ইসলামের পাঁচস্তম্ভ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

13 May, 2026

ইসলামের পাঁচস্তম্ভ

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ

পাঁচটি মূল নীতি ও ধর্মাচরণের উপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে। এদেরকে বলা হয় ইসলামের ভিত্তি বা পাঁচ স্তম্ভ। এগুলো হলো (১) কলেমা, (২) নামাজ, (৩) রোজা, (৪) জাকাত ও (৫) হজ।

প্রথম স্তম্ভ কলেমা:

কলেমা হল ইসলামের ছয়টি মূল মন্ত্র, যথা (১) কলেমা তৈয়ব, (২) কলেমা শাহাদাৎ, (৩) কলেমা তৌহীদ, (৪) কলেমা তামজীদ, (৫) কলেমা রদ্দে কুফর এবং (৬) কলেমা তাহমীদ। এই ছয়টি কলেমায় বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান। ঈমান শব্দের অর্থ হল বিশ্বাস। কাজেই কলেমায় দৃঢ় ও আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন না করলে কেউ ঈমানদার বা বিশ্বাসী মুসলমান হতে পারে না। উপরিউক্ত ছয়টি কলেমার মধ্যে প্রথম কলেমা বা কলেমা তৈয়ব সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং বলা যায় ইসলামের প্রাণ।

The Five Pillars of Islam

কলেমা তৈয়ব

এই কলেমার মন্ত্র হল, "লা ইলাহা ইল্লাল্লা, মহম্মদুর রসুলুল্লা”, অর্থাৎ আল্লা ব্যতীত উপাস্য নেই, মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল। কাজেই এই কলেমায় বিশ্বাস স্থাপন করার অর্থ হল, একেশ্বর আল্লায় বিশ্বাস এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে মহম্মদের নবীত্বে বিশ্বাস করা। এই কারণেই এই কলেমার গুরুত্ব এত অপরিসীম। এই কলেমাতে অবিশ্বাসী হলে কোন মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, তৎক্ষণাৎ কাফের হয়ে যাবে। এই কারণেই আল্লা কোরানে বলেছেন, "আল্লা ও তাঁর রসুলের অনুগত হও” أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ (৩/৩২) এবং "যারা আল্লা ও তাঁর রসুলকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে" (৭২/২৩)। কাজেই সেই ব্যক্তিই ঈমানদার, যে আল্লাকে তার প্রভু, ইসলামকে তার ধর্ম ও মহম্মদকে রসুলরূপে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেছে। এই কলেমায় এটাও পরিষ্কার হচ্ছে যে, শুধু আল্লায় বিশ্বাস করলেই কেউ মুসলমান হতে পারে না। মহম্মদ যে আল্লার রসুল, সেটা বিশ্বাস করাও জরুরি। “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” সরাসরি এসেছে সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৯ আয়াতে।

কলেমা শাহাদাৎঃ

এই কলেমার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লা ছাড়া কোন উপাস্য নেই; তিনি এক এবং তাঁর কোন অংশী নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে নিশ্চয়ই মহম্মদ তাঁর বান্দা ও রসুল।"

কলেমা তৌহীদ:

এর বাংলা অর্থ হল, "(হে আল্লা) আপনি ভিন্ন কোন উপাস্য নেই, আপনি অদ্বিতীয় এবং আপনার কোন অংশী নেই। রসুল মহম্মদ ধর্মভীরুগণের নেতা এবং বিশ্বপালক কর্তৃক প্রেরিত।"

কলেমা তামজীদ:

এই কলেমার বাংলা অর্থ হল, “(হে আল্লা) আপনি ভিন্ন কোন উপাস্য নেই। আপনি জ্যোতির্ময় আল্লা এবং আপনি আপনার জ্যোতি দ্বারা যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। হজরত মহম্মদ প্রেরিত পুরুষগণের মধ্যে অগ্রগণ্য ও শেষ নবী।" প্রথম কলেমার পরেই এই চতুর্থ কলেমার গুরুত্ব। কারণ এই কলেমায় ইসলামের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে আর তা হল, মহম্মদ নবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী। মুসলমানদের মধ্যে কেউ নিজেকে নবী বলে ঘোষণা করলে এই কলেমার বলেই তাকে কাফের বলে চিহ্নিত করা হয় এবং হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে একজন দরবেশ মীর্জা আহম্মদ নিজেকে নবী বলে প্রচার করায় তাকে হত্যা করা হয় এবং সমগ্র আহম্মদী সম্প্রদায়কে কাফের বলে চিহ্নিত করা হয়। আজও এই সম্প্রদায়ের লোকেরা পাকিস্তানে কাফের ও অ-মুসলমান বলে গণ্য ও পরিত্যক্ত। অথচ মীর্জা আহম্মদ নবী মহম্মদকে কখনই অস্বীকার করেননি, বরং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নবী বলে মেনে নিয়েছিলেন। এই কলেমার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এই যে, এর ফলেই কোরান এবং হাদিসের কোন সংশোধন সম্ভব নয়। আর নবী না জন্মালে কে সংশোধন করবে?

কলেমা রদ্দে কুফর

এর বাংলা অর্থ হল, "(হে আল্লা) আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি যেন কাউকে আপনার শরীক না করি। আমার জ্ঞানের গোচর ও জ্ঞানের অগোচর সমস্ত পাপের জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং অনুতাপ (তওবা) করছি। আমি আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করছি এবং বলছি যে, আল্লা ভিন্ন উপাস্য নেই এবং মহম্মদ আল্লার প্রেরিত রসুল।" এই কলেমা সম্পর্কে দু একটি কথা বলার আছে। এতে বান্দা আল্লার কাছে প্রতিজ্ঞা করছে যে, সে আল্লার অংশী বা শরীক সৃষ্টি করবে না। এই কারণেই মুসলমানরা বলে যে, এক আল্লা ছাড়া আর কারও কাছে

তারা মাথা নত করে না বা সিজদা করে না। এই কলেমার জন্যই তারা দেশ-মাতৃকাকে প্রণাম করে না এবং "বন্দে মাতরম্" গাইতে অস্বীকার করে।

“কলেমা রদ্দে কুফর” ইসলামী সমাজে প্রচলিত একটি দোয়া/কলেমা হিসেবে পরিচিত। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— এটি কোরআনের সরাসরি আয়াত নয় এবং সহীহ হাদিসে “ইসলামের বাধ্যতামূলক ছয় কলেমা” হিসেবে একত্রে উল্লেখও পাওয়া যায় না। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মশিক্ষার অংশ হিসেবে এগুলো বেশি প্রচলিত।

ইসলামের পাঁচস্তম্ভ
প্রচলিত “কলেমা রদ্দে কুফর” হলোঃ

“আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইওঁ ওয়া আনা আ’লামু বিহি, ওয়া আসতাগফিরুকা লিমা লা আ’লামু বিহি, তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল কুফরি ওয়াশ্ শিরকি ওয়াল কিযবি ওয়াল গীবাতি ওয়াল বিদআতি ওয়ান্ নামীমাতি ওয়াল ফাওয়াহিশি ওয়াল বুহতানি ওয়াল মা’আসী কুল্লিহা, ওয়া আসলামতু ওয়া আকুলু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”

বাংলা অর্থঃ
“হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে আপনার সঙ্গে কাউকে শরীক করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আর না জেনে যে গুনাহ করেছি তার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আমি কুফর, শিরক, মিথ্যা, গীবত, বিদআত, চোগলখোরি, অশ্লীলতা, অপবাদ ও সব পাপ থেকে তওবা করছি। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং বলছি— আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।”

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কোরআনের আয়াতঃ

📖 শিরক সম্পর্কে
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না…”
— সূরা আন-নিসা ৪:৪৮

📖 তওবা সম্পর্কে
“তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”
— সূরা আন-নূর ২৪:৩১

📖 একত্ববাদ সম্পর্কে
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক।”
— সূরা ইখলাস ১১২:১

অর্থাৎ “কলেমা রদ্দে কুফর”-এর মূল বিষয়গুলো— শিরক থেকে বাঁচা, তওবা করা, এবং তাওহীদের ঘোষণা— কোরআন ও ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পুরো কলেমাটি নিজে কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত নয়।

কলেমা তাহমীদ:

এর বাংলা অর্থ হল, "পবিত্র ও সর্বশক্তিমান আল্লাতায়লাকে সকল প্রশংসার সাথে স্মরণ করছি। তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছি এবং আমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।"

এর পর রয়েছে দুটো বিশ্বাসের শপথ যার মাধ্যমে বান্দা আল্লা, তাঁর রসুল, ধর্মশাস্ত্র, কেয়ামত ইত্যাদি সব কিছুর উপর বিশ্বাসের শপথ গ্রহণ করে। দুটো শপথ বাক্যের নাম (১) ঈমান মুজমাল ও (২) ঈমান মুফাচ্ছল। ঈমান মুজমালের বাংলা করলে দাঁড়ায়, "আমি সর্ববিধ নাম ও গুণবিশিষ্ট আল্লার উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং তাঁর আদেশ ও বিধানসমূহ মেনে নিলাম।” ঈমান মুফাচ্ছল এর বাংলা অর্থ, "আমি আল্লা, তাঁর ফেরেস্তাগণ, তাঁর কেতাবসকল, তাঁর প্রেরিত রসুলগণ, কেয়ামত, তকদীর (ভাগ্য) এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবন লাভ ইত্যাদি সকল বিষয়ের উপর ঈমান আনলাম, বিশ্বাস স্থাপন করলাম।"

উপরিউক্ত কলেমাগুলি থেকে এটা পরিষ্কার হচ্ছে যে, শুধু আল্লায় বিশ্বাস করলেই মুসলমান হওয়া যায় না, সেই সঙ্গে সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, মহম্মদ আল্লার রসুল। অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে, সে কোন আল্লায় বিশ্বাস করলে হবে না, মহম্মদ যে আল্লার রসুল সেই আল্লাতেই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। অনেক সময় আল্লায় বিশ্বাস করার চাইতে মহম্মদের নবীত্বে বিশ্বাস স্থাপন করাটাই বেশী জরুরী বলে মনে হয়। কারণ মহম্মদের মতে সে ব্যক্তি এখনও প্রকৃত বিশ্বাসী হয়ে ওঠেনি যে নাকি নিজের সন্তান-সন্ততি, বাবা-মা, তথা সমগ্র মানবসমাজের থেকেও মহম্মদকে বেশী ভাল না বাসে (মুসলীম-৭১)।

হিন্দু ধর্ম মানুষের নৈতিক চরিত্রের উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। হিন্দু ধর্মমত অনুসারে আধ্যাত্মিক প্রাপ্তির মূল সোপানই হল নৈতিক চরিত্র। কিন্তু ইসলাম সে কথা বলে না। ইসলামী মতে যে কলেমা গ্রহণ করে ঈমান এনেছে বা মুসলমান হয়েছে, নৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত অধঃপতিত হলেও তার অক্ষয় স্বর্গবাস সুনিশ্চিত। এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে কলেমার গুরুত্ব অপরিসীম এবং শুধুমাত্র "লা ইলাহা ইল্লাল্লা........" কলেমা গ্রহণ করার জন্যই কেয়ামতের দিন মহম্মদ তাঁর ৭০ হাজার উম্মত সহ সকলের আগে স্বর্গে প্রবেশ করবেন (মুসলীম-৬৬৬৮)। মহম্মদ বলতেন যে, একদিন ফেরেস্তা জিব্রাইল এসে তাঁকে বললেন, "আপনার উন্মত (শিষ্য)-দের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লার কোন খোঁজ-খবর রাখে না সেও স্বর্গে প্রবেশ করবে।" একদিন তাঁর এক উন্মত আবুজার তাঁকে প্রশ্ন' করল, " সে ব্যক্তি যদি চোর কিংবা ব্যভিচারী হয় তাহলেও কি সে স্বর্গে প্রবেশ করবে?" মহম্মদ বললেন, হ্যাঁ, তাহলেও সে স্বর্গে প্রবেশ করবে" (মুসলীম-১৭১)। এখানে স্মরণ করা প্রয়োজন যে, চুরি করা ও ব্যভিচার করা ইসলামে ঘোরতর পাপ এবং তার শাস্তি হল, চোরের ডান হাত কেটে ফেলা এবং ব্যভিচারীকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা।

এ সব ব্যাপারে ইসলামী সিদ্ধান্ত হল, "আল্লার দৃষ্টিতে সব থেকে গুরুতর পাপ হল আল্লার অংশী সৃষ্টি করা, তারপর গুরুতর পাপ হল আপন শিশু সন্তানকে হত্যা করা এবং তার পরের গুরুতর পাপ হল (মুসলমান) প্রতিবেশীর পত্নীর সঙ্গে ব্যভিচার করা" (ঐ ১৫৬)। কাজেই একজন অংশীবাদী কাফের যত ভাল কাজই করুক না কেন, আল্লার অংশী সৃষ্টি করার পাপের জন্য তার সমস্ত পুণ্যের কাজই নিষ্ফল হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে একজন মুসলমান যত পাপই করুক না কেন, অংশীবাদের পাপে লিপ্ত না হবার দরুন তার কোন পাপই পাপ বলে গ্রাহ্য হবে না। এই কারণেই মুসলমানরা বলে থাকে যে, গান্ধীর চাইতে একজন অধঃপতিত মুসলমানও শ্রেষ্ঠ।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ইসলামের পাঁচস্তম্ভ

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ পাঁচটি মূল নীতি ও ধর্মাচরণের উপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে। এদেরকে বলা হয় ইসলামের ভিত্তি বা পাঁচ স্তম্ভ। এগুলো হলো (১) কলেমা, (২...

Post Top Ad

ধন্যবাদ