বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাস_ড০ রঘুবীর বেদালঙ্কার - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

01 December, 2025

বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাস_ড০ রঘুবীর বেদালঙ্কার

 প্রথম অধ্যায়

বেদশব্দার্থ তথা বেদাবির্ভাব

বেদ শব্দের অর্থ

ঋষিগণের নিকট পরম্পরাগতভাবে প্রাপ্ত জ্ঞানরাশি এবং পুস্তকরূপে নিবদ্ধ চারটি সংহিতার নামই বেদ। ঋগ্বেদ প্রভৃতি চার সংহিতাতেই ‘বেদ’ শব্দের বহুবার প্রয়োগ হয়েছে। স্পষ্ট যে এই প্রয়োগ সংহিতা-গ্রন্থের জন্য নয়। ‘বেদ’ শব্দটি ‘বিদ্’ ধাতু থেকে করণ ও অধিকরণ কারকে ‘ঘঞ্’ প্রত্যয় যোগে গঠিত হয়। ‘জ্নিত্যাদিনিত্যম্’ (পা. ৬/১/১৯৭) অনুসারে এটি আদ্যুদাত্ত হওয়া উচিত। ঋগ্বেদে প্রথমা একবচনে পনেরোবার আদ্যুদাত্ত ‘বেদ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে¹ এবং তৃতীয়া একবচনে একবার²। অন্তোদাত্ত ‘বেদ’ শব্দ ঋগ্বেদে পাওয়া যায় না। যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে আদ্যুদাত্ত ও অন্তোদাত্ত*—উভয় রূপেই ‘বেদ’ শব্দ উপলব্ধ হয়।

এই কারণেই পাণিনি আদ্যুদাত্তের জন্য ‘বেদ’ শব্দকে বৃষাদিগণ (৬/১/২০৩)-এ এবং অন্তোদাত্তের জন্য উঞ্ছাদিগণ (৬/১/১৬০)-এ পাঠ করেছেন। এই গণদ্বয় যথাক্রমে আদ্যুদাত্ত ও অন্তোদাত্তের বিধান করে। স্বামী দয়ানন্দ এ বিষয়টি স্পষ্ট করে লিখেছেন—
‘করণকারকে প্রত্যয় হলে বেগ, বেদ, বেষ্ট, বন্দ্য প্রভৃতি চারটি শব্দ অন্তোদাত্ত হয় এবং ভাব বা অধিকরণে প্রত্যয় হলে আদ্যুদাত্তই বুঝতে হবে।’

১। ঋ০ ১/৭০/৫, ৩/৫৩/১৪, ৮/১৯/৫ ইত্যাদি।

২। ঋ ৮/১৯/৫

৩। যজু. ১৯/১৮, অথর্ব ৪/৩৫/৬, ৭/৫৭/১, ১০/৮/৫৭, ১৯/৬৮/১, ১৯/৭২/১; যজু. ২/২১, অথর্ব ২/২৯/১, ১৯/৯/১২

৪। বৃষাদীনাং চ, উঞ্ছাদীনাং চ

৫। স্বা. দয়া., সৌবর, *‘উঞ্ছাদীনাঞ্চ’ সূত্রের ব্যাখ্যা।

আদ্যুদাত্ত ‘বেদ’ শব্দের অর্থ সকল ভাষ্যকারই ‘ঋগ্বেদাদি সংহিতা-চতুষ্টয়াত্মক জ্ঞানরাশি’ করেছেন। সায়ণাচার্য¹ এবং স্বামী দয়ানন্দ² অন্তোদাত্ত ‘বেদ’ শব্দের অর্থও ঋগ্বেদাদি সংহিতাই করেছেন।

ঋ. ৮/১৯/৫-এ পঠিত ‘বেদেন’ পদের অর্থ ভেঙ্কট মাধব ‘স্বাধ্যায়েন’ এবং সায়ণ ‘বেদাধ্যয়নেন’, ‘ব্রহ্মযজ্ঞেন’ করেন। যজুর্বেদেও ‘বেদেন’ পদ জ্ঞানের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অথর্ববেদেও আদ্যুদাত্ত ‘বেদ’ শব্দ জ্ঞানের অর্থে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে।

ল্যাটিন ভাষায় ‘বিদ্’ ধাতুকে (৪০৭৪) ধাতু বলা হয়। ইংরেজি ‘ভিশন’ (৪৫০) শব্দটি বেদের আশয়কে আরও স্পষ্ট করে। এর অর্থ ‘দর্শন’। ঋষিগণকেও মন্ত্রের দ্রষ্টা বলা হয়।

যাস্কাচার্য এখানে আরও লিখেছেন যে, তপস্যা করতে করতে ঋষিদের নিকট স্বয়ম্ভূ ব্রহ্ম-বেদ অবতীর্ণ হয়েছিল। এটিই ঋষিদের ঋষিত্ব। এইভাবে যে জ্ঞানরাশি ঋষিগণ তাঁদের ঋতম্ভরা প্রজ্ঞার দ্বারা দর্শন করেছেন, সেটিই ‘বেদ’ পদবাচ্য। উইন্টারনিট্‌জও বেদ সম্বন্ধে এইরূপ ভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি এই জ্ঞানরাশিকে “The knowledge par excellence” এবং “The Sacred religious knowledge” বলেছেন।

বেদের ব্যুৎপত্তিলভ্য অর্থ

গ্রন্থরূপে বেদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সায়ণাচার্য বলেন—
ইষ্টপ্রাপ্ত্যনিষ্টপরিহারয়োরলৌকিকমুপায়ং যো গ্রন্থো বেদয়তি স বেদঃ
(তৈত্তিরীয় সংহিতা-ভাষ্যের ভূমিকা)

অর্থাৎ যে গ্রন্থ ইষ্টপ্রাপ্তি ও অনিষ্টপরিহারের অলৌকিক উপায় জানায়, সেটিই বেদ।

ঋগ্বেদ-ভাষ্য-ভূমিকায় তিনি বেদকে পুরুষার্থের অলৌকিক উপায় নির্দেশকারী বলেছেন।

1.বেদাঃ সপ্ত ঋষয়গ্ন্যঃ। অথর্ব ১৯/৯/১২-এ সা.ভা.— ‘বেদাঃ সাঙ্গাশ্চত্বারঃ’।
2.বেদোऽসি যেন ত্বম্‌। যজু. ২/২১-এ দয়া.ভা.— বিদন্তি যেন স ঋগ্বেদাদির্বা।
3.যঃ সমিধা য আহুতি যো বেদেন দদাশ। ঋ. ৮/১৯/৫
4.বেদেন রূপে ব্যপিবৎ‌ সুতাসুতৌ প্রজাপতিঃ। যজু. ১৯/৭৮
5.অথর্ব ৪/৩৫/৬, ৭/৫৭/১, ১০/৮/১৭, ১৫/৩/৭, ১৯/৬৮/১, ১৯/৭২/২১
6.ঋষিদর্শনাত্‌। স্তোমান্‌ দদশেত্যৌপমন্যবঃ। নি. ২/২১
7.তদ্যদেতান্‌ তপস্যমানান্‌ ব্রহ্ম স্বয়ম্ভবভ্যানর্ষৎ‌ ঋষয়োऽভবন্‌। নি. ২/১১
8.অলৌকিক পুরুষার্থোপায়ং বেত্তি অনেনেতি বেদশব্দনির্বচনম্‌।

সায়ণাচার্য বেদের ব্যুৎপত্তি-বিষয়ক নিম্ন শ্লোকটি তাঁর ঋগ্ভাষ্যের ভূমিকায় উদ্ধৃত করেছেন—
প্রত্যক্ষেনুমিত্যা বা যস্তূপায়ো ন বুধ্যতে।
এনং বিদন্তি বেদেন তস্মাদ্‌ বেদস্য বেদতা।।

প্রত্যক্ষ ও অনুমানের দ্বারাও যে উপায় জানা যায় না, তা বেদের দ্বারা জানা যায়। এটিই বেদের বেদত্ব।

মহর্ষি দयानন্দ ‘বেদ’ শব্দের নিম্নলিখিত ব্যুৎপত্তি প্রদান করেছেন—
বিদন্তি জানন্তি বিদ্যন্তে ভবন্তি বিন্দন্তি বিদন্তে লভন্তে, বিদন্তে বিচারয়ন্তি সর্বে মনুষ্যাঃ সর্বাঃ সত্যবিদ্যা যৈয়েষু বা॥

ধাতুপাঠে ‘বিদ্’ ধাতু—
বিদ্ জ্ঞানে (অদাদি),
বিদ্ সত্তায়াম্‌ (ভবাদি),
বিদ্ লাভে (তুদাদি),
এবং বিদ্ বিচারণে (স্বাদি)

এইরূপে পাঠিত হয়েছে। এই ব্যুৎপত্তি উক্ত চারটি ‘বিদ্’ ধাতুর অর্থের উপর ভিত্তি করে রচিত। যথা—

১. যাদের দ্বারা সমস্ত মানুষ সকল সত্য বিদ্যা জানে, সেগুলিই বেদ (করণ কারক)।
২. যেগুলিতে সকল সত্য বিদ্যা বর্তমান, সেগুলিই বেদ (অধিকরণ)।
৩. যেগুলিতে সমস্ত মানুষ সত্য বিদ্যা লাভ করে, সেগুলিই বেদ (অধিকরণ)।
৪. যেগুলিতে সমস্ত মানুষ সকল সত্য বিদ্যার বিচার করে, সেগুলিই বেদ (অধিকরণ)।

অমরকোষ (১/৫/৩)-এর টীকায় ক্ষীরস্বামী এবং হেমচন্দ্র তাঁর অভিধান চিন্তামণিতে লিখেছেন—
বিদন্ত্যনেন ধর্ম বেদ।
এখানে বেদকে কেবল ধর্মজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।

সর্বানন্দ এর বিস্তার করে অমরকোষের টীকায় লিখেছেন—
বিদন্তি ধর্মাদিকমনেেনেতি বেদঃ।

এইভাবে করণ ও অধিকরণ কারকে ‘বেদ’ শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে। একে কর্তা কারকেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যথা—আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র (১/৩)-এর বৃত্তিতে হারদত্ত লিখেছেন—
বেদয়তীতি বেদঃ।

তৈত্তিরীয় সংহিতার ভাষ্যে ভট্ট ভাস্করও অনুরূপ লিখেছেন—
পুরুষার্থানাং বেদয়িতা বেদ উচ্যতে।

কাঠক, মৈত্রায়ণী ও তৈত্তিরীয় সংহিতার ৩/৩/৪/৭ স্থানে ‘বেদ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিম্নরূপে করা হয়েছে—
চেদেন বৈ দেবা অসুরাণাং বিত্তমবিদন্ত তদ্বেদস্য বেদত্বম্‌।
[তৈত্তিরীয় সংহিতা ১/৪/২০]

১. ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা, বেদোৎপত্তিবিষয়, পৃষ্ঠা ২০

ক্রকপ্রাতিশাখ্যের বর্গদ্বয়বৃত্তির প্রস্তাবনায় বিষ্ণু শর্মা বেদের এই সংজ্ঞা প্রদান করেছেন—
“বিদ্যন্তে জ্ঞায়ন্তে লভ্যন্তে বা এবির্ধর্মাদিপুরুষার্থ ইতি বেদাঃ।”
এখানে ‘বিদ্ জ্ঞানে’, ‘বিদ্ সত্তায়াম্‌’ এবং ‘বিদ্ লাভে’—এই ধাতুগুলি থেকে ‘বেদ’ শব্দ সিদ্ধ করা হয়েছে।

বেদ শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাচস্পতি গাইরোলা লিখেছেন—‘বেদ’ শব্দের ব্যাকরণশাস্ত্রীয় অর্থ জ্ঞান। বেদ বলতে আমরা সেই ঈশ্বরীয় জ্ঞানকেই বুঝি, যাকে বৈদিক ধর্মের পরম্পরা অনুযায়ী সর্বপ্রথম ঋষি-মহর্ষিগণ লাভ করেছিলেন অথবা যার তাঁরা সাক্ষাৎকার করেছিলেন। অতএব বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল। তপঃপূত ঋষি-মহর্ষিগণের দ্বারা দৃষ্ট জ্ঞানই ‘বেদ’ শব্দের অভিপ্রেত অর্থ। এই ভাবই গোবিন্দচন্দ্র পাণ্ডেয় এইভাবে প্রকাশ করেছেন—

বেদের অর্থ চিরন্তন বিদ্যা এবং সেই বিদ্যার প্রতিপাদনকারী শব্দরাশি। ক্ষীরস্বামী¹ এবং হেমচন্দ্র²-র মতে, যার দ্বারা ধর্মাদি প্রাপ্ত হয়, তাকেই বেদ বলা হয়। সর্বানন্দও অনুরূপ বলেন—‘বিদন্তি ধর্মাদিকমেনেনেতি বেদঃ’। আপস্তম্ব সূত্র (১/৩৩)-এর ভাষ্যে কপর্দী স্বামী লিখেছেন—‘নিঃশ্রেয়সকরাণি কর্মাণি বেদয়ন্তি বেদাঃ।’

বেদের অন্যান্য নাম—সংস্কৃত বাঙ্ময়ে ‘বেদ’ নামে পরিচিত এই জ্ঞানরাশিকে বহু নামে অভিহিত করা হয়েছে। যথা—শ্রুতি, মন্ত্র, নিগম, আগম, ঋষি, ব্রহ্ম, ছন্দ, আম্নায়, শাস্ত্র ইত্যাদি নাম বেদের জন্য বহুল ব্যবহৃত হয়েছে।

গাইরোলা, বাচস্পতি, সংস্কৃত সাহিত্য ইতি., পৃ. ৭৩–৭৪
পাণ্ডেয়, গোবিন্দচন্দ্র, বৈদিক সংস্কৃতি, পৃ. ২৭

বিদন্ত্যনেন ধর্ম॑ বেদঃ। ক্ষীরস্বামী, অমরকোষের টীকা ১/৫/৩
হেমচন্দ্র, অভিধানচিন্তামণি, পৃ. ১–৬

শ্রুতিস্তু বেদো বিজ্ঞেয়ঃ। মনু ২/১০

মন্যন্তে জ্ঞায়ন্তে সর্বৈর্মনুষ্যৈঃ সত্যাঃ পদার্থা যেন যস্মিন্‌ বা স মন্ত্রো বেদঃ। স্বা. দয়া.,
ঋভাষ্য ভূমিকা, বেদবিষয়বিচার, পৃ. ৮৩

৭. অধ্যাধ্যায়ীতে বহুবার ‘নিগমে’ পদ পঠিত হয়েছে। কাশিকা (৩/৩/১)-এ ‘নৈগম রূঢ়িভবং হি সুসাধু’ প্রয়োগও করা হয়েছে।

৮. প্রত্যক্ষানুমানাগমেষু—অন্তিমো বেদঃ। সায়ণ, ঋগ্ভাষ্য ভূমিকা, পৃ. ২; ‘আগম’ পদে শ্রুতি। নাগেশ, উদ্দ্যোত।

৯. ঋষিরিতি বেদঃ। মহাভাষ্য ৩/১/১৭-এ কৈয়্যট।

১০. ব্রহ্ম চৈব ধনং যেষাম্‌। মনু ৯/৩১৬-এ কুল্লূক—বেদ এব চ যেষাং ধনম্‌।

১১. বহুলং ছন্দসি। পা. ২/৪/৭৩ প্রভৃতি।

১২. তদ্বচনাদাম্নায়স্য প্রামাণ্যম্‌। বৈ. দ. ১/১/৩

১৩. শাস্ত্রযোনিত্বাৎ। বেদ. দ. ১/১/৩, শাস্ত্রস্য ঋগ্বেদাদিলক্ষণস্য। শা. ভা.

৯ সায়ন ঋ০ভা০ভূ০ ॥

শ্রুতিভ্রূয়ত ইতি শ্রুতিঃ। লেখনকলার পূর্বে বেদজ্ঞান শ্রুতি-পরম্পরার মাধ্যমেই
অবস্থিত ছিল। অথবা শ্রূয়ন্তে সকল বিদ্যা যয়া সা শ্রুতিঃ—যার দ্বারা সমগ্র
বিদ্যার জ্ঞান লাভ হয়, সেটিই শ্রুতি।

ছন্দস্‌—যাস্ক বলেছেন ছন্দাংসি ছাদনাত্‌ (নি. ৭/১২)। আচ্ছাদন অর্থাৎ রক্ষা করার
কারণে বেদসমূহকে ছন্দ বলা হয়। শতপথে বলা হয়েছে যে দেবগণ মৃত্যুভয়ের কারণে
এইগুলির দ্বারা নিজেদের আচ্ছাদিত করেছিলেন, সেইজন্য বেদকে ছন্দ বলা হয়!—

মন্ত্রমত্রি গুপ্তপরিভাষণে ধাতু থেকে ‘মন্ত্র’ শব্দ সিদ্ধ হয়। অর্থাৎ যাতে গুপ্ত
রহস্যের বর্ণনা থাকে, তাকেই বেদ বলা হয়। যাস্ক মন্ত্রামননাত্‌ বলে ‘মন্‌ জ্ঞানে’
ধাতু থেকে মন্ত্রের সিদ্ধি করেন।

নিগমনিতরাং গময়তি প্রাপয়তি বিজ্ঞাপয়তি বা সর্বজ্ঞনানি স নিগমঃ

বেদের প্রয়োজন

বেদ বিশ্বকে অমূল্য নিধি—এ কথা সকলেই স্বীকার করেন; এবং এই বেদাত্মক অমূল্য
নিধির প্রয়োজন কী, তা বিচারযোগ্য। এই বিষয়ে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত হয়েছে
যে বেদের প্রয়োজন কেবল যজ্ঞমাত্র। এই ধারণার মূলে আচার্য লঘট্‌-এর নিম্ন
প্রসিদ্ধ শ্লোকটি এক দৃঢ় প্রমাণরূপে ব্যবহৃত হয়েছে—

বেদা হি যজ্ঞার্থমভিপ্রবৃত্তাঃ
কালানুপূর্বা বিহিতাশ্চ বেদাঃ!

উবট, মহীধর, সায়ণ প্রভৃতি ভাষ্যকারগণও এই লক্ষ্য সামনে রেখেই তাঁদের বেদভাষ্য
রচনা করেছেন। যদিও তাঁরা আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও করেছেন, তবু সেগুলি
অত্যন্ত অল্প। ঋগ্‌, যজুঃ ও সাম—এইরূপে বেদের যে ত্রৈবিধ্য স্বীকৃত হয়েছে, তারও
প্রকৃত অর্থ না বুঝে একে যাজ্ঞিক প্রক্রিয়ারই অনুমোদন বলে ধরা হয়েছে। অতএব
ঋক্‌-এর অর্থ করা হয়েছে—যেসব মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞে অগ্নি প্রভৃতি দেবতাদের
স্তুতি করা হয়, সেগুলিই ঋক্‌। যেসব মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞে আহুতি প্রদান করা হয়,
সেগুলি যজুঃ; এবং যেসব মন্ত্রের গান যজ্ঞে করা হয়, সেগুলি সামপদবাচ্য। এইভাবে
তিনটি বেদকেই কেবল যজ্ঞের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেওয়া হয়েছে। অথচ নিজের
ঋগ্ভাষ্য-ভূমিকায় সায়ণাচার্য ইতিমধ্যেই বলেছেন—

১. যদ্‌ এবি আত্মানমাচ্ছাদয়ন্তি দেবা মৃত্যোর্বিভ্যতঃ তচ্ছন্দসাং ছন্দত্বম্‌।
২. বেদাঙ্গ জ্যোতিষ, শ্লোক ৩

প্রত্যক্ষে অনুমিত্যা বা যস্তূপায়ো ন বুধ্যতে।
এনং বিদন্তি বেদেন তস্মাদ্‌ বেদস্য বেদতা॥

বেদকে কেবল যজ্ঞমাত্রে সীমাবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এই উক্তি অর্থবহ হতে পারে না।

বাস্তবে ‘ঋক্‌’-এর অভিধেয়ার্থ ‘স্তুতি’ পদটির যে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থ নয়। ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রেই ‘অগ্নিমীড়ে’ পদটি পঠিত হয়েছে। ধাতুপাঠে এই ধাতু স্তুত্যর্থক হলেও যাস্ক একে অধ্যেষণাকর্মাও মনে করেন। অধ্যেষণার অর্থ হল—অগ্নির বিভিন্ন কার্য্যে যথোচিত ব্যবহার।

যজ্ঞের অগ্নিও অগ্নি, বিদ্যুৎও অগ্নি, যা জলের মধ্যে নিহিত, সূর্যও অগ্নি, শরীরে নিহিত প্রাণও অগ্নি, পরমেশ্বর এবং জীবাত্মাও অগ্নি। এইভাবে অগ্নি সর্বত্র ব্যাপ্ত। এটি আমাদের পাকশালা থেকে শুরু করে অন্তরীক্ষ, দ্যুলোক এবং সমগ্র বিশ্বে পরিব্যাপ্ত।

অগ্নিসূক্তে এই কথাই বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন রূপে ব্যাপ্ত এই অগ্নির আধ্যাত্মিক ও আধিভৌতিক রূপে নানাবিধ ব্যবহার করে সমগ্র ঐশ্বর্য লাভ করো, কেবল যজ্ঞকুণ্ডে আহুতি প্রদান করতেই থেকো না। এই অগ্নিকে আমরা প্রত্যেক কার্য্যে আমাদের সম্মুখে রাখি। প্রত্যেক ঋতু ও কার্য্যে এর যজন-সংগতীকরণ করি, তবেই এটি রত্নধাতম হবে।

বেদে প্রাপ্ত ইন্দ্র প্রভৃতি অন্যান্য দেবদের স্তবনের ভাবও এইরূপ। ইন্দ্র বিদ্যুতের বাচকও বটে। আজ বিদ্যুতের বিভিন্ন কার্য্যে ব্যবহার হচ্ছে—এটাই তার স্তবন-অধ্যেষণা। এইভাবে ঋগ্বেদ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান লাভ করে আমরা নানাবিধ সাংসারিক জ্ঞান ও ঐশ্বর্য অর্জন করি। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ঋগ্বেদকে জ্ঞানের প্রতীক বলে মানা হয়।

যজুর্বেদও কেবল অগ্নিহোত্রাত্মক যজ্ঞের বেদ নয়, বরং তার সম্পর্ক বিভিন্ন কর্মের সঙ্গে। এর প্রথম মন্ত্রেই ‘ইষে ত্বা ঊজে ত্বা’ দ্বারা অন্ন-প্রাপ্তি ও বল-প্রাপ্তির কথা বলে কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার প্রেরণা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, শ্রেষ্ঠতম কর্ম করার জন্য সবিতা দেব তোমাকে প্রেরণা দেন। শেষে চল্লিশতম অধ্যায়ে পুনরায় ‘কুর্বন্নেবেহ কর্মাণি’ মন্ত্রের দ্বারা—

ঈড়িরধ্যেষণাকর্মা, পূজাকর্মা বা। নি. ৭/১৫
প্রাণো বা অগ্নিঃ। শৎ. ৯/৫/২/৬৮
অগ্নিরেব ব্রহ্ম। শৎ. ১০/৪/২/৫
আত্মা বা’গ্নিঃ। শৎ. ৬/৭/১/২০

স্তনয়িলুরেবেন্দ্রঃ। শৎ. ১/৬/৩/৯

জীবকে সদা কর্মশীল থাকার প্রেরণা দেওয়া হয়েছে। এই কারণেই এখানে জীবকে ‘বায়ু’ বলা হয়েছে।¹ ‘বা গতি-গন্ধনয়োঃ’ ধাতুর ভিত্তিতে ‘বায়ু’-র অর্থ গতিশীলতাও। কর্মের জন্য গতিশীলতা অপরিহার্য। প্রথম মন্ত্রেও ‘বায়বস্থ’ বলে এই ভাবই প্রকাশ করা হয়েছে। এইভাবে যজুর্বেদের সম্পর্ক গতিশীলতা এবং তার উপর ভিত্তিশীল কর্মের সঙ্গে, কেবল ঘৃত-সামগ্রী দ্বারা সম্পন্ন যজ্ঞের সঙ্গে নয়।

পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায় শতপথের ভিত্তিতে ‘যজুঃ’ শব্দের বিস্তার এইভাবে লিখেছেন—

যজুঃ শব্দ ‘যত্‌’ ও ‘জূঃ’ এই দুই শব্দের সংযোগে নিষ্পন্ন। এখানে ‘যত্‌’ শব্দের অর্থ নিরন্তর গতিশীলতা এবং ‘জূঃ’ শব্দের অর্থ স্থিতি। এই দুই তত্ত্বের দ্বারাই সমস্ত বস্তু নির্মিত হয়। এইভাবেই বিজ্ঞানে যে তত্ত্ব ‘ইলেকট্রন’ ও ‘প্রোটন’ শব্দে অভিহিত, সেই তত্ত্বকেই শতপথ ব্রাহ্মণে ‘যত্‌’ ও ‘জূঃ’ শব্দ দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণে আরও বলা হয়েছে যে ‘যত্‌’ শব্দের অপর নাম বায়ু এবং ‘জূঃ’ শব্দের অপর নাম আকাশ।

বাস্তবতঃ ‘যজ্ঞ’ শব্দ নিজেই এক বিস্তৃত অর্থ ধারণ করে। এই বিষয়ে পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায় লিখেছেন

যজ্ঞ দুই প্রকার। (১) এক যজ্ঞ সেই, যা প্রকৃতিগতভাবে সদা ক্রিয়াশীল, যার দ্বারা এই সংসার সৃষ্ট ও পালিত হয়। (২) অপর যজ্ঞ লোকব্যবহারের জন্য সর্বতোভাবে আবশ্যক। ‘যজ দেবপূজা-সঙ্গতিকরণ-দানেṣu’—এই পাণিনীয় ধাতুর ভিত্তিতে উপাধ্যায়জি লিখেছেন—

‘সঙ্গতিকরণ অর্থাৎ দুই তত্ত্বের সংমিশ্রণে নূতন তত্ত্বের নির্মাণও যজ্ঞ। তদুপরি জগতে সমস্ত পদার্থের আদান-প্রদানের যে প্রক্রিয়া চলমান, সেটিও যজ্ঞ।’

যজুর্বেদ ও অন্যান্য বেদের সম্পর্ক এইরূপ যজ্ঞের সঙ্গে, কেবল ঘৃত-সামগ্রী দ্বারা সম্পন্ন যজ্ঞের সঙ্গে নয়।

সামবেদ উপাসনার বেদ। তার গেয়তার অর্থ কেবল এই নয় যে সামবেদের মন্ত্রগুলি যজ্ঞে গান করা হবে; বরং তার অর্থ এই যে সামবেদের মন্ত্রের দ্বারা পরমেশ্বরের উপাসনা করা হবে। এইভাবে জ্ঞান, কর্ম ও উপাসনার মধ্যে বিশ্বের সমস্ত কার্য অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কেবল যজ্ঞের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করলে তো বেদ—

১. বায়ুরনিলমমৃতমথমেদং ভস্মান্তং শরীরম্‌। যজুঃ ৪০/১৫
২. সংস্কৃতবাঙ্ময়ের বৃহৎ ইতিহাস, ভূমিকা, পৃ. ১৫
৩. তদেব, পৃ. ১৩

বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসের দৃষ্টিতে কেবল যজ্ঞের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তা অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে যাজ্ঞিক দিকটি এক বিস্তৃত ও সুসংগঠিত দিক, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বেদসমূহের রচনা কেবল যজ্ঞার্থেই হয়েছে। এই কারণেই মহর্ষি দয়ানন্দ বেদকে ‘সমস্ত সত্য বিদ্যার গ্রন্থ’ বলে অভিহিত করেছেন। স্বামীজির বক্তব্য—

বেদে বিষয়বস্তুর রূপে বহু উপাদান আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে চারটি প্রধান—
(১) বিজ্ঞান, অর্থাৎ সকল পদার্থের যথার্থ জ্ঞান,
(২) কর্ম,
(৩) উপাসনা,
(৪) জ্ঞান।
বিজ্ঞান সেই বিদ্যা, যার দ্বারা কর্ম, উপাসনা ও জ্ঞান—এই তিনটির যথাযথ ব্যবহার সম্ভব হয় এবং পরমেশ্বর থেকে তৃণপর্যন্ত সকল পদার্থের প্রত্যক্ষ বোধ লাভ করা যায়।

এইভাবেই পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায়ও বলেছেন যে বেদে আধুনিক বিজ্ঞানের থেকেও উচ্চতর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রতিপাদন রয়েছে। এতকিছুর পরেও কিছু বিদ্বানের ধারণা যে সামবেদ ও যজুর্বেদের সংকলন নাকি নিশ্চিতভাবেই যাজ্ঞিক কার্যকে কেন্দ্র করে হয়েছে—এটি মূলত একটি ভ্রান্ত ধারণা। ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদকে তো অধিকাংশ বিদ্বানই যজ্ঞার্থ বলে মানেন না। ম্যাক্স মুলার, উইলসন প্রমুখ পাশ্চাত্য পণ্ডিতদেরও মত যে ঋগ্বেদের সংকলন যজ্ঞের উদ্দেশ্যে হয়নি। মধুসূদন সরস্বতী স্পষ্টভাবেই অথর্ববেদের যজ্ঞার্থতার নিষেধ করেছেন।

বাণীর উৎপত্তি

বাণী মূলত দুই প্রকার—
(১) দৈবী বাক্‌,
(২) মানুষী বাক্‌।

(১) দৈবী বাক্‌
মহাভারতে বলা হয়েছে, সৃষ্টির আদিতে স্বয়ম্ভূ প্রজাপতি নিজে থেকেই বেদময়ী দিব্য বাক্‌-এর প্রকাশ করেছিলেন। এই বাক্‌ আদিহীন ও নাশরহিত ছিল। এই দৈবী বাক্‌ থেকেই জগতের সকল প্রবৃত্তির উদ্ভব হয়েছে। নিষ্কলুষ ঋষিগণ এই দৈবী বাক্‌কে তাঁদের হৃদয়গুহায় প্রত্যক্ষ করেছেন। ঋগ্বেদে এই ভাবটি এইভাবে প্রকাশিত হয়েছে—

“বৃহস্পতে প্রথমং বাচো অগ্রং
যৎ প্রৈরত নামধেয়ং দধানাঃ।
যদেষাং শ্রেষ্ঠং যদরিপ্রমাসীত্‌
প্রেণা তদেষাং নিহিতং গুহাবিঃ॥” (ঋগ্বেদ ১০.৭.১)

অর্থাৎ—বৃহস্পতি, বাক্‌-এর আদিরূপ প্রথমে যিনি প্রকাশ করলেন, নাম ও রূপ স্থাপন করলেন; যে বাক্‌ তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ও কলুষহীন ছিল, তা প্রজ্ঞার দ্বারা ঋষিদের হৃদয়গুহায় নিহিত হয়ে রইল।

এইভাবে বেদকে কেবল যজ্ঞকেন্দ্রিক গ্রন্থ হিসেবে দেখলে তার ব্যাপ্তি, গভীরতা ও সর্বজনীন বিদ্যামূলক চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।

এই অংশে ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলিকে ভিত্তি করে বাণীর আদিরূপ, তার বিকাশ ও মানবভাষার উৎপত্তি—এই গভীর বৈদিক দর্শনটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ঋগ্বেদ ১০.৭.১–এ বলা হয়েছে—
হে বৃহস্পতিতে, ঋষিরা যখন নাম, রূপ ইত্যাদি স্থাপন করে আদিম বাণীকে প্রকাশের দিকে প্রবৃত্ত করলেন, তখন সেই বাণী ছিল সর্বোত্তম, নির্মল ও দোষরহিত জ্ঞানরূপ। এই জ্ঞান ঋষিদের হৃদয়গুহায় নিহিত ছিল এবং প্রেরণার দ্বারা প্রকাশিত হল। অর্থাৎ দैবী বাক্‌ প্রথমে বাহিরে উচ্চারিত ভাষা নয়, বরং ঋষিদের অন্তরে উদ্ভাসিত এক চৈতন্যরূপ জ্ঞান।

‘অগ্রम्’ শব্দের ব্যাখ্যায় উদ্গীথ বলেছেন—এটি আদিবাচক; অর্থাৎ বাণীর সর্বপ্রথম কারণ, উৎস ও নিমিত্ত। কোষেও ‘অগ্র’ শব্দের অর্থ হিসেবে ‘সর্বোৎকৃষ্ট’, ‘সর্বোপরি’ ও ‘আদি’—এই তিনটিই পাওয়া যায়। তাই এই আদিবাক্‌ ছিল বাণীর শ্রেষ্ঠ ও মৌলিক রূপ, যা সরাসরি ঋষিদের হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়েছিল।

এই সূক্তের পরবর্তী মন্ত্রে (ঋগ্বেদ ১০.৭১.১) এক অত্যন্ত সুন্দর উপমা দেওয়া হয়েছে—যেমন চালুনিতে সত্তু ছেঁকে অশুদ্ধ অংশ ফেলে দিয়ে বিশুদ্ধ অংশ গ্রহণ করা হয়, তেমনি সৃষ্টির আদিতে ধ্যানরত ঋষিগণ মননের মাধ্যমে বিশুদ্ধ বাণীকে পৃথক করে প্রকাশ করেছিলেন। এরপর (১০.৭১.২) বলা হয়েছে, অন্য লোকেরা যজ্ঞ ও সংগতির মাধ্যমে সেই বাণীর পথকে লাভ করল, যা ঋষিদের মধ্যে প্রবিষ্ট ছিল। অর্থাৎ ঋষিদের অন্তর্দৃষ্টিতে যে দैবী বাক্‌ প্রকাশ পেয়েছিল, তা পরবর্তীকালে যজ্ঞ, শিক্ষা ও পরম্পরার মাধ্যমে সমাজে প্রবাহিত হয়।

ঋগ্বেদের আরেক স্থানে বলা হয়েছে—
“দেবতারা দৈবী বাণীকে প্রকাশ করেছেন, আর সেই বাণীকেই নানারূপী পশুগণ উচ্চারণ করে।” (ঋগ্বেদ ৮.১০০.৮)
এখানে ‘পশু’ শব্দের দ্বারা সমস্ত প্রাণী বোঝানো হয়েছে। মানুষের ভাষা ব্যক্ত (স্পষ্ট ও বিকশিত), আর অন্য প্রাণীদের ভাষা অব্যক্ত। কিন্তু উৎস একটিই—দৈবী বাক্‌।

এই সমস্ত মন্ত্রের মাধ্যমে বাণীর একটি সম্পূর্ণ বিকাশধারা বোঝানো হয়েছে—

  1. আদিবাক্‌ বা দৈবী বাক্‌ : অবিভক্ত, অবর্ণিত, নিরাকার, ঋষিদের হৃদয়ে উদ্ভাসিত।

  2. ঋষিবাক্‌ : মনন ও ধ্যানের দ্বারা শুদ্ধীকৃত।

  3. যজ্ঞ ও পরম্পরার মাধ্যমে প্রাপ্ত সামাজিক বাণী।

  4. মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মুখে প্রকাশিত ব্যক্ত ও অব্যক্ত ভাষা।

আদিবাক্‌ কেমন ছিল—এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, তা বর্ণ, পদ, বাক্য, ছন্দ ইত্যাদির বিভাজনহীন ছিল। সায়ণাচার্য স্পষ্টভাবে বলেছেন—' अग्निमीळे पुरोहितमित्यादि वाक्‌ पूर्वस्मिन्‌ काले पराची समुद्रादिषु ध्वनिवदेकात्मिका सत्यव्याकृता प्रकृतिः प्रत्ययः पद वाक्यमित्यादि विभागकारिग्रन्थरहिता आसीत्‌' “অগ্নিমীলে পুরোহিতম্‌” প্রভৃতি মন্ত্র আদিকালে সমুদ্রের ধ্বনির মতো একাত্ম ছিল। তখন সেখানে স্বর-ব্যঞ্জন, পদ, বাক্য বা ছন্দের কোনো ভেদ ছিল না। সমস্ত মন্ত্র যেন ধ্বনিসমুদ্রে লীন ছিল।

এই ধ্বনিসমুদ্রই হচ্ছে শব্দব্রহ্ম। ভর্তৃহরিও এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। পরে সেই অবিভক্ত শব্দব্রহ্ম থেকেই ধীরে ধীরে বর্ণ, পদ, বাক্য ও ভাষার প্রকাশ ঘটেছে।

সারকথা—
বেদে বাণী কোনো মানবসৃষ্ট ভাষা নয়; তা চৈতন্যস্বরূপ দৈবী তত্ত্ব। ঋষিরা সেই তত্ত্বের দ্রষ্টা, নির্মাতা নন। মানবভাষা ও পশুভাষা—সবই সেই এক আদিবাক্‌-এর বিভিন্ন স্তরের প্রকাশ। এই দৃষ্টিতে বেদ শুধু ধর্ম বা যজ্ঞের গ্রন্থ নয়, বরং বাক্‌, চেতনা ও জ্ঞানতত্ত্বের এক অতুলনীয় দর্শন

অনাদিনিধন ব্রহ্ম, শব্দতত্ত্ব যদক্ষর।
অর্থভাবের দ্বারা যে বিবর্তিত হয়, যাহা হইতে জগতের প্রক্রিয়া প্রবাহিত—
(বাক্যপদীয় ১/১)

এই ধ্বনিসমুদ্রাত্মক শব্দতত্ত্ব ব্রহ্ম—বৃদ্ধিশীল এবং অক্ষর, অর্থাৎ ক্ষয়রহিত। এটি ছিল অব্যাকৃত বাক্‌। ঋষিগণ একে লাভ করে বর্ণ, পদ, বাক্য প্রভৃতির রূপে ব্যাকৃত করেছিলেন। এই কথাটিই তৈত্তিরীয় সংহিতায় এইভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে—আদিতে একাত্মিকা, অবিচ্ছিন্ন রূপবিশিষ্ট অব্যক্ত বাক্‌ ছিল। দেবতারা ইন্দ্রকে প্রার্থনা করলেন—এই বাক্‌কে ব্যক্ত করো। পূর্বে উদ্ধৃত ‘সক্তুমিব তিতউনা পুনন্তো’—এই বাক্যেরও একই ভাব যে, ঋষিগণ তাঁদের হৃদয়ে প্রকাশিত সেই অব্যক্ত বাক্‌কে পরিশোধিত করে বর্ণ, পদ, বাক্য প্রভৃতি রূপে প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময়েই বেদের শব্দাবলিরও অস্তিত্ব ঘটে।

কখনো কখনো এমন হয় যে, কোনো বিশেষ ভাব প্রকাশ করার জন্য বুদ্ধিতে বহু প্রকার শব্দ অবতীর্ণ হয়। জ্ঞানীজন অসম্পূর্ণ ও দোষযুক্ত শব্দ পরিত্যাগ করে সুন্দর শব্দের মাধ্যমে নিজের ভাবকে প্রকাশ করেন। বেদের অভিব্যক্তি বা আবির্ভাবের ক্রমও ঠিক এইরূপ। একে এইভাবে ভালো করে বোঝা যায়—যেমন বাল্মীকী ঋষির প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘শোকঃ শ্লোকত্বমাগতঃ’; অর্থাৎ ব্যাধ কর্তৃক ক্রৌঞ্চমিথুনের একটিকে হত্যা করার ফলে বাল্মীকীর হৃদয়ে যে শোক উৎপন্ন হয়েছিল, তা শ্লোকে রূপান্তরিত হয়। এর দ্বারাই লৌকিক কাব্যের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ঠিক সেইভাবেই নির্মল কলুষশূন্য, অতীন্দ্রিয়ার্থদ্রষ্টা ঋষিদের হৃদয়ে যে জ্ঞান প্রকাশিত হয়েছিল—যা অব্যক্ত বাক্‌রূপ ছিল—তা ব্যাকৃত হয়ে সর্বপ্রথম বেদমন্ত্রের রূপে প্রকাশিত হয়। এটাই ‘ধীরা মনসা বাচমক্রত’—এর অভিপ্রায়।

শুদ্ধ অন্তঃকরণের ঋষিদের হৃদয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত এই অনাদিনিধন অব্যক্ত বাক্‌ই বেদের আবির্ভাবের মূল। ভর্তৃহরি একে এইভাবে বলেছেন—

অত্রাতীতবিপর্যাসঃ কেবলামনুপশ্যতি।
ছন্দস্যশ্ছন্দসাং যোনিমাত্মা ছন্দোময়ীং তনুম্‌॥

(বাক্যপদীয় ১/১৭)

এখানে ‘ছন্দস্য’ অর্থাৎ বেদগ্রহণসমর্থ ঋষি, ছন্দ বা বেদের যোনিস্বরূপ—উৎপত্তির কারণ—এই কেবল অব্যক্ত বাক্‌, যা বর্ণ, পদ প্রভৃতির ভেদহীন, তারই সাক্ষাৎ করেছিলেন।

১. “বাক্‌ বৈ পরাচ্যব্যকৃতা অবদৎ। তে দেবা ইন্দ্রমব্রুবন্নিমাং বাকং ব্যাকুর্বিতি।”
—তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬/৪/৭/২

প্রত্যস্মিতভেদায়া যদ্বাচো রূপমুত্তমম্।
তদস্মিন্নেব তমসি জ্যোতিঃ শুদ্ধং বিবর্ত্ততে॥

—বাক্যপদীয় ১/১৮

সেই আদিমূল অব্যক্ত বাক্‌-এ বর্ণ, পদ প্রভৃতির কোনো ভেদ ছিল না। সেটিই ছিল বাক্‌-এর সর্বোত্তম রূপ। একেই মন্ত্রে পরে ‘শ্রেষ্ঠম্’ ও ‘অরিপ্রম্’ বলা হয়েছে। এই শুদ্ধ জ্যোতিস্বরূপ অব্যক্ত বাক্‌ই বৈকৃত ধ্বনিরূপ অন্ধকারে বিবর্ত প্রাপ্ত হয়ে বর্ণ, পদ, বাক্য প্রভৃতি রূপে প্রকাশিত হয়েছে।

বর্ণ প্রভৃতির রূপে বিভক্ত এই ব্যক্ত বাক্‌-এর পূর্বে ঋষিদের হৃদয়রূপ গুহায় অবস্থিত অব্যক্ত বাক্‌ কেবল জ্ঞানস্বরূপাই ছিল; কিন্তু তাতে বর্ণ প্রভৃতির ভেদ সূক্ষ্মরূপে সেইভাবেই অন্তর্নিহিত ছিল, যেমন পাখির ডিমে তার সমস্ত অঙ্গ প্রথমে অব্যক্ত অবস্থায় থাকে, কিন্তু ডিমের মধ্যেই ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। ভর্তৃহরি এই তত্ত্বকেই এইভাবে বলেছেন—

আণ্ডভাবাভিবাপন্নো যঃ ক্রতুঃ শব্দসঞ্জ্ঞকঃ।
বৃত্তিস্তস্য ক্রিয়ারূপা ভাগশো ভজতে ক্রমম্॥

—বাক্যপদীয় ১/৫১

ঋষিদের সেই ‘ক্রতু’—অর্থাৎ জ্ঞান—ডিমসদৃশ অবস্থাকে প্রাপ্ত হয়েছিল। তার ক্রিয়ারূপা বৃত্তিই বর্ণ প্রভৃতির রূপে বিভাগকে প্রাপ্ত হয়।

শব্দাবির্ভাব—এই অনাদিনিধন অব্যক্ত বাক্‌ ঋষিদের হৃদয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আবির্ভূত হয়েছিল। বাক্য প্রকাশের ইচ্ছায় ঋষিরা মুখ প্রভৃতি অঙ্গের দ্বারা তাকে শব্দরূপে প্রকাশ করেছিলেন। শব্দোৎপত্তির এই-ই প্রক্রিয়া—

যথালব্ধক্রিয়ঃ প্রযত্নেন বক্তুরিচ্ছানুবর্ত্তিনা।
স্থানেṣ্বভিহিতো বায়ুঃ শব্দত্বং প্রতিপদ্যতে॥

—বাক্যপদীয় ১/১০৮

এইভাবেই অব্যক্ত বাক্‌ ঋষিদের দ্বারা ঋক্‌, যজুঃ ও সাম—এই তিন রূপে ব্যক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ জ্ঞান, কর্ম ও উপাসনার অভিব্যঞ্জক রূপে বেদের আবির্ভাব ঘটে। এইভাবে বেদরূপে এই সুবিশাল শব্দাত্মক রাশির জনক ঋষিরাই, কিন্তু এর মূলেই রয়েছে সেই অব্যক্ত বাক্‌, যার অবতরণ ঋষিদের হৃদয়ে কোনো প্রয়াস ছাড়াই স্বতঃসিদ্ধভাবে ঘটেছিল। এই কারণেই বর্তমান বেদসমূহকে অপৌরুষেয় বলা হয়—কারণ মূলরূপে সেই জ্ঞান ছিল অপৌরুষেয়; তার ভিত্তিতেই ঋষিরা ঋক্‌, যজুঃ ও সাম রূপে সেই জ্ঞানকে প্রকাশ করেছিলেন।

১. ‘ক্রতুঃ’—কর্মনাম; নিঘণ্টু ২/১, প্রজ্ঞানাম; নিঘণ্টু ৩/২৯
২. “সা বা এষা বাক্‌ ত্রেধা বিহিতা ঋচো যজূঁষি সামানি।”
—শতপথ ব্রাহ্মণ ১০/৫/১/২

নিজের শব্দে বিভক্ত করা হলো। সাধারণত বেদসমূহের বর্তমান রূপকে পৌরুষেয় মানা হয়। এইভাবে সর্বপ্রথম বেদের আবির্ভাব ঘটে। এই ঋষিদের হৃদয় রজস ও তমস থেকে সম্পূর্ণ শূন্য ছিল। তাই তাদের বুদ্ধিতে জ্ঞানের আলোকপ্রকাশ হয়েছিল। তাদের সেই ঋতম্ভরা প্রজ্ঞা দিয়ে তারা অতীত ও ভবিষ্যতের তত্ত্বকেও প্রত্যক্ষভাবে সाक्षাৎ করেছিলেন। এ কারণেই বেদে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এই তিন কালের সঙ্গে সম্পর্কিত চিরন্তন সত্য পাওয়া যায়। ভর্তৃহরী এটিকে এইভাবে প্রকাশ করেছেন—

আবির্ভূতপ্রকাশানামঅনুপ্ৰলুতচেতসাম্‌।
অতীতানাগতজ্ঞানং প্রত্যক্ষান্ন বিশিষ্যতে॥
—বাক্যপদীয় ১/৩৮

সাক্ষাৎকৃত ধর্ম যা ঋষি দেখেন, তা অতন্দ্রিয় ও অসংবেদ্য হলেও তারা নিজের আর্ষ চক্ষু দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে দেখতেন। যদিও আদিজ্ঞান বেদের রূপে একাত্ম ছিল, তা ডিমের মধ্যে অবস্থানরত তরলের মতো অব্যক্ত অবস্থায় ছিল। এটিকেই ঋষিরা চার রূপে বিভক্ত করে নিজেদের শব্দে ঋক্‌ প্রভৃতি হিসেবে প্রকাশ করেছেন।

এইভাবে বর্তমান চার বেদরূপী শব্দরাশি ঋষিপ্রণীত হিসেবে গণ্য করা উচিত। এটি শব্দের রাশি এবং এর বর্ণানুক্রম বিভিন্ন যুগে পরিবর্তিত হতে পারে, যেমন মহাভাষ্যতে পিতাঞ্জলি বলেছেন—“যা বর্ণানুপূর্বী সাঽনিত্য।” অর্থাৎ বেদের বর্ণানুক্রম ঋষিপ্রণীত হওয়ায় অনিত্য, কিন্তু এর আদিমূল শব্দব্রহ্ম চিরন্তন। সেই এক বেদ-জ্ঞানকে ঋষিরা ঋক্‌ প্রভৃতি চার ভাগে বিভক্ত করেছেন।

প্রারম্ভে এক বেদ ছিল কি না

এছাড়াও বলা হয় যে প্রারম্ভে একটি বেদই ছিল। দ্বাপর যুগে বেদব্যাস এটি চার ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। এ ভিত্তিতেই তার নামও বেদব্যাস হিসেবে পরিচিত। মহাভারত ও পুরাণে এই বিষয়ের সমর্থক প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু অনোত্তীয়ানুসারে বলা হয়েছে—

বিব্যাসএক চতুর্ধা যঃ বেদা বেদবিদাং বরঃ।
—মহাভারত ১/৬০/৫

তারপর সেখানে বলা হয়েছে—

ততোऽত্র মাতসুতো ব্যাসো অষ্টাবিংশতিতমে উত্তরে।
বেদমেকং চতুষ্পাদং চতুর্থা ব্যভজৎ প্রভুঃ॥
—বাক্যপদীয় ৩/৪/২

এটি একটি একপক্ষীয় মত এবং সবাই এটি গ্রহণ করে না। এই বিষয়ে অচ্যুত প্রমাণ হলো যে উপনিষদ এবং ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে চারটি বেদের বর্ণনা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। উপনিষদ সাহিত্য, ব্রাহ্মণগ্রন্থ, মহাভারত এবং পুরাণগুলি প্রাচীন, তাই উপনিষদগুলির সামনে মহাভারত ও পুরাণের কথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অতিরিক্তভাবে, বেদের মধ্যে নিজেই চার বেদের উল্লেখ রয়েছে।

এই প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পুরাণের কথা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।

তিন বা চার বেদ – বিভিন্ন স্থানে ঋগ্‌, যজু এবং সাম এই তিন বেদের উল্লেখ থাকায় মনে করা হয়েছে যে প্রারম্ভে তিন বেদই ছিল। অথর্ববেদ পরে সৃষ্টি। এই মত সাধারণত পশ্চিমা গবেষকদের। কিন্তু বেদের মধ্যেই চার বেদের উল্লেখ রয়েছে। ঋগ্‌, যজু এবং সাম এই তিন বেদেরই যজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এদের সঙ্গে সম্পর্কিত অধ্বর্যু ও উদ্গাতা এই তিন ঋত্বিজের নিযুক্তি যজ্ঞে হয়। অথর্ববেদের মূল বিষয় যজ্ঞ নয়। তাই কোথাও কোথাও তিন বেদের সঙ্গে অথর্ববেদের নাম নেই। যজ্ঞ এবং সকল বেদের সমাপনায় এটি আধ্যাত্মিক। অথর্ববেদের মূল বিষয়ও এইই। এতে ব্রহ্মবিদ্যার প্রতিপাদন বিভিন্ন খণ্ডে হয়েছে। ব্রহ্মা এখানেই বিশেষজ্ঞ। তাই অথর্ববেদকে পরে সৃষ্টি বলা যুক্তিসঙ্গত নয়।

এই কারণে বেদ দুই ধরনের – পৌরুষেয় এবং অপৌরুষেয়। একীভূত, চিরন্তন, পরমেশ্বরীয় জ্ঞানের রূপে এটি অপৌরুষেয়; শব্দাত্মক রূপে এটি পৌরুষেয়।

মন্ত্রের তক্ষণ – ঋগ্বেদে মন্ত্রের তক্ষণের কথা বলা হয়েছে। যে সমস্ত মানবকল্যাণকারী ঋষিরা মাননীয় মন্ত্র তক্ষণ করেছেন, হৃদয় থেকে তক্ষণ করেছেন, সেই তক্ষণকৃত মন্ত্রগুলি জনতার সামনে উচ্চারিত হয়েছে। সেই পরমেশ্বরের উদ্দেশ্যে।

উদাহরণস্বরূপ:

  • তত্রাপরা ঋগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদো অথর্ববেদঃ। মূঃ উপ° ১/১/৫ – জ্ঞান দ্বারা ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ জানা যায়।

  • ঋগ্বেদেই হোতার নির্বাচিত, যজুর্বেদবিদ অধ্বর্যু, সামবেদ উদ্গাতা, অথর্ববেদজ্ঞ ব্রহ্মাণ। (গোঅব্রাশ ৩/১)

  • যক্ষ্মাদূচো আপাতক্ষন যজু থেকে জন্ম নেয়। যেখানেই বেদ নিহিত, সেখানে বিশ্বরূপী বিদ্যমান। (অথর্ব ৪/৩৫/৬)

  • মন্ত্র যে কোনো সময়ে মানুষদের মধ্যে উচ্চারিত হয়। (ঋ ৭/৭/৬)

  • মানুষের দ্বারা প্রশংসিত মন্ত্র। (ঋ ১/৬৭/২)

ঋচাগুলির তক্ষণ করা হয়েছে। ভ্বাদিগণিতে "তক্ষূ, ত্বক্ষূ, তনূকরণে" ধাতু পড়া হয়েছে। তক্ষণ অর্থ সূক্ষ্মীকরণ। যেমন একটি বাড়াই কাঠের গাছকে ছিঁড়ে সুন্দর মেজ-কুসি ইত্যাদির আকার দেয়, সেই কাজটিই তার তক্ষণ। তাই বাড়াইকে তক্ষা বলা হয়। একই কাজ ঋষিরাও করেছেন। ঋতম্ভরা প্রজ্ঞা প্রাপ্ত আদিঋষিদের মনেই যে পরমেশ্বরীয় জ্ঞানের অবতরণ হয়েছিল, তা হয়তো সংক্ষেপে বা অস্পষ্টভাবে ছিল, অথবা তাদের মনেই জ্ঞানের কিছু ঝলক এলো। মস্তিষ্কে জ্ঞানের কিছু রশ্মি পড়ল, তার কিছু ধারণা বা দর্শন হল। সেটিকে তারা তাদের শব্দে মন্ত্রের আকারে প্রকাশ করলেন। যেমন একজন চিত্রশিল্পী তার হৃদয়ে জমা ভাবগুলোকে চিত্র আকারে প্রকাশ করে, তেমনি এই ঋষিরা হৃদয়ে অবতীর্ণ পরমেশ্বরীয় জ্ঞানকে তাদের শব্দে মন্ত্ররূপে প্রকাশ করলেন। এটিই মন্ত্রের তক্ষণের অর্থ। এভাবে মূলরূপে বেদ জ্ঞান পরমেশ্বরপ্রদত্তই, কিন্তু তার বর্তমান শব্দমালা ঋষিকৃত। আগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা ঋষিরা বেদের প্রকাশের এই ভাবকেই বোঝায়।

বেদের পৌরুষেয়তা ও অপৌরুষেয়তা

বেদের বিষয়ে দুটি স্পষ্ট মত আছে:
১) ভারতীয় পরম্পরা বেদের অপৌরুষেয়তা মানে, অর্থাৎ বেদ মানবসৃষ্ট নয়।
২) পশ্চিমা চিন্তাধারার মতে দীর্ঘ সময় ধরে ঋষিরা বেদমন্ত্র তৈরি করেছেন।

এই দুটি মত পরস্পর বিরোধী। আজকাল কিছু ভারতীয় বিদ্বানও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক। এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু প্রমাণ দেওয়া হলো।

(১) অপৌরুষেয় পক্ষ

  • ঋগ্বেদে রিক্‌ ইত্যাদির উৎপত্তি সর্বহুত যজ্ঞ থেকে বলা হয়েছে।

  • অথর্ববেদে পরমেশ্বররূপী স্তম্ভ থেকে ঋগাদি সৃষ্টি হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ:

  1. যেহেতু ঋচি আপাতক্ষন। (অথর্ব ১০/৭/২০)

  2. তাই যজ্ঞ থেকে সবহুত ঋচি, সামানি, চদানসি সৃষ্টি হয়েছে; তাই যজু থেকে উৎপন্ন। (ঋ ১০/৯০/৯)

  3. যসমাদৃচঃ অপাতক্ষন্যজুঃর্যস্মাদাপাক্ষন্। সামানি যস্য লোমান্যথর্বাঙ্গিরসঃ মুখং স্কম্ভং তং ব্রূহি কতমঃ স্বিদেভ সঃ। (অথর্ব ১০/৭/২০)
(যস্মাৎ) যার থেকে [প্রাপ্ত করে] (ঋচঃ) ঋগ্ মন্ত্রের [স্তুতিবিদ্যা-সমূহকে] (অপ-অতক্ষন্) তাঁরা [ঋষিগণ] সূক্ষ্ম করেছে [উত্তমরূপে বিচার করেছে] (যস্মাৎ) যার থেকে [প্রাপ্ত করে] (যজুঃ) যজুর্জ্ঞান [সৎকর্মের বোধ] (অপ-অকষন্) তাঁরা নির্ণয় করেছে। (সামানি) মোক্ষবিদ্যা-সমূহ (যস্য) যার (লোমানি) লোম [সমান ব্যাপক] এবং (অথর্ব-অঙ্গিরসঃ) অথর্বমন্ত্র [নিশ্চল ব্রহ্মের জ্ঞান] (মুখম্) মুখ [তুল্য], (সঃ) তিনি (কতমঃ স্বিৎ) কে (এব) নিশ্চিতরূপে ? [উত্তর] (তম্) তা (স্কম্ভম্) স্কম্ভ [ধারণকারী পরমাত্মা] (ব্রূহি) তুমি বলো ॥

(2) বিষ্ণু পুরাণ ১/৫/৫৪-৫৮, মার্কণ্ডেয় পুরাণ ৩/১২/৩৪/৩৭ এবং ভাগবত পুরাণ ৯৯/১/৩/৬-এ চতুর্মুখী ব্রহ্মা থেকে বেদ, যজ্ঞ, ছন্দ, স্তোম প্রভৃতি উত্পত্তি বর্ণিত হয়েছে।

(3) এই বিষয়ে মনুস্মৃতির নিম্ন শ্লোক সুপরিচিত—

অগ্নিভায়ুরঅবিভ্যস্তু ত্রয়ং ব্রহ্ম সনাতনম্।
দুদোহ যজ্ঞসিদ্ধার্থমৃগ্যজুঃসামলক্ষণম্॥
মনু০  ১/২৩

(4) বৈশেষিক দর্শনে বেদকে ঈশ্বরীয় বচন হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।

(5) শাস্ত্রযোনিত্বাত্‌ (ওএঃদঃ ১/১/৩)-এর ব্যাখ্যায় আদি শঙ্করাচার্য লিখেছেন—
ঋগ্বেদাদেঃ শাস্ত্রস্যানেকবিদ্যাস্থানোপবৃংহিতস্য প্রদীপवत্‌ সর্বার্থাবদ্যতিঃ সর্বজ্ঞকল্পস্য যোনিঃ কারণং ব্রহ্ম।

(6) অনাদিনিধনা নিত্যা ভাগুত্সৃষ্টা স্বয়ম্ভূয়া।
আদৌ বেদময়ী দিব্যা যতঃ সর্বাঃ প্রবৃত্তয়ঃ॥ ম0ভা০, শা০প*, অ০ ২২৩-২৪

(7) প্রজাপতিঃ বা ইমান্‌ বেদানসৃজত। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ।

(8) অরে’স্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বাসিতমেতদ্‌ যদ্‌ ঋগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদো’থর্ববেদঃ। বृहঞ্উপ° ৪/৫/১৭

(9) ন্যায়বর্ত্তিক তাৎপর্যটি টীকাকার লিখেছেন—
‘মহাপ্রলয়ে তু ঈশ্বরেণ বেদান্‌ প্রণীয় সৃষ্ট্যাদৌ স্বয়মেভ সম্প্রদায়ঃ প্রবর্ত্যৎ এভেতি ভাবঃ’

(10) তস্মাদপৌরুষেয়ত্বান্নিত্যত্বাচ্চ কৃত্স্নস্যাপি বেদরাশেঃ (অর্থর্ববেদভাষ্য পোদ্ধাত্যে সায়ণাচার্যঃ)

(11) আধুনিক যুগে স্বামী দয়ানন্দও বেদকে পরমেশ্বরীয় বাণী হিসেবে মানেন। (ঋভা০ভূ০, বেদোৎপত্তি বিষয়)

(12) এই বিষয়ে পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায় লিখেছেন—
“বেদ আপৌরুষেয়, তা স্বতঃ আবির্ভূত হওয়া নিত্য পদার্থ।”
উপাধ্যায়জি তার पुष्टि-রূপে নিম্ন বেদমন্ত্র প্রস্তাব করেছেন—

তস্মৈ নুনমভিদ্যবে বাচাবিরূপনিত্যয়া।
বৃষ্ণো চোদস্ব সুষ্টুতিম্‌ ঋগ© ৮/৭৫/৬

এই মন্ত্রে নির্দিষ্ট '*নিত্য বাক' ব্যবহার শুধুমাত্র বেদ মন্ত্রের জন্যই করা হয়েছে। এই নিত্য বেদ প্রলয়ে কেবল তিরোহিত হয়ে যায় এবং সৃষ্টির শুরুতে পুনরায় ঋষিদের হৃদয়ে স্ফুরিত হয়। ডঃ গোবিন্দচন্দ্র পাণ্ডে এই সত্যটি এভাবে বলেছেন—

“পরম্পরার অনুসারে বেদ নিত্য। যেহেতু ঋষিরা এগুলি শুনেছেন, সেগুলি শব্দশ্রুতি হিসেবে পরিচিত। যিনি এগুলির দর্শন বা প্রত্যক্ষ করেন, তিনি ঋষি হিসেবে গণ্য হন।”

এই বিষয়ে বাচস্পতি গৈরোলা বলেন—
“এই দৃষ্টিতে জানা যায় যে, বেদ স্বয়ম্ভূ, স্বয়ংপ্রকাশ এবং স্বয়ংপ্রমাণ।”

প. রামগোবিন্দ ত্রিবেদী অনুযায়ী, জ্ঞানরূপ বেদ নিত্য, কিন্তু শব্দরূপ নয়।

যে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা বেদকাল নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন, তাদের মধ্যে ম্যাক্সমুলার অগ্রণী ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদেরও লিখতে হয়েছিল—
‘Reason and comparative study of Religions declare that god gives his divine knowledge from his first appearance on earth.’ (Science and Religion)
অর্থাৎ, তর্ক ও ধর্মের তুলনামূলক অধ্যয়ন উভয়ই ঘোষণা করে যে, সৃষ্টির শুরু থেকেই পরমেশ্বর মানবকে তার জ্ঞান প্রদান করেছেন।

এইভাবে, শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত ভারতীয় পরম্পরা বেদকে নিত্য ও অপরুষেয় হিসেবে গ্রহণ করে এসেছে। এটি কেবল শ্রদ্ধার কারণে বা অন্ধবিশ্বাসের কারণে বলা হয়নি, বরং এর পিছনে যুক্তি রয়েছে যে, যদি পরমেশ্বর এই সৃষ্টির নিমিত্তকারণ হন, তবে সৃষ্টির শুরুতেই তিনি জ্ঞান প্রদান করতেন, কারণ মানুষকে শেখানো ছাড়া কেউ কিছু শিখতে পারে না। এটি বহু পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। জ্ঞানটি কোন রূপে ছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, কারণ আজ কোন সाक्षাত্কৃত ধর্মা ঋষি উপস্থিত নেই।

সূত্রসমূহ:

  1. উপাধ্যায়, বলদেব, সংস্কৃত সংস্কৃতি, ভূমিকা পৃ. 31

  2. বেদ নিত্যঃ, প্রলয়ে তস্য তিরোধানং ভবতি, সৃষ্ট্যাদৌ চ সঃ তপোনিষ্ণান ঋষীণামন্তঃ স্ফুরতি, वही, পৃ. 12

  3. পাণ্ডে, গোবিন্দচন্দ্র, বৈদিক সংস্কৃতি, পৃ. 6

  4. সংস্কৃত সাহিত্য, পৃ. 113

  5. বৈদিক সাহিত্য, পৃ. 31

বৈদিক সূক্पতে নির্দিষ্ট ঋষি – একটি বিশ্লেষণ

বেদগুলির সূক্তে ঋষি এবং দেবতা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখিত থাকে। দেবতা হলেন মন্ত্রের বিষয়, কিন্তু এই ঋষি কারা, তা নিয়ে বিভিন্ন ধারণা বিদ্যমান। এই ঋষি কি মন্ত্রদ্রষ্টা, নাকি মন্ত্রকারক, তা এখানে আলোচনা করা নয়। দৃষ্টা বা কর্তা যাকে নেবেন, যাই হোক, তাদেরকে ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করতে হবে। তবে সমস্যা হলো, সব ঋষি মানুষ নয়; মানুষের অতীত প্রাণীও সূক্তের ঋষি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ—কদ্রু, শ্যেন, মাছ, কূর্ম, ভাববৃত্ত, যক্ষ্মধ্ন, সরমা, শিবসঙ্কল্প প্রভৃতি মন্ত্রের ঋষি। এদেরকে মানুষ বা মন্ত্রদ্রষ্টা/মন্ত্রকারক বলা যায় না।

যদিও অধিকাংশ ঋষি মানুষরূপে প্রকাশিত, যেমন—বামদেব, অন্ত্রি, সত্যশ্রবা ইত্যাদি। এই ঋষিদের বংশপরম্পরাও সেখানে উল্লেখ আছে, যেমন—প্রগাথঃ কান্ভঃ, প্রাগাথঃ শঁযুর বার্হস্পত্যঃ ইত্যাদি। এই ঋষিদের মন্ত্রদ্রষ্টা ধরা যেতে পারে। এরই প্রেক্ষিতে যাস্ক বলেন—“ঋষয়ঃ মন্ত্রদ্রষ্টরঃ।”

এ অনুযায়ী উবট (উচ্চারণ: উভট) যজুর্বেদ (৭/৪৬)-এর ভাষ্যে লিখেছেন—“ঋষিঃ মন্ত্রাণাং ব্যাখ্যাতা।” বৌধায়নধর্মসূত্র (২/৬/৩৬)-এর ভাষ্যেও গোবিন্দ স্বামী লিখেছেন—“ঋষিঃ মনত্রার্থজ্ঞঃ।” অর্থাৎ যিনি মন্ত্রার্থ দর্শন বা জ্ঞান করেন, তাঁকেই ঋষি বলা হয়। এই ভাবার্থেই মহর্ষি দয়ানন্দ বলেন যে, যেসব ঋষি যেসব মন্ত্রের অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে উপলব্ধি ও প্রচার করেছেন, তাঁদের স্মরণার্থে ওই মন্ত্রে ঋষির নাম লেখা থাকে।

এটি আংশিকভাবে সত্য, অর্থাৎ যারা মানুষরূপে সূক্তের ঋষি, তাঁরা মন্ত্রদ্রষ্টা হতে পারেন। কিন্তু পূর্বোক্ত কদ্রু ইত্যাদি, যারা মানুষ নয়, তাদের মন্ত্রদ্রষ্টা ধরা যায় না।

এই সমস্যার আংশিক সমাধান ‘সর্বানুক্রমণী’-এর সংজ্ঞা দ্বারা হয়—“যস্য বাক্যং স ঋষিঃ।” অর্থাৎ, যে ব্যক্তি যে মন্ত্রের বক্তা, সে মানুষ হোক বা পশু/পাখি, এমনকি জড় পদার্থ হোক, সেই ব্যক্তি ওই মন্ত্রের ঋষি। অর্থাৎ যার মাধ্যমে মন্ত্রে কোনো কথা প্রকাশিত হয়েছে, তিনি ওই মন্ত্রের ঋষি। এভাবে সরমা, শ্যেন ইত্যাদিও ঋষি হিসেবে গণ্য হয়। এই অবস্থায় ঋষি হওয়া মানে মন্ত্রদ্রষ্টা হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি হলো আলাদা, যিনি তাদের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। যেমন—পঞ্চতন্ত্রে লেখক বিষ্ণুশর্মা পশু/পাখির মাধ্যমে নিজের কথা প্রকাশ করেন।

কিছু সূক্তে ঋষি এবং দেবতা পরিবর্তিত হয়। যেমন—পুরূরব-উর্বশী সংলাপে ৯টি মন্ত্রের ঋষি পুরূরব, দেবতা উর্বশী; বাকি ৯টির ঋষি উর্বশী, দেবতা পুরূরব। স্পষ্ট, তারা মানুষ নয়। কারণ নীরুক্তকারের মতে বিদ্যুৎই উর্বশী এবং বারবার গর্জন করা মেঘই পুরূরব। এখানে সমাধান একই—পুরূরব ও উর্বশী মন্ত্রদ্রষ্টা নয়।
বৃহদ্‌দেবতা (২/২৮)-এ এই সত্যটি এভাবে বলা হয়েছে—

संवादेषु वाक्यं स तु तस्मिन् भवेद् ऋषि:। অর্থাৎ, সংলাপ বা মন্ত্র বলার ব্যক্তি নিজেই তার ঋষি।

প্রতীকবাদ—যোগী আরবিন্দ ঋষিবাচক শব্দের প্রতীকাত্মক ব্যাখ্যা করেন। উদাহরণস্বরূপ, মন্ত্রে সর্বত্র “অঙ্গিরস” শব্দটি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সংজ্ঞারূপে নয়। আরবিন্দের দৃষ্টিতে, আগুনের জ্বালা এবং জ্যোতি-ই অঙ্গিরসপদবাচ্য, যেমন বেদও বলে যে অঙ্গিরস আগুনের সন্তান এবং আগুন থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। এই শব্দগুলোকে প্রতীকীভাবে বোঝালে বেদের অর্থে ঋষিজ্ঞান প্রয়োগযোগ্য হয়, ইতিহাসিকভাবে নয়।

যদিও আরবিন্দের দৃষ্টিভঙ্গি সূক্ষ্ম ও ব্যাপক, তবে সব সূক্তে উদ্ধৃত ঋষিদের প্রতীকী ধরা যায় না। কারণ সেখানে বংশপরম্পরাও বিদ্যমান এবং কিছু ঋষির অর্থ সুস্পষ্ট, যেমন—শিবসঙ্কল্প, যক্ষ্মধ্ন। উদাহরণস্বরূপ, যক্ষ্মধ্ন-এর সরল অর্থ—যক্ষ্মা (রোগ) কে বিনাশকারী। এই সূক্তে এ কাজই বর্ণিত হয়েছে। তাই এখানে প্রতীকাত্মক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

ঋষিদের সম্পর্কিত কিছু तथ्य:

  1. কর্মের মাধ্যম—মন্ত্রের বিষয়কে দেবতা বলা হয়। মন্ত্রে উল্লিখিত কর্ম যেই মাধ্যমে সিদ্ধ হয়, সেই মাধ্যমকে ওই মন্ত্রের ঋষি বলা হয়। উদাহরণ:

    • ঋ (১/১৫৫)-এর দেবতা হলো অলক্ষ্মীধ্ন, অর্থাৎ অলক্ষ্মীকে দূর করা।

    • এর ঋষি হলো শিরিম্বিঠো ভারত্বাজ। শিরিম্বিঠ মানে মেঘবাচক, ভারত্বাজ মানে বিশেষণ। “ভাজ” পদ অর্থ—অন্ন, তাই অন্ন পূর্ণ করা ভারত্বাজ। মেঘ (শিরিম্বিঠ) বৃষ্টির মাধ্যমে অলক্ষ্মী দূর করে এবং ধানের ক্ষেত পূর্ণ করে। এইভাবে অলক্ষ্মী দূর করার মাধ্যম—শিরিম্বিঠ ভারত্বাজ মেঘ—ঋষি হিসেবে গণ্য।

  2. বিষয় হিসাবে ঋষি—কিছু সূক্তে বর্ণিত বিষয়কেই ঋষি ধরা হয়। উদাহরণ:

    • ঋ ১০/১২৫-এর ঋষি হলো “বাগম্ভূণী”। এই সূক্তে বাক্যের মাহাত্ম্যই বর্ণিত হয়েছে। সূক্তের দেবতাও বাগম্ভূণী। ফলে ঋষি এবং দেবতা এক হয়ে গেছে।

সূত্রসমূহ:

  1. “এং অঙ্গিরস সুন্বস্ত অগ্নেঃ পরি জজ্ঞরে।”

  2. শিরিম্বিঠো মেধ; ঋ ৬/৩০

  3. ভাজ অন্ননাম। নিঘণ্টু ২/৭

ऋषि নির্বাচনের বিভিন্ন পদ্ধতি – আরও উদাহরণ

(খ) ঋ ১০/৩৪-এর ঋষি হলো কవষ ঐলূষ অক্ষ বা মৌজবান। সূক্তের দেবতাও অক্ষ। এই সূক্তে অক্ষের নিন্দা এবং কৃষি প্রশংসা করা হয়েছে। এখানে অক্ষকে বিকল্প ঋষি বলা হয়েছে।

(গ) যজুর্বেদ ৩৪-এর ৬টি মন্ত্রের ঋষি হলো শিবসঙ্কল্প। এই মন্ত্রগুলিতে শিবসঙ্কল্পত্বেরই কামনা করা হয়েছে।

(৩) অবস্থা বিশেষ—নাসদীয় সূক্ত (ঋ ১০/১২৯)-এর ঋষি হলো ভাববৃত্তম্। এটি একটি বিশেষ অবস্থা, কোনো ব্যক্তি নয়। “ভবন্তি পদার্থ অ্যানেনেতি ভাবঃ” অর্থাৎ সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিই এর वृত্ত। এই সূক্তে সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এটিকেই ভাববৃত্তম্ রূপে ঋষি বলা হয়েছে।

(৪) মন্ত্রের শব্দ অনুযায়ী ঋষি—কিছু সূক্তে মন্ত্রের প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী শব্দকেই ঋষি বলা হয়েছে। উদাহরণ:

  • (ক) ঋ ১০/১৭০-এর ঋষি হলো বিদ্রাট্ সূর্য। সূক্তের তিনটি মন্ত্র বিদ্রাট্ দিয়ে শুরু হয়েছে।

  • (খ) ঋ ১০/৬২-এর ঋষি হলো মুদ্গলো ভার্ম্যশ্ব। সূক্তের পঞ্চম ও নবম মন্ত্রে মুদ্গল পদ পাঠিত হয়েছে। এটিকেই ঋষি ধরা হয়েছে।

  • (গ) ঋ ১০/১৪০-এর ঋষি হলো অগ্নিঃ পাৱকঃ। সূক্তের প্রথম মন্ত্র অগ্নি দিয়ে শুরু হয়েছে, দ্বিতীয় মন্ত্রে “পাৱক ভার্চা” পাঠিত হয়েছে। দু’টি পদ মিলিয়ে ঋষি ধরা হয়েছে।

  • (ঘ) ঋ ১০/১৬৪-এর ঋষি হলো প্রচেতা। চতুর্থ মন্ত্রে “প্রচেতা ন আঙ্গিরসো” পাঠিত হয়েছে। এটিকেই ঋষি ধরা হয়েছে।

  • (ঙ) ঋ ১০/১৭৪/১-এর ঋষি হলো অভীবর্ত্ত। প্রথম মন্ত্রে “অভীবর্ত্তেন হবিশা” পাঠিত হয়েছে, তাই ঋষি ধরা হয়েছে।

  • (ছ) ঋ ১০/৭১-এর জ্ঞানসূক্ত। প্রথম মন্ত্র “বৃহস্পতে প্রথমং বাচোऽগ্রমঃ” থেকে বৃহস্পতিকে ঋষি ধরা হয়েছে।

(৫) কর্ম অনুযায়ী ঋষি—কিছু সূক্তে সূক্তের উদ্দেশ্য বা কার্য অনুযায়ী ঋষির কল্পনা করা হয়েছে। উদাহরণ:

  • (ক) ঋ ১০/১১৭-এর ঋষি হলো ভিক্ষু। সূক্তে দানের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে এবং দান দেওয়ার প্রেরণা দেওয়া হয়েছে। এই ভিত্তিতেই ভিক্ষুকে ঋষি ধরা হয়েছে।

ঋষি নির্বাচনের আরও উদাহরণ ও উপসংহার

(খ) যজুর্বেদ (১৮/৭০)-এর ঋষি হলো শাসঃ। এই শব্দ “শাসু অনুশিষ্টৌ” ধাতু থেকে উদ্ভূত। মন্ত্রে শাসনের ভাবই প্রকাশ পেয়েছে। তাই এইভাবেই ঋষির কল্পনা করা হয়েছে।

(গ) ঋ (১০/১২৪)-এর ঋষি হলো অগ্নিভরুণসোমানাং বিহবঃ। সেই অনুযায়ী সূক্তে অগ্নি, বরুণ এবং সোমের আহ্বান করা হয়েছে।

(ঘ) ঋ ১০/৯৭-এর ঋষি হলো ভিষগাথর্বণঃ। সূক্তে ২২টি মন্ত্র রয়েছে, যেখানে ঔষধি ও রোগের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্র ১১-১২-তে যক্ষ্মানাশের আলোচনা আছে। এই অনুযায়ী ভিষককে ঋষি ধরা হয়েছে।

(৬) কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রের সমার্থক শব্দকেই ঋষি ও দেবতা হিসেবে ধরা হয়েছে। উদাহরণ:

  • ঋ ১০/৮৯-এর ঋষি হলো সার্পগজ্ঞী এবং দেবতা সার্পরাশি সূর্যা বা। সূক্তে “গো” এবং “বাক্‌” পদ পাঠিত হয়েছে। গো ও বাক উভয়ই সার্পরাজ্ঞী। পৃথিবীকেও গো বলা হয়। প্রথম মন্ত্রে পৃথিবীর মাধ্যমে সূর্যের পরিক্রমা বর্ণিত হয়েছে। তাই সূর্যকেও দেবতা ধরা হয়েছে।

উপসংহার:

  1. সূক্তে নির্দিষ্ট ঋষি হলো সেই সচেতন মানুষ যারা মন্ত্র ও সূক্তের অর্থ বোঝে। এদের মধ্যে বংশানুক্রমও বিদ্যমান।

  2. কোথাও কোথাও ঋষি প্রতীকীভাবে ধরা হয়েছে।

  3. সার্মা, শ্যেন ইত্যাদি অমানব প্রাণীর ঋষি হওয়ার কারণ—ঋষি (মন্ত্রদ্রষ্টা) তার বক্তব্য এই প্রাণীদের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

  4. এছাড়াও সূক্তের বিষয়বস্তু, মন্ত্রগত পদ, বিশেষ অবস্থা, কর্মের মাধ্যম ইত্যাদিকেও ঋষি রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। এইসব সচেতন প্রাণী নয়।


No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

অষ্টাঙ্গহৃদয়ম্

  পুরোবচন আয়ুর্বেদীয় বাঙ্ময়ের ইতিহাস ব্রহ্মা, ইন্দ্র প্রভৃতি দেবদের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে অত্যন্ত প্রাচীন, গৌরবময় এবং বিস্তৃত। ভগ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ