শিবের দৃষ্টিতে ধর্ম - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

10 October, 2025

শিবের দৃষ্টিতে ধর্ম

 

শিবের দৃষ্টিতে ধর্ম

🍁 সম্পাদকীয় 🍁
আজ ভারতে যে মহাপুরুষের সর্বাধিক পূজা করা হয়, তিনি হলেন - ভগবান্ মহাদেব শিব। একদিকে যেমন পৌরাণিক বিদ্বানরা মহাদেব শিবের চরিত্রকে অত্যন্ত অশ্লীল, চমৎকারী আর কাল্পনিক রূপে প্রস্তুত করেছে, তেমনই অন্যদিকে আর্যসমাজিরা তাঁর চরিত্রকে নিকৃষ্ট বলে মনে করে অবহেলা করে দিয়েছে। বস্তুতঃ দুটোই তাঁর যথার্থ স্বরূপকে সমাজের সম্মুখে প্রস্তুত করতে পারেনি। সম্ভবতঃ তারা তাঁকে, তাঁর চরিত্রকে, তাঁর আদর্শ এবং সিদ্ধান্তকে জানেই না। এমন পরিস্থিতিতে পূজ্য আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক ভগবান্ মহাদেবের বাস্তবিক স্বরূপের বোধ করার জন্য মহাভারত গ্রন্থের আধারে তাঁর ধর্মবিষয়ক উপদেশকে সংসারের সামনে প্রস্তুত করেছেন। এই বিষয়ে আচার্যশ্রীর প্রবচনের প্রসারণ আমাদের "বৈদিক ফিনিক্স" ইউটিউব চ্যানেলের মধ্যে ষোলোটা ভিডিওর মাধ্যমে করা হয়েছে। এই প্রবচন মহাভারতের অনুশাসন পর্বের অন্তর্গত দানধর্ম পর্বের একটা শ্লোকের উপর আধারিত। এরমধ্যে অহিংসা, সত্য, দয়া, শম আর দানের প্রমাণপূর্বক ও দৃষ্টান্তসহিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
.
প্রবচন প্রত্যেক মানুষকে শোনা ও গ্রহণ করা উচিত আর শুনে নিজ ব্যবহারে সেটা ধারণ করা উচিত, বিশেষ করে গৃহস্থিদের। মহাভারতে লেখা আছে -
.
"শ্রূয়তাম্ ধর্মসর্বস্বম্ শ্রুত্বা চৈবাবধার্য়তাম্।"
.
অর্থাৎ ধর্মের স্বরূপ কি? শুনুন আর শুনে তদনুসারে চলুন।
.
ধর্মের অনিবার্যতা নিয়ে মহর্ষি বেদব্যাস মহাভারতের স্বর্গারোহণ পর্বে বলেছেন -
ঊর্ধ্ববাহুর্বিরৌম্যেষ ন চ কশ্চিচ্ছৃণোতি মে।
ধর্মাদর্থশ্চ কামশ্চ সঃ কিমর্থম্ ন সেব্যতে।।
.
অর্থাৎ আমি আমার দুই বাহু উপর তুলে, চিৎকার করে বলছি, কিন্তু আমার কথা কেউই শুনছে না। ধর্মের দ্বারা মোক্ষ তো প্রাপ্ত হয়, অর্থ আর কামও ধর্মের দ্বারাই সিদ্ধ হয়, তা সত্ত্বেও মানুষ তার সেবন কেন করে না? আচার্য চাণক্য ধর্মকে সুখের মূল বলেছেন - "সুখস্য মূলম্ ধর্মঃ"। এইজন্য প্রত্যেক সুখাভিলাষী ব্যক্তিকে ধর্মের আচরণ অবশ্যই করা উচিত।
.
এই পুস্তকের মধ্যে সর্বপ্রথম ধর্মের প্রথম লক্ষণ "অহিংসা"র উপর বিচার করে হয়েছে। হিংসা, কাম, ক্রোধ, লোভ আদির তরঙ্গগুলো সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডকে কিভাবে প্রভাবিত করে? এই বিজ্ঞান পাঠকদের জন্য নবীন হবে। এর পশ্চাৎ "সত্য" নিয়ে চর্চা করা হয়েছে, যার উপর সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড টিকে আছে। দয়ার দ্বারা কিভাবে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে? পরে এই বিষয়ে সবিস্তারে বলা হয়েছে। পরবর্তী কিছু অধ্যায়ের মধ্যে মানুষের মন ও ইন্দ্রিয় কিভাবে প্রদূষিত হচ্ছে আর এগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করে কিভাবে ব্রহ্মচর্যের পালন করা সম্ভব, তা নিয়ে বলা হয়েছে। অন্তিমে দুটো অধ্যায়ের মধ্যে দান কেন করবেন? আর সর্বশ্রেষ্ঠ দান কি? এইরূপ প্রশ্নের উত্তর পাঠকগণ পড়তে পারবেন। পুস্তকের অন্তিমে পরিশিষ্টের রূপে ভগবান্ শিবের অনুসারে চার বর্ণের ধর্ম, বর্ণ পরিবর্তন আর স্বর্গের অধিকারী কে? এইসব বিষয় বর্ণিত আছে।
.
পাঠকদের সুবিধা আর কিছু সজ্জনদের আগ্রহে আমি এই প্রবচনকে লিপিবদ্ধ করার নির্ণয় লিয়েছি। আচার্যশ্রীর উপদেশকে লিখিত রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব প্রিয় য়শপাল আর্যের। মৌখিক আর লিখিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য হওয়ার কারণে ভাষাকে পরিষ্কৃত করা অত্যাবশ্যক ছিল। এই কাজ আমার সহধর্মিণী শ্রীমতি মধুলিকা আর্যা, যিনি শ্রীমদ্ দয়ানন্দ কন্যা গুরুকুল, চোটিপুরার সুযোগ্যা স্নাতিকা হন তথা সম্প্রতি পি.এইচ.ডি. পূর্ণ করতে চলেছেন, তিনি দক্ষতার সাথে সম্পাদিত করেছেন, এরজন্য তাকে সহৃদয়ে ধন্যবাদ জানাই।
.
পাঠকদের কাছে বিনম্র নিবেদন যে তারা পুস্তকটা আদ্যোপান্ত পড়বেন, তার পাশাপাশি তারা এই বিষয়গুলোর উপর গম্ভীরতাপূর্বক চিন্তন করবেন আর এই উপদেশগুলোকে নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করবেন, যাতে তাদের জীবন সুখময় আর আদর্শ হয়ে ওঠে।
- বিশাল আর্য
🍁 ভূমিকা 🍁
ভগবান্ মহাদেব শিব একজন ঐতিহাসিক মহাপুরুষ ছিলেন, যিনি দেব বর্গে উৎপন্ন হয়েছিলেন। কৈলাশ ক্ষেত্র তাঁর রাজধানী ছিল। আজ শ্রাবণ মাসের শুরু থেকেই দেশ ও বিদেশের শিবালয়গুলোতে পূজা, কীর্তন, কথাবাচন, শিবলিঙ্গের অশ্লীল পূজা, যেটা শিবপুরাণের মধ্যে বর্ণিত দারুবন কথার উপর আধারিত তথা এই কথাকে কোনো সভ্য ও সুসংস্কৃত মহিলা বা পুরুষ শুনতেই পাবে না, শুরু হয়ে যায়। শিবলিঙ্গের উপর দুধ চড়ানো, যেটা বয়ে নর্দমায় গিয়ে পরিবেশকে দূষিত করে, পূজা করার স্বরূপ কি সত্যিই এমন? আশ্চর্যের বিষয় যে ভগবান্ শিবের এই অভাগা রাষ্ট্রের মধ্যে যেখানে কোটি-কোটি বাচ্চা বা বৃদ্ধ পেট ভরে খাওয়ার জন্য ভুগছে, সেই দেশের মধ্যে এইভাবে দুধ ছড়ানো, এটা সেই ক্ষুধার্ত নর-নারীর সাথে-সাথে স্বয়ং ভগবান্ শিবেরও অপমান নয় কি? কত জন শিবভক্ত আছে যারা ভগবান্ শিবের বিমল ও দিব্য চরিত্র, শৌর্য, ঈশ্বরভক্তি, য়োগসাধনা এবং অদ্ভুত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত? এটা আপনারা স্বয়ং আত্মনিরীক্ষণ করুন। ভগবান্ শিব কেমন ছিলেন, তাঁর কি প্রতিভা ছিল, তাঁর কি উপদেশ ছিল, এইসব জানা বা বোঝার না তো কারও কাছে সময় আছে আর না বোধ আছে। এই কারণে আমি একটা শৃঙ্খলা রূপে তাঁর গম্ভীর উপদেশ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানকে মহাভারত গ্রন্থের আধারে প্রস্তুত করা প্রারম্ভ করবো। এই বর্ণনা ভীষ্ম পিতামহের সেই উপদেশগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়, যা তিনি শরশয্যাতে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে দিয়েছিলেন। আজ এটা ভারী সমস্যা যে পৌরাণিক (তথাকথিত সনাতনী) ভাইরা ভগবত্পাদ মহাদেব শিবকে অত্যন্ত অশ্লীল, চমৎকারী ও কাল্পনিক রূপে চিত্রিত করেছে, অপরদিকে আর্যসামাজী বন্ধুরা যেন তাঁকে জঞ্জালের পাত্রে ফেলে দিয়েছে। এমতাবস্থায় তাঁর যথার্থ চিত্রন এই সংসারের সম্মুখে নিতান্ত লুপ্ত হয়েগেছে।
পৌরাণিক বন্ধু ধর্মের নামে প্রচলিত বিভিন্ন মান্যতা ও কথনকে বুদ্ধির চক্ষু বন্ধ করে অক্ষরশঃ সত্য বলে মেনে নেয় আর যদি বা কেউ মিথ্যা কথনের খণ্ডন করে, তাহলে তাকে হিন্দু বিরোধী বলে ঝগড়া করতে উদ্যত হয়। তারা এটাও কিভাবে না যে মিথ্যা কথন আর অন্ধবিশ্বাসের কারণেই এই ভারত আর হিন্দু জাতির এই দুর্গতি হয়েছে, ভারতের ইতিহাস ও জ্ঞান-বিজ্ঞান নষ্ট হয়েছে, ভারত কয়েকশ বছর ধরে বিদেশীদের দাস ছিল। অন্যদিকে আর্যসামাজী বন্ধু বিনা গম্ভীর চিন্তন ও স্বাধ্যায় করে পুরাণের সাথে-সাথে মহাভারত, বাল্মিকী রামায়ণের সব অথবা অধিকাংশ কথাকে কাল্পনিক মনে করে খণ্ডন করার জন্য তৎপর থাকে; মহাদেব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্রের মতো ভগবানদের ভুলে যাওয়ার পাপ করতে হলেও, তারা খণ্ডন করাকেই আর্যবর্ত বলে মনে করে। তারা এটা ভাবে না যে যদি মিথ্যা কথন আর অন্ধবিশ্বাসের খণ্ডন করতে হয়, তাহলে এই দেবতাদের সত্য ইতিহাসও তো জানা ও জানিয়ে দেওয়া অনিবার্য হবে। আপনাদের কাছে আগ্রহ করবো যে আপনারা এই উপদেশগুলোকে গম্ভীর্তাপূর্বক শুনবেন, বিচার করবেন তথা আচরণে নিয়ে এসে আসল শিবভক্ত হওয়ার চেষ্টা করবেন। ঈশ্বর আমাদের সবাইকে এমন সত্য শিবভক্ত হওয়ার বুদ্ধি ও শক্তি প্রদান করুক, এটাই কামনা করি।
.
ভগবান্ শিবের বিষয়ে প্রায়শই শিবপুরাণের কথার বাচন হয়, অথচ মহর্ষি বেদব্যাস কৃত মহাভারতকে পড়ার পাঠক এখন আর নেই বললেই চলে। উল্লেখনীয় হল যে মহর্ষি বেদব্যাস দ্বারা রচিত আঠারো পুরাণের মান্যতা আসলে তাঁর দ্বারা নয় বরং অন্য আচার্যদের দ্বারা রচিত ছিল আর এই গ্রন্থগুলো কোনো প্রামাণিক গ্রন্থের ধাঁচে আসে না। যদিও মহাভারতেও প্রায় ৯৫ শতাংশ এমন আছে, যা মহর্ষি বেদব্যাসের পশ্চাৎ তাঁর শিষ্য এবং কালান্তরে অনেক অপ্রামাণিক বিদ্বানরা লিখে জুড়ে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও বলবো যে মহাভারত হল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা গ্রন্থ। মহর্ষি দয়ানন্দ কৃত "সত্যার্থপ্রকাশ" আর "ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা"র গম্ভীর অধ্যায়ণ থেকে প্রাপ্ত ও নীর-ক্ষীর বিবেকী প্রজ্ঞার দ্বারা আমি যেকোনো আর্ষ গ্রন্থকে সঠিকভাবে বুঝতে পারি। আমার "বেদবিজ্ঞান-আলোক" গ্রন্থও এই ধরণের তদন্তে পরোক্ষ সহযোগিতা করতে পারে।
এখন আমি মহাদেব শিবের চর্চা করবো -
মহর্ষি দয়ানন্দ তাঁর পুনা প্রবচনে মহাদেব শিবকে অগ্নিষ্বাতের পুত্র বলেছেন। অগ্নিষ্বাত কার পুত্র ছিলেন, এটা খুব স্পষ্ট নয় তবে তিনি মহর্ষি ব্রহ্মার বংশজ অবশ্যই ছিলেন। মহাভারতে মহর্ষি বৈশম্পায়ন বলেছেন -
.
উমাপতির্ভূতপতিঃ শ্রীকণ্ঠো ব্রহ্মণঃ সুতঃ।
উক্তবানিদমব্যগ্রো জ্ঞানম্ পাশুপতম্ শিবঃ।।
শান্তিপর্ব । মোক্ষধর্মপর্ব । অধ্যায় ৩৪৯ । শ্লোক ৬৭ (গীতাপ্রেস)
.
এখানে ভগবতী উমার পতি ভূতপতি, যেটা ভগবান্ শিবেরই নাম, তাঁকে মহর্ষি ব্রহ্মার পুত্র বলেছেন। তাঁর পাশুপত অস্ত্র বিশ্বপ্রসিদ্ধ ছিল। এই অস্ত্রকে নষ্ট করতে পারে এমন কোনো অস্ত্র ভূমণ্ডলে ছিল না।
.
মহাভারতের অনুশীলন করে জানা যায় যে, ভগবান্ শিব অত্যন্ত বিরক্ত পুরুষ, সর্বদা য়োগ-সাধনায় লীন, বিবাহিত হয়েও পূর্ণ জিতেন্দ্রিয়, আকাশগমন আদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধি সম্পন্ন, বেদ-বেদাঙ্গের মহান বৈজ্ঞানিক, সুগঠিত, তেজস্বী ও অত্যন্ত বলিষ্ঠ শরীর ও বীরতার অপ্রতিম ধনী দিব্য পুরুষ ছিলেন। তিনি জীবনমুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত মহাবিভূতি ছিলেন। তাঁর ইতিহাসের বর্ণনা তো অধিক পাওয়া যায় না কিন্তু তাঁর উপদেশগুলোকে আমরা মহাভারতের মধ্যে পড়তে পারি। এই কারণে আমি এই গ্রন্থের উপরই ধ্যান কেন্দ্রিত করবো।
🌿 ২. ভগবান্ শিবের অনুসারে ধর্মের প্রথম লক্ষণ
ও৩ম্ য়ো ভূতম্ চ ভব্যম্ চ সর্বম্ য়শ্চাধিতিষ্ঠতি।
স্বর্য়স্য চ কেবলম্ তস্মৈ জ্যেষ্ঠায় ব্রহ্মণে নমঃ।।
(অথর্ববেদ ১০.৮.১)
.
এখন আমি মহাভারতের আধারে ভগবান্ শিবের উপদেশের বর্ণনা প্রারম্ভ করবো। মহাভারতের অনুশাসন পর্বে দানধর্ম পর্বের অন্তর্গত ভগবতী উমা মহাদেব শিবের নিকট প্রশ্ন করেছেন যে -
ধর্মঃ কিম্লক্ষণঃ প্রোক্তঃ কথম্ বা চরিতুম্ নরৈঃ।
শক্যো ধর্মমবিন্দদ্ভির্ধর্মজ্ঞ বদ মে প্রভো।।২৩।।
অর্থাৎ হে প্রভো ধর্মজ্ঞ! ধর্মের লক্ষণ কি? তথা যারা ধর্মকে জানে না, তারা কিভাবে ধর্মের আচরণ করবে?
.
আজ ধর্মের পরিভাষা বাইরের লক্ষণকে দেখে করা হয়। কেউ দাড়ি দেখে, তো কেউ শিখা দেখে, কেউ যজ্ঞোপবীত দেখে, তো কেউ সন্ধ্যা করতে দেখে, কেউ যজ্ঞ করতে, তো কেউ নামাজ পড়তে আর কেউ প্রার্থনা করতে দেখে। এগুলোর মধ্যে একটাও ধর্মের লক্ষণ নয়। সন্ধ্যা করাও ধর্মের লক্ষণ নয়। সন্ধ্যা করলে আমাদের ভিতরে যে গুণগুলো তৈরি হবে, সেগুলো ধর্মের লক্ষণ হবে। সন্ধ্যা করেছি আর আমাদের ভিতরে ধর্মের লক্ষণ আসেনি, তো সন্ধ্যা ধর্ম নয়। সন্ধ্যা হল ধর্ম পথে চলার জন্য একটা সাধন।
এখন মহাদেব শিব ধর্মের লক্ষণ সম্বন্ধে বলেছেন -
অহিম্সা সত্যবচনম্ সর্বভূতানুকম্পনম্।
শমো দানম্ য়থাশক্তি গার্হস্থ্য়ো ধর্ম উত্তমঃ ।। ২৫।।
(মহাভারত অনুশাসন পর্ব, দানধর্ম পর্ব, অধ্যায় ১৪১)
শ্রীমহেশ্বর বললেন - দেবী ! কোনো জীবের উপর হিংসা না করা, সত্য বলা, সব প্রাণীর উপর দয়া করা, মন আর ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ করা তথা নিজের সামর্থ্যানুসারে দান দেওয়া হল গৃহস্থ আশ্রমের উত্তম ধর্ম ।।২৫।।
.
এখানে অহিংসাকে প্রথম ধর্ম বলা হয়েছে আর যদি পাতঞ্জল য়োগদর্শনকে দেখি, তাহলে অষ্টাঙ্গ য়োগের মধ্যে প্রথম ধর্ম য়ম আছে - অহিংসা। ভগবান্ পতঞ্জলি এটাও লিখেছেন যে অহিংসা হল মূল, অহিংসা হল মহাব্রত, অহিংসার থেকে বড় কোনো ব্রত নেই।
.
এখন অহিংসা কি, এর উপর বিচার করবো -
প্রায়শঃ মানুষ এমন মনে করে যে অহিংসার অর্থ হল কারও সাথে শত্রুতা না করা। আমরা গান্ধীর তিন বাঁদরের কথা শুনেছি - কারও মন্দ দেখো না, কারও মন্দ শোনো না আর কাউকে মন্দ বলো না। মন্দটা কি, সেটাও তো জেনে রাখা দরজার। যদি রাজা কারও মন্দ না শোনে, তাহলে অপরাধীকে কিভাবে দণ্ড দিবে? কোনো ব্যক্তি যদি আবেদনকারী হয়ে ন্যায়ের জন্য আবেদন নিয়ে আসে, আর সেখানে রাজা চোখ, মুখ আর কান বন্ধ করে বসে পড়ে, তাহলে কি হবে? অর্থাৎ অহিংসার অর্থ বোঝাই হয়নি। অহিংসার অর্থ প্রাচীন ঋষিদের কালের পশ্চাৎ যদি সবথেকে বেশি কেউ জেনেছেন তো তিনি হলেন ঋষি দয়ানন্দ। তিনি সত্যার্থ প্রকাশের মধ্যে অহিংসার অর্থ সম্বন্ধে লিখেছেন -
"প্রাণীমাত্রের প্রতি দ্রোহ ত্যাগ অর্থাৎ সবার সঙ্গে প্রীতি করা।"
.
এখানে "অর্থাৎ সবার সঙ্গে প্রীতি করা" যদি না লিখতেন, তাহলে অহিংসা বোঝাই যেতো না। পরমাণু বোম কারও হিংসা করে না, কেউ তাকে চালাবে, তখন সেটা হিংসা করবে। বন্দুকের গুলিও স্বয়ং কারও হিংসা করে না, তাহলে কি এটা অহিংসা হবে? কবুতর কারও হিংসা করে না, কেউ মারতে এলে, তাহলে চোখ বন্ধ করে নেয়, এটা কি অহিংসা হবে? পাথরও হিংসা করে না, যদি কেউ সেটা মাথায় মারে, তাহলে সেটা আঘাতকারীর হিংসা হবে। এর ফলে পাথর কি অহিংসক হবে? এইজন্য ঋষি দয়ানন্দ জুড়ে দিয়েছেন - "সবার সঙ্গে প্রীতি করা"। অন্যদিকে মহর্ষি ব্যাস য়োগদর্শনের ভাষ্যতে অহিংসার পরিভাষা করে লিখেছেন -
"সর্বথা সর্বদা সর্বভূতানাম্ অনভিদ্রোহঃ সা অহিংসা"
- য়োগদর্শন
.
(সর্বথা) সব রকম ভাবে (সর্বদা) সব কালে (সর্বভূতানাম্) সব জীবের প্রতি (অনভিদ্রোহঃ) দ্রোহ করা উচিত নয়, (সা অহিংসা) সেটা হল অহিংসা।
.
যখন বিচারক কাউকে দণ্ড দেয়, তো তার মনে কোনো দ্রোহের ভাবনা থাকে না, বরং ন্যায়ের ভাবনা থাকে। বিচারকের মনে এই ভাবনা থাকে যে পীড়িত ব্যক্তি ন্যায় পাবে তথা অপরাধীরও উন্নতি হবে। যদি বিচারক অহিংসার অর্থ এটাই গ্রহণ করে যে কারও সাথে দ্রোহ না করা অর্থাৎ অপরাধীকে দণ্ড না দেওয়া, তাহলে অপরাধ বাড়বে। আর এর জন্য উত্তরদায়ী বিচারকই হবে। এইজন্য অহিংসার অর্থ হবে - কারও সাথে দ্রোহ না করা। ন্যায়ার্থ কাউকে মারা হিংসা নয়, বরং অহিংসা হয়। এর দ্বারা অনেকের প্রাণ বাঁচবে, এইজন্য ডাকাতকে দণ্ড দেওয়া অহিংসার অন্তর্গত আসে, হিংসার অন্তর্গত নয়।
.
এখন দ্বিতীয় কথা হল - সবার সাথে প্রীতি করা। দুষ্টকে দণ্ড দেওয়া কঠিন কাজ বটে। দুষ্ট যদি দুর্বল হয় তাহলে যে কেউ তাকে দণ্ড দিয়ে দিবে, কিন্তু যদি বলবান হয় তাহলে দণ্ড দেওয়ার সাহস কে করবে? ঋষি দয়ানন্দ মানুষের পরিভাষা নিয়ে বলেছেন - "অন্যায়কারী বলবান হলেও তাকে কখনও ভয় করবে না।" মানুষের লক্ষণ প্রথমে বলে দিয়েছেন - মানুষ অহিংসা থেকে তৈরি হয় আর যে ব্যক্তি মানুষ হয়, সেই ব্যক্তিই য়োগী হয়। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী য়োগী হতে পারে না। এইজন্য মানবতার প্রথম পরিভাষাও অহিংসাই হয়। ধর্মের পরিভাষা হল অহিংসা আর যে ব্যক্তি ধর্মকে ধারণ করে, সেই ব্যক্তিই মানুষ হয়। "অন্যায়কারী বলবান হলেও তাকে কখনও ভয় করবে না" এটা কোনো সহজ কাজ নয়। যদি রাজা অন্যায়কারী হয়, তাহলে তাকেও ভয় না পাওয়া। এর বিপরীত ন্যায়কারী, ধর্মাচরণকারী, আধ্যাত্মিক ব্যক্তি, খুব দুর্বল, যার কাছে কিছুই নেই, তবুও তাকে ভয় করে চলবে। কিন্তু ব্যবহারে এমন হয় না। আজ সত্য কথা বলা ও সত্যের উপর চলা ব্যক্তিদের কেউ কিছু মনেই করে না, যারা ক্ষমতা এবং বলসম্পন্ন আছে, সবাই তাদের তোষামোদ করে, এমন করা হিংসা হয়। যদি দুষ্ট ব্যক্তির তোষামোদ করা হয়, তাহলে সেই দুষ্ট আরও অধিক দুষ্ট কর্ম করবে। এইভাবে তার দোষও আমাদের উপরই আসবে। এইজন্য ঋষি লিখেছেন যে "অন্যায়কারী বলবান হলেও তাকে কখনও ভয় করবে না, সর্বদা তার নাশের চেষ্টা করতে থাকবে", তার নাশ করাও অহিংসার কোটিতে আসবে। একজন রাজা যদি দুষ্ট হয়, তাহলে তাকে দণ্ড দিলে সম্পূর্ণ রাজ্য সুখী হয়ে উঠবে, এইজন্য তাকে দণ্ড দেওয়া অহিংসার কোটিতে আসবে। ভগবান্ কৃষ্ণ, ভগবান্ রাম, ভগবান্ মহাদেব আদি এমনই তো করেছেন, সবার হাতে অস্ত্র আছে, এটা হিংসার জন্য নয়, বরং অহিংসার রক্ষার জন্য। তাঁদের অস্ত্রের ব্যবহারও অহিংসার কোটিতে আসে। যেমন - বিচারকের ন্যায়পূর্বক ফাঁসির শাস্তি দেওয়াও অহিংসার কোটিতে আসে। যদি অন্যায়পূর্বক দণ্ড দেয়, তাহলে সেটা হিংসার কোটিতে আসবে।
.
এরপরের কথায় আসবো, "ধর্মাত্মা নির্বল হলেও সর্বদা তাকে ভয় করে চলবে, তার সর্বদা প্রিয়াচরণ করবে" অর্থাৎ তার সঙ্গে প্রীতি রাখবে। মহর্ষি দয়ানন্দ এটাও বলে দিয়েছেন যে কার সাথে প্রীতি আর কার সাথে শত্রুতা করবেন - "অন্যায়কারীর সাথে শত্রুতা আর সজ্জনদের সাথে প্রীতি করবে।" সবার সাথে প্রীতি করে, এটা মুখে বলা অনেক সহজ, কিন্তু এক নিজের ভাই আছে আর এক শত্রুর ভাই আছে। শত্রু যতই দুষ্ট হোক না কেন, কিন্তু তার ভাই যদি সজ্জন হয়, তাহলে কতজন মানুষ আছে যে তার সাথে প্রীতি করবে? নিজের আর অপরের ভেদ মুছে ফেলে ব্যবহার করা, এটাই হল বাস্তবে প্রীতি করা আর এটাই হল অহিংসা। সবার সাথে প্রীতি করা অর্থাৎ সবার সুখ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। মন্দিরে স্লোগান দেওয়া হয় - ধর্মের জয় হোক, অধর্মের নাশ হোক, সবাই সুখী হোক, সব প্রাণীর মধ্যে সদ্ভাবনা হোক, সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ। এইসব এমন ভাবে বলা হয়, যেভাবে টেপ রেকর্ডার বলে। টেপ রেকর্ডের মধ্যে কোনো ভাবনা থাকে না, কেবল শব্দ থাকে আর যখন আমরা কথাবলি, তখন ভাবও থাকে। এইভাবে যেসব স্লোগান দেওয়া হয়, সেগুলোতেও কোনো ভাব থাকে না। যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয় যে সব প্রাণীর মধ্যে সদ্ভাবনা এবং তাদের কল্যাণের জন্য আপনি কি করছেন? যেমন কোনো ডাক্তার স্লোগান দেয় যে সব রোগী ঠিক হোক, সব রোগী নিরোগ হোক, সব রোগী সুস্থ্য হোক আর ওষুধ কাউকে না দেয়, তাহলে কি তার স্লোগানে সব রোগী ঠিক হয়ে যাবে? কখনও না। ঠিক সেইরকম ভাবে আমরা স্লোগান দিচ্ছি - ধর্মের জয় হোক, অধর্মের নাশ হোক, সবাই সুখী হোক, সব প্রাণীর মধ্যে সদ্ভাবনা হোক। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা অহিংসক হয়ে উঠবো না আর আমাদের মনের মধ্যে সবার প্রতি প্রীতির ভাবনা উৎপন্ন হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত এইসব স্লোগান দিয়েও কোনো লাভ হবে না।
.
দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে এমন কি কোনো সময় আছে যখন আমরা সবার ভালোর জন্য চিন্তা ভাবনা করি? সব সময় আমার দোকান, আমার বাড়ি, আমার ব্যবসা, আমার চাকরি, আমার ছেলে, আমার মেয়ে, আমার স্ত্রী, আমার মা-বাবা, এমন বলতে থাকি। কেবল মাত্র নিজের বিষয়েই ভাবি, নিজের বিষয়ে ভাবা মোটেও মন্দ নয়, অবশ্যই ভাবা উচিৎ, এটা ভালো কথা। নিজের সম্বন্ধে যদি না ভাবেন তাহলে অন্যের ভালো কিভাবে করবেন? কিন্তু এইসব করার পরেও কি এমন কোনো সময় আসে যে আমরা দেশের সম্বন্ধে ভাবি, মানবতার সম্বন্ধে ভাবি, ধর্মের সম্বন্ধে ভাবি? মন্দিরে গিয়ে ঘন্টা বাজিয়ে দিবো আর তিন-চারটা স্লোগান দিয়ে ফিরে চলে আসবো। যখন আমার স্লোগান দিবো আর সেই সময় কোনো দুঃখী ব্যক্তি এসে পরে, তাহলে কি আমরা তার কথা শোনার জন্য প্রস্তুত হবো? আমরা তাকে বলবো যে আমাদের পূজা করতে দাও। যদি আমরা ধ্যানে বসি আর কোনো দুঃখীর আওয়াজ আসে, তাহলে আমাদের কি কর্তব্য করা উচিত? আমরা কি ধ্যানে বসে থাকবো নাকি সেখানে গিয়ে তার সহায়তা করবো? উত্তর হল সেখানে গিয়ে তার সহায়তা করা। পরমাত্মাকে ধ্যানের কোনো আবশ্যকতা নেই। আমি চার ঘন্টা ধ্যান করি, তো এর থেকে সে কি পাবে? আমরা ধ্যান নিজের স্বার্থের জন্য করি, যাতে আমাদের আত্মা এবং বুদ্ধি পবিত্র হয়, যার দ্বারা আমরা ভালো কাজ করবো আর ভালো ফল পাবো। এইজন্য অবশ্যই ধ্যান করা উচিত, কারণ যদি এগুলো পবিত্র না হয় তাহলে সারা জীবন অব্যবস্থিত হয়ে যাবে। এইভাবে অহিংসা অর্থ হল - কারও সাথে দ্রোহ না করা, কাউকে অন্যায় ও দ্বেষ দৃষ্টিতে না দেখা, বরং প্রেম আর স্নেহের দৃষ্টিতে দেখা। এইজন্য য়জুর্বেদের মধ্যে বলা হয়েছে -
"মিত্রস্য চক্ষুষা সমীক্ষামহে।।" (য়জুর্বেদ ৩৬.১৮)
অর্থাৎ আমরা সব প্রাণীকে মিত্রের দৃষ্টিতে দেখবো।
.
এই সংসারের মধ্যে লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি প্রকারের প্রাণ আছে। সেগুলোর মধ্যে আমরাও হলাম একটা প্রজাতি। অহিংসা বলে - সব প্রাণীর প্রতি প্রীতিভাব। আমরা তো মানবের সাথেও প্রীতি করতে পারিনি, তো অন্য প্রাণীদের সাথে কিবা করতে পারি। স্বয়ংকে ছেড়ে দিয়ে বাকি সবাইকে তো আমরা নিজের ভোজন বানিয়ে ফেলেছি। যাকেই খাওয়া যেতে পারে, মানুষ তাকেই খাওয়ার চেষ্টা করছে। যেখানে অহিংসা বলছে যে সবার সাথে প্রীতি করো, সেখানে আমরা সব প্রাণীকে খাওয়াই নিজের ধর্ম বানিয়েছি। আমরা এমন বলি যে - আমরা কি খাবো কি খাবো না এটা আমরা নির্ণয় করবো, অন্যরা কেন তার নির্ণয় নিবে? এটাই তো আমাদের স্বতন্ত্রতা। এর জন্য অধিকারের আওয়াজ ওঠে যে আমাদের খাওয়ার অধিকার আছে। আমি গরু খাবো নাকি কি খাবো, এটা আমার অধিকার, গোহত্যা বন্ধ করলে কি হবে? এই কারণেই গোহত্যা আজ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি। এখন বাকি রইলো মানুষ, তাদের মধ্যেও একে-অপরকে খাওয়ার কথা করছে। সারা বিশ্বের মধ্যে ৭-৮ আরব মানুষ আছে, সেগুলোর মধ্যে আমরা কতজনের ভালো চাই? মহাদেব শিবের পরিভাষা তো এটাও ছিল যে কেউই আমাদের কারণে যেন দুঃখী না হয়, কিন্তু দুষ্টকে দণ্ড দেওয়ার ও আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। হিংসা জেআরএম অনেক প্রকারের হয়, তেমনই অহিংসাও অনেক প্রকারের হয়। এরপর আমরা এই বিষয়ে চর্চা করবো।

৩. মহাদেব শিবের উপদেশের জন্য আপনি কি করছেন? পূর্বে আমরা ভগবান্ শিব দ্বারা উপদিষ্ট ধর্মের প্রথম লক্ষণ অহিংসার উপর বিচার করছিলাম। দ্বিতীয় হল - সত্য বচন, তৃতীয় হল - সব প্রাণীর উপর দয়া, চতুর্থ হল - মন ও ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা আর পঞ্চম হল - দান। . এখন আমরা অহিংসার চর্চাকে আগে বাড়িয়ে হিংসাকেও জানার চেষ্টা করবো। ভগবান্ পতঞ্জলি য়োগদর্শনে আর মহর্ষি ব্যাসকৃত ভাষ্যে তিন প্রকারের হিংসার কথা বলা হয়েছে - কৃতা, কারিতা আর অনুমোদিতা। . কৃতা অর্থাৎ যেটা নিজের দ্বারা করা হয়। যেমন - মাংসাহারী ব্যক্তি, যারা স্বয়ং মেরে খায়। কারিতা অর্থাৎ যেটা অন্য কাউকে দিয়ে করানো হয়। অনুমোদিতা অর্থাৎ না নিজে করেছে আর না কাউকে দিয়ে করিয়েছে, কিন্তু অনুমোদন করেছে অর্থাৎ কারও দ্বারা হিংসা করা হলে এমন কথা বলা যে ঠিক করেছে, ভালো করেছে, এমনই হওয়া উচিত। এই তিনজনই পাপী হয় - যে করে, যে করায় আর যে হিংসার অনুমোদন করে। . এইভাবে অহিংসাও তিন প্রকারের হয়ে যাবে - একটা হল যেটা আমরা স্বয়ং আচরণে নিয়ে আসছি, দ্বিতীয় হল কাউকে শেখাচ্ছি আর তৃতীয় হল যদি কোনো ধার্মিক ব্যক্তি বা মহাত্মা আছে, তাহলে তার অনুমোদন করছি। . অন্য তিন প্রকারের হিংসা হল - মনসা, বাচা আর কর্মণা। . মনসা হিংসা - অনেক ভুল বিষয় আমাদের মনের মধ্যে থাকে, কিন্তু সমাজ ও শাসনের ভয়ের কারণে করতে পারি না। যেমন - একে মেরে ফেলবো, তাকে মেরে ফেলবো, ওর ধন সম্পদ নিয়ে নিবো, তবে করতে পারি না। কিন্তু মন দিয়ে করা হিংসাও পাপ হয়। বাচা হিংসা - বাণী দ্বারা কাউকে দুঃখ দেওয়া। অনেক ব্যক্তি আছে যারা কিছু করতে পারে না কিন্তু কঠোরভাবে কথা বলে। এই রকম হিংসাকে বাণী দ্বারা করা হিংসা বলে। কর্মণা হিংসা - নিজের কর্মের দ্বারা কাউকে কষ্ট দেওয়া। এইভাবে কৃতা, কারিতা এবং অনুমোদিতা হিংসার পরে আরও তিন-তিনটা ভেদ হওয়াতে সর্বমোট নয় প্রকারের হিংসা আছে। . মহর্ষি ব্যাস এরমধ্যেও হিংসার আরও তিনটা ভেদ বলেছেন - মৃদু, মধ্যম আর তীব্র। . যেমন কাউকে গালি দেওয়া হিংসা হবে, তাকে আঘাত করলে, তার থেকেও বড় হিংসা হবে, কিন্তু তাকে হত্যা করা, তার থেকেও বড় হিংসা হবে। আজ আমাদের দেশে সবথেকে বেশি মন্দির মহাদেব শিবের পাওয়া যায় আর শ্রাবণমাসকে মহাদেব শিবের মাস বলে ধরা হয়। অনেক মাংসাহারী শ্রাবণমাসে মাংস খাবে না, চুল কাটবে না, প্রতিদিন মন্দিরে গিয়ে দুধ ও জল চরাবে। কিন্তু মহর্ষি ব্যাস বলেছেন যে অহিংসা কোনো দেশ বা কালের অনুসারে হয় না যে মন্দিরে হিংসা করবো না, ঘরে গিয়ে করবো। ধর্ম সব স্থানে হবে আর অধর্ম সব স্থানে মানা হবে। এইরকমই শ্রাবণমাসে হিংসা করবো না, পরে অন্য কোনো মাসে করবো। যখনই হোক আর যেখানেই হোক, এটা অপরাধই হবে। কোনো একাদশী, পূর্ণিমা বা অমাবশ্যাতে পাপ করবো না, এটাও হল ভারী অজ্ঞান। ধর্ম সার্বভৌম হয়, অহিংসাও সার্বভৌম হয়। সব প্রাণীর প্রতি প্রীতি সদা করা উচিত আর সর্বদা দ্রোহ ত্যাগ করা উচিত। কেউ সোমবারে হিংসা করে না, কারণ মহাদেবের দিন মানে, তো কেউ মঙ্গলবারে করে না কারণ হনুমানের দিন মানে। মহাদেবের তো প্রতিদিন হবে কারণ মহাদেব নামটা হল পরমাত্মার। যদি মহাপুরুষ ওয়ালা মহাদেবকে মানা হয় তাহলে তিনি আজ নেই আর থাকলে মোক্ষের মধ্যে আছেন। যদি তাঁকেও স্মরণ করতে হয় তো প্রতিদিন করুন, কখনও-সখনও কেন? সোমবারেই কেন? যে দেশের মধ্যে সবথেকে বেশি শিব মন্দির আছে, সেই দেশের মধ্যে ৭০ শতাংশের অধিক মাংসাহারী হয়ে গেছে। এই বিষয়ে সব অহিংসক, ধর্মাচার্য ও শিবভক্ত মৌন আছে। নন্দীর পূজা করবে, কারণ তারা মনে করে যে ভগবান্ শিব নন্দী¹ বৃষের উপর গমন করতেন। নন্দীর মূর্তি প্রত্যেকটা মহাদেব মন্দিরে পাওয়া যায়, মানুষ তার পূজা করে। কিন্তু নিজের আবশ্যকতার পূর্তির জন্য নন্দীকে মেরে ফেলা হচ্ছে, সেটা নিয়ে কারও চিন্তা নেই। হিন্দু মাছকেও অবতার মানে, তো অন্যদিকে সরকার মাছ রপ্তানি করে কয়েক আরব টাকা কামাই করছে। মাছ মেরে বিক্রি করাকে যদি নীলী অর্থব্যবস্থা বলা হয়, তাহলে মাংস বিক্রিকে গুলাপী। আজ অর্থব্যবস্থাও রঙ হয়ে গেছে। মাছ মরে যাওয়ার কারণে যে ঘূর্ণিঝড় আসবে, তারমধ্যে একটা ঘূর্ণিঝড়ও যদি ভয়ংকর হয়, তাহলে কয়েক আরব টাকাও সেই ক্ষতির পূর্তি করতে পারবে না। যতটা বিনাশ হয়, সরকার ততটা দেয়ও না আর দিতেও পারবে না। আজকের সেই অর্থশাস্ত্রী, সমাজশাস্ত্রী, বৈজ্ঞানিক সবগুলো মূর্খ আছে, তারা ভাবে যে মানুষকে মদ্যপান করিয়ে ধন কামাবে , তারা এটা ভাবে না যে মদ্যপান করালে যেসব রোগ হবে, অপরাধ হবে আর এক্সিডেন্ট হবে, তাতে কত বিনাশ হবে, তার কোনো গণনা নেই। যেকোনো ভাবে যারা হিংসা করছে, তারা সবাই হল ভগবান্ শিবের দ্রোহী, তা সে তিলক আদি লাগিয়ে বর্ফানী বাবার দর্শনও করুক না কেন, এখন তো দর্শনও অনলাইন হয়ে গেছে। মহাদেব শিব যেটা লিখে গেছেন, তাকে মানে এমন কেউকে আজ দেখা যায় না। এটা ঠিক যে কোনো মহাদেবের মন্দিরে হিংসা হয় না, কিন্তু দেবীর কিছু মন্দিরে তো হয়। . এখন ভোজন ও অর্থব্যবস্থার নামে যে হিংসা হচ্ছে, কেউ এর প্রতিকার করছে না, সবাই ধন চায়। বৈজ্ঞানিক রিসার্চ করেছে যে মাছের বিস্কুট খেলে প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু যজ্ঞ, ব্যায়াম, প্রাণায়ামাদি করলে প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়বে, এটা কেউ বলে না। ফল-শাক, দুধ আদির সেবন করলে প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়বে, এটা কেউ বলে না। এলোপ্যাথির মধ্যে এমন কোনো ওষুধ নেই, যেটা প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, আয়ুর্বেদের মধ্যে অবশ্য আছে। সর্বত্র হিংসার সাম্রাজ্য চলছে। যদি আজ মহাদেব শিব হতেন, তাহলে একটা পাশুপত অস্ত্র চালাতেন আর সবাইকে নষ্ট করে ফেলতেন। কিন্তু আজ না মহাদেব আছেন আর না তাঁর কোনো ভক্ত, যে এই অহিংসার বিরুদ্ধে বলতে পারবে। নেতাদের হাতে ক্ষমতা থাকে আর একটাও নেতা মহাদেব শিবের ভক্ত নয়। সবাই হিংসক হয়ে গেছে, সবার উপর রাক্ষসী প্রবৃত্তি আধিপত্য করছে। রাক্ষসী প্রবৃত্তির কেন আধিপত্য আছে, এর তিনটাই কারণ হতে পারে - সবাই হয় আতঙ্কিত হয়ে আছে নয়তো ভ্রমিত অথবা লোভে পড়ে আছে। যে ভয় দেখাচ্ছে, প্রলোভন দিচ্ছে আর লোভ দিচ্ছে সে দেশের বাইরে বসে আছে। কে কতটা লাভ প্রাপ্ত করলো, এটা তো সে স্বয়ং জানে তথা ঈশ্বর জানে। যাকে আজ আমরা বিজ্ঞান বলি, সেটা সারা বিশ্বের অনেক প্রজাতিকে নষ্ট করে দিয়েছে আর আমাদের এখানে স্লোগান হয় "অহিম্সা পরমো ধর্মঃ"। . অহিংসা অর্থাৎ প্রাণীমাত্রের দ্রোহ ত্যাগ তখনই মানা হবে, যখন এই দেশ থেকে মাংসাহার সমাপ্ত হয়ে যাবে আর তখনই এই দেশ মহাদেব শিবের দেশ মানা হবে। যখন ওষুধের নামে হিংসা সমাপ্ত হয়ে যাবে আর যেসব টেকনিকের কারণে প্রজাতিগুলো মারা যাচ্ছে, সেইসব টেকনিক যখন সমাপ্ত হয়ে যাবে, তখন এই দেশ হবে - ঋষিদের দেশ, দেবতাদের দেশ, বুদ্ধ-মহাবীরের দেশ, মহর্ষি দয়ানন্দের দেশ। অহিংসা ছাড়া ধর্ম, ধর্ম থাকে না, সম্প্রদায় বা মত-পন্থ হতে পারে, তবে ধর্ম নয়। যেসব ব্যক্তি অহিংসক নয়, যাদের মধ্যে প্রাণীমাত্রের প্রতি সমবেদনা নেই, তারা হল অধর্মী ও পাপী। . কিছু ব্যক্তি বলে যে খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে ধর্মের কি যায়-আসে? তাহলে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা উচিত যে মানুষের মাংস খাবেন,আর খেলে কিছু যায়-আসবে নাকি যায়-আসবে না? ধর্ম কি কেবল মানুষের জন্যই হয়? ধর্ম সারা ভূমণ্ডলের জন্য হয়, সারা ব্রহ্মাণ্ডের জন্য হয়। ধর্মের অর্থ হল "ধিয়তে লোকোऽনেন" অর্থাৎ যার দ্বারা সৃষ্টিকে ধারণ করা হয়, সেটাই হল ধর্ম। আমরা হিংসা করে ভাবছি যে আমরা সুস্থ্য হবো, ধন আসবে, কিন্তু আমরা এটা ভাবছি না যে এতে সুস্থ্য হবো না, বরং রোগ আরও অধিক বেড়ে যাবে। কাল যদি কোনো ডাক্তার এমন অনুসন্ধান করে যে মানুষের রক্তপান করলে যৌবন ফিরে আসবে, তাহলে কি মানুষের রক্তও পান করবেন? শুনেছি কিছু ক্রূর ব্যক্তি এমনও করছে। গরীবের বাচ্চাকে অপহরণ করে, তাদের যন্ত্রণা দিয়ে, সেই দিশাতে তাদের রক্ত বের করে পান করে এমন ব্যক্তিও এই ভূমিতে আছে। একথা কতটা প্রমাণিত আমি তা জানি না, কিন্তু যদি এমন নরভক্ষী মানুষও এই ভূমিতে থাকে তাহলে এ হল সেই রাক্ষস, যাদের বধ করার জন্য ভগবান্ শ্রীরাম বনে গিয়েছিলেন। আমরা রাম মন্দিরের জন্য গ্রাম-গ্রাম থেকে ধন একত্রিত করছি, কিন্তু এই নরভক্ষীদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে প্রস্তুত নয়। . মহর্ষি দয়ানন্দ গো-করুণানিধির মধ্যে লিখেছেন - হে মাংসাহারীগণ! যখন এই ভূমিতে প্রাণী সমাপ্ত হয়ে যাবে, তখন কি মানুষকেও ছেড়ে দিবে নাকি তাদেরও খেয়ে ফেলবে? যারা ধনবান আছে, সত্তাবান আছে, ঐশ্বর্য-সম্পন্ন আছে, তারা গরীবদের খেয়ে ফেলবে, তাদের বাধা দেওয়ার কেউ থাকবে না আর আমাদের সবাইকে মনোরঞ্জনের নামে মোবাইলের মধ্যে, ইন্টারনেটের মধ্যে বিভ্রান্ত করে দিয়েছে, যাতে আমরা সেগুলোতে ব্যস্ত থাকি আর সেই হিংসকরা সারা বিশ্বের মধ্যে রাজত্ব করতে থাকে। এটা হল মহাদেব শিবের দেশ। যে সকল মহাদেব ভক্ত আমার আওয়াজ শুনছেন্, তারা ভেবে দেখুন যে মহাদেব শিবের এই উপদেশগুলোকে আত্মসাৎ করার জন্য আপনি কি করছেন? অন্যদের আপনি কি প্রেরণা দিচ্ছেন? এইসব বিষয়ের উপর ধর্মগুরু মৌন আছে। আসলে ধর্মগুরুরা সমাজকে মূর্খ করে রেখেছে। আমি কেবল মহাদেব শিবের কথা করবো, তাঁর অনুসারে ধর্মের প্রথম লক্ষণ হল - অহিংসা। . আসুন, আমরা আত্মনিরীক্ষণ করি যে আমরা মহাদেব শিবের কত ভক্তি করি, আমরা তাঁর কত অনুগামী? মহাদেব হলেন আমাদের পূর্বজ, আমাদের মহাপুরুষ। পরমেশ্বরেরও আরেকটা মহাদেব, যিনি সৃষ্টির রচনা করেন, সেই মহাদেবের চর্চা এখানে হচ্ছে না, কারণ তিনি তো উপদেশ বেদের মধ্যে আমাদের দিয়েছেন, যাকে আমরা ভুলে গেছি। যে বেদভক্ত মহাদেব শিব মহাপুরুষ ছিলেন, তাঁর বিষয়ে এমন মানা হয় যে তিনি মান কৈলাশে থাকতেন। মানসরোবরও এখন আমাদের হাত থেকে চলে গেছে, সেখানে অসুরের শাসন হচ্ছে। এইজন্য বিচার করুন যে আমাদের কি করা উচিত? এখন আপনাকে আপনার আত্মার আওয়াজ শুনতে হবে তথা এটা জানতে হবে যে আমাদের কি কি করতে হবে? মহর্ষি দয়ানন্দ লিখেছেন যে "মানুষের আত্মা সত্যাসত্যের জ্ঞানী হয়, তবুও নিজের প্রয়োজনের সিদ্ধি, হঠ, দুরাগ্রহ আর অবিদ্যাদি দোষের কারণে সত্যকে ছেড়ে দিয়ে অসত্য অর্থাৎ অধর্মের দিকে ঝুঁকে যায়। _______________ ¹ সম্ভবতঃ নন্দী নামক কোনো বাহন ছিল।

৪. নাকারাত্মক তরঙ্গ ব্রহ্মাণ্ডকে কিভাবে প্রভাবিত করে?
মহাভারতে চারটা স্থানে লেখা আছে - "অহিম্সা পরমো ধর্মঃ।"
.
মহর্ষি পতঞ্জলিও অহিংসাকে মূল বলেছেন, বাকি সব হল এর শাখা, এইজন্য এর উপর আরও একটু বিচার করবো। অহিংসার বিপরীত হল - হিংসা। হিংসা কেন ভয়ংকর হয়? কেন অহিংসারূপী ধর্মই সারা সংসারকে শরণ দিতে পারবে? এর উপর বিচার করবো -
.
যদি আমি বৈজ্ঞানিকদের জিজ্ঞেস করি যে এই সম্পূর্ণ সৃষ্টি কি দিয়ে তৈরি হয়েছে, তাহলে তারা বলবে যে মোলিকিউলস দিয়ে, তারপর আমি জিজ্ঞেস করবো যে মোলিকিউলস কি দিয়ে তৈরি হয়েছে, তো তারা বলবে যে এটম দিয়ে। তারপর আমি জিজ্ঞেস করবো যে এটম কি দিয়ে তৈরি হয়েছে, তো তারা বলবে যে ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন তথা অন্য কিছু কণা দিয়ে। তারপর আমি জিজ্ঞেস করবো যে এগুলো কি দিয়ে তৈরি হয়েছে, তো তারা বলবে যে এগুলো কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি হয়েছে, কিন্তু ইলেকট্রন কি দিয়ে তৈরি? এর কোনো জ্ঞান কারও কাছে নেই। তারপর আমি জিজ্ঞেস করি যে কোয়ার্ক তথা ফোটন কি দিয়ে তৈরি, তো এরও কোনো জ্ঞান কারও কাছে নেই, কিন্তু কিছু স্ট্রিং থিয়োরি ওয়ালা ব্যক্তি বলে দিবে যে এগুলো স্ট্রিং দিয়ে তৈরি, কিন্তু স্ট্রিং কি দিয়ে তৈরি হয়েছে? এর কোনো জ্ঞান তাদের কাছে নেই। আমি বলছি যে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড ধ্বনি তরঙ্গের কম্পন দিয়ে তৈরি হয়েছে আর সেই কম্পনই হল বৈদিক ছন্দ (মন্ত্র), সেই কম্পনই হল প্রাণ। এই কম্পন মনস্তত্ত্বের মধ্যে হচ্ছে। এখন তারা জিজ্ঞেস করবে যে মন কি দিয়ে তৈরি, তো এর উত্তর হল - প্রকৃতি দিয়ে।
.
এখন এখানে বিচার করবো যে যখন আমরা কোনো প্রাণীকে পীড়া দেই, তো সেই পীড়া কে অনুভব করে? সবার আগে মনই অনুভব করে কিন্তু এই পীড়া মন পর্যন্ত গিয়েই থেমে যায় না, বরং আত্মা পর্যন্ত যায়, এইজন্য উপনিষদের মধ্যে বলা হয়েছে -
"এষ হি দ্রষ্টা স্প্রষ্টা শ্রোতা ঘ্রাতা রসয়িতা মন্তা বোদ্ধা কর্তা বিজ্ঞানাত্না পুরুষঃ।" (প্রশ্নোপনিষত্ ৪.৯)
.
এর তাৎপর্য হল এই যে জীবাত্মা আছে, এটাই দেখে, স্পর্শ করে, শোনে, শুঁকে, জানে আর কর্ম করে। আমাদের বাণী এবং মনের বিচারের প্রভাব, আত্মা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। এখন একটু ভাবুন যে আত্মা ধ্বনি তরঙ্গের কোন রূপকে অনুভব করে? উত্তর হল - আত্মা ধ্বনি তরঙ্গকে পরা রূপে গ্রহণ করে আর পরা ধ্বনি তরঙ্গ দিয়েই সব তৈরি হয়েছে, এমনকি মন পর্যন্ত। জীবের উপর হিংসা করার কারণে যে পেইন-ওয়েভ উৎপন্ন হবে, তাকে এক ভারতীয় বৈজ্ঞানিক প্রফেসর মদন মোহন বাজাজ তার পুস্তকের মধ্যে "আইনস্টাইন পেইন ওয়েভ" নাম দিয়েছেন। যদি তিনি এই নাম দিয়ে থাকেন আর বাজাজ একজন ভালো বৈজ্ঞানিক হন, তাহলে এর অর্থ এই হল যে আইনস্টাইন মানতেন যে পেইন ওয়েভ হয়। আমি পড়িনি, প্রফেসর বাজাজ তার পুস্তকের মধ্যে দিয়েছেন আর সেই পুস্তক আমার কাছে আছে। যদি আইনস্টাইন, ফাইনম্যান আদি কোনো পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক বলে, আমরা কি তখনই মারবো? তাহলে এটা আমাদের বৌদ্ধিক দাসত্ব হবে। আমাদের ঋষি যা বলেছেন, আমাদের সেটাই মানা উচিত আর তাঁদের মার্গে যদি কোনো বৈজ্ঞানিক কিছু বলে, তাহলে তাকেও স্বাগত বা সমর্থন করা উচিত। অজ্ঞানী বালকও যদি তর্কসঙ্গত কথা বলে, তাহলে তাকে স্বীকার করা উচিত আর যদি তর্কবিহীন ও মিথ্যা কথা কোনো বড় বৈজ্ঞানিক বলে, তাকেও মানা উচিত নয়।
.
সম্পূর্ণ সৃষ্টি মনস্তত্ত্ব দিয়ে তৈরি হয়েছে। যখন কোনো প্রাণীকে মারা হবে, তো সেখান থেকে যে হিংসার তরঙ্গ বের হবে, তাতে সম্পূর্ণ মনস্তত্ত্বের মধ্যে কম্পন হবে। যেমন একটা পুলের উপর ৫০ জন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে আর একজন ব্যক্তি কোনো ভাবে পুলটাকে হেলায়, তো তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা সব ৫০ জন ব্যক্তিও প্রভাবিত হবে, এমন হবে না যে কেবল পুলটাই প্রভাবিত হবে। যখন কোনো হিংসার চিৎকার হয়, তখন এক তো সেই ধ্বনি তরঙ্গ স্বয়ং হানিকারক হয়, দ্বিতীয়ত তার পীড়ার তরঙ্গ, যেটা মন থেকে বের হচ্ছে, এই দুটোই সংসারকে প্রভাবিত করে। প্রোফেসর বাজাজ এরপর বলেছেন যে অন্য গ্যালাক্সি পর্যন্ত এই পেইন ওয়েভ যাবে।
.
এখন এর উপর বিচার করবো যে মানুষ কেন হিংসা করে -
কেউ লোভে হিংসা করে, ভাবে যে পশুকে মারলে চামড়া পাওয়া যাবে, মাংস বিক্রি করলে ধন প্রাপ্ত হবে। নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যকে মারা, এটা হল বর্তমান অসুরী স্বাস্থ্য নীতি। কেউ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ক্রোধে হিংসা করে। যুদ্ধ লোভ আর প্রতিশোধ উভয়ের জন্য হয়। তৃতীয় কারণ হল - কাম। বর্তমানে কামের কারণেও খুব হিংসা হচ্ছে। যে হিংসাই করবে, তো সেই হিংসার তরঙ্গের সঙ্গে-সঙ্গে কাম, ক্রোধ আর লোভের কোনো-না-কোনো তরঙ্গ অবশ্যই আসবে। ধরে নিন, আমি লোভ করছি, তাই ভাবছি যে তার ধন আমার কাছে আসুক, মাছ তথা পশুকে মেরে ধন সংগ্রহ করবো, তো যেমন পেইন-ওয়েভ ব্রহ্মাণ্ডকে প্রভাবিত করে, তেমনই লোভ ও ক্রোধাদির তরঙ্গও ব্রহ্মাণ্ডকে প্রভাবিত করবে। সারা ব্রহ্মাণ্ডের আধার হল এই মন, আজ সেটা সম্পূর্ণ ভাবে কম্পন করছে। যদি ঘরের ভিত্তিকে কম্পন করতে থাকা হয়, তাহলে ঘর কতক্ষণ স্থির থাকবে? নিরন্তর দুর্বল হয়ে পড়ে যাবে। মানুষ আজ রাক্ষস হয়ে গেছে, সেই রাক্ষস রাজনেতা, কর্মচারী, বৈজ্ঞানিক, অর্থশাস্ত্রী, শিক্ষাশাস্ত্রী, সমাজশাস্ত্রী, পুঁজিপতি যেকোনো রূপে হতে পারে। আজ মনে হচ্ছে যে সবথেকে বড় পুঁজিপতিরাই হচ্ছে আসল বৈজ্ঞানিক। কিন্তু সত্য বিজ্ঞানকে জানা বৈজ্ঞানিক কখনও হিংসার কথা বলতে পারে না।
.
হিংসার তরঙ্গ ব্রহ্মাণ্ডকে কিভাবে প্রভাবিত করবে? যেমন কোনো ঘরে একটু কম্পন করা হয়, তাহলে তার প্রত্যেকটা অণু প্রভাবিত হবে। ঠিক সেইরকম হিংসার তরঙ্গের কারণে সম্পূর্ণ মনস্তত্ত্ব প্রভাবিত হবে তথা সেই মনস্তত্ত্ব দিয়ে তৈরি হওয়া যত পার্টিকলস্ আছে, সেগুলোও প্রভাবিত/কম্পিত হবে। সেই কম্পিত হওয়া পার্টিকলও তরঙ্গ উৎপন্ন করবে আর সেই তরঙ্গ আমাদের মন, আমাদের স্বাস্থ্য, পৃথ্বী, সমুদ্র আদিকে প্রভাবিত করবে, যারফলে ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় ও তুফান আসবে। সেই তরঙ্গগুলো মেঘকেও প্রভাবিত করবে, যারফলে কোথাও বন্যা আসবে তো কোথাও শুকিয়ে যাবে। সেই তরঙ্গই সূর্যকে প্রভাবিত করবে, তো তারফলে হিট-ওয়েভ আসবে।
.
হিংসার তরঙ্গ ক্রোধ, লোভ আর মোহ থেকে উৎপন্ন হয়, তো তাকে কিভাবে শান্ত করা যাবে? ক্রোধের বিপরীত প্রেম, লোভের বিপরীত ত্যাগ আর পীড়ার বিপরীত হল শান্তি। ক্রোধের তরঙ্গ নাকারাত্মক প্রভাব ফেলবে আর প্রেমের তরঙ্গ সাকারাত্মক প্রভাব ফেলবে। কারণ প্রেমের তরঙ্গের মধ্যে সত্ত্বগুণ প্রধান হবে আর সত্ত্বগুণের পরিণাম হল - সুখ, শান্তি আর আনন্দ। ক্রোধের তরঙ্গের মধ্যে রজোগুণ ও তমোগুণ প্রধান হবে, যার পরিণাম হবে - অশান্তি, অজ্ঞানতা, মূঢ়তা আদি। এইভাবে ক্রোধ, লোভ, হিংসা, পীড়া আদির তরঙ্গকে দূর করার একমাত্র উপায় হল, প্রেমের তরঙ্গকে সংসারের মধ্যে উৎপন্ন করা। এইজন্য ঋষি দয়ানন্দ বলেছেন যে সবার সঙ্গে প্রীতি করা। আজ হিংসার তরঙ্গের সঙ্গে পীড়া, লোভ, ক্রোধ আর কামের তরঙ্গও যুক্ত হয়ে গেছে। এই পাঁচটা মিলিত হয়ে এই সংসারের নাশ করছে। সেটা ভূগর্ভীয় কম্পনের বৃদ্ধি হোক বা তুফান, সেটা বিশ্বের কোনো বন্যা হোক বা সাইবেরিয়ার মতো ঠাণ্ডা স্থানে উচ্চ তাপমান। এই সবগুলোর কারণ হল গত কয়েক বছর থেকে হিংসা অনেক অধিক বেড়ে গেছে। আজ হিংসার তরঙ্গের যে তাণ্ডব চলছে, তার পিছনে ক্রোধ নয়, বরং ধনের লোভ প্রমুখ কারণ আছে। রাক্ষস ব্যক্তিরা হিংসা ও পীড়ার তরঙ্গকে নিরন্তর বাড়িয়ে তোলার কাজ করছে আর মহাদেব ভক্ত মৌন আছে। তারা শুধু মৌনই নয়, বরং সমর্থনও করছে। অহিংসার প্রকরণ আমি এখানেই সমাপ্ত করছি। এরপর আমি সত্যের উপর চর্চা করবো।

৫. মিথ্যার ব্যাপার এবং সত্যের হ্রাস
এখন আমি মহাদেব দ্বারা নির্ধারিত ধর্মের দ্বিতীয় কথন "সত্য" -এর উপর চর্চা করবো -
.
কোনো ব্যক্তি সত্য তখনই বলবে, যখন সে সত্যকে জানবে। বেদের মধ্যে লেখা আছে - "স্বেন ক্রতুনা সম্বদেত" অর্থাৎ নিজের কর্মের দ্বারা বলো। এর অর্থ হল সত্য জানো, সত্য বলো আর সত্যই করো। সত্যের জন্য ঋগ্বেদের মধ্যে বলা হয়েছে -
.
সত্যেনোত্তভিতা ভূমিঃ সূর্য়েণোত্তেভিতা দ্যৌঃ। ঋতেনাদিত্যাস্তিষ্ঠন্তি দিবি সোমো অধি শ্রিতঃ।।
(ঋগ্বেদ ১০.৮৫.১)
.
এই ভূমি সত্যের উপর টিকে আছে, সূর্য সত্যের উপর টিকে আছে। সত্যের বিষয়ে মহর্ষি ব্যাস য়োগদর্শন ভাষ্যের মধ্যে লিখেছেন - "যেমন আত্মার মধ্যে আছে, তেমনই মনের মধ্যে, যেমন মনের মধ্যে আছে, তেমনই বাণীর মধ্যে আর তেমনই কর্মের মধ্যেও হোক, কিন্তু সেটা সবার হিতের জন্য হোক" আর ভগবান্ শিব মহাভারতের মধ্যে সত্যের লক্ষণ সম্বন্ধে লিখেছেন - "যেমন শুনেছেন, তাতে কোনো কিছু না মিশিয়ে, তাকে কোনো রূপ বিকৃত না করে প্রস্তুত করা হল সত্য।" এটা সবাই জানে যে সত্য কথা বলা সবথেকে সহজ কাজ, কিন্তু কেউ বলে না। অসত্য কথা বলতে অনেক চিন্তা-ভাবনা করতে হয় যে কি বলবো। কোনো অপরাধ বা একটু ত্রুটি হলে দেখবেন মনের মধ্যে কত তরঙ্গ ওঠে। এর সামনে এমন বলবে, অন্য কারও সামনে এমন বলবে, অর্থাৎ সবার সামনে আলাদা-আলাদা ভাবতে হবে, কিন্তু সত্য কথা বলতে কিছুই ভাবতে হয় না, যেমন জানা আছে, তেমনই বলে দিবে। খুব ছোট বাচ্চারা সত্য কথা বলে। তাদের মনের মধ্যে যেমন আছে, তারা তেমনই মুখ দিয়ে বলে দেয়। একজন পাগল ব্যক্তিও সত্য কথা বলে। তার মনে যা আসবে, সেটাই সে বলে দিবে আর করবেও ঠিক তেমনি। যদি তার মনে আসে যে কারও মাথায় পাথর মারতে হবে, তো সে মেরে দিবে, চিন্তা-ভাবনাও করবে না। এটা কি সত্য?
.
মহর্ষি ব্যাস সত্যের পরিভাষা করেছেন - "যেমন আত্মার মধ্যে আছে, তেমনই মনের মধ্যে, যেমন মনের মধ্যে আছে, তেমনই বাণীর মধ্যে আর যেমন বাণীর মধ্যে আছে, তেমনই কর্মের মধ্যে," কিন্তু তিনি এই শর্ত রেখে দিয়েছেন যে - যেটা সব প্রাণীর হিতের জন্য হবে সেটাই সত্য হবে আর যেটা প্রাণীর বিনাশের জন্য হবে, সেটাই অসত্য হবে। যেমন যদি কারও মনের মধ্যে আসে যে আমি কারও ধন চুরি করবো, কারও মাথা ফাটিয়ে দিবো, কাউকে গালি দিবো, কারও হানি করবো, তেমনই তার বাণীতেও হয় আর যদি সে তেমনই করে, তাহলে কি এটা সত্য হয়ে যাবে? যদি এইভাবে দেখা হয় তাহলে তো ডাকাতও সত্য কথা বলে, কারণ এমন অনেক ডাকাত আছে, যারা আগে থেকে পত্র পাঠিয়ে জানিয়ে দেয় যে অমুক দিনে ডাকাতি করতে আসবো, তোমার কাছে সাহস থাকলে থামিয়ে দেখাবে। এইজন্য মহর্ষি ব্যাস অনেক চিন্তা-ভাবনা করে লিখেছেন যে যার দ্বারা সব প্রাণীর হিত হবে, সেটাই সত্য হবে। সব প্রাণীর ভালো হতে হবে, এমন নয় যে কেবল নিজের ভালো হবে।
.
কোনো দোকানদারকে জিজ্ঞেস করুন যে আপনি দিনে কতবার মিথ্যা কথা বলেন, তো তিনি বলবেন এটা জিজ্ঞেস করার এমন কি আছে, অসত্য তো বলতেই হয়, অসত্য না বললে ব্যবসা চলবে কিভাবে? রাজনেতাদের ভাষণ রাজনৈতিক সভাতে গিয়ে শুনুন আর তাদের জিজ্ঞেস করুন যে আপনি যে ভাষণ দিলেন, তারমধ্যে কত শতাংশ অসত্য ছিল? তো তারাও এটাই বলবেন যে এটা জিজ্ঞেস করার এমন কি আছে, অসত্য তো বলতেই হবে, তা নাহলে রাজনীতি চলবে কিভাবে? কিছু ব্যক্তি বলে যে আজ তো অসত্য ছাড়া ব্যবহারই চলবে না। কিন্তু আজও এমন কিছু দোকানদার আছে, যারা সবাইকে এক মূল্যে জিনিস দিবে, তা সে বালক হোক বা বৃদ্ধ আর তাদের ব্যবসাও খুব ভালো চলছে।
.
এমন নয় যে লোকব্যবহারে সত্যের পরিণাম ভালো হয় না। আমি তো স্বয়ং সত্যের ব্যবহার করেছি আর সত্যকে খুব পরীক্ষা করে দেখেছি। যখন আমি যুবকাবস্থায় ছিলাম, তো অপরাধীও আমার সামনে আসতো না আর বড়-বড় নেতা, অধিকারীর সঙ্গে আমার বিবাদ প্রায়শই হতো, কিন্তু কেউ আমার খারাপ করতে পারেনি। যারা অসত্য কথা বলে তাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যদি সত্য বললে হানি হয়, তাহলে সহ্য করা উচিত, কারণ অন্ততঃ সত্য বলাও লাভদায়ক হয়। যদি সবাই সত্য একদম না বলে আর কেবল অসত্য বলে, তাহলে ব্যবহারই চলবে না। যেমন কাউকে খিদে পেয়েছে, তার মা জিজ্ঞেস করছে যে খিদে পেয়েছে কিনা, তো সে যদি বলে যে খিদে পায়নি, তাহলে তো খাবারই পাবে না। আর যদি খিদে না পায় অথচ বলে যে হ্যাঁ খিদে পেয়েছে, তাহলে খাবার নিয়ে আসলেও সে খেতে পারবে না। সংসারের যত অসত্যের ব্যাপার চলছে, সেটা এই কারণে চলছে যে তার মধ্যে সত্যও মিলিত আছে। বিশ্বের মধ্যে যত সুখ দেখা যায়, সেগুলো সত্যের কারণে টিকে আছে আর যত দুঃখ দেখা যাচ্ছে, সেগুলো অসত্যের কারণে আছে।
.
অসত্য বলে আমরা ধন অর্জন করেছি, তাহলে কি আমরা সুখী হয়ে গেছি? আশ্চর্যের বিষয় যে আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় চিহ্নে "সত্যমেব জয়তে" লেখা আছে, কিন্তু যতটা আমাদের ভারতে অসত্য বলা হয়, সম্ভবতঃ ততটা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে বলা হয় না। ভারত ধর্মপ্রধান দেশ কোথায় আছে? মাত্র বাহ্য আডম্বর প্রধান দেশ হয়ে রয়ে গেছে। তিলক, জনেউ, শিখা, যজ্ঞ, তপ, ব্রত, উপবাস, মন্দিরে যাওয়া, শুয়ে-শুয়ে যাওয়া, পায়ে হেঁটে যাওয়া এইসব হল বাহ্য আডম্বর। যজ্ঞ, জনেউ, শিখা আদির নিজস্ব গুরুত্ব আছে, কিন্তু এগুলো হল প্রতীকমাত্র। আমরা প্রতীকগুলোকেই ধর্ম ভেবে নিয়েছি। আমরা ভারতের মানচিত্রকেই ভারত ভেবে নিয়েছি। মানচিত্র হল মার্গদর্শক, কিন্তু ভারত নয়। কোথাও "গৌ" শব্দ লেখা আছে, তো সেটা দুধ দিবে না, সেটা তো তার প্রতীকমাত্র।
.
সত্য হল সুপার এক্সপ্রেসওয়ের মত পথ, যেটা সোজা আর খালি পড়ে আছে, যার উপর দিয়ে আরামে দৌড়ে চলে যাবেন, কোথাও ধাক্কা লাগবে না আর অসত্য হল ভিড়-ভার যুক্ত পথের সমান, তার উপর কোথাও এদিক তো কোথাও সেদিক মুড়ে যেতে হয়। গাড়ি যদি সোজা যায় তাহলে সঠিক ভাবে যাবে আর যদি এদিক-সেদিক হয়ে চলে, তাহলে গাড়ির ক্ষতি হবে। ঠিক এমনই অসত্য কথা বললে আমাদের শরীরেরও হানি হবে। এটা সবাই জানে যে অসত্য কথা বলা ব্যক্তির মন কত কম্পন করে, বুকের ধুকপুক বেড়ে যায়, দম ফুরিয়ে আসে, কারণ অসত্য শরীরের মধ্যে বিকার উৎপন্ন করে। যে অসত্য শরীরের মধ্যে বিকার উৎপন্ন করতে পারে, সেটা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কেন করবে না? একটা মনস্তত্ত্ব আমাদের ভিতরে আছে, যা দিয়ে সমষ্টি মন প্রভাবিত হয়, সেটা সারা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ব্যাপ্ত আছে, যার দ্বারা সারা সৃষ্টি নির্মিত হয়েছে। যেমন হিংসার তরঙ্গ, পার্টিকলস আর ওয়েভস সবাইকে প্রভাবিত করে, সেই রকম মুখে বলা অসত্যও এইসবকে প্রভাবিত করে, কারণ সেটাও এর আধারকে (মনস্তত্ত্ব) ঝাঁকাচ্ছে।
.
আজ বিশ্বের মধ্যে আট আরব মানুষ বসবাস করে। যদি একজন ব্যক্তি একদিনে প্রায় দশবার অসত্য কথা বলে, তাহলে আশি আরব বার অসত্য কথা বলা হবে। যদি অসত্যের দ্বারা কাউকে আতঙ্কিত করা হয়, তাহলে ভয়ের তরঙ্গ, যদি অসত্য ভাষণ করে কাউকে প্রলোভন দেওয়া হয় তাহলে লোভের তরঙ্গ আর যদি কেউ অহংকার বা অহেতুক নিজের প্রশংসায় অসত্য কথা বলে, তাহলে তাতে অহংকারের তরঙ্গ জুড়ে যাবে। কিছু মানুষ কোনো কথাকে ভালো করার জন্য অসত্য কথা বলে, যেমন বেশিরভাগ উপদেশক অসত্য মিলিয়ে উপদেশ করে। শুনেছি, একবার ডাক্তার সম্পূর্ণানন্দের কাছে একজন জিজ্ঞেস করে যে ভারত তো সত্যবাদী মহারাজ হরিশচন্দ্রের দেশ, তা সত্ত্বেও দেশের মধ্যে এত অসত্য বলা হয়, আমরা কেন সত্যবাদী হইনি? তো তিনি উত্তর দেন যে দেশ এইজন্য সত্যবাদী হতে পারেনি, কারণ সত্যবাদী হরিশচন্দ্রের কাহিনীতে অনেকগুলো অসত্য মিশ্রিত করে প্রচার করা হয়েছে, সত্যের মধ্যে অসত্য মিশ্রিত করা হয়েছে। সত্যকে মনোরঞ্জন ও অতিশয়োক্তিপূর্ণ বানানোর জন্য বা অন্য কোনো কারণে অসত্য বলা হয়। সব স্থানে অসত্যের ব্যাপার চলছে, তাহলে ভূমি টিকবে কিভাবে? কারণ ভূমি তো সত্যের উপর টিকে আছে।
.
যার উপর ভূতাদি প্রাণী বাস করে, তাকে ভূমি বলে। সেটা পৃথিবী হোক বা অন্য কোনো লোক, প্রাণী সর্বত্র বাস করে, সূর্যের মধ্যেও আগ্নেয় শরীর যুক্ত প্রাণী বাস করে। এর অর্থ হল সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড সত্যের উপর টিকে আছে। আচার্য চাণক্য বলেছেন -
সত্যেন ধার্য়তে পৃথ্বী সত্যেন তপতে রবিঃ।
সত্যেন বাতি বায়ুশ্চ সর্বম্ সত্যে প্রতিষ্ঠিতম্।।
(চাণক্যনীতিদর্পণম্ ৫.১৯)
.
এটাও আশ্চর্যের বিষয় যে মানুষ ছাড়া কোনো প্রাণীই অসত্য বলে না। গরু, ঘোড়া, কুকুর, বেড়াল, সাপ আদি কেউই অসত্য বলে না, তারা কোনো অজুহাত করে না আর কাউকে বিভ্রান্তও করে না। বাঘ মারবে তো মারবেই, সে বিভ্রান্ত করবে না যে লেজ নাড়াবে আর তারপর মেরে ফেলবে। কিছু কুকুর চুপচাপ কামড়ে দেয় আর কিছু কুকুর ঘেউ-ঘেউ করে কামড়ে দেয়, কুকুর যদি লেজ নাড়ায় তাহলে কামড়াবে না, কিন্তু এই মানুষ লেজ নাড়াবে, তবুও কামড়াবে অর্থাৎ সামনে-সামনে চাটুকারিতা করবে আর ভিতরে-ভিতরে আঘাত করবে। বিশ্বের মধ্যে যে নিজেকে সবথেকে বুদ্ধিমান মনে করে, সেই মানুষ সবথেকে বেশি অসত্য বলে। অসত্য তার জীবনের মধ্যে ভরে পড়ে আছে। আমাদের নেতা, যাদের আমরা প্রমাণ মানি যে এরা তো অন্ততঃ সত্যিই বলবে, বৈজ্ঞানিক সত্যিই বলবে, কিন্তু বর্তমানে এরা এমন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে যে সবাই অসত্য বলছে আর অসত্যের কারণে সম্পূর্ণ পরিবেশ তন্ত্র নষ্ট হচ্ছে। আজকের পরিবেশ বৈজ্ঞানিক কেবল এটাই ভাবে যে সূর্য থেকে উষ্ণতা আসে আর তাতে কোনো পরিবর্তন হলে, তো সেটাই পরিবেশ প্রদূষণের কারণ হয়। সব দোষকে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের নামে স্ট্যাম্প লাগিয়ে দেয়। তাদের জিজ্ঞেস করুন যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং কেন হয়েছে? এর উত্তর তাদের কাছে নেই। কখনও আবহাওয়া খারাপ হবে, তো আবহাওয়া দপ্তর বলবে যে পশ্চিমী বিক্ষোভের কারণে এমন হচ্ছে, পূর্ব বিক্ষোভ, পশ্চিমী বিক্ষোভ পরস্পর সংঘর্ষ হয়েছে, তাই এমন হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলকে বিক্ষুব্ধ কে করেছে? আমরা বিক্ষুব্ধ করেছি, অসত্য বলে, লোভ, হিংসা, অহংকার, কাম, ক্রোধ, ঈর্ষার তরঙ্গ দিয়ে। তারা এইসব বিষয়ে জানেই না, কারণ তাদের ক্ষেত্র পার্টিকল পর্যন্তই আছে। বৈজ্ঞানিক আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি যে সেইসব পার্টিকলস্ কেমন, কি দিয়ে তৈরি, সেগুলোর ঘটক কি? যখন সত্য জানা নেই আর কেউ যদি সেটা বলে, তাহলে সেটা বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
.
সত্য বলার মধ্যে হৃদয় সামান্য থাকে, সরল থাকে, নিষ্কপট থাকে আর অসত্য বললে হৃদয়ের ধুকপুক বেড়ে যায়, এইজন্য মেশিন ধরে ফেলে। অসত্য আমাদের শরীরকে ভিতর পর্যন্ত ঝাঁকা দিয়েছে, কিন্তু এই বিষয়ে ভাবার জন্য কেউই প্রস্তুত নয়। অসত্যও এত দৃঢ় আর নির্লজ্জভাবে ভাবে বলে যাতে সবাই সত্য মনে করে। তাদের নির্লজ্জতা দেখে আমাদের মনে হয় যে তারা হয়তো সত্যিই বলছে। অভিনেতা যেভাবে কথা বলে, ঠিক সেইভাবে আজকের মানুষ কথা বলে। যেমন কোনো রাঁধুনি যদি নাটকে হনুমান সাজে আর তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তুমি কে? তো সে বলবে যে হনুমান, যদি রাঁধুনি বলে তাহলে নাটক কিভাবে চলবে, এইজন্য অসত্য বলে। সর্বহিতের জন্য যদি কেউ এমন ধারাবাহিক করে, তাহলে ভালো কথা। কিন্তু যদি লোভের কারণে করে, তাহলে সেই অসত্য মানবতার জন্য ঘাতক হবে।

🌿 ৬. সত্যই হল জীবনের সুন্দর সঙ্গীত 🌿
এখন আমি ভগবান্ শিবের দ্বারা নির্দেশিত ধর্মের দ্বিতীয় লক্ষণের উপর চর্চাকে আগে নিয়ে যাবো। আমি যেমন পূর্বে বলেছি যে মহর্ষি ব্যাসের অনুসারে "যেমন আত্মার মধ্যে আছে, তেমনই মনের মধ্যে হোক, যেমন মনের মধ্যে আছে, তেমনই বাণীর মধ্যে হোক আর তেমন কর্মের মধ্যেও হোক, কিন্তু সেটা সবার হিতের জন্য হোক।"
.
যদি আত্মা, মন আর বাণীর মধ্যে সমতা থাকে, তাহলে আমাদের জীবনের সঙ্গীত ভালো হবে। যেমন হারমোনিয়ামের যদি একটা স্বর এদিকে বাজে তো আরেকটা ওদিকে অথবা হারমোনিয়াম গাইছে একটা আর গায়ক গাইছে আরেকটা। ঢোল এক রকম বাজাচ্ছে আর করতাল আরেকরকম, তাহলে সঙ্গীত খারাপ হয়ে যাবে। ঠিক সেইরকম আমাদের জীবনরূপী সঙ্গীতের জন্য আমাদের সব ইন্দ্রিয়রূপী যন্ত্রের মধ্যে সমতা ও অভিন্নতা হওয়া উচিত। কঠোপনিষদের মধ্যে বলা হয়েছে -
.
আত্মানম্ রথিনম্ বিদ্ধি শরীরম্ রথমেব তু।
বুদ্ধিম্ তু সারথিম্ বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ।।
ইন্দ্রিয়াণি হয়ানাহুর্বিষয়াম্স্তেষু গোচরান্।
আত্মেন্দ্রিয়মনোয়ুক্তম্ ভোক্তেত্যাহুর্মনীষিণঃ।।
(কঠোপনিষদ্ ১.৩.৩-৪)
.
অর্থাৎ আত্মাকে রথী, শরীরকে রথ, বুদ্ধিকে সারথী, মনকে লাগাম, ইন্দ্রিয়কে ঘোড়া আর বিষয়কে মার্গ বলা হয়েছে। যদি রথী অর্থাৎ রথের মালিকের আজ্ঞানুসারে সারথী রথকে চালাচ্ছে, লাগামকে শক্ত করে ধরে আছে আর লাগাম ঘোড়ার সাথে নিয়ন্ত্রিত আছে, তাহলে সেটা সঠিক মার্গে যাবে। তা নাহলে মালিক বলবে একটা, সারথী করবে আরেকটা আর সারথীর হাতে লাগামও যদি দূর্বল হয়, তাহলে ঘোড়া কোথায় যাবে, সেটা কেউ জানে না। এইজন্য জীবনের সঙ্গীতে এর অভিন্নতা হওয়া উচিত আর সেই অভিন্নতার নামই হল সত্য, যারমধ্যে কোনো জটিলতা, বাধা, বিকৃত হবে না। যেমন এক ব্যক্তি অন্ধকে অন্ধ বলেছে, কথাটা তো সত্যি, একদম অভিন্ন। আত্মাও জানে যে এই ব্যক্তিটা অন্ধ, মনও জানে আর তারপর যদি বাণীও অন্ধকে অন্ধ বলে, তাহলে কি এটা সত্য হয়ে যাবে? এইজন্য মহর্ষি ব্যাস বলেছেন - না, এটা সত্য নয়। সত্য এমন হয় যেটা সবার হিতের জন্য হবে। অন্ধকে অন্ধ বলে বিরক্ত করলে কারও হিত নেই, কারণ এতে তার কোনো হিত হবে না আর আমাদেরও কোনো হিত হবে না তথা অন্য কোনো ব্যক্তিরও হিত হবে না, এইজন্য এটা সত্য নয়। ভগবান্ ব্রহ্মা মহাভারতে বলেছেন -
"সত্যস্য বচনম্ শ্রেয়ঃ সত্যজ্ঞানম্ তু দুষ্করম্।"
অর্থাৎ সত্য কথা বলা শ্রেষ্ঠ, তবে সত্যের জ্ঞান খুব কঠিন। তারপর লিখেছেন যেটা প্রাণীদের অত্যন্ত হিতকারী হবে সেটাই হল সত্য, ধর্মের মুখ্য লক্ষণ হল এটাই। যেমন একটা চোর চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে আর তাকে বাঁচানোর জন্য আমরা যদি অসত্য বলি, তারপর আমরা ভাবি যে তার হিত হয়েছে। বস্তুতঃ এটা হবে না, বরং অনেকের অহিত হবে। কারণ সে যতদিন জীবিত থাকবে, ততদিন পর্যন্ত চুরি করবে, এরফলে কত জনের অহিত হবে? এইজন্য সেই চোরকে রক্ষা করার জন্য অসত্য কথা তো অসত্যই হবে। কিন্তু যদি ধর্মের রক্ষার জন্য অসত্য বলা হয়, যেমন মহাভারতে বলা হয়েছে - "অশ্বত্থামা মারা গেছে"। ধর্মরাজকে এটা বলার প্রেরণা সাক্ষাৎ ধর্মের রূপ শ্রীকৃষ্ণ দিয়েছিলেন। তাঁর শত্রুও বলেছিল যে -
"য়তঃ কৃষ্ণস্ততো ধর্মো য়তো ধর্মস্ততো জয়ঃ।"
.
অর্থাৎ যেখানে কৃষ্ণ আছে, সেখানে ধর্ম আছে আর যেখানে ধর্ম আছে সেখানে জয় আছে। শ্রীকৃষ্ণ অধর্ম করেছেন কোথায়? মহর্ষি ব্রহ্মা ও মহর্ষি ব্যাসের পরিভাষায় তো এটাই ছিল যে যারদ্বারা প্রাণীদের অত্যন্ত হিত হবে, সেটাই হল ধর্ম। দ্রোণাচার্য চলে গেলেন, অথচ ধর্মের বিজয় হয়ে গেল, কারণ দ্রোণাচার্য অধর্মের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি অসত্যের সাক্ষাৎ মূর্তি হয়ে গিয়েছিলেন। এইজন্য সেটা মিথ্যাভাষণ নয়, বরং সত্যই ছিল।
.
এখন ভগবান্ শ্রীরামের জীবনে চলুন। শ্রীরাম যখন বনে যাচ্ছিলেন, সুমন্ত্র তাঁকে ছেড়ে দিতে যাচ্ছিল। তখন মহারাজ দশরথ পিছনে-পিছনে দৌড়াচ্ছিলেন আর বলছিলেন "সুমন্ত্র রথ থামাও" তথা শ্রীরাম বলেন যে "সুমন্ত্র রথকে এগিয়ে নিয়ে যাও"। সুমন্ত্র জিজ্ঞেস করে যে মহারাজ বলছেন যে "রথ থামাও" আর আপনি বলছেন যে "রথকে এগিয়ে নিয়ে যাও", আমি কার আদেশ মানবো? তখন শ্রীরাম বলেন যে "তুমি সামনে চলো আর যদি মহারাজ জিজ্ঞেস করে যে রথ কেন থামাও নি, তাহলে বলে দিবে যে আমি শুনতে পাইনি"। ভগবান্ শ্রীরাম এমন এইজন্য বলেছেন, কারণ এরমধ্যেই সবার হিত ছিল। তিনি বলেন যে আমরা যতক্ষণ এখানে থাকবো, পিতার মোহ বাড়তে থাকবে আর নাগরিক আমাদের পিছনে আসতে থাকবে, এতে সবার কষ্ট হবে। এইজন্য এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা বেরিয়ে যাবো, ততই সবার হিত হবে। এখানে এটা মিথ্যাভাষণ নয়, বরং এটা সত্যভাষণ, কারণ এতে সবার হিত আছে। এরমধ্যে ভগবান্ শ্রীরামের কোনো স্বার্থ ছিল না। যদি তিনি স্বার্থী হতেন, তাহলে রাজা হয়ে যেতেন। কারণ মহারাজ দশরথ তো স্বয়ং বলেছেন যে আমাকে বন্দী বানিয়ে রাজা হয়ে যাও। তাঁর আগে ভাই লক্ষণও এমনই বলেছিলেন।
.
এখন ঋষি দয়ানন্দের জীবনে আসুন। তাঁর যখন বৈরাগ্য হয়, তখন তিনি শুদ্ধ চৈতন্য হয়ে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্যের দীক্ষা নেন। তখন একবার তিনি সিদ্ধপুর মেলাতে যান। সেখানে তাঁকে এক বৈরাগী চিনে ফেলেন যে এটা তো মূলশঙ্কর, কারণ তিনি প্রসিদ্ধ ব্যক্তির প্রসিদ্ধ পুত্র ছিলেন। সেই ব্যক্তি তাঁর পিতাকে জানিয়ে দেন যে আপনার পুত্র তো সাধু হয়ে, সিদ্ধপুর মেলাতে যাচ্ছে। তখন তাঁর পিতা সিপাহী নিয়ে সেখানে যান আর তাঁকে ধরে ফেলেন। শুদ্ধ চৈতন্য বলেন - পিতাজী! ভালো হয়েছে, আপনি এসেছেন। আমি তো আপনার কাছেই আসছিলাম। প্রতারণার প্রভাবে সাধু হয়ে গেছি। তবুও তাঁর পিতা পাহারা লাগিয়ে দেয় যে এর উপর করা নজর রাখবে। তাঁর গেরুয়া বস্ত্র ছিড়ে ফেলে দেন তথা অন্য বস্ত্র পরিয়ে দেন। রাতে যখন সব সিপাহী ঘুমাচ্ছিল, তখন শুদ্ধচৈতন্য ওঠেন তথা ঘটিতে জল নিয়ে রওনা হন আর মনে-মনে ভেবে নেন যে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে কোথায় যাচ্ছেন, তাহলে বলে দিবেন যে শৌচের জন্য যাচ্ছেন আর গিয়ে একটা বটগাছের মাথায় উঠে বসেন। পিতাজী সিপাহীদের দিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করেন, কিন্তু অনেক খোঁজার পরও তাঁকে পেলেন না। এটা পিতা-পুত্রের অন্তিম মিলন ছিল। এখানেও অসত্য বলা হয়েছে, কিন্তু এটা সর্বহিতে হওয়ার কারণে সত্য ছিল। যদি সত্য বলে দিতেন তাহলে মারও খেতেন আর ঘরেও ফিরে যেতে হতো। এইজন্য মহর্ষি ব্যাস লিখেছেন যে যার দ্বারা সব প্রাণীর হিত হবে, সেটাই হল সত্য। এখন দোকানদার ব্যবসার জন্য যদি অসত্য বলে আর এমন বলে যে এতে আমার ভালো হবে, তো এমন উচিত নয়, কারণ সবার হিত হওয়া উচিত। তার ভাবা উচিত যে লোক ঠকিয়ে ধন কামানো এতে তারও হিত হবে না, কারণ আজ তো সে কামিয়ে নিবে, কিন্তু পরবর্তীতে তার ফল অবশ্যই তাকে ভুগতে হবে।
.
☘️ এখন হিত তথা রুচির মধ্যে একটু পার্থক্য জেনে নিবো -
অসত্য সর্বহিতের জন্য বলা যেতে পারে, রুচির জন্য নয়। সবার রুচি ভিন্ন-ভিন্ন হয়, কখনও এক হবেই না, কিন্তু হিত সবার জন্য সমান হয়। হিতের অর্থ হল - "যার দ্বারা নিজের ধারণ-পোষণ হবে" তথা রুচির অর্থ হল - "যেটা ইন্দ্রিয় ও মনকে ভালো লাগে"। যেমন - কারও মধুমেহ রোগ আছে, মিষ্টি খেতে তার খুব ভালো লাগে। এরমধ্যে তার রুচি তো আছে কিন্তু হিত নেই। চোরকে চুরি করতে খুব ভালো লাগে, কিন্তু তাতে তার হিত নেই, সে লোক তথা পরলোক দুটোকেই নষ্ট করছে। রুচির পূর্তির জন্য অসত্য বলা যায় না। কোনো দোষীকে বাঁচানোর জন্য অসত্য বলা যায় না, কিন্তু ধর্ম, দেশ, নির্দোষ আদির রক্ষার জন্য বলা অসত্য কথাও সত্য হয়ে যায়।
.
একদা একস্থানে প্রবচননে আমি একবার এমন বলেছিলাম, তো সেখানে এক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন যে আপনি তো অসত্য বলার লাইসেন্স দিচ্ছেন। অসত্য কেবল রাজা বা ক্ষত্রিয় বলতে পারে, কিন্তু ব্রাহ্মণ বা য়োগী কখনও অসত্য বলতে পারে না। তখন আমি বলি - এর মানে হল, আপনি কিছুই পড়েন নি। মহাভারতে ভীষ্ম পিতামহ খুব প্রসিদ্ধ ক্ষত্রিয় ছিলেন। তিনি রাজার লক্ষণ বলেছেন, তারমধ্যে দুটো লক্ষণ হল - জিতেন্দ্রিয় অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী হওয়া উচিত আর সত্যবাদী হওয়া উচিত। সুতরাং রাজাকে অসত্য বলার কোনো অধিকার নেই। তাছাড়া অসত্য বলার অধিকার তো কারও নেই, কিন্তু তিনি এমন বলেন নি যে ক্ষত্রিয় অসত্য বলতে পারবে। ধরে নিন কোথাও মেল হচ্ছে, সেখানে কোনো আতংবাদীর সঙ্গে দেখা হল আর সে জিজ্ঞেস করলো যে কোনদিকে লোকজন একত্রিত হবে? তাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে সে ওখানে বোমা ফেলবে। যদি তাকে রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া হয় যে ঐদিকে আছে, একথা মুখে বলা তো সত্য হবে, কিন্তু বাস্তবে অসত্যই হবে। কারণ এতে অনেক প্রাণীর অহিত হবে।
.
আচার্য চাণক্য পদে-পদে যা করেছেন, তাতে সেই মহাপুরুষের কোনো স্বার্থ ছিল না, তিনি যা করেছেন রাষ্ট্র এবং সর্বহিতের জন্য করেছেন। যদি রাজা ধনানন্দ ভালো হতেন, তাহলে তিনি কোনো ধনানন্দকে সরানোর প্রতিজ্ঞা নিতেন না। সম্ভবতঃ তিনি খুব দুষ্ট রাজা ছিলেন।™ এমন দুষ্টকে মারার জন্য, যেকোনো প্রকারে মারাই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, কারণ সেটাই হল সত্য।
.
সত্য হল ধর্মের জয় হওয়া উচিত আর অসত্য হল অসত্যের জয় হওয়া উচিত। কারণ অহিংসা হল ধর্মের মূল, যে সত্য আমাদের অহিংসা অর্থাৎ সবার ভালো করার দিকে নিয়ে যাবে, সেটাই হল সত্য আর যে সত্য অহিংসার বিরুদ্ধে হবে, সেটা সত্য নয়, বরং সেটা হবে সত্যের আভাসমাত্র। আমাদের এখানেও এমন কিছু জন আছে যারা একথার উপর শ্রীরাম এবং শ্রীকৃষ্ণকে য়োগী মানে না, তারা বলেন যে, তাঁরা যুদ্ধও করেছেন, হিংসাও করেছেন, অসত্যও বলেছেন। তাঁদের সংখ্যার পরিমাণও দেয় যে শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ ৭০-৮০ শতাংশ য়োগী ছিলেন। পরীক্ষক, পরীক্ষার্থীর থেকেও অধিক যোগ্য হয়ে থাকে। তার মানে তাঁদের সংখ্যা-পরিমাণ দেওয়া ব্যক্তি স্বয়ংকে শ্রীরাম আর শ্রীকৃষ্ণের থেকে বড় য়োগী মনে করছে। এটা আমাদের এবং সম্পূর্ণ মানব সমাজের জন্য লজ্জার বিষয় যে এমন ব্যক্তি আমাদের সমাজের মধ্যে আছে। যার মধ্যে সবার হিত হবে এবং অহিংসার পূর্তি হবে, সেটাই হল সত্য। এর বিপরীত হল অসত্য।
.
একটা মামলাতে দুটো পক্ষ থাকে, একটা পক্ষ জানে যে সে অসত্য বলছে। সে জানে যে সে কারও হত্যা করেছে, তবুও সে বলে যে আমি করিনি আর তার উকিলও কেবল লাভের জন্যই তার সমর্থন করে। অসত্য কেবল লোভবশ, ক্রোধবশ, প্রশংসাবশ অথবা নিন্দাবশ বলা হয়। এইভাবে একটা অসত্য অনেকগুলো নাকারাত্মক তরঙ্গের জন্ম দেয়। এইজন্য সারা ব্রহ্মাণ্ড সেই অসত্যের কারণে প্রভাবিত হয়। না জেনে বলা অসত্য, ততটা বড় অপরাধ হয় না। এইজন্য ভগবান্ শিব বলেছেন যে যেসব অধর্ম বা অপরাধ অজান্তে হয়েছে, সেটা ক্ষম্য হবে। সেটা প্রায়শ্চিত্ত, তপ, দানাদির দ্বারা ধুয়ে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু যেসব অপরাধ জেনেশুনে করা হয়েছে, সেগুলো কখনও ক্ষম্য হবে না।
_____________________
™ ধারাবাহিক সিরিয়ালে আমরা যেমন দেখেছি।

💫 ৭. মাংস ভক্ষণকারীদের প্রতি আমার চ্যালেঞ্জ 💫

এখন আমি ভগবান্ শিবের দ্বারা নির্দেশিত ধর্মের তৃতীয় লক্ষণের উপর চর্চা করবো -

ধর্মের তৃতীয় লক্ষণ হল - সব প্রাণীর প্রতি দয়া। সত্যার্থ প্রকাশের দৃষ্টিতে যদি দেখা হয়, তাহলে দয়া হিংসার বিপরীত হবে আর অহিংসারই রূপ হবে। কিন্তু ভগবান্ শিব দয়াকে আলাদা রেখেছেন। সব প্রাণীর প্রতি দয়া, এটা মুখে বলা যতটা সহজ, জীবনে পালন করা ততটাই খুব কঠিন। আজ সংসারে যত মাংসাহারী আছে, তারা পশুকে স্বয়ং নিজে হাতে মেরে মাংস খায় না, যদি তারা স্বয়ং হত্যা করে খাওয়া শুরু করে, তাহলে তাদের ভিতরেও দয়ার ভাব উঠবে আর তারা মাংস খাওয়া ছেড়ে দিবে। যেসব মাংসাহারী, বাজার বা হোটেলে গিয়ে মাংস খায়, তাদেরকে কসাইখানা (slaughterhouse) দেখানো উচিত। কসাইখানাতে যা দেখা যায় - ছটপট করতে থাকা পশু, নালা দিয়ে বয়ে চলা রক্ত, পশুদের চিৎকার আর করুণ-ক্রন্দন। অধিকাংশ মানুষ একে সহ্য করতে পারবে না। খাওয়া যেমন আলাদা বিষয়, কিন্তু এমনভাবে রক্তপাত করা একদম আলাদা বিষয়। যারা আমাদের দেশের যোজনা তৈরি করে যে গরু, মোষ, মাছ, ছাগল, মুরগি আদিকে মেরে আয় বৃদ্ধি করবে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাংসদ পর্যন্ত, মুখ্যমন্ত্রী থেকে বিধায়ক পর্যন্ত, এদের সবাইকে একবার কসাইখানা দেখতে অবশ্যই যাওয়া উচিত। হতে পারে তাদের হৃদয় পরিবর্তন হবে আর তারা এমন যোজনা তৈরি করবে না।
.
পরমাত্মা মানুষকে স্বভাবে দয়ালুই বানিয়েছে, এইজন্য সে পশুকে স্বয়ং মেরে খেতে পারে না। যখন সর্বপ্রথম মানুষ কোনো পশুকে মেরেছিল, তখন নিশ্চয়ই তার ভিতরেও দয়াভাব এসেছিল, কিন্তু ধীরে-ধীরে সে ক্রূর হয়ে যায়। মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য এটাই যে পশুর মধ্যে দয়াভাব হয় না, তার ভিতরে বুদ্ধি হয় না যে সে কারও উপর দয়া করবে। বাঘ মাংস খায়, তো মেরে খাবেই, গরু যদি কাউকে মারে, তাহলে মারবেই, দয়া করবে না। গরু যদিও মারে না, আত্মরক্ষা করে আর আত্মরক্ষা করার অধিকার সবার আছে। যদি দশটা পশু কোথাও যায় আর একটা পশু কোথাও গর্তে পরে যায়, তাহলে কোনো পশু তাকে বাঁচাবে না, কারণ তাদের মধ্যে বাঁচানোর বুদ্ধি নেই। কিন্তু যদি সেই পশু তাদের পরিবারের হয়, তাহলে তাদেরও দয়া আসে আর তারাও শোক পালন করে। কিন্তু অন্য কেউ হলে, তাহলে দয়া আসে না। বাঁদর মারা গেলে অনেক বাঁদর একত্রিত হয়ে যায়, কিন্তু কোনো কুকুর আসবে না। একটা কাক মারা গেলে অনেক কাক এসে যাবে আর একত্রিত হয়ে শোক পালন করবে, কিন্তু কেবল কাকের জন্য, নিজের জাতির জন্য। পরিবারের সদস্যদের প্রতি দয়াভাব তো তাদের মধ্যেও আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে এই ধর্মটা নেই যে সব প্রাণীর প্রতি দয়াভাব হোক।
.
মানুষ হল এমন প্রাণী যারমধ্যে সবার প্রতি দয়াভাব স্বাভাবিক রূপে আছে, আর একেই ধর্ম বলা হয়েছে। যেমন হিংসার থেকে বড় কোনো অধর্ম নেই, তেমনই দয়ার থেকে বড় কোনো ধর্ম নেই। আজ সংসারের মধ্যে যে হিংসার তরঙ্গ উৎপন্ন হচ্ছে, তাকে নিষ্প্রভাবী করার একমাত্র উপায় হল এটাই যে আমাদের ভিতরে দয়া, করুণা ও প্রেমের তরঙ্গ উৎপন্ন হোক আর এগুলো উৎপন্ন তখনই হবে, যখন আমরা একবার হিংসার ভয়ংকর রূপকে দেখে নিবো। যারা মাংস খায় তারা জানেই না যে মাংস কিভাবে পাওয়া যায়? হিংসা না করে কেউ মাংস প্রাপ্তই করতে পারবে না। প্রাণীমাত্রের প্রতি দয়ার অর্থই হল দয়ার মধ্যে ভেদভাব হওয়া উচিত নয়, যেমনটা পশু-পাখির মধ্যে ভেদভাব হয়, তাদের কেবল নিজের জাতির প্রতি দয়া হয়। কিন্তু মানুষের তো নিজের জাতির প্রতিও একদম দয়া নেই। যদি মানুষ মানুষজাতির প্রতিও দয়া করা শুরু করে, তাহলেও তার স্তর অনেক উঁচু হয়ে যাবে। আজ যে অহিংসার কথা বলা হয়, সেটা কেবল মানুষ পর্যন্তই সীমিত আছে।
.
পশুকে মেরে খাওয়া মাংসাহারী বৌদ্ধ দেশ, তারা ভগবান্ বুদ্ধের অনুগামী। যে ভগবান্ বুদ্ধ অহিংসাকে মূল মেনে চলে ছিলেন, আজ তার সব অনুগামী কিভাবে মাংসাহারী হয়ে গেছে? এর কারণ কি ছিল? হয়তো তারা ভেবেছিল যে অহিংসার ব্যবহার কেবল মানুষের জন্যই হয়, অন্য প্রাণীগুলো তো আমাদের ভোজন। এটা ভারী সুন্দর কথা যে জৈনরা আজ পর্যন্ত এমন হতে দেয়নি, তারা আজও অহিংসার প্রতি দৃঢ় হয়ে আছে, লুকিয়ে-লুকিয়ে যদি কেউ খায় তো সেটা আদালা বিষয় হবে। যখন প্রাণীমাত্রের প্রতি দয়া হয়, তখন আমাদের ভিতর থেকে দয়ার তরঙ্গ প্রবাহিত হয়, যা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিদ্যমান ঈর্ষা, ক্রোধ, হিংসার তরঙ্গকে শান্ত করতে সহায়ক হয়। যেমন - পজিটিভ চার্জকে নেগেটিভ চার্জ শান্ত করে দেয় আর দুটোই নিউট্রোল হয়ে যায়, ঠিক তেমনই হিংসা আর পীড়ার তরঙ্গকে প্রেম, করুণা ও দয়ার তরঙ্গ শান্ত করতে পারে, এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এইজন্য সন্ধ্যার মন্ত্রতে বলা হয়েছে -

য়োऽস্মান্দ্বেষ্টি য়ম্ বয়ম্ দ্বিষ্মস্তম্ বো জম্ভে দধ্মঃ।।
(অথর্ববেদ ৩.২৭.৩)
.
যারা আমার উপর ক্রোধ বা দ্বেষ করে কিংবা আমি যাদের উপর ক্রোধ বা দ্বেষ করি, সেগুলো শান্ত হোক। হে ঈশ্বর! সেগুলো আমি তোমার ন্যায়রূপী দণ্ডের জন্য সমর্পণ করছি। কসাইখানাকে দেখে মানুষের হৃদয় গলে যাবে, কিন্তু সম্ভবতঃ কিছু সময়ের জন্য, তবে বেশিরভাগ মানুষ বদলে যাবে। এমন কিছুজন আছে যারা মারতে আনন্দ অনুভব করে, তারা এতই ক্রূর হয় যে পশুকে হত্যা করবে আর সেটাও হালাল করে। পশুকে এমনভাবে হত্যা করবে যাতে অধিক থেকে অধিক কষ্ট সে পায়, একেই হালাল বলে। এমন ব্যক্তি অহিংসা ও দয়া শিখতেই পারবে না। তাদের শব্দকোষে দয়া নামক কোনো শব্দই নেই। যেমন ডাকাত কিছু অর্থের জন্য যে কাউকে মেরে ফেলতে পারে।
.
কয়েক বছর আছে আমি দেখি যে জলপাইগুড়িতে রেল দুর্ঘটনা হয়েছিল, তাতে প্রায় ৪৭৫ জন ব্যক্তি মারা যায়। সেখানে কিছু ব্যক্তি, মরে যাওয়া মৃত দেহগুলোর পকেট হাতড়াচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য এই ছিল না যে মৃত ব্যক্তিদের বের করবে, বরং তাদের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে পকেট থেকে কিছু পাওয়া যাবে তো ঠিক আছে। কারও সোনার চেন নিয়েছে, কারও হাতের আংটি নিয়েছে, কারও মানিব্যাগ নিয়েছে। যারা এইসব কাজ করেছিল, তারা কি মানুষ ছিল? মানুষ সবথেকে ভয়ংকর হয়ে গেছে, অথচ পরমাত্মা মানুষকে সবথেকে ভালো বানিয়ে ছিল। কোনো প্রাণীই হিংসা করে না, বরং সে ভোজনের জন্য এমন করে। মাংসাহারী প্রাণীকে মাংস খাওয়ার জনই তৈরি করা হয়েছে, তাই তারা খিদে পেলে মেরে খাবেই। কিন্তু মানুষ অকারণে বা শত্রুতা করে মেরে ফেলে। আমরা এটা ভাবি যে সব প্রাণীর প্রতি দয়ার ভাবনা হোক অর্থাৎ সব প্রাণী সুখী হোক, প্রাণীদের মধ্যে সদ্ভাবনা হোক, কিন্তু সেই সদ্ভাবনার জন্য আমরা কি করি?
.
আজ ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের দয়া নেই। এক ভাই অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে আর আরেক ভাই ব্যবসার কোনো কাজে বাইরে যাচ্ছে, তো এমন অনেক হবে যে ব্যবসার কাজকে থামিয়ে রাখবে না, অসুস্থ ভাই মরে যায় তো যাক। মহানগরে যদি কোনো প্রতিবেশী মারা যায়, তাহলেও কারও কোনো দয়া বা সহানুভূতি হয় না। আজ সবথেকে বড় ধন (টাকা) হয়ে গেছে, সেই ধনের জন্য মানুষ তার সবকিছু সমর্পণ করে দিচ্ছে। ধনের কোনো ঠিক নেই কখন আর কোথায় চলে যাবে, কিন্তু যে ধনের পিছনে মানুষ ছুটছে, সেই ধনের দ্বারা তৃপ্তিও হয় না। নিরুক্তকারের অনুসারে যার দ্বারা তৃপ্ত হওয়া যায়, সেটা হল ধন। কেউ কি আজ পর্যন্ত এই ধন দ্বারা তৃপ্ত হয়েছে? কঠোপনিষদের কথন হল -

ন বিত্তেন তর্পণীয়ো মনুষ্যঃ অর্থাৎ বিত্ত দিয়ে কোনো তৃপ্ত হয় না।
.
যদি ভোজন করে তৃপ্তি না হয় অর্থাৎ খিদে না মিটে, তো ভোজন করে লাভ কি? কল্পনা করুন যে বারংবার খাচ্ছেন অথচ খিদেই মিটছে না, তাহলে সেটা কেমন ভোজন হবে? সেইরকম ধন এমন ভোজন হয়ে গেছে যার দ্বারা তৃপ্তিই হয় না, বস্তুতঃ সেটা ধন নয়, বরং নিধন। সেই ধনকে পাওয়ার জন্য দয়া, প্রেম, ভ্রাতৃত্ব, করুণা সবকিছু সমাপ্ত হয়ে গেছে।
.
আজ সম্পূর্ণ দেশ অর্থপ্রধান হয়েছে। এই শিক্ষা কোথাও দেওয়া হয় না যে দয়া করো, কারণ এটা পাঠ্যক্রমে নেই। এটা কারও বিষয় না, কারণ আমাদের দেশ হল ধর্মনিরপেক্ষ, যেখানে দয়া, করুণা, সত্য, প্রেম এসবের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ নেই। যারা ধর্মনিরপেক্ষ বলছে, তারা জানেই না যে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিভাষা কি? ধর্মনিরপেক্ষ অর্থাৎ অধর্মের সাপেক্ষে বা ধর্মের প্রতি উদাসীন। তারা মজহব-গুলোকেই ধর্ম ভেবে নিয়েছে।
.
যদি আমরা সব প্রাণীর প্রতি দয়া করতে পারি, তাদের কিছু সহায়তা করতে পারি, তাহলে করার চেষ্টা করা উচিত আর যদি না করতে পারি, তাহলে মনের মধ্যে অবশ্যই করুণা জাগা উচিত যে আমি কারও দুঃখকে কিভাবে দূর করতে পারবো? কোনো দুঃখীকে দেখে যদি আমাদের হৃদয়ে কোনো দয়ার ভাবনা না আসে, কোনো রোগীকে দেখে সেবার ভাবনা না আসে, কোনো বস্ত্রহীনকে দেখে বস্ত্র দেওয়ার ভাবনা না আসে, কোনো ক্ষুধার্তকে দেখে ভোজন দেওয়ার ভাবনা না আসে, কাউকে মারা যেতে দেখে তার প্রাণ বাঁচানোর ভাবনা না আসে, তাহলে বুঝে নেওয়া উচিত যে আমরা মানুষ নই, বরং আমরা ভয়ংকর পশু হয়েগেছি। দেওয়ার জন্য ধন চাই, আমাদের কাছে ধন নেই, কিন্তু তাতে কি হয়েছে, হৃদয়ের মধ্যে তো অন্ততঃ এমন ভাবনা হওয়া উচিত যে যদি আমার কাছে ধন হতো তাহলে আমি সবার দুঃখ দূর করার চেষ্টা করতাম আর নির্ধনদের সহায়তা করতাম। সহায়তার মানে এই নয় যে এমনিভাবে সবাইকে বিতরণ করা, বরং তাদের পুরুষার্থের জন্য প্রেরিত করা উচিত। দয়া আমাদের ভিতরে শান্তি উৎপন্ন করে। পশু তার আত্মরক্ষার জন্য মারে আর নিজের আত্মরক্ষার জন্য মারার অধিকার সবার আছে।
.
🔴 প্রশ্ন - কোনো পশুর দ্বারা অন্য পশুকে মারা হলে তখন কি তরঙ্গ উঠবে না?
.
🔵 উত্তর - যে পশু মরবে, তার থেকে তরঙ্গ তো উঠবে, কারণ সেই পশুর পীড়া হবে। কিন্তু কোনো পশু এমনভাবে মারে যে সে দ্রুত মারা যায়। যেমন বাঘ সোজা গলায় কামড়ে ধরে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেই পশুর পীড়া হবে ততক্ষণ পর্যন্ত পীড়ার তরঙ্গ অবশ্যই উঠবে। কিন্তু বাঘের ভিতর থেকে ক্রোধের তরঙ্গ উঠবে না, কারণ সে ক্রোধ, অহংকার বা লোভবশতঃ মারছে না, বরং খিদে মেটানোর জন্য মারছে। তার পেট ভরে গেল সে কোনো পশুকে মারবে না। কিন্তু মানুষ ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা, অহংকার, শত্রুতাবশতঃ মারবে, তখন এদের তরঙ্গ সঙ্গে মিলে যাবে।
.
অহিংসার অর্থ হল - প্রাণীমাত্রের প্রতি দ্রোহ ত্যাগ অর্থাৎ সবার সঙ্গে প্রীতি করা। দয়া অহিংসার মধ্যে সমাহিত আছে এমন বলা যেতে পারে, কারণ সবার সঙ্গে প্রীতি হবে, তবেই দয়া হবে। কিন্তু আমাদের কারও সঙ্গে প্রীতি নেই, আমরা কারও সঙ্গে দেখাও করতে চাই না, কোনো সম্বন্ধও রাখি না, তবুও যদি কাউকে দুঃখী দেখি, তাহলে ভিতর থেকে করুণার ভাব এসে যাবে। যেমন আমরা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি আর কোনো পশুকে দুঃখী দেখলাম, তো দয়া এসে গেল। সেইরকম প্রাণীমাত্রের প্রতি প্রীতির মধ্যেও এই ভাবনাই হবে। প্রীতি যদি না থাকে, তাহলে সত্য সত্য থাকবে না আর দয়া দয়া থাকবে না। প্রীতি অনিবার্য কারণ অহিংসা হল সবার মূল। "প্রীতি" শব্দটা খুব বিস্তৃত। কেউ দুঃখী নয় তবুও তার সঙ্গে প্রীতি করো, তবে দয়া দুঃখীর উপরই হয়।
.
য়োগদর্শনের মধ্যে লেখা আছে - "সুখীর সঙ্গে মিত্রতা করো, দুঃখীকে দেখে দয়ালু হও, সজ্জনদের দেখে প্রসন্ন হও আর দুষ্ট জনদের উপেক্ষা করো"। সংসারে ব্যবহার করার পদ্ধতি হল এটাই। দয়া দুঃখীর জন্য হয়, কিন্তু প্রীতি সবার জন্য হয়। ভগবান্ শিব ধর্মের যে তৃতীয় লক্ষণ বলেছেন, তার অনুসারে আমরা সব প্রাণীর প্রতি দয়ার ভাব জাগাবো আর সব মাংসাহারীদের বলবো যে তোমরা মাংস খেতে চাও, তাহলে স্বয়ং নিজে হাতে হত্যা করে মাংস খেয়ে দেখাও। চলুন, আমরাও এই তৃতীয় লক্ষণকে গ্রহণ করি আর দয়ালু হই।

🌿✨ ৪. দয়া কিভাবে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আসে? ✨🌿
মহর্ষি পতঞ্জলি বলেছেন যে দুঃখী ব্যক্তির প্রতি দয়া হওয়া উচিত। এখন প্রথমে এটা দেখুন যে দয়া কারা করতে পারবে? দয়া তথা যতগুলো ধর্মের লক্ষণ আছে, সেগুলো কারোর মধ্যে ততক্ষণ পর্যন্ত আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার এই বিশ্বাস হবে না যে সব প্রাণীর মধ্যে আমার মতো আত্মা আছে আর ততক্ষণ পর্যন্ত না তো অহিংসা হবে আর না দয়া হবে। সবার আগে তার এই বিশ্বাস হওয়া উচিত যে সব প্রাণী চেতন হয়, জড় হয় না। পরমাত্মার অস্তিত্বের উপরও তার বিশ্বাস হওয়া উচিত আর সব প্রাণী যে সেই পরমাত্মারই পরিবারের সদস্য, এমনও বিশ্বাস হওয়া উচিত, তা নাহলে দয়া আসবে না। যন্ত্র কারও উপর দয়া করে না, সেটা তার মালিককেও মেরে ফেলতে পারে।
.
যদি সংসারের মানুষ নিজেকে রোবট বলে মনে করে আর চেতন সত্তাকে অস্বীকার করে, তাহলে তাদের মধ্যে ধর্মের কোনো লক্ষণ কখনও আসবে না আর মারামারি-কাটাকাটি, লুটপাট, দুঃখ দেওয়া, চুরি-ছিনতাই আদি চলতে থাকবে। আজ যারা বিজ্ঞানের কথা বলছে, তারা যতই বড় বৈজ্ঞানিক হোক না কেন, তারা যদি বলে যে চেতনতত্ত্ব নেই, তাহলে তারা ভারী অজ্ঞানী হবে। তাদের বিজ্ঞান কখনও সত্যকে সামনে নিয়ে আসতে পারবে না, তারা এতে যতই রিসার্চ করুক না কেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মনের মধ্যে এই বিচার হবে না যে চেতন আছে আর এর আবশ্যকতাও আছে, কারণ চেতন ছাড়া না তো সৃষ্টি চলতে পারবে আর না তৈরি হবে। বিনা চেতন কোনো ক্রিয়াই হওয়া সম্ভব নয়। যখন সবার মনের মধ্যে এমন বিশ্বাস হবে, তখনই তাদের ভিতরে দয়াভাব আসবে।
.
যখন কোনো মানুষ কাউকে কষ্ট দেয় বা হত্যা করে, তখন সে মনে করে যে এটা হচ্ছে আমার ভোজন। তার ছটফট করা, চিৎকার করা আর করুণ ক্রন্দনকে সে শুনতে পারে না। সে মনে করে যে মেশিন যেমন শব্দ করে, এটাও ঠিক তেমনই শব্দ করছে। কিন্তু সেই ছুরিটাই যখন তার গলায় রাখা হয় আর তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে বলো তুমি কি রোবট নাকি চেতন? রোবট তো কান্না করবে না, তার কোনোরূপ দুঃখ হবে না। কোনো কসাইয়ের ছুরি নিয়ে, সেটা সেই কসাইয়ের গলার উপর রেখে জিজ্ঞেস করুন যে তুমি কি রোবট? তুমি কি জড় নাকি তোমার ভিতরে চেতনা আছে? যদি তোমার ভিতরে চেতনা না থাকে, তাহলে তোমাকেও মেরে ফেলা উচিত। তখন সে মিনতি করতে-করতে স্বয়ংকে চেতন মেনে নিজ প্রাণের ভিক্ষে চাইবে, এই কারণে চেতনার উপর বিশ্বাস অনিবার্য।
.
যেসব ব্যক্তি আজ সংসারে সুখী এবং ঐশ্বর্যসম্পন্ন, তারা এটা দেখতে পায় না যে কারা দুঃখী আছে? আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, অন্য মন্ত্রী, বড় অফিসার এবং রাজ্যপাল আদি যখন কোথাও যায়, তখন তারা দুঃখী দেখতে পায় না, কারণ তাদেরকে দুঃখী ব্যক্তিদের থেকে দূরত্ব রেখেই নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চারিদিকে সুরক্ষার ঘেরা এইজন্য লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা সাধারণ ব্যক্তিদের সাথে মিশতে না পারে আর সাধারণ ব্যক্তিদের পীড়াকে তারা জানতেও না পারে। কিছু সুরক্ষার ঘেরা হতে পারে আর কিছু লুকিয়ে রাখার ভাব হতে পারে যে, তারা যেন কোনো গরীবকে না দেখে। যদি কোনো রাজা বা মন্ত্রী ভালো হয়, তাহলে সে দেখবে আর দেখবে তো তার মনে করুণাও আসবে আর সেই অনুসারে নীতিও তৈরি করবে, কিন্তু আমলাতন্ত্র তাকে দেখতে দেয় না। তার নিচে থাকা নেতাও তাকে দেখতে দেয় না। কোনো অধিকারী কি দেখাবে যে কেন এত গরীব আছে?
.
পূর্বকালে রাজা সুরক্ষার ঘেরাতে চলতো, কিন্তু সাধারণ জনগণের সাথেও মিশতো। যেকোনো সময় যেকোনো আবেদনকারী তার দ্বারে ঘন্টা বাজিয়ে চলে আসতো। আজকের মতো বেরিয়ার ছিল না যে ৫-৬ বছর যাবৎ পত্র লিখতে থাকো আর কোনো উত্তরই নেই। আগে এমন হতো না। তারা কিভাবে জানবে যে দুঃখ কি? যদিবা কেউ দারিদ্রতা থেকে উপরে উঠে আসে, সেও নিজের পৃষ্ঠভূমি ভুলে যায় যে একসময় আমিও গরীব ছিলাম। আজ মানুষকে দেখলে দেখা যায় যে তারা পুরুষার্থহীন আর অনেক দুর্ব্যসনে আক্রান্ত, তারা গরীব আর এটা হওয়াও উচিত, তাদের উপর কোনো দয়া হওয়া উচিত নয়। তাদের উপর দয়া যদি করতেই হয় তাহলে এই শিখিয়ে দয়া করুন যে তোমরা এই দুর্ব্যসন ত্যাগ করো, কারণ কখনও-কখনও দরিদ্রতা বুদ্ধিকে হরণ করে নেয়। কোথাও কোনো গরীব মদ্যপান করছে, সেইজন্য তাকে গালি দিবো আর কোনো ধনী ব্যক্তি মদ্যপান করছে, তো তার চাটুকারিতা করবো, এই নীতিটা ঠিক নয়, এটা পক্ষপাত হবে। সবার সঙ্গে যে প্রীতিপূর্বক ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে, সেটা এখানেই সমাপ্ত হয়ে গেছে।
.
দুর্ব্যসন গরীবের দেখছেন তো ধনীরও দুর্ব্যসন দেখুন অথবা গরীবকে বোঝান যে ধনী পান করছে তো পান করতে দাও আর মরতে দাও তাকে, কিন্তু তোমার ধন তো পরিশ্রম করে উপার্জন করা ধন। ধনীর থেকে অধিক পরিশ্রমী গরীব মারা যাচ্ছে। সারাদিন পরিশ্রম করে মদ্যপান করে অথবা অন্য কোনো নেশা করে, তাহলে তার জীবন কিভাবে চলবে? তাকে বলা উচিত যে এই সংসারে পুরুষার্থ ব্যক্তির আবশ্যকতা আছে। যারা পুরুষার্থহীন, তারা গরীব হোক বা ধনী, দুটো মরে গেলেও কোনো সমস্যা নেই, বরং পৃথিবীর ভার কমবে।
.
মহাত্মা বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন -
দ্বাবম্ভসি নিবেষ্টব্যৌ গলে বদ্ধ্বা দৃঢাম্ শিলাম্।
ধনবন্তমদাতারম্ দরিদ্রম্ চাতপস্বিনম্।।
.
অর্থাৎ দুই প্রকারের মানুষকে সংসারে বাঁচার কোনো অধিকার নেই, তাদের মেরে ফেলা উচিত। তারপর বলেছেন যে কিভাবে মারা উচিত? গলার মধ্যে অনেক বড় পাথর বেঁধে, সমুদ্রের মধ্যে ফেলে দেওয়া উচিত, যাতে সাঁতার কেটেও না আসতে পারে। এখন বলেছেন যে কাদের মারা উচিত? প্রথম হল তাদের যারা ধনী হয়েও দয়া, দান ও ত্যাগ করে না আর দ্বিতীয় হল তাদের যারা দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও পরিশ্রম করতে চায় না।
.
দয়ার পাত্র হল তারা যারা পুরুষার্থী হয় আর কিছু করতে চায়, তাদের সহায়তা করা উচিত যাতে তারা জীবনে কিছু করতে পারে। ভোটের জন্য এমনিভাবে অনুদান বিতরণ করলে দেশের হিত হয় না, এতে দেশের অর্থব্যবস্থা নষ্ট হয়। কিন্তু আজ যতটা গরীবকে বিতরণ করা হয়, তার থেকে কয়েক গুণ অধিক ধনীদের বিতরণ করা হয়। কৃষকদের লোন একটু-আধটু মাফ হয়, তারমধ্যেও ভিন্ন-ভিন্ন ঝামেলা হয়। অন্যদিকে শিল্পপতিদের লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি অর্থ মাফ হয়ে যায়। তাদের উপর দয়া করার আবশ্যকতা কি আছে? দয়া ধনীদের উপর নয় বরং গরীবের উপর করা উচিত। মহর্ষি বলেছেন যে ধনীকে দেখে প্রসন্ন হবে, দুঃখীকে দেখে দয়া করবে অর্থাৎ দয়া দুখীদের সঙ্গে জুড়ে আছে, ধনী দয়ার পাত্র নয়। যদি সে সঠিক পদ্ধতিতে ধন উপার্জন করে তবে অবশ্যই সে সম্মানের পাত্র হবে, কিন্তু তার প্রতি ঈর্ষা হওয়া উচিত নয়। কৃষক আর শ্রমিক এই দুটো আজ সংসারে সবথেকে বেশি দুঃখী দেখা যায়।
.
একটু ভাবুন! একটা কোম্পানির মালিক নিজের কাছে যে কর্মচারীকে রাখে, তাকে কত টাকা বেতন দেয়? প্রত্যেক সময় তার বাণিজ্যিক বুদ্ধি থাকে, যার কারণে মানবতা নষ্ট হচ্ছে। সে মনে করে যে যতটা সম্ভব কম বেতনে, অনেক অধিক কাজ কিভাবে নেওয়া যেতে পারে। যদি এমন ভাবনা হয় তাহলে গরীবের শোষণ হবে, দয়া একদম থাকবে না। যত টাকা সে গরীবকে বেতন দেয়, ততটা তো সেই ধনীর বাচ্চা একদিনে হাত-খরচ করে ফেলে। কোটিপতিদের ওখানে রান্না খাওয়ার তুলনায় আমাকে গ্রামের কোনো কৃষকের ওখানে গাছের নিচে বসে, থালাতে সামান্য রুটি খেতে বেশি ভালো লাগে। কারণ তারমধ্যে বিচার আসে যে জানি না সেই ব্যবসায়ী কিভাবে এই ধন উপার্জন করেছে, কিন্তু কৃষক বা শ্রমিকের ওখানে খাওয়ার সময় এমন কোনো বিচার আসে না, বরং এই বিচার আসে যে কত পরিশ্রম করে সে এই খাবার আমাকে খাওয়াচ্ছে।
.
আমি একবার জলপাইগুড়ি গিয়েছিলাম। সেখানে আমার দশ দিনের কার্যক্রম ছিল। সম্ভবতঃ সাল ২০০২-০৩ হবে। অন্তিম দিনে যখন সবাই দক্ষিণা দিচ্ছিল, তখন কেউ ৫০০ দিচ্ছিল, কেউ ২০০, তো কেউ ১০০ দিচ্ছিল। সেখানে এক বৃদ্ধা মহিলা, খুব দরিদ্র পরিবার থেকে এসে ছিলেন। তাকে কেউ আহুতি দিতে দিচ্ছিল না, আমি বলেছিলাম যে মাতাজীকে সামনে আসতে দাও। যখন তিনি দক্ষিণা নিয়ে আসেন, তখন তিনি তার শাড়ির আঁচলে পাঁচ টাকার নোট খুব শক্ত করে বেঁধে ছিলেন, যাতে পরে না যায় আর এমন ভাবে বেঁধে ছিলেন যে সেটা ফেটে গিয়েছিল। তিনি যখন সেই টাকা আমায় দেন, আমি তখন সেই বৃদ্ধা মাতার মধ্যে নিজের মায়ের দর্শন করি আর আমি তাকে বলি যে আপনার এই দক্ষিণা ৫০০ টাকার থেকেও বেশি। কিন্তু সমাজ তাকে তিরস্কার করছিল আর যেসব ধনপতিদের মহিলারা ছিলেন, তারা চাইছিলেন না যে তিনিও আহুতি দিক। যাদের হাতের পরিশ্রমে আমরা কোটিপতি আর আরবপতি হয়েছি ও হচ্ছি, তাদের সঙ্গে আমরা কেমন অন্যায়পূর্ণ ব্যবহার করছি? শ্রমিক যখন ধর্মঘট করে, তখন ফ্যাক্টরির মালিক বুঝতে পারে যে শ্রমিক কাকে বলে? তাদের বাচ্চা পেটভরে রুটি পর্যন্ত খেতে পারে না আর ধনপতির বাচ্চারা না জানি কি কি খায়। এটা ধর্মের বিরুদ্ধ।
.
শ্রীরামের পূজা করা, জয়ঘোষ করা আর মন্দির নির্মাণ করা হল আলাদা বিষয়, কিন্তু শ্রীরামের ভাবনার অনুসারে জীবনযাবন করা, খুবই কঠিন বিষয়। যখন মহাত্মা ভরত চিত্রকূটে এসেছিলেন, তখন শ্রীরাম বলেছিলেন যে তুমি তোমার সেবকদের না খাইয়ে, সুস্বাদু ভোজন স্বয়ং সেবন করছো নাতো? এর অর্থ সকল ধনপতি এবং শ্রীরাম ভক্তকে বুঝে নেওয়া উচিত। বিশ্বের সব কমিউনিষ্ট দেশ, পুঁজিপতি, সাম্যবাদী বা সমাজবাদিদের মধ্যে কি কোথাও আছে এমন ব্যবস্থা যাদের শ্রমিক ভালোভাবে ভোজন করতে পাচ্ছে, শ্রমিকরা উচিত বেতন পাচ্ছে?

পুনরায় কৃষকের বিষয়ে আসবো। কৃষকের পরিবারকে দেখুন, তো দেখবেন যে সারা পরিবারে পতি, পত্নী, বাচ্চা এবং তাদের মাতা-পিতা আদি সবাই খেতির কাজে লেগে থাকে। তাদের পারিশ্রমিক জুড়ে দেখুন, তারা কি তাদের পারিশ্রমিক পায়? ফসল যতই ভালো হোক না কেন কিন্তু বর্তমানে ফসলের যে বিক্রয় মূল্য বা সমর্থন মূল্য আছে, সেখান থেকে তারা তাদের পারিশ্রমিক কখনও পায় না। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে কৃষকদের আয় দেড় গুণ করে দিবেন। খুব ভালো কথা, কিন্তু খরচের দেড় গুণ আয় হবে কি? আর খরচের মধ্যে সেই পরিবারের পারিশ্রমিকও জুড়ে দেওয়া হবে কি? একজন ব্যক্তির পারিশ্রমিক ৪০০ টাকা হয়। পত্নীকে কিছু কম দিলেও, ধরে নিন ৩০০ টাকা আর বাচ্চাদেরও জুড়ে দিন, তো হাজার টাকা প্রতিদিনের পারিশ্রমিক হয়ে গেল। যতক্ষণ পর্যন্ত ফসল খেতের মধ্যে আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই লেগে থাকে। কোনো সরকার কি এদের পারিশ্রমিক দিতে পারবে? শ্রমিক তো পারিশ্রমিক নিয়ে পকেটে রেখে দিবে, কিন্তু কৃষকের ফসলের উপর শিলাবৃষ্টি হলে, বন্যা হলে অথবা অনাবৃষ্টি হলে, তাহলে সে কি খাবে? সরকার থেকে কতটুকুই বা সহায়তা পাবে, এসব নিয়ে ভাবার কেউ নেই।
.
এখন প্রশ্ন উঠবে যে এত ধন কোথা থেকে আসবে? এর উত্তর হল যখন সমতা, সমাজবাদের এত কথা বলেন, তাহলে এই পুঁজিপতিদের থেকে কেন নিবেন না। সরকার বুলেট ট্রেন নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে, যারমধ্যে কোটি-কোটি টাকা খরচ হবে। একটু ভাবুন! এই অর্থে কৃষকরা কতটা লাভবান হতে পারে? কৃষকদের সমর্থন মূল্যটাও সেই ব্যক্তিরা নির্ধারিত করে, যারা কখনও খেতই দেখেনি আর কৃষি কাজের কোনো জ্ঞানও যাদের নেই। নেতাদের কৃষকদের ঘরে গিয়ে থাকা উচিত। তারা কখনও যাবেন তো এমন ফার্মহাউসে যাবেন, যেখানে তারা ট্যাক্স বাঁচানোর জন্য বানিয়ে রেখেছেন। যদি যেতে হয় তো গরীব কৃষকের ঘরে গিয়ে দেখুন, ছোট কৃষকের ঘরে যান আর দেখুন তারা কি খায়? কি পরে? কত কাজ করে? অসুস্থ হলে নিজের চিকিৎসা করতে পারে কিনা? তারা তাদের বাচ্চাদের পড়াতে পারে কিনা? যখন আপনি এইসব দেখবেন, তখন দয়া আসবে আর নীতিগুলো ঠিক হবে। দয়াহীন নীতি বেকারই হয়।
.
আমরা এটা তো বলি যে যত ভিখারী ঘোরাঘুরি করছে, তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হোক, কেউ যেন ভিক্ষে না চায়। কিন্তু তাদের জন্য আমাদের কাছে কোনো দ্বিতীয় বিকল্প আছে কি? এটা ঠিক যে বেশিরভাগ নকল ভিখারী ঘুরে বেড়ায় বা প্রতারক হয়। কিন্তু কেবল এই কারণে ভিখারিদের উপেক্ষা করাটা উচিত হবে না, কারণ আমাদের দেশের মধ্যে দরিদ্র ব্যক্তিও আছে। আমি তো কখনও-কখনও ভাবি যে যদি আমাকে কখনও ভিক্ষা চাইতে হয়, তাহলে মানুষ আমাকেও পাখণ্ডী বলবে, কেউ রুটিও দিবে না, কারণ ভিখারীদের প্রতি দৃষ্টিকোণ বদলে গেছে। আমি মনে করি, সেগুলোর মধ্যে অনেকে প্রতারক হবে, যারা ভিক্ষা চেয়ে মদ্যপান করে বা ধনপতি কিছু প্রতারক ব্যক্তি আছে যারা বাচ্চাদের ধরে নিয়ে গিয়ে ভিক্ষে করায়। কিন্তু বাস্তবে কি কোনো গরীব নেই? আমি মনে করি না যে ভারতে গরীব নেই। কেউ-কেউ বলে যে তাদের কাজে লাগিয়ে দাও, কিন্তু আমি যদি কোথাও যাচ্ছি, তো আমি কিভাবে তাদের কাজ দিতে পারবো? এমতাবস্থায় যা পকেটে আছে, সেটাই দিতে পারবো। পুঁজিপতি ও সরকার কাজ দিতে পারবে, প্রত্যেক ব্যক্তি কিভাবে কাজ দিতে পারবে? এটা মুখে বলা সহজ কিন্তু কাজ দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারই বানাতে পারে। কোনো ভিখারী ভিক্ষে চাইছে, তো তাকে ভোজন করিয়ে দাও, এটা ভালো কথা। কিন্তু যদি অসুস্থ হয় আর চিকিৎসার জন্য অর্থ চায়, তাহলে খাবার খাইয়ে কি হবে? অনেক কিছু ভাবতে হয়। যদি সে ভুল করছে, তাহলে সে তার ফল ভোগ করবে, আমি তার গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করতে কেন যাবো? যদি আমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে কোথাও যাই আর পথে কোনো ভিখারী আসে, তাহলে কি আমরা এই নিয়ে অনুসন্ধান করবো যে এই ভিখারী কোথা থেকে এসেছে, সে আসলেই গরীব নাকি নাটক করছে? আমরা কি আমাদের কাজ ছেড়ে দিয়ে তার পিছনে লেগে যাবো? এমন হয় না। সে যদি ভুল করে, তাহলে তার ফল সে স্বয়ং ভোগ করবে। কিন্তু দয়া করা, যেটা আমাদের গুণ, সেটা কখন কাজে আসবে? কখনও-কখনও তো তাদেরকে এমনভাবে তিরস্কৃত করা হয়, যেন কোনো পশু এসে গেছে। কেন? তুমি গাড়িতে বসে আছো, তোমার কাছে ধন আছে, এইজন্য তিরস্কার করছো? সে গরীব ও দুঃখী, এইজন্য তিরস্কার করছো? আস্তিকতার গুণ কোথায়? যদি আমাদের কাছে কোনো কারণবশতঃ অর্থ না থাকে, তাহলে ভালোভাবে বুঝিয়েও তো আমরা মানা করতে পারি।
.
যদি সংসারের সবাই এই দয়া গুণকে ধারণ করে নেয়, তাহলে সারা সংসারে শান্তি ফিরে আসবে। দয়াবান্ ব্যক্তি কখনও আতংবাদী, প্রতারক, কসাই, মাংসাহারী, মাছ আর ডিম ভক্ষণকারী হয় না আর সে কখনও কারও শোষণ করতে পারে না। যারা ধনসম্পন্ন আছে, তারা দেখুক যে তাদের ওখানে কর্মরত কর্মচারীদের জীবন স্তর কিরকম আছে আর কেমন হওয়া উচিত? তাদের সামান্য আবশ্যকতা বেতন দিয়ে পূর্ণ হচ্ছে কিনা? এসব নিয়ে ভাবা উচিৎ। তা নাহলে, ভগবান্ শিবের জন্য করা আপনার পূজাপাঠ পাখণ্ড হবে। দয়াভাব হবে, তবেই পৃথিবী থেকে পেইন-ওয়েভ সমাপ্ত হবে, ক্রোধ এবং হিংসার তরঙ্গ সমাপ্ত হবে আর পরিবেশও শুদ্ধ হয়ে উঠবে। প্রেম আর দয়ার তরঙ্গ মিলিত হয়েই সারা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে।
.
💫 প্রশ্ন - মনের মধ্যে দয়া ভাব সব সময় কিভাবে আসবে?
উত্তর - কল্পনা করুন, আমাদের ঘরে কোনো চাকর কাজ করছে বা কোনো বৃদ্ধা পরিচারিকার কাজ করছে, তো আমাদের মনের মধ্যেও এমন ভাব আসবে যে এখানে যদি আমার মা এইভাবে পরিচারিকার কাজ করতো আর তাকে তার মালিক এমন ব্যবহার করতো, যেমনটা আমি এর সাথে করছি, তাহলে আমার কেমন লাগতো? সেই বৃদ্ধা পরিচারিকার মধ্যে নিজের মাকে দেখবেন, তো আপনার মধ্যে দয়া আসবে। মাকে না দেখলেও, তবে এটা তো দেখুন যে আমার মতো ইনিও পরমপিতা পরমাত্মার পরিবারের একজন সদস্য। এরদ্বারা আমাদের সম্বন্ধ সবার প্রতি সমান হবে। কারও সঙ্গে ভাইয়ের, কারও সঙ্গে বোনের, তো কারও সঙ্গে মায়ের হবে। এমন সম্বন্ধ হবে, তো অবশ্যই সবার প্রতি দয়া আসবে।
আত্মনঃ প্রতিকূলানি পরেষাম্ ন সমাচরেত্।
অর্থাৎ আমাদের এটাও ভাবা উচিত যে আজ আমি যে পশুটাকে মারছি, কালকে এই পশুটা মানুষ হয়ে জন্মাবে আর আমি পশু হবো, তখন এটাও আমাকে মারবে, তখন কি হবে? ঈশ্বর যদি সব স্থানে অনুভব হতো, তাহলে আমরা এমন করতাম না। ঋষি দয়ানন্দকে যখন অদ্বৈতবাদী জিজ্ঞেস করে যে দয়ানন্দ কোথায় ঘুরছেন, এই সংসার হল মিথ্যা, কেবল ব্রহ্মই হল সত্য, তাঁরই উপাসনা করুন, কেন ঝামেয়ার মধ্যে পড়ে আছেন? তখন ঋষি দয়ানন্দ তাকে জিজ্ঞেস করেন যে আপনি যার উপাসনা করেন সেই ব্রহ্ম কোথায় থাকে? তখন সে বলে যে সে তো সবার হৃদয়ে নিবাস করে। পুনরায় ঋষি বলেন যে সেই ব্রহ্ম যখন সবার হৃদয়ে নিবাস করে, তাহলে আপনার কি ধ্যান আছে যে আমাদের এই দেশটা পরাধীন আছে, স্ত্রীদের কি পরিস্থিতি, শূদ্র বর্গের কি পরিস্থিতি? এই দেশের মধ্যে কত নির্ধনতা এসে গেছে, কত মানুষ দুঃখী আছে, কত মানুষ ক্ষুধার্ত আর বস্ত্রহীন হয়ে আছে, তাদের মধ্যে কি ব্রহ্ম নেই? আপনি বলছেন যে ব্রহ্ম সবার মধ্যে আছে, তো এদের চিন্তা কে করবে? এদের দুঃখ দূর করলে তবেই আমার মোক্ষ হবে, কারণ ব্রহ্ম এদের সবার ভিতরেও আছে। আমরা যখন ব্রহ্মকে সবার ভিতরে দেখবো, তখন অবশ্যই আমাদের ভিতরে দয়াভাব আসবে।
.
আমরা মুখে তো বলি যে ঈশ্বর সব স্থানে আছে, কিন্তু ব্যবহারে এটা আসে না। আগুন দিয়ে হাত জ্বলে, কিন্তু যদি অন্য কারও জ্বলে যায় তখন খুশী হই। কেউ রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, তখন হাসি আসে আর সেটা যদি নিজের কারও হয়, তখন কান্না আসে। কারণ আমরা সবার মধ্যে ব্রহ্মকে দেখিনি, সবার মধ্যে জীবাত্মাকেও দেখিনি, যেটা আমাদের সবার মধ্যে বিদ্যমান আছে। আমরা যখন সবার মধ্যে ব্রহ্মকে দেখবো আর সবাইকে ব্রহ্মের মধ্যে দেখবো, তখন আমরা সবাইকে পরিবারের সদস্য মনে করবো আর আমাদের ভিতরে "বসুধৈব কুটুম্বকম্" উদাত্ত ভাবনা উৎপন্ন হবে।
.
আজ তো পরিবারের সদস্যের উপরেও দয়া নেই। অবৈধ-সম্বন্ধ আদির কারণে পত্নী পতিকে মেরে ফেলছে আর পতি পত্নীকে মেরে ফেলছে। বাচ্চা বাবাকে মেরে ফেলছে তো বাবা বাচ্চাকে মেরে ফেলছে। দয়া তো সেখানেও নেই, কারণ সেখানেও তারা ব্রহ্মকে দেখছে না। ইন্দ্রিয়ের লোলুপতায় ফেঁসে গিয়ে সবাই ব্রহ্মকে ভুলে যাচ্ছে, আসলে আমরা মানিই না। আমরা কেবল এটুকু মানি যে মন্দিরে গিয়ে পূজা করে নিবো, আর্যসমাজী হবন করে নিবে। তারপর ২৪ ঘন্টা পরে হবন (যদিও সবাই করে না) করা হবে এবং সায়ংকালে সন্ধ্যাও করা হবে। মন্দিরের মধ্যে "ওম্ স্বাহা স্বাহা" হবে, সেখানে "শ্রীরাম জয় রাম, জয়-জয় রাম, ওম্ নমঃ শিবায়" এসবও হবে, কিন্তু "ওম্ নমঃ শিবায়" স্লোগান দেওয়ার পর জীবন তেমনটাই হয়, যেমনটা যারা "ওম্ নমঃ শিবায়" বলেনি, তাদের জীবন যেমন হয়। তেমনই হয়, যেমন নাস্তিক বা প্রতারকদের জীবন হয়। সকালে দোকানদার দোকান খোলে, ধুপকাঠি জ্বালিয়ে দেয় আর তারপর খুব আরতি করে। এরপর সেখানেই লোক ঠকানো শুরু হয়ে যায়। কোথায় গেল গ্রাহকের প্রতি দয়া? কেউ-কেউ তো বড়-বড় প্রফিট নিয়ে নেয়, দয়া কোথায়? যদি সবার মধ্যে ব্রহ্মকে মানা হয়, তাহলে আমাদের সম্বন্ধ বাস্তবে পরিবারের মতো হয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা সবার উপর দয়া করতে শিখি। যদি আমরা এমন না করি, তাহলে আমরা রাক্ষস হয়ে যাবো। আজ রাক্ষসের সংখ্যা বাড়ছে, মানুষ কমে যাচ্ছে আর দেব তো নেই বললেই চলে। এইজন্য ধর্মের তৃতীয় লক্ষণকে ধারণ করুন ও আস্তিক হউন, কারণ আস্তিক ব্যক্তিই তৃতীয় লক্ষণ "দয়া" -কে ধারণ করতে পারবে।

🌿✨ ৯. মনের চঞ্চলতার কারণ ✨🌿
ভগবান্ শিব দ্বারা নির্দেশিত ধর্মের চতুর্থ লক্ষণের উপর বিচার করবো -
ধর্মের চতুর্থ লক্ষণ হল - শম। এখানে "শম" আছে, কিন্তু দম নেই। দুটো একই শব্দ দ্বারা গৃহীত হয়। "শম" শব্দের অর্থ এমন ধরা হয় যে মন-ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখা। যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্মের পূর্বোক্ত তিন লক্ষণ আমাদের ভিতরে আসবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত মন ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ হবে না। যেমন পূর্বে বলা হয়েছে যে আত্মা হল রথী, শরীর হল রথ, বুদ্ধি হল সারথী, মন হল লাগাম, ইন্দ্রিয় হল ঘোড়া আর বিষয় হল মার্গ। যদি এগুলোর নিজের মধ্যে তালমেল না থাকে, তাহলে ঘোড়া (ইন্দ্রিয়) অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে।
.
একবার এক উট আরোহী যাচ্ছিল তো তার হাত থেকে লাগাম ছুটে গিয়েছিল। উট দৌঁড়ে যাচ্ছিল, এই দেখে একজন সেই উট আরোহীকে জিজ্ঞেস করে যে কোথায় যাচ্ছো? সে বলে যে - জানি না, উট যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে চলে যাবো, কারণ লাগাম আমার হাতে নেই। আজ সংসারের প্রায় সব মানুষ ঠিক এইভাবে দৌঁড়াচ্ছে, যেন তাদের লাগাম তাদের হাত থেকে ছুটে গেছে। কোনো মানুষ কখন আর কি করে বসবে, কিছুই বলা যায় না। সেই উট সঠিক রাস্তাতেও নিয়ে যেতে পারে আবার গর্তের মধ্যেও ফেলে দিতে পারে। সে নিজেও মরতে পারে আবার আমাদেরও মারতে পারে। সঠিক রাস্তায় যাওয়ার সম্ভাবনা তো নগণ্য হবে, কারণ পশু তো পশুই হয়।
.
মন আর ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সবার আগে আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একটা লোকপ্রচলিত লোকক্তি আছে যে "যথা খাদ্য তথা মন"। আজ আমাদের অন্ন দূষিত আর এই অন্ন দুই ভাবে দূষিত হয়, এক তো তার মধ্যে কিছু নোংরা আসলে আমাদের অন্ন অনেক ধরণের বিষ হতে পারে, সেই বিষ রাসায়নিক খাদ বা কীটনাশক থেকেও আসতে পারে, বিষাক্ত জল দিয়ে সেচন করেও আসতে পারে। দ্বিতীয়ত যদি সেটা অধর্ম দিয়ে অর্জন করা হয়ে থাকে। আজ অন্ন সম্পূর্ণ রূপে দূষিত হয়েছে, কারণ অধর্ম দিয়েও অর্জন করা হচ্ছে। যার যত সামর্থ্য আছে, সে ততটা অধর্ম - চুরি, বেইমানি, ঘুষ নেওয়ার চেষ্টা করে। বড় ব্যক্তি, বেশি বড় আর ছোট ব্যক্তি, ছোট চুরি করে। আগে চোর ঘরে যেতো, তখন দেয়ালে ছেদ করে আটা, ডাল, ধন যা পেতো নিয়ে যেতো। কিন্তু এখন তো টেকনোলজির যুগ, তাই ব্যাংকের থেকেও ধন চুরি করে নেয়। আগে অপরাধীর কাছে লাঠি, তরোয়াল, ভালা থাকতো। গ্রামের মানুষজন তাকে ঘিরে মেরেও ফেলতো, কারণ তাদের কাছেও এইসব ছিল। কিন্তু এখন তো অপরাধী অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আসে। যাকে নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের কাছেও অনেক কঠিন কাজ হয়। আগে সারা গ্রামকে একজন পুলিশ কর্মী নিয়ন্ত্রণ করতো। কিন্তু এখন তো এমন অনেক গ্রাম আছে সেখানে যদি ফোর্স এসে যায়, তাহলে তাদেরকেও টিকতে দেয় না। ইউপি, বিহারের মধ্যে এমন অনেক গ্রাম আছে, রাজস্থানের মধ্যেও এমন কিছু ব্যক্তি হবে।
.
মানুষের মন দূষিত, কারণ অন্ন দূষিত হয়েছে। একজন ব্যবসায়ী ব্যবসা করে, তাহলে সে কি এই চিন্তা করে যে আমাকে কত লাভ নেওয়া উচিত? সে ভাবে যে মার্কেটে কি চলছে। মার্কেটে সব ধূর্ত বসে আছে, তাই আমিও ঠকাবো। যারা এমন করবে, তাদের ধন কি শুদ্ধ হবে? আমরা অন্যদের দেখে জীবনযাপন করি, স্বয়ংকে দেখি না, ঈশ্বরকে আর ধর্মকেও দেখি না। যতজন ধনপতি আছে, তাদের সবাইকে আত্মনিরীক্ষণ করা উচিত যে তাদের অর্থোপার্জনে অনৈতিকতার ভাগ কতটা আর নৈতিকতার ভাগ কতটা? নিজের মনের মধ্যে প্রশ্ন আসতে পারে যে ব্যবসায়ী লাভ নেওয়ার জন্য বসেছে, লাভ তো সে নিবেই, তা নাহলে ব্যবসা কেন করবে? কিন্তু সেই লাভের তো কিছু সীমাও আছে। ছোট-ছোট দোকানদার অনেক টাকাওয়ালা কিভাবে হয়ে যায়। এর অর্থ হল তারা অনেক ধন লুট করে আর যেখানে খুব অধিক লুট হয়, সেখানে আর্থিক বিষমতা উৎপন্ন হয় আর যেখানে আর্থিক বিষমতা উৎপন্ন হয়, সেখানে নকশালবাদ আর আতংবাদ বাড়ে। পূর্বোক্ত রাজ্যগুলোতে নকশলবাদ ও আতংবাদ বৃদ্ধির এটাই হচ্ছে অনেক বড় কারণ। এমনটা আমাদের সংস্থার সচিব দামোর সাহেব বলেছিলেন, কারণ তিনি আগরতলা, ত্রিপুরাতে ফোর্সে ছিলেন।
.
এর অর্থ হল অন্ন দূষিত হয়েছে, কারণ অধর্ম দ্বারা সেটা অর্জন করা হচ্ছে। কেউ এটা ভাবে না যে অনেক ধন হয়ে গেলে, তারপর সেটা দিয়ে কি হবে? খাবে তো রুটি, সোনা-রূপা-হীরা-মোতি তো আর খাবে না। রুটির জন্য এই দুনিয়াতে কত তাণ্ডব সৃষ্টি করেছে। ঘুমাবে তো একটা চারপায়ার উপরেই, কিন্তু ঘর এত বড় বানায় যে ঝাড়ুও দিতে পারে না। তারা সবাই গরীবের ভাগ্যকে চেপে রেখেছে। শোষণ করে ধন চাই। কোনো ব্যক্তি শোষণ এইজন্য করে, কারণ তার ভিতরে অহিংসা, সত্য আর দয়া, এই তিনটা গুণ নেই। কারণ আমাদের অন্ন দূষিত আর তার উপর তাতে বিষ মেশানো আছে, এইজন্য মন তো দূষিত হবেই। মনকে শুদ্ধ করার সবথেকে বড় উপায় হল - অন্ন শুদ্ধ হওয়া। যদি কারও কাছে ভূমি থাকে, তাহলে সে নিজের কৃষি করে শুদ্ধ অন্ন চাষ করে বাঁচতে পারবে, তা নাহলে দূষিত অন্ন থেকে বাঁচা সম্ভব নয়।
.
যার সম্বন্ধে আমরা জানতে পারি যে এর ধন পাপের, তখন আমরা তার দান গ্রহণ করি না। আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে লিখে দিয়েছি আর প্রত্যেক পুস্তকের মধ্যেও লিখে দিয়েছি যে কোন-কোন ব্যক্তির ধন আমরা গ্রহণ করি না। আমাদের এখানে এস.ডি.এম. সাহেব এসেছিলেন, তো আমি তাকে বলি যে দেখুন আমাদের এই শর্ত আছে, তখন তিনি বলেন যে দান নেওয়ার এমন শর্ত, তিনি কোথাও দেখেন নি। কারণ আমরা যদি অধর্মের দ্বারা অর্জন করা ধন গ্রহণ করি, তাহলে আমাদের বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়ে যাবে, আমাদের মন খারাপ হবে। কিন্তু মন খারাপ হলে মানুষ আনন্দ পায়, কারণ মন খারাপ হলে খারাপ-খারাপ ভাবে আর তারমধ্যে সে সুখের অনুভব করে।
.
সর্বপ্রথম আমাদের যে ভোজন আছে তাকে যতটা সম্ভব, সমর্থ্যানুসারে শুদ্ধ নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। একবার আমি এক আর্যসমাজ মন্দিরে গিয়েছিলাম। সেখানে একটা পিয়াউ ছিল যেখান থেকে আমি জল পান করি। তার উপর নির্মাণকারীর নাম লেখা ছিল, কাউকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি যে একজন মাছ বিক্রেতা সেটা বানিয়েছে। আমার মনে আছে, তারপর আমি সেখানে জল পান করিনি। কোনো মাছ বিক্রেতা বলেছে যে আমি এখানে পিয়াউ বানিয়ে দিবো আর আমরা স্বীকার করে নিয়েছি, কারণ আমরা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছি। মাছ বিক্রেতার টাকা দিয়ে জল পান করে বা কোনো পাপীর টাকাতে কলেজ, গুরুকুল খুলে বা মন্দির বানিয়ে আমরা কি ধর্মাত্মা হয়ে যাবো?
.
আমি আমার নিজের বাড়ির কথাই বলি, তো আমি একবার আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমি সেখানে স্বাদবশতঃ কোনো কিছু খেতাম না, এমনি সামান্য ভোজন করতাম, কখনও-কখনও তো অশ্বত্থ আর বটগাছের পাতাই সেদ্ধ করে রুটি দিয়ে খেয়ে ফেলতাম। আমাকে কেউ শেখায়নি, আমি স্বয়ংই কিছু পুস্তক পড়ে নভেম্বর ১৯৮১ থেকে মশলা আদি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। মাতাজী কান্না করে বলেছিলেন যে আমি কি খাওয়াবো, কিছুই তো খাও না, তখন আমি বলি যে ক্ষীর রান্না করে দাও, খেয়ে নিবো। থালীতে ক্ষীর রাখেন, খাবার রাখেন আর লাইট জ্বালিয়ে দেন। সেইসময় নতুন-নতুন লাইট এসেছিল, গ্রামে এসে বেশি দিন হয়নি। খুঁটি একটু দূরে ছিল, তো আমি পিতাজীকে জিজ্ঞেস করি যে লাইটের কানেকশান কবে নিয়েছেন? তখন তিনি বলেন যে এমনিভাবে তার রেখে নিয়েছেন। আমি সেই সময়ই থালী ছেড়ে দিই আর বলি - যে ঘরে চুরি হয় আমি সেখানে ভোজন করবো না। ভাবুন! আমার মায়ের অবস্থা তখন কেমন হয়েছিল, যিনি কান্না করে কিছু বানিয়ে ছিলেন আর আমি সেটাও ছেড়ে দিয়েছি। বাইরে আসি আর কাকার ঘরে চলে যাই। সেখানেও ক্ষীর রান্না হয়েছিল, সেখানে আমার বৌঠান বলেন যে মহাত্মাজী! খাবার খেয়ে নিন, আমার অনুকূল ছিল, তাই আমি বলি যে নিয়ে আসুন। আমার ভাই সাহেব বলেন যে নিশ্চয়ই কোনো গণ্ডগোল হয়েছে, এ তো এমনিভাবে খাওয়ার জন্য হ্যাঁ বলে না, তখনই মেজো ভাই এসে বলে যে চলুন ভাই সাহেব! তার সরিয়ে দিয়েছি। আমি বলি যে তার তো পুনরায় দিয়ে দিবে। তারপর তাদেরকে দিয়ে সংকল্প করাই যে বিনা কানেকশান নিয়ে বিদ্যুৎ জ্বালাবো না।
.
এত ধ্যান কি কেউ রাখে? আজ কেউ বিদ্যুতের, তো কেউ জলের চুরি করে। এমন হলে আমাদের মন কিভাবে শুদ্ধ হবে? নিজের মনের উপর আমাদের কিভাবে নিয়ন্ত্রণ থাকবে? খাওয়ার জন্যও রাজসিক আর তামসিক ভোজন চাই, যেমন তেজ মশলা, রসুন, পিঁয়াজ আদি। একে তো এগুলো অশুদ্ধ তার উপর রজোগুণী তথা তমোগুণী। মাংস, মদের তো কথাই বলবো না, কারণ সেটা ভোজন নয়, বরং অভক্ষ্য পদার্থ। রসুন ও পিঁয়াজ অভক্ষ্য নয়, এগুলো খাওয়া অধর্ম নয়। তবে সেগুলো ওষুধ হয়, ভোজন নয় আর মাংস তো ওষুধও হয় না। কেউ যতই বলুক না কেন, তবুও খাওয়া উচিত নয়। আমরা নিজের স্বাদের জন্য কারও জীবন নিতে পারি না। খাওয়ার জন্য যদি অনেক বেশি তমোগুণী এবং রজোগুণী চাই, তাহলে আমাদের মন কিভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
.
এক ভঙ্গেড়ি ঋষি দয়ানন্দের কাছে আসে আর বলে যে মহারাজ জী! আমি ধ্যানে বসি তো আমার ধ্যান লাগে না। ঋষি জানতেন না যে এ ব্যক্তি ভাঙ্গের সেবন করে, কিন্তু মুখ আর তার চালচলন দেখে বুঝে যান। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন যে দুই লোটা ভাঙ্গ ভবানীর নামে আরও সেবন করতে থাকো, তবে ধ্যান লাগবে। যতক্ষণ পর্যন্ত মন শুদ্ধ হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত মন আর ইন্দ্রিয়ের উপরও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, কারণ শুদ্ধ মনই নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, অশুদ্ধ নয়। সুস্থ ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু যদি সে কোথাও আঘাত পেয়ে থাকে বা কেউ তাকে মদ খাইয়ে দেয়, তাহলে ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। ঘোড়ার স্বাস্থ্য এমনিতেই খারাপ তথা তার উপর মদ খাইয়ে দিয়েছে। এখানে মদের অর্থ হল উত্তেজক ভোজন। ভোজনের অনেক অর্থ আছে, তার চর্চা আমি আগামী দিনে করবো।

🌿✨ ১২. "আমি আত্মা না" এমন ভাবার পরিণাম ✨🌿
এর পূর্বে আমরা জেনেছি যে ইন্দ্রিয়কে আমাদের দাস মানতে হবে, তবেই আমরা সেগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো, অন্যথা নয়। কিন্তু আজ সারা সংসার সেগুলোরই দাস হয়ে যাচ্ছে। আজ মন যেমন চাইবে, ইন্দ্রিয় দিয়ে তেমনই আচরণ করাকে স্বতন্ত্রতা মানা হয়। কিন্তু বাস্তবে আত্মার নিয়ন্ত্রণে থাকাই স্বতন্ত্রতা হয়। ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্বতন্ত্রতা হয় না, বরং স্বেচ্ছাচার ও লাম্পট্য হয়। কিন্তু যেখানে বিজ্ঞানের নামে আত্মা আর পরমাত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়, সেই সমাজ আর বিশ্ব কিভাবে অনুশাসিত হতে পারবে? কিভাবে স্বতন্ত্র হতে পারবে? কিভাবে নিজের ইন্দ্রিয় আর মনের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? ইন্দ্রিয় আর মনের উপর নিয়ন্ত্রণ সেই ব্যক্তি করতে পারবে, যে এগুলোকে নিজের দাস মানবে। যেমন আমি বলছি - আমার হাত, আমার চোখ, আমার নাক, আমার মন, আমার পুস্তক, আমার গাড়ি আদি। আমার গাড়ি, আমার পুস্তক অর্থাৎ আমি হলাম এগুলো থেকে আলাদা। ঠিক এইরকমই আমার মন, আমার ইন্দ্রিয় অর্থাৎ আমি হলাম এগুলো থেকে আলাদা।
.
কখনও-কখনও মানুষ এমন বলে যে আমার আত্মা এমন ভাবছে, কিন্তু এর শুদ্ধ উচ্চারণ এমন হবে যে আমি আত্মা এমন ভাবছি। "আমার আত্মা" বলাটা একটা পরম্পরা হয়ে গেছে, সেটা যদিও দার্শনিক দৃষ্টিতে শুদ্ধ নয়। কিন্তু তারা এটাই বলতে চাইছে যে আমি হলাম আত্মা। যদি আমার আত্মা বলা হয়, তাহলে আত্মার থেকেও উপরে কিছু মানতে হবে। আত্মার থেকে উপরে পরমাত্মা আছে, কিন্তু শরীরের মধ্যে তাঁর কোনো হস্তক্ষেপ নেই, তাঁর কেবল প্রেরণা আছে, কিন্তু সেই প্রেরণাকে কেউ শোনে না।
.
কোনো ব্যক্তি যখন ভালো কর্ম করে, তখন ভালো কর্ম করার সময় সে ভিতর থেকে প্রসন্নতা, আনন্দ, উৎসাহ, শান্তির অনুভব করে আর যখন কোনো মন্দ কর্ম করে, তখন সে লজ্জা, দুঃখ, অশান্তি, শঙ্কা, ভয়ের অনুভব করে যে কেউ কোথাও দেখছে না তো। যে বিষয়ের জন্য আমাদের এমন ভাবতে হয় যে কেউ কোথাও যেন না দেখে ফেলে, সেইরকম কাজ করা ঠিক নয়, সেটা যে ইন্দ্রিয়ের সাথেই যুক্ত হোক না কেন। কেউ-কেউ তো মোবাইল নিয়ে এমনভাবে দেখে যে কেউ যেন না দেখে, লেপ দিয়ে নিজেকে ঢেকে তারপর মোবাইল চালায়। এক তো এইজন্য ভয় পাবে যে আমাদের মতো কেউ দেখবে, তাহলে বলবে - শুয়ে পড়ো, অনেক দেরি হয়েছে। এপর্যন্ত তো ঠিক আছে, কিন্তু সে কিছু লুকিয়েও রাখছে। সে যেটা দেখছে, যদি সেটা লুকায়, তাহলে পাপ হবে। ভগবান্ মনুস্মৃতিতে বলেছেন যে তুমি এমন মনে করছো যে তোমাকে কেউ দেখছে না, এটা হচ্ছে তোমার ভ্রম। একজন মুনি আছেন, যিনি মনের কথা জানেন, সেই পরমাত্মা তোমার ভিতরে বসে তোমায় জানছে যে তুমি কি ভাবছো।
.
এখনকার যুবক একটু পড়েই এমন ভাবে যে আত্মা-পরমাত্মা এসব কি? তারা যদি এমন ভাবে তাহলে আসলেই তারা অনেক নির্বোধ, তারা শিক্ষার দৃষ্টিতে যতই পড়াশোনা করুক না কেন। এই বিষয়ে আমার সঙ্গে যে কেউ চর্চা করতে পারে, শর্ত কেবল এটাই থাকবে যে সে যেন ভালো বিজ্ঞান জানে, অন্য কেউ চর্চা করার যোগ্য নয়, কারণ তারা বেশি বুদ্ধি খাটাতে পারবে না, বিজ্ঞান জানা ব্যক্তিই সেই স্তর পর্যন্ত ভাবতে পারবে। যারা পরমাত্মার বাণীর অনুসারে চলে, তাঁর প্রেরণার উপেক্ষা করে না, তারা মন আর ইন্দ্রিয়কে জিততে পারবে। কিন্তু এর জন্য সবার আগে সেই পরমাত্মার উপর বিশ্বাস করতে হবে, তাঁর উপর বিচার করতে হবে যে সে আছে কি নেই? ধরে নিন, কোনো ব্যক্তি ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস করে না, তাহলে তাকে এটা ভাবা উচিৎ যে আমার কান আদি কেন আছে, এইসবের ব্যবহার কি? মাইক, চেয়ার, মোটর সাইকেল, মোবাইল আদির ব্যবহার কি? ব্যবহার আর অপব্যবহার হল দুটো বস্তু। একটা চেয়ারে আমি বসে আছি, এটা হল এর ব্যবহার আর যদি চেয়ারটাকে আমি আমার মাথার উপর বসাই, তাহলে এটা এর অপব্যবহার হবে। একজন ব্যক্তি মোটরসাইকেল দিয়ে নিজের কোনো কাজ করবে, সেটা তো ব্যবহার হবে। কিন্তু একজন ব্যক্তি এমনি করেই ঘুরে বেড়ায়, তাহলে এটা তার অপব্যবহার হবে, আর এক ব্যক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে অপরাধ করতে যাবে, তাহলে এটা তার আরও বড় অপব্যবহার হবে।
.
কিছু কাজ আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে মনোরঞ্জনের জন্য করি, অথচ ইন্দ্রিয় মনোরঞ্জনের জন্য হয় না। ইন্দ্রিয় কাজ করার জন্য হয়, যেমন চোখ দেখার জন্য হয়, নিরুক্তের মধ্যে বলা হয়েছে - সুহিতম্ খেভ্যঃ সুখম্। আমি এমন আর ততটুকুই দেখবো যাতে আমি আমার চোখ দিয়ে অনেক দিন পর্যন্ত দেখতে পারি, দেখে-দেখে যদি শীঘ্র অন্ধ হয়ে যাই, তাহলে সেটা ইন্দ্রিয়-সুখ হবে না। ঠিক এইভাবে প্রত্যেক ইন্দ্রিয়ের বিষয়ে জেনে রাখা উচিত। এমন দেখবো, যা দেখে আমাদের কিছু লাভ হবে, আমাদের জীবনে যার কিছু ব্যবহার হবে। যেমন কেউ পড়বে, কেউ পথে কাটা দেখবে, তো এড়িয়ে চলবে, কিন্তু অনাবশ্যক দেখা আর সেইসব দেখা যা দেখে মন আর আত্মার উপর খারাপ প্রভাব পড়বে, তাহলে এমন দেখা চোখের জন্য অপব্যবহার হবে। সেইসব দেখার জন্য চোখ বানানো হয়নি, এইজন্য বেদমন্ত্র বলেছে -
.
ভদ্রম্ কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবাঃ ভদ্রম্ পশ্যেমাক্ষভির্য়জত্রাঃ।
.
অর্থাৎ আমরা কান দিয়ে ভদ্রই শুনবো আর চোখ দিয়ে ভদ্রই দেখবো। ভদ্র রুচিকারী হয় না, বরং হিতকারী হয়। আজ যাকে স্বতন্ত্র বলা হচ্ছে, সেটা হল রুচির স্বতন্ত্রতা, হিতের স্বতন্ত্রতা নয়। হিতের স্বতন্ত্রতাতে কোনো বিবাদও নেই। মহর্ষি দয়ানন্দ আর্যসমাজের নিয়মে স্বতন্ত্রতা আর পরতন্ত্রতার কত সুন্দর সীমা বেঁধেছেন যে প্রত্যেক হিতকারী কাজে সবাই স্বতন্ত্র থাকবে আর প্রত্যেক সর্বহিতকারী কাজে সবাই পরতন্ত্র থাকবে।
.
আমার হিত এরমধ্যে আছে যে কোনো শাক আমার স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূল নয়, তাই আমি যেন সেটা না খাই, এটা আমার স্বতন্ত্রতা হওয়া উচিত। আমার জন্য এই বস্ত্র হিতকারী ও সুখদায়ক হবে, তো আমাকে এই বস্ত্র পরার স্বতন্ত্রতা হওয়া উচিত। কেমন যুগ এসে গেছে যে পুরুষ সারা শরীরে বস্ত্র পরে আর স্ত্রী ও যুবতীরা ছোট-ছোট বস্ত্র পরে ঘুরে বেড়ায়। এমতাবস্থায় যদি আমাদের পূর্বজ আসে, তাহলে হার্ট অ্যাটাকে মরে যাবে। এটাই কি স্বতন্ত্রতা? এমন স্বতন্ত্রতা আমরা শিখেছি কোথা থেকে? এটা স্বতন্ত্রতা নয়, বরং এটা হচ্ছে বৌদ্ধিক দাসত্ব। এক সময় আমি একটা সঙ্গীত লিখেছিলাম, সেখানে একটা পঙক্তি ছিল -
पश्चिमी सभ्यता के दासों! मैं चुनौती दे रहा
आओ सत्य विज्ञान जानें, जो सुख का आधार है।
(হে পাশ্চাত্য সভ্যতার দাশগণ! আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি, আসুন আমরা সত্য বিজ্ঞানকে জানি, যেটা হল সুখের আধার।)
.
পাশ্চাত্য সভ্যতা থেকে তারা যা শিখেছে, তাদেরকে তো আমি চ্যালেঞ্জ করছি যে তারা হচ্ছে খেলা দেখানো মাদারির বাঁদর আর যদি না হয়, তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলুক। তাদের মাদারী ভারতে নেই, বরং ভারতের বাইরে বসে আছে আর ভারতে যারা বসে আছে, তারাও মাদারী নয়, বরং তারা হল বাঁদর, কারণ তারাও বাইরে থেকে শিখছে। তা সে বড়-বড় প্রফেসর হোক, শিক্ষাবিদ্ হোক, সমাজশাস্ত্রী হোক, অর্থশাস্ত্রী হোক বা বৈজ্ঞানিক। ভারতের সবাই বাঁদর হয়ে গেছে আর তাদের মাদারী যেমনটা বাইরে থেকে ডুগডুগি বাজাচ্ছে, তারাও তেমনই নাচছে। যারা ছোট বস্ত্র পরে ঘুরে বেড়ায় তারা তো অনেক পিছিয়ে আছে, বাঁদরের শ্রেণীর থেকেও অনেক নিচে আছে, কারণ আমার মনে হয় না যে বেশি পড়াশোনা জানা কেউ এমন করে, এরা সামান্য স্তরের লোকই হয়।
.
আমি পাঠকদের বলতে চাইবো যে আপনারা নিজের ভিতরে উঁকি মেরে দেখুন। যদি আপনাকে বস্ত্র পরার জন্যও অন্য কারও কাছ থেকে শিখতে হয়, চুল কাটানোর জন্য অন্য কারও কাছ থেকে শিখতে হয়, শৌচালয়, প্রস্রাবে যাওয়ার জন্যও অন্য কারও কাছ থেকে শিখতে হয় যে কিভাবে বসবেন। সামান্য ভারতীয় শৌচালয় ভালো লাগে না, হাঁটু খারাপ হলে, ব্যাপারটা আলাদা। যারা মল-মূত্র কিভাবে ত্যাগ করতে হয় সেটাও জানে না, যারা খেতেও জানে না, যারা বস্ত্র পরতেও জানে না, তারা বলছে যে আমি প্রগতিশীল, আমি বুদ্ধিমান। যদি এমন কোনো ব্যক্তি ভাবে যে আমি বুদ্ধিমান আছি, তাহলে এটাই হবে তার সবথেকে বড় বুদ্ধিহীনতা।
.
দ্বিতীয় কথা আমি এটাই বলবো যে সাধারণ মানুষও জানে, পরীক্ষাতে যে নকল করে সে কখনও অধিকারপূর্বক বলতে পারবে না যে আমি বুদ্ধিমান যুবক, কারণ বুদ্ধিমান তো নকলই করে না। যার নকল করে, তাকে নিজের আদর্শ মনে করে, তাকে বুদ্ধিমান আর নিজের থেকে প্রগতিশীল মনে করে। কিন্তু এখানে তো যারা নকল করছে তাদের বুদ্ধিমান মানা হচ্ছে, এটা কোন ধরনের বুদ্ধিমত্তা? এইজন্য নিজের আত্ম-সম্মানকে জাগিয়ে তুলুন। নিজেকে মূর্খের সন্তান ভাবা বন্ধ করুন। আপনার শিরায় অনেক-অনেক বুদ্ধিমান বৈজ্ঞানিক ঋষিদের রক্ত বইছে, কিন্তু আপনি সেগুলো ভুলে গেছেন। আমি কেবল আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, এটা কোনো নতুন কথা নয়। আমি তো এটাই বলবো যে নিজের মূলে গিয়ে দেখুন।
.
একবার এক বাঘের বাচ্চা কোথাও হারিয়ে যায়, তো সে কোনো এক পশুপালক মেষ চরাতো সেখানে গিয়ে ভেড়াগুলোর সাথে মিশে যায়। সেও ভেড়াগুলোর সাথে থাকতো, খেলতো। বাঘের বাচ্চাও জানতো না যে সে কে আর ভেড়াগুলোও জানতো না যে সে বাঘের বাচ্চা। সে বড় হয়ে যায়, তবুও সে সেখানে আরামে থাকতো আর নিজেকে সে ভেড়াই মনে করতো। একবার সেখানে একটা বড় বাঘ আসে আর যখনই সে গর্জন করে, এও ঠিক সেইরকম গর্জন করে, এর আওয়াজও ঠিক সেইরকম ছিল। বাঘকে দেখে সবগুলো ভেড়া পালিয়ে যায় আর পশুপালকও পালিয়ে যায়। তখন সে ভাবে যে আমাকে দেখে তারা কেন পালিয়ে যায়নি, তার মানে আমিও নিশ্চয়ই এদের মতো। তখন সেই বাঘটা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে তুমি ভেড়া না, তুমি হচ্ছ বাঘ। আমিও ঠিক সেইরকম কাজ করছি। আপনি যে নিজেকে তথা নিজের পূর্বোজদের মূর্খ মনে করছেন, আর এমন ভাবছেন যে আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, চীন, রুস আমাদেরকে শেখাবে, এটা আপনার বোকামি হবে। তাই নিজের জীবনকে নিজের মতো করে বাঁচতে শিখুন।
.
যারা বলে যে আমি তো নিজের মতো করে জীবনযাপন করি, আমি তো স্বতন্ত্র আছি। স্বতন্ত্র হয়ে উঠুন, তো এতে কমতি কিসের? আমি তো এটাই বলবো যে, আপনি স্বতন্ত্র নন, বরং স্বচ্ছন্দ আছেন। আপনি নকল করেন। হীনতার ভাবনা আপনার ভিতরে বাসা বেঁধেছে। যখন ব্যক্তি এমনটা ভেবে নেয় যে আমি আত্মা নই, পরমাত্মা বলে কিছু নেই, আমি হলাম ইন্দ্রিয়, আমি হলাম মন, তাহলে সে কখনও সেগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারণ সে স্বয়ংকে সেগুলোর উপরে মনে করে না। তাই জিতেন্দ্র হওয়ার জন্য নিজের স্বরূপের বাস্তবতাকে সবার আগে বুঝতে হবে। কেউ হয়তো এমন মনে করবে যে এই বিষয়টা তো ব্রহ্মচারীদের জন্য, গৃহস্থীদের জন্য নয়। এমন ভাবা ঠিক নয়, মহাদেব শিব এইসব গৃহস্থীদের জন্যই লিখেছেন।
.
আমি না তো মন হই আর না কোনো ইন্দ্রিয়, বরং এগুলো হচ্ছে আমার সাধন। আমি হলাম এগুলোর স্বামী আর আমি হলাম অমর, মন-ইন্দ্রিয় অমর হয় না। যদিও এগুলোও এক জন্ম থেকে আরেক জন্মে যায়, কিন্তু তবুও এগুলো অমর নয়, কারণ এগুলো প্রকৃতি দিয়ে তৈরি। আমরা হলাম আত্মা, তো আমাদেরকে এই সাধনগুলো কেন দেওয়া হয়েছে? কেউ আমাদেরকে পুস্তক দিয়েছে, তো কেন দিয়েছে? কেউ উপকরণ দিয়েছে, তো কেন দিয়েছে? ওষুধ দিয়েছে, তো কেন দিয়েছে? আমাদের এগুলো ভাবা উচিৎ। ওষুধ ফেলে দেওয়ার জন্য দেয়নি, খাওয়ার জন্য দিয়েছে। রুচি অনুসারে চলা বন্ধ করুন, নিজের হিতে যেটা হবে তাতে স্বতন্ত্র থাকুন, কিন্তু যেটা সর্বহিতে হবে, তাতে পরতন্ত্র থাকুন।
.
যেসব ব্যক্তি বলে যে এটা আমার ব্যক্তিগত জীবন। আমি বলবো যে ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু হয় না। আমাদের ব্যক্তিগত জীবন এই সম্পূর্ণ সৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। আমাদের আচরণ ও চিন্তা-ভাবনা, শরীর এবং মস্তিষ্ক থেকে বের হওয়া তরঙ্গ ব্রহ্মাণ্ডকে প্রভাবিত করতে থাকে, তাহলে এরমধ্যে ব্যক্তিগত রইলো কি? দ্বিতীয় কথা হল যার ব্যক্তিগত জীবন ভালো নেই, সে কি পারবে সুস্থ সমাজের নির্মাণ করতে? এক ব্যক্তি মদ্যপান করে আর বলে যে এটা আমার ব্যক্তিগত জীবন। কোনো ব্যক্তি দুরাচার করে আর বলে যে এটা আমার ব্যক্তিগত জীবন। দুরাচারও করে, মদ্যপানও করে, অসত্যও বলে, বেইমানীও করে। অসত্য বলা আর বেইমানীকে সমাজের সাথে জুড়ে দেখুন। কিন্তু মদ্যপান করা, বস্ত্র পরা, মাংস খাওয়া, দুরাচার করা, ব্রহ্মচর্যের হানি করা আদিকে তারা বলবে যে এটা আমার ব্যক্তিগত জীবন। এমন ব্যক্তিগত জীবন সম্পন্ন ব্যক্তিরা যখন মিলিত হয়ে কোনো সমাজের নির্মাণ করবে, তখন সেই সমাজটা কি ভালো হবে? যদি সবাই চোর হয়ে যায় আর চোরেরা মিলিত হয়ে সংগঠন বা সংস্থার নির্মাণ করে, তখন সেই সংস্থাটা কি ভালো হবে? চোরেরা মিলিত হয়ে যদি কোনো রাষ্টের নির্মাণ করে, তখন সেই রাষ্ট্রটা কি ভালো হবে? একইভাবে যদি চোর আর বেইমানরা মিলিত হয়ে কোনো বিশ্বের নির্মাণ করে, তাহলে কি সেই বিশ্ব ভালো হবে? ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু হয় না, ব্যক্তিগত জীবন যদি ভালো হয়, তাহলে সমাজও ভালো হবে, রাষ্ট্র ভালো হবে আর বিশ্বও ভালো হবে।

🌿✨ ১৩. ভূমিতে চলতে জানে না অথচ গ্যালাক্সিতে... ✨🌿
এর পূর্বে আমি ভগবান্ শিব দ্বারা নির্দেশিত ধর্মের লক্ষণ "শম" নিয়ে বিচার করেছি। আমি যেমনটা স্পষ্ট করেছিলাম যে কেবল সাধু-সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী, বানপ্রস্থীদের জন্য নয়, বরং ধর্মের এই উপদেশ প্রত্যেক গৃহস্থদের জন্য। পূর্বে আমি বলেছি যে মানুষ যখন এমন ভাবে যে আমি হলাম আত্মা, তখন সে মন আর ইন্দ্রিয়কে নিজের দাস মনে করে। কিন্তু সেই মানুষই যদি এমন ভাবে যে আমি হলাম শরীর, তখন সে মন আর ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে যায়। আজ অধিকাংশ ব্যক্তি এমনই ভাবে যে এই শরীরটাই হলাম আমি আর মৃত্যুর পর কিছু হবে না। একদা এই সংসারে চার্বাক নামক একটা সম্প্রদায় এসেছিল, সেটার ঘোষণা ছিল -
য়াবজ্জীবেৎসুখম্ জীবেত্ ঋণম্ কৃত্বা ঘৃতম্ পিবেত্। ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনম্ কুতঃ।।
.
যতদিন বাঁচবেন, সুখে বাঁচুন, দরকার হলে ঋণ করে ঘী পান করুন, কারণ মৃত্যুর পর কেউ ফিরে আসবে না।
.
আমি যখন মথুরাতে পড়াশোনা করতাম, তো একবার মথুরার ছাত্তা বাজার হয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে এক ঘিয়ের দোকানের বাইরে একটা ছোট্ট বোর্ড লাগা ছিল যে "ঋণ করে ঘী পান করুন"। আমি সেই সময় ভাবি যে এর কাছে হয়তো কেউ ঋণ করে ঘী নিতে আসেনি, যদি কেউ ঋণ করে ঘী নিয়ে টাকা না দেয়, তাহলে এই বোর্ড খুলে ফেলবে। তারপর দেখি যে তার বোর্ডটা সেখানে আর নেই। সে লিখেছিল যে "ঋণ করে ঘী পান করুন", তাই কেউ হয়তো ঋণ করেছিল আর টাকা ফেরত দেয়নি, এইজন্য সে বোর্ডটাকে সরিয়ে দিয়েছে। সেই সময় চার্বাক সম্প্রদায়কে খুব বড় মানা হতো। এই সম্প্রদায় এইজন্য জন্মায় কারণ তারপূর্বে যারা আত্মা-পরমাত্মাকে মানতো তারা পশুর বলি দিতো। তাদের পাঁচটা মকার চলছিল - মদ্যপান, মাংসাহার, মাছ খাওয়া, ধনোপার্জন করা আর দুরাচার করা। এই পাঁচটা বস্তুই তাদের পাঁচটা পূজা বলা হতো। যজ্ঞতে মানুষ আর পশুর বলি চড়ানো হতো, তখন চার্বাক মতের উদয় হয়।
.
বস্তুতঃ প্রত্যেকটা সম্প্রদায় একে অপরের প্রতিক্রিয়াতে জন্মেছে। চার্বাক সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা বলে পশুর বলি চড়ালে যদি স্বর্গ প্রাপ্ত হয়, তাহলে নিজের মা-বাপের বলি কেন দিচ্ছেন না? তখন তারা মনে করে যে ঈশ্বর আর ধর্ম যদি এইরকম হয়, তাহলে সমাজে এইরকম ঈশ্বর আর ধর্মের কোনো আবশ্যকতা নেই। এইভাবে লুকিয়ে থাকা নাস্তিকরা অর্থাৎ মিথ্যুক আস্তিকরা নাস্তিকদের জন্ম দেয়। আজও এমন মিথ্যুক আস্তিক অনেক আছে, বাস্তবে তারা ভিতর থেকে নাস্তিকই হয়। ধর্মের নামে যত আডম্বর চলছে অর্থাৎ যতগুলো সম্প্রদায় চলছে, সেগুলোর মিথ্যা মান্যতাই সংসারে নাস্তিকতার জন্ম দিয়েছে। আগে একটা চার্বাক সম্প্রদায় ছিল, কিন্তু এখন নাস্তিকতা এতই বেড়ে গেছে যে প্রত্যেক স্থানে চার্বাকই দেখা যায়।
.
আজ সব স্থানে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে আর সেই ঋণ আমাদের মন ও ইন্দ্রিয়কে চঞ্চল করে দিয়েছে। কারণ ঋণ যখন পাওয়া যাচ্ছে, তখন মানুষ ভাবছে যে আমি সব ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগ করবো। যদি ঋণ না পায়, তাহলে মানুষ নিজের খরচ কম করবে। ঋণ সহজে আর সুদ ছাড়াই পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে কেনই বা ঋণ নিবে না? চার্বাক যেমন বলতো যে মৃত্যুর পর কেউ আসবে না, সেইরকমই আমাদের এখানে মানুষ মনে করছে যে ঋণ নেওয়ার পর ঠিক নেই সরকার মাফ করে দিতে পারে, এইজন্য ঋণ নাও। কোনো যোজনা আসবে আর সরকার ও রাজনৈতিক পার্টিও ভোট নেওয়ার জন্য ঋণ মাফ করার ঘোষণা করে দিবে, তখন আমাদের খুব মজা হবে। এটা সুখের নয়, বরং দুঃখের মার্গ। যে সুখে থাকতে চায়, সে নিজের ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ করুক ও নিজের ব্যয় কম করুক।
.
মানুষ খিদে মেটানোর জন্য রুটি খায়, কিন্তু খাওয়ার নামে কত খরচ করে? মানুষ শরীর ঢাকতে ও শীত-উষ্ণ থেকে বাঁচতে বস্ত্র পরে, কিন্তু বস্ত্রের উপর কত খরচ করে? পায়ের সুরক্ষার জন্য জুতা পরে, কিন্তু জুতার উপর কত খরচ করে, কারণ সে ঋণ পেয়ে যায়। কখনও ঋণে অথবা কারও কাছ থেকে নেওয়ার চাহিদা করবেন না, কারণ এমন করে আমরা আমাদের মন আর আত্মাকে অনিয়ন্ত্রিত করছি। ইন্দ্রিয়কে তারাই জিততে পারবে, যারা নিজের আবশ্যকতাকে কম করে নিয়েছে। কেবল স্বাস্থ্যের উপর ধ্যান রাখা উচিত আর অন্য এমন কিছুর আবশ্যকতা হওয়া উচিত নয়, যেটা কেবল লোক দেখানোর জন্য হবে। আজ সেই ভোজনের উপর কেউ খরচ করছে না, যার দ্বারা শরীর তৈরি হয়, বরং এমন ভোজনের উপর খরচ করা হয়, যার দ্বারা শরীর খারাপ হয়। যেমন - চা, বিড়ি, আফিম, গুটকা, মাংস, ফাস্ট-ফুডের খরচ আর যত সুস্বাদু অনেক দামি ব্যঞ্জন আছে, সেগুলোর খরচ। এইসব শরীরকে খারাপ করে, অথচ শরীরকে পুষ্ট করে তোলে যেমন - ডাল, চাল, রুটি, সব্জি, দুধ, দই, ঘী আদি, এগুলোর উপরে অনেক কম খরচ হয়।
.
শহরের বাজারগুলোতে গিয়ে দেখুন শরীর খারাপ করবে এমন ভোজনের উপর কত খরচ হয়? কারণ ইন্দ্রিয় আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। জিহ্বা যে দোকানে বা যে হোটেলে নিয়ে যেতে চাইবে, সেখানেই নিয়ে যায়। আমাদের মধ্যে এত ক্ষমতা নেই যে আমরা তাকে থামাতে পারবো। চোখ যেটা বলে সেটা দেখে, কারণ আমাদের মধ্যে তাকে থামানোর ক্ষমতাই নেই। কান যেটা বলে সেটাই শোনে, কারণ আমাদের মধ্যে তাকে থামানোর ক্ষমতা নেই। এমন এইজন্য, কারণ আমাদের স্বয়ংয়ের বোধ নেই, যেমন আমরা পূর্বে জেনেছিলাম।
.
একটু ভাবুন, আমাদের যখন কোনো বস্তুর তীব্র ইচ্ছা হয়, তখন আমাদের অনেক ইন্দ্রিয় বিরক্ত করে আর যদি তার পূর্তি না হয়, তাহলে ক্রোধ আসে। যদি কারও ইচ্ছা হয় যে সে মিষ্টি খাবে আর সে মিষ্টি না পায়, তাহলে তার শরীরে অস্থিরতা আসবে, ক্রোধ আসবে, নিরাশা হবে। একটা ইন্দ্রিয়ের ইচ্ছা পূরণ না হওয়াতে কতগুলো তরঙ্গের উৎপত্তি হবে? নিরাশ ও শোকের তরঙ্গ, ক্রোধের তরঙ্গ আর যেটা জিহ্বা থেকে স্বাদের জন্য তরঙ্গ বের হচ্ছে, সেই তরঙ্গ। কোথাও সংবাদপত্রে তো এমন দেখি যে মা তার ছেলেকে মোবাইল দেয়নি, তাই ছেলে মাকে মেরে ফেলেছে। একবার সংবাদপত্রে পড়েছিলাম যে দিল্লিতে ১৫-১৬ বছরের বাচ্চা মায়ের কাছে মোবাইলের জন্য জেদ করেছিল আর মোবাইল পায়নি, তাই সে মায়ের হত্যা করে।
.
মানুষ জিজ্ঞেস করে যে বৈদিক ফিজিক্সে এর সমাধান কোথায়? তারা ভাবে যে ইলেকট্রন, প্রোটন, গ্যালাক্সির কথাই কেবল ফিজিক্স হয়। কিন্তু তারা এটা ভাবে না যে "য়থা পিণ্ডে তথা ব্রহ্মাণ্ডে"। তারা এটা ভাবে না যে তারা ভূমিতে চলতে জানে না আর গ্যালাক্সির মধ্যে উড়তে চাইছে, কারণ গ্যালাক্সির মধ্যে উড়া পরে হবে, তার আগে ভূমিতে চলা শিখতে হবে। নিজের শরীরকে দেখো, শরীরের মধ্যে কি কি হচ্ছে, এটা জানাও তো ফিজিক্স, যাকে বায়ো-ফিজিক্স বলে আর বায়ো-ফিজিক্স যেটা বলে, আমি তারথেকে অধিক গভীরে বলি। বায়ো-ফিজিক্স এটাই তো বলে যে শরীরের মধ্যে কি কি পরিবর্তন হচ্ছে আর কিভাবে হচ্ছে? কিন্তু বায়ো-ফিজিক্সের সীমা আয়নস পর্যন্তই সীমিত, এর আগে নেই। যদি আমরা আরও অধিক গভীরে যাই, তাহলে বায়ো-ফিজিক্স ছেড়ে পার্টিকল ফিজিক্সের কথা বলবো। কিন্তু আমি পার্টিকল ফিজিক্সেরও আগের কথা বলছি। যখন আমরা কারও দ্বারা বিরক্ত হই, যেমন ধরে নিন কেউ কারও উপর ঈর্ষা করছে যে এই ব্যক্তিটা আমার থেকেও অধিক ধনবান, বলবান, বুদ্ধিমান অথবা সুখী আছে। সেই ব্যক্তি এটাই ভাবতে থাকে, আর এমন ভাবতে-ভাবতে তার ভিতরে ঈর্ষার পাশাপাশি ক্রোধও উৎপন্ন হবে। সে ভাববে যে এই যদি মারা যায় তাহলে আমার জন্য ভালো হবে।
.
সুখ-দুঃখ বেশিরভাগ মনোদশার উপর নির্ভর করে। এক ব্যক্তি প্রতিবন্ধী, সে চলতে পারে না। সে বসে-বসে ভাবছে যে এই রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছে, তারা কত সুখী, তাদের দুটো পা আছে। পায়ে হেঁটেও চলছে আবার দৌঁড়েও চলছে। আমারও যদি দুটো পা হতো তাহলে আমি দৌঁড়াতে না পারলেও, অন্তর হাঁটতে তো পেতাম, কত সুখ পেতাম। ধরে নিন, কেউ তার পা ঠিক করে দিয়েছে। এখন সে দৌঁড়াতে পারে না, কিন্তু ধীরে-ধীরে হাঁটতে পারে। দুই-চারদিন তো ভালো লাগবে যে অনেক সুখ পেয়েছি। তারপর সে কাউকে দৌঁড়াতে বা ব্যায়াম করতে দেখবে, তখন সে ভাববে যে পায়ে হেঁটে কি হবে? আমি তো দৌঁড়াতে পাচ্ছি না আর ব্যায়ামও করতে পাচ্ছি না। তারপর সে ভাববে যে আমার মতো সবাই হয়ে যাক, তাহলে ভালো হবে, আমার আগে কেউ হওয়া উচিত নয়। ধরে নিন, সে এখন দৌঁড়াতে পারে। তারপর তার সামনে দিয়ে কেউ সাইকেল নিয়ে চলে গেল, তখন সে ভাববে যে আমার কাছেও যদি একটা সাইকেল থাকতো, তাহলে কত ভালো হতো। সে সাইকেল কিনেছে, দুই-চারদিন ভালো লাগলো, তারপর সে মোটরসাইকেল দেখলো, তখন সাইকেলও দুঃখ দেওয়া শুরু করলো। মোটরসাইকেলের জন্য কোথাও লোন নিবে, কোথাও চুরি করবে, মোটরসাইকেল কিনবে। তারপর কোথাও কেউ ক্যার নিয়ে বেরোলো, তখন মোটরসাইকেলও দুঃখ দেওয়া শুরু করবে। অর্থাৎ এই সুখের কোনো পরিমাপ নেই। তাকে না তো মোটরসাইকেল দুঃখ দিচ্ছে, না সাইকেল দুঃখ দিচ্ছে, আর না পা দুঃখ দিচ্ছে, বরং তাকে ঈর্ষা দুঃখ দিচ্ছে, কারণ সে অন্যের সুখ দেখে জ্বলছে।
.
যখন দুর্যোধন রাজসূয় যজ্ঞ থেকে ফিরে হস্তিনাপুরে আসে, তখন শকুনি ধৃতরাষ্ট্রকে বলে যে মহারাজ! দুর্যোধন খুব দুর্বল হয়ে গেছে, শরীর ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এর কারণ ঈর্ষা ছিল। বায়োলজি, মেডিক্যাল সাইন্স এবং ফিজিওলজির ব্যক্তিরা জানে যে ঈর্ষার কারণে শরীরে কোন-কোন হরমোনের উৎপত্তি হয় আর সেই হরমোনগুলো কোন-কোন অঙ্গকে প্রভাবিত করে। একইভাবে ক্রোধ, শোক ও ঘৃণার আগুনেও কোন-কোন হরমোনের উৎপত্তি হয়, এটাই তো ফিজিক্স। শরীরের ফিজিক্স এটাই হয় যে কেন সেটা হরমোন উৎপন্ন করছে? মানুষ স্বয়ং জ্বলছে আর অন্যকেও জ্বালাচ্ছে। কারণ আমরা এমন ভেবে জীবনযাপন করছি যে এই জীবনটাই হল অন্তিম জীবন। এখানে অন্তিম জীবনের তাৎপর্য হল আমাদের জীবন পূর্বেও ছিল না আর পরেও থাকবে না আর শরীরের রুচির পূর্তির জন্য আমাদেরকে যা করতে হবে, সেটা করা উচিত, ব্যস, এটাই হল জীবন।
.
সংসারের মধ্যে রুচিগুলো অনেক সংঘর্ষ আর বিশ্বযুদ্ধ করিয়েছে। কখনও কারও হিত সংঘর্ষ করে না, রুচিগুলোই সংঘর্ষ করে। কিন্তু আজ রুচির নামে স্বতন্ত্রতার কথা বলা হয়। যেদিন ইচ্ছাগুলো অধিকার হয়ে উঠবে, সেইদিন সংসারে রক্তে ভরা ক্রান্তি আসবে আর এটাই এখন হচ্ছে। আমার ইচ্ছা, আমি এইভাবে বাঁচতে চাই আর তোমার ইচ্ছা, তুমি তোমার মতো করে বাঁচো, যদি এমন হয় তাহলে বিচারের মধ্যে সংঘর্ষ হবে। রুচিগুলো সংঘর্ষ করবে, অসত্য সংঘর্ষ করবে, কিন্তু না কখনও সত্য সংঘর্ষ করবে আর না কখনও হিত সংঘর্ষ করবে। সত্য আর হিতের কথা কেবল সে বলতে পারবে, যে ব্যক্তি স্বয়ংকে আত্মা ভেবে নিয়েছে, পরমাত্মাকেও জেনেছে আর তাঁর ব্যবস্থাকেও জেনেছে তথা যে ব্যক্তি এটা বুঝে গেছে যে আমার হিতে সবার হিত আছে আর সবার হিতে আমার হিত আছে।
.
ব্যক্তিগত হিতের বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দ বলেছেন যে স্বহিতকারী নিয়মে সবাই স্বতন্ত্র আর সর্বহিতকারী নিয়মে সবাই পরতন্ত্র থাকবে। যেমন কোনো ফল আমার জন্য হিতকারী, কিন্তু এমনও হতে পারে যে অন্য কারও জন্য হিতকারী নয়। কিন্তু তাকে এমন ভাবা উচিত যে যেটা আমার জন্য হিতকারী হবে, সেটা যেন অন্য কারও জন্য অহিতকারী না হয়, অন্যথা নেওয়া উচিত নয়। যেমন ধরে নিন, কোনো ফল খাওয়া আমার জন্য হিতকারী, তাহলে কি সেই ফলটা আমি কারও খেত থেকে চুরি করে খেতে পারি? উত্তর হল - না, কারণ সেই ফল আমার জন্য তো হিতকারী, কিন্তু আমি যার চুরি করেছি, তার জন্য অহিতকারী হবে। দ্বিতীয় কথা হল চুরি করার পাপও তো আমার লাগবে, এইজন্য সেটা আমার জন্যও হিতকারী থাকলো কোথায়? হতে পারে যে চুরি করে খেয়ে শরীর বলবান হয়ে উঠবে, কিন্তু মন আর আত্মা কখনও বলবান হবে না।
.
স্বাস্থ্যের অর্থ কেবল এই নয় যে শরীর বলবান হবে, বরং এই হয় যে যেখানে সব ইন্দ্রিয় নিজ-নিজ কাজে নিয়োজিত থাকবে। মন নিজের মধ্যে নিয়োজিত থাকবে, আত্মা নিজের মধ্যে নিয়োজিত থাকবে, বুদ্ধি নিজের মধ্যে নিয়োজিত থাকবে, সবকিছু ভারসাম্যে থাকবে। সবার স্বর যদি আলাদা-আলাদা ভাবে চলে, তাহলে সেটা হিতকারক হবে না। শরীর তো বলবান আছে, কিন্তু মন অশান্ত, মনের মধ্যে রাগ-দ্বেষ, কাম, ক্রোধ আদি অনেক দুর্গুণ ভরে আছে, তাহলে সেটা স্বাস্থ্যকর হবে না। তন্দুরুস্ত আর স্বাস্থ্যকরের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। উর্দুতে তন্দুরুস্ত বলা হয়, আমার মনে হয় না সেখানে এর কোনো বিশেষ অর্থ আছে অর্থাৎ তন দুরুস্ত ব্যস এটুকুই অর্থ আছে। কিন্তু স্বাস্থ্যকরের অভিপ্রায় এইটুকু নয়। স্বাস্থ্যকর অর্থাৎ যেখানে বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়, আত্মা এইসবের ভারসাম্য হবে। স্বাস্থ্যকর আর এইসবের উপর ভারসাম্য রাখা ব্যক্তি সংসারে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। এই পরিভাষার অনুসারে একজন উচ্চ কোটির য়োগী ব্যক্তিই স্বাস্থ্যকর হতে পারবে।
.
আমরা যখন আমাদের ইন্দ্রিয়ের দাস হই, তখন আমাদের শরীরে অনেক রকম হরমোন স্রাবিত হতে থাকে। সেই হরমোন সবার আগে মস্তিষ্ক আর হৃদয়কে প্রভাবিত করে। অপ্রিয় সমাচার শুনলে হৃদয়স্পন্দন দ্রুত হবে আর মন অশান্ত হয়ে উঠবে আর এমন হলে সারা শরীর ধীরে-ধীরে রোগে আক্রান্ত হবে। দুঃখ সংবাদ মন শুনেছে, তো হার্ড-এ্যাটাক কিভাবে হল? কেউ কোনো গুলি মারিনি, কিন্তু বিচার আর শোকের তরঙ্গগুলো হৃদয়কে আঘাত করে, যারফলে সারা শরীর সমাপ্ত হয়ে যায়। এইজন্য আমরা স্বয়ংকে আত্মা মেনে আত্মার অনুকূল সব ইন্দ্রিয় আর মনকে চালানোর চেষ্টা করবো আর এটা নিরন্তর অভ্যাসের বিষয়। পরবর্তী প্রবচন ব্রহ্মচর্যের উপরে হবে। এইসব ইন্দ্রিয় সুষম হলে, তবেই ব্রহ্মচর্যের পালন অনেক সহজ হবে। ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে কেউ ব্রহ্মচারী হয়ে থাকতে পারবে না।

🌿✨ ১৪. ব্রহ্মচর্য ✨🌿
আমি ভগবান্ শিব দ্বারা নির্দেশিত ধর্মের লক্ষণ "শম" নিয়ে বিচার করেছিলাম। "শম" শব্দের অর্থ হল - কল্যাণ, শান্তি ও সুষম। শান্তির অর্থ নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং সুষম হয়। সব ইন্দ্রিয়, মন ও আত্মার মধ্যে সুষম হওয়া হল শম। সব ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কাম ইন্দ্রিয় প্রভাবিত হয়। এর নিয়ন্ত্রণ সবথেকে কঠিন হয়, কিন্তু যখন ব্যক্তি ত্বক, চোখ, কান, নাক ও জিহ্বা আদি ইন্দ্রিয়ের উপরে নিয়ন্ত্রণ করবে, তখন এর উপরেও তার নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে। যদি এগুলোর উপরে নিয়ন্ত্রণ না হয়, তাহলে এর উপরেও নিয়ন্ত্রণ হবে না। ব্যক্তিকে বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে সাত্ত্বিকই শোনা ও সাত্ত্বিকই দেখা উচিত, কোথাও কোনো মন্দ বিষয় হচ্ছে, তো সেখান থেকে উঠে চলে যাওয়া উচিত। একবার আমি এক বিদ্বানের মোটরসাইকেলে চড়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় এক ছাত্রী যাচ্ছিল, তো তিনি তাকে ঘুরে দেখতে থাকেন। আমার দৃষ্টি সেই বিদ্বানের উপরে ছিল, তবে আমি তাকে কিছু বলিনি।
.
অনেক ব্যক্তি এমন আছেন যারা সংবাদপত্র পড়বেন, তো সম্পূর্ণ পড়বেন আর চিত্রকে অবশ্যই দেখবেন। এই কারণে আমি আমার এখানে সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলাম আর রাজস্থান-পত্রিকার প্রধান সম্পাদককেও লিখে ছিলাম যে আপনি এইসব কি ছাপেন? কিন্তু সংবাদপত্র ছাপা ব্যক্তিদের উপর কোনো প্রভাব পড়েনি। তাদেরকে সংবাদপত্র চালাতে হবে আর অর্থোপার্জন করতে হবে, কারণ যতটা সস্তায় দেয়, ততটা ছাপতেই পারবে না। আমি সবাইকে পরামর্শ দিয়েছিলাম যে ভালো বিজ্ঞাপন বের করুক। সাত্ত্বিকই দেখুন ও সাত্ত্বিকই আহার করুন। মানুষ ইন্দ্রিয়ের এমন গুলাম হয়ে গেছে যে সাত্ত্বিক পদ্ধতি কাউকে ভালোই লাগে না। এই বিষয়গুলোর উপরে যার নিয়ন্ত্রণ নেই, সে কখনও ব্রহ্মচর্যের পালন করতে পারবে না। ব্রহ্মচর্যের পালন কেবল ব্রহ্মচারিদের জন্যই হয় না, বরং গৃহস্থদের জন্যও হয়। গৃহস্থাশ্রমের মধ্যেও তার কিছু নিয়ম আছে। আজ আমরা পশুদের থেকেও নিচে নেমে গেছি, কারণ পশুদের মধ্যেও নিয়ম আছে, কিন্তু মানুষের কোনো নিয়মই নেই।
.
যদি খাওয়ার কথাই বলি, তাহলে চাল, যব, মুগডাল আদি এইসব হল বিশেষ সাত্ত্বিক। যদি সার না দেওয়া হয়, তাহলে গমও সাত্ত্বিক হবে, কিন্তু এগুলো বেশি সাত্ত্বিক হবে। এটা আয়ুর্বেদের বিষয়, এইজন্য বেশি কিছু বলতে পারবো না। কিন্তু যতটুকু পড়েছি, ততটুকু বলছি, সবজির মধ্যে লাউ, ঝিঙা, টিন্ডা আদি এমন কিছু সবজি আছে, যেগুলো গরম হয় না, সেগুলোও সাত্ত্বিক হয়। মিষ্টি ফল সাত্ত্বিক হয় আর টিকের মধ্যে আমলা সাত্ত্বিক হয়। যদিও সত্ত্বগুণ, রজোগুণ আর তমোগুণ প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান আছে, কারণ এগুলো ছাড়া পদার্থের নির্মাণই হওয়া সম্ভব নয়। কেবল একটা গুণ দিয়ে সৃষ্টি তৈরি হয়নি, তবে এখানে প্রাধান্যের আধারে বিভাজিত করা হয়েছে।
.
যেটা খেলে, পড়লে, শুনলে আর দেখলে মনের মধ্যে শান্তি ও ভারসাম্য থাকে আর ক্রোধ, ঈর্ষা, অহংকার আদির অভাব হয়, তখন জেনে রাখা উচিত যে এরমধ্যে সত্ত্বগুণ প্রধান আছে। এটা সংস্কার থেকেও আসে আর শরীরের প্রকৃতির (বাত, পিত্ত ও কাফ) উপরেও নির্ভর করে। আগে এটা জানা ছিল না, কিন্তু প্রফেসর শ্রী বসন্ত মদনসুরে বলেছেন যে পিত্ত প্রকৃতির ব্যক্তিদের ক্রোধ বেশি আসে। তারা যদি সাত্ত্বিক ভোজনের সেবন করে, তাহলে ধীরে-ধীরে শান্ত হয়ে যাবে। যারা রজোগুণী বা তমোগুণী আছে বা এমন ভোজনের ইচ্ছা রাখে, তারা কখনও ব্রহ্মচর্যের পালন করতে পারবে না। এগুলো ছাড়াও আরও অনেক নিয়ম আছে।
.
সংসারের মধ্যে যতগুলো মন্দ আছে, সেগুলোর জন্য শরীরের মধ্যে কোনো হরমোন উৎপন্ন হয় না। কিন্তু কামকে উত্তেজিত করে এমন হরমোন স্বাভাবিক রূপে শরীরের মধ্যে উৎপন্ন হয়। হরমোন না হলে, তো সৃষ্টিই চলবে না, এইজন্য হরমোন হওয়া আবশ্যক। কিন্তু সেই হরমোনকে সুষম ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্য সাত্ত্বিক ভোজন, সাত্ত্বিক অধ্যয়ন, সাত্ত্বিক চিন্তন-মনন, সাত্ত্বিক দর্শন এবং সাত্ত্বিক শ্রবণ হওয়াটাও অত্যাবশ্যক। সেই হরমোনের প্রভাবকে চেপে রাখা উচিত। যখনই আমাদের হরমোন বিরক্ত করবে, তখন তাকে নিরপেক্ষ দ্রষ্টা হিসেবে দেখা উচিত আর বিষয়ের উপর একদম বিচার করা উচিত নয়। তার গভীরে কখনও যাওয়া উচিত নয়। যেমন হবনে ঘী দিলে আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠতে থাকে, ঠিক তেমনই বিষয়ের আগুন বাড়তে থাকবে। মনুস্মৃতি ২.৯৪ শ্লোকে বলা হয়েছে -
.
ন জাতু কামঃ কামানামুপভোগেন শাম্যতি।
হবিষা কৃষ্ণবৎর্মেব ভূয় এবাভিবর্ধতে।।
.
ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ গীতার মধ্যে বলেছেন যে বিষয়ের চিন্তা করা ছেড়ে দাও, একা থাকবে না, এমন কারও সঙ্গে থাকবে, যে সাত্ত্বিক আছে। একান্ত হয় পশু থাকতে পারে নয়তো দেবতা। সাধারণ ব্যক্তি যদি একা থাকে, তাহলে তার মনের মধ্যে কিছু মন্দ বিচার আসবে অথবা সে কিছু খারাপ চিন্তন করবে। যদি কারও বালক একা থাকতে চায়, তাহলে তার উপর দৃষ্টি বজায় রাখা উচিত যে সে কি করে, কি পড়ে, কেমন মিত্রের সঙ্গে মেলামেশা করে? কিন্তু এখনকার মাতা-পিতা এর উপরে ধ্যান দেয় না। এমন মাতা-পিতা কি ধ্যান দিবে, যারা স্বয়ং ব্রহ্মচর্যের পালন করেনি। আজ বিবাহ হতেই সবার আগে ডবল-বেড কেনা হয়। কোনো প্রাণীর মধ্যে এমন হয় না যে নর-মাদা একসাথে ঘুমায়। ঋতুকাল ছাড়া তারা কখনও একে অপরের কাছে থাকে না। আজ থেকে কিছু বছর পূর্বে দেখুন, তাহলে দেখবেন যে কারও ঘরে এইরকম বেড ছিল না।
.
কয়েক বছর পূর্বে আমি এক শহরে যাই। একজন আর্য সজ্জন নতুন বাড়ি তৈরি করেছেন। আমি আর আমার সঙ্গে কিছু ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ভারী প্রসন্ন হয়ে তাদের দেখাচ্ছিলেন যে এই ঘরটা ছেলের জন্য, এই ঘরটা আমাদের জন্য, এই ঘরটা অতিথিদের জন্য। তিনি বলেন যে ডবল বেড আজকের আবশ্যকতা হয়ে গেছে। আমার খুব লজ্জা অনুভব হয় যে এ কেমন আবশ্যকতা? বাচ্চা হোক, বুড়া হোক, যুবক হোক, সবার জন্যই বিছানা পাওয়া যায়। হোটেলে যাও, তো সেখানেও এইরকম বেড, কারও বাড়িতে যাও, তো সেখানেও এইরকম বেড। কোথাও দুটো বেড মিলিয়ে নিবে আর কোথাও তো সংযুক্তই থাকে। যদি বেড আলাদা-আলাদা থাকে, তাহলে আমরা তো আলাদা-আলাদা করে নিই।
.
মহর্ষি দয়ানন্দ যখন উদয়পুরে গিয়েছিলেন, তখন মহারাণা সজ্জন সিংহকে উপদেশ দিতেন আর মহারাণা সজ্জন সিংহ প্রতিদিন তাঁর কাছে পড়তে আসতেন, ধ্যান এবং প্রাণায়াম শিখতেন। তিনি তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন যে মহারাণীর কক্ষে ঘুমাবেন না আর সেখানে ঘুমানোর কোনো নিয়ম করুন, ঋতুগামী হউন। তখন মহারাণা তার সব ক্রিয়াকলাপ শুধরে নেন। যে সময় রাজারা বেশ্যা রাখতেন, মহর্ষি দয়ানন্দ সেই সময় মহারাণাকে ব্রহ্মচর্যের এই উপদেশ দিয়েছিলেন।
.
গৃহস্থের মধ্যেই ব্যক্তির পরীক্ষা হয়। গৃহস্থীদের সবার আগে পশু হওয়া শেখা উচিত যে পশু কিভাবে থাকে। গরুর যদি ঋতুকাল না হয়, তাহলে কোনো ষাঁড় কখনও তার কাছে যাবে না, কিন্তু মানুষের কোনো নিয়ম নেই। তাহলে এইরকম মাতা-পিতার সন্তানরা কিভাবে ব্রহ্মচর্যের পালন করবে আর সাত্ত্বিক হবে? মাতা-পিতা উভয়ের আহার-বিহার খারাপ, তমোগুণ ও রজোগুণ ছাড়া তো তাদের স্বাদই লাগে না। যখন গর্ভের মধ্যে বালক হয়, তখনও ঘরের মধ্যে ঝগড়া হয়। সারাদিন টিভি দেখে আর টিভিতে কি দেখা হয়, সেটা সবাই জানে, বলার কোনো আবশ্যকতা নেই। সব নয়, তবে অধিকাংশ ব্যক্তির স্থিতি এইরকমই হয়। ভেবে দেখুন, গর্ভস্থ শিশুর উপরে এইসবের কেমন প্রভাব পড়বে?
.
অভিমন্যু চক্রব্যূহকে ভঙ্গ করা গর্ভের মধ্যেই শিখেছিল। কিন্তু আজকের বাচ্চারা গর্ভের মধ্যে এই সমস্ত কামলীলা, ক্রোধ, লড়াই-ঝগড়া আর হিংসা করা শিখছে, কারণ টিভিতে এইসব দেখা হয়। ঘরের মধ্যেও গালাগাল, মারপিট, খিটখিটে মেজাজ, ঝগড়া-ঝাটি হতে থাকে, তাহলে তাদের বাচ্চারা কি আজ্ঞাকারী জন্মাবে? তারাও এইরকম হবে। বাচ্চা যখন বড় হয়, তখন বলে যে বাচ্চা আমাদের কথা মানে না। তারা এমন বাচ্চারই জন্ম দেয়নি, যে তাদের কথা মানবে।
.
বাচ্চা যখন আরও একটু বড় হয়, তখন তাকে শেখানো হয় যে পড়ো আর আই.এ.এস., আই.পি.এস., ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যানেজার, উদ্যোগপতি অথবা রাজনেতা হও আর খুব ধন অর্জন করো। ধন অর্জন করা শিখিয়েছে, তাই সে ধনই অর্জন করে। কিন্তু এটা তো শেখানোই হয়নি যে কার সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করা উচিত, মাতা-পিতার সেবা করা উচিত, বড়দের সম্মান করা উচিত। এইসব বিষয়কে শেখানো আপনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেননি। আপনি ধন কামানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন, সুতরাং সে ধন কামাচ্ছে আর অর্থের জন্য মাতা, পিতা, ভাই, বোন, স্ত্রী সবার হত্যা করতে পারে। এমন এইজন্য হয়েছে, কারণ বাচ্চাদের শেখানো হয়েছে যে ধনই হচ্ছে সর্বোপরি, এই কারণে সব সম্পর্ক সমাপ্ত হয়ে গেছে।
.
কাম আর এর চঞ্চলতা এমন হয় যে স্ত্রীর হাতে স্বামীর হত্যা করিয়ে দেয় আর স্বামীর হাতে স্ত্রীর হত্যা করিয়ে দেয়। এটা কামের চঞ্চলতাই হয়, যেটা ভাই-বোন, গুরু-শিষ্য আর পিতা-পুত্রীর সম্বন্ধকে খারাপ করে দেয়, ছোট বাচ্চার সঙ্গে ব্যভিচার করায়, হত্যা করায়। ভগবান্ মনু বলেছেন যে একাকী শোয়া উচিত, বাচ্চাও যদি একটু বড় হয়ে যায়, তাহলে তাদেরও পাশে শোয়ানো উচিত নয়। মহর্ষি মনু মনুস্মৃতি ২.১৮০ শ্লোকের মধ্যে লিখেছেন - একঃ শয়ীত সর্বত্র।
.
আমার মনে আছে, যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন বাচ্চাদের জন্য ছোট-ছোট চারপায়া হতো। যাকে উত্তরপ্রদেশে খটোলা বলা হয়, যার উপরে বাচ্চাদের শোয়ানো হতো। এমন নয় যে একটা খাটের উপরেই চার-পাঁচ ছেলে বা মেয়ে শুতো। একটা বিছানায় যদি চার-পাঁচটা ছেলে-মেয়ে শোয়, তাহলে পরবর্তীতে তারা সবাই খারাপ হবে। এখন সেই পরম্পরা সমাপ্ত হয়ে গেছে। পরিবারের লোকজন আর মাতা-পিতা সব নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। যারা আমার এই কথা শুনছেন, আমি সেইসব যুব গৃহস্থদের কাছে আগ্রহ করবো যে মিস্ত্রী ডেকে আপনার ডবল বেডটা কেটে ফেলুন, সেটার দুটো টুকরো করুন আর নিজের নিয়ম তৈরি করুন। যারা ব্রহ্মচারী আছে, তাদেরকে তো খুবই ধ্যান রাখা উচিত। মহিলাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ধ্যান দিয়ে দেখা উচিত নয়।
.
আমি যখন সার্ভিস করতাম, তখন আমার ঘরে কোনো মহিলার প্রবেশ নিষেধ ছিল। প্রতিবেশী ছোট-ছোট বাচ্চা মেয়েরা অবশ্য চলে আসতো। একবার সেখানকার ব্যক্তিরা বলেন যে আমাদের বাচ্চাদের পড়াও, তখন আমি বলি যে আমি ছেলেদের পড়াতে পারবো, কিন্তু মেয়েদের পড়াবো না। তারা বলে যে এরা তো এমনিতেই এখানে আসে আর তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। তখন আমি বলি যে তাদের নিয়মিত আসা আমার একদম স্বীকার নয়। সেই ব্যক্তিরা আমার উপরে খুব স্নেহ করতেন আর বাচ্চারা এমন ছিল যে আমি যখন বাস স্ট্যান্ডে নামতাম, তো সেখানেই দেখা হতো, কেউ হাত ধরতো তো কেউ ব্যাগ তুলে ধরতো। কিন্তু নিয়মিত বাচ্চা মেয়েদের আসা আমার স্বীকার ছিল না, তারা দ্বিতীয় শ্রেণীতেও পড়ুক না কেন। নিজের স্বামীর সঙ্গে কোনো মহিলা ওষুধ নিতে আসতো, সে যদি দ্বিতীয়বার আসে, তো আমি তাকে চিনতাম না যে সেই মহিলা কে ছিল। মহাত্মা লক্ষণকে দেখুন, যিনি সীতার কুণ্ডল আর বাজুবন্দকে চিনতে অস্বীকার করেছিলেন আর বলেছিলেন যে আমি তাঁর মুখ ধ্যান দিয়ে দেখিনি। এই ছিল মহান্ আদর্শ।
.
বর্তমানে সহশিক্ষা চলছে, যেটা খুবই ঘাতক। বাচ্চাদের এই প্রকারের শিক্ষা মাতা-পিতার দ্বারাই দেওয়া উচিত। আচার্য চাণক্য ও রাজা ভর্তৃহরি আহার, নিদ্রা, ভয়, মৈথুন এই চারটা বস্তু পশু আর মানুষের মধ্যে সমান বলেছেন। কিন্তু আজ এই চারটার মধ্যে একটাও সমান নেই, যদি এই চারটাও সমান হয়ে যায়, তাহলে আমরা অন্ততঃ পশু তো হয়ে যাবো। পশু যেমন খিদে পেলে তবেই আহার করে, জিহ্বার স্বাদের জন্য আহার করে না। খিদে পেলে তবেই খাবে আর খিদে যদি না পায়, তাহলে যাকিছুই রেখে দাও না কেন, সে খাবে না। বাঘের পেট যদি ভরা থাকে, তাহলে সে শিকার করবে না। কিন্তু আমাদের খিদা লাগেনি, তবুও এটা মহাবীর হনুমানের প্রসাদ, এটা গুলাবজামুন, এমন বলতে-বলতে খেয়ে ফেলি। পার্টিতে যাই, তো সেখানেও গিয়ে খাই। এদিকেও খাই, সেইদিকেও খাই, সারাদিন ছাগলের মতো চাবাতে থাকবো, আমাদের কোনো নিয়ম নেই। গরু, বাঁদর আদিকে মদ্যপান করাতে চাইলে, তো তারা কখনও পান করবে না, কারণ এটা তাদের ভোজন নয়, কিন্তু মানুষ তো সেটাও খেয়েছে, যেটা তার ভোজনই নয়, মাংস আদি তো আরও ভিন্ন বস্তু। মাংস আদির বিষয়ে মৈথিলীশরণ গুপ্ত বলেছেন -
বিহঙ্গমো মে পতঙ্গ ওর জলচরো মে নাও হী,
ভোজনার্থ চতুষ্পদো মে চারপাই বচ রহী।
.
অর্থাৎ উড়ার মধ্যে পতঙ্গকে খায়নি, জলে থাকা নৌকোকে খায়নি আর চারপায়ার মধ্যে খাটকে খায়নি, বাকি সব খেয়ে ফেলেছে। মানে আহারে আমরা পশুদের থেকেও নিচে নেমে গেছি। সব পাখি তাদের সময় মতোই শুয়ে পরে, সঠিক সময়েই তারা জেগে ওঠে, তাদেরকে কেউ ঘুম থেকে ডেকে তোলে না। কিন্তু আমাদের মহানগরের মানুষ রাত একটা-দুইটাতে ঘুমোতে যায় আর সকাল ৭-৮ টা পর্যন্ত ঘুমোতে থাকে, কোনো নিয়ম নেই। পশু দুর্বলদের ভয় দেখায় আর বলবানকে দেখে ভয় পায় আর মানুষ এমন হয়েছে যে দুর্বলের কাছেও ভয় পায়। ভূতের নামে ভয় পায় অর্থাৎ যার কোনো অস্তিত্বই নেই, তাকেও ভয় পায়।
.
আর্মির মধ্যে এখন মহিলাদেরও ভর্তি হচ্ছে। ন্যায়ালয় এই বিষয়ে খুব সক্রিয় আছে, এটা ভারী আশ্চর্যজনক। এরমধ্যে গুণ কম দোষ অধিক আছে। তবে হ্যাঁ, তাদের টিম আলাদা হোক আর পুরুষদের সঙ্গে সম্বন্ধ না হোক, তাহলে ভালো, কিন্তু এমন হচ্ছে না। আমি মনে করি যে তারা যতই চরিত্রবান্ হোক না কেন, কিন্তু পুরুষদের সঙ্গে তাদের থাকাটা কোনো দৃষ্টিতেই উচিত নয়। কোনো শত্রুর হাতে ধরা পড়লে তখন কি হবে? তারা কোনো রাণী পদ্মিনী বা রাণী কর্মাবতী তো নয় যে জোহর করবে। তাদের কি অবস্থা করবে, কি অবস্থা করতে পারে, একথা কেউ ভাবে না। মেনে নিচ্ছি যে তাদেরও যুদ্ধ-কলা জেনে রাখা উচিত, তাদেরও ব্যাটালিয়ন হওয়া উচিত আর হতে পারে, এমন হলেও, কারণ তাদের মহিলাদের সঙ্গেও কোথাও যেতে হতে পারে। কিন্তু ব্যবস্থা আলাদা-আলাদাই হওয়া উচিত। আমরা এইসব পাশ্চাত্য থেকে শিখেছি, আমাদের এখানকার লেখাপড়া জানা ব্যক্তিদের মাথায় এমন ভরে দেওয়া হয়েছে যে আমরা হলাম জংলীদের সন্তান, আর যা কিছু শিখিয়েছে সব ব্রিটিশরা শিখিয়েছে। আমাদের এখানেও বীরাঙ্গনা ছিলেন - ঝাঁসীর রাণী, রাণী দুর্গাবতী, মহারাণী কৈকেয়ী আদি। তাঁদের চরিত্র অনেক মহান্ ছিল।
.
আমরা সবাই এমন যুগের মধ্যে যাচ্ছি, যেখানে নিজের বলে কিছু নেই। যেখানে ধর্ম, ভারতীয়তা, সাত্ত্বিকতা আর জিতেন্দ্রতা নেই, আছে কেবল লাম্পট্যতা। যেকোনো স্কুলে গিয়ে দেখুন, তো দেখবেন, কি পরিস্থিতি হয়ে আছে? দেখা যায় না। কখনও-কখনও ইচ্ছে হতো যে বিশ্ববিদ্যালয়, আই.আই.টি., শোধ সংস্থান আদিতে গিয়ে ব্যাখ্যান দিবো, কিন্তু আমাকে তো সেখানে যাওয়ার যোগ্য পরিবেশই মনে হয় না।
.
ব্রহ্মচারীকে সাত্ত্বিক ভোজন নেওয়া উচিত। লঙ্কা এবং টকের মধ্যে আমলা আর লেবু বাদে অন্য সাত্ত্বিক নয়। লেবুর বিষয়ে আয়ুর্বেদের এক প্রফেসর বলেছিলেন যে লেবু ব্রহ্মচারীদের জন্য অনুকূল, প্রতিকূল নয়, কারণ লেবু শরীরের মধ্যে গিয়ে ক্ষারে পরিবর্তিত হয়। স্বামী ওমানন্দ ব্রহ্মচারীর জন্য লবণও নিষেধ করেছেন। আমি প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে একদম লবণ খাইনি, যার পরিণাম খুব সুখদ ছিল। তার আগে আমার আহার-বিহার ঠিক ছিল না, সব সুস্বাদু চাইতাম। তখন অসুস্থও ছিলাম অনেক, কিন্তু যখন থেকে ব্রহ্মচর্যের অনুকূল ভোজন, ব্যায়াম আদি শিখলাম, তখন থেকে তিন বছর পর্যন্ত খুব নিরোগ ছিলাম, দমা আদিও পালিয়ে যায়। আমি স্বয়ং পরিণাম দেখেছি, এইজন্য বলছি। এক বৈদ্য বলেন যে লবণ খেতে হলে সেন্ধা লবণ সেবন করতে পারেন। কারণ সেন্ধা লবণ পেটের জন্য ঠিক আছে।
.
বাস্তবে প্রাকৃতিক স্বাদ তো সেটাই হয়, যার মধ্যে কোনো কিছুর মিশ্রণ নেই। যদি আমরা প্রাকৃতিক সবজির স্বাদ নিতে চাই, তাহলে তারমধ্যে কিছু মিশ্রণ করা উচিত হবে না। হোটেলের মধ্যে দেখবেন যে সবজি কম আর মশলা বেশি আছে আর বোঝাই যায় না যে কি-কি দেওয়া হয়েছে? যেটাই হচ্ছে, ব্রহ্মচর্যের নিতান্ত প্রতিকূল আর কামকে উত্তেজিত করে এমন হচ্ছে। দৃশ্য, গীত, ভোজন আদি সবই কামকে উত্তেজিতকারী হচ্ছে আর কামকে উত্তেজিত করে এমন সংস্কারই সব হয়েছে, এইজন্য সারা ব্রহ্মাণ্ড কামের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
.
বর্তমান সময়ে একে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। এইজন্য নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী থাকাও দুষ্কর হচ্ছে। ধরে নিন যে কেউ ব্রহ্মচর্যপালনের প্রতিজ্ঞা করেছে আর মনের মধ্যে কোনো অপবিত্র ভাব আসলো, তো সেই ভাবকে সেখানেই থামিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিত। আমিও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। আমাকে অত্যন্ত কামোত্তেজক বিষ দেওয়া হয়েছিল। আমিই কেবল জানি যে আমি নিজেকে কিভাবে নিয়ন্ত্রিত রেখেছি? মন যদিও অত্যন্ত পীড়িত হয়েছে, কিন্তু শরীরের উপরে প্রভাব হতে দিইনি আর কখনও বিষয়ের মধ্যেও ভ্রান্ত হইনি। পরে একটা ভজন লিখেছিলাম, তারমধ্যে এটাও লিখেছি -
.
বিষয়ো সে বাচতা রহা, চাহে মন মেরা জলতা রহা।
আই য়াদ প্রভু তেরি, রক্ষা মম হোতি রহি।।
.
ঈশ্বরের উপাসনা হল প্রত্যেক পরিস্থিতির জন্য সবথেকে বড় অস্ত্র। এইজন্য যারা ব্রহ্মচারী থাকতে ইচ্ছুক বা যেসব গৃহস্থী সংযমী থাকতে ইচ্ছুক, বা কোনো বড় কিছু কাজ করতে চায়, তাদেরকে অবশ্যই উপাসনা করা উচিত। উপাসনার থেকে উত্তর অন্য কোনো মার্গ নেই। সাত্ত্বিক ভোজন করলেও কিছু-না-কিছু মন্দ বিচার আসতে পারে, কারণ আত্মার ভোজন হল ঈশ্বর উপাসনা আর আজ আত্মাকে কেউ ভোজন দিচ্ছে না, এমন খুবই কম ব্যক্তি আছে যারা দিচ্ছে।
.
কেউ-কেউ তো উপাসনার ঢং করে, যাতে তাদের শিষ্য ও ভক্তরা তাদের প্রতি প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে সাধনা শিবিরগুলোতে খুব লোকদেখানো উপাসনা হয়। আমাদের এক ট্রাস্টি আছেন, তিনি কোথাও কোনো এক য়োগ-শিবির থেকে আসেন আর বলেন যে গুরুজী! সেই আচার্য অনেক বড় য়োগী হন। আমি জিজ্ঞেস করি কিভাবে জানলেন, তখন তিনি বললেন আমি একবার রাতে লঘুশঙ্কার জন্য উঠি, তো তিনি চাদর ঢেকে ধ্যান করছিলেন আর পরেরদিন উঠি, তখনও তাকে এমনই দেখি। আমি তখন বলি শিবিরের মধ্যে এইরকমই নাটক হয়। কারণ শিবিরের মধ্যে অনেক ভক্ত থাকে, কারও না কারও চোখ তো পড়বেই, আর সে সবার সঙ্গে চর্চা করবে যে গুরুজী হলেন অনেক বড় য়োগী, যারফলে দান-দক্ষিণাও ভালো আসবে। সে অন্য ব্যক্তিদেরও প্রেরিত করবে যে তার কাছে গিয়ে য়োগ শেখো।
.
তিনিও সেই তথাকথিত য়োগী ছিলেন, যার প্রশংসা আমাদের ট্রাস্টি করেছেন, আমার হাতেও ধরা পড়ে। আমি আর তিনি একসঙ্গে যাত্রা করছিলাম। সাধারণ রেলগাড়ির সাধারণ ডিব্বা ছিল আর ভিড়ও খুব ছিল। আমি ভাবি যে গাড়ি চলা শুরু করলে আর পরের স্টেশন আসবে, তারপূর্বেই আমরা আমাদের মন্ত্র-পাঠ করে নিবো, কারণ আমরা তো চোখ বন্ধ করে বসে থাকবো আর তখন যদি কেউ এসে আমাদের থলি তুলে নিয়ে যায়। চার ব্যক্তির সিটের কিনারে যে রাস্তা থাকে, সেই ধাক্কা-ধাক্কির মধ্যেই সেই য়োগিজী ঘন্টা ধরে বসে ছিলেন আর কখনও হাস ছিলেন, তো কখনও কিছু করছিলেন, যাতে সবাই তাকে দেখেন। যখন আমরা আমাদের গন্তব্য স্থানে গিয়ে পৌঁছাই, তখন আমরা একই ঘরের মধ্যে ছিলাম, আমার স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। কিন্তু আমি তবু প্রতিদিন পৌনে চারটায় উঠে যেতাম আর যতদিন পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে ছিলাম, আমিই তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি যে আপনি তো শিবিরে রাত দেড়টা-আড়াইটা পর্যন্ত সমাধিতে থাকেন, কিন্তু এখানে প্রতিদিন আমিই আপনাকে জাগিয়ে তুলছি, ওখানে নাটক কেন করেন? রেলগাড়িতে ধ্যানের সময় হাসছিলেন, মানুষ আপনাকে ধাক্কা দিচ্ছিল, আপনার কি ধ্যান লাগছিল? নাটক কেন করেন? এইরকম নাটকবাজ আজ অনেক আছে। সেই য়োগি এক মাতাজীকে ঘোরাচ্ছেন, কোথাও রেল স্টেশনে যাচ্ছেন তো কোথাও বন্ধ ঘরের মধ্যে দুই-দুই ঘন্টা যাবৎ কথা বলছেন, এমন ব্রহ্মচারী য়োগী ছিলেন তিনি।
.
আমি কখনও কোনো স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে কথা বলি না। আমাদের গ্রামে প্রতিবেশী এক বোন আছে, সে কন্যা গুরুকুলের আচার্যা হয়। সে আমার থেকে অনেক ছোট আর আমাকে দাদা বলে ডাকে। আমি যখন কোনো আর্যসমাজের কার্যক্রমে যাই, তখন সে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে আর বলে যে আপনি আমার শঙ্কা-সমাধান করবেন? কিন্তু আমি কখনও একান্তে তার সঙ্গেও কথা বলতাম না, সে আমাকে দাদা বলে ডাকতো তবুও। আমি প্রতিবেশীর চবুতরেতে যেখানে গলিপথ বের হয়েছে, সেখানে দুটো খাট পেতে বসে যেতাম আর তাদের বাচ্চাদেরও ডেকে আনতাম, তারা খেলতে থাকতো আর আমি শঙ্কা-সমাধান করতে থাকতাম বা ঘরে যেখানে আমার মা আছে, সেখানে গিয়ে কথা বলতাম। অথচ বড়-বড় য়োগীরা শিষ্যাদের খুব পড়ায়, যার ফলে তারা ভালো দক্ষিণাও পায়।
.
সর্বত্র ব্রহ্মচর্যের প্রতিকূল হচ্ছে। আমরা ঋষি দয়ানন্দের কথা মানিনি, এইজন্য আমাদের পতন হয়েছে আর হচ্ছে। যাই হোক না কেন, আমাদেরকে মর্যাদার পালন করতে হবে। আমাদের এখানেও অনেকবার ছাত্রীদের পত্র আসে যে আমরা আমাদের শঙ্কার সমাধান করতে চাই। আমি তাদের বলি, যদি বিবাহিত হও তাহলে স্বামীকে নিয়ে আসবেন অথবা স্বামীর ভাইকে নিয়ে আসবেন, কিছুক্ষণ কথা বলে নিবো। এইসব বিষয়ের পালন খুবই আবশ্যক। সংবাদ চ্যানেল দেখছেন আর কোনো খারাপ দৃশ্য এসে গেল, যেটা আমাদের দেখা উচিত নয়, তাহলে দৃষ্টি এদিক-সেদিক করা উচিত। কারণ তারফলে খারাপ সংস্কার তৈরি হয়। এইরকম সংস্কার হোক আমি সেটা চাই না। এমনও কিছু সংস্কার তৈরি হয়, যার সম্বন্ধে আমরা জানতেও পারি না।
.
ভগবান্ মনু বলেছেন যে গুরুর স্ত্রীও যদি যুবতী হয় তাহলে তার চরণ স্পর্শ করবে না। আজ তো য়োগী ও সাধু মহিলাদের দিয়ে নিজের পা টেপে আর কন্যাদের পড়াচ্ছে। নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী কন্যা গুরুকুল চালাচ্ছে। আমরা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা কি বলবো, স্বয়ংকেও দেখা উচিত। যারা বিদ্বান আছেন, তারা কত নিয়মের পালন করছেন? তারা কি স্বয়ংকে মহর্ষি মনু ও ঋষি দয়ানন্দের থেকেও বড় য়োগী মনে করেন? যখন মায়েরা আসতেন, তখন ঋষি দয়ানন্দ বলতেন যে নিজের স্বামীদের পাঠিয়ে দিন, আমি তাদের উপদেশ দিয়ে দিবো, তারা আপনাদের শুনিয়ে দিবে। আমাদের কি এইসব ভাবা উচিত নয়? ধর্মের এই পরিভাষা, ভগবান্ শিব কেবল গৃহস্থদের জন্য বানিয়েছেন, একথা ধ্যানে রাখবেন। যদি ভগবান্ শিব কেবল ব্রহ্মচারীদের জন্য লিখতেন, তাহলে সেটা আরও কঠোর নিয়ম হতো।

🌿✨ ১৫. ব্রহ্মচর্যের সাধন ✨🌿
চলুন! ব্রহ্মচর্যের চর্চাকে আগে নিয়ে যাই। কখনও কখনও আমাকে হোটেলেও ভোজন করতে হয়, কিন্তু মোটেও আমার ইচ্ছা হয় না। আমার ইচ্ছা হয় যে ছোলা বা কিছু ফল খেয়ে নিই, কিন্তু পাচনতন্ত্র এমন নয় যে আমি শুকনো ভোজন করতে পারবো। আগে যদি কেউ জোর করে আমাকে মিষ্টিও খাওয়াতো, তাহলে আমি ৫০০টাকা দণ্ড নিতাম। যদি কেউ মিষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করতো তাহলে আমি বলে দিতাম যে ৫০০ টাকা আরও দাও, কারণ আমাকে সেই দণ্ড কাউকে দান দিতে হবে, তখন সে বলতো যে না-না, আপনাকে মিষ্টি খাওয়াবো না। কেউ জিজ্ঞেস করেছে যে কখনও-সখনও মিষ্টি খাওয়া যেতে পারে কি? দেখুন মিষ্টি খাওয়া খারাপ নয়, কিন্তু মিষ্টির প্রতি আসক্তি হওয়া উচিত নয়। বাজারের তো খাওয়াই উচিত নয়, আপাতকালকে ছাড়া। আজ আমাদের দেশের এমন দুর্দশা হয়েছে যে কোনো বস্তুই শুদ্ধ পাওয়া যায় না। যদি আপনি বাজার থেকে মিষ্টি কিনে খেয়েছেন, তো আপনি কি ধ্যান দিয়েছেন যে সেটা শুদ্ধ নাকি শুদ্ধ নেই, সেটা সিনথেটিক নয় তো? কখনও-কখনও খাওয়ারে মিষ্টি পাওয়া গেলো আর তাই বেশি খেয়ে ফেলেছেন, তাহলে এক সময় উপবাস থেকে, তার প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। কোনো সুস্বাদু ভোজন হলে তাহলে অনেকে বেশি খেয়ে নেয়। আমি বলছি না যে যদি কেউ ভালবেসে খাওয়াচ্ছে, তো তার অপমান করবেন, কিন্তু তার দণ্ডও নেওয়া উচিত।
.
ডায়াবিটিস মিষ্টির জন্য হয় না, বরং শরীরের মধ্যে ক্যালোরির মাত্রা অত্যধিক হওয়াতে হয়। ডাক্তার জিতেন্দ্র নাগর এই কথা বলেছিলেন, তিনি হচ্ছেন ডায়াবিটিসের অনেক বড় ডাক্তার। তিনি বলেছেন যে ডায়াবিটিস বেশি মিষ্টি খেলে নয়, বরং বেশি ক্যালোরি খেলে হয় আর ভোজন যদি হজম না হয়, তাহলে হয়। তিনি বলেছেন যে যদি গুলাবজামুন খেতে হয়, তাহলে একটা রুটি কম খাও। ভোজনে কেবল রুটিকেই গনা হয়, বাকি বস্তুকে গনা হয় না, সেটা যতই খাও। কিন্তু যদি এমন বলেন যে রুটি তো দুটোই খেয়েছি, অথচ রসগোল্লা ৫০ টা খেয়েছেন। এমন ব্যক্তি তো ব্রহ্মচারী কেন, সুস্থও থাকবে না, রোগী থাকবে। এইজন্য কামের উপর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অন্য ইন্দ্রিয়ের উপরও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
.
আজকের পরিবেশে ভোজনও রাজসী এবং তামসী হয়ে গেছে, কারণ সব খাদ্য পদার্থের মধ্যে কেমিকেল মেশানো আছে আর সেগুলো থেকে বাঁচা আমাদের হাতে নেই। যদি রোগ থেকে বাঁচতে হয় আর ব্রহ্মচর্যের পালন করতে হয়, তাহলে আমাদেরকে কেমিকেল রহিত ভোজনকে প্রাথমিকতা দিতে হবে, তার মূল্য যতই অধিক হোক না কেন। আমাদের প্রতিদিন উপাসনা করা উচিত আর বিষয়ের চিন্তন একদম করা উচিত নয় আর যদি মনের মধ্যে খারাপ বিচার উঠে আসে, তাহলে মনকে অপর দিশাতে ঘুরে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। ঠাণ্ডা পদার্থের সেবন ও গরম পদার্থের সেবন না করা অথবা কম করা উচিত। গরমের তাৎপর্য হল যেটা শরীরে উষ্ণতা প্রদান করে। সাত্ত্বিক ভোজন করা, সাত্ত্বিক চর্চা করা আর স্বাধ্যায় আদি করা, এগুলো ব্রহ্মচর্য পালনে সহায়ক হয়।
.
পরমাত্মা আমাদেরকে কান এইজন্য দিয়েছেন যাতে আমরা ভালো কথা শুনি, কিন্তু আমাদের কাছে এর জন্য সময়ই নেই, আড্ডা মারার জন্য সময় আছে অবশ্য আর সংসারের মধ্যে দেখুন, তো দেখবেন গালি-গালাজ করতে আর না জানি কি-কি করার জন্য লোকের বেশ সময় আছে। চোখ দিয়েছেন যাতে আমরা সাত্ত্বিক অধ্যয়ন করি ও ভালো দৃশ্য দেখি, কিন্তু আমরা পড়ি না, সদ-ব্যবহার করি না, বরং অপব্যবহার করি। প্রত্যেক ইন্দ্রিয়কে শান্ত আর সুষম অবস্থায় রাখা উচিত। প্রত্যেক ইন্দ্রিয়কে একে-অপরের সঙ্গে তালমেল রাখা উচিত আর সবার তালমেল ও নিয়ন্ত্রণ বুদ্ধির দ্বারাই হবে। কিন্তু যদি কারও বুদ্ধিটাই খারাপ হয় তখন? মহর্ষি দয়ানন্দ লিখেছেন যে প্রত্যেক ব্যক্তির আত্মা সত্য-অসত্যকে জানার হয়। কিন্তু অসত্যের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার সবথেকে বড় কারণ হল অবিদ্যা। বিদ্যুতের তার ছুঁয়ে যদি কেউ বলে যে আমি তো জানতাম না। জানতেন না, তবুও বিদ্যুৎ কারেন্ট মারবেই, সেটা কি বলবে যে এই জানে না, তাই একে ছেড়ে দাও। জানা ছিল না, তো জানার চেষ্টা করা উচিত ছিল যে স্যুইচ ওন আছে নাকি অফ আছে? যারা জানে না, তাদের জানার জন্য অনেকগুলো পুস্তক আছে। কিন্তু পুস্তক পড়ার সময় কার আছে?
.
সংবাদপত্র পড়ার জন্য আমরা যতটা সময় লাগিয়ে দিই, ততটুকু সময় যদি কোনো ভালো গ্রন্থের মধ্যে লাগিয়ে দিই, তাহলে আমাদের জীবন বদলে যাবে। প্রতিদিন আধা ঘন্টা কোনো আধ্যাত্মিক গ্রন্থ পড়ুন, তাহলে মনের বিচার বদলাবে। আমি এমন বলছি না যে সংবাদপত্র পড়া উচিত নয়, আমিও পড়ি। যেসব বিশেষ ঘটনা হয়, সেগুলো দেখি আর এখন তো দেখাও কম হয়, কারণ যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, সব দুর্ভাগ্যপূর্ণই ঘটছে। কিন্তু সেগুলোর জ্ঞান থাকা উচিত যে আমরা সেই পরিস্থিতিতে কি করতে পারি? এই পর্যন্ত তো ঠিক আছে, কিন্তু এক-একটা অক্ষর পড়ে সময় নষ্ট করা, এটা কোনো বুদ্ধিমানী হয় না। মোবাইলে সময় নষ্ট করা তো আরও বুদ্ধিমানের হয় না।
.
আমরা আমাদের ঘরের ভিতরে প্রত্যেকটা বস্তু সাজিয়ে রাখি, এটা যদিও কারও-কারও ঘরের মধ্যেই হয়, সবার ঘরের মধ্যে হয় না। কারও-কারও ঘরে তো পুস্তক কোথাও পড়ে আছে, বাসন কোথাও পড়ে আছে। রান্নাঘরের বিষয়ে ঋষি দয়ানন্দ বলেছেন যে মিঁয়ার রান্নাঘরে কোথাও হাড্ডি পড়ে আছে, কোথাও কিছু পড়ে আছে। কিন্তু অনেকের ঘর সুব্যবস্থিতও হয়। এখনকার বাচ্চারা এমন হয় যে চুলকে ভালো করে সাজাবে, জামা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরবে, কিন্তু এই জীবনকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে না। একে কিভাবে ব্যবস্থিত করবে, কখন কি করবে, দিনের কোনো নিয়মাবলী নেই। সংসারে অনেক মানুষ আছে আর আমি যদি কেবল ভারতেরই কথা বলি, তাহলে তারমধ্যে এমন অনেক কম মানুষ হবে, যাদের দিনচর্যা সুব্যবস্থিত আছে। যারা কর্মচারী অথবা অধিকারী হয়, তাদের দিনচর্যা এইজন্য সুব্যবস্থিত রাখতে হয়, কারণ তাদেরকে সকালে কার্যালয়ে যেতে হয়। সেই দিনচর্যাতে স্বাধ্যায় আর উপাসনার জন্য কোনো স্থান নেই, কিন্তু সংবাদপত্র, টিভি, মোবাইল ও রাজসী মনোরঞ্জনের জন্য স্থান আছে অবশ্য।
.
কিছু ব্যক্তি তো বসে-বসেই আড্ডা মেরে বেড়ায়, এটা দেখে না যে খালি বসে-বসে তাদের আয়ু কমে যাচ্ছে। যদি আমরা পুস্তকালয় থেকে কোনো পুস্তক ১৫ দিনের জন্য নিয়ে আসি আর ১৫ দিন পরে সেই পুস্তককে নিয়ে নেওয়া হবে। তাহলে কি আমরা পুস্তককে এদিক-সেদিক পড়ে থাকতে দিবো? আমরা কি তাকে পড়বো না? পরমাত্মা আমাদেরকে এই জীবন দিয়েছেন, আমরা কি আমাদের জীবনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করছি? যদি না করি, তাহলে তারজন্য বেদ ভগবান্ বলেছেন যে শুভ আর নিষ্কাম কর্ম করতে-করতে ১০০ বছর পর্যন্ত বাঁচো। অর্থাপত্তি করে এর অর্থ দাঁড়াবে যে যারা শুভ কর্ম করতে চায় না, তাদের বাঁচার অধিকার নেই। মনকে শুভ কাজ করতে, ভালো অধ্যয়ন-অধ্যাপনে, ভালো মনন-চিন্তনে ব্যস্ত রাখুন। জীবন আর সৃষ্টির সত্যকে যারা জানতে চান, তারা সবার আগে নিজের বুদ্ধিকে পবিত্র ও নিষ্পক্ষ তৈরি করুন। যেকোনো পুস্তক নিজের দৃষ্টি দিয়ে পড়বেন না, নিজের চশমা দিয়ে পড়লে কোনো পুস্তক কড়া লাগতে পারে আর কড়া লাগবে এমন পুস্তকটা হল "সত্যার্থ প্রকাশ", নিজের পূর্বাগ্রহকে ছেড়ে সেটা অবশ্যই পড়বেন।
.
মহর্ষি দয়ানন্দের "ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা" ও "আর্য়াভিবিনয়" গ্রন্থ দুটোও পড়বেন আর য়োগদর্শনে মহর্ষি বেদব্যাসের ভাষ্য তথা রাজর্ষি ভোজদেবের বৃত্তি পড়বেন। সাংখ্যদর্শন পড়বেন আর ডাক্তার সুরেন্দ্র কুমারের মনুস্মৃতির ভাষ্য পড়বেন, অন্য কারও ভাষ্য নয়, কারণ মনুস্মৃতির মধ্যে অনেক প্রক্ষিপ্ত আছে। সংসারকে সুখী করার জন্য, ধর্ম আর কর্তব্যকে ভালো ভাবে জানার জন্য, সেটা গৃহস্থ হোক, ব্রহ্মচারী হোক, রাজা, প্রজা, ব্যবসায়ী, আচার্য, শিষ্য বা কৃষক হোক, সবার জন্য একমাত্র গ্রন্থ হল মনুস্মৃতি। কিন্তু মনুস্মৃতির মধ্যে অর্ধেকের অধিক প্রক্ষিপ্তের কারণে সেটা ভারতকে বিভাজিত করে দিয়েছে, সমাজকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়েছে। এইজন্য ডাক্তার সুরেন্দ্র কুমারের ভাষ্যই পড়বেন। যদি কেউ ব্রহ্মচর্যের বিষয়ে পড়তে ইচ্ছুক থাকেন তাহলে তাদের জন্য "ব্রহ্মচর্য কে সাধন" (স্বামী ওমানন্দ) যার ১১টা ভাগ আছে¹, "ব্রহ্মচর্য সন্দেশ" (ডা০ সত্যব্রত সিদ্ধান্তালঙ্কার), "ব্রহ্মচর্য হি জীবন হে" (স্বামী শিবানন্দ) এগুলোই যথেষ্ট। বাকি সত্যার্থ প্রকাশ পড়বেন। এমন নয় যে নিজের পড়া ছেড়ে দিয়ে এইসব পড়া শুরু করে দিবেন। আপনি যদি নিজের পড়াশোনাতে পিছিয়ে থাকেন, তাহলে আমার কথা আপনার উপর কোনো প্রভাবই ফেলবে না, আমি চাই যে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী অনেক আগে যাক। কিন্তু আমি জানি যে তারা অনেক সময় খারাপ বিষয়ে নষ্ট করে। তাদেরকে সঠিক বিষয়ের জন্য আধা ঘন্টা বের করা উচিত। খারাপ বিষয় থেকে সময় বের করুন আর ঠিক বিষয়ের মধ্যে জুড়ে দিন, তাহলে তাদের জীবন তৈরি হবে আর নিজের পড়াশোনাতেও এগিয়ে থাকবে।
.
আমরা স্বয়ং আত্মা হয়ে সব ইন্দ্রিয়ের উপরে শাসন করার চেষ্টা করবো। বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রিত করবো, তাহলে মনের দিকে যাবো আর মনকে নিয়ন্ত্রিত করবো, তাহলে আত্মার দিকে যাবো আর আত্মা থেকে তারপর পরমাত্মার দিকে যাবো। আমি কোনো য়োগী নই। আমি এটা বলতে পারবো না যে আমি আত্মা বা ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার করেছি। তবে কিশোরাবস্থায় ভালো অনুভব হতো, এটা বলতে পারি। সেই সময় কোনো ঘড়ি ছাড়াই পৌনে চার ঘন্টা ধ্যানে বসতাম। আমার শরীরেরও খেয়াল প্রায় আমার থাকতো না। বর্তমানে স্বাস্থ্য ঠিক না থাকা আদি অনেক কারণে আমি ততটা সাধনা করতে পারি না, যতটা করা উচিত। সাধনার জন্য ক্রমাগত তিন ঘন্টা বসে থাকা, সেটা খুবই ভালো। কিন্তু ঋষি দয়ানন্দ বলেছেন যে যেমন করে হোক অন্ততঃ এক ঘন্টা উপাসনা অবশ্যই করবেন। যদি কেবল উপাসনার মধ্যেই ঈশ্বরের অনুভব হয়, তাহলে সেই উপাসনা ঠিক নয়। উপাসনার ফল তখনই মানা যেতে পারে, যখন প্রত্যেকটা কাজ করার সময় আমাদের ঈশ্বরের অনুভব হবে।
.
আমি যখন সাঞ্চৌরে থাকতাম, তখন রবিবারের দিন গাছের নিচে খাট পেতে শুয়ে পড়তাম। গাছের এক-একটা পাতাকে ধ্যান দিয়ে দেখতাম আর সেই পাতাগুলো দেখতে-দেখতে আমার এমন হতো যে আমার খেয়ালই থাকতো না যে আমি কোথায় শুয়ে আছি। সেই পাতাগুলোতে আমার ঈশ্বরের দর্শন হতো যে ঈশ্বর কিভাবে এই পাতাগুলোকে বানিয়েছেন, কি-কি আছে এরমধ্যে? সৃষ্টির প্রত্যেকটা কণা আর প্রত্যেকটা রচনা, যাকে আমরা চোখ দিয়ে দেখতে পারি, সেগুলো আমাদেরকে ঈশ্বরেরই বোধ করিয়ে দেয়। যেগুলোকে আমরা চোখ দিয়ে দেখতে পারি না, যেমন এটম, ইলেকট্রন, প্রোটন, বড়-বড় গ্যালাক্সি, রশ্মি আদি, আমরা এগুলোকে বুদ্ধি দিয়ে দেখতে পারবো। এগুলো আমাদেরকে ঈশ্বরেরই বোধ করিয়ে দেয়। এই বোধ হওয়ার জন্য বুদ্ধি সাত্ত্বিক হওয়া উচিত। রাজসী এবং তামসী বুদ্ধি কিছুই বোধ করাতে পারবে না।
.
উপাসনা তারই সফল মানা যেতে পারে, যারা প্রত্যেক সময় ঈশ্বরের অনুভব করে আর যারা লাভ-হানি, সুখ-দুঃখ, মান-অপমান, অনুকূলতা-প্রতিকূলতার মাঝে সমভাব রাখে, উত্তেজিত হয় না বা উত্তেজিত হওয়ার চেষ্টা করে না। পরনিন্দা আর আত্মপ্রশংসা এই দুটোই হল খুব খারাপ বস্তু। যদি আমার বিচার কারও সঙ্গে না মেলে আর কেউ তার নিন্দা করে, তখন খুব আনন্দ লাগে। নিন্দার অর্থ সত্যকথা বলা হয় না, সত্যকথা বলাকে তো স্তুতি বলা হয়েছে। যে যেমন আছে তাকে সেইরকম বলাকে স্তুতি বলে, কিন্তু অন্ধকে অন্ধ বলা স্তুতি হয় না, যেমনটা সত্যের পরিভাষাতে বলা হয়েছে। কিন্তু কেউ যেমনটা-তেমনই বলে আমাদের সজাগ করে দিচ্ছে, তাহলে সে স্তুতি করছে, নিন্দা করছে না। কখনও-কখনও কেউ কারও নিন্দা করছে, অথচ সেটা আমাদের ভালো লাগছে আর আমরা তাকে খারাপ মানছি না, তো এর তাৎপর্য হল আমরা সঠিক ভাবে উপাসনা করছি না। আমাদের এমন করা উচিত নয়।
.
বস্তুতঃ যে ব্যক্তির জীবনে নিষ্পক্ষতা আছে, সেই ব্যক্তিই য়োগী হয়। ঋষি দয়ানন্দ সবার আগে তাদের খণ্ডন করেছেন, যাদের তিনি আপন মানতেন। যেমন হিন্দুদের, তিনি হিন্দু নয়, বরং আর্য বলতেন। তিনি ঋষিদের এই ভূমিকে ভালবাসতেন। তিনি এটাও বলতেন যে একদা শুধু এই ভূমিই নয়, বরং সারা ভূমণ্ডলই ঋষিদের ছিল। যেমন কোনো কৃষক যখন চাষ করে, তখন এক-একটা ক্যারীতে জল দেয়, সবগুলোর মধ্যে একসঙ্গে দিতে পারে না। ঠিক সেইভাবে ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ প্রকাশের ১১ সমুল্লাসের মধ্যে নিকটবর্তী ক্যারী অর্থাৎ ভারত ভূমির মন্দগুলোকে পরিষ্কার করেন। তারপর হিন্দুদের থেকে যেগুলো একটু আলাদা মত আছে আর বেদকে মানে না, সেগুলোর মন্দকে দূর করার চেষ্টা করেন। তারপর সেগুলোর থেকে দূরে ঈশাই (ক্রিশ্চিয়ান) মত ছিল, কারণ সেই সময় তাদের শাসন ছিল, তাদেরকে ঠিক করেন। অন্তিমে ইসলামকে ঠিক করার চেষ্টা করেন, কারণ তাঁর জীবনে নিষ্পক্ষতা ছিল। আর্যসমাজের স্থাপনা লাহৌরে ডাক্তার রহীম খানের বাড়িতে হয়েছিল। যদি তাঁর মধ্যে সম্প্রদায়বাদ থাকতো, তাহলে কি সেখানে স্থাপনা হতো? এক হিন্দু ছিলেন, যিনি তাঁর খণ্ডন দেখে তাঁকে বের করে দেন, তখন সেখানে গিয়ে তিনি স্থাপনা করে ছিলেন।
.
ঋষি দয়ানন্দ ধর্মের পরিভাষাতেই লিখেছেন - "সত্যাচরণ অর্থাৎ পক্ষপাত রহিত ন্যায় করাই হল ধর্ম।" যে ব্যক্তি পক্ষপাত রহিত আছে, সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখে, সবার প্রতি সমবেদনা এবং সদভাবনা রাখে, সে ব্যক্তি য়োগী হয়। কিন্তু এর অভিপ্রায় এই নয় যে দুষ্টের অপরাধকে দণ্ড দেয় না, সে স্বয়ং দিবে না কিন্তু অন্য কাউকে দিয়ে অবশ্যই দেওয়াবে। ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়ের য়োগী হওয়াতে একটা পার্থক্য আছে, ব্রাহ্মণকে দণ্ড দেওয়ার অধিকার নেই, কিন্তু ক্ষত্রিয়ের আছে। যদি ক্ষত্রিয় দণ্ড না দেয়, তাহলে এর অর্থ হল সে য়োগী নয়, প্রজার পালন কিভাবে করবে? এইজন্য য়োগীর ব্যবহার বদলানো উচিত।
.
কোনো মহিলার উপরই আসক্তি হওয়া উচিত নয়, কারণ মহিলা আদরণীয় ও পূজ্য হয়। ঋষি দয়ানন্দ তো চার বছরের বাচ্চার সামনেও মস্তক নত করেছিলেন যে এই হল মাতৃশক্তি। তিনি মহিলাদের নিন্দক ছিলেন না, তবে মর্যাদা রাখতেন। যে ব্যক্তি মর্যাদা রাখে না, লোকৈষণা, বিত্তৈষণার দ্বারা কোনো-না-কোনো প্রকারে আক্রান্ত, যে ব্যক্তি কথায়-কথায় উত্তেজিত হয়ে যায়, এর অর্থ হল - সে ঠিক ভাবে উপাসনা করছে না। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ গীতার মধ্যে বলেছেন - "সমত্বম্ য়োগ উচ্যতে" অর্থাৎ সমত্বই য়োগী হয়, ভগবান্ পতঞ্জলি য়োগদর্শনের মধ্যে বলেছেন - "য়োগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ" অর্থাৎ চিত্তের বৃত্তিগুলোকে নিরোধ করাই হল য়োগ। নিরোধ তখনই হতে পারবে যখন আমাদের ভিতরে সাত্ত্বিক ভাব আসবে। যখন সাত্ত্বিকতার ভাব হবে, তখনই আমাদের মন শান্ত হবে আর তারপরই আত্মদর্শন হবে। মন যদি অশান্ত থাকে তাহলে আমাদের বুদ্ধিও অশান্ত থাকবে। যারা পড়াশোনা করছে তাদের জন্যও মন শান্ত থাকা অত্যাবশ্যক। যদি কারও মনের মধ্যে অনেক সমস্যা থাকে, তাহলে সে বৈজ্ঞানিক হতে পারবে না, কারণ তার মন একাগ্র হতে পারবে না।
.
এইসবের মূল মন্ত্র হল - ইন্দ্রিয়ের উপরে নিয়ন্ত্রণ। ইন্দ্রিয়ের উপরে নিয়ন্ত্রণের মূল মন্ত্র হল - শুদ্ধ আহার-বিহার, শুদ্ধ বিচার, শুদ্ধ আচরণ আর এইসবের উপায় হল - উপাসনা। কোনো ব্যক্তি যদি উপাসনা না করে, তাহলে তাকে রজোগুণ ও তমোগুণ ভালো লাগবে আর সে সাত্ত্বিক ভোজন করবে না, তাই উপাসনাতেও তার মন লাগবে না, এই দুটোই পরস্পরের সঙ্গে আশ্রিত হয়। এই কাজটা খুব কঠিন, কিন্তু যেদিন ভূমিতে বসবাসকারী সব মানুষের মধ্যে সত্ত্বগুণ প্রধান হবে, তখনই সবাই বুদ্ধিমান হয়ে যাবে, সবাই সুখী হবে আর সবকিছুর মধ্যে শান্তি হবে। কোথাও আতংবাদ, ডাকাতি, হিংসা, প্রতারণা ও চুরি হবে না, সবাই ভালোভাবে বাস করবে। তখন বলা হবে সংসারের এটা শম অবস্থা, সুষম অবস্থা, সুখের অবস্থা আর এটাই হল কল্যাণকরিণী অবস্থা।
___________________
¹ এই পুস্তকটি বাংলাতে "ব্রহ্মচর্যের সাধনা" নামে করা হয়েছে। - অনুবাদক

🌿✨ ১৬. দান কেন করবেন? ✨🌿 ভগবান্ শিব দ্বারা নির্দেশিত ধর্মের অন্তিম লক্ষণ দানের উপরে বিচার করবো - . দেওয়ার ভাবনা আর পরোপকার করা হল প্রত্যেক ব্যক্তির অনিবার্য কর্তব্য। সাংখ্যদর্শন ১.৩১ সূত্রের মধ্যে বলা হয়েছে - "সম্হতপরার্থত্বাৎ পুরুষস্য" অর্থাৎ সংঘাতের পরার্থ হওয়াতে পুরুষের অনুমান হয়। প্রকৃতির সংঘাতে, রশ্মির সংঘাতে আর কণার সংঘাতে যে সৃষ্টি তৈরি হয়েছে, সেটা হল পরার্থ অর্থাৎ অন্যের জন্য। সূর্য নিজের জন্য তপ্ত হচ্ছে না, চন্দ্রমা নিজের জন্য চাঁদের আলো দিচ্ছে না, জল নিজের জন্য নয়, অগ্নি নিজের জন্য নয়, বায়ু নিজের জন্য নয়, ভূমি নিজের জন্য নয়, বৃক্ষ নিজের জন্য নয়, সবকিছ হল অন্যের জন্য। এরদ্বারা পুরুষের অনুমান হয় যে কারও জন্য হয়েছে। যদি কেউ না থাকতো, তাহলে এই সৃষ্টি কার জন্য তৈরি হতো? . ধরে নিন, আমি একটা কার্পেট বিছিয়েছি আর সেখানে কেউ নেই। কেউ যদি সেটা দেখে তাহলে বলবে যে কেউ কারও জন্য কার্পেট বিছিয়েছে। এমনও কিছু আছে যেটা স্বয়ংয়ের জন্য বিছানো হয়। রন্ধনকারী স্বয়ংও ভোক্তা হতে পারে আর অন্যকেও খাওয়াতে পারে। কিন্তু যদি রন্ধনকারী তৃপ্ত হয়, তার খিদে না থাকে অথবা ভোজন করেছে, তবুও সে ভোজন তৈরি করছে, তাহলে এর তাৎপর্য হল সে অন্য কারও জন্য তৈরি করছে। ঠিক এইরকমই সৃষ্টির মধ্যে যত পদার্থ তৈরি হয়েছে, একটা তো সেগুলোর নির্মাতা আছে আর আরেকটা যার জন্য সেগুলো তৈরি হয়েছে। সম্পূর্ণ সৃষ্টিকে যে তৈরি করেছে, সে অবশ্যই পূর্ণ হবে। কারণ অপূর্ণ শক্তিশালী সৃষ্টি নির্মাণের মতো কাজ করতে পারবে না। . শরীরের অঙ্গের মধ্যে অন্য অঙ্গের তুলনায় সম্ভবতঃ দাঁতের কাঠামো সবথেকে সরল হবে। একজন ডাক্তার, যিনি সারা জীবন দাঁতের চিকিৎসা করেছেন, বড়-বড় সার্জারি করেছেন। যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে আপনি সত্যি করে বলুন, আপনি কি দাঁতের বিষয়ে সবকিছু জানেন? তখন তিনি বলবেন যে সবকিছু তো জানি না। একটা স্থিতিও এমন আসে যে তিনি বলে দেন যে দাঁতটা তুলতেই হবে, এখন ঠিক করতে পারবো না। যারা নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবে, তারা সারা জীবন ধরে পড়ার পরেও একটা দাঁতের বিষয়ে সম্পূর্ণ জানতে পারে না, সে যতই বড় ডেন্টিস্ট হোক না কেন, সারা শরীরের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভাবে কে জানতে পারবে? সে এনাটমী ও ফিজিওলজীর যতই বড় বিদ্বান হোক না কেন, সে এটাই বলবে যে আমি সবকিছু জানি না। . এখন ব্রহ্মাণ্ডকে দেখুন, তাকে সম্পূর্ণ ভাবে কে জানতে পারবে? কিন্তু তাকে যে তৈরি করেছে, সে সবকিছু জানে আর যাকে কেউ জানে না, তাকে যে জানে, সেটা হল ঈশ্বর। যাকে কেউ দেখতে পায় না, যে তাকে দেখতে পারে, সেটা হল ঈশ্বর। যাকে কেউ তৈরি করতে পারবে না, যে তাকে তৈরি করতে পারবে, সেটা হল ঈশ্বর। সেই ঈশ্বর এইরকম পূর্ণ হয়। বেদের মধ্যে তাঁকে পূর্ণকাম ও অকাম বলা হয়েছে অর্থাৎ তাঁর কোনো কামনা নেই। তাহলে সে অবশ্যই সংসারকে নিজের জন্য তৈরি করেনি, অন্য কারও জন্য তৈরি করেছে। সূর্য চন্দ্রমার জন্য হয়নি, পৃথিবী সূর্যের জন্য হয়নি, একটা নক্ষত্র অন্য আরেকটা নক্ষত্রের জন্য হয়নি, বরং তার জন্য হয়েছে, যে সেগুলোর ব্যবহার করতে সক্ষম হয়, সেটা হল চেতন। এইজন্য ভগবান্ কপিল বলেছেন যে এইসব দেখে পুরুষের অনুমান হয়, কারণ এইসব নিজের জন্য হয় না। . পিবন্তি নদ্যঃ স্বয়মেব নাম্ভঃ, স্বয়ম্ ন খাদন্তি ফলানি বৃক্ষাঃ। নাদন্তি সস্যম্ খলু বারিবাহাঃ, পরোপকারায় সতাম্ বিভূতয়ঃ।। . নদী স্বয়ং নিজের জল পান করে না, ফসল স্বয়ং নিজের জন্য হয় না আর মেঘ স্বয়ং নিজের জন্য বর্ষণ করে না। কেউ তো আছে, যার জন্য সব হচ্ছে। ঋগ্বেদ ৯.৬২.২৭ মন্ত্রের মধ্যে বলা হয়েছে - তুভ্যেমা ভুবনা কবে মহিম্নে সোম তস্থিরে। তুভ্যমর্ষন্তি সিন্ধবঃ।। হে জীবাত্মন্! এই সম্পূর্ণ লোক তোমার জন্য বিদ্যমান আছে, তোমার জন্য নদী বয়ে চলেছে, সবকিছু তোমার জন্য। যদিও সবকিছু তো সব জীবের জন্য, তবে যারা মানুষ অর্থাৎ বিচারশীল প্রাণী আছে, তাদের উপর সবথেকে বড় দায়িত্ব আছে। ঈশ্বর আমাদের সংকেত দিচ্ছেন যে এই সৃষ্টিকে আমি তোমাদের জন্য বানিয়েছি, সৃষ্টির প্রত্যেকটা কণা এটাই সংকেত করে যে তুমিও অন্য কারও জন্য বাঁচো, কেবল নিজের জন্য নয়। মৈথিলীশরণ গুপ্তের শব্দে - यही पशु प्रवृत्ति है कि आप आप ही चरे। वही मनुष्य है कि जो मनुष्य के लिए मरे।। (যারা কেবল নিজের জন্য বাঁচে তাকেই পশু-প্রবৃত্তি বলে, মানুষ তাদের বলে যারা অন্য মানুষের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেয়।) . সূর্য প্রতি সেকেণ্ডে নিজের ৪০ লক্ষ টন ওজন খরচ করে অর্থাৎ প্রকাশ ও উষ্মা আদি ঊর্জাতে পরিবর্তিত করে দেয়। এত বড় নক্ষত্র আমাদের জন্য জ্বলছে। চন্দ্রমা শীতল যুক্ত চাঁদের আলো আমাদের দেয়। বৃক্ষ আমাদের জন্য ফল দেয়, তাহলে আমরা কেবল নেওয়ার জন্যই জন্মেছি? পশু-পক্ষী তো বোঝে না, কিন্তু আমরা পশু পক্ষীদের থেকেও নিচে নেমে গেছি। পশু-পক্ষী নিজের বাচ্চাকে নিঃস্বার্থ সেবা করে আর মানুষের মধ্যে মাতা-পিতার মধ্যে এমন হয় যে বাচ্চা বড় হয়ে আমাদের সেবা করবে আর যাদের করার তারা করেও, কিন্তু পশু-পক্ষী করে না আর না তারা অপেক্ষা করে যে তাদের বাচ্চা সেবা করবে। কিন্তু আজ মানুষের মধ্যে নিজের বাচ্চার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেম নেই। পিতা নিজের ধনাদি নিজের বাচ্চাকে দিতে চায় না। স্বামী-স্ত্রীরও আলাদা-আলাদা তালাচাবি আছে, আলাদা-আলাদা ব্যাংক ব্যালেন্স আছে। এইজন্য বলা হয় যে মেয়েকে বিবাহের পূর্বে পড়াও, যাতে সে আত্মনির্ভর হতে পারে, এটা কে শিখিয়েছে? বেদের মধ্যে তো লেখা আছে - "সম্রাজ্ঞী ভব" (ঋগ্বেদ ১০.৮৫.৪৬) অর্থাৎ বধূ গৃহের রাণী হবে। রাজা-রাণীকে লড়ালো? স্ত্রী ভাবছে যে আমি আলাদা ভাবে আত্মনির্ভর হতে হবে, স্বামীর উপরে নির্ভীর থাকা উচিত নয়। যার সঙ্গে বিবাহ হয়েছে, তার উপরেও কি নির্ভর থাকা উচিত নয়? আর স্বামীও স্ত্রীকে দেয়, তো সে এই ভেবে দেয় যে আমি উপকার করছি। পরিবার কি এইরকম হয়? একটা সময় ছিল যখন ভাই-ভাই রাজ্যকে ত্যাগ করার জন্য বিবাদ করেছিল আর একে-অপরকে রাজ করার জন্য বলেছিল, রামায়ণের মধ্যে দেখুন। মহাভারতের মধ্যে দৃশ্যটা বদলে যায়। . ঈশ্বর এই সৃষ্টির দ্বারা শেখায় যে আমি যেমন পরোপকার করার জন্য এই জগতের নির্মাণ করেছি, তুমিও সেইরকম করো, সেটা পরোপকারের জন্য করো। দান দেওয়া আর ত্যাগ করা শেখো। রামধারী সিংহ দিনকর কবিতা লিখেছেন তার কিছু পঙক্তি এইরকম - दान जगत् का प्रकृत धर्म है, मनुज व्यर्थ डरता है। एक रोज तो हमें स्वयं सब-कुछ देना पड़ता है।। দান হল প্রকৃতির স্বাভাবিক ধর্ম, মানুষ তাতে ব্যর্থ ভয় পায় আর ভাবে যে আমি দিয়ে দিচ্ছি, অথচ একদিন তো তার থেকে সবকিছুই ছিনিয়ে নেওয়া হবে। किस पर करते कृपा यदि वृक्ष अपना फल देते हैं? गिरने से उसको सम्भाल क्यों रोक नहीं लेते हैं? অর্থাৎ বৃক্ষ যদি ফল দিচ্ছে, তাহলে কার উপর কৃতজ্ঞতা করছে, তারা কি পারবে নিজের ফলকে পড়ে যাওয়ার থেকে থামাতে? থামাতে পারবে না, কারণ দেওয়া ও ত্যাগ করা হল স্বাভাবিক ধর্ম। देते तरु इसलिए कि रेशों में मन कीट समायें। रहें डालियां स्वस्थ और फिर नए-नए फल आयें।। বৃক্ষ এইজন্য ফল দেয় যাতে তার ডালের মধ্যে থাকা ফলগুলো পচে না যায়। ডালগুলো সুস্থ থাকে, ফল পেকে নিচে পরে যাবে আর তারপর নতুন-নতুন ফল আসবে। . বেদের মধ্যে বলা হয়েছে - বিষ্ণোঃ কর্মাণি পশ্যত য়তো ব্রতানি পস্পশে। (ঋগ্বেদ ১.২২.১৯) বিষ্ণু অর্থাৎ সর্বব্যাপক পরমাত্মার মহান্ পালন আদি কর্মগুলোকে দেখো আর নিজের ব্রতগুলোকে শেখো। ঈশ্বরকে দেখে নিজের ব্রতের পালন করা শেখো, ব্রতের উপর চলা শেখো। কেবল ঈশ্বরের নাম নিলেই কোনো লাভ হয় না, বরং ঈশ্বরের কর্মকে দেখে তারদ্বারা নিজের কর্মের উন্নতি করে তবেই লাভ হয়। ঋষি দয়ানন্দ একেই স্তুতি বলেছেন। স্তুতির অর্থ হল গুণের কীর্তন করা আর তারদ্বারা নিজের গুণের উন্নতি করা। ঈশ্বর হল দাতা, তো আমরাও দাতা হবো, কিন্তু দেওয়ার ভাবনা খুব কম ব্যক্তির মধ্যে আছে। হিন্দু মুসলমানকে দোষ দেয়, কিন্তু সে এটা দেখে না যে মুসলমান জাকাতের নামে ২.৫% দেয়, আমি যতদূর শুনেছি। কিন্তু হিন্দু তার আয়ের কত ভাগ দেয়? . ঋষি দয়ানন্দ আর্যসমাজের নিয়মাবলীতে লিখেছেন যে প্রত্যেক আর্যসমাজী নিজের আয়ের উপার্জিত বা অধিকৃত সম্পদের ১০০ ভাগের এক ভাগ (১%) দান করবে। আর্যসমাজের বিশেষ উৎসবে কিছু দিলে, তাহলে সেটা এর থেকে আলাদা হবে। কিন্তু কেউ দেয় না, বিশেষ করে যারা অনেক বড় দান দাতা আছে, তারা ১০০ ভাগের এক ভাগ দান কখনও দেয় না। তারা ভাবে যে আমার এতগুলো ধন চলে যাচ্ছে, কিন্তু এটা দেখে না যে তাদের কাছে তো ৯৯ থাকবে। এটা দেখে যে সে মাসে ₹ ১০০ দিচ্ছে, তো আমি এক লাখ কেন দিবো? এর উত্তর হল তুমি এক মাসে এক কোটি টাকা উপার্জন করো আর তোমার কাছে ৯৯ লাখ থাকবে। যে ১০,০০০ টাকা উপার্জন করে, সে ১০০ টাকা দিচ্ছে, আর তার কাছে তো ৯,৯০০ টাকাই থাকবে। তার ৯,৯০০ বেশি লাগছে আর নিজের ৯৯ লাখ কম লাগছে? আমাদের মধ্যে দেওয়ার ভাবনা নেই, যদি প্রত্যেক ব্যক্তি ১০০ ভাগের এক ভাগ দান করতো, তাহলে আর্য সমাজের মধ্যে বিবাহ করাতে হতো না। অমিল বিবাহ, পালিয়ে বিবাহ, অবৈধ বিবাহ এইজন্য করানো হয়, যাতে সমাজে ধন আসে। সমাজ ও মন্দিরগুলোর শৌচালয়, স্নানঘর, বিছানাগুলোকে গিয়ে দেখুন আর নিজের ঘরের বিছানাকে দেখুন যে কত পার্থক্য আছে। মন্দির নোংরা আর ঘর পরিষ্কার, এমন কেন? এইভাবে কি করে পরোপকারের কাজ হবে? পরোপকারের ভাবনাই নেই। আমরা ঈশ্বরের কাছ থেকে শিখিনি। . আমরা যজ্ঞ তো করেছি, কিন্তু যজ্ঞের মধ্যে বলা "স্বাহা" শব্দের অর্থই শিখিনি। "স্বাহা" শব্দের অর্থ হল - "ইদম্ ন মম। ওম্ অগ্নয়ে স্বাহা" অর্থাৎ আমি নিজের আহুতি বা আমার কাছে যাকিছু আছে, তার আহুতি অগ্নি স্বরূপ পরমাত্মাকে সমর্পণ করছি। এগুলো আমার না, এগুলো সব ঈশ্বরের। এগুলো তোমার, তোমাকে অর্পণ করছি। আমরা সারা জীবন ধরে "স্বাহা-স্বাহা" করেছি, কিন্তু স্বাহা আমাদের জীবনে আসেনি। "ইদম্ ন মম", "ইদম্ ন মম" বলে গেছি, কিন্তু জীবনে "ইদম্ ন মম" আসেনি। কিন্তু মৃত্যুকাল পর্যন্ত তৃষ্ণা যায়নি। যে নিজের কর্মচারীকে ঠিকভাবে বেতন দিতে পারে না, সে কোনো ভিক্ষুককে কি দান দিবে? দান নিঃস্বার্থ হওয়া উচিত। কিছু ব্যক্তি লোক-দেখানোর জন্য দান দেয়। কারণ কর্মচারীকে বেতন দিলে তো কোনো দেখানো হবে না। কখনও কার্যক্রমে দান দিবো, তাহলে সবাই দেখবে যে এত দান দিয়েছে। কার্যক্রমে দান করুন, কিন্তু প্রথমে নিজের ঘর, কার্যালয়, ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করুন। আমাদের ভিতরে দেওয়ার প্রবৃত্তি হওয়া উচিত, কারণ "ন বিত্তেন তর্পণীয়ো মনুষ্যঃ" অর্থাৎ মানুষ কখনও ধন দিয়ে তৃপ্ত হবে না, এইজন্য দম দাও। য়জুর্বেদ ৪০.১ মন্ত্রের মধ্যে লেখা আছে - ঈশা বাস্যমিদম্ সর্বম্ য়ৎকিঞ্চ জগত্যাম্ জগৎ। তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্ধনম্।। এর অভিপ্রায় হল সবকিছু হল ঈশ্বরের, তাই ত্যাগপূর্বক ভোগ করুন, এই ধন হল প্রজাপতি পরমাত্মার। কেউ-কেউ যে আমাদের দেওয়ার সামর্থই নেই। সামর্থ্য তৈরি করা হয়, একটু খরচ বাঁচিয়ে। তাদের সঙ্গে তুলনা করুন যারা আমাদের থেকে অধিক দুঃখী আছে। আমরা তাদের সঙ্গে তুলনা করে দুঃখী হই, যারা আমাদের থেকে বেশি সুখী আছে। নিজের থেকে বেশি সুখীর সঙ্গে তুলনা করবেন, তো দুঃখ হবেই। নিজের থেকে নিচে নামা ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করুন আর ভাবুন যে আমরা উপরে ঈশ্বরের কত কৃপা আছে যে আমি এর থেকে ঠিক তো আছি। আমরা দেওয়া শিখবো, কারণ সংসারের মধ্যে আমাদের কিছুই নেই। আমরা তো কেবল পোস্টম্যানের কাজ করছি। পোস্টম্যান যখন মানিঅর্ডার নিয়ে আসে, তখন হস্তাক্ষর করিয়ে নেয় আর আমাদেরকে আমাদের ধন দিয়ে চলে যায়। সে তো আর দান করে না, কেউ পাঠিয়েছে আর সে আমাদেরকে দিয়েছে। ঠিক সেইরকম পরমাত্মাও আমাদের দিয়েছে আর আমরা অন্যদের দিবো, নিজের ধর্মের পালন করে। . (ক্রমশঃ)

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ভিরদান্না— সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন সাইট

🏺 ভিররানা (Bhirrana) খননে কি পাওয়া গেছে? ভিররানা (বা ভিরদান্না) প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি হরিয়ানার (ফতেহাবাদ জেলায়) ঘগ্গর (পৌরাণিক সরস্বতী) ন...

Post Top Ad

ধন্যবাদ