রামায়ণ সন্দর্শিকা - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

20 April, 2026

রামায়ণ সন্দর্শিকা

রামায়ণ সন্দর্শিকা
সমগ্র বিশ্বে নিম্নলিখিত ৩টি গ্রন্থ সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ— (১) বেদ (২) রামায়ণ (৩) মহাভারত। এই তিনটি গ্রন্থের প্রভাব কেবল ভারতবর্ষেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সাহিত্যে সর্বাধিকভাবে লক্ষ্য করা যায়। বেদের শব্দ (পদ) বিশ্বের সকল ভাষায় তৎসম বা তদ্ভব রূপে পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারতে যেসব স্থান (ভৌগোলিক অঞ্চল)-এর নাম ও উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি আজও আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্রগুলির নাম আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে রাখা হয়েছিল এবং সেই নামগুলি- রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, হনুমান, দশরথ, সীতা, কৌশল্যা, সুমিত্রা, অনুসূয়া, তারা প্রভৃতি আজও সহস্রাব্দ ধরে রাখা হয়ে আসছে। একইভাবে, রামায়ণে যাদের নিন্দিত চরিত্র ছিল, সেই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, কৈকেয়ী, মন্ত্রা এবং শূর্পণখার নাম আজও ভারতীয় সমাজে রাখা হয় না। ওয়াশিংটনস্থিত ‘মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক শ্রী তুফাইল আহমদ ভারতীয়দের আত্মপরিচয় ও সত্তাকে রামায়ণের আদর্শ ও বার্তায় প্রত্যক্ষ করেন। রামায়ণের কাহিনি শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সকলেই কেবল শিক্ষা লাভ করেন না, বরং শিক্ষার পাশাপাশি আনন্দও পান। বিশ্বকবির ভাষায় ‘যদি কবি বাল্মীকি মানুষের চরিত্রের বর্ণনা না করে দেব-চরিত্রের বর্ণনা করতেন, তবে অবশ্যই রামায়ণের গৌরব কমে যেত.....। রামের মানুষ হওয়ার কারণেই রামচরিতের এত মহিমা। রামায়ণে দেবতা পদচ্যুত হয়ে নিজেকে মানুষ করেননি, মানুষই নিজের গুণের কারণে দেবতা হয়ে উঠেছে।’

সংস্কৃত ভাষায় রচিত অধিকাংশ প্রাচীন সাহিত্যে ⚠️প্রক্ষেপ (অন্তর্বর্তী সংযোজন) হয়েছে। বৈদিক সংহিতাগুলি ব্যতীত রামায়ণ, মহাভারত এবং মনুস্মৃতি-র মতো প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলি (যেগুলি সহস্রাব্দ ধরে বিদ্বজ্জন থেকে সাধারণ মানুষের কণ্ঠহার হয়ে আছে) তাও এ থেকে রক্ষা পায়নি। বেদ-মন্ত্রগুলির অষ্ট বিকৃতপাঠের কারণে, বিশেষত ক্রমপাঠ এবং ঘনপাঠের জটিলতা বৈদিক সংহিতার পাঠকে বিকৃত হওয়া এবং প্রক্ষেপের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তুলেছে। এর অতিরিক্ত বৈদিক বাঙ্ময়ে অনুক্রমণীকাররা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্যভাবে ঋষি, দেবতা, ছন্দ, বর্ণ, মাত্রা এবং স্বর পর্যন্ত গণনা করে রেখেছেন, যার ফলে মন্ত্রসংহিতায় প্রক্ষেপ করার সাহস কেউ করতে পারেনি। কিছু ব্রাহ্মণগ্রন্থ স্বরাঙ্কিত হওয়া সত্ত্বেও পশুমাংসলোলুপ কর্মকাণ্ডীরা পরবর্তী ব্রাহ্মণগ্রন্থ এবং কল্পসূত্র সাহিত্যেও প্রক্ষেপ করতে কোনও কসুর রাখেনি। পুনরায় পূর্বাপর ক্রমের প্রতি দৃষ্টি রাখলে এই প্রক্ষেপস্থলগুলি স্পষ্ট হয়ে যায়।
‘রামায়ণ’ থেকে শুরু করে ভক্তিকালীন ‘রামচরিতমানস’ প্রভৃতি গ্রন্থে প্রক্ষেপের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। রামচরিতমানস-এর সম্পূর্ণ ‘লবকুশকাণ্ড’ প্রক্ষিপ্ত। একইভাবে বাল্মীকীয় 📚রামায়ণের সম্পূর্ণ উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত। কারণ, যে কোনও গ্রন্থ ‘ফলশ্রুতি’ পর্যন্তই সমাপ্ত বলে গণ্য হয়। ‘রামায়ণ’-এ এই ফলশ্রুতি যুদ্ধকাণ্ডের ১২৮তম সর্গের ১০৭তম শ্লোক থেকে শুরু হয়ে ১২৫তম শ্লোক পর্যন্ত বিস্তৃত। এর অতিরিক্ত উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও শক্তিশালী কারণ রয়েছে। উত্তরকাণ্ডের দ্বিতীয় সর্গ থেকে ৩৪তম সর্গ পর্যন্ত রাবণ এবং রাক্ষসদেরই বর্ণনা আছে, যার রামকথার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। উত্তরকাণ্ডের রচনাশৈলী কাব্যশৈলী না হয়ে পুরাণশৈলী। বাল্মীকি স্থান-স্থানান্তরে প্রকৃতি, পর্বত, বন, ঋতু এবং পশুপাখির বর্ণনাও করেছেন, যা উত্তরকাণ্ডে সামান্যও নেই। বাল্মীকি-র উপমাগুলি আনন্দদায়ক ও প্রাসঙ্গিক, যার উত্তরকাণ্ডে সম্পূর্ণ অভাব। রামায়ণে আগত চরিত্রগুলির জন্মাদি সংক্রান্ত অন্তর্কথার বিস্তার বিভিন্ন পুরাণে পাওয়া যায়, যা রামায়ণের কথকরা পুরাণ থেকে নিয়ে এখানে সংযোজন করেছেন। এই অন্তর্কথাগুলির পূর্ণ বিশ্লেষণ রামকথার উৎপত্তি ও বিকাশের সম্পূর্ণ যাত্রাপথের গবেষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত Father Kamil Bulke করেছেন। সচেতন পাঠকবর্গ এই বিষয়ের বিস্তৃত তথ্য বুলকের প্রসিদ্ধ গবেষণাগ্রন্থ ‘রামকথা : উৎপত্তি এবং বিকাশ’ (প্রকাশক— হিন্দি পরিষদ, হিন্দি বিভাগ, প্রয়াগ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ, ষষ্ঠ সংশোধিত সংস্করণ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে পেতে পারেন।
বাল্মীকীয় রামায়ণের গবেষকদের🧠 সিদ্ধান্ত হলো যে বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড নিঃসন্দেহে প্রক্ষিপ্ত। এর পাশাপাশি মধ্যবর্তী কাণ্ডগুলিতেও বহু স্থানে পরবর্তী কথকরা প্রক্ষিপ্ত অংশ সংযোজন করেছেন। কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি প্রকৃত অবস্থা জানলেও পৌরাণিক বিশ্বাসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে এ বিষয়ে লেখা বা বলা থেকে বিরত থাকেন। শম্বূক প্রসঙ্গ, যযাতি–শুক্রাচার্য, লবণাসুর এবং ব্রাহ্মণ বালকের মৃত্যুকে শূদ্রের তপস্যার সঙ্গে যুক্ত করার মতো অধিকাংশ বিষয়ের রামায়ণের সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। সীতার নির্বাসনও পরবর্তীকালে সংযোজিত অংশ। প্রক্ষিপ্ত অংশগুলি চিহ্নিত করার জন্য গবেষণামূলক🔎 দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। এর বহু মানদণ্ড আছে— মূল কাহিনির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা, অলৌকিকতার প্রদর্শন, অযৌক্তিক বক্তব্য এবং অমানবিক প্রবৃত্তির আধিক্য ইত্যাদি। প্রক্ষেপের ধারার প্রধান ভিত্তি হলো রামকে ঈশ্বরীয় পরব্রহ্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, অবতারবাদ, উপকাহিনি, ভিন্ন প্রসঙ্গ, অতিশয়োক্তি এবং পুনরুক্তি; অথচ রামায়ণের মূল স্বর মানবত্ব, দেবত্ব নয়। বাল্মীকি বহু মানবগুণে সমৃদ্ধ এক পুরুষ সম্পর্কে জানতে চান—

জ্ঞাতুমেবংবিধং নরম্।

নারদ তাঁকে সেইরূপ পুরুষের কথাই বলেন—

তৈর্যুক্তঃ শ্রূয়তাং নরঃ (বালকাণ্ড ১/৭)।

এভাবেই সীতা নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—

নারীণামুত্তমা বধূঃ (১/২৭)।

রাবণের মৃত্যু ও সীতার মুক্তির পর রামও এই মানবীয় দিকটিকেই গুরুত্ব দেন—

দৈবসম্পাদিতো দোষো মানুষেণ ময়া জিতঃ (যুদ্ধকাণ্ড ১১৫/৫)।

অর্থাৎ রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিল, সেই দোষ দৈববশত সংঘটিত ছিল; আমি মানুষ হয়ে তা দূর করেছি।রামায়ণের মূল স্বর বা মূল পাঠের দিকে বিদ্বান চিন্তাবিদদের দৃষ্টি পূর্বেও আকৃষ্ট হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে বহু পণ্ডিত তাঁদের গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। মহামহোপাধ্যায় Swami Bhagavadacharya বাল্মীকী রামায়ণের উপর তাঁর গবেষণাপূর্ণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সীতার অগ্নিপরীক্ষার সময় রামের মুখ দিয়ে যে কঠোর বাক্য বলানো হয়েছে, তা বাল্মীকির চরিত্র-আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনও নারী-নিন্দক ব্যক্তি রাম ও সীতার চরিত্রকে কলুষিত করার উদ্দেশ্যে রামায়ণের মূল পাঠে এই নিকৃষ্ট প্রসঙ্গ সংযোজন করেছে। অগ্নিপরীক্ষার রাম-সীতা-সংলাপ বাল্মীকির “চারিত্র্যেণ চ কো যুক্তঃ” তত্ত্বদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে বাল্মীকি যেন তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত বলে মনে হয়। তিনি যে রামকে খুঁজছিলেন—

জিতক্রোধো দ্যুতিমান্ কোऽনসূয়কঃ

অর্থাৎ ‘যিনি ক্রোধজয়ী, উজ্জ্বলচিত্ত এবং অনিন্দক’— সেই রাম কি করে তাঁর সতী-সাধ্বী পত্নীকে এভাবে অপমান করতে পারেন! ভগবদাচার্যজি একে বাল্মীকির বাক্য বলে মানেন না। তাই তিনি তাঁর সংশোধিত বাল্মীকীয় রামায়ণ থেকে অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গ সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন। Tulsidas-ও তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এ মায়াময় সীতারই অগ্নিপরীক্ষা করিয়েছেন; প্রকৃত সীতা পূর্বেই অগ্নিতে গোপনবাসে চলে গিয়েছিলেন। ‘মানস’-এর ‘অরণ্যকাণ্ড’-এ তুলসীর রাম সীতাকে বলেন—

সুনহু প্রিয়া ব্রত রুচির সুসীলা, ম্যাঁ কছু করবি ললিত নর লীলা।
তুম্হ পাৱক মহুঁ করহু নিবাসা, জৌঁ লাগি করৌঁ নিশাচর নাসা।

অধ্যাত্ম রামায়ণে-ও সীতার ছায়ামূর্তিই অগ্নিতে প্রবেশ করেছিল। তামিলের মহাকবি কম্বনও তাঁর রামায়ণ মহাকাব্যে সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গকে বাল্মীকির দোষপরিহারের রূপেই প্রকাশ করেছেন। সীতার সতীত্বের উপর লাঞ্ছনায় তিনি বিচলিত হয়ে ওঠেন। সীতার ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র বর্ণনা যুদ্ধকাণ্ডের সর্গ ১১৪ থেকে ১২০ পর্যন্ত রয়েছে। এর প্রক্ষিপ্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—এই প্রসঙ্গে সীতার প্রতি রামের প্রেমে যে আকস্মিক পরিবর্তন দেখানো হয়েছে, তা কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, সম্পূর্ণ অস্বাভাবিকও। (Bulke, Ramkatha-অনুচ্ছেদ ৫৬৫)। সীতাহরণের পর রামের বিরহের বর্ণনা বহু সর্গে পাওয়া যায়। যুদ্ধকাণ্ডের শুরুতেই রাম নিজেই বলেন যে আমার বিরহজনিত শোক দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে (সর্গ-৫ শ্লোক-৪২)। লঙ্কা অবরোধের পরেও সীতার জন্য রামের আকাঙ্ক্ষা—

জগাম মনসা সীতা দুযমানেন চেতসা (৪২/৭)

—এইরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। ইন্দ্রজিতের দ্বারা মায়া সীতার বধের সংবাদ শুনে রাম মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান—

তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা রাঘবঃ শোকমূর্ছিতঃ।
নিপপাত তদা ভূমৌ ছিন্নমূল ইব দ্রুমঃ ॥ (৮৩/১০)

এতে স্পষ্ট যে সীতার প্রতি রামের প্রেম অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু এত কিছু থাকা সত্ত্বেও রাবণবধের পর আগত সীতাকে দেখে রামের মুখে এই কথা বলা—আমি শত্রুর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি, এখন তোমার প্রতি আমার কোনও আকর্ষণ নেই; লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব অথবা বিভীষণের মধ্যে কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারো; তোমার চরিত্র নিয়ে আমার সন্দেহ আছে—এই তথাকথিত বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে রাম সীতার সত্যবচনে, যা তার পতিব্রতা স্বভাব এবং রামের প্রতি একান্ত প্রেমের পরিচায়ক, বিশ্বাস করেননি। পূর্বে রাবণের বক্তব্যও স্পষ্ট, যেখানে সে সীতাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণের জন্য এক বছরের সময় দিয়েছিল, নচেৎ সে রাবণের পাকশালার উপাদান হয়ে যাবে (অরণ্যকাণ্ড, সর্গ-৫৫)। দশ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন সীতা রাবণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তখন রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলে—নির্ধারিত সময় পূর্ণ হতে আরও দুই মাস বাকি আছে; এর পরও যদি তুমি স্বেচ্ছায় আমার পত্নী না হও, তবে আমার রাঁধুনিরা তোমাকে টুকরো টুকরো করে আমার প্রাতরাশের অংশ করে দেবে—

দ্বাভ্যামূর্ধ্বং তু মাসাভ্যাং ভর্ত্তারং মামনিচ্ছন্তীম্।
মম ত্বাং প্রাতরাশার্থে সূদাশ্ছেত্স্যন্তি খণ্ডশঃ ॥
(সুন্দর০, সর্গ-২২ শ্লোক-৯)

এতে স্পষ্ট যে রাবণ সীতার উপর জোরপূর্বক অত্যাচার করতে পারেনি। এই অবস্থায় সীতার চরিত্র নিয়ে রামের সন্দেহের কোনও সুযোগই নেই, এবং এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষারও কোনও প্রয়োজন নেই।

এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষার পর রামের এই উক্তি—আমার মনে তোমার প্রতি কোনও সন্দেহ ছিল না, কিন্তু জনসমাজের দৃষ্টিতে তোমার এই শুদ্ধিকরণ প্রয়োজন ছিল—বুলকের ভাষায়, এই ধরনের প্রদর্শন সমগ্র মূল বাল্মীকী রামায়ণের ভাবধারার বিরোধী। (বুলকে, অনুচ্ছেদ ৫৬৫)।

এই প্রকরণ (অগ্নিপরীক্ষা)-র প্রক্ষেপ অবতারবাদ স্বীকৃত হওয়ার পরেই সম্ভব হয়েছে। কারণ পরবর্তীতে বলা হয়েছে যে রামের প্রকৃত কোনও দুঃখ নেই, তিনি তো নরলীলা করছেন। রাম ও সীতা যথাক্রমে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর অবতার। ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতারা রামকে বিষ্ণু এবং সীতাকে লক্ষ্মীর অবতার জেনে তাঁদের স্তব করছেন। বাল্মীকী রামায়ণের এটিই একমাত্র স্থান যেখানে সীতা ও লক্ষ্মীর অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (যুদ্ধকাণ্ড– ১১৭/২৭)।

এই প্রসঙ্গের প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও কিছু কারণ আছে—

১. যুদ্ধকাণ্ডের ১২৪তম সর্গে ভরদ্বাজ তপোবলে রামকথা জেনে যে বর্ণনা করেন, তাতে এই প্রসঙ্গ নেই। একইভাবে ১২৬তম সর্গে হনুমান ভরতকে যে কাহিনি বলেন, তাতেও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ নেই।

২. বালকাণ্ডের সর্গ–১ এবং সর্গ–৩-এ রামকথার সংক্ষিপ্ত অনুক্রমণিকা দেওয়া হয়েছে। সর্গ–১-এর তালিকায় অগ্নিপরীক্ষা আছে, কিন্তু সর্গ–৩-এর তালিকায় নেই। Father Kamil Bulke-এর মতে, এই দুই অনুক্রমণিকার প্রামাণিক সংস্করণই অগ্নিপরীক্ষার বিষয়ে নীরব (বুলকে, Ramkatha, পৃ–৪২৫, সংস্করণ–২০০৪)।

৩. উত্তরকাণ্ডও অগ্নিপরীক্ষা সম্পর্কে কিছুই বলে না। ২ (দুই) স্থানে রাম সীতার নির্দোষতার প্রমাণের উল্লেখ করেন। প্রথমবার সীতা-ত্যাগের সময় তিনি কেবল দেবতাদের সাক্ষ্যের কথা বলেন। দ্বিতীয়বার তিনি বাল্মীকিকে বলেন যে লঙ্কা-নিবাসের পর আমি তখনই সীতাকে গ্রহণ করেছি, যখন তিনি তাঁর সতীত্বের শপথ নিয়েছিলেন—

প্রত্যয়শ্চ পুরা বৃত্তো বৈদেহ্যাঃ শপথশ্চ কৃতস্তত্র তেন বেষ্ম সুসন্নিধৌ। প্রবেশিতা ॥
(সর্গ-৯৭, শ্লোক-৩)

যদি এই সর্গের রচনাকালে অগ্নিপরীক্ষার ঘটনা প্রচলিত থাকত, তবে এখানে রামের দ্বারা সীতার সতীত্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের উল্লেখ অবশ্যই হত। অতএব মানতে হবে যে উত্তরকাণ্ডের প্রামাণিক কাহিনি লিপিবদ্ধ হওয়ার পরেই অগ্নিপরীক্ষা-সংক্রান্ত প্রক্ষেপ যুদ্ধকাণ্ডের অংশে পরিণত হয়েছে।

৪. মহাভারতের রামোপাখ্যান থেকেও এই সিদ্ধান্ত (অর্থাৎ সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রক্ষিপ্ততা) সমর্থিত হয়। রামায়ণের এই প্রাচীনতম সংক্ষিপ্ত রূপে কোথাও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

3. অগ্নিপরীক্ষার পরবর্তী দুই সর্গ (১১৯–১২০)ও অপ্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত। এতে শিব রামের স্তব করেন, স্বর্গ থেকে রাজা দশরথ উপস্থিত হন এবং ইন্দ্র রামের অনুরোধে মৃত বানর-সৈন্যদের পুনরুজ্জীবিত করেন।

রামকথার উৎস হিসেবে বাল্মীকীয় রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, কম্বন রামায়ণ এবং তুলসীদাসকৃত ‘রামচরিতমানস’ সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এর মধ্যে বাল্মীকী রামায়ণই সর্বপ্রাচীন। কিন্তু এতে কবি, কথক এবং বিভিন্ন মত-পন্থার সমর্থক-বিরোধীদের এত হস্তক্ষেপ ঘটেছে যে আজ তার কাহিনিতে আসল-নকলের পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

জার্মান ভারতেরবিদ্যা-বিশারদ Hermann Jacobi বাল্মীকী রামায়ণের উত্তরকাণ্ড ও বালকাণ্ডকে সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেন। তবে সমগ্র বালকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হতে পারে না, কারণ অযোধ্যার বর্ণনা, রাজা, মন্ত্রী, পুরোহিত ও নাগরিকদের বিবরণ, পুত্রেষ্টি যজ্ঞ, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নের জন্ম, বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রাম-লক্ষ্মণের যজ্ঞরক্ষার্থে গমন, বল ও অতিবল শক্তির প্রাপ্তি, তাড়কা বধ, বিশ্বামিত্রের যজ্ঞরক্ষা, রামের বিবাহ এবং অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন—এই সমস্তই বালকাণ্ডে বর্ণিত। বালকাণ্ডে রামকথার মূল অংশ সর্গ ১–৮, ১৩, ১৪, ১৮–৩১, ৬৬–৭৩ এবং ৭৭—মোট ৩৩টি সর্গে সীমাবদ্ধ, অথচ এই কাণ্ডে মোট ৭০টি সর্গ আছে। অতএব বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ (যা রামকথার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়) এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়া প্রমাণিত হয়।

বাল্মীকী রামায়ণের বালকাণ্ডের প্রথম সর্গে প্রদত্ত বিষয়সূচীতেও উত্তরকাণ্ডের ঘটনাবলির উল্লেখ নেই। যুদ্ধকাণ্ডেই রামকথা সমাপ্ত করা হয়েছে। সীতা নির্বাসন উত্তরকাণ্ডের মূল কাহিনি। অধ্যাত্ম রামায়ণ, Tulsidas-রচিত ‘রামচরিতমানস’ এবং কম্বন-প্রণীত তামিল রামায়ণেও বাল্মীকীর অনুকরণে অযোধ্যায় রামের রাজ্যাভিষেক ও রামরাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই কাহিনির সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।

সিয় নিন্দক অঘ ওঘ নসায়ে। লোক বিসোক বনাই বসায়ে ॥
(রামচরিত মানস, বালকাণ্ড)

তুলসীদাসকৃত এই চৌপাই থেকে সীতার বনবাসের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, লেখকের মতে এটি গোস্বামীজির রচনা নয়, বরং পরবর্তীকালের প্রক্ষেপ।

সীতার নির্বাসনকে প্রসিদ্ধ আধুনিক তামিল রামায়ণের রচয়িতা C. Rajagopalachari-ও বাল্মীকীর রামচরিত্রের আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গত বলে মনে করেন। তাঁর ‘রামকথা দশরথ-নন্দন শ্রীরাম’-এ তিনি এই অংশ অন্তর্ভুক্ত করেননি এবং এটিকে প্রক্ষিপ্ত বলে স্বীকার করেছেন।

রামকথায় অতিশয়োক্তিপূর্ণ অমানবিক বর্ণনা কীভাবে বিস্তৃত হয়ে লোকমুখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা রাবণের ‘দশশীর্ষ’ (দশানন) এবং বিশটি বাহুর বর্ণনায় স্পষ্ট দেখা যায়। যদিও বাল্মীকী রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের দশম সর্গের ৮টি শ্লোকে (১০/১৫–২২) রাবণের দুইটি বাহুরই বর্ণনা রয়েছে। পরবর্তীতে রাবণ ও সুগ্রীবের যুদ্ধে রাবণ দুই হাতে সুগ্রীবকে ধরে মাটিতে আছাড় মারেন—

বাহুভ্যামাক্ষিপত্তলে (যুদ্ধকাণ্ড, ৪০/১৩)

অতএব অনুমান করা যায়, মূল কাহিনিতে রাবণের দুই হাতই ছিল। ‘দশগ্রীব’ শব্দের প্রকৃত অর্থ না বুঝে পরবর্তী সংযোজকরা তাকে বিশ বাহুযুক্ত করে তুলেছেন। দশমস্তকের প্রসঙ্গে বুলকে লিখেছেন— “রাবণের দশটি মস্তক ছিল... এমন বর্ণনা যেমন পাওয়া যায়, তেমনই অনেক স্থানে তার একটিমাত্র মস্তকের উল্লেখও রয়েছে। ‘দশগ্রীব’ শব্দটি প্রথমে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল (অর্থাৎ যার গ্রীবা দশজন সাধারণ মানুষের সমান শক্তিশালী), পরে তা আক্ষরিক অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে।” (Ramkatha: Utpatti aur Vikas, পৃ. ৯৩, অনুচ্ছেদ ১১২, সংস্করণ ২০০৪)

এরপর Vasudev Sharan Agrawal-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বুলকে অথর্ববেদের একটি মন্ত্র উল্লেখ করেছেন—

ব্রাহ্মণো জজ্ঞে প্রথমো দশশীর্ষো দশাস্যঃ।

স সোমং প্রথমঃ পপৌ স চকারারসং বিষম্ ॥ (৪/৬/১)

এবং লিখেছেন— অথর্ববেদে এক ‘দশাস্য’ (দশমুখ) ও ‘দশশীর্ষ’ ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে, যা রাবণের রূপকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে—এটি অসম্ভব বলা যায় না।

বুলকের এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে Ram Vilas Sharma তাঁর ‘রামকথা এবং ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়’ প্রবন্ধে লিখেছেন— অথর্ববেদের এই মন্ত্রেও রূপক অর্থই নিহিত, যেমন সাতভালেকরের টীকায় বলা হয়েছে— “শীর্ষ শব্দ বুদ্ধির এবং আস্য শব্দ বক্তৃতার প্রতীক; দশগুণ বুদ্ধিমান ও দশগুণ বিদ্বান—এই তার অর্থ।” এই ধরনের রূপকের সূচনা ঋগ্বেদের—

সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ (ঋগ্বেদ ১০/৯০/১)

—ইত্যাদি মন্ত্র থেকেই। কিছু পৌরাণিক ব্যাখ্যাতা এই রূপককে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে রাবণের এক মাথাকে দশটি এবং দুই হাতকে বিশটি করে তুলেছেন।

প্রক্ষেপসমূহের আলোচনা কেবল আধুনিক কালেই হয়েছে, এমন নয়। বেদান্ত দর্শনের দ্বৈতবাদ প্রবর্তক Madhvacharya (জন্ম—১১৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)-এর অপর নাম ‘আনন্দতীর্থ’। তিনি বেদান্তের উপর ‘পূর্ণপ্রজ্ঞ’ নামে ভাষ্য রচনা করেন। তাঁর আরেকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘মহাভারত-তাত্পর্য-নির্ণয়’। এতে তিনি লিখেছেন—

ক্বচিদ্গ্রন্থান্ প্রক্ষিপন্তি ক্বচিদন্তরিতানপি।
কুর্যুঃ ক্বচিচ্চব্যত্যাসং প্রমাদাৎ ক্বচিদন্যথা ॥৩॥
অনুৎসন্না অপি গ্রন্থা ব্যাকুলা ইতি সর্বশঃ।
উৎসন্নাঃ প্রায়শঃ সর্বে কোট্যংশোপি ন বর্ততে ॥৪॥ (২/৩–৪)

এর অর্থ এই যে— “প্রক্ষেপকারীরা কেবল নতুন শ্লোক রচনা করে মূল গ্রন্থে সংযোজনই করেন না, বরং বহু মূল শ্লোক (পাঠ) অপসারণও করেন। কোথাও কোথাও মূল শ্লোকের কিছু অংশ পরিবর্তন করে তার স্থলে নিজেদের রচিত পাঠ সংযোজন করেন। এর ফলে প্রাচীন গ্রন্থকারদের রচনায় ব্যাপক বিকৃতি (উলটপালট বা বিপর্যয়) ঘটেছে।” এই কারণেই রামায়ণ ও মহাভারতের মূল কাহিনিতে অনৈতিহাসিক, প্রত্যক্ষ প্রমাণবিরোধী এবং সৃষ্টিক্রমবিরোধী অসম্ভব ঘটনার আধিক্য দেখা যায়, যার ফলে বহু বিদ্বান এই কাহিনিগুলিকে কবিকল্পিত বলে মনে করেন।

রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণ

১. পশ্চিমী সংস্করণ—নির্ণয় সাগর প্রেস (১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) এবং Gujarati Printing Press (১৯১২–১৯২০) থেকে প্রকাশিত। এটি দাক্ষিণাত্য পাঠের প্রতিনিধিত্ব করে এবং অধিক প্রচলিত।

২. দাক্ষিণাত্য সংস্করণ—সম্পূর্ণ দাক্ষিণাত্য পাঠ, কুম্ভকোণম ও মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত।

৩. পূর্বোত্তরীয় (বঙ্গীয়) সংস্করণ—Gasper Gorresio (প্যারিস) সম্পাদিত; ‘গৌড়ীয় সংস্করণ’ নামেও পরিচিত; Calcutta Series থেকে প্রকাশিত।

৪. পশ্চিমোত্তরীয় সংস্করণ—D.A.V. College, Lahore থেকে পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত, পণ্ডিত রামলভায়া এবং পণ্ডিত বিশ্ববন্ধু শাস্ত্রী সম্পাদিত।

৫. আলোচনামূলক সংস্করণ (Critical Edition)—Baroda-এর Maharaja Sayajirao University-এর Oriental Institute-এর পণ্ডিতগণ প্রায় দুই সহস্র পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে ১৯৬০–১৯৭৫ সালের মধ্যে সাত কাণ্ডে প্রকাশ করেন।

প্রচলিত সংস্করণে ৭ কাণ্ড, ৬৪৫ সর্গ এবং ২৪,০৪৯ শ্লোক পাওয়া যায়; কিন্তু Baroda Critical Edition-এ ৭ কাণ্ড, ৬০৬ সর্গ এবং ১৮,৭৬৬ শ্লোক প্রকাশিত হয়েছে।

ঈসা-পরবর্তী তৃতীয় শতকের গ্রন্থ Abhidharma Mahāvibhāṣā-তে রামায়ণের উল্লেখ আছে, যেখানে বলা হয়েছে—‘Ramayana’ নামক গ্রন্থে ১২,০০০ শ্লোক রয়েছে। এর অর্থ এই যে সেই সময়ে রামায়ণের আকার বর্তমানের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ছিল; অতএব ‘আদি রামায়ণ’-এ শ্লোকসংখ্যা আরও কম ছিল। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে Śrīmad-Valmīkiya-Rāmāyaṇam (শোধিত) গ্রন্থের সম্পাদক Śrī Niranjanlal Mangal মূল শ্লোকসংখ্যা ৩৬০৭ নির্ধারণ করেছেন এবং সেই অনুযায়ী প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে যুদ্ধকাণ্ডই উত্তরকাণ্ড, পৃথক উত্তরকাণ্ড নেই। এই অনুযায়ী ৬ কাণ্ড, প্রতি কাণ্ডে ২৪ সর্গ এবং প্রতি সর্গে ২৪ শ্লোক।

রামায়ণের গবেষণামূলক উপস্থাপনার বহু প্রচেষ্টা পূর্বে হয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশক ‘সংক্ষিপ্ত Ramayanam’ প্রকাশ করেছেন। Arya Samaj-এর ক্ষেত্রে Brahmachari Akhilanand প্রক্ষিপ্ত শ্লোকগুলি পৃথকভাবে চিহ্নিত করে প্রকাশ করেন। মহামহোপাধ্যায় আর্যমুনি-র ‘রামায়ণার্য ভাষ্য’, শ্রিপাদ দামোদর সাতভালেকর-এর টীকা, পণ্ডিত প্রেমচন্দ্র শাস্ত্রী সম্পাদিত সংস্করণ, স্বামী জগদীশ্বরানন্দ সরস্বতীর প্রচেষ্টা, ঈশ্বরীপ্রসাদ প্রেম-এর ‘শুদ্ধ রামায়ণ’—এসব উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্বামী ব্রহ্মমুনি-র ‘রামায়ণ দর্পণ’ এবং স্বামী জগদীশ্বরানন্দ-এর ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম’ গ্রন্থ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে উপস্থাপিত ‘Ramayan Sandarshika’ গ্রন্থটি তরুণ পণ্ডিত যশপাল-এর গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার ফল। লেখক রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ধারণার খণ্ডন করে যুক্তি ও প্রমাণসহ সঠিক সমাধান উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন সংস্করণ ও পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি যে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই নতুন গ্রন্থ নিঃসন্দেহে রামায়ণ বিষয়ক সাহিত্যে সমৃদ্ধি আনবে এবং রামায়ণপ্রেমী পাঠকদের আনন্দ প্রদান করবে।

বাল্মীকী রামায়ণে প্রক্ষেপ, বিকৃতি, ভ্রান্তি ও নানা সমস্যা বিদ্যমান। গ্রন্থকার শ্রী যশপাল কিছু গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিজনক প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ভ্রান্তিগুলিকে দূর করার একটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা করেছেন। প্রক্ষেপ চিহ্নিত করার জন্য তিনি রামায়ণের পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন সংস্করণ, Critical Edition, পুরাণ এবং প্রাচীন টীকাকারদের পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে ‘পারস্পরিক বিরোধ’-কে ভ্রান্তি-নিরসনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোথাও কোথাও বেদমন্ত্র, মনুস্মৃতি এবং Dayananda Saraswati ও পাশ্চাত্য লেখকদের মতামতের দ্বারা নিজের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন।

✍️ সূত্র: 📕রামায়ণ সন্দর্শিকা
ডঃ জ্বলন্তকুমার শাস্ত্রী, বৈদিক বিদ্বান,
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সংস্কৃত বিভাগ,
রণবীর রণঞ্জয় স্নাতকোত্তর মহাবিদ্যালয়,
আমেঠি–২২৭৪০৫ (উত্তর প্রদেশ)
প্রাক্তন সম্পাদকঃ ‘বৈদিক পথ’ (মাসিক)।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

রামায়ণ সন্দর্শিকা

সমগ্র বিশ্বে নিম্নলিখিত ৩টি গ্রন্থ সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ— (১) বেদ (২) রামায়ণ (৩) মহাভারত। এই তিনটি গ্রন্থের প্রভাব কেবল ভারতবর্ষেই নয়, বরং সমগ্...

Post Top Ad

ধন্যবাদ