্ত্রসংহিতা ই একমাত্র ব্রহ্ম প্রেরিত বাণী তা স্বয়ং বেদ নিজেই বলছে-
প্র নুনং ব্রহ্মণ স্বতির্মন্ত্রং বদত্যুক্তম
(যজুর্বেদ ৩৪/৫৭)

অর্থাৎ ব্রহ্ম স্বয়ং মন্ত্রের উপদেষ্টা।(ব্রাহ্মণ এর নন)

অর্থাৎ আমরা বুঝলাম যে প্রাচীন সায়ন,ভাস্কর,হরদত্ত জৈমিনি, পাণিনি,গৌতম সহ সকল বিখ্যাত ভাষ্যকার ই বলে গেছেন একমাত্র মন্ত্রসংহিতা ই ঐশ্বরিক গ্রন্থ,ব্রাহ্মণ গ্রন্থ মনুষ্য লিখিত যা বেদের তথা মন্ত্রসংহিতার ব্যখ্যামাত্র।সুতরাং যারা সায়নের নাম বেচে কলা খেতে চাইছেন তাদের জন্য একরাশ সমবেদনা।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ভিরদান্না— সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন সাইট

🏺 ভিররানা (Bhirrana) খননে কি পাওয়া গেছে? ভিররানা (বা ভিরদান্না) প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি হরিয়ানার (ফতেহাবাদ জেলায়) ঘগ্গর (পৌরাণিক সরস্বতী) ন...

Post Top Ad

ধন্যবাদ