সম্সৃষ্টম্ ধন॑মু॒ভয়ং॑ স॒মাকৃ॑তম॒স্মভ্যং॑ ধত্তাং॒ বরু॑ণশ্চ ম॒ন্যুঃ।
ভিয়ো॒ দধা॑না॒ হৃদ॑য়েষু॒ শত্র॑বঃ॒ পরা॑জিতাসো॒ অপ॒ নি ল॑য়ন্তাম্ ॥
(অথর্ববেদ ৪/৩১/৭)
স্বরসহ পদপাঠ
সম্ঽসৃ॑ষ্টম্ । ধন॑ম্ । উ॒ভয়॑ম্ । সম্ঽআকৃ॑তম্ । অস্মভ্য॑ম্ । ধত্তা॒ম্ । বরু॑ণঃ । চ॒ । ম॒ন্যুঃ । ভিয়॑ঃ । দধা॑নাঃ । হৃদ॑য়েষু । শত্র॑বঃ । পরা॑জিতাসঃ । অপ॑ । নি । ল॒য়॒ন্তা॒ম্ ॥৩১.৭॥
স্বররহিত মন্ত্র
সংসৃষ্টং ধনমুভয়ং সমাকৃতমস্মভ্যং ধত্তাং বরুণশ্চ মন্যুঃ। ভিয়ো দধানা হৃদয়েষু শত্রবঃ পরাজিতাসো অপ নি লয়ন্তাম্ ॥
স্বররহিত পদপাঠ
সম্ঽসৃষ্টম্ । ধনম্ । উভয়ম্ । সম্ঽআকৃতম্ । অস্মভ্যম্ । ধত্তাম্ । বরুণঃ । চ । মন্যুঃ । ভিয়ঃ । দধানাঃ । হৃদয়েষু । শত্রবঃ । পরাজিতাসঃ । অপ । নি । লয়ন্তাম্ ॥৩১.৭॥
ক্ষেমকরণ জীকৃত পদার্থ ভাষ্যঃ (বরুণঃ) শ্রেষ্ঠ বীর (চ) এবং (মন্যুঃ) ক্রোধ (সংসৃষ্টম্) সংগৃহীত এবং (সমাকৃতম্) সংকলিত/একত্রিত (উভয়ম্) উভয় প্রকারের [আত্মিক ও সমাজিক] (ধনম্) ধন (অস্মভ্যম্) আমাদের (ধত্তাম্) প্রদান করুক। (পরাজিতাসঃ) পরাজিত, এবং (হৃদয়েষু) হৃদয়ে (ভিয়ঃ) অনেক ভয় (দধানাঃ) ধারণ করে (শত্রবঃ) শত্রুরা (অপ=অপক্রম্য) পালিয়ে (নি লয়ন্তাম্) স্খলিত হবে/হোক ॥৭॥
বিশ্বনাথ জী কৃত পদার্থ ভাষ্য়ঃ (সংসৃষ্টম্) শত্রুর সাথে সংসর্গে অর্থাৎ যুদ্ধে প্রাপ্ত ধন [সংসৃজি, মন্ত্র ৬], (সমাকৃতম্) এবং তাঁর রাষ্ট্রে পূর্বতঃ একত্রিত ধন, (উভয়ম্) এই দ্বিবিধ ধন, (বরুণঃ চ মন্যুঃ) বরুণ রাজা ও বোধযুক্ত ক্রোধ, (অস্মভ্যম্) আমাদের [প্রজাদের] বা আমাদের [অধিকারীদের], (ধত্তাম্) প্রদান করুক; (পরাজিতাসঃ, শত্রুঃ) পরাজিত শত্রু (হৃদয়েষু) হৃদয়ে (ভিথঃ) ভয় (দধানাঃ) ধারণ করে (অপ) সংগ্রাম ভূমিতে অপগত হয়ে (নিলয়ন্তাম্) নিলীন হয়ে যাক, লুকিয়ে যাক।
টীকাঃ[যুদ্ধে প্রাপ্ত ধন প্রজাদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া উচিৎ, বা রাজকোষে জমা করা উচিৎ। বরুণঃ= প্রজা দ্বারা নির্বাচিত, রাষ্ট্রের রাজা, "ইন্দ্রশ্চ সম্রাড্ বরুণশ্চ রাজা" (যজুঃ০ ৮।৩৭)।] (বিশ্বনাথ)
এর ঋষি হল ব্রহ্মাস্কন্দ।[ব্রহ্মা = বলম্ বৈ ব্রহ্মা (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.৮.৫.২)] এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি এমন কিছু বিশেষ ঋষি রশ্মির দ্বারা হয়, যা উপযোগী বলগুলোকে গতি প্রদান করে অর্থাৎ সেগুলোকে সমৃদ্ধ করে আর অনুপযোগী অথবা বাধক বলগুলোকে শোষিত করে নেয় অর্থাৎ সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এর দেবতা হল মন্যু আর ছন্দ হল জগতী। "মন্যু" বিষয়ে মহর্ষি য়াস্ক বলেছেন -
মন্যুঃ মন্যতের্দীপ্তিকর্মণঃ ক্রোধকর্মণো বধকর্মণো বা মন্যন্ত্যস্মাদিষবঃ (নিরুক্ত ১০.২৯)। এর অর্থ হল এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবে অনিষ্ট এবং বাধক পদার্থকে ধ্বংসকারী রশ্মিগুলো আকাশের মধ্যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত স্পন্দিত হতে থাকে আর সম্পূর্ণ পদার্থের মধ্যে উজ্জ্বল বর্ণের উৎপত্তি বা সমৃদ্ধি হতে থাকে। এর ভাষ্য এইরকম হবে -
আধিদৈবিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) [বরুণঃ = স য়দগ্নির্ঘোরসম্স্পর্শস্তদস্য ( = অগ্নেঃ) বারুণম্ রূপম্ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.৪), য়ঃ প্রাণঃ স বরুণঃ (গোপথ ব্রাহ্মণ উত্তরভাগ ৪.১১), অপানো বরুণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৪.২.৬), ব্যানো বরুণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৯.১.১৬)] এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই অতি তীক্ষ্ম অগ্নি বিদ্যমান আছে, সেখানে প্রাণ, অপান এবং ব্যানের ত্রিক সূক্ষ্ম বাধক পদার্থকে নষ্ট করার জন্য তেজস্বী হয়ে ওঠে, এই ত্রিক পদার্থকে সংকুচিত আর ঘনীভূতও করে। (সম্সৃষ্টম্, সমাকৃতম্, উভয়ম্, ধনম্) দুই প্রকারের অর্থাৎ ভালোভাবে মিশ্রিত সূক্ষ্ম পদার্থ এবং ভালো করে আকার প্রাপ্ত করা পদার্থ অর্থাৎ মূর্ত আর অমূর্ত উভয় প্রকারের পদার্থের দ্বারা (অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) এই ছন্দ রশ্মির কারণরূপ ঋষি রশ্মিগুলোকে ধারণ করে রাখে।
(পরাজিতাসঃ) যেসব বাধক ও অনিষ্ট পদার্থকে এই ত্রিক রূপ রশ্মি সমূহ পরাজিত করে রেখেছে, সেগুলোর (হৃদয়েষু) [হৃদয়ম্ = আত্মা বৈ মনো হৃদয়ম্ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৮.৩.৮), হৃদয়ম্ বৈ স্তোমভাগাঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৬.২.১৫)] ভিতরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু এবং অন্য রশ্মির মধ্যে (ভিয়ঃ, দধানাঃ) অনেক প্রকারের তীব্র কম্পনকে উৎপন্ন করে দেয়, যারফলে (শত্রবঃ, অপ, নি, লয়ন্তাম্) সেই বাধক বা হিংসক পদার্থ খণ্ড-খণ্ড হয়ে সুদূর আকাশের মধ্যে লীন হয়ে যায় অর্থাৎ সূক্ষ্ম ভাগে পরিণত হয়ে অশক্তরূপে আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
ভাবার্থ - এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যেখানেই তীব্র উষ্মা বিদ্যমান আছে, সেখানে সমস্ত বাধক আর অনিষ্ট পদার্থ ছিন্ন-ভিন্ন বা নষ্ট হয়ে যায়। সেইসব ছিন্ন-ভিন্ন পদার্থ আকাশ তত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। সূক্ষ্ম পদার্থের পরস্পর সংযোজনও উচ্চ তাপযুক্ত অবস্থার মধ্যেই হয়।
আধিভৌতিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) বিদ্বান সজ্জনদের দ্বারা বরণীয়, দুষ্ট জনদের বাঁধনকারী এবং অপরাধীদের উপরে ক্রোধ করে এমন শ্রেষ্ঠ রাজা (সম্সৃষ্টম্) রাষ্ট্রের মধ্যে উৎপন্ন অন্নাদি ভোজ্য পদার্থ এবং খনিজ আদি বিভিন্ন প্রকারের পদার্থ (সমাকৃতম্) প্রজার থেকে সংগৃহীত করা কর (উভয়ম্, ধনম্) এই দুই প্রকারের ধনকে (অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) আমাদের প্রজাজনকে সমুচিত রূপে প্রদান করবেন। (পরাজিতাসঃ, শত্রবঃ) তিনি পরাজিত হওয়া দুষ্ট শত্রুর (হৃদয়েষু, ভিয়ঃ, দধানাঃ) হৃদয়ে ভয় উৎপন্ন করেন, যারফলে (অপ, নি, লয়ন্তাম্) সেই শত্রুরা দূরে পালিয়ে যায়, পুনরায় কখনও ফিরে আসে না অথবা তারা শত্রুতার ব্যবহারকেই সর্বথা ত্যাগ করে দেয়।
ভাবার্থ - যেকোনো রাষ্ট্রের রাজা বিদ্বান সদাচারিদের দ্বারাই চয়ন করা উচিত। এমন রাজার কর্তব্য হল তিনি রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ সম্পত্তির বাস্তবিক স্বামিনী প্রজাকেই ভাববেন আর সেটা প্রজার কল্যাণের জন্যই ব্যয় করবেন। সেই রাজা অপরাধী এবং রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী তত্ত্ব এবং বিদেশী শত্রুকে যথাপরাধ কঠিন দণ্ড দিবেন, যাতে তারা রাষ্ট্রের কোনো হানি না ঘটাতে পারে।
আধ্যাত্মিক ভাষ্য -
(বরুণঃ, চ, মন্যুঃ) সবার বরণীয় সর্বোৎকৃষ্ট মন্যুরূপ পরমেশ্বর (সম্সৃষ্টম্) আমাদের ক্রিয়মাণ কর্ম (সমাকৃতম্) এবং সঞ্চিত কর্ম (উভয়ম্, ধনম্, অস্মভ্যম্, ধত্তাম্) উভয়ের অনুসারে আমাদেরকে সাংসারিক পদার্থ আর বুদ্ধি আদি ইন্দ্রিয় প্রদান করেন। (হৃদয়েষু, ভিয়ঃ, দধানাঃ) সেই পরমেশ্বর বিভিন্ন প্রকারের পাপ কর্মের প্রতি পবিত্র হৃদয় যুক্ত মানুষের হৃদয়ে ভয়, লজ্জা, শঙ্কা আদি উৎপন্ন করেন, (পরাজিতাসঃ, শত্রবঃ) যারদ্বারা বিভিন্ন প্রকারের পাপরূপ শত্রু পরাজিত হয়ে (অপ, নি, লয়ন্তাম্) দূরে চলে যায়।
ভাবার্থ - এই সৃষ্টির মধ্যে পরমেশ্বরের থেকে অধিক কোনো শ্রেষ্ঠ আর উপাস্য সত্তা নেই। সেই ঈশ্বর তাঁর ন্যায়ানুসারে আমাদের এই জন্ম তথা পূর্ব জন্মে করা কর্মের অনুসারে ফল প্রদান করেন। যে সকল মানুষের অন্তঃকরণ পবিত্র আর শান্ত হয়, তাদের হৃদয়ে পরমাত্মা যেকোনো অনুচিত কর্ম করতে ইচ্ছা করার সময় ভয়, লজ্জা আর শঙ্কা উৎপন্ন করেন, যারফলে তারা পাপ কর্ম করার থেকে বেঁচে যায়। যদিও এই ভয়, লজ্জা আর শঙ্কা সকল মানুষের হৃদয়ে উৎপন্ন হয়, কিন্তু অবিদ্যাদি দোষে গ্রস্থ দুরাত্মা এবং অশান্তাত্মা সেটা অনুভব করতে পারে না। এই কারণে আমি এখানে পবিত্র অন্তঃকরণকারীর মধ্যে ভয়, লজ্জা, শঙ্কা আদি হওয়া বলেছি। এই কারণে প্রত্যেক মানুষের উচিত যে তারা বিদ্যার অভ্যাসের পাশাপাশি উপাসনার দ্বারা নিজ অন্তঃকরণকে পবিত্র আর শান্ত রাখার চেষ্টা নিরন্তর করতে থাকবেন, যাতে পরমেশ্বরের প্রেরণার দ্বারা তাদের কর্তব্যাকর্তব্যের সঠিক বোধ হতে থাকে।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ