বেদের উৎপত্তি - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

27 July, 2023

বেদের উৎপত্তি

 


আকাশে অনেক বেদ মন্ত্র ছন্দরূপী প্রাণ রশ্মি রূপে উৎপন্ন হয়ে বিদ্যমান থাকে..তখন অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা ঋষি সমধি অবস্থায় পরমাত্মার কৃপায় ঐ অন্তরিক্ষস্থ ঋচা হতে মানব জীবন হেতু আবশ্যক বেদমন্ত্রকে সমাধি অবস্থায় সমাহিত চিত্ত দ্বারা ছেঁকে নিজের চিত্তে সংগৃহীত করেন এই সমস্ত ঋচা ক্রমশ ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ রূপ হয় (ঋ০ ১০।৭১।৩)। হে মনুষ্যগণ ! তোমাদের উচিত যে, (তস্মাৎ) সেই পূর্ণ, (য়জ্ঞাৎ) অত্যন্ত পূজনীয় (সর্বহুতঃ) যাঁর জন্য সকলে সমস্ত পদার্থ প্রদান করে বা সমর্পণ করে সেই পরমাত্মা হতে (ঋচঃ) ঋগ্বেদ, (সামানি) সামবেদ (জজ্ঞিরে) উৎপন্ন হয় (তস্মাৎ) সেই পরমাত্মা হতে (ছন্দাংসি) অথর্ববেদ (জজ্ঞিরে) উৎপন্ন হয় এবং (তস্মাৎ) সেই পুরুষ হইতে (য়জুঃ) যজুর্বেদ (অজায়ত) উৎপন্ন হয়, তাঁকে জানো (যজু০ ৩১।৭) 

বৃহস্পতে প্রথমম্ বাচো অগ্রম্ য়ৎপ্রৈরত নামধেয়ম্ দধানাঃ। 

য়দেষাম্ শ্রেষ্ঠম্ য়দরিপ্রমাসীৎপ্রেণা তদেষাম্ নিহিতম্ গুহাবিঃ।। ঋগ্বেদ ১০।৭১।১

পদার্থঃ—(বৃহস্পতে) হে বেদাধিপতি! হে পরমাত্মা! (প্রথমম্) সর্বপ্রথম, সৃষ্টির আদিতে, (নামধেয়ম্) বিভিন্ন পদার্থের নামকরণের ইচ্ছা (দধানাঃ) ধারণ করে আদিকালীন ঋষিরা (যৎ) যে (বাচঃ) বাক্য বা বচন (প্রৈরত) উচ্চারণ করেছিলেন সেই বাণীই ছিল (অগ্রম্) বাণীর প্রথম প্রকাশ। (যৎ) যে (এষাম্) সৃষ্টির আদিতে উৎপন্ন ঋষিদের মধ্যে (শ্রেষ্ঠম্) শ্রেষ্ঠ ছিল, (যৎ) যে (অরিপ্রম্) সম্পূর্ণ নির্দোষ, পাপরহিত (আসীত্) ছিল, (এষাম্) তাঁদের (গুহা) হৃদয়রূপ গুহায় (নিহিতম্) নিহিত বা সংরক্ষিত ছিল (তৎ) সেই অংশই (প্রেণা) তোমারই প্রেরণা ও প্রেমের কারণে (আবিঃ) প্রকাশিত হয়। যিনি অগ্নি, বায়ু আদির নিকট থেকে চার বেদ পড়েছিলেন তিনিই ব্রহ্মা ঋষি ছিলেন, কারণ "চতুর্বেদ বিদ্ ব্রহ্মা ভবতি" চার বেদের জ্ঞানীই হল ব্রহ্মা। স্বামী জগদীশ্বরানন্দকৃত পদার্থভাষ্য

আচার্য অগ্নিব্রতজীকৃত আধিভৌতিক ভাষ্য:-

বৃহস্পতে) [এখানে "বৃহস্পতেঃ" এই স্থানে সম্বোধনান্ত পদ ব্যবহৃত হয়েছে। তারসঙ্গে এই পদ সম্বোধনার্থও ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ দুটো অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।] হে বেদবাণীর পালক বিদ্বন্! (নামধেয়ম্) সৃষ্টির সমস্ত পদার্থ এবং তার নামকে (দধানাঃ) ধারণকারী অত্যন্ত পবিত্র অন্তঃকরণ যুক্ত সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে উৎপন্ন ঋষি (য়ৎ, প্র, ঐরৎ) যে প্রেরণা পরমাত্মার থেকে প্রাপ্ত করেন অর্থাৎ সেই আদি ঋষি যেসব ঋচাকে পরব্রহ্ম পরমাত্মার প্রেরণায় ব্রহ্মাণ্ড থেকে গ্রহণ করেন, (প্রথমম্, বাচঃ, অগ্রম্) সেই বাণী হল মানব ব্যবহারে ব্যবহৃত হওয়া বাণীর মধ্যে সবথেকে অগ্রিম বাণী। (য়দেষাম্, য়ৎ, শ্রেষ্ঠম্) সেই বেদবাণী হল সমস্ত মানবী ভাষার মধ্যে সবথেকে উত্তম বাণী, (য়ৎ, অরিপ্রম্, আসীৎ) [অরিপ্রম্ = রীঙ্ শ্রবণে দিবা. ধাতো "লীরীঙ্গোহ্রস্ব. উ.কো. ৫.৫৫ সূত্রেণ রঃ প্রত্যয়ঃ পুগাগমো হ্রস্বশ্চ। নঞ্ সমাসঃ (বৈদিক কোষঃ )] সেটা পূর্ণ শুদ্ধ হয়ে থাকে। ঋষিদের দ্বারা আকাশ থেকে গ্রহণ করার সময় সেই বাণী কোনোরূপ ক্ষয় প্রাপ্ত হয় না আর না তাতে কোনোরূপ মিশ্রণ থাকে। (তৎ, এষাম্, প্রেণা) সেই বেদবাণী এই সকল বাণীর মধ্যে সর্বাধিক বেগপূর্বক গমন কারী হয় অথবা সেটা প্রকৃষ্টরূপেণ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে। (গুহা, নিহিতম্, আবিঃ) [আবিঃ = আবিষ্কুরুতে (নিরুক্ত ৫.৯)] সেই বাণী অন্তরীক্ষরূপী গুহার মধ্যে নিহিত থাকে, যা ঋষিদের অন্তঃকরণ রূপী গুহার মধ্যে প্রকট হয়।

এখানে এই ঋচার প্রথম পদ "বৃহস্পতে" কে "বৃহস্পতেঃ" মানলে এই সংকেতও পাওয়া যায় যে সেই অন্তরীক্ষে ব্যাপ্ত বেদবাণী হল সম্পূর্ণ বাণী এবং সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের পালক ও স্বামী পরমাত্মারই বাণী অর্থাৎ তাঁর থেকেই উৎপন্ন হয়েছে।

ভাবার্থ - সৃষ্টি উৎপন্ন হলে সম্পূর্ণ সৃষ্টির মধ্যে বেদের ঋচা প্রাপ্ত হয়। এই ঋচা পরা ও পশ্যন্তী রূপে সম্পূর্ণ অন্তরীক্ষে ভরে থাকে। প্রথম প্রজন্মে উৎপন্ন সর্বাধিক পবিত্রাত্মা চার ঋষি সমাধিস্থ হয়ে ঈশ্বরের প্রেরণায় এইসব ঋচাকে গ্রহণ করেন। এর পূর্বে মানুষের কোথাও কোনো ভাষাই ছিল না, বরং ভাষার উৎপত্তি এইসব ঋচা উৎপত্তির পশ্চাৎ এরই অপভ্রষ্ট হওয়াতে হয়েছে। এই বাণী থেকে শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে অন্য কোনো ভাষা হওয়া সম্ভব নয়। যখন সেই ঋষি জন বাণীকে সমাহিত চিত্ত দ্বারা অন্তরীক্ষ থেকে গ্রহণ করেন, সেই সময় সেই বাণী শুদ্ধ ও পূর্ণ রূপে তাঁদের অন্তঃকরণে প্রবিষ্ট হয়। কোনো ঋচা ও ঋচার অংশের একটা পদও এই প্রক্রিয়াতে স্রাবিত হয় না অর্থাৎ অন্তরীক্ষে সেই ঋচাগুলো যেরূপ ব্যাপ্ত থাকে, সেগুলোকে সেইরূপে গ্রহণ করা হয়। সেই বাণী অর্থাৎ বেদমন্ত্র সেই ঋষিদের অন্তঃকরণে অত্যন্ত শীঘ্রতাপূর্বক সহজে প্রবিষ্ট হয়ে যায়, যেভাবে কেউ মন্ত্রকে কণ্ঠস্থ করে সেইরূপ নয়। সেই মন্ত্রগুলো অন্তরীক্ষ থেকে সেই ঋষিদের অন্তঃকরণে প্রবেশ করে, এর অর্থ হল সেইসব মন্ত্র ঋষিদের স্মৃতিস্তরে সদ্যঃ অঙ্কিত হয়ে যায়।

সক্তুমিব তিতউনা পুনন্তো য়ত্র ধীরা মনসা বাচমক্রত।
অত্রা সখায়ঃ সখ্যানি জানতে ভদ্রৈষাম্ লক্ষ্মীর্নিহিতাধি বাচি।। 
 ঋগ্বেদ ১০।৭১।২

পদার্থঃ (তিতউনা সক্তুম্ ইব) যেমন সত্তুকে চালুনি দিয়ে ছেঁকে পরিষ্কার করা হয়, ঠিক তেমনই (যত্র) যে সময়ে (ধীরাঃ) বুদ্ধিমান, ধ্যানশীল পুরুষেরা (মনসা) সংকল্প–বিকল্প, ঊহাপোহকারী চিত্ত বা জ্ঞানের দ্বারা (বাচম্) বাণীকে (পুনন্তঃ) পবিত্র করতে করতে (অক্রত) তার যথাযথ ব্যবহার করেন, (অত্র) তখন সেই বাণীতেই (সখায়ঃ) পারস্পরিক প্রেমভাবযুক্ত বন্ধু বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা (সখ্যানি) বন্ধুত্ব বা ভাবসমূহকে (জানতে) উপলব্ধি করেন। (এষাম্ অধিবাচি) তাঁদের বাণীতে (ভদ্রা) সুখদায়ক, কল্যাণকর, রমণীয়, প্রাপ্তিযোগ্য ও ইষ্টলাভসাধক (লক্ষ্মীঃ) ভাব প্রকাশকারী অর্থগ্রাহী শক্তি (নিহিতা) বিদ্যমান থাকে।

এই কারণেই সর্বপ্রথম জ্ঞানপূর্বক ধ্যানশীল ও বিচারশীল ঋষিগণ ইষ্টপ্রাপ্তি ও অনিষ্ট-পরিহার নির্দেশকারী বেদের জ্ঞানদর্শন করে অন্যদের উপদেশ দিয়েছেন। সেই সময়েও তাঁদের বেদবাণীতে অর্থবোধক শক্তি ছিল, যার ফলে শ্রোতারা উৎকৃষ্ট ও সুস্পষ্ট অভিপ্রায় বুঝতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ বাণীর যে বোধক গুণ, তার প্রধান কারণ হলো জ্ঞানযুক্ত চিত্ত থেকে বিবেকপূর্বক তার ব্যবহার; নচেৎ চিন্তাহীনভাবে বলা কথা কোনো অর্থই প্রকাশ করে না, তা প্রমত্তবাদের ন্যায় নিরর্থক হয়। পণ্ডিত জয়দেব শর্মাকৃত ভাষ্য॥

হরিশরণ সিন্ধান্তলঙ্কারকৃত ভাষ্যঃ

[১] (ইব) = যেমন (সক্তুম্) = সত্তুকে (তিতউনা) = চালুনি দিয়ে (পুনন্তঃ) = পরিশুদ্ধ করা হয়, ঠিক তেমনই (যত্র) = যেখানে (ধীরাঃ) = জ্ঞানে রমণকারী ধীর পুরুষেরা (মনসা) = মন দিয়ে, অর্থাৎ মনে মনন ও চিন্তার দ্বারা (বাচম্) = এই বেদবাণীকে (অক্রত) = প্রকৃতি–প্রত্যয়ের বিচার করে তার স্পষ্ট অর্থ প্রকাশ করেন, (অত্রা) = সেখানে (সখায়ঃ) = [যাঁদের জ্ঞানচর্চা একত্রে] এমন লোকেরা (সখ্যানি) = প্রকৃত বন্ধুত্বকে (জানতে) = অনুভব করেন। এই সংসারে প্রকৃত মৈত্রী আসলে প্রভুর সঙ্গেই; আর এই মৈত্রীর অনুভব তারাই করতে পারেন, যাঁরা জ্ঞানচর্চায় একসঙ্গে নিয়োজিত।

[২] (এষাম্ বাচি) = এঁদের বাণীতে (ভদ্রা লক্ষ্মীঃ) = কল্যাণময় লক্ষ্মী (অধি নিহিতা) = বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। এঁদের বাণী পবিত্র হয়; তারা সবার জন্য শুভ কথাই উচ্চারণ করে। প্রভুর নামের নিরন্তর স্মরণের ফলে এই লক্ষ্মী সদা সমৃদ্ধ থাকে। যিনি নিজেই লক্ষ্মীবান সেই প্রভুর সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের বাণীতে লক্ষ্মী থাকবে না—এমন হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের বাণীতে এমন শক্তি এসে যায় যে, তাঁরা যা বলেন, তাই বাস্তবে পরিণত হয়।

আচার্য অগ্নিব্রতজীকৃত আধিভৌতিক ভাষ্য:-

(সক্তুম্, এব) [সুক্তুঃ = সুক্তুঃ সচতের্দুধাবো ভবতি (নিরুক্ত ৪.১০)] অশুদ্ধ মিশ্রিত ছাতু যাকে হাত দিয়ে শুদ্ধ করা কষ্টসাধ্য হয়, তাকে যেভাবে সহজে শুদ্ধ করা হয় (তিতউনা) [তিতউ = তিতউ পরিপবনম্ ভবতি। ততবদ্বা তুন্নবদ্বা তিলমাত্রম্ তুন্নমিতি বা (নিরুক্ত ৮.৯)] সূক্ষ্ম ছিদ্র যুক্ত বিস্তৃত শোধন কর্মকারী ছাঁকনি দিয়ে, (য়ত্র, ধীরাঃ) সেইরূপ যখন অথবা যেখানে অত্যন্ত সত্ত্বগুণ ধারণকারী সৃষ্টির প্রারম্ভে উৎপন্ন ঋষি ধ্যানাবস্থিত অবস্থায় [ধীরাঃ = প্রজ্ঞানবন্তো ধ্যানবন্তঃ (নিরুক্ত ৪.১০)] (মনসা) সমাহিত অন্তঃকরণ দ্বারা (পুনন্তঃ) অন্তরীক্ষস্থ বেদ বাণীকে শুদ্ধ করে (বাচম্, অক্রত) সেই বেদ বাণীকে নিজের অন্তঃকরণে ধারণ করেন। (অত্র, সখায়ঃ) এই বেদবিদ্যার বিষয়ে সব প্রাণীদের সখারূপ হিতচিন্তক সেই ঋষিজন (সখ্যানি, জানতে) [সখা = সমানম্ খ্যাতীতি সখা (উ.কো.৪.১২৮)] যেখানে এমন মানুষ আছেন যারা সকল প্রাণীর প্রতি মিত্রধর্মকে জানেন, সেখানে ঈশ্বরের সহায়তায় বেদমন্ত্র, সেগুলোর পদের অর্থ অর্থাৎ শব্দ এবং অর্থের সম্বন্ধকে পূর্ণ রূপে জেনে যান। (এষাম্, বাচি, অধি) সেই বেদবাণীর মধ্যে (ভদ্রা, লক্ষ্মীঃ) [লক্ষ্মীঃ = লক্ষ্মীর্লাভাদ্বা লক্ষণাদ্বা লক্ষ্যতে চিন্ত্যতে সর্বেণ - স্কন্দস্বামী (নিরুক্ত ৪.১০), ভদ্রম্ = ভদ্রম্ ভগেন ব্যাখ্যাতম্ ভজনীয়ম্ ভূতানামভিদ্রবণীয়ম্ ভবদ্রময়তীতি বা (নিরুক্ত ৪.১০)] সকল প্রাণীর জন্য প্রাপ্ত করার যোগ্য পদার্থ আর চিন্তন অর্থাৎ সেই পদার্থের বিজ্ঞান (নিহিতা) নিহিত থাকে।

ভাবার্থ - মানব সৃষ্টি উৎপত্তির সময় এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডে বেদমন্ত্র ব্যাপ্ত থাকে। সেগুলো সম্পূর্ণ অন্তরীক্ষের মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে। সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে উৎপন্ন হওয়া চার সর্বশ্রেষ্ঠ ঋষি সমাধিস্থ মনের দ্বারা অন্তরীক্ষ থেকে সেই ঋচাগুলোকে সেইভাবে ছাঁনিয়ে গ্রহণ করে যেভাবে ছাতু বা আটা ছাঁকনি দিয়ে শুদ্ধ করা হয়। যেরূপ ছাঁকনি ছাড়া হাত দিয়ে ছাতু বা আটাকে শুদ্ধ করা কঠিন হয়, সেইরূপ সমাধিস্থ মন ছাড়া অন্তরীক্ষস্থ ঋচাকে গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। এখানে এই উপমা এটাও দর্শায় যে চারজন ঋষির দ্বারা বেদমন্ত্র গ্রহণ করার জন্য এটা সিদ্ধ হয়ে যায় না যে সম্পূর্ণ সৃষ্টির মধ্যে এই সমস্ত মন্ত্রের অতিরিক্ত আর কোনো মন্ত্র ছিল না। যদি এমন হতো, তাহলে ছাঁকনি দিয়ে ছাতু ছাঁনিয়ে নেওয়ার সমান মন্ত্রকে গ্রহণ করার চর্চা হতো না। সেই চারজন ঋষি প্রাণীমাত্রের হিতচিন্তক আর মুক্তি থেকে পুনরাবৃত্ত হয়ে মানুষের মধ্যেও সর্বোচ্চ স্তরের ছিলেন। এইজন্য তাঁরাই মন্ত্রকে গ্রহণ করতে সক্ষম হন। তাঁরা ঈশ্বরের কৃপায় সেই গৃহীত মন্ত্র, সেগুলোর পদ আর সেই পদের অর্থের নিত্য সম্বন্ধকে সম্পূর্ণ রূপে জেনে নেন। সেইসব মন্ত্রের মধ্যে সৃষ্টির সম্পূর্ণ পদার্থকে যথাযথ ভাবে জানার জন্য সম্পূর্ণ বিজ্ঞান নিহিত আছে আর সেই বিজ্ঞান প্রত্যেক মানুষের জন্য সকল প্রকারের লাভ প্রাপ্তকারীও হয়।

য়জ্ঞেন বাচঃ পদবীয়মায়ন্তামন্ববিন্দন্নৃষিষু প্রবিষ্টাম্।
তামাভৃত্যা ব্যদধুঃ পুরুত্রা তাম্ সপ্তরেভা অভি সম্ নবন্তে।। (ঋগ্বেদ ১০।৭১।৩)

.
(য়জ্ঞেন) [য়জ্ঞঃ = ব্রহ্ম হি য়জ্ঞঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৫.৩.২.৪), য়জ্ঞঃ প্রজাপতিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.৬.৩.৯)] সেই ধীর বিদ্বানজন, যাঁদের চর্চা পূর্ব মন্ত্রের মধ্যে করা হয়েছে, সবার পালক পরব্রহ্ম পরমাত্মার সাক্ষাৎকার দ্বারা অর্থাৎ তাঁর সহায়তায় (বাচঃ, পদবীয়ম্) সেই বেদবাণীর বিভিন্ন পদের মার্গ আর অনুক্রমকে (আয়ন্) জানেন বা প্রাপ্ত করেন ( ঋষিষু, প্রবিষ্টাম্) আকাশস্থ সূক্ষ্ম রশ্মির মধ্যে প্রবেশ হওয়া (তাম্, অনু, অবিন্দন্) সেই বেদবাণীকে অনুক্রমপূর্বক প্রাপ্ত করেন। (তাম্, আভৃত্য) সেই প্রাপ্ত হওয়া বেদবাণীকে নিজের অন্তঃকরণে ধারণ করে (পুরুত্রা, ব্যদধুঃ) সর্বত্র প্রচারিত করেন। (তাম্, সপ্তরেভাঃ) [রেভঃ = স্তোতৃনাম (নিঘন্টু ৩.১৬)] সেই বেদবাণীর মধ্যে সাত প্রকারের ছন্দ (অভি, সম্নবন্তে) [সম্নবন্তে = নবতে, গতিকর্মা (নিঘন্টু ২.১৪)] সবদিক দিয়ে ব্যাপ্ত থাকে।
.
ভাবার্থ - পূর্বোক্ত চার আদি ঋষি যখন ধ্যানাবস্থিত হন আর পরব্রহ্মের সাক্ষাৎকার করেন, তখন তাঁরা অন্তরীক্ষ থেকে আসা ঋচা আর সেগুলোর পদকে ক্রমপূর্বক আসতে অনুভব করেন। তাঁরা ক্রমপূর্বক সেইসব ঋচা আর পদের বিজ্ঞানকেও পূর্ণরূপে জানতে থাকেন। সেই ঋচাগুলো অন্তরীক্ষে বিদ্যমান সূক্ষ্ম ঋষিরশ্মির মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে, সেখান থেকে সেই ঋষিগণ সেগুলোকে নিজের অন্তঃকরণে গ্রহণ করেন। এইভাবে নিজের সামর্থ্যের অনুসারে সমস্ত ঋচাকে মহর্ষি ব্রহ্মার মাধ্যমে সর্বত্র প্রচারিত করেন। সেই বেদবাণী প্রধানত সাত ছন্দ যুক্ত হয়। [ সপ্ত = সৃপ্তা সংখ্যা (নিরুক্ত ৪.২৬)] সেইসব ছন্দ সম্পূর্ন আন্তরীক্ষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে আর সর্বত্র এগুলো একে-অপরের দিকে গতিশীল হয়। চারজন ঋষি সেগুলোর মধ্যে বেদের এই ঋচাগুলোকে গ্রহণ করেন।
.
এই তিন মন্ত্রের দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে যখন আকাশে অনেক ঋচা ছন্দরূপী প্রাণরশ্মি রূপে উৎপন্ন হয়ে বিদ্যমান থাকে, তখন অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা ঋষি সমাধি অবস্থায় পরমাত্মার কৃপায় অন্তরীক্ষস্থ সেই ঋচাগুলো থেকে মানব জীবন হেতু আবশ্যক ঋচাকে সমাহিত চিত্ত দ্বারা ছেঁকে-ছেঁকে নিজের চিত্তের মধ্যে সংগৃহীত করেন। সেই ঋচাই হল ক্রমশঃ ঋগ্বেদ, য়জুর্বেদ, সামবেদ আর অথর্ববেদের রূপ। এই চারজন ঋষি না কেবল সেইসব ঋচাকে সংগ্রহ করেন, অপিতু পরমাত্মার কৃপায় সেই ঋষিগণ সেইসব ঋচা অর্থাৎ বাণীর অর্থকেও জেনে যান। সেই চারজন ঋষি এই জ্ঞানকে মহর্ষি আদ্য ব্রহ্মাকে প্রদান করেন। এইভাবে সংসারের মধ্যে পরবর্তীতে জ্ঞানের প্রবাহ চলতে থাকে। আচার্য অগ্নিব্রতজীকৃত আধিভৌতিক ভাষ্য

নিরুক্ত অনুযায়ী স॒প্তऽঋষ॑য়ঃ॒ শব্দের অর্থঃ

স॒প্তऽঋষ॑য়ঃ॒ প্রতি॑হিতাঃ॒ শরী॑রে স॒প্ত র॑ক্ষন্তি॒ সদ॒মপ্র॑মাদম্ ।
স॒প্তাপঃ॒ স্বপ॑তো লো॒কমী॑য়ু॒স্তত্র॑ জাগৃতো॒ऽঅস্ব॑প্নজৌ সত্র॒সদৌ॑ চ দে॒বৌ ॥ যজু০ ৩৪।৫৫ ॥
পদার্থঃ- যে সব (সপ্ত, ঋষয়ঃ) বিষয় অর্থাৎ শব্দাদির প্রাপক পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় মন ও বুদ্ধি এই সাত ঋষি এই (শরীরে) শরীরে (প্রতিহিতাঃ) প্রতীতি সহ স্থির, তাহারাই (সপ্ত) সাত (অপ্রমাদম্) যেমন প্রমাদ অর্থাৎ ভুল না হয় তদ্রূপ (সদম্) স্থিত হওয়ার আধার শরীরকে (রক্ষন্তি) রক্ষা করে । তাহারা (স্বপতঃ) সুপ্ত ব্যক্তিকে (আপঃ) শরীরে ব্যাপ্ত উক্ত (সপ্ত) সাত (লোকম্) জীবাত্মাকে (ঈয়ু) প্রাপ্ত হয় (তত্র) সেই লোক প্রাপ্তি সময়ে (অস্বপ্নজৌ) যাহার কখনও স্বপ্ন হয় না, (সত্রসদৌ) জীবাত্মার রক্ষক (চ) এবং (দেবৌ) স্থির উত্তম গুণযুক্ত প্রাণও অপান (জাগৃতঃ) জাগ্রত থাকে ॥
📌সপ্ত ঋষয়ঃ = ষড়্ ইন্দ্রিয়াণি বিদ্যা সপ্তমী (নিরুক্ত ১২৷৩৭)। সেই সময় সেই যোগীর পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি; অথবা জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহ, বাক্‌ ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি এই সাত ঋষি দিব্যত্ব লাভ করেন।

📌
ত্বম॑গ্নে প্রথ॒মোऽঅঙ্গি॑রা॒ऽঋষি॑র্দে॒বো (যজুর্বেদ ৩৪।১২)

ভাবার্থঃ- এই শরীরে স্থির ব্যাপক বিষয়গুলির জ্ঞাতা অন্তঃকরণের সহিত পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ই নিরন্তর শরীরের রক্ষা করে এবং যখন জীব ঘুমায় তখন তাহাকে আশ্রয় করিয়া তমোগুণের বলে ভিতরে স্থির হয় কিন্তু বাহ্য বিষয়ের বোধ করায় না এবং স্বপ্নাবস্থায় জীবাত্মার রক্ষায় তৎপর তমোগুণ দ্বারা অদমিত প্রাণ ও অপান জাগিতে থাকে অন্যথা যদি প্রাণ-অপান ও ঘুমিয়ে পড়ে তাহা হইলে মৃত্যুই সম্ভব বুঝিতে হইবে ॥

উক্ত যজুর্বেদের ভাষ্যে ভগবদ্দত্ত জী নিরুক্তে লিখেছেনঃ (নিরুক্ত ১২।৩৭)

সপ্ত ঋষয়ঃ প্রতিহিতাঃ শরীরে। রশ্ময় আদিত্যে। সপ্ত রক্ষন্তি সদদ্মপ্রমাদম্। সংবৎসরমপ্রমাদ্যন্তঃ। সপ্তাপানাস্ত এব স্বপতো লোকমস্তমিতমাদিত্যং যন্তি। তত্র জাগৃতোऽখপ্নজৌ সত্রসদৌ চ দেবৌ। বাগ্বাদিত্যৌ। ইত্যধিদৈবতম্।

অথাধ্যাত্যম্। সপ্ত ঋষয়ঃ প্রতিহিতাঃ শরীরে। ষডিন্দ্রিয়াণি বিদ্যা সপ্তমী। আত্মনি। সপ্ত রক্ষন্তি সদমপ্রমাদম্। শরীরমপ্রমাদ্যন্তি। সপ্তাপানানীমান্যেব খপতো লোকমস্তমিতমাত্মানং যন্তি। তত্র জাগৃতোऽস্বপ্নজৌ সত্রসদৌ চ দেবৌ। প্রাজ্ঞশ্চাত্মা তৈজসশ্চ। ইত্যাত্মগতিমাচষ্টে। তেষামেষাऽপরা ভবতি। ॥ ৩৭ ॥

অর্থ—সাত ঋষি (প্রতিহিতাঃ) শরীরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সাতজন (সদম্) সদা (অপ্রমাদম্) প্রমাদহীন হয়ে রক্ষা করেন। সাত (আপঃ) ব্যাপ্ত হয়ে (স্ত্রপতঃ) নিদ্রিত অবস্থায় (লোকম্) লোককে (ঈয়ুঃ) প্রাপ্ত হন। সেখানে (জাগৃনঃ) জাগ্রত থাকেন (অস্বপ্নজঃ) নিদ্রাহীন, (সত্রসদৌ) যজ্ঞে উপবিষ্ট এই দুই দেবতা।।

সাত [প্রধান] রশ্মি আদিত্যের মধ্যে স্থাপিত। সাতজন সদা সংবৎসরকে প্রমাদহীনভাবে রক্ষা করেন। সাত আপান যারা ব্যাপ্তিস্বরূপ তারা নিদ্রিত অবস্থার লোককে, অর্থাৎ অস্তগামী আদিত্যকে প্রাপ্ত হন। সেখানে জাগ্রত, নিদ্রাহীন, যজ্ঞে উপবিষ্ট দুই দেবতা অর্থাৎ বায়ু ও আদিত্য। এটি অধিদৈবত [ব্যাখ্যা]।

এখন অধ্যাত্ম, অর্থাৎ মানবদেহ-সম্পর্কিত [ব্যাখ্যা] ছয় ইন্দ্রিয়, বিদ্যা-বুদ্ধি এবং সপ্তম আত্মা এই সাতই শরীরের মধ্যে। সাতজন প্রমাদহীন হয়ে শরীরকে রক্ষা করেন। সাত আপানানি এই ব্যাপ্তিস্বরূপ শক্তিগুলিই নিদ্রিত অবস্থার লোককে, অর্থাৎ অস্তগামী, নিদ্রিত শরীরকে প্রাপ্ত হয়। সেখানে জাগ্রত, নিদ্রাহীন, যজ্ঞে উপবিষ্ট দুই দেবতা প্রাজ্ঞ আত্মা (বুদ্ধিতত্ত্ব) ও তেজস জীবাত্মা। এটি আত্মগতিকে প্রকাশ করে। এটাই তাদের দ্বিতীয় [ঋক্]। ॥ ৩৭ ॥

ভাষ্য—একই ঋকের দুই অর্থের আলোকময় ছটা এই যাস্কীয় ব্যাখ্যানে উপলব্ধ হয়। পরম্পরাগত অর্থের জ্ঞান ব্যতীত এই মহান জ্ঞান প্রত্যক্ষ হয় না। ‘অস্ত’ অর্থাৎ নিদ্রিত। ॥ ৩৭ ॥

অগ্নিবাযুরবিভ্যস্তু ত্রয়ম্ ব্রহ্ম সনাতনম্।

দুদোহ য়জ্ঞসিদ্ধ্যর্থমৃগ্যজুঃ সামলক্ষণম্।। (মনুঃ ১|২৩)


অর্থাৎ - অগ্নি, বায়ু, অঙ্গিরা নামক ঋষাদির মাধ্যমে ক্রমশঃ ঋক্ আদি বেদকে পরমাত্মা দোহন করে প্রকাশ করেছিলেন।


স ইমানি ত্রীণি জ্যোতীংষ্যভিততাপ তেভ্যস্তপ্তেভ্যস্ত্রয়ো বেদা আজায়ন্ত । অগ্নেরৃগ্বেদো বায়োর্যজুর্বেদঃ সূর্যাৎ সামবেদঃ
(শতপথ ব্রাহ্মণঃ ১১|৫|৮|৩) গঙ্গাপ্রসাদজীকৃত ভাষ্য (বামে ছবি)

He heated these three lights, and from them, thus heated, the three Vedas were produced—the Rig-veda from Agni, the Yajur-veda from Vayu, and the Sama-veda from Surya.
শতপথ ব্রাহ্মণঃ ১১|৫|৮|৩
"অগ্নিঃ ঋগ্বেদঃ বায়োর্য়জুর্বেদঃ সূর্য়াত্সামবেদঃ"
(শতপথ ব্রাহ্মণঃ ১১|৫|৮|৩)

অর্থাৎ - অগ্নি থেকে ঋগবেদ বায়ু থেকে য়জুর্বেদ তথা সূর্য থেকে সামবেদ প্রকট হয়।

য়শ্মাদৃচো অপাতক্ষন্যজুর্য়স্মাদপাকষন্।
সামানি য়স্য লোমান্যথর্বাঙ্গিরসো মুখম্।
স্কম্ভম্ তম্ ব্রূহি কতমঃ স্বিদেব সঃ।। (অথর্বঃ ১০|৭|২০)

অর্থাৎ - সেই সর্বশক্তিমান পরমাত্মা হতে ঋগ্বেদ, য়জুর্বেদ, সামবেদ আর অথর্ববেদ, এই বেদ চতুষ্টয় প্রাদুর্ভূত হয়। অঙ্গিরস অর্থাৎ অথর্ববেদ যার মুখের স্বরূপ, সামবেদ যার লোমবৎ, য়জুর্বেদ যার হৃদয় স্বরূপ আর ঋগ্বেদ যার প্রাণ স্বরূপ। এইভাবে পরমাত্মা রূপকালঙ্কার দ্বারা বেদের উৎপত্তির প্রকাশ করেন।

তস্মা॑দ্য॒জ্ঞাৎ স॑র্ব॒হুত॒ऽঋচঃ॒ সামা॑নি জজ্ঞিরে ।
ছন্দা॑ᳬসি জজ্ঞিরে॒ তস্মা॒দ্যজু॒স্তস্মা॑দজায়ত ॥ যজুর্বেদ০ ৩১।৭, ঋগ্বেদ ১০/৯০/৯

ভাষ্যম্ :- (তন্মাদ্যাৎস০) তস্মাত্যজ্ঞাৎ সচ্চিদানন্দাদিলক্ষণাৎ পূর্ণাৎ পুরুষাৎ সৰ্ব্বভূতাৎ সৰ্ব্বপূজ্যাৎ সর্ব্বোপাস্যাৎ সর্ব্বশক্তিমতা পরব্রহ্মণঃ (চঃ) ঋগ্বেদন, (যজুঃ ) য়জুর্ব্বেদঃ, (সামানি) সামবেদঃ, (ছন্দা॑ᳬসি) অথর্ব্ববেদশ্চ (জজ্ঞিরে) চত্বারো বেদান্তেনৈৰ প্ৰকাশিতা ইতি বেদ্যম্। সর্ব্বহুতঃ ইতি বেদানামপি বিশেষণং ভবিতুমর্হতি, বেদাঃ সৰ্ব্বহুতঃ, য়তঃ সৰ্ব্বমনুষ্যেহোতুমাদাতুং গ্রহীতুং যোগ্যাঃ সন্ত্যতঃ। জঞ্জিরে, অজায়ত ইতি ক্রিয়াদ্বয়ং বেদানামনেক বিদ্যাবত্ত্বদ্যোতনার্থম্ । তথা তন্মাদ ইতি পদদ্বয়মীশ্বরাদের বেদা জাতা ইত্যাবধারণার্থম্ ।। 

বেদানাং গায়াদিচ্ছন্দোন্বিতত্ত্বাৎ পুনশ্ছন্দাংসীতি পদং চতুর্থস্যাথাবেদস্যোৎপত্তিং আপয়তীত্যবধেয়ম্। যজ্ঞো বৈ বিষ্ণুঃ। শo কাং০১ অ০১।। [ব্রা০২। ক ১৩] ইদং বিষ্ণুবিচক্রমে ত্রেধা নিদধে পদম্।' যজুঃ অ০ ৫ ম০ ১৫ । ইতি সৰ্ব্ব জগতকর্তৃত্বং বিষ্ণৌ পরমেশ্বর এব ঘটতে, নান্যত্র। বেবেষ্টি ব্যাপ্নোতি চরাচরং জগৎ স বিষ্ণুঃ পরমেশ্বরঃ।।

পদার্থঃ- হে মনুষ্যগণ ! তোমাদের উচিত যে, (তস্মাৎ) সেই পূর্ণ, (য়জ্ঞাৎ) অত্যন্ত পূজনীয় (সর্বহুতঃ) যাহার জন্য সকলে সমস্ত পদার্থ প্রদান করে বা সমর্পণ করে সেই পরমাত্মা হইতে (ঋচঃ) ঋগ্বেদ, (সামানি) সামবেদ (জজ্ঞিরে) উৎপন্ন হয় (তস্মাৎ) সেই পরমাত্মা হইতে (ছন্দাংসি) অথর্ববেদ (জজ্ঞিরে) উৎপন্ন হয় এবং (তস্মাৎ) সেই পুরুষ হইতে (য়জুঃ) যজুর্বেদ (অজায়ত) উৎপন্ন হয়, তাহাকে জানো ॥ 

ভাবার্থঃ-(তস্মাৎ যজ্ঞাৎ) সৎ যাঁহার কখনো নাশ হয় না চিৎ যিনি সদা জ্ঞান স্বরূপ, যাঁহার কখনো লেশমাত্র অজ্ঞানতা নাই আনন্দ যিনি সদা সুখস্বরূপ এবং সকলের সুখদাতা, এবম্ভূত সচ্চিদানন্দাদি 
লক্ষণযুক্ত সর্ব্বত্র পরিপূর্ণ, সকলের উপাসনার যোগ্য, ইষ্টদেব ও সর্ব্বশক্তিমান্ পরমব্রহ্ম হতে, (ঋচঃ) ঋগ্বেদ (য়জু) যজুর্ব্বেদ (সামানি) সামবেদ (ছন্দাংসি) এবং অথর্ব্ববেদ প্রকাশিত হয়েছে। এজন্য সকলেরই বেদশাস্ত্র গ্রহণ ও তদনুযায়ী আচরণ করা কর্ত্তব্য। বেদ অনেক বিদ্যার আধার, ইহা প্রকাশ করার জন্য, 'জঞ্জিরে' এবং 'অজায়ত' এই ক্রিয়া দ্বয়ের প্রয়োগ হয়েছে। ঈশ্বর হতে বেদ সকল উৎপন্ন হয়েছে, তা অবধারণের জন্য, ‘তস্মাৎ' এই পদ দুইবার প্রযুক্ত হয়েছে। বেদ মন্ত্ৰ সকল গায়ত্রাদি ছন্দ যুক্ত হেতু, 'ছন্দাংসি' এই পদ দ্বারা অথর্ব্ববেদের উৎপত্তি প্রকাশ করিতেছে। শতপথ ব্রাহ্মণ এবং বেদ মন্ত্র প্রমাণ দ্বারা তা সিদ্ধ হয়েছে, যে 'যজ্ঞ' শব্দে 'বিষ্ণু', এবং বিষ্ণু শব্দে সৰ্ব্বব্যাপক পরমেশ্বরেরই গ্রহণ হয়ে থাকে, কারণ জগৎ উৎপত্তি করা, এক পরমেশ্বর ভিন্ন অন্যত্র বা অপরে ঘটতে পারে না। 

হে মনুষ্যগণ ! যাহা হইতে সকল বেদ উৎপন্ন হইয়াছে, তোমরা সেই পরমাত্মার উপাসনা কর, বেদ পড় এবং তাহার আজ্ঞা অনুযায়ী আচরণ করিয়া সুখী হও ॥

মহর্ষি দয়ানন্দ জী ঋগ্বেদাদি ভাষ্যভূমিকায় (পৃ০১৭) বলেছেন শতপথ ১১।৫ "তেভ্যস্তপ্তেভ্যস্ত্রয়ো বেদা অজায়ন্তে ঋগ্বেদো বায়োর্য়জুর্বেদঃ সূর্য়াৎ সমাবেদ"-অর্থাৎ অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা ঋষিরা মন্ত্র গ্রহণ করেছিলেন !

যস্মাদৃচো অপাতক্ষন্ যজুর্য়স্মাদপাকষন্। সমানিয়স্য লোকান্যথর্বাংঙ্গিরসো মুখম্। স্কম্ভং তং ব্রহি কতমঃ স্বিদেব সঃ॥ অথর্ব০ ১০।৭।২০ মহর্ষিদয়ানন্দকৃত ভাষ্য

(য়স্মাদৃচো০) য়স্মাৎ সর্বশক্তিমতঃ ঋচঃ ঋগ্বেদঃ (অপাতক্ষন) অপাতক্ষৎ উৎপন্নোৎস্তি, য়স্মাৎ পরব্রহ্মণঃ (য়জুঃ) যজুর্বেদঃ (অপাকষন) প্রাদুর্ভূতো্যস্তি। তথৈব য়স্মাৎ সামানি সামবেদঃ (আঙ্গিরসঃ) অথর্ববেদশ্চোৎপন্নৌ স্তঃ। এবমেব য়স্যেশ্বরস্যাঙ্গিরসোৎথর্ববেদোমুখং মুখবমুখ্যোৎস্তি। সামানি লোমানীব সন্তি, য়জুয়স্য হৃদয়মৃচঃ প্রাণশ্চেতি রূপকালংকারঃ। য়স্মাচ্চত্ত্বারোবেদা উৎপন্নাঃ স কতমঃ স্বিদ্দেবোেऽস্তি তং ত্বং ব্রহীতি প্রশ্নঃ? অস্যোত্তরম্ (স্কম্ভং তং০) তং স্কম্ভং সৰ্ব্বজগদ্ধারকং পরমেশ্বরং ত্বং জানীহীতি, তস্মাৎ স্কংভাৎ সর্ব্বাধারাৎ পরমেশ্বরাৎ পৃথক্ কশ্চিদপ্যন্যো দেবো বেদকর্তা নৈবাস্তীতি মন্তব্যম্। এবং বা অরেৎস্য মহতো ভূতস্য নিঃস্বসিতমেতদ্যদৃখেদো যজুর্ব্বেদঃ সামবেদোর্থর্বাঙ্গিরসঃ ।। ২।। শ০ কাং০ ১৪ অ০৫। [ব্রাঃ ৪। কং১০।।]
ভাষার্থঃ-
(যস্নাদৃচো অপা০) যে সর্ব্বশক্তিমান পরমেশ্বর হইতে, (ঋচঃ) ঋগ্বেদ, (যজুঃ) যজুর্ব্বেদ (সামানি) সামবেদ (আংগিরসঃ) অথর্ববেদ, এই বেদ চতুষ্টয় উৎপন্ন বা প্রাদুর্ভূত হইয়াছে এবস্তৃত ঈশ্বর, আংগিরস অর্থাৎ অথর্ব্ববেদ যাঁহার মুখ স্বরূপ, সামবেদ যাঁহার লোমবৎ, যজুর্ব্বেদ যাঁহার হৃদয় স্বরূপ, এবং ঋগ্বেদ যাহার প্রাণ স্বরূপ, (ক্রহি কতমঃ স্বিদেব সঃ) যে, যাঁহা হইতে চারি বেদ উৎপন্ন হইয়াছে, তিনি কোন্ দেব? তাহা তুমি বল? এই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান বলিতেছেন, (স্কংভ তং) যিনি সমগ্র জগতের ধারণ কর্তা পরমেশ্বর, তাঁহাকেই স্কম্ভ বলা যায়, এবং সেই স্কম্ভকেই বেদ সকলের কর্তা প্রকাশক বলিয়া জানিবে সেই সর্বাধার পরমেশ্বর ভিন্ন, অন্য কোন দেব, বেদ কর্তা নহে, এবং তিনি ভিন্ন মনুষ্যের উপাসনা যোগ্য অন্য কোন ইষ্টদেব নাই। কারণ যে বেদকর্তা পরমাত্মাকে পরিত্যাগ করিয়া তৎস্থানে অন্যর উপাসনা করে, সে (নিশ্চয়ই) হতভাগ্য (সন্দেহ নাই)।।
( এবং বা অরেৎস্য) এই মন্ত্রে মহাবিদ্বান যাজ্ঞবল্ক্য নিজ পত্নী মৈত্রেয়ীকে উপদেশ করিতেছেন , হে মৈত্রেয়ি ! যে পরমাত্মা আকাশ হইতেও বৃহৎ, তাহা হইতেই ঋক্ , যজুঃ , সাম ও অথর্ব , এই বেদ চতুষ্টয় নিঃশ্বাসের ন্যায় সহজভাবে নিঃসৃত হইয়াছে । যেরূপ শরীর হইতে শ্বাস সহজে নির্গত হইয়া পূনঃ সেই শরীরেই প্রবেশ করে , তদ্রূপ সৃষ্টির আদিতে পরমেশ্বর বেদ শাস্ত্রকে উৎপন্ন বা ( প্রাদুর্ভূত ) করিয়া , সংসারে উহাকে প্রকাশ করিয়া থাকেন ও পুনঃ প্রলয়কালে তিনি বেদশাস্ত্রকে সংসার হইতে অপসারিত করিয়া , নিজ ( অনন্ত ) জ্ঞান মধ্যে সদা স্থিত রাখেন । এইরূপে বীজাঙ্কুরবৎ পরমাত্মা কর্তৃক বেদশাস্ত্রের প্রাদুর্ভাব ও তিরোভাব হইয়া থাকে, অর্থাৎ যেরূপ বীজ মধ্যে প্রথম হইতেই অঙ্কুর বর্তমান থাকে , এবং তাহাই বৃক্ষরূপে প্রকাশিত হয় ও পুনঃ সেই বৃক্ষ আবার বীজরূপে পরিণত হয় , তদ্রূপ বেদ শাস্ত্র সদা ঈশ্বরের জ্ঞানে বিরাজমান থাকে , তাহার কদাপি নাশ হয় না , কারণ বেদ সাক্ষাৎ ঈশ্বরের বিদ্যা বা জ্ঞান , এজন্য ইহাকে নিত্য বলিযা জানিবে ।

বেদ জ্ঞান কেবল সংস্কৃত ভাষাতেই কেন?

প্রশ্ন - পরমাত্মা সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের অনেক মানুষের মধ্যে কেবল চারজন ঋষিকেই কেন জ্ঞান দিয়েছেন? ঈশ্বর কি পক্ষপাতী? তারপর এটাও একটা প্রশ্ন যে পরমাত্মা তাঁর জ্ঞান বৈদিক ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষাতেই কেন দিয়েছেন? এর দ্বারা অন্য ভাষী মানুষের সঙ্গে বৈষম্য বা দোষ পরমাত্মার উপর লাগবে না?
.
উত্তর - এটা সত্য যে সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে স্ত্রী-পুরুষের অনেক জোড়া উৎপন্ন হয়েছে। তাঁরা পূর্ণ যুবকাবস্থায় পৃথিবী রূপী গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যে মহানুভাব পূর্ণ যুবকাবস্থায় ও ভূমি থেকে উৎপত্তির উপর শঙ্কা করছেন, তাকে ঋষি দয়ানন্দ কৃত "সত্যার্থ-প্রকাশ" তথা মদ্রচিত "সত্যার্থ প্রকাশ উভর্তে প্রশ্ন-গরজতে উত্তর" নামক গ্রন্থ পড়ার চেষ্টা করা উচিত। বিস্তারভয়ে আমি এই বিষয়কে এখানেই ছেড়ে দিচ্ছি। তাছাড়া প্রত্যেক বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি সম্পন্ন পাঠক এটাই মানবে যে প্রথম প্রজন্মের উৎপত্তি কেবল এই ভাবেই হওয়া সম্ভব।
.
সেই প্রথম প্রজন্মের মধ্যে সেই চারজন ঋষিই সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও সামর্থ্যবান ছিলেন। তাঁরা নিজের মহান তপ দ্বারা আকাশ থেকে বেদের ঋচাকে গ্রহণ করেছেন, এই কারণে তাঁদেরকেই জ্ঞান দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা সবাইকে জ্ঞান প্রদান করতে পারেন। বাকি রইলো সংস্কৃত-ভাষাতে জ্ঞান দেওয়ার, তো তদ্বিষয়ে জ্ঞাতব্য হল সেই সময় সম্পূর্ণ মানব জাতির মধ্যে কোনো ভাষার উৎপত্তিই হয়নি। যেটা উৎপন্ন হয়েছিল, সেটা কেবল বৈদিক ভাষা সংস্কৃতই ছিল, তাও আবার বৈদিক ছন্দের রূপে। পরে ঋষিগণ এই ভাষাকে কথোপকথনের ভাষাতে ব্যবহৃত করেন। কালান্তরে সংস্কৃত ভাষা থেকে অপভ্রষ্ট হয়ে ধীরে-ধীরে বিশ্বের মধ্যে অনেক ভাষার উৎপত্তি হয়। এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভূমণ্ডলে সংস্কৃত ভাষাই সর্বাধিক শাসন করেছে। আজ সারা বিশ্বের মধ্যে এটা তো সর্বমান্য তথ্য যে সংস্কৃত ভাষাই হল সমস্ত মানব ভাষার জননী। এই কারণে সংস্কৃত ভাষাতেই জ্ঞান দেওয়া অনিবার্য আর নিষ্পক্ষ ছিল।
.
🌿 প্রশ্ন - যদি ছন্দ অন্য কোনো ভাষা হিন্দি, ইংরাজি, চিনি, আরবী আদির মধ্যে কোনো এক ভাষাতে হতো আর সেই ভাষা থেকে অন্য ভাষার উৎপত্তি হতো, তাহলে তাতে কি অসুবিধা হতো? সংস্কৃত ভাষার সঙ্গেই কেন ঈশ্বরের প্রেম ছিল? এটা সংস্কৃত ভাষাবিদদের নিজস্ব কল্পনা ও পূর্বাগ্রহ নয় কি?
.
উত্তর - আপনার প্রশ্ন একটা ভাষার প্রথম উৎপত্তি নিয়ে, এটা উচিত ও স্বাভাবিক। আমি "বৈদিক সৃষ্টি উৎপত্তি বিজ্ঞান" নামক অধ্যায়ে স্পষ্ট করবো যে বৈদিক সংস্কৃত ভাষার শব্দের সঙ্গে তার অর্থের নিত্য সম্বন্ধ আছে। যে শব্দের যে অর্থ হয়, সেই অর্থ কোনো মানুষ স্বকল্পনায় মেনে নেয় নি, বরং সেই অর্থ ওই শব্দের সঙ্গে নিত্য সম্বন্ধে থাকে। সেই বস্তু বিশেষ যখন সর্গপ্রক্রিয়াতে নির্মিত হচ্ছিল, তখন সেই শব্দ বিশেষের উৎপত্তিও হচ্ছিল। এইভাবে বৈদিক সংস্কৃত ভাষাতে বাচক ও বাচ্যের সম্বন্ধ নিত্য, প্রকৃতিক আর ঈশ্বরীয় হয়, মানবীয় মোটেও নয়। এই বিশেষত্ব অন্য কোনো ভাষার মধ্যে নেই। এইভাবে বৈদিক শব্দই নিত্য হয়, অন্য কোনো ভাষার শব্দ হয় না। বৈদিক শব্দই প্রাণ রূপ হয়ে সৃষ্টির সকল পদার্থের উপাদান কারণও হয়, অথচ এমন বিশেষত্ব নামমাত্রেও কোনো মানবীয় ভাষার মধ্যে নেই।
.
এই কারণে বৈদিক সংস্কৃত ভাষা কোনো বর্গ, দেশ বা সম্প্রদায়, এমনকি কেবল পৃথিবীস্থ মানব জাতির ভাষা নয়, বরং এটা হল ব্রহ্মাণ্ডীয় ভাষা। বৈদিক ছন্দ সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রাণতত্ত্বের (স্পন্দন বা কম্পন বা ভাইব্রেশন) রূপে ব্যাপ্ত হয়ে আছে। বিভিন্ন সূক্ষ্ম কণার উৎপত্তি এগুলো থেকেই হয়। এইভাবে বৈদিক সংস্কৃত ভাষা পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, শাশ্বত ও সার্বদেশিক হওয়াতে অত্যন্ত ব্যবস্থিত। এর ব্যাকরণ অন্য যেকোনো ভাষার ব্যাকরণের তুলনায় সুব্যবস্থিত আছে। আধুনিক কালে উপলব্ধ একমাত্র প্রামাণিক ব্যাকরণের আধার গ্রন্থ পাণিনীয় অষ্টাধ্যায়ী আজও সারা বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞানীদের জন্য আশ্চর্যজনক আদর্শ হয়ে আছে। এই অষ্টাধ্যায়ীর গুরুত্বকে বর্ণনা করে এমন কিছু কথন আমি "অষ্টাধ্যায়ী ভাষ্য প্রথমাবৃত্তি" - পণ্ডিত ব্রহ্মদত্ত জিজ্ঞাসুর (সংস্করণ ২০৪২ বিক্রম সম্বত্ সাল ১৯৮৫) প্রাককথন থেকে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করছি -

১. তত্রাশক্যম্ বর্ণেনাপ্যনর্থকেন ভবিতুম্ কিম্ পুনরিয়তা সূত্রেণ (মহাভাষ্য ১.১.১ চৌখম্বা সংস্করণ) অর্থাৎ তাঁর অর্থাৎ ভগবৎ পাণিনির একটা বর্ণও অনর্থক নেই, তাহলে এত বড় সূত্রের কথা কি বলবো? মহর্ষি পতঞ্জলি পুনরায় বলেছেন -

সামর্থ্যয়োগান্নহি কিঞ্চিদস্মিন্ পশ্যামি শাস্ত্রে য়দনর্থকম্ স্যাত্

অর্থাৎ শাস্ত্রের সামর্থ্য দ্বারা আমি এই গ্রন্থের মধ্যে একটাও এমন কোনো বর্ণ বা পদ দেখছি না, যেটা অনর্থ হবে।

২. চীন যাত্রী হিওয়েন সাং - শব্দ এবং অক্ষর বিষয়ক কোনো জ্ঞান এরথেকে অবশিষ্ট নেই।

৩. মোনিয়ার উলিয়ামস্ - অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থ হল মানব মস্তিষ্কের প্রতিভার আশ্চর্যতম ভাগ, যা মানব মস্তিষ্কের সামনে এসেছে।

৪. হন্টার - মানব মস্তিষ্কের চরম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল এই অষ্টাধ্যায়ী।

৫. লেনিনগ্রাডের প্রফেসর টি. বাৎসকি - মানব মস্তিষ্কের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা হল এই অষ্টাধ্যায়ী।

এইভাবে সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের এই গ্রন্থ সারা বিশ্বের মধ্যে আজও সবার সম্মানের পাত্র হয়ে আছে। এই গ্রন্থের পূর্বেও অনেক বৈয়াকরণ হয়েছে। কয়েকটা বৈয়াকরণের নাম ভগবৎ পাণিনি স্বয়ং তাঁর অষ্টাধ্যায়ীর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। যে ভাষার ব্যাকরণ সংসারে সর্বাধিক সুব্যবস্থিত ও আশ্চর্যজনক হবে, সেই ভাষাই তো পরমাত্মার দ্বারা প্রথমে উৎপন্ন প্রাকৃতিক ব্রহ্মাণ্ডীয় ভাষা হতে পারে। এইজন্য সংসারের সুবিজ্ঞ জনদের উচিত যে তাঁরা যেন বেদের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য অবশ্যই খুব চেষ্টা করেন। এর উপর প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার আছে। এর জন্য সংসারের উচিত আর্যাবর্তিদের (ভারতবাসী) ধন্যবাদ করা, কারণ তারা এগুলোকে অন্তত কিছুটা তো সুরক্ষিত রেখেছে। এর পাশাপাশি সংসারের উচিত বেদপাঠী ব্রাহ্মণদেরও ঋণী হওয়া, যাঁরা এই ভারী সম্পদাকে নিজের কণ্ঠের মধ্যে সুরক্ষিত রেখে বিনাশ হওয়ার থেকে বাঁচিয়েছেন।

এইভাবে অগ্নিব্রতজী এটা সিদ্ধ করেছেন যে অগ্নি, বায়ু আদি চারজন ঋষির মধ্যে সর্বস্রষ্টা পরমাত্মা বৈদিক ছন্দের মাধ্যমে জ্ঞান ও ভাষার উৎপত্তি করেন। এই কথাই ভগবান্ মনু মহারাজ বলেছেন -

অগ্নিবায়ুরবিভ্যস্তু ত্রয়ম্ ব্রহ্ম সনাতনম্।
দুদোহ য়জ্ঞ সিদ্ধ্যর্থমৃগ্যজুঃ সামলক্ষণম্।। (মনুস্মৃতি ১।২৩) শেষে অংশে বিশুদ্ধ মনুস্মৃতি দেখুন

এর অর্থ করে ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা এবং সত্যার্থ প্রকাশে লিখেছেন - পরমেশ্বর অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা এই চার ঋষিকে জ্ঞান দেন। এখানে প্রায়শঃ প্রশ্ন করা হয় যে বেদ তিনটা নাকি চারটা? আমি এর উপর চর্চা করে কলেবর বাড়াতে চাইবো না। এর উপর ঋষি দয়ানন্দকৃত গ্রন্থের পাশাপাশি অনেক আর্য বিদ্বানের পর্যাপ্ত এবং নিশ্চয়াত্মক লেখা আছে। পাঠক সেখানে দেখতে পাবেন। তবে, বৈদিক বিদ্যা অবশ্যই ঋক্, য়জুঃ ও সাম এই তিন লক্ষণযুক্ত হয়। এর বৈজ্ঞানিক অর্থাৎ আধিদৈবিকরূপ আমার গ্রন্থের মধ্যে স্থানে-স্থানে পাওয়া যাবে। এখানে একটা শঙ্কা বিদ্বানদের মধ্যে অবশ্যই উপস্থিত হতে পারে, যার সমাধান সম্ভবতঃ আমার জানা কোনো আর্য বিদ্বানরা ও করেন নি।

সেই শঙ্কাটা হল যে ঋষি দয়ানন্দ এখানে "অগ্নি", "বায়ু" ও "রবি" এই তিনটা নাম থেকে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চারটা নাম কেন গ্রহণ করেছেন? এই ভাবে সত্যার্থ প্রকাশ গ্রন্থের মধ্যেও শতপথ ব্রাহ্মণের প্রমাণ দিয়ে অগ্নি, বায়ু ও সূর্য থেকে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চারটা নাম কেন গ্রহণ করেছেন? এটা মনগড়া ও পূর্বাগ্রহ গ্রস্ততার প্রমাণ নয় কি? বেদ হল চার আর ঋষিও হল চার, এর অনেক প্রমাণ অন্যত্র অবশ্যই উপলব্ধ আছে, কিন্তু এখানে দুটো স্থানে কেবল তিনটা নামই আছে। বেদ তো শৈলীভেদ অনুসারে চারের স্থানে তিনটা মানা যেতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিবাচক নামের মধ্যে তিনটা থেকে চারটার গ্রহণ কিভাবে হবে? অন্য আরেকটা প্রশ্ন করা হয় যে কোনো ব্যক্তির নামের স্থানে তার সমার্থক শব্দেরও ব্যবহার করা যায় কি? এমনতো কখনও সম্ভব নয়। তাহলে এই সূর্য অথবা রবির ব্যবহার আদিত্যের স্থানে কিভাবে হয়েছে?

বাস্তবে শঙ্কা দুটোই গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতে এর সমাধান নিম্নানুসারে হবে -

আর্ষ গ্রন্থের মধ্যে যদিও প্রায়শঃ সর্বত্র এবং স্বয়ং বেদ সংহিতার মধ্যেও চার প্রকারের বেদের বর্ণনা হওয়াতে বেদের তিনটা হওয়া তো সম্ভব নয়। অনেকত্র চার বেদের জ্ঞানকে চারজন ঋষির দ্বারা গ্রহণ করারও বর্ণনা আছে, কিন্তু এখানে মনুস্মৃতি তথা সত্যার্থপ্রকাশ্যের মধ্যে উদ্ধৃত প্রমাণে তিনটাই নাম আছে। এখানে বেদ বিদ্যার শৈলীগত বিভাগ তিন প্রকারে করা হয়েছে, তাহলে তাকে চারটা নামের সঙ্গে কিভাবে সংগত করা যাবে, এটাও একটা সমস্যা। এই কারণে "রবি" ও "সূর্য" দুটোর মধ্যে প্রত্যেক শব্দ থেকে আদিত্য ও অঙ্গিরার গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয়। এখানে দুটো স্থানেই "আদিত্য" শব্দের ব্যবহার হয়নি। যৌগিক অর্থের দৃষ্টিতে আদিত্যের সমার্থক শব্দ রবি ও সূর্য দুটোই তথা অঙ্গিরা প্রাণকে বলে - প্রাণো বা অঙ্গিরা (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬.১.২.২৮)। ঋষি দয়ানন্দ য়জুর্বেদ ১১।১৫ মন্ত্রে অঙ্গিরার অর্থ সূর্য করেছেন। সূর্য হল প্রাণতত্ত্বের সবথেকে বড় ভাণ্ডার, এই কারণেই সূর্য থেকে অঙ্গিরাকে গ্রহণ করেছেন। সূর্যের মধ্যে অনেক ধরণের তীব্র বিস্ফোরণের জন্য ধ্বনি হতে থাকার কারণে তাকে রবি বলে। এইভাবে "রবি" ও "সূর্য" পদ থেকে আদিত্য ও অঙ্গিরা দুই ঋষিকে গ্রহণ ত্রয়ী বিদ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য হেতু করা হয়েছে। বস্তুতঃ অথর্ববেদের মধ্যে তিন প্রকারের বিদ্যা আছে। তাহলে তাকে কেবল কোনো একটা বিদ্যার সঙ্গে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়, সুতরাং বিদ্যার শৈলীর দৃষ্টিতে বেদ তিনটাই দর্শানো হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল ব্যক্তির নামের মধ্যে সমার্থক শব্দের ব্যবহার করা কি সাধু? আমার দৃষ্টিতে অগ্নি, বায়ু ও অঙ্গিরা ব্যক্তি বিশেষ নয়, বরং যে ঋষিগণ ক্রমশঃ ঋগ্বেদ, য়জুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদের জ্ঞান প্রাপ্ত করেন, তাঁদের নাম অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরাই হয়। এমনটা প্রত্যেক সৃষ্টির আদিতে হয়। এইভাবে এই নাম যৌগিক না হলেও, তবে য়োগরূঢ় তো হবেই, এই নাম যেন তাদের উপাধি। এই পরিস্থিতিতে ত্রয়ী বিদ্যার সামঞ্জস্যে তিন পদ থেকে চার পদের গ্রহণ সমার্থক শব্দের রূপেও গ্রহণ করা অনুচিত নয়। তাহলে আর্ষ প্রয়োগ সাধুই ধরা উচিত, এটা হল বৈদিক পরম্পরা। আমরা মানবীয় ইতিহাসের মধ্যেও এমন কিছু ব্যবহার দেখতে পারি, যেখানে "রাম" শব্দ থেকে তিন মহাপুরুষের গ্রহণ হতে দেখা যায়। সেই তিন ব্যক্তি হল - মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম, মহর্ষি পরশুরাম এবং বাসুদেব পুত্র বলরাম। এইভাবে এখানেও "রবি" বা "সূর্য" থেকে আদিত্য ও অঙ্গিরা দুই মহর্ষিকে গ্রহণ করা উচিত। অস্তু। (অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিকজীর বৈদিক রশ্মি বিজ্ঞানম্ লেখার অংশ বঙ্গানুবাদ)

(আদিত্যেভ্যঃ) = চার বেদ গ্রহণকারী ‘আদিত্য’ নামে পরিচিত বিদ্বান (যজু০ ৩৪।৫৪ হরিশরণ জী ভাষ্য)

নীচে ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকার প্রশ্নউত্তর অংশ দেওয়া হলঃ-
বেদোৎপত্তি বিষয়ে কেহ কেহ এরূপ প্রশ্ন করেন , যে পরমেশ্বর নিরাকার হওয়ায় কি প্রকারে শব্দ রূপ বেদ তাঁহা কর্তৃক উৎপন্ন হইতে পারে ?
ইহার উত্তর এই যে , পরমেশ্বর সর্বশক্তিমান , এজন্য তাঁহাতে এরূপ শঙ্কা করা যুক্তিযুক্ত নহে , কেননা মুখ প্রাণাদি সাধন ব্যতিরেকেও তদ্বিষযের কাৰ্য্য করিবার পরমেশ্বরের অনন্ত শক্তি বর্তমান আছে অর্থাৎ পরমাত্মা নিজ অনন্ত সামর্থ্য বলে , মুখ ও প্রাণাদি ব্যতীত , মুখ প্রাণাদির যথাবৎ কাৰ্য্য করণে সদা সমর্থ হয় । মুখ প্রাণাদি ( ইন্দ্রিয় . ) ব্যতীত , তত্তৎ ইন্দ্রিয়াদি জনিত কাৰ্য্য করণে আসক্ত রূপ দোষ , কেবল অল্পসামর্থযুক্ত জীবেরই ঘটিয়া থাকে , পরমাত্মায় ঘটে না । পুনশ্চ মানসিক কোন বিষয় বিচার করিবার সময় , যেরূপ আমরা বাক্যাদি সাধন ব্যতিরেকেও , মনে মনে প্রশ্নোত্তরাদিও শব্দোচ্চারণ করিতে সমর্থ হই , তদ্রূপ পরমেশ্বরের বিষয় জ্ঞাত হওয়া কর্তব্য । যিনি সৰ্ব্ব সামর্থ্যযুক্ত , তিনি কোন কাৰ্য্য করিবার জন্য , কখন কাহারও সহায়তা গ্রহণ করেন না । কারণ তিনি নিজ সামর্থ্য বলেই সকল প্রকার কার্য্য সাধনে সমর্থ হয়। যে প্রকার অন্যের সাহায্য ব্যতীত আমরা কোন কার্য্য করিতে সক্ষম নয়, ঈশ্বর সম্বন্ধে তদ্রূপ নহে। যেমন দেখ, যখন জগৎ উৎপন্ন ছিল না, সেই সময় নিরাকার ঈশ্বর সম্পূর্ণ জগৎ নির্মাণ করেন, তখন বেদ রচনায় শঙ্কা থাকতে পারে কি❓ যেমন বেদে অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিদ্যা রচনা করিয়াছেন, সেইরূপ জগতেও নেতাদি পদার্থগুলি অত্যন্ত আশ্চর্যরূপে রচনা করিয়াছেন, তাহা হইলে বেদের রচনা নিরাকার ঈশ্বর কেন করিতে পারেন না❓
প্রশ্নঃ - জগৎ রচনার সামর্থ ঈশ্বর ব্যতীত অন্য জীবে থাকিতে পারে না (ইহা সত্য বটে ) , পরন্তু ব্যাকরণাদি গ্রন্থ রচনায় যেরূপ জীবের সামর্থ আছে তদ্রূপ বেদ রচনায়ও জীবের সামর্থ হইতে পারে❓
উত্তরঃ - বেদ রচনায় জীবের সামর্থ নাই , কারণ ঈশ্বর রচিত বেদাধ্যয়নের পর, মনুষ্যের গ্রন্থ রচনার সামর্থ জন্মিতে পারে , অন্যথা নহে । অর্থাৎ বেদ শাস্ত্রের পঠন ও তদ্বিষয়ক জ্ঞান ভিন্ন , অন্য কোন উপায়ে মনুষ্যের বিদ্বান হওয়া সম্ভব নহে , যেহেতু কোন শাস্ত্র পাঠ করিয়া বা কোন উপদেশ শ্রবণ করিয়া , অথবা লােকের ব্যবহার দেখিয়াই , মনুষ্যের জ্ঞান জন্মে , অন্যথা অন্য কোন প্রকারে জ্ঞানােদয়ের সম্ভব হয় না । কারণ যদি আমরা কাহারও শিশু সন্তানকে ( শৈশব কাল হইতেই ) কোন নির্জন স্থানে রাখিয়া , যাবৎ তাহার মৃত্যু না হয় , তাবৎ তাহার সহিত লেশ মাত্র ভাষণাদি ব্যবহার না করিয়া , যুক্তি দ্বারা অন্নপানাদি প্রদান করি , তবে যেরূপ তাহার মনুষ্যোচিত কিছু মাত্র যথার্থ জ্ঞানােদয় হয় না অথবা যেরূপ মহারণ্যস্থিত মনুষ্যের উপদেশ ব্যতীত পশুবৎ প্রবৃত্তি হইয়া থাকে, তদ্রূপ আদি সষ্টি হইতে আজ পর্যন্ত বেদোপদেশ ব্যতীত, সকল মনুষ্যেরই পশুবৎ প্রবৃত্তি হইয়া থাকে, গ্রন্থ রচনা করা ত দূরের কথা । অতএব বেদ শাস্ত্র যে ঈশ্বরের রচিত, ইহা স্বীকার করাই কল্যাণদায়ক, অন্যথা নহে।
প্রশ্নঃ - ঈশ্বর মনুষ্যকে স্বাভাবিক জ্ঞান প্রদান করিয়াছেন , যাহা সকল গ্রন্থের জ্ঞান হইতে শ্রেষ্ঠ , কারণ ঐ স্বাভাবিক জ্ঞান ব্যতীত , বেদের শব্দার্থ ও সম্বন্ধ বিষয়ের জ্ঞান মনুষ্যের কদাপি ঘটিতে পারে না , এবং ঐ জ্ঞান ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইলে , তদ্দ্বারা মনুষ্যরা অনায়াসে পুস্তকাদি রচনা করিতে সমর্থ হন , এজন্য বেদ ঈশ্বর প্রসূত এরূপ কীজন্য স্বীকার করিব ❓
উঃ - ইতিপূর্বে বর্ণিত নির্জনস্থিত শিশু অথবা নিবিড় বনবাসী মনুষ্যদিগকে কি পরমেশ্বর স্বাভাবিক জ্ঞান প্রদান করেন নাই ❓ কীজন্যই বা তাহারা ঐ স্বাভাবিক জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়াও নিজ নিজ বলে বিদ্বান হইতে সমর্থ হন না ❓ এজন্য নিশ্চয় জানা উচিত , যে ঈশ্বরের কৃত বেদরূপ উপদেশ বিনা কখন কাহারও যথার্থ জ্ঞানােদয় হইতে পারে না। যেরূপ আমরা বেদাধ্যয়ন , বিদ্বানদিগের নিকট হইতে শিক্ষা , ও তাহাদিগের কৃত গ্রন্থাদি পাঠ বিনা পণ্ডিত হইতে সমর্থ হই না , তদ্রূপ সষ্টির আদিতে যদি পরমাত্মা বেদশাস্ত্রের উপদেশ না করিতেন , তাহা হইলে আজ পর্যন্ত কেহই বিদ্যাদি বিষয়ক যথার্থ প্রাপ্ত হইতে সমর্থ হইতেন না । ইহার দ্বারা আমরা কী বুঝিলাম? বুঝিলাম এই যে বিদ্বানের নিকট শিক্ষা এবং বেদাধ্যয়ন ব্যতীত , কেবল স্বাভাবিক জ্ঞান বলে, মনুষ্যের সকল কার্য নির্বাহ হইতে পারে না । যেরূপ আমরা প্রথমে অন্য বিদ্বান ব্যক্তির নিকট হইতে বেদাদি শাস্ত্রের লিখিত জ্ঞান ও বিজ্ঞান বিষয় শিক্ষা করিয়া , পরে গ্রন্থ রচনা করিতে সমর্থ হই, তদ্রূপ সর্ব প্রথমে সকল মনুষ্যেরই ঐশ্বরীয় জ্ঞানের নিত্যান্ত আবশ্যক আছে । সৃষ্টির প্রারম্ভে পঠন পাঠনের কোন ব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল না , অথবা মনুষ্য কৃত কোন বিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ বিদ্যমান ছিল না , অতএব সে সময় ঈশ্বর কৃত বেদশাস্ত্র প্রকাশ বিনা , কাহারও গ্রন্থ রচনার শক্তি ঘটিতে পারে না , কারণ কোন মনুষ্যেরই সহায়কারী জ্ঞান বিষয়ে স্বতন্ত্রতা নাই , ( অর্থাৎ বিদ্যা বা বস্তু বিষয়ক জ্ঞান অপরের নিকট হইতেই প্রাপ্ত হওয়া যায় অন্যথা নহে ) । লােকে কেবল স্বাভাবিক জ্ঞান বলে , বিদ্যা প্রাপ্ত হইতে সমর্থ হন না । এজন্য মনুষ্য মাত্রেরই হিতার্থে পরমেশ্বর বেদের উৎপত্তি ( প্রকাশ ) করিয়াছেন । পুনশ্চ আপনি যে বলিয়াছিলেন যে , স্বাভাবিক জ্ঞানই সর্বশ্রেষ্ঠ , সে কথাও যথার্থ নহে , কারণ স্বাভাবিক জ্ঞানও , সাধন সাপেক্ষ । যেরূপ মনের সংযােগ বিনা , কেবল দর্শনেন্দ্রিয় দ্বারা কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না , অথবা যেরূপ আত্মার সংযােগ বিনা , মন স্বয়ং কোন কাৰ্য্য করিতে পারে না , তদ্রূপ স্বাভাবিক জ্ঞানকেও জানিবে । এই স্বাভাবিক জ্ঞান , বেদশাস্ত্রও বিদ্বানদিগের গ্রন্থ বিষয়ক জ্ঞানােপার্জনের সাধন স্বরূপ হইয়া থাকে , নচেৎ ইহা কেবল পশুদিগের মত ( আহারও নিদ্রাদি ) সাধনােপযােগীমাত্র হইয়া থাকে । অর্থাৎ স্বাভাবিক জ্ঞান , নিজ স্বতন্ত্রতায় ধৰ্ম্ম , অর্থ , কাম ও মােক্ষ বিদ্যা বিষয়ক সাধন স্বরূপ হইতে পারে না ।
প্রশ্নঃ - ঈশ্বরের বেদোৎপাদন করিবার প্রয়ােজন কী ?
উত্তরঃ - আমি আপনাকেই জিজ্ঞাসা করিতেছি , যে পরমেশ্বরের বেদোৎপাদন না করিবারই বা প্রয়ােজন কী ?
আর যদি আপনি বলেন , যে আমি এরূপ প্রশ্নের উত্তর জানি না , তবে সে কথা সত্য বটে , কারণ বেদ ঈশ্বরের নিত্য বিদ্যা , এজন্য ইহার উৎপত্তি বা অনুৎপত্তি , দুইয়ের মধ্যে একটিও হইতে পারে না । পরন্তু আমাদিগের অর্থাৎ জীবের প্রয়োজন সাধনাৰ্থে পরমেশ্বর বেদশাস্ত্র প্রকাশ করিয়াছেন , এজন্য পরমাত্মা আমাদিগের প্রতি বিশেষ কৃপা করিয়াই বেদোৎপত্তি বা বেদশাস্ত্র প্রকাশ করিয়াছেন তাহা আপনারা জ্ঞাত হইবেন । ।
প্রশ্নঃ - ঈশ্বরে অনন্ত বিদ্যা আছে কী না ?
উত্তরঃ - আছে।
প্রশ্নঃ - সেই বিদ্যার আবশ্যকতা কি ?
উত্তরঃ - নিজের জন্যই আছে , যদ্বারা তিনি সমস্ত পদার্থ রচনা করেন , ও তদ্বিষয়ে জ্ঞাত হইয়া থাকেন। ভাল আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি যে ঈশ্বর পরােপকার করেন কি না ?
প্রশ্নঃ - ঈশ্বর পরােপকারী বটে , পরন্তু তাহাতে আপনার কী সিদ্ধ হইল ?
উত্তরঃ - ইহাতে এই সিদ্ধ হইতেছে যে , বিদ্যা , স্বার্থ ও পরার্থ জন্য হইয়া থাকে, কারণ স্বার্থ ও পরাৰ্থ সিদ্ধ করাই বিদ্যার স্বাভাবিক গুণ । যদ্যপি পরমেশ্বর আমাদিগের জন্য বেদবিদ্যা উপদেশপ্রদান না করেন , তাহা হইলে বিদ্যা প্রদানরূপ পরােপকার গুণ তাহাতে বর্তে না , তজ্জন্য পরমেশ্বর স্ববিদ্যাযুক্ত বেদোপদেশ দ্বারা , তাঁহার বিদ্যোপদেশের সপ্রয়ােজনতা সম্পাদন করিয়াছেন , যেহেতু পরমেশ্বর আমাদিগের পিতা মাতার স্বরূপ , আমরা সকলে তাঁহারই প্রজা , তিনি সর্বদাই আমাদিগের প্রতি কৃপা দৃষ্টি রাখিয়া থাকেন এবং যেরূপ পিতা মাতা সন্তানদিগের প্রতি সদৈব করুণা প্রকাশ করেন , যাহাতে তাহারা সর্ব প্রকারে সুখ প্রাপ্ত হয় , তদ্রূপ ঈশ্বরও সকল মনুষ্যাদি সৃষ্টির প্রতি সদৈব কৃপাদৃষ্টিকরিয়া থাকেন , এবং তজ্জন্যই পরমেশ্বর যাবতীয় মনুষ্যের কল্যাণের জন্য , কৃপাপূর্বক বেদশাস্ত্রের উপদেশ দিয়াছেন । যদি পরমেশ্বর মনুষ্যের হিতার্থে বেদোপদেশ না দিতেন , তবে অন্ধ পরম্পরায় কাহারও ধৰ্ম্ম , অর্থ , কাম , মোক্ষের সাক্ষাৎ প্রাপ্তি হইত না, সুতারাং কেহই পরমানন্দ প্রাপ্ত হইতে সমর্থ হইতেন না, যখন পরম দয়ালু পরমেশ্বর প্রজাদিগের সুখার্থে কন্দমূল ফলাদি ও তৃণাদি ক্ষুদ্র পদার্থ সৃজন ও রচনা করিয়াছেন, তখন সেই ঈশ্বর সর্বসুখ প্রকাশিকা সর্ব সত্যবিদ্যাময়ী বেদবিদ্যার উপদেশ প্রজাদিগের সুখার্থে কেন করিবেন না? ব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় উৎকৃষ্ট পদার্থ প্রাপ্তি দ্বারা যে সুখ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহা সত্য বিদ্যালব্ধক সুখের সহস্রাংশের একাংশের সহিত তুল্য হইতে পারে না। এজন্য এরূপ সর্বোত্তম বিদ্যা পদার্থ যাহাকে বেদ বলে তাহার উপদেশ পরমেশ্বর কেন করিবেন না ? এতএব নিশ্চয় জানিও যে বেদ ঈশ্বর প্রণীত।
প্রশ্নঃ- ঈশ্বর বেদ পুস্তক লিখিবার জন্য লেখনী মসীও পাত্রোদি সাধন কোথায় প্রাপ্ত হইলেন ?যেহেতু সে সময় কাগজাদি পদার্থ রচিত হয় নাই ?
উত্তরঃ- অহো! আপনি ত বড়ই শঙ্কা করিতেছেন, আপনার বুদ্ধির কী বিশেষ প্রশংসা করিব? ভাল আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞসা করি, যে হস্ত পদাদি অবয়ব ওকাষ্ঠ লোষ্ট্রাদি সাধন ব্যতিরেকেও জগদীশ্বর কীরূপে জগৎ রচনা করিতে সামর্থ হইয়াছিলেন ? যেরূপ হস্ত পদাদি ব্যতিরেকেও পরমেশ্বর জগৎ রচনা করিয়াছেন। তদ্রূপ লেখনী মসী ও পাত্রাদি সাধন ব্যতীতও ঈশ্বর বেদ শাস্ত্র রচনা করিয়াছেন। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান এজন্য তাঁহার সামর্থ্য বিষয়ে আপনার এরূপ শঙ্কা করা যোগ্য ও যুক্তিযুক্ত নহে। পরন্তু আপনার প্রশ্নের উত্তর ইহাও জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক যে, বেদশাস্ত্রকে পুস্তকাকারে লিখিয়া, সৃষ্টির আদিতে পরমেশ্বর প্রকাশ করেন নাই।
প্রশ্নঃ - তবে ঈশ্বর কী প্রকারে বেদ প্রকাশ করিয়াছিলেন ?
উত্তরঃ – ঈশ্বর জ্ঞান মধ্যে বেদশাস্ত্রকে প্রেরণা দিয়াছিলেন ।
প্রশ্নঃ – কাহাদের জ্ঞান মধ্যে প্রেরণা দিয়াছিলেন?
উত্তরঃ – অগ্নি , বায়ু , আদিত্য ও আঙ্গিরা ঋষিদিগের মধ্যে ।
প্রশ্নঃ - তাঁহারাও ত জ্ঞান রহিত জড় পদার্থ ছিলেন ?
উত্তরঃ - না না এরূপ বাক্য বলিবেন না , ইহারা সৃষ্টির আদি সময়ে শরীরধারী মনুষ্য ছিলেন , যেহেতু জড় পদার্থে জ্ঞানের কাৰ্য্য বা প্রকাশ অসম্ভব , এবং যে যে স্থানে অর্থ অসম্ভব হয় , তথায় লক্ষণা হইয়া থাকে , অর্থাৎ যে লক্ষণ ধরিলে , ঐ কাৰ্য্য বা অর্থ সম্ভব , তথায় তদনুযায়ী অর্থকরিতে হইবে । যেমন কোন সত্যবাদী ধর্মাত্মা বিদ্বান আপ্ত পুরুষ যদি বলেন যে , ক্ষেত্র মধ্যে মঞ্চ শব্দ করিতেছে ' , এস্থলে লক্ষণ দ্বারা এরূপ বুঝিতে হইবে , যে মঞ্চের স্বয়ং শব্দ করা অসম্ভব , অতএব মঞ্চস্থ কোন ব্যক্তি শব্দ করিতেছে । তদ্রপ ইহাও জ্ঞাত হইবেন যে , মনুষ্যেই বিদ্যার প্রকাশ হওয়া সম্ভব , অন্যত্র নহে । এবিষয়ে ( তেভ্যঃ ) ইত্যাদি শতপথ ব্রাহ্মণের প্রমাণ লিখিত আছে যে ( অগ্নি বায়ু , আদিত্য ও অঙ্গিরা ) এই চারি ঋষিগণের জ্ঞান মধ্যে পরমেশ্বর ( বেদ ) প্রেরণা দিয়া ছিলেন , পরে ঐ চারি ঋষি ব্রহ্মাদি ঋষিগণের মধ্যে চারি বেদ প্রকাশ করিয়াছিলেন ।
প্রশ্নঃ - ইহা সত্য বটে , যে ঈশ্বর ঐ ঋষিদিগকে জ্ঞান দান করিয়াছিলেন । পরন্তু তাহারা ( প্রথমে জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া পরে ) নিজ জ্ঞান দ্বারা বেদ রচনা করিয়া লইয়াছেন ?
উত্তরঃ – আপনার এরূপ বলা উচিত নহে । কারণ ঈশ্বর তাহাদিগকে কী প্রকার জ্ঞান প্রদান করিয়াছিলেন , তাহা কি আপনি অবগত আছেন ? পরমেশ্বর ঐ ঋষিগণকে ।বেদরূপ জ্ঞানই প্রদান করিয়াছিলেন ।
প্রশ্নঃ – তবে আমি জিজ্ঞাসা করি ,ঐ জ্ঞান ঈশ্বরের অথবা উক্ত ঋষিদিগের ?
উত্তরঃ - ঐ জ্ঞান ঈশ্বরেরই ।
প্রশ্নঃ – পুনঃ আপনাকে জিজ্ঞাসা করি , বেদ ঈশ্বর রচনা করিয়াছেন অথবা উক্ত ঋষিগণ ?
উত্তরঃ - যাহার জ্ঞান তিনিই তাহার প্রণেতা ।
প্রশ্নঃ - তবে আপনি কী জন্য শঙ্কা করিয়াছিলেন যে , উক্ত ঋষিগণই বেদশাস্ত্রের প্রণেতা ?
উত্তরঃ - এ বিষয় নিশ্চয় করিবার ও করাইবার জন্যই ঐরূপ শঙ্কা করিয়াছিলাম ।
প্রশ্নঃ - ঈশ্বর ন্যায়কারী অথবা পক্ষপাতী ?
উত্তরঃ - তিনি ন্যায়কারী ।
প্রশ্নঃ- তিনি যদি ন্যায়কারী তবে তিনি কীজন্য সকলের হৃদয়ে বেদ প্রকাশ করিলেন না , কেবল চারিজনের হৃদয়ে প্রকাশ করায় কি তাঁহার পক্ষপাতিত্ব প্রমাণ হইল না ?
উত্তরঃ – ইহাতে ঈশ্বরে লেশমাত্র পক্ষপাতিত্ব আরােপিত হইতে পারে না , বরং ন্যায়কারী পরমাত্মার সম্যক্ ন্যায়েরই প্রকাশ হইয়াছে । কারণ যে ব্যক্তি যেরূপ কৰ্ম করে , তাহাকে তদনুযায়ী ফল প্রদান করাই ন্যায় ব্যবহারের কার্য বলা হয় । অতএব জানিবেন যে , উক্ত চারি ঋষিগণের এরূপ পূৰ্ব জন্মার্জিত পণ্য ছিল যে তাহাদিগের হৃদয়ে বেদ প্রকাশ করা ঈশ্বর উচিত বিবেচনা করিয়াই উহা প্রকাশ করিয়াছিলেন।
প্রশ্নঃ - এই চারি পুরুষই সৃষ্টির প্রথমেই উৎপন্ন হইয়াছিলেন । অতএব ইহাদিগের পূর্ব পূণ্য কোথা হইতে আসিল?
উত্তরঃ - জীব , জীবের কর্ম ও জগতের কারণ ( প্রকৃতি ) এই তিনই অনাদি । জীব ও কারণ জগৎ স্বরূপতঃ অনাদি এবং জীবের কৰ্ম ও প্রকৃতি ইঁহারা প্রবাহরূপে অনাদি , এবিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রমাণসহকারে পরে লিখিত হইতেছে ।
প্রশ্নঃ - গায়ত্র্যাদি কি ঈশ্ববই রচনা করিয়াছেন ?
উত্তরঃ – আপনার এরূপ সংশয় কোথা হইতে আসিল ?
প্রশ্নঃ - আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি যে , গায়ত্র্যাদি ছন্দ রচনা করিবার জ্ঞান কি ঈশ্বরের নাই ?
উত্তরঃ – ঈশ্বর সর্ব বিদ্যাযুক্ত হেতু তাঁহার গায়ত্র্যাদি ছন্দ রচনার জ্ঞান আছে। সুতরাং আপনার এরূপ সংশয় করা নিরর্থক জানিবেন ।
প্রশ্নঃ - চতুর্মুখব্রহ্মা বেদ রচনা করিয়াছেন , এরূপ ইতিহাস আমরা শুনিতে পাই?
উত্তরঃ - আপনার এরূপ কথা সঙ্গত নহে । কারণ ঐতিহাসিক প্রমাণ শব্দ প্রমাণের অন্তর্গত ন্যায়শাস্ত্রে গােতমাচার্য সত্যবাদী সাক্ষাৎকৃতধর্মা , বিদ্বান্ ব্যক্তির উপদেশকেই শব্দ প্রমাণ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন এবং যাহা শব্দপ্রমাণযুক্ত , তাহাকেই ঐতিহ্য বা ঐতিহাসিক প্রমাণ বলা যায় । বাৎসায়ন মুনি ন্যায়ভাষ্যে আপ্তের লক্ষণ লিখিয়াছেন যে , যিনি সাক্ষাৎ সমস্ত পদার্থ বিদ্যার জ্ঞাতা , কপটতাদি রহিত ও ধর্মাত্মা ,যিনি সত্যবাদী , সত্যমানী ও সত্যকারী এবং যিনি পূর্ণ বিদ্যাযুক্ত ও দয়াপরবশ হইয়া স্বেচ্ছায় পরােপকারার্থে ও সকলের সুখ বৃদ্ধির জন্য নিজ নির্ভ্রান্ত জ্ঞান অপরকে প্রদান করেন এবং যিনি পৃথিবী হইতে পরমাত্মা পর্যন্ত সমস্ত পদার্থের যথাবৎ সাক্ষাৎ করিয়াছেন ও যিনি তদনুযায়ী নিজ আচরণের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন , এরূপ শুভ গুণকেই আপ্তি বলা হয় । এইরূপ আপ্তি অর্থাৎ শ্রেষ্ঠগুণযুক্ত মনুষ্যকেই ' আপ্ত ' বলা হয় । এইরূপে আপ্তের বচন বা উপদেশই শব্দপ্রমাণ বলা হইয়া থাকে । আপ্তের লক্ষণের বিপরীত লক্ষণযুক্ত মনুষ্যের বাক্য শব্দপ্রমাণ নহে , যেহেতু সত্য বৃতান্তকেই ইতিহাস বলা হয়, অসত্য বৃতান্ত ইতিহাস নহে । এই কারণে যে সকল ইতিহাস সত্যপ্রমাণযুক্ত তাহাই গ্রহনীয় ও যাহা অসত্য তাহা অগ্রাহ্য । প্রমাদযুক্ত পুরুষ লিখিত মিথ্যা বৃত্তান্ত কদাপি গ্রাহ্য হইতে পারে না । এজন্য ব্যাসদেব চারি বেদ সংহিতা ভাগকে সংগ্রহ করিয়াছেন ইত্যাদি ইতিহাস বা বৃত্তান্তকে সদা মিথ্যা বলিয়া জানিবে । এইরূপ আজকালের নবীন ব্রহ্মবৈবর্তাদি পুরাণ ও ব্রহ্ময়ামল আদি তন্ত্র গ্রন্থাদির লিখিত বৃত্তান্তকে কদাপি প্রমাণ বলিয়া স্বীকার করা মনুষ্যের কর্তব্য নহে , কারণ এই সকল পুস্তকে অসম্ভব , অপ্রমাণ ও কপােল কল্পিত মিথ্যা ইতিহাসরূপ অনেক কথা লিখিত আছে , অতএব শতপথ ব্রাহ্মণাদি সত্যগ্রন্থে ইতিহাস বা লিখিত বৃত্তান্তকে কদাপি মিথ্যা বলিয়া ত্যাগ করা কর্তব্য নহে।
প্রশ্নঃ - বেদমন্ত্র ও সূক্তে যে সকল ঋষির নাম লেখা আছে তাঁহারা কী জন্য বেদ রচনাকারী হইবেন না?
উত্তরঃ- এরূপ বলিবেন না, যেহেতু ব্রহ্মাদি ঋষিগণও বেদাধ্যয়ন করিয়াছিলেন। এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে লিখিত আছে যে
পরমাত্মা ব্রহ্মাকে উৎপন্ন করিয়া সৃষ্টির আদিতে অগ্নি বায়ু আদি ঋষি দ্বারা বেদের উপদেশ করিয়াছেন, সেই পরমেশ্বরের আশ্রয় যেন আমরা প্রাপ্ত হই । এমন কি যখন মরীচ্যাদি ঋষি এবং ব্যাসাদি মুনিগণের জন্ম পযর্ন্ত হয় নাই তখনও ব্রহ্মাদির নিকটে বেদশাস্ত্র বর্তমান ছিল এবিষয়ে ভগবান মনু বলিয়াছেন যে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরার নিকট হইতে ব্রহ্মা ঋষিও বেদপাঠ করিয়াছিলেন, তখন ব্যাসাদি বা আমাদিগের কথাই আসিতে পারে না।
প্রশ্নঃ - ঋগ্বেদাদি সংহিতার বেদ ও শ্রুতি এই দুই নাম কী জন্য হইল ?
উত্তরঃ – অর্থভেদ হেতু । কারণ এক ( বিদ্ ) ধাতুই জ্ঞানার্থ , সত্যার্থ , লাভার্থ ও বিচারার্থ এই চারি প্রকার অর্থ বাচক হইয়া থাকে । তৎপরে ঐ " বিদ " ধাতু করণ এবং অধিকরণ কারকে “ ঘঞ্ প্রত্যয় ’' করিলে “ বেদ ’ ’ শব্দ সিদ্ধ হইয়া থাকে । এইরূপ ( শ্রু ) ধাতু শ্রবণ অর্থ বাচক , ইহাতে করণ কারকে
‘ ‘ ক্তিন্ ' ' প্রত্যয় করিলে “ শ্রুতি " পদ সিদ্ধ হয় । যাহা পাঠ করিলে মনুষ্যগণ সমস্ত সত্য বিদ্যার জ্ঞাতা হন , যাহা পাঠ করিলে লােকে বিদ্বান হইতে সমর্থ হন ও যদ্বারা মনুষ্যেরা সত্যাসত্যের বিচার করিতে সমর্থ হন তাহাকে বেদ বলে । এজন্যই ঋগ্বেদাদি সংহিতার নাম বেদ সংজ্ঞা দেওয়া হইয়াছে । পুনশ্চ সৃষ্টির আদি হইতে আজ পর্যন্ত ব্রহ্মাদি হইতে যাবতীয় মনুষ্য সকলেই যদ্বারা সত্যবিদ্যা শ্রবণ করিয়া আসিতেছেন তাহাকে শ্রুতি বলে এবং এইজন্যই সংহিতা বা বেদকে শ্রুতি বলা হয় । আজ পর্যন্ত কোন ব্যক্তিই কোন দেহধারীকে বেদের প্রণেতা বলিয়া শুনেন নাই , ইহারই বা কারণ কী ? এজন্যই বেশ বুঝা যাইতেছে যে , নিরাকার ঈশ্বর হইতেই বেদের উৎপত্তি বা প্রকাশ হইয়াছে । এবং এই কথাই আমরা লােক পরম্পরায় শুনিয়াও আসিতেছি । পুনশ্চ যেমন কোন ব্যক্তি বাদ্যযন্ত্র বাজাইয়া থাকেন অথবা কাষ্ঠ পুতুলকে নৃত্য করাইয়া থাকেন , সেই প্রকার পরমেশ্বর বেদের প্রকাশার্থে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চারি জন ঋষিকে নিমিত্ত মাত্র করিয়াছিলেন। এই ঋষিদিগের নিজ জ্ঞান দ্বারা বেদের উৎপত্তি বা প্রকাশ হয় নাই। কিন্তু বেদের যাবতীয় শব্দার্থ সম্বন্ধপূর্ণ ও বিদ্যাযুক্ত পরমেশ্বর নিজ জ্ঞান বলেই উপরোক্ত ঋষিদিগের দ্বারা প্রকট করিয়াছেন। এতদ্দ্বারা ইহাই সিদ্ধ হইতেছে যে, পরমেশ্বর মনুষ্যদেহধারী অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চারি ঋষিগণের হৃদয়ে বেদের প্রকাশ করিয়াছেন।

(অঙ্গিরস্বত্) = বায়ু, সূর্য ও অগ্নির ন্যায় তেজস্বী ও বলবান (যজুর্বেদ ৩৪।১৬)
(অঙ্গিরসঃ) = প্রত্যেক অঙ্গের রস বা শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ (যজুর্বেদ ৩৪।১৭) 
অথর্বাঙ্গিরসো =অথর্ব০ ১০।৭।২০ 

বেদজ্ঞান মানুষ কীভাবে লাভ করল?

সৃষ্টির সূচনালগ্নেই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে বেদের ঋচাগুলি বিদ্যমান হয়ে যায়। এর অর্থ হলো—সূক্ষ্মতম কণিকা থেকে শুরু করে বৃহৎ নক্ষত্র, গ্রহ ও গ্যালাক্সি পর্যন্ত—সমস্ত কিছুই এই ঋচাগুলির দ্বারাই গঠিত। এই ঋচাগুলি ‘পরা’ ও ‘পশ্যন্তী’ অবস্থায় সমগ্র অন্তরীক্ষে পরিব্যাপ্ত থাকে। অর্থাৎ, বেদের ছন্দসমূহ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে বিস্তৃত এবং পরস্পরের প্রতি নিরন্তর গতিশীল।

মানবজাতির প্রথম প্রজন্মে চারজন অত্যন্ত পবিত্র আত্মা—চার ঋষি—সমাধিতে নিমগ্ন হয়ে, ঈশ্বরের অনুপ্রেরণায়, এই ঋচাগুলিকে তাঁদের চিত্তে গ্রহণ করেন। সেই সময় পর্যন্ত কোনো মানুষের কাছেই ভাষা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, ভাষার উৎপত্তিই পরে এই ঋচাগুলির অপভ্রংশ রূপ থেকে ঘটে। এই দিব্য বাণীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা সমতুল্য কোনো ভাষা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে নেই।

যখন এই ঋষিগণ গভীর একাগ্রতা ও সমাধিস্থ চিত্তে অন্তরীক্ষ থেকে এই বাণীগুলি গ্রহণ করেন, তখন সেই মন্ত্রগুলি সম্পূর্ণ ও শুদ্ধ রূপে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের অন্তঃকরণে প্রবেশ করে। এটি কোনো কণ্ঠস্থ করার প্রক্রিয়া নয়; বরং তা তাৎক্ষণিক ও স্বাভাবিক এক অনুভব। অন্তরীক্ষে যেভাবে মন্ত্রগুলি বিদ্যমান থাকে, ঠিক সেই রূপেই সেগুলি ঋষিদের স্মৃতিপটে অক্ষুণ্ণভাবে অঙ্কিত হয়ে যায়—একটিও অক্ষর বা শব্দাংশ নষ্ট হয় না।

ঋষিগণ অন্তরীক্ষ থেকে আগত ঋচা ও তাদের পদসমূহ ক্রমান্বয়ে অনুভব করেন এবং একই সঙ্গে তাতে নিহিত সম্পূর্ণ বিজ্ঞানও আত্মস্থ করেন। এই ঋচাগুলি সূক্ষ্ম রূপে অন্তরীক্ষের ঋষি-রশ্মিতে পরিব্যাপ্ত থাকে, আর সেখান থেকেই ঋষিগণ সেগুলিকে নিজেদের অন্তঃকরণে গ্রহণ করেন।

এই চার ঋষি সমাধিস্থ মনের দ্বারা ঋচাগুলিকে এমনভাবে ছেঁকে গ্রহণ করেন, যেমন চালুনির সাহায্যে সত্তু বা আটা ছাঁকা হয়। যেমন চালুনি ছাড়া সত্তু বিশুদ্ধ করা কঠিন, তেমনি সমাধিস্থ মন ছাড়া অন্তরীক্ষে পরিব্যাপ্ত ঋচাগুলিকে গ্রহণ করাও অসম্ভব। এই উপমা এটিও বোঝায় যে—ঋষিরা মন্ত্র গ্রহণ করেছেন বলেই সমগ্র সৃষ্টিতে কেবল এই মন্ত্রগুলিই ছিল, এমন নয়; কারণ যদি তাই হতো, তবে ‘ছেঁকে নেওয়া’র উপমারই প্রয়োজন পড়ত না।

এই চার ঋষি সমস্ত প্রাণীর কল্যাণকামী এবং মুক্তিলাভের পর পুনর্জন্ম গ্রহণকারী শ্রেষ্ঠ সত্তা। সেই কারণেই ঈশ্বরের কৃপায় তাঁরা মন্ত্র, তার পদ ও অর্থের নিত্য সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। এই মন্ত্রগুলিতে সমগ্র সৃষ্টির তত্ত্ব জানার পূর্ণ বিজ্ঞান নিহিত রয়েছে, যা প্রত্যেক মানুষের জন্য সর্বতোভাবে কল্যাণকর।

নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এই ঋচাগুলিকে গ্রহণ করে, তাঁরা মহর্ষি আদ্য ব্রহ্মার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে তা প্রচার করেন। এই বেদবাণী প্রধানত সাত প্রকার ছন্দে বিন্যস্ত।

উপসংহার
ঋগ্বেদের তিনটি মন্ত্র থেকে স্পষ্ট হয় যে, আকাশে অসংখ্য ঋচা ছন্দরূপী প্রাণ-রশ্মি হিসেবে সদা বিদ্যমান। অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা—এই চার ঋষি সমাধি অবস্থায় পরমাত্মার কৃপায় অন্তরীক্ষস্থ এই ঋচাগুলির মধ্য থেকে মানবজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ঋচাগুলিকে ছেঁকে নিয়ে নিজেদের চিত্তে ধারণ করেন। এই ঋচাগুলিই ক্রমে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদের রূপ ধারণ করে। এই চার ঋষি কেবল মন্ত্রের সংগ্রাহকই নন, বরং পরমাত্মার কৃপায় তাঁদের বাণী ও অর্থও সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেন। পরবর্তীতে তাঁরা এই সমগ্র জ্ঞান মহর্ষি আদ্য ব্রহ্মাকে প্রদান করেন, যার মাধ্যমে জগতের মধ্যে জ্ঞানের প্রবাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে অগ্রসর হতে থাকে।

সূত্র — বৈদিক রশ্মিবিজ্ঞানম্

সায়াণাচার্যকৃত ঋগ্বেদভাষ্যভূমিকা (পৃষ্ঠা ১০)
সায়াণাচার্যকৃত ঋগ্বেদভাষ্যভূমিকা (পৃষ্ঠা ১০)

“ঋগ্বেদ এবাগ্নেরজায়েত, যজুর্বেদো বায়োঃ, সামবেদ আদিত্যাৎ”—এই শ্রুতি (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৫।৩২) থেকে বোঝা যায় যে, ঈশ্বর প্রেরক (অনুপ্রেরণাদাতা) হিসেবে আছেন।

অর্থাৎ, বলা হচ্ছে—ঋগ্বেদের প্রকাশ অগ্নি থেকে, যজুর্বেদের প্রকাশ বায়ু থেকে এবং সামবেদের প্রকাশ আদিত্য থেকে হয়েছে।

নিরুক্ত (ভগবদ্দত্ত পৃ ৩৮৬)

ঋষি এবং দেবতা—বেদের ঋষি দুই ধরনের:

  1. আন্তরীক্ষ বা দ্যঃলোকস্থ (দ্যোলোকস্থ) দেব ঋষি। {দ্যুঃলোকস্থ} "ঋষ্যঃ সপ্ত দৈব্যাঃ” (ঋগ্বেদ ১০।১৩০।৭)

  2. পৃথিবীতে অবস্থানকারী মানব ঋষি।

দেব ঋষিদের নাম অনুসরণ করেই পার্থিব ঋষিরা নিজেদের নাম রেখেছেন। ইতিহাসে এর দৃঢ় প্রমাণ পাওয়া যায়। (ভারতবর্ষের বৃহৎ ইতিহাস, ভাগ২, পৃ ১৪৮)

মন্ত্রপাঠে যেসব ঋষি নাম এসেছে, তারা মূলত দেব ঋষিদের স্থায়ী নাম। যেমন—বসিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভারদ্বাজ ইত্যাদি।

এজন্য যাস্ক ও অন্যান্যজ্ঞরা এই নামগুলোর সাধারণ মানব অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন।

বেদে পৃথিবীর মানুষের ইতিহাস নেই। বেদ মন্ত্রগুলো পার্থিব মানব সৃষ্টি হওয়ার আগেই সৃষ্টি হয়েছিল, এবং পার্থিব ঋষিরা ঈশ্বর প্রেরণা ও ব্রহ্মপ্রেম দ্বারা সেগুলো শুনেছেন।

মহাভারত এবং বৃহদ্‌দেবতায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—

(ক)
“যস্য রশ্মিসাহস্ত্রেষু শাখাস্বিব বিধঙ্গমাঃ।
বসন্ত্যাশ্রিত্য মুনযঃ সংসিদ্ধা দৈবতৈঃ সহ ॥”

(খ)
“দেবান্ যথায়থং সর্বান্ নিভেষ্য স্বেষু রশ্মিষু ॥” (বৃহদ্‌দেবতা ১.৬৩)

অর্থাৎ—সূর্যের রশ্মির সাথে এখনো ঋষি এবং দেবতা বিদ্যমান।

এই দেব এবং ঋষি ভৌত, এবং প্রকৃতির ফল। ঈশ্বরের মহাশক্তি দ্বারা তাদের বহুবিধ ক্রিয়া ঘটে।

তাদের মধ্যেই কখনও মন্ত্র সৃষ্টি হয়েছিল, যেমন—

সহস্তোমাঃ সহছন্দস আভৃতঃ সহপ্রমাঃ ঋষ্যঃ সপ্ত দৈব্যাঃ।
পূর্বেষাং পন্থাম অনুদৃশ্য ধীরা অন্বালেবিরে রথ্যো ন রশ্মীন্॥ ঋ০ ১০।১৩০।৭

(সহস্তোমা:) ঋচা-সমূহসহ, (সহ-ছন্দসঃ:) ছন্দসহ, (সহ-প্রমাঃ:) পরিমাপসহ, (আবৃতঃ:) বিদ্যমান। (সপ্ত দৈব্য ঋষ্যঃ:) সাত জ্ঞানদ্রষ্টা, (ধীরাঃ:) প্রজ্ঞাবান ঋষিগণ। (পূর্বেষাং পন্থাম অনুদৃশ্য:) পূর্বে বিদ্যমান ঋষিদের পথ দেখে, (অনু আলেবিরে:) তা অবলম্বন করে, তারা অবিচলিতভাবে যজ্ঞ সম্পন্ন করে, যেমন লাগাম ধরে ঘোড়াকে চালানো হয়। এই সাত দৈব ঋষি আধ্যাত্মিকভাবে সাত শীর্ষ প্রাণ হিসেবে বিবেচিত। আত্মা: প্রজাপতি, তিনি ১০০ বছর ধরে যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। (পদার্থ ভাষ্য হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)

জয়দেব শর্মাকৃত পদার্থঃ

(সহস্তোমাঃ) স্তোত্রসমূহ, ঋচাসমূহসহ, (সহছন্দসঃ) ছন্দসহ, (সহপ্রমাঃ) পরিমাপসহ প্রমা অনুযায়ী, (আবৃতঃ) উপস্থিত, (সপ্ত দৈব্যাঃ ঋষ্যঃ) সাত দেবীয়, জ্ঞানী ঋষি, (ধীরাঃ) বুদ্ধিমান ঋষিগণ, (পূর্বেষাং পন্থাম অনুদৃশ্য) পূর্বজ্ঞানী ঋষিদের পথ দেখে, (অনু আলেবিরে) সেই পথকে অবলম্বন করে, (রথ্যঃ রশ্মীন্ ন) যেন ঘোড়ার দণ্ড বা লাগাম সমান নিয়মে, তারা প্রতিদিন, ধারাবাহিকভাবে, নিরন্তর যজ্ঞ সম্পন্ন করে।

ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজককৃত পদার্থ ভাষ্যঃ

(সহস্তোমাঃ) স্তোত্রবচনসমূহের সঙ্গে, (সহ ছন্দসঃ) ছন্দসমূহের সঙ্গে, (আবৃতঃ) আবর্তনকারী বা নিয়মিত পালনকারী, (সহপ্রমাঃ) পরিমাপসহ, (সপ্ত-দৈব্যাঃ) সাতটি জ্ঞানপ্রদর্শক ঋষি; সাতটি উচ্চতম প্রাণ বা মন-বুদ্ধি-চেতনাসহ, শ্রোতৃ, চোখ ও বাণী সমেত; (পূর্বেষাং পন্থাম্) পূর্বে মুক্ত প্রাপ্তদের পথ অনুধাবন করে, (ধীরাঃ অন্বালেভিরে) মননশীলভাবে অনুপ্রাপ্তি লাভ করে; (রথ্যঃ ন রশ্মীন্) ঠিক যেমন রথসওয়ামী ঘোড়ার লাগাম ধরে পথ অতিক্রম করে।

“অগ্নিবায়ুরবিভ্যস্তু ত্রয়ং ব্রহ্মা সনাতনম্।
দুদোহ যজ্ঞসিদ্ধ্যর্থমৃগ্ যজুঃসামলক্ষণম্॥
 বিশুদ্ধমনুস্মৃতি ১।২৩॥”

অর্থ—সেই পরমাত্মা (যজ্ঞসিদ্ধ্যর্থম্‌) জগতে ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ প্রভৃতি সমস্ত ব্যবহারের সিদ্ধির জন্য অথবা জগতের সিদ্ধি অর্থাৎ জগতের সমস্ত রূপের জ্ঞান লাভের জন্য [যজ্ঞে জগতি প্রাপ্তব্যা সিদ্ধিঃ যজ্ঞসিদ্ধিঃ, অথবা যজ্ঞস্য সিদ্ধিঃ যজ্ঞসিদ্ধিঃ] (অগ্নি-বায়ু-রবিভ্যঃ তু) অগ্নি, বায়ু ও রবি নামক ঋষিদের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে (ঋগ্ য়জুঃসামলক্ষণং ত্রয়ং সনাতনং ব্রহ্ম) ঋক্‌-জ্ঞান, যজুঃ-কর্ম ও সাম-উপাসনারূপ ত্রিবিধ জ্ঞানসম্বলিত ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ ও সামবেদ নামক নিত্য বেদসমূহকে (দুদোহ) দোহন করে প্রকাশ করলেন। ॥ ২৩ ॥ -সুরেন্দ্র কুমারজী

অগ্নিবায়ুরবিভ্যন্বিত্যাদি। ব্রহ্ম ঋগ যজুঃসামসংজ্ঞা বেদত্রয়ং অগ্নিবায়ুরবিভ্য আকৃষ্টবান, সনাতনং নিতাম্। বেদাপৌরুষেরত্বপক্ষ এব মনোবভিষতঃ পূর্ব্বকল্পে যে বেদান্ত এব পরমাত্মমূর্তেত্র ঋণঃ সর্ব্বজ্ঞস্য মৃত্যারূঢ়াঃ তানেব কল্পাদৌ অগ্নিবায়ুর বিভ্য আচকর্ষ। শ্রৌতশ্চায়মর্থো ন শঙ্কনীয়ঃ। তথা চ শ্রুতিঃ-অগ্নেঋগ্বেদো বায়োর্যজুর্বেদ আদিত্যাৎ সামবেদ ইতি। আকর্ষণার্থত্বাব্দ হিধাতোলারি-বায়ুরধীণামকথিতকৰ্ম্মতা, কিন্তু অপাদানতৈব। যন্ত্রসিদ্ধ্যর্থং ত্রয়ীসম্পাস্বত্বাৎ যজ্ঞানাম্ আপীনস্থক্ষীরবং বিদ্যমানানামের বেদানামভিব্যক্তি প্রদর্শনার্থম্ আকর্ষণবাচকো গৌণো দুহিঃ প্রযুক্তঃ। ২৩॥ কুল্লুকভট্ট

ভিন্ন এব দেবতা অমিপ্রভৃত্য ইতি নৈরুক্তাঃ সত্যপ্যভিধাননানাত্বে। অতস্তেন দর্শনেন নোচ্যতে। এতাভ্যক্তিস্থভ্যো যজ্ঞসিদ্ধার্থং যাগসংপ্রধানত্বাত্তাসাং চতুর্থী। এয়মৃগবন্ধুঃসামলক্ষণং ব্রহ্ম বেদাখ্যং ছদ্রোহ। দ্বিকর্ম্মকোইয়ং ধাতুঃ, প্রধানং কৰ্ম্ম এয়মপ্রধানেন দ্বিতীয়েন কৰ্ম্মণা ভবি-তব্যম্, ন চ তদন্তি। অতঃ পঞ্চয্যেবেয়মিতি মল্লাফাহে। অগ্ন্যাদিভ্যো দুদোহাক্ষর যদভাবরং। কথং পুনরম্যাদিভ্যো বর্ণাত্মা শব্দো যন্ত্রবাক্যানি ব্রাহ্মণবাক্যানি চ বেস্তুঃ। কিং নোপপয়তে। ক নক্রীয়দৃষ্টা অতীর্ব্বাক্ত মহতি। নাখ্যাতার্থে। বিল্পয়িতুং যুক্তঃ। পঞ্চমী তর্হি কিষর্থং দুহিযাচীতি দ্বিতীয়য়া ভবিতব্যম্। কিক দৃষ্টপ্রমাণবিষোষী প্রাগ বৃত্তোৎর্থ উচ্যবানো যনসঃ পরিতোষমাধত্তে প্রামাণিকানাং পরিহৃতো বিরোধঃ স্বরূপপরত্বাশ্রণেনৈষাযাগমানানৃগ্বেদ এবাগ্নেরজায়ত যজুর্ব্বেদো যাবোঃ সামবেদ আদিত্যাদিতি। অগ্ন্যাদয়োংপি দেবতা ঐশ্বর্য্যভালো নিরতিশয়শক্তিশ্চ প্রজাপতি-স্তত্র কা নামানুপপত্তিঃ। অস্মিন্ দর্শনে পঞ্চম্যপি বিবক্ষাতঃ কারকাণি কথিতা্যত্রাপাদান-সংজ্ঞেতাপাদান বিবক্ষায়াং ভাষ্যে সমর্থিতানি। অন্যদর্শনে কথং চতুর্থী তাবছক্তৈব। অর্থ-বাধাশ্চৈতে, তত্র দ্বিতীয়ং কৰ্ম্মাত্মৈব প্রজাপতিরাত্মানং দুদোহ। দোহনং চাধ্যাপনং পরসংক্রান্তি-সামান্ডেন। অথাপি পঞ্চত্রী তত্ৰাপ্যায়েরা যন্ত্রা আদামৃগ্বেদেহতোহগ্নেরজায়তেত্যুচাতে, যজুর্ব্বেদেহপি ইযেখোজে ত্বেতি। ইড়ন্নং তন্মধ্যস্থানহাদ্বায়না বর্ষদানেন ক্রিয়তে। ঋক্ প্রাণঃ স বায়ুরেব। অত আদিতো বায়ুকাৰ্য্যসম্বন্ধাদ্বায়োরিত্যুপমা। অথবা ব্যবমাত্বিজ্যৎ বহুপ্রকারান্চেষ্টাশ্চ সর্ব্বা বায়ো-রিত্যনেন সাহান্তেন বায়োর্জ্জন্ম যজুর্ব্বেদস্যানধিকারস্য সামগীত্যযোগ্য জাদুত্তমাধ্যয়নানি সাহাস্থ্যক্ত-বস্থানশ্চ্যদিত্য ইতি। ২৩॥ ভাষ্যকার মেধাতিথি গৌতম

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ঋগ্বেদ ১/৯৫/১

  নিজের জন্য নোট; নিচে উল্লেখিত ঋগ্বেদের মন্ত্র ১.৭৩.০৭-এ বলা হয়েছে কীভাবে ২৪ ঘণ্টার একটি দিনের দুই বিপরীত দিক—অর্থাৎ দিন ও রাত—সম্পর্কে জ্...

Post Top Ad

ধন্যবাদ