যেভাবে সদাচারের বর্ণনা করা হয়েছে সেভাবে সদাচারী মানুষ সমাজে ততক্ষণ পর্যন্ত উৎপন্ন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে উত্তম সংস্কার দ্বারা জন্ম থেকেই সংস্কৃত না করা হয়। সংস্কারের অর্থ হল মন, বাণী আর শরীরের সচ্ছতা, এইজন্য মানুষকে জন্ম থেকেই নয় বরং জন্মের পূর্ব থেকেই সংস্কার হওয়া উচিত। এখানেই শেষ নয়, বরং যেসব স্ত্রী-পুরুষের দ্বারা গর্ভাধান হবে তাদেরও ভালোভাবে সুসংস্কৃত হতে হবে। এটা বলার তাৎপর্য হল যে, বিবাহই সমস্ত সংস্কারের মূল সেটা বুঝে নেওয়া উচিত। বিবাহ করবে এমন বর-বধূর কি যোগ্যতা হবে, তাদের কি আয়ু হবে আর তাদের কি কর্তব্য হবে - এইসব বিষয় সংস্কারের আরম্ভের পূর্বেই স্থির করে দেওয়া হয়েছে, এইজন্য আমি এখানে এই বিষয়গুলো এই ক্রম থেকেই বর্ণনা করবো। বেদের আজ্ঞানুসারে সবার প্রথম সংস্কারই হল বিবাহ আর বিবাহের মধ্যে সবার প্রথম কথাটি বর-বধূর যোগ্যতা হবে, অতএব আমি বেদের মন্ত্র উদ্ধৃত করছি যারমধ্যে বিবাহ করবে এমন বর-বধূর যোগ্যতার বর্ণনা রয়েছে। অথর্ববেদের মধ্যে লেখা রয়েছে যে -
শুদ্ধাঃ পূতা য়োষিতো য়জ্ঞিয়া ইমা ব্রহ্মণাম্ হস্তেষু
প্রপৃথক্ সাদয়ামি। য়ত্কাম ইদমভিষিঞ্চামি
বোऽহমিন্দ্রো মরুত্বান্ত্স দদাতু তন্মে।।
(অথর্বঃ ৬|১২২|৫)
অর্থাৎ - শুদ্ধ, পবিত্র আর পূজনীয় এই স্ত্রীদের আমি জ্ঞানীদের হাতে আলাদা-আলাদা ভাবে হস্তান্তর করছি আর যে কামনার জন্য আমি তোমার এই অভিষেক করছি, সকল দেবতা আমার সেই কামনা পূর্ণ করুক।
এই মন্ত্রের মধ্যে বিবাহ করবে এরকম কন্যাকে শুদ্ধ, পবিত্র আর পূজনীয় বলা হয়েছে আর যার সঙ্গে বিবাহ হবে তাকে জ্ঞানী বিদ্বান বলা হয়েছে। এতে জ্ঞাত হচ্ছে যে, যেকোনো প্রকারের যোগ্য কন্যা আর বরের বিবাহই হল বৈদিক, অযোগ্যদের নয়, কারণ অবোধ কন্যা স্বয়ং নিজের যোগ্য বরের জন্য নিজের অভিপ্রায় প্রকট করতে পারবে না, কিন্তু বেদ উপদেশ করছে যে, যোগ্য কন্যা তার নিজের বর নিজেই বেছে নিক। ঋগ্বেদের মধ্যে লেখা রয়েছে -
কিয়তী য়োষা মর্য়তো বধূয়োঃ পরিপ্রীতা পন্যসা
বার্য়েণ। ভদ্রা বধূর্ভবতি য়ত্সুপেশাঃ স্বয়ম্ সা মিত্রম্
বনুতে জনে চিত্।। (ঋঃ ১০|২৭|১২)
অর্থাৎ - বধূ হবে এমন অনেক স্ত্রী যারা ভদ্র আর সুরূপা হয়ে থাকে মানুষের যোগ্যতাকে পছন্দ করে নিজের মিত্রকে (পতিকে) জনসমুহ থেকে স্বয়ং বেছে নেয়।
এই মন্ত্রের মধ্যে পতিবরণ করতে কন্যাদের স্বতন্ত্রতা দেখা যাচ্ছে। এরপর বিবাহের সময়ে কন্যার আয়ুর উপদেশ এইভাবে রয়েছে -
সোমঃ প্রথমো বিবিদে গন্ধর্বো বিবিদ উত্তরঃ।
তৃতীয়ো অগ্নিষ্টে পতিস্তুরীয়স্তে মনুষ্যজাঃ।।
সোমো দদদ্ গন্ধর্বায় গন্ধর্বো দদদগ্নয়ে।
রয়িম্ চ পুত্রাম্শ্চাদাদগ্নির্মহ্যমথো ইমাম্।।
(ঋঃ ১০|৮৫|৪০-৪১)
অর্থাৎ - প্রথম পতি হল সোম, দ্বিতীয় হল গন্ধর্ব, তৃতীয় হল অগ্নি আর চতুর্থ হল মানুষ। সোম দেয় গন্ধর্বকে, গন্ধর্ব দেয় অগ্নিকে আর অগ্নি ধন আর পুত্রের জন্য আমাকে দেয়।
এই মন্ত্রের দ্বারা বলে দেওয়া হয়েছে যে, সোম, গন্ধর্ব আর অগ্নির উপভোগের পরে কেবল সন্তানের জন্যই বিবাহ হওয়া উচিত। এই মন্ত্রের অর্থ করে অত্রিস্মৃতিতে বলা হয়েছে যে, মানুষের পূর্বে কন্যাকে সোম, গন্ধর্ব আর অগ্নি আদি দেবতা ভোগে, অর্থাৎ রোমকালে সোম, স্তনকালে গন্ধর্ব আর রজোদর্শণ কালে অগ্নির প্রভাব থাকে, এইজন্য কন্যার বিবাহ রোম, স্তন আর রজোদর্শনের পরেই বিবাহ হওয়া উচিত (অত্রিস্মৃতি ১৯৪)। এইভাবে কন্যার আয়ু বলার পর বরের আয়ুর জন্য ঋগ্বেদ উপদেশ করেছে -
য়ুবা সুবাসাঃ পরিবীত আগাত্স উ শ্রয়ান্ভবতি
জায়মানঃ। তম্ ধীরাসঃ কবয় উন্নয়ন্তি
স্বাধ্যো৩মনসা দেবয়ন্তঃ।। (ঋঃ ৩|৮|৪)
অর্থাৎ - যে যুবকাবস্থাকে প্রাপ্ত হয়ে, বিদ্যা পড়ে আর য়জ্ঞোপবীত তথা সুন্দর বস্ত্র পরে আসে সে-ই শ্রেয়কে পেয়ে প্রসিদ্ধ হয় আর তাকেই বিদ্বান্ তথা ধীর পুরুষ অন্তঃকরণ দ্বারা উৎপন্ন করেন আর বড়ো মানেন।
এই মন্ত্রতে সমাবর্তন সময়ে আয়ুর বর্ণনা রয়েছে। সমাবর্তনের পরেই বিবাহ হয়, যারদ্বারা স্পষ্ট হচ্ছে যে, বিবাহের সময়ে পুরুষও যুবক হতে হবে, কারণ যদি বিবাহ করার যোগ্য আর যুবকাবস্থা প্রাপ্ত না হয় তবে সে নিজের কর্তব্য বুঝে পরস্পর প্রতিজ্ঞা করতে পারবে না। বর-বধূর পরস্পর বৈবাহিক প্রতিজ্ঞাগুলো বেদমন্ত্রের মধ্যে খুবই ভালোভাবে দর্শানো হয়েছে। বিবাহের সময় বর প্রতিজ্ঞা করে যে -
গৃহ্বামি তে সৌভগত্বায় হস্তম্ ময়া পত্যা
জরদষ্টির্য়থাসঃ। ভগো অর্য়মা সবিতা পুরন্ধির্মহ্যম্
ত্বাদুর্গার্হপত্যায় দেবাঃ।। (অথর্বঃ ১৪|১|৫০)
ভগস্তে হস্তমগ্রহীত্ সবিতা হস্তমগ্রহীত্। পত্নী ত্বমসি
ধর্মণাহম্ গৃহপতিস্তব।। (অথর্বঃ ১৪|১|৫১)
অর্থাৎ - ভগ, অর্য়মা , সবিতা আর পুরন্ধি আদি দেবতাগণ আমাকে গার্হপত্যের জন্য তোমাকে দিয়েছে, অতএব আমি সৌভাগ্যের জন্য তোমার হাত ধরছি। তুমি বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকো। ভগ আর সবিতা আদি দেবতাগণ আমাকে তোমার সঙ্গে ধরিয়েছে, এইজন্য এখন তুমি ধর্ম দ্বারা আমার পত্নী হলে আর আমি ধর্ম দ্বারা তোমার স্বামী হলাম।
বরের এই প্রতিজ্ঞার পরে বধূ প্রতিজ্ঞা করছে যে -
অভি ত্বা মনুজাতেন দধামি মম বাসসা।
য়থাসো মম কেবলো নান্যাসাম্ কীর্তয়াশ্চন।।
(অথর্বঃ ৭|৩৭|১)
অহম্ বদামি নেত্ ত্বম্ সভায়ামহ ত্বম্ বদ।
মমেদসস্ত্বম্ কেবলো নান্যাসাম্ কীর্তয়াশ্চন।।
(অথর্বঃ ৭|৩৮|৪)
অর্থাৎ - হে মননশীল পুরুষ! আমি তোমাকে নিজের বস্ত্র দ্বারা বাঁধছি আর অন্য স্ত্রীদের কখনও কথা বলো না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি আর এই সভাতে তুমিও প্রতিজ্ঞা করো যে যারদ্বারা তুমি আমারই হবে আর অন্য স্ত্রীদের কখনও কথা বলবে না।
এই প্রকারের এই প্রতিজ্ঞাবচনের পরেই বিবাহ হয়ে যায়। বিবাহ হয়ে গেলে মাতা-পিতার উচিত যে তারা যেন বর-বধূকে আবশ্যক পদার্থ দেন। এই বিষয়কে বেদমন্ত্র সূর্যের আলোঙ্কার দিয়ে এইভাবে বলেছে -
চিত্তিরা উপবর্হণম্ চক্ষুরা অভ্যঞ্জনম্।
দ্যৌর্ভূমিঃ কোশ আসীদ্ য়দয়াত্ সুর্য়া পতিম্।।
(অথর্বঃ ১৪|১|৬)
য়া অকৃন্তন্নবয়ন্ য়াশ্চ তত্নিরে য়া দেবীরত্নাঁ
অভিতোऽদদন্ত। তাস্ত্বা জরসে সম্ ব্যয়ন্ত্বায়ুষ্মতীদম্
পরি ধত্স্ব বাসঃ।। (অথর্বঃ ১৪|১|৪৫)
কৃত্রিমঃ কণ্টকঃ শতদন্ য় এষঃ।
অপাস্যাঃ কেশম্ মলমপ শীর্ষণ্যম্ লিখাত্।।
(অথর্বঃ ১৪|২|৬৮)
অর্থাৎ - যখন সূর্য়া (কন্যা) পতিকে প্রাপ্ত করবে তখন চৈতন্য-বুদ্ধিই ওঢ়না হবে, দর্শনশক্তিই অঞ্জন হবে আর ভূমি ও আকাশের সম্পুটই ঝাঁপি হবে। যেসব স্ত্রীগণ সূত কেটেছে, যারা টেনেছে, যারা বুনেছে আর যেসব দেবীগণ আঞ্জল ক্বাথ (তাঁতে বোনা বস্ত্র) করেছে, সেসব স্ত্রীগণ কন্যাকে বস্ত্র পরাবে আর বলবে যে, হে আয়ুষ্মতী বধূ! তুমি এটা পরে নাও। কৃত্রিম কাঁটা দিয়ে নির্মিত অনেক দাঁতের এই যে চিরুনি রয়েছে সেটা বধূর কেশের আর মাথার মলকে বের করে দিক।
এইভাবে অঞ্জন, ঝাঁপি, ওঢ়না, ক্বাথ (তাঁতে বোনা) বস্ত্র আর চিরুনি আদি আবশ্যক পদার্থ বধূকে দিতে হবে আর ভালো বাহনে বসিয়ে তাকে পতির গৃহে বিদায় করা হবে।
বেদ আজ্ঞা দেয় যে -
রুক্মপ্রস্তরণম্ বহ্যম্ বিশ্বা রূপাণি বিভ্রতম্।
আরোহত্ সুর্য়া সাবিত্রী বৃহতে সৌভগায় কম্।।
(অথর্বঃ ১৪|২|৩০)
অর্থাৎ - নকশা করা চাদর বিছানো সাজগাড়ী যা অনেক প্রকার পদার্থে সুসজ্জিত করা হয়েছে তার উপর সৌভাগ্যবতী বধূ পতির গৃহে যাওয়ার জন্য আরোহণ করুক। যেসময় বধূ বাহনে চরে যাবে সেসময় বিদ্বান্ আশীর্বাদ করবে যে -
ব্রহ্মাপরম্ য়ুজ্যতাম্ ব্রহ্ম পূর্বম্ ব্রহ্মান্ততো মধ্যতো
ব্রহ্ম সর্বতঃ। অনাব্যাধাম্ দেবপুরাম্ প্রপদ্য শিবা
স্যোনা পতিলোকে বি রাজ।। (অথর্বঃ ১৪|১|৬৪)
য়থা সিন্ধুর্নদীনাম্ সাম্রাজ্যম্ সুষুবে বৃষা।
এবা ত্বম্ সম্রাজ্ঞ্যেধি পত্যুরস্তম্ পরেত্য।।
সম্রাজ্ঞ্যেধি শ্বশুরেষু সম্রাজ্ঞ্যুত দেবৃষু।
ননান্দুঃ সম্রাজ্ঞ্যেধি সম্রাজ্ঞ্যুত শ্বশ্র্বাঃ।।
(অথর্বঃ ১৪|১|৪৩,৪৪)
অর্থাৎ - ব্রহ্ম আগে, ব্রহ্ম পিছে, ব্রহ্ম মাঝেতে আর ব্রহ্মকে অন্তে ভেবেচিন্তে হে বধূ! তুমি তোমার সুদৃঢ় দেবপুর - পতিগৃহে সুখদায়িনী আর কল্যাণকারিণী হও আর বিরাজমান হও। যেরকম শক্তিশালী সমুদ্র নদীর রাজ্য প্রাপ্ত করেছে সেরকম তুমিও পতির গৃহে রাজরাজেশ্বরী হও। শ্বশুরের দৃষ্টিতে রানীর মতো, শাশুড়ির নিকট রানীর মতো আর ননদ তথা দেবরের জন্য মহারানীর মতো হয়ে থাকো।
এই প্রকারের আশীর্বাদ পেয়ে বধূ পতিগৃহে এসে পৌঁছায় আর পতিগ্রামের স্ত্রী-পুরুষ তার স্বাগতম করে তথা বলে যে -
আত্মন্বত্যুর্বরা নারীয়মাগন্ তস্যাম্ নরো বপত
বীজমস্যাম্। সা বঃপ্রজাম্ জনয়দ্ বক্ষণাভ্যো
বিভ্রতী দুগ্ধমৃষভস্য রেতঃ।। (অথর্বঃ ১৪|২|১৪)
অর্থাৎ - এই আত্মবান্ আর উর্বশী নারী এসেছে, এইজন্য হে নর (পতি)! এরমধ্যে বীজ বপন করো আর এই বধূ শুদ্ধ বীর্য়কে ধারণ করে নিজের গর্ভে তোমার জন্য পুত্র উৎপন্ন করুক।
এখানে পর্যন্ত বেদমন্ত্রতে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে যে, বিদ্বান, যোগ্য, যুবক আর ধন-ধান্যসম্পন্নই হবে বিবাহ করার অধিকারী, অন্যরা নয়। অযোগ্যদের বিবাহের নিন্দা করার সঙ্গে বেদ উপদেশ করেছে যে -
অশ্লীলা তনূর্ভবতি রুশতী পাপয়ামুয়া।
পতির্য়দ্ বধ্বো৩বাসসঃ স্বমঙ্গমভ্যূর্ণতে।।
(অথর্বঃ ১৪|১|২৭)
অর্থাৎ - দরিদ্র পুরুষ যখন স্ত্রীর বস্ত্র পরে বাইরে বেরিয়ে আসে তখন স্ত্রীর শরীর নগ্ন হয়ে যায়, এইজন্য এদের সঙ্গে বিবাহ করতে নেই।
বিবাহ সর্বদা যোগ্য স্ত্রী-পুরুষদের মধ্যেই হওয়া উচিত। তারাই গর্ভাধানাদি সংস্কারগুলোকে সঠিকভাবে করতে পারবে আর তাদেরই সন্তান সদাচারী হয়ে সমাজের যোগ্য হতে পারবে আর প্রারম্ভে বলা সাত ইচ্ছাগুলোকে পূর্ণ করতে পারবে। উপর্যুক্ত বেদের মন্ত্রগুলো আদর্শ বিবাহের চিত্র তুলে ধরে বলে দিয়েছে যে, এই ধরনের আদর্শ বিবাহের পরেই গর্ভাধান হওয়া উচিত। বেদের গর্ভাধানপ্রকরণ প্রজনন-শাস্ত্র খুবই সূক্ষ্ম নিয়মের উপদেশ করেছে। সেটি এই রহস্যকে এক উচ্চশ্রেণীর বৈদ্যের মতো করে বলেছে, যারদ্বারা উত্তম সন্তান হোক আর দম্পতি সেই ব্যাধি আর হানিগুলো থেকে বেঁচে যাক যা প্রায়শই অজ্ঞানী যুবকদের আর সদ্যবিবাহিতদের ভুগতে হয়। এই উপদেশগুলোকে অশ্লীল ভাবা উচিত নয়। এরপরে এই বিবাহপ্রকরণের মধ্যে গর্ভাধানসংস্কারের জন্য বেদ আজ্ঞা দেয় যে -
আরোহ তল্পম্ সুমনস্যমানেহ প্রজাম্ জনয় পত্যে
অস্মৈ। ইন্দ্রাণীব সুবুধা বুধ্যমানা জ্যোতিরগ্রা উষসঃ
প্রতি জাগরাসি।। (অথর্বঃ ১৪|২|৩১)
দেবা অগ্রে নিপদ্যন্ত পত্নীঃ সমস্পৃশন্ত তন্বস্তনূভিঃ।
সূর্য়েব নারী বিশ্বরূপা মহিত্বা প্রজাবতী পত্যা সম্
ভবেহ।। (অথর্বঃ ১৪|২|৩২)
তাম্ পূষঞ্ছিবতমামেরয়স্ব য়স্যাম্ বীজম্ মনুষ্যা
বপন্তি। য়া ন ঊরূ উশতী বিশ্রয়াতি য়স্যামুশন্তঃ
প্রহরেম শেপঃ।। (অথর্বঃ ১৪|২|৩৮)
প্র ত্বা মুঞ্চামি বরুণস্য পাশাদ্ য়েন ত্বাবধ্নাত্ সবিতা
সুশেবাঃ। উরুম্ লোকম্ সুগমত্র পন্থাম্ কৃণোমি
তুভ্যম্ সহ পত্ন্যৈ বধু।। (অথর্বঃ ১৪|১|৫৮)
আ রোহোরুমুপ ধত্স্ব হস্তম্ পরি ষ্বজস্ব জায়াম্
সুমনস্যমানঃ। প্রজাম্ কৃণ্বাথামিহ মোদমানৌ দীর্ঘম্
বামায়ুঃ সবিতা কৃণোতু।। (অথর্বঃ ১৪|২|৩৯)
য়দ্ দুষ্কৃতম্ য়চ্ছমলম্ বিবাহে বহতৌ চ য়ত্।
তত্ সম্ভলস্য কম্বলে মৃজ্মহে দুরিতম্ বয়ম্।।
(অথর্বঃ ১৪|২|৬৬)
অর্থাৎ - হে বধূ! তুমি প্রসন্ন চিত্ত হয়ে এই পর্য়কে আরোহণ করো আর এই নিজের পতির জন্য সন্তান উৎপন্ন করো তথা ইন্দ্রাণীর নেয় হে সৌভাগ্যবতী! বুদ্ধিমানের সঙ্গে সূর্য ওঠার পূর্বে ঊষাকালেই জাগবে। বিদ্বানগণ পূর্বেও তাদের পত্নীদের প্রাপ্ত করেছে আর নিজের শরীরের সঙ্গে তাদের শরীর দিয়ে ভালো করে মিলিয়েছে, এইজন্য হে বড় ঐশ্বর্যশালী আর প্রজা প্রাপ্তকারী স্ত্রী! তুমিও তোমার পতির সঙ্গে মিলন করো। হে পালনকর্তা পরমেশ্বর! যে স্ত্রীর আজ বীজ বপন করা হবে তাকে প্রেরিত করুন, যারদ্বারা সে আমাদের কামনা করার সঙ্গে নিজের উরুকে ছড়াবে আর আমি কামনা করে নিজের গুপ্তেন্দ্রিয়ের প্রহার করি। হে বধূ! আমি তোমার পতির দ্বারা তোমার উরুপ্রদেশের গুপ্ত মার্গকে সুগম করি আর তোমাকে সেই বরুণের উৎকৃষ্ট বন্ধন দ্বারা মুক্ত করি যাকে সবিতা বেঁধেছে। হে পুরুষ! তুমি উরুর উপর আসো, হাতের সাহায্য দাও, প্রসন্নচিত্ত হয়ে পত্নীকে আলিঙ্গন করো আর হর্ষের সঙ্গে তোমরা দুজনে সন্তানকে উৎপন্ন করো যারদ্বারা সবিতাদেব তোমাদের উভয়ের আয়ুকে বাড়াবে। এই বৈবাহিক কাজের জন্য যে মলিনতা আমাদের উভয়ের দ্বারা হয়েছে সেই কম্বলের দাগকে আমরা ধুয়ে দিই।
এই মন্ত্রগুলোর মধ্যে গর্ভাধান ক্রিয়ার উপদেশ আয়ুর্বৈদিক বিজ্ঞানের অনুসারে করা হয়েছে। সর্বপ্রথম মন্ত্রতে গর্ভাধানের জন্য রাতের সময়কে বলা হয়েছে, দিনের সময় নয়, কারণ বলা হয়েছে যে ঊষাকালের পূর্বেই জাগবে। এর এটাই তাৎপর্য হল যে, দিনের সময়ে লজ্জা আর সঙ্কোচ হয়। দ্বিতীয় মন্ত্রে আলিঙ্গনের উপদেশ রয়েছে। আলিঙ্গনে বিদ্যুৎ পরিবর্তিত হয়ে থাকে, ভয় দূর হয়ে আনন্দের উদ্বেগ হয়, আর লজ্জার নিবারণ হয়ে যায় যা প্রায়শঃ প্রথম সমাগমের সময় স্ত্রীদের মধ্যে হয়ে থাকে, এইজন্য তৃতীয় মন্ত্রতে বলা হয়েছে যে, স্ত্রী প্রসন্নতাপূর্বক এই কাজে সম্মিলিত হোক। চতুর্থ মন্ত্রতে বলা হয়েছে যে, সমাগমের পূর্বে প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভমার্গ এক নির্দিষ্ট ঝিল্লী দ্বারা আবরণ থাকে, এইজন্য পুরুষকে তারথেকে সাবধান থাকা উচিত আর এমন সময় যেন না আসে যারদ্বারা স্ত্রীর কোনো কষ্ট হোক।
পঞ্চম মন্ত্রতে স্বাভাবিক আসনের বর্ণনা করা হয়েছে যার তাৎপর্য এই হল যে, উল্টো - বেঁকা আসনের যেন ব্যবহার না হয়, কারণ অস্বাভাবিক আসন দ্বারা সন্তান বিকলাঙ্গ উৎপন্ন হয়ে থাকে। পঞ্চম মন্ত্রতে কার্যনিবৃত্তির পরে পরিষ্কার জলে স্নান করারও উপদেশ রয়েছে, যার তাৎপর্য হল স্বচ্ছতা আর আরোগ্যরক্ষা। এইসব উপদেশের তিনটি তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমটি হল যে, প্রথম সমাগমের ব্রহ্মচর্যযুক্ত রজ-বীর্য অজ্ঞানতার কারণে যেন ব্যর্থ না হয়ে যায়, কিন্তু গর্ভ অবশ্যই স্থাপিত হয়, এইজন্য রাতের সময়ের, আলিঙ্গনের, স্ত্রীর প্রসন্নতাপূর্বক সম্মিলিত হওয়ার উপদেশ আর স্বাভাবিক আসনের উপদেশ করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হল যে, সন্তান যেন সর্বাঙ্গ সুন্দর আর উত্তম হয়, এইজন্য ভয়, লজ্জা, সঙ্কোচ আর কষ্টের নিবারণ বলে দেওয়া হয়েছে। আর তৃতীয়টি হল যে, দম্পতির আরোগ্যতা যেন স্থির থাকে, এইজন্য আনন্দ আর শুদ্ধতার উপদেশ করা হয়েছে। এইসব উপদেশের তাৎপর্য এটাই হল যে, ব্রহ্মচর্যযুক্ত রজ-বীর্য দ্বারা সর্বগুণসম্পন্ন সন্তান উৎপন্ন হয়ে যাক আর দম্পতির আরোগ্যতে যেন কোনো বাঁধা উপস্থিত না হয়। এই মন্ত্রগুলোর দ্বারা এই রহস্যপূর্ণ কৃত্যের বর্ণনা করার পরে বেদ উপদেশ করছে যে, যখন পতি-পত্নী গর্ভাধান থেকে নিবৃত্তি হয়ে যাবে তখন বস্ত্রকে ধুয়ে নিক আর দুজনে স্নান করে গার্হপত্যাগ্নিতে হবন করবে তথা পতি বিনম্রভাবে পরমেশ্বরের নিকট এইভাবে প্রার্থনা করবে যে -
বিষ্ণুর্য়োনিম্ কল্পয়তু ত্বষ্টা রূপাণি পিম্শতু।
আ সিঞ্চতু প্রজাপতির্ধাতা গর্ভম্ দধাতু তে।।
গর্ভম্ ধেহি সিনীবালি গর্ভম্ ধেহি সরস্বতি।
গর্ভম্ তে অশ্বিনৌ দেবাবা ধত্তাম্ পুষ্করস্রজা।।
হিরণ্যয়ী অরণী য়ম্ নির্মন্থতো অশ্বিনা।
তম্ তে গর্ভম্ হবামহে দশমে মাসি সূতবে।।
(ঋঃ ১০|১৮৪|১-৩)
অর্থাৎ - হে বধূ! বিষ্ণু তোমার গর্ভস্থানকে গর্ভ গ্রহণ করার যোগ্য করুক, ত্বষ্টা তোমার গর্ভের আকারকে স্পষ্ট করুক, প্রজাপতি জীবনীশক্তির সঞ্চার করুক আর ধাতা গর্ভের পুষ্টি করুক। চন্দ্রশক্তি গর্ভকে ধারণ করুক, সরস্বতী গর্ভকে ধারণ করুক, আর আকাশপুত্র অশ্বিনী দেবতা গর্ভকে পোষণ করুক। অশ্বিনী দেবতা যে বিদ্যুত্ প্রেরণা দ্বারা গর্ভকে বাইরে নিয়ে আসে সেই শক্তি দ্বারা দশ মাসের মধ্যে গর্ভ বাইরে নিয়ে আসার জন্য আমি আপনার আহ্বান করছি।
এই প্রার্থনাতে বিষ্ণু, ত্বষ্টা, প্রজাপতি, ধাতা, চন্দ্র, সরস্বতী আর অশ্বিনী আদি শক্তিগুলোর বর্ণনা এসেছে। এগুলো হল সেইসব সূক্ষ্মশক্তি যা দিয়ে গর্ভের ধারণ, পোষণ আর জনন হয়ে থাকে, এইজন্য সগর্ভার উচিত যে, সে যেন এরকম আহার-বিহারে থাকে যাতে গর্ভ দশ মাস পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকে আর সময় এলে পরে সরলতার সঙ্গে সন্তানোত্পত্তি হয়ে যায়। বেদ সর্বদা প্রার্থনার দ্বারা তত্তত্কার্যশক্তির সূচনা দিয়ে দেয়, যার উপয়োগ দ্বারা সেই-সেই কার্য হয়ে থাকে। এটাই হল বেদের শৈলী।
এইভাবে গর্ভাধান সংস্কারের পরে প্রাতঃকাল গ্রামের বৃদ্ধ পুরুষ বধূর মুখ দেখেন আর আশীর্বাদ করেন। বেদ আদেশ করেছে যে -
য়ে পিতরো বধূদর্শা ইমম্ বহতুমাগমন্।
তে অস্যৈ বধ্বৈ সম্পত্ন্যৈ প্রজাবচ্ছর্ম য়চ্ছন্তু।।
(অথর্বঃ ১৪|২|৭৩)
অর্থাৎ - বধূকে দেখার জন্য যেসব পিতর এই বিবাহতে এসেছে তারা সকলে পতিসহিত বধূকে উত্তম প্রজার জন্য আশীর্বাদ দিক।
এইভাবে এই বৈদিক বিবাহ আর গর্ভাধান সমাপ্ত হয়েছে, কিন্তু যদি কখনও দুর্ভাগ্যবশত পতিসংযোগের পূর্বেই কন্যা বিধবা হয়ে যায়, তবে এরকম আপত্কালের জন্য বেদ উপদেশ করেছে যে -
গ্রাহ্যা গৃহাঃ সম্ সৃজ্যন্তে স্ত্রিয়া য়ন্ম্রিয়তে পতিঃ।
ব্রহ্মৈব বিদ্বানেষ্যো৩য়ঃ ক্রব্যাদম্ নিরাদধত্।।
(অথর্বঃ ১২|২|৩৯)
য়া পূর্বম্ পতিম্ বিত্ত্বাথান্যম্ বিন্দতেऽপরম্ পতিম্।
পঞ্চৌদনম্ চ তাবজম্ দদাতো ন বি য়োষতঃ।।
সমানলোকো ভবতি পুবর্ভুবাপরঃ পতিঃ।
য়ো৩জম্ পঞ্চৌদনম্ দক্ষিণাজ্যোতিষম্ দদাতি।।
(অথর্বঃ ৯|৫|২৭-২৮)
অর্থাৎ - যখন স্ত্রীর পতি মরে যায়, তখন গৃহ নষ্ট হয়ে যায়, এইজন্য কন্যার জন্য পতি সর্বদা বেদবেত্তাই খোঁজা উচিত, যে কখনও মাংস খায়নি। যে স্ত্রী আগের পতিকে পেয়ে দ্বিতীয় পতিকে প্রাপ্ত হয় সে পঞ্চৌদন দ্বারা তার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় না। দ্বিতীয় পতি বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে পঞ্চৌদনয়জ্ঞ দ্বারা বিবাহ করে নিজের জাতির মধ্যে সমানতার স্থান পেয়ে থাকে।
বেদ মন্ত্রগুলো দ্বারা আমি এই পর্যন্ত বিবাহ আর গর্ভাধান সংস্কারের বর্ণনা করেছি। এরপর পুম্সবন সংস্কার সম্বন্ধিত মন্ত্রগুলো লিখবো। এই সংস্কারের মুখ্য উদ্দেশ্য গর্ভস্থকে পুষ্ট (সুস্থ) রাখা। এই কাজ এক ঔষধির দ্বারা করা হয়। বেদের মধ্যে লেখা রয়েছে যে -
শমীমশ্বত্থ আরূঢ়স্তত্র পুম্সবনম্ কৃতম্।
তদ্বৈ পুত্রস্য বেদনম্ তত্স্রীষ্বা ভরামসি।।
পুম্সি বৈ রেতো ভবতি তত্স্রিয়ামনু সিচ্যতে।
তদ্বৈ পুত্রস্য বেদনম্ তত্প্রজাপতিরব্রবীত্।।
(অথর্বঃ ৬|১১|১-২)
অর্থাৎ - যে শমীবৃক্ষে অশ্বত্থ উৎপন্ন হয়েছে তার মূলটিকে গর্ভাধানের দিন থেকে দুই-তিন মাস পর্যন্ত স্ত্রীকে দিলে পরে পুত্র প্রাপ্ত হয়। যে বীর্য স্ত্রীর মধ্যে দেওয়া হয় তা পুম্সত্বকে প্রাপ্ত হয়ে যায় আর পুত্রের প্রাপ্তি হয়, এটা প্রজাপতি - পরমাত্মা বলেছেন।
এই পুম্সবন সংস্কারের পরে সীমন্তোন্নয়ন সংস্কার হয়ে থাকে। যখন গর্ভ চার-পাঁচ মাসের হয়ে যায় তখন মস্তিষ্ক উন্নত হয় আর বুদ্ধি জাগ্রত্ হয়। এটিকেই সীমন্ত - উন্নয়ন, অর্থাৎ শির (মস্তিষ্কের) উন্নতি বলা হয়। মস্তিষ্কের বিষয়ে বেদের মধ্যে লেখা রয়েছে যে -
তদ্বা অথর্বণাঃ শিরো দেবকোশঃ সমুব্জিতঃ।
তত্ প্রাণো অভি রক্ষতি শিরো অন্নমথো মনঃ।।
(অথর্বঃ ১০|২|২৭)
অর্থাৎ - জ্ঞানের কেন্দ্র হল মস্তক যা হল দেবতাদের সুরক্ষিত কোশ। এই কোশটির রক্ষা প্রাণ, মন আর অন্ন করে থাকে।
এরকম জ্ঞানকোশ মস্তিষ্কের বৃদ্ধির সময় থেকে গর্ভিণীর উচিত যে সে যেন বীর যোদ্ধাদের গল্প শোনে, উত্তম চিত্র দেখে আর উত্তম কর্মের (যজ্ঞের) অনুষ্ঠান করে, যারদ্বারা গর্ভস্থের মস্তিষ্ক উত্তম সংস্কারের দ্বারা সুসংস্কৃত হয়ে যায়। এই সংস্কারের পরে জাতকর্ম সংস্কার রয়েছে। এই সংস্কারটি সন্তানের জন্মের পর করা হয়। যেসময় সন্তান উৎপন্ন হয় সেই সময়ের প্রার্থনার অর্থাৎ প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক ক্রিয়ার বর্ণনা বেদ এইভাবে করেছে -
য়থা বাতঃ পুষ্করিণীম্ সমিম্গয়তি সর্বতঃ।
এবা তে গর্ভ এজতু নিরৈতু দশমাস্যঃ।।
য়থা বাতো য়থা বনম্ য়থা সমুদ্র এজতি।
এবা ত্বম্ দশমাস্য সহাবেহি জরায়ুণা।।
দশ মাসাঞ্ছশয়ানঃ কুমারো অধিমাতরি।
নিরৈতু জীবো অক্ষতো জীবো জীবন্ত্যা অধি।।
(ঋঃ ৫|৭৮|৭-৯)
অর্থাৎ - যেভাবে বায়ুর দ্বারা ছোটো সরোবর সবদিক থেকে নড়াচড়া করা শুরু করে সেইভাবে দশ মাসের মধ্যে তোমার গর্ভ নড়াচড়া করুক, আর শিশুটি বাইরে আসুক। যেভাবে বায়ু, বন আর সমুদ্র নড়াচড়া করে সেইভাবে হে শিশু! তুমি জরায়ু সহিত আসো। জীবিত মাতার জীবনে হে জীব (শিশু)! তুমি মাতার গর্ভে দশটি মাস ঘুমিয়ে অক্ষত বাইরে আসো।
এই মন্ত্রগুলোর দ্বারা বলে দেওয়া হয়েছে যে, গর্ভিণীর পেটে যে চতুর্দিক থেকে পীড়া উৎপন্ন হয় তাতে বিচলিত হয়ে সে যেন গর্ভস্থের প্রতি খারাপ ভাবনা না ভাবে, যার প্রভাব শিশুর উপর খারাপ পড়বে, বরং সে যেন এটা ভাবে যে এই পীড়া শিশুটি করছে না, কিন্তু প্রাকৃতিক শক্তির কারণে হচ্ছে। এরপর সর্বপ্রথম দুগ্ধপানের ক্রিয়ার উপর বেদ বলেছে যে -
ইমঁস্তনমূর্জস্বন্তম্ ধয়াপাম্ প্রপীনমগ্নে সরিরস্য মধ্যে।
উত্সম্ জুষস্ব মধুমন্তমর্বন্ত্সমুদ্রিয়ঁ সদনমাবিশস্ব।।
(য়জুঃ ১৭|৮৭)
য়স্তে স্তনঃ শশয়ো য়ো ময়োভূর্য়েন বিশ্বা পুষ্যসি
বার্য়াণি। য়ো রত্নধা বসুবিধঃ সুদত্রঃ সরস্বতি তমিহ
ধাতবে কঃ।। (ঋঃ ১|১৬৪|৪৯)
অর্থাৎ - হে অগ্নিতুল্য শিশু! তুমি সম্বন্ধীদের মাঝে এসে এই জলীয় রস দিয়ে স্থূল স্তনকে পান করো আর সুস্বাদু, গতিশীল তথা সমুদ্রের সমান জ্ঞান দাতা এই স্তনের সেবন করো। হে জ্ঞানবতী প্রসূতা! তুমি নিজের এই সূখদায়ী শরীরস্থ স্তন যা শিশুর অঙ্গের পুষ্টকারক, দুগ্ধরূপ রত্নের ধারণকারী আর শোভাদায়ক, তাহা শিশুর মুখে দাও।
এই মন্ত্রগুলোতে আরম্ভিক দুগ্ধপানের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষার দ্বারা শিশুতে মাতার দুগ্ধের গুণের সংস্কার ভরা হয়, যারদ্বারা শিশুটি যেন আজীবন তার মাতার ভক্ত হয়ে থাকে আর প্রসবের সময় মাতার কষ্টের কারণে যা শিশুর উপর খারাপ প্রভাব পড়েছে, তা দূর হয়ে যায়। এরই নাম হল জাতকর্ম, অর্থাৎ জন্ম হওয়ার কর্ম। জাতকর্মের পরে নামকরণ সংস্কার রয়েছে। বেদে লেখা রয়েছে যে -
কোऽ সি কতমোऽ সি কস্যাসি কো নামাসি।
য়স্য তে নামামন্মহি য়ম্ ত্বা সামেনাতীতৃপাম্।
ভূর্ভুবঃ স্বঃ সুপ্রজাঃ প্রজাভিঃ স্যাঁ সুবীরো বীরৈঃ
সুপোষঃ পোষৈঃ।। (য়জুঃ ৭|২৯)
অর্থাৎ - তুমি কে আর তোমার নাম কি? তুমি বড় নামকরা হও আর পৃথিবী থেকে মহাকাশ আর দ্যৌ পর্যন্ত পূজা আর পোষণের সঙ্গে বড় হও।
এই মন্ত্রটিতে নামকরণ সংস্কারের শিক্ষা রয়েছে। এই সংস্কারের তাৎপর্য শিশুটির নামের সঙ্গে রয়েছে। মানুষের উপর নামের অনেক বড় প্রভাব হয়ে থাকে। উত্তম, সার্থক আর উচ্চভাবের বোধকারী নাম নামীকে সর্বদা নিজের নামের সূচনা দিয়ে তাকে অনেক দুর্ব্যবহারের থেকে বাঁচিয়ে দেয় আর উচ্চ হওয়ার প্রেরণা দেয়, এইজন্য বেদ এই সংস্কারটি করার আজ্ঞা দিয়েছে। এই নামকরণ সংস্কারের পরে নিষ্ক্রমণ সংস্কার রয়েছে। এই সংস্কারের দ্বারা শিশুকে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসা হয়। এর দ্বারাই শিশুর প্রথমবার সংসারের সঙ্গে পরিচয় হয়। বেদ এই সম্বন্ধে উপদেশ করেছে যে -
শিবে তে স্তাম্ দ্যাবাপৃথিবী অসন্তাপে অভিশ্রিয়ৌ।
শম্ তে সূর্য় আ তপতু শম্ বাতো বাতু তে হৃদে।
শিবা অভি ক্ষরন্তু ত্বাপো দিব্যাঃ পয়স্বতীঃ।।
শিবাস্তে সন্ত্বোষধয় উত্ত্বাহার্ষমধরস্যা উত্তরাম্
পৃথিবীমভি। তত্র ত্বাদিত্যৌ রক্ষতাম্
সূর্য়াচন্দ্রমসাবুভা।। (অথর্বঃ ৮|২|১৪-১৫)
অর্থাৎ - হে শিশু! তোমার জন্য এই দ্যৌ আর পৃথিবীলোক দুঃখ রহিত, কল্যাণকারী আর শোভা তথা ঐশ্বর্যের দাতা হোক। এই সূর্য তোমার জন্য প্রকাশদাতা হোক, বায়ু তোমার হৃদয়কে শান্তিদায়ক হোক আর জল তোমার জন্য সুন্দর সুস্বাদু হয়ে প্রবাহিত হোক। তোমাকে ভিতর থেকে বাইরে নিয়ে এসেছি যেন তোমার জন্য ঔষধি কল্যাণকারী হয়। সূর্য-চন্দ্র উভয় তোমার রক্ষা করুক।
এই মন্ত্রগুলোর মধ্যে নিষ্ক্রমণের দুই তাৎপর্য বলা হয়েছে। একটি হল শিশুটিকে পদার্থের পরিচয় করানো, অন্যটি হল শীতোষ্ণ সহ্য করার অভ্যাস, এইজন্য এই সংস্কারটিকে আবশ্যক বলে মনে করা হয়। এরপর রয়েছে অন্নপ্রাশন সংস্কার। এই সংস্কারের দ্বারা উত্তম পদার্থের স্বাদের জ্ঞান করানো আর হানিকারক পদার্থের থেকে তিরস্কারের সংস্কার জানানো হয়। এর সম্বন্ধে বেদ উপদেশ করেছে যে -
অন্নপেতऽ ন্নস্য নো দেহ্যনমীবস্য শুষ্মিণঃ।
প্রপ্র দাতারম্ তারিষ ঊর্জম্ নো ধেহি দ্বিপদে
চতুষ্পদে।। (য়জুঃ ১১|৮৩)
অর্থাৎ - হে অন্নের স্বামী পরমাত্মন্! আপনি আমাদের জন্য, আমাদের পশু-পক্ষীর জন্য আর অন্য মানুষদের জন্য রোগরহিত আর বলকারক অন্ন দিন আর তার বৃদ্ধি করুন।
এই প্রার্থনার তাৎপর্য হল এটাই যে, আমরা যেন রোগরহিত, বলকারক অন্নেরই সেবন করি আর সেই প্রকারের অন্ন সেবনের সংস্কার শিশুকাল থেকেই সন্তানদের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করি। এই সংস্কারের পরে মুণ্ডন (চূড়াকর্ম) সংস্কার রয়েছে। বেদের মধ্যে এরজন্য এইভাবে আজ্ঞা দেওয়া হয়েছে -
য়েনাবপত্সবিতা ক্ষুরেণ সমস্য রাজ্ঞো বরুণস্য বিদ্বান্। তেন ব্রাহ্মণো বপতেদমস্য গোমানশ্ববানয়মস্তু
প্রজাবান্।। (অথর্বঃ ৬|৬৮|৩)
অর্থাৎ - যেভাবে ক্ষুর দিয়ে সোম আর বরুণের ক্ষৌর সবিতা = বিদ্বান্ করেন সেইভাবে ব্রাহ্মণের উচিত যে তিনি যেন এই শিশুটির মুণ্ডন করেন, যাতে এই শিশুটি ধনবান্ আর প্রজাবান্ হয়।
এখানে শিশুর মুণ্ডনের বিধি বলে দেওয়া হয়েছে যে, যেভাবে সোম অর্থাৎ জলতত্ত্বে সূর্য অর্থাৎ অগ্নিতত্ত্ব নিজের সঞ্চার করে, সেইভাবে শিশুটির ঠান্ডা মাথায় হালকা উষ্ণ জল দিয়ে মুণ্ডন করা হোক। এই মুণ্ডনসংস্কার গর্ভের অপবিত্র কেশকে কেটে দেওয়ার জন্য করা হয়, যারদ্বারা শুদ্ধতা আসে আর আরোগ্যতা বাড়ে। এই সংস্কারের পরে কর্ণবেধ সংস্কারের আবশ্যকতা বলে দেওয়া হয়েছে। কর্ণবেধ দ্বারা ডিম্ববৃদ্ধির রোগ হয় না আর এর থেকেই আরোগ্যতার জন্য সুবর্ণ পড়ার কাজও হয়ে যায়। বেদ উপদেশ করেছে -
লোহিতেন স্বধিতিনা মিথুনম্ কর্ণয়ো কৃধি।
অকর্তামশ্বিনো লক্ষ্ম তদস্তু প্রজয়া বহু।।
(অথর্বঃ ৬|১৪১|২)
অর্থাৎ - দুটি কানের মধ্যে অশ্বিনী দেবতাগণ পূর্বেই চিহ্ন করেছেন, তবে লৌহ শস্ত্র দ্বারা হে বৈদ্যো! অনেক প্রজা দিবে এমন ছিদ্র করুন।
এই ছিদ্রকে সুশ্রুতে "দেবকৃতে ছিদ্রে" লেখা রয়েছে। কানের মধ্যে তিনটি শিরার মাঝে যেস্থানটি রয়েছে সেটিই হল দেবছিদ্র। তার ছেদন করলে আর তাতে সুবর্ণ পড়লে ডিম্ববৃদ্ধি রোগ হয় না আর ডিম্ববৃদ্ধি না হওয়াতেই সন্তান হয়, এইজন্য এই সংস্কারটি আবশ্যক। এই মুণ্ডন আর কর্ণবেধ উভয় সংস্কার দুটি শিশুর মধ্যে আরোগ্যরক্ষার সংস্কারের প্রভাব দেওয়া শুরু করে। এইভাবে ছোট-বড় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর পরে উপনয়ন সংস্কার হয়। বেদের মধ্যে এই সংস্কারের বর্ণনা এইভাবে রয়েছে -
আচার্য় উপনয়মানো ব্রহ্মচারিণম্ কৃণুতে গর্ভমন্তঃ।
তম্ রাত্রীস্তিস্র উদরে বিভর্তি তম্ জাতম্
দ্রষ্টুমভিসম্য়ন্তি দেবাঃ।।৩।।
ইয়ম্ সমিত্ পৃথিবীদ্যৌর্দ্বিতীয়োতান্তরিক্ষম্ সমিধা
পৃণাতি। ব্রহ্মচারী সমিধা মেখলয়া শ্রমেণ
লোকাম্স্তপসা পিপর্তি।। (অথর্বঃ ১১|৫|৩-৪)
অর্থাৎ - আচার্য আগন্তুক ব্রহ্মচারীকে নিজের নিকট গর্ভের নেয় তিন দিন পর্যন্ত রাখেন আর সকলে সেই ব্রহ্মচারীকে দেখতে আসেন। তার প্রথম সমিধা পৃথিবী, দ্বিতীয় মহাকাশ আর তৃতীয় দ্যৌ হয়ে থাকে। সে সমিধা দ্বারা, মেখলা দ্বারা, শ্রম দ্বারা আর তপ দ্বারা তিন লোককে পালন করে।
এই দুই মন্ত্রের মধ্যে ব্রহ্মচারীর আচার্যকুলে যাওয়া আর আচার্যের গৃহে জন্ম নিয়ে দ্বিজ হওয়া - বলা হয়েছে আর বলে দেওয়া হয়েছে যে সরলতা, যজ্ঞ, শ্রম আর তপ দ্বারা পৃথিবী, মহাকাশ আর দ্যৌ এর জ্ঞান - ঋগ্বেদ, য়জুর্বেদ আর সামবেদকে প্রাপ্ত করুক। এরপরে তার ভিক্ষাবৃত্তির গৌরব বেদের মধ্যে এইভাবে বলা হয়েছে যে -
ইমাম্ ভূমিম্ পৃথিবীম্ ব্রহ্মচারী ভিক্ষামা জভার
প্রথমো দিবম্ চ। তে কৃত্বা সমিধাবুপাস্তে তয়োরার্পিতা
ভুবনানি বিশ্বা।। (অথর্বঃ ১১|৫|৯)
অর্থাৎ - ব্রহ্মচারী প্রথমে বিশাল ভূমি আর দ্যুলোকের ভিক্ষা প্রাপ্ত করেছে। এখন সেই ব্রহ্মচারী তার দুই সমিধা বানিয়ে উপাসনা করে, কারণ সেই উভয়ের মাঝে সব ভুবন স্থিত রয়েছে।
এই মন্ত্রের মধ্যে পৃথিবী থেকে দ্যৌ পর্যন্ত ঈশ্বরের নির্মিত পদার্থের ভিক্ষার উপদেশ রয়েছে। এর তাৎপর্য হল এটাই যে, জীবাত্মাকে পরমাত্মা প্রবন্ধ করে দিয়েছেন, এইজন্য ভিক্ষা করে সেটা গ্রহণ করো আর বিদ্যাধ্যয়ন করো। এরপর বেদের মধ্যে ব্রহ্মচর্যের মাহাত্ম্য এইভাবে বর্ণিত রয়েছে -
আচার্যো ব্রহ্মচারী ব্রহ্মচারী প্রজাপতিঃ।
প্রজাপতির্বি রাজতি বিরাডিন্দ্রোऽভবদ্ বশী।।
ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা রাজা রাষ্ট্রম্ বি রক্ষতি।
আচার্যো ব্রহ্মচর্য়েণ ব্রহ্মচারিণমিচ্ছতে।।
ব্রহ্মচর্য়েণ কন্যা য়ুবানম্ বিন্দুতে পতিম্।
অনঙ্বান্ ব্রহ্মচর্য়েণাশ্বো ঘাসম্ জিগীর্ষতি।।
ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা দেবা মৃত্যুমপাঘ্নত।
ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্য়েণ দেবেভ্যঃ স্বরাভরত্।।
(অথর্বঃ ১১|৫|১৬-১৯)
অর্থাৎ - ব্রহ্মচারীই আচার্য হয়, ব্রহ্মচারীই প্রজাপতি হয় আর প্রজাপতি অর্থাৎ ইন্দ্রই বিরাটের নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকে। ব্রহ্মচর্যের তপ দ্বারাই রাজা রাষ্ট্রের রক্ষা করেন, ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই আচার্য ব্রহ্মচারীদের পড়াতে পারেন, ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই কন্যা যুবক পতিকে প্রাপ্ত করে, ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই বৃষ আর অশ্ব ঘাসকে হজম করতে পারে, ব্রহ্মচর্য আর তপ দ্বারাই দেবতাগণ মৃত্যুকে সরিয়ে দেন আর ব্রহ্মচর্যের দ্বারাই ইন্দ্র দেবতাদের সুখে ভরে দেন।
এইভাবে এই সদাচার আর সভ্যতার মূল তথা লোক আর পরলোকের সাধনরূপ ব্রহ্মচর্যের মহিমা বেদের মধ্যে বিস্তারভাবে বর্ণিত রয়েছে। এইজন্য এই সংস্কারের আবশ্যকতা বলে দেওয়া হয়েছে। এই সংস্কার দ্বারা মনুষ্য উৎকৃষ্ট গুণগুলোকে পেয়েই সমাজের মধ্যে মিলিত হওয়ার যোগ্য হয়ে যায়। এই মিলিত হওয়ার নামই হল সমাবর্তনসংস্কার। সমাবর্তন সংস্কারেরও অনেক মহিমা রয়েছে, কারণ এটাই হল সমাজের মূল। এরজন্য বেদ আজ্ঞা দিয়েছে যে -
তানি কল্পদ্ ব্রহ্মচারী সলিলস্য পৃষ্ঠে
তপোऽতিষ্ঠত্তপ্যমানঃ সমুদ্রে।
স স্নাতো বভ্রুঃ পিঙ্গলঃ পৃথিব্যাম্ বহু রোচতে।।
(অথর্বঃ ১১|৫|২৬)
অর্থাৎ - যে ব্রহ্মচারী সমুদ্রের মতো গম্ভীর হয়ে আর উত্তম ব্রত ব্রহ্মচর্যের মধ্যে নিবাস করে মহাতপকে ধারণ করে আর বেদপঠন, বীর্যনিগ্রহ তথা আচার্যের প্রিয়াচরণাদি কর্মকে পূর্ণ করে আর সমাবর্তনের স্নানবিধিকে করে উত্তম গুণ - কর্ম - স্বভাবের দ্বারা প্রকাশিত হয়, সে-ই ধন্যবাদের যোগ্য।
এই মন্ত্রের মধ্যে সমাবর্তন সংস্কারের গুরত্ব দেখানো হয়েছে। এরপর বিবাহ আর গৃহস্থাশ্রম সংস্কার রয়েছে যা পূর্ণ রূপে পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে। এখানেই লৌকিক সংস্কারের সমাপ্তি হয়ে যায়। গৃহস্থাশ্রম সংস্কারের পরে পরলোক সম্বন্ধিত তিনটি সংস্কার আরও রয়েছে। তাদের নাম হল বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস আর অন্ত্যেষ্টি সংস্কার। বিনা এই তিন সংস্কার ছাড়া মানুষের জন্ম সফল হয় না, কারণ বিনা বানপ্রস্থ আর সন্ন্যাসে মনুষ্য সঠিকভাবে পরলোক চিন্তা করতে পারে না আর না পরম তত্বকে পেতে পারে, এইজন্যই ঋগ্বেদের মধ্যে অরণ্যানী সূক্তে উপদেশ করা হয়েছে। অরণ্যানী সূক্তের মধ্যে লেখা রয়েছে যে -
ন বা অরণ্যানির্হন্ত্যন্যশ্চেন্নাভিগচ্ছতি।
স্বাদোঃ ফলস্য জগ্ধ্বয় য়থাকামম্ নি পদ্যতে।।
(ঋঃ ১০|১৪৬|৫)
অর্থাৎ - এই বানপ্রস্থীকে জঙ্গলের মধ্যে কেউ মারে না আর না কেউ তার নিকটে যায়। সে সুস্বাদু ফলগুলো খেয়ে যেখানে ইচ্ছে হয় সেখানে বিচরণ করে বেড়ায়।
এই সংস্কার দ্বারা একান্তে থেকে তপ আর য়োগের দ্বারা গৃহস্থাশ্রম, অর্থাৎ লোকে যেসব সংস্কারগুলো রয়েছে তা দূর করে দেওয়া হয় আর পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের উৎকট অভিলাষার পারলৌকিক সংস্কারগুলোকে বদ্ধমূল করার চেষ্টা করা হয়। এই সংস্কারের পরে সন্ন্যাস সংস্কার রয়েছে, কিন্তু বৈদিক সন্ন্যাসের অভিপ্রায় আজকালকার সন্ন্যাসীদের মতো নয়। আজকালকার সন্ন্যাসী তো বৌদ্ধ-ভিক্ষুদের নকল। বৈদিক সন্ন্যাসী এই ধরণের ছিল না। বৈদিক সন্ন্যাসীদের দেব বলা হতো আর তারা সংসার হতে বিরক্ত হয়ে সমাধির দ্বারা পরমাত্মার দর্শনের জন্য সর্বদা চেষ্টা করতেন। বেদের মধ্যে লেখা রয়েছে যে "ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা দেবা মৃত্যুমপাঘ্নত", অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য আর তপ দ্বারাই সমস্ত দেবগণ মোক্ষ প্রাপ্ত করেন। এই কারণেই দেবসংস্কারের উপদেশ বেদের মধ্যে এইভাবে রয়েছে -
য়েনা সহস্রম্ বহসি য়েনাগ্নে সর্ববেদসম্।
তেনেমম্ য়জ্ঞম্ নো বহ স্বর্দেবেষু গন্তবে।।
(অথর্বঃ ৯|৫|১৭)
অর্থাৎ - হে অগ্নে - পরমেশ্বর! যে গৃহস্থাশ্রমকে সহস্রজন ধারণ করে আছে, তাকে ত্যাগ করে আমি দেবের মধ্যে প্রবেশ করার জন্য প্রস্তুত হই। এটাই হল সন্ন্যাস ধারণ করার সংস্কার।
এই সংস্কারের পরে অন্ত্যেষ্টি সংস্কার রয়েছে। বেদের মধ্যে অন্ত্যেষ্টি সংস্কারের অনেক বড় মহিমা রয়েছে। এটিকে পিতৃয়জ্ঞ নামেও ডাকা হয়। এই ক্রিয়ার বর্ণনা বেদের মধ্যে বিস্তারভাবে রয়েছে। আমি এখানে সেই প্রকরণের কেবল একটি মন্ত্র দিয়ে এই সংস্কার প্রকরণটি সমাপ্ত করছি। ঋগ্বেদে লেখা রয়েছে যে -
সূর্য়ম্ চক্ষুর্গচ্ছতু বাতমাত্মা দ্যাম্ চ গচ্ছ পৃথিবীম্ চ
ধর্মণা। অপো বা গচ্ছ য়দি তত্র তে হিতমোষধীষু প্রতি
তিষ্ঠা শরীরৈঃ।। (ঋঃ ১০|১৬|৩)
অর্থাৎ - চক্ষু সূর্যতে চলে যাক, প্রাণ বায়ুতে চলে যাক, পৃথিবীর অংশ পৃথিবীতে চলে যাক, জলের অংশ জলে মধ্যে চলে যাক আর ঔষোধির অংশ ঔষোধির মধ্যে চলে যাক।
এইভাবে জন্ম হওয়ার পূর্ব থেকে মৃত্যুর পরে পর্যন্ত সংস্কারের বর্ণনা বেদের মধ্যে রয়েছে। এই সংস্কারগুলোর দ্বারা মানুষের মন, বাণী আর কর্ম সদাচারযুক্ত বানানো হয়, যারদ্বারা সে সমাজের মধ্যে উত্তম গৃহস্থ হয়ে তার নিজের সাত ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে পারে, কিন্তু মনুষ্যসমাজের কাজ কেবল সদাচার দ্বারাই চলা সম্ভব নয়।

No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ