ঋগ্বেদর প্রথম মন্ত্র - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

30 March, 2026

ঋগ্বেদর প্রথম মন্ত্র

ও৩ম্
ঋগ্বেদ এর প্রথম মন্ত্র এর ভাষ্য
[ভাষ্যকার : আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক]

अ॒ग्निमी॑ळे पु॒रोहि॑तं य॒ज्ञस्य॑ दे॒वमृ॒त्विज॑म्। होता॑रं रत्न॒धात॑मम्॥

ওম্ অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্।। [ঋগ্বেদ ১.১.১ ]

ভূমিকা

চারো বেদ জ্ঞান একই সময়ে চার ঋষিদের অন্তঃকরণে সমাধি অবস্থায় প্রকাশিত হয় অর্থাৎ সেই ঋষিরা সমাধি অবস্থায় ব্রহ্মাণ্ড থেকে বেদমন্ত্র রূপী ছন্দ রশ্মিগুলিকে নিজের যোগস্থ মন দ্বারা বেছে-২ করে গ্রহণ করে, সেই ছন্দ রশ্মিগুলির পদগুলির অর্থ এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত পদার্থগুলির জ্ঞান ঈশ্বর সঙ্গে-সঙ্গে করায়।

চারো বেদগুলির মধ্যে ঋগ্বেদ সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়। এতে সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থগুলির গুণ-কর্ম-স্বভাবগুলির বিবেচন হয়। চারো বেদগুলির প্রথম মন্ত্রগুলির রচনা কে দেখে আমাদের এমন মত হয় যে যদিও চারো বেদ সমকালীন হয়, পুনরপি বেদমন্ত্রগুলিকে গ্রহণ করার প্রক্রিয়া এর প্রারম্ভ ঋগ্বেদ থেকেই হয় হবে, যদিও এগুলির সমাপ্তি সঙ্গে-সঙ্গে হয়েছে হয়। যদিও মনুস্মৃতি আদি শাস্ত্রগুলির ব্যাহতিসহ গায়ত্রী মন্ত্র (সাবিত্রী মন্ত্র) উচ্চারণ করার মহিমাকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য বহু শাস্ত্রেও এই মন্ত্রের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। এর সমান মহিমা অন্য কোনো মন্ত্রের কোথাও শোনা ও পড়া যায় না। ঋষি দয়ানন্দের মহান গুরু দণ্ডী শ্রী স্বামী বিরজানন্দ সরস্বতী এই মন্ত্রেরই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জপ করতেন। ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী জির কাছে ‘বিশ্বানি দেব সবিত ...’ এই মন্ত্র প্রিয় ছিল, কিন্তু জপের জন্য তিনিও গায়ত্রী মন্ত্রকেই প্রধানতা দিতেন।

এখানে প্রশ্ন এই উঠে যে তাহলে ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রে এমন কী বিশেষতা আছে যে এই মন্ত্রই সর্বপ্রথম প্রাদুর্ভূত হল? যদি এই মন্ত্র বিশেষ হয়, তবে এর কী অর্থ?

আসুন, আমরা পৃথিবীতে মানবোৎপত্তির সময়ের পরিস্থিতির উপর কিছু স্থূল চিন্তা করি। মানুষের প্রথম প্রজন্মের সদ্যই যৌবনাবস্থায় ভূমি থেকে প্রাদুর্ভাব হয়েছে। এর পূর্বে সমগ্র পৃথিবী জলচর, নভচর, স্থলচর সকল প্রাণী, বনস্পতি, ফুল ও ফলের সঙ্গে অত্যন্ত শুদ্ধ বায়ুমণ্ডল, নদী এবং সরোবরগুলিতে অত্যন্ত পবিত্র জল প্রভৃতি দ্বারা যুক্ত ছিল। ভূমি-আকাশ সব কিছু সম্পূর্ণ শুদ্ধ, সর্বত্র অক্সিজেনের পরিপূর্ণ মাত্রা, ফল ও মূলগুলিতে প্রচুর পুষ্টিকতা, এটাই ছিল সেই সময় এই পৃথিবীর পরিবেশ। সব কিছু সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবর্ধক এবং সুষম অবস্থায় ছিল। সমস্ত প্রাণী ও বনস্পতি সম্পূর্ণরূপে নিরোগ, বিশালকায় ও বলবান ছিল।

সেই সময়ের প্রথম প্রজন্ম যদিও নৈমিত্তিক জ্ঞান থেকে বিহীন ছিল, কিন্তু তাদের সকলের স্বাভাবিক জ্ঞান বর্তমান জন্মানো শিশুদের তুলনায় অথবা জন্মানো শিশুকে যদি যৌবনাবস্থা পর্যন্ত একান্তে রাখা হয়, সেইরূপ এক যুবকের তুলনায় অধিক এবং পবিত্র ছিল। এই কারণে তাদের বুদ্ধি খুব সূক্ষ্ম এবং গভীর ছিল। পুনরপিও তাদের নৈমিত্তিক জ্ঞানের পরম প্রয়োজন ছিল, কিন্তু পশু-পাখিদের অতিরিক্ত এমন কোনো প্রাণী ছিল না, যার থেকে প্রথম প্রজন্মের মানুষ কিছু জ্ঞান প্রাপ্ত করতে পারে এবং পশু-পাখিদের থেকে তাদের জ্ঞান নেওয়ার কোনো প্রয়োজনও ছিল না, কারণ তারা তাদের তুলনায় জ্ঞানের দৃষ্টিতেও উন্নতই উৎপন্ন হয়েছিল। এমন অবস্থায় এই প্রশ্ন স্বাভাবিক যে সর্বপ্রথম কোন্‌ ছন্দ রশ্মির গ্রহণ হল এবং নৈমিত্তিক জ্ঞানের উৎস পরমাত্মা সেই মন্ত্রের কী অর্থ সুপারিশ করলেন?

এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মন্ত্রের ভাষ্য থেকেই প্রাপ্ত হতে পারবে।

এখন আসুন, মন্ত্রের উপর চিন্তা করি—

ঋষি, দেবতা ও ছন্দ

এই মন্ত্রের ঋষি মধুচ্ছন্দা। [ মধু = প্রাণো বৈ মধু (শ.6.4.3.2), মধু ধমতের্বিপরীতস্য (নি.10.31), ছন্দ ধমতি অর্চতিকর্মা (নিঘং.3.14), গতিকর্মা (নিঘং.2.14), বধকর্মা (নিঘং.2.19) ]

এর অর্থ এই যে এই ছন্দ রশ্মি এমন এক বিশেষ প্রাণ রশ্মি, যা আলোকযুক্ত হয়ে গমন করে এবং যে কোনো বাধক পদার্থকে নষ্ট করে, প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মি দ্বারা আচ্ছাদিত হয়, তা থেকেই উৎপন্ন হয়। এর দেবতা অগ্নি এবং ছন্দ গায়ত্রী। এই কারণে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাব দ্বারা অগ্নি তত্ত্ব তেজস্বী এবং বলবান হয়। এখানে অগ্নি তত্ত্ব দ্বারা বহু পদার্থের বোধ হয়, এমন জানা উচিত, যাদের বিষয়ে আমরা ভাষ্যে আলোচনা করব, কারণ মন্ত্রেও অগ্নি পদ বিদ্যমান আছে।

এখন আমরা এই মন্ত্রের দুই প্রকারের ভাষ্য প্রদর্শন করি, যাদের মধ্যে সর্বপ্রথম আধিদৈবিক ভাষ্য করব, কারণ এই ভাষ্য যে কোনো মন্ত্ররূপ ছন্দ রশ্মির এই সৃষ্টিতে হওয়া তার প্রভাব এবং সৃষ্টির পদার্থগুলির স্পষ্ট বোধ করায়।

আধিদৈবিক ভাষ্য

(যজ্ঞস্য) [ যজ্ঞম্ = ক্রিয়াকাণ্ডজন্যং সংসারম্ (ম.দ.য. ভা.2.21), সঙ্গতঃ সংসারঃ (ম.দ.ঋ. ভা.1.18.7)] ‘যজ্ঞ’ শব্দ ‘যজ্ঞ দেবপূজাসঙ্গতিকরণদানেষু’ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয় অর্থাৎ যাতে বিভিন্ন দেব পদার্থের পূজা অর্থাৎ তাদের সমুচিত ব্যবহার, তাদের পারস্পরিক সংগতিকরণ এবং তাদের গ্রহণ ও বিসর্জন প্রভৃতি কর্ম হয়, তাকে যজ্ঞ বলে। এই সৃষ্টিতে সর্বত্র এমনই হচ্ছে। এই কারণে এই সমগ্র সৃষ্টি যজ্ঞরূপ, যেমন ঋষি দয়ানন্দের এই উদ্ধরণগুলি থেকে স্পষ্ট। সেই এমন সৃষ্টি-যজ্ঞের প্রধান সাধক পদার্থ এই সেই প্রথম শব্দ, যা মানুষের মস্তিষ্কে সর্বপ্রথম এসেছে। এই পদের বিষয়ে ঋষিদের বক্তব্য হল—

(অগ্নিম্) [অগ্নিঃ = অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীর্ ভবতি। অংগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে। অঙ্গং নয়তি সন্নমমানঃ। (নি.7.14), অগ্নির্ বৈ দেবানাং বসিষ্ঠঃ (ঐ.1.28), অগ্নি বৈ দেবানাং মুখং প্রজনয়িতা স প্রজাপতিঃ (শ.3.9.1.6), অগ্নিরেব ব্রহ্মা (শ.10.4.1.5), বাগেবাগ্নিঃ (শ.3.2.2.13), মন এবাগ্নিঃ (শ.10.1.2.3),আত্মৈবাগ্নিঃ (শ.6.7.1.20)]

এই বাক্যগুলি থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে এটি সেই পদার্থ, যার সৃষ্টি-রচনায় সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয়। সৃষ্টি নির্মাণের পৃথক-পৃথক স্তরে ‘অগ্নি’ পদের পৃথক-পৃথক অর্থ হয়, কারণ পৃথক-পৃথক স্তরে প্রাথমিক উপাদান পৃথক-পৃথক হয়। এজন্য যখন মূল উপাদান কারণ প্রকৃতি-ই বিদ্যমান থাকে, তখন ‘অগ্নি’-র অর্থ বাক্ তত্ত্ব অর্থাৎ পরা ‘ওম্’ রশ্মি মানা উচিত, কারণ এই রশ্মিই প্রকৃতিতে প্রাথমিক স্পন্দন উৎপন্ন করে।

দ্বিতীয় চরণে ‘অগ্নি’-র অর্থ মনস্তত্ত্ব (মহৎ) মানা উচিত, কারণ এটিই সৃষ্টির সর্বপ্রথম পদার্থ, যার ছাড়া আগামী সৃষ্টি অসম্ভব।

তৃতীয় চরণে ‘অগ্নি’ পদের অর্থ আত্মা অর্থাৎ সূত্রাত্মা বায়ু, যা পদার্থকে সংঘনিত করা আরম্ভ করে। ‘অগ্নি’ পদের চতুর্থ অর্থ হল— ‘প্রাণ’, যার প্রাণাপান প্রভৃতি দশ ভেদ আছে। ‘অগ্নি’-র পঞ্চম অর্থ হল ব্রহ্ম এবং এখানে ‘ব্রহ্ম’-র অর্থ হল— বল, যেমন মহর্ষি তিত্তির বলেছেন—
বলম্ বৈ ব্রহ্মা (তৈ.ব্রা. 3.8.5.2)। বল সেই গুণ, যার সৃষ্টি-রচনার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয়। পরা ‘ওম্’ রশ্মি উৎপন্ন হতেই বল গুণ উৎপন্ন হয়ে যায়।

এই সমস্ত পদার্থ সমস্ত দেব পদার্থকে বসানো এবং উৎপন্ন করার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, এজন্য অগ্নিকে দেবদের বসিষ্ঠ বলা হয়েছে। এই পদার্থগুলিই বিভিন্ন দেব পদার্থের মুখরূপও, কারণ সব প্রকারের দেব পদার্থ ছন্দ, কণ, বিকিরণ, আকাশ প্রভৃতি এই পদার্থগুলি থেকেই শক্তি প্রাপ্ত করে এবং এগুলিই সকলকে উৎপন্ন, পরিচালিত এবং সংরক্ষিতকারী হয়। এই পদার্থগুলি থেকে স্থূল অগ্নির আরও দুই পদার্থ আছে।

প্রথম অর্থাৎ পঞ্চম অর্থ হল ‘বিদ্যুৎ’, যার উৎপন্ন হওয়ার দ্বারা সমস্ত কণ-বিকিরণ প্রভৃতি উৎপন্ন হওয়া আরম্ভ হয়। বিদ্যুতের উৎপত্তি ছাড়া এদের উৎপত্তি সম্ভব নয়। যদিও আমরা বলকে পঞ্চম পদার্থ লিখে ফেলেছি, কিন্তু বল দ্রব্য না হয়ে গুণ, এই কারণে তাকে পৃথক ধরে বিদ্যুৎকে পঞ্চম পদার্থ লেখা হয়েছে।

দ্বিতীয় অর্থাৎ ষষ্ঠ অর্থ হল— ‘ঊষ্মা’, এর উৎপত্তি ছাড়াও সৃষ্টিতে কোনো পদার্থ নির্মিত হতে পারে না। এখানে ছন্দ এবং রশ্মিগুলির আলোচনা এই কারণে করা হয়নি, কারণ এদের গ্রহণ বাক্ তত্ত্ব থেকেই হয়ে যায়।

এইভাবে এই ছয় পদার্থরূপী অগ্নি তত্ত্ব, যার বিশেষণগুলির আলোচনা এই মন্ত্রে ক্রমানুসারে নিম্নলিখিত প্রকারে করা হয়েছে—

  1. পুরোহিতম্- [ পুরোহিতঃ = যঃ পুরস্তাত্ সর্বং জগদ্ দধাতি, ছেদন ধারণা-আ কर्षণাদিগুণাংশ্চাপি তম্ (অগ্নিম্ = পরমেশ্বরং ভৌতিকং বা), পুরোহিতঃ পুর এনং দধতি (নি.2.12), প্রথমঃ পুরোহিতমিতি পুর এবং বা এনমেতদ্ দধতে। যদগ্নিমাদধতে। (জৈ.3.63)] অর্থাৎ যে পদার্থকে অন্যান্য পদার্থ সম্মুখে ধারণ করে নানা প্রকারের বল প্রাপ্ত করে, সেই পদার্থগুলিকে পুরোহিত বলা
    হয়। অগ্নি নামক উপরিউক্ত সমস্ত পদার্থ পুরোহিত কেমন করে বলা হয়? এ বিষয়ে আমরা ক্রমানুসারে চিন্তা করি—

(ক) বাক্ তত্ত্ব— সৃষ্টির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম পদার্থ, সে রশ্মি হোক অথবা কোনো তরঙ্গ প্রভৃতি, তারা যখন নিজেদের সম্মুখে অথবা নিজেদের সঙ্গে ‘ওম্’ রশ্মিকে ধারণ করে, তখনই তারা সৃষ্টির সূক্ষ্মতম বলকে প্রাপ্ত হয়ে অগ্রিম যজন প্রক্রিয়া আরম্ভ করতে পারে। স্থূল পদার্থ, যা নিজেরাই রশ্মি প্রভৃতি সূক্ষ্ম
পদার্থ দিয়ে গঠিত, তারা নিজেদের অবয়বভূত সূক্ষ্ম রশ্মিগুলির দ্বারা সূক্ষ্মতম ‘ওম্’ রশ্মিকে ধারণ করেই বিভিন্ন প্রকারের বল প্রাপ্ত করতে পারে, অন্যথায় সৃষ্টিতে কোনো বল উৎপন্নই হতে পারে না। ঋষি দয়ানন্দ বেদ ভাষ্যে ‘পুরোহিত’ পদ থেকে আটটি গুণ গ্রহণ করেছেন— রূপ, দাহ, প্রকাশ, বেগ, ছেদন, ধারণ এবং আকর্ষণ প্রভৃতি। এখানে ‘আদি’ শব্দ থেকে প্রতিকর্ষণ গুণ গ্রহণ করা উচিত। এই আটটি গুণের মধ্যে একটি গুণও তখন পর্যন্ত প্রকাশিত হতে পারে না, যতক্ষণ না কোনো পদার্থ ‘ওম্’ রশ্মি দ্বারা যুক্ত হয়। মনে রাখতে হবে যে প্রত্যেক পদার্থের ভিতরে ‘ওম্’ রশ্মি ব্যাপ্ত থাকে, এর পরেও যতক্ষণ না সেই পদার্থ অন্য কোনো পদার্থের ‘ওম্’ রশ্মিকে নিজের সঙ্গে ধারণ করে মিলিত হবে, ততক্ষণ তাদের মিলন সম্ভব হবে না অর্থাৎ ততক্ষণ কোনো বল উৎপন্ন হবে না। এই কারণে বাক্ রূপ অগ্নিকে এখানে
পুরোহিত বলা হয়েছে। অন্যান্য ছন্দ রশ্মিগুলির বিষয়েও এইরূপেই পুরোহিত গুণের সম্পর্ক বোঝা উচিত।

(খ) মন— এই সৃষ্টিতে পরা ‘ওম্’ রশ্মি ছাড়া সমস্ত রশ্মিই মনস্তত্ত্বেই উৎপন্ন হয়। মনস্তত্ত্বে রশ্মিগুলি সেইরূপেই উৎপন্ন বা স্পন্দিত হয়, যেমন জলে ঢেউ উৎপন্ন হয়। এই কারণে বাক্ রশ্মিগুলির সমস্ত কার্য মনস্তত্ত্বেরই কার্য। এই জন্য মহর্ষি জৈমিনিকে বলতে হয়েছে— ‘বাগিতি মনঃ’ (জৈ.উ. 4.11.1.11)
এবং মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন— ‘বাক্ চ বৈ মনশ্চ দেবানাং মিথুনম্’ (ঐ.5.23)। এইরূপে বাক্ তত্ত্ব মনস্তত্ত্ব ছাড়া উৎপন্নই হতে পারে না, এই কারণে মনস্তত্ত্বরূপ অগ্নিকেও পুরোহিতরূপ বলা হয়েছে।

(গ) আত্মা (সূত্রাত্মা বায়ু)— এই সৃষ্টিতে যেখানে কোথাও দুই রশ্মির সংযোগ হয়, সেখানে ‘ওম্’ রশ্মির পরে যদি কোনো রশ্মির সবচেয়ে প্রধান এবং প্রাথমিক ভূমিকা থাকে, তবে তা সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মিরই। এর
ছাড়া বলের কল্পনাই সম্ভব নয়। যখন কোনো কণ, তরঙ্গ বা রশ্মি অন্য কোনো কণ, তরঙ্গ বা রশ্মির সঙ্গে সংযোগ করে, তখন তাদের ভিতরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু সম্মুখে উপস্থিত পদার্থের বাইরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মিগুলির সঙ্গেই যুক্ত হয়। ‘পুরোহিত’ শব্দ থেকে অগ্নির যে আটটি গুণ দেখানো হয়েছে, তাদের মধ্যে একটি গুণও সূত্রাত্মা বায়ু ছাড়া কখনও প্রকাশিত হতে পারে না। এজন্য সূত্রাত্মা বায়ুরূপ অগ্নিও পুরোহিত বলা হয়।

(ঘ) প্রাণ— দুই পদার্থের সংযোগ এবং বিয়োগের প্রক্রিয়ায় সূত্রাত্মা বায়ুর পরে যে পদার্থের স্থান, তা হল— প্রাণ তত্ত্ব অর্থাৎ প্রাণ, আপান, ব্যান, সমান, উদান, নাগ, কূর্ম, কৃকল, দেবদত্ত এবং ধনঞ্জয়— এদেরই ভূমিকা থাকে। পূর্বোক্ত আটটি গুণের মধ্যে প্রত্যেক গুণের উৎপত্তিতে কোনো না কোনো প্রাণ রশ্মির থাকা অনিবার্য। এই রশ্মিগুলিও বিভিন্ন পদার্থের যজন ক্রিয়ায় সর্বদা সেই পদার্থগুলির সম্মুখে প্রকাশিত হয়ে সেই ক্রিয়াগুলি সম্পাদন করে।

(ঙ) বিদ্যুৎ— এই সৃষ্টিতে প্রত্যেক যজন ক্রিয়াকে সম্পন্ন করতে বিদ্যুতের অনিবার্য ভূমিকা থাকে। সেই বিদ্যুৎ ধনাবেশ, ঋণাবেশ অথবা উদাসীন— যে কোনো রূপে হতে পারে। বৈদিক বিজ্ঞানে ‘বিদ্যুৎ’ শব্দের অর্থ খুব ব্যাপক, যা আধুনিক বিজ্ঞানে নেই। গুরুত্বাকর্ষণ বলও বিদ্যুতেরই একটি রূপ। এইভাবে সমস্ত পদার্থ বিদ্যুতের কোনো না কোনো রূপ অবশ্যই ধারণ করে থাকে। পূর্বোক্ত আটটি গুণের উৎপত্তিও বিদ্যুৎ ছাড়া সম্ভব নয়। এই কারণে এটিও পুরোহিতরূপ।

(চ) ঊষ্মা— সমস্ত পদার্থের সমস্ত প্রকারের ক্রিয়াগুলি ঊষ্মার বিদ্যমানতায়ই হয়, যদিও সেই ঊষ্মার পরিমাণ যতই কম কেন না হোক। অনন্ত শীতল প্রকৃতিতে কোনো ক্রিয়া অথবা বলের থাকা সম্ভব নয় এবং এদের ছাড়া পূর্বোক্ত আটটি গুণের প্রকাশ হওয়াও সম্ভব নয়। এই কারণে ঊষ্মাকেও পুরোহিত বলা হয়েছে।

  1. দেবম্— [দেবম্ = দেবো দানাদ্ বা। দীপনাদ্ বা। দ্যোতনাদ্ বা। দ্যুস্থানো ভবতীতি বা। যো দেবঃ সা দেবতা। (নি.7.15)] অর্থাৎ যে পদার্থ বল প্রভৃতি দেওয়ার, নিজে প্রকাশিত এবং অন্যদের প্রকাশিত করার এবং দ্যুস্থানে থাকে, তাকে দেব বলা হয়। এখানে ‘দ্যু’-র অর্থ [দ্যৌঃ = বাগিতি দ্যৌঃ (জৈ.উ.4.22.11), দ্যৌরেবাত্মা (শ.6.3.3.15), ঐন্দ্রী দ্যৌঃ (তা. 15.4.8), আপো বৈ দ্যৌঃ (শ.6.4.1.9), প্রাণো বৈ দিবঃ (শ.6.7.4.3)] প্রসঙ্গ অনুযায়ী পৃথক-পৃথক হয়। যা অগ্নিবাচী সমস্ত ছয় পদার্থের সঙ্গে ঘটতে পারে। যেমন ‘ওম্’ রশ্মি পরমাত্মায় বিদ্যমান। মনস্তত্ত্ব ‘ওম্’ রশ্মি এবং পরমাত্মায় বিদ্যমান। প্রাণ রশ্মিগুলিও সূত্রাত্মা বায়ুতে বিদ্যমান, সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি বাক্ অর্থাৎ ‘ওম্’ রশ্মিতে বিদ্যমান, বিদ্যুৎ প্রাণ রশ্মিগুলিতে বিদ্যমান এবং ঊষ্মা বিদ্যুতে বিদ্যমান। এই কারণে দেবরূপ অগ্নিকে দ্যুস্থানে বলা হয়েছে।

  2. ঋত্বিজম্— [ঋত্বিক্ = ঋত্বিক্ কস্মাত্। ঈরণঃ। ঋগ্যষ্টা ভবতীতি শাকপূণিঃ। ঋতুযাজী ভবতীতি বা।] পূর্বোক্ত অগ্নিবাচী সমস্ত ছয় পদার্থ ঋত্বিক্ এই কারণে বলা হয়, কারণ এরা অগ্রবর্তী স্তরের পদার্থগুলিকে প্রেরিতকারী হয়। এর সঙ্গে এরা সকলেই সূক্ষ্ম থেকে বৃহৎ ছন্দ রশ্মিগুলির যজনকারী হয়। এই যজন থেকে সমস্ত পদার্থ ক্রমশ উৎপন্ন হয়। এরা সকল পদার্থ যথাসময়ে প্রকাশিত হয়ে যজন প্রক্রিয়াগুলি সম্পাদন করে। এই কারণে সমস্ত পদার্থ ঋত্বিক্ বলা হয়।

  3. হোতারম্— [হোতা = হোতারং হ্বাতারম্ (নি.7.15), আত্মা বৈ যজ্ঞস্য হোতা (কৌ.9.6), বাগ্বৈ হোতা (কৌ.13.9.17.7), মনো হোতা (তৈ.ব্রা.2.1.5.9) প্রাণো বৈ হোতা (ঐ.6.8), ক্ষত্রং বৈ হোতা (ঐ.6.21)]

পূর্বোক্ত অগ্নিবাচী সমস্ত পদার্থ হোতারূপও হয়, কারণ এই সমস্ত পদার্থ অন্য পদার্থগুলিকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। ‘ওম্’ রশ্মি, মনস্তত্ত্ব, সূত্রাত্মা বায়ু এবং প্রাণ রশ্মিগুলি সকলেই আকর্ষণ গুণে যুক্ত। বিদ্যুৎ এবং ঊষ্মাও আকর্ষণ অথবা ভেদন অথবা উভয় গুণে যুক্ত হওয়ার কারণে ক্ষত্ররূপ বলা হয়। এই কারণেই তারা হোতারূপও হয়।

  1. রত্নধাতমম্— [রত্নম্ = রময়তি হর্ষয়তীতি রত্নম্ (উ.কো.3.14), রত্নম্ ধননাম (নিঘং.2.10)] অগ্নিবাচী পূর্বোক্ত সমস্ত পদার্থ রত্নধা-ও বলা হয়, কারণ এই সমস্ত পদার্থ নিজেদের থেকে সূক্ষ্ম অন্যান্য পদার্থকে ধারণ করতে শ্রেষ্ঠ হয়। আমরা এখানে ক্রমানুসারে এই বিষয়টি স্পষ্ট করি—

(ক) ‘ওম্’ রশ্মি— এই রশ্মি সমস্ত পদার্থকে উৎপন্ন ও তৃপ্তকারী এবং মূল উপাদান পদার্থ প্রকৃতিকে ধারণকারী হওয়ায় রত্নধাতম বলা হয়। এর থেকে অধিক নিকটতা দিয়ে প্রকৃতিকে ধারণকারী অন্য কোনো পদার্থ এই সৃষ্টিতে নেই।

(খ) মনস্তত্ত্ব— ওম্ রশ্মিগুলি, যা সকলের তৃপ্তিকারিণী, তাদের ধারণকারীদের মধ্যে এটি শ্রেষ্ঠতম।

(গ) সূত্রাত্মা বায়ু— এই রশ্মি সকলের তৃপ্তিকারিণী ‘ওম্’ রশ্মি এবং মনস্তত্ত্বকে ধারণকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

(ঘ) প্রাণ— পূর্বোক্ত তিনটি পদার্থ, যা পরবর্তী পদার্থগুলিকে তৃপ্ত করে, তাদের ধারণকারীদের মধ্যে প্রাণ শ্রেষ্ঠতম।

(ঙ) বিদ্যুৎ— পূর্বোক্ত সমস্ত পদার্থ, যা নিজেদের থেকে স্থূল পদার্থগুলিকে তৃপ্তকারী, তাদের সকলকে ধারণকারীদের মধ্যে বিদ্যুৎ শ্রেষ্ঠতম।

(চ) ঊষ্মা— ঊষ্মাযুক্ত পদার্থ এই পাঁচটি পদার্থকে ধারণকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

ধ্যানযোগ্য যে এখানে যেসব পদার্থকে তৃপ্তিকারী বলা হয়েছে, তারা সমস্ত পদার্থকে ক্রিয়াশীল করতেও সক্ষম। এই কারণে তারা ‘রত্ন’ বলা হয়। সেই রত্নরূপ পদার্থগুলিকে ধারণকারী পদার্থ রত্নধা বলা হয় এবং বহু রত্নধা পদার্থের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ হয়, তাকে রত্নধাতম বলা হয়।

(ইळे) স্তুবে যাছে অধীচ্ছামি প্রেরয়ানি বা অর্থাৎ আমি এই উপরিউক্ত অগ্নিকে, যা উপরিউক্ত বিশেষণগুলি দ্বারা বিভূষিত হয়, তাকে প্রকাশ করি, তাদের আকর্ষণ করার বারবার ইচ্ছা করি। এখানে করণকারী কর্তা এই মন্ত্রের ঋষি মধুচ্ছন্দা, যার ব্যাখ্যা আমরা প্রারম্ভেই করে ফেলেছি অর্থাৎ এই মধুচ্ছন্দা
রশ্মিগুলি অগ্নির ছয়টি রূপের মধ্যে কোনো একটিকে প্রকাশ করে, কোনো একটিকে আকর্ষণ করে এবং কোনো একটিকে প্রেরিতও করে। এই ঋষি রশ্মিগুলি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ছন্দ রশ্মিগুলিও এই সমস্ত কার্য্যে পূর্ণ সহযোগ করে।

ভাবার্থ
সমগ্র সৃষ্টি বিভিন্ন সূক্ষ্ম তত্ত্বের মিলনে নির্মিত, এই কারণে এটি যজ্ঞরূপই। এই যজ্ঞের প্রধান উপাদান অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন তত্ত্বের পরিচায়ক। এই পদার্থগুলি ক্রমানুসারে এইরূপে মানা যেতে পারে— ‘ওম্’ রশ্মি, মনস্তত্ত্ব, সূত্রাত্মা বায়ু, প্রাণ তত্ত্ব, বিদ্যুৎ এবং ঊষ্মা। এই সমস্ত তত্ত্ব প্রত্যেক পদার্থকে নিজেদের সম্মুখে ধারণ করে তাতে নানা প্রকারের প্রয়োজনীয় বল উৎপন্ন করে। রূপ, দাহ, প্রকাশ, বেগ, ছেদন প্রভৃতি গুণের জন্যও এই তত্ত্বগুলিই নিজেদের নিজ নিজ স্তরে প্রথম দায়িত্বশীল হয়। এই পদার্থগুলিই নিজেদের তুলনায় সূক্ষ্ম পদার্থে অবস্থান করে নিজেদের গুণ ও কর্ম প্রকাশ করে। সৃষ্টির বিভিন্ন ক্রিয়ায় যখন-যখন যে-যে পদার্থের প্রয়োজন হয়, তখন-তখন তারা প্রকাশিত হতে থাকে। এই পদার্থগুলিই নিজেদের তুলনায় সূক্ষ্ম পদার্থগুলিকে সর্বদা নিজেদের ভিতরে ধারণ করে থাকে। এই ছন্দ রশ্মিকে উৎপন্নকারী ঋষিরূপ রশ্মিগুলি এমন সমস্ত পদার্থের মধ্যে কিছুদের আকর্ষণ করে, আবার কিছুদের প্রেরিত করতে থাকে। সমগ্র সৃষ্টি এই ছয়টি প্রধান পদার্থ দ্বারা খেলা হওয়া ঈশ্বরের খেলা।

এই মন্ত্রে সৃষ্টি-নির্মাণের প্রধান উপাদান, তাদের প্রেরক প্রভৃতির সংক্ষেপে বর্ণনা আছে। মানুষের প্রথম প্রজন্ম যখন এই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করল অথবা ব্রহ্মাণ্ডে কোথাও জন্ম গ্রহণ করল, তখন সেই সময়
মানুষ কৌতূহলবশে এই সৃষ্টিকে দেখল, তখন তার এর বিষয়ে কিছুই জ্ঞান ছিল না এবং তাকে বলার মতো অর্থাৎ তার থেকে বুদ্ধিমান অন্য কোনো প্রাণীও ছিল না। সেই সময় অগ্নি ঋষি ব্রহ্মাণ্ড থেকে যে ছন্দ রশ্মিগুলি সমাধি অবস্থায় গ্রহণ করেছিলেন, সেই রশ্মিগুলির মধ্যে এটি প্রথম রশ্মি ছিল, যা সৃষ্টির সার বলার জন্য অপরিহার্য ছিল এবং এই শব্দগুলির জ্ঞান অগ্নি ঋষিকে ঈশ্বর দ্বারা হয়েছে, এমন আমরা লিখেছি। মানুষ সৃষ্টিতে কীভাবে থাকবে, সৃষ্টির পদার্থগুলির কীভাবে ব্যবহার করবে এবং সৃষ্টিকে জেনে ঈশ্বরকে কীভাবে জানবে ও প্রাপ্ত করবে, এই সবের জন্য সৃষ্টির জ্ঞান অপরিহার্য।

এখন আমরা এর আধিভৌতিক অর্থ উপস্থাপন করছি—

আধিভৌতিক ভাষ্য

(যজ্ঞস্য) [ যজ্ঞম্ = অনেকবিধব্যবহারম্ (ম.দ.য. ভা.29.36), বিদ্যাপ্রজ্ঞাপ্রবর্ধকম্ (ম.দ.ঋ. ভা. 4.34.1) ] এই সৃষ্টির সমগ্র বিজ্ঞানকে জানার এবং প্রজ্ঞাকে বৃদ্ধি করার এবং সমস্ত প্রকারের লৌকিক আচরণকে
জানার, (অগ্নিম্) [অগ্নিঃ = অগ্নিরেব ব্রহ্ম (শ. 10.4.1.5), বিশ্বোপকারক (ম.দ.ঋ. ভা. 1.76.2) ] বেদ অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টির বিজ্ঞান এবং ব্রহ্মকে জানেন, সমগ্র প্রাণিজগতের মঙ্গল কামনা করেন এমন মহাবিদ্বান্,
(পুরোহিতম্) যিনি নিজের সম্মুখে আগত যে কোনো মানুষ বা প্রাণীর সর্বদা মঙ্গল সাধনে প্রবৃত্ত থাকেন।

(দেবম্) [ দেবঃ = দিব্যগুণসম্পন্নো বিদ্বান্ (ম.দ.ঋ. ভা.1.68.1), যো বৈ দেবানাং পথমেতি ঋতস্য পথমেতি (শ.4.3.4.16)] যিনি দিব্যগুণসম্পন্ন এবং সর্বদা ঈশ্বরের আজ্ঞার অনুকূল পথে চলেন এমন বিদ্বান্। (ঋত্বিজম্) যিনি সর্বদা সকলের সঙ্গে সংগতি এবং সৃষ্টির প্রত্যেক পদার্থকে সর্বহিতের জন্য ব্যবহার করার ভাবনা রাখেন। 

(হোতারম্) যিনি দেওয়ার যোগ্য পদার্থ এবং তাদের যথার্থ বিজ্ঞানের দাতা এবং গ্রহণ করার যোগ্য পদার্থের গ্রহীতা অর্থাৎ সমস্ত লোকোপকারক আচরণের জ্ঞানী এবং সেগুলির উপর সর্বদা আচরণশীল হন।

(রত্নধাতমম্) যিনি তিন প্রকারের সুখ প্রদানকারী পদার্থগুলিকে ধারণকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সেইরূপ মহান পুরুষকে (ঈডী) অনুসন্ধান করো, তাকে অনুসন্ধান ও জানার ইচ্ছা করো এবং এমন পুরুষ প্রাপ্ত হলে তার নিকট থেকে সমগ্র সৃষ্টি ও লোকব্যবহার শেখার প্রার্থনা করো এবং শেখো। এখানে পুরুষ-ব্যত্যয় দ্বারা মধ্যম পুরুষের স্থানে উত্তম পুরুষের প্রয়োগ হয়েছে।

ভাবার্থ
এই সৃষ্টির সমগ্র বিজ্ঞান এবং তার ব্যবহার করা এবং সাংসারিক আচরণগুলিকে বিশুদ্ধভাবে জানেন, সমগ্র প্রাণিজগতের মঙ্গল কামনা করেন, দিব্যগুণসম্পন্ন এবং সর্বদা ঈশ্বরের আজ্ঞা অনুযায়ী আচরণ করেন, সকল প্রকার সুখপ্রদাতা ত্যাগী-তপস্বী গুরুকে পুরুষার্থসহকারে অনুসন্ধান করে লৌকিক এবং পারলৌকিক জ্ঞান গ্রহণের পূর্ণ চেষ্টা করা উচিত। এর দ্বারা সকল মানুষ পরস্পর একে অপরের সুখ বৃদ্ধি করতে করতে আনন্দের সঙ্গে বাস করতে পারে।

এইরূপেই সকল মানুষকে এই সমস্ত সদ্গুণে যুক্ত তেজস্বী রাজারও নির্বাচন করা উচিত, যাতে সমগ্র পৃথিবীতে সুখ এবং শান্তির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

জ্ঞাতব্য
এখানে এই মন্ত্রের দ্বারা পৃথিবীতে উৎপন্ন প্রারম্ভিক প্রজন্মের সকল মানুষকে সংসারে বাস করার জন্য এমন গুরুকে অনুসন্ধান করার প্রেরণা দেওয়া হয়েছে, যিনি বেদের সাক্ষাৎকার লাভ করেছেন অর্থাৎ অগ্নি প্রভৃতি চার মহর্ষি, পুনরায় অন্যান্য ব্রহ্মা প্রভৃতি ঋষিদের অনুসন্ধান করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

সকল মানুষকে চার ঋষির কাছ থেকে অথবা ব্রহ্মা প্রভৃতি থেকে সমগ্র বিদ্যা এবং আচরণ শেখার উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই উপদেশ গ্রহণ করাও অনিবার্য ছিল। এখানে শিক্ষক পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে রাজপুরুষকেও গ্রহণ করা যেতে পারে, তখন অর্থে কিছু ভেদ হয়ে যাবে। মহর্ষি দয়ানন্দ জি যে ভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক অর্থ করেছেন, সেগুলিকেও এখানে যুক্ত করে দেখা উচিত। এইরূপে মন্ত্রের মোট চারটি অর্থ হয়। দুইটি অর্থ এখানে আমরা দিয়েছি এবং দুইটি ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যে পড়া যায়। যদি ঋষির ভাষ্য উপলব্ধ না হত, তবে আমরা এইরূপ আরও দুইটি অর্থ করতাম। ঋষি দয়ানন্দ অর্থগুলিতে ভৌতিক অগ্নিকে অনুসন্ধান করে নানা প্রকার ভৌতিক অনুসন্ধানের প্রেরণার কথা বলেছেন, যা এই পৃথিবীতে সুখদ জীবনযাপনের জন্য এটি অপরিহার্য। এই জ্ঞানও প্রথম প্রজন্মের মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।

শেষে মহর্ষি দয়ানন্দ ‘অগ্নি’ পদ দ্বারা পরমেশ্বরকে গ্রহণ করে তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করে জানার প্রেরণা দিয়েছেন। এটিই মানবজীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। এই কারণে এই জ্ঞান সবচেয়ে অধিক প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু সৃষ্টিকে না জেনে সৃষ্টিকর্তা পরমাত্মার বিজ্ঞান কখনোই জানা সম্ভব নয়। এই কারণে এই মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য অপরিহার্য।

এইভাবে এই মন্ত্র মানুষকে লৌকিক ও পারলৌকিক সকল ধর্ম ও কর্তব্য এবং সমগ্র সৃষ্টিকে জানার সাররূপ উপদেশ প্রদান করে, যা সমগ্র বেদের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। এই কারণেই এই মন্ত্র চারটি বেদের প্রস্তাবনা এবং সেইজন্যই এটি প্রথম মন্ত্র।

~**~

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ঋগ্বেদর প্রথম মন্ত্র

ও৩ম্ ঋগ্বেদ এর প্রথম মন্ত্র এর ভাষ্য [ভাষ্যকার : আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক] अ॒ग्निमी॑ळे पु॒रोहि॑तं य॒ज्ञस्य॑ दे॒वमृ॒त्विज॑म्। होता॑रं रत्न॒धा...

Post Top Ad

ধন্যবাদ