এখন মনুষ্যদিগকে ঈশ্বর আজ্ঞা পালন করা উচিত, এই বিষয়কে মন্ত্রে বলা হইয়াছে ।
ত্বমগ্ন ইত্যস্য হিরণ্যস্তূপ আঙ্গিরস ঋষিঃ । অগ্নির্দেবতা । বিরাড্ জগতী ছন্দঃ । নিষাদঃ স্বরঃ ॥
ত্বম॑গ্নে প্রথ॒মোऽঅঙ্গি॑রা॒ऽঋষি॑র্দে॒বো দে॒বানা॑মভবঃ শি॒বঃ সখা॑ ।
তব॑ ব্র॒তে ক॒বয়ো॑ বিদ্ম॒নাপ॒সোऽজা॑য়ন্ত ম॒রুতো॒ ভ্রাজ॑দৃষ্টয়ঃ ॥ ১২ ॥
অন্বয়ঃ হে অগ্নে! যতোস্ত্বং প্রথমোऽঙ্গিরা দেবানাং দেবঃ শিবঃ সখা ঋষিরভবস্তস্মাৎ তব ব্রতে বিদ্মনাপসো ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ কবয়ো মরুতোऽজায়ন্ত ॥১২॥
পদার্থঃ- (ত্বম্) তুমি (অগ্নে) হে অগ্নি, অর্থাৎ পরমেশ্বর বা বিদ্বান (প্রথমঃ) প্রথম, প্রসিদ্ধ (অঙ্গিরাঃ) অঙ্গগুলির মধ্যে রসের ন্যায় বিরাজমান, অথবা অঙ্গীভূত জীবাত্মাদের সুখ দানকারী (ঋষিঃ) জ্ঞানী (দেবঃ) দিব্য গুণ, কর্ম ও স্বভাবসম্পন্ন (দেবানাম্) বিদ্বানদের মধ্যে (অভবঃ) হয়েছ (শিবঃ) কল্যাণকারী (সখা) বন্ধু (তব) তোমার (ব্রতে) শীল বা নিয়মে (কবয়ঃ) মেধাবী, জ্ঞানী ব্যক্তিগণ (বিদ্মনাপসঃ) যাদের কর্মসমূহ বিদিত, জ্ঞানসম্মত (অজায়ন্ত) উৎপন্ন হয়েছেন (মরুতঃ) মানুষগণ (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) যাদের দীপ্ত, শোভাময় অস্ত্রসমূহ রয়েছে ॥১২॥ (মহর্ষি দয়ানন্দকৃত পদ বিন্যাস)
পদার্থঃ- হে (অগ্নে) পরমেশ্বর বা বিদ্বন্ ! যে কারণে (ত্বম্) আপনি (প্রথমঃ) প্রখ্যাত (অঙ্গিরাঃ) অবয়বের সারভূত রসের তুল্য বা জীবাত্মাগুলিকে সুখদাতা (দেবানাম্) বিদ্বান্দিগের মধ্যে (দেবঃ) উত্তম, গুণ, কর্ম, স্বভাবযুক্ত (শিবঃ) কল্যাণকারী (সখা) মিত্র (ঋষিঃ) জ্ঞানী (অভবঃ) হইবেন, ইহার ফলে (তব) আপনার (ব্রতে) স্বভাব ও নিয়মে (বিদ্মনাপসঃ) প্রসিদ্ধ কর্ম্মসম্পন্ন (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) সুন্দর অস্ত্র-শস্ত্র যুক্ত (কবয়ঃ) বুদ্ধিমান্ (মরুতঃ) মনুষ্য (অজায়ন্ত) প্রকট হয় ॥ ১২ ॥
পদার্থঃ হে (অগ্নে) স্বপ্রকাশ জগদীশ্বর! (ত্বম্) তুমি (প্রথমঃ) সবার থেকে প্রথম প্রখ্যাত, (অঙ্গিরাঃ) জীবাত্মার সুখদাতা, (ঋষি) জ্ঞানী, (দেবানাম্) বিদ্বানের মধ্যে (দেবঃ) উত্তম গুণ-কর্ম-স্বভাবযুক্ত ব্যক্তিদের (শিবঃ) কল্যাণকারী (সখা) মিত্র (অভবঃ) হও। (তব ব্রতে) তোমার নিয়মে ( কবয়ঃ) মেধাবী (বিদ্মনাপসঃ) সকল কর্মসমূহের জ্ঞাতা (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) প্রদীপ্ত দৃষ্টি যার, তেমন (মরুতো জায়ন্ত) মনুষ্য প্রকট হয়। (অচ্যুতানন্দ সরস্বতীকৃত পদার্থ)
ভাবার্থঃ- যদি মনুষ্য সকলের মিত্র বিদ্বান্ ব্যক্তি এবং হিতৈষী পরমাত্মাকে মিত্র মানিয়া বিজ্ঞানের নিমিত্ত কর্ম করিয়া প্রকাশিত আত্মাসম্পন্ন হয় তাহা হইলে তাহারা বিদ্বান্ হইয়া পরমেশ্বরের আজ্ঞায় আচরণ করিতে পারিবে ॥ ১২ ॥
হিরণ্যস্তূপ (হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)
পদার্থঃ
সরস্বতীরূপ মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে এক যুবক অত্যন্ত সংযত জীবনযাপনকারী হয়ে ওঠে। সে প্রভুকে নিম্নলিখিত শব্দগুলির মাধ্যমে আরাধনা করে—
১. হে (অগ্নে) = হে আমাদের সকল প্রকার উন্নতির সাধক প্রভু! (ত্বম্) = আপনি (প্রথমঃ) = সর্বপ্রথম, গুরুদেরও গুরু [হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে]। আপনি অত্যন্ত বিস্তৃতস্বরূপ [প্রথ্ বিস্তারেঃ], সর্বব্যাপক—সবকিছুর মধ্যে আপনি বিরাজমান এবং সবকিছুই আপনার মধ্যেই অবস্থিত।
২. (অঙ্গিরাঃ) = [অঙ্গ, রস] আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আপনি-ই রস সঞ্চারকারী। সকলকে শক্তি দানকারী আপনিই। আপনার দীপ্তিতেই প্রকৃতপক্ষে সমগ্র জগৎ দীপ্ত।
৩. (ঋষিঃ) = আপনি সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।
৪. (দেবঃ) = আপনি সকল দিব্য গুণের সমষ্টি; দেবতাদের মধ্যেও দেবত্ব প্রদানকারী আপনিই।
৫. (দেবানাম্) = যারা দিব্য গুণ গ্রহণ করে দেবত্ব লাভ করেছে, তাদের (শিবঃ সখা) = আপনি কল্যাণকারী বন্ধু (অভবঃ) = হয়ে থাকেন। প্রভু যদি দেব হন, তবে দেবত্ব লাভকারীদের কাছে তিনি প্রিয় হবেন না কেন?
৬. দেবত্ব লাভের জন্য যারা (তব ব্রতে) = আপনার ব্রতে চলেন, অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য হিসেবে প্রভু-প্রাপ্তিকে স্থির করেন, তারা—
[ক] (কবয়ঃ) = ক্রান্তদর্শী হন; তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ করে বস্তুজগতের বাহ্যিক চাকচিক্যে মোহিত হন না।
[খ] (বিদ্মনাপসঃ) = জ্ঞানপূর্বক কর্মসম্পাদনকারী হওয়ায় তাদের কর্ম পবিত্র থাকে।
[গ] (মরুতঃ) = তারা মিতভাষী—কম বলেন, বেশি করেন; বাগ্বীর নয়, কর্মবীর হন এবং
[মরুতঃ প্রাণাঃ] — প্রাণসাধনায় রত থাকেন।
[ঘ] এই প্রাণসাধনার ফলেই তারা প্রকৃতপক্ষে (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) = দীপ্ত জ্ঞানদর্শনসম্পন্ন (অজায়ন্ত) = হয়ে ওঠেন। তাদের জ্ঞানাগ্নি উজ্জ্বলভাবে প্রজ্বলিত হয়।
ভাবার্থঃ বীর্যকে ঊর্ধ্বগামী করে যে সাধক, সেই ‘হিরণ্যস্তূপ’ প্রভুকে অগ্নি, অঙ্গিরা, ঋষি, দেব ও দেবসখা এই রূপে প্রত্যক্ষ করে। প্রভু-প্রাপ্তিকেই জীবনের লক্ষ্য করে সে কবি, জ্ঞানপূর্বক কর্মকারী, মরুত এবং ভ্রাজদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে ওঠে।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ