পঞ্চমহাভূত:-(আকাশ তত্ত্ব)
আমাদের বৈদিক বিজ্ঞান এই বিষয়কে দেখায় যে এই সৃষ্টির উৎপত্তি বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির বিভিন্ন প্রকারের মিশ্রণ থেকেই হয়েছে। সমগ্র পঞ্চমহাভূত পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু এবং আকাশ এগুলো থেকেই হয়েছে তথা প্রাণ ও ছন্দ উভয় প্রকারের রশ্মি বস্তুতঃ একই হয়। এইসব মূলতঃ ছন্দ রশ্মিরই রূপ হয়। পৃথিবী, জল, অগ্নি এবং বায়ু এই চারটা মহাভূতের তো গন্ধ, রস আদি গুণ আছে, কিন্তু এগুলোর মধ্যে আকাশের কোনো গুণ না থাকার কারণে শব্দকে আকাশের গুণ মানা হয়েছে আর একে আকাশের মধ্যে বিদ্যমান থাকে মানা হয়েছে। শব্দ যদিও অন্য মহাভূতেরও গুণ হয় তথা এটা সেই মহাভূতগুলোর মধ্যেও বিদ্যমান থাকে, কিন্তু সেখানে এর বিদ্যমানতা আকাশ তত্ত্বের বিদ্যমানতার কারণেই হয়, আকাশের অভাবে হয় না।
রিক্তস্থান রূপী আকাশ, মহাভূত আকাশ থেকে পৃথক হয়। মহাভূত আকাশ অন্য মহাভূতের প্রবেশ ও নিষ্ক্রমণের স্থান ও আধার হয়। বর্তমান ভৌতিকী পঞ্চ মহাভূতের থেকে সূক্ষ্ম কোনো পদার্থের বিষয়ে বিচার করতে পারে না। এই কারণে তাদের দৃষ্টিতে আকাশ (স্পেস) মহাভূতের থেকে সূক্ষ্ম এবং নিরবয়ব কোনো পদার্থ এই সৃষ্টির মধ্যে নেই।
আকাশ (স্পেস) আট প্রকার ছন্দ রশ্মিগুলোর (দৈবী, যাজুষী, প্রাজাপত্যা, সাম্নী, আসুরী, আর্চী, আর্ষী, ব্রাহ্মী) উৎপত্তি চলাকালীনই আকাশের উৎপত্তি হয়। "আকাশ" পদ দুইটা রূপে ব্যবহৃত হয়। প্রথম রূপ হল একরস মূল প্রকৃতি পদার্থের মধ্যে প্রারম্ভিক সংকোচন বা সংঘননের ক্রিয়া আরম্ভ হলে অবকাশ রূপ (এম্পটিনেস) স্থানকেই আকাশ বলে। অবকাশ রূপ আকাশ হল অভাব বা শূন্যরূপ, এর উৎপত্তি ও এর বিনাশ ব্যবহারেই ব্যবহৃত হয়। ঋষি দয়ানন্দ দুই প্রকারের আকাশের সংকেত করেছেন। প্রথম আকাশ তো অবকাশ রূপ তথা আরেকটা ব্যোম নামক দ্বিতীয় আকাশের সংকেত আছে। অহংকার থেকেই পাঁচ মহাভূত উৎপন্ন হয়েছে, যারমধ্যে আকাশ মহাভূতের উৎপত্তি সর্বপ্রথম হয়েছে। এই সময় শ্রোত্র-ইন্দ্রিয়েরও উৎপত্তি হয়েছে।
মহাভারত শান্তিপর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩ থেকে আমরা জানতে পারি সম্পূর্ণ অহংকার (মনস্তত্ত্ব) পদার্থ স্থির, অনন্ত, অবকাশরূপ তমোময় আকাশের সমান তথা তারমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। সেই সময় চন্দ্র, সূর্য, বায়ু আদি সব পদার্থ নষ্ট অর্থাৎ নিজ কারণ রূপ সেই অচল, অনন্ত পদার্থের ভিতরে ঘুমিয়ে ছিল অর্থাৎ তারমধ্যেই লীন ছিল। সেই অহংকার বা মনস্তত্ত্ব থেকে সলিল (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.১.৬.১) অর্থাৎ সবকিছুকে নিজের ভিতরে ব্যাপ্ত বা লীন করে এমন আকাশ নামক মহাভূত উৎপন্ন হয়। সেই আকাশ এমন মনে হচ্ছিল যেন একটা অন্ধকারের মধ্যে তার থেকেই আরেকটা অন্ধকার উৎপন্ন হয়েছে। সেই আকাশ তত্ত্বের উৎপীড়ন অর্থাৎ সংকোচন থেকে বায়ু মহাভূতের উৎপত্তি হয়।
অর্থাৎ অহংকার বা মনস্তত্ত্ব থেকে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি। বৈদিক বাঙ্ময়ে আকাশ ও অন্তরিক্ষকে সমানার্থক মানা হয়েছে। এই কারণে নিঘন্টু ১.৩ -মধ্যে "আকাশ" শব্দকে অন্তরিক্ষ নামে পড়ানো হয়েছে।
ঋষির মতে আকাশ হল সেই পদার্থ যারমধ্যে সম্পূর্ণ সৃষ্টির বীজ বপন করা হয় অর্থাৎ সব প্রকারের কণা ও তরঙ্গাণু আকাশ তত্ত্বের মধ্যেই উৎপন্ন হয় ও তারমধ্যেই নিবাস করে (ঐতরেয় আরণ্যক ২.৩.১)। আকাশ প্রাণ রশ্মির রূপেই বিদ্যমান থাকে, যার মন্থন দ্বারা অগ্রিম সৃষ্টি উৎপন্ন হয় (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.১৮)। আকাশ স্বয়ং রশ্মি রূপ হয়, এই রশ্মিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয় (ঐতরেয় আরণ্যক ২.৪.১)। এর উৎপত্তি "ভুবঃ" নামক মূল ছন্দ রশ্মি থেকে হয় কিংবা এই ছন্দ রশ্মি তার বীজরূপ হয় (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৫.১; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৫.১)। এরমধ্যে বাক্ অর্থাৎ "ওম্" ছন্দ রশ্মি প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে (জৈমিনীয়োপনিষদ ব্রাহ্মণ ৪.১১.১.১১)। মহর্ষি গৌতম তাঁর ন্যায়দর্শনে আকাশের ধর্ম সম্বন্ধে লিখেছেন -
অব্যূহাবিষ্টম্ভবিভুত্বানি (ন্যায়দর্শন ২.৪.২২) অর্থাৎ এটা বিভিন্ন পদার্থকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে না, বিশেষ অবরোধ না করে সবাইকে মার্গ প্রদান করে তথা সবার মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে।
অন্যদিকে মহর্ষি কণাদ আকাশের মুখ্য লক্ষণ সম্বন্ধে এইভাবে বলেছেন - নিষ্ক্রমণম্ প্রবেশনমিত্যাকাশস্য লিঙ্গম্ (বৈশেষিক দর্শন ২.১.২০) অর্থাৎ যারমধ্যে দিয়ে বিভিন্ন পদার্থ প্রবেশ করে বা বেরিয়ে যায়, তাকে আকাশ বলে।
আর্ষী ভুরিগুষ্ণিক্ ছন্দ রশ্মির মধ্যে বিদ্যমান প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মি থেকে আকাশ তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবে বিভিন্ন রশ্মি আদি পদার্থের মাঝে আকাশ তত্ত্ব বিস্তৃত হতে থাকে, সেই কারণে বিভিন্ন রশ্মির গতি আর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই রশ্মিগুলোও সেই আকাশ তত্ত্বের মধ্যে ব্যাপ্ত হতে থাকে (ঋগ্বেদ ৩.১৩.১)। প্রাণ, অপান এবং উদান রশ্মির এক হাজার বার আবৃত্তি তথা বিভিন্ন প্রাণের সঙ্গম থেকে অন্য ছন্দ রশ্মিগুলো আকাশ তত্ত্বের রূপে প্রকট হয়। আকাশ তত্ত্ব হল সূক্ষ্ম প্রাণ আর মরুদ্ রশ্মির মিশ্র রূপ। এরমধ্যেও ত্রিষ্টুপ্ আর বৃহতী ছন্দ রশ্মি প্রচুর মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। ঋষিদের কতন বিচার করলে আকাশ তত্ত্বের স্বরূপ নিম্মানুসারে প্রকাশিত হয় - সৃষ্টি প্রক্রিয়ার অন্তর্গত যখন "ওম্", "ভূঃ", "ভুবঃ", "স্বঃ" -এর অতিরিক্ত অন্য দৈবী ছন্দ রশ্মি এবং সূত্রাত্মা বায়ু সহিত প্রাণাপানাদি প্রাণ রশ্মি উৎপন্ন হয়ে যায়, সেই সময় সেগুলোর মধ্যে কিছু রশ্মির সংঘাতে একটা সূক্ষ্ম ও প্রায় একরসবৎ পদার্থের উৎপত্তি হয়। এই পদার্থের উৎপত্তির পূর্বে প্রাণ, অপান এবং উদানের এক সহস্র বার আবৃত্তি হয়ে গিয়ে থাকে। তখন দৈবী অনুষ্টুপ্, বৃহতী, পঙক্তি ও ত্রিষ্টুপ্ এগুলোও উৎপন্ন হয়ে গিয়ে থাকে। এই চারটা ছন্দ রশ্মি পরস্পর এমন মিশ্রিত হয় যে দৈবী অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মির সমান প্রভাব দেখায়। বিভিন্ন প্রাণ, অপান আদি রশ্মিগুলো বিভিন্ন দৈবী ছন্দ রশ্মির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এমন দৈবী অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিকে প্রকট করে যা প্রায় নিষ্কম্প হয়। এই রশ্মিগুলো নিজ স্থানের উপরই স্পন্দিত হতে থাকে, এমন নয় যে মনস্তত্ত্বের মধ্যে সর্বত্র গমন করে। আকাশ তত্ত্বের অবয়বভূত প্রাণ ও মরুদ্ রশ্মিগুলো শিথিলাবস্থায় পারস্পরিক সংঘাত রূপে বিদ্যমান থাকে। এই সংঘাতে বিদ্যমান সেই রশ্মিগুলো চক্রাকার ঘূর্ণনও করতে থাকে অর্থাৎ সেগুলোর মধ্যে রেখীয় গতি হয় না, কিন্তু ঘূর্ণন গতি মন্দ বেগে হয়। এগুলোর মধ্যে অব্যক্ত দীপ্তিও বিদ্যমান থাকে।
এই রশ্মিগুলো আকাশ রশ্মি রূপে পরিচিত হয়। এই রশ্মিগুলো এই অবস্থায় এমন শিথিল হয় যে বিভিন্ন বৃহদ্ ছন্দ রশ্মি, কণা বা তরঙ্গাণু সহজে এগুলোর মধ্য দিয়ে স্বচ্ছন্দ গতি করতে পারে। গতি করা কালীন কণা, তরঙ্গাণু বা রশ্মি যখন আকাশ (স্পেস) তত্ত্বের মধ্যদিয়ে যায়, তখন সেগুলো চক্রণ করতে-করতে পূর্বোক্ত শিথিল আকাশ রশ্মির (প্রাণ ও মরুত্) মাঝে সহজভাবে স্খলিত হয়ে গতি করে। এতকিছুর পরেও এই শিথিল রশ্মিগুলো সর্বদা সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকে। এই কারণে যখন আকাশ তত্ত্ব কোনো বলের দ্বারা সংকুচিত বা ডিস্টার্ড হয়, তখন সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির দ্বারা আকাশ রশ্মির ঘূর্ণন গতি প্রভাবিত হওয়ার কারণেই হয়। বিভিন্ন মরুদ্ ও প্রাণ রশ্মিও সূত্রাত্মা বা ধনঞ্জয় বায়ু রশ্মির সানিধ্যে আকাশ তত্ত্বকে ডিস্টার্ট বা কার্ভ করতে সক্ষম হয়। উপরিনির্দিষ্ট আর্ষী ভুরিগুষ্ণিক্ অথবা ২৪ স্তোম রশ্মি উৎপন্ন হলে আকাশের নির্মাণ দ্রুত হয়।
অন্তরিক্ষম্ বা অন্তর্য়ামঃ (গ্রহঃ) (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৫.৬; ৪.৭.১; কাঠক সংহিতা ২৭.২; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪২.২) এখানে অন্তরিক্ষ অর্থাৎ আকাশ তত্ত্বকে অন্তর্য়াম নামক বল বলা হয়েছে। "বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ" গ্রন্থের মধ্যে অন্তর্য়াম বলকে এইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে -
"উদান বা অপানের সংযুক্ত বলকে অন্তর্য়াম বলে। এগুলোর মধ্যে উদান প্রাণ উপরে আর অপান প্রাণ নিচে সংযুক্ত হয়ে কোনো পদার্থের মাঝে সঞ্চারিত হতে থাকে। বিভিন্ন সূক্ষ্ম মরুদ্ রশ্মিও এই ক্ষেত্রেই সঞ্চারিত হয়। এই সবের সংযুক্ত বলকে অন্তর্য়াম বলে।"
এরদ্বারা স্পষ্ট হয় যে যেকোনো কণা বা কোয়ান্টার ভিতরেও স্পেসের অংশ বিদ্যমান থেকে সেগুলোকে ধারণ করে রাখে। আচার্য সুশ্রুত আকাশকে সতোগুণ প্রধান বলার পাশাপাশি বলেছেন - সত্ত্ববহুলমাকাশম্ (সুশ্রুতসংহিতা শারীরস্থানম্ ১.২৭) এই কারণে এই তত্ত্ব সূক্ষ্ম ও অব্যক্ত প্রকাশযুক্ত, সবথেকে হালকা অর্থাৎ নগণ্য দ্রব্যমানের হয়। ধ্যাতব্য হল, এই তত্ত্বের উৎপত্তির সঙ্গে-সঙ্গে প্রাণীদের মধ্যে বিদ্যমান শ্রোত্র ইন্দ্রিয়েরও সূক্ষ্ম রশ্মি রূপে উৎপত্তি হয়।
তথ্যসূত্রঃ
- মহাভারত আশ্বমেধিক পর্ব, অনুগীতা পর্ব, অধ্যায় - ৪২
- মহাভারত শান্তিপর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩
- আপঃ = অন্তরিক্ষনাম (নিঘন্টু ১.৩)
- বেদ বিজ্ঞান আলোক
- বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞানম্
- ঐতরেয় আরণ্যক ২.৩.১
- জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.১৮
- শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.৩.১.৩
- ঐতরেয় আরণ্যক ২.৪.১
- শতপথ ব্রাহ্মণ ১.২.১.১৬
- তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.৯
- তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৪.৬.৪
- কাঠক সংহিতা ১৬.২
- তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৩.১০.২; ২১.৭.৩
- তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.২.১.১
- শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৩.৪.১১
- কাঠক সংহিতা ৬.৮; ৭.৭
- কপিষ্ঠল সংহিতা ৩১.১৩
- তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৬.৮.৫
- জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩০৭
- তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৫.১
- তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৫.১
- জৈমিনীয়োপনিষদ ব্রাহ্মণ ৪.১১.১.১১
- গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ২.২৪

No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ