প্রাচীনকাল হতে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ভাষায় ভাষ্য, প্রকরণ গ্রন্থ এবং স্তোত্রাদি মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা গ্রন্থ শঙ্করের নামে প্রচলিত আছে।
তার মধ্যে ব্রহ্মসূত্রের উপর বিখ্যাত শারীরক ভাষ্য, ঈশ-কঠ-মুণ্ডক-ঐতরেয়-ছান্দোগ্য বৃহদারণ্যক উপনিষদের উপর রচিত উপাদেয় ভাষ্যরাজি, গৌড়পাদকৃত মাণ্ডুক্যকারিকার ভাষ্য, বিষ্ণুসহস্রনাম ভাষ্য, শ্রীমদ্ভগবদগীতা ভাষ্য, মণ্ডলব্রাহ্মণোপনিষদের উপর রাজযোগ ভাষ্য, বিবেকচূড়ামণি, সর্ববেদান্তসিদ্ধান্তসংগ্রহ, উপদেশসহস্রী, অদ্বৈতানুভূতিঃ, অনাত্মশ্রীবির্গহন প্রকরণম্, মঠাম্নায়ঃ, মোহমুদগরঃ, নির্বাণদশকম্, আত্মবোধঃ, অদ্বৈতপঞ্চক, কেবলোহম্ ওর্বষ্টকম্, দক্ষিণামূর্তিস্তোত্রম্, পরাপূজা, নির্গুণমানসপূজা, প্রবোধসুধাকর, স্বাত্মপ্রকাশিকা, প্রশ্নোত্তরমালিকা, মণিরত্নমালা, বিজ্ঞান-নৌকা (স্বরূপানুসন্ধানম্), ব্রহ্মজ্ঞানাবলীমালা, ব্রহ্মানুচিন্তনম্ এবং নির্বাণষটকম্ প্রভৃতি গ্রন্থ যে আদি শঙ্করাচার্যের রচিত এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নাই। নিশ্চিত প্রমাণের ভিত্তিতে পণ্ডিতরা সকলেই এ বিষয়ে একমত। কিন্তু আপনার উল্লেখিত ভবাণ্যষ্টক, গঙ্গাষ্টক, গণেশাষ্টক, শিবস্তুতি, দুর্গাপরাধভঞ্জনস্তোত্র প্রভৃতি প্রায় ৭৫ খানি স্তবস্তুতি গ্রন্থ সহ শঙ্করের নামাঙ্কিত আরও কয়েকটি ভাষ্য ও উপদেশগ্রন্থ সম্বন্ধে আমার মনে ঘোরতর সংশয় অছে।
'দেবী সুরেশ্বরি ভগবতি গঙ্গে' থেকে আরম্ভ করে প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুণ, ভবান্যষ্টক, দুর্গাপরাধভঞ্জন স্তোত্র, কাল্যপরাধভঞ্জন স্তোত্র, গণেশাষ্টক প্রভৃতি স্তোত্র শঙ্করের রচিত নয়। ঐগুলি প্রক্ষিপ্ত।
শঙ্করাচার্যের নামে প্রকাশিত তাবৎ গ্রন্থকে তাঁর লেখা বলে স্বীকার না করলে তাতে তাঁর মহিমা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না। গ্রন্থকারের কৃতিত্ব সংখ্যাধিক্যের উপর নির্ভর করে না, বিষয় গৌরব, বস্তু গৌরব, চিন্তার স্বকীয়তা ও গভীরতা, সর্বোপরি গ্রন্থনিহিত বোধির দীপ্তিই গ্রন্থকারকে অমরতা দান করে।
ভারতের ধর্ম, দর্শন এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আচার্য শঙ্কর ছিলেন কোহিনুর স্বরূপ- কোহিনুরই বা বলি কেন, তিনি ততোধিক। কোহিনুর বহুবার লুন্ঠিত হয়েছে, তুর্কী-মোগল-ইংরেজ অনেকের কাছেই হস্তান্তরিত হয়েছে বারবার, তাতে আমাদের স্থায়ী কিছু ক্ষতি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু যদি শঙ্করাচার্যের মূল একখানি গ্রন্থও চিরতরে অপহৃত বা নষ্ট হত তাহলে দেশের যে ক্ষতি হত তা অপূরণীয়। ১৫০/২০০ টির পরিবর্তে মাত্র ৩৫টি গ্রন্থকে তাঁর প্রকৃত রচনা বলায় আপনি ক্ষুণ্ণ হচ্ছেন, কিন্তু মাত্র ৩২ বৎসর আয়ুষ্কালের মধ্যে ৩৫ খানা কালজয়ী গ্রন্থ লেখাও কি কম কথা? আমার মতে তিনি যদি কেবল ব্রহ্মহ্মসূত্রের শারীরিক ভাষ্য লিখে যেতেন, অন্য কোন বই লেখার সুযোগ তাঁর নাও হত তাহলেও তিনি মৃত্যুজিৎ কীর্ত্তির অধিকারী হতেন।
নিম্নলিখিত প্রমাণ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শঙ্করের নামে প্রচলিত অনেক পুস্তকই প্রকৃত পক্ষে অন্য লোকের দ্বারা রচিত হয়ে তাঁর নামে আরোপিত হয়ে আসছে:-
(ক) উদাহরণস্বরূপ প্রথমেই 'জ্ঞানগঙ্গাশতক এবং 'বোধসারা' নামক দুইখানি গ্রন্থের কথাই ধরা যাক। ১২৯২ সালে জনৈক অন্নদাপ্রসাদ বসু ঐ দুখানি পুস্তক কলিকাতা হতে প্রকাশ করেন। রচনার লালিত্য, রস এবং উপাদেয়তা লক্ষ্য করে তিনি ভুলক্রমে এইগুলিকে স্বয়ং শঙ্করাচার্যের লেখা বলে প্রচার করেন। কিন্তু পরে পন্ডিতরা আবিষ্কার করেন যে বিখ্যাত সংস্কৃত কাব্যকার এবং দার্শনিক বিদ্বদ্বর্ষ নরহরি নামক জনৈক দক্ষিণী ব্রাহ্মণ ঐ বই দুখানির লেখক। প্রকৃত তথ্য হল, অন্নদাপ্রসাদ বসু নরহরি রচিত 'বোধসারঃ' হতে ২৫০টি শ্লোক সঙ্কলন করেছিলেন মাত্র। নরহরি বাংলা ১২২০ সালে 'বোধসারা' রচনা করেন এবং তাঁর প্রিয় শিষ্য দিবাকর ১২২৩ সালে (১৭৩৮ শকাব্দে) তার টাকা রচনা করেন। তাঁরা কেউ শঙ্করাচার্যের নাম উল্লেখ করেন। নি। জ্ঞানগঙ্গাশতক এবং বোধসারঃ এর গ্রন্থকার যে শঙ্করাচার্য নন তার একটি বড় প্রমাণ ঐ বই দুটিতে শঙ্কর প্রবর্তিত সন্ন্যাস ধর্মের বিধি ও চিহ্নাদি ধারণের নিন্দা আছে। তাছাড় গ্রন্থমধ্যে ষোড়শ শতাব্দীতে আবির্ভূত মধুসূদন সরস্বতীর বহু উদ্ধৃতিই প্রমাণ করে যে বইটি শঙ্করাচার্যের রচনা নয়।
(খ) কাল্যপরাধভঞ্জন স্তোত্রটিও শঙ্করের রচিত নয়। কারণ, স্তোত্রটি গুপ্তার্ণব তন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। যিনি তন্ত্রমত খণ্ডন করে তার উচ্ছেদ সাধন ঘটিয়েছিলেন এবং যার জন্য বহু স্থানে তাঁর তান্ত্রিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটেছিল, এমন কি একসময় একজন কাপালিকের হাতে তাঁর প্রাণ যাওয়ারও উপক্রম ঘটেছিল, সেই শঙ্কর কোন তান্ত্রিক ভাবধারামণ্ডিত স্তোত্র রচনা করবেন বলে মনে হয় না।
(গ) আচার্যের নামে প্রচারিত দুর্গাপরাধভঞ্জন স্তোত্রটি সম্বন্ধেও ঐ একই কথা। একথা সবাই জানেন, পণ্ডিতমহলেও একথা স্বীকৃত সত্য যে আচার্য শঙ্কর ৭৮৮ খৃঃ ৮২০ খৃষ্টাব্দ অর্থাৎ ৩২ বৎসর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এমতাবস্থায় স্তোত্রটিকে শঙ্কর রচিত বলে স্বীকার করলে তিনি ৮৫ বৎসর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলে মানতে হবে। কারণ ঐ স্তোত্রের মধ্যে রচয়িতা স্বীকারোক্তি করেছেন মা দুর্গে। অন্য দেবতা পরিত্যাগ করে পঁচাশি বৎসর বা তদধিক কাল পর্যন্ত তোমারই সেবা করে এলাম। এখন তুমি যদি আমায় কৃপা না কর, তাহলে আমি আর কার শরণ নিবা পরিত্যক্তা দেবা বিবিধবিধিসেবাকুলতয়া ময়া পঞ্চাশীতেরধিকমপনীতে তু বয়সি। অপীদানীং মাতস্তব যদি কৃপা নাপি ভবিতা নিরালম্বো লম্বোদর-জননি কং যামি শরণম।।
(ঘ) শুনলে আশ্চর্য হবেন বাংলাদেশেও একজন শঙ্করাচার্য ছিলেন। লন্ডনে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে রক্ষিত 'তারারহস্যবৃত্তিকা' নামে একখানি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। নেপাল দরবার লাইব্রেরীতেও ঐ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি রয়েছে। ঐ প্রতিলিপির তারিখ লক্ষ্মণসংবৎ ৫১১ (১৬৩০ খৃঃ)। গ্রন্থের পুষ্পিকায় লেখক আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি বাঙালী এবং কৌল। তাঁর পিতার নাম কমলাকর, পিতামহের নাম লম্বোদর (Descriptive Catalougue of Sanskrit Mss in India Office Libary 4/2603)। এই গৌড়ীয় শঙ্করাচার্য রচিত 'মৃত্যুঞ্জয় পূজা', 'প্রপঞ্চসার' এবং 'সৌন্দর্যলহরী' প্রভৃতি গ্রন্থ বৈদান্তিক চূড়ামণি জ্ঞান-গুরু শঙ্করের নামে অবলীলাক্রমে প্রচলিত হয়ে আসছে।
(ঙ) প্রকৃতপক্ষে শঙ্করের রচিত নয় অথচ তাঁর নামে প্রচলিত হয়ে আসছে এমন গ্রন্থগুলিকে তাঁর মূল রচনার সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে বিচার করলেই যে কোন নিরপেক্ষ পাঠকের চোখে উভয় শ্রেণীর গ্রন্থের মধ্যে ভাষাগত ও ভাবগত অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। যেমন শ্বেতাশ্বতর ও নৃসিংহতাপনীয় উপনিষদের তথাকথিত শঙ্করভাষা। ঐ দুটি ভাষ্যের লেখক পৌরাণিক প্রসঙ্গ ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু আদি শঙ্করাচার্যের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, তিনি তাঁর লেখার মধ্যে উপনিষৎ প্রমাণকেই প্রধান্য দিয়েছেন। এ ছাড়া ঐ দুখানি ভাষ্যে ব্যাকরণ অশুদ্ধিও রয়েছে। এতেই বুঝা যায় যে, ঐ দুটি ভাষ্যের ব্যাখ্যাতা আর যিনিই হোন, তিনি কদাপি আদি শঙ্করাচার্য নন।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ ভাষ্যের একস্থানে গৌড়পাদের একটি কারিকার (৩/৫৫) উল্লেখ এইভাবে করা হয়েছে 'তথা চ শুকশিয্যো গৌড়পাদাচার্যঃ। অর্থাৎ শুকের শিষ্য কোন এক গৌড়পাদাচার্য ইত্যাদি। শঙ্করাচার্যের মত মহাজ্ঞানী শিষ্যের আচার-বিরুদ্ধ এইরকম লঘু ভাষায় লঘু চালে নিজ পরমগুরুর নাম স্মরণ করবেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন।
(চ) কেনোপনিষদের পদভাষ্য এবং বাক্যভাষাও শঙ্করের নামে প্রচলিত। কিন্তু যে কোন অনুসন্ধানী পাঠক একটু খুঁটিয়ে বিচার করলেই দেখতে পাবেন এই উভয় ভাষ্যের কোন কোন অংশে মূলের ব্যাখ্যা পরস্পর ভিন্ন এবং বিপরীত। মূল ২/১/২ এর পাঠ পদভাষ্য মতে 'নাহম' কিন্তু বাক্যভাষ্য মতে 'নাই'। লেখক একজন হলে বিশেষতঃ শঙ্করের মত মহাপণ্ডিত এর রচয়িতা হলে এই ধরণের ভাবগত ও ভাষাগত ভুল কখনও সম্ভব নয়।
(ছ) সম্প্রতি বর্তমান ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ তত্ত্বদর্শী মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ প্রণীত 'ভারতীয় সাধনার ধারা' নামে একখানি অমূল্য গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই বই-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, মাণ্ডুক্য উপনিষদের ভাষ্যও আদি শঙ্করের নয়। এর দুটি মঙ্গল শ্লোক অত্যন্ত নিকৃষ্ট ভাষায় রচিত। দ্বিতীয় শ্লোকে ত পরিষ্কার ছন্দোভঙ্গের দোষ। শ্লোকের প্রথম তিন পক্তি মন্দাক্রান্তা এবং চতুর্থ পঙক্তি অধরা ছন্দে লিখিত। অন্তিম তিন শ্লোকে ব্যাকরণগত অশুদ্ধিও বর্তমান। এই সব মারাত্মক ত্রুটি কি শঙ্করাচার্যের লেখায় সম্ভবপর।
সম্ভব যে নয় তা বিচারশীল লোকমাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য। তবুও যে নানা অবৈদিক মতবাদে কণ্টকিত (কোন কোন ক্ষেত্রে শঙ্করের জীবন-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবধারায় পরিপূর্ণ) গ্রন্থও অবলীলাক্রমে তাঁর নামে কিভাবে চলে আসছে, তার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের দেশের দু' একটি বিশিষ্ট প্রাচীন রীতি এবং বিচিত্র মানসিকতাকেই দায়ী করতে হয়। সাম্প্রদায়িক স্বার্থ এবং অতিভক্তির জলাভূমিতেই এই রীতি ও মানসিকতার জন্ম। স্বরচিত গ্রন্থের গৌরব বৃদ্ধির জন্য অনেকেই আমাদের দেশে নিজ নাম গোপন করে প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মহাত্মা ও মনীষীর নামে গ্রন্থরচনা করে গেছেন অনেকে আবার নিজ মতবাদকে জনপ্রিয় এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রসিদ্ধ আকরগ্রন্থের মধ্যে স্বরচিত অনেক শ্লোকও সুকৌশলে প্রক্ষেপ (Interpolation) করেছেন। পরবর্তীকালে অনেক গবেষক পণ্ডিতের চোখে এ রহস্য ধরাও পড়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে অভিসন্ধিপরায়ণ লোকেরা বিশেষতঃ নানা মঠ মিশনের মোহান্ত মহারাজের দল এইরকম অপকার্য করে এসেছেন। এখানে কিছু ঘটনার উল্লেখ করছি। যেমন রামের দুর্গাপুজা প্রসঙ্গ। রাম দুর্গাপূজা করেন নি, মূল বাল্মীকি রামায়ণে দুর্গাপূজার উল্লেখ নাই। রাজসাহী জেলার অন্তর্গত তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ খুঃ পঞ্চদশ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান করেন। তাঁর সভাপণ্ডিত ও পুরোহিত। পণ্ডিত রমেশ চন্দ্র শাস্ত্রীই দুর্গাপূজার পদ্ধতি ও মন্ত্রাদি রচনা করে বাজাকে দিয়ে পূজা করান। ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের লেখা 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' নামক বই-এ এই প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে এবং রাজা কংসনারায়ণের সাক্ষাৎ বংশধর, কাশীস্থ ভারতীয় ধর্ম মহামণ্ডলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রাজা শশিশেখরেশ্বর রায়ও প্রাচীন দলিল ও কাগজপত্র দৃষ্টে এই তথ্য সমর্থন করেছেন। কিন্তু রাজার সভাকবি কৃত্তিবাস তাঁর বাংলা রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রের নামে এই মহাপূজা আরোপ করার পর থেকে সারাদেশে দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়ে গেল। এখন আবালবৃদ্ধবনিতা বিশ্বাস করেন যে রাম দুর্গাপূজা করেছিলেন এবং মহামুনি বাল্মীকিই যেন ঐ পূজাপদ্ধতির প্রবর্তক।
বুদ্ধদেবের কথা ভেবে দেখুন যে বুদ্ধদেবের প্রতিষ্ঠিত ধর্মের মূল মন্ত্রই ছিল ক্ষমা, প্রেম, মুদিতা, করুণা ও অহিংসা, যে বুদ্ধদেব ঈশ্বর সম্বন্ধে সারাজীবন নীরব থেকেছেন, মূর্তিপূজা ও বহিরাচারকে যিনি অসার ও নিরর্থক বলেছেন, তন্হা অর্থাৎ তৃষ্ণা দূর করে নির্বাণলাভই ছিল যাঁর ধর্মে পরম পুরুষার্থ, সেই অমিতাভবুদ্ধের মৃত্যুর পর কি দেখা গেল। দেখা গেল, তথাগতের ধর্ম কতকগুলো ভ্রষ্টাচারী ভিক্ষু ভিক্ষুণীর স্বকপোলকল্পিত তান্ত্রিক পূজাপাঠ এবং গুহ্য ক্রিয়াকৌশলে পরিণত হয়ে গেল। একদিকে যেমন তা মহাযান, হীনযান, বজ্রযান প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত হল, অন্যদিকে তেমনি তা দণ্ডেশ্বরী, বজ্রেশ্বরী, চক্রেশ্বরী প্রভৃতি বহুতর দেবদেবীর অনুষ্ঠানসর্বস্ব পূজাপদ্ধতিতে হল পর্যবসিত। যেহেতু বৌদ্ধধর্মের কোন কোন সম্প্রদায়ে ঐ সব অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে, এজন্য কি কেউ বলবেন যে বুদ্ধদেব ঐ সব মূর্তিপূজা এবং তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ। করতেন।
আমি বলতে চাই যে রাম ও বুদ্ধদেবের মত নির্বিশেষে ব্রহ্মহ্মবাদী শঙ্করাচার্যের নামে নানা দেবদেবীর আরাধনা এবং তদনুকূল স্তোত্রমন্ত্রাদি প্রচলনের মূলেও ঐ একই মনোবৃত্তি বর্তমান। প্রক্ষেপের ভূত ভারতের ধর্মজগতে অনেক অঘটন ঘটিয়েছে, অনেক অনাচারেরই জন্ম দিয়েছে। এই ভৌতিক উপদ্রব থেকে ব্যাসদেব এমন কি স্বয়ং ভূতনাথও রক্ষা পাননি। বোম্বাই এর ক্ষেমরাজ কোম্পানী দেবনাগরী অক্ষরে একখানি পুরাণ প্রকাশ করেছেন। নাম- ভবিষাপুরাণ। অন্যান্য পুরাণ-গ্রন্থের মত এটিও ব্যাসদেবের রচিত বলে অপপ্রচার করা হয়েছে। বইটিতে আছে মহাদেবেন লোকার্থে ভবিষ্যং রচিতং শুভম্' লোকহিতের জন্য মহাদেবই যেন বইখানির প্রণেতা। লক্ষ্য করুন, এখানে লেখক এক ঢিলে দুই পাখী মারার আশ্চর্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
শিব ও ব্যাসদেব দুজনকেই জড়িয়েছেন। দুইজনের পুণ্য নামকে যথেচ্ছভাবে অপব্যবহার করেছেন। ভাবখানা এই বইটি originally মহাদেবের দ্বারা লিখিত হলেও এই অধরম ধরাধামে ব্যাসদেবই তার প্রকাশক। শিবের উক্তিতে কলিকাতারও উল্লেখ করা হয়েছে 'কলিকাতা-পূরী রম্যা প্রসিদ্ধাভুৎ মহীতলে' (৪র্থ খণ্ড)। শান্তিপুরেরও নাম বাদ যায়নি 'গঙ্গামুলে শান্তিপুরং রচিতং তেন ধীমতা'। 'তেন' অর্থাৎ রাজা শাস্তিবমা গঙ্গাতীরে শান্তিপুর নগর নির্মাণ করলেন আর তাঁর পুত্র নদীবর্মা গৌড়দেশে গড়ে তুললেন 'নদীহা' অর্থাৎ নদীয়া 'চকার নগরীং রম্যাং নদীহাং গৌড়রাষ্ট্রভাক্ (শ্লোক ২৫) শিব একে ত্রিনয়ন তায় ত্রিকালদর্শী। কাজেই মতলবী গ্রন্থকার তাঁর মুখ দিয়ে রামানন্দ, শ্রীধরস্বামী ও তাঁর গীতার টীকা, জয়দেব-পদ্মাবতী এবং গীতগোবিন্দ, চৈতন্য-শঙ্কর-রামানুজ, কবীর-নানক-নিত্যানন্দ, বিশ্বমঙ্গল, তুলসীদাস সকলের কথাই বলিয়েছেন। স্থান-কাল-পাত্র, সমীচীনতা-অসমীচীনতা কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই।
সংস্কৃত ভাষায় লিখিত হলেই তা যেমন শাস্ত্র হয় না, তেমনি 'শিব উবাচ', 'ব্যাস-উবাচ' বলে নিজেদের সংস্কার বিশ্বাস এবং মতবাদ প্রচারের প্রয়াসও কখনও মান্য ও প্রামাণ্য বলে গ্রাহ্য হতে পারে না। শঙ্করাচার্যের গদীতে বসে কেউ ফরমান জারী করলেও না।
ভবিষ্যপুরাণের শিব ও ব্যাসের উক্তিতে যেমন কৌতুক সৃষ্টি করা হয়েছে, তেমনি কৌতুক সৃষ্টি করা হয়েছে সাক্ষাৎ বেদান্ত মূর্তি আচার্য শঙ্করকে নিয়ে। ভবিষ্যপুরাণের শুদ্ধ ও সরল সংস্কৃত ভাষার কোন ব্যাকরণ গত দোষ নাই। তাই তা যেমন শিব ও ব্যাসের রচনা বলে চালাতে কোন অসুবিধা নাই, তেমনি লালিত্যমণ্ডিত ছন্দোবদ্ধ সংস্কৃতে নানা শ্লোক ও স্তোত্রমন্ত্রাদি রচনা করে শঙ্করের নামে প্রচার করলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তাও সহজে ধরার উপায় নাই। সূক্ষ্ম মনন ও বিচারের আলো ফেলে শঙ্করের নামাঙ্কিত কোন কোন গ্রন্থে তাঁর জীবন-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব সুকৌশলে পরিবেশন করে সম্প্রদায়ীরা তাদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থবুদ্ধি চরিতার্থ করেছে, কয়জনই বা তা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে বলুন। তাই অগণিত মানুষ আজও সহজিয়া ভক্তিবশে আচার্যের নামাঙ্কিত প্রতিটি রচনাকেই তাঁরই মূল রচনা বলে মনে করেন। যিনি ছিলেন জ্ঞানগঙ্গার নব ভগীরথ, অদ্বৈতবাদের মহান্ উদ্গাতা, যাঁর অভেদ দৃষ্টিতে সর্বত্র সর্ব বস্তুতে অদ্বয় ব্রহ্মের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু ভাসত না, তাঁর পক্ষে 'দেবী। সুরেশ্বরী ভগবতে গঙ্গে' বলে ভৌম গঙ্গার স্তবস্তুতি এবং বাহ্যিক পূজারাধনামূলক মন্ত্রাদি রচনা সম্ভব কিনা তা একবারও কেউ বিচার করে দেখে না। যিনি স্বরচিত 'আত্মপূজা' বা 'পরাপূজা'তে ব্রহ্ম যজ্ঞের ভাব এবং 'নির্গুণমানসপূজা'তে বাহ্যিক পূজাঙ্গ ষোড়শোপচারাদির নিগূঢ় তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করে কিভাবে দিব্যভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে নির্গুণের ধ্যান করতে হয়, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিশদভাবে বুঝিয়ে গেলেন, তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মঠের মঠাচার্যরা তবু কেন যে পূর্ণাগিরি, শারদাদেবী, প্রভৃতির জড়োপসানার ঠাঁট সাড়ম্বরে বজায় রেখেছেন, তা আমার বুদ্ধির অগম্য। ঐ সমস্ত মূর্তির পূজা যে তাঁর অন্তর্ধানের পর শিষ্য প্রশিষ্যদের দ্বারাই প্রচলিত হয় নি, তার কি কোন নিশ্চিত প্রমাণ আছে?
সত্য বটে, আচার্য তাঁর 'মঠাম্নায়ঃ' নামক অনুশাসন-গ্রন্থে সিদ্ধেশ্বর, নারায়ণ, জগন্নাথ, ভদ্রকালী, বিমলা ও পূর্ণাগিরি প্রভৃতি দেবদেবীর নামোল্লোখ করেছেন। কিন্তু তা কি অর্থে? তাঁর ঐ সনদ বা অনুশাসনে পূজ করার কোন নির্দেশ নাই, প্রধান চারটি মঠের পরিচয় দিতে আচার্য ঐ সব দেব-দেবীর কথা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন মাত্র। যেমন শারদা মঠের পরিচিতিতে বসেছেন
দ্বারকাখ্য হি ক্ষেত্রং স্যাৎ দেবঃ সিদ্ধেশ্বরঃ স্মৃতঃ।
ভদ্রকালী তু দেবী স্যাদাচার্যো বিশ্বরূপকা।
মঠটি কোথায়। না দ্বারকাক্ষেত্রে, যেখানে সিদ্ধেশ্বর ও ভদ্রকালী রয়েছেন, সেখানকার প্রথম আচার্য হবেন বিশ্বরূপ অর্থাৎ সুরেশ্বর।
গোবর্দ্ধন মঠ সম্বন্ধে আচার্যের বিজ্ঞপ্তি-
পুরুষোত্তমং তু ক্ষেত্রং স্যাজ জগন্নাথোহস্য দেবতা।
বিমলাখ্যা হি দেবী স্যাদাচাৰ্য্যঃ পদ্মপাদকঃ।
অর্থাৎ গোবর্দ্ধন মঠটি পুরুষোত্তমক্ষেত্র অর্থাৎ পুরীতে অবস্থিত যেখানে জন্মনাথ ও বিমলা দেবী আছেন, সেখানকার প্রথম আচার্য হবেন পদ্মপাদ। এখানে 'অস্য দেবতা' বলতে মঠের আরাধ্য দেবতা নন, অস্য ক্ষেত্রসা দেবতা। পুরীক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ দেবতা জগন্নাথ, জগন্নাথের নামেই পুরীর নাম পুরুষোত্তম বা জগন্নাথক্ষেত্র। গোবর্দ্ধন মঠের অভ্যন্তরে জগন্নাথের কোন মূর্তি প্রতিষ্ঠিত নাই, আচার্যও তাঁর পূজার কথা বলছেন না।
জ্যোতির্মঠ সম্বন্ধে বলেছেন
বদরিকাশ্রমঃ ক্ষেত্রং দেবো নারায়ণঃ স্মৃতঃ।
পূর্ণাগিরি চ দেবী স্যাদাচার্যড্রোটকঃ মৃতঃ।।
এই মঠটি বদরিকাশ্রমে অবস্থিত যেখানে ক্ষেত্রদেবতা নারায়ণ এবং পূর্ণাগিরির মন্দির আছে
সেখানে প্রথম আচার্য হবেন তোটকাচার্য।
সর্বশেষে আচার্য শৃঙ্গেরী মঠের অবস্থান নির্দেশ করেছেন এইভাবে
রামেশ্বরাহয়ং ক্ষেত্রমাদিবরাহ দেবতা।
কামাক্ষী তস্য দেবী স্যাৎ সর্বকামফলপ্রদা।
পৃথ্বীধরাখ্য আচার্যস্তুঙ্গভদ্রেতি তীর্থকম্।।
শৃঙ্গেরী মঠটি কোথায়। না রামেশ্বরক্ষেত্রে, তুঙ্গভদ্রা নদীতীরে এই তীর্থের দেবতা হলেন আদিবরাহ এবং দেবী কামাক্ষী। পৃথ্বীধর এখানকার প্রথম আচার্য হবেন।
আপনি যদি কাউকে আপনার বাসস্থান কলিকাতার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন যে, এই শহর গঙ্গাতীরে অবস্থিত, হিন্দুরা গঙ্গাকে তীর্থ বলে মনে করেন, এখানে কালীঘাটের কালী প্রধান দেবতা, এখানে নকুলেশ্বর শিবের মন্দির এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল রয়েছে, তাহলে তাতে যেমন আপনি ঐ ভদ্রলোককে কালী নকুলেশ্বর প্রভৃতিকে পূজা করতে বলছেন একথা মনে করা চলবে না, তেমনি মঠাপ্লায়ে দেবদেবীর উল্লেখ আছে বলেই আচার্য তাঁদের পূজার বিধান দিয়েছেন এ কথা ভাবাও যুক্তিসঙ্গত নয়। আচার্যের আবির্ভাবের পূর্ব হতেই তাঁর মঠগুলির সন্নিহিত স্থানে ঐ সকল দেবদেবীর মন্দির বর্তমান ছিল, তিনি সেগুলির উল্লেখ করে নিজের মঠের অবস্থান (Location) বর্ণনা করেছেন।
তবুও যদি বলেন তবে কেন মঠাচার্য 'জগদ্গুরুর' দল ঐ সব মূর্তিপূজা করেন, তার একমাত্র উত্তর তাঁদের সংস্কার বদ্ধতা এবং প্রচলিত সামাজিক বিধিবিধান পালন করে জনতার তুষ্টি বিধানের মনোবৃত্তিই এর জন্য প্রধানতঃ দায়ী। এইভাবে তাঁরা অদ্বৈতবেদান্ত এবং বহিরাচারকে জোড়াতালি দিয়ে আপোষরফা করেছেন এবং প্রতিষ্ঠা বজায় রেখেছেন। আমার যুক্তির অনুকূলে আরও কিছু প্রমাণ দিচ্ছি। 'ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ্যশঃ। যজুর্বেদের (৩২/৩) এই বিখ্যাত মন্ত্রের অর্থ আচার্য অবগত ছিলেন একথা আশা করি, সকলেই স্বীকার করবেন। 'ন প্রতীকে ন হিঃ সঃ' ব্রহ্মসূত্রের ((8/9) / 8) মন্ত্রের ভাষ্য করতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, জড়মূর্তি কোনমতেই নির্বিশেষ ব্রহ্মের প্রতীক হতে পারে না। 'মনকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করবে এটি আধ্যাত্মিক প্রতীক। আকাশ ব্রহ্ম এটি আধিদৈবিক প্রতীক ইত্যাদি' (শারীরিক ভাষ্যের অনুবাদ)। শুধু তাই নয়, গীতার ১৮অ/৫০ শ্লোকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির পদ্ধতি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ যেখানে বলেছেন- 'সিদ্ধিং প্রান্তো যথা ব্রহ্মা তথাপ্নোতি নিবোধ মে' সেখানে সেই শ্লোকের ভাষ্য করতে গিয়ে জ্ঞান-ভাস্করের বক্তব্য কত স্পষ্ট শুনুন। যাঁরা নিরাকার পরমাত্মার বুদ্ধিতে ধারণার জন্য মূর্তির দরকার বলে থাকেন, তাঁদের সেই অসার যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে আচার্য কতকটা যেন উষ্ণ কণ্ঠেই বলছেন 'কেচিত্ব পণ্ডিতম্মন্যা নিরাকারত্মাদাত্মবস্তু নোপৈতি বুদ্ধিরতো দুঃসাধ্যা সম্যগ জ্ঞাননিষ্ঠেতাহা। সত্যমেবং গুরুসম্প্রদায়রহিতানাং অশ্রুতবেদান্তানাং অত্যন্তবহিবিষয়াসক্তবুদ্ধীনাম্ সম্যক্ প্রমাণেষকৃতশ্রমানাং কোন কোন পণ্ডিতম্মন্য বলে থাকে যে পরমাত্মা নিরাকার বলে তাঁকে মনুষ্যবৃদ্ধি ধারণা করতে পারে না। কাজেই দুঃসাধ্য। সতা বটে, যারা সদগুরুর কোনদিন সেবা করেনি, বেদান্ত শ্রবণ মননের সৌভাগ্য যাদের হয়নি, ন্যায়াদি প্রমাণ বিষয়ে কিছুমাত্র পরিশ্রম করে নি, সেই সব অত্যন্ত বহির্মুখ বিষয়াসক্তরাই তো ঐ রকম বলবে।" অর্থাৎ সাকার উপাসনা সম্বন্ধে যাঁর মন্তব্য এতই কঠোর, তিনি তাঁর মঠে পূর্ণাগিরি, শারদা ইত্যাদি পূজার নির্দেশ দিয়ে যাবেন এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। যিনি প্রকৃত আচার্য তিনি নিজে যা বলেন, কার্যতঃ তাই আচরণ করেন। শঙ্কর ছিলেন আচার্যানাং আচার্য্য তাঁর practice এবং preaching এর মধ্যে বিরোধিতা (Self-contradiction) ত আমি ভাবতেই পারি না।
বজ্রগতি যখন এই প্রকার, কীর্তিমান শঙ্করপন্থীদের হাতেই যখন শঙ্করের ভাবধারা এইভাবে বিপর্যস্তঃ এবং বিকৃত, তখন কোন গ্রন্থটি প্রকৃতপক্ষে তাঁরই লেখা, তা নির্ণয় করা দুরূহ সন্দেহ নাই। তবুও আমার মতে এর একটি সহজ উপায় আছে। সবাই জানেন গ্রন্থ হল লেখকের মানস-দর্পণ। গ্রন্থের ভাবধারা দিয়েই চেনা যায় লেখককে এবং তাঁর লেখাকে। আদি শঙ্করাচার্যের ভাবধারাও তাঁর কৃত ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে বিধৃত রয়েছে; বিধৃত রয়েছে তাঁর গীতা এবং উপনিষদগুলির ভাষ্যের মধ্যে, ভাষাবৃত তত্ত্বের নিগূঢ় তাৎপর্য বিদ্যারণাকৃত পঞ্চদশী, বাচস্পতি মিশ্রের ভামতী টীকা, মধুসুদন সরস্বতীর অদ্বৈতসিদ্ধিঃ নামক গ্রন্থ এবং আরও অনেক বার্তিক ও টাকা টীপ্পনীর মধ্যে অত্যন্ত যুক্তিসিদ্ধ ভাষায় আম্লাত রয়েছে। সেইগুলি দেখলেই এই অদ্বৈতবাদী পরমযোগীর জীবন-দর্শনের সম্যক্ পরিচয় পেতে কারও অসুবিধা হয় না। এখন যদি এইসব চিন্তাধারার বিপরীত কোন তত্ত্ব কোন গ্রন্থে দেখা যায়, তাহলে অবিলম্বে আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসা উচিত যে ঐ সব তথাকথিত গ্রন্থ শঙ্করের নামে। প্রচারিত ও প্রচলিত হলেও তা নিশ্চয়ই শঙ্করের নয়।
এই ব্রহ্মাজ্ঞ মহাপুরুষের মহত্তম স্থিতি এবং সর্বোত্তম গতির কথা একবারটি চিন্তা করে দেখুন। যিনি বলতে পেরেছিলেন
অহং নির্বিকল্পো নিরাকাররূপো বির্ভূব্যাপী সর্বত্র সর্বেন্দ্রিয়াণাম।
ন বা বন্ধনং বৈ মুক্তির্ন ভীতিশ্চিদানন্দরূপঃ শিবোহহম্ শিবোহহম্।। ৬
যিনি অনুভব করেছিলেন
(নির্বাণঘাটকম) 'আমি বিকল্পশূণ্য, সর্বত্রব্যাপ্তিহেতু, আমি নিরাকার, সকল সময়ে সকল ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্বন্ধরহিত হওয়ায় আমি ইন্দ্রিয়াতীত, আমার যুক্তি বা বন্ধনের বালাই নাই, আমি সচ্চিদানন্দ শিব অর্থাৎ স্বয়ং ব্রহ্মাস্বরূপ,
যদর্কেন্দুবিদ্যুৎ প্রভাজালমালা বিলাসাম্পদং যৎ স্বভেদাদিশূনাম।
সমস্তং জগদ যস্য পাদাত্মকং স্যাল্ যতঃ শক্তিভানং তদেবাহম্মি।। ১০ (নির্বণিমারী) 'যিনি সূর্য, চন্দ্র, বিদ্যুৎপ্রভাসমূহের বিলাসের আশ্রয়, যিনি স্বগতাদিভেদশূণ্য, সমস্ত জগৎ যাঁর এক চতুর্থাংশস্বরূপ, যা হতে সমস্ত শক্তির উদ্ভব ও প্রকাশ ঘটে, আমি সেই ব্রহ্মস্বরূপ। 'যিনি পুনঃ পুনঃ ঘোষণা করে গেছেন- 'নির্বিকার, নির্বিশেষ, নির্গুণ, চৈতনাস্বরূপ পরমাত্মা কখনও দ্বৈতভাবে উপাস্য নন, কেবল অহং ইত্যাকার জ্ঞানেই উপলভ্য,' তাঁর পক্ষে কখনও কি ক্ষন্তব্যোমেহপরাধঃ প্রকটিতবদনে কামরূপে করালে'
ইত্যাদি বলে সগুণ দেবতার পূজাপাঠ বা স্তবস্তুতি রচনা সম্ভব। যিনি নির্গুণমানসপূজাতে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন-
অখণ্ডে সচ্চিদানন্দে নির্বিকল্পৈকরাপিণি।
স্থিতিহদ্বিতীয়ভাবেহস্মিন্ কথং পূজা বিধয়ীতে।।
তিনিই আবার
স্নাহা প্রত্যুষকালে রূপনবিধিবিধৌ নাহৃতং গাঙ্গতোয়ং,
পূজার্থং বা কদাচিদবহুতরগহনাৎ খণ্ডবিশ্বদলানি।।
নানীতা পদ্মামালা সরসি বিকশিতা গন্ধযুপৌ ত্বদর্থং
ক্ষন্তব্যোমেহপরাধঃ শিব শিব শির ভোঃ শ্রীমহাদের শন্তো।' (শিবপারবভঞ্জন ডোত্র)
ইত্যাদি বাহ্যপূজামূলক স্তোত্রাদি রচনা করেন কি করে। অত্যন্ত সহজ বুদ্ধিতেই ধরা পড়ে, প্রথমটি শঙ্কর-রচিত হলে দ্বিতীয়টি নিশ্চয়ই তিনি লেখেন নি। 'নির্গুণমানসপূজা' যে আদি শঙ্করাচার্যের লেখা, সে কথা সকল পণ্ডিতরাই স্বীকার করেন। কাজেই শিবপরাধভঞ্জন' স্তোত্রটি শঙ্কর-রচিত নয়, একথা বলাই বাহুল্য মাত্র। নিজের ইস্টের প্রাধান্য স্থাপনের জন্যই কোন শিবভক্ত শঙ্করাচার্যের নাম অপব্যবহার করেছেন।
দীর্ঘকাল ধরেই এই অপকার্য চলে আসছে। আমি পূর্বেই বলেছি সম্প্রদায়ীদের নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠার দুরভিসন্ধি ছাড়াও এর মূলে আরও একটি কারণ রয়েছে, তার নাম দিয়েছি অতিভক্তির জলাভূমি। ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির গবেষক মাত্রেই জানেন যে প্রাচীনকালে শুরুগতপ্রাণ শিষ্যরা গ্রন্থ রচনা করে স্বীয় গুরুদেবের নামে উৎসর্গ করতেন গুরুর নামেই তা প্রকাশ করতেন। এই পদ্ধতি শুরুভক্তির পরাকাষ্ঠা সন্দেহ নাই কিন্তু ব্রহ্মবিদ্ শুরু নিজে ভূমার ভূমিতে উঠে আপন উপলব্ধ সত্য যেমন ভাবে প্রকাশ করতে পারেন তেমনিভাবেই তাঁর কোন শিষ্যের পক্ষে তা কখনও নির্ভুলভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রশিষ্যরা প্রকাশ করলে ত আর কথাই নাই।আদিগুরুর ভাবধারার সঙ্গে তাঁদের ভাবধারার উপলব্ধিগত তারতম্য ঘটতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, নানক ও কবীরের কথা চিন্তা করে দেখুন। বিখ্যাত 'গ্রন্থসাহেবের' সকল চৌপাই বা দৌহা নানকের স্বরচিত নয়। তাঁর তিরোধানের পর গুরু অঙ্গদ হতে আরম্ভ করে শুরু অর্জুনদেব, হরকিষণজী, শুরু গোবিন্দ সিং প্রভৃতি অপর ৯ জন গুরুর বহু উপদেশও 'নানক কহে' এই বয়ানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কবীরের নামে যে অজস্র দোঁহা প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটি কবীরের রচিত নয়। তাঁর শিষ্য প্রশিষ্য রচিত দোঁহাও 'কহত কবীরা শুন ভাই সাধু'। বলে কবীরের নামে প্রচলিত হয়ে আসছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঐ সব দোঁহাতে যে স্থানে স্থানে ভাববিভ্রাট এবং তত্ত্বগত বিভ্রাট ঘটেছে তা যেকোন বিচারশীল পাঠকের চোখে ধরা পড়বে।
জ্ঞানগুরু শঙ্করের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা প্রযোজ্য। ভারতবর্ষে আদি শঙ্করাচার্য ছাড়াও আরও অনেক 'শঙ্করের' সন্ধান পাওয়া গেছে। আমি পূর্বেই এক গৌড়ীয় শঙ্করাচার্যের কথা বলেছি। আচার্য প্রতিষ্ঠিত প্রধান চারটি মঠের মোহান্ত মাত্রেই শঙ্করাচার্য নামে অভিহিত হয়ে আসছেন অর্থাৎ তাঁরা প্রত্যেকেই 'শঙ্কর'। শৃঙ্গেরী মঠের গুরু পরম্পারাতেও বিদ্যাশঙ্কর ও ভারতীশঙ্কর নামে দুজন প্রসিদ্ধ 'শঙ্কর' ছিলেন। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের 'ত্রিপুরাতন্ত্রর' নামে একখানি গ্রন্থ আছে। ঐ গ্রন্থমতে শঙ্করাচার্যে ১৪ জন শিষ্য ছিলেন, তার মধ্যে ৫ জন সন্ন্যাসী এবং ৯জন গৃহী। ঐ ৫ জন সন্ন্যাসী শিষ্যের মধ্যে একজনের মূল নামই ছিল 'শঙ্কর'। এ ছাড়া কাজী-কামকোটি পীঠের গুরুপরম্পরাতে কৃপাশঙ্কর, উজ্জ্বলশঙ্কর, মুকশঙ্কর এবং অভিনবশঙ্কর নামেও কয়েকজন বিদ্বান্ সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটেছিল। অভিনবশঙ্করের তিরোভাব কাল ৮৪০ খৃষ্টাব্দ। আর আদি শঙ্করাচার্যের তিরোভাব কাল ৮২০ খৃষ্টাব্দ। অর্থাৎ আদি শঙ্করাচার্যের সমসাময়িক কালে ত বটেই তাঁর তিরোভাবের পরও কিছুকাল ঐ অভিনবশঙ্কর বর্তমান ছিলেন। এই সমস্ত 'শঙ্করের' রচিত অনেক গ্রন্থই নামসামা হেতু আদি শঙ্করের নামে প্রচলিত হয়ে আসছে বলে আমার ধারণা। বিশেষতঃ শঙ্করের নামে প্রচলিত যাবতীয় শক্তিবিষয়ক স্তবস্তুতি যে পূর্বোক্ত কৌলসাধক গৌড়ীয় শঙ্করাচার্য এবং ত্রিপুরাতন্ত্রোক্ত শঙ্করের দ্বারা রচিত হয়েছে, সে বিষয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ নাই। কবীর নানকের শিষ্য প্রশিযারা যেমন স্ববর্তিত রচনা স্ব স্ব গুরুবর্গের নামে প্রকাশ করে স্বেচ্ছায় আত্মবিলোপ ঘটিয়েছেন, তেমনি ঐ সমস্ত 'শঙ্কর মহারাজরাও' কেউ নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আবার কেউ বা গুরুভক্তির পরাকাষ্ঠা স্বরূপ নিজেদের রচনা আদি শঙ্করাচার্যের নামে স্বেচ্ছায় প্রচলিত করে থাকতে পারেন। তার ফলে তাঁদের ভাবধারাও শঙ্করাচার্যের ভাবধারা বলে অবলীলাক্রমে ভ্রমবশতঃ পরিগৃহীত ও পরিগণিত হয়ে আসছে।
এমতাবস্থায় গুরুমুখী বা হিন্দী ভাষায় রচিত যে কোন দোঁহার অন্তে 'নানক কহে' কিংবা 'কহত কবীরা' থাকলে তাকে যেমন নিঃসংশয়ে নানক বা কবীরের রচিত বলা যায় না, তেমনি সংস্কৃত ভাষায় রচিত যে কোন গ্রন্থের অন্তে ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ-পূজ্যপাদ-গোবিন্দপাদাচার্যশিষ্য-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য-শ্রীশঙ্করভগবৎপূজ্যপাদ বিরচিতং' ইত্যাদি ছাপা থাকলেই তা স্বয়ং আদি শঙ্করাচার্যের দ্বারা লিখিত একথা বলা যুক্তিসঙ্গত নয়, এই হল আমার সিদ্ধান্ত। অলমিতি।
তপোভূমি নর্মদা সপ্তম খণ্ড
(শ্রী শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী)
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ