পারস্যের আর একটি প্রাচীন নাম ইরাণ। ইরাণদেশের অধিবাসীরা 'ঐরাণ' নামেও পরিচিত। ইরাণ ও ঐরাণ- এই দুটি শব্দের মূল অনুসন্ধান করলে আমরা পাই যে চন্দ্রবংশে ইড়ার গর্ভে পুরুরবার জন্ম হয়। তাঁর বংশধরগণ অর্থাৎ ইড়ার পুত্র- এই অর্থে 'ঐড়' নামে অভিহিত। এই ঐড়গণের বাসস্থান বলে ঐড়াণ বা ঐরাণ নামের উৎপত্তি। সূর্যবংশীয়দের সঙ্গে চন্দ্রবংশীয়দের বিবাদের ফলেই যে তাদেরকে এদেশ ত্যাগ করতে হয় একথাও আমাদের ধর্মশাস্ত্রে বারবার উল্লেখ আছে। তুরাণ ও ইরাণদের যুদ্ধ আসলে চন্দ্রবংশীয় ও সূর্যবংশীয়দেরই যুদ্ধ। সুর ও সুরাণ শব্দের অপভ্রংশে যে তুর ও তুরাণ শব্দের উৎপত্তি - একথা ভাষাতত্ত্ববিদমাত্রেই স্বীকার করতে বাধ্য। বেদ ও জেন্দ অভেস্তায় বর্ণিত দেবদেবীদের নাম, বীরগণের নাম ও উপাখ্যান, যজ্ঞবিধি ধর্ম কর্ম আচার ব্যবহার সবকিছু আলোচনা করলে সব বিষয়ে সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। অনেক ঘটনার এমন হবহু মিল দেখা যায় যে সবিস্ময়ে ভাবতে হয়- একটি অপরটির ভাষান্তরে অনুবাদ মাত্র কিনা। কর্ণেল টডের মত ভারতবিদ্বেষী লোকও প্রাচীন মিডিয়া রাজ্যের অভ্যুদয় বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একস্থানে লিখেছেন প্রাচীন ব্রহ্মাবর্তবর্ষের রাজা অজমেধের পাঁচটি পুত্র ছিল। তাঁদের মধ্যে দুজন ভারতবর্ষ ত্যাগ করে উত্তর পশ্চিমে চলে যান। তাঁরা সেখানে নূতন রাজ্য স্থাপন করেন এবং পিতৃস্মৃতি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তাঁদের পদবী মেধ এবং তাঁদের বাসস্থানের নাম রাখেন মেধদেশ- এই মেধদেশই চলতি ভাষায় মেধিয়া হতে ক্রমে Media নামের উৎপত্তি। এইভাবে তিনি পারসীদের সম্বন্ধে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন The country from which Persians are said to have come, can no other be than the North-West Part of Ancient India.'
প্রাচীন ভারতীয়দের একটি দল যে আফগানিস্থান বেলুচিস্থানের পথে হিমালয় অতিক্রম করে পারস্যে উপনীত হয়েছিলেন- একথা সবিস্তারে জেন্দ অভেস্থাতেই লেখা আছে। জেন্দ অভেস্থার অন্তর্গত 'ভেন্দিদাদ' নামক অংশে জরাথুষ্ট্রকে সম্বোধন করে আহুর মাজদা বলছেন- 'আমি মনুষ্যদিগের জন্য অত্যুৎকৃষ্ট উর্বর ভূখণ্ড প্রদান করিয়াছি। কেহই সেরূপ ভূখণ্ড প্রদানে সমর্থ নহেন। সেই ভূখণ্ড পূর্বভাগে অবস্থিত। সেখানে প্রতি সন্ধ্যায় তারাদল সমূদিত হন'। জেন্দ্ অভেস্থায় আরও লেখা আছে জামসেড নামক নেতার কর্তৃত্বাধীনে ঐ জাতি সেই পূর্ব স্থিত উচ্চ ভূখণ্ড হতে জীবজন্তু মনুষ্যহীন সমতলে উপনীত হন। ভূগোল সম্বন্ধে যাঁর কিঞ্চিৎমাত্র জ্ঞান আছে - তিনি নিশ্চয়ই ঐ বর্ণনা হতে বুঝতে পারছেন যে পারস্যের পূর্বভাগে ভারতবর্ষ অবস্থিত। মূলকথা যে জরাথুষ্ট্রকে পাশ্চাত্য ও প্রতীচ্যের গবেষকগণ ও পণ্ডিতগণ পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদের উদ্দ্গাতা বলে বর্ণনা করেন- তাঁর সেই প্রাচীনতম ধর্মমতের মূল উৎস ভারতীয় বৈদিক ধর্মের মধ্যেই নিহিত।
ভারতের আর্য হিন্দুগণ ও পারস্যের প্রাচীন অধিবাসীদের ভাব ভাষা আচার ব্যবহার এবং ধর্মগ্রন্থের বাণীবচনের সাদৃশ্য আলোচনা করলেই বোঝা যাবে যে ভারতীয় ধর্ম হতেই ইরাণীয় ধর্মের উৎপত্তি। প্রথমতঃ ধরুন - ধর্মগ্রন্থের নামে বিভাগ ও ভাষার সাদৃশ্য। হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থের নাম বেদ। বেদ শব্দের মূল বিদ ধাতু। বিদ্ ধাতুর অর্থ জানা। জেন্দ অভেস্থা নামের মূল জেন্দ অবেস্তা, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় এই নাম - নানারূপে এবং বিভিন্ন শব্দ সংযোগে উচ্চারিত হয়। বাংলা ভাষায় বলা হয় জেন্দ অভেস্তা, কেউ বলেন জেন্দাভেস্তা আবার কেউ বলেন জেন্দ অভস্থা। ইংরাজীতে বলা হয় Zend Avesta, ইরাণী ভাষায় জেন্দ শব্দ ইরাণী ধাতু Zan বা জান্ ধাতু হতে নিষ্পন্ন। এই জান্ ধাতু মানেও জানা অর্থাৎ সংস্কৃতে 'জ্ঞা' ধাতুর সমার্থক অবস্তা শব্দটি বিদ্ ধাতুরই রূপান্তর। নিরুক্ততে বিদ্ ধাতুর যতরকম রূপান্তর এবং প্রয়োগ হতে পারে তা বলতে গিয়ে অবস্তা শব্দটিরও উল্লেখ আছে।
আমার মতে জেন্দ শব্দটিকে সংস্কৃত 'ছন্দঃ' শব্দেরও রূপান্তর বলা যেতে পারে। অভিজ্ঞান শকুন্তলমে দেখি সংস্কৃত 'ঐয়ি শকুন্তলে' কে সখীরা 'হলে শউন্দলে' বলে সম্বোধন করেছেন। সংস্কৃতে ঐয়ি শকুন্তলে যদি প্রাকৃত ভাষায় হলে শউন্দলে হয় তাহলে লৌকিক কথ্য ভাষার মহিমায় ছন্দ শব্দটিও জেন্দ বা জেন্দ এ রূপান্তরিত হওয়া এমন কিছু আশ্চর্য নয়। বেদের ভাষাকে পাণিনি বলেছেন- ছন্দঃ। তদনুযায়ী যে অভেস্তার ভাষাকে ইরাণীরা জেন্দ বলেছেন- এ বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। ছন্দঃ এবং জেন্দ একই ভাবাত্মক। এইভাবে আভেস্তা শব্দটি সংস্কৃত অবস্থা শব্দেরও রূপান্তর হতে পারে। অবস্থা শব্দের অর্থ স্থিতি। জেন্দ ভাষায় জেন্দ অভেস্থাতে যে জ্ঞানের কথা আছে- যে নিত্যস্থিতির কথা আছে- ছন্দঃ অর্থাৎ বেদেও সেই পরিপূর্ণ স্থিতির কথা আছে।
আর একটি বিষয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায় জেন্দ অভেস্তা প্রধানতঃ তিন ভাগে বিভক্ত (১) যশ্ব (২) ভেন্দিদাদ (৩) যস্থ বা যশৎ। 'যশ্ন' শব্দটি সংস্কৃত যজন বা যজ্ঞ শব্দের রূপান্তর। বৈদিক সূত্রে যেমন ঈশ্বরের স্তব বা যজ্ঞাহতির পরিচয় পাই, জেন্দ অভেস্তায় যশ্ন অংশেও সেইরকম আহরমণ অর্থাৎ ঈশ্বরের স্তব স্তুতি বা হবনাদি ক্রিয়ার বর্ণনা আছে। এই যশ্বের অপর নাম গাথা। বেদের ঋক্ মন্ত্রগুলিতে যেখানে স্তব আছে সেগুলিকে গাথা বলে।
ভেন্দিদাদ কথাটি সংস্কৃতে বন্দিতাতঃ কথার অপভ্রংশ। বন্দিতাতঃ মানে হে তাতঃ, হে পরমপিতঃ। তোমাকে বন্দি অর্থাৎ বন্দনা করি। আশ্চর্যভাবে জেন্দ্ অভেস্তার ভেন্দিদাদ অংশটি পুরোপুরি আহুর মাজদার উপাসনা পদ্ধতিতে পরিপূর্ণ। জেন্দ অভেস্তার তৃতীয় অংশ যস্থ বা যষতে আমাদের অথর্ববেদের মত লৌকিক ব্যবহার বিষয়ে বহু উপদেশ লিপিবদ্ধ আছে। জেন্দ অভেস্তার এই যে তিনটি ভাগ এও বেদের প্রতিচ্ছায়া।
শুধু তাই নয়- আমাদের দেশে সকলের সংস্কার আছে যে সকল রকম ধর্ম কর্ম আধ্যাত্মিক বিষয় সংস্কৃতে হওয়া চাই। কারণ সংস্কৃত বাক্যগুলি ঋষিবাক্য। হিন্দু মাত্রই বিশ্বাস করেন ঋষিগণ যে ভাষায় মন্ত্রগুলি আদিতে রচনা করেছেন সেই সংস্কৃত ভাষাতেই সেগুলি যথাযথ উচ্চারিত হলে তবেই কার্য সিদ্ধ হয়। কারণ ঐ ভাষা ও শব্দের মধ্যে তাঁদের বাক্ চৈতন্য ছড়িয়ে আছে। আজ পর্যন্ত্য কোন হিন্দুকেই কখনও তাঁর মাতৃভাষায় পূজা-পদ্ধতি শ্রাদ্ধাদি দশকর্ম করতে দেখা যায় না। বেদমন্ত্রগুলি যথাযথ ভাবে উদাত্তপ্লুত অনুদাত্ত স্বর যোগে যথাবিহিত ছন্দে উচ্চারিত হলে যে কোন আধ্যাত্মিক কার্যে তবেই সিদ্ধিলাভ সম্ভব -এ বিশ্বাস প্রত্যেক হিন্দুর মজ্জাগত। ঠিক তেমনি ইরাণীগণও জেন্দ অভেস্তার ভাষাতেই তাঁদের ঈশ্বর আহুর মাজদার উপাসনা করে থাকেন। কোন ইরাণীকেই আপনি জেন্দ অভেস্তার ভাষা ছাড়া তাদের কথ্য ভাষার আহুর মাজদার উপাসনা করতে দেখবেন না। কারণ তাঁরাও আমাদের মত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন জেন্দ ভাষায় লিখিত স্তোত্রাদি মোহিনী শক্তি সম্পন্ন। সাধারণ ভাষায় সে স্তোত্র অনুবাদ করে উচ্চারণ করলে তাতে কোন ফললাভ হবে না।
এই সহজ সংস্কার, এই চেতনা এই সাদৃশ্য দেখে কি ইরাণীদের মধ্যে বৈদিক ঋষিদের Heredity complex এর প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না? এই কৃষ্টিগত বোধের সমতা ও সাদৃশ্য দেখে কি ইরাণীদেরকে সেই প্রাচীন ভারতীয়দের সেই বৈদিক অব্যাহত ধারার একটি নিরবচ্ছিন্ন সংস্কৃতির স্রোত বললে কি ভুল হবে?
এইবার কিছু ব্যাকরণগত সাদৃশ্য আলোচনা করা যাক। সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেদে যাহা অস্মৈ, কস্মৈ, যস্যাম জেন্দ ভাষায় লিখিত অবেস্তাতে তা হয়েছে অহ্মৈ কম্বো এং যেস্যাম্। সংস্কৃতে অস্মৈ মানে ইঁহাদেরকে জেন্দের অহ্মৈ মানেও ইঁহাদেরকে। বেদে আছে কস্মৈ দেবায় বিধেম - কোন দেবতাকে উৎসর্গ করবো? অবেস্তাতেও ঠিক ঐ কথাই আছে কহ্মৈ দেবায় বিধেম। এইভাবে যস্যাম এবং যেস্যাম একই অর্থ বহন করে। সংস্কৃতে কুকুরকে বলা হয় শ্বন, অবেস্তাতেও কুকুরকে বলা হয়েছে স্পন্। শব্দ রূপের বিচারে এই দুই মহাগ্রন্থের কি অপূর্ব মিল। সংস্কৃতে শ্বন্ শব্দের প্রথমার একবচনে 'শ্বা', জেন্দ ভাষায়ও 'স্পন্' শব্দের প্রথমার একবচনে 'স্পা'। শ্বন্ শব্দের দ্বিতীয়ার একবচনে সংস্কৃতে 'শ্বানম্', জেন্দ ভাষাতেও 'স্পন্' শব্দের দ্বিতীয়ার একবচনে 'স্পানম্' অর্থাৎ কুকুরকে। চতুর্থীর একবচনে উভয় শব্দ একবারে মিলে গেছে- যথা শুনে এবং সুনে। কেবলমাত্র তফাৎ বানানে। সংস্কৃতে তালব্যশতে উকার, জেন্দে দন্ত্যসতে উকার। জেন্দ্ অবেস্তার 'পথন' শব্দটিরও ব্যুৎপত্তি আলোচনা করলে আরও স্পষ্ট হবে যে বেদেরই কোন অংশ ভাষান্তরে জেন্দ অবেস্তারূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। জেন্দের এই পথন্ শব্দটি সংস্কৃতে 'পথিন' শব্দের অনুরূপ। সংস্কৃতে 'পথন' শব্দের প্রথমার একবচনে 'পন্থা', জেন্দ ভাষায় 'পথন' শব্দেরও প্রথমার একবচনে পস্তা। প্রথমার বহুবচনে 'পন্থানঃ' জেন্দ ভাষায় 'পস্তানো'। শব্দরূপ ও বিভক্তির ধারায় কোন প্রভেদ নেই, প্রভেদ শুধু 'থ' এর জায়গায় 'ত'।
পারসীদের পরম পূজনীয় গ্রন্থ জেন্দ অভেস্তা এবং হিন্দুদের পরম পূজনীয় গ্রন্থ বেদ – এই দুই এর তত্ত্বগত, গুণগত এবং সাধনতত্ত্ব আলোচনা করে আমি বলতে চাইছি যে- জেন্দ অভেস্তা অথর্ববেদেরই লুপ্ত অংশ মাত্র। এ আমার হিন্দু সংস্কার বা বেদ প্রীতিমাত্র নয়; প্রাচ্য পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতগণ যে তড়িৎ সিদ্ধান্তে এসেছেন- অথর্ববেদের অংশ বিশেষ নানা রাষ্ট্র বিপর্যয় এবং অন্য কোন কারণে নষ্ট হয়ে গেছে- সে বিষয়েই আমি প্রতিবাদ করছি এবং বলতে পারেন- আমার দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের ফল প্রকাশ করে এই আবেদন জানাতে চাইছি- পণ্ডিতমহাশয়গণ। কৃপা করে অন্য কোন বই এর অংশকে অথর্ববেদের অংশ বলে চালাতে চাইবেন না। বেদের সেই লুপ্ত ভৃগু বিদ্যা, অথর্বন ঋষি বা ভৃগু ঋষির সেই আলোকজ্জ্বল উপলব্ধির সারসত্য আমাদেরই পূর্বপুরুষদের একটি শাখা ইরাণীদের মহাগ্রন্থ জেন্দ অবেস্তা রূপে বিরাজমান। তত্ত্বগত মিল ছাড়াও সামান্য মাত্র একটি আধটি বর্ণের পরিবর্তন করে দেখলে উভয় ভাষায় উভয় গ্রন্থের ভাষা ও শব্দের অভিন্নত্ব সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।
তপোভূমি নর্মদা সপ্তম খণ্ড, পৃ০ ১৫-১৭
(শ্রী শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী)
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ