অভেদ্য বেদ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

09 January, 2026

অভেদ্য বেদ

অভেদ্য বেদ

ভূমিকা

সকল বেদানুরাগী মহানুভব! আপনারা জানেন যে আমি গত শ্রাবণী পর্ব বিক্রম সম্বত্ ২০৮০ তদনুসারে ৩০ জুলাই ২০২৩ সালে সব বেদ বিরোধীদের আহ্বান করেছিলাম যে তারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ সাল পর্যন্ত বেদাদি শাস্ত্রের উপরে যেকোনো আক্ষেপ করতে চাইলে, করতে পারবে। আমি এই ঘোষণার যথোচিত প্রচার করেছি আর অন্যদের দিয়েও করিয়েছি। এর উপর আমি সর্বমোট ১৩৪ পৃষ্ঠার আক্ষেপ প্রাপ্ত করেছি। এই আক্ষেপগুলোকে আমি নিজের একটা পত্রের সঙ্গে দেশের শঙ্করাচার্যের অতিরিক্ত পৌরাণিক জগতের মহা-মণ্ডলেশ্বর শ্রী স্বামী গোবিন্দ গিরি, শ্রী স্বামী রামভদ্রাচার্য, শ্রী স্বামী চিদানন্দ সরস্বতী আদি অনেক বিদ্বানদেরকে পাঠিয়ে ছিলাম।

.
একইসঙ্গে আমি আর্যসমাজের বিভিন্ন শীর্ষ সংস্থান তথা প্রসিদ্ধ সব আর্য বিদ্বানদেরও এই আক্ষেপ পাঠিয়ে এই নিবেদন করেছিলাম যে ঋষি দয়ানন্দের ২০০ তম জন্মোৎসব ফাল্গুন কৃষ্ণ পক্ষ দশমী বিক্রম সম্বত্ ২০৮০ তদনুসারে ৫ মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত যেসব আক্ষেপের উত্তর দেওয়া যেতে পারে, সেগুলো লিখে আমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার কষ্ট করবেন। সেই উত্তরকে আমি আমাদের স্তর থেকে প্রকাশিত আর প্রচারিত করবো। যদিও সব প্রশ্নের উত্তর আমাকেই দেওয়া উচিত, কিন্তু আমি বিচার করেছি যে এই আক্ষেপগুলোর উত্তর দেওয়ার শ্রেয় কেবল আমিই কেন পাবো আর বেদ বিরোধীরাও যেন এমন মনে না করে যে আর্যসমাজের মধ্যে একজনই বিদ্বান আছেন, যিনি উত্তর দেওয়ার জন্য সামনে এসেছেন। এরসঙ্গে আমি এটাও বিচার করেছি যে আমার উত্তর দেওয়ার পশ্চাৎ কোনো বিদ্বান যেন এমন না বলেন যে আমি উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাইনি, যদি আমাকে সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে আমি আরও ভালো উত্তর দিতাম।
.
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার পশ্চাৎ পর্যন্ত কোথাও থেকে কোনো উত্তরই প্রাপ্ত হয়নি। বড়-বড় শঙ্করাচার্য, মহামণ্ডলেশ্বর, মহাপণ্ডিত, গুরুপরম্পরাতে পড়া মহাবৈয়াকরণ, দার্শনিক, রাষ্ট্রীয় আর আন্তর্জাতিক বৈদিক প্রবক্তা, য়োগী এবং বেদ বিজ্ঞান অনুসন্ধানকারী আদির মধ্যে কেউ একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পাননি অথবা বেদের উপরে করা আক্ষেপের প্রতি তাদের কোনো পীড়া হয়নি। যে কারণই হোক না কেন, এটা তো নিশ্চিত হয়ে গেল যে এই আক্ষেপ বা প্রশ্ন সামান্য নয়। আক্ষেপকর্তারা পৌরাণিক তথা আর্যসমাজী দুটোরই ভাষ্যকে আধার বানিয়ে গম্ভীর ও ঘৃণিত আক্ষেপ করেছে। তারা গায়ত্রী পরিবারকেও তাদের লক্ষ্য বানিয়েছে, কিন্তু সবাই মৌন হয়ে বসে আছেন, তবে আমি মৌন হয়ে থাকতে পারবো না। এই কারণে এই আক্ষেপগুলোর উত্তর দেওয়া আমি নিজেরই কর্তব্য বলে মনে করেছি।
.
আমি যা উত্তর দিয়েছি, সেগুলোকে যেকোনো বৈদিক বিদ্বান, যারা আজ মৌন হয়ে বসে আছেন, নৈতিক রূপে ভুল বলার অধিকারী থাকবেন না। তারা আমার উত্তর আর বেদমন্ত্রের ভাষ্যের উপরে খুঁত বের করার অধিকারীও থাকবেন না। আজ ধর্ম আর অধর্মের যুদ্ধ হচ্ছে, এর নীরব দর্শককে প্রকৃত বেদের ভক্ত বলা যাবে না। আমি অন্ততঃ চ্যালেঞ্জ স্বীকার তো করেছি, তাদের মতো মৌন হয়ে তো বসে নেই। বেদের উপরে করা আক্ষেপের উপরে মৌন হয়ে থাকাও সেই আক্ষেপকে মৌন সমর্থন করাই হবে। আমি যদিও অনেক ব্যস্ত থাকি, তবুও আমি উত্তর দেওয়াটা অনিবার্য মনে করেছি। আমি সব উত্তরদায়ী মহানুভাবদের কাছে দিনকরজীর শব্দে এটা অবশ্যই বলতে চাইবো যে -
"जो तटस्थ हैं, समय लिखेगा उनका भी अपराध"
মানুষ হল এই সংসারের সবথেকে বিচারশীল প্রাণী। এইভাবে এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই কোনো বিচারশীল প্রাণী আছে, তাদেরকেও মানুষই বলা হবে। বাস্তবে জ্ঞান হল প্রত্যেক জীবধারীর একটা প্রমুখ লক্ষণ। জ্ঞানের দ্বারাই কারও চেতনার প্রকাশন হয়, সূক্ষ্ম জীবাণু থেকে শুরু করে আমাদের মতো মানুষ পর্যন্ত সব প্রাণী জীবনযাপনের ক্রিয়াকলাপের মধ্যেও নিজের জ্ঞান আর বিচারের ব্যবহার অবশ্যই করে। জীবন-মরণ, খিদা-তৃষ্ণা, গমনাগমন, সন্ততি-জনন, ভয়, নিদ্রা আর জাগরণ আদি সবকিছুর পিছনেও জ্ঞান আর বিচারের সহযোগিতা থাকেই, তাহলে মহর্ষি য়াস্ক "মত্বা কর্মাণি সীব্যতীতি মনুষ্যঃ" বলে মানুষকে সংজ্ঞায়িত কেন করেছেন?
.
এর জন্য ঋষি দয়ানন্দ দ্বারা প্রস্তুত আর্যসমাজের পঞ্চম নিয়ম "সব কর্ম ধর্মানুসারে অর্থাৎ সত্য আর অসত্যকে বিচার করে করা উচিত" এর উপরে বিচার করার আবশ্যকতা আছে। বিচার করা আর সত্য-অসত্যের উপরে বিচার করা এই দুটোর মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে, যা আমাদের পশু-পক্ষী আর কীটপতঙ্গ থেকে পৃথক করে। বিচার তো তারাও করে, কিন্তু তাদের বিচার কেবল জীবনযাপনের ক্রিয়া পর্যন্ত সীমিত থাকে। এইদিকে সত্য আর অসত্যের উপর বিচার জীবনযাপন করার সীমার বাইরেও নিয়ে গিয়ে পরোপকারে প্রবৃত্ত করে মোক্ষ পর্যন্ত যাত্রা করাতে পারে।
.
এটা এক আশ্চর্যজনক তথ্য যে জীবনযাপনের বিচার পর্যন্ত সীমিত থাকা প্রাণী জন্ম থেকেই আবশ্যক স্বাভাবিক জ্ঞান প্রাপ্ত করে থাকে, কিন্তু মানুষের মতো সর্বাধিক বুদ্ধিমান প্রাণী পশু-পক্ষীদের তুলনায় ন্যূনতম জ্ঞান নিয়ে জন্ম নেয়। সে তার পরিবেশ আর সমাজ থেকে শিখে নেয়। এই কারণে কেবল মানুষের জন্যই সমাজ তথা শিক্ষণ-সংস্থানের আবশ্যকতা হয়। এসবের অভাবে মানুষ পশু-পক্ষীদের দেখে তাদের মতোই হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, ওদের মতো উড়ার মতো কাজ করতে পারবে না।
.
সমাজ আর শিক্ষার অভাবে মানুষ মানবীয় ভাষা আর জ্ঞান উভয়ের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত রয়ে যাবে। তাকে যদি পশু-পক্ষীকেও দেখানো না হয়, তাহলে তার আহার-বিহারেও অসুবিধা দেখা দিতে পারে। এর বিপরীত কোটি-কোটি বছর ধরে আমাদের সঙ্গে থাকা গরু-মোষ, ঘোড়া আদি প্রাণী আমাদের একটাও ব্যবহার শিখতে পারে না। তবে হ্যাঁ, তারা তাদের স্বামীর ভাষা আর সংকেতকে কিছু বুঝে নিয়ে তদনুকূল আহার-পানাদি ব্যবহার করে অবশ্য। এই কারণে কিছু পশুকে কিছু মাত্রায় প্রশিক্ষিতও করা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো তাদেরকে শিক্ষিত, সুসংস্কৃত, সভ্য এবং বিদ্বান বানানো সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে আর তাদের মধ্যে এটাই হল পার্থক্য। এখন প্রশ্ন হল, যে মানুষ জন্ম নেওয়ার সময় পশু-পক্ষীর তুলনায় মূর্খ হয়, জীবনযাপনেও সক্ষম হয় না, সে সবথেকে অধিক বিদ্বান, সভ্য ও সুশিক্ষিত কিভাবে হয়ে যায়?
.
যখন মানুষের প্রথম প্রজন্ম এই পৃথিবীতে জন্মেছিল, তখন নিশ্চয়ই তারা তাদের চারিদিকে থাকা পশু-পক্ষী আর কীটপতঙ্গকেই দেখেছিল, তখন যদি সেই প্রজন্ম তাদের থেকে কিছু শিখতো, তাহলে তাদের মতোই ব্যবহার করতো আর তাদের সন্তানও তাদের থেকে সেইরূপ ব্যবহারই শিখতো। আজ পর্যন্ত আমরা পশুদের মতোই থাকতাম, কিন্তু এমনটা হয়নি। আমরা বিজ্ঞানের উচ্চতাকেও স্পর্শ করেছি। বৈদিক কালে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিভিন্ন লোক-লোকান্তরের যাত্রাও করতো। কলা, সঙ্গীত, সাহিত্য আদি ক্ষেত্রের মধ্যেও মানুষের চরমোৎকর্ষ হয়েছে, কিন্তু পশু-পক্ষী তাদের লাফালাফি থেকে অগ্রসর হয়ে কিছুই শিখতে পারেনি। মানুষ কিভাবে এমন সুযোগ প্রাপ্ত করেছে? কার সঙ্গতি দ্বারা এইসব শিখেছে?
.
এই প্রশ্নগুলোর বিষয়ে কোনো নাস্তিকই কিছু বিচার করে না। তাদেরকে এর জন্য বিবর্তনবাদের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। যদি বিবর্তন দ্বারাই সবকিছু সম্ভব হয়ে যেতো, তাহলে তো পশু-পক্ষীও এতদিনে বৈজ্ঞানিক হয়ে যেতো, কারণ তাদের জন্ম তো আমাদেরও পূর্বে হয়েছিল। এই কারণে উন্নতির জন্য তারা আমাদের তুলনায় অধিক সময় পেয়েছে। একইসঙ্গে যদি বিবর্তন দ্বারাই সবকিছু স্বতঃ সিদ্ধ হয়ে যেতো, তাহলে মানুষের জন্যও কোনো প্রকারের বিদ্যালয় আর সমাজের আবশ্যকতা হতো না, কিন্তু এমনটা হয়নি।
.
নাস্তিকদের এই বিষয়ে অধিক গম্ভীরভাবে বিচার করা উচিত যে মানুষের মধ্যে ভাষা আর জ্ঞানের বিকাশ কোথা থেকে হল? এই বিষয়ে সবিস্তারে জানার জন্য আমার গ্রন্থ "বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানম্" অবশ্যই পড়া উচিত, যারদ্বারা এটা সিদ্ধ হয়েছে যে প্রথম প্রজন্মের চারজন সর্বাধিক সক্ষম ঋষি অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা ব্রহ্মাণ্ড থেকে সেই ধ্বনিগুলোকে নিজের আত্মা আর অন্তঃকরণ দিয়ে শোনেন, সেগুলো ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে পরা আর পশ্যন্তী রূপে বিদ্যমান ছিল। সেই ধ্বনিগুলোকেই বেদমন্ত্র বলা হয়েছে। সেই বেদমন্ত্রের অর্থ ব্যাখ্যা করার জন্য ঈশ্বর ছাড়া আর কেউই ছিল না।
.
অন্য মানুষরা তো এই ধ্বনিগুলোকে ব্রহ্মাণ্ড থেকে গ্রহণ করতেও সক্ষম ছিল না, হতে পারে তাদের প্রাতিভ জ্ঞান এবং ঋতম্ভরা ঋষি স্তরের ছিল। সৃষ্টির আদিতে সব মানুষ ঋষি কোটির ব্রাহ্মণ বর্ণেরই ছিল, অন্য কোনো বর্ণ ভূমণ্ডলের মধ্যে ছিল না। সেই চার ঋষিকে সমাধি অবস্থায় ঈশ্বর সেই মন্ত্রের অর্থের জ্ঞান দেয়। সেই চারজন মিলে মহর্ষি ব্রহ্মাকে চার বেদের জ্ঞান দেয় আর মহর্ষি ব্রহ্মা থেকে জ্ঞানের পরম্পরা সব মানুষের কাছে পৌঁছাতে থাকে। এইভাবে ব্রহ্মাণ্ডের এই ধ্বনিগুলো থেকেই মানুষ ভাষা আর জ্ঞান দুটোই শিখেছে। এই কারণে মানুষ নামক প্রাণী সব প্রাণীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে যায়।
ধ্যাতব্য হল, প্রথম প্রজন্মের জন্মা সব মানুষ মোক্ষ থেকে পুনরাবৃত্ত হয়ে আসে। এই কারণে তারা সবাই ঋষি কোটির ছিল। জ্ঞানের পরম্পরা কিভাবে অগ্রসর হতে থাকে আর মানুষের ঋতম্ভরা কিভাবে ধীরে-ধীরে ক্ষীণ হতে থাকে, মানুষকে বেদার্থ জানার জন্য কেমন কেমন গ্রন্থের রচনার আবশ্যকতা হয় আর কিভাবে-কিভাবে সাহিত্য তৈরি করা হয়, এসব জানার জন্য আমার "বেদার্থ-বিজ্ঞানম্" গ্রন্থ পড়তে হবে। যখন মানুষের মধ্যে বেদকে বেদের দ্বারা জানার প্রজ্ঞা সমাপ্ত বা কম হয়ে যায়, তখনই তার জন্য অন্য কোনো গ্রন্থের আবশ্যকতা হয়। ধীরে-ধীরে বেদার্থের মধ্যে সহায়ক আর্ষ গ্রন্থও মানুষের জন্য কঠিন হয়ে যায় আর আজ তো পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বেদ এবং আর্ষ গ্রন্থের প্রবক্তাও এগুলোর যথার্থ থেকে অতি দূরে চলে গেছে। এই কারণে শুধু বেদ কেন, আর্ষ গ্রন্থও তথাকথিত বুদ্ধিমান মানবের জন্য অবর্ণনীয় ধাঁধা হয়ে গেছে।
.
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী আর তাঁর মহান গুরু প্রজ্ঞাচক্ষু শ্রী স্বামী বিরজানন্দ সরস্বতী অনেক চেষ্টা করেন, কিন্তু সময়াভাব আদি পরিস্থিতির কারণে ঋষি দয়ানন্দের বেদভাষ্য এবং অন্য গ্রন্থ বেদের রহস্যকে খোলার জন্য সংকেতমাত্রই রয়ে যায়। তিনি বেদের বাস্তবতাকে জানার জন্য সুমার্গে চলা পথিকের বালির মধ্যে হওয়া পদচিহ্নের সমান ছিলেন। গন্তব্যের দিকে যাওয়া পদচিহ্ন যেকোনো ভ্রান্ত পথিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ ঋষি দয়ানন্দের অনুগামীরা ঋষির তৈরি কিছু পদচিহ্নকেই গন্তব্য ধরে নিয়েছে আর বেদার্থকে জানার জন্য তারা কোনো বিশেষ ভাবে চেষ্টা করেনি। তাদের এই কর্ম মহাপুরুষদের প্রতিমাকেই পরমাত্মা মেনে নেওয়ার মতোই ছিল।
.
এর পরিণাম এই হয় যে ঋষি দয়ানন্দের অনুগামী বিদ্বানও বেদাদি শাস্ত্রের ভাষ্য করতে আচার্য সায়ণ আদির সরল প্রতীত হওয়া কিন্তু বাস্তবে ভ্রান্ত ভাষ্যের অনুগামী হয়ে যায়। এই কারণে পৌরাণিক (তথাকথিত সনাতনী) ভাষ্যকারদের মতো আর্য বিদ্বানদের ভাষ্যের মধ্যেও অশ্লীলতা, পশুবলি, মাংসাহার, নরবলি, অস্পৃশ্যতা, আদি পাপ বিদ্যমান আছে। তারা শাস্ত্রকে এই পাপের থেকে মুক্ত করার পূর্ণ চেষ্টা করেছে অবশ্য, কিন্তু তারা এতে সম্পূর্ণ ভাবে সফল হতে পারেনি। এই কারণে এদের ভাষ্যের মধ্যে সায়ণ আদি আচার্যের ভাষ্যের তুলনায় এই দোষ কম মাত্রায় বিদ্যমান আছে, কিন্তু বেদ আর ঋষিদের গ্রন্থের মধ্যে একটাও দোষ বিদ্যমান হওয়া বেদের অপৌরুষেয়ত্ব আর ঋষিদের ঋষিত্বের উপরে প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করানোর জন্য যথেষ্ট। এইজন্য ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যের অতিরিক্ত সব ভাষ্য হল দোষপূর্ণ আর মিথ্যা।
.
তবে হ্যাঁ, ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যও সাংকেতিক পদচিহ্ন মাত্র হওয়ার কারণে সাত্ত্বিক ও তর্কসঙ্গত ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। এর জন্য সব মানুষকে এটাই অতি উচিত হবে যে তারা বেদের রহস্যকে জানার জন্য "বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানম্" গ্রন্থের গভীর ভাবে অধ্যয়ন করবেন। যেসব বিদ্বান বেদ আর ঋষিদের প্রজ্ঞার গভীরতায় আরও অধিক যেতে চান, তাদেরকে "বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ" আর "বেদার্থ-বিজ্ঞানম্" গ্রন্থ পড়া উচিত। যারা আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্ত করতে থাকা শিক্ষক বা বিদ্যার্থী বেদের সামান্য পরিচয় জানতে চান, তাদেরকে ঋষি দয়ানন্দ কৃত "সত্যার্থ-প্রকাশ" এবং "ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা" আর প্রিয় বিশাল আর্য কৃত "পরিচয় বৈদিক ভৌতিকী" গ্রন্থ অবশ্যই পড়া উচিত।

আক্ষেপের সমাধান করার পূর্বে আমি এখানে এটাই বলতে চাইবো যে বেদ ভাষ্যকাররা বেদের ভাষ্য করতে গিয়ে কি কি ভুল করেছে। বেদের ঈশ্বরীয়তা এবং সর্ববিজ্ঞানময়তাকে ভালো ভাবে জানতে হলে "বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞান" অবশ্যই পড়া উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত বেদের সঠিক স্বরূপ বুঝতে পারা যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সংসারের কোনো বেদ ভাষ্যকারই বেদের সঙ্গে ন্যায় করতে পারবে না। যখন ভাষ্যকারই বেদের সঙ্গে অন্যায় করে ফেলবে, তখন সেই ভাষ্যগুলোকে যারা পড়বে এমন পাঠকও নিশ্চিত রূপে বিভ্রান্তই হবে। যেসব পাঠক ভাষ্যকার বিদ্বানদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা রাখবে, তারা দূষিত ভাষ্য পড়ার পরেও মৌন হয়ে বসে থাকবে।
.
যেসব পাঠক জিজ্ঞাসু প্রবৃত্তির হবে, তারা দূষিত ভাষ্য পড়ে বেদের প্রতি বিরক্ত হয়ে যাবে অথবা জিজ্ঞাসা ভাব নিয়ে বৈদিক বিদ্বানদের কাছে সমাধান করার ইচ্ছা করবে, কিন্তু যেসব পাঠক পূর্বাগ্রহগ্রস্ত হয়ে বেদের বিরোধী হবে অথবা নিজের বেদবিরুদ্ধ মজহবকে বেদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ সিদ্ধ করতে চাইবে, তারা বেদের দূষিত ভাষ্যগুলোকে নিয়ে তীক্ষ্ণ ও ঘৃণিত প্রহার করার চেষ্টা করবে। এমন ব্যক্তিরা নিজেদের মজহবী গ্রন্থের বড়-বড় দোষগুলোকে লুকিয়ে বেদভাষ্যের দোষকে তুলে ধরবে আর যেখানে দোষও নেই, সেখানেও নিজের কাকবৃত্তির কারণে দোষ বের করার চেষ্টা করবে। সংসারে এই সময় তিন প্রকারের মানুষ বিদ্যমান আছে। এগুলোর মধ্যে মধ্যম মানুষই নির্দোষ হয়, অন্য দুই প্রকারের মানুষ দোষী হয়।
.
বেদ ভাষ্য করার সময় ভাষ্যকারদের সবথেকে মৌলিক বিষয় এটা বোঝা উচিত যে সর্বপ্রথম বেদকে বেদের দ্বারাই অর্থ করার চেষ্টা করা উচিত। আমি একটা জীবহিংসা প্রকরণকেই এখানে নিবো আর এর জন্য বেদের কিছু প্রমাণ এখানে উদ্ধৃত করবো -
য়দি নো গাম্ হম্সি য়দ্যশ্বম্ য়দি পূরুষম্।
তম্ ত্বা সীসেন বিধ্যামঃ।। (অথর্ববেদ ১.১৬.৪)
অর্থাৎ তুমি যদি আমাদের গাভী, ঘোড়া বা মানুষকে মারো, তাহলে আমি তোমাকে সীসা দিয়ে বিদ্ধ করবো।
মা নো হিম্সিষ্টম্ দ্বিপদো মা চতুষ্পদঃ (অথর্ববেদ ১১.২.১)
অর্থাৎ আমাদের মানুষ আর পশুদের নষ্ট করবে না। অন্যত্র বেদের মধ্যে দেখবেন -
ইমম্ মা হিম্সীর্দ্বিপাদম্ পশুম্ (য়জুর্বেদ ১৩.৪৭)
অর্থাৎ এই দুই খুর যুক্ত পশুর হিংসা করবে না।
ইমম্ মা হিম্সীরেকশফম্ পশুম্ (য়জুর্বেদ ১৩.৪৮)
অর্থাৎ এই এক খুর যুক্ত পশুর হিংসা করবে না।
য়জমানস্য পশূন্ পাহি (য়জুর্বেদ ১.১)
অর্থাৎ য়জমানের পশুর রক্ষা করবে।
আপনি বলবেন যে একথা তো য়জমান বা কোনো মানুষ বিশেষের পালিত পশুর করা হয়েছে, প্রত্যেক প্রাণীর জন্য নয়। আমি এই ভ্রমকে নিবারণার্থ অন্য প্রমাণ দিচ্ছি -
মিত্রস্যাহম্ চক্ষুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষে (য়জুর্বেদ ৩৬.১৮)
অর্থাৎ আমি সব প্রাণীকে মিত্রের দৃষ্টিতে দেখি।
মা হিম্সীস্তন্বা প্রজাঃ (য়জুর্বেদ ১২.৩২)
অর্থাৎ এই শরীর দিয়ে প্রাণীদের মেরো না।
মা স্রেধত (ঋগ্বেদ ৭.৩২.৯)
অর্থাৎ হিংসা করো না।
য়জুর্বেদ ১.১ মন্ত্রের মধ্যে গাভীকে অঘ্ন্যা বলা হয়েছে অর্থাৎ গাভী সর্বদা অবধ্য হয়। এই সমস্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো ভাষ্যকার বেদের মধ্যে পশু-হিংসা, পশুবলি অথবা মাংসাহারের মতো পাপের বিধান করে, তাহলে সেটা ভাষ্যকারের ভারী অপরাধ হবে, নাকি বেদের উপরে আক্ষেপকারীর। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিও তার গ্রন্থের মধ্যে দুটো পরস্পর বিরুদ্ধ কথাকে স্থান দিবে না, তাহলে ঈশ্বরীয় গ্রন্থ বেদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী কথা হওয়া তো সম্ভবই না। এই কারণে বেদভাষ্যের মধ্যে যেখানেই হিংসা আর মাংসাহারের মতো পাপ দেখা দিবে, তাহলে সেটা ভাষ্যকারের বুদ্ধির দোষ হবে, বেদের নয়।
.
বেদভাষ্যকারকে আরেকটা কথা এটাও বোঝা উচিত যে যখন বেদ দিয়ে বেদের অর্থ বুঝতে পারা যাবে না, তখন ভাষ্যকারকে বৈদিক পদের যথার্থ বিজ্ঞানকে জানার জন্য বেদের বিভিন্ন শাখা, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ এবং আরণ্যকের মধ্যে বৈদিক পদের ব্যাখ্যা এবং বিবৃতির রহস্যকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
.
আমি উদাহরণের জন্য এখানে কিছু প্রমাণ উদ্ধৃত করবো। মহর্ষি জৈমিনী বলেছেন -
পশবোऽয়ম্ (পৃথিবী) লোকঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩০৭)
.
মহর্ষি তিত্তির বলেছেন -
প্রাণাঃ পশবঃ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.২.৬.৩)
.
মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্যের কথন হল -
প্রাণো বৈ পশুঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৪.৫)
.
অন্যদিকে মৈত্রায়ণী সংহিতার মধ্যে লেখা আছে -
পশবশ্চ্ছন্দাম্সি (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৩.৫)
আর শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে লেখা আছে -
পশবো বৈ সবিতা (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.২.৩.১১)
.
এখানে পৃথিবী, সূর্য, প্রাণ এবং ছন্দ রশ্মি আদি পদার্থকে পশু বলা হয়েছে, তাহলে বেদভাষ্যকারের উচিত যে বেদের মধ্যে পশু শব্দ আসা মাত্র তার অর্থ লোকপ্রচলিত পশু অর্থ না করা। যদি সে এমন করে, তাহলে সে নিজের অজ্ঞানতা বা মূর্খতারই পরিচয় দিবে আর এই কারণে অনেক পাঠক বেদ বিরোধী হয়ে যায়। এর দোষ ভাষ্যকারের মস্তকেই থাকবে।

এখন আমি "গৌঃ" পদের বিষয়ে কিছু প্রমাণ প্রস্তুত করবো -
অন্তরিক্ষম্ গৌঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.১৫), অসৌ (দ্যৌঃ) গৌঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৪৩৯), ইয়ম্ (পৃথিবী) বৈ গৌঃ (কাঠক সংহিতা ৩৭.৬), প্রাণো হি গৌঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৩.৪.২৫), গৌর্বৈ বাক্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.২.৩)।

এখানে এই প্রমাণগুলোকে দেখার পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে পৃথিবী, অন্তরিক্ষ এবং দ্যুলোককেও বেদের মধ্যে গৌ বলা হয়েছে। একইভাবে বাক্ তত্ত্ব এবং প্রাণ তত্ত্বকেও গৌ বলা হয়েছে। এখন কোনো বেদভাষ্যকার যদি বেদমন্ত্রের মধ্যে "গৌ" পদ আসা মাত্র তার অর্থ গাভী নামক প্রাণী করে দেয়, তাহলে এটা ভাষ্যকারেরই মূর্খতা বলা হবে।

এখন আমরা "অশ্বঃ" পদের উপরে বিচার করবো -
অসৌ বা আদিত্যোऽশ্বঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.৯.২৩.২), বজ্রোऽশ্বঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.১.২.৯), ইন্দ্রো বা অশ্বঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১৫.৪)।

এই প্রমাণগুলো থেকে এটা সিদ্ধ হয় যে বেদের মধ্যে অগ্নি, সূর্য, তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ এবং বজ্র রশ্মিকেও অশ্ব বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো বেদের অধ্যেতা বেদের মধ্যে "অশ্বঃ" পদ দেখে তার অর্থ ঘোড়া করে, তাহলে তাকে অনাড়ি বলা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? ঠিক এইরকমই অনেকত্র গোমেধ বা অশ্বমেধ যজ্ঞের চর্চা শোনা যায়। এখানে "মেধৃ মেধাহিম্সনয়োঃ সঙ্গমে চ" ধাতুর ব্যবহার হয়েছে। এইভাবে এই ধাতু জানতে, বুঝতে, মেরে ফেলতে, দুঃখ দিতে আর সঙ্গতি করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। তাহলে যদি কেউ গোমেধ বা অশ্বমেধ পদ দিয়ে গাভী অথবা ঘোড়ার বলির বিধান করে, তাহলে তাকে পূর্বাগ্রহী মাংসাহারী কেন ভাবা হবে না?

এইভাবে ব্রাহ্মণ গ্রন্থকে না বুঝে যদি কেউ বেদের অর্থ করে, তখন সে বেদের তেমনই দুর্গতি করবে, যেমনটা কেউ বন্দুক ছুরি নিয়ে কোনো রোগীর শল্যক্রিয়া করবে। দুর্ভাগ্যবশতঃ আজ এমন বাঁদরের কোনো অভাব নেই।

যখন ব্রাহ্মণ আদি গ্রন্থের দ্বারাও বেদার্থ বোঝা যাবে না, তখন ভাষ্যকারের উচিত নিরুক্তের ব্যাখ্যার ব্যবহার করা, কারণ নিরুক্ত হল বেদের পদের ব্যাখ্যাকে বোঝার জন্যই রচনা করা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যেটা বেদের যেকোনো অধ্যেতাকে বেদের পদের রূঢ় অর্থ করার থেকে বাঁচায় আর সেই পদের মহান বিজ্ঞানের উদঘাটন করে। আজ দুর্ভাগ্যের বিষয় হল যে গ্রন্থ বেদকে রূঢ়িবাদ থেকে বের করে মহান বিজ্ঞানবাদের মধ্যে নিয়ে যায়, সেই গ্রন্থই তার সমস্ত ভাষ্যকারের দ্বারা রূঢ়িবাদের গভীর গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাহলে নিরুক্তের এমন ভাষ্যের আধারে কেউ কিভাবে বেদকে বুঝবে? এর জন্য বেদের অধ্যেতাদের আমার নিরুক্তের বৈজ্ঞানিক ভাষ্য "বেদার্থ বিজ্ঞানম্" অবশ্যই পড়া উচিত। এর অতিরিক্ত অন্য কোনো মার্গ নেই।

এইসব গ্রন্থের অতিরিক্ত বেদভাষ্যকারকে ব্যাকরণের জ্ঞানেরও কিছু আবশ্যকতা আছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে ধাতু প্রত্যয়ের আধারে বৈদিক পদের ব্যুৎপত্তি করার চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু এমন বৈয়াকরণকেও এটা ভোলা উচিত নয় যে একই ধাতুর অনেক প্রকারের অর্থ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে কোনো ধাতুর তর্কসঙ্গত অর্থের কল্পনা করা উচিত আর কোনো প্রত্যয় যদি অনুকূল তৈরি না হয়, তাহলে কোনো নতুন প্রত্যয়ের কল্পনা করা উচিত। একইভাবে কোথাও-কোথাও নতুন ধাতুরও কল্পনা করা উচিত, কিন্তু এইসব কাজ কোনো সত্ত্বগুণসম্পন্ন প্রাতিভ জ্ঞানযুক্ত বিদ্বানই করতে পারবে, অন্যথা তার কল্পনা বেদকেও কাল্পনিক আর হাস্যকর বানিয়ে দিবে।

এখানে ভাষ্যকার বা বেদের অধ্যেতাকে এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে বেদ ব্যাকরণের জন্য নয়, বরং ব্যাকরণ বেদের জন্য হয়েছে। লোক আর বেদ দুটোই ব্যাকরণের অধীন হয় না, বরং ব্যাকরণ লোক আর বেদ দুটোর অধীন হয়। মহর্ষি পাণিনি আদি মহাবৈয়াকরণ বেদ আর লোকের মধ্যে প্রচলিত পদগুলোকে নিয়মবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বেদ কেন, লৌকিক পদকেও সম্পূর্ণ রূপে নিয়মবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এই কারণে বেদের জন্য অনেকত্র "ছন্দসি বহুলম্" ব্যবহৃত করেন আর "ব্যত্যয়ো বহুলম্" সূত্রকেও নিজের গ্রন্থের মধ্যে সমাবেশ করেছেন। লৌকিক পদকেও অনেকত্র শিষ্টের ব্যবহার বলে সাধু মেনেছেন। "পৃষোদরাদীনি য়থোপদিষ্টম্" এইরূপ সূত্রের রচনা করেন, আবার অনেকত্র অনেক পদকে নিপাতন থেকে ব্যুৎপন্ন মেনেছেন।

গণপাঠের মধ্যে মহর্ষি অনেক গণকে আকৃতিগণ মেনে সেই গণের মধ্যে অনেক পদকে সম্মিলিত করার অবকাশ রেখে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সেইসময় লোকের মধ্যে প্রচলিত পদকেও ব্যাকরণের নিয়মে পূর্ণ রূপে বাঁধা সম্ভব হয়নি। ঋষিদের দ্বারা এত স্পষ্টতা করার পরেও যদি কেউ কেবল প্রকৃতি এবং প্রত্যয়ের আধারে বেদার্থ করার জিদ করে, তাহলে তার করা বেদভাষ্য পাঠকদের গোলকধাঁধার মধ্যে ফেলে দেওয়াই সিদ্ধ হবে।
.
দুর্ভাগ্যবশতঃ বেদের অনেক অধ্যেতা ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, নিরুক্ত আদি আর্ষ গ্রন্থকে না জেনে সংস্কৃত ভাষার সামান্য জ্ঞানের আধারেই বেদার্থ করতে বসে যায়, তাহলে তারা বেদের দুর্গতি কেন করবে না? এদের বাকি থাকা ত্রুটি বেদের ইংরাজী আদি ভাষাতে করা অনুবাদ পূর্ণ করে দেয় আর সেইসব অনুবাদক বেদের সম্পূর্ণ বিনাশ করার পরেও বেদের ভাষ্যকার রূপে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। এই ধরণের ভাষ্যকার ও ইংরাজী আদি ভাষাতে বেদের অনুবাদকের ভাষ্য বা অনুবাদকে আধার বানিয়ে আক্ষেপকর্তারা বেদের উপরে অধিকাংশ আক্ষেপ করে।
.
এমন পরিস্থিতিতে অধিক দোষী তো ভাষ্যকার বা অনুবাদকই সিদ্ধ হয়। এতকিছুর পরেও কেউ এই ভাষ্যকার বা অনুবাদকদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে উদ্যত হয় না, কারণ সে এদের মহান বিদ্বান মনে করে আর তাদের কট্টর ভক্তও হয়। আমার এটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে এই ভাষ্যকার ও অনুবাদকরা ভালো বিদ্বান ছিল। তারা অনেক উপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক গ্রন্থ লিখেছে, কিন্তু বেদ, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ এবং নিরুক্তের মতো জটিল গ্রন্থের উপরে কলম চালিয়ে তারা ভারী ভুল করেছে। তাদের এই ভুল বেদের জন্য দীর্ঘ কাল ধরে থাকা ঘা সিদ্ধ হচ্ছে।
.
এখানে এটা মনে রাখতে হবে যে বেদভাষ্য প্রক্রিয়ার এইসব চরণের সফলতার জন্য য়োগাভ্যাস অতি আবশ্যক আর য়োগাভ্যাস দেখানোর জন্য চোখ বন্ধ করার নাম হয় না আর না য়োগের উপরে বড়-বড় প্রবচন দিয়ে বা লিখন লিখে বা গ্রন্থ লেখার নাম য়োগ হয়। য়োগ উৎপন্ন হয় য়ম ও নিয়মের ভূমি থেকে। আশ্চর্যের বিষয় হল আজ মিথ্যাভাষী, ধূর্তপ্রতারক, কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকার, ঈর্ষা আদি দুর্গুণের ভাণ্ডার য়োগের প্রণেতা হচ্ছে আর কোটি-কোটি টাকার সম্পত্তির স্বামী শ্রীমন্ত হয়ে বসে আছে। মাংসাহারী ও মাছ-ডিম খেয়ে নিজের পেটকে শ্মশান বানানো ব্যক্তি, মাতাল ও বিষয়লোলুপ ব্যক্তি মাত্র কিছু শব্দ জ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে বেদের ভাষ্যকার হয়ে যাচ্ছে, আবার অন্যদিকে ঈর্ষা, অহংকার, দ্বেষ, কাম ও ক্রোধ আদির আগুনে দগ্ধ হওয়া বাক্পটু ব্যক্তিরাও বেদের উপর কলম চালানোর সাহস করে বা য়োগের প্রেরণা দিতে দেখা যায়। এমন বিষম পরিস্থিতির মধ্যে বেদের সর্বনাশ কেন হবে না? বস্তুতঃ য়ম ও নিয়মকে না সিদ্ধ করা পর্যন্ত বেদ বা ধর্ম বা বিজ্ঞানের মর্ম জানাই সম্ভব নয়। এই কারণে বেদের অধ্যেতার উচিত যে সে সর্বপ্রথমে সত্য, অহিংসা ও ব্রহ্মচর্যাদি ব্রতের সেবন করবে আর ঈশ্বরপ্রণিধানপূর্বক জীবনযাপনের চেষ্টা করবে।
.
বেদকে বুঝতে এই ক্রমিক প্রক্রিয়ার এতটা পরিচয় করার পশ্চাৎ এখন আমি সর্বপ্রথমে বেদের উপরে করা কিছু গম্ভীর আক্ষেপের ক্রমশঃ উত্তর দেওয়া শুরু করবো। সর্বপ্রথমে আমি বেদের উপরে তোলা আক্ষেপের উত্তর দিবো। তারমধ্যেও সবথেকে অধিক প্রক্ষেপ "वेद का भेद" (বেদের ভেদ) ওয়েবসাইটে সুলেমান রিজভী করেছেন। বেদের উপরে হিংসা এবং সাম্প্রদায়িকতার দাবিও রিজভী করেছেন।
.
এই পুস্তকের সম্পাদন এবং ঈক্ষ্যবাচন প্রিয় শ্রী বিশাল আর্য এবং ডাক্তার মধুলিকা আর্যা খুবই যোগ্যতা এবং মনোযোগ সহ করেছেন। এর জন্য আমি আমার মানস সন্তানকে অনেক আশীর্বাদ করছি। ঈশ্বর এদের স্বাস্থ্য এবং পাবন যশ প্রদান করুক।

🔴 আক্ষেপ -
Vedas are terror manual which turns humans into savages. Many tribes were destroyed as a result of the violent passages in Vedas. As per Vedas, you must kill a person who rejects Vedas, who hates Vedas and Ishwar, who does not worship, who does not make offerings to Ishwar, who insults God (Blasphemy), one who oppresses a Brahmin etc. There are several passage in Vedas which calls for death of disbelievers.

এনার দৃষ্টিতে বেদ হল মানুষকে বর্বর আতঙ্কি তৈরি করার গ্রন্থ। এই গ্রন্থ অনেক জনজাতিকে নষ্ট করে দিয়েছে। যারা বেদ আর ঈশ্বরকে মানে না, ঈশ্বরের পূজা করে না, ঈশ্বরের নিন্দা করে আর ব্রাহ্মণের অপমান করে তাদেরকে বেদের মধ্যে মেরে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
.
একইসঙ্গে রিজভীর কথন হল যারা বেদকে মানে তারা বেদের মধ্যে নির্দেশিত হিংসাকে দেখে না, বরং অন্য সম্প্রদায়ের গ্রন্থের ভুল অর্থ করে সেগুলোর উপরে হিংসার দোষারোপ করে।

🔵 উত্তর - আমি শ্রী রিজভীর সঙ্গে-সঙ্গে সকল ইসলামী বিদ্বানদের কাছে জিজ্ঞেস করতে চাইবো -

১. মক্কা-মদীনা থেকে শুরু হওয়া ইসলাম কি শান্তি আর সত্যের দ্বারা বিশ্বের ৫৬-৫৭ দেশের মধ্যে ছড়িয়েছে?
২. তৈমুর, আলাউদ্দিন খিলজী, বাবর, আকবর আর ঔরঙ্গজেবের মতো ব্যক্তিরা কি ইসলামের শান্তিদূত হয়ে ভারতে এসেছিল?
৩. এই শান্তিদূতদের শান্তির দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই কি হাজার-হাজার রাণী জোহর করে নিজের প্রাণত্যাগ করেছিলেন?
৪. তারা কি ভারতে শান্তির স্থাপনা করার জন্য হাজার-হাজার মন্দির ভেঙেছে?
৫. কুরআনের মধ্যে কি কাফিরের গলা ওড়ানোর বর্ণনা নেই?
.
আপনি বেদ অনুগামীদের উপরে বনবাসী, যাদের ষড়যন্ত্রপূর্বক আদিবাসী বলা হয়েছে, তাদের হত্যার দোষারোপ করছেন। আপনার এতটুকু বোঝার ক্ষমতা তো থাকা উচিত যে ভারতের মধ্যে আজও বনবাসী বর্গ তাদের পরম্পরা ও মন্যতাকে প্রসন্নতাপূর্বক পালন করছে, অথচ ইসলামী দেশগুলোতে সবাইকে বলপূর্বক হয় ইসলামী মন্যতাকে স্বীকার করার জন্য বিবশ করা হয় অথবা তাদের নষ্ট করে দেওয়া হয়।
.
ভারতের মধ্যে তো সম্পূর্ণ বনবাসী সমাজ ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে রাষ্ট্রের রক্ষার জন্য নিজের বলিদান দিয়ে গেছে, সেটা হয় ইসলামী আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে হোক অথবা ইংরেজদের বিরুদ্ধে। বনবাসীরা সর্বদা রাষ্ট্র ও ধর্মের রক্ষার জন্য নিজের বলিদান দিয়েছে। এইজন্য আপনাকে আপনার ঘরের চিন্তা করা উচিত, আমাদের ঘরের নয়। যদি বেদের অনুগামী সমাজ হিংসক হতো, তাহলে সংসারের মধ্যে অন্য কোনো সম্প্রদায় জন্মই হতো না আর যদি জন্ম হতো, তাহলে সেটা জীবিতও থাকতো না।
.
আপনি কুরআনের উপরে করা কোনো আক্ষেপকে অজ্ঞানতার পরিণাম বলছেন, তাহলে কৃপা করে বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়ে আপনি কি কুরআনের সেই অনুবাদগুলোকে নষ্ট করিয়ে সেগুলোর সঠিক অনুবাদ করার সাহস করবেন? ছয় দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সৃষ্টি তৈরি হওয়া, মাটি দিয়ে মানুষের শরীর তৈরি হওয়া, সিংহাসনের উপরে খুদার বসে থাকা এবং অন্য সৃষ্টি সম্বন্ধীয় আয়তের সঠিক ব্যাখ্যা করে সম্পূর্ণ সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন? আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে কোনো ইসলামী বিদ্বান এতে সক্ষম হতে পারবে না?
.
আপনি তো বেদকে সঠিক ভাবে বুঝেই গেছেন, সেই জন্যই তো দোষারোপ করছেন। আপনি যদি বেদকে বোঝেন, তাহলে তো আপনাকে কারও ভাষ্য উদ্ধৃত করার আবশ্যকতাই ছিল না। এখানে এমন মনে হচ্ছে যে আর্যসমাজ এবং পৌরাণিকদের (তথাকথিত সনাতনী হিন্দু) বদনাম করাই আপনার মুখ্য লক্ষ্য আছে। সংস্কৃত ভাষার কোনো জ্ঞান আপনার নেই, অন্যথা আপনি আচার্য সায়ণের ভাষ্যও উদ্ধৃত করতেন। আপনি কেবল দেবীচন্দকেই আর্য বিদ্বান বলেছেন, এই জ্ঞান আপনাকে কি খুদা দিয়েছে যে দেবীচন্দ আর্যসমাজের বিদ্বান ছিলেন? আমি তো আর্যসমাজের মধ্যে কোনো দেবীচন্দ নামক বেদভাষ্যকারের নাম পর্যন্ত শুনিনি।
.
আপনি ভাষ্যের মধ্যেও কেবল ইংরাজী অনুবাদকেই অধিক উদ্ধৃত করেছেন। এরদ্বারা এটাও সিদ্ধ হয় যে হিন্দি ভাষারও খুব অধিক জ্ঞান আপনার নেই আর কেবল ইংরাজী ভাষা পড়ে বেদের অধিকারী বিদ্বান হয়ে বেদের উপর দোষারোপ করতে বসেছেন। আমি স্বীকার করছি যে ঋষি দয়ানন্দের অতিরিক্ত অন্য সব ভাষ্যকার দ্বারা বেদভাষ্য করাতে ভারী ভুল হয়েছে।
.
এখন আমি ক্রমশঃ আপনার দ্বারা উদ্ধৃত এক-একটা বেদ মন্ত্রের উপরে বিচার করবো -

🔴 আক্ষেপ -
অপঘ্নন্তো অরাব্ণঃ পবমানাঃ স্বর্দৃশঃ।
য়োনাবৃতস্য সীদত।। (ঋগ্বেদ ৯.১৩.৯)


আপনি এই মন্ত্রের ভাষ্য নিম্নানুসারে করেছেন -

May you (O love divine), the beholder of the path of enlightenment, purifying our mind and destroying the infidels who refuse to offer worship, come and stay in the prime position of the eternal sacrifice.
- Tr. Satyaprakash Saraswati

(অরাব্ণঃ) দুষ্টদের (অপঘ্নন্তঃ) দারুণ দণ্ড দাতা (পবমানাঃ) সৎকর্মীদের পবিত্রকারী (স্বর্দৃশঃ) সর্বদ্রষ্টা পরমাত্মা (ঋতস্য) সৎকর্মরূপী যজ্ঞের (য়োনৌ) বেদীতে (সীদত) এসে বিরাজমান হউন।

এর উপরে এই আক্ষেপ করেছেন যে বেদের মধ্যে শত্রুকে নষ্ট করা তথা ঈশ্বর ভক্তদের জ্ঞান প্রকাশ প্রদান করার কথা বলা হয়েছে।

🔵 উত্তর - এখানে ইংরাজী অনুবাদকে স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর বলা হয়েছে। এই অনুবাদটা অবশ্যই উচিত নয়, কিন্তু হিন্দি অনুবাদটা কার, এটা আপনি বলেননি। এটা আমি বলে দিচ্ছি যে এটা হচ্ছে আর্যবিদ্বান আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর দ্বারা করা অনুবাদ। এই হিন্দি অনুবাদের উপরে আপনার কি আপত্তি আছে? অথবা সংসারের কোনো সভ্য অথবা ন্যায়প্রিয় ব্যক্তি এর উপরে কি আপত্তি করতে পারবে? দুষ্ট ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়া কি অপরাধ? যদি এমন হয়, তাহলে সংসারের সমস্ত ন্যায়ালয়, পুলিশ ব্যবস্থা আর সেনাকে বন্ধ বা সমাপ্ত করে দেওয়া উচিত।
.
আমি এই মন্ত্রের উপর আপনার আক্ষেপকে বুঝতে পাচ্ছি না। আপনি কি দুষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত আর সৎকর্মীকে দণ্ডিত বা অপবিত্র করতে চাইছেন? যেমনটা সংসারে হত্যাকারী মজহবের ইতিহাস ও চরিত্র ছিল। এই হিন্দি ভাষ্যটা যদিও ভুল নয়, তবে এটা কথমপি পর্যাপ্তও নয়। এখন আমি এই মন্ত্রের উপরে নিজের শৈলীতে বিচার করবো -

এই মন্ত্রের ঋষি হল অসিত কাশ্যপ দেবল। এর অর্থ হল এই মন্ত্ররূপী ছন্দ রশ্মি কূর্ম প্রাণ রশ্মি থেকে উৎপন্ন এমন সূক্ষ্ম প্রাণ রশ্মির, যা স্বয়ং কারও বন্ধনে আসে না, কিন্তু সূক্ষ্ম কণা আর রশ্মিকে নিজের সঙ্গে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়, দ্বারা হয়। এর দেবতা হল পবমান সোম আর ছন্দ য়বমধ্যা গায়ত্রী। এই কারণে এর দৈবত আর ছান্দস প্রভাবে এই সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সোম পদার্থ শ্বেতবর্ণীয় তেজ যুক্ত হতে থাকে। একইসঙ্গে এই সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বলও সমৃদ্ধ হতে থাকে। এখন আমি এর তিন প্রকারের ভাষ্য করবো -
অপঘ্নন্তো অরাব্ণঃ পবমানাঃ স্বর্দৃশঃ।
য়োনাবৃতস্য সীদত।। (ঋগ্বেদ ৯.১৩.৯)

আধিদৈবিক ভাষ্য (১) -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের সমান তেজস্বী আর শুদ্ধ সোম পদার্থ (অরাব্ণঃ, অপঘ্নন্তঃ) [অরাব্ণঃ = রা দানে (অদা.) ধাতোর্বনিপ্। নঞ্ সমাসঃ] সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়াতে বাধা উৎপন্নকারী অথবা সেই প্রক্রিয়াতে ভাগ নিতে অক্ষম পদার্থকে নষ্ট করে অথবা সেগুলোকে সরিয়ে দিয়ে (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = ঋতমিত্যেষ (সূর্য়ঃ) বৈ সত্যম্ ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.২০), ঋতমেব পরমেষ্ঠী (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৫.৫.১), অগ্নির্বা ঋতম্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.১.১১.১)] সূর্যলোকের সর্বোত্তম আগ্নেয় ক্ষেত্র অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ভাগ অথবা সম্পূর্ণ সূর্যলোকের উৎপত্তি আর নিবাসস্থানে বিদ্যমান থাকে।

ভাবার্থ - সূর্যলোকের উৎপত্তি হওয়ার পূর্বে বিশাল খগোলীয় মেঘের ভিতরে সোম রশ্মিগুলো শুদ্ধ রূপে ব্যাপ্ত হয়। যখন সেই সোম রশ্মিগুলো তপ্ত হওয়া শুরু করে, তখন সেগুলো এমন পদার্থ যা স্বয়ং সূর্যলোক নির্মাণের প্রক্রিয়াতে ভাগ নেওয়ার জন্য সংযোগ-বিয়োগ আদি প্রক্রিয়াতে ভাগ নেওয়ার যোগ্য হয় না অথবা যা সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়াতে বাধার সৃষ্টি করে, সেগুলোকে নষ্ট বা দূর করে দেয়। এমন করতে-করতে সেই সোম রশ্মিগুলো সম্পূর্ণ মেঘের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে যায়। একইভাবে সোম প্রধান বিদ্যুৎ ঋণাবেশিত কণাও সম্পূর্ণ খগোলীয় মেঘ আর কালান্তরে সূর্যলোকের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে যায়।

আধিদৈবিক ভাষ্য (১) -
(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বিদ্যুতের সমান গত্যাদি ব্যবহারকারী অর্থাৎ বিদ্যুতের মতো শুদ্ধ মার্গের উপর গমন করে সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণ (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) মার্গের মধ্যে আসা এমন কণা, যা সংযোগ-বিয়োগ ক্রিয়াতে ভাগ নেয় না অথবা বাধা উৎপন্ন করে, তাকে দূরে সরিয়ে গমন করে। (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = অগ্নির্বা ঋতম্ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.১.১১.১)] সেইসব কণা অগ্নির কারণরূপ প্রাণ তত্ত্বের মধ্যে নিরন্তর নিবাস করে অর্থাৎ সেগুলো প্রাণের মধ্যেই নিবাস আর প্রাণের মধ্যেই প্রাণের দ্বারা গমন করে।

ভাবার্থ - এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেসব কণা প্রায় প্রকাশের বেগে গমন করে, সেইসব কণা অথবা বিকিরণ মার্গের মধ্যে বাধক পদার্থকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজের মার্গকে নির্বাধ বানিয়ে গমন করে। এর অর্থ হল সেগুলো বিভিন্ন আয়ন বা ইলেকট্রনকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং সেগুলোর দ্বারা নিঃসরণ আর শোষণের ক্রিয়া করে নিরাপদ রূপে নিরন্তর গমন করতে থাকে। এই ক্রিয়ার কারণে সেগুলোর বাস্তবিক শুদ্ধ গতির মধ্যে কিছুটা ঘাটতিও দেখা দেয়। যদি শোষণ ও নিঃসরণ পদার্থ অধিক মাত্রায় বিদ্যমান হয়, তাহলে সেই অনুপাতের মধ্যে গমনকারী কণার পরিণামী গতি কম হতে থাকবে। বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা পরিভাষিত ডার্ক মেটার এই সূক্ষ্ম কণা বা বিকিরণের সঙ্গে কোনো পরস্পর প্রতিক্রিয়া করে না, এইজন্য সেই পদার্থকে সেইসব কণা বা বিকিরণ দূরে সরিয়ে নির্বাধ গমন করতে থাকে। এই কণা বা বিকিরণ সূর্যাদি নক্ষত্র, অন্য আকাশীয় লোক, প্রাণীদের শরীর বা বনস্পতি অথবা খোলা অন্তরিক্ষের মধ্যে সর্বত্র এই ব্যবহারই দর্শায়।

ধ্যাতব্য - আমি এখানে দুই প্রকারের আধিদৈবিক ভাষ্য প্রস্তুত করেছি, এইভাবে "পবমান স্বর্দৃক্" পদগুলো থেকে নক্ষত্র, গ্রহাদি লোকের অর্থ গ্রহণ করে অন্য আধিদৈবিক ভাষ্যও করা যেতে পারে।

আধিভৌতিক ভাষ্য (১) -

(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) সূর্যের সমান তেজস্বী বেদবিত্ পবিত্রাত্মা ও পুরুষার্থী রাজা (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) এমন নাগরিক, যারা ধনবান্ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রহিতে ন্যায়কারী রাজার দ্বারা নেওয়া করের পরিশোধ করে না অথবা কর চুরি করে অথবা আবশ্যকতা হলে কোনো নির্ধনের অথবা পরোপকারের কাজে আর্থিক সহায়তা করে না অথবা সমাজ আর রাষ্ট্রের হিতের বিরোধী বা উদাসীন হয়, রাজা তাদের উচিত দণ্ড দিয়ে (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) [ঋতম্ = ব্রহ্ম বাऽঋতম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.১.৪.১০), সত্যম্ বিজ্ঞানম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৭১.২)] সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল বেদের কারণ রূপ পরব্রহ্ম পরমাত্মার মধ্যে নিবাস করেন।

ভাবার্থ - যেকোনো রাষ্ট্রের রাজা শরীর, মন আর আত্মার দ্বারা পূর্ণ সুস্থ আর বলবান্ হওয়া উচিত। এমন রাজাই সতত পুরুষার্থকারী হতে পারবেন। শরীর, মন বা আত্মার মধ্যে যেকোনো একটা নির্বল বা রোগী হলে কোনো রাজাই রাষ্ট্রের সঞ্চালনে সক্ষম হবেন না। এর পাশাপাশি যতক্ষণ পর্যন্ত রাজা জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হবেন না, ততক্ষণ পর্যন্তও রাজা রাষ্ট্রের উচিত সঞ্চালন করতে পারবেন না, কারণ এমন রাজাকে তার চাটুকার, চালাক-স্বার্থপর মন্ত্রী, প্রশাসনিক অধিকারী, বৈজ্ঞানিক, পুঁজিপতি এবং অন্য দেশের রাজা ভ্রমিত করে নিজের প্রয়োজন সিদ্ধ করতে পারেন।
.
এমন রাজা দণ্ডনীয় আর সম্মানীয় পাত্রের বিবেক রাখতে পারবেন না, অথচ বিদ্বান আর য়োগী রাজা এর পরিচয় নিশ্চিত করে দণ্ডনীয়কে দণ্ড আর সম্মানীয়কে সম্মান দিয়ে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের হিত সম্পাদন করেন। যে রাষ্ট্রের মধ্যে দণ্ডনীয়কে দণ্ড আর সম্মানীয়কে সম্মান তথা সত্য ও উন্নতির মার্গে চলা ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণা দেওয়া হয় না, সেই রাষ্ট্র অরাজকতা, হিংসা, ভয়, অশান্তি, অন্যায় আর তিন প্রকারের দুঃখে গ্রস্থ হয়ে বিনাশ প্রাপ্ত হয়। অপরাধীকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে ভগবান্ মনুর কথন হল -

দণ্ডঃ শাস্তি প্রজাঃ সর্বা দণ্ড এবাভিরক্ষতি।
দণ্ডঃ সুপ্তেষু জাগর্তি দণ্ডম্ ধর্মম্ বিদুর্বুধাঃ।। (মনুস্মৃতি ৭.১৮)


অর্থাৎ উচিত দণ্ডই প্রজার উপর শাসন করে আর দণ্ডই প্রজার রক্ষা করে। দণ্ড কখনও শিথিল হয় না, এইজন্য বিদ্বান ব্যক্তিরা দণ্ডকেই ধর্ম বলেছেন। কৃপণ ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে মহাত্মা বিদুর বলেছেন -

দ্বাবম্ভসী নিবেষ্টব্যৌ, গলে বদ্ধ্বা দৃঢাম্ শিলাম্।
ধনবন্তমদাতারম্, দরিদ্রম্ চাতপস্বিনম্।। (বিদুরনীতি ১.৬৫)


অর্থাৎ ধনবান হওয়া সত্ত্বেও পরোপকারের কাজে দান না দেওয়া ব্যক্তি আর নির্ধন হওয়া সত্ত্বেও পরিশ্রম না করা তথা দুঃখ না সহ্য করতে চাওয়া ব্যক্তিকে গলার মধ্যে ভারী পাথর বেঁধে গভীর জলাশয়ে ডুবিয়ে দেওয়া উচিত। এখানে সম্পূর্ণ প্রজার জন্যও নির্দেশ আছে যে ধনী ব্যক্তি ধনকে ঈশ্বরের প্রসাদ ভেবে ত্যাগপূর্বকই উপভোগ করবেন। তারা অবশ্যই নির্ধন ও দুর্বলের সহায়তা করবেন। অন্যদিকে নির্ধন ব্যক্তি কখনও ধনীদের প্রতি ঈর্ষা করবেন না, বরং স্বয়ং ধর্মপূর্বক পুরুষার্থ করতে থাকবেন আর দুঃখকেও সহ্য করার অভ্যেস করবেন। তারা কারও ধন চুরি করে ধনী হওয়ার চেষ্টা করবেন না অথবা বিনা কর্ম আর যোগ্যতায় ধন, পদ বা ঐশ্বর্য পাওয়ার ইচ্ছা কখনও করবেন না।

আধিভৌতিক ভাষ্য (২) -

(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) বেদবিদ্যার প্রকাশ দ্বারা প্রকাশমান, ব্রহ্মতেজ দ্বারা সম্পন্ন, পবিত্রাত্মা এবং য়োগী আচার্য বা আচার্যা নিজ বিদ্যার্থীদের বিদ্যাভাস করা কালীন (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) বিদ্যাকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক অথবা গ্রহণ না করা শিষ্য আর শিষ্যাদের আবশ্যক এবং উচিত তাড়নাও করবেন। (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) এমন আচার্য আর আচার্যা সম্পূর্ণ সত্য বিদ্যার মূল কারণ বেদ অথবা পরমাত্মার মধ্যে নিরন্তর বিরাজমান থাকেন।

ভাবার্থ - বেদ জ্ঞান দ্বারা সম্পন্ন নিরন্তর য়োগনিষ্ঠ বিদ্বান বা বিদুষীকেই আচার্য বা আচার্যা হবার অধিকারী হওয়া উচিত। তাদের উচিত তারা তাদের শিষ্য বা শিষ্যাদের প্রীতিপূর্বক আর নির্মল ভাবে অধ্যাপনা করবেন। যেসকল বিদ্যার্থী বিদ্যাগ্রহণে প্রমাদ করবে আর প্রীতিপূর্বক বুঝালেও বুঝবে না, তাদের সমুচিত দণ্ড অবশ্যই দিবেন। এই বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ-প্রকাশের দ্বিতীয় সমুল্লাসের মধ্যে ব্যাকরণ মহাভাষ্যের প্রমাণ দিয়ে লিখেছেন -

সামৃতৈঃ পাণিভির্ঘ্নন্তি গুরবো ন বিষোক্ষিতৈঃ।
লালনাশ্রয়িণো দোষাস্তাডনাশ্রয়িণো গুণাঃ।।

অর্থাৎ যে সকল মাতা, পিতা আর আচার্য সন্তান আর শিষ্যদের তাড়ন করেন, মনে করতে হবে যে তারা নিজের সন্তান আর শিষ্যকে নিজের হাতে অমৃত পান করাচ্ছেন আর যারা সন্তান বা শিষ্যদের লালন করেন (আদর দিয়ে মাথায় তোলেন), তারা নিজের সন্তান ও শিষ্যদের বিষ পান করিয়ে নষ্ট-ভ্রষ্ট করেন। কারণ লালনের দ্বারা সন্তান ও শিষ্য দোষযুক্ত এবং তাড়নার দ্বারা গুণবান হয়। আর সন্তান এবং শিষ্যদের সর্বদা তাড়নে প্রসন্ন এবং লালনে অপ্রসন্ন থাকা উচিত। কিন্তু মাতা, পিতা ও শিক্ষকগণ ঈর্ষা ও দ্বেষ বশতঃ তাড়না করবেন না, কিন্তু বাইরে ভয় দেখাবেন আর অন্তরে কৃপাদৃষ্টি রাখবেন।

ধ্যাতব্য - এইভাবে মাতা-পিতা আদির গ্রহণ করে অন্য প্রকারের আধিভৌতিক ভাষ্য করা যেতে পারে।

আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(পবমানাঃ, স্বর্দৃশঃ) য়ম-নিয়ম দ্বারা পবিত্র হওয়া য়োগী ব্রহ্মের সাক্ষাৎকারী (অপঘ্নন্তঃ, অরাব্ণঃ) সব ধরণের দোষের পরিত্যাগ করতে না পারার অনিষ্ট চিত্তবৃত্তিকে দূর করে দেন অর্থাৎ সেই য়োগী পুরুষ সব প্রকারের অনিষ্ট বৃত্তিগুলোকে ধীরে-ধীরে নিরুদ্ধ করতে থাকেন। যখন তার বৃত্তিগুলো নিরুদ্ধ হয়ে যায়, তখন (ঋতস্য, য়োনৌ, সীদত) সেই য়োগী পুরুষ সব সত্য বিদ্যার মূল পরব্রহ্ম পরমাত্মার মধ্যে বিরাজমান হয়ে যান অর্থাৎ তিনি ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার করেন।

ভাবার্থ - যখন কোনো য়োগাভ্যাসী অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য আর অপরিগ্রহের মতো য়ম এবং শৌচ, সন্তোষ, তপ, স্বাধ্যায়, ঈশ্বর-প্রণিধানের মতো নিয়ম দ্বারা নিজেকে পবিত্র বানিয়ে নেন, তখন তার চিত্তের বৃত্তি নিরুদ্ধ হতে থাকে, যারদ্বারা তিনি ব্রহ্মসাক্ষাৎকার করতে সক্ষম হন।

এখানে এটা স্পষ্ট হল যে য়ম-নিয়মের পালন না করে কোনো ব্যক্তিই য়োগী হতে পারবেন না। সারা সংসারের বেদবিরোধী বা ভ্রান্ত পাঠকগণ! আমার এই তিন শ্রেণীর সর্বমোট পাঁচটা ভাষ্যকে পড়ে বলুন যে এই মন্ত্রের মধ্যে হিংসার বিধান নেই, বরং যেকোনো রাষ্ট্র, সমাজ বা বিশ্ব কল্যাণের সুন্দর উপায় সূত্র রূপে দেখানো হয়েছে। বাস্তবিক এবং বুদ্ধিমান জিজ্ঞাসু এই একটা আক্ষেপের উপরেই আমার সমাধান থেকে বেদের উপরে আক্ষেপকর্তাদের ভাবনা তথা ভাষ্যকারদের ত্রুটি বুঝে যাবেন।

🔴 আক্ষেপ -
এখানে সুলেমান রিজভী ঋগ্বেদ ৭.৬.৩ মন্ত্রের দুটো ভাষ্য নিম্ন প্রকারে উদ্ধৃত করেছেন -
Rig Veda 7.6.3
"May the fire divine chase away those infidels, who do not perform worship and who are uncivil in speech. They are niggards, unbelievers, say no tribute to fire divine and offer no homage. The fire divine turns those Godless people far away who institute no sacred ceremonies."
- Tr. Satya Prakash Saraswati
পদার্থ - হে রাজন্ (অগ্নিঃ) অগ্নির তুল্য তেজোময়! আপনি (অক্রতূন্) নির্বুদ্ধি (গ্রথিনঃ) অজ্ঞানতায় আবদ্ধ (মৃধ্রবাচঃ) হিংসক বাণী যুক্ত (অয়জ্ঞান্) সঙ্গাদি বা অগ্নিহোত্রাদির অনুষ্ঠান হতে রহিত (অশ্রদ্ধান্) শ্রদ্ধারহিত (অবৃধান্) ক্ষতি সাধনকারী (তান্) সেই (দস্যূন্) দুষ্ট সাহসী চোরদের (প্রপ্র, বিবায়) ভালোভাবে অনেক দূরে পৌঁছে দিন (পূর্বঃ) প্রথম থেকে প্রবৃত্ত হয়ে আপনি (অপরান্) অন্য (অয়জ্যূন্) বিদ্বান বা জ্ঞানীদের সম্মান জানানোর বিরোধীদের প্রতি (পণীন্) ব্যবহার কারী (নিশ্চকার) নিরন্তর করেন।
ভাবার্থ - এই মন্ত্রের মধ্যে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে। হে বিদ্বানগণ! আপনারা সত্যের উপদেশ আর শিক্ষার দ্বারা সব অবিদ্বানদের বোধিত করুন, যাতে তারা অন্যদেরও বিদ্বান করে তোলেন।
পদার্থ - (নি) (অক্রতূন্) নির্বুদ্ধীন্ (গ্রথিনঃ) অজ্ঞানেন বদ্ধান্ (মৃধ্রবাচঃ) মৃধ্রা হিম্স্রা অনৃতা বাগ্যেষান্তে (পণীন্) ব্যবহারিণঃ (অশ্রদ্ধান্) শ্রদ্ধারহিতান্ (অবৃধান্) অবর্ধকান্ হানিকরান্ (অয়জ্ঞান্) সঙ্গাদ্যগ্নিহোত্রাদ্যনুষ্ঠানরহিতান্ (প্রপ্র) (তান্) (দস্যূন্) দুষ্টান্ সাহসিকাঁশ্চোরান্ (অগ্নিঃ) অগ্নিরিব রাজা (বিবায়) দূরম্ গময়তি (পূর্বঃ) আদিমঃ (চকার) করোতি (অপরান্) অন্যান্ (অয়জ্যূন্) বিদ্বৎসৎকারবিরোধিনঃ।
.
ভাবার্থ - অত্র বাচকলুপ্তোপমালঙ্কারঃ। হে বিদ্বাম্সো! য়ূয়ম্ সত্যোপদেশশিক্ষাভ্যাম্ সর্বানবিদুষো বোধয়ন্তু য়ত এতেऽপরানপি বিদুষঃ কুর্য়্যুঃ।
🔵 উত্তর - এখানে আক্ষেপকর্তা নিজের শব্দে এই ভাষ্যের উপর কোনো মন্তব্য করেননি, কিন্তু স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর ইংরাজী অনুবাদের কিছু বাক্যকে অবশ্য রেখাঙ্কিত করা হয়েছে, যারদ্বারা এই সংকেত পাওয়া যাচ্ছে যে এর উপর আক্ষেপকর্তার সেই আক্ষেপ আছে, যে আক্ষেপ ১ ক্রমাঙ্কের মধ্যে দেখানো হয়েছে। পাঠক আমার ১ ক্রমাঙ্কের উত্তরকে বুঝে নিবেন, তারা এই আক্ষেপেরও উত্তর স্বয়ং পেয়ে যাবেন। স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর ইংরাজী অনুবাদ অবশ্যই না তো সঠিক আছে, না পর্যাপ্ত আর না স্পষ্ট।
.
স্বামী জীর সমস্যা এটাও হতে পারে যে ইংরাজী ভাষার মধ্যে হিন্দি বা সংস্কৃত ভাষার গম্ভীর ভাবের সমান কোনো শব্দই নেই। এই কারণে বেদাদি শাস্ত্রকে অন্য ভাষা, বিশেষ করে ইংরাজী আদি নির্ধন ভাষাতে অনুবাদ করা সর্বথা অনুচিত আর সংকটপূর্ণ হবে। স্বামী জীর উচিত ছিল যে তিনি ইংরাজী ভাষাতে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যের ব্যাখ্যা করতেন। যেখানে উপযুক্ত শব্দ পাওয়া যায় না, সেখানে আরও অধিক স্পষ্ট ব্যাখ্যার আবশ্যকতা হয়। আক্ষেপকর্তা দ্বিতীয় ভাষ্য ঋষি দয়ানন্দের দিয়েছেন, যার উপর কোনো আক্ষেপ করা হয়নি আর আমার মনে হয় না যে ঋষি দয়ানন্দের এই ভাষ্যের উপর কোনো বুদ্ধিমান মানবতাবাদী অসম্মত হবেন।
.
এখন আমি এই মন্ত্রের উপরে বিচার করবো। এই মন্ত্রটা হল এইরকম -
ন্যক্রতূন্গ্রথিনো মৃধ্রবাচঃ পণীঁরশ্রদ্ধাঁ অবৃধাঁ অয়জ্ঞান্। প্রপ্রতান্দস্যূঁরগ্নির্বিবায় পূর্বশ্চকারাপরাঁ অয়জ্যূন্।। (ঋগ্বেদ ৭.৬.৩)
এই মন্ত্রের ঋষি হল বসিষ্ঠ। বসিষ্ঠের বিষয়ে ঋষিদের কথন হল - প্রাণা বৈ বসিষ্ঠ ঋষিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.১.১.৬), অগ্নির্বৈ দেবানাম্ বসিষ্ঠঃ (ঐরেয় ব্রাহ্মণ ১.২৮)। এইভাবে এখানে আগ্নেয় পদার্থের মধ্যে বিদ্যমান বা সেগুলো থেকে নিঃসরণ হওয়া প্রাণ রশ্মিগুলোকেই বসিষ্ঠ বলে আর এই রশ্মিগুলো থেকেই এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়েছে। এর দেবতা হল বৈশ্বানর। এর বিষয়ে ঋষিদের কথন হল - অগ্নির্বা এষ বৈশ্বানরো য়ৎসম্বৎসরঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৩৭৯)।
.
এর ছন্দ হল ভুরিক্ পঙক্তি। ভুরিক্ এর বিষয়ে মহর্ষি য়াস্ক লিখেছেন -
ভুরিজৌ বাহুনাম (নিরুক্ত ২.৪)
.
ঋষি দয়ানন্দ কৃত ঋগ্বেদ ভাষ্য ৪.২.১৪ মন্ত্রের মধ্যে এর অর্থ ধারক আর পোষক করা হয়েছে। এই কারণে এর দৈবত আর ছান্দস প্রভাবে সূর্যলোকের মধ্যে অগ্নি নিজের বাধক বা বারক বলের দ্বারা পদার্থের য়জন প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করে আর নীল বর্ণের উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হতে থাকে। ধ্যাতব্য হল, আচার্য পিঙ্গল পঙক্তি ছন্দের বর্ণ নীল বলেছেন। এখন আমি এর ভাষ্য প্রারম্ভ করবো -
.
আধিদৈবিক ভাষ্য -
(নি, অক্রতূন্) [ক্রতুঃ = কর্মনাম (নিঘন্টু ২.১), মিত্র এব ক্রতুঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.১.৪.১)] যে পদার্থ নিতরাম্ অর্থাৎ পূর্ণরূপে য়জন ক্রিয়া হতে রহিত হয়। (গ্রথিনঃ) অব্যবস্থিত বা অনিষ্ট রূপে জড়িয়ে থাকা (মৃধ্রবাচঃ) [এই পদের মধ্যে "মৃধু উন্দনে" ধাতু ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হল মারা, ভিজিয়ে দেওয়া বা হওয়া।] যেসব পদার্থের মধ্যে হিংসক বাক্ রশ্মি বিদ্যমান থাকে, (অয়জ্ঞান্) যেসব পদার্থ সংযোজক বা বিয়োজক গুণ যুক্ত হয় না, (অশ্রদ্ধান্) [শ্রদ্ধা = তেজ এব শ্রদ্ধা (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.৩.১.১) , শ্রদ্ধা বা আপঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.২.৪.১)] যেসব পদার্থ দুর্বল প্রাণ রশ্মি যুক্ত তথা যেখানে-সেখানে বিরল মাত্রায় ছড়িয়ে থাকে, (অবৃধান্) এমন পদার্থ যেগুলোর মধ্যে বৃদ্ধি হচ্ছে না অথবা যেগুলো য়জন ক্রিয়াতে বৃদ্ধি হতে দেয় না, (তান্, দস্যূন্) এইরকম সব পদার্থ সৃজন প্রক্রিয়াকে ক্ষীণ করে, এইরকম সব পদার্থকে (অগ্নিঃ) বৈশ্বানর অগ্নি (প্র, প্র, বিবায়) খুব ভালো ভাবে দূরে সরিয়ে দেয় আর যেসব পদার্থ দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় হয়, সেগুলোকে অনেক ভালো ভাবে গতি প্রদান করে।
.
মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন - অন্তরিক্ষম্ বৈ প্র (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৪১), প্রাণো বৈ প্র (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৪০)। এর অর্থ হল অগ্নি তত্ত্ব প্রাণ আর আকাশ তত্ত্বকে বিশেষভাবে সক্রিয় করে দুর্বল এবং নিষ্ক্রিয় পদার্থকে সবল করে তোলে আর হানিকারক পদার্থকে দূরে সরিয়ে দিয়ে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়। (পূর্বঃ, অপরান্, অয়জ্যূন্) [এখানে "য়জ্যুঃ" পদ য়জ ধাতু থেকে "য়জিমনিশুন্ধিদসিজনিভ্যো য়ুচ্" (উণাদিকোষ ৩.২০) দ্বারা য়ুচ্ প্রত্যয় হয়ে ব্যুৎপন্ন হয়েছে।] সম্পূর্ণ পদার্থের মধ্যে পূর্বে থেকেই পূর্ণ রূপে ব্যাপ্ত বৈশ্বানর অগ্নি এমন পদার্থ, যেগুলোর মধ্যে য়জনশীলতার গুণ নগণ্য হয়, সেগুলোকে (পণীন্, চকার) যজ্ঞীয় ব্যবহার যুক্ত করতে থাকে।
.
এখানে "অপরান্" পদ য়জনশীল পদার্থ হতে ভিন্ন পদার্থের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
.
ভাবার্থ - সূর্যলোকের মধ্যে বিদ্যমান তীব্র উষ্মা সমস্ত পদার্থকে নিরন্তর ছেদন-ভেদন করতে থাকে। বড় কণা ভেঙে গিয়ে ছোটো কণাতে পরিণত হতে থাকে। সেগুলোর মধ্যে যে পদার্থ সংযোজন হওয়ার যোগ্য হয়, সেটা আয়ন রূপে কেন্দ্রীয় ভাগের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। তাদের মার্গে যেসব বাধক পদার্থ আসে এবং যেসব পদার্থ সংযোজন হওয়ার যোগ্য হয় না, সেই পদার্থগুলোকে উষ্মাযুক্ত তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ তরঙ্গ দূরে সরিয়ে দিতে থাকে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -
এই ভাষ্য আপনি আগে থেকে উদ্ধৃত করেছেন আর এর উপরে আপনার কোনো মন্তব্যও নেই। অবিদ্যাগ্রস্ত অর্থাৎ মূঢ় মতি, হিংসার জন্য মানুষকে উৎসাহ প্রদানকারী, সমাজের মধ্যে বিচ্ছেদ উৎপন্নকারী, অগ্নিহোত্রাদির দ্বারা পরিবেশকে শুদ্ধ না করা ব্যক্তি, বিদ্যা এবং মানবতার উপরে শ্রদ্ধা না রাখা ব্যক্তি আর হানিকারক দুষ্ট অপরাধীদের রাজা যদি দূর না করেন, তাদের সৎপথে না নিয়ে আসেন, তাহকে কি তাদের পূজা করবেন? তাদের দূর করলে তবেই কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের হিত হওয়া সম্ভব, অন্যথা রাষ্ট্র আর বিশ্বের মধ্যে অরাজকতাই ছড়াবে। এইজন্য ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য হল সর্বথা উচিত আর কল্যাণকারী।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(অগ্নিঃ) শরীরস্থ বিদ্যুদগ্নি (অক্রতূন্) [ক্রতুঃ = কর্মনাম (নিঘন্টু ২.১), প্রজ্ঞানাম (নিঘন্টু ৩.৯)] যেসব কোষিকা আদি পদার্থ নিষ্ক্রিয় বা মৃত হয়ে যায়, (গ্রথিনঃ) যেসব পদার্থ বিকৃত বা অনিষ্ট বন্ধন যুক্ত হয়, (মৃধ্রবাচঃ) [বাক্ = বাগেবাऽগ্নিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.২.২.১৩)] অনিষ্টকারী অগ্নি অর্থাৎ যে বিকৃত অগ্নির দ্বারা শরীরের মধ্যে বিভিন্ন রোগ হতে পারে, (অয়জ্ঞান্) এমন অবশিষ্ট পদার্থ যা শরীরের জন্য উপযোগী নয়, (অশ্রদ্ধান্) [শ্রদ্ধা = তেজ এব শ্রদ্ধা (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.৩.১.১)] যেসব পদার্থ তেজহীন বা দুর্বল হয়ে গেছে, (অবৃধান্) যেসব পদার্থ শরীরের জন্য হানিকারক অর্থাৎ বিজাতীয় পদার্থ (তান্, দস্যূন্) এমন সব পদার্থ শরীরের ক্ষীণকারী হয়, সেইসব হানিকারক পদার্থকে (প্র, প্র, বিবায়) বহির্গত অথবা নষ্ট করতে থাকে।

এমন সব পদার্থই অবশিষ্ট রূপ হয়ে মল-মূত্র, স্বেদ, কফ, শ্বাস আদির দ্বারা নিরন্তর নিঃসৃত হতে থাকে। (পূর্বঃ) এইসব পদার্থের উৎপত্তির থেকে পূর্ব হতে বিদ্যমান সেই শরীরস্থ অগ্নি (অপরান্) অন্য পদার্থকে (অয়জ্যূন্) যেসব পদার্থ সপ্তধাতুতে পরিণত হয় না, সেগুলোকে (পণীন্, নি, চকার) সম্যক ক্রিয়া আর বল দ্বারা নিরন্তর যুক্ত করতে থাকে।

ভাবার্থ - শরীরের মধ্যে থাকা বিদ্যুৎ এবং অগ্নি পদার্থ শরীরের সমস্ত ক্রিয়াকে সঞ্চালিত করতে অনিবার্য ভূমিকা পালন করে। বিদ্যুৎ আর উষ্মার কারণেই শরীরের মধ্যে অনেক ছেদন আর ভেদনের ক্রিয়া চলতে থাকে। ভোজনের অবয়ব সূক্ষ্মভাবে ভেঙে যাওয়া, পাচক রস বের হওয়া, সেগুলো থেকে বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক ক্রিয়া হওয়া, রসরূপ হওয়া ভোজন অন্ত্রের দ্বারা শোষিত হওয়া, ফুসফুস, হৃদয় আর মস্তিষ্কের সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত নাড়ি আর শিরার ক্রিয়াশীল হওয়া, নিঃসরণ আদি সমস্ত তন্ত্রের কাজ করা, বাইরে থেকে আসা জীবাণু আর বিষাণুকে রক্তের শ্বেত অণুর দ্বারা নষ্ট করে দেওয়া, শরীরের কোষিকার মধ্যে ঊর্জার উৎপত্তি হওয়া, এই সমস্ত ক্রিয়া বিদ্যুৎ আর উষ্মার দ্বারাই সম্পন্ন হয়।

আপনি যেসব মন্ত্রের মধ্যে হিংসার দোষারোপ করেছেন, সেগুলোর উত্তর এইভাবেই বুঝে নেওয়া উচিত। হিংসক, চোর, ডাকু, জ্ঞানের শত্রু, জ্ঞানী ও পরোপকারীদের দুঃখ দেওয়া ব্যক্তি, কৃপণ, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরোপকার না করা ব্যক্তি, আতংবাদী এবং নির্বলের উপর অত্যাচার করা ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়া হিংসা নয়, বরং বাস্তবে অহিংসা হয়, যারদ্বারা সব প্রাণী সুখে থাকতে পারবে। এই কারণে আমি হিংসা আদি দোষে অভিযুক্ত অন্য মন্ত্রের কোনো উত্তর দেওয়া আবশ্যক বলে মনে করছি না।

আমি এখানে বেদের কিছু সেই মন্ত্রগুলোকে উদ্ধৃত করবো, যেগুলোর মধ্যে কেবল মানুষই নয়, বরং প্রাণীমাত্রের প্রতি অত্যন্ত প্রেম আর আত্মীয়তাপূর্ণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

১. মিত্রস্য চক্ষুষা সমীক্ষামহে।
অর্থাৎ প্রাণীমাত্রের প্রতি মিত্রের সমান ব্যবহার করবে।
২. সমানী প্রপা সহ বোऽন্নভাগঃ।
অর্থাৎ আমাদের সবার আহার-বিহার সমান হবে।
৩. য়ত্র ভুবনম্ ভবত্যেকনীডম্।
অর্থাৎ আমরা সবাই পৃথিবীবাসী পরস্পর এমন ভাবে বাস করবো, যেভাবে বাসার মধ্যে পাখির পরিবার পরস্পর প্রীতির সহিত বসবাস করে।
৪. সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানম্ মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।
অর্থাৎ আমাদের বিচার, আমাদের সামাজিক পরম্পরা, আমাদের চিত্ত আর ভাবনা সব সমান হবে।
৫. অজ্যেষ্ঠাসো অকনিষ্ঠাসঃ।
অর্থাৎ আমাদের মানুষের মধ্যে কেউ বড় নয় আর কেউ ছোট নয় অর্থাৎ আমরা সবাই হলাম এক পিতা পরমাত্মার সন্তান।

এই ধরণের উদাত্ত উপদেশ থাকতে কোনো অজ্ঞানী ব্যক্তিই বেদের মধ্যে হিংসা, অস্পৃশ্যতা, উঁচু-নিচু, শোষণের মতো পাপের দোষারোপ করতে পারে। বুদ্ধিমান তো কখনও এই ধরণের বিচার মনের মধ্যেও নিয়ে আসবে না। এই কারণে এই প্রকরণকে আমি এখানেই সমাপ্ত করছি।

🍁 বৈদিক ঈশ্বরকে যে বিশ্বাস করে না, সে দোষী কেন হবে?

সুলেমান রিজভীর অভিযোগের মধ্যে অনেক মন্ত্রের উপরে এই অভিযোগ আছে যে সেগুলোতে নাস্তিককে দণ্ড দেওয়ার বিধান আছে। সর্বপ্রথমে তো আমি এখানে এটা বলতে চাইবো যে স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর অনুবাদ অথবা অন্য যারাই অনুবাদ করেছেন, তারা বেদের বাস্তবিক এবং সম্পূর্ণ অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করতে নিতান্ত অক্ষম হয়েছেন। বেদের ভাষ্য করার শৈলী সেটাই হওয়া উচিত, যেটা আমি দুটো মন্ত্রের ভাষ্য করে এর পূর্বে দেখিয়েছি।

বেদের মূল অর্থ তো আধিদৈবিকই হয়, অন্য দুই প্রকারের অর্থ মূল অর্থের সঙ্গে কোথাও-না-কোথাও সঙ্গত থাকে। মূল অর্থ সার্বদেশিক ও শাশ্বত হয়, অথচ আধিভৌতিক অর্থ ভিন্ন-ভিন্ন লোকের মননশীল প্রাণীর জন্য ভিন্ন-ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থও শাশ্বত আর সার্বদেশিক হয়। সারাংশ হল, বেদের আধিদৈবিক ভাষ্য না করে কিংবা তাকে না জেনে অন্য দুই প্রকারের ভাষ্য অনিশ্চিতই হবে।

ঋষি দয়ানন্দ সময়াভাবের কারণে অনেক কম মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য করেছেন। তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক আর বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দেখে মানুষকে আধ্যাত্মিক হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে লৌকিক ব্যবহারেও কুশল আর সর্বহিতৈষী বানানোর ভাবনায় প্রায়শঃ আধিভৌতিক আর আধ্যাত্মিক অর্থই করেছেন। তিনি কেবল সংস্কৃত ভাষাতেই তাঁর ভাষ্য করেছেন, হিন্দি অনুবাদ তাঁর সহযোগী পণ্ডিতেরা করেছেন। এই কারণে সেই হিন্দি ভাষার মধ্যে অনেকত্র ত্রুটি রয়ে গেছে। কোথাও ত্রুটি না জেনে হয়েছে, তো কোথাও জেনে শুনে করা হয়েছে বলে মনে হয়।

বেদের অন্য আর্যসমাজী ভাষ্যকারেরা ঋষি দয়ানন্দের শৈলীর যথাশক্তি অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু যেখানে তারা এমনটা করতে পারেন নি, সেখানে তারা আচার্য সায়ণ আদির অনুসরণ করতে বাধ্য হন। এই কারণে অনেকত্র ভারী দোষ এসে গেছে। এইসব বলার অর্থ এই নয় যে যেকোনো অনভিজ্ঞ ব্যক্তি বেদের উপরে আক্রমণ করার অধিকারী হয়ে যাবে। দুর্বল কাঁচের মহলে বাস করা ব্যক্তি যদি পাথরের মহলে বাস করা ব্যক্তির উপরে পাথর ফেলার দুঃসাহস করে, এটা অযৌক্তিকই হবে। এতকিছুর পরেও আমি এনার আক্ষেপের বিষয়ে কিছু কথা স্পষ্ট করতে চাইবো, সেগুলোর মধ্যে প্রথম হল নাস্তিক কাকে বলে?

ভগবান্ মনুর অনুসারে - "নাস্তিকো বেদবিন্দকঃ" অর্থাৎ যে ব্যক্তি বেদের নিন্দা করে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিন্দা করে, জ্ঞানীদের শত্রু হয়, জ্ঞানের অনুসারে আচরণ করে না, মানুষকে অন্ধবিশ্বাসী করে তোলে, বিদ্যার বিরোধী করে তোলে, যারা স্বয়ং সত্য থেকে দূরে থাকে আর অন্যদেরও সত্য থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে, তাকে নাস্তিক বলে। বেদ কোনো বিষয়কে বিচার-বিশ্লেষণ বা সত্যতা যাচাই না করে অন্ধভাবে বা জোরপূর্বক (বলাৎ) মেনে নেওয়ার উপদেশ দেয় না, বরং সেটা সত্য আর অসত্যকে জেনেই সম্পূর্ণ লোকব্যবহার করার উপদেশ করে। প্রাণীমাত্রের প্রতি মৈত্রী করা আর দুষ্টকে দণ্ড দেওয়ার উপদেশ করে। সম্পূর্ণ সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক রহস্যের উদ্ঘাটন করে।

বেদ কোনো সাম্প্রদায়িক অথবা কোনো বর্গ ও দেশের গ্রন্থ নয়, বরং এটা হচ্ছে ব্রহ্মাণ্ডীয় গ্রন্থ। এর বিরোধ করার অর্থ হল বিরোধকারী ব্যক্তি সম্পূর্ণ সৃষ্টির জ্ঞান-বিজ্ঞানেরই বিরোধী হবে। এখন যেকোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি বিচার করে দেখুক যে এমন মহান জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থ বেদের বিরোধকারী মানবতার হিতৈষী হবে নাকি শত্রু হবে? অবশ্যই সে মানবতার প্রবল শত্রু হবে। তাহলে মানবতার শত্রুকে কেন দণ্ড দেওয়া হবে না? এইভাবে আমি ঈশ্বরের বিরোধ করার আক্ষেপের উপরেও বিচার করবো।

বেদোক্ত ঈশ্বর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্ণিত কাল্পনিক ঈশ্বর নয়, তিনি সপ্তম আকাশ অথবা চতুর্থ আকাশের উপর সিংহাসনে বসে থাকা খুদা নন, যাকে তুলে ধরার জন্য ফারিস্তাদের আবশ্যকতা হয়। তিনি মানুষ আর মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ও হিংসা উৎপন্নকারী খুদা নন। তিনি নিজ-নিজ ক্ষেত্রের মধ্যে বসবাসকারী মানুষকে অকারণে পথভ্রষ্ট করা বা দিশা নির্দেশকারী নন। তিনি নিজেরই সন্তানরূপ পশু-পক্ষীকে মেরে খাওয়ার উপদেশকারীও নন। তিনি সৃষ্টির বিষয়ে নিতান্ত কাল্পনিক এবং হাস্যকর কাহিনী শোনান না। তিনি কৈলাশ পর্বত, ক্ষীর সাগর আদিতে থাকা শরীরধারী ঈশ্বরও নন।

বেদোক্ত ঈশ্বর হলেন এমন সর্বব্যাপক, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমতী, সর্বকল্যাণকরিণী এবং নিরাকার চেতনের নাম, যিনি সৃষ্টির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম আর স্থূল থেকে স্থূল পদার্থের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন, যিনি জীবমাত্রের কল্যাণ করার জন্যই সৃষ্টির রচনা করেছেন আর সব মানুষকে এমনই উপদেশ করেন। এইরূপ সেই সর্বোচ্চ সামর্থ্যবান চেতনস্বরূপ ঈশ্বরের পূজার অর্থ এই নয় যে মন্দিরে গিয়ে তাঁকে প্রসাদ চড়ানো হবে, আর এমনও নয় যে মসজিদ, চার্চ আর গুরুদ্বারে গিয়ে বিভিন্ন প্রকারের কর্মকাণ্ড করা হবে, বরং ঈশ্বরের পূজার অর্থ হল য়ম-নিয়মের পালন সহিত অর্থাৎ পূর্ণ সত্যবাদী, জীবমাত্রের প্রতি প্রেম করা, নিজের ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সৃষ্টির ঠিক-ঠিক জ্ঞান প্রাপ্ত করার চেষ্টাকারী হয়ে নিরন্তর পরোপকার করার চেষ্টা করতে থাকা আর এমন করার পাশাপাশিই ধ্যান, উপাসনা আদি করা।

যতক্ষণ পর্যন্ত এমন হবে না অথবা যে ব্যক্তি এমন করার চেষ্টা করবে না, তাকে ঈশ্বরের পূজা না করা মানা উচিত। এমন ব্যক্তিই দুষ্ট আর অধার্মিক হয়। আজ এমন ব্যক্তির সংখ্যাই সংসারের মধ্যে অধিক আছে, এইজন্য সারা সংসার দুঃখী হয়ে আছে। পূজা-নামাজ আর প্রার্থনার আডম্বর অনেক হচ্ছে, কল্পিত ঈশ্বরের উপরে ভাষণ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এই মানুষগুলো সত্যের সঙ্গে সম্বন্ধ ভেঙে দিয়েছে। এমন লোকেদের কি দণ্ডণীয় হওয়া উচিত নয়?

বস্তুতঃ ঈশ্বর, পূজা এবং বেদ এই তিনটার সত্য স্বরূপকে না জানার কারণেই আপনি বেদের বিষয়ে নিতান্ত বিভ্রান্তে আছেন অথবা আপনার কুরআনের মধ্যে বর্ণিত হিংসাদি পাপগুলোকে সঠিক বলে গণ্য করার জন্যই বিদ্বেষবশত বেদের উপরেও এমন অভিযোগ করছেন। একদিকে তো ভাষ্যকার আর অনুবাদকদের দোষ, অন্যদিকে পূর্বাগ্রহ আর বিদ্বেষবশত এই ভাষ্য আর অনুবাদগুলোকে পঠনকারীর দোষ, এইভাবে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে গেছে। যদি কেউ বাস্তবে সত্যের জিজ্ঞাসু হন, তাহলে তিনি আমার এই দুটো ভাষ্যকে পড়েই বাস্তবিকতাকে জেনে যাবেন আর বেদের অনুগামী হয়ে যাবেন, কিন্তু বুদ্ধিহীন আর পূর্বাগ্রহী ব্যক্তির জন্য সংসারের মধ্যে কোনো ওষুধ নেই।

এই স্পষ্টিকরণের পশ্চাৎ আপনার অন্য অভিযোগের উপরে বিচার করবো।

৩.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 5.21.3
"Let this war drum made of wood, muffled with leather straps, dear to all the persons of human race and bedewed with ghee, speak terror to our formen."
- Tr. Vaidyanath Shastri
বানস্পত্যঃ সম্ভৃত উস্রিয়াভির্বিশ্বগোত্র্যঃ।
প্রত্রাসমমিত্রেভ্যো বদাজ্যেনাভিঘারিতঃ।।
ভাষ্য - হে দুন্দুভি! নাকারা! তুমি যেভাবে (বানস্পত্যঃ) কাঠ দিয়ে নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও (উস্রিয়াভিঃ সম্ভৃতঃ) চামড়ার ফিতা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা (বিশ্বগোত্র্যঃ) সমস্ত জনের বন্ধু হও। সেটা (অমিত্রেভ্যঃ) শত্রুর জন্য (আজ্যেন অভিঘারিতঃ) ঘৃত দ্বারা অভিষিক্ত হয়ে (প্রত্রাসম্ বদ) ভয় আর ত্রাসের বার্তা দাও।
.
এখানে আক্ষেপকর্তার আক্ষেপ হল বেদের মধ্যে তার বিরোধীদের আতঙ্কিত করার বিধান আছে।
.
উত্তর - এই মন্ত্রের দ্বারা উপরোক্ত ভাষ্যকারেরা শত্রুদের আতঙ্কিত করার বর্ণনা করেছেন। এটা যদিও ভাষ্য নয়, তবুও সরল অনুবাদ মাত্র, যা মন্ত্রের অভিপ্রায়কে উচিত রীতিতে দেখাতে সক্ষম হয়নি। আমি এখানে পূর্বের মতো এটাই বলতে চাইবো যে বেদের অনুবাদ করা উচিত নয়, বরং সমুচিত ভাষ্য করা উচিত। তবুও এরমধ্যে আপত্তির কি আছে বলে আপনার মনে হচ্ছে? যখন দুইপক্ষের সেনার মধ্যে যুদ্ধ হয়, তখন শত্রুকে কেবল আতঙ্কিত করার কথা কেন, তাকে তো নষ্টই করে ফেলা হয়। এরই নাম হল যুদ্ধ, যেটা ধর্মাত্মা আর পাপীদের মধ্যে চিরকাল ধরে চলে আসছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কাকে আমাদের শত্রু মানা উচিত?
.
মহর্ষি দয়ানন্দ স্বমন্তব্যামন্তব্যপ্রকাশের মধ্যে মনুষ্যত্বের লক্ষণ সম্বন্ধে লিখেছেন -
.
মানুষ তাকেই বলা উচিত যে মননশীল হয়ে স্বাত্মবৎ অন্যের সুখ-দুঃখ আর হানি-লাভকে বুঝবে। অন্যায়কারী বলবানের কাছেও ভয় পাবে না আর ধর্মাত্মা নির্বলের কাছেও ভয় করবে। শুধু তাই নয়, নিজ সর্ব সামর্থ্যানুসারে ধর্মাত্মাদের - তারা মহা অনাথ, নির্বল আর গুণরহিত হোক না কেন - তাদের রক্ষা, উন্নতি, প্রিয়াচরণ সদা করবে আর অধর্মী চক্রবর্তী, সনাথ, মহাবলবান আর গুণবান হলেও, তবুও তার নাশ, অবনতি আর অপ্রিয়াচরণ সদা করবে অর্থাৎ যতটা সম্ভব অন্যায়কারীর বলের হানি আর ন্যায়কারীর বলের উন্নতি সর্বথা করবে। এই কাজে তার যতই দুঃখ প্রাপ্ত হোক না কেন, জীবন উৎসর্গ করতে হলেও, তবুও এই মনুষ্যত্বরূপ ধর্ম থেকে কখনও পৃথক হবে না।
.
এখন কেউ বলুক যে মানুষের এরথেকে অধিক ন্যায়সঙ্গত, তর্কসঙ্গত এবং কল্যাণকরিণী পরিভাষা আর কি হতে পারে? যে ব্যক্তি নিজের বলের অহংকারে জনসাধারণ অথবা বিভিন্ন পশু-পক্ষীকে দুঃখ দেয়, তাকে যেকোনো সজ্জন ব্যক্তি কেন নিজের শত্রু ভাববে না? এইরকম দুষ্ট ব্যক্তিই সম্পূর্ণ বিশ্বের মধ্যে অরাজকতা ছড়ায়। যতই অধিক এদের সহ্য করা হবে অথবা এদের প্রতি যত অধিক তটস্থ থাকা হবে, ততই অধিক এরা সমাজ, রাষ্ট্র বা বিশ্বের মধ্যে হিংসা, অরাজকতা আর অশান্তি ছড়াবে। এই কারণে এমন বর্বর ব্যক্তিদের শান্তি আর মানবতার স্থাপনা করার জন্য অবশ্যই নষ্ট করে দেওয়া উচিত। তখন যদি বেদের মধ্যে এমন শত্রুদের দণ্ড দেওয়ার প্রার্থনা থাকে, তাহলে তার নিন্দা কোনো অরাজক আর উপদ্রবকারী তত্ত্বই করতে পারে।
.
এখন আমি এই মন্ত্রের নিজের অর্থ প্রস্তুত করবো -
বানস্পত্যঃ সম্ভৃত উস্রিয়াভির্বিশ্বগোত্র্যঃ।
প্রত্রাসমমিত্রেভ্যো বদাজ্যেনাভিঘারিতঃ।। (অথর্ববেদ ৫.২১.৩)
এই মন্ত্রের ঋষি হল ব্রহ্মা। [ব্রহ্মা = ইন্দ্র এব ব্রহ্মাऽऽসীৎ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.৩৭৪), ঐন্দ্রো বৈ ব্রহ্মা (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.১.৭.৫)] এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ তরঙ্গ দ্বারা উৎপন্ন হওয়া রশ্মি থেকে হয়। এর দেবতা হল দুন্দুভি। দুন্দুভির বিষয়ে মহর্ষি য়াস্ক বলেছেন -
দুন্দুভিঃ ইতি শব্দানুকরণম্।
দ্রুমো ভিন্ন ইতি বা, দুন্দুভ্যতের্বা স্যাচ্ছব্দ কর্মণঃ (নিরুক্ত ৯.১২)
.
এর অর্থ হল সংযোজক গুণ যুক্ত একটা বিশেষ প্রকারের ঊর্জাকে দুন্দুভি বলে। এর বিষয়ে সবিস্তারে জানতে হলে আমার গ্রন্থ "বেদার্থ-বিজ্ঞানম্" পঠনীয়। এর ছন্দ অনুষ্টুপ্ হওয়াতে সংযোজক ঊর্জা অনুকূলতাপূর্বক বিভিন্ন কণার পরস্পর সংযুক্ত হওয়াতে সহায়ক হয়। এর ছান্দস ও দৈবত প্রভাবে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের রং-বেরংয়ের প্রকাশের উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হতে থাকে। এই মন্ত্রের ভাষ্য এইরকম হবে -
আধিদৈবিক ভাষ্য -
(বানস্পত্যঃ) [বনস্পতিঃ = অগ্নির্বৈ বনস্পতিঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১০.৬), প্রাণো বনস্পতিঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১২.৭), প্রাণো বৈ বনস্পতিঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.৪), সোমো বৈ বনস্পতিঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১০, শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৩.৩৩)] অগ্নি এবং বায়ু থেকে উৎপন্ন দুন্দুভি সংজ্ঞক উপরোক্ত ঊর্জা (উস্রিয়াভিঃ) [উস্রিয়া = উস্রিয়া ইতি গোনাম (নিঘন্টু ২.১১)] বিভিন্ন প্রকারের রশ্মির দ্বারা (সম্ভৃতঃ) সঠিকভাবে ধারণ এবং পুষ্ট হওয়া (বিশ্বগোত্র্যঃ) [গোত্রঃ = মেঘনাথ (নিঘন্টু ১.১০)] সম্পূর্ণ খগোলীয় মেঘের মধ্যে বিদ্যমান (অমিত্রেভ্যঃ) শত্রুরূপী বাধক অথবা অসংযোজক পদার্থের দিকে (প্রত্রাসম্, বদ) [বদ = বদতি গতিকর্মা (নিঘন্টু ২.১৪)] তীব্র ভেদক তরঙ্গকে প্রক্ষিপ্ত করে। (আজ্যেন, অভিঘারিতঃ) [আজ্যম্ = প্রাণো বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৮.১৫.২৩), ছন্দাম্সি বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.১.৫.৩)] এই উর্জা বিভিন্ন প্রাণ আর ছন্দ রশ্মির দ্বারা অভিসিঞ্চিত হয়।

ভাবার্থ - খগোলীয় মেঘের ভিতরে বিভিন্ন প্রাণ আর ছন্দ রশ্মি থেকে উৎপন্ন তীক্ষ্ম বিদ্যুৎ তরঙ্গ বিভিন্ন প্রকারের ছেদন, ভেদন আর সংযোজন ক্রিয়াগুলোকে সম্পন্ন করে, যারদ্বারা হানিকারক পদার্থ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে দূরে সরে যায় আর সংযোগযোগ্য পদার্থ নির্বাধ রূপে সংযুক্ত হতে থাকে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -
(বানস্পত্যঃ) [বনম্ = রশ্মিনাম (নিঘন্টু ১.৫)। এই পদ "বন শব্দে", "বন সম্ভক্তৌ" এবং "বনু য়াচনে" ধাতু দ্বারা ব্যুৎপন্ন হয়েছে। বনস্পতিরেব বানস্পত্যঃ] রাষ্ট্রের মধ্যে প্রজা দ্বারা বাঞ্ছিত অন্ন-ধনাদি পদার্থের উপযুক্ত বিতরণকারী, বিদ্যার প্রকাশ দ্বারা প্রকাশিত সত্যোপদেষ্টা রাজা (বিশ্বগোত্র্যঃ) রাষ্ট্রের প্রজার সকল কূলের মধ্যে নিজের হিতকারী কর্মের দ্বারা সর্বদা বিদ্যমান অর্থাৎ সমস্ত প্রজার হিতচিন্তক (উস্রিয়াভিঃ, সম্ভৃতঃ) গৌ আদি উপকারী পশুর দ্বারা তথা বিভিন্ন প্রকারের নিরাপদ কিরণ বা ঊর্জার দ্বারা রাষ্ট্রকে সম্যক রূপে ধারণকারী (অমিত্রেভ্যঃ, প্রত্রাসম্, বদ) রাষ্ট্রবিরোধী তত্ত্ব আর সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর দণ্ডের আদেশ দিবেন। (আজ্যেন, অভিঘারিতঃ) যেরকম ঘৃত দ্বারা সিঞ্চিত সমিধা জ্বলে নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক সেইভাবে তেজস্বী রাজা হিংসক আর ক্রূর অপরাধীদের নষ্ট করে দিবেন।
ভাবার্থ - বেদবিদ্যার মহান জ্ঞাতা রাজা তাঁর প্রজার জন্য অন্ন-ধন আদি পদার্থের ন্যায়সঙ্গত বিতরণের ব্যবস্থা করবেন। সুখের ইচ্ছুক যেকোনো রাষ্ট্র গৌ আদি উপকারী পশুকে নিজের আর্থিক আধার বানিয়ে রাখবে আর একইভাবে সবথেকে নিরাপদ আর শুদ্ধ পেশীয় ঊর্জার ব্যবহার করবে। এর অতিরিক্ত সেই ঊর্জারই ব্যবহার করবে, যেটা সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ হবে। রাজা তাঁর প্রজার জন্য মাতা-পিতার সমান হিতকারী হওয়া উচিত, প্রজার জন্য যেটা ভয়ের কারণ হবে, তাকে নষ্ট করে দিবেন। সেই রাজা পরিবেশ শোধনার্থ গোঘৃত আদি উত্তম পদার্থ দিয়ে যজ্ঞ করবেন আর করাবেন এবং যেভাবে ঘৃতের আহুতির দ্বারা অগ্নি তেজস্বী হতে থাকে, সেইভাবে রাজাও ব্রহ্মচর্যাদি ব্রত আর য়োগাভ্যাস আদির দ্বারা তেজযুক্ত হবেন।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(বানস্পত্যঃ) প্রাণবিদ্যার জ্ঞাতা আর প্রাণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম য়োগাভ্যাসী ((উস্রিয়াভিঃ, সম্ভৃতঃ) বেদের ঋচার দ্বারা স্বয়ংকে সম্যক রূপে পুষ্ট করেন আর তিনি নিরন্তর বেদের ঋচার মধ্যেই স্থির থাকেন। (বিশ্বগোত্র্যঃ) তিনি কোনো কূল বা বংশ বিশেষের না হয়ে প্রাণীমাত্রের হিতের মধ্যেই লেগে থাকেন। (অমিত্রেভ্যঃ, প্রত্রাসম্, বদ) সেই য়োগী য়োগসাধনার মধ্যে বাধক চিত্ত বৃত্তিকে নিজের অন্তশ্চেতনা দ্বারা প্রতিবন্ধিত করার আদেশ দেন অর্থাৎ মনের মধ্যে চলে আসা বিকারকে বলপূর্বক প্রতিবন্ধিত করার চেষ্টা করেন। (আজ্যেন, অভিঘারিতঃ) [আজ্যম্ = প্রাণো বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৮.১৫.২৩), য়জ্ঞো বা আজ্যম্ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৩.৪.১)] এমন য়োগী নিজ প্রাণায়ামাদি তপের দ্বারা প্রাণ বলকে বাড়িয়ে পরব্রহ্ম পরমাত্মার সঙ্গে সঙ্গত হওয়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি পরহিতের ভাবনায় স্বয়ংকে নিরন্তর সিঞ্চিত করেন অথবা তিনি যজ্ঞস্বরূপ পরব্রহ্ম পরমাত্মার প্রতি প্রীতি ভাবনায় স্বয়ংকে নিরন্তর সিঞ্চিত করতে থাকেন।
ভাবার্থ - প্রাণকে বশীভূত করেছেন এমন য়োগী সর্বদা বেদের ঋচার মধ্যে রমণ করেন। তিনি প্রাণীমাত্রের আত্মার মধ্যে নিরন্তর ঈশ্বরের বাস অনুভব করার সঙ্গে-সঙ্গে সর্বদা তাদের হিতচিন্তন করেন। তাঁর মনের মধ্যে যখনই কোনো বিকার উৎপন্ন হতে থাকে, তখনই তিনি নিজের মনকে আদেশ দিয়ে মন্দ বিচারকে বাইরে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। য়োগী ব্যক্তির আত্মবল খুব প্রবল হয়, কারণ তিনি সর্বদাই স্বয়ংকে ঈশ্বরাধীন অনুভব করেন।
.
এই ভাষ্যগুলোকে পড়ে যেকোনো বেদবিরোধী এটা বলুক যে এই ভাষ্যগুলোর উপরে তার কি আপত্তি আছে?

৪.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 4.31.7

"Let the King [Varuna] and Manyu, the warm emotion give us the wealth of both kinds- earned and gathered.

Let our enemies overwhelmed with terror in their mind and spirit and defeated in their design run away."
- Tr. Vaidyanath Shastri.

Tasks Acharya also writes about terror, Nirukta 10.21... These are hemistichs. Like a spear hurled, it inspires terror (among enemies) or courage (among friends)...

এখানেও আক্ষেপকর্তা বেদের মধ্যে শত্রুকে আতঙ্কিত করা তথা ভক্তদের ধনাদি দেওয়ার অভিযোগে করেছেন।
.
উত্তর - আমি এরপূর্বে এটা বুঝিয়েছি যে বৈদিক সংস্কৃতির মধ্যে চোর, ডাকাত, ছিনতাইবাজ, দুরাচারী আর অন্যায়কারী ব্যক্তিদেরই দুষ্ট আর শত্রু বলা হয়েছে। বস্তুতঃ এমন ব্যক্তিরা মানবতার শত্রু হয়, তাদের অবশ্যই দণ্ড দেওয়া উচিত। এখানে আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর দ্বারা করা ইংরাজী অনুবাদটাও পূর্বের অনুবাদের মতো অতি সামান্য আর অস্পষ্ট আছে, কিন্তু সেগুলোর ভাবকে জানতে হলে আপনাকে বৈদিক সংস্কৃতির সঙ্গে নিষ্পক্ষতাপূর্বক অবগত হতে হবে আর আমার দ্বারা এপর্যন্ত করা সমাধানকেও বুদ্ধি আর হৃদয়ের মধ্যে বসাতে হবে। এই অনুবাদের মধ্যে আপনি কোন দোষটা দেখেছেন?
.
এই মন্ত্রের উপর আমি নিজের শৈলীতে বিচার করবো -

সম্সৃষ্টম্ ধনমুভয়ম্ সমাকৃতমস্মভ্যম্ ধত্তাম্ বরুণশ্চ মন্যুঃ। ভিয়ো দধানা হৃদয়েষু শত্রবঃ পরাজিতাসো অপ নি লয়ন্তাম্।। (অথর্ববেদ ৪.৩১.৭)
.
এর ঋষি হল ব্রহ্মাস্কন্দ।[ব্রহ্মা = বলম্ বৈ ব্রহ্মা (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৮.৫.২)] এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি এমন কিছু বিশেষ ঋষি রশ্মির দ্বারা হয়, যা উপযোগী বলগুলোকে গতি প্রদান করে অর্থাৎ সেগুলোকে সমৃদ্ধ করে আর অনুপযোগী অথবা বাধক বলগুলোকে শোষিত করে নেয় অর্থাৎ সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এর দেবতা হল মন্যু আর ছন্দ হল জগতী। "মন্যু" বিষয়ে মহর্ষি য়াস্ক বলেছেন -

মন্যুঃ মন্যতের্দীপ্তিকর্মণঃ ক্রোধকর্মণো বধকর্মণো বা মন্যন্ত্যস্মাদিষবঃ (নিরুক্ত ১০.২৯)। এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবে অনিষ্ট এবং বাধক পদার্থকে ধ্বংসকারী রশ্মিগুলো আকাশের মধ্যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত স্পন্দিত হতে থাকে আর সম্পূর্ণ পদার্থের মধ্যে উজ্জ্বল বর্ণের উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হতে থাকে। এর ভাষ্য এইরকম হবে -

আধিদৈবিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) [বরুণঃ = স য়দগ্নির্ঘোরসম্স্পর্শস্তদস্য ( = অগ্নেঃ) বারুণম্ রূপম্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.৪), য়ঃ প্রাণঃ স বরুণঃ (গোপথ ব্রাহ্মণ উত্তরভাগ ৪.১১), অপানো বরুণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৪.২.৬), ব্যানো বরুণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৯.১.১৬)] এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই অতি তীক্ষ্ম অগ্নি বিদ্যমান আছে, সেখানে প্রাণ, অপান এবং ব্যানের ত্রিক সূক্ষ্ম বাধক পদার্থকে নষ্ট করার জন্য তেজস্বী হয়ে ওঠে, এই ত্রিক পদার্থকে সংকুচিত আর ঘনীভূতও করে। (সম্সৃষ্টম্, সমাকৃতম্, উভয়ম্, ধনম্) দুই প্রকারের অর্থাৎ ভালোভাবে মিশ্রিত সূক্ষ্ম পদার্থ এবং ভালো করে আকার প্রাপ্ত করা পদার্থ অর্থাৎ মূর্ত আর অমূর্ত উভয় প্রকারের পদার্থের দ্বারা (অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) এই ছন্দ রশ্মির কারণরূপ ঋষি রশ্মিগুলোকে ধারণ করে রাখে।

(পরাজিতাসঃ) যেসব বাধক ও অনিষ্ট পদার্থকে এই ত্রিক রূপ রশ্মি সমূহ পরাজিত করে রেখেছে, সেগুলোর (হৃদয়েষু) [হৃদয়ম্ = আত্মা বৈ মনো হৃদয়ম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৩.৮), হৃদয়ম্ বৈ স্তোমভাগাঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৬.২.১৫)] ভিতরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু এবং অন্য রশ্মির মধ্যে (ভিয়ঃ, দধানাঃ) অনেক প্রকারের তীব্র কম্পনকে উৎপন্ন করে দেয়, যারফলে (শত্রবঃ, অপ, নি, লয়ন্তাম্) সেই বাধক বা হিংসক পদার্থ খণ্ড-খণ্ড হয়ে সুদূর আকাশের মধ্যে লীন হয়ে যায় অর্থাৎ সূক্ষ্ম ভাগে পরিণত হয়ে অশক্তরূপে আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
.
ভাবার্থ - এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই তীব্র উষ্মা বিদ্যমান আছে, সেখানে সমস্ত বাধক আর অনিষ্ট পদার্থ ছিন্ন-ভিন্ন বা নষ্ট হয়ে যায়। সেইসব ছিন্ন-ভিন্ন পদার্থ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। সূক্ষ্ম পদার্থের পরস্পর সংযোজনও উচ্চ তাপযুক্ত অবস্থার মধ্যেই হয়।
.
আধিভৌতিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) বিদ্বান সজ্জনদের দ্বারা বরণীয়, দুষ্ট জনদের বাঁধনকারী এবং অপরাধীদের উপরে ক্রোধ করে এমন শ্রেষ্ঠ রাজা (সম্সৃষ্টম্) রাষ্ট্রের মধ্যে উৎপন্ন অন্নাদি ভোজ্য পদার্থ এবং খনিজ আদি বিভিন্ন প্রকারের পদার্থ (সমাকৃতম্) প্রজার থেকে সংগৃহীত করা কর (উভয়ম্, ধনম্) এই দুই প্রকারের ধনকে (অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) আমাদের প্রজাজনকে সমুচিত রূপে প্রদান করবেন। (পরাজিতাসঃ, শত্রবঃ) তিনি পরাজিত হওয়া দুষ্ট শত্রুর (হৃদয়েষু, ভিয়ঃ, দধানাঃ) হৃদয়ে ভয় উৎপন্ন করেন, যারফলে (অপ, নি, লয়ন্তাম্) সেই শত্রুরা দূরে পালিয়ে যায়, পুনরায় কখনও ফিরে আসে না অথবা তারা শত্রুতার ব্যবহারকেই সর্বথা ত্যাগ করে দেয়।
.
ভাবার্থ - যেকোনো রাষ্ট্রের রাজা বিদ্বান সদাচারিদের দ্বারাই চয়ন করা উচিত। এমন রাজার কর্তব্য হল তিনি রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ সম্পত্তির বাস্তবিক স্বামিনী প্রজাকেই ভাববেন আর সেটা প্রজার কল্যাণের জন্যই ব্যয় করবেন। সেই রাজা অপরাধী এবং রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী তত্ত্ব এবং বিদেশী শত্রুকে যথাপরাধ কঠিন দণ্ড দিবেন, যাতে তারা রাষ্ট্রের কোনো হানি না ঘটাতে পারে।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) সবার বরণীয় সর্বোৎকৃষ্ট মন্যুরূপ পরমেশ্বর (সম্সৃষ্টম্) আমাদের ক্রিয়মাণ কর্ম (সমাকৃতম্) এবং সঞ্চিত কর্ম (উভয়ম্, ধনম্, অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) উভয়ের অনুসারে আমাদেরকে সাংসারিক পদার্থ আর বুদ্ধি আদি ইন্দ্রিয় প্রদান করেন। (হৃদয়েষু, ভিয়ঃ, দধানাঃ) সেই পরমেশ্বর বিভিন্ন প্রকারের পাপ কর্মের প্রতি পবিত্র হৃদয় যুক্ত মানুষের হৃদয়ে ভয়, লজ্জা, শঙ্কা আদি উৎপন্ন করেন, (পরাজিতাসঃ, শত্রবঃ) যারদ্বারা বিভিন্ন প্রকারের পাপরূপ শত্রু পরাজিত হয়ে (অপ, নি, লয়ন্তাম্) দূরে চলে যায়।
.
ভাবার্থ - এই সৃষ্টির মধ্যে পরমেশ্বরের থেকে অধিক কোনো শ্রেষ্ঠ আর উপাস্য সত্তা নেই। সেই ঈশ্বর তাঁর ন্যায়ানুসারে আমাদের এই জন্ম তথা পূর্ব জন্মে করা কর্মের অনুসারে ফল প্রদান করেন। যে সকল মানুষের অন্তঃকরণ পবিত্র আর শান্ত হয়, তাদের হৃদয়ে পরমাত্মা যেকোনো অনুচিত কর্ম করতে ইচ্ছা করার সময় ভয়, লজ্জা আর শঙ্কা উৎপন্ন করেন, যারফলে তারা পাপ কর্ম করার থেকে বেঁচে যায়। যদিও এই ভয়, লজ্জা আর শঙ্কা সকল মানুষের হৃদয়ে উৎপন্ন হয়, কিন্তু অবিদ্যাদি দোষে গ্রস্থ দুরাত্মা এবং অশান্তাত্মা সেটা অনুভব করতে পারে না। এই কারণে আমি এখানে পবিত্র অন্তঃকরণকারীর মধ্যে ভয়, লজ্জা, শঙ্কা আদি হওয়া বলেছি। এই কারণে প্রত্যেক মানুষের উচিত যে তারা বিদ্যার অভ্যাসের পাশাপাশি উপাসনার দ্বারা নিজ অন্তঃকরণকে পবিত্র আর শান্ত রাখার চেষ্টা নিরন্তর করতে থাকবেন, যাতে পরমেশ্বরের প্রেরণার দ্বারা তাদের কর্তব্যাকর্তব্যের সঠিক বোধ হতে থাকে।
.
বলুন সুলেমান রিজভী! আপনি এই মন্ত্রের মধ্যে কোথায় হিংসা দেখেছেন? আপনি তো অনুবাদকের অভিপ্রায়কেও বুঝতে পান না আর কাকবৎ চেষ্টা করে স্বচ্ছ-পরিষ্কার ত্বকের মধ্যেও ঘা করার চেষ্টা করেন। আপনি যে নিরুক্তের ভাষ্যটা দিয়েছেন, সেটাও কেবল অনুবাদই আছে। এটা কোন অংশের অনুবাদ, এটাও কি আপনার জ্ঞাত আছে? বলতে পারবেন না। চলুন কোনো ব্যাপার না, আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি যে আপনি নিম্নলিখিত অংশের অনুবাদের ভাগ উদ্ধৃত করেছেন। নিরুক্তের সেই অংশটা হল এইরকম -
.
"সেনেব সৃষ্টা। ভয়ম্ বা বলম্ বা দধাতি। অস্তুরিব দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা ভয়প্রতীকা। বলপ্রতীকা য়শঃ প্রতীকাঃ। মহাপ্রতীকা দীপ্তপ্রতীকা বা।"
.
মহর্ষি য়াস্কের এই কথন হল "সেনেব সৃষ্টাম্ দধাত্যস্তুর্ন দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা" (ঋগ্বেদ ১.৬৬.৪) মন্ত্রের ভাষ্য। এর ব্যাখ্যা আপনার মতো ব্যক্তির মাথায় আসবে না।
এই সম্পূর্ণ মন্ত্রটা হল এইরকম -
সেনেব সৃষ্টামম্ দধাত্যস্তুর্ন দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা।
য়মো হ জাতো য়মো জনিত্বম্ জারঃ কনীনাম্ পতির্জনীনাম্।। (ঋগ্বেদ ১.৬৬.৪)
.
এই মন্ত্রের উপরে আমার আধিদৈবিক ব্যাখ্যা (নিরুক্তের অনুসারে) হল এইরকম -
.
এই ঋচার ঋষি হল পরাশর। এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হিংসক পদার্থের নাশক বজ্র রশ্মি থেকে হয়েছে। এর দেবতা অগ্নি তথা ছন্দ বিরাট্ পঙক্তি হওয়াতে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে বিভিন্ন রূপ যুক্ত নীলবর্ণের উৎপত্তি ও সমৃদ্ধি হয়।
.
আধিদৈবিক ভাষ্য -
(সেনা, ইব, সৃষ্টা, অমম্, দধাতি, অস্তুঃ, ন, দিদ্যুত্, ত্বেষ, প্রতীকা) "সেনেব সৃষ্টা ভয়ম্ বা বলম্ বা দধাতি অস্তুরিব দিদ্যুত্ত্বেষপ্রতীকা ভয় প্রতীকা বলপ্রতীকা য়শঃপ্রতীকাঃ মহাপ্রতীকা দীপ্তপ্রতীকা বা" সেই য়মরূপ বিদ্যুৎ অগ্নি প্রেরিত করা সেনার সমান বিভিন্ন বাধক পদার্থকে আতঙ্কিত অর্থাৎ কম্পিত করে। এর অর্থ হল যেভাবে যুদ্ধের জন্য প্রেরিত সেনা শত্রুকে আতঙ্কিত করে, সেইরূপ তীব্র অগ্নি সেই বাধক বা হিংসক পদার্থকে কম্পায়মান করে দেয়। একইসঙ্গে যেভাবে কোনো রাজার সুদৃঢ় সেনা সেই রাজা বা রাষ্ট্রকে বল প্রদান করে, সেইরূপ অগ্নিতত্ত্ব বিভিন্ন সংযোগযোগ্য কণাকে উপযুক্ত বল প্রদান করে। এখানে উপমাবাচী "ইব" পদকে নিরর্থক ধরে নিলে অর্থ এইরকম হবে -
.
অগ্নির তীক্ষ্ম কিরণের সেনা অর্থাৎ সমান গতি আর বল দ্বারা গমনকারী তীক্ষ্ম কিরণ উৎপন্ন হওয়া মাত্রই বাধক এবং হিংসক পদার্থের মধ্যে তীব্র কম্পন করাতে থাকে। সেইসব তীব্র কিরণ সংযোগযোগ্য কণাকে য়জন কর্ম করার জন্য উপযুক্ত বলও প্রদান করে। সেইসব কিরণ প্রক্ষেপক বল [বিদ্যুৎ = বিচ্ছেদিকা (মহর্ষি দয়ানন্দ ভাষ্য)] যুক্ত পদার্থের সমান বিভিন্ন কণাকে বিখণ্ডনকারী হয়। সেগুলো দীপ্তি দেখাতে, কম্পন করাতে, বলকে উৎপন্ন করতে, তেজকে উৎপন্ন করতে, ব্যাপক রূপে দৃশ্যমান আর সবকিছুকে প্রকাশিত করে। এইসব গুণ তীব্র ঊর্জা যুক্ত তরঙ্গের বলা হয়েছে।
.
(য়মঃ, হ, জাতঃ, য়মঃ, জনিত্বম্, জারঃ, কনীনাম্, পতিঃ, জনীনাম্) "য়ম ইব জাতঃ য়মো জনিষ্যমাণঃ জারঃ কনীনাম্ জরয়িতা কন্যানাম্ পতির্জনীনাম্ পালয়িতা জায়ানাম্ তৎপ্রধানা হি য়জ্ঞসম্য়োগেন ভবন্তি" সবার নিয়ন্ত্রক সেই অগ্নি নিশ্চিত রূপে বায়ুতত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়। এর উৎপত্তি পূর্ব খণ্ডের মধ্যে বর্ণিত ইন্দ্র রূপ য়মের সমানই হয় অথবা য়মরূপ বায়ু থেকেই এর উৎপত্তি হয়। সৃষ্টির সব কণা আদি পদার্থ য়মরূপ অগ্নি থেকেই উৎপন্ন হয় আর নিরন্তর এইভাবে উৎপন্ন হতে থাকবে। এই অগ্নিতত্ত্ব কন্যা অর্থাৎ আকর্ষণ আর দীপ্তিযুক্ত তরঙ্গ, যার বিষয়ে নিরুক্ত খণ্ড ৪.১৫ পঠনীয়, তাকে জীর্ণ করে। এখানে আকর্ষণ এবং দীপ্তিযুক্ত কিরণের তাৎপর্য হল সেই সূক্ষ্ম কণা, যেগুলো কণার সঙ্গে তরঙ্গ রূপ ব্যবহারও করে। এইরকম কণাকে বর্তমান ভৌতিকীতে মূল কণা বলা হয়। অগ্নি কিভাবে এগুলোকে জীর্ণ করে, এই প্রশ্ন গম্ভীর্তাপূর্ণ বিচারণীয়।
.
এখানে জীর্ণের অর্থ পুরোনো মানা উচিত নয়, বরং এর অর্থ দীপ্তিযুক্ত মানা উচিত। এই পদ "জৄ বয়োহানৌ" ধাতু দ্বারা ব্যুৎপন্ন হয়েছে। মন্ত্রের মধ্যে "জারঃ" পদ আছে, সেটাও এই ধাতু দিয়ে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই পদের অর্থ করতে "জীর্ণঃ" পদ ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রন্থকার এই ধাতুকে স্তুতিকর্মা বলেছেন। (দেখুন - খণ্ড ১০.৮) এই কারণে জারঃ পদের অর্থ প্রকাশক হবে, কোনো পদার্থের আয়ুকে হ্রাসকারী হবে না। এটা সর্ববিদিত যে অগ্নিই সব পদার্থের প্রকাশক হয়, এইজন্য একে এখানে কমনীয় তরঙ্গের প্রকাশক বলা হয়েছে। এই সৃষ্টির মধ্যে যেসব পদার্থ প্রকাশযুক্ত হয়, অগ্নিই হল তার কারণ। একে জনী অর্থাৎ উৎপন্ন পদার্থের পতিও বলা হয়েছে। এর কারণ হল পৃথিবী এবং আপঃ আদি পদার্থের পালক এবং রক্ষকই হল অগ্নি।
.
একথা সাধারণ যে বিনা অগ্নি অর্থাৎ ঊর্জা ছাড়া বর্তমান ভৌতিকীর মধ্যে তথাকথিত যেকোনো দ্রব্য পদার্থের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। ঊর্জা থেকেই এইসব পদার্থের উৎপত্তি হয় আর এর কারণেই যেকোনো কণা আদি পদার্থের অস্তিত্বের রক্ষাও হয়। এখানে গ্রন্থকার "জনী"-র অর্থ "জায়া" করেছেন। এর অর্থ হল অগ্নি আপঃ এবং পৃথিব্যাদি কণার সাপেক্ষ পুরুষরূপ ব্যবহার করে, এই কারণে সেটা স্ত্রীরূপ আপঃ এবং পৃথিব্যাদি কণার পালক আর সংরক্ষক হয়। এর কারণ হল অগ্নি ছাড়া এই দুই পদার্থের না কেবল অস্তিত্ব অসম্ভব হবে, বরং সেগুলো থেকে যেকোনো প্রকারের পদার্থের উৎপত্তিও অসম্ভব হবে।
.
এখানে "তৎপ্রধানা হি য়জ্ঞসম্য়োগেন ভবন্তি" কথনের তাৎপর্য হল স্ত্রীরূপ কণা আদি পদার্থ য়জন কর্মের দ্বারাই অগ্নি প্রধান হয়। আমার মতে এখানে গ্রন্থকারের অভিপ্রায় হল স্ত্রী সংজ্ঞক পদার্থ যখন য়জনশীল হয়, সেই সময় সেগুলো বিশেষ ঊর্জাযুক্ত হয় অর্থাৎ দুটো কণার সংযোগের সময় অকস্মাৎ সেই কণাগুলোর ঊর্জা বা গতি বিশেষ ভাবে বেড়ে যায়, এখানে একেই স্ত্রীরূপ কণার অগ্নি প্রধান হওয়া বলা হয়েছে।
.
এখানে আমি ঋষি দয়ানন্দের আধিভৌতিক ভাষ্যই উদ্ধৃত করবো, সেটা হল এইরকম -
.
পদার্থ - (সেনেব) য়থা সুশিক্ষিতা বীরপুরুষাণাম্ বিজয়কর্ত্রী সেনাস্তি তথাভূতঃ (সৃষ্টা) য়ুদ্ধায় প্রেরিতা (অমম্) অপরিপক্ববিজ্ঞানম্ জনম্ (দধাতি) ধরতি (অস্তুঃ) শত্রূণাম্ বিজেতুঃ প্রক্ষেপ্তঃ (ন) ইব (দিদ্যুত্) বিচ্ছেদিকা (য়মঃ) নিয়ন্তা (হ) কিল (জাতঃ) প্রকটত্বম্ গতঃ (য়মঃ) সর্বোপরতঃ (জনিত্বম্) জন্মাদিকারণম্ (জারঃ) হন্তা সূর্য়্যঃ (কনীনাম্) কন্যেব বর্ত্তমানানাম্ রাত্রীণাম্ সূর্য়্যাদীনাম্ বা (পতিঃ) পালয়িতা (জনীনাম্) জনানাম্ প্রজানাম্।
.
ভাবার্থঃ - অত্রোপমালঙ্কারঃ। মনুষ্যৈর্বিদ্যয়া সম্যক্ প্রয়ত্নেন য়থা সুশিক্ষিতা সেনা শত্রূন্ বিজিত্য বিজয়ম্ করোতি। য়থা চ ধনুর্বেদবিদঃ শত্রূণামুপরি শস্ত্রাস্ত্রাণি প্রক্ষিপ্যৈতান্বিচ্ছিদ্য প্রলয়ম্ গময়ন্তি তথৈবোত্তমঃ সেনাऽধিপতিঃ সর্বদুঃখানি নাশয়তীতি বোদ্ধব্যম্।
.
পদার্থ - হে মানব! তোমরা যে সেনাপতি (য়মঃ) নিয়ম কর্তা (জাতঃ) প্রকট (য়মঃ) সর্বথা নিয়মকর্তা (জনিত্বম্) জন্মাদি কারণযুক্ত (কনীনাম্) কন্যাবৎ বর্তমান রাত্রির (জারঃ) আয়ুর হননকর্তা সূর্যের সমান (জনীনাম্) উৎপন্ন হওয়া প্রজার (পতিঃ) পালনকর্তা (সৃষ্টা) প্রেরিত (সেনেব) শুভ শিক্ষাপ্রাপ্ত হওয়া বীর পুরুষের বিজয়কারী সেনার সমান (অস্তুঃ) শত্রুর উপর অস্ত্র-শস্ত্র প্রহারকারী (ত্বেষপ্রতীকা) দীপ্তির প্রতীতিকারী (দিদ্যুন্ন) বিদ্যুতের সমান (অমম্) অপরিপক্ব বিজ্ঞানযুক্ত জনকে (দধাতি) ধারণ করে, তার সেবন করো।
.
ভাবার্থ - এই মন্ত্রের মধ্যে উপমালঙ্কার আছে। মানুষের উচিত বিদ্যার মাধ্যমে ভালো ভাবে চেষ্টার দ্বারা যেভাবে উত্তম শিক্ষার দ্বারা সিদ্ধ করা সেনা শত্রুকে জিতে বিজয় করে, যেমন ধনুর্বেদের জ্ঞাতা বিদ্বানগণ শত্রুর উপর অস্ত্র-শস্ত্র প্রহার করে তাদের ছেদন করে তাড়িয়ে দেয়, সেইরূপ উত্তম সেনাপতি সব দুঃখের নাশ করেন, এটা তোমরা জেনে রাখবে।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য - (সৃষ্টা, ত্বেষপ্রতীকা, সেনা, ইব) [ত্বেষপ্রতীকা = ভয়প্রতীকা বলপ্রতীকা য়শঃপ্রতীকা মহাপ্রতীকা দীপ্তপ্রতীকা (নিরুক্ত ১০.২১)] কুশলতা-পূর্বক সুসজ্জিত বল, ভয় আর তেজস্বিতার প্রতীক সেনার সমান (য়মঃ, হ, জাতঃ) জিতেন্দ্রিয়তা আদি গুণ দ্বারা প্রসিদ্ধ বিদ্বান (অমম্, দধাতি) [অমঃ = গৃহম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৫.৫৬.৩), অমম্ ভয়ম্ বলম্ বা (নিরুক্ত ১০.২১), অমা গৃহনাম (নিঘন্টু ৩.৪)] সবার আশ্রয়দাতা এবং সমস্ত বলের দাতা পরমাত্মাকে ধারণ করেন। (অস্তুঃ, ন, দিদ্যুত্) [অস্তুঃ = শত্রুনাম বিজেতুঃ প্রক্ষেপ্তুঃ (ঋষি দয়ানন্দ ভাষ্য)] সেই য়োগনিষ্ঠ বিদ্বান শত্রুর উপর বিজয়প্রাপ্ত করা সেনার সমান নিজের সব দোষকে কেটে ফেলেন। (য়মঃ, জনিত্বম্, জারঃ) সেই নিয়তাত্মা য়োগী নিজের জন্ম-মরণের কারণরূপ অবিবেককে নিজ সাধনার দ্বারা নিরন্তর জীর্ণ করতে থাকেন। (কনীনাম্, জনীনাম্, পতিঃ) [কনীনঃ = কনী দীপ্তিকান্তিগতিষু (ভ্বা.) ধাতোর্বাহু. ঈনপ্রত্যয়ঃ (বৈদিক-কোষ)] সেই য়োগী ব্রহ্মতেজ পান করে মানবমাত্রকে নিজের সদুপদেশের দ্বারা সংরক্ষণ করেন।
.
ভাবার্থ - যেভাবে শত্রুকে নিজ বল আর তেজস্বিতার দ্বারা আতঙ্কিত করে এমন সেনা শত্রুকে দূরে তাড়িয়ে দেয়, সেইরূপ য়োগনিষ্ঠ বিদ্বান নিজের সব দোষ আর পূর্বজন্মের সংস্কারকে দগ্ধবীজ করতে সক্ষম হন। এইরূপ সক্ষম সেই য়োগী পরব্রহ্ম পরমাত্মার জ্ঞান আর আনন্দকে ধারণ করে পরমলোককে প্রাপ্ত করেন। এমন য়োগী পুরুষ নিজ সদুপদেশের দ্বারা নিরন্তর সকল প্রাণীর উপকারেও সংলগ্ন থাকেন। পরোপকার বিনা কোনো ব্যক্তিই য়োগী হতে পারবেন না। যারা সমাজ থেকে দান বা ভিক্ষা আদি প্রাপ্ত করে নিজের জীবনযাপন করেন, তারা সমাজের ঋণী হন আর সেই ঋণকে শোধ না করে যদি কেউ কেবল আত্মকল্যাণ হেতু সর্বদা য়োগসাধনাই করতে থাকেন, তার য়োগ কখনও সিদ্ধ হবে না। এইজন্য মুমুক্ষুজনদের উচিত সমাজের ঋণ থেকে উঋণ হওয়ার জন্য তারা নিরন্তর নিজের সদুপদেশের দ্বারা প্রাণীমাত্রের কল্যাণ করার চেষ্টা করতে থাকবেন।
.
এই প্রকরণের উপর কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি আপত্তির করতে পারবেন?

৫.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 5.20.4-5

"Let this war-drum victorious in the battle, loudly roaring and becoming the means of seizing whatever may be seized, be seen by all. Let this war-drum utter wonderful voice and let the army-controlling man capture the possessions of the enemies. Amid the conflict of the deadly weapons let the woman of enemy waked by the roar and afflicted run forward in her terror hearing the resounding and far reaching voice of the war-drum, holding her son in her hand."
- Tr. Vaidyanath Shastri.

দুন্দুভের্বাচম্ প্রয়তাম্ বদন্তীমাশৃণ্বতী নাথিতা ঘোষবুদ্ধা। নারী পুত্রম্ ধাবতু হস্তগৃহ্যামিত্রী ভীতা সমরে বধানাম্।।৫।।
.
দুন্দুভি বাদ্যের স্পষ্ট বেরিয়ে আসা ধ্বনিকে শুনে তার গর্জনে জেগে ওঠা রিপু-স্ত্রীগণ সংগ্রামে বীর (পতি) -দের মরে যাওয়ার কারণে আতঙ্কিত হয়ে নিজ পুত্রের হাত ধরে পালিয়ে যাবে।
.
এখানেও পূর্ববৎ আক্ষেপ করা হয়েছে।
.
উত্তর - এখানে যে মন্ত্রটা উদ্ধৃত করা হয়েছে, তার ঋষি হল ব্রহ্মা। [ব্রহ্মা = প্রাণদেবত্যো বৈ ব্রহ্মা (ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ ২.৯)] এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি বিভিন্ন প্রাণ রশ্মির দ্বারা হয়। বিভিন্ন বলকে উৎপন্ন করতে যখন প্রাণ রশ্মির ভূমিকা হয়, সেই সময়ই এই ছন্দ রশ্মি প্রকট হয়, বিশেষ করে অত্যন্ত তীব্র ভেদক বল উৎপন্ন হওয়ার সময়। এর দেবতা হল দুন্দুভি, যার চর্চা আমি পূর্বে করেছি। এর ছন্দ হল ত্রিষ্টুপ্। এই কারণে এর দৈবত প্রভাব আক্ষেপ সংখ্যা ৩ এরমধ্যে নির্দিষ্ট মন্ত্রের দৈবত প্রভাবের সমান হয়। এর ছান্দস প্রভাবে তীব্র বল উৎপন্ন হয় আর রক্তবর্ণীয় তেজও উৎপন্ন হতে থাকে। এর ভাষ্য এইরকম হবে -

আধিদৈবিক ভাষ্য - (দুন্দুভেঃ) দুন্দুভি সংজ্ঞক পূর্বোক্ত সংযোজক ঊর্জা (প্রয়তাম্, বদন্তীম্) প্রকৃষ্ট রূপে পদার্থকে নিয়ন্ত্রণকারী তীব্র গতিযুক্ত (বাচম্) বাক্ রশ্মিগুলোকে (সমরে, বধানাম্) হিংসক পদার্থের সংগ্রাম বা সংঘর্ষের সময় (আমিত্রী, নারী) [নারী = য়জ্ঞনাম (নিঘন্টু ৩.১৭), পুমাম্সো বৈ নরঃ স্ত্রিয়ো নার্য়ঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.৩৪)] বাধক অসংযোগযোগ্য পদার্থ দিয়ে ঘেরা য়োষা রূপ কণা বা রশ্মি আদি পদার্থ (ঘোষবুদ্ধা) তীব্র বাক্ রশ্মির দ্বারা সক্রিয় হওয়া (নাথিতা) [নাথিতা পদ 'নাথৃ য়াচ্ঞোপতাপৈশ্বর্য়াऽऽশীঃষু' ধাতু দ্বারা ব্যুৎপন্ন হয়।] বৃষারূপ রশ্মি বা কণা আদি পদার্থের দ্বারা আকৃষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত থেকে (ভীতা) কম্পন করে (আশৃণ্বতি) নিজের চারিদিকে গমন করা বাক্ রশ্মির কারণে চাঞ্চল্যতা তৈরি করে (পুত্রম্, হস্তগৃহ্য) [পুত্রম্ = পুত্রো বৈ বীরঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৩.১.১২) প্রাণা বৈ দশ বীরাঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৮.১.২২)] প্রাণাপানাদি প্রাণ রশ্মির হরণশীল বলকে প্রাপ্ত করে (ধাবতু) শুদ্ধ হয়ে অর্থাৎ বাধক ও অসংযোগযোগ্য পদার্থ থেকে মুক্ত হয়ে বৃষা রূপ পদার্থের দিকে গমন করতে থাকে।
.
ভাবার্থ - এই সৃষ্টির মধ্যে সর্বদা প্রকাশিত আর অপ্রকাশিত এমন তীক্ষ্ম রশ্মি উৎপন্ন হয়, যা তীব্র ধ্বনি উৎপন্ন করতে-করতে বাধক পদার্থের উপর প্রহার করে আর অপ্রকাশিত পদার্থের মাঝে ফেঁসে থাকা প্রকাশিত পদার্থকে মুক্ত করে দেয়। ধ্যাতব্য হল, প্রকাশিত পদার্থ দুই প্রকারের হয়, যার মধ্যে প্রথম প্রকারের পদার্থ পুরুষের সমান ব্যবহার করে। বাধক ও অসংযোগযোগ্য পদার্থ থেকে মুক্ত হওয়া এই পদার্থ পরস্পর সংযোগ করে বিভিন্ন প্রকারের পদার্থের রচনা করে।
.
আধিভৌতিক ভাষ্য - এখানে আপনিও কারও ভাষ্য হিন্দিতে দিয়েছেন, যেটা ভাবার্থ রূপেই আছে। এর ভাষ্য আর্য বিদ্বান পণ্ডিত ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদী এইরকম করেছেন -

দুন্দুভের্বাচম্ প্রয়তাম্ বদন্তীমাশৃণ্বতী নাথিতা ঘোষবুদ্ধা। নারী পুত্রম্ ধাবতু হস্তগৃহ্যামিত্রী ভীতা সমরে বধানাম্।। (অথর্ববেদ ৫.২০.৫)
.
ভাবার্থ - (দুন্দুভেঃ) দুন্দুভির (প্রয়তাম্) নিয়মযুক্ত, (বদন্তীম্) প্রতিধ্বনিত হয়ে (বাচম্) ধ্বনিকে (আশৃণ্বতী) শ্রবণ করে, (ঘোষবুদ্ধা) গর্জনে জেগে ওঠা, (নাথিতা) অধীন হওয়া, (বধানাম্) মারূশাস্ত্রের (সমরে) সমরের মধ্যে (ভীতা) আতঙ্কিত (আমিত্রী) প্রতিপক্ষের (নারী) নারী (পুত্রম্) পুত্রকে (হস্তগৃহ্য) হাতে ধরে (ধাবতু) পালিয়ে যাবে।
.
ভাবার্থ - যোদ্ধাগণ নিয়মপূর্বক দুন্দুভি বাজাবে, যাতে শত্রুরা পরাজিত হয় আর তাদের স্ত্রী আদিও ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়।
.
এই ভাষ্যের উপরে আপনার কি আপত্তি আছে? আপনার কুরআনের মধ্যে তো শত্রুর মহিলা আর বাচ্চাদের লুট করার বিধান আছে আর এই বর্বরতাপূর্ণ কামুকতার তাণ্ডব সারা সংসার দেখেছে আর এই কারণেই ভারতবর্ষের হাজার-হাজার ক্ষত্রাণি জীবিত অবস্থায় চিতার মধ্যে জ্বলতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা তো আপনার ভালো লাগবে? এখানে বেদ তো কেবল দুষ্ট অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছে আর যুদ্ধও অন্তিম বিকল্প হয়। সেই যুদ্ধেরও নিশ্চিত নিয়ম আর মর্যাদা আছে। এমন মর্যাদার কারণেই এখানে স্ত্রী আর বাচ্চাদের যুদ্ধস্থল থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে, যাতে তারা সুরক্ষিত থাকতে পারে, তাদের লুট করতে বা মেরে ফেলার জন্য তো বলা হয়নি। তবে হ্যাঁ, স্ত্রীও যদি হিংসক হয়ে যুদ্ধ করে বা অত্যাচার করে, তাহলে তাকেও দণ্ডিত করার বিধান আছে।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য - (দুন্দুভেঃ) [দুন্দুভিঃ = পরমা বা এষা বাগ্ য়া দুন্দুভৌ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৩.৬.২.৩), দুন্দুভ্যতের্বা স্যাচ্ছব্দকর্মণঃ (নিরুক্ত ৯.১২)] সৃষ্টির প্রারম্ভে বেদের উপদেষ্টা, যাঁর মধ্যে পরম বাক্ অর্থাৎ বেদ বাক্ সর্বদা বিদ্যমান থাকে, সেই পরমাত্মা থেকে (প্রয়তাম্) সঠিকভাবে ব্যবস্থিত হওয়া (বদন্তীম্) বিভিন্ন প্রকারের ছন্দের রূপে উচ্চারিত ও প্রকাশিত হওয়া (বাচম্) বেদবাণীকে (আশৃণ্বতী) ব্রহ্মের মধ্যে স্থিত য়োগীর আত্মা চারিদিক থেকে অনুভব করে (ঘোষবুদ্ধা) সেই বেদবাণীর ঘোষ দ্বারা জেগে ওঠে অর্থাৎ যেভাবে রাত্রির অন্ধকারে শুয়ে থাকা মানুষ উষাকাল হওয়া মাত্র জেগে ওঠে, সেইভাবে বেদবাণীর ঘোষে অজ্ঞানরূপী অন্ধকার সর্বথা সমাপ্ত হয়ে জ্ঞানের প্রকাশ হয়ে যায়। একেই আত্মার জাগরণ বলা হয়েছে। (নাথিতা) সেই আত্মা পরব্রহ্ম পরমাত্মার সানিধ্যে অলৌকিক ঐশ্বর্যকে প্রাপ্ত করে।
.
(বধানাম্, সমরে) [বধ = বলনাম (নিঘন্টু ২.৯), বজ্রনাম (নিঘন্টু ২.২০)। সমরঃ = সম্+ঋ গতিপ্রাপণয়োঃ ধাতোঃ 'ঋদোরপ্' ইত্যপ্ অথবা শম অব্যৈক্লব্যে ধাতোর্বাহুলকাত্ ঔণাদিক অরঃ প্রত্যয়ঃ (বৈদিক কোষ)] পরমাত্মার সাক্ষাৎকারে মহান আত্মবল প্রাপ্ত করলে পরে সেই প্রশান্তাত্মা (ভীতা, আমিত্রী, নারী) থেকে ভয়ভীত হয়ে [নারী= নারাণামিয়ম্ ক্রিয়া (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ৫.২২)] তার অন্তঃকরণের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব অনিষ্ট ক্রিয়াগুলো অর্থাৎ কর্ম, যা ঈশ্বর থেকে বিমুখকারী হয়, (পুত্রম্, হস্তগৃহ্য, ধাবতু) সেগুলো নিজ সন্তানরূপ ফলকে সঙ্গে নিয়ে দূরে পালিয়ে যায়।
.
ভাবার্থ - যখন কোনো য়োগী য়োগসাধনা করেন, তখন তিনি অন্তরীক্ষস্থ বেদের ঋচা পরা ও পশ্যন্তী রূপে উপলব্ধ করেন। বেদের সেই ঋচার উৎপত্তিকর্তাও সেই পরমেশ্বর হন, যিনি এই সৃষ্টির উৎপত্তি করেছেন। সেই বেদবাণীকে শুনে আর তার অর্থের বোধ করে য়োগী পুরুষ পরমাত্মার প্রতি পূর্ণ সমর্পণযুক্ত হয়ে তাঁর মধ্যেই মগ্ন হয়ে যান। সেই সময় য়োগীর চিত্তে পূর্ব জন্মের কিছু অবাঞ্ছিত সংস্কার আর বাসনার সঙ্গে তার সংঘর্ষ হতে থাকে। এই সংঘর্ষের মধ্যে যে সকল অনিষ্ট কর্মের সংস্কার এবং বিচার বিদ্যমান থাকে, সেইসব নিজের সম্ভাবিত ফলের সঙ্গে দূরে চলে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। এইভাবে ধীরে-ধীরে সেই য়োগীর সমস্ত পূর্ব সংস্কার দগ্ধবীজ হয়ে যায় আর সেই য়োগী মুক্তির পথে চলে যান।
.
সূচনা - এপর্যন্ত আমি সব মন্ত্রের তিন প্রকারের ভাষ্য প্রস্তুত করেছি, কিন্তু এই আক্ষেপকর্তার বৌদ্ধিক দুর্বলতা এবং পূর্বাগ্রহগ্রস্থতা দেখার পশ্চাৎ এখন আমি উপলব্ধ ঋষি দয়ানন্দ বা আর্য বিদ্বানদের ভাষ্য দিয়েই সমাধান প্রস্তুত করার চেষ্টা করবো। কোথাও আবশ্যকতা হলে তবেই নিজের ভাষ্য করবো, সেটাও কেবল আধিভৌতিক ভাষ্য, কারণ আক্ষেপও আধিভৌতিক ভাষ্যের সঙ্গে সম্বন্ধিত। এখন আক্ষেপের উত্তর মাত্র দেওয়া আমার কর্তব্য হবে, বেদের গম্ভীর বিজ্ঞানকে উদ্ঘাটিত করা নয়।
.
এর কারণ হল দুর্বল বুদ্ধিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এতটা পরিশ্রম করা আমার উচিত বলে মনে হয় না। যারা তীব্র বুদ্ধি ও জিজ্ঞাসু প্রবৃত্তির পাঠক হবেন, তারা আমার এই পাঁচটা আক্ষেপের উত্তর এবং ভূমিকা থেকেই বেদের শ্রেষ্ঠতাকে বুঝে নিবেন। অধিক জ্ঞানের পিপাসু আমার অন্য গ্রন্থ, যার চর্চা আমি পূর্বেই করেছি, সেগুলো পড়তে পারবেন, সেগুলো না পড়ে বেদের বিজ্ঞানকে বোঝা একদমই সম্ভব নয়।

৬.
আক্ষেপ -
Rig Veda 1.103.6

"...The Hero, watching like a thief in ambush, goes parting the possessions of the Godless." - Tr. Ralph T.H. Griffith
.
উত্তর - এখানে এই মহাশয় ঈশ্বরকে চোর বলছেন আর তার জন্য গ্রিফিথ দ্বারা করা ইংরাজী অনুবাদ প্রস্তুত করেছেন, যেন গ্রিফিথ কোনো বেদের অনেক বড় বিদ্বান হন। যেসব বিদেশী ভাষ্যকারের উদ্দেশ্যই ছিল বেদকে বদনাম করা, তাকে প্রমাণ রূপে প্রস্তুত করা দুর্ভাবনারই পরিচায়ক হবে। আপনি আপনাদের চতুর্থ আর সপ্তম আকাশে বসবাস রত ঈশ্বরের লীলা তো দেখতে পান না, এইদিকে অভিযোগ করতে চলে এসেছেন।
.
স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর অনুবাদের ক্ষেত্রে বলতে গেলে, তিনি তো ঈশ্বরকে নাস্তিক আর জনতার শোষক অর্থাৎ চোর, ডাকু আর জ্ঞানের শত্রুর কাছ থেকে ধন ছিনিয়ে নিয়ে সৎ ব্যক্তিদের দেওয়ার কথা বলেছেন, তাঁকে আপনি কিভাবে চোর বলতে পারেন? মুসলিম আর ঈশাই আক্রান্তা ভারতবর্ষের ধন লুট করে নিয়ে গেছে, আপনার দৃষ্টিতে সেটা কি ভালো ছিল? আর দুষ্টের কাছ থেকে ধন নিয়ে সজ্জনকে দেওয়া কিভাবে চুরি হয়ে গেল? এই সংস্কার আপনার হতে পারে, আমার নয়।
.
এখন আমি এখানে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য প্রস্তুত করবো -

ভূরিকর্মণে বৃষভায় বৃষ্ণে সত্যশুষ্মায় সুনবাম
সোমম্। য় আদৃত্যা পরিপন্থীব শূরোऽয়জ্বনো বিভজন্নেতি বেদঃ।। (ঋগ্বেদ ১.১০৩.৬)

পদার্থ - (ভূরিকর্মণে) বহুকর্মকারিণে (বৃষভায়) শ্রেষ্ঠায় (বৃষ্ণে) সুখপ্রাপকায় (সত্যশুষ্মায়) নিত্যবলায় (সুনবাম) নিষ্পাদয়েম (সোমম্) ঐশ্বর্য়্যসমূহম্ (য়ঃ) (আদৃত্য) আদরম্ কৃত্বা (পরিপন্থীব) য়থা দস্যুস্তথা চৌরাণাম্ প্রাণপদার্থহর্ত্তা (শূরঃ) নির্ভয়ঃ (অয়জ্বনঃ) য়জ্ঞবিরোধিনঃ (বিভজন্) বিভাগম্ কুর্বন্ (এতি) প্রাপ্নোতি (বেদঃ) ধনম্।
.
ভাবার্থ - অত্রোপমালঙ্কারঃ। মনুষ্যৈর্য়ো দস্যুবৎ প্রগল্ভঃ সাহসী সন্ চৌরাণাম্ সর্বস্বম্ হৃত্বা সৎকর্মণামাদরম্ বিধায় পুরুষার্থী বলবানুত্তমো বর্ত্ততে, স এব সেনাপতিঃ কার্য়্যঃ।
.
পদার্থ - আমরা (য়ঃ) যিনি (শূরঃ) নির্ভীক পরাক্রমশালী পুরুষ (আদৃত্য) আদর সৎকার করে (পরিপন্থীব) যেমন সব প্রকারে মার্গে চলা ডাকু অন্যের ধন আদি সর্বস্ব হরণ করে নেয়, সেই রকম চোরের প্রাণ আর তাদের পদার্থকে ছিনিয়ে নিবেন সেই (বিভজন্) বিভাগ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ আর দুষ্ট পুরুষদের পৃথক-পৃথক করে তাদের মধ্যে (অয়জ্বনঃ) যারা যজ্ঞ করে না তাদের (বেদঃ) ধনকে (এতি) ছিনিয়ে নেন, সেই (ভূরিকর্মণে) ভারী কর্মকারী (বৃষভায়) শ্রেষ্ঠ (বৃষ্ণে) সুখদায়ক (সত্যশুষ্মায়) নিত্য বলী সেনাপতির জন্য যেমন (সোমম্) ঐশ্বর্য়্য সমূহকে (সুনবাম) উৎপন্ন করে, সেইরকম তুমিও করবে।
.
ভাবার্থ - এই মন্ত্রের মধ্যে উপমালঙ্কার আছে। মানুষের উচিত যে যিনি ডাকু আদির মতো এমন ধৃষ্ট হবেন আর সাহস করে চোরের ধন আদি পদার্থকে হরণ করে সজ্জনদের আদর করে পুরুষার্থী বলবান উত্তম হতে উত্তম হবেন, তাকেই সেনাপতি করবে।
.
আমি এখানে বলতে চাইবো যে সর্বপ্রথমে তো আপনি যজ্ঞ শব্দের অর্থ বুঝে নিবেন, যাকে আমি পূর্বে বুঝিয়েছি। এখানে বলা হয়েছে যে যেমন কোনো চোর বলপূর্বক কোনো পথিকের ধন হরণ করে নেয়, সেইরকম বীর পুরুষের উচিত যে তিনি চোর-ডাকাতের ধনকে বলপূর্বক ছিনিয়ে নিবেন আর যেসব পরোপকারী সজ্জন ব্যক্তি আছেন, তাদের আদর করবেন আর এমন বীর পুরুষই সেনাপতি হবেন। বর্তমানেও তো ন্যায়প্রিয় শাসক চোরের দ্বারা চুরি করা ধনের হরণ করে যার ধন চুরি হয়েছে, তাকে দিয়ে দেয় অথবা সেই ধন রাজকোষের মধ্যে ব্যবহৃত হয় আর এমন অবশ্যই হওয়া উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত চোরের ধন ছিনিয়ে নেওয়া হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ বন্ধ হবে না।
.
এখানে যজ্ঞকর্ম না করা ব্যক্তি এবং যজ্ঞ বিরোধীর থেকে ধন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটাও ঠিকই আছে, কারণ যারা পরোপকার করে না অথবা রাজ্যকে কর দেয় না, সেটা চুরি করাই হয়, তাহলে তার ধন যদি রাজা বা সেনাপতি ছিনিয়ে নেয়, তো সেটা উচিতই হবে, যারফলে সেই ধন রাষ্ট্রহিতে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে হ্যাঁ, কোনো চোর ব্যক্তি অবশ্যই বেদের এই আদেশের বিরোধ করবে। এখন আপনাকে ভাবতে হবে যে আপনার কি করা উচিত?

৭.
আক্ষেপ -
Rig Veda 1.93.4

Agni and Sons, famed is that your, prowers wherewith ye stole the kine, his food, from Pani...

অগ্নীষোমা চেতি তদ্বীর্য়ম্ বাম্ য়দমুষ্ণীতমবসম্ পণিম্ গাঃ। অবাতিরতম্ বৃসয়স্য শেষোऽবিন্দতঞ্জ্যোতিরেকম্ বহুভ্যঃ।।

হে অগ্নিদেব আর সোমদেব! আপনার সেই পরাক্রম ঐ সময় জ্ঞাত হয়, যখন আপনি "পণি" দিয়ে গাভীর হরণ করেন আর "বৃসয়" -এর শেষ রক্ষকদের ক্ষত-বিক্ষত করেন। অসংখ্যের জন্য সূর্য প্রকাশের আবির্ভাব করেন।
.
এখানে আপনি (সুলেমান রিজভী) ঈশ্বরকে চোর বলেছেন।

উত্তর - এখানে আপনি যার-যার ভাষ্য উদ্ধৃত করেছেন, তাদের নাম লেখেননি। এই দুটো ভাষ্যকারই অগ্নি আর সোমকে দিয়ে গাভীর চুরি করাচ্ছেন। একদিকে তো এই ভাষ্যকার অগ্নি আর সোম দেবের দ্বারা সূর্যের প্রকাশের আবির্ভাব হওয়ার কথা বলছেন, তারপর সেই সূর্যের প্রকটকারীকে দিয়ে গাভীর চুরি করিয়েছেন। এরমধ্যে তো রিজভী আপনাকেও বুদ্ধি দিয়ে ভাবা উচিত। গাভীকে চুরি করবে এমন মানুষ তো হতে পারে, কোনো মাংসাহারী পশুও হতে পারে, কিন্তু সূর্যের নির্মাণকারী সর্বশক্তিমতী সত্তা গাভী চুরি করবে, কারও ভোজন চুরি করবে, এমন তো কোনো গম্ভীর মানসিক রোগীই ভাবতে পারে।
.
এখন আমি ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য এখানে প্রস্তুত করবো -

অগ্নীষোমা চেতি তদ্বীর্য়ম্ বাম্ য়দমুষ্ণীতমবসম্ পণিম্ গাঃ। অবাতিরতম্ বৃসয়স্য শেষোऽবিন্দতঞ্জ্যোতিরেকম্ বহুভ্যঃ।। (ঋগ্বেদ ১.৯৩.৪)

পদার্থ - (অগ্নীষোমা) বায়ুবিদ্যুতৌ (চেতি) বিজ্ঞাতম্ প্রখ্যাতমস্তি (তত্) (বীর্য়ম্) পৃথিব্যাদিলোকানাম্ বলম্ (বাম্) য়য়োঃ (য়ত্) (অমুষ্ণীতম্) চোরবদ্ধরতম্ (অবসম্) রক্ষণাদিকম্ (পণিম্) ব্যবহারম্ (গাঃ) কিরণান্ (অব) (অতিরতম্) তমো হিম্স্তঃ। অবতিরতিরিতি বধকর্মা (নিঘন্টু ২.১৯) (বৃসয়স্য) আচ্ছাদকস্য। বস আচ্ছাদন ইত্যস্মাত্ পৃষোদরাদিত্বাদিষ্টসিদ্ধিঃ। (শেষঃ) অবশিষ্টো ভাগঃ (অবিন্দতম্) লম্ভয়তম্ (জ্যোতিঃ) দীপ্তিম্ (একম্) অসহায়ম্ (বহুভ্যঃ) অনেকেভ্যঃ পদার্থেভ্যঃ।
.
ভাবার্থ - মনুষ্যৈর্য়াবৎপ্রসিদ্ধম্ তমস আচ্ছাদকম্ সর্বলোকপ্রকাশকম্ তেজো জায়তে তাবৎসর্বম্ কারণভূতয়োর্বায়ুবিদ্যুতোঃ সকাশাদ্ভবতীতি বোদ্ধম্।

পদার্থ - যেটা (অগ্নীষোমা) বায়ু আর বিদ্যুৎ (য়ত্) যে (অবসম্) রক্ষা আদি (পণিম্) ব্যবহারকে (অমুষ্ণীতম্) চুপিসারে প্রসিদ্ধাপ্রসিদ্ধ গ্রহণ করে (গাঃ) সূর্যের কিরণের বিস্তার করে (অবাতিরতম্) অন্ধকারের বিনাশ করে (বহুভ্যঃ) বিভিন্ন পদার্থ দিয়ে (একম্) এক (জ্যোতিঃ) সূর্যের প্রকাশকে (অবিন্দতম্) প্রাপ্ত করায়, যাদের (বৃসয়স্য) ঢেকে রাখা সূর্যের (শেষঃ) অবশেষ ভাগ লোকের প্রাপ্ত করে (বাম্) এগুলোর (তত্) সেই (বীর্য়্যম্) পরাক্রম (চেতি) বিদিত আছে সবাই জানেন।
.
ভাবার্থ - মানুষের এটা জানা উচিত যে যতটা প্রসিদ্ধ অন্ধকারকে ঢেকে দিতে আর সমস্ত লোককে প্রকাশকারী তেজ হয়, ততটা সব কারণরূপ পবন আর বিদ্যুতের উত্তেজনা থেকে হয়।
.
এখানে ঋষি দয়ানন্দ বায়ু আর বিদ্যুতের গুণের বর্ণনা করেছেন। বস্তুতঃ এই বর্ণনা বেদের মধ্যে আছে। সূর্য অথবা যেকোনো নক্ষত্রের প্রকাশের মূল কারণ বায়ু আর বিদ্যুৎ হয়। একথা ঋষি দয়ানন্দের সময়ে বিশ্বের বড়-বড় ভৌতিক বৈজ্ঞানিকও জানতেন না। এখানে বায়ুর তাৎপর্য সেই সূক্ষ্ম তত্ত্বের সঙ্গে হবে, যারদ্বারা ফোটন তথা মূল কণার নির্মাণ হয়। বর্তমান বিজ্ঞানের ভাষায় এই পদার্থের কিছু তুলনা ভেক্যুম এনার্জী আর ডার্ক এনার্জীর সঙ্গে করা যেতে পারে। এখন কেউ বেদের উপরে আক্ষেপকারী অথবা ঋষি দয়ানন্দের উপহাসকারী আমাকে বলুক যে প্রকাশের উৎপত্তি আর উৎসর্জন বা অবশোষণ আদির মধ্যে ভেক্যুম এনার্জী আর বিদ্যুতের ভূমিকার সম্বন্ধে তার কি এত জ্ঞান আছে?
.
আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে আপনি অথবা যেকোনো বেদ বিরোধী খুব কমই জানেন। এখন সারা সংসারের তথাকথিত ধর্মগ্রন্থ যারা মানে তারা বলুক যে তাদের ধর্মগ্রন্থের মধ্যে এইধরনের গম্ভীর বিদ্যার কি কোনো সংকেত আছে? এখানে "অমুষ্ণীতম্" পদ দেখে চুরি অর্থ গ্রহণ করে নিয়েছে। ঋষি দয়ানন্দ এর অর্থ "চোরবদ্ধরতম্" করেছেন, যার অর্থ হল - যেভাবে চোর চুপচাপ কারও বস্তুকে তুলে নেয় আর কেউ সেটা জানতেও পারে না, সেইভাবে সূর্যাদি লোকের মধ্যে বিদ্যুৎ আর বায়ু রশ্মির ক্রিয়াগুলো এইরকম হয় যে সেগুলোকে আমরা স্পষ্টরূপে জানতেও পারবো না। এইজন্য এইধরনের উপমা দেওয়া হয়েছে। আপনি অভিযোগ লাগানোর পূর্বে একটু তো বুদ্ধির প্রয়োগ করতেন, কিন্তু কি করবেন বুদ্ধি দিয়ে কাজ তো বুদ্ধিমানই করতে পারেন।
.
আপনি (সুলেমান রিজভী) এইধরনের আরও কিছু উদাহরণ দিয়েছেন, সেগুলোর উত্তরও আপনি এমনই বুঝে নিতে পারেন।

৮.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 1.7.7
"O Agni, bring thou hitherward the Yatudhanas bound and chained. And afterward let Indra tear their heads off with his thunder-bolt."
ত্বমগ্নে য়াতুধানানুপবদ্ধাঁ ইহা বহ।
অথৈষামিন্দ্রো বজ্রেণাপি শীর্ষাণি বৃশ্চতু।।
উৎপন্ন হয়েছে। হে অগ্নে! তুমি আমাদের দূত হয়ে য়াতুধানকে বিলাপ করাও।। হে অগ্নে! তুমি (য়াতুধানান্) দুষ্টদের (উপবদ্ধান্) বেঁধে (ইহ আ বহ) এখানে নিয়ে আসো। (অথ) আর ইন্দ্র নিজের বজ্র দিয়ে (এষাম্ শীর্ষাণি) এদের মস্তক (বৃশ্চতু) কেটে দিক।
.
এখানে আক্ষেপ করা হয়েছে যে বেদের মধ্যে অহিন্দুদের রাক্ষস বলে তাদের মেরে ফেলার বিধান আছে।
.
উত্তর - আপনি অভিযোগ করেছেন যে হিন্দু গ্রন্থের মধ্যে অহিন্দুদের রাক্ষস বলা হয়েছে, এটা আপনি কোথা থেকে জেনেছেন? বেদ অথবা ঋষিদের কোনো গ্রন্থের মধ্যে হিন্দু শব্দই নেই, আর হিন্দু কোনো ধর্মও নয়, বরং বৈদিক সনাতন ধর্মই হল ব্রহ্মাণ্ডবাসীর একমাত্র ধর্ম। প্রাচীন আর্ষ গ্রন্থের মধ্যে মানবাকৃতি যুক্ত প্রাণীদের অনেক বর্গে বিভাজন করা হয়, যেমন মনুষ্য, দেব, গন্ধর্ব, রাক্ষস, অসুর, কিন্নর, নাগ, গৃধ্র, পক্ষী, ঋক্ষ, বানর আদি। আর্যও কোনো জাতি ছিল না, বরং "আর্য" শব্দ হল গুণবাচক আর "দস্যু" শব্দও গুণবাচক হয়।
.
বৈদিক আচরণ যুক্ত ব্যক্তিকে আর্য বলা হতো। এই দেশের মধ্যে এইরকমই ধর্মাত্মা মানুষের বাস হওয়াতে এই দেশের নাম আর্যাবর্ত হয়। কালান্তরে এই দেশের নিবাসীকে আর্য বলা হয়, তারা গুণে আর্য না হলেও। বিদেশীরা এদেরকেই হিন্দু বলা প্রারম্ভ করে, যেটা ছিল এক ষড়যন্ত্রের ভাগ। দুর্ভাগ্য বশতঃ আজ কোনো রাষ্ট্রবাদী একথা বুঝতে প্রস্তুত নয়। মহারাণী মন্দোদরী রাবণকে আর্যপুত্রই বলতেন। বানরবংশী মহারাজ বালির ধর্মপত্নী মহারাণী তারা নিজের স্বামীকে আর্যপুত্রই বলতেন। গৃধ্রবংশী ক্ষত্রিয় জটায়ু, যিনি মহারাজ দশরথের মিত্র ছিলেন, দেবী সীতা তাঁকে "আর্য" শব্দের দ্বারাই সম্বোধিত করেছিলেন।
.
বস্তুতঃ ঈশ্বরীয় জ্ঞান বেদের অনুসারে জীবনযাপন করা শ্রেষ্ঠ পুরুষকে আর্য বলা হতো, তা সে যেকোনো বংশের হতে পারে। এই বংশগুলোর মধ্যে পরস্পর বৈবাহিক সম্বন্ধও হতো। লঙ্কেশ রাবণ বেদের বিদ্বান হওয়া সত্ত্বেও আর্যোচিত আচরণ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন, তবুও মহারাণী মন্দোদরী আদরার্থ নিজ স্বামীকে আর্যপুত্রই বলতেন। এই তো হল ইতিহাসের কথা, কিন্তু যতদূর বেদের প্রশ্ন আছে, তো বেদের মধ্যে সব পদ যৌগিক হয়। এইজন্য তারমধ্যে কোনো ব্যক্তি, বর্গ বা বংশ আদির উল্লেখ নেই। যারা এই যথার্থ জানে না, তাদের বেদের সম্বন্ধে লেখা উচিত নয়।
.
এখানে দুষ্ট ব্যক্তিকে য়াতুধান বলা হয়েছে। য়জুর্বেদ ৩৪.২৬ মন্ত্রের ভাষ্যে ঋষি দয়ানন্দ পরপদার্থকে যারা অন্যায়পূর্বক নেয় তাদের য়াতুধান বলেছেন। য়জুর্বেদ ১৫.১৬ ভাষ্যের মধ্যে পরপীড়ন অর্থাৎ যারা অন্যদের পীড়া দেয় তাদের য়াতুধান বলেছেন। প্রাচীন ঋষিদের কথন হল - য়াতুধান হেতিঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.৮.১০) অর্থাৎ হননকারী হত্যাকারীকে য়াতুধান বলে। এখন কোনো বেদবিরোধী এটা বলুক যে ডাকাত আর হত্যাকারীকে যদি বন্দী করে ন্যায়ালয়ে প্রস্তুত করা হয় আর রাজা অথবা ন্যায়াধিশ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তখন এরমধ্যে আপনার কি আপত্তি অনুভব হচ্ছে? এখানে য়াতুধান কোনো দেশবিশেষের নিবাসীকে বলা হয়নি, বরং দুষ্ট ব্যক্তিকেই য়াতুধান বলা হয়েছে। এইজন্য বেদ সর্বহিতের জন্য দুষ্টকে দণ্ড দেওয়ার আদেশ দেয়, কোনো নিরীহকে পীড়া দেওয়ার জন্য নয়।
.
এই মন্ত্রের মধ্যে "অগ্নি" আর "ইন্দ্র" দুটো শব্দ বিচারক অথবা রাজার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই দুইয়ের কাজ অনেক সংবেদনশীল আর জটিল হয়। যখন এরা কোনো অপরাধীকে দণ্ড, বিশেষকরে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তখন সেই অপরাধীর পরিজন বিলাপই করে, কারণ মহাত্মা বিভীষণের মতো পবিত্রাত্মা আর নিষ্পক্ষ ব্যক্তি বিরল হয়, যিনি অধর্মী আর অহংকারী রাজা আর নিজের ভাই রাবণকে ত্যাগ করে ধর্মের প্রতিমূর্তি মর্যাদা শ্রীরামের সঙ্গ দেন আর লঙ্কার প্রজার রক্ষা করেন।
.
দুর্ভাগ্য বশতঃ তথাকথিত প্রবুদ্ধ, কিন্তু নিতান্ত নির্বোধ ব্যক্তিরা মহাত্মা বিভীষণকে ঘরের শত্রু বলে "ঘরের শত্রু বিভীষণ" প্রবাদ বানিয়েছে, যেটা আজ লোকপ্রসিদ্ধ হয়েছে। এইরকম নির্বোধ সমাজ থেকে এমন আশা কিভাবে করা যেতে পারে যে সেটা বেদের ন্যায় ব্যবস্থাকে বুঝতে পারবে। যেকোনো পাঠকের উচিত যে কোনো গ্রন্থ পড়ার সময় লেখক অথবা তার অনুবাদক বা ভাষ্যকারের অভিপ্রায়কে বোঝার চেষ্টা করা, তারপরই সেটা নিয়ে লেখার সাহস করা।

৯.
আক্ষেপ -
Yajur Veda 5.26

"By impulse of God Savitar I take thee with arms of Asvins, with the hands of Peahen. Thou art a woman. Here I cut the necks of Rakshasas away. Barley art thou. Bar off from us our haters, bar our enemies..."
.
দেবস্য ত্বা সবিতুঃ প্রসবেऽশ্বিনোর্বাহুভ্যাম্ পূষ্ণো হস্তাভ্যাম্।
আদদে নার্য়সীদমহꣳ রক্ষসাম্ গ্রীবাऽঅপিকৃন্তামি। য়বোऽসি য়বয়াস্মদ্দ্বেষো য়বয়ারাতীর্দিবে ত্বাऽন্তরিক্ষায় ত্বা পৃথিব্যৈ ত্বা শুন্ধন্তাঁল্লোকাঃ পিতৃষদনাঃ পিতৃষদনমসি।।
.
হে অভ্রি (মধ্যে অধিষ্ঠিত দেবসত্তা)! আমরা সবিতার দ্বারা প্রেরিত অশ্বিনীদেবের ভুজা দিয়ে তথা পূষাদেবের হস্ত দিয়ে আপনাকে স্বীকার করছি। আপনি আমাদের অনুকূল হউন। গর্ত খোঁড়ার মতোই আমরা এখন রাক্ষসদের গলা কাটি। তাদের বিনাশ করি। হে দেব! (পৃথককারী স্বভাব যুক্ত) দুর্ভাগ্য থেকে তথা শত্রুর সমূহ থেকে আপনি আমাদের আলাদা করুন। হে উদুম্বর বৃক্ষের শাখা! (অগ্রভাগ) দ্যুলোককে হর্ষিত করার জন্য, (মধ্যভাগ) অন্তরীক্ষলোককে প্রসন্ন করার জন্য তথা (মূলভাগ) পৃথিবীকে প্রসন্ন করার জন্য আমরা আপনার প্রক্ষণ করছি। হে য়জুষ্! এই জল দিয়ে পিতরদের নিবাস স্থান শুদ্ধ হয়ে উঠুক। হে কুশ! আপনি হলেন পিতরদের আবাস স্থান।
.
এখানেও আপনি (রিজভী) অহিন্দুদের রাক্ষস বলে তাদের গলা কাটার অভিযোগ করেছেন।
.
উত্তর - আপনি এই হিন্দি এবং ইংরেজি অনুবাদ বা ভাষ্য কার দিয়েছেন, সেটা উল্লেখ করেননি। এটাও আপনার একটা চালবাজীর সূচক। যেখানে কোনো আর্যসমাজী বিদ্বানের ভাষ্য বা অনুবাদ আছে, সেখানে আপনি সেই অনুবাদক বা ভাষ্যকারের নাম দিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু যেখানে অন্য কারও ভাষ্য বা অনুবাদ আছে, সেখানে আপনি নাম লুকিয়ে ফেলেছেন, এটা মোটেও সততা নয়।
.
আমি এখানে এই মন্ত্রের জন্য ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ভাষ্য উদ্ধৃত করবো —

দেবস্য ত্বা সবিতুঃ প্রসবেऽশ্বিনোর্বাহুভ্যাম্ পূষ্ণো হস্তাভ্যাম্।
আদদে নার্য়সীদমহꣳ রক্ষসাম্ গ্রীবাऽঅপিকৃন্তামি। য়বোऽসি য়বয়াস্মদ্দ্বেষো য়বয়ারাতীর্দিবে ত্বাऽন্তরিক্ষায় ত্বা পৃথিব্যৈ ত্বা শুন্ধন্তাঁল্লোকাঃ পিতৃষদনাঃ পিতৃষদনমসি।।
(য়জুর্বেদ ৫.২৬)

পদার্থঃ - (দেবস্য) সর্বানন্দপ্রদস্য (ত্বা) ত্বাম্ হোমশিল্পাখ্যয়জ্ঞকর্ত্তারম্ (সবিতুঃ) সকলোৎপাদকস্যেশ্বরস্য (প্রসবে) য়থা সৃষ্টৌ তথা (অশ্বিনোঃ) প্রাণাপানয়োঃ (বাহুভ্যাম্) য়থা বলবীর্য়াভ্যাম্ তথা (পূষ্ণঃ) পুষ্টিমতো বীরস্য (হস্তাভ্যাম্) য়থা প্রবলভুজদণ্ডাভ্যাম্ তথা (আ) সমন্তাত্ (দদে) গৃহ্বামি (নারি) নরাণামিয়ম্ শক্তিমতী স্ত্রী তৎসম্বুদ্ধৌ (অসি) ভবতি (ইদম্) বিশ্বম্ (অহম্) সভাধ্যক্ষঃ (রক্ষসাম্) দুষ্টকর্মকারিণাম্ প্রাণিনাম্ (গ্রীবাঃ) শিরাম্সি (অপি) নিশ্চয়ে (কৃন্তামি) ছিনদ্মি (য়বঃ) মিশ্রণামিশ্রণকর্ত্তা (অসি) বর্ত্তসে (য়বয়) শ্রেষ্ঠৈর্গুণৈঃ সহ মিশ্রয়। দোষেভ্যশ্চ দূরীকারয়। অত্র বা ছন্দসীতি বৃদ্ধ্যভাবঃ (অস্মত্) স্বেভ্যঃ (দ্বেষঃ) ঈর্ষ্যাদিদোষান্ (য়বয়) দূরীকারয় (অরাতীঃ) শত্রূন্ (দিবে) সত্যধর্মপ্রকাশায় (ত্বা) ত্বাম্ (অন্তরিক্ষায়) আকাশে গমনায় (ত্বা) ত্বাম্ (পৃথিব্যৈ) পৃথিবীস্থপদার্থপুষ্টয়ে (ত্বা) ত্বাম্ (শুন্ধন্তাম্) পবিত্রীকর্বতাম্ (লোকাঃ) সর্বে (পিতৃষদনাঃ) য়থা পিতৃষু জ্ঞানিষু সীদন্তি তথা (পিতৃষদনম্) য়থা বিদ্যাবন্তো জ্ঞানিনস্সীদন্তি য়স্মিম্স্তত্তথা (অসি) অস্তি।

ভাবার্থঃ - অত্রোপমালঙ্কারঃ। মনুষ্যৈর্য়থাক্রিয়ম্ য়থানুক্রমম্ বিদ্বদাশ্রয়ম্ কৃত্বা য়জ্ঞমনুষ্ঠায় সর্বেষাম্ শুদ্ধিঃ সম্পাদনীয়া।
.
পদার্থ - হে বিদ্বান মানব! আমি যেমন (সবিতুঃ) সকল জগতের উৎপন্নকারী আর (দেবস্য) সকল আনন্দের দাতা পরমেশ্বরের (প্রসবে) উৎপন্ন করা সংসারে (অশ্বিনোঃ) প্রাণ আর অপানের (বাহুভ্যাম্) বল আর বীর্য তথা (পূষ্ণঃ) অতিপুষ্ট বীরের (হস্তাভ্যাম্) প্রবল প্রতাপযুক্ত ভুজ আর দণ্ডের দ্বারা অনেক উপকারকে (আদদে) নিয়ে বা (ইদম্) এই জগতের রক্ষা করে (রক্ষসাম্) দুষ্টকর্মকারী প্রাণীদের (গ্রীবাঃ) মস্তকের (অপি) (কৃন্তামি) ছেদন করে দিই তথা পদার্থের উত্তম গুণ দিয়ে যেভাবে মিশ্রণ করি তোমরাও সেই রকম উপকার নাও আর (য়বয়) উত্তম গুণ দিয়ে পদার্থের মিশ্রণ করে আমি যেমন (দ্বেষঃ) ঈর্ষ্যা আদি দোষ বা (অরাতীঃ) শত্রুদের (অস্মত্) নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিই তোমরাও সেইরূপ (য়বয়) দূর করো। হে বিদ্বান! আমরা যেমন (দিবে) ঐশ্বর্য্যাদি গুণের প্রকাশ হওয়ার জন্য (ত্বা) তোমাকে (অন্তরিক্ষায়) আকাশের মধ্যে থাকা পদার্থকে শোধন করার জন্য (ত্বা) তোমাকে (পৃথিব্যৈ) পৃথিবীর পদার্থের পুষ্টি হওয়ার জন্য (ত্বা) তোমাকে সেবন করে তোমরাও সেইরকম করো। যেমন (পিতৃষদনম্) এই স্থান বিদ্যা পড়া জ্ঞানী ব্যক্তিদের (অসি) হয় আর যার মাধ্যমে (পিতৃষদনাঃ) যেমন জ্ঞানীদের মাঝে থেকে পবিত্র হয় সেইরকম আমি শুদ্ধ হই তথা সকল মানুষ (শুন্ধন্তাম্) নিজেদের শুদ্ধি করুক আর হে স্ত্রী! তুমিও এইসব এইভাবে করো।
.
ভাবার্থ — এই মন্ত্রের মধ্যে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে। মানুষের উচিত সঠিক ক্রিয়াক্রমপূর্বক বিদ্বানদের আশ্রয়ে থেকে এবং যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে সকল ভাবে নিজেদের শুদ্ধ করা।
.
এই ভাষ্যের মধ্যে কোথাও এমন কিছু নেই, যার দ্বারা কোনো ব্যক্তি, বর্গ অথবা দেশকে লক্ষ্য বানিয়ে তার বিনাশ করার কথা প্রমাণিত হয় আর দুষ্টদের দমনের জন্যই সারা বিশ্বের সভ্য সমাজগুলোতে ন্যায়পূর্ণ দণ্ড ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়, যার কোনো বিরোধিতা কেউ করে না। দুষ্টকে দণ্ড না দেওয়া এবং সজ্জনকে সুরক্ষিত না করা এক অরাজক রাষ্ট্রের পরিচয় হবে, তাই দুষ্টকে দণ্ড দেওয়ার বিধান কেবল ঈশ্বরীয় জ্ঞান বেদে বিদ্যমান নয়, বরং সারা বিশ্বের রাজব্যবস্থাগুলোও এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই কাজ করে। এমনটা না করলে সম্পূর্ণ বিশ্বের মধ্যে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে।
.
যতদূর আপনার দ্বারা উদ্ধৃত অনুবাদের কথা বলা হয়েছে, সেখানে আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে সেটা স্পষ্ট বা যথাযথ নয় এবং আপনিও সেটা ঠিকমতো বুঝতে পারেননি। কেবল "রাক্ষস" শব্দটি দেখে আপনি অভিযোগ তুলেছেন।

১০.
আক্ষেপ -
Rig Veda 6.26.3

"Thou didst impel the sage to win the daylight, didst ruin Susna for the pious Kutsa. The invulnerable demon's head thou clavest when thou wouldst win the praise of Atithigva."
.
হে ইন্দ্র! অন্ন-লাভের জন্য তুমি ভার্গব ঋষিকে অনুপ্রাণিত করো। হব্যদাতা কুৎসের জন্য তুমি শুষ্ণাসুরকে বিনাশ করেছিলে। তুমি অতিথিগ্বকে (দিবোদাস) সুখী করার জন্য শম্বরাসুরের শিরচ্ছেদন করেছিলে। সে নিজেকে মরণহীন (দুর্ভেদ্য) মনে করতো।
.
Rig Veda 8.14.13
"With waters' foam thou torest off, Indra, the head of Namuci, Subduing all contending hosts."
.
এখানেও আপনি বেদের মধ্যে অসুরদের মারার বিধানের অভিযোগ করেছেন।
.
উত্তর - এখানে আপনি আবার চালাকি করেছেন, কারণ এখানেও অনুবাদক এবং ভাষ্যকারের নাম দেননি। এই অনুবাদক এবং ভাষ্যকার দু'জনেই নিতান্ত আনাড়ি আছে। যে শব্দগুলো বেদের মধ্যেই নেই, সেগুলোকেও অসুর বা ঋষি বানিয়ে এখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
.
এই মন্ত্রের মধ্যে কোথাও ভার্গব ঋষির নাম নেই, অথচ এখানে তাকে অন্নলাভের জন্য উৎসাহিত করার কথা লেখা হয়েছে। 'শুষ্ণম্'-কে শুষ্ণাসুর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শম্বরাসুরকে কোথা থেকে এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ইন্দ্রের দ্বারা তার মস্তক ছেদন করা হয়েছে। যেখানে এমন মূঢ়মতি ভাষ্যকার থাকবেন, সেখানে সুলেমান রিজবীর মতো ব্যক্তি তো বেদের উপহাস করতে আসবেই। এখানে সুলেমান রিজবী ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য দেখতে পাননি।
.
এখন আমি এখানে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য উদ্ধৃত করবো —

ত্বম্ কবিঁ চোদয়োऽর্কসাতৌ ত্বম্ কুত্সায় শুষ্ণম্ দাশুষে বর্ক্। ত্বম্ শিরো অমর্মণঃ পরাহন্নতিথিগ্বায় শম্স্যম্।।৩।। (ঋগ্বেদ ৬.২৬.৩)
.
পদার্থঃ - (ত্বম্) (কবিম্) বিদ্বাম্নসম্ (চোদয়ঃ) প্রেরয় (অর্কসাতৌ) অন্নাদিবিভাগে (ত্বম্) (কুৎসায়) বজ্রায় (শুষ্ণম্) বলম্ (দাশুষে) দাত্রে (বর্ক্) ছিনৎসি (ত্বম্) (শিরঃ) (অমর্মণঃ) অবিদ্যমানানি মর্মাণি বস্মিঁস্তস্য (পরা) (অহন্) দূরীকুর্য়াঃ (অতিথিগ্বায়) য়োऽতিথীনাগচ্ছতি তস্মৈ (শম্স্যম্) প্রশম্সনীয়ম্ কর্ম (করিষ্যন্)।
.
ভাবার্থঃ - রাজা বিদ্যাবিনয়াদিশুভগুণান্ রাজকার্য়েষু য়োজয়েত, উন্নতিঞ্চ করিষ্যন্ বিদ্যাদীনাম্ দাতা ভূত্বা প্রশম্সাম্ প্রাপ্নুয়াৎ।
.
পদার্থ - হে তেজস্বিরাজন! (ত্বম্) আপনি (অর্কসাতৌ) অন্ন আদির বিভাগে (কবিম্) বিদ্বানের (চোদয়ঃ) প্রেরণা করুন আর (ত্বম্) আপনি (কুৎসায়) বজ্রের জন্য আর (দাশুষে) দানকারীর জন্য (শুষ্ণম্) শক্তিকে (বর্ক্) দমন করেন আর (ত্বম্) আপনি (অমর্মণঃ) যার মধ্যে মর্ম বিদ্যমান নেই তার (শিরঃ) মস্তককে (পরা, অহন্) দূর করুন আর (অতিথিগ্বায়) অতিথিদের প্রাপ্ত হওয়ার জন্য (শম্স্যম্) প্রশংসনীয় যোগ্য কর্মকে (করিষ্যন্) করতে করতে বিরাজমান হউন, এতে আপনি শ্রদ্ধার যোগ্য হবেন।
.
ভাবার্থ - রাজা বিদ্যা আর বিনয় আদি শ্রেষ্ঠ গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিদের রাজকার্যে নিযুক্ত করবেন এবং তাদের উন্নতির ব্যবস্থা করে বিদ্যা আদির দাতা হয়ে প্রশংসা প্রাপ্ত করবেন।
.
এই ভাষ্য সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা কঠিন হতে পারে। সময়াভাবে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যে কোথাও-কোথাও জটিলতা ও অস্পষ্টতা দেখা যায়। আমি এখানে একে স্পষ্ট ও সরল করার চেষ্টা করবো —

এখানে প্রতাপশালী রাজার কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে যে, তিনি যেন তার বিদ্বান মন্ত্রীদের এমনভাবে অনুপ্রাণিত করেন যাতে তারা সমগ্র রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে অন্ন ও ধন আদি সঠিকভাবে বিতরণ করেন। এমন যেন কখনও না হয় যে কিছু মানুষ অত্যন্ত সম্পদশালী হয়ে উঠবে আর কিছু মানুষ চরম দারিদ্র্যের কষ্টে জর্জরিত হতে বাধ্য হবে। এমন করা স্বয়ংকে অন্যায়কারী হিসেবে সিদ্ধ করবে। আজ আমাদের রাষ্ট্র বা বিশ্বের মধ্যে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে যে অত্যন্ত ব্যবধান আছে, সেটা আসলে রাষ্ট্র ও বিশ্বের নীতি-নির্ধারকদের অন্যায়কারী বা অজ্ঞানী হওয়ার একটা জীবন্ত প্রমাণ।
.
রাজার দ্বিতীয় কাজ হল দুষ্টদের দমন করা, যারা অন্যের ধন সম্পদ চুরি, লুট বা ঘুষের মাধ্যমে শোষণ করে অথবা নানা প্রকার মিথ্যা ও প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ঠকায়। রাজাকে সেই অপরাধীদের শোষক শক্তিকে সমূলে বিনাশ করার দণ্ড দিতে হবে। বর্তমানে বড়-বড় নেতা, পুঁজিপতি, রাজকর্মচারী, কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশলে প্রজাদের শোষণ করে। রাজাকে সেই শোষণের কৌশলগুলোকে গোড়া থেকে নির্মূল করতে হবে, যাতে তারা আর কখনও শোষণ করতে না পারে। যারা ধনবলের কারণে শোষণ করে, রাজা তাদের সম্পত্তির অধিগ্রহণ করে শোষিতদের হিতে ব্যবহার করবেন।
.
যারা নিজেদের জনবলের কারণে অন্যদের লুট করে, তাদের সেই জনবল থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা নিবেন, তাদের অনুসারীদের মধ্যে তাদের অপরাধের কথা প্রচার করে তাদের ছিন্নভিন্ন করে দিবেন। যদি কেউ নিজের পদের অপব্যবহার করে নাগরিকদের শোষণ করে, তবে তাকে অবিলম্বে পদচ্যুত করে দিবেন। যদি কেউ শারীরিক শক্তি বা অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে শোষণ করে, তবে তার অঙ্গভঙ্গ করে তার অস্ত্র কেড়ে নিবেন। এখানে "শুষ্ণম্ বর্ক্" অর্থাৎ বলকে দমন করার এই লোকোপকারক অর্থ আছে। একে কিভাবে শুষ্ণাসুর বানিয়ে দিয়েছে?
.
এখানে দানকারীর জন্যও শোষণের শক্তিকে দমন করার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হল, কোনো দুষ্ট ব্যক্তি কোনো দাতা অর্থাৎ পরোপকারী পুরুষের শোষণ করতে শুরু করলে, তাকে পরোপকারের কাজে দান করতে না দিলে অথবা স্বয়ংই তার ধন লুট করে নিলে, তার রক্ষার জন্যও একইভাবে শোষণকারী অপরাধীদের শক্তিকে পূর্বোক্তভাবে নষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। এতে পরোপকারী মহানুভবগণ নির্বিঘ্নে সমাজ ও রাষ্ট্রের সেবা করতে পারবেন। এরপর বলা হয়েছে যে, যাদের মর্ম স্থান নেই, তাদের মস্তক কেটে ফেলে দিন। এর অভিপ্রায় হল, ঠিক যেমন শরীরে কিছু মর্ম স্থান থাকে, যেখানে আঘাত লাগলে ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে। তেমনই শোষণকারীদের যদি পূর্বোক্ত উপায়গুলো দ্বারা দুর্বল করা না যায়, তাহলে এমন শোষকদের মাথা কেটে ফেলাই একমাত্র বিকল্প থেকে যায়।
.
আজ আমাদের দেশে কোনো দণ্ড ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে ভারী অরাজকতার উৎপাত চলছে, যার ফলে কোটি-কোটি নাগরিক দুঃখী হয়ে আছে আর কিছু ব্যক্তি ক্ষমতা, ধন আদির মাধ্যমে তাদের ভরপুর শোষণ করে নিরন্তর অধিকাধিক ধনসম্পন্ন হচ্ছে। এই স্থিতি সম্পূর্ণ মানবতার জন্য গম্ভীর সংকট উৎপন্ন করছে।
.
এখানে আনাড়ি ভাষ্যকার 'অতিথিগ্ব' পদ থেকে দিবোদাস নামক কোনো এক ব্যক্তির গ্রহণ করেছেন। এই বিষয়ে কি মন্তব্য করবো? এই পদ 'অতিথি + গম্লৃ গতৌ + ড্বঃ প্রত্যয়' থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। [দেখুন - বৈদিক কোষ, আচার্য রাজবীর শাস্ত্রী] এখন কেউ অতিথিগ্ব থেকে দিবোদাস তৈরি করলে, তাকে কি বলবো? এখানে ঋষি দয়ানন্দ যে অর্থ করেছেন, সেটাই সত্য। মনে রাখবেন যে, নিরন্তর সত্যোপদেশকারী ভ্রমণশীল আপ্ত বিদ্বান পুরুষকে অতিথি বলা হয়। এই বিষয়ে মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাসের কথন হল -
.
য়ঃ শ্রেষ্ঠতামশ্নুতে স বা অতিথির্ভবতি (ঐতরেয় আরণ্যক ১.১.১)
.
অর্থাৎ যিনি বিদ্যা এবং শ্রেষ্ঠ কর্মের দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব প্রাপ্ত করেন, তাকে অতিথি বলা হয়।
.
এমন অতিথি বিদ্বানদের প্রাপ্ত বিদ্যা আদি ধনের জন্য যে প্রশংসনীয় ও পরোপকারী কাজ আছে, সেগুলো রাজাকেও করা উচিত, তবেই রাজা সম্মানের অধিকারী হবেন। এর অর্থ হল, যেমন অতিথি বেদবিদ্যা এবং শ্রেষ্ঠ পরোপকারী কর্মের দ্বারা অতিথি পদ প্রাপ্ত করেন, তেমনি রাজাকেও হওয়া উচিত। মূর্খ, ছদ্মবেশী বা প্রমাদী ব্যক্তিকে কখনও রাজা বানাবেন না।
.
এই মন্ত্রের দেবতা ইন্দ্র হওয়ায় এই প্রকাশ পায় যে, নিজ বিদ্যা, বল, তেজ আদির দ্বারা ঐশ্বর্য প্রাপ্ত জিতেন্দ্রিয়তাদি উত্তমোত্তম গুণবান ব্যক্তিই রাজা হবেন আর এমন ইন্দ্ররূপ রাজাই এই ধরণের কর্ম করতে সক্ষম হবেন, অন্য কেউ নয়।
.
এখন বেদবিরোধী বিচার করবেন যে এই মন্ত্রের কেমন অনর্থ করে বেদের উপর প্রহার করার পাপ করছেন। এই একটা মন্ত্রকেই যদি কোনো রাষ্ট্রের প্রমুখ নিজের আচরণে ধারণ করেন, তাহলে সেই রাষ্ট্রের বাজিমাত হতে পারে।

__________________________________________

১১.
আক্ষেপ -
Rig Veda 6.44.11

"Give us not, O showerer of benefits, to the wicked. Relying upon your friendship, O Lord of riches, may we remain unharmed. Many are the boons you distribute amongst men; may you demolish those who make no libation, and root out those who present no offerings."
- Tr. Satyaprakash Saraswati

এখানেও আপনি সজ্জন ব্যক্তিদের ধন দিতে তথা নাস্তিক দুষ্টদের বিনাশ করার অভিযোগ করেছেন।

উত্তর— এখানেও আগের মতোই অনুবাদের স্বাভাবিক দোষ আছে। কে দুষ্ট আর কে সজ্জন, সে বিষয়ে আমি আগেই লিখে দিয়েছি। এমন পরিস্থিতিতে বারংবার একই ধরণের আক্ষেপ করা কেবল মূর্খতা বা সত্যের প্রতি বিদ্বেষই বলা যেতে পারে।
.
এখন আমি এখানে মন্ত্র এবং ঋষি দয়ানন্দের করা ভাষ্য প্রস্তুত করবো—
.
মা জস্বনে বৃষভ নো ররীথা মা তে রেবতঃ সখ্যে রিষাম।
পূর্বীষ্ট ইন্দ্র নিঃষিধো জনেষু জহ্যসুষ্বীন্প্র বৃহাপৃণতঃ।।
(ঋগ্বেদ ৬.৪৪.১১)

পদার্থঃ — (মা) নিষেধে (জস্বনে) অন্যায়েন পরস্বপ্রাপকায় দুষ্টায় রাজ্ঞে। জসতীতি গতিকর্মা। (নিঘন্টু ২.১৪) (বৃষভ) বলিষ্ঠ (নঃ) অস্মান্ (ররীথাঃ) দদ্যাঃ (মা) (তে) তব (রেবতঃ) বহুধনস্য (সখ্যে) মিত্রত্বায় (রিষাম) রুষ্টা ভবেম (পূর্বীঃ) প্রাচীনাঃ (তে) তব (ইন্দ্র) দুঃখবিদারক রাজন্ (নিঃষিধঃ) নিঃশ্রেয়সকর্য়ঃ ক্রিয়াঃ (জনেষু) (জহি) (অসুষ্বীন্ ) অভিষবস্যাকর্তৃন্ (প্র) (বৃ্হ) পৃথক্কুরু (অপৃণতঃ) দুঃখদাতুর্দুর্জনাৎ।

ভাবার্থঃ — হে রাজন্ ! য়েऽস্মান্ পীডয়েয়ুস্তদধীনান্মা কুর্য়্যাঃ শ্রেয়সি ক্রিয়াঃ প্রাপয়েস্তথা বয়মপ্যেতৎসর্বম্ ত্বদর্থমনুতিষ্ঠেম, এবম্ সখায়ো ভূত্বাऽভীষ্টান্কামান্ৎসর্বে বয়ম্ প্রাপ্নুয়াম।
.
পদার্থ - হে (বৃষভ) বলবান (ইন্দ্র) দুঃখের বিনাশকারী রাজন্! আপনি (জস্বনে) অন্যায়ভাবে অন্যের ধন অন্য জায়গায় প্রাপ্ত করিয়ে দেওয়া দুষ্ট রাজার জন্য (নঃ) আমাদের (মা) না (ররীথাঃ) দিবেন আর আমরা (তে) আপনি (রেবতঃ) খুব ধনবানের (সখ্যে) মিত্রতার জন্য (মা) না (রিষাম) ক্রুদ্ধ হবেন আর যে (তে) আপনার (জনেষু) মানুষের মধ্যে (পূর্বীঃ) প্রাচীন (নিঃষিধঃ) সুখকারক ক্রিয়াগুলো আছে, সেগুলো দিন (অসুষ্বীন্) উৎপত্তির না করার ব্যক্তিদের (জহি) ত্যাগ করুন আর (অপৃণতঃ) দুঃখ দাতা দুর্জনদের থেকে আমাদের (প্র, বৃ্হ) পৃথক করুন।
.
ভাবার্থ - হে রাজন্! যারা আমাদের পীড়া দেয়, তাদের অধীন করবেন না আর কল্যাণের মধ্যে কাজগুলো প্রাপ্ত করান, তেমনি আমরাও এই সব আপনার জন্য করবো। এইভাবে মিত্র হয়ে আমরা সবাই অভীষ্ট মনোরথ প্রাপ্ত করবো।

এখানে কোনো রাষ্ট্রের প্রজা দ্বারা রাজার কাছে এই প্রার্থনা করা হয়েছে যে তিনি তার প্রজাদের যেন এমন কোনো রাজার দাসী না বানিয়ে দেন, যে অন্যায়ভাবে অন্যের ধন-সম্পত্তি হরণ করে, যদিও সেই রাজা তার নিজের রাজার উত্তরাধিকারী পুত্রই হোন না কেন। যে কোনো রাজার উচিত যে তিনি এমন ব্যক্তিকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে তৈরি করবেন, যিনি সমগ্র প্রজার হিতসাধক হতে পারবেন আর তার ব্যক্তিগত জীবনও সত্য, ন্যায়, সততা, জিতেন্দ্রিয়তা আদি সদ্গুণে পরিপূর্ণ হবে।
.
এখানে 'জস্বনে' পদ গত্যর্থক 'জস' ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এর অর্থ হল রাজা সর্বদা গতিশীল হওয়া উচিত। এখানে গতির অর্থ জ্ঞান, গমন আর প্রাপ্তি তিনটাই গ্রাহ্য হবে। এর তাৎপর্য হল যে কোনো রাষ্ট্রের রাজা পূর্ণ বিদ্বান হবেন, যাতে কোনো দেশি বা বিদেশি চাটুকার ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের দল তাকে বোকা বানাতে না পারে। এছাড়াও, রাজা সর্বদা পুরুষার্থী এবং কর্তব্যপরায়ণ হবেন। এর জন্য তাকে শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিকভাবে পূর্ণ সুস্থ এবং বলবান হওয়া উচিত। এগুলো ছাড়া কোনো রাজা কোনো রাষ্ট্রের সঠিক ভাবে পরিচালনা করতে পারবেন না।
.
রাজার অন্য গুণ হল যে সেই রাজা তার ন্যায়ের আলোতে সমগ্র রাষ্ট্রকে প্রাপ্ত করবেন অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিককে ন্যায় প্রদান করবেন। সেই রাজা যে কোনো নাগরিকের জন্য সাক্ষাৎ করতে সহজ-সুলভ হবেন। এখানে রাজাকে বৃষভও বলা হয়েছে, যার অর্থ ঋষি দয়ানন্দ বলিষ্ঠ করেছেন। এছাড়া প্রজাদের জন্য সুখবর্ষককেও বৃষভ বলা হয়। এখানে রাজাকে ইন্দ্রও বলা হয়েছে, যিনি দুঃখ বিনাশক হওয়ার পাশাপাশি দুষ্টদের শাস্তি প্রদানকারীও হন। এমন রাজা না তো কোনো দুষ্ট ব্যক্তিকে তার উত্তরাধিকারী বানাতে পারেন আর না বিদেশি শক্তিদের দ্বারা নিজের রাষ্ট্রকে গোলাম হতে দিতে পারেন।
.
এখানে প্রজাদের জন্যও কর্তব্য বলা হয়েছে। প্রজারাও রাজার প্রতি শ্রদ্ধা ও বিনম্র আচরণ করবেন, তার সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য অর্থাৎ তার কাছ থেকে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য ক্রোধ, হিংসা, অগ্নিসংযোগ, ধর্মঘট অথবা রাজার মিথ্যা প্রশংসা অর্থাৎ তোষামোদ আদির আশ্রয় নিবেন না। রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য রাজা এবং প্রজা উভয়েরই নিজেদের দায়িত্ব আছে। রাজার উচিত তার প্রজাদের জন্য প্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, ক্রিয়াকলাপ এবং সংস্কারের সঞ্চারকারী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রদান করা। যে রাজা নিজের প্রাচীন সর্বকল্যাণকারী সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ভুলে যান বা নষ্ট করে দেন, তার রাজ্যও নষ্ট হয়ে যায়।
.
এখানে 'অসুষ্বী' পদের অর্থ হল যেসব ব্যক্তি অন্ন-ধন আদি উৎপন্ন করে না অর্থাৎ অলস, অসতর্ক এবং সম্পদের অপচয়কারী হয়, এমন ব্যক্তিদের এখানে শাস্তি দেওয়ার আদেশ আছে, কারণ এমন ব্যক্তিরা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য বোঝা স্বরূপ হয়। শেষে রাজার জন্য বলা হয়েছে যে রাজা নির্দোষ বা দুর্বলদের দুঃখ দাতা দুষ্ট ব্যক্তিদের আলাদা করে দিবেন অর্থাৎ তাদের দেশ থেকে বের করে দিবেন।
.
এখন কোনো বেদবিরোধী বলুক যে এই অর্থের উপর কোনো সভ্য এবং প্রবুদ্ধ মানব কি আপত্তি করতে পারে?

১২.
আক্ষেপ -
Atharva Veda 20.93.2

"Crush with thy foot the niggard churls who bring no gifts. Might art thou: There is not one to equal thee."

This verse refers to the Panis tribe, according to some scholars the Panis tribe were also part of the Vedic society but were plundered and killed because they made no offerings to Ishwar, this is why they are considered Niggards. But Yaska gives a different meaning, Yaska writes that Panis tribe were Demons. One is not to be deluded by the usage of the word Demon here as Demons and Barbarians are those who does not follow the Veda or who lives beyond the boundaries of Aryavarta. The Vedic followers are commanded here to crush the Panis tribe only because they make no offerings to Vedic Gods. There are more evidences to show that tribes were plundered and killed just because they made no offerings to Vedic gods.
.
এখানে এই মহাশয় (রিজভী) বেদ মন্ত্রকে উদ্ধৃত করে এই আক্ষেপ করেছেন যে এই মন্ত্রের আধারে বৈদিক সমাজে জনজাতি, যাকে বর্তমানে ষড়যন্ত্রপূর্বক আদিবাসী বলা হয়, তাদের দাস বানিয়ে তাদের একদা লুট করা হতো আর মেরে ফেলা হতো, কারণ তারা ঈশ্বরকে প্রসাদ চরাতো না। তাদের কৃপণ ও লোভী বলা হতো। এই ব্যক্তি (রিজভী) মহর্ষি য়াস্কের ওপর অভিযোগ তুলে বলছেন যে, য়াস্ক এদের 'দৈত্য' বলেছেন। আর্যাবর্তের বাইরে বসবাসকারী এবং বেদ না মানা লোকেদের 'রাক্ষস' বলা হয়েছে আর সেখানে আদিবাসী তথা জনজাতীয় লোকেদের পিষে ফেলার কথা বলা হয়েছে।
.
উত্তর— এই অভিযোগকারী (সুলেমান রিজভী) এতটাই চতুর এবং প্রতারক যে তিনি এখানে কোনো অনুবাদকের নাম দেননি এবং নিরুক্তের কোনো সূত্রও দেননি। এখানে মন্ত্রের মধ্যে জনজাতীয় সমাজ সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই আর হিন্দুদের বিরুদ্ধে তাদের উত্তেজিত করার জন্য এই ধরণের ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই ব্যক্তিকে আগে নিজের কোরআন পড়া উচিত।
.
এখন আমি এই মন্ত্রকে উপস্থাপন করবো —
.
পদা পণীরঁরাধসো নি বাধস্ব মহাঁ অসি।
নহি ত্বা কশ্চন প্রতি ॥ (অথর্ববেদ ২০.৯৩.২)
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য—
হে পরমেশ্বর! (অরাধসঃ) [অরাধসম্ = অনারাধয়ন্তম্ (নিরুক্ত ৫.১৪)] যারা ঈশ্বরের আরাধনা করে না অর্থাৎ যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এই জগতে স্বেচ্ছাচারী, পাপী আর অহংকারে মদমস্ত হয়ে অন্যদের কষ্ট দেয়, তাদের (পণীন্) এই দুষ্ট ব্যবহার আর এই কুচিন্তাকে (পদা) আপনার সর্বব্যাপক শক্তির দ্বারা (নিবাধস্ব) দূর করে দিন। (মহান্ অসি) হে পরমেশ্বর! আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ। (কশ্চন) মহাবিশ্বের কোনো শক্তিই (ত্বা, প্রতি, নহি) আপনার প্রতিরোধ করতে পারে না অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে কোনো শক্তির অস্তিত্ব নেই।
.
ভাবার্থ - এখানে পরমেশ্বরের উপাসক প্রার্থনা করছেন যে, তার মনে যখনই নাস্তিকতার ভাব আসবে, তিনি যখনই স্বাধীন বিষয়ী হওয়ার ইচ্ছা শুরু করবেন, তিনি যখনই সমস্ত প্রাণীর মধ্যে ঈশ্বরের বাস না মেনে তাদের দুঃখ দিতে শুরু করবেন, তাদের নিজের খাদ্য মনে করে মেরে খেতে শুরু করবেন, তখনই যেন তিনি সেই পরমেশ্বরকে সর্বব্যাপী মেনে তাকে নিজের মধ্যে অনুভব করে এই ধরণের ভাবনাগুলোকে দূর করতে সক্ষম হন।
.
বৈদিক উপাসনা প্রসাদ চড়ানো, ঘন্টা বাজানো আর ফুল আদির অর্পণ করার নাম নয়, বরং এই ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে চিন্তন করতে-করতে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে কণায়-কণায় অনুভব করা আর তার পাশাপাশি নিজের পাপকর্ম নিয়েও চিন্তন করতে-করতে, সেই পরমেশ্বরের কাছ থেকে সেগুলো দূর করার প্রার্থনা এবং সমস্ত সৎ গুণ আর সৎ বুদ্ধির কামনা করাকেই বৈদিক প্রার্থনা বলা হয়। ধ্যানাবস্থিত হয়ে সেই ঈশ্বরকে নিজের আত্মার মধ্যে অনুভব করাকেই উপাসনা বলা হয়। যে পরম চেতনা এই সমগ্র সৃষ্টি রচনা করেছেন, তার সঞ্চালন আর প্রলয় করেন, নিশ্চিতভাবেই তাঁর চেয়ে বড় অথবা তাঁর সমান অন্য কোনো শক্তি কোথাও বিদ্যমান থাকতে পারে না।
.
এখন এই মন্ত্রের উপর অভিযোগকারী বলুক যে এখন কি বলতে চাইবে? এখানে নিজের দুর্ভাবনা দূর করার কথা বলা হয়েছে, কোনো মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কথা নয়। মানুষকে কষ্ট দেওয়ার বিষয় তো বেদবিরোধী মতগুলোর মধ্যেই ভরে পরে আছে আর তাদের মজহব সারা বিশ্বে রক্তপাত ঘটিয়েই ছড়িয়েছে, কিন্তু আমরা বৈদিক মানুষেরা কখনও কোনো দেশ বা ব্যক্তিকে লুট করার কথা মনেও ভাবিনি।

__________________________________________
১৩.
আক্ষেপ -
Rig Veda 4.25.7

"(Indra), the drinker of the effused Soma, contracts no friendship with the wealthy trader who offers not any libation; he takes away his wealth; destroys him when destitute; but he is a special (friend) to him who presents the libation and oblation."
.
ন রেবতা পণিনা সখ্যমিন্দ্রোऽসুন্বতা সুতপাঃ সম্ গৃণীতে। আস্য বেদঃ খিদতি হন্তি নগ্নম্ বি সুষ্বয়ে পক্তয়ে কেবলোভূৎ ॥
.
লোভী বণিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত নয়। তারা তাদের নিরর্থক ধনকে তুলে ধরে আর নষ্ট করে। তারা সোমরস প্রস্তুতকারী তথা হব্যপাককারী য়জমানের অসাধারণ বন্ধু হয়।
.
এখানে ইংরেজি অনুবাদক ইন্দ্রকে সোমরস পানকারী হিসেবে দেখাচ্ছেন। সেই ধনী বণিকদের, যারা ইন্দ্র দেবতার জন্য সোমরস আদি পদার্থ প্রসাদ হিসেবে অর্পণ করে না, তাদের ধন নষ্ট করার কথা বলা হয়েছে আর যারা এমন করে, তাদের ইন্দ্রের বন্ধু বলা হয়েছে। হিন্দি অনুবাদের মধ্যেও এমন লেখা আছে। এখানেও আক্ষেপকারী কোনো অনুবাদকের নাম দেননি।

উত্তর – এখন আমি এই মন্ত্রের ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য প্রস্তুত করবো -

ন রেবতা পণিনা সখ্যমিন্দ্রোऽসুন্বতা সুতপাঃ সম্ গৃণীতে। আস্য বেদঃ খিদতি হন্তি নগ্নম্ বি সুষ্বয়ে পক্তয়ে কেবলোভূৎ ॥ (ঋগ্বেদ ৪.২৫.৭)
.
পদার্থঃ — (ন) (রেবতা) প্রশস্তধনবতা (পণিনা) ব্যবহর্ত্রা বণিগ্জনাদিনা (সখ্যম্) মিত্রভাবম্ (ইন্দ্রঃ) পরমৈশ্বর্য়্যবান্ রাজা (অসুন্বতা) অপুরুষার্থিনা (সুতপাঃ) সুষ্ঠু ধর্ম্মাত্মা রাগদ্বেষরহিতঃ (সম্) (গৃণীতে) উপদিশতি (আ) (অস্য) রাজ্ঞঃ (বেদঃ) দ্রব্যম্ (খিদতি) দৈন্যম্ প্রাপ্নোতি (হন্তি) (নগ্নম্) নির্লজ্জম্ (বি) (সুষ্বয়ে) সুষ্ঠু নিষ্পাদকায় (পক্তয়ে) পাককর্ত্রে (কেবলঃ) অসহায়ঃ (ভূৎ) ভবতি।
.
ভাবার্থঃ – য়ো রাজা ধনাদিলোভেন ধনিনামুপরি প্রীতো দরিদ্রান্ প্রত্যপ্রসন্নো ন ভবতি য়ো দুষ্ঠান্ৎস ম্যগ্দণ্ডয়িত্বা শ্রেষ্ঠান্ সততম্ রক্ষতি নৈবাऽস্য রাষ্ট্রম্ কদাচিৎ খেদম্ প্রাপ্নোতি।
.
পদার্থ - যে (সুতপাঃ) উত্তম প্রকার ধার্মিক আর অনুরাগ অর্থাৎ বিষয়ে প্রীতি আর প্রাণীদের প্রতি বিদ্বেষ থেকে মুক্ত (ইন্দ্রঃ) অত্যন্ত ঐশ্বর্য্যশালী রাজা (রেবতা) শ্রেষ্ঠ ধনশালী (পণিণা) ব্যবসায়ী বৈশ্য জন আদি আর (অসুন্বতা) পুরুষার্থ করে না এমন জনের সাথে (সখ্যম্) বন্ধুত্ব (ন) করে না আর সবাইকে সত্য ন্যায়ের (সম্, গৃণীতে) ভালোভাবে উপদেশ দেয় আর যে (কেবলঃ) সহায়হীন হওয়া (সুষ্বয়ে) উত্তম প্রকার উৎপন্নকারী (পক্তয়ে) পাককর্তার জন্য (ভূৎ) হয় আর যে (নগ্রম্) নির্লজ্জকে (বি, হন্তি) উত্তম প্রকার নাশ করে (অস্য) এই রাজার (বেদঃ) দ্রব্য কখনও (আ, খিদতি) দীনতা অর্থাৎ নাশ প্রাপ্ত হয় না।
.
ভাবার্থ - যে রাজা ধন আদির লোভে ধনীদের উপর প্রসন্ন আর দরিদ্রের প্রতি অপ্রসন্ন হন না আর যিনি দুষ্টদের উত্তমরূপে শাস্তি দিয়ে শ্রেষ্ঠদের নিরন্তর রক্ষা করেন, তার রাজ্য কখনও দুঃখ প্রাপ্ত হয় না।
.
এখানে হিন্দি অনুবাদের মধ্যে কিছু ত্রুটি আছে। কেবল সংস্কৃত ভাষ্যটাই হল ঋষি দয়ানন্দের। সংস্কৃত ভাষ্যের মধ্যে সেই বৈশ্যদের ভালো মনে করা হয়নি, যারা পুরুষার্থ (পরিশ্রম) করে না আর ঝগড়া-বিবাদ উৎপন্ন করে। 'ব্যবহর্ত্রা' পদটি বি+অব উপসর্গপূর্বক হৃঞ্ হরণে ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে, যার অর্থ পণ্ডিত য়ুধিষ্ঠির মীমাংসক তাঁর সংস্কৃত ধাতুকোষের মধ্যে শিল্প করা এবং ব্যবসা করা ছাড়াও ঝগড়া-বিবাদ আদি করাও লিখেছেন। শিল্প-ব্যবসা করা আর পুরুষার্থ করা উভয়ই সমার্থক হয়, কারণ পুরুষার্থ ছাড়া শিল্প-ব্যবসা হতেই পারে না। এখানে 'পণিনা'-র বিশেষণ "অসুন্বতা" দেওয়া হয়েছে আর 'অসুন্বতা'-র অর্থ 'অপুরুষার্থিনা' করা হয়েছে। এই কারণে 'ব্যবহর্ত্রা'-র অর্থ শিল্প করা ব্যক্তি হতে পারে না, বরং ঝগড়া-ঝাঁটি আদি করা ব্যবহারই হবে।
.
এখন এই বিষয়ে চিন্তা করুন যে যদি বৈশ্য পুরুষার্থী না হয় আর ধনবান হয়, তাহলে অবশ্যই সে ছলনা এবং চুরি আদির দ্বারা ধন উপার্জন করেছে, তখন এটাই উচিত হবে যে তার ধন কেড়ে নেওয়া উচিত। বেদ ধনী হওয়ার বিরোধিতা করে না, বরং সে বলে যে -

'বয়ম্ স্যাম পতয়ো রয়ীণাম্'

অর্থাৎ আমরা ধন-ঐশ্বর্যের স্বামী হবো। বেদ বাইবেল নয়, যেখানে বলা হয়েছে -

"ধনীর স্বর্গে প্রবেশ করা ততটাই কঠিন, যতটা সূঁচের ছিদ্র দিয়ে উটের বেরিয়ে আসা।"
.
ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যের হিন্দি অনুবাদকারী পণ্ডিতরা এই ভুলটা করে ফেলেছেন যে তাঁরা 'পণিনা' এবং 'অসুন্বতা' পদের মাঝে 'এবং' শব্দটা নিজেদের কল্পনা থেকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, অথচ মন্ত্রের মধ্যে কোথাও 'চ' অব্যয় নেই। ঋষি দয়ানন্দের অন্বয়ের মধ্যে 'পণিনা' আর 'অসুন্বতা' উভয়কে একসাথে লেখা হয়েছে। এই কারণে এই দুটোকে আলাদা করা এই মন্ত্রের মূল ভাবনারই বিরুদ্ধে হয়েছে আর যুক্তিরও বিরুদ্ধে হয়েছে।
.
এখানে রাজাকে 'সুতপা' বলা হয়েছে অর্থাৎ রাজা তপস্বী হওয়া উচিত আর রাগ-দ্বেষ থেকে মুক্ত হওয়া উচিত, তবেই তিনি সকলের সাথে সত্য ন্যায় করতে পারবেন। রাজা বিলাসী এবং আড়ম্বরী হওয়া উচিত নয়, বরং ত্যাগী হওয়া উচিত। রাজা একাই সব ধরণের পদার্থ উৎপাদনকারী শিল্পপতি এবং নানা ধরণের অন্ন-ফল আদি উৎপাদনকারী কৃষকদের জন্য সর্বদা সহায়ক হন আর নির্লজ্জ দুরাচারী ব্যক্তিদের নষ্ট করেন। এমন রাজার রাজকোষ কখনও নষ্ট হয় না।
.
বলুন, রিজভী মহাশয়! এমন রাজা কি আপনার ভালো লাগে না? মূর্খ অনুবাদকদের ভরসায় বেদের ওপর আক্রমণ করার চেষ্টা করা উচিত নয়, বরং আপনাকে আর বিশ্বের সকল রাজনৈতিক নেতাদের এরথেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

১৪.
আক্ষেপ -
Rig Veda 5.34.8

“When Indra, the possessor of opulence, discriminates between two men, both wealthy, and exerting themselves (against each other) for the sake of valuable cattle, he takes one of them [The one who performs Yajna) as his associate, causing (his adversaries) to tremble, and the agitator (of the clouds), together with the Maruts, bestows upon him herds of cattle.”
.
সম্ য়জ্জনৌ সুধনৌ বিশ্বশর্ধসাবহবেদিন্দ্রো মঘবা গোষু শুভ্রিষু। য়ুজম্ হ্য১ন্যমকৃত প্রবেপন্যুদীম্ গব্যম্ সৃজতে সত্ত্বভির্ধুনিঃ॥
.
উত্তম ধনবান, অত্যন্ত বলশালী দুইজন মানুষ যখন শুভ্র গাভীর জন্য পরস্পর সংগ্রাম করে, তখন ঐশ্বর্যশালী ইন্দ্রদেব তাদের মধ্যে য়াজ্ঞিকেরই সহায়তা করেন। নিজের বল দ্বারা শত্রুদের কাঁপিয়ে তোলা ইন্দ্রদেব এই য়াজ্ঞিককে গাভীর সমূহ দান করেন।
.
Other verses shows that Ishwar provides pro-tection to those who make offerings to him, but Ishwar slays the person who doesn't worship or make offerings. Why is Ishwar behaving like a thug? Shouldn't Ishwar be equal and friendly to everyone irrespective of their offerings?
.
All the verses I quoted above orders to kill those who make no offerings, there are several instances in Vedas wherein tribesmen were killed just because they made no offering to Ishwar,
.
এই দুটো মন্ত্রের অনুবাদের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে বেদের মধ্যে ঈশ্বর দ্বারা য়াজ্ঞিকদের দান এবং অয়াজ্ঞিকদের শাস্তির বিধান করা হয়েছে।
.
উত্তর - এখানেও অভিযোগকারী নিজের স্বভাব থেকে বিরত হননি, যিনি অনুবাদকদের নাম না দিয়েই হিন্দি এবং ইংরেজি উভয় অনুবাদ উদ্ধৃত করেছেন। প্রথমত, এই দুই অনুবাদকও সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন, যাদের মনে যা এসেছে, তাই অনুবাদ করেছেন। দ্বিতীয়ত, অভিযোগকারী মহাশয় তাদের চেয়েও বেশি অশিক্ষিত সিদ্ধ হচ্ছে, যিনি এই সাধারণ অনুবাদগুলোর অর্থও বুঝতে পারেননি আর বিভ্রান্তি ছড়াতে ও লোকেদের উস্কে দিতে উদ্যত হয়েছেন।
.
আমি অভিযোগকারীর কাছে জানতে চাইবো যে এখনও পর্যন্ত আপনি 'যজ্ঞ' এবং "য়াজ্ঞিক' পদের অর্থ বুঝেছেন কি না? যদি না বুঝে থাকেন, তবে আপনার বুদ্ধি সম্পর্কে কি বলবো? চলুন, আবার বুঝিয়ে দিচ্ছি-
.
পরোপকার করা, সমস্ত সজ্জন ব্যক্তিদের সংগঠিত করা এবং সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থের সর্বজনীন কল্যাণে ব্যবহার করার পাশাপাশি মাতা-পিতা, সমস্ত পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তি, গুরু, বিদ্বান এবং অন্যান্য পালক ও রক্ষক মানুষদের সম্মান করাকে যজ্ঞ বলা হয়। এইভাবে যে ব্যক্তি এমন কাজ করেন, তাকে য়াজ্ঞিক বলা হয়। এর বিপরীত স্বার্থপর, লোভী, বড়দের সম্মান করে না বা তাদের কষ্ট দেয়, সৃষ্টির সম্পদের অপব্যবহার বা বিনাশ করে, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রে বিভেদ সৃষ্টি করে, তাকে অয়াজ্ঞিক বলা হয়। যখন দুষ্টজনের মধ্যে কোনো বিবাদ হবে, তখন ন্যায়কারী ব্যক্তির জন্য কি করা উচিত? তিনি কি সেই দুইজনকে একটা পাল্লায় তুলবেন, নাকি সজ্জনের সাহায্য করে দুষ্টকে শাস্তি দিবেন? এর উত্তর অল্প বুদ্ধিমান ব্যক্তিও জানতে পারে। এর নির্ণয় আপনাকে করতে হবে যে আপনার বৌদ্ধিক স্তর কেমন?
.
এখন আমি এখানে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যও উদ্ধৃত করবো —
.
সম্ য়জ্জনৌ সুধনৌ বিশ্বশর্ধসাবহবেদিন্দ্রো মঘবা গোষু শুভ্রিষু। য়ুজম্ হ্য১ন্যমকৃত প্রবেপন্যুদীম্ গব্যম্ সৃজতে সত্ত্বভির্ধুনিঃ ॥ (ঋগ্বেদ ৫.৩৪.৮)
.
পদার্থঃ — (সম্) (য়ৎ) য়ৌ (জনৌ) (সুধনৌ) ধর্মেণ জাতশ্রেষ্ঠধনৌ (বিশ্বশর্ধসৌ) সমগ্রবলয়ুক্তৌ (অবেৎ) প্রাপ্নুয়াৎ (ইন্দ্রঃ) রাজা (মঘবা) পরমপূজিতবহুধনঃ (গোষু) ধেনুপৃথিব্যাদিষু (শুভ্রিষু) শুভগুণেষু (য়ুজম্) য়ুক্তম্ (হি) য়তঃ (অন্যম্) (অকৃত) করোতি (প্রবেপনী) গচ্ছন্তী (উৎ) (ঈম্) উদকম্ (গব্যম্) গোভ্যো হিতম্ (সৃজতে) (সত্ত্বভিঃ) পদার্থৈঃ (ধুনিঃ) কম্পকঃ ।
.
ভাবার্থঃ — রাজ্ঞা স্বরাজ্য উত্তমান্ধনিনো বিদুষোऽধ্যাপকোপদেশকাঁশ্চ সঁরক্ষ্যৈতৈর্ব্যবহারধনবিদ্যোন্নতিঃ কার্য়্যা।
.
পদার্থ — হে মানব ! যে (ধুনিঃ) কম্পনকারী (মঘবা) অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ অনেক ধনযুক্ত (ইন্দ্রঃ) রাজা আর (য়ৎ) যে (সুধনৌ) ধর্ম থেকে উৎপন্ন শ্রেষ্ঠ ধন দিয়ে তথা (বিশ্বশর্ধসৌ) সম্পূর্ণ বলযুক্ত (জনৌ) দুই জনকে (সম্, অবেৎ) ভালোভাবে প্রাপ্ত হন আর (শুভ্ররিষু) উত্তম গুণযুক্ত (গোষু) ধেনু আর পৃথিবী আদির মধ্যে (হি) যার দ্বারা (য়ুজম) যুক্ত (অন্যম) অন্যকে (অকৃত) করে আর (প্রবেপনী) চলমান (গব্যম) গাভীর জন্য উপকারী (ঈম) জলকে (সত্ত্বভিঃ) পদার্থ দ্বারা (উৎ, সৃজতে) উৎপন্ন করে, সে সুখ প্রদানকারী হয়।
.
ভাবার্থ - রাজার উচিত তার রাজ্যের মধ্যে উত্তম ধনী, বিদ্বান তথা অধ্যাপক আর উপদেশকদের উত্তমরূপে রক্ষা করে তাদের দ্বারা ব্যবহার, ধন আর বিদ্যার উন্নতি করা।
.
এখানে ঋষি দয়ানন্দ রাজার কিছু গুণের বর্ণনা করেছেন, সেগুলো এইরকম -
.
১. রাজার উচিত দুষ্ট অপরাধীদের দণ্ড দ্বারা কাঁপিয়ে তোলা।

২. রাজার রাষ্ট্রীয় কোষ ধর্ম অর্থাৎ নৈতিকতার দ্বারা অর্জিত প্রচুর ধনে সমৃদ্ধ হওয়া উচিত।

৩. রাজা ইন্দ্ররূপ হওয়া উচিত অর্থাৎ তার ঐশ্বর্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত হওয়া উচিত।

৪. রাজার উচিত ধর্ম দ্বারা অর্জিত ধনে সম্পন্ন ধনবানদের আর বল আদির দ্বারা সম্পন্ন বলবানদের সহযোগিতার জন্য সর্বদা তৎপর থাকা।

৫. এদের ছাড়াও যেসব দুর্বল আর নির্ধন নাগরিক আছে, তাদেরও শুভ গুণযুক্ত গাভী আদি পশু আর উর্বর ভূমি আদি ধন দ্বারা প্রতিষ্ঠিতকারী হওয়া উচিত।
.
এর অর্থ হল, রাজার উচিত নির্ধনদের ধনবান আর দুর্বলদের বলবান করার পরিস্থিতি তৈরি করা আর যারা ইতিমধ্যে এমন হয়েছে, তাদেরও নিরন্তর উৎসাহিত করা।
.
৬. চারণভূমিতে বিচরণকারী গাভী আদি পশুর জন্য উত্তম পুষ্টিকর ঘাস আদি আর বিশুদ্ধ জলের ব্যবস্থাকারী হওয়া উচিত।

এখন বেদবিরোধী মিত্র ভাবুন যে আপনার কি এমন রাজা দরকার নেই? বস্তুতঃ আপনার কাছে সেই রাজারা আদর্শ বলে মনে হয়, যারা ধর্মান্ধ হয়ে নিষ্ঠুরভাবে অন্য মতাবলম্বীদের ব্যাপক সংহার করে অন্য দেশগুলোকে নিজের দাস বানায় তথা নাগরিকদের বলপূর্বক তাদের মজহবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে।
__________________________________________

১৫.
আক্ষেপ -
Rig Veda 3.53.14

"O bounteous Lord, of what avail are the cattle of infidels to you. Neither they yield milk nor do these faithless persons kindle sacred fire. May you bring wealth of these unbelievers to us and give us possession of people of low mortality and crush them."

-Tr. SatyaPrakash Saraswati
.
This verse is referring to the Kikata tribe who were plundered by Vedic heroes and killed. Maharishi Yaska explains this as,
.
Nirukta 6.32 What are the cows doing in Kikata? Kikata is the name of a country where the non-Aryans dwell. Non-Aryan tribes are (so called because it is said), What have they done? Or their assumption is that religious rites are useless. They neither get the milk to mix with the soma, nor kindle fire.
.
Here the Vedic god is invoked to plunder the cows of of Kikata people and to plunder the wealth of the king of Kikata tribe. As I said earlier, many tribes were plundered and looted by Vedic gods just because they made no offering to Ishwar, Kikata and Panis tribes are few examples. Here is another translation by Arya Samaj,
.
Rig Veda 3.53.14

"O learned king! you possess admirable wealth, what do the cattle do among the atheists because they have no faith in the Vedic teachings and rites or in place inhabited by them. They yield no milk to mix with theSoma, and do not perform the Yajna with the ghee of the cows. Therefore, bring them to us, so that we may use them for hospitality (giving the milk mixed with Soma) to teachers and prea-chers. Give us wealth taken away from the wicked persons for the use of those who hailing from a good family come to us. Remove far away from us a man who uses his power for doing mean or inglorious acts or keep him under us."

-Tr. Acharya Dharma Deva Vidya Martanda
.
Swami Dayanand Saraswati wrote on this verse, "As the cows do not grow among the wicked atheists, in the same manner, Dharma and other virtues do not grow among the persons lacking faith. Among the enlightened persons atheists can never have the upper hand. Therefore, good scholars should blot out atheism."

-Tr. Acharya Dharma Deva Vidya Martanda

উত্তর - এখানে সুলেমান রিজভী বেদ আর আর্যসমাজকে বদনাম করার জন্য সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেছেন। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.১৪ মন্ত্রের বিভিন্ন ভাষ্যের ইংরেজি অনুবাদ পেশ করে আক্ষেপকারী বলতে চাইছেন যে, জনজাতিদের গাভী আদি পশু রাখার অধিকার নেই। এখানে মহর্ষি য়াস্ককেও উদ্ধৃত করেছেন আর তাঁর ভাষ্যের উপরেও এই একই আক্ষেপ আছে।
.
এখানে আমি সর্বপ্রথমে তো এটাই বলতে চাইবো যে, বেদমন্ত্রের সর্বপ্রথম ভাষ্য আধিদৈবিকই হয়, কারণ বেদমন্ত্র থেকেই সৃষ্টির রচনা হয়েছে। আধিদৈবিক ভাষ্যই স্বাভাবিক ভাষ্য হয় আর সেগুলোও অনেক প্রকারের হতে পারে, কিন্তু যে ভাষ্য যেকোনো বেদমন্ত্রের সৃষ্টির উপর পড়া প্রভাবকে ধরে রাখে, সেই ভাষ্যই বাস্তবে স্বাভাবিক হয়। অন্য প্রকারের আধিদৈবিক ভাষ্য ভাষ্যকারের ঊহা, প্রতিভা ও রুচির অনুকূল হতে পারে। যেকোনো লেখক দেশ-কাল-পরিস্থিতি অনুসারে আধিভৌতিক ভাষ্য ভিন্ন-ভিন্ন করতে পারেন। একইভাবে আধ্যাত্মিক ভাষ্যের বিষয়েও বুঝে নিবেন।
.
আমি আমার নিরুক্ত-ভাষ্য 'বেদার্থ-বিজ্ঞানম্'-এ এর আধিদৈবিক ভাষ্য করেছি, যেখানে গভীর সূর্য বিজ্ঞানের বর্ণনা আছে, কিন্তু সেটা আমি এখানে উদ্ধৃত করছি না, এটাকে পাঠক গ্রন্থের মধ্যে যথা স্থানে পড়তে পারেন। তাছাড়া এইরকম আক্ষেপকারীর বুদ্ধি আমার আধিদৈবিক ভাষ্যকে বুঝতে সক্ষমও নয়। আমি এখানে ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য উদ্ধৃত করবো, যেটা আক্ষেপ-কর্তা আর্য বিদ্বানদের দ্বারা করা ইংরেজি অনুবাদ উদ্ধৃত করেছেন।
.
কিম্ তে কৃণ্বন্তি কীকটেষু গাবো নাশিরম্ দুহ্রে ন তপন্তি ঘর্মম্। আ নো ভর প্রমগন্দস্য বেদো নৈচাশাখম্ মঘবন্ রন্ধয়া নঃ॥ (ঋগ্বেদ ৩.৫৩.১৪)
.
পদার্থঃ — (কিম্) (তে) তব (কৃণ্বন্তি) (কীকেটেষু) অনায়্যদেশনিবাসিষু ম্লেচ্ছষু (গাবঃ) ধেনূঃ (ন) (আশিরম্) য়দস্য তে তত্ ক্ষীরাদিকম্ (দুহ্রে) দুহন্তি (ন) (তপন্তি) (ঘর্মম্) দিনম্। ঘর্ম ইত্যহর্না. (নিঘন্টু ১.৯) (আ) সমন্তাত্ (নঃ) অস্মভ্যম্ (ভর) ধর (প্রমগন্দস্য) য়ঃ কুলীনো মাম্ গচ্ছতি স তস্য (বেদঃ) ধনম্ (নৈচাশাখম্) নীচা শাখা শক্তির্য়স্মিঁস্তম্ (মঘবন্) পূজিতধনয়ুক্ত (রন্ধয়) নিবারয় (নঃ) অস্মাকম্।
.
ভাবার্থঃ — অত্রোপমালঙ্কারঃ। য়থা ম্লেচ্ছেষু গাবো ন বর্দ্ধন্তে নাস্তিকেষু ধৰ্মাদয়ো গুণাশ্চ, তথৈব বিদ্বত্স্বনীশ্বরবাদিনঃ প্রবলা ন জায়ন্তে তস্মাদ্বিদ্বদ্ভির্মনুষ্যেষু নাস্তিকত্বম্ সর্বথা নিবারণীয়ম্।
.
পদার্থ - হে বিদ্বান! (তে) আপনার (কীকটেষু) অনার্য দেশে বসবাসকারীদের মধ্যে (গাবঃ) গাভী থেকে (ন) না (আশিরম্) দুগ্ধ আদিকে (দুহ্রে) দোহন করে (ঘর্মম্) দিনকে (ন) না (তপন্তি) তাপায় তারা (কিম) কি (কৃণ্বন্তি) করে বা করবে আর আপনি (নঃ) আমাদের জন্য (প্রমগন্দস্য) যে কুলীন আমাকে প্রাপ্ত হয়, তার (বেদঃ) ধনকে (আ) সব প্রকারে (ভর) ধারণ করুন আর হে (মঘবন্) শ্রেষ্ঠ ধনযুক্ত! আপনি (নঃ) আমাদের (নৈচাশাখম্) নীচ শক্তি যাতে আছে তার (রন্ধয়) নিবৃত্তি করুন।
.
ভাবার্থ - এই মন্ত্রের মধ্যে উপমালঙ্কার আছে। যেমন ম্লেচ্ছ লোকেদের মধ্যে গাভীর, নাস্তিক পুরুষদের মধ্যে ধর্ম আদি গুণের বৃদ্ধি হয় না আর তেমনই বিদ্বানদের মধ্যে ঈশ্বরকে না মানার প্রবণতা যেন প্রবল না হয়, এর থেকে বোঝা যায় যে মানুষদের মধ্যে নাস্তিকতাকে সর্বথা বারণ করা উচিত।
.
এখানে স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতীর তুলনায় আচার্য ধর্মদেব বিদ্যামার্তণ্ডের অনুবাদ অধিক উপযুক্ত আছে। নাস্তিক আর আস্তিকের যথার্থ সংজ্ঞা আমি আগেই বলেছি। যেসব ব্যক্তি গাভীর ঘি দিয়ে পরিবেশ-শোধক যজ্ঞ করে না, গোদুগ্ধ আদি পান করাও যাদের ভালো লাগে না আর যারা মাংসাশী, যারা সেই গাভীদের মাংস এবং চর্বি আদির জন্য লালন-পালন করে, তাদেরই অনার্য বলা হয়। গাভী হল সংসারের সর্বাধিক উপকারী পশু, তাকে মেরে খাওয়া, যেন মানুষকে মেরে খাওয়ার সমান হয়, তাও তখন, যখন সেই মানুষটিও উপকারী হয় আর যখন মানুষ পাপী, চোর, ডাকাত আর মাংসাশী হবে, তখন গো-হত্যা তার হত্যার চেয়ে কয়েক গুণ বড় অপরাধ হবে, তাছাড়া পাপী মানুষকে মারা তো পুণ্যের কাজ, কারণ তার মৃত্যুর ফলে অনেক মানুষ আর পশুপাখির উপকার হবে। এমন অনার্য অর্থাৎ দুষ্ট লোকেদের কাছে গাভীর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় না, কারণ তারা তাদের মেরে খেতে থাকে।
.
এখানে মন্ত্রের মধ্যে বলা হয়েছে যে, পাপী লোকেদের দেশে যেভাবে গাভীর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় না, সেইভাবে নাস্তিক লোকেদের মধ্যে ধর্ম আদির সদ্গুণের বৃদ্ধি হয় না। এই কারণে এখানে কামনা করা হয়েছে যে, নাস্তিক লোকেরা যেন কখনোই বলবান না হয়, অন্যথা তারা মানুষ আর পশুপাখিদের কষ্ট দিতেই থাকবে। মনে রাখা দরকার যে, নাস্তিকের সংজ্ঞা সেটাই মানা উচিত, যেটা আমি পূর্বে লিখেছি।
.
আজ পৃথিবীতে নাস্তিক ও পাপী লোকেদের কাছেই পৃথিবীর সর্বাধিক সম্পদ আছে। তাই সারা পৃথিবীতে ভয়, আতঙ্ক, দুঃখ, কষ্ট, হিংসা, বৈরিতা, ঈর্ষা আদির ছড়াছড়ি আর পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই আর এমন মনে হয় যে, বেদবিরোধীদের কাছে অশান্তি আর হিংসাই প্রিয়। যারা পৃথিবীতে ধর্মের নামে নির্দোষ মানুষ আর নিরীহ পশুপাখির রক্তে স্নান করাকে নিজেদের অধিকার মনে করে, তারা বেদের উপর আক্ষেপ করতে এসেছে। এর চেয়ে বড় আশ্চর্যের আর কি হতে পারে?
.
এখন পর্যন্ত আমি ১৫ টা আক্ষেপের উত্তর দিয়েছি, যা প্রায়শঃ বেদের মধ্যে সহিংসতার অভিযোগে আছে। এই ১৫ টা আক্ষেপের উত্তর মনোযোগ দিয়ে নিরপেক্ষভাবে পড়ে বিশ্বের যেকোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি ভয় তৈরি করা, কোনো নির্দোষকে কষ্ট দেওয়া বা হত্যা করা, অকারণে কারও সাথে শত্রুতা করা—এমন অভিযোগ বেদের উপর দোষারোপ করতে পারবে না। যেখানেই বেদের উপর এই ধরণের অভিযোগ করা হয়েছে, সেই সব অভিযোগের উত্তর এই ১৫ টা আক্ষেপের উত্তর থেকেই পাওয়া যাবে।
.
বৈদিক ধর্ম আর সংস্কৃতির মধ্যে এটা স্পষ্ট আছে যে, চোর, ডাকাত, দুরাচারী, সমাজ আর রাষ্ট্রের প্রতি কোনো সদ্ভাবনা নেই, ধনবান হওয়া সত্ত্বেও কৃপণের মতো এমন দুষ্ট জনদেরই শত্রু বানানোর বিধান আছে আর এমন শত্রুকেই শাস্তি দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো সভ্য দেশের আইনও এমন দুষ্টদের শাস্তিরই আদেশ দেয়, তাহলে বেদের উপর দোষারোপ করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আজও কি কিছু আরব দেশের মধ্যে অপরাধীকে অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই? এত বিস্তারিত ব্যাখ্যার পর আমার মনে হয় না যে, এখন বেদের মধ্যে সহিংসতার কোনো অভিযোগের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে। তাই আমি এই প্রসঙ্গকে এখানেই স্থগিত করছি আর অন্যান্য আক্ষেপ নিয়ে বিবেচনা করবো।

১৬.
🪴 বেদের উপর অশ্লীলতার অভিযোগ 🪴

'Hinduism Exposed Obscenity in Vedas' নামে সুলেমান রিজভীর একটা প্রবন্ধ আছে। এরমধ্যে লেখক হিন্দু গ্রন্থগুলোতে খোলাখুলি অশ্লীলতা ও যৌনাচারের অভিযোগ এনেছেন। এর জন্য প্রধান লক্ষ্য হিসাবে বেদ ও এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ 'নিরুক্ত'-কে বানানো হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে ইনি ভাগবত, ব্রহ্মবৈবর্ত ও শিবপুরাণাদি মধ্যযুগীয় গ্রন্থগুলোর আলোচনা পর্যন্ত করেননি। তবে হ্যাঁ, কামসূত্রের নাম অবশ্যই নিয়েছেন। এর পাশাপাশি খাজুরাহো মন্দির আর অজন্তা ও ইলোরা গুহাগুলোকেও প্রমাণ হিসাবে পেশ করেছেন।
.
আশ্চর্যের বিষয় হল, যাদের কুরআনাদি গ্রন্থের মধ্যে কোথাও ব্রহ্মচর্য ও অহিংসার নাম পর্যন্ত নেই, তারা আমাদের সদাচার, লজ্জা ও অহিংসার উপদেশ দিচ্ছেন। অনেক স্ত্রীর অনুমতি দেওয়া তথা অন্যের স্ত্রীদেরও লুট করা লোকেরা এখন বৈদিক সনাতনী লোকেদের বেদের অশ্লীলতা দেখাচ্ছেন, এটা দুঃসাহস নয়তো কি, যাইহোক!
.
আমি রিজভী মহাশয়ের অভিযোগের উত্তর দেওয়ার পূর্বে আমাদের তথাকথিত সনাতনী বিদ্বান মহানুভবদের বলতে চাইবো যে, যদি আপনারা আপনাদের গ্রন্থগুলো পড়তেন, তাহলে আপনাদের স্বয়ংই এই গ্রন্থগুলোর মিথ্যা ভাষ্য ও অনুবাদের বোধ হতো আর সত্য ভাষ্য করার ইচ্ছা তো হতো তথা মন্দিরে প্রতিমাপূজা ও ঘণ্টা শঙ্খ বাজানো বা অন্য যুক্তিহীন কর্মকাণ্ড ও কথা শ্রবণ-শ্রাবণ করেই নিজেকে কৃতার্থ মনে করতেন না। একইভাবে যদি আর্য বিদ্বানরাও বেদের উপর পরিশ্রম করতেন তথা মঞ্চশূরতা ও সম্মেলনের নামে বাহ্যিক আড়ম্বর, বেদের নামে গল্প-কাহিনী শোনা ও বলা, কোথাও দর্শনগ্রন্থের উপর নিজের কল্পনা অনুযায়ী ব্যাখ্যা ও প্রচার, কোথাও য়োগের নামে কল্পিত ধ্যান ও সমাধি বা শুধুমাত্র ব্যায়ামের প্রদর্শনী তথা বৈরাগ্যের নামে পরিবার ভাঙা ও পলায়নবাদের মিথ্যা রাষ্ট্রঘাতী উপদেশে না জড়িয়ে থাকতেন, তাহলে একশো পঞ্চাশ বছরের দীর্ঘ সময়কালে বেদের উজ্জ্বল বিজ্ঞানকে বিশ্বের মধ্যে প্রকাশ করে দিতেন।
.
এটা দুর্ভাগ্যের বিষয় যে তথাকথিত আর্য এবং তথাকথিত সনাতনীরা অর্থাৎ এই দুটো মিলে বেদবিরোধী লোকেদের নিজেরই বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। এই বেদবিরোধীদের তাদের ত্রুটি দেখানোর জন্য কিছু আর্যসমাজী তো তাদের মিথ্যা গ্রন্থও পড়েছেন আর শাস্ত্রার্থে তাদের সর্বদা ধরাশায়ীও করেছেন, কিন্তু আমার তথাকথিত সনাতনী বিদ্বানরা বেদবিরোধীদের আক্রমণের উপর কখনও মনোযোগ দেননি আর নিজেদের শাস্ত্র ও পূর্বপুরুষদের অপমান চুপচাপ সহ্য করে গেছেন আর আর্যসমাজেরই নিন্দা করাকে সনাতন ধর্মের রক্ষা বলে মনে করেছেন।
.
আমার মনে হয় যে লেখক এই কারণে কেবল বেদকে নিশানা বানিয়েছেন আর পৌরাণিক গ্রন্থকে ছেড়ে দিয়েছেন। এর পাশাপাশি সায়ণ ও মহীধরের বেদভাষ্যও কোথাও উদ্ধৃত করেননি, অধিকাংশ আর্যসমাজীদের ভাষ্য বা অনুবাদ উদ্ধৃত করেছেন। দ্বিতীয় কারণ এই মনে হচ্ছে যে সারা বিশ্বের সমস্ত আসুরী শক্তি এই পৃথিবী থেকে মানবতার সম্পূর্ণ বিনাশ করতে চেয়েছে এবং আজও এটা হচ্ছে। সেই দুষ্ট শক্তিগুলো এটাও জানে যে মানবতার আধারভূত গ্রন্থ হল কেবল বেদ তথা বেদের বিজ্ঞান হল বর্তমান বিজ্ঞান, যা বৃহৎ অংশে আসুরী বিজ্ঞান, তার থেকেও অধিক উৎকৃষ্ট।
.
বেদের বিজ্ঞান হল প্রাণীমাত্রের হিত সম্পাদক, যেখানে আসুরী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হল শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতিকে সমৃদ্ধ ও নিরঙ্কুশ বানানোর সাধন। এই কারণে এই শক্তিগুলো বেদকে নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর হয়েছে। এই শক্তিগুলো এও জানে যে, বেদের কিছুটা হলেও অর্থ জানার ঐতিহ্য কেবল আর্যসমাজেই আছে, অথচ তথাকথিত সনাতনীরা আসলে মুষ্টিমেয় কিছু জন তো কেবল বেদপাঠ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ আছে তথা অধিকাংশ তো ভাগবতাদি পুরাণ, রামচরিতমানস, হনুমান চালিসা, গীতা ও বহুদেববাদে জড়িয়ে মূর্তিপূজা আদির মধ্যেই নিজেদের ধর্ম মনে করে বসে আছে। এই কারণেও বেদ ও আর্যসমাজকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, গৌণরূপে সমগ্র হিন্দু সমাজকে আক্রমণ করা হয়েছে।
.
খাজুরাহো আদি মন্দিরে কেমন মূর্তি আছে, সেই সম্পর্কে আমার একেবারেই ধারণা ছিল না। একদিন আমার এক সহকর্মী প্রিয় রাকেশ উপাধ্যায় জানালেন যে, সেখানে অনেক অশ্লীল মূর্তি আছে। আমি কাউকে বলে মোবাইল ফোনে দেখার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এক-দুটি ছবি দেখার পর আমি আর দেখতে পারিনি। বস্তুতঃ এই মন্দিরগুলো সনাতন ধর্মের নামে কলঙ্ক। কিন্তু কারা সেই লোক, যারা আজও এই মন্দিরগুলোকে মহিমান্বিত করে চলেছে? এমন মনে হয় যে, হিন্দু সমাজকে দিশাহীন করার জন্য সনাতন ধর্মের নামে বিভিন্ন ভণ্ডামিকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বিদেশি শক্তিগুলো যুগ যুগ ধরে ষড়যন্ত্র করে আসছে আর হিন্দু সমাজ শুরু থেকেই বুদ্ধিহীনতার শিকার হয়ে আসছে, এই কারণেই একে দাসত্বের দংশন ভোগ করতে হয়েছে।
.
কামসূত্রকে বাৎস্যায়ন মুনির লেখা বলে মনে করা হয়, আর্য বিদ্বানরাও কি এমনটা মনে করেন? আমি আমার এক গৃহস্থ শিষ্য, যে দিল্লিতে সংস্কৃত শিক্ষক, তাকে জিজ্ঞেস করি - 'তুমি কি কখনো কামসূত্র দেখেছ?' সে বলে - 'দেখেছি', আমি জিজ্ঞাসা করি- 'তাতে কি বিজ্ঞান আছে?' সে বলল যে তাতে বিজ্ঞানের মতো কিছু মনে হয় না, বরং সাধারণ কিছু বিষয় আছে, যা কুরুচিপূর্ণ শৈলীতে লেখা। এতে আমি বুঝে যাই যে কামসূত্রের লেখক কোনো মুনি নন, বরং কোনো কামুক পুরুষ হবেন। যেভাবে ভাগবতাদি আঠারো পুরাণের রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাসকে মিথ্যাই প্রচার করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই কামসূত্রের রচয়িতা বাৎস্যায়ন মুনিকে মিথ্যাই প্রচার করে ঋষি-মুনিদেরকে জংলী সিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমন মনে হচ্ছে যে বর্তমান বিদ্বানদের মধ্যে সত্য-মিথ্যা ও আর্ষ-অনার্ষ চেনার মতো বিবেকই আর নেই।
.
আমাদের বিদ্বানদের ঋষিদের বিচার জানার জন্য প্রথমে এটা জেনে নেওয়া উচিত যে ঋষি কাকে বলে? এটা না জেনে কোনো গ্রন্থ ঋষিকৃত (ঋষি দ্বারা রচিত) তা জানা সম্ভব নয়। যিনি ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার করে বেদমন্ত্রের মহান জ্ঞান-বিজ্ঞান জেনে নেন, তাঁকেই ঋষি বলা হয়। ঈশ্বর-সাক্ষাৎকারের জন্য পূর্ণ য়োগী হওয়া অনিবার্য আর অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ নামক পাঁচটা য়ম তথা শৌচ (বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা), সন্তোষ, তপ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান, এই পাঁচটা নিয়ম পালন করা বাধ্যতামূলক। এখানে আমরা বেদের ওপর অশ্লীলতার আক্ষেপ নিবারণের বিষয়ে আলোচনা করছি, এই কারণে এখানে কেবল ব্রহ্মচর্য নামক য়মই প্রাসঙ্গিক হবে। ব্রহ্মচর্যের মর্যাদাও ঋষিরা নির্ধারণ করেছেন, সেটা হল এইরকম -
.
যদি গৃহস্থের কামনা থাকে, তবুও ন্যূনতম পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত পূর্ণ ব্রহ্মচারী থাকবে অর্থাৎ স্বেচ্ছায় বীর্যনাশ কখনও করবে না। বিবাহিত হলেও পূর্ণ ঋতুগামীই হবে তথা শুধুমাত্র সন্তান কামনায় স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করবে, বিলাসের জন্য কখনই নয়। কোনো বেদবিরোধী এমন আদর্শ পরিস্থিতির কল্পনা করার সাহসও করতে পারবে না।
.
এবার ভাবুন যিনি ঋষি বা মুনি হবেন, তিনি অনিবার্যভাবেই এমন ব্রহ্মচারী হবেন। তখন এমন ঋষি বা মুনি না তো কামসূত্রের মতো অশ্লীল কিছু লিখবেন আর না কোনো খাজুরাহোর মতো পাপ-পঙ্কে ডুবে থাকা মন্দির তৈরির অনুপ্রেরণা দিবেন। না তিনি ভাগবত-ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণাদিতে বর্ণিত অশ্লীল প্রসঙ্গ লিখবেন আর না বেদাদির অশ্লীল টীকা লিখবেন। ঋষির যে সংজ্ঞা বৈদিক বাঙ্ময়ের মধ্যে আছে, ঈশ্বর উপাসনার যে পদ্ধতি বৈদিক বাঙ্ময়ের মধ্যে আছে, তেমন সংজ্ঞা ও পদ্ধতি পৃথিবীর যেকোনো মত-মজহবের মধ্যে দেখান।
.
সুলেমান রিজভী দেখুন যে নিজের ওখানে সদাচারের কোথাও কোনো ইঙ্গিতও আছে কি? যেখানে-যেখানে দীন বা কর্তব্যের বর্ণনা আছে, সেখানে সত্য, অহিংসা, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহের মতো পবিত্র মানবিক মূল্য আছে কি? এমন পরিস্থিতিতেও আপনি বৈদিক সাহিত্যে অশীলতা খুঁজতে এসেছেন ! আপনি ভাগ্যক্রমে পথভ্রষ্ট ভাষ্যকার লেখক এবং হিন্দুদের প্রমাদ আপনাকে এমন সামগ্রী দিয়েছে, তবুও আপনি নিজের সাহিত্য ও ঘর তো দেখে নিতেন।
.
বড় আশ্চর্যের বিষয় হল পৃথিবীতে যেসব লোকেরা এই ভূ-পৃষ্ঠকে রক্তে রাঙিয়েছে, যারা কারও প্রাণ নেওয়ার সময়ও মৃতকের অধিকাধিক যন্ত্রণা হোক, এমন নিষ্ঠুর কাজ করে। যারা নিজেদের পেটকে পশুপাখির কবরস্থান বানিয়েছে, তারা আমাদের অহিংসা, ভ্রাতৃত্বের পাঠ পড়াবে। কোনো বেশ্যা কোনো পতিব্রতা নারীকে পতিব্রত ধর্মের উপদেশ করবে, রাত-দিন মদের নেশায় নোংরা নর্দমায় পড়ে থাকা কোনো ব্যক্তি নর্দমায় পড়ে থেকেই নেশাবন্দী (মদ নিষিদ্ধকরণ) নিয়ে ভাষণ দিবে। বেদের ওপর কলঙ্ক লেপনকারীদের অবস্থাও ঠিক তেমনই।
.
এখন আমি আমার হিন্দু ভাই-বোন তথা বৈদিক সনাতন ধর্মের ধ্বজাধারী বলে পরিচিত বিদ্বান ব্যক্তি, শঙ্করাচার্য, মহামণ্ডলেশ্বর, দিন-রাত কেবল মুসলমানদের ষড়যন্ত্র ফাঁস করতে থাকা বক্তা ও প্রবক্তা, রাষ্ট্রবাদের কর্ণধার হিসেবে পরিচিত মঞ্চশূর, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্রের উন্মোচনকারী গবেষক, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS) এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো নিজেদের হিন্দুদের রক্ষক মনে করা সংগঠন, বেদের ওপর অনুসন্ধান অথবা ভাষণ দেওয়া আর্যসমাজী বা পৌরাণিক বৈদিক পণ্ডিত, ভাগবত-রামচরিতমানস আদির কথা-পাঠ করে ধনৈশ্বর্যে মত্ত কথাবাচক, বিভিন্ন তথাকথিত ধর্মীয় আয়োজনকারী, আর্যসমাজের সকল সভা, ঋষি দয়ানন্দের নামে উত্তেজনাপূর্ণ মহাসম্মেলন আয়োজনকারীদের কাছে বিনম্র অনুরোধ করতে চাইবো যে নিজের পায়ের নিচে তাকিয়ে দেখুন, তো আপনারা ভূমিও দেখতে পাবেন না।
.
আপনারা হাওয়ায় উড়ছেন, এই কারণে মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, বামপন্থী যে কেউ আপনাদের তুলে আছড়ে মারছে। তারা আপনাদের বেদ ও ঋষিদের ওপর আক্রমণ করছে আর আপনারা মিথ্যা আস্থার আফিম খেয়ে ঘুমিয়ে আছেন। বেদের ওপর আক্রমণের উত্তর কোরান ও বাইবেলের ওপর আক্রমণ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এর উত্তর কেবল শাস্ত্রের প্রকৃত ও বৈজ্ঞানিক স্বরূপকে অনুধাবন করেই দেওয়া সম্ভব, যা আপনাদের মধ্যে কেউই স্বীকার করতে চান না। আপনারা নিজেদের অর্থ এই সমস্ত আয়োজন, মন্দির নির্মাণ আদির মধ্যেই বৃথা ব্যয় করছেন, মূল আদর্শ মুছে যেতে দেখেও মৌন হয়ে আছেন। বৈদিক বিজ্ঞানের জন্য আপনাদের কাছে না আছে অর্থ, না আছে সময়, আর না আছে কোনো পরিকল্পনা। আপনাদের কাছে কেবল মিথ্যা আড়ম্বরের জন্য ধন আর সময় আছে। তখন আপনাদের বাঁচাতে কোনো দেবদূত আসবে না।
.
আজ যারা ধর্মাচার্য ও য়োগ-অধ্যাত্মের প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে, তারা বেদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কেবল আনাড়িই নয়, বরং তারা বেদের মধ্যে মানবিক ইতিহাস বলা, অশ্লীলতাকে গৃহস্থ ধর্ম বলা, পশুবলিকে বৈদিক হিংসা বলে উচিত বলার মতো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করছে। এটা তাদের অজ্ঞানতা তো বলা হবেই, বরং এদের বিদেশি বেদবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা প্ররোচিত ও উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বেদবিরোধীরা খুব চালাক হয়। তারা আমাদেরই লোকেদের মীর জাফর বানিয়ে দেয়।
.
এই ভূমিকার পশ্চাৎ এখন আমি আক্ষেপের উপর বিচার করবো —
.
সর্বপ্রথমে তো আমি এটা বলতে চাইবো যে প্রত্যেক বেদমন্ত্রের মূল ও স্বাভাবিক অর্থ কেবল আধিদৈবিকই হয়, অন্য অর্থ তো বিদ্বানদের দ্বারা দেশ, কাল ও পরিস্থিতিকে দৃষ্টিতে রেখে করা হয়, কিন্তু এমন নয় যে এমন সব অর্থ মিথ্যা হয়। যদি বেদের আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ না থাকে, তাহলে মানুষ লোকব্যবহার এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষা কোথা থেকে গ্রহণ করবে? আধিদৈবিক অর্থ সৃষ্টির সূক্ষ্ম রহস্যের উন্মোচন করে, যেহেতু লোকব্যবহার ছাড়াও সৃষ্টির স্থূল পদার্থের বিবেচনা আধিভৌতিক অর্থে তথা আত্মা-পরমাত্মা ও মোক্ষ আদির পাশাপাশি শরীর ক্রিয়া-বিজ্ঞান আধ্যাত্মিক অর্থের অন্তর্ভুক্ত মানা উচিত।
.
ধর্তব্য হল, একই বেদ মন্ত্রের সৃষ্টির ভিন্ন-ভিন্ন প্রক্রিয়াতে কিছুটা ভিন্ন প্রভাবও হতে পারে, এই কারণে একই মন্ত্রের আধিদৈবিক অর্থও একাধিক হতে পারে। বেদের মধ্যে সব সত্য বিদ্যা আছে, এই কারণে শরীর ও ব্রহ্মাণ্ড উভয়ের সেই যথাযথ তথ্য, যা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়, বেদের মধ্যে বিদ্যমান আছে। কিছু বিদ্বান এই অজুহাতে অনেক অশ্লীল কথা ও বাহ্যিক যৌনাঙ্গের জঘন্য বর্ণনা করেছেন আর এমন অভদ্র ভাষ্যও করা হয়েছে। বেদের মধ্যে শরীর ক্রিয়াবিজ্ঞান সেই শৈলীতেই থাকতে পারে, যে শৈলী শরীর ক্রিয়াবিজ্ঞানের হয়, যার মধ্যে একটা মর্যাদা ও শালীনতা থাকে এবং যার মধ্যে গভীর বিজ্ঞান নিহিত থাকে।
.
দুর্ভাগ্য এই যে, আজ অশ্লীল কথাগুলোকেই গৃহস্থের বিজ্ঞান হিসেবে বর্ণনাকারীদের ছড়াছড়ি হয়ে আছে। এমন কথা যারা বলে, তারা গৃহস্থকে পশুর থেকেও নিচে নামিয়ে দেয় আর বেদের গৌরবকে নষ্ট করে দেয়। আমি এমন সমস্ত ভাষ্যকার এবং তাদের অন্ধভক্ত বিদ্বানদের খণ্ডন করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে আছি।

১৭.
এই প্রকরণে আক্ষেপকর্তার আক্ষেপ হল এইরকম -

Yajur Veda 19.88

“Just as a wife, the recipient of semen, at the time of cohabitation keeps her head opposite to the head of the husband, and her face opposite to that of his, so should both husband and wife perform together their domestic duties. A husband is a protector like a physician. He lives happily like a child, and with tranquility produces progeny with penis keen with ardor.”

—Tr Devi Chand (Arya Samaj)

Following is the Arya Samaj Hindi translation with commentary—
.
পদার্থ - হে মনুষ্যগণ! যেমন (জিহ্বা) যা দিয়ে রস গ্রহণ করা হয় তা (সরস্বতী) বাণীর সমান স্ত্রী (অস্য) এই পতির (সতেন) সুন্দর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা বিভক্ত মস্তকের সাথে (শিরঃ) মস্তক যুক্ত করে তথা (আসন্) মুখের নিকট (পবিত্রম্) পবিত্র (মুখম্) মুখ করে। একইভাবে (অশ্বিনা) গৃহস্থ আশ্রমের আচরণে ব্যাপৃত স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই (ইৎ) বর্তমান থাকবে তথা যে (অস্য) এই রোগ থেকে (পায়ুঃ) রক্ষক (ভিষক্) বৈদ্য আর (বালঃ) বালকের (ন) সমান (বস্তিঃ) বাস করার হেতু পুরুষ (শেপঃ) উপস্থেন্দ্রিয়কে (হরসা) বল দ্বারা (তরস্বী) করার অধিকারী হয় সে (চপ্যম্) শান্তি করার (ন) সমান (সৎ) বর্তমানে সন্তান উৎপত্তির হেতু হোক, সেই সব কিছু যথাযথভাবে করবে।
.
ভাবার্থ - স্ত্রী-পুরুষ গর্ভাধানের সময় পরস্পর মিলে প্রেমপূর্ণ হয়ে মুখের সাথে মুখ, চোখের সাথে চোখ, মনের সাথে মন, শরীরের সাথে শরীরের অনুসন্ধান করে গর্ভ ধারণ করবে, যাতে কুরূপ বা বকরাঙ্গ সন্তান না হয়।
.
এখানে আক্ষেপকারী বলতে চাইছেন যে বেদের মধ্যে যৌন-ক্রিয়ার খোলা ও অশ্লীল প্রদর্শন আছে।
.
উত্তর - আসুন, আমরা এই বিষয়ে বিচার করি -
.
মুখঁ সদস্য শির ইৎ সতেন জিহ্বা পবিত্রমশ্বিনাসন্ৎসরস্বতী ।
চপ্যম্ ন পায়ুর্ভিষগস্য বালো বস্তির্ন শেপো হরসা তরস্বী ॥
(য়জুর্বেদ ১৯.৪৪)
.
পদার্থঃ - (মুখম্) (সৎ) (অস্য) পুরুষস্য (শিরঃ) (ইৎ) এব (সতেন) উত্তমাবয়বৈর্বিভক্তেন শিরসা। সৎ ইত্যুতরনা০ (নিঘন্টু ৩.২৯) (জিহ্ব) জুহোতি গৃহ্বাতি য়য়া সা (পবিত্রম্) শুদ্ধম্ (অশ্বিনা) গৃহাশ্রম-ব্যবহারব্যাপিনৌ (আসন্) আস্যে (সরস্বতী) বাণীব জ্ঞানবতী স্ত্রী (চপ্যম্) চপেষু সান্ত্বনেষু ভবম্। চপ সান্ত্বনে ধাতোরেচ্ ততো য়ৎ। (ন) ইব (পায়ুঃ) রক্ষকঃ (ভিষক্) বৈদ্যঃ (অস্য) (বালঃ) বালকঃ (বস্তিঃ) বাসহেতুঃ (ন) ইব (শেপঃ) উপস্থেন্দ্রিয়ম্ (হরসা) হরিত য়েন তেন বলেন (তরস্বী) প্রশস্তম্ তরো বিদ্যতে য়স্য সঃ ।
.
ভাবার্থ:- স্ত্রীপুরুষৌ গর্ভাধানসময়ে পরস্পরাঙ্গব্যাপিনৌ ভূত্বা মুখেন মুখম্ চক্ষুষা চক্ষুঃ মনসা মনঃ শরীরেণ শরীরম্ চানুসন্ধায় গর্ভম্ দধ্যাতাম্ য়তঃ কুরূপম্ বক্রাঙ্গম্ বাऽপত্যন্ন স্যাৎ ।
.
আক্ষেপকর্তা যে হিন্দি ভাষ্য দেখিয়েছেন, সেটা হল উপরোক্ত ঋষি দয়ানন্দ কৃত ভাষ্যেরই হিন্দি অনুবাদ।
.
এগুলোর মধ্যে প্রথম মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য আমি 'বেদার্থ-বিজ্ঞান' নামক গ্রন্থে করেছি, যেটা হল নিরুক্তের একটা বৈজ্ঞানিক ভাষ্য, তাতে করেছি। পাঠক সেখানে যথাস্থানে দেখতে পারেন। আমি আবারও বলতে চাইবো যে, বেদমন্ত্রের মূল ও স্বাভাবিক ভাষ্য আধিদৈবিকই হয়, যারমধ্যে সৃষ্টির বিজ্ঞান প্রকাশিত হয়। এখানে উভয় অর্থই আধিভৌতিক আছে। এই দুটো অর্থ থেকে দুটো বার্তা প্রকাশিত হয়, সেটা হল এইরকম —
.
১. কোনো পতিব্রতা নারী তার শরীর কেবল তার স্বামীকেই দেখাতে পারেন আর বৈদিক সংস্কৃতিতে প্রত্যেক নারীকে পতিব্রতাই হওয়া উচিত। কামভাবনায় পরপুরুষের দর্শন করা ঘোর পাপকর্ম বলে গণ্য করা হতো। বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ ভারতীয় ক্ষত্রিয়াণীদের 'জওহর' (সম্মান রক্ষার্থে আত্মবলিদান) অন্য কোনো দেশ, সমাজ ও মজহবের মধ্যে দেখতে বা শুনতে পাওয়া যায় না। যখন আলাউদ্দিন খিলজি মহারানি পদ্মিনী দেবীকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, তখন যে পরিণতি হয়েছিল, সেটা বিশ্বের মধ্যে কার অজানা আছে? আজও কামুক ও বর্বর আক্রমণকারীদের দ্বারা বিশ্ববিখ্যাত চিত্তৌড় দুর্গের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার অবশেষ দেখা যায়। জওহর কেবল মহারানি পদ্মিনী দেবীই করেননি, তাঁর পাশাপাশি জালোর, জয়সলমীর, সিন্ধু প্রভৃতি অনেক স্থানে হাজার-হাজার সংখ্যায় বীর সতী ক্ষত্রিয়াণীরা স্বয়ংকে জলন্ত শিখায় জীবিত উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। ভগবতী দেবী উমা, সতী অনসূয়া, ভগবতী সীতা আদি দেবীরা বৈদিক সংস্কৃতিতেই পাওয়া যেতে পারেন, অবৈদিকদের মধ্যে কখনোই নয়। তাঁরা সবাই এই মন্ত্রগুলো থেকেই অনুপ্রেরণা প্রাপ্ত করেছিলেন যে তাঁরা যেন তাঁদের শরীর পরপুরুষদের না দেখান। কামুক দুষ্টদের মুখ দেখাকেও তাঁরা পাপ মনে করতেন। আজ অর্ধনগ্ন ভ্রমণকারী প্রজন্ম, কখনও স্বামী বা স্ত্রীকে পণ্যের মতো বদলে ফেলা কামুক স্বচ্ছন্দ মানুষজন, যুদ্ধক্ষেত্রে মহিলাদের লুট করা কামুক পরম্পরায় জন্মানো মানুষজন তাদের শালীনতা শেখানোর দুঃসাহস করছে, যারা পরস্ত্রীকে সর্বদা মা, বোন বা পুত্রীই ভেবেছেন। এখানে মহিলাদের জন্য যে শালীনতা আছে, সেই শালীনতা পুরুষদের জন্যও আছে। এখানে এমন নয় যে নারী তো শরীর লুকিয়ে রাখবে, কিন্তু পুরুষ জোর করে যে কারোর নারীকে নিজের স্ত্রী বা যৌন-দাসী বানিয়ে নিবে। ভগবান মনু পরস্ত্রীগামী পুরুষ তথা পরপুরুষগামী মহিলা উভয়কেই ভয়ঙ্কর মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য মনে করেছেন। যখন আমাদের আদর্শ ছত্রপতি শিবাজীর সামনে তাঁর সৈন্যরা শত্রু পক্ষের সুন্দরী স্ত্রী গৌহরবানোকে নিয়ে আসে, তখন শিবাজী মহারাজ সেই মহিলাকে মায়ের স্বরূপ বলেছিলেন আর সসম্মানে তাকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়ে ছিলেন। সুলেমান রিজভী নিজের হৃদয়ে হাত রেখে বলুন যে এই ঘটনা যদি কোনো মুসলিম আক্রমণকারীর সাথে ঘটতো, তাহলে সে কোনো হিন্দু মহিলার সাথে কি করতো? তারা তো সবসময় সুন্দরী যুবতীদের ওপরই শকুনী দৃষ্টি রাখতো, অথচ রিজভী মহাশয় আমাদের শিক্ষা দিতে এসেছেন। ইশ! যদি আপনি এই মন্ত্রের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পেতেন!
.
২. এখানে দ্বিতীয় ইঙ্গিতও বুঝুন যে এখানে মহিলাকে 'জনী' বলা হয়েছে, নিরুক্তকার যার 'জায়া' অর্থ করেছেন তথা পুরুষকে 'পতি' বলা হয়েছে। এর অর্থ হল যেকোনো স্ত্রী তার স্বামীকেও মন্ত্রের মধ্যে বর্ণিত রীতি অনুযায়ী নিজের শরীর তখনই দেখাতে পারে, যখন তার সন্তানের কামনা হয় অর্থাৎ গর্ভাধান প্রক্রিয়ার সময়ই এমন করে, অন্যথায় সে তার স্বামীর সাথে আর স্বামী তার স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা তো দূরের কথা, তারা একে অপরের সামনে নগ্ন বা অর্ধনগ্নও থাকতে পারবে না, এটাই হল বেদের আদেশ। কোরআনের আদেশ তো আপনি ভালো করেই জানেন। বর্তমানে গৃহস্থ জীবনে বিষয়ের প্রতি আসক্তির যে অবাধ অনুমতি মনে করার ভারী পাপ হচ্ছে, তাতে সংযম-নিয়মের ক্ষেত্রে পশুদেরকেও সম্পূর্ণভাবে পেছনে ফেলে দিয়েছে। অবিবাহিত ছেলে-মেয়েরা না জানি কেমন-কেমন কুকর্ম করার জন্য পাপী আইন দ্বারা সুরক্ষিত আছে, তারা কি জানবে বেদের আদেশের মর্ম। এই বিষয়ে আমার মতো নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারীর কোনো ধারণাই নেই যে বর্তমানে কী-কী হচ্ছে আর আমার এমন তথ্যের কোনো আবশ্যকতাও নেই। তাই এতটুকু লেখাই আমার জন্য যথেষ্ট।
.
এখানে দ্বিতীয় মন্ত্রের মধ্যে গর্ভাধান প্রক্রিয়ার পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে, সাথে ঋষি দয়ানন্দ তার কারণও বলেছেন যে অন্যথা পরিস্থিতি গ্রহণ করলে জন্ম নেওয়া শিশু বিকলাঙ্গও হতে পারে। আজকের প্রজন্ম, যারা আহার, নিদ্রা, ভয়, মৈথুন, এই চারটা কর্মে পশুদের থেকেও কিছু শিখতে চায় না, যারা এই চারটার মধ্যেই স্বাধীনতা চায়, তারা কী-কী না করে থাকবে, সেটা ঈশ্বরই জানেন। তবে হ্যাঁ, আজ শুধুমাত্র সন্তানের জন্য শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের আজ্ঞার মতো কোনো প্রতিবন্ধকতাই নেই, তাই এই মন্ত্রটাও সেই স্বচ্ছন্দ লম্পটদের জন্য নয়।
.
এই মন্ত্র তো সম্পূর্ণ সদাচারী, উত্তম স্বাস্থ্যযুক্ত, বলবান ও ধার্মিক সন্তান কামনা করা দম্পতিদের জন্য। আমি না কখনো এইসব অপ্রয়োজনীয় গল্প শুনেছি, না আলোচনা করেছি আর না কখনো এমন চিত্র দেখেছি, তাই আমি জানি না যে পৃথিবীতে কামুক ব্যক্তিরা কি-কি করে? তবে হ্যাঁ, বামন শিবরাম আপ্টের সংস্কৃত-হিন্দি শব্দ কোষের মধ্যে কখনও-কখনও এমন কিছু শব্দ চোখে পরে, যার অর্থ লেখা ছিল - 'এক প্রকারের রতিবন্ধ' (যৌন ক্রিয়ার বিশেষ ভঙ্গি)। এর অর্থ থেকেই পতিত মানবের মানসিকতার অনুমান হয়ে যায়। এই কারণেই দয়ালু ঋষি দয়ানন্দ, যিনি ব্রহ্মচর্যের মহান সমর্থক ছিলেন তথা বলবান ও মেধাবী সন্তানকে উৎপন্ন করার জন্য গৃহস্থদের ঋতুগামী হতে তথা সর্বোত্তম স্বাস্থ্যবর্ধক সাত্ত্বিক ভোজন খাওয়ার উপদেশ দিতেন, তিনি এই মন্ত্রের আধিভৌতিক ভাষ্যের মাধ্যমে কেবল সুসন্তানই উৎপন্ন করার উপদেশ দিয়েছেন, স্বেচ্ছাচারিতার পাঠ পড়াননি।
.
ধ্যাতব্য হল, ধার্মিক (সাম্প্রদায়িক নয়), পরোপকারী, সুস্থ, প্রজ্ঞাবান এবং বলবান সন্তান উৎপন্ন করা হল বিশ্বের সেরা কাজ। উত্তম কোটির য়োগী, পরোপকারী বৈজ্ঞানিক, দানবীর ও উদার ধনবান, পাপীদের বিনাশকারী শূরবীর ক্ষত্রিয় রাজা এবং বেদের জ্ঞাতা, মহান ত্যাগী-তপস্বী আর প্রজ্ঞাবান বিদ্বানই এই বিশ্বকে স্বর্গ বানাতে পারেন, অন্যথায় সম্পূর্ণ বিশ্ব তো ধ্বংস হচ্ছেই। এমন সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য তেমনই বাবা-মা হওয়া উচিত। তারা পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় ও ঋতুগামী হওয়া উচিত, যা বেদের এই উপরোক্ত বার্তাগুলো থেকেই হওয়া সম্ভব।
.
গৃহস্থের বাস্তবিক ধর্ম ও বিজ্ঞান যারা বোঝেন, তারাই সুসন্তানবান হতে পারেন, অন্যথায় বাচ্চা তো সব পশুপাখিদেরও হয়। তবে হ্যাঁ, নিজেকে বুদ্ধিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মনে করা এই মানব সন্তান উৎপন্ন না করে নিজের অসীম বাসনা পূরণে দিনরাত লেগে থাকে, আদালত, শিক্ষাবিদ, বিধায়িকা এবং মিডিয়া সবার কৃপাদৃষ্টি এদের সহজেই প্রাপ্ত। এরফলে কখনও-কখনও এমন মনে হয় যে, এখন এই পৃথিবী সত্যিকারের মানুষদের থাকার যোগ্য আর নয়।
.
হ্যাঁ, এটা নিশ্চিত যে ব্রহ্মচর্য ব্রত বিশ্বের অন্যান্য সকল উত্তম ব্রত (সত্য-ব্রত, অহিংসা-ব্রত, অস্তেয় বা অপরিগ্রহ ব্রত) থেকে কঠিন হয়। অন্যান্য ব্রত ভঙ্গ করার জন্য প্ররোচিত করার মতো কোনো হরমোন শরীরে থাকে না, যেখানে কামভাবের উদ্দীপক হরমোন বয়সের সাথে-সাথে উৎপন্ন হয়, এই কারণে এটা হল সর্বাধিক কঠিন ব্রত, যার জন্য কঠোর তপস্যার প্রয়োজন আর এই তপস্যা অবশ্যই করা উচিত, আমার এটা নিজস্ব অভিজ্ঞতা।
.
সুলেমান রিজভী! যদি আপনি আমার এই উত্তর মনোযোগ দিয়ে পড়েন, তাহলে বেদের ওপর এমন অভিযোগ আনার কথা চিন্তাও করবেন না। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে অনেক জায়গায় ভাষ্যকাররা ভুল অর্থ করেছেন, আমি তার যথাস্থানে সেগুলো খণ্ডন করে সত্য অর্থ বর্ণনা করবো।

১৮.
আক্ষেপ -

Transgenderism/Homosexuality in Vedas

We read in newspaper about some Hindu scholars condemning homosexuality. But do they have any evidence that prohibits homosexuality in Hinduism? Hindu scholars fail to furnish any reference from authoritative text like Vedas which condemns homosexuality but still some try to term homosexuality as irreligious act. Fortunately there are some Hindu scholars like Shri Shri Ravishankar who honestly accept such facts, below are two snapshots of his tweets¹ -

👉Gurudev Sri Sri Ravi Shankar @SriSri -
Homosexuality-not a crime in any Smriti. Everyone has male & female elements. According to their dominance, tendencies show up & may change.
10:14 PM · Dec 11, 2013

👉Gurudev Sri Sri Ravi Shankar @SriSri -
Homosexuality has never been considered a crime in Hindu culture. In fact, Lord Ayyappa was born of Hari-Hara (Vishnu & Shiva), #Sec377
10:07 PM · Dec 11, 2013
.
Although we are aware of the homosexual act of Vishnu and Shiva but homosexuality/trans-genderism is present in Vedas too. In Veda Indra transformed himself into a woman,

অদদা অর্থাম্ মহতে বচস্যবে কক্ষীবতে বৃচয়ামিন্দ্র সুন্বতে। মেনাऽভবো বৃষণশ্বস্য সুক্রতো বিশ্বেত্তা তে সবনেষু প্রবাচ্যা ॥

Rig Veda 1.51.13 To old Kaksivin, Soma-presser, skilled in song, O Indra, thou didst give the youthful Vrcaya. Thou [Indra], very wise, was wife [Mena] of Vrisanaiva; those deeds of thine must all be told at Soma feasts.
Griffith has translated the word Mena as daughter/child but according to Brahmana, Purana and lexicons the word Mena denotes wife, woman, or female of any animal. Yaska Acharya gives the following meaning for Mena (also spelled Menah),
.
মেনা গ্না ইতি স্ত্রীণাম্।
.
"Menah and Gnah are (synonyms) of Women."
Nirukta 3.21, Tr. Lakshman Swarup
.
"Mena-Wife, female" - Cappeller's Sanskrit English Dictionary
.
It is also confirmed in Satapatha Brahmana that Indra became the wife of Vrishanasva, Satapatha Brahmana 3.3.4.18. 'Come, O Indra!' Indra is the deity of the sacrifice: therefore he says, 'Come, O Indra!' 'Come, O lord of the bay steeds! Ram of Medhatithi! Wife of Vrishanasva!
.
Bestriding buffalo! Lover of Ahalya' Thereby he wishes him joy in those affairs of his.
.
Maitrayani Samhita 2.5.5 "When Indra became Vrishanasva's Mena [or wife] he was seized by Nirrti, Calamity. When he chased it away, that Calamity became a castrated animal. Whoever thinks he is seized by Calamity, Darkness, he should sacrifice this castrated animal to Indra."
—Tr. Danielle Feller
.
Indra is considered the wife of Vrishanasva in Satapatha Brahama, as we all know Indra lusted after Ahalya thus he is also called the lover of Ahalya in the Satapatha Brahmana. From major sources like Satapatha Brahmana and Maitrayani it is proved that Indra indeed became the wife of Vrishnasva.

উত্তর - এখানে লেখক ধূর্ততার সীমা অতিক্রম করে দিয়েছেন, যিনি বেদের মধ্যে সমকামী সম্পর্কের কথা বলেছেন। এর পাশাপাশি শতপথ ব্রাহ্মণ ও মৈত্রায়ণী সংহিতার মিথ্যা ও কুরুচিপূর্ণ ইংরেজি অনুবাদও উদ্ধৃত করেছেন। আমি দৃঢ়পূর্বক বলতে পারি যে, রিজবী মহাশয় এই গ্রন্থগুলোই দেখেননি। এখানে বেদের কোনো ভারতীয় ভাষ্যকার লেখকের অশ্লীল মানসিকতার সমর্থক না পাওয়ায়, বিদেশি গ্রিফিথের মতো নোংরা মানসিকতার অনুবাদককে উদ্ধৃত করা হয়েছে। এই মিথ্যা অনুবাদে ইন্দ্রকে বৃষণশ্বের স্ত্রী বলে সমকামিতা সিদ্ধ করে দিয়েছে। এরমধ্যে নিরুক্তকেও টেনে আনা হয়েছে।
.
এই ধরণের আক্ষেপকর্তা তথা তাদের কুসভ্যতাগুলোতে এমনই সব পাপের আধিক্য আছে, এই কারণে তারা সর্বত্র এই নোংরামিই দেখতে পায়। আমার মনে বিচার আসে যে, গ্রিফিথ-এর মনে এমন চিন্তা কোথা থেকে এলো? তখন আমি আচার্য সায়ণের ভাষ্য দেখলাম, সেখানে ইন্দ্রের বৃষণাশ্ব দুহিতা হয়ে যাওয়া লেখা আছে অর্থাৎ সেখানেও মূর্খতাপূর্ণ কথা লিখে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পাপিষ্ঠ গ্রিফিথ সেই দুহিতা (কন্যা) -কে পত্নী বানিয়ে ফেলেছে। উন্মত্ত প্রলাপে সায়ণ ইন্দ্রকে এক কন্যা বানিয়ে দিয়েছেন, আর গ্রিফিথ সেই কন্যাকেই বৃষণাশ্বের পত্নী বানিয়ে দিয়েছেন। যখন লিঙ্গ পরিবর্তনই করে দিয়েছেন, তখন সমকামী সম্পর্কের কথা আসছে কোথা থেকে?
.
বস্তুতঃ পাশ্চাত্য বেদ-নিন্দকদের বেদ-নিন্দার পর্যাপ্ত সামগ্রী সায়ণ আদি ভারতীয় আচার্যরাই প্রদান করেছেন। আর হ্যাঁ, সেই পাশ্চাত্য বেদ-নিন্দকরা নিজেদের পক্ষ থেকে বেদকে আরও বিকৃত করার চেষ্টা অবশ্যই করেছে, যার প্রমাণ হল এই আক্ষেপ। মুসলিম আক্ষেপকর্তাদের সাধ্য ছিল না যে তারা সায়ণ আদির বেদ-ভাষ্য পড়তে পারবে; তাই তাদের আধারে অথবা নিজেদের দূষিত মনোবৃত্তির আধারে পাশ্চাত্য বেদ-নিন্দকদের আশ্রয় নিয়ে বিদ্বান হওয়া শুরু করে, যেমন এখানে সুলেমান রিজভীর মতো অশিক্ষিত ব্যক্তি বেদের ওপর লেখালেখি করতে বসেছেন।
.
এখন এই ধরণের জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের অথবা যাদের মস্তিষ্কে কামুকতার কাদায় ভরা আছে, তাদের কে বোঝাবে যে কোনো বৈদিক পদের প্রত্যেক অর্থ সর্বত্র প্রযোজ্য হয় না তথা একটা পদের অনেক অর্থ হয়, যাকে প্রসঙ্গানুসারে বুঝতে হয়। নিরুক্তের মধ্যে 'মেনা' অবশ্যই স্ত্রী নাম বাচক শব্দ, কিন্তু নিরুক্তের রচয়িতা মহর্ষি য়াস্ক তাঁর নিঘন্টু, যার ব্যাখ্যা নিরুক্তের মধ্যে আছে, সেখানে 'মেনা'-কে বাণীর বাচকও বলেছেন, কিন্তু নারীদের প্রতি আসক্ত থাকা অথবা সমকামিতার পাপের পাকে ডুবে থাকা কোনো ব্যক্তির কাছে 'মেনা' পদের অর্থ বাণী কেন মনে হবে? তাদের কাছে তো সর্বদা স্ত্রী-ই মনে হবে। এই কারণেই তো বিদেশি আক্রমণকারীরা, যারা নিষ্ঠুর ও দস্যু ছিল, তারা সুন্দর যুবতীদের খোঁজেই থাকতো। এমন কামাসক্ত লোকেরা কিভাবে বেদাদি শাস্ত্রকে বুঝবে?
.
এই বিচিত্র বুদ্ধির ব্যক্তির যুক্তিও দেখুন, যিনি বলছেন যে হিন্দুত্বের মধ্যে সমকামিতা নিষেধ কোথায়? ইনি কোথা থেকে এমন যুক্তি করা শিখেছেন? যদি আমি সুলেমান রিজভীকে বলি যে কুরআনের মধ্যে নাক দিয়ে খাবার খাওয়ার নিষেধ নেই, তাহলে আপনি কি নাক দিয়ে খাওয়া শুরু করবেন? কুরআনে শীর্ষাসন করে চলার নিষেধ নেই, তাহলে কি আপনি মাথায় ভর দিয়ে চলা শুরু করবেন? কুরআনে মহাসাগরে ডুবে মরার নিষেধ নেই, তাহলে কি আপনি মহাসাগরে ডুবে মরার জন্য প্রস্তুত আছেন? তাহলে কিভাবে বলছেন যে হিন্দু গ্রন্থের মধ্যে সমকামিতার নিষেধ নেই, আর সেই কারণে বেদাদির মধ্যে এর বিধান সিদ্ধ হয়ে গেল? যদি কারও মজহব গ্রন্থের মধ্যে বিষ্ঠা খাওয়ার নিষেধ না থাকে, তাহলে কি তাকে বিষ্ঠা খাওয়া শুরু করা উচিত? ভেবে দেখুন, রিজভী মহাশয়! নিজের গ্রন্থকে খুলে দেখে নিন। ওহে মহাশয়! বেদাদি শাস্ত্রের মধ্যে এই পাপের বিধান কোথায়? আপনি যে প্রমাণ দিয়েছেন, আমি তার ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) করে দিয়েছি।
.
শ্রী শ্রী রবিশঙ্করের সমর্থনকে রিজভী নিজের সৌভাগ্য মনে করছেন। যদি কোনো ব্যক্তি বা মজহব অন্য কাউকে নিচু দেখিয়েই নিজেকে উচ্চ মনে করতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে যে তার নিজের কোনো অস্তিত্ব নেই। যদি কোনো সমতল স্থান কোনো গর্তকে দেখে নিজেকে পর্বত মনে করতে শুরু করে, তাহলে সেটা তার মূর্খতা হবে। তাহলে যে ব্যক্তি কোনো কলঙ্কহীন, পবিত্র ও মহান জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাণ্ডার রূপী গ্রন্থ বেদ বা এমন বৈজ্ঞানিক পাবন ঐতিহ্যকে নিচু করার জন্য যদি নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের আশ্রয় নেয়, তবে তাকে মহামূর্খতা ও ধূর্ততাই বলা হবে। যদি আপনার দ্বারা উপস্থাপিত করা কথন সত্যিই শ্রী রবিশঙ্করের হয়ে থাকে, তাহলে তিনিও অবাধ যৌনাচারের বশবর্তী, পশুত্বের প্রবক্তা এবং সেই একই মোহে নিমগ্ন ওশো (রজনীশ)-এর কাতারেই দাঁড়িয়ে আছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে হিন্দু সমাজে এমন স্বেচ্ছাচারীরাও ভগবান হয়ে যান, তাহলে রিজভী-দের আর দোষ কী?
.
এখন আমি এই মন্ত্রের ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য উদ্ধৃত করবো -
.
অদদা অর্ভাম্ মহতে বচস্যবে কক্ষীবতে বৃচয়ামিন্দ্র সুম্বতে।
মেনাऽভবো বৃষণশ্বস্য সুক্রতো বিশ্বেত্তা তে সবনেষু প্রবাচ্যা ॥
(ঋগ্বেদ ১.৫১.১৩)
.
পদার্থঃ - (অদদাঃ) দেহি (অর্ভাম্) অল্পামপি শিল্পক্রিয়াম্ বাচম্ বা (মহতে) মহাগুণবিশিষ্টায় (বচস্যবে) আত্মনো বচঃ শাস্ত্রোপদেশমিচ্ছবে (কক্ষীবতে) কক্ষাঃ প্রশস্তাঙুলয় ইব বিদ্যাপ্রান্তা বিদ্যন্তে য়স্য তস্মৈ। কক্ষা ইত্যঙ্গুলিনা. (নিঘন্টু ২.৫) (বৃচয়াম্) ছেদনভেদনপ্রকারাম্ (ইন্দ্র) শিল্পক্রিয়াবিদ্বিদ্বন্ (সুন্বতে) শিল্পবিদ্যানিষ্পাদকায় (মেনা) বাণী। মেনেতি বাঙ্না. (নিঘন্টু ১.১১) (অভবঃ) ভব (বৃষণশ্বস্য) বৃষণো বৃষ্টিহেতবো য়ানগময়িতারো বাऽশ্বা য়স্য তস্য । বা.- বৃষণ্বস্বশ্বয়োশ্চ । [অ.] ১.৪.১৮। অনেন য়চি ভম্। ইতি সূত্রস্থ বার্তিকেন ভসংজ্ঞাকরণান্নলোপো ন ণত্বম্ চ ভবতি (সুক্রতো) শোভনাঃ ক্রতবঃ প্রজ্ঞাঃ কর্মাণি বা য়স্য তৎসম্বুদ্ধৌ (বিশ্বা) সর্বাণি (ইৎ) এব (তা) তানি (তে) তব (সবনেষু) সুন্বন্তি সুবন্তি য়ৈঃ কর্মভিস্তেষু (প্রবাচ্যা) প্রকৃষ্টতয়া বক্তুম্ য়োগ্যা।
.
ভাবার্থঃ - অত্র বাচকলুপ্তোপমালঙ্কারঃ । বিদ্বদ্ভিরগ্ন্যাদিপদার্থবিদ্যাদানম্ কৃत्वा সর্বেভ্যো হিতম্ নিষ্পাদনীয়মিতি ।
.
পদার্থ- হে (সুক্রতো) শোভনকর্মযুক্ত (ইন্দ্র) শিল্পবিদ্যাকে জানার যোগ্য বিদ্বান! তুমি (বচস্যবে) নিজেকে শাস্ত্রোপদেশের ইচ্ছুক বা (মহতে) মহাগুণ বিশিষ্ট (সুন্বতে) শিল্পবিদ্যাকে সিদ্ধ করার (কক্ষীবতে) বিদ্যাপ্রান্ত অঙ্গুলিযুক্ত মানুষের জন্য যে (বৃচয়াম্) ছেদন-ভেদনরূপ (অর্ভাম্) সামান্য শিল্পক্রিয়াকেও (অদদাঃ) দাও (সবনেষু) প্রেরণাকারী কর্মে (প্রবাচ্যা) ভালোভাবে বলার যোগ্য (মেনা) বাণী (বৃষণশ্বস্য) শিল্পক্রিয়ার ইচ্ছুক (তে) তোমার (বিশ্বা) সব কার্য্য আছে (তা) (ইৎ) সেগুলো সিদ্ধ করতে সমর্থ (অভবঃ) হও।
.
ভাবার্থ - বিদ্বান মানুষদের অগ্নি আদি পদার্থ থেকে বিদ্যাদান করে সব মানুষের জন্য হিতকর কাজ করা উচিত।
.
এই ভাষ্য রিজবীর মতো বেদনিন্দকদের চোখে পড়েনি, কি আর করা যাবে, কাকপ্রবৃত্তি তো ছাড়ে না। এই ভাষ্য পড়ে যদি কিছু বুঝতে পারেন, তাহলে হয়তো বুদ্ধির কিছু প্রকাশ হবে। এই মন্ত্রের মধ্যে সমকামিতার মতো পাপের কথা বলতে একটুও লজ্জা হয়নি?
.
এখন আমি শতপথের উদাহরণের উপরে বিচার করবো -

আমার বিশ্বাস যে শতপথ ব্রাহ্মণ বা মৈত্রায়ণী সংহিতা দুটো গ্রন্থই আক্ষেপকারী পড়া তো দূরের কথা, নিজ চোখে ভালো করে দেখেনওনি, কেবল কোনো মূর্খ ব্যক্তির করা কোনো ইংরেজি অনুবাদের আশ্রয় নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। আমি এখানে শতপথ ব্রাহ্মণের বচন উদ্ধৃত করছি -
.
"ইন্দ্রাগচ্ছেতি। ইন্দ্রো বৈ য়জ্ঞস্য দেবতা তস্মাদাহেনদ্রাগচ্ছেতি হরিব আগচ্ছ মেধাতিথের্মেষ বৃষণশ্বস্য মেনে...।"
.
এখানে আমি কেবল আক্ষেপকর্তা দ্বারা করা আক্ষেপযুক্ত পদই নিবো -

'বৃষণশ্বস্য মেনে'

আমি 'মেনা' পদের উপর পূর্বেই বিবেচনা করেছি যে এই পদের অর্থ স্ত্রীর পাশাপাশি বাণীও হয়, সুতরাং প্রসঙ্গানুসারেই অর্থ গ্রহণ করা উচিত, কিন্তু যাদের বৈদিক বা আর্ষ গ্রন্থগুলোর সঙ্গে দূর-দূর পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই অর্থাৎ যারা এই বিষয়ে কিছুই জানেন না আর জানার ইচ্ছাও রাখেন না, তারা প্রসঙ্গানুসারে অর্থ গ্রহণ করা কিভাবে করবেন? এখানে 'বৃষণশ্ব' পদের অর্থ হল -
.
সেইসব কণা, যা অতি তীব্র গতিতে গমন করে এবং যেগুলোতে তীব্র বল থাকে অর্থাৎ যেগুলোর ঊর্জা খুব অধিক হয়। এখানে 'বৃষু সেচনে হিংসা-সংক্লেশনয়োঃ' ধাতুর প্রয়োগ হয়েছে। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, এমন কণা আদি পদার্থ, যা তীব্র হিংসক অর্থাৎ ছেদন-ভেদন বলযুক্ত হয়, বৃষণশ্ব নামে পরিচিত। সেই বাণী অর্থাৎ এমন পদার্থগুলো থেকে নির্গত হওয়া বাক্ রশ্মিগুলোও অতি তীব্র বলযুক্ত হয়, এই কারণে এদের ইন্দ্র বলা হয়।
.
তারা কোথা থেকে ইন্দ্র ও বৃষণশ্বকে সমকামী বলছেন? হে মহাশয়! বেদবিদ্যা হল সাত্ত্বিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন বিদ্বানদের বিষয়; মাংসাশী, তামসিক ও ঈর্ষা-দ্বেষগ্রস্ত লোকেদের বিষয় নয়।
.
মৈত্রায়ণী সংহিতাতেও এই পদগুলোই আছে, এই কারণে তাদের সমাধানও এটাই বুঝে নিবেন।

১৯.
আক্ষেপ -

There's a verse in Rig Veda which reads as,

য়ঃ সত্রাহা বিচৰ্ষণিরিন্দ্ৰম্ তম্ হূমহে বয়ম্ ।
সহস্ৰমুষ্ক তুবিনৃম্ণ সত্পতে ভবা সমত্সু নো বৃধে ॥

Rig Veda 6.46.3
"We invoke that Indra who is the destroyer of mighty foes, the supervisor (of all things): do thou, the many-organed, the protector of the good, the distributor of wealth, be unto us (the insurer of) success in combats."
-Tr. H.H. Wilson
.
The Sanskrit word mentioned here to describe Indra is Sahastra+Mushka which means thousand vaginas/testicles. Some translators including Griffith has translated this word as "thousand powers" but I do not agree with it since the word Mushka clearly means Vagina/Testicles, Mushka here definitely means vagina because there is evidence from other Hindu text to support "thousand vagina" definition. Whether the word Mushka means Vagina or testicle is not an issue but a Vedic god described as being with "A Thousand Testicles" in holy scripture is surely obscene.
.
One can check the meaning of Mushka in V.S Apte's dictionary available online uchicago.edu and also from another online dictionary Spokensanskrit.de.
.
The story as mentioned in Skanda Purana V.iii. 136.2–16; Brahma Purana, Gautami-Mahatmya 16.59 states that Indra was cursed by Sage Gautama to be with one thousand Vaginas all over the body as Indra had raped Sage Gautam's wife Ahalya which I have explained briefly in Hinduism and Lust article.
.
Maharshi Yaska mentions a strange story about the birth of Asvins (the twin horsemen). Which is a elaboration of Rig Veda Mandal 10, hymn 17. The story says Saranyu was unwilling to have sex with Vivasvat and ran away but Vivasvat chased her and raped her. Yaska writes,

Nirukta 12.10 "Saranyu daughter of Tvastr bore twins, Yama and Yami, to Vivasvat the sun. She having substituted another lady of similar appearance, and having assumed the shape of a mare, ran away. He, Vivasvat, the sun, having also assumed the shape of a horse, pursued her, and joined her. Thence the Asvins were born. Manu was born from the lady of similar appearance."

—Tr. Lakshman Swarup
.
This story of Vivasvat raping his wife by inserting penis in her mouth is further elaborated in Brahma Purana 4.42-43; Shiva Purana, UmaSamhita 5.35..
.
32-34; Matsya Purana 11.34-37 and Brahmanda Purana 2.3.59.74-76 which I have mentioned in Hinduism and Lust article under Oral Sex category. The question is how sun god was aroused seeing his wife who was in the form of a mare? It must have been that Vedic god Vivaswat was sexually attracted towards animals that's the reason he raped his wife whilst she was in the form of a mare. But Vedas also has mention of bestiality.
.
উত্তর - সুলেমান রিজবী স্বয়ং এই মন্ত্রের অনুবাদ করার মূর্খতাপূর্ণ প্রচেষ্টা করেছেন। এখানে তিনি মনমতো অর্থাৎ কামুক প্রকৃতির অনুকূল কোনো ভাষ্য পাননি, তাই নিজেই অর্থ করতে বসে গেছেন। বারবার গ্রিফিথকে উদ্ধৃত করা এই ব্যক্তি এখানে গ্রিফিথের অনুবাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে 'মুষ্ক' শব্দের অর্থ য়োনি অথবা অণ্ডকোষ করেছেন আর লৌকিক সংস্কৃত-হিন্দি কোষের প্রমাণ দিয়েছেন। বেদবিদ্যা থেকে অনভিজ্ঞ উইলসন ও গ্রিফিথের বেদ-অনুবাদের পাশাপাশি বামন শিবরাম আপ্টে দ্বারা রচিত 'সংস্কৃত হিন্দি কোষ'-এর সহায়তা নিয়ে বেদ মন্ত্রের ভাষ্য করা, তার উপর এই পাশ্চাত্য অনুবাদকদেরও উপেক্ষা করে নিজের স্বয়ংয়ের কালিমাকে বেদের উপর আরোপিত করা আক্ষেপকর্তার অসততার স্পষ্ট পরিচায়কই হবে।
.
এই ব্যক্তির এতটুকুও জ্ঞান নেই যে বৈদিক ও লৌকিক সংস্কৃতের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে তথা লৌকিক সংস্কৃতের মধ্যেও একটা শব্দের অনেক অর্থ হয়, যেগুলোর মধ্যে প্রসঙ্গ অনুযায়ী সঠিক অর্থ গ্রহণ করতে হয়, তাহলে বৈদিক সংস্কৃতের লৌকিক শব্দকোষ অনুযায়ী অনুবাদ করে দেওয়া তো মাত্র পাগলামো বা ঈর্ষা-দ্বেষের পরিচায়কই হবে।
.
রিজবী মহাশয়! ইন্দ্র ও অহল্যার রহস্য জানার জন্য শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৩.৮.১৮ তো আপনার বুদ্ধিতে কখনও আসবে না, তাই আমি আপনাকে ঋষি দয়ানন্দকৃত ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা পড়ারই পরামর্শ দিবো। শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে ইন্দ্রের একটা বিশেষণ 'অহল্যাজার' দেওয়া আছে। এই প্রসঙ্গে 'অহন্' অর্থাৎ দিনের যার মধ্যে লয় হয়, সেই রাতকে অহল্যা বলা হয়েছে। রাতকে জীর্ণ বা নষ্টকারী সূর্যকে অহল্যার জার বলা হয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের কেমন কুত্সিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে আর একটা লম্বা মিথ্যা গল্পও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুটো পদ থেকে মধ্যযুগে কোনো পাপী, রাষ্ট্র ও ধর্মদ্রোহী সংস্কৃত-ভাষাবিদ নিজের মনের মলিনতাকে প্রকাশ করতে গিয়ে ইন্দ্র ও অহল্যার সম্পূর্ণ অশ্লীল গল্প বানিয়ে বাল্মীকি রামায়ণের মধ্যে জুড়ে দিয়েছে।
.
ভগবান শ্রীরামকে পরমপিতা পরমাত্মার অবতার সিদ্ধ করতে, এতদর্থ দেবী অহল্যা তথা দেবরাজ ইন্দ্রকে ব্যভিচারী প্রমাণ করা আর রামচরিতমানসের মধ্যে তো অহল্যার পাথর হয়ে যায় আর শ্রীরামের চরণের ধুলোর স্পর্শে পাথর থেকে পুনরায় নারী হয়ে যাওয়ার মনগড়া গল্প জুড়ে দেওয়ার করার পাপ বেদদ্রোহীরা করেছে। এই লোকেরা শ্রীরামকে ঈশ্বর সিদ্ধ করার প্রচেষ্টায় দেবী অহল্যা এবং দেবরাজ ইন্দ্রের মতো মহান আত্মাদের দুরাচারী বলতে একটুও সংকোচ করেনি।
.
এখানে সুলেমান রিজবী 'সহস্রমুষ্ক'-এর অর্থ 'অসংখ্য পরাক্রমশালী' না মেনে হাজার য়োনি বা হাজার অণ্ডকোষ বিশিষ্ট মানছেন। সুলেমান রিজবী কি এই কথা স্বীকার করেন যে কারও শরীরে হাজার য়োনি বা অণ্ডকোষ থাকতে পারে? যদি এমনটাই হয়, তাহলে এমন ব্যক্তির আক্ষেপের উত্তর দিতে আমার সময় নষ্ট করা উচিত নয়। যদি রিজবী ইন্দ্র ও অহল্যার গল্পকে সত্য বলে মনে করেন, তাহলে তো উনি এটাও মনে করবেন যে ভগবান শ্রীরামের পায়ের ধুলোয় পাথরের অহল্যা আবার নারী হয়ে গিয়েছিলেন? হ্যাঁ, এটা আলাদা কথা যে বাল্মীকি রামায়ণে অহল্যার পাথর হওয়া তথা পুনরায় নারী হয়ে যাওয়ার কোনো উল্লেখ পর্যন্ত নেই। এটা গোস্বামী তুলসীদাসের মনের কল্পনা ছিল।
.
যদি সুলেমান রিজবী বাল্মীকি রামায়ণকেই প্রমাণ বলে মনে করেন, তাহলে তিনি এটাও মানবেন যে ভগবান শ্রীরাম বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন, যিনি বিশ্বের নায়ক ছিলেন আর সেই সময় পৃথিবীতে বৈদিক ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো মজহব ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে রিজবী মহাশয়ের পূর্বপুরুষরাও ভগবান শ্রীরামের আদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতেন, তারাও বেদ মানতেন, তাহলে আজ তাদের পুনরায় সেই বৈদিক ধর্মের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যদি আপনি (রিজবী) নিজেকে অসুর বা রাক্ষসদের বংশধর মনে করেন, তাহলে তাঁরাও সেই সময় বেদকেই মানতেন। এই কারণেও রিজবী মহাশয়কে পুনরায় বৈদিক ধর্ম গ্রহণ করা উচিত, কোনো নতুন মিথ্যা মজহবের মধ্যে কেন থাকবেন?
.
এখন আমি এই মন্ত্রের ঋষি দয়ানন্দ রচিত ভাষ্য উদ্ধৃত করবো -

য়ঃ সত্রাহা বিচৰ্ষণিরিন্দ্ৰম্ তম্ হূমহে বয়ম্ ।
সহস্ৰমুষ্ক তুবিনৃম্ণ সত্পতে ভবা সমত্সু নো বৃধে ॥
(ঋগ্বেদ ৬.৪৬.৩)
.
পদার্থঃ — (য়ঃ) (সত্রাহা) সত্যদিনানি (বিচর্ষণিঃ) বিদ্বান্মনুষ্যঃ (ইন্দ্রম্) ঐশ্বর্য়্যয়ুক্তম্ (তম্) (হূমহে) প্রশংসামঃ (বয়ম্) (সহস্রমুষ্ক) অসঙ্খ্যেবীর্য়্য (তুবিনৃম্ণ) বহুধন (সৎপতে) সতাম্ বিদুষাম্ পালক (ভবা) অত্র দ্বয়চোতস্তিঙ ইতি দীর্ঘঃ । (সমৎসু) সঙ্গ্রামেষু (নঃ) অস্মাকম্ (বৃধে) বর্ধনায় ।
.
ভাবার্থঃ — তমেব বয়ম্ প্রশংসামো য়ঃ প্রতিদিনমস্মাকম্ রক্ষাম্ বিধত্তে তমেব বয়ম্ সঙ্গ্রামে সংরক্ষেম ।

পদার্থ - হে (সহস্রমুষ্ক) অসংখ্য পরাক্রমশালী (তুভিনৃম্ণ) প্রচুর ধনসম্পদযুক্ত (সৎপতে) বিদ্বানদের পালক অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী (য়ঃ) যে (বিচর্ষণিঃ) বিদ্বান মানুষ (সত্রাহা) সত্য দিনগুলোতে (ইন্দ্রম্) অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালীকে আহ্বান করে, সেভাবেই (তম্) তার (বয়ম্) আমরা (হূমহে) প্রশংসা করি আর আপনি (সমৎসু) যুদ্ধক্ষেত্রে (নঃ) আমাদের (বৃধে) উন্নতির জন্য (ভবা) হোন।
.
ভাবার্থ - আমরা কেবল তারই প্রশংসা করি, যে প্রতিদিন আমাদের রক্ষা করে আর আমরাও যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে রক্ষা করি।
.
রিজবী জি এই ভাষ্যটাও দেখে নিন আর তারপর গভীরতার সাথে বিচার করুন যে এরমধ্যেও কি কোনো সমস্যা আছে?
.
এখানে বীর সেনাপতি বা রাজাকে ইন্দ্র বলা হয়েছে আর রাজা বা সেনাপতির বিভিন্ন ধরণের পরাক্রমের অধিকারী হওয়াটা অনিবার্য। যতক্ষণ পর্যন্ত এমনটা হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারবেন না। এখানে 'মুষ্ক' শব্দের অর্থ বীর্য অর্থাৎ পরাক্রম করা হয়েছে। ঋষি দয়ানন্দ উণাদি কোষ ৩.৪১-এ 'মুষ্কঃ' পদের ব্যুৎপত্তি করতে গিয়ে লিখেছেন -

'মুষ্যত আব্রিয়ত ইতি মুষ্কঃ, অণ্ডকোষঃ সঙ্ঘাতো বা'

এখানে সঙ্ঘাত ও অণ্ডকোষ উভয় অর্থই দেওয়া হয়েছে। প্রকরণ অনুসারে এখানে অণ্ডকোষ অর্থ হতেই পারে না, কারণ কোনো ব্যক্তিরই হাজার বা অসংখ্য বা অনেক অণ্ডকোষ থাকতে পারে না। যে এমন অর্থ করে, তাকে কোনো মানসিক চিকিৎসালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে তার মধ্যে কিছু ভাবার ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তবে হ্যাঁ, একজন রাজা বা সেনাপতি শত্রুদের ওপর অনেকভাবে আক্রমণ করতে পারে, এই কারণে তাকে এখানে সহস্রমুষ্ক বলা হয়েছে। 'মুষ্কঃ' পদ 'মুষ স্তেয়ে' ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, অর্থাৎ যা লুকিয়ে থাকে, তাকে মুষ্ক বলে। রাজা বা বিদ্যুতের পরাক্রম সাধারণত লুকিয়ে থাকে। যখন এগুলো ক্রিয়াশীল হয়, তখনই এদের পরাক্রম প্রকাশ পায়।
.
আধিদৈবিক পক্ষে তীক্ষ্ণ বিদ্যুৎ তরঙ্গকে ইন্দ্র বলা হয় আর বিদ্যুতের পরাক্রমও অসংখ্য হয়, বিদ্যুৎ অসংখ্য প্রকারের কণা আদি সূক্ষ্ম পদার্থ থেকে শুরু করে বিশাল লোক পর্যন্ত অনেক প্রকারের সংঘাতের জন্ম দেয়। এই কারণে বিদ্যুৎ রূপী ইন্দ্রকেও সহস্রমুষ্ক বলা হয়।
.
এবার দেখুন, সুলেমান রিজবী সহস্রমুষ্ক পদ থেকেই দেবরাজ ইন্দ্র দ্বারা দেবী অহল্যার সঙ্গে কুকর্মের গল্প করে বসেছেন। বস্তুতঃ যার যেমন প্রবৃত্তি হয়, সে সর্বত্র তেমনই দেখে।

২০.
আক্ষেপ -
Sex with Animals
.
Some protestant Hindus proudly promote Vedas as philosophical, free from all vulgarities. But in reality there is no limit for Vulgarity in Vedas. It even promotes sex with animals let alone adultery and pornography. Sex with animals in Hinduism is not a vulgar thing, Ancient Hindu temples like Khajuraho, Ajanta, Ellora clearly depicts men and girls having sex with animals.
.
Ashvamedha Yajna

Read the article Ashvamedha Yajna the obscene for more evidence Ashvamedha Yajna is a ritual performed by Queens (particularly by chief queen) for fertility and also to gain power in the kingdom. The Ashvamedha Yajna includes slaughtering the horse, then follows the obscene Queen's intercourse with the horse, then the horse is cut into pieces and cooked. However some Hindus due to extreme obscenity reject these facts and are giving their personal interpretations. They even deny the fact that Horse was slaughtered during the ritual, I request the readers to go through the article Meat Consumption in Hinduism.
.
It is mentioned both in Krishna and Yajur Veda, but the this sacrifice mentioned in Krishna Yajur Veda is obscure because the author has omitted those verses,
.
Krishna Yajur Veda 7.4.19 The wicked horse is sleeping. O fair one, clad in fair raiment in the world of heaven be ye two covered several verses omitted from original translation...}

Sacred-texts.com
.
It is mentioned in Shukla Yajur Veda,
.
Yajur Veda 23.19-21 All wife of the host reciting three mantras go round the horse. While praying, they say: 'O horse, you are, protector of the community on the basis of good qualities, you are, protector or treasure of happiness. O horse, you become my husband'. After the animal is purified by the priest, the principal wife sleeps near the horse and says: 'O Horse, I extract the semen worth conception and you release the semen worth conception. The horse and principal wife spread two legs each. Then the Ardhvaryu (priest) orders to cover the oblation place, raise canopy etc. After this, the principal wife of the host pulls penis of the horse and puts it in her vagina and says:
.
"This horse may release semen in me."
.
Then the host, while praying to the horse says:
.
"O horse, please throw semen on the upper part of the anus of my wife.
.
Expand your penis and insert it in the vagina because after insertion, this penis makes women happy and lively."

উত্তর- এখানে এই মহাশয় খাজুরাহো আদি মন্দিরগুলোর ঘৃণ্য মূর্তির অশ্লীলতার দোষ বেদের উপর চাপাচ্ছেন, এটা হল মানসিক দেউলিয়াপনার প্রতীক। এই অশ্লীলতার নিশ্চিতকরণের জন্যই অশ্বমেধ যজ্ঞের আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। বৈদিক সনাতন ধর্মের ধ্বজবাহকেরা বেদভাষ্য করার ক্ষেত্রে যে পাগলামির পরিচয় দিয়েছেন, সেটা পড়তে, লিখতে, শুনতে ও শোনাতে লজ্জা হয়।
.
আচার্য মহীধরকৃত য়জুর্বেদ ভাষ্যের কিছু মন্ত্রের ভাষ্যকে ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকাতে উদ্ধৃত করেছেন, সেটা পড়াও অত্যন্ত লজ্জাজনক। বড় আশ্চর্য লাগে যে এমন ভাষ্য করার সময় মহীধরের হাত কেন কাঁপেনি? কেন বড়-বড় শঙ্করাচার্য এবং অন্যান্য পৌরাণিক চিন্তাধারার বৈদিক বিদ্বানরা মহীধরের ভাষ্যকেই প্রমাণ মেনে ঋষি দয়ানন্দকে গালি দেওয়ার মধ্যেই সনাতন ধর্মের জয় মনে করেন? এই কারণেই এই আক্ষেপগুলোর উপর মৌনতা অবলম্বন করে বসে আছেন।
.
বস্তুতঃ, আজ মানুষ অনর্গল সংস্কৃত ভাষা বলতে ও লিখতে পারা এবং ব্যাকরণের বিদ্বানকেই বেদবেত্তা মনে করে বসে আছে, এই অজ্ঞানতা পৌরাণিক ও আর্যসমাজী উভয় পক্ষের মধ্যেই দেখা যায়। তাদের কাছে বেদ বা আর্ষ গ্রন্থগুলোর উপর ঘৃণ্য আক্ষেপ তো স্বীকার্য, তাদের কাছে কোনো সংস্কৃত ভাষাবিদের দ্বারা ছড়ানো অশ্লীলতা আদি পাপ তো স্বীকার্য, কিন্তু এর থেকে আলাদা কোনো বৈদিক ও বৈজ্ঞানিক মেধা সম্পন্ন ব্যক্তির দ্বারা বেদ ও আর্ষ গ্রন্থগুলোর গৌরব বাড়ানোর প্রচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর অর্থ হল, এদের সংস্কৃত ভাষায় গালি শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু হিন্দি ভাষায় সম্মানসূচক গৌরবগান এদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এদের কুবুদ্ধির কারণেই সুলেমান রিজভীর মতো বেদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ব্যক্তিরা বেদের ওপর আঘাত হানছে আর সব মঞ্চশূর মৌনব্রত পালন করছেন।
.
আক্ষেপকারী যে মন্ত্রগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, আমি সেই মন্ত্রগুলোর ঋষি দয়ানন্দ দ্বারা করা ভাষ্য উপস্থাপন করবো -

গণানাম্ ত্বা গণপতিꣳ হবামহে প্রিয়াণাম্ ত্বা প্রিয়পতিꣳ হবামহে । নিধীনাম্ ত্বা নিধিপতিꣳ হবামহে বসো মম আহমজানি গর্ভধমা ত্বমজাসি গর্ভধম্ ॥ (য়জুর্বেদ ২৩.১৯)

পদার্থঃ — (গণানাম্) সমূহানাম্ (ত্বা) ত্বাম্ (গণপতিম্) সমূহ-পালকম্ (হবামহে) স্বীকুর্মহে (প্রিয়াণাম্) কমনীয়ানাম্ (ত্বা) (প্রিয়পতিম্) কমনীয়ম্ পালকম্ (হবামহে) (নিধীনাম্) বিদ্যাদিপদার্থ-পোষকাণাম্ (ত্বা) (নিধিপতিম্) নিধীনাম্ পালকম্ (হবামহে) (বসো) বসন্তি ভূতানি য়স্মিন্ৎস বসুস্তৎসম্বুদ্ধৌ (মম) (আ) (অহম্) (অজানি) জানীয়াম্ (গর্ভধম্) য়ো গর্ভম্ দধাতি তম্ (আ) (ত্বম্) (অজাসি) প্রাপ্নুয়াঃ (গর্ভধম্) প্রকৃতিম্ ।

ভাবার্থঃ – হে মনুষ্যাঃ ! য়ঃ সর্বস্য জগতো রক্ষক ইষ্টানাম্ বিধাতৈশ্বর্য়্যাণাম্ প্রদাতা প্রকৃতেঃ পতিঃ সর্বেষাম্ বীজানি বিদধাতি তমেব জগদীশ্বরম্ সর্ব উপাসীরন্ ।

পদার্থ - হে জগদীশ্বর! আমরা (গণানাম্) গণদের মধ্যে (গণপতিম) গণদের পালনকর্তা (ত্বা) আপনাকে (হবা মহে) স্বীকার করি (প্রিয়াণাম্) অতিপ্রিয় সুন্দরদের মধ্যে (প্রিয়পতিম) অতিপ্রিয় সুন্দরদের পালনকারী (ত্বা) আপনার (হবামহে) প্রশংসা করি (নিধীনাম) বিদ্যা আদি পদার্থের পুষ্টিকারীদের মধ্যে (নিধিপতিম) বিদ্যা আদি পদার্থের রক্ষাকারী (ত্বা) আপনাকে (হবামহে) স্বীকার করি। হে (বসো) পরমাত্মা! আপনার মধ্যে সব প্রাণী বাস করে সেই আপনি (মম) আমার বিচারক হোন যে (গর্ভধম) গর্ভের মতো সংসারকে ধারণকারী প্রকৃতিকে ধারণকারী (ত্বম) আপনি (আ, অজাসি) জন্মাদি-দোষরহিত সঠিকভাবে প্রাপ্ত হন সেই (গর্ভধম) প্রকৃতির ধারক আপনাকে (অহম) আমি (আ, আজানি) যেন সঠিকভাবে জানি।
.
ভাবার্থ – হে মনুষ্যগণ! যিনি সব জগতের রক্ষা, সুখের বিধান, ঐশ্বর্যের ভালোভাবে দান, প্রকৃতির পালন আর সব বীজের বিধান করেন, সেই জগদীশ্বরের উপাসনা সবাই করো।
.
তাऽউভৌ চতুরঃ পদঃ সম্প্রসারয়া‌ব স্বর্গে লোকে প্রোর্ণুবাথাম্ বৃষা বাজী রেতোধা রেতো দধাতু ।। (য়জুর্বেদ ২৩.২০)

পদার্থঃ — (তৌ) প্রজারাজানৌ (উভৌ ) (চতুরঃ) ধর্মার্থকামমোক্ষান্ (পদঃ) প্রাপ্তব্যান্ (সম্প্রসারয়া‌ব) বিস্তারয়া‌বঃ (স্বর্গে) সুখময়ে (লোকে) দ্রষ্টব্যে (প্র) (ঊর্ণুবাথাম্) প্রাপ্নুয়াথাম্ (বৃষা) দুষ্টানাম্ শক্তি-বন্ধকঃ (বাজী) বিজ্ঞানবান্ (রেতোধাঃ) য়ো রেতঃ শ্লেষমালিঙ্গনম্ দধাতি সঃ (রেতঃ) বীর্য়ম্ পরাক্রমম্ (দধাতু) ।

ভাবার্থঃ — অত্র বাচকলুপ্তোপমালঙ্কারঃ। য়দি রাজপ্রজে পিতাপুত্রবদ্বর্ত্তেয়াম্ তর্হি ধর্মার্থকামমোক্ষফলসিদ্ধিম্ য়থাবৎপ্রাপ্নুয়াতাম্ য়থা রাজা প্রজাসুখবলে বর্দ্ধয়েত্তথা প্রজা অপি রাজ্ঞঃ সুখবলে উন্নয়েৎ।

পদার্থ - হে রাজা প্রজাগণ! তোমরা (উভা) দুজনেই (তৌ) প্রজা রাজাজনের মতো (স্বর্গে) সুখে পূর্ণ (লোকে) দেখার যোগ্য ব্যবহার বা পদার্থে (চতুরঃ) ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ এই চারটা (পদঃ) যা পাওয়ার যোগ্য, সেগুলোকে (প্রোর্ণুবাথাম্) প্রাপ্ত হও, তেমনই এদের আমরা অধ্যাপক আর উপদেশক উভয়ই (সম্প্রসারয়াব) বিস্তার করি, যেমন (রেতোধাঃ) আলিঙ্গন অর্থাৎ অন্যের সাথে মিলিত হওয়াকে ধারণকারী আর (বৃষা) দুষ্টদের সামর্থ্য বর্ষণকারী অর্থাৎ তাদের শক্তিকে রোধকারী (বাজী) বিশেষ জ্ঞানবান রাজা প্রজাদের মধ্যে (রেতঃ) নিজের পরাক্রম স্থাপন করে, তেমনই প্রজারাও (দধাৎ) স্থাপন করুক।

ভাবার্থ — এই মন্ত্রের মধ্যে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে। যে রাজা-প্রজা পিতা আর পুত্রের সমান নিজেদের আচরণ করে, তারা ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ ফলের সিদ্ধি যথাযথভাবে লাভ করে। যেমন রাজা প্রজার সুখ আর বল বৃদ্ধি করবে, তেমনি প্রজারাও রাজার সুখ আর বলের উন্নতি করবে।
.
উৎসক্থ্যাऽঅব গুদম্ ধেহি সমঞ্জিম্ চারয়া বৃষন্ । য় স্ত্রীণাম্ জীবভোজনঃ ।। (য়জুর্বেদ ২৩.২১)

পদার্থঃ - (উৎসক্থ্যা) ঊর্ধ্বম্ সক্থিনী য়স্যাস্তস্যাঃ প্রজায়াঃ (অব) (গুদম্) ক্রীডাম্ (ধেহি) (সম্) (অঞ্জিম্) প্রসিদ্ধন্যায়ম্ (চারয়) প্রাপয়। অত্র সংহিতায়ামিতি দীর্ঘঃ (বৃষন্) শক্তিমন্ (য়ঃ) (স্ত্রীণাম্) (জীবভোজনঃ) জীবা ভোজনম্ ভক্ষণম্ য়স্য সঃ ।
.
ভাবার্থঃ – হে রাজন্ ! য়ে বিষয়সেবায়াম্ ক্রীডন্তো জনঃ ক্রীডন্ত্যঃ স্ত্রিয়ো বা ব্যভিচারম্ বর্দ্ধয়েয়ুস্তে তাশ্চ তীব্রেন দণ্ডেন শাসনীয়াঃ ।
.
পদার্থ - হে (বৃষন্) শক্তিমান! (য়ঃ) যে (স্ত্রীণাম্) স্ত্রীদের মধ্যে (জীবভোজনঃ) প্রাণীদের মাংস ভক্ষণকারী ব্যভিচারী পুরুষ বা পুরুষদের মধ্যে উক্ত প্রকারের ব্যভিচারিণী স্ত্রী বর্তমান আছে, সেই পুরুষ আর স্ত্রীকে বেঁধে (উৎ‌সকথ্যাঃ) পা উপরের দিকে আর মাথা নিচের দিকে করে তাড়না করে আর নিজের প্রজাদের মধ্যে (অব, গুদম) উত্তম সুখকে (ধেহি) ধারণ করো আর (অঞ্জিম) নিজের প্রকাশ্য ন্যায়কে (সম্, চারয়) ভালোভাবে চালাও।
.
ভাবার্থ- হে রাজন! যে সকল ব্যক্তি বিষয় সেবায় মগ্ন থেকে বা সেইরকম স্ত্রী ব্যভিচার বৃদ্ধি করে, তাদের প্রত্যেককে কঠোর দণ্ড দিয়ে শিক্ষা দেওয়া উচিত।
.
এই মন্ত্রগুলোর আধিদৈবিক ভাষ্য করে সৃষ্টির গভীর রহস্যের উন্মোচন করা যেতে পারে আর আমি এমন ঘোষণাও করেছিলাম, কিন্তু অনেক আর্যদের আগ্রহে আমি এখন বেদভাষ্য করারই ঘোষণা করে ফেলেছি, এই কারণে এখন কেবল আক্ষেপগুলোর উত্তর দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। পাঠক যখন এই প্রসঙ্গ তথা পূর্ব প্রসঙ্গের ভূমিকা হৃদয়ঙ্গম করবেন, তখনই বুঝতে পারবেন যে কোন মিথ্যা ধারণার কারণে এই মন্ত্রগুলোর অশ্লীল অর্থ করা হয়েছে?
.
এখানে ভাষ্যকারী নিজের ভাষ্য বা ব্যাকরণ-জ্ঞানের অহংকারে বুদ্ধির শিশুসুলভ ব্যবহারও করতে পারেননি, তাহলে পাঠকদের আর বেদের উপর আক্ষেপকারীদের তো বুদ্ধির সাধারণ ব্যবহার করার চেষ্টা করা উচিত। তাছাড়া ঘোড়ার সাথে কোনো মানবী শারীরিক সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব? যাদের এতটুকুও বুদ্ধি নেই, তারাই বেদভাষ্যকার, বেদের বিদ্বান বা বেদের উপর আক্ষেপকারী হয়ে উঠেছে। এটা নিছক মূর্খের ভিড়ের মধ্যেই হওয়া সম্ভব, সাধারণ বুদ্ধি সম্পন্ন শিশুদের মধ্যেও কখনো সম্ভব নয়।

২১.
আক্ষেপ -

Incest in Vedas Rig Veda 10.61.5-7

"(Rudra), the benefactor of man, whose eager virile energy was developed, drew it back when disseminated (for the generation of offspring) again the irresistible (Rudra) concentrates (the energy) which was communicated to his maiden daughter. When the deed was done in mid-heaven in the proximity of the father working his will, and the daughter coming together, they let the seed fall slightly; it was poured upon the high place of sacrifice.

When the father united with the daughter, then associating with the earth, he sprinkled it with the effusion [Semen]: then the thoughtful gods begot Brahma: they fabricated the lord of the hearth (of sacrifice); the defender of sacred rites."

—Tr. H.H. Wilson

Following Hindi translation is by Pandit Ram Govind Trivedi.
.
১. যে সময় পিতা যুবতী কন্যা (উষা)-র প্রতি পূর্বোক্ত রূপে কামুক হয়েছিলেন আর উভয়ের মিলন হয়েছিল, সেই সময় উভয়ের পারস্পরিক মিলনে সামান্য শুক্রপাত হয়েছিল। সুকর্মের আধার-স্বরূপ একটা উন্নত স্থানে সেই শুক্রপাত হয়েছিল।
.
২. যে সময় পিতা নিজের কন্যা (উষা)-র সাথে সঙ্গম করেছিলেন, সেই সময় পৃথিবীর সাথে মিলিত হয়ে শুক্র সেচন করেছিলেন। সুকৃতি দেবগণ এর দ্বারা ব্রতরক্ষক ব্রহ্ম (বাস্তোষ্পতি বা রুদ্র) -এর নির্মাণ করেছিলেন।

৩. যেমন ইন্দ্র, নমুচি বধ-কালে, যুদ্ধে ফেন নিক্ষেপ করতে-করতে এসেছিলেন, ঠিক তেমনই বাস্তোষ্পতি আমার কাছ থেকে প্রত্যাগমন করেছিলেন। তিনি যে পায়ে (পথে) এসেছিলেন, সেই পথেই ফিরে গেছেন। অঙ্গিরা বংশের লোকেরা আমাকে দক্ষিণাস্বরূপ যে গাভীগুলো দিয়েছিলেন, তিনি সেগুলো দূরে সরিয়ে দেন। অনায়াসে গ্রহণ করতে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও তিনি গাভীগুলো গ্রহণ করেননি।
.
Some scholars say Rig Veda 10.61.5-7 verses are about the creation of universe after the union of father with his daughter. This is supported by Brihadaranyaka Upanishad, Upanishad also permits sex with daughter, its mentioned in Brihadaran-yaka Upanishad that men were born after God had intercourse with his daughter,

Birhadaranyaka Upanishad 1.4.3

"He was not at all happy. Therefore people (still) are not happy when alone. He desired a mate. He became as big as man and wife embracing each other. He parted this very body into two. From that came husband and wife.

Therefore, said Yajnavalkya, this (body) is one-half of oneself, like one of the two halves of a split pea. Therefore this space is indeed filled by the wife. He was united with her. From that men were born."

-Tr. Swami Madhavananda

AdiShankara Acharya writes on this verse,

"He, the Viraj called Manu, was united with her, his daughter called Satarupa, whom he conceived of as his wife. From that union men were born."

_Shankara on Brihadaranyaka Upanishad 1.4.3, Shankara Bhashya, P.101, Tr. Swami Madhavananda

Hindus argue that this incest is merely allegorical and thus shouldn't be taken literally. It maybe allegorical but it does not negate the fact that incest is permitted by the Vedas after all many such verses are used by Hindus to prove their points. Was Ishwar short on words that he used such vulgar words in 'Holy' Vedas?

Why have a lengthy discussion on this incest issue? Hindus just have to provide a verse from Vedas wherein Ishwar (God) prohibits incest, That's it. No need to waste time and energy in lengthy discussions, If there is not a single verse in Vedas that prohibits incest then why defend it? on the other hand there are several Vedic verses that promotes incest.

My other question is that if incest was considered a serious offense then how could Ishwar inspire such incestuous verses so easily? Wasn't Ishwar aware of the fact that this could be used to justify incest? Inspiration of such incestuous verses only signifies that incest wasn't considered a taboo.

Hindus are requested to prove incest is prohibited in Vedas, Quote a single verse wherein Ishwar (Aum)

prohibits brother-sister, father-daughter, mother-son incest, if you can't then you shouldn't be defending it. And why does Ishwar have to inspire verses in such obscene language? Why can't he reveal in some nice poetry. The composer of these verses must be a pervert that's why there are these kind of obscene verses.
.
I'm sure no one can ever prove that. Now let's have a look at some unholy words used by Ishwar in the so called "Holy" Vedas.
.
উত্তর - এখানে সুলেমান রিজবী বেদ ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে পিতা কর্তৃক নিজের কন্যার সাথে সঙ্গম করে সন্তান উৎপাদন করার অভিযোগ করেছেন। সর্বপ্রথম আমি উপরোক্ত তিনটা মন্ত্র নিয়ে আলোচনা করবো —
.
পণ্ডিত রাম গোবিন্দ ত্রিবেদীর ভাষ্য অবশ্যই সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অশ্লীল। এই ধরণের মূর্খতাপূর্ণ ভাষ্য কিভাবে তৈরি হল, সেটা আমি প্রাথমিক পর্যায়েই স্পষ্ট করে দিয়েছি। ভাষ্যকারদের মূর্খতার সুযোগ সুলেমান রিজবীদের মতো লোকেরা নিবেই। বস্তুতঃ এই ঘরকে নিজেদের প্রদীপ দিয়েই আগুন লাগানো হয়েছে।
.
এখানে আমি দুইজন আর্য বিদ্বানের ভাষ্যই উদ্ধৃত করছি—
.
১. আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য—

প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ। পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫)
.
পদার্থ— (য়স্য) যে রুদ্র নামী প্রজাপতি অগ্নির (ইষ্ণদ্) ঈক্ষণযুক্ত (বীরকর্মম্) উৎপাদন কর্ম (প্রথিষ্ঠ) প্রথিত হয় সেই (অনুস্থিতম্) স্থাপিত এবং স্থিত হওয়া উৎপাদন কর্মকে (অনর্বা) দৃঢ় (নর্য়ঃ) মনুষ্য আর দেবগণের হিতকারক পার্থিব অগ্নি (নু) নিশ্চয়ই (অপ, ঔহৎ) লুকিয়ে রাখে (তৎ) সেটা (পুনঃ) আবার (আবৃহতি) চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এটাই হল সেই তত্ত্ব (য়ৎ) যা (কনায়াঃ) উজ্জ্বল (দুহিতুঃ) দ্যুলোক থেকে (অনুভৃতম্) গ্রহণ করা হয়েছে (আঃ) হয়।

ভাবার্থ— প্রজাপতি রুদ্র=অগ্নির উৎপাদন শক্তি বিস্তার লাভ করে। তার দ্বারা স্থাপিত উৎপাদন শক্তি রূপ তেজকে দৃঢ় আর নর তথা দেবগণের হিতকারী পার্থিব অগ্নি নিজের ভেতরে ঢেকে রাখে আর সেই তেজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বস্তুতঃ এটা সেই তেজ, যা দ্যুলোক থেকে গ্রহণ করা হয়।
.
মধ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃণ্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্ । মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ।। (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬)

পদার্থ - (কামম্) ইচ্ছামতো (পিতরি) সূর্য (য়ুবত্যাম্) দ্যুলোক বা ঊষার (কৃণ্বানে) করার পর (য়ৎ) যে (কর্ত্বম্) কর্ম (মধ্যা) অন্তরিক্ষের মধ্যে (অভীকে) তাদের নিকট (অভবৎ) হয়েছিল বা হয় তাতে (মনানক্) সামান্য (রেতঃ) অরুণ কিরণ নামক তেজকে (বিয়ন্তা) পরস্পর অভিগমনকারী দুইজনে (জহতুঃ) ছেড়েছিল বা ছাড়ে। এটা হল সেই তেজ যাকে প্রজাপতি সূর্য দ্বারা (সুকৃতস্য) উত্তম কর্মের (সানৌ) উঁচু (য়োনৌ) স্থান দ্যুলোকে (নিষিক্তম্) নিষিক্ত থাকে।
.
ভাবার্থ- আদিত্য আর ঊষা বা দ্যুলোকের পারস্পরিক অভিগমনে যে কর্ম হয়, তাতে আদিত্য অরুণ কিরণ নামক তেজকে ঊষা বা দ্যুলোকের মধ্যে ছেড়ে দেয় আর দিনের উৎপত্তি হয়। সূর্যের এই তেজ দ্যুলোকের মধ্যে ভরা থাকে।
.
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ক্ষ্ময়া রেতঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ। স্বাধ্যোऽজনয়ন্ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭)
.
পদার্থ— (পিতা) প্রজাপতি আদিত্য (য়ৎ) যখন (স্বাম্) নিজের (দুহিতরম্) ঊষা অথবা দ্যুলোককে (অধিষ্কন্) প্রাপ্ত করেন তখন (ক্ষ্ময়া) পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে (রেতঃ) নিজের অরুণ কিরণ নামক তেজকে (নিসিঞ্চৎ) আকাশে সেচন করেন তখন (স্বাধ্যঃ) ভালোভাবে প্রকট (দেবাঃ) দিব্য শক্তিগুলো - সূর্যকিরণগুলো (ব্রহ্ম) অগ্নিকে (অজনয়ন্) উৎপন্ন করে আর তাকে (ব্রতপাম্) ব্রতের পালক (বাস্তোঃ, পতিম্) বাস্তোষ্পতি রুদ্র নামক অগ্নিকে (নিঃ, অতক্ষন্) নির্মিত করে।
.
ভাবার্থ— আদিত্য যখন দ্যুলোক অথবা ঊষাকে অভিব্যাপ্ত করে, তখন পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে আকাশে তেজ সেচন করে, সেটা থেকে দিনের প্রকাশ অগ্নি ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। এই অগ্নিকে বাস্তোষ্পতি রুদ্র-অগ্নি বলা হয়।
.
২. স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক ভাষ্য—

প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ। পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ট) য়স্য গৃহস্থস্য পুত্রকর্ম পুত্রার্থকর্ম বীর্য়সেচনম্ 'পুত্রো বৈ বীরঃ' [শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৩.১.১২] প্রথিতম্ প্রথতে বা (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপেণ প্রাপ্তম্ 'ইষ্ণন্ প্রাপ্নুবন্' [ঋগ্বেদ ৪.১৭.৩ দয়ানন্দঃ] সেবিতম্ সেবায়াম্ সফলীভূতম্ য়ুবানম্ (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) পুনস্তম্ স সমন্তাদুদ্যচ্ছতি পুত্রোৎপাদনেন (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরেভ্যো হিতো হিতকরঃ সন্ সর্বকার্য়ভারম্ ত্যজেৎ (য়ৎ) য়তঃ (কনয়াঃ-দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) কান্তায়াঃ সন্তানদোহনয়োগ্যায়াঃ পত্ন্যাঃ-আনুকূল্যেন ধারিতমাসীৎ (অনর্বা) স্বস্মিন্ সমর্থাऽনন্যাশ্রমী জাতঃ ।

ভাষান্বয়ার্থ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ঠ) যে গৃহস্থের পুত্রকর্ম-পুত্র উৎপাদনের জন্য কর্ম বীর্য সেচন দ্বারা প্রথিত-পুষ্ট হয় (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপে প্রাপ্ত সফলীকৃতকে (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) তারপর তাকে সে ভালোভাবে উৎসাহিত করে পুত্র উৎপাদনের দ্বারা (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরদের অবশ্যই হিতকর হয়ে সব কার্যভার ত্যাগ করে (য়ৎ) যার দ্বারা (কনায়াঃ দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) সন্তান দোহন যোগ্য-উৎপাদন যোগ্য কান্তার অনুকূলতায় ধারণ করা হয় (অনর্বা) নিজের মধ্যে সমর্থ স্বাশ্রয়ী হয়ে যায়।
.
ভাবার্থ — গৃহস্থের লক্ষ্য হল সন্তান উৎপাদন করা, তদর্থ বীর্য সেচন করার পর কমনীয় সন্তানকে দোহনকারী পত্নীতের মধ্যে সেটা পুষ্ট হয়ে সন্তানের রূপে উৎপন্ন হয় আর সে যুবক হয়ে যায়। তখন পিতা তাকে পুত্র পরম্পরা চালানোর জন্য উৎসাহিত করে। যখন সেই পুত্র পুত্রবান হয়ে যায়, তখন আবার তার পিতা গৃহস্থ জীবন ত্যাগ করে, অন্য মানুষদের হিত কর্ম করার জন্য।
.
মথ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃন্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্। মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) য়দা য়ুবত্যাম্ ভাৰ্য়ায়াম্ পুত্ৰোৎপাদনকৰ্ত্তব্যম্ পূৰ্ণম্ ভবতি (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবতি পিতরি তদাশ্রমে পুত্ৰস্য পুত্ৰোৎপাদনম্ কামম্ কুৰ্বতি সতি তৎসম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ- জহতুঃ) বিশিষ্টতয়া প্ৰাপ্নুবন্তৌ পতিপত্ম্যৌ-অল্পাঃ প্ৰজাস্তু ত্যজতাম্ 'রেতঃ প্ৰজাঃ' [ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৩] (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মণঃ পিতৄণ্যস্য প্ৰতীকারায় গৃহে গৃহাশ্রমে বিভক্তে জগতে নিষক্তম্ নিষেচনীয়ম্ কৰ্ত্তব্যম্ ভৱতি 'সানৌ বিভক্তে জগতি' [ঋগ্বেদ ১.১৪৬.২ দয়ানন্দঃ]।
.
ভাষান্বয়াৰ্থ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) যখন যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদন থেকে কৰ্তব্য পূৰ্ণ হয়ে যায় (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবিত পিতার মধ্যে - তার আশ্ৰয়ে পুত্ৰের পুত্ৰ উৎপাদনের কামনা হয়ে গেলে তার সম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ জহতুঃ) বিশিষ্টতা থেকে প্ৰাপ্ত হতে থাকা পতি পত্নী অল্প সন্তানদের তো ত্যাগ করবেন - উৎপন্ন করবেন (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মের অৰ্থাৎ পিতৃ ঋণের প্ৰতীকার হয়ে যাওয়ার পর গৃহাশ্ৰমে বিশেষ সেবন করার যোগ্য জগতে নিষেক করা কৰ্তব্য হয়।
.
ভাবাৰ্থ - যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদনের জন্য বীৰ্য নিষেক করা কৰ্তব্য হয়। পিতা জীবিত থাকাকালীন অন্ততঃ প্ৰজা তো অবশ্যই উৎপন্ন করবে। এর জন্য গৃহস্থ আশ্ৰম হল পুণ্যের স্থান। বিশেষ সেবনীয় জগতে সন্তান পরম্পরার জন্য নিষেক করা আবশ্যক হয়। এটা হল গৃহস্থাশ্ৰমের পরম্পরা।
.
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ ক্ষ্ময়া তঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ। স্বাধ্যোऽজনয়ন্ ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ।। (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭)

সংস্কৃতান্বয়ার্থঃ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানস্য ভূমিরূপয়া ভার্য়য়া সঙ্গচ্ছমানঃ (রেতঃ-নিষিঞ্চন্) বীর্য়ম্ গর্ভাধানরূপেণ নিষিঞ্চন্ সন্ (পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন্) পিতা স্বাম্ কন্যাম্ প্রাপ্নোতি-উত্পাদয়তি 'স্কন্ নিস্সারয়তু' [য়জুর্বেদ ১.২৬ দয়ানন্দঃ] 'স্কন্দন্তি-প্রাপ্ত হয়' [ঋগ্বেদ ৫.৫১.৩ দয়ানন্দঃ ] ন তু পুত্রম্ (স্বাধ্যঃ দেবাঃ- ব্রহ্ম জনয়ন্) সু-আধ্যাতারঃ-দূরদর্শিনো বিদ্বাংসো জ্ঞানম্ প্রাদুর্ভাবয়ন্তি মন্যন্তে ঘোষয়ন্তি (বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন্) য়ৎ তাম্ কন্যাম্ গৃহস্য পতিম্ স্বামিনীম্ কর্মপালিকাম্ পিতৃকর্মরক্ষিকাম্ নির্ধারয়ন্তি ।
.
ভাষান্বয়াৰ্থ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানের ভূমিরূপ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে তথা ( রেতঃ-নিষিঞ্চন ) গর্ভাধান রীতিতে বীর্য সেচন করে ( পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন ) পিতা তার কন্যাকে প্রাপ্ত করেন - উৎপন্ন করেন - পুত্র প্রাপ্ত করেন না, তখন ( স্বাধ্যঃ-দেবাঃ-ব্রহ্ম জনয়ন ) দূরদর্শী বিদ্বান জ্ঞানকে - গৃহস্থ জ্ঞানকে নিয়মকে প্রকট করেন, ঘোষিত করেন ( বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন ) সেই কন্যাকে গৃহপতি - ঘরের স্বামী রূপে পিতৃকর্মের রক্ষিকা নির্ধারিত করেন।
.
ভাবার্থ — যদি পুরুষের স্ত্রী সহবাস অর্থাৎ বীর্যসেচন করার পর পুত্রকে না প্রাপ্ত করে কেবল কন্যাকে প্রাপ্ত করে, তখন সেই কন্যা পিতৃকর্মের রক্ষিকা তথা পিতার ঘরের সম্পত্তির স্বামী হয়। বেদের পরম্পরা এবং বৈদিক বিদ্বানদের মান্যতা হল এটা।
.
এই ভাষ্যগুলোতে আপনি অশ্লীলতার গন্ধ কোথাও পাবেন না। যেমনটা আমি আগেও লিখেছি যে বেদের স্বাভাবিক (অর্থ) কেবল আধিদৈবিকই হয়, বাকি দুই প্রকারের ভাষ্য ভাষ্যকারীর রুচি ও যোগ্যতার উপর নির্ভর করে আর সেগুলো থেকে সমাজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ লাভ করে। এই দুই বিদ্বানই আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক ভাষ্য করেছেন। আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর আধিদৈবিক ভাষ্য সাধারণ স্তরের, তবুও আক্ষেপকারীর আক্ষেপকে নির্মূল করতে সক্ষম আছে। এই বিদ্বানদের ভাষ্য পড়ে কোনো সাধারণ বুদ্ধির মানুষও এই মন্ত্রগুলোর উপর কোনো আক্ষেপ করতে পারবে না। এই মন্ত্রগুলোর বাস্তবিক বিজ্ঞানের বোধ কেবল আমার বেদভাষ্য থেকেই হওয়া সম্ভব।
.
আপনি যে প্রশ্ন করছেন যে বেদের মধ্যে এমন ভাষায় উপদেশ কেন দেওয়া হয়েছে, যা থেকে নানা প্রকারের অবাঞ্ছিত যৌন সম্পর্কের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় অর্থাৎ কিছু মন্ত্রের এমনও অর্থ হতে পারে, যা অশ্লীল হবে? এর উত্তর জানার জন্য আপনাকে বেদ তথা ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে হবে। বেদ সেই ভাষায় আছে, যে ভাষা বেদের উৎপত্তি অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে চার ঋষির দ্বারা আকাশ থেকে বৈদিক ঋচার রশ্মিকে গ্রহণ করার পূর্বে এই পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল না।
.
বেদের তুলনা পৃথিবীর অন্য কোনো গ্রন্থের সাথে করা যায় না। পৃথিবীর অন্য সব গ্রন্থ সেই ভাষায় লেখা হয়েছে, যে ভাষা সেই গ্রন্থগুলো লেখার পূর্বে পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, কোরআন লেখার পূর্বে আরবি ভাষা আরবে প্রচলিত ছিল। আরবি ভাষা আরবদের কথ্য-ভাষা ছিল। একইভাবে অন্যান্য সব গ্রন্থের ক্ষেত্রেও এটাই বুঝুন, কেবল বেদই হল এর ব্যতিক্রম।
.
সারমর্ম হল অন্যান্য গ্রন্থের ভাষাগুলো সংসার থেকে সেই গ্রন্থগুলোতে গেছে। কিন্তু বেদ থেকে সংসারে ভাষা ও জ্ঞান উভয়েরই উদ্ভব হয়েছে। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে যে শব্দগুলো বিদ্যমান আছে, সেগুলো সেই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, যে অর্থে সেগুলো সেই অঞ্চলে বলা হয়, অথচ বেদের মধ্যে এমনটা আবশ্যক নয়। এই কারণে সংসারে প্রচলিত অর্থ দেখে বৈদিক পদের অর্থ করা আনাড়ি কাজ হবে, যেটা বেশিরভাগ ভাষ্যকার করেছেন। বৈদিক শব্দগুলোর অর্থের বোধ শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নিরুক্ত ও নিঘন্টুর আধারেই হওয়া সম্ভব। এরমধ্যেও এই বিষয়টা ধ্যানে রাখতে হয় যে বেদের পদগুলো শুধুমাত্র য়ৌগিকই হয়, রূঢ় নয়।
.
আমি এখানে শব্দের তিনটা প্রকার স্পষ্ট করবো -

১. রূঢ় - এমন শব্দ, যা কোনো প্রকৃতি-প্রত্যয়ের নিশ্চয়তা ছাড়াই সমাজে প্রচলিত হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, 'খাট' শব্দটা চারপাই (খাট) বোঝাতে সমাজে ব্যবহৃত হয়। এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই।

২. য়োগরূঢ় - এমন শব্দ, যা নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয়, কিন্তু সেগুলো কোনো বিশেষ বস্তুর জন্যই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, নীরজ, বারিজ আদি। এগুলোর অর্থ হল- জলে উৎপন্ন বস্তু, কিন্তু জলে উৎপন্ন প্রত্যেকটা পদার্থ, উদ্ভিদ বা প্রাণীকে নীরজ অথবা বারিজ বলা যায় না, শুধুমাত্র কমলের জন্যই এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।
.
৩. য়ৌগিক - যেসব শব্দ নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয় অথবা যেগুলোর অর্থের ভিত্তিতে তাদের ব্যাখ্যা করা যায়। এই শব্দগুলো কোনো বিশেষ পদার্থের জন্য কখনও ব্যবহৃত হয় না, বরং প্রসঙ্গ অনুযায়ী অনেক পদার্থের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, 'অগ্নি' পদ প্রকৃতি-প্রত্যয় থেকেও উৎপন্ন হয়। এছাড়া মহর্ষি য়াস্ক নিরুক্তের মধ্যে এর বিস্তারিত নির্বচন করেছেন। প্রসঙ্গ অনুসারে এর অনেক অর্থ হওয়া সম্ভব, যেমন- প্রাণ, তাপ, বিদ্যুৎ ও আলো আদিতে যুক্ত পদার্থ, রাজা, সেনাপতি, বিদ্বান, আত্মা ও পরমাত্মা। বেদের মধ্যে সমস্ত পদ এই প্রকারের হয়, এই কারণে বৈদিক পদের কেবল এক প্রকারেই অর্থ করা অজ্ঞানতা হবে। বেদের মধ্যে 'অগ্নি' পদ দেখে মানুষ সমাজে আগুনে 'অগ্নি' নাম দিয়েছে, কারণ আগুনের মধ্যে তাপ ও আলো আদির গুণ বিদ্যমান থাকে।
.
একইভাবে বেদের (ঋগ্বেদ ৩.২৭.৪) মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' শব্দটি আছে। এর বিষয়ে শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৪.৩.৯ মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য লিখেছেন-
.
'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্ শিশ্নম্ হীদম্ শিশ্নিনম্ ভূয়িষ্ঠম্ শোচয়তি ।'
.
এখানে 'কেশ' শব্দের বিষয়েও জানা আবশ্যক। নিরুক্ত ১২.৩৬ মহর্ষি য়াস্ক লিখছেন-

'কেশা রশ্ময়ঃ'

তৈত্তিরীয় সংহিতার (৭.৫.২৫.১) মধ্যে বলা হয়েছে-

'রশ্ময়ঃ কেশাঃ'

এইভাবে শিশ্ন সেই বস্তুকে বলা হয়, যার রশ্মি তেজস্বী হয়। এইভাবে যে কোনও নক্ষত্র, যার মধ্যে আমাদের সূর্যও সম্মিলিত আছে, শোচিষ্কেশ নামে পরিচিত হবে। এর কারণ হল তাদের রশ্মিগুলো তেজস্বী হয়।
.
'শোচিষ্কেশ' -এর মধ্যে 'শুচ্' ধাতু শোক করার অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং 'শোচতি জ্বলতিকর্মা' (নিঘন্টু ১.১৬) থেকে জ্বালাতে ও তেজস্বী হওয়ার অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই থেকেই 'শোচিষ্কেশ'-এর অর্থ নক্ষত্র প্রমাণিত হয়। এইভাবে 'শিশ্ন' -এর অর্থও নক্ষত্র হয়। এখানে 'শোচিষ্কেশঃ'-এর মধ্যে বহুব্রীহি সমাস মানলে এই অর্থ হয়। যদি এখানে কর্মধারয় সমাস মানা হয়, তাহলে তেজস্বিনী কিরণই 'শোচিষ্কেশ' এবং শিশ্ন বলা হবে তথা নক্ষত্রকে শিশ্নিন যুক্ত বলা হবে। 'শিশ্ন'-এর অন্য নির্বচন মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে করেছেন - যেটা শিশ্নযুক্তকে প্রভূত মাত্রায় প্রকাশিত করে। এর অর্থ হল শিশ্নী নক্ষত্র বলা হবে, কারণ নক্ষত্রকে তার শিশ্নরূপী কিরণই প্রকাশিত করে অর্থাৎ দর্শায়।
.
এখানে 'শিশ্ন' শব্দ, যেটা বেদের মধ্যে সূর্য বা সূর্যের কিরণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটা দেখে মানব সমাজ পুরুষেন্দ্রিয়েরও 'শিশ্ন' নাম সেই সময় রাখে, যখন তার কোনো নাম ছিল না অর্থাৎ সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে। পুরুষের উপস্থও মানুষকে সন্তান উৎপন্ন করার চিন্তায় যুক্ত করে আর কামুক পুরুষদের এই ইন্দ্রিয়ই অন্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় সর্বাধিক দুঃখী ও অস্থির করে তোলে। এখানে 'শুচ্' ধাতু শোক করা অর্থেও ব্যবহৃত হয় আর জ্বালানো অর্থে গ্রহণ করলে কামাগ্নির প্রচণ্ডতা সর্বজনবিদিত।
.
এখন এখানে সুলেমান রিজভীর মতো বেদবিরোধী বলবেন যে বেদের মধ্যে সূর্যকিরণ বা সূর্যের জন্য 'শিশ্ন' বা 'শিশ্নী'-র প্রয়োগ কেন হয়েছে? এই মূর্খতাপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত রিজভী মহাশয় বুঝে গেছেন। এখানে শতপথ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতির পূর্বভাগ 'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্' লোকপ্রচলিত শিশ্নের জন্য না হয়ে কেবল নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই কথা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, বেদের পাশাপাশি শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' এবং 'শিশ্ন' পদ পুরুষের উপস্থের জন্য নয়, বরং নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ধৃতির কিছু অংশের সাদৃশ্য থেকে সমাজে পুরুষেন্দ্রিয়ের নাম শিশ্ন রেখে দেওয়া হয়।
.
একইভাবে "য়োনিঃ শব্দ বেদের মধ্যে অন্তরীক্ষের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটা উদাহরণ মন্ত্র আছে -
.
য় ঈম্ চকার ন সো অস্য বেদ য় ঈম্ দদর্শ হিরুগিন্নু তস্মাৎ । স মাতুর্য়োনা পরিবীতো অন্তর্বহুপ্ৰজা নির্ঋতিমা বিবেশ ॥ (ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩২)
.
এর ব্যাখ্যায় নিরুক্তকার মহর্ষি য়াস্কের উক্তি হল—
.
"য়োনিরন্তরিক্ষম্ মহানবয়বঃ পরিবীতো বায়ুনা।'
.
অর্থাৎ অন্তরীক্ষকে (আকাশ) য়োনি বলা হয়, যার খুব বড় অংশ বায়ু দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে। এই পদ 'য়ু মিশ্রণেऽমিশ্রণে চ' ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই পদ বেদের মধ্যে য়ৌগিক শব্দ হয়, যা অন্য আরও কিছু পদার্থের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকেই লোকসমাজে স্ত্রীর জননেন্দ্রিয়ের জন্যও এই শব্দ প্রচলিত হতে শুরু করে। তার পূর্বে এই অঙ্গের কোনো নামই ছিল না, কারণ সংসারে ভাষার উৎপত্তি বেদ থেকেই হয়েছে। এই অঙ্গও মাংসপেশী, রক্তনালী, স্নায়ু আদি দ্বারা আচ্ছাদিত থাকার কারণে য়োনি নামে পরিচিত হয়। মূলত এই শব্দ আকাশ আদির জন্য হয়, বিশেষ করে বেদ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের মধ্যে।
.
এখন যদি কোনো কামুক ব্যক্তি বেদাদি শাস্ত্রের মধ্যে শিশ্ন ও য়োনি শব্দ দেখা মাত্র তাতে অশ্লীলতার অভিযোগ করে, তাহলে সেই অশ্লীলতা তার মস্তিষ্কে ভরা আছে, শাস্ত্রের মধ্যে নয়। কোনো গ্রন্থের মধ্যে শরীর ক্রিয়াবিজ্ঞানের প্রসঙ্গে যদি লোকপ্রচলিত শিশ্ন ও য়োনি বাচক শব্দও থাকে, তাহলেও সেটা বিজ্ঞানের বিষয় হবে, অশ্লীল কথা নয়। অনেক অশ্লীলতা তো ভাষ্যকারদের মনে ভরা ছিল আর বাকিটা সুলেমান রিজবীদের মতো মানুষদের মন পূরণ করে দিয়েছে। যদি এনার মধ্যে একটুও বুদ্ধি থাকে, তাহলে এনার অশ্লীলতা দেখার অশ্লীল বৃত্তি এই সমাধানের মাধ্যমে দূর হয়ে যাবে।
.
এই মহাশয় যে এটা বলেছিলেন যে কেউই বেদের মধ্যে অশ্লীলতা নিষেধ সিদ্ধ করতে পারবে না। এই পাগলামি আর কুতর্কের উত্তর আমি আক্ষেপ ১৮ -এর সমাধানে দিয়েছি। এখন আমি বেদের মধ্যে ব্রহ্মচর্যের বিধানকারী কিছু মন্ত্র এখানে উদ্ধৃত করবো -
১. অপক্ষাঃ পক্ষিণশ্চ য়ে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ। (অথর্ববেদ. ১১.৫.২১)
.
পশু আর পাখিও ব্রহ্মচর্য পালন করে অর্থাৎ তারা ঋতুগামী হয়।
.
২. ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্য়েণ দেবেভ্যঃ স্বরাভরৎ। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
.
ঐশ্বর্যবান রাজা ব্রহ্মচর্যের সাধনাতেই সমস্ত দেবতাদের তেজস্বী বানান। এর অর্থ হল যে রাষ্ট্রের রাজা জিতেন্দ্রিয় হন, সেই রাষ্ট্রে সমস্ত বিদ্বান বিদুষী, মাতা-পিতা, কৃষক, চিকিৎসক, সৈনিক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক, বণিক আদি সমস্ত প্রজা জ্ঞান আর আনন্দে যুক্ত হয়।
.
৩. তৎ কেবলম্ কৃণুতে ব্রহ্ম বিদ্বান্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১০)
.
জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বামী কেবল ব্রহ্মচর্যপূর্বকই হওয়া সম্ভব।
.
৪. তস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে সমোতাঃ। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
.
ব্রহ্মচারী অর্থাৎ জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির মধ্যেই সকল দিব্য গুণ বাস করে।
.
৫. তানা তিষ্ঠতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ ১১.৫.১১)
.
ব্রহ্মচর্যপূর্বক অনুসন্ধানকারীই কেবল রশ্মির মতো সূক্ষ্ম পদার্থের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
.
৬. তান্ সর্বান্ ব্রহ্ম রক্ষতি ব্রহ্মচারিণ্যাভৃতম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.২২)
.
ব্রহ্মচারীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিজ্ঞানই সকল প্রাণীর রক্ষা করতে পারে, যখন বিষয়ী (ভোগী) মানুষের বিজ্ঞান সকলের বিনাশকারী হয়।
.
৭. তে রক্ষতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ১১.৫.৮)
.
ব্রহ্মচারী বিদ্বানই কেবল নিজের তপ আর সাধনার দ্বারা পৃথিবী আর সূর্যের রক্ষা করতে পারে। এর অর্থ হল, এমন বিদ্বান ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোনো প্রকারের অশুভ রশ্মি নির্গত না করে সর্বদা সাত্ত্বিক রশ্মির দ্বারা সকল পদার্থকে সুষম করতে নিজের ভূমিকা পালন করে।
.
৮. ব্রহ্মচর্য়েন কন্যা য়ুবানম্ বিন্দতে পতিম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৮)
.
ব্রহ্মচর্য পালন করেই কেবল কন্যা যুবক ব্রহ্মচারীকে স্বামী হিসেবে বরণ করে।
.
৯. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা দেবা মৃত্যুমপান্ত। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
.
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কেবল বিদ্বান লোকেরা মৃত্যু অর্থাৎ দুঃখকে জয় করতে পারে।
.
১০. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা রাজা রাষ্ট্র বি রক্ষতি। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৭)
.
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কোনো রাজা নিজের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে, অন্যথায় রাজা রাষ্ট্রের সেই প্রকার বিনাশ করে দেয়, যেমন আজ সংসারের বিনাশ হচ্ছে।
.
১১. ব্রহ্মচারী ব্রহ্ম ভ্রাজদ বিভর্তি। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
.
ব্রহ্মচর্য পালন করে বিদ্বান ব্যক্তিরা বেদাদি শাস্ত্রের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক বিদ্যা অর্জন করতে পারেন।
.
বেদের এই আদেশ ও উপদেশগুলো মাথায় রেখেই ভগবান মনু মনুস্মৃতির মধ্যে স্পষ্টভাবে লিখেছেন-
.
অর্থকামেষ্বসক্তানাম্ ধর্মজ্ঞানম্ বিধীয়তে। ধর্মজিজ্ঞাসমানানাম্ প্রমাণম্ পরমম্ শ্রুতিঃ॥ (মনুস্মৃতি ২.১৩)
.
অর্থাৎ অর্থ ও কামে আসক্ত ব্যক্তি কখনও ধর্মের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারবে না, অর্থাৎ সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবে, বরং সে পদার্থ বিজ্ঞানকেও সূক্ষ্ম স্তরে গিয়ে জানতে পারবে না। এই উভয় প্রকারের বিদ্যার জন্য বেদই হল পরম প্রমাণ, যাকে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমেই ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।
.
সুলেমান রিজভীর মতো বেদবিরোধীরা কি এখনও আমাকে জিজ্ঞেস করবেন যে বেদের মধ্যে অশ্লীলতা কোথায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে? আপনার কোরআনের মধ্যে এমন একটা প্রমাণ দেখান, যেখানে ব্রহ্মচর্যের বিধান করা হয়েছে।

২২.
আক্ষেপ -
Men only with Long Penis can impregnate women
Atharva Veda 20.126.17; Rig Veda 10.86.16-17 He whose organ [Penis] even in dream and even before cohabitation discharges genitive fluid may not be capable of having progeny. He whose long-shaped organ enters deep in the womb straight may be capable of having progeny. Almighty God is rarest of all and supreme over all.
-Tr. Vaidyanath Shastri (Arya Samaj)
Following is the Hindi translation of Rig Veda 10.86.16-17 by Pandit Ram Govind Trivedi (Puranik Hindu)
১৬. (ইন্দ্রাণীর উক্তি)- ইন্দ্র! সেই মানুষ সঙ্গম করতে সক্ষম হয় না, যার পুরুষাঙ্গ উভয় উরুর মাঝে লম্বায়মান আছে। কেবল সে সক্ষম হতে পারে, যার বসলে লোমযুক্ত পুরুষাঙ্গ বল প্রকাশ করে বা প্রসারিত হয়। ইন্দ্র হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।
.
১৭. (ইন্দ্রের উক্তি) - সেই মানুষ সঙ্গম করতে সক্ষম হয় না, যার বসলে লোমযুক্ত পুরুষাঙ্গ বল প্রকাশ করে। কেবল সে সক্ষম হতে পারে, যার পুরুষাঙ্গ উভয় উরুর মাঝে লম্বায়মান আছে।
.
উত্তর- নিশ্চিতভাবেই এই ভাষ্য মূর্খতাপূর্ণ এবং অশ্লীল। এর উপর আমার ভাষ্য হল এই রকম -
.
ন সেশে য়স্য রম্বতেऽন্তরা সক্থ্যা৩কপৃৎ।
সেদীশে য়স্য রোমশম্ নিষেদুষো বিজৃম্ভতে বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)
.
ন সেশে য়স্য রোমশম্ নিষেদুষো বিজৃম্ভতে । সেদীশে য়স্য রম্বতেऽন্তরা সক্থ্যা৩ কপৃদ্বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৭)
.
এখন আমি এই দুটো মন্ত্রের উপর আমার ত্রিবিধ ভাষ্য উপস্থাপন করবো -
.
অত্র প্রমাণানি (আধিদৈবিক পক্ষে) -
.
ইন্দ্রঃ = কালবিভাগকর্ত্তাসূর্য়লোকঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.১৫.১), মহাবলবান্ বায়ুঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৭.১), বিদ্যুদাখ্যো ভৌতিকাऽগ্নিঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.১৬.৩)। ইন্দ্রাণী = ইন্দ্রস্য সূর্য়স্য বায়োর্বা শক্তিঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.২২.১২))। বৃষা = বীর্য়কারী (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৩.২.১১), বেগবান্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ২.১৬.৬), পরশক্তিবন্ধকঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ২.১৬.৪)। বৃষাকপিঃ = বৃষা চাऽসৌ কপিঃ। কপিঃ = কম্পতেऽসৌ (উণাদি কোষ ৪.১৪৫), আদিত্যঃ (গোপথ ব্রাহ্মণ উত্তরভাগ ৬.১২)। কপৃৎ = ক + পৃৎ, 'পদাদিষু মাংস্পৃৎস্নূনামুপসঙ্খ্যানম্' (বা. অষ্টা.৬.১.৬৩) থেকে পৃতনাকে পৃৎ আদেশ। পৃতনা = সেনা (আপ্টেকোষ), সংগ্রামনাম (নিঘন্টু ২.১৭), কঃ = প্রাণঃ - প্রাণো বাব কঃ (জৈমিনীয়োপনিষদ্ ব্রাহ্মণ ৪.১১.২.৪)। সক্থি = সজতীতি (উণাদি কোষ ৩.১৫৪), ষঞ্জ সঙ্গে = আলিঙ্গন করা, সেঁটে থাকা (সংস্কৃত ধাতু কোষ পণ্ডিত য়ুধিষ্ঠির মীমাংসক), সক্থিভ্যাম্ ক্রৌঞ্চৌ-অজায়েতাম্ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.২৬৭)। ক্রৌঞ্চঃ = রজ্জুঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১৩.৯.১৭)। রজ্জুঃ = রশ্মিঃ। রশ্ময়ঃ রজ্জবঃ কিরণা বা (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ২৯. ৪৩), রশ্মেব = (রশ্মা + ইব) = কিরণবদ্ রজ্জুবদ্ বা (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৬.৬৭.১), প্রাণাঃ রশ্ময়ঃ (তেত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.২.৫.২)। রোমশঃ = লোমশঃ (রেফস্য লত্বম্), লোমাঃ = ছান্দাংসি বৈ লোমানি (সতপথ ব্রাহ্মণ ৬.৪.১.৬), পশবো বৈ লোম (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১৩.১১.১১), প্রাণা = ছান্দাংসি (তুলনা মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.১.৯)। রম্বতে = লম্বতে (রেফস্য লত্বম্) কদাচিৎ রম্বতেও থাকবে। নিষেদুঃ = নিষণ্ণাঃ (নিরুক্ত ১৩.১০), নিতরাম্ দৃঢ়স্থিত, বিশ্রাম্ত, নতমুখ, খিন্ন, কষ্টগ্রস্ত। ঋষয়ঃ = জ্ঞাপকাঃ প্রাণাঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৫.১১), প্রাপকা বায়বঃ (তুলনা মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৫.১০), বলবন্তঃ প্রাণাঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৫.১৩), প্রাণা বা ঋষয়ঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.২৭; শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.২.৩.৫), ধনঞ্জয়াদয়ঃ সূক্ষ্মস্থূলাবায়বঃ প্রাণাঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৫.১৪) ।
.
অত্র প্রমাণানি (আধ্যাত্মিক এবং আধিভৌতিক পক্ষে) –
ইন্দ্রঃ = রাজা (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৬.২৯.৬), বিদ্বান্মনুষ্যঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ২৬.৪), জীবঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৩.৩২.১০)। কৃপৃৎ = কম্ সুখনাম (নিঘন্টু ৩.৬), অন্নম্ (নিরুক্ত ৬.৩৫), উদকনাম (নিঘন্টু ১.১২), সুখস্বরূপঃ পরমেশ্বরঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ৫.১৮)। পৃৎ = পৃৎসু সংগ্রামনাম (নিঘন্টু ২.১৭)। সেনা = সিন্বন্তি বধ্নন্তি শত্রূন্ য়াভিস্সা (তুলনা মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১৭.৩৩)। বলম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ২.৩৩.১১), সেশ্বরা সমানগতির্বা (নিরুক্ত ২.১১)। ক্রৌঞ্চম্ = বাগ্ বৈ ক্রৌঞ্চম্ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১১.১০.১৯), রশ্মিঃ = জ্যোতিঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৩৫.৭), য়মনাৎ (নিরুক্ত ২.১৫), অন্নম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.৩.৩), এতে বৈ বিশ্বেদেবাঃ রশ্ময়ঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ২.৩.১.৭)। দেবঃ = ধনম্ কাময়মানঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ৭.১.২৫) । লোম = অনুকূলবচনম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ২৩.৩৬)। রোমা = রোমাণি ঔষধ্যাদীনি (মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.৬৫.৪)।
.
আধিদৈবিক ভাষ্য -
মন্ত্র ১. (য়স্য) যখন সূর্যের ভেতরে (কপৃৎ) বিভিন্ন প্রকারের প্রাণের সেনা অর্থাৎ ধারা (স্ট্রিম) এবং তাদের মধ্যে ঘর্ষণ বা ইন্টারঅ্যাকশন সেই (অন্তরা, সক্থ্যা) সূর্যের কেন্দ্রীয় ও বহির্ভাগকে যুক্তকারী উত্তরী ও দক্ষিণী দৃঢ় ভাগে, যেগুলো থেকে বিভিন্ন প্রকারের বিকিরণ ও প্রাণের (ভাইব্রেশন) ধারা (স্ট্রিম) উৎপন্ন হতে থাকে, তার মাঝে (রম্বতে-লম্বতে) পিছিয়ে গিয়ে থেমে যায় অথবা ছড়িয়ে পড়ে মন্দীভূত হয়ে যায়। সেই সময় (ন, সঃ, ঈশে) সেই ইন্দ্রতত্ত্ব অর্থাৎ সূর্যের মধ্যে অবস্থিত বলবান বৈদ্যুতিক বায়ু সমস্ত সূর্য কিংবা দুটো ভাগের মাঝখানের গতি ও সঙ্গতিতে সামঞ্জস্য রাখতে অসমর্থ হয়ে পড়ে। এর তাৎপর্য হল, সূর্যের দুই ভাগ অর্থাৎ নাভিকীয় সংযোজন যুক্ত কেন্দ্রীয় ভাগ, যেখানে নিরন্তর অপার ঊর্জা উৎপন্ন হতে থাকে, যাকে সূর্যের চুল্লি বলা যেতে পারে এবং বহির্ভাগের যে পৃথক-পৃথক ঘূর্ণন গতি আছে আর দুটোর মাঝে যে একটা এমন সন্ধি ক্ষেত্র থাকে, যার প্রান্ত উত্তরী ও দক্ষিণী ধ্রুবের দিকে হয়, তাদের মধ্যে ভারসাম্য হারানোর উপক্রম হয়। এই কারণে সমস্ত সূর্যের উপর সংকট আসতে পারে। এখন এই মন্ত্রের মধ্যেই আরও বলা হয়েছে যে, এমন অশুভ পরিস্থিতি কখন তৈরি হয় না আর কখন এই সূর্য সুষম ও অনুকূল অবস্থায় থাকে?
.
(য়স্য, নিষেদুষঃ) যে নিরন্তর দৃঢ় তেজস্বী উপরোক্ত ইন্দ্রের প্রাণের সেনা অর্থাৎ ভাইব্রেশনের স্ট্রিম (রোমশম্=লোমশম্) বিভিন্ন ছন্দরূপী প্রাণ তথা মরুত্ অর্থাৎ সূক্ষ্ম পবন দ্বারা ভালোভাবে সম্পন্ন হয়ে (বিজৃম্ভতে) বিশেষভাবে জেগে ওঠে অর্থাৎ সক্রিয় হয়ে নিজের বল ও তেজ দ্বারা সম্পন্ন হয়, (সঃ, ইৎ, ঈশে) তখন এই ইন্দ্র অর্থাৎ বিদ্যুৎদগ্নি-যুক্ত বায়ু সূর্যের দুটো ভাগের গতি ও স্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম হয়। এই প্রাণ সেনা বা স্ট্রিম উপরোক্ত সক্থি অর্থাৎ সূর্যের উভয় ভাগকে মেলানো উত্তরী ও দক্ষিণী ধ্রুবের দিকে অবস্থিত সন্ধি ভাগস্থ দৃঢ় ভাগের মাঝেই উৎপন্ন ও সক্রিয় হয়। (বিশ্বস্মাৎ ইন্দ্রঃ, উত্তরঃ) এই ইন্দ্র তত্ত্ব অর্থাৎ বিদ্যুদগ্নিযুক্ত তেজস্বী বলবান বায়ু অন্য তেজস্বী পদার্থের তুলনায় উৎকৃষ্ট ও বলবান হয়। এটাই বলপতি হয় তথা সৃষ্টি যজ্ঞকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে রক্ষা করে। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)
ভাবার্থ - যখন সূর্যের কেন্দ্রীয় ও বহির্ভাগকে যুক্তকারী দৃঢ় স্তম্ভরূপী উত্তরী ও দক্ষিণী প্রাণ ধারাগুলো মন্থর হয়ে যায়, তখন সূর্যের উভয় ভাগের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে সূর্যের অস্তিত্ব সংকটগ্রস্ত হতে পারে আর যখন সেই উভয় ধারা বিশেষ রূপে সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়, তখন সূর্যের ভারসাম্য যথাযথভাবে বজায় থাকে।
মন্ত্র ২. (য়স্য) যখন সূর্যের ভেতরে (কপৃৎ) বিদ্যুদগ্নিযুক্ত বায়ুর বিভিন্ন প্রাণের সেনা (স্ট্রিম) সেই (অন্তরা, সক্থা) সূর্যের কেন্দ্রীয় ও বহির্ভাগের মধ্যস্থলে অবস্থিত সেগুলোকে যুক্তকারী উত্তরী ও দক্ষিণী দৃঢ় ভাগের মধ্যে, যেগুলোতে বিভিন্ন প্রকারের প্রাণের (ভাইব্রেশন) ধারা উৎপন্ন হতে থাকে, তার মাঝে (রম্বতে=লম্বতে) আঁকড়ে থেকে সেগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে উপরের ভাগকে উপরেই ঝুলিয়ে ও ধারণ করতে সক্ষম হয়, তখন (সঃ, ইৎ, ঈশে) বৈদ্যুত অগ্নিযুক্ত বায়ুরূপী ইন্দ্র এগুলোকে অর্থাৎ সূর্যের উভয় ভাগকে সুষম রাখতে সক্ষম হয় অর্থাৎ সেই সময় সূর্যের বহির্ভাগ তার কেন্দ্রীয় ভাগ, যেখানে নাভিকীয় সংলয়নের প্রক্রিয়া ক্রমাগত চলে, (য়স্য, নিষেদুষঃ) এর উপরে ভারসাম্য বজায় রেখে ক্রমাগত পিছলে যেতে থাকে, কিন্তু যদি (রোমশম্=লোমশম্) প্রশস্ত বলযুক্ত ছন্দ, প্রাণ ও মরুত্ অর্থাৎ সূক্ষ্ম পবন (বিজৃম্ভতে) যখন অবাধে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেগুলোর প্রভাব কমে যায়। যেমন, জলের কোনো এক ধারাকে যখন তীব্র চাপে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তারমধ্যে ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা বেশি থাকে। সেটা পাথরকেও ভেদ করতে পারে, কোনো প্রাণীকেও মারতে পারে, কিন্তু যখন সেই একই ধারাকে একটা বড় ছিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়, তখন সেটা অবাধে ছড়িয়ে পড়বে আর তার ধ্বংসাত্মক বা ভেদক প্রভাব কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে। এখানে সেই মন্থর কথাই আলোচনা করা হয়েছে।
.
(সঃ, ইৎ, ঈশে) সেই সময় সেই ইন্দ্র তত্ত্ব অর্থাৎ বিদ্যুদগ্নিযুক্ত বায়ু সূর্যের সেই দুটো ভাগের উপর ভারসাম্য-সামঞ্জস্য হারাতে পারে, যার ফলে সূর্যের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। (বিশ্বস্মাৎ ইন্দ্রঃ, উত্তরঃ) এই ইন্দ্র তত্ত্বই সমস্ত উৎপন্ন পদার্থ সমূহ রূপী সংসারের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বলবান তথা এটা সমস্ত অন্ন অর্থাৎ সংযোগযোগ্য পরমাণুকে উৎকৃষ্টতার সাথে রক্ষা করে জগতের রচনাতে নিজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৭)
.
ভাবার্থ - যখন সূর্যের কেন্দ্রীয় ও বহির্ভাগের মাঝে প্রবাহিত উত্তরী ও দক্ষিণী প্রাণ ধারাগুলো তীব্র বলবান হয়, তখন উভয় ভাগের মধ্যবর্তী গতি ও অবকাশের ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য বজায় থাকে, কিন্তু যখন সেই ধারাগুলো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে দুর্বল হয়ে যায়, তখন দুই ভাগের মাঝে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়ে সূর্যের অস্তিত্বের উপর সংকট আসতে পারে।
.
এই দুটো ঋচার সৃষ্টি প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব -
আর্ষ ও দৈবত প্রভাব - এর ঋষি হল বৃষাকপি ইন্দ্র তথা ইন্দ্রাণী। এর তাৎপর্য হল বিদ্যুদ্বায়ুযুক্ত তীব্র বলবান সূর্যলোকের ভিতরের ভাগের অবস্থিত প্রাথমিক প্রাণ রশ্মিগুলো থেকে এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়।
.
এই সময়ে প্রাথমিক প্রাণ রশ্মিগুলো প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকায় এই ছন্দ রশ্মিগুলো বিশেষ শক্তিশালী হয়, এই কারণে এগুলোর প্রভাবেও বিশেষ বল উৎপন্ন হয়। এগুলোর দেবতা ইন্দ্র হওয়ায় এই ছন্দ রশ্মির দ্বারা সূর্য আদি নক্ষত্রের মধ্যে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বলের সমৃদ্ধি ঘটে অর্থাৎ বিদ্যুদাবেশিত কণাগুলোর ঊর্জাতে ভারী বৃদ্ধি হয়।
.
ছান্দস প্রভাব - এর ছন্দ নিবৃত্ত পঙ্‌ক্তি হওয়ায় নক্ষত্রের বহির্ভাগ থেকে বিভিন্ন কণাকে নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় ভাগে নিয়ে যাওয়া হয় আর এমন করতে গিয়ে বাইরের ও ভেতরের ভাগের মধ্যে ভারী ক্ষোভ উৎপন্ন হয়, তবুও সেই কণাগুলোর পারস্পরিক সংযোগযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এগুলোর পঞ্চম স্বর সমস্ত ক্রিয়াকে ক্রমাগত বিস্তারিত করতে সহায়ক হয়।
.
ঋচাগুলোর প্রভাব - এই দুই ছন্দ রশ্মির প্রভাব নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় ভাগ (যারমধ্যে নাভিকীয় সংযোজনের ক্রিয়া হয়) তথা তার ওপরে বিদ্যমান বাকি সম্পূর্ণ বিশাল ভাগের মধ্যবর্তী সন্ধি ক্ষেত্রের মধ্যে হয়। এই দুটো ভাগ পরস্পর কিছুটা অসম গতিতে একে অপরের ওপর পিছলে যেতে থাকে। সন্ধি ভাগের উত্তরী ও দক্ষিণী ভাগের মধ্যে বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির সুদৃঢ় ধারা বিদ্যমান থাকে, যা দুটো ভাগকে পরস্পর একটা সীমিত দূরত্বে বজায় রাখার সাথে-সাথে বিশাল ভাগকে দৃঢ়তার সাথে ধরে রাখে। সেই ধারাগুলোর মধ্যে এই ছন্দ রশ্মিগুলোরও বিশেষ ভূমিকা থাকে। এগুলোর প্রভাবে সেই সুদৃঢ় ধারাগুলো ক্রমশঃ দুর্বল এবং সবল রূপ প্রাপ্ত করতে থাকে। এই কারণে নক্ষত্রের বিশাল ভাগ সন্ধি ভাগের ওপরে কখনও কিছুটা কাছে, তো কখনও কিছুটা দূরে হতে থাকে অর্থাৎ দোলন করতে থাকে। এর তাৎপর্য হল, কেন্দ্রীয় ভাগ এবং বাকি বিশাল ভাগের মধ্যবর্তী বিদ্যমান সন্ধি ভাগ স্প্রিংয়ের মতো সূক্ষ্ম মাত্রায় কখনও প্রসারিত, তো কখনও সংকুচিত হতে থাকে। এই ক্ষেত্রের মধ্যে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বলের বিশেষ প্রাধান্য ও সক্রিয়তা থাকে।
.
আধিভৌতিক ভাষ্য -
মন্ত্র ১. (য়স্য) যে রাজার (কপৃৎ) সেনাবল অথবা তার অন্ন-ধনের ভাণ্ডার (সক্থ্যা, অন্তরা) সমস্ত বিদ্বান বা ধন কামনা করা প্রজাদের মধ্যে উদ্ভূত রাগ-দ্বেষ রূপ সংগ্রামের মাঝে (রম্বতে) পিছিয়ে পড়ে অথবা তাদের বিশেষ আসক্তির কারণ হয়ে ওঠে। (সঃ, ন, ঈশে) সেই ঐশ্বর্যহীন রাজা তার দেশবাসীর উপর শাসন করতে পারে না অর্থাৎ তার রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি হয়, কিন্তু (য়স্য, নিষেদুষঃ) নিরন্তর স্থিরতায় আশ্রিত যে রাজার সেনাবল অথবা অন্ন-ধন সম্পদ (রোমশম্) যখন প্রশস্তরূপে সমস্ত প্রজাদের জন্য অনুকূল বচনযুক্ত এবং প্রচুর ঔষধ, পশু আদি দ্বারা সম্পন্ন হয় তথা (বিজৃম্ভতে) সমস্ত প্রজাদের জন্য যথাযথ রীতিতে বিতরণ করা হয় তথা এই বিতরণ ব্যবস্থা সর্বদা সুষ্ঠুভাবে চলতে থাকে, (সঃ, ইৎ, ঈশে) সেই রাজাই তার রাষ্ট্রের উপর সমস্ত ঐশ্বর্য সহকারে শাসন করতে পারে। (বিশ্বস্মাৎ, ইন্দ্র, উত্তরঃ) এমন সমগ্র ঐশ্বর্যসম্পন্ন রাজার শাসন অন্য সমস্ত ব্যবস্থার থেকে শ্রেষ্ঠ হয়। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)
.
ভাবার্থ - রাজার উচিত যে তিনি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য অনুকূল বাক্য সহকারে তার প্রজাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া রাগ-দ্বেষজনিত অসন্তোষ এবং সংগ্রাম দূর করার ক্রমাগত চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি নিজের বল ও ধন সম্পূর্ণ প্রজাদের হিতে যথাযথভাবে নিয়োগ করবেন।
.
মন্ত্র ২. (য়স্য, নিষেদুষঃ) যে বিশ্রান্ত এবং কষ্টগ্রস্ত রাজার (রোমশম্) প্রশস্ত অন্ন, ঔষধ ও পশ্বাদি সম্পদ (বিজৃম্ভতে) অব্যবস্থিতরূপে খোলা থাকে অর্থাৎ যার রাজ্যে অপব্যয় ও বিতরণের অব্যবস্থা থাকে। (ন, সঃ, ঈশে) সেই ঐশ্বর্যহীন রাজা নিজের রাষ্ট্রে শাসন করতে সক্ষম হন না।
.
(সঃ, ইৎ, ঈশে) সেই রাজাই ঐশ্বর্যবান হয়ে নিজের রাষ্ট্রে যথাযথ রীতিতে শাসন করতে পারেন, (য়স্য, কপৃৎ) যার সেনাবল এবং অন্ন-ধন ভাণ্ডার (সক্থ্যা, অন্তরা) সকল বিদ্বান ও প্রজাদের মধ্যে উৎপন্ন রাগ-দ্বেষজনিত সংঘর্ষের মধ্যে (রম্বতে) সেই রাগ-দ্বেষের ভাবকে পরাজিত করে অর্থাৎ দূর করে প্রজাদেরকে তার উপরে ওঠান। তারপর সেই রাজা সকল প্রজাদের মধ্যে সেই বল ও ধনাদি পালনের সামগ্রীর দৃঢ়তার সাথে যথাযথভাবে বিতরণ করতে-করতে নিজের পালন কর্মের দ্বারা সকল প্রজাদের হৃদয়ে বাস করেন। (বিশ্বস্মাৎ, ইন্দ্র, উত্তরঃ) এমন ঐশ্বর্যবান রাজা নিজের প্রজাদেরকে নিজের অন্নাদি পদার্থের দ্বারা সর্বপ্রকার দুঃখ থেকে উদ্ধারকারী হন। (ঋগ্বেদ 10.86.17)
.
ভাবার্থ - ঐশ্বর্য ইচ্ছুক রাজার উচিত যে তিনি নিজের রাষ্ট্রকে বাইরের আক্রমণাদি কষ্ট থেকে সুরক্ষিত রেখে পূর্ণ পুরুষার্থের সাথে নিজের অন্ন-ধন আদি পালনের সামগ্রীর অপব্যয় বা অব্যবস্থিত বিতরণ কখনোই হতে দিবেন না, বরং নিজের প্রজাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা রাগ-দ্বেষজনিত অসন্তোষ এবং সংঘর্ষকে উচিত পালনাদি ক্রিয়া ও আবশ্যক হলে উচিত দণ্ডের আশ্রয় নিয়ে দূর করে সকলের হিত করার সর্বদা চেষ্টা করতে থাকবেন, যাতে তিনি সকলের কাছে পিতার মতো প্রিয় হয়ে থাকেন।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
মন্ত্র ১. (য়স্য) যে বিদ্বান পুরুষের (কপৃৎ) মন এবং সুখকারী প্রাণের সমূহ (সক্ত্যা, অন্তরা) রাগ-দ্বেষাদি দ্বন্দ্বের প্রতি আসক্তি এবং কোলাহলের মধ্যে (রম্ভতে) লেগে থাকে অর্থাৎ তাতেই রত থাকে, (ন, সঃ, ঈশে) সে নিজের ইন্দ্রিয়কে শাসন করতে পারে না, বরং (য়স্য, নিষেদুষঃ, রোমশম্) দৃঢ় ও ব্রহ্মবর্চস দ্বারা তেজস্বী হয়ে নিজের অন্তঃকরণকে প্রণব তথা গায়ত্র্যাদি ছন্দরূপ বেদের পবিত্র ঋচার মধ্যে প্রশস্ত রূপে রমণ করতে-করতে (বিজৃম্ভতে) নিজেকে সুখস্বরূপ পরমপিতা পরমেশ্বরের আনন্দে বিস্তৃত করে দেয়, (সঃ, ইৎ, ঈশে) সেই য়োগী পুরুষই নিজের ইন্দ্রিয়কে শাসন করতে পারে। (বিশ্বস্মাৎ, ইন্দ্র, উত্তরঃ) এমন জিতেন্দ্রিয় বিদ্বান অন্য প্রাণীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)
.
ভাবার্থ - বিদ্বান পুরুষের উচিত নিজেকে য়োগযুক্ত করে পরমপিতা পরমাত্মার মধ্যে রমণ করার জন্য নিজের অন্তঃকরণকে রাগ-দ্বেষাদি দ্বন্দ্ব থেকে দূরে সরিয়ে প্রণব তথা গায়ত্র্যাদি ঋচার বিধিপূর্বক জপ দ্বারা পরমেশ্বরের উপাসনা করার জন্য নিজের ইন্দ্রিয়কে জয় করা।
.
মন্ত্র ২. (য়স্য, নিষেদুষঃ, রোমশম্) যে নিরন্তর বিশ্রামরত ও খিন্ন থাকা বিদ্বান পুরুষের অন্তঃকরণ বিভিন্ন গায়ত্র্যাদি ঋচার জপ করার সময় অর্থাৎ উপাসনার অভ্যাস করার সময় (বিজৃম্ভতে) এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়তে থাকে অর্থাৎ অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক ছোটে, (ন, সঃ, ঈশে) সেই বিদ্বান নিজের ইন্দ্রিয়কে জয় করতে সক্ষম হয় না, বরং (য়স্য, কপৃৎ) যার মন তথা সুখকারী প্রাণ সমূহ (সক্থ্যা, অন্তরা) বিভিন্ন দ্বন্দ্ব তথা সাংসারিক ব্যবহারের মাঝে (রম্ভতে) স্থির হয়ে তপ্ত হতে-হতে এক স্থানে দৃঢ় থাকে এবং নিরন্তর পরমেশ্বরের জপে মগ্ন থাকে, (সঃ, ইৎ, ঈশে) সেই বিদ্বান য়োগী হয়ে নিজের ইন্দ্রিয়ের উপর শাসন করে সমগ্র ঐশ্বর্য লাভ করে। (বিশ্বস্মাৎ, ইন্দ্র, উত্তরঃ) এমন য়োগী নিজেকে সব দুঃখ থেকে উদ্ধার করে অন্য প্রাণীদেরও দুঃখ থেকে উদ্ধারকারী হয়। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৭)
ভাবার্থ — মুমুক্ষু বিদ্বান পুরুষের উচিত ঈশ্বরোপাসনা বা জপ করার সময় মনকে একাগ্র করে নিরন্তর পরমেশ্বরে মগ্ন থাকা তথা এমন করতে-করতে নিজের সম্পূর্ণ দ্বন্দ্বকে জিতে স্বয়ং মোক্ষ লাভ করে অন্য প্রাণীদেরও দুঃখ থেকে দূর করার চেষ্টা করতে থাকা।
.
আমার এই ভাষ্যগুলো পড়ে আপনার মন-মস্তিষ্কের মধ্যে ভরা অশ্লীলতা বেরিয়ে যাবে, এমনটা আমার বিশ্বাস। এই কারণে আমি বেদগুলোতে অশ্লীলতার বাকি আক্ষেপগুলোর উত্তর দিচ্ছি না, কারণ এতগুলো উত্তর থেকেই বিজ্ঞ পাঠক আক্ষেপকারীর বৌদ্ধিক স্তর এবং সত্য-মিথ্যার বিবেকের ভাবনাকে জানতে পারবেন।

২৩.
আক্ষেপ -
Niyog Pratha is the ugly practice where the wife copulates with other men to beget children, it is also a license for Brahmins to enjoy numerous women as Vedic law permits them to copulate with any women they desire if they are unable to control their passion. Following verse is taken as a proof for Niyoga from the Vedas,
Rig Veda 10.40.2
.
Where are ye, Aśvins, in the evening, where at morn? Where is your halting-place, where rest ye for the night? Who brings you home ward, as the widow bedward draws her husband's brother, as the bride attracts the groom?
.
Yaska explains this verse as, Nirukta 3.15
.
"Where do you remain at night, and where during the day? Where do you obtain the necessities of life, and where do you dwell? Who puts you to bed as a widow her husband's brother? From what (root) is Devara derived? (He is) so called (because) he is the second husband..."
-Tr. Lakshman Swarup
.
The one who is to contract Niyoga with the widow is known as Appointed Husband or Devar. The brother of the deceased is most preferred in the case of Niyoga, after that Sapinda (Close relatives) and Niyoga with high caste Brahmins is also preferable as a widow can't contract Niyoga with lower caste. It is recommended to contract Niyoga with higher caste men only as they are said to be so called Intellectuals'. Above verse from Vedas as well as Nirukta talks about Niyoga. Arya Samaji scholar named Chiranjiva Bhardvaja explains the word Devar (in Niyoga sense) in the amendment of his translation in the 4th chapter of Satyarth Prakash,
.
Q. Supposing the deceased husband of a widow had no younger brother, with whom should she contract Niyoga?
.
A. With her devar, but the word devar does not mean what you think. For the Nirukta says "The second husband by Niyoga of a widow, be he the younger brother of her deceased husband or his elder brother, or of a man of her won Class or of a higher Class, is called Devar."
.
Explanation by Dr. Chiranjiva Bhardwaja, page 134, Ch 4, Satyarth Prakash.
.
Some Hindus especially Aryas are shying away from this topic and even defying their guru Swami Dayanand Saraswati (Mulshankar) who immensely supported Niyoga.
.
Stalwarts of Arya Samaj viewed Niyoga as legit and that it is sanctioned by the Vedas. Rig Veda hymn 10 of chapter 10 endorses Niyoga (as per Arya Samaj translation), Following is the snapshot of the header from their website.
.
It states,
.
"This hymn is a dialogue between Yama and Yami i.e. between husband and wife. The husband on being impotent allows his wife to contract Niyoga..."
.
.
It is mentioned in Rigved, Rig Veda 10.40.2
.
"O man and woman (connected by Niyoga), just as a widow, cohabits with her husband by Niyoga and produces children for him, and a wife cohabits with her husband by marriage and produces children for him, likewise (it may be asked) where both of you were during the day and during the night, and where you slept, who you are, and what your native place is." taken from the book Satyarth Prakash, Ch 4, P.134, Tr. Chiranjiva Bhardwaj (Arya Samaj)
.
Atharva Veda 14.2.18
.
"Do thou O woman that givest no pain to thy husband or Devar (husband by Niyoga), art kind to animals in this Order of householders, walk assiduously in the path of righteousness and justice, art well-versed in all the Shastras, hast children and grandchildren, givest birth to valiant the brave boys, desirest a second husband (by Niyoga), and bestoweth happiness on all, accept a man of they choice as thy husband or Devar, and always perform the Homa which is the duty of every householder." taken from the book Satyarth Prakash, Ch 4, P.135, Tr. Chiranjiva Bhardwaja (Arya Samaj),
.
What's more uglier is that Rishis created this practice to legitimize their desire. It enables a Brahmin to have sex with numerous women. Mulshankar (Dayanand) writes in his book,
.
"Those, however, who cannot control their passions may beget children by having recourse to Niyoga"
.
-Satyarth Prakash by Swami Dayanand Saraswati,
.
Ch 4, page 130, Tr. Chiranjiva Bhardwaja
.
উত্তর— এখন এই প্রসঙ্গের মধ্যে শুধুমাত্র নিয়োগ প্রথা নিয়ে করা আক্ষেপের উত্তর আমি আমার বই ‘সত্যার্থ প্রকাশ—উভরতে প্রশ্ন এবং গরজতে উত্তর’ থেকে কিছু মন্তব্যের সাথে এখানে উদ্ধৃত করবো —
.
নিয়োগ বিষয়— এই বিষয়ে বিচার করার পূর্বে আমাদের ঋষির সেই সব মতামতের ওপর বিশেষ ধ্যান দেওয়া উচিত, যিনি জিতেন্দ্রিয়তাকে (ইন্দ্রিয় জয় করা) অত্যন্ত আবশ্যক মনে করেন। সর্বপ্রথম তো মহর্ষি দয়ানন্দের মান্যতা হল, যে যুবক বা যুবতী জিতেন্দ্রিয় থাকতে পারবে তথা রাষ্ট্র ও সমাজের বিশেষ হিত সাধন করতে চাইবে, তারা যেন বিবাহই না করে, কিন্তু এমন সংকল্পকারীদের সতর্কও করেছেন যে এই কাজটা শুধুমাত্র পূর্ণ জ্ঞান সম্পন্ন, জিতেন্দ্রিয় আর নির্দোষ য়োগী নারী আর পুরুষের কাজ। এটা অত্যন্ত কঠিন কাজ যে কামের গতিকে থামিয়ে ইন্দ্রিয়কে নিজের বশে রাখা, কিন্তু তাঁর ভাবনা অবশ্যই এই ছিল যে যারা এমন করতে পারবে, তারা অবশ্যই যেন করে। (দেখুন-সত্যার্থ প্রকাশ, তৃতীয় সমু্লাস এবং সংস্কৃত বাক্য প্রবোধ)
.
এই ধরণের প্রস্তুতির জন্য অথবা বৈদিক বিচারানুকূল গৃহস্থ হওয়ার জন্য তিনি তাদের পিতামাতার দ্বারা গর্ভাধান থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া আবশ্যক মনে করেন। তিনি শিক্ষা বিষয়কে শুরু করতে গিয়ে দ্বিতীয় সমুলাসে একটা আর্ষ বাক্য উদ্ধৃত করেন - 'মাতৃমান্ পিতৃমান্ আচার্য়বান্ পুরুষো বেদ' অর্থাৎ মাতা-পিতা ও আচার্যকে ভালো শিক্ষক হতে হবে, তবেই সন্তান উত্তম হবে। সেই সমুলাসের পূর্বে উত্তম শিক্ষা শুরু করতে গিয়ে প্রথম সমুলাসে সর্বোত্তম জ্ঞান পরমেশ্বরের জ্ঞানের বিশদ আলোচনা করেছেন। একশো নামের ব্যাখ্যা দিয়ে ঈশ্বরের স্বরূপের যে গগরে সাগর ভরিয়েছেন, সেটা অন্যত্র কোথাও একসাথে পাওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। এত জ্ঞানী পুরুষের জন্যও প্রথমে বিবাহের যোগ্যতা নির্ধারণ করতে গিয়ে চতুর্থ সমুলাসে ভগবান মনু মহারাজকে উদ্ধৃত করেছেন - .
বেদানধীত্য বেদৌ বা বেদম্ বাপি য়থাক্রমম্ ।
অবিলুপ্ত ব্রহ্মচর্য়ো গৃহস্থাশ্রমমাবিষেৎ ॥
.
অর্থাৎ যে পূর্ণ অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালন করে অর্থাৎ স্বপ্নেও যার বীর্য স্খলন হয়নি, এমন পূর্ণ জিতেন্দ্রিয়তা যুক্ত যে পুরুষ বা নারী চার বেদ, তিন, দুই বা কমপক্ষে একটা বেদ সাঙ্গোপাঙ্গ অধ্যয়ন করেনি, তার গৃহস্থ হওয়ারই অধিকার নেই অর্থাৎ প্রথমে তো পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় ও পরোপকারী বিবাহই করবে না আর যদি করেও, তাহলে উপরোক্ত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক। এই ধরণের পিতামাতা গর্ভাধানের পূর্বে, মাঝে আর পশ্চাৎ শান্তি, আরোগ্য, বল, বুদ্ধি, পরাক্রম আর সুশীলতার সাথে সভ্যতাকে প্রাপ্ত করবে, তেমনই ঘি, দুধ, মিষ্টি, অন্নপান আদি শ্রেষ্ঠ পদার্থের সেবন করবে, যাতে রজবীর্যও দোষমুক্ত হয়ে গুণযুক্ত হয়। এর পূর্বে পঠনকালে অষ্ট মৈথুন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকবে। তারপর বলাদি যুক্ত স্ত্রী-পুরুষ বিধিপূর্বক গর্ভাধান করবে তথা গর্ভ স্থির হওয়ার পর এক বছর পর্যন্ত পরস্পরের সাথে কখনও শারীরিক সম্পর্ক করবে না। ঋষির কথন হল মানুষ পূর্ণ ঋতুগামী হোক। এই বিষয়ে পশুরাও আমাদের আদর্শ হতে পারে, যারা ঋতুকাল ছাড়া স্ত্রী পশুর নিকটেও যায় না।
.
ঋষির মন্তব্য হল, সন্তান উৎপাদনের জন্যই শারীরিক সম্পর্ক হবে। যখন সন্তানের ইচ্ছা থাকবে না, তখন কখনও শারীরিক সম্পর্ক করবেই না। যারা মনুর এই বাক্যের উপর উপহাস করে যে সর্বোচ্চ ১০টা পর্যন্ত সন্তান উৎপন্ন করবে, তারা এটা ভুলে যায় যে যারা ঘৃণিত সন্ততি নিরোধক দ্বারা সারাজীবন স্বেচ্ছাচারিতায় সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে আর 'আমরা দুই আমাদের দুই'কে আদর্শ মেনে লোকদেখানো সংযমী সেজে আছে। এমনটা কোনো পশুকে করতে কেউ দেখেছে কি? তারা কিভাবে সেই মনুর (যিনি বলেছেন যে জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বারই শারীরিক সম্পর্ক রাখবে।) উপর ব্যঙ্গ করতে পারে? আছে কি কোনো মনু বিরোধী, যে এমন সর্বোচ্চ ব্যবস্থার মধ্যেও থাকতে পারবে? অর্থাৎ নিজের জীবনকালে কেবল মাত্র দশ বারই শারীরিক সম্পর্ক রাখার সংযম দেখাতে পারে।
.
এবার আমি নিয়োগ ব্যবস্থায় আসবো। এপর্যন্ত লেখার অভিপ্রায় হল যে ঋষির স্তর অত্যন্ত উচ্চ কোটির ছিল। তাঁর স্তর পর্যন্ত ভাববার মস্তিষ্ক ও চিত্তই আজকের তথাকথিত শ্রেষ্ঠ মানবদের মধ্যেও নেই। যে উদ্দেশ্য বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষের শারীরিক সংযোগের হয়, সেই একই উদ্দেশ্য নিয়োগেরও হয়। কেবল পার্থক্য হল, নিয়োগ একটা অস্থায়ী ও আপাৎ-কালের ব্যবস্থা হয়, যেখানে বিবাহের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদন নয়, বরং সমাজকে একটা সুশৃঙ্খল ও উন্নত রূপ দেওয়াও হয় আর এটা হল আজীবন স্থায়ী ব্যবস্থা।
.
এই উভয় ব্যবস্থার উপর সামাজিক অনুমোদনের ছাপ থাকা বাধ্যতামূলক। এটা ছাড়া উভয় ব্যবস্থাই ব্যভিচারের পর্যায়ে পড়ে। এখানে আমি এর সমর্থনে বেদাদি শাস্ত্রের প্রমাণ দিবো না, কারণ অবৈদিকদের তাতে কি লাভ হবে? আর কিছু বৈদিক সেটার অর্থ পরিবর্তন করার দুঃসাহসও করতে পারে। আমি এখানে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণও দিবো না, কারণ আজকের পাশ্চাত্য শিক্ষার দাস ব্যাস, বায়ুদেব, ইন্দ্র, ধর্মদেব আদিকে ব্যভিচারী বলতে তারা কেন সংকোচ করবে? এই কারণে আমি কেবল সাধারণ যুক্তিই ব্যবহার করবো।
.
পুনর্বিবাহ কার হবে আর কার হবে না, এই বিষয়টা প্রথমে 'সত্যার্থ প্রকাশ'-এ ভালোভাবে পড়ে নেওয়া উচিত। তারপর নিয়োগ কখন আর কেন করা হবে, তাকে বৈচারিক পরিপক্কতা ও উচ্চত্ব স্তর পর্যন্ত পৌঁছে পড়া উচিত, তাহলে অনেক প্রশ্নের সমাধান সেখানেই হয়ে যাবে। আমি 'সত্যার্থ প্রকাশ'-এর সমস্ত যুক্তি এখানে উদ্ধৃত করে পুনরুক্তি করে লেখাকে অকারণে বাড়াতে চাইবো না। ঋষি তো ব্যভিচার বা কুকর্ম প্রতিরোধের উপায় লিখেছেন —
.
"এই ব্যভিচার আর কুকর্ম প্রতিরোধের একমাত্র এটাই হল শ্রেষ্ঠ উপায়, যারা জিতেন্দ্রিয় থাকতে পারবে, বিবাহ বা নিয়োগও করবে না তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু যারা এমন নয়, তাদের বিবাহ আর আপাৎকালে নিয়োগ অবশ্যই করা উচিত।"
.
তিনি বিধবা বা বিধুর (বিপত্নীক) -কে সেই আপাতকালে নিয়োগের প্রেরণা করেছেন, যখন তাদের সন্তান লাভের ইচ্ছা হবে অথবা যে বিধবা বা বিধুর ব্রহ্মচারী থাকতে পারবে না। এর ফলে তাদের কর্মের ফল এই হবে যে সন্তানও প্রাপ্ত হবে, কারণ ঋষি সন্তান লাভের ইচ্ছা ছাড়া বীজ অকারণে ফেলাকে ব্যভিচার ও পাপ মনে করেন। তাঁর এই ধারণা ঠিক সেইরকমই যথার্থ, যেমন কোনো কৃষক সুন্দর বীজকে এমনিই ঊষর জমিতে ছড়িয়ে দেওয়াকেই কৃষকের ধর্ম মনে করছে আর ফল একটাও প্রাপ্ত না হয় আর না ফল পাওয়ার ইচ্ছাও করে। এমন কৃষককে মহামূর্খই মানা হবে।
.
কিন্তু যারা শুধু বীজ ফেলার মধ্যেই আনন্দ মনে করছে, তাদের কি বলা হবে? তাদেরও সেই দশা, যারা সারা জীবন ভোগ করতে চায়, কিন্তু সন্তান হওয়ার ভয়ে এমনভাবে ভীত হয়, যেমন মানুষ ভয়ংকর সাপকে ছুঁতে ভয় পায়। তারা ঘোর অপ্রাকৃতিক হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঈশ্বরের ব্যবস্থার পালনকে পাপ মনে করে আর স্বয়ং সারাজীবন যে স্বামী বা স্ত্রী ব্যভিচারে লিপ্ত থাকে, তারা নিজেদেরকে সংস্কারবান গৃহস্থ মনে করে আর ঋষিদের পাপী বলে।
.
যদি কেউ বলে যে আজকের দিনে কোনো ঋষিভক্ত নামধারী ব্যক্তি তার স্ত্রী, কন্যা বা বোনকে কারোর সাথে আপাৎকালেও নিয়োগ করাতে চাইবে অথবা কোনো মায়ের ছেলে কি তার বড়ো বৌদি বা ছোটো বৌদির সাথে আপাৎকালে নিয়োগ করবে? যদি এমন করে, তাহলে অবশ্যই মহাপাপী ও দুষ্ট বলা হবে আর আমিও এটা স্বীকার করি যে বর্তমান দেশ-কাল-পরিস্থিতিতে এমনটাই বলা উপযুক্ত হবে। তখন কেউ বলবে যে তাহলে আমি কেন ঋষি কথিত বা বেদোক্ত নিয়োগ ব্যবস্থার সপক্ষে ওকালতি করছি? আমিও কেন কিছু আর্যের মতো চাপা স্বরে এটাকে সত্যার্থ প্রকাশ, বেদ বা ভারতীয় ইতিহাসের একটা কলঙ্ক বলে মেনে নিবো না? না, আমি এমনটা কখনোই করতে পারবো না, কিন্তু আমি বর্তমানে এই পরম্পরাকে কখনোই উপযুক্ত বলে মানতে পারি না। তবে হ্যাঁ, নীতিগতভাবে নিয়োগ হল শ্রেষ্ঠ আপদ্ ধর্ম।
.
যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে আজ আপনি এই ধর্মকে অধর্ম বলতে গিয়ে বর্তমানে এমন কাজ করাকে পাপ কেন বলছেন? এর কারণ আমি বলতে চাইবো। সর্বপ্রথম এটা জেনে নেওয়া উচিত যে কিছু ব্যবস্থা দেশ, কাল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়ে যায়, যদিও সেগুলো যতই শ্রেষ্ঠ ও হিতকারী হোক না কেন? যে কাজ হেমন্ত ঋতুতে করার যোগ্য হতে পারে, সেই কাজ গ্রীষ্ম ঋতুতে অযোগ্য হবে। কোনো কাজ ধ্রুব প্রদেশে করার যোগ্য, সেই কাজ ভূমধ্যরেখীয় উষ্ণ প্রদেশগুলোতে ক্ষতিকর হতে পারে। কোনো কাজ শিশুর জন্য করার যোগ্য, সেই কাজ যুবক ও বৃদ্ধদের জন্য অযোগ্য হতে পারে। এর উদাহরণ দেওয়া আমি আবশ্যক মনে করছি না, কারণ এটা প্রায় সব প্রবুদ্ধ পাঠকই জানতে পারেন।
.
প্রাচীন কালে নদীর তীরে, বনে বা পর্বতে সন্ধ্যা করা, বনভ্রমণ ও বসবাসকে বানপ্রস্থী ও সন্ন্যাসীর ধর্ম বলা হয়েছে, কিন্তু আজ বন আর নেই আর যদি কোথাও থাকেও, তাহলে সেই অধিকাংশ বনে কাঁটাঝোপ, জলহীনতা বা দূষিত জলেরই বিদ্যমানতা, মশা আদির ঘোর প্রকোপ আর কন্দমূল ফলের প্রায় অভাব আছে। যদি কোথাও অভাব না থাকে, তাহলে সেখানে বন বিভাগের পাহারা আছে। এমন অবস্থায় 'গঙ্গাতীরে হিমগিরিশিলা...'-কে ব্যবহারে আনা কোনো সহজ কাজ নয় আর না এর আবশ্যকতা আছে, তাই আমাদের এর এমন বিকল্প খুঁজতে হবে, যেখানে সাধনায় বিঘ্নও হবে না আর বনের মতো শান্তি, সরলতা আর প্রাকৃতিক জীবন ঘর বা আশ্রমের মধ্যেই উপলব্ধ হয়ে যাবে।
.
যে সময়ে এই সব লেখা হয়েছিল, সেই সময়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক ব্যবস্থা আর রাজধর্মও সেই অনুযায়ীই ছিল। রাম রাজ্যে মশা, সাপ আদিরও ভয় ছিল না। তখন যেখানে খুশি বসে নির্বিঘ্নে সাধনা করা যেতো। আজ তো বন্ধ ঘরে বসেও মশারী ও পাখার দরকার হয়, তাহলে গভীর জঙ্গলে সাধনা কীভাবে হবে? এইজন্য আমাদের প্রাচীনকালের কিছু সর্বোত্তম ব্যবস্থাকে তৎকালে সম্পূর্ণ উপকারী মনে করলেও বর্তমান প্রতিকূল সময়ে সেটা উপযুক্ত মনে করা উচিত নয়।
.
যখন ভারতের মধ্যে নিয়োগ প্রথা প্রচলিত ছিল, সেই সময়ের মানুষ উপরে বর্ণিত সংযমিত সুব্যবস্থায় থাকতো। তারা কামশক্তি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও কামুক ছিল না। স্ত্রী-পুরুষ পরস্পর সংযোগ শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্যেই করতো, সেটা নিয়োগ হোক বা বিবাহ। যখন উদ্দেশ্য সফল হয়ে যেতো, তখন তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের কোনো আকাঙ্ক্ষাও থাকতো না। তখন তারা নিশ্চিতভাবেই নিয়োগ করা বা করানোর অধিকারী ছিল, কিন্তু আজ মানব কামুকতায় সংসারের সবথেকে নিম্নশ্রেণীর প্রাণীদেরও পিছনে ফেলে দিয়েছে, যারা অকারণে বীর্যপাত করেই আনন্দ পায় আর যে উদ্দেশ্যে বীজের ব্যবহার হওয়া উচিত, তা থেকে ভয় পায়। যেখানে স্বয়ং মাতা সর্পিণী হয়ে বা ক্ষুধার্ত কুকুরীর মতো নিজেরই ভ্রূণ খেয়ে ফেলে অর্থাৎ গর্ভপাত করে পাপী হয়ে যায়, আবার কেউ পরিবার পরিকল্পনার নামে স্বেচ্ছাচারী হয়ে প্রতিদিন ভোগ-বাসনায় লিপ্ত থাকে, তারা তো নিয়োগ প্রথার উপর আঙুল তোলার যোগ্য নয় এবং তারা নিয়োগ করার বা করানোর অধিকারীও নয়।
.
আশ্চর্য হল যে, যারা সত্যার্থ প্রকাশের ভূমিকা থেকে তৃতীয় সমুল্লাস তথা অর্ধেক চতুর্থ সমুল্লাসের মহর্ষির উজ্জ্বল ধারণাগুলোকে জীবনে এক শতাংশও প্রয়োগ করার যোগ্যতা রাখে না, তারা সরাসরি নিয়োগ প্রথা নিয়ে হইচই করে। আরে! প্রথমে এটা তো পড়ে নাও যে ঋষি জিতেন্দ্রিয়তাকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? তিনি বিবাহিতদেরও কেমন হওয়ার পরামর্শ দেন? যদি ঋষির কথা মানো, তবে গৃহস্থ হওয়াও কঠিন হবে, তখন নিয়োগ কে করতে বা করাতে পারবে? এই কথা কে অস্বীকার করতে পারে যে ঋষি দ্বারা অনুমোদিত গৃহস্থের জন্য খুব কম লোকই উপযুক্ত হতে পারে। নিয়োগের যোগ্যতা তো এর চেয়েও বেশি। তাহলে কোথায় নিয়োগ নিয়ে আলোচনা করতে চলেছো। ভালো তো এটাই হবে যে নিজের দোষ খুঁজে দেখো, তারপর না হয় কাদা ছোঁড়ো।
.
যে ব্যক্তি শরীর শাস্ত্রের ক, খ, গ-ও জানে না, একজন যোগ্য সার্জন দ্বারা করা অস্ত্রোপচারে তার গোলমাল করার কোন অধিকারটা আছে? আরে! প্রথমে সার্জনের প্রাথমিক জ্ঞান তো অর্জন করো, তারপর ভাববে যে সার্জন দ্বারা করা অস্ত্রোপচার হিংসা নয়, বরং সত্যিকারের অহিংসা হয়। একইভাবে, যারা অত্যন্ত জিতেন্দ্রিয় যোগী পুরুষ বা স্ত্রী, তারাই নিয়োগ করার বা করানোর যোগ্যতা রাখে এবং তারাই এই বিষয়ে বিশেষ চিন্তা করতে পারে। নীতিগতভাবে, বিচার তো প্রত্যেক প্রবুদ্ধ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি করতে পারে, কেউ স্বয়ং পুরোপুরি জিতেন্দ্রিয় নয়, তবুও ইন্দ্রিয়াসক্তিকে পাপ বলে মনে করে। ইন্দ্রিয়াসক্তিকে যারা স্বাভাবিক মনে করে তাদের মস্তিষ্কে এই কথা সাত জন্মেও ঢুকবে না যে নিয়োগ ভালো আর একে খারাপ এই কারণে বলা হচ্ছে, কারণ সমাজ আজ একে খারাপ বলে। এই সমাজে কি-কি পাপ প্রকাশ্যে বা গোপনে হচ্ছে, সেদিকে না সমাজ মনোযোগ দেয় আর না অভিযোগকারীরা।
.
আজ শুধু নিয়োগই নয়, বরং এমন অনেক বৈদিক ব্যবস্থা আছে যা যেকোনো নিরপেক্ষ সত্যবাদী ব্যক্তির কাছে সঠিক মনে হবে, কিন্তু সেগুলো করা সম্ভব নয়। যেমন বেদ বলেছে যে, যদি কেউ আমাদের গাভী, ঘোড়া বা মানুষকে মারে, তাহলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা উচিত। যদিও এই আদেশ সম্পূর্ণভাবে সঠিক ও হিতকারী, কিন্তু আজকের সামাজিক ও রাজব্যবস্থা এটা করতে দিবে না। হাজার-হাজার নির্দোষ প্রাণীর হত্যাকারীকে যে বীর পুরুষ শাস্তি দিবে, তাকেও ঠিক সেভাবেই জেলে বন্দী করা হবে, যেভাবে অন্য কোনো হত্যাকারীকে বন্দী করা যেতে পারে। তাহলে এটা কেমন অন্ধ আইন? এই অন্ধ আইনের কারণে আজ বেদের সঠিক ও উত্তম আদেশ বৃথা হয়ে গেছে। তাহলে বেদের আদেশকে কেন দোষ দেওয়া হবে? সেই উত্তম ব্যবস্থাকে দোষ দেওয়া উচিত নাকি আজকের পাপপূর্ণ তথাকথিত সমতার আচরণের ভান করা আইন ব্যবস্থাকে দোষ দেওয়া উচিত? এটা পাঠক নিজেই ভাবুন।
.
যদি এই ব্যবস্থা জারি করার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে পরস্পর রক্তপাতই হবে। যার ক্ষমতা থাকবে, সে দুর্বলকে সুযোগ পেয়ে মারতেই থাকবে। আজ পাপীকে গুলি করে মারার মতো মানসিকভাবে প্রস্তুত ব্যক্তিও তো বিরল। বৈদিক আর্ষ ব্যবস্থায় এটাও আছে যে, যে ধনী দান করে না আর যে গরীব তপস্যা করে না, তাদের উভয়কেই মেরে ফেলা উচিত। (দেখুন বিদুর নীতি) যদি আজ এই ব্যবস্থা জারি হয়, তাহলেও ভয়ঙ্কর রক্তপাত হবে, কারণ আজ তো দান চাওয়ার নামে অর্থ চোরদেরও একটা জাল বিছানো আছে, যারা বলপূর্বক দান চাইবে আর না দিলে বিদুরজীর প্রমাণ দিয়ে অদাতাকে মেরে ফেলবে। ঠিক সেভাবেই ক্ষুধার্ত, বস্ত্রহীন শোষিতদের রক্তশোষক ধনী তপস্যা করার উপদেশ দিবে, অন্যথায় মেরে ফেলার জন্য তৎপর থাকবে। এই কারণে এই ব্যবস্থাও বর্তমানে সঠিক নয়, কারণ আজ না তো তপস্বী ভিক্ষার্থী আছে আর না পরোপকারী ধনী ব্যক্তি আছে।
.
এইজন্য আজ বৈদিককালীন সর্বোত্তম, কিন্তু এই ধরণের তীক্ষ্ম বা আপদ্ধর্মের ব্যবস্থাগুলোকে সহসা গ্রহণ করার নয়, বরং সম্পূর্ণ পরিবেশকেই বেদানুকূল করার প্রয়োজন আছে। তার পরই সেই ব্যবস্থাগুলোকে প্রয়োগ করা যেতে পারে, অন্যথায় যোগ্য ব্যক্তিকেও নিয়োগের অধিকার থাকা উচিত নয়, কারণ যদিও সে সঠিক কাজ করছে, তবুও অনধিকারী লোকেরা তার স্তরকে না জেনে নিজে সন্তানের জন্য নয়, বরং ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হতে পারে, যার ফলে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। তবে হ্যাঁ, যদি কখনও বৈদিক সাম্রাজ্য বা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে পুনরায় সেই সমস্ত নিয়ম সহজেই প্রয়োগ হতে পারে। কিন্তু এতটুকুও মনে রাখা উচিত যে তখনও নিয়োগ সামান্য ধর্ম না হয়ে কেবলমাত্র আপদ্ধর্মই থাকবে, আর বিবাহ সামান্য ধর্মই থাকবে।
.
আমি নিয়োগ-প্রথা নিয়ে উপরোক্ত লেখাটা ২০০৫ সালে লিখেছিলাম। এটা সংশোধন করার পরিবর্তে কিছু মন্তব্য লিখে দিচ্ছি-
.
১. নিযুক্ত স্বামীকে দেবর বলা হয়েছে, যার অর্থ স্বামীর ছোট বা বড় ভাই করা আমার কাছে যথাযথ মনে হয় না, বরং এটা আপত্তিজনক। বাল্মীকি রচিত রামায়ণ অনুসারে মহাত্মা শ্রী লক্ষ্মণ কখনও তাঁর বৌদি দেবী সীতার মুখের দিকেও মনোযোগ দিয়ে তাকাননি, এই কারণেই তিনি তাঁর বাহুবন্ধনী এবং কুণ্ডলগুলো চিনতে পারেননি। এমন আদর্শে কেউ স্বামীর ভাইয়ের সাথে বৌদির নিয়োগ কিভাবে করতে পারে? এই কারণে আমার কাছে দেবরের এই বর্তমান সংজ্ঞা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে হ্যাঁ, দূরবর্তী উচ্চ বংশের ব্যক্তিই এমন আপদ্ধর্ম গ্রহণ করতে পারে।
.
২. মহারাজ পাণ্ডুকে মহর্ষি কর্দম দ্বারা অভিশাপ দেওয়ার ঘটনা আর মহারাজ পাণ্ডুর সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়ে পড়া, পুনঃ ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র আদি দেবতাদের মহারানী কুন্তীর সাথে নিয়োগের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করাও আমার কাছে প্রক্ষিপ্ত (পরবর্তী সংযোজন) বলে মনে হয়। যখন ঋষি দয়ানন্দ নিজেই তাঁর বিষদাতাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, তখন মহাভারতকালীন কর্দম ঋষি এত ক্রোধী ও প্রতিশোধপরায়ণ কিভাবে হতে পারেন? অভিশাপ ও বরদানের সমস্ত প্রসঙ্গ আরও বেশি মীমাংসা চাইছে।
.
এখানে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে যে, এই দেবতাদের সাথে পাণ্ডবদের কি কোনো সম্পর্ক ছিল না? যেহেতু এই বিষয়টা ইতিহাসের, তাই প্রামাণিক রূপে আমি কিছু বলতে অক্ষম, তবুও আমার মতে এমন মনে হয় যে, এই দেবতারা মহারাজ পাণ্ডুর বনবাস কালে য়ুধিষ্ঠির আদি রাজকুমারদের পৃথক-পৃথক দীক্ষা দিয়েছিলেন, অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের গুরু ছিলেন।
.
৩. বানর বর্গের বিভিন্ন যোদ্ধাদের মধ্যে দেবতাদের অংশ থাকা অর্থাৎ তারা সবাই দেবতাদের দ্বারা কৃত নিয়োগ থেকে জন্মেছিল, এই কথাটাও প্রক্ষিপ্ত বলে মনে হয়। তাদের সব বানর যোদ্ধাদের পিতা কি একসাথে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে তাদের স্ত্রীদের নিয়োগের মতো আপদ্ধর্ম অবলম্বন করতে হয়েছিল? আমার কাছে এই কথাটা একদমই গ্রহণযোগ্য নয়।
.
এইভাবে আমি নিয়োগ বিষয়ের উপর ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছি। আমি আবারও দৃঢ়তার সাথে বলতে চাইবো যে এই প্রথাটা অত্যন্ত বিপদের সময়েই কেবল সম্পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় যোগী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত, অন্য কারোর জন্য কখনওই নয়।

২৪.
আক্ষেপ—
বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ১১ টা মুখ্য উপনিষদের মধ্যে যেটা অন্যতম। তারমধ্যে একটা অবৈজ্ঞানিক প্রকরণ পাওয়া যায় —
.
বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৬ অধ্যায় ৪ ব্রাহ্মণ ১৪ মন্ত্র—
.
স য় ইচ্ছেৎপুত্রো মে শুক্লো জায়েত বেদমনুব্রুবীত সর্বমায়ুরিয়াদিতি ক্ষীরৌদনম্ পাচয়িত্বা সর্পিষ্মন্তমশ্নীয়াতামীশ্বরৌ জনয়িতবৈ ॥
.
অর্থাৎ— যে ব্যক্তি চাইবে যে তার পুত্র শুক্ল শ্বেত হোক, এক বেদের বক্তা হোক আর সম্পূর্ণ ১০৮ বছর আয়ু লাভ করুক, তাহলে সেই পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে ক্ষীরৌদন অর্থাৎ চালের পায়েস তৈরি করে তাতে ঘি মিশিয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সেই পায়েস খাবে (জনয়িতবৈ ঈশ্বরৌ); তাহলে তারা অবশ্যই সেইরূপ পুত্র উৎপাদনে সক্ষম হবে।
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ হিন্দি আর্য ভাষ্য, শিবশঙ্কর শর্মা ১৯১৭)
.
যে পুরুষ চাইবে যে তার পুত্র শুক্ল বর্ণের উৎপন্ন হোক, এক বেদের অধ্যয়ন করুক তথা পুরো আয়ু—একশো বছর পর্যন্ত জীবিত থাকুক, তাহলে সেই দম্পতি দুধ-চালের পায়েস রান্না করে তাতে ঘি দিয়ে খাবে। এতে তারা সেই রূপ পুত্র জন্ম দিতে সক্ষম হবে।
(শঙ্করভাষ্য, চৌখাম্বা প্রকাশন)
.
উভয় ভাষ্যের মধ্যেই শ্বেত বর্ণের আর বেদ বক্তা বালকের কামনায় পায়েস খাওয়ার বিধান আছে। এই কথা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অসত্য। তাছাড়া পায়েস খেলে কোনো বালক বেদ বক্তা আর শ্বেত বর্ণের কিভাবে হতে পারে? সেটা তো বাবা-মায়ের জিনের ওপর নির্ভর করে। এই একই ধরণের অবৈজ্ঞানিক কথা চরক সংহিতা, শরীর স্থান, ৮ ম অধ্যায় এবং ৯ ম মন্ত্রের মধ্যেও আছে —
সা চেদেবমাশাসীত—বৃহন্তমবদাতম্ হর্য়্যক্ষমোজস্বিনম্ শুচিম্ সত্ত্বসম্পন্নম্ পুত্রমিচ্ছেয়মিতি। শুদ্ধস্নানাত্ প্রভৃত্যসৌ মন্থমবদাতম্ য়বানাম্ মধুসর্পির্ভ্যাম্ সংসৃজ্য শ্বেতায়া গোঃ সংরূপবত্সায়াঃ পয়সাऽऽলোড্য রাজতে কাংস্যে বা পাত্রে কালে কালে সপ্তাহম্ সততম্ প্রয়চ্ছেত্ পানায়।
প্রাতশ্চ শালিয়বান্নবিকারান্ দধিমধুসর্পির্ভিঃ
পয়োভির্বা সংসৃজ্য ভুঞ্জীত, তথা
সায়মবদাতশরণশয়নাসনয়ানবসনভূষণবেশাচ স্যাত্।
সায়ম্ প্রাতশ্চ শশ্বচ্ছ্বেতম্ মহান্তম্ বৃষভমাজানেয়ম্
বা হরিচন্দনাঙ্গদম্ পশ্যেত্।
সৌম্যান্যভিশ্চৈনাম্ কথাভির্মনোऽনুকূলাভিরুপাসীত।
সৌম্যাকৃতিবচনোপচারচেষ্টাংশ্চস্ত্রীপুরুষানিতরানপি চেন্দ্রিয়ার্থানবদাতান্ পশ্যেত্।
সহচর্য়্যশ্চৈনাম্ প্রিয়হিতাভ্যাম্ সততমুপচরেয়ুস্তথা ভর্ত্তা ন চ মিশ্রীভাবমাপদ্যেয়াতামিতি।
অনেন বিধিনা সপ্তরাত্রম্ স্থিত্বাऽষ্টমেऽহন্যাপ্লুত্যাদ্ভিঃ
সশিরস্কম্ সহ ভর্ত্রা চাহতানি বস্ত্রাণ্যাচ্ছাদয়েদবদাতানি, অবদাতাশ্চ স্রজো ভূষণানি বিভৃয়াৎ ॥
.
ইংরেজি অনুবাদ -
A woman desirous of having a male child with large limbs, fair complexion, with eyes like those of a lion (full of vigor), pure, and with good mental disposition should, after hermenstrual period, first take a purificatory bath, then be given a light porridge of well cleaned white barley grains duly sweetened by adding honey and ghee, diluted in the milk of a white cow having a white calf, in a utensil made of silver or bronze, regularly in the morning and evening for a week.
During mornings and evenings, she should eat a diet prepared with sali rice and/or barley mixed with curd, honey, ghee or with milk. Her room, bed, seat, drink, dress and ornaments etc. all should be of white color. In the evenings and mornings, she should look at a white majestic bull/stallion duly smeared with white sandal paste without fail. She should also be entertained with pleasant tales of her interest, acceptable to her mood. She should also look at men and women having good personality, speech, behaviour and manners, as well as visuals and objects that are white in color.
Her companions and husband should also entertain her with things, discussion topics, and activities that are pleasant to her, and not stressful. The couple, should, however avoid sexual contact during this period. Following this regimen for a week, on the eighth day she, along with her husband, after taking a head bath with pure (consecrated abhimantritam) water, get prepared for coitus by adorning themselves with new white apparel, garlands and ornaments. [9]
.
অনুগ্রহ করে এখন সিদ্ধ করুন যে এই বিষয়গুলো কিভাবে বৈজ্ঞানিক হবে? কারণ আধুনিক বিজ্ঞানে এমন কিছুই নেই। পায়েস খেলে কি শ্বেত রঙের বালক হওয়া সম্ভব? এটা স্পষ্ট করুন।
.
সমাধান - এই আক্ষেপ নিবাকরণ ঝা-এর পক্ষ থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি বৃহদারণ্যক উপনিষদের পাশাপাশি চরক সংহিতাকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন। আমার জানা নেই যে আয়ুর্বেদ অথবা আধুনিক আয়ুর্বিজ্ঞান সম্পর্কে তার কতটা জ্ঞান আছে? এই আক্ষেপ বিজ্ঞানের সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে করা হয়েছে বলে মনে হয়। মূলত, আজকের যুবকদের মধ্যে মানসিক দাসত্বের এমন রোগ বাসা বেঁধেছে যে, কোনো পাশ্চাত্য ব্যক্তি কোনো কথা বললে, তাকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া হয় আর যে কথা বেদ অথবা ঋষিদের দ্বারা বলা হয়েছে, তাকে অবৈজ্ঞানিক মনে হয়। বর্তমান বিজ্ঞানের ভয়ংকর ভুলগুলোকে আমি খুব ভালো করেই জানি।
.
বাবা-মায়ের জিনের সাথে-সাথে শিশুর পূর্ব জন্মের সংস্কার আর গর্ভবতী মায়ের দ্বারা অন্ন ও ঔষধ সেবনের শিশুর উপর প্রভাব কেবল মানুষের মধ্যেই নয়, বরং পশুদের মধ্যেও দেখা যায়। একই বাবা-মায়ের সন্তানদের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা যায়, যদিও বাবা-মায়ের জিন একই থাকে। তাহলে একই বাবা-মায়ের সব শিশুদের মধ্যে যেসব পার্থক্য দেখা যায়, তার কারণ সেই শিশুদের পূর্ব কর্ম আর গর্ভবতী মায়েদের দ্বারা ব্যবহৃত খাদ্য ও ওষুধের প্রভাব হয়।
.
এখানে যে পায়েস খাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তারমধ্যে কেবল গোদুগ্ধ আর চালের ব্যবহার হয়নি, বরং মধু আর গোঘৃত খাওয়ারও বিধান দেওয়া হয়েছে। এর সাথে রূপা অথবা কাঁসার পাত্রে পায়েস খাওয়ার বিধানও করা হয়েছে। এই প্রকারে এটা পায়েস নয়, বরং একটা ওষুধ হবে। আজকের বিজ্ঞান তো আয়ুর্বেদের কোনো ওষুধকে অবৈজ্ঞানিক বলতে পারে। তারা কোটি কোটি বছরের আমাদের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। তাহলে কি আমরা এমন তথাকথিত বিজ্ঞানের সব কথা চোখ বন্ধ করে মেনে নিবো? এই বিষয়ে প্রত্যেক প্রবুদ্ধ ব্যক্তিকে বিচার করতে হবে।
======================================
২৫.
আক্ষেপ -
প্রকাশ মেঘওয়াল— শ্রীমান! আমার আক্ষেপ বর্ণ-ব্যবস্থার উপরে, 'মনুস্মৃতি' যার সমর্থন করে। বর্ণ-ব্যবস্থার ফলেই আমাদের ধর্মের মধ্যে জাতিবাদ বেড়েছে আর জাতিবাদের মতো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা আমাদের ধর্মকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। এরই কারণে অন্য অনেক ধর্ম আর সমাজের সৃষ্টি হয়েছে তথা আমাদের ধর্ম বিভক্ত আর বিচ্ছিন্ন প্রমাণিত হয়েছে। যদি আজ আমাদের ধর্মের মধ্যে একতা হতো, তাহলে আমাদের ভারতকে আবার 'সোনার পাখি', 'বিশ্বগুরু' আর 'আর্যাবর্ত'-এর মতো বিশাল 'অখণ্ড ভারত' হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হতো।
.
আমার মনে হয়, যারা এই ধরণের ব্যবস্থাকে প্রশ্রয় দিয়েছে আর মানুষ-মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ করে তাদের উঁচু-নিচুতে ভাগ করেছে, অস্পৃশ্যতার মতো অমানবিক কাজকে প্রশ্রয় দিয়ে তাদের শোষণ করেছে আর ধর্মের একতাকে ব্যাপকভাবে খণ্ডিত করেছে, এমন মানুষদের আমি 'ধর্মের একতার হত্যাকারী' আর 'ঘোর পাপী' বলতে পছন্দ করবো।
.
আমার বিশ্বাস যে, বিশ্বের মধ্যে সনাতন সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার করার চেয়ে বেশি মনোযোগ আমাদের নিজেদের দেশে বসবাসকারী নাগরিকদের সম্পূর্ণ সম্মান দিতে আর তাদের ঐক্যের সূত্রে বেঁধে দেওয়ার উপর দেওয়া উচিত, যাতে আমাদের দেশের নাগরিকরা এই ধর্মকে সম্মানের সাথে পালন করতে পারে। তারা যেন নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতির উপর গর্ব অনুভব করতে পারে আর তারাও যেন বিশ্বজুড়ে আনন্দ, উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে এর মহিমা প্রচার করতে পারে।
.
মহোদয়! আপনি কি বিশ্বাস করেন যে বর্ণ-ব্যবস্থা ঠিকই ছিল আর এখনও আছে? যদি হ্যাঁ বলেন, তাহলে কেন? আর এর পিছনে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, মানবিক ও বৈজ্ঞানিক কারণগুলো কী কী? আজও কি এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা আছে? আর ভগবান কি আলাদা-আলাদা ঘরে জন্ম নেওয়া মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন?
.
কিন্তু আপনি যদি মনে করেন যে এই ব্যবস্থা ঠিক নয়, ভুল, অত্যাচারী ও শোষণমূলক এবং দেশ ও ধর্মকে ভাঙার কারণ, তাহলে আজ আপনি জাতিভেদ ও বৈষম্যের মতো কুপ্রথা আর শোষণ দূর করার জন্য কি প্রচেষ্টা করছেন? আর বিভিন্ন ধর্মগুরু আর ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের এই ব্যবস্থা দূর করার জন্য আপনি কি-কি কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছেন?
.
সুভাষ চৌহান — শ্রদ্ধেয় আচার্য অগ্নিব্রত জী সশ্রদ্ধ প্রণাম! আমি আপনার পুরুষার্থের প্রশংসা করছি যে আপনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই খুব ভালো কাজ করছেন। কিন্তু আপনার সব প্রচেষ্টা সেই সময় নিরর্থক প্রমাণিত হবে, যখন আপনি কোনো অসুস্থ শরীরের রোগের মূলে প্রহার না করে কেবল উপরে-উপরে ওষুধের প্রলেপ লাগানোর পুরুষার্থ করতে থাকবেন আর অসুস্থ শরীরের সুস্থ হওয়ার কামনা করতে থাকবেন। আমাদের সমাজের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে বেদ, বেদের মধ্যে থাকা তিনটা শব্দ 'পদ্ভ্যাম্ শূদ্রো অজায়ত'। এই শব্দগুলো এমন মনে করুন যেন নিজের সমাজের জন্য বিষ হয়ে গেছে। 'শূদ্র' শব্দের অস্তিত্বে আসা মানব সমাজের জন্য একটা কলঙ্ক প্রমাণিত হয়েছে। যে মহান ব্যক্তি 'শূদ্র' শব্দের রচনা করেছিলেন, তিনি এই সংসারকে শূদ্র শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। তারপর বাকি লোকেরা নিজেদের মতো করে এই শব্দের যে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলেন, তারা তো এই শব্দটাকে নিম্ন থেকে নিম্নতর করে তুলতে থাকেন। আমার আপনাকে পরামর্শ যে আপনি এই শব্দটাকে শাস্ত্র থেকে সরানোর জন্য চেষ্টা করুন। আজকের তারিখে যেসব পুস্তকের মধ্যে 'শূদ্র' শব্দ আছে, আমি সেই পুস্তককে বিষাক্ত মনে করি আর জলসমাধি দেওয়ার যোগ্য মনে করি। ভারত রত্ন আম্বেদকর জী তো মনুস্মৃতির মধ্যে বিষ দেখে সেটা জ্বালিয়েই দিয়ে ছিলেন।
.
আমার চ্যালেঞ্জ - আজ পর্যন্ত এমন একজনও মানুষ জন্মায়নি যাকে 'শূদ্র' বলা যেতে পারে। আমার মোবাইল নম্বর হল 8104116101 আর আমি এই বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত আছি। এই বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরা প্রমাণ সহ আমার সাথে আলোচনার জন্য আমন্ত্রিত।
.
সমাধান - এই অভিযোগগুলো শ্রী প্রকাশ মেঘওয়াল এবং শ্রী সুভাষ চৌহান দ্বারা প্রস্তুত করা হয়েছে। আজ সারা দেশের মধ্যে মনুস্মৃতি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি আছে। অন্যদিকে এটাও সত্য যে মনুস্মৃতির মধ্যে সময়ে-সময়ে বেদবিরোধী আর দেশদ্রোহী তত্ত্বরা বিভিন্ন ধরণের ভেজাল মিশিয়েছে। সেই ভেজালগুলোর জন্য ভগবান মনুকে দায়ী করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যেভাবে আমাদের দেশে সংসদ কর্তৃক অনেক সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে যেকোনো সংশোধনের জন্য সংবিধান সভার বিদ্বান কোনোভাবেই উত্তরদায়ী হবেন না। ঠিক একইভাবে, বর্তমানে উপলব্ধ মনুস্মৃতির মধ্যে বিদ্যমান আপত্তিকর শ্লোকগুলোর জন্য ভগবান মনুকে কখনোই দায়ী করা যায় না।
.
এটাও দুঃখজনক যে আজ অনেক তথাকথিত ধর্মীয় ধ্বজাধারী ব্যক্তি মনুস্মৃতির মধ্যে হওয়া ভেজালকে (প্রক্ষিপ্ত) ভেজাল হিসেবে স্বীকার না করে অস্পৃশ্যতার মতো পাপের সমর্থক হয়ে উঠেছেন। তবে হ্যাঁ, আর্য সমাজের বিদ্বানরা মনুস্মৃতিকে শুদ্ধ রূপ দেওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাদের মধ্যে ড. সুরেন্দ্র কুমার জী-র করা মনুস্মৃতির ভাষ্য সর্বোত্তম, যা দিল্লি আর্ষ সাহিত্য প্রচার ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত হয়েছে। যাদের মনুস্মৃতি নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধানের ইচ্ছা আছে, তাদের এই মনুস্মৃতি পড়া উচিত। এর পাশাপাশি ড. সুরেন্দ্র কুমার রচিত 'মহর্ষি মনু বনাম ড. আম্বেদকর' এবং 'ভগবান মনুর বিরোধিতা কেন' পুস্তকগুলো অবশ্যই পড়া উচিত।
.
একই সাথে যারা 'পদ্ভ্যাম্ শূদ্রোऽজায়ত'-এর সঠিক অর্থ এবং বর্ণ-ব্যবস্থার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ সহজ ভাষায় পড়তে চান, তারা আমার পুস্তক 'জাতিবাদ এবং ভগবান মনু' অবশ্যই পড়বেন। এই পুস্তক আমাদের ওয়েবসাইটেও পাওয়া যাবে।¹ এই পুস্তক পড়লে যে কোনো মনু-বিরোধী ব্যক্তি এটা মেনে নিতে বাধ্য হবেন যে, ভগবান মনু ছিলেন সমগ্র মানবতার সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী।
___________________
======================================
২৬.
আক্ষেপ—
আমাদের গ্রন্থ পারস্কর গৃহ্যসূত্র, আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্রের মধ্যে যজ্ঞে গাভী আদি পশুহত্যার কথা বলা হয়েছে এবং গাভী আদি পশুর মাংস খাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
পারস্কর গৃহ্যসূত্রের মধ্যে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ—
১. অপূপমা সশাকৈর্য়থাসংখ্যম্ (৩.৩.৩)
২. মধ্যমা গবাম্ (৩.৩.৮)
৩. তস্যৈ বপাম্ জুহোতি বহ বহাম্ জাতবেদঃ পিতৃভ্য ইতি (৩.৩.৯)
৪. শূলগব য়াগ (পা. ৩.৮.১)
আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্রের মধ্যে গাভী আদি হত্যা ও মাংস ভক্ষণ—
১. অবিকৃতমাতিথ্যম্। (তৃতীয় পটল, খণ্ড-৭, সূত্র-২৬)
২. উত্তরায়াভিমন্ত্র্য তস্যৈ বপাম্ শ্রপয়িত্বোপস্তীর্ণাভিঘারিতাম্ মধ্যমেনান্তমেন বা পলাশপর্ণেনোত্তরয়া জুহোতি। (পঞ্চম পটল, ত্রয়োদশ খণ্ড)
৩. অন্বষ্টকা কর্ম—অত এব য়থার্থ মাংসম্ শিষ্টবা শ্রোভূতেন্বষ্টকাম। (অষ্টম পটল, ২২তম খণ্ড)
.
এছাড়াও এই গৃহ্যসূত্রগুলোতে এবং অন্য গৃহ্যসূত্রের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে— স্থানে যজ্ঞে গোবধ এবং গোমাংস বিতরণ ও ভক্ষণের বিধান আছে।
— প্রভাত কুমার
.
সমাধান— এখানে আপনি ১ নম্বর ক্রমে 'মাংস' শব্দের যে অর্থ 'গোমাংস' করেছেন, সেটা আপত্তিজনক। আর্ষ গ্রন্থের অর্থ করার জন্য অত্যন্ত সতর্কতা আর ব্যাপক স্বাধ্যায়ের আবশ্যকতা হয়। লোকপ্রচলিত অর্থ করে শাস্ত্রকে বিকৃত করা সম্ভব, কিন্তু বোঝা সম্ভব নয়। যদি মাংস শব্দের অর্থ লোকপ্রচলিত মাংস নামক অভক্ষ্য পদার্থই ধরা হয়, তাহলে নিম্নলিখিত বচনগুলোর কি অর্থ করবেন?
.
নভো মাংসানি (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.৫.২৫.১)
মাংসানি বিরাটু (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৫৮)
মাংসম্ বৈ পুরুষম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৬.২.১৪)
.
এই কারণে এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, পারস্কর গৃহ্যসূত্রের এই প্রকরণে 'মাংস' শব্দের অর্থ এই লোকপ্রচলিত মাংস নয়। একইভাবে 'অপূপ' শব্দের অর্থও 'মালপোয়া' নয়। অপূপ বিষয়ে মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস লিখেছেন—
.
ইন্দ্রিয়মপূপঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২.২৪)
.
একইভাবে অন্য ঋষিদেরও উক্তি আছে —
.
ইন্দ্রস্যাপূপঃ ইতীন্দ্রিয়ম্ বা ইন্দ্রঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.১০.৬; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪৫.২)
.
একইভাবে 'শাকঃ' পদের অর্থও খাদ্যদ্রব্য শাক-সবজি নয়। 'শাকঃ' পদ 'শাক' প্রাতিপদিক থেকে 'অচ্' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ব্যুৎপন্ন হয়েছে, যার অর্থ হল— শক্তিশালী রশ্মি আদি পদার্থ। আমার দৃষ্টিতে 'অপূপ' শব্দের অর্থ হল ইন্দ্রতত্ত্বের ইন্দ্রিয় অর্থাৎ ত্রিষ্টুপ ছন্দের রশ্মিসমূহ। মাংস পদের অর্থ হল বিরাট্ ছন্দ রশ্মি তথা শাকের অর্থ হল শক্বরী ছন্দ রশ্মি।
.
আমি এখানে এই প্রসঙ্গের ভাষ্য করছি না, কিন্তু আপনাদের মতো মানুষদের বোঝানোর জন্য এতটুকু বলাই যথেষ্ট। ভাষ্যকারেরা বেদ ভাষ্য করার ক্ষেত্রে যে ভুল করেছেন, আর্ষ গ্রন্থের ভাষ্য করার ক্ষেত্রেও একই ভুল করেছেন।
.
আপনি ক্রম সংখ্যা ২, ৩ এবং ৪-এ 'গৌ'-এর অর্থ গরু নামক প্রাণী এবং 'বপা'-এর অর্থ গরুর চর্বি করেছেন। বস্তুতঃ এই অর্থগুলো আপনার করা নয়। এই কারণে দোষী আপনি নন, বরং যাদের অনুবাদ পড়ে আপনি এই আক্ষেপ করেছেন, মূলতঃ সেই অনুবাদকরাই দোষী হবে। 'গৌ' শব্দের অর্থ গরু করা এটাই প্রমাণ করে যে ভাষ্যকার বা অনুবাদকের শাস্ত্রের বর্ণমালারও জ্ঞান ছিল না। যদি 'গৌঃ'-এর অর্থ কেবল গরুই হয়, তাহলে নিম্নলিখিত আর্ষ বচনগুলোর কি অর্থ হবে?
.
১. অন্তরিক্ষ গৌঃ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪.১৫)
২. অসৌ দ্যৌঃ গৌঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ২.৪৩৯)
৩. আগ্নেয়ো বৈ গৌঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.৫.২.১৯)
৪. ইয়ম্ পৃথিবী বৈ গৌঃ (কাঠক সংহিতা ৩৭.৬)
৫. গাভো বৈ শঙ্কর্য়ঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ৩.১০৩)
৬. গৌস্ত্রিষ্টুপ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.৫.১.৫)
৭. জগতী ছন্দস্তদ্ গৌঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.১৩.১৪)
৮. প্রাণো হি গৌঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৩.৪.২৫)
.
এই বচনগুলো থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো ব্যক্তি বেদ অথবা আর্ষ গ্রন্থের মধ্যে 'গৌঃ' পদের অর্থ কেবল গরুই করে, তাহলে তাকে কি বলবেন? আপনি নিজেই ভাবতে পারেন। একইভাবে আমি 'বপা' (চর্বি) সম্পর্কে কিছু আর্ষ বচন উদ্ধৃত করছি -
.
১. আত্মা বপা (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৩.৯.৬)
২. স্বর্গো বপা (কাঠক সংহিতা ২৬.৭)
.
এই পদ 'ডুবপ বীজসন্তানে' ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে অর্থাৎ বীজ রোপণের কাজকেও বপা বলা হয়। এইভাবে শুধুমাত্র 'বপা' শব্দ দেখে গাভী বা অন্য কোনো পশুর চর্বি অর্থ করা অজ্ঞানতা হবে।
.
একইভাবে অন্য গৃহ্যসূত্রের বিষয়েও বুঝে নিবেন। তবুও এটুকু অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, বেদ ব্যতীত অন্য সমস্ত গ্রন্থ হল পরতঃ প্রমাণ। যদি সেগুলোতে কোথাও আপত্তিজনক প্রসঙ্গ দেখা যায়, তাহলে প্রথমে সেই গ্রন্থগুলোর ভাষ্যকার বা অনুবাদকের উচিত সেই প্রসঙ্গগুলোর অর্থ অন্য আর্ষ গ্রন্থের নির্বচনের আধারে এবং সেই গ্রন্থের মূল ভাবনার আধারেই অর্থ করার চেষ্টা করা। যদি তারপরও আপত্তিজনক প্রসঙ্গগুলোর অর্থ অনুকূলভাবে না করা যায়, তাহলে এটা বিবেচনা করা উচিত যে সেই প্রসঙ্গটা প্রক্ষিপ্ত (ভেজাল) কিনা। এমন করলে বিদ্বান ভাষ্যকারেরা অবশ্যই সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন।
======================================
২৭.
আক্ষেপ -
সা চেদস্মৈ ন দদ্যাৎকামসেনামবক্রীণীয়াৎ...
— বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৬.৪.৭ (অধ্যায় ৬, ব্রাহ্মণ ৪, কাণ্ড ৭)
.
এরমধ্যে স্ত্রীকে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে মারার কথা বলা হয়েছে। য়জুর্বেদের মধ্যে স্ত্রীকে 'অঘ্ন্যা' বলা হয়েছে, কিন্তু এখানে এমন কেন?
— সুশান্ত পাণ্ডে
.
সমাধান - এখানে আক্ষেপ করা হয়েছে যে বৃহদারণ্যক উপনিষদের মধ্যে স্বামীর দ্বারা স্ত্রীকে পেটানোর বিধান আছে। এই বিষয়ে আমার মত হল, এই উদ্ধৃতিটি প্রক্ষিপ্ত, যা বেদ আর মনুস্মৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এর পূর্বে আর পরের বিষয়গুলো দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই অভদ্র উক্তির এখানে কোনো প্রয়োজন নেই। এই বিষয়টা নারী বিদ্বেষী কোনো ব্যক্তি এখানে যুক্ত করে দিয়েছে। ভগবান মনুর ধর্মশাস্ত্র মনুস্মৃতি ভারত এবং বিশ্বজুড়ে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং পারিবারিক আচরণের জন্য প্রমাণভূত (প্রামাণিক) হয়ে আছে। ভগবান মনুর নারীর বিষয়ে উক্তি হল -
.
য়ত্র নার্য়্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ ।
য়ত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলা ক্রিয়াঃ ॥ (মনুস্মৃতি ৩.৫৬)
.
সন্তুষ্টো ভার্য়য়া ভর্ত্তা ভর্ত্রা ভার্য়া তথৈব চ।
য়স্মিন্নেব কুলে নিত্যম্ কল্যাণম্ তত্র বৈ ধ্রুবম্ ॥ (মনুস্মৃতি ৩.৬০)
.
তর্ক আর বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও নির্যাতিত নারী পরিবার এবং সন্তান—উভয়ের জন্যই সুখ বয়ে আনতে পারে না। এই কারণে এটা নিশ্চিতভাবেই কোনো দুষ্ট চক্রের বা অশুভ শক্তির চক্রান্ত।

২৮.
আক্ষেপ -
🔴 শঙ্কা—
ঋষি দয়ানন্দ সূর্যলোক এবং চন্দ্রলোকের মধ্যেও মানব জীবনের কথা বলেছেন, এটা কিভাবে সত্য হতে পারে?
— রানা
.
এখানে আক্ষেপকারী শ্রী রানা ঋষি দয়ানন্দের এই মন্তব্যের উপর আক্ষেপ করেছেন যে, সূর্যাদি লোকের মধ্যে প্রাণী কিভাবে থাকতে পারে?
.
সত্যার্থ প্রকাশের অষ্টম সমুল্লাসে মহর্ষি দয়ানন্দ জী সূর্যাদি লোকের মধ্যেও মনুষ্যাদি প্রজা থাকার কথা লিখেছেন। বর্তমান বিজ্ঞান অনুসারে সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৪০০০-৭০০০° সে. পর্যন্ত। তারও উপরে করোনা নামক অত্যন্ত উজ্জ্বল ভাগ আছে, যা প্রায় ২ লক্ষ °সে. পর্যন্ত গরম হয়। সূর্য পৃষ্ঠে হাজার-হাজার কি.মি. উঁচু প্রচণ্ড আগুনের শিখা উঠতে থাকে। ভয়ংকর সৌর ঝড় হতে থাকে। অনেক বিস্ফোরণ হতে থাকে। সেখানে কোনো তত্ত্বের এটমও কেবল আয়ন রূপে থাকতে পারবে, যা স্বচ্ছন্দ বিচরণ করতে থাকে। এই অবস্থাকে প্লাজমা অবস্থা বলে। এমন অবস্থায় মনুষ্যাদি প্রজা থাকা কিভাবে সম্ভব? এমন পরিস্থিতিতে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অস্তিত্ব কিভাবে সম্ভব? এই কথাটা সম্পূর্ণভাবে অবৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধি বিরুদ্ধ হওয়ায় এটা সত্যার্থ প্রকাশের উপর একটা বড় কলঙ্ক বলেই মনে হয়।
.
আশ্চর্য হয় যে বিজ্ঞান ও সত্যের মহান সমর্থক মহর্ষি জী এমন মিথ্যা কথা কিভাবে লিখলেন? আজকের বৈজ্ঞানিক যুগে এই কথা থেকে উপহাস ছাড়া আর কি উপলব্ধি হতে পারে?
.
🚩 সমাধান- বস্তুতঃ এই প্রশ্ন অনেক উচ্চস্তরের আর্য বিদ্বানদেরও বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। এই প্রশ্নের উত্তর আমি আমার বই 'সত্যার্থ প্রকাশ-উভরতে প্রশ্ন গরজতে উত্তর'-এ দিয়েছি, সেটাই এখানে উদ্ধৃত করছি -
.
বস্তুতঃ আমরা প্রায়শই আমাদের ক্ষমতা, পরিবেশ ও স্বভাবের সঙ্গে তুলনা করেই অন্যদের সম্পর্কে চিন্তা করি। আমরা প্রায়শই ০-৫০° সে. পর্যন্ত তাপমাত্রায় থাকতে অভ্যস্ত। তার উপরেও অনেক সরঞ্জাম ব্যবহার করেই এমনটা করতে পারি, যাতে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। অনেক প্রাণী, বিশেষ করে মেরু অঞ্চলের প্রাণী প্রায় -৫০° সে. বা -৬০° সে. তাপমাত্রাতেও কোনো সরঞ্জাম ছাড়াই আরামে থাকে। অন্যদিকে সমুদ্রের অত্যন্ত গভীরে যেখানে জলের অত্যন্ত চাপ থাকে, সেখানে প্রায় ২০০° সে. বা তারও বেশি তাপমাত্রার ফুটন্ত জলের স্রোতেও প্রাণীদের দেখা গেছে। এইভাবে প্রায় -৬০° সে. থেকে ২০০° সে. অর্থাৎ ২৬০° সে. তাপমাত্রার ব্যবধানে প্রাণীদের দেখা গেছে। সম্ভব যে এর চেয়েও বড় তাপমাত্রার ব্যবধানে আমাদের এই পরিচিত পৃথিবীর মধ্যেই প্রাণীদের অস্তিত্ব থাকতে পারে। এই তাপমাত্রার ব্যবধানে মানুষের স্বাভাবিক অবস্থায় থাকা একেবারেই সম্ভব নয়।
.
এই ধরণের প্রাণীদের আবিষ্কারের পূর্বে যে কেউই তাদের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করতো, কিন্তু এখন এই বিষয়টা আর সন্দেহজনক নয়। কিন্তু কেউ বলতে পারে যে এই তাপে থাকাটা একরকম ব্যাপার আর সূর্যের উপরোক্ত প্লাজমা অবস্থায় থাকাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। আজ তো এই বিষয়টাও বড় বিতর্কিত যে এই পৃথিবীর বাইরে অন্য কোথাও প্রাণী আছে কিনা? উড়ন্ত তশতরীর গল্প এবং অন্য জগৎ থেকে মানবজাতির প্রাণীদের এই পৃথিবীতে আসার আলোচনা অনেকদিন ধরে শোনা গেছে। অনেক বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিতে ভিনগ্রহী প্রাণীদের অস্তিত্ব সিদ্ধ হয়েছে, আবার কেউ সেটা মানতে রাজি নয়। বর্তমানে নিজের প্রতিভার জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিং ভিনগ্রহী প্রাণীদের অস্তিত্বের প্রবল সমর্থক হন।
.
ডিসকভারি টি.ভি. চ্যানেলে বেশ কয়েকবার তাঁকে এই বিষয়ে জোরালো দাবি করতে দেখা ও শোনা গেছে। দিনাঙ্ক ০৯.০৭.১০ শুক্রবার আমি তাঁকে শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন যে 'প্রাণী জলের অভাবে -১৯৬° সে. এর অত্যন্ত কম তাপে তরল নাইট্রোজেনের উপর নির্ভর করে থাকতে পারে' অর্থাৎ জল ছাড়াও জীবন সম্ভব। এখন পর্যন্ত সমস্ত বৈজ্ঞানিক জগৎ জীবনের জন্য জলের উপস্থিতি অনিবার্য বলে মনে করতেন। জীবনের খোঁজে চাঁদ, মঙ্গল বা দূরবর্তী গ্রহগুলোতে জল খোঁজার ব্যাপক প্রচেষ্টা করা হয়েছে এবং এখনও এই প্রচেষ্টা ক্রমাগত চলছে।
.
যদি কোথাও জলের উপস্থিতির সামান্যও ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে বৈজ্ঞানিকরা সেই খোঁজকে জীবন আবিষ্কারের দিশাতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু এখন স্টিফেন হকিং-এর উপরোক্ত বক্তব্য এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জীবনের জন্য জল (H₂O) থাকা অনিবার্য নয়। তাহলে সেই প্রাণীদের জলবিহীন শরীর কেমন হবে? তাদের খাবারের ব্যবস্থা কি ও কিভাবে হবে? এই সব এখন অদ্ভুত হয়ে গেছে আর এই অদ্ভুতুড়ে বিষয়টাকে ধীরে-ধীরে বিজ্ঞান স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। স্টিফেন হকিং জলবিহীন প্রাণীর ধারণা থেকে অনেক এগিয়ে গিয়ে সেই উপরোক্ত কার্যক্রমে বলেছেন -
.
“ভিনগ্রহের প্রাণীরা গ্যাসের তৈরিও হতে পারে, যারা ক্রমাগত চমকানো বিদ্যুৎ থেকে ঊর্জা সংগ্রহ করতে পারে। এই ধরণের গ্রহ বৃহস্পতি ও শনি হতে পারে। এরপর আরও বলেছেন যে, কিছু জীব নিজেদের বয়স বাড়া থামিয়ে অমর হয়ে গেছে।”
.
এখন আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাইবো যে আপনি কি কখনও ভেবেছিলেন যে হকিং-এর মতো বিশ্বের মহান বৈজ্ঞানিক প্রাণীদের গ্যাসীয় শরীরের অস্তিত্বও মানবেন? পাশাপাশি কিছু প্রাণীর দ্বারা অমর হওয়ার সম্ভাবনাকেও স্বীকার করবেন। হকিং-এর মতানুসারে আপনি যদি ভাবেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে এমন ভিনগ্রহের জীবের হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, হাড়, রক্ত, মাংস, মজ্জা আদিও থাকবে না, তাহলে হকিং কেমন শরীরের কল্পনা করছেন? তার এই কল্পনার উপরে কোনো বুদ্ধিমান নাস্তিক সন্দেহ করবে না, কারণ সে হকিংকে একজন মহাবৈজ্ঞানিক মেনে তাঁর প্রত্যেকটা কথাকে প্রমাণ মানবে, অথচ সেই একই বুদ্ধিমান ব্যক্তি মহর্ষি দয়ানন্দের উপর প্রশ্ন তুলবে, কারণ তার কাছে ঋষিদের কোনো গুরুত্ব নেই।
.
একবার ভাবুন, হকিং-এর এই ভিনগ্রহী প্রাণীরা যদি বিদ্যুতের গর্জন থেকেই ঊর্জা সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে তাদের জন্য আহার, শ্বসন, রক্ত সংবহনতন্ত্রের কোনো প্রয়োজনই রইলো না। একটু ভেবে দেখুন যে উর্জার পূর্তি তো হয়ে গেল। আহার হবে না, তাহলে মল বিসর্জনেরও আবশ্যকতা হবে না। প্রজননতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র কিভাবে কাজ করবে এবং গ্যাসীয় অবস্থার সেই তন্ত্রগুলো কেমন হবে? এই কথা আপনি কিভাবে বিশ্বাস করবেন? যদি এটা মানেন, তাহলে আপনাকে জানিয়ে দিই যে প্লাজমা অবস্থা হল গ্যাসীয় অবস্থা থেকে এক অগ্রিম ধাপের অবস্থা মাত্র। তাহলে প্লাজমা অবস্থায় থাকা সূর্যের মধ্যে প্রাণীদের অস্তিত্ব কেন সম্ভব নয়? এটাকেও কি হকিং-এর কথা বলে মানবো, তবেই কি আপনার কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে?
.
মহর্ষির প্রতিভার উপর আপনার অবাক হওয়া উচিত যে, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ছাড়া তথা বর্তমান গণিতবিদ্যা না পড়েই মহর্ষি নিজের প্রতিভা, য়োগবল এবং বেদবিদ্যার জোরে এমন সব রহস্য উন্মোচন করেছেন, যা সেই সময় পর্যন্ত বিশ্বের কোনো বৈজ্ঞানিকের কাছে অজ্ঞাত ও অকল্পনীয় ছিল। গ্যাসীয় অবস্থার শরীরের অস্তিত্ব হকিংও এখন বুঝতে পেরেছেন। অনেক ধরণের বায়ুযান আদি যন্ত্রের নির্মাণও মহর্ষির পশ্চাৎই সংসারের বিকশিত বিজ্ঞান করেছে, অথচ মহর্ষি কেবল এমনই নয় বরং আজকের চেয়েও উৎকৃষ্ট বিমানের ইঙ্গিত নিজের বেদভাষ্যের মধ্যে করেছেন। যদি সেই সময় পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকরা ঋষির বেদভাষ্য পড়তেন, তাহলে তারা সেভাবেই অবিশ্বাস করতেন যেভাবে আপনি সূর্যের মধ্যে প্রাণীদের অস্তিত্ব নিয়ে অবিশ্বাস করছেন, কিন্তু কিছু সময় পশ্চাৎ এটাও প্রমাণিত পাবেন। স্টিফেন হকিং-এর গ্যাসীয় প্রাণীর কল্পনা থেকে তো আজও এটা প্রায় সিদ্ধবৎ আছে।
.
🔴 প্রশ্ন— ঋষি সূর্য আদিতে বসবাসকারী প্রাণীদের শরীর ও অঙ্গ আমাদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন মনে করেন, এই বিষয়ে আপনি কি বলবেন?
.
🔵 উত্তর— যেসব লোকের মধ্যে প্রাণীদের শরীর আকৃতি বিশিষ্ট আছে, সেখানে ঋষির কথা হুবহু সঠিক, কিন্তু সূর্য আদি নক্ষত্র বা কিছু গ্রহের মধ্যে যেখানে প্রাণীদের শরীর গ্যাস বা প্লাজমা দিয়ে তৈরি, সেখানে ঋষির কথার উদ্দেশ্য হলো সেই প্রাণীদের মধ্যেও ইন্দ্রিয়গুলো নিজ-নিজ কাজ করে। সেখানে চক্ষু আদি অঙ্গও প্লাজমা দিয়ে তৈরি হয়। আত্মা ও সূক্ষ্ম শরীর তো সব লোকের মধ্যে সমানই হয়। সেগুলো না জ্বলে আর না গলে। স্থূল শরীর বিভিন্ন লোকের পরিবেশ অনুযায়ী কঠিন, তরল, গ্যাস বা প্লাজমার হতে পারে তথা বিভিন্ন প্রকারের প্রাণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। গ্যাস বা প্লাজমার ক্ষেত্রও বিভিন্ন প্রাণাদি দ্বারা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে কাজ করে। সেই প্রাণীদের আচরণও তদনুরূপই হয়।
.
🔴 প্রশ্ন — মহর্ষি 'মনুষ্যাদি' শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাতে কি এটা বোঝায় না যে মহর্ষি দুই হাত, দুই পা, দুই চোখ আদি যুক্ত মানব আকারের প্রাণীই মানছেন, স্টিফেন হকিং-এর মতো গ্যাসীয় শরীর বিশিষ্ট বিদ্যুৎ আদির গর্জন থেকে ঊর্জা গ্রহণকারী বিচিত্র প্রাণীদের অস্তিত্বের কথা বলছেন না?
.
🔵 উত্তর — 'মনুষ্যাদি'-র তাৎপর্য কেবল পৃথিবীতে বিদ্যমান মনুষ্যাদির আকারের প্রাণী গ্রহণ করা উচিত নয়। মহর্ষি য়াস্ক মানুষের সংজ্ঞা নিয়ে বলেছেন - 'মত্বা কর্মাণি সীব্যতীতি' অর্থাৎ যে বিচারপূর্বক কর্ম করে, তাকে মানুষ বলে। এখানে এই সংজ্ঞা অনুসারে ঋষি দয়ানন্দের এটাই মত যে সূর্য আদি লোকে বিদ্যমান প্রাণীরাও মনন শক্তিসম্পন্ন হয়। তারা স্থূল স্নায়ুতন্ত্র যুক্ত না হলেও, তাদের মধ্যে বুদ্ধি, মন, ইন্দ্রিয় সবকিছুর অস্তিত্বের সাথে প্লাজমা অবস্থা বিশিষ্ট জ্ঞান তন্তু বা অঙ্গের অস্তিত্বও অবশ্যই থাকে, যার মাধ্যমে তারা আমাদের মতো সম্পূর্ণ ব্যবহার চালায়।
.
🔴 প্রশ্ন - 'মনুষ্য' পদের অর্থ আপনি আপনার কল্পনা থেকে করে মহর্ষির অন্ধ পক্ষ নিয়ে তার কথার যৌক্তিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। আপনার এই পক্ষপাতদুষ্ট ও পূর্বাগ্রহী প্রচেষ্টা সফল হবে না। মহর্ষি জী 'পূষণম্ ন্ব... উচ্যতে' ঋগ্বেদ ৬.৫৫.৪-এর ভাষ্যে 'অজাশ্বম্' পদের অর্থ নিয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, সূর্যের মধ্যে ছাগল ও ঘোড়া বিদ্যমান আছে। এখন আপনি ছাগল ও ঘোড়া এই হিন্দি পদগুলোর যৌগিক অর্থ করার সাহস করুন আর বলুন যে এই ছাগল ও ঘোড়াগুলো কেমন হবে?
.
🔵 উত্তর- প্রথমে আমি সত্যার্থ প্রকাশের উপর করা শঙ্কাগুলোর নিবারণে সত্যার্থ প্রকাশের দৃষ্টিতে বিচার করবো। মহর্ষি জী দ্বাদশ সমুল্লাসে জৈন মত খণ্ডন করতে গিয়ে এই ভূগোলে ১৩২টা সূর্য তপে থাকার কথায় ব্যঙ্গ করে লিখেছেন - 'এখন দেখো ভাই! এই ভূগোলের মধ্যে ১৩২ টা সূর্য এবং ১৩২ টা চন্দ্র জৈনদের ঘরে তপ্ত হচ্ছে। আচ্ছা, যদি তপ্তে থাকে তাহলে তারা বাঁচবে কিভাবে?' যদি মহর্ষি সূর্যকে পৃথিবীর মানুষের মতো আকৃতিযুক্ত প্রাণীর আবাসস্থল বলে মানতেন, তাহলে সূর্য থেকে প্রায় ১৫ কোটি কি.মি. দূরে পৃথিবীতে সূর্য থেকে আসা আলো ও তাপের ১৩২ গুণ তাপ হলে মানুষ নামক প্রাণীর বেঁচে থাকার উপর ব্যঙ্গ করতেন না। এতে প্রমাণিত হয় যে, ঋষি সূর্যের পৃষ্ঠের তাপে পৃথিবীতে বিদ্যমান মনুষ্যাদি আকৃতিযুক্ত প্রাণীর অস্তিত্ব মানতে পারেন না।
.
এখন বেদভাষ্যের আলোচনায় আসবো। মহর্ষি জী এই মন্ত্রের সংস্কৃত অংশে 'অজাশ্বম্' পদের অর্থ 'অজাশ্চাশ্বাশ্চাস্মিঁস্তম্" করেছেন আর হিন্দিতে 'যেখানে ছাগল এবং ঘোড়া বিদ্যমান আছে" এই অর্থ করেছেন, অথচ এর ঠিক পূর্বের মন্ত্রের মধ্যেও 'অজাশ্ব' পদ আছে, যার অর্থ সংস্কৃত অংশে 'অজোऽনুৎপন্নো বিদ্যুদশ্বো য়স্য তৎসম্বুদ্ধৌ' করেছেন এবং হিন্দি ভাষায় 'অবিনাশী বিদ্যুত্ রূপ ঘোড়া বিশিষ্ট', এই অর্থ আছে। এখন বিচার করুন যে, 'অজাশ্ব' উভয় মন্ত্রের মধ্যে প্রায় সমান আছে। পূর্ব মন্ত্রের মধ্যে 'অবিনাশী বিদ্যুত্ রূপ ঘোড়া বিশিষ্ট' অর্থ করেছেন, তাহলে পরের মন্ত্রের মধ্যেই ছাগল ও ঘোড়া নামক পৃথিবীর প্রাণী কোথা থেকে এলো?
.
অনেক আর্য বিদ্বান যেমন মনে করেন যে বেদভাষ্যের মধ্যে আর্য ভাষা (হিন্দি) ভাষ্য মহর্ষিকৃত নয়, বরং অন্য বিদ্বানরা করেছেন, আমি এই মতের সঙ্গে একমত। সেই বিদ্বানরা কোথাও-কোথাও মহর্ষির ভাব বুঝতে না পেরে মিথ্যা অর্থ করে গেছেন। যেখানে-যেখানে মহর্ষির সংস্কৃত ভাষ্য পূর্ণ স্পষ্ট হয়নি, অর্থাৎ শীঘ্রতাবশতঃ ঋষি এই ভেবে ছিলেন যে পূর্ব প্রসঙ্গে দেওয়া অর্থ অনুযায়ী ভাষা লেখক নিজেই বুঝে নিবেন, নিজের ভাষ্য কিছুটা অস্পষ্ট রেখে গেছেন, সেখানে ভাষা লেখকরা নিজেদের বুদ্ধির আশ্রয় নিয়ে পূর্ব অর্থকে গুরুত্ব না দিয়ে মনগড়া অর্থ করে ফেলেছেন, যেমনটা উপরে স্পষ্ট আছে যে পূর্ব মন্ত্রের মধ্যে 'অজাশ্ব' পদের স্পষ্টার্থ 'অজোऽনুৎপন্নো বিদ্যুদশ্বো য়স্য তৎসম্বুদ্ধৌ' করা হয়েছিল, সেটাই পরের মন্ত্রে 'অজাশ্বম্'-এর অর্থ 'অজাশ্চাশ্বাশ্চাস্মিঁস্তম্' করে 'অজ' ও 'অশ্ব' উভয় পদকেই যথাযথভাবে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেছেন।
.
তিনি ভেবেছিলেন যে যেহেতু 'অজাশ্ব' পদের স্পষ্ট অর্থ উপরেই দেওয়া হয়েছে, তাই ভাষা লেখক স্বয়ং 'অজ' ও 'অশ্ব' পদগুলোর, যা যথাক্রমে বিশেষণ ও বিশেষ্য, অর্থ পূর্ব মন্ত্র দেখে করে নিবেন, কিন্তু ভাষ্যার্থকারী উপরের মন্ত্রের সংস্কৃত ও স্বয়ং দ্বারা করা ভাষ্যার্থকেও দেখার চেষ্টা করেননি আর "ছাগল" ও "ঘোড়া" এই পদগুলোকে 'অজ' ও 'অশ্ব'-এর অর্থ হিসাবে চাপিয়ে দিয়েছেন। আমাদের মহর্ষির বেদভাষ্যের মধ্যে দেওয়া সংস্কৃত ভাষ্য খুব সাবধানে দেখা উচিত, তবেই ভাষ্যার্থ ঠিক হবে।
.
🔴 প্রশ্ন - আপনি মহর্ষির মন্তব্যের সমর্থনে স্টিফেন হকিংকে প্রমাণ মেনে সমাধান প্রস্তুত করেছেন। এই হকিং তো ঈশ্বর ও পুনর্জন্মের মান্যতাকে অস্বীকার করে ভৌতিকীর নিয়ম দ্বারাই সৃষ্টি উৎপত্তি ও সঞ্চালন হওয়াকে স্বীকার করেন। এই বিষয়ে কি আপনি হকিংকে প্রমাণ মানবেন? যদি হ্যাঁ বলেন, তাহলে আপনার মহর্ষি ও বেদাাদি শাস্ত্র মিথ্যা প্রমাণিত হবে আর যদি প্রমাণ না মানেন, তাহলে কোথাও প্রমাণ মানা আর কোথাও না মানা, এটা স্বার্থপরতা বলেই গণ্য হবে।
.
🔵 উত্তর - সংসারে কোনো ব্যক্তিই পূর্ণ হন না। কেবল পরমাত্মাই পূর্ণ হন। এই কারণে এটা আবশ্যক নয় যে কোনো ব্যক্তির সব মতামতের সম্পূর্ণ সমর্থন করা হবে বা সম্পূর্ণ বিরোধিতা করা হবে। আমাদের সত্যকে গ্রহণ ও মিথ্যাকে ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। যেসব মতামত আপনার আত্মার কাছে সঠিক ও সত্য বলে মনে হবে, সেগুলো স্বীকার করা আর যেগুলো বিপরীত মনে হবে, সেগুলো অস্বীকার করাই হল ন্যায়। কোনো ব্যক্তিরই অন্ধানুকরণ করা উচিত নয়। ভৌতিকীর নিয়ম দ্বারা সৃষ্টি উৎপত্তি ও সঞ্চালনের কথাকে তো মহর্ষি এবং তাঁর অনুগামী আমরা সবাই স্বীকার করি। আমরা এর সঙ্গে এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে একথাও বলি যে সেই নিয়মগুলোর নিয়ন্ত্রক একটা চেতন সত্তা আছে, কারণ নিয়ম না তো নিজে থেকে তৈরি হয় আর না সেগুলো স্বয়ং নিয়ন্ত্রণে থাকে।
.
হকিংয়ের 'দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন' পুস্তক না দেখেই ভারতীয় মিডিয়া যে নাস্তিকতার জোরালো প্রচার করেছিল, সেটা মূর্খতা বা ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। পাপের প্রচার খুব জোরেশোরে হয় আর সত্য-পুণ্যের প্রচার হয় না। ভারতীয় মিডিয়া, রাজনীতি ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা সবাই চার্বাক মতে দীক্ষিত নাস্তিক হয়ে গেছে। হকিং এই পুস্তকের মধ্যে বাইবেলের অলৌকিক ঈশ্বরের দ্বারা কোনো নিয়ম ছাড়াই নিজের ইচ্ছামতো মাত্র ৬ দিনে সম্পূর্ণ সৃষ্টি রচনা করে দেওয়ার অলৌকিক ঘটনা তথা বাবা আদম আদির মান্যতার খণ্ডন করেছেন। তিনি তাঁর পুস্তকের মধ্যে বাইবেল তথা বাবা আদম আদির নাম উল্লেখ করে খণ্ডন করেছেন। অন্য দেশের দর্শন সম্পর্কেও কিছু ইঙ্গিত করেছেন, তবে ভারতীয় বৈদিক ধারণার দিকে কোথাও কোনো ইঙ্গিত করেননি।
.
এমন মনে হয় যে হয়তো হিন্দুদের বহুদেবতাবাদে আবদ্ধ হাজার-হাজার মত-পন্থের জালকে তিনি এই ভেবে নিজের চিন্তায় আনেননি যে হিন্দুদের কোন ঈশ্বরকে মেনে নিজের বিচার লিখবেন, অথবা তিনি ভারতীয় দর্শনের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করেছেন। বস্তুতঃ যতক্ষণ পর্যন্ত বৈদিক ঈশ্বরবাদ সারা বিশ্বের মধ্যে প্রচারিত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং তার সাথে কর্মফলের ব্যবস্থা, পুনর্জন্মের ধারণা সবকিছুর উপহাস এভাবেই হতে থাকবে। দুর্ভাগ্যবশত, আজ পর্যন্ত তথাকথিত হিন্দু সমাজ নিজেই বৈদিক বিচারধারাকে বোঝার চেষ্টা করছে না, তাহলে হকিংকে দোষ দেব কেন?
.
যদি হকিংয়ের কাছে বৈদিক ঈশ্বরবাদ সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হতো এবং তিনিও যদি পূর্বাগ্রহ বা অহংকার দ্বারা প্রভাবিত না হতেন, তাহলে ঈশ্বরাদি মান্যতাকে অস্বীকার করার কোনো কারণ তিনি খুঁজে পেতেন না। আমি তো তাঁকে ধন্যবাদই দিবো যে তিনি খ্রিস্টানদের দেশের মধ্যে থেকেও বাইবেলের প্রবল খণ্ডন করেছেন। ভারতেও বৈজ্ঞানিকদের পুরাণ, জৈন, বৌদ্ধ, কুরআন, বাইবেল আদির অবৈজ্ঞানিক মান্যতাকে প্রকাশ্যে খণ্ডন করা উচিত। তবেই সত্য ধর্মের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রবণতা বাড়বে, কিন্তু এর জন্য আর্য বিদ্বানদের নিজেদের আলস্য ত্যাগ করতে হবে।
==================================
২৯.
আক্ষেপ -
আচার্যজিকে প্রণাম! আমার কাছে গীতাপ্রেস গোরখপুর দ্বারা মুদ্রিত রামায়ণ গ্রন্থ আছে, যারমধ্যে কিছু অবৈজ্ঞানিক কথা আছে, সেটা হল এই রকম -
এক শূদ্র শম্বুককে ভগবান রাম কেবল এই কারণে মেরে ফেলেন যে সে একজন শূদ্র হয়ে তপস্যা করছিল।
— অমরদীপ সিং
.
🚩 উত্তর - আক্ষেপকারী অমরদীপ সিংকে আমার পরামর্শ হল যে তিনি আমার পুস্তক 'জাতিবাদ আর ভগবান মনু' মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, সেটা আমাদের ওয়েবসাইটে উপলব্ধ।²
.
এই আক্ষেপকারীদের ছাড়াও শ্রী যতীন আগরওয়াল কিছু বেদমন্ত্রের ভাষ্য এবং অনুবাদের কিছু উদ্ধৃতি পাঠিয়েছেন। এই ভাষ্য এবং অনুবাদ নিতান্ত মূর্খতাপূর্ণ এবং অশ্লীল। এগুলোর উত্তর বোঝার জন্য আমার সেই উত্তরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, যা আমি সুলেমান রিজভীর আক্ষেপের উপর দিয়েছি। সেখানেই বেদভাষ্যের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সেগুলো পাঠযোগ্য। এতে আপনার সব প্রশ্নের সমাধান হতে পারবে। মনুস্মৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকারের আক্ষেপের সমাধান করার জন্য ড. সুরেন্দ্র কুমার দ্বারা করা মনুস্মৃতির ভাষ্য পাঠযোগ্য। এর জন্য আর্ষ সাহিত্য প্রচার ট্রাস্ট, দিল্লি দ্বারা প্রকাশিত মনুস্মৃতি এবং বিশুদ্ধ মনুস্মৃতি নামক গ্রন্থ পাঠযোগ্য।
.
এই আক্ষেপগুলো ছাড়াও আরও আক্ষেপের উত্তর আমার সমাধানগুলোতে নিহিত আছে। এর অতিরিক্ত কিছু আক্ষেপ আসলে আক্ষেপ নয়, বরং প্রশ্ন আছে তথা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য আমি শুরুতেই নিষেধ করেছিলাম। আক্ষেপকারীদের আক্ষেপ ছাড়াও 'কিছু অন্যান্য প্রশ্ন' শিরোনামে ১১ টা আক্ষেপ আমার নিজের ছিল।
.
আমি এটা দেখতে চেয়েছিলাম যে ভারতভূমিতে কি এমন কোনো বৈদিক বিদ্বান আছেন, যিনি ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নিরুক্ত এবং বেদাদিকে ভালোভাবে বোঝেন, কিন্তু সবার নীরবতা আমাকে এটাই জানিয়ে দিয়েছে যে আজ কারোরই বেদাদি শাস্ত্রের অধ্যয়ন আর অনুসন্ধানের কোনো আগ্রহ আর যোগ্যতা নেই। এইজন্য সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমিও দিচ্ছি না, যাদের এই উত্তরের দরকার আছে, তারা আমার 'বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ' এবং 'বেদার্থ-বিজ্ঞানম্' গ্রন্থ থেকে পড়তে পারেন।
____________________
²vaidicphysics.org.
(ক্রমশঃ)

৩০.

ঋষি দয়ানন্দের য়জুর্বেদ ভাষ্যের উপর যে একটা আক্ষেপ আছে, তার উত্তর আমি এখানে অবশ্যই দিবো -
.
আক্ষেপ -
.
পূষণম্ বনিষ্ঠুনান্ধাহীন্ৎস্থূলগুদয়া সর্পান্ গুদাভির্বিহ্রুতऽ আন্ত্রৈরপো বস্তিনা বৃষণমাণ্ডাভ্যাম্ বাজিনꣳ শেপেন প্রজাᳬ রেতসা চাষান্ পিত্তেন প্রদরান্ পায়ুনা কূশ্মাঞ্ছকপিণ্ডৈঃ ॥
(য়জুর্বেদ.২৫.৭)
.
এই মন্ত্রের ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইছে। এই মন্ত্রের ঋষি দয়ানন্দের সংস্কৃত ভাষ্য কেউ স্পষ্ট করে দেখাক অথবা নিজের ভাষ্য করে দেখাক। এর হিন্দি অনুবাদ অত্যন্ত অশ্লীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

🔵 উত্তর - এই ভাষ্য হঠাৎই যেকোনো বিদ্বানকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। এই বিষয়ে আমার মত হল মহর্ষি দয়ানন্দের ভাষ্যের হিন্দি অংশটা তাঁর নিজের নয়, বরং তাঁর লেখক পণ্ডিতদের তৈরি। এই মন্ত্রের হিন্দি অংশটা দেখলে এমন মনে হয় যে এটা সংস্কৃত অংশের মতোই, কিন্তু আমি এতে একমত নই। বস্তুতঃ সময়ের অভাবে ঋষি নিজের মনের মতো ভাষ্য করতে পারেননি, কিন্তু হিন্দি অনুবাদকদের কাছে আশা ছিল যে তারা তাঁর ভাবগুলোকে যথার্থভাবে বুঝে পদার্থ লিখবেন, কিন্তু এমনটা হয়নি। বেদার্থ এবং এই বিষয়ে ঋষির দৃষ্টিতে অনভিজ্ঞ সংস্কৃত বিদ্বান হিন্দি পদার্থ দেখে ঋষি ভাষ্যের উপর আক্ষেপ করেন। এই বিষয়ে আর্যসমাজের সভাগুলোর দায়িত্ব হল সক্ষম বিদ্বানদের দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করানোর চেষ্টা করা। যে মন্ত্রের উপর ইঙ্গিত করা হয়েছে, সেটা হল এইরকম —
.
পূষণম্ বনিষ্ঠুনান্ধাহীন্ৎস্থূলগুদয়া সর্পান্ গুদাভির্বিহ্রুতऽ আন্ত্রৈরপো বস্তিনা বৃষণমাণ্ডাভ্যাম্ বাজিনꣳ শেপেন প্রজাᳬ রেতসা চাষান্ পিত্তেন প্রদরান্ পায়ুনা কূশ্মাঞ্ছকপিণ্ডৈঃ ॥
.
এর ঋষিকৃত ভাষ্য হল এইরকম —

পদার্থঃ (পূষণম্) পুষ্টিকরম্ (বনিষ্ঠুনা) য়াচনেন (অন্ধাহীন্) অন্ধান্ সর্পার্ন্ (স্থূলগুদয়া) স্থূলয়া গুদয়া সহ (সর্পান্) (গুদাভিঃ) (বিহ্রুতঃ) বিশেষেণ কুটিলান্ (আন্ত্রৈঃ) উদরস্থৈর্নাডীবিশেষৈঃ (অপঃ) জলানি (বস্তিনা) নাভেরধোভাগেন (বৃষণম্) বীর্য়াধারম্ (আণ্ডাভ্যাম্) অণ্ডাকারাভ্যাম্ বৃষণাবয়বাভ্যাম্ (বাজিনম্) অশ্বম্ (শেপেন) লিঙ্গেন (প্রজাম্) সন্ততিম্ (রেতসা) বীর্য়েণ (চাষান্) ভক্ষণানি (পিত্তেন) (প্রদরান্) উদরাবয়বান্ (পায়ুনা) এতদিন্দ্রিয়েণ (কূশ্মান্) শাসনানি। অত্র কশধাতোর্মক্প্রত্যয়োऽন্যেষামপীতি দীর্ঘশ্চ (শকপিণ্ডৈঃ) শক্তেঃ সংঘাতৈঃ ।

ভাবার্থঃ - য়েন য়েন য়দ্যৎকার্য়ম্ সিধ্যেত্তেন তেনাঙ্গেন পদার্থেন বা তত্তৎসাধনীয়ম্ ।
.
উপলব্ধ হিন্দী অনুবাদ -
.
পদার্থ - হে মনুষ্যগণ। তোমরা (বনিষ্ঠুনা) চাওয়ার মাধ্যমে (পূষণম্) পুষ্টিদানকারীকে (স্থূলগুদয়া) স্থূল গুহ্যদ্বারের সাথে বর্তমান (অন্ধাহীন) অন্ধ সাপদেরকে (গুদাভিঃ) গুহ্যদ্বারগুলোর সাথে বর্তমান (বিহ্রুতঃ) বিশেষ কুটিল (সর্পান্) সর্পদের (আন্ত্রৈঃ) অন্ত্র দিয়ে (অপঃ) জলসমূহকে (বস্তিনা) নাভির নিচের অংশ দিয়ে (বৃষণম্) অণ্ডকোষকে (আণ্ডাভ্যাম্) অণ্ডদ্বয় দিয়ে (বাজিনম্) ঘোড়াকে (শেপেন) লিঙ্গ এবং (রেতসা) বীর্য দিয়ে (প্রজাম্) সন্তানকে (পিত্তেন) পিত্ত দিয়ে (চাষান্) ভোজনসমূহকে (প্রদরান্) পেটের অঙ্গসমূহকে (পায়ুনা) গুহ্যদ্বার দিয়ে এবং (শকপিণ্ডৈঃ) শক্তি দিয়ে (কূশ্মান্) শিখাবটদের নিরন্তর গ্রহণ করো।
.
ভাবার্থ - যে যে বস্তু দিয়ে যে যে কাজ সম্পন্ন হয়, সেই সেই অঙ্গ বা পদার্থ দিয়ে সেই সেই কাজ সম্পন্ন করা উচিত।
.
নিশ্চিতভাবেই এই হিন্দি পদার্থ উপযুক্ত ও স্পষ্ট নয়। তাই এখন আমি ঋষির এই ভাষ্যের ব্যাখ্যা করবো-
.
হে মনুষ্যগণ! (বনিষ্ঠুনা) য়াচন অর্থাৎ গ্রহণ করার ইচ্ছা তথা নষ্ট করার প্রবৃত্তি, [য়াচ্চু বধকর্মা - নিঘন্টু ২.১৯] এই উভয় প্রকারের কর্ম দ্বারা (পূষণম্) পুষ্টিকরণের ক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়। ধ্যাতব্য হল, শরীর এবং ব্রহ্মাণ্ড উভয়ের মধ্যে সংযোগ ও বিয়োগ কিংবা সৃষ্টি বা বিনাশ উভয় প্রকারের প্রবৃত্তি সঙ্গে-সঙ্গে চলে। এগুলোর মধ্যে একটার অভাবে সৃষ্টি প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়ে যাবে। এখানে মহর্ষির "য়াচনেন' পদের দুটো অর্থই গ্রহণ করা উচিত। এখানে যদি কেউ "য়াচনেন' পদ দিয়ে উভয় অর্থ গ্রহণ না করে, তাহলে তাকে 'বনিষ্ঠুনা' পদ 'বনু য়াচনে' এবং 'বনু সংভক্তৌ' এই দুটো ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন মনে করা উচিত। তখনও এখানে এই দুটো অর্থই বের হবে।
.
(স্থূলগুদয়া) স্থূল গুহ্যদ্বার কিংবা পুচ্ছভাগের দ্বারা (অন্ধাহীন) অন্ধ সাপ নিজের ক্রিয়াকলাপ করতে সক্ষম হয়। আমি ইন্টারনেট থেকে জানতে পারি যে, যেসব সাপ অন্ধ হয়, তাদের লেজ মুখের মতোই মোটা হয় এবং সেখানেই তাদের গুহ্যদ্বার থাকে। সেই স্থূল গুহ্যদ্বার দিয়েই সেই সাপ ডিম দেয়। এই কারণে গুহ্যদ্বার স্থূল হয়। ব্রাহ্মিনী ব্লাইন্ড স্নেক কেবল স্ত্রী জাতীয় হয়। এদের মধ্যে পুরুষ দেখা যায় না। এই কারণে এরা কোনো পুরুষ সাপের সংযোগ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুহ্যদ্বার দিয়ে ডিম দেয়। এই কারণে বলা হয়েছে যে, স্থূল গুহ্যদ্বারের দ্বারা অন্ধ সাপেরা তাদের কর্ম সম্পাদনে সক্ষম হয়।
.
(গুদাভিঃ) গুহ্যদ্বার বা পুচ্ছভাগের দ্বারা (বিহ্রুতঃ) বিশেষভাবে আঁকাবাঁকা গতিতে চলা সাপেরা তাদের গত্যাদি ক্রিয়াকলাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। এখানে ‘বিহ্রুতঃ’ শব্দ দ্বারা শাকল সাপকে গ্রহণ করা যেতে পারে। এই সাপ নিজের লেজ বা গুহ্যদ্বারকে মুখ দিয়ে কামড়ে ধরে চাকার মতো গোল আকৃতি ধারণ করে এবং চাকার মতোই গতিতে চলে। এই ধরণের সাপকে ইংরেজি ভাষায় হুপ স্নেক (Hoop Snake) বলা হয়। এই ধরণের সাপের বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মনে সন্দেহ আছে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণের মধ্যেও একটা স্থানে এই ধরণের সাপের আলোচনা আছে। আচার্য সায়ণও তাঁর ঐতরেয় ব্রাহ্মণের ভাষ্যে এই সাপের কথা উল্লেখ করেছেন। সম্ভবতঃ এই প্রজাতি এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক সাপ লেজ নাড়িয়ে শিকারকে আকর্ষণ করে তাদের ধরে ফেলে। এখানেও গুহ্যদ্বার বা লেজের ভূমিকা আছে, তবে এখানে গতির পরিবর্তে শিকার ধরার ক্ষেত্রে কাজ করে। এই কারণে গুহ্যদ্বারের মাধ্যমে এদের সক্রিয় থাকা বা সঠিক ক্রিয়া করার কথা আলোচনা করা হয়েছে।
.
(সর্পান্) অন্য প্রকারের সাপ (আন্ত্রৈঃ) উদরস্থিত নাড়ি [অমতি জানাতি প্রাপ্নোতি য়েন তত্ অন্ত্রম্ (উণাদি কোষ ৪.১৬৫)] অর্থাৎ শরীরের উপর ওঠা আঁশের সাহায্যে চলাচল করে অথবা তাদের শরীরে মধ্যে থাকা হাজার-হাজার মাংসপেশী-সদৃশ নাড়ীর মাধ্যমেই সে তার সমস্ত কাজ করতে সক্ষম হয়।
.
(অপঃ) যেকোনো প্রাণীর শরীরের একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বড় উপাদান জল (বস্তিনা) নাভির নীচের অংশে অবস্থিত অঙ্গগুলোর, বিশেষ করে মূত্র নির্গমন তন্ত্রের মাধ্যমেই শরীরের মধ্যে সঠিক ক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। আয়ুর্বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে পারেন যে বহুমূত্র বা মূত্রকৃচ্ছ্র রোগে শরীরের মধ্যে বিদ্যমান জল কিভাবে সঠিকভাবে তার কাজ করতে অক্ষম হয়।
.
(বৃষণম্) পুরুষ প্রাণীর অণ্ডকোষ (আণ্ডাভ্যাম্) তার অবয়ব স্বরূপ অণ্ডগুলোর সঠিকভাবে ক্রিয়াশীল ও বলবান থাকার মাধ্যমেই শুক্র নির্মাণ আদি কর্মকে সঠিকভাবে করতে সক্ষম হতে পারে। সেগুলোতে দোষ উপস্থিত হলে সম্পূর্ণ অণ্ডকোষের কাজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
.
(বাজিনম্) ঘোড়া, ষাঁড় আদি বলবান পশু (শেপেন) তাদের লিঙ্গের মাধ্যমে বিশেষ বল ও গতিতে যুক্ত হয়। যেসব ঘোড়াকে নপুংসক করে দেওয়া হয়, তাদের বল ও গতি উভয়ই কমে যায়। তাদের ক্রিয়াশীলতায় স্বল্পতা আসে। এই অঙ্গই হল তাদের বল-পৌরুষের প্রধান ভিত্তি বা সাধন। এই কারণেই এই অঙ্গের আলোচনা করা হয়েছে।
.
(প্রজাম্) বিভিন্ন প্রাণীর সন্তান (রেতসা) তাদের পিতা ও মাতার রেতঃ অর্থাৎ শুক্র ও রজঃ সক্ষম হওয়ার মাধ্যমেই সামর্থ্যবান হয়। শুক্র ও রজঃ-এর সংযোগ ছাড়া প্রজা উৎপন্ন হওয়া অসম্ভব আর তাদের দুর্বল হলে সন্তানও দুর্বলই হবে।
.
(চাষান্) বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য (পিত্তেন) আহারনালীতে মেশা পিত্ত আদি বিভিন্ন পাচক রসের মাধ্যমেই তাদের প্রভাব সঠিকভাবে প্রদর্শন করতে পারে। এর তাৎপর্য হল এই পাচক রসের অভাবে খাদ্যদ্রব্য কেবল শরীরকে পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করে না, বরং সেই প্রাণীকে রোগীও বানিয়ে দেয়।
.
(প্রদরান্) শরীরের ভেতরে, বিশেষ করে পেটের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন অবয়ব (পায়ুনা) গুহ্যদ্বার-ইন্দ্রিয়ের সঠিক কার্যকারিতার উপরই নিজ-নিজ কর্ম সঠিকভাবে করতে সক্ষম হয়। যখন মানুষ ও অন্য যেকোনো প্রাণীর কোষ্ঠকাঠিন্য, অতিসার বা অর্শ-ভগন্দরের মতো কোনো রোগ হয়, তখন সেই মানুষের পাচনতন্ত্রের অন্য অঙ্গ যেমন পাকস্থলী, গ্রহণী, উভয় প্রকারের অন্ত্র, যকৃৎ, প্লীহা ও অগ্ন্যাশয় আদি অঙ্গও প্রভাবিত হয়, অর্থাৎ সেগুলোও সঠিকভাবে নিজেদের কাজ করতে পারে না।
.
(কুশ্মান্) মস্তিষ্ক এবং এর দ্বারা সঞ্চালিত সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ ও সঞ্চালন ক্ষমতা (শকপিণ্ডৈঃ) মস্তিষ্ক এবং তার দ্বারা সঞ্চালিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শক্তির সঠিক ভারসাম্যের দ্বারাই সঠিকভাবে কাজ করতে পারে।
.
এই মন্ত্রের মধ্যে এই অধ্যায়ের প্রথম মন্ত্র থেকে 'স্বাহা' পদের অনুবৃত্তি বোঝা উচিত। এই থেকেই আমি সঠিক ক্রিয়া করার ভাব গ্রহণ করেছি।
.
ভাবার্থ - হে মনুষ্যগণ! সৃষ্টিতে সংযোগ-বিয়োগ গুণের দ্বারা বিভিন্ন ক্রিয়া ও পদার্থের রক্ষা ও পালন, অন্ধ সাপের লেজ বা গুহ্যদ্বার অংশ থেকে ডিম পাড়া বা এর সহযোগে শাকল সাপের চলা, সমস্ত সাপের মাংসপেশীর দ্বারা হতে চলা কর্মকে করা, শরীরের মধ্যে মূত্র বিসর্জনের সঠিক ক্রিয়ার দ্বারা শরীরের মধ্যে জলের সঠিক কার্যকারিতা বজায় রাখা, অণ্ডকোষের মধ্যে অবস্থিত শুক্রাশয় সুস্থ হওয়ার জন্যই অণ্ডকোষ সবল হওয়া, পৌরুষ শক্তি সম্পন্ন ঘোড়া আদি বলবান প্রাণীর বলবান থাকতে পারা, শুক্র ও রজের বিশুদ্ধতা ও স্বাস্থ্য থেকেই সুস্থ প্রজা উৎপন্ন হওয়া, পিত্ত আদি পাচক রস দ্বারা খাদ্য হজম হওয়া, মলাদি বিসর্জনের সঠিক ক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ থাকতে পারা এবং মস্তিষ্কস্থিত স্নায়ুগুলো সুস্থ ও সবল হওয়ার জন্যই শরীরের মধ্যে অন্য অঙ্গের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও সঞ্চালন আদি কাজ হয়, এটা তোমরা জেনে রাখো।
.
আধিদৈবিক ভাষ্য -

[প্রজাপতিঃ = প্রাণো হি প্রজাপতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.৫.১৩), প্রজাপতির্হ্যাত্মা (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬.২.২.১২), সর্বাণি ছন্দাংসি প্রজাপতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬.২.১.১০) । পূষা = পুষ্টির্বৈ পূষা (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.৭.২.১), অসৌ বৈ পূষা য়োऽসৌ (সূর্য়ঃ) তপতি (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ৫.২), অন্নম্ বৈ পূষা (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১২.৮), পশবো বৈ পূষা (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.১. ৮.৬), ইয়ম্ পৃথিবী বৈ পূষা (মৈত্রায়ণী সংহিতা ২.৫.৫)]
.
এই ঋচার ঋষি হল প্রজাপতি। এর তাৎপর্য হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি সব ধরণের অন্য ছন্দ রশ্মির মধ্যে কর্মরত প্রাণ ও সূত্রাত্মা বায়ুর মিলনে হয়। এর দেবতা পূষা হওয়াতে এর দৈবত প্রভাবে বিভিন্ন প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত কণা এবং বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির পারস্পরিক সংযোগের প্রক্রিয়া পৃথিবী ও সূর্য্যাদি লোকের ভিতরে সমৃদ্ধ হয়।
.
এর ছন্দ নিবৃদষ্টি হওয়াতে এর ছান্দস প্রভাবে সমস্ত ক্রিয়া তীক্ষ্ণ ও ব্যাপক হয়। এর স্বর মধ্যম হওয়াতে এই ছন্দ রশ্মি বিভিন্ন লোকের মধ্যে বিদ্যমান থেকে বিভিন্ন ছন্দ রশ্মি ও কণার মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকে।
.
(পূষণম্) সৃষ্টির প্রত্যেক পালন, রক্ষণ আদি ক্রিয়া (বনিষ্ঠুনা) সংযোগ-বিয়োগ অথবা আকর্ষণ, বিকর্ষণ, বিস্ফোরক এবং বিভাজক আদি বলের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়। [বন সম্ভক্তৌ, বনু য়াচনে, য়াচৃ বধকর্মা (নিঘন্টু ২.১৯)]
.
(অন্ধাহীন) [অন্ধঃ = অন্ননাম (নিঘন্টু ২.৭), অন্নম্ বা অন্ধঃ (জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩.৩), অন্ধো রাত্রিঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৯.১.৭), অহর্ব্বা অন্ধঃ (তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ১২.৩.৩; জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.১১৬)। অহিঃ দ্যাবাপৃথিব্যোর্ণাম (নিঘন্টু ৩.৩০)] বিভিন্ন সংযোজ্য প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত কণা (স্থূলগুদয়া) [গুদা = প্রাণো বৈ গুদঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৪.৩) এখানে 'গুদঃ' পদকে 'গুদা' রূপে লেখা ছান্দস প্রয়োগ আছে।] ব্যাপক রূপে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন প্রাণের দ্বারা নিজের বিভিন্ন ক্রিয়াকে সঠিকভাবে করতে পারে।
.
(সর্পান্) [সর্পাঃ = ইমে বৈ লোকাঃ সর্পাস্তে হানেন সর্বেণ সর্পন্তি য়দিদম্ কিম্ চ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.৪.১.২৫) (ছন্দাংসি বৈ সর্বে লোকাঃ - জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১.৩৩২), দেবা বৈ সর্পাঃ (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২.২.২.৬)] সব প্রকারের ছন্দ রশ্মি এবং দৃশ্য কণা বা তরঙ্গ (গুদাভিঃ) বিভিন্ন প্রাণ রশ্মির দ্বারা নিজের ক্রিয়াকে করার জন্য সক্ষম হয়।
.
(বিহ্রুতঃ) বিশেষ রূপে কুটিল চালচলনকারী সকল প্রকারের লোক এবং কণা (আন্ত্ৰৈঃ) বিভিন্ন প্রকারের ছন্দ ও প্রাণ রশ্মি দ্বারা নির্মিত পথে সেই রশ্মিগুলোর দ্বারা প্রেরিত হয়ে সঠিকভাবে সুরক্ষিত গমন করে।
.
(অপঃ) বিভিন্ন তন্মাত্রা এবং প্রাণাদি রশ্মি (বস্তিনা) [বস্ত আচ্ছাদয়তি সা বস্তিঃ (উণাদি কোষ ৪.১৮১)] সূত্ৰাত্মা এবং বৃহতী ছন্দ আদি রশ্মির দ্বারা সঠিক স্বরূপ প্রাপ্ত করে নিজেদের বিভিন্ন ক্রিয়াকে সঠিকভাবে সম্পন্ন করে।
.
(বৃষণম্) বিভিন্ন বৃষা অর্থাৎ পুরুষ রূপে কাজ করা রশ্মি বা কণাগুলো তাদের মধ্যে থাকা (আণ্ডাভ্যাম্) রেতঃ সেচনে সক্ষম অর্থাৎ তেজরূপ প্রাণ ও অপান বা প্রাণাদি রশ্মিগুলোর দ্বারাই তাদের সংযোগাদি কর্ম করতে সক্ষম হয়।
.
(বাজিনম্) [ছন্দাংসি বৈ বাজিনঃ (গোপথ ব্রাহ্মণ উত্তরভাগ ১.২০), ইন্দ্রো বৈ বাজী (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.১৮)] বেগবান ও বলবান বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন কণা বা ছন্দ রশ্মিগুলো (শেপেন) [শেপঃ = গ্রাভা শেপঃ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.৫.২৫.২)। গ্রাভা = প্রাণা বৈ গ্রাভাণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪.২.২.৩৩), বার্হতা বৈ গ্রাবাণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৮.২.১৪), জাগতা বৈ গ্রাভাণঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ২৯.১)। শেপঃ = শপতে স্পৃশতিকর্মণঃ (নিরুক্ত ৩.২১)] নিজেকে স্পর্শ করা প্রাণ এবং বৃহতী আদি ছন্দ রশ্মির দ্বারা নিজেদের কাজ করতে সক্ষম হয়। এর সাথে শুনঃশেপ নামক রশ্মির দ্বারা সূর্যলোকের কেন্দ্রীয় ভাগ সমৃদ্ধ হয়। (প্রজাম্) বিভিন্ন উৎপন্ন রশ্মি বা কণা আদি পদার্থ (রেতসা) তাদের উৎপন্ন করা বিভিন্ন রশ্মির দ্বারা ক্রিয়াশীল হয়।
.
(চাষান্) অবশোষিত হওয়ার মতো কণা বা রশ্মি আদি পদার্থ (পিত্তেন) [পিত্তম্ = তেজঃ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ১.৭.৬)] তাকে তেজ বা বল প্রদানকারী রশ্মির দ্বারাই নিজেদের ক্রিয়াকে সম্পাদন করতে পারে।
.
(প্রদরান্) [প্রদরান্ = প্র+দৃ বিদারণে, উদরাবয়বান্ (মহর্ষি দয়ানন্দ ভাষ্য)] অবকাশরূপ আকাশের মধ্যে অবস্থিত বিভিন্ন পদার্থ (পায়ুনা) [পায়ুঃ = অন্তরিক্ষম্ পায়ুঃ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.৫.২৫.২)] আকাশ তত্ত্বের দ্বারা আবৃত থেকে তার দ্বারাই বিভিন্ন বলকে প্রদর্শন ও অনুভব করতে পারে।
.
(কূশ্মান্) এই সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের ক্রিয়া (শকপিণ্ডৈঃ) [শক উদকনাম (নিঘন্টু ১.১২)] নিজের সিঞ্চনরূপী কর্মের দ্বারা উৎপন্ন সংঘনিত কণার (মিডিয়েটর পার্টিকলস) দ্বারাই সঞ্চালিত হয়। এখানে মনে রাখতে হবে যে, প্রথম মন্ত্র থেকে 'স্বাহা' পদের অনুবৃত্তি আছে।
.
ভাবার্থ - এই সৃষ্টির মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের পদার্থ নিজেদের পৃথক-পৃথক কর্মকে পৃথক-পৃথক কণা বা রশ্মি আদি পদার্থের সহযোগিতাতেই করতে সক্ষম হয়। বিদ্বানদের এই সব ক্রিয়া এবং পদার্থকে জানা উচিত।
.
সৃষ্টির উপর এই ঋচার প্রভাব - এই ছন্দ রশ্মির সৃষ্টির উপর ব্যাপক প্রভাব আছে। এর প্রভাবে বিভিন্ন কণা ও রশ্মির মধ্যে কার্যকর বিভিন্ন প্রকারের বল, গতি, সুরক্ষিত পথ, বিভিন্ন উৎপাদন কর্ম, নিরন্তর ক্রিয়াশীলতা আদির জন্য বিভিন্ন প্রকারের কণা, প্রাণ ও ছন্দাদি রশ্মি এবং আকাশ আদি তত্ত্ব সক্রিয় হয়। এই রশ্মি পূর্ব থেকে হয়ে আসা বিভিন্ন কর্মকে ভালোভাবে সম্পন্ন করতে ব্যাপক সহযোগিতা করে।
.
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(পূষণম্) য়োগসাধক সবার পালন, পোষণ ও রক্ষার মুখ্য হেতু পরমাত্মাকে (বনিষ্ঠুনা) পুরুষার্থপূর্বক প্রার্থনা এবং নিজের সমস্ত দুর্গুণ-দুর্ব্যসন নষ্ট করেই প্রাপ্ত করতে সমর্থ হন।
.
(অন্ধাহীন) [অহিঃ = সমস্তবিদ্যাসু ব্যাপনশীলঃ (ঈশ্বরঃ) (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ৫.২৩)] অন্ধ অর্থাৎ অন্ন রূপ অথবা জীবদের দ্বারা সর্বদা নমন করার যোগ্য অহিরূপ অর্থাৎ সমস্ত বিদ্যায় সমৃদ্ধ পরমেশ্বর (স্থূলগুদয়া) শরীর ও সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত প্রাণাপানোদান আদির সঠিক নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ প্রাণায়ামাদি তপস্যার দ্বারা পরিপক্ক য়োগসাধনা দ্বারা প্রাপ্ত করতে সহজ হয়।
.
(সর্পান্) ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ব্যাপ্ত বিভিন্ন গায়ত্র্যাদি ছন্দ রশ্মিগুলোকেও (গুদাভিঃ) প্রাণের উপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে য়োগাভ্যাসের দ্বারা প্রাপ্ত করা যেতে পারে।
.
(বিহ্রুতঃ) বিভিন্ন প্রকারের কুটিল পথ এবং অবিদ্যাদি ক্লেশকে (আন্ত্রৈঃ) বেদবিদ্যা অথবা বেদবিদ্যার মূল উপদেশক পরমপিতা পরমাত্মা অথবা য়োগবিদ্যায় পারদর্শী আচার্যের প্রতি সমর্পণ ও সম্মানের দ্বারা বিনাশ করা যেতে পারে।
.
(অপঃ) বিভিন্ন প্রকারের উত্তম গুণ এবং কর্মকে (বস্তিণা) নাভির নিচের অংশে অবস্থিত উপস্থেন্দ্রিয়ের পূর্ণ সংযম এবং তপ ও স্বাধ্যায় থেকে প্রাপ্ত সদ্গুণের আচ্ছাদনের দ্বারা সঠিকভাবে প্রাপ্ত করা যেতে পারে।
.
(বৃষণম্) সমস্ত সুখের বর্ষণকারী পরমেশ্বরকে (আণ্ডাভ্যাম্) [অণ্ডঃ = অমন্তি সংপ্রয়োগম্ প্রাপ্নুবন্তি য়েন সঃ অণ্ডঃ (উণাদি কোষ ১.১১৪)] সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড এবং শরীররূপী পিণ্ডের সঠিক বিজ্ঞানের দ্বারাই জানা যেতে পারে।
.
(বাজিনম্) বিভিন্ন বল এবং গতির মূল কারণ পরমেশ্বর (শেপেন) বিভিন্ন সাংসারিক বিষয়কে ক্রমাগত স্পর্শ করার স্বভাবযুক্ত বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও মনের নিগ্রহের দ্বারা প্রাপ্ত হন।
.
(প্রজাম্) [প্রজানাম্ = সর্বেষাম্ ব্যবহারাণাম্ (মহর্ষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ভাষ্য ৩৪.৫)] য়োগ-সাধনা আদি বিভিন্ন মোক্ষসাধক ব্যবহার (রেতসা) [রেতঃ = বাগ্ রেতঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৭.২.২১), বাগু হি রেতঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৫.২.৭)] বাক্ অর্থাৎ প্রণবের জপ ও ধ্যান আদির দ্বারা সঠিকভাবে সিদ্ধ হয়।
.
(চাষান্) ভক্ষণীয় অর্থাৎ বিনাশ করার যোগ্য কাম, ক্রোধ, লোভ আদি অভ্যন্তরীণ শত্রু অথবা সেবনযোগ্য ব্রহ্মানন্দ রস (পিত্তেন) ব্রহ্মবর্চস রূপী তেজের দ্বারা ক্রমশঃ নষ্ট বা প্রাপ্ত হয়।
.
(প্রদরান্) [ উদরꣳ সদঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৮.৮; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪০.৩) ] পরমেশ্বরের আনন্দ ধাম (পায়ুনা) বিভিন্ন দোষ থেকে রক্ষা করার গায়ত্রী জপ এবং উপাসনাদি কর্মের দ্বারা প্রাপ্ত হয়।
.
(কূষ্মান্) মন-ইন্দ্রিয়াদির ওপর নিয়ন্ত্রণ (শকপিণ্ডৈঃ) ঈশ্বরোপাসনাদি থেকে প্রাপ্ত সামর্থ্যের দ্বারা সঠিকভাবে স্থাপিত হতে পারে।
.
ভাবার্থ— প্রত্যেক য়োগসাধকের উচিত যে তিনি যেন য়োগের বিভিন্ন অঙ্গের সাধনা করে নিজের অবিদ্যাদি ক্লেশ এবং কাম, ক্রোধাদি শত্রুদের জয় করে নিজের য়োগসাধনাকে পরিপুষ্ট করেন। এমন য়োগী ব্রহ্মাণ্ডস্থ বেদের ঋচাগুলোকে সহজে গ্রহণ করার সাথে-সাথে ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার করে ভ্রান্তিহীন ও সম্পূর্ণ জ্ঞানযুক্ত হয়ে ব্রহ্মানন্দ ধামকে প্রাপ্ত করেন।
.
বিশেষ জ্ঞাতব্য— য়জুর্বেদের এই সম্পূর্ণ অধ্যায়ের মধ্যে কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয় নেই। অনেক প্রকারের দেবতা থাকার কারণে বিষয়ও অনেক আছে। এই কারণে সম্পূর্ণ সূক্তের পূর্ণ সংগতি সম্ভব নয়। ঈশ্বর বিষয়ক মন্ত্রগুলো ছাড়া অন্য মন্ত্রগুলোর ভাষ্য হিন্দি ভাষায় অস্পষ্ট ও অনুপযুক্ত মনে হয়। আমি এই অধ্যায়ের অন্য দ্বিবিধ ভাষ্য নিজেও করতে পারবো। আর ঋষিকৃত ভাষ্যকে স্পষ্ট, উপযুক্ত ও বোধগম্য হিন্দি ভাষায় ব্যাখ্যা করার যে বিষয়টা আছে, সেটাও সম্ভব। এর জন্য সময় ও শ্রম উভয়েরই প্রয়োজন আছে এবং আমি আমার কাজে ব্যস্ত আছি। আমি উদাহরণের জন্য একটা মন্ত্রের ঋষি-কৃত ভাষ্যকে হিন্দিতে ব্যাখ্যা করেছি। বাকি মন্ত্রগুলো অন্য জ্যেষ্ঠ বৈদিক বিদ্বানদের জন্য ছেড়ে দিচ্ছি।

==================================

৩১.

পরিশেষে আমি যারা বেদ নিয়ে লেখনি ধরেন তাদের সতর্ক করতে চাইবো যে, কেবল সংস্কৃত ব্যাকরণ অথবা শব্দকোষের ভিত্তিতে বেদার্থ করা সম্ভব নয়। এর জন্য নিরুক্ত, বিভিন্ন ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, বেদের বিভিন্ন শাখা, আরণ্যক, আশ্বলায়নাদি শ্রৌতসূত্র এবং ছন্দশাস্ত্রের বিস্তৃত অধ্যয়নের পাশাপাশি ঈশ্বরপ্রদত্ত উচ্চ কোটির ঊহা ও তর্ক, শুদ্ধ অন্তঃকরণ এবং ঈশ্বরের নিষ্কাম ও যথার্থ উপাসনা বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োজন।
.
আমি বেদ অথবা এর ঋষি দয়ানন্দ কৃত ভাষ্যের উপর মিথ্যা ব্যঙ্গকারী ইসলামী মিত্রদের বলতে চাইবো যে, কাঁচের ঘরে বসে বেদরূপী সুদৃঢ় মহলে পাথর ছোঁড়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমি কুরআনের তিনটা সংস্করণ পড়েছি। আপনারাও ভালোভাবে বুদ্ধি দিয়ে পড়ুন। এটা স্মরণ রাখা উচিত যে আমরা সবাই হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান আদি পরে, প্রথমে সবাই মানুষ। আমাদের সবাইকে মিলে একটা সত্য ধর্ম খোঁজার চেষ্টা করা উচিত। আমাদের এও মনে রাখা উচিত যে ঈশ্বরীয় জ্ঞান সৃষ্টির শুরুতেই পাওয়া যায়, এখন থেকে এক-দু হাজার বছর আগে নয়। আপনারা দয়া করে নিজেদের মজহবের মূল চেনার চেষ্টা করুন। তারপরই বেদের উপর আঙুল তুলতে আসবেন।
.
আমি তো বেদের আধারে বর্তমান ভৌতিকীর গম্ভীর ও অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা রাখি, সমগ্র ইসলামী জগতের মধ্যে কি এমন কোনো কুরআন বিশেষজ্ঞ আছেন, যিনি কুরআনের আধারে এমন দাবি করতে পারেন? আসুন, বিভেদ সৃষ্টিকারী প্রচেষ্টা দিয়ে মানবতাকে আঘাত না করে বরং আমরা সবাই এক পরমাত্মার সন্তান হওয়ার প্রয়াস করি।
.
এখানে আমি ৩০ টা আক্ষেপের উত্তর দিয়েছি, এগুলো পড়েই পাঠকরা বুঝতে পারবেন যে বেদাদি শাস্ত্র পড়া, সেগুলোর ভাষ্য এবং অনুবাদ আদি করার ক্ষেত্রে এতদিন কি-কি ভুল হয়েছে? যদি এই ভুলগুলো না হতো, তাহলে এই শাস্ত্রগুলোর ওপর কেউ কোনো আক্ষেপ করতে পারতো না। আমি এই সমস্ত আক্ষেপের উত্তর সরল এবং সংক্ষিপ্তভাবেই দিয়েছি। আমি এতটুকুই প্রচেষ্টা করেছি যাতে আক্ষেপকর্তার শুধুমাত্র আক্ষেপগুলো দূর হতে পারে।
.
এখন আমি যতটুকু সময় পাবো, আমি বেদের কঠিন সূক্তগুলোর ভাষ্য করার চেষ্টা করবো। এই কারণে এই প্রসঙ্গটা এখানেই স্থগিত করছি। ঈশ্বর সকল পাঠককে সত্য গ্রহণ এবং মিথ্যা ত্যাগ করার প্রজ্ঞা প্রদান করুন।

(সমাপ্ত)

PDF তালিকা (ই-বুক)
১. বেদ মন্ত্রের উপদেশ
২. বৈদিক-সন্ধ্যা (সংশোধিত, 2025)
৩. ব্রহ্মচর্যের সাধনা
৪. সর্বশ্রেষ্ঠ কে
৫. জাতিবাদ আর ভগবান্ মনু
৬. আমাদের পূর্বপুরুষ কি বানর
৭. উপদেশামৃত
৮. বৈদিক ভৌতিকী
৯. মাংসাহার
১০. য়োগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের দিনচর্যা
১১. শাস্ত্রার্থ সংগ্রহ – ১
১২. শাস্ত্রার্থ সংগ্রহ – ২
১৩. শাস্ত্রার্থ সংগ্রহ – ৩
১৪. সৃষ্টি সঞ্চালক
১৫. ভগবান্ শিবের দৃষ্টিতে ধর্ম

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

অষ্টাঙ্গহৃদয়ম্

  পুরোবচন আয়ুর্বেদীয় বাঙ্ময়ের ইতিহাস ব্রহ্মা, ইন্দ্র প্রভৃতি দেবদের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে অত্যন্ত প্রাচীন, গৌরবময় এবং বিস্তৃত। ভগ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ