অপঘ্নন্তো অরাব্ণঃ পবমানাঃ স্বর্দৃশঃ । যোগনাবৃতস্য সীদত ॥ ঋ০ ৯।১৩।৯
আধিদৈবিক ভাষ্য ১— 🌞✨ সূর্যলোকের উৎপত্তি রহস্য ✨🌞
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের মতোই দীপ্তিমান ও শুদ্ধ সোম পদার্থ (আরাব্ণঃ, অপরঘ্নন্তঃ) [আরাব্ণ = রা দানে (দেওয়া) ধাতু থেকে, বনিপ্ প্রত্যয়; নঞ্-সমাস] — যে সমস্ত পদার্থ সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে অক্ষম কিংবা বাধা সৃষ্টি করে, তাদের নষ্ট করে বা সরিয়ে দেয়। (ঋতস্য, যোনৌ, সীদত) [ঋতম্ = “ঋতমিত্যেষ (সূর্য:) বৈ সত্যম্” (ঐ.৪.২০), “ঋতমেব পরমেষ্ঠী” (তৈ.ব্রা.১.৫.৫.১), “অগ্নির্বা ঋতম্” (তৈ.ব্রা.২.১.১১.১)] — সূর্যলোকের সর্বোৎকৃষ্ট অগ্নিময় কেন্দ্রস্থল তথা সূর্যলোকের উৎপত্তি ও অবস্থানস্থলে বিরাজ করে।
📢ভাবার্থ— সূর্যলোক উৎপত্তির পূর্বে বিশাল খগোলীয় (মহাজাগতিক) মেঘের মধ্যে সোম রশ্মিগুলি বিশুদ্ধ অবস্থায় ব্যাপ্ত হতে থাকে। যখন এই সোম রশ্মিগুলি উত্তপ্ত হতে শুরু করে, তখন যে সব পদার্থ সূর্যলোক গঠনের জন্য সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে অক্ষম, কিংবা এতে বাধা দেয়, তাদের দূর করে দেয় বা বিনষ্ট করে। এভাবে সোম রশ্মিগুলি সমগ্র মহাজাগতিক মেঘে ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে সোম-প্রধান বিদ্যুৎযুক্ত ঋণাবিষ্ট কণাগুলিও সমগ্র মহাজাগতিক মেঘ এবং পরে সূর্যলোক জুড়ে ছড়িয়ে যায়।
আধিদৈবিক ভাষ্য ২— ⚡🌌 মহাবিশ্বের সূক্ষ্ম রহস্য 🌌⚡
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বিদ্যুতের মতো আচরণকারী, অর্থাৎ বিদ্যুতের মতো শুদ্ধ মার্গে গমনকারী সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণ (অপরঘ্নন্তঃ, আরাব্ণঃ) তাদের মার্গে (পথে) আসা এমন কণাগুলিকে, যারা সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না বা বাধা সৃষ্টি করে, সেগুলিকে সরিয়ে দেয়। (ঋতস্য, যোনৌ, সীদত) [ঋতম্ = “অগ্নির্বা ঋতম্” (তৈ.ব্রা.২.১.১১.১)] — এই কণাগুলি অগ্নির কারণরূপ প্রাণতত্ত্বে নিরন্তর অবস্থান করে, অর্থাৎ তারা প্রাণের মধ্যেই নিবাস করে এবং প্রাণের মাধ্যমেই গমন করে।
ভাবার্থ— এই ব্রহ্মাণ্ডে যে কণাগুলি প্রায় আলোর বেগে গতি করে, তারা তাদের পথে থাকা বাধাস্বরূপ পদার্থকে সরিয়ে দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গতিপথ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ তারা বিভিন্ন আয়ন বা ইলেকট্রনকে দূরে সরায় না, বরং তাদের সঙ্গে নির্গমন ও শোষণের ক্রিয়া করে নিরাপদে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। এই ক্রিয়ার কারণে তাদের আসল শুদ্ধ গতিতে সামান্য হ্রাস ঘটে। যদি অবশোষণ বা উত্সর্জক পদার্থ অধিক মাত্রায় বিদ্যমান হয়, তবে অনুপাতে সেই কণার গতিও কমে যেতে থাকে। বর্তমান বিজ্ঞানে পরিভাষিত (সংজ্ঞায়িত) ডার্ক ম্যাটার এই সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণের সঙ্গে কোনো প্রকার পারস্পরিক ক্রিয়া করে না। তাই এই পদার্থকে তারা বাধাহীনভাবে এড়িয়ে চলতে থাকে। এ ধরনের কণা বা বিকিরণ সূর্যাদি তারা সমূহ, অন্যান্য আকাশলোক, প্রাণীর দেহ, উদ্ভিদ কিংবা মুক্ত মহাশূন্য— সর্বত্র একই আচরণ করে।
✨ এভাবেই মহাবিশ্বের গোপন নিয়মে চলছে এক চিরন্তন খেলা ✨
ধ্যাতব্য— এখানে আমরা দুটি আধিদৈবিক ভাষ্য উপস্থাপন করেছি। অনুরূপভাবে ‘পবমান স্বর্দৃক্’ পদ থেকে নক্ষত্র, গ্রহাদি লোকের অর্থ নিয়ে আরও ভাষ্য করা যেতে পারে। ক্রমশঃ…
বেদের আসল অর্থ ও বৈজ্ঞানিক বিশদ বোঝার জন্য ‘বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞান’ গ্রন্থ পড়া অত্যন্ত জরুরি।
যতক্ষণ বেদের প্রকৃত রূপ জানা যাবে না, ততক্ষণ কোনো বেদভাষ্যকারও বেদের সাথে সঠিক বিচার করতে পারবে না।
⚠️ বেদভাষ্যকারদের প্রধান ভুল:
-
অনেক ভাষ্যকার শুধুমাত্র নিজের ধ্যান-ধারণা বা রীতিনীতির ভিত্তিতে বেদের অর্থ ব্যাখ্যা করেন।
-
তারা প্রায়ই ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, এবং নিরুক্ত গ্রন্থের গভীর জ্ঞান না নিয়ে অনর্থক বা দ্বন্দ্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেন।
-
এর ফলে পাঠক বিভ্রান্ত হন—কিছু পাঠক বেদ থেকে বিরক্ত হয়ে যান, আবার কিছু অজ্ঞ ব্যক্তি বেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে।
🐄 উদাহরণ – বেদে হিংসা ও পশু-बलি:
-
বেদের বিভিন্ন স্তোত্রে দেখা যায়, “গাই, ঘোড়া বা মানুষকে হত্যা করলে শাস্তি প্রাপ্য।”
-
কিন্তু অনেক ভাষ্যকার ‘গো’ বা ‘অশ্ব’ শব্দকে কেবল পশু হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, অথচ বেদে তা কখনো কখনো প্রাকৃতিক বা আকাশীয় শক্তি বোঝায়।
-
তাই বেদের মূল বক্তব্য ভাঙা বা ভুল ব্যাখ্যা ভাষ্যকারেরই অপরাধ।
📚 প্রয়োজনীয়তা:
-
বেদভাষ্যকারকে প্রথমে বেদকে বেদ থেকেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
-
যখন তা সম্ভব না হয়, তখন ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, নিরুক্ত ইত্যাদি আর্ষ গ্রন্থ থেকে অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
-
বৈদিক পদ, ধাতু ও প্রত্যয় জ্ঞানসহ প্রাঞ্জল ও যোগ্যতা সম্পন্ন বিদ্বানেরাই বেদভাষ্য করার অধিকারী।
🧘♂️ মৌলিক শর্ত:
-
সত্য, অহিংসা, ব্রহ্মচর্য ও ঈশ্বরপ্রেমময় জীবন যাপন না করে কেউ বেদভাষ্যকার হতে পারে না।
-
যোগ, নিয়ম ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন অবলম্বন করা বেদভাষ্যকারের জন্য অপরিহার্য।
✨ সারসংক্ষেপ:
আজকের দিনে অনেকেই অল্প জ্ঞান, অহংকার বা প্রভাবের আশ্রয়ে বেদভাষ্য করেন। কিন্তু প্রকৃত বেদভাষ্যকার হন সেই যারা নিজ জীবনে সত্য, অহিংসা ও আধ্যাত্মিক নিয়ম মেনে চলে এবং বেদের গভীর বিজ্ঞান ও অর্থ বুঝে ব্যাখ্যা করে।
এই মন্ত্রের আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।
আধিভৌতিক ভাষ্য ১ — রাজা ও দণ্ড
মন্ত্রের ব্যাখ্যা:
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের মতো দীপ্তিমান, বেদবিদ্যা সমৃদ্ধ, পবিত্র আত্মা ও পুরুষার্থী রাজা।
(অপঘ্নন্তঃ, আরাব্ণঃ) যারা ধনী হলেও রাষ্ট্রের কল্যাণে ন্যায়পরায়ণ রাজ্যের আদেশিত কর প্রদান না করে, কর চুরি করে, প্রয়োজনে দরিদ্র বা পরোপকারে অর্থ সহায়তা দেয় না, অথবা সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধী বা উদাসীন— তাদেরকে রাজা যথাযথ দণ্ড প্রদান করে। (ঋতস্য, যোগনৌ, সীদত) সমস্ত জ্ঞান-বিদ্যার মূল কারণ বেদের মাধ্যমে পরম ব্রহ্মের মধ্যে অবস্থান করে।
ভাবার্থ:
-
রাষ্ট্রের রাজা দেহ, মন ও আত্মা থেকে সুস্থ ও শক্তিশালী হতে হবে।
-
দুর্বল বা অসুস্থ রাজা রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম হতে পারে না।
-
জ্ঞান-বিদ্যা ছাড়া রাজা বিভ্রান্ত হতে পারে এবং নিজের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়।
-
যে রাষ্ট্রে দণ্ডনীয়দের শাস্তি ও সম্মানীয়দের সম্মান দেওয়া হয় না, সেই রাষ্ট্রে অরাজকতা, হিংসা, ভয়, অন্যায় ও বিভিন্ন কষ্ট দেখা দেয়।
মহর্ষি মনুর বাণী:
দণ্ডই প্রজাদের উপর শাসন করে, দণ্ডই প্রজাদের রক্ষা করে।
দণ্ড নিদ্রিতদের মধ্যেও সতর্ক থাকে; বুদ্ধিমানরা দণ্ডকেই ধর্ম মনে করে।
মহাত্মা বিদুরের বাণী:
ধনী হলেও দান না করা এবং দরিদ্র হলেও পরিশ্রম না করা ব্যক্তিকে ভারী পাথর বাঁধে গভীর জলাশয়ে ফেলে দেওয়া উচিত।-বিদুরনীতি ১।৬৫
পাঠ:
-
ধনী ব্যক্তি তার ধন ঈশ্বরের দান হিসেবে ব্যবহার করবে।
-
দরিদ্র ব্যক্তি ঈর্ষা করবে না, নিজের ধর্মানুযায়ী পরিশ্রম করবে এবং কষ্ট সহ্য করতে শিখবে।
আধিভৌতিক ভাষ্য ২ — শিক্ষক ও শাস্তি
মন্ত্রের ব্যাখ্যা:
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বেদবিদ্যা দ্বারা দীপ্তিমান, ব্রহ্মতেজ সমৃদ্ধ পবিত্র যোগী শিক্ষক বা শিক্ষিকা।
(অপঘ্নন্তঃ, আরাব্ণঃ) যারা বিদ্যা গ্রহণে অনীহা দেখায় বা অলসতা করে, তাদের যথাযথ শাস্তি প্রদান।
(ঋতস্য, যোগনৌ, সীদত) এমন শিক্ষকরা সত্য বিদ্যার মূল কারণ বেদ বা পরমাত্মার মধ্যে অবস্থান করেন।
ভাবার্থ:
-
যোগনিষ্ঠ জ্ঞানী শিক্ষক বা শিক্ষিকাই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য।
-
শিক্ষার্থীদের প্রীতিপূর্ণ ও নিষ্কলুষভাবে শিক্ষা দিতে হবে।
-
যারা বিদ্যা গ্রহণে অলস, তাদের যথাযথ শাস্তি প্রয়োজন।
-
শাস্তি ও লালন উভয়ই শিক্ষার্থীর গুণগত বিকাশে সহায়ক।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য — যোগী ও চিত্তশুদ্ধি
মন্ত্রের ব্যাখ্যা:
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) নিয়ম-কায়দা ও যম-নিয়মের দ্বারা পবিত্র যোগী,
(অপঘ্নন্তঃ, আরাব্ণঃ) সমস্ত অশুভ চিত্তপ্রবৃত্তি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করে।
(ঋতস্য, যোগনৌ, সীদত) যখন চিত্তের সমস্ত অশুভ প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন যোগী ব্রহ্মসাক্ষাৎকার লাভ করেন।
ভাবার্থ:
-
অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচার্য, অপরিগ্রহ, শৌচ, সন্তোষ, তপ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর-প্রণিধান অনুশীলনের মাধ্যমে চিত্তশুদ্ধি অর্জন হয়।
-
এর ফলে ব্রহ্মসাক্ষাৎকার সম্ভব হয়।
উপসংহার:
-
স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যম ও নিয়ম ছাড়া কেউ সত্যিকারের যোগী হতে পারে না।
লেখক মন্তব্য:
এই মন্ত্র এবং ভাষ্য আমাদের শিক্ষা দেয় যে রাজা, শিক্ষক ও যোগীর পবিত্রতা ও দায়িত্ব প্রতিটি স্তরে প্রযোজ্য। দণ্ড, শিক্ষা, এবং নিয়মিত আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে সমাজ ও ব্যক্তির সঠিক বিকাশ সম্ভব।

No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ