অভেদ্য বেদ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

09 January, 2026

অভেদ্য বেদ

অভেদ্য বেদ

ভূমিকা

সকল বেদানুরাগী মহানুভব! আপনারা জানেন যে আমি গত শ্রাবণী পর্ব বিক্রম সম্বত্ ২০৮০ তদনুসারে ৩০ জুলাই ২০২৩ সালে সব বেদ বিরোধীদের আহ্বান করেছিলাম যে তারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ সাল পর্যন্ত বেদাদি শাস্ত্রের উপরে যেকোনো আক্ষেপ করতে চাইলে, করতে পারবে। আমি এই ঘোষণার যথোচিত প্রচার করেছি আর অন্যদের দিয়েও করিয়েছি। এর উপর আমি সর্বমোট ১৩৪ পৃষ্ঠার আক্ষেপ প্রাপ্ত করেছি। এই আক্ষেপগুলোকে আমি নিজের একটা পত্রের সঙ্গে দেশের শঙ্করাচার্যের অতিরিক্ত পৌরাণিক জগতের মহা-মণ্ডলেশ্বর শ্রী স্বামী গোবিন্দ গিরি, শ্রী স্বামী রামভদ্রাচার্য, শ্রী স্বামী চিদানন্দ সরস্বতী আদি অনেক বিদ্বানদেরকে পাঠিয়ে ছিলাম।

.
একইসঙ্গে আমি আর্যসমাজের বিভিন্ন শীর্ষ সংস্থান তথা প্রসিদ্ধ সব আর্য বিদ্বানদেরও এই আক্ষেপ পাঠিয়ে এই নিবেদন করেছিলাম যে ঋষি দয়ানন্দের ২০০ তম জন্মোৎসব ফাল্গুন কৃষ্ণ পক্ষ দশমী বিক্রম সম্বত্ ২০৮০ তদনুসারে ৫ মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত যেসব আক্ষেপের উত্তর দেওয়া যেতে পারে, সেগুলো লিখে আমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার কষ্ট করবেন। সেই উত্তরকে আমি আমাদের স্তর থেকে প্রকাশিত আর প্রচারিত করবো। যদিও সব প্রশ্নের উত্তর আমাকেই দেওয়া উচিত, কিন্তু আমি বিচার করেছি যে এই আক্ষেপগুলোর উত্তর দেওয়ার শ্রেয় কেবল আমিই কেন পাবো আর বেদ বিরোধীরাও যেন এমন মনে না করে যে আর্যসমাজের মধ্যে একজনই বিদ্বান আছেন, যিনি উত্তর দেওয়ার জন্য সামনে এসেছেন। এরসঙ্গে আমি এটাও বিচার করেছি যে আমার উত্তর দেওয়ার পশ্চাৎ কোনো বিদ্বান যেন এমন না বলেন যে আমি উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাইনি, যদি আমাকে সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে আমি আরও ভালো উত্তর দিতাম।
.
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার পশ্চাৎ পর্যন্ত কোথাও থেকে কোনো উত্তরই প্রাপ্ত হয়নি। বড়-বড় শঙ্করাচার্য, মহামণ্ডলেশ্বর, মহাপণ্ডিত, গুরুপরম্পরাতে পড়া মহাবৈয়াকরণ, দার্শনিক, রাষ্ট্রীয় আর আন্তর্জাতিক বৈদিক প্রবক্তা, য়োগী এবং বেদ বিজ্ঞান অনুসন্ধানকারী আদির মধ্যে কেউ একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পাননি অথবা বেদের উপরে করা আক্ষেপের প্রতি তাদের কোনো পীড়া হয়নি। যে কারণই হোক না কেন, এটা তো নিশ্চিত হয়ে গেল যে এই আক্ষেপ বা প্রশ্ন সামান্য নয়। আক্ষেপকর্তারা পৌরাণিক তথা আর্যসমাজী দুটোরই ভাষ্যকে আধার বানিয়ে গম্ভীর ও ঘৃণিত আক্ষেপ করেছে। তারা গায়ত্রী পরিবারকেও তাদের লক্ষ্য বানিয়েছে, কিন্তু সবাই মৌন হয়ে বসে আছেন, তবে আমি মৌন হয়ে থাকতে পারবো না। এই কারণে এই আক্ষেপগুলোর উত্তর দেওয়া আমি নিজেরই কর্তব্য বলে মনে করেছি।
.
আমি যা উত্তর দিয়েছি, সেগুলোকে যেকোনো বৈদিক বিদ্বান, যারা আজ মৌন হয়ে বসে আছেন, নৈতিক রূপে ভুল বলার অধিকারী থাকবেন না। তারা আমার উত্তর আর বেদমন্ত্রের ভাষ্যের উপরে খুঁত বের করার অধিকারীও থাকবেন না। আজ ধর্ম আর অধর্মের যুদ্ধ হচ্ছে, এর নীরব দর্শককে প্রকৃত বেদের ভক্ত বলা যাবে না। আমি অন্ততঃ চ্যালেঞ্জ স্বীকার তো করেছি, তাদের মতো মৌন হয়ে তো বসে নেই। বেদের উপরে করা আক্ষেপের উপরে মৌন হয়ে থাকাও সেই আক্ষেপকে মৌন সমর্থন করাই হবে। আমি যদিও অনেক ব্যস্ত থাকি, তবুও আমি উত্তর দেওয়াটা অনিবার্য মনে করেছি। আমি সব উত্তরদায়ী মহানুভাবদের কাছে দিনকরজীর শব্দে এটা অবশ্যই বলতে চাইবো যে -
"जो तटस्थ हैं, समय लिखेगा उनका भी अपराध"
মানুষ হল এই সংসারের সবথেকে বিচারশীল প্রাণী। এইভাবে এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই কোনো বিচারশীল প্রাণী আছে, তাদেরকেও মানুষই বলা হবে। বাস্তবে জ্ঞান হল প্রত্যেক জীবধারীর একটা প্রমুখ লক্ষণ। জ্ঞানের দ্বারাই কারও চেতনার প্রকাশন হয়, সূক্ষ্ম জীবাণু থেকে শুরু করে আমাদের মতো মানুষ পর্যন্ত সব প্রাণী জীবনযাপনের ক্রিয়াকলাপের মধ্যেও নিজের জ্ঞান আর বিচারের ব্যবহার অবশ্যই করে। জীবন-মরণ, খিদা-তৃষ্ণা, গমনাগমন, সন্ততি-জনন, ভয়, নিদ্রা আর জাগরণ আদি সবকিছুর পিছনেও জ্ঞান আর বিচারের সহযোগিতা থাকেই, তাহলে মহর্ষি য়াস্ক "মত্বা কর্মাণি সীব্যতীতি মনুষ্যঃ" বলে মানুষকে সংজ্ঞায়িত কেন করেছেন?
.
এর জন্য ঋষি দয়ানন্দ দ্বারা প্রস্তুত আর্যসমাজের পঞ্চম নিয়ম "সব কর্ম ধর্মানুসারে অর্থাৎ সত্য আর অসত্যকে বিচার করে করা উচিত" এর উপরে বিচার করার আবশ্যকতা আছে। বিচার করা আর সত্য-অসত্যের উপরে বিচার করা এই দুটোর মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে, যা আমাদের পশু-পক্ষী আর কীটপতঙ্গ থেকে পৃথক করে। বিচার তো তারাও করে, কিন্তু তাদের বিচার কেবল জীবনযাপনের ক্রিয়া পর্যন্ত সীমিত থাকে। এইদিকে সত্য আর অসত্যের উপর বিচার জীবনযাপন করার সীমার বাইরেও নিয়ে গিয়ে পরোপকারে প্রবৃত্ত করে মোক্ষ পর্যন্ত যাত্রা করাতে পারে।
.
এটা এক আশ্চর্যজনক তথ্য যে জীবনযাপনের বিচার পর্যন্ত সীমিত থাকা প্রাণী জন্ম থেকেই আবশ্যক স্বাভাবিক জ্ঞান প্রাপ্ত করে থাকে, কিন্তু মানুষের মতো সর্বাধিক বুদ্ধিমান প্রাণী পশু-পক্ষীদের তুলনায় ন্যূনতম জ্ঞান নিয়ে জন্ম নেয়। সে তার পরিবেশ আর সমাজ থেকে শিখে নেয়। এই কারণে কেবল মানুষের জন্যই সমাজ তথা শিক্ষণ-সংস্থানের আবশ্যকতা হয়। এসবের অভাবে মানুষ পশু-পক্ষীদের দেখে তাদের মতোই হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, ওদের মতো উড়ার মতো কাজ করতে পারবে না।
.
সমাজ আর শিক্ষার অভাবে মানুষ মানবীয় ভাষা আর জ্ঞান উভয়ের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত রয়ে যাবে। তাকে যদি পশু-পক্ষীকেও দেখানো না হয়, তাহলে তার আহার-বিহারেও অসুবিধা দেখা দিতে পারে। এর বিপরীত কোটি-কোটি বছর ধরে আমাদের সঙ্গে থাকা গরু-মোষ, ঘোড়া আদি প্রাণী আমাদের একটাও ব্যবহার শিখতে পারে না। তবে হ্যাঁ, তারা তাদের স্বামীর ভাষা আর সংকেতকে কিছু বুঝে নিয়ে তদনুকূল আহার-পানাদি ব্যবহার করে অবশ্য। এই কারণে কিছু পশুকে কিছু মাত্রায় প্রশিক্ষিতও করা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো তাদেরকে শিক্ষিত, সুসংস্কৃত, সভ্য এবং বিদ্বান বানানো সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে আর তাদের মধ্যে এটাই হল পার্থক্য। এখন প্রশ্ন হল, যে মানুষ জন্ম নেওয়ার সময় পশু-পক্ষীর তুলনায় মূর্খ হয়, জীবনযাপনেও সক্ষম হয় না, সে সবথেকে অধিক বিদ্বান, সভ্য ও সুশিক্ষিত কিভাবে হয়ে যায়?
.
যখন মানুষের প্রথম প্রজন্ম এই পৃথিবীতে জন্মেছিল, তখন নিশ্চয়ই তারা তাদের চারিদিকে থাকা পশু-পক্ষী আর কীটপতঙ্গকেই দেখেছিল, তখন যদি সেই প্রজন্ম তাদের থেকে কিছু শিখতো, তাহলে তাদের মতোই ব্যবহার করতো আর তাদের সন্তানও তাদের থেকে সেইরূপ ব্যবহারই শিখতো। আজ পর্যন্ত আমরা পশুদের মতোই থাকতাম, কিন্তু এমনটা হয়নি। আমরা বিজ্ঞানের উচ্চতাকেও স্পর্শ করেছি। বৈদিক কালে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিভিন্ন লোক-লোকান্তরের যাত্রাও করতো। কলা, সঙ্গীত, সাহিত্য আদি ক্ষেত্রের মধ্যেও মানুষের চরমোৎকর্ষ হয়েছে, কিন্তু পশু-পক্ষী তাদের লাফালাফি থেকে অগ্রসর হয়ে কিছুই শিখতে পারেনি। মানুষ কিভাবে এমন সুযোগ প্রাপ্ত করেছে? কার সঙ্গতি দ্বারা এইসব শিখেছে?
.
এই প্রশ্নগুলোর বিষয়ে কোনো নাস্তিকই কিছু বিচার করে না। তাদেরকে এর জন্য বিবর্তনবাদের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। যদি বিবর্তন দ্বারাই সবকিছু সম্ভব হয়ে যেতো, তাহলে তো পশু-পক্ষীও এতদিনে বৈজ্ঞানিক হয়ে যেতো, কারণ তাদের জন্ম তো আমাদেরও পূর্বে হয়েছিল। এই কারণে উন্নতির জন্য তারা আমাদের তুলনায় অধিক সময় পেয়েছে। একইসঙ্গে যদি বিবর্তন দ্বারাই সবকিছু স্বতঃ সিদ্ধ হয়ে যেতো, তাহলে মানুষের জন্যও কোনো প্রকারের বিদ্যালয় আর সমাজের আবশ্যকতা হতো না, কিন্তু এমনটা হয়নি।
.
নাস্তিকদের এই বিষয়ে অধিক গম্ভীরভাবে বিচার করা উচিত যে মানুষের মধ্যে ভাষা আর জ্ঞানের বিকাশ কোথা থেকে হল? এই বিষয়ে সবিস্তারে জানার জন্য আমার গ্রন্থ "বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানম্" অবশ্যই পড়া উচিত, যারদ্বারা এটা সিদ্ধ হয়েছে যে প্রথম প্রজন্মের চারজন সর্বাধিক সক্ষম ঋষি অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা ব্রহ্মাণ্ড থেকে সেই ধ্বনিগুলোকে নিজের আত্মা আর অন্তঃকরণ দিয়ে শোনেন, সেগুলো ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে পরা আর পশ্যন্তী রূপে বিদ্যমান ছিল। সেই ধ্বনিগুলোকেই বেদমন্ত্র বলা হয়েছে। সেই বেদমন্ত্রের অর্থ ব্যাখ্যা করার জন্য ঈশ্বর ছাড়া আর কেউই ছিল না।
.
অন্য মানুষরা তো এই ধ্বনিগুলোকে ব্রহ্মাণ্ড থেকে গ্রহণ করতেও সক্ষম ছিল না, হতে পারে তাদের প্রাতিভ জ্ঞান এবং ঋতম্ভরা ঋষি স্তরের ছিল। সৃষ্টির আদিতে সব মানুষ ঋষি কোটির ব্রাহ্মণ বর্ণেরই ছিল, অন্য কোনো বর্ণ ভূমণ্ডলের মধ্যে ছিল না। সেই চার ঋষিকে সমাধি অবস্থায় ঈশ্বর সেই মন্ত্রের অর্থের জ্ঞান দেয়। সেই চারজন মিলে মহর্ষি ব্রহ্মাকে চার বেদের জ্ঞান দেয় আর মহর্ষি ব্রহ্মা থেকে জ্ঞানের পরম্পরা সব মানুষের কাছে পৌঁছাতে থাকে। এইভাবে ব্রহ্মাণ্ডের এই ধ্বনিগুলো থেকেই মানুষ ভাষা আর জ্ঞান দুটোই শিখেছে। এই কারণে মানুষ নামক প্রাণী সব প্রাণীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে যায়।
ধ্যাতব্য হল, প্রথম প্রজন্মের জন্মা সব মানুষ মোক্ষ থেকে পুনরাবৃত্ত হয়ে আসে। এই কারণে তারা সবাই ঋষি কোটির ছিল। জ্ঞানের পরম্পরা কিভাবে অগ্রসর হতে থাকে আর মানুষের ঋতম্ভরা কিভাবে ধীরে-ধীরে ক্ষীণ হতে থাকে, মানুষকে বেদার্থ জানার জন্য কেমন কেমন গ্রন্থের রচনার আবশ্যকতা হয় আর কিভাবে-কিভাবে সাহিত্য তৈরি করা হয়, এসব জানার জন্য আমার "বেদার্থ-বিজ্ঞানম্" গ্রন্থ পড়তে হবে। যখন মানুষের মধ্যে বেদকে বেদের দ্বারা জানার প্রজ্ঞা সমাপ্ত বা কম হয়ে যায়, তখনই তার জন্য অন্য কোনো গ্রন্থের আবশ্যকতা হয়। ধীরে-ধীরে বেদার্থের মধ্যে সহায়ক আর্ষ গ্রন্থও মানুষের জন্য কঠিন হয়ে যায় আর আজ তো পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বেদ এবং আর্ষ গ্রন্থের প্রবক্তাও এগুলোর যথার্থ থেকে অতি দূরে চলে গেছে। এই কারণে শুধু বেদ কেন, আর্ষ গ্রন্থও তথাকথিত বুদ্ধিমান মানবের জন্য অবর্ণনীয় ধাঁধা হয়ে গেছে।
.
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী আর তাঁর মহান গুরু প্রজ্ঞাচক্ষু শ্রী স্বামী বিরজানন্দ সরস্বতী অনেক চেষ্টা করেন, কিন্তু সময়াভাব আদি পরিস্থিতির কারণে ঋষি দয়ানন্দের বেদভাষ্য এবং অন্য গ্রন্থ বেদের রহস্যকে খোলার জন্য সংকেতমাত্রই রয়ে যায়। তিনি বেদের বাস্তবতাকে জানার জন্য সুমার্গে চলা পথিকের বালির মধ্যে হওয়া পদচিহ্নের সমান ছিলেন। গন্তব্যের দিকে যাওয়া পদচিহ্ন যেকোনো ভ্রান্ত পথিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ ঋষি দয়ানন্দের অনুগামীরা ঋষির তৈরি কিছু পদচিহ্নকেই গন্তব্য ধরে নিয়েছে আর বেদার্থকে জানার জন্য তারা কোনো বিশেষ ভাবে চেষ্টা করেনি। তাদের এই কর্ম মহাপুরুষদের প্রতিমাকেই পরমাত্মা মেনে নেওয়ার মতোই ছিল।
.
এর পরিণাম এই হয় যে ঋষি দয়ানন্দের অনুগামী বিদ্বানও বেদাদি শাস্ত্রের ভাষ্য করতে আচার্য সায়ণ আদির সরল প্রতীত হওয়া কিন্তু বাস্তবে ভ্রান্ত ভাষ্যের অনুগামী হয়ে যায়। এই কারণে পৌরাণিক (তথাকথিত সনাতনী) ভাষ্যকারদের মতো আর্য বিদ্বানদের ভাষ্যের মধ্যেও অশ্লীলতা, পশুবলি, মাংসাহার, নরবলি, অস্পৃশ্যতা, আদি পাপ বিদ্যমান আছে। তারা শাস্ত্রকে এই পাপের থেকে মুক্ত করার পূর্ণ চেষ্টা করেছে অবশ্য, কিন্তু তারা এতে সম্পূর্ণ ভাবে সফল হতে পারেনি। এই কারণে এদের ভাষ্যের মধ্যে সায়ণ আদি আচার্যের ভাষ্যের তুলনায় এই দোষ কম মাত্রায় বিদ্যমান আছে, কিন্তু বেদ আর ঋষিদের গ্রন্থের মধ্যে একটাও দোষ বিদ্যমান হওয়া বেদের অপৌরুষেয়ত্ব আর ঋষিদের ঋষিত্বের উপরে প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করানোর জন্য যথেষ্ট। এইজন্য ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যের অতিরিক্ত সব ভাষ্য হল দোষপূর্ণ আর মিথ্যা।
.
তবে হ্যাঁ, ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যও সাংকেতিক পদচিহ্ন মাত্র হওয়ার কারণে সাত্ত্বিক ও তর্কসঙ্গত ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। এর জন্য সব মানুষকে এটাই অতি উচিত হবে যে তারা বেদের রহস্যকে জানার জন্য "বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানম্" গ্রন্থের গভীর ভাবে অধ্যয়ন করবেন। যেসব বিদ্বান বেদ আর ঋষিদের প্রজ্ঞার গভীরতায় আরও অধিক যেতে চান, তাদেরকে "বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ" আর "বেদার্থ-বিজ্ঞানম্" গ্রন্থ পড়া উচিত। যারা আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্ত করতে থাকা শিক্ষক বা বিদ্যার্থী বেদের সামান্য পরিচয় জানতে চান, তাদেরকে ঋষি দয়ানন্দ কৃত "সত্যার্থ-প্রকাশ" এবং "ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা" আর প্রিয় বিশাল আর্য কৃত "পরিচয় বৈদিক ভৌতিকী" গ্রন্থ অবশ্যই পড়া উচিত।

আক্ষেপের সমাধান করার পূর্বে আমি এখানে এটাই বলতে চাইবো যে বেদ ভাষ্যকাররা বেদের ভাষ্য করতে গিয়ে কি কি ভুল করেছে। বেদের ঈশ্বরীয়তা এবং সর্ববিজ্ঞানময়তাকে ভালো ভাবে জানতে হলে "বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞান" অবশ্যই পড়া উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত বেদের সঠিক স্বরূপ বুঝতে পারা যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সংসারের কোনো বেদ ভাষ্যকারই বেদের সঙ্গে ন্যায় করতে পারবে না। যখন ভাষ্যকারই বেদের সঙ্গে অন্যায় করে ফেলবে, তখন সেই ভাষ্যগুলোকে যারা পড়বে এমন পাঠকও নিশ্চিত রূপে বিভ্রান্তই হবে। যেসব পাঠক ভাষ্যকার বিদ্বানদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা রাখবে, তারা দূষিত ভাষ্য পড়ার পরেও মৌন হয়ে বসে থাকবে।
.
যেসব পাঠক জিজ্ঞাসু প্রবৃত্তির হবে, তারা দূষিত ভাষ্য পড়ে বেদের প্রতি বিরক্ত হয়ে যাবে অথবা জিজ্ঞাসা ভাব নিয়ে বৈদিক বিদ্বানদের কাছে সমাধান করার ইচ্ছা করবে, কিন্তু যেসব পাঠক পূর্বাগ্রহগ্রস্ত হয়ে বেদের বিরোধী হবে অথবা নিজের বেদবিরুদ্ধ মজহবকে বেদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ সিদ্ধ করতে চাইবে, তারা বেদের দূষিত ভাষ্যগুলোকে নিয়ে তীক্ষ্ণ ও ঘৃণিত প্রহার করার চেষ্টা করবে। এমন ব্যক্তিরা নিজেদের মজহবী গ্রন্থের বড়-বড় দোষগুলোকে লুকিয়ে বেদভাষ্যের দোষকে তুলে ধরবে আর যেখানে দোষও নেই, সেখানেও নিজের কাকবৃত্তির কারণে দোষ বের করার চেষ্টা করবে। সংসারে এই সময় তিন প্রকারের মানুষ বিদ্যমান আছে। এগুলোর মধ্যে মধ্যম মানুষই নির্দোষ হয়, অন্য দুই প্রকারের মানুষ দোষী হয়।
.
বেদ ভাষ্য করার সময় ভাষ্যকারদের সবথেকে মৌলিক বিষয় এটা বোঝা উচিত যে সর্বপ্রথম বেদকে বেদের দ্বারাই অর্থ করার চেষ্টা করা উচিত। আমি একটা জীবহিংসা প্রকরণকেই এখানে নিবো আর এর জন্য বেদের কিছু প্রমাণ এখানে উদ্ধৃত করবো -
য়দি নো গাম্ হম্সি য়দ্যশ্বম্ য়দি পূরুষম্।
তম্ ত্বা সীসেন বিধ্যামঃ।। (অথর্ববেদ ১.১৬.৪)
অর্থাৎ তুমি যদি আমাদের গাভী, ঘোড়া বা মানুষকে মারো, তাহলে আমি তোমাকে সীসা দিয়ে বিদ্ধ করবো।
মা নো হিম্সিষ্টম্ দ্বিপদো মা চতুষ্পদঃ (অথর্ববেদ ১১.২.১)
অর্থাৎ আমাদের মানুষ আর পশুদের নষ্ট করবে না। অন্যত্র বেদের মধ্যে দেখবেন -
ইমম্ মা হিম্সীর্দ্বিপাদম্ পশুম্ (য়জুর্বেদ ১৩.৪৭)
অর্থাৎ এই দুই খুর যুক্ত পশুর হিংসা করবে না।
ইমম্ মা হিম্সীরেকশফম্ পশুম্ (য়জুর্বেদ ১৩.৪৮)
অর্থাৎ এই এক খুর যুক্ত পশুর হিংসা করবে না।
য়জমানস্য পশূন্ পাহি (য়জুর্বেদ ১.১)
অর্থাৎ য়জমানের পশুর রক্ষা করবে।
আপনি বলবেন যে একথা তো য়জমান বা কোনো মানুষ বিশেষের পালিত পশুর করা হয়েছে, প্রত্যেক প্রাণীর জন্য নয়। আমি এই ভ্রমকে নিবারণার্থ অন্য প্রমাণ দিচ্ছি -
মিত্রস্যাহম্ চক্ষুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষে (য়জুর্বেদ ৩৬.১৮)
অর্থাৎ আমি সব প্রাণীকে মিত্রের দৃষ্টিতে দেখি।
মা হিম্সীস্তন্বা প্রজাঃ (য়জুর্বেদ ১২.৩২)
অর্থাৎ এই শরীর দিয়ে প্রাণীদের মেরো না।
মা স্রেধত (ঋগ্বেদ ৭.৩২.৯)
অর্থাৎ হিংসা করো না।
য়জুর্বেদ ১.১ মন্ত্রের মধ্যে গাভীকে অঘ্ন্যা বলা হয়েছে অর্থাৎ গাভী সর্বদা অবধ্য হয়। এই সমস্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো ভাষ্যকার বেদের মধ্যে পশু-হিংসা, পশুবলি অথবা মাংসাহারের মতো পাপের বিধান করে, তাহলে সেটা ভাষ্যকারের ভারী অপরাধ হবে, নাকি বেদের উপরে আক্ষেপকারীর। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিও তার গ্রন্থের মধ্যে দুটো পরস্পর বিরুদ্ধ কথাকে স্থান দিবে না, তাহলে ঈশ্বরীয় গ্রন্থ বেদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী কথা হওয়া তো সম্ভবই না। এই কারণে বেদভাষ্যের মধ্যে যেখানেই হিংসা আর মাংসাহারের মতো পাপ দেখা দিবে, তাহলে সেটা ভাষ্যকারের বুদ্ধির দোষ হবে, বেদের নয়।
.
বেদভাষ্যকারকে আরেকটা কথা এটাও বোঝা উচিত যে যখন বেদ দিয়ে বেদের অর্থ বুঝতে পারা যাবে না, তখন ভাষ্যকারকে বৈদিক পদের যথার্থ বিজ্ঞানকে জানার জন্য বেদের বিভিন্ন শাখা, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ এবং আরণ্যকের মধ্যে বৈদিক পদের ব্যাখ্যা এবং বিবৃতির রহস্যকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
.
আমি উদাহরণের জন্য এখানে কিছু প্রমাণ উদ্ধৃত করবো। মহর্ষি জৈমিনী বলেছেন -
পশবোऽয়ম্ (পৃথিবী) লোকঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩০৭)
.
মহর্ষি তিত্তির বলেছেন -
প্রাণাঃ পশবঃ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.২.৬.৩)
.
মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্যের কথন হল -
প্রাণো বৈ পশুঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৪.৫)
.
অন্যদিকে মৈত্রায়ণী সংহিতার মধ্যে লেখা আছে -
পশবশ্চ্ছন্দাম্সি (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৩.৫)
আর শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে লেখা আছে -
পশবো বৈ সবিতা (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.২.৩.১১)
.
এখানে পৃথিবী, সূর্য, প্রাণ এবং ছন্দ রশ্মি আদি পদার্থকে পশু বলা হয়েছে, তাহলে বেদভাষ্যকারের উচিত যে বেদের মধ্যে পশু শব্দ আসা মাত্র তার অর্থ লোকপ্রচলিত পশু অর্থ না করা। যদি সে এমন করে, তাহলে সে নিজের অজ্ঞানতা বা মূর্খতারই পরিচয় দিবে আর এই কারণে অনেক পাঠক বেদ বিরোধী হয়ে যায়। এর দোষ ভাষ্যকারের মস্তকেই থাকবে।

এখন আমি "গৌঃ" পদের বিষয়ে কিছু প্রমাণ প্রস্তুত করবো -
অন্তরিক্ষম্ গৌঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.১৫), অসৌ (দ্যৌঃ) গৌঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৪৩৯), ইয়ম্ (পৃথিবী) বৈ গৌঃ (কাঠক সংহিতা ৩৭.৬), প্রাণো হি গৌঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৩.৪.২৫), গৌর্বৈ বাক্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.২.৩)।

এখানে এই প্রমাণগুলোকে দেখার পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে পৃথিবী, অন্তরিক্ষ এবং দ্যুলোককেও বেদের মধ্যে গৌ বলা হয়েছে। একইভাবে বাক্ তত্ত্ব এবং প্রাণ তত্ত্বকেও গৌ বলা হয়েছে। এখন কোনো বেদভাষ্যকার যদি বেদমন্ত্রের মধ্যে "গৌ" পদ আসা মাত্র তার অর্থ গাভী নামক প্রাণী করে দেয়, তাহলে এটা ভাষ্যকারেরই মূর্খতা বলা হবে।

এখন আমরা "অশ্বঃ" পদের উপরে বিচার করবো -
অসৌ বা আদিত্যোऽশ্বঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.৯.২৩.২), বজ্রোऽশ্বঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.১.২.৯), ইন্দ্রো বা অশ্বঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১৫.৪)।

এই প্রমাণগুলো থেকে এটা সিদ্ধ হয় যে বেদের মধ্যে অগ্নি, সূর্য, তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ এবং বজ্র রশ্মিকেও অশ্ব বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো বেদের অধ্যেতা বেদের মধ্যে "অশ্বঃ" পদ দেখে তার অর্থ ঘোড়া করে, তাহলে তাকে অনাড়ি বলা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? ঠিক এইরকমই অনেকত্র গোমেধ বা অশ্বমেধ যজ্ঞের চর্চা শোনা যায়। এখানে "মেধৃ মেধাহিম্সনয়োঃ সঙ্গমে চ" ধাতুর ব্যবহার হয়েছে। এইভাবে এই ধাতু জানতে, বুঝতে, মেরে ফেলতে, দুঃখ দিতে আর সঙ্গতি করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। তাহলে যদি কেউ গোমেধ বা অশ্বমেধ পদ দিয়ে গাভী অথবা ঘোড়ার বলির বিধান করে, তাহলে তাকে পূর্বাগ্রহী মাংসাহারী কেন ভাবা হবে না?

এইভাবে ব্রাহ্মণ গ্রন্থকে না বুঝে যদি কেউ বেদের অর্থ করে, তখন সে বেদের তেমনই দুর্গতি করবে, যেমনটা কেউ বন্দুক ছুরি নিয়ে কোনো রোগীর শল্যক্রিয়া করবে। দুর্ভাগ্যবশতঃ আজ এমন বাঁদরের কোনো অভাব নেই।

যখন ব্রাহ্মণ আদি গ্রন্থের দ্বারাও বেদার্থ বোঝা যাবে না, তখন ভাষ্যকারের উচিত নিরুক্তের ব্যাখ্যার ব্যবহার করা, কারণ নিরুক্ত হল বেদের পদের ব্যাখ্যাকে বোঝার জন্যই রচনা করা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যেটা বেদের যেকোনো অধ্যেতাকে বেদের পদের রূঢ় অর্থ করার থেকে বাঁচায় আর সেই পদের মহান বিজ্ঞানের উদঘাটন করে। আজ দুর্ভাগ্যের বিষয় হল যে গ্রন্থ বেদকে রূঢ়িবাদ থেকে বের করে মহান বিজ্ঞানবাদের মধ্যে নিয়ে যায়, সেই গ্রন্থই তার সমস্ত ভাষ্যকারের দ্বারা রূঢ়িবাদের গভীর গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাহলে নিরুক্তের এমন ভাষ্যের আধারে কেউ কিভাবে বেদকে বুঝবে? এর জন্য বেদের অধ্যেতাদের আমার নিরুক্তের বৈজ্ঞানিক ভাষ্য "বেদার্থ বিজ্ঞানম্" অবশ্যই পড়া উচিত। এর অতিরিক্ত অন্য কোনো মার্গ নেই।

এইসব গ্রন্থের অতিরিক্ত বেদভাষ্যকারকে ব্যাকরণের জ্ঞানেরও কিছু আবশ্যকতা আছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে ধাতু প্রত্যয়ের আধারে বৈদিক পদের ব্যুৎপত্তি করার চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু এমন বৈয়াকরণকেও এটা ভোলা উচিত নয় যে একই ধাতুর অনেক প্রকারের অর্থ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে কোনো ধাতুর তর্কসঙ্গত অর্থের কল্পনা করা উচিত আর কোনো প্রত্যয় যদি অনুকূল তৈরি না হয়, তাহলে কোনো নতুন প্রত্যয়ের কল্পনা করা উচিত। একইভাবে কোথাও-কোথাও নতুন ধাতুরও কল্পনা করা উচিত, কিন্তু এইসব কাজ কোনো সত্ত্বগুণসম্পন্ন প্রাতিভ জ্ঞানযুক্ত বিদ্বানই করতে পারবে, অন্যথা তার কল্পনা বেদকেও কাল্পনিক আর হাস্যকর বানিয়ে দিবে।

এখানে ভাষ্যকার বা বেদের অধ্যেতাকে এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে বেদ ব্যাকরণের জন্য নয়, বরং ব্যাকরণ বেদের জন্য হয়েছে। লোক আর বেদ দুটোই ব্যাকরণের অধীন হয় না, বরং ব্যাকরণ লোক আর বেদ দুটোর অধীন হয়। মহর্ষি পাণিনি আদি মহাবৈয়াকরণ বেদ আর লোকের মধ্যে প্রচলিত পদগুলোকে নিয়মবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বেদ কেন, লৌকিক পদকেও সম্পূর্ণ রূপে নিয়মবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এই কারণে বেদের জন্য অনেকত্র "ছন্দসি বহুলম্" ব্যবহৃত করেন আর "ব্যত্যয়ো বহুলম্" সূত্রকেও নিজের গ্রন্থের মধ্যে সমাবেশ করেছেন। লৌকিক পদকেও অনেকত্র শিষ্টের ব্যবহার বলে সাধু মেনেছেন। "পৃষোদরাদীনি য়থোপদিষ্টম্" এইরূপ সূত্রের রচনা করেন, আবার অনেকত্র অনেক পদকে নিপাতন থেকে ব্যুৎপন্ন মেনেছেন।

গণপাঠের মধ্যে মহর্ষি অনেক গণকে আকৃতিগণ মেনে সেই গণের মধ্যে অনেক পদকে সম্মিলিত করার অবকাশ রেখে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সেইসময় লোকের মধ্যে প্রচলিত পদকেও ব্যাকরণের নিয়মে পূর্ণ রূপে বাঁধা সম্ভব হয়নি। ঋষিদের দ্বারা এত স্পষ্টতা করার পরেও যদি কেউ কেবল প্রকৃতি এবং প্রত্যয়ের আধারে বেদার্থ করার জিদ করে, তাহলে তার করা বেদভাষ্য পাঠকদের গোলকধাঁধার মধ্যে ফেলে দেওয়াই সিদ্ধ হবে।
.
দুর্ভাগ্যবশতঃ বেদের অনেক অধ্যেতা ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, নিরুক্ত আদি আর্ষ গ্রন্থকে না জেনে সংস্কৃত ভাষার সামান্য জ্ঞানের আধারেই বেদার্থ করতে বসে যায়, তাহলে তারা বেদের দুর্গতি কেন করবে না? এদের বাকি থাকা ত্রুটি বেদের ইংরাজী আদি ভাষাতে করা অনুবাদ পূর্ণ করে দেয় আর সেইসব অনুবাদক বেদের সম্পূর্ণ বিনাশ করার পরেও বেদের ভাষ্যকার রূপে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। এই ধরণের ভাষ্যকার ও ইংরাজী আদি ভাষাতে বেদের অনুবাদকের ভাষ্য বা অনুবাদকে আধার বানিয়ে আক্ষেপকর্তারা বেদের উপরে অধিকাংশ আক্ষেপ করে।
.
এমন পরিস্থিতিতে অধিক দোষী তো ভাষ্যকার বা অনুবাদকই সিদ্ধ হয়। এতকিছুর পরেও কেউ এই ভাষ্যকার বা অনুবাদকদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে উদ্যত হয় না, কারণ সে এদের মহান বিদ্বান মনে করে আর তাদের কট্টর ভক্তও হয়। আমার এটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে এই ভাষ্যকার ও অনুবাদকরা ভালো বিদ্বান ছিল। তারা অনেক উপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক গ্রন্থ লিখেছে, কিন্তু বেদ, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ এবং নিরুক্তের মতো জটিল গ্রন্থের উপরে কলম চালিয়ে তারা ভারী ভুল করেছে। তাদের এই ভুল বেদের জন্য দীর্ঘ কাল ধরে থাকা ঘা সিদ্ধ হচ্ছে।
.
এখানে এটা মনে রাখতে হবে যে বেদভাষ্য প্রক্রিয়ার এইসব চরণের সফলতার জন্য য়োগাভ্যাস অতি আবশ্যক আর য়োগাভ্যাস দেখানোর জন্য চোখ বন্ধ করার নাম হয় না আর না য়োগের উপরে বড়-বড় প্রবচন দিয়ে বা লিখন লিখে বা গ্রন্থ লেখার নাম য়োগ হয়। য়োগ উৎপন্ন হয় য়ম ও নিয়মের ভূমি থেকে। আশ্চর্যের বিষয় হল আজ মিথ্যাভাষী, ধূর্তপ্রতারক, কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকার, ঈর্ষা আদি দুর্গুণের ভাণ্ডার য়োগের প্রণেতা হচ্ছে আর কোটি-কোটি টাকার সম্পত্তির স্বামী শ্রীমন্ত হয়ে বসে আছে। মাংসাহারী ও মাছ-ডিম খেয়ে নিজের পেটকে শ্মশান বানানো ব্যক্তি, মাতাল ও বিষয়লোলুপ ব্যক্তি মাত্র কিছু শব্দ জ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে বেদের ভাষ্যকার হয়ে যাচ্ছে, আবার অন্যদিকে ঈর্ষা, অহংকার, দ্বেষ, কাম ও ক্রোধ আদির আগুনে দগ্ধ হওয়া বাক্পটু ব্যক্তিরাও বেদের উপর কলম চালানোর সাহস করে বা য়োগের প্রেরণা দিতে দেখা যায়। এমন বিষম পরিস্থিতির মধ্যে বেদের সর্বনাশ কেন হবে না? বস্তুতঃ য়ম ও নিয়মকে না সিদ্ধ করা পর্যন্ত বেদ বা ধর্ম বা বিজ্ঞানের মর্ম জানাই সম্ভব নয়। এই কারণে বেদের অধ্যেতার উচিত যে সে সর্বপ্রথমে সত্য, অহিংসা ও ব্রহ্মচর্যাদি ব্রতের সেবন করবে আর ঈশ্বরপ্রণিধানপূর্বক জীবনযাপনের চেষ্টা করবে।
.
বেদকে বুঝতে এই ক্রমিক প্রক্রিয়ার এতটা পরিচয় করার পশ্চাৎ এখন আমি সর্বপ্রথমে বেদের উপরে করা কিছু গম্ভীর আক্ষেপের ক্রমশঃ উত্তর দেওয়া শুরু করবো। সর্বপ্রথমে আমি বেদের উপরে তোলা আক্ষেপের উত্তর দিবো। তারমধ্যেও সবথেকে অধিক প্রক্ষেপ "वेद का भेद" (বেদের ভেদ) ওয়েবসাইটে সুলেমান রিজভী করেছেন। বেদের উপরে হিংসা এবং সাম্প্রদায়িকতার দাবিও রিজভী করেছেন।
.
এই পুস্তকের সম্পাদন এবং ঈক্ষ্যবাচন প্রিয় শ্রী বিশাল আর্য এবং ডাক্তার মধুলিকা আর্যা খুবই যোগ্যতা এবং মনোযোগ সহ করেছেন। এর জন্য আমি আমার মানস সন্তানকে অনেক আশীর্বাদ করছি। ঈশ্বর এদের স্বাস্থ্য এবং পাবন যশ প্রদান করুক।

🔴 আক্ষেপ -
Vedas are terror manual which turns humans into savages. Many tribes were destroyed as a result of the violent passages in Vedas. As per Vedas, you must kill a person who rejects Vedas, who hates Vedas and Ishwar, who does not worship, who does not make offerings to Ishwar, who insults God (Blasphemy), one who oppresses a Brahmin etc. There are several passage in Vedas which calls for death of disbelievers.

এনার দৃষ্টিতে বেদ হল মানুষকে বর্বর আতঙ্কি তৈরি করার গ্রন্থ। এই গ্রন্থ অনেক জনজাতিকে নষ্ট করে দিয়েছে। যারা বেদ আর ঈশ্বরকে মানে না, ঈশ্বরের পূজা করে না, ঈশ্বরের নিন্দা করে আর ব্রাহ্মণের অপমান করে তাদেরকে বেদের মধ্যে মেরে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
.
একইসঙ্গে রিজভীর কথন হল যারা বেদকে মানে তারা বেদের মধ্যে নির্দেশিত হিংসাকে দেখে না, বরং অন্য সম্প্রদায়ের গ্রন্থের ভুল অর্থ করে সেগুলোর উপরে হিংসার দোষারোপ করে।

🔵 উত্তর - আমি শ্রী রিজভীর সঙ্গে-সঙ্গে সকল ইসলামী বিদ্বানদের কাছে জিজ্ঞেস করতে চাইবো -

১. মক্কা-মদীনা থেকে শুরু হওয়া ইসলাম কি শান্তি আর সত্যের দ্বারা বিশ্বের ৫৬-৫৭ দেশের মধ্যে ছড়িয়েছে?
২. তৈমুর, আলাউদ্দিন খিলজী, বাবর, আকবর আর ঔরঙ্গজেবের মতো ব্যক্তিরা কি ইসলামের শান্তিদূত হয়ে ভারতে এসেছিল?
৩. এই শান্তিদূতদের শান্তির দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই কি হাজার-হাজার রাণী জোহর করে নিজের প্রাণত্যাগ করেছিলেন?
৪. তারা কি ভারতে শান্তির স্থাপনা করার জন্য হাজার-হাজার মন্দির ভেঙেছে?
৫. কুরআনের মধ্যে কি কাফিরের গলা ওড়ানোর বর্ণনা নেই?
.
আপনি বেদ অনুগামীদের উপরে বনবাসী, যাদের ষড়যন্ত্রপূর্বক আদিবাসী বলা হয়েছে, তাদের হত্যার দোষারোপ করছেন। আপনার এতটুকু বোঝার ক্ষমতা তো থাকা উচিত যে ভারতের মধ্যে আজও বনবাসী বর্গ তাদের পরম্পরা ও মন্যতাকে প্রসন্নতাপূর্বক পালন করছে, অথচ ইসলামী দেশগুলোতে সবাইকে বলপূর্বক হয় ইসলামী মন্যতাকে স্বীকার করার জন্য বিবশ করা হয় অথবা তাদের নষ্ট করে দেওয়া হয়।
.
ভারতের মধ্যে তো সম্পূর্ণ বনবাসী সমাজ ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে রাষ্ট্রের রক্ষার জন্য নিজের বলিদান দিয়ে গেছে, সেটা হয় ইসলামী আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে হোক অথবা ইংরেজদের বিরুদ্ধে। বনবাসীরা সর্বদা রাষ্ট্র ও ধর্মের রক্ষার জন্য নিজের বলিদান দিয়েছে। এইজন্য আপনাকে আপনার ঘরের চিন্তা করা উচিত, আমাদের ঘরের নয়। যদি বেদের অনুগামী সমাজ হিংসক হতো, তাহলে সংসারের মধ্যে অন্য কোনো সম্প্রদায় জন্মই হতো না আর যদি জন্ম হতো, তাহলে সেটা জীবিতও থাকতো না।
.
আপনি কুরআনের উপরে করা কোনো আক্ষেপকে অজ্ঞানতার পরিণাম বলছেন, তাহলে কৃপা করে বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়ে আপনি কি কুরআনের সেই অনুবাদগুলোকে নষ্ট করিয়ে সেগুলোর সঠিক অনুবাদ করার সাহস করবেন? ছয় দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সৃষ্টি তৈরি হওয়া, মাটি দিয়ে মানুষের শরীর তৈরি হওয়া, সিংহাসনের উপরে খুদার বসে থাকা এবং অন্য সৃষ্টি সম্বন্ধীয় আয়তের সঠিক ব্যাখ্যা করে সম্পূর্ণ সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন? আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে কোনো ইসলামী বিদ্বান এতে সক্ষম হতে পারবে না?
.
আপনি তো বেদকে সঠিক ভাবে বুঝেই গেছেন, সেই জন্যই তো দোষারোপ করছেন। আপনি যদি বেদকে বোঝেন, তাহলে তো আপনাকে কারও ভাষ্য উদ্ধৃত করার আবশ্যকতাই ছিল না। এখানে এমন মনে হচ্ছে যে আর্যসমাজ এবং পৌরাণিকদের (তথাকথিত সনাতনী হিন্দু) বদনাম করাই আপনার মুখ্য লক্ষ্য আছে। সংস্কৃত ভাষার কোনো জ্ঞান আপনার নেই, অন্যথা আপনি আচার্য সায়ণের ভাষ্যও উদ্ধৃত করতেন। আপনি কেবল দেবীচন্দকেই আর্য বিদ্বান বলেছেন, এই জ্ঞান আপনাকে কি খুদা দিয়েছে যে দেবীচন্দ আর্যসমাজের বিদ্বান ছিলেন? আমি তো আর্যসমাজের মধ্যে কোনো দেবীচন্দ নামক বেদভাষ্যকারের নাম পর্যন্ত শুনিনি।
.
আপনি ভাষ্যের মধ্যেও কেবল ইংরাজী অনুবাদকেই অধিক উদ্ধৃত করেছেন। এরদ্বারা এটাও সিদ্ধ হয় যে হিন্দি ভাষারও খুব অধিক জ্ঞান আপনার নেই আর কেবল ইংরাজী ভাষা পড়ে বেদের অধিকারী বিদ্বান হয়ে বেদের উপর দোষারোপ করতে বসেছেন। আমি স্বীকার করছি যে ঋষি দয়ানন্দের অতিরিক্ত অন্য সব ভাষ্যকার দ্বারা বেদভাষ্য করাতে ভারী ভুল হয়েছে।
.
এখন আমি ক্রমশঃ আপনার দ্বারা উদ্ধৃত এক-একটা বেদ মন্ত্রের উপরে বিচার করবো -

🔴 আক্ষেপ -
অপঘ্নন্তো অরাব্ণঃ পবমানাঃ স্বর্দৃশঃ।
য়োনাবৃতস্য সীদত।। (ঋগ্বেদ ৯.১৩.৯)


আপনি এই মন্ত্রের ভাষ্য নিম্নানুসারে করেছেন -

May you (O love divine), the beholder of the path of enlightenment, purifying our mind and destroying the infidels who refuse to offer worship, come and stay in the prime position of the eternal sacrifice.
- Tr. Satyaprakash Saraswati

(অরাব্ণঃ) দুষ্টদের (অপঘ্নন্তঃ) দারুণ দণ্ড দাতা (পবমানাঃ) সৎকর্মীদের পবিত্রকারী (স্বর্দৃশঃ) সর্বদ্রষ্টা পরমাত্মা (ঋতস্য) সৎকর্মরূপী যজ্ঞের (য়োনৌ) বেদীতে (সীদত) এসে বিরাজমান হউন।

এর উপরে এই আক্ষেপ করেছেন যে বেদের মধ্যে শত্রুকে নষ্ট করা তথা ঈশ্বর ভক্তদের জ্ঞান প্রকাশ প্রদান করার কথা বলা হয়েছে।

🔵 উত্তর - এখানে ইংরাজী অনুবাদকে স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর বলা হয়েছে। এই অনুবাদটা অবশ্যই উচিত নয়, কিন্তু হিন্দি অনুবাদটা কার, এটা আপনি বলেননি। এটা আমি বলে দিচ্ছি যে এটা হচ্ছে আর্যবিদ্বান আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর দ্বারা করা অনুবাদ। এই হিন্দি অনুবাদের উপরে আপনার কি আপত্তি আছে? অথবা সংসারের কোনো সভ্য অথবা ন্যায়প্রিয় ব্যক্তি এর উপরে কি আপত্তি করতে পারবে? দুষ্ট ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়া কি অপরাধ? যদি এমন হয়, তাহলে সংসারের সমস্ত ন্যায়ালয়, পুলিশ ব্যবস্থা আর সেনাকে বন্ধ বা সমাপ্ত করে দেওয়া উচিত।
.
আমি এই মন্ত্রের উপর আপনার আক্ষেপকে বুঝতে পাচ্ছি না। আপনি কি দুষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত আর সৎকর্মীকে দণ্ডিত বা অপবিত্র করতে চাইছেন? যেমনটা সংসারে হত্যাকারী মজহবের ইতিহাস ও চরিত্র ছিল। এই হিন্দি ভাষ্যটা যদিও ভুল নয়, তবে এটা কথমপি পর্যাপ্তও নয়। এখন আমি এই মন্ত্রের উপরে নিজের শৈলীতে বিচার করবো -

এই মন্ত্রের ঋষি হল অসিত কাশ্যপ দেবল। এর অর্থ হল এই মন্ত্ররূপী ছন্দ রশ্মি কূর্ম প্রাণ রশ্মি থেকে উৎপন্ন এমন সূক্ষ্ম প্রাণ রশ্মির, যা স্বয়ং কারও বন্ধনে আসে না, কিন্তু সূক্ষ্ম কণা আর রশ্মিকে নিজের সঙ্গে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়, দ্বারা হয়। এর দেবতা হল পবমান সোম আর ছন্দ য়বমধ্যা গায়ত্রী। এই কারণে এর দৈবত আর ছান্দস প্রভাবে এই সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সোম পদার্থ শ্বেতবর্ণীয় তেজ যুক্ত হতে থাকে। একইসঙ্গে এই সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বলও সমৃদ্ধ হতে থাকে। এখন আমি এর তিন প্রকারের ভাষ্য করবো -
অপঘ্নন্তো অরাব্ণঃ পবমানাঃ স্বর্দৃশঃ।
য়োনাবৃতস্য সীদত।। (ঋগ্বেদ ৯.১৩.৯)

আধিদৈবিক ভাষ্য (১) -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের সমান তেজস্বী আর শুদ্ধ সোম পদার্থ (অরাব্ণঃ, অপঘ্নন্তঃ) [অরাব্ণঃ = রা দানে (অদা.) ধাতোর্বনিপ্। নঞ্ সমাসঃ] সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়াতে বাধা উৎপন্নকারী অথবা সেই প্রক্রিয়াতে ভাগ নিতে অক্ষম পদার্থকে নষ্ট করে অথবা সেগুলোকে সরিয়ে দিয়ে (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = ঋতমিত্যেষ (সূর্য়ঃ) বৈ সত্যম্ ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.২০), ঋতমেব পরমেষ্ঠী (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৫.৫.১), অগ্নির্বা ঋতম্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.১.১১.১)] সূর্যলোকের সর্বোত্তম আগ্নেয় ক্ষেত্র অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ভাগ অথবা সম্পূর্ণ সূর্যলোকের উৎপত্তি আর নিবাসস্থানে বিদ্যমান থাকে।

ভাবার্থ - সূর্যলোকের উৎপত্তি হওয়ার পূর্বে বিশাল খগোলীয় মেঘের ভিতরে সোম রশ্মিগুলো শুদ্ধ রূপে ব্যাপ্ত হয়। যখন সেই সোম রশ্মিগুলো তপ্ত হওয়া শুরু করে, তখন সেগুলো এমন পদার্থ যা স্বয়ং সূর্যলোক নির্মাণের প্রক্রিয়াতে ভাগ নেওয়ার জন্য সংযোগ-বিয়োগ আদি প্রক্রিয়াতে ভাগ নেওয়ার যোগ্য হয় না অথবা যা সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়াতে বাধার সৃষ্টি করে, সেগুলোকে নষ্ট বা দূর করে দেয়। এমন করতে-করতে সেই সোম রশ্মিগুলো সম্পূর্ণ মেঘের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে যায়। একইভাবে সোম প্রধান বিদ্যুৎ ঋণাবেশিত কণাও সম্পূর্ণ খগোলীয় মেঘ আর কালান্তরে সূর্যলোকের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে যায়।

আধিদৈবিক ভাষ্য (১) -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বিদ্যুতের সমান গত্যাদি ব্যবহারকারী অর্থাৎ বিদ্যুতের মতো শুদ্ধ মার্গের উপর গমন করে সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণ (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) মার্গের মধ্যে আসা এমন কণা, যা সংযোগ-বিয়োগ ক্রিয়াতে ভাগ নেয় না অথবা বাধা উৎপন্ন করে, তাকে দূরে সরিয়ে গমন করে। (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = অগ্নির্বা ঋতম্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.১.১১.১)] সেইসব কণা অগ্নির কারণরূপ প্রাণ তত্ত্বের মধ্যে নিরন্তর নিবাস করে অর্থাৎ সেগুলো প্রাণের মধ্যেই নিবাস আর প্রাণের মধ্যেই প্রাণের দ্বারা গমন করে।

ভাবার্থ - এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেসব কণা প্রায় প্রকাশের বেগে গমন করে, সেইসব কণা অথবা বিকিরণ মার্গের মধ্যে বাধক পদার্থকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজের মার্গকে নির্বাধ বানিয়ে গমন করে। এর অর্থ হল সেগুলো বিভিন্ন আয়ন বা ইলেকট্রনকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং সেগুলোর দ্বারা নিঃসরণ আর শোষণের ক্রিয়া করে নিরাপদ রূপে নিরন্তর গমন করতে থাকে। এই ক্রিয়ার কারণে সেগুলোর বাস্তবিক শুদ্ধ গতির মধ্যে কিছুটা ঘাটতিও দেখা দেয়। যদি শোষণ ও নিঃসরণ পদার্থ অধিক মাত্রায় বিদ্যমান হয়, তাহলে সেই অনুপাতের মধ্যে গমনকারী কণার পরিণামী গতি কম হতে থাকবে। বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা পরিভাষিত ডার্ক মেটার এই সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণের সঙ্গে কোনো পরস্পর প্রতিক্রিয়া করে না, এইজন্য সেই পদার্থকে সেইসব কণা বা বিকিরণ দূরে সরিয়ে নির্বাধ গমন করতে থাকে। এই কণা বা বিকিরণ সূর্যাদি নক্ষত্র, অন্য আকাশীয় লোক, প্রাণীদের শরীর বা বনস্পতি অথবা খোলা অন্তরিক্ষের মধ্যে সর্বত্র এই ব্যবহারই দর্শায়।

ধ্যাতব্য - আমি এখানে দুই প্রকারের আধিদৈবিক ভাষ্য প্রস্তুত করেছি, এইভাবে "পবমান স্বর্দৃক্" পদগুলো থেকে নক্ষত্র, গ্রহাদি লোকের অর্থ গ্রহণ করে অন্য আধিদৈবিক ভাষ্যও করা যেতে পারে।

আধিভৌতিক ভাষ্য (১) -

(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের সমান তেজস্বী বেদবিত্ পবিত্রাত্মা ও পুরুষার্থী রাজা (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) এমন নাগরিক, যারা ধনবান্ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রহিতে ন্যায়কারী রাজার দ্বারা নেওয়া করের পরিশোধ করে না অথবা কর চুরি করে অথবা আবশ্যকতা হলে কোনো নির্ধনের অথবা পরোপকারের কাজে আর্থিক সহায়তা করে না অথবা সমাজ আর রাষ্ট্রের হিতের বিরোধী বা উদাসীন হয়, রাজা তাদের উচিত দণ্ড দিয়ে (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = ব্রহ্ম বাऽঋতম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.১.৪.১০), সত্যম্ বিজ্ঞানম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৭১.২)] সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল বেদের কারণ রূপ পরব্রহ্ম পরমাত্মার মধ্যে নিবাস করেন।

ভাবার্থ - যেকোনো রাষ্ট্রের রাজা শরীর, মন আর আত্মার দ্বারা পূর্ণ সুস্থ আর বলবান্ হওয়া উচিত। এমন রাজাই সতত পুরুষার্থকারী হতে পারবেন। শরীর, মন বা আত্মার মধ্যে যেকোনো একটা নির্বল বা রোগী হলে কোনো রাজাই রাষ্ট্রের সঞ্চালনে সক্ষম হবেন না। এর পাশাপাশি যতক্ষণ পর্যন্ত রাজা জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হবেন না, ততক্ষণ পর্যন্তও রাজা রাষ্ট্রের উচিত সঞ্চালন করতে পারবেন না, কারণ এমন রাজাকে তার চাটুকার, চালাক-স্বার্থপর মন্ত্রী, প্রশাসনিক অধিকারী, বৈজ্ঞানিক, পুঁজিপতি এবং অন্য দেশের রাজা ভ্রমিত করে নিজের প্রয়োজন সিদ্ধ করতে পারেন।
.
এমন রাজা দণ্ডনীয় আর সম্মানীয় পাত্রের বিবেক রাখতে পারবেন না, অথচ বিদ্বান আর য়োগী রাজা এর পরিচয় নিশ্চিত করে দণ্ডনীয়কে দণ্ড আর সম্মানীয়কে সম্মান দিয়ে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের হিত সম্পাদন করেন। যে রাষ্ট্রের মধ্যে দণ্ডনীয়কে দণ্ড আর সম্মানীয়কে সম্মান তথা সত্য ও উন্নতির মার্গে চলা ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণা দেওয়া হয় না, সেই রাষ্ট্র অরাজকতা, হিংসা, ভয়, অশান্তি, অন্যায় আর তিন প্রকারের দুঃখে গ্রস্থ হয়ে বিনাশ প্রাপ্ত হয়। অপরাধীকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে ভগবান্ মনুর কথন হল -

দণ্ডঃ শাস্তি প্রজাঃ সর্বা দণ্ড এবাভিরক্ষতি।
দণ্ডঃ সুপ্তেষু জাগর্তি দণ্ডম্ ধর্মম্ বিদুর্বুধাঃ।। (মনুস্মৃতি ৭.১৮)


অর্থাৎ উচিত দণ্ডই প্রজার উপর শাসন করে আর দণ্ডই প্রজার রক্ষা করে। দণ্ড কখনও শিথিল হয় না, এইজন্য বিদ্বান ব্যক্তিরা দণ্ডকেই ধর্ম বলেছেন। কৃপণ ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে মহাত্মা বিদুর বলেছেন -

দ্বাবম্ভসী নিবেষ্টব্যৌ, গলে বদ্ধ্বা দৃঢাম্ শিলাম্।
ধনবন্তমদাতারম্, দরিদ্রম্ চাতপস্বিনম্।। (বিদুরনীতি ১.৬৫)


অর্থাৎ ধনবান হওয়া সত্ত্বেও পরোপকারের কাজে দান না দেওয়া ব্যক্তি আর নির্ধন হওয়া সত্ত্বেও পরিশ্রম না করা তথা দুঃখ না সহ্য করতে চাওয়া ব্যক্তিকে গলার মধ্যে ভারী পাথর বেঁধে গভীর জলাশয়ে ডুবিয়ে দেওয়া উচিত। এখানে সম্পূর্ণ প্রজার জন্যও নির্দেশ আছে যে ধনী ব্যক্তি ধনকে ঈশ্বরের প্রসাদ ভেবে ত্যাগপূর্বকই উপভোগ করবেন। তারা অবশ্যই নির্ধন ও দুর্বলের সহায়তা করবেন। অন্যদিকে নির্ধন ব্যক্তি কখনও ধনীদের প্রতি ঈর্ষা করবেন না, বরং স্বয়ং ধর্মপূর্বক পুরুষার্থ করতে থাকবেন আর দুঃখকেও সহ্য করার অভ্যেস করবেন। তারা কারও ধন চুরি করে ধনী হওয়ার চেষ্টা করবেন না অথবা বিনা কর্ম আর যোগ্যতায় ধন, পদ বা ঐশ্বর্য পাওয়ার ইচ্ছা কখনও করবেন না।

আধিভৌতিক ভাষ্য (২) -

(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বেদবিদ্যার প্রকাশ দ্বারা প্রকাশমান, ব্রহ্মতেজ দ্বারা সম্পন্ন, পবিত্রাত্মা এবং য়োগী আচার্য বা আচার্যা নিজ বিদ্যার্থীদের বিদ্যাভাস করা কালীন (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) বিদ্যাকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক অথবা গ্রহণ না করা শিষ্য আর শিষ্যাদের আবশ্যক এবং উচিত তাড়নাও করবেন। (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) এমন আচার্য আর আচার্যা সম্পূর্ণ সত্য বিদ্যার মূল কারণ বেদ অথবা পরমাত্মার মধ্যে নিরন্তর বিরাজমান থাকেন।

ভাবার্থ - বেদ জ্ঞান দ্বারা সম্পন্ন নিরন্তর য়োগনিষ্ঠ বিদ্বান বা বিদুষীকেই আচার্য বা আচার্যা হবার অধিকারী হওয়া উচিত। তাদের উচিত তারা তাদের শিষ্য বা শিষ্যাদের প্রীতিপূর্বক আর নির্মল ভাবে অধ্যাপনা করবেন। যেসকল বিদ্যার্থী বিদ্যাগ্রহণে প্রমাদ করবে আর প্রীতিপূর্বক বুঝালেও বুঝবে না, তাদের সমুচিত দণ্ড অবশ্যই দিবেন। এই বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ-প্রকাশের দ্বিতীয় সমুল্লাসের মধ্যে ব্যাকরণ মহাভাষ্যের প্রমাণ দিয়ে লিখেছেন -

সামৃতৈঃ পাণিভির্ঘ্নন্তি গুরবো ন বিষোক্ষিতৈঃ।
লালনাশ্রয়িণো দোষাস্তাডনাশ্রয়িণো গুণাঃ।।

অর্থাৎ যে সকল মাতা, পিতা আর আচার্য সন্তান আর শিষ্যদের তাড়ন করেন, মনে করতে হবে যে তারা নিজের সন্তান আর শিষ্যকে নিজের হাতে অমৃত পান করাচ্ছেন আর যারা সন্তান বা শিষ্যদের লালন করেন (আদর দিয়ে মাথায় তোলেন), তারা নিজের সন্তান ও শিষ্যদের বিষ পান করিয়ে নষ্ট-ভ্রষ্ট করেন। কারণ লালনের দ্বারা সন্তান ও শিষ্য দোষযুক্ত এবং তাড়নার দ্বারা গুণবান হয়। আর সন্তান এবং শিষ্যদের সর্বদা তাড়নে প্রসন্ন এবং লালনে অপ্রসন্ন থাকা উচিত। কিন্তু মাতা, পিতা ও শিক্ষকগণ ঈর্ষা ও দ্বেষ বশতঃ তাড়না করবেন না, কিন্তু বাইরে ভয় দেখাবেন আর অন্তরে কৃপাদৃষ্টি রাখবেন।

ধ্যাতব্য - এইভাবে মাতা-পিতা আদির গ্রহণ করে অন্য প্রকারের আধিভৌতিক ভাষ্য করা যেতে পারে।

আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) য়ম-নিয়ম দ্বারা পবিত্র হওয়া য়োগী ব্রহ্মের সাক্ষাৎকারী (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) সব ধরণের দোষের পরিত্যাগ করতে না পারার অনিষ্ট চিত্তবৃত্তিকে দূর করে দেন অর্থাৎ সেই য়োগী পুরুষ সব প্রকারের অনিষ্ট বৃত্তিগুলোকে ধীরে-ধীরে নিরুদ্ধ করতে থাকেন। যখন তার বৃত্তিগুলো নিরুদ্ধ হয়ে যায়, তখন (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) সেই য়োগী পুরুষ সব সত্য বিদ্যার মূল পরব্রহ্ম পরমাত্মার মধ্যে বিরাজমান হয়ে যান অর্থাৎ তিনি ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার করেন।

ভাবার্থ - যখন কোনো য়োগাভ্যাসী অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য আর অপরিগ্রহের মতো য়ম এবং শৌচ, সন্তোষ, তপ, স্বাধ্যায়, ঈশ্বর-প্রণিধানের মতো নিয়ম দ্বারা নিজেকে পবিত্র বানিয়ে নেন, তখন তার চিত্তের বৃত্তি নিরুদ্ধ হতে থাকে, যারদ্বারা তিনি ব্রহ্মসাক্ষাৎকার করতে সক্ষম হন।

এখানে এটা স্পষ্ট হল যে য়ম-নিয়মের পালন না করে কোনো ব্যক্তিই য়োগী হতে পারবেন না। সারা সংসারের বেদবিরোধী বা ভ্রান্ত পাঠকগণ! আমার এই তিন শ্রেণীর সর্বমোট পাঁচটা ভাষ্যকে পড়ে বলুন যে এই মন্ত্রের মধ্যে হিংসার বিধান নেই, বরং যেকোনো রাষ্ট্র, সমাজ বা বিশ্ব কল্যাণের সুন্দর উপায় সূত্র রূপে দেখানো হয়েছে। বাস্তবিক এবং বুদ্ধিমান জিজ্ঞাসু এই একটা আক্ষেপের উপরেই আমার সমাধান থেকে বেদের উপরে আক্ষেপকর্তাদের ভাবনা তথা ভাষ্যকারদের ত্রুটি বুঝে যাবেন।

🔴 আক্ষেপ -
এখানে সুলেমান রিজভী ঋগ্বেদ ৭.৬.৩ মন্ত্রের দুটো ভাষ্য নিম্ন প্রকারে উদ্ধৃত করেছেন -
Rig Veda 7.6.3
"May the fire divine chase away those infidels, who do not perform worship and who are uncivil in speech. They are niggards, unbelievers, say no tribute to fire divine and offer no homage. The fire divine turns those Godless people far away who institute no sacred ceremonies."
- Tr. Satya Prakash Saraswati
পদার্থ - হে রাজন্ (অগ্নিঃ) অগ্নির তুল্য তেজোময়! আপনি (অক্রতূন্) নির্বুদ্ধি (গ্রথিনঃ) অজ্ঞানতায় আবদ্ধ (মৃধ্রবাচঃ) হিংসক বাণী যুক্ত (অয়জ্ঞান্) সঙ্গাদি বা অগ্নিহোত্রাদির অনুষ্ঠান হতে রহিত (অশ্রদ্ধান্) শ্রদ্ধারহিত (অবৃধান্) ক্ষতি সাধনকারী (তান্) সেই (দস্যূন্) দুষ্ট সাহসী চোরদের (প্রপ্র, বিবায়) ভালোভাবে অনেক দূরে পৌঁছে দিন (পূর্বঃ) প্রথম থেকে প্রবৃত্ত হয়ে আপনি (অপরান্) অন্য (অয়জ্যূন্) বিদ্বান বা জ্ঞানীদের সম্মান জানানোর বিরোধীদের প্রতি (পণীন্) ব্যবহার কারী (নিশ্চকার) নিরন্তর করেন।
ভাবার্থ - এই মন্ত্রের মধ্যে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে। হে বিদ্বানগণ! আপনারা সত্যের উপদেশ আর শিক্ষার দ্বারা সব অবিদ্বানদের বোধিত করুন, যাতে তারা অন্যদেরও বিদ্বান করে তোলেন।
পদার্থ - (নি) (অক্রতূন্) নির্বুদ্ধীন্ (গ্রথিনঃ) অজ্ঞানেন বদ্ধান্ (মৃধ্রবাচঃ) মৃধ্রা হিম্স্রা অনৃতা বাগ্যেষান্তে (পণীন্) ব্যবহারিণঃ (অশ্রদ্ধান্) শ্রদ্ধারহিতান্ (অবৃধান্) অবর্ধকান্ হানিকরান্ (অয়জ্ঞান্) সঙ্গাদ্যগ্নিহোত্রাদ্যনুষ্ঠানরহিতান্ (প্রপ্র) (তান্) (দস্যূন্) দুষ্টান্ সাহসিকাঁশ্চোরান্ (অগ্নিঃ) অগ্নিরিব রাজা (বিবায়) দূরম্ গময়তি (পূর্বঃ) আদিমঃ (চকার) করোতি (অপরান্) অন্যান্ (অয়জ্যূন্) বিদ্বৎসৎকারবিরোধিনঃ।
.
ভাবার্থ - অত্র বাচকলুপ্তোপমালঙ্কারঃ। হে বিদ্বাম্সো! য়ূয়ম্ সত্যোপদেশশিক্ষাভ্যাম্ সর্বানবিদুষো বোধয়ন্তু য়ত এতেऽপরানপি বিদুষঃ কুর্য়্যুঃ।
🔵 উত্তর - এখানে আক্ষেপকর্তা নিজের শব্দে এই ভাষ্যের উপর কোনো মন্তব্য করেননি, কিন্তু স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর ইংরাজী অনুবাদের কিছু বাক্যকে অবশ্য রেখাঙ্কিত করা হয়েছে, যারদ্বারা এই সংকেত পাওয়া যাচ্ছে যে এর উপর আক্ষেপকর্তার সেই আক্ষেপ আছে, যে আক্ষেপ ১ ক্রমাঙ্কের মধ্যে দেখানো হয়েছে। পাঠক আমার ১ ক্রমাঙ্কের উত্তরকে বুঝে নিবেন, তারা এই আক্ষেপেরও উত্তর স্বয়ং পেয়ে যাবেন। স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর ইংরাজী অনুবাদ অবশ্যই না তো সঠিক আছে, না পর্যাপ্ত আর না স্পষ্ট।
.
স্বামী জীর সমস্যা এটাও হতে পারে যে ইংরাজী ভাষার মধ্যে হিন্দি বা সংস্কৃত ভাষার গম্ভীর ভাবের সমান কোনো শব্দই নেই। এই কারণে বেদাদি শাস্ত্রকে অন্য ভাষা, বিশেষ করে ইংরাজী আদি নির্ধন ভাষাতে অনুবাদ করা সর্বথা অনুচিত আর সংকটপূর্ণ হবে। স্বামী জীর উচিত ছিল যে তিনি ইংরাজী ভাষাতে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যের ব্যাখ্যা করতেন। যেখানে উপযুক্ত শব্দ পাওয়া যায় না, সেখানে আরও অধিক স্পষ্ট ব্যাখ্যার আবশ্যকতা হয়। আক্ষেপকর্তা দ্বিতীয় ভাষ্য ঋষি দয়ানন্দের দিয়েছেন, যার উপর কোনো আক্ষেপ করা হয়নি আর আমার মনে হয় না যে ঋষি দয়ানন্দের এই ভাষ্যের উপর কোনো বুদ্ধিমান মানবতাবাদী অসম্মত হবেন।
.
এখন আমি এই মন্ত্রের উপরে বিচার করবো। এই মন্ত্রটা হল এইরকম -
ন্যক্রতূন্গ্রথিনো মৃধ্রবাচঃ পণীঁরশ্রদ্ধাঁ অবৃধাঁ অয়জ্ঞান্। প্রপ্রতান্দস্যূঁরগ্নির্বিবায় পূর্বশ্চকারাপরাঁ অয়জ্যূন্।। (ঋগ্বেদ ৭.৬.৩)
এই মন্ত্রের ঋষি হল বসিষ্ঠ। বসিষ্ঠের বিষয়ে ঋষিদের কথন হল - প্রাণা বৈ বসিষ্ঠ ঋষিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.১.১.৬), অগ্নির্বৈ দেবানাম্ বসিষ্ঠঃ (ঐরেয় ব্রাহ্মণ ১.২৮)। এইভাবে এখানে আগ্নেয় পদার্থের মধ্যে বিদ্যমান বা সেগুলো থেকে নিঃসরণ হওয়া প্রাণ রশ্মিগুলোকেই বসিষ্ঠ বলে আর এই রশ্মিগুলো থেকেই এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়েছে। এর দেবতা হল বৈশ্বানর। এর বিষয়ে ঋষিদের কথন হল - অগ্নির্বা এষ বৈশ্বানরো য়ৎসম্বৎসরঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৩৭৯)।
.
এর ছন্দ হল ভুরিক্ পঙক্তি। ভুরিক্ এর বিষয়ে মহর্ষি য়াস্ক লিখেছেন -
ভুরিজৌ বাহুনাম (নিরুক্ত ২.৪)
.
ঋষি দয়ানন্দ কৃত ঋগ্বেদ ভাষ্য ৪.২.১৪ মন্ত্রের মধ্যে এর অর্থ ধারক আর পোষক করা হয়েছে। এই কারণে এর দৈবত আর ছান্দস প্রভাবে সূর্যলোকের মধ্যে অগ্নি নিজের বাধক বা বারক বলের দ্বারা পদার্থের য়জন প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করে আর নীল বর্ণের উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হতে থাকে। ধ্যাতব্য হল, আচার্য পিঙ্গল পঙক্তি ছন্দের বর্ণ নীল বলেছেন। এখন আমি এর ভাষ্য প্রারম্ভ করবো -
.
আধিদৈবিক ভাষ্য -
(নি, অক্রতূন্) [ক্রতুঃ = কর্মনাম (নিঘন্টু ২.১), মিত্র এব ক্রতুঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.১.৪.১)] যে পদার্থ নিতরাম্ অর্থাৎ পূর্ণরূপে য়জন ক্রিয়া হতে রহিত হয়। (গ্রথিনঃ) অব্যবস্থিত বা অনিষ্ট রূপে জড়িয়ে থাকা (মৃধ্রবাচঃ) [এই পদের মধ্যে "মৃধু উন্দনে" ধাতু ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হল মারা, ভিজিয়ে দেওয়া বা হওয়া।] যেসব পদার্থের মধ্যে হিংসক বাক্ রশ্মি বিদ্যমান থাকে, (অয়জ্ঞান্) যেসব পদার্থ সংযোজক বা বিয়োজক গুণ যুক্ত হয় না, (অশ্রদ্ধান্) [শ্রদ্ধা = তেজ এব শ্রদ্ধা (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.৩.১.১) , শ্রদ্ধা বা আপঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.২.৪.১)] যেসব পদার্থ দুর্বল প্রাণ রশ্মি যুক্ত তথা যেখানে-সেখানে বিরল মাত্রায় ছড়িয়ে থাকে, (অবৃধান্) এমন পদার্থ যেগুলোর মধ্যে বৃদ্ধি হচ্ছে না অথবা যেগুলো য়জন ক্রিয়াতে বৃদ্ধি হতে দেয় না, (তান্, দস্যূন্) এইরকম সব পদার্থ সৃজন প্রক্রিয়াকে ক্ষীণ করে, এইরকম সব পদার্থকে (অগ্নিঃ) বৈশ্বানর অগ্নি (প্র, প্র, বিবায়) খুব ভালো ভাবে দূরে সরিয়ে দেয় আর যেসব পদার্থ দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় হয়, সেগুলোকে অনেক ভালো ভাবে গতি প্রদান করে।
.
মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন - অন্তরিক্ষম্ বৈ প্র (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৪১), প্রাণো বৈ প্র (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৪০)। এর অর্থ হল অগ্নি তত্ত্ব প্রাণ আর আকাশ তত্ত্বকে বিশেষভাবে সক্রিয় করে দুর্বল এবং নিষ্ক্রিয় পদার্থকে সবল করে তোলে আর হানিকারক পদার্থকে দূরে সরিয়ে দিয়ে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়। (পূর্বঃ, অপরান্, অয়জ্যূন্) [এখানে "য়জ্যুঃ" পদ য়জ ধাতু থেকে "য়জিমনিশুন্ধিদসিজনিভ্যো য়ুচ্" (উণাদিকোষ ৩.২০) দ্বারা য়ুচ্ প্রত্যয় হয়ে ব্যুৎপন্ন হয়েছে।] সম্পূর্ণ পদার্থের মধ্যে পূর্বে থেকেই পূর্ণ রূপে ব্যাপ্ত বৈশ্বানর অগ্নি এমন পদার্থ, যেগুলোর মধ্যে য়জনশীলতার গুণ নগণ্য হয়, সেগুলোকে (পণীন্, চকার) যজ্ঞীয় ব্যবহার যুক্ত করতে থাকে।
.
এখানে "অপরান্" পদ য়জনশীল পদার্থ হতে ভিন্ন পদার্থের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
.
ভাবার্থ - সূর্যলোকের মধ্যে বিদ্যমান তীব্র উষ্মা সমস্ত পদার্থকে নিরন্তর ছেদন-ভেদন করতে থাকে। বড় কণা ভেঙে গিয়ে ছোটো কণাতে পরিণত হতে থাকে। সেগুলোর মধ্যে যে পদার্থ সংযোজন হওয়ার যোগ্য হয়, সেটা আয়ন রূপে কেন্দ্রীয় ভাগের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। তাদের মার্গে যেসব বাধক পদার্থ আসে এবং যেসব পদার্থ সংযোজন হওয়ার যোগ্য হয় না, সেই পদার্থগুলোকে উষ্মাযুক্ত তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ তরঙ্গ দূরে সরিয়ে দিতে থাকে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -
এই ভাষ্য আপনি আগে থেকে উদ্ধৃত করেছেন আর এর উপরে আপনার কোনো মন্তব্যও নেই। অবিদ্যাগ্রস্ত অর্থাৎ মূঢ় মতি, হিংসার জন্য মানুষকে উৎসাহ প্রদানকারী, সমাজের মধ্যে বিচ্ছেদ উৎপন্নকারী, অগ্নিহোত্রাদির দ্বারা পরিবেশকে শুদ্ধ না করা ব্যক্তি, বিদ্যা এবং মানবতার উপরে শ্রদ্ধা না রাখা ব্যক্তি আর হানিকারক দুষ্ট অপরাধীদের রাজা যদি দূর না করেন, তাদের সৎপথে না নিয়ে আসেন, তাহকে কি তাদের পূজা করবেন? তাদের দূর করলে তবেই কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের হিত হওয়া সম্ভব, অন্যথা রাষ্ট্র আর বিশ্বের মধ্যে অরাজকতাই ছড়াবে। এইজন্য ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য হল সর্বথা উচিত আর কল্যাণকারী।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(অগ্নিঃ) শরীরস্থ বিদ্যুদগ্নি (অক্রতূন্) [ক্রতুঃ = কর্মনাম (নিঘন্টু ২.১), প্রজ্ঞানাম (নিঘন্টু ৩.৯)] যেসব কোষিকা আদি পদার্থ নিষ্ক্রিয় বা মৃত হয়ে যায়, (গ্রথিনঃ) যেসব পদার্থ বিকৃত বা অনিষ্ট বন্ধন যুক্ত হয়, (মৃধ্রবাচঃ) [বাক্ = বাগেবাऽগ্নিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.২.২.১৩)] অনিষ্টকারী অগ্নি অর্থাৎ যে বিকৃত অগ্নির দ্বারা শরীরের মধ্যে বিভিন্ন রোগ হতে পারে, (অয়জ্ঞান্) এমন অবশিষ্ট পদার্থ যা শরীরের জন্য উপযোগী নয়, (অশ্রদ্ধান্) [শ্রদ্ধা = তেজ এব শ্রদ্ধা (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.৩.১.১)] যেসব পদার্থ তেজহীন বা দুর্বল হয়ে গেছে, (অবৃধান্) যেসব পদার্থ শরীরের জন্য হানিকারক অর্থাৎ বিজাতীয় পদার্থ (তান্, দস্যূন্) এমন সব পদার্থ শরীরের ক্ষীণকারী হয়, সেইসব হানিকারক পদার্থকে (প্র, প্র, বিবায়) বহির্গত অথবা নষ্ট করতে থাকে।

এমন সব পদার্থই অবশিষ্ট রূপ হয়ে মল-মূত্র, স্বেদ, কফ, শ্বাস আদির দ্বারা নিরন্তর নিঃসৃত হতে থাকে। (পূর্বঃ) এইসব পদার্থের উৎপত্তির থেকে পূর্ব হতে বিদ্যমান সেই শরীরস্থ অগ্নি (অপরান্) অন্য পদার্থকে (অয়জ্যূন্) যেসব পদার্থ সপ্তধাতুতে পরিণত হয় না, সেগুলোকে (পণীন্, নি, চকার) সম্যক ক্রিয়া আর বল দ্বারা নিরন্তর যুক্ত করতে থাকে।

ভাবার্থ - শরীরের মধ্যে থাকা বিদ্যুৎ এবং অগ্নি পদার্থ শরীরের সমস্ত ক্রিয়াকে সঞ্চালিত করতে অনিবার্য ভূমিকা পালন করে। বিদ্যুৎ আর উষ্মার কারণেই শরীরের মধ্যে অনেক ছেদন আর ভেদনের ক্রিয়া চলতে থাকে। ভোজনের অবয়ব সূক্ষ্মভাবে ভেঙে যাওয়া, পাচক রস বের হওয়া, সেগুলো থেকে বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক ক্রিয়া হওয়া, রসরূপ হওয়া ভোজন অন্ত্রের দ্বারা শোষিত হওয়া, ফুসফুস, হৃদয় আর মস্তিষ্কের সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত নাড়ি আর শিরার ক্রিয়াশীল হওয়া, নিঃসরণ আদি সমস্ত তন্ত্রের কাজ করা, বাইরে থেকে আসা জীবাণু আর বিষাণুকে রক্তের শ্বেত অণুর দ্বারা নষ্ট করে দেওয়া, শরীরের কোষিকার মধ্যে ঊর্জার উৎপত্তি হওয়া, এই সমস্ত ক্রিয়া বিদ্যুৎ আর উষ্মার দ্বারাই সম্পন্ন হয়।

আপনি যেসব মন্ত্রের মধ্যে হিংসার দোষারোপ করেছেন, সেগুলোর উত্তর এইভাবেই বুঝে নেওয়া উচিত। হিংসক, চোর, ডাকু, জ্ঞানের শত্রু, জ্ঞানী ও পরোপকারীদের দুঃখ দেওয়া ব্যক্তি, কৃপণ, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরোপকার না করা ব্যক্তি, আতংবাদী এবং নির্বলের উপর অত্যাচার করা ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়া হিংসা নয়, বরং বাস্তবে অহিংসা হয়, যারদ্বারা সব প্রাণী সুখে থাকতে পারবে। এই কারণে আমি হিংসা আদি দোষে অভিযুক্ত অন্য মন্ত্রের কোনো উত্তর দেওয়া আবশ্যক বলে মনে করছি না।

আমি এখানে বেদের কিছু সেই মন্ত্রগুলোকে উদ্ধৃত করবো, যেগুলোর মধ্যে কেবল মানুষই নয়, বরং প্রাণীমাত্রের প্রতি অত্যন্ত প্রেম আর আত্মীয়তাপূর্ণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

১. মিত্রস্য চক্ষুষা সমীক্ষামহে।
অর্থাৎ প্রাণীমাত্রের প্রতি মিত্রের সমান ব্যবহার করবে।
২. সমানী প্রপা সহ বোऽন্নভাগঃ।
অর্থাৎ আমাদের সবার আহার-বিহার সমান হবে।
৩. য়ত্র ভুবনম্ ভবত্যেকনীডম্।
অর্থাৎ আমরা সবাই পৃথিবীবাসী পরস্পর এমন ভাবে বাস করবো, যেভাবে বাসার মধ্যে পাখির পরিবার পরস্পর প্রীতির সহিত বসবাস করে।
৪. সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানম্ মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।
অর্থাৎ আমাদের বিচার, আমাদের সামাজিক পরম্পরা, আমাদের চিত্ত আর ভাবনা সব সমান হবে।
৫. অজ্যেষ্ঠাসো অকনিষ্ঠাসঃ।
অর্থাৎ আমাদের মানুষের মধ্যে কেউ বড় নয় আর কেউ ছোট নয় অর্থাৎ আমরা সবাই হলাম এক পিতা পরমাত্মার সন্তান।

এই ধরণের উদাত্ত উপদেশ থাকতে কোনো অজ্ঞানী ব্যক্তিই বেদের মধ্যে হিংসা, অস্পৃশ্যতা, উঁচু-নিচু, শোষণের মতো পাপের দোষারোপ করতে পারে। বুদ্ধিমান তো কখনও এই ধরণের বিচার মনের মধ্যেও নিয়ে আসবে না। এই কারণে এই প্রকরণকে আমি এখানেই সমাপ্ত করছি।

🍁 বৈদিক ঈশ্বরকে যে বিশ্বাস করে না, সে দোষী কেন হবে?

সুলেমান রিজভীর অভিযোগের মধ্যে অনেক মন্ত্রের উপরে এই অভিযোগ আছে যে সেগুলোতে নাস্তিককে দণ্ড দেওয়ার বিধান আছে। সর্বপ্রথমে তো আমি এখানে এটা বলতে চাইবো যে স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর অনুবাদ অথবা অন্য যারাই অনুবাদ করেছেন, তারা বেদের বাস্তবিক এবং সম্পূর্ণ অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করতে নিতান্ত অক্ষম হয়েছেন। বেদের ভাষ্য করার শৈলী সেটাই হওয়া উচিত, যেটা আমি দুটো মন্ত্রের ভাষ্য করে এর পূর্বে দেখিয়েছি।

বেদের মূল অর্থ তো আধিদৈবিকই হয়, অন্য দুই প্রকারের অর্থ মূল অর্থের সঙ্গে কোথাও-না-কোথাও সঙ্গত থাকে। মূল অর্থ সার্বদেশিক ও শাশ্বত হয়, অথচ আধিভৌতিক অর্থ ভিন্ন-ভিন্ন লোকের মননশীল প্রাণীর জন্য ভিন্ন-ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থও শাশ্বত আর সার্বদেশিক হয়। সারাংশ হল, বেদের আধিদৈবিক ভাষ্য না করে কিংবা তাকে না জেনে অন্য দুই প্রকারের ভাষ্য অনিশ্চিতই হবে।

ঋষি দয়ানন্দ সময়াভাবের কারণে অনেক কম মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য করেছেন। তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক আর বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দেখে মানুষকে আধ্যাত্মিক হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে লৌকিক ব্যবহারেও কুশল আর সর্বহিতৈষী বানানোর ভাবনায় প্রায়শঃ আধিভৌতিক আর আধ্যাত্মিক অর্থই করেছেন। তিনি কেবল সংস্কৃত ভাষাতেই তাঁর ভাষ্য করেছেন, হিন্দি অনুবাদ তাঁর সহযোগী পণ্ডিতেরা করেছেন। এই কারণে সেই হিন্দি ভাষার মধ্যে অনেকত্র ত্রুটি রয়ে গেছে। কোথাও ত্রুটি না জেনে হয়েছে, তো কোথাও জেনে শুনে করা হয়েছে বলে মনে হয়।

বেদের অন্য আর্যসমাজী ভাষ্যকারেরা ঋষি দয়ানন্দের শৈলীর যথাশক্তি অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু যেখানে তারা এমনটা করতে পারেন নি, সেখানে তারা আচার্য সায়ণ আদির অনুসরণ করতে বাধ্য হন। এই কারণে অনেকত্র ভারী দোষ এসে গেছে। এইসব বলার অর্থ এই নয় যে যেকোনো অনভিজ্ঞ ব্যক্তি বেদের উপরে আক্রমণ করার অধিকারী হয়ে যাবে। দুর্বল কাঁচের মহলে বাস করা ব্যক্তি যদি পাথরের মহলে বাস করা ব্যক্তির উপরে পাথর ফেলার দুঃসাহস করে, এটা অযৌক্তিকই হবে। এতকিছুর পরেও আমি এনার আক্ষেপের বিষয়ে কিছু কথা স্পষ্ট করতে চাইবো, সেগুলোর মধ্যে প্রথম হল নাস্তিক কাকে বলে?

ভগবান্ মনুর অনুসারে - "নাস্তিকো বেদবিন্দকঃ" অর্থাৎ যে ব্যক্তি বেদের নিন্দা করে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিন্দা করে, জ্ঞানীদের শত্রু হয়, জ্ঞানের অনুসারে আচরণ করে না, মানুষকে অন্ধবিশ্বাসী করে তোলে, বিদ্যার বিরোধী করে তোলে, যারা স্বয়ং সত্য থেকে দূরে থাকে আর অন্যদেরও সত্য থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে, তাকে নাস্তিক বলে। বেদ কোনো বিষয়কে বিচার-বিশ্লেষণ বা সত্যতা যাচাই না করে অন্ধভাবে বা জোরপূর্বক (বলাৎ) মেনে নেওয়ার উপদেশ দেয় না, বরং সেটা সত্য আর অসত্যকে জেনেই সম্পূর্ণ লোকব্যবহার করার উপদেশ করে। প্রাণীমাত্রের প্রতি মৈত্রী করা আর দুষ্টকে দণ্ড দেওয়ার উপদেশ করে। সম্পূর্ণ সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক রহস্যের উদ্ঘাটন করে।

বেদ কোনো সাম্প্রদায়িক অথবা কোনো বর্গ ও দেশের গ্রন্থ নয়, বরং এটা হচ্ছে ব্রহ্মাণ্ডীয় গ্রন্থ। এর বিরোধ করার অর্থ হল বিরোধকারী ব্যক্তি সম্পূর্ণ সৃষ্টির জ্ঞান-বিজ্ঞানেরই বিরোধী হবে। এখন যেকোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি বিচার করে দেখুক যে এমন মহান জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থ বেদের বিরোধকারী মানবতার হিতৈষী হবে নাকি শত্রু হবে? অবশ্যই সে মানবতার প্রবল শত্রু হবে। তাহলে মানবতার শত্রুকে কেন দণ্ড দেওয়া হবে না? এইভাবে আমি ঈশ্বরের বিরোধ করার আক্ষেপের উপরেও বিচার করবো।

বেদোক্ত ঈশ্বর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্ণিত কাল্পনিক ঈশ্বর নয়, তিনি সপ্তম আকাশ অথবা চতুর্থ আকাশের উপর সিংহাসনে বসে থাকা খুদা নন, যাকে তুলে ধরার জন্য ফারিস্তাদের আবশ্যকতা হয়। তিনি মানুষ আর মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ও হিংসা উৎপন্নকারী খুদা নন। তিনি নিজ-নিজ ক্ষেত্রের মধ্যে বসবাসকারী মানুষকে অকারণে পথভ্রষ্ট করা বা দিশা নির্দেশকারী নন। তিনি নিজেরই সন্তানরূপ পশু-পক্ষীকে মেরে খাওয়ার উপদেশকারীও নন। তিনি সৃষ্টির বিষয়ে নিতান্ত কাল্পনিক এবং হাস্যকর কাহিনী শোনান না। তিনি কৈলাশ পর্বত, ক্ষীর সাগর আদিতে থাকা শরীরধারী ঈশ্বরও নন।

বেদোক্ত ঈশ্বর হলেন এমন সর্বব্যাপক, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমতী, সর্বকল্যাণকরিণী এবং নিরাকার চেতনের নাম, যিনি সৃষ্টির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম আর স্থূল থেকে স্থূল পদার্থের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন, যিনি জীবমাত্রের কল্যাণ করার জন্যই সৃষ্টির রচনা করেছেন আর সব মানুষকে এমনই উপদেশ করেন। এইরূপ সেই সর্বোচ্চ সামর্থ্যবান চেতনস্বরূপ ঈশ্বরের পূজার অর্থ এই নয় যে মন্দিরে গিয়ে তাঁকে প্রসাদ চড়ানো হবে, আর এমনও নয় যে মসজিদ, চার্চ আর গুরুদ্বারে গিয়ে বিভিন্ন প্রকারের কর্মকাণ্ড করা হবে, বরং ঈশ্বরের পূজার অর্থ হল য়ম-নিয়মের পালন সহিত অর্থাৎ পূর্ণ সত্যবাদী, জীবমাত্রের প্রতি প্রেম করা, নিজের ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সৃষ্টির ঠিক-ঠিক জ্ঞান প্রাপ্ত করার চেষ্টাকারী হয়ে নিরন্তর পরোপকার করার চেষ্টা করতে থাকা আর এমন করার পাশাপাশিই ধ্যান, উপাসনা আদি করা।

যতক্ষণ পর্যন্ত এমন হবে না অথবা যে ব্যক্তি এমন করার চেষ্টা করবে না, তাকে ঈশ্বরের পূজা না করা মানা উচিত। এমন ব্যক্তিই দুষ্ট আর অধার্মিক হয়। আজ এমন ব্যক্তির সংখ্যাই সংসারের মধ্যে অধিক আছে, এইজন্য সারা সংসার দুঃখী হয়ে আছে। পূজা-নামাজ আর প্রার্থনার আডম্বর অনেক হচ্ছে, কল্পিত ঈশ্বরের উপরে ভাষণ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এই মানুষগুলো সত্যের সঙ্গে সম্বন্ধ ভেঙে দিয়েছে। এমন লোকেদের কি দণ্ডণীয় হওয়া উচিত নয়?

বস্তুতঃ ঈশ্বর, পূজা এবং বেদ এই তিনটার সত্য স্বরূপকে না জানার কারণেই আপনি বেদের বিষয়ে নিতান্ত বিভ্রান্তে আছেন অথবা আপনার কুরআনের মধ্যে বর্ণিত হিংসাদি পাপগুলোকে সঠিক বলে গণ্য করার জন্যই বিদ্বেষবশত বেদের উপরেও এমন অভিযোগ করছেন। একদিকে তো ভাষ্যকার আর অনুবাদকদের দোষ, অন্যদিকে পূর্বাগ্রহ আর বিদ্বেষবশত এই ভাষ্য আর অনুবাদগুলোকে পঠনকারীর দোষ, এইভাবে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে গেছে। যদি কেউ বাস্তবে সত্যের জিজ্ঞাসু হন, তাহলে তিনি আমার এই দুটো ভাষ্যকে পড়েই বাস্তবিকতাকে জেনে যাবেন আর বেদের অনুগামী হয়ে যাবেন, কিন্তু বুদ্ধিহীন আর পূর্বাগ্রহী ব্যক্তির জন্য সংসারের মধ্যে কোনো ওষুধ নেই।

এই স্পষ্টিকরণের পশ্চাৎ আপনার অন্য অভিযোগের উপরে বিচার করবো।

৩.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 5.21.3
"Let this war drum made of wood, muffled with leather straps, dear to all the persons of human race and bedewed with ghee, speak terror to our formen."
- Tr. Vaidyanath Shastri
বানস্পত্যঃ সম্ভৃত উস্রিয়াভির্বিশ্বগোত্র্যঃ।
প্রত্রাসমমিত্রেভ্যো বদাজ্যেনাভিঘারিতঃ।।
ভাষ্য - হে দুন্দুভি! নাকারা! তুমি যেভাবে (বানস্পত্যঃ) কাঠ দিয়ে নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও (উস্রিয়াভিঃ সম্ভৃতঃ) চামড়ার ফিতা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা (বিশ্বগোত্র্যঃ) সমস্ত জনের বন্ধু হও। সেটা (অমিত্রেভ্যঃ) শত্রুর জন্য (আজ্যেন অভিঘারিতঃ) ঘৃত দ্বারা অভিষিক্ত হয়ে (প্রত্রাসম্ বদ) ভয় আর ত্রাসের বার্তা দাও।
.
এখানে আক্ষেপকর্তার আক্ষেপ হল বেদের মধ্যে তার বিরোধীদের আতঙ্কিত করার বিধান আছে।
.
উত্তর - এই মন্ত্রের দ্বারা উপরোক্ত ভাষ্যকারেরা শত্রুদের আতঙ্কিত করার বর্ণনা করেছেন। এটা যদিও ভাষ্য নয়, তবুও সরল অনুবাদ মাত্র, যা মন্ত্রের অভিপ্রায়কে উচিত রীতিতে দেখাতে সক্ষম হয়নি। আমি এখানে পূর্বের মতো এটাই বলতে চাইবো যে বেদের অনুবাদ করা উচিত নয়, বরং সমুচিত ভাষ্য করা উচিত। তবুও এরমধ্যে আপত্তির কি আছে বলে আপনার মনে হচ্ছে? যখন দুইপক্ষের সেনার মধ্যে যুদ্ধ হয়, তখন শত্রুকে কেবল আতঙ্কিত করার কথা কেন, তাকে তো নষ্টই করে ফেলা হয়। এরই নাম হল যুদ্ধ, যেটা ধর্মাত্মা আর পাপীদের মধ্যে চিরকাল ধরে চলে আসছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কাকে আমাদের শত্রু মানা উচিত?
.
মহর্ষি দয়ানন্দ স্বমন্তব্যামন্তব্যপ্রকাশের মধ্যে মনুষ্যত্বের লক্ষণ সম্বন্ধে লিখেছেন -
.
মানুষ তাকেই বলা উচিত যে মননশীল হয়ে স্বাত্মবৎ অন্যের সুখ-দুঃখ আর হানি-লাভকে বুঝবে। অন্যায়কারী বলবানের কাছেও ভয় পাবে না আর ধর্মাত্মা নির্বলের কাছেও ভয় করবে। শুধু তাই নয়, নিজ সর্ব সামর্থ্যানুসারে ধর্মাত্মাদের - তারা মহা অনাথ, নির্বল আর গুণরহিত হোক না কেন - তাদের রক্ষা, উন্নতি, প্রিয়াচরণ সদা করবে আর অধর্মী চক্রবর্তী, সনাথ, মহাবলবান আর গুণবান হলেও, তবুও তার নাশ, অবনতি আর অপ্রিয়াচরণ সদা করবে অর্থাৎ যতটা সম্ভব অন্যায়কারীর বলের হানি আর ন্যায়কারীর বলের উন্নতি সর্বথা করবে। এই কাজে তার যতই দুঃখ প্রাপ্ত হোক না কেন, জীবন উৎসর্গ করতে হলেও, তবুও এই মনুষ্যত্বরূপ ধর্ম থেকে কখনও পৃথক হবে না।
.
এখন কেউ বলুক যে মানুষের এরথেকে অধিক ন্যায়সঙ্গত, তর্কসঙ্গত এবং কল্যাণকরিণী পরিভাষা আর কি হতে পারে? যে ব্যক্তি নিজের বলের অহংকারে জনসাধারণ অথবা বিভিন্ন পশু-পক্ষীকে দুঃখ দেয়, তাকে যেকোনো সজ্জন ব্যক্তি কেন নিজের শত্রু ভাববে না? এইরকম দুষ্ট ব্যক্তিই সম্পূর্ণ বিশ্বের মধ্যে অরাজকতা ছড়ায়। যতই অধিক এদের সহ্য করা হবে অথবা এদের প্রতি যত অধিক তটস্থ থাকা হবে, ততই অধিক এরা সমাজ, রাষ্ট্র বা বিশ্বের মধ্যে হিংসা, অরাজকতা আর অশান্তি ছড়াবে। এই কারণে এমন বর্বর ব্যক্তিদের শান্তি আর মানবতার স্থাপনা করার জন্য অবশ্যই নষ্ট করে দেওয়া উচিত। তখন যদি বেদের মধ্যে এমন শত্রুদের দণ্ড দেওয়ার প্রার্থনা থাকে, তাহলে তার নিন্দা কোনো অরাজক আর উপদ্রবকারী তত্ত্বই করতে পারে।
.
এখন আমি এই মন্ত্রের নিজের অর্থ প্রস্তুত করবো -
বানস্পত্যঃ সম্ভৃত উস্রিয়াভির্বিশ্বগোত্র্যঃ।
প্রত্রাসমমিত্রেভ্যো বদাজ্যেনাভিঘারিতঃ।। (অথর্ববেদ ৫.২১.৩)
এই মন্ত্রের ঋষি হল ব্রহ্মা। [ব্রহ্মা = ইন্দ্র এব ব্রহ্মাऽऽসীৎ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.৩৭৪), ঐন্দ্রো বৈ ব্রহ্মা (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.১.৭.৫)] এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ তরঙ্গ দ্বারা উৎপন্ন হওয়া রশ্মি থেকে হয়। এর দেবতা হল দুন্দুভি। দুন্দুভির বিষয়ে মহর্ষি য়াস্ক বলেছেন -
দুন্দুভিঃ ইতি শব্দানুকরণম্।
দ্রুমো ভিন্ন ইতি বা, দুন্দুভ্যতের্বা স্যাচ্ছব্দ কর্মণঃ (নিরুক্ত ৯.১২)
.
এর অর্থ হল সংযোজক গুণ যুক্ত একটা বিশেষ প্রকারের ঊর্জাকে দুন্দুভি বলে। এর বিষয়ে সবিস্তারে জানতে হলে আমার গ্রন্থ "বেদার্থ-বিজ্ঞানম্" পঠনীয়। এর ছন্দ অনুষ্টুপ্ হওয়াতে সংযোজক ঊর্জা অনুকূলতাপূর্বক বিভিন্ন কণার পরস্পর সংযুক্ত হওয়াতে সহায়ক হয়। এর ছান্দস ও দৈবত প্রভাবে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের রং-বেরংয়ের প্রকাশের উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হতে থাকে। এই মন্ত্রের ভাষ্য এইরকম হবে -
আধিদৈবিক ভাষ্য -
(বানস্পত্যঃ) [বনস্পতিঃ = অগ্নির্বৈ বনস্পতিঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১০.৬), প্রাণো বনস্পতিঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১২.৭), প্রাণো বৈ বনস্পতিঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৪), সোমো বৈ বনস্পতিঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১০, শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৩.৩৩)] অগ্নি এবং বায়ু থেকে উৎপন্ন দুন্দুভি সংজ্ঞক উপরোক্ত ঊর্জা (উস্রিয়াভিঃ) [উস্রিয়া = উস্রিয়া ইতি গোনাম (নিঘন্টু ২.১১)] বিভিন্ন প্রকারের রশ্মির দ্বারা (সম্ভৃতঃ) সঠিকভাবে ধারণ এবং পুষ্ট হওয়া (বিশ্বগোত্র্যঃ) [গোত্রঃ = মেঘনাথ (নিঘন্টু ১.১০)] সম্পূর্ণ খগোলীয় মেঘের মধ্যে বিদ্যমান (অমিত্রেভ্যঃ) শত্রুরূপী বাধক অথবা অসংযোজক পদার্থের দিকে (প্রত্রাসম্, বদ) [বদ = বদতি গতিকর্মা (নিঘন্টু ২.১৪)] তীব্র ভেদক তরঙ্গকে প্রক্ষিপ্ত করে। (আজ্যেন, অভিঘারিতঃ) [আজ্যম্ = প্রাণো বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৮.১৫.২৩), ছন্দাম্সি বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.১.৫.৩)] এই উর্জা বিভিন্ন প্রাণ আর ছন্দ রশ্মির দ্বারা অভিসিঞ্চিত হয়।

ভাবার্থ - খগোলীয় মেঘের ভিতরে বিভিন্ন প্রাণ আর ছন্দ রশ্মি থেকে উৎপন্ন তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ তরঙ্গ বিভিন্ন প্রকারের ছেদন, ভেদন আর সংযোজন ক্রিয়াগুলোকে সম্পন্ন করে, যারদ্বারা হানিকারক পদার্থ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে দূরে সরে যায় আর সংযোগযোগ্য পদার্থ নির্বাধ রূপে সংযুক্ত হতে থাকে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -
(বানস্পত্যঃ) [বনম্ = রশ্মিনাম (নিঘন্টু ১.৫)। এই পদ "বন শব্দে", "বন সম্ভক্তৌ" এবং "বনু য়াচনে" ধাতু দ্বারা ব্যুৎপন্ন হয়েছে। বনস্পতিরেব বানস্পত্যঃ] রাষ্ট্রের মধ্যে প্রজা দ্বারা বাঞ্ছিত অন্ন-ধনাদি পদার্থের উপযুক্ত বিতরণকারী, বিদ্যার প্রকাশ দ্বারা প্রকাশিত সত্যোপদেষ্টা রাজা (বিশ্বগোত্র্যঃ) রাষ্ট্রের প্রজার সকল কূলের মধ্যে নিজের হিতকারী কর্মের দ্বারা সর্বদা বিদ্যমান অর্থাৎ সমস্ত প্রজার হিতচিন্তক (উস্রিয়াভিঃ, সম্ভৃতঃ) গৌ আদি উপকারী পশুর দ্বারা তথা বিভিন্ন প্রকারের নিরাপদ কিরণ বা ঊর্জার দ্বারা রাষ্ট্রকে সম্যক রূপে ধারণকারী (অমিত্রেভ্যঃ, প্রত্রাসম্, বদ) রাষ্ট্রবিরোধী তত্ত্ব আর সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর দণ্ডের আদেশ দিবেন। (আজ্যেন, অভিঘারিতঃ) যেরকম ঘৃত দ্বারা সিঞ্চিত সমিধা জ্বলে নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক সেইভাবে তেজস্বী রাজা হিংসক আর ক্রূর অপরাধীদের নষ্ট করে দিবেন।
ভাবার্থ - বেদবিদ্যার মহান জ্ঞাতা রাজা তাঁর প্রজার জন্য অন্ন-ধন আদি পদার্থের ন্যায়সঙ্গত বিতরণের ব্যবস্থা করবেন। সুখের ইচ্ছুক যেকোনো রাষ্ট্র গৌ আদি উপকারী পশুকে নিজের আর্থিক আধার বানিয়ে রাখবে আর একইভাবে সবথেকে নিরাপদ আর শুদ্ধ পেশীয় ঊর্জার ব্যবহার করবে। এর অতিরিক্ত সেই ঊর্জারই ব্যবহার করবে, যেটা সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ হবে। রাজা তাঁর প্রজার জন্য মাতা-পিতার সমান হিতকারী হওয়া উচিত, প্রজার জন্য যেটা ভয়ের কারণ হবে, তাকে নষ্ট করে দিবেন। সেই রাজা পরিবেশ শোধনার্থ গোঘৃত আদি উত্তম পদার্থ দিয়ে যজ্ঞ করবেন আর করাবেন এবং যেভাবে ঘৃতের আহুতির দ্বারা অগ্নি তেজস্বী হতে থাকে, সেইভাবে রাজাও ব্রহ্মচর্যাদি ব্রত আর য়োগাভ্যাস আদির দ্বারা তেজযুক্ত হবেন।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(বানস্পত্যঃ) প্রাণবিদ্যার জ্ঞাতা আর প্রাণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম য়োগাভ্যাসী ((উস্রিয়াভিঃ, সম্ভৃতঃ) বেদের ঋচার দ্বারা স্বয়ংকে সম্যক রূপে পুষ্ট করেন আর তিনি নিরন্তর বেদের ঋচার মধ্যেই স্থির থাকেন। (বিশ্বগোত্র্যঃ) তিনি কোনো কূল বা বংশ বিশেষের না হয়ে প্রাণীমাত্রের হিতের মধ্যেই লেগে থাকেন। (অমিত্রেভ্যঃ, প্রত্রাসম্, বদ) সেই য়োগী য়োগসাধনার মধ্যে বাধক চিত্ত বৃত্তিকে নিজের অন্তশ্চেতনা দ্বারা প্রতিবন্ধিত করার আদেশ দেন অর্থাৎ মনের মধ্যে চলে আসা বিকারকে বলপূর্বক প্রতিবন্ধিত করার চেষ্টা করেন। (আজ্যেন, অভিঘারিতঃ) [আজ্যম্ = প্রাণো বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৮.১৫.২৩), য়জ্ঞো বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৩.৪.১)] এমন য়োগী নিজ প্রাণায়ামাদি তপের দ্বারা প্রাণ বলকে বাড়িয়ে পরব্রহ্ম পরমাত্মার সঙ্গে সঙ্গত হওয়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি পরহিতের ভাবনায় স্বয়ংকে নিরন্তর সিঞ্চিত করেন অথবা তিনি যজ্ঞস্বরূপ পরব্রহ্ম পরমাত্মার প্রতি প্রীতি ভাবনায় স্বয়ংকে নিরন্তর সিঞ্চিত করতে থাকেন।
ভাবার্থ - প্রাণকে বশীভূত করেছেন এমন য়োগী সর্বদা বেদের ঋচার মধ্যে রমণ করেন। তিনি প্রাণীমাত্রের আত্মার মধ্যে নিরন্তর ঈশ্বরের বাস অনুভব করার সঙ্গে-সঙ্গে সর্বদা তাদের হিতচিন্তন করেন। তাঁর মনের মধ্যে যখনই কোনো বিকার উৎপন্ন হতে থাকে, তখনই তিনি নিজের মনকে আদেশ দিয়ে মন্দ বিচারকে বাইরে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। য়োগী ব্যক্তির আত্মবল খুব প্রবল হয়, কারণ তিনি সর্বদাই স্বয়ংকে ঈশ্বরাধীন অনুভব করেন।
.
এই ভাষ্যগুলোকে পড়ে যেকোনো বেদবিরোধী এটা বলুক যে এই ভাষ্যগুলোর উপরে তার কি আপত্তি আছে?

৪.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 4.31.7

"Let the King [Varuna] and Manyu, the warm emotion give us the wealth of both kinds- earned and gathered.

Let our enemies overwhelmed with terror in their mind and spirit and defeated in their design run away."
- Tr. Vaidyanath Shastri.

Tasks Acharya also writes about terror, Nirukta 10.21... These are hemistichs. Like a spear hurled, it inspires terror (among enemies) or courage (among friends)...

এখানেও আক্ষেপকর্তা বেদের মধ্যে শত্রুকে আতঙ্কিত করা তথা ভক্তদের ধনাদি দেওয়ার অভিযোগে করেছেন।
.
উত্তর - আমি এরপূর্বে এটা বুঝিয়েছি যে বৈদিক সংস্কৃতির মধ্যে চোর, ডাকাত, ছিনতাইবাজ, দুরাচারী আর অন্যায়কারী ব্যক্তিদেরই দুষ্ট আর শত্রু বলা হয়েছে। বস্তুতঃ এমন ব্যক্তিরা মানবতার শত্রু হয়, তাদের অবশ্যই দণ্ড দেওয়া উচিত। এখানে আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর দ্বারা করা ইংরাজী অনুবাদটাও পূর্বের অনুবাদের মতো অতি সামান্য আর অস্পষ্ট আছে, কিন্তু সেগুলোর ভাবকে জানতে হলে আপনাকে বৈদিক সংস্কৃতির সঙ্গে নিষ্পক্ষতাপূর্বক অবগত হতে হবে আর আমার দ্বারা এপর্যন্ত করা সমাধানকেও বুদ্ধি আর হৃদয়ের মধ্যে বসাতে হবে। এই অনুবাদের মধ্যে আপনি কোন দোষটা দেখেছেন?
.
এই মন্ত্রের উপর আমি নিজের শৈলীতে বিচার করবো -

সম্সৃষ্টম্ ধনমুভয়ম্ সমাকৃতমস্মভ্যম্ ধত্তাম্ বরুণশ্চ মন্যুঃ। ভিয়ো দধানা হৃদয়েষু শত্রবঃ পরাজিতাসো অপ নি লয়ন্তাম্।। (অথর্ববেদ ৪.৩১.৭)
.
এর ঋষি হল ব্রহ্মাস্কন্দ।[ব্রহ্মা = বলম্ বৈ ব্রহ্মা (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৮.৫.২)] এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি এমন কিছু বিশেষ ঋষি রশ্মির দ্বারা হয়, যা উপযোগী বলগুলোকে গতি প্রদান করে অর্থাৎ সেগুলোকে সমৃদ্ধ করে আর অনুপযোগী অথবা বাধক বলগুলোকে শোষিত করে নেয় অর্থাৎ সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এর দেবতা হল মন্যু আর ছন্দ হল জগতী। "মন্যু" বিষয়ে মহর্ষি য়াস্ক বলেছেন -

মন্যুঃ মন্যতের্দীপ্তিকর্মণঃ ক্রোধকর্মণো বধকর্মণো বা মন্যন্ত্যস্মাদিষবঃ (নিরুক্ত ১০.২৯)। এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবে অনিষ্ট এবং বাধক পদার্থকে ধ্বংসকারী রশ্মিগুলো আকাশের মধ্যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত স্পন্দিত হতে থাকে আর সম্পূর্ণ পদার্থের মধ্যে উজ্জ্বল বর্ণের উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হতে থাকে। এর ভাষ্য এইরকম হবে -

আধিদৈবিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) [বরুণঃ = স য়দগ্নির্ঘোরসম্স্পর্শস্তদস্য ( = অগ্নেঃ) বারুণম্ রূপম্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.৪), য়ঃ প্রাণঃ স বরুণঃ (গোপথ ব্রাহ্মণ উত্তরভাগ ৪.১১), অপানো বরুণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৪.২.৬), ব্যানো বরুণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৯.১.১৬)] এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই অতি তীক্ষ্ম অগ্নি বিদ্যমান আছে, সেখানে প্রাণ, অপান এবং ব্যানের ত্রিক সূক্ষ্ম বাধক পদার্থকে নষ্ট করার জন্য তেজস্বী হয়ে ওঠে, এই ত্রিক পদার্থকে সংকুচিত আর ঘনীভূতও করে। (সম্সৃষ্টম্, সমাকৃতম্, উভয়ম্, ধনম্) দুই প্রকারের অর্থাৎ ভালোভাবে মিশ্রিত সূক্ষ্ম পদার্থ এবং ভালো করে আকার প্রাপ্ত করা পদার্থ অর্থাৎ মূর্ত আর অমূর্ত উভয় প্রকারের পদার্থের দ্বারা (অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) এই ছন্দ রশ্মির কারণরূপ ঋষি রশ্মিগুলোকে ধারণ করে রাখে।

(পরাজিতাসঃ) যেসব বাধক ও অনিষ্ট পদার্থকে এই ত্রিক রূপ রশ্মি সমূহ পরাজিত করে রেখেছে, সেগুলোর (হৃদয়েষু) [হৃদয়ম্ = আত্মা বৈ মনো হৃদয়ম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৩.৮), হৃদয়ম্ বৈ স্তোমভাগাঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৬.২.১৫)] ভিতরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু এবং অন্য রশ্মির মধ্যে (ভিয়ঃ, দধানাঃ) অনেক প্রকারের তীব্র কম্পনকে উৎপন্ন করে দেয়, যারফলে (শত্রবঃ, অপ, নি, লয়ন্তাম্) সেই বাধক বা হিংসক পদার্থ খণ্ড-খণ্ড হয়ে সুদূর আকাশের মধ্যে লীন হয়ে যায় অর্থাৎ সূক্ষ্ম ভাগে পরিণত হয়ে অশক্তরূপে আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
.
ভাবার্থ - এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই তীব্র উষ্মা বিদ্যমান আছে, সেখানে সমস্ত বাধক আর অনিষ্ট পদার্থ ছিন্ন-ভিন্ন বা নষ্ট হয়ে যায়। সেইসব ছিন্ন-ভিন্ন পদার্থ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। সূক্ষ্ম পদার্থের পরস্পর সংযোজনও উচ্চ তাপযুক্ত অবস্থার মধ্যেই হয়।
.
আধিভৌতিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) বিদ্বান সজ্জনদের দ্বারা বরণীয়, দুষ্ট জনদের বাঁধনকারী এবং অপরাধীদের উপরে ক্রোধ করে এমন শ্রেষ্ঠ রাজা (সম্সৃষ্টম্) রাষ্ট্রের মধ্যে উৎপন্ন অন্নাদি ভোজ্য পদার্থ এবং খনিজ আদি বিভিন্ন প্রকারের পদার্থ (সমাকৃতম্) প্রজার থেকে সংগৃহীত করা কর (উভয়ম্, ধনম্) এই দুই প্রকারের ধনকে (অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) আমাদের প্রজাজনকে সমুচিত রূপে প্রদান করবেন। (পরাজিতাসঃ, শত্রবঃ) তিনি পরাজিত হওয়া দুষ্ট শত্রুর (হৃদয়েষু, ভিয়ঃ, দধানাঃ) হৃদয়ে ভয় উৎপন্ন করেন, যারফলে (অপ, নি, লয়ন্তাম্) সেই শত্রুরা দূরে পালিয়ে যায়, পুনরায় কখনও ফিরে আসে না অথবা তারা শত্রুতার ব্যবহারকেই সর্বথা ত্যাগ করে দেয়।
.
ভাবার্থ - যেকোনো রাষ্ট্রের রাজা বিদ্বান সদাচারিদের দ্বারাই চয়ন করা উচিত। এমন রাজার কর্তব্য হল তিনি রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ সম্পত্তির বাস্তবিক স্বামিনী প্রজাকেই ভাববেন আর সেটা প্রজার কল্যাণের জন্যই ব্যয় করবেন। সেই রাজা অপরাধী এবং রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী তত্ত্ব এবং বিদেশী শত্রুকে যথাপরাধ কঠিন দণ্ড দিবেন, যাতে তারা রাষ্ট্রের কোনো হানি না ঘটাতে পারে।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) সবার বরণীয় সর্বোৎকৃষ্ট মন্যুরূপ পরমেশ্বর (সম্সৃষ্টম্) আমাদের ক্রিয়মাণ কর্ম (সমাকৃতম্) এবং সঞ্চিত কর্ম (উভয়ম্, ধনম্, অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) উভয়ের অনুসারে আমাদেরকে সাংসারিক পদার্থ আর বুদ্ধি আদি ইন্দ্রিয় প্রদান করেন। (হৃদয়েষু, ভিয়ঃ, দধানাঃ) সেই পরমেশ্বর বিভিন্ন প্রকারের পাপ কর্মের প্রতি পবিত্র হৃদয় যুক্ত মানুষের হৃদয়ে ভয়, লজ্জা, শঙ্কা আদি উৎপন্ন করেন, (পরাজিতাসঃ, শত্রবঃ) যারদ্বারা বিভিন্ন প্রকারের পাপরূপ শত্রু পরাজিত হয়ে (অপ, নি, লয়ন্তাম্) দূরে চলে যায়।
.
ভাবার্থ - এই সৃষ্টির মধ্যে পরমেশ্বরের থেকে অধিক কোনো শ্রেষ্ঠ আর উপাস্য সত্তা নেই। সেই ঈশ্বর তাঁর ন্যায়ানুসারে আমাদের এই জন্ম তথা পূর্ব জন্মে করা কর্মের অনুসারে ফল প্রদান করেন। যে সকল মানুষের অন্তঃকরণ পবিত্র আর শান্ত হয়, তাদের হৃদয়ে পরমাত্মা যেকোনো অনুচিত কর্ম করতে ইচ্ছা করার সময় ভয়, লজ্জা আর শঙ্কা উৎপন্ন করেন, যারফলে তারা পাপ কর্ম করার থেকে বেঁচে যায়। যদিও এই ভয়, লজ্জা আর শঙ্কা সকল মানুষের হৃদয়ে উৎপন্ন হয়, কিন্তু অবিদ্যাদি দোষে গ্রস্থ দুরাত্মা এবং অশান্তাত্মা সেটা অনুভব করতে পারে না। এই কারণে আমি এখানে পবিত্র অন্তঃকরণকারীর মধ্যে ভয়, লজ্জা, শঙ্কা আদি হওয়া বলেছি। এই কারণে প্রত্যেক মানুষের উচিত যে তারা বিদ্যার অভ্যাসের পাশাপাশি উপাসনার দ্বারা নিজ অন্তঃকরণকে পবিত্র আর শান্ত রাখার চেষ্টা নিরন্তর করতে থাকবেন, যাতে পরমেশ্বরের প্রেরণার দ্বারা তাদের কর্তব্যাকর্তব্যের সঠিক বোধ হতে থাকে।
.
বলুন সুলেমান রিজভী! আপনি এই মন্ত্রের মধ্যে কোথায় হিংসা দেখেছেন? আপনি তো অনুবাদকের অভিপ্রায়কেও বুঝতে পান না আর কাকবৎ চেষ্টা করে স্বচ্ছ-পরিষ্কার ত্বকের মধ্যেও ঘা করার চেষ্টা করেন। আপনি যে নিরুক্তের ভাষ্যটা দিয়েছেন, সেটাও কেবল অনুবাদই আছে। এটা কোন অংশের অনুবাদ, এটাও কি আপনার জ্ঞাত আছে? বলতে পারবেন না। চলুন কোনো ব্যাপার না, আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি যে আপনি নিম্নলিখিত অংশের অনুবাদের ভাগ উদ্ধৃত করেছেন। নিরুক্তের সেই অংশটা হল এইরকম -
.
"সেনেব সৃষ্টা। ভয়ম্ বা বলম্ বা দধাতি। অস্তুরিব দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা ভয়প্রতীকা। বলপ্রতীকা য়শঃ প্রতীকাঃ। মহাপ্রতীকা দীপ্তপ্রতীকা বা।"
.
মহর্ষি য়াস্কের এই কথন হল "সেনেব সৃষ্টাম্ দধাত্যস্তুর্ন দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা" (ঋগ্বেদ ১.৬৬.৪) মন্ত্রের ভাষ্য। এর ব্যাখ্যা আপনার মতো ব্যক্তির মাথায় আসবে না।
এই সম্পূর্ণ মন্ত্রটা হল এইরকম -
সেনেব সৃষ্টামম্ দধাত্যস্তুর্ন দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা।
য়মো হ জাতো য়মো জনিত্বম্ জারঃ কনীনাম্ পতির্জনীনাম্।। (ঋগ্বেদ ১.৬৬.৪)
.
এই মন্ত্রের উপরে আমার আধিদৈবিক ব্যাখ্যা (নিরুক্তের অনুসারে) হল এইরকম -
.
এই ঋচার ঋষি হল পরাশর। এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হিংসক পদার্থের নাশক বজ্র রশ্মি থেকে হয়েছে। এর দেবতা অগ্নি তথা ছন্দ বিরাট্ পঙক্তি হওয়াতে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে বিভিন্ন রূপ যুক্ত নীলবর্ণের উৎপত্তি ও সমৃদ্ধি হয়।
.
আধিদৈবিক ভাষ্য -
(সেনা, ইব, সৃষ্টা, অমম্, দধাতি, অস্তুঃ, ন, দিদ্যুত্, ত্বেষ, প্রতীকা) "সেনেব সৃষ্টা ভয়ম্ বা বলম্ বা দধাতি অস্তুরিব দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা ভয় প্রতীকা বলপ্রতীকা য়শঃপ্রতীকাঃ মহাপ্রতীকা দীপ্তপ্রতীকা বা" সেই য়মরূপ বিদ্যুৎ অগ্নি প্রেরিত করা সেনার সমান বিভিন্ন বাধক পদার্থকে আতঙ্কিত অর্থাৎ কম্পিত করে। এর অর্থ হল যেভাবে যুদ্ধের জন্য প্রেরিত সেনা শত্রুকে আতঙ্কিত করে, সেইরূপ তীব্র অগ্নি সেই বাধক বা হিংসক পদার্থকে কম্পায়মান করে দেয়। একইসঙ্গে যেভাবে কোনো রাজার সুদৃঢ় সেনা সেই রাজা বা রাষ্ট্রকে বল প্রদান করে, সেইরূপ অগ্নিতত্ত্ব বিভিন্ন সংযোগযোগ্য কণাকে উপযুক্ত বল প্রদান করে। এখানে উপমাবাচী "ইব" পদকে নিরর্থক ধরে নিলে অর্থ এইরকম হবে -
.
অগ্নির তীক্ষ্ম কিরণের সেনা অর্থাৎ সমান গতি আর বল দ্বারা গমনকারী তীক্ষ্ম কিরণ উৎপন্ন হওয়া মাত্রই বাধক এবং হিংসক পদার্থের মধ্যে তীব্র কম্পন করাতে থাকে। সেইসব তীব্র কিরণ সংযোগযোগ্য কণাকে য়জন কর্ম করার জন্য উপযুক্ত বলও প্রদান করে। সেইসব কিরণ প্রক্ষেপক বল [বিদ্যুৎ = বিচ্ছেদিকা (মহর্ষি দয়ানন্দ ভাষ্য)] যুক্ত পদার্থের সমান বিভিন্ন কণাকে বিখণ্ডনকারী হয়। সেগুলো দীপ্তি দেখাতে, কম্পন করাতে, বলকে উৎপন্ন করতে, তেজকে উৎপন্ন করতে, ব্যাপক রূপে দৃশ্যমান আর সবকিছুকে প্রকাশিত করে। এইসব গুণ তীব্র ঊর্জা যুক্ত তরঙ্গের বলা হয়েছে।
.
(য়মঃ, হ, জাতঃ, য়মঃ, জনিত্বম্, জারঃ, কনীনাম্, পতিঃ, জনীনাম্) "য়ম ইব জাতঃ য়মো জনিষ্যমাণঃ জারঃ কনীনাম্ জরয়িতা কন্যানাম্ পতির্জনীনাম্ পালয়িতা জায়ানাম্ তৎপ্রধানা হি য়জ্ঞসম্য়োগেন ভবন্তি" সবার নিয়ন্ত্রক সেই অগ্নি নিশ্চিত রূপে বায়ুতত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়। এর উৎপত্তি পূর্ব খণ্ডের মধ্যে বর্ণিত ইন্দ্র রূপ য়মের সমানই হয় অথবা য়মরূপ বায়ু থেকেই এর উৎপত্তি হয়। সৃষ্টির সব কণা আদি পদার্থ য়মরূপ অগ্নি থেকেই উৎপন্ন হয় আর নিরন্তর এইভাবে উৎপন্ন হতে থাকবে। এই অগ্নিতত্ত্ব কন্যা অর্থাৎ আকর্ষণ আর দীপ্তিযুক্ত তরঙ্গ, যার বিষয়ে নিরুক্ত খণ্ড ৪.১৫ পঠনীয়, তাকে জীর্ণ করে। এখানে আকর্ষণ এবং দীপ্তিযুক্ত কিরণের তাৎপর্য হল সেই সূক্ষ্ম কণা, যেগুলো কণার সঙ্গে তরঙ্গ রূপ ব্যবহারও করে। এইরকম কণাকে বর্তমান ভৌতিকীতে মূল কণা বলা হয়। অগ্নি কিভাবে এগুলোকে জীর্ণ করে, এই প্রশ্ন গম্ভীর্তাপূর্ণ বিচারণীয়।
.
এখানে জীর্ণের অর্থ পুরোনো মানা উচিত নয়, বরং এর অর্থ দীপ্তিযুক্ত মানা উচিত। এই পদ "জৄ বয়োহানৌ" ধাতু দ্বারা ব্যুৎপন্ন হয়েছে। মন্ত্রের মধ্যে "জারঃ" পদ আছে, সেটাও এই ধাতু দিয়ে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই পদের অর্থ করতে "জীর্ণঃ" পদ ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রন্থকার এই ধাতুকে স্তুতিকর্মা বলেছেন। (দেখুন - খণ্ড ১০.৮) এই কারণে জারঃ পদের অর্থ প্রকাশক হবে, কোনো পদার্থের আয়ুকে হ্রাসকারী হবে না। এটা সর্ববিদিত যে অগ্নিই সব পদার্থের প্রকাশক হয়, এইজন্য একে এখানে কমনীয় তরঙ্গের প্রকাশক বলা হয়েছে। এই সৃষ্টির মধ্যে যেসব পদার্থ প্রকাশযুক্ত হয়, অগ্নিই হল তার কারণ। একে জনী অর্থাৎ উৎপন্ন পদার্থের পতিও বলা হয়েছে। এর কারণ হল পৃথিবী এবং আপঃ আদি পদার্থের পালক এবং রক্ষকই হল অগ্নি।
.
একথা সাধারণ যে বিনা অগ্নি অর্থাৎ ঊর্জা ছাড়া বর্তমান ভৌতিকীর মধ্যে তথাকথিত যেকোনো দ্রব্য পদার্থের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। ঊর্জা থেকেই এইসব পদার্থের উৎপত্তি হয় আর এর কারণেই যেকোনো কণা আদি পদার্থের অস্তিত্বের রক্ষাও হয়। এখানে গ্রন্থকার "জনী"-র অর্থ "জায়া" করেছেন। এর অর্থ হল অগ্নি আপঃ এবং পৃথিব্যাদি কণার সাপেক্ষ পুরুষরূপ ব্যবহার করে, এই কারণে সেটা স্ত্রীরূপ আপঃ এবং পৃথিব্যাদি কণার পালক আর সংরক্ষক হয়। এর কারণ হল অগ্নি ছাড়া এই দুই পদার্থের না কেবল অস্তিত্ব অসম্ভব হবে, বরং সেগুলো থেকে যেকোনো প্রকারের পদার্থের উৎপত্তিও অসম্ভব হবে।
.
এখানে "তৎপ্রধানা হি য়জ্ঞসম্য়োগেন ভবন্তি" কথনের তাৎপর্য হল স্ত্রীরূপ কণা আদি পদার্থ য়জন কর্মের দ্বারাই অগ্নি প্রধান হয়। আমার মতে এখানে গ্রন্থকারের অভিপ্রায় হল স্ত্রী সংজ্ঞক পদার্থ যখন য়জনশীল হয়, সেই সময় সেগুলো বিশেষ ঊর্জাযুক্ত হয় অর্থাৎ দুটো কণার সংযোগের সময় অকস্মাৎ সেই কণাগুলোর ঊর্জা বা গতি বিশেষ ভাবে বেড়ে যায়, এখানে একেই স্ত্রীরূপ কণার অগ্নি প্রধান হওয়া বলা হয়েছে।
.
এখানে আমি ঋষি দয়ানন্দের আধিভৌতিক ভাষ্যই উদ্ধৃত করবো, সেটা হল এইরকম -
.
পদার্থ - (সেনেব) য়থা সুশিক্ষিতা বীরপুরুষাণাম্ বিজয়কর্ত্রী সেনাস্তি তথাভূতঃ (সৃষ্টা) য়ুদ্ধায় প্রেরিতা (অমম্) অপরিপক্ববিজ্ঞানম্ জনম্ (দধাতি) ধরতি (অস্তুঃ) শত্রূণাম্ বিজেতুঃ প্রক্ষেপ্তঃ (ন) ইব (দিদ্যুত্) বিচ্ছেদিকা (য়মঃ) নিয়ন্তা (হ) কিল (জাতঃ) প্রকটত্বম্ গতঃ (য়মঃ) সর্বোপরতঃ (জনিত্বম্) জন্মাদিকারণম্ (জারঃ) হন্তা সূর্য়্যঃ (কনীনাম্) কন্যেব বর্ত্তমানানাম্ রাত্রীণাম্ সূর্য়্যাদীনাম্ বা (পতিঃ) পালয়িতা (জনীনাম্) জনানাম্ প্রজানাম্।
.
ভাবার্থঃ - অত্রোপমালঙ্কারঃ। মনুষ্যৈর্বিদ্যয়া সম্যক্ প্রয়ত্নেন য়থা সুশিক্ষিতা সেনা শত্রূন্ বিজিত্য বিজয়ম্ করোতি। য়থা চ ধনুর্বেদবিদঃ শত্রূণামুপরি শস্ত্রাস্ত্রাণি প্রক্ষিপ্যৈতান্বিচ্ছিদ্য প্রলয়ম্ গময়ন্তি তথৈবোত্তমঃ সেনাऽধিপতিঃ সর্বদুঃখানি নাশয়তীতি বোদ্ধব্যম্।
.
পদার্থ - হে মানব! তোমরা যে সেনাপতি (য়মঃ) নিয়ম কর্তা (জাতঃ) প্রকট (য়মঃ) সর্বথা নিয়মকর্তা (জনিত্বম্) জন্মাদি কারণযুক্ত (কনীনাম্) কন্যাবৎ বর্তমান রাত্রির (জারঃ) আয়ুর হননকর্তা সূর্যের সমান (জনীনাম্) উৎপন্ন হওয়া প্রজার (পতিঃ) পালনকর্তা (সৃষ্টা) প্রেরিত (সেনেব) শুভ শিক্ষাপ্রাপ্ত হওয়া বীর পুরুষের বিজয়কারী সেনার সমান (অস্তুঃ) শত্রুর উপর অস্ত্র-শস্ত্র প্রহারকারী (ত্বেষপ্রতীকা) দীপ্তির প্রতীতিকারী (দিদ্যুন্ন) বিদ্যুতের সমান (অমম্) অপরিপক্ব বিজ্ঞানযুক্ত জনকে (দধাতি) ধারণ করে, তার সেবন করো।
.
ভাবার্থ - এই মন্ত্রের মধ্যে উপমালঙ্কার আছে। মানুষের উচিত বিদ্যার মাধ্যমে ভালো ভাবে চেষ্টার দ্বারা যেভাবে উত্তম শিক্ষার দ্বারা সিদ্ধ করা সেনা শত্রুকে জিতে বিজয় করে, যেমন ধনুর্বেদের জ্ঞাতা বিদ্বানগণ শত্রুর উপর অস্ত্র-শস্ত্র প্রহার করে তাদের ছেদন করে তাড়িয়ে দেয়, সেইরূপ উত্তম সেনাপতি সব দুঃখের নাশ করেন, এটা তোমরা জেনে রাখবে।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য - (সৃষ্টা, ত্বেষপ্রতীকা, সেনা, ইব) [ত্বেষপ্রতীকা = ভয়প্রতীকা বলপ্রতীকা য়শঃপ্রতীকা মহাপ্রতীকা দীপ্তপ্রতীকা (নিরুক্ত ১০.২১)] কুশলতা-পূর্বক সুসজ্জিত বল, ভয় আর তেজস্বিতার প্রতীক সেনার সমান (য়মঃ, হ, জাতঃ) জিতেন্দ্রিয়তা আদি গুণ দ্বারা প্রসিদ্ধ বিদ্বান (অমম্, দধাতি) [অমঃ = গৃহম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৫.৫৬.৩), অমম্ ভয়ম্ বলম্ বা (নিরুক্ত ১০.২১), অমা গৃহনাম (নিঘন্টু ৩.৪)] সবার আশ্রয়দাতা এবং সমস্ত বলের দাতা পরমাত্মাকে ধারণ করেন। (অস্তুঃ, ন, দিদ্যুত্) [অস্তুঃ = শত্রুনাম বিজেতুঃ প্রক্ষেপ্তুঃ (ঋষি দয়ানন্দ ভাষ্য)] সেই য়োগনিষ্ঠ বিদ্বান শত্রুর উপর বিজয়প্রাপ্ত করা সেনার সমান নিজের সব দোষকে কেটে ফেলেন। (য়মঃ, জনিত্বম্, জারঃ) সেই নিয়তাত্মা য়োগী নিজের জন্ম-মরণের কারণরূপ অবিবেককে নিজ সাধনার দ্বারা নিরন্তর জীর্ণ করতে থাকেন। (কনীনাম্, জনীনাম্, পতিঃ) [কনীনঃ = কনী দীপ্তিকান্তিগতিষু (ভ্বা.) ধাতোর্বাহু. ঈনপ্রত্যয়ঃ (বৈদিক-কোষ)] সেই য়োগী ব্রহ্মতেজ পান করে মানবমাত্রকে নিজের সদুপদেশের দ্বারা সংরক্ষণ করেন।
.
ভাবার্থ - যেভাবে শত্রুকে নিজ বল আর তেজস্বিতার দ্বারা আতঙ্কিত করে এমন সেনা শত্রুকে দূরে তাড়িয়ে দেয়, সেইরূপ য়োগনিষ্ঠ বিদ্বান নিজের সব দোষ আর পূর্বজন্মের সংস্কারকে দগ্ধবীজ করতে সক্ষম হন। এইরূপ সক্ষম সেই য়োগী পরব্রহ্ম পরমাত্মার জ্ঞান আর আনন্দকে ধারণ করে পরমলোককে প্রাপ্ত করেন। এমন য়োগী পুরুষ নিজ সদুপদেশের দ্বারা নিরন্তর সকল প্রাণীর উপকারেও সংলগ্ন থাকেন। পরোপকার বিনা কোনো ব্যক্তিই য়োগী হতে পারবেন না। যারা সমাজ থেকে দান বা ভিক্ষা আদি প্রাপ্ত করে নিজের জীবনযাপন করেন, তারা সমাজের ঋণী হন আর সেই ঋণকে শোধ না করে যদি কেউ কেবল আত্মকল্যাণ হেতু সর্বদা য়োগসাধনাই করতে থাকেন, তার য়োগ কখনও সিদ্ধ হবে না। এইজন্য মুমুক্ষুজনদের উচিত সমাজের ঋণ থেকে উঋণ হওয়ার জন্য তারা নিরন্তর নিজের সদুপদেশের দ্বারা প্রাণীমাত্রের কল্যাণ করার চেষ্টা করতে থাকবেন।
.
এই প্রকরণের উপর কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি আপত্তির করতে পারবেন?

৫.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 5.20.4-5

"Let this war-drum victorious in the battle, loudly roaring and becoming the means of seizing whatever may be seized, be seen by all. Let this war-drum utter wonderful voice and let the army-controlling man capture the possessions of the enemies. Amid the conflict of the deadly weapons let the woman of enemy waked by the roar and afflicted run forward in her terror hearing the resounding and far reaching voice of the war-drum, holding her son in her hand."
- Tr. Vaidyanath Shastri.

দুন্দুভের্বাচম্ প্রয়তাম্ বদন্তীমাশৃণ্বতী নাথিতা ঘোষবুদ্ধা। নারী পুত্রম্ ধাবতু হস্তগৃহ্যামিত্রী ভীতা সমরে বধানাম্।।৫।।
.
দুন্দুভি বাদ্যের স্পষ্ট বেরিয়ে আসা ধ্বনিকে শুনে তার গর্জনে জেগে ওঠা রিপু-স্ত্রীগণ সংগ্রামে বীর (পতি) -দের মরে যাওয়ার কারণে আতঙ্কিত হয়ে নিজ পুত্রের হাত ধরে পালিয়ে যাবে।
.
এখানেও পূর্ববৎ আক্ষেপ করা হয়েছে।
.
উত্তর - এখানে যে মন্ত্রটা উদ্ধৃত করা হয়েছে, তার ঋষি হল ব্রহ্মা। [ব্রহ্মা = প্রাণদেবত্যো বৈ ব্রহ্মা (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ২.৯)] এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি বিভিন্ন প্রাণ রশ্মির দ্বারা হয়। বিভিন্ন বলকে উৎপন্ন করতে যখন প্রাণ রশ্মির ভূমিকা হয়, সেই সময়ই এই ছন্দ রশ্মি প্রকট হয়, বিশেষ করে অত্যন্ত তীব্র ভেদক বল উৎপন্ন হওয়ার সময়। এর দেবতা হল দুন্দুভি, যার চর্চা আমি পূর্বে করেছি। এর ছন্দ হল ত্রিষ্টুপ্। এই কারণে এর দৈবত প্রভাব আক্ষেপ সংখ্যা ৩ এরমধ্যে নির্দিষ্ট মন্ত্রের দৈবত প্রভাবের সমান হয়। এর ছান্দস প্রভাবে তীব্র বল উৎপন্ন হয় আর রক্তবর্ণীয় তেজও উৎপন্ন হতে থাকে। এর ভাষ্য এইরকম হবে -

আধিদৈবিক ভাষ্য - (দুন্দুভেঃ) দুন্দুভি সংজ্ঞক পূর্বোক্ত সংযোজক ঊর্জা (প্রয়তাম্, বদন্তীম্) প্রকৃষ্ট রূপে পদার্থকে নিয়ন্ত্রণকারী তীব্র গতিযুক্ত (বাচম্) বাক্ রশ্মিগুলোকে (সমরে, বধানাম্) হিংসক পদার্থের সংগ্রাম বা সংঘর্ষের সময় (আমিত্রী, নারী) [নারী = য়জ্ঞনাম (নিঘন্টু ৩.১৭), পুমাম্সো বৈ নরঃ স্ত্রিয়ো নার্য়ঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.৩৪)] বাধক অসংযোগযোগ্য পদার্থ দিয়ে ঘেরা য়োষা রূপ কণা বা রশ্মি আদি পদার্থ (ঘোষবুদ্ধা) তীব্র বাক্ রশ্মির দ্বারা সক্রিয় হওয়া (নাথিতা) [নাথিতা পদ 'নাথৃ য়াচ্ঞোপতাপৈশ্বর্য়াऽऽশীঃষু' ধাতু দ্বারা ব্যুৎপন্ন হয়।] বৃষারূপ রশ্মি বা কণা আদি পদার্থের দ্বারা আকৃষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত থেকে (ভীতা) কম্পন করে (আশৃণ্বতি) নিজের চারিদিকে গমন করা বাক্ রশ্মির কারণে চাঞ্চল্যতা তৈরি করে (পুত্রম্, হস্তগৃহ্য) [পুত্রম্ = পুত্রো বৈ বীরঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৩.১.১২) প্রাণা বৈ দশ বীরাঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৮.১.২২)] প্রাণাপানাদি প্রাণ রশ্মির হরণশীল বলকে প্রাপ্ত করে (ধাবতু) শুদ্ধ হয়ে অর্থাৎ বাধক ও অসংযোগযোগ্য পদার্থ থেকে মুক্ত হয়ে বৃষা রূপ পদার্থের দিকে গমন করতে থাকে।
.
ভাবার্থ - এই সৃষ্টির মধ্যে সর্বদা প্রকাশিত আর অপ্রকাশিত এমন তীক্ষ্ম রশ্মি উৎপন্ন হয়, যা তীব্র ধ্বনি উৎপন্ন করতে-করতে বাধক পদার্থের উপর প্রহার করে আর অপ্রকাশিত পদার্থের মাঝে ফেঁসে থাকা প্রকাশিত পদার্থকে মুক্ত করে দেয়। ধ্যাতব্য হল, প্রকাশিত পদার্থ দুই প্রকারের হয়, যার মধ্যে প্রথম প্রকারের পদার্থ পুরুষের সমান ব্যবহার করে। বাধক ও অসংযোগযোগ্য পদার্থ থেকে মুক্ত হওয়া এই পদার্থ পরস্পর সংযোগ করে বিভিন্ন প্রকারের পদার্থের রচনা করে।
.
আধিভৌতিক ভাষ্য - এখানে আপনিও কারও ভাষ্য হিন্দিতে দিয়েছেন, যেটা ভাবার্থ রূপেই আছে। এর ভাষ্য আর্য বিদ্বান পণ্ডিত ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদী এইরকম করেছেন -

দুন্দুভের্বাচম্ প্রয়তাম্ বদন্তীমাশৃণ্বতী নাথিতা ঘোষবুদ্ধা। নারী পুত্রম্ ধাবতু হস্তগৃহ্যামিত্রী ভীতা সমরে বধানাম্।। (অথর্ববেদ ৫.২০.৫)
.
ভাবার্থ - (দুন্দুভেঃ) দুন্দুভির (প্রয়তাম্) নিয়মযুক্ত, (বদন্তীম্) প্রতিধ্বনিত হয়ে (বাচম্) ধ্বনিকে (আশৃণ্বতী) শ্রবণ করে, (ঘোষবুদ্ধা) গর্জনে জেগে ওঠা, (নাথিতা) অধীন হওয়া, (বধানাম্) মারূশাস্ত্রের (সমরে) সমরের মধ্যে (ভীতা) আতঙ্কিত (আমিত্রী) প্রতিপক্ষের (নারী) নারী (পুত্রম্) পুত্রকে (হস্তগৃহ্য) হাতে ধরে (ধাবতু) পালিয়ে যাবে।
.
ভাবার্থ - যোদ্ধাগণ নিয়মপূর্বক দুন্দুভি বাজাবে, যাতে শত্রুরা পরাজিত হয় আর তাদের স্ত্রী আদিও ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়।
.
এই ভাষ্যের উপরে আপনার কি আপত্তি আছে? আপনার কুরআনের মধ্যে তো শত্রুর মহিলা আর বাচ্চাদের লুট করার বিধান আছে আর এই বর্বরতাপূর্ণ কামুকতার তাণ্ডব সারা সংসার দেখেছে আর এই কারণেই ভারতবর্ষের হাজার-হাজার ক্ষত্রাণি জীবিত অবস্থায় চিতার মধ্যে জ্বলতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা তো আপনার ভালো লাগবে? এখানে বেদ তো কেবল দুষ্ট অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছে আর যুদ্ধও অন্তিম বিকল্প হয়। সেই যুদ্ধেরও নিশ্চিত নিয়ম আর মর্যাদা আছে। এমন মর্যাদার কারণেই এখানে স্ত্রী আর বাচ্চাদের যুদ্ধস্থল থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে, যাতে তারা সুরক্ষিত থাকতে পারে, তাদের লুট করতে বা মেরে ফেলার জন্য তো বলা হয়নি। তবে হ্যাঁ, স্ত্রীও যদি হিংসক হয়ে যুদ্ধ করে বা অত্যাচার করে, তাহলে তাকেও দণ্ডিত করার বিধান আছে।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য - (দুন্দুভেঃ) [দুন্দুভিঃ = পরমা বা এষা বাগ্ য়া দুন্দুভৌ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৩.৬.২.৩), দুন্দুভ্যতের্বা স্যাচ্ছব্দকর্মণঃ (নিরুক্ত ৯.১২)] সৃষ্টির প্রারম্ভে বেদের উপদেষ্টা, যাঁর মধ্যে পরম বাক্ অর্থাৎ বেদ বাক্ সর্বদা বিদ্যমান থাকে, সেই পরমাত্মা থেকে (প্রয়তাম্) সঠিকভাবে ব্যবস্থিত হওয়া (বদন্তীম্) বিভিন্ন প্রকারের ছন্দের রূপে উচ্চারিত ও প্রকাশিত হওয়া (বাচম্) বেদবাণীকে (আশৃণ্বতী) ব্রহ্মের মধ্যে স্থিত য়োগীর আত্মা চারিদিক থেকে অনুভব করে (ঘোষবুদ্ধা) সেই বেদবাণীর ঘোষ দ্বারা জেগে ওঠে অর্থাৎ যেভাবে রাত্রির অন্ধকারে শুয়ে থাকা মানুষ উষাকাল হওয়া মাত্র জেগে ওঠে, সেইভাবে বেদবাণীর ঘোষে অজ্ঞানরূপী অন্ধকার সর্বথা সমাপ্ত হয়ে জ্ঞানের প্রকাশ হয়ে যায়। একেই আত্মার জাগরণ বলা হয়েছে। (নাথিতা) সেই আত্মা পরব্রহ্ম পরমাত্মার সানিধ্যে অলৌকিক ঐশ্বর্যকে প্রাপ্ত করে।
.
(বধানাম্, সমরে) [বধ = বলনাম (নিঘন্টু ২.৯), বজ্রনাম (নিঘন্টু ২.২০)। সমরঃ = সম্+ঋ গতিপ্রাপণয়োঃ ধাতোঃ 'ঋদোরপ্' ইত্যপ্ অথবা শম অব্যৈক্লব্যে ধাতোর্বাহুলকাত্ ঔণাদিক অরঃ প্রত্যয়ঃ (বৈদিক কোষ)] পরমাত্মার সাক্ষাৎকারে মহান আত্মবল প্রাপ্ত করলে পরে সেই প্রশান্তাত্মা (ভীতা, আমিত্রী, নারী) থেকে ভয়ভীত হয়ে [নারী= নারাণামিয়ম্ ক্রিয়া (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ৫.২২)] তার অন্তঃকরণের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব অনিষ্ট ক্রিয়াগুলো অর্থাৎ কর্ম, যা ঈশ্বর থেকে বিমুখকারী হয়, (পুত্রম্, হস্তগৃহ্য, ধাবতু) সেগুলো নিজ সন্তানরূপ ফলকে সঙ্গে নিয়ে দূরে পালিয়ে যায়।
.
ভাবার্থ - যখন কোনো য়োগী য়োগসাধনা করেন, তখন তিনি অন্তরীক্ষস্থ বেদের ঋচা পরা ও পশ্যন্তী রূপে উপলব্ধ করেন। বেদের সেই ঋচার উৎপত্তিকর্তাও সেই পরমেশ্বর হন, যিনি এই সৃষ্টির উৎপত্তি করেছেন। সেই বেদবাণীকে শুনে আর তার অর্থের বোধ করে য়োগী পুরুষ পরমাত্মার প্রতি পূর্ণ সমর্পণযুক্ত হয়ে তাঁর মধ্যেই মগ্ন হয়ে যান। সেই সময় য়োগীর চিত্তে পূর্ব জন্মের কিছু অবাঞ্ছিত সংস্কার আর বাসনার সঙ্গে তার সংঘর্ষ হতে থাকে। এই সংঘর্ষের মধ্যে যে সকল অনিষ্ট কর্মের সংস্কার এবং বিচার বিদ্যমান থাকে, সেইসব নিজের সম্ভাবিত ফলের সঙ্গে দূরে চলে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। এইভাবে ধীরে-ধীরে সেই য়োগীর সমস্ত পূর্ব সংস্কার দগ্ধবীজ হয়ে যায় আর সেই য়োগী মুক্তির পথে চলে যান।
.
সূচনা - এপর্যন্ত আমি সব মন্ত্রের তিন প্রকারের ভাষ্য প্রস্তুত করেছি, কিন্তু এই আক্ষেপকর্তার বৌদ্ধিক দুর্বলতা এবং পূর্বাগ্রহগ্রস্থতা দেখার পশ্চাৎ এখন আমি উপলব্ধ ঋষি দয়ানন্দ বা আর্য বিদ্বানদের ভাষ্য দিয়েই সমাধান প্রস্তুত করার চেষ্টা করবো। কোথাও আবশ্যকতা হলে তবেই নিজের ভাষ্য করবো, সেটাও কেবল আধিভৌতিক ভাষ্য, কারণ আক্ষেপও আধিভৌতিক ভাষ্যের সঙ্গে সম্বন্ধিত। এখন আক্ষেপের উত্তর মাত্র দেওয়া আমার কর্তব্য হবে, বেদের গম্ভীর বিজ্ঞানকে উদ্ঘাটিত করা নয়।
.
এর কারণ হল দুর্বল বুদ্ধিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এতটা পরিশ্রম করা আমার উচিত বলে মনে হয় না। যারা তীব্র বুদ্ধি ও জিজ্ঞাসু প্রবৃত্তির পাঠক হবেন, তারা আমার এই পাঁচটা আক্ষেপের উত্তর এবং ভূমিকা থেকেই বেদের শ্রেষ্ঠতাকে বুঝে নিবেন। অধিক জ্ঞানের পিপাসু আমার অন্য গ্রন্থ, যার চর্চা আমি পূর্বেই করেছি, সেগুলো পড়তে পারবেন, সেগুলো না পড়ে বেদের বিজ্ঞানকে বোঝা একদমই সম্ভব নয়।

৬.
আক্ষেপ -
Rig Veda 1.103.6

"...The Hero, watching like a thief in ambush, goes parting the possessions of the Godless." - Tr. Ralph T.H. Griffith
.
উত্তর - এখানে এই মহাশয় ঈশ্বরকে চোর বলছেন আর তার জন্য গ্রিফিথ দ্বারা করা ইংরাজী অনুবাদ প্রস্তুত করেছেন, যেন গ্রিফিথ কোনো বেদের অনেক বড় বিদ্বান হন। যেসব বিদেশী ভাষ্যকারের উদ্দেশ্যই ছিল বেদকে বদনাম করা, তাকে প্রমাণ রূপে প্রস্তুত করা দুর্ভাবনারই পরিচায়ক হবে। আপনি আপনাদের চতুর্থ আর সপ্তম আকাশে বসবাস রত ঈশ্বরের লীলা তো দেখতে পান না, এইদিকে অভিযোগ করতে চলে এসেছেন।
.
স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর অনুবাদের ক্ষেত্রে বলতে গেলে, তিনি তো ঈশ্বরকে নাস্তিক আর জনতার শোষক অর্থাৎ চোর, ডাকু আর জ্ঞানের শত্রুর কাছ থেকে ধন ছিনিয়ে নিয়ে সৎ ব্যক্তিদের দেওয়ার কথা বলেছেন, তাঁকে আপনি কিভাবে চোর বলতে পারেন? মুসলিম আর ঈশাই আক্রান্তা ভারতবর্ষের ধন লুট করে নিয়ে গেছে, আপনার দৃষ্টিতে সেটা কি ভালো ছিল? আর দুষ্টের কাছ থেকে ধন নিয়ে সজ্জনকে দেওয়া কিভাবে চুরি হয়ে গেল? এই সংস্কার আপনার হতে পারে, আমার নয়।
.
এখন আমি এখানে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য প্রস্তুত করবো -

ভূরিকর্মণে বৃষভায় বৃষ্ণে সত্যশুষ্মায় সুনবাম
সোমম্। য় আদৃত্যা পরিপন্থীব শূরোऽয়জ্বনো বিভজন্নেতি বেদঃ।। (ঋগ্বেদ ১.১০৩.৬)

পদার্থ - (ভূরিকর্মণে) বহুকর্মকারিণে (বৃষভায়) শ্রেষ্ঠায় (বৃষ্ণে) সুখপ্রাপকায় (সত্যশুষ্মায়) নিত্যবলায় (সুনবাম) নিষ্পাদয়েম (সোমম্) ঐশ্বর্য়্যসমূহম্ (য়ঃ) (আদৃত্য) আদরম্ কৃত্বা (পরিপন্থীব) য়থা দস্যুস্তথা চৌরাণাম্ প্রাণপদার্থহর্ত্তা (শূরঃ) নির্ভয়ঃ (অয়জ্বনঃ) য়জ্ঞবিরোধিনঃ (বিভজন্) বিভাগম্ কুর্বন্ (এতি) প্রাপ্নোতি (বেদঃ) ধনম্।
.
ভাবার্থ - অত্রোপমালঙ্কারঃ। মনুষ্যৈর্য়ো দস্যুবৎ প্রগল্ভঃ সাহসী সন্ চৌরাণাম্ সর্বস্বম্ হৃত্বা সৎকর্মণামাদরম্ বিধায় পুরুষার্থী বলবানুত্তমো বর্ত্ততে, স এব সেনাপতিঃ কার্য়্যঃ।
.
পদার্থ - আমরা (য়ঃ) যিনি (শূরঃ) নির্ভীক পরাক্রমশালী পুরুষ (আদৃত্য) আদর সৎকার করে (পরিপন্থীব) যেমন সব প্রকারে মার্গে চলা ডাকু অন্যের ধন আদি সর্বস্ব হরণ করে নেয়, সেই রকম চোরের প্রাণ আর তাদের পদার্থকে ছিনিয়ে নিবেন সেই (বিভজন্) বিভাগ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ আর দুষ্ট পুরুষদের পৃথক-পৃথক করে তাদের মধ্যে (অয়জ্বনঃ) যারা যজ্ঞ করে না তাদের (বেদঃ) ধনকে (এতি) ছিনিয়ে নেন, সেই (ভূরিকর্মণে) ভারী কর্মকারী (বৃষভায়) শ্রেষ্ঠ (বৃষ্ণে) সুখদায়ক (সত্যশুষ্মায়) নিত্য বলী সেনাপতির জন্য যেমন (সোমম্) ঐশ্বর্য়্য সমূহকে (সুনবাম) উৎপন্ন করে, সেইরকম তুমিও করবে।
.
ভাবার্থ - এই মন্ত্রের মধ্যে উপমালঙ্কার আছে। মানুষের উচিত যে যিনি ডাকু আদির মতো এমন ধৃষ্ট হবেন আর সাহস করে চোরের ধন আদি পদার্থকে হরণ করে সজ্জনদের আদর করে পুরুষার্থী বলবান উত্তম হতে উত্তম হবেন, তাকেই সেনাপতি করবে।
.
আমি এখানে বলতে চাইবো যে সর্বপ্রথমে তো আপনি যজ্ঞ শব্দের অর্থ বুঝে নিবেন, যাকে আমি পূর্বে বুঝিয়েছি। এখানে বলা হয়েছে যে যেমন কোনো চোর বলপূর্বক কোনো পথিকের ধন হরণ করে নেয়, সেইরকম বীর পুরুষের উচিত যে তিনি চোর-ডাকাতের ধনকে বলপূর্বক ছিনিয়ে নিবেন আর যেসব পরোপকারী সজ্জন ব্যক্তি আছেন, তাদের আদর করবেন আর এমন বীর পুরুষই সেনাপতি হবেন। বর্তমানেও তো ন্যায়প্রিয় শাসক চোরের দ্বারা চুরি করা ধনের হরণ করে যার ধন চুরি হয়েছে, তাকে দিয়ে দেয় অথবা সেই ধন রাজকোষের মধ্যে ব্যবহৃত হয় আর এমন অবশ্যই হওয়া উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত চোরের ধন ছিনিয়ে নেওয়া হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ বন্ধ হবে না।
.
এখানে যজ্ঞকর্ম না করা ব্যক্তি এবং যজ্ঞ বিরোধীর থেকে ধন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটাও ঠিকই আছে, কারণ যারা পরোপকার করে না অথবা রাজ্যকে কর দেয় না, সেটা চুরি করাই হয়, তাহলে তার ধন যদি রাজা বা সেনাপতি ছিনিয়ে নেয়, তো সেটা উচিতই হবে, যারফলে সেই ধন রাষ্ট্রহিতে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে হ্যাঁ, কোনো চোর ব্যক্তি অবশ্যই বেদের এই আদেশের বিরোধ করবে। এখন আপনাকে ভাবতে হবে যে আপনার কি করা উচিত?
(ক্রমশঃ)


PDF তালিকা (ই-বুক)
১. বেদ মন্ত্রের উপদেশ
২. বৈদিক-সন্ধ্যা (সংশোধিত, 2025)
৩. ব্রহ্মচর্যের সাধনা
৪. সর্বশ্রেষ্ঠ কে
৫. জাতিবাদ আর ভগবান্ মনু
৬. আমাদের পূর্বপুরুষ কি বানর
৭. উপদেশামৃত
৮. বৈদিক ভৌতিকী
৯. মাংসাহার
১০. য়োগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের দিনচর্যা
১১. শাস্ত্রার্থ সংগ্রহ – ১
১২. শাস্ত্রার্থ সংগ্রহ – ২
১৩. শাস্ত্রার্থ সংগ্রহ – ৩
১৪. সৃষ্টি সঞ্চালক
১৫. ভগবান্ শিবের দৃষ্টিতে ধর্ম

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

অথর্ববেদ ৪/৩১/৭

সম্সৃষ্টম্ ধন॑মু॒ভয়ং॑ স॒মাকৃ॑তম॒স্মভ্যং॑ ধত্তাং॒ বরু॑ণশ্চ ম॒ন্যুঃ।  ভিয়ো॒ দধা॑না॒ হৃদ॑য়েষু॒ শত্র॑বঃ॒ পরা॑জিতাসো॒ অপ॒ নি ল॑য়ন্তাম্ ॥  (অথ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ