বর্তমানে নারীদের হেনস্তার ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠছে। আর এই ঘটনা শুধুমাত্র এখনকার সময়ের তা নয়, বহু আগে থেকেই এরকম নিন্দনীয় ঘটনা হয়ে আসছে। ইংরেজ ও মুঘল আমলেও নারীদের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হতো এবং তারা যেন হিন্দু নারীদের শুধুমাত্র সম্পদ বলে মনে করতো।
ইংরেজ ও মুঘল আমলেও নারীদের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হতো এবং তারা যেন হিন্দু নারীদের শুধুমাত্র সম্পদ বলে মনে করতো।
এমনকি মুঘল রাজার নজর যে হিন্দু নারীর উপর পড়তো তাকেই তারা শোষন করতে উদ্ধত্য হত। তবে সেই সময় এমন কিছু নারীও ছিলেন যারা কখনো মোঘলদের সামনে মাথা নত করেননি। তেমনই এক বীরঙ্গনা ছিলেন কিরন দেবী। তিনি ছিলেন মহারানা প্রতাপ-এর ভাইজি, শক্তি সিংয়ের কন্যা ও পৃথ্বীরাজ রাঠোরের স্ত্রী।
কিরণ দেবী শক্তি সিংহের কন্যা ছিলেন, যিনি মহারাণা প্রতাপের ভাই ছিলেন। মেওয়ারের দ্বিতীয় মহারাজা উদয় সিংহের মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলেদের মধ্যে লড়াই হয়। মহারাণা প্রতাপ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এবং মেওয়ারের রাজা হিসাবে ঘোষিত হওয়ার পরে শক্তি সিং আকবরের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। মুঘল দরবারে তিনি মীর (লর্ড) উপাধি অর্জন করেছিলেন। এভাবেই আকবরের একে অপরের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করে রাজপুতদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শক্তি সিং মেওয়ার আক্রমণ করার আকবরের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে রাগান্বিত হন। এরপরে হলদিঘাটের যুদ্ধে, তিনি তার ভাই মহারাণা প্রতাপের বাহিনীতে যোগ দেন।
সুন্দরী কিরণ দেবী রাঠোরের বিয়ে হয়েছিল বিকানেরের রাজপুত্র / রাজা পৃথ্বীরাজ রাঠোরের সাথে। পৃথ্বীরাজের পিতা রাজা কল্যাণমাল ইতিমধ্যে ১৫৭১ সালে আকবরের একীকরণের নীতিতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এভাবেই বিকানের মোঘল রাজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়।
সেই সময় ভারতের মোঘল আমলে এক মেলার আয়োজন করা হতো শুধুমাত্র মোঘল রাজাদের লালসা চরিতার্থ করার জন্য এবং সেখানে অন্যান্য পুরুষদের যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। আকবরের দরবারের নবরত্ন এবং আকবরনামা রচয়িতা আবুল-ফজলও মীনা বাজারের মেলায় আকবর কীভাবে রাজপুত মহিলাদের সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিলেন সে সম্পর্কে তাঁর লেখায় বর্ণনা করেছিলেন। আকবরের নজর পড়েছিল কিরণ দেবী রাঠোরের দিকে। তিনি তার সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি তার সাথে এক রাত থাকার জন্য আকুল হয়েছিলেন। তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে, তিনি জানতে পারেন তিনি কে, কিন্তু তিনি তার অভিলাষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নি। এই মেলায় আকবর কিরন দেবীকে দেখেছিলেন এবং দেখা মাত্র তাকে পাওয়ার জন্য পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছিলেন। অপরদিকে পৃথ্বীরাজ রাঠোর এক যোদ্ধা এবং 'নবরত্ন' উভয়ের একজন হিসাবে আকবরের মুঘল দরবারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনিও ছিলেন মহারাণা প্রতাপের এক দূর সম্পর্কের কাকাতো ভাই। তিনি তাঁর রানী কিরণ দেবীর সাথে আগ্রায় অবস্থান করেছিলেন।এই পরিকল্পনা মাফিক আকবরের অধীনে সেনা হিসেবে নিযুক্ত থাকা কিরনদেবীর স্বামী পৃথ্বীরাজ রাঠোরকে এক যুদ্ধের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর কিরনদেবীকে মহলে আসার জন্য দূত দ্বারা নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়। নিমন্ত্রণ রক্ষার জন্য কিরনদেবী মহলে আসলে তখন তাকে আকবর বলেন যে আমি আপনাকে আমার বেগম হিসেবে রাখতে চাই।
এই কথার জবাবে কিরন দেবী বলেছিলেন যে, আমি একজন বিবাহিত স্ত্রী এবং আপনার প্রজা তাই আপনার উচিত আমাকে খারাপ চোখে দেখার পরিবর্তে আমাকে সুরক্ষা প্রদান করা।
কিন্তু আকবর কিরণ দেবীর কথাতে একমত হতে কোনমতেই রাজি ছিলেন না। তখন কিরনদেবী বিচলিত না হয়ে নিজেকে বাঁচানোর জন্য পরিকল্পনা করতে থাকেন। যেহেতু কিরণদেবীর ছোট থেকেই যুদ্ধ কৌশল শেখা ছিল,তাই তখন যুদ্ধকৌশলকে কাজে লাগিয়ে আকবরকে নিচে ফেলে দেন তিনি।
এরপর এই বীরঙ্গনা আকবরের বুকে উপর পা রেখে গলায় ছোরা ধরে বলেন যে, “বাদশা বল তোর শেষ ইচ্ছা কী? আমি হলাম মহারানা প্রতাপ এর ভাইজি যার জন্য তোর রাতের ঘুম উড়ে যায়।” এই কথা শোনার পর আকবর নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় কিরন দেবীর কাছে প্রাণ ভিক্ষা চায়।
এরপর কিরনদেবী তার কাছে বেশ কিছু প্রতিজ্ঞা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেন। আর এই প্রতিজ্ঞাগুলির মধ্যে একটি হলো যে, আকবর যেন আর এমন শর্ত দেন যে, তিনি যাতে নারীদের প্রতি সম্মান দেন এবং নারী বেচাকেনার নৌরুজ মেলা আর কখনও অনুষ্ঠিত না হয় যা নির্বাক আকবর রাজি হন। কিরণ দেবী তার ছোরা সরিয়ে নেন। আকবর তখন চুপ করে চলে যান আর কখনো তার দিকে কামুক দৃষ্টিতে তাকানোর কথা ভাবেননি।
গিরধর অসিয়া রচিত সাগতসিংহ রস রাজপুতানি বীরত্বের এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। বিকানের জাদুঘরের কিরণ দেবী রাঠোরের আর একটি চিত্রও আছে এ ঘটনার।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ