ঋগ্বেদ ১/১/১ - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

ঋগ্বেদ ১/১/১

 <<পূর্বের অংশ<<

এখন দ্যুলোক কী, সে বিষয়ে বোঝা যাক। মহর্ষি জৈমিনি বলেছেন- 'বাগিতি দ্যোঃ' অর্থাৎ বাক তত্ত্বই হল দ্যৌ অর্থাৎ এই অগ্নি বাক্ তত্ত্ব, ছন্দ রশ্মি এবং প্রাণ রশ্মির মধ্যে অবস্থান করে। তাই মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য বলেছেন যে 'প্রাণো বৈ দ্যোঃ' অর্থাৎ প্রাণই হল দ্যুলোক। 'আপো বৈ দ্যোঃ' - এটি অগ্নি কণা এবং তন্মাত্রার ভেতরেও অবস্থান করে। কণা ছাড়া কোনো প্রকারের আবেশ থাকতে পারে না। এর ভিত্তিই হল কণা। কল্পনা করুন যে এই ব্রহ্মাণ্ডে যদি কোনো কণা বারশ্মি না থাকতো, তাহলে বিদ্যুৎ আবেশের কথা বলা অর্থহীন হতো। মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য লিখেছেন- 'দ্যৌরেবাত্মা' অর্থাৎ তিনি আত্মায় বাস করেন। দেব সূত্রাত্মা বায়ুতে বাস করে। এখানে আমরা আত্মা শব্দ থেকে পরমাত্মাকে গ্রহণ করবো না, কারণ সেটি আধ্যাত্মিক অর্থে চলে আসবে।

অগ্নি এই কারণেও দেব হয়, কারণ অগ্নি ছন্দ ও প্রাণ রশ্মি, কণা, সূত্রাত্মা বায়ু এবং ইন্দ্রের মধ্যেও অবস্থান করে। 'ইন্দ্র' কাকে বলে? বিদ্যুৎকে। এর তাৎপর্য হল অগ্নি বিদ্যুতে অবস্থান করে। যেখানেই বিদ্যুৎ আছে, সেখানেই অগ্নি আছে। যদি বিদ্যুৎ আবেশ না থাকে, তাহলে তাপ উৎপন্ন হওয়া অসম্ভব। যাকে আমরা আবেশরহিত বলি, যেমন- নিউট্রন, যদি তা কম্পিত হতে শুরু করে বা অনেকগুলো নিউট্রন থাকে এবং তাদের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি হয়, তাহলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। তাহলে কি আবেশ ছাড়াই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে গেলো? না, নিউট্রনেও আবেশ থাকে। যদি নিউট্রনে আবেশ না থাকতো, তাহলে সেটি কোনো প্রোটনের সাথে যুক্ত হতে পারতো না। নিউট্রনের মধ্যে কোয়ার্ক থাকে, তাদেরমোট আবেশ শূন্য হয়- এটি ঠিক, কিন্তু যে দিকে ধনাত্মক কোয়ার্ক থাকবে সেটি ধনাত্মক হিসেবে এবং যে দিকে ঋণাত্মক কোয়ার্ক থাকবে সেটি ঋণাত্মক হিসেবে আচরণ করবে। যদি কোয়ার্কের মধ্যে আবেশ না থাকতো, তাহলে নিউট্রন সম্পূর্ণ আবেশহীন হতো এবং নিউট্রন ও প্রোটন নিউক্লিয়াসে থাকতেই পারতো না।

এমন মনে করা হয় যে ফোটনে আবেশ থাকে না, কিন্তু তাতে বল থাকে এবং তাপ থাকে, তবে এটি সঠিক নয়। ফোটনেও আবেশ থাকে। বিজ্ঞানের দ্বারা আবেশের সংজ্ঞা এখনও সঠিক-ভাবে জানা যায়নি। যা কোনো প্রকারের আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল অনুভব করায়, তাকে আবেশ বলে। আবেশের কারণ হল রশ্মি। ঋণাত্মক আবেশে মরুৎ রশ্মি অধিক থাকে এবং ধনাত্মক আবেশে প্রাণ রশ্মি অধিক থাকে। স্পেস/আকাশের মধ্যেও আবেশ থাকে। আমি এর আলোচনা এখানে করবো না। বৈদিক ভৌতিকী হল অত্যন্ত গম্ভীর একটি বিষয়, যার পূর্ণ ব্যাখ্যা সহজে হওয়া উচিত নয়। এখানে দেব-এর ব্যাখ্যা সমাপ্ত হচ্ছে। এইভাবে অগ্নিও হল দেব।

3. ঋত্বিজম্ - এখন অগ্নির আরও একটি বিশেষণ হল- ঋত্বিজম্। ঋত্বিক্ কী? নিরুক্তকার বলেন- 'ঋত্বিক্ কস্মাৎ? ঈরণঃ। ঋগ্যষ্টা ভবতীতি শাকপূণিঃ। ঋতুয়াজী ভবতীতি বা' অর্থাৎ এটি হল দেব। দেব কারা? ছয়টি পদার্থ হল দেব। অগ্নির ছয়টি অর্থ বলেছিলাম- মন, বাক্, প্রাণ, সূতাত্মা বায়ু, উষ্মা (তাপ) এবং বিদ্যুৎ, এই সবকটিই হল দেব। যখন অগ্নির অর্থ প্রাণ হয়, তখন তা প্রাণ দ্যৌ-তে থাকে, সেখানে প্রসঙ্গ অনুসারে অর্থ বুঝে নিতে হয়।

ঋত্বিক
ঋত্বিক্-এর অর্থ হল, যে পদার্থগুলো পরবর্তী পর্যায়ের পদার্থকে প্রেরিত করে এবং সূক্ষ্ম ও স্থূল সব প্রকার পদার্থের য়জন করে, তাদের ঋত্বিক্ বলা হয়। মন, বাক্, প্রাণ, সূতাত্মা বায়ু উষ্মা এবং বিদ্যুৎ- এই ছয়টি পদার্থ যদি আরও স্পষ্ট করি, তবে এরা স্থূল পদার্থের য়জন করে অর্থাৎ তাদের সংযুক্তও করে আবার বিযুক্তও করে। এরা একটি চক্র এবং নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে। যেমন পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরছে, তা নিজের অক্ষের চারপাশেই হোক অথবা সূর্যের চারপাশেই হোক, তার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। তাতে কোনো পার্থক্য আসে না, যদি কোনো পার্থক্য আসেও তবে তা নিয়মানুসারেই হবে। একইভাবে এই ছয়টি পদার্থও নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে; কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীনভাবে (randomly) ঘটছে না। যাকে আমরা জানি না, তাকে রান্ডোমলি বলে দেই, যেমন অনিশ্চয়তার সিদ্ধান্ত।

4. হোতারম্ - পরবর্তী বিশেষণটি হল হোতারম্। হোতা কাকে বলা হয়? কৌষীতকী ব্রাহ্মণে লেখা আছে- 'আত্মা বৈ হোতা', 'বাগ্বৈ হোতা'; মহর্ষি তিত্তির তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে লিখেছেন- 'মনো হোতা'; মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস লিখেছেন- 'প্রাণো বৈ হোতা' এবং 'ক্ষত্রম্ বৈ হোতা'; এর অর্থ হল এই সকল পদার্থই হল হোতা। কাউকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা, আহ্বান করা অথবা আকর্ষণকারীকে হোতা বলা হয়। বাক্, মন, প্রাণ, সূতাত্মা বায়ু, তাপ এবং অগ্নি- এই সবকিছুর উপস্থিতিতেই আকর্ষণ ও সংযোজনের ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তাই এই সবই 'হোতা' নামে পরিচিত। কল্পনা করুন যে, সূর্যের কেন্দ্রে যদি খুব বেশি তাপমাত্রা না থাকে, তবে সেখানে নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়াই ঘটবে না। এই হোতা যেমন আকর্ষণকারী, তেমনি ভেদকও।

যখন সৃষ্টিতে সংযোগের ক্রিয়া ঘটে, তখন আকর্ষণ বল কাজ করে। এর পাশাপাশি বিকর্ষণ বলও কাজ করে এবং ভেদক অর্থাৎ ভাঙন সৃষ্টিকারী বলও কাজ করে। ধরুন দুটি অণু আছে, তাদের মধ্যে কোনো রাসায়নিক ক্রিয়া হবে, সেখানে একটি অণুর সাথে অন্যটি যুক্ত হবে। ধরুন তাদের মধ্যে কোনো অণুতে কোনো ইলেকট্রন আসবে অথবা যাবে, তাহলে প্রথমে বিখণ্ডনের ক্রিয়াই হবে, তারপর সংযোগ ও বিয়োগের প্রক্রিয়া ঘটবে। যদি সোডিয়ামের এটম এবং ক্লোরিনের এটমের মধ্যে ইলেকট্রনের আদান-প্রদান না হয়, তাহলে সোডিয়াম ক্লোরাইড গঠিত হতে পারে না। একটি থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয় এবং অন্যটিতে যুক্ত হয়, ফলে সেখানে সংযোগ এবং ভেদন উভয় প্রক্রিয়াই ঘটে। এইভাবে যেগুলো এই সমস্ত কাজ করে, তাদের বলা হয়- হোতা। অগ্নি নামক ছয়টি পদার্থ আছে, সেগুলো এই কাজও করে, তাই এখানে অগ্নিকেও হোতা বলা হয়েছে। বাক্, মন, প্রাণ, বিদ্যুৎ, সূত্রাত্মা বায়ু আদি সবই হল হোতা।

5. রত্নধাতমম্ - রত্নধাতম অর্থাৎ রত্ন ধারণকারীর মধ্যে যে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়। রত্নধা শব্দের অর্থ হল- রত্ন ধারণকারী। আর রত্নধাতম শব্দের অর্থ- রত্ন ধারণকারী যত পদার্থ আছে, তাদের মধ্যে যেটি সর্বশ্রেষ্ঠ। এখন প্রশ্ন হল, রত্ন কাকে বলে? ঋষি দয়ানন্দ লিখেছেন- 'রময়তি হর্ষয়তীতি রত্নম্' এবং মহর্ষি য়াস্ক বলেছেন- 'রত্নম্ ধননাম' অর্থাৎ সেই সমস্ত সূক্ষ্ম পদার্থ যা কারও দ্বারা ধারণ করা হয়, তাদের রত্ন বলা হয়। যেগুলো এই সংসারে বিভিন্ন ধরণের ক্রিয়া সম্পন্ন করে, সেগুলো রত্ন নামে পরিচিত। এই রত্নদের ধারণ করার মতো অনেক পদার্থ থাকলেও, তাদের মধ্যে অগ্নি হল শ্রেষ্ঠ এবং সবথেকে উৎকৃষ্ট মানের পদার্থ। তাই তাকে বলা হয়েছে- রত্নধাতম।

এই যে পাঁচটি বিশেষণের কথা বলা হয়েছে, এগুলো বায়ু, মন, বাক্, প্রাণ, বিদ্যুৎ, সূত্রাত্মা বায়ু এবং তাপেরও আছে।

এখন পরবর্তী ক্রিয়াবাচক পদটি হল- ঈঠে। এর অর্থ হল 'স্তবে যাচে অধীচ্ছামি প্রেরয়ানি বা', অর্থাৎ আমি এমন এক অগ্নির প্রকাশ করছি যা উপরোক্ত বিশেষণগুলোতে বিভূষিত। আমি তাকে বারবার আকর্ষণ করার ইচ্ছা করি। এখন লোকে বলবে যে, এটি কি পরমাত্মা বলছেন? না, এই ছন্দ রশ্মি যার দ্বারা উৎপন্ন হয়, সেই মধুচ্ছন্দা রশ্মি বলছে যে-আমি অগ্নিকে এই সমস্ত বিশেষণে যুক্ত করছি, অর্থাৎ সেই ছন্দ রশ্মি অগ্নিকে এই বিশেষণগুলো দ্বারা যুক্ত করে। অগ্নিকে প্রকাশিত করে অর্থাৎ এই পদার্থগুলোকে বারবার আকর্ষিত করে। অগ্নি নামের ছয়টি পদার্থ সমগ্র সৃষ্টিতে আছে। এমন নয় যে অগ্নি শব্দটি কেবল এই মন্ত্রেই আছে, এই শব্দটি অনেক মন্ত্রে আছে। বেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্নি শব্দই এসেছে। তাহলে এই রশ্মি কী করে, যে এই ছন্দ রশ্মিকে উৎপন্ন করেছে?

'অগ্নিমীলে পুরোহিতম্...' এই যে ছন্দ রশ্মি আছে, এটি মধুচ্ছন্দা রশ্মি থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সেই মধুচ্ছন্দা রশ্মি এই রশ্মির দ্বারা এই সকল ছয়টি পদার্থকে বারবার আকর্ষিত করে এবং প্রকাশিতও করে। আপনি বলবেন যে মন তো মধুচ্ছন্দা ঋষি রশ্মি থেকে সূক্ষ্ম, বাক্ রশ্মি (ওম) সেটিও মধুচ্ছন্দা রশ্মি থেকে সূক্ষ্ম, তাহলে কি স্কুলও সূক্ষ্মকে আকর্ষিত করে? হ্যাঁ, এমনও হয়। পিতা পুত্রকে আকর্ষিত করে এবং পুত্রও পিতাকে আকর্ষিত করে। কোথাও পিতা পুত্রকে খোঁজে আবার কোথাও পুত্র পিতাকে খোঁজে।

যেখানে এই ছন্দ রশ্মি থাকে, সেই স্থানে যে মনস্তত্ব থাকে, সেটিও এই গুণগুলোর দ্বারা অধিক যুক্ত হয়ে যায়। যেখানেই এই গুণসম্পন্ন বাক্ রশ্মি থাকে, সেখানে অনেক ক্রিয়া সম্পন্ন হয়, কিন্তু এই ছন্দ রশ্মির নিকটে যে বাক্ রশ্মি, 'ওম্' রশ্মিগুলো থাকে, সেগুলো অধিক সক্রিয় হয় এবং অধিক মাত্রায় স্পন্দিত হয়। যেমন কেউ একটি ধ্বনি উৎপন্ন করে এবং অন্যদিকেও সমান বল দিয়ে সেই একই ধ্বনি উৎপন্ন করে, তাহলে এর শক্তি বেড়ে যাবে। দড়ি পাথরকে ক্ষয় করতে পারে না, কিন্তু সেই দড়িই বারবার পাথরের উপর ঘষা হলে পাথরে দাগ পড়ে যায়। 'ওম্' রশ্মির অধিক সক্রিয় হওয়ার তাৎপর্য কী? আসলে ওম্' রশ্মি অধিক সক্রিয় বা কম সক্রিয় হয় না, কিন্তু তার আবৃত্তি বেড়ে যায়, সেটি অধিকবার উৎপন্ন হয় অর্থাৎ তার সংখ্যা বেড়ে যায়, তাই তার প্রভাবও বৃদ্ধি পায়।

এখন আপনি কুরআন, বাইবেল বা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থের প্রথম এক-দুটি বাক্য নিয়ে ভাবুন যে সেগুলোর অর্থ কী হয়? আমি ইতিপূর্বে এর বৈজ্ঞানিক অর্থ বলেছি, একে বৈজ্ঞানিক অর্থ না বলে আধিদৈবিক অর্থাৎ পদার্থ বিজ্ঞানের অর্থ বলা যেতে পারে।

ভাবার্থ - সম্পূর্ণ সৃষ্টি, যা আমরা দেখতে পারি, দেখছি অথবা দেখছি না; প্রকৃতপক্ষে আমরা সৃষ্টির কেবল কিছু অংশই দেখতে পাই, অবশিষ্টাংশ দেখতে পাই না। এই সম্পূর্ণ সৃষ্টিতে যা কিছু পদার্থ আছে, তা সূক্ষ্ম উপাদান দিয়ে তৈরি। তাই এই সৃষ্টি হল একটি হবন কুণ্ড, এরমধ্যে পরমাত্মা নিরন্তর যজ্ঞ করছেন। বিভিন্ন রশ্মি, কণা, তরঙ্গ, প্রাণ-রশ্মি আদির আহুতি দেওয়া হচ্ছে এবং সেই আহুতির পরিণামস্বরূপ আমাদের শরীর, উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন লোক-লোকান্তর তৈরি হয়েছে। সেই যজ্ঞের প্রধান ঘটক, যা সবার আগে তৈরি হয়েছে, তা হল- অগ্নি। অগ্নিকে ছয়টি রূপে গণ্য করা যেতে পারে- মন, 'ওম্' রশ্মি, সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি, প্রাণ রশ্মি, বিদ্যুৎ এবং তাপ। এই সবকিছুর মাধ্যমে সৃষ্টিতে আটটি গুণ উৎপন্ন হয়, সেগুলো হল-

রূপ- সৃষ্টিতে আকার তৈরি হতে শুরু করে অর্থাৎ পদার্থে ঘনীভবন প্রক্রিয়া শুরু হয়। দাহ-এই সৃষ্টিতে তাপ উৎপন্ন হতে শুরু করে। সৃষ্টিতে যে পদার্থ সৃষ্টির মূল উপাদান কারণ হয়, তাতে ধীরে-ধীরে তাপ উৎপন্ন হয়। বেগ- অগ্নি সর্বদা গতিশীল থাকে। প্রকাশ- ফোটন তৈরি হতে থাকে। কিছু পদার্থ যা আমরা দেখতে পাই অথবা দেখতে পাই না, উভয় প্রকারই উৎপন্ন হতে শুরু করে। এগুলো এই সৃষ্টিতে রশ্মি, কণা বা তরঙ্গ হয়ে গতিশীল হয়। ছেদন- এই সৃষ্টিতে কণাগুলো একে-অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে কোনো বস্তুকে ছেদ বা ভেদ করে, অর্থাৎ ভাঙাগড়ার কাজও সাথে সাথে চলতে থাকে। ধারণ- একটি কণা অন্য কণাকে আকর্ষণ করে এবং আকর্ষণ করে ধারণও করে নেয়। যদি কেবল আকর্ষণ করে ছেড়ে দেয়, তাহলে পরিস্থিতি ঠিক তেমনই হবে যেমন কোনো ভলিবল খেলোয়াড় বলকে একজনের থেকে অন্যজনের কাছে ছুঁড়ে তো দেয়, কিন্তু অন্য কেউ যদি তা ধরে নিয়ে আবার না ছোঁড়ে। কখনও কোনও ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে, একটি কণা যদি অন্য একটি কণা থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে দ্বিতীয় ক্রিয়াটির জন্য অন্য কোনও কণা তাকে ধরে নেয়। সেই সঙ্গে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ- এই আটটি গুণ ওই পদার্থে উৎপন্ন হতে শুরু করে এবং এই সমস্তই অগ্নির ছয়টি রূপ থেকে আটটি গুণকে উৎপন্ন করতে নিজ-নিজ স্তরে ভূমিকা পালন করে আর এই ছয়টি পদার্থ যে পদার্থের মধ্যে বিদ্যমান আছে, যেমন কোনো কণা, ফোটন অথবা কোনো ছন্দ রশ্মির মধ্যে আছে, তাহলে তারমধ্যে এই সমস্ত গুণ উৎপন্ন হয়ে যাবে।

সৃষ্টিতে যখনই কোনো ক্রিয়া ঘটে, তখন যদি তাতে আকর্ষণ বলের প্রয়োজন হয়, তবে আকর্ষণ হতে শুরু করবে। যদি ছেদন-ভেদন করার প্রয়োজন হয়, তবে ছেদন-ভেদন হতে শুরু করবে। বিকর্ষণের প্রয়োজন হলে বিকর্ষণ হতে শুরু করবে। গতির প্রয়োজন হলে গতি সৃষ্টি হবে। বিরাম অবস্থার প্রয়োজন হলে বিরাম হতে শুরু করবে। উত্তাপের প্রয়োজন হলে উত্তাপ কম বা বেশি হতে শুরু করবে। এইভাবে অগ্নির যে ছয়টি রূপ আছে, তারাই এর জন্য দায়ী হয়। এই কারণে বিভিন্ন পদার্থ অগ্নিকে ধারণ করে। কোয়ার্ক, প্রোটন-নিউট্রন আদি কণা এবং বিভিন্ন মিডিয়েটর কণা, এরা সবাই যারা অগ্নিকে ধারণ করে, তাদের মধ্যেও অগ্নির গুণাবলি চলে আসবে। এইভাবে সম্পূর্ণ সৃষ্টি হল এই অগ্নিরই খেলা। এই মন্ত্রে অগ্নিকে প্রধান ঘটকের মধ্যে একটি ঘটক হিসেবে বলা হয়েছে। মধুচ্ছন্দা রশ্মি সেই অগ্নিকে সমৃদ্ধ করে এবং তাকে উৎপন্নও করে। সেটি মন আদিকে উৎপন্ন করে না, কিন্তু তাদের আকর্ষণ করে এবং কোথাও-কোথাও তাদের সমৃদ্ধ করে দেয়। বিদ্যুৎ, তাপ আদি যা আছে, মধুচ্ছন্দা রশ্মি তাদের উৎপন্নও করে।

বিবেকশীল ও মননশীল প্রাণী, যাকে আমরা এখানে মানুষ বলি, সে ব্রহ্মাণ্ডের যেখানেই যুবাবস্থায় জন্ম নেয় এবং সে দেখে যে আমার শরীর আসলে কী? এই সূর্য দেখা যাচ্ছে, এটি কী? নক্ষত্র-চন্দ্র কী? পৃথিবী কী? গাছপালা কী? সাগর কী? তাকে এসব কে বলে দেয়? কোনো গরু, মোষ, সিংহ, চিতাবাঘ আদি তো বলতে পারে না এবং সেই সময়কার সকল মানুষই একই রকম ছিল যারা ওই সময়ে উৎপন্ন হয়েছিল। যদি জ্ঞান স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়, তাহলে অনেক বনবাসী কোনো পড়াশোনা ছাড়াই বৈজ্ঞানিক হয়ে যেতো। কোনো কলেজ বা রিসার্চ সেন্টারের প্রয়োজনই হতো না। বিকাশবাদী চিন্তাধারা এই বিষয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে, তাদের জন্য কোনো স্কুল-কলেজের প্রয়োজন নেই, তারা তো এমনিতেই বিকশিত হয়ে যাবে, কারণ বিকাশ তো হয়েই থাকে।

এই বিকাশবাদীরা এটুকুও ভাবেননি যে, বর্ষা ঋতুতে যদি একটি প্রদীপ জ্বালানো হয়, তবে প্রচুর পতঙ্গ এসে পুড়ে মারা যায়; আর এটা কতকাল ধরে হয়ে আসছে? যখন থেকে সৃষ্টি নির্মিত হয়েছে। সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত পতঙ্গদের মধ্যে জ্ঞানের এতটুকুও বিকাশ হয়নি যে তারা প্রদীপের কাছে যাবে না যেখানে পুড়ে মরতে হবে; অথচ আমাদের মধ্যে এতটাই বিকাশ হয়েছে যে আমরা চন্দ্রযান বানাচ্ছি, মঙ্গলযান বানাচ্ছি। এদের মতে আমরাও নাকি একসময় ওই পতঙ্গদের মতোই ছিলাম। এটা কত বড় মূর্খতাপূর্ণ কথা।

প্রশ্ন- বেদে নির্দিষ্ট সংখ্যক মন্ত্র আছে, তো আপনি বেদে 'অনন্ত জ্ঞান' কীভাবে বললেন?

উত্তর- আমি অনন্ত বলিনি। কোনো এক সময় ভগবান ইন্দ্র মহর্ষি ভরদ্বাজকে বলেছিলেন-'অনন্তা বৈ বেদাঃ' (বেদ অনন্ত)। আমি ঋষি ও দেবগণের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা পোষণ করি, কিন্তু আমি অন্ধবিশ্বাসী নই। আমি মনে করি যে, ঋষি ও মহাপুরুষদের চিন্তাধারাকে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই খণ্ডন করা মূর্খতা ও অকৃতজ্ঞতা হবে। আমি এই মন্ত্রের অত্যন্ত বিস্তৃত অর্থ করেছি। এর ব্যাখ্যা আরও হতে পারে। পরে আধিভৌতিক অর্থও হবে যে লোকব্যবহারে এই মন্ত্রের উপযোগিতা কী? অগ্নির যে আধিদৈবিক অর্থ করেছি, তা থেকে আমরা আগুনের অনেক গুণাবলী সম্পর্কে জেনে উপকৃত হতে পারি। এর মাধ্যমে আমরা অনেক প্রযুক্তিও (Technology) তৈরি করতে পারি। তাপ, বিদ্যুৎ, প্রাণরশ্মির আমরা কতটা ব্যবহার করতে পারি, তা আমাদের উপর নির্ভর করে।

তাই চারটি বেদে যে মন্ত্রগুলো আছে, বেদ কেবল ততটুকুই নয়। মন্ত্র এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে ভরে আছে। কিছু মন্ত্র বেদে নেই, কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডে আছে এবং গায়ত্রী মন্ত্র বেদে চারবার আছে, কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডে অনেকবার আছে। এইজন্য বলা হয়েছে 'অনন্ত বৈ বেদাঃ' অর্থাৎ বৈদিক ছন্দ এই ব্রহ্মাণ্ডে অনন্ত আছে, এদের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। জ্ঞানের দৃষ্টিতে আমরা যতটা পড়বো, যতটা তার ভেতরে প্রবেশ করবো, তত বেশি অর্থ বেরিয়ে আসবে।

প্রিয় পাঠকগণ! আমি যেমন আলোচনা করছিলাম যে এটি হল চার বেদের প্রথম মন্ত্র। ঈশ্বর আমাদের সবার আগে কী জানাতে চাইবেন? প্রথমে তিনি এটা জানাতে চাইবেন যে এই সৃষ্টি কী, যেখানে আমি আপনাকে পাঠিয়েছি। যতক্ষণ আমরা এটি জানবো না, ততক্ষণ এর সঠিক ব্যবহারও করতে পারবো না।

আধিভৌতিক অর্থ- এতে আমরা দুই ধরণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। এক হল আমরা কীভাবে জড় পদার্থগুলোকে কাজে লাগাতে পারি এবং দ্বিতীয়টি হল আমরা প্রাণী জগতের সাথে কীভাবে আচরণ করতে পারি বা এই সংসারে কীভাবে ব্যবহার করতে পারি। আমাদের ব্যবহার দুই প্রকারের হয়। একটি ব্যবহার হল আমরা সূর্য, অগ্নি, বায়ু ও জলের কীভাবে প্রয়োগ করবো? এটি এক প্রকার বিজ্ঞানেরই অংশ। একবার যখন আমরা সৃষ্টি বিজ্ঞানকে বুঝে নিবো, তখন এর ব্যবহার কীভাবে করতে হয় তাও বুঝে যাবো। আমরা যেমন বুঝে নিয়েছি যে একটি মোটরসাইকেল কীভাবে তৈরি হয়? তার কী কী অংশ বা কলকব্জা আছে- এটি হল একটি বিষয়। দ্বিতীয় বিষয় হল তাকে কীভাবে চালাতে হয়, কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা হল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়, কিন্তু কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা প্রত্যেক ব্যক্তিকে শিখতে হবে।

মানুষের প্রথম প্রজন্মের অন্তত এটুকু জ্ঞান তো ছিল যে তাদের কী খাওয়া উচিত, কী খাওয়া উচিত নয় এবং কীভাবে থাকা উচিত। তাদের সন্তান উৎপাদন, খাদ্য এবং আত্মরক্ষাদি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান ছিল। বস্তুতঃ স্বাভাবিক জ্ঞান পশু-পাখিদের মধ্যে আমাদের চেয়ে বেশি থাকে, কিন্তু মানুষের প্রথম প্রজন্মের মধ্যেও এই স্বাভাবিক জ্ঞান প্রচুর ছিল। যদি অনেক জ্ঞান না থাকতো, তাহলে তারা নিজেদের রক্ষাও করতে পারতো না। মানুষের আগে সিংহ, চিতার মতো হিংস্র প্রাণীরা জন্মেছিল, তারা তাদের খেয়ে ফেলতো। তাই আমি বলছি যে মানুষ যুবাবস্থায় উৎপন্ন হয়েছে। এ বিষয়ে কেউ জানতে চাইলে আমাদের ওয়েবসাইট vaidicphysics.org-এ আমার একটি নিবন্ধ আছে- 'বিকাশবাদের বৈদিক সিদ্ধান্ত'; মানুষ কীভাবে যুবাবস্থায় পৃথিবী থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তা আপনারা সেখানে পড়তে পারেন।

এখানে মন্ত্রের অর্থ হল যে, আমি এই প্রকার অগ্নির স্তুতি করছি, তাকে জানছি, তাকে জানতে চাইছি অথবা তাকে জানো এবং তাকে অনুসন্ধান করো। সবার আগে তাপ এবং বিদ্যুৎ বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে আসবে। যখনই মানুষ আগুন জ্বালানো আবিষ্কার করেছিল, সেটি সেই সময়ের জন্য অনেক বড় একটি আবিষ্কার ছিল। আজ মানুষ ভাবে যে এটি কোনো আবিষ্কারই নয়। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন যাদের প্রজন্ম আগুন দেখেইনি, তাদের জন্য আগুন জ্বালানো ছিল এক বিশাল আবিষ্কার। আমার এই কথা থেকে কেউ যেন না ভাবেন যে আমিও পাশ্চাত্য বিদ্বানদের মতো আদিম মানুষকে মূর্খ মনে করছি। না, তারা মূর্খ ছিলেন না, বরং বর্তমান মানুষের তুলনায় অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ছিলেন, তবুও তারা প্রযুক্তিকে ধীরে-ধীরে উন্নত করেছেন। এর অর্থ এই নয় যে এতে হাজার-হাজার বছর সময় লেগেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা নিজেদের বৈদিক মহান বিদ্যার বলে ধীরে-ধীরে আবিষ্কার করতে থাকেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এর ব্যবহার করাও ছিল এক বিরাট আবিষ্কার। এখন বিদ্যুতের ব্যবহার কোথায় কোথায় হবে?

ঋষি দয়ানন্দ তাঁর ভাষ্যে অনেক জায়গায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আকাশীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করো। সূর্যের রশ্মি থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে তার ব্যবহার করো। এইভাবে যখন সৃষ্টিকে জেনে নেওয়া যাবে যে এটি সৃষ্টি, এটি মন, এটি প্রাণ, এটি তাপ, এটি বাক্, তখন সে সেগুলো নির্মাণও করতে পারবে। অগ্নির উৎপত্তির কথা বলে সেই মানুষকে বলা হচ্ছে যে- তুমি আগুন আবিষ্কার করো, বিদ্যুৎ আবিষ্কার করো এবং সেগুলোকে কাজে লাগাও। এটি জগতের প্রথম আবিষ্কার। এর আগের আবিষ্কারগুলোতে কোনো অনুসন্ধানের প্রয়োজন ছিল না, কারণ তারা সেগুলো জানতো।

সেই যুবক মানুষটি সৃষ্টিতে এসে কী দেখবে? যখন মানুষ যুবাবস্থায় ভূ-গর্ভ থেকে বের হয়েছিল, তখন তার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছিল এবং তার চারপাশে ফল ছিল। সবার আগে যে মানুষরা এসেছিল, তারা ফলাহারী ছিল। যারা আজ বলে যে আগেকার মানুষ মাংসাশী ছিল এবং পাথর দিয়ে মেরে প্রাণীদের খেতো, এটি সেই মানুষদেরই চিন্তাধারা যারা নিজেরা মাংসাহারী হয়। তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন- মানুষ যদি পশুদের দেখে মাংস খাওয়া শিখে থাকে, তবে গরুর মতো ঘাস খাওয়া কেন শিখলো না? কেন সে গরু বা হিংস্র প্রাণীদের মতো চলাফেরা করা শিখলো না? প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল প্রথম প্রজন্মের উন্নত মানুষ, যাদের বুদ্ধি এতটাই বিকশিত ছিল যে তারা জানতো তাদের কী খাওয়া উচিত আর কী নয়। সবার আগে তারা ফলই দেখতে পেয়েছিল, তাই তারা ফল আহার করা শুরু করে। এর জন্য খুব বেশি খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন ছিল না, কারণ সম্পূর্ণ সৃষ্টিতে তখন বন, উদ্ভিদ, ফল এবং শাকসবজি আদি ছিল। এই কারণেই সে ছিল ফলাহারী। এরপর মানুষ দুগ্ধাহারী হয়, যখন সে পশু পালন শুরু করে।

পরমাত্মা প্রথম মন্ত্রে উপদেশ দিচ্ছেন যে, এই ফল আদি খেয়ে আরও এগিয়ে যাও, আগুনের ব্যবহার করো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করো। বিজ্ঞান জানে এমন যে কেউ বলে দিবে যে বিদ্যুৎ তো বর্তমান বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে। বস্তুতঃ এটি হল বৌদ্ধিক দাসত্ব এবং এর শিকড় অনেক গভীরে। তারা ভাবে না যে আমাদের দেশ কতটা মহান ছিল। এর জন্য আমি এই ধরণের বৌদ্ধিক দাসদের একটি পুস্তক পড়ার পরামর্শ দিবো- বিপ্লবী আর্য নেতা লালা লাজপত রায়ের পুস্তক 'দুঃখী ভারত', আর এই পুস্তকটি আমেরিকার এক সাংবাদিক মিস মেরি-র লেখা 'মাদার ইন্ডিয়া' পুস্তকের উত্তরে লেখা হয়েছিল। নামটি দেখে মনে হতে পারে যে সেই মহিলা ভারতের বড় ভক্ত ছিলেন, কিন্তু তিনি এতে ভারতকে একটি ক্ষুধার্ত, নগ্ন এবং অনেক মন্দের ও অজ্ঞানতায় ভরা দেশ হিসেবে প্রমাণ করেছেন। লালা লাজপত রায় তাঁর 'দুঃখী ভারত' নামক পুস্তকে এর উত্তর দিয়েছেন, যা দুটি খণ্ডে আছে। তাতে পড়ে দেখুন যে ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা কতটা পিছিয়ে ছিল, ইউরোপের দেশগুলো কতটা পিছিয়ে ছিল এবং সেই সময়ে ভারতের অবস্থা কেমন ছিল?

একবার লন্ডন থেকে এক ইঞ্জিনিয়ারের ফোন আমার কাছে আসে, সে প্রথমে অনেক প্রশ্ন করে তারপর আমি তাকে বোঝালাম, তখন সে আমার সাথে একমত হয়। সে বলে যে, 'আচার্য জী! আপনি এই নোংরা ইন্ডিয়াতে কীভাবে থাকছেন?' সে ভারতীয়, ইংল্যান্ডে থাকে আর ভারতকে 'ডাটি ইন্ডিয়া' বলে। আমি সেই যুবককে বললাম যে ইংল্যান্ড কবে থেকে উন্নত হয়ে গেল? এখানকার সম্পদ লুট করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ওটা খুব দরিদ্র দেশ ছিল। লালা লাজপত রায়ের পুস্তকটি পড়ে দেখো, ওখানকার কী পরিস্থিতি ছিল, তিনি প্রমাণসহ লিখেছেন। সেখানে কেমন দাসপ্রথা ছিল আর কেমন দারিদ্র্য ছিল।

আমি বললাম যে ইংল্যান্ড ধনবান্, এই জ্ঞান কবে হলো? আমি বললাম যে এটি সেই ইউরোপ, যার ধর্মগুরুরা গ্যালিলিওকে শাস্তি দিয়েছিলেন। এটি সেই ইউরোপ, যারা 1602 সালে ব্রুনোকে চৌরাস্তায় জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল, কারণ সে বলেছিল যে পৃথিবী ঘোরে, সূর্য নয়। ভারতে সবসময় বিজ্ঞানীদের সম্মান করা হয়েছে এবং ভারতে ঋষি-মুনিদের স্থান রাজাদের চেয়েও উপরে ছিল। মধ্যযুগীয় রাজারাও জ্যোতিষী, কবি ও সাহিত্যিকদের পুরস্কৃত করতেন আর ওখানে ইংল্যান্ডে সত্য কথা বলা এবং বিজ্ঞান চর্চার জন্য ফাঁসি দেওয়া হতো। হ্যাঁ, এটা অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক যে আজ ভারতে বৈদিক বিজ্ঞানের কোনো সম্মান নেই, বিশেষ করে সেই সব বৈদিক বিজ্ঞানীদের যারা পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের চেয়েও গভীর কথা বলেন। আমি নিজেও এর ভুক্তভোগী।

তবে এই কথা সত্য যে আমাদের দেশ বিদ্যুৎ বিদ্যা, বিমান বিদ্যা এবং শিল্প বিদ্যা আদিতে অত্যন্ত উন্নত ছিল, কখনো পুরনো ভবনগুলো গিয়ে দেখুন। এখানে জালোর জেলায় একটি 800 বছরের পুরনো কেল্লা আছে, যা তৎকালীন রাজা বীরমদেব সোনগরা নির্মাণ করেছিলেন। তার একটি দেয়ালে চুন দিয়ে প্লাস্টার করা হয়েছিল, যা আজও কাঁচের মতো চকচক করে। কেমন চুন ছিল আর কীভাবে প্লাস্টার করা হয়েছিল? আজ বিশ্বের কোন ইমারত আছে যার প্লাস্টার 100 বছর পরেও থাকবে? এমন কোনো ইমারত থাকবে না, কিন্তু এখানে হাজার-হাজার বছর পুরনো কেল্লা দাঁড়িয়ে আছে। মেহরৌলির প্রায় 1600 বছরের পুরনো যে লোহার স্তম্ভটি আছে, সেটি কোন ধাতু দিয়ে তৈরি যাতে মরিচা ধরে না? এমন ছিল ভারত এবং এটি তো মধ্যযুগীয় কথা। তাই এমনটা ভাবা উচিত নয় যে আগের মানুষ বিদ্যুৎ জানতো না, আগে কেবল মাংস খেতো, এমনটা নয়।

ইউরোপ এবং আমেরিকার লোকেরাও নিজেদের ভুলে গেছে। আমরা সবাই ঋষিদের সন্তান। এই কথা আপনাদের পূর্বপুরুষরাও ভুলে গেছেন এবং আমাদের পূর্বপুরুষরাও, কিন্তু সবকিছুর পরেও আমাদের পূর্বপুরুষরা এটি মনে রেখেছেন এবং ঋষিদের নাম সুরক্ষিত রেখেছেন, সাহিত্যকেও সুরক্ষিত রেখেছেন, কিন্তু তারা এগুলো বুঝতে পারেননি এবং বোঝাতেও পারেননি, এটা আলাদা কথা। তবুও তারা আজও সাহিত্যকে সুরক্ষিত রেখেছেন। ইউরোপের গ্রন্থাগারগুলোতে আজও আমাদের সাহিত্য আছে, যা তারা এখান থেকে নিয়ে গিয়েছিল। আমেরিকান বিদ্বান ডেভিড হ্যাচার চাইন্ড্রেসের পুস্তক 'অ্যান্টি গ্র্যাভিটি' পড়ে দেখুন, তবেই বুঝতে পারবেন ভারতের বিমান বিদ্যা বর্তমানের উন্নত বিমান বিদ্যার চেয়েও কত বেশি উন্নত ছিল।

এটি অত্যন্ত শোক ও আশ্চর্যের বিষয় যে কিছু নিরপেক্ষ বিদেশী বিদ্বান ভারতের অতীতের বৈজ্ঞানিক গৌরবের গুণগান করেন আর ভারতের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নিজেরই দেশের তথা বেদ ও ঋষিদের পেট ভরে নিন্দা করেন। একে পাগলামো ও বোকামি ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? হ্যাঁ, যদি কিছু বলা যেতে পারে, তবে কেবল রাষ্ট্রদ্রোহই বলা যেতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, এ ধরণের রাষ্ট্রদ্রোহীদের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়াতেও প্রচুর দেখা যাবে। বিদ্যুৎ ও তাপ খুঁজে বের করা এবং সেগুলোর ব্যবহারের বর্ণনা বেদের মধ্যে আছে এবং বিদ্যুৎ ও তাপ উভয়ই

কীভাবে পুরোহিতের কাজ করে, তা আমি আগেই বলেছি।

যজ্ঞ - মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদ-ভাষ্য 4.34 মন্ত্রে যজ্ঞের অর্থ করেছেন- 'বিদ্যাপ্রজ্ঞাপ্রবর্ধকম্ অনেকবিধব্যবহারম্' অর্থাৎ বিদ্যা বা প্রজ্ঞার বর্ধন করে এমন আচরণও যজ্ঞ হিসেবে গণ্য হয়। যজ্ঞের অর্থ হল- দেবপূজা, সংগতিকরণ এবং দান অর্থাৎ আমরা বিদ্বানদের সম্মান করি। যারা যেকোনো বিজ্ঞান জানেন, তাদের সম্মান করি। মনে রাখবেন, যে রাষ্ট্র বা সমাজে বিদ্যার সম্মান হয় না, বিদ্বান ও বিজ্ঞানীর সম্মান হয় না, সেই সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়।

আপনারা বিজ্ঞানীদের ভক্ত হোন বা অন্য কারো, বাস্তবে আপনারা জ্ঞানেরই ভক্ত হন, মূর্খের কোনো ভক্ত হয় না। এটি আলাদা কথা যে বিজ্ঞানীরা অর্ধেক জানেন আর অর্ধেক জানেন না, তবুও তারা জ্ঞানী হন। তারা দিনরাত পরিশ্রম করেন, তারা সম্মানের পাত্র এবং আমাদের তাদের সম্মান করা উচিত- এটিও একটি যজ্ঞ। কিন্তু আপনারা বেদের সম্মান করছেন না, বৈদিক বিজ্ঞানীর সম্মান করছেন না, এটি হল আপনাদের অজ্ঞতা। এতে আমি আপনাদের দোষও দিবো না, কারণ বেদের নামে মধ্যযুগে যা হয়েছে এবং আজ যা হচ্ছে, তা দুর্ভাগ্যজনক। যা বেদ নয়, তাকে বেদের নামে প্রচার করা হচ্ছে। বেদ যেমন নয়, তাকে সেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাই এতে বেদের নিন্দা যারা করছেন তাদের কোনো দোষ নেই। আজ দোষ সেই বিষয়ের যে আমাদের মধ্যযুগীয় পূর্বপুরুষেরা যে ভুল করেছিলেন বা যে অজ্ঞতায় ভেসে গিয়েছিলেন, তার পরিণাম আজ আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে।

যে গ্রন্থের ভিত্তিতে কিছু লোক নির্মমভাবে পশু হত্যা করে, মানুষের বলি দেয়, অস্পৃশ্যতা পালন করে, নারীদের সঙ্গেও বৈষম্য করে, সেই গ্রন্থ নিশ্চিতভাবেই ভালো নয় এবং এটি বেদের নামে হয়েছে; ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, মনুস্মৃতি এবং অন্যান্য গ্রন্থের নামে হয়েছে। রামায়ণ, মহাভারতেও ভুল তথ্য মেশানো হয়েছে, কাকে বাদ দেওয়া হয়েছে? তাই সমালোচনাকারী বামপন্থী হোক, খ্রিস্টান হোক, মুসলিম হোক বা অন্য কেউ, তাদের আমি ততটা দোষী মনে করি না, যতটা দোষী তারা যারা এই গ্রন্থগুলো না বুঝে বা ভুল বুঝে প্রচার করতে থাকে এবং বলতে থাকে যে বেদ আমাদের হিন্দুদের, অন্যদের নয় এবং অন্যদের নিজের শত্রু বানিয়ে নেয়। ঋষি দয়ানন্দ বুঝিয়েছিলেন যে বেদ সবার জন্য। কোনো এক মহিলা একটি প্রশ্ন করেছিলেন-

প্রশ্ন- স্ত্রীরা কি 'ওম্' জপ করতে পারবে?

উত্তর- 'ওম্' জপ করা, গায়ত্রী মন্ত্রের জপ করা, বেদ পড়া ও পড়ানো- এই সবকিছুর উপর প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে। যেমন পরমাত্মার দেওয়া জল, হাওয়া, আকাশ, ভূমি, সূর্যের আলো, চাঁদের আলো আদি সবার জন্য, ঠিক তেমনই বেদও সবার জন্য। তাই মধ্যযুগে যা ঘটেছে তা দুর্ভাগ্যজনক এবং আপত্তিকর ছিল। এরই কারণে বেদ কলঙ্কিত হয়েছে এবং বেদের বিরুদ্ধে অনেক মত-মতাস্তর সৃষ্টি হয়েছে। তাই যে সমাজ বা রাষ্ট্রে জ্ঞানের বিরোধিতা হয়, জ্ঞানীর পূজা হয় না, সেই সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায় অর্থাৎ ধ্বংস হয়ে যায়। মধ্যযুগে এটাই ঘটেছিল, তাই ভারতের পতন হয়েছিল।

সেই ভারত, যা সারা বিশ্বের আদর্শ ছিল, সারা বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র ছিল, সবার গুরু ও পথপ্রদর্শক ছিল, সবাইকে নিয়ন্ত্রণে রাখতো, সে নিজেই যদি অবিদ্যাগ্রস্ত হয়ে যায়, বেদ বিদ্যাবর্জিত হয়ে যায়, সেখানে যদি বেদের নামে, ভগবান মনু এবং ঋষি-মুনিদের নামে অত্যাচার হতে শুরু করে, তবে বিশ্বের অবস্থা কী হবে, তা কি কল্পনা করা যায়? যখন গুরু নিজেই বিপথগামী হন, তখন শিষ্য কী করবে? যখন রাজা নিজেই বিগড়ে যান, তখন প্রজা কী করবে? তাই নারী হোক বা পুরুষ, সে যেকোনো দেশের বাসিন্দা হোক বা যেকোনো ভাষায় কথা বলুক, যেকোনো বর্গ বা মজহবের হোক, যদি তার বুদ্ধি বোঝার এবং পড়ার যোগ্য হয় তবে সবারই বেদ পড়ার অধিকার আছে।

দুঃখের বিষয় হল, ভগবতী উমা, অপালা, ঘোষা, লোপামুদ্রা, অনসূয়া, সীতা, সাবিত্রী, গার্গী, মৈত্রেয়ী, কুন্তীর মতো মহান বেদবিদুষীদের (বেদজ্ঞ নারী) দেশে সবার জননী নারী জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পাপ করা হয়েছে। ধন্য ঋষি দয়ানন্দ, যিনি এই পাপকে ধুয়ে ফেলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন এবং আর্য সমাজ সেটি দূরও করেছে। আজ এই পর্যন্তই। ওম শম।61

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ঋগ্বেদ ৯/১৩/৯

ঋষি | দেবতা | ছন্দ | স্বর অসিতঃ কাশ্যপো দেবলো বা ঋষিঃ॥ পবমানঃ সোমো দেবতা॥ ছন্দঃ—১— ৩, ৫, ৮ গায়ত্রী। ৪ নিচৃদ্ গায়ত্রী। ৬ ভুরিগ্গায়ত্রী। ৭ ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ