বালী বধ :- ছল দ্বারা বা বল দ্বারা?
মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম সুগ্রীবকে বলেন-
অদ্য বালিসমুত্থং তে ভয়ং বৈরং চ বানর ॥ একেনাহং প্রমোক্ষ্যামি বাণমোক্ষণেন সংযুগে ॥ প্রত্যক্ষং সপ্ত তে সালা ময়া বাণেন দারিতাঃ ॥অর্থাৎ বানররাজ! আজ আমি বালি থেকে উৎপন্ন তোমার ভয় এবং বৈর উভয়কেই যুদ্ধস্থলে একবার বাণ নিক্ষেপ করে দূর করব। তোমার চোখের সামনে আমি আমার একটিমাত্র বাণ দ্বারা সাতটি শাল বৃক্ষ বিদীর্ণ করেছিলাম, আমার সেই বল দ্বারা আজ যুদ্ধে তুমি বালিকে নিহত বলে জেনে নাও।
এখন পশ্চিমোত্তর সংস্করণে দেখুন-
অদ্য বালিসমুত্থং তে ভয়ং শোকং চ বানর। একেনাহং প্রমার্জিষ্যে বাণমোক্ষণেন সংযুগে ॥ (বা. রা. পশ্চিমো. সং. কিষ্কি. 9/34)
এখানেও শ্রীরাম স্পষ্টরূপে এই বলেন যে আমি বালির বধ যুদ্ধে করব। "বলেনাদ্য বালিনং নিহতং ময়া" থেকে স্পষ্ট যে শ্রীরাম বালির বধ বল দ্বারা করার জন্য বলেন না যে ছল দ্বারা। সব জায়গায় শ্রীরাম বল দ্বারা যুদ্ধে বালির বধ করার কথা বলে কি ছল দ্বারা বালি বধ করবেন? "রামো দ্বির্নাভিভাষতে” (বা. রা. অযোধ্যা. ১৮/৩০) যাঁর জন্য প্রয়ুক্ত ছিল, যাঁর জন্য দেবর্ষি নারদ বলেন "সত্যে ধর্ম ইবাপরঃ" (বা. রা. গী. প্রে. বাল. 1/19, Cri. ed. বাল. 1/18) কি সেই শ্রীরাম নিজের বাক্য থেকে এই প্রকার বিমুখ হতে পারেন? কদাপি নয়। মহর্ষি বাল্মীকি দ্বারা অনেক গুণে যুক্ত পুরুষের বিষয় জিজ্ঞাসা করলে দেবর্ষি নারদজি তাঁকে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামের বিষয় বলেন। এই প্রসঙ্গে মহর্ষি বাল্মীকের এই শ্লোক দ্রষ্টব্য - "কস্য বিভ্যতি দেবাশ্চ জাতরোষস্য সংযুগে।" (বা. রা. গী. প্রে., Cri. ed. 1/4,) যদি শ্রীরাম ছল দ্বারা বালির বধ করতেন তবে
______________________________________
102 এই শ্লোকগুলি Cri. ed. কিষ্কি. 14/9,12 এ প্রাপ্ত হয়, সেখানে কেবল 'তেনাবেহি' এর স্থানে 'ততো বেত্সি' পাঠ পাওয়া যায়। মহর্ষি বাল্মীকি এরূপ জিজ্ঞাসা করলে নারদজি শ্রীরামের নাম নেন না। সুগ্রীবের ললকারে তারা বালিকে সুগ্রীবের সঙ্গে যুদ্ধে না যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং শ্রীরামের বিষয়ে বলেন-
তৎ ক্ষমো ন বিরোধস্তে সহ তেন মহাত্মনা ॥২১॥ দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন রামেণ রণকর্মসু ॥ ২২ ॥ প্রসীদ পথম্ শৃণু জল্পিতং হি মে ন রোষমেবানুবিধাতুমর্হসি । ক্ষমো হি তে কোশলরাজসুনুনা ন বিগ্রহঃ শক্রসমানতেজসা ।॥ ৩০ ॥ (বা. রা. গী. প্রে. কিষ্কি. ১৫/২১,২২,৩০)
অর্থাৎ সেই মহাত্মা রামের সঙ্গে আপনার বিরোধ করা মোটেই উপযুক্ত নয়। তাঁদের জয় করা অত্যন্ত কঠিন। আমি আপনার মঙ্গলের কথা বলছি। আপনি তা মন দিয়ে শুনুন। কেবল রোষের অনুসরণ করবেন না। কোশলরাজপুত্র শ্রীরাম ইন্দ্রের সমান তেজস্বী। তাঁর সঙ্গে বৈর বাঁধা আপনার জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়।
এখন অন্যান্য সংস্করণের পাঠ দেখুন-
ততঃ ক্ষমো ন বিরোধঃ সহ তেন মহাত্মনা। দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন রামেণ রণকর্কশ ॥১৮॥ যৌবরাজ্যেন সুগ্রীব তূর্ণং তমভিষেচয় । বিগ্রহং মা কৃথা মৌর্য্যাদ্ভাত্রা রামেণ বা স্বয়ম্ ॥২০॥ প্রসীদ পথম্ শৃণু জল্পিতং হি মে ন রোষমেতং তু বিধাতুমর্হসি । ক্ষমো হি তে কোশলরাজসুনুনা ন বিগ্রহঃ শক্রসমো হি রাঘবঃ ॥২৪॥
(বা. রা. পশ্চিমো. সং. কিষ্কি. ১০/১৮,২০,২৪)
তৎ ক্ষমং ন বিরোদ্ধং তে সহ তেন মহাত্মনা। দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন বীরেণ রণকর্মণি ॥ সুগ্রীবং প্লবগশ্রেষ্ঠং যৌবরাজ্যেऽভিষেচয় । বিগ্রহং মা কৃথা বীর রামেণামিততেজসা ॥ (বা. রা. বং. সং. কিষ্কি. ১৪/১৯,২১) তৎক্ষমং ন বিরোধস্তে সহ তেন মহাত্মনা। দুর্জয়েনাপ্রমেয়েন রামেণ রণকর্মসু ॥ (বা. রা. Cri. ed. কিষ্কি. ১৫/১৮)
এখানে সর্বথা স্পষ্ট যে শ্রীরাম বালির সাথে যুদ্ধ করতে আসছেন, তারা এই তত্ত্ব জানত। এই সবের অনুসীলন করলে এই বিদিত হয় যে বালি এবং সুগ্রীবের একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতে সময় শ্রীরাম দ্বারা লুকিয়ে বালির বধ করার প্রসঙ্গ মিশ্রণ। রামায়ণ থেকে শ্রীরাম ও বালির মধ্যে হওয়া যুদ্ধের সমস্ত শ্লোক বের করে দেওয়া হয়েছে। যা মিশ্রণ তা দূর করা যেতে পারে কিন্তু যেসব মূল কথা গ্রন্থ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে সেগুলি পুনরায় প্রাপ্ত করা সহজ নয়। যদিও বাল্মীকি রামায়ণ থেকে শ্রীরাম এবং বালির সংগ্রাম বিষয়ক শ্লোকগুলি বের করে দেওয়া হয়েছে তথাপি রামায়ণে এই যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রাপ্ত হয়। বালি বধের তারা সংবাদ প্রাপ্ত হলে সে নিজের পুত্র অঙ্গদকে নিয়ে পর্বতের গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। অঙ্গদকে চারিদিক থেকে বলশালী বীরেরা ঘিরে ছিল এবং শ্রীরামকে দেখে তারা লোকেরা পালিয়ে যায়। তারা তাদের পালাতে দেখে বলে তোমরা কেন পালাচ্ছ, তখন তারা (বানর) উত্তর দেয়-
জীবপুত্রে নিবর্তস্ব পুত্রং রক্ষস্ব চাঙ্গদম্। অন্তকো রামরূপেণ হত্বা নয়তি বালিনম্ ॥১১॥ ক্ষিপ্তান্ বৃক্ষান্ সমাবিধ্য বিপুলাশ্চ তথা 103 শিলাঃ। বালী বজ্রসমৈর্বাণৈর্বজ্রেণেব নিপাতিতঃ ॥১২॥ (বা. রা. গী. প্রে. কি. কা. সর্গ 19/11,12; Cri. ed. 19/11.12)অর্থাৎ হে দেবী! এখনও তোমার পুত্র জীবিত আছে। তুমি ফিরে যাও এবং তোমার পুত্র অঙ্গদের রক্ষা কর। শ্রীরামরূপী কাল বালিকে মেরে নিয়ে যাচ্ছে। বালির নিক্ষিপ্ত বৃক্ষ এবং বড় বড় শিলাগুলিকে নিজের বজ্রতুল্য বাণ দ্বারা বিদীর্ণ করে শ্রীরাম বালিকে আঘাতে ফেলে দিয়েছেন।
বঙ্গাল সংস্করণে এই প্রকার প্রাপ্ত হয়-
জীবপুত্রি নিবর্তস্ব রক্ষ পুত্রং অন্তকো রামরূপেণ হত্বা হরতি ত্বমঙ্গদং ।
____________________
103 শিলাস্তথা Cri. ed.
বালিনং ক্ষিপন্ বৃক্ষান্ মহাকায়ান্ বিসৃজংশ্চ মহাশিলাঃ । বজ্রিবজ্রোপমৈর্বাণৈ রামেণ বিনিপাতিতঃ ॥ (বা. রা. বং. সং. কিষ্কি. 18/10.11)
এই শ্লোকগুলিতে শ্রীরাম এবং বালির যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রাপ্ত হয়।
দেবর্ষি নারদ মহর্ষি বাল্মীকিকে বলেন—
ততঃ সুগ্রীববচনাদ্ধত্বা বালিনমাহবে। সুগ্রীবমেব তদ্রাজ্যে রাঘবঃ প্রত্যপাদয়ত্ ॥ 104 (বা. রা. গী. প্রে. বাল. 1/69.70: Cri. ed. বাল. 1/55)
অর্থাৎ সুগ্রীবের কথানুসারে সংগ্রামে বালিকে হত্যা করে তার রাজ্যে রাম সুগ্রীবকেই প্রতিষ্ঠিত করেন।
অন্যান্য সংস্করণে এই প্রকার বলা হয়েছে—
ততঃ সুগ্রীববচসা হত্বা সুগ্রীবায়ৈব তদ্রাজ্যং রাঘবঃ বালিনমাহবে। প্রত্যপাদয়ত্ ॥
(বা. রা. পশ্চিমো. সং. বাল. 1/69)
ততঃ সুগ্রীববচনাদ্ধত্বা বালিনমাহবে। সুগ্রীবমেব তদ্রাজ্যং রাঘবঃ প্রত্যপাদয়ত্ ॥ 105
(বা. রা. বং. সং. বাল. 1/72)
হনুমান্ জি দেবী সীতা জির সাথে মিলিত হলে তখন তিনিও এই বলেন যে শ্রীরাম মহাবলী বালিকে যুদ্ধে বধ করেছিলেন—
ততো নিহত্য তরসা রামো বালিনমাহবে। সর্বর্ক্ষহরিসঙ্ঘানাং সুগ্রীবমকরোত্ পতিম্ ॥
(বা. রা. গী. প্রে. সুন্দর. 35/52; Cri. ed. সুন্দর. 33/48)
104 এই পাঠ Professor Peter Peterson দ্বারা প্রকাশিত রামায়ণ (বাল. ১/৬৬) तथा Augustus Guilelmus A Schlegel দ্বারা সম্পাদিত রামায়ণ (বাল. ১/৬৮) এ প্রাপ্ত হয়।
105 William Carey And Joshua Marshman দ্বারা 1806 খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রামায়ণ (বাল. ১/৮১,৮২) এও অতি অল্প ভেদ সহ এই পাঠ প্রাপ্ত হয়, কেবল সুগ্রীবমেব এর স্থানে সুগ্রীবায়েব পাঠ প্রাপ্ত হয়।
এখন অন্যান্য সংস্করণেও দেখুন—
ততো নিহত্য তরসা রামো বালিনমাহবে। সর্বক্ষহরিসৈন্যানাং সুগ্রীবম্ অকরোত্ পতিম্ ॥
(বা. রা. পশ্চিমো. সং. সুন্দর. 29/50)
তং রামো বাহুবীর্যেণ স্বরাজ্যে প্রত্যপাদয়ত্। কপিরাজং রণে হত্বা বালিনং সুমহাবলং ।॥
(বা. রা. বং. সং. সুন্দর. 32/20)
হনুমান্ জি রাবণের সম্মুখে শ্রীরামের গুণের বর্ণনা করতে করতে বলেন যে শ্রীরাম যুদ্ধে বালির বধ করেছিলেন—
ততস্তেন মৃধে হত্বা রাজপুত্রেণ বালিনম্ । সুগ্রীবঃ স্থাপিতো রাজ্যে হরিবৃক্ষাণাং গণেশ্বরঃ ॥
(বা. রা. গী. প্রে. সুন্দর. ৫১/১০, Cri. ed. ৪৯/১০)
বঙ্গাল সংস্করণে এই প্রকার বলা হয়েছে—
ততস্তেন রণে হত্বা বয়স্যং তব বালিনং । সুগ্রীবঃ স্থাপিতো রাজ্যে হর্যক্ষাণাং গণেশ্বরঃ ॥
(বা. রা. বং. সং. সুন্দর. ৪৭/১০)
যখন শ্রীরাম মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রমে অবস্থান করেন তখন তিনি অযোধ্যার সংবাদ জানার জন্য এবং নিজের আগমনের সংবাদ ভরত জি ও নিজের বন্ধু গুহকে দেওয়ার জন্য হনুমান্ জিকে প্রেরণ করেন। ভরত জিকে বনবাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি বলার জন্য বলেন। সেখানে ভগবান শ্রীরাম বলেন যে বালির বধ যুদ্ধে হয়েছিল—
হরণং চাপি বৈদেহ্যা রাবণেন বলীয়সা। সুগ্রীবেণ চ সংবাদং 106 বালিনশ্চ বধং রণে 107 |
(বা. রা. গী. প্রে. যুদ্ধ. 125/8; দা. সং. ১২৮/৭ পশ্চিমো. ১০৬/১০ Cri. ed. 113/8)
106 সুগ্রীব সমবায়ং চ পশ্চিমো. সং. সংসর্গং দা. সং.
107 রণে বধম্ - পশ্চিমো. সং.
হনুমান্ জি ভরত জিকে বালি বধের বিষয়ে বলেন—
রামঃ স্ববাহুবীর্যেণ স্বরাজ্যং প্রত্যপাদয়ত্। বালিনং সমরে হত্বা মহাকায়ং মহাবলম্ ॥
(বা. রা. গী. প্রে. যুদ্ধ. 126/38; Cri. ed. যুদ্ধ. 114/30)
অর্থাৎ শ্রীরাম নিজের বাহুর বীর্য দ্বারা যুদ্ধে মহাকায় মহাবল বালিকে বধ করে সুগ্রীবকে তার রাজ্য প্রদান করেন।
পশ্চিমোত্তর এবং বঙ্গাল পাঠে এই প্রকার বলা হয়েছে—
তং রামো বাহুবীর্যেণ স্বং রাজ্যং প্রত্যপাদয়ত্। বালিনং সমরে হত্বা মহাকায়ং মহাবলম্ ।।
(বা. রা. পশ্চিমো. সং. যুদ্ধ. 107/86; বং. সং. 110/42,43)
হরিবংশ পুরাণ থেকেও জানা যায় যে শ্রীরাম বালির বধ যুদ্ধে করেছিলেন—
সুগ্রীবস্য কৃতে যেন বানরেন্দ্রো মহাবলঃ । বালী বিনিহতো যুদ্ধে সুগ্রীবশ্চাভিষেচিতঃ ॥
(হরি. পু. হরি. প. 41/133)
ভগবান শ্রীরাম এবং বালির যুদ্ধ হয়েছিল, যাতে ভগবান শ্রীরাম বালির বধ করেছিলেন, এর সমর্থনে আমরা পর্যাপ্ত প্রমাণ দিয়েছি। বিদ্বান জন নিজেরা চিন্তা করুন আমাদের গ্রন্থগুলির সঙ্গে কিরূপ প্রকারের ছেদ-ছাড় হয়েছে।
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ