নাসদীয় সূক্ত - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

05 January, 2026

নাসদীয় সূক্ত

নাসদীয় সূক্ত, ঋগ্বেদ ১০/১২৯
অথ নাসদীয় সূক্তম্

ভূমিকা—

নাসদীয় সূক্ত বেদের একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সূক্ত। ‘ন অসৎ’ এই পদগুলির দ্বারা সূচনা হওয়ার কারণে এই সূক্তের নাম নাসদীয় রাখা হয়েছে। এই নামের সঙ্গে এর ঋষি বা দেবতার কোনো সম্পর্ক নেই। সকল বিদ্বান এই সূক্তের সৃষ্টিপরক ব্যাখ্যাই করেছেন।

প্রায়ই বহু বিদ্বান এই সূক্তে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্পিত মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং) তত্ত্বের মাধ্যমে সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া দেখতে চান—এটি হাস্যকর। মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি বৃহৎ মিথ্যাবাদ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে এই সূক্তে সৃষ্টির প্রারম্ভিক অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে পদার্থের সেই অবস্থার বর্ণনা রয়েছে, যার কল্পনা করাও বর্তমান বিজ্ঞানের পক্ষে কঠিন।

ঋগ্বেদ ১০.১২৯—

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

नास॑दासी॒न्नो सदा॑सीत्त॒दानीं॒ नासी॒द्रजो॒ नो व्यो॑मा प॒रो यत् । 

किमाव॑रीव॒: कुह॒ कस्य॒ शर्म॒न्नम्भ॒: किमा॑सी॒द्गह॑नं गभी॒रम् ॥

নাসদাসীন্নো সদাসীত্তদানীং নাসীদ্রজো নো ব্যোমা পরো যত্।
কিমাবরীবঃ কুহ কস্য শর্মন্নম্ভঃ কিমাসীদ্ গহনং গভীরম্ ॥ ১ ॥

এর ঋষি প্রজাপতি পরমেষ্ঠী। [পরমেষ্ঠী আপো বৈ প্রজাপতিঃ পরমেষ্ঠী তা হি পরমে স্থানে তিষ্ঠন্তি (শ. ব্রা. ৮.২.৩.১৩), ঋতমেব পরমেষ্ঠি (তৈ. ব্রা. ১.৫.৫.১)। ঋতম্ ওমিত্যেত-দেবাক্ষরমৃতম্ (জৈ. উ. ৩.৩৬.৫)]
এর অর্থ এই যে, এই ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তি সর্বব্যাপী ‘ওম্’ রশ্মিসমূহ থেকে হয়। এর দেবতা ভাববৃত্তম্ এবং ছন্দ নিবৃত্ ত্রিষ্টুপ্। এই কারণে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে তীক্ষ্ণ তেজস্বিতার সঙ্গে সৃষ্টি-প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হতে থাকে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য—

(ন, অসৎ, আসীত্, নো, সৎ, আসীত্, তদানীম্)
[সৎ প্রাণা বৈ সৎ (তৈ. সং. ৭.২.৯.৩), যত্ সৎ তৎসাম তন্মনস্ স প্রाणঃ (জৈ. উ. ১.৫৩.২), ইমে বৈ লোকাঃ সতঃ (শ. না. ৭.৪.১.১৪), সৎ উদকনাম (নিঘं. ১.১২)। অসৎ মৃত্যুর্বাঽঅসৎ (শ. ব্রা. ১৪.৪.১.৩১)]

এই ছন্দ-রশ্মির কারণভূত ঋষি-রশ্মি অর্থাৎ ‘ওম্’ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে ‘সৎ’ নামে কোনো পদার্থই ছিল না। এর অর্থ, সেই সময় কোনো ছন্দ-রশ্মি, সূক্ষ্ম কণা বা লোক বিদ্যমান ছিল না। কোথাও উদক অর্থাৎ তরল অবস্থারও কোনো চিহ্ন ছিল না; অর্থাৎ না কঠিন পদার্থ ছিল, না তরল পদার্থ। এর অর্থ, সেই সময় এমন কোনো সূক্ষ্ম পদার্থও ছিল না, যা অন্য পদার্থকে সিঞ্চিত করতে পারে বা করতে সক্ষম হয়। সাম রশ্মি না থাকার ফলে কোথাও কোনো বিকিরণও ছিল না; অর্থাৎ সর্বত্র অনন্ত অন্ধকার ছিল। তখন কোনো প্রকার প্রাণ বা ছন্দ-রশ্মিও ছিল না এবং মহৎ, অহংকার বা মনস্তত্ত্বও বিদ্যমান ছিল না। সেই সময় সকলের প্রেরক কালতত্ত্বও তার প্রেরণাশক্তিসহ বিদ্যমান ছিল না।

এইভাবে সেই সময় এমন এক অবস্থা ছিল, যেন কোনো পদার্থই বিদ্যমান নয়। এই পদার্থসমূহ না থাকার ফলে গতি, বল, উষ্ণতা, ভর, বৈদ্যুতিক আধান, শব্দ, রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সত্ত্বগুণ, রজোগুণ, তমোগুণ—কোনো গুণ বা কর্মই বিদ্যমান ছিল না বা হতে পারে না। এতদসত্ত্বেও সেখানে ‘অসৎ’ও ছিল না, অর্থাৎ মৃত্যু ছিল না। এর অর্থ, এই সকল পদার্থের সম্পূর্ণ অভাবও ছিল না; অর্থাৎ সেই সময় বস্তুমাত্রের সম্পূর্ণ অনস্তিত্ব ছিল না। এইভাবে প্রকাশরূপে কোনো পদার্থের ভাব ছিল না, কিন্তু তাদের মূল উপাদান কারণ অবশ্যই বিদ্যমান ছিল, যার মধ্যে এই সকল পদার্থ সম্পূর্ণরূপে লীন ছিল। তাই একে নিঃশর্ত অভাবও বলা যায় না। বর্তমানে এই সৃষ্টিতে যে পরিমাণ পদার্থ বিদ্যমান, সেই পরিমাণই তখনও বিদ্যমান ছিল; কিন্তু মূল কারণরূপে বিদ্যমান থাকার ফলে ব্যবহারিকভাবে কিছুই প্রকাশিত ছিল না।

ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকায় ‘অসৎ’ শব্দ দ্বারা শূন্য আকাশ গ্রহণ করে লিখেছেন—

“যদা কার্যং জগন্নোৎপন্নমাসীত্ তদাঽসৎ সৃষ্টেঃ প্রাক্ শূন্যমাকাশমপি নাসীত্। কুতঃ? তদ্‌ব্যবহারস্য বর্তমানাভাবাত্।”

অর্থাৎ, সেই সময় কোথাও শূন্য স্থান (অভাবরূপ আকাশ)ও ছিল না; অর্থাৎ সর্বত্র মূল উপাদান পদার্থ তার সূক্ষ্মতম সত্তাসহ একরসভাবে বিদ্যমান ছিল।

(ন, আসীত্, রজঃ, নো, ব্যোম, পরঃ, যত্)
[রজঃ রজসঃ অন্তরিক্ষলোকস্য (নিরুক্ত ১২.৭)]

¹ দ্রব্য–শক্তি সংরক্ষণ তত্ত্বের এটি সর্বাধিক উপযুক্ত উদাহরণ।

[রজসী দ্যাবাপৃথিবীনাম (নিঘं. ৩.৩০), ইমে বৈ লোকা রজাংসি (শ. ব্রা. ৬.৩.১.১৮)]
সেই সময় প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত কোনো প্রকারের অতি সূক্ষ্ম থেকেও অতি সূক্ষ্ম কণাও বিদ্যমান ছিল না। তখন অন্তরীক্ষও ছিল না; অর্থাৎ পদার্থগুলির মধ্যে কোনো দূরত্বই ছিল না, কারণ সমস্ত পদার্থ একরস ও অদৃশ্য অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। এখানে ‘ব্যোম’ পদ সম্পর্কে ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকায় লিখেছেন—
‘ব্যোমাকাশমপরং যস্মিন্ বিরাডাখ্যং সোऽপি নো আসীত্ কিন্ত্ত পরব্রহ্মণঃ সামর্থ্যাখ্যমতীব সূক্ষ্মং সর্বস্যাস্য পরমকারণসংজ্ঞকमेব তদানীং সমবর্তত’।
যখন কোনো প্রকার রশ্মিই বিদ্যমান ছিল না, তখন সেগুলির দ্বারা নির্মিত আকাশ মহাভূত কীভাবে বিদ্যমান হতে পারে? হ্যাঁ, পরমেশ্বরের পরম সামর্থ্যে সমস্ত পদার্থ কারণরূপে অবশ্যই বিদ্যমান ছিল।

কারণ ছাড়া কোনো কার্য হতে পারে না—যেমন মহর্ষি কণাদ বলেছেন, ‘কারণাভাবাৎ কার্যাভাবঃ’ (বৈ. দ. ৪.১.৩)। এই জন্য মূল উপাদান পদার্থ অবশ্যই বিদ্যমান থাকে। এখানে ‘ব্যোম’ পদটি এ কথাও নির্দেশ করে যে, সেই সময় যে মূল উপাদান পদার্থ অব্যক্তরূপে বিদ্যমান ছিল, তার অবয়বগুলির মধ্যে না কেউ কারও দ্বারা রক্ষিত ছিল, না কেউ কারও রক্ষক ছিল; না কেউ আচ্ছাদক ছিল, না কেউ আচ্ছাদ্য ছিল। এর অর্থ এই যে, প্রকৃতিরূপী পদার্থের অক্ষররূপ অবয়বগুলি প্রলয়কালে পৃথক পৃথক, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, নিশ্চল ও সম্পূর্ণ অব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। তারা সকলেই পৃথক পৃথকভাবে অনাদি। এই কারণেই প্রকৃতি পদার্থকেও অনাদি বলা হয়। যদি প্রলয়কালে অক্ষররূপ অবয়বগুলির মধ্যে সামান্যতমও কোনো সম্পর্ক বা সংযোগ থাকত, তবে সেই সংযোগ অনাদি না হওয়ায় প্রকৃতিরূপী পদার্থ কখনোই অনাদি হতে পারত না। পাঠকদের এই বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে নেওয়া উচিত। সেই সময় সকলকে কেবল ব্রহ্মই আচ্ছাদিত করে রাখে।

(কিম্, আবরীবঃ) এখানেও একই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সেই সময় অক্ষররূপ অবয়বগুলি কারও দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল না; তখন ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কোনো আবরকের প্রয়োজনই ছিল না।
(কুহ, কস্য, শর্মন্) [শর্ম গৃহনাম (নিঘं. ৩.৪), সুখম্ (তু. ম. দ. ঋ. ভা. ১.৮৫.১২), শরণম্ (নিরু. ৯.১৯)]
কোথায় কারও কোনো আবাস ছিল? কোথায় কারও সুখ ছিল? আর কোথায় কারও কোনো আশ্রয়দাতা ছিল? এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে এই অর্থই প্রকাশিত হয় যে, কোনো জড় পদার্থই অন্য কোনো জড় পদার্থের আবাস বা আশ্রয় ছিল না, কারণ কোনো প্রকার ব্যাপ্য–ব্যাপক সম্পর্কই তখন ছিল না। সমস্ত অক্ষররূপ অবয়ব স্বতন্ত্র ছিল; তাদের মধ্যে কোনো প্রকার বল কার্যরত ছিল না। এতসব সত্ত্বেও সমগ্র পদার্থ সম্পূর্ণ একরস ছিল। সেই সময় কোনো বন্ধ জীবাত্মা সুখ বা দুঃখে আক্রান্ত ছিল না; তার সমস্ত অনুভূতি ও সংস্কার সম্পূর্ণ শান্ত ছিল। এখানে ‘কুহ’ পদের অর্থ ‘প্রজাপতি পরমাত্মায়’ বলেও গ্রহণ করা যেতে পারে। একইভাবে ‘কস্য’ পদের অর্থ ‘প্রজাপতি পরমাত্মার আশ্রিত’ হিসেবেও গ্রহণযোগ্য। এইভাবে সেই সময় সমস্ত মুক্তাত্মা প্রজাপতি পরমাত্মার আশ্রয় পেয়ে তাতেই পরমানন্দ ভোগ করতে করতে স্বতন্ত্রভাবে বিচরণ করে। অপরদিকে, সমগ্র প্রকৃতিরূপী জড় পদার্থ এবং বন্ধ জীবাত্মা পরমাত্মার মধ্যেই নিশ্চল ও সম্পূর্ণ নির্গুণ অবস্থায় বিদ্যমান বা আশ্রিত থাকে।

(অম্ভঃ, কিম্, আসীত্, গহনম্, গভীরম্)
[অম্ভঃ— ‘অম্ভঃ’ পদের ব্যুৎপত্তি করতে গিয়ে উণাদি-কোষের ব্যাখ্যায় ঋষি দয়ানন্দ লিখেছেন— ‘আপ্যতে তৎ অম্ভঃ’ (উ. কো. ৪.২১১)।
গহনম্— উদকনাম (নিঘং. ১.১২), কঠিনম্ (ম. দ. য. ভা. ৮.৫৩)।
গভীরঃ— উদকনাম (নিঘং. ১.১২), মহান্নাম (নিঘং. ৩.৩), গভীরা বাঙ্‌নাম (নিঘং. ১.১১)]

সেই সময় কোন পদার্থ ব্যাপক ছিল? কোন পদার্থ উদকরূপ, অর্থাৎ সেচনাদি ক্রিয়ায় যুক্ত ছিল? কোন পদার্থ বাক্‌-রশ্মির রূপে বিদ্যমান ছিল? এখানে এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে এই অর্থই প্রতীয়মান হয় যে, সেই সময় অব্যক্ত কারণ পদার্থে না কোনো ব্যাপক ছিল, না কোনো ব্যাপ্য ছিল। না কোনো সেচক ছিল, না কোনো সেচ্য পদার্থ ছিল। কোনো প্রকার গতির সম্পূর্ণ অভাব থাকার কারণে কোনো বাক্‌-আদি রশ্মিও বিদ্যমান ছিল না। তখন কোনো কঠিন বা সঘন পদার্থ থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। এইভাবে সেই সময় বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত কঠিন, তরল, গ্যাস, শক্তি ও আকাশ ইত্যাদি কোনো পদার্থই বিদ্যমান ছিল না, কিংবা থাকতে পারে না। তবে সেই পদার্থের ভিতরে ও বাইরে পরম চেতন তত্ত্ব পরব্রহ্ম পরমাত্মা অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন। সেই পরব্রহ্ম সর্বদা সমস্ত আত্মা ও প্রকৃতিরূপী মূল উপাদান কারণে সম্পূর্ণরূপে ব্যাপ্ত থাকেন। তিনি মুক্তাত্মাদের তাঁর বিজ্ঞানযুক্ত আনন্দ দ্বারা সিঞ্চিত করতে থাকেন। সেই পরব্রহ্মই সর্বাপেক্ষা মহান।

ভাবার্থ— এখানে সৃষ্টির মূল উপাদান পদার্থের স্বরূপ এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ-প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্ববর্তী অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে।

পদার্থের সেই অবস্থার বিষয়ে ভগবান মনুর উক্তি হল—

আসীদিদং তমোভূতমপ্রজ্ঞাতমলক্ষণম্ ।
অপ্রতর্ব্যমবিজ্ঞেয়ং প্রসুপ্তমিব সর্বতঃ ॥ (মনু ১.৫)

অর্থাৎ মহাপ্রলয়ের কালে এই জগৎ গভীর অন্ধকারে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন থাকে। এই কারণেই প্রকৃতির এক নাম ‘তমস্’‘অপ্রজ্ঞাতম্’ অর্থাৎ সেই সময়কার অবস্থাকে কখনোই কেউ সুস্পষ্টভাবে জানতে পারেনি। এখানে এই অর্থও প্রতীয়মান হয় যে, সেই অবস্থাকে ঋষিগণ অবশ্যই জেনেছেন এবং জেনেই আর্ষ গ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন; কিন্তু ‘ন’ পূর্বক ‘প্র’ উপসর্গ এই ইঙ্গিত দেয় যে, তাকে প্রকৃষ্ট রূপে জানা যায়নি। ‘অলক্ষণম্’ অর্থাৎ সেই পদার্থে এমন কোনো লক্ষণ বিদ্যমান থাকে না, যার দ্বারা তার কোনো প্রকার অনুভূতি সম্ভব হয়। ‘অপ্রতর্ব্যম্’ পদটি এই কথা নির্দেশ করে যে, পদার্থের সেই অবস্থার বিষয়ে মহান তত্ত্বদর্শীরা তর্ক-বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু অত্যন্ত সুগভীর ও সূক্ষ্ম তর্ক করা সম্ভব নয়, কারণ সেই পদার্থ অব্যক্ত রূপে বিদ্যমান থাকে। ‘অবিজ্ঞেয়ম্’ পদটি এই কথা জানায় যে, কোনো ব্যক্তি যতই মহান জ্ঞানী হোন না কেন, তিনি তাকে বিশেষ রূপে কখনোই জানতে পারেন না। তা ঋষিগণের দ্বারা জ্ঞেয় বটে, কিন্তু বিশেষভাবে জ্ঞেয় নয়। এইভাবে পদার্থের সেই অবস্থা এমন হয়, যেন তা সম্পূর্ণরূপে নিদ্রিত অবস্থায় রয়েছে।

এইভাবে মহাপ্রলয় কালে যখন কোনো জড় পদার্থ ভাবরূপে বিদ্যমান থেকেও অভাবরূপ হয়ে যায়, সেই সময়ও পরব্রহ্ম পরমাত্মার সত্তা অপরিবর্তিতভাবে বিদ্যমান থাকে। তিনি সৎ ও অসৎ—উভয়ের অতীত হয়ে নিত্য ও একরস রূপে বিরাজমান থাকেন। যখন সূক্ষ্ম বা স্থূল পদার্থের কোনো প্রকার আলো বিদ্যমান থাকে না, কারণ সেই পদার্থসমূহও তখন প্রকাশযোগ্য অবস্থায় থাকে না, সেই অবস্থায় পরমাত্মার জ্ঞানরূপ আলো অবশ্যই সর্বত্র বিদ্যমান থাকে, যার মধ্যে মুক্তাত্মারা স্বচ্ছন্দে ও সহজভাবে বিচরণ করতে থাকেন। সেই মুক্তাত্মারা ব্রহ্মকে আশ্রয় করে তাঁর মধ্যেই বিচরণ করেন। তিনিই সকলকে আচ্ছাদিত করেন, তিনিই সমগ্র আশ্রয় ও আবাস প্রদান করেন এবং তিনিই সর্বত্র নিতান্তভাবে ব্যাপ্ত থাকেন। এমন কোনো পদার্থ নেই, যার ভিতরে ও বাইরে সেই ব্রহ্মের সত্তা বিদ্যমান নয়।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(ন, অসৎ, আসীত্, তদানীম্) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে পদার্থের অবস্থা অসৎ রূপ ছিল না। এর অর্থ এই যে, সেই সময় পদার্থ অব্যক্ত অবস্থায় ছিল না, তাতে আন্দোলনও বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন প্রকার সূক্ষ্ম বলও ইতিমধ্যেই উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, যার কারণে পদার্থ গতিশীল অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। সেই পদার্থ এমন এক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তা নিজের সূক্ষ্ম রশ্মির দ্বারা পরস্পরকে সিঞ্চিত করতে সক্ষম হয়ে উঠেছিল। (নো, সৎ, আসীত্) এতদসত্ত্বেও সেই পদার্থ প্রকাশ্য রূপে অনুভবযোগ্য ছিল না। পদার্থে আন্দোলন অবশ্যই ছিল, কিন্তু তা অত্যন্ত তীব্র বলযুক্ত ছিল না। সেই সূক্ষ্ম পদার্থের অবয়বসমূহ থেকে নিঃসৃত সূক্ষ্ম রশ্মিগুলি একে অপরকে অবশ্যই অবসিঞ্চিত করছিল, কিন্তু তারা পদার্থকে তরল অবস্থায় উপনীত করতে সক্ষম ছিল না; যার ফলে কোনো পদার্থ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে উঠতে পারেনি।

(ন, আসীত্, রজঃ) সেই সময় আকাশ মহাভূত উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তা বিশেষ ক্রিয়াশীলতা লাভ করতে পারেনি। তীব্র বলের অভাবে তা সেই বায়বীয় দশা প্রাপ্ত পদার্থকে ঘনীভূত করতে পারছিল না, যার ফলে না তো অগ্নির পরমাণু অর্থাৎ ফোটন সৃষ্টি হচ্ছিল এবং না বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা সংজ্ঞায়িত কোয়ার্কস ও ইলেকট্রন প্রভৃতি মৌল কণারই নির্মাণ সম্ভব হচ্ছিল। এই অবস্থায় এই কণাগুলির মধ্যে অন্তরিক্ষ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। (নো, ব্যোম, পরঃ, যৎ) সেই সময় বিদ্যমান পদার্থের অবয়বসমূহ স্বতন্ত্রভাবে বিচরণ করছিল। কোনো অবয়ব অন্য কোনো অবয়বের আচ্ছাদক বা আচ্ছাদ্য ছিল না এবং না কেউ কারও রক্ষক বা রক্ষিত ছিল। এই কারণে সেই পদার্থের অবস্থা এমন ছিল, যেন তাদের অবয়বগুলির মধ্যে কোনো বল কার্যরতই নয়। এর অর্থ এই যে, সেই সময় বিদ্যমান বলসমূহ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্তরের। (কিম্, আবরীবঃ) সেই সময় বিদ্যমান পদার্থের অবয়বগুলির কোনো আবরণকারী ছিল না, অর্থাৎ তারা আবরণবিহীন অবস্থায় ছিল, যার ফলে সেই অবয়বগুলির পৃথক পৃথক পরিচয় নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না। এই কারণেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলেও মানবীয় সামর্থ্যের দৃষ্টিতে সেই সমগ্র পদার্থ একরসই ছিল। (কুহ, কস্য, শর্মন্) কে কার আবাস ছিল—অর্থাৎ কারও কোনো আবাস ছিল না। এই কারণে সমগ্র পদার্থ নিরন্তর স্বতন্ত্র রূপে সর্বত্র বিচরণ করছিল। এর দ্বিতীয় অর্থ এই যে, সেই সমগ্র পদার্থ প্রাণতত্ত্ব দ্বারা নির্মিত এবং প্রাণতত্ত্বের মধ্যেই সমাহিত ছিল কিংবা তাতেই বিচরণ করছিল। সেই সময় অবস্থা এমন ছিল, যেন প্রাণই প্রাণের মধ্যে বিদ্যমান বা বিচরণ করছে। (অম্ভঃ, কিম্ আসীত্, গহনম্, গভীরম্) সেই সময় কোন পদার্থ ব্যাপ্ত ছিল—অর্থাৎ তখন বিদ্যমান পদার্থের অবয়বগুলির মধ্যে কেউ কারও মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল না, বরং সকলেই প্রাণতত্ত্বের মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল। কোনো অবয়বই কঠিন রূপে বিদ্যমান ছিল না এবং না মধ্যমা বা বৈখরী ধ্বনির উৎপত্তি ঘটতে পেরেছিল।

ভাবার্থ — এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড সূক্ষ্ম বায়ু তত্ত্বের রূপে বিদ্যমান ছিল (বর্তমান পরিভাষায় একে ভ্যাকুয়াম এনার্জি বলা যেতে পারে, যার মধ্যে ডার্ক এনার্জিও অন্তর্ভুক্ত)। সেই সময় পর্যন্ত ফোটন অথবা মৌল কণার উৎপত্তি ঘটেনি, এই কারণে মানবীয় দৃষ্টিতে পদার্থ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। কণার অভাবে ধ্বনির মধ্যমা বা বৈখরী রূপেরও উৎপত্তি হয়নি। অতএব মানবীয় দৃষ্টিতে ব্রহ্মাণ্ডের সেই অবস্থা ছিল নিঃশব্দ। এর সঙ্গে সেই অবস্থা ছিল অতিশয় শীতলও। পদার্থের এই অবস্থার জ্ঞান বর্তমান বিজ্ঞানের নেই। বর্তমান বিজ্ঞান অগ্নি তত্ত্বের উৎপত্তির পর থেকেই সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মনে করে। কিন্তু বর্তমান বিজ্ঞান এই বিষয়টি চিন্তা করতে পারছে না যে অগ্নি তত্ত্ব, অর্থাৎ মৌল কণা ও ফোটন কোথা থেকে এলো, কীভাবে তৈরি হলো এবং কোন পদার্থ থেকে তৈরি হলো।

আধিভৌতিক ভাষ্য — বাংলা অর্থ

এখানে সেই সময়ের আলোচনা করা হয়েছে, যখন কোনো লোক বা জগতে মানবের ন্যায় প্রাণী প্রথমবারের মতো সেই লোকের গর্ভ থেকে যৌবন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। তার পূর্বে ভোগযোনিতে জন্ম নেওয়া বহু প্রাণীর আবির্ভাব ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছিল। তাদের জন্মও যৌবন অবস্থায় ভূমির গর্ভ থেকেই হয়। যখন চার ঋষি এখনও বেদের জ্ঞান লাভ করেননি, তখন এই পৃথিবীর পরিস্থিতি কেমন ছিল—অর্থাৎ ভূমি থেকে যৌবনে জন্ম নেওয়া যুবক-যুবতীদের সমাজ কেমন ছিল—তারই আলোচনা এখানে করা হয়েছে।

(ন, অসৎ, আসীত্, নো, সত্, আসীত্, তদানীম্) সে সময় ‘সৎ’ও ছিল না অর্থাৎ কোনো মানুষের নিকট সত্য জ্ঞান ছিল না। তারা সৃষ্টিকে, পরমাত্মাকে এবং নিজেদের প্রকৃত স্বরূপকে যথার্থভাবে জানত না। আবার ‘অসৎ’-ও ছিল না এর অর্থ এই যে প্রাথমিক প্রজন্মের মানুষরা বুদ্ধিহীন ছিল না। তারা ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান, পরম সত্ত্বগুণসম্পন্ন, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও শক্তিশালী। বর্তমান যুগের মহা বুদ্ধিমানদের তুলনায়ও তাদের বৌদ্ধিক স্তর ছিল অনেক উচ্চ অর্থাৎ তারা ঋষিদের ন্যায় প্রজ্ঞাসম্পন্ন ছিল। তবে নৈমিত্তিক (প্রযোজ্য) জ্ঞান লাভের পূর্বে তারা সেই প্রজ্ঞাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম ছিল না। তাদের মধ্যে মিথ্যাভাষণ প্রভৃতি আচরণ একেবারেই ছিল না, কিন্তু যথার্থ ব্যবহারিক জ্ঞান ও বিজ্ঞান সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট বোধ ছিল না। (ন, আসীত্, রজঃ, নো, ব্যোম, পরঃ, যত্) সে সময় কোনো মানুষ রাজ্য বা ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিল না অর্থাৎ পৃথিবীতে তখন কোনো রাজা ছিল না, কেউ কারও পালনকর্তা বা নেতা ছিল না। একইভাবে ‘ব্যোম’ অর্থে কেউ কারও প্রেরক বা বন্ধু ছিল না। সবাই ভূমির গর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করেছিল। ফলে কারও সঙ্গে কারও কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না (কিম্, আবরীবঃ) সে সময় কে কার রক্ষক ছিল? অর্থাৎ কেউ কারও রক্ষক বা রক্ষিত ছিল না; কেবল পরমাত্মাই সকলের রক্ষক ছিলেন। (কুহ, কস্য, শর্মন্) কোথায় কার বাসস্থান ছিল? অর্থাৎ তখন মানুষের কোনো স্থায়ী আবাস ছিল না। কেউ কারও আশ্রয়দাতা বা আশ্রিত ছিল না; বরং সবাই স্বাধীন ও নিরাপদ জীবন যাপন করত। (অম্ভঃ, কিম্, আসীত্, গহনম্, গভীরম্) সে সময় জ্ঞান ও বিদ্যার দৃষ্টিতে কে গভীর, গম্ভীর ও সর্বব্যাপী ছিল? কেউই নয়। একমাত্র পরমাত্মাই ছিলেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস।

ভাবার্থ — বাংলা অনুবাদ

সৃষ্টির প্রথম প্রজন্ম অত্যন্ত সুস্থ, শক্তিশালী, বিশালদেহী এবং মহান প্রজ্ঞার অধিকারী হয়। সেই প্রজন্মের মানুষেরা বর্তমান মানুষের ন্যায় অত্যন্ত নিম্ন স্তর থেকে উপদেশ পাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না। তবুও মোক্ষরূপ জীবনলক্ষ্য অর্জনের জন্য এবং সংসারিক ঐশ্বর্য লাভের জন্য নৈমিত্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন তাদেরও অনিবার্যভাবে থাকে। তাদের প্রজ্ঞার স্তর ঋষিদের ন্যায়ই হয়, কিন্তু সেই প্রজ্ঞাকে কার্যকর করার জন্য বিদ্যোপদেশ অপরিহার্য। তাদের একমাত্র উপদেশক ব্রহ্মই হতে পারেন, কারণ তিনিই একমাত্র সর্বজ্ঞ সত্তা।

এই অবস্থাতেই চার ঋষি ব্রহ্মাণ্ড থেকে বেদের ঋচাগুলি গ্রহণ করেন। তারা সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধির অবস্থায় এই ঋচাগুলি গ্রহণ করেন। সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধি সিদ্ধ করার যোগ্যতা তারা পূর্ববর্তী সৃষ্টিতে অথবা পূর্বে কোনো এক সময় মনুষ্যযোনি লাভ করার সময় থেকেই সংস্কাররূপে অর্জন করেছিলেন। তারা ঋচাগুলির গ্রহণ অবশ্যই করেন, কিন্তু সেই ঋচাগুলির অর্থবোধ ঈশ্বরের কৃপা দ্বারাই লাভ করেন। অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা—এই চার ঋষি আদ্য ব্রহ্মাকে সেই ঋচাগুলি এবং তাদের জ্ঞান উপদেশ করেন। বেদের সেই ঋচাগুলিতে সমগ্র সৃষ্টির সেই জ্ঞান বিদ্যমান থাকে, যা মানবজাতির জন্য অপরিহার্য এবং যে স্তরের জ্ঞান প্রথম প্রজন্ম সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম। পরবর্তীতে সেই জ্ঞান সকল মানুষের মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে যায়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

न मृ॒त्युरा॑सीद॒मृतं॒ न तर्हि॒ न रात्र्या॒ अह्न॑ आसीत्प्रके॒तः । 

आनी॑दवा॒तं स्व॒धया॒ तदेकं॒ तस्मा॑द्धा॒न्यन्न प॒रः किं च॒नास॑ ॥

ন মৃত্যুরাসীদমৃতং ন তর্হি ন রাত্র্যা অহ্ন আসীৎপ্রকেতঃ ।
আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধান্যন্ন পরঃ কিং চনাস ॥ ২ ॥

এটি বুঝতে হবে। এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎ।

আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক ভাষ্য ১-

(ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) [মৃত্যুঃ মৃত্যুঃর্বৈযমঃ (মৈ.সং. ২.৫.৬), মৃত্যুরগ্নিঃ (কাঠ. সং. ২১.৭), অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীরভবতি অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে (নিরু. ৭.১৪), মৃত্যুরপানো ভূত্বা নাভিং প্রাবিশৎ (ঐ.আ. ২.৪.২), অপানাৎ মৃত্যুঃ (ঐ.আ. ২.৪.১)]

সৃষ্টি-উৎপত্তি প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্বে পদার্থের অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, সেই সময় পদার্থের অবস্থা এমন ছিল যে প্রকৃতির অক্ষররূপ অবয়বসমূহ, যা অব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান ছিল, পরস্পর একে অপরকে রোধ করতে অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিল না, অর্থাৎ তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল না। সকলেই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রূপে বিদ্যমান ছিল। সেই সময় পদার্থ অগ্নিরূপেও ছিল না, অর্থাৎ কোনো সূক্ষ্ম ও স্বতন্ত্র অবয়ব পরস্পর একে অপরকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে সক্ষম ছিল না; অর্থাৎ না কেউ কারো অগ্রণী ছিল, না কেউ কারো অনুগামী ছিল। না কেউ কাউকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম ছিল, না কেউ কারো সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রবৃত্ত ছিল—অর্থাৎ সংযোগ-বিয়োগের কোনো কার্য কোথাও ছিল না, সর্বত্র পূর্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজমান ছিল। না কেউ কাউকে নিজের থেকে দূরে সরাতে সক্ষম ছিল, না অক্ষররূপ অবয়বগুলির মধ্যে কোনো অবকাশই ছিল, না তারা পরস্পর একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

‘মৃত্যুঃ’ পদের নির্বচন করতে গিয়ে মহর্ষি যাস্ক লিখেছেন—

মারয়তীতি সতঃ ।
মৃতং চ্যাবয়তীতি বা শতবলাক্ষো মৌদ্গল্যঃ । (নিরু. ১১.৬)

এর অর্থ এই যে, সেই সময় কোনো অবয়বই কাউকে ধ্বংস করতে সক্ষম ছিল না এবং গতি প্রদান করতেও সক্ষম ছিল না।

(অমৃতম্, ন, তর্হি) [অমৃতম্ অমৃতং হিরণ্যনাম (নিঘং. ১.২), উদকনাম (নিঘং. ১.১২), অমৃতেষু দেবেষু (নিরু. ৮.২০), অমৃতাঃ দেবাঃ (শত. ২.১.৩.৪), অমৃতং বৈ প্রাণাঃ (গো.উ. ১.৩), অমৃতত্বং বা আপঃ (কৌ.ব্রা. ১২.১)] সেই সময় পদার্থ সম্পূর্ণরূপে তেজশূন্য ছিল, অর্থাৎ সম্পূর্ণ অন্ধকারময় ছিল। সেই পদার্থে কোথাও হরণশীলতার গুণ ছিল না। সেই সময় কোনো দেব-পদার্থ বিদ্যমান ছিল না। এর তাৎপর্য এই যে, কোনো পদার্থই না কোনো প্রকার গতিযুক্ত ছিল, না কোনোতে দীপ্তি ছিল, না কোনোতে আকর্ষণ বল ছিল এবং না পদার্থসমূহের এদিক-ওদিক বিনিময় ঘটছিল। সেই সময় প্রাণতত্ত্বও ছিল না এবং কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থে ব্যাপ্ত ছিল না।

(ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, প্রকেতঃ, আসীত্) [রাত্রিঃ ভ্রাতৃব্যদেবত্যা রাত্রিঃ (তৈ.ব্রা. ২.২.৬.৪), রাত্রির্বরুণঃ (ঐ.ব্রা. ৪.১০, তাং. ব্রা. ২৫.১০.১০), তমঃ পাপ্মা রাত্রিঃ (গো.উ. ৫.৩), রাত্রিঃ সাবিত্রী (গো.পূ. ১.৩৩)। অহন্ অহর্বে মিত্রঃ (ঐ.ব্রা. ৪.১০), অহনা উষোনাম (নিঘং. ১.৮)] সেই সময় কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থকে না তার অবস্থান থেকে বিচলিত করতে সক্ষম ছিল এবং না বাঁধতে বা ধ্বংস করতে সক্ষম ছিল। কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থকে না প্রেরণা দিতে সক্ষম ছিল এবং না উৎপন্ন করতেও সক্ষম ছিল। সেই সময় কোনো পদার্থই অন্য পদার্থের সঙ্গে সংযুক্ত হতে প্রবৃত্ত হতে পারত না এবং কোথাও দাহকতা বা আলোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কোথাও অন্ধকার বা আলোর আগমন-গমনেরও কোনো চিহ্ন ছিল না।

(আনীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) [বাতঃ বাতো বৈ যজ্ঞঃ (শ.ব্রা. ৩.১.৩.২৬), বাতো হি বায়ুঃ (শ.ব্রা. ৮.৭.৩.১২)। আনীত্ জীবনং ধারয়তি (স্বামী ব্রহ্মমুনি ভাষ্য)] নিজের ধারণাশক্তির দ্বারা কাল বা পরমাত্মতত্ত্ব, বায়ুতত্ত্বের উৎপত্তি না হয়েও, সমগ্র উপাদান পদার্থে বল ও গতির সঞ্চারকারী একমাত্র তত্ত্ব হয়ে থাকে। পরমাত্মার শক্তি স্বাভাবিক, যেমন উপনিষৎকার বলেছেন—

‘স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ’ (শ্বে.উ. ৬.৮)।

যেমন পরব্রহ্ম পরমাত্মা এক হয়েও সর্বব্যাপী, তেমনই কালতত্ত্বও পরমাত্মা দ্বারা নিরন্তর প্রেরিত হয়ে সদা সমান গতিতে গমন করতে থাকে। তিনিই সৃষ্টির সকল পদার্থের ধারক এবং সকলকে প্রাণত্বও প্রদান করেন। সেই ঈশ্বর ও কালতত্ত্ব অবাত রূপ। এর তাৎপর্য এটিও যে, তাঁরা কোনো যজন প্রক্রিয়ার অঙ্গ নন। কালতত্ত্ব কখনোই কোনো পদার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না, অর্থাৎ তার পথে কোনো পদার্থের প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না।

(তস্মাত্, হ, অন্যৎ, কিঞ্চন, পরঃ, ন, আস) এই ব্রহ্ম ও কাল—এই উভয়ের অতিরিক্ত আর কোনো অন্য পদার্থ বিদ্যমান থাকে না, যা সেই মূল পদার্থকে ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে; সুতরাং এদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ কোনো পদার্থের অস্তিত্ব থাকা তো সম্ভবই নয়।

ভাবার্থ— সৃষ্টির পূর্বে মূল উপাদান পদার্থে অক্ষররূপ অবয়বসমূহ পৃথক্‌ পৃথক্‌ স্বাধীন অবস্থায় সম্পূর্ণরূপে নিশ্চল হয়ে সর্বত্র বিদ্যমান থাকে। সেই অবয়বগুলির মধ্যে না কোনো শূন্যস্থান থাকে এবং না তারা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে। তাদের মধ্যবর্তী স্থানে কেবল পরমাত্মাই বিদ্যমান থাকেন। সেই অবয়বগুলির মধ্যে কোনো প্রকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও বলশীলতা বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় পদার্থ সম্পূর্ণরূপে আলোকহীন, ক্রিয়াহীন ও বলহীন অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। সেই পদার্থে না কেউ কারো বাধা হয় এবং না কেউ কারো দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়, না কোনো পদার্থ উৎপন্ন হয় এবং না কেউ কারো উৎপাদক হয়। কোথাও অন্ধকার ও আলোর কোনো চক্রও চলে না, বরং সেই সময় সর্বত্র ঘন অন্ধকারই বিরাজ করে। সেই সময় পরব্রহ্ম পরমাত্মাই নিজের স্বাভাবিক ধারণাশক্তির সঙ্গে অব্যক্ত কালতত্ত্বের দ্বারা সমগ্র পদার্থকে একাই ধারণ করে রাখেন। তাঁর থেকে ভিন্ন অন্য কোনো ধারক পদার্থ বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা জ্ঞাত বা কল্পিত আকাশ, শক্তি, দ্রব্য, বৈদ্যুতিক আধান, ভর, শব্দ, তাপ ইত্যাদির কোনোটিরই কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র আকাশে কোনো ফোটন ও মূলকণ উৎপন্ন হয়নি। এই কারণে সেই অবস্থা অত্যন্ত শীতল ও অন্ধকারপূর্ণ ছিল। যে পদার্থ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল, তাতেও বিনাশ বা ক্ষয়ের কোনো প্রক্রিয়া চলছিল না। (অমৃতম্, ন, তরহি) সেই সময় পদার্থে প্রাণত্বও অত্যন্ত অল্প ছিল; এর অর্থ এই যে, সেই বায়ব্য অবস্থাসম্পন্ন পদার্থে বল ও গতির বিশেষ তীব্রতা ছিল না। [অমৃতম্ = অমৃতং হিরণ্যমমৃতমেষ (আদিত্যঃ) (শ. ব্রা. ৬.৭.১.২)] সূক্ষ্ম কণিকা, তীব্র বল ও তাপের অভাবে আদিত্যাদি লোকসমূহের নির্মাণকার্যও তখন আরম্ভ হতে পারছিল না।

(ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, আসীত্, প্রকেতঃ) সমগ্র পদার্থে কৃষ্ণ ও শ্বেত বর্ণের কোনো লক্ষণ ছিল না; বরং সমগ্র পদার্থই তম দ্বারা আবৃত বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল। সেই পদার্থের বর্ণে কোনো ওঠানামা ছিল না, বরং সমগ্র পদার্থই একরূপ বলে বোধগম্য ছিল। [অহন্ = অহর্বৈ বিয়চ্ছন্দঃ (শ. ব্রা. ৮.৫.২.৫)। রাত্রিঃ = রাত্রির্বৈ সংযচ্ছন্দঃ (শ. ব্রা. ৮.৫.২.৫)] সেই সময় পর্যন্ত যে সকল ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়েছিল, তারা পরস্পরের নিকটে ছিল না, আবার অতিদূরেও ছিল না। এর তাৎপর্য এই যে, তাদের মধ্যে সংঘননের প্রক্রিয়াও তখনো আরম্ভ হয়নি এবং তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টাও করছিল না।

(আনীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) [স্বধা = দ্যাবাপৃথিব্যোর্নাম (নিঘং. ৩.৩০)] সেই সময় সূক্ষ্ম প্রাণতত্ত্ব তার সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক শক্তি ও আকাশতত্ত্বের সঙ্গে কোনো তীব্র আন্দোলন ছাড়াই একাই সমগ্র পদার্থকে ধারণ করে রেখেছিল। লক্ষণীয় যে, প্রাণ-আপানই সূক্ষ্ম বিদ্যুতের রূপ, যাকে দ্যৌও বলা হয়। এখানে পৃথিবী পদ দ্বারা আমরা আকাশতত্ত্বেরই গ্রহণ করেছি। সেই সময় বলের আর কোনো রূপ উৎপন্ন হয়নি, এই কারণেই এখানে ‘একম্’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে। (তস্মাত্, হ, অন্যত্, ন, কিঞ্চন, পরঃ, আস) সেই প্রাণতত্ত্ব ব্যতীত অন্য কোনো পদার্থই ধারণাশক্তিসম্পন্ন ছিল না, যা সমগ্র পদার্থকে ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে। লক্ষণীয় যে, সেই সময় বহু প্রকার ছন্দ রশ্মিও উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেগুলিকেও বৃষারূপ প্রাণ রশ্মিগণই ধারণ করে রেখেছিল।

ভাবার্থ— এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র পদার্থ শীতল ও অন্ধকারপূর্ণ ছিল। তাতে ক্ষয় ও বৃদ্ধির কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া চলছিল না। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড একটিমাত্র কৃষ্ণ বর্ণের ছিল। সেই পদার্থের অবয়বরূপ ছন্দ রশ্মিগুলি পরস্পরের খুব নিকটে ছিল না এবং অতিদূরেও ছিল না। এই কারণে সৃজন ও বিনাশের কোনো লীলাও তখন চলছিল না। সেই সময় সূক্ষ্ম প্রাণবল—যা বিদ্যুতেরই অতি সূক্ষ্ম বা সূক্ষ্মতম রূপ—সর্বত্র বিদ্যমান ছিল। সেই বলই সমগ্র পদার্থকে ধারণ করে রেখেছিল। বর্তমান বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, সেই সময় কোনো প্রকার বিক্ষোভ ও স্পন্দন (ফ্লাকচুয়েশন) ব্যতীত ভ্যাকুয়াম এনার্জিই সর্বত্র নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পরিপূর্ণ ছিল।

আধিভৌতিক ভাষ্য – (ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) মানব সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের মানুষদের কাছে মৃত্যু অর্থাৎ ত্রিবিধ দুঃখের মধ্যে কোনো প্রকার দুঃখই ছিল না, কারণ সেই সময় পরিবেশ ইত্যাদি সবকিছুই সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুষম ছিল। (অমৃতম্, ন, তরহি) সেই সময় অমৃত অর্থাৎ মোক্ষসদৃশ আনন্দও সেই মানুষদের প্রাপ্ত ছিল না। যদিও প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাবৃত্ত হয়ে এসেছিল, তবুও তারা তখন মোক্ষসুখ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। তারা জীবন্মুক্ত অবস্থাও লাভ করেনি। (ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, আসীত্, প্রকেতঃ) সেই সময় মানুষ অজ্ঞানরূপ রাত্রিতেও আক্রান্ত ছিল না এবং তার মধ্যে বিদ্যার আলোও ছিল না; অর্থাৎ অজ্ঞান ও জ্ঞান উভয়েরই কোনো লক্ষণ ছিল না। (আসীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) সেই মানুষ একমাত্র নৈমিত্তিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ছিল; নৈমিত্তিক জ্ঞান ব্যতীত সে সর্বদিক থেকেই পরিপূর্ণ ছিল। সে স্বধা অর্থাৎ নিজের অতুলনীয় স্বাভাবিক জ্ঞানের দ্বারা পূর্ণ প্রাণত্বসহ সর্বতোভাবে সুখী ও সুস্থ জীবন যাপন করছিল। (তস্মাত্, হ, অন্যত্, ন, পরঃ, কিঞ্চন, আস) সেই নৈমিত্তিক জ্ঞানের অভাব ব্যতীত তার আর কোনো প্রকার অভাব ছিল না। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষের অতিরিক্ত আর কোনো প্রাণীই এই স্তর প্রাপ্ত ছিল না।

ভাবার্থ— যখন প্রথমবার মানুষ এই পৃথিবীতে বা অন্য যে কোনো লোকেই জন্ম গ্রহণ করে, তখন সমগ্র পৃথিবীর ভূমি, জল ও বায়ু তাদের সর্বাধিক শুদ্ধ অবস্থায় থাকে। এই কারণে সমগ্র উদ্ভিদজগতও অত্যন্ত পুষ্ট ও সুস্থ হওয়ায় পুষ্টিগুণ ইত্যাদিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ থাকে। এর ফলে এদের উপর নির্ভরশীল সমস্ত প্রাণীও সম্পূর্ণ সুস্থ ও বলবান হয়। পরিবেশের পূর্ণ বিশুদ্ধতার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগব্যাধির কোনো চিহ্নমাত্রও থাকে না। সমগ্র পৃথিবী ফল, পুষ্প, শাক, অন্ন ও ঔষধিতে আচ্ছাদিত থাকে। নদী ও সরোবরসমূহ এমন শুদ্ধতম পানীয় জলে পরিপূর্ণ থাকে, যা নানা প্রকার জীবনোপযোগী তত্ত্বে সমৃদ্ধ। সেই প্রথম প্রজন্মের মানুষ বর্তমানকালে জন্ম নেওয়া মানুষের ন্যায় অতি অল্প স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে নয়, বরং সর্বাধিক ও শ্রেষ্ঠতম স্বাভাবিক জ্ঞান নিয়ে পূর্ণ যৌবনাবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। সে তার অতুল স্বাভাবিক জ্ঞান, সর্বোৎকৃষ্ট প্রজ্ঞা, অনুপম সত্ত্বগুণসম্পন্নতা, অতুল শারীরিক বল ও পূর্ণ স্বাস্থ্য ধারণ করে মোক্ষসুখ ব্যতীত সমস্ত সাত্ত্বিক সুখ লাভকারী হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী এই গুণসমূহে সম্পন্ন হয় না। এর সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকার পরিবেশ এই পৃথিবীতে আর কখনো কোনো প্রজন্মের জন্য সুলভ হয় না এবং না এত স্বাভাবিক জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠতম প্রজ্ঞা পুনরায় কোনো প্রজন্ম প্রাপ্ত করে। সেই প্রজন্ম নিজের মধ্যেই অনুপম ও অতুলনীয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

तम॑ आसी॒त्तम॑सा गू॒ळ्हमग्रे॑ऽप्रके॒तं स॑लि॒लं सर्व॑मा इ॒दम् । 

तु॒च्छ्येना॒भ्वपि॑हितं॒ यदासी॒त्तप॑स॒स्तन्म॑हि॒नाजा॑य॒तैक॑म् ॥

তাম্ আসীত্ তমসা গুঢ়হম্ অগ্রেऽপ্রকেতং সালিলং সর্বমা ইদম্। 

তুচ্ছ্যেনাভ্বপিহিতং যাদাসীত্তপস্তন্মহিনাজায়তৈকং ॥ ৩॥

এই মন্ত্রের ঋষি, দেবতা এবং ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎ।

আধিদৈবিক ভাষ্য ১-

(অগ্রে, তমসা, গুঢ়ম্, তমঃ, আসীত্) এখানে 'তমঃ' পদ প্রকৃতি অর্থাৎ সৃষ্টির মূল উপাদান কারণরূপ পদার্থের নির্দেশক। মহাভারত আশ্বমেধিক পার্ব, অনুগীতা পার্বের অধ্যায় ৩৯, শ্লোক ২৩-এ মহর্ষি ব্রহ্মা জী প্রকৃতির বিভিন্ন নির্দেশক মধ্যে 'তমঃ'কেও একটি নির্দেশক হিসাবে গণ্য করেছেন—

তমো ব্যক্তং শিবং ধাম রজো যোনিঃ সনাতনঃ। 

প্রকৃতির বিকারঃ প্রলয়ঃ প্রধানং প্রভাবাপ্যয়ৌ॥

'তমঃ' সম্পর্কে মহর্ষি যাস্কের বক্তব্য— তমঃ তনোতেঃ (নিরু. ২.১৬)। এটি প্রকৃতি রূপী মূল পদার্থ সর্বত্র বিস্তৃত থাকে এবং গভীর অন্ধকারে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত থাকে। এটি এই ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় অনেক বিস্তৃত এবং আমাদের কল্পনার যে কোনো গভীর অন্ধকার থেকেও অধিক অন্ধকারযুক্ত। সেই অন্ধকারে কোথাও কোনো বিচ্যুতি নেই; অর্থাৎ সেই অন্ধকারও একরূপ। (ইদং, সর্বং, সালিলং, আহ্, অপ্রকেতম্) [আঃ ব্যাপতা (আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী)] সর্বপ্রথম এই সমগ্র সৃষ্টিই সম্পূর্ণরূপে লক্ষণহীন থাকে, অর্থাৎ তার রূপকে কোনোভাবেই প্রকাশ করা যায় না। এই পদার্থের মধ্যেই এই সমগ্র সৃষ্টির মিলন ঘটে। সেই পদার্থ সমগ্র শূন্যরূপ আকাশে বিস্তৃত থাকে। এখানে 'সালিল' পদার্থের সেই রূপের নাম, যেখানে সমস্ত পদার্থ সম্পূর্ণভাবে মিলিত হয় এবং যেখান থেকে কোনো ক্ষুদ্র জড় পদার্থের কল্পনাও করা যায় না। সেই পদার্থ সর্বত্র সমান রূপে বিদ্যমান। সেজন্যে ভগবান শিব মহাভারত, অনুশাসন পার্ব, দানধর্ম পার্বের ১৪৫তম অধ্যায়ে সেই পদার্থের নির্দেশক ‘এক’ বলেও উল্লেখ করেছেন। অপর দিকে মহর্ষি ব্রহ্মা সেই পদার্থের প্রলয় এবং অপ্যয়—এই দুই নির্দেশক হিসেবেও গণ্য করেছেন।

(তুচ্ছ্যেন, আভু, আপিহিতম্, যৎ, আসীত্) [আভু রিক্তঃ (তু.ম.দ.য.ভা.১৬.১০)] সেই পদার্থটি এতটা দুর্বল বা ক্ষুদ্র যে তাকে শূন্যের মতো ধরা যায়। এমন পদার্থ তার অতিসূক্ষ্মতার সঙ্গে গোপন রূপে বিদ্যমান থাকে। এর অর্থ হলো এটি থাকা সত্ত্বেও না থাকার মতো প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় অর্থ, সেই পদার্থটি পরমপিতা পরমাত্মার তুলনায় তুচ্ছ। বিস্তৃতির দিক থেকে ঈশ্বর প্রকৃতির চেয়ে মহান, এবং ঈশ্বর প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক হওয়ায় প্রকৃতিও তার কাছে তুচ্ছ। এছাড়াও ঈশ্বর প্রকৃতির চেয়ে অতিসূক্ষ্ম। এই অবস্থায় প্রকৃতির সত্ত্বাদি তিনটি গুণও গোপন থাকে। গোপন থাকার ফলে সমগ্র জড় পদার্থের অন্যান্য সমস্ত উৎপন্ন গুণ ও কর্মও গোপন থাকে। (তপসঃ, তৎ, একম্, মহিনা, অজায়ত) [তপঃ তপো দীক্ষা (শ. ভ্রা. ৩.৪.৩.২), মনঃ হা ভাভ তপঃ (জৈ. ভ্রা. ৩.৩৩৪)। মহি মহি মহৎ (নিরু. ১১.৯)] সেই গোপন রূপে থাকা পদার্থ বা মূল উপাদানভূত পদার্থে গোপন বা মিলিত বিশ্ব পরমেশ্বরের বিজ্ঞানেরূপ মহান সামর্থ্য দ্বারা প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় অর্থ, যে একরূপ উপাদান পদার্থ তার অতিসূক্ষ্মতার কারণে গোপন থাকে, তা একরূপ ও অব্যক্ত পদার্থ পরমেশ্বরের প্রভাবে প্রকাশিত অবস্থায় আসে, অর্থাৎ সৃষ্টির জন্য উদগ্রীব হয়।

ভাবার্থ - মহাপ্রলয়ের সময় সমগ্র প্রকৃতি পদার্থ গভীর অন্ধকারে আচ্ছাদিত থাকে। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড (ক্ষুদ্রতম পদার্থ থেকে বিশাল লোক-লোকান্তর পর্যন্ত) তাতে মিলিত থাকে। সেই পদার্থকে চিনতে কোনো লক্ষণ বা চিহ্ন থাকে না। তার সূক্ষ্মতার কারণে এটি শূন্যের মতো প্রতীয়মান হয়। আজ আমরা আকাশ মহাতত্ত্বকে শূন্যের মতো ধরি, কিন্তু প্রকৃতিরূপ পদার্থের তুলনায় আকাশ মহাতত্ত্বও অনেক ঘন। পরমপিতা পরমাত্মার দৃষ্টিতে সেই প্রকৃতি পদার্থের সূক্ষ্মতা এবং বিস্তৃতিও খুব তুচ্ছ। সেই পদার্থের শূন্যের মতো সূক্ষ্মতায় তার সমস্ত গুণ-কর্ম-স্বভাব লুকিয়ে থাকে। সেই সময়ে পরমেশ্বরের সমস্ত জ্ঞানও সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করা হয়নি, তাই তা গোপন থাকে। পরম ব্রহ্ম পরমাত্মার জ্ঞান ও শক্তিরূপ সামর্থ্যের দ্বারা সেই প্রকৃতিরূপ পদার্থ তার গুণ, কর্ম এবং স্বভাবসহ প্রকাশিত হতে শুরু করে, যার মাধ্যমে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। লক্ষ্যযোগ্য, সেই জড় পদার্থ নিজে থেকেই সৃষ্টির উদ্রেক করতে পারে না। জড় পদার্থকে কার্যকর করা হল চেতনারই সামর্থ্য, এবং প্রকৃতির বিষয়ে সেই চেতনা হল পরমেশ্বর পরমাত্মা।

(অগ্রে, তমসা, গূঢম্, তমঃ, আসীত্) [তমঃ রাত্রিনাম (নিঘ. ১.৭), কৃষ্ণমিভ হি তমঃ (তাং. ভ্রা.৬.৬.১০)] এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে যদিও অনেক ছন্দ রশ্মি ইতিমধ্যেই উৎপন্ন হয়ে গেছে, তবু সমগ্র পদার্থ কৃষ্ণবর্ণেরই ছিল, কারণ সমস্ত ছন্দ রশ্মির বর্ণ অব্যক্তাবস্থায়ই বিদ্যমান ছিল। নেকত্র ফোটনের মাধ্যমে সমস্ত পদার্থকে দেখে, কিন্তু সেই দৃশ্যমান পদার্থও মূল কণার দ্বারা নির্মিত। এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে ন ফোটনের উৎপত্তি হয় এবং ন কণারও। এই কারণে সেই সময় কিছুই দৃশ্যমান ছিল না, তাই এটিকে অন্ধকারে আচ্ছাদিত বলা হয়েছে।

(অপ্রকেতম্, সলিলম্, সর্বম্, আঃ, ইদম্) এটি যে প্রকৃত জগৎ, তা সেই বায়ব্য অবস্থাপ্রাপ্ত পদার্থে লীন থাকে। সেই পদার্থ এই জগতের তুলনায় বেশি বিস্তৃত। যদিও সেই অবস্থায় গতি এবং সূক্ষ্ম বল বিদ্যমান, তবু সেই অবস্থায় প্রাণীর দৃষ্টিতে তা অলক্ষণা থাকে। আমরা বায়ুতত্ত্বকে আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি অনুভব করতে পারি না। (তুচ্ছ্যেন, যৎ, আপিহিতম্, আভু, আসীত্) সেই পদার্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, এবং এই সূক্ষ্মতার কারণে এটি অদৃশ্য ও ব্যাপক। সেই বায়ব্য অবস্থায় সমস্ত কণা বা ফোটনের মতো সূক্ষ্ম পদার্থ যেন গোপন থাকে। (তপসঃ, তৎ, মহিনা, একম্, অজায়ত) এই ছন্দ রশ্মির তীক্ষ্ণ তেজ ও বলের প্রভাবে এবং এর সঙ্গে উৎপন্ন অন্যান্য রশ্মির প্রভাবে পদার্থ উৎপন্ন হতে শুরু করে, অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্বের উদ্ভব হয়, যার ফলে তাপ ও আলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

ভাবার্থ - এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অবস্থা বর্তমান বিজ্ঞানের দ্বারা অনুমেয় ভ্যাকুয়াম এনার্জির মতো। বৈদিক ভাষায় এটিকে বায়ু তত্ত্ব বলা হয়। এর ক্রিয়াকলাপ সরাসরি দেখা কঠিন, তাই এটিকে অন্ধকারপূর্ণ অবস্থা বলা হয়। প্রলয় প্রক্রিয়ার সময় মহাপ্রলয়ের পূর্বে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড এই অবস্থায় লীন থাকে। এটি পদার্থের সেই সূক্ষ্ম রূপ, যা তার সূক্ষ্মতার কারণে আমাদের দৃষ্টিতে গোপন। বর্তমান বিজ্ঞান ভ্যাকুয়াম এনার্জি এবং ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব মানে, তবে তা সরাসরি প্রদর্শন করতে পারে না, কারণ তা আমাদের প্রযুক্তির ক্ষমতার বাইরে। এই সূক্ষ্ম এনার্জির দ্বারা এই ছন্দ রশ্মি ও অন্যান্য তৃষ্টুপ ছন্দ রশ্মির তেজ, তাপ ও বলের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কণার জগত প্রকাশ পেতে শুরু করে।

(অগ্রে, তমসা, গূঢম্, তমঃ, আসীত্) সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে যখন চার ঋষি সমাধি অবস্থায় আকাশ থেকে বৈদিক ছন্দ গ্রহণ করেন, তখনও তারা এই মন্ত্রগুলোর অর্থ সম্পর্কে অনভিজ্ঞই থাকেন। অর্থাৎ, মহাপ্রজ্ঞা এবং সতৎসত্ত্বগুণে সমৃদ্ধ এই ঋষিরা বৈদিক মন্ত্রগুলো অন্তঃকরণে ধারণ করলেও, তাদের অর্থবোধের দিক থেকে অজ্ঞতার অন্ধকারে অবস্থান করতেন। এখানে 'তমঃ' এবং 'তমসা' এই দুটি পদ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি তমঃ হলো যা ঋষিদের অন্তঃকরণে ছন্দ গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান ছিল, আর অন্য তমঃ হলো যা ছন্দ রশ্মি গ্রহণের পরও তাদের অর্থের প্রতি অনভিজ্ঞতা হিসেবে বিদ্যমান ছিল, যাকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেও দূর করতে পারছিল না।

(ইদম্, সর্বम्, সলিলम्, আঃ, অপ্রকেতম্) সমস্ত বৈদিক জ্ঞান সেই ছন্দগুলিতে পূর্ণরূপে লীন ছিল, যা ঋষিদের হৃদয়ে নিহিত হয়ে গেছে। এখানে 'আঃ' পদ নির্দেশ করে যে, সেই বিশাল সৃষ্টির সমস্ত জ্ঞান সেই ছন্দগুলিতে বিদ্যমান ছিল, কিন্তু ঋষিরা তা থেকে অজ্ঞই ছিলেন। (তুচ্ছ্যেন, যৎ, আপিহিতম্, আভু, আসীত্) ঋষিদের দ্বারা ধারণ করা ছন্দ রশ্মিগুলিতে বিদ্যমান জ্ঞান পরমেশ্বরের পূর্ণ জ্ঞানের তুলনায় তুচ্ছ বা অল্পমাত্রার ছিল, অর্থাৎ সেই জ্ঞান পরমেশ্বরের সার্বজ্ঞতা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। (তপসঃ, তৎ, মহিনা, একম্, অজায়ত) ঋষিরা যে তপস্যা ও সাধনা করেছিলেন এবং সেই অদ্বৈত পরমেশ্বরের দয়ালু প্রভাবে, তাদের অন্তঃকরণে সেই ছন্দ রশ্মিগুলির জ্ঞান প্রকাশ পেতে শুরু করে।

ভাবার্থ – প্রতিটি মানব সৃষ্টিতে প্রথম প্রজন্মের সকল মানুষ পূর্ণ প্রজ্ঞা ও সত্ত্বগুণে সমৃদ্ধ থাকে, তবে তাদের মধ্যেও চারজন মানুষ অন্যদের তুলনায় সর্বশ্রেষ্ঠ হন। এমনটি প্রত্যেক সৃষ্টিতেই ঘটে। এই কারণেই অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা—এই চারটি নাম কেবল এই সৃষ্টি ও এই পৃথিবীতে উৎপন্ন চারজন নির্দিষ্ট ঋষির নাম নয়, বরং এগুলি যোগরূঢ় নাম। যখন এই ঋষিরা ব্রহ্মাণ্ড থেকে বৈদিক মন্ত্র গ্রহণ করেননি, তখন তারা সৃষ্টিবিজ্ঞান ও তজ্জনিত মোক্ষজ্ঞানের বিষয়ে অনভিজ্ঞ থাকেন, যদিও তারা পালন, রক্ষণ ও বংশবৃদ্ধি প্রভৃতি জীবনোপযোগী জ্ঞানে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হন। তাদের অন্তঃকরণে অবতীর্ণ বৈদিক ছন্দ রশ্মিগুলি এই জ্ঞানের ভাণ্ডার হলেও, তবুও সেই জ্ঞানের বিষয়ে তারা অনবহিতই থাকেন। ঐ মন্ত্রগুলিতে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান নিহিত থাকে, তা পরমেশ্বরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনায় অত্যন্ত তুচ্ছ। যখন সেই ঋষিরা সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হন, তখন পরমেশ্বরের সান্নিধ্য ও কৃপায় তাদের সেই মন্ত্রগুলির বিজ্ঞানবোধ লাভ হতে শুরু করে। এটাই মানুষের মধ্যে জ্ঞানের উৎপত্তির প্রক্রিয়া।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

काम॒स्तदग्रे॒ सम॑वर्त॒ताधि॒ मन॑सो॒ रेत॑: प्रथ॒मं यदासी॑त् । 

स॒तो बन्धु॒मस॑ति॒ निर॑विन्दन्हृ॒दि प्र॒तीष्या॑ क॒वयो॑ मनी॒षा ॥

কামস্তদগ্রে সমবর্ততাধি মনসো রেতঃ প্রথমং যদাসীত্ । 

সতঃ বন্ধুমসতি নিরবিন্দন্ হৃদী প্রতীষ্যা কবয়ো মনীষা ॥ ৪॥

এই মন্ত্রের ঋষি ও দেবতা পূর্ববৎ। এর ছন্দ ত্রিষ্টুপ্ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাব পূর্বের তুলনায় কিছু কম তীক্ষ্ণ।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(কামঃ, তৎ, অগ্রে, যৎ, মনসঃ, অধি, সম্, অবর্তত) মহাপ্রলয়ের অবস্থায় যখন সৃষ্টির উৎপত্তির সময় আসে, তখন সর্বপ্রথম পরমেশ্বরের বিজ্ঞানরূপ সামর্থ্যের মধ্যে সৃষ্টি উৎপন্ন করার অভিলাষ প্রকাশ পায়। ঈশ্বরের ইচ্ছা আমাদের জীবদের ইচ্ছার ন্যায় নয়। তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, যা নির্দিষ্ট সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপন্ন হয়। (প্রথমম্, রেতঃ, আসীত্) সেই ইচ্ছাই এই সৃষ্টির বীজ, যার অভাবে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আরম্ভই হতে পারে না। [রেতঃ বাগ্রেতঃ (শ. ব্রা. ১.৭.২.২১), রেতো বৈ বৃষ্ণ্যম্ (শ. ব্রা. ৭.৩.১.৪৬)] নির্বিকার ব্রহ্মে ইচ্ছা কীভাবে ও কোথায় উৎপন্ন হয়—এই সংশয়ের সমাধান মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের উপর্যুক্ত বক্তব্যে পাওয়া যায়। মহাপ্রলয়ের অবস্থায় কালতত্ত্ব অর্থাৎ ‘ওঁ’ ছন্দ রশ্মি সম্পূর্ণ অব্যক্ত পরা রূপে সমগ্র প্রকৃতি পদার্থে বিদ্যমান থাকে। তার সম্পর্ক পরমাত্মার সঙ্গে নিত্য বিদ্যমান থাকে। এই ‘ওঁ’ রশ্মির মধ্যেই—যা প্রকৃতপক্ষে পরা রশ্মিরও রূপ নয়, বরং সম্পূর্ণ অব্যক্ত ‘ওঁ’ অক্ষররূপে অবস্থান করে জাগরণের ইচ্ছা আরম্ভ হয়। এই ইচ্ছা পরমেশ্বরের প্রেরণা ও বিজ্ঞান থেকেই উৎপন্ন হয়। এই অবস্থাই সেই সন্ধি, যা সৃষ্টি ও প্রলয়—উভয় প্রক্রিয়াকে অব্যক্তভাবে সংযুক্ত করে এবং এটিই সৃষ্টির উৎপত্তির বীজও।

(হৃদি, প্রতীষ্যা, কব্যঃ, মনীষা) শব্দকে উৎপন্নকারী ব্রহ্ম তার সর্বব্যাপক চিন্তাশীল সামর্থ্যের মাধ্যমে অব্যক্ত কালতত্ত্বের মধ্যে সৃষ্টির সময় অনুভব করে (সতঃ, বন্ধুম্, অসতি, নির্, অবিন্দন্) অসত্ রূপ, অর্থাৎ অব্যক্ত প্রকৃতি পদার্থের মধ্যে সত্ রূপ পদার্থ বা জগতের [বন্ধুঃ = সম্পর্ক বা সংযুক্তি] সৃষ্টির প্রক্রিয়ার নিয়ম বা বন্ধন লাভ করে। এই নিয়মগুলোই সমগ্র সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে পরিপূর্ণ বা সম্পন্ন করে এবং তাদের জ্ঞান কালতত্ত্বের মধ্যে নিহিত হয়ে যায়।

ভাবার্থ — সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাবর্তিত হয়েই আগমন করে এবং তাদের জন্ম পৃথিবীর গর্ভ থেকেই হয়। এই কারণে তাদের মধ্যে কামসংস্কারের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। ফলে সেই যৌবনপ্রাপ্ত অবস্থায় উদ্ভূত নারী ও পুরুষদের মধ্যে পরমাত্মা সর্বপ্রথম কামভাবের উদ্ভব ঘটান। এই কামই পরবর্তী প্রজন্মের বীজ। সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের সময় পৃথিবীর ভূমিস্তর কোমল, স্নিগ্ধ এবং সকল প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তিসম্পন্ন তত্ত্বে পরিপূর্ণ থাকে। পরবর্তীকালে তা ধীরে ধীরে কঠোর হয়ে যেতে থাকে। এই কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলির উৎপত্তি পৃথিবীর গর্ভ থেকে আর সম্ভব হয় না। অতএব সেই প্রাণী বা মানুষের মধ্যে কামভাবের উদয়ের অনিবার্যতা সৃষ্টি হয়। নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে কেবল একটি প্রজন্মই পৃথিবীর গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়, না কি আরও কিছু প্রজন্মও হয়। এখানে কামভাবের উদ্ভবের কথা সেই প্রজন্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যার পর পৃথিবীর গর্ভ থেকে এদের উৎপত্তির পরিস্থিতি আর বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় কামভাবের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীদের মধ্যে ঋতুচক্র প্রভৃতি প্রক্রিয়া এবং পুরুষদের মধ্যেও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলির সূচনা হতে থাকে। এই কামভাব তাদের হৃদয় ও মনেই উৎপন্ন হয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

ति॒र॒श्चीनो॒ वित॑तो र॒श्मिरे॑षाम॒धः स्वि॑दा॒सी३दु॒परि॑ स्विदासी३त् । 

रे॒तो॒धा आ॑सन्महि॒मान॑ आसन्त्स्व॒धा अ॒वस्ता॒त्प्रय॑तिः प॒रस्ता॑त् ॥

তিরশ্চীনো বিততো রশ্মিরেষামধঃ স্বিদাসী ৩দুপরি স্বিদাসী ৩ত্ ।
রেতোধা আসন্মহিমান আসন্ত্স্বধা অবস্তাৎপ্রযতিঃ পরস্তাৎ ॥ ৫॥

এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় মন্ত্রের প্রভাবও পূর্ববৎই বুঝতে হবে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য ১—

(এষাম্, রশ্মিঃ, তিরশ্চীনঃ, বিততঃ) [রশ্মিঃ যমনাত্ (নিরু. ২.১৫), তিরঃ = তিরস্তীণং ভবতি (নিরু. ৩.২০)] এই অব্যক্ত উপাদান পদার্থকে ধারণকারী অব্যক্ত কালতত্ত্বের রশ্মিগুলি সেই সমগ্র পদার্থে বিস্তৃত হয়ে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই অব্যক্ত ‘ওম্’ রশ্মিগুলি ওই পদার্থের সকল অক্ষররূপ অবয়বের অন্তরে গুপ্তভাবে অবস্থান করে। এখানে ‘এষাম্’ এই বহুবচনান্ত পদটি অব্যক্ত অক্ষররূপ অবয়বগুলির জন্যও প্রযোজ্য। এদের বিস্তার একরসভাবেই ঘটে। (অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরী, স্বিত্, আসীত্) সেই অব্যক্ত কালরশ্মিগুলি উপাদান পদার্থের বাইরে ও ভিতরে এবং তার অক্ষররূপ অবয়বগুলির অন্তরে ও উপরে সর্বত্র বিদ্যমান থাকে, তবেই তারা সেই সমগ্র পদার্থকে নিয়ন্ত্রণ ও সক্রিয় করতে সক্ষম হয়। সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আরম্ভ হলে সেই অব্যক্ত কালরশ্মিগুলি স্বয়ং ব্যক্তরূপ ধারণ করে অক্ষররূপ অবয়বগুলির উপরে ও নীচে অর্থাৎ ভিতরে ও বাইরে স্পন্দিত হতে থাকে।

(রেতোধাঃ, আসন্, মহিমানঃ, আসন্) সেই কালরশ্মিগুলি ব্রহ্মের প্রেরণারূপ রেতস্ অর্থাৎ পরাক্রমকে ধারণ করে। তারা অত্যন্ত ব্যাপক, অর্থাৎ অনন্ত পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্ত কালরশ্মিগুলি ব্রহ্মের মহান বিজ্ঞান এবং তজ্জনিত নিয়মসমূহেও যুক্ত থাকে। (স্বধা, অবস্তাৎ, প্রযতিঃ, পরস্তাৎ) সৃষ্টিনির্মাণের প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্বে এই সমগ্র পদার্থ স্বধারূপ অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ সে নিজের গুণসমূহকে নিজের মধ্যেই গুপ্ত ও অব্যক্ত রূপে ধারণ করে রাখে। লক্ষণীয় যে গুণ কখনোই তার গুণী থেকে পৃথক হতে পারে না; এই কারণে মহাপ্রলয় অবস্থায় প্রকৃতির সত্ত্বাদি গুণসমূহ প্রকৃতির সঙ্গে অবশ্যই বিদ্যমান থাকে, তবে তারা অব্যক্ত রূপেই অবস্থান করে। এই অবস্থার পর অব্যক্ত কালরশ্মিগুলির মধ্যে প্রয়াসের সামর্থ্য প্রকাশ পায়, অর্থাৎ কালতত্ত্ব ব্যক্ত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমন হলে সকল অক্ষররূপ অবয়বও প্রয়াসী হতে শুরু করে।

ভাবার্থ — মহাপ্রলয়ের অবস্থায় সমগ্র মূল উপাদান পদার্থ অবকাশরূপ আকাশে সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে থাকে। সেই পদার্থের মধ্যে অব্যক্ত কালরশ্মিগুলিও সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকে। এই রশ্মিগুলি মূল পদার্থের অক্ষররূপ অবয়বগুলির বাইরে ও ভিতরে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত থাকে। তারা সেই পদার্থকে ধারণ করে এবং নিজেরাও পরমেশ্বর কর্তৃক ধারণকৃত থাকে। সেই সময় মূল উপাদান পদার্থের সত্ত্বাদি তিনটি গুণও অব্যক্ত ও সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পরব্রহ্ম অব্যক্ত কালতত্ত্বকে প্রেরিত, ব্যক্ত ও সক্রিয় করতেই সত্ত্বাদি তিনটি গুণ প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং অক্ষররূপ অবয়বগুলিও ব্যক্তভাব লাভ করে পদার্থকে মহত্তত্ত্বরূপ প্রদান করে। লক্ষণীয় যে সক্রিয় কালতত্ত্ব স্বয়ং সত্ত্ব ও রজস এই দুই গুণে যুক্ত থাকে, আর তার দ্বারাই প্রকৃতি পদার্থের তৃতীয় গুণ তমোগুণও সক্রিয় বা জাগ্রত হয়ে ওঠে। সেই অবস্থার নামই মহৎ তত্ত্ব।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(এষাম্, রশ্মিঃ, তিরশ্চীনঃ, বিততঃ, অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরি, স্বিত্, আসীত্) এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হতেই এটি সেই সময় বিদ্যমান সকল ছন্দ রশ্মিতে বিস্তৃত হতে শুরু করে। এটি সমগ্র পদার্থের ভিতরে-বাইরে এবং উপরে-নিচে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি সম্পর্কে ঋষিদের বক্তব্য হলো- “তীর্ণতমং ছন্দঃ। ত্রিবৃদ্ বজ্রস্তস্য স্তভনীতি বা। যৎ ত্রিরস্তভত্ তৎ ত্রিষ্টুভস্ত্রিষ্টুপ্ত্মিতি বিজ্ঞায়তে। (নিরু.৭.১২)”, “বলং বৈ বীর্যং ত্রিষ্টুপ্ (কৌ.ব্রা.৭.২; ৮.২)”, “ওজো বা ইন্দ্রিয়ং বীর্যং ত্রিষ্টুপ্ (ঐ.ব্রা.১.৫; ৮.২)।” এর অর্থ হলো, এই রশ্মিগুলো তীক্ষ্ণ রূপে দীর্ঘ দূরত্বে বিস্তৃত হয়ে অন্যান্য রশ্মিগুলোকে তিনভাবে বা তিন দিক থেকে ধারণ করে। এগুলো বিশেষ শক্তি ও তেজ দ্বারা সমৃদ্ধ থাকে।

(রেতোধাঃ, আসन्, মহিমানঃ, আসन्) এই রশ্মি এবং অন্যান্য ত্রিষ্টুপ্ রশ্মিগুলো বিশেষভাবে দীপ্তিময় ও শক্তিশালী হয় এবং এদের প্রভাবও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। (স্বধা, অবস্তাত্, প্রয়তিঃ, পরস্তাত্) এই ছন্দ রশ্মি এবং অন্যান্য ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে সকল রশ্মি নিজের-নিজস্ব শক্তি নিজের মধ্যে ধারণ করে রাখে। এর অর্থ হলো, এই রশ্মিগুলো সূক্ষ্ম কণার উৎপাদনে নিজের ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সেই কণাগুলোকে সৃষ্ট করতে সক্ষম নয়। যখন এই ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিগুলো উৎপন্ন হয়ে প্রচেষ্টাশীল হয়ে ওঠে, তখন সমস্ত ছন্দ রশ্মি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে যায়।

ভাবার্থ – এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হতেই পূর্বে বিদ্যমান পদার্থের বায়ব্য অবস্থায় সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অন্যান্য ছন্দ রশ্মির উপরে-নিচে এবং সামনে-পীঠে সর্বত্র বিস্তৃত হয়। এই ত্রিষ্টুপ্ রশ্মিগুলো তীব্র তেজ ও শক্তি ধারণকারী এবং ব্যাপক প্রভাবশালী হয়। এই রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে অন্যান্য রশ্মিগুলো নিজস্ব শক্তি বিশেষভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। ফলে মূল কণ ও ফোটন ইত্যাদির উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয় না এবং সমগ্র পদার্থ সূক্ষ্ম শক্তি ও গতির সত্ত্বেও অন্ধকার, শীতলতা এবং নীরবতায় পূর্ণ থাকে। এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পর অন্যান্য সমস্ত রশ্মি আরও সক্রিয় হয়ে আগামী সৃষ্টিকে উৎপন্ন করতে শুরু করে। লক্ষ্যণীয় যে এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে অন্যান্য ছন্দ রশ্মিও নিজস্ব শক্তি, তেজ ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ থাকলেও তাদের ক্ষমতা এতটা নেই যে তারা আগ্নি তত্ত্ব অর্থাৎ বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় মূল কণ ও ফোটন তৈরি করতে পারে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -

(তিরশ্চীনঃ, এষাম্, বিততঃ, রশ্মিঃ) [তিরশ্চীনঃ তিরসুপপদে অঞ্ছু গতৌ ‘ঋত্বিক্’ ইতি ক্বিন্। ততঃ ‘বিভাষাঞ্ছেরদিস্ত্রিয়াম্’ ইতি স্বার্থে খঃ প্রত্যয়ঃ। (বৈদিক কোষ আ० রাজবীর শাস্ত্রী)। রশ্মিঃ অশ্নুতে ব্যাপ্নোতীতি রশ্মিঃ (উ.কো. ৪.৪৭)] সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে যে সকল প্রাণী থাকে, তাদের সকলের আচরণ নিয়ন্ত্রিত বা সুসংগঠিত হওয়ার উপযোগী স্বাভাবিক জ্ঞান সকল প্রাণীর মধ্যেই গোপন রূপে বিদ্যমান থাকে এবং তারই ভিত্তিতে তাদের আচরণ বিস্তৃত হয়। এর অর্থ হলো, প্রারম্ভে কোনো প্রাণীই না তো কারও নিয়ন্ত্রক হয়, না কেউ কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রত্যেকে নিজ নিজ স্বাভাবিক জ্ঞানের দ্বারা এমন আচরণ করে, যেন সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে।

(অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরী, স্বিত্, আসীত্) সেই সময় দুই প্রকার প্রাণীর জন্ম হয়। এক প্রকার প্রাণী অত্যন্ত প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয় এদের মানুষ বা দেব বলা হয়। অন্য প্রকার প্রাণী পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি, যাদের মধ্যে বুদ্ধিতত্ত্বের পরিমাণ মানুষের তুলনায় অত্যন্ত অল্প। এদেরই যথাক্রমে উচ্চ ও নিম্ন যোনির জীব বলা হয়। (রেতোধাঃ, আসন্) এদের মধ্যে নিম্ন যোনির জীবেরা তাদের পূর্ববর্তী সৃষ্টিতে কৃত কর্মের সংস্কারকে বীজরূপে সঙ্গে নিয়ে আসে। এইভাবে তারা ভোগযোনির জীব নামে পরিচিত হয়।

(মহিমানঃ, আসন্) প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাগমনকারী হওয়ার কারণে অত্যন্ত মহিমাসম্পন্ন হয়। তারা সকল প্রকার দুঃখ থেকে মুক্ত থাকে এবং নৈমিত্তিক জ্ঞান দ্রুতগতিতে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। (স্বধা, অবস্তাত্) যারা নিজেদের মধ্যে নানাবিধ কর্মের বীজ ধারণ করে, তারা প্রথমে পশ্বাদি যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে অথবা মানুষের তুলনায় নিম্নতর স্থানে জন্মায়। সেই সঙ্গে তাদের দেহও মানুষের দেহের তুলনায় নিম্নমানের পদার্থ দ্বারা ভূগর্ভে নির্মিত হয়। (প্রযতিঃ, পরস্তাত্) পশ্বাদি ছাড়া যে অন্যান্য জীব পরমাত্মার ব্যবস্থায় বিশেষ পুরুষার্থের জন্য জন্মগ্রহণ করে, তারা পশ্বাদি যোনির পর জন্মায়। তাদেরই দেব ও মানুষ বলা হয়। এদের দেহ পশ্বাদির দেহের তুলনায় উৎকৃষ্ট পদার্থ দ্বারা নির্মিত হয়। এদের কর্মযোনির জীব বলা হয়। পরবর্তী প্রজন্মে এই মানুষরাই উভয়যোনির জীব হয়ে ওঠে, কারণ তারা প্রথম প্রজন্মের তুলনায় কিছুটা দুঃখ ও দুর্গুণ দ্বারা আক্রান্ত হতে শুরু করে।

ভাবার্থ – সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে মানুষ ও পশ্বাদি সকল প্রাণী নিজ নিজ স্তরের স্বাভাবিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সুসংগত ও সুশৃঙ্খল আচরণ করে। সেই প্রজন্মে হিংস্র ও মাংসাহারী প্রাণীর জন্ম হয় না, বরং সকল প্রাণীই শাকাহারী হয়। সিংহ, সাপ এবং অন্যান্য মাংসাহারী পশু ও কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি পরবর্তী কালে উৎপন্ন হয়। পশ্বাদি যোনি ভোগযোনি এবং মানুষের প্রথম প্রজন্ম উভয়যোনি নয়, বরং কেবল কর্মযোনি হয়, কারণ তারা ত্রিবিধ তাপ থেকে মুক্ত থাকে। ভোগযোনির পশ্বাদি জীব তাদের পূর্ব সৃষ্টির কর্ম অনুযায়ী জন্ম গ্রহণ করে, কিন্তু প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাগমনকারী হওয়ায় কোনো কর্মফল ভোগের জন্য নয়, বরং পুনরায় মুক্তির উদ্দেশ্যে পুরুষার্থ করার জন্য জন্ম গ্রহণ করে। মানুষের উৎপত্তি অন্যান্য প্রাণীর উৎপত্তির পর ঘটে। সকল প্রাণীই ভূগর্ভ থেকে যুবাবস্থায় উৎপন্ন হয়। ভূমির যে অংশে মানুষের জন্ম হয়, সেই অংশে জীবনীশক্তি পশ্বাদির জন্মস্থানের তুলনায় অধিক উৎকৃষ্ট হয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

को अ॒द्धा वे॑द॒ क इ॒ह प्र वो॑च॒त्कुत॒ आजा॑ता॒ कुत॑ इ॒यं विसृ॑ष्टिः । 

अ॒र्वाग्दे॒वा अ॒स्य वि॒सर्ज॑ने॒नाथा॒ को वे॑द॒ यत॑ आब॒भूव॑ ॥

কো অদ্ধা বেদ ক ইহ প্রবোচৎ কুত আজাতা কুত ইয়ং বিসৃষ্টিঃ ।
অর্বাগ্‌দেবাঃ অস্‌য বিসর্জনেনাথা কো বেদ যত আ বভূব ॥ ৬ ॥

এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎই বুঝতে হবে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(কঃ, অদ্ধা, বেদ) [অদ্ধা সত্যনাম (নিঘं. ৩.১০)। কঃ কো বৈ প্রজাপতিঃ (গো.উ.৬.৩), প্রাণো বাভ কঃ (জৈ.উ.৪.১১.২.৪), প্রজাপতির্বৈ কঃ (ঐ.ব্রা.২.৩৮; তৈ.সং.১.৬.৮.৫)] সৃষ্টির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র সৃষ্টির পালনকারী প্রকৃতি পদার্থ বা মনস্তত্ত্ব বিদ্যমান থাকে। সেই পদার্থকে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই জানেন। সেই প্রকৃতি পদার্থ নিত্য এবং সৃষ্টির তুলনায় মনস্তত্ত্বও নিত্যই।
(কঃ, ইহ, প্রবোচত্) এই অবকাশরূপ আকাশে বিদ্যমান প্রকৃতি পদার্থে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই বাক্‌তত্ত্বকে উৎপন্ন করেন। অন্যদিকে মনস্তত্ত্বে কালতত্ত্বরূপ প্রজাপতি বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি করেন।

(কুতঃ আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) এই বহুবিধ সৃষ্টি কোথা থেকে জন্মায় এবং কার দ্বারা এর সৃষ্টি হয়—এই প্রশ্নের আধিদৈবিক ভাষ্যে প্রশ্নবাচক শব্দগুলির বিশেষ গুরুত্ব নেই। সুতরাং এর স্বাভাবিক অর্থ এই যে, এই সৃষ্টি প্রজাপতিরূপ প্রকৃতি থেকে জন্মায় এবং প্রজাপতিরূপ পরমাত্মার দ্বারাই সৃষ্টি হয়। এখানে উভয় প্রকার কারণ—উপাদান কারণ ও নিমিত্ত কারণ—উল্লেখিত হয়েছে। এখানে ‘জনী প্রাদুর্ভাবে’ ধাতুর প্রয়োগ নির্দেশ করে যে ‘কুতঃ’ শব্দটি প্রকৃতিরূপ উপাদান কারণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘সৃজ বিসর্গে’ ধাতুর প্রয়োগ প্রধান নিমিত্ত কারণ ঈশ্বরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এখানে ‘বি’ উপসর্গযুক্ত ‘সৃজ’ ধাতুর অর্থ ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা অর্থাৎ নষ্ট করাও গ্রহণযোগ্য। এতে এই অর্থ আরও স্পষ্ট হয় যে সেই প্রজাপতি পরমাত্মাই এই সৃষ্টি নির্মাণ করে জীবদের জন্য তা ত্যাগ করে দেন, অর্থাৎ তাদের প্রদান করেন এবং সময় এলে তার প্রলয়ও করেন। এইভাবে সৃষ্টির উৎপত্তি ও প্রলয়ের উভয় অবস্থারই এখানে বর্ণনা রয়েছে। (অর্বাক্, দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন) এই সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়ায় দেব অর্থাৎ মনস্তত্ত্ব, বাক্‌তত্ত্ব ও প্রাণতত্ত্ব প্রভৃতি পদার্থ উৎপন্ন হয়। তার পরেই পঞ্চমহাভূতের উৎপত্তি ঘটে। এই পদার্থগুলির বিষয়ে 

ঋষিদের উক্তি— মনো দেবঃ (গো.পূ.২.১১), বাগেব দেবাঃ (শ.ব্রা.১৪.৪.৩.১৩), প্রাণা দেবাঃ (শ.ব্রা.৬.৩.১.১৫), বাক্‌ চ বৈ মনশ্চ দেবানাং মিথুনম্ (ঐ.ব্রা.৫.২৩)। এদের দেব বলা হয়, কারণ সূক্ষ্ম বল ও দীপ্তির উৎপত্তি ক্রমান্বয়ে এই তত্ত্বগুলির থেকেই শুরু হয়। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) [কঃ অন্নং বৈ কম্ (ঐ.ব্রা.৬.২১, গো.উ.৬.৩)। এখানে ‘কম্’-এর স্থানে ‘কঃ’-এর প্রয়োগ ছান্দস।] প্রকৃতি ও ঈশ্বরকে সৃষ্টির কারণ বলার সঙ্গে সঙ্গে এখানে আর যে কারণটি নির্দেশ করা হয়েছে, তা হলো—মূল পদার্থে সংযোজকত্ব গুণের উৎপত্তি। এটি ছাড়া সৃষ্টির নির্মাণ সম্ভব নয়। এর কারণেই সর্বত্র সৃজন প্রক্রিয়া শুরু ও পরিচালিত হয়। এই সমগ্র সৃজন ও পরিচালনা এবং সংযোজকত্বাদি গুণসমূহকে ঈশ্বরই জানেন, কারণ তিনিই এগুলিকে উৎপন্ন করেন।

ভাবার্থ – এই সৃষ্টির দুটি মূল কারণ আছে, যেগুলি থেকে সৃষ্টি উৎপন্ন হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম কারণ হলো প্রধান নিমিত্ত কারণ, অর্থাৎ এর কর্তা ঈশ্বর, যাঁর ব্যতীত মূল উপাদান কারণে কোনো আন্দোলন সম্ভব নয়। দ্বিতীয় কারণ হলো প্রকৃতিরূপ মূল উপাদান কারণ, যেখান থেকে ঈশ্বর সৃষ্টি নির্মাণ করেন। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম মহৎ বা মনস্তত্ত্ব এবং বাক্‌ রশ্মিগুলি উৎপন্ন হয়। এই পদার্থগুলি থেকে কালক্রমে আকাশ মহাভূত, বায়ু মহাভূত, ফোটন এবং মূল কণার ক্রমান্বয়ে উৎপত্তি ঘটে। এই পদার্থগুলিতে, বিশেষত মনস্তত্ত্ব ও বাক্‌তত্ত্বে আকর্ষণ প্রভৃতি বলের উৎপত্তি হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সৃষ্টির উৎপত্তি ও পরিচালনার বিজ্ঞান সম্পূর্ণরূপে কেবল ঈশ্বরই জানেন।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(কঃ, অদ্ধা, বেদ, কঃ, ইহ, প্রবোচৎ) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে প্রসিদ্ধ প্রাণতত্ত্ব সমগ্র পদার্থে বিদ্যমান ছিল। সেই পদার্থে সংঘটিত সকল ক্রিয়া ও বলসমূহকে কালতত্ত্বের মাধ্যমে প্রাণতত্ত্বই জানে। এই কারণেই সেই প্রাণতত্ত্ব ঐ পদার্থে নানা প্রকারের ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি করে, কিন্তু তারও প্রেরক কালতত্ত্বই হয়। এই কালতত্ত্বের মধ্যে পরমেশ্বরের বিজ্ঞান নিহিত থাকে, যার ফলে সমগ্র সৃষ্টিই বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংঘটিত হয়। (কুতঃ, আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) এই সৃষ্টি কোথা থেকে এসেছে, কোন পদার্থ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং কে একে রচনা করেছে—এর উত্তরও এখানেই নিহিত যে, এই সৃষ্টি এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তিকালে বিদ্যমান বায়ব্য অবস্থান থেকেই উৎপন্ন হয় এবং প্রাণতত্ত্বই কালতত্ত্ব দ্বারা প্রেরিত হয়ে সূক্ষ্ম কণাগুলিকে নির্মাণ করতে শুরু করে।

(দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন, অর্বাক্) বিশেষভাবে রচিত বিভিন্ন লোকের উৎপত্তির পূর্বে দেব পদার্থ অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্বের উৎপত্তি হয় এবং অগ্নি তত্ত্ব তথা বিভিন্ন সূক্ষ্ম কণার উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে আলো, উষ্ণতা ও স্থূল বলসমূহের উৎপত্তি শুরু হয়। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) তদনন্তর সংঘটিত সকল ক্রিয়াকেই কালতত্ত্ব এবং তদ্দ্বারা প্রেরিত প্রাণতত্ত্ব জানে, যার ফলে সমস্ত লোক-লোকান্তর, প্রাণীদের দেহ এবং বনস্পতি প্রভৃতি পদার্থ বিজ্ঞানসম্মতভাবে উৎপন্ন ও পরিচালিত হতে থাকে।

ভাবার্থ — সমগ্র সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত প্রাণতত্ত্ব কালতত্ত্বের প্রেরণায় যেমন সমগ্র সৃষ্টিকে উৎপন্ন করে, তেমনি প্রতিটি উৎপত্তি ও পরিচালনার প্রক্রিয়া এবং তার বিজ্ঞানকেও সম্যকভাবে জানে। এই সৃষ্টি সেই প্রাণতত্ত্ব থেকেই উৎপন্ন হয় এবং যথাসময়ে তাতেই বিলীন হয়ে যায়। এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পর সর্বপ্রথম ফোটন ও মূলকণার উৎপত্তি হয়, তদনন্তর সেই মূলকণাগুলির মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ ও প্রতিকর্ষণ বলের উৎপত্তি হতে থাকে। বর্তমান বিজ্ঞান মূলকণা ও ফোটনের উৎপত্তি এবং তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ আধান ও ভরের ন্যায় গুণের উৎপত্তির বিজ্ঞান জানে না। সে এই বিষয়টিও বিবেচনা করে না যে, এই কণাগুলি প্রকৃতপক্ষে মৌলিক পদার্থ নয়, বরং এদেরও পৃথক পৃথক অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে, যার ভিন্নতার কারণে কণাগুলিও ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -

(কঃ, অদ্ধা, বেদ) সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে কে বেদকে জানে—অর্থাৎ কেউই জানে না। সকল মানুষ উন্নত স্বাভাবিক জ্ঞানের অধিকারী হলেও সত্য বিজ্ঞানস্বরূপ বেদের সঙ্গে পরিচিত থাকে না। (কঃ, ইহ, প্রবোচৎ) এই সৃষ্টিতে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই সেই মানুষদের বেদের উপদেশ দেন। তাঁর উপদেশ প্রাপ্ত হয়ে অগ্নি প্রভৃতি চার ঋষি বেদমন্ত্রের অর্থ সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে নেন। জ্ঞানপ্রাপ্তির এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত ঘটে, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিস্ময়কর বলেই প্রতীয়মান হয়। (কুতঃ, আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) বিভিন্ন যোনির অন্তর্গত প্রাথমিক প্রজন্মগুলি কোথা থেকে প্রকাশিত হয়? তাদের বিকাশ কোথায় হয়? অর্থাৎ মানুষ, পশু-পাখি ও কীট প্রভৃতি প্রাণীর জন্ম কীভাবে এবং কোথায় হয়? অর্থাৎ তাদের ভ্রূণের বিকাশ কোন স্থানে ঘটে? এই প্রশ্নের উত্তরও এখানেই নিহিত যে, এদের সকলের ভ্রূণের বিকাশ পৃথিবীর সেই গর্ভস্থানে হয়, যেখানে অন্ন, ঔষধি এবং তজ্জনিত উৎকৃষ্ট জীবনীশক্তিসম্পন্ন রসের প্রাচুর্য থাকে।

(অর্বাক্, দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন) বিভিন্ন প্রকারের প্রাণী ও উদ্ভিদের সৃষ্টির পর দেবদের—অর্থাৎ বিশেষ প্রজ্ঞাসম্পন্ন প্রাণী তথা মানুষের—সৃষ্টি হয়। এখানে মানুষকে দেব বলা হয়েছে, কারণ সে সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) যে ক্রম অনুসারে সকল প্রাণীর দেহ যৌবনাবস্থায় পৃথিবীর গর্ভ থেকে আবির্ভূত হয়, সেই সুবিন্যস্ত ক্রম কে জানে? এই প্রশ্নের উত্তরও এই যে, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কেবল ব্রহ্মই জানেন।

ভাবার্থ — সৃষ্টির প্রথম মানব প্রজন্ম অত্যন্ত উন্নত স্বাভাবিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সহকারে উৎপন্ন হয়। তাদের সৃষ্টিবিদ্যা ও মোক্ষ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকে না। সেই সময় পরব্রহ্ম পরমাত্মা চারজন শ্রেষ্ঠতম মানুষকে—যারা ব্রহ্মাণ্ড থেকে বৈদিক ঋচাগুলি গ্রহণ করে থাকে—সেই বেদমন্ত্রগুলির অর্থ বিধিপূর্বক ও সম্পূর্ণরূপে অবগত করান। অর্থবোধের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত হয় এবং অন্তরীক্ষ থেকে বেদমন্ত্র গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত দ্রুতগতির হয়।

এই পৃথিবী এবং এর ন্যায় অন্যান্য লোকের ভূমি প্রারম্ভে অত্যন্ত কোমল ও জীবনীশক্তিসম্পন্ন তত্ত্বে পরিপূর্ণ থাকে। সেখানে স্থানে স্থানে এমন গর্ভসদৃশ স্থান থাকে, যা মাতৃগর্ভের ন্যায় বিশুদ্ধ ভ্রূণ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তিসম্পন্ন তরল পদার্থে পরিপূর্ণ থাকে। সেখানেই বিশেষ রাসায়নিক সংযোজনের দ্বারা ভ্রূণ বিকশিত হতে থাকে, যেখানে পরমাত্মার ব্যবস্থায় জীবাত্মাদের প্রবেশ ঘটতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম উদ্ভিদের, তারপর তাদের উপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীর এবং সর্বশেষে মানুষের উৎপত্তি ঘটে। কোন জীবাত্মা কোন ভ্রূণে প্রবেশ করবে—এ কথা ঈশ্বর ব্যতীত আর কেউ জানে না।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द  पादनिचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

इ॒यं विसृ॑ष्टि॒र्यत॑ आब॒भूव॒ यदि॑ वा द॒धे यदि॑ वा॒ न । 

यो अ॒स्याध्य॑क्षः पर॒मे व्यो॑म॒न्त्सो अ॒ङ्ग वे॑द॒ यदि॑ वा॒ न वेद॑ ॥ ৭

পদার্থ

(ইয়ং বিসৃষ্টিঃ) এই বিবিধ সৃষ্টি (যতঃ-আবভূব) যে উপাদান থেকে উৎপন্ন হয়েছে (অস্য যঃ-অধ্যক্ষঃ) সেই উপাদানের যে অধিপতি (পরমে ব্যোমন্) মহান আকাশে অবস্থানরত (অঙ্গ) হে জিজ্ঞাসু! (সঃ) সেই পরমাত্মা (যদি বা দধে) যদি ইচ্ছা করেন তবে ধারণ না-ও করতে পারেন, অর্থাৎ সংহার করে দিতে পারেন (যদি বেদ) যদি উপাদান কারণকে জানেন, নিজের বিজ্ঞানে লক্ষ্য করেন, সৃষ্টিরূপে পরিণত করেন (যদি বা ন বেদ) যদি না জানেন স্বজ্ঞানে লক্ষ্য না করেন, সৃষ্টিরূপে পরিণত না করেন এইভাবে সৃষ্টি ও প্রলয় সেই পরমাত্মার অধীন ॥৭॥ (ব্রহ্মমুনিজীকৃত পদার্থ)

ভাবার্থ

এই বিবিধ সৃষ্টি যে উপাদান-কারণ থেকে উৎপন্ন হয়, সেই উপাদান কারণ অব্যক্ত প্রকৃতির তিনি পরমাত্মা স্বামী-অধিপতি। তিনি তার দ্বারা সৃষ্টিকে উৎপন্ন করেন এবং তার সংহারও করেন। প্রকৃতিকে যখন লক্ষ্য করেন, তখন তাকে সৃষ্টির রূপে নিয়ে আসেন; যখন লক্ষ্য করেন না, তখন প্রলয় অবস্থায়ই থাকে। এইভাবে সৃষ্টি ও প্রলয় পরমাত্মার অধীন ॥৭॥ (ব্রহ্মমুনিজীকৃত ভাবার্থ)

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

নাসদীয় সূক্ত

অথ নাসদীয় সূক্তম্ ভূমিকা— নাসদীয় সূক্ত বেদের একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সূক্ত। ‘ন অসৎ’ এই পদগুলির দ্বারা সূচনা হওয়ার কারণে এই সূক্তের নাম নাসদ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ