সাত্ত্বিক আহার - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

09 September, 2018

সাত্ত্বিক আহার


যে খাবার গুলি আমরা খাই, সেগুলিকে আয়ুর্বেদের ওপর ভিত্তি করে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।হিন্দুশাস্ত্র মতে আমিষ ও নিরামিষ বলে কোনো শব্দ নাই, যা আছে সেটা হল সাত্ত্বিক ,রাজসিক ও তামসিক ।নিরামিষ এর অপর নাম স্বাত্মীক ।প্রাচীন আয়ুর্বেদ এর জ্ঞানের অনুসারে বৈদিক ঋষিরা আহার কে তিন ভাগে ভাগ করেন 
১. সাত্ত্বিক আহার
২. রাজসিক আহার
৩. তামসিক আহার


সাত্ত্বিক খাবার যা আমাদের মনকে শান্ত করে, আমাদের সত্য বলতে সাহায্য করে ও সর্বদা আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটাই আসল কারণ যার জন্য ব্রাহ্মণরা কেবলমাত্র সাত্ত্বিক খাবার খাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।


সাত্ত্বিক খাবারের বৈশিষ্ট্য –
১. এই খাবার গুলি সাধারণত হালকা,রসালো, মিষ্ট বা মিশ্র, সতেজক স্বাদ বা প্রকৃতি বিশিষ্ট।
২. এই শ্রেণীর আহারে প্রায় সবকটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান বর্তমান। উদাহরণ নেন দুধ সুষমখাদ্য।
৩. এই শ্রেণীর আহারগুলির শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব সর্বনিম্ন।
৪. এই শ্রেণীর আহার গ্রহনে দৈহিক ও মানসিক শক্তি, কাম, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
- এরজন্য কোনো ধর্মীয় উপবাস চলাকালীন এই শ্রেণীর খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. এই শ্রেণীর আহার গুলিতে সর্বাধিক ভেষজ গুণাবলী বর্তমান।
- এর জন্য পিঁয়াজ ও রসুন অর্ধ-তামসিক খাবার, সাত্ত্বিক আহারের এই গুণাবলী টা পিঁয়াজ ও রসুনে প্রবল। কারণ পিঁয়াজ ও রসুনের ভেষজ গুণাবলী উল্লেখযোগ্য।
৬. এই শ্রেণীর আহার অতিরিক্ত গ্রহণে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব সর্বনিম্ন।
উদাহরণ-দুধ, শাকসব্জী, তণ্ডুল শস্য,দানা শস্য, ডাল শস্য, ফল ইত্যাদি
আয়ু, উৎসাহ, বল, আরোগ্য, চিত্ত-প্রসন্নতা ও রুচি- এসকলের বর্ধনকারী এবং সরস, স্নেহযুক্ত, সারবান্ এবং প্রীতিকর- এইরূপ আহার সাত্ত্বিক আহার। 
"আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ"-গীতা, ১৭/৮
রাজসিক আহার মানে হল রাজকীয় আহার। অতিরিক্ত তেল, ঘি, মাখন, মশলা এবং আমিষ যোগে যে খাদ্য তৈরী করা হয় তাহাই রাজসিক আহার। এধরনের খাবার খুবই সুস্বাদু এবং লোভনীয় হয়ে থাকে। রাজসিক আহার মানুষকে অলস, নিদ্রালু করে দেয়। মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাকে হ্রাস করে আর স্থবিরতাকে বৃদ্ধি করে। এসব খাদ্য শরীরের স্বাভাবিক পরিপাক ক্রিয়াতে ব্যাহত করে। নিয়মিত রাজসিক আহারে অভ্যস্থ মানুষরা ক্রমশঃ নানান জঠিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।রাজসিক আমাদের মধ্যে জাগতিক আনন্দের প্রতি ইচ্ছা ও চাহিদাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। পেঁয়াজ উত্তেজনা অনুভূতি বর্ধক হিসাবে পরিচিত। প্রাচীনকালে পেঁয়াজ ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতার কারণগুলির মধ্যে এটি অন্যতম একটি।
রাজসিক খাবারের বৈশিষ্ট্য –
১. সাধারণত তীব্র ও ঝাঁঝালো প্রকৃতি বিশিষ্ট।
২. এই শ্রেণীর আহারে প্রায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে না।
৩. এই শ্রেণীর খাবার গুলি মানব শরীরে উভয়ধর্মী অর্থাৎ উপকার ও ক্ষতিসাধন দুটো করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ- অতিরিক্ত মসলাদার খাবার, কোল্ড ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংক, কাফিনটেড ড্রিংক ইত্যাদি।
৪. এই শ্রেণীর আহার গ্রহনে দৈহিক ও মানসিক শক্তি ও ক্রোধ হ্রাস বা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
৫. এই শ্রেণীর আহার গুলিতে ভেষজ ও বিষ (toxic) গুণাবলী দুটোই বর্তমান।
৬. এই শ্রেণীর অতিরিক্ত আহার গ্রহণে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটা Slow Poisoning এর ন্যায়। অর্থাৎ শুরুতে ধীরে ধীরে এবং একসময়ে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে।
-উদাহরণ নেন বাঙালীদের প্রিয় তেলে ভাজা আলুর চপ ও বেগুনি, যা বহুদিন যাবৎ ধরে খাওয়ার ফলে আপনার শরীরে অসম্পৃক্ত ফ্যাট ও কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে সহায়ক।
অতি কটু, অতি অম্ল, অতি লবণাক্ত, অতি উষ্ণ, তীক্ষ্ম, বিদাহী এবং দু:খ, শোক ও রোগ উৎপাদক আহার রাজসিক আহার। 
"কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরূক্ষবিদাহিনঃ
আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ"-গীতা, ১৭/৯
যে সকল খাবারে ঝাল মশলা, টক, নানা মুখরোচক এবং স্নায়ু উত্তেজক পদার্থ যেমন- মদ, চা, কপি ইত্যাদি ক্যাফিন যুক্ত পদার্থ সম্মিলিত থাকে তাহাই তামসিক আহার। চা, কপিতে টেনিন ও ক্যাফিন থাকে। হালকা চা কপি পানে শরীরের মধ্যে চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে আসে। অতিমাত্রায় চ-কপি পান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া মদ বা যে কোন নেশা জাতীয় দ্রব্য শরীরের জন্য শুধু ক্ষতিই করে এতে শরীরের জন্য উপকারী কোন পুষ্টি উপাদান নেই।তামসিক যেমন পেঁয়াজ, রসুন খেলে আমরা যেই বৈশিষ্ট্যগুলি পাই সেগুলি হল, আমাদের মন অশুভ হয়ে ওঠে, আমরা বেশি ক্রোধ প্রবণ হয়ে পড়ি ও আমাদের মন কখনোই নিয়ন্ত্রণে থাকে না। প্রাচীন আয়ুর্বেদ অনুযায়ী চরিত্রগত কারণে যেহেতু পিয়াঁজ ও রসুনের তীব্র ঝাঁঝালাে গন্ধ আছে, তাই এগুলি রাজসিক খাদ্যের মধ্যে পড়ে। যেহেতু রাজসিক খাদ্য, রাজা গুণকে জাগিয়ে তােলে, যা কিনা মানুষের মনে ক্রোধ, ঈর্ষা, অহংকার, প্রচারমুখীতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও জাগতিক সুখভােগের ইচ্ছা বাড়িয়ে তােলে তাই এই ধরনের খাবার না খাওয়াই উচিত।মনের আধ্যাত্মিক উন্নতি চাইলে এই জাতীয় খাবার না খাওয়াই শ্রেয়।
🔺 বিখ্যাত আয়ুর্বেদ পন্ডিত Robert Svoboda এর মতে পিয়াঁজ ও রসুন খেলে মনে জাগতিক চিন্তা বড় প্রবল হয়ে ওঠে। যেহেতু আত্মার মুক্তি পেতে জাগতিক চিন্তার প্রতি মােহভঙ্গ সবার আগে দরকার তাই পিয়াঁজ ও রসুন সবজী হয়েও পরিকল্পিতভাবে শাস্ত্রে নিষিদ্ধ আমিষ হিসেবে। পিয়াঁজ রসুনের অন্তর্ভুক্তি ও খাদ্যরূপে নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ আছে।
🔺 পিয়াঁজ ও রসুন দুইই আলিয়াম শ্রেণীভুক্ত হওয়ার কারণে এই দুইয়ের মধ্যে ভীষণ ভাবে ফেনােলিক ফাইটোকেমিক্যাল উপস্থিত যা কিনা মানুষের শরীরে আনড্রোজেনিক, অর্থাৎ যৌন উত্তেজক হিসেবে কাজ করে। আয়ুর্বেদ মতে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে এই দুটি, অর্থাৎ পিয়াঁজ ও রসুন ব্যবহার হয়। এগুলাে খেলে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম সরাসরি উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এখন এই কামনা বাসনা যেহেতু মানব মনের তামসিক প্রবৃত্তির মধ্যে পড়ে, তাই আত্মার শুদ্ধির প্রয়ােজনেই এগুলির গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত বলে মনে করা হয়।
🔺 পিঁয়াজ ও রসুন কাঁচা খেলে মুখদিয়ে দুর্গন্ধ বের হয়। যদি এগুলি খেলে মুখে দুর্গন্ধযুক্ত গন্ধ হবে এবং এই গন্ধ ঘামের মধ্যেও অনুভূত হয়
আমরা জানি পূজায় সবসময় সুগন্ধযুক্ত জিনিস, যেমন সুগন্ধি ধূপ, ধূনা, ফুল দেওয়া হয়।
আমরা অনেকেই এই মতের সাথে একমত না হলে এটি ঠিক যে আয়ুর্বেদ ও আধুনিক বিজ্ঞানে জ্ঞানের উভয় উত্সকে যদি মূল্যবান বলে মনে করি, তাহলে সমস্ত প্রাচীন আয়ুর্বেদিক সিদ্ধান্তকে প্রমাণ করার জন্য আরও অনেক আধুনিক গবেষণা করা দরকার।
অনেকেই পেঁয়াজ খাওয়া পছন্দ করেন না। অনেক ব্রহ্মণ, বৈষ্ণব, বিধবা এই সমস্ত জিনিস খাদ্য তালিকায় রাখেন না, কারণ তারা বিশ্বাস বা ঐতিহ্য অনুসরণ করেন। তাই হয়তো পিঁয়াজ / রসুন খাওয়া নিষিদ্ধ বলে মনে করে। এর পিছনে উপরোক্ত কারণ ছাড়া আর কোনও যৌক্তিক তথ্য জানা নেই।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে যে সমস্ত খাবার যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে সেই সমস্ত খাবার গুলিকে আমিষ হিসাবে গন্য করা হয়। সে অর্থে পেয়াজ রসুন মসুরডাল এগুলি আমিষ খাবার।ভারতবর্ষে দীর্ঘদিন ধরে আর্য়ুরবেদ চিকিত্ সা পদ্ধতি প্রচলিত। আর্য়ুরবেদে ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে পথ্যরও নিদান দেওয়া হয় ।পথ্য হচ্ছে অসুখের সময় কোন খাবার খাবে এবং কোন খাবার এড়িয়ে চলবে ।ফলে সনাতন ধর্মীরা খাবারের গুনাবলী সম্র্পকে সচেতন হন এবং আমিষ ও নিরামিষ খাবারের শ্রেনীবিভাগ করা ও দৈনন্দিন জীবনে সেগুলি গ্রহন করা বা নাকরা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে দাড়ায়। রেফারেন্সের জন্য শিবকালী ভট্টাচার্যের চিরন্জীব বনৌষধি পড়ে দেখতে পারেন।
তামসিক খাবারের বৈশিষ্ট্য –
১. শুষ্ক, উষ্ণ, অসার প্রকৃতি বিশিষ্ট।
২. এই শ্রেণীর আহারে প্রায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান বর্তমান।
৩. এই শ্রেণীর আহারগুলির শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব সর্বাধিক।
৪. এই শ্রেণীর আহারগুলি গ্রহণে দৈহিক ও মানসিক শক্তি, কাম, ক্রোধ বৃদ্ধিতে সহায়ক।
৫. এই শ্রেণীর আহার গুলিতে সর্বনিম্ন ভেষজ গুণাবলী বর্তমান। এছাড়া এতে কতিপয় বিষ (toxic) গুনাবলী বর্তমান।
৬. এই শ্রেণীর আহার অতিরিক্ত গ্রহণে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব সর্বাধিক।
উদাহরণ- মাংশ, ডিম, মাছ, পিঁয়াজ ও রসুন (অর্ধ-তামসিক) ইত্যাদি।
বহু পূর্বে পক্ব, যাহার রস শুষ্ক, দুর্গন্ধ, বাসি, উচ্ছিষ্ট ও অপবিত্র আহার তামস আহার। 
"যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতং চ যত্ 
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্"-গীতা, ১৭/১০
আহার শুদ্ধতা সম্পর্কে উপনিষদ বলেছে-
আহার শুদ্ধ হলে চিত্ত শুদ্ধ হয়, চিত্ত শুদ্ধ হলে সেই চিত্ত সর্বদা ঈশ্বরাভিমুখী থাকে। ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৭/২৬
রামানুজাচার্য এস্থলে খাদ্যের তিনটি দোষের কথা বলেছেন-
১. জাতিদোষ :
এটিকে প্রকৃতিগত দোষ হিসেবে তিনি মদ্য, মাংস, রসুন, পেঁয়াজ ইত্যাদি উত্তেজক খাদ্য পরিহার করতে বলেছেন। এগুলো জাতিদোষ যুক্ত খাবার।
২. আশ্রয় দোষ :
অশুচি, অতিকৃপণ, আসুর-স্বভাব, রোগাক্রান্ত এগুলো দোষে দুষ্ট -খাদ্যবিক্রেতা, পাচক বা পরিবেশনকারীর কাছ থেকে খাদ্য গ্রহণ না করা। অর্থাৎ এগুলো আশ্রয় দোষ।
৩. নিমিত্ত দোষ :
খাদ্যে ধূলি, ময়লা, কেশ, লালা ইত্যাদি অপবিত্রতা হচ্ছে নিমিত্ত দোষ।
সূত্র: জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, শ্রীমদ্ভগবদগীতা(বৃহৎ), পৃ. ৪৮৬

হিন্দু ধর্মে (বৈদিক ধর্মে) দুধ কে নিরামিষ বলে গণ্য করা হয়। আমাদের হিন্দুসমাজে একটি ভ্রান্ত সংস্কার আছে আমিষ ও নিরামিষ খাবারের ধারনা কে নিয়ে। এই বিষয়ে এক একজন মানুষ এক একটি মত পোষন করেন। অনেকে বলে থাকেন প্রোটিন জাতীয় খাবার মানেই আমিষ, কিন্তু সেই সব ব্যাক্তিরা মানব শরীরে প্রোটিনের গুরুত্বই সঠিক ভাবে জানেন না। এরজন্য সেইসব ব্যাক্তিরা মসুর ডাল কেও আমিষ জাতীয় খাবারের মধ্যে ধরে থাকে।
আবার প্রাণীজ উৎস মানে আমিষ হবে এই ধারনা টা ভুল, দুধ নিরামিষ। শুধু যে উদ্ভিদজাত আহার নিরামিষ হবে এই ধারনা টা ভুল, রসুন ও পেঁয়াজ যা ওই ব্যাক্তিদের ভাষাতে আমিষ কিন্তু যুক্তি ও প্রমান সাপেক্ষে ইহা অর্ধ-আমিষ ।স্বাত্মীক শ্রেণীর আহার গুলির বেশীভাগটা উদ্ভিদজাত হবার জন্য, সবাই এটা ভাবে যে উদ্ভিদজাত আহারই নিরামিষ হবে । কিন্তু দুধ সাত্ত্বিক শ্রেণীর আহারের অর্ন্তগত ।
উপর্যুক্ত গুণ বিচার করলে সাত্ত্বিক আহারই সর্বাপেক্ষা উত্তম আহার।

অনন্ত জীবন প্রাপ্ত করার জন্য বৈদিক আর্য সভ্যতা সাত্ত্বিক আহার, উত্তম জলবায়ু আর উচিত শ্রমের সেবন, ব্রহ্মচর্যের পালন, চিন্তার ত্যাগ, সদাচার, সঙ্গীত আর প্রাণায়াম আদি সাত উপায়ের শিক্ষা দেয়, যা হচ্ছে সর্বমান্য। এইজন্য আমি এখানে কেবল এর সামান্য বর্ণনা করে বলে দিতে চাই যে এই সাতটি উপায় কিভাবে সবাইকে সমানরূপে দীর্ঘজীবন প্রাপ্তকারী হবে।

সর্বপ্রথম উপায়টি হচ্ছে সাত্ত্বিক আহার। সাত্ত্বিক আহারের মধ্যে দুধ, দই, ঘী, ফল, ফুল আর হবিষ্যান্নকে ধরা হয়েছে। এখন দেশী আর বিদেশী সব বৈদ্য আর ডাক্তার স্বীকার করে নিয়েছে যে এই পদার্থের আহার দ্বারা মানুষ রোগী হয় না, সর্বদা স্বাস্থ্যবান থাকে আর দীর্ঘজীবি হয়। তাছাড়া এই সাত্ত্বিক আহারের কারণে বল, কান্তি, মেধা, রূপ, স্মৃতি আর ধারণা আদি অনেক দৈবী শক্তিও প্রাপ্ত হয়, এইজন্য দীর্ঘজীবন প্রাপ্তকারীর জন্য সর্বদা দুধ আর ফলেরই সেবন করা উচিত।

ভোজনের অনুসারে স্থলচর পশুদের তিনটি ভেদ রয়েছে যথা - মাংসভক্ষী, বনস্পতিভক্ষী আর ফলভক্ষী। বিড়াল, কুকুর আর সিংহ আদি যত হিংস্র পশু রয়েছে, তারা সবাই হল মাংসভক্ষী। মাংসই হল তাদের স্বাভাবিক ভোজন, এইজন্য তাদের দাঁত লম্বা, ধারালো আর প্রসারিত। এইধরনের দাঁত দিয়ে এরা জীবের মাংসকে টেনে ছিড়ে গিলে নেয়। এদের দাঁতের রচনা দ্বারা এটা সূচিত হচ্ছে যে পরমেশ্বর এদের মাংস খাওয়ার জন্যই এরকম দাঁত দিয়েছে। গাভী, বৃষ, মহিষ, ছাগ আদি জীব হল বনস্পতিভক্ষী, তাই পরমেশ্বর তাদের দাঁত এরকম বানিয়েছে যা দিয়ে তারা ঘাসকে সহজেই কাটতে পারে। তাদের দাঁতের রচনাই হল তাদের বনস্পতিভক্ষী হওয়ার প্রমাণ, কিন্তু মানুষের দাঁত না তো মাংসভক্ষী পশুদের সঙ্গে মেলে আর না ঘাসভক্ষী পশুদের সঙ্গে। তাদের গঠন সেইরকম যেমনটা বাঁদর আদি ফলভোগী জীবদের হয়।এইজন্য একথা নির্বিবাদ, নির্ভ্রান্ত আর নিঃসংশয় যে পরমেশ্বর মানুষের দাঁত ফল খাওয়ার জন্যই বানিয়েছে, কিন্তু আমরা যদি সেটা দিয়ে মাংস আর মাছ কাটা আরম্ভ করি, এর মাথা ওর পা চিবিয়ে ভাঙ্গি, তারপরও কি কেউ নিরোগ থাকার কথা ভাবতে পারে? মাংসভক্ষী জীবদের আমাশয় ছোটো আর গোল হয়। তাদের শরীর থেকে তাদের অন্ত্র ৩ থেকে ৫ গুণ পর্যন্ত অধিক লম্বা হয়। বনস্পতিভক্ষী জীবদের আমাশয় অনেক বড়ো হয়, সে খাবারও খায় অনেক বেশি। তাদের অন্ত্র তাদের শরীরের থেকে ২০ থেকে ২৮ গুণ পর্যন্ত অধিক লম্বা হয়।

এখন বাকি রইলো ফলভক্ষী, তাদের আমাশয় মাংসভক্ষী জীবদের আমাশয়ের থেকে অধিক চওড়া হয় আর তাদের অন্ত্র তাদের শরীরের থেকে ১০ থেকে ১২ গুণ পর্যন্ত অধিক লম্বা হয়। এখন এই তিন প্রকারের জীবদের সঙ্গে মানুষের মিলিয়ে দেখুন। মাথা থেকে মেরুদণ্ডের হাড্ডির শেষপ্রান্ত পর্যন্ত মানুষের দৈর্ঘ্য ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত হয় আর মানুষের অন্ত্রের দৈর্ঘ্য ১৬ থেকে ২৮ ফুট পর্যন্ত হয়, অর্থাৎ তার দৈর্ঘ্য শরীরের দৈর্ঘ্যের তুলনায় ১০ থেকে ১২ গুণ অধিক হয়। এখানেও ফলভক্ষী জীবদের সঙ্গে মানুষের সমতা মিলে যায়। শরীরের অনুসারে মানুষের অন্ত্র ফলভক্ষী জীবদেরই মতো বের হল, অতএব মানুষ যে ফলভক্ষী তার এটা দ্বিতীয় প্রমাণ হল। এইভাবে "Odontogeaphy" নামক গ্রন্থের ৪৭১ পৃষ্ঠাতে প্রফেসর ওয়েন (Owen) বলেছেন যে মানুষের দাঁত বনমানুষ আর বাঁদরের সঙ্গে অনেকটা অনুরূপ আর এদের ভোজনও ফল, অন্ন এবং বাদাম একই ধরনের। এই চার পাওয়ালা আর মানুষের দাঁত সম্বন্ধিত সাদৃশ্য থেকে বিদিত হচ্ছে যে সৃষ্টির আরম্ভে মানুষের জন্য স্বাভাবিক ভোজন ফলই নির্মাণ করা হয়েছিল।

এর সম্বন্ধে লিনাকুস (Linnacus) বলেছেন যে ফল-মূল হল মানুষের জন্য অত্যন্ত হিতকর ভোজন যা চার পাওয়ালাদের থেকে প্রকাশিত হয় তথা বনমানুষ আর লাঙ্গুরের সাদৃশ্য এবং তাদের মুখ, পেট আর হাতের গঠন দ্বারাও প্রকট হয় (Linnasi Amoonitales Academical, Vol. X, Page 8)। একইভাবে ডক্টর ইব্রামৌস্কি যিনি একজন প্রসিদ্ধ চিকিৎসক আর যিনি সমস্ত রোগের একটাই সহজ ঔষুধ বের করেছেন, লিখেছেন যে আমরা যেসব রন্ধন আদি করে, গুঁড়ো করে কৃত্রিম ভোজন করি তা আমাদের জন্য অস্বাভাবিক। আমাদের শরীরকে বৃদ্ধি তথা পুষ্টি পাওয়ার জন্য প্রায়শঃ এন্দ্রিক পদার্থেরই (Organic Matter) আবশ্যকতা হয়ে থাকে, ফল তথা খাদ্যশস্যের মধ্যে সেটা প্রচুরমাত্রায় বিদ্যমান রয়েছে, কিন্তু যদি ফল আর খাদ্যশস্যকে আগুনে রন্ধন করা হয় তাহলে তার অনেকটা এন্দ্রিক অংশ পৃথক হয়ে যায়। শেষ পদার্থ না কেবল কঠিনতার সঙ্গে পচে, বরং পচে গিয়ে আমাদের শরীরের জন্য কিছুই লাভ দেয় না। যখন এরকম ভোজন করলে অনেক ধরনের অকেজো পদার্থ আমাদের শরীরের মধ্যে ঘর করে নেয় তখন অনেক রোগের উৎপত্তি হয়। প্রায়শঃ সব আন্তরিক রোগের উৎপত্তি এরকম অকেজো পদার্থের একত্র হয়ে যাওয়ার জন্য হয়, সুতরাং এই রোগগুলোর একটাই ঔষধ রয়েছে যে যেভাবেই হোক সেই অকেজো পদার্থ আমাদের শরীর থেকে যেন বেরিয়ে যায় আর নতুন করে যেন প্রবেশ না করে। এরকমটা হলেই সেই রোগ স্বয়ংই নষ্ট হয়ে যাবে, এইজন্য প্রায়শঃ নব সম্মতির চিকিৎসকেরাও রোগীদের উপবাস করান। তাদের বেশ কয়েকদিন ধরে কেবল উষ্ণ জল ছাড়া আর কিছুই দেওয়া হয় না। এই ঔষধি প্রায়শঃ লাভদায়ক সিদ্ধ হয়েছে। যথাশক্তি উপবাস দ্বারা প্রায়শঃ রোগ দূর হয়ে যায়, কিন্তু এই ঔষধি করার একটা ভয় থাকে যে কখনও-কখনও অনেকদিন পর্যন্ত শরীরের আধারভূত পদার্থ না পাওয়ার কারণে রোগী এতটাই দুর্বল হয়ে যায় যে বৃদ্ধি হওয়ার স্থানে ধীরে-ধীরে ক্ষয়ের রাজ্য হয়ে যায় আর রোগী কিছু দিনের মধ্যেই মৃত্যুর গ্রাসে চলে যায়, এইজন্য কেবল উপবাসের স্থানে ফলোপবাস অধিক উপযোগী, কারণ ফল খাওয়াতে কোনো অকেজো পদার্থ শরীরে প্রবেশ করে না আর বল প্রাপ্ত হয়ে যায়, রোগও নষ্ট হয়ে যায় আর শক্তির হ্রাস হয় না।

এই বিদেশি প্রমাণগুলো থেকেও সিদ্ধ হচ্ছে যে ফলই হল মানুষের আদিম আর মৌলিক ভোজন আর ফলের সেবন হতে মানুষ অসুস্থ তো হয়ই না বরং যদি অসুস্থ থাকে তাহলেও ঠিক হয়ে যায় আর সুদৃঢ় তথা দীর্ঘজীবি হয়, এইজন্য আর্যরা নিজেদের মূল সভ্যতাতে ফল আর দুধেরই স্থান দিয়েছে আর কৃষিকে তথা কৃষি থেকে উৎপন্ন হওয়া অন্নকে আপত্কালে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ব্রত আর উপবাসের মধ্যে ফলাহারের মহিমা হতে তথা আর্য পরম্পরা আর আর্য সভ্যতাতে নিষোজ্ঞার বিশেষত্বগুলো হতে এটাই সূচিত হচ্ছে যে আর্যদের আহার সাত্ত্বিকই যারমধ্যে ফল আর দুধ-ঘীয়েরই প্রাধান্য রয়েছে, কারণ ফল-ফুল আর দুধ-ঘৃতাদি সাত্ত্বিক আহারই অর্থের পাঁচ শর্তের সঙ্গে সংগ্রহ হতে পারে তথা তার থেকেই আয়ু, বল, কান্তি, মেধা আর সত্ত্ব আদিও প্রাপ্ত হতে পারে তথা সেসবের আহার থেকেই সংসারের মধ্যে কারও আয়ু আর ভোগের মধ্যে হস্তক্ষেপও হবে না আর য়োগাভ্যাস, মোক্ষসাধনেও সহায়তা পাওয়া যায়, এইজন্য আর্যরা নিজেদের সভ্যতাতে সাত্ত্বিক আহারকেই স্থান দিয়েছে।
মানুষের আহার হল চার প্রকারের, যার প্রাপ্তি বৃক্ষ আর পশুদের থেকে হয়ে যায়। এরমধ্যে দুই প্রকারের আহার বৃক্ষ থেকে আর দুই প্রকারের আহার পশুদের থেকে প্রাপ্ত হয়। দুধ আর মাংস পশু থেকে তথা ফল আর ফসল বৃক্ষ থেকে প্রাপ্ত হয়। এরমধ্যে ফল, দুধ, ঘৃতাদি হল সাত্ত্বিক, ফসল আর শাকাদি হল রাজস্ আর মাংস-মদ্যাদি হল তামস্ অন্ন। সাত্ত্বিক অন্নের মধ্যে ফল আর দুধ-ঘৃতাদিকে ধরা হয়। ফল আর ঘৃত-দুগ্ধাদিকে বিধিবত্ গ্রহণ করলে পরে হিংসার কিছুই হয় না। পৃথিবীকে ঊর্বরা বানিয়ে আর বীজকে কলম আদি দ্বারা সুসংস্কৃত করে সেচ আর আগাছা নিড়ানির দ্বারা যে ফল উৎপন্ন হয়, তা প্রাকৃতিক বন্য ফলের তুলনায় বড়ো হয় আর সেগুলোতে বীজ অনেক কম হয়ে থাকে, তাই স্বভাবে পাকা আর আপনা- আপনি পরে যাওয়া ফলের বীজ বের করে নিয়ে খেলে তাতে কোনো হিংসাই হয় না, কারণ বীজ বের করে খেলে অন্য বৃক্ষকে উৎপন্নকারী বীজের নাশ হয় না। একইভাবে পারস্কর শিক্ষার অনুসারে বৃষোত্সর্গের দ্বারা উত্তম ক্ষেত্রের বৃষকে স্বতন্ত্রতাপূর্বক চড়িয়ে আর তার থেকে অমুক ক্ষেত্রের গৌ দ্বারা সন্ততি উৎপন্ন করিয়ে আর সেই সন্ততির সন্তানকেও সেই ক্রম দ্বারা গোবর্ধন (Cow-breeding) এর সিদ্ধান্তানুসারে তৈরি করলে পঞ্চম প্রজন্মতে দুধের মাত্রা চারগুণ বেড়ে যায় আর এক-একটি গৌ দেড়-দেড় মন দুধ দিতে পারে। কিন্তু গাভীকে জঙ্গলে ছেড়ে দিলে আর ইচ্ছেমত স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি উৎপন্ন করলে পরে কখনও এত দুধ উৎপন্ন হয় না, তাই অনেক গাভীকে এইভাবে অমিত দুগ্ধদাতা বানিয়ে, তাদের থেকে কিছু পরিমাণ দুধ নিলে পরে হিংসা হয় না, কারণ যতটা দুধ বাচ্চার জন্য আবশ্যক সেটা তো সে পেয়েই যায়। মানুষ তো ফলের মতো নিজের কারিগরী দ্বারা গাভীর সেবা করে দুধকে স্বাভাবিক পরিমাণ থেকে অধিক বাড়িয়ে দেয়, এইজন্য যতটা অধিক বাড়িয়ে দেয় ততটা নিলে পরে কারও হানি হয় না, অতএব হিংসাও হয় না। বাকি রইল রাজস্ আর তামস্ অন্ন, তামসান্নের জন্য মনুস্মৃতিতে (১১|৯৫) স্পষ্ট লেখা রয়েছে যে "য়ক্ষরক্ষঃ পিশাচান্নম্ মদ্যম্ মাম্সম্ সুরাऽऽসবম্", অর্থাৎ মাংস আর মদ্য হল রাক্ষস আর পিশাচদের অন্ন, আর্যদের নয়, তাই মাংস-মদ্য আদি হিংসারূপ তামস্ আহারকে আর্য সভ্যতার মধ্যে স্থান দেওয়া হয়নি, কিন্তু রাজসান্ন অর্থাৎ খাদ্যশস্য আর শাকান্ন অর্থাৎ যাকে খেলে কিছু হিংসার সম্ভাবনা হয়, সেগুলোকে আপত্কালের সময়েই সেবন করার আজ্ঞা রয়েছে, তাই যজ্ঞশেষান্ন খাওয়ার বিধান করা হয়েছে। কিছু লোক বলে যে আর্যদের সভ্যতার মধ্যে অন্ন আর কৃষির জন্যও স্থান রয়েছে, কারণ অনেক স্থানে অন্ন আর কৃষির প্রশংসা করা হয়েছে। আমি বলবো যে ঠিক আছে আর্যদের সভ্যতার মধ্যে অন্ন আর কৃষির বর্ণনা এসেছে, কিন্তু বর্ণনার অভিপ্রায় অন্ন রয়েছে।

অর্থাৎ যেখানে-যেখানে অন্নের বর্ণনা পাওয়া যায় সেখানে - সেখানে সর্বত্র অন্নের তাৎপর্য আহারই রয়েছে, খাদ্যশস্য নয়, এইজন্য আহারের পরিভাষা করে উপনিষদের মধ্যে লেখা হয়েছে যে "অদ্যতেऽত্তি চ ভূতানি। তস্মাদন্নম্ তদুচ্যত ইতি।" (তৈত্তিরীয়০ ২|২|১ {পৃষ্ঠ৪০০}) অর্থাৎ প্রাণীমাত্রের যা কিছু আহার রয়েছে সেই সব হল অন্ন, কারণ অন্ন শব্দ "অদ্ ভক্ষণে" ধাতু হতে তৈরি, যার তাৎপর্য হল যা কিছু খাওয়া যায়, সে সবই হল অন্ন, এইজন্য মনু ভগবান্ পিশাচ আর রাক্ষসদের অন্ন মদ্য আর মাংস বলেছেন। বলার তাৎপর্য হল অন্ন শব্দ দ্বারা কেবল খাদ্যশস্যই গ্রহণ হয় না, বরং অন্নের মধ্যে সেই সমস্ত পদার্থের সমাবেশ রয়েছে যা হল প্রাণীমাত্রের আহার। এখন বাকি রইলো কৃষি, কৃষির জন্য ভগবান্ মনু বলেছেন -

বৈশ্যবৃত্ত্যাপি জীবম্স্তু ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্রিয়োऽপি বা।
হিম্সাপ্রায়াম্ পরাধীনম্ কৃষিম্ য়ত্নেন বর্জয়েত্।।
কৃষিম্ সাধ্বিতি মন্যন্তে সা বৃত্তিঃ সদ্বিগর্হিতা।
ভূমিম্ ভূমিশয়াম্শ্চৈব হন্তি কাষ্ঠময়ো মুখম্।।
(মনুঃ ১০|৮৩-৮৪)
অর্থাৎ - বৈশ্যবৃত্তি থেকে জেতা ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয় অনেক হিংসাত্মক আর পরাধীন কৃষিকাজকে যত্নের সঙ্গে ছেড়ে দিবে। "কৃষিকাজ করা ভালো", এমনটা লোকে বলে, কিন্তু এই বৃত্তি সত্পুরুষদের দ্বারা এইজন্য নিন্দিত যে কৃষকের লোহা লাগানো হাল ভূমি আর ভূমিবাসীদের নাশ করে দেয়, কারণ ধান্যের কৃষিকাজ দ্বারা বন আর বাটিকার নাশ হয়ে যায়, পশুদের চারণভূমি নষ্ট হয়ে যায় আর বনবৃক্ষ থেকে যে প্রাকৃতিক শীতলতা প্রাপ্ত হয় তা আর থাকে না। জঙ্গলের শীতলতার অভাবে বর্ষা কমে যায় আর প্রাণনাশক বায়ুর ব্যয় কম হয়ে যাওয়ার জন্য বায়ু বিষাক্ত হয়ে যায় আর অনাবৃষ্টি তথা রোগ হতে মানুষ-পশু-পক্ষী আদি মরে যায়, এইজন্য কৃষিকে গর্হিত বলা হয়েছে আর বলা হয়েছে যে কৃষি হতে ভূমি আর ভূমিতে বসবাসকারী প্রাণী মরে যায়। এরপর মনু ভগবান্ বলেছেন যে -

অকৃতম্ চ কৃতাত্ক্ষেত্রাদ্ গৌরজাবিকমেব চ।
হিরণ্যম্ ধান্যমন্নম্ চ পূর্বম্ পূর্বমদোষবত্।।
(মনুঃ ১০|১১৪)
অর্থাৎ - নির্মাণ করা ক্ষেতের তুলনায় স্বাভাবিক ক্ষেতের মধ্যে, ছাগ-মেষের তুলনায় গৌয়ের মধ্যে আর ধান্য তথা অন্নের তুলনায় সোনার মধ্যে কম দোষ হয়, অর্থাৎ উত্তর-উত্তর থেকে পূর্ব-পূর্ব ভালো। অন্নের থেকে সোনা ভালো, মেষ-ছাগের থেকে গৌ ভালো আর অন্নের ক্ষেতের থেকে তপোবনের অকৃত ক্ষেত উত্তম।

এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে অন্নকারী ক্ষেতের স্থান আর্য সভ্যতাতে খুবই নিকৃষ্ট। মনু ভগবান্ যেখানে কৃষিকাজকে এত হীন দৃষ্টিতে দেখেছেন, সেখানে বৃক্ষের সুরক্ষার জন্য খুবই বল দিয়েছেন। উনি বলেছেন যে -

ইন্ধনার্থমশুষ্কাণাম্ দ্রুমাণামবপাতনম্।
আত্মার্থম্ চ ক্রিয়ারম্ভো নিন্দিতান্নাদনম্ তথা।।
(মনুঃ ১১|৬৪)
ফল দানাম্ তু বৃক্ষাণাম্ ছেদনে জপ্যমৃক্ শতম্।
গুল্মবল্লীলতানাম্ চ পুষ্পিতানাম্ চ বীরুধাম্।।
(মনুঃ ১১|১৪২)
বনস্পতীনাম্ সর্বেষামুপভোগম্ য়থায়থা।
তথাতথা দমঃ কার্য়ো হিম্সায়ামিতি ধারণা।।
(মনুঃ ৮|২৮৫)
অর্থাৎ - জ্বালানির জন্য সবুজ(জীবিত) বৃক্ষকে কাটা আর নিন্দিত অন্ন খাওয়া হল উপপাতক। ফল দেওয়া বৃক্ষ, গুল্ম, লতা আর পুষ্পিত বৃক্ষকে যে কাটবে একশ ঋচার জপ করবে। যে ব্যক্তি সমস্ত বনস্পতির যেমন- যেমনটা হানি করবে, তাকে রাজা সেইরকম দণ্ড দিবে।

এই আজ্ঞাগুলো থেকে সিদ্ধ হচ্ছে যে বন আর বাটিকার স্থান ক্ষেতির থেকে অনেক বড়ো। ঋগবেদ ১০|১৪৬|৬ এর মধ্যে লেখা রয়েছে যে "বহ্বন্নমকৃষীবলাম্", অর্থাৎ বনবৃক্ষ থেকে বিনা কৃষিকাজ করেই অনেক অন্ন, অর্থাৎ মানুষের আহারের উৎপত্তি হয়। বলার তাৎপর্য হল আর্য সভ্যতার মধ্যে কৃষির অধিক বন-তপোবনের মহানতা অনেক বেশি। যদিও বন-তপোবনের মহানতা অনেক বেশি তবুও জীবিকার প্রবন্ধক বৈশ্যদের কৃষি করারও কিছুটা আজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই নির্বল আজ্ঞার কারণ হল তিনটি। প্রথমত কৃষি থেকে উৎপন্ন খাদ্যশস্য যজ্ঞের কাজে লাগে, অর্থাৎ অনেক প্রকারের যজ্ঞ অনেক প্রকারের অন্ন দ্বারাই হয়। দ্বিতীয়ত, কিছু পরিমাণ যজ্ঞশেষান্ন প্রসাদের রূপে প্রতিদিন খাওয়ারও অভ্যাস রাখা হয়, যাতে সংকটের সময় অন্ন দিয়েও নির্বাহ করা যেতে পারে, (আহারের অভ্যাস একদম পরিবর্তন করা যায় না, তাই আপত্কালকে ধ্যানে রেখে প্রসাদের রূপে কিছু পরিমাণ যজ্ঞশেষান্ন অবশ্য খাওয়া উচিত। নিত্য যজ্ঞান্ন খেলে তাদের ভালো করে রন্ধনেরও ভাবনা থাকবে আর ভালো রন্ধন করা সুস্বাদু অন্নই যজ্ঞের মধ্যে গুণকারী হবে।) এইজন্য বলা হয়েছে যে যজ্ঞশেষ অন্নই খাওয়া উচিত, কেবল নিজের জন্য রন্ধন করা নয়। মনু ভগবানও তাই বলেছেন "য়জ্ঞশিষ্টাশনম্ হ্যোতত্সতামন্নম্ বিধীয়তে" (মনুঃ ৩|১১৮)। তাৎপর্য হল খাদ্যশস্য আর শাকান্ন আদি রাজস্ আহার আর্যদের স্বাভাবিক ভোজন নয়। আর্যদের তো সাত্ত্বিক আহারই হল ফল আর দুধ যা অর্থ আর আহার সংগ্রহের সমস্ত নিয়মের অনুসারে আর মোক্ষের সহায়ক, তাই শতপথ ব্রাহ্মণ ২|৫|১|৬ এর মধ্যে লেখা রয়েছে যে "এতদ্বৈ পয় এব অন্নম্ মনুষ্যাণাম্", অর্থাৎ এই দুধই হল মানুষের অন্ন (আহার)। এইভাবে ঋগবেদ ১০|১৪৬|৫ এর মধ্যে লেখা রয়েছে "স্বাদোঃ ফলস্য জগ্ধ্বায়", অর্থাৎ মোক্ষমার্গীকে সুস্বাদু ফলেরই আহার করা উচিত। একথা আর্যদের আদিম সভ্যতার ইতিহাস থেকেও ভালোভাবে প্রমাণিত হয়, কারণ আদিম কালে তপস্বীদের আহার প্রায়শঃ ফল-ফুলই ছিল, অন্ন ছিল না। বনস্থদের আহারের বর্ণনা করে মনু মহারাজ লিখেছেন -

পুষ্পমূলফলৈর্বাऽপি কেবলৈর্বর্তয়েত্সদা।
কালপক্বৈঃ স্বয়ম্ শীর্ণৈর্বৈখানসমতে স্থিতঃ।।
(মনুঃ ৬|২১)
অর্থাৎ - বানপ্রস্থী পুষ্প, মূল অথবা পাকা আর আপনা- আপনি পরে যাওয়া ফল দ্বারা নির্বাহ করবে।
মহুয়ার একটি বৃক্ষতেই এত অধিক ফুল হয় যে তার থেকে এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ বছর নির্বাহ করতে পারবে। ফুল ছাড়াও ফল, তেল, পত্র আর কাঠ আদি পদার্থ প্রাপ্ত হয়, যে কারণে মানুষকে আর অন্য কোনো আহারের আবশ্যকতা থাকে না।

বাল্মীকি রামায়ণে লেখা রয়েছে যে রামচন্দ্র, ভরত, লক্ষ্মণ আর সীতা ফলাহার করেই তপস্বী জীবন নির্বাহ করেন। গুহরাজের আতিথ্য করাতে শ্রী রামচন্দ্র বলেন -

কুশচীরাজিনধরম্ ফলমূলা শনম্ চ মাম্।
বিধিপ্রণিহিতম্ ধর্মে তাপসম্ বনগোচরম্।।
(বাল্মীকি রা০ অয়োধ্যা কা০ ৫০|৪৪)
অর্থাৎ - আমি কুশচীর পরে, তাপসবেশ আর মুনিদের ধর্মে স্থির হয়ে কেবল ফল-মূলই আহার করি।

ভরতও বলেন যে -
চতুর্দশ হি বর্ষাণি জটাচীরধরোম্যহম্।
ফলমূলাশনো বীর ভবেয়ম্ রঘুনন্দন।।
(বাল্মীকি রা০ অয়োধ্যা কা০ ১১২|২৩-২৪)
অর্থাৎ - আমিও চোদ্দো বর্ষ পর্যন্ত জটা ধারণ করে আর ফল-মূলই আহার করবো।

লক্ষ্মণও বলেন যে -
আহরিষ্যামি তে নিত্যম্ ফূলানি চ ফলানি চ।
বন্যানি চ তথান্যানি স্বাহার্হাণি তপস্বিনাম্।।
(বাল্মীকি রা০ অয়োধ্যা কা০ ৩১|২৬)
অর্থাৎ - আপনার জন্য তপস্বীদের মতো বন্য পদার্থ নিয়ে এসে দিবো আর আমিও ফল-ফুলই আহার করবো।
এইভাবে অয়োধ্যা কাণ্ড ২৭|১৬ র অনুসারে সীতা জীও বলেন যে - "ফলমূলাশনা নিত্যা ভবিষ্যামি ন সম্শয়ঃ", অর্থাৎ আমি সর্বদা ফল-মূল আহার করে থাকবো, এতে সন্দেহ নেই।

এই প্রমাণগুলো থেকে জ্ঞাত হচ্ছে যে চোদ্দো বর্ষ পর্যন্ত ফল-ফুল খেয়ে শুধু বৃদ্ধই নয় বরং যুবক মানুষও থাকতে পারতো আর বড়ো-বড়ো যোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিজয় প্রাপ্ত করতো। এখনও যুক্তপ্রান্তের বৈসবাড়ে আমের ফসলের সময় তিন মাস পর্যন্ত কেবল আম খেয়েই লোকজন কুস্তি লড়াই করে। বলার তাৎপর্য হল আর্য সভ্যতার উচ্চাদর্শের অনুসারে মানুষের ভোজন হল ফল-ফুল, দুধ, ঘী। অন্ন তো যজ্ঞশেষ - প্রসাদের নামেই খাওয়া হল, কিন্তু যখন কৃষিকাজ বাড়ে আর জঙ্গল বনের নাশ হয় তখন মানুষ অন্নের ভূমির আশ্রয় করতে থাকে। কলিযুগের বর্ণনা করে মহাভারত বনপর্ব অধ্যায় ১৯০ এরমধ্যে লেখা রয়েছে যে -

য়ে য়বান্না জনপদা গোধূমান্নাস্তথৈব চ।
তান্ দেশান্ সম্শ্রয়িষ্যন্তি য়ুগান্তে পর্য়ুপস্থিতে।।
অর্থাৎ - যে দেশের মধ্যে যব আর গম আদি বিশেষভাবে উৎপন্ন হয়, কলিযুগের লোকজন সেইসব দেশের আশ্রয় নিবে।

এর দ্বারা জ্ঞাত হচ্ছে যে অন্য যুগের মানুষ সেই দেশের আশ্রয় নিতো যেখানে ফল-ফুলই অধিক হত, অন্ন নয়। এটাই হল কারণ যে হিন্দুজগতে ফলাহারের এযাবৎ যত প্রতিষ্ঠা রয়েছে ততটা অন্য খাদ্যের নেই। ফলাহারকে এক প্রকারের মহান উচ্চ আচরণ আর তপ বলে মনে করা হয়। শুধু এটাই নয় বরং যত ব্রত, শুভ অনুষ্ঠান অর্থাৎ সতোগুণী কার্য রয়েছে, সবার মধ্যে ফলাহারেরই বিধান রয়েছে। এর ভাব স্পষ্ট যে ফলাহার হল সাত্ত্বিক আহার, তাই সতোগুণী অনুষ্ঠানে তার ব্যবহার হয়। এর থেকেই বলপূর্বক বলা যেতে পারে যে ফলাহারই হল আর্য ভোজন। এটি আর্য ভোজনের অধিক প্রতিষ্ঠার কারণ হল - ফলাহার কামচেষ্টার প্রতিষেধক। কোনো ব্যক্তি যদি ব্রহ্মচারী থাকতে চায় তবে তাকে ফলাহার করা উচিত, কারণ ফলাহার হতে কামচেষ্টা কমে যায়, তাই বিধবা স্ত্রীদেরও ফলাহারের দ্বারা কামকে শরীরের মধ্যেই শোষণ করার জন্যই মনু ভগবান্ বিধান করেছেন। এর অতিরিক্ত ফল আর ফুলের দ্বারা মানুষের সারা জীবন নির্বিঘ্নতায় কেটে যাবে। আজও বছরের তিনমাস আমাদের অবধের বৈসবারা প্রান্তে আম, মহুয়া আর জামুন দিয়েই কেটে যায়। জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্রমাস পর্যন্ত আম, মহুয়া আর জামুনের কারণে অনেক ঘরে উনুনই জ্বলে না, আর না কাউকে ক্ষুধার্থ ব্যাকুল বা দুর্বল দেখা যায়।
ভোজনের পরে দীর্ঘজীবনের সঙ্গে সম্বন্ধিত দ্বিতীয় বস্তু হচ্ছে বায়ু, জল আর পরিশ্রম। শহরের জল-বাযু ভালো না, তাই শহরের বাইরে বনজঙ্গল বা অরণ্যের মধ্যে সাধারণ আর পরিষ্কার ঘরে বাস করা উচিত আর ফল তথা দুধ উৎপন্নকারী শ্রমকে মর্যাদার সঙ্গে করা উচিত। এই পদার্থ বন-বাগান আর চারণভূমির দ্বারা গাভীর থেকে পাওয়া যেতে পারে, এইজন্য বন-বাগান বানানো আর চারণভূমি বানানোর মধ্যেই শ্রম করা উচিত, উঠ-বস আর হকি, ক্রিকেট আদির মধ্যে নয়।

দীর্ঘজীবনের সহায়ক তৃতীয় উপায়টি হচ্ছে চিন্তার নিবৃত্তি। যে মানুষ সর্বদা চিন্তাগ্রস্থ থাকে তার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। কোনো এক কবি ঠিকই বলেছে যে -
চিতাচিন্তাদ্বয়োর্মধ্যে চিন্তা য়াতি গরীয়সী। চিতা দহতি নির্জীবম্ চিন্তা দহতি জীবিতম্।।
অর্থাৎ - চিন্তা আর চিতার মধ্যে চিন্তাই হচ্ছে বড়ো, কারণ চিতা কেবল মৃতকেই জ্বালায়, কিন্তু চিন্তা তো জীবিত মানুষকেই জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়।

এইজন্য দীর্ঘজীবনের ইচ্ছুকদের সর্বদা চিন্তার ত্যাগ করে দেওয়া উচিত। যখন খাওয়ার জন্য বাগান থেকে ফল আর গাভীর থেকে দুধ পাওয়া যাচ্ছে তাহলে চিন্তা কিসের জন্য? চিন্তা তো হচ্ছে কেবল আহারের, কিন্তু "কা চিন্তা মন জীবনে য়দি হরির্বিশ্বম্ভরো গীয়তে", অর্থাৎ যে পরমাত্মা জঙ্গল আর পশুদের প্রদান করে সারা বিশ্বের ভরণ-পোষণ করছে, তার রাজ্যে নিজের জীবনের জন্য কিসের চিন্তা? চিন্তা তো কামী, লোভী আর ঈর্ষা-দ্বেষ রাখে এরকম নীচদের হয়ে থাকে, কিন্তু যে অর্থ, কাম আর মানের ব্যর্থ পাখণ্ডকে ছেড়ে দিয়েছে তার জন্য চিন্তা করার আবশ্যকতা নেই, কারণ চিন্তা থেকে শোক আর শোক থেকে দৌর্বল্য প্রাপ্ত হয় আর শেষে জীবন নষ্ট হয়ে যায়, তাই দীর্ঘজীবনের ইচ্ছাকারীদের কখনও চিন্তা করা উচিত নয়।

দীর্ঘজীবনের চতুর্থ উপায়টি হচ্ছে ব্রহ্মচর্য। য়োগশাস্ত্রের (২|৩৮) মধ্যে লেখা রয়েছে যে "ব্রহ্মচর্য়প্রতিষ্ঠায়াম্ বীর্য়লাভঃ", অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য থেকে বীর্য প্রাপ্ত হয় আর "বীর্য়ে বাহুবলম্", অর্থাৎ বীর্য থেকে বল প্রাপ্ত হয়। বলবান মানুষই বাটিকা লাগাতে আর পশুর জন্য চারণভূমি বানানোর শ্রম করতে পারবে আর বীর্যবানরাই সর্বদা চিন্তামুক্ত থাকতে পারে, কারণ বীর্যের মধ্যে সবথেকে বড়ো গুণ হচ্ছে এটাই যে সেটা সর্বদা মানুষকে আনন্দিত রাখে। বীর্যের মধ্যে এক বিশেষ প্রকারের আনন্দ থাকে যা মানুষকে সর্বদা প্রসন্ন রাখে আর চিন্তিত হতে দেয় না। তাছাড়া ব্রহ্মচারীরাই অনেক সন্তানের দুঃখ থেকে বাঁচতে পারে তথা তারাই অমোঘবীর্য হয়ে আবশ্যক আর উত্তম সন্তানকে উৎপন্ন করতে পারে, তারাই দীর্ঘাতিদীর্ঘজীবন প্রাপ্ত করতে পারে। অথর্ববেদের (১১|৫|১৯) মধ্যে লেখা রয়েছে "ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা দেবা মৃত্যুমপাঘ্নত", অর্থাৎ বিদ্বানেরা ব্রহ্মচর্য দ্বারাই মৃত্যুকে সরিয়ে দিতে পারে। এইজন্য দীর্ঘজীবনের অনুষ্ঠানকারীদের জন্য অখণ্ড ব্রহ্মচর্যের অত্যন্ত আবশ্যকতা রয়েছে।

দীর্ঘজীবনের পঞ্চম উপায়টি হচ্ছে সদাচার। যে মানুষ চুরি, ব্যভিচার, অসত্য-ভাষণ, মদ্য-মাংসের সেবন, কলহ, লড়াই, আর অন্য অনেক ধরনের অসভ্যতা, অশিষ্টতা তথা ঈর্ষা-দ্বেষ আদি অনাচারকে করে আর সংয়ম, ব্রত, ইন্দ্রিয়-নিগ্রহ আদি করে না, তাদেরও আয়ু ক্ষীণ হয়ে যায়, কিন্তু যে মানুষ সদাচার রত - আচরণশীল, চরিত্রবান, তারা দীর্ঘজীবি হয়, এতে সন্দেহ নেই। ভগবান্ মনু বলেছেন "সদাচারেণ পুরুষঃ শতবর্ষাণি জীবতি", অর্থাৎ সদাচার দ্বারা মানুষ শত বছর বাঁচে। এর কারণ হচ্ছে এটাই যে যারা সদাচারের নিয়মে বাঁধা থাকে তারা মর্যাদিত আর ব্রতযুক্ত হয়, অতঃ তারা অবশ্যই দীর্ঘজীবি হয়, এইজন্য দীর্ঘজীবনের ইচ্ছাকারীদের সর্বদা সদাচারী হওয়া উচিত।

দীর্ঘজীবনের ষষ্ঠ উপায়টি হচ্ছে সঙ্গীত। সঙ্গীতের সদৃশ চিত্তকে প্রসন্নকারী আর কোনো বস্তু সংসারের মধ্যে নেই আর না প্রসন্নতার সমান বা আনন্দের সমান জীবনদানের দাতা কোনো ঔষধি রয়েছে, অতএব দীর্ঘজীবন দেয় এরকম সঙ্গীতের অভ্যাস করা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য। আর্যরা তাদের প্রত্যেক কাজের মধ্যে যে বেদের সস্বর পাঠের ক্রম রেখেছে, তার কারণ হচ্ছে এটাই। আর্য লোকেরা সারাদিন কোনো-না-কোনো বৈদিক যজ্ঞের অনুষ্ঠানের মধ্যেই থাকতো আর কোনো-না-কোনো বেদমন্ত্র গান করে থাকতো, কিন্তু আজকাল বিদ্বানেরা সস্বরজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, এইজন্য বেদের পাঠ তেমনটা আনন্দ দেয় না, যতটা সঙ্গীতের সঙ্গে দিতো। দীর্ঘজীবনের ইচ্ছুক প্রত্যেক আর্যের উচিত যে তারা পরমাত্মার স্তুতি-প্রার্থনা আর উপাসনা সম্বন্ধিত বেদমন্ত্রকে সর্বদা স্বরের সঙ্গে নিয়ম মতো গান করার অভ্যাস করা। বৈদিক গানের দ্বারা হৃদয়ে আনন্দ আর মস্তিষ্কে উচ্চ জ্ঞান প্রাপ্ত হয়, যার দ্বারা তার নিজের সমস্ত কাজকে নিয়মপূর্বক করার সূচনা প্রাপ্ত হতে থাকে আর সে দীর্ঘজীবনের উপায় করতে গিয়ে কখনও বিচলিত হয় না।

দীর্ঘজীবনের অন্তিম আর সপ্তম উপায়টি হচ্ছে প্রাণায়াম, কারণ প্রাণীদের আয়ু প্রাণের উপরেই অবলম্বিত। যে প্রাণী যতটা কম শ্বাস নেয় সে ততটাই অধিক বাঁচে। কচ্ছপ সবথেকে কম শ্বাস নেয়, এইজন্য সবথেকে বেশি দিন বাঁচে। প্রাণায়ামের দ্বারা দ্বিতীয় লাভটা হচ্ছে প্রাণপ্রদ বায়ুর সংগ্রহ। প্রাণপ্রদ বায়ু ভিতরে যাওয়াতে রক্তের মধ্যে প্রবাহমান মলের শুদ্ধি হয়, এইজন্য ভগবান্ মনু বলেছেন - যেভাবে অগ্নি ধাতুর মলকে জ্বালিয়ে দেয় সেইভাবে প্রাণায়াম দ্বারা ইন্দ্রিয়ের মল নষ্ট হয়ে যায়। মল নষ্ট হতেই শরীর নিরোগ হয়ে যায় আর দীর্ঘজীবন প্রাপ্ত হয়। প্রাণায়ামের এই বিশেষত্ব এখন পশ্চিমের বিদ্বানদেরও জ্ঞাত হয়েছে, এইজন্য সেখানে এখন প্রাণায়ামের খুব প্রচার চলছে। সেখানকার লোকেদের প্রাণায়াম হতে দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে∆। আমাদের দেশের মধ্যে তো পূর্ব সময়ে প্রাণায়ামের খুবই অধিক প্রচার ছিল। প্রত্যেক আর্যকে সকাল-বিকেল প্রাণায়াম করতেই হতো। এটাই হচ্ছে কারণ যে এখানে প্রাণায়ামের অন্তিম সীমা সমাধি পর্যন্ত লোকেদের ক্ষমতা হয়ে গেছিল। পাঞ্জাবকেশরী রানা রণজিৎ সিংহের সময়ে হরিদাস বৈরাগী শ্বাসরহিত হয়ে চল্লিশ দিন পর্যন্ত ভূমির ভিতরে থেকে দেখিয়ে দিয়েছিল যে কিভাবে বিনা শ্বাসে মানুষ বাঁচতে পারে। এই চমৎকারটা সেই সময় যেই ইংরেজরা নিজের চোখে দেখেছিল, সেটা তারা ইতিহাসের মধ্যে লিখে রেখেছে¶। এই রকমই মাদ্রাজের এক য়োগী আকাশে উড়ে আর কলকাতার ভূমিকৈলাসের এক য়োগী বিনা শ্বাসে মৃতবত্ হয়ে কতই-না ইউরোপনিবাসীদের চকিত করেছে, এইজন্য আর্যদের প্রাণায়ামবিদ্যা হচ্ছে সর্বদা সিদ্ধ। দীর্ঘজীবন বানিয়ে তুলতে এটা হচ্ছে তাদের অন্তিম উপায়। এই উপায় দ্বারা তারা এই লোকের মধ্যে দীর্ঘজীবন প্রাপ্ত করতো আর এর দ্বারাই সমাধিস্থ হয়ে পরমাত্মার দর্শন করে পরলোকের দীর্ঘজীবন মোক্ষও প্রাপ্ত করে নিতো। বলার অভিপ্রায় হল এই সাতটি উপায় দিয়ে দীর্ঘজীবন প্রাপ্ত হতে পারে। পূর্বকালে এর দ্বারাই আর্যরা দীর্ঘজীবন প্রাপ্ত করতো আর এখনও প্রাপ্ত করা যেতে পারে।
আর্যরা অর্থের প্রধান অঙ্গ ভোজন অর্থাৎ আহারের খুবই নিরীক্ষণ করেছে। তারা আর্য আহারকে ধার্মিক আর বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের অনুসারে দাঁড় করেছে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে "আহারশুদ্ধৌ সত্ত্বশুদ্ধিঃ সত্ত্বশুদ্ধৌ ধ্রুবা স্মৃতিঃ" অর্থাৎ আহারের শুদ্ধি দ্বারা সত্ত্বের শুদ্ধি হয় আর সত্ত্বের শুদ্ধি দ্বারা স্মরণশক্তি নিশ্চল হয়, কিন্তু অশুদ্ধ আহার দ্বারা সত্ত্ব আর স্মৃতিও অশুদ্ধ হয়ে যায়। এমনকি অন্নদোষের কারণে আয়ুও কমে যায়। মনু ভগবান্ স্পষ্ট বলেছেন যে "আলস্যাদন্নদোষাচ্চ মৃত্যুর্বিপ্রাঞ্জিঘাম্সতি", অর্থাৎ আলস্য আর অন্নদোষ হতে মানুষ শীঘ্র মারা যায়। এইজন্য যে আহার আয়ু, বল, রূপ, কান্তি আর মেধার বৃদ্ধিকারী হবে সেটাই আর্যদের ভোজন হতে পারে। কেবল এটাই নয় বরং যে ভোজনের সংগ্রহ করতে অর্থের পাঁচটি নিয়মের অনুকূলতা হবে, কোনো প্রাণীর আয়ু আর ভোগে বিঘ্ন হবে না এরকম আর আয়ু, বল, রূপ আর মেধার সঙ্গে-সঙ্গে মোক্ষ প্রাপ্ত করতেও সহায়ক হবে সেই আহারই আর্যদের ভোজন হতে পারে, আর্য ভোজন হল চারটি পরীক্ষা দিয়ে বাঁধা। প্রথম পরীক্ষাটি হল - যে আহার দ্বারা আয়ু, বল, কান্তি, আর বুদ্ধির বৃদ্ধি হবে। দ্বিতীয় পরীক্ষাটি হল - যাকে প্রাপ্ত করতে কারও কষ্ট হয় না, অর্থাৎ কোনো প্রাণীর আয়ু আর ভোগের মধ্যে বিঘ্ন উৎপন্ন হয় না। তৃতীয় পরীক্ষাটি হল - যে আহার বিনা কোনো কষ্টে কেবল নিজেরই অগর্হিত কর্মের দ্বারা উৎপন্ন হয়েছে আর চতুর্থ পরীক্ষাটি হল - যে আহার মোক্ষ প্রাপ্ত করতে সহায়ক হবে, সেটাই আর্যদের ভোজন হতে পারে, অন্য নয়। এরকম আহারকে আর্যদের পরিভাষাতে সাত্ত্বিক আহার বলে। সাত্ত্বিক আহারের স্বরূপ আর প্রভাব বর্ণনা করার সঙ্গে ভগবদ্গীতার মধ্যে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন -

আয়ুঃ সত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতি বিবর্ধনঃ।
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।
(গীতাঃ ১৭|৮)
বিবিক্তসেবী লঘ্বাশী য়তবাক্কায়মানসঃ।
(গীতাঃ ১৮|৫২)
অর্থাৎ - আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ আর সৌন্দর্যের বৃদ্ধিকারী রসালো, হালকা, পুষ্ট আর রুচিকর আহারই সাত্ত্বিক পুরুষদের প্রিয়, এইজন্য মোক্ষার্থীদের সর্বদা একান্ত সেবী, হালকা ভোজনকারী আর শরীর, বাণী আর মনকে নিয়ন্ত্রণকারী হওয়া উচিত। এই সাত্ত্বিক আর হালকা ভোজনের স্পষ্টীকরণ করার সঙ্গে বেদ বলেছে যে-

ঊর্জম্ বহন্তীরমৃতম্ ঘৃতম্ পয়ঃ কীলালম্ পরিস্রুতম্।
স্বধা স্থ তর্পয়ত মে পিতৄন্।।
(য়জুঃ ২|৩৪)

অর্থাৎ - ঘী, দুধ, অন্নরস (মিশ্রী), পাকা, পরিশ্রুত (ঝরে পরা) ফল আর জল আদি বলকারক পদার্থকে খেয়ে তথা পান করে হে পিতর! তুমি তৃপ্ত হও।

এই মন্ত্রটির মধ্যে সেই আহারের স্বরূপ স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যাকে গীতা সাত্ত্বিক আহার বলেছে আর যাকে পিতৃপূজনের পরে আর্যদের নিত্য খাওয়া উচিত। গীতা সাত্ত্বিক আহারের লক্ষণ রসালো, হালকা, পুষ্ট আর রুচিকর করেছে আর বেদমন্ত্রের মধ্যে তাকেই ঘী, দুধ, মিশ্রী, জল আর ফল বলা হয়েছে। উভয়ের তাৎপর্য হল একই। ঘী, দুধ, মিশ্রী, জল আর ফলই রসালো, হালকা, পুষ্ট আর রুচিকর হয়, এইজন্য ঘী, দুধ, মিশ্রী, জল আর ফলই হল আর্যদের আহার। এই আহারই উপরিউক্ত চারটি পরীক্ষার দ্বারা পরীক্ষিতও হয়েছে। এই পদার্থগুলোকে খাওয়া-পান করার জন্যই আয়ু, বল, মেধা আর সত্ত্বের বৃদ্ধি হয়, এই পদার্থগুলোকে খেলে না তো কোনো প্রাণীর কষ্ট হয় আর না কোনো প্রাণীর আয়ু আর ভোগের মধ্যে বাধা পড়ে, এই পদার্থ বিনা কোনো প্রকারের কষ্ট করে কেবল ফলের বাগান লাগিয়ে আর গৌ সেবা করলেই প্রাপ্ত হয়ে যায় আর হালকা ভোজন হওয়াতে এই পদার্থই ব্রহ্মচর্য আর য়োগাভ্যাসের মধ্যেও সহায়ক হয় আর মোক্ষ সাধনের যোগ্য বানিয়ে তোলে, এইজন্য আর্যশাস্ত্রের মধ্যে ইষ্টাপূর্তের দ্বারা বন-বাগান থেকে ফলের আর গোরক্ষার দ্বারা ঘী-দুধের প্রাপ্তি করা উত্তম বলেছে। 

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ঋগ্বেদ ৮/১/৬

  ।৷ ঋষিঃ মেধাতিথির্মেধ্যাতিথিশ্চ ॥ দেবতাঃ ইন্দ্ৰঃ ॥ ছন্দঃ বৃহতী ॥ স্বরঃ মধ্যমঃ ।। বস্যাঁ ইন্দ্রাসি মে পিতুরুত ভ্রাতুরভুজতঃ। মাতা চ মে ছদয়থ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ