সদাচার বিনা সামাজিক ব্যবহার উত্তমতার সঙ্গে সফলই হবে না। সদাচারী মানুষই সমাজের মধ্যে সুখে থাকতে পারে। সত্যতা, শুদ্ধতা, চরিত্রশীলতা আর ব্রত আদির বিনা সমাজের মধ্যে মানুষদের নির্বাহই হবে না, এইজন্য সদাচার সবন্ধিত অনেক উপদেশ বেদের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। এখানে উদাহরণস্বরূপ কিছু মন্ত্র উদ্ধৃত করছি। ঋগ্বেদে লেখা রয়েছে -
সপ্ত মর্য়াদাঃ কবয়স্ত তক্ষুস্তাসামেকামিদভ্যম্হুরো গাত্।
আয়োর্হ স্কম্ভ উপমস্য নীळे পথাম্ বিসর্গে ধরুণেষু
তস্থৌ।। (ঋঃ ১০|৫|৬)
অর্থাৎ - হিংসা, চুরি, ব্যভিচার, মদ্যপান, জুয়া, অসত্য ভাষণ আর এই পাপীদের সহযোগিতাকারীদের নাম হল সপ্ত মর্যাদা। এগুলোর মধ্যে কেউ যদি একটাও মর্যাদার উলঙ্ঘন করে, অর্থাৎ একটাও পাপ করে, তবে সে হবে পাপী আর যে ধৈর্যের সঙ্গে এইসব হিংসাদি পাপগুলোকে ত্যাগ করে দেয় তার জীবনের স্তম্ভ নিঃসন্দেহে আদর্শ হয়ে যায় আর সে মোক্ষভাগী হয়।
উলূকয়াতুম্ শুশুলূকয়াতুম্ জহি শ্বয়াতুমুত
কোকয়াতুম্। সুপর্ণয়াতুমুত গৃধ্রয়াতুম্ দৃষদেব প্র মৃণ
রক্ষ ইন্দ্র।। (ঋঃ ৭|১০৪|২২)
অর্থাৎ - গরুড়ের সমান মদ (অহংকার), শকুনের সমান লোভ, কোক (পাখির) সমান কাম, কুকুরের সমান মৎসর (হিংসুটে), প্যাঁচার সমান মোহ (মূর্খতা) আর নেকড়ের সমান ক্রোধকে মেরে তাড়িয়ে দিন, অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মৎসর আদি ছয় বিকারকে নিজের অন্তঃকরণ থেকে সরিয়ে দিন।
এই হিংসা আদি বাহ্য আর কামাদি অন্তর্দুর্বাসনাগুলোকে ত্যাগ দ্বারাই মানুষ উত্তম সামাজিক হতে পারবে। এসবের মধ্যে সত্যের মহিমা হল মহান্। বেদ উপদেশ করছে যে -
শক্তুমিব তিতউনা পুনন্তো য়ত্র ধীরা মনসা বাচমক্রত।
অত্রা সখায়ঃ সখ্যানি জানতে ভদ্রৈষাম্
লক্ষ্মীর্নিহিতাধি বাচি।। (ঋঃ ১০|৭১|২)
অগ্নে ব্রতপতে ব্রতম্ চরিষ্যামি তচ্ছকেয়ম্ তন্মে
রাধ্যতাম্। ইদমহমনৃতাত্ সত্যমুপৈমি।।
(য়জুঃ ১|৫)
দৃষ্ট্বা রূপে ব্যাকরোত্সত্যানৃতে প্রজাপতিঃ।
অশ্রদ্ধামনৃতেऽ দধাচ্ছ্রদ্ধাঁসত্যে প্রজাপতিঃ।।
(য়জুঃ ১৯|৭৭)
য়দর্বাচীনম্ ত্রৈহায়ণাদনৃতম্ কিম্ চোদিম।
আপো মা তস্মাত্সর্বস্মাদ্ দুরিতাত্পাত্বম্হসঃ।
(অথর্বঃ ১০|৫|২২)
সুবিজ্ঞানম্ চিকিতুষে জনায় সচ্চাসচ্চ বচসী
পস্পৃধাতে। তয়োর্য়ত্সত্যম্
য়তরদৃজীয়স্তদিত্সোমোऽবতি হন্ত্যাসত্।।
(ঋঃ ৭|১০৪|১২)
অর্থাৎ - যেভাবে চালনি দিয়ে ছাতু চালা হয় সেইভাবে যেখানে বিদ্বানগণ নিজের বাণীকে মন দ্বারা শুদ্ধ করে বলেন, সেখানেই লক্ষ্মী আর মিত্রতা বাস করে। হে পরমেশ্বর! আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, আমি নিজের শক্তিভর সত্যের পালন করবো, তাই এই অসত্য থেকে বেরিয়ে সত্যতে আসছি। প্রজাপতি সত্য আর অসত্যকে ভেবেচিন্তে আলাদা করেছেন আর অসত্যতে অশ্রদ্ধা তথা সত্যতে শ্রদ্ধা উৎপন্ন করেছেন। তিন বর্ষের এইপারে যে মিথ্যা আমি বলেছি, হে পরমাত্মন্! সেসব দুষ্ফল পাপ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। মানুষের সুবিধার জন্য সত্য আর অসত্যের বিজ্ঞানকে একে-অপরের বিরুদ্ধ বলা হয়েছে। এই উভয়ের মধ্যে যা সত্য হবে সেটা সরল আর সোজা স্বভাবে বলা হয়ে থাকে তথা তাতে কোমলতা আসে, কিন্তু অসত্য হল সেটা যা সর্বপ্রকারে বিনাশই করে থাকে।
এই সত্যের প্রতিপাদনকারী মন্ত্রগুলো সত্যভাষণের সমস্ত বিশেষত্বগুলোকে সুন্দর বর্ণনা করে দিয়েছে। এরপর মধুর ভাষণের বিশেষত্বের বর্ণনা করা যাক -
জিহ্বায়া অগ্রে মধু মেম্ জিহ্বামূলে মধুকলম্।
মমেদহ ক্রতাবসো মম চিত্ত মুপায়সি।।
মধুমন্মে নিক্রমণম্ মধুমন্মে পরায়ণম্।
বাচা বদামি মধুমদ্ ভূয়াসম্ মধু সন্দৃশঃ।।
(অথর্বঃ ১|৩৪|২-৩)
অর্থাৎ - আমার জিহ্বার অগ্রভাগে মধুরতা হোক আর জিহ্বার মূলে মধুরতা হোক। হে মধুরতা! আমার কর্মে তোমার নিবাস হোক আর আমার মনের ভিতরও তুমি পৌঁছে যাও। আমার আসা-যাওয়া মধুর হোক, আমি যে ভাষা বলি সেটা মধুর হোক আর আমি স্বয়ং মধুর-মূর্তি হয়ে যাই।
এইপর্যন্ত সত্য আর মধুর বাণী বলার শিক্ষা দিয়ে এখন বেদ উপদেশ করছে যে, নিজের কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা অভদ্র, অসভ্য আর অমঙ্গল ব্যবহার যেন না হয়ে যায়, কিন্তু সব ব্যবহার ভদ্র আর ভদ্রই হয়। য়জুর্বেদ উপদেশ করছে যে-
ভদ্রম্ কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবা ভদ্রম্
পশ্যেমাক্ষভির্য়জত্রাঃ।
স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টুবাঁসস্তনূভির্ব্যশেমহি দেবহিতম্ য়দায়ুঃ।।
(য়জুঃ ২৫|২১)
অর্থাৎ - হে য়জ্ঞকারী পরমেশ্বরের ভক্ত বিদ্বানগণ! আমরা সর্বদা কল্যাণকারী শব্দই কান দিয়ে শুনবো, কল্যাণকারী দৃশ্যই চোখ দিয়ে দেখবো আর নিজের দৃঢ় অঙ্গগুলোর দ্বারা শরীর দিয়ে আজীবন সেই কর্ম করবো, যারদ্বারা বিদ্বানদের হিত হবে।
এরপর মনসা, বাচা, কর্মণা মন্দ থেকে বাঁচার উপদেশ করা হয়েছে। অথর্ববেদের মধ্যে লেখা রয়েছে -
ইদম্ য়ত্ পরমেষ্ঠিনম্ মনো বাম্ ব্রহ্মসম্শিতম্।
য়েনৈব সসৃজে ঘোরম্ তেনৈব শান্তিরস্তু নঃ।।
ইয়ম্ য়া পরমেষ্ঠিনী বাগ্দেবী ব্রহ্মসম্শিতা।
য়েয়ৈব সসৃজে ঘোরম্ তয়ৈব শান্তিরস্তু নঃ।।
ইমানি য়ানি পঞ্চেন্দ্রিয়াণি মনঃ ষষ্ঠানি মে হৃদি ব্রহ্মণা
সম্শিতানি। য়েরৈব সসৃজে ঘোরম্ তৈরেব শান্তিরস্তু
নঃ।। (অথর্বঃ ১৯|৯|৪,৩,৫)
অর্থাৎ - এটা যা জ্ঞান দ্বারা তীক্ষ্ণ নির্মিত মন রয়েছে আর যারদ্বারা ভয়ংকর প্রসঙ্গ উৎপন্ন হয়ে যায়, সেটা আমাদের শান্তি দিক। এটা যা ব্রাহ্মণের দ্বারা সংস্কৃত হওয়া পরমেষ্ঠিনী বাণী রয়েছে আর যারদ্বারা ভয়ংকর প্রসঙ্গ উৎপন্ন হয়ে যায়, সেটা আমাদের শান্তি দিক। এটা যা পাঁচ জ্ঞান অথবা কর্মেন্দ্রিয় রয়েছে আর যারদ্বারা ষষ্ঠ মনের সঙ্গে ভয়ংকর পাপ হয়ে যায়, সেটা আমাদের শান্তি দিক।
এইভাবে এই মন্ত্রগুলো মনসা, বাচা আর কর্মণা পাপ থেকে বাঁচতে আর শান্তিতে থাকার উত্তম উপদেশ দিয়েছে। এইসব মন, বাণী আর কর্মের মধ্যে মনই হল প্রধান। তার দ্বারাই সকল পাপ উৎপন্ন হয়ে থাকে, এইজন্য মনকে নিষ্পাপ করার উপদেশ এইভাবে দেওয়া হয়েছে -
পরোऽপেহি মনস্পাপ কিমশস্তানি শম্সসি।
পরেহি ন ত্বা কাময়ে বৃক্ষাম্ বনানি সম্চর গৃহেষু গোষু
মে মনঃ।। (অথর্বঃ ৬|৪৫|১)
অর্থাৎ - হে আমার মনের পাপ! তুমি আমার থেকে দূরে চলে যাও। আমার সঙ্গে খারাপ কথা কেন বলো? আমি তোমাকে চাই না, এইজন্য আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাও আর যেখানে বন-বৃক্ষ রয়েছে সেখানে চলে যাও, কারণ আমি আমার শরীর, ইন্দ্রিয় আর মনের মধ্যে চিত্ত লাগাচ্ছি।
এইভাবে মন সম্বন্ধিত ঈর্ষা-দ্বেষ থেকে বাঁচারও উপদেশ করা হয়েছে। অথর্ববেদের মধ্যে বলা হয়েছে -
য়থা ভূমির্মৃতমনা মৃতান্মৃতমনস্তরা।
য়থোত মম্রুষো মন এবের্ষ্যোর্মৃতম্ মনঃ।।
(অথর্বঃ ৬|১৮|২)
অর্থাৎ - যেরকম পৃথিবী মৃতক হতেও অধিক মননশক্তিশূন্য আর যেরকম মৃত ব্যক্তির মনও শূন্য হয়ে যায় সেইরকম ঈর্ষাকারীর মনও মৃত হয়ে যায়।
এই উপদেশের তাৎপর্য হল এটাই যে, ঈর্ষা-দ্বেষ মনের মহানতা নষ্ট করে দেয়। সেটা অত্যন্ত সঙ্কুচিত হয়ে যায়, মরে যায় আর নিন্দাও হয়। নিন্দার থেকে বাঁচতে বেদ উপদেশ করছে যে -
অয়ুতোऽহময়ুতো ম আত্মায়ুতম্ মে চক্ষুরয়ুতম্ মে
শ্রোত্রময়ুতো মে প্রাণোऽয়ুতো মে পানোऽ য়ুতো মে
ব্যানোऽয়ুতোऽহম্ সর্বঃ।। (অথর্বঃ ১৯|৫১|১)
অর্থাৎ - আমি অনিন্দিত হবো, আমার আত্মা অনিন্দিত হোক আর আমার চক্ষু, শ্রোত্র, প্রাণ, অপান তথা ব্যান অনিন্দিত হোক।
এরপর বেদমন্ত্রের মধ্যে ব্যভিচার আদি দুষ্ট কর্মকে ত্যাগ করার শিক্ষা এইভাবে দেওয়া হয়েছে -
মা পৃণন্তো দুরিতমেন আরন্মা জারিষুঃ সূরয়ঃ
সুব্রতাসঃ। অন্যস্তেষাম্ পরিধিরস্তু কশ্চিদপৃণন্তমভি
সম্ য়ন্তু শোকাঃ।। (ঋঃ ১|১২৫|৭)
অর্থাৎ - দুষ্ট কর্ম করো না আর প্রতিষ্ঠিত তথা ধর্মাত্মার মধ্যে ব্যভিচার করো না, কারণ ব্যভিচারীদের জন্য আলাদা বিধানও রয়েছে, যারদ্বারা তারা শোক প্রাপ্ত হয়ে থাকে।
এরপর হিংসার নিষেধ এইভাবে রয়েছে -
অনাগোহত্যা বৈ ভীমা কৃত্যে মা নো গামশ্বম্ পুরুষম্
বধীঃ। য়ত্র য়ত্রাসি নিহিততা ততস্ত্বোত্থাপয়ামসি
প্রণাল্লঘীয়সী ভব।। (অথর্বঃ ১০|১|২৯)
য়েऽশ্রদ্ধা ধনকাম্যা ক্রব্যাদা সমাসতে।
তে বা অন্যেষাম্ কুম্ভীম্ পর্য়াদধতি সর্বদা।।
(অথর্বঃ ১২|২|৫১)
অর্থাৎ - হে হিংসে! নির্দোষীদের হত্যা নিশ্চয়ই মহাভয়ানক, অতঃ তুমি আমাদের গৌ, অশ্ব, পুরুষদের মেরো না। যেখানে-যেখানে তুমি গুপ্তরূপে লুকাবে সেখান-সেখান থেকে আমি তোমাকে বের করছি, অতঃ তুমি পত্র থেকেও অধিক হালকা হয়ে যাও। অশ্রদ্ধাকারী যে ধনের কামনায় মাংস ভক্ষকদের সঙ্গ দেয়, সে সর্বদা অন্যেরই হাঁড়ির খেয়ে থাকে।
এই মন্ত্রগুলোর মধ্যে পশুবধ আর মাংস ভক্ষণের নিষেধ করা হয়েছে। এরপর মদ্যের নিষেধ এইভাবে রয়েছে -
হৃত্সু পীতাসো য়ুধ্যন্তে দুর্মদাসো ন সুরায়াম।
ঊধর্ন নগ্না জরন্তে।।
(ঋঃ ৮|২|১২)
অর্থাৎ - মদ্যপান করা দুষ্ট ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে লড়াই করে আর নগ্ন হয়ে ব্যর্থ অনর্গল কথা বলে, এইজন্য মদ্যপান করা ভালো নয়।
যেরকম মদ্যপান করা খারাপ সেইরকম জুয়া খেলায়ও খারাপ। বেদ উপদেশ করেছে -
জায়া তপ্যতে কিতবস্য হীনা মাতা পুত্রস্য চরতঃ ক্ব
স্বিত্। ঋণাবা বিভ্যদ্ধনমিচ্ছমানোऽন্যেষামস্তমুপ
নক্তমেতি।। (ঋঃ ১০|৩৪|১০)
অর্থাৎ - জুয়ারীর স্ত্রী কষ্টময় অবস্থার কারণে দুঃখী থাকে, পথে-ঘাটে জুয়ারীর মাতা কেঁদে বেড়ায়, ঋণে ডুবা জুয়ারী স্বয়ং সর্বদা ভয় পেতে থাকে আর ধনের আশায় রাতের অন্ধকারে অন্যের গৃহে চুরি করতে পৌঁছায়, এইজন্য জুয়া খেলা অত্যন্ত খারাপ।
এইভাবে চুরি করাকেও খারাপ বলা হয়েছে। অথর্ববেদে বলা হয়েছে -
য়েऽমাবাস্যাম্৩ রাত্রিমুদস্থুর্ব্রাজমত্রিণঃ।
অগ্নিস্তুরীয়ো য়াদুহা সো অস্মভ্যমধি ব্রবত্।।
(অথর্বঃ ১|১৬|১)
অর্থাৎ - যেসব শয়তান, ক্ষুধাতুর আর বিচরণকারী রাতের অন্ধকারে গ্রামের ভিতর চুরি আর ডাকাতি করার জন্য আসে, তাদের থেকে বাঁচার জন্য রাজপুরুষ সকলকে সাবধান করে দেয় আর তাদের মেরে ফেলে, এইজন্য কখনও কিছু চুরি করা উচিত নয়।
এই পর্যন্ত স্থূল সদাচারের বর্ণনা করে এখন সভ্যতা-সম্বন্ধিত সদাচারের বর্ণনাতে আসা যাক। সভ্যতার মধ্যে সর্বপ্রথম বিষয় হল স্বচ্ছতা আর পবিত্রতা, এইজন্য বেদ উপদেশ করেছে -
দ্রুপদাদিব মুমুচানঃ স্বিন্নঃ স্নাতো মলাদিব।
পূতম্ পবিত্রেণেবাজ্যমাপঃ শুন্ধন্তু মৈনসঃ।।
(য়জুঃ ২০|২০)
পুনন্তু মা দেবজনাঃ পুনন্ত মনসা ধিয়ঃ।
পুনন্তু বিশ্বা ভূতানি জাতবেদঃ পুনীহি মা।।
(য়জুঃ ১৯|৩৯)
অর্থাৎ - যেভাবে বৃক্ষ থেকে শুকনো পাতা পরে যায়, যেভাবে ঘেমে যাওয়া ব্যক্তি স্নান করে তার শরীরের মল ধুয়ে ফেলে আর যেভাবে ঘী দিয়ে পবিত্রতা হয়, ঠিক সেইভাবে হে জল! আমার শরীর, বস্ত্র আর গৃহের মলকে শুদ্ধ করে দাও। আমাকে বিদ্বান্ পবিত্র করুক। আমার মন আর বুদ্ধিকে পবিত্র করুক। সংসারের সমস্ত প্রাণী আমাকে পবিত্র করুক আর এই অগ্নি আমাকে পবিত্র করুক।
এই স্বচ্ছতা আর পবিত্রতার উপদেশের পরে সদাচার সম্বন্ধিত দিনচর্চার উপদেশ এইভাবে রয়েছে -
শ্রদ্ধাম্ প্রাতর্হবামহে শ্রদ্ধাম্ মধ্যন্দিনম্ পরি।
শ্রদ্ধাম্ সূর্য়স্য নিম্রুচি শ্রদ্ধে শ্রদ্ধাপয়েহ নঃ।।
(ঋঃ ১০|১৫১|৫)
সুগুরসত্সু হিরণ্যঃ স্বশ্বো বৃহদস্মৈ বয় ইন্দ্রো দধাতি।
য়স্ত্বায়ন্তম্ বসুনা প্রাতরিত্বো মুক্ষীজয়েব
পদিমুত্সিনাতি।। (ঋঃ ১|১২৫|২)
প্রাতা রত্নম্ প্রাতরিত্বা দধাতি তম্ চিকিত্বান্প্রতিগৃহ্যা নি
ধত্তে। তেন প্রজাম্ বর্ধয়মান আয়ু রায়ষ্পোষেণ সচতে
সুবীরঃ।। (ঋঃ ১|১২৫|১)
অর্থাৎ - আমি প্রাতঃকাল শ্রদ্ধার পূজা করি, আমি মধ্যদিনে শ্রদ্ধার পূজা করি আর আমি সূর্য়াস্ত হলে শ্রদ্ধার পূজা করি, এইজন্য হে শ্রদ্ধে! তুমি শ্রদ্ধার জন্য আসো। যে প্রাতঃকালে ওঠে তাদের সুন্দর গৌ, সোনা, অশ্ব আর দীর্ঘ আয়ু প্রাপ্ত হয় আর তাকে সূর্যদেবতা বসুর দ্বারা এইভাবে বেঁধে দেন যেরকম কেউ কাউকে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেয়, অর্থাৎ প্রাতঃকাল ওঠার অভ্যাস করায় সূর্য স্বয়ংই উঠিয়ে দেয়। প্রাতঃকালে ওঠা ব্যক্তি অনেক প্রকারের রত্ন প্রাপ্ত করে থাকে, এইজন্য বুদ্ধিমান্ মনুষ্য সেই সময়টিকে ধরে রাখে, কারণ প্রাতঃকাল জাগরণ দ্বারা প্রজা, আয়ু, ধন, পুষ্টি বাড়ে আর বীরতা আসে।
এইভাবে দিনচর্চার বর্ণনা করে এখন সদাচারের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধিত উদারতা, অর্থাৎ দানের বর্ণনা করা যাক -
তবোতিভিঃ সচমানা অরিষ্টা বৃহস্পতে মঘবানঃ
সুবীরাঃ। য়ে অশ্বদা উত বা সন্তি গোদা য়ে বস্ত্রদাঃ
সুভগাস্তেষু রায়ঃ।। (ঋঃ ৫|৪২|৮)
অনুপূর্ববত্সাম্ ধেনুমনঙ্বাহমুপবর্হণম্।
বাসো হিরণ্যম্ দত্ত্বা তে য়ন্তি দিবমুত্তমাম্।।
(অথর্বঃ ৯|৫|২৯)
অর্থাৎ - হে বৃহস্পতে! যে আপনার রক্ষায় সম্বন্ধ রাখে, সে দুঃখ হতে রহিত, ধনবান্ আর পুত্র-পৌত্রকারী হয়ে থাকে, আর যে গৌ, অশ্ব আর বস্ত্রের দান করে সে সৌভাগ্যশালী হয়ে থাকে, আর তার গৃহে সর্বদা অনেক প্রকারের ধন প্রস্তুত থাকে। যে দুগ্ধদাতা গৌ, বোঝা টানা ষাঁড়, শিরের নিচে রাখা টাকিয়া, বস্ত্র আর সুবর্ণ দান করে, তার উত্তম গতি প্রাপ্ত হয়।
এই উদারতা আর দান সম্বন্ধিত উপদেশের পরে এখন সদাচারের মূল সৎসঙ্গের বর্ণনা দেখা যাক। ঋগ্বেদের লেখা রয়েছে যে -
নাকস্য পৃষ্ঠে অধি তিষ্ঠতি শ্রিতো য়ঃ প্রিণাতি স হ
দেবেষু গচ্ছতি। তস্মা আপো ঘৃতমর্ষন্তি
সিন্ধবস্তস্মা ইয়ম্ দক্ষিণা পিন্বতে সদা।।
(ঋঃ ১|১২৫|৫)
অর্থাৎ - যে সর্বদা বিদ্বানদের নিকট থাকে সে সুখদায়ক স্বর্গের মধ্যে নিবাস করে, যেখানে অপতত্ব (ইথর) স্থান দেয় আর সূর্যকিরণ দক্ষিণা দেয়।
এই মন্ত্রের মধ্যে বিদ্বানদের সঙ্গে সৎসঙ্গের ফল বলে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিদ্বানদের দক্ষিণা দিয়ে তাদের সেবা করার ফলও বলে দেওয়া হয়েছে। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে -
দক্ষিণাবতামিদিমানি চিত্রা দক্ষিণাবতাম্ দিবি সূর্য়াসঃ।
দক্ষিণাবন্তো অমৃতম্ ভজন্তে দক্ষিণাবন্তঃ প্র তিরন্ত
আয়ুঃ।। (ঋঃ ১|১২৫|৬)
দক্ষিণাবান্প্রথমো হূত ইতি দক্ষিণাবান্গ্রামণীরগ্রমেতি।
টমেব মন্যে নৃপতিম্ জনানাম্ য়ঃ প্রথমো
দক্ষিণাবিবায়া।। (ঋঃ ১০|১০৭|৫)
দক্ষিণাশ্বম্ দক্ষিণা গাম্ দদাতি দক্ষিণা চন্দ্রমুত
য়দ্ধিরণ্যম্। দক্ষিণান্নম্ বনুতে য়ো ন আত্মা দক্ষিণাম্
বর্ম কৃণুতে বিজানন্।। (ঋঃ ১০|১০৭|৭)
অর্থাৎ - দক্ষিণাবান্ পুরুষদের নানা প্রকারের সুখ, সূর্যের সমান ঐশ্বর্য আর অমৃতের সমান ফল তথা দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত হয়। যিনি প্রথম শ্রেণীর দক্ষিণাবান্ হন তাকে সর্বপ্রথম আহ্বান করা হয়, তিনিই গ্রামের প্রধান হন, আর তিনিই রাজার নিকট সম্মান পান। যিনি বিদ্বানগণের দক্ষিণাতে অশ্ব, গৌ, সোনা, রুপো আর অন্ন দান করেন, তার জন্য এই দক্ষিণা ঢালের সমান কাজে লাগে - তার রক্ষা করে।
এই সদাচার সম্বন্ধিত সমস্ত ব্যবহার তখনই সম্পন্ন হতে পারে যখন মানুষ ব্রতধারী হবে, যার সংকল্প দৃঢ় হবে আর যে সর্বদা নিজের সিদ্ধান্তের উপর স্থির থাকবে। এই ব্রতের মহত্ব বলার সঙ্গে বেদ উপদেশ করেছে -
ব্রতেন দীক্ষামাপ্নোতি দীক্ষয়াপ্নোতি দক্ষিণাম্।
দক্ষিণা শ্রদ্ধামাপ্নোতি শ্রদ্ধয়া সত্যমাপ্যতে।।
(য়জুঃ ১৯|৩০)
অর্থাৎ - মানুষ ব্রত দ্বারা দীক্ষাবান্ হয়, দীক্ষা দ্বারা দক্ষিণাবান্ হয়, দক্ষিণা দ্বারা শ্রদ্ধাবান্ হয় আর শ্রদ্ধা দ্বারা সত্যকে, অর্থাৎ মোক্ষকে প্রাপ্ত করে।
এইভাবে এই ব্রতই হল সদাচারের মূল। যিনি ব্রতধারী হন - দৃঢ় প্রতিজ্ঞাকারী হন - তিনিই সদাচারের মধ্যে সফলতা প্রাপ্ত করতে পারবেন, কিন্তু স্মরণে রাখতে হবে যে, এই দৃঢ়তা আর এই ধরনের ব্রত বিনা কোনো নিয়মিত অভ্যাস ছাড়া হওয়া সম্ভব নয় আর বিনা সংস্কারে অভ্যেস হওয়া সম্ভব নয়।

No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ