আয়ুর্বেদীয় বাঙ্ময়ের ইতিহাস ব্রহ্মা, ইন্দ্র আদি দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে অত্যন্ত প্রাচীন, গৌরবময় ও বিস্তৃত। ভগবান ধন্বন্তরি এই আয়ুর্বেদকে 'তদিদং শাশ্বতং পুণ্যং স্বর্গ্যং যশস্যমায়ুষ্যং বৃত্তিকরং চেতি' (সু.সূ. ১।১৯) বলেছেন। লোকোপকারের দৃষ্টিতে এই বিস্তৃত আয়ুর্বেদকে পরে আটটি অঙ্গে বিভক্ত করে দেওয়া হয়। তখন থেকে একে 'অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ' বলা হয়। এই অঙ্গগুলির বিভাজন সেই সময়ের আয়ুর্বেদজ্ঞ মহর্ষিরা করেছিলেন। কালান্তরে কালচক্রের অব্যাহত আঘাতে এবং অন্যান্য বহু কারণে এই অঙ্গগুলি খণ্ডিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় লুপ্তও হয়ে যায়। শতাব্দীর পর ঋষিকল্প আয়ুর্বেদবিদ পণ্ডিতেরা আয়ুর্বেদের সেই খণ্ডিত অঙ্গগুলির পুনরায় রচনা করেন। খণ্ডিত অংশগুলির পূর্তি-যুক্ত সেই সংহিতাগ্রন্থগুলিকে প্রতিসংস্কৃত বলা হতে থাকে, যেমন আচার্য দৃঢ়বল কর্তৃক প্রতিসংস্কৃত চরকসংহিতা। এ ছাড়াও প্রাচীন খণ্ডিত সংহিতাগুলির মধ্যে ভেড় (ল) সংহিতা এবং কাশ্যপসংহিতার নামও উল্লেখযোগ্য। তৎপরবর্তী কালে সংগ্রহের প্রবৃত্তি থেকে রচিত সংহিতাগুলির মধ্যে অষ্টাঙ্গসংগ্রহ এবং অষ্টাঙ্গহৃদয় সংহিতা প্রধান ও সুপ্রসিদ্ধ। পরবর্তী পণ্ডিতেরা শ্রেণিবিভাগের দৃষ্টিতে আয়ুর্বেদীয় সংহিতাগুলির বিভাজন বৃহত্ত্রয়ী এবং লঘুত্রয়ীর রূপে করেন। বৃহত্ত্রয়ীতে-চরকসংহিতা, সুশ্রুতসংহিতা এবং অষ্টাঙ্গহৃদয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কারণ 'গুণা গুণজ্ঞেষু গুণাঃ ভবন্তি'। এটিও তথ্য যে বাগ্ভটের রচনাগুলির মধ্যে যতটা প্রচার-প্রসার 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর রয়েছে, ততটা 'অষ্টাঙ্গসংগ্রহ'-এর নেই। এটিকেই ভিত্তি করে বৃহত্ত্রয়ী রত্নমালায় 'হৃদয়' রূপ রত্নটিকে নিয়ে পারখিরা গেঁথেছিলেন কি?
চরক-সুশ্রুত সংহিতাগুলির মান্যতা নিজ নিজ স্থানে প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি অক্ষুণ্ণভাবে চলে আসছে। অতএব এগুলির পঠন-পাঠন তথা কর্মাভ্যাসও হয়ে আসছে। এটিও সত্য যে পুনর্বসু আত্রেয় এবং ভগবান ধন্বন্তরির উপদেশের সংগ্রহরূপ উক্ত সংহিতাগুলিতে যা লেখা আছে, তা নিজ নিজ ক্ষেত্রের মধ্যে আপ্ত তথা আর্ষ বচনের চৌহদ্দি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে রয়ে গেছে এবং উক্ত মহর্ষিরা পরাধিকারে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিজ্ঞা করে রেখেছিলেন। এটি উক্ত সংহিতাকারদের নিজ নিজ উজ্জ্বল চরিত্র ছিল। মহর্ষি অগ্নিবেশ প্রণীত কায়চিকিৎসার নাম চরকসংহিতা এবং ভগবান ধন্বন্তরি কর্তৃক উপদিষ্ট শল্যতন্ত্রের নাম সুশ্রুতসংহিতা। এই উভয়ই আয়ুর্বেদশাস্ত্রের উত্তরাধিকার এবং অক্ষয়নিধি। সেই সেই আচার্যদের দ্বারা এগুলিতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি বিশেষভাবে আয়ুর্বেদশাস্ত্রের জীবাতু, অতএব এই সংহিতাগুলি সমাজের পরম উপকারক।
চরকসংহিতায় স্বাস্থ্যরক্ষার সিদ্ধান্তসমূহ, রোগমুক্তির উপায়সমূহ তথা আয়ুর্বেদীয় সদ্বৃত্ত আদি বিষয়গুলির যে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, তা সমস্ত দৃষ্টিতেই গুরুত্বপূর্ণ। আর অধিক কী বলা যায়, চরকোক্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত ত্রিকালাবাধিত। এই ধরনের বিষয়গুলির প্রচুর উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আচার্য দৃঢ়বল 'যদিহাস্তি তদন্যত্র যন্নেহাস্তি ন তৎক্বচিৎ' (চ.সি. ১২।৫৪) এই যে ডিণ্ডিমঘোষ করেছেন, তা চিকিৎসা-সিদ্ধান্তগুলির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে সঠিক প্রমাণিত হয়। সুশ্রুতসংহিতায় আয়ুর্বেদের আটটি অঙ্গের বিভাজন শল্যকর্মকে প্রধান বলে মনে করে করা হয়েছে; তবুও আধুনিক শল্য-শালাক্য চিকিৎসার দৃষ্টিতে এই প্রাচীন সিদ্ধান্তগুলিতে পদে পদে প্রতিসংস্কারের প্রয়োজনীয়তা প্রতীয়মান হয়।
সিংহগুপ্তের পুত্র বাগ্ভট এই প্রতিসংস্কারের উৎকট ভাবনা দ্বারা প্রেরিত হয়ে প্রথমে অষ্টাঙ্গসংগ্রহের রচনা করেন, যাকে তিনি 'যুগানুরূপসন্দর্ভ' সংজ্ঞা দিয়েছিলেন (অ.সং.সূ. ১।১৮)। তারপর সেই অষ্টাঙ্গসংগ্রহ থেকেই 'হৃদয়'-এর মতো সারভাগ স্বতন্ত্রভাবে পৃথক সংগ্রহ করে 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর রচনা করে ফেললেন এবং তার বিশ্বে সাদরে প্রচার-প্রসার হয়েছিল। বাগ্ভট কেবল আত্রেয় আদি মহর্ষিদের বচনের অনুকরণমাত্র করেননি, বরং প্রসঙ্গোচিত অভিনব বিষয়গুলিরও এতে স্থানে স্থানে সমাবেশ করেছেন, যেগুলি চিকিৎসার দৃষ্টিতে উপাদেয়। তিনি উত্তরস্থানে সেই রোগগুলির নিদান তথা চিকিৎসার বর্ণনা করেছেন, যেগুলির বর্ণনা আরম্ভের নিদান তথা চিকিৎসাস্থানগুলিতে হতে পারেনি, অতএব আয়ুর্বেদের বৃহত্ত্রয়ীতে পরবর্তী বিদ্বানেরা 'অষ্টাঙ্গসংগ্রহ' ছেড়ে 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর সমাবেশ করে ফেলেছেন, যা এই গ্রন্থের সর্বাঙ্গীণ গুণমানের জ্বলন্ত প্রমাণ।
বস্তুত কালিদাসের অনুসারে 'পুরাণমিত্যেব ন সাধু সর্বং, নবীনমিত্যেব ন চাপ্যবদ্যম্। সন্তঃ পরীক্ষ্যান্যতরদ্ ভজন্তে মূঢ়ঃ পরপ্রত্যয়নেয়বুদ্ধিঃ' ।। (মালবি০ ১।২) এর তাৎপর্য এই যে, পুরোনো অথবা নতুন সমস্ত বস্তুই নিজেদের গুণমানের কারণে গ্রহণযোগ্য এবং তার বিপরীত হওয়ার কারণে ত্যাজ্য হয়। এমন কোনো মাপকাঠি নেই যে পুরোনো সমস্ত বস্তু ভালো হবে এবং নতুন সমস্ত বস্তু অনুপাদেয় হবে। তাৎপর্য এই যে, ভালো বস্তু নিজের গুণের প্রভাবে সকলের মন আকর্ষণ করেই নেয়। নারায়ণভট্ট তাঁর 'প্রক্রিয়াসর্বস্ব' গ্রন্থে এই কথার প্রামাণিক আলোচনা করেছেন যে, যে বিষয়টি পাণিনি বলেছেন, তার ঘাটতি তাঁর পরবর্তী বার্তিককার পূরণ করেছেন; তাতে যে ঘাটতি থেকে গিয়েছিল, তা ভাষ্যকার পতঞ্জলি এবং তাতেও যে ত্রুটি থেকে গিয়েছিল, তা ভোজ আদি বিদ্বানেরা সংশোধন ও পরিমার্জন করেছেন। অতএব ব্যাকরণ সম্প্রদায়ে এই সিদ্ধান্তটি সুপ্রসিদ্ধ— 'যথোত্তরং মুনীনাং প্রামাণ্যম্' । আয়ুর্বেদের ক্ষেত্রে এই প্রকারের প্রামাণ্য মহর্ষি বাগ্ভটের রচনারও রয়েছে।
ভারতীয় বাঙ্ময়ে 'বাগ্ভট'-এর উল্লেখ অনেক পাওয়া যায়। যথা—বৃদ্ধ, মধ্য, লঘু তথা রসবাগ্ভট নামের দ্বারা প্রায় চারজন বাগ্ভট প্রসিদ্ধ। এঁদের অতিরিক্তও অন্যান্য সাহিত্যিক ক্ষেত্রে অনেক বাগ্ভট গ্রন্থকার রূপে পাওয়া যায়। হরীতসংহিতায় আয়ুর্বেদের এই আচার্যেরা বহুচর্চিত—'চরকঃ সুশ্রুতশ্চৈব বাগ্ভটশ্চ তথা পরঃ। মুখ্যাশ্চ সংহিতা বাচ্যাস্তিস্র এব যুগে যুগে।। অত্রিঃ কৃতযুগে বৈদ্যো দ্বাপরে সুশ্রুতো মতঃ। কলৌ বাগ্ভটনামা চ গরিমাত্র প্রদৃশ্যতে'।। মহর্ষি বাগ্ভটের বচনের উল্লেখ নিশ্চলকর চক্রদত্ত গ্রন্থের রত্নপ্রভা ব্যাখ্যায় করেছেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর রসরত্নসমুচ্চয়ের রচয়িতা বাগ্ভটকেই এখানে 'রসবাগ্ভট' নামে স্মরণ করা হয়েছে, কারণ তাঁর পিতার নামও সিংহগুপ্ত ছিল। পিতা-পুত্রের নামের সাদৃশ্যকে ভিত্তি করে কিছু ঐতিহাসিক বিদ্বান অষ্টাঙ্গহৃদয় তথা রসরত্নসমুচ্চয়ের রচয়িতাদের একই ব্যক্তি বলে মানার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এত কিছু হওয়া সত্ত্বেও সময়ের ব্যবধান উভয়কে এক বলে স্বীকার করার ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ প্রমাণিত হয়।
বৃদ্ধ বা প্রথম বাগ্ভট ঐতিহাসিকদের মান্যতা অনুসারে, তিনি পূর্ববর্তী আর্শসংহিতাগুলিকে নিজের গ্রন্থের ভিত্তিশিলা করে 'অষ্টাঙ্গসংগ্রহ সংহিতা'-র রচনা করেছেন। তার উত্তরস্থান অধ্যায় ৫০/১৩২-৩৩-এ নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও দিয়েছেন। আমাদের মতে, তিনি নিজের জীবনের আরম্ভে বৈদিক ধর্মানুযায়ী ছিলেন এবং 'অবলোকিত' নামক বৌদ্ধ গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করার পরে তাঁর চিন্তাধারায় পরিবর্তন এসেছিল, যার পূর্ণ প্রভাব তাঁর উক্ত রচনায় পরিলক্ষিত হয়। যেখানে বৌদ্ধধর্মের অতিরিক্ত বচনগুলির সমাবেশ হয়েছে, তাকে আত্রেয় আদি মহর্ষিদের বচন এবং তাঁর পূর্বাশ্রমের প্রভাব বলে বুঝে নেওয়া উচিত। চিকিৎসাক্ষেত্রের বিষয় 'বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়' হয়। এতে ধর্মীয় প্রভাব বাধাস্বরূপ হয় না। উক্ত বাগ্ভট বৈদিকধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের সমুচিত সমন্বয় নিজের রচনাগুলিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এমনটা অন্যত্রও দেখা যায়। অবলোকিতেশ্বরের মূর্তিগুলি গুপ্তকালে অধিকাধিক পরিমাণে পাওয়া গেছে। কালক্রমে অবলোকিতেশ্বরের মূর্তির বাহুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেখুন- কলিকাতা সংস্কৃত সিরিজ XII-8.37-38, এরই অনুসারে বাগ্ভট অবলোকিতেশ্বরের ১২টি বাহুর উল্লেখ করেছেন। বাগ্ভটের এই সংগ্রহ তথা হৃদয়ে মন্ত্রযানের রূপ তো দৃষ্টিগোচর হয়, কিন্তু বজ্রযানের নয়। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে আট প্রকারের সিদ্ধির যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেগুলির উল্লেখ বাগ্ভট রসায়ন প্রকরণে অঞ্জন, পাদলেপ, রস, রসায়নের রূপে করেছেন। কোষকার অমরসিংহ বৌদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজের কোষে প্রথমে সাংকেতিক রূপে বুদ্ধকে প্রণাম করে শাস্ত্রীয় মর্যাদা পালন করে মঙ্গলাচরণ করেছেন। তৎপর স্বর্গ, গণদেবতা, দেবযোনি তথা দৈত্যদের নামের উল্লেখ করে পরে বুদ্ধের নামগুলির পরিগণনা করতে গিয়ে এঁদের মধ্যেই যাঁদের সমাবেশ করেছেন, তাঁদের এখন ভিন্ন রূপে দেখা যায়।
চীনা পর্যটক ইৎসিং (৬৭১-৬৯৫ খ্রিস্টাব্দ) সমগ্র ভারতে প্রসিদ্ধ 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর প্রচারের উল্লেখ করেছেন। ইৎসিং-এর পূর্ববর্তী বরাহমিহির (৫০৫-৫৮৭ খ্রিস্টাব্দ)-এর জ্যোতিষ-সম্বন্ধীয় সিদ্ধান্তগুলি দ্বারা হৃদয়কার প্রভাবিত ছিলেন। যেমন তিনি আত্রেয় আদি-কে নিজের সংহিতার জীবাতু বলে মনে করেছেন, কিন্তু তিনি দৃঢ়বলের উল্লেখ কোথাও করেননি, এতে মনে হয় যে তাঁর সামনে চরকসংহিতার আদিম স্বরূপই সহজলভ্য ছিল, দৃঢ়বলের দ্বারা প্রতিসংস্কৃত স্বরূপ নয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে দৃঢ়বল তথা প্রথম বাগ্ভট প্রায় সমকালীনই ছিলেন অথবা দৃঢ়বল কিছু পূর্ববর্তী ছিলেন। বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও 'হৃদয়'-এর তুলনায় 'সংগ্রহ'-এর কলেবর বিশাল। অতএব পরিনিরীক্ষণ করার পরে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে বাগ্ভট প্রথমের কাল ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ মেনে নেওয়া উচিত। যেমন ইতিহাসকারেরা স্বীকার করেছেন, তদনুসারে এখানে পর্যন্ত প্রথম অথবা বৃদ্ধবাগ্ভটের আলোচনা করা হয়েছে। এখন এর পরবর্তী অংশে 'অষ্টাঙ্গহৃদয়'-এর রচয়িতা বাগ্ভটের আলোচনা উপস্থাপিত।
সাম্প্রদায়িক স্বরূপ - শাস্ত্র-রচনা অথবা শাস্ত্র-চিন্তার ক্ষেত্রে সমস্ত শ্রেণির বিদ্বানদের চিন্তাভাবনা সাম্প্রদায়িক ভাবগুলি পরিত্যাগ করে তত্ত্বচিন্তার দিকে অগ্রসর হতে দেখা যায়। কয়েকটি উদাহরণ- নামলিঙ্গানুশাসনের রচয়িতা অমরসিংহের মতো বাগ্ভটও নিজের ক্ষেত্রে সর্বমান্য ও সুপ্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। বৌদ্ধ জিনেন্দ্রবুদ্ধি অষ্টাধ্যায়ীর কাশিকাবৃত্তির উপর 'কাশিকাবিবরণ পঞ্জিকান্যাস' নামক ব্যাখ্যা লিখেছেন। ব্যাকরণশাস্ত্রের ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। এমনিতেও লোকে তিনি বুদ্ধের সমান সম্মান লাভ করেছেন। বৌদ্ধ পুরুষোত্তমদেব-রচিত ত্রিকাণ্ডশেষ, ভাষাবৃত্তি (অষ্টাধ্যায়ী ব্যাখ্যা) গ্রন্থগুলির সর্বত্র সমভাবের সঙ্গে আদর রয়েছে। এই শাস্ত্রকারদের কোথাও ধর্মের প্রতি দুরাগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। কারণ শাস্ত্রচিন্তায় পরম্পরা কোথাও বাধাস্বরূপ হয় না। দেখুন- হর্ষবর্ধন শৈব ছিলেন এবং রাজ্যবর্ধন সৌগত ছিলেন, অথচ এই দুজন সহোদর ভাই ছিলেন। বাস্তুপাল জৈন ছিলেন। তিনি সোমনাথের যাত্রা করেছিলেন তথা অনেক শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—এমন বর্ণনা অরিসিংহ-রচিত 'সুকৃতসংকীর্তনকাব্য'-এ পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণভক্ত জয়দেব গীতগোবিন্দে 'কেশবধৃতবুদ্ধশরীর' বলে তাঁর স্তব করেছেন। রত্নাবলীতে শ্রীহর্ষ 'শিব-পার্বতী'-র এবং নাগানন্দ নাটকে 'বুদ্ধো জিনঃ পাতু বঃ' বলে বুদ্ধের বন্দনা করেছেন। এই সমস্ত উদ্ধৃতি দেখে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে সেই কালে আজকের মতো কলহ তথা মনোমালিন্যপূর্ণ দুরাগ্রহ ছিল না। এই কারণেই বাগ্ভট আয়ুর্বেদের নির্বচনে মধ্যমার্গ অনুসরণ করেছিলেন, যার ফলে বাগ্ভট তথা তাঁর কৃতির বিশ্বে সর্বত্র সমাদর রয়েছে।
অষ্টাঙ্গহৃদয়কার বাগ্ভট- সংগ্রহ তথা হৃদয়ের রচয়িতা বাগ্ভট 'ইতি হ স্মাহুরাত্রেয়াদয়ো মহর্ষয়ঃ' এই অংশে উভয়েই সমান। মঙ্গলাচরণের পদ্যের আরম্ভ 'রাগাদিরোগ' পদ দিয়েও উভয়েই সমান এবং উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি অনুসারে উভয়ের দ্বারা গ্রথিত গ্রন্থগুলিতে চরক-সুশ্রুতের অনুগামিতাও সমান। আর কী বলব, 'সংগ্রহ'-এর অনেক অবিকল পদ্য 'হৃদয়'-এ সহজলভ্য। এই দৃষ্টিগুলি থেকে সংগ্রহ ও হৃদয়ের রচয়িতাদের এক বলে মেনে নেওয়া উচিত। এর সমর্থনে আমরা নাগপুর-নিবাসী বৈদ্য শ্রীগোবর্ধনশর্মা ছাঙ্গাণী-রচিত অষ্টাঙ্গসংগ্রহ সূত্রস্থানের ভূমিকা থেকে কিছু অংশ সাদরে উদ্ধৃত করছি-
'স্বর্গীয় জ্যোতিষচন্দ্র সরস্বতীও অষ্টাঙ্গহৃদয় উত্তরস্থান (শিবদাস সেন টীকা)-এর সম্পাদকীয় উপোদ্ঘাতে অষ্টাঙ্গসংগ্রহ ও হৃদয়ের রচয়িতাদের ভিন্ন ভিন্ন বলে মেনেছেন। এতে ভিত্তি কেবল সংগ্রহ থেকে হৃদয়ের কিছু স্থানে মতভেদ দেখানো হয়েছে। এই মতভেদে সংগ্রহের মত তো দেওয়াই হয়েছে, কিন্তু তাতে সুश्रুত আদি অনুসারে আরও কিছুটা যোগ করা হয়েছে, যা সংগ্রহের রচনাকালে বাদ পড়ে গিয়েছিল। কেবল এই কারণকে নিয়ে অষ্টাঙ্গসংগ্রহ ও অষ্টাঙ্গহৃদয়ের রচয়িতারা ভিন্ন হতে পারেন না। অষ্টাঙ্গসংগ্রহের রচনা আগে হয়েছে। তার পরে লিখিত অষ্টাঙ্গহৃদয়ে সেই একই গ্রন্থকার বাদ পড়ে যাওয়া বিষয় গ্রহণ করতে পারেন।'
মহামহোপাধ্যায় স্বর্গীয় গণনাথসেন সরস্বতী এবং শ্রদ্ধেয় যাদবজি আচার্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, উপস্থাপিত এই দুই গ্রন্থের সর্বত্র ভাষার সাদৃশ্য তথা পিতা-পিতামহের একই নাম আদি হওয়ার কারণে সংগ্রহ ও হৃদয়ের ভিন্ন ভিন্ন রচয়িতা বলে মনে করা বড় ভুলের কথা। সারাংশ এই যে, অষ্টাঙ্গসংগ্রহ এবং অষ্টাঙ্গহৃদয়ের রচয়িতা বাস্তবে একই বাগ্ভট।
এই তথ্যগুলি থেকে আশ্বস্ত অষ্টাঙ্গসংগ্রহের ব্যাখ্যাকার তথা বাগ্ভটের শিষ্য শ্রী ইন্দু তাঁর দ্বারা করা মঙ্গলাচরণ 'দুর্ব্যাখ্যাবিষসুপ্তস্য বাগ্ভটস্যাস্মদুক্তয়ঃ'-এ তথা ব্যাখ্যায় 'সোঽয়ং বাগ্ভটনামা শাস্ত্রকারঃ'-এ কোথাও বৃদ্ধ, প্রথম, মধ্য অথবা লঘু বিশেষণগুলির প্রয়োগ তাঁর নামের পূর্বে করেননি। তিনি কেবল সিংহগুপ্তসূনু বাগ্ভট বলেছেন। তাঁর দৃষ্টিতেও উভয় (সংগ্রহ তথা হৃদয়)-এর রচয়িতা বাগ্ভট একই ছিলেন। উক্ত মতের সমর্থনে অষ্টাঙ্গহৃদয়ের রচয়িতার নিম্নলিখিত সূক্তিগুলির অবলোকন তথা মনন করুন এবং এগুলির ব্যাখ্যা যথাস্থানে দেখুন-
তেভ্যোঽতি বিপ্রকীর্ণেভ্যঃ প্রায়ঃ সারতরোচ্চয়ঃ।
ক্রিয়তেঽষ্টাঙ্গহৃদয়ংনাতিসংক্ষেপবিস্তরম্।। (অ.হৃ.সূ. ১।১৪)
অষ্টাঙ্গবৈদ্যকমহোদধিমন্থনেন যোঽষ্টাঙ্গসংগ্রহমহামৃতরাশিরাপ্তঃ।
তস্মাদনল্পফলমল্পসমুদ্যমানাং প্রীত্যর্থমেতদুদিতং পৃথগেব তন্ত্রম্।। (অ.হৃ.উ. ৪০/৮০)
গ্রন্থকারদের ব্যাস ও সমাস পদ্ধতি- প্রাচীনকালে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়, যেখানে একই গ্রন্থকার একই বিষয়ের ব্যাস ও সমাস পদ্ধতিতে রচনা করেছেন; যথা- ভট্টোজিদীক্ষিতের পৌত্র তথা নাগেশভট্টের বিদ্যাগুরু শ্রী হরিদীক্ষিত বৃহচ্ছব্দরত্ন তথা লঘুশব্দরত্নের রচনা করেছিলেন। এরই প্রভাব ছিল যে তাঁর শিষ্য আচার্য নাগেশভট্ট ব্যাকরণ বিষয়ের অনেক গ্রন্থ লিখেছিলেন; যথা-বৃহচ্ছন্দেন্দুশেখর তথা লঘুশব্দেন্দুশেখর, মঞ্জূষা, লঘুমঞ্জূষা, পরমলঘুমঞ্জূষা। জয়পুরের রাজা সওয়াই জয়সিংহ (১৬৮৮-১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ)-এর কাল তথা শ্রীনাগেশভট্টের কাল একই ছিল।
নামনির্ধারণ পরম্পরা প্রায়শই প্রাচীনকালে পিতামহের নামই পৌত্রেরও রাখা হতো। দেখুন-নীলকণ্ঠ দীক্ষিত-রচিত 'গঙ্গাবতরণম্'-এর ভূমিকা, কাব্যমালা গুচ্ছক ৭৬ পৃষ্ঠা ১২, সিদ্ধান্ত-সাগর প্রেস থেকে ১৯১৬ সালে প্রকাশিত 'বিদিতমেব হি সর্বেষামস্মাকমস্মদ্দেশীয়াঃ প্রায়শো বিভ্রতি পিতামহানাং নাম; যথা-আচার্য দীক্ষিতঃ, আচার্য দীক্ষিত পৌত্রঃ'। এই প্রকারের এই নামনির্ধারণ পরম্পরা কোথায় কোথায় ছিল এবং কবে থেকে চলে এসেছে, এটিও একটি গবেষণার বিষয়, যার প্রভাব 'বাগ্ভট' নামের উপরও পরিলক্ষিত হয়। দেখুন- 'ভিষগ্বরো বাগ্ভট ইত্যভূন্মে পিতামহঃ'। (অ.সং.উ. ৫০/২০৩)
অষ্টাঙ্গহৃদয়ের কলেবর - 'কায়বালগ্রহোর্ধ্বাঙ্গশল্যদংষ্ট্রাজরাবৃষান্। অষ্টাবঙ্গানি'। (অ.হৃ.সূ. ১।১৫) অনুসারে আয়ুর্বেদের আটটি অঙ্গ এইগুলি- ১. কায়চিকিৎসাতন্ত্র, ২. বাল (কৌমারভৃত্য) তন্ত্র, ৩. গ্রহচিকিৎসা (ভূতবিদ্যা) তন্ত্র, ৪. ঊর্ধ্বাঙ্গচিকিৎসা (শালাক্য) তন্ত্র, ৫. শল্যচিকিৎসা (শল্যতন্ত্র), ৬. দংশ্ট্রা বিষচিকিৎসা (অগদতন্ত্র), ৭. জরাচিকিৎসা (রসায়নতন্ত্র) তথা ৮. বৃষচিকিৎসা (বাজীকরণতন্ত্র)। যদিও উক্ত সমস্ত অঙ্গের মধ্যে কায়চিকিৎসা এমন একটি অঙ্গ, যা সমগ্র কায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, অতএব এর দ্বারা সমস্ত অঙ্গ প্রভাবিত হয়ে যায়, তবুও অন্যান্য অঙ্গের সত্তা নিজ নিজ স্থানে বিশেষ গুরুত্ব রাখেই, তথাপি কায়চিকিৎসা অঙ্গকে সকলের মধ্যে প্রধান বলে মনে করা হয়। তিনিও সুশ্রুতের মতো নিজের গ্রন্থকে (অষ্টাঙ্গহৃদয়) ৬টি স্থানে বিভক্ত করেছেন।

No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ