ঋষি | দেবতা | ছন্দ | স্বর
ঋষিঃ—বৃহস্পতিঃ॥ দেবতা—জ্ঞানম্॥ ছন্দঃ—১. ত্রিষ্টুপ্। ২. ভুরিক্ ত্রিষ্টুপ্। ৩, ৭. নিচৃত্ ত্রিষ্টুপ্। ৪. পাদনিচৃত্ ত্রিষ্টুপ্। ৫, ৬, ৮, ১০, ১১. বিরাট্ ত্রিষ্টুপ্। ৯. বিরাড্ জগতী॥ একাদশর্চং সূক্তম্॥
বৃহ॑স্পতে প্রথ॒মং বা॒চো অগ্রং॒ যৎপ্রৈর॑ত নাম॒ধেয়ং॒ দধা॑নাঃ ।
যদে॑ষাং॒ শ্রেষ্ঠং॒ যদ॑রি॒প্রমাসী॑ৎ প্রে॒ণা তদে॑ষাং॒ নিহি॑তং॒ গুহা॒বিঃ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৭১.১)
স্বররহিত মন্ত্র
বৃহস্পতে প্রথমং বাচো অগ্রং যৎপ্রৈরত নামধেয়ং দধানাঃ। যদেষাং শ্রেষ্ঠং যদরিপ্রমাসীৎ প্রেণা তদেষাং নিহিতং গুহাবিঃ॥
স্বরসহ পদপাঠ
বৃহ॑স্পতে । প্র॒থ॒মম্ । বা॒চঃ । অগ্র॑ম্ । যৎ । প্র । ঐর॑ত । না॒ম॒ऽধেয়॑ম্ । দধা॑নাঃ । যৎ । এ॒ষা॒ম্ । শ্রেষ্ঠ॑ম্ । যৎ । অ॒রি॒প্রম্ । আসী॑ৎ । প্রে॒ণা । তৎ । এ॒ষা॒ম্ । নিऽহি॑তম্ । গুহা॑ । আ॒বিঃ ॥
স্বররহিত পদপাঠ
বৃহস্পতে । প্রথমম্ । বাচঃ । অগ্রম্ । যৎ । প্র । ঐরত । নামऽধেয়ম্ । দধানাঃ । যৎ । এষাম্ । শ্রেষ্ঠম্ । যৎ । অরিপ্রম্ । আসীৎ । প্রেণা । তৎ । এষাম্ । নিऽহিতম্ । গুহা । আবিঃ ॥ ১০.৭১.১
আধিভৌতিক ভাষ্যঃ-
পদার্থঃ(বৃহস্পতে) [এখানে "বৃহস্পতেঃ" এই স্থানে সম্বোধনান্ত পদ ব্যবহৃত হয়েছে। তারসঙ্গে এই পদ সম্বোধনার্থও ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ দুটো অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।] হে বেদবাণীর পালক বিদ্বন্! (নামধেয়ম্) সৃষ্টির সমস্ত পদার্থ এবং তার নামকে (দধানাঃ) ধারণকারী অত্যন্ত পবিত্র অন্তঃকরণ যুক্ত সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে উৎপন্ন ঋষি (য়ৎ, প্র, ঐরৎ) যে প্রেরণা পরমাত্মার থেকে প্রাপ্ত করেন অর্থাৎ সেই আদি ঋষি যেসব ঋচাকে পরব্রহ্ম পরমাত্মার প্রেরণায় ব্রহ্মাণ্ড থেকে গ্রহণ করেন, (প্রথমম্, বাচঃ, অগ্রম্) সেই বাণী হল মানব ব্যবহারে ব্যবহৃত হওয়া বাণীর মধ্যে সবথেকে অগ্রিম বাণী। (য়দেষাম্, য়ৎ, শ্রেষ্ঠম্) সেই বেদবাণী হল সমস্ত মানবী ভাষার মধ্যে সবথেকে উত্তম বাণী, (য়ৎ, অরিপ্রম্, আসীৎ) [অরিপ্রম্ = রীঙ্ শ্রবণে দিবা. ধাতো "লীরীঙ্গোহ্রস্ব. উ.কো. ৫.৫৫ সূত্রেণ রঃ প্রত্যয়ঃ পুগাগমো হ্রস্বশ্চ। নঞ্ সমাসঃ (বৈদিক কোষঃ )] সেটা পূর্ণ শুদ্ধ হয়ে থাকে। ঋষিদের দ্বারা আকাশ থেকে গ্রহণ করার সময় সেই বাণী কোনোরূপ ক্ষয় প্রাপ্ত হয় না আর না তাতে কোনোরূপ মিশ্রণ থাকে। (তৎ, এষাম্, প্রেণা) সেই বেদবাণী এই সকল বাণীর মধ্যে সর্বাধিক বেগপূর্বক গমন কারী হয় অথবা সেটা প্রকৃষ্টরূপেণ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে। (গুহা, নিহিতম্, আবিঃ) [আবিঃ = আবিষ্কুরুতে (নিরুক্ত ৫.৯)] সেই বাণী অন্তরীক্ষরূপী গুহার মধ্যে নিহিত থাকে, যা ঋষিদের অন্তঃকরণ রূপী গুহার মধ্যে প্রকট হয়।
এখানে এই ঋচার প্রথম পদ "বৃহস্পতে" কে "বৃহস্পতেঃ" মানলে এই সংকেতও পাওয়া যায় যে সেই অন্তরীক্ষে ব্যাপ্ত বেদবাণী হল সম্পূর্ণ বাণী এবং সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের পালক ও স্বামী পরমাত্মারই বাণী অর্থাৎ তাঁর থেকেই উৎপন্ন হয়েছে।
ভাবার্থ - সৃষ্টি উৎপন্ন হলে সম্পূর্ণ সৃষ্টির মধ্যে বেদের ঋচা প্রাপ্ত হয়। এই ঋচা পরা ও পশ্যন্তী রূপে সম্পূর্ণ অন্তরীক্ষে ভরে থাকে। প্রথম প্রজন্মে উৎপন্ন সর্বাধিক পবিত্রাত্মা চার ঋষি সমাধিস্থ হয়ে ঈশ্বরের প্রেরণায় এইসব ঋচাকে গ্রহণ করেন। এর পূর্বে মানুষের কোথাও কোনো ভাষাই ছিল না, বরং ভাষার উৎপত্তি এইসব ঋচা উৎপত্তির পশ্চাৎ এরই অপভ্রষ্ট হওয়াতে হয়েছে। এই বাণী থেকে শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে অন্য কোনো ভাষা হওয়া সম্ভব নয়। যখন সেই ঋষি জন বাণীকে সমাহিত চিত্ত দ্বারা অন্তরীক্ষ থেকে গ্রহণ করেন, সেই সময় সেই বাণী শুদ্ধ ও পূর্ণ রূপে তাঁদের অন্তঃকরণে প্রবিষ্ট হয়। কোনো ঋচা ও ঋচার অংশের একটা পদও এই প্রক্রিয়াতে স্রাবিত হয় না অর্থাৎ অন্তরীক্ষে সেই ঋচাগুলো যেরূপ ব্যাপ্ত থাকে, সেগুলোকে সেইরূপে গ্রহণ করা হয়। সেই বাণী অর্থাৎ বেদমন্ত্র সেই ঋষিদের অন্তঃকরণে অত্যন্ত শীঘ্রতাপূর্বক সহজে প্রবিষ্ট হয়ে যায়, যেভাবে কেউ মন্ত্রকে কণ্ঠস্থ করে সেইরূপ নয়। সেই মন্ত্রগুলো অন্তরীক্ষ থেকে সেই ঋষিদের অন্তঃকরণে প্রবেশ করে, এর অর্থ হল সেইসব মন্ত্র ঋষিদের স্মৃতিস্তরে সদ্যঃ অঙ্কিত হয়ে যায়।
পদার্থ> ঋগ্বেদ ভাষ্য (হরিশরণ সিদ্ধান্তালঙ্কার) — পণ্ডিত হরিশরণ সিদ্ধান্তালঙ্কার
[১] (বৃহস্পতে) = [বৃহস্পতেঃ] সেই জ্ঞানের স্বামী প্রভুর। (প্রথমম্) = [প্রথ বিস্তারে] অত্যন্ত বিস্তৃত। (বাচঃ অগ্রম্) = বাণীর অগ্রস্থানে অবস্থিত এই বেদজ্ঞান। ‘প্রথমং’ এই কারণে যে, এতে সমস্ত সত্যবিদ্যার প্রকাশ হয়েছে এবং ‘বাচঃ অগ্রং’ এই কারণে যে, সর্বপ্রথম এই শব্দগুলিরই উচ্চারণ হয়েছিল—‘তচ্চক্ষুর্দেবহিতং পুরস্তাচ্ছুক্রমুচ্চরৎ’। প্রভু মানসপুত্রদের উৎপন্ন করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ চারজন—‘অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা’—তাঁদের হৃদয়ে এই বেদজ্ঞানের প্রকাশ করেছিলেন। এইরূপে সর্বপ্রথম এই বাণীরই উচ্চারণ হয়েছিল।
[২] [ক] এখন (নামধেয়ং দধানাঃ) = প্রভুর নাম হৃদয়ে ধারণ করতে করতে অন্যান্য ঋষি ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরাও (যৎ) = এই যে বেদজ্ঞান ছিল, তাকে (প্রৈরত) = নিজেদের মধ্যে প্রেরিত করেছিলেন। অগ্নি প্রভৃতির নিকট থেকে তাঁরা বেদজ্ঞান লাভ করেছিলেন এবং এই বেদজ্ঞান লাভ করতে করতে তাঁরা সর্বদা সেই প্রভুর নামের মানসিক জপে নিযুক্ত ছিলেন।
[খ] এই মন্ত্রাংশের অর্থ এইরূপও হতে পারে যে, জগতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান [আকৃতি]-র নাম নির্ধারণ করার সময় তাঁরা সেই বেদবাণীকেই নিজেদের মধ্যে প্রেরিত করেছিলেন; তার ধ্যান করে সেই থেকেই নদীগুলির ‘সিন্ধু’ প্রভৃতি এবং পর্বতগুলির ‘হিমালয়’ প্রভৃতি নাম নির্ধারণ করেছিলেন—‘বেদশব্দেভ্য এবাদৌ পৃথক্ সংস্থাশ্চ নির্মমে’।
[৩] (এষাম্) = সৃষ্টির প্রারম্ভে উৎপন্ন এই ব্যক্তিদের মধ্যে (যৎ) = যারা (শ্রেষ্ঠম্) = সর্বোত্তম ছিলেন, (যৎ) = যারা (অরিশম্) = একেবারে নির্দোষ ছিলেন, যাঁদের বুদ্ধি ও মন সর্বাধিক পবিত্র (আসীৎ) = ছিল, (তৎ) = সেই (এষাম্) = এই শ্রেষ্ঠ ও অরিপ্র ব্যক্তিদের (গুহা) = হৃদয়রূপ গুহায় (প্রেণা) = [প্রেম্ণা] প্রভু প্রেমবশত (নিহিতম্) = এই বেদজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং (আবিঃ) = প্রকাশ করেছিলেন। প্রাথমিক মানসী সৃষ্টিতে যারা সর্বাগ্রগণ্য ছিলেন, তাঁদের পবিত্রতম হৃদয়ে এই বেদজ্ঞান প্রকাশ করা হয়েছিল। তাঁদের মাধ্যমে এই বেদজ্ঞান অন্যদের কাছেও পৌঁছেছিল।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ