দূ॒র॒ঙ্গ॒মং জ্যোতি॑ষাং॒ জ্যোতি॒রেকং॒ তন্মে॒ মনঃ॑ শি॒বসং॑কল্পমস্তু ॥ ১ ॥
১. পূর্ববর্তী অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছিল “প্রভুর হয়ে নিজের মধ্যে শক্তিবর্ধন”—এই কথার মাধ্যমে। এই অধ্যায়টি সেই শক্তিবর্ধনের উদ্দেশ্যেই মনকে শিবসঙ্কল্পযুক্ত করার প্রার্থনা দিয়ে শুরু হয়েছে। এই প্রার্থনার কারণেই ঋষির নামই হয়ে গেছে ‘শিবসঙ্কল্প’। এর উদ্দেশ্য হল মনকে একাগ্র করা।
“কোন মনকে?” এই প্রশ্নের উত্তরই পরবর্তী মন্ত্রগুলিতে দেওয়া হয়েছে। অতএব এই মন্ত্রগুলির দেবতা বা বিষয় হল ‘মন’।
২. শিবসঙ্কল্প ঋষি প্রার্থনা করছেন হে প্রভু! আপনার কৃপায় (তন্মে মনঃ) অর্থাৎ আমার সেই মন (শিবসঙ্কল্পম্) কল্যাণময় সংকল্পযুক্ত (অস্তু) হোক। মনের মধ্যে এক আশ্চর্য শক্তি আছে এটি বৈদ্যুতিক ও চন্দ্রময়; এতে বিদ্যুতের মতো বল এবং চন্দ্রের মতো ওজ বিদ্যমান। যখন মনের বৃত্তিগুলি ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেগুলি শক্তিহীন হয়ে যায়; সেই কারণেই সেগুলিকে বলা হয় ‘বিকল্প’, অর্থাৎ সামর্থ্যহীন অবস্থা। এইজন্যই ঋষিরা প্রার্থনা করেন আমাদের মন যেন বিকল্প থেকে দূরে সরে এসে সঙ্কল্পযুক্ত, শক্তিসম্পন্ন হয়; এবং সেই শক্তি যেন ‘শিব’, অর্থাৎ কল্যাণকর হয় ধ্বংসাত্মক না হয়।
৩. (যৎ) যে মন (জাগ্রতঃ) জাগ্রত অবস্থায় (দূরম্) দূর দূর (উৎ–আ–এতি) বাইরে বেরিয়ে চারদিকে ঘুরে বেড়ায়। ঋগ্বেদের “মনোজগাম দূরকম্” সূক্তে এই কথাটি ১২ বার পুনরুক্ত হয়েছে। এই মন সমুদ্র, পর্বত ও নানা দিকে দূরে দূরে ঘুরে বেড়ায়। (দৈবম্) এই মন দেহরাজ ইন্দ্র দেবতার প্রধান উপকরণ ছিল। ঈশ্বরলাভের জন্য এটি ছিল সর্বোচ্চ মাধ্যম। যেমন চোখ রূপ দর্শনের উপকরণ, তেমনি মন হল পরমাত্মা দর্শনের উপকরণ। কিন্তু এই মন এখন এদিক–ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, নিজের নির্ধারিত উদ্দেশ্যে নিয়োজিত নয়। এমন নয় যে মন শুধু জাগ্রত অবস্থায়ই ঘোরে (তৎ) সেই মন (উ) নিশ্চয়ই (সুপ্তস্য) নিদ্রিত অবস্থাতেও জাগ্রত অবস্থার মতোই দূরে দূরে ভ্রমণ করে (দূরঙ্গমম্) যার স্বভাবই দূরে গমন করা (জ্যোতিষম্ একম্ জ্যোতিঃ) সেই মনই সমস্ত জ্যোতির একমাত্র জ্যোতি।
য়েন কর্মাণীত্যস্য শিবসঙ্কল্প ঋষিঃ । মনো দেবতা । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
য়েন॒ কর্মা॑ণ্য॒পসো॑ মনী॒ষিণো॑ য়॒জ্ঞে কৃ॒ণ্বন্তি॑ বি॒দথে॑ষু॒ ধীরাঃ॑ ।
য়দ॑পূ॒র্বং য়॒ক্ষম॒ন্তঃ প্র॒জানাং॒ তন্মে॒ মনঃ॑ শি॒বসং॑কল্পমস্তু ॥ ২ ॥
পদার্থঃ- হে পরমেশ্বর বা বিদ্বান্ ! যখন আপনার সঙ্গ দ্বারা (য়েন) যে (অপসঃ) সদা কর্ম্ম ধর্মনিষ্ঠ (মনীষিণঃ) মনের দমনকারী (ধীরাঃ) ধ্যানকারী বুদ্ধিমান লোকেরা (য়জ্ঞে) অগ্নিহোত্রাদি বা ধর্মসংযুক্ত ব্যবহার বা যোগযজ্ঞে এবং (বিদথেষু) বিজ্ঞান-সম্পর্কীয় এবং যুদ্ধাদি ব্যবহারে (কর্মাণি) অত্যন্ত ইষ্ট কর্ম্মকে (কৃণ্বন্তি) করে, (য়ৎ) যাহা (অপূর্বম্) সর্বোত্তম গুণ, কর্ম, স্বভাবযুক্ত (প্রজানাম্) প্রাণিমাত্রের (অন্তঃ) হৃদয়ে (য়ক্ষম্) পূজনীয় বা সঙ্গত একীভূত হইতেছে (তৎ) সেই (মে) আমার (মনঃ) মনন-বিচার-করণ রূপ মন (শিবসঙ্কল্পম্) ধর্মাচারী (অস্তু) হউক ॥ ২ ॥ ‘ধীর’ শব্দটি মেধাবীদের নামরূপে নিঘণ্টুতে উল্লেখিত হয়েছে (নিঘণ্টু ৩/১৫)।
ভাবার্থঃ- মনুষ্যদিগের উচিত যে, পরমেশ্বরের উপাসনা সুন্দর বিচার, বিদ্যা ও সৎসঙ্গ দ্বারা স্বীয় অন্তঃকরণকে অধর্মাচরণ হইতে নিবৃত্ত করিয়া ধর্মের আচরণে প্রবৃত্ত করুক ॥ ২ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ।
য়ৎ প্রজ্ঞানমিত্যস্য শিবসঙ্কল্প ঋষিঃ । মনো দেবতা । স্বরাট্ ত্রিষ্টুপ্ছন্দ । ধৈবতঃ স্বরঃ ।
য়ৎপ্র॒জ্ঞান॑মু॒ত চেতো॒ ধৃতি॑শ্চ॒ য়জ্জ্যোতি॑র॒ন্তর॒মৃতং॑ প্র॒জাসু॑ ।
য়স্মা॒ন্নऽঋ॒তে কিং চ॒ন কর্ম॑ ক্রি॒য়তে॒ তন্মে॒ মনঃ॑ শি॒বসং॑কল্পমস্তু ॥ ৩ ॥
পদার্থঃ- হে জগদীশ্বর বা পরমযোগিন্ বিদ্বান্ ! আপনার জ্ঞাপন দ্বারা (য়ৎ) যাহা (প্রজ্ঞানম্) বিশেষ করিয়া জ্ঞানের উৎপাদক বুদ্ধিরূপ (উত) আরও (চেতঃ) স্মৃতির সাধন (ধৃতিঃ) ধৈর্য্যস্বরূপ (য়ৎ, চ) এবং যাহা লজ্জাদি কর্ম্মের হেতু (প্রজাসু) মনুষ্যদিগের (অন্তঃ) অন্তঃকরণে আত্মার সঙ্গী হওয়ায় (অমৃতম্) নাশরহিত (জ্যোতিঃ) প্রকাশরূপ (য়স্মাৎ) যদ্দ্বারা (ঋতে) বিনা (কিম্, চন্) কোনও (কর্ম) কর্ম্ম (ন, ক্রিয়তে) করা হয় না (তৎ) সেই (মে) আমা জীবাত্মার (মনঃ) সকল কর্ম্মের সাধনরূপ মন (শিবসংকল্পম্) কল্যাণকারী পরমাত্মায় ইচ্ছাসম্পন্নকারী (অস্তু) হউক ॥ ৩ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যাহা অন্তঃকরণ, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকাররূপ বৃত্তিসম্পন্ন হওয়ায় চারি প্রকারে আন্তরিক প্রকাশক, প্রাণিদের সকল কর্ম্মের সাধক অবিনাশী মন আছে, তাহাকে ন্যায় ও সত্য আচরণে প্রবৃত্ত করিয়া পক্ষপাতিত্ব, অন্যায় ও অধর্মাচরণ হইতে তোমরা নিবৃত্ত কর ॥ ৩ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
য়েনেদমিত্যস্য শিবসঙ্কল্প ঋষিঃ । মনো দেবতা । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
য়েনে॒দং ভূ॒তং ভুব॑নং ভবি॒ষ্যৎ পরি॑গৃহীতম॒মৃতে॑ন॒ সর্ব॑ম্ ।
য়েন॑ য়॒জ্ঞস্তা॒য়তে॑ স॒প্তহো॑তা॒ তন্মে॒ মনঃ॑ শি॒বসং॑কল্পমস্তু ॥ ৪ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! (য়েন) যে (অমৃতেন) নাশরহিত পরমাত্মা সহ যুক্ত মন দ্বারা (ভূতম্) অতীত (ভুবনম্) বর্তমান কাল সম্পর্কীয় এবং (ভবিষ্যৎ) ভবিষ্যৎ (সর্বম্, ইদম্) ইহা সব ত্রিকালস্থ বস্তুমাত্র (পরিগৃহীতম্) সকল দিক দিয়া গৃহীত অর্থাৎ জানা যায় (য়েন) যদ্দ্বারা (সপ্তহোতা) সাত মনুষ্য হয় অর্থাৎ পঞ্চ প্রাণ, ষষ্ঠ জীবাত্মা এবং অব্যক্ত সপ্তম এই সাত গ্রহীতা-দাতা যন্মধ্যে হয় সেই (য়জ্ঞঃ) অগ্নিষ্টোমাদি বা বিজ্ঞানরূপ ব্যবহার (তায়তে) বিস্তৃত করা হয় (তৎ) সেই (মে) আমার (মনঃ) যোগচিত্ত (শিবসংকল্পম্) মোক্ষরূপ সঙ্কল্পযুক্ত (অস্তু) হউক ॥ ৪ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে চিত্ত যোগাভ্যাসের সাধন এবং উপসাধন দ্বারা সিদ্ধ ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমান ত্রিকালের জ্ঞাতা, সকল সৃষ্টির জ্ঞাতা, কর্ম্ম, উপাসনা ও জ্ঞানের সাধক তাহাকে সর্বদাই কল্যাণে প্রিয় কর ॥ ৪ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
য়স্মিন্নিত্যস্য শিবসঙ্কল্প ঋষিঃ । মনো দেবতা । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবত স্বরঃ ॥
য়স্মি॒ন্নৃচঃ॒ সাম॒ য়জূ॑ᳬষি॒ য়স্মি॒ন্ প্রতি॑ষ্ঠিতা রথনা॒ভাবি॑বা॒রাঃ ।
য়স্মিঁ॑শ্চি॒ত্তꣳ সর্ব॒মোতং॑ প্র॒জানাং॒ তন্মে॒ মনঃ॑ শি॒বসং॑কল্পমস্তু ॥ ৫ ॥
পদার্থঃ- (য়স্মিন্) যে মনে (রথনাভাবিব, অরাঃ) যেমন রথের চাকার মধ্যেকার কাষ্ঠে অরা লাগানো থাকে তদ্রূপ (ঋচঃ) ঋগ্বেদ (সাম) সামবেদ (য়জুংষি) যজুর্বেদ (প্রতিষ্ঠিতা) সকল দিক্ দিয়া স্থিত এবং (য়স্মিন্) যাহাতে অথর্ববেদ স্থিত (য়স্মিন্) যন্মধ্যে (প্রজানাম্) প্রাণিদিগের (সর্বম্) সমগ্র (চিত্তম্) সর্বপদার্থ সম্পর্কীয় জ্ঞান (ওতম্) সূত্রে মণিগুলির সমান সংযুক্ত (তৎ) সেই (মে) আমার (মনঃ) মন (শিবসঙ্কল্পম্) কল্যাণকারী বেদাদি সত্যশাস্ত্রের প্রচাররূপ সঙ্কল্পযুক্ত (অস্তু) হউক ॥ ৫ ॥
ব্যাখ্যানঃ (মহর্ষি দয়ানন্দকৃত ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা)
( যস্মিন্নৃচঃ ) হে ভগবান! দয়া নিধি! ( ঋচঃ ) ঋগ্বেদ, ( সাম ) সামবেদ, ( যজুঁষি ) যজুর্বেদ এবং এই তিনটির অন্তর্ভুক্ত অথর্ববেদও এই সমস্ত যেসব স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং ( যস্মিন প্রতিষ্টিতা ) যেখানে মোক্ষবিদ্যা অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যা এবং সত্য-অসত্যের প্রকাশ থাকে, ( যস্মিঞ্চিত্তং সর্বমোতং প্রজানাম্ ) যেখানে সমস্ত প্রজাদের চিত্ত, যা স্মরণের ক্ষমতা, সেখানেই সমন্বিত থাকে, যেমন মালার মানিগুলি সুতোয় গাঁথা থাকে, এবং (রতনাভাভিবারাঃ) যেমন রথের চাকার মধ্যভাগে কাঠের অংশ থাকে, তেমনি। (তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু) তাই আমার মন আপনার কৃপায় পবিত্র হোক এবং কল্যাণময় হোক—যাতে মোক্ষ, সত্যধর্ম পালনের এবং অশুভ ত্যাগের সংকল্পে সমৃদ্ধ থাকে। এই মন দ্বারা আমাদের জন্য আপনার দ্বারা প্রদত্ত বেদগুলোর সত্যার্থ যথাযথভাবে প্রকাশিত হোক।
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে উপমা ও বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । হে মনুষ্যগণ ! তোমাদের উচিত, যে মনের সুস্থ থাকলেই বেদাদি বিদ্যাগুলির আধার এবং যাহাতে সকল ব্যবহারের জ্ঞান একত্র হয়, সেই অন্তঃকরণকে বিদ্যা ও ধর্মের আচরণ দ্বারা পবিত্র কর ॥ ৫ ॥
হরিশরণজী কৃত পদার্থ ভাষ্যঃ
১. (তৎ মে মনঃ) = তা হে আমার মন, (শিবসংকল্পম্) = শুভ সংকল্পযুক্ত হোক, (অস্তু) = হোক, (যস্মিন) = যেটিতে এবং (যস্মিন) = যেটি দ্বারা, (ঋচঃ) = সম্পূর্ণ বিজ্ঞান [ঋগ্বেদ - বিজ্ঞানবেদ] সাম-উপাসনা ও (যজুঁষি) = যজ্ঞাত্মক কর্মে (প্রতিষ্ঠিতা:) = প্রতিষ্ঠিত আছে, (ইভ) = যেমন, (রতনাভৌ) = রথের চাকার নাভিতে অরা- অরা স্থাপিত থাকে। নাভি যখন নড়ে তখন সমস্ত অরা নড়ে যায়, ঠিক তেমনি মনোরোগ হলে সমস্ত বিজ্ঞান, সমস্ত উপাসনা এবং সমস্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির তথ্য পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করতে হয়। উপাসনা তখনই কার্যকর হয় যখন মন থেকে অন্যান্য সমস্ত বিষয় দূরে সরানো হয়। সমস্ত যজ্ঞ মন থেকেই হয়। ওরা কি বেদাধিগম = [বেদ পড়া] এবং কি বৈদিক কর্মকাণ্ড—সবই মন না হলে কার্যকর হয় না। মননিরোধের মাধ্যমে মানুষ বৈজ্ঞানিক তথ্য চিন্তা করতে পারে, মননিরোধই উপাসনার নাম। [ধ্যানং নির্বিষয়ং মনঃ], মনের একাগ্রতায় করা কর্ম সুন্দর হয়।
২. এটি মন হলো (যস্মিন) = যেটিতে প্রজানাম্ প্রজাদের (সর্বম্ চিত্তম্) = সমস্ত চিত্ত, সম্পূর্ণ স্মরণ (ওতম্) = ওত-প্রত প্রসারিত আছে। যখন এটি ইন্দ্রিয় দ্বার থেকে বাইরে গিয়ে সংসারের বিষয়ের সঙ্গে মিশে যায়, তখন মানুষ ‘(কো’হং কুত আয়াতঃ)’ = আমি কে, এখানে কেন এলাম? সব ভুলে যায়। আত্মবিস্মরণ থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। (‘যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’) = চিত্তবৃত্তির জন্য মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হলো যোগ এবং (‘তদা দ্রষ্টুঃ স্বরূপে’অবস্থানম্’) = তখন দৃষ্টা স্বরূপে অবস্থান করে, নিজেকে চিনতে পারে, ভুলে যায় না। ঋগ্-যজু-সামের ভিত্তি হলো মন।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
সুষারথিরিত্যস্য শিবসঙ্কল্প ঋষিঃ । মনো দেবতা । স্বরাট্ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
সু॒ষা॒র॒থিরশ্বা॑নিব॒ য়ন্ম॑নু॒ষ্যা᳖ন্নে॑নী॒য়তে॒ऽভীশু॑ভির্বা॒জিন॑ऽইব ।
হৃ॒ৎপ্রতি॑ষ্ঠং॒ য়দ॑জি॒রং জবি॑ষ্ঠং॒ তন্মে॒ মনঃ॑ শি॒বসং॑কল্পমস্তু ॥ ৬ ॥
অন্বয়ঃ যত্ সুসারথির অশ্বানিব মনুষ্যাণ্ নেনীয়তে অভীশুভিঃ বাজিন্ ইভ নীয়চ্চতি চ, বলাত্ সারথির অশ্বানিব প্রাণিনো নয়তি, যদ্ হৃত্প্রতিষ্ঠম্ আজিরং জবিষ্ঠমস্তি, তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু॥৬॥
পদার্থঃ- (য়ৎ) যে মন (সুষারথিঃ) যেমন সুন্দর চতুর সারথি চালক (অশ্বানিব) লাগাম দ্বারা অশ্বদিগকে সব দিকে চালনা করে সেইরূপ (মনুষ্যান্) মনুষ্যাদি প্রাণিসকলকে (নেনীয়তে) শীঘ্র ইতস্তুতঃ ভ্রমণ করায় এবং (অভীশুভিঃ) যেমন রজ্জু দ্বারা (বাজিন ইব) বেগবান্ অশ্বদিগকে সারথি বশ করে, সেই মত নিয়মে রাখে (য়ৎ) যাহা (হৃৎপ্রতিষ্ঠম্) হৃদয়ে স্থিত (অ জিরম্) বিষয়াদিতে প্রেরক বা বৃদ্ধাদি অবস্থারহিত এবং (জবিষ্ঠম্) অত্যন্ত বেগবান্ (তৎ) সেই (মে) আমার (মনঃ) মন (শিবসংকল্পম্) মঙ্গলময় নিয়মে ইষ্ট=কল্যাণ (অস্তু) হউক ॥ ৬ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে দুইটি উপমালঙ্কার আছে, যে মনুষ্য যে পদার্থে আসক্ত সেই বল দ্বারা সারথি অশ্বসকলকে যেমন, সেইরূপ প্রাণিদেরকে লইয়া যায়, যেমন লাগাম দ্বারা সারথি অশ্বকে যেমন, সেইরকম বশে রাখে, সকল মূর্খগণ যাহার অনুকূল আচরণ করে এবং বিদ্বান্ স্বীয় বশে রাখে, যাহা শুদ্ধ হইয়া সুখকারী এবং অশুদ্ধ হইয়া দুঃখদায়ী, যাহা জিতিয়া সিদ্ধিকে এবং না জিতিয়া অসিদ্ধি প্রদান করে, সেই মন মনুষ্যদিগকে স্বীয় বশে রাখা উচিত ॥ ৬ ॥
অথ কঃ শত্রূন্ বিজেতুং শক্নোতীত্যাহ ॥
এখন কোন্ মনুষ্য শত্রুদিগকে জিতিতে পারে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
পিতুমিত্যস্যাগস্ত্য ঋষিঃ । অন্নং দেবতা । উষ্ণিক্ ছন্দঃ । ঋষভঃ স্বরঃ ॥
পি॒তুং নু স্তো॑ষং ম॒হো ধ॒র্মাণং॒ তবি॑ষীম্ ।
য়স্য॑ ত্রি॒তো ব্যোজ॑সা বৃ॒ত্রং বিপ॑র্বম॒র্দ্দয়॑ৎ ॥ ৭ ॥
পদার্থঃ- আমি (য়স্য) যাহার (পিতুম্) অন্ন (মহঃ) মহান্ (ধর্মানম্) পক্ষপাতরহিত ন্যায়াচরণরূপ ধর্ম এবং (তবিষীম্) বলযুক্ত সেনার (নু) শীঘ্র (স্তোষম্) স্তুতি করি সেই রাজপুরুষ (ত্রিতঃ) তিন কালে যেমন সূর্য্য (ওজসা) জল সহ বর্ত্তমান (বিপর্বম্) যাহার বাদল রূপ গ্রন্থি ভিন্ন-ভিন্ন হয় সেই (বৃত্রম্) মেঘকে (বি, অর্দয়ৎ) বিশেষ করিয়া নষ্ট করে, সেইরূপ শত্রুদিগকে জিতিতে সক্ষম হয় ॥ ৭ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । যে সত্য-ধর্ম, বলবতী সেনা এবং পুষ্কল অন্নাদি সামগ্রী ধারণ করিয়াছে সে, যেমন সূর্য্য মেঘকে, তদ্রূপ শত্রুদিগকে জিতিতে পারে ॥ ৭ ॥
পুনর্মনুষ্যৈঃ কিং কর্ত্তব্যমিত্যাহ ॥
পুনরায় মনুষ্যদিগকে কী করা উচিত এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
অন্বিদিত্যস্যাগস্ত্য ঋষিঃ । অনুমতির্দেবতা । নিচৃদনুষ্টুপ্ ছন্দঃ । গান্ধারঃ স্বরঃ ॥
অন্বিদ॑নুমতে॒ ত্বং মন্যা॑সৈ॒ শং চ॑ নস্কৃধি ।
ক্রত্বে॒ দক্ষা॑য় নো হিনু॒ প্র ণ॒ऽআয়ূ॑ᳬষি তারিষঃ ॥ ৮ ॥
পদার্থঃ- হে (অনুমতে) অনুকূল বুদ্ধিযুক্ত সভাপতি বিদ্বন্ ! (ত্বম্) আপনি যাহাকে (শম্) সুখকারী (অনু, মন্যাসৈ) অনুকূল মানিবেন তাহার সহিত যুক্ত (নঃ) আমাদিগকে (কৃধি) করুন ।(ক্রত্বে) বুদ্ধি (দক্ষায়) বল বা চাতুর্য্যের জন্য (নঃ) আমাদেরকে (হিনু) বৃদ্ধি করুন (চ) এবং (নঃ) আমাদের (আয়ূংষি) আয়ুকে (ইৎ) নিশ্চয় করিয়া (প্র, তারিষঃ) উত্তম প্রকার পূর্ণ করুন ॥ ৮ ॥
ভাবার্থঃ- মনুষ্যদিগের উচিত যে, যেমন স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রযত্ন করা হয় তদ্রূপ অন্যার্থেও প্রযত্ন করিবে । যেমন আপনি স্বীয় কল্যাণ ও বৃদ্ধি কামনা করেন সেইরূপ অন্যদের জন্য চাহিবেন । এই ভাবে সকলের পূর্ণ আয়ু সাধন করিবে ॥ ৮ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
অনু ন ইত্যস্যাগস্য ঋষিঃ । অনুমতির্দেবতা । নিচৃদনুষ্টুপ্ ছন্দঃ । গান্ধারঃ স্বরঃ ॥
অনু॑ নো॒ऽদ্যানু॑মতির্য়॒জ্ঞং দে॒বেষু॑ মন্যতাম্ ।
অ॒গ্নিশ্চ॑ হব্য॒বাহ॑নো॒ ভব॑তং দা॒শুষে॒ ময়ঃ॑ ॥ ঌ ॥
পদার্থঃ- যে (অনুমতিঃ) অনুকূল বিজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি (অদ্য) আজ (দেবেষু) বিদ্বান্দিগের মধ্যে (নঃ) আমাদের (য়জ্ঞম্) সুখ দেওয়ার সাধনরূপ ব্যবহারকে (অনু, মন্যতাম্) অনুকূল মানিবে, সে (চ) এবং গ্রহণীয় পদার্থ সমূহের প্রাপ্ত করায় যাহারা (অগ্নিঃ) অগ্নিতুল্য তেজস্বী বা অগ্নি বিদ্যার বিদ্বান্ তোমরা উভয়ে (দাশুষে) দানশীল মনুষ্যদিগের জন্য (ময়ঃ; নিঘ০ ৩।৬) সুখকারী (ভবতম্) হও ॥ ঌ ॥
ভাবার্থঃ- যে সব মনুষ্য সৎকর্মের অনুষ্ঠানে অনুমতি দান করে এবং দুষ্টকর্মসমূহের অনুষ্ঠানকে নিষেধ করে তাহারা অগ্নি আদির বিদ্যা দ্বারা সকলের জন্য সুখ দিবে ॥ ঌ ॥
অথ বিদুষ্যঃ কুমার্য়ঃ কিং কুর্য়ুরিত্যাহ ॥
এখন বিদুষী কুমারী কী করিবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
সিনীবালীত্যস্য গৃৎসমদ ঋষিঃ । সিনীবালী দেবতা । অনুষ্টুপ্ ছন্দঃ । গান্ধারঃ স্বরঃ ॥
সিনী॑বালি॒ পৃথু॑ষ্টুকে॒ য়া দে॒বানা॒মসি॒ স্বসা॑ ।
জু॒ষস্ব॑ হ॑ব্যমাহু॑তং প্র॒জাং দে॑বি দিদিড্ঢি নঃ ॥ ১০ ॥
পদার্থঃ- হে (সিনীবালি) প্রেমযুক্ত বলকারিণী (পৃথুষ্টুকে) যাহার বিস্তৃত স্তুতি শিরের কেশ বা কামনা হউক এমন (দেবি) বিদুষি কুমারি (য়া) যে তুমি (দেবানাম্) বিদ্বান্দিগের (স্বসা) ভগ্নী (অসি) হও, সুতরাং (হব্যম্) গ্রহণীয় (আহুতম্) উত্তম প্রকার বর দীক্ষাদি কর্ম্ম দ্বারা স্বীকৃত পতির (জুষস্ব) সেবন কর এবং (নঃ) আমাদের জন্য (প্রজাম্) সুন্দর সন্তানরূপ প্রজাকে (দিদিড্ঢি) দাও ॥ ১০ ॥
ভাবার্থঃ- হে কুমারীগণ ! তোমরা ব্রহ্মচর্য্য আশ্রম সহ সমস্ত বিদ্যাসমূহকে প্রাপ্ত হও, যুবতী হইয়া স্বয়ং পরীক্ষা করিয়া বরণীয় পতিদেরকে বরণ করিবে, সেই সব পতিদের সহ আনন্দ করিয়া প্রজা পুত্রাদিকে উৎপন্ন করিতে থাক ॥ ১০ ॥
‘গত দুই মন্ত্রে’ বর্ণিত ‘অনুমতি’ কীভাবে গৃহিণী তার সন্তানদের মধ্যে জন্ম দেয়, তা স্পষ্ট করতে এই দুটি মন্ত্রে ‘আদর্শ স্ত্রী’র কার্যক্রম উল্লেখ করা হয়েছে— (হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)
১. আদর্শ স্ত্রী (সিনিমল্লী) অন্নের মাধ্যমে সব কমতরতা দূর করে এবং মনকে অনুমতি ও তৎসংক্রান্ত যজ্ঞীয় মনোবৃত্তিতে পূর্ণ করে। সে ঘরে সর্বদা শুদ্ধ সত্ত্বিক অন্নেরই ব্যবহার রাখে, কখনো রাজসিক বা তামসিক খাবারকে ঘরে ঢুকতে দেয় না। এর ফলে সে নিজে অনুমতিধারিণী হয় এবং তার সন্তানদের মধ্যেও অনুমতি উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়।
২. জীবনযাত্রায় ভুল না হওয়ার জন্য সে সর্বদা প্রভুর স্তবন করে। মন্ত্রে তাকে (পৃথুষ্টুকে) বলা হয়েছে— “হে প্রশংসিত!” তার জীবনে স্তবনের বিস্তার সর্বদা থাকে। যখন সামান্য সময় ফাঁকা থাকে বা অন্য কাজে ক্লান্ত হয়, তখনও সে ‘প্রভুর নাম জপে’ লিপ্ত হয়।
৩. এইভাবে, (য়া) = যে তুমি, (দেবানাং স্বসা) = দেবতাদের বোন, (অসি) = হ। যিনি দিভ্য গুণধারিণী, মা চায় যে যেসব গুণ সে সন্তানদের মধ্যে দেখতে চায়, সে নিজেই তা ধারণ করুক (স্বয়ং সৃ)। ঘুমন্ত মা সন্তানদের জাগিয়ে শিক্ষায় উৎসাহিত করতে পারে না, তাই নিজের জীবনে গুণগুলির চর্চা অপরিহার্য।
৪. (আহুতং হব্যং জুষস্ব) = আগুনে আরোহিত হব্য পদার্থ আনন্দপূর্বক গ্রহণ কর; অর্থাৎ তুমি নিয়মিত আগ্নিহোত্র করবে। প্রতিদিনের এই যজ্ঞ সন্তানদের জীবনকেও যজ্ঞময় করে তুলবে। মা আগ্নিহোত্র সম্পন্ন করতে দেখলে শিশুদের জন্যও যজ্ঞ এক সুন্দর খেলা হয়ে যাবে।
৫. এভাবে নিজের জীবনকে দিভ্য গুণে পূর্ণ করা আদর্শ গৃহিণী প্রকৃতপক্ষে দেবী। তাই বলা হয়েছে— (দেভি) = দিভ্য গুণধারিণী আদর্শ গৃহিণী, তুমি (নঃ) = আমাদের (প্রজাম্) = উৎকৃষ্ট সন্তান (দিদিদি) = দাও। “এই স্ত্রীর সন্তানও নিজে উৎকৃষ্ট জীবনধারী হবে”—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
৬. এই উৎকৃষ্ট জীবনধারী স্ত্রীকে পেয়ে স্বামীর জীবনও আনন্দময় হয়, এবং সে উৎকৃষ্ট সঙ্গী পেতে সর্বদা প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। সে গৃণাতি মাদ্যতি—প্রভুর স্তবন করে আনন্দিত থাকে, এবং ‘গৃত্সমদ’ এই নামের অর্থ পূর্ণ হয়।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
পঞ্চেত্যস্য গৃৎসমদ ঋষিঃ । সরস্বতী দেবতা । নিচৃদনুষ্টুপ্ ছন্দঃ । গান্ধারঃ স্বরঃ ।
পঞ্চ॑ ন॒দ্যঃ᳕ সর॑স্বতী॒মপি॑ য়ন্তি॒ সস্রো॑তসঃ ।
সর॑স্বতী॒ তু প॑ঞ্চ॒ধা সো দে॒শেऽভ॑বৎ স॒রিৎ ॥ ১১ ॥
পদার্থঃ- মনুষ্যদিগের উচিত যে, (সস্রোতসঃ) এক মন রূপী প্রবাহযুক্তা (পঞ্চ) পাঁচ (নদ্যঃ) নদীতুল্য প্রবাহরূপ জ্ঞানেন্দ্রিয় সমূহের বৃত্তি যে (সরস্বতীম্) প্রশস্ত বিজ্ঞানযুক্ত বাণীকে (অপি, য়ন্তি) প্রাপ্ত হয় (সা, উ) উহাও (সরিৎ) গমনরতা (সরস্বতী) বাণী (দেশে) স্বীয় নিবাসস্থলে (পঞ্চধা) পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের শব্দাদি পাঁচ বিষয়ের প্রতিপাদন করায় বলিয়া পাঁচ প্রকারের (তু) ই (অভবৎ) হয় এইরকম জানিবে ॥ ১১ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । মনুষ্যদিগের উচিত যে, যে বাণী পাঁচ শব্দাদি বিষয়গুলির আশ্রিত নদীতুল্য প্রবাহযুক্ত বর্ত্তমান তাহাকে জানিয়া যথাবৎ প্রচার করিয়া মধুর ও শ্লক্ষ্ম প্রযুক্ত করুক ॥ ১১ ॥
—পাঁচভাবে সন্তানদের অগ্রগতি করানো (হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)
শরীরে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় হলো পাঁচটি জ্ঞানবাহিনী নদী। চক্ষু থেকে প্রবাহিত হওয়া জ্ঞাননদী রূপের জল দ্বারা পূর্ণ, শ্রবণেন্দ্রি থেকে চলা শব্দরূপী জল দ্বারা, এবং প্রতিটি জ্ঞানেন্দ্রি থেকে প্রতিটি বিষয়ের গ্রহন দ্বারা এই সম্পূর্ণ পাঁচটি ভৌত জগৎ আমাদের জ্ঞানের বিষয় হয়ে ওঠে। এভাবে জ্ঞানজলবাহিনী সরস্বতী নদী পূর্ণ জলের সাথে প্রবাহিত হয়।
জ্ঞানজলবাহিনীযুক্ত গৃহিণীকেও এখানে ‘সরস্বতী’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এবং গত মন্ত্রে বলা হয়েছে যে এই সিনিৱালী—অন্নের মাধ্যমে দোষ দূর করে নিজের পূর্ণতা অর্জনকারী—প্রকৃতপক্ষে সেই সত্ত্বিক অন্নগ্রহণই তাকে ‘সরস্বতী’ হবার ক্ষমতা প্রদান করেছে।
(সরস্বতীং) = এই সরস্বতীকে (পঞ্চ) = পাঁচটি (সস্ত্রোতসঃ) = সমান উৎসযুক্ত (নদ্যঃ) = এই জ্ঞান জল বাহিনী নদীগুলি (অপিয়ন্তি) = প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ এই উৎকৃষ্ট গৃহিণী সর্বদা নিজের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রি দিয়ে জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে।
বেদের এই উপদেশ যে ‘পঞ্চৌদনঃ পঞ্চধা বিক্রমাতাম্’—পঞ্চউদন (জীব) পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রি দিয়ে জ্ঞানার্জনে লিপ্ত থাকুক। কখনো উৎকৃষ্ট স্ত্রী ভুলে না। তাই প্রকৃতপক্ষে সে সত্যিই (সরস্বতী) = জ্ঞানের অধিদেবী হয়ে ওঠে।
(সা তু) = এই স্ত্রী তো (সরস্বতী) = জ্ঞানের অধিদেবী হয়ে (উ) = নিঃসন্দেহে (দেশে) = যেখানে সে গৃহে এবং অঞ্চলে কাজ করে (সরিত্) = কার্যকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে (অভবৎ) = হয়। অজ্ঞানে ক্রিয়া ভুল হয়, জ্ঞানে ক্রিয়া পবিত্রতা এবং দক্ষতা নিয়ে আসে। এভাবে ‘সরস্বতী’ তার গৃহের প্রশাসন এত সুন্দরভাবে পরিচালনা করে যে (পঞ্চধা) = পাঁচভাবে, অর্থাৎ অন্নময়াদি পাঁচটি কোষের দৃষ্টিকোণ থেকে (সরিত্) = সমস্ত সন্তানদের অগ্রগতি নিশ্চিত করে। তিনি তার সন্তানদের অন্নময় কোষকে সুস্থ রাখে, প্রাণময়কোষকে শক্তিশালী, মনোময়কোষকে নির্মল, জ্ঞানময়কোষকে দীপ্ত এবং আনন্দময়কোষকে সর্বদা উজ্জ্বল রাখে। এটাই ‘সরস্বতী’-এর ‘পঞ্চধা সরিত্’ হওয়া।
অথ জনৈরীশ্বরাজ্ঞা পাল্যেত্যাহ ॥
এখন মনুষ্যদিগকে ঈশ্বর আজ্ঞা পালন করা উচিত, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ।
ত্বমগ্ন ইত্যস্য হিরণ্যস্তূপ আঙ্গিরস ঋষিঃ । অগ্নির্দেবতা । বিরাড্ জগতী ছন্দঃ । নিষাদঃ স্বরঃ ॥
ত্বম॑গ্নে প্রথ॒মোऽঅঙ্গি॑রা॒ऽঋষি॑র্দে॒বো দে॒বানা॑মভবঃ শি॒বঃ সখা॑ ।
তব॑ ব্র॒তে ক॒বয়ো॑ বিদ্ম॒নাপ॒সোऽজা॑য়ন্ত ম॒রুতো॒ ভ্রাজ॑দৃষ্টয়ঃ ॥ ১২ ॥
অন্বয়ঃ হে অগ্নে! যতোস্ত্বং প্রথমোऽঙ্গিরা দেবানাং দেবঃ শিবঃ সখা ঋষিরভবস্তস্মাৎ তব ব্রতে বিদ্মনাপসো ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ কবয়ো মরুতোऽজায়ন্ত ॥১২॥
পদার্থঃ- (ত্বম্) তুমি (অগ্নে) হে অগ্নি, অর্থাৎ পরমেশ্বর বা বিদ্বান (প্রথমঃ) প্রথম, প্রসিদ্ধ (অঙ্গিরাঃ) অঙ্গগুলির মধ্যে রসের ন্যায় বিরাজমান, অথবা অঙ্গীভূত জীবাত্মাদের সুখ দানকারী (ঋষিঃ) জ্ঞানী (দেবঃ) দিব্য গুণ, কর্ম ও স্বভাবসম্পন্ন (দেবানাম্) বিদ্বানদের মধ্যে (অভবঃ) হয়েছ (শিবঃ) কল্যাণকারী (সখা) বন্ধু (তব) তোমার (ব্রতে) শীল বা নিয়মে (কবয়ঃ) মেধাবী, জ্ঞানী ব্যক্তিগণ (বিদ্মনাপসঃ) যাদের কর্মসমূহ বিদিত, জ্ঞানসম্মত (অজায়ন্ত) উৎপন্ন হয়েছেন (মরুতঃ) মানুষগণ (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) যাদের দীপ্ত, শোভাময় অস্ত্রসমূহ রয়েছে ॥১২॥ (মহর্ষি দয়ানন্দকৃত পদ বিন্যাস)
পদার্থঃ- হে (অগ্নে) পরমেশ্বর বা বিদ্বন্ ! যে কারণে (ত্বম্) আপনি (প্রথমঃ) প্রখ্যাত (অঙ্গিরাঃ) অবয়বের সারভূত রসের তুল্য বা জীবাত্মাগুলিকে সুখদাতা (দেবানাম্) বিদ্বান্দিগের মধ্যে (দেবঃ) উত্তম, গুণ, কর্ম, স্বভাবযুক্ত (শিবঃ) কল্যাণকারী (সখা) মিত্র (ঋষিঃ) জ্ঞানী (অভবঃ) হইবেন, ইহার ফলে (তব) আপনার (ব্রতে) স্বভাব ও নিয়মে (বিদ্মনাপসঃ) প্রসিদ্ধ কর্ম্মসম্পন্ন (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) সুন্দর অস্ত্র-শস্ত্র যুক্ত (কবয়ঃ) বুদ্ধিমান্ (মরুতঃ) মনুষ্য (অজায়ন্ত) প্রকট হয় ॥ ১২ ॥
পদার্থঃ হে (অগ্নে) স্বপ্রকাশ জগদীশ্বর! (ত্বম্) তুমি (প্রথমঃ) সবার থেকে প্রথম প্রখ্যাত, (অঙ্গিরাঃ) জীবাত্মার সুখদাতা, (ঋষি) জ্ঞানী, (দেবানাম্) বিদ্বানের মধ্যে (দেবঃ) উত্তম গুণ-কর্ম-স্বভাবযুক্ত ব্যক্তিদের (শিবঃ) কল্যাণকারী (সখা) মিত্র (অভবঃ) হও। (তব ব্রতে) তোমার নিয়মে (কবয়ঃ) মেধাবী (বিদ্মনাপসঃ) সকল কর্মসমূহের জ্ঞাতা (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) প্রদীপ্ত দৃষ্টি যার, তেমন (মরুতো জায়ন্ত) মনুষ্য প্রকট হয়। (অচ্যুতানন্দ সরস্বতীকৃত পদার্থ)
ভাবার্থঃ- যদি মনুষ্য সকলের মিত্র বিদ্বান্ ব্যক্তি এবং হিতৈষী পরমাত্মাকে মিত্র মানিয়া বিজ্ঞানের নিমিত্ত কর্ম করিয়া প্রকাশিত আত্মাসম্পন্ন হয় তাহা হইলে তাহারা বিদ্বান্ হইয়া পরমেশ্বরের আজ্ঞায় আচরণ করিতে পারিবে ॥ ১২ ॥
হিরণ্যস্তূপ (হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)
পদার্থঃ
সরস্বতীরূপ মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে এক যুবক অত্যন্ত সংযত জীবনযাপনকারী হয়ে ওঠে। সে প্রভুকে নিম্নলিখিত শব্দগুলির মাধ্যমে আরাধনা করে—
১. হে (অগ্নে) = হে আমাদের সকল প্রকার উন্নতির সাধক প্রভু! (ত্বম্) = আপনি (প্রথমঃ) = সর্বপ্রথম, গুরুদেরও গুরু [হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে]। আপনি অত্যন্ত বিস্তৃতস্বরূপ [প্রথ্ বিস্তারেঃ], সর্বব্যাপক—সবকিছুর মধ্যে আপনি বিরাজমান এবং সবকিছুই আপনার মধ্যেই অবস্থিত।
২. (অঙ্গিরাঃ) = [অঙ্গ, রস] আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আপনি-ই রস সঞ্চারকারী। সকলকে শক্তি দানকারী আপনিই। আপনার দীপ্তিতেই প্রকৃতপক্ষে সমগ্র জগৎ দীপ্ত।
৩. (ঋষিঃ) = আপনি সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।
৪. (দেবঃ) = আপনি সকল দিব্য গুণের সমষ্টি; দেবতাদের মধ্যেও দেবত্ব প্রদানকারী আপনিই।
৫. (দেবানাম্) = যারা দিব্য গুণ গ্রহণ করে দেবত্ব লাভ করেছে, তাদের (শিবঃ সখা) = আপনি কল্যাণকারী বন্ধু (অভবঃ) = হয়ে থাকেন। প্রভু যদি দেব হন, তবে দেবত্ব লাভকারীদের কাছে তিনি প্রিয় হবেন না কেন?
৬. দেবত্ব লাভের জন্য যারা (তব ব্রতে) = আপনার ব্রতে চলেন, অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য হিসেবে প্রভু-প্রাপ্তিকে স্থির করেন, তারা—
[ক] (কবয়ঃ) = ক্রান্তদর্শী হন; তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ করে বস্তুজগতের বাহ্যিক চাকচিক্যে মোহিত হন না।
[খ] (বিদ্মনাপসঃ) = জ্ঞানপূর্বক কর্মসম্পাদনকারী হওয়ায় তাদের কর্ম পবিত্র থাকে।
[গ] (মরুতঃ) = তারা মিতভাষী—কম বলেন, বেশি করেন; বাগ্বীর নয়, কর্মবীর হন এবং
[মরুতঃ প্রাণাঃ] — প্রাণসাধনায় রত থাকেন।
[ঘ] এই প্রাণসাধনার ফলেই তারা প্রকৃতপক্ষে (ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ) = দীপ্ত জ্ঞানদর্শনসম্পন্ন (অজায়ন্ত) = হয়ে ওঠেন। তাদের জ্ঞানাগ্নি উজ্জ্বলভাবে প্রজ্বলিত হয়।
ভাবার্থঃ বীর্যকে ঊর্ধ্বগামী করে যে সাধক, সেই ‘হিরণ্যস্তূপ’ প্রভুকে অগ্নি, অঙ্গিরা, ঋষি, দেব ও দেবসখা এই রূপে প্রত্যক্ষ করে। প্রভু-প্রাপ্তিকেই জীবনের লক্ষ্য করে সে কবি, জ্ঞানপূর্বক কর্মকারী, মরুত এবং ভ্রাজদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে ওঠে।
বিষয়: অঙ্গিরা ঋষি, রাজা (জয়দেবশর্মাকৃত পদার্থভাষ্য)
ভাবার্থঃ হে (অগ্নে) অগ্রণী, অগ্নি ও সূর্যের ন্যায় তেজস্বী! হে রাজন! তুমি (অঙ্গিরাঃ) দেহে রসের ন্যায় কিংবা অগ্নির মতো তেজস্বী, (ঋষিঃ) মন্ত্রার্থের দ্রষ্টা, (দেবানাম্) বিদ্বান ও তেজস্বী পুরুষদের মধ্যে (দেবঃ) সর্বাধিক জ্ঞানী, তেজস্বী ও বিজয়ী এবং (প্রথমঃ) সর্বাগ্রে অবস্থানকারী, (শিবঃ সখা) কল্যাণকারী বন্ধু (অভবঃ) হও। (তব) তোমার (ব্রতে) প্রণীত নিয়ম ও শাসনব্যবস্থার মধ্যে থেকে (কবয়ঃ) বিদ্বান, ক্রান্তদর্শী পুরুষেরা (বিদ্মনাপসঃ) সমস্ত কর্তব্যকর্ম সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন হোক এবং (মরুতঃ) শত্রুনাশকারী বীর পুরুষেরা (ভ্রাজদ্ ঋষ্টয়ঃ) প্রখর, তেজস্বী অস্ত্রধারী হয়ে (অজায়ন্ত) উৎপন্ন হোক।(২) পরমেশ্বরের পক্ষে অর্থ হে পরমেশ্বর! তুমি-ই সর্বপ্রথম জ্ঞানী, সকলের দ্রষ্টা, সকল দেবতার দেব, সকলের কল্যাণকারী ও বন্ধু। তোমার ব্রতে দীক্ষিত বিদ্বানরা সকল সৎকর্ম ও জ্ঞানের প্রকৃত দ্রষ্টা হয়ে ওঠে।
রাজেশ্বরৌ কথং সেবনীয়াবিত্যাহ ॥
রাজা ও ঈশ্বরের কেমন সেবা করা উচিত, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ত্বন্ন ইত্যস্য হিরণ্যস্তূপ আঙ্গিরস ঋষিঃ । অগ্নির্দেবতা । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ত্বং নো॑ऽঅগ্নে॒ তব॑ দেব পা॒য়ুভি॑র্ম॒ঘোনো॑ রক্ষ ত॒ন্ব᳖শ্চ বন্দ্য ।
ত্রা॒তা তো॒কস্য॒ তন॑য়ে॒ গবা॑ম॒স্যনি॑মেষ॒ꣳ রক্ষ॑মাণ॒স্তব॑ ব্র॒তে ॥ ১৩ ॥
পদার্থঃ- হে (দেব) উত্তম গুণ-কর্ম-স্বভাবযুক্ত (অগ্নে) রাজন্ বা ঈশ্বর (তব) আপনার (ব্রতে) উত্তম নিয়মে বর্ত্তমান (মঘোনঃ) বহুধনযুক্ত আমাদের (তব) আপনার (পায়ুভিঃ) রক্ষাদি হেতু কর্ম্ম দ্বারা (ত্বম্) আপনি (রক্ষ) রক্ষা করুন (চ) এবং (নঃ) আমাদের (তন্বঃ) শরীরের রক্ষা করুন । হে (বন্দ্য) স্তুতিযোগ্য ভগবান্ ! যে কারণে আপনি (অনিমেষম্) নিরন্তর (রক্ষমাণঃ) রক্ষা করিয়া (তোকস্য) সন্তানপুত্র (তনয়ে) পৌত্র এবং (গবাম্) গৌ আদির (ত্রাতা) রক্ষক (অসি) আছেন, এইজন্য আপনি আমাদেরকে সর্বদা সৎকার এবং উপাসনার যোগ্য ॥ ১৩ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে শ্লেষালঙ্কার আছে । যে সব মনুষ্য ঈশ্বরের গুণকর্মস্বভাব সমূহ এবং আজ্ঞার অনুকূলতা দ্বারা বর্ত্তমান যাহার ঈশ্বর ও বিদ্বান্গণ নিরন্তর রক্ষা করিয়া থাকেন তাহারা লক্ষ্মী, দীর্ঘায়ু এবং সন্তান হইতে রহিত কখনও হয় না ॥ ১৩ ॥
হরিশরণজীকৃত পদার্থভাষ্যঃ
হে (অগ্নে) = উন্নতির সাধক! (দেব) = দিব্য গুণের পুঞ্জ, হে প্রভু! (ত্বম্) = আপনি (নঃ) = আমাদের
(মঘোনঃ) = [মা অঘ] পাপের অণুমাত্র অংশ থেকেও শূন্য ঐশ্বর্যবানদের এবং [মঘ = মখ] যজ্ঞশীল মানুষদের (তব পায়ুভিঃ) = আপনার রক্ষাকবচসমূহ দ্বারা (রক্ষ) = নিরাপদ রাখুন। প্রভু রক্ষা করেন তাঁদেরই, [ক] যারা (মঘ) = ঐশ্বর্য উপার্জন করেন, কিন্তু সেই ঐশ্বর্য কুটিলতা বা পাপের দ্বারা অর্জিত নয়। [খ] যারা ঐশ্বর্য অর্জন করে সেই ঐশ্বর্যের বিনিয়োগ করেন যজ্ঞে (মঘ = মখ)। [গ] যারা এইভাবে সাধন সংগ্রহ করে এবং সেই সাধনের সদ্ব্যবহার করে উন্নতির পথে অগ্রসর হন (অগ্নি)। [ঘ] এবং ধীরে ধীরে দিব্য গুণের পুঞ্জে পরিণত হন (দেব)।
হে (বন্দ্য) = বন্দনা ও স্তবের যোগ্য প্রভু! (নঃ তন্বঃ চ) = আমাদের দেহসমূহেরও (রক্ষ) = আপনি রক্ষা করুন। হে প্রভু! আপনিই তো (তোকস্য ত্রাতা) = আমাদের সন্তানদেরও রক্ষক। বাস্তবে প্রভুর কৃপা ব্যতীত পিতা-মাতা সন্তানের নির্মাণ করতে সক্ষম হন না। আমাদের (তনয়ে) = পৌত্রদের ক্ষেত্রেও — [তনুতে বংশম্] — আপনিই ত্রাতা ও রক্ষক। আমাদের এই সন্তানাদি রক্ষার জন্যই (গবাম্) = আমাদের গাভী প্রভৃতি পশুদেরও আপনি (ত্রাতা অসি) = রক্ষক। এখানে বংশবিস্তারের জন্য গোরক্ষার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। হে প্রভু! প্রকৃতপক্ষে (তব ব্রতে) = আপনার ব্রতে যারা চলেন, তাঁদের আপনি (অনিমেষম্) = সম্পূর্ণ প্রমাদশূন্যতা ও পূর্ণ সতর্কতার সঙ্গে (রক্ষমাণঃ) = রক্ষা করেন। যারা প্রভু-প্রাপ্তিকেই নিজের জীবনের লক্ষ্য করে নেন, প্রভু স্বয়ং তাঁদের রক্ষক হয়ে ওঠেন।
পুনর্বিদ্বান্ কিং কুর্য়্যাদিত্যাহ ॥
পুনঃ বিদ্বান্গণ কী করিবে এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
উত্তানায়ামিত্যস্য দেবশ্রবদেববাতৌ ভারতাবৃষী । অগ্নির্দেবতা । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
উ॒ত্তা॒নায়া॒মব॑ ভরা চিকি॒ত্বান্ৎস॒দ্যঃ প্রবী॑তা॒ বৃষ॑ণং জজান ।
অ॒রু॒ষস্তূ॑পো॒ রুশ॑দস্য॒ পাজ॒ऽইডা॑য়াস্পু॒ত্রো ব॒য়ুনে॑ऽজনিষ্ট ॥ ১৪ ॥
পদার্থঃ- হে বিদ্বান্ পুরুষ । আপনার ন্যায় (চিকিত্বান্) জ্ঞানবান্ (প্রবীতা) কামনাকারী বিদ্বান্ ব্যক্তি (উত্তানায়াম্) উৎকর্ষতা সহ বিস্তীর্ণ ভূমি বা অন্তরিক্ষে (বৃষণম্) বর্ষা হেতু যজ্ঞকে (জজান) প্রকট করেন এবং (অরুষস্তূপঃ) রক্ষকদিগের উন্নতিকারী (ইডায়াঃ) প্রশংসিত স্ত্রীর (পুত্রঃ) (বয়ুনে) বিজ্ঞানে (অজনিষ্ট) প্রসিদ্ধ হয় (অস্য) ইহার (রুশৎ) সুন্দর রূপযুক্ত (পাজঃ) বল প্রসিদ্ধ হয় সেইরূপ (সদ্যঃ) শীঘ্র (অব, ভর) নিজের দিকে পুষ্ট করুন ॥ ১৪ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । যদি মনুষ্য এই সৃষ্টিতে ব্রহ্মচর্য্যাদির সেবন দ্বারা কন্যা-পুত্রদিগকে দ্বিজ করে তাহা হইলে তাহারা সকলে শীঘ্র বিদ্বান্ হইয়া যাইবে ॥ ১৪ ॥
(উত্তানায়াম্) = উৎকৃষ্টভাবে বিস্তৃত ভূমিতে অথবা অন্তরিক্ষে (অব) = নিকটে / নিম্নদিকে (ভর) = ধারণ করে / বহন করে। এখানে দ্ব্যচোऽতস্তিঙঃ [অ॰ ৬.৩.১৩৫] সূত্র অনুসারে দীর্ঘ স্বর হয়েছে। (চিকিত্বান্) = জ্ঞানবান (সদ্যঃ) = তৎক্ষণাৎ (প্রবীতা) = কামনাকারী / প্রেরণকারী (বৃষণম্) = বৃষ্টিকারী (যজ্ঞম্) = যজ্ঞকে (জজান) = উৎপন্ন করে। এখানে অন্তর্নিহিত ণিচ্ প্রত্যয় বিদ্যমান। (অরুষস্তূপঃ) = যে অরুষ অর্থাৎ অহিংসক, শান্ত গুণসম্পন্নদের উন্নত করে তোলে (রুশত্) = সুদর্শন, দীপ্তিমান (অস্য) = তার (পাজঃ) = বল, শক্তি (ইডায়াঃ) = প্রশংসিতার (পুত্রঃ) = পুত্র (বয়ুনে) = বিজ্ঞানে (অজনিষ্ট) = জন্মগ্রহণ করে / উৎপন্ন হয়॥ দয়ানন্দ সরস্বতী॥
হিন্দি ভাবার্থগত অনুবাদ (সমন্বিত অর্থ):
উৎকৃষ্টভাবে বিস্তৃত ভূমি বা অন্তরিক্ষে নিকটবর্তীভাবে ধারণ করে জ্ঞানবান ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ কামনাপূর্বক বৃষ্টিদায়ক যজ্ঞের সৃষ্টি করেন। তিনি অহিংস ও পবিত্র গুণসম্পন্নদের উন্নত করেন। তাঁর শক্তি দীপ্ত ও সুদৃশ্য হয় এবং প্রশংসিত ইলার পুত্র রূপে তিনি বিজ্ঞানের দ্বারা জন্মগ্রহণ করেন।
কিংভূতো জনো রাজ্যাধিকারে স্থাপনীয় ইত্যাহ ॥
কেমন মনুষ্য রাজ্যের অধিকার স্থাপিত করিবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ইডায়া ইত্যস্য দেবশ্রবদেববাতৌ ভারতাবৃষী । অগ্নির্দেবতা । বিরাডনুষ্টুপ্ ছন্দঃ । গান্ধারঃ স্বরঃ ॥
ইডা॑য়াস্ত্বা প॒দে ব॒য়ং নাভা॑ পৃথি॒ব্যাऽঅধি॑ ।
জাত॑বেদো॒ নি ধী॑ম॒হ্যগ্নে॑ হ॒ব্যায়॒ বোঢ॑বে ॥ ১৫ ॥
পদার্থঃ- হে (জাতবেদঃ) উৎপন্ন বুদ্ধিসম্পন্ন (অগ্নে) অগ্নির তুল্য তেজস্বী বিদ্বান্ রাজন্! (বয়ম্) অধ্যাপক তথা উপদেশক আমরা (ইডায়াঃ) প্রশংসিত বাণীর (পদে) ব্যবস্থা তথা (পৃথিব্যাঃ) বিস্তৃত ভূমির (অধি) উপর (নাভা) মধ্যভাগে (ত্বা) আপনাকে (হব্যায়) হবন যোগ্য পদার্থগুলিকে (বোঢবে) প্রাপ্ত করিবার বা করাইবার জন্য (নি, ধীমহি) নিরন্তর স্থাপিত করি ॥ ১৫ ॥
ভাবার্থঃ- হে বিদ্বান্ রাজন্ ! যে অধিকারে আপনাকে আমরা স্থাপিত করি সেই অধিকারকে ধর্ম ও পুরুষার্থ হইতে যথাবৎ সিদ্ধ করুন ॥ ১৫ ॥
দেবশ্রবদেববাত (হরিশরণ জীকৃত পদার্থভাষ্য)
পদার্থ / ব্যাখ্যা:
পূর্ববর্তী ও বর্তমান মন্ত্রের ঋষি হলেন ‘দেবশ্রবদেববাত’ (দেবশ্রব-দেববাত) যিনি ভারত নামে পরিচিত। তিনি মাতা-পিতা, আচার্য ও অতিথি প্রভৃতি দেবসম ব্যক্তিদের নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করেছেন বলেই তাঁর নাম হয়েছে দেবশ্রব (অর্থাৎ দেবদের কাছ থেকে শ্রবণ করা জ্ঞান যার আছে)। আবার ঐ দেবসম ব্যক্তিদের কাছ থেকেই সর্বদা উৎকৃষ্ট প্রেরণা লাভ করার কারণে তাঁর নাম হয়েছে দেববাত (এখানে বা ধাতুর অর্থ প্রেরণা)। তিনি নিজের মধ্যে বেদবাণী ধারণ করেছেন, সেই কারণেই তিনি ভারত নামে অভিহিত।
জ্ঞান অর্জন করে এবং যজ্ঞাদি উত্তম কর্মের প্রেরণা পেয়ে তিনি সর্বদা যজ্ঞকর্মে নিয়োজিত থাকেন, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে চলেন এবং দানের প্রবৃত্তিকে কখনও নিজের থেকে দূরে রাখেন না। এই দানের প্রবৃত্তিই নিত্যিক অগ্নিহোত্ররূপে প্রকাশ পায়।
তিনি বলেন—
হে (জাতবেদঃ) = প্রত্যেক বস্তু ও সত্তাকে জানেন ও প্রাপ্ত করান যিনি, সেই অগ্নি! হে হব্যবস্তুসমূহকে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়া অগ্নি! (হব্যায় বোঢবে) = হব্যবস্তু বহন করার জন্য (বয়ম্) = আমরা (ত্বা) = তোমাকে (পৃথিব্যাঃ নাভৌ অধি) = এই পৃথিবীর যজ্ঞরূপ নাভিতে [“অয়ং যজ্ঞো ভুবনস্য নাভিঃ” এই যজ্ঞই জগতের নাভি] (নিধীমহি) = প্রতিষ্ঠা করি। যজ্ঞ ছাড়া কারও কল্যাণ হয় না। এই পৃথিবীলোক যজ্ঞজাত পर्जন্যের দ্বারাই পরিপুষ্ট হয়।“যজ্ঞাদ্ ভবতি পর্জন্যঃ, পর্জন্যাদন্নসম্ভবঃ” অর্থাৎ যজ্ঞ থেকে পর্জন্য উৎপন্ন হয় এবং পর্জন্য থেকেই অন্নের সৃষ্টি হয়।
এই অগ্নিই জাতবেদঃ— এতে অর্পিত হব্যবস্তু সে প্রত্যেক দেবতার কাছে পৌঁছে দেয়। শুধু অগ্নি জ্বালানো ও হব্য নিক্ষেপ করাই যথেষ্ট নয়; বরং সে হব্যবস্তু নিক্ষেপ করে (ইডায়াঃ) = বেদবাণীর
(পদে) = শব্দ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। অর্থাৎ মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক যজ্ঞ সম্পাদন করাই তার প্রকৃত রীতি। এইভাবে যজ্ঞের উপলক্ষে সে বেদবাণীরও রক্ষক হয়ে ওঠে। বেদবাণীই তার মাতা— সেই বেদই তাকে গড়ে তুলেছে, আর সেই বেদের রক্ষা করাই তার কর্তব্য।
মনুষ্যৈর্বিদ্যাধর্মৌ বর্দ্ধনীয়াবিত্যাহ ॥
মনুষ্যগণকে বিদ্যা ও ধর্ম বৃদ্ধি করা দরকার, এই বিষয়কে বলা হইতেছে ॥
প্র মন্মহ ইত্যস্য নোধা ঋষিঃ । ইন্দ্রো দেবতা । বিরাট্ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
প্র ম॑ন্মহে শবসা॒নায়॑ শূ॒ষমা॑ঙ্গূ॒ষং গির্ব॑ণসেऽঅঙ্গির॒স্বৎ ।
সু॒বৃ॒ক্তিভিঃ॑ স্তুব॒তऽঋ॑গ্মি॒য়ায়ার্চা॑মা॒র্কং নরে॒ বিশ্রু॑তায় ॥ ১৬ ॥
অন্বয়ঃ
হে মনুষ্যাঃ!যথা বয়ং সুবৃক্তিভিঃ শবসানায় গির্বণসে ঋগ্মিয়ায় বিশ্রুতায় স্তুবতে নরে অঙ্গিরস্বদ্ আঙ্গূষং শূষং প্রমন্মহে—এবং অর্কম্ অর্চাম।তথা এতং প্রতি ইউয়ম্ অপি বর্ত্তধ্বম্॥১৬॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন আমরা (সুবৃক্তিভিঃ) নির্দোষ ক্রিয়াসমূহের দ্বারা (শবসানায়) বিজ্ঞানের জন্য (গির্বণসে) সুশিক্ষিত বাণী দ্বারা যুক্ত (ঋগ্মিয়ায়) ঋচা পাঠকারী (বিশ্রুতায়) বিশেষ করিয়া যাহাতে গুণ শ্রবণ করা হয় (স্তুবতে) শাস্ত্রের অভিপ্রায়ের গুণগানকারী (নরে) নায়ক মনুষ্যের জন্য (অঙ্গিরস্বৎ) প্রাণতুল্য (আঙ্গুষম্) বিদ্যাশাস্ত্রের বোধরূপ (শূষম্) বলকে (প্র, মন্মহে) কামনা করি এবং এই (অর্কম্) পূজনীয় পুরুষের (অর্চাম) সৎকার করি তদ্রূপ এই বিদ্বানের প্রতি তোমরাও আচরণ কর ॥ ১৬ ॥
(প্র) (মন্মহে) যাচামহে। মন্মহ ইতি যাঞ্চাকর্মা॥ (নিঘং ৩।১৯) (আঙ্গূষম্)বিদ্যাশাস্ত্রবোধম্। আঙ্গূষ ইতি পদনামসু পঠিতম্॥ (নিঘং ৪।২) (অঙ্গিরস্বত্) প্রাণবৎ।
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে উপমা ও বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । মনুষ্যদিগের উচিত যে, সৎকারের যোগ্যের সৎকার এবং নিরাদরের যোগ্যের নিরাদর করিয়া বিদ্যা ও ধর্মকে নিরন্তর বৃদ্ধি করিবে ॥ ১৬ ॥
হরিশরণজীকৃত পদার্থভাষ্যঃ
১. (শবসানায়) = [অভিবলায়মানায়] — যে সর্বদিকে বলের পুঞ্জের ন্যায় আচরণ করে, তার জন্য (শূষম্) = শত্রুনাশকারী বলকে আমরা (প্রমন্মহে) = কামনা করি; অর্থাৎ বাসনা-শোষণকারী বলেরই কামনা করি। কারণ যদি কোনো বলবান পুরুষের মধ্যে কামাদি বাসনা শোষণের শক্তি না থাকে, তবে তার বল অত্যন্ত অপব্যবহৃত হতে শুরু করে। যত যত আমাদের বল বৃদ্ধি পায়, তত তত আমাদের বাসনা-শোষণশক্তিও বৃদ্ধি পাক—যাতে বর্ধিত বলের কারণে আমরা অধিক বাসনার শিকার না হয়ে পড়ি।
২. (গির্বণসে) = বেদবাণী সেবনকারীর জন্য (আঙ্গুষম্) = [আঘোষম্ স্তোমম্]—উচ্চস্বরে উচ্চারণযোগ্য স্তবসমষ্টিকে আমরা (প্রমন্মহে) = কামনা করি, (অঙ্গিরস্বত্) = যেমন এই স্তবসমষ্টি অঙ্গিরা ঋষির নিকট প্রাপ্ত হয়েছিল। অঙ্গিরা অথর্ববেদ তথা ব্রহ্মবেদ লাভ করেছিলেন। এই গির্বণের জন্যও আমরা সেটিই কামনা করি। বেদবাণীর অধ্যয়নকারী যখন (ঋগ্বেদ) = বিজ্ঞানবেদ অধ্যয়ন করবে, তখন অঙ্গিরার এই আঙ্গুষ—ব্রহ্মমন্ত্র ছাড়া সে বিজ্ঞানের হিংসাত্মক প্রয়োগকারী হয়ে উঠবে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক উন্নতির সঙ্গে যদি ব্রহ্মের (আঙ্গুষ)—উচ্চস্বরে গেয় স্তোত্র যুক্ত থাকে, তবে এই সংকট দূর হয়ে যাবে। বিজ্ঞানের সঙ্গে ব্রহ্মস্মরণ যুক্ত হলে বিজ্ঞান নির্মাণেই নিয়োজিত হবে, ধ্বংসে নয়।
৩. (সুবৃক্তিভিঃ) = উত্তম বর্জনের দ্বারা, অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে অকল্যাণ ত্যাগ করে (স্তুবতে) = যে প্রভুর স্তব করে, অসৎ পরিত্যাগ করে সৎ গ্রহণ করে এবং (ঋগ্মিয়ায়) = যে ঋচাগুলিকে প্রশংসার সঙ্গে গ্রহণ করে, তার জন্য (অর্চাম্) = পূজাকে আমরা (প্রমন্মহে) = কামনা করি। জগতে সম্মান তাকেই দেওয়া উচিত, যে দোষ ত্যাগ করে এবং উত্তম বিজ্ঞান অর্জন করে। যে ব্যক্তি মন ও মস্তিষ্ক—উভয়েরই উন্নতি সাধন করে, সেই ব্যক্তি লোকসমাজের সম্মানের যোগ্য হয়।
৪. লোকেরা তাকে সম্মান করুক, কিন্তু সে যেন অহংকারে না ভরে ওঠে—এইজন্য আমরা এই (বিশ্রুতায়) = দূরদূরান্তে বিশেষ খ্যাতিলাভকারী (নরে) = মানুষের জন্য (অর্কম্) = প্রভু-স্তবনকেই (আপ্রমন্মহে) = বিশেষভাবে কামনা করি। এই ‘বিশ্রুত নর’ যদি সদা গভীরভাবে প্রভুস্মরণে নিয়োজিত থাকে, তবে মানুষের দেওয়া অর্চনা তথা সম্মান থেকে তার মধ্যে অহংকার জন্মাবে না। সাধারণত ব্যক্তি সাধনার দ্বারা জগতে উচ্চস্থানে পৌঁছে যায়, লোকেরা তার সম্মান করতে শুরু করে; কিন্তু অতিরিক্ত সম্মান সে ঠিকভাবে ধারণ করতে না পেরে গর্বিত হয়ে ওঠে এবং একসময় নিজেকেই পূজার কেন্দ্র বানিয়ে ফেলে। কিন্তু এই ‘বিশ্রুত নর’ যদি সর্বদা প্রভুস্মরণে নিয়োজিত থাকে, তবে লোকসম্মানের মোহে পড়ে নিজের ক্ষুদ্রতা ভুলে যাবে না এবং এইভাবে অহংকারের শিকারও হবে না।
জয়দেবশর্মাকৃত পদার্থভাষ্যঃ
আমরা (শবসানায়) = দুষ্টদের বিনাশকারী বলের বৃদ্ধি কামনাকারী, (গির্বণসে) = সমস্ত স্তুতির যোগ্য, (অঙ্গিরস্বত্) = বায়ু, সূর্য ও অগ্নির ন্যায় তেজস্বী ও বলবান, (সুবৃক্তিভিঃ) = উত্তম শত্রু-বর্জনকারী শক্তির দ্বারা, (স্তুবতে) = স্তবযোগ্য, (ঋগ্মিয়ায়) = বিদ্বান, (বিশ্রুতায়) = নানা শৌর্য প্রভৃতি গুণে প্রসিদ্ধ, (নরে) = নায়কের (শূপম্) = বল এবং (আহূপম্) = ঘোষণার অধিকার অথবা যশবৃদ্ধিকে (প্রমন্মহে) = আমরা উত্তমভাবে কামনা করি। এবং আবার (সুবৃক্তিভিঃ) = হৃদয়কে উত্তমভাবে আকর্ষণকারী ও পাপনাশক জ্ঞানবাণীর দ্বারা (স্তুবতে) = শাস্ত্রের সিদ্ধান্তসমূহের প্রবচনকারী, (ঋগ্মিয়ায়) = স্তবযোগ্য ও বেদমন্ত্রের জ্ঞাতা, (বিশ্রুতায়) = বিভিন্ন বিদ্যায় প্রসিদ্ধ বিদ্বানের (অর্কম্) = স্তবযোগ্য জ্ঞানকে (অর্চাম্) = আমরা আদর ও সম্মান করি।
(২) পরমেশ্বরের পক্ষ থেকে — বিজ্ঞানের প্রাপ্তির জন্য সর্বস্তবযোগ্য, প্রাণের ন্যায় সর্ব জীবনের আধার, জ্ঞানী, স্তবযোগ্য ও প্রসিদ্ধ পরমেশ্বরের বলবর্ধক, বেদময় আঘোষরূপ মন্ত্রসমূহ অথবা স্তবযোগ্য স্বরূপের স্তবনা করা হোক এবং তারই চিন্তা ও মনন করা হোক।
অথ কে পিতরঃ সন্তীত্যাহ ॥
এখন কে পিতরগণ, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
প্র ব ইত্যস্য নোধা ঋষিঃ । ইন্দ্রো দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
প্র বো॑ ম॒হে মহি॒ নমো॑ ভরধ্বমাঙ্গূ॒ষ্য᳖ꣳ শবসা॒নায়॒ সাম॑ । য়েনা॑ নঃ॒ পূর্বে॑ পি॒তরঃ॑ পদ॒জ্ঞাऽঅর্চ॑ন্তো॒ऽঅঙ্গি॑রসো॒ গাऽঅবি॑ন্দন্ ॥ ১৭ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন (পদজ্ঞাঃ) জানিবার বা হওয়ার যোগ্য আত্মস্বরূপ জ্ঞাতা (নঃ) আমাদের (অর্চন্তঃ) সৎকার করিয়া (অঙ্গিরসঃ) সকল সৃষ্টির বিদ্যার অবয়ব সকলের জ্ঞাতা (পূর্বে) পূর্ব পুরুষগণ (পিতরঃ) রক্ষক জ্ঞানীগণ (য়েন) যদ্দ্বারা (মহে) বড় (শবসানায়) ব্রহ্মচর্য্য ও উত্তম শিক্ষা দ্বারা শরীর ও আত্মার বল দ্বারা যুক্ত ব্যক্তি এবং (বঃ) তোমাদিগের জন্য (আঙ্গূষ্যম্) সৎকার বা বলের জন্য উপযোগী (সাম) সামবেদ এবং (গাঃ) সুশিক্ষিত বাণীকে (অবিন্দন্) প্রাপ্ত করাইবে তদ্দ্বারা তাহাদের জন্য তোমরা (মহি) মহাসৎকারের জন্য (নমঃ) উত্তম কর্ম বা অন্নকে (প্রঃ ভরধ্বম্) ধারণ কর ॥ ১৭ ॥ (সাম) সামবেদম্ (যেন) অত্র সংহিতায়াম্ (অ০ ৬।৩।১১৪)॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । হে মনুষ্যগণ ! যে সব বিদ্বান্গণ তোমাকে বিদ্যা এবং উত্তম শিক্ষা দ্বারা পন্ডিত ধর্মাত্মা করিবে, তাহাদেরকে, প্রথম পঠিত লোকদেরকে, তোমরা পিতর জানিবে ॥ ১৭ ॥
হরিশরণজীকৃত পদার্থভাষ্যম্ঃ
১. নোধা ঋষি বলেন যে (বঃ) = তোমাদের (মহে) = [মহসে] তেজস্বিতার জন্য (মহি নমঃ) = পূজ্য নততার ভাবকে (প্রভরধ্বম্) = নিজের ভিতরে গভীরভাবে ধারণ করো। মানুষ তখনই প্রভু-প্রবণ হয়, যখন সে বিষয়াসক্তি থেকে বাঁচতে বাঁচতে শক্তিকে রক্ষা করে তেজস্বী হতে পারে।
২. তেজস্বী হয়ে (শবসানায়) = [অভিবলায়মানায়] সর্বদিকে শক্তিপুঞ্জের ন্যায় আচরণকারী ব্যক্তির জন্য প্রয়োজন যে সে (আঙ্গূষ্যম্ সাম) = উচ্চস্বরে উচ্চারণযোগ্য উপাসনামন্ত্রসমূহ নিজের মধ্যে ধারণ করে, যাতে শক্তির বৃদ্ধি হলেও তার আচরণ ভোগবাসনাময় না হয়ে ওঠে।
৩. সাধারণ ক্রম এই যে—
[ক] বাসনা-বিজয়ের মাধ্যমে শক্তি লাভ হয়,
[খ] শক্তিবৃদ্ধি হলে বাসনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।
শক্তি প্রাপ্তির জন্য যেমন প্রভু-নমন আবশ্যক, তেমনি শক্তি প্রাপ্তির পর সেই শক্তিকে বিনাশ থেকে রক্ষা করার জন্য প্রভু-নমন আরও অধিক প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।
৪. ‘শক্তি প্রাপ্তির জন্য প্রভু-নমন এবং শক্তির রক্ষার জন্যও প্রভু-নমন’—এই পথেই (যেন) = যে পথে (নঃ) = আমাদের
[ক] (পূর্বে) = নিজ নিজ পূরণকারী,
[খ] (পিতরঃ) = রক্ষণ ও পালনকারী,
[গ] (পদজ্ঞাঃ) = বেদশব্দের রহস্য উপলব্ধিকারী,
[ঘ] (অর্চন্তঃ) = উপাসক,
[ঙ] (অঙ্গিরসঃ) = প্রত্যেক অঙ্গের রস বা শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ (গাঃ) = ইন্দ্রিয়সমূহকে (অবিন্দন্) = লাভ করতেন, অর্থাৎ সম্পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় হতেন।
(গাঃ) শব্দের অর্থ ‘বেদবাণী’ও করা যায়; সে ক্ষেত্রে এরা বেদবাণীকে সম্পূর্ণরূপে লাভকারী হতেন। এটি এক নতুন জীবন, তাই এঁরা ‘নবধা’ বা ‘নোধা’ নামে পরিচিত হন।
অথাপ্তলক্ষণমাহ ॥
এখন আপ্তের লক্ষণ বলা হইতেছে ॥
ইচ্ছন্তীত্যস্য দেবশ্রবা দেববাতশ্চ ভারতাবৃষী । ইন্দ্রো দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ই॒চ্ছন্তি॑ ত্বা সো॒ম্যাসঃ॒ সখা॑য়ঃ সু॒ন্বন্তি॒ সোমং॒ দধ॑তি॒ প্রয়া॑ᳬসি ।
তিতি॑ক্ষন্তেऽঅ॒ভিশ॑স্তিং॒ জনা॑না॒মিন্দ্র॒ ত্বদা কশ্চ॒ন হি প্র॑কে॒তঃ ॥ ১৮ ॥
পদার্থঃ- হে (ইন্দ্র) সভাধ্যক্ষ রাজন্ ! যিনি (সোম্যাসঃ) ঐশ্বর্য্য হওয়ায় উত্তম স্বভাবযুক্ত (সখায়ঃ) মিত্র হওয়া (সোমম্) ঐশ্বর্য্যাদিকে (সুন্বন্তি) সিদ্ধ করেন (প্রয়াংসি) কামনার যোগ্য বিজ্ঞানাদি গুণসকলকে (দধতি) ধারণ করেন এবং (জনানাম্) মনুষ্যদিগের (অভিশস্তিম্) দুর্বচন বাদ-বিবাদকে (আ, তিতিক্ষন্তে) উত্তম প্রকার সহ্য করেন তাহাদের আপনি নিরন্তর সৎকার করুন (হি) যে কারণে (ত্বৎ) আপনার অপেক্ষা (প্রকেতঃ) উত্তম বুদ্ধিমান্ (কঃ, চন্) কেহই নহে, ইহার জন্য (ত্বা) আপনাকে সকলে (ইচ্ছন্তি) কামনা করে ॥ ১৮ ॥
ভাবার্থঃ- যে সব মনুষ্য এই সংসারে নিন্দা-স্তুতি এবং হানি-লাভাদিকে সহ্য করেন, পুরুষার্থী, সকলের সঙ্গে মিত্রতার আচরণ করিয়া আপ্ত হয়েন, তাহারা সকলের সেবনীয় এবং সৎকার করিবার যোগ্য তথা তাহারাই সকলের অধ্যাপক ও উপদেশক হইবেন ॥ ১৮ ॥
হরিশরণজীর পদার্থভাষ্যঃ
হে প্রভু! (ত্বা) = আপনাকে (ইচ্ছন্তি) = কামনা করে—কারা?
যারা—
১. (সোম্যাসঃ) = বিনীত, নিরভিমান। প্রকৃতির দিকেই যাঁরা ঝুঁকে পড়ে, প্রকৃতিতেই আসক্ত হয়ে পড়ে—এই অসুরপ্রকৃতির লোকেরা তো নিজেরাই নিজেকে ‘ঈশ্বর’ বলে মনে করতে শুরু করে “কোন্যোऽস্তি সদৃশো ময়া” ‘আমার মতো আর কে আছে?’ এই বাক্যেই তাদের অহংকার প্রকাশ পায়।
২. (সখায়ঃ) = এরা বন্ধু। প্রভুকে যাঁরা কামনা করেন, তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্বের ভাব নিয়ে আচরণ করেন।
৩. (সোমং শুন্বন্তি) = নিজেদের মধ্যে সোম-শক্তির (অভিষব) = উৎপাদন করেন। প্রভুর বিধান অনুযায়ী আহারের চূড়ান্ত পরিণাম হলো সোম; এই সোমকেই তাঁরা নিজের ভেতরে গ্রহণ করার চেষ্টা করেন। এই সোমই তাঁদের জ্ঞানাগ্নিকে প্রজ্বালিত করে এবং তাঁদের বুদ্ধিকে সূক্ষ্ম করে প্রভু-দর্শনের উপযোগী করে তোলে।
৪. (প্রযাংসি দধতি) = ত্যাগময় প্রয়াসসমূহকে ধারণ করেন [প্রয়স্ = প্রয়াস, sacrifice = ত্যাগ]। অর্থাৎ তাঁরা কেবল পরিশ্রমীই নন, তাঁদের সব প্রচেষ্টাই ত্যাগভাবনায় পরিপূর্ণ।
৫. এইভাবে ত্যাগ ও প্রয়াসকে একত্র করে যখন তাঁরা লোককল্যাণে নিয়োজিত থাকেন, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের অজ্ঞতার কারণে তাঁদের মন্দ কথা বলে, গালাগালি দেয়; কিন্তু এই প্রভুপ্রবণ মানুষরা (জনানাম্) = সেই লোকদের (অভিশস্তিম্) = কটুবাক্য গ্রহণ করেন না, সেগুলো তাদের কাছেই পড়ে থাকতে দেন।
এই মানুষরা সাধারণ মানবস্তরের অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন; এরা মানুষ নন, যেন দেবতা। বেদ বলে (ইন্দ্র) = হে পরম ঐশ্বর্যশালী প্রভু! (ত্বত্ হি) = আপনারই (কশ্চন) = কোনো অবর্ণনীয় (প্রকেতঃ) = আলোক (আ) = চারদিকে এই ব্যক্তিদের মধ্যে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মানুষদের অসাধারণ মানসিক প্রসন্নতা তাঁদের মধ্যে প্রভুর আলোকের উপস্থিতির কারণেই ঘটে।
এরা সদা প্রভুর প্রিয় দেবগণের সঙ্গে ওঠা-বসা করে, তাঁদের জ্ঞানচর্চা শ্রবণ করে এই জন্য এরা ‘দেবশ্রব’ নামে পরিচিত। আবার সেই দেবদের কাছ থেকেই সদা উত্তম প্রেরণা গ্রহণ করে এই কারণে এদের নাম ‘দেববাত’। এরা পাথরের উত্তরে পুষ্প দেয়, ঘৃণার জবাবে প্রেম দেয়।
পুনঃ সভাধ্যক্ষঃ কিং কুর্য়্যাদিত্যাহ ॥
পুনঃ সভাধ্যক্ষ রাজা কী করিবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ন ত ইত্যস্য দেবশ্রবা দেববাতশ্চ ভারতাবৃষী । ইন্দ্রো দেবতা । নিচৃৎত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ন তে॑ দূ॒রে প॑র॒মা চি॒দ্ রজা॒ᳬস্যা তু প্র য়া॑হি হরিবো॒ হরি॑ভ্যাম্ ।
স্থি॒রায়॒ বৃষ্ণে॒ সব॑না কৃ॒তেমা য়ু॒ক্তা গ্রাবা॑ণঃ সমিধা॒নেऽঅ॒গ্নৌ ॥ ১ঌ ॥
পদার্থঃ- হে (হরিবঃ) প্রশস্ত অশ্বসম্পন্ন রাজন্ ! যেমন (সমিধানে) প্রদীপ্ত কৃত (অগ্নৌ) অগ্নিতে (ইমাঃ সবনা) এই সব প্রাতঃ সবনাদি যজ্ঞকর্ম (কৃতা) করা হয় (তু) এই হেতু দ্বারা (গ্রাবাণঃ) [গ্রাবেতি মেঘনামসু পাঠিতম্॥ (নিঘং ১।১০)] গর্জনকারী মেঘ (য়ুক্তাঃ) একত্রিত হইয়া আইসে তদ্রূপ (স্থিরায়) দৃঢ় (বৃষ্ণে) সুখদায়ী বিদ্যাদি পদার্থের জন্য (হরিভ্যাম্) ধারণ ও আকর্ষণের বেগরূপ গুণ দ্বারা যুক্ত অশ্বগুলি বা জল ও অগ্নি দ্বারা (আ, প্র, য়াহি) উত্তম প্রকার আসুন । এই প্রকার করিলে (পরম) দূরস্থ (চিৎ) ও (রজাংসি) স্থান (তে) আপনার (দূরে) দূরে (ন) থাকে না ॥ ১ঌ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । হে বিদ্বান্গণ ! যেমন অগ্নি দ্বারা উৎপন্ন কৃত বর্ষার মেঘ পৃথিবীর সমীপ হয়, আকর্ষণের ফলে দূরেও গমন করে, তদ্রূপ অগ্নিযান দ্বারা গমন করিলে কোন দেশ দূর হয় না, এই প্রকার পুরুষার্থ করিয়া সম্পূর্ণ ঐশ্বর্য্যকে উৎপন্ন কর ॥ ১ঌ ॥
হরিশরণজীর পদার্থভাষ্য:
উপস্থাপিত মন্ত্রে প্রভু ‘দেবশ্রব’-কে বলেন—
১. হে দেবশ্রব! যে উৎকৃষ্ট লোকসমূহ তোমার প্রাপ্তব্য, সেগুলি (তে দূরে ন) = তোমার থেকে দূরে নয়। সৌম্য, সখাভাবসম্পন্ন, সোমপায়ী, সত্ত্বগুণে প্রতিষ্ঠিত ও সহনশীল হয়ে তুমি ইতিমধ্যেই সেই লোকসমূহের নিকট পৌঁছে গেছ। হে (হরিবঃ) = উৎকৃষ্ট ইন্দ্রিয়রূপ অশ্বযুক্ত! (হরিভ্যাম্) = এই জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়রূপ অশ্বদ্বয়ের দ্বারা (তু চিত্) = নিশ্চিতভাবেই (পরমা রজাংসি) = উৎকৃষ্ট লোকসমূহে (আপ্রয়াহি) = সম্পূর্ণরূপে আগমন কর। প্রভু আমাদের এই দেহরূপ রথে ইন্দ্রিয়রূপ অশ্ব যুক্ত করেছেন এইজন্যই যে, তাদের সাহায্যে আমরা উৎকৃষ্ট লোকসমূহে পৌঁছাতে পারি। সাধারণত নীচের আকর্ষণের কারণে আমরা উৎকর্ষের পথে না গিয়ে অপকর্ষের পথেই ছুটে চলি; কিন্তু ‘দেবশ্রবদেববাত’ উত্তম জ্ঞান ও প্রেরণা লাভ করতে করতে উৎকৃষ্ট লোকসমূহের দিকেই অগ্রসর হয়।
২. এই দেবশ্রবের বুদ্ধি বিষয়ভোগে আন্দোলিত হয় না; সে স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে থাকে। (স্থিতিরায়) = এই স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন (বৃষ্ণে) = শক্তিশালী পুরুষের জন্য অক্ষর ব্রহ্ম [প্রভু] বেদে যজ্ঞসমূহের (ইমা সবনা কৃতা) = এই বিধান করেছেন। এই প্রতিপাদনের দ্বারা স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন শক্তিশালী পুরুষেরা যজ্ঞকর্মে নিজেদের সময়ের সদ্ব্যয় করতে পারে।
৩. যজ্ঞে নিয়োজিত এই ‘দেবশ্রব’ জনেরা (অগ্নৌ সমিধানে) = যজ্ঞে অগ্নি প্রজ্বলিত হলে (যুক্তাঃ) = যোগযুক্ত হয় এবং (গ্রাবাণঃ) = উৎকৃষ্ট বেদগিরা [বেদবাণী] এর উপদেশদাতা হয়ে ওঠে। তারা কেবল যজ্ঞেই নিজেদের জীবন সীমাবদ্ধ করে না। যজ্ঞের সঙ্গে সঙ্গে তারা যোগাভ্যাস করে; প্রাণনিরোধের দ্বারা মনের বৃত্তিগুলিকে কেন্দ্রীভূত করে প্রভুর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে এবং এই নিরুদ্ধ চিত্তবৃত্তিকে জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত করে নিজেরা উচ্চস্তরের জ্ঞানী হয়ে সেই জ্ঞানের উপদেশদাতা হয়। এইভাবে তারা জীবনে ‘কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান’ এই তিনটিরই সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে। কেবল যজ্ঞ করেই তারা নিজেদের কৃতকৃত্য মনে করে না।
অথ রাজধর্মবিষয়মাহ ॥
এখন রাজধর্ম বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
অষাঢমিত্যস্য গোতম ঋষিঃ । সোমো দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
অষা॑ঢং য়ু॒ৎসু পৃত॑নাসু॒ পপ্রি॑ꣳ স্ব॒র্ষাম॒প্সাং বৃ॒জন॑স্য গো॒পাম্ ।
ভ॒রে॒ষু॒জাᳬসু॑ক্ষি॒তিꣳ সু॒শ্রব॑সং॒ জয়॑ন্তং॒ ত্বামনু॑ মদেম সোম ॥ ২০ ॥
পদার্থঃ- হে (সোম) সমস্ত ঐশ্বর্য্য দ্বারা যুক্ত রাজন্ বা সেনাপতে ! আমরা যে সব (য়ুৎসু) যুদ্ধে (অষাঢম্) অসহ্য (পৃতনাসু) মনুষ্যের সেনামধ্যে (পপ্রিম্) পূর্ণ বল বিদ্যাযুক্ত বা রক্ষক (স্বর্ষাম্) সুখের সেবনকারক বা (অপ্সাম্) জল বা প্রাণপ্রদাতা (বৃজনস্য) বলের (গোপাম্) রক্ষক (ভরেষুজাম্) ধারণ করিবার যোগ্য সংগ্রামগুলির বিজেতা (সুক্ষিতিম্) (निघं॰१।१) পৃথিবীর সুন্দর রাজ্য যাহার (সুশ্রবসম্) সুন্দর অন্ন বা কীতিগুলির সহিত যুক্ত (জয়ন্তম্) শত্রুদের বিজেতা (ত্বাম্) আপনাকে (অনু, মদেম) অনুমোদিত করি ॥ ২০ ॥
ভাবার্থঃ- যে রাজা বা সেনাপতির উত্তম স্বভাব দ্বারা রাজপুরুষ, সেনাগণ ও প্রজাপুরুষ প্রসন্ন থাকে এবং যাহাদের প্রসন্নতায় রাজা প্রসন্ন হয় সেখানে দৃঢ় বিজয়, উত্তম নিশ্চল ঐশ্বর্য্য এবং উত্তম প্রতিষ্ঠা হয় ॥ ২০ ॥
গৌতমের দশ গুণ (হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)
পদার্থ
১. (যুত্সু অষাঢম্) = যুদ্ধে যে পরাজিত হয় না—এমন মানুষের হৃদয়ে দৈব ও আসুরিক প্রবৃত্তির মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ চলতে থাকে। এই অবিরাম দেবাসুর সংগ্রামে যে পুরুষ পরাজিত হয় না, তাকেই আমরা (অনুমদেম) = অনুমোদন করি; অর্থাৎ তাকেই আমরা প্রকৃত ‘মানুষ’ বলে মানি।
২. (পৃতনাসু পপ্রিম্) = [পৃতনা = সংগ্রাম] সংগ্রামে যে নিজের পালন ও পূরণ করে। আধ্যাত্মিক সংগ্রাম তো সর্বদাই চলে। সমাজজীবনেও সংঘর্ষ আসে। এই সংঘর্ষগুলিতে সে নিজের রক্ষণ করে, যাতে রোগ, ঈর্ষা প্রভৃতির শিকার না হয়। ‘সংঘর্ষ শক্তি সৃষ্টি করে’—এই নীতিকে স্মরণে রেখে সে সংগ্রামকে স্বাগত জানায়।
৩. (স্বর্ষাম্) = [স্বঃ সন্] সে আলোর সেবনকারী। ‘স্বঃ’ শব্দের অর্থ স্বর্গও হতে পারে, কিন্তু এখানে ‘আলো’ অর্থই অধিক উপযুক্ত। নিজের ভেতরে জ্ঞানের আলো বৃদ্ধি করার জন্য সে সদা চেষ্টা করে।
৪. (অপ্সাম্) = [অপ্ সন্] সেই জ্ঞানালোর ফলেই সে সর্বদা [আপ্ = ব্যাপ্তি] ব্যাপক, স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কর্ম করে। জ্ঞান তাকে স্বার্থপর কামনা থেকে ঊর্ধ্বে তোলে এবং পরার্থভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সে সার্বজনিক কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত থাকে।
৫. (বৃজনস্য গোপাম্) = এইভাবে পরার্থের কাজে নিয়োজিত থেকে সে কখনও বিষয়াসক্ত হয় না এবং নিজের বলের রক্ষক হয়। [বৃজনম্ = বল]
৬. এই সংরক্ষিত বলের কারণেই (ভরেষুজাম্) = ভরণীয় সংগ্রামসমূহে সে বিজয়ী হয়। সংগ্রামে সে নিজের শক্তির প্রকাশ ঘটায়, কখনও নিরাশ হয় না।
৭. (সুক্ষিতিম্) = [ক্ষি = নিবাস ও গতি] সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে সে উত্তম নিবাস ও উত্তম গতিসম্পন্ন হয়।
৮. (সুশ্রবসম্) = সে উত্তম কীর্তিসম্পন্ন হয়।
৯. (জয়ন্তম্) = সে জয়ী হয়েই চলে, পরাজিত হয় না।
১০. এত সব গুণ থাকা সত্ত্বেও সে অহংকারী হয় না; বিনয়ীই থাকে। তাই বলা হয়েছে—হে (সোম) = সকল দিব্য গুণে যুক্ত হয়েও বিনীত থাকা, প্রশস্ততম ইন্দ্রিয়সম্পন্ন ‘গৌতম’, (ত্বাম্ অনুমদেম) = আমরা তোমাকে অনুমোদন করি। আমরা তোমার জীবনের প্রশংসা করি।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
সোম ইত্যস্য গোতম ঋষিঃ । সোমো দেবতা । ভুরিক্ পংক্তিশ্ছন্দঃ । পঞ্চমঃ স্বরঃ ॥
সোমো॑ ধে॒নুꣳ সোমো॒ऽঅর্ব॑ন্তমা॒শুꣳ সোমো॑ বী॒রং ক॑র্ম॒ণ্যং᳖ দদাতি ।
সা॒দ॒ন্যং᳖ বিদ॒থ্য᳖ꣳ স॒ভেয়ং॑ পিতৃ॒শ্রব॑ণং॒ য়ো দদা॑শদস্মৈ ॥ ২১ ॥
পদার্থঃ- (য়ঃ) যে প্রজাস্থ মনুষ্য (অস্মৈ) এই ধর্মিষ্ঠ রাজা বা অধ্যাপক বা উপদেশকের জন্য উচিত পদার্থ (দদাশৎ) দেয় তাহার জন্য (সোমঃ) ঐশ্বর্য্যযুক্ত উক্ত পুরুষ (ধেনুম্) বিদ্যার আধাররূপ বাণীকে (দদাতি) দেয় (সোমঃ) সত্যাচরণে প্রেরণাকারী রাজাদি ব্যক্তি (অর্বন্তম্) বেগ সহ গমনরত তথা (আশুম্) মার্গকে শীঘ্র ব্যাপ্ত হইবার অশ্বগুলিকে দান করে এবং (সোমঃ) শরীর ও আত্মার বল সহ যুক্ত রাজাদি (কর্মণ্যম্) কর্ম্ম দ্বারা যুক্ত পুরুষার্থী (সাদন্যম্) উপবেশনাদি করিতে প্রবীণ (বিদথ্যম্) যজ্ঞ করিতে কুশল (পিতৃ শ্রবণম্) আচার্য্য পিতা হইতে বিদ্যা পাঠকারী (সভেয়ম্) সভায় বসিবার যোগ্য (বীরম্) শত্রুদের বলকে ব্যাপ্ত হইবার শূরবীর পুরুষকে দেয় ॥ ২১ ॥
ভাবার্থঃ- যে সব অধ্যাপক, উপদেশক বা রাজপুরুষ সুশিক্ষিত বাণী, অগ্নি ইত্যাদির তত্ত্ববিদ্যা, পুরুষের জ্ঞান ও সভ্যতা সকলের জন্য দিবে তাহারা সকলের সৎকারের যোগ্য ॥ ২১ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ত্বমিত্যস্য গোতম ঋষিঃ । সোমো দেবতা । বিরাট্ পংক্তিশ্ছন্দঃ । পঞ্চমঃ স্বরঃ ॥
ত্বমি॒মাऽওষ॑ধীঃ সোম॒ বিশ্বা॒স্ত্বম॒পোऽঅ॑জনয়॒স্ত্বং গাঃ ।
ত্বমা ত॑তন্থো॒র্ব᳕ন্তরি॑ক্ষং॒ ত্বং জ্যোতি॑ষা॒ বি তমো॑ ববর্থ ॥ ২২ ॥
পদার্থঃ- হে (সোম) উত্তম সোমবল্লী ওষধিসমূহের তুল্য রোগনাশক রাজন্ ! (ত্বম্) আপনি (ইমাঃ) এই (বিশ্বাঃ) সব (ওষধীঃ) সোমাদি ওষধি সকলকে (ত্বম্) আপনি সূর্য্য তুল্য (অপঃ) জল বা কর্ম্মকে এবং (ত্বম্) আপনি (গাঃ) পৃথিবী বা গাভি সকলকে (অজনয়ঃ) উৎপন্ন বা প্রকট করুন । (ত্বম্) আপনি সূর্য্য সদৃশ (উরু) বৃহৎ (অন্তরিক্ষম্) অবকাশকে (আ, ততন্থ) বিস্তৃত করেন এবং (ত্বম্) আপনি সূর্য্যের মত (জ্যোতিষা) প্রকাশ দ্বারা (তমঃ) অন্ধকারকে চাপিয়া রাখেন তদ্রূপ ন্যায় দ্বারা অন্যায়কে (বি, ববর্থ) আচ্ছাদিত বা নিবৃত্ত করুন, সুতরাং আপনি আমাদের মাননীয় ॥ ২২ ॥
ভাবার্থঃ- যেমন ওষধি রোগকে তদ্রূপ দুঃখকে যে সব মনুষ্য হরণ করে, প্রাণতুল্য বলকে প্রকট করে এবং যে রাজপুরুষ সূর্য্য রাত্রিকে যেমন সেইরূপ অধর্ম ও অবিদ্যার অন্ধকারকে নিবৃত্ত করে, তাহারা জগতে পূজ্য কেন হইবে না? ॥ ২২ ॥
হরিশরণজীরপদার্থভাষ্যঃ
ভগবানভক্ত পিতা–মাতা তাঁদের সন্তানদেরও ভগবান-ভজনে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং প্রতিদিন ব্যবহৃত ফুল-ফল, জল, গাভী ও অন্যান্য পশু সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসা করেন—“এগুলো কে সৃষ্টি করেছে?” এভাবে ধীরে ধীরে তারা শিশুদের মন ভগবানের দিকে আকর্ষিত করার চেষ্টা করেন। তারপর শিশুদের মুখে নিম্নরূপ ভগবান-ভজন প্রকাশ পায়—
হে (সোম) = শান্ত প্রভো! যাঁর কার্যকলাপ অত্যন্ত মহান ও বিস্তৃত হয়েও গভীর শান্তির সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে—এমন (ত্বম্) = আপনিই (ইমাঃ বিশ্বাঃ ওষধীঃ) = এই সমস্ত ঔষধি ও উদ্ভিদকে (অজনয়ঃ) = উৎপন্ন করেছেন। (ত্বম্) = আপনিই (অপঃ) = এই শান্ত ও নির্মল জলসমূহকে সৃষ্টি করেছেন। (ত্বম্) = আপনিই আমাদের দুধ প্রভৃতি আহারের জন্য (গাঃ) = গাভী ও অন্যান্য পশুকে সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে (ত্বম্) = আপনিই এই বিশাল (অন্তরিক্ষম্) = আকাশকে চারদিকে অনন্ত দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত করেছেন এবং (ত্বম্) = আপনিই (জ্যোতিষা) = সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রদের আলোর দ্বারা (তমঃ) = অন্ধকারকে (বিববর্ত) = দূর করে দেন।
বিবেচক পিতা-মাতা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে এই সমস্ত বিষয় সন্তানদের মনে গভীরভাবে অঙ্কিত করে দেন। তারা ফুল-ফল, নদী, পর্বত ইত্যাদির সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ সন্তানদের সেগুলির স্রষ্টা সম্পর্কে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেন। যখন সন্তানেরা ভগবানের কিছু আভাস উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের স্তব তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়। যে ঘরগুলোতে এইভাবে ভগবান-ভজন চলে, সেখানে সন্তানরা সদ্গুণসম্পন্ন এবং পূর্ববর্তী মন্ত্রে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যযুক্ত হবে না—এটা কীভাবে সম্ভব?
দেবেনেত্যস্য গোতম ঋষিঃ । সোমো দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
দে॒বেন॑ নো॒ মন॑সা দেব সোম রা॒য়ো ভা॒গꣳ স॑হসাবন্ন॒ভি য়ু॑ধ্য ।
মা ত্বা ত॑ন॒দীশি॑ষে বী॒র্য়্য᳖স্যো॒ভয়ে॑ভ্যঃ॒ প্র চি॑কিৎসা॒ গবি॑ষ্টৌ ॥ ২৩ ॥
পদার্থঃ- হে (সহসাবন্) অধিকতর সেনাদি বলসম্পন্ন (সোম) সম্পূর্ণ ঐশ্বর্য্যের প্রাপক (দেব) দিব্য গুণে যুক্ত রাজন্ ! আপনি (দেবেন) উত্তম, গুণ, কর্ম্ম, স্বভাবযুক্ত (মনসা) মন দ্বারা (রায়ঃ) ধনের (ভাগম্) অংশকে (নঃ) আমাদের জন্য (অভি, য়ুধ্য) অত্র অন্তর্ভাবিতণ্যর্থঃ।যুধ্যতির্গতিকর্মা॥ (নিঘং॰২।১৪) সকল দিক দিয়া প্রাপ্ত করুন যাহাতে আপনি (বীর্য়্যস্য) অত্র অধীগথর্দয়েশাং কর্মণি (অষ্টা॰২।৩।৫২) ইতি কর্মণি ষষ্ঠী। বীরকর্ম করিতে (ঈশিষে) সমর্থ হউন ইহার ফলে (ত্বা) আপনাকে কেহ (মা) না (আ, তনৎ) চাপাচাপি করে, সুতরাং আপনি (গবিষ্টৌ) সুখ বিশেষের ইচ্ছা থাকায় (উভয়েভ্যঃ) উভয় এই লোক, পরলোকের সুখের জন্য (প্র, চিকিৎস) অত্র সংহিতায়াম্ (অ॰৬।৩।১১৪) ইতি দীর্ঘঃ। রোগ নিবারণের তুল্য বিঘ্ন নিবৃত্তির উপায়কে করিতে থাকুন ॥ ২৩ ॥
ভাবার্থঃ- রাজাদি বিদ্বান্দিগের উচিত যে, কপটাদি দোষ ত্যাগ করিয়া শুদ্ধভাব পূর্বক সকলের সুখ কামনা করিয়া পরাক্রম বৃদ্ধি করিবেন এবং যে কর্ম দ্বারা দুঃখের নিবৃত্তি তথা সুখের বৃদ্ধি এইলোক পরলোকে হয়, তাহাকে করিতে নিরন্তর প্রযত্নশীল থাকিবেন ॥ ২৩ ॥
ইহলোক ও পরলোকের সাধক -হরিশরণজীকৃত পদার্থভাষ্যঃ
প্রস্তাবিত মন্ত্রে গৃহের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা—যারা গৃহপরিচালনার জন্য ধনার্জনের কাজে নিয়োজিত—এই প্রার্থনা করেন যে, হে (দেব) = দিব্য গুণের পুঞ্জ প্রভু! হে (সোম) = অত্যন্ত শান্ত প্রভু! হে (সহসাবন্) = শক্তিশালী প্রভু! (নঃ) = আমাদেরকে (দেবেন মনসা) = দিব্য গুণে যুক্ত মনসহ (রায়ঃ ভাগম্) = ধনের সেবনযোগ্য অংশ (অভিযুধ্য) = চারদিক থেকে লাভ করিয়ে দিন।
এই প্রার্থনায় প্রভুকে যে যে নামে সম্বোধন করা হয়েছে, সেগুলি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে আমরা আমাদের ধনার্জন প্রভৃতি লৌকিক কার্যকলাপে [দেব] দিব্যভাব বজায় রাখব, সৎগুণকে বিসর্জন দেব না। আমরা ধন কেবল দেবোচিত পথেই উপার্জন করব; [সোম] এই সব কাজে কখনও মানসিক শান্তি হারাব না; [সহসাবন্] ধন নিজের বল ও পুরুষার্থ দ্বারাই অর্জন করব। ধনসংক্রান্ত ব্যবহারে চলার সময় আমাদের মন ‘দেব-মন’ হয়েই থাকবে।
এই ধন উপার্জনকারী ব্যক্তি হে প্রভু! (ত্বা) = আপনাকে (মা তনত্) = ক্ষীণ না করে ফেলে—অর্থাৎ আপনার স্মরণকে শিথিল না করে। সে যেন প্রতিদিন আপনার স্মরণ দিয়েই দিন শুরু করে এবং আপনার স্মরণেই দিন শেষ করে, কারণ (বীর্যস্য ঈশিষে) = সমস্ত শক্তির অধীশ্বর তো আপনিই। আপনার সংস্পর্শ থেকেই সে শক্তি লাভ করে।
হে প্রভু! যারা দিনে দিব্য মন নিয়ে ধন উপার্জনের কাজে নিয়োজিত থাকে এবং প্রাতঃ ও সায়ং আপনার সঙ্গে নিজেদের সংযোগ স্থাপনে যত্নবান হয়, এইভাবে অভ্যুদয় ও নিঃশ্রেয়স—ইহলোক ও পরলোক উভয়েরই চিন্তা করে—তাদের জন্য (উভয়েভ্যঃ) = ইহলোক ও পরলোকের কল্যাণার্থে (গবিষ্টৌ) [গো ইষ্টি, গাভঃ ইন্দ্রিয়াণি] = ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিচালিত এই জীবন-যজ্ঞে (প্রচিকিৎসা) = আগত রোগাদি ও বিঘ্নের প্রকৃষ্ট নিবারণ করুন।
বিঘ্ন ও অভাব দূর হলে ইন্দ্রিয়সমূহ আরও প্রশস্ত হয়ে ওঠে, এবং এই প্রশস্ত ইন্দ্রিয়সম্পন্ন ব্যক্তি সত্যই ‘গোতম’ এই নামের যথার্থ অধিকারী হয়।
অথ সূর্য়ঃ কিং করোতীত্যাহ ॥
এখন সূর্য্য কী করে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
অষ্টাবিত্যস্যাऽऽঙ্গিরসো হিরণ্যস্তূপ ঋষিঃ । সবিতা দেবতা । ভুরিক্পংক্তিশ্ছন্দঃ । পঞ্চমঃ স্বরঃ ॥
অ॒ষ্টৌ ব্য॑খ্যৎ ক॒কুভঃ॑ পৃথি॒ব্যাস্ত্রী ধন্ব॒ য়োজ॑না স॒প্ত সিন্ধূ॑ন্ ।
হি॒র॒ণ্যা॒ক্ষঃ স॑বি॒তা দে॒বऽআগা॒দ্ দধ॒দ্ রত্না॑ দা॒শুষে॒ বার্য়্যা॑ণি ॥ ২৪ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন (হিরণ্যাক্ষঃ) নেত্রের সমান রূপ দর্শন করানো জ্যোতিসমূহ সম্পন্ন (দেবঃ) প্রেরক (সবিতা) সূর্য্য (দাশুষে) দানশীল প্রাণিদিগের জন্য (বার্য়্যাণি) স্বীকার করিবার যোগ্য (রত্না) পৃথিবীর উত্তম পদার্থগুলিকে (দধৎ) ধারণ করিয়া (ত্রী) তিন (ধন্ব) (निघं॰१।३) অবকাশরূপ (য়োজনা) অর্থাৎ দ্বাদশ ক্রোশ এবং (সপ্ত) সাত (সিন্ধূন্) পৃথিবীর সমুদ্র হইতে লইয়া মেঘের উপরের অবয়ব পর্যন্ত সমুদ্রের তথা (পৃথিব্যাঃ) পৃথিবী সম্পর্কিত (অষ্টৌ) আট (ককুভঃ) (निघं॰१।६) দিকগুলিকে (বি, অখ্যৎ) প্রসিদ্ধ প্রকাশিত করে, সেইরূপ তোমরা হও ॥ ২৪ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন সূর্য্য হইতে পৃথিবী পর্য্যন্ত ১২ ক্রোশ পর্য্যন্ত হালকা ভার দ্বারা যুক্ত সাত প্রকারের জলের অবয়ব এবং দিশা বিভক্ত হয় তথা বর্ষাদি দ্বারা সকলকে সুখ প্রদান করা হয়, সেইরূপ শুভ গুণকর্ম্ম, ও স্বভাব দ্বারা দিকগুলিতে কীর্ত্তির বহু প্রকারের ঐশ্বর্য্য প্রদান করিয়া মনুষ্যাদি প্রাণি সকলকে নিরন্তর সুখী কর ॥ ২৪ ॥
হরিশরণজীকৃত পদার্থভাষ্যঃ
১. (সবিতা দেবঃ) = সকলকে কর্মে প্রবৃত্ত করানো, দীপ্তিময় ও আলো প্রদানকারী সূর্য (পৃথিব্যাঃ) = পৃথিবীর (অষ্টৌ) = আটটি (ককুভঃ) = দিককে (ব্যখ্যৎ) = আলোকিত করেন। চারটি প্রধান দিক ও চারটি উপদিক—এইভাবে আট দিকের কল্পনা করা হয়েছে। বেদের মতে এই পৃথিবী ‘দেবযজনী’ অর্থাৎ দেবতাদের যজ্ঞের স্থান, এক দেবযজ্ঞশালা। তারই অনুকরণে যজ্ঞশালাগুলি সাধারণত অষ্টকোণ আকৃতির করার প্রথা প্রচলিত হয়েছে।
২. এই সবিতা দেব (ত্রী যোজন ধন্ব) = তিন প্রকার অন্তরীক্ষকে যেগুলি প্রত্যেক প্রাণীকে নিজ নিজ ভোগ প্রদান করে (ব্যখ্যৎ) = আলোকিত করেন। তিন অন্তরীক্ষলোকের উল্লেখ বিভিন্ন মন্ত্রে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়—
[ক] ঋগ্বেদ ৭।৮৭।৫
[খ] ঋগ্বেদ ২।২৭।৮
[গ] ঋগ্বেদ ১।১৬৪।১০
[ঘ] তাণ্ড্য ব্রাহ্মণ ১১।১০
[ঙ] জৈমিনীয় উপনিষদ ১৫৫/৩
[চ] গোপথ ব্রাহ্মণ ১।৫
যজুর্বেদ যেমন তিন ভাগে বিভক্ত, তেমনি অন্তরীক্ষলোকও তিন ভাগে বিভক্ত। যজুর্বেদের প্রথম অংশে (৩৮ অধ্যায় পর্যন্ত) বিভিন্ন যজ্ঞের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয় অংশে (৩৯তম অধ্যায়ে) যজ্ঞকারী যেন অহংকারী না হয়—এই জন্য অন্ত্যেষ্টির বর্ণনা আছে। তৃতীয় অংশে (৪০তম অধ্যায়ে) বলা হয়েছে—হে জীব, সমস্ত কর্মের কর্তা সেই প্রভুই; তাঁর আশ্রয়ে অবস্থান করেই তোমার মাধ্যমে কর্ম সম্পন্ন হচ্ছে। ঠিক তেমনভাবেই অন্তরীক্ষও তিন ভাগে বিভক্ত, এবং এই সবকিছুকেই সবিতা দেব আলোকিত করছেন।
৩. (সপ্ত সিন্ধূন্) = সাতটি সমুদ্রকেও এই সবিতা দেব আলোকিত করেন। এই (হিরণ্যাক্ষঃ) = স্বর্ণময় চক্ষুবিশিষ্ট সবিতা দেব (আগাৎ) = উপস্থিত হন এবং (দাশুষে) = হব্য প্রদানকারীর জন্য (বার্যাণি রত্না) = বরণীয় উত্তম রত্নসমূহকে (দধৎ) = ধারণ করেন। স্পষ্টই বোঝা যায় যে সূর্যোদয়ের সময় গৃহে অগ্নিহোত্র করা উচিত। এমন করলে এই সূর্য সেই দাশ্বানকে স্বাস্থ্য প্রভৃতি উৎকৃষ্ট রত্ন প্রদান করেন।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
হিরণ্যপাণিরিত্যস্যাঙ্গিরসো হিরণ্যস্তূপ ঋষিঃ । সবিতা দেবতা । নিচৃজ্জগতী ছন্দঃ । নিষাদঃ স্বরঃ ॥
হির॑ণ্যপাণিঃ সবি॒তা বিচ॑র্ষণিরু॒ভে দ্যাবা॑পৃথি॒বীऽঅ॒ন্তরী॑য়তে ।
অপামী॑বাং॒ বাধ॑তে॒ বেতি॒ সূর্য়্য॑ম॒ভি কৃ॒ষ্ণেন॒ রজ॑সা॒ দ্যামৃ॑ণোতি ॥ ২৫ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যাহা (হিরণ্যহস্তঃ) হস্তের তুল্য জলাদির গ্রাহক প্রকাশরূপ কিরণ দ্বারা যুক্ত (বিচর্ষণিঃ) বিশেষ করিয়া সকলের প্রদর্শক (সবিতা) সকল পদার্থের উৎপত্তির হেতু (সূর্য়্যম্) সূর্য্যলোক যখন (উভে) উভয় (দ্যাবাপৃথিবী) আকাশ ভূমির (অন্তঃ) মধ্যে (ঈয়তে) উদয় হইয়া ভ্রমণ করে তখন (অমীবাম্) ব্যাধিরূপ অন্ধকারকে (অপ, বাধতে) দূর করে এবং যখন (বেতি) অস্ত সময় প্রাপ্ত হয় তখন (কৃষ্ণেন) (রজসা) কৃষ্ণ অন্ধকার রূপ দ্বারা (দ্যাম্) আকাশকে (অভি, ঋণোতি) ऋणोतीति गतिकर्मा॥ (निघं॰२।१४) সকল দিক দিয়া ব্যাপ্ত হয়, সেই সূর্য্যকে তোমরা জানো ॥ ২৫ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন সূর্য্য তাহার সমীপবর্ত্তী লোক-লোকান্তরকে আকর্ষণ করিয়া ধারণ করে সেইরূপ অনেক লোক-লোকান্তরে শোভায়মান সূর্য্যাদি সকল জগৎকে সব দিক দিয়া ব্যাপ্ত হইয়া এবং আকর্ষণ করিয়া ঈশ্বর ধারণ করে এই রকম জানিবে, কেননা ঈশ্বর বিনা সকলের স্রষ্টা ও ধর্ত্তা অন্য কেহ হইতে পারে না ॥ ২৫ ॥
হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারকৃত পদার্থভাষ্য়ঃ
১. (হিরণ্যপাণিঃ) = যার হাতে স্বর্ণ রয়েছে—এমন সবিতা, অর্থাৎ সকলকে কর্মে প্রেরণকারী (বিচর্ষণিঃ) = বিশ্বদ্রষ্টা, সর্বপ্রকাশক সূর্য (উভে দ্যাবাপৃথিবী অন্তঃ) = এই দ্যুলোক ও পৃথিবীলোক—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে (ঈয়তে) = গতি করেন। সূর্যের কিরণগুলিই সূর্যের হাত। এই কিরণরূপ হাতের মাধ্যমে সূর্য হিরণ্য—স্বর্ণ বহন করে আনে। যেমন একজন বৈদ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত রোগীকে স্বর্ণের ইনজেকশন দেন, তেমনি সূর্যও যেন নিজের কিরণের দ্বারা দেহে স্বর্ণ প্রবেশ করায়। সকলকে কর্মে প্রবৃত্ত করার কারণে তিনি ‘সবিতা’ এবং সকলকে আলোকিত করার কারণে তিনি ‘বিচর্ষণি’।
২. উদিত সূর্য যখন এই কিরণরূপ হাত দিয়ে স্বর্ণের ইনজেকশন প্রদান করেন, তখন তিনি (অমীবাম্) = রোগসৃষ্টিকারী কৃমিসমূহকে (অপবাধতে) = সম্পূর্ণরূপে দূর করে দেন, নষ্ট করে দেন। “উদয়ন্ আদিত্যঃ ক্রিমীন্ হন্তি নিম্লোচন্ হন্তু রশ্মিভিঃ”—অর্থাৎ উদিত ও অস্তগামী সূর্য নিজের কিরণের দ্বারা কৃমিনাশ করেন।
৩. (সূর্যম্) = জ্যোতি ও বর্চসকে [সূর্যো জ্যোতিঃ, সূর্যো বর্চঃ] (বেতি) = [বী = প্রজনন] উৎপন্ন করেন। সূর্যকিরণের সংস্পর্শে এলে মস্তিষ্কে জ্যোতির উদয় হয় এবং দেহ বর্চস্বী, দীপ্তিমান হয়ে ওঠে।
৪. এই সবিতা দেব (কৃষ্ণেন) = অন্ধকারনাশক রজঃ বা তেজের দ্বারা (দ্যাম্) = দ্যুলোককে (অভিঋণোতি) = সর্বত্র পরিব্যাপ্ত করেন। অথবা (অভিকৃষ্ণেন) = নিজের দিকে আকৃষ্ট (রজসা) = লোকসমূহের সঙ্গে (দ্যাম্ ঋণোতি) = দ্যুলোকে গমন করেন। সূর্য নিজের দ্বারা আকৃষ্ট লোকসমূহকে সঙ্গে নিয়ে আকাশপথে ক্রমাগত অগ্রসর হয়ে চলেছেন।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
হিরণ্যহস্ত ইত্যস্য আঙ্গিরসো হিরণ্যস্তূপ ঋষিঃ । সবিতা দেবতা । বিরাট্ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
হির॑ণ্যহস্তো॒ऽঅসু॑রঃ সুনী॒থঃ সু॑মৃডী॒কঃ স্ববাঁ॑ য়াত্ব॒র্বাঙ্ ।
অ॒প॒সেধ॑ন্ র॒ক্ষসো॑ য়াতু॒ধানা॒নস্থা॑দ্ দে॒বঃ প্র॑তিদো॒ষং গৃ॑ণা॒নঃ ॥ ২৬ ॥
অন্বয়ঃ হে মনুষ্যাঃ! যো হিরণ্যহস্তঃ সুনীথোऽসুরঃ সুমৃডীকঃ স্ববান্ দেবো রক্ষসো যাতুধানানপসেধন্ প্রতিদোষং গৃণানশ্চাস্থাৎ, সোऽর্বাঙস্মৎ সুখায় যাতু, তদ্বদ্যূয়ং ভবত॥২৬॥
পদার্থঃ
(হিরণ্যহস্তঃ) হিরণ্যানি জ্যোতীংশি হস্তবদ্ যস্য সঃ (অসুরঃ) প্রক্ষেপ্তা (সুনীথঃ) যঃ সুষ্ঠু নয়তি সঃ
(সুমৃডীকঃ) সুষ্ঠু সুখকরঃ (স্ববান্) স্বে স্বকীয়াঃ প্রকাশাদয়ো গুণা বিদ্যন্তে যস্মিন্ সঃ। অত্র দীর্ঘাদটি সমানপাদে॥ (অষ্টা॰ ৮।৩।৯) রুত্বে ভোভগো॰ [অ॰ ৮।৩।১৭] ইত্যনেন রোর্যাদেশে চ হলি সর্বেষাম্ [অ॰ ৮।৩।২২] ইতি লোপঃ। (যাতু) প্রাপ্নোতু (অর্বাঙ্) যোऽর্বাচীনান্ অঞ্চতি প্রাপ্নোতি সঃ (অপসেধন্) দূরীকুর্বন্ (রক্ষসঃ) দস্যুচোরাদীন্ (যাতুধানান্) অন্যায়েন পরপদার্থধারকান্ (অস্থাত্) উত্তিষ্ঠতি উদেতি (দেবঃ) প্রকাশকঃ (প্রতিদোষম্) প্রতিজনং যো দোষস্তম্। অত্র উত্তরপদলোপঃ। (গৃণানঃ) উচ্চরয়ন্ প্রকটয়ন্॥২৬॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যাহা (হিরণ্যহস্তঃ) হস্তের তুল্য প্রকাশ সম্পন্ন (সুনীথঃ) সুন্দর প্রকার প্রাপ্তি করাইবার (অসুরঃ) জলাদিকে প্রক্ষিপ্তকারী (সুমৃডীকঃ) সুন্দর সুখকারী (স্ববান্) স্বীয় প্রকাশাদি গুণে যুক্ত (দেবঃ) প্রকাশক সূর্য্যলোক (য়াতুধানান্) অন্যায় পূর্বক অন্যের পদার্থ সমূহের ধারক (রক্ষসঃ) ডাকাইত চোরাদিকে (অপসেধন্) নিবৃত্ত করে অর্থাৎ ডাকাইত, চোরাদি সূর্য্যোদয় হইলে নিজের কর্ম্ম সাধন করিতে পারে না, কিন্তু প্রায়ঃ রাত্রিতেই স্বীয় কর্ম্ম সাধন করিয়া থাকে এবং (প্রতিদোষম্) মনুষ্যদিগের প্রতি যে দোষ তাহাকে (গৃণানঃ) প্রকট করিয়া (অস্থাৎ) উদয় হয় (অর্বাঙ্) সমীপবর্ত্তী পদার্থগুলিকে যে প্রাপ্ত করে সে আমাদের সুখের জন্য (য়াতু) প্রাপ্ত হইবে, সেইরূপ তুমি হও ॥ ২৬ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যাচনাকারীদের জন্য উদারতাপূর্বক সুবর্ণাদি দিবে এবং দুষ্টাচারীদের তিরস্কার করিয়া এবং ধার্মিকগণকে সুখ দিয়া প্রতিদিন সূর্য্যের তুল্য প্রশংসিত হও ॥ ২৬ ॥
হরিশরণজীকৃত পদার্থভাষ্যঃ
১. (হিরণ্যহস্তঃ) = সোনাময় হাতবিশিষ্ট। এই ভাবনাই পূর্ববর্তী মন্ত্রে ‘হিরণ্যপাণিঃ’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ‘পাণি’ শব্দে রক্ষার ভাব ছিল, আর ‘হস্ত’ শব্দে [হস্তো হন্তেঃ] নাশ করার ভাব আছে। সূর্য তার কিরণসমূহে বিদ্যমান স্বর্ণের প্রভাবে আমাদের দেহের রক্ষা করে এবং রোগের নাশ করে।
২. (অসুরঃ) = [অসূন্ রাতি] অর্থাৎ প্রাণশক্তি দানকারী। প্রশ্নোপনিষদে বলা হয়েছে— (‘প্রাণঃ প্রজানামুদয়ত্যেষ সূর্যঃ’) অর্থাৎ এই সূর্য উদিত হলে প্রজাদের প্রাণই যেন উদিত হয়।
৩. (সুনীথঃ) = সর্বত্র আলো বিস্তার করার কারণে উত্তম পথ ধরে নিয়ে যায়।
৪. (সুমৃডীকঃ) = উত্তম পথে পরিচালিত করে আমাদের জীবনে উৎকৃষ্ট সুখ প্রদান করে।
৫. (স্ববান্) = এই সূর্য উৎকৃষ্ট ধনসম্পন্ন। স্বাস্থ্যই সর্বোত্তম ধন, আর তা লাভ করাতে এই সূর্য সর্বশ্রেষ্ঠ সহায়ক।
৬. এই সূর্য (যাতুধানান্) = দেহে শত শত যন্ত্রণা সঞ্চারকারী এবং (রক্ষসঃ) = নিজের ভোগের জন্য অন্যের ক্ষয়সাধনকারী রোগকৃমিরূপ রাক্ষসদের (অপসেধন্) = দূর করতে করতে (অর্বাঙ্ যাতু) = আমাদের অভিমুখে আগমন করুক। আমরা যদি সূর্যাভিমুখী হই, তবে রোগকৃমির সংহার হয়ে আমাদের স্বাস্থ্যরূপী ধনের প্রাপ্তি হবে।
৭. উপর্যুক্ত কারণগুলির জন্যই ‘হিরণ্যহস্ত, অসুর, সুনীথ, সুমৃডীক ও স্ববান্’ হওয়ার ফলে এই (দেবঃ) = দিব্য গুণসম্পন্ন আলোকময় সূর্য (প্রতিদোষম্) = প্রতিরাত্রি, অর্থাৎ সর্বদা (গৃণানঃ) = স্তবিত হতে হতে (অস্থাত্) = প্রতিষ্ঠিত থাকে। অর্থাৎ সূর্যের গুরুত্ব অনুধাবনকারী মানুষ সর্বদা সূর্যের স্তব করে এবং প্রতিদিন তার গুণাবলির স্মরণ করে।
অথাধ্যাপকোপদেশকবিষয়মাহ ॥
এখন অধ্যাপক ও উপদেশক বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলিয়াছে ॥
য়ে ত ইত্যস্যাঙ্গিরসো হিরণ্যস্তূপ ঋষিঃ । সবিতা দেবতা । বিরাট্ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
য়ে তে॒ পন্থাঃ॑ সবিতঃ পূ॒র্ব্যাসো॑ऽরে॒ণবঃ॒ সুকৃ॑তাऽঅ॒ন্তরি॑ক্ষে ।
তেভি॑র্নোऽঅ॒দ্য প॒থিভিঃ॑ সু॒গেভী॒ রক্ষা॑ চ নো॒ऽঅধি॑ চ ব্রূহি দেব ॥ ২৭ ॥
অন্বয়ঃ হে সবিতর্দেবা’প্তবিদ্বন্! যস্য তে সূর্যস্যান্তরিক্ষে ইব যে পূর্ব্যাসো’রণবঃ সুকৃতাঃ পন্থাঃ সন্তি, তেভিস্সুগেভিঃ পথিভিরদ্য নো নয়, তত্র গচ্ছতো নো রক্ষ চ নো’স্মাংশ্চাধি ব্রূহি। এবং সর্বান্ প্রতি বোধয়॥২৭॥
পদার্থঃ (য়ে) (তে) তব (পন্থাঃ) মার্গাঃ। অত্র বচনব্যত্যয়েনৈকবচনম্। (সবিতঃ) সবিতৃবদৈশ্বর্যপ্রদ (পূর্ব্যাসঃ) পূর্বৈরাপ্তৈঃ সেবিতাঃ (অরণবঃ) অবিদ্যমানা রেণবো যেষু তে (সুকৃতাঃ) সুষ্ঠু নিষ্পাদিতাঃ (অন্তরিক্ষে) আকাশে (তেভিঃ) তাইঃ (নঃ) অসমান্ (অদ্য) ইদানীম্ (পথিভিঃ) মার্গৈঃ (সুগেভিঃ) সুখেন গমনা’ধিকরণৈঃ (রক্ষ) অত্র দ্ব্যচো’তস্তিঙঃ [অ॰৬.৩.১৩৫] ইতি দীর্ঘঃ। (চ) (নঃ) অসমান্ (অধি) উপরিভাবে (চ) (ব্রূহি) উপদিশ (দেব) সুখবিদ্যয়োর্দাতঃ॥২৭॥
পদার্থঃ- হে (সবিতঃ) সূর্য্য তুল্য ঐশ্বর্য্যদাতা (দেব) বিদ্যা ও সুখ দাতা আপ্ত বিদ্বান্ পুরুষ ! (তে) আপনার ন্যায় সূর্য্যের (অন্তরিক্ষে) আকাশে গমনের শুদ্ধ মার্গ আছে, সেইরূপ (য়ে) যে সব (পূর্ব্যাসঃ) পূর্ব পুরুষ আপ্তগণ দ্বারা সেবিত (অরেণবঃ) ধূলি আদি রহিত (সুকৃতাঃ) সুন্দর সিদ্ধ কৃত (পন্থাঃ) মার্গ আছে (তেভিঃ) সেই সব (সুগেভিঃ) সূখপূর্বক যাহাতে চলিবে এমন (পথিভিঃ) মার্গ গুলি দ্বারা (অদ্য) আজ (ন) আমাদেরকে পরিচালিত করুন, এই সব মার্গে চলিয়া আমাদের (রক্ষ) রক্ষা (চ) ও করুন (চ) তথা (নঃ) আমাদিগকে (অধি, ব্রূহি) অধিকতর উপদেশ করুন, এই প্রকার সকলকে সচেতন করুন ॥ ২৭ ॥
ভাবার্থঃ- এখানে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । হে বিদ্বান্গণ ! যেমন সূর্য্যের অন্তরিক্ষে নির্মল মার্গগুলি আছে, সেইরূপ উপদেশ অধ্যাপনা দ্বারা বিদ্যাধর্ম সুশীল প্রদা পন্থাগুলির প্রচার করা কর্ত্তব্য ॥ ২৭ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
উভেত্যস্য প্রস্কণ্ব ঋষিঃ । অশ্বিনৌ দেবতে । নিচৃদ্ গায়ত্রী ছন্দঃ । পঞ্চমঃ স্বরঃ ॥
উ॒ভা পি॑বতমশ্বিনো॒ভা নঃ॒ শর্ম॑ য়চ্ছতম্ ।
অ॒বি॒দ্রি॒য়াভি॑রূ॒তিভিঃ॑ ॥ ২৮ ॥
পদার্থঃ- হে (অশ্বিনা) সূর্য্য চন্দ্র তুল্য অধ্যাপক উপদেশকগণ ! (উভা) উভয় তোমরা যে জায়গায় উত্তম রসকে (পিবতম্) পান কর সেই (শর্ম) উত্তম আশ্রয় স্থল বা সুখকে (উভা) উভয়ে তোমরা (অবিদ্রিয়াভিঃ) ছিদ্ররহিত (ঊতিভিঃ) রক্ষাদি ক্রিয়াগুলির দ্বারা রক্ষিত ঘরকে (নঃ) আমাদের জন্য (য়চ্ছতম্) দাও ॥ ২৮ ॥
ভাবার্থঃ- অধ্যাপক ও উপদেশকগণের উচিত যে, সর্বদা উত্তম গৃহ নির্মাণ এবং নিবাসের উপদেশ করিয়া যেখানে পূর্ণ রক্ষা হয়, সেই বিষয়ে সকলকে প্রেরণা করিবে ॥ ২৮ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
অপ্নস্বতীমিত্যস্য কুৎস ঋষিঃ । অশ্বিনৌ দেবতে । বিরাট্ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
অপ্ন॑স্বতীমশ্বিনা॒ বাচ॑ম॒স্মে কৃ॒তং নো॑ দস্রা বৃষণা মনী॒ষাম্ ।
অ॒দূ্য॒ত্যেऽব॑সে॒ নি হ্ব॑য়ে বাং বৃ॒ধে চ॑ নো ভবতং॒ বাজ॑সাতৌ ॥ ২ঌ ॥
পদার্থঃ- হে (দস্রা) দুঃখের নাশক (বৃষণা) সুখবর্ষক (অশ্বিনা) সকল বিদ্যায় ব্যাপ্ত অধ্যাপক ও উপদেশকগণ ! তোমরা উভয়ে (অস্মৈ) আমাদের (বাচম্) বাণী (চ) এবং (মনীষাম্) বুদ্ধিকে (অপ্নস্বতীম্) প্রশস্ত কর্ম্মযুক্তা (কৃতম্) কর (নঃ) আমাদের (অদূ্যত্যে) দূ্যতরহিত স্থানে ঘটিত কর্ম্মে (অবসে) রক্ষার জনা স্থিত কর (বাজসাতৌ) ধনের বিভাগকারী সংগ্রামে (নঃ) আমাদের (বৃধে) বৃদ্ধির জন্য (ভবতম্) উদ্যত হও, যে জন্য (বাম্) তোমাদের (নি, হ্বয়ে) নিরন্তর স্তুতি করি, তাহারা উভয়ে আমার উন্নতি করুক ॥ ২ঌ ॥
ভাবার্থঃ- যে সকল মনুষ্য নিষ্কপট আপ্ত দয়ালু বিদ্বান্দিগের নিরন্তর সেবন করে তাহারা বুদ্ধিমান্ ধার্মিক বিদ্বান্ হইয়া সব দিক দিয়া বৃদ্ধি পায় এবং বিজয়ী হইয়া সকলের জন্য সুখদায়ী হয় ॥ ২ঌ ॥
বিদ্বান ও নায়ক রাজার কর্তব্য (জয়দেবশর্মা ভাষ্য)
ভাবার্থঃ হে (অশ্বিনৌ) দিন ও রাত্রি, সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় তেজস্বী, প্রভাবশালী এবং সর্বজনকে আনন্দ প্রদানকারী সেনাপতি ও সভাপতি—আপনারা উভয়ে (অস্মে বাচম্) আমাদের বাণীকে (আপ্নস্বতীম্) উৎকৃষ্ট কর্মে যুক্ত (কৃতম্) করুন। হে (দস্রা) শত্রু ও প্রজার কষ্টদায়ক দুঃখ এবং দুষ্ট পুরুষদের বিনাশকারী! হে (বৃষণা) প্রজার উপর সুখের বর্ষণকারী! আপনারা উভয়ে (অমস্বতীম্ মনীষাম্ কৃতম্) শুভ কর্মে যুক্ত মন ও ইচ্ছাবুদ্ধিকে উৎপন্ন করুন। আমি প্রজাজন (বাম্) আপনাদের উভয়কে (অদ্যত্যে) দ্যূত প্রভৃতি ছলযুক্ত কর্ম বা শর্তবিহীন কর্মে অথবা (অদ্যূত্যে) আলোকহীন, অন্ধকারকালে অজ্ঞাত স্থানে এবং (অবসে) প্রজার রক্ষণকার্যে (বাম্) আপনাদের উভয়কে (নিয়ে) নিরন্তর আহ্বান করি। আপনারা উভয়ে (বাজসাতৌ) সংগ্রামে ও এই ঐশ্বর্যপ্রাপ্তির কার্যে (নঃ) আমাদের (বৃদ্ধে) বৃদ্ধির জন্য (ভবতম্) সক্ষম হোন। ‘ভদ্যূত্যে’—দ্যূতাদাগতং, দ্যূতে ভবং বা দ্যূত্যম্। ন দ্যূত্যমদ্যত্যং তস্মিন্।
অথ সভাসেনাধিপৌ কিং কুর্য়াতামিত্যাহ ॥
এখন সভাসেনাধীশ কী করিবে এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
দ্যুভিরিত্যস্য কুৎস ঋষিঃ । অশ্বিনৌ দেবতে । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
দ্যুভি॑র॒ক্তুভিঃ॒ পরি॑ পাতম॒স্মানরি॑ষ্টেভিরশ্বিনা॒ সৌভ॑গেভিঃ ।
তন্নো॑ মি॒ত্রো বর॑ুণো মামহন্তা॒মদি॑তিঃ॒ সিন্ধুঃ॑ পৃথি॒বীऽউ॒ত দ্যৌঃ ॥ ৩০ ॥
পদার্থঃ- হে (অশ্বিনা) সভাসেনাধীশগন ! যেমন (অদিতিঃ) পৃথিবী (সিন্ধুঃ) সাত প্রকারের সমুদ্র (পৃথিবী) আকাশ (উত) এবং (দ্যৌঃ) প্রকাশ (তৎ) তাহারা (নঃ) আমাদের (মামহন্তাম্) সৎকার করিবে, সেইরূপ (মিত্রঃ) মিত্র তথা (বরুণঃ) দুষ্টদিগকে বন্ধন করিবার ও প্রতিহত করিবার জন্য তোমরা উভয়ে (দ্যুভিঃ) দিন (অক্তুভিঃ) রাত্রি (অরিষ্টেভিঃ) অহিংসিত (সৌভগেভিঃ) শ্রেষ্ঠ ধনসকলের হওয়ায় (অস্মান্) আমাদের (পরি, পাতম্) সকল দিক্ দিয়া রক্ষা কর ॥ ৩০ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । সভাধীশাদি বিদ্বান্গণ যেমন পৃথিবী আদি তত্ত্ব সকল প্রাণিদিগের রক্ষা করেন সেইরূপই বৃদ্ধি প্রাপ্ত ঐশ্বর্য্য দ্বারা দিন-রাত্রি সকল মনুষ্যদিগকে বৃদ্ধি করাইবেন ॥ ৩০ ॥
অথ বিদ্যুতা কিং সাধ্যমিত্যাহ ॥
এখন বিদ্যুৎ দ্বারা কী সিদ্ধ করা উচিত, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
আ কৃষ্ণেনেত্যস্য হিরণ্যস্তূপ ঋষিঃ । সূর্য়্যো দেবতা । বিরাট্ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
আ কৃ॒ষ্ণেন॒ রজ॑সা॒ বর্ত্ত॑মানো নিবে॒শয়॑ন্ন॒মৃতং॒ মর্ত্যং॑ চ ।
হি॒র॒ণ্যয়ে॑ন সবি॒তা রথে॒না দে॒বো য়া॑তি॒ ভুব॑নানি॒ পশ্য॑ন্ ॥ ৩১ ॥
পদার্থঃ- হে বিদ্বন্ ! আপনি যে (আ, কৃষ্ণেন) আকর্ষিত (রজসা) লোকসমূহের সঙ্গে (বর্ত্তমানঃ) বর্ত্তমান নিরন্তর (অমৃতম্) নাশরহিত কারণ (চ) এবং (মর্ত্যম্) নাশসহিত কার্য্যকে (নিবেশয়ন্) স্ব স্ব কক্ষে স্থিত করিয়া (হিরণ্যয়েন) তেজঃ স্বরূপ (রথেন) রমণীয় স্বরূপের সহিত (সবিতা) ঐশ্বর্য্যের দাতা (দেবঃ) দেদীপ্যমান বিদ্যুৎরূপ অগ্নি (ভুবনানি) সংসারস্থ বস্তুগুলিকে (য়াতি) প্রাপ্ত হয় তাহাকে (পশ্যন্) দেখিয়া সম্যক্ প্রযুক্ত করুন ॥ ৩১ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে বিদ্যুৎ কার্য্য ও কারণকে সম্যক্ প্রকাশিত করিয়া সর্বত্র অভিব্যাপ্ত তেজস্বরূপ শীঘ্রগামিনী সকলকে আকর্ষণ করে, তাহাকে দেখিয়া সম্প্রয়োগে অভীষ্ট স্থানগুলিতে শীঘ্র গমন কর ॥ ৩১ ॥
অথ রাত্রিবর্ণনমাহ ॥
এখন রাত্রির বর্ণনা পরবর্ত্তী মন্ত্রে করা হইতেছে ॥
আ রাত্রীত্যস্য কুৎস ঋষিঃ । রাত্রির্দেবতা । পথ্যা বৃহতী ছন্দঃ । মধ্যমঃ স্বরঃ ॥
আ রা॑ত্রি॒ পার্থি॑ব॒ꣳ রজঃ॑ পি॒তুর॑প্রায়ি॒ ধাম॑ভিঃ ।
দি॒বঃ সদা॑ᳬंসি বৃহ॒তী বি তি॑ষ্ঠস॒ऽআ ত্বে॒ষং ব॑র্ত্ততে॒ তমঃ॑ ॥ ৩২ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে (বৃহতী) বৃহতী (রাত্রি) রাত্রি (দিবঃ) প্রকাশের (সদাংসি) স্থানগুলিকে (বি, তিষ্ঠসে) ব্যাপ্ত হয়, যে রাত্রি (পিতুঃ) নিজের তথা সূর্য্যের মধ্যস্থ লোকের (ধামাভিঃ) সকল স্থান সহ (পার্থিবম্) পৃথিবী সম্পর্কীয় (রজঃ) লোককে (আ, অপ্রায়ি) উত্তম প্রকার পূর্ণ করিয়াছে, যাহার (ত্বেষম্) স্বীয় কান্তি দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত (তমঃ) অন্ধকার (আ) (বর্ত্ততে) আসা-যাওয়া করে তাহার যুক্তি সহ সেবন কর ॥ ৩২ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে পৃথিব্যাদির ছায়া রাত্রিতে প্রকাশকে প্রতিহত করে অর্থীৎ সকলের আবরণ করে, তাহার আপনারা যথাবৎ সেবন করুন ॥ ৩২ ॥
হরিশরণজীর পদার্থভাষ্যঃ
সূর্যের আলোর পরে রাত্রি আসে, রাত্রির সমাপ্তিতে ঊষাকাল উপস্থিত হয়। ঠিক এইভাবেই সূর্যদেবের ৩১তম মন্ত্রের পর এখানে রাত্রি দেবতার ৩২তম মন্ত্র আছে এবং এর পর ঊষার ৩৩তম মন্ত্র আসবে, আর ৩৪ থেকে ৪০ পর্যন্ত প্রাতঃকালের প্রার্থনার মন্ত্র চলবে।
প্রস্তাবিত মন্ত্রে বলা হয়েছে যে (আরাত্রি) = রাত্রি পর্যন্ত, অর্থাৎ রাত্রি আসা পর্যন্ত (পার্থিবং রজঃ) = এই পার্থিব লোক (পিতুঃ) = সেই পালনকারী সূর্যের (ধমাভিঃ) = তেজ দ্বারা সম্পূর্ণরূপে পরিপূর্ণ করা হয়। [এষা বৈ পিতা য এষ সূর্যস্তপতি । – শতপথ ১৪।১।৪।১৫]।
দিনভর সূর্য তার হিরণ্য কিরণের দ্বারা তেজস্বিতার প্রসার করে। সূর্যই প্রজাদের প্রাণ। সমগ্র পার্থিব লোক—উদ্ভিদ হোক বা প্রাণী—সবাই সূর্যকিরণের সংস্পর্শে জীবিত হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পৃথিবী তার অক্ষে ঘুরতে ঘুরতে সূর্যের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নেয় এবং সেই সময় আমাদের (দিবঃ) = আকাশের স্থায়ী স্থানসমূহে বিস্তৃত ও বৃদ্ধি পেতে থাকা এই (রাত্রি) = রাত (বিতিষ্ঠসে) = বিশেষরূপে অবস্থান করে। রাত্রির রাজ্য চারদিকে বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং তখন (ত্বেষং তমঃ) = এই দীপ্তিময় রাত্রির অন্ধকার সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হয়ে বর্তমান থাকে।
আমরা রাত্রির অন্ধকারে আবৃত হয়ে যাই। আমাদের দিগন্ত অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ইন্দ্রিয়গুলির বাহ্য বিস্তার রুদ্ধ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ইন্দ্রিয়গুলি যেন বন্ধ হয়ে অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে। সেই সময় কখনো কখনো স্বপ্নে প্রভু-দর্শন হয়; এই কারণেই যোগদর্শনে বলা হয়েছে—‘স্বপ্নজ্ঞানালম্বনং বা’—স্বপ্নে দেখা প্রভু-জ্ঞানের স্মরণ রাখতে চেষ্টা করতে। সুষুপ্তিতে তো ‘সমাধিসুষুপ্তিমোক্ষেষু ব্রহ্মরূপতা’ এই সাংখ্যসূত্র অনুযায়ী আমরা কিছুটা ব্রহ্মরূপ হয়ে যাই। এইভাবে রাত্রির এই অন্ধকারও আমাদের জন্য (ত্বেষং) = দীপ্তিময় হয়ে ওঠে।
দিনের ‘আলোতে’ আমরা সংসারিক বস্তু দেখি, আর রাত্রির সেই অন্ধকারে প্রভু-দর্শন হয়; তাই এই অন্ধকার (‘ত্বেষং’) = দীপ্তিময় হয়ে ওঠে। সেই ব্রহ্মরূপতাকে লাভকারী এই ঋষি হলেন ‘কুত্স’, যিনি সমস্ত অকল্যাণকে বিনাশ করেছেন [কুথ্ হিংসায়াম্]।
পুনরুষো বর্ণনমুপদিশ্যতে ॥
পুনঃ উষঃকালের বর্ণন পরবর্ত্তী মন্ত্রে করা হইতেছে ॥
উষ ইত্যস্য গোতম ঋষিঃ । উষর্দেবতা । নিচৃৎ পরোষ্ণিক্ ছন্দঃ । ঋষভঃ স্বরঃ ॥
অন্বয়: হে বাজিনীবত্যুষর্বদ্বর্তমানে স্ত্রী! যথা বাজিনীবত্যুষা যাদৃশং চিত্রং স্বরূপং ধরতি, তৎ তাদৃশমস্মভ্যং ত্বামাভর, যেন বয়ং তোকং চ তনয়ং চ ধামহে॥৩৩॥
পদার্থঃ- হে (বাজিনীবতি) বহু অন্নাদি ঐশ্বর্য্য দ্বারা যুক্ত (উষঃ) প্রাতঃ সময়ের বেলা তুল্য কান্তিসহিত বর্ত্তমান স্ত্রী! যেমন অধিকতর অন্নাদি ঐশ্বর্য্যের হেতু প্রাতঃকালের বেলা যে প্রকারে (চিত্রম্) আশ্চর্য্যস্বরূপকে ধারণ করে (তৎ) তেমন রূপকে তুমি (অস্মভ্যম্) আমাদের জন্য (আ, ভর) উত্তম প্রকার পুষ্ট কর । (য়েন) যাহাতে আমরা (তোকম্) সদ্যজাত বালক (চ) এবং (তনয়ম্) কুমারাবস্থার বালককে (চ) ও (ধামহে) ধারণ করি ॥ ৩৩ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । যেমন সকল শোভা সহ যুক্ত মঙ্গলদাত্রী প্রভাত সময়ের বেলা সব ব্যবহার সকলকে ধারণ কারিণী যদি তদ্রূপ স্ত্রীগণ হয় তাহা হইলে সর্বদা নিজ নিজ পতিকে প্রসন্ন করিয়া পুত্রপৌত্রাদি সহ আনন্দ লাভ করিবে ॥ ৩৩ ॥
পুনর্মনুষ্যাঃ কিং কুর্য়ুরিত্যাহ ॥
পুনঃ মনুষ্য কী করিবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
প্রাতরিত্যস্য বসিষ্ঠ ঋষিঃ । অগ্ন্যাদয়ো লিঙ্গোক্তা দেবতাঃ । নিচৃদজ্জগতী ছন্দঃ । নিষাদঃ স্বরঃ ॥
প্রা॒তর॒গ্নিং প্রা॒তরিন্দ্র॑ꣳ হবামহে প্রা॒তর্মি॒ত্রাবর॑ুণা প্রা॒তর॒শ্বিনা॑ ।
প্রা॒তর্ভগং॑ পূ॒ষণং॒ ব্রহ্ম॑ণ॒স্পতিং॑ প্রা॒তঃ সোম॑মু॒ত রু॒দ্রꣳ হু॑বেম ॥ ৩৪ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন আমরা (প্রাতঃ) প্রাতঃকাল (অগ্নিম্) পবিত্র বা স্বয়ং প্রকাশস্বরূপ পরমাত্মা বা অগ্নিকে (প্রাতঃ) প্রাতঃ সময় (ইন্দ্রম্) উত্তম ঐশ্বর্য্যকে (প্রাতঃ) প্রভাত সময় (মিত্রাবরুণা) প্রাণ উদানকে এবং (প্রাতঃ) প্রভাত সময় (অশ্বিনা) অধ্যাপক ও উপদেশককে (হবামহে) গ্রহণ করি বা আহ্বান করি । (প্রাতঃ) প্রাতঃ সময় (ভগম্) সেবন করিবার যোগ্য ভাগ (পূষণম্) পুষ্টিকারক ভোগ (ব্রহ্মণস্পতিম্) ধনকে বা বেদের রক্ষককে (প্রাতঃ) প্রভাত সময় (সোমম্) সোমাদি ওষধিসমূহ (উত) এবং (রুদ্রম্) জীবকে (হুবেম) গ্রহণ বা স্বীকার করি সেই রূপ তোমরাও আচরণ কর ॥ ৩৪ ॥
ভাবার্থঃ- যে সব মনুষ্য প্রাতঃকাল পরমেশ্বরের উপাসনা, অগ্নিহোত্র, ঐশ্বর্য্যের উন্নতির উপায়, প্রাণ ও অপানের পুষ্টি করা, অধ্যাপক, উপদেশক, বিদ্বানগণ তথা ওষধির সেবন এবং জীবাত্মাকে প্রাপ্ত হইবার বা জানিবার প্রযত্ন করে,তাহারা সকলে সুখ দ্বারা সুশোভিত হয় ॥ ৩৪ ॥
হরিশরণজীর পদার্থভাষ্যঃ
(প্রাতঃ) = প্রভাতবেলায় (অগ্নিম্) = আলো ও উষ্ণতা দিয়ে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়া সত্য অগ্নি = অগ্রণী-নেতা, ভগবানকে, জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ভাবনাকে প্রাতঃপ্রাতঃকালে (ইন্দ্রম্) = ঐশ্বর্যশালী ও বিঘ্ন বিদীর্ণকারী ইন্দ্ররূপ পরমাত্মাকে, জীবনে ঐশ্বর্যশালী, ধন-ধান্যে সমৃদ্ধ হওয়ার ভাবনাকে (হবামহে) = আহ্বান করি, ডাকি, স্মরণ করি, নিজের জীবনে ধারণ করি। (প্রাতঃ) = প্রভাতবেলায় (মিত্রাবরুণৌ) = সকলের প্রতি স্নেহশীল মিত্ররূপ, সর্বাধিক বরণীয়, কারও প্রতি বিদ্বেষ না রাখা, ন্যায়কারী, দণ্ডদাতা বরুণরূপ প্রভুকে সকলের প্রতি স্নেহ করা, কারও প্রতি বিদ্বেষ না রাখার ভাবনাকে (প্রাতঃ) = প্রাতঃকালে (অশ্বিনৌ) = প্রাণ ও অপানরূপ, দাতা ও গ্রহণকারী, সকলের নিকট দ্রব্য পৌঁছে দেওয়া এবং সকলের কাছ থেকে দ্রব্য গ্রহণকারী অশ্বিনীরূপ পরমেশ্বরকে (হবামহে) = সহায়তার জন্য আহ্বান করি। (প্রাতঃ) = এই ঊষাকালে (ভগম্) = সৌভাগ্য দানকারী, ধন-সম্পদের ভাণ্ডার, ভজনীয়, সেবনীয় ভগরূপ ভগবানকে, (পূষাণম্) = সকলের পোষণকারী পূষারূপ ভগবানের কাছে এমন পরিমাণ ধনের প্রার্থনা করি, যা পোষণের জন্য যথেষ্ট হয়; কিন্তু পারিবারিক জীবন কেবল খাদ্য-পান যথেষ্ট হলেই সুন্দর হয় না, তাই বলা হয়েছে—
৬. (ব্রহ্মণস্পতিম্) = আমরা প্রাতঃ বृहস্পতি—জ্ঞানদেবতার আহ্বান করি। স্বাধ্যায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। স্বাধ্যায়শীল স্বামী-স্ত্রী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে জড়িয়ে পড়েন না। তাঁদের মানদণ্ড উঁচু থাকে। তাঁরা সংসারকে যথাযথভাবে দেখতে পারেন, ফলে তাঁদের কর্মও যথাযথ হয়।
৭. সামাজিক জীবনকে সুন্দর করার জন্য (প্রাতঃ সোমম্) = এই প্রাতঃকালে আমরা সোমকে আহ্বান করি। সৌম্য ও নম্র হওয়ার সংকল্প গ্রহণ করি। অহংকার সর্বাধিক সামাজিক দোষ। এর ফলে আমরা সকলের ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠি। নম্রতা সদ্গুণে সমৃদ্ধ করে, সকলের প্রিয়ও করে তোলে; কিন্তু কেবলমাত্র সৌম্য সৌম্য রাজা প্রজাকে সঠিকভাবে শাসন করতে পারে না, তাই মন্ত্রে বলা হয়েছে—
৮. (উত রুদ্রং হুবেম) = সৌম্যতার সঙ্গে রুদ্রতাকেও আমরা আহ্বান করি। এই রুদ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয়। এইভাবে আমরা সংসারে সৌম্য হব, কিন্তু তার সঙ্গে যথোচিত মাত্রায় রুদ্রতার সংযোগ থাকবে। তবেই সমাজে, যে কোনো অবস্থাতেই আমরা সফল হব।
মনুষ্যা ঐশ্বর্য়্যং সম্পাদয়েয়ুরিত্যাহ ॥
মনুষ্যগণ ঐশ্বর্য্যের সম্পাদন করুক, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
প্রাতর্জিতমিত্যস্য বসিষ্ঠ ঋষিঃ । ভগো দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
প্রা॒ত॒র্জিতং॒ ভগ॑মু॒গ্রꣳ হু॑বেম ব॒য়ং পু॒ত্রমদি॑তে॒র্য়ো বি॑ধ॒র্ত্তা ।
আ॒ধ্রশ্চি॒দ্যং মন্য॑মানস্তু॒রশ্চি॒দ্ রাজা॑ চি॒দ্যং ভগং॑ ভ॒ক্ষীত্যাহ॑ ॥ ৩৫ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন (বয়ম্) আমরা (প্রাতঃ) প্রভাত সময় (য়ঃ) যে (বিধর্ত্তা) বিবিধ পদার্থগুলির ধারক (আধ্রঃ) ন্যায়াদিতে অতৃপ্তিকারীর পুত্র (চিৎ) ও (য়ম্) যে ঐশ্বর্য্যকে (মন্যমানঃ) বিশেষ করিয়া জানিয়া (তুরঃ) শীঘ্রকারী (চিৎ) ও (রাজা) শোভাযুক্ত রাজা আছে (য়ম্) যে (ভগম্) ঐশ্বর্য্যকে (চিৎ) ও (ভক্ষি, ইতি, আহ) তুমি সেবন কর এই প্রকার ঈশ্বর উপদেশ করেন, সেই (অদিতেঃ) অবিনাশী কারণের সমান মাতা (পুত্রম্) পুত্র রক্ষক (জিতম্) স্বীয় পুরুষার্থ বলে প্রাপ্ত (উগ্রম্) উৎকৃষ্ট (ভগম্) ঐশ্বর্য্যকে (হুবেম) গ্রহণ করি সেইরূপ তোমরা স্বীকার কর ॥ ৩৫ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে, হে মনুষ্যগণ ! তোমাদিগকে সর্বদা প্রাতঃকাল হইতে লইয়া শয়নের সময় পর্য্যন্ত যথাশক্তি সামর্থ্য দ্বারা বিদ্যা ও পুরুষার্থ বলে ঐশ্বর্য্যের উন্নতি করিয়া আনন্দভোগ করা এবং দরিদ্রের জন্য সুখ দেওয়া উচিত ইহা ঈশ্বর বলিয়াছেন ॥ ৩৫ ॥
হরিশরণজীর পদার্থঃ
পদার্থঃ সংসার-যাত্রা ধন ছাড়া চলা সম্ভব নয়, কিন্তু অন্যায়ভাবে উপার্জিত ধন মানুষের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বশিষ্ঠ প্রভুর কাছে বলেন যে—
১. আমরা (প্রাতঃ) = উত্তম ভাবনায় নিজেকে পূর্ণ করার সময়ে [প্রা পূরণে] (জিতং ভগম্) = সেই সেবনীয় ধনকে, যা আমরা নিজের পুরুষার্থে অর্জন করেছি, (হুবেম) = আহ্বান করি। পুরুষার্থ ব্যতীত প্রাপ্ত ধন মানুষের পতনের কারণ হয়।
২. আমরা সেই ধনকে আহ্বান করি যা (উগ্রম্) উদাত্ত [High, noble]—যা লাভ করে আমরা অহংকারী ও নীচ হয়ে যাই না। (উগ্রম্) = [Industrious] যে ধন আমাদের শ্রমশীল করে রাখে।
৩. (বয়ম্ পুত্রম্) [ভগম্ হুবেম] = আমরা সেই ধনকে আহ্বান করি যা [পুনাতি + ত্রায়তে] আমাদের জীবনকে পবিত্র করে এবং কামনা-বাসনা থেকে রক্ষা করে।
৪. তারপর আমাদের সেই ধন চাই (যঃ) = যা (অদিতেঃ) = অখণ্ডতা, অর্থাৎ স্বাস্থ্যের (বিধর্ত্তা) = বিশেষভাবে ধারণকারী। যে ধন আমাদের অসুস্থ করে তোলে, তা আমরা চাই না। ‘অদিতি’-র অর্থ নিরুক্তে দেওয়া হয়েছে ‘অদীনা দেবমাতা’। আমাদের সেই ধন চাই যা আমাদের অদীন করে তোলে, যার কারণে কাউকে মিনতি করতে না হয় এবং আমাদের হৃদয়ে দিব্য গুণের বিকাশ ঘটে।
৫. আমাদের সেই ধন চাই (যং ভগম্) = যে ধনকে—
[ক] (আধ্রঃ) = আশ্রয় দেওয়ার যোগ্য, অর্থাৎ লুলা-ল্যাংড়া পর্যন্ত (ভক্ষি ইতি আহ) = ‘আমি খাই’—এভাবে বলতে পারে; অর্থাৎ সেই ধনে এই আশ্রয়প্রার্থী প্রতিবন্ধীদেরও অংশ থাকে।
[খ] (মন্যমানঃ তুরঃ চিত্) = সম্মানীয়, সমাজের অজ্ঞতা প্রভৃতি কু-প্রবৃত্তির হিংসা-নাশকারী ব্যক্তিও ‘আমি খাই’—এভাবে বলে; অর্থাৎ আমাদের ধনে সমাজহিতের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও অংশীদার হবে। যে ব্যক্তিরা (মন্যমানঃ) = সম্মানযোগ্য বলে বিবেচিত। এখানে ‘মন্যমানঃ’ বিশেষণটি এজন্য যে, ধন যেন ‘অপাত্রে’ না পৌঁছে। যাঁদের আমরা ধন দিই, তাঁরা সমাজে আদরণের পাত্র হন, যাতে ধনের সদ্ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের নিশ্চিততা থাকে।
[গ] (রাজা চিত্ যং ভগং ভক্ষি ইতি আহ) = এবং শেষে আমাদের সেই ধন চাই, যে ধনকে রাজাও ‘আমি খাই’—এভাবে বলে; অর্থাৎ যে ধন থেকে রাজাকে যথোচিত কর প্রদান করা হয়। রাজা এই করপ্রাপ্ত ধন দ্বারাই রাষ্ট্রের রক্ষা ও ব্যবস্থা করেন। আমরা যদি কর না দিই, তবে রাষ্ট্রের চুরি করি। অতএব আমাদের ধনে অনাথ, সমাজসেবক এবং রাজার অংশ থাকা অবশ্যই উচিত।
অথেশ্বরপ্রার্থনাদিকবিষয়মাহ ॥
এখন ঈশ্বরের প্রার্থনাদি বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ভগ ইত্যস্য বসিষ্ঠ ঋষিঃ । ভগবান্ দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ভগ॒ প্রণে॑ত॒র্ভগ॒ সত্য॑রাধো॒ ভগে॒মাং ধিয়॒মুদ॑বা॒ দদ॑ন্নঃ ।
ভগ॒ প্র নো॑ জনয়॒ গোভি॒রশ্বৈ॒র্ভগ॒ প্র নৃভি॑নৃর্বন্॒তঃ॑ স্যাম ॥ ৩৬ ॥
অন্বয়ঃ হে ভগ প্রণেতর্ভগ সত্যরাধো ভগ! ত্বং নোऽস্মাকমিমাং ধিয়ং দদৎ সদুদব। হে ভগ! ত্বং গোভিরশ্বৈর্নৃভিস্সহ নোऽস্মান্ প্রজনয়। হে ভগ! যেন বয়ং নৃবন্তঃ প্রস্যান্ তথা বিধেহি॥৩৬॥
পদার্থঃ (ভগ) ঐশ্বর্যযুক্ত! (প্রণেতঃ) পুরুষার্থং প্রতি প্রেরক (ভগ) ঐশ্বর্যপ্রদ! (সত্যরাধঃ) সৎসু সাধূনি রাধাংসি ধনানি যস্য তৎসম্বুদ্ধৌ (ভগ) ভজনীয়! (ইমাম্) বর্তমানাম্ (ধিয়ম্) প্রজ্ঞাম্ (উত্) (অব) রক্ষ। অত্র দ্ব্যচোऽতস্তিঙঃ [অ॰৬।৩।১৩৫] ইতি দীর্ঘঃ। (দদৎ) দদানঃ (নঃ) অসমাকম্ (ভগ) বিদ্যৈশ্বর্যপ্রদ! (প্র) (নঃ) অসমান্ (জনয়) প্রকটয় (গোভিঃ) ধেন্বাদিভিঃ (অশ্বৈঃ) অশ্বাদিভিঃ (ভগ) ভজমান! (প্র) (নৃভিঃ) নায়কৈঃ (নৃবন্তঃ) (স্যাম) ভবেম॥৩৬॥
পদার্থঃ- হে (ভগ) ঐশ্বর্যযুক্ত ! (প্রণেতঃ) পুরুষকারের প্রতি প্রেরণাদাতা ঈশ্বর বা (ভগ) হে ঐশ্বর্যের দাতা ! (সত্যরাধঃ) বিদ্যমান পদার্থ সকলের মধ্যে উত্তম ধনবানগণ (ভগ) সেবন যোগ্য বিদ্বান্ আপনি (নঃ) আমাদের (ইমাম্) এই বর্ত্তমান (ধিয়ম্) বুদ্ধিকে (দদৎ) প্রদান করিয়া (উত, অব) উৎকৃষ্টতা পূর্বক রক্ষা করুন । হে (ভগ) বিদ্যারূপ ঐশ্বর্য্যের দাতা ঈশ্বর বা বিদ্বান্ ! আপনি (গোভিঃ) গো আদি পশুসকল (অশ্বৈঃ) অশ্বাদি বাহন এবং (নৃভিঃ) নায়ক কুলনির্বাহক মনুষ্যদিগের সঙ্গে (নঃ) আমাদিগকে (প্র, জনয়) প্রকট করুন । হে (ভগ) সেবাকারী বিদ্বন্ ! যাহাতে আমরা (নৃবন্তঃ) প্রশস্ত মনুষ্য (প্রস্যাম) উত্তম প্রকার হই, সেইরূপ করুন ॥ ৩৬ ॥
ভাবার্থঃ- মনুষ্যদিগের উচিত যে, যখন ঈশ্বরের প্রার্থনা তথা বিদ্বান্দিগের সঙ্গ করিবে তখন তখন বুদ্ধিরই প্রার্থনা বা শ্রেষ্ঠ পুরুষদিগের কামনা করিতে থাকিবে ॥ ৩৬ ॥
অথৈশ্বর্য়োন্নতিবিষয়মাহ ॥
এখন ঐশ্বর্য্যের উন্নতির বিষয় বলা হইতেছে ॥
উতেদানীমিত্যস্য বসিষ্ঠ ঋষিঃ । ভগো দেবতা । পংক্তিশ্ছন্দঃ । পঞ্চমঃ স্বরঃ ॥
উ॒তেদানীং॒ ভগ॑বন্তঃ স্যামো॒ত প্র॑পি॒ত্বऽউ॒ত মধ্যে॒ऽঅহ্না॑ম্ ।
উ॒তোদি॑তা মঘব॒ন্ৎসূর্য়্য॑স্য ব॒য়ং দে॒বানা॑ᳬসুম॒তৌ স্যা॑ম ॥ ৩৭ ॥
পদার্থঃ- হে (মঘবন্) উত্তম ধনযুক্ত ঈশ্বর বা বিদ্বান্ ! (বয়ম্) আমরা (ইদানীম্) বর্তমান সময়ে (উত) এবং (প্রপিত্বে) পদার্থগুলির প্রাপ্তিতে (উত) এবং ভবিষ্যৎকালে (উত) এবং (অহ্নাম্) দিনগুলির (মধ্যে) মধ্যে (ভগবন্তঃ) (স্যাম) সমস্ত ঐশ্বর্য্য দ্বারা যুক্ত হই (উত) এবং (সূর্য়স্য) সূর্য্যের (উদিতা) উদয় সময় তথা (দেবানাম্) বিদ্বান্দিগের (সুমতৌ) উত্তম বুদ্ধিতে সমস্ত ঐশ্বর্য্যযুক্ত (স্যাম) হই ॥ ৩৭ ॥
ভাবার্থঃ- মনুষ্যদিগের উচিত যে, বর্ত্তমান ও ভবিষ্যৎ কালে যোগের ঐশ্বর্য্য সকলের উন্নতি দ্বারা লৌকিক ব্যবহারের বৃদ্ধি করিতে এবং প্রশংসায় নিরন্তর প্রচেষ্টা করিবে ॥ ৩৭ ॥
উক্ত মন্ত্রের হরিশরণজীর পদার্থ ভাষ্যঃ
১. (ইদানীম্ উৎ) = এই সময়েও (ভগবন্তঃ স্যাম) = আমরা ভগযুক্ত হই। (উৎ প্রপিত্বে) = এবং অন্তকালেও ঐশ্বর্যযুক্ত হই। (উৎ অহ্নাম্ মধ্যে) = আর দিনগুলির মধ্যভাগেও আমরা ঐশ্বর্যযুক্ত থাকি। (উৎ) = এবং হে (মঘবন্) = হে ঐশ্বর্যশালী প্রভো! (বয়ম্) = আমরা (সূর্যস্য উদিতা) = সূর্য উদিত হতেই (দেবানাম্ সুমতৌ স্যাম) = দেবগণের কল্যাণী মতিতে অবস্থান করি।
২. ‘ভগ’ শব্দের ছয়টি অর্থ আছে—
(‘ঐশ্বর্যস্য সমগ্রস্য বীর্যস্য যশসঃ শ্রিয়ঃ।
জ্ঞানবৈরাগ্যয়োশ্চৈব ষণ্ণাং ভগ ইতীরণা’)।
এগুলি হল—
[ক] সমগ্র ঐশ্বর্য, প্রকৃতপক্ষে ঐশ্বর্যলাভের সাধনরূপ বিজ্ঞান,
[খ] বীর্য,
[গ] যশ,
[ঘ] শ্রী,
[ঙ] জ্ঞান,
এবং
[চ] বৈরাগ্য।
জীবনের প্রাতঃকালে, অর্থাৎ ব্রহ্মচর্যাশ্রমে, আমরা যেন বিজ্ঞান ও বীর্যের সাধন করি। এই জীবনের প্রাতঃকালে মানুষ নিজের মধ্যে বিজ্ঞান-ঐশ্বর্য ও শক্তি সঞ্চয় করবে। এই শক্তি ও ঐশ্বর্য অর্জনের যোগ্যতা দ্বারা নিজেকে পরিপূর্ণ করে সে সদ্গৃহস্থ হয়।
৩. এই সদ্গৃহস্থ জীবনের মধ্যাহ্নকালে অবস্থান করে। তাকে জীবনে যশ ও শ্রী অর্জন করতে হয়। একজন গৃহস্থকে সর্বদা এমন কর্ম করতে হবে, যা তার যশের কারণ হয় এবং তার জীবনকে শোভাময় করে তোলে।
৪. যশস্বী ও শ্রীসম্পন্ন গৃহস্থজীবন অতিবাহিত করে মানুষের উচিত আরও অগ্রসর হওয়া এবং জীবনের সায়ঙ্কালে জ্ঞান ও বৈরাগ্যের সাধনা করা। এই ‘শ্রেয়োজ্ঞান’ [ব্রহ্মজ্ঞান—ব্রহ্মদর্শন] পতঞ্জলি যোগের অভ্যাসের দ্বারাই সম্ভব। অতএব, বানপ্রস্থ অবস্থায় প্রাতঃ ও সায়ং অন্তত এক-এক ঘণ্টা ধ্যান করা আবশ্যক; আরও বেশি হলে তাও উত্তম। অবশিষ্ট সময় স্বাধ্যায়ে অতিবাহিত করার চেষ্টা করতে হবে। স্বাধ্যায়ে ক্লান্ত হলে লোকহিতকর কর্মে আনন্দ ও আমোদ অনুভব করতে হবে। এই কর্মগুলিই তার আমোদ-প্রমোদ [Amusements] হয়ে উঠবে। এই জ্ঞান লাভের ফলে বৈরাগ্য ও অনাসক্তি [Detachment]-র ভাবের উদয় হবে এবং এইভাবে তার জীবন সম্পূর্ণ ভগযুক্ত হয়ে উঠবে।
৫. এই ভগের ক্রমিক বিকাশকে সিদ্ধ করার জন্য আমরা সূর্যোদয় থেকেই, অর্থাৎ জীবনের শুরু থেকেই দেবগণের কল্যাণী মতিতে অবস্থান করি। প্রাতঃকালে—‘মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব, আচার্যদেবো ভব’—অর্থাৎ মাতা, পিতা ও আচার্য আমাদের সুমতি দানকারী হন। মধ্যাহ্নকালে—‘অতিথিদেবো ভব’—বিদ্বান ও ব্রতনিষ্ঠ জীবনযাপনকারী অতিথিরা যেন আমাদের সময়ে সময়ে সুমতি প্রদান করেন। জীবনের পূর্ণতার কালে [সায়ঙ্কালে] অন্তর্মুখ যাত্রার অনুশীলনের মাধ্যমে যে মহাদেবের কল্যাণী মতি প্রতিভাত হয়, তা আমরা শ্রবণ করতে সক্ষম হই—অর্থাৎ আত্মার কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পারি। এইভাবে দেবগণের কল্যাণী মতির সঙ্গে যদি আমরা জীবনে বিচ্ছিন্ন না হই, তবে অবশ্যই নিজের মধ্যে ভগের বৃদ্ধি ঘটাতে ঘটাতে ভগবানের দর্শন লাভ করতে পারব।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ভগ ইত্যস্য বসিষ্ঠ ঋষিঃ । ভগবান্ দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ভগ॑ऽএ॒ব ভগ॑বাঁ২ऽঅস্তু দেবা॒স্তেন॑ ব॒য়ং ভগ॑বন্তঃ স্যাম ।
তং ত্বা॑ ভগ॒ সর্ব॒ऽইজ্জো॑হবীতি॒ স নো॑ ভগ পুরऽএ॒তা ভ॑বে॒হ ॥ ৩৮ ॥
অন্বয়ঃ হে দেবাঃ! যো ভগ এব ভগবানস্তু তেন বয়ং ভগবন্তঃ স্যাম। হে ভগ! তং ত্বা সর্ব ইজ্জোহবীতি।ভগ! স ত্বমিহ নঃ পুরএতা ভব॥৩৮॥
পদার্থঃ- হে (দেবাঃ) বিদ্বান্গণ ! যিনি (ভগ, এব) সেবনীয় (ভগবান্) প্রশস্ত ঐশ্বর্য্যযুক্ত (অস্তু) হইবেন (তেন) সেই ঐশ্বর্য্যরূপ ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন পরমেশ্বর সহ (বয়ম্) আমরা (ভগবন্তঃ) সমগ্র শোভাযুক্ত (স্যাম) হইব । হে (ভগ) সম্পূর্ণ শোভাযুক্ত ঈশ্বর ! (তম্ ত্বা) সেই আপনাকে (সর্বঃ, ইৎ) সমস্তই ব্যক্তি (জোহবীতি) শীঘ্র আহ্বান করে । হে (ভগ) সকল ঐশ্বর্য্য প্রদাতা (সঃ) সুতরাং আপনি (ইহ) এই জগতে (নঃ) আমাদের (পুর এতা) অগ্রগামী (ভব) হউন ॥ ৩৮ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! তোমরা যে সমস্ত ঐশ্বর্য্য দ্বারা যুক্ত পরমেশ্বর, তাঁহার এবং যাহারা তাঁহার উপাসক বিদ্বান্, তাহাদের সহ সিদ্ধ ও শ্রীমান্ হও, যে জগদীশ্বর মাতা-পিতার সমান আমাদের উপর কৃপা করেন, তাঁহার ভক্তিপূর্বক এই সংসারে মনুষ্যদিগকে ঐশ্বর্য্য সম্পন্ন নিরন্তর করিতে থাকিবে ॥ ৩৮ ॥
হরিশরণজীর পদার্থভাষ্যঃ
১. হে (দেবাঃ) = দেবগণ! আপনারা এমন কৃপা করুন যে (ভগবান্ এৱ) = প্রভুই (ভগঃ অস্তু) = আমাদের ঐশ্বর্য হন, অর্থাৎ আমরা ভগবানকেই আমাদের ‘ভগ’ রূপে গ্রহণ করি, প্রভুপ্রাপ্তিকেই সত্য ঐশ্বর্য বলে মনে করি। (তেন) = সেই প্রভুর দ্বারাই (বয়ম্) = আমরা (ভগবন্তঃ) = ভগসম্পন্ন (স্যাম্) = হই। প্রভুই হোন আমাদের ধন। আমরা ‘আত্মক্রীড়’ ও ‘আত্মরতি’ হয়ে উঠতে পারি। আমরা ‘আত্মন্যেব চ সন্তুষ্টঃ’—আত্মতত্ত্ব প্রাপ্ত হয়েই সন্তুষ্ট হই।
২. হে (ভগ) = সর্ব ঐশ্বর্যের পুঞ্জ প্রভু! (তম্ ত্বা) = সেই আপনাকেই (সর্ব ইত্) = সকলেই (জোহবীতি) = আহ্বান করে। প্রভুর সত্য উপাসনা সেই-ই করে যে ‘সর্ব’ হয়ে ওঠে। ‘সর্ব’ হওয়ার অর্থ—শরীর, মন ও মস্তিষ্ক এই তিনেরই উন্নতি সাধন করা। কেবল সুস্থ দেহধারী ব্যক্তি, কেবল কুদ্ভাবনামুক্ত ব্যক্তি, কেবল কারও অমঙ্গল চিন্তা না করা ব্যক্তি, অথবা কেবল জ্ঞানপূর্ণ মস্তিষ্কধারী ব্যক্তি—এদের কেউই এককভাবে প্রভুর সত্য উপাসক নয়। সত্য উপাসক সেই-ই, যে এই তিন প্রকার উন্নতির সাধনা করে ‘সর্ব’ হওয়ার প্রয়াস করে।
৩. হে (ভগ) = সেবনীয়, উপাসনীয় প্রভু! (সঃ) = সেই আপনিই (ইহ) = এই মানবজীবনে (নঃ) = আমাদের (পুরএতা) = অগ্রে চলনকারী (ভব) = হোন। আপনিই আমাদের নেতা হোন, আমরা হই আপনার অনুসারী। আমাদের পথপ্রদর্শক আপনিই হোন।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
সমধ্বরায় ইত্যস্য বসিষ্ঠ ঋষিঃ । ভগো দেবতা । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
সম॑ধ্ব॒রায়ো॒ষসো॑ নমন্ত দধি॒ক্রাবে॑ব॒ শুচ॑য়ে প॒দায়॑ ।
অ॒র্বা॒চী॒নং ব॑সু॒বিদং॒ ভগং॑ নো॒ রথ॑মি॒বাশ্বা॑ বা॒জিন॒ऽআ ব॑হন্তু ॥ ৩ঌ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! (উষসঃ) প্রভাত সময় (দধিক্রাবেব) উত্তম ভাবে চালিত ধারক অশ্বের তুল্য (শুচয়ে) পবিত্র (পদায়) প্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য (অধ্বরায়) হিংসারূপ অধর্মরহিত ব্যবহারের জন্য (সম্, নমন্ত) সম্যক্ নমতে অর্থাৎ প্রাতঃকাল সত্বগুণের আধিক্য বশতঃ সকল প্রাণিগুলির চিত্ত শুদ্ধ নম্র হয় । (অশ্বাঃ) শীঘ্রগামী (বাজিনঃ) অশ্বগুলি যেমন (রথমিব) রমণীয় যানকে সেইরূপ (নঃ) আমাদিগকে (অর্বাচীনম্) এই সময়ের (বসুবিদম্) অনেক প্রকারের ধন প্রাপ্তি হেতু (ভগম্) ঐশ্বর্য্যযুক্ত ব্যক্তিকে প্রাপ্ত করাইবে তদ্রূপ ইহাদেরকে তোমরা (আ, বহন্তু) উত্তম প্রকারে চালাইবে ॥ ৩ঌ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে দুইটি উপমালঙ্কার আছে । যে সব মনুষ্য প্রভাত বেলার তুল্য বিদ্যা ও ধর্মের প্রকাশ করে এবং যেমন অশ্ব যানকে সেইরূপ শীঘ্র সমস্ত ঐশ্বর্য্যকে উপস্থিত করিয়া থাকে তাহারা বিদ্বান্ জানিবার যোগ্য ॥ ৩ঌ ॥
হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারঃ পদার্থ
১. (উষসঃ) = উষাকাল (অধ্বরায়) = অধ্বরের জন্য (সংনমন্ত) = সন্নত হোক। আমরা প্রভাতকালেই বিনীত হয়ে অধ্বর-মার্গে চলার সংকল্প করি। ‘ন ধ্বরতি কুটিলো ভবতি, অধ্বানং সৎপথং রাতি ইতি বা’ = বিনীত হয়ে কুটিলতাহীন সৎপথে চলি। বিনীততার ফল কুটিলতা-ত্যাগ। যখন নম্রতা নষ্ট হয়ে অহংকার আসে, তখনই জীবন কুটিল ও হিংসাময় হয়ে ওঠে। দৈবী সম্পদের চরমসীমাই বিনীততা—‘নাতিমানিতা’।
২. (দধিক্রাবা ইব) = দধিক্রাবার ন্যায় (শুচয়ে পদায়) = পবিত্র পথের জন্য, অথবা সেই সম্পূর্ণ শুদ্ধ প্রভুকে প্রাপ্ত করার জন্য এই উষাকাল হোক।
[ক] ‘দধৎ ক্রামতীতি দধিক্রাবা’—শক্তি ধারণ করে অগ্রসর হয়; আমরা শক্তিশালী হয়ে পবিত্র পথে চলি। সংসার দুর্বলদের জন্য নয়। দুর্বলতায় মানুষ পাপ করে বসে। ‘বি শক্রঃ পাপকৃত্যয়া—অ ৩।৩১।২’—শক্তিশালী পাপ থেকে দূরে থাকে; তাই উপনিষদ বলে (‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ’)।
[খ] ‘দধৎ ক্রন্দতি ইতি বা দধিক্রাবা’—শক্তিশালী হয়ে প্রভুকে আহ্বান করতে করতে আমি পবিত্র পথে চলি। (দধৎ) = ধারণাত্মক কর্ম করতে করতে প্রার্থনা করি। দুর্বল হয়ে প্রভুকে ডাকলে কোনো লাভ নেই। ধারণাত্মক কর্মে নিয়োজিত হয়েই প্রভু-প্রার্থনার অধিকার জন্মায়।
৩. (ইব) = যেমন (বাজিনঃ অশ্বাঃ) = শক্তিশালী ঘোড়া (রথম্) = রথকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়, তেমনি (বাজিনঃ) = শক্তিশালী ও জ্ঞানসম্পন্ন (অশ্বাঃ) = ইন্দ্রিয়রূপ ঘোড়া (নঃ) = আমাদের (অর্বাচীনে) = [অবরে দেশে অঞ্চতি ন তু পরে] অন্তরেই বিদ্যমান (বসুবিদম্) = বাসের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বস্তু প্রদানকারী (ভগম্) = ঐশ্বর্যপুঞ্জ, সেবনীয় প্রভুকে (আবহন্তু) = প্রাপ্ত করিয়ে দিক। এখানে ইন্দ্রিয়গুলির বিশেষণ ‘বাজিনঃ’; তারা শক্তিশালী হোক এবং জ্ঞানপ্রাপ্তির উপযুক্ত সাধন হোক। সেই প্রভুকে প্রাপ্ত করার জন্য এই ইন্দ্রিয়রূপ ঘোড়াগুলির অন্তর্মুখী যাত্রা প্রয়োজন; তিনি ‘অর্বাচীন’—অন্তরেই বর্তমান, তিনি সকল বস্তু의 অধিপতি; অতএব প্রভু-প্রাপ্তিতে ‘যোগক্ষেম’ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়।
ভাবার্থ
ভাবার্থ—প্রভু-প্রাপ্তির পথ এই যে: [ক] আমরা বিনীততা গ্রহণ করে অহিংসা ও অকুটিলতার পথে চলি, [খ] নিজেকে শক্তিশালী করে পবিত্র পথের আক্রমণ করি এবং ধারণাত্মক কর্মে নিয়োজিত থেকে প্রভুর প্রার্থনা করি, [গ] প্রভুকে ঐশ্বর্যের পুঞ্জ ও সকল বস্তু প্রদানকারী জেনে ইন্দ্রিয়সংযম করে তাঁরই ধ্যানে স্থিত হই।
বিদুষ্যঃ কিং কুর্য়ুরিত্যাহ ॥
এখন বিদুষী স্ত্রীগণ কী করিবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
অশ্বাবতীরিত্যস্য বসিষ্ঠ ঋষিঃ । উষা দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
অশ্বা॑বতী॒র্গোম॑তীর্নऽউ॒ষাসো॑ বী॒রব॑তীঃ॒ সদ॑মুচ্ছন্তু ভ॒দ্রাঃ ।
ঘৃ॒তং দুহা॑না বি॒শ্বতঃ॒ প্রপী॑তা য়ূ॒য়ং পা॑ত স্ব॒স্তিভিঃ॒ সদা॑ নঃ ॥ ৪০ ॥
পদার্থঃ- হে বিদুষী স্ত্রীগণ ! যেমন (অশ্বাবতীঃ) প্রশস্ত ব্যাপ্তিশীল জল সম্পন্ন (গোমতীঃ) বহু কিরণ দ্বারা যুক্ত (বীরবতীঃ) বহু বীর পুরুষ দ্বারা সংযুক্ত (ভদ্রাঃ) কল্যাণকারিণী (ঘৃতম্) (निघं॰१।१२) শুদ্ধ জলকে (দুহানাঃ) পূর্ণ করিয়া (বিশ্বতঃ) সব দিক্ দিয়া (প্রপীতাঃ) প্রকর্ষতা পূর্বক বৃদ্ধি প্রাপ্ত (উষাসঃ) প্রভাত বেলা (নঃ) আমাদের (সদম্) সভাকে প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ প্রকাশিত বা প্রবৃত্ত করে সেইরূপ আমাদের সভাকে তোমরা (উচ্ছন্তু) সমাপ্ত কর এবং (নঃ) আমাদের (য়ূয়ম্) তোমরা (স্বস্তিভিঃ) সুস্থতা প্রদাতা সুখ দ্বারা (সদা) সর্বদা (পাত) রক্ষা কর ॥ ৪০ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । যেমন প্রভাতবেলা জাগ্রত মনুষ্যদিগের সুখ প্রদানকারিণী হয়, সেইরূপ বিদুষী নারী, কুমারী, বিদ্যার্থিনী, কন্যাদের বিদ্যা, সুশিক্ষা ও সৌভাগ্য বৃদ্ধি করিয়া সর্বদা এই সব কন্যাদিগকে আনন্দিত করিতে থাকিবে ॥ ৪০ ॥
অথেশ্বরাপ্তসেবিনঃ কীদৃশা ভবন্তীত্যাহ ॥
এখন ঈশ্বর ও আপ্তজনের সেবক কেমন হয়, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
পূষন্নিত্যস্য সুহোত্র ঋষিঃ । পূষা দেবতা । গায়ত্রী ছন্দঃ । ষড্জঃ স্বরঃ ॥
পূষ॒ন্তব॑ ব্র॒তে ব॒য়ং ন রি॑ষ্যেম॒ কদা॑ চ॒ন ।
স্তো॒তার॑স্তऽই॒হ স্ম॑সি ॥ ৪১ ॥
পদার্থঃ- হে (পূষন্) পুষ্টিকারক পরমেশ্বর বা আপ্তবিদ্বান্ ! (বয়ম্) আমরা (তব) আপনার (ব্রতে) স্বভাব বা নিয়মে এমন আচরণ করি যে, যাহাতে (কদা, চন) কখনও (ন) না (রিষ্যেম) চিত্ত নষ্ট করি (ইহ) এই জগতে (তে) আপনার (স্তোতারঃ) স্তুতিকারী আমরা সুখী (স্মসি) হই ॥ ৪১ ॥
ভাবার্থঃ- যে মানুষরা পরমেশ্বরের বা তাঁর দ্বারা প্রাপ্ত আদর্শ পুরুষের গুণ, কর্ম ও স্বভাবের অনুকূলে আচরণ করে, তারা কখনও সুখহীন হয়ে যায় না। ॥৪১॥
'সুহোত্র' ঋষির এই মন্ত্রের অর্থ হলো: [হু = প্রদান] এটি (সু) = উত্তম বস্তুসমূহের (হোত্র) = প্রদান করে নিজের রক্ষা করে। এটি বলছে যে, হে (পূষণ) = সকলের পালনকারি সূর্যদেব! (বয়ম্) = আমরা তোমার নিয়ম অনুসারে তোমার উপাসনায় চলছি (কদাচন) = কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত হই না (ন রিষ্যেম)। এই উদ্দেশ্যেই এই মানবজীবনে আমরা (তে) = তোমার (স্তোতারঃ) = স্তবক/স্তুতি কর্তা (স্মসিঃ) = হই। স্তুতি মানে হলো, আমরা তোমার গুণের স্মরণ করি এবং নিজের জীবনের জন্য একটি লক্ষ্য স্থির করি।
১. যেমন সূর্য 'পূষা', সকলের পালনকারী, তেমনি আমরাও 'পোষণের' নিয়ম গ্রহণ করি। আমরা ধারণামূলক কর্ম করব, ধ্বংসমূলক নয়। এটিই আসলে 'দধিক্রাবা' [সংখ্যা ৩৯] হওয়া।
২. এই পূষা আদিত্য সব স্থানে থেকে জল গ্রহণ করে, কিন্তু এই গ্রহণে সে শুধু জলই নেয়, সেই স্থানের দূর্গন্ধ বা অশুদ্ধি নয়। আমাদেরও এই নিয়ম হওয়া উচিত যে আমরা অন্যদের সদ্গুণই গ্রহণ করি এবং তা নিজের জীবনে ধার করি।
৩. সূর্য (সরতি) = অনবরত চলমান, আরামের জন্য কখনো থামে না।
৪. সূর্যের চতুর্থ বিষয় হলো, এটি মানুষের স্তুতি বা নিন্দা থেকে নিজের তাপ ও আলো দেওয়ার কাজ কখনো বিচলিত হয় না। আমাদেরও এটাই আদর্শ হওয়া উচিত যে ('নিন্দা বা স্তুতি হোক, ধন-দারিদ্র্য হোক, জীবন-মরণ হোক—কোনো কিছুই আমাদের কর্তব্যপথ থেকে বিচলিত করতে পারবে না')।
প্রদত্ত মন্ত্রে ঋষি 'সুহোত্র' এই 'পোষণ, উৎকর্ষের প্রদান, সর্বদা ক্রিয়াশীল থাকা এবং কর্তব্যপথে অচল থাকা' এই গুণাবলীর মাধ্যমে সূর্যের নিয়মে চলেন, সূর্যের সত্য উপাসক হন এবং এইভাবে নিজের জীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। (হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
পথস্পথ ইত্যস্য ঋজিষ্ব ঋষিঃ । পূষা দেবতা । বিরাট্ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
প॒থস্প॑থঃ॒ পরি॑পতিং বচ॒স্যা কামে॑ন কৃ॒তোऽঅ॒ভ্যা᳖নড॒র্কম্ ।
স নো॑ রাসচ্ছু॒রুধ॑শ্চ॒ন্দ্রাগ্রা॒ ধিয়ং॑ধিয়ꣳ সীষধাতি॒ প্র পূ॒ষা ॥ ৪২ ॥
অন্বয়ঃ হে মনুষ্যাঃ! যো বচস্যা কামেন কৃতঃ পূষাঃ জগদীশ্বর আপ্তো বা শুরুধঃ চন্দ্রাগ্রাঃ সাধনানি নো রাসদ্ধিয়ং ধিয়ং প্রসীষধাতি স শুভগুণকর্মস্বভাবানভ্যানট্ তমর্কং পথম্পথঃ পরিপতিং বয়ং স্তুয়াম॥৪২॥
পদার্থঃ (পথম্পথঃ) মার্গস্ম (পরিপতিম্) স্বামিনম্ (বচস্যা) বচসা বচনেন। অত্র সুপাং সুলুগ্॰ [অ॰৭.১.৩৯] ইতি সূত্রেণ বিভক্তের্যাদেশঃ। (কামেন) (কৃতঃ) নিস্পন্নঃ (অভি) অভিতঃ (আনট্) ব্যাপনোতি (অর্কম্) অর্চনীয়ম্ (সঃ) (নঃ) অসমভ্যম্ (রাসৎ) দদাতু (শুরুধঃ) যাঃ শুরুধো দুখানি রুন্ধন্তি তাঃ (চন্দ্রাগ্রাঃ) চন্দ্রমা হ্লাদনমগ্রং মুখ্যং ইয়াসান্তাঃ (ধিয়ং ধিয়ম্) প্রজ্ঞা প্রজ্ঞা কর্ম কর্ম বা (সীষধাতি) সাধনুয়াত্ (প্র) (পূষা) পুষ্টিকর্ত্তা॥৪২॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যিনি (বচস্যা) বচন ও (কামেন) কামনা করিয়া (কৃতঃ) নিষ্পন্ন (পূষা) পুষ্টিকর্তা জগদীশ্বর বা আপ্তজন (শুরুধঃ) শীঘ্র দুঃখকে প্রতিরোধকারী (চন্দ্রাগ্রাঃ) প্রথম হইতেই আনন্দকারী সাধনগুলিকে (নঃ) আমাদের জন্য (রাসৎ) প্রদান করিবেন (ধিয়ং ধিয়ম্) প্রত্যেক বুদ্ধি বা কর্মকে (প্রসীষধাতি) প্রকর্ষতাপূর্বক সিদ্ধ করিবেন (সঃ) তিনি শুভ গুণ, কর্ম, স্বভাবগুলিকে (অভি, আনট্) সব দিক্ দিয়া ব্যাপ্ত হন, সেই (অর্কম্) পূজনীয় (পথস্পথঃ) প্রত্যেক মার্গের (পরিপতিম্) স্বামীর আমরা স্তুতি করি ॥ ৪২ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে জগদীশ্বর সকলের সুখের জন্য বেদের প্রকাশের এবং আপ্ত পুরুষকে পড়াইবার ইচ্ছা করেন, যিনি সকলের জন্য শ্রেষ্ঠ বুদ্ধি, উত্তম কর্ম্ম ও শিক্ষা প্রদান করেন, সেই সব শ্রেষ্ঠ মার্গের স্বামিদের সদা সৎকার করা উচিত ॥ ৪২ ॥
অথেশ্বরবিষয়মাহ ॥
এখন ঈশ্বরের বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ত্রীণীত্যস্য মেধাতিথির্ঋষিঃ । বিষ্ণুর্দেবতা । নিচৃদ্ গায়ত্রী ছন্দঃ । ষড্জঃ স্বরঃ ॥
ত্রীণি॑ প॒দা বি চ॑ক্রমে॒ বিষ্ণু॑র্গো॒পাऽঅদা॑ভ্যঃ ।
অতো॒ ধর্মা॑ণি ধা॒রয়॑ন্ ॥ ৪৩ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যিনি (অদাভ্যঃ) অহিংসা ধর্মসম্পন্ন হওয়ায় দয়ালু (গোপাঃ) রক্ষক, (বিষ্ণুঃ) চরাচর জগতে ব্যাপ্ত পরমেশ্বর (ধর্মাণি) পুণ্যরূপ কর্ম্মের ধারক (ধারয়ন্) পৃথিব্যাদিকে ধারণ করিয়া (অতঃ) এই কারণে (ত্রীণি) তিন (পদা) জানিবার বা প্রাপ্ত হইবার যোগ্য কারণ, সূক্ষ্ম ও স্থূলরূপ জগৎকে (বি, চক্রমে) আক্রমণ করেন, তিনিই আমাদের পূজনীয় ॥ ৪৩ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে পরমেশ্বর ভূমি, অন্তরিক্ষ ও সূর্য্যরূপ করিয়া তিন প্রকারের জগৎ নির্মাণ করিয়াছেন, সকলকে ধারণ করিয়াছেন এবং রক্ষণ করিয়াছেন, তিনিই উপাসনার যোগ্য ইষ্টদেব ॥ ৪৩ ॥
বিষয়: তিন পদক্ষেপ
পদার্থঃ গত মন্ত্রের ঋষি ('ঋজিশ্বা') = সরল পথে চলে পূষার প্রদত্ত পথ অনুসরণ করেন। এই পথে চলতে চলতে তিনি (ত্রিণি পদা) = তিনটি পদকে (বিচক্রমে) = বিশেষভাবে স্থাপন করেন। ১. তিনি (বিশ্ণুঃ) = [বিস্লৃ ব্যাপ্তৌ] বিস্তৃত, উদার অন্তঃকরণসম্পন্ন হন। নিজের বুদ্ধিকে বিশাল করেন। ২. তিনি (গোপাঃ) = [গাভঃ ইন্দ্রিয়াণি] ইন্দ্রিয়দের রক্ষক হন। ইন্দ্রিয়দের বিষয়বস্তুর দিকে বিচলিত হওয়া থেকে রক্ষা করেন। এভাবে তার ইন্দ্রিয়গুলি বিষয়াসক্ত হওয়া থেকে বাঁচে, অন্য কথায় তার ইন্দ্রিয়-ঘোড়ার পথ বিপথগামী হয় না এবং তিনি নিজের জীবনযাত্রায় অগ্রসর হন। ৩. (অদাভ্যঃ) = [দভ্-হিংসায়াম্] তিনি নিজের শরীরে রোগ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হন না। রোগকৃমির দ্বারা ভীত হন না। সদা সুস্থ দেহসম্পন্ন থাকেন। ৪. যেহেতু তিনি 'বিশ্ণু, গোপা ও অদাভ্য' রূপে 'ব্যাপক মনোন্নতি, ইন্দ্রিয় রক্ষা ও শরীরের স্বাস্থ্য' রূপ তিনটি পদক্ষেপ স্থাপন করেন, অতএব (ধর্মাণি) = দেবপূজা, সঙ্গসংযোগ ও দানের মূল ধর্মগুলি (ধারয়ন্) = ধারণ করেন। ৩১তম অধ্যায়ের ১৬তম মন্ত্রে 'তানি ধর্মাণি প্রথমান্যসান্' এই শব্দগুলিতে যোগ্যানুষ্ঠান অনুসারে এই তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। দেবপূজা জ্ঞান বৃদ্ধি করে, সঙ্গসংযোগ রাগ-দ্বেষের ওপর উত্তীর্ণ করে এবং দান আমাদের বিষয়াসক্তি থেকে বাঁচায় ও সুস্থ রাখে। এগুলোই তিনটি পদক্ষেপ, যা বর্তমান মন্ত্রের ঋষি 'মেধাতিথি' নিজের জীবনে অনুসরণের চেষ্টা করেন।
ভাবার্থ- আমরা নিজের জীবনে তিনটি পদক্ষেপ স্থাপনকারী ত্রিভিক্রম হই। 'বিশ্ণু হই, গোপা হই এবং অদাভ্য হই'। (হরিশরণজী)
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
তদ্বিপ্রাস ইত্যস্য মেধাতিথির্ঋষিঃ । বিষ্ণুর্দেবতা । গায়ত্রী ছন্দঃ । ষড্জঃ স্বরঃ ॥
তদ্বিপ্রা॑সো বিপ॒ন্যবো॑ জাগৃ॒বাᳬসঃ॒ সমি॑ন্ধতে ।
বিষ্ণো॒র্য়ৎপ॑র॒মং প॒দম্ ॥ ৪৪ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যাহারা (জাগৃবাংসঃ) অবিদ্যারূপ নিদ্রা হইতে উত্থিত হইয়া চেতন হইয়া (বিপন্যবঃ) বিশেষ করিয়া স্তুতি করিবার যোগ্য বা ঈশ্বরের স্তুতিকারী (বিপ্রাসঃ) বুদ্ধিমান্ যোগীগণ (বিষ্ণোঃ) সর্বত্র অভিব্যাপক পরমাত্মার (য়ৎ) যাহা (পরমম্) উত্তম (পদম্) প্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য মোক্ষদায়ী স্বরূপ (তৎ) তাহাকে (সম, ইন্ধতে) সম্যক্ প্রকাশিত করে তাহাদের সৎসঙ্গে তোমরাও সেইরকম হও ॥ ৪৪ ॥
ভাবার্থঃ- যাহারা যোগাভ্যাসাদি সৎকর্ম করিয়া শুদ্ধ মন এবং আত্মাযুক্ত ধার্মিক পুরুষকার সম্পন্ন ব্যাক্তি তাঁহারাই ব্যাপক পরমেশ্বরের স্বরূপকে জানিতে এবং তাহাকে প্রাপ্ত হইবার যোগ্য হন অন্য নহে ॥ ৪৪ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ঘৃতবতীত্যস্য ভরদ্বাজ ঋষিঃ । দ্যাবাপৃথিব্যৌ দেবতে । নিচৃজ্জগতী ছন্দঃ । নিষাদঃ স্বরঃ ॥
ঘৃ॒তব॑তী॒ ভুব॑নানামভি॒শ্রিয়ো॒র্বী পৃ॒থ্বী ম॑ধু॒দুঘে॑ সু॒পেশ॑সা ।
দ্যাবা॑পৃথি॒বী বর॑ুণস্য॒ ধর্ম॑ণা॒ বিষ্ক॑ভিতেऽঅ॒জরে॒ ভূরি॑রতেসা ॥ ৪৫ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে (বরুণস্য) সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ জগদীশ্বরের (ধর্মণা) ধারণ রূপ সামর্থ্যের দ্বারা (মধুদুঘে) জলকে পূরণকারী (সুপেশসা) সুন্দর রূপযুক্ত (পৃথ্বী) বিস্তারযুক্ত (উর্বী) বহু পদার্থ বিশিষ্টা (ঘৃতবতী) বহু জলের পরিবর্তন দ্বারা যুক্ত (অজরে) স্বীয় স্বরূপে নাশরহিত (ভূরিরেতসা) বহু জল দ্বারা যুক্ত বা অনেক বীর্য্য বা পরাক্রম হেতু (ভুবনানাম্) লোক-লোকান্তরের (অভিশ্রিয়া) সব দিক দিয়া শোভা কারিণী (দ্যাবাপৃথিবী) সূর্য্য ও ভূমি (বিষ্কভিতে) বিশেষ করিয়া ধারণ বা দৃঢ় করিয়াছে, তাহাকেই উপাসনার যোগ্য তোমরা জানিবে ॥ ৪৫ ॥
ভাবার্থঃ- মনুষ্যদিগকে যে পরমেশ্বর প্রকাশরূপ এবং অপ্রকাশরূপ দুই প্রকারের জগৎ নির্মাণ করিয়াছেন এবং ধারণ করিয়া পালন করিয়াছেন তিনিই সর্বদা উপাসনার যোগ্য ॥ ৪৫ ॥
অথ রাজধর্মবিষয়মাহ ॥
এখন রাজধর্ম বিষয়কে পরবরত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
য়ে ন ইত্যস্য বিহব্য ঋষিঃ । লিঙ্গোক্তা দেবতাঃ । ভুরিক্ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
য়ে নঃ॑ স॒পত্না॒ऽঅপ॒ তে ভ॑বন্ত্বিন্দ্রা॒গ্নিভ্যা॒মব॑ বাধামহে॒ তান্ ।
বস॑বো রু॒দ্রাऽআ॑দি॒ত্যাऽউ॑পরি॒স্পৃশং॑ মো॒গ্রং চেত্তা॑রমধিরা॒জম॑ক্রন্ ॥ ৪৬ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! (য়ে) যাহারা (নঃ) আমাদের (সপত্নাঃ) শত্রুগণ (তে) তাহারা (অপ, ভবন্তু) দূর হউক অর্থাৎ পরাজয় প্রাপ্ত হউক যেমন (তান্) সেই সব শত্রুদিগকে আমরা (ইন্দ্রাগ্নিভ্যাম্) বায়ুও বিদ্যুতের শস্ত্র দ্বারা (অব, বাধামহে) পীড়িত করি এবং যেমন (বসবঃ) পৃথিবী আদি বসু (রুদ্রাঃ) দশ প্রাণ, একাদশ আত্মা ও (আদিত্যাঃ) দ্বাদশ মাস (উপরিস্পৃশম্) উচ্চস্থানোপরি আসীন (উগ্রম্) তেজস্বভাব এবং (চেত্তারম্) সত্যাসত্যকে যথাবৎ জ্ঞাতা (মা) আমাকে (অধিরাজম্) অধিপতি স্বামী সমর্থ (অক্রন্) করুক সেইরূপ সেই সব শত্রুদের তোমরা নিবারণ ও আমার সৎকার কর ॥ ৪৬ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচক লুপ্তোপমালঙ্কার আছে, যাহার অধিকারে পৃথিবী আদি পদার্থ হয় তিনিই সকলের উপর রাজা হইবেন । যিনি রাজা হইবেন তিনি অস্ত্র-শস্ত্র দ্বারা শত্রুদেরকে নিবারণ করিয়া নিষ্কন্টক রাজ্য করিবেন ॥ ৪৬ ॥
অথ কে জগদ্ধিতৈষিণ ইত্যাহ ॥
এখন কে জগতের হিতাকাঙ্ক্ষী হইবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ।
আ নাসত্যেত্যস্য হিরণ্যস্তূপ ঋষিঃ । অশ্বিনৌ দেবতে । জগতী ছন্দঃ । নিষাদঃ স্বর ॥
আ না॑সত্যা ত্রি॒ভিরে॑কাদ॒শৈরি॒হ দে॒বেভি॑র্য়াতং মধু॒পেয়॑মশ্বিনা ।
প্রায়ু॒স্তারি॑ষ্টং॒ নী রপা॑ᳬসি মৃক্ষত॒ꣳ সেধ॑তং॒ দ্বেষো॒ ভব॑তꣳ সচা॒ভুবা॑ ॥ ৪৭ ॥
অন্বয়ঃ হে নাসত্যাঃঅশ্বিনা! যথা যুবামিহ ত্রিভি-একাদশৈঃ দেবেভিঃ সহ মধুপেয়মায়াতম্, রপান্সি মৃক্ষতং, দ্বেষো নিঃষেধতং সচাভূবা ভবতমায়ুঃ প্রতারিষ্টম্, তথা ওয়মপি ভবেম্॥৪৭॥
পদার্থঃ(আ) সমন্তাত্ (নাসত্যা) অবিদ্যমানাঃসত্যাচরণৌ (ত্রিভিঃ) (একাদশৈঃ) ত্রয়স্ত্রিংশতা (ইহ) (দেবেভিঃ) দিব্যৈঃ পৃথিব্যাদিভিঃ সহ (যাতম্) প্রাপ্নুতম্ (মধুপেয়ম্) মধুরৈঃগুণৈর্যুক্তং পাতুং যোগ্যম্ (অশ্বিনা) বিদ্বান্সৌ রাজপ্রজাজনৌ (প্র) (আয়ুঃ) জীবনম্ (তারিষ্টম্) বর্ধয়তম্ (নিঃ) নিতরাম্ (রপান্সি) পাপানি (মৃক্ষতম্) মার্জয়তম্ (সেধতম্) গময়তম্ (দ্বেষঃ) দ্বেষাদিদোষযুক্তান্ প্রাণিনঃ (ভবতম্) (সচাভূবা) যৌ সত্যেন পুরুষার্থেন সহ ভবতস্তৌ॥৪৭॥
পদার্থঃ- হে (নাসত্যা) অসত্য আচরণ হইতে রহিত (অশ্বিনা) রাজ্য ও প্রজার বিদ্বান্গণ ! যেমন তোমরা (ইহ) এই জগতে (ত্রিভিঃ) (একাদশৈঃ) তেত্রিশ (দেবেভিঃ) উত্তম পৃথিবী আদি (অষ্ট বসু, প্রাণাদি একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ মাস তথা বিদ্যুৎ ও যজ্ঞ) তেত্রিশ দেবতাদের সঙ্গে (মধুপেয়ম্) মধুর গুণে যুক্ত, পান করিবার যোগ্য ওষধি সমূহের রসকে (আ, য়াতম্) উত্তম প্রকার প্রাপ্ত হও বা তাহার জন্য আসিতে থাক (রপাংসি) পাপসকলকে (মৃক্ষতম্) শুদ্ধ করিতে থাক (দ্বেষঃ) দ্বেষাদি দোষযুক্ত প্রাণিসকলের (নিঃ, সেধতম্) খন্ডন বা নিবারণ করিতে থাক (সচাভুবা) সত্য পুরুষকার সহ কার্য্যে সংযুক্ত (ভবতম্) হও এবং (আয়ুঃ) জীবনকে (প্র, তারিষ্টম্) উত্তম প্রকার বৃদ্ধি কর সেইরূপ আমরা হইব ॥ ৪৭ ॥
ভাবার্থঃ- তাহারাই জগতের হিতাকাঙ্ক্ষী যাহারা পৃথিবী আদি সৃষ্টির বিদ্যাকে জানিয়া অন্যকে গ্রহণ করাইবে, দোষগুলি দূর করাইবে এবং অধিক কাল জীবনের বিধানের প্রচার করিতে থাকিবে ॥ ৪৭ ॥
পুনর্মনুষ্যাঃ কিং কুর্য়ুরিত্যাহ ॥
পুনঃ মনুষ্যগণ কী করিবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
এষ ব ইত্যস্যাগস্ত্য ঋষিঃ । মরুতো দেবতাঃ । পংক্তিশ্ছন্দঃ । পঞ্চমঃ স্বরঃ ॥
এ॒ষ ব॒ স্তোমো॑ মরুতऽই॒য়ং গীর্মা॑ন্দা॒র্য়স্য॑ মা॒ন্যস্য॑ কা॒রোঃ ।
এষা য়া॑সীষ্ট ত॒ন্বে᳖ ব॒য়াং বি॒দ্যামে॒ষং বৃ॒জনং॑ জী॒রদা॑নুম্ ॥ ৪৮ ॥
পদার্থঃ- হে (মরুতঃ) মরণ ধর্মযুক্ত মনুষ্যগণ ! (মান্দার্য়স্য) প্রশস্তকর্মের সেবক উদার চিত্তসম্পন্ন (মান্যস্য) সৎকারের যোগ্য (কারোঃ) পুরুষার্থী শিল্পীর (এষঃ) এই (স্তোমঃ) প্রশংসা এবং (ইয়ম্) এই (গীঃ) বাণী (বঃ) তোমাদের জন্য উপযোগী হইবে, তোমরা (ইষা) ইচ্ছা বা অন্নের নিমিত্ত দ্বারা (বয়াম্) অবস্থাযুক্ত প্রাণিদের (তন্বে) শরীরাদির রক্ষার জন্য (আ, য়াসীষ্ট) উত্তম প্রকার প্রাপ্ত হও এবং আমরা (জীরদানুম্) জীবনের হেতু (ইষম্) বিজ্ঞান বা অন্ন তথা (বৃজনম্) দুঃখের বর্জনযুক্ত বলকে (বিদ্যাম) প্রাপ্ত হই ॥ ৪৮ ॥
ভাবার্থঃ- মনুষ্যদিগের উচিত যে, সর্বদা প্রশংসনীয় কর্মের সেবন এবং শিল্পবিদ্যার বিদ্বান্দিগের সৎকার করিয়া জীবন, বল এবং ঐশ্বর্য্যকে প্রাপ্ত হইবে ॥ ৪৮ ॥
অথ কে ঋষয়ো ভবন্তীত্যাহ ॥
এখন ঋষি কাহারা হয়, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
সহস্তোমা ইত্যস্য প্রাজাপত্যো য়জ্ঞ ঋষিঃ । ঋষয়ো দেবতাঃ । ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
স॒হস্তো॑মাঃ স॒হচ্ছ॑ন্দসऽআ॒বৃতঃ॑ স॒হপ্র॑মা॒ऽঋষ॑য়ঃ স॒প্ত দৈব্যাঃ॑ ।
পূর্বে॑ষাং॒ পন্থা॑মনু॒দৃশ্য॒ ধীরা॑ऽঅ॒ন্বালে॑ভিরে র॒থ্যো᳕ ন র॒শ্মীন্ ॥ ৪ঌ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যেমন (সহস্তোমাঃ) প্রশংসার সহিত বর্ত্তমান বা যাহাদের শাস্ত্রস্তুতি এক সঙ্গে হয় (সহছন্দসঃ) বেদাদির অধ্যয়ন অথবা স্বতন্ত্র সুখ ভোগ যাহাদের সঙ্গে হয় (আবৃতঃ) ব্রহ্মচর্য্য সহ সমস্ত বিদ্যা পড়িয়া এবং গুরুকুল হইতে নিবৃত্ত হইয়া গৃহে আগত (সহপ্রমাঃ) সেই সাথে যাহার প্রমাণাদি যথার্থ জ্ঞান হয় (সপ্ত) পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, অন্তঃকরণ ও আত্মা এই সাত (দৈব্যাঃ) উত্তম গুণ, কর্ম, স্বভাবে প্রবীণ, (ধীরাঃ) ধ্যানবন্ত যোগী (ঋষয়ঃ) বেদাদি শাস্ত্র সকলের জ্ঞাতাগণ (রথ্যঃ) সারথি (ন) যেমন (রশ্মীন্) লাগামের রজ্জুকে গ্রহণ করে সেইরূপ (পূর্বেষাম্) পূর্বপুরুষ বিদ্বান্দিগের (পন্থাম্) মার্গকে (অনুদৃশ্য) আনুকুল্যপূর্বক দেখিয়া (অন্বালেভিরে) পশ্চাৎ প্রাপ্ত হয় সেইরূপ হইয়া তোমরাও আপ্তদের মার্গ প্রাপ্ত হও ॥ ৪ঌ ॥ সপ্তঋষি
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে উপমা ও বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । যাহারা রাগদ্বেষাদি দোষগুলিকে দূর হইতে ত্যাগ করিয়া পরস্পর প্রীতি রক্ষাকারী ব্রহ্মচর্য্য দ্বারা ধর্মের অনুষ্ঠানপূর্বক সমস্ত বেদ জানিয়া সত্য-অসত্যের নিশ্চয় করিয়া সত্যকে প্রাপ্ত হয় এবং অসত্য পরিত্যাগ করিয়া আপ্ত সকলের ভাবে আচরণ করেন তাহারা সুশিক্ষিত সারথিদের সমান অভীষ্ট ধর্মযুক্ত মার্গে গমন করিতে সমর্থ হয় এবং তাহারাই ঋষিসংজ্ঞক হয় ॥ ৪ঌ ॥
অথৈশ্বর্য়জয়াদিসংপাদনবিষয়মাহ ॥
এখন ঐশ্বর্য্য ও জয়াদি সম্পদান বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
আয়ুষ্যমিত্যস্য দক্ষ ঋষিঃ । হিরণ্যন্তেজো দেবতা । ভুরিগুষ্ণিক্ ছন্দঃ । ঋষভঃ স্বরঃ ॥
আ॒য়ু॒ষ্যং᳖ বর্চ্চ॒স্য᳖ꣳ রা॒য়স্পোষ॒মৌদ্ভি॑দম্ ।
ই॒দꣳ হির॑ণ্যং॒ বর্চ্চ॑স্ব॒জ্জৈত্রা॒য়া বি॑শতাদু॒ মাম্ ॥ ৫০ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে (ঔদ্ভিদম্) দুঃখগুলির নাশক (আয়ুষ্যম্) জীবন হেতু হিতকারী (বর্চস্যম্) অধ্যয়নের জন্য উপযোগী (রায়ঃ, পোষম্) ধনের পোষক (বর্চস্বৎ) প্রশস্ত অন্নের হেতু (হিরণ্যম্) তেজঃ স্বরূপ সুবর্ণাদি ঐশ্বর্য্য (জৈত্রায়) জয় হইবার জন্য (মাম্) আমাকে (আ, বিশতাৎ) প্রেরণা দিবে অর্থাৎ আমার নিকট স্থির থাকে, উহা (উ) তোমাদের নিকটেও স্থির হইবে ॥ ৫০ ॥
ভাবার্থঃ- যে সব মনুষ্য নিজের তুল্য সকলকে জানে এবং বিদ্বান্দিগের সহ বিচার করিয়া সত্যাসত্যের নির্ণয় করে তাহারা দীর্ঘায়ু, পূর্ণ বিদ্যা, সমগ্র ঐশ্বর্য্য এবং বিজয় লাভ করে ॥ ৫০ ॥
অথ ব্রহ্মচর্য়প্রশংসাবিষয়মাহ ॥
এখন ব্রহ্মচর্য্যের প্রশংসার বিষয় পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ন তদিত্যস্য দক্ষ ঋষিঃ । হিরণ্যন্তেজো দেবতা । ভুরিক্ছক্বরী ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ন তদ্রক্ষা॑ᳬসি॒ ন পি॑শা॒চাস্ত॑রন্তি দে॒বানা॒মোজঃ॑ প্রথম॒জꣳ হ্যে॒তৎ । য়ো বি॒ভর্তি॑ দাক্ষায়॒ণꣳ হির॑ণ্য॒ꣳ স দে॒বেষু॑ কৃণুতে দী॒র্ঘমায়ুঃ॒ স ম॑নু॒ষ্যে᳖ষু কৃণুতে দী॒র্ঘমায়ুঃ॑ ॥ ৫১ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যাহা (দেবানাম্) বিদ্বান্দিগের (প্রথমজম্) প্রথম অবস্থা বা ব্রহ্মচর্য্য আশ্রমে উৎপন্ন (ওজঃ) বল পরাক্রম (তৎ) তাহাকে (ন, রক্ষাংসি) অন্যান্যদেরকে না পীড়া বিশেষ দিয়া নিজেরই রক্ষাকারী এবং (ন, পিশাচাঃ) না প্রাণিদিগের রুধিরাদি ভক্ষণকারী হিংসক ম্লেচ্ছাচারী দুষ্টগণ (তরন্তি) উল্লঙ্ঘন করে, (য়ঃ) যে মনুষ্য (হি, এতৎ) এই (দাক্ষায়ণম্) দক্ষতা প্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য (হিরণ্যম্) তেজঃস্বরূপ ব্রহ্মচর্য্যকে (বিভর্ত্তি) ধারণ বা পোষণ করে (সঃ) সে (দেবেষু) বিদ্বান্দিগের মধ্যে (দীর্ঘম্, আয়ুঃ) দীর্ঘায়ুকে (কৃণুতে) প্রাপ্ত হয় এবং (সঃ) সে (মনুষ্যেষু) মননশীল ব্যক্তিদিগের মধ্যে (দীর্ঘম্, আয়ু) দীর্ঘায়ুকে (কৃণুতে) প্রাপ্ত করে ॥ ৫১ ॥
ভাবার্থঃ- যাহারা প্রথম আয়ুতে বড় ধর্মযুক্ত ব্রহ্মচর্য্য দ্বারা পূর্ণ বিদ্যা পড়েন, তাহাদেরকে না কোন চোর, না দায়ভাগী এবং না তাহাদের ভার হয়, যে সব বিদ্বান্ এই প্রকার ধর্মযুক্ত কর্ম সহ আচরণ করে তাহারা বিদ্বান্গণ ও মনুষ্যগণের মধ্যে দীর্ঘ আয়ুকে প্রাপ্ত হইয়া নিরন্তর আনন্দিত হয় এবং অন্যকে আনন্দিত করে ॥ ৫১ ॥
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
য়দেত্যস্য দক্ষ ঋষিঃ । হিরণ্যন্তেজো দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
য়দা ব॑ধ্নন্ দাক্ষায়॒ণা হির॑ণ্যꣳ শ॒তানী॑কায় সুমন॒স্যমা॑নাঃ ।
তন্ম॒ऽআ ব॑ধ্নামি শ॒তশা॑রদা॒য়ায়ু॑ষ্মাঞ্জ॒রদ॑ষ্টি॒র্য়থাऽস॑ম্ ॥ ৫২ ॥
পদার্থঃ- (দাক্ষায়ণাঃ) চাতুর্য্য ও বিজ্ঞানযুক্ত (সুমনস্যমানাঃ) সুন্দর বিচার করিয়া সজ্জনগণ (শতানীকায়) শতশত সেনা যুক্ত (মে) আমার জন্য (য়ৎ) যে (হিরণ্যম্) সত্যাসত্য প্রকাশক বিজ্ঞানের (আ, অবধ্নন্) নিবন্ধন করিবে (তৎ) তাহাকে আমি (শতশারদায়) শত বর্ষ পর্য্যন্ত জীবনের জন্য (আ, বধ্নামি) নিয়ত করি । হে বিদ্বান্গণ ! (য়থা) যেমন আমি (য়ুস্মান্) তোমাদিগকে প্রাপ্ত হইয়া (জরদষ্টিঃ) পূর্ণ আয়ুকে ব্যাপ্ত (অসম্) হই সেইরূপ তোমরা আমার প্রতি উপদেশ কর ॥ ৫২ ॥
ভাবার্থঃ- এক দিকে শত শত সেনা এবং অন্যদিকে এক বিদ্যাই বিজয় প্রদান কারিণী হয় । যাহারা বহু কাল পর্য্যন্ত ব্রহ্মচর্য্য ধারণ করিয়া বিদ্বান্দিগের হইতে বিদ্যা ও সুশিক্ষা গ্রহণ করিয়া তাহার অনুকূল আচরণ করে তাহারা অল্পায়ু কখনও হয় না ॥ ৫২ ॥
হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারকৃত পদার্থভাষ্যঃ
পূর্ববর্তী মন্ত্রে ‘দাক্ষায়ণ হিরণ্য’ ধারণের মহিমার সুন্দর বর্ণনা করা হয়েছে। বর্তমান মন্ত্রে সেই ‘দাক্ষায়ণ হিরণ্য’ বাঁধার সংকল্প প্রকাশ করতে গিয়ে ‘দক্ষ’ বলেন যে (যৎ) = যে (দাক্ষায়ণাঃ) = বৃদ্ধির কারণভূত, রোগ ও কৃমির বিনাশকারী (হিরণ্যম্) = হিতকর ও রমণীয় তেজকে (সুমনস্যমানাঃ) = উৎকৃষ্ট চিন্তা করতে করতে মানুষরা (শতানীকায়) = শত-শত বছর প্রাণশক্তি [অন্ প্রাণনে] স্থির রাখার জন্য (আবধ্নন্) = নিজেদের মধ্যে বাঁধে, (তৎ) = সেই তেজকে (মে) = নিজের জন্য (আবধ্নামি) = আমি বাঁধি, (যথা) = যাতে (আয়ুষ্মান্) = উৎকৃষ্ট জীবনসম্পন্ন (জরদষ্টিঃ) = বার্ধক্য পর্যন্ত পূর্ণ আয়ু বিস্তৃতকারী (শতশারদায়) = শত-শত বছরের জন্য (আসম্) = আমি হই। উল্লিখিত অর্থে ‘সুমনস্যমানাঃ’ শব্দের দ্বারা নিজের মধ্যে হিরণ্য বাঁধার উপায়ের সংকেত দেওয়া হয়েছে। মানুষ যদি মনে সর্বদা উৎকৃষ্ট চিন্তা করে, তবে সে অবশ্যই এই বীর্যকে সংরক্ষিত রাখতে পারবে। অশুভ চিন্তাই এর বিনাশের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
এটিকে নিজের মধ্যে বাঁধার ফলে যে লাভগুলি হয়, সেগুলি এইরূপ—
১. শতানীকায় শত-শত বছর প্রাণশক্তিসম্পন্ন থাকা। ২. শতশারদায় শত বছর আয়ু পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে জীবনযাপন। ৩. আয়ুষ্মান্ উৎকৃষ্ট জীবনসম্পন্ন হওয়া। ৪. জরদষ্টিঃ সম্পূর্ণ বার্ধক্য পর্যন্ত জীবন স্থায়ী হওয়া; যৌবনেই জীবন শেষ হয়ে না যাওয়া। ৫০ থেকে ৫২ পর্যন্ত তিনটি মন্ত্রে ‘হিরণ্য’ বীর্যের মহিমার বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা এটিকে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রবেশ করাই [৫০], নিজের মধ্যে ধারণ করি [৫১] এবং নিজের মধ্যেই বাঁধি [৫২]। যে ব্যক্তি এই হিরণ্যের প্রবেশ, ধারণ ও বন্ধন সাধন করতে পারে, সে-ই ‘দক্ষ’—অর্থাৎ উন্নতিশীল [to grow], স্ফূর্তির সঙ্গে কর্মসম্পাদনকারী [to act quickly], রোগ, কৃমি ও দ্বেষাদি মল বিনাশকারী [to hurt, kill], কার্যকুশল [to be competent], কর্মশীল ও নিরালস [to go, move] হয়ে ওঠে।
অথ কে সর্বরক্ষকাঃ সন্তীত্যাহ ॥
এখন কাহারা সকলের রক্ষক হয়, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
উত ন ইত্যস্য ঋজিষ্ব ঋষিঃ । লিঙ্গোক্তা দেবতাঃ । ভুরিক্ পংক্তিশ্ছন্দঃ । পঞ্চমঃ স্বরঃ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! (বুধ্ন্যঃ) অন্তরিক্ষে ঘটিত (অহিঃ) মেঘতুল্য এবং পৃথিবী তথা (সমুদ্রঃ) অন্তরিক্ষ তুল্য (একপাৎ) একপ্রকারের নিশ্চল অব্যভিচারী বোধযুক্ত (অজঃ) যিনি কখনও উৎপন্ন হন না সেই পরমেশ্বর (নঃ) আমাদের বচনসমূহকে (শৃণোতু) শ্রবণ করুক তথা (ঋতাবৃধঃ) সত্যের বৃদ্ধিকারীগণ (হুবানাঃ) স্পর্দ্ধমান্ (বিশ্বে) সকল (দেবাঃ) বিদ্বান্গণ (উত) এবং (কবিশস্তাঃ) বুদ্ধিমানদের দ্বারা প্রশংসা কৃত (স্তুতাঃ) স্তুতির প্রকাশক (মন্ত্রাঃ) বিচারসাধক মন্ত্র আমাদের (অবন্তু) রক্ষা করুক ॥ ৫৩ ॥
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রে বাচকলুপ্তোপমালঙ্কার আছে । হে মনুষ্যগণ ! যেমন পৃথিবী আদি পদার্থ, মেঘ ও পরমেশ্বর সকলের রক্ষা করে সেইরূপই বিদ্যা ও বিদ্বান্গণ সকলকেই পালন করেন ॥ ৫৩ ॥
হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারকৃত পদার্থভাষ্যঃ
১. গত মন্ত্রে হিরণ্যের বন্ধনের দ্বারা ‘আয়ুষ্মান্’ উত্তম জীবনসম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই উত্তম জীবনেরই চিত্রণ বর্তমান মন্ত্রে করা হয়েছে। এই মন্ত্রের ঋষি হলেন ‘ঋজিশ্বা’। ‘ঋজুনাশ্বয়তি’ অর্থাৎ সরল পথে চলে এবং অগ্রসর হয় (শ্বি গতিবৃদ্ধয়ৌ)। আর উত্তম জীবন সেইটিই, যেখানে—[ক] সরলতা আছে, [খ] গতিশীলতা আছে এবং [গ] শক্তির বিকাশ আছে। এই ঋজিশ্বা প্রার্থনা করেন যে (নঃ) = আমাদের প্রার্থনাকে (অহির্বুধ্ন্যঃ) = অক্ষয় মূলসম্পন্ন [অগ্নির্বা অহির্বুধ্ন্যঃ – কৌ ১৬।৭] অগ্নি, (উত) = এবং (অজঃ একপাৎ) = [সূর্যং দেবমজমেকপাদম্ – তৈ ৩।১।২৮] সূর্য, (পৃথিবী) = পৃথিবী, (সমুদ্রঃ) = সমুদ্র এই দেবগণ (শৃণোতু) = শুনুন।
এই সমস্ত দেবতার কৃপা আমার ওপর বর্ষিত হোক। আমি যেন এই দেবতাদের গুণাবলি নিজের জীবনে ধারণ করতে পারি। [ক] অগ্নির মতো সকল মল দহনকারী হই। [খ] মল বিনষ্ট হয়ে তেজস্বিতার দৃষ্টিতে সূর্যের ন্যায় হয়ে উঠি। [গ] তেজস্বী হওয়ার ফলে পৃথিবীর মতো ক্ষমাশীল হই। পৃথিবীর নামই তো ‘ক্ষমা’। আমরা তার ওপর লাফাই, দৌড়াই, গর্ত করি তবুও পৃথিবী সব সহ্য করে। এই তেজস্বী পুরুষও সহনশীল হয়ে ওঠে। [ঘ] এই ক্ষমাশীল পুরুষ সমুদ্রের মতো গভীর হয়।
২. অগ্নিকে ‘অহির্বুধ্ন্য’ বলা হয়েছে অক্ষয় মূলসম্পন্ন। যতক্ষণ শরীরে এই অগ্নিতত্ত্ব থাকে, ততক্ষণ জীবনের মূল ক্ষীণ হয় না। অগ্নি নষ্ট হলে মূলও নষ্ট হয়ে যায়। সূর্য হল ‘অজ একপাৎ’।
‘অজ গতিক্ষেপণযোঃ’—সূর্য নিরন্তর ক্রিয়ার মাধ্যমে মল দূরে নিক্ষেপ করে এবং একবার পদক্ষেপ করলে আর থামে না।
৩. অগ্নি, সূর্য, পৃথিবী ও সমুদ্র তো আমাদের প্রার্থনা শুনুকই, অন্যান্য সকল দেবতাও (হুবানাঃ) = পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে করতে (ঋতাবৃধঃ) = আমার মধ্যে ঋতকে বৃদ্ধি করুক।
সকল দেবতা যেন তাঁদের দিব্যতা আমার মধ্যে সঞ্চার করেন। আমি যেন সকল দেবতার এমন প্রিয় হই যে তাঁরা পরস্পরের চেয়ে অধিক আমাকে উন্নত করার কামনা করেন। আমি সকল দেবতার দিব্যতার উপযুক্ত পাত্র হয়ে উঠি।
৪. (স্তুতাঃ) = প্রভুর স্তুতি প্রতিপাদনকারী (কবিশস্তাঃ) = ক্রান্তদর্শী বিদ্বানদের দ্বারা উচ্চারিত
(মন্ত্রাঃ) = মন্ত্রসমূহ [জ্ঞানপ্রতিপাদক বাক্য] (অবন্তু) = আমাদের রক্ষা করুন। আমরা যেন বিদ্বানদের নিকট থেকে সদা প্রভুর মহিমা প্রতিপাদক উৎকৃষ্ট জ্ঞানবাণী শুনি, যাতে আমা দের জীবন ক্রমশ সুন্দর থেকে সুন্দরতর হয়ে ওঠে।
অথ বাগ্বিষয়মাহ ॥
এখন বাণীর বিষয় পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ইমেত্যস্য কূর্ম গাৎর্সমদ ঋষিঃ । আদিত্যা দেবতাঃ । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ই॒মা গির॑ऽআদি॒ত্যেভ্যো॑ ঘৃ॒তস্নূঃ॑ স॒নাদ্রাজ॑ভ্যো জু॒হ্বা᳖ জুহোমি ।
শৃ॒ণোতু॑ মি॒ত্রোऽঅ॑র্য়॒মা ভগো॑ নস্তুবিজা॒তো বর॑ুণো॒ দক্ষো॒ऽঅꣳশঃ॑ ॥ ৫৪ ॥
পদার্থঃ- আমি (আদিতেভ্যঃ) তেজস্বী (রাজভ্যঃ) রাজাদের হইতে (ইমাঃ) এই সব সত্য (গিরঃ) বাণীদেরকে (জুহ্বা) গ্রহণের সাধন দ্বারা (সনাৎ) নিত্য (জুহোরি) গ্রহণ স্বীকার করি, সেই সব (ঘৃতস্নূঃ) জলের তুল্য ভাল ব্যবহারকে শোধনকারিণী (নঃ) আমাদিগের বাণীসমূহকে (মিত্রঃ) মিত্র (অর্য়মা) ন্যায়কারী (ভগঃ) ঐশ্বর্য্যবান্ (তুবিজাতঃ) বহু লোকের মধ্যে প্রসিদ্ধ (দক্ষঃ) চতুর (অংশঃ) বিভাগকর্ত্তা এবং (বরুণঃ) শ্রেষ্ঠ পুরুষ (শৃণোতু) শ্রবণ করুক ॥ ৫৪ ॥
ভাবার্থঃ- বিদ্যার্থী লোকেরা আচার্য্যদিগের হইতে যে সব সুশিক্ষিত বাণীসমূহকে গ্রহণ করিয়াছে, উহাদেরকে অন্য আপ্ত লোকেরা শুনুক এবং ভাল মত পরীক্ষা করিয়া শিক্ষা করুক ॥ ৫৪ ॥
হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারকৃত পদার্থভাষ্যঃ
১. পূর্ববর্তী মন্ত্রে ‘কবিশস্ত মন্ত্রসমূহের শ্রবণ’-এর কথা বলা হয়েছে। সেই বিষয়টিকেই এখানে কিছু বিস্তারে বলা হচ্ছে যে—
(ইমাঃ গিরঃ) = এই বাণীগুলিকে, যা (ঘৃতস্নূঃ) = জ্ঞানদীপ্তি নিঃসরণকারী, (সনাত্) = নিত্য (রাজভ্যঃ) = জ্ঞানদীপ্তিতে দীপ্যমান (আদিত্যেভ্যঃ) = চার বেদ গ্রহণকারী ‘আদিত্য’ নামে পরিচিত বিদ্বানদের (জুহ্বা) = বাণী দ্বারা [‘জুহূ’ শব্দটি বাণীর নাম] আমি আহুতি দিই।
চার (সামবেদ) বেদের বিদ্বানরাই ‘আদিত্য’। এই আদিত্য বিদ্বানদের নিকট থেকে আমি সদা জ্ঞানবাণী শুনি। সেই বাণীগুলির উচ্চারণ করতে করতে সেগুলিকে হৃদয়ে ধারণ করি।
২. এই জ্ঞানবাণীগুলি শ্রবণের ফল এই হোক যে নিম্নলিখিত দেবগণ আমাদের প্রার্থনা শুনুন। আমি যেন এই দেবতাদের কৃপাপাত্র হই, এই দেবতাদের বাস আমার মধ্যে হোক—
[ক] মিত্রঃ = স্নেহের দেবতা। আমরা যেন সকলের সঙ্গে সদা স্নেহপূর্ণ আচরণকারী হই।
[খ] অর্য্যমা = [অরীণ্ গচ্ছতি] আমরা যেন কাম, ক্রোধ প্রভৃতি শত্রুদের নিয়ন্ত্রণকারী হই; ‘অর্যমেতি তমাহুর্যো দদাতি’ আমরা যেন সদা দানশীল হই।
[গ] ভগঃ = ঐশ্বর্যের দেবতা। ‘ভজ্ সেবায়াম্’ আমরা যেন ভজ্য ধন লাভকারী হই।
[ঘ] তুবিজাতঃ মহান্ বরুণঃ = মহান বিকাশসম্পন্ন, দ্বেষনিবারক বরুণদেব আমাদের প্রার্থনা শুনুন। আমরা যেন কারও প্রতি দ্বেষ না করি। দ্বেষ ও ঈর্ষার ঊর্ধ্বে ওঠাই উন্নতির পথ।
[ঙ] দক্ষঃ = আমরা যেন ‘দক্ষ’-এর প্রিয় হই।
দক্ষ [to grow] = নিজের শক্তির বিকাশকারী হই।
দক্ষ [to act quickly, to go] = স্ফূর্তির সঙ্গে কর্মসম্পাদনকারী হই।
দক্ষ [to hurt, to kill] = রোগ ও কৃমির বিনাশকারী হই।
দক্ষ [to be competent] = আমরা যেন কার্যকুশল হই।
[চ] অংশঃ = উপর্যুক্ত সমস্ত গুণ জীবনেআনয়ন করে আমরা যেন প্রভুর ‘অংশ’—এক ক্ষুদ্র রূপ—হতে পারি; অথবা ‘অংশ্’ (to divide)—আমরা যেন নিজের ধনের যথাযথ বণ্টনকারী হই, সবকিছু একাই ভোগ না করি। প্রকৃতপক্ষে প্রভু যখন বণ্টন করেন, তখন সবই বণ্টন করেন; জীবও নিজের জন্য কিছু রেখে যতটা সম্ভব দান করার চেষ্টা করুক, নিজের প্রয়োজনকে ন্যূনতম করার চেষ্টা করুক। এটাই পরমেশ্বরের ‘ক্ষুদ্র রূপ’ হওয়ার উপায়।
৩. এইভাবে জীবন গঠনকারী ব্যক্তি হল ‘কূর্ম গার্ত্সমদ’। ‘কূর্ম’ = ক্রিয়াশীল, ‘গৃত্স’ = প্রভুর স্তোতা, ‘মদ’ = আনন্দময়। প্রকৃতপক্ষে নিত্য জ্ঞানযজ্ঞ সম্পাদন করতে করতে এই ব্যক্তি নিজের জীবনকে প্রভুর অনুরূপ করে তোলার চেষ্টা করে।
অথ শরীরেন্দ্রিয়বিষয়মাহ ॥
এখন শরীর ও ইন্দ্রিয়ের বিষয় পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
সপ্তেত্যস্য কণ্ব ঋষিঃ । অধ্যাত্মং প্রাণা দেবতাঃ । ভুরিগ্ জগতী ছন্দঃ । নিষাদঃ স্বরঃ ॥
পদার্থঃ- যে সব (সপ্ত, ঋষয়ঃ) বিষয় অর্থাৎ শব্দাদির প্রাপক পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় মন ও বুদ্ধি এই সাত ঋষি এই (শরীরে) শরীরে (প্রতিহিতাঃ) প্রতীতি সহ স্থির, তাহারাই (সপ্ত) সাত (অপ্রমাদম্) যেমন প্রমাদ অর্থাৎ ভুল না হয় তদ্রূপ (সদম্) স্থিত হওয়ার আধার শরীরকে (রক্ষন্তি) রক্ষা করে । তাহারা (স্বপতঃ) সুপ্ত ব্যক্তিকে (আপঃ) শরীরে ব্যাপ্ত উক্ত (সপ্ত) সাত (লোকম্) জীবাত্মাকে (ঈয়ু) প্রাপ্ত হয় (তত্র) সেই লোক প্রাপ্তি সময়ে (অস্বপ্নজৌ) যাহার কখনও স্বপ্ন হয় না, (সত্রসদৌ) জীবাত্মার রক্ষক (চ) এবং (দেবৌ) স্থির উত্তম গুণযুক্ত প্রাণও অপান (জাগৃতঃ) জাগ্রত থাকে ॥ ৫৫ ॥
সপ্ত পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়াণি মনো বুদ্ধিশ্চ ঋষয়ঃ বিষয়প্রাপকাঃ প্রতিহিতাঃ প্রতীত্যা ধৃতাঃ শরীরে। সপ্ত রক্ষন্তি সদম্ সীদন্তি যস্মিংস্তৎ অপ্রমাদম্। সপ্ত আপঃ আপ্নুবন্তি ব্যাপ্নুবন্তি শরীরমিত্যাপঃ। স্বপতঃ শয়নং প্রাপ্তস্য লোকং জীবাত্মানম্ ঈয়ুঃ যন্তি । তত্র লোকগমনকালে জাগৃতঃ অস্বপ্নজৌ স্বপ্নো ন জায়তে যয়োস্তৌ । সত্রসদৌ সতাং জীবাত্মনাং ত্রাণং সত্রং তত্র সীদন্তস্তৌ চ দেবৌ দিব্যস্বরূপৌ প্রাণাপানৌ ॥ (মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীকৃত সংস্কৃত ভাষ্যম্)
(সপ্ত) = পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি এই সাতটি (ঋষয়ঃ) = বিষয়গ্রাহক (প্রতিহিতাঃ) = প্রতীতিসহ ধারণ করা (শরীরে) = শরীরের মধ্যে (সপ্ত) = এই সাতটিই (রক্ষন্তি) = রক্ষা করে (সদম্) = সদা (সীদন্তি) = অবস্থান করে (যস্মিন্) = যে দেহে, সেইটি (অপ্রমাদম্) = প্রমাদহীন হয়। (সপ্ত) = আবার সেই সাত (আপঃ) = ‘আপঃ’ অর্থাৎ যা ব্যাপ্ত করে (আপ্নুবন্তি) = লাভ করে (ব্যাপ্নুবন্তি) = সর্বত্র বিস্তৃত করে; শরীরকে ব্যাপ্ত করে বলেই ‘আপঃ’ বলা হয়। (স্বপতঃ) = নিদ্রায় গমনকারী (লোকম্) = লোক বা জীবাত্মাকে (ঈয়ুঃ) = গমন করে। (তত্র) = সেই লোকগমনের কালে (জাগৃতঃ) = জাগ্রত অবস্থায় (অস্বপ্নজৌ) = যাদের মধ্যে স্বপ্ন উৎপন্ন হয় না (স্বপ্নঃ ন জায়তে যয়োস্তৌ) = যাদের ক্ষেত্রে স্বপ্ন জন্মায় না (সত্রসদৌ) = সত্রে অধিষ্ঠিত (সতাম্) = জীবাত্মাদের (ত্রাণম্) = রক্ষাকারী (সত্রম্) = আশ্রয়স্থান (তত্র) = সেখানে (সীদন্তস্তৌ) = অধিষ্ঠানকারী (চ) = এবং (দেবৌ) = দেবদ্বয় (দিব্যস্বৰূপৌ) = দিব্য স্বরূপবিশিষ্ট (প্রাণাপানৌ) = প্রাণ ও অপান।
ভাবার্থঃ- এই শরীরে স্থির ব্যাপক বিষয়গুলির জ্ঞাতা অন্তঃকরণের সহিত পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ই নিরন্তর শরীরের রক্ষা করে এবং যখন জীব ঘুমায় তখন তাহাকে আশ্রয় করিয়া তমোগুণের বলে ভিতরে স্থির হয় কিন্তু বাহ্য বিষয়ের বোধ করায় না এবং স্বপ্নাবস্থায় জীবাত্মার রক্ষায় তৎপর তমোগুণ দ্বারা অদমিত প্রাণ ও অপান জাগিতে থাকে অন্যথা যদি প্রাণ-অপান ও ঘুমিয়ে পড়ে তাহা হইলে মৃত্যুই সম্ভব বুঝিতে হইবে ॥ ৫৫ ॥
হরিশরণজী কৃতপদার্থভাষ্যঃ
ঋষির আশ্রম, সাত ঋষি, অস্বপ্রজ দেব
পদার্থ
১. (সপ্ত ঋষয়ঃ) = সাত ঋষি (প্রতিশরীরে) = প্রত্যেক শরীরে (হিতাঃ) = স্থাপিত আছেন। প্রভু ‘কর্ণাবিমৌ নাসিকে চক্ষণী মুখম্’ এইভাবে দুই কান, দুই নাসিকা (ছিদ্র), দুই চোখ ও এক মুখ এই সাতটি ঋষি-তত্ত্বজ্ঞান প্রদানকারী দেবতা (জ্ঞানেন্দ্রিয়) অর্থাৎ পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সঙ্গে মন ও বুদ্ধি এই সাত জ্ঞানসাধক দেবতাকে আমাদের সকলের শরীরে স্থাপন করেছেন।
২. (সপ্ত) = এই সাত ঋষি (সদম্) = তেত্রিশ দেবতার এই নিবাসস্থলকে (অপ্রমাদম্) = কোনো প্রকার প্রমাদ ছাড়া (রক্ষন্তি) = রক্ষা করেন। যতক্ষণ এই জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহ এবং মন ও বুদ্ধিরূপ ঋষিরা যথাযথভাবে কার্য করে, ততক্ষণ বিনাশের কোনো আশঙ্কা থাকে না।
৩. এই সাত ঋষির মধ্য দিয়ে জ্ঞানের প্রবাহ নিরন্তর চলতে থাকে। এই জ্ঞানপ্রবাহ চলার কারণেই এখানে তাদের ‘আপঃ’ নামে স্মরণ করা হয়েছে। যেমন জল প্রবাহিত হয়, তেমনই এদের দ্বারা জ্ঞানের প্রবাহ চলে; বৃত্তিগুলি এদিক-ওদিক বিস্তৃত হয়। কিন্তু যে সময় জীবাত্মা ইন্দ্রিয়সমূহের অধিষ্ঠাতা ‘ইন্দ্র’ দেব মস্তিষ্করূপ কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে হৃদয়রূপ গৃহে যায় [‘স্বম্ অপি ইতো ভবতি’ = নিজের ঘরের দিকে গমন করে স্বপিতি], তখন (স্বপতঃ) = হৃদয়রূপ গৃহের দিকে গমনরত ইন্দ্রের (লোকম্) = স্থান ও দর্শনকে [লোক্ = to look] (সপ্ত আপঃ) = এই সাত ইন্দ্রিয়বৃত্তির প্রবাহ (ঈয়ুঃ) = প্রাপ্ত হয়। জাগ্রত অবস্থায় এই প্রবাহগুলি বাহিরের দিকে চলছিল। এখন স্বপ্নাবস্থায় এগুলি বাহিরে না গিয়ে সেই আত্মার লোকেই পৌঁছে যায়। এইজন্য স্বপ্নে বহুবার আমাদের আত্মার আভাস পাওয়া যায় বলে মনে হয়। এই আভাসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার জন্য যোগদর্শনের (‘স্বপ্নজ্ঞানালম্বনং বা’) এই সূত্রে বলা হয়েছে।
৪. (তত্র) = সেই স্বপ্নাবস্থাতেও (অস্বপ্নজৌ) = [স্বপ্নক্ = শয়ালু] যাদের স্বভাব নিদ্রাহীন এমন দেবদ্বয়, সদা নিজের ক্রীড়া স্থির রাখেন, দিব্য গুণসম্পন্ন ‘প্রাণাপান’ (সত্রসদৌ) = এই জীবন-যজ্ঞে সদা অধিষ্ঠিত (জাগৃতঃ) = জাগ্রতই থাকেন। সকলেই নিদ্রায় আচ্ছন্ন হোক, কিন্তু এই প্রাণ-অপান তো যজ্ঞের রক্ষক; এরা নিদ্রা করেন না। এরা যদি নিদ্রিত হন, তবে কি সবকিছুই নষ্ট হয়ে যাবে না? এ থেকেই প্রাণ-অপানের মহত্ত্ব স্পষ্ট হয়। এই কারণেই এদের সাধনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি এদের সাধনা করে, সে ‘কণ্ব’ মেধাবী হয়ে ওঠে। এই কণ্বই এই মন্ত্রের ঋষি।
জয়দেবশর্মাকৃত পদার্থ ভাষ্যঃ
(সপ্ত) সাত (ঋষয়ঃ) বিষয়কে প্রদর্শনকারী পাঁচ জ্ঞানের ইন্দ্রিয়, মন এবং বুদ্ধি (শরীরে) শরীরে (প্রতিহিতাঃ) প্রতিটি বিষয়ে জ্ঞানের জন্য প্রতিষ্ঠিত আছে এবং তারা (সপ্ত) সাতটি (অপ্রমাদঃ) অবিজ্ঞতিহীনভাবে এই (সদঃ) অবিজ্ঞতিহীন এই (সদঃ) আশ্রয়িত শরীরের (রক্ষন্তি) রক্ষা করে এবং তারা (সপ্ত) সাতটি (আপঃ) ক্ষুদ্র প্রসারণশীল প্রাণ (স্বপতঃ) শয়নরত পুরুষের (লোকঃ) দর্শনক্ষম আত্মা পর্যন্ত (ঈযুঃ) পৌঁছে এবং তার মধ্যে লীন হয়ে যায়, সেই সময়েও (অস্বপ্নজৌ) আত্মায় অধ্যায় বা লীন না হওয়া, নিদ্রাহীন দুটি (সত্রসদৌ) (সদা সঙ্গী থাকা) (দেবৌ) দেব, দিভ্য গুণযুক্ত 'প্রাণ' এবং 'আপান' ক্রিয়া করে। একইভাবে (শরীরে) এই রাষ্ট্র-সদৃশ শরীরে (সপ্ত ঋষয়ঃ প্রতিহিতাঃ) সাতটি দর্শক জ্ঞানী পুরুষ বিভিন্ন অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হন, তারা সাতজন সঙ্গী পুরুষ শয়নরত অবস্থায়, অবচেতন অবস্থায় প্রজাজনের মধ্যে থাকলেও (লোকঃ ঈযুঃ) সমস্ত পদার্থের দর্শনকারী প্রধান পুরুষকে উপস্থিত থাকে এবং সেই সময়েও (সনসদৌ) সদ্জনদের কাজে অধিষ্ঠিত (অস্বমজৌ) কখনো ঘুমাতে বা অবজ্ঞা করতে না থাকা (দেবৌ) দুই জ্ঞানী পুরুষ নিয়োজিত থাকে।
সপ্ত ঋষয়ঃ—ত্বক-চক্ষুঃ শ্রবণ-রসন-ঘ্রাণ-মনো-বুদ্ধি লক্ষণাঃ ইতি মধীধরঃ। ষড় ইন্দ্রিয়াণি মনঃ সপ্তমানি ইত্যুবঃ।
বিদ্বান্ কিং কুর্য়াদিত্যাহ ॥
বিদ্বান্ পুরুষ কী করিবে, এই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
উত্তিষ্ঠেত্যস্য কণ্ব ঋষিঃ । ব্রহ্মণস্পতির্দেবতা । নিচৃদ্বৃহতী ছন্দঃ । মধ্যমঃ স্বরঃ ॥
উত্তি॑ষ্ঠ ব্রহ্মণস্পতে দেব॒য়ন্ত॑স্ত্বেমহে ।
উপ॒ প্র য়॑ন্তু ম॒রুতঃ॑ সু॒দান॑ব॒ऽইন্দ্র॑ প্রা॒শূর্ভ॑বা॒ সচা॑ ॥ ৫৬ ॥
পদার্থঃ- হে (ব্রহ্মণঃ) ধনের (পতে) রক্ষক (ইন্দ্র) ঐশ্বর্য্যকারক বিদ্বন্ ! (দেবয়ন্তঃ) দিব্য বিদ্বান্দিগের কামনা করিয়া আমরা যে (ত্বা) আপনার (ঈমহে) যাচনা করি, যে আপনাকে (সুদানবঃ) সুন্দর দানদাতা (মরুতঃ) মনুষ্য (উপ, প্র, য়ন্তু) সমীপ হইতে প্রযত্ন সহ প্রাপ্ত হয়, সুতরাং আপনি (উৎ, তিষ্ঠ) উঠুন এবং (সচা) সত্যের সম্পর্ক দ্বারা (প্রাশূঃ) উত্তম ভোগকারী (ভব) হউন ॥ ৫৬ ॥
অত্র দ্ব্যচোऽতস্তিঙঃ ইতি দীর্ঘঃ। এখানে দ্ব্যচ্ থেকে অতস্তিং প্রত্যয় হওয়ায় দীর্ঘ রূপ হয়েছে [অষ্টাধ্যায়ী ৬.৩.১৩৫]।
ভাবার্থঃ- হে বিদ্বন্ ! যাহারা বিদ্যার কামনা করিয়া আপনার আশ্রয় গ্রহণ করিবে, তাহাদের অর্থ বিদ্যা দেওয়ার জন্য আপনি উদ্যত হউন ॥ ৫৬ ॥
হরিশরণজী কৃত পদার্থঃ
১. আমাদের জীবনে সাধারণত পার্থিব ভাবনাগুলি প্রবলভাবে জেগে ওঠে। কখনো কামনার বাসনা মাথা তোলে, কখনো ক্রোধ প্রবল হয়ে ওঠে, আবার কখনো লোভ আমাদের গ্রাস করে। এই বাসনাগুলি জেগে উঠলে আমাদের হৃদয় থেকে দিব্য ভাবনাগুলি সরে যায়। এগুলি সরে গেলে সেখানে থেকে ‘দেব’ও প্রস্থান করেন। সেইজন্য ‘কণ্ব’ প্রার্থনা করেন যে হে (ব্রহ্মণস্পতে) জ্ঞানের অধিপতি প্রভো! (উত্তিষ্ঠ) আমাদের হৃদয়ে আপনারই ভাব জাগ্রত হোক। আমরা আপনারই চিন্তন করি। আপনাকে কখনো বিস্মৃত না হই।
২. যেমন রাজার আগমনে অন্যান্য অধিকারী ব্যক্তিরা স্বতঃই তাঁর অনুসরণে আসে, তেমনি সেই মহান দেবের আগমনে অন্যান্য দেবগণও তাঁর সঙ্গে আসবেনই। অতএব (দেবয়ন্তঃ) দেবভাব গ্রহণের কামনা নিয়ে আমরা (ত্বা) আপনাকেই (ঈমহে) কামনা করি, আপনাকেই লাভ করতে চাই। আমার হৃদয়ে যদি প্রভুভাবনা জেগে ওঠে, তবে ‘আসুর ভাবনাগুলি’ লুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, বরং সমস্ত দিব্য ভাবনাই আমার হৃদয়ভূমিতে অঙ্কুরিত হয়ে উঠবে। ‘কণ্ব’-এর এই প্রার্থনার উত্তরে প্রভু বলেন—
৩. (উপপ্রয়ন্তু) আমার নিকটে আসুক। কারা? [ক] (মরুতঃ) প্রাণসাধনায় নিয়োজিত, সীমিত ভাষণকারী [মিতরাবিণঃ] এবং [খ] (সুদানবঃ) উত্তম দানকারী। আসলে প্রভুভাবনা জাগ্রত করার এই তিনটি উপায় ‘প্রাণসাধনা, সংযত বাক্য ও দানশীলতা’।
পুনরায় প্রভু বলেন [গ] (ইন্দ্র) হে ইন্দ্রিয়সমূহের অধিষ্ঠাতা জীব! তুমি [ঘ] (প্রাশূঃ) [প্র অশ্ ব্যাপ্তি] বিশেষভাবে কর্মে ব্যাপ্ত হও। ‘কুর্বন্নেবেহ কর্মাণি’এই নির্দেশ ভুলে যেয়ো না। ‘এবং ত্বয়ি ন অন্যথা ইতঃ অস্তি’এই পথই একমাত্র পথ, অন্য কিছু নয় এই কথাটিও ভুলে যেয়ো না। এবং [ঙ] পুনরায় (সচাভবা) সকলের সঙ্গে মিলেমিশে চল। একা একা মোক্ষলাভের কামনা করো না। সকলের কল্যাণের মধ্যেই নিজের কল্যাণকে দেখো। এই জীবনযাত্রায় বৈরিতা ও বিরোধ নিয়ে চলো না। সকলের প্রতি তোমার প্রেমভাব থাকলেই তুমি আমাকে লাভ করতে পারবে।
অথেশ্বরবিষয়মাহ ॥
এখন ঈশ্বরের বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
প্র নূনমিত্যস্য কণ্ব ঋষিঃ । ব্রহ্মণস্পতির্দেবতা । বিরাট্ বৃহতী ছন্দঃ । মধ্যমঃ স্বরঃ ॥
প্র নূ॒নং ব্রহ্ম॑ণ॒স্পতি॒র্মন্ত্রং॑ বদত্যুক্থ্য᳖ম্ ।
য়স্মি॒ন্নিন্দ্রো॒ বর॑ুণো মি॒ত্রোऽঅ॑র্য়॒মা দে॒বাऽওকা॑ᳬসি চক্রি॒রে ॥ ৫৭ ॥
পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! (য়স্মিন্) যে পরমাত্মায় (ইন্দ্রঃ) বিদ্যুৎ বা সূর্য্য (বরুণঃ) জল বা চন্দ্র (মিত্রঃ) প্রাণ বা অন্য অপানাদি বায়ু (অর্য়মা) সূত্রাত্মা বায়ু (দেবাঃ) এই সব উত্তম গুণযুক্ত (ওকাংসি) নিবাসগুলিকে (চক্রিরে) করা হইয়াছে, তিনি (ব্রহ্মণঃ) বেদবিদ্যার (পতিঃ) রক্ষক জগদীশ্বর (উক্থম্) প্রশংসনীয় পদার্থগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ (মন্ত্রম্) বেদরূপ মন্ত্রভাগকে (নূনম্) নিশ্চয় করিয়া (প্র, বদতি) সম্যক্ প্রকার বলেন, এইরকম জানিবে ॥ ৫৭ ॥
ভাবার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! যে পরমাত্মায় কার্য্য কারণরূপ সব জগৎ ও জীব নিবাস করে তথা যিনি সকল জীবদের হিতসাধক বেদের উপদেশ করিয়াছেন, তাঁহাকেই তোমরা ভক্তি, সেবা, উপাসনা কর ॥ ৫৭ ॥
হরিশরণজী কৃত পদার্থঃ
পূর্ববর্তী মন্ত্রগুলিতে কণ্বের প্রার্থনা ছিল যে ‘ব্রহ্মণস্পতির আমার হৃদয়ে উদয় হোক, আমার অন্তরে প্রভুভাবনা জাগ্রত হোক’। এর উত্তরে প্রভু বলেছিলেন ‘মরুত্, সুদানু, ইন্দ্র, প্রাশূ ও সচনা হয়ে আমার নিকটে এসো’। যদি আমরা প্রভুর নির্দেশ অনুযায়ী এভাবেই প্রভুর নিকটে উপস্থিত হই, তবে আমাদের হৃদয়ে অবস্থানকারী সেই (ব্রহ্মণস্পতিঃ) জ্ঞানের অধিপতি প্রভু (নূনম্) নিশ্চয়ই (উক্থ্যম্) উচ্চ থেকে উচ্চতর উচ্চারণের যোগ্য, প্রশংসনীয় (মন্ত্রম্) মননযোগ্য জ্ঞানসমৃদ্ধ বেদবাক্যসমূহ (প্রবদতি) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন। আমরা যদি তা না শুনি, তবে সেটি আমাদেরই দোষ; প্রভু তো নিরন্তর উচ্চারণ করেই যাচ্ছেন।
এই মন্ত্রগুলি সেইরূপ (যস্মিন্) যার মধ্যে (ইন্দ্রঃ বরুণঃ মিত্রঃ আর্য্যমা দেবাঃ) ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, আর্য্যমা এবং অন্যান্য সকল দেব (ওকাংসি) নিজ নিজ গৃহ (চক্রিরে) নির্মাণ করেন। এই মন্ত্রের এমন শক্তি রয়েছে যে, যেখানে এই মন্ত্র বিদ্যমান থাকে, সেখানেই দেবগণেরও নিবাস ঘটে। যেখানে আমরা হৃদয়স্থিত প্রভুর মন্ত্রসমূহ গ্রহণ করতে সক্ষম হই, সেখানে আমাদের জীবনই এই দেবগণের আবাসস্থলে পরিণত হয়।
জ্ঞানের বাণীর অধ্যয়নের ফল এই যে, মানুষ—
১. (ইন্দ্রঃ) জিতেন্দ্রিয় হয়, ইন্দ্রিয়সমূহের অধিষ্ঠাতা হয়ে ওঠে। তার ইন্দ্রিয়গুলি আর বিষয়াসক্ত থাকে না। বিষয়রসের তুচ্ছতা উপলব্ধি করে তারা ‘রসরূপ’ প্রভুর দিকে অগ্রসর হয়।
২. (বরুণঃ) এই ব্যক্তি দ্বেষের নিবৃত্তি সাধনকারী হয়।
৩. (মিত্রঃ) সে সকলের প্রতি স্নেহপূর্ণ ভাব নিয়ে চলতে থাকে।
৪. (আর্য্যমা) [অরীণ্ যচ্ছতি] এই ব্যক্তি ‘কাম, ক্রোধ ও লোভ’ রূপ শত্রুগুলিকে নিয়ন্ত্রণকারী হয়।
৫. (দেবাঃ) [দেবো দানাদ্বা দীপনাদ্বা] সে দানবৃত্তি গ্রহণ করে, জ্ঞানের দীপ্তিতে দীপ্ত হয় এবং অন্যদেরও জ্ঞানের দীপ্তিতে আলোকিত করে।
পুনস্তমেব বিষয়মাহ ॥
পুনঃ সেই বিষয়কে পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হইয়াছে ॥
ব্রহ্মণস্পত ইত্যস্য গৃৎসমদ ঋষিঃ । ব্রহ্মণস্পতির্দেবতা । নিচৃৎ ত্রিষ্টুপ্ ছন্দঃ । ধৈবতঃ স্বরঃ ॥
ব্রহ্ম॑ণস্পতে॒ ত্বম॒স্য য়॒ন্তা সূ॒ক্তস্য॑ বোধি॒ তন॑য়ং চ জিন্ব ।
বিশ্বং॒ তদ্ভ॒দ্রং য়দব॑ন্তি দে॒বা বৃ॒হদ্ব॑দেম বি॒দথে॑ সু॒বীরাঃ॑ ॥ ৫৮ ॥
পদার্থঃ- হে (ব্রহ্মণঃ) ব্রহ্মাণ্ডের (পতে) রক্ষক ঈশ্বর! (দেবাঃ) বিদ্বান্গণ (বিদথে) প্রকট করিবার যোগ্য ব্যবহারে (য়ৎ) যাহার (অবন্তি) রক্ষা বা উপদেশ করেন এবং যাহাকে (সুবীরাঃ) সুন্দর উত্তম বীরপুরুষ আমরা (বৃহৎ) মহৎ শ্রেষ্ঠ (বদেম) বলি সেই (অস্য) এই (সূক্তস্য) সুষ্ঠু প্রকার বলিবার যোগ বচনের (ত্বম্) আপনি (য়ন্তা) নিয়মকর্ত্তা হউন (চ) এবং (তনয়ম্) বিদ্যার শুদ্ধ বিচারকারী পুত্রবৎ প্রিয়পুরুষকে (বোধি) বোধ করান তথা (তৎ) সেই (ভদ্রম্) কল্যাণকারী (বিশ্বম্) সকল জীবমাত্রকে (জিন্ব) তৃপ্ত করুন ॥ ৫৮ ॥
ভাবার্থঃ- হে জগদীশ্বর ! আপনি আমাদের বিদ্যা ও সত্য ব্যবহারের নিয়ন্তা হউন, আমাদের সন্তানদিগকে বিদ্যাযুক্ত করুন, সব জগতের যথাবৎ রক্ষা, ন্যায়যুক্ত ধর্ম, উত্তম শিক্ষা ও পরস্পর প্রীতি উৎপন্ন করুন ॥ ৫৮ ॥
পরমেশ্বরের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার্থ:
পরমেশ্বর সমগ্র জগতের নিয়ন্তা। তিনিই বেদময় সূক্তের জ্ঞান দানকারী। তিনিই আমাদের পুত্রাদির পালনকর্তা। সমস্ত কল্যাণকর বস্তু ও আচরণকে বিদ্বান ব্যক্তিরা গ্রহণ ও পালন করেন। আমরা যজ্ঞে মহান বৈদিক জ্ঞানের প্রবচন ও উচ্চারণ করি অথবা যজ্ঞের মাধ্যমে সেই মহান পরমেশ্বরের স্তব করি।
যেমন—
‘য ইমা বিশ্ব…’ (অধ্যায় ১৭।১৭)
‘বিশ্বকর্মা…’ (অধ্যায় ১৭।২৬)
‘যো নঃ পিতা…’ (১৭।২৭)
‘অন্নপতেऽন্নস্য নো দেহি…’ (১১।৮৩)
এই চারটি মন্ত্রের ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট স্থানে দ্রষ্টব্য।
এই অধ্যায়ে মনের লক্ষণ, শিক্ষা, বিদ্যার ইচ্ছা, বিদ্বান্দিগের সঙ্গ, কন্যাদের প্রবোধ, চেতনতা, বিদ্বান্ দিগের লক্ষণ, রক্ষার প্রার্থনা, বল ঐশ্বর্য্যের ইচ্ছা, সোম ওষধির লক্ষণ, শুভ কর্মের ইচ্ছা, পরমেশ্বর ও সূর্য্যের বর্ণন, স্বরক্ষা, প্রাতঃকালে উত্থান, পুরুষকার দ্বারা ঋদ্ধি ও সিদ্ধি লাভ করা, ঈশ্বরের জগতের রচনা, মহারাজাদিগের বর্ণন, অশ্বির গুণকথন, আয়ু বৃদ্ধি করা, বিদ্বান্ ও প্রাণের লক্ষণ এবং ঈশ্বরের কর্ত্তব্য বলা হইয়াছে । এইজন্য এই অধ্যায়ের অর্থের পূর্ব অধ্যায়ে কথিত অর্থ সহ সঙ্গতি জানিতে হইবে ॥
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ