জড়ত্ব অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে চেতনাত্ব অবস্থা লাভই সাধনার লক্ষ। সাধনার ক্রম অনুসারে বেদ তথা ঋষি গন ওঙ্কার সাধনার পদ্ধতি নির্দেশ দিয়েছে।
'ওম' এই শব্দ ব্রহ্মবাচক তথা পরমেশ্বরের সর্বোচ্চ নাম। কারণ ইহাতে অ, উ, ম এই তিন অক্ষর মিলিয়া এক 'ওম' সমুদায় হয়েছে এই একটি নাম হইতে পরমেশ্বরের অনেক নাম সূচিত হয়। যথা- অ- কার হইতে বিরাট অগ্নি এবং বিশ্ব প্রভৃতি। উ-কার হইতে হিরণ্যগর্ভ, বায়ু তৈজস্ব প্রভৃতি। ম-কার হইতে ঈশ্বর আদিত্য প্রাজ্ঞ প্রভৃতি সৃচিত হয়। প্রকরণানুসারে এই সকল যে পরমেশ্বরেরই নাম তাহা বেদাদি সত্য শাস্ত্রে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা হইয়াছে [সত্যার্থ প্রকাশ ১ সমুল্লাস]
ওম্ খং ব্রহ্ম -
[যজুর্বেদ -৪০/১৭ মন্ত্র]
(ওম্) আদি নাম সার্থক । যেমন - ওম্ খম্ অবতীত্যোম্ , আকাশমিব ব্যাপকত্বাৎ খম্ , সর্ব্বেভ্যো বৃহত্বাদ্ ব্রহ্ম । রক্ষা করেন বলিয়া ওম্ আকাশের ন্যায় ব্যাপক বলিয়া খম্ এবং সর্বপেক্ষা বৃহৎ বলিয়া ব্রহ্ম ঈশ্বরের নাম ।
বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম্।
ওতম্ ক্রতো স্মর ক্লিবে স্মর কৃতং স্মর।।
পদার্থঃ- (ক্রতো) হে কর্মকর্তা জীব (ওতম্) পরমাত্মার নাম (ক্লিবে) সামর্থ্যের জন্য (স্মর) স্মরণ কর (বায়ুঃ) আধ্যাত্মিক প্রাণ (অনিলম্) আধিদৈবিক প্রাণ (অমৃতম্) পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হও (অথ) তৎপর (ইদং শরীরম্) এই ভৌতিক শরীর (ভস্মান্তম্) ভস্মে শেষ হয়।--- যজুর্বেদ ৪০/১৫
অনুবাদঃ- হে কর্মশীল জীব! শরীর ত্যাগের সময় পরমাত্মার নাম "ও৩ম্" স্মরণ করো।আধ্যাত্মিক প্রাণ, আধিদৈবিক প্রাণ এবং পুনরায় সেই প্রাণস্বরূপ পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হও। তৎপর এই ভৌতিক শরীর ভস্মে পরিণত হউক।
এবার দেখি আমাদের উপনিষদ কি বলে
সর্বে বেদা যৎ পদমামনম্তি তপাংসি সর্বাণি চ যদন্তি। যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য চরন্তি তত্তে পদং সংগ্রহেণ ব্রবীমি-ওমিত্যেতৎ।। [কঠ-১/২/১৫]
অনুবাদঃ চার বেদ যার স্বরুপের বর্ণনা করে এবং সকল তপস্যা যার বর্ণনা করে। যাকে পাইবার ইচ্ছা করে সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের ব্রত পালন করেন, সেই পরম পদকে তোমার জন্য সংক্ষেপে বলছি এই "ওম" ই সেই পরম পদ।
এতদ্ব্যেবাক্ষরং ব্রহ্ম এতদ্ব্যেবাক্ষরং পরম।
এতদ্ব্যেবাক্ষরং জ্ঞাত্বা যো যদিচ্ছতি তস্য তৎ। [কঠ-১/২/১৬]
অনুবাদঃ এই "ওম" ই নিশ্চিত রূপে নাশ রহিত, ইনিই সর্বোত্তম অক্ষর ব্রহ্ম। এইজন্যই এই অক্ষরকে জেনে, যিনি যা ইচ্ছা করেন তিনি সেটাই প্রাপ্ত হয়।
এতদালস্বনং শ্রেষ্ঠং এতদালস্বনং পরম্।
এতদালস্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে।
[কঠ-১/২/১৭]
অর্থাৎঃ যেসব উপায় অবলম্বন পূর্বক ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া পরম শক্তির অধিকারী হওয়া যায় তাহদের মধ্যে ওঙ্কার অবলম্বনই শ্রেষ্ঠ।
❝ওমিত্যেবং ধ্যায়থ আত্মানং❞
[মুণ্ডকোঃ উপঃ ২/২/৬] অর্থাৎ ও৩ম্ এই শব্দ বাচক অবলম্বন করে সেই পরমাত্মাকে ধ্যান করো
মহর্ষি - পতঞ্জলি - যোগদর্শনে 
সূত্র - তস্য বাচকঃ প্রণবঃ।। (১/২৭)
পদার্থঃ (তস্য) ওই ঈশ্বরের (বাচকঃ) বোধন শব্দ = নাম (প্রণবঃ) ওঁ
সূত্রার্থ- ঈশ্বরের বোধক নাম 'ওম'।
ব্যাখ্যা - এই সূত্রে ঈশ্বরের নামের বিষয়ে চর্চা করা হয়েছে। ঈশ্বরের নিজ এবং মুখ্য নাম ওম। এই বাচ্য ঈশ্বরের সাতে বাচক প্রণবের যে সম্বন্ধ রয়েছে সেটি অনাদিকালের। তাই এই সম্বন্ধকে জানানোর জন্য কেবল সংকেত মাত্র করা হয়। এই সংকেত ঈশ্বরের সাতে ওম এর বিদ্যমান সম্বন্ধকেই জানায়। যেমন - পিতা পুত্রের সম্বন্ধ প্রথম থেকে বিদ্যমান থাকে, সেই সম্বন্ধকে জানানোর জন্য কেবল সংকেত করা হয় যে ইনি এর পিতা এবং এ এনার পুত্র। ঈশ্বরের সাতে যে প্রণব সম্বন্ধ রয়েছে সেটা অন্য সৃষ্টিতেও একই রকম থাকবে এবং সেই সম্বন্ধকেই কেবলমাত্র সংকেত দ্বারাই জানানো হবে।
'প্রণব' শব্দ দ্বারা ওম কীভাবে গ্রহণ করা হয়.? যজুর্বেদ ১৮/২৫ এর ভাষ্য করার সময় মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী জী লিখেছেন যে "প্রণবৈঃ ওস্কারৈঃ" অতএব এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে 'প্রণব' শব্দের দ্বারা ওঙ্কার কে বলা হয়েছে। "প্রণব" শব্দের অর্থ হল যে শব্দ দ্বারা উৎকৃষ্ট ভাবে স্তুতি করা করা হয় তাকে প্রণব বলা হয়। ওম এর অর্থ হল রক্ষক= রক্ষাকর্তা। এই নাম দ্বারা ঈশ্বর সাধনা করা উচিত ।
সূত্র- তজ্জপস্তদর্থভাবনম্।। (১/২৮)
অর্থঃ ওম শব্দের জপ এবং ওম নামের নামী ঈশ্বরের ভাবনা অর্থাৎ তার রক্ষণাদির গুনের চিন্তন করা উচিৎ ।
ব্যাখ্যা - এই সূত্রের ওম এর জপ এবং ঈশ্বরের গুনের চিন্তন কিভাবে করা উচিৎ এই বিষয়ে বলা হয়েছে। যোগী ওম এর জপ এবং ঈশ্বরের গুনের চিন্তন করতে থাকলে মন একাগ্র হয়ে যায়। মন একাগ্র হয়ে গেলে শীঘ্রই ঈশ্বর প্রাপ্ত হয়।
সূত্র - ততঃ প্রত্যক্ চেতনাধিমোঅপ্যন্তরায়াভাবশ্চ।। (১/২৯)
অর্থাৎ ওই ঈশ্বরপ্রনিধান দ্বারা ঈশ্বরের এবং জীবাত্মার সাক্ষাৎকার হয় এবং রোগ প্রভৃতি বিঘ্নের বিনাশ ঘটে।
ব্যাখ্যা- এই সূত্রে বিধি পূর্বক জপ এবং ঈশ্বরের গুনের চিন্তন করলে কি প্রাপ্ত হয় সেই বিষয়ে বলা হয়েছে।
ঈশ্বর প্রনিধান দ্বারা রোগ প্রভৃতি যে বিঘ্ন সে গুলো হয় না এবং যোগী নিজের স্বরুপের দর্শনও করে নেন। যেমনঃ ঈশ্বর প্রবিত্র, দুঃখ রহিত, অন্য পদার্থের সংমিশ্রণ হতে রহিত, সব প্রকার বাধা হতে রহিত। সেই রকম বুদ্বির প্রতিসংবেদনকারী জীবাত্মাও নিজেকে জেনে নেয় যে আমিও পবিত্র।
গীতায় যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন 
ওম্ ইতি একাক্ষরম্ ব্রহ্ম ব্যাহরন্ মাম্ অনুস্মরন্ ।
য়ঃ প্রযাতি ত্যজন্ দেহম্ সঃ যাতি পরামাম্ গতিম্ ।।
গীতা-৮/১৩
পদার্থঃ (ওম্, একাক্ষরম্, ব্রহ্ম) 'ওঁ' হলো এক অক্ষর ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রহ্মের বোধক যে 'ওঁ' অক্ষর আছে উহাকে (ব্যাহরন্) কথন করে (মাম্, অনুস্মরন্) আমাকে এর অনন্তর স্মরণ করে অর্থাৎ এই পদের উপদেষ্টা হিসেবে জেনে (য়ঃ) যে পুরুষ (দেহম্, ত্যজন্) দেহকে ত্যাগ করে (প্রযাতি) মৃত্যু হয় (সঃ) সে (পরামাম্, গতিম্, যাতি) পরম গতি কে প্রাপ্ত হয়।।
ভাবার্থঃ যে পুরুষ 'ওম' নামক ব্রহ্ম অক্ষর কে স্মরণ করতে করতে দেহ ত্যাগ দ্বারা প্রয়াণ করে সে পুরুষ পরম গতি কে প্রাপ্ত হয়।।
শুদ্ধ চিত্রে সকল লোভ ত্যাগ করে 'ওঙ্কার অবলম্বন উপাসনা করলেই ব্রহ্ম প্রাপ্তি হয়, এই বিষয়ে সন্দেহ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিখিল ভুবনে ব্রহ্ম প্রাপ্তির মতো আর আনন্দ নেই। তাই বন্ধুগন এই ওঙ্কারের কোনো বিকল্প নেই।
ওঙ্কারের পুনঃ পুনঃ ধ্যান করলেই পরমাত্মার উপলব্ধি হয়ে থাকে। অনন্ত অভিনাশী এই পরমাত্মাই আমাদের প্রেমশক্তি। আমাদের পরম স্থান। যজুর্বেদের ৩১।১৮ তে বলা হয়েছে, তাঁহাকে জানিয়াই মৃত্যুকে অতিক্রম করা যায়, পরমপদ লাভের দ্বিতীয় কোন গ্রন্থা নেই। আমাদেরকে ওঙ্কারের স্বরূপে চিন্তা করিয়াই ধ্যান করতে হবে। তারপর পুনঃ পুনঃ অভ্যাসের ফলে যখন সাধনা স্থিতপ্রজ্ঞ হবে তখনই সেই পরমাত্মার উপলব্ধি আমাদের হৃদয় হবে, এ ছাড়া দ্বিতীয় কোন পন্থা নেই । ওঙ্কার উপনিষদসমূহে পরমাত্মা উপলব্ধির মৌল অবলম্বন উপনিষদের মূল লক্ষ্য একটাই- জীব ও ব্রহ্মের ঐক্য উপলব্ধি। আর সেই উপলব্ধির প্রধান মাধ্যম হিসেবে যাকে বারবার নির্দেশ করা হয়েছে তা হলো ওঙ্কার। হৃদয়েই পরমাত্মার অধিষ্ঠান — ওঙ্কার তার ধ্যানের উপায়। উপনিষদে বলা হচ্ছে,

অরা ইব রথনাভৌ সংহতা যত্র নাড্যঃ স এষাম্তশ্চরতে বহুধা জায়মানঃ।
ওমিত্যেবং ধ্যানথ আত্মনং স্বস্তি বঃ পারায় তমসঃ পরস্তাৎ।। [মুন্ডক উপঃ ২/২/৬]
অনুবাদঃ যেরূপ রথচক্রের নাভিতে চক্রশলাকা প্রবিষ্ট থাকে, তদ্রূপ যে হৃদয়ে নাড়িসমূহ সম্প্রবিষ্ট আছে, সেই হৃদয়ে বহু প্রকারে প্রকাশমান হয়ে এই পরমাত্মা অন্তরে বিচরণ করেন। 'ওম' এই বাচক শব্দ অবলম্বন করে সেই পরমাত্মার ধ্যান করো। হে শিষ্যগণ! সংসার-সাগর থেকে উত্তরণের জন্য ওই পরমাত্মার আশ্রয় গ্রহণ করো, যিনি অজ্ঞানরূপ অন্ধকারের অতীত। তোমাদের কল্যাণ হোক।
প্রথম তত্ত্ব — পরমাত্মার অবস্থান রথচক্রের নাভিতে যেমন সব শলাকা একত্রে যুক্ত থাকে, তেমনি- সমস্ত নাড়ি, সমস্ত ইন্দ্রিয়গত গতি,
সমস্ত প্রাণের প্রবাহ সবকিছুর কেন্দ্র হলো হৃদয়।
সেই হৃদয়েই পরমাত্মা বহু রূপে বিচরণ করেন।
দ্বিতীয় তত্ত্ব — সেই পরমাত্মাকে জানবার উপায়
মন্ত্রটি সরাসরি বলে- “ওম্ এই শব্দ অবলম্বন করে পরমাত্মার ধ্যান করো।” অর্থাৎ এখানে ওঙ্কারকে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত পরমাত্মার দিকে চিত্তকে নিবদ্ধ করার কার্যকর অবলম্বন বলা হয়েছে।

ওঙ্কার বেদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ এবং সাধকের কল্যাণের আশ্রয়,

যশ্চন্দসামৃষভো বিশ্বরূপঃ ছন্দোভ্যোঽধ্যমৃতাৎ সম্বভূব। স মেন্দ্রো মেধয় স্পৃণোতু। অমৃতস্য দেব ধারণো ভূয়াসম্। শরীরং মে বিচর্ষণম্। জিব্বা মে মধুমত্তমা। কর্ণাভ্যাং ভূরি বিশ্রুবম্। ব্রহ্মণঃ কেশোঽসি মেধয়া পিহিতঃ শ্রুতং মে গোপায়। আবহন্তী বিতন্বানা [তৈত্তিরীয় উপঃ ১/৪/১]
অনুবাদঃ যে ওঙ্কার বেদসমূহে সর্বশ্রেষ্ঠ, বিশ্বরূপ এবং যিনি বেদ তথা মুক্তি থেকেও ঊর্ধ্বে স্থিত, সেই ওঙ্কাররূপ পরমেশ্বর আমার বুদ্ধিকে রক্ষা করুন। হে দিব্যগুণযুক্ত দেব! আমি যেন মুক্তিরূপ সুখের ধারণকারী হই। আমার শরীর রোগরহিত হোক, আমার জিহ্বা মধুরভাষিণী হোক, কর্ণ দ্বারা যেন অনেক দিন শ্রবণ করতে পারি। হে পরমেশ্বর। তুমি বেদের রক্ষক, এজন্য লৌকিক বুদ্ধিদ্বারা তুমি আচ্ছাদিত। আমার যে শ্রবণলব্ধ জ্ঞান, তা তুমি রক্ষা করো এবং সমস্ত ভোগ্য পদার্থ এবং পদার্থের বৃদ্ধিকারী শোভা আমাকে দান করো ॥১॥

এখানে ওঙ্কারকে বলা হচ্ছে, ছন্দসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, বিশ্বরূপ, এবং অমৃততত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত।
এরপর সাধক নিজের জন্য যে প্রার্থনা করছে—
বুদ্ধির পুষ্টি, শরীরের সুস্থতা, বাকশক্তি,শ্রবণশক্তি
সবই চাওয়া হচ্ছে ওঙ্কাররূপ ঈশ্বরের কাছে।
ফলে বোঝা যায় ওঙ্কার কেবল মোক্ষলক্ষ্য সাধনার বিষয় নয়, বরং সাধকের সমগ্র জীবনশুদ্ধির আশ্রয়।

ওমিতি ব্রহ্ম। ওমিতীদং সর্বম্। ওমিত্যেতদনুকৃতির্হ স্ম বা অপ্যো শ্রাবয়েত্যাশ্রাবয়ন্তি। ওমিতি সামানি গায়ন্তি। ওম্ শোমিতি শস্ত্রাণি শংসন্তি। ওমিত্যধ্বর্যুঃ প্রতিগরং প্রতিগৃণাতি। ওমিতি ব্রহ্মা প্রসৌতি। ওমিত্যগ্নিহোত্রমনু-জানাতি। ওমিতি ব্রাহ্মণঃ প্রবহ্ম্যন্নাহ ব্রহ্মোপাপ্নবানীতি ব্রহ্মৈবোপাপ্নোতি। (তৈত্তিরীয়ঃ উপঃ ১/৮/১)
অনুবাদঃ ওম্'-ই ব্রহ্ম, এই সমস্ত ওঙ্কারই। 'ওম' এটি অনুজ্ঞা (অনুমতি সূচক)। এছাড়া এটি প্রসিদ্ধ যে, "হে আচার্য আমাকে শ্রবণ করান" শিষ্যের এরূপ বলার পর 'ওম' উচ্চারণপূর্বক আচার্য শিষ্যকে উপদেশ দিয়ে থাকেন। 'ওম্' উচ্চারণপূর্বক উদ্গাতা সামবেদের গান করেন এবং 'ওম্ শম্' বলেই গীতরহিত ঋচাসমূহের উচ্চারণ করেন। 'ওম' উচ্চারণপূর্বক যজুর্বেদী ঋত্বিক যজুর্বেদের প্রোৎসাহক মন্ত্রের পাঠ করেন। 'ওম' উচ্চারণপূর্বকই সমস্ত ঋত্বিকগণের শিরোমণি ব্রহ্মা বৈদিক কর্মের অনুমতি প্রদান করেন এবং 'ওম' উচ্চারণ করেই অগ্নিহোত্র করার আজ্ঞা দেন। 'ওম্' উচ্চারণপূর্বক ব্রাহ্মণ বেদাধ্যয়ন করে "আমরা যেন ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হই" এরূপ বলেন এবং তিনি ব্রহ্মকেই প্রাপ্ত হন ॥১॥

ব্রহ্ম কোনো দূরবর্তী সত্তা নন, ব্রহ্ম এই জগৎ থেকে আলাদা কোনো বস্তু নন, বরং যেই চেতনা দ্বারা এই জগৎ প্রকাশিত—তার শব্দরূপই ওঙ্কার। এর পরের অংশে দেখা যায়, আচার্য উপদেশ দেন ‘ওম্’ বলে, সামগান শুরু হয় ‘ওম্’ দিয়ে, যজ্ঞকর্মের অনুমতিও ‘ওম্’ দ্বারা। অর্থাৎ বৈদিক কর্ম ও জ্ঞান দুটির সূচনাস্বরই ওঙ্কার।

বিজ্ঞানাত্মা সহ দেবৈশ্চ সবৈঃ প্রাণা ভূতানি সম্প্রতিষ্ঠিন্তি যত্র।
তদক্ষরং বেদয়তে যন্তুু সোম্য স সর্বজ্ঞঃ সর্বমেবাবিবেশ ইতি।। [প্রশ্ন উপঃ ৪/১১]
অনুবাদঃ হে প্রিয়বর! পঞ্চপ্রাণ, পৃথিব্যাদি পঞ্চভূত এবং চক্ষুরাদি সকল ইন্দ্রিয় সমূহ যার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, সেই অক্ষর ব্রহ্মকে যে জীবাত্মা জানেন, তিনি সর্বজ্ঞ হয়ে সর্বময় পূর্ণ ব্রহ্মে প্রবিষ্ট হন।
যে অক্ষর ব্রহ্মের মধ্যে পঞ্চপ্রাণ, পঞ্চভূত,
এবং সমস্ত ইন্দ্রিয় প্রতিষ্ঠিত, সেই অক্ষর ব্রহ্মকে যে জানতে পারে সে সর্বজ্ঞ হয়ে সর্বময় ব্রহ্মে প্রবিষ্ট হয়। এই অক্ষর ব্রহ্মই পরবর্তী অধ্যায়ে স্পষ্ট করে বলা হয় ওঙ্কার দ্বারা উপলব্ধিযোগ্য। অর্থাৎ ওঙ্কার কেবল ধ্যানের বস্তু নয়, অক্ষর ব্রহ্মের বোধের প্রবেশদ্বার।

এতদ্বৈ সত্যকাম পরং চাপরং চ ব্রহ্ম যদোঙ্কারঃ। তস্মাদ্বিদ্বানেতেনৈবায়তনেনৈকতরমম্বেতি। [প্রশ্ন উপঃ ৫/২]
অনুবাদঃ সেই ঋষিপুত্রকে প্রসিদ্ধ ঋষি (পিপ্পলাদ) স্পষ্টভাবে বললেন, "হে সত্যকাম। যে পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্ম আছেন- এই উভয় ওঙ্কারস্বরূপ। এজন্য বিবেকী পুরুষ ওঙ্কার অবলম্বনেই পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্মের মধ্যে যে-কোনো একটিকে প্রাপ্ত হন"॥২॥

ঋগভিরেতং যজুর্ভিরম্তরিহ্মং সামভির্য়ৎ তৎ কবয়ো বেদয়ম্তে।
তমোঙ্কারেণৈবায়তনেনাম্বেতি বিদ্বান্ যত্তচ্ছাম্তমজরমমৃতমভয়ং পরং চেতি।। (প্রশ্ন উপঃ ৫/৭)
অনুবাদঃ জ্ঞানিগণ জানেন যে, ঋগ্বেদের জ্ঞান দ্বারা এই মনুষ্যলোক, যজুর্বেদের কর্ম দ্বারা দেহে সৌম্যভাব প্রাপ্তি এবং সামবেদোক্ত উপাসনা দ্বারা ব্রহ্মানন্দ লাভ হয়। সেই তিন অবস্থাকে ওঙ্কার অবলম্বনেই বিদ্বান ব্যক্তি প্রাপ্ত হন। আবার এই ওঙ্কার অবলম্বনেই বিদ্বান ব্যক্তি শান্ত, অজর, অমর, অভয় এবং সর্বোৎকৃষ্ট ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন ॥৭॥
বঙ্গেয়থা য়োনিগতস্য মূর্তির্ন দৃশ্যতে নৈব চ লিঙ্গনাশঃ। স ভূয় এবেন্ধনয়োনিগৃহ্যস্তদ্বোভয়ং বৈ প্রণবেন দেহে॥ [শ্বেতাঃ উপঃ ১/১৩]
সরলার্থঃ যেরূপ অগ্নির নিজ যোনিতে (উৎপত্তিস্থান কাষ্ঠে) তার আকৃতি (তেজোময় স্বরূপ) দেখা যায় না এবং এর উপস্থিতির চিহ্নেরও নাশ হয় না। কারণ সেই অগ্নিই পুনরায় ইন্ধনরূপী উৎপত্তিস্থান কাষ্ঠে গ্রহণ করা যেতে পারে অর্থাৎ অগ্ন্যুৎপাদক দুটি কাষ্ঠ খণ্ডের ঘর্ষণের ফলেই অগ্নি দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে থাকে। তদ্রূপ বিধিপূর্বক প্রণব (ও৩ম) জপ দ্বারা মনন করলে এই দেহে (হৃদয়পদ্মে) পরমাত্মা ও জীবাত্মা উভয়কে উপলব্ধি করা সম্ভব॥১৩॥

ওম এর মাধ্যমে পরমাত্মাকে দর্শন(লাভ) করা যায়। তা শাস্ত্রের অতি মৌলিক কথা। শ্বেতাশ্বতর ১/১৪ উপনিষদে বলা আছে-

স্বদেহমরণিং কৃত্বা প্রণবং চোত্তরারণিম্।
ধ্যাননির্মথনাভ্যাসাদ্ দেবং পশ্যেন্নিগূঢ়বৎ ॥১৪॥
সরলার্থঃ সাধক নিজের দেহকে নিম্ন অরণি (নীচের কাষ্ঠখণ্ড) এবং প্রণবকে (ওঙ্কারকে) উর্ধ্ব অরণি (উপরের কাষ্ঠখণ্ড) রূপে গ্রহণ করে, ধ্যানরূপ ঘর্ষণের দ্বারা নিরন্তর অভ্যাস করে গুপ্ত অগ্নির ন্যায় আত্মার মধ্যে স্থিত পরমাত্মাকে জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা দর্শন করবেন ॥১৪॥
বেদের শুরুতে এবং শেষে অবশ্যই প্রণব উচ্চারণ করতে হবে। আর যদি না করা হয় তাহলে পাঠের ফল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ওঙ্কার ছাড়া বৈদিক মন্ত্রও পূর্ণতা পায় না। তাই ত সব মন্ত্রের শুরুতে মনু মহারাজ ওঙ্কার উচ্চারণের বিধান দিয়েছেন,

ব্রহ্মণঃ প্রণবং কুর্যাদাদাবস্তে চ সর্ব্বদা।
স্রবত্যনোংকৃতং পূর্বং পরস্তাচ্চ বিশীর্য্যতে। [মনুস্মৃতি ২/৭৪]
অনুবাদঃ (ব্রহ্মণঃ) বেদের (আদৌ) আদিতে (চ) আর (অন্তে) অন্তে (প্রণবম্+কুর্যাত্) ওঙ্কার উচ্চারণ করা আবশ্যক। যদি বেদের আদি ও অন্তে ওঙ্কার শব্দের উচ্চারণ না করা হয় তাহলে ভুল হবে। তাই আগেই বলা হয়ে থাকে (পূর্বম্) মন্ত্রোচ্চারণের প্রথম (অনোংকৃতম্) ওঙ্কার উচ্চারণ না করলে (স্রবতি) তাহার মাহাত্ম্য বিফল হয়। (পরস্তাত্+চ) আর আস্তে যদি ওঙ্কার উচ্চারণ না করে তবে (বিশীর্য্যতে) সেই পাঠ কর্তা স্থিতি পায় না অর্থাৎ বেদের মন্ত্রের আদি অন্তে ওঙ্কার শব্দের পাঠ অবশ্যই করা উচিৎ।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ