রোজা - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

20 March, 2026

রোজা

 

কু০ ২।১৮৩-১৮৫

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ١٨٣
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়াবান হতে পারো। মুসলমাদের পূর্ববর্তীরা কারা ছিল, যাদের ওপর এটি ফরজ করা হয়েছিল? https://quran.com/2/183
যদি ইসলাম একটি ইব্রাহিমীয় ধর্ম হয়, তবে কেন এক মাসের রোজা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে এইভাবে পালিত হয় না?
খ্রিস্টান বা ইহুদিরা? তারা তো এভাবে রোজা রাখে না। তোমাদের জন্য রোজার রাতগুলোতে স্ত্রীদের সাথে সহবাস বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক—যেভাবে ইচ্ছা পরিধান করো। কারণ আল্লাহ জানতেন যে তোমরা গোপনে এসব করতে, তাই তিনি তোমাদের ক্ষমা করেছেন এবং তা বৈধ করে দিয়েছেন। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে এই মাসেই কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়া শুরু হয়েছিল।
এই আয়াতে আল্লাহ এই মাসে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এই রমজান কি কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে, নাকি অন্য কিছু? ভিডিও'তে শুনুন>
রোজা

ভিডিও বার্তালাপ > এটি একটি প্রাক্তন মুসলিম নাস্তিকদের চ্যানেল, যা মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের সত্যতা তুলে ধরে তাদের মানবতাবাদী ও যুক্তিবাদী করে তুলতে চেষ্টা করে। আমরা কারো ধর্ম বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে অপমান বা ঘৃণা ছড়ানোর উদ্দেশ্য রাখি না। রুহআফজা, হালুয়া, কাবাব, বিরিয়ানি, সমোসা, শির খুরমা, সেমাই, মিষ্টি এবং খেজুর… না না, আমি কোনো পার্টি দিইনি। আমি শুধু সেহরি ও ইফতারের কথা বলছি, আমি ইসলামের পবিত্রতম মাস—রমজানের কথা বলছি। পবিত্র রমজান কি ইসলাম নিজেই শুরু করেছে, নাকি অপবিত্র বহুদেববাদীরা?

যদি ইসলাম একটি ইব্রাহিমীয় ধর্ম হয়, তবে কেন এক মাসের রোজা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে এইভাবে পালিত হয় না? আজকের এই বিশেষ ভিডিওতে রমজান ও ঈদের এমন কিছু গোপন বিষয় তুলে ধরা হবে, যা হয়তো আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি। তাই ভিডিওর শেষ পর্যন্ত থাকুন এবং মানবতার নামে শুরু করি। হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়াবান হতে পারো। আমাদের পূর্ববর্তীরা কারা ছিল, যাদের ওপর এটি ফরজ করা হয়েছিল?

খ্রিস্টান বা ইহুদিরা? তারা তো এভাবে রোজা রাখে না। তোমাদের জন্য রোজার রাতগুলোতে স্ত্রীদের সাথে সহবাস বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক—যেভাবে ইচ্ছা পরিধান করো। কারণ আল্লাহ জানতেন যে তোমরা গোপনে এসব করতে, তাই তিনি তোমাদের ক্ষমা করেছেন এবং তা বৈধ করে দিয়েছেন। হে আল্লাহ, সবসময়ই কি বিষয়টি যৌনতা নিয়ে? আপনি কি জানেন না যে সবাই বিবাহিত নয় বা সবার দাসী নেই কামনা পূরণের জন্য? এবং এটি কেমন বিচার? কেউ অপরাধ করছিল দেখে আপনি সেই অপরাধকে ক্ষমা করে বৈধও করে দিলেন?

আপনি কি ভয় পেয়েছিলেন যে মানুষ আপনার ধর্ম ছেড়ে যাবে? এখন তোমরা (রাতে) সহবাস করো এবং আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তা কামনা করো, এবং খাও ও পান করো যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা রাতের কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। তারপর রাত পর্যন্ত (অর্থাৎ সূর্যাস্ত পর্যন্ত) রোজা পূর্ণ করো। এবং ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে থাকাকালে তাদের সাথে সহবাস করো না। এগুলো আল্লাহর সীমা, তাই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না। এখানে রাতে খাওয়া, পান করা ও সহবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু দিনে খাওয়া বা পান করা যাবে কি না, তা কি স্পষ্ট? নাকি এটি কোথাও লুকানো আছে? রোজা কি সত্যিই সারাদিন না খেয়ে না পান করে থাকা? আজ আমরা খুব সতর্কভাবে বোঝার চেষ্টা করব যে রমজান কোথা থেকে এসেছে, এর অর্থ কী ছিল এবং কীভাবে ও কেন এটি ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অধ্যায় ২ – হারিয়ে যাওয়া চাঁদের প্রাচীন গল্প। রমজান ইসলামী ক্যালেন্ডারের নবম মাস। মুসলিমরা এটিকে রহমত ও ত্যাগের মাস হিসেবে মানে। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে এই মাসেই কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়া শুরু হয়েছিল।

এই আয়াতে আল্লাহ এই মাসে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এই রমজান কি কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে, নাকি অন্য কিছু? চলুন ইতিহাসে গিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখি এবং এরপর ভিডিওতে রমজানের রহমতের বিষয়টি উন্মোচন করি। সিরিয়ার উত্তর সীমান্ত থেকে মাত্র ২০ কিমি দূরে তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বে হারান নামক একটি স্থান রয়েছে। প্রায় ৪০০০ বছর আগে সুমেরীয় ব্যবসায়ীরা এই শহরের ভিত্তি স্থাপন করেন। শীঘ্রই হারান মেসোপটেমীয় সভ্যতার একটি বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

হারানের বাসিন্দারা বহুদেববাদী ছিল। তারা যে দেবতাদের পূজা করত, তাদের মধ্যে ‘সিন’ নামক এক দেবতা ছিল, যাকে তারা চাঁদের দেবতা বলত। তারা ‘এখুলখুল’ নামে চাঁদের দেবতার একটি মন্দির নির্মাণ করেছিল, যার অর্থ আনন্দের মন্দির। গরম দিনের পর তারা শীতল সন্ধ্যা ও চাঁদের আলো থেকে স্বস্তি পেত। তাই চাঁদের দেবতার গুরুত্ব অন্য দেবতাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এমনকি সূর্য দেবতা ‘শামাশ’-কেও চাঁদের দেবতার পুত্র হিসেবে ধরা হতো। ‘নিংগাল’ ছিল চাঁদের দেবতার স্ত্রী। হারানের পুরাণকথা অনুযায়ী, একবার মার্চ মাসে আকাশ থেকে চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যায়।

মানুষ সন্দেহ করল যে চাঁদ প্লেইয়াডিস নক্ষত্রমণ্ডলে লুকিয়ে গেছে। হারানের মানুষ বহুদিন ধরে চাঁদের দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে থাকে, কিন্তু সে ফিরে আসেনি। শেষ পর্যন্ত চাঁদের দেবতাকে খুশি করে ফিরিয়ে আনার জন্য তারা রোজা রাখা শুরু করে। দিন কেটে যায়, তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়। একদিন উপবাসের পর ডেইর কাদি নামক এলাকায় চাঁদ আবার দেখা যায়। হারানের মানুষের আনন্দের সীমা ছিল না। তারা জাঁকজমকের সাথে চাঁদকে স্বাগত জানায় এবং পরে এই ঘটনাটি বার্ষিক উৎসবে পরিণত হয়।

যেদিন চাঁদ ফিরে আসে, সেই দিনটি বিশেষ উৎসবে পরিণত হয়। তারা এটিকে ‘আল ফেতের’ নামে ডাকত। এখান থেকেই ইসলামি ঈদুল ফিতর ও রমজানের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। অধ্যায় ৩ – কীভাবে রমজান আরবে পৌঁছাল। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৩ সালে নব্য-বাবিলীয় রাজা নাবোনিদুস আরব অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সামরিক অভিযান শুরু করেন। নাবোনিদুস হারানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি চাঁদের দেবতা ‘সিন’-এর বড় ভক্ত ছিলেন।

আরব অঞ্চলে তিনি একের পর এক বিজয় অর্জন করেন। তিনি ‘তাইমা’ নামক স্থানে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে ১০ বছর কাটান। পরে তিনি হারানে ফিরে এসে ‘এখুলখুল’ মন্দিরের সংস্কার করেন। তার জয়ের মধ্যে একটি অঞ্চল ছিল ‘ইয়াথরিব’, যা আজকের মদিনা। নাবোনিদুসের সাথে হারানের সংস্কৃতি, রীতি ও উৎসবও এই অঞ্চলে আসে, যার মধ্যে ‘আল ফেতের’ উৎসবও ছিল।

এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে ইসলামের চাঁদের প্রতীক (হিলাল)-এর শিকড় হারানের সাথে যুক্ত। হারানের এই জনগোষ্ঠীকে ‘সাবিয়ান’ও বলা হতো। কুরআনে সাবিয়ানদের খ্রিস্টান ও ইহুদিদের সমতুল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু কোন সাবিয়ানদের বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। কারণ হারানের সাবিয়ানরা বহুদেববাদী ছিল। এছাড়াও কিছু পৌত্তলিক সম্প্রদায়কেও ইতিহাসবিদরা সাবিয়ান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবার একেশ্বরবাদী মান্দিয়ান সম্প্রদায়কেও সাবিয়ান হিসেবে গণ্য করা হয়।

মান্দিয়ানদের পবিত্র গ্রন্থ ছিল ‘গিনজা রাব্বা’। তারা ‘সাউমা’ নামে উপবাস করত, যেখানে তারা পাপ থেকে দূরে থেকে আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের চেষ্টা করত। ইসলামে ‘সওম’ শব্দটির সাথে এর মিল লক্ষ্য করা যায়। মান্দিয়ানরা নতুন বছরের প্রথম মাসের ষষ্ঠ রাতকে শক্তির রাত হিসেবে পালন করত, যেখানে তারা বিশ্বাস করত স্বর্গের দরজা খুলে যায়। ইসলামের রমজানেও ‘লাইলাতুল কদর’ নামে একটি রাত রয়েছে এবং হাদিসে উল্লেখ আছে যে এই মাসে স্বর্গের দরজা খোলা হয়।

হযরত মুহাম্মদ বা যারা ইসলাম প্রণয়ন করেছেন তারা সাবিয়ানদের বহু ধর্মীয় অনুশীলন গ্রহণ করেছেন। ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, মানুষ মুহাম্মদকে ‘সাবিয়ান’ বলে ডাকত। অধ্যায় ৪ – কীভাবে রমজান ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হলো। ইবন নাদিম তার ‘কিতাব আল-ফিহরিস্ত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে হারানের লোকেরা তাদের চাঁদের দেবতা ‘সিন’-এর জন্য ৩০ দিন উপবাস করত। অন্যান্য ঐতিহাসিকরাও তাদের উপবাস ও উৎসবের কথা বলেছেন।

রমজানের রোজা সেই হারানীয় উপবাসেরই ধারাবাহিকতা। যখন নবী মদিনায় আসেন, তখন তিনি আওস ও খাজরাজ গোত্রের ধর্মীয় রীতি গ্রহণ করে ইসলামি রূপ দেন। তারা প্রতি শুক্রবার ধর্মীয় ভোজ করত, যা পরে ইসলামে পবিত্র দিন হয়ে যায়। এই গোত্রগুলো নবীকে সমর্থন করেছিল। বলা যায়, তাদের সমর্থন না থাকলে ইসলাম আজকের অবস্থায় থাকত না।

ভিডিওর শুরুতে যে আয়াতটির কথা বলা হয়েছিল, সেখানে রাতে খাওয়া ও সহবাসের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু দিনে কী করতে হবে তা স্পষ্ট নয়। বাস্তবে পৌত্তলিকরা ৩০ দিনের উপবাসে দিনে খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকত এবং পুরো মাস যৌনতা থেকেও দূরে থাকত। তারা দিনের বেলায় নীরব থাকত—কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল।

ইসলামে এই ধারণাগুলো পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। কিছু মানুষের মতে, ইসলামে রোজা মানে শুধু নীরব থাকা। কুরআনের একটি আয়াতে মারইয়ামকে খাওয়া ও পান করার অনুমতি দিয়ে বলা হয়েছে যে তিনি যেন কথা না বলেন—এটিকেই তারা নীরবতার রোজা হিসেবে দেখায়।

অধ্যায় ৫ – রমজানের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। রমজানকে বরকতের মাস বলা হয়, কিন্তু অনেক ইসলামি দেশে এই সময় দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। গরমে পানিশূন্যতা ও রক্তে শর্করা কমে যাওয়ায় মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়া কমে যায়। চিকিৎসকদের মতে, অনিয়মিত খাবার ও ঘুমের কারণে উত্তেজনা ও মনোযোগের ঘাটতি বাড়ে।

রমজানে মক্কা-মদিনার সড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। ২০১৭ সালে জেদ্দায় প্রথম ১০ দিনে ২৪৭৮টি জরুরি কল আসে। ২০১৮ সালে মদিনায় এক দুর্ঘটনায় ১০ জন শ্রমিক নিহত হয়। ২০২০ সালে পাকিস্তানে একটি বিমান দুর্ঘটনায় ৯৮ জন মারা যায়, যেখানে পাইলট রোজা রাখছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে।

ভারতেও ২০২১ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু মৃত্যুর ক্ষেত্রে রমজানকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেকে রোজার কারণে টিকা নিতে অস্বীকার করেছিলেন।

রমজানে পানি না খাওয়ার কারণে কিডনির সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় অসুস্থ বা বৃদ্ধ লোকজন সামাজিক চাপের কারণে রোজা রাখেন। কিছু দেশে প্রকাশ্যে খাওয়ার জন্য জরিমানা বা শাস্তি দেওয়া হয়।

সবশেষে বলা হয়—ধর্ম মানুষের তৈরি, এবং মানুষ যদি তা বুঝতে পারে তবে মানবতা ও যুক্তিবাদ দিয়ে জীবন যাপন করা সম্ভব। জীবনের আনন্দ উদযাপনের জন্য কোনো ধর্ম, বই বা ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। মানবতা আপনাকে রক্ষা করুক।


তাফসীর> ১৮৩-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের ঈমানদারগণকে সম্বোধন করে বলেছেন যে, তারা যেন রোযাব্রত পালন করে। রোযার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনের খাটি নিয়তে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকা। এর উপকারিতা এই যে, এর ফলে মানবাত্মা পাপ ও কালিমা থেকে সম্পূর্ণ রূপে পরিষ্কার ও পবিত্র হয়ে যায়। এর সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই রোযার হুকুম শুধুমাত্র তাদের উপরেই হচ্ছে না বরং তাদের পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতিও রোযার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এই বর্ণনার উদ্দেশ্য এটাও যে, উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ) যেন এই কর্তব্য পালনে পূর্বের উম্মতদের পিছনে না পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে প্রত্যেকের জন্যে একটা পন্থা ও রাস্তা রয়েছে, আল্লাহ চাইলে তোমাদের সকলকেই একই উম্মত করে দিতেন; কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করছেন, তোমাদের উচিত যে তোমরা পুণ্যের কাজে অগ্রগামী থাকবে। এই বর্ণনাই এখানেও হচ্ছে যে এই রোযা তোমাদের উপর ঐ রকমই ফরয, যেমন ফরয ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরে। রোযার দ্বারা শরীরের পবিত্রতা লাভ হয় এবং শয়তানের পথে বাধার সৃষ্টি হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে যুবকবৃন্দ! তোমাদের মধ্যে যার বিয়ে করার সামর্থ রয়েছে সে বিয়ে করবে, আর যার ক্ষমতা নেই সে রোযা রাখবে, এটাই তার জন্যে অণ্ডকোষ কর্তিত হওয়া। অতঃপর রোযার জন্যে দিনের সংখ্যা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এটা কয়েকটি দিন মাত্র যাতে কারও উপর ভারী না হয় এবং কেউ আদায়ে অসমর্থ না হয়ে পড়ে; বরং আগ্রহের সাথে তা পালন করে। প্রথমে প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখার নির্দেশ ছিল। অতঃপর রমযানের রোযার নির্দেশ হয় এবং পূর্বের নির্দেশ উঠে যায়। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ আসছে। হযরত মু'আয (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আতা’ (রাঃ), হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-এবং হযরত যহ্হাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোযার নির্দেশ ছিল, যা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে পরিবর্তিত হয় এবং তাদের উপর এই বরকতময় মাসে রোযা ফরয করা হয়।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও পূর্ণ একমাস রোযা ফরয ছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ রমযানের রোযা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরয ছিল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতি এই নির্দেশ ছিল যে, এশার নামায আদায় করার পর যখন তারা শুয়ে যেত তখন তাদের উপর পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হয়ে যেতো। পূর্ববর্তী’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে আহলে কিতাব। এর পরে বলা হচ্ছে-‘রামযান মাসে যে ব্যক্তি রুগ্ন হয়ে পড়ে ঐ অবস্থায় তাকে কষ্ট করে রোযা করতে হবে না। পরে যখন সে সুস্থ হবে তখন তা আদায় করে নেবে। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে যে ব্যক্তি সুস্থ থাকতে এবং মুসাফিরও হতো না তার জন্যেও এই অনুমতি ছিল যে, হয় সে রোযা রাখবে বা রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে এবং একজনের বেশী মিসকীনকে খাওয়ানো উত্তম ছিল। কিন্তু মিসকীনকে ভোজ্য দান অপেক্ষা রোযা রাখাই বেশী মঙ্গলজনক কাজ ছিল। হযরত ইবনে মাসউদ (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এটাই বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ) বলেনঃ নামায ও রোযা তিনটি অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। নামাযের তিনটি অবস্থা হচ্ছেঃ (১) মদীনায় এসে মোল সতেরো মাস ধরে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করা; অতঃপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে মক্কা শরীফের দিকে মুখ করা হয়। (২) পূর্বে নামাযের জন্যে একে অপরকে ডাকতেন এবং একত্রিত হতেন; অবশেষে এতে তারা অসমর্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আবদ-ই-রব্বিহী (রাঃ) নামক একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্ন দেখার মতই আমি স্বপ্ন দেখেছি; কিন্তু যদি বলি যে, আমি নিদ্রিত ছিলাম না তবে আমার সত্য কথাই বলা হবে। (স্বপ্ন) এই যে, সবুজ রঙ্গের হুল্লা (লুঙ্গি ও চাদর) পরিহিত এক ব্যক্তি কিবলার দিকে মুখ করে বলছেন (আরবি) দু’বার। এভাবে তিনি আযান শেষ করেন। ক্ষণেক বিরতির পর তিনি পূর্বের কথাগুলো আবার উচ্চারণ করেন কিন্তু এবারে (আরবি) কথাটি দু’বার অতিরিক্ত বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন-‘বেলালকে (রাঃ) এটা শিখিয়ে দাও। সে আযান দেবে। সুতরাং সর্বপ্রথম হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) এসে এই স্বপ্ন বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু তার পূর্বেই হযরত যায়েদ (রাঃ) এসে গিয়েছিলেন। (৩) পূর্বে প্রচলন এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়াচ্ছেন, তার কয়েক রাকআত পড়া হয়ে গেছে এমন সময় কেউ আসছেন। কয় রাক'আত পড়া হয়েছে এটা তিনি ইঙ্গিতে কাউকে জিজ্ঞেস করছেন। তিনি বলছেন-“এক রাক'আত বা দু'রাকআত ।তিনি তখন ঐ রাকআতগুলো পড়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হচ্ছেন। একদা হযরত মুআয (রাঃ) আসছেন এবং বলছেন-“আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যে অবস্থাতেই পাবো সেই অবস্থাতেই তার সাথে মিলিত হয়ে যাবে এবং যে নামায ছুটে গেছে তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সালাম ফেরাবার পর পড়ে নেবো। সুতরাং তিনি তাই করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর তাঁর ছুটে যাওয়া রাকআতগুলো আদায় করার জন্য দাঁড়িয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, মুআয (রাঃ) তোমাদের জন্যে উত্তম পন্থা বের করেছেন। তোমরাও এখন হতে এরূপই করবে। এই তো হলো নামাযের তিনটি পরিবর্তন।রোযার তিনটি পরিবর্তন এইঃ (১) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন তিনি প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখতেন এবং আশূরার রোযা রাখতেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা (আরবি)অবতীর্ণ করে রমযানের রোযা ফরয করেন। (২) প্রথমতঃ এই নির্দেশ ছিল যে, যে চাইবে রোযা রাখবে এবং যে চাইবে রোযার পরিবর্তে মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি ঐ মাসে (নিজ আবাসে) উপস্থিত থাকে সে যেন তাতে রোযা পালন করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বাড়ীতে অবস্থানকারী হয় এবং মুসাফির না হয়, সুস্থ হয় রুগ্ন না হয়, তার উপর রোযা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তবে রুগ্ন ও মুসাফিরের জন্যে অবকাশ থাকে। আর এমন বৃদ্ধ, যে রোযা রাখার ক্ষমতাই রাখে না সে ‘ফিদইয়াহ' দেয়ার অনুমতি লাভ করে। (৩) পূর্বে রাত্রে দ্রিা যাওয়ার আগে আগে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস বৈধ ছিল বটে; কিন্তু ঘুমিয়ে যাবার পর রাত্রির মধ্যেই জেগে উঠলেও পানাহার ও সহবাস তার জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। অতঃপর একদা সরমা’ নামক একজন আনসারী (রাঃ) সারাদিন কাজ কর্ম করে ক্লান্ত অবস্থায় রাত্রে বাড়ী ফিরে আসেন এবং এশার নামায আদায় করেই তার ঘুম চলে আসে। পরদিন কিছু পানাহার ছাড়া তিনি রোযা রাখেন। কিন্তু তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি:' তখন তিনি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। এদিকে তার ব্যাপারে তো এই ঘটনা ঘটে আর ওদিকে হযরত উমার (রাঃ) ঘুমিয়ে যাওয়ার পর জেগে উঠে স্ত্রী সহবাস করে বসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সাথে এই দোষ স্বীকার করেন। ফলে (আরবি) (২:১৮৭) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং মাগরিব থেকে নিয়ে সুবহে সাদেক পর্যন্ত রমযানের রাত্রে পানাহার ও স্ত্রী সহবাসের অনুমতি দেয়া হয়।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পূর্বে আশূরার রোযা রাখা হতো। যখন রমযানের রোযা ফরয করে দেয়া হয় তখন আর আশূরার রোযা বাধ্যতামূলক থাকে না; বরং যিনি ইচ্ছা করতেন, রাখতেন এবং যিনি চাইতেন না, রাখতেন না।(আরবি) (২:১৭৪)-এর ভাবার্থ হযরত মু'আয (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইচ্ছে করলে কেউ রোযা রাখতেন আবার কেউ রাখতেন না। বরং মিসকীনকে ভোজ্য দান করতেন। হযরত সালমা বিন আকওয়া (রাঃ) হতে সহীহ বুখারী শরীফে একটি বর্ণনা এসেছে" যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় যে ব্যক্তি ইচ্ছে করতো রোযা ছেড়ে দিয়ে ‘ফিদইয়া দিয়ে দিতে। অতঃপর তার পরবর্তী আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এটা ‘মানসূখ’ (রহিত) হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) ও এটাকে মানসূখ বলেছেন। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন যে, এটা মানসূখ নয় বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে বৃদ্ধ পুরুষ বা বৃদ্ধা নারী, যারা রোযা রাখার ক্ষমতা রাখে না। ইবনে আবি লাইলা (রঃ) বলেনঃ “আমি আতা (রঃ)-এর নিকট রমযান মাসে আগমন করি। দেখি যে, তিনি খানা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি বলেনঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি আছে যে, এই আয়াতটি পর্বের আয়াতটিকে মানসূখ করে দিয়েছে। এখন এই হুকুম শুধুমাত্র শক্তিহীন, অচল বৃদ্ধদের জন্যে রয়েছে। মোট কথা এই যে, যে ব্যক্তি নিজ আবাসে আছে এবং সুস্থ ও সবল অবস্থায় রয়েছে তার জন্যে এই নির্দেশ নয়। বরং তাকে রোযাই রাখতে হবে। হাঁ, তবে খুবই বয়স্ক, বৃদ্ধ এবং দুর্বল লোক যাদের রোযা রাখার ক্ষমতা নেই, তারা রোযাও রাখবে না এবং তাদের উপর রোযা কাযাও জরুরী নয়। কিন্তু যদি সে ধনী হয় তবে তাকে কাফফারাও আদায় করতে হবে কি হবে না, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর একটি উক্তি তো এই যে, যেহেতু তার রোযা করার শক্তি নেই, সুতরাং সে নাবালক ছেলের মতই। তার উপর যেমন কাফফারা নেই তেমনই এর উপরও নেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলা কাউকেও ক্ষমতার অতিরিক্ত কষ্ট দেন না। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার দায়িত্বে কাফফারা রয়েছে। অধিকাংশ আলেমেরও সিদ্ধান্ত এটাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীগণের তাফসীর হতেও এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ)-এর এটাই পছন্দনীয় মত। তিনি বলেন যে, খুব বেশী বয়স্ক বৃদ্ধ যার রোযা রাখার শক্তি নেই সে ‘ফিদইয়াই দিয়ে দেবে। যেমন হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) শেষ বয়সে অত্যন্ত বার্ধক্য অবস্থায় দু'বছর ধরে রোযা রাখেননি এবং প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একটি মিসকীনকে গোশত-রুটি আহার করাতেন।মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা' গ্রন্থে রয়েছে যে, যখন হযরত আনাস (রাঃ) রোযা রাখতে অসমর্থ হয়ে পড়েন তখন রুটি ও গোশত তৈরি করে ত্রিশ জন মিসকীনকে আহার করিয়ে দেন। অনুরূপভাবে গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী স্ত্রীলোকেরা যখন তাদের নিজেদের ও সন্তানদের জীবনের ভয় করবে এদের ব্যাপারেও ভীষণ মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, তারা রোযা রাখবে না, বরং ফিদইয়া’ দেবে এবং যখন ভয় দূর হয়ে যাবে তখন রোযাও কাযা করে নেবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, শুধু ফিদইয়া যথেষ্ট, কাযা করার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ আবার বলেন যে, রোযাই রাখবে, ফিদইয়া’ বা কাযা নয়।

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

রোজা

  কু০ ২।১৮৩-১৮৫ يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتّ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ