ঋষি দয়ানন্দের লেখা সত্যার্থ প্রকাশ হলো এক কালজয়ী গ্রন্থ। ঋষি দয়ানন্দ সত্যার্থ প্রকাশের ১৪ সমুল্লাসের মধ্যে ইসলামের কুরআন কে খণ্ডন করেছেন। ঋষি দয়ানন্দই এমন এক ব্যক্তি যিনি এই ভারতে সর্ব প্রথম বেদ বিরোধী সকল মতবাদ কে যুক্তি তর্ক দ্বারা খণ্ডন করেন এবং বেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিরপেক্ষ ভাবে তুলে ধরেন, শুধু তাই নয় তিনি প্রমাণ করেন বেদ হলো মনুষ্য জাতির জন্য। ঋষি দয়ানন্দ ১৪ সমুল্লাসের শুরুতে কুরআনের প্রথম সূরার প্রথম আয়াত কে খণ্ডন করেন-
কুরআন ১/১
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
''শুরু করছি আল্লাহর নামে, তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।''
ঋষি দয়ানন্দ এই আয়াতের খণ্ডনে এই বিষয়টি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে কুরআন যখন আল্লাহর বাণী, তাহলে আল্লাহ আবার কার নাম করে শুরু করছে ? যদি বলা হতো 'মনুষ্যের প্রতি উপদেশের জন্য আরম্ভ' তাহলে ঠিক ছিল।
ঋষি দয়ানন্দের এই খণ্ডন দেখে কিছু সনাতনী ও মুসলিম বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে বেদও তো ঈশ্বরের বাণী কিন্তু সেখানেও তো এইরূপ বাণী অনেক আছে, যা পড়লে বোঝা যায় যে মনুষ্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে, যেমন ঋগ্বেদ ১/১/১ মন্ত্রে বলা হয়েছে 'আমি অগ্নির (পরমেশ্বর) স্তুতি করি'। আবার এমনও মন্ত্র রয়েছে যা দেখলে বোঝা যাবে ঈশ্বর সরাসরি মনুষ্য কে উপদেশ করছেন, যেমন ঋগ্বেদ ৪/২৬/২ 'এই ভূমি আমি আর্যদের দিয়েছি'। তা বেদে এমন থাকা সত্ত্বেও ঋষি দয়ানন্দ কুরআনের ওই আয়াতকে কেন খণ্ডন করলেন ?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে বলতে চাই যে বেদ হলো পরমাত্মার জ্ঞান, যা মনুষ্য সৃষ্টির শুরুতে চার ঋষির (অগ্নি, বায়ু, আদিত্য, অঙ্গীরা) আত্মায় এই জ্ঞান দিয়েছিলেন। আর এই কারণেই বেদ কে পরমাত্মার রচনা ও বাণী বলা হয়। ঈশ্বর বা পরমাত্মা অস্নাবিরম্= নাড়ি আদি বন্ধন হতে রহিত। অব্রণম্= ছিদ্ররহিত এবং যাকে খণ্ডিত করা যায় না। অকায়ম্= স্থূল, সূক্ষ্ম এবং কারণ শরীর হতে রহিত, য়জুর্বেদ ৪০/৮ । ঈশ্বর যে নিরাকার বা অদৃশ্য সত্তা সেটা এই মন্ত্র থেকেই প্ৰমাণ হয়।
ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী ঋগ্বেদ ১/১/১ মন্ত্রের ভাবার্থে লিখেছেন-
ভাবার্থঃ এই মন্ত্রে শ্লেষ অলঙ্কার দ্বারা দুই প্রকার অর্থ গ্রহণ হয়। পিতার সাদৃশ্য কৃপাকারক পরমাত্মা সমস্ত জীবের হিত ও সমস্ত বিদ্যা প্রাপ্তির জন্য কল্প- কল্পের আদিতে বেদ উপদেশ করে থাকেন। যেমন পিতা বা অধ্যাপক নিজ শিষ্য বা পুত্রকে শিক্ষা দান করেন যে তুমি এইরূপ করবে অথবা এইরূপ বলবে, সত্য বচন বলবে, ইত্যাদি শিক্ষা গ্রহণ করে বালক বা শিষ্যও বলেন যে আমি সত্য বলবো, পিতা ও আচার্যের সেবা করবো, মিথ্যা বচন বলবো না, এই প্রকার যেমন পরস্পর শিক্ষকেরা শিষ্য বা পুত্রদের উপদেশ করে থাকেন, ঠিক সেইরূপ 'অগ্নিমীডে' ইত্যাদি বেদ মন্ত্রেও বোঝা উচিত। কেননা ঈশ্বর বেদ সমস্ত জীবের উত্তম সুখ প্রাপ্তির জন্য প্রকট করে থাকেন। এই 'অগ্নিমীডে' বেদোক্ত উপদেশের পরোপকার ফল হওয়ার জন্য এই মন্ত্রে 'ঈডে' এই উত্তম পুরুষ প্রয়োগও রয়েছে।
[ভাষ্যকার- ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী, সংস্কৃত ভাষ্যের হিন্দি অনুবাদ]
অতএব বেদ হলো পরমাত্মার দেওয়া জ্ঞান তাই এমনটা ভাবা ভুল যে পরমাত্মার মুখ আছে আর সেই মুখ দিয়ে তিনি বেদ জ্ঞান প্রদান করেছেন। বেদে এমন বাণীও রয়েছে যেখানে ঈশ্বর মনুষ্য কে উপদেশ করছেন, আবার এমনও বাণী রয়েছে যেখানে মনুষ্য পরমেশ্বরের স্তুতি, প্রার্থনা, উপাসনা করছেন। এখন উক্ত শঙ্কা সমাধানে আসি যে, কুরআনের শুরুর আয়াতে ও বেদের শুরুর মন্ত্রে মধ্যে একই ধরণের বাণী থাকা সত্ত্বেও ঋষি দয়ানন্দ কুরআনের শুরুতে থাকা 'শুরু করছি আল্লাহর নামে' এই বাণীর খণ্ডন কেন করলেন ? এই প্রশ্নের উত্তর হলো বেদ ঈশ্বরের দেওয়া জ্ঞান, আর এদিকে কুরআন হলো কথা বলতে পারা আল্লাহর বাণী 😀😄 আসল পার্থক্য এই জায়গায়, বেদে এমন কোথাও নেই যেখানে পরমাত্মা কোনো জীবের সাথে কথোপকথন করে থাকেন, কিন্তু কুরআনের নানান জায়গায় এমন পাওয়া যায় যেখানে আল্লাহ ফেরেশতাদের সাথে, আদমের সাথে, মূসার সাথে, ইবলিশের সাথে, পৃথিবীর সাথে কথোপকথন করছেন।
#কুরআন ২৮ঃ৩০
যখন সে তার কাছে পৌছল, তখন পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত উপত্যকার ডান প্রান্তের বৃক্ষ থেকে তাকে আওয়াজ দেয়া হল, হে মূসা! আমি আল্লাহ, বিশ্ব পালনকর্তা।
#কুরআনের ৭ নং সূরার ১১-২৪ আয়াত পড়লে দেখা যাবে সেখানে আল্লাহ আদম, অন্যান্য ফেরেশতা ও ইবলিশের সাথে কথা বলছে।
#কুরআন ৪১ঃ১১
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতএব কুরআন থেকেই প্রমাণ হয় যে আল্লাহ কথা বলে। যে আল্লাহ কথা বলে সেই আল্লাহ কুরআনের শুরুতেই কেন এমন বাণী দেবেন যেখানে বলা হচ্ছে 'শুরু করছি আল্লাহর নাম করে' ? উদাহরণ স্বরূপ মনে করেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোথাও এক জায়গায় বক্তৃতা দিতে উঠেছেন, এবং তিনি শুরুতেই বললেন যে 'আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কে শ্রদ্ধা জানাই, তিনি আমাদের গর্ব'। এখন বলুন যে শেখ হাসিনা যদি এমন বলেন তাহলে সাধারণ ব্যক্তিরা তাকে বুদ্ধিমান নাকি বুদ্ধিহীন বলবে ? সেই একই বিষয় কুরআনে পাওয়া যায়। আল্লাহর শেখ হাসিনার মতোই কথাও বলতে পারেন তা কুরআন থেকেই প্রমাণ দিলাম। তবুও তিনি কুরআনের শুরুতেই বলছেন 'শুরু করছি আল্লাহর নামে'।
এখন কিছু মুসলিম বন্ধুরা বলতেই পারে যে কুরআনের এই বাণী গুলো আলঙ্কারিক ভাবে রয়েছে, যেমন বেদেও রয়েছে ঈশ্বরের সহস্র মাথা, সহস্র চক্ষু, সহস্র পা ঋগ্বেদ ১০/৯০/১। মুসলিম বন্ধুরা যদি এমন বলেন তাহলে তা হাস্যকর হবে। কেননা ঋগ্বেদের এই মন্ত্রে পুরোই আলঙ্কারিক ব্যাখ্যা রয়েছে যেমন ঈশ্বরের হাজার মাথা অর্থাৎ তার অনন্ত জ্ঞান রয়েছে, তার হাজার চক্ষু অর্থাৎ তিনি সকল এই জগতের সকল কিছুই দর্শন করছেন, তার হাজার পা অর্থাৎ তিনি অনন্ত গতিশীল, এই মন্ত্র অনুযায়ী এটাই বোঝায় যে ঈশ্বর জগতের প্রতিটি জায়গায় বিরাজমান রয়েছেন, সব কিছু দেখছেন, সকল জায়গায় কর্ম করছেন। ঋগ্বেদ এর এই মন্ত্রে ঈশ্বর কে সাকার বলা হয়নি। এমন আলঙ্কারিক বাণী কুরআনেও রয়েছে যেমন-
সুরা ৩৮ঃ৭৫
আল্লাহ বললেন, হে ইবলীস, আমি স্বহস্তে যাকে সৃষ্টি করেছি, তার সম্মুখে সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি অহংকার করলে, না তুমি তার চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন?
কুরআন ৪৮ঃ১০
আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে।
কুরআন ৫৫ঃ২৭
অবশিষ্ট থাকবে শুধু প্রতিপালকের মুখ মণ্ডল, যা মহিমাময়, মহানুভব।
কুরআন ২ঃ১৩৮
আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে? আমরা তাঁরই এবাদত করি।
কুরআনের এই আয়াত গুলোতে আল্লাহ হাত, মুখ, আল্লাহর রং দ্বারা আল্লাহকে সাকার বলা হয়নি বরং পুরোই আলঙ্কারিক হিসেবে বলা হয়েছে যা দেখে একজন সাধারণ বুদ্ধির ব্যক্তিও বুঝবে। কিন্তু কুরআনের আল্লাহ যে কথা বলে এই বিষয়ে যে যে আয়াত ওপরে তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো কোনোভাবেই আলঙ্কারিক বানানো সম্ভব নয়, কেননা সেগুলো ঐতিহাসিক আয়াত। আল্লাহ আদমের সাথে, ফেরেশতাদের সাথে, ইবলিশের সাথে, পৃথিবীর সাথে কথা বলছে, এগুলো ঐতিহাসিক বিষয়। তাই ঐতিহাসিক ঘটনাকে আলঙ্কারিক বানানো মানেই পাগলামি। ঋষি দয়ানন্দ কুরআন ১/১ এর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু এই বিষয়েও খণ্ডন করেছেন। দয়া ও ক্ষমা বাস্তবে কেমন হয় সেটা মুসলিমদের বোধ শক্তির বাইরে, তাই এই বিষয়ে কিছু বললাম না।
বেদ হলো শ্রুতি এবং অনান্য ধর্মশাস্ত্র হলো স্মৃতি-
প্রমাণ মনুস্মৃতি ২/১০-
শ্ৰুতিস্তু বেদো বিজ্ঞেয়ো ধর্মশাস্ত্ৰস্তু বৈ স্মৃতিঃ
অর্থাৎ -‘বেদ’ বলতে ‘শ্রুতি' বোঝায় এবং 'ধর্মশাস্ত্রের' নাম ‘স্মৃতি'।

এখন চলুন প্রমাণগুলো দেখা যাক-

প্রথমেই মনু মহারাজের উক্তি-
“বেদোখিলো ধর্মমূলম্।”(মনুসংহিতা ২/৬)
অর্থাৎ বেদ হল হল ধর্মের মূল। ধর্মের বিষয়ে বেদ স্বতঃ প্রমাণ।

অর্থকামেম্বসক্তানাং ধর্মজ্ঞানং বিধীয়তে। ধর্মং জিজ্ঞাসমানানাং প্রমাণং পরমং শ্রুতিঃ।।(মনুস্মৃতি ২/১৩)
অর্থাৎ -যারা কামে আসক্ত নয় তাঁদের পক্ষেই প্রকৃত ধর্মজ্ঞান লাভ সম্ভব । আর ধর্মজিজ্ঞাসু ব্যক্তিদের কাছে বেদই প্রকৃষ্ট প্রমাণ । সুতরাং যেখানে শ্রুতি(বেদ) ও স্মৃতির বিরােধ হবে সেখানে শ্রুতি(বেদ)-র মতই গ্রাহ্য । তাই শ্রুতি(বেদ)কে সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ বলা হয়েছে ॥

যোহবমন্যেত তে মূলে হেতুশাস্ত্রাশ্রয়াদ দ্বিজঃ ।
স সাধুভি বহিষ্কার্যো নাস্তিকো বেদনিন্দকঃ ।। (মনুস্মৃতি ২/১১)
অনুবাদ : যে দ্বিজ হেতুশাস্ত্র অর্থাৎ অসৎ-তর্ককে অবলম্বন করে ধর্মের মূলস্বরূপ এই শাস্ত্রদ্বয়ের (শ্রুতি ও স্মৃতির প্রাধান্য অস্বীকার করে ( বা অনাদর করে), সাধু ব্যক্তিদের কর্তব্য হবে- তাকে সকল কর্তব্য কর্ম এবং সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করা (অর্থাৎ অপাংক্তেয় ক’রে রাখা) । কারণ, সেই ব্যক্তি বেদের নিন্দাকারী, অতএব নাস্তিক।।
অনুবাদক- মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

এবার দেখুন গীতা তথা মহাভারতকে যিনি লিপিবদ্ধ করেছেন সেই মহর্ষি ব্যাসদেবের উক্তি কি-
শ্রুতিসবমৃতিপুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে। তত্ৰ শ্ৰৌতং প্রমানন্ত তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতির্ব্বরা||

(ব্যাস সংহিতা ১।৪)
অর্থাৎ শ্রুতি ও স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায় সেখানে শ্রুতি কথিত বিধিই বলবান এং যেস্থলে স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেস্থলো স্মৃতিকথিত বিধিই বলবান।

“নাস্তি বেদাত্ পরং শাস্ত্রম্।”(অত্রিস্মৃতি ১৫০)
অর্থাৎ বেদের চেয়ে বড় কোনো শাস্ত্র নেই।

“সর্বজ্ঞানময়ো হি সঃ।।”(মনুসংহিতা ২/৭)
অর্থাৎ বেদ সকল জ্ঞানের ভান্ডার।

“যজ্ঞানাং তপসাঞ্চৈব শুভানাং চৈব কর্মণাম্।
বেদ এব দ্বিজাতীনাং নিঃশ্রেয়সকরঃ পরঃ।।”(যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি ১/৪০)
অর্থাৎ যজ্ঞের বিষয়ে,তপস্যার বিষয়ে,শুভ কর্মের জ্ঞানার্থ দ্বিজের জন্য বেদ পরম কল্যাণের সাধন।

মীমাংসা মতে, বেদই পিতৃলোক, দেবতা ও মানুষের সনাতন চক্ষু। বেদ অপ্রমেয় এবং অপৌরুষেয়। ॥ মনু ১২/৯৪ ॥

যে সব স্মৃতিশাস্ত্র বেদবহির্ভূত এবং যে সব শাস্ত্র বেদবিরুদ্ধ কুতর্কমূলক, পরলোক সম্পর্কে সেইসব শাস্ত্রই নিষ্ফল এবং তমঃকল্পিত মাত্র। যে সব শাস্ত্র বেদমূলক নয় কিন্তু পুরুষকল্পিত সে সব শাস্ত্র বারবার উৎপন্ন হচ্ছে ও বার বার বিনষ্ট হচ্ছে। আধুনিকতার দরুন সেই সব শাস্ত্র নিষ্ফল ও মিথ্যা। ॥ মনু ১২/৯৫-৯৬ ॥

ব্রাহ্মণ প্রভৃতি চতুবর্ণ, স্বর্গ প্রভৃতি তিন লোক, ব্রহ্মচর্য প্রভৃতি চার আশ্রম এবং ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান এই সমুদয় বেদ হতেই প্রসূত হয়েছে। শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ এসবই বেদ প্রসূত। বৈদিক কর্ম জীবের গতি নিয়ন্ত্রণ করে বলে গুণ ও কর্ম অনুযায়ী বেদই সকলের প্রসূতি। ॥মনু১২/ ৯৭-৯৮ ॥

এই চরাচর সমুদয় প্রাণীজগৎকে সনাতন বেদ শাস্ত্রই ধারণ করছেন। তাই জ্ঞানীরা বেদকে মানুষের পুরুষার্থ সাধনের পরম উপায় বলে মনে করেন। একমাত্র বেদশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি সৈনাপত্য, রাজ্য, দণ্ডপ্রণেতৃত্ব এবং সর্বলোকাধিপত্য পাওয়ার উপযুক্ত।॥মনু ১২/৯৯-১০০৷

যিনি ধর্মের তত্ত্ব জানতে চান তাঁর পক্ষে প্রত্যক্ষ, অনুমান এবং বেদমূলক স্মৃতি প্রভৃতি বিভিন্ন আগম সব কিছুই উত্তম রূপে জানা উচিত। যিনি বেদ এবং বেদমূলক স্মৃতি প্রভৃতি ধর্মোপদেশ বেদশাস্ত্রের অবিরোধী তর্কের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেন একমাত্র তিনিই ধর্মকে জানতে পারেন, অপর কেউ নয় ॥
মনু ১২/১০৫-১০৬ ॥

মহাভারতে মহর্ষি বেদব্যাস বেদ কে নিত্য এবং ঈশ্বর কৃত বলেছেন এবং বেদ কে অর্থ শহিত অধ্যয়ন করার জন্যও বলেছেন।
“অনাদিনিধনা নিত্যা বাগূত্সৃষ্টা স্বয়ম্ভূবা।
আদৌ বেদময়ী দিব্যা য়তঃ সর্বাঃ প্রবৃত্তয়ঃ।।” (মহাভারত শান্তি পর্ব ১২/২৩২/২৪)
অর্থাৎ,
সৃষ্টির আদিতে স্বয়ম্ভূ পরমাত্মা থেকে এই বেদ বাণী প্রকাশিত হয়েছিল যার না আদি আছে,না অন্ত,যা নিত্যনাশরহিত এবং দিব্য।যা থেকে জগতের সমস্ত প্রবৃত্তির প্রকাশ পেয়েছে।

ঋষয়স্তপসা বেদানধ্যৈষন্ত দিবানিশম অনাদিনিধনা
বিদ্যা বাগৎসৃষ্টা স্বয়ম্ভুবা।।
(মহাঃ শান্তি পর্ব ২৩২।২৪)
অর্থাৎ মহর্ষিগণ তপোবলেই দিবানিশি বেদ অধ্যয়ন
করিয়া থাকেন। সৃষ্টির প্রথমে জগদীশ্বর আদি অন্ত শূন্য বেদ রূপী বিদ্যার সৃষ্টি করিয়াছেন ।

ন্যায় দর্শনের (২/১/৬৭) সুত্র অর্থাৎ
“মন্ত্রায়ুর্বেদ প্রামাণ্যবচ্চ তত্প্রমাণ্যমাপ্তপ্রামাণ্যাত্ " দ্বারা
- পরম আপ্ত পরমেশ্বরের বাণী এবং অসত্য, পরস্পর বিরোধী এবং পুনরোক্তি দোষরহিত হওয়ায় বেদকে পরম প্রমাণ হিসেবে সিদ্ধ করা হয়েছে।

বৈশেষিক দর্শনে শাস্ত্রকার কণাদ মুনি
“তদ্ বচনাদাম্নায়স্য প্রামাণ্যম্।”(১০/১/৩)
এই সূত্রের দ্বারা পরমেশ্বরের বাণী হওয়ায় আম্নায় অর্থাৎ বেদকে প্রামাণ্য বলেছেন।
ভিন্ন আর একটি সূত্রে বলা হয়েছে-
“বুদ্ধিপূর্বা বাক্যকৃতির্বেদ।”(৬/১/১)
অর্থাৎ বেদ বাক্য রচনা বুদ্ধিপূর্বক। এখানে সৃষ্টিক্রম বিরুদ্ধ কোনো কথা নেই।অতএব ইহা ঈশ্বরীয় জ্ঞান।

সাংখ্য দর্শনে কপিল মুনি
“শ্রুতি বিরোধাত্র কুতর্কাপসদস্যাত্মলাভঃ।”(৬/৩৪)
শ্রুতি বিরুদ্ধ কুতর্ককারীরা কখনোই আত্মজ্ঞান প্রাপ্ত হন না। এই সূত্রের মাধ্যমে সাংখ্যকার বেদের প্রামাণিকতা স্বীকার করেছেন।
ভিন্ন একটি সূত্রে বলা হয়েছে-
“ন পৌরুষেয়ত্বং তত্কর্তুঃ পুরুষস্যাভাবাত্।”(৫/৪৬)
অর্থাৎ-বেদ পৌরুষের নয়,কেননা বেদের রচয়িতা কোনো পুরুষ নয়।জীব অল্পজ্ঞ এবং অল্পশক্তি হওয়ায় সে সমস্ত বিদ্যার ভাণ্ডার বেদ রচনা করতে অসমর্থ।বেদ মনুষ্য রচনা না হওয়ায় বেদ অপৌরুষেয়।
শেষ আর একটি সূত্রে বলা হয়েছে➙
নিজশক্ত্যভিব্যক্তেঃ স্বতঃ প্রমাণ্যংম্।”(৫/৫১)
সূত্রের দ্বারা বেদকে ঈশ্বরীয় শক্তি থেকে অভিব্যক্ত(প্রকট) হওয়ায় স্বতঃ প্রমাণ মানা হয়েছে।
যোগদর্শনকার পতঞ্জলি মুনিও এমনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন
“তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞ বীজম্”(যোগ ১/২৫)
সেই (ঈশ্বর)এর সর্বজ্ঞ হওয়া এতটাই নিমিত্ত যে তিনি ছাড়া আর কারোরই সেই ক্ষমতা নাই।
“স এষ পূর্বেমেষামপি গুরুঃ কালেনানবচ্ছেদাত্।”(যোগ ১/২৬)
ঈশ্বরকে এইভাবে সমস্ত জ্ঞানের স্তোত্র মেনে বলেছেন সেই(ঈশ্বর)যার কাল বিভাগ নেই, তিনি পূর্ব ঋষিদের ও গুরু।
অর্থাৎ তিনি জগতের প্রারম্ভে বেদরুপী জ্ঞান দিয়ে মানুষকে শিক্ষিত করেছেন। এই দর্শন এটাই সিদ্ধ করে যে,বেদ হলো ঈশ্বরীয় জ্ঞান। বেদজ্ঞান দান করায় পরমেশ্বর কে আদি গুরু মানা হয়েছে।
বেদান্ত শাস্ত্রের কর্তা ব্যাসদেব লিখছেন-
“শাস্ত্র য়োনিত্বাত্” (১/১/৩) তে তথা “অতএব চ নিত্যত্বম্”(১/৩/২৯) ইত্যাদি সূত্রের দ্বারা পরমেশ্বরকে ঋগ্বেদাদি রুপ সর্ব জ্ঞানের কর্তা মেনে বেদের নিত্যতা প্রতিপাদন করা হয়েছে।“শাস্ত্রয়োনিত্বাত্”(১/১/৩)
উপরিউক্ত সূত্রের ভাষ্যে পৌরাণিকদের অতিপ্রিয় শঙ্করাচার্য লিখেছেন-
“ঋগ্বেদেঃ শাস্ত্রস্যানেকবিদ্যা স্থানোপ্বৃংহিতস্য প্রদীপবত্ সর্বার্থাবধোতিনঃ সর্বজ্ঞকল্পস্য য়োনিঃ কারণং ব্রহ্ম। নহীদৃশস্য-র্গ্বেদাদি লক্ষণস্য সর্বজ্ঞগুণাচিতস্য সর্বজ্ঞাদন্যতঃ সংভবোস্তি।”
.
অর্থাৎ ঋগ্বেদাদি যে চার বেদ আছে যা অনেক বিদ্যার দ্বারা যুক্ত, সূর্যের সমান সমস্ত সত্য অর্থের প্রকাশ করে,যা সর্বজ্ঞত্বাদী গুণযুক্ত পরমেশ্বরের বাণী, কেননা সর্বজ্ঞ ব্রহ্ম ছাড়া কোনো জীব সর্বজ্ঞ গুণযুক্ত এই বেদকে তৈরি করতে পারে না।
বিঃদ্রঃ আমরা শঙ্করাচার্যের সেই সিদ্ধান্তগুলোকেই প্রামান্য মানি যা বেদাদি শাস্ত্রসম্মত। কারন শঙ্করাচার্যের চেয়েও বৈদিক ঋষিরা নিশ্চয়ই বড় জ্ঞানী ছিলেন।
নমস্তে
ঋষি ব্রহ্মা হতে ঋষি দয়ানন্দের জয় হোক
সনাতন বৈদিক ধর্মের জয় হোক 🚩🚩
কৃণ্বন্তো বিশ্বমার্য়ম্
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ