"যারা সৃষ্টিকে বিচার না করে কেবল আস্থা, বিশ্বাস বা ঐতিহ্যের নামে ঈশ্বরের পূজা করে, তারা মানবজাতিকে অন্ধবিশ্বাসের গভীর অন্ধকারে ঠেলে দেয় আর যারা বিচার না করে অহংকারের বশবর্তী হয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তারা মানুষকে লাগামহীন ভোগবাদী বানিয়ে পশুর চেয়েও অধম করে তোলে।
অন্যদিকে, আমাদের বৈদিক বিজ্ঞান উভয়কেই সত্যের পথে এনে মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। বৈদিক বিজ্ঞান আধুনিক বিজ্ঞানের বিরোধী নয়, বরং এটি হল আধুনিক বিজ্ঞানের বাস্তব ও অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধান করতে সহায়ক।"- আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক
সম্পাদকীয়
পৃথিবীর অনেক সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের বাণী বলে দাবি করে এবং মানবজাতিকে সেই অনুযায়ী পরিচালনা করার যথাসম্ভব চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের ধর্মগ্রন্থ কেবল সেটিই হতে পারে, যার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান-বিজ্ঞান আছে, যার মাধ্যমে মানুষসহ সকল প্রাণী সুখে বসবাস করতে পারে এবং যার বাইরে অন্য কোনো জ্ঞানের প্রয়োজন থাকে না। এমন জ্ঞান কেবল তিনিই দিতে পারেন, যিনি আমাদের সকলকে সৃষ্টি করেছেন, এই সৃষ্টির রচনা করেছেন এবং যিনি এর সঞ্চালক ও প্রলয়কর্তাও বটে। বেদ ছাড়া অন্য কোনো গ্রন্থ কি এই কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হয়? না।
বেদ কী? পূজ্য আচার্যশ্রী কর্তৃক প্রতিপাদিত 'বৈদিক রশ্মি সিদ্ধান্ত' অনুযায়ী সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড (সূক্ষ্ম কণা থেকে শুরু করে বিশাল নক্ষত্র পর্যন্ত) বেদের মন্ত্রের ঋচাগুলো দ্বারা নির্মিত এবং এটিই আমাদের প্রাচীন ঋষি-মুনিদের অভিমত ছিল। এই মন্ত্রগুলো বাণীর পশ্যন্তী অবস্থায় সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান আছে। যখন মানব সৃষ্টি শুরু হয়, তখন চার ঋষি (অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা) এই তরঙ্গগুলোকে ব্রহ্মাণ্ড থেকে সরাসরি নিজেদের মনে গ্রহণ করেন। এতে পরমপিতা পরমাত্মার প্রেরণা অনিবার্যভাবে থাকে, অথবা এভাবে বলা যায় যে পরমাত্মা এই চার ঋষির মাধ্যমে মানুষকে জ্ঞান প্রদান করেন। এই ক্রমে সর্বপ্রথম জ্ঞান তরঙ্গরূপে অগ্নি ঋষি যেটি প্রাপ্ত করেছিলেন, সেটি হল
অ॒গ্নিমী॑ळे পু॒রোহি॑তং য॒জ্ঞস্য॑ দে॒বমৃ॒ত্বিজ॑ম্।
হোতা॑রং রত্ন॒ধাত॑মম্॥ (ঋগ্বেদ ১।১।১)
এই মন্ত্রটি হল সমগ্র বেদ অর্থাৎ সৃষ্টি বিজ্ঞান, লোকব্যবহার এবং আধ্যাত্ম বিজ্ঞানের ভূমিকা স্বরূপ। এতে ঈশ্বর প্রথম প্রজন্মের মানুষদের জন্য উপদেশ দিয়েছেন যে, সর্বপ্রথম তাঁদের কী করা উচিত এবং কেমন রাজা বা গুরু করা উচিত এবং কেন নিজেকে জানা প্রয়োজন?
একটি বেদ মন্ত্রের ব্যাখ্যা কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তা পাঠকরা এই পুস্তকে দেখতে পাবেন। যদিও এই ব্যাখ্যাটিও সংক্ষিপ্তই, কারণ বেদে অনন্ত জ্ঞান আছে। এই কারণেই দেবরাজ ইন্দ্র বলেছিলেন- অনন্তা বৈ বেদাঃ; এই পুস্তকে আপনি একটি বেদ মন্ত্রেরই তিন ধরণের ভাষ্য (আধিদৈবিক, আধিভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক) পড়তে পারবেন। বেদ ভাষ্যের যে শৈলীটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, আচার্য শ্রী তাকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন।
এই পুস্তকটি আচার্যশ্রীর প্রবচনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা আমার সহধর্মিণী শ্রীমতী মধুলিকা আর্যা সংকলন করেছেন এবং ভাষাগতভাবেও একে অনেক মার্জিত করেছেন। এই পুস্তকটির ইক্ষ্যবাচনেও তাঁর অনেক বড় অবদান আছে। এই পুস্তকটিতে 'অগ্নিমীঠ পুরোহিতম্...' মন্ত্রের ত্রিবিধ ভাষ্য করা হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের গ্রন্থসমূহের প্রথম-প্রথম বাক্যগুলির নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করার পর, বেদ সম্পর্কে বিদেশী বিচারকদের মতামতও উদ্ধৃত করা হয়েছে। এর পরে এই মন্ত্রের বিস্তৃত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পুস্তকের শেষে প্রবুদ্ধ শ্রোতাদের অনেক শঙ্কার সমাধান করা হয়েছে। পাঠকদেরও এই ধরণের কিছু শঙ্কা হতে পারে, তাই এই অধ্যায়টিও অপরিহার্য রূপে পঠনীয়।
পাঠকদের কাছে বিনীত নিবেদন যে, তারা যেন এই পুস্তকটি সমস্ত পূর্বগ্রহ থেকে মুক্ত হয়ে সমাপ্তি পর্যন্ত পড়ার প্রয়াস করেন। তারপর তারা নিরপেক্ষ হৃদয়ে বিচার করবেন যে কোনটি সঠিক। যদি তাদের আত্মা এতে বলা কথাগুলোকে স্বীকার করে, তবে ঈশ্বরের এই প্রথম উপদেশ দ্বারা নিজের জীবনকে অগ্নিরূপ বানানোর প্রয়াস করবেন।- বিশাল আর্য
ভূমিকা
চারটি বেদ একই সময়ে চারজন ঋষির অন্তঃকরণে সমাধি অবস্থায় প্রকাশিত হয়েছিল অর্থাৎ, সেই ঋষিরা সমাধি অবস্থায় ব্রহ্মাণ্ড থেকে বেদমন্ত্র রূপী ছন্দ-রশ্মিগুলোকে তাঁদের য়োগস্থ মনের দ্বারা চয়ন করে গ্রহণ করেছিলেন। সেই ছন্দ-রশ্মিগুলোর পদসমূহের অর্থ এবং সেই সংক্রান্ত সমস্ত পদার্থের জ্ঞান ঈশ্বর তাঁদেরকে একই সাথে প্রদান করেছিলেন।
চারটি বেদের মধ্যে ঋগ্বেদ হল সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ। এতে সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থের গুণ, কর্ম ও স্বভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চারটি বেদের প্রথম মন্ত্রগুলোর রচনাকে দেখে আমার অভিমত হল, যদিও চারটি বেদ হল সমকালীন, তবুও বেদমন্ত্র গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্ভবত ঋগ্বেদ থেকেই শুরু হয়েছিল, যদিও এগুলোর সমাপ্তি একসাথেই হয়েছিল। তাছাড়াও মনুস্মৃতি আদি শাস্ত্রগুলোতে গায়ত্রী মন্ত্র (সাবিত্রী মন্ত্র)-কে ব্যাহৃতিসহ উচ্চারণ করার মহিমাকে সর্বোপারি স্থান দেওয়া হয়েছে। অন্য অনেক শাস্ত্রের মধ্যেও এই মন্ত্রের মহিমা বর্ণিত আছে। এর সমান মহিমা অন্য কোনো মন্ত্রের কোথাও শোনা ও পড়া যায় না। মহর্ষি দয়ানন্দের মহান গুরু দণ্ডী স্বামী বিরজানন্দ সরস্বতী ঘন্টার পর ঘন্টা এই মন্ত্র জপ করতেন। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী জীর কাছে 'বিশ্বানি দেব সবিত...' এই মন্ত্রটি প্রিয় ছিল, কিন্তু জপের জন্য তিনিও গায়ত্রী মন্ত্রকেই প্রাধান্য দিতেন।
এখানে প্রশ্ন জাগে যে, ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রে এমন কী বিশেষত্ব আছে যে এই মন্ত্রটিই সবার আগে আবির্ভূত হল? যদি এই মন্ত্রটি বিশেষ হয়, তবে এর অর্থ কী?
আসুন, আমরা পৃথিবীতে মানব উৎপত্তির সময়ের পরিস্থিতির ওপর কিছু স্কুল বিচার করি। মানুষের প্রথম প্রজন্ম এখনই ভূমি থেকে যুবাবস্থায় আবির্ভূত হয়েছে। এর পূর্বে সম্পূর্ণ পৃথিবী জলচর, নভচর, থলচর সকল প্রাণী, বনস্পতি, ফুল ও ফলের সাথে অত্যন্ত শুদ্ধ বায়ুমণ্ডল, নদী ও সরোবরে অত্যন্ত পবিত্র জল আদিতে পূর্ণ ছিল। ভূমি-আকাশ সবকিছু ছিল পূর্ণ শুদ্ধ, সর্বত্র অক্সিজেনের ভরপুর মাত্রা, ফল ও মূলের প্রচুর পৌষ্টিকতা- এই ছিল সেই সময়ের পৃথিবীর পরিবেশ। সবকিছু পূর্ণ স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ছিল। সকল প্রাণী ও বনস্পতি ছিল পূর্ণ নিরোগ, বিশালকায় ও বলবান।
সেই সময়ের প্রথম প্রজন্ম যদিও নৈমিত্তিক জ্ঞানহীন ছিল, তবুও তাঁরা বর্তমানের জন্মানো শিশুদের তুলনায় অথবা জন্মানোর পর যুবাবস্থা পর্যন্ত একান্তে রাখা কোনো যুবকের তুলনায় অনেক বেশি পবিত্র ছিল। এই কারণে তাঁদের বুদ্ধি ছিল খুব সূক্ষ্ম ও গম্ভীর। তবুও তাঁদের নৈমিত্তিক জ্ঞানের পরম আবশ্যকতা ছিল, কিন্তু পশু-পাখি ছাড়া এমন কোনো প্রাণী ছিল না, যার কাছ থেকে প্রথম প্রজন্মের মানুষ কোনো জ্ঞান লাভ করতে পারতো এবং পশু-পাখিদের থেকে তাঁদের জ্ঞান নেওয়ার কোনো প্রয়োজনও ছিল না, কারণ তাঁরা তাদের তুলনায় জ্ঞানের দিক থেকে অনেক উন্নত হয়েই জন্মগ্রহণ করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক যে, সর্বপ্রথমে কোন ছন্দ রশ্মি গ্রহণ করা হয়েছিল এবং নৈমিত্তিক জ্ঞানের উৎস পরমাত্মা সেই মন্ত্রের কী অর্থ বুঝিয়েছিলেন? এই সব প্রশ্নের উত্তর মন্ত্রের ভাষ্য থেকেই পাওয়া সম্ভব হবে।
এখন আসুন, মন্ত্রটি নিয়ে আলোচনা করি-
ঋষি, দেবতা ও ছন্দ
এই মন্ত্রের ঋষি হলেন মধুচ্ছন্দা। [মধু প্রাণই মধু (শ.6.4.3.2), মধু ধমতেবিপরীতস্য (নি.10.31), ছন্দ ধমতি অর্চতিকর্মা (নিঘ.3.14), গতিকর্মা (নিঘ.2.14), বধকর্মা (নিঘ.2.19)]
এর অর্থ হল, এই ছন্দ রশ্মি এমন এক বিশেষ প্রাণ রশ্মি, যা আলোকোজ্জ্বল হয়ে বিচরণ করে এবং যেকোনো বাধক পদার্থকে ধ্বংস করে; এটি প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মি দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে উৎপন্ন হয়। এর দেবতা হল অগ্নি এবং ছন্দ হল গায়ত্রী। এই কারণে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে অগ্নি তত্ত্ব তেজস্বী ও বলবান হয়। এখানে অগ্নি তত্ত্বের মাধ্যমে অনেক পদার্থের বোধ হয়, এটি জেনে রাখা উচিত, সে বিষয়ে আমি ভাষ্যে আলোচনা করবো, কারণ মন্ত্রের মধ্যেও অগ্নি পদ বিদ্যমান আছে।
এখন আমি এই মন্ত্রের দুই প্রকার ভাষ্য প্রদর্শন করবো, যার মধ্যে সর্বপ্রথমে আধিদৈবিক ভাষ্য করবো। কারণ এই ভাষ্য যেকোনো মন্ত্ররূপ ছন্দ রশ্মির এই সৃষ্টিতে হতে থাকা তার প্রভাব এবং সৃষ্টির পদার্থসমূহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
আধিদৈবিক ভাষ্য
(য়জ্ঞস্য) [য়জ্ঞম্ = ক্রিয়াকাণ্ডজন্যম্ সংসারম্ (ম. দ. য়. ভা. 2.21), সংগতঃ সংসারঃ (ম. দ. ঋ. ভা. 1.18.7)] 'য়জ্ঞ' শব্দটি 'য়জ দেবপূজাসঙ্গতিকরণদানেষু' ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে অর্থাৎ যার মধ্যে বিভিন্ন দেব পদার্থের পূজা অর্থাৎ সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার, পারস্পরিক সঙ্গতিকরণ এবং সেগুলোর গ্রহণ ও বিসর্জন আদি কর্ম সম্পাদিত হয়, তাকেই যজ্ঞ বলা হয়। এই সৃষ্টিতে সর্বত্র এমনই ঘটছে। এই কারণে এই সম্পূর্ণ সৃষ্টি হল যজ্ঞস্বরূপ, যা ঋষি দয়ানন্দের এই উদ্ধৃতিগুলো থেকে স্পষ্ট। সেই এমন সৃষ্টি-যজ্ঞের মুখ্য সাধক পদার্থ এই সেই প্রথম শব্দ, যা মানুষের মস্তিষ্কে সর্বপ্রথম উদিত হয়েছিল। এই পদের বিষয়ে ঋষিদের বক্তব্য হল-
(অগ্নিম্) [অগ্নিঃ অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীর্ভবতি। অগ্রম্ য়জ্ঞেষু প্রণীয়তে। অঙ্গম্ নয়তি সম্মমমানঃ। (নি. 7.14), অগ্নির্বৈ দেবানাম্ বসিষ্ঠঃ (ঐ. 1.28), অগ্নির্বৈ দেবানাম্ মুখম্ প্রজনয়িতা স প্রজাপতিঃ (শ. 3.9.1.6), অগ্নিরেব ব্রহ্মা (শ.10.4.1.5), বাগেবাগ্নিঃ (শ.3.2.2.13), মন এবাগ্নিঃ (শ.10.1.2.3), আত্মৈবাগ্নিঃ (শ.6.7.1.20)] এই বচনগুলো থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, এটি সেই পদার্থ, সৃষ্টি রচনায় যার সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয়। সৃষ্টি নির্মাণের বিভিন্ন স্তরে 'অগ্নি' পদের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হয়, কারণ ভিন্ন ভিন্ন স্তরে প্রাথমিক উপাদান ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই যখন মূল উপাদান কারণ প্রকৃতিই কেবল বিদ্যমান থাকে, সেই সময় 'অগ্নি'র অর্থ বাক্ তত্ত্ব অর্থাৎ পরা 'ওম' রশ্মি বলে মানা উচিত, কারণ এই রশ্মিই প্রকৃতিতে প্রাথমিক স্পন্দন উৎপন্ন করে।
দ্বিতীয় চরণে 'অগ্নি'র অর্থ মনস্তত্ত্ব (মহৎ) বলে মানা উচিত, কারণ এটিই হল সৃষ্টির সর্বপ্রথম পদার্থ, যাকে ছাড়া পরবর্তী সৃষ্টি অসম্ভব।
তৃতীয় চরণে 'অগ্নি' পদের অর্থ হল আত্মা অর্থাৎ সূত্রাত্মা বায়ু, যা পদার্থকে ঘনীভূত করতে শুরু করে। 'অগ্নি' পদের চতুর্থ অর্থ হল- 'প্রাণ', যার প্রাণাপান আদি দশটি ভেদ আছে। 'অগ্নি'র পঞ্চম অর্থ হল ব্রহ্ম এবং এখানে 'ব্রহ্ম' শব্দের অর্থ হল বল (শক্তি), যেমনটি মহর্ষি তিত্তিরি বলেছেন- বলম্ বৈ ব্রহ্মা (তৈ.ব্রা. 3.8.5.2), বল হল সেই গুণ, যা সৃষ্টি রচনার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয়। 'ওম্' রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথেই বল গুণ উৎপন্ন হয়ে যায়।
এই সমস্ত পদার্থ সকল দেব পদার্থকে বসাতে এবং উৎপন্ন করতে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়, তাই অগ্নিকে দেবতাদের বসিষ্ঠ বলা হয়েছে। এই পদার্থগুলোই বিভিন্ন দেব পদার্থের মূল রূপও হয়, কারণ সকল প্রকার দেব পদার্থ ছন্দ, কণা, বিকিরণ, আকাশ আদি এই পদার্থগুলো থেকেই উর্জা লাভ করে এবং এইগুলোই সবাইকে উৎপন্ন, সঞ্চালিত ও সংরক্ষিত করে। এই পদার্থগুলো থেকে স্কুল অগ্নির আরও দুটি পদার্থ আছে।
প্রথম অর্থাৎ পঞ্চম অর্থ হল 'বিদ্যুৎ', যার উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত কণা-বিকিরণ আদি উৎপন্ন হতে শুরু করে। বিদ্যুতের উৎপত্তি হওয়া ছাড়া এদের উৎপত্তি সম্ভব নয়। যদিও আমি বলকে পঞ্চম পদার্থ হিসেবে লিখেছি, কিন্তু বল দ্রব্য না হয়ে গুণ হয়, এই কারণে তাকে পৃথক বিবেচনা করে বিদ্যুৎকে পঞ্চম পদার্থ হিসেবে লেখা হয়েছে।
দ্বিতীয় অর্থাৎ ষষ্ঠ অর্থ হল- 'উষ্মা' (তাপ), এর উৎপত্তি ছাড়া সৃষ্টিতে কোনো পদার্থই নির্মিত হতে পারে না। এখানে ছন্দ ও রশ্মির আলোচনা এই কারণে করা হয়নি, কারণ এদের গ্রহণ বাক্ তত্ত্ব থেকেই হয়ে যায়।
এইভাবে এই ছয়টি পদার্থ রূপী অগ্নি তত্ত্ব, যার বিশেষণগুলোর আলোচনা এই মন্ত্রে ক্রমশ নিম্নলিখিতভাবে করা হয়েছে-
1. পুরোহিতম্ - [পুরোহিতঃ য়ঃ পুরস্তাত্ সর্বম্ জগদ্ দধাতি, ছেদন ধারণাऽऽকর্ষণা দিগুণীশ্চাপি তম্ (অগ্নিম্ পরমেশ্বরম্ ভৌতিকম্ বা), পুরোহিতঃ পুর এনম্ দধতি (নি.2.12), প্রথমঃ পুরোহিতমিতি পুর এব বা এনমেতদ্ দধতে। য়দগ্নিমাদধতে। (জৈ.3.63)] অর্থাৎ যে পদার্থকে অন্য পদার্থ সম্মুখে ধারণ করে বিভিন্ন প্রকারের বল প্রাপ্ত করে, সেই পদার্থগুলোকে পুরোহিত বলে। অগ্নি নামক উপরোক্ত সব পদার্থ কেন পুরোহিত নামে পরিচিত হয়? এ বিষয়ে আমরা ক্রমানুসারে বিচার করবো -(ক) বাক্ তত্ত্ব - সৃষ্টির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর পদার্থ, তা কোনো রশ্মি হোক অথবা কোনো তরঙ্গ
আদি, সেগুলো যখন নিজেদের সম্মুখে অথবা নিজেদের সাথে 'ওম' রশ্মিকে ধারণ করে, তখনই সেগুলো সৃষ্টির সূক্ষ্মতম বল প্রাপ্ত করে অগ্রিম য়জন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। স্থূল পদার্থ, যা স্বয়ং রশ্মি আদি সূক্ষ্ম পদার্থ দিয়ে গঠিত হয়, সেগুলো নিজেদের অবয়বভূত সূক্ষ্ম রশ্মিগুলোর মাধ্যমে সূক্ষ্মতম 'ওম' রশ্মিকে ধারণ করেই বিভিন্ন প্রকার বল প্রাপ্ত করতে পারে, অন্যথায় সৃষ্টিতে কোনো বল উৎপন্নই হতে পারবে না। মহর্ষি দয়ানন্দ বেদ ভাষ্যে 'পুরোহিত' পদ থেকে আটটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন রূপ, দাহ, প্রকাশ, বেগ, ছেদন, ধারণ এবং আকর্ষণ আদি। এখানে 'আদি' শব্দ থেকে বিকর্ষণ গুণকে গ্রহণ করা উচিত। এই আটটি গুণের মধ্যে একটি গুণও ততক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে না, যতক্ষণ না কোনো পদার্থ 'ওম' রশ্মিযুক্ত হচ্ছে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রত্যেক পদার্থের ভেতরে 'ওম' রশ্মি ব্যাপ্ত থাকে, এরপরও যতক্ষণ না সেই পদার্থ অন্য পদার্থের 'ওম' রশ্মিকে নিজের সাথে ধারণ করার সুযোগ পাবে, ততক্ষণ তাদের মিলন সম্ভব হবে না অর্থাৎ ততক্ষণ কোনো বল উৎপন্ন হবে না। এই কারণে বাক্ রূপ অগ্নিকে এখানে পুরোহিত বলা হয়েছে। অন্য ছন্দ রশ্মিগুলোর বিষয়েও একইভাবে পুরোহিত গুণের সম্বন্ধ বুঝতে হবে।
(খ) মন - এই সৃষ্টিতে পরা 'ওম' রশ্মি ব্যতীত অন্য সব রশ্মিগুলো মনস্তত্ত্ববের মধ্যেই উৎপন্ন হয়। মনস্তত্বের মধ্যে রশ্মিগুলো ঠিক সেভাবেই উৎপন্ন বা স্পন্দিত হয়, যেভাবে জলে ঢেউ উৎপন্ন হয়। এই কারণে বাক্ রশ্মির সকল কার্যই আসলে মনস্তত্বের কার্য হয়। এজন্যই মহর্ষি জৈমিনিকে বলতে হয়েছে 'বাগিতি মনঃ' (জৈ.উ. 4.11.1.11) এবং মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন- 'বাক্ চ বৈ মনশ্চ দেবানাম্ মিথুনম্' (ঐ. 5.23), এইভাবে বাক্ তত্ত্ব মনস্তত্ব ছাড়া উৎপন্ন হতেই পারে না, তাই মনস্তত্ব রূপ অগ্নিকেও 'পুরোহিত' রূপ বলা হয়েছে।
(গ) আত্মা (সূত্রাত্মা বায়ু)- এই সৃষ্টিতে যেখানেই দুটি রশ্মির সংযোগ ঘটে, সেখানে 'ওম্' রশ্মির পর যদি কোনো রশ্মির সবচেয়ে প্রধান ও প্রাথমিক ভূমিকা থাকে, তবে তা হল সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি। এটি ছাড়া বলের কল্পনা করা সম্ভব নয়। যখন কোনো কণা, তরঙ্গ বা রশ্মি অন্য কোনো কণা, তরঙ্গ বা রশ্মির সাথে মিলিত হয়, তখন তাদের ভেতরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু সামনে উপস্থিত পদার্থের বাইরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির সাথেই সংযুক্ত হয়। 'পুরোহিত' শব্দ দিয়ে অগ্নির যে আটটি গুণের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই সূত্রাত্মা বায়ু ছাড়া কখনো প্রকাশিত হতে পারে না। তাই সূত্রাত্মা বায়ু রূপ অগ্নিও পুরোহিত নামে পরিচিত।
(ঘ) প্রাণ- দুটি পদার্থের সংযোগ ও বিয়োগের প্রক্রিয়ায় সূত্রাত্মা বায়ুর পরে যে পদার্থের স্থান হয়, তা হল প্রাণ তত্ত্ব অর্থাৎ প্রাণ, অপান, ব্যান, সমান, উদান, নাগ, কুর্ম, কৃকল, দেবদত্ত এবং ধনঞ্জয়েরই ভূমিকা থাকে। পূর্বোক্ত আটটি গুণের প্রত্যেকটির উৎপত্তিতে কোনো না কোনো প্রাণ রশ্মির উপস্থিতি অনিবার্য হয়। এই রশ্মিগুলো বিভিন্ন পদার্থের য়জন প্রক্রিয়ায় সর্বদা সেই পদার্থগুলোর সামনে উপস্থিত হয়ে সেই ক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে।
(ঙ) বিদ্যুৎ- এই সৃষ্টিতে প্রত্যেক য়জন ক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিদ্যুতের অনিবার্য ভূমিকা আছে। সেই বিদ্যুৎ ধনাত্মক আবেশ, ঋণাত্মক আবেশ অথবা উদাসীন যেকোনো রূপেই হতে পারে। বৈদিক বিজ্ঞানে 'বিদ্যুৎ' শব্দের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক, যা আধুনিক বিজ্ঞানে নেই। গুরুত্বাকর্ষণ বলও বিদ্যুতেরই একটি রূপ হয়। এইভাবে সকল পদার্থ বিদ্যুতের কোনো না কোনো রূপ অবশ্যই ধারণ করে থাকে। পূর্বোক্ত আটটি গুণের উৎপত্তিও বিদ্যুৎ ছাড়া সম্ভব নয়। এই কারণে এটিও একটি পুরোহিত রূপ হয়।
(চ) উষ্মা (তাপ)- সকল পদার্থের সকল প্রকার ক্রিয়া তাপের উপস্থিতিতেই ঘটে থাকে, যদিও সেই তাপের পরিমাণ অনেক কম হতে পারে। অত্যন্ত শীতল প্রকৃতিতে কোনো ক্রিয়া বা বলের অস্তিত্ব সম্ভব নয় এবং এগুলো ছাড়া পূর্বোক্ত আটটি গুণের প্রকাশও সম্ভব নয়। এই কারণে উষ্মাকেও পুরোহিত বলা হয়েছে।
2. দেবম্ - [ দেবম্ দেবো দানাদ্বা। দীপনাদ্ধা। দ্যোতনাদ্বা। দ্যুস্থানো ভবতীতি বা। য়ো দেবঃ সা দেবতা। (নি. 7.1.5)] অর্থাৎ, যে পদার্থ বল আদি দেয়, নিজে প্রকাশিত হয়ে অন্যকে প্রকাশিত করে এবং দ্যুস্থানে অবস্থান করে, তাকে দেব বলা হয়। এখানে 'দ্যু' এর অর্থ [দ্যোঃ = বাগিতি দ্যোঃ (জৈ.উ. 4.22.11), দ্যৌরেবাত্মা (শ. 6.3.3.15), ঐন্দ্রী দ্যৌঃ (তাং, 15.4.8), আপো বৈ দ্যোঃ (শ. 6.4.1.9), প্রাণো বৈ দিবঃ (শ. 6.7.4.3)] প্রকরণ অনুযায়ী পৃথক-পৃথক হয়। যা অগ্নিবাচক সকল ছয়টি পদার্থের সাথে ঘটতে পারে। যেমন 'ওম্' রশ্মি পরমাত্মার মধ্যে বিদ্যমান হয়। মনস্তত্ব 'ওম্' রশ্মি এবং পরমাত্মার মধ্যে বিদ্যমান হয়। প্রাণ রশ্মিগুলোও সূত্রাত্মা বায়ুর মধ্যে বিদ্যমান হয়, সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি বাক্ অর্থাৎ 'ওম্' রশ্মির মধ্যে বিদ্যমান হয়, বিদ্যুৎ প্রাণ রশ্মিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান হয় এবং উষ্মা (তাপ) বিদ্যুতের মধ্যে বিদ্যমান হয়। এই কারণে দেবরূপী অগ্নিকে দ্যুস্থানী বলা হয়েছে।
3. ঋত্বিজম্ - [ঋত্বিক্ ঋত্বিক্ কস্মাৎ। ঈরণঃ। ঋগ্যষ্টা ভবতীতি শাকপূণিঃ। [ঋতুয়াজী ভবতীতি বা।] পূর্বোক্ত অগ্নিবাচী সকল ছয়টি পদার্থই ঋত্বিক্, এই কারণে বলা হয়, কারণ এরা পরবর্তী পর্যায়ের পদার্থগুলোকে প্রেরিতকারী হয়। এর পাশাপাশি, এই সকল পদার্থ সূক্ষ্ম থেকে বড় ছন্দ রশ্মিগুলোর য়জনকারী হয়। এই য়জন থেকেই সকল পদার্থ ক্রমশ উৎপন্ন হয়। এই সকল পদার্থ যথাসময়ে প্রকট হয়ে য়জন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এই কারণে সকল পদার্থকে ঋত্বিক বলা হয়।
= 4. হোতারম্ - [হোতা হোতারম্ হ্রাতারম্ (নি. 7.15), আত্মা বৈ যজ্ঞস্য হোতা (কৌ. 9.6), বাগ্নৈ হোতা (কৌ. 13.9.17.7), মনো হোতা (তৈ. ব্রা. 2.1.5.9) প্রাণো বৈ হোতা (ঐ. 6.8), ক্ষত্রম্ বৈ হোতা (ঐ. 6.21)]
পূর্বোক্ত অগ্নিবাচী সকল পদার্থই হোতারূপ হয়, কারণ এই সকল পদার্থ অন্য পদার্থকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। 'ওম' রশ্মি, মনস্তত্ত্ব, সূত্রাত্মা বায়ু এবং প্রাণ রশ্মি- এরা সবাই আকর্ষণ গুণসম্পন্ন হয়। বিদ্যুৎ ও তাপও আকর্ষণ অথবা ভেদন কিংবা উভয় গুণসম্পন্ন হওয়ার কারণে ক্ষত্ররূপ বলে পরিচিত হয়। এই কারণেই সেগুলো হোতারূপও হয়।
5. রত্নধাতমম্ - [রত্নম্ রময়তি হর্ষয়তীতি রত্নম্ (উ. কো. 3.14), রত্নম্ ধননাম (নিঘ. 2.10)] অগ্নিবাচী পূর্বোক্ত সকল পদার্থ রত্নধাও বলা হয়, কারণ এই সকল পদার্থ নিজের থেকে সূক্ষ্ম অন্য পদার্থগুলোকে ধারণ করতে শ্রেষ্ঠ হয়। আমি এখানে পর্যায়ক্রমে এই বিষয়টি স্পষ্ট করছি-
(ক) 'ওম' রশ্মি - এই রশ্মি সকল পদার্থকে উৎপন্ন ও তৃপ্ত করে এবং মূল উপাদান পদার্থ প্রকৃতিকে ধারণ করে, তাই একে রত্নধাতম বলা হয়। এরথেকে অধিক নিকট থেকে প্রকৃতিকে ধারণকারী অন্য কোনো পদার্থ এই সৃষ্টিতে নেই।
(খ) মনস্তত্ত্ব- ওম্ রশ্মি যা সবার তৃপ্তিদায়ক হয়, সেগুলোকে ধারণকারীদের মধ্যে এটি শ্রেষ্ঠতম হয়।
(গ) সূত্রাত্মা বায়ু - এই রশ্মি সবার তৃপ্তিদায়ক 'ওম' রশ্মি এবং মনস্তত্বকে ধারণকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হয়।
(ঘ) প্রাণ - পূর্বোক্ত তিনটি পদার্থ, যা আগামী পদার্থগুলোকে তৃপ্ত করে, তাদের ধারণকারীদের মধ্যে প্রাণ হল শ্রেষ্ঠতম।
(ঙ) বিদ্যুৎ- পূর্বোক্ত সকল পদার্থ, যা নিজেদের থেকে স্থূল পদার্থগুলোকে তৃপ্ত করে, তাদের সবাইকে ধারণকারীদের মধ্যে বিদ্যুৎ হল শ্রেষ্ঠতম।
(চ) উষ্মা - উষ্মা যুক্ত পদার্থ এই পাঁচটি পদার্থকে ধারণকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হয়।
উল্লেখ্য যে, এখানে যে পদার্থগুলোকে তৃপ্তিকারী বলা হয়েছে, তারা সেই সকল পদার্থকে ক্রিয়াশীলও করে। এই কারণে তারা 'রত্ন' নামে পরিচিত। সেই রত্নরূপী পদার্থগুলোকে যারা ধারণ করে তারা রত্নধা এবং অনেক রত্নধা পদার্থের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ, তাকে রত্নধাতম বলা হয়।
(মী॑ळे) স্তবে য়াচে অধীচ্ছামি প্রেরয়ানি বা অর্থাৎ আমি এই উপযুক্ত অগ্নিকে, যা উপর্যুক্ত বিশেষণগুলোতে বিভূষিত, তাকে প্রকাশিত করছি, তাকে আকৃষ্ট করার জন্য বারবার ইচ্ছা প্রকাশ করছি। এখানে এই কাজটি সম্পাদনকারী কর্তা হলেন এই মন্ত্রের ঋষি মধুচ্ছন্দা, যাঁর ব্যাখ্যা আমি শুরুতেই করেছি। অর্থাৎ এই মধুচ্ছন্দা রশ্মিগুলো অগ্নির ছয়টি রূপের মধ্যে কাউকে প্রকাশিত করে, কাউকে আকর্ষিত করে এবং কাউকে প্রেরিতও করে। এই ঋষি রশ্মিগুলো থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ছন্দ রশ্মিগুলোও এই সমস্ত কাজে পূর্ণ সহযোগিতা করে।
ভাবার্থ
সম্পূর্ণ সৃষ্টি বিভিন্ন সূক্ষ্ম তত্ত্বের মিলনে তৈরি হয়েছে, এই কারণে এটি হল যজ্ঞস্বরূপ। এই যজ্ঞের প্রধান ঘটক অগ্নি তত্ত্ব হল বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন-ভিন্ন স্তরের পরিচায়ক। এই পদার্থ ক্রমানুসারে এভাবে মানা যেতে পারে- 'ওম্' রশ্মি, মনস্তত্ত্ব, সূত্রাত্মা বায়ু, প্রাণ তত্ত্ব, বিদ্যুৎ এবং উষ্মা। এই সকল তত্ত্ব প্রত্যেক পদার্থকে নিজের সম্মুখে ধারণ করে তার মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের প্রয়োজনীয় বলকে উৎপন্ন করে। রূপ, দাহ, প্রকাশ, বেগ, ছেদন আদি গুণের জন্যও এই তত্ত্ব নিজ-নিজ স্তরে প্রথম উত্তরদায়ী হয়। এই পদার্থই নিজের তুলনায় সূক্ষ্ম পদার্থে স্থিত হয়ে নিজের গুণ ও কর্মকে প্রকট করে। সৃষ্টির বিভিন্ন ক্রিয়াতে যখনই যে পদার্থের প্রয়োজন হয়, এগুলো প্রকট হতে থাকে। এই পদার্থগুলোই নিজেদের চেয়েও সূক্ষ্ম পদার্থকে সর্বদা নিজেদের ভেতরে ধারণ করে রাখে। এই ছন্দ রশ্মিকে উৎপন্নকারী ঋষিরূপ রশ্মিগুলো এমন সব পদার্থের মধ্যে কয়েকটিকে আকর্ষণ করে, আবার কয়েকটিকে প্রেরণা দিতে থাকে। সম্পূর্ণ সৃষ্টি এই ছয়টি প্রধান পদার্থের মাধ্যমে খেলা করা ঈশ্বরের একটি খেলা।
এই মন্ত্রের মধ্যে সৃষ্টি নির্মাণের মুখ্য ঘটক, তাদের প্রেরক আদির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। মানুষের প্রথম প্রজন্ম যখন এই পৃথিবীতে জন্ম নেয় অথবা ব্রহ্মাণ্ডে কোথাও জন্ম নেয়, তখন সেই সময় মানুষ কৌতূহলপূর্বক এই সৃষ্টিকে দেখে; তখন তার এ বিষয়ে কোনো জ্ঞান ছিল না এবং তাকে বলার মতো অর্থাৎ তার চেয়ে বুদ্ধিমান অন্য কোনো প্রাণীও ছিল না। সেই সময় অগ্নি ঋষি ব্রহ্মাণ্ড থেকে যে রশ্মিগুলোকে সমাধি অবস্থায় গ্রহণ করেছিলেন, সেই রশ্মিগুলোর মধ্যে এটিই ছিল প্রথম রশ্মি, যা সৃষ্টির সারকথা জানানোর জন্য অনিবার্য ছিল এবং এই শব্দগুলোর জ্ঞান অগ্নি ঋষিকে ঈশ্বর দিয়েছিলেন, যা আমি আগেই লিখেছি। মানুষ সৃষ্টিতে কীভাবে থাকবে, সৃষ্টির পদার্থকে কীভাবে ব্যবহার করবে এবং সৃষ্টিকে জেনে ঈশ্বরকে কীভাবে জানবে ও প্রাপ্ত করবে, এই সবকিছুর জন্য সৃষ্টির জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক।
এখন আমি এর আধিভৌতিক অর্থ প্রস্তুত করছি-
আধিভৌতিক ভাষ্য
য়জ্ঞস্য [য়জম্ = অনেকবিধব্যবহারম্ (ম.দ.য়. ভা.29.36), বিদ্যাপ্রজ্ঞাপ্রবর্ধকম্ (ম.দ.ঋ.ভা. 4.34.1)] এই সৃষ্টির সম্পূর্ণ বিজ্ঞান জানতে এবং প্রজ্ঞাকে বৃদ্ধিকারী এবং সব প্রকারের লৌকিক ব্যবহার যারা জানেন। (অগ্নিম্) [অগ্নিঃ অগ্নিরেব ব্রহ্ম (শ. 10.4.1.5), বিশ্বোপকারক (ম.দ.ঋ.ভা. 1.76.2)] বেদ অর্থাৎ সম্পূর্ণ সৃষ্টির বিজ্ঞান এবং ব্রহ্মকে জানার যোগ্য, সমস্ত প্রাণিজগতের হিতাকাঙ্ক্ষী মহাবিদ্বান। (পুরোহিতম্) যিনি নিজের সামনে আসা যে কোনো মানুষ বা প্রাণীর সর্বদা হিত সাধনে প্রবৃত্ত থাকেন। (দেবম্) [দেবঃ দিব্যগুণসম্পন্না বিদ্বান্ (ম.দ.ঋ.ভা. 1.68.1), য়ো বৈ দেবানাম্ পথৈতি ঋতস্য পথৈতি (শ. 4.3.4.16)] যিনি দিব্য গুণসম্পন্ন এবং সর্বদা ঈশ্বরের আজ্ঞার অনুকূল পথে চলা বিদ্বান হন। (ঋত্বিজম্) যিনি সর্বদা সকলের সাথে সঙ্গতি এবং সৃষ্টির প্রত্যেক পদার্থ সর্বহিতে ব্যবহার করার ভাবনা রাখেন। (হোতারম্) যিনি দেওয়ার যোগ্য পদার্থ ও তাদের যথার্থ বিজ্ঞানের দাতা এবং নেওয়ার যোগ্য পদার্থের গ্রহীতা অর্থাৎ সমস্ত লোকহিতকর ব্যবহারের জ্ঞাতা এবং সেই অনুযায়ী আচরণকারী হন। (রত্নধাতমম্) যিনি তিন প্রকারের সুখ প্রদানকারী পদার্থসমূহকে ধারণকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হন, সেই এমন মহান পুরুষের (ঈডে) খোঁজ করো, তাকে খোঁজার ও জানার ইচ্ছা করো এবং এমন পুরুষ প্রাপ্ত হলে তার কাছ থেকে সম্পূর্ণ সৃষ্টি ও লোকব্যবহার শেখার য়াচনা করো ও শিক্ষা গ্রহণ করো।
ভাবার্থ
এই সৃষ্টির সম্পূর্ণ বিজ্ঞান ও তার সঠিক ব্যবহার এবং সাংসারিক ব্যবহারগুলোকে বিশুদ্ধভাবে জানা, সকল প্রাণীকুলের হিতাকাঙ্ক্ষী, দিব্যগুণসম্পন্ন এবং সর্বদা ঈশ্বরের আজ্ঞা অনুযায়ী আচরণকারী, সকল প্রকার সুখ প্রদানকারী ত্যাগী-তপস্বী গুরুকে পুরুষার্থের সাথে খুঁজে বের করে লৌকিক ও পারলৌকিক জ্ঞান লাভের পূর্ণ চেষ্টা করা উচিত। এর মাধ্যমেই সকল মানুষ একে অপরের সুখ বাড়িয়ে আনন্দে থাকতে পারে। একইভাবে সব মানুষের উচিত এই সকল সদ্গুণ সম্পন্ন তেজস্বী রাজাকেও নির্বাচন করা, যাতে সম্পূর্ণ পৃথিবীতে সুখ ও শান্তির সাম্রাজ্য স্থাপিত হতে পারে।
জ্ঞাতব্য
এখানে এই মন্ত্রের দ্বারা পৃথিবীতে উৎপন্ন প্রারম্ভিক প্রজন্মের সকল মানুষকে সংসারে থাকার জন্য এমন গুরু খোঁজার প্রেরণা দেওয়া হয়েছে, যিনি বেদের সাক্ষাৎ করেছেন; অর্থাৎ অগ্নি আদি চার মহর্ষিদের পরে অন্যান্য ব্রহ্মাদি ঋষিদের খোঁজার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
সকল মানুষকে চার ঋষি বা ব্রহ্মাদি থেকে সম্পূর্ণ বিদ্যা ও ব্যবহার শেখার উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই উপদেশ গ্রহণ করাও অনিবার্য ছিল। এখানে শিক্ষক পুরুষের সাথে-সাথে রাজপুরুষকেও গ্রহণ করা যেতে পারে, তাহলে অর্থে কিছুটা পার্থক্য হবে। মহর্ষি দয়ানন্দ জী যে ভৌতিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ করেছেন, সেগুলোকেও এখানে যুক্ত করে দেখা উচিত। এইভাবে মন্ত্রের মোট চারটি অর্থ আছে। এখানে আমি দুটি অর্থ দিয়েছি এবং বাকি দুটি ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্য থেকে পড়ে নিবেন। যদি ঋষির ভাষ্য উপলব্ধ না হতো, তাহলে আমি এইভাবে আরও দুটি অর্থ করতাম। ঋষি দয়ানন্দ অর্থের মধ্যে ভৌতিক অগ্নিকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন ধরণের ভৌতিক অনুসন্ধানের (গবেষণার) প্রেরণা দিয়েছেন, যা এই পৃথিবীতে সুখদায়ক জীবনযাপনের জন্য অনিবার্য। এই জ্ঞানও প্রথম প্রজন্মের জন্য অনিবার্য ছিল।
পরিশেষে, ঋষি দয়ানন্দ 'অগ্নি' পদের মাধ্যমে পরমেশ্বরকে গ্রহণ করে তাঁকে সাক্ষাৎ করে জানার প্রেরণা প্রদান করেছেন। এটাই হল মানব জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য, এই কারণে এই জ্ঞান সবচেয়ে বেশি অনিবার্য ছিল কিন্তু সৃষ্টিকে না জেনে সৃষ্টি নির্মাণকারী পরমাত্মার বিজ্ঞান কখনো সম্ভব নয়, এই কারণে এই মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য অনিবার্য।
এইভাবে এই মন্ত্র মানুষের লৌকিক ও পারলৌকিক সকল ধর্ম বা কর্তব্য এবং সম্পূর্ণ সৃষ্টিকে জানার সারসংক্ষেপ উপদেশ দেয়, যা হল সম্পূর্ণ বেদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয়। এই কারণে এই মন্ত্র চারটি বেদের প্রস্তাবনা এবং সেইজন্যই এটি হল প্রথম মন্ত্র।
1. বাস্তবে ঈশ্বরীয় গ্রন্থ কোনটি হবে?
অ॒গ্নিমী॑ळे পু॒রোহি॑তং য॒জ্ঞস্য॑ দে॒বমৃ॒ত্বিজ॑ম্। হোতা॑রং রত্ন॒ধাত॑মম্॥
প্রিয় শ্রোতাগণ! আজ আমি বিশ্বের সমস্ত মানব সমাজের সাথে কিছু কথা বলতে চাইবো। আজ থেকে পৌরাণিক হিন্দু সমাজের 9 দিনের একটি উৎসব 'নবরাত্রি' শুরু হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন ধরণের পূজা-পাঠ, কর্মকাণ্ড আদির আয়োজন করা হবে। এমনকি যেসব মানুষের ধর্মে অগাধ আস্থা নেই, তারাও এই ৭ দিনে নিজেদের মধ্যে কিছু ধর্মীয় অনুভূতি অনুভব করতে শুরু করবেন। এমন হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত স্পষ্ট এবং তিক্ত সত্য হল যে, ধর্মের এই আপাত প্রবাহে না তো প্রকৃত ধর্ম কোথাও দেখা যায়, আর না বেদ। একইভাবে আমাদের ইসলাম বন্ধুদের রোজার সময় এবং খ্রিষ্টান বন্ধুদের তাদের উৎসবের সময় এমন মনে হয় যে তারা খুব ধার্মিক হয়ে উঠেছেন। হিন্দু ভাইদেরও আজ থেকে তেমনই মনে হবে।
সকলেই জানেন যে সমগ্র বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত যদি হয়ে থাকে, তবে তা ধর্মের নামেই হয়েছে এবং আজও হয়ে চলেছে। বিশ্বের প্রায় 56 টি দেশে ইসলাম এবং 100 টি দেশে খ্রিষ্ট মতের বিস্তার কি রক্তপাত এবং ছল-চাতুরি ও সরল মানুষকে প্রলোভন দেখানোর মাধ্যমে হয়নি? তবে কি একে ধর্ম বলা হবে? আজ যেসব সমস্যা দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের মধ্যে যে দেশগুলো নতুন-নতুন এজেন্ডা নিয়ে আসছে, তাদের পেছনে কোথাও-না-কোথাও এই উদ্দেশ্য থাকে যে আমার ধর্মই যেন এই বিশ্বের উপর সাম্রাজ্য বিস্তার করে। তারা একথা মুখে বলবে না, কিন্তু আসল এজেন্ডা এটাই যে আমাদেরই রাজত্ব হোক, আমাদেরই সম্প্রদায়ের রাজত্ব হোক। মনে হয় যেন এই মানুষ সব কিছু হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হতে পারেনি। তাই আজ মানুষ মানুষের রক্তের তৃষ্ণার্ত। এটি এই কারণে হয়েছে কারণ মানুষ মনুষ্যধর্মকে ভুলে গেছে। আগে কখনও এক ধর্ম, এক ভাষা এবং ভাবনা এক ছিল, কিন্তু এখন সমস্ত মানব সমাজ খণ্ডিত হয়ে গেছে। তারমধ্যেও সবথেকে বেশি হিন্দু সমাজের খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছে।
বাস্তবে ঈশ্বরপ্রদত্ত ধর্ম তো গঙ্গোত্রী এবং তারও আগে গোমুখ থেকে নির্গত বিশুদ্ধ পবিত্র জল ছিল, কিন্তু যখন গঙ্গা নদী সুন্দরবন ডেল্টায় গিয়ে মেশে, তখন তার জল কেমন হয়, তা সকলেই জানেন। সেই পবিত্র গঙ্গাজলে এই অশুদ্ধিগুলো কোথা থেকে এলো? এর উত্তর হল-
- নদী-নালা এবং শহরের বর্জ্য থেকে। তেমনই ধর্ম তো একটাই ছিল শুদ্ধ, পবিত্র এবং সকলের জন্য হিতকর, কিন্তু তাতে অনেক রোগব্যাধি চলে এসেছে। তাতে অনেক চিন্তাধারার নদী-নালা মিশেছে এবং সেগুলো থেকে আরও অনেক নদী-নালা ও খাল বেরিয়েছে। সেগুলো সবই অপবিত্র ছিল, তাতে অনেক ভেজাল ছিল।
বর্তমানে যারা দাবি করেন যে তাদের ধর্ম সেই শক্তি উৎপন্ন করেছে যিনি সংসার রচনা করেছেন, এমন চারটি ধর্মের কথা আমি বলবো। বাস্তবে ধর্ম একটাই হয়, সেটি হল মানব ধর্ম। আমি 'ধর্ম' শব্দটি এই জন্য ব্যবহার করছি কারণ লোকে একে ধর্ম বলে। বস্তুতঃ এগুলো সবই হল সম্প্রদায়। কিন্তু যখন এইসব সম্প্রদায়ের লোক নিজের-নিজের সম্প্রদায়কে মানব ধর্ম বলতে শুরু করে এবং সম্পূর্ণ মানব জাতিকে সেই পতাকার নিচে আনার প্রাণপণ চেষ্টা করে, তখন এক বিবেকবান পুরুষের সামনে এই প্রশ্ন উপস্থিত হয় যে এদের মধ্যে ধর্ম কোনটি? এদের মধ্যে মানব ধর্ম কোনটি? এদের মধ্যে কোন আদর্শটি এমন, যেটিকে নিয়ে চললে সংসারে সুখ-শান্তি স্থাপিত হবে? তাদের মধ্যে প্রথম সম্প্রদায় হল- হিন্দু। যদি 'হিন্দু' শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করা হয়, তাহলে হিন্দুরাই তা জানে না। কিছু লোক 'হিন্দুত্ব'-কে একটি আদর্শ বা জীবনশৈলী বলে, কিন্তু তারা সেই জীবনশৈলীর তর্কসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারে না। কিছু লোক এটিকে বিদেশিদের দেওয়া নাম বলে মনে করেন, যারা সিন্ধু নদীর এই পাড়ে থাকতেন তাদের হিন্দু বলতে শুরু করেছিলেন।
এটি অত্যন্ত শোকের বিষয় যে তাদের নিজেদের নাম পর্যন্ত জানার জন্য বিদেশিদের আশ্রয় নিতে হয়, এর চেয়ে বড় বৌদ্ধিক দাসত্ব আর কী হতে পারে? নিজেদের শাস্ত্র ও ঐতিহাসিক গ্রন্থে দেওয়া 'আর্য' নামটি তাদের পছন্দ হয় না। যারা খুব শিক্ষিত মানুষ, তারাও কেবল এটাই জানেন যে হিন্দু হল একটি ধর্ম বিশেষ। তারা এমনটা মনে করেন যে বেদ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ, কিন্তু এটিও পূর্ণ সত্য নয়। বেদ কেবল হিন্দুদের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য। বেদ মানুষের মতো প্রতিটি বুদ্ধিমান প্রাণীরও, যারা ব্রহ্মাণ্ডের যেকোনো স্থানে বসবাস করে। সবার জন্য বেদ একই, এটি আমাদের দাবি অবশ্যই, তবে এখন আমরা এমনটা বলবো না, তার আগে পরীক্ষা করবো। তবে হ্যাঁ, এই প্রসঙ্গে এটুকু বলাও আবশ্যক হয়ে পড়েছে যে, আজ হিন্দুত্বের অনেক ধ্বজাধারী বেদের পরিবর্তে উপনিষদ, ভাগবত পুরাণ, গীতা, বিশেষ করে গীতাকেই হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করছেন। যখন এই তথাকথিত হিন্দুত্ববাদীরাই বেদকে উপেক্ষা করতে শুরু করবেন, তখন তাদের অন্য সম্প্রদায়ের উপহাসের পাত্র হওয়া থেকে কীভাবে বাঁচানো সম্ভব?
বাস্তবে এমন মানুষ বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী লোকদের দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ আছে। বিদেশিরা জানে যে বেদকে মিটিয়ে দিলেই সনাতন ধর্ম ও ভারতের আদর্শকে মুছে ফেলা সম্ভব, অন্যথায় নয়। এই কারণেই সেই সব লোকেদেরই ভারতের মহাপুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়, যাদের বেদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। যখন তাদের আদর্শে বেদের জ্ঞান ছিল না, তখন তাদের ভক্তদের সাথে বেদের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? আর বেদহীন ভারত কীভাবে কখনো মহান হয়ে উঠবে? প্রকৃতপক্ষে বেদের উপেক্ষা করা মানে কেবল ভারতের উপেক্ষা নয়, বরং সমগ্র মানব ও প্রাণিকুলের উপেক্ষা এবং এটিই হল সব দুঃখের মূল কারণ।
দ্বিতীয় সম্প্রদায় হল- খ্রিস্টান, যারা নিউ টেস্টামেন্টকে তাদের ধর্মগ্রন্থ বলে মনে করে। তারা একে ঈশ্বরীয় গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করে। তারা বিশ্বাস করে যে যিশু খ্রিস্ট ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন এবং তিনি নতুন নিয়ম 'নিউ টেস্টামেন্ট' লিখেছিলেন, যারমধ্যে তাঁর শিক্ষা আছে। তাদের চেয়েও প্রাচীন হল- ইহুদি, যারা ওল্ড টেস্টামেন্টকে নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বলে মনে করে এবং ইসলাম, যারা কুরআনকে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মানে। আমি এই চারটি গ্রন্থের বিষয়ে আলোচনা করবো।
আজ থেকে প্রায় 30 বছর আগে আমার সামনে একটি পুস্তক আসে, যখন আমি মথুরা গুরুকুলে পড়তে গিয়েছিলাম। সেই পুস্তকটির নাম ছিল 'বেদ ও কুরআন'; শ্রীমদ্ আচার্য প্রেমভিক্ষু জী আমাকে এই পুস্তকটি দিয়ে বলেছিলেন যে এর উপর কিছু লিখতে। আমি সেই পুস্তকটি দেখি, তার লেখক বলছেন যে বেদ হল ঈশ্বরীয় বাণী যা সবার আগে প্রকাশিত হয়েছে এবং কুরআন হল অন্তিম বাণী যা খোদার মাধ্যমে সবার শেষে প্রকাশিত হয়েছে। তারপর সেই লেখক লিখছেন যে কোনো লেখকের শেষ গ্রন্থটিই অধিক প্রামাণিক হয়। আজ ডঃ জাকির নায়েকের মতো ইসলামি স্কোলারও একই কথা বলেন এবং বেদের অনেক প্রমাণ দিয়ে বলেন যে বেদও ঈশ্বরীয় এবং কুরআনও ঈশ্বরীয়। পার্থক্য শুধু এই যে, বেদ শুরুতে বলা হয়েছে এবং কুরআন শেষে, আর কোনো লেখকের অন্তিক গ্রন্থটিই অধিক প্রামাণিক হয়। এই ধরণের বিদ্বানরা এই পৃথিবীতে এক নতুন ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত করছেন, বিশেষ করে হিন্দুদের বিরুদ্ধে। অনেক হিন্দু বা সনাতন ধর্মী তাদের বাজালে ফেঁসে যান। তারা এই কথাটি ভুলে যান যে এমন কথা বলে তারা এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত বন্ধুরা নিজেরা উপহাসের পাত্র হচ্ছেন এবং ঈশ্বরকেও উপহাসের পাত্র বানাচ্ছেন।
আমি: প্রশ্ন হল ডঃ জাকির নায়েক বা তার সমান বিচারধারার অন্য কোনো বিদ্বান, যারা এই ধরণের কথা বলেন যে বেদ পরমাত্মার প্রথম পুস্তক এবং কুরআন হল অন্তিম পুস্তক। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য কেন আছে? যদি তারা মনে করেন যে কুরআন অন্তিম পুস্তক, তাই এটি অধিক প্রামাণিক; লেখক সংশোধন করেন। হ্যাঁ, আমি মানি যে মানুষ সংশোধন করে কারণ মানুষ অল্পজ্ঞ, তার ভুল হয়ে যায়। সে ভুল সংশোধন করে, আবার ভুল করার পর আবার সংশোধন করে এবং এভাবে সে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। যেমন আমি নিজেও আমার কোনো গ্রন্থ লিখছি, তো প্রেসে পাঠানোর আগে আমি নিজেই অনেকবার সংশোধন করে নিই বা করতে হয়, কারণ কোনো মানুষই পূর্ণ নয়। তাহলে যাকে খুদা বলা হয় বা যাকে ঈশ্বর বলা হয়, তিনিও কি আমাদের মতোই অপূর্ণ বা অল্পজ্ঞানী? যিনি বেদের জ্ঞান দিয়েছিলেন, তারপর কি তিনি ভুলে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে যে অন্য মজহবী গ্রন্থগুলো এসেছে, সেগুলোতে সংশোধন করা হয়েছে এবং কুরআনে এসে তা ফাইনাল বা চূড়ান্ত হয়েছে। এর থেকে তো এটাই প্রমাণিত হয় যে, কুরআন বা বেদ রচনাকারী অদক্ষ ছিলেন অথবা অল্পজ্ঞ অর্থাৎ কম জ্ঞানী ছিলেন। এইজন্য নিজের ভুলগুলোকে বারবার সংশোধন করে তিনি কুরআনে তা ফাইনাল করেছেন। এখন এটা জানার চেষ্টা করা যাক যে কুরআনে ফাইনাল কী হয়েছে?
বৈদিক মানুষেরা বিশ্বাস করেন যে বেদের মধ্যে সমস্ত বিদ্যা আছে। বেদের উপর ভিত্তি করে সুখপূর্বক জীবন যাপন করা সম্ভব। বেদের উপর ভিত্তি করে রাজনীতিও করা যেতে পারে। বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, কৃষিশাস্ত্র, অর্থনীতি, আধ্যাত্মিকতা আদি সবই বেদ থেকে শেখা সম্ভব। কুরআনে কি এসব আছে? বেদের উপর ভিত্তি করে কোনো আয়ুর্বেদের বিদ্বান অথর্ববেদ থেকে কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা করতে পারেন। কিন্তু কোনো ব্যক্তি কি কুরআন বা বাইবেলের উপর ভিত্তি করে কারও চিকিৎসা করতে পারেন? বেদের উপর ভিত্তি করে মানুষ বাড়ি তৈরি করতে পারে। অন্য গুলোকে যে ধর্মগ্রন্থ কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর উপর ভিত্তি করে কি কেউ বাড়ি তৈরি করতে পারে? অন্য ধর্মীয় গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে কি কেউ কৃষি কাজ করতে পারে? অন্য ধর্মীয় গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে কি অর্থশাস্ত্র চালানো যেতে পারে? অন্য ধর্মীয় গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে কি দেশ চালানো যেতে পারে? কী কী কাজ করা যেতে পারে? বিচার করে দেখুন। বেদের উপর ভিত্তি করে সমগ্র সৃষ্টিকে জানা সম্ভব, বাইবেল ও কুরআন আদির উপর ভিত্তি করে কি এমনটা হওয়া সম্ভব?
বেদের পক্ষের লোকেরা বিশ্বাস করেন যে মানুষ বেদের ওপর ভিত্তি করে সব কাজ করতে পারে এবং সব কাজ করেও আসছে। এই বিষয়ে ইঞ্জিল, তৌরেত এবং কুরআনের পক্ষের লোকেরা কী বলবেন? তাদের বিদ্বানরা এই বিষয়ে বিচার করে দেখুন যে যদি সংসার থেকে সমস্ত বিদ্যা লুপ্ত করে দেওয়া হয় এবং যাকে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ বলে মনে করে, শুধু সেগুলোই বেঁচে থাকে, তবে কি তারা বেঁচে থাকতে পারবে? সৃষ্টি সম্পর্কে কি কিছু জানতে পারবে? লোকেরা কি লৌকিক ব্যবহার শিখতে পারবে? তারা কতটা জানতে পারবে? যদি এই সবকিছুই না জানতে পারে, তবে তো খোদা সংশোধন করার পরিবর্তে আরও উল্টোটা করেছেন। বেদে অনেক কিছু ছিল এবং সবকিছু ভুলে গিয়ে এমন গ্রন্থ তৈরি করেছেন, যারমধ্যে সমস্ত বিদ্যাই নেই, তবে জীবন চলবে কীভাবে?
সৃষ্টির আদিতে পরমাত্মা বেদের জ্ঞান দিয়েছিলেন, জীবন চালানোর জন্য সম্পূর্ণ বিদ্যা দিয়েছিলেন, কারণ সম্পূর্ণ সৃষ্টি পরমাত্মাই তৈরি করেছেন। ঈশ্বর যখন মানুষ ও অন্য প্রাণীদের তৈরি করেছেন, তখন কি মানুষ বানিয়ে তাদের এভাবেই নিরাশ্রয় ও মূর্খ হিসেবে ছেড়ে দিয়েছেন? তাকে তো নিশ্চয়ই জ্ঞান দিয়েছিলেন যে এতে কীভাবে থাকতে হয়? কীভাবে বাঁচতে হয়, কীভাবে সৃষ্টিকে জানতে হয়, কীভাবে নিজের শরীরকে জানতে হয়, কীভাবে নিজেকে জানতে হয়, কীভাবে ঈশ্বরকে জানতে হয়? যদি এই সব জ্ঞান দেওয়ার না হতো, তবে কোনও পুস্তকের প্রয়োজনীয়তাই থাকতো না। তবে কি কোরআনে এসে সব ভুলে গেছেন? সংশোধন কোথায় হল? বেদ ছাড়া অন্য ধর্মগ্রন্থগুলোতে কোন-কোন বিদ্যা আছে? ইসলাম ও বাইবেলের স্কোলাররা এই বিষয়ে বিচার করুন। বাইবেলকে যারা বিশ্বাস করেন তারা বলুন যে, বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে অগ্রগতি হচ্ছে, তার উৎস কি কোথাও বাইবেল আছে? যখন বাইবেল রচিত হয়েছিল, তখন জেরুসালেম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বিদ্যা ও ধন-সম্পদের অবস্থা কী ছিল? যখন কোরআন রচিত হয়, তখন আরবে বিদ্যা ও সমৃদ্ধির অবস্থা কী ছিল?
এদিকে ভারতের বৈদিক কালের দিকে তাকালে, সম্পূর্ণ বিশ্ব এটি স্বীকার করে যে, আর্যাবর্ত (ভারত) ছিল সম্পূর্ণ বিদ্যা ও ধন-সম্পদের কেন্দ্র। তবে কীভাবে বিশ্বাস করবো যে, ঈশ্বর বেদের মধ্যে সংশোধন করে অন্য গ্রন্থগুলোর জ্ঞান দিয়েছেন? তারা কি জানে না যে, তারা ভারত থেকে কত পুস্তক নিয়ে গেছে এবং সেই পুস্তকগুলোতে যে জ্ঞান আছে, তার মূলও বেদের মধ্যে আছে। এটি আমি বলছি না, আমি অনেক বিদ্বান ব্যক্তির প্রমাণ দিতে পারি। আমার কাছে একটি পুস্তক আছে- 'বেদের যথার্থ স্বরূপ'; এর লেখক পণ্ডিত ধর্মদেব বিদ্যামার্তণ্ড, যিনি আর্য সমাজের একজন অত্যন্ত জ্ঞানী বিদ্বান ছিলেন। তিনি খ্রিস্টান, মুসলিম, জৈন এবং বৌদ্ধদের অনেক বিদ্বানদের মত উল্লেখ করেছেন যে বেদ আসলে কী? বাইবেল ও কোরআন সম্পর্কেও কি এমন কোনো মত আছে যে এগুলোর মধ্যে সব বিদ্যা বা সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান নিহিত আছে?
ঈশ্বরীয় জ্ঞান সেটাই হবে, যার মধ্যে সম্পূর্ণ সৃষ্টির জ্ঞান-বিজ্ঞান থাকবে। আর দ্বিতীয় কথা হল, যা ঈশ্বরীয় জ্ঞান হবে, তাতে কোনো মানুষের কাহিনী থাকবে না; কারণ ঈশ্বর মানুষের কাহিনী লেখেন না। আমি এ বিষয়ে খুব বেশি আলোচনা করবো না, শুধু একটি বিষয়ে চর্চা করবো। আপনারা আমার অনেক বক্তৃতায় 'বৈদিক রশ্মি সিদ্ধান্ত'-এর মাধ্যমে বেদ আসলে কী, তা শুনেছেন। আমি সেটির পুনরাবৃত্তি করবো না, তবে যে চারজন ঋষি মহাকাশ থেকে বেদের জ্ঞান লাভ করেছিলেন, তাঁদের কাছে প্রথম উপদেশটি কী ছিল, সেটি আমি দেখবো।
লেখকের প্রথম বাক্য সাধারণত গ্রন্থের ভূমিকা হয়, যাতে সারসংক্ষেপ থাকে। সবার আগে আমি তাদের প্রথম বাক্যটি নিচ্ছি, যারা বলেন যে আমাদের পুস্তকটি অন্বিম। আসুন সেই সর্বশেষ পুস্তকের প্রথম বাক্য বা প্রথম আয়াতটি দেখি। কোরআনের প্রারম্ভ হয়- 'সূরা আল-বাকারা: মাদানি' দিয়ে; এতে 286 টি আয়াত এবং 40 টি রুকু আছে। 'শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও অত্যন্ত দয়ালু'-এটি কে বলছেন? তাঁদের মতে, এটি স্বয়ং খোদা (আল্লাহ) বলছেন। আমি মুসলিম যুবকদের এটি ভেবে দেখার অনুরোধ করবো যে, যদি এই কথা খোদাই বলে থাকেন, তবে তিনি কেন এমন বলছেন যে 'শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও অত্যন্ত দয়ালু'?
আমি আমার পুস্তক 'বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ'-এ যদি লিখতাম 'অগ্নিব্রতের নামে শুরু করছি, যিনি একজন মহান লেখক', আমি কি আমার পুস্তক এইভাবে শুরু করতাম? এটি নিয়ে চিন্তা করুন। এতে তারপর লেখা আছে- 'আলিফ লাম মীম', এর অর্থ কেউ জানে না। আমার কাছে যে কুরআন শরীফ আছে তা মুম্বাইয়ের মারোল পাইপলাইনের 'মেহমুদ অ্যান্ড কোম্পানি' থেকে প্রকাশিত এবং এর তর্জমা (অনুবাদ) করেছেন মাওলানা ফতেহ মুহাম্মদ খাঁ সাহেব জালন্ধরি। তসহী কী জিনিস, আমি জানি না। মাওলানা আব্দুল মজিদ সর্বর সাহেব এর ফুটনোটে লিখেছেন যে, 'আলিফ লাম মীম'-এর অর্থ মুহাম্মদ সাহেব (সা.) বলেননি, তাই আমাদের এর উপর কিছু না বলে ইমান (বিশ্বাস) স্থাপন করা উচিত। আমাদের কি এর অর্থ জানার চেষ্টা করাও উচিত নয়? এরপর তিনি প্রথম আয়াতে লিখেছেন-
"এটি সেই কিতাব (পুস্তক), যারমধ্যে কোনো সন্দেহ নেই, এটি খোদাভীরুদের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা এর উপর ইমান নিয়ে আসে, আদাবের সাথে নামাজ কায়েম করে এবং আমি যা তাদের দিয়েছি, তা থেকে তারা খরচ করে আর যে কিতাব তোমার উপর নাজিল হয়েছে এবং তোমার পূর্ববর্তী নবীদের উপর যা নাজিল হয়েছে, সবার উপর বিশ্বাস করে এবং পরকালের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।"
"তোমার উপর নাজিল হয়েছে এবং তারপূর্বে যে আসমানী কিতাবগুলো এসেছে, আমরা সে সবগুলোর উপরই বিশ্বাস রাখি।"
অর্থাৎ, কুরআনের আগে যেসব গ্রন্থ এসেছে, সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়েছে। এটি এক ধরণের সততা বা সম্ভাবনা যে, এর আগে যেসব আসমানী কিতাব এসেছে সেগুলো সঠিক ছিল এটাই এদের বক্তব্য। এখান থেকেই কুরআন শুরু হয়।
প্রথম প্রশ্ন হল, এটি স্বয়ং খোদা শুরু করছেন এবং খোদার নাম নিয়েই শুরু করছেন। এখন আমি এর পেছনের দিকে যাবো। নিউ টেস্টামেন্ট, যাকে ইঞ্জিল বলা হয়, এমন পণ্ডিত ধর্মদেব বিদ্যামার্তণ্ড লিখেছেন যে এর প্রথম আয়াত হল "ইব্রাহিমের সন্তান, দাউদের সন্তান, যীশু খ্রীষ্টের বংশতালিকা, ইব্রাহিম থেকে ইসহাক জন্মগ্রহণ করেন, ইসহাক থেকে ইয়াকুব জন্মগ্রহণ করেন এবং ইয়াকুব থেকে ইহুদা ও তার ভাইয়েরা জন্মগ্রহণ করেন।" এখান থেকেই নিউ টেস্টামেন্ট শুরু হয়। আপনার কি মনে হচ্ছে যে এটি কোনো আসমানী কিতাব বা ঈশ্বরীয় গ্রন্থ? এতে তো বংশতালিকা শোনানো হচ্ছে। সৃষ্টির রচয়িতা, যিনি কোটি-কোটি গ্যালাক্সি তৈরি করেছেন, যিনি কোটি-কোটি সৌরজগৎ সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি ইব্রাহিমের বংশতালিকা শোনাবেন? এখান থেকে শুরু করবেন? বংশতালিকা তো মানুষ শোনায়। যারা বেদের মধ্যে কোনো মহাপুরুষের কাহিনী, কোনো নদী, পর্বত বা দেশের নামের কথা বলেন, তারা যেন এই বিষয়টি ভেবে দেখেন যে ঈশ্বর কেন এই কাহিনীগুলো লিখলেন? বেদ আগে নাকি মহাপুরুষ? প্রকৃতপক্ষে এটি বেদের প্রতি অজ্ঞতারই চরম সীমা।
এখন তৌরেত, যাকে ওল্ড টেস্টামেন্ট বলা হয়, এতে তবুও কিছু সৃষ্টি সম্পর্কে লেখা আছে যে, "আদিতে ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন এবং পৃথিবী ছিল আকারহীন ও জনশূন্য এবং গভীর জলের উপরে অন্ধকার ছিল এবং ঈশ্বরের আত্মা জলের উপরে ভাসমান ছিল।” ঈশ্বরের আত্মা জলের উপর ভাসমান ছিল, কিন্তু ঈশ্বর তো সপ্তম আকাশে থাকেন, তবুও জলে আসবেন না আর চতুর্থ আকাশে থাকলেও আসবেন না। জল কোন আকাশে আছে? আমাদের ইহুদি ভাইয়েরা এই কথাটি ভেবে দেখুন যে জল কোন আকাশে আছে এবং ঈশ্বর কি এক জায়গায় থাকেন নাকি সর্বত্র থাকেন? সবার আগে শুরুটা কী ছিল? যদি ঈশ্বরই শুরু করতেন, তবে তিনি বলতেন যে 'আমার আত্মা অথবা আমি জলের উপরে ভাসমান ছিলাম', এরথেকে এই অর্থ বের হয় যে অন্য কেউ উপদেশ দিচ্ছে, ঈশ্বর নয়।
এই তিনটি গ্রন্থকে আমি নিয়েছি, যা পৃথিবীর এক বিশাল অংশ মেনে চলে এবং এই লোকেরা নিজেদের খুব সভ্য ও বিদ্বান মনে করে, বড় বিজ্ঞানী মনে করে এবং তারা চায় যে তারা পৃথিবী শাসন করুক, কিন্তু তারা এটাই জানে না যে পৃথিবী কীভাবে তৈরি হল। যখন সৃষ্টি নির্মাণই হয়নি, তখন পৃথিবী কীভাবে তৈরি হয়ে গেল? এমন লেখা উচিত ছিল যে ঈশ্বর পৃথিবী ও আকাশ উৎপন্ন করেছেন এবং উৎপন্ন হওয়ার পর পৃথিবী শূন্য ও আকারহীন ছিল। জল কিসের উপর ছিল, তা স্পষ্ট লেখা নেই। ঈশ্বরের আত্মা জলের উপর ভাসমান ছিল, এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে হয় ঈশ্বর জলের উপর ভাসছিলেন অথবা ঈশ্বর জলের উপর উড়ছিলেন, ঠিক যেমন জলচর পাখিরা জলের উপর ঘুরপাক খায় যাতে মাছ খেতে পায়। ঈশ্বর কেন জলের উপর ঘুরপাক খাচ্ছিলেন? সেখানে কি ঈশ্বরের আবাস ছিল? এর উপর বিচার করুন। তিনি জলের উপর ঘুরপাক খাচ্ছিলেন, এর অর্থ কি এই হল যে অন্য কোথাও ঈশ্বর ছিলেনই না, কারণ তিনি তো জলের উপর ঘুরপাক খাচ্ছিলেন এবং সরাসরি কি জল হয়ে গিয়েছিলেন? তারা যদি জলকে H₂O মনে করেন, যাকে ওয়াটার বলা হয়, তবে সেটি তো অনেক পরে তৈরি হয় এবং এতে এটাও বলা হয়নি যে এগুলো সব কীভাবে তৈরি হল? মূলরূপে কী ছিল, তাও কোথাও বলা হয়নি।
এখন আমি বেদের একটি মন্ত্র নিচ্ছি। তিনটি মজহবী গ্রন্থ, যাদের আসমানী কিতাব বলা হয়, তাদের প্রারম্ভিক বাক্যগুলো নেওয়ার পর এবং এই তিনটির অনুসারী সকল ভাই, বোন ও মায়েদের কাছে এই আবেদন করছি যে, তারা যেন নিজেদের মজহবী গ্রন্থ বা আসমানী কিতাবগুলোর শুরুর বাক্যগুলো নিয়ে বিচার করেন যে, এই শুরুর বাক্যগুলো কি তাঁর হতে পারে যিনি সম্পূর্ণ সৃষ্টি রচনা করেছেন। সম্পূর্ণ সৃষ্টি কত বড়, তা আপনারা জানেন। এখন আর সেই পোপের সময় নেই, যারা গ্যালিলিওকে দণ্ড দিয়েছিলেন, যারা ব্রুনোকে জীবন্ত পুড়িয়ে ছিলেন। এখন তো হয়তো পোপরাও বিজ্ঞানের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন। বিজ্ঞানীদের ফাঁসি দেওয়ার দিন চলে গেছে।
আজ আপনি বাইবেলের বিরুদ্ধে অনেক আবিষ্কার করেছেন, তৌরেত ও ইঞ্জিলের বিরুদ্ধে অনেক আবিষ্কার করেছেন এবং মুসলিম ভাইয়েরা কুরআনের বিরুদ্ধে অনেক আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু তবুও সবার নিজেদের আসমানী কিতাবের উপর বিশ্বাস অটুট আছে, এটি বড়ই আশ্চর্যের বিষয়। আমাদের হিন্দুদের মধ্যেও এমনটি হয়, মন্দিরে কিছু বলেন আর বিজ্ঞানের পুস্তকে অন্য কিছু পড়েন। যেমন- সূর্য পৃথিবী থেকে তেরো লক্ষ গুণ বড়, এটি বিজ্ঞানের পুস্তকে পড়া হয় এবং বাচ্চাদেরও পড়ানো হয়, কিন্তু মন্দিরে বলেন- 'বাল সময় রবি ভক্ষ লিয়ো, তব তিনই লোক ভয়ো আঁধিয়ারো' (শৈশবে সূর্যকে গিলে নিয়েছিলেন, তখন তিন লোক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল)। মন্দিরে সূর্য ছোট হয়ে যায়, যাকে হনুমান জী মুখে নিয়ে নেন। বাস্তবে এদের মধ্যে কোনোটিই কম নয়, এই বিষয়ে সবাই ভাই-ভাই। যখন মজহবী উন্মাদনা জেঁকে বসে, তখন বিজ্ঞানকে ভুলে যায় এবং যখন বিজ্ঞানে মগ্ন থাকে, তখনও মজহব তাদের হৃদয়ে গেঁথে থাকে।
ধর্ম হল সেটি, যা মস্তিষ্ক এবং হৃদয়- উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান থাকে। আমি এ কথা
বলছি না যে, এই মজহবী গ্রন্থগুলোকে হৃদয় থেকে বের করে দাও, তবে এগুলোকে মস্তিষ্কের (যুক্তি) সাথেও যুক্ত করো। যখন মস্তিষ্কও সাক্ষ্য দেয় যে বিষয়টি সত্য, তর্কসংগত, সর্বজনীন এবং চিরন্তন, তবেই তা গ্রহণ করো; আর যদি আত্মা বলে যে কথাটি সত্য বলে মনে হচ্ছে না, তবে তা একদম গ্রহণ করো না এবং তা ত্যাগ করো। আমি আমার মজহবের সাথে যুক্ত আছি, তাই আমাকে এটি মেনে নিতেই হবে, এমন কথা অনেকের মনেই আসে। তখন তাদের উচিত সেই মজহবী খুঁটি থেকে বেরিয়ে এসে আলাদাভাবে দেখা। কেউ যেকোনো মজহবের সাথে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু আমরা হলাম মানুষ, পশু নই। পশুকে কোনো খুঁটিতে বেঁধে দিলে সে কেবল তার চারপাশেই ঘুরবে, নিজে থেকে মুক্ত হয়ে কোথাও যেতে পারবে না। কিন্তু আমাদের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা আছে, নিজস্ব বিচারশক্তি আছে; তাই তা দিয়ে ভাবা উচিত। এখন যারা দাবি করেন যে বেদ ঈশ্বরপ্রদত্ত বাণী, সেই বেদের প্রথম মন্ত্রটি আমি বলছি-
অ॒গ্নিমী॑ळे পু॒রোহি॑তং য॒জ্ঞস্য॑ দে॒বমৃ॒ত্বিজ॑ম্। হোতা॑রং রত্ন॒ধাত॑মম্॥
2. বেদ সম্পর্কে বিশ্ব কী বলে?
প্রিয় পাঠকগণ! বেদের প্রথম মন্ত্র ব্যাখ্যা করার আগে আমি অন্য কিছু বিচারকদের মতামত উপস্থাপন করতে চাইবো, কারণ বর্তমানে আমাদের দেশের তরুণ ও বিদ্বানদের স্বভাব এমন হয়েছে যে, কোনো বিদেশি কিছু বলে, তাহলে তারা সেটাকেই বেশি বিশ্বাস করে। যেমন কোনো লেখাপড়া জানা ব্যক্তি, যার কাছে অনেক ডিগ্রি আছে বা অন্য মজহবের কোনো প্রাচীন ব্যক্তি, তাদেরই বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি আমাদের বৌদ্ধিক পতন ও দাসত্বের অত্যন্ত দুঃখজনক চরম পর্যায়।
এখন আমি 'বেদের যথার্থ স্বরূপ' নামক পুস্তক থেকে কিছু প্রমাণ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি-
আরব দেশের বিদ্বান লাবী কর্তৃক বেদের গুণগান
আরব দেশের একজন বিদ্বান ছিলেন লাবী এবং তাঁর সময়কাল ছিল হজরত মুহাম্মদ সাহেবের জন্মের প্রায় 2400 বছর আগে। তিনি আরবি ভাষায় বেদের বিষয়ে যা লিখেছেন সেটি হল একটি কবিতা এবং এটি হারুন রশিদের রাজসভার কবি আসমাই মালেকুস শরা দ্বারা সংগৃহীত 'সীরুল-উকুল' নামক পুস্তকে পাওয়া যায়। এর অনুবাদ আরবি, ইংরেজি এবং হিন্দিতেও দেওয়া হয়েছে। হিন্দি অনুবাদটি নিম্নরূপ-
"হে হিন্দুস্তানের ধন্য ভূমি! তুমি শ্রদ্ধার যোগ্য, কারণ ঈশ্বর তোমার মধ্যেই সত্য জ্ঞানের আলো প্রকাশ করেছেন। ঈশ্বরীয় জ্ঞানস্বরূপ এই চারটি পুস্তক (বেদ) আমাদের মানসিক দৃষ্টিকে কী এক আকর্ষণীয় ও শীতল উষার জ্যোতি প্রদান করে। পরমেশ্বর হিন্দুস্তানে তাঁর পয়গম্বর অর্থাৎ ঋষিদের হৃদয়ে চার (বেদের) আলোকপাত করেছেন এবং তিনি পৃথিবীতে বসবাসকারী সকল জাতিকে এই উপদেশ দেন যে আমি বেদে যে জ্ঞান আলোকিত করেছি, তোমরা তা তোমাদের জীবনে বাস্তবায়িত করো এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করো। নিশ্চয়ই পরমেশ্বরই বেদের জ্ঞান দিয়েছেন।”
তারপর লাবী লিখছেন যে- "সাম এবং য়জুর্ হল সেই ভাণ্ডার (কোষ), যা পরমেশ্বর দিয়েছেন। হে আমার ভাইয়েরা! তোমরা এগুলোকে সম্মান করো, কারণ এগুলো আমাদের মুক্তির সুসংবাদ দেয়। এই চারটির মধ্যে বাকি দুটি ঋক্ এবং অথর্ব আমাদের বিশ্বভ্রাতৃত্বের পাঠ পড়ায়। এই দুটি জ্যোতিস্তম্ভ, যা আমাদের সেই লক্ষ্য (বিশ্বভ্রাতৃত্ব) থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেওয়ার জন্য সতর্ক করে।"
দারাশিকোহ-র বেদের জ্ঞানকে ঈশ্বরীয় মানা
দারাশিকোহ, যিনি আওরঙ্গজেবের বড় ভাই ছিলেন, তিনি কুরআনের একটি আয়াতের অনুবাদ এভাবে করেছেন- "কুরআন শরীফ হল একটি পুস্তক এবং সেই পুস্তকটি গুপ্ত আছে। তার জ্ঞান কেবল তারই হয় যার হৃদয় পবিত্র আছে এবং সেই পুস্তকটি জগতের পালনকর্তা ঈশ্বরের পক্ষ থেকে প্রকট হয়েছে।"
আপনারা ধ্যান দিন যে আসল কুরআন গুপ্ত আছে, তবে এর থেকে সিদ্ধ হয় যে মুহাম্মদ সাহেবের কাছে এমন কোনো গ্রন্থ ছিল যা তিনি বুঝতেন না, কিন্তু সেটিকে আসল কুরআন বলে সম্মান জানাতেন। এখন মুসলিম বন্ধুরা ভেবে দেখুন, তাহলে এই কুরআন কি আসল নয়? কুরআনে অনেক জায়গায় 'রওশন কিতাব কি কসম' (উজ্জ্বল কিতাবের শপথ) বাক্যটি এসেছে। সেই উজ্জ্বল কিতাব বেদ ছাড়া আর কী হতে পারে?
এখন আমি আরও কিছু বিদ্বানদের কথা উপস্থাপন করবো-
প্রো. হীরেন নামক খ্রিস্টান বিদ্বানের বেদ বিষয়ক নিবন্ধ
"এতে কোনো সন্দেহ নেই যে বেদ হল সংস্কৃতের প্রাচীনতম গ্রন্থ। বিদ্যমান প্রাচীনতম সংস্কৃত গ্রন্থগুলোর মধ্যেও সেগুলোর উপস্থিতির স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়। সেগুলো মানবজাতির উন্নতির জন্য তার অদ্ভুত জ্ঞানের মাধ্যমে দিব্য আলোক-স্তম্ভের কাজ করে।”
লিও ডেলবো নামক ফরাসি বিদ্বানের অভিমত
14 জুলাই 1884 সালে প্যারিসে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সভায় প্রবন্ধ পাঠ করার সময় লিও ডেলবো নামক সুপ্রসিদ্ধ ফরাসি বিদ্বান ঘোষণা করেছিলেন যে- "ঋগ্বেদ হল মানবজাতির উচ্চ প্রগতি এবং আদর্শের উচ্চতম কল্পনা।”
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মেটারলিঙ্কের অভিমত
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সুপ্রসিদ্ধ দার্শনিক মেটারলিঙ্ক, স্টাইনার নামক বিদ্বানের ভাষায় বেদের গুরুত্ব নিম্নলিখিত শব্দে প্রকাশ করেছেন-
"কেবল সূক্ষ্মদর্শীর অন্তদৃষ্টিই বেদে থাকা সূক্ষ্ম জ্ঞানকে প্রকট করতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হল, আমাদের প্রাগৈতিহাসিক কালের পূর্বপুরুষেরা যাঁদের সম্পর্কে ধারণা করা হয় যে তাঁরা ঘোর অজ্ঞতার ভয়ানক অবস্থায় ছিলেন- তাঁরা কোথা থেকে সেই অসাধারণ অন্তজ্ঞান লাভ করেছিলেন, যা আমরা পুনরায় অর্জন করার চেষ্টা করছি?"
আমেরিকার সুপ্রসিদ্ধ চিন্তাবিদ থোরোর সম্মতি
"আমি বেদের যে উদ্ধৃতিগুলো পড়েছি, সেগুলো আমার উপর এক উচ্চ এবং পবিত্র জ্যোতিঃপুঞ্জের আলোর মতো পড়ে, যা এক উৎকৃষ্ট মার্গের বর্ণনা দেয়। বেদের উপদেশ সরল, দেশ বা জাতিবিশেষের ইতিহাস বর্জিত এবং সার্বভৌম। এছাড়া তাতে ঈশ্বর বিষয়ক যুক্তিযুক্ত বিচার দেওয়া হয়েছে।”
আয়ারল্যান্ডের ডাঃ জেমস কাজিন্সের শ্রদ্ধাঞ্জলি
ডাঃ জেমস কাজিন্স নামক আয়ারল্যান্ডের সুপ্রসিদ্ধ কবি এবং দার্শনিক 'শান্তির পথ' নামক পুস্তকে বৈদিক আদর্শের উচ্চতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন-
"অর্থাৎ প্রেম করা, বিচার করা এবং কাজ করা, এগুলো বৈদিক বিচারানুসারে ক্ষণিক হতাশাপূর্ণ ব্যর্থ ক্রিয়া নয়, বরং এগুলো বিশ্বব্যাপী ক্রিয়ারই অংশ, যা নিত্য পরমেশ্বরের আনন্দে পরিপূর্ণ এবং অনুকরণ মাত্র।”
রাশিয়ার বিদ্বান বুল্যাঙ্গরের বেদের প্রতি শ্রদ্ধা
"প্রো, ম্যাক্সমুলারের অনুবাদে যে বিষয়টি আমাকে অত্যন্ত আশ্চর্য করেছে তা হল, তাতে অনেক বেহুদা, অশ্লীল এবং অস্পষ্ট কথা আছে। যতটুকু আমি বেদের শিক্ষা বুঝতে পারি, আমার কাছে সেটি এত অধিক উচ্চ মনে হয় যে রুশ জনতাকে একটি বিশৃঙ্খল এবং খারাপ অনুবাদ দ্বারা তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়াকে আমি অনেক বড় অপরাধ মনে করি, কারণ এর ফলে তারা সেই আধ্যাত্মিক লাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে, যা বৈদিক শিক্ষা জনতাকে দিয়েছে।”
মি. ব্রাউন ইংরেজি লেখকের শ্রদ্ধাঞ্জলি
"বৈদিক ধর্ম কেবল এক ঈশ্বরকে প্রতিপাদন করে। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ধর্ম, যেখানে ধর্ম এবং বিজ্ঞান হাত মিলিয়ে চলে। ধর্মীয় সিদ্ধান্তগুলো এখানে বিজ্ঞান এবং তত্ত্বজ্ঞান বা ফিলোসফির উপর আশ্রিত আছে।”
জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের বেদমূলক উপনিষদ-বিষয়ক বচন
"সারা বিশ্বে উপনিষদের মতো এত লাভদায়ক এবং উন্নত আর কোনো গ্রন্থ নেই। এটি আমার জীবনে শান্তিপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে ছিল এবং মৃত্যুর সময়েও এটি আমাকে শান্তি প্রদান করবে।"
ফরাসি শ্রী জ্যাকোলিয়ট-এর গুরুত্বপূর্ণ বচন
"কী আশ্চর্যজনক সত্য! হিন্দুদের ঈশ্বরীয় জ্ঞান (বেদ) এমনই এক বিষয়, যা মানুষের মন্দ ও ক্রমিক রচনাকে ব্যক্ত করে; এটি সকল ঈশ্বরীয় জ্ঞানের মধ্যে এমন এক জ্ঞান, যার কল্পনাগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পূর্ণরূপে মিলে যায়।"
আমেরিকান বিদুষী নারী মিসেস হুইলার উইলকক্স লিখেছেন-
"আমি প্রাচীন ভারতের ধর্ম সম্পর্কে শুনেছি এবং পড়েছি। এটি সেই মহান বেদের ভূমি, যা অত্যন্ত অদ্ভুত গ্রন্থ। এতে কেবল পূর্ণাঙ্গ জীবনের জন্য উপযোগী ধর্মীয় তত্ত্বই বলা হয়নি, বরং সেইসব তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে যা সমগ্র বিজ্ঞান সত্য বলে প্রমাণ করেছে।"
(বেদের যথার্থ স্বরূপ, ধর্মদেব বিদ্যামর্তণ্ড)
এগুলো ছাড়াও আরও অনেক প্রমাণ আছে। এখানে আমার উদ্দেশ্য শুধু এটুকুই ছিল যে আপনারা ভাবুন, যারা বৈদিক মতাবলম্বী নন, সেই বিদ্বান ব্যক্তিরা বেদ সম্পর্কে কী ভেবে এসেছেন। কিন্তু আমার কাছে এই প্রমাণগুলোর খুব একটা গুরুত্ব নেই। এগুলো আমি তাদের জন্য বলছি, যারা বিদেশিদের প্রমাণকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং এমনটা করে নিজেদের আধুনিক ও প্রগতিশীল ভাবেন।
এখন ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্র নিয়ে আলোচনার আগে এই বিষয়টি বিবেচনা করবো যে, মানুষ যখন পৃথিবীতে এসেছিল, তখন এখানকার অবস্থা কেমন ছিল। সমগ্র পৃথিবীর কিছু অংশই ভূ-ভাগ ছিল, বাকিটা জলময় ছিল। সেই সময় বায়ু, জল, মাটি আদি খুব পবিত্র ছিল। ফল, শাক, অন্ন আদি সবই প্রাকৃতিক রূপে উৎপন্ন হয়েছিল। মানুষ ভূমির গর্ভ থেকে বের হয় এবং বের হয়ে সম্পূর্ণ সৃষ্টি দেখে। বৈদিক বিচারধারা এটি বিশ্বাস করে যে, প্রথম প্রজন্মের মধ্যে আমাদের তুলনায় স্বাভাবিক জ্ঞান অনেক বেশি থাকে। তারা সবাই এই যোগ্য হয় যে যাতে তারা নিজেদের লালন-পালন করতে পারে এবং বংশ চালাতে পারে। আর এমনটা কখন হতে পারে? এমনটা তখনই সম্ভব যখন মানুষ যুবাবস্থায় জন্ম নেয়। কিন্তু তবুও, এমন মানুষও কারো শেখানো ছাড়া নিজের জীবনকে খুব বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না, খুব উন্নতও হতে পারে না। মানুষ অন্যদের থেকে শেখে, তো কোন অন্যদের থেকে শিখবে? সেই সময় তো অন্য বলতে কেবল পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গই ছিল। যদি এদের থেকে শিখতো, তাহলে এদের মতোই হাঁটু গেড়ে চলতো অথবা হাত ও পা ব্যবহার করে হাঁটতো। পশুরা যেমন শিকার করে খায় বা ঘাস খায়, তেমনই খেতো; কিন্তু মানুষ তেমন নয়।
আজও যদি কোনো মানুষের শিশুকে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তার ভেতরে বাবা-মায়ের জিন থাকা সত্ত্বেও সে পশুদের মতোই জীবনযাপন করবে। তাই শুরুতে মানুষের অন্য কোনো জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল। সেই সময় চারজন ঋষি অর্থাৎ সেই প্রথম প্রজন্মের মানুষরা -যারা পূর্ব সৃষ্টির সংস্কার ও জ্ঞানের কারণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন- য়োগ-সাধনার বলে সমাধি লাভ করে আকাশ বা মনস্তত্ব থেকে কিছু ধ্বনি গ্রহণ করেছিলেন। সেই ধ্বনিগুলো পশ্যন্তী ও মধ্যমা অবস্থায় ছিল, বিশেষ করে পশ্যন্তী ও পরা অবস্থার ধ্বনিগুলো তাঁরা গ্রহণ করেন এবং সেই ধ্বনিগুলোই বেদ মন্ত্র নামে পরিচিত হয়। ওই চারজন ঋষি যতগুলো ধ্বনি গ্রহণ করেছিলেন, তা ছাড়াও ব্রহ্মাণ্ডে আরও কিছু ধ্বনি ও মন্ত্র বিদ্যমান ছিল; কিন্তু তাঁদের যতটা সামর্থ্য ছিল, তাঁরা ততটাই গ্রহণ করেছিলেন। আর এটা নিশ্চিত যে, সেই চারজন পুরুষ এতটাই সামর্থ্যবান ছিলেন যে তাঁদের চেয়ে বড় সামর্থ্যবান ব্যক্তি এই পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত আর কেউ হয়নি। জগতের মানুষদের জন্য যতটুকু জ্ঞান প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত, তাঁরা সেই পরিমাণ জ্ঞানের তরঙ্গই গ্রহণ করেছিলেন। জ্ঞানের সেই তরঙ্গ বা ধ্বনির মাধ্যমে তাঁরা যে জ্ঞান লাভ করেছিলেন, সেই জ্ঞানের কোন ধ্বনির কী অর্থ, তা পরমেশ্বরই তাঁদের জানিয়েছিলেন।
প্রথম ধ্বনি হিসেবে প্রথম ছন্দ কী বেরিয়েছিল? সেই ছন্দটি হল-
অ॒গ্নিমী॑ळे পু॒রোহি॑তং য॒জ্ঞস্য॑ দে॒বমৃ॒ত্বিজ॑ম্। হোতা॑রং রত্ন॒ধাত॑মম্॥
স্বর সহিত পদ পাঠ
অ॒গ্নিম্ । ঈ॒লে॒ । পু॒রঃऽহি॑তম্ । য॒জ্ঞস্য॑ । দে॒বম্ । ঋ॒ত্বিজ॑ম্ । হোতা॑রম্ । র॒ত্ন॒ऽধাত॑মম্ ॥
এখানে 'অগ্নি'র কিছু বিশেষণ বলা হয়েছে- পুরোহিত, দেব, ঋত্বিক্, হোতা, রত্নধাতম। এগুলো হল অগ্নির বিশেষণ এবং সেই অগ্নির গুণাবলির প্রকাশ করা হয়েছে। বেদের প্রথম শব্দ হল 'অগ্নি', ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও প্রথম শব্দ হল 'অগ্নি' এবং চার ঋষির মধ্যে প্রথম ঋষি হলেন-অগ্নি। এই 'অগ্নি' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভবত চারটি বেদে 'অগ্নি' পদটিই সবচেয়ে বেশিবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে অর্থাৎ সবচেয়ে বেশিবার এসেছে। এই অগ্নির মধ্যে এমন কী আছে? এই অগ্নি এবং অগ্নির বিশেষণ অন্যান্য শব্দগুলো কি সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞানের ভূমিকা? এই অগ্নি এবং তার বাচক বিশেষণবাচক শব্দগুলো কি সমগ্র সৃষ্টিতে বসবাসের জন্য লোকব্যবহারের ভূমিকা? অগ্নি এবং তার বিশেষণবাচক শব্দগুলো কি সমগ্র সৃষ্টির আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের ভূমিকা?
জ্ঞান তিন প্রকারের হয়-
1. আধিদৈবিক জ্ঞান- সৃষ্টি সংক্রান্ত জ্ঞান।
2. আধিভৌতিক জ্ঞান- লোকব্যবহারের জ্ঞান অর্থাৎ সংসারে কীভাবে থাকা উচিত, তার সঙ্গে সম্পর্কিত জ্ঞান।
3. আধ্যাত্মিক জ্ঞান- চেতন বিজ্ঞান।
এই তিনটি ছাড়া চতুর্থ আর কোনো জ্ঞান সম্পূর্ণ সংসারে নেই। চতুর্থ জ্ঞান যেটাই হবে তা এই তিনটির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত হবে। এই মন্ত্রটি কি আমাদের এই সৃষ্টিতে বসবাস করা, সৃষ্টিকে জানা, স্রষ্টা এবং নিজের স্বকীয় অর্থাৎ আত্মার জ্ঞানের ভূমিকার নির্দেশ করে? যদি তাই হয়, তাহলে বেদই ঈশ্বরীয় হবে; আর যদি তা না হয়, তাহলে বেদও ঈশ্বরীয় নয় এবং এর অর্থও তেমনই হবে, যেমনটা কোরআন বা বাইবেলের আয়াতের আছে।
বিশ্বের সকল ইহুদি, ইসলামি ও খ্রিস্টান বন্ধুদের কাছে আমি অনুরোধ করছি যেন তারাও তাদের নিজ-নিজ প্রথম আয়াতগুলো আমাকে জানান এবং তার অর্থ কী তাও বলেন। যদি তারা আমাকে জানান যে তাতে সৃষ্টিবিজ্ঞান, লোকব্যবহার ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের কী ভূমিকা আছে, তাহলে আমি এই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য প্রস্তুত আছি এবং যদি বলতে না পারেন, তাহলে এই ভূমিকাটি শুনুন। যদি আপনার আত্মা বলে যে হ্যাঁ, এই ভূমিকা ঠিক আছে, তাহল্ট আমার সাথে আসুন। এটা তো আপনিও মানেন যে বেদ সবচেয়ে প্রাচীন। এর অর্থ এই যে আমাদের পূর্বপুরুষরা পথভ্রষ্ট হয়েছিলেন। আমাদের তো ঋষি দয়ানন্দ সঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছেন এবং এর জন্য বলিদানও দিয়েছেন। তিনি কেবল হিন্দু বা আর্যসমাজীদের একার ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির। এটি বড়ই দুর্ভাগ্য যে বিশ্ব তাঁকে আজও বুঝতে পারলো না। কী করা যাবে যখন ভারতের কর্ণধাররাই তাঁকে ভুলে যান, বিদ্বান সমাজ ভুলে যায়, তখন অনেক তথাকথিত দেশপ্রেমিক যদি তাঁর নিন্দা করে, তবে অন্য দেশগুলোর দোষ আর কী হবে?
মনস্তত্ত্ব, অহঙ্কার ও মহৎ-এর বিস্তার কতটা, তা কেউ জানে না। এদের চেয়েও বড় বিস্তার প্রকৃতিরূপী পদার্থের এবং তার চেয়েও বড় বিস্তার স্বয়ং পরমাত্মার। এই সবকিছুর মধ্যে পরমাত্মা হলেন চেতন। পরমাত্মা প্রকৃতিকে বিকৃত (রূপান্তর) করে সৃষ্টি তৈরি করেছেন। কোনো পদার্থকে বিকৃত করেই অন্য পদার্থ তৈরি করা যায়। নির্বিকার কখনো পদার্থের অংশ হয় না। জীবাত্মা ও পরমাত্মা দুটোই হল নির্বিকার, তাই তারা কোনো পদার্থ বা সৃষ্টির অংশ নয়, বরং তারা এর নির্মাতা হয়। যেমন রাঁধুনি স্বয়ং মিষ্টি, ডাল-ভাত বা রুটির অঙ্গ হয় না, সে এগুলো তৈরি করে মাত্র। ভোজনের অঙ্গ তো জল, আটা, তেল, ঘি, লবণ, মশলা আদি হয়। প্রকৃতি হল সৃষ্টির অঙ্গরূপ এবং তা থেকে তৈরি হয় পদার্থগুলো। তেমনি সৃষ্টিতে পরমাত্মা আছেন, যিনি সৃষ্টি রচনা করছেন, তাই সম্পূর্ণ সৃষ্টিই হল একটি যজ্ঞ। বেদের মধ্যে বলা হয়েছে- 'অয়ম্ হোতা প্রথমঃ পশ্যত ইদম্' অর্থাৎ দেখো! এই পরমাত্মাই সৃষ্টির সবচেয়ে প্রথম 'হোতা' অর্থাৎ আহুতি দানকারী। তাঁকে দেখো অর্থাৎ বোঝো। এটি সৃষ্টিযজ্ঞ এবং এর হোতা হলেন অগ্নি, অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ হতে পারে না। যেমন হবনকুণ্ডের অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ সম্ভব নয়।
-মহর্ষি য়াস্ক 'অগ্নি' শব্দের ব্যুৎপত্তি ব্যাখ্যা করে লিখেছেন 'অগ্নিঃ কস্মাৎ? অগ্রণীর্ভবতি। অগ্রম্ য়জ্ঞেষু প্রণীয়তে। অঙ্গম্ নয়তি সন্নমমানঃ।' অর্থাৎ যিনি সবার আগে চলেন, সবার নেতৃত্ব দেন, সবাইকে নিজের পেছনে নিয়ে যান, তিনিই অগ্নি নামে পরিচিত। যেকোনো যজ্ঞে অর্থাৎ সংযোগ ও বিয়োগের প্রক্রিয়ায়, তা কসমোলজিকাল, রাসায়নিক, ভূ-গর্ভস্থ বা জৈবিক আদি যাই হোক না কেন, সবকিছুর আগে অগ্নির প্রয়োজন হয়। 'অঙ্গম্ নয়তি সন্নমমানঃ' অর্থাৎ অগ্নি অন্য যেকোনো পদার্থকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিজের মতো করে নেয় বা নিজের দিকে ঝুঁকিয়ে নেয়। এমন অগ্নি কী হতে পারে? অগ্নির অনেক অর্থ আসবে, যার আমি একে-একে ব্যাখ্যা করবো।
অগ্নির বিষয়ে ঐতরেয় ব্রাহ্মণে মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন- 'অগ্নির্বৈ দেবানাম্ বসিষ্ঠঃ' অর্থাৎ অগ্নি সকল দেব পদার্থের মধ্যে সবকিছুর উৎপত্তিকারী এবং ধারণকারী হয়। ধারণকারীদের মধ্যে অগ্নি হল সর্বশ্রেষ্ঠ। মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য বলেন- 'অগ্নির্বৈ দেবানাম্ মুখম্ প্রজনয়িতা স প্রজাপতিঃ।' অগ্নি বিভিন্ন দেব পদার্থ যথা- কণা, তরঙ্গ, আকাশ আদিকে উৎপন্নকারী অর্থাৎ সবার মুখ স্বরূপ হয়। সেই অগ্নির সাহায্যেই এই দেব পদার্থগুলো জীবিত থাকে অর্থাৎ অগ্নি ছাড়া এদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না, তাই এর নাম হল অগ্নি। সবাইকে উৎপন্ন করার কারণে অগ্নিকে প্রজাপতিও বলা হয়। অগ্নি কী? এর উত্তর মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য শতপথ ব্রাহ্মণে দিয়েছেন- 'বাক্ এবাগ্নিঃ' অর্থাৎ বাক্ তত্ত্ব বা রশ্মিসমূহ অর্থাৎ ছন্দ রশ্মিগুলোই হল অগ্নি। এগুলো অগ্নি হওয়ার কারণ হল, সর্বপ্রথম এই বাক্ তত্ত্বই কম্পন হিসেবে উৎপন্ন হয় এবং তারপর এটিই অন্যান্য কম্পনকে সৃষ্টি করে।
'অগ্রণীর্ভবতি' অর্থাৎ একটি রশ্মি অন্য রশ্মিগুলোকে সামনে নিয়ে যায় অথবা নিজের পেছনে নিয়ে আসে এবং যখন সংযোগ-বিয়োগের প্রক্রিয়া ঘটে, তখন রশ্মির এই গুণের কারণেই রশ্মিগুলোর বিনিময় হয়। আজ ভৌতিক বিজ্ঞান সম্পর্কে যারা জানেন তারা বলবেন যে মৌলিক বল চারটি হয়, সেগুলোর মধ্যে সংযোগ-বিয়োগের ক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল কাজ করে। কিন্তু এই বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল কী? এর স্বরূপ কী? এটি কীভাবে কাজ করে? কেন উৎপন্ন হয়? আদি প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। কেউ জানলে আমাদের জানাবেন। মিডিয়েটর কণাগুলো কীভাবে তৈরি হয়, এদের ক্রিয়াবিজ্ঞান কী? এটাও কেউ জানে না। কিন্তু আমি বলতে পারি যে এগুলোও বাক্ রশ্মি দ্বারা গঠিত। বাক্, ছন্দ এবং প্রাণ আদি রশ্মির কারণেই মিডিয়েটর কণাগুলোর একে অপরের মধ্যে বিনিময় হতে থাকে অর্থাৎ এগুলো এক্সচেঞ্জ হতে থাকে।
যদি কেউ বলে যে ছন্দ রশ্মিগুলো তো মন অর্থাৎ সমষ্টি মনের ভেতরে উৎপন্ন হয়। এই বিষয়ে মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য লিখেছেন- 'মন এবাগ্নিঃ' অর্থাৎ ছন্দ রশ্মিগুলোরও আগে তাদের সামনে নিয়ে যাওয়ার মতো মনস্তত্ব আছে। আবার শতপথ ব্রাহ্মণে মহর্ষি য়াজ্ঞবন্ধ্য বলেন-'অগ্নিরেত ব্রহ্মা' অগ্নিই হল ব্রহ্মা অর্থাৎ এই বাক্ রশ্মিগুলোই সবচেয়ে ব্যাপক এবং শক্তিশালী হয়, এদের বলই সর্বাধিক ব্যাপক হয়। মহর্ষির এদের বিষয়ে আরও একটি বক্তব্য হল-আত্মৈবাগ্নিঃ। আত্মার এখানে দুটি অর্থ আছে একটি হল পরমাত্মা যাকে আমরা আধ্যাত্মিক অর্থে নিবো। আত্মার দ্বিতীয় অর্থ হল সূত্রাত্মা বায়ু। সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মিগুলো সমস্ত প্রাণ এবং ছন্দ রশ্মিগুলোর থেকেও সূক্ষ্ম হয়। এইভাবে অগ্নির বাক্, মন, আত্মা আদি অনেক অর্থ হতে পারে। সৃষ্টি নির্মাণে বিভিন্ন স্তরে অগ্নির ভিন্ন-ভিন্ন রূপ থাকে।
এখন আমরা প্রথম পর্যায়টি দেখবো। প্রথম পর্যায়ে অগ্নি কী? বাক্। কোন্ বাক্? পরা ওম্। পরা 'ওম্' রশ্মিই হল অগ্নির প্রথম রূপ। পরা 'ওম্' রশ্মি হল মনেরও আগের অগ্নি, কারণ এটি প্রকৃতিতে উৎপন্ন হয়। এটি প্রকৃতিতে উৎপন্ন হওয়ার পর পরা 'ওম্' রশ্মিযুক্ত প্রকৃতি পদার্থই মহৎ নামে পরিচিত হয়, যেটি হল মনস্তত্বের পূর্ববর্তী একটি অবস্থা। সৃষ্টিতে সবার আগে অগ্নি অর্থাৎ পরা 'ওম' রশ্মি ছাড়া কোনো কিছুই সৃষ্টি হতে পারে না, তাই সেটিই হল সবার অগ্রণী অর্থাৎ সবাইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি। এই রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পরেই চাঞ্চল্য শুরু হয় এবং তারপরই প্রকৃতিতে বিকার শুরু হয় ও সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটে।
দ্বিতীয় অগ্নি কী? দ্বিতীয় অগ্নি হল- সমষ্টি মন। যখন সমগ্র সৃষ্টি বা প্রকৃতি পদার্থের মধ্যে পরা 'ওম্' রশ্মি সর্বত্র উৎপন্ন হয়ে যায়, প্রকৃতির সেই অবস্থার নাম হল মহৎ, যার অগ্রিম পর্যায় হল- অহংকার এবং তার পরবর্তী পর্যায় হল- মন। এই তিনটিকে ক্রমান্বয়ে এভাবে বোঝা যেতে পারে- যেমন একটি কাঁচা আম, একটি আধাপাকা আম এবং একটি সম্পূর্ণ পাকা আম। এখানে মনস্তত্বকেও অগ্নি বলা হয়েছে, কারণ যতক্ষণ মনস্তত্ব তৈরি হবে না, ততক্ষণ তাতে কোনো রশ্মি উৎপন্ন হতে পারে না। এখন তৃতীয় অগ্নি কী? সেটি হল- আত্মা। আধিদৈবিক ভাষ্যে এর অর্থ পরমাত্মা হিসেবে না নিয়ে আধ্যাত্মিক অর্থে নেওয়া হবে। এখানে আমরা এর অর্থ সূত্রাত্মা বায়ু হিসেবেই গ্রহণ করবো। যদিও মনস্তত্বের পর আরও অনেক রশ্মি উৎপন্ন হয়, যেমন- 'ভূঃ', 'ভুবঃ', 'স্বঃ' আদি, কিন্তু এগারোটি প্রাণ রশ্মির মধ্যে সূত্রাত্মা বায়ু সবার আগে উৎপন্ন হয়, তাই এটিও অগ্নি হয়।
এর পরবর্তী অগ্নি কাকে বলা হয়েছে? চতুর্থ অগ্নি হল- প্রাণ। সূত্রাত্মা বায়ুর পর প্রাণ নামক প্রাথমিক প্রাণই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়। মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য বলেছেন- 'প্রাণো বৈ সম্রাট্ পরমম্ ব্রহ্ম' অর্থাৎ প্রাণতত্ত্বই হল ব্রহ্ম বা ব্রহ্মা। অন্যদিকে মহর্ষি তিত্তির বলেছেন- 'বলম্ বৈ ব্রহ্মা' অর্থাৎ বলই হল ব্রহ্মা অর্থাৎ প্রাণরূপ অগ্নিই হল ব্রহ্মা। এটি হওয়ার কারণ হল, যতক্ষণ পর্যন্ত সৃষ্টির মধ্যে বল উৎপন্ন হবে না, ততক্ষণ সৃষ্টি এগিয়ে যেতে পারে না। আধুনিক বিজ্ঞান কেবল চার প্রকারের বলের কথা জানে, যেখানে বৈদিক ভৌতিকীর মধ্যে নয়টি বলের কথা বলা হয়েছে।
এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, আমি আধুনিক বিজ্ঞানের অনুকরণ করছি না। আধুনিক বিজ্ঞানের পক্ষাবলম্বীরা শুনে রাখুন যে, একদিন আপনাদের বৈদিক ভৌতিকীর কাছে আসতেই হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা তা না করবেন, ততক্ষণ এগিয়ে যেতে পারবেন না। আমি কাউকে অনুকরণ করতে বলছি না, আমি শুধু এটুকুই বলছি যে, আপনারা বৈদিক বিজ্ঞান গুরুত্ব সহকারে অধ্যয়ন করুন। যদি আপনাদের মনে হয় আমার কথাগুলো যুক্তিযুক্ত, আপনাদের ভৌতিকী এবং আপনাদের জন্য তা লাভজনক হয়, আপনাদের কোনো নতুন দিশা দেখাতে পারে এবং এমন পরিণাম দিতে পারে, যা আপনাদের বড়-বড় ল্যাবরেটরিগুলো দিতে পারছে না, তাহলে আমার কথাগুলো একবার ভেবে দেখবেন।
সৃষ্টির সর্বপ্রথম এবং মূল বল বা শক্তি হল ঈশ্বরের, সেটি এখানে আলোচ্য নয়, কারণ তা আধ্যাত্মিকতার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। পরা ওম্ রশ্মির দ্বারা যে বল উৎপন্ন হয়, সেই বল হল অগ্নি। অগ্নির একটি অর্থ হল বিদ্যুৎ। যতক্ষণ বিদ্যুৎ আবেশ উৎপন্ন হবে না, ততক্ষণ কণাগুলো নিজেদের মধ্যে মিলবে না। অগ্নির আরও একটি অর্থ হল- তাপ। অগ্নির বিভিন্ন অর্থ বিভিন্ন স্তরে আলাদা-আলাদা হয়।
5. প্রথম বেদমন্ত্রের বৈজ্ঞানিক রহস্য
ও৩ম্ অ॒গ্নিমী॑ळे পু॒রোহি॑তং য॒জ্ঞস্য॑ দে॒বমৃ॒ত্বিজ॑ম্।
হোতা॑রং রত্ন॒ধাত॑মম্॥
ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রে 'অগ্নি'র ছয়টি অর্থ আছে এবং অগ্নির এই ছয়টি প্রকার পৃথক-পৃথক স্তরে সংযোগ-বিয়োগের প্রক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে আগে প্রয়োজন হয়। আমি অগ্নির সর্বশেষ অর্থ হিসেবে উষ্মা (তাপ) বলেছিলাম। আধুনিক বিজ্ঞানও এই কথা জানে যে যতক্ষণ পর্যন্ত তাপ উৎপন্ন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়।
আধুনিক বিজ্ঞান স্বীকার করে যে যতক্ষণ পর্যন্ত এই ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যুৎ আবেশ উৎপন্ন হয় না, ততক্ষণ কোনো পদার্থ উৎপন্ন হয় না, কিন্তু তাপ অথবা ফোটন হল বৈদিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত স্থূল। যারা মনে করেন যে আমি আধুনিক বিজ্ঞানের পেছনে চলছি এবং সেইসব বিষয়ই খুঁজছি যা আধুনিক বিজ্ঞান ইতিমধ্যে খুঁজে পেয়েছে, তারা জেনে রাখুন যে আমি অগ্নির যে চারটি অর্থ- বাক্, মন, প্রাণ এবং সূত্রাত্মা বায়ু বলেছি, সেগুলো সম্পর্কে আধুনিক ভৌতিক বিজ্ঞান সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আধুনিক ভৌতিকীর সৃষ্টিকে বোঝার সীমা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকে বৈদিক ভৌতিকী (পদার্থবিজ্ঞান) শুরু হয়। বৈদিক ভৌতিকী মূলকণাসমূহ থেকে ছয় স্তর সূক্ষ্ম পদার্থের ব্যাখ্যা করতে পারে। এইভাবে বৈদিক ভৌতিকী আধুনিক বিজ্ঞান থেকে ছয় স্তর এগিয়ে সৃষ্টিকে বুঝতে পারে।
এই মন্ত্রের মধ্যে অগ্নির বিশেষণ হিসেবে পুরোহিত, দেব, ঋত্বিজ, হোতা এবং রত্নধাতম বলা হয়েছে। এবার এই বিষয়ে আলোচনা করা করবো।
1. পুরোহিত - অগ্নির সর্বপ্রথম বিশেষণ হল পুরোহিত। পুরোহিত কাকে বলে? আজকাল এই শব্দটি কথিত জাতিবাচক হয়ে গেছে। এক জায়গায় শুনেছি যে এই মন্ত্রটি দেখে লোক বলে যে এটি পুরোহিতের মন্ত্র। আমাদের দেশে এই ধরণের অশিক্ষিত মানুষের অনেক ধারণা প্রচলিত আছে। পুরোহিত শব্দের অর্থ হল য়ঃ পুরস্তাৎ সর্বম্ জগদ্ দধাতি ছেদনাকর্ষণগুণাভ্যাম্। এই নির্বচন ঋষি দয়ানন্দ করেছেন। এই মন্ত্রের ভাষ্যে তিনি বলেছেন- যা এই জগৎকে আগে থেকে ধারণ করে, যার ছেদন, ধারণ, আকর্ষণ, প্রতিকর্ষণ আদি গুণ আছে, তাকে পুরোহিত বলে। নিরুক্তকার পুরোহিত শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন- 'পুরোহিতঃ পুর এনম্ দধতি' অর্থাৎ যেটি কোনো পদার্থকে সম্মুখে ধারণ করে। মহর্ষি জৈমিনিও ঠিক এটাই বলছেন-'প্রথমঃ পুরোহিতমিতি পুর এব এনমেতদ্ দধতে। য়দগ্নিমাদধতে' অর্থাৎ যেটি কোনো পদার্থকে সামনে থেকে বা সম্মুখে ধারণ করে, তাকে পুরোহিত বলে। যেমন আমি কোনো পদার্থ বা কোনো ব্যক্তিকে ধরি, তাহলে আমি আমার সামনের দিক থেকে ধরবো, পেছন থেকে নয়। তেমনই অগ্নি পদার্থ অথবা বাক্, মন, প্রাণ, সূত্রাত্মা বায়ু, বিদ্যুৎ, তাপ যা-ই হোক না কেন, এগুলোর সামনে যে পদার্থই আসবে, এগুলো তাকে তার সম্মুখ থেকে গ্রহণ বা ধারণ করে, আকর্ষিত অথবা বিকর্ষিত করে।
প্রথমে বাক্-কে নেওয়া যাক। বাক্ কী? সবচেয়ে প্রথম বাক্ হল- ওম্। যত বেদমন্ত্র ও ছন্দ রশ্মি আছে, সেগুলো সবই বাক্-এর রূপ, কিন্তু তাদের মধ্যে প্রথম বাক্ হল ওম্। এর আগে এই ব্রহ্মাণ্ডে কোনো কম্পন ছিল না। আধুনিক বিজ্ঞানীরাও মানেন যে ধ্বনি তরঙ্গ বা পদার্থের ফ্লাকচুয়েশন (কম্পন) থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের কারণও শব্দ তরঙ্গ হয়। কিছু বিজ্ঞানী বলেন যে ডার্ক ম্যাটার থেকেও ধ্বনি তরঙ্গ নির্গত হয়। আমি বলি যে শুধু সেগুলো থেকেই নয়, প্রতিটি পদার্থ থেকেই ধ্বনি তরঙ্গ নির্গত হয়। ঐ বিজ্ঞানীদের জানা নেই যে সেই ধ্বনি তরঙ্গগুলো কোনগুলো? ধ্বনি তরঙ্গ যদি কোনো কণা থেকে নির্গত হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই সেগুলো বাণীর মধ্যমা অবস্থায় থাকবে। তার আগে সেগুলো পশ্যন্তী অবস্থায় থাকে। যখন কণা তৈরি হয় না, তখনও ধ্বনি তরঙ্গ থাকে।
কেউ মন্তব্য করেছিলেন যে ধ্বনি তরঙ্গ বা কম্পনের জন্য কোনো মাধ্যম থাকা প্রয়োজন। হ্যাঁ, বৈখরী তরঙ্গ বা ধ্বনিগুলোর জন্য মাধ্যম দরকার হয়, যেমন- হাওয়া, জল, ধাতু বা অন্য কোনো কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় পদার্থ। এগুলো ছাড়া আমরা বাণী শুনতে পাবো না, তবে এর অর্থ এই নয় যে বাণী উৎপন্নই হবে না। বৈখরীর পর বাণীর মধ্যমা অবস্থা আসে, তার জন্য এই সব মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না; কারণ সেগুলো ইলেকট্রিক সিগন্যাল রূপে গমন করে। মধ্যমা বাণী গমনের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন হয়? এর জন্য আকাশ তত্ত্ব অর্থাৎ স্পেস প্রয়োজন। বাণীর মধ্যমা থেকেও যে সূক্ষ্ম অবস্থা আছে, সেটি হল পশ্যন্তী। আমি বাণীকে ধ্বনি বা সাউন্ড বলি না, এর জন্য বৈদিক শব্দ 'বাক্' আছে। বাণীর এই সূক্ষ্ম স্তরের জন্য আকাশেরও প্রয়োজন নেই। স্পেস অর্থাৎ আকাশ হল একটি নির্মিত পদার্থ, এর অর্থ শূন্যস্থান নয়।
আকাশ হল এমন একটি পদার্থ, যা প্রসারিত ও সংকুচিত হয় এবং এর মধ্য দিয়ে কণা, তরঙ্গ আদি কোনো বাধা ছাড়াই এপার-ওপার চলে যায়। আকাশ সম্পূর্ণ শূন্য স্থান পূরণ করে আছে, কিন্তু সেটি নিজে শূন্য নয়। এটি আমাদের জন্য এবং কণা, তরঙ্গ আদির জন্য শূন্যতা বা খালি জায়গা হতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও সূক্ষ্ম ছন্দ ও প্রাণ রশ্মি এবং মনের জন্য তা খালি নয়; কারণ মন, প্রাণ ও সূক্ষ্ম ছন্দ রশ্মি আদি দিয়েই সেই আকাশ তত্ত্ব (স্পেস) তৈরি হয়েছে। পশ্যন্তী বাণীর জন্য মনস্তত্ত্ব মাধ্যম হিসেবে প্রয়োজন, যা সম্পূর্ণ সৃষ্টিতে ভরে আছে। পরা বাণীর জন্য প্রকৃতি ছাড়া আর কিছুরই প্রয়োজন নেই।
প্রকৃতি অর্থাৎ মূল পদার্থ, যে বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান জানে না এবং তার ভৌতিক উপকরণের মাধ্যমে কখনো জানতেও পারবে না, সেই মূল পদার্থের মধ্যে সর্বপ্রথম যে কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি হল- পরা 'ওম' রশ্মি অর্থাৎ সেই সময় সৃষ্টির প্রথম অগ্নি উৎপন্ন হয়েছিল এবং সেই অগ্নি কী করে? এই মন্ত্রের ভাষ্যে ঋষি দয়ানন্দ 'পুরোহিত' শব্দের অর্থ করতে গিয়ে এই 'ওম্' রশ্মি বা অগ্নির আটটি গুণের কথা বলেছেন, যা হল- রূপ (কোনো কিছুর দৃশ্যমান হওয়া), আকাশ (আকার), দাহ (গরম), প্রকাশ, বেগ, ছেদন, ধারণ এবং আকর্ষণ আদি। এখানে আদি বলতে আমরা বিকর্ষণ গুণকেও গ্রহণ করবো।
এখন এই আটটি গুণের মধ্যে আলোক (প্রকাশ) কীভাবে উৎপন্ন হয়, তা কেউ জানে না। বর্তমান বিজ্ঞানীরা বলেন যে, ফোটন প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে, এ পর্যন্ত ঠিক আছে; কিন্তু ফোটনের মধ্যে এই গুণ কোথা থেকে এলো যে সে কোনো বস্তুর রূপ দেখাবে? তার মধ্যে আলোর গুণ কোথা থেকে এলো? তার মধ্যে তাপের গুণ কোথা থেকে এলো? তার সাথে অন্য কোনো কণার পার্থক্য কী বা এক্স-রে এবং রেডিও আদি তরঙ্গের সাথে পার্থক্য কী? সেই পার্থক্য কি কেবল কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সির হয়? যদি পার্থক্য ফ্রিকোয়েন্সির হয়, তাহলে ফ্রিকোয়েন্সিতে এই পার্থক্য কেন এলো?
একটি মোটরসাইকেল 100 কিমি প্রতি ঘন্টা গতিতে চলে এবং একটি বিমান 700-800 কিমি প্রতি ঘন্টা গতিতে চলে। দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী? উভয়ের গতির মধ্যে কী পার্থক্য আছে? পার্থক্য কি কেবল এটাই যে একটি বিমান আর অন্যটি মোটরসাইকেল? নাকি অন্য কোনো কারণে এই পার্থক্য? আপনারা জানেন যে, এর কারণ হল তাদের গঠনের পার্থক্য। যদি মোটরসাইকেল এবং বিমানের গঠনের মধ্যে পার্থক্য না থাকতো, তবে বিমান কখনোই মোটর-সাইকেলের চেয়ে দ্রুত চলতে পারতো না। দুটি গাড়ির স্পিডের মধ্যে পার্থক্য আছে, এর অর্থ হল তাদের গঠনের মধ্যেও পার্থক্য আছে। বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ (Electromagnetic wave) সেটি রেডিও তরঙ্গ হোক বা এক্স-রে বা গামা বা আল্ট্রা ভায়োলেট আদি যাই হোক না কেন, তাদের স্পিডের কোনো পার্থক্য নেই, কিন্তু তাদের গুণের মধ্যে পার্থক্য আছে। গুণের মধ্যে পার্থক্য অর্থাৎ তাদের কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে পার্থক্য আছে। কম্পাঙ্কের মধ্যে কেন পার্থক্য আছে? এটা স্পষ্ট যে কোথাও না কোথাও তাদের যে অভ্যন্তরীণ গঠন আছে, তাতে পার্থক্য আছে এবং সেই অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে কেউ জানে না। যদি কেউ জানেন, তাহলে আমাকে বলুন।
আমরা বলছি যে, এই তরঙ্গ বা যেকোনো কণার অভ্যন্তরীণ গঠন কী? এগুলো সবই ছন্দ এবং প্রাণ-রশ্মি বা কম্পন দিয়ে তৈরি এবং সেগুলো যা কিছু ক্রিয়া করে, তা অভ্যন্তরীণ গঠনের কারণেই করে। আমি কথা বলছি, তবে এতে কি আমার অভ্যন্তরীণ গঠনের কোনো ভূমিকা নেই? যদি আমার কণ্ঠনালি খারাপ হয়ে যায়, তবে আমি কথা বলতে পারবো না অথবা মস্তিষ্কের যে অংশটি কথা বলতে সাহায্য করে সেটি যদি খারাপ হয়ে যায়, তবে আমি কথা বলতে পারবো না। একজন ব্যক্তি খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে, অন্য একজন হাঁটতেও পারে না, কারণ দুজনের গঠনের মধ্যে পার্থক্য আছে। যে দুটি কণা বা তরঙ্গের গুণের মধ্যে পার্থক্য আছে, সেগুলো নিশ্চিতভাবে ভিন্ন-ভিন্ন রশ্মি দিয়ে তৈরি, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি বিষয় সমান যে উভয়ের মধ্যেই 'ওম্' রশ্মি আছে। যখন কোনো ক্রিয়া হয়- যেমন ধরুন, আমি এই টেবিলে আঘাত করলাম এবং তা থেকে শব্দ বের হল। কেউ কি বলতে পারেন শব্দ কীভাবে এলো? আমি এর ব্যাখ্যা করবো না, তবে এখান থেকে যে তরঙ্গগুলো বের হয়েছে, তাদের ভেতরে যে রশ্মিগুলো আছে এবং সেই রশ্মিগুলোরও ভেতরে যে সবচেয়ে চূড়ান্ত রশ্মিটি আছে, যার এই ব্রহ্মাণ্ডে মৌলিক ভূমিকা আছে, সেটি হল- 'ওম্' রশ্মি।
'ওম্' রশ্মি ছাড়া এই ব্রহ্মাণ্ডে কোনো কাজ কখনো হয়নি এবং কখনো হতেও পারে না। তাই যারা বলেন যে ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না, তা একেবারে সত্য। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা আমাদের মানুষের ইচ্ছার মতো নয়। এর অর্থ এই নয় যে আমরা কিছুই নই, আমরাও সচেতন। আমাদের শরীরে যে ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা জাগে, তা আমাদের নিজেদের, ঈশ্বরের নয়। কিন্তু আমাদের শরীর যে কণাগুলো দিয়ে তৈরি, তার ভেতরে যে ক্রিয়াগুলো চলছে, তাতে চূড়ান্ত ভূমিকা এই 'ওম' রশ্মিরই হয়। যেমন আমি এই পুস্তকটি তুললাম, এখানে হাতের ভূমিকা আছে, কিন্তু হাতের পেছনে কার ভূমিকা? মাংসপেশির। মাংসপেশির পেছনে কার ভূমিকা? বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বলের। তার পেছনে কি কোনো ভূমিকা আছে? অনেকগুলো ছন্দ রশ্মির। তাদের পেছনেও কি কোনো ভূমিকা আছে? এভাবে শেষ পর্যন্ত 'ওম্' রশ্মিরই ভূমিকা আসবে। তাই, 'ওম্' রশ্মিই যেকোনো পদার্থকে সামনে থেকে ধারণ করে, সেটি ফোটন হোক বা ইলেকট্রন অথবা অন্য যেকোনো ছন্দ রশ্মি। এজন্যই বাক্য তত্ত্ব (পরা 'ওম্')-ই হল অগ্নি এবং এটিই হল পুরোহিত। অগ্নির জন্য 'পুরোহিত' শব্দটি এখানে সার্থক হচ্ছে।
এখন মন নিয়ে বিচার করা যাক। মন কী? মন হল একটি পদার্থ। বাক্ তো হল মন বা প্রকৃতির ভেতরের একটি কম্পন, কিন্তু মন হল সেই পদার্থ, যা কম্পিত বা স্পন্দিত প্রকৃতির রূপ হয়। মহৎ, অহঙ্কার ও মন- তিনটিই এক, শুধু স্তরের কিছুটা পার্থক্য আছে। মনের মধ্যে বাক্ আছে এবং বাক্-এর মধ্যে মন আছে। বিষয়টি এভাবে বোঝা যেতে পারে যেমন আপনি পুকুরের পাড়ে বা সমুদ্রের ঢেউ দেখছেন; তাহলে ঢেউ কী? ঢেউয়ের ভেতরে জল আছে এবং জলের ভেতরে ঢেউ আছে, অর্থাৎ ঢেউ জল থেকে আলাদা নয় এবং জলও ঢেউ থেকে আলাদা নয়। তাহলে ঢেউ এবং জলের মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য হল এই যে, যখন জলে স্পন্দন নেই, তখনও সেটি জল হয়। জল তখনই ঢেউ হয়, যখন তা স্পন্দিত হয়।
একইভাবে স্পন্দিত হতে থাকা মনই হল বাক্ রূপ। এজন্যই মহর্ষি জৈমিনিকে বলতে হয়েছে- 'বাগিরিতি মনঃ' অর্থাৎ এই বাক্-ই হল মন এবং মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন- 'বাক্ চ মনশ্চ দেবানাম্ মিথুনম্' অর্থাৎ বাক্ এবং মন, এই দুটিরই যুগ্ম হয়। যতক্ষণ মনে স্পন্দন নেই, ততক্ষণ সেটি থেকে কিছু তৈরি হতে পারে না। স্পন্দন হলে তবেই সৃষ্টি হবে। যেমন আমরা যদি ঘুমিয়ে থাকি, আমাদের হাত-পা না নড়ে, তবে আমাদের থাকা বা না থাকার কোনো অর্থ নেই। কিন্তু যখনই আমাদের মধ্যে নড়াচড়া আসবে, স্পন্দন হবে, তখনই আমরা কোনো কাজ করতে পারবো। একইভাবে, বাক্-যুক্ত মনই সৃষ্টির পরবর্তী পর্যায়ের পদার্থসমূহ উৎপন্ন করে। এই কারণে এই মনও অগ্নির একটি রূপ হয় এবং সেইজন্য একেও পুরোহিত বলা হয়েছে। মন ছাড়া বাক্ উৎপন্ন হতে পারে না। খেয়াল রাখবেন, এখানে পশ্যন্তী বাক্-এর কথা বলা হচ্ছে, পরা বাক্-এর নয়।
অগ্নির তৃতীয় রূপ হল- আত্মা। মনের পর এগারো প্রকারের প্রাণ-রশ্মি উৎপন্ন হয়, তাদের মধ্যে প্রথম স্থান হল সূত্রাত্মা বায়ুর। সূত্রাত্মার অর্থ কী এবং এর গুণাগুণ কী? আধিদৈবিক অর্থে আত্মার অর্থ হল সূত্রাত্মা বায়ু। এই রশ্মি এগারোটি প্রাণ রশ্মির মধ্যে প্রথম রশ্মি এবং এর কাজ হল যেকোনো পদার্থকে আকর্ষণ করা। এই ব্রহ্মাণ্ডে যেখানেই আকর্ষণ বল আছে, সেখানে মন এবং বাক্ তো থাকেই, কিন্তু সূত্রাত্মা বায়ুও অবশ্যই বিদ্যমান থাকে। এর রশ্মিগুলো এমন হয় যে একটি রশ্মি থেকে আরেকটি বের হয়, যেমন গাছের কাণ্ড, তারপর ডালপালা এবং এরপর প্রশাখা। যখন দুটি কণা কাছে আসে, তখন তাদের থেকে অনেক রশ্মি বের হয়, কিন্তু সেই কণাগুলোকে বেঁধে রাখার কাজ সূত্রাত্মা বায়ু করে। যেমন একটি ঘড়ি আছে, ঘড়ির চারপাশেই সূত্রাত্মা বায়ুর বেষ্টনী থাকে।
সৃষ্টিতে যত লোক-লোকান্তর, গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র, কণা, ফোটন আদি আছে, সবই সূত্রাত্মা বায়ু দিয়ে ঘেরা থাকে। যেমন আমাদের শরীর চামড়া দিয়ে ঘেরা থাকে। কেবল সূত্রাত্মা বায়ুই নয়, এর থেকেও বড় কিছু রশ্মি আছে, তাদের মধ্যে বৃহতী নাম হল প্রধান। কিন্তু এখানে প্রথমটির কথা বলা হচ্ছে, তাই সূত্রাত্মা বায়ুকে অগ্নি বলা হয়েছে। যখন দুটি কণা সংযোগের জন্য কাছে আসে, তখন উভয়ের চারপাশেই সূত্রাত্মা বায়ুর ঘের থাকে। দুটি কণা নিকটে আসার পর সূত্রাত্মা বায়ু মাঝখান থেকে সরে গিয়ে একটি সংযুক্ত আবরণ তৈরি করে নেয়।
অগ্নির যে গুণগুলো আছে, সেগুলো সূত্রাত্মা বায়ুর মধ্যেও আছে। অগ্নিও সামনে থেকে ধরে এবং সূত্রাত্মা বায়ুও। যেমন দুটি সংযোজ্য কণা, এই দুটি থেকে রশ্মি বের হয়, এই রশ্মিগুলোকে সূত্রাত্মা বায়ু সামনে থেকে ধরে এবং এইভাবে দুই কণাকে আঁকড়ে ধরে সংযুক্ত করে দেয়, তাই সূত্রাত্মা বায়ু হল পুরোহিত এবং সূত্রাত্মা বায়ুরূপ অগ্নিও হল পুরোহিত।
সূত্রাত্মা বায়ুর পর যে প্রথম প্রাণ রশ্মি উৎপন্ন হয়, তার নাম হল- ধনঞ্জয়। ধনঞ্জয়ের পরে উৎপন্ন হওয়া দশটি রশ্মি মিলিয়ে এগারোটি রশ্মিকে প্রাণ বলে, কিন্তু সেই এগারোটির মধ্যে একটি রশ্মির নিজের নামও হল প্রাণ। যখন পাঁচটি মুখ্য প্রাণের আলোচনা আসবে, তখন প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমানকে গ্রহণ করা হবে। যখন সাতটি মুখ্য প্রাণ বলা হয়, তখন সূত্রাত্মা এবং ধনঞ্জয় আরও যুক্ত হয়ে যাবে এবং যখন এগারোটি প্রাণের কথা বলা হবে, তখন নাগ, কূর্ম, কৃকল, দেবদত্ত, ধনঞ্জয়- এই পাঁচটি উপপ্রাণও যুক্ত হবে। প্রাণ রশ্মির গুণ হল এরমধ্যে আকর্ষণ বল থাকে। অপানে বিকর্ষণ বল থাকে।
আমি 'বিগ ব্যাং থিওরি' মানি না। 'বিগ ব্যাং থিওরি'-র নামে বিশ্বে অনেক মিথ্যে চলছে। স্পেস প্রসারিত হচ্ছে, পদার্থ প্রসারিত হচ্ছে অথবা যা কিছু প্রসারিত হচ্ছে, তার আলোচনা আমি এখানে করবো না। বৈদিক ভৌতিকীর অনুসারে, যখন সৃষ্টির উৎপত্তি হয়, তখন পদার্থ প্রসারিত হয় না, বরং সংকুচিত হয়। প্রলয়াবস্থায় পদার্থ সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে ছিল, তারপর তা ঘনীভূত অর্থাৎ কন্ডেন্স হয়েছে। ঘনীভূত হওয়ার ফলেই সৃষ্টি তৈরি হয়। প্রসারিত হতে থাকা পদার্থ কীভাবে একে-অপরের সাথে ঘনীভূত হয়ে কোনো কণা বা নক্ষত্র হতে পারে? এই তথাকথিত সিদ্ধান্তের পিছনে কোনো যুক্তি নেই।
এখন পদার্থ ঘনীভূত কীভাবে হল? তা ঠিক তেমনই, যেমন দই মন্থন করার আগে মাখন পুরো দইয়ের মধ্যেই থাকে, কিন্তু যখন মন্থন করা হয়, তখন দই থেকে ঘনীভূত হয়ে তার কণাগুলো একে-অপরের সাথে জুড়ে যায় এবং আলাদা হয়ে মাখন উপরে চলে আসে। একইভাবে যখন সৃষ্টিতে বিক্ষোভ বা চাঞ্চল্য তৈরি হয়, যখন মনস্তত্ত্বে কম্পন শুরু হয়, তখন বিভিন্ন ধরণের রশ্মি উৎপন্ন হয়, তা প্রাণ রশ্মিই হোক বা ছন্দ রশ্মি। এই ছন্দই হল বেদমন্ত্র, যার মধ্যে একটি হল- 'অ॒গ্নিমী॑ळे পু॒রোহি॑তং...'; এই সবগুলোতে প্রাণ রশ্মির ভূমিকা অনেক বেশি থাকে। তাই এই প্রাণ রশ্মিও পুরোহিত হয়, কারণ এটি যে কোনো কণা অথবা ফোটনের আগে গমন করে।
যদি কোনো বিজ্ঞানীকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে ফোটন কেন প্রতিনিয়ত চলে? তবে এর কোনো নিশ্চিত উত্তর তাদের কাছে নেই। আমি একটি পাথর তুলে নিয়ে ছুড়ে দিলাম। আমি পাথরটির সাথে কী করলাম যে এটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে? আপনি বলবেন যে গতিজ উর্জা। আবার প্রশ্ন উঠবে যে গতিজ উর্জা আসলে কী? এটি তো আপনি নাম দিয়েছেন। সেই গতিজ উর্জা আসলে কী, যা আমার হাত থেকে পাথরে স্থানান্তরিত হল? বস্তুতঃ প্রতিটি কণার সামনে প্রাণ এবং অপান রশ্মি পথ তৈরি করতে-করতে চলে। সামনে থেকে এই রশ্মিগুলো সেই কণাগুলোকে ধারণ করে নিয়ে চলে। যেমন যখন কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি যান, তখন পুলিশের গাড়ি সামনে রাস্তা খালি করতে-করতে চলে, ঠিক তেমনই কিছু রশ্মি আগে-আগে চলে, তাদের মধ্যে একটি প্রাণ রশ্মিও আছে। এইভাবে এই প্রাণও পুরোহিতের কাজ করে।
এখন পরবর্তী বিষয়টি হল- বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ কী? আধুনিক ভৌতিকীতে এর কোনো সংজ্ঞা নেই। রিচার্ড পি. ফাইনম্যান লিখেছেন যে বিদ্যুৎ কী, তা আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি না এবং এর স্বরূপ কী, তা আমরা ঠিকঠাক বলতে পারি না। যখন আমি একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম, তখন আমি রুড়কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌতিক বিভাগকে প্রশ্ন করেছিলাম যে চার্জ কী? এটি কীভাবে উৎপন্ন হয়? সবার আগে এটিকে কে উৎপন্ন করে? তখন বিভাগের রিডার উত্তর দিয়েছিলেন যে চার্জ হল একটি মৌলিক রাশি, যাকে বিশ্বের কেউ জানে না। এটি কীভাবে এবং কে উৎপন্ন করে, এর উত্তর তো এটাই হতে পারে যে এটি ভগবান উৎপন্ন করেছেন। সেই চিঠিটি আজ অবধি আমার কাছে আছে। বিদ্যুতের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক হয়, এখানে তার আলোচনা করবো না।
আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে, যখন দুটি ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক আবেশযুক্ত কণার মধ্যে আকর্ষণ হয়, তখন মিডিয়েটর কণাগুলোর আদান-প্রদান হতে থাকে। ওই সংযোজক কণাগুলোও সেই কণাগুলোকে একই দিকে আকর্ষণ করে, যেদিকে ওই কণাগুলো অগ্রসর হচ্ছে। উভয় কণা থেকে রশ্মি নির্গত হতে থাকে, তাই মিডিয়েটর কণাও সেই দিক থেকেই আকর্ষিত করবে, অন্য দিক থেকে নয়। এই কারণে বিদ্যুৎও হল পুরোহিত, যা সবাইকে ধারণ ও পোষণ করে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটি ছাড়া চার্জ বা আবেশ শেষ হয়ে যাবে। যদি ব্রহ্মাণ্ডে আবেশ শেষ হয়ে যায়, তাহলে সংসার ভেঙে পড়বে, কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তাই বিদ্যুৎ আবেশও পুরোহিতের কাজ করে এবং এটিও অগ্নি হয়।
এখন পর্যন্ত আমি যা বলেছি, তা আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক উর্ধ্বে এবং এখন যা বলছি, সেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের পৌঁছানোর ক্ষমতা থাকলেও তা অসম্পূর্ণ। কারণ তারা জানে না যে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল, প্রবল নিউক্লীয় বল আদি কীভাবে কাজ করে, তাদের ক্রিয়া-বিজ্ঞান কী? গুরুত্বীয় বল কীভাবে কাজ করে, কেন করে- এসব তাদের জানা নেই।
উষ্মার (তাপের) উপস্থিতিতেই সব কাজ সম্পন্ন হয়। যদি উষ্মা শেষ হয়ে যায়, তাহলে
ব্রহ্মাণ্ডে কোনো ক্রিয়া হবে না। উষ্মা শেষ হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাপমাত্রা ০° সেন্টিগ্রেড হয়ে
যাবে, এটি তো আমরা পরিমাপ করেছি। অনন্ত শীতলতা নেমে এলে কোনো কম্পন থাকবে না।
এইভাবে এই অগ্নি পুরোহিতও হয়।
2. দেবম্ - অগ্নির দ্বিতীয় বিশেষণ হল- দেবম্। অগ্নিও দেব হয়। দেব-এর জন্য মহর্ষি য়াস্ক লিখেছেন- 'দেবো দানাদ্ধা। দীপনাদ্ধা। দ্যোতনাদ্ধা। দ্যুস্থানো ভবতীতি বা। য়ো দেবঃ সা দেবতা।' (নি.7.15) অর্থাৎ, যে পদার্থ বল দান করে, অন্যকে আলোকিত করে এবং যা দ্যুস্থানীয় হয়, তাকে দেব বলে। দ্যুস্থানীয়-এর অর্থ হল যে দ্যুলোকে বাস করে, সে-ই হল দেব।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ